Wednesday, March 8, 2017

আশেপাশে আছে ধর্ষক, হত্যাকারী! by মনিজা রহমান



জানেন, ফেসবুকে কেউ যখন আমার ছবি দেখে ‘নাইস’ ‘সুন্দর লাগছে’ ‘দারুণ লাগছে’ লেখেন, আমার না খুব ভালো লাগে। আমি যেন আমার হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস ফিরে পাই। হাসবেন না প্লিজ। এটা একদম সত্যি। বাংলাদেশে থাকার সময় এসব নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। কিন্তু নিউ ইয়র্কে আসার পরে প্রথম প্রথম মনে হতো আমার মতো কুৎসিত প্রাণী মনে হয় প্রথিবীতে নেই।
কারণটা কি ?
কেউ আমার দিকে তাকায় না। চোখে চোখ পড়ে না কারো। কেউ অপাঙ্গে দেখে নেয় না শরীরের মাপ। পাশ দিয়ে যাবার সময় মন্তব্য ছুঁড়ে দেয় না। কেমন যেন খালি খালি লাগতো। ভেবে উঠতে পারতাম না, কীভাবে আমি রাতারাতি এমন বিশ্রী হয়ে গেলাম। সেজে বের হই কিংবা না সেজে প্রতিক্রিয়া দেখি একইরকম। আয়নার সামনে অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখতাম। উত্তর পেতাম না। হঠাৎ করে আমার চেহারায় এমন কি অধপতন হলো যে কেউ একবার ফিরে তাকানোর সময় পায় না।
শৈশব থেকে দেখে এসেছি, অতি স্বাভাবিক বলে জেনে এসেছি, পথেঘাটে বের হলে পুরুষ মানুষ তাকিয়ে থাকে মেয়েদের দিকে। সেই মেয়ে সুন্দর হোক আর অসুন্দর হোক! কেউ এক কাঠি সরস হয়ে মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়। কেউ কেউ তো আবার ভিড়ের মধ্যে অন্যরকম সুযোগ খোঁজে।  
বাসা থেকে বের হবো তো, প্রথমে দারোয়ান-ড্রাইভার দিয়ে শুরু হয়। তারপর একে একে রাস্তার মোড়ের পান-বিড়ি বিক্রেতা, সবজিওয়ালা, মাছওয়ালা, মুরগি বিক্রেতা, দোকানের কর্মচারী, মুচি, মেথর, রাস্তার ভিখিরি, সুটেড বুটেড ভদ্রলোক, কম বয়সী-বেশি বয়সী সবাই এক পলকের জন্য হলেও তাকাবেই তাকাবে। আমিও সেটা জানতাম। জানতাম বলেই অকারণে চোখ-মুখ শক্ত করে পথ চলতাম। এভাবে চোখ-মুখ শক্ত করে চলতে চলতে চেহারায় বলিরেখা পড়ে যায়। তবু তাদের দৃষ্টির লেহন থেকে মুক্তি নেই !
নিউ ইয়র্কে এসে জানলাম, পুরুষরা নারীদের দিকে তাকায় না। নারীরাও পুরুষদের দিকে তাকায় না। আসলে কেউ কারো দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করে না। সবাই সবাইকে নিয়ে ব্যস্ত। এমন ভাবার কারণ নেই, নিউ ইয়র্কে আমি যেখানে বাস করি,  সেখানে সবাই খুব উচ্চশিক্ষিত, অভিজাত সম্প্রদায়ের। আমাদের আশেপাশের প্রতিবেশীদের মধ্যে সাদা-কালো-এশিয়ান-স্প্যানিশ সবাই আছে।
এখানে স্প্যানিশ মানে স্পেনের নাগরিক নয়, মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের মানুষ, যারা স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে তাদেরকে বোঝায়। এরা প্রায় সবাই শ্রমিকশ্রেণির। শিক্ষাদীক্ষায় আমাদের চেয়ে পিছিয়ে। তবে নারীদের সম্মান করতে জানে। ভুলেও ফিরে তাকাবে না আপনার দিকে। আবার কোনো সাহায্য চাইলে নিজের কাজ বাদ দিয়ে  ছুটে আসবে।
এখানে যে কেউ কারো দিকে তাকায় না, সেটা বুঝতে আমার কেটে গেছে কয়েক মাস। মনে পড়েছে শৈশবে পড়া সেইসব কাহিনী। অনেক আগে যখন সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্ন বই পড়তাম, খুব অবাক হতাম। পাহাড়-বনভূমির মাঝখানে নির্জন প্রান্তরে এক বাড়িতে একা থাকছে একটা মেয়ে। সম্পূর্ণ একা। আউটল’রা হয়ত ওর বাবা কিংবা স্বামী অথবা ভাইকে হত্যা করেছে। কিন্তু ওর চুল পর্যন্ত স্পর্শ করেনি। আসলে নারীদের অপমান করা কিংবা গায়ে হাত তোলাকে তখন থেকেই মনে করা হতো চরম কাপুরুষোচিত কাজ। যেটা খুব খারাপ মানুষটিও করতো  না। ওই মূল্যবোধ এখনও রয়ে গেছে।
আপনি ভাবছেন পোশাকের কথা! আমার বাড়ির ডান দিকে রুজভেল্ট এভিনিউয়ের রাস্তায় সামারের সময় প্রায় অর্ধ উলঙ্গ নারীদের হাঁটতে দেখি। কেউ তাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। মাঝে মাঝে এমন সুন্দরীদের দেখি যে, তারা মিস ওয়ার্ল্ড কম্পিটিশনে অংশ নেবার মতো, তারা অনায়াসে টেক্কা দিতে পারে যে কোনো হলিউডের নায়িকাকে, তারাও দেখি উপেক্ষিত। কারো মাথাব্যথা নেই কে বিকিনি পরল আর কে বোরকা পরল সেই ভাবনায়।
