Monday, February 3, 2025

ট্রাম্পের প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা ইরানের

গাজাবাসীকে জর্ডান ও মিশরে পাঠিয়ে দেয়ার যে প্রস্তাব করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, তার তীব্র নিন্দা করেছে ইরান। তারা বলেছে, এটাকে জাতিনিধনের পর্যায়ে বলে ধরা যেতে পারে। একই কথা বলেছে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। এ জন্য তারা ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করতে তাদের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ খবর দিয়ে অনলাইন গার্ডিয়ান বলছে, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে ওয়াশিংটন সফরে রয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তবে যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় দফার আলোচনা সোমবার শুরুর কথা রয়েছে।

নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রার আগে সাংবাদিকদের বলেছেন, এই সফরে তিনি হামাসের বিরুদ্ধে জয়ের বিষয়ে আলোচনা করবেন। তবে প্রাকটিক্যাল অর্থে এই বিজয় সম্পর্কে বিস্তারিত বলেননি। মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা। এ সময় ইরানকে মোকাবিলা এবং হামাসের হাতে থাকা সব জিম্মি মুক্তির বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। ২০শে জানুয়ারিতে শপথ নিয়ে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর এটাই হতে যাচ্ছে বিদেশি কোনো নেতার সঙ্গে তার প্রথম বৈঠক। বিমানে উঠার আগে নেতানিয়াহু বলেন, এই সফর হলো ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের জোটের শক্তির প্রমাণ। তাকে রোববার রাতে ওয়াশিংটনে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ডেনন। এই দূত বলেন, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মিত্রতা আরো গাঢ় হবে। সহযোগিতা আরো বৃদ্ধি পাবে। ওদিকে নেতানিয়াহুর অফিস থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় দফা নিয়ে সোমবার ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক দূত স্টিভ উইটকোফের সঙ্গে আলোচনা করার কথা নেতানিয়াহুর। উল্লেখ্য, ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে ৪২ দিনের প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি শেষ হবে আগামী মাসে। পরবর্তী পর্যায়ে বাকি সব জিম্মিকে মুক্তি দেয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত আছে গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ আরো স্থায়ীভাবে বন্ধে আলোচনা। ওদিকে গাজা উপত্যকা থেকে গাজাবাসীকে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাঠিয়ে দেয়ার যে প্রস্তাব করেছেন ট্রাম্প তার কড়া নিন্দা জানিয়েছে ইরান। তারা সতর্ক করে বলেছে, ট্রাম্পের এই উদ্দেশ্যকে জাতি নিধন হিসেবে দেখা যায়।

বার্তা সংস্থা এএফপি ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাইয়িকে উদ্ধৃত করে বলেছে, আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করতে তাদেরকে সহায়তা করা উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। উল্লেখ্য, গত সপ্তাহে ট্রাম্প যে ঘোষণা দিয়েছেন তার উদ্ধৃতি দিয়ে এসব কথা বলেন তিনি। ট্রাম্প ওই সময় প্রস্তাব করেছেন, পুরো গাজা উপত্যকাকে পরিষ্কার করার জন্য বিপুল পরিমাণ ফিলিস্তিনির গাজা ছেড়ে যাওয়া উচিত। এসব ফিলিস্তিনিকে প্রতিবেশী জর্ডান ও মিশরের মতো দেশগুলোর আশ্রয় দেয়া উচিত। সেটা হতে পারে অস্থায়ী অথবা দীর্ঘমেয়াদের জন্য। ট্রাম্পের এই প্রস্তাবের নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ, হামাস ও এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্র। এমনিতেই জর্ডানে বর্তমানে অবস্থান করছেন বহু লাখ ফিলিস্তিনি। কয়েক লাখ বসবাস করছেন মিশরে। গাজাবাসীকে তাদের দেশ ছেড়ে যাওয়ার যে ধারণা দিয়েছেন ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছে জর্ডান, মিশর ও আরবের অনেক দেশ।

