Showing posts with label নির্বাচন ও রাজনীতি. Show all posts
Showing posts with label নির্বাচন ও রাজনীতি. Show all posts

Sunday, February 1, 2026

সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তেমন কোনো লাভ নেই: রেহমান সোবহান

প্রকাশ ৩০ জানুয়ারি ২০২৬ঃ সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তেমন কোনো লাভ নেই বলে মন্তব্য করেছেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান।

‘পুরাতন বন্দোবস্তে ভাঙন, সংস্কার এবং গণতন্ত্রের পুনর্ভাবনা: ক্রান্তিকালে দুঃসহ পথচলা’ শীর্ষক দিনব্যাপী একটি সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এই সম্মেলনের আয়োজন করে। এ আয়োজনে সহায়তা করে যুক্তরাজ্য সরকারের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (এফসিডিও) এবং ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (আইডিআরসি)। অনুষ্ঠানে বিআইজিডির স্টেট অব গভর্ন্যান্স ২০২৪–২৫ গবেষণা প্রকল্পের ফলাফল তুলে ধরা হয়। বিআইজিডির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

অনুষ্ঠানের বিভিন্ন সেশনে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের ফলে সৃষ্ট পরিবর্তন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় কতটা প্রভাব ফেলেছে, নতুন কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠছে কি না, এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে—এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় বক্তারা অভ্যুত্থানের সময়কার সংহতি, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতি, তরুণদের রাজনৈতিক সংগঠনের গতিপ্রকৃতি, সংস্কার ও বিপ্লবের রাজনীতি এবং রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায় জেন্ডারভিত্তিক বিতর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।

২০০৬ সাল থেকে বিআইজিডির স্টেট অব গভর্ন্যান্স প্রতিবেদনগুলো তাত্ত্বিক এবং মাঠভিত্তিক গবেষণা ও সুসংগঠিত কাঠামোর ভিত্তিতে দেশের শাসনব্যবস্থার জাতীয়, স্থানীয় ও খাতভিত্তিক বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আসছে।

সম্মেলনে অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘সংস্কার বিষয়ে কিছু প্রস্তাবনার কথা কাগজে তুলে ধরলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তাতে তেমন কোনো লাভ নেই।’

বিআইজিডির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুলাই গণ–অভ্যুত্থান শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারকে পতনের দিকে নিয়ে যায়, সেটি আসলে ধারাবাহিকভাবে তৈরি হওয়া একাধিক সংহতির ফল ছিল। একক কোনো কারণ থেকে উদ্ভূত হয়ে নয়; বরং এই অভ্যুত্থান ছিল বহুদিনের মিলিত কারণের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ, যা মাত্র দুই মাসের মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্মিলিত প্রয়াসে শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। ক্রমে এটি সামান্য ইস্যুভিত্তিক প্রতিবাদ থেকে প্রসারিত হয়ে বহুমুখী, বহু খাতের আন্দোলনে রূপ নেয়, যার প্রভাব পড়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। শেষ পর্যন্ত রাজপথের সঙ্গে, ডিজিটাল এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধরনের সংহতি একসাথে মিলিত হয়ে একটি শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলে। তবে বক্তাদের মতে, শেষ পর্যন্ত এই অভ্যুত্থানটি সত্যিকারের ‘গণ–আন্দোলন’-এ পরিণত হতে পারেনি।

গণ–অভ্যুত্থান–পরবর্তী রাজনীতি

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর প্রথম দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি জনসমর্থন ও বৈধতা অনেক বেশি ছিল। কারণ আন্দোলনকে জনগণ ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছিল। বিআইজিডির একটি জাতীয় জরিপ (আগস্ট ২০২৪) অনুযায়ী ৮৩ শতাংশ মানুষ আগের সরকারকে উৎখাত করার পক্ষে ছিল। আন্দোলনের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা সবচেয়ে বেশি থাকলেও ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি এটি আবারও প্রায় গণ–অভ্যুত্থানের আগের পর্যায়ে নেমে আসে। অর্থনৈতিক আশাবাদও কমে যায়, কারণ গভর্ন্যান্স ও অর্থনীতি উন্নত হবে বলে যে প্রত্যাশা ছিল, তা পুরোপুরি পূরণ হয়নি। আস্থা কমার ফলে দ্রুত নির্বাচনের দাবিও বাড়তে থাকে। রাজনৈতিক চাপ, দেশ-বিদেশের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়।

বিআইজিডির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের যথেষ্ট রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি হয়। জনশৃঙ্খলার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় দলবদ্ধ সহিংসতা বাড়ে, যা সরকার পুরোপুরি সামাল দিতে পারেনি। অনেক সময় জনগণের দাবিগুলো ন্যায্যতা বা সমতার ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাব করে বিবেচনা করা হয়েছে। সংস্কারের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার খুব একটা সক্রিয় ছিল না। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো রাজনৈতিক অভিজাতদের আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং সাধারণ নাগরিক গোষ্ঠীর জন্য কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ কঠিন হয়েছে । এ ছাড়া সংস্কার কার্যক্রম মূলত নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের জন্য রেখে দেওয়ায় এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যা সংসদে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পাশাপাশি রাজপথেও নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।

গতকালের অনুষ্ঠানে উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং বাংলাদেশ সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান আলী রীয়াজ বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন না থাকায় রাষ্ট্রকে এমন এক আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা আগের সরকারের সময় শক্তিশালী ছিল।’ তিনি বলেন, ‘এর মানে হলো আমার সঙ্গে যোগ দাও, যদিও একই সঙ্গে আমি তোমাদের অতিরিক্ত ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। এখানে যেসব বিষয় উঠে এসেছে, সেগুলোই গণভোটে সামনে আনা হয়েছে। যদি এগুলো অনুমোদিত হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলো জনতার প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং সংস্কারের সুযোগ তৈরি হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সুশীল সমাজ অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারত। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুশীল সমাজ মূলত রাজনীতি থেকে দূরে থেকেছে। অথচ তারা আরও সক্রিয় হলে সরকারকে জবাবদিহি করতে সাহায্য করতে পারত।’ তিনি বলেন, ‘দেশ এখনো অনেক দূর এগোতে পারে, সমস্যাগুলো পুরোপুরি সমাধান হয়নি; এবং এখনো এগুলো নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে। গণভোটে এমন অনেক বিষয় আনা হয়েছে, যেগুলো ভোটে পাস হলে রাজনৈতিক দলগুলো জনতার চাপের মুখে পড়বে এবং সংস্কারের সুযোগ তৈরি হবে।’

ক্ষমতাবিহীন দৃশ্যমানতা: বাংলাদেশের রূপান্তর প্রক্রিয়ায় জেন্ডারভিত্তিক বিতর্ক

স্টেট অব গভর্ন্যান্স গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার আগে থেকে অনুমান করতে পারেনি যে, নারীর উন্নয়ন ও অধিকারবিষয়ক এজেন্ডা সামনে আনার ফলে জনগণের মধ্যে এত শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রধান উপদেষ্টার অফিস নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্যদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়রানি করেছে এবং নেতিবাচক মতগুলোকে নিয়ে জনগণের আলোচনার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। সবচেয়ে বিতর্কিত সুপারিশগুলোও তারা কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই প্রকাশ করেছে।

পুরুষপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে। তারা এমন একটি ব্যবস্থা জোরদার করেছে, যেখানে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ পরিবারের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে, নিজের অধিকার বা স্বতন্ত্রভাবে নয়। জাতীয় কনসেনসাস কমিশন জেন্ডারভিত্তিক এজেন্ডা অন্তর্ভুক্ত করতে চায়নি; আর সরকারও প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে সমর্থন করতে বা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী হয়নি।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘নীতিনির্ধারণে নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি জেন্ডারভিত্তিক সমস্যাগুলোকে প্রান্ত থেকে কেন্দ্রের দিকে তুলে আনে। নারীরা, বিশেষ করে যাঁরা নীতিনির্ধারণের অবস্থানে আছেন, যদি অন্যদের ওপর নির্ভর করে তাদের লক্ষ্য এগোতে দেন, তাহলে নারীবাদী আন্দোলন পিছিয়ে যায়।’

গণ–অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন যুবরাজনীতি

বাংলাদেশের তরুণ এবং শিক্ষার্থীরা আগেও রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন, তবে বেশির ভাগ সময় তাঁরা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের কর্মী বা নেতা হিসেবে কাজ করেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রথম তরুণেরাই বাংলাদেশে নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলার এবং তাতে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়ার সূচনা করেন। বিআইজিডির যুব নেতৃত্বাধীন রাজনীতিবিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে যে জুলাই বিপ্লব থেকে জন্ম নেওয়া জাতীয় সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) একটি যুব নেতৃত্বাধীন আন্দোলনভিত্তিক দল, যা শুরুতে অনানুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হতো; কিন্তু ধীরে ধীরে এটি সংগঠিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপান্তরিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, আন্দোলনভিত্তিক দলগুলো প্রায়ই আন্দোলনের স্বাধীন কার্যপদ্ধতিকে পার্টি রাজনীতির দাবির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, এ ধরনের চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশেও দেখা গেছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যতই চেষ্টা করুক, ভেতরে অরাজক ও বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘ছাত্র আন্দোলন অন্তর্বর্তী সরকারের মূলশক্তি হতে পারত। তারা একধরনের জবাবদিহিব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে স্থানীয় স্তরে শক্তিশালী সমর্থন গড়ে তুলতে পারত। হয়তো তারা ভেবেছিল, যদি সরকার থেকে দূরে থাকে, তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাবে, তাই তারা সরকারের সঙ্গে যুক্ত হলো; কিন্তু এই কৌশল ব্যর্থ হলো—অন্তর্বর্তী সরকারের অংশ হয়ে তারা সেই রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে মিশে গেল, যেটির থেকে তারা স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল। তাদের কাছে স্পষ্ট কোনো ম্যান্ডেট বা তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছানোর সুসংগঠিত কাঠামোও ছিল না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আসিফ শাহান বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি পরিবর্তনের কঠিন সময়’ অতিক্রম করেছে, এবং এই কঠিন সময়কে পার করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে অভিজাতদের ঐকমত্য এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। দুর্ভাগ্যবশত তা হয়নি; এবং এখন আমাদের কাছে এমন একটি অভিজাত ঐকমত্য আছে, যেটিতে সাধারণ মানুষ বা নাগরিকদের কোনো অংশ নেই। আমরা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি এবং সংস্কারের ভবিষ্যৎকে নিয়ে নিশ্চিত নই।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেন, ‘যদিও শিক্ষা, জেন্ডার ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ সংস্কার নেওয়া যায়নি, তবু অর্থনীতিতে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। সংস্কার আমাদের প্রজন্মের জন্য কোনো মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বা প্রলোভন ছিল না; এটি একটি গভীরভাবে শিকড়গাঁথা প্রত্যাশা। সরকার হয়তো এগুলো পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু আমাদের আকাঙ্ক্ষা এখনো অটুট।’

লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাওমী হোসাইন বলেন, ‘গণ–অভ্যুত্থানের পরে সুশীল সমাজের শূন্য স্থানে একটি হিংস্র শক্তি প্রবেশ করেছে। আমরা দেখেছি মব নারী, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করেছে এবং দেশের দুটি প্রধান সংবাদপত্রকেও টার্গেট করেছে। এই হামলাগুলো আগের সরকারের কর্মকাণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি ফ্যাসিস্ট আচরণের মতো। অন্তর্বর্তী সরকার আরও দৃঢ়ভাবে বার্তা দিতে পারত যে কী গ্রহণযোগ্য এবং কী নয়—যাতে ব্যক্তিগত অধিকার, সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক সমাজের নীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো।’

‘পুরাতন বন্দোবস্তে ভাঙন, সংস্কার এবং গণতন্ত্রের পুনর্ভাবনা: ক্রান্তিকালে দুঃসহ পথচলা’ শীর্ষক সম্মেলনে বক্তব্য দেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান
‘পুরাতন বন্দোবস্তে ভাঙন, সংস্কার এবং গণতন্ত্রের পুনর্ভাবনা: ক্রান্তিকালে দুঃসহ পথচলা’ শীর্ষক সম্মেলনে বক্তব্য দেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। ছবি: বিআইজিডির সৌজন্যে

Saturday, September 28, 2024

কেমন হবে নির্বাচনের দৃশ্যপট?

নির্বাচন নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। সেনাপ্রধান এরইমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন হতে পারে। নিউ ইয়র্ক সফররত প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসও নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি অবশ্য সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ বলেননি। সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট পাওয়ার পর নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের কথা বলেছেন। নির্বাচনের সময়সীমা  নিয়ে যখন এক ধরনের ধারণা পাওয়া যাচ্ছে তখন আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য দৃশ্যপটগুলোও আলোচনায় এসেছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিকা কী হবে সেটিই প্রধান প্রশ্ন। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে প্রবল পরাক্রমে দেশ শাসন করা দলটি গেল দুই মাস ধরে একেবারেই নীরব। যদিও সংস্কার ও নির্বাচনে ভূমিকা রাখার কথা বলেছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী দেশ ছাড়লেও এখন পর্যন্ত দলটিতে কোনো ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নিয়োগ দেয়া হয়নি। সাধারণ সম্পাদক কোথায় রয়েছেন তাও কেউ জানে না। দলটির অন্য শীর্ষ নেতাদেরও একই দশা। এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কী পরিবর্তন আসবে? দলটির পলাতক শীর্ষ নেতৃত্ব এ নিয়ে আগ্রহী নয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে। দেড় দশক ধরে গুরুত্ব না পাওয়া নেতারা কোনো উদ্যোগ নেন কি-না সেটিও দেখার বিষয় বলে কেউ কেউ মন্তব্য করছেন। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে সরকারের সমন্বিত কোনো সিদ্ধান্ত এখনও পাওয়া যায়নি। এ নিয়ে উপদেষ্টাদের মন্তব্যে একধরনের ভিন্নতা রয়েছে। সরকারের একজন উপদেষ্টা বলেছেন, ‘মতপ্রকাশের নামে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে কি-না সেটা একটা প্রশ্ন। আওয়ামী লীগ ফ্যাসিজমে জড়িত, গণহত্যায় জড়িত। তাদের বিচার প্রক্রিয়া চলছে। আমরা বলেছি, এ মুহূর্তে তাদের রাজনীতি করার সুযোগ নেই।’ তবে এ ব্যাপারে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বিএনপি’র পক্ষ থেকে এরইমধ্যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে দলটি ক্ষমতায় গেলে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করা হবে। একাধিক সূত্র বলছে, যুগপৎ আন্দোলনে যেসব দল ছিল নির্বাচনে বিএনপি সেসব দলকে গুরুত্ব দিবে। সরকার গঠন করলে সেসব দলকেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিএনপি’র সম্ভাব্য জাতীয় সরকারে জামায়াতকে অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা নেই বলে একাধিক সূত্র বলছে। জামায়াতের সঙ্গে বিএনপি’র জোট নেই অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই। যদিও দল দু’টির মধ্যে কখনো কখনো পর্দার আড়ালে একধরনের যোগাযোগ ছিল। তবে ৫ই আগস্টের পর বিএনপি’র সঙ্গে জামায়াতের দূরত্ব বেশ বেড়েছে। দল দু’টির শীর্ষ নেতারা প্রকাশ্যই সমালোচনামূলক বক্তব্য রাখছেন।

