Saturday, August 3, 2024

বাংলাদেশে আন্দোলনের সমর্থনে রেমিট্যান্স বর্জন নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা :নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদন

নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলমান ভয়াবহ প্রতিবাদ বিক্ষোভকে সমর্থন দিতে বিদেশি রেমিট্যান্সকে নতুন এক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন সমালোচকরা। তারা এই সহিংসতাকে রাষ্ট্র আরোপিত বলে অভিহিত করছেন। এ  উদ্যোগের আয়োজকরা বিদেশে অবস্থানরত প্রায় এক কোটি বাংলাদেশির প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন দেশে রেমিট্যান্স না পাঠাতে। এসব প্রবাসী মাসে প্রায় ২০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠান। বর্তমান সরকার অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়ে গত বছর আইএমএফের কাছে ঋণ চাইতে বাধ্য হয়, এমন অবস্থার মধ্যে প্রবাসীরা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বৈদেশিক মুদ্রার উৎস হলো রেমিট্যান্স। এ উদ্যোগের আয়োজকদের একজন ইউরোপে একটি টেলিকম কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ফয়েজ আহমেদ তৈয়ব। তিনি বলেন, রেমিট্যান্স কমিয়ে দিয়ে স্বৈরাচার সরকারের অর্থনৈতিক লাইফলাইন কেটে দিতে পারি আমরা। নতুন এই উদ্যোগে সমর্থন করছেন বেশ কিছু সুপরিচিত বাংলাদেশি প্রবাসী। তার মধ্যে আছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একজন সাংবাদিক। তিনি এর আগে একটি টেলিভিশনে সাংবাদিকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি ক্ষমতাসীন সরকারের কড়া সমালোচক। ইউটিউবে আছেন তার কমপক্ষে ২০ লাখ ফলোয়ার।

দেশে যুবকদের মধ্যে বেকরত্ব  আকাশচুম্বী। এমন অবস্থায় সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের আহ্বান জানান শিক্ষার্থীরা ও অন্য প্রতিবাদকারীরা। গত মাসে সেই দাবিকে সামনে রেখে প্রতিবাদ বিক্ষোভ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এরপর কমপক্ষে ২০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেখা দেয় ভয়ঙ্কর অস্থিরতা। তাদেরকে কঠোর হস্তে দমন করে সরকার। এর জন্য দেশে ও বিদেশে তীব্র নিন্দা জানানো হচ্ছে। ওদিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে হাজারো মানুষকে। বিরোধী দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে এ বছর বিতর্কিত নির্বাচনে টানা চতুর্থ মেয়াদে পুনঃনির্বাচিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার।  তারা সহিংসতার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে তাদেরকে এবং তাদের ছাত্র সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে। উল্লেখ্য, তীব্র প্রতিবাদের পর ২০১৮ সালে চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। কিন্তু জুনে তা পুনর্বহালের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। কোটা কমিয়ে আনতে যখন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সরকার রাজি হয়, তখন কারফিউ চলতে থাকে এবং জনগণের মধ্যে ক্ষোভ উচ্চ পর্যায়ে রয়ে যায়।

বুধবার ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বলেছে, অস্থিরতায় ঢাকা যেভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে তার কড়া সমালোচনা করে তারা। এরপরই বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন সহযোগিতামুলক চুক্তির আলোচনা স্থগিত করে তারা। দুই বছর আগে বাংলাদেশের রিজার্ভ প্রায় ৪৯০০ কোটি থেকে কমে দাঁড়ায় ১৮০০ কোটি ডলারে। এমন অবস্থায় বৈদেশিক রিজার্ভ সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করছে বাংলাদেশ। গত বছরে  প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪০০ কোটি ডলার। তারা যে অর্থ পাঠান তাতে সরকারি ট্যাক্স থেকে এই আয় আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডজাঙ্কট ইন্সট্রাক্সটর অব বিজনেস অ্যানালাইটিসের শাফকাত রাব্বি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য তেল বিক্রি করে যেমন আয় হয়, বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্সও তেমন। রেমিট্যান্স কমে গেলে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।

এই বর্জন আন্দোলনের আরেকজন নেতা টোকিও ভিত্তিক তৈরি পোশাকের মার্চেন্ডাইজার সাদ্দাম হোসেন।  জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াতে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের প্রতি তিনি আহ্বান জানাচ্ছেন অস্থায়ীভিত্তিতে অর্থনৈতিক সঙ্কট থাকা সত্ত্বেও দেশে বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের কাছে অর্থ পাঠানো বন্ধ রাখতে। তিনি বলেন, আমি এটা করছি আমার মাতৃভূমির জন্য। শিক্ষার্থীদের হত্যা করে এই স্বৈরাচার সরকার সকল বৈধতা হারিয়েছে।
তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বন্ধ রাখাকে দেশদ্রোহিতা এবং দীর্ঘ মেয়াদে অবাস্তব বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, দেশে অবস্থানরত আত্মীয়রা এই অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বৈধ চ্যানেল পরিহার করার আহ্বানের মাধ্যমে তারা অবৈধ উপায়কে উৎসাহিত করছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি রেমিট্যান্স এড়াতে অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের উল্লেখ করেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই প্রচারণার ফলে সরকারের শীর্ষ স্থানীয় মন্ত্রীরা দেশে অর্থ পাঠাতে প্রবাসীদের অনুরোধ করছেন। কোনো কোনো ব্যাংক রেমিট্যান্স আসা বৃদ্ধির জন্য ডলারের মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা এরই মধ্যে সতর্কতা দিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক প্রতিবাদ বিক্ষোভ, কারফিউ এবং সরকারের নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ায় প্রায় ১০০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ একটি বিনিয়োগের স্থান এমন মর্যাদা হুমকিতে পড়েছে।
বর্তমানে এটা পরিষ্কার নয় যে, কি পরিমাণ প্রবাসী বাংলাদেশি রেমিট্যান্স বর্জন আহ্বানে অংশ নিচ্ছেন এবং কি পরিমাণ রেমিট্যান্স কমতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্ট বলছে,  ১৯শে জুলাই থেকে ২৪শে জুলাই পর্যন্ত মাত্র ৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা একদিনের রেমিট্যান্সের সমান। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মেজবাহ উল হক বলেন, বিক্ষোভের সময় ৫ দিন ইন্টারনেট বন্ধ  থাকার কারণে দ্রুত রেমিট্যান্সের এই পতন হয়ে থাকতে পারে। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান বলেন, রেমিট্যান্স বর্জনের ফলে এই অবস্থা কিনা তা এখনই বলা যাবে না। কিন্তু যারা রেমিট্যান্স পাঠান তাদের ভগ্নাংশও যদি দেশে অর্থ পাঠানো থেকে বিরত থাকেন, তার মানে হবে বৈদেশিক মুদ্রার  বিনিময় কম আসবে। এর ফলে দেশীয় মুদ্রা টাকার ওপর নিম্নমুখী চাপ বাড়বে। যদি রেমিট্যান্স অর্ধেক কমে যায় তাহলে বাংলাদেশ অস্বচ্ছল হয়ে পড়বে। স্থানীয় মুদ্রা ‘ক্র্যাশ’ করবে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিক্ষাবিদ রাব্বি।
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট জাভেদ  আখতার সতর্কতা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া সবে আসছে। বিক্ষোভ অব্যাহত থাকলে পুরো ক্ষতি আরও বড় হতে পারে। তবে সরকার আন্দোলন রুখে দিলে রেমিট্যান্স বর্জন হিতে বিপরীত হতে পারে। ঢাকা ভিত্তিক অর্থনীতিবিদ রুবাইয়াত সারওয়ার বলেন, বর্তমান অবস্থা জটিল। তীব্র চাপ রয়েছে। এটাকে সরকার নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘাত বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

ঢাকার পয়েন্টে পয়েন্টে বিক্ষোভ-অবস্থান

রাজধানীর আফতাবনগর, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মিরপুর-১০ ও সায়েন্সল্যাব, শহীদ মিনারে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। শনিবার সকাল থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা এ বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নেন তারা।

আফতাবনগরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা কর্মসূচিতে অংশ নিতে জড়ো হয়েছেন কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে রামপুরার আফতাবনগরের জড়ো হন তারা। এ সময় ব্যাপক পুলিশ সদস্যের অবস্থানও লক্ষ্য করা যায়। কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রাজধানীর বাড্ডা রামপুরা সড়কে অবস্থান নিয়েছেন। এ সময় বাড্ডা থানার অর্ধশতাধিক পুলিশ রাস্তা থেকে সরে গেছে।

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ইউআইটিএস ও সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যোগ দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অংশ নিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, এদিন সকাল সাড়ে ১১টা থেকে শিক্ষার্থীরা অবস্থান শুরু করেন। পরে ১১টা ৫০ মিনিটে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী একযোগে ৯ দফা দাবি আদায়ে স্লোগান দেয়া শুরু করেন।

তারা বলেন, ‘নয় দফা আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরবো না। দেশজুড়ে আমাদের ভাই-বোনদের হত্যা করা হয়েছে। সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।’

বনশ্রী বি ব্ল‌কের সাম‌নে আইডিয়াল স্কু‌লের শিক্ষার্থী অভিভাবকরা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগন দিতে থাকেন। এছাড়া সায়েন্সল্যাবে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’সহ নানা স্লোগান দিচ্ছেন তারা। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে সকাল থেকে অনেক পুলিশ সদস্যকে অবস্থান করতে দেখা গেছে।

এদিকে রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে অবস্থান নিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। দুপুর ১২টার দিকে বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হতে শুরু করেন। পরে দুপুর ১টার দিকে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্রে করে সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করে 'আমার ভাই মরল কেন'সহ বিভিন্ন শ্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। রাজধানীর শনির আখড়ায় সড়কে অবস্থান নিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা নানা ধরনের স্লোগান দিচ্ছেন। রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়িতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

উল্লেখ্য, সারা দেশে আজ শনিবার বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গতকাল শুক্রবার রাত পৌনে ৮টার দিকে ফেসবুক লাইভে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান।

একইসঙ্গে আগামীকাল রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন তারা। ‘সারা দেশে ছাত্র-নাগরিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে খুনের প্রতিবাদ ও ৯ দফা’ দাবিতে এই কর্মসূচির ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

ফেসবুক পোস্টে যা লিখেছেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া

অনেক হয়েছে, অন্ধ উন্মত্ততার এবার অবসান জরুরি। এমন মন্তব্য করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। শুক্রবার (০২ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের আইডি থেকে (ইংরেজি এবং বাংলায়) এক পোস্টে তিনি লিখেছেন,

"যথেষ্ট হয়েছে। এই অন্ধ উন্মত্ততার অবসান জরুরী। আমাদের সন্তানদের উপর গুলি চালানো, তাদের অপহরণ, গণগ্রেফতার ও নির্যাতন এখনই বন্ধ করুন।"