আমি নিজেও কি অনায়াসে ট্রেনে উঠে দুইজন অপরিচিত পুরুষের মাঝখানের সিটে গিয়ে বসি। এমনকি মাঝে মাঝে ট্রেনের দুলুনিতে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েও যাই। আমার পাশে কে বসেছে তার চেহারাটা দেখার প্রয়োজন বোধ করি না। অনেক রাতে নাটক দেখে একা বাড়ি ফিরি। নির্জন ফুটপাথ ধরে হাঁটি। একবিন্দু ভয় করে না।
জ্যাকসন হাইটসে অনেক বাঙালি মহিলা হিজাব করেন। সকালে এলাকার ফিটনেস সেন্টার গমগম করতে থাকে তাদের উপস্থিতিতে। ভিন্ন দেশের ভিন্ন সংস্কৃতির পুরুষদের পাশে তারা ট্রেডমিলে দৌড়ান। শরীরের ঘাম ঝরান। এক মুহূর্তের জন্য তাদের বিব্রত মনে হয় না। অথচ বাংলাদেশে থাকলে কি তারা পারতো এভাবে দেশি ভাইদের সঙ্গে একসঙ্গে জিম করতে !
কীভাবে পারবেন? সোহাগী জাহান তনুকে যারা ধর্ষণ করেছে, যারা তাকে হত্যা করেছে, তারা তো এদের  মধ্যেই আছে।  গিরগিটি যেভাবে ক্যামোফ্লেজ করে, সেভাবে কিছু অমানুষ রঙ পাল্টে মানুষ সেজে ঘুরে বেড়ায়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি লালন-পালন করে তাদের। এই সব অমানুষ আর তাদের পৃষ্ঠপোষকতাদানকারীদের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্টতম গালিটাও খুব সামান্য মনে হয়।
সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা।

‘আমরা কিন্তু এ বিষয়টির সঙ্গে অভ্যস্ত’ by মারুফ কিবরিয়া

বেশ কিছুদিন দেশের বাইরে ছিলেন স্বাগতা। এরপর ফিরেই নিয়মিত হয়েছেন। তবে খুব যে বেশি কাজ তিনি করছেন তা নয়। ব্যস্ততার কথা জানতে চাইলে জনপ্রিয় এ অভিনেত্রী জানান, বেশ কিছু খন্ড নাটক ও দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্যরে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন কিছু দিন আগেই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নাটকগুলোর গল্প ভালো ছিল। সে সঙ্গে স্বল্পদৈর্ঘ্যরে কাজ দুটিও দারুণ ছিল। সব তো গল্পের ওপর নির্ভর করে। সেজন্য গল্প ভালো হওয়ায় রাজি হয়েছি কাজগুলো করতে। অভিনয়ের পাশাপাশি উপস্থাপনা নিয়েও ব্যস্ত স্বাগতা। গত বছর থেকে প্রচারে আসা ‘সোনালী দিনের রূপালি গল্প’ নামের একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছেন তিনি। এটি বাংলাভিশনের প্রচার হচ্ছে। কাজটিতে শুরু থেকেই দর্শক সাড়া পাচ্ছেন বলেন জানান স্বাগতা। তিনি বলেন, আগেই বলেছিলাম চমকে ভরা একটি অনুষ্ঠান নিয়ে হাজির হবো। আমি আমার কথা রেখেছি। এটি একটি চলচ্চিত্র বিষয়ক অনুষ্ঠান। পুরনো দিনের সিনেমার নানা মজার মজার গল্প  নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এটি। প্রচারের শুরু থেকে দারুণ সাড়া পাচ্ছি। আশা করছি সামনে এটি দর্শকের আরো প্রিয় অনুষ্ঠানে পরিণত হবে। এর আগে বাংলাভিশনেই ‘সিনেবিট সাদাকালো’ নামের একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছিলেন স্বাগতা। এরই ধারাবাহিকতায় ‘সোনালী দিনের রূপালি গল্প’ নিয়ে হাজির হয়েছেন তিনি। এই অনুষ্ঠানটি ছাড়া ‘সময় কাটুক গানে গানে’ নামের আরো একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনাও করছেন জনপ্রিয় এ অভিনেত্রী। এদিকে গতবছরও বেশ কিছু ধারাবাহিক নাটকে নিয়মিত অভিনয় করেছিলেন স্বাগতা। তবে এ মুহূর্তে কোনো  ধারাবাহিকে কাজ করছেন না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি ভালো গল্পের পক্ষে। টানা অনেক কাজ করতে হবে তা নয়। ভালো গল্প পেলে ধারাবাহিকে অভিনয় করবো। নয়তো কাজ করবো না। ধারাবাহিকের চেয়ে খন্ড নাটকের প্রতিই বেশি আকর্ষণ স্বাগতার। কারণ এ ধারার নাটক দর্শক একটা সীমিত সময়ের মধ্যে দেখে শেষ করতে পারেন। তাছাড়া তারা বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে খন্ড নাটককেই বেশি প্রাধান্য দেন বলে মনে করেন এ অভিনেত্রী। প্রসঙ্গক্রমে স্বাগতা বলেন, সিরিয়ালের চেয়ে সিঙ্গেল কিংবা টেলিফিল্মে কাজ করে বেশি সাচ্ছন্দ্যবোধ করি। কারণ এ ধরনের নাটকের গল্পটা শেষ হয়। আর সিরিয়ালে তো গল্প ঝুলে থাকে। দর্শককে অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু  খন্ড নাটকের ক্ষেত্রে তা হয় না। পুরো নাটকটা এক ঘন্টায় শেষ হয়। বর্তমান সময়ে টিভি মাধ্যম খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করছে বলে অনেকে মনে করেন। ভালো গল্প সমৃদ্ধ নাটক নেই, অনুষ্ঠানের কন্টেন্ট ভালো নয়সহ অনেক অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। দীর্ঘদিনের ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয়টিকে স্বাগতা কিভাবে দেখছেন? তিনি বলেন, একটা কথা আগেই বলে রাখি। এত এত চ্যানেল হয়েছে যেখান থেকে ভালো খারাপ যাচাই করাটা দুরূহ ব্যাপার। আমার অবস্থানের কথা যদি বলি, আমাদের চ্যানেলগুলোতে প্রচুর সংখ্যক বিদেশী সিরিয়াল প্রচার হচ্ছে। নাটকের সংখ্যা কমে গেছে। নাটকে ভালো গল্পও খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। আবার একই অনুষ্ঠান বারবার রিপিট হচ্ছে। এক কথায় টিভিতে কন্টেন্ট কমে গেছে। এসব কারণে দর্শকও অনেক কমে গেছে বলে আমার মনে হয়। আরেকটা কথা ইদানিং অনেক শোনা যাচ্ছে। তা হলো আমাদের দেশে অনেক চ্যানেল। কিন্তু বিশেষায়িত কোনো চ্যানেল নেই। সবকটিতেই গান, অনুষ্ঠান, নাটক, টক শো, খবর প্রচার চলছে। এ প্রসঙ্গে স্বাগতার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা কিন্তু এ বিষয়টির সঙ্গে অভ্যস্ত। কারণ বিটিভি এমনভাবেই চলে আসছে সবসময়। এখন অনেক চ্যানেল হয়েছে। আর সেজন্য অনেকে মনে করেন স্পেশালাইজড চ্যানেল প্রয়োজন। ২০১৫ সালে চিত্রগ্রাহক রাশেদ জামানের সঙ্গে সংসার জীবন শুরু করেন স্বাগতা। কেমন কাটছে তাদের এ সংসার। স্বাগতা বলেন, শুরু তো করলাম। ভালোই যাচ্ছে। নতুন বাসা নিয়েছি। আগে বনানীতে ছিলাম। এখন বসুন্ধরায় উঠেছি। সবাই দোয়া করবেন আমাদের জন্য।

‘একদিন সিইসি হবেন নারী’ by তামান্না মোমিন খান

নির্বাচন কমিশনে প্রথম নারী কমিশনার তিনি। কর্মজীবনে ছিলেন বিচারক। এখন জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার দায়িত্বে। সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে সুনাম কুড়িয়েছেন বিচারক জীবনে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে সামনে রেখে তার মুখোমুখি হয়েছিল মানবজমিন। তিনি মনে করেন নারী এবং পুরুষকে আলাদা করে দেখার কিছু নেই। দেশের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী কমিশনার। সামনে হয়তো এমন সময় আসবে এখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হবেন একজন নারী। তিনি মনে করেন, মেধার দিক দিয়ে নারী এবং পুরুষের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। তফাৎটা শুধু সুযোগের। সুযোগ পেলে নারীরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। যেক্ষেত্রে পুরুষ সফল হতে পারে নারীরাও সেখানে পিছিয়ে নেই। নিজেকে নারী হিসেবে নয় একজন মানুষ হিসেবে দেখেন তিনি। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সম্মোধনের প্রতি আপত্তি রয়েছে এই কমিশনারের। তিনি বলেন, কর্মক্ষেত্রে একজন পুরুষকে আমরা খুব সহজেই স্যার বলে সম্মোধন করি অথচ একজন নারীকে স্যার ডাকতে লজ্জাবোধ হয়।  পুরুষকে যদি স্যার ডাকা যায় কেন নারীকে স্যার ডাকা যাবে না। এ ক্ষেত্রে নারী কেন বৈষম্যের শিকার হবে। আমাদের ধারণা রয়েছে নারী মানেই পিছিয়ে থাকবে। এটা ভুল ধারণা। কারণ নারী বলে করুণা করে তাকে কোনো পদ দেয়া হয় না। যোগ্যতার বলে সে তা অর্জন করে। 
ছোটবেলা থেকে প্রশ্ন করতে ভালোবাসতেন কবিতা। তাই বড় ভাই তাকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন বড় হয়ে তুই উকিল হবি। নিজের আগ্রহ থেকেই আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যোগ দেন বিচার বিভাগে।
কবিতা খানমের জন্ম ১৯৫৭ সালে নওগাঁও জেলায়। ৮ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। কবিতা খানম বলেন, অন্যান্য ভাইবোনের চেয়ে ছোটবেলায় আমি একটু বেশি দুরন্ত ছিলাম। সব কিছুতেই শুধু তর্ক করতাম। একারণে বড় ভাই আমাকে বলতো তুমি বড় হয়ে ওকালতি পড়বে। সেখান থেকেই আমার একটা সুপ্ত বাসনা জন্মায় ওকালতি পড়ার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল.এল.