বিএনপি’র সঙ্গে ঐক্য হবে না ধরে নিয়েই জামায়াত নিজেদের আগামী দিনের রাজনীতির প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইসলামপন্থি দলগুলোসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জামায়াত আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এ নিয়ে অবশ্য খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। ইসলামপন্থি দলগুলোর মধ্যে যেমন জামায়াতকে নিয়ে প্রশ্ন আছে তেমনি এ ধরনের জোটের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। নতুন রাজনৈতিক দলগঠনে জামায়াতের ভেতরে-বাইরে আগে আলোচনা থাকলেও তা এখন অনেকটাই মিইয়ে গেছে। ক্যাম্পাসগুলোতে শিবির প্রকাশ্য হওয়ার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের দূরত্ব বাড়তে পারে।
ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া নেতারা নতুন কোনো দল করেন কি-না সেটা অবশ্য এখনো স্পষ্ট নয়। সমন্বয়করা বলছেন, এখনই নতুন কোনো দল গঠনের চিন্তা তাদের নেই। তবে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল গঠনের সম্ভাবনা তারা নাকচ করছেন না। এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টরা স্বীকার করছেন, রাজনৈতিক দলগঠন করা একটি বড় কর্মযজ্ঞ। তবে এ নিয়ে তাদের তৎপরতার খবর নানা সূত্রে জানা যাচ্ছে।

অনেক কিছুই ঝাঁপসা। তবে রাজনীতির এক ধরনের রূপচিত্র দেখা যাচ্ছে। যেটা ইঙ্গিত দেয় যে, বহুদিনের পুরনো অনেক সমীকরণই পাল্টে যেতে পারে। তবে রাজনীতিতে যেকোনো দৃশ্যপটই যে অভাবনীয়ভাবে বদলে যেতে পারে সেটা তো ৫ই আগস্টই দেখিয়ে গেল। কয়েকঘণ্টা আগেও খুব কম লোকই জানতেন শেখ হাসিনার সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।

mzamin

Thursday, September 5, 2024

সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘সৌজন্য বিনিময়ে’ আসছে ইসি

সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘সৌজন্য বিনিময়’ করবে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামীকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করবেন নির্বাচন কমিশনাররা। এই সৌজন্য বিনিময়ে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের ঘোষণা আসতে পারে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন পর্যন্ত চুপচাপ আছে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের করণীয় নিয়ে দোটানায় পড়েছে তারা। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের বার্তা পায়নি ইসি। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য কমিশনাররা নিয়মিত অফিস করছেন।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। পরদিনই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা শপথ নেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। প্রধান বিচারপতি থেকে শুরু করে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকে ইতিমধ্যে পদত্যাগ করেছেন।

ইসি সূত্র জানায়, সরকার পতনের পর নির্বাচন কমিশনাররা ধরে নিয়েছেন, তাঁদেরও পদত্যাগ করতে হবে। এ জন্য তাঁরা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। তবে তাঁরা নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন, নাকি এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্য কোনো চিন্তা আছে, তা বোঝার চেষ্টায় ছিল ইসি। এ বিষয়ে পরামর্শের জন্য তাঁরা রাষ্ট্রপতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন; কিন্তু তাতে সফল হননি।

এমন পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময়ে আসছেন সিইসি ও অন্য কমিশনাররা। নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের পরিচালক মো. শরিফুল আলম জানান, আগামীকাল দুপুর ১২টায় নির্বাচন ভবনের সম্মেলনকক্ষে নির্বাচন কমিশন সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করবে। এই সৌজন্য বিনিময়ে নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের ঘোষণা আসতে পারে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।

২৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট সময় নিয়ে কিছু বলেননি। তিনি বলেন, কখন নির্বাচন হবে, সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সরকারের নয়। তবে নির্বাচন কমিশনকে সংস্কার করে যেকোনো সময় আদর্শ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রাখা হবে বলেও ভাষণে উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা।

নির্বাচন কমিশনের একটি সূত্র জানায়, সংবিধান অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন করার কথা বলা আছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি সম্ভব নয়, তা পরিষ্কার; কিন্তু সংবিধান স্থগিত করা হয়নি বা সরকার পতনের পরে কোনো ফরমানও জারি করা হয়নি। ফলে নির্বাচন করার বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়ে গেছে। এই কমিশন যদি আরও এক-দুই মাস দায়িত্বে থাকে, তাহলে এ বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন হবে। কারণ, নির্বাচন আয়োজন করার সাংবিধানিক দায়িত্ব ইসির। আইনি ফাঁকফোকর রেখে যদি নির্বাচন পেছানো হয়, তাহলে কোনো একসময় ইসিকে সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতে পারে। এ ছাড়া যেভাবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে, সেটি পুরোপুরি সংবিধান মেনে হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে।

সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল ২৪ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে ‘বিপ্লব ও ফরমান: সরকার ও সংবিধান’ শিরোনামে একটি কলাম লিখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন সংবিধান ও সফল বিপ্লবোত্তর সাংবিধানিক পরিস্থিতিতে সংকটে রয়েছে।’

সিইসি তাঁর কলামে আরও লিখেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্বাচন কমিশনারদের অপসারণ যখনই হোক না কেন, রাষ্ট্র ও সরকারের আইনগত ও সাংবিধানিক ভিত্তি মজবুত করতে হলে সফল বিপ্লবোত্তর উদ্ভূত এমন পরিস্থিতিতে অবিলম্বে একটি অসামরিক ফরমান জারি করে প্রচলিত সংবিধান স্থগিত বা পাশাপাশি বহাল রেখে অসামরিক ফরমানকে সংবিধানের ঊর্ধ্বে অবস্থান প্রদান করে সাংবিধানিক বা আইনগত সংকট পরিহার করা প্রয়োজন।’