ওদিকে বার্তা সংস্থা ওয়াফা বলেছে, টানা ১৪ দিনের মতো পশ্চিমতীরের শহর জেনিনে অভিযান অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি সেনাবাহিনী। এ হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৫ ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে বহু ঘরবাড়ি। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেছেন, জেনিনে রোববার ধ্বংস করা হয়েছে ২৩টি ভবন। সেখানে ‘সন্ত্রাসীদের অবকাঠামো’ পুনর্গঠন প্রতিরোধে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জেনিন ক্যাম্প ও আল হাদাফে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন মেয়র মোহাম্মদ জারার।

mzamin

নতুন দল, নানা চ্যালেঞ্জ by লুৎফর রহমান

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর থেকে আলোচনায় শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক দল গঠন। কেমন হবে এই দল, কারা থাকছেন নেতৃত্বে এমন প্রশ্ন, আলোচনা জনমনে। নতুন দল কতোটা মানুষের কাছে যেতে পারবে। কতোটা গ্রহণযোগ্য হবে। আসছে নির্বাচনে কেমন হতে পারে এই দলের প্রভাব- এসব খুঁটিনাটিও এখন আলোচনার বিষয়বস্তু। শিক্ষার্থীদের তরফে দল গঠন করা হবে এটি অনেক আগেই পরিষ্কার করা হয়েছিল। সর্বশেষ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন ছাত্ররা দল গঠন করতে যাচ্ছে এবং এটা দরকার। কারণ ছাত্ররা জীবন দিয়ে  যে অর্জন করেছে তা রক্ষা করতে হবে। হ্যাঁ, এটা সত্য যে, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর মানুষের মাঝে নানা ক্ষেত্রে আশা জেগেছে। প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে পরিবর্তনের। রাজনীতিতে পরিবর্তন আসবে। অর্থনীতি সাবলীল হবে। সমাজ জীবন পরিবর্তন হবে। রাষ্ট্রীয় ও সরকারি সেবা ব্যবস্থা গণমুখী হবে।

কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। দলীয় মোড়ক থেকে বের হয়ে রাষ্ট্র ও সরকার জনমানুষের হয়ে উঠবে- এমন প্রত্যাশা শুরুতে মানুষ যেমনটা পোষণ করতে শুরু করেছিল ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন মেয়াদে তা অনেকটা ম্লান হওয়ার মতো অবস্থা। মানুষের আশা-প্রত্যাশা অবশ্য শেষ হয়ে যায়নি। মানুষ এখনো মনে করে পরিবর্তন দরকার। সেই পরিবর্তন আসবেও। কিন্তু কারা, কোন দল এই পরিবর্তনে নেতৃত্ব দেবে নাকি জাতীয় কোনো উদ্যোগ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করবে- এমন জিজ্ঞাসা দিনকে দিন বাড়ছে। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণ করে এই ফেব্রুয়ারিতেই শিক্ষার্থীদের নতুন দল রাজনীতির ময়দানে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। এটা হতে পারে মধ্য ফেব্রুয়ারির মাঝেই। বলা হচ্ছে রাষ্ট্র সংস্কারের  যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়নে এই দলটি হবে মূল প্রেসার গ্রুপ। এ ছাড়া আগামী দিনে দেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য তৈরির পেছনেও ভূমিকা রাখবে ছাত্রদের এই নতুন দল।