এর আগের দিন (০১ আগস্ট) আরেক পোস্টে (ইংরেজি এবং বাংলায়) তিনি লিখেছেন, "আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে, বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে তাজা প্রাণ উৎসর্গকারী শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করছি।"

এটাই প্রথম নয়, ২০১২ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইকবাল করিম ভূঁইয়া এর আগেও বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। সম্প্রতি, শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে নিজের ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার এবং কাভার ফটো লাল রঙে পরিবর্তন করে তিনি আলোচনার শীর্ষে চলে আসেন।

উল্লেখ্য, জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জন্ম ১৯৫৭ সালের ২ জুন কুমিল্লায়। কুমিল্লা জিলা স্কুল এবং ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে তার পড়ালেখা। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশন পান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। নবম পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়কের ভূমিকায় ছিলেন তিনি। ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে কুয়েত সরকার তাকে লিবারেশন অব কুয়েত মেডেল প্রদান করেছিল।

সাক্ষাৎকার: ছাত্র-যুবকরা মরে যায়নি, আন্দোলনে প্রমাণিত -বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী

সাধারণ ছাত্ররা কোটার সংস্কার চেয়ে আন্দোলন শুরু করেছে। যেটি খুব স্বাভাবিক। আমার এতদিন মনে হয়েছিল যে এ দেশে ছাত্র-যুবক মরে গেছে। এ আন্দোলনে প্রমাণ হয়েছে যে ছাত্র-যুবক কখনো মরে না। তারা হয়তো স্তিমিত হয়ে থাকে, ঝিমিয়ে থাকে, নুয়ে থাকে কিন্তু তারা কখনো মরে না। নির্লোভ ছাত্ররা মরে গেলে জাতি-দেশ বেঁচে থাকে না। দেশে চলমান ছাত্র আন্দোলন নিয়ে মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনই মন্তব্য করেছেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। রণাঙ্গণের এ মুক্তিযোদ্ধা বলেন, যে নেতার নেতৃত্বে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি, তার-ই কন্যা হিসেবে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে ২০০ হোক আর দুইজন হোক- একটা প্রাণও ঝরা উচিত না। বাংলাদেশের অর্ধেক ধ্বংস কিংবা পুরো ছারখার হয়ে গেলে- বাড়িঘর, গাড়ি, স্থাপনা সবই করা যাবে কিন্তু এ পৃথিবীতে একটি মানুষও জন্মায়নি যিনি একটা মৃত মানুষকে জীবিত করে দিতে পারে। তাই আমি মনে করি একটা কেন দশটা দেশ ধ্বংসের চেয়ে একটা প্রাণ ধ্বংস অনেক বড় জিনিস। সেটা করা বা হওয়া উচিত না।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে অনেকের কানে পানি যায় না। এ যে শিক্ষকদের আন্দোলনের দাবিও যৌক্তিক। এ জিনিসগুলো খুব তলিয়ে দেখা হয় না। রাষ্ট্রের যেভাবে গভীরভাবে তলিয়ে দেখা দরকার সেভাবে দেখা হয় না। সেটাই হচ্ছে অসুবিধা। ছাত্রদের আন্দোলনটা গোড়াতেই মনযোগ দেয়া উচিত ছিল। ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল।
বঙ্গবীর বলেন, আমি ছাত্রলীগ করা মানুষ। আমাদের সময় ছাত্রদের প্রতি দেশের মানুষের যে আস্থা, ভালোবাসা, ভরসা ছিল- এখন তার বিন্দুমাত্রও নেই। ইতিহাস ঘুরে ফিরেই আসে। ষাটের দশকে মোনায়েম খান বলে আইয়ুব খানের একজন প্রিয় মানুষ ছিলেন। মোনায়েম খানের ছাত্র সংগঠন ছিল এনএসএফ। আমাদের বিরুদ্ধে লাঠিসোটা নিয়ে অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছে। পুলিশ আজকের দিনের মতো সাহায্য করেছে। একটা সময় সমস্ত দেশের ছাত্ররা একজোট এক প্রাণ হয়ে গেছে তখন তুলার থেকেও হালকা হয়ে উড়ে গেছে।

শিক্ষার্থীদের প্রধানমন্ত্রীর রাজাকার বলার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটা খুবই ভালো কাজ হয়নি। আমি আমার বোনকে বলেছি। কখনো কখনো শোনেন কখনো শোনেন না। উনি যদি পরদিন ক্ষমা চাইতেন যে আমি এভাবে বলিনি। তখন দশ ভাগের একভাগ আন্দোলন হতো না।

পুলিশের গুলিতে নয়, সহিংসতায় ছাত্র-জনতা নিহত হয়েছেন বলে সরকারের দাবির বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, তারা সহিংসতায় নয়, ঘরের বারান্দায় যে গুলিতে নিহত হয়েছেন। সেখানে হেলিকপ্টার থেকে গুলি ছুঁড়ছেন মারা গেছে। মিথ্যা অজুহাত দিয়ে কেউ পার পেতে পারে না। সরকারকে বলবো এখনো সময় আছে সত্য বলার সাহস দেখানো উচিত। যার সত্য বলার সাহস নেই তার কোনো কিছু করার ক্ষমতা নেই। হয়তো সাময়িক কিছু হতে পারে। আন্দোলনকারীদের হাতে ইটপাটকেল, লাঠি, ছুরি থাকতে পারে। কিন্তু তাদের কাছে ছররা গুলি নেই। ন্যায়বিচার নাই বলে এত অশান্তি। তিনি বলেন, ভুল স্বীকার করার মতো শক্তিশালী অস্ত্র দুনিয়াতে আর কিছু নেই। ভুল স্বীকার করলে সাময়িক একটা চাপ হতে পারে। কোনো কোনো সময় মাপ চাওয়ার ফলে দুই-তিন কিংবা দশগুণও শক্তি বৃদ্ধি পায়। সে সময় আমার বোন শেখ হাসিনা হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু তিনি করতে পারতেন এখনো করতে পারেন। কিন্তু ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়ার মতো জঘন্যতম অপরাধ আর হতে পারে না। আমার তো ধারণা ছিল যে ছাত্রলীগও এ আন্দোলনের পক্ষে গিয়ে এ আন্দোলনকে জোরদার করে সফলকাম করবে। এবং সেই আন্দোলনে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দেবে। এখন তো নেতৃত্ব দেয়ার চাইতে বিরুদ্ধে চলে গেছে। আজকে ছাত্রলীগের কোনো সম্মান নেই। আমি কখনো ভাবিনি ছাত্রলীগের সভাপতির কক্ষ তছনছ করা হবে। মানুষের শক্তির কাছে কোনো শক্তির টিকবার ক্ষমতা নেই। এটা আনবিক বোমার চেয়েও শক্তিশালী। তিনি বলেন, গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, সবাই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছে। আগেও ১৬ কি ২১ বছর বিএনপি ক্ষমতায় ছিল- সবাই বিএনপি হয়ে গেছে। এটা একটা জাতির জন্য শুভ না। বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা ১৪ দল দেশ না। ১৮ কোটি মানুষ নিয়ে দেশ।

ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়ককে ডিবিতে আটকে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ৬ সমন্বয়ককে নিরাপত্তার জন্য ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখা হয়েছে। এটা কী কোনো আইনের কথা? নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেখবে। ডিবির উপ-কমিশনারের (হারুন-অর-রশিদ) দেখবার কী আছে? এর জন্য ওই পুলিশ কর্মকর্তার জেল হওয়া উচিত। রাষ্ট্র আইন ও সংবিধান অনুযায়ী চললে একজন নাগরিককে আটকিয়ে রাখার সুযোগ নেই। আজ হারুন যেটা করছে, বেনজীর আহমেদ (সাবেক আইজিপি) কী সেটা করেনি ৫-৭ বছর আগে। বেনজীরের যে অবস্থা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছর পর কী হারুনের তার থেকে খারাপ অবস্থা হতে পারে না? আমি বলবো, এত বাড়াবাড়ি ভালো না।

কোটার বিষয়ে তিনি বলেন, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন ৭ শতাংশ। ছাত্ররাও ৯৩ শতাংশ চায়নি। পিছিয়ে পড়া বহু মানুষ আছে তাদের জন্য কোটা থাকা উচিত। মুক্তিযোদ্ধাদের পাঁচ শতাংশও সম্মানজনকভাবে দিলে এতেই মুক্তিযোদ্ধারা খুশি। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলেরা ভিক্ষা চায়নি। এখানে অনেক প্রশ্ন আছে। মেধাহীনদের জন্য কোনো কোটা নেই। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা ভোগাস, মশকারি। আমরা দেখেছি স্বাধীনতার পর থেকে কখনো কোটার থেকে ১৩ শতাংশের ওপরে নেয়া যায়নি। কারণ কোটায় পাশ করার লোক নেই। কোটার সুবিধা এর বেশি নয়। ছাত্রদের আন্দোলন করা উচিত ছিল যে ছাত্রলীগের কোটা বন্ধ করতে হবে। অথচ যারা স্বাধীনতা এনেছেন, রক্ত দিয়েছেন, যাদের সম্মান থাকার কথা- সেই মুক্তিযোদ্ধরাই আজকে কিন্তু বিতর্কিত হয়েছে। অসম্মানিত হচ্ছেন। আজ বঙ্গবন্ধুর গায়ে ঢিল ছুঁড়ছে, শাবল মারছে, লাথি মারছে- এত মনে হয় আমার গায়ে মারছে। মুসলমান হিসেবে কোনো প্রতিমা-মূর্তি পছন্দ করি না। কিন্তু যারা বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল বানিয়েছেন তারা যদি সেই ম্যুরালের সম্মান রাখতে না পারেন তখন এটা বানিয়ে কী করেছেন। মোটেই ভালো কাজ করেননি। সাধারণ ছাত্রদের বলবো- সরকারি কোটা বন্ধের দাবি করতে হবে। যে যখন সরকার তখন সেই সরকার তার লোককে যোগ্য হোক অযোগ্য হোক নিয়োগ দেয়। কাদের সিদ্দিকী বলেন, পাকিস্তান বৈষম্য না করলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ হতো না, এত রক্ত-জীবন দিতে হতো না। আরও বৈষম্য ছিল ৯৮ শতাংশ আসন পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। সে সময় ভোটের রায় মানা হয়নি সে জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল।

কাদের সিদ্দিকী বলেন, এক সময় ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগের নেতৃত্ব করতেন। তার নেতৃত্বের প্রশংসা শুনেছি। কিন্তু এখন তিনি সেই প্রশংসার কাজ করেন না। যত অঘটন তার অনেক বেশি দায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলা এবং গুলির নির্দেশ দেয়া। তার গুলির নির্দেশ দেয়ার সুযোগ নেই। যদি দিতে হয় যারা আইনানুগ ক্ষমতাপ্রাপ্ত তারা বলবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশ অসম্ভব। যদি সরকার গুলির নির্দেশ দিলো আবার শোক পালনের মানে কী হয়? এটা সাংঘর্ষিক। হ্যাঁ, যদি সরকার না দিতেন তাহলে ভিন্ন কথা। এ যেমন কারফিউ জারি হয়েছে- সেখানে গুলি হলে সেখানে সরকার করতে পারতেন। সরকারি দলের সরকার হওয়া উচিত না, সরকার দেশের মানুষের হওয়া উচিত। যারা আন্দোলন করছে তাদের কিংবা যারা ফিরাচ্ছে তাদের সবার হওয়া উচিত। এবার দেখা যাচ্ছে সরকার আন্দোলনকারীদের পক্ষে না। আন্দোলনকারীদের প্রতিও যে তাদের দায় দায়িত্ব আছে সেটার পরিচয়ও দিতে পারেনি।

ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে তিনি বলেন, সব সময় সব মানুষের কার্যক্ষমতা এক থাকে না। আমি মুক্তিযুদ্ধে একটা ভয়াবহ অবস্থায় রুখে দাঁড়াতে পেরেছিলাম। আজকেও যে পারবো সেটাতো সত্য নয়। ওবায়দুল কাদের একটা সময় সত্যিই ছাত্রদের উদ্দীপ্ত ও সংগঠিত করেছেন। এখন তার সেই ভাবমূর্তি নেই। আরেকটা বিষয় হচ্ছে তিনি প্রচণ্ড রকম অসুস্থ। কয়েকদিন আগেও বলেছিলাম তাকে ডাক্তারের পরীক্ষা করে দেখা উচিত। তিনি এবার সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তার কথাগুলো বাস্তবের সঙ্গে মিলছে না। মানুষকে টানছে না। আকৃষ্ট করছে না। রাজনৈতিক নেতার কথায় মানুষকে আকৃষ্ট করতে হয়। বন্দুক কামান দিয়ে তিনি সবকিছু দখল করে নেবেন এটা হবে না। জয় করতে হবে কথা ব্যবহারের মাধ্যমে। সেখানে ত্রুটি হচ্ছে। এমনকি আমি একটি লেখায় তাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার কথাও বলেছি। সাধারণ মানুষ থেকেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ২০-৩০ গুণ বেশি ক্ষুব্ধ ওবায়দুল কাদেরর প্রতি। এটা কী করবেন- যখন কেউ পিছিয়ে আসে বা তাকে পছন্দ না হয় তাহলে তাকে তো সরিয়ে দিতে হবে, বা পিছনে দিতে হবে।
সরকারি স্থাপনায় হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, সেতু ভবনের জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভিডিও দেখলাম। এটা দেখে মনে হয়েছে যে তারা কী আগ থেকেই এটা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল। ক্যামেরায় দেখা যাচ্ছে ২০-২৫ জন লোক সেটি করেছে। কিন্তু ওই ভবন পাহারা দেয়ার জন্য কম করে ৫০ জন আনসার ছিল, পাহারাদার ছিল। গাড়িগুলোর ড্রাইভার ও সহযোগী ছিল। একটা মানুষও তো বাধা দেয়নি। তাহলে এটা কী? যারা ওখানে আছেন তারা তো রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার কোনো চেষ্টা করেননি। আবার ওটার জন্য আন্দালিব রহমান পার্থকে (বিজিপির চেয়ারম্যান) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ জ্বালাও পোড়াওয়ের সঙ্গে ওর যে চরিত্র আমরা দেখেছি এ কুকাম করার মতো অবস্থা ওর নেই। তাহলে দেশটা কোন ভাবে চলছে।

গণহারে গ্রেপ্তারের বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, বড় কিছু হলে ছোট জিনিস দেখতে নেই। এ রকম একটা বড় ঘটনায় একটা মানুষকেও আর গ্রেপ্তার করা সরকারের জন্য উচিত না। এটার পরিণতি ভয়াবহ হবে। আজকে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হয়তো এ আন্দোলনের সঙ্গেও নেই। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর সরকারের বিরুদ্ধে এবং বিরোধীদের পক্ষে যাবে। এটা ক্ষতির কারণ হবে। নিজে চোখে দেখেছি অনেক মা-বাবা তাদের সন্তান নিয়ে রাস্তায় এসেছেন। ১৯৬৯ সালে যখন আইয়ুব খানের পতন হলো তখন আমি জেলে ছিলাম। আমাদের কারও কারও নামে ৮০-৯০টা মামলা ছিল। আইয়ুব খান যখন চলে গেলেন তখন সবকিছু কিন্তু বাতিল হয়ে গেল। এ আন্দোলনের জন্য একজন মানুষকেও আর গ্রেপ্তার করা উচিত না। বিএনপি, জামায়াত, শিবির- আন্দোলনের জন্য তাদেরও গ্রেপ্তার করা উচিত না। যদি দেশে শান্তি, সমৃদ্ধি চান। বলতে পারেন- যারা এসব করেছে তাদের শাস্তি দিতে হবে না? হবে। তবে যখন হাজার মানুষ মিলে কোনো ঘটনা ঘটায় তখন ওই ঘটনায় হাজার মানুষকে আর বিব্রত করা হয় না।

তিনি বলেন, বিরোধী মত প্রকাশ করলেই ট্যাগ দিয়ে দেয়া ভালো না। বাংলাদেশটা শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের বা রাজাকারের না। বাংলাদেশটা বাংলাদেশের মানুষের। নিশ্চয় মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদা সম্মান থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে রাজাকার বলে কেউ নেই। রাজাকারের মানসিকতা থাকতে পারে। চিন্তা চেতনা ধারণ করতে পারে।

আন্দোলন নিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনটি অল্প সময়ে গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে। কিন্তু এখন আন্দোলনটি যারা রিয়েল আন্দোলন করছে তাদের হাতে নেই। সরকার যেমন বলছে বিএনপি-জামায়াত, শিবির এটা করছে। তাদের যদি এত শক্তি থাকতো তাহলে আমাদের আওয়ামী লীগের সরকার থাকার কথা ছিল না। তাদের একটা নেতাকর্মীরও ঘুমানোর কথা ছিল না। এতটা শক্তি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে নেই। মানুষের মধ্যে একটা বিক্ষোভ-জ্বালা, এ আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়েছে। এখন যদি ছাত্রবন্ধুরা এটা এগিয়ে নিতে চায় তাহলে তারা ফেইল করবে। তাদের সঙ্গে মানুষ একাত্মতা ঘোষণা করেছে। এ সরকারকে যা খুশি করা বা বলা যায় এটা যে ঠিক না এটাকে বুঝানোর জন্য কিন্তু মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। যদি সরকারই সমন্বয়কদের ধরে নিয়ে না যেতো, বাচ্চাদের গ্রেপ্তার না করতো।

সমাধানের বিষয়ে কাদের সিদ্দিকী বলেন, স্পষ্ট বলতে হয়- রাজনীতির মাধ্যমে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার বোন প্রথমে ডেকেছেন ব্যবসায়ীদের। তারা কি সরকারকে রাখতে পারবে? তারা নাকি সর্বস্ব দিয়ে এ সরকারকে রাখবে। তাহলে এটা কি ব্যবসায়ীর সরকার। আমরাতো জনগণের সরকার চাই। তাহলে আমরা ভুল করছি। তিনি যত তাড়াতাড়ি সবাইকে ডাকবেন তিনি একটা শ্বাস নেয়ার সুযোগ পাবেন। সবাই তার ডাকে সাড়া দিক আর না দিক। সব কাজে সবাইকে যেতে হয় না, যায়ও না। কিন্তু ডাকতে হয়। দেশ যখন সবার তাহলে সবাইকে নিয়ে সংলাপে যেতে হবে। দেশ আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলের না কেবল। আওয়ামী লীগ ছাড়া ১৪ দল ১৪ ভোটও পাবে না। এখন যে অবস্থা আওয়ামী লীগের নৌকাও পার পাবে না। হাঁটু পানিতে পড়ে যাবে। তাই বাস্তবকে স্বীকার করতে হবে। বঙ্গবন্ধু যত প্রিয় ছিলেন তার জন্য মানুষ নামাজ পড়েছেন। সেই বঙ্গবন্ধুকে আজ গালি দিচ্ছে। এটা কি তার কারণে না আমাদের কর্মকাণ্ডের জন্য দিচ্ছে। আমরা আমাদের দোষে এ রকম একজন মহান নেতাকে দোষী করছি। এটাতো ভালো কাজ না।
জামায়াত নিষিদ্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, জামায়াত নামের একটি দলকে নিষিদ্ধ করবেন। কিন্তু তাদের বিদ্যা, বুদ্ধি, অর্থ, সামর্থ- এগুলোকে কি আটকাতে পারবেন? ওকে নিষিদ্ধ করলেইতো হবে না। জামায়াত দলকে নিষিদ্ধ করবেন, অন্য নামে তারা দল চালাবে। মূল কথা হলো তাদের সামর্থ। সামাজিক ছত্রছায়ায় জামায়াতের যেসব সংগঠন গড়ে উঠেছে সেগুলো যতদিন থাকবে ততদিন জামায়াতের পশম পর্যন্ত আপনি স্পর্শ করতে পারবেন না। জামায়াতের যে হাসপাতালগুলো রয়েছে সেটা বন্ধ হলেতো চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাবে। ইবনে সিনার যত টাকা আছে তা দিয়ে জামায়াতের সব কর্মীদের দুই চার বছর চালানো যাবে। তাই এ রকম নিষিদ্ধ করলে হবে না। নিষিদ্ধ করার মতো ক্ষমতা থাকতে হবে। সুযোগ, জ্ঞান, বুদ্ধি থাকতে হবে। জামায়াত স্বাধীনতাবিরোধী তাদের এত দূরে আসতে দিলেন কেন।

নিজের জীবনে বঙ্গবন্ধুর প্রভাব নিয়ে বলতে গিয়ে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর কর্মী। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের প্রেম হয়েছে। তাকে পেয়েছি বলেই মুক্তিযোদ্ধা হয়েছি। তা না হলে রাজাকারও হতাম কিনা বলা যায় না। বোধ জাগতো না। বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছি রাজনীতিতে এসে। রাজনীতিতে না এলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানুষ হতাম। হয়তো রিকশা চালাতাম, নয়তো গরুর রাখাল হতাম। আমি জানি নিঃস্ব, রিক্ত মানুষের কষ্ট কোথায়? আমার বড় ভাইকে দেখে আমি রাজনীতিতে এসেছি। তার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পরিচয়। বঙ্গবন্ধুকে পেয়ে দেশকে চিনতে পেরেছি। আমার মধ্যে দেশের জন্য কোনো কিছু থেকে থাকলে সেটি বঙ্গবন্ধুর কল্যাণে।

বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদের চিঠি

বাংলাদেশের অবনতিশীল গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি জে. ব্লিঙ্কেনকে চিঠি লিখেছেন মার্কিন কংগ্রেসের ২২ জন সিনেটর ও প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য। তারা ক্ষমতাসীন দলের এবং বিরোধী রিপাবলিকান উভয় দলের সদস্য। ২রা আগস্ট লেখা ওই চিঠিতে তারা বলেছেন, কয়েক সপ্তাহে সারা বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষে লিপ্ত নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। এতে বর্তমান সরকারের অধীনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এই চিঠির উদ্যোক্তা সিনেটর এডওয়ার্ড জে. মারকি (ডেমোক্রেট- ম্যাচাচুসেটস), প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য জিম ম্যাকগভার্ন ও বিল কেটিং।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অন্যরা হলেন সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন (ডেমোক্রেট), ডিক ডারবান  (ডেমোক্রেট), টিম কেইন (ডেমোক্রেট), টামি বল্ডউইন (ডেমোক্রেট), জেফ মারকি (ডেমোক্রেট) এবং ক্রিস মারফি। এছাড়া প্রতিনিধি পরিষদের যারা স্বাক্ষর করেছেন তারা হলেন শেঠ মুলটন, লোরি ট্রাহান, জো উইলসন, দিনা তিতাস, গ্রেস মেং, গেরি কনোলি, গাবি আমো, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, ইলহান ওমর, নিদিয়া ভেলাজকুয়ে, ড্যান কিলডি, বারবারা লি এবং ডেলিগেট জেমস মোইলান।

চিঠিতে তারা লিখেছেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে খর্ব করে এমন পদক্ষেপ অব্যাহতভাবে নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এর মধ্যে আছে জানুয়ারিতে ভয়াবহ ত্রুটিপূর্ণ এক নির্বাচন। শ্রমিকদের বিষয়ে বিধান উন্নত করতে ব্যর্থতা। আর অতি সম্প্রতি গুলি, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ এবং ইন্টারনেট সার্ভিস প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়ে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ভয়াবহভাবে দমনপীড়ন চালাচ্ছে।  এই চিঠিতে জোর দিয়ে বলা হয়, এসব উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এবং অব্যাহতভাবে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে আমরা  আশা  করি যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের যে জোরালো সম্পর্ক আছে তার প্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে সমুন্নত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে উদ্যোগ নেবেন আপনি।

সব রকম সহিংসতার অবশ্যই নিন্দা জানাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। নিশ্চিত করতে হবে নাগরিক গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীনতাকে। এর মধ্যে আছে মত প্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার সুরক্ষিত রাখা। বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে উপরে বর্ণিত নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিতে হবে। উপরন্তু গণতান্ত্রিক আরও অবনতি রোধ করার জন্য বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক সরকারের বিষয়ে বাংলাদেশি জনগণের অধিকারকে সমর্থন করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করতে হবে। যে সরকার জনগণের মানবাধিকার ও স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখবে।

উল্লেখ্য, সিনেটর মারকি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে মানবাধিকার সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। এর মধ্যে আছে- শান্তিতে নোবেল  পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হয়রানি বন্ধে এ বছর জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি ও তার সহকর্মীরা চিঠি লিখেছেন। একই সঙ্গে ব্যাপকভাবে সরকারের সমালোচকদের টার্গেট করতে বিচারবিভাগকে ব্যবহার করে নিয়ম লঙ্ঘন বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সিনেটর মারকি ও তার সহকর্মীরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার। একই সঙ্গে তাদেরকে ভাসানচরে পুনর্বাচন স্থগিত করার আহ্বান জানান, যতক্ষণ ওই স্থানকে জাতিসংঘ নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী বলে নিশ্চয়তা না দেয়।

জরুরি অবস্থার নামে দমন-পীড়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না: সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ

দেশে জরুরি অবস্থার নামে দমন-পীড়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। শনিবার বিকালে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ কথা বলেন তিনি।

তিনি ওই স্ট্যাটাসে বলেন, দেশ সবচেয়ে নিরাপদ দেশের জনগণের হাতেই। জনগণ রাজপথের দখল নিয়েছে। জরুরি অবস্থার নামে দমন-পীড়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না। আজ এবং এখন থেকে রাজপথ ছাত্র-জনতার দখলে থাকবে।

সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে ছাত্র-নাগরিকের অভ্যুত্থান সফলে আপামর জনসাধারণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আজকের বিক্ষোভ মিছিল ও আগামীকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অসহযোগ আন্দোলন সফল করুন।

এর আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে ফেসবুক পোস্টে বলেন, খুনি সরকারের সাথে কোনো প্রকার সংলাপে বসতে আমরা রাজি নই, সেখানে রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সাথে আলোচনার প্রশ্নই উঠে না। দেশের চলমান পরিস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে বসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পরপরই এই স্ট্যাটাস দেন তিনি।

গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণভবনের দরজা খোলা। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সাথে আমি বসতে চাই, তাদের কথা শুনতে চাই।’ কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে কোনো সংঘাত চান না বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে: ফখরুল

কোটা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শনিবার দুপুরে বনানীতে দলের স্থায়ী কমিটির কারাবন্দি সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বাসায় তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষতের পর কোটা বিরোধী আন্দোলন সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন,  আমি বলব যে, দেশে এখন একটা গণজাগরণ শুরু হয়ে গেছে। আপনারা লক্ষ্য করে দেখেছেন যে, এখন শিক্ষার্থীদের কোটা বৈষম্য বিরোধী যে আন্দোলন সেই আন্দোলনে সাধারণ সমস্ত মানুষ যোগ দিয়েছে। শুধু ছাত্ররা নয়, এখন অভিভাবক, চিকিৎসক, আইনজীবী, শিল্পী-সাংস্কৃতিক কর্মী, সাংবাদিকসহ সব পেশার মানুষ, সব ধরনের মানুষেরা কিন্তু এই আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। তারা যুক্ত হয়েছেন সব ভয়কে উপেক্ষা করে, এটাই হচ্ছে, এবারকার আন্দোলনের সবচেয়ে বড় যে দিকটা যে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা জেগে উঠেছেন, যে জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। আমি মনে করি যে, এই আন্দোলন তার বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে এসে গেছে। আমি বিশ্বাস করি, ইনাআশাল্লাহ জনগণের বিজয় অবশ্যই হবে, ছাত্র-শিক্ষার্থীদের বিজয় অবশ্যই হবে।

তিনি বলেন, প্রথম দিন থেকে আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন যে, ছাত্ররা যখন আন্দোলন শুরু করেছে তখনই এর যে যৌক্তিকতা তা নিয়ে আমরা কথা বলেছি, আমরা তাদের সঙ্গে সহযোগিতা শুধু নয়, তাদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছি। আমরা এখনো ওটা শুধু নয়, আরও বেশি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, যে ছাত্রদের এই যৌক্তিক আন্দোলন, এই আন্দোলনে আমাদের শুধু সমর্থন নয়, আমাদের সর্ব রকমের সহযোগিতা তাদের প্রতি থাকবে। যেহেতু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এটা। সেজন্য রাজনৈতিক দল হিসেবে আমাদের যে দায়িত্ব-কর্তব্য সেই দায়িত্ব-কর্তব্য আমরা পালন করছি, আমরা করতে থাকবো।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা যেটা সব সময় বলে আসছিলাম, তরুণদের জাগ্রত হবার কথা। সেই তরুণরাই এবার জেগে উঠেছে। এজন্যেই আমরা অত্যন্ত আশাবাদী। আশাবাদী এই কারণে যে, তরুণরা যখন জেগে উঠে, ছাত্ররা যেখানে জেগে উঠে, যুবকরা যেখানে জেগে উঠে সেই আন্দোলনকে পরাজিত করা কারো পক্ষে সম্ভব না। আজকে ভয়াবহ যে দানবীয় ফ্যাসিস্ট সরকার, তারা যেভাবে হত্যা করেছে আমাদের সন্তানদেরকে, সেটা অবর্ণনীয়, ভাষায় বর্ণনা করার মতো নয়, শত শত ছাত্রদেরকে তারা হত্যা করেছে। আমরা যখন আবার দেখতে পাই যে, তাদেরকে গণকবর দেয়া হয়েছে, আমি যেটা দেখলাম পত্রিকায় ৫৯ জনকে গণকবর দেয়া হয়েছে, এটা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকেও তো ছাড়িয়ে যাচ্ছে, চিন্তাই করা যায় না এটা।

তিনি বলেন, আমি এখানে এসেছিলাম আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাহেব বাসায় তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য। এরআগে আমি গিয়েছিলাম নজরুল ইসলাম খান সাহেবের বাসায় তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার জন্য, তার স্ত্রী অত্যন্ত অসুস্থ আপনারা জানেন সবাই। মূলত আসার কারণটা হচ্ছে, আমরা যে তথ্য পাচ্ছি যে, কারাগারে তাদেরকে, শুধু তাদেরকে নয় সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিদেরকে যাদেরকে এক মাসের মধ্যে বন্দি করেছে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা। তাদের সঙ্গে পরিবারের কোনো যোগাযোগ নেই, তারা কোনো কিছু পাঠাতে পারছেন না, যোগাযোগই করতে পারছেন না।

ফখরুল বলেন, ‘এটা কখনই গ্রহণযোগ্য না, এটা জেল কোডের বাইরেও বটে। তারা (বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য) অসুস্থ মানুষ, বয়স্ক মানুষ, নজরুল ইসলাম খান ভাই ও আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ভাই অসুস্থ মানুষ, বড় বড় অসুখ আছে। তারা তাদের ঔষধপত্র ঠিকমতো পাঠাতে পারছেন না। এমনকি ইনসোলিন সেটাও সঠিকভাবে পাঠাতে পারছেন না। আমি আপানাদের মাধ্যমে জেল কর্তৃপক্ষকে বলতে চাই, এই অমানবিক কাজগুলো এই মুহূর্তে করবেন না, আপনারা অতীতে অনেক করেছেন, এখন দয়া করে এই অমানবিক কাজগুলো করবেন না’।

সকাল ১১টায় বিএনপি মহাসচিব প্রথমে যান বনানী ডিওএইচএসে দলের কারাবন্দি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের বাসায় তার অসুস্থ স্ত্রী কান্তা ইসলামকে দেখতে। এই সময়ে তার ছেলে অনিক খান, স্ত্রী রাবেয়া আক্তার রাখি খান ছিলেন। পরে বনানীতে কারাবন্দি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর স্ত্রী তাহেরা খসরুর সাথে দেখা করেন। এ সময়ে তার ছেলে ইসরাফিল খসরু ছিলেন। মহাসচিব তাদের খোঁজ-খবর নেন।

গত ২১ জুলাই নজরুল ইসলাম খান ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে তাদের বাসা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গ্রেপ্তার করে। দুই নেতার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ে বিএনপি মহাসচিবের সাথে ছিলেন দলের মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান ও মহাসচিবের একান্ত সহকারি ইউনুস আলী।

শিক্ষার্থী-জনতার স্রোত মিশেছে শহীদ মিনারে

এ যেন এক অন্য রকম দৃশ্য। চারিদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। কোথাও এতটুকু জায়গা ফাঁকা নেই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে ছাত্র-জনতার ঢল নেমেছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। শহীদ মিনার পেরিয়ে পাশের সড়কগুলোতেও অবস্থান নিয়েছেন তারা। শনিবারের এই কর্মসূচিতে স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে শহীদ মিনার।