বি ডিগ্রি অর্জন করি। ল’ পড়ার কারণেই পরবর্তীতে আমি বিচার বিভাগে কাজ করতে পেরেছি। আমার লেখাপড়া বা কর্মক্ষেত্রে কখনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি আমার পরিবার। বিয়ের পর আমার স্বামী ও আমার শ্বশুরবাড়ির পরিবার আমাকে খুব সহায়তা করেছে। ১৯৮৪ সালে বিসিএস জুডিশিয়াল ক্যাডার হিসেবে রাজশাহীর মুন্সেফ কোর্টে যোগদান করেন কবিতা। একই বছরে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তিনি। তার স্বামী মশিউর রহমান চৌধুরী রাজশাহীর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। কবিতা খানম বলেন আমরা স্বামী-স্ত্রী ভালো বন্ধু ছিলাম। কর্মক্ষেত্রে আমাদের স্বামী-স্ত্রীকে সেরা জুটি আখ্যা দেয়া হয়েছিল। একারণে আমি সংসার এবং কর্মক্ষেত্র উভয় ক্ষেত্রেই সফলতার সঙ্গে কাজ করতে পেরেছি। সন্তানদের সঠিকভাবে লালন-পালন করতে পেরেছি। তার এক ছেলে সামরিক কর্মকর্তা চৌধুরী আবিদ রহমান এবং এক মেয়ে ডা. মুম্‌তাহ্‌িনা কুদসিয়াহ্‌ মিথিলা। কবিতা খানম বলেন মেয়েদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা কোনো অংশেই কম নেই।  মেয়েরা যদি বিয়ের আগে বাবার বাড়ি এবং পরে স্বামীর বাড়ির সহযোগিতা পায় তবে মেয়েরা কোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকবে না। দীর্ঘ দিন বিচার বিভাগের কর্মক্ষেত্রে নারী হিসেবে কোনো বৈষম্যের শিকার হয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাকে কখনো  বৈষম্যের শিকার হতে হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সহ চারজন পুরুষ আর একজন নারী কমিশনার যখন কমিশন বৈঠকে বসেন তখন আপনার মতামতের কতটা গুরুত্ব দেয়া হয়  জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে নারী-পুরুষ আলাদা করে দেখা হয় না। সবার মতামতকে সমান গুরুত্ব দেয়া হয়। কমিশনে নারী-পুরুষের কোনো বৈষম্য নেই। আমাকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে আমি তা সততার সঙ্গে পালন করবো। বিগত কমিশন নিয়ে যে বিতর্ক রয়েছে তা থেকে নির্বাচন কমিশন মুক্ত করতে আপনারা কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে কবিতা খানম বলেন সব প্রতিষ্ঠানেই তর্ক-বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচন কমিশনেও আছে। আমরা যে দায়িত্ব নিয়েছি সে দায়িত্বের প্রতি সৎ থাকবো এবং সুষ্ঠু, নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবো এটাই আমাদের সদিচ্ছা। এই  মেসেজটাই আমরা সব জায়গায় দিয়ে আসছি এবং দিচ্ছি। সবখানেই নেগেটিভ পজেটিভ দুটি দিক আছে। আমরা পজেটিভ দিক থেকেই এগিয়ে যেতে চাই। আমরা চাই সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে। বিসিএস জুডিশিয়াল ক্যাডার হিসেবে ১৯৮৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাজশাহী মুন্সেফ কোর্টে যোগদান করেন কবিতা। পদোন্নতি পেয়ে ১৯৯৪ সালে যুগ্ম জেলা জজ ও ২০০০ সালে অতিরিক্ত জেলা জজ হন তিনি। ২০০৬ সালে জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি পান কবিতা। জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে চাঁপাই নবাবগঞ্জ ও রাজশাহীতে কর্মরত ছিলেন তিনি। গত বছর জুন মাসে তিনি রাজশাহী জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

বিচরণ বেড়েছে মিলেছে কি মুক্তি by সালমা বেগম

দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা, সংসদের স্পিকারসহ উচ্চ অনেক পদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা। শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, বিমান চালনা, রাজনীতি সব ক্ষেত্রেই পদচারণা বাড়ছে নারীদের। তবে সেই অংশগ্রহণের হার এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি বলে মনে করছেন বিভিন্ন অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত নারীরা। তারা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ও তাদের বিকাশের ক্ষেত্রে এখন অনেক বাধা রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় বাধা হলো মানসিকতার। সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের আলাদা করে দেখার মানসিকতা এখন বড় দাগেই রয়ে গেছে। তবে সংখ্যা আর পরিসংখ্যান যাই বলুক, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের নারীরা উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় যে সাফল্য দেখিয়েছেন তা নজর কেড়েছে বিশ্ববাসীর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এখানেই থেকে থাকলে হবে না। সব ক্ষেত্রে নারীদের সমতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে হবে। এটি নিশ্চিত হলে উন্নয়ন ও অগ্রগতিতেও গতি সমানভাবে।