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেয় কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন। এই কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর। এর আগের কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশনের মতো হাবিবুল আউয়াল কমিশন নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক ছিল। প্রথমবারের মতো একটি আইনের মাধ্যমে এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। তবে ২০২২ সালে প্রণয়ন করা ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন’ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

দেশের অন্যতম প্রধান বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিসহ ইসিতে নিবন্ধিত বেশির ভাগ দল হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশনকে মেনে নেয়নি। ইসির সংলাপের আহ্বানও প্রত্যাখ্যান করেছিল বিএনপিসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দল ও জোট। এই কমিশনের আমলে গত জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বর্জন করে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। শুধু আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র দলগুলো ওই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। জাতীয় নির্বাচনের আগে নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দলকে নিবন্ধন দেওয়া, বিতর্কিত বিভিন্ন সংস্থাকে পর্যবেক্ষক সংস্থা হিসেবে অনুমোদন দেওয়া, আইনে নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করার প্রস্তাব দেওয়া, ইভিএম ব্যবহার নিয়ে সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলোর দেওয়া মত পাল্টানোসহ কমিশনের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক ছিল।

Monday, August 26, 2024

নির্বাচন কখন হবে সেটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত -ড. মুহাম্মদ ইউনূস

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেছেন, বৈষম্যহীন, শোষণহীন, কল্যাণময় এবং মুক্ত বাতাসের রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই স্বপ্নপূরণে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ।  রোববার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তার ভাষণ সরাসরি সমপ্রচার করা হয়। ছাত্র-জনতা যে স্বপ্ন নিয়ে বিপ্লব এনেছে তা সফল করতে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। ছাত্র-জনতার বিপ্লবে নিজেকে একজন সহযোদ্ধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার নানা খাতে পর্বতসম চ্যালেঞ্জ রেখে গেছে। দেশবাসীর সহযোগিতা নিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা হবে। জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত আমাদের নয়।

জুলাই-আগস্ট মাসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার শপথ নিয়ে আপনাদের কাছে কিছু কথা বলতে চাই। স্মরণাতীত কালের ভয়াবহ বন্যায় যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, যারা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বা যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন, যারা দুঃসহ জীবনযাপন করেছেন তাদের স্মরণে রেখে কথা বলছি। বন্যাদুর্গতদের জীবন দ্রুত স্বাভাবিক করার জন্য যাবতীয় উদ্যোগ সরকারি- বেসরকারি পর্যায়ে নেয়ার আয়োজন করেছি। ভবিষ্যতে সব ধরনের বন্যা প্রতিরোধে আমাদের অভ্যন্তরীণ এবং প্রতিবেশীদর সঙ্গে যাতে যৌথভাবে নেয়া যায়, সে আলোচনা শুরু করছি।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিপ্লবী ছাত্র-জনতা জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে আমাকে এক গুরুদায়িত্ব অর্পণ করেছেন। তারা নতুন এক বাংলাদেশ গড়তে চায়। নতুন প্রজন্মের এই গভীর আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব রূপ দেয়ার সংগ্রামে আমি একজন সহযোদ্ধা হিসেবে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছি। দেশের সব বয়সের, সব পেশার, সব মতের, সব ধর্মের সবাইকে বিনা দ্বিধায় এই সংগ্রামে যোগ দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।

ড. ইউনূস বলেন, লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে লাখো মা-বোনের আত্মদানের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ আমরা পেয়েছিলাম, তা ফ্যাসিবাদ এবং স্বৈরাচারের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে। আপনারা দেখেছেন আমাদের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তারা কীভাবে শেষ করেছে। দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে দুর্নীতি। এমন এক দেশে আমাদের দেশ রূপান্তরিত হয়েছে যেখানে স্বৈরাচারের পিয়ন দুর্নীতির মাধ্যমে ৪০০ কোটি টাকার সম্পদ করার মতো অকল্পনীয় কাজ করে গেছে নির্বিবাদে। শিক্ষা খাতকে পঙ্গু করে দিয়েছে, ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজার খাতে লুটপাট, প্রকল্প ব্যয়ে বিশ্বরেকর্ড, অবাধ সম্পদ পাচার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে নিজ দলের পুতুলে রূপান্তর, বাকস্বাধীনতা হরণ, মানবাধিকার হরণ এসব হিমশৈলের অগ্রভাগমাত্র। ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে ফ্যাসিবাদী সরকার খর্ব করেছে জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা ও অধিকার। দুঃশাসন, দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচার নিপীড়ন, বিচারের নামে প্রহসনের মাধ্যমে জনসুরক্ষা বিপন্ন করেছে। জনগণকে নির্যাতন ও বঞ্চনা ও বৈষম্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। নতুন প্রজন্মের মানুষসহ কোটি কোটি মানুষের ভোটাধিকার বছরের পর বছর হরণ করেছে। মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে স্বৈরাচার তার নিজের, পরিবারের ও দলের কিছু মানুষের হাতে দেশের মালিকানা তুলে দিয়েছে।

তিনি বলেন, কিন্তু এই দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েই আমাদের গড়তে হবে স্বপ্নের বাংলাদেশ। বৈষম্যহীন, শোষনহীন, কল্যাণময় এবং মুক্ত বাতাসের রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন নিয়ে ছাত্র-জনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আমি তাদের সেই স্বপ্নপূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ। আপনাদের সবাইকে এই শুভ লগ্নে তাদের স্বপ্নপূরণে সব শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি। তাদের স্বপ্ন আমাদের স্বপ্ন। জাতীয় জীবনে তরুণরা একটি মহাসুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আমরা সবাইকে সুযোগ ব্যবহার করার কাজে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানাচ্ছি, বলেন তিনি।

ড. ইউনূস বলেন, গণরোষের মুখে ফ্যাসিবাদী সরকার-প্রধান দেশত্যাগ করার পর আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে প্রতিটি নাগরিকের মানবাধিকার থাকবে পুরোপুরি সুরক্ষিত। আমাদের লক্ষ্য একটিই। উদার, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশ। আমরা এক পরিবার। আমাদের এক লক্ষ্য। কোনো ভেদাভেদ যেন আমাদের স্বপ্নকে ব্যাহত করতে না পারে সেজন্য আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহ শেষ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মযাত্রার প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে আপনাদের কাছ থেকে যে সমর্থন পাচ্ছি সেজন্য আন্তরিক ধন্যবাদ। আমরা অনুধাবন করছি যে, আমাদের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা অনেক। এ প্রত্যাশা পূরণে আমরা বদ্ধপরিকর। যদিও দীর্ঘদিনের গণতন্ত্রহীনতা, ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের জন্য পর্বতসম চ্যালেঞ্জ রেখে গিয়েছে। কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণে আমরা প্রস্তুত। আজ আমি সরকারের পক্ষ থেকে আপনাদের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করতে আপনাদের সামনে এসেছি।
শুধু আমি বলবো আপনাদের একটু ধৈর্য ধরতে হবে। এখনই সব দাবি পূরণ করার জন্য জোর করা, প্রতিষ্ঠানে ঢুকে ব্যক্তিবিশেষকে হুমকির মধ্যে ফেলা, মামলা গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করা, বিচারের জন্য গ্রেপ্তারকৃতকে আদালতে হামলা করে আগেই এক ধরনের বিচার করে ফেলার যে প্রবণতা তা থেকে বের হতে হবে। ছাত্র-জনতার বিপ্লবের গৌরব ও সম্ভাবনা এসব কাজে ম্লান হয়ে যাবে, নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টাও এতে ব্যাহত হবে, যোগ করেন তিনি।