‘আওয়ামী লীগের কবর দে, সারা বাংলায় খবর দে’, ‘আবু শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো একসাথে’, ‘আওয়ামী লীগের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’, ‘রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়’, ‘২৪ এর রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’, ‘কে কে রাজাকার হাসিনা হাসিনা’ ইত্যাদি স্লোগান দিচ্ছেন তারা। এদিন দুপুর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারীরা।

খণ্ড খণ্ড বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারের জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা। এ সময় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে শহীদ মিনার। এদিন বেলা দেড়টার দিকে এই চিত্র দেখা যায়। পরে বিকাল ৩ টার দিকে ছাত্র-জনতার ঢল নামে সেখানে।
এর আগে শহীদ মিনারের আশপাশে বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছিলেন শিক্ষার্থীরা। পরে সেখানে তারা জড়ো হন। এরপর বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। সেখানে উপস্থিত সকল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাথায় ও হাতে দেশের লাল-সবুজের পতাকা বাঁধা দেখা গেছে।
অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় নিহত, গণগ্রেপ্তার ও হয়রানির প্রতিবাদে কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন দেশের ব্যান্ড সংগীতশিল্পীরা। আজ বিকেল ৩টায় ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে ‘গেটআপ, স্ট্যান্ডআপ’ ব্যানারে এ কর্মসূচি শেষে সংহতি জানাতে শহীদ মিনারে যাবেন তারা।

এর আগে সকাল থেকে রাজধানীর আফতাবনগর, বাড্ডা, রামপুরা, বনশ্রী, মিরপুর-১০ ও সায়েন্সল্যাবে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। এতে অভিভাবকসহ সাধারণ জনতাও যোগ দেন।

আফতাবনগরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা কর্মসূচিতে অংশ নিতে জড়ো হন কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বনশ্রী বি ব্ল‌কের সাম‌নে আইডিয়াল স্কু‌লের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বিক্ষোভে অংশ নেন। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগন দিতে থাকেন।

এছাড়া সায়েন্সল্যাবে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’সহ নানা স্লোগান দিচ্ছেন তারা। সায়েন্স ল্যাব মোড়ে সকাল থেকে অনেক পুলিশ সদস্যকে অবস্থান করতে দেখা গেছে।

রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে অবস্থান নিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্রে করে সহিংসতায় নিহতদের স্মরণ করে 'আমার ভাই মরল কেন'সহ বিভিন্ন শ্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা।

গতকাল শুক্রবারও কেন্দ্রী শহীদ মিনারে জড়ো হন ছাত্র ও জনতা। শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের ডাকা ‘দ্রোহযাত্রায়’ যোগ তারা। যাত্রার শুরুতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বক্তব্য দেন। তিনি সরকারের পদত্যাগ চেয়ে বলেন, এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে আনতে হবে। সরকারের কাছে কোনো কিছু চাওয়ার নেই।

উল্লেখ্য, সারা দেশে আজ শনিবার বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালন করছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। গতকাল শুক্রবার রাত পৌনে ৮টার দিকে ফেসবুক লাইভে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল হান্নান।

একইসঙ্গে আগামীকাল রোববার থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন তারা। ‘সারা দেশে ছাত্র-নাগরিকের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে খুনের প্রতিবাদ ও ৯ দফা’ দাবিতে এই কর্মসূচির ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

ভয় পেয়ো না মা... :ছুটির দিনেও ঢাকা কোর্টে স্বজনদের খোঁজে ভিড় by রাশিম মোল্লা

ছুটির দিনেও স্বজনদের খোঁজে ঢাকার বিচারিক আদালতে উপচেপড়া ভিড়। বৃষ্টির মধ্যেই আটক স্বজন আছে কিনা তা দেখার জন্য কখনো ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের (সিএমএম) গারদখানার সামনে, আবার কখনো ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা গেছে স্বজনদের। রাজধানীর বিভিন্ন থানা থেকে পুলিশ ভ্যান আসামাত্র ঘিরে ধরছে স্বজনরা। কেউ কেউ নাম ধরে ডাকাডাকি করছেন। কেউ সাড়া পাচ্ছেন, আবার কেউ সাড়া পাচ্ছেন না। গতকাল শুক্রবার ছুটির দিনেও ঢাকা কোর্টের সামনে এমন চিত্র দেখা গেছে। জামিন না পাওয়ায়  বেশ কয়েকজন স্বজনকে প্রিজন ভ্যানের পিছনে পিছনে ছুটতে দেখা যায়। সরজমিন দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন থানা থেকে আটককৃত আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের আদালতে সোপর্দ করা হয়। আটককৃতদের রিমান্ড মঞ্জুর ছাড়া সব আসামিকেই কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। প্রিজন ভ্যান থেকে আটক একজন স্বজনকে বলতে শোনা যায়, ভয় পেয়ে না মা। খুব শিগগিরই জয়ী হবো। জেল-জুলুম করে আমাদের দমন করা যাবে না। দোয়া করো আন্দোলনকারী তোমার অন্য ছেলেদের জন্য। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের দোতলায় দেখা যায়, রামপুরা থেকে আসা রেহানা বেগম নামে এক মা সন্তানের জন্য কান্না করছেন।

মায়ের সঙ্গে প্রাইমারি স্কুল শিক্ষার্থী হাবিবাও এসেছেন ভাইকে দেখার জন্য। রেহানা বেগম জানান, পরশু রাতে রামপুরা থেকে আমার সন্তানকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে আমার ছেলের মোবাইলে আন্দোলনের ছবি আর ভিডিও পাইছে। পাশে দাঁড়িয়ে আরেক স্বজন জানান, বৃহস্পতিবার মিরপুর থেকে পুলিশ তার ভাইকে আটক করেছে। তার ভাই মূলত বাইক চালান। এদিকে, গতকাল সেতু ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বনানী থানায় দায়ের করা পুলিশের মামলায় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থকে দুই দফায় ৮ দিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হয়। তাকে দেখতে ছোটভাই ও বেশকিছু নেতাকর্মীদেরও দেখা যায়। আদালতের শুনানিতে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পার্থকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

অপরদিকে আসামি পক্ষে জামিন চেয়ে শুনানি করেন তার আইনজীবীরা। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। রাজধানীর রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান ওরফে শিমুল বিশ্বাস, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র আহ্বায়ক সাইফুল আলম নিরব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মজনুসহ ৬ জনকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। গত ২৯শে জুলাই ৪ এবং ২৫শে জুলাই ৪ দিনের রিমান্ডে ছিলেন তারা। গতকাল রিমান্ড শেষে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও জোনাল টিমের পুলিশ পরিদর্শক তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

সরকারের দমন-পীড়নে ছাত্র আন্দোলন রূপ নিচ্ছে গণঅভ্যুত্থানে -সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের কলাম

জুলাইয়ের শুরু থেকেই কোটা সংস্কারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা। তাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে পুলিশের গুলিতে রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন উত্তাল থেকে আরও উত্তাল হয়ে ওঠে। যে পরিস্থিতি- মোকাবিলা করতে সরকার অধিক কঠোর নীতি গ্রহণ করে। ছাত্র-জনতা এবং আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারীবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে কমপক্ষে দুই শতাধিক সাধারণ মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। এত এত হতাহতের পরও বাংলাদেশের উত্তপ্ত পরিবেশ দমাতে পারছে না সরকার। বরং এই দমন-পীড়ন সরকারের জন্য বুমেরাং হয়েছে বলে মনে করছেন ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক শেখ আজিজুর রহমান। ২রা আগস্ট ‘বাংলাদেশ স্টুডেন্ট প্রটেস্টস বিকাম ‘পিপল’স আপরাইজিং’ আফটার ব্রুটাল গভর্নমেন্ট ক্র্যাকডাউন’- নামে আজিজুর রহমানের একটি কলাম প্রকাশ করেছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। এতে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ১১ দিন পার হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ প্রশাসন। বাংলাদেশে কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা এখন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিচ্ছে।

কলামে আরও বলা হয়েছে, চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা এখন জনতার আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়েছে। গত একমাস এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংস পরিস্থিতি চলছে বাংলাদেশে। বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ, সেনাবাহিনী, আধাসামরিক এবং সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠনের কর্মীদের হামলার ফলে দেশটিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যানুযায়ী সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ২৬৬ জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যাদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। নিহতের পাশাপাশি আহত হয়েছেন ৭ হাজারের বেশি মানুষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওকে উদ্ধৃত করে আজিজুর লিখেছেন, আহত এক যুবককে উদ্ধার করতে যখন আরেক যুবক টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন এক পুলিশ সদস্যকে পর পর তিনটি গুলি করতে দেখা গেছে। এই ঘটনা রাজধানীর শনির আখড়া এলাকার বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি। এমন হতাহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হয়ে উঠেছে।

আন্দোলনকারী কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে প্রশাসন। শিক্ষার্থীরা এখন আটককৃত শিক্ষার্থীদের নিঃশর্ত মুক্তি এবং হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থী এবং দেশটির সাধারণ জনতা। শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগও দাবি করেছে। এ সব দাবির মধ্যেও দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশের প্রশাসন। চলছে  গ্রেপ্তারও। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক, শিল্পী সমাজ, আইনজীবী এবং সমাজের সর্বস্তরের নাগরিকরা। বলা বাহুল্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলন এখন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে। ২০০৯ সালের পর থেকে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে ব্যাপক দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদল তার অধীনে অনুষ্ঠিত সবগুলো নির্বাচন নিয়ে কারচুপির অভিযোগ করেছেন। ভিন্নমত দমনেও শেখ হাসিনার সরকার দমন-পীড়ন নীতি অবলম্বন করেছে বলে অভিযোগ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো। এছাড়া তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও রয়েছে। উদ্ভূত এসব সংকট এবং সাম্প্রতিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে ক্ষমতাসীনরা।
-সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত।

শিগগিরই খুলে দেয়া হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে by কাজী সোহাগ

আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই খুলে দেয়া হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড  এক্সপ্রেসওয়ে। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার সময় বনানী ও মহাখালীর গুরুত্বপূর্ণ দু’টি টোলপ্লাজা আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার পর ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, আন্দোলনে দু’টি টোলঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই দু’টি টোলঘর বাদ দিয়ে ম্যানুয়ালি পদ্ধতি ব্যবহার করে চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সবমিলিয়ে আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চালু করা হবে। কোটা সংস্কার আন্দোলনে বিক্ষোভ ও সংঘাতে গত ১৮ই জুলাই রাতে বনানী ও ১৯শে জুলাই বিকালে মহাখালী টোলঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। এতে আনুমানিক ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) কোম্পানি লিমিটেড। গত ১৮ই জুলাই রাত পৌনে ৮টায় শত শত লোক বনানী টোলঘরে হামলা চালায়। তাদের মধ্যে একদল শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) খুলে নিয়ে যায়। কেউ কম্পিউটার, ক্যামেরা নিয়ে যায়। আরেক দল আগুন লাগিয়ে দেয়। আগুনে টোল বুথ, ছাউনি, সিস্টেম সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। আর ১৯শে জুলাই বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে মহাখালী টোলঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়। দু’টি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। তবে আগুনে পুড়ে যাওয়া বনানী টোলঘরের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ঠিক না করা পর্যন্ত অন্তত হাতে হাতে টোল নিয়ে (ম্যানুয়ালি) চালু করা যায় কিনা, সেটাও ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এক্সপ্রেসওয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। প্রথমে কারফিউ পুরোপুরি না ওঠা পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এক্সপ্রেসওয়ে চালু করার জন্য সরকারের কাছে নিরাপত্তা চায় প্রতিষ্ঠান।

এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ থাকায় উত্তরা এয়ারপোর্ট থেকে এফডিসি সিগন্যাল এবং ফার্মগেট হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে প্রতিনিয়ত যাতায়াতকারীদের জন্য এখন হাতে ১ থেকে ২ ঘণ্টা বেশি সময় নিয়ে বের হতে হচ্ছে। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বন্ধ থাকায় উত্তরা-কুড়িল-বাড্ডা-রামপুরা-মৌচাক-পল্টন এবং উত্তরা-বনানী-মহাখালী-গুলশান-ফার্মগেট-আগারগাঁও সড়কে ব্যাপক যানজট তৈরি হচ্ছে। ফলে এসব সড়কের যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে থেকে শুরু হয়ে কুড়িল, বনানী, মহাখালী, তেজগাঁও, মগবাজার, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালীতে গিয়ে শেষ হবে এ উড়াল সড়ক। পুরো উড়াল সড়কের দৈর্ঘ্য ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার। হাতিরঝিল সংলগ্ন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএফডিসি) পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। ২০২৩ সালের ২রা সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশে যান চলাচল উদ্বোধন করেন। পরদিন ৩রা সেপ্টেম্বর থেকেই এতে যান চলাচল শুরু হয়। এরপর চলতি বছরের ২০শে মার্চ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এফডিসি র‌্যাম্প খুলে দেয়া হয়। এটি একটি পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) প্রকল্প যার প্রাক্কলিত ব্যয় ৮৯.৪০০ বিলিয়ন টাকা। এই প্রকল্পের ৭৩ ভাগ ব্যয় বহন করছে ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (এফডিইই) কোম্পানি এবং ২৭ ভাগ ব্যয় বহন করছে বাংলাদেশ সরকার।

গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর অর্ণব বলছিল, আমি বাঁচবো না, আমাকে হাসপাতালে নিও না by মরিয়ম চম্পা

আমি আর বাঁচবো না। আমাকে হাসপাতালে নিও না। হুজুর আমাকে কালেমা পড়ান। আমি পানি খাবো। পানি দাও। ছেলের শেষ মুহূর্তের কথাগুলোর স্মৃতিচারণ করে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন র‌্যাবের গুলিতে নিহত মোহাম্মদপুরের বসিলার বাসিন্দা মিরাজুল ইসলাম অর্ণবের মা সাহিদা বেগম। মানবজমিন’র সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আর্তনাদ করে অর্ণবের মা বলছিলেন, আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই। ওদের একটুও মায়া হলো না?  প্রথমে পায়ে গুলি করে। পরে বুকের বাম পাশে গুলি করে। যেটা বুকের একপাশ ভেদ করে অপর পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমাদের বাসা মোহাম্মদপুরের বসিলায় র‌্যাব ২ কার্যালয় সংলগ্ন। আমরা যে বাসায় ভাড়া থাকি তার সামনে মূল সড়কে গত ১৯শে জুলাই সকাল থেকে দফায় দফায় ছাত্রদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষ চলছিল। এ সময় অর্ণব বাসাতেই ছিল। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় কিছুক্ষণ ফোনে ডাউনলোড করা গেমস খেলার পর নিচে নামে। এরপর আবার বাসায় আসলে দুপুরে গোসল করতে বলি। অনেক সময় নিয়ে গোসল শেষ করে। এরপর ৩ তলায় থাকা এক শিক্ষার্থীকে নিয়ে বাসায় এসে ভাত খায়। ওই শিক্ষার্থী মেসে থাকায় মাঝে মধ্যেই অর্ণব বাসায় ভালো কিছু রান্না হলে ডেকে খাওয়াতো। খাওয়া শেষ করলে আমি মসজিদে যাওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দেই। ও বাইরে চলে যায়।

এ সময় ওর বোন জামাইয়ের দেয়া আইফোনটি সঙ্গে ছিল। আমরাও কিছুক্ষণ পরপর গুলির শব্দ শুনে রাস্তায় ছুটে আসি। চোখের সামনে দিয়ে হতাহতদের নিয়ে যাচ্ছিল। দুপুরে মূল সড়কে দাঁড়িয়ে সংঘর্ষের ঘটনা দেখছিল অর্ণব। এ সময় হঠাৎ র‌্যাব গুলি করে। অর্ণবের সঙ্গে থাকা ছেলেটি দৌঁড় দেয় এবং অর্ণবের পায়ে প্রথমে গুলি লাগে। এরপর বুকে গুলি লাগলে মাটিতে ঢলে পড়ে। সঙ্গে থাকা ছেলেটি অনেক কষ্টে টেনেহিঁচড়ে অর্ণবকে স্থানীয় একটি মসজিদে নিয়ে যায়। এই মসজিদেই দুপুরে নামাজ পড়েছিল অর্ণব। এ সময় মসজিদের হুজুর অর্ণবকে কালেমা পড়ান। হুজুরের কাছে পানি খেতে চায়। তাকে পানি খাওয়ানো হয়। পানি খাওয়ার পর একটি ভ্যানে তোলা হয়। অর্ণব তখন বারবার বলছিল আমি বাঁচবো না। আমাকে হাসপাতালে নিও না। এদিকে অর্ণবের বুক পিঠ দিয়ে গলগলিয়ে রক্ত ঝরছিল। ভ্যানে করে প্রথমে দুই হাসপাতালে ঘুরে ভর্তি করতে না পেরে পরবর্তীতে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিকে অর্ণবকে আমরা পাগলের মতো খুঁজছিলাম। সঙ্গে থাকা ছেলেটি আমাদের কারও ফোন নম্বর জানে না। বিকালে হঠাৎ অর্ণবের ফোনে ফোন দিলে সঙ্গে থাকা ছেলেটি জানায় অর্ণব গুলিতে আহত। এ সময় আমরা হাসপাতালে ছুটে যাই। ততক্ষণে সব শেষ। অর্ণব মারা যায়। সময়টা আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিট।
তিনি বলেন, বুক থেকে রক্ত পড়ছে। মনে হচ্ছিল ওর বুকের গুলি পিঠের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত গর্ত হয়ে গেছে। এতটা কষ্ট দিয়েও মানুষ মানুষকে মারতে পারে। আমার ছেলে তো কোনো আন্দোলনে ছিল না। ওর কি দোষ ছিল। ওকে বড়জোড় পায়ে একটি গুলি করতে পারতো। কিন্তু বুক কেন ঝাঁঝরা করে দিলো। আমি এর বিচার চাই। আমার সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তি ছিল ২৩ বছরের এই ছেলেটি। এখন আমাদের কী হবে? কে দেখবে আমাদের সংসার। আমাদের আর্থিক সচ্ছলতা নাই। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো সহমর্মিতা কিংবা আর্থিক সহযোগিতা পাইনি। এ ঘটনায় মামলা করেছেন কিনা জানতে চাইলে অর্ণবের মা সাহিদা বেগম বলেন, কার বিরুদ্ধে মামলা করবো? তাছাড়া আমার তো মামলা চালানোর সামর্থ্য নেই। এ সময় তিনি ছেলে হত্যার সঠিক তদন্তসহ বিচারের পাশাপাশি আর্থিক সাহায্য কামনা করেন। অর্ণবের মা বলেন, এইচএসসি পাস করার পর অর্থনৈতিক কারণে আর ভর্তি হতে পারেনি। সংসারের হাল ধরেছিল। ওর আয়েই সংসার চলতো। ছেলেকে বিয়ে করাবেন তাই সম্প্রতি বিভিন্ন স্থানে পাত্রী দেখছিলেন। অর্ণবের বাবা ইতালি প্রবাসী হলেও বর্তমানে তিনি বেকার এবং অসুস্থ জীবনযাপন করছেন। মা সাহিদা বেগমও শারীরিকভাবে অসুস্থ। তিন ছেলে মেয়ের মধ্যে অর্ণব ছোট। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। অর্ণবের সঙ্গে সঙ্গে গোটা একটি পরিবারের সকল স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন মা সাহিদা।

মেট্রোরেল চালু হবে কবে? by নাজমুল হুদা

টানা দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বন্ধ মেট্রোরেল চলাচল। দুর্বৃত্তদের তাণ্ডবে  মেট্রোরেলের মিরপুর-১০ ও কাজীপাড়া স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেট্রো চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। এক বছরেও এই দুই স্টেশন চালু করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তবে বাকি স্টেশনগুলোতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও সেখানে কেন মেট্রোরেল চালানো হচ্ছে না তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্থ দুই স্টেশন বন্ধ রেখে ট্রেন চালানো যেতে পারে। অবশ্য ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) কর্তৃপক্ষও নিয়ে কোনো জবাব দিচ্ছে না। সম্প্রতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এক বিবৃতিতে বলেছেন, আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অজুহাতে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ রেখে মানুষকে কষ্ট দেয়া উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাঠামোগত ও কমিউনিকেশন সিস্টেমে কোনো ক্ষতি না হলে ক্ষতিগ্রস্ত দুই স্টেশন বন্ধ রেখে মেট্রোরেল চালানো যেতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনের সংস্কার কাজ চলমান রাখা যেতে পারে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে গত ১৮ই জুলাই ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকায় ব্যাপক সংঘাত হয়। একপর্যায়ে মিরপুর-১০ পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। ওই আগুন ছড়িয়ে পড়ে ওভার ব্রিজের উপর। সংঘর্ষ চলমান থাকায় তখন মেট্রোরেলের মিরপুর-১০, মিরপুর-১১, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে ওই সময়ে অন্য স্টেশনগুলোতে চলছিল মেট্রোরেল। একইদিন বিকাল ৫টার দিকে ডিএমটিসিএল এক বিজ্ঞপ্তিতে মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ ঘোষণা করে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অনিবার্য কারণবশত জননিরাপত্তার স্বার্থে মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশন থেকে সর্বশেষ মেট্রো ট্রেন বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে উত্তরা উত্তর মেট্রোরেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে।’ তবে ওই বিজ্ঞপ্তির পর থেকে এখন পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে মেট্রোরেলে চলাচল করা যাত্রীদের। আগের মতো লক্কড়-ঝক্কর বাসে চলাচল করতে হচ্ছে তাদের। আগের মতো বাসে যানজটে নাকাল অবস্থার মধ্যদিয়ে যেতে হচ্ছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের প্রশ্ন তুলেছেন মেট্রোরেল বন্ধ রাখা নিয়ে। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক আন্দোলনে মেট্রোরেলের দুই/একটি স্টেশন ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের দুই/একটি টোল প্লাজা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মেট্রোরেলের ইঞ্জিন, বগি ও লাইনের কোনো ক্ষতি হয়নি বলেই জানি। সে কারণে, ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনগুলো বন্ধ রেখে, মেট্রোরেল অবিলম্বে চালু করা সম্ভব বলে মনে করছি। একইভাবে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মূল অবকাঠামোর কোনো ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে জানা যায়নি। প্রয়োজনে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টোল আদায়ের ব্যবস্থা করে যান চলাচল পুনরায় শুরু করা যেতে পারে। তিনি বলেন, আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অজুহাতে মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ রেখে মানুষকে কষ্ট দেয়া উচিত নয়। এগুলো সাধারণ মানুষের অর্থে সাধারণ মানুষের সেবার জন্যই নির্মাণ হয়েছে। জনগণ এখন মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং কষ্ট পাচ্ছে। মেট্রোরেলের ইঞ্জিন, বগিসমূহ ও লাইনের কোনো ক্ষতি হয়নি বলেই জানি। এই সেবাগুলো চালু রাখাও সরকারেরই দায়িত্ব।