প্রত্যাশা আর অর্জন এই দুইয়ের যোজন ফারাক অবস্থান নিয়েই আজ বাংলাদেশে পালিত হবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সারা বিশ্বের ন্যায় দেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হবে দিবসটি। এ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে উচ্চশিক্ষায় মেয়েদের অনুপাত ৪০ শতাংশের মতো। যেসব কারণে উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ কম তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো তাদের কম বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া। বিয়ের পর মেয়েরা সাধারণত পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে। বর্তমানে ১৮ বছরের কম বয়সেই ব্যাপক সংখ্যক মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। ইউনিসেফ-এর ২০১২-১৩ সালের তথ্য অনুযায়ী ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী বিবাহিতা নারীদের ১৮ বছরের কম বয়সে ৫২ শতাংশ এবং ১৫ বছরের কম বয়সের মেয়েদের ১৮ শতাংশ বিয়ে হয়ে যাওয়ার তথ্য উঠে আসে। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে খারাপ। মেয়েশিশুদের (অর্থাৎ মেয়েদের ১৮ বছরের কম বয়সে) বিয়ে দেয়া তাদের মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এছাড়া সকল বিবাহিতা মেয়েশিশুর শুধু পড়াশোনাই যে বন্ধ হয় তা-ই নয়, বরং অল্প বয়সে সন্তান ধারণ করতে গিয়ে তাদের স্বাস্থ্যহানি হয়, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে থাকে। এছাড়াও অনেক সময় তারা অল্প বয়স ও বুদ্ধিমত্তায় অপরিপক্বতার কারণে নতুন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না। ফলে তারা অশান্তিতে নিপতিত হয়, এমন কি অনেক সময় নির্যাতনের শিকার হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রাজনীতিতে নারী-পুরুষ সমতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এগিয়েছে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক্ষেত্রে সার্কভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ পুরুষদের সমান বা কিছু বেশি। সরকারি চাকুরেদের মধ্যে নারী ২৪ শতাংশ। আর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে নারী ৩৩ শতাংশ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক নাজমা চৌধুরী বলেন, সব মিলিয়ে নারীরা ভালো করছেন। তবে খুব বেশি অগ্রগতি হয়েছে এটা বলা যাবে না। এখনও নারী নির্যাতনের শিকার হয়। প্রতিনিয়ত তারা নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত সুযোগ দেয়া হলে নারীরা অগ্রগতির ধারায় আরো বেশি অবদান রাখতে পারবেন।
এদিকে গত তিন দশকে দেশের রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বিস্ময়করভাবে বেড়েছে। ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সরাসরি ভোটে মাত্র পাঁচজন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বর্তমানে সংসদে ৭০ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সংসদ উপনেতা, বিরোধী দলের নেতা, স্পিকার হয়েছেন নারী। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বাড়লেও নীতিনির্ধারণী পর্যায় বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে নারী এখনো অবিরাম সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নারী নেত্রীদের মতে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে নারীকে রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে দেয়ার বঞ্চনার সূত্রপাত হয় মনোনয়নের মধ্য দিয়ে। যথেষ্ট শিক্ষা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া এখনো ব্যাপক সংখ্যক নারী জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি মনোনয়ন পাচ্ছেন না। ফলে জনপ্রতিনিধি হিসেবে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখার জন্য সংরক্ষিত আসনই অন্যতম বিকল্প হিসেবে রয়ে গেছে। দলীয় স্বার্থে সংসদে কোরাম পূরণ ও হ্যাঁ-না ভোটে আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখা ছাড়া সংরক্ষিত সদস্যদের আর করার কিছুই নেই। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অগ্রগতি সম্পর্কে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন সর্বত্রই কঠিন। রাজনীতিতে আরো বেশি কঠিন। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি দলে ৩৩ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ থাকার কথা থাকলেও সেটা দেখা যায় না। আর দলের যে সদিচ্ছা নেই সেটাও বোঝা যায়। উচ্চপদে নারীদের দেখা যায়। কারণ, তারা বাবা কিংবা স্বামীর জায়গায় এসেছেন। মেয়েদের মেয়ে হিসেবে হেনস্থা করার ধরন সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই বিদ্যমান। রাজনীতিতে আসতে হলে প্রথমে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়। তারপর পরিবার এবং সমাজ। আর বিরোধী দলে থাকলে তো কথাই নেই। পুলিশের হামলা আর মামলার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। যে কারণে রাজনীতিতে নতুন মুখ খুব কম দেখা যায়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীদের মূল্যায়ন করতে চায় না। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি কাজ করলেও আশানুরূপ অগ্রগতি দেখা যায় না। যে কারণে পুরুষের তুলনায় নারীর জন্য রাজনীতিতে আসা অনেক বেশি কঠিন। তবে তৃণমূল থেকে উঠে আসার সংখ্যাটা একেবারেই কম।
প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক ডা. নুজহাত চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, আমাদের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান নারী। আমরা স্পিকার পেয়েছি নারী। তবে এক্ষেত্রে পারিবারিক সংযুক্তি থেকে ক্ষমতায় আসার প্রবণতা বেশি। যদিও তারা ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্র পরিচালনায় যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন এটা বলতেই হবে। বাংলাদেশে রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন ওপর থেকে নিচে। নিচে থেকে উপরে নয়। নিচ থেকে উপরে গেলে স্থায়িত্বটা বেশি হতো। তৃণমূল থেকে রাজনীতিতে এসে ধাপে ধাপে উপরে ওঠার উদাহরণ নেই। তবে আমরা আশা করবো গণসংযোগের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসার প্রবণতা বাড়বে। যদিও সমাজের একটা মাইন্ডসেট আছে যে নারীরা পুরুষের সমান কাজ করতে পারে না। তাই নারীদের সবক্ষেত্রেই দ্বিগুণ কাজ করে, অর্জন করে প্রমাণ করতে হয় যে নারী পুরুষ সমকক্ষ। তিনি বলেন, নারীদের সামাজিক, মানসিক, শারীরিক এবং প্রথাগত দায়িত্ব অনেক বেশি। এগুলোর কারণে তারা সুযোগ কম পাচ্ছেন। তবুও নারীরা এগিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। নিজেদের সাহস প্রকাশ করার সাহসিকতা দেখাচ্ছেন।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের ‘নারী ব্যবসা ও আইন-২০১৬’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নারীরা এখনো কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার। প্রতি দু’বছর অন্তর প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের বিস্ময়কর সাফল্যের পেছনে নারীর অগ্রগতি ভূমিকা রাখলেও এখনো বৈষম্যের শিকার তারা। নারীদের এগিয়ে যেতে হচ্ছে সহিংসতাকে মোকাবিলা করেই। যৌন নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, আত্মহত্যা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। নারী নির্যাতন থেমে নেই। নারীর প্রতি সহিংসতা ও পারিবারিক নির্যাতন এবং নারী পাচার চলছেই। ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা, যৌতুকের বলি হওয়ার ঘটনা এখনো উদ্বেগের পর্যায়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রথমবারের মতো করা নারী নির্যাতন নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের জরিপে উঠে এসেছে, নারী ঘরেই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হচ্ছেন। এতে বলা হয়েছে, নারীরা বাইরে থেকে নিজ ঘরে অনেক বেশি নির্যাতিত হন। জরিপ অনুযায়ী, বিবাহিত মেয়েদের ৮৭ শতাংশ নির্যাতনের শিকার নিজ ঘরে স্বামীর দ্বারা। ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ স্বামীগৃহে মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ। বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশের ৫ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে ১ কোটি ৬২ লাখ নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৯৭ জন। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৭৬ লাখ প্রবাসীর মধ্যে ৮২ হাজার ৫৫৮ জন নারী। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ৮০ ভাগ কর্মীই নারী। আর দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহারকারীও নারী। বাংলাদেশে সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৩৩৪টি। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮৩ হাজার ১৩৩, অর্থাৎ শতকরা ৭.৬ ভাগ। উপসচিব পদ থেকে সচিব পদ পর্যন্ত নারীদের সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ বা তারও কম। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিচার বিভাগে বিচারক পদের ১০ শতাংশ হলেন নারী। জাতীয় শ্রমশক্তি জরিপ প্রতিবেদন অনুসারে, দেশে নারী শ্রমিকের সংখ্যা সাড়ে ৮ লাখ। তারা সবাই মজুরি বৈষম্যের শিকার। পুরুষের সমান কাজ করলেও মজুরি পান কম। গ্রামাঞ্চলে একই কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা গড়ে ১৮৪ টাকা পেলেও নারী শ্রমিকরা পান মাত্র ১৭০ টাকা।
এদিকে লিঙ্গ-অসমতা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে সফল দেশ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম তাদের লিঙ্গ-বৈষম্য প্রতিবেদন-২০১৬-এ এই তথ্য পরিবেশন করেছে। ১৪৪টি দেশে এই জরিপ চালানো হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭২, ভারতের ৮৭, শ্রীলঙ্কার ১০০, নেপালের ১১০, মালদ্বীপের ১১৫, ভুটানের ১২১ এবং পাকিস্তানের ১৪৩। ফোরামের জরিপে গত বছরও এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে ছিল।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস (আদি নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস) প্রতি বছর ৮ই মার্চ তারিখে পালিত হয়। সারা বিশ্বব্যাপী নারীরা একটি প্রধান উপলক্ষ হিসেবে এ দিবস উদযাপন করে থাকেন। বিশ্বের একেক প্রান্তে নারী দিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য একেক প্রকার হয়। এ দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকারি বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে নিউ ইয়র্কে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে আয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। পরবর্তীতে ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বছর ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ই মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে শুরু করে। ১৯৭৫ সালে ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবীজুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি নারীর সমঅধিকার আদায়ের প্রত্যয় উচ্চারণ করার মধ্য দিয়ে।

বাধ্য হয়ে যৌন ব্যবসায় হিজড়ারা

বাংলাদেশে হিজড়া সম্প্রদায় ও তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে ঢাকায় দু’বছর অতিবাহিত করেন ডেনমার্কের ফটোগ্রাফার জ্যান মোয়েলার হ্যানসেন। তার দৃষ্টিতে হিজড়া সম্প্রদায়ের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে বৃটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইলের এক প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, যৌন ব্যবসায় ঢুকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন হিজড়ারা। সমাজে একপ্রকার নির্বান্ধব জীবন কাটাচ্ছেন তারা। নিজেদের এক আপন সম্প্রদায় গড়ে তুলেছেন তারা। সরকারিভাবে তারা ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃত। ট্রান্সজেন্ডারদের প্রতি মানুষের অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গির কারণে অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের পরিবার ও স্বজনদের থেকে বিতাড়িত হন হিজড়ারা। ড্যানিশ আলোকচিত্রী হ্যানসেন বলেন, ‘ঢাকায় কয়েক বছর থাকার পর, আমি উপলব্ধি করলাম, বাংলাদেশে আমার মোট ৫ বছর কাটানো সময়ে আমার দেখা অন্যতম খোলামেলা মনের, গর্বিত, আত্মসচেতন ও সম্মানিত মানুষ তারা। তাদের ভিন্ন সেক্সুয়ালিটি, বেশভূষা ও আচরণ এবং সমাজে তাদের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করা হয়- এসব কারণে তারা নিজেদের মধ্যে নিজস্ব পারিবারিক কাঠামো আর বন্ধন গড়ে তুলেছে। আমি দেখেছি, হিজড়া পরিবারগুলোতে এই বন্ধন ও সম্পর্ক অত্যন্ত