প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেন, রাতারাতি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন। নড়বড়ে এক কাঠামো, আমি বরং বলবো জনস্বার্থের বিপরীতমুখী এক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আমাদের দেশ পুনর্গঠনের কাজে হাত দিতে হয়েছে। আমরা এখান থেকেই বাংলাদেশকে এমনভাবে গড়তে চাই যেন এ দেশে জনগণই সত্যিকার অর্থে সকল ক্ষমতার উৎস হয়। বিশ্বদরবারে একটি মানবিক ও কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে সমাদৃত হয়। তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষার্থী ও জনতার আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজে সফল আমাদের হতেই হবে। এর আর কোনো বিকল্প নেই।

দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনারা ইতিমধ্যে জেনেছেন জুলাই-আগস্ট মাসে গণঅভ্যুত্থানে বলপ্রয়োগ ও হতাহতের যে দুঃসহ ঘটনা ঘটানো হয়েছে তার স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধানকে বাংলাদেশে এসে তদন্ত শুরু করতে আমরা আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তদন্তের প্রক্রিয়া এ সপ্তাহেই শুরু হবে। তাদের প্রথম দল ইতিমধ্যে এসে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ইতিমধ্যে ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে নস্যাৎ করতে যে শত শত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছিল তার অধিকাংশ প্রত্যাহার করেছি এবং আটক ছাত্র-জনতার মুক্তিলাভের ব্যবস্থা করেছি। পর্যায়ক্রমে মিথ্যা ও গায়েবি সব মামলার ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষকে দুঃসহ ভোগান্তি থেকে মুক্ত করা হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে গণঅভ্যুত্থানে সকল শহীদের পরিবারকে পুনর্বাসন করা হবে।
তিনি বলেন, সকল আহত শিক্ষার্থী ও জনতার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় সরকার বহন করবে। সে লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিত্বকারী দুইজন উপদেষ্টার সহায়তায় একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। এই কার্যক্রমের জন্য এবং গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে সরকার অতি দ্রুত ‘জুলাই গণহত্যা স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে এনেছি। আপনাদের সবার এবং বিদেশে অবস্থানরত ভাই-বোনদের অনুদান এই প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করছি। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ করেছি।

তিনি বলেন, আপনারা লক্ষ্য করেছেন, দায়িত্ব গ্রহণ করেই আমাদের আইনশৃঙ্খলা অঙ্গনে অস্থির পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। আপনাদের সহযোগিতা ও সমর্থন দেশপ্রেমিক সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজে যোগ দিয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকার প্রশাসনকে চরম দলীয়করণ করার ফলে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। আমরা ইতিমধ্যে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আরম্ভ করেছি। তবে প্রশাসনকে গতিশীল রাখতে এবং একইসঙ্গে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সময় প্রয়োজন। সেজন্য সকলকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রশাসনের সকল ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো যেন জনগণের আস্থা ফিরে পায় সেটি আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, লুটপাট ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। এই খাতে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা স্থাপন, ব্যবসা বাণিজ্যের সহায়ক পরিবেশ তৈরি এবং জনগণের জীবনযাপন সহজ করতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ সচল করেছি। ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য ব্যাংক কমিশন গঠন করা হবে। আর্থিক খাতে সার্বিক পরিস্থিতি এবং সংস্কার বিষয়ে একটি রূপকল্প তৈরি করা হবে যা দ্রুত জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। শেয়ার বাজার, পরিবহন খাতসহ যেসব ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে তা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে দুর্নীতি ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করতে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জবাবিদিহিতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফ্যাসিবাদী সরকারের বিচার বিহর্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, অপহরণ এবং আয়নাঘরের মতো চরম ঘৃণ্য সব অপকর্মের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। এসব অপকর্মের সঙ্গে জড়িত সবার বিচার নিশ্চিত করা হবে। তালিকা প্রস্তুত করে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে। দুর্নীতি ও সম্পদ পাচারের বিচার করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আইন-শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে জনমুখী ও দলীয় প্রভাবমুক্ত ও জবাবদিহিতামূলক কাঠামো সৃষ্টির লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন গঠন করা হবে। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদন, দায়িত্বপ্রাপ্ত সব সংস্থা ও জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে কমিশনের নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। বাংলাদেশকে আর কোনোদিন কেউ যেন কোনো পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত না করতে পারে তার ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তিনি বলেন, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও গণমাধ্যেমর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। ফ্যাসিবাদী সরকার গণমাধ্যমের ওপর দলীয়করণ ও নির্যাতনের বোঝা চাপিয়েছিল। জনগণের তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তথ্যের প্রবাহে বিদ্যমান আইন ও অন্যান্য বাধা অপসারণ করা হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত করে এমন সব আইনের নিপীড়নমূলক ধারা সংশোধন করা হবে। ইতিমধ্যে এ ধরনের আইনগুলো চিহ্নিত করে এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

ড. ইউনূস বলেন, বিদেশি সংবাদ কর্মীদের এদেশে আসার ওপর যে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল, ইতিমধ্যে আমরা তা তুলে নিয়েছি। বিদেশি সাংবাদিকদের দ্রুত ভিসা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমরা আশা করি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকর্মীরা নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা চালিয়ে যাবেন। বিগত সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা করে গেছে। আমরা তার পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের উদ্যোগ নেবো। এটা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। আপনারা জানেন দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য সৃজনশীল, নিরাপদ ও ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের অঙ্গীকার। একইসঙ্গে পাঠ্যক্রমকেও যুগোপযোগী করার কাজও দ্রুত শুরু করা হবে।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা হবে এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করা হবে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে সফল পরিণতি দিতে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা খাত এবং তথ্য প্রবাহে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণ করে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করা হবে। এর লক্ষ্য হবে দুর্নীতি, লুটপাট ও গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি জবাবদিহিতামূলক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সূচনা।

বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, আমাদের সব উপেদষ্টা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করবেন। পর্যায়ক্রমে এটি সব সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত এবং বাধ্যতামূলক করা হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে প্রতিশ্রুত ন্যায়পাল নিয়োগে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষকের স্বার্থ যেন সুরক্ষিত থাকে, কৃষক যেন তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় তা নিশ্চিত করা হবে। প্রবাসী শ্রমিকেরা যেভাবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সমর্থন দিয়েছেন মুক্তিকামী জনগণ তা কৃতজ্ঞচিত্রে স্মরণ করে। তাদের প্রতি সকল পর্যায়ে সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করা হবে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। জনগণের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। এই খাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। হাসপাতালগুলোকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে এবং সেখানে সরকারি ডাক্তারসহ বিশেষজ্ঞদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। স্বাস্থ্যসেবা যেন নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত না থাকে, দেশের সব অঞ্চলের মানুষ সমান স্বাস্থ্যসেবা পায় সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে আমরা বদ্ধপরিকর।

বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি সচেতন মন্তব্য করে ড. ইউনূস বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন বিষয়ে বর্তমান প্রজন্ম ওয়াকিবহালই শুধু নয়, তারা নেতৃত্ব দিচ্ছে। তারা যে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখে তা টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব। প্রকৃতি ধ্বংসকারী উন্নয়ন নয়। শুধু জিডিপি একটি দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি হতে পারে না। নদী-নালা, খাল-বিল, পাহাড়, বন, মাটি আর বাতাস ধ্বংস আর দূষিত করে যে উন্নয়ন হয় তা দীর্ঘমেয়াদি-টেকসই নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির বিরুদ্ধে পরিবেশবাদীদের সঙ্গে আমাদের সরকারের অবস্থান সামঞ্জস্যপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করতে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সুস্থ একটি পৃথিবী রেখে যেতে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনার বিকল্প নেই। আমাদের সরকার পরিবেশ ও জলবায়ু রক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। এই কার্যক্রমে তরুণ সম্প্রদায়কে সম্পৃক্ত করা হবে।

তিনি আরও বলেন, একটা বিষয়ে সবাই জানতে আগ্রহী, কখন আমাদের সরকার বিদায় নেবে। এটার জবাব আপনাদের হাতে, কখন আপনারা আমাদের বিদায় দেবেন। আমরা কেউ দেশ শাসনের মানুষ নই। আমাদের নিজ নিজ পেশায় আমরা আনন্দ পাই। দেশের সংকটকালে ছাত্রদের আহ্বানে আমরা এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা সব শক্তি দিয়ে এই দায়িত্ব পালন করবো।

ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলী এই লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলে একটা টিম হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। কখন নির্বাচন হবে সেটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, আমাদের সিদ্ধান্ত নয়। দেশবাসীকে ঠিক করতে হবে আপনারা কখন আমাদের ছেড়ে দেবেন। আমরা ছাত্রদের আহ্বানে এসেছি। তারা আমাদের প্রাথমিক নিয়োগকর্তা। দেশের আপামর জনসাধারণ আমাদের নিয়োগ সমর্থন করেছে।’

আমরা ক্রমাগতভাবে সবাইকে বিষয়টি স্মরণ করিয়ে যাবো যাতে হঠাৎ করে এই প্রশ্ন উত্থাপিত না হয় আমরা কখন যাবো। তারা যখন বলবে আমরা চলে যাবো। আমরা সংস্কারের অংশ হিসেবে নির্বাচন কমিশনকেও সংস্কার করবো। কমিশনকে যেকোনো সময় আদর্শ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত রাখবো।

ড. ইউনূস বলেন, আমরা জাতীয় ঐক্যে বিশ্বাসী। প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক ঐক্যর মধ্যদিয়ে নিশ্চিত করা হবে নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী সবাই এদেশের নাগরিক এবং সমান আইনের সুরক্ষার অধিকারী। তাদের সবার মানবিক অধিকারসহ অন্যান্য সব অধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়া হবে। এজন্য আমি উপদেষ্টা পদমর্যাদাসম্পন্ন একজন বিশেষ সহকারী নিয়োগ দিয়েছি যার দায়িত্ব হবে জাতীয় সংহতি উন্নয়ন।
তিনি বলেন, আমরা বিভিন্ন সংস্কারের কাজ শুরু করেছি। দেশবাসীকে অনুরোধ করবো, একটা আলোচনা শুরু করতে আমরা সর্বনিম্ন কী কী কাজ সম্পূর্ণ করে যাবো, কী কী কাজ মোটামুটি করে গেলে হবে। এই আলোচনার মাধ্যমে আমরা একটা দিকনির্দেশনা পেতে পারি। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক আলোচনা থেকেই আসবে। এই দিকনির্দেশনা না পেলে আমরা দাতা সরকার এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সঙ্গে আলোচনায় দৃঢ়তার সঙ্গে অগ্রসর হতে পারছি না।