অনেকটা মধ্যধারার এই দলে সব শ্রেণি- পেশার প্রতিনিধিত্ব রাখতে চাইছেন উদ্যোক্তারা। অনেকে বলছেন নতুন দলের সামনে এসব লক্ষ্য পূরণ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আসবে। কারণ এতদিন বহু দলের মাঝে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগই ঘুরে ফিরে ভোটের মাঠে প্রভাব ধরে রেখেছে। এর বাইরে যেসব দল আবির্ভূত হয়েছে তারা এই দুই দলের সহযোগী হয়েছে। এককভাবে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের মতো তেমন কোনো দলের দেখা মিলেনি। এখনো নির্বাচন কমিশনের খাতায় যেসব দল রয়েছে এই দুই দলের বাইরে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো দল নেই যারা ভোট বা জনমতের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারছে। এমন অবস্থায় নতুন দল গঠনের আলোচনা মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানের পর বিপুল আশাবাদী মানুষের জন্য এটা ভালো খবরও বটে। কারণ মানুষ পরিবর্তন চায়, পরিবর্তন চাইছে। দলীয় স্বার্থের রাজনীতির বাইরে মানুষের জন্য রাজনীতির ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পক্ষেই মানুষ রাস্তায় নেমে অকাতরে জীবন দিয়েছে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ যাতে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ হয়, এমন একটা স্বপ্ন নিয়ে মানুষ প্রতিবাদী হয়ে উঠেছিল। মানুষের সেই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে নতুন দল কতোটা ভূমিকা রাখতে পারে, কতোটা মানুষের দল হয়ে উঠবে সেই জিজ্ঞাসা নিয়ে মানুষ অপেক্ষায় আছে।  

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন দল আসার আগে নানা ধরনের নেতিবাচক আলোচনা থাকে। অনেক পক্ষের আপত্তি, অনুযোগ থাকে। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি যে দল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে তার ক্ষেত্রে অনেক ব্যতিক্রমও দেখা যাচ্ছে। প্রায় সব রাজনৈতিক দল তাদের স্বাগত জানাচ্ছে। দল গঠনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। সাধারণ মানুষও এমন একটা দল গঠনের প্রয়োজন অনুভব করছে। সরকারের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার মনোভাব আছে এই দলের প্রতি। এমন ইতিবাচক আবহে হতে যাওয়া নতুন দল সঙ্গত কারণেই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে। বিশেষ করে নানা মঞ্চ থেকে আসা লোকজনকে নিয়ে যে বৃহৎ ঐক্য গড়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদী সরকারের বিরুদ্ধে তার কিছুটা হলেও বিচ্যুতি মাঠে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। বিভেদ-বিভক্তি বাড়ছে। বিদ্যমান দলগুলোর মতো জুলাই-আগস্টে নেতৃত্ব দেয়া প্ল্যাটফরমের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের অভিযোগ আসতে শুরু করেছে।

এমন অবস্থার মধ্যে হতে যাওয়া নতুন দলের কোনো নাম এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি। বলা হচ্ছে, শুরুতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে পরবর্তীতে কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। ইতিমধ্যে সেই লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে ছাত্র আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা প্ল্যাটফরম জাতীয় নাগরিক কমিটি। নতুন দল ঘোষণার আগে ছাত্ররা যোগাযোগ রক্ষা করছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও। উদ্দেশ্য তাদেরকে নতুন দলে ভেড়ানো। এ ছাড়াও বিভিন্ন দলের নেতারা নিজ থেকেও যোগাযোগ করছেন ছাত্রদের সঙ্গে। সমাজে প্রভাব আছে এমন বিশিষ্টজনদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন ছাত্র আন্দোলনের নেতারা।

দল ঘোষণাকে সামনে রেখে পর্যায়ক্রমে পদত্যাগ করবেন সরকারে থাকা ছাত্রদের তিন প্রতিনিধি। যাদের একজন নতুন দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিতে পারেন। জানা গেছে, ফেব্রুয়ারির মধ্যেই পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন সরকারের আইসিটি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা নাহিদ ইসলাম। যিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নম্বর সমন্বয়ক ছিলেন। নাহিদের পর উপদেষ্টা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে পারেন আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। যিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে অথবা অক্টোবরের শেষে পদত্যাগ করতে পারেন। তবে পদত্যাগ ইস্যুতে নাহিদ ইসলাম বৃহস্পতিবার বলেছেন, পদত্যাগের সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। যদি হয় তাহলে আমরা নিজেরাই বলবো।

