Tuesday, November 5, 2013

সহজিয়া কড়চা- সৌজন্যবোধ ও বাঙালির কথাবার্তার কথা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বনে-জঙ্গলে বাস করলে আলাদা কথা, কিন্তু সংসারে বাস করলে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করতেই হয়, এমনকি কখনো শত্রুর সঙ্গেও।

আদালতে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা- অভিযোগ অস্বীকার মন্ত্রী-সাংসদদের by কাজী আনিছ

‘বিডিআর সদস্যদের দাবি-দাওয়া জেনেও গুরুত্ব দেননি। সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় এত বড় ঘটনা ঘটেছে।’

রানা প্লাজা ধস- শরীরে লাশের গন্ধ by আনোয়ার হোসেন

২৪ এপ্রিল আমার অবস্থান ছিল ধসে পড়া রানা প্লাজা থেকে এক কিলোমিটারের কম দূরত্বে। আগের দিন রাতে বেড়াতে গিয়েছিলাম সেখানে।

রায়ে রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট, গোঁজামিল বলছে আসামিপক্ষ

বিডিআর বিদ্রোহের মামলার রায়ে বাহিনী কলঙ্কমুক্ত হয়েছে বলে মনে করছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক। রাষ্ট্রপক্ষও এতে সন্তুষ্ট।

সেনা অভিযান হয়নি যে কারণে by কামরুল হাসান ও গোলাম মর্তুজা

বিডিআর বিদ্রোহের দিন পিলখানার ভেতরের অবস্থা বোঝা না যাওয়ায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।

ফিরে দেখা- রেহাই পায়নি নারী-শিশুরাও

দরবার হলে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি বিদ্রোহ শুরুর কিছুক্ষণ পরেই বিদ্রোহী জওয়ানদের একটি দল বিডিআরের তত্কালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদের বাসায় ঢুকে পড়ে।

ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড- by কামরুল হাসান, শেখ সাবিহা আলম ও গোলাম মর্তুজা ও কুন্তল রায়

পিলখানায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যার দায়ে ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনের ফাঁসির আদেশ হয়েছে।

পিলখানা হত্যার ঘটনায় বিচারকের পর্যবেক্ষণ- ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ একটি বড় কারণ

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তত্কালীন বিডিআরের ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কর্মসূচিসহ বেশ কয়েকটি বিষয়কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত।

১৪ই নভেম্বরের পর নতুন মোড়কে মহাজোট সরকার by দীন ইসলাম

‘সর্বদলীয়’ সরকার গঠনের আগে মন্ত্রিসভার সদস্যরা পদত্যাগ করবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঠিক করবেন কার পদত্যাগ গ্রহণ করবেন বা কারটি করবেন না।

খালেদা-মার্কিন কংগ্রেসম্যান বৈঠক- গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সংলাপের তাগিদ

আগামীতে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছেন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় পররাষ্ট্রবিষয়ক সাব-কমিটির চেয়ারম্যান ও মার্কিন কংগ্রেম্যান স্টিভ শ্যাবট।

দুই নেত্রীর ফোনালাপ কি সমস্যা বাড়াল

কথা ছিল, প্রধানমন্ত্রী ফোনে বিরোধী নেত্রীকে সংলাপের আমন্ত্রণ জানাবেন। এর আগে ঢাকায় ১৮ দলীয় জোটের জনসভায় খালেদা জিয়া ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংলাপের জন্যে যোগাযোগের সময় বেঁধে দিয়ে ২৭-২৮-২৯ অক্টোবর ৬০ ঘণ্টার হরতালের ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন।

আমন্ত্রণ জানাতেই রাজি ফারিয়া

বাংলাদেশের মডেল ফারিয়া আলম যৌন আবেদনময়ী। স্মার্ট। গায়ের রঙ শ্যামলা। উত্তেজনাকর তার অভিব্যক্তি। তার সঙ্গে আমার রোমান্টিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সপ্তাহে কমপক্ষে একবার আমাদের দেখা হতো। কখনও লিওনার্দো হোটেলে। কখনও একটি ভারতীয় রেস্তরাঁয়। এর মালিককে সে ভালভাবে চেনে। ন্যান্সি ডেলওলিও’র সঙ্গে আমার রোমান্টিক সম্পর্কের বাইরেও ফারিয়ার সঙ্গে এ সম্পর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। এসব কথা অকপটে স্বীকার করেছেন ফুটবল বস বলে পরিচিত ভেন গোরান এরিকসন। তার সঙ্গে বাংলাদেশী বংশোদভূত মডেল ফারিয়া আলমের প্রেম কাহিনী নিয়ে কয়েক বছর আগে তোলপাড় হয়েছিল সারাবিশ্বে। তা প্রকাশ হয়ে পড়ায় এরিকসনের ক্ষতি হয় কয়েক লাখ ডলারের চুক্তি। তবে তখনও মুখ খোলেন নি ফারিয়া আলম। কিন্তু এতদিন পর সব গোপন কথা ফাঁস করে দিয়েছেন সেই এরিকসনই। ভেন গোরান এরিকসন ও স্টেফান লোভগ্রেন দু’জনে মিলে লিখেছেন বই ‘ভেন: মাই স্টোরি’ নামের বই। এ বইটি আজ বৃটেনের বাজারে আসার কথা। দাম ২০ পাউন্ড। এতে এরিকসন কিভাবে ফারিয়ার প্রেমে পড়েন, কিভাবে তারা একে অন্যের একেবারে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে চলে আসেন তার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এ বইয়ে তিনি লিখেছেন, লন্ডনে ফুটবল এসোসিয়েশনের অফিসে প্রথম ফারিয়া আলমের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়। ফুটবল এসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক ডেভিড ডেভিসের কাচে ঘেরা অফিসের বাইরে একটি ডেস্কে সে বসা ছিল। বাংলাদেশী বংশোদভূত এই সাবেক মডেল শ্যামলা। দেখতে ভীষণ যৌন উত্তেজক। প্রতিবারই যখন ডেভিড ডেভিসের অফিসে এসেছি ততবারই তার সঙ্গে অনেক অনেক বেশি কথা বলেছি। এর মধ্যে ফুটবল এসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী মার্ক পালিওসের সঙ্গে সে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। আমি পরে এ বিষয়ে আর তেমন কিছু দেখি নি। তখন কেউই তাদের এ সম্পর্কের কথা জানতো না। যতদূর মনে করতে পারি সেটা ছিল ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি। এ সময়ই আমি প্রথম ফারিয়াকে দুপুরের খাবারের আমন্ত্রণ জানাই। আমি নিশ্চিত ছিলাম সে আমার আমন্ত্রণ এড়িয়ে যাবে না। বলবে- ‘হ্যাঁ, আমি রাজি।’ ঠিক তাই বললো সে। তাই মার্বেল আর্চের কাছেই লিওনার্দ হোটেল বুকিং দিলাম। সেখানে আমরা দুপুরের খাবার খেলাম। এখানে একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে আমাদের অন্তত একবার সাক্ষাৎ হতে থাকে। ইউরোপিয়ান ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের সময় আমি যখন পর্তুগালে তখন প্রায় প্রতিদিনই আমি ফারিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলতাম। তখন ন্যান্সি আমার সঙ্গে পর্তুগালে। কিন্তু সে ছিল হোটেলে। সেখানে সে খেলোয়াড়দের স্ত্রী ও গার্লফ্রেন্ডকে দেখাশোনা করতো। এরিকসন আরও লিখেছেন, ইউরোর পর ন্যান্সি চলে যায় ইতালি। আমি যাই সুইডেনে। সেখানে বেরকেফোরে আমার লেকসাইডের বাসায় আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যায় ফারিয়া। এ বাড়িটি মেরামতে আমি খরচ করি ৫০ লাখ পাউন্ড। আমরা যখন ইংল্যান্ডে ফিরে যাই তখন অপ্রত্যাশিত একটি ফোনকল পাই আমি। কলটি করেন ডেভিড ডেভিস। তিনি বলেন, একটি পত্রিকা প্রায় বলেই দিয়েছে যে ফারিয়ার সঙ্গে আমার প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। ডেভিড আমার কাছে জানতে চাইলেন, এ কথা সত্য কিনা। এ কথার পর আমার বাড়ির চারদিকে সুইডেনের ও ইংলিশ ফটোশিকারিতে ভরে গেল। তারা আমার একটি মাত্র শট চাইছিল। এমনকি তাদের একজন আমার বাড়ির ভিতরে আমার একটি ছবি ধারণ করতে একটি ক্রেন পর্যন্ত ভাড়া করেছিল। আমি ডেভিডের কথার জবাবে তাকে বললাম, এসব বাজে কথা। এর মাধ্যমে আমি অভিযোগ স্বীকারও করলাম না। কিন্তু আমাকে যে প্রশ্ন করা হয়েছে তাকে বলা যায় ননসেন্স। সর্বোপরি এটা আমার ব্যক্তিগত জীবন। ডেভিড যখন আমাকে ফোন করেছিলেন তখন আমার সঙ্গে লিওনার্দ হোটেলে ফারিয়া আলম। এ কথা তিনি জানতেন না। আমি ফারিয়াকে বললাম, তাকে ফোন করলে সেও যেন একই রকম উত্তর দেয়। অন্য কথায় এমনভাবে যেন সে কথা বলে যা দিয়ে সত্যা-মিথ্যা কিছুই বোঝা না যায়। এ বিষয়টি অন্যদের নয়। কিছুক্ষণ পরে ফারিয়ার ফোন বেজে ওঠে। ফোন করেছেন ডেভিড ডেভিস। ফোনটি ধরতে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ফারিয়া। আমি ঠিক জানি না সে কি বলেছে। তবে ফারিয়া যখন ফিরে তখন দৃশ্যত সে কাঁপছে। আমি তাকে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে বলি, দ্রুততার সঙ্গে কিছু করে বসো না। শেষ রাতের দিকে সে ফিরে গেল। সে ছিল উদ্বিগ্ন। আমার মনে হলো, হোটেলের বাইরে ততক্ষণে অবস্থান নিয়েছে ফটোশিকারিরা। এর কিছু পরেই পত্রিকায় স্কুপ নিউজ হিসেবে ছাপা হলো যে, ফারিয়া আলমের সঙ্গে আমার প্রেম রয়েছে। আমি ধরে নিলাম, যে পরিস্থিতিই সৃষ্টি হোক আমি তা মানিয়ে নিতে পারবো। তখন ন্যান্সি লন্ডনে ছিল বলে আমার মনে হলো না। পরের দিন অফিসে গেলাম। আমি অফিসে ঢুকেই দেখি ফারিয়া কথা বলছে ডেভিড ডেভিসের রুমে। তাকে আইনি সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। সে বলছে, যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সত্য নয়। তাই ফুটবল এসোসিয়েশন দ্রুত একটি বিবৃতি ইস্যু করে। তাতে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। পত্রিকাটির বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দেয়া হয়। এটা ছিল বড় একটি ভুল। শুধু তা-ই নয়। মার্ক পালিওসের সঙ্গে ফারিয়ার সম্পর্ক ছিল তা জানতো ওই পত্রিকাটি। তবে তাতে রক্ষা পেয়েছে মার্ক পালিওস। এরিকসন লিখেছেন, আমার জানার বাইরে প্রেস ডাইরেক্টর কলিন গিবসন ওই পত্রিকার সঙ্গে একটি চুক্তি করার চেষ্টা করেন। তাতে বলা হয়, আমার সঙ্গে ফারিয়ার সম্পর্ক নিয়ে তাদেরকে জানানো হবে। এর বিনিময়ে মার্ক পালিওসের নাম এ কাহিনী থেকে গোপন করতে হবে। তবে আমি মার্ক পালিওসকে রক্ষা করার পক্ষপাতী ছিলাম না। যে কোন ভাবেই হোক বাস্তবে আমরা এক হতে পারি না। সব সময়ই আমি মনে করতাম যে, প্রধান নির্বাহী পদে চাকরি করার যোগ্য নন মার্ক পালিওস। গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে ফারিয়া কয়েক লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে তার কাহিনী বিক্রি করে দিচ্ছে। কিন্তু তাতে আমি মোটেও বিব্রত হই নি। পরে যখন ওই পত্রিকাটি এ বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে ঠিকই দেখতে পাই তাদের প্রথম পৃষ্ঠায় আমার ও ফারিয়ার ছবি।

কয়লা থেরাপি নিয়ে আসছেন মাহী

কয়লা থেরাপি নিয়ে আসছেন মাহী। তার এই আসার তারিখ আগামী ২৯শে নভেম্বর। ওই দিন মুক্তি পেতে যাচ্ছে মাহী অভিনীত ছবি ‘কি দারুণ দেখতে’।

একাধিক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল উদিতার!

ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই বিতর্কিত নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছেন উদিতা গোস্বামী।

কায়রোয় কেরি

মাত্র কয়েক ঘণ্টার সফরে মিসরে গেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। মোহাম্মদ মুরসির ক্ষমতাচ্যুতির পর এটিই তার প্রথম মিসর সফর। মিসরের পৌঁছে সাংবাদিকদের দেয়া সাক্ষাৎকারে কেরি বলেন, আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করতে বদ্ধপরিকর। ওয়াশিংটন সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে তবে সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়াটা জরুরি।
তিনি মিসরের জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মিসরের ভালো বন্ধু; একে অপরের অংশীদার। দেড় বিলিয়ন অর্থ সহায়তা স্থগিত সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, মিসর-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক সাহায্যর ওপর স্থাপিত নয়। সূত্র জানায়, মিসর সফরকালে তিনি সেখানকার সমাজের বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বশীল গোষ্ঠীর সঙ্গে কথা বলবেন বলে জানা গেছে। মোহাম্মদ মুরসির ক্ষমতাচ্যুতির পর দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করে আমেরিকা। এতে করে মিসরীয় সেনাবাহিনীর আস্থা হারায় আমেরিকা। আমেরিকাও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করায় যোগাযোগ কমিয়ে দেয় তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র মিসরের সেনাবাহিনীকে। এর আগে মিসরের সেনবাহিনীকে ট্যাংক, হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করার কথা থাকলেও গত মাসের ৯ তারিখে তা বন্ধ করে দেয় ওবামা প্রশাসন। এছাড়া ২৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি সাহায্যও আটকে দিয়েছে ওবামা প্রশাসন।
উল্লেখ্য, ১২ দিনের সফরে মধ্যপ্রাচ্যে এসেছেন জন কেরি। মিসর ছাড়াও তিনি সৌদি আরব, জর্ডান, জেরুজালেম ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আলজেরিয়া এবং মরোক্কাতেও সফর করবেন। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বন্ধু সৌদি আরবের সঙ্গেও আমেরিকার সম্পর্কটা ইদানীং ভালো যাচ্ছে না। সূত্র: আলজাজিরা।

সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার নির্বাচন কেন প্রয়োজন by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ, ড. একেএম রিয়াজুল হাসান ও মোশাররফ হোসেন মুসা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গত ৪ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় নতুন পদ্ধতির নির্বাচন চাই শিরোনামে প্রবন্ধে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার একটি রূপরেখা তুলে ধরেছেন। এর আগে তিনি রাজধানীর একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেন। পরবর্তীকালে সিপিবি ও বাসদ এক সেমিনারে ওই রূপরেখার সমর্থনে বক্তব্য দেয়। এছাড়া বিভিন্ন সময় পিডিপির চেয়ারম্যান ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম, মানবাধিকার সংগঠক রাশেদ চৌধুরী, কলাম লেখক ইকতেদার আহমেদ এবং বর্তমান প্রবন্ধের লেখকরা জাতীয় সংসদের নির্বাচন পদ্ধতি সংস্কার করে প্রাপ্ত ভোটের হারে আসন বণ্টনের ব্যবস্থা করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। শোনা যাচ্ছে, জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু ৫ নভেম্বর কার্যপ্রণালীর ৭১ বিধিতে সংসদে দলভিত্তিক সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার রূপরেখা উপস্থাপনের জন্য নোটিশ প্রদান করেছেন। সে অনুযায়ী সংসদের শতকরা ৫০ ভাগ সাধারণ কোটা, ৩০ ভাগ মহিলা কোটা, ১০ ভাগ সংখ্যালঘু কোটা এবং ১০ ভাগ পেশাজীবী কোটার বিপরীতে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে পূরণ করার প্রস্তাব পেশ করা হবে। উল্লেখ্য, যে দল কাস্টিং ভোটের ৫০ ভাগ পাবে, সেই দল ১৫০টি আসন লাভ করবে এবং কোনো দল ১ শতাংশ ভোট পেলে সে দল ৩টি আসন পাবে। এখানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা ও তা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতিকালের ওপর আলোকপাত করা হবে।
দেশে প্রতিনিধি নির্বাচনের যে পদ্ধতি চালু আছে তাকে বলা হয় এফপিটিপি। এর প্রধান ত্র“টি হল, কোনো দলের শতকরা হারে প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে সংসদীয় আসন লাভের ক্ষেত্রে গুরুতর অসামঞ্জস্যতা। এছাড়া এ ব্যবস্থায় কোনো আসনে দুয়ের অধিক প্রার্থী হলে শতকরা ৫০ ভাগ ভোট না পেয়েই প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকে। এরশাদ ঠিকই বলেছেন, ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মোট কাস্টিং ভোটের মাত্র ৩০.৮১ ভাগ ভোট পেয়ে আসনে সর্বাধিক ছিল। কিন্তু শতকরা ৩৪ ভোট পেয়েও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করেছিল। সে সময় জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠন করে। আবার ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ৪০.৮৬ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিল ১৯৩টি। আর আওয়ামী লীগ ৪০.২১ শতাংশ ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিল মাত্র ৬২টি। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ৪.২৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৭টি আসন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে তারা ২১০টি আসন লাভ করে। অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। যেখানে আওয়ামী লীগ ২৩০টি এবং বিএনপি ৩০টি আসন লাভ করেছে।
বর্তমান যুগে যে কোনো রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল একটি অপরিহার্য উপাদান। রাজনৈতিক দল জনমত প্রকাশের অন্যতম শক্তিশালী বাহন। সমাজের অন্যান্য সংগঠিত গোষ্ঠীর মধ্যে একমাত্র রাজনৈতিক দলই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের জন্য কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্য থেকে বাছাই করার জন্য জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো মোটেই সুশৃংখল নয়। অধিকাংশ দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের যেমন খুব একটা চর্চা হয় না, তেমনি প্রার্থী মনোনয়নেও রয়েছে নানা অনিয়ম। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যথার্থই বলেছেন, এ পদ্ধতিতে মাস্তান, কালো টাকার মালিক, অর্থ ও বিত্তের জোরে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দলীয় মনোনয়ন কিংবা নির্বাচনে জিতে আসার সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে ক্ষমতায় যেতে হলে আসন নিয়ে আসতে হবে। তার জন্য প্রথমেই খোঁজা হয় প্রার্থীর অর্থবিত্ত কী পরিমাণ আছে। তার পরের যোগ্যতা বাছাইপর্বে দেখা হয় প্রার্থীর জোর দাপট কেমন আছে। এলাকার মানুষ তাকে ভয় পায় কিনা। ভোটকেন্দ্র দখলে রাখতে পারবে কিনা। মাস্তানিই তার সম্পদ। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের এ বক্তব্যের সঙ্গে কারও দ্বিমত করার অবকাশ আছে বলে মনে হয় না। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোর শৃংখলা বিধান করতে সহায়তা করতে পারে। প্রথমত, দলতালিকা ব্যবস্থাকে নির্বাচন পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হলে প্রতি আসনভিত্তিক যে প্যানেল তৈরি হবে, সেখানকার ভোটারদের আকর্ষণ করার জন্য সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এক্ষেত্রে অর্থ, পেশিশক্তি বা প্রভাব-প্রতিপত্তির সুযোগ কমে আসবে। দ্বিতীয়ত, যোগ্য প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে এলে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম গুণগতভাবে উন্নত হবে। সংসদ সদস্যরা গঠনমূলক বিতর্কে জড়িত হবেন বলে আশা করা যায়। তৃতীয়ত, জাতীয় পার্টির প্রস্তাব অনুযায়ী যদি কোটার ভিত্তিতে তালিকা তৈরি করে দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়, তাহলে সংখ্যালঘু ও পেশাজীবীদের মধ্য থেকে যেসব প্রতিনিধি জাতীয় সংসদে আসবেন তাতে বৈচিত্র্যময় কণ্ঠস্বর শোনা যাবে, যা গণতন্ত্রের জন্য সুসংবাদ হিসেবে গণ্য হবে।
যে কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু বাংলাদেশে এক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে যে প্রধান চারটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, শুধু ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সরকারি ও বিরোধী দলের নিয়মিত অংশগ্রহণে কার্যকর জাতীয় সংসদ দেখা যায়নি। ২০০১ সালে বিএনপি ও ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দল বহাল হওয়ায় প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে আচরণে অসহিষ্ণুতা পরিলক্ষিত হয়। এরশাদের অভিমত, নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সরকারের পরিণতি আমরা ২০০৬-এ দেখেছি এবং এখনও দেখছি। অথচ ১৯৯১ সালের সরকার কিংবা ১৯৯৬ সালের সরকারের এ রকম করুণ অবস্থা ছিল না। যদি আনুপাতিক হারে ভোটের ভিত্তিতে কোনো দলের সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার বিধান থাকত, তাহলে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির আসন সংখ্যা হতো ১২১ এবং আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা হতো ১২০। সেক্ষেত্রে অন্য ছোট দলের সমন্বয়ে একটি কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হতো। অভিজ্ঞতা বলে, কোয়ালিশন সরকার সব সময় নমনীয় হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হলে বাংলাদেশ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সব সময় পিছিয়ে থাকবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই এক্ষেত্রে গভর্নেন্স ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে অভূতপূর্ব ফল পাওয়া যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। বর্তমানে বিভিন্ন দেশে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে। সম্প্রতি শ্রীলংকা ও নেপালে এই ব্যবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হল দল-তালিকা ব্যবস্থা বা পার্টি লিস্ট পিআর সিস্টেম যা আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে উপযোগী হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের সংখ্যালঘু, নারী-পুরুষ, পেশাজীবী, প্রতিবন্ধী প্রভৃতি সামাজিক গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের কথা বিবেচনা করে এটিকে আরও সঙ্গতিপূর্ণ সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থারূপে গ্রহণ করা যেতে পারে। আবার জাতীয় সংসদকে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট করা হলে এই ব্যবস্থাকে মিক্সড বা মিশ্র পিআর সিস্টেম হিসেবেও গঠন করা যায়। এজন্য সংসদ ও সংসদের বাইরে আলাপ-আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। তাই আমরা মনে করি, জাতির বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা করে পাঁচ বছর পর অর্থাৎ ২০১৯/২০২০ সালে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেন এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা সম্ভব হয়, সে জন্য রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে এখন থেকেই মতামত গঠন করা জরুরি।
প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ : চেয়ারম্যান, জানিপপ; প্রফেসর ড. একেএম রিয়াজুল হাসান : রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বিসিএস শিক্ষা; এবং মোশাররফ হোসেন মুসা : সদস্য, সিডিএলজি

সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি ও বাস্তব চিত্র by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

জনগণই যে ক্ষমতার মালিক তা কেবল গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা পাওয়া দেশগুলোতেই দৃষ্টিগোচর হয় না, গণতান্ত্রিক হতে সচেষ্ট উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও বিষয়টি প্রমাণিত হয়; যদিও এসব দেশে শাসনকারী কর্তৃপক্ষ প্রায়শই গণদাবি পাশ কাটিয়ে দলীয় স্বার্থ চরিতার্থে সচেষ্ট থাকে। এসব দেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর জনস্বার্থের কথা ভুলে যায়; ভুলে যায় জনগণকে দেয়া প্রতিশ্র“তির কথা। পরিবর্তে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে সরকার অগণতান্ত্রিক পথে যেতে দ্বিধা করে না। তবে নির্বাচন নিকটবর্তী হলে এসব দেশে সরকার নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবি করে জনগণের মুখাপেক্ষী হয়। নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন দল তখন নিজেদের ব্যর্থতা চেপে গিয়ে সরকারের সাফল্যের দিকগুলো বড় করে দেখাতে চেষ্টা করে। কিন্তু সে চেষ্টা করলেও সরকার নিজ ব্যর্থতার দিকগুলো নাগরিকদের চোখ থেকে আড়াল করতে পারে না। বিরোধী দল, সুশীল সমাজ এবং সচেতন গণমাধ্যমের কারণে নাগরিক সম্প্রদায় সরকারের ব্যর্থতার দিকগুলোও অনুধাবন করতে পারেন।
বাংলাদেশে সরকারি দলের অবস্থা উপরের চিত্র থেকে ভিন্ন নয়। বিশেষ করে দশম সংসদ নির্বাচন আসন্ন হওয়ার পর মহাজোট সরকার এখন অনেকটাই জনগণের মনোরঞ্জনে মনোযোগী। গত পৌনে পাঁচ বছর এ সরকার যেসব কাজ করেছে, তা জনগণের মতামত নিয়ে করেছে বলা যায় না। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষেত্রে বা অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনমতকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি। তবে সরকার কর্তৃক গণইচ্ছাকে পদদলিত করার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ হল জনমতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে যুগপৎ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট সৃষ্টি করা। সরকার জনগণের মতামতকে তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্য নিয়ে এ কাজটি করায় নাগরিক সম্প্রদায় বিষয়টিকে সহজভাবে নিতে পারেনি। বিরোধী দলগুলোও দলীয় ব্যবস্থাধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে। সরকারের দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে এবং নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে বিরোধী দলগুলো তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে।
সংসদ নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় সরকার বুঝেছে যে, হ্রাসকৃত জনপ্রিয়তা নিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করলে পরাজয় সুনিশ্চিত। পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দল সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবির পর সরকারের এ ধারণা আরও সুনিশ্চিত হয়। এ কারণে সরকার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, গণমাধ্যম ব্যবহার, দেশবাসীর কাছে সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং নির্বাচন আসার অনেক আগ থেকে প্রধানমন্ত্রী সরকারি প্রটোকল ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সমাবেশ করে নৌকা মার্কায় ভোট চাইতে শুরু করেন। সে সঙ্গে শুরু হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফিতা কাটা এবং প্রকল্প উদ্বোধনের রাজনীতি। একই সঙ্গে রাতারাতি রাজধানীর বিলবোর্ডগুলো ব্যবহার করে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের বাহারি বর্ণনা দিয়ে নাগরিকদের মধ্যে সরকারি দলের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। পরে আরও দু-একটি বিভাগীয় শহরে এ কার্যক্রম শুরু করে সরকার যখন বুঝতে পারে যে, এভাবে দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না, তখন এ পরিকল্পনা থেকে সরে আসে। তবে সরকারি নেতা-মন্ত্রীরা তাদের বক্তৃতায় সরকারের উন্নয়নের দীর্ঘ বয়ান প্রদান অব্যাহত রাখেন। তাদের বক্তৃতা শুনলে মনে হয়, মহাজোট সরকারের আমলে যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং হচ্ছে আর কোনো সরকারের আমলে এত উন্নয়ন হয়নি। এ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য মহাজোট নেতারা নাগরিকদের তাদের আবারও সরকার গঠনের সুযোগ দিতে অনুরোধ করেন।
সরকারি নেতা-মন্ত্রীদের এ দাবি কতটা যৌক্তিক, তা বিশ্লেষণ করতে হলে একটি পৃথক লেখা তৈরি করতে হবে। তবে এ কথা বলা যায়, উন্নয়ন যতটা হয়েছে তার চেয়ে বেশি হয়েছে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, দলীয়করণ, জেলাপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি। প্রতিটি সাংবিধানিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়েছে নৈরাজ্য, অনিয়ম, বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসীদের কোনঠাসা করার প্রবণতা, ওএসডিকরণ এবং নিয়োগ ও পদোন্নতিতে চরম নৈরাজ্য এবং পেশাদারিত্বের অভাব। দুর্নীতি ও আর্থিক লুটপাটের কারণে ব্যাংক ও অর্থ প্রশাসনে নৈরাজ্য ও ধস নেমেছে।
মহাজোট সরকারের চারদিকে যখন দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্যের চিত্র প্রকটাকারে প্রকাশিত, এমন সময়ে নির্বাচন আসন্ন হয়ে ওঠায় সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা উন্নয়ন ও সাফল্যের ফিরিস্তি প্রদান অব্যাহত রেখে প্রমাণ করতে চান, তারা পাঁচ বছরে অনেক ভালো কাজ করেছেন। তবে তাদের এ দাবি নাগরিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হচ্ছে না। এ জন্য তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে সরকারদলীয় প্রার্থীদের পছন্দ না করে পরিবর্তনের পক্ষে রায় প্রদান করেছেন। বিরোধী দলের প্রতি সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণও যে নাগরিক সম্প্রদায় পছন্দ করেননি তাও বোঝা যায়। পাঁচ বছরে বিরোধী দলের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে নির্বাচন সন্নিকটে আসার পর তাদের সঙ্গে আলোচনা করার সরকারি উদ্যোগের আন্তরিকতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আছে। বড় বড় পদে অযোগ্যদের বসিয়ে সরকার একদিকে প্রশাসনের বারোটা বাজিয়েছে, অন্যদিকে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে প্রায় সব সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা দুর্নীতি করে আখের গুছিয়েছেন, তারা এখন সরকারের মেয়াদান্তে এসে দীর্ঘ মেয়াদের ছুটি নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যস্ত। এহেন নৈরাজ্যের মধ্যেও সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা তাদের শাসনামলকে সফল দাবি করে বলতে চেষ্টা করছেন যে, অন্য কোনো সরকার আমলে এত উন্নয়ন হয়নি। তারা আরও দাবি করছেন, এ সরকার যেমন ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করেছে, তেমনি সরকার পরিচালনার ব্যবস্থাপনায়ও দেখিয়েছে অভূতপূর্ব সাফল্য।
সরকার পরিচালনায় মহাজোট সরকারের ব্যবস্থাপনা সাফল্য উপস্থাপনের জন্য একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করলে বুঝতে সুবিধা হবে। নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের জন্য যখন সবাই ব্যাকুল, যখন বিরোধী দল নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনরত, যখন বড় দুটি দলের মধ্যে এ সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে আলোচনার জন্য উভয় পক্ষের ওপর যুগপৎ স্বদেশী সুশীল সমাজ ও বিদেশী কূটনীতিকদের চাপ অব্যাহত, বিরোধী দল যখন চলমান অহিংস সভা-সমাবেশ থেকে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার জন্য প্রস্তুতিরত, এমন গুরুত্বপূর্ণ সময় সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর বিরোধীদলীয় নেতাকে ফোন করার কথা বলা হয়। এ ছোট সংবাদটি উত্তপ্ত সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিবেশে কিছুটা আশাবাদের সঞ্চার করে। সাধারণ মানুষ ভাবেন, এবার হয়তো কোনো সমঝোতার দুয়ার খুলতে পারে। এমনটা ভাবতেই সাধারণ শান্তিপ্রিয় মানুষ ভালোবাসেন। কারণ, তারা সংঘাত, সহিংসতা ও নৈরাজ্য চান না। কাজেই প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্য ফোনকল করার ঘোষণাটি যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আলোচ্য ফোনকল করার কথা বলার কয়েকদিন পর প্রধানমন্ত্রী ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় বিরোধীদলীয় নেতাকে ফোন করে তার সঙ্গে ৩৭ মিনিট কথা বলেন। এর আগে ওই দিন দুপুরে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে লাল টেলিফোনে কথা বলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) পারফরম্যান্স ও ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। বিটিসিএল কর্মকর্তারা এতই করিৎকর্মা ও দায়িত্বশীল(?) যে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাকে ফোন করবেন ঘোষণা দেয়ার কয়েক দিন পরও তিনি বিটিসিএলের লাল টেলিফোনে কথা বলতে পারলেন না। তাকে তার একজন এডিসির এবং বিরোধীদলীয় নেতাকে তার একজন একান্ত সহকারীর মোবাইল ফোনে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে হল। আলোচ্য ফোনালাপে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হোক বা না হোক, টেলিফোন বিভাগের যোগ্যতা, দায়িত্বপরায়ণতা ও পেশাদারিত্বের মান কোন পর্যায়ে রয়েছে, সে বিষয়টি দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট হয়েছে।
বলা প্রয়োজন, প্রধানমন্ত্রীর আলোচ্য ফোনকলটি একটি সাধারণ ফোনকল ছিল না। এটি ছিল সম্ভাব্য রাজনৈতিক সহিংসতা এড়িয়ে দেশকে একটি স্বস্তিময় ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়ার পরিবেশ তৈরির জন্য বিবদমান দু’পক্ষের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত আলোচনার সূত্রপাত ঘটানোর লক্ষ্যে দেশের দুই প্রধান নেতার মধ্যে কথোপকথনের জন্য সরকারপ্রধানের করা ফোনকল। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি টেলিফোন করা হবে জেনেও এবং হাতে দু-তিন দিন সময় পেয়েও বিটিসিএলের করিৎকর্মা(?) কর্মকর্তারা বিষয়টিকে এতই গুরুত্ব দিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী লাল টেলিফোনে নিজে ফোন করে বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে কথা বলতে ব্যর্থ হলেন। এতে প্রকাশ পেল, বিরোধীদলীয় নেতার লাল টেলিফোনটি কয়েক মাস ধরে বিকল হয়ে রয়েছে। টেলিফোন বিভাগের মতো সরকারের অন্যান্য বিভাগের অভ্যন্তরীণ চিত্রও প্রায় কমবেশি একই রকম। প্রশাসনের প্রায় প্রতিটি বিভাগে বড় বড় উচ্চপদে যোগ্যদের বাদ দিয়ে অযোগ্যদের প্রাধান্য দেয়ায় সর্বক্ষেত্রে পেশাদারিত্ব ভেঙে পড়ে দেখা দিয়েছে চরম ব্যবস্থাপনা, ব্যর্থতা। প্রধানমন্ত্রীর ফোনালাপের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতার বাস্তব চিত্রের নমুনা জনসমক্ষে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, লাল টেলিফোন কেবল দেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং ভিভিআইপিদের দেয়া হয়। এ টেলিফোনের সেবাদান উন্নত করতে রয়েছে একটি বিশেষ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ও এর রক্ষণাবেক্ষণের মানও বিশেষ মানের হওয়ার কথা। এ অবস্থায় দেশের বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার লাল টেলিফোন যদি মাসের পর মাস বিকল হয়ে থাকে, তাহলে তা থেকে বিটিসিএলের পেশাদারিত্ব ও ব্যবস্থাপনা যোগ্যতার নমুনা পাওয়া যায়। আর এমন একটি ফোনে স্বয়ং সরকারপ্রধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফোনকল করবেন জানার পর দু-তিন দিন সময় পেয়েও টেলিফোন বিভাগ স্বয়ং সরকারপ্রধানকেই সেবা প্রদান করতে ব্যর্থ হলে প্রশাসনের অন্যান্য বিভাগ থেকে সাধারণ মানুষ কতটা সেবা পাচ্ছেন, তা অনুমান করা যায়। কাজেই মহাজোট সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি এবং এ সরকারের মন্ত্রী-নেতাদের বক্তৃতায় প্রদত্ত সাফল্যের বর্ণনায় বিভ্রান্ত হলে সরকারি পারফরম্যান্সের প্রকৃত চিত্র ও প্রশাসনের সেবাদান কার্যক্রমের পেশাদারিত্ব এবং এর ব্যবস্থাপনা যোগ্যতার বাস্তব চিত্র যথার্থভাবে অনুধাবন করা যাবে না।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

উপেক্ষিত ভোক্তা স্বার্থ by এমদাদ হোসেন মালেক

২০০৯ সাল থেকে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন দেশে কার্যকর করা হয়। গঠন করা হয় জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এ দফতরের মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা কিংবা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা, তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জরিমানা আরোপ, ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ক্ষমতা রাখেন। ভোক্তা সংজ্ঞার ব্যাখ্যায় কোনো পণ্য বা সেবা গ্রহীতা নগদ, বাকি, আংশিক মূল্য অথবা কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের চুক্তিতে যে বা যিনি পণ্য কিনবেন তিনিই ভোক্তা। ভোক্তা আইনে কেউ পণ্য বা সেবা ক্রয় করে ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্ভূত ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক কিংবা উল্লিখিত জেলা পর্যায়ের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের বরাবর সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। তিনি সাদা কাগজে লিখিত অথবা ই-মেইল, ফ্যাক্স অথবা টেলিফোনে প্রমাণসহ নিজ পরিচয় দিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। এ আইনের সবচেয়ে ভালো দিকে হচ্ছে ১. অভিযোগ দায়ের করতে কোনো কোর্ট ফি দিতে হয় না। ২. দায়েরকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসনিক ব্যবস্থার আরোপিত ও আদায়কৃত জরিমানার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রদান করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে অভিযোগ দায়েরের এতসব ভালো দিক থাকার পরও বিগত প্রায় ৪ বছরে মাত্র ৪০টি অভিযোগ জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে জমা পড়ায় দফতরের মহাপরিচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে ২১ জুন এবং ৩ জুলাই ২০১৩ জাতীয় প্রেস ক্লাবে ভোক্তা স্বার্থসংশ্লিষ্ট দুটি সভায় বলেছেন, শুধু আইন থাকলেই চলবে না, আইন বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের বরাবর ক্রেতা-ভোক্তাদের সমস্যা জানাতে হবে। নাগরিক সমাজ যদি সে দায়িত্ব পালন না করে থাকেন তাহলে ভোক্তা স্বার্থ কীভাবে সংরক্ষিত হবে? মহাপরিচালকের এ ধরনের বক্তব্য অনুযায়ী বলা যায়, আমরা যারা ভোক্তা তারা হয় বেখেয়ালি অথবা দায়িত্ব-কর্তব্যহীনভাবে সংঘটিত অন্যায় মেনে নিচ্ছি। বাস্তবে কি তাই? না, আমরা কিভাবে, কাদের কাছে অভিযোগ করব তাই-ই জানি না।
ধরুন আমি একজন সাধারণ ভোক্তা। রাস্তা সংলগ্ন একটি দোকান থেকে রুটি, কলা, পানি, চা ২০ টাকা দিয়ে খেলাম। খাওয়ার সময় বুঝলাম রুটিটা ভালো না, পানিও বিশুদ্ধ না। এসব খেয়ে রাতে আমার ডায়রিয়া হল। ভোক্তা অধিদফতরে কী প্রমাণ দিয়ে অভিযোগ করব?
সবাই জানেন, ঢাকা শহরে কোনো মাংসের দোকানে মহিষ ও ভেড়ার মাংস পাওয়া যায় না। সবই খাসি-গরুর মাংস। অথচ প্রতিদিন আমরা দেখি, যে কসাই দশটা গরু কেনেন, তার সঙ্গে তিনি ২-৪টা মহিষও কেনেন। এগুলো জবাই করার পর ক্রেতার কাছে সব মাংসই বিক্রি করা হয় গরুর মাংস নামে। এভাবে ভেড়া-বকরির মাংসও খাসির মাংস হিসেবে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। একজন ক্রেতা মাংস কিনে প্রতারিত হলেন কিনা তা কিভাবে বুঝবেন।
সংবাদমাধ্যম প্রায়ই কলা-আনারস পাকাতে ও সংরক্ষণে নানাবিধ কেমিক্যাল ব্যবহারের সংবাদ পরিবেশন করে চলেছে। মাছে ফরমালিন ব্যবহারের গল্প শুনতে শুনতে এখন শুনছি সরাসরি মাছে ফরমালিন ব্যবহার না করে যে বরফ দিয়ে মাছ সংরক্ষণ করা হয় সেই বরফ তৈরির সময় নাকি পানিতে ফরমালিন মিশিয়ে বরফ তৈরি করা হচ্ছে। ক্রেতা হিসেবে এমনিভাবে বাজার থেকে মাছ, মাংস, ফলমূল, শাকসবজি যা প্রতিদিন আমরা আমাদের পরিবারের লোকদের খেতে দিচ্ছি, এর কোনটি কী পরিমাণে অস্বাস্থ্যকর বা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তা নিরূপণ করব কিভাবে? জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে কিভাবে অভিযোগ করব তার কূলকিনারা আমরা সাধারণ ক্রেতা-ভোক্তারা করতে পারি না। এখন আবার ক্রেতা-ভোক্তার অসহায়ত্বকে খোদ অধিদফতরই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ সংরক্ষণে নিয়োজিত এ অধিদফতর কয়টি হোটেল, রেস্তোরাঁর পানি, বাজারের মাছ, মাংস, শাকসবজি ও ফল-ফলাদি পরীক্ষা করিয়ে বলছেন- এগুলো স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
ভোক্তা আইনের ৩১ ধারায় বলা হয়েছে, ‘নমুনা সংগ্রহের ক্ষমতা ইত্যাদি (১) মহাপরিচালক বা তাহার নিকট হইতে এতদুদ্দেশ্যে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোন কর্মকর্তা বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে যে কোন দোকান, গুদাম, কারখানা, প্রাঙ্গণ বা স্থান হইতে যে কোন পণ্য বা পণ্য উৎপাদনে ব্যবহৃত উপাদানের নমুনা সংগ্রহ করিতে পারিবেন। (২) এই ধারার অধীন গৃহীত নমুনা সম্পর্কে উক্ত উপধারার উল্লিখিত নমুনা বা গবেষণা করার রিপোর্ট বা উভয়ই সংশ্লিষ্ট কার্যধারায় সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণীয় হইবে।’
ধারা ২৯-এ বলা হয়েছে, ‘মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যসামগ্রী উৎপাদন, বিক্রয় ইত্যাদির উপর বাধা নিষেধ : কোনো পণ্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর বলিয়া প্রমাণিত হইলে মহাপরিচালকের পরামর্শক্রমে সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা দেশে বা কোন নির্দিষ্ট এলাকায় এইরূপ পণ্যের উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করিবার বা প্রজ্ঞাপনে নির্ধারিত শর্তাধীনে ঐ সকল কার্যক্রম পরিচালনা বা ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশ জারি করিতে পারিবে।’
ভোক্তা অধিদফতরের মহাপরিচালক মহোদয় ক্রেতা-ভোক্তার অভিযোগের প্রত্যাশায় বসে না থেকে যদি অধিদফতর গঠনের পর থেকে আইনের ৩১ ধারায় বিতর্কিত ও সন্দেহজনক খাদ্য-খাবারের নমুনা বাজার থেকে জব্দ করে পরীক্ষা করিয়ে আইনের ২৯ ধারার বিধান অনুযায়ী আইনানুগ কার্যকর ব্যবস্থা নিতেন তাহলে এতদিনে ১ কারওয়ানবাজার, টিসিবি ভবন (৮তলা), ঢাকার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরটি জননন্দিত হয়ে উঠত। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আইনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২০০৯ সাল থেকে মূল দায়িত্ব পালন করলে দেশের ভোক্তাদের কষ্ট লাঘবে সহায়তা হতো। আমরা সাধারণ ভোক্তারা আশা করব, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা-কর্মীরা পরস্পর পরস্পরকে বা সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডার বা সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী কেউ কাউকে দোষারোপ না করে নিজ অবস্থান থেকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজ নিজ কার্য সম্পাদন করবেন এবং তাতেই দেশ-জাতি তথা সর্বস্তরের মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হবে।
ভোক্তা অধিদফতরের বেলায় এ কথাটির যথার্থতা আরও বেশি। কারণ এ আইন করা হয়েছে অসহায় ক্রেতা-ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে। জেলায় জেলায় ভোক্তাদের জন্য অফিস খোলা, জনবল নিয়োগ বা বাজার অভিযান করা এগুলো অধিদফতরটির মূল কাজ হতে পারে না। এগুলো পরিপূরক কাজ। বরং উপরে উল্লিখিত আইনের ধারাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই আজ সবচেয়ে জরুরি। এ প্রতিষ্ঠান মূল কাজে হাত না দিয়ে ভোক্তাদের দোষারোপ করলে তাদের অসহায়ত্ব ও হতাশা আরও বাড়বে। জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হবে। একই সঙ্গে মানব স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে নিপতিত হবে। সম্প্রতি একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশের ৪৫ শতাংশ মানুষ ভেজাল খাবার খেয়ে নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ থেকে আমরা জানতে পারছি আমরা ভয়াবহ খাদ্য দূষণের শিকার হয়ে অকালে মৃত্যুর মুখে ধাবিত হচ্ছি।
আশা করি, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্তাব্যক্তিরা ভোক্তা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে দেশ-জাতির প্রত্যাশা পূরণে কর্মতৎপর হবেন।
এমদাদ হোসেন মালেক : সাধারণ সম্পাদক, কনজুমারস ফোরাম (সিএফ)

জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে by কারার মাহমুদুল হাসান

সবকিছু যদি ভালোয় ভালোয় চলে তবে আশা করা যায়, আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন জানুয়ারি ২০১৪-এর তৃতীয় সপ্তাহ অতিক্রম হওয়ার আগেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে বোঝা যাচ্ছে, এ নির্বাচন হবে বর্তমান সংসদে পাস করা পঞ্চদশ সংশোধনীর ভিত্তিতেই, যা কিনা বর্তমান সংসদ ও চলমান মন্ত্রিসভা বহাল রেখেই অনুষ্ঠিত হতে হবে মর্মে সর্বশেষ সংশোধিত (বর্তমান সরকারের আমলে) শাসনতন্ত্রে উল্লেখ আছে। ক্ষমতাসীন মহাজোট অন্তত একটি সিদ্ধান্তে এখন পর্যন্ত অনড় যে, শাসনতন্ত্রের বাইরে কোনো ধরনের অগণতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক ধরনের অনির্বাচিত সরকারের অধীনে কোনোমতেই নির্বাচন করা যাবে না। আর নির্বাচনের সময় বর্তমান সংসদ সদস্যরা নিজ নিজ পদে বহাল থেকেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। উল্লিখিত সংশোধনীটি প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের নেতৃত্বে ফুল বেঞ্চে সাতজন বিচারপতির মধ্যে চারজনের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে ঘোষিত হয়েছিল, যদিও ওই রায়ে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে মর্মে দিকনির্দেশনা বা পর্যবেক্ষণ ছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট সে দিকনির্দেশনা সংবলিত পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের অনেক আগেই সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করিয়ে নেয় বিদ্যমান নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে। উল্লিখিত বিষয়ে সামগ্রিক প্রক্রিয়ার বিষয়টি ২৮ অক্টোবর প্রথম আলোয় প্রকাশিত ‘নির্বাচন : কোন সংবিধান, কার সংবিধান’ শীর্ষক বদিউল আলম মজুমদারের নিবন্ধে মোটামুটি বস্তুনিষ্ঠ তথ্যাদিসহ আলোচনা করা হয়েছে। এ থেকে জানা যায়, ২১ জুলাই ২০১০ সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবক্রমে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করে মহাজোটের অংশীদারদের মধ্য থেকে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয় (ওই কমিটিতে বিএনপি অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানায়)। এ কমিটি মোট ২৭টি বৈঠক করে তিনজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি, ১০ জন আইনজীবী/বিশেষজ্ঞ, আওয়ামী লীগসহ জোটের ৬টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি (যার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও জেনারেল এরশাদও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন), ১৮ জন বুদ্ধিজীবী, ১৮ জন সম্পাদক এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করে। ওই কমিটির ২৯ মার্চ ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিত ১৪তম সভায় বিদ্যমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অপরিবর্তিত রাখার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করা হয়। ওই বৈঠকে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের নমস্য ব্যক্তিরা যথা- সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমু, আবদুল মতিন খসরু, রাশেদ খান মেনন, শিরীন শারমীন চৌধুরী, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত- সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখার পক্ষে নীতিগতভাবে নিজ নিজ অভিমত অত্যন্ত জোরালোভাবে প্রদান করেছিলেন। তারা কে কী বলেছিলেন তার সবই বদিউল আলম মজুমদারের নিবন্ধে উল্লেখ আছে। কমিটির সর্বশেষ ২৭ এপ্রিল ২০১১ তারিখে অনুষ্ঠিত ২০তম সভায় প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্য যেভাবে লেখক তার লেখায় তুলে ধরেছেন তা এরকম : ‘অনির্বাচিত ও অগণতান্ত্রিক সরকার আর কেউ দেখতে চায় না। আর ৫৮ অনুচ্ছেদে একটি সুযোগ থাকায় তা দিয়ে যাতে অন্য কিছু ঢুকে না যায়- সে লক্ষ্যে ৫৮ অনুচ্ছেদকে একটু সংশোধন করে এ সুযোগটি যাতে না থাকে (তা) বন্ধ করে একটি টাইম ফ্রেম দিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করুন।’
উপরোক্ত বিবরণ থেকে এটা পরিষ্কারভাবে প্রতীয়মান, প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সংস্কারের পক্ষেই সুপারিশ করেছেন, তা বাতিল করতে কেউ বলেননি। এরপর ১০ মে ২০১১ তারিখে সুপ্রিমকোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। এ সংক্ষিপ্ত আদেশের পরও ২৯ মে ২০১১ কমিটি সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি লিখিত সুপারিশ প্রণয়ন করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ ৯০ দিনের মধ্যে সীমিত করে এবং বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে পরবর্তী সংসদে এটি অনুমোদনের বিধান রেখে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে বহাল রাখার পক্ষে ওই কমিটি সর্বসম্মতভাবে ২৯ মে ২০১১ সুপারিশ করে, যে কমিটির ১৫ জন সদস্যই মহাজোটের। এসবই ঐতিহাসিক ঘটনা।
উপরোক্ত সুপারিশ প্রণয়নের পরদিন ৩০ মে ২০১১ কমিটির সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সে সাক্ষাতের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। এর আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের লক্ষ্যে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত একটি বিল মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে (আদালতের পূর্ণ রায় লেখার প্রায় ১৫-১৬ মাস আগেই), যা ২৫ জুন ২০১১ সংসদে উত্থাপন করা হয়। এরপর ৩০ জুন সংসদে বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে সংশোধনীটি পাস হয়। এ থেকে জনগণ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের অভিপ্রায়ের, না প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন! প্রশ্নটি রেখেছেন বদিউল আলম মজুমদার তার লেখা নিবন্ধে। তিনি বিগত আওয়ামী লীগ আমলের সুনামের অধিকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলামের গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে আরও প্রশ্ন রেখেছেন, শুধু পঞ্চদশ সংশোধনীর লেজিটিমেসিই নয়, এর আইনি বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ। সংশোধনীটির মাধ্যমে (অনুচ্ছেদ ৭বি) সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশকেই অপরিবর্তনযোগ্য করে ফেলা হয়েছে। কিন্তু কোনো সংসদই পরবর্তী সংসদের হাত-পা বেঁধে দিতে পারে না (মাহমুদুল ইসলাম, কনস্টিটিউশনাল ল’ অব বাংলাদেশ, তৃতীয় সংস্করণ)। অন্যদিকে বাংলাদেশ শাসনতন্ত্রের অন্যতম প্রণেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সুপ্রিমকোর্ট পঞ্চদশ সংশোধনী করতে বলেননি। আদালতের রায়ে কোথাও বলা নেই, যে সরকার আছে সে সরকারের অধীনেই দশম নির্বাচন হবে (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৯.০৯.১৩)।
এ অবস্থায় সংশোধিত শাসনতন্ত্র অনুসরণে জানুয়ারির (২০১৪) তৃতীয় সপ্তাহের মধ্যে অনুষ্ঠেয় দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দুই পক্ষের তুমুল হানাহানির কারণে আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি-না, আর নির্বাচন হলেও দেশে-বিদেশে তা গ্রহণযোগ্য হবে কি-না, সে প্রশ্ন দিন দিন জোরালো হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের কারণে দেশের রাজনীতিতে ক্রমেই উত্তাপ বাড়ছে। হরতালসহ বিভিন্ন ধরনের হিংসাত্মক এবং ক্ষেত্রবিশেষে জানমাল বিনাশী ভয়ংকর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে দেশের সামগ্রিক অবস্থা এক কথায় নাজুক রূপ ধারণ করে ঘন কালো অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ অবস্থায় ২৭ অক্টোবর ২০১৩ সন্ধ্যায় দুই প্রধান নেত্রীর ৩৭ মিনিটের ফোনালাপের পর সংলাপ শুরু হবে কি-না এবং শুরু হলেও সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কিনা, তা এখন আক্ষরিক অর্থেই অনিশ্চিত।
নির্বাচন কমিশন নিয়েও অনেক কথা রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) একজন সৎ, ভদ্র ও নিষ্ঠাবান সাবেক আমলা, যিনি অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতি নিয়ে জীবনভর চাকরি করেছেন। চাকরি জীবনের প্রথমদিকে মুক্তিযুদ্ধেও অংশ নিয়েছিলেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিষয়ে বর্ষীয়ান রাজনীতিক সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য) বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে মেরুদণ্ডহীন আখ্যায়িত করে বিরোধী দলের উদ্দেশে নসিহত করেছিলেন, মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) শক্তিশালী করতে তারা যেন এগিয়ে আসেন। তিনি আরও বলেছিলেন, সুষ্ঠুু নির্বাচনের জন্য জনগণের কাছে আস্থাশীল ও শ্রদ্ধাশীল নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৭.০১.১২)। বিরোধী দল বিএনপি সেনগুপ্তের আহ্বানে কোনো সাড়া দিয়েছিলেন কিনা, তা জানা যায়নি। তবে তারা এ নির্বাচন কমিশনকে সরকারের তল্পিবাহক হিসেবে আখ্যা দিয়ে নিরন্তর তাদের সমালোচনা করে চলেছেন এবং ইসিকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পরামর্শ দিয়েছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের একজন সদস্য সাংবাদিকদের সামনে চেয়ার থেকে ‘লাফ’ দিয়ে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন, ইসির মেরুদণ্ড সোজাই আছে। এ সবই আচানক ঘটনা বটে।
নির্বাচন কমিশনের অন্য একজন সদস্য মোহাম্মদ আবু হাফিজ সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত কথা বলেছিলেন কয়েক সপ্তাহ আগে। তিনি বলেছিলেন, সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করলে সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে সমান সুযোগ দেয়া নির্বাচন কমিশনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদ রেখে নির্বাচন করার চেয়ে ভেঙে দেয়ার পরবর্তী ৯০ দিনে নির্বাচন করা ইসির জন্য সহজ হবে। তবে সংসদ বহাল রেখে না ভেঙে নির্বাচন করা হবে তা এখনও অনিশ্চিত (আমাদের সময়, ০৯.০৯.১৩)।
এখন দেশবাসী গত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেমনভাবে ভোট প্রদান করেছেন- সে বিষয়ে আত্মভোলা এ জাতির উদ্দেশে কিছু তথ্য প্রদান করতে চাই।
বিগত চারটি সংসদ নির্বাচনের ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ৯ম সাধারণ নির্বাচন (২০০৮) ছাড়া আগের তিনটি নির্বাচনে দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে প্রায় সমানসংখ্যক ভোট পেয়েও সংসদে বেশি আসন লাভের ফলে দল দুটি পর্যায়ক্রমে সরকার গঠন করেছিল। ১৯৯১-এর নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১,০৫,০৭,৫৪৯ (মোট প্রদত্ত ভোটের ৩০.৮১ ভাগ) ও ১,০২,৫৯,৮৬৬ (মোট প্রদত্ত ভোটের ৩০.০৮ ভাগ) এবং প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান তিন লাখের কম হলেও জয়ী হওয়া আসনের ব্যবধান ছিল ৫২টি। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে দুই বড় দলের প্রাপ্ত ভোটের (আওয়ামী লীগ : ৩৭.৪৪ ও বিএনপি ৩৩.৬০ ভাগ) বিপরীতে প্রাপ্ত আসনের ব্যবধান (মাত্র ৩০টি) মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল বলে ধরা যায়।
একইভাবে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২,২৮,৩৩,৯৭৮ (মোট প্রদত্ত ভোটের ৮০.৯৭ ভাগ) এবং ২,২৩,৬৫,৫১৬ (মোট প্রদত্ত ভোটের ৪০.১৩ ভাগ)। এ নির্বাচনে দুই দলের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান অনধিক পাঁচ লাখ হলেও প্রাপ্ত আসন সংখ্যার ব্যবধান দাঁড়ায় ১৩১টি।
সেনাসমর্থিত ভিন্ন ধাঁচের এক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মোট ২৬৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩০টি আসনে বিজয়ী হয় এবং প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ৩,৩৫,৫৩,৯৭১ (মোট প্রদত্ত ভোটের ৪৮.০৬ শতাংশ)। অন্যদিকে ওই নির্বাচনে বিএনপি ২৫৯টি আসনে অংশ নেয় এবং সাকুল্যে ২৯টি আসনে জয়লাভ করে। এ দলের মোট প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ২,২৬,৫১,৭২১ (মোট প্রদত্ত ভোটের ৩২.২৪ ভাগ)। আওয়ামী লীগের বিপরীতে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বিবেচনায় বিএনপির অন্তত মোট ১২০টি বা তার চেয়েও বেশি আসনে জয়ী হওয়া হয়তোবা যৌক্তিক হতো। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।
তাছাড়া, ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এক চমকপ্রদ ও জনবান্ধব নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। এতে উল্লিখিত ঘরে ঘরে চাকরি প্রদান, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দেশের প্রতিটি ছোট-বড় নদী খনন ও সেগুলোকে সারা বছর নাব্য রাখা, নৌপথ উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন, স্বল্প খরচে যাতায়াত ও রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে রেলওয়ের ব্যাপক উন্নয়ন সাধন, রাজধানী ঢাকার পরিবহন সমস্যার সমাধান ও যানজটমুক্ত করার লক্ষ্যে ভূগর্ভস্থ রেললাইন নির্মাণ এবং সর্বোপরি নতুন চমক ‘ডিজিটাল’ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ইত্যাদি ঘোষণা নতুন ভোটার হওয়া প্রায় ৮০ ভাগ তরুণ-তরুণীকে আওয়ামী লীগকে ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করে। সেই সঙ্গে দেশে প্রকৃত অংশীদারিত্বমূলক সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম, সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণসহ বিভিন্ন অঙ্গীকার দেশের মানুষকে উৎসাহিত করেছিল আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে। এসব ঘোষণায় দেশের শিক্ষিত-কমশিক্ষিত আমজনতা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, যার ফলে ওই নির্বাচনে দুই বড় দলের ভোটের ব্যবধান এক কোটিরও বেশি অতিক্রম করেছিল।
বিগত চারটি নির্বাচনে বড় দুই দলের প্রাপ্ত ভোটের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে এ দুটি দলেরই কমবেশি প্রায় সমানসংখ্যক সমর্থক রয়েছে, যা মাঝে মধ্যে সীমিতভাবে হলেও ওঠানামা করে। তারপরও বলা যায়, জনগণ ভোটদানে কখনও বড় রকম ভুল করে না, যদি ভোটদান পদ্ধতি ও পরিবেশ যৌক্তিকভাবে ন্যায়সঙ্গত হয় এবং নির্বাচনকালীন সরকার যদি নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনায় সক্ষম হয়। তবে গত জুনে চারটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন এবং সর্বশেষ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন (গোপালগঞ্জের পর যাকে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে শক্তিশালী দুর্গ বলে অভিহিত করা হয়) নির্বাচনের ফলাফল এবং সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জনমত জরিপে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বর্তমান আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১৪ দলের সরকারের জন্য অস্বস্তিকর বটে। তারপরও জাতির প্রত্যাশা, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে যা যা করার তার সবই করবেন। মহান আল্লাহ্ তায়ালা সবাইকে ধৈর্য ও সুমতি প্রদান করুন।
কারার মাহ্মুদুল হাসান : সাবেক সচিব ; প্রেসিডেন্ট, চার্টার্ড ইন্সটিটিউট অব লজিস্টিকস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট, বাংলাদেশ কাউন্সিল

আলো, আমার আলো

সকালবেলায়ই মেজাজটি তিরিক্ষে হয়ে গেল। উৎসটি হলো প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠার একটি খবরের বিন্যাস; অথবা পরিবেশনে অসামঞ্জস্য কিংবা শিরোনামে অসংগতি। বারান্দায় বসে সদ্য হকারের দেওয়া প্রথম আলো পড়ছিলাম। সামনে ধূমায়িত গরম চায়ের কাপ। প্রাতঃপান তথা মর্নিং টিতে চুমুক দেব আর পত্রিকার পাতায় চোখ বুলিয়ে নেব—এ আমার প্রায় অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের অভ্যাস।
সেই পাকিস্তান অবজারভার আমলে যখন বার্তা সম্পাদক (অনেকে পদবিটির আগে দুঁদে কথাটি যোগ করতেন), তখন থেকেই পত্রিকার পাতায় উকুন খোঁজার অভ্যাস। তখন পদাধিকারবলে কাজটি যথাযথ মনে হলেও এখন প্রথম আলো, যার কোনো পদেই আমি অধিষ্ঠিত নই, সেখানে কোনো কর্তৃত্ব প্রয়োগ করা শুধু বেমানান নয়, অবাঞ্ছিতও বটে। তবু কেন জানি প্রথম আলোতে সংবাদ পরিবেশন অথবা মন্তব্য প্রতিবেদন কিংবা সংবাদচিত্রের ব্যবহার অথবা পৃষ্ঠা সাজানোতে বিন্দুমাত্র খুঁত চোখে পড়লেই মেজাজটি তিরিক্ষি হয়ে ওঠে, দিনটিই মনে হয় খারাপ যাবে। কেন এমনটি হয়? আমার সব ব্যাপার-স্যাপার ও মন-মেজাজের অন্ধিসন্ধি অজানা নয় আমার ৬০ বছরের সহধর্মিণী সেতারা মূসার, যিনি একসময় নিজেও সাংবাদিকতা করেছেন, আমি বাহ্যত প্রকাশ না করলেও মেজাজটি বুঝে ফেলেন। সেদিন আমার উত্তপ্ত মেজাজের আভাস পেয়ে হাতে ধরা প্রথম আলোটি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে?’ আমি একটি খবর অথবা প্রতিবেদনটির দিকে তর্জনী নির্দেশ করে বললাম, ‘দেখো, দেখো, এটা কি এভাবে দেওয়ার কথা?’ অথবা বলতাম, ‘ইশ্, নিউজ সেন্স দেখেছ? খবরটি নিজেও বোঝেনি, পাঠককেও বোঝাতে পারেনি।’ ফোকলা দাঁতে হেসে তিনি বললেন, ‘তাতে তোমার হয়েছেটা কী।’
গিন্নির কথার উত্তর দেওয়ার আগেই অতি স্নেহভাজন সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম ওরফে মুকুলকে ফোন করে খবরটি উদ্ধৃত করে তার মুণ্ডুপাত শুরু করেছি। ঝাড়ি খেয়ে ওদিক থেকে মুকুল কী বলেছে, তা শোনার অবকাশ ছিল না, শুধু বকেই গেলাম। পরে শুনেছিলাম বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে সেদিন সকালের সম্পাদকীয় বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। যাকগে, একসময় ফোনটি রেখে দিলাম। তার পরই গিন্নির প্রশ্নটি ‘তাতে তোমার কী’ কথাটি নিয়ে ভাবতে লাগলাম। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রথম আলোর ভালো-মন্দ, সাফল্য-ব্যর্থতা, গুণাবলি বা ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে আমার কেন মেজাজ তিরিক্ষে হয়? পত্রিকাটির কোনো বিশেষ বা অনুসন্ধানী খবর প্রকাশে বা সামাজিক উদ্যোগে মনে খুশির জোয়ার জাগে—এই প্রশ্নটির জবাব পেয়ে গেছি। উত্তরটি হলো, আমি প্রথম আলোকে ভালোবাসি, পত্রিকাটির ভালো-মন্দের সঙ্গে কেন জানি জড়িয়ে গেছি। একসময় যেখানে সাংবাদিকতার জীবনে বেড়ে উঠেছি, সেই অবজারভার যেমন ২১ বছর আমার রক্তে আর হাড়-মাংসে মিশে গিয়েছিল, তেমনি প্রথম আলো গত ১৫ বছরে অন্তরে জায়গা করে নিয়েছে। তাই তো পত্রিকাটির সামান্য পথচ্যুতি অথবা সাংবাদিকতার নিয়মবাঁধা গণ্ডির বাইরে গেলে আমার মেজাজ গরম হয়, যেমন—৪০ বছর আগে অবজারভার-এর বার্তা সম্পাদকের হতো। কেন জানি তখনকার মানদণ্ডে এখন শতকরা ১০০ ভাগ ত্রুটিহীন সাংবাদিকতা আশা করি প্রথম আলোর কাছে; কি সংবাদ পরিবেশনে অথবা মতামত প্রকাশ অথবা প্রচার-প্রচারণায়। আমার একটি নিবন্ধ প্রতিবেদন লিখতে তিন দিন লাগে। প্রথম দুই দিন বাড়িতে বসে লিখে, তৃতীয় দিন প্রথম আলোর ষষ্ঠ তলায় কোনো খোপে বসে প্রতিবেদনটির খোলনলচে পাল্টাতে থাকি। প্রথম আলোতে পর পর তিন দিন লেখাটির পুনর্বিন্যাস-প্রক্রিয়ার ফাঁকে সম্পাদকীয় বিভাগের প্রত্যেকের খোঁয়াড়ে ঢুকে লেগ-পুলিং তথা কথার খোঁচাখুঁচি করে আসি। প্রতিবেদনটি লেখালেখির চেয়েও এই খোঁচাখুঁচি আমি অধিকতর উপভোগ করি।
বস্তুত ওইটি আমার কোনো লেখার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণাও বটে। তার মানে আমি পত্রিকাটির নিছক একজন লেখক নই, সম্পাদকীয় বিভাগের প্রত্যেকের সঙ্গে আমার আত্মার যোগসূত্র গড়ে উঠেছে। প্রথম আলোর বার্তা বিভাগের সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ কিঞ্চিৎ কদাচিৎ ঘটে থাকে। বার্তা পরিবেশকদের অনেককেই চিনি না, এতৎসত্ত্বেও তারা আমাকে চেনে নানা সূত্রে। আমি তাদের জানি প্রতিবেদন পড়ে, সংবাদচিত্র দেখে। এই চেনাচিনিতে অলক্ষ্যে অতীতের একজন বার্তা সম্পাদক উঁকি মারে। অথচ এদের কার্যক্রমেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমার মেজাজ চড়ে যায়, মুকুলকে সকালবেলা টেলিফোন করে ঝাড়ি মারি। এতৎসত্ত্বেও বার্তা বিভাগের তথা বার্তা সম্পাদকের ও সহসম্পাদক, অনুবাদকদের আমার প্রতি যে সম্মানবোধ, অগাধ আস্থা, তার একটি উদাহরণ পেশ করছি। বছর কয়েক আগের কথা, রাত ১০টার দিকে প্রথম আলোর বার্তা সম্পাদক টেলিফোন করে যা বলল, শুনে আমি তো হতবাক। কোনো একটি চাঞ্চল্যকর খবর শুনিয়ে আমার কাছে জানতে চাইল, ‘এটি কীভাবে পরিবেশন করা যায়, শিরোনাম কী হতে পারে।’ প্রথম পাতায় অবস্থান কোথায় হবে। আমি বললাম, ‘এ তো তোমার সম্পাদকের বলার কথা।’ উত্তর এল, ‘তিনি এখন আমেরিকায়। তিনিও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না, আপনার কাছ থেকে নির্দেশনা পেতে বলেছেন।’ আমি ভাবলাম, ‘একি অবাক কাণ্ড রে বাবা।’ যা-ই হোক, প্রথম আলোর বার্তা সম্পাদককে যথাযথ উপদেশ দিলাম। তার পরেই অনুরোধ, 
এর ওপর এখনই আপনাকে ছোট্ট একটি মন্তব্য প্রতিবেদন দিতে হবে।’ আমি ভাবি, ‘বলে কী?’ যা-ই হোক, বার্তা সম্পাদকের অনুরোধ রক্ষা করে ভাবতে বসলাম, আমাকে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান কতখানি মর্যাদা দেন, কতখানি আপন ভাবেন বলেই তাঁর পত্রিকার অভ্যন্তরীণ কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে আমাকে নির্ভরশীল মনে করলেন! বহুবার লিখেছি, বলেছি, ভোরের কাগজ-এ মতিউর রহমান আমাকে কীভাবে কলামিস্ট বানানোর অসাধ্য সাধন করলেন। একদিন ভোরের কাগজ-এ প্রতিবেদন জমা দিতে গেলে অনেক কালের পরিচিত (সেই অবজারভার-চিত্রালীর আমল থেকে) সাংবাদিক আবদুল হাই বললেন, ‘মতি আর ভোরের কাগজ-এ নেই।’ কেন নেই, তা নিয়ে কিছু খোঁজখবর করে বাসায় ফিরতেই মতির টেলিফোন, ‘মূসা ভাই, আপনি কি আজ দুপুরে আমার সঙ্গে শেরাটনে লাঞ্চ করবেন?’ কারণ জিজ্ঞাসা করলাম না, দুপুরে চুপচাপ লাঞ্চ খাওয়ার পর মতি জানালেন, ‘মূসা ভাই, আমি নতুন পত্রিকা প্রকাশ করছি, আপনার সহযোগিতা চাই।’ সেদিন থেকেই আমি আলোর পথের সহযাত্রী হয়ে অন্তরঙ্গ হয়ে গেলাম সম্পাদক ও পত্রিকা—উভয়ের সঙ্গে। প্রথম আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে পত্রিকাটি এখন মধ্যগগন থেকে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। এই উত্তরণ ও উত্থানে আমার কিছু অবদান আছে, ভাবতেই আবেগাপ্লুত হয়ে যাই। এই উত্থান বা ক্রমারোহণ করতে গিয়ে প্রথম আলো শুধু সংবাদ ও মন্তব্য প্রতিবেদনে বৈচিত্র্য আনেনি, সম্পাদক ও নিত্যনতুন ধারণার উদ্ভাবক মতিউর রহমান সংবাদপত্র তথা মিডিয়ার একটি দায়বদ্ধতাকে সামনে নিয়ে এসেছেন। এই দায়বদ্ধতা হচ্ছে সামাজিক দায়িত্ববোধ,
পত্রিকাটি রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতিতে যেমন পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে, একইভাবে সমাজ বদলানোর দায়ভার নিয়েছে, যা আলোচিত, সমালোচিত ও প্রশংসিত হচ্ছে। অন্যান্য পত্রিকা থেকে এখানেই প্রথম আলোর ভিন্নতা। বলতে বাধা নেই, প্রথম আলো সামাজিক দায়বদ্ধতা বিষয়টিকে বস্তুত নিজেদের প্রচার ও প্রচারণার স্বার্থেই ব্যবহার করছে—এমন ধারণাও কারও কারও আছে। তাঁরা সাংবাদিক ও গণমাধ্যম যে অতীতেও নিজেদের জগৎ বা গণ্ডির বাইরে সমাজ পরিবর্তনে, জনহিতকর ও জনস্বার্থে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে, তা জানেন না। তাঁদের জ্ঞাতার্থে ইতিহাসের পেছনের পাতা ওল্টাতে হচ্ছে। বিগত শতাব্দীর ছিচল্লিশের হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পর দৈনিক আজাদ ‘বিহার রিলিফ ফান্ড’ মাধ্যমে দাঙ্গাপীড়িতদের জন্য অর্থ-সাহায্য সংগ্রহ করেছিল। সেই অর্থে বিহারে স্বেচ্ছাসেবক দল পাঠিয়েছিল। সেদিন কেউ প্রশ্ন করেনি, এ তো পত্রিকার কাজ নয়। প্রচার বৃদ্ধির কৌশল নয়, পাকিস্তান আমলে চৌষট্টির দাঙ্গার পর দুটি আইয়ুব-সমর্থক পত্রিকা বাদে সব পত্রিকায় সম্মিলিত আবেদন ছাপা হলো, পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও—ইস্ট পাকিস্তান রেসিস্ট। এটা কোনো খাঁটি সংবাদ নয়, প্রতিবেদনও নয়, এ ছিল একটি সামাজিক আন্দোলনে গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা থেকে উত্তরণের ভূমিকা।
শুধু পত্রিকার পাতায় আবেদন নয়, রাজনীতি ও সাম্প্রতিকতাবিরোধীদের সঙ্গে মিছিলে সাংবাদিকদের মিছিল করলেন। এমনি আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়, সব মনে পড়ছে না। প্রথমটি যে ছিল দৈনিক আজাদ-এর মানবতার সেবা, যেমনটি আজ করেছে প্রথম আলো, অ্যাসিডদগ্ধদের একটি অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়ে সার্বিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। পত্রিকার পাতায় এখন অ্যাসিড নিক্ষেপের খবর অনেক কম দেখা যায়। এই মানবতাসংশ্লিষ্ট ভূমিকার কারণে পত্রিকাটি কি আর্থিক অথবা পরোক্ষভাবে লাভবান হয়েছে? এমনি আরেকটি ব্রত নিয়ে প্রথম আলো আমাদের বিপথগামী যুবাদের সামাজিক-পারিবারিক জীবনে ফিরিয়ে আনছে। তা হলো মাদককে ‘না’ বলুন। এই আবেদনটি পত্রিকার পাতায়, সভা-সেমিনার করে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য কি ছিল যুবকদের মাঝে প্রথম আলোর পাঠক সৃষ্টি? মনে হয় না, কিংবা তা-ই যদি হয়, মন্দ কী? তারা পয়সা দিয়ে ইয়াবা না কিনে প্রথম আলো কিনছে, এমনটি যদি হয় ক্ষতি কী? প্রথম আলো আমাদের গণমাধ্যম-জগতে যে এমনি অনেক সামাজিক সচেতনতার বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে যাচ্ছে, নিছক সংবাদ বিতরণ করে না। নোটবই পড়া ছাত্র এখন গণিত শেখার চর্চা করছে।
কিশোর-কিশোরী বিদেশে যাচ্ছে প্রথম আলোর প্রচারে নয়, বাংলার খুদে প্রতিভাধরদের বিশ্বদরবারে পরিচিত করতে যোগ দিচ্ছে গণিত অলিম্পিয়াডে। চলমান বিতর্ক প্রতিযোগিতা ছেলেমেয়েদের সাধারণ জ্ঞানের ভান্ডার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। প্রথম আলো এসবই করছে। সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা পরস্ফুিট করতে। মূল কথা হচ্ছে, প্রথম আলো শুধু একটি দৈনিক পত্রিকা নয়, ‘যা কিছু ভালো তার সঙ্গে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রথম আলো’ সক্রিয় অংশগ্রহণ করছে। তার পরও ভয় হয়, ‘পত্রিকাটির প্রভাতে সূর্য ওঠা সফল হয়েছে।’ এখন দ্বিপ্রহরের মধ্যগগনে। কিন্তু অতীতে অনেক পত্রিকাকে মধ্যগগনে থেকে গনগন করে তাপ ছড়াতে দেখেছি। তারপর চলেছে তাদের অস্তাচলের পথে যাত্রা। প্রথম আলোর ক্ষেত্রে তেমনটি যেন না হয়, মতিউর রহমানকে এখন সেই চিন্তা করতে হবে। কারণ, যতই প্রথম আলো ‘বদলে যাও, বদলে দাও’ বলুক, রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ ও জনমনে সবকিছু যে সেই প্রত্যাশা মিটিয়ে বদলাচ্ছে না। তার পরও পত্রিকা ও সম্পাদককে বলব, ‘ও আলোর পথযাত্রী! এ যে রাত্রি এখানে থেমো না!’
এবিএম মূসা: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

সাঁথিয়ায় সাম্প্রদায়িক হামলা

পাবনার সাঁথিয়ায় হিন্দু সমাজের মানুষের ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা যেমন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আত্মবিশ্বাসে ফাটল, তেমনি তা বাংলাদেশের জনগণের অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যেও আঘাত। যারাই এই বিবাদের সৃষ্টি করুক না কেন, তারা ধর্ম, দেশ ও জাতির শত্রু। গত বছর রামুর বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধপল্লিতে পরিকল্পিতভাবে হামলার ছক প্রায় হুবহু সাঁথিয়া বাজারেও দেখা গেল। যথারীতি ফেসবুকে মহানবী (সা.)-এর নামে আপত্তিকর মন্তব্য ও কার্টুন প্রকাশের গুজব রটিয়ে একদল মানুষকে উত্তেজিত করে আরেক দল মানুষকে ভীতসন্ত্রস্ত করা হলো। সকাল ১০টায় গুজব রটল, ১১টায় বিলি করা হলো কথিত ফেসবুক পেজের ছবির ফটোকপি। তারও এক ঘণ্টা পরে শুরু হলো হিন্দু বসতি ও মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর। সাঁথিয়া পাবনা জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং মহাসড়কের ওপর অবস্থিত। সেখানে সার্বক্ষণিক পুলিশ থাকার কথা। ঘটনার সূত্রপাত সকাল ১০টায় হলেও পুলিশের হস্তক্ষেপ ঘটতে কেন সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগল?
জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের ভূমিকা তাই প্রশ্নবিদ্ধ। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের পাবনা জেলা শাখার সভাপতি চন্দন কুমার চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘এটি একটি ষড়যন্ত্র বলে আমাদের ধারণা।’ তাঁর কথাকে আমলে নেওয়া দরকার। উচ্চ আদালত ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন। গ্রেপ্তার ও বিচারের স্বার্থে সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে। রামুর ঘটনায় প্রকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্তে গাফিলতি দেখা গেছে, পুলিশের দায়িত্বহীনতারও শাস্তি হয়নি, সাক্ষী না পাওয়ার অজুহাতে আসামিরাও ছাড়া পাচ্ছে। রামুর বেলায় যদি ন্যায়বিচার হতো, তাহলে সাঁথিয়ার ঘটনা হয়তো ঘটতে পারত না। আজকের ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে সবার হাতেই রয়েছে যোগাযোগের অবাধ সুযোগ। ফেসবুক, অনলাইন মাধ্যম, মোবাইল ফোন, ক্যামেরাসহ যেকোনো প্রযুক্তিকেই নিমেষে গণবিদ্বেষের হাতিয়ার বানানো সম্ভব এবং অনেক অর্বাচীন ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তি তা করেও থাকে। এ রকম নাজুক বাস্তবতায় সবাইকে সংযমী ও ধৈর্যশীল হতে হবে।

প্রথম আলোর দেড় দশক

দৈনিক প্রথম আলোর আজ জন্মদিন। আজ থেকে ১৫ বছর আগে এই সংবাদপত্রটি যাত্রা শুরু করেছিল সর্বাঙ্গীণ সুন্দর এক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্নের ভিত আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের মৌল আদর্শগুলো: গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচার এবং অসাম্প্রদায়িকতা। দেড় দশক ধরে অগণিত পাঠক, সাংবাদিক, লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, পরিবেশক, এজেন্ট, হকারসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা, আন্তরিক সমর্থন ও ভালোবাসা পেয়ে প্রথম আলো আজ বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক। শুধু মুদ্রিত সংস্করণই নয়, প্রথম আলোর ইন্টারনেট সংস্করণও এখন বিশ্বের সর্বাধিক পঠিত বাংলা ওয়েব পোর্টালের মর্যাদা অর্জন করেছে।
পঞ্চদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই আনন্দময় মুহূর্তে আমরা সবাইকে জানাচ্ছি আন্তরিক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।  বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই প্রথম আলোর পেশাগত ও নৈতিক অঙ্গীকার। সরকার, রাজনৈতিক দল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্র ও সমাজের সব ক্ষেত্র সম্পর্কে জনসাধারণকে নিয়মিতভাবে ওয়াকিবহাল রাখতে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সরবরাহ করা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম-দুর্নীতি, সন্ত্রাস, ধর্মের নামে জঙ্গিবাদী সহিংসতাসহ যা কিছু রাষ্ট্র, সমাজ ও মানুষের জন্য ক্ষতিকর, তথ্যনির্ভর সমালোচনার মাধ্যমে সেসবের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের দায়িত্ব পালনেও প্রথম আলো শুরু থেকেই সচেষ্ট। সাংবাদিকতার নৈতিক উৎকর্ষ ও পেশাদারি দক্ষতা অর্জনের প্রতিও আমরা সমানভাবে মনোযোগী। সাংবাদিকতার পাশাপাশি দুর্গত মানুষের ত্রাণ ও পুনর্বাসন, অ্যাসিডদগ্ধ নারীদের সহায়তা ও পুনর্বাসন, দরিদ্র কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহযোগিতা, মাদক ও এইডসবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টি ইত্যাদি সামাজিক কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করে প্রথম আলো। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দলীয় সংকীর্ণতা, বৈরিতা, অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহারসহ নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভর্তির ক্ষেত্রে মেয়েশিশুর হার বেড়েছে; শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে; বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু ও সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা।
তবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও শাসনব্যবস্থার অনেক নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের আরও অগ্রগতির পথে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে থেকেই যাচ্ছে। আজ যে মুহূর্তে প্রথম আলোর পঞ্চদশ জন্মবার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে, বাংলাদেশ তখন এক জটিল রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। নির্বাচনকালীন সরকারপদ্ধতি নিয়ে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যকার তীব্র মতবিরোধের অবসান এখনো ঘটেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার মধ্যে টেলিফোনে সংলাপ হওয়ার পরেও অচলাবস্থা নিরসনের আলামত স্পষ্ট হয়নি। বরং উভয় পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থেকে যাওয়ার ফলে শঙ্কা-উদ্বেগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এক সপ্তাহের মধ্যেই বিরোধী জোটের টানা ৬০ ঘণ্টার হরতাল শুরু হয়েছে আজ থেকে। সামনের দিনগুলোর কথা ভেবে জাতি যারপরনাই উদ্বিগ্ন। কিন্তু এই অচলাবস্থা ও সংকট সমাধান-অতীত নয়। আমরা আন্তরিকভাবে প্রত্যাশা করি, উভয় পক্ষের শুভচেতনার উদয় হবে। মুখোমুখি সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতির ঝুঁকি তাঁরা অবশ্যই উপলব্ধি করবেন; একটি সমঝোতার পথ খুঁজে পেতে তাঁরা আলোচনায় বসবেন। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ গণতন্ত্রের বিকাশ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের যে পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই পথ সে হারাবে না।