Friday, August 21, 2009

ভোটারদের ‘সত্যাগ্রহের’ অপ্রকাশিত সত্য by ফারুক ওয়াসিফ

এরকম এক কথা আছে যে, জনগণ যেমন সরকার তেমন। কথাখানি বাংলাদেশে আর সত্য মনে হয় না। অন্তত গত নির্বাচন দেখে এই অমত করতেই হচ্ছে।
নির্বাচনটি যে ‘ঐতিহাসিক’ তা নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। ক্ষমতার মসনদ কার হলো তার নিরিখে নয়, কীভাবে এবং কোন অবস্থায় এমন ‘ঐতিহাসিক’ বিজয় এসেছে, তার বিচারে। জরুরি অবস্থা, জেল-জুলুম, ফৌজি হম্বিতম্বি মানুষকে খুব একটা উত্তেজিত করেনি। তারা বরং উপযুক্ত মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করেছে। ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮-এর মোক্ষম মুহূর্তে ভোটারের বেশে তারা তাদের ‘নীরব’ অ্যাকশনটি করে দিয়েছে। সেটাই ছিল তাদের এক ঢিলে দুই পাখি মারার কর্ম। একদিকে সেনা-সমর্থিত জরুরি অবস্থা অন্যদিকে রাজনীতি-আশ্রিত দুর্নীতিবাজ, ধর্ম ব্যবসায়ী, মিথ্যার ব্যাপারিদের জবাব দিয়ে দেওয়া। মাওলানা ভাসানীর ভাষায় ‘অলাইকুমআসসালাম’ বলে দেওয়া।
জরুরি অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই আইনের বরখেলাপ ঘটিয়েছিল। তার জবাবে মানুষ আইন অমান্য প্রতিবাদ তেমন হয়নি। এজন্যই একে বলছি, গান্ধির সত্যাগ্রহ বা শেখ মুজিবের অসহযোগ। আজকের সীমিত গণতন্ত্রের টাইট বাঁধনে অনেক ক্ষেত্রেই গণআন্দোলনের সুযোগ থাকে না। এরকম অবস্থায় নির্বাচনের মাধ্যমে অপশাসন পাল্টানোর সুযোগ নিতে দেখা যাচ্ছে। আমেরিকা ও বাংলাদেশের গত নির্বাচন এর আদর্শ উদাহরণ। মানুষ মনের মতো সরকার পায়নি সত্য কিন্তু ‘যারে সইতে নারি’ তার বিদায় হয়েছে। এজন্যই তা ‘সত্যাগ্রহ’। কিন্তু কোন সত্যকে তারা সেদিন তুলে ধরেছিল? জনতার সেই সত্য আর জনতা-সমর্থিত সরকারের সত্য কি এখন এক দাগে এক মাপে মিলছে? দাগে দাগে মিলিয়ে দেখা যাক।
এক. ২৯/১২-র নির্বাচন সরাসরি ১/১১-এর খণ্ডন বা নেমেসিস। যে অবস্থা ও যে শক্তি একে ডেকে এনেছিল ২৯/১২-তে জনগণ তাদের অস্বীকার করেছে। নির্বাচনের আগে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের (ইডব্লিউজি) এক জরিপে দেখা যায়: ৮৭ ভাগ ভোটার মনে করে, যে দলেরই সরকার হোক নির্বাচিত সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের থেকে ভালভাবে দেশ চালাবে (http://asiafoundation.org)। নিশ্চয়ই দ্রব্যমূল্য বাড়া এবং ক্ষমতার অনেক কর্তাদের দুর্নীতি তাদের এটা ভাবতে বাধ্য করেছিল।
দুই. ১৯৫৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ মরণ-ধাক্কা খেয়েছিল, বিএনপি-জামায়াত জোট তেমন ধাক্কা না খেলেও, তাদের চালচলন বদলাতে হবেই, হুঁশিয়ারির সেই লাল পতাকা ভোটাররা উড়িয়ে দিয়েছেন। আওয়ামি লীগের হাতে এছ আরও প্রায় সাড়ে চার বছর, কিন্তু বিএনপির হাতে সেই সময় নেই, যদি পরের নির্বাচনে সবুজ কার্ড পাওয়ার আশা দলটি করে থাকে।
তিন. প্রমাণ হয়েছে ‘বিদেশি বন্ধুরা’ নয়, জনগণই বাংলাদেশি গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সহায়। বিদেশিরা সমর্থন দিয়েছিল ১/১১-এর অনির্বাচিত সরকারকে। অথচ ২০০৮-এর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন প্রমাণ হয় জনগণের ঝোঁক নির্বাচন ও রাজনীতিবিদদের দিকে। অতীতেও পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো এবং তাদের আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার, বিএনপি-জোটের দুই আমলের ‘সেনা-সমর্থিত’ সরকারকে সমর্থন দিয়ে তাদের মেয়াদ বাড়াতে সাহায্য করেছে বলে অভিযোগ আছে। অথচ ওই সব আমলেই বেশি হারে আইন-আদালতকে তুচ্ছ করা, দলীয়করণ এবং কালো টাকা ও দুর্বৃত্তদের প্রতিষ্ঠা তথা রাজনৈতিক ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি হয়েছে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই সময়েই রাজনীতি থেকে সাধারণ মানুষ ক্রমশ পরিত্যক্ত হয়েছে।
চার. ‘সত্যাগ্রহ’ বা ‘ঐতিহাসিক’ কথাটা বাড়িয়ে বলা নয়। ভোটের দিন ভোট যাই সাভার অঞ্চলে। ঘুরে ঘুরে যা দেখি এককথায় ‘তীর্থযাত্রী’ ও ‘তীর্থদর্শন’। ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল তীর্থস্থানের মতোই জনাকীর্ণ ও মুখর। পশ্চিমা দেশের মতো মানুষ কাজ সারার মতো ভোট দিয়েই চলে যাচ্ছে না। যিনি সকালে এসেছেন, তিনি দুপুর পর্যন্ত রয়ে যাচ্ছেন। যিনি দুপুরে খেয়েদেয়ে এসেছেন তিনি সন্ধ্যা পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রের সামনের মাঠে বা চত্বরে বসে আড্ডা-আলোচনা ইত্যাদি করছেন। মহিলারা এসেছে সেজেগুজে—যেন ঈদ লেগেছে। ফতুল্লার পোশাক শ্রমিক ভোটের ছুটিতে সাভারের গেরুয়ায় গ্রামের বাড়িতে এসে বন্ধুবান্ধব নিয়ে ভোট দিতে বেরিয়েছেন। তাঁর কারখানার শ্রমিকরা অনেকেই নাকি ভোট দিতে বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে করে দূরদূরান্তে গ্রামের বাড়ি গেছে। প্রাচীন লোকশ্রুতি আছে, ন্যায়ের পক্ষে নাকি গায়েবি জিন-ফেরেশতারা এসে যুদ্ধ করে দিয়ে যায়। এমনিতে যাঁদের সাড়াশব্দ কম পাওয়া যায়, দেশের সেই হতদরিদ্র মানুষরা সেই গায়েবি সৈনিকদের মতো নীরবে এসে নীরবে মহাজোটকে জয়যুক্ত করে দিয়ে গেছেন।
এই ভোটারদের বড় অংশই কিন্তু গ্রাম-শহরের গরিব মানুষ। সেদিক থেকে এই সরকার গরিব ও বঞ্চিতদের রায়ে আসা সরকার। গত এক যুগের লাগামছাড়া বাজার অর্থনীতি, দিশাহীন উন্নয়ন প্রকল্প ও রাষ্ট্রীয় লুটপাটের সর্বনাশা কার্যক্রমের বিরুদ্ধেও তাঁরা সেদিন একযোগে ‘না’ বলেছেন। যেহেতু ওই সময়টায় বিএনপি ক্ষমতায় ছিল সেহেতু খেসারতটা বিএনপিকেই দিতে হয়েছে বেশি। অস্ফুট হলেও এটা মুক্তবাজারি বাড়াবাড়ি, করপোরেট উন্নয়ন, রাজনৈতিক মাফিয়াতন্ত্র এবং যুদ্ধাপরাধী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের শ্রেণীসংগ্রামেরই প্রকাশ। ঠিক যেমন পূর্ব বাংলার দরিদ্র কৃষকেরা ১৯৪৬-এ জমিদার শ্রেণীর বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের জোতদারদের জয়ী করেছিলেন, অনেকটা সেভাবেই। কিন্তু মুসলিম লীগ তাদের চরম হতাশ করেছিল। এ জন্যই তীব্র আশার শিখর থেকে সাধারণ মানুষ যদি আবার হতাশার খাদে পড়তে বাধ্য হলে বিজয়ীদের জন্য এর প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ। গতকালই এক বয়স্ক রিকশাচালককে বলতে শুনি, আওয়ামি লীগের মেরুদণ্ড গরিবরা, কিন্তু গরিবদের সঙ্গে কী লাগাইছে সরকার? তাঁর অভিযোগ ছিল, মোবাইল কোর্ট বসিয়ে রিকশাচালকদের হয়রানি করা বিষয়ে। এরকম আশাভঙ্গের স্বাদ স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার অনেকটা পেয়েছিল।