শক্তিশালী। এটা তাদের নিজস্বতা ধরে রাখতে এবং সমাজে টিকে থাকতে প্রয়োজনও বটে।’
এদের অনেকেই যৌনকর্মী। বেশিরভাগ হিজড়া জন্মগতভাবে পুরুষ, তবে তারা নিজেদের নারী বা পুরুষ কোনোভাবেই দেখেন না। 
মি. হ্যানসন বলেন, ‘প্রকৃত হিজড়া হওয়া মানে অনেক ক্ষেত্রে তাদের পুরুষাঙ্গ ও অণ্ডকোষ ফেলে দেয়ার মাধ্যমে খোজায় পরিণত করার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।’
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হিজড়ারা সমঅধিকারের জন্য লড়াই করে আসছেন। হ্যানসেন বলেন, ‘হিজড়ারা তাদের অধিকারের জন্য লড়ছেন। তারা অন্যদের মতো একই অধিকার পেতে চান। তারা অন্যদের জানাতে চান যে তারাও স্বাভাবিক মানুষ। তারা চান তাদেরকেও অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করার সুযোগ দেয়া হোক। হিজড়ারের দাবি অন্যরা তাদের জীবন, লিঙ্গ আর সেক্সুয়ালিটি বোঝে না। তাদের চাওয়া, সমাজ ও সরকার তাদের অন্য মানুষের মতো সমঅধিকার দিয়ে স্বীকৃতি দিক।’

খালেদা জিয়ার নাইকো মামলা স্থগিত

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা নাইকো দুর্নীতি মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার করা এক আবেদনের শুনানি শেষে গতকাল বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. খসরুজ্জামানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ স্থগিতাদেশ দেন। আদালতে খালেদার পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। আর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। পরে খুরশীদ আলম খান মানবজমিনকে জানান, এ মামলায় মওদুদ আহমদের বিষয়ে জারি করা রুলের শুনানি হচ্ছে। সেই শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা এই মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে খালেদা জিয়া এ মামলার যে বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করেছেন সেটি কেন বাতিল করা হবে না-এ মর্মে রুল জারি করেছেন আদালত। তিনি বলেন, হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আমরা আপিল করবো।
মামলার বিবরণে জানা যায়, কানাডার কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি ও দুর্নীতির অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ৯ই ডিসেম্বর দুদকের সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম তেজগাঁও থানায় এ মামলাটি দায়ের করেন। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ৫ই মে খালেদাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এ মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে দাখিল করা হয়। নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া, দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন, দুর্নীতির অভিযোগে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী গিয়াস উদ্দিন আল মামুন, বাপেক্সের সাবেক মহাব্যবস্থাপক মীর ময়নুল হক, ঢাকা ক্লাবের সাবেক সভাপতি সেলিম ভূঁইয়া ও নাইকোর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশেম শরীফকে আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় মওদুদ আহমদের বিষয়ে গত বছরের ১লা ডিসেম্বর হাইকোর্ট রুল ও স্থগিতাদেশ জারি করেন। পরে মওদুদের পক্ষে যাওয়া সেই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে দুদক আপিল করলে আপিল বিভাগেও হাইকোর্টের আদেশ বহাল থাকে। তবে, রুল শুনানিতে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ বিব্রতবোধ করলে নিয়ম অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি তা অন্য একটি বেঞ্চে পাঠিয়ে  দেন। ওই রুলের শুনানি বর্তমানে চলছে।