নতুন দলে পরিচিত একজন রাজনৈতিক মুখকে নিয়ে আসতে চাইছেন ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। সে লক্ষ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে। গ্রহণযোগ্য এমন কাউকে পাওয়া গেলে দলের নেতৃত্বে আনা হতে পারে তাকে।
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ছাত্রদের নতুন দলের নাম চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে আগামী সপ্তাহে অনলাইন ও অফলাইনে গণমানুষের মত নেয়া হবে। মানুষের দেয়া নাম ও নিজেদের প্রস্তাবনা থেকে দলের নাম চূড়ান্ত করা হবে। এক্ষেত্রে নতুন দলের নামেও জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের প্রতিফলন রাখতে চান ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। এ ছাড়া গঠনতন্ত্রের বিষয়টিও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করে এটি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রেও জুলাই-আগস্টের চেতনাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দল গঠনের আগে দেশব্যাপী নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক কমিটি দেয়া হচ্ছে। প্রতিদিনই একাধিক উপজেলা কমিটি গঠন করে দল গোছানোর চেষ্টায় রয়েছেন তারা। কমিটিগুলো নিজ নিজ এলাকায় দল গঠনের বিষয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর লক্ষ্যে হচ্ছে সভা-সমাবেশ।

দল গঠনের মূল প্রক্রিয়ায় উপদেষ্টা মাহফুজ আলম, নাহিদ ইসলাম, নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, মুখপাত্র সামান্তা শারমিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় আছেন। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, মুখ্য সংগঠন সারজিস আলম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ, সদস্য সচিব আরিফ সোহেল ও মুখ্য সংগঠক আব্দুল হান্নান মাসউদও দল গঠন প্রক্রিয়ায় কাজ করছেন।

নতুন দলের বিষয়ে লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানিয়েছেন ছাত্রদের দল করা দরকার। কারণ, রক্ত দিয়ে তারা যেগুলো অর্জন করেছে, সেগুলো তাদেরকে রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় সেগুলো সেই সব ব্যক্তি নিয়ে যাবে, যারা বিগত প্রশাসন ও অন্যান্যের মতো সবকিছুর পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ খুঁজছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে হয়তো তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এটাও একটা বিপদ। কারণ, রাজনীতি শুরু করলে সব ধরনের রাজনীতিবিদ তাদের সঙ্গে মিশে যাবে। তাই আমরা জানি না তারা আমাদের দেশে যে রাজনীতি, তা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে কি-না। এ ধরনের সুযোগ আছে, যা আমাদের নিতে হবে। তবে ছাত্ররা প্রস্তুত। তারা প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেশ জুড়ে লোকজনকে সংগঠিত করছে। তিনি বলেন, তরুণরা সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের খারাপ কোনো কিছুর সঙ্গে সংস্পর্শ নেই বা নিজেদের রাজনৈতিক আখের গোছানোর ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নেই। তারা এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল গঠন করছে বা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এটা দরকার।

প্রধান উপদেষ্টা নতুন দল নিয়ে যে আশার কথা বলেছেন, নতুন দলের উদ্যোক্তারাও এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। জাতীয় নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এ বিষয়ে বলেন, আমরা একটা মধ্যমপন্থি রাজনীতির কথা বলছি। এটাই আমাদের আদর্শ হবে। আমরা বাম-ডান এমন যে বিভাজন আছে সেগুলোতে ঢুকতে চাই না। আমরা বাংলাদেশ প্রশ্নে এক থাকতে চাই। ইসলাম ফোবিয়ার রাজনীতি অথবা উগ্র ইসলামপন্থি বা উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মধ্যেও আমরা নেই।

আমরা জনগণের কাছে গিয়ে যে ধারণা পেয়েছি এবং বিভিন্ন জরিপেও একটা নতুন দলের আকাঙ্ক্ষা আছে জনগণের মধ্যে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দীর্ঘসময় ধরে ক্