পাঁচ. প্রমাণ হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের সামাজিক ভিত্তি খুবই নাজুক। এই নির্বাচন জনবিচ্ছিন্ন উগ্রপন্থাকে প্রত্যাখ্যান করে তাকে রাজনৈতিক হুমকির পর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা সমস্যার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। পাশ্চাত্যের বহু বিশ্লেষক, গবেষক ও কূটনীতিকের ‘বাংলাদেশ হবে পরবর্তী আফগানিস্তান’, ‘ককুন অব টেরর’ জাতীয় মুখস্থ বুলিকে নাকচ করে ভোটাররা প্রমাণ করেছেন, ধর্মীয় সহনশীলতা, নমনীয় ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতাই বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক মেজাজের মূল সুর। গণযুদ্ধ, গণ-অভ্যুত্থান এবং গণভোটই তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র। একাত্তর থেকে এ অবধি এর বাইরে প্রমাণ নেই। তাই দেখা গেল, পাকিস্তানের মতো পশ্চিমা হস্তক্ষেপ, আলজেরিয়ার মতো সরকারি দমন-পীড়ন, কিংবা মার্কিন-ব্রিটিশ প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা ও তাদের যন্ত্রপাতি দিয়ে যা করা যানি, তা ভোটাররাই করে দিয়েছেন। এখনো দুর্নীতি, অগণতন্ত্র ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণই বড় রক্ষাকবচ। এবং এই জনগণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মুসলিম ভোটার। দুঃখ যে, ওপর তলার অনেকেই এই মানুষের প্রতি আস্থা না রেখে ভরসা করেন আরো ওপরের ‘বিদেশি বন্ধুদের’। আমাদের বিভিন্ন সরকারও জনগণের এই উদার ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক চেতনার বিপরীত রাষ্ট্রীয় নীতি চাপিয়ে দিয়েছে। পঁচাত্তর-পরবর্তী পাশ্চাত্যের মদদপুষ্ট এসব সরকারই ইসলামের রাজনৈতিক অপব্যবহার বেশি করেছে। শেখ হাসিনাও কম যাননি। ২২ জানুয়ারি নির্বাচন সামনে রেখে তিনি তো খেলাফত মজলিশের সঙ্গে চুক্তিই করে ফেলেছিলেন! তার পরও প্রতিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট ৫-১০ শতাংশ করে বেড়েছে। কারণ, তারা একেই মনে করেছে মন্দের ভালো। দুঃখ এই, ‘মন্দের ভাল’র বাইরে সত্যিকার বিকল্প এখনো দানা বাধেনি আর আশা এই, ‘মন্দের ভাল’ বাছতে বাছতে ‘ভাল’র ভাল জন্মানোর পরিবেশ হয়তো সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশি সমাজ মোটাদাগে গণতন্ত্রভক্ত এবং ধর্ম বিষয়ে প্রাণখোলা ও উদার, কিন্তু রাষ্ট্র তা নয়। বলা যায়, সমাজ ও রাষ্ট্রের এই বিরোধই বাংলাদেশের মূল সমস্যা। ‘বিদেশি বন্ধুদের’ প্রতি আবেদন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিজ থেকেই কায়েম থাকতে সক্ষম। হস্তক্ষেপ ও সবক নয়, আমাদের প্রয়োজন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রাখায় নিঃশর্ত সহযোগিতা। তাতে আমাদের গণতন্ত্রের গণতন্ত্রায়ন সহজ না হোক, কিছু বাধা অন্তত কমবে। গত নির্বাচনের ‘সত্যাগ্রহের’ এটাও এক পরম সত্য।
ছয়. স্বাধীনতার রক্ষক দাবিদার আওয়ামী লীগ কিন্তু তাদের স্লোগান ও ইশতেহারে তাদের এসব বাহারি বুলির ব্যবহার কম করে সুফল পেয়েছে। কিছুটা পিছু হটে মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শকে তারা সাংস্কৃতিক আদর্শে পরিণত করে নিয়েছে আরও আগে। উভয় জোটই কমবেশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তির মুখাপেক্ষী। তাহলেও বরাবরের মতো বিএনপি-জামায়াত ভারত বিরোধিতা ও ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের রাজনীতি দিয়ে নিজেদের আলাদা দেখাতে চাইছে। কিন্তু এই কার্ড গত নির্বাচনে খুব একটা কাজ করেছে বলে মনে হয় না। এখন সরকার দিচ্ছে সুশাসন, দ্রব্যমূল্য কমানো ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিশ্রুতি আর বিএনপি জোট নিয়েছে সার্বভৌমত্ব রক্ষার অবস্থান। টিপাইমুখ, বিডিআর বিদ্রোহ, ট্রানজিট ইত্যাদি প্রশ্নে আওয়ামী লীগের কিছুটা নমনীয় ও ধীরে চলো নীতির সুযোগ নিতে চাইছে তারা। হারানো সমর্থন ফিরে পাওয়ায় এটাই তাদের বর্তমান কৌশল। নির্বাচনে প্রভাব না ফেললেও প্রতিকূল আঞ্চলিক পরিস্থিতির জন্য সার্বভৌমত্বের রাজনীতির আবেদন আপাতত বেশি বলেই মনে হচ্ছে। সরকার যদি এ ব্যাপারে সতর্ক ও স্বচ্ছ না হয়, তাহলে এটাই হতে পারে তার একিলিসের হিল অর্থাত্ সেই নাজুক জায়গা, যেখানে আঘাত করে তাকে ধরাশায়ী করা সম্ভব।
সাত. তৃতীয় দফায় নির্বাচিত হলে খালেদা জিয়া পরিবার ডায়নাস্টি বা রাজবংশ হিসেবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার ভয় ছিল। সমর্থন তুলে নিয়ে নতুন ডায়নাস্টির পথে ভোটাররা কাঁটা বিছিয়ে দিয়েছে ভোটাররাই। একদিক থেকে ‘মাইনাস টু’ সফল কারণ দুই পরিবারের দুই তনয় ক্ষমতার বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। এদেশে যতবারই কোনো রাজনৈতিক পরিবার ডায়নাস্টি হতে গিয়েছে, ততবারই জনগণ তা রুখে দিয়েছেন। বায়াত্তরের পর মুজিব পরিবারের একচ্ছত্র ক্ষমতার তাপে জনসমর্থন উঠে যাওয়াতেই ঘাতকদের পক্ষে ষড়যন্ত্র সফল করা সম্ভব হয়েছিল। বিষয়টা যদি দুই নেত্রী বুঝতে পারেন, তাতে তাঁদের ও দেশের সবারই মঙ্গল।
উপসংহার: ভোটের দিন দেখেছিলাম, ক্যাডাররা ভোটকেন্দ্র থেকে দূরে দাঁড়িয়ে ভোটারদের তেল-তোয়াজ দিয়ে যাচ্ছে। আজ পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ভোটারের সারিতে যাঁরা সেদিন দাঁড়িয়েছেন, তার সঙ্গে ক্ষমতার সারিতে আজ যাঁরা দাঁড়িয়ে, তাদের মধ্যে দূরত্ব কেবলই বাড়ছে। জনগণের সত্যাগ্রহ আর ক্ষমতাসীনদের পালিত সত্য এক থাকছে না। গরিব মানুষ ‘ভদ্রলোক-বাবুদের’ ভোট দেয় বটে কিন্তু প্রয়োজন না মিটলে তাদের প্রত্যাখ্যান করতে দেরি করে না। জনগণ বদলানোর আগে শাসকদের খাসলতই বদলাতে হবে। কী অর্থনীতি কী রাজনীতি, সবখানেই জনগণ দায়িত্বশীল বলেই দেশটা চলছে এবং টিকে আছে। এই সত্য উপলব্ধি করতে হবে।
যে অতীত মৃত, তা ইতিহাস নয়। কেননা, ইতিহাস একমাত্র বর্তমানেই বেঁচে থাকে। সেই বর্তমানে গত নির্বাচনের ঐতিহাসিক শিক্ষা ও সত্য এখনো জাগ্রত। একইভাবে জাগ্রত জরুরি অবস্থার ক্ষত। প্রজাতন্ত্রে রাজশক্তি ও প্রজাশক্তির ভারসাম্য রাখার স্বার্থে এই দুইকেই মনে রাখা দরকার।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com