ক্ষতিগ্রস্ত দুই স্টেশন ছাড়া বাকি স্টেশনে মেট্রোরেল চালু করা হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে ডিএমটিসিএল’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিক এর কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এই মুহূর্তে আমি কিছু বলতে পারবো না। এখনো আমরা কেনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী মানবজমিনকে বলেন, কবে মেট্রোরেল চালু হবে সেটা আমরা বলতে পারবো না। জাপানের এক্সপার্ট টিম দেখে গেছে। শুধু দু’টো স্টেশন নয়, আমাদের প্রসেসটা পুরো সিস্টেম নিয়ে চলে। এক্সপার্টরা কাজ করছে। তারা মতামত দিবে। মতামত পেলে আমরা বলতে পারবো। আমরা যত দ্রুত সম্ভব মেট্রোরেল চালানোর চেষ্টা করবো। সময়টা বলতে পারছি না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত দু’টো স্টেশন ঘিরে একটা তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। সেখানে টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞরা আছে। তাদের পর্যবেক্ষক দল আসার আগেই যে, বলা হচ্ছে এক বছর লাগবে, ছয় মাস লাগবে; এটা না বলাই যৌক্তিক। তিনি বলেন, মেট্রোরেলে কমিউনিকেশন সিস্টেমে কোনো ক্ষতি না হলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দু’টো স্টেশনে কাঠামোগত ক্ষতি না হলে ওই দু’টি স্টেশন সাময়িক বন্ধ রেখে মেট্রোরেল চলানো যেতে পারে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনের সংস্কার চলতে পারে। তিনি বলেন, মেট্রোরেল অপারেশনের সময় সবগুলো স্টেশন তো একসঙ্গে খোলা হয়নি। ধাপে ধাপে খোলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত দুই স্টেশনে যেসব বিষয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার সংস্কার কাজ চলতে থাকুক। বাকি স্টেশনগুলো চালু করে মেট্রো চালানো যেতে পারে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক মানবজমিনকে বলেন, আগুনে ভায়াডাক্টের কোনো কাঠামোগত সক্ষমতার ক্ষতি হয়েছে কিনা সেটা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হয়। এটা খুব দ্রুত করতে হয়। এই সময়ের মধ্যে এই পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল। এই ধরনের বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশেও আছে। অর্থাৎ যখনই জানা যাবে, এখানে কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি তারপর দিন থেকেই দুই স্টেশনে না থেমে মতিঝিল পর্যন্ত অপারেশন চালানো যায়। তবে ওই স্টেশনের সেবা দিতে গেলে পুরো স্টেশনকে সংস্কার করতে হবে। নতুন উপকরণ বিদেশ থেকে নিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, মেট্রোরেলের ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনগুলোর কাজও দ্রুত ঠিক করা যায়। কমলাপুর পর্যন্ত লাইন বাড়ানো হচ্ছে। সেখানে এই ধরনের স্টেশনের উপকরণ পাইপলাইনে আছে। এটাকে ওই জায়গায় না লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্টেশনে ব্যবহার করা যেতে পারে।

নয়া দৃশ্যপট

এ এক নয়া দৃশ্যপট। জনতার ঢেউ বাঁধ ভেঙেছে। আছে হামলা-মামলা, গুম গ্রেপ্তারের ভয়। কিন্তু কোনো বাধাই থামাতে পারছে না জনস্রোত। বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষ করছেন প্রতিবাদ, নেমে এসেছেন সড়কে। ছাত্র-জনতার হত্যার বিচার  চান তারা। চোখে তাদের রুদ্রমূর্তি। গতকাল ছুটির দিনেও সর্বত্র হয়েছে প্রতিবাদ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গণমিছিল কর্মসূচি পালনে সকালেই আবতাবনগর ও উত্তরায় শিক্ষার্থীরা নেমেছিলেন প্রতিবাদ জানাতে। ছিলেন অভিভাবকরাও। জুমার নামাজের পর প্রতিবাদের স্রোত বেড়ে যায় কয়েকগুণ। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নেমে পড়েন তারা। বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা অবস্থান নেন সাইন্সল্যাব মোড়, শাহবাগ, পল্টন, ইসিবি চত্বর, মিরপুর-১০ এ। উত্তরায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। গুলিবিদ্ধ হন কয়েকজন। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে মিছিল যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। শিক্ষার্থী-জনতার এই মিছিল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দাবি তোলা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের। এ ছাড়াও দেশ জুড়ে হয়েছে গণমিছিল। এ সময় পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে হবিগঞ্জ ও খুলনায় একজন করে ২ জন নিহত হন। লক্ষ্মীপুরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলায় আহত হন অন্তত ১৫ জন। সিলেট, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, ফেনীসহ কয়েক স্থানে হয়েছে সংঘর্ষ-সংঘাত। এভাবে দেশ জুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে গতকাল ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি পালিত হয়।

বৃষ্টিতে ভিজে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-মিছিল: গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় রাজধানীর আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে থেকে শিক্ষার্থীরা গণমিছিল ও বিক্ষোভ করেন। শিক্ষার্থীদের গণমিছিলটি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে থেকে শুরু হয়ে রামপুরা ব্রিজ ঘুরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সামনে যায়। সেখান থেকে আবারো রামপুরা ব্রিজ হয়ে দুপুর ১২টার দিকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে গিয়ে শেষ হয়। গণমিছিলের সামনে ও পেছনে পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যও ছিলেন।

আন্দোলনকারীরা ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’, ‘আবু সাঈদ মরলো কেন প্রশাসন জবাব দে’, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। এরপর ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শতাধিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাক পরিহিত অনেকেই বৃষ্টিতে ভিজে বিক্ষোভ ও মিছিল করেন। এখানেই অনেকেই ছিলেন স্কুলের শিক্ষার্থী। তাদের সঙ্গে ছিলেন অভিভাবকরাও।

শহীদ মিনারে জনসমুদ্র: গণগ্রেপ্তার বন্ধ, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, আটক শিক্ষার্থী-জনতার মুক্তি, কারফিউ প্রত্যাহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া ও অসংখ্য শিক্ষার্থী জনতাকে হত্যার দায়ে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষক-জনতার ডাকা ‘দ্রোহযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি উপেক্ষা করে এই যাত্রায় হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। যাত্রাটি বেলা সাড়ে ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে শুরু হয়। এর আগে তারা অবস্থান নিয়ে পথ নাটক প্রদর্শন এবং গান পরিবেশন করেন। গানের মাঝে মাঝে বক্তব্যে রাখেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। এরপর মিছিল দোয়েল চত্বর, টিএসসি হয়ে শহীদ মিনার যায়। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে শহীদ মিনার এলাকা। সরজমিন দেখা গেছে, বেলা ২টা থেকেই আন্দোলনকারীরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। একে একে মিছিল নিয়ে জড়ো হতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। বিপুল পরিমাণ আন্দোলনকারীদের এই মিছিলের ধ্বনিতে প্রকম্পিত হতে থাকে প্রেস ক্লাব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শহীদ মিনার এলাকা।

শহীদ মিনারে জাতীয় ও লাল পতাকা এবং সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান, ব্যানার নিয়ে অবস্থান নেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা। মূল ব্যানারে লেখা ছিল, ‘এই বিস্তর শ্মশান আমার দেশ না, এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না। এ সময় ‘রক্তের দাগ দিচ্ছে ডাক স্বৈরাচার নিপাত যাক’, ‘ দফা এক দাবি এক সরকারের পদত্যাগ,’ ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’, ‘আমার ভাই মরলো কেন, শেখ হাসিনা জবাব দে’, ‘আমার ভাই কবরে খুনি কেন বাইরে’, ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফেরত দে’, ‘দিয়েছি তো রক্ত আরও দেবো রক্ত, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই, ‘লাঠি, গুলি, টিয়ারগ্যাস জবাব দিবে বাংলাদেশ, ‘যেখানে গুলি সেখানেই লড়াই, বিভিন্ন স্লোগানে শহীদ মিনার প্রকম্পিত করে তোলেন তারা। সেখানে তারা পথ নাটকও প্রদর্শন করেন।

যাত্রার শুরুতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, এখন দাবি একটাই- এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। জনগণের ক্ষমতা জনগণের কাছে আনতে হবে। সরকারের কাছে কোনো কিছু চাওয়ার নেই। তবে অনেক বিচার বকেয়া রয়েছে। ‘জুলাই হত্যাকাণ্ডের’ বিচার করতে হবে। আর এখন প্রধান এজেন্ডা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রূপান্তর কীভাবে হবে।

দ্রোহযাত্রায় অংশ নেন জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- সি আর আবরার, আসিফ নজরুল, শিক্ষক রেহনুমা আহমেদ, সামিনা লুৎফা, উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা, লেখক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সিপিবি’র সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম প্রমুখ।

দ্রোহযাত্রায় ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেন ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি রাগীব নাঈম। তিনি বলেন, রোববারের মধ্যে কারফিউ প্রত্যাহার করতে হবে, সব গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে, বর্তমান সরকারকে শিক্ষার্থী-জনতা হত্যার দায়ে পদত্যাগ করতে হবে। এই দাবিগুলো যদি রোববারের মধ্যে পূরণ না হয় তাহলে সে দিন বিকাল ৩টায় জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে গণমিছিল শুরু হবে।

উত্তাল সায়েন্সল্যাব-শাহবাগ:
কোটা সংস্কার কর্মসূচির প্ল্যাটফরম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব ও শাহবাগে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। ৯ দফা দাবি আদায়ে আন্দোলনকারীরা সায়েন্সল্যাব মোড় থেকে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর আবারো সায়েন্সল্যাব মোড়ে গিয়ে নিজেদের কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এ সময় প্রশাসন ও সরকারবিরোধী নানা স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।   

সরজমিন দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকেই ধানমণ্ডি-২, সায়েন্সল্যাব, সিটি কলেজ, ঢাকা কলেজ এলাকায় ছিল ব্যাপক পুলিশি উপস্থিতি। তাদের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরাও। এর মাঝেই পূর্ব ষোষিত কর্মসূচি সফল করতে গতকাল দুপুর ১টার পর থেকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে জড়ো হতে থাকেন ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, ধানমণ্ডি আইডিয়াল কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফ কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজসহ আশপাশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। কিছু সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ একে একে এলাকাটিতে কয়েকশ’ মানুষের জমায়েত হয়ে যায়। এ সময় তারা এলিফ্যান্ট রোডের মাথায় (ফুট ওভার ব্রিজের নিচে) অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। শিক্ষার্থীদের জমায়েত বাড়লে পুলিশ একপর্যায়ে এলিফ্যান্ট রোডের বাইতুল মামুর জামে মসজিদের সামনের ফুটপাথে অবস্থান নেন। আর আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা নিউমার্কেটের গাউছিয়া এলাকায় সরে যান। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই দুপুর পৌনে দুইটার দিকে তারা সকলে একত্রিত হয়ে গণমিছিল শুরু করেন। মিছিলটি কিছুদূর এগিয়ে আবারো সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান করে। আমার ভাই কবরে-পুলিশ কেন বাইরে, ভুয়া ভুয়া, পুলিশ ভুয়াসহ বিভিন্ন স্লোগান দেয় তারা। বেলা তিনটার পর আন্দোলনকারীদের একটি পক্ষ তাদের কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করেন। কিন্তু এরপরও রাস্তা ছাড়তে রাজি হয়নি বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। তারা বিকাল ৪টা ১২ মিনিটে সায়েন্সল্যাব মোড় ছেড়ে মিছিল নিয়ে শাহবাগের দিকে রওনা করেন। তাদের পেছন পেছন পুলিশও অগ্রসর হয়। এ সময় শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনকারীরা। কিছু সময়ের জন্য শাহবাগ এলাকা দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শাহবাগে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা অবস্থানের পর আবারো তারা ফিরে আসেন সায়েন্সল্যাব মোড়ে। সেখানে অবস্থান নিয়ে আবারো তারা সরকার ও প্রশাসনবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।  বিকাল পাঁচটার পর সেখান থেকে তারা তাদের কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করে যার যার গন্তব্যে ফিরে যান।

কওমি মাদ্রাসাছাত্র ঐক্য ও সাধারণ মুসল্লিদের প্রতিবাদ: কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘর্ষে হত্যা ও বর্বর হামলার প্রতিবাদে এবং নিহতদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসাছাত্র ঐক্য ও সাধারণ মুসল্লিরা। শুক্রবার বাদ জুমা বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের সিঁড়িতে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান নিয়ে শত শত ছাত্র ও মুসল্লিরা মিছিল বের করেন। মিছিলটি পুরানা পল্টন মোড়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, মৎস্য ভবন, শাহবাগ হয়ে আবারো প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

সরজমিন দেখা গেছে, ছাত্র ও মুসল্লিরা মিছিল নিয়ে শাহবাগ হয়ে টিএসসি’র দিকে যেতে চাইলে শাহবাগ জাদুঘরের সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকে দেন। সেখানে তারা ৫ থেকে ৭ মিনিট অপেক্ষা করে সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে সেখান থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। সেখানে প্রায় ১০ মিনিট অপেক্ষা করে মিছিল সহকারে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে গিয়ে শেষ করেন। এরমধ্যে হাইকোর্ট ও জাদুঘরের সামনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সম্বলিত ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেন তারা।

ইসিবি চত্বর ও মিরপুরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ: বৈষ্যম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তাবায়নে রাজধানীর ইসিবি চত্বর ও মিরপুর-১০ এ বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। বিকাল ৫টার দিকে কয়েকশ’ আন্দোলনকারী এই দুই এলাকায় একত্র হয়ে বিক্ষোভ করেন। দুপুর ৩টা থেকে জড়ো হতে শুরু করেন আন্দোলনকরীরা। এখানে বিক্ষোভ হলেও সড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। এ ছাড়াও বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষার্থী নিহতের প্রতিবাদ ও সরকারের পতন চায় উদীচী: কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে সাংস্কৃতিক সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। গতকাল সকাল ১১টার পর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এই সাংস্কৃতিক সমাবেশে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি অধ্যাপক বদিউর রহমান বলেন, আমরা আমাদের সন্তানদের হারিয়েছি, বন্ধুদের হারিয়েছি। ছিল ছাত্রদের কোটা আন্দোলন কিন্তু এখন তা বাংলার মানুষের আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। যা কিছু ঘটেছে তার দায় সরকার এড়াতে পারে না।

সহ-সভাপতি জামশেদ আনোয়ার বলেন, যারা যৌক্তিক কোটা আন্দোলনের সঙ্গে ছিল সরকার তাদের বিভিন্ন তকমা দিয়েছে। অথচ কোটি কোটি টাকা লুট, হত্যা, গুম করা হচ্ছে সরকারের অধীনে, তাদের বিচার নেই। আমরা অনতিবিলম্বে এই স্বৈরাচারী সরকারের পতন চাই। প্রতিটি জায়গায় নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর যেভাবে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এ সময় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ঢাকা মহানগরের সভাপতি ইকবাল আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক আসিফ নূরসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।প্রতিটি বু

লেটের বিচার চাইলেন মেডিকেল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা: গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘কোটা সংস্কার আন্দোলন ও এ নিয়ে সৃষ্ট সংঘর্ষে শিক্ষার্থী ও জনসাধারণ হত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত চিকিৎসক ও মেডিকেল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশে বলা হয়, আমরা প্রতিটি বুলেটের বিচার চাই, প্রতিটি হত্যার বিচার চাই।’

সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে এই সমাবেশে বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর শাকুর খান বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা বৃদ্ধদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার শিক্ষা দিয়েছে। সারা পৃথিবীর ইতিহাসে আছে, আন্দোলন যখন চলে, ষড়যন্ত্রও তখন চলে। দিনে দিনে দেনা হয়েছে অনেক। এ দেনা শোধ করে আগামীতে সুন্দর স্বাধীন বাংলাদেশ, যেখানে নিপীড়ন থাকবে না। আগামীতে আমরা দেখবো, স্বাধীন দেশের সাধারণ নাগরিকের মতো এ দেশের মানুষ কথা বলতে পারবে। তিনি বলেন, ট্যাক্সের টাকায় কেনা গুলিতে শিক্ষার্থী ও জনতা গুলিবিদ্ধ, মৃত। সারা সমাজ ক্ষতবিক্ষত। সমগ্র জাতি আজ ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। আমার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। সমাবেশে সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দেন। এরপর তারা একটি মিছিল বের করেন।

সরকারের পদত্যাগ দাবি নিপীড়নবিরোধী শিল্পী সমাজের:
গতকাল সকাল ১১টার দিকে ‘গণহত্যা ও নিপীড়নবিরোধী শিল্পী সমাজ’ আন্দোলনে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ, জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, বিচার ও হত্যার দায় নিয়ে সরকারের পদত্যাগের দাবি করেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করে দৃশ্যশিল্পী, আলোকচিত্রশিল্পী, পারফরম্যান্সশিল্পী, সংগীতশিল্পী, কবি, লেখক, গবেষক, স্থপতি, শিল্প সংগঠকসহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেন। শিল্পীরা হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য নিয়ে দীর্ঘ ক্যানভাসে লাল রঙের প্রতিবাদী চিত্র অঙ্কন করেন। তারা ‘আস্থা-অনাস্থা’ নামের একটি বেদনাবিধুর আবেগময় পারফরম্যান্স আর্ট পরিবেশন করেন। আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ‘জনতায় আস্থা, স্বৈরাচারে অনাস্থা’ এই স্লোগানসহ ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’ এমন স্লোগান দেয়া হয়।
এ সময় বেসরকারি সংস্থা ব্রতী ও উত্তরসূরির কর্ণধার শারমিন মুর্শিদ বলেন, এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আমাদের সাহসী হতে শিখিয়েছে। ন্যায়সংগত অধিকার আদায়ে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাদের এই আত্মদান যেন বৃথা না যায়, সে কারণে সর্বস্তরের মানুষকে পথে নামতে হবে। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। লেখক রেহেনুমা আহমেদ বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঠিক সংখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিভিন্নভাবে ২১২ জনের মৃত্যুর কথা জানা গেছে। তবে প্রকৃতপক্ষে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

এ ছাড়াও আরও বক্তব্য রাখেন- কবি সাখাওয়াত টিপু, শিল্পী সুমনা সোমা, শিল্পী মোস্তফা জামান প্রমুখ। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন- আলোকচিত্রী ইমতিয়াজ আলম বেগ, শিল্পী শেহজাদ চৌধুরী, আমিরুল রাজীব, চিত্রশিল্পী কাজী তাহসিন আগাজ অপূর্ব, নুজহাত তাবাসসুম আনন, অসিত রায়, সংগীতশিল্পী বিথী ঘোষ, কৃষ্ণকলি, আলোকচিত্রশিল্পী মেহবুবা মাহজাবীন হাসান, আর্কাইভিস্ট রীশাম শাহাব, কবি শাওন চিশতি প্রমুখ।

শিল্পী সমাজ তিনটি দাবি জানান। এগুলো হলো- গণগ্রেপ্তার ও গণমামলা বন্ধ করে অবিলম্বে আটককৃত ছাত্র-জনতাকে মুক্তি দেয়া, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকার দলীয় গুণ্ডাবাহিনী মুক্ত করা এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের দায় নিয়ে অবিলম্বে সরকারের পদত্যাগ। এরপর তারা সাতমসজিদ সড়ক হয়ে শোভাযাত্রা করে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর সড়কে গিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন। সভা শেষে শনিবার বিকাল ৩টায় ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে সংগীতশিল্পীদের আয়োজনে প্রতিবাদী সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

‘ন্যায্য দাবির কথা বললেই গুলি করা হচ্ছে’:
কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের গুলি করে হত্যা এবং গণগ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তারা বলেন, দেশে একটা ভয়ের রাজত্ব কায়েম করছে। মানুষের জীবনের ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। ন্যায্য দাবির কথা বললেই গুলি করা হচ্ছে।
গতকাল বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজধানীর বাংলামোটরে প্ল্যানার্স টাওয়ারের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে তারা এ নিন্দা জানান। এ সময় স্বাধীন বাংলাদেশে এটা মোটেও কাম্য নয় জানিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলেন, দেশের মানুষ মহা আতঙ্কে দিন পার করছে। যাকে-তাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা ঘরে ঘুমাতে পারছে না। অবিলম্বে সব হত্যার বিচার এবং গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।