Friday, December 13, 2013

একতরফা নির্বাচন সমাধান নয়- তারানকোর সফর

বাংলাদেশের প্রত্যেক শান্তিকামী মানুষেরই প্রত্যাশা ছিল, জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর উদ্যোগটি সফল হবে। বিশেষ করে তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল বিএনপির নেতাদের যখন একসঙ্গে বসাতে পেরেছেন,
তখন নির্বাচন নিয়ে তাঁরা একটি মীমাংসায় আসতে পারবেন। কিন্তু তারানকো তাঁর বিদায়ী প্রেস ব্রিফিংয়ে দুই দলকে একসঙ্গে বসানো ছাড়া কোনো আশার খবর শোনাতে পারেননি। এটি দেশ ও জনগণের জন্য চরম হতাশাজনক।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশের সমস্যা বাংলাদেশের রাজনীতিকদেরই সমাধান করতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রধান দুই প্রতিযোগী যদি কোনো বিষয়েই একমত না হতে পারেন এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করেন, তাহলে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান আশা করা কঠিন।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে যে অচলাবস্থা চলে আসছিল, তার সহিংস রূপ দেশবাসী প্রত্যক্ষ করছে। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য অচল এবং জনজীবন স্থবির হয়ে পড়লেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের চৈতন্যোদয় হয়েছে বলে মনে হয় না। সরকার যেমন সংবিধান রক্ষার নামে ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী একটি যেনতেন নির্বাচন করার ব্যাপারে কৃতসংকল্প, তেমনি বিরোধী দলও সেই নির্বাচন ঠেকাতে সর্বশক্তি নিয়োগ করছে। আর দুই পক্ষের এই কাজিয়ার শরিক না হয়েও সাধারণ মানুষকে তার শিকার হতে হচ্ছে। আরও দুর্ভাগ্যজনক যে, রাজনৈতিক বিবাদের সুযোগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিশেষভাবে আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিরুদ্ধে জামায়াত-শিবির সারা দেশে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও নৈরাজ্য চালানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। তাদের সাঁড়াশি ও সর্বাত্মক আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। প্রশ্ন হলো, যে সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সরকার কীভাবে জনগণের নিরাপত্তা দেবে?

দুর্ভাগ্যজনক যে দুই প্রধান দলই তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করতে এমন শক্তির সঙ্গে আঁতাত করছে, যাদের এ দেশের মানুষ একাত্তরে পরাজিত করেছিল মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এবং নব্বইয়ে উৎখাত করেছিল স্বৈরাচারের পতনের মাধ্যমে।

জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের মানুষ অংশগ্রহণমূলক, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষপাতী। কিন্তু ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন হলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির তাতে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্দলীয় সরকারের দাবি মানা হলেই কেবল আন্দোলনের চলমান কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হবে। অন্যদিকে, সরকার বিরোধী দলের কর্মসূচি প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিলেও কীভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নিতে পারবে, সে ব্যাপারে কিছুই বলছে না।

এই অবস্থায় সংঘাত অনিবার্য এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। দেশ ও জনগণের হেফাজতকারী হিসেবে সরকার এই সংঘাতের দায় এড়াতে পারে না। তাই একতরফা নির্বাচনের চিন্তা বাদ দিয়ে সরকারের উচিত সবার অংশগ্রহণে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।

খোলা চোখে- ম্যান্ডেলার কাছ থেকে তিন শিক্ষা by হাসান ফেরদৌস

নেলসন ম্যান্ডেলা, সবার প্রিয় মাদিবা, চলে গেলেন। আমাদের জন্য রেখে গেলেন তাঁর সারা জীবনের কীর্তি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাঁর নিজের দেশে তো বটেই, আমাদের দেশেও।

বৈরী সময়ের আমি by রফিকুন নবী

৭০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বেঙ্গল গ্যালারিতে শুরু হয়েছে রফিকুন নবীর নির্বাচিত কাজের প্রদর্শনী। এ প্রদর্শনীকে ঘিরে তাঁর শিল্পবৃত্তান্ত...

নির্বাচনী সংকট- স্থায়ী সাংবিধানিক সমাধানে কিছু প্রস্তাব by মঈন ফিরোজী

নির্বাচনপদ্ধতি স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ নেবে, যদি সাংবিধানিকভাবে একটি গ্রহণযোগ্য কার্যকর নির্বাচন কমিশন এবং এর আইনি প্রায়োগিক ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস এবং নির্বাচনকালে রাষ্ট্রক্ষমতার অপপ্রয়োগের সুযোগ রোধ এবং উক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হয়।

একুশ শতকে এক অবাস্তবতা by সাযযাদ কাদির

সমঝোতা ভাল, সমঝোতার জন্য সংলাপ-ও ভাল, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয় না তাতে। অন্তত আমাদের দেশে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য পাওয়ার তেমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। তাহলে কি আছে আমাদের সামনে?

গল্প- শূন্য লকার by রেজাউর রহমান

তসলীমা বেগম ও তাঁর একমাত্র মেয়ে অন্তরার এটা একটা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। রাতের খাবারের পর তাঁরা দুজনে কাপভর্তি আইসক্রিম খান। রসিয়ে রসিয়ে। আইসক্রিমের কাপটা বিশেষ যত্ন সহকারে সাজায় অন্তরা। মা প্রতি রাতে আয়েশি হয়ে প্রায় একই বয়ান ছাড়েন।

মুত্তিযুদ্ধের গল্প- টিফিন ক্যারিয়ার by আখতার হুসেন

‘এই মঞ্জু, মঞ্জু। দাঁড়া।’
পেছন থেকে ডাকটা কানে আসতেই মঞ্জু থমকে দাঁড়ায়। ভালো করে তাকাতেই দেখে, আর কেউ নয়, ডাকছে সোনাল। ওর ক্লাসমেট। দুজন একসঙ্গে পড়ে—ক্লাস সেভেনে।
কাছাকাছি যেতেই সোনাল মঞ্জুর একটা হাত চেপে ধরে বলে, ‘কোথায় যাচ্ছিস?’

অরণ্যে রোদন- কোনো শর্টকাট নেই by আনিসুল হক

আজ ১৩ ডিসেম্বর। আজকের দিনটা পার হলেই আসবে সেই রাত, যখন আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় সহযোগীরা—আলবদর, আলশামস, রাজাকাররা।

অবরোধের শেষ দিনে নিহত ৭- অগ্নিগর্ভ লক্ষ্মীপুর

ব্যাপক সংঘর্ষ ও রক্তপাতের মধ্য দিয়ে শেষ হলো বিরোধী জোটের ডাকা দেশব্যাপী টানা ১৪৪ ঘণ্টার অবরোধ। শেষ দিনেও অবরোধকারীদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে সারা দেশে নিহত হয়েছে অন্তত ৭ জন।
লক্ষ্মীপুর শহরের তেমুহনীতে সকালে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাবউদ্দিন সাবুর বাসভবনে র‌্যাব অভিযান চালালে ওই এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এ সময় র‌্যাবের গুলিতে নিহত হয় ১৮দলের ৪ নেতাকর্মী। নিহতরা হলেন- বিএনপি নেতা মাহবুব হোসেন, যুবদল নেতা ইকবাল মাহমুদ জুয়েল, সুমন ও শিবির কর্মী শিহাব হোসেন। গুলিবিদ্ধ ও আহত হন অন্তত ৫০ জন। এ ঘটনায় শহরের ইসলাম মার্কেট এলাকায় র‌্যাব সন্দেহে জনতার গণপিটুনিতে নিহত হন আরও একজন। পরে বিক্ষুব্ধ জনতা ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও জেলার পুলিশ লাইন ঘেরাও করে রাখে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিকাল তিনটার দিকে পুলিশ লাইনে একটি হেলিকপ্টার অবতরণ করে এবং এক ঘণ্টা অবস্থানের পর চলে যায়। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ওই হেলিকপ্টার থেকে চারটি প্যাকেট নামানো হয়েছে। এ ঘটনায় লক্ষ্মীপুরে আগামীকাল সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে ১৮ দলের। নিন্দা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। প্রেস নোট দিয়ে অবস্থান ব্যাখ্যা করেছে সরকার। ওদিকে ফেনীর মহিপালে পিকেটারের ইটের আঘাতে ট্রাকচালক মাহবুবুল আলম চট্টগ্রামে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে নিহত হন শিবির কর্মী আনোয়ার হোসেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, রেল লাইন উৎপাটনের ঘটনা ঘটেছে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাস্থ বাসভবনে ককটেল হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। যশোরে সিঙ্গিয়া স্টেশনের কাছে রেললাইন উপড়ে ফেলে ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় অবরোধকারীরা। ফলে সারা দেশের সঙ্গে খুলনা-যশোর ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়া রাস্তার পাশের শতাধিক গাছ কেটে ফেলে যশোর মহাড়ক অবরোধ করে ১৮ দলের নেতাকর্মীরা। রাজশাহীতে ডাচবাংলা ও মার্কেন্টাইল কো-অপরারেটিভ ব্যাংক এবং চেম্বার ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে অবরোধকারীরা। সিলেটের অবরোধকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাবউদ্দিন সাবুর শহরের উত্তর তেমুহনীর বাসভবনে সকালে অভিযান চালায় র‌্যাব। এ সময় সাবুর বাসভবনের সামনে তাদের ব্যবহৃত তিনটি গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে এক পর্যায়ে র‌্যাব ও ১৮ দলের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এসময় ৩০ জন গুলিবিদ্ধসহ প্রায় ৫০ জন আহত হন। ইসলাম মার্কেট এলাকায় র‌্যাব সন্দেহ গণপিটুনিতে একজন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় শনিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে ১৮ দলীয় জোট। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দীন সাবুর ভাই আবুল কালাম আজাদ জানান, সকাল ৬টায় র‌্যাবের সঙ্গে সাদা মাইক্রোবাসে করে আসা সন্ত্রাসীরা বাসভবনে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। এতে সাহাব উদ্দিন সাবু, আজিজুল করিম বাচ্ছু ও তাদের দুই কেয়ারটেকার গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চারজনকে মারধর করতে করতে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার সময় তারা সাবুর তিনটি গাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। এদিকে খবর পেয়ে জেলা যুবদল সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল মাহমুদ জুয়েলের নেতৃত্বে ১৫-১৬ জন যুবদলকর্মী সাবুর বাসার দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। মিছিলটি শহরের চকবাজার এলাকায় পৌঁছলে র‌্যাব গুলি চালায়। এতে যুবদল নেতা জুয়েল ও নেছার গুলিবিদ্ধ হয়। ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, যুবদল নেতা জুয়েলের গুলিবিদ্ধ দেহ র‌্যাবের গাড়িতে তুলে নেয়া হয়। এরপর র‌্যাব সদস্যরা লক্ষ্মীপুর থেকে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলে অবরোধ সৃষ্টি করে ১৮দল নেতাকর্মীরা। ফলে শহরের বাসস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে পুলিশ লাইন পর্যন্ত দিনভর থেমে থেমে ১৮ দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশ ও র‌্যাবের দিনভর দফায় দফায় ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। সংঘর্ষের জের ধরে শহরের আলীয়া মাদ্রাসা, ঝুমুর সিনেমা, এলজিইডি অফিস, ইসলাম মার্কেট ও পুলিশ লাইন এলাকাসহ লক্ষ্মীপুর-ঢাকা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছ ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে ১৮ দলের নেতাকর্মীরা। এসময় জোটের নেতাকর্মীদের সঙ্গে স্থানীয় এলাকাবাসী একত্রিত হয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এদিকে লক্ষ্মীপুর বন বিভাগের কার্যালয়ের সামনে  র‌্যাবের সহযোগী সন্দেহে অজ্ঞাতনামা এক যুবককে গণপিটুনি দেয়। পরে সে মারা যায়। বিক্ষুব্ধ জনতা বন বিভাগ ভাঙচুর করে। সংঘর্ষে আহত এনএসআই সদস্য আনোয়ার হোসেন, মানিক হোসেন, শিমুল, রাকিব হোসেন, কামাল হোসেন, ওসমান গনি, টিপু সুলতান ও তারেক হোসেন, বেলাল হোসেন, মাহবুব হোসেন, শিহাব হোসেনসহ ২৬ জনকে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ও বাকিদেরকে বিভিন্ন ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল খায়ের ভূইঁয়া এমপি জানান, র‌্যাব একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী। সন্ত্রাস দমন করার জন্য বিগত বিএনপি সরকার এ র‌্যাব সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু বর্তমান সরকার দমনের জন্য র‌্যাবকে দলীয় হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহাব উদ্দিন সাবুর বাসভবনে ঢুকে তারা পাখির মতো নির্বিচারে গুলি করে। জেলা যুবদল ও বিএনপির ৩ জন নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে। তিনি র‌্যাবকে দায়ী করে এ হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
এদিকে বিএনপি দাবি করেছে, লক্ষ্মীপুরের ঘটনায় র‌্যাবের গুলিতে ৯জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় তিন শতাধিক নেতাকর্মী।  এখনও অনেক নেতার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া কুমিল্লার লাকসাম কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিলকে পুলিশ ও র‌্যাব গ্রেপ্তার করার জন্য তার বাড়িতে হামলা করে। তাকে না পেয়ে তার বাড়িতে লুটপাট করে এবং যাওয়ার সময় পরিবারের লোকজনকে ঘরের ভিতরে আটক রেখে বাইরে তালা মেরে ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় এলাকার লোকজন ছুটে এসে তাদের প্রাণ রক্ষা করে। এ ঘটনায় সাবেক এমপি কর্নেল আনোয়ারুল আজিম এ বিষয়ে থানায় যোগাযোগ করলে অভিযানের কথা তারা স্বীকার করেন। কিন্তু র‌্যাব অস্বীকার করে বলেন, এ বিষয়ে কিছুই জানেন না তারা। অথচ স্থানীয় লোকজন র‌্যাব-১১ লেখা একটি মাইাক্রোবাস দেখতে পেয়েছেন। বিএনপির দাবিতে অবরোধের শেষ দিন সারাদেশে ৭৭৫ জন আহত, গুলিবিদ্ধ ২৩০ জন, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৮০ জন। মামলা দায়ের করা হয়েছে ৩০০০ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেসনোট
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের তৃতীয় দফায় সড়ক, নৌ ও রেলপথ অবরোধের ষষ্ঠ দিনে গতকাল লক্ষ্মীপুরে চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এক প্রেসনোটে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, লক্ষ্মীপুর জেলায় অবরোধ-সমর্থনকারী বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা র‌্যাবকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও দেশীয় অস্ত্রসহ আক্রমণ চালালে র‌্যাব সরকারি সম্পদ ও জনগণের জানমাল রক্ষার্থে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করলে সংঘর্ষ বাধে। সংঘর্ষে চারজন মৃত্যুবরণ করেন। প্রেসনোটে আরও বলা হয়, অবরোধ চলাকালে ফেনী জেলার লেমুয়া ব্রিজের কাছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দিলে অগ্নিদগ্ধ চালক মাহবুবুল আলম চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা বাজারে বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা অবরোধবিরোধী জনতার ওপর অতর্কিতে লাঠি ও রড দিয়ে হামলা চালালে দু’জন গুরুতর জখম হন। সিলেট মহানগরের কোতোয়ালি মডেল থানার ওসমানী মেডিকেল কলেজের সামনে অবরোধ সমর্থনকারী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের ইট-পাটকেলের আঘাতে এএসআই কামাল গুরুতর আহত হন। এ কয়েকটি ঘটনা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক ও তৎপর থাকায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আর কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। অবরোধের নামে নাশকতার হাত থেকে সরকারি সম্পদ ও জনসাধারণের জানমাল রক্ষার জন্য সরকার রাজধানীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে বলেও প্রেসনোটে বলা হয়। এছাড়াও কয়েকটি জায়গায় অবরোধকারী বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা মিছিল, ভাঙচুর, অবরোধ, অগ্নিসংযোগসহ নাশকতামূলক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ ও ধাওয়ার মুখে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। অবরোধের সময় দূরপাল্লার বাস চলাচলে অসুবিধা হলেও রাজধানীসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরে বিমান, ট্রেন, লঞ্চ এবং ব্যাংক-বীমা, অফিস-আদালতসহ জীবনযাত্রা অনেকটা স্বাভাবিক ছিল বলে প্রেসনোটে দাবি করা হয়। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল, সরকারি সম্পদ ও জনসাধারণের জানমালের ক্ষতি, অর্থনীতি ধ্বংস ও দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করতে যারা বিক্ষিপ্তভাবে সহিংস ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করেছে, তদন্ত করে দ্রুত সেসব দুষ্কৃতকারীকে আইনের আওতায় আনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে প্রেসনোটে জানানো হয়।
মনোহরগঞ্জে পুলিশের গুলিতে শিবির কর্মী নিহত
স্টাফ রিপোর্টার, কুমিল্লা থেকে: কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের নাথেরপেটুয়ায় পুলিশের গুলিতে এক শিবির কর্মী নিহত হয়েছে। গতকাল পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির সঙ্গে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সংঘর্ষের সময় উপজেলার বিপুলাসার বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিবির কর্মীর নাম আনোয়ার হোসেন। তার বাড়ি উপজেলার দোপাইমুড়ি গ্রামে। পরে বাজারের অন্তত ২০টি দোকান ভাঙচুর করা হয়। সংঘর্ষে আট পুলিশ গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রায় ৩ শতাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যায় কাদের মোল্লার রিভিউ খারিজ করে ফাঁসির রায় পুনর্বহালের প্রতিবাদে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা উপজেলার বিপুলাসার এলাকায় রেললাইনে অবস্থান নেয়। এছাড়া বাজারে দোকান ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় পুলিশ সেখানে গেলে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। পুলিশ জামায়াত-শিবিরকে লক্ষ্য করে গুলি চালালে ওই শিবির কর্মী নিহত হয়। এছাড়া আট পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। মনোহরগঞ্জ থানার ওসি হারুন-অর-রশিদ চৌধুরী জানান, সংঘর্ষে জামায়াত-শিবিরের হামলায় ৮ জন পুলিশ আহত হয়েছে। মনোহরগঞ্জ উপজেলা পূর্ব শিবিরের সভাপতি আরিফ হোসেন শিবির কর্মী নিহতের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ফেনীতে হামলায় আহত কাভার্ডভ্যান চালক নিহত
ফেনী প্রতিনিধি: ফেনীতে অবরোধকারীদের হামলায় আহতকাভার্ডভ্যান চালক মাহবুবুল আলম (৪২) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকালে মারা গেছেন। বুধবার ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদরের লেমুয়া এলাকায় অবরোধকারীরা কাভার্ডভ্যানে ইট পাথর ও লাঠি দিয়ে হামলা চালায় এবং এক পর্যায়ে কাভার্ড ভ্যানটিতে আগুন দেয়। এতে কাভার্ডভ্যান চালক মাহবুবুল আলম গুরুতর আহত হন। গতকাল দুপুরে ফেনীতে  শিবির কর্মীরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের গাড়ি লক্ষ্য করে ২টি ককটেল নিক্ষেপ করলে নুরুল করিম (৪৫) ও আবু সুফিয়ান (৩৮) নামে দুই পুলিশ কনস্টেবল আহত হয়েছে। আহতদের ফেনী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই শিবির কর্মীরা সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী শহরের মহিপাল অংশে ২টি কাভার্ডভ্যান ও ৩টি সিএনজি চালিত অটো রিকশায় আগুন দিয়েছে ।

বগুড়ায় ৪৮টি গাড়িতে আগুন দিয়েছে জামায়াত

বগুড়ায় জামায়াত-শিবিরের মিছিল থেকে বিভিন্ন জায়গায় তাণ্ডব চালিয়ে ৪৮টি গাড়িতে আগুন এবং পণ্যবোঝাই ৫০-৬০টি ট্রাক ভাঙচুর করা হয়েছে। আজ শুক্রবার বেলা একটার পর এসব তাণ্ডব চালানো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, বেলা সোয়া একটার দিকে রংপুর-ঢাকা মহাসড়কের বগুড়ার তেলিপুকুর এলাকায় জামায়াত-শিবিরের মিছিল থেকে আকিজ করপোরেশন লিমিটেডের গ্যারেজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে গ্যারেজের ৩৪টি গাড়ি পুড়ে যায়।
এর কিছুক্ষণ আগে বগুড়ার চারমাথা এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে গ্যারেজে রাখা সরকারি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের অন্তত ১২টি গাড়ি পুড়ে গেছে।
বেলা একটার দিকে বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কের শাহজাহানপুর ফটকি ব্রিজ এলাকায় দুর্বৃত্তরা ঢাকা থেকে বগুড়াগামী পণ্যবোঝাই ৫০-৬০টি ট্রাক ভাঙচুর করে এবং দুটি ট্রাকে আগুন ধরিয়ে দেয়।

বগুড়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সবাই যখন মসজিদে মসজিদে জুমার নামাজ পড়ছিলেন, তখন জামায়াত-শিবিরের দুর্বৃত্তরা গ্যারেজে গ্যারেজে হামলা চালিয়ে গাড়ি পুড়িয়ে দিতে ব্যস্ত ছিল।  এদের বিরুদ্ধে সর্বত্র গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা না হলে পুলিশের একার পক্ষে এমন নাশকতা ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’

বগুড়া শহর ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক মিজানুর রহমান জানান, কাদের মোল্লার মতো একজন নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুদণ্ড সাধারণ মানুষ মেনে নিতে পারেনি। তাই তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। এর সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা ধৈর্য ধরতে বললেন পরিবারকে

ধৈর্য ধারণ এবং সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে স্ত্রী-পুত্রসহ পরিবারের সদস্যদের আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা। একই সঙ্গে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কাদের মোল্লার সঙ্গে দেখা করেছেন তার স্বজনরা।

ফের আসছে টানা অবরোধ

নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে ফের অবরোধ কর্মসূচি আসছে ১৮ দলের তরফে। আগামী ১৭ই ডিসেম্বর থেকে শুরু হতে পারে চতুর্থ দফার টানা অবরোধ। ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস পর্যন্ত চলমান আন্দোলনে বিরতি দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্তও নিয়েছে বিরোধী জোট।

রাজধানীজুড়ে আগুন, ভাঙচুর, ককটেল

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। আগুন, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণে অনেক এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
পল্টন থেকে ফকিরাপুল, রামপুরা থেকে টেলিভিশন সেন্টার পর্যন্ত রাস্তায় তান্ডব চালিয়েছে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা। কমলাপুর ও যাত্রাবাড়ীতেও সংঘর্ষ এবং ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। জুমার নামাজের পরপরই এসব এলাকায় বিক্ষোভ, ও অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফকিরাপুল এলাকায় কয়েকশ’ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী মিছিল শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরই তারা বেশ কয়েকটি প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল, রিক্সাভ্যানসহ যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেন। আগুন দেয়া হয় রাস্তার পাশে রাখা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দোকান ও আসবাবপত্রে। আগুন ভাঙচুরে পুরো এলাকায যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করলে মিছিরকারীরা সরে পড়ে। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো এলাকা আগুন ও ধোয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। এদিকে রামপুরা থেকে টেলিভিশন সেন্টার পর্যন্ত এলাকায় একইভাবে আগুন ও ককটেল বিস্ফারণ ঘটিয়ে বিক্ষোভ করেন জামায়াত শিবিরের কর্মীরা। এসময় সাধারণ পথচারিরা ভয়ে রাস্তা ছেড়ে বিভিন্ন অলিগলিতে আশ্রয় নেন। মিছিলকারীরা মোটর সাইকেলে এলাকায় মহড়া দেয় এবং একের পর এক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

ফাঁসির পর জেলায় জেলায় ব্যাপক সহিংসতা, নিহত ২

জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পর ১০ জেলায় ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে। সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দুই কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মহাসড়কে গাছ ফেলে ও গর্ত খুড়ে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।
ব্রীজের পাটাতন উপড়ে ফেলা হয়েছে। এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাচন অফিস ও সরকারি দলের কর্মীদের বাড়ি ঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ভাঙচুর ও আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। ফাঁসি কার্যকরের খবর শোনার পর থেকেই শুরু হয়েছে এসব সহিংসতা। সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, চাপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লক্ষীপুর, বগুড়া, মৌলভীবাজার এলাকায় রাত থেকে আজ সকাল অবধি এসব সহিংসতা হয়েছে। এদিকে কাদের মোল্লার স্মরণে সারা দেশে গায়েবানা জানাজা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াত। আজ সকালে নাটোরসহ বিভিন্ন স্থানে জানাজাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। দুপুরেও বিভিন্ন স্থানে গায়েবানা জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি জানান, জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার পর সাতক্ষীরায় ব্যাপক সহিংসতা হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গেও সংঘর্ষ হয়েছে জামায়াত শিবিরের। গতরাত সাড়ে ১২ টার দিকে সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আজিজুর রহমান আজুকে (৫১) কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত পরিবারের দাবি আজ রাতে পনের বিশ জনের জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র কর্মীরা তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে। প্রথমে তারা বাড়ীতে ঢুকে ব্যাপক ভাংচুর করে। পরে আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুর রহমানকে কুপিয়ে হত্যা করে ফেলে রেখে চলে যায়। এ ঘটনার দুই ঘন্টা পর রাত আড়াই টার দিকে দুবৃত্তরা একই উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান জজ মিয়া (৩৫) এর বাড়ীতে হামলা চালিয়ে তাকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করে। তারা প্রথমে বাড়ীতে ঢুকে তাদের বসত ঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে যুবলীগ নেতা জজ মিয়াকে বাহিরে রাস্তায় বের করে কুপিয়ে হত্যা করে। ঘটনার ঘন্টা খানেক পর বাড়ীর পার্শ্ববর্তী ক্ষেত্রপাড়া এলাকার রাস্তার উপর থেকে নিহতের স্বজনরা তার লাশ উদ্ধার করে। নিহতের সহদর আব্দুর রহমান জানান, শিবির ক্যাডাররা তার ভাই কে কুপিয়ে এবং শ্বাস নালি কেঁটে দিয়ে হত্যা করেছে। এদিকে রায় কার্যকর হাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাতক্ষীরার আগরদাঁড়ী, ঝাউডাঙ্গা, শ্যামনগরের সদর, কাশিমাড়ী, আটুলিয়া এবং কালিগঞ্জের মৌতলায় রাতেই কয়েটি ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটায় দূর্বৃত্তরা। কালিগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি আব্দুল মাজেদ এর বাড়ীতে রাত ১১ টার দিকে হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও অগ্নি-সংযোগ করে। এসময় তার মটর সাইকেলটি পুড়িয়ে দেয়। আশাশুনির বুধহাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আক্তারুজ্জামান এবং আ’লীগ সমর্থীত চন্দন দেবনাথ, তরুন কুমার ও সোনা মন্ডলের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে। এ ছাড়াও জেলার অধিকাংশ স্থানে গাছ, টল দোকান রাস্তায় ফেলে এবং সড়ক কেটে অবরোধ করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ফাসির রায় কার্যকরের আগে থেকেই সিরাজগঞ্জে সহিংসতা শুরু হয়। রাত ৯টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা ব্যাপক বিক্ষোভ ও ভাংচুর করে। জামায়াত কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানের প্রভাবাধীন এলাকা উল্লাপাড়ায় আওয়ামী লীগ অফিস ও যানবাহন এবং সিরাজগঞ্জ সদরের চন্ডিদাসাগাতিতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ৭টি বসতবাড়ি ও বেলকুচিতে সিনেমা হলসহ বেশ কয়েকটি বসতবাড়ি এ সময় পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড়, পাবনা-নগরবাড়ি ও সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়ক এবং সিরাজগঞ্জ-রায়গঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ-নলকা আঞ্চলিক সড়কে গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করা হয়েছে।  সিরাজগঞ্জ-নলকা আঞ্চলিক সড়কের চন্ডিদাসগাতি ও নলকা এলাকায় ২টি ব্রীজের পাটাতন তুলে ফেলা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে উল্লাপাড়ায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। উল্লাপাড়া থানার উপ-পরিদর্শক আব্দুল জলিল জানান, রাত ৯টার পর থেকে হাজারো নেতাকর্মী লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হয়ে পাবনা-নগরবাড়ি মহাসড়কের শাহজাদপুরের বালসাবাড়ি থেকে উল্লাপাড়ার শ্রীখোলা মোড় পর্যন্ত কয়েকটি স্থানে গাছ কেটে মহাসড়ক অবরোধ করে। উপজেলা সদরে গভীর রাত পর্যন্ত ঘটানো হয় মূহুমূহু ককটেল বোমার বিস্ফোরণ। রাত ১১টার দিকে উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেয় তারা। সাড়ে ১১টার দিকে উপজেলা সদরের পাট বন্ধরের একটি পাটের গুদাম ও শ্রীখোলা মোড়ে একটি তেলের মিলে আগুণ ধরিয়ে দেয়া হয়। তারা থানা ঘেরাও করার চেষ্টা করলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এতে আকবর আলী কলেজ মোড় এলাকায় জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিপুল সংখ্যক টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রন করা হয়। শিয়ালকোল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ও চন্ডিদাসগাতি গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল ওয়াহাব জানান, গভীর রাতে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়ে তার বসতবাড়িতে ব্যাপক ভাংচুর ও ধান, চাল, পাট, স্বর্নাংলকার ও আসবাবপত্র লুটপাট করা করেছে এবং ৬ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুর আলমসহ তার ৬ ভাইয়ের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক বিল্লাল হোসেন উল্লাপাড়ায় বিজিবি মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নাটোর প্রতিনিধি জানান, রাতে নাটোরের সড়ক মহাসড়কে গাছ কেটে ও গুড়ি ফেলে অবরোধ মিছিল সমাবেশের ফলে নাটোরে অঘোষিত অবরোধ চলছে। দুপুর ১২টা পর্যন্ত মহাসড়কে অটোরিক্সা ও দুএকটি মালবাহী ট্রাক ছাড়া কোন যাত্রীবাহী পরিবহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। এদিকে ফাঁসির প্রতিবাদে শহরের বাইপাস সহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল সমাবেশ করেছে দলটির নেতাকর্মীরা। বড়াইগ্রামের আহম্মেদপুরে মিছিল শেষে সমাবেশ চলাকালে পুলিশের লাঠিচার্জে আতিকুল্লাহ নামের এক কর্মীসহ জামায়াত শিবিরের ৩ নেতাকর্মী আহত হয়েছে। আহতদের বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে শুক্রবার সকালে শহরের বাইপাস এলাকা থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মী নিয়ে একটি মিছিল বের করে জামায়াত শিবির। পরে তারা শহরের মাদরাসা মোড় ঘুরে একই স্থানে এসে গায়েবানা জানাযায় অংশ নেয়। জানাযার পরে মোনাজাতে নেতাকর্মীদের কান্নায় এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর মহাসড়কের বড় খোচাবাড়ী থেকে ২৯ মাইল নামক স্থান পর্যন্ত ৫ কিলোমিটার সড়ক জুড়ে গাছ কেটে অবরোধ করে রেখেছে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরা। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর গভীর রাত থেকে শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত গাছ কেটে সড়ক অবরোধ করে রাখে। এতে এ সড়কে সকল প্রকার যানচলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এতে পন্যবাহী কয়েকশ ট্রাক আটকা পড়ে।
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী থেকে জানান, রাজশাহীতে সাবেক শিল্প প্রতিমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক চৌধুরী এমপির বাড়িতে দ্বিতীয় বারের মতো হামলা করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে সাবেক প্রতিমন্ত্রী এবং স্থানীয় ওয়ার্ড আ’লীগ নেতার বাড়ি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এছাড়া রাত ১১টার পর থেকে নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে থেমে থেমে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এদিকে নাশকতা ঠেকাতে সন্ধ্যার পরপরই নগরীর রাস্তায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যদের নামানো হয়।
চাপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে জেলা শহরের বড়ইন্দারা মোড়ে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, যুমুনা ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কার্যালয় ভাংচুর করা হয়। রহনপুরে একটি বিআরটিসি বাসে অগ্নিসংযোগও করা হয়। একই সময় আরামবাগ এলাকায় একটি মিছিল বের করে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এসময় তারা বড়ইন্দারা মোড়, নিমতলা মোড়, বাতেন খাঁর মোড়, আরামবাগ ও শিবতলা এলাকায় মুহুর্ম ককটেল বিষ্ফোরণ ঘটায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীও পাল্টা গুলি ছোঁড়ে। এছাড়া পৌর এলাকার টিকরামপুর মোড়ে ৭/৮টি দোকানে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে পুড়িয়ে দিয়েছে দূর্বত্তরা। এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কের বেশ কয়েকটি জায়াগায় রাস্তা কেটে, পোল ও গাছের গুড়ি ফেলে ব্যারিকেড দেয় জামায়াত-শিবির কর্মীরা। বর্তমানের হরতাল বা অবরোধ না থাকলেও ব্যারিকেডের কারনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ সময় তারা কানসাট বাজার এলাকায় ২টি দোকানে আগুন ও ২/৩টি ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও ভাংচুর করা হয়। এছাড়া শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান তহুর আলীর বাড়ীসহ ১০/১২টি বাড়ীতে অগ্নিসংযোগ ও এলাকর প্রায় ২০/২৫টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।
স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া থেকে জানান, বগুড়ার সঙ্গে সারাদেশের ট্রেন ও সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। এদিকে মহাসড়ক অবরোধের ফলে উত্তরাঞ্চলে এখনো জাতীয় দৈনিক পত্রিকা গুলো পৌছেনি। বগুড়ার মহাস্তান এলাকার মাঝিপাড়ায় মহাসড়ক খুড়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এছাড়াও মাঝিপাড়া থেকে বগুড়া জেলার উত্তরের শেষ সীমানা চন্ডিহারা পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশের গাছ কেটে এবং গাছের গুড়ি ফেলে রাস্তা অবরোধ করেছে। বগুড়া শহরতলীর ফটকি ব্রিজ থেকে মহাসড়কে শেরপুরের মহিপুর পর্যন্ত মাঝে মাঝে গাছের গুড়ি ও গাছ কেটে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। বগুড়া থেকে সারিয়াকান্দি উপজেলায় ও বগুড়া থেকে নওগাঁ সড়কেও একই উপায়ে গাছের গুড়ি দিয়ে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে কাহালু উপজেলার পাঁচপীর এলাকায় রেললাইনের নীচের মাটি তুলে ফেলেছে অবরোধকারীরা। বগুড়ার সহকারী পুলিশ সুপার গাজিউর রহমান (সদর ও মিডিয়া) জানান, মহাসড়কের উপর এখনো গাছের গুড়ি ও কাটা গাছ রয়েছে। দুর্বৃত্তরা অসংখ্য গাছ কেটে রাস্তা অবরোধ করেছে। পুলিশ একই সাথে আইন-শৃঙ্খলা ও গাছের গুড়ি অপসারণের কাজ করছে। আজ সকালে বগুড়া শহরের তেলিপুকুর এলাকায় আকিজ গ্রুপের গুদাম এবং শহরের চারমাথা এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের তত্তাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ে আজ শুক্রবার দুপুর ১২টায় আগুন দিয়েছে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা।
লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুরে বিভিন্ন স্থানে জামায়াত শিবিরের হামলা ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। তারা বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে ও রাস্তায় গাছ ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করেছে। এতে জেলা শহরের সঙ্গে সারাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার পর থেকে লক্ষ্মীপুর শহরের উত্তর তেমুহনী, দক্ষিণ তেমুহনী, জকসিন, মান্দারী, চন্দ্রগঞ্জ বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে এ অবস্থার সৃষ্টি করে তারা। লক্ষ্মীপুর-ঢাকা মহাসড়কের রবিদাসের পোল, ইটের পোল, ঢাকা-রামগঞ্জ সড়কের আলীপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সড়ক কেটে ফেলায় জেলা শহরের সাথে  সারাদেশের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়া রায়পুর উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে দূর্বৃত্তরা। অপরদিকে কমলগর উপজেলা পরিষদে হামলা ভাংচুর করার খবর পাওয়া গেছে।
মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারে দুবৃত্তরা পেট্রোল বোমা ছুড়ে রাজনগর উপজেলা যুবলীগ সভাপতি ও মনসুরনগর ইউপি চেয়ারম্যান মিলন বখত এর বাসার সামনে গেরেজে রাখা তার গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। এই সময় মিলন বাসায় ছিলেন। ঘটনা ঘটেছে গত রাত সাড়ে ১২ টার সময়। বাসাটি শহরের পোষ্ট অফিস সড়কস্থ পুলিশ ফাঁড়ির ঠিক সামনে অবস্থিত। দারোয়ান জানিয়েছে রাত সাড়ে ১২ টার সময় দু’জন মোটরসাইকেল আরোহী গেইটের সামনে এসে থামে। একজন হেলমেট পড়া যুবক সাইকেল থেকে নেমে বাসার সামনে গেরেজে রাখা গাড়ি লক্ষ্য করে পরপর তিনটি পেট্রোল বোমা ছোড়ে। এতে বিকট আওয়াজে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় পুরো এলাকা। পরে হামলাকারিরা পালিয়ে যায়। গাড়িতে আগুন ধরে এবং পুঁড়ে যায়। বাড়ীর বিভিন্ন স্থানেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তবে বাড়িতে তেমন কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
স্টাফ রিপোর্টার, দিনাজপুর থেকে জানান, চিরিরবন্দর উপজেলার পুরাতন ভূষিবন্দরে মোটর পরিবহন মালিক গ্রুপের জেলা সভাপতি ভবনী শংকর আগরওয়ালার ৬টি বাসে অগ্নিসংযোগ ও দিনাজপুর- ৬ আসনের আওয়ামী লীগের এমপি আজিজুর রহমান চৌধূরীর নবাবগঞ্জ উপজেলার ভাদুরিয়া বাজারস্থ বাড়িতে হামলা করা হয়েছে। ফিলিং ষ্টেশনে রাখা ৬টি ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। খানসামা উপজেলার নির্বাচন অফিসে জামায়াত-শিবির দু’দফা হামলা চালায়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। এতে আহত হয় কমপক্ষে ৮জন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৯ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়েছে পুলিশ। দিনাজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, চিরিরবন্দর উপজেলার বিন্যাকুড়ি হাটে ১২টি দোকান, খানসামা উপজেলার পাকের হাটে ২ আওয়ামী লীগ নেতার বাড়ি ও মার্কেটসহ শহরের বেশ কিছু স্থানে দোকানপাট ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া দিনাজপুরের খানসামা ও চিরিরবন্দর উপজেলার ৩টি স্থানে পাকা সড়ক কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। চিরিরবন্দর কারেন্টের হাট বেইলী ব্রীজের ৩টি পাটাতন খুলে ফেলায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। খানসামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কৃষ্ণ কুমার সরকার ও চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সর্বত্র ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলায় বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।

জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির পর ১০ জেলায় ব্যাপক সহিংসতা, নিহত ২

জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পর ১০ জেলায় ব্যাপক সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছে। সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দুই কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। মহাসড়কে গাছ ফেলে ও গর্ত খুড়ে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা।

রুহি থাইল্যান্ডে

গতকাল ভোরে থাইল্যান্ডের উদ্দেশে উড়াল দিলেন র‌্যাম্প তারকা রুহি। না, র‌্যাম্প কিংবা কোন নাটকের শুটিংয়ে নয়। গিয়েছেন ইসমাত আরা শান্তি পরিচালিত ‘মায়ানগর’ ছবির শুটিং করতে। থাইল্যান্ডে উড়াল দেয়ার আগে রুহি বলেন, এর আগেও একবার এ ছবির কাজে থাইল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল।

নড়েচড়ে বসেছেন ইয়ানা

গত কয়েক বছর ধরে বলিউডে একেবারেই অনুপস্থিত ছিলেন সেক্সসিম্বল আইটেম গার্ল ইয়ানা গুপ্তা। তবে দীর্ঘ সময়ের নীরবতা ভেঙে আবারও পর্দার সামনে আসছেন তিনি। বর্তমানে ‘দাম’ ছবিটির সিক্যুয়ালের শুটিং চলছে।

রুদ্ধশ্বাস নাটক ও দুই প্রতিমন্ত্রী

যুদ্ধাপরাধীদের যথাবিচারিক শাস্তি কার্যকর দেখতে লক্ষ-কোটি মানুষ যখন অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন, তখন ক্ষমতাসীন দলের অতি-উৎসাহীরা একটি শ্বাসরুদ্ধকর নাটকের জন্ম দিলেন। অনেকের কাছে মেনে নেওয়া কষ্টকর হলেও চেম্বার জজ ও সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। সরকার অহেতুক দোষী সাব্যস্ত হতো। সেই দায় থেকে তাঁরা বাঁচিয়ে দিলেন।
যথাযথ বিচার-প্রক্রিয়া নিঃশেষিত হওয়া ছাড়াই কাদের মোল্লার ফাঁসি বিতর্ক ভুল-বোঝাবুঝি ও বিভেদ বাড়াতে উপাদান হিসেবে ব্যবহূত হতো। আমরা একটি বিচার বিভাগীয় বিশেষ পদক্ষেপ প্রত্যক্ষ করলাম, এমন একটি পরিস্থিতিতে যখন বিবাদ মেটাতে ঢাকায় অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো ব্যস্ত, জাতিসংঘের বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়াররা বাংলাদেশের বিচার বিভাগের নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক না থাকার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তখন বিশ্ব দেখল, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর সরকারকে ‘না’ বলতে পারে। ক্রান্তিকালের এই অর্জন অসামান্য। ‘রিভিউ আইনসংগত বিএনপি কৌশলগত’ শীর্ষক নিবন্ধে গত ১৮ সেপ্টেম্বর যে মন্তব্য করেছিলাম, তা এভাবে ফলবে ভাবিনি। মন্তব্যটি ছিল: ‘দেশের বিরাজমান বাস্তবতায় দলীয়করণ দোষে দুষ্ট একটি সরকারের পক্ষে এ নিয়ে অনভিপ্রেত বিতর্ক করা কিংবা রিভিউর শুনানি হতে না দিয়ে তাড়াহুড়ো করা কিংবা অতি-উৎসাহীদের কবলে পড়া কিংবা নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ফায়দা লাভের প্রবণতায় ফাঁসির রায় কার্যকর করতে উদ্যোগী হওয়া অথবা ধূম্রজাল সৃষ্টি করে রায় কার্যকর করা কিংবা বিলম্বিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা বুমেরাং হতে পারে।’ আইনমন্ত্রী হিসেবে শফিক আহমেদ এবং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কাদের মোল্লাকে ফাঁসির রায় দানের দিন থেকেই দাবি করেন যে, তিনি রিভিউর সুযোগ পাবেন না।
রিভিউ আসলে নিতান্ত মামুলি ও ঠুনকো বিষয়। কালক্ষেপণের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। এ নিয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে কেন তাঁরা আইনি ব্যাখ্যাদানে ব্যাকুল হয়েছিলেন, সেও এক প্রশ্ন। এর বিপরীতে অন্যদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান কৌঁসুলি আনিসুল হক ও যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ রিভিউর সুযোগ আছে বলেই মত দিয়েছিলেন। আমরাও ওই অবস্থান সমর্থন করেছিলাম। রিভিউর অধিকার যেকোনো নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। এটা কে পাবে বা পাবে না, সেটা নিশ্চিত করাও আপিল বিভাগের সাংবিধানিক অধিকার। দৃশ্যত দুই প্রতিমন্ত্রী এটা হরণ করতে চেয়েছিলেন। শহীদ মুনীর চৌধুরীর ছেলেকে একটি টিভি চ্যানেলে অহেতুক তাড়াহুড়ো করার ব্যাপারে মঙ্গলবার রাতে দুঃখ প্রকাশ করতে শুনলাম। তিনি ঠিকই বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই বিচার নিবিড়ভাবে লক্ষ করছে। সুতরাং এখানে দরকার নিয়মরীতি মেনে চলতে বাড়তি সতর্কতা। অথচ আমরা একি দেখলাম! এটা সন্দেহাতীত যে, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রী সরকারের ‘অতি-উৎসাহী মহলের’ নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের অস্বাভাবিক কাণ্ডকারখানা বিশ্লেষণ করলেই প্রমাণ করে দেওয়া সম্ভব যে বাংলাদেশকে কয়েক ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর নাটকে ফেলার জন্য তাঁরাই প্রধানত দায়ী। তাঁরা প্রমাণ করেছেন, সবকিছু নিয়েই খেলা করা চলে। এর সঙ্গে আইনের শাসনের ব্যাপার নেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হলেন প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। তাই এটা একেবারেই বোধগম্য নয় যে, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরের সত্যতা কতটুকু। চেম্বার জজ স্টে করে জাতিকে বিচারিক দুর্ঘটনা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন—এটা মানতে পারলে এটাও মানতে হবে যে, দুই রাজনীতিক দুই প্রতিচরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা রাষ্ট্রের আইন ও নিয়মরীতি খেলার সামগ্রীতে পরিণত করতে উদ্যত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতা মো. নাসিম বলেছেন, ‘১৪ দল মনে করে, সরকারের দায়িত্বে থেকে কোনো মন্ত্রী বিরূপ মন্তব্য করেছেন। রায় নিষ্পন্ন হওয়ার আগে এ ধরনের মন্তব্য করা ঠিক হয়নি।’ এটা ১৪ দলের বিষয় নয়, মন্ত্রিসভার খাস তালুকের বিষয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর পাঁচ খুনির ওপর মৃত্যু পরোয়ানা জারি হয় ৩ জানুয়ারি ২০১০। জেল কোড অনুযায়ী ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামির রায় কার্যকর হবে মৃত্যু পরোয়ানা জারি থেকে ২১ দিনের আগে নয় এবং ২৮ দিনের পরে নয়। সে অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার শেষ দিন ছিল ৩১ জানুয়ারি ২০১০। আমরা তখন অনাবশ্যক তাড়াহুড়ো দেখিনি। একটানা তিন দিন শুনানি শেষে রিভিউ আবেদন নাকচ হয়েছিল ২৭ জানুয়ারি সকালে। আত্মীয়স্বজন সাক্ষাৎ সারেন বিকেলেই। প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ হয় ফাঁসির রাতেই। সাংবাদিকেরা ২৭ জানুয়ারি আইনমন্ত্রী ও আইন প্রতিমন্ত্রীকে যথারীতি ঘিরে ধরেছিলেন। কিন্তু তাঁরা সাবধানতা অবলম্বন করেন।
সতর্ক আইনমন্ত্রী শুধু এতটুকু বলেছিলেন, ‘৩১ জানুয়ারির মধ্যে ফাঁসির রায় কার্যকর হবে।’ অথচ তিনি জানতেন, ওই দিনই মধ্যরাতে ফাঁসির রায় কার্যকর হবে। কখন ফাঁসি হবে, তা জানিয়ে প্রেস ব্রিফিং করেননি। অথচ এবার নজিরবিহীন ঘটনা ঘটানো হলো। বিশ্বকে এবং বিচারপ্রত্যাশীদের মধ্যে সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে অহেতুক সংশয়ের বীজ ঢোকানো হলো। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাসভবনে প্রেস ব্রিফিং ওপরের নির্দেশেই ঘটেছে ধরে নিতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রীর একক দায়িত্ব বা ব্যর্থতা গণ্য হয় না। এটা সমষ্টিগতভাবে গ্রহণ করার বিষয়। দুই প্রতিমন্ত্রীর প্রেস ব্রিফিং মানে মন্ত্রিসভারই সিদ্ধান্ত। যদি তাঁরা মন্ত্রিসভা বা সরকারকে জনগণের সামনে হেয় করে থাকেন, তাহলে তাঁদের সামনে দুটি পথ খোলা—হয় তাঁদের ক্ষমা চাইতে হবে, না হলে প্রধানমন্ত্রীকে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। আইজি প্রিজন কী দোষ করলেন, তা বোধগম্য নয়। পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়া থেকে এক মাসের মধ্যে রিভিউ দরখাস্ত করা যাবে। মঙ্গলবার রাতে আনিসুল হক ১৫ মিনিট থেকে অনধিক চার দিনের মধ্যে এর নিষ্পত্তি আশা করেন। আপিল বিভাগের রায়ে বড় ধরনের গলদ না দেখাতে পারলে রিভিউ অচল। জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক ফরমান আলী বলেন, ৮ ডিসেম্বর মৃত্যু পরোয়ানা পাওয়ার দিন থেকে সাত দিনের মধ্যে কাদের মোল্লার ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ আছে। তাহলে প্রশ্ন হলো, আইন যদি ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে থাকে, তাহলে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করা হলো না কেন?
আইন প্রতিমন্ত্রী দাবি করেছেন, দুজন ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কাদের মোল্লার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছে, রাষ্ট্রপতির কাছে তিনি প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না। কাদের মোল্লা তা নাকচ করেছেন। এখানে কথা হলো, কাদের মোল্লা নাকচ করলেও আইন যেহেতু তাঁকে সাত দিনের সুযোগ দিয়েছে, তাই সে পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত ছিল। কারণ, নাকচ করলেও তিনি যে তাঁর সিদ্ধান্ত সাত দিনের মধ্যে বদলাতে পারবেন না, সেটা সরকার ধরে নিতে পারে না। আইন প্রতিমন্ত্রীর রিভিউ-বিরোধী অবস্থান নিজের দায়ের কোপে নিজের আঙুল কাটার সমতুল্য। কারণ, রিভিউ-বিরোধীরা যুক্তি দিচ্ছেন, আইনে রিভিউ করার অধিকারের কথা লেখা নেই। সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে রিভিউর যে বিধান আছে, তা যুদ্ধাপরাধ বা দালাল আইনে দণ্ডিতদের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ, সংবিধানের ৪৭ক(২) অনুচ্ছেদ বলেছে, এ ধরনের দণ্ডিতদের ‘কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার’ অধিকার থাকবে না। কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে শাহবাগের স্বপ্রণোদিত সময়ের গণজাগরণকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম সরকারের ওপর অবিশ্বাস থেকেই তারা ক্ষোভে ফেটেছে। জনতার শক্তিতে ভীত সরকার ও তার মিত্ররা এটা দ্রুত ছিনিয়ে নিল। এই বিক্ষুব্ধ জনগোষ্ঠী ‘চোখের বিনিময়ে চোখ’ নীতির অনুসারী নয়। তারা ভেবেছিল, যাবজ্জীবনে বিশ্বাস কী, সরকার এদেরকে ছেড়ে দেবে।
তাই রাষ্ট্রপতির ক্ষমা দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না করতে আইন বানাতে বলেছিলাম। সেই সঙ্গে এও বলেছি যে, সংবিধানের একটি ব্যাখ্যা মানলে নতুন আইন লাগবে না। আসুন, মেনে নিই, রাষ্ট্রপতির ক্ষমাসংক্রান্ত ৪৯ অনুচ্ছেদের সুবিধা সাধারণভাবে দণ্ডিত অপরাধীদের জন্য প্রযোজ্য। এর আওতায় দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীরা প্রতিকার পাবেন না। একজন আইনজ্ঞ গতকাল আমাকে টেলিফোনে বলেন, ‘আইন প্রতিমন্ত্রী কী করে মোল্লার প্রাণভিক্ষা চাওয়ার অধিকারের কথা বলেন। এটা তো প্রতিকার। সংবিধান এটা নিষিদ্ধ করেছে। আর রিভিউ প্রতিকার নয়, অথচ তিনি এর বিরোধিতা করছেন।’ আমি তাঁর সঙ্গে একমত হই। আইনমন্ত্রী থাকতে শফিক আহমেদের সঙ্গে এ নিয়ে একদিন কথা হলো। সেখানে বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম ছিলেন। তিনিও একটি মার্জনানিরোধ আইন করার প্রবক্তা। আমরা উভয়ে আইনমন্ত্রীকে এটা বললাম। তিনি বললেন, এখন আর সংবিধান সংশোধনের সুযোগ নেই। বললাম, সংবিধান সংশোধনের দরকার নেই। ১৯৭৩ সালের আইনটি সংশোধন করে একটা রক্ষাকবচ তৈরি করে রাখুন। মৃদু কণ্ঠে তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন। দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীকে জিন্টু বা তাহেরপুত্রের মতো ক্ষমা পেতে দেখলে জনতা অবশ্যই গর্জন করবে। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ আইনটা করল না কেন? এই বিচার চাইলে কেবল তাদেরকে রাখতে হবে বলেই কি?
আইন প্রতিমন্ত্রী স্পষ্টতই একটি স্ববিরোধী সাংবিধানিক অবস্থান গ্রহণ করেছেন। এক মুখে দুই কথা বলছেন। রিভিউ অধিকার নেই অথচ প্রাণভিক্ষার সাংবিধানিক অধিকার আছে। আরও একটি গুরুতর স্ববিরোধী অবস্থান তাঁর আছে। এটা আপিল বিভাগের অবমাননাও। কারণ তিনি বলেন, ‘যদিও আইনে রিভিউ করার সুযোগ নেই, তবু আমরা ভেবেছিলাম যে পূর্ণাঙ্গ রায় পাওয়ার পর দ্রুত তাঁরা সাজা স্থগিতের জন্য হয়তো চেম্বার জজের কাছে যাবেন কিন্তু রোববার থেকে তিন দিন সময় পেলেও তাঁরা যাননি। সুযোগ গ্রহণ করেননি, বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন।’ কে তাঁকে তিন দিন মঞ্জুর করার এখতিয়ার দিল? কোনো সন্দেহ নেই, জামায়াতের নেতারা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন এবং এই বিচার-প্রক্রিয়াকে কী করে বানচাল করা যায়, সেই চেষ্টা তাঁদের রয়েছে। তাঁদের মিত্র বিএনপির সঙ্গে যোগ দিয়ে তাঁরা যে নাশকতায় লিপ্ত রয়েছেন, তারও মূলে রয়েছে ওই বিচার ভেস্তে দেওয়ার অপচেষ্টা। কিন্তু আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মনোজগতে কী আছে, সেটা তো আমরা ঔদাসীন্যে উড়িয়ে দিতে পারি না। অপরিণামদর্শী দুই প্রতিমন্ত্রী যে বিভ্রান্তি ছড়ালেন, সেটাও একটা বিরাজনীতিকীকরণ, এর প্রতিকার কে দেবে? এটুকু অনুমেয়, এই নাটকের এটাই শেষ দৃশ্য নয়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

কৃষি ও খাদ্যচিন্তাই জন্ম দেয় দেশনায়ক

সৃষ্টির সূচনা থেকেই প্রাণীর প্রধানতম তাগিদ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। খাদ্যশৃঙ্খল গড়ে তুলতে গিয়েই মানুষ ভেবেছে তার অন্য সব চাহিদার কথা। সভ্যতার শুরু থেকেই যত আন্দোলন-সংগ্রাম, তার মূলে কাজ করেছে মানুষের প্রধানতম স্বার্থ—খাদ্য। তাই যুগে যুগে অধিকার আদায়, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনসহ সব সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল খেয়ে-পরে নিষ্কণ্টক জীবনযাপনের স্বপ্ন। বহু আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পেরিয়ে এই বাংলার মানুষ তখন স্বাধীনতার কঠিন তাগিদ অনুভব করে, যখন তার খাদ্য গ্রাস করে অন্যরা, যখন তার নিজস্ব অর্জন আর অস্তিত্ব লুটে নিতে চায় অন্য কেউ, যখন তার অস্তিত্ব হয়ে পড়ে বিপন্ন। দীর্ঘ ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন ও ২৪ বছরের পাকিস্তানি শোষণ বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রাম অনিবার্য করে তোলে। আর ঐতিহ্যগতভাবে কৃষক পরিবারেরই সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন হাল ধরেন সাত কোটি মানুষের। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের বীর সেনানী যাঁরা, তাঁদের কেউ কৃষকের সন্তান, কেউ কৃষক। কেউ শহীদ হয়েছেন দেশমাতৃকার জন্য, আর কেউ টিকে আছেন স্বাধীনতার স্বপ্ন-সাধ মিলিয়ে দেখার জন্য। আসলে কি হিসাব মেলাতে পারেন তাঁরা? এই একই প্রশ্ন নিয়ে গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মুুক্তিযোদ্ধা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছি। কৃষক বারবারই যেন হোঁচট খেয়েছেন স্বপ্ন আর বাস্তবতাকে মেলাতে গিয়ে।
তাঁদের স্বাধীনতার স্বপ্ন-সাধ বারবার ধুলায় মিশেছে। এমন উদাহরণ আজ অসংখ্য। একাত্তরের যে কৃষকের সহায়-সম্পত্তিসহ অনেক কিছু ছিল, আজ তিনি ভূমিহীন, হতদরিদ্র। রাষ্ট্রব্যবস্থা জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তার কথা ভেবেই কৃষি উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেয়, কিন্তু গুরুত্ব পায় না গ্রামীণ কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নের ইস্যু। সঠিক পরিকল্পনা ও সুশাসনের অভাব, রাজনৈতিক মতানৈক্য, শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনসহ দেশের সবকিছুতেই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হতে হয় কৃষককে। রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান শক্তি কৃষি উৎপাদন তথা খাদ্যনিরাপত্তা হলেও সেই শক্তির পেছনের নিয়ামক যে কৃষক শ্রেণী, তারা বরাবরই থেকে যায় অবহেলিত। মহান বিজয় দিবসের প্রাক্কালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস বাঙালি জাতিকে শোকে স্তব্ধ করে দেয়। কারণ, এই দিনেই হারিয়ে যায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানগুলো। যাঁরা নিজেদের অর্জন ও অধ্যয়ন দিয়ে পৌঁছেছিলেন সমাজের সুউচ্চ চূড়ায়। তাঁরা সব সময় চেয়েছেন ক্ষুধামুক্ত, চিন্তার দারিদ্র্যমুক্ত এবং সমৃদ্ধ দেশ। যাঁরা নিজের জীবন দিয়ে পূরণ করে গেছেন স্বাধীনতার স্বপ্নসাধ। তাঁরা যেন বলে গেছেন, আমরা চলে যাচ্ছি, কিন্তু থেকে যাচ্ছে আমাদের আত্মবিশ্বাস আর ভেতরের শক্তি। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে কয়েকজন বিশেষ ব্যক্তি ও ঘটনার কথা। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপ্লবী কৃষকনেতা লির কথা কি আপনাদের মনে আছে? যিনি ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বিবেচনায় সে বছর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কৃষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর প্রতিবাদ ছিল কৃষককে বঞ্চনার বিরুদ্ধে।
২০০৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মেক্সিকোর কানকুনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে হাজারো মানুষ ও গণমাধ্যমের সামনে আত্মাহুতি দেন লি। সে সময় লি বলেছিলেন, সংগ্রামী আত্মার মৃত্যু নেই। লির ওই আত্মত্যাগ সারা বিশ্বের কৃষককে শেখায়, অধিকার আদায়ের জন্য প্রকাশ্য প্রতিবাদের বিকল্প নেই। বিপ্লবী হো চি মিনের দেশ ভিয়েতনামে একটি নীতিই কৃষিকে উঠিয়ে দেয় উন্নয়নের চূড়ান্ত শিখরে। বিপুলভাবে বাড়িয়ে দেয় খাদ্য উৎপাদন। এই নীতিই হচ্ছে ভূমি সংস্কার নীতি, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা যায় ‘দোই মোই’। অর্থাৎ ১৯৮৮ সাল থেকে ভিয়েতনাম সংঘবদ্ধ কৃষি আবাদের সমাজতান্ত্রিক নীতি থেকে সরে দাঁড়ায়। অর্থাৎ রাষ্ট্র ব্যক্তির ভূমি মালিকানা দিয়ে দেওয়ার কারণে কৃষক নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখার যেমন সুযোগ পান, একইভাবে প্রথম বছরেই খাদ্যঘাটতির দেশটি পরিণত হয় পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম খাদ্য রপ্তানির দেশে। ড. নরম্যান বরলোগ কিংবা ড. সয়ামি নাথানের মতো বিজ্ঞানীরা এই পৃথিবীবাসীকে খাদ্যের প্রশ্নে নিশ্চিন্ত করেছেন ১৯৬০-এর দশকে। তাঁদের ডাক দেওয়া সবুজ বিপ্লব আজকের দিনেও যেন অনন্য এক মন্ত্র। বিখ্যাত চিকিৎসক দম্পতির ছেলে ড. সয়ামি নাথানের হওয়ার কথা ছিল ডাক্তার। কিন্তু ১৯৪৩-৪৪ সালের দুর্ভিক্ষ বা বেঙ্গল ফেমিন তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়া যায়—এমন কোনো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করার। পরে তিনিই হয়ে ওঠেন পৃথিবীর বিখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী। ৮৮ বছর বয়সেও ড. সয়ামি নাথান ভাবেন এই বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে।
সারা বিশ্বে আজকের খাদ্যবিপ্লবের পেছনে অবদান রয়েছে মাও সে তুংয়ের দেশ চীনের। চীনের হুনান প্রদেশের চাংসায় মাও সে তুংয়ের জন্মভিটায় আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল ২০০৬ সালে। কৃষির মতো মহৎ পেশা ও চেতনাই যে প্রকৃত বিপ্লবীর জন্ম দেয়, ওই বাস্তুভিটা সে-কথাই মনে করিয়ে দেয়। মনে হয়, কৃষক পরিবারের সন্তানই তো হতে পারে জাতির মহানায়ক। চীনের আরেক সূর্যসন্তান ইয়ান লং পিং, যিনি হাইব্রিড ধানের জনক হিসেবে বিশ্বময় পরিচিত। অসামান্য কীর্তির কারণে চীন যাঁকে দেবতাজ্ঞান করে, সেই ইয়ান লং পিং ১৯৩১ সালে জন্মেছিলেন দরিদ্র কৃষক পরিবারে। মাটির ঋণ শোধ করতে পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল চীনকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি সারা বিশ্বের খাদ্যনিরাপত্তায় যোগ করেন অনন্য এক শক্তি। তাঁর আবিষ্কৃত হাইব্রিড ধান আজ আবাদ হচ্ছে বিশ্বের সব কটি ধান উৎপাদনকারী দেশে। আমাদের দেশে সবুজ বিপ্লবের বাতাস পৌঁছে যায় ষাটের দশকেই। আর খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ পথকে মসৃণ করার জন্য স্বাধীনতার আগে ও পরে আত্মনিয়োগ করেন এই মাটির বড় বড় সংগ্রামী নায়ক। মাটির যোদ্ধারা। প্রয়াত অধ্যাপক হাসানুজ্জামান, ড. কাজী এম বদরুদ্দোজাসহ বহুসংখ্যক বিজ্ঞানী, সম্প্রসারক মগ্ন হন এ দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিরন্তর প্রয়াসে। তাঁদের সেই অমূল্য অবদানের স্বীকৃতিই স্বাধীনতার ৪২ বছরে আমাদের সবচেয়ে গর্বের গল্প। একাত্তরে যখন সাত কোটি মানুষ, তখন এ দেশে যে জমিতে উৎপাদিত হতো মাত্র এক কোটি টন খাদ্যশস্য, ২০ লাখ টন আমদানি করতে হতো। আজ ১৬ কোটিরও বেশি মানুষ, খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয় সোয়া তিন কোটি টন।
এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে? কয়েক দিন আগে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। বিশ্বের মানুষের শান্তি-নিরাপত্তার পাশাপাশি গত ৩০ বছর সারা বিশ্বের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই মহান নেতার ছিল অসামান্য অবদান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মহাপরিচালক জোসে গ্রাজিয়ানো দ্য সিলভা এক শোকবাণীতে বলেছেন, ম্যান্ডেলা বিশ্বাস করতেন, ক্ষুধার্ত পুরুষ, নারী বা শিশু কখনো স্বাধীন নয়। তিনি মনে করতেন, ক্ষুধা দূর করা মানে শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর প্রশ্ন নয়, ক্ষুধা দূর করা মানে সেই রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা পূরণ করা, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ দেশের সম্পদের উৎস ও সর্বোচ্চ সেবার কাছে যেতে পারবে। যার মাধ্যমে সে সহজেই জোগাড় করতে পারবে নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য। কৃষক জমি কর্ষণ করেন, ফসল ফলান। আমাদের মুখে খাদ্য তুলে দেন। দেশ ও দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে তাঁর ভূমিকাই সবার আগে। একজন কৃষকের জীবন মানেই একটি সংগ্রামের ইতিহাস। সে ইতিহাসকে আজকের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সুশীল সমাজ, নতুন প্রজন্ম থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক কীভাবে মূল্যায়ন করছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমার কৃষিকে খাটো করে দেখছি মানে—স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী বীর শহীদদের অবমাননা করছি। দেশকে যাঁরা প্রতিদিন স্বপ্নবান করে তোলেন—অনেক অশান্তি আর নৈরাজ্যের পরও শেষ শক্তিটুকু, আশ্রয়ের জায়গাটুকু টিকিয়ে রাখেন—সেই মাটির মানুষের দিকে তাকিয়েই মানবতাবাদী নেতারা বিপ্লব গড়ে তোলেন, বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেন নতুন কিছু, শিক্ষাবিদ-সমাজকর্মীরা আঁকেন পরিবর্তনের রূপরেখা। আমাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীরা ছিলেন সেই পরিবর্তনেরই একেকজন নায়ক। তাঁদের সবার প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা। শ্রদ্ধা একাত্তরের সব শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি।
শাইখ সিরাজ: পরিচালক ও বার্তাপ্রধান, চ্যানেল আই।
shykhs@gmail.com

বিলম্বে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে

ব্যাপক আয়োজনের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন ২২ নভেম্বর ২০১৩ শেষ হয়েছে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ নগরে। ধনী দেশগুলোর শত শত বছরের ভোগবাদী দর্শনতাড়িত জীবন এবং তার উপাদানসমূহের জোগান নিশ্চিত করতে পৃথিবীর আবহাওয়ামণ্ডলে যে বিপুল পরিমাণ গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরিত হয়েছে, তাতে পৃথিবীর আবহাওয়ামণ্ডলীর উষ্ণায়ন আরও দুই ডিগ্রি বৃদ্ধি ঠেকানো যাবে কি না, তা নিয়ে গুরুতর সংশয় রয়েছে। বলাই বাহুল্য, দ্রুত সম্পদশালী ও উন্নত হয়ে ওঠার দৌড়ে যে দেশগুলো এগিয়ে, তারাও দূষণে পিছিয়ে নেই। রাখঢাক ছাড়াই তারা নিজেদের জীবনমান উন্নত করার প্রয়োজনে পরিবেশ দূষণ করার দায় নিজেদের ঘাড়ে নিতে অনিচ্ছুক। আবার প্রবল সুনামি ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ২০১১ সালের মার্চ মাসে জাপানের ফুকুশিমা দাই-চি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎনির্ভর জাপানকে তার প্রায় সব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করতে হয়েছে। ফলে, জাপানের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কয়লাসহ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হয়েছে। সম্প্রতি জাপান ফুকুশিমা এলাকায় দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ জাপান একই সঙ্গে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ। ফলে, জাপান যখন বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে ২০২০ সালের মধ্যে তারা তাদের গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ
(১৯৯০ সালের সূচক পর্যায়) লক্ষ্যমাত্রা ২৫ শতাংশ হ্রাস করার পূর্বঘোষণা থেকে সরে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত রায় পুনর্নির্ধারণে বাধ্য হচ্ছে, তখন বিশ্বের উষ্ণায়ন হ্রাস করার চ্যালেঞ্জ কঠিনতর হয়ে উঠছে। বাড়তি হিসেবে, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম কয়লা উৎপাদন ও ব্যবহারকারী দেশ অস্ট্রেলিয়া তার গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা পুনর্বিবেচনার কথা ভাবছে। বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৮ এর অন্যতম সদস্য কানাডা ইতিমধ্যে ‘কিয়োটো প্রটোকল’ (১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা ২০১২ সালের মধ্যে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে ৫ শতাংশ গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে) থেকে বেরিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র কিয়োটো প্রটোকল স্বাক্ষরই করেনি। আগামী ২০১৫ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে কিয়োটো প্রটোকলের পরবর্তী ধাপ হিসেবে বিশ্বের সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস করার লক্ষ্যমাত্রা সুনির্দিষ্ট করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ‘বর্ধিত কার্যক্রম’ গ্রহণের পদক্ষেপ নির্ধারণ করে ২০২০ সাল থেকে তা প্রয়োগের চুক্তি যেন চূড়ান্ত হতে পারে, তার আলোচনা হলো ওয়ারশ সম্মেলনে। এদিকে বিজ্ঞানীরা বিশ্বে আবহাওয়ামণ্ডলীর উষ্ণায়ন হ্রাস করার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার জন্য বারবার তাগাদা দিচ্ছেন। এ জন্য মানুষের সাধ্যের মধ্যে করণীয় গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত হ্রাস করা গুরুত্বপূর্ণ; নইলে প্রাক-শিল্পবিপ্লব পর্যায়ের সঙ্গে বাড়তি দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার ‘লক্ষণরেখা’ অতিক্রান্ত হলে বিপর্যয় অবধারিত। যুক্তরাজ্যের জ্বালানিমন্ত্রী এড ডেভিস ওয়ারশ জলবায়ু সম্মেলনে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন, ব্রিটিশ ট্যাক্সদাতাদের অর্থ উন্নয়নশীল দেশে আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় করা হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাচারাল রিসোর্সেস ডিফেন্স কাউন্সিলের তথ্যমতে, যুক্তরাজ্য গত সাত বছরে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন কয়লা প্রকল্পে উন্নয়ন ব্যাংকসমূহের মাধ্যমে জোগান দিয়েছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কয়লা খনি উন্নয়ন ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে জোগান দিয়েছে প্রায় নয় বিলিয়ন ডলার। একই খাতে জার্মানি ও জাপান অর্থ জোগান দিয়েছে যথাক্রমে ছয় ও নয় বিলিয়ন ডলার। অবশ্য, শেষোক্ত দেশ দুটি এখনো ব্রিটিশ মন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া না দিলেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ উন্নয়নশীল দেশে নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগে অর্থ জোগান না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। দ্য গার্ডিয়ান (১৮ নভেম্বর ২০১৩) যুক্তরাজ্যের তিনটি বড় ব্যাংক, রয়্যাল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড (আরবিএস), বার্কলেস এবং এইচএবিসি গত আট বছরে যথাক্রমে পাঁচ বিলিয়ন ইউরো, ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো এবং ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরো বিভিন্ন দেশে কয়লা খনিশিল্পের উন্নয়নে বিনিয়োগ করেছে। এ ছাড়া পৃথিবীর বড় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সিটিগ্রুপ, মর্গ্যান স্ট্যানলি এবং ব্যাংক অব আমেরিকা বিশ্বজুড়ে কয়লা খনিশিল্পে বিনিয়োগ করেছে। এক গবেষণা রিপোর্টের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মিলিতভাবে কয়লাখনিশিল্পে ৫৭ শতাংশ তহবিল জোগান দিয়েছে। তা ছাড়া, যুক্তরাজ্যে ২০১২ সালে ৩৯ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে কয়লা দিয়ে, ২০১১ সালে এ পরিমাণ ছিল ২৯ শতাংশ। দি ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় এক হাজার ২০০ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা এক হাজার ৪০০ গিগাওয়াট (১৪ লাখ মেগাওয়াট)। ২০১০ সালে বিশ্বের আবহাওয়ামণ্ডলীতে উদিগরিত মোট কার্বন ডাই-অক্সাইডের ৪৩ শতাংশ এসেছে কয়লা থেকে। চীন আগামী ২০২২ সাল অবধি প্রতিমাসে অন্তত তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনা অব্যাহত রাখবে এবং ভারত ইতিমধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লা আমদানিকারক দেশে রূপান্তরিত হয়েছে। সুতরাং বিশ্বে কয়লার ব্যবহার কমছে না। তবে কয়লা খনি উন্নয়ন এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আমাদের মতো দেশ, যারা বিলম্বিত এবং দ্বিধাগ্রস্ত যাত্রাশুরু করেছে, তাদের জন্য বিনিয়োগ দুষ্প্রাপ্য ও ব্যয়বহুল হবে।
বাড়তি হিসেবে এখন কয়লা পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রচলিত এবং দূষণপ্রবণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বদলে অপেক্ষাকৃত দক্ষ ও কম কার্বন দূষণক্ষম বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি মনে করে, বিদ্যমান ৩৩ শতাংশ দক্ষতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থলে ৪৫ শতাংশ দক্ষতার নতুন প্রযুক্তির বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলে বিশ্বে বছরে প্রায় ২ দশমিক ৪ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস পাবে। অনেক জায়গাতেই পুরোনো প্রযুক্তির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে নতুন প্রযুক্তি প্রতিস্থাপন শুরু হয়েছে। তবে নিশ্চিতভাবে নতুন প্রযুক্তির জন্য বাড়তি ব্যয় করতে হবে। বাংলাদেশের মতো বিনিয়োগ-দৈন্যের দেশে সেই চ্যালেঞ্জ আরও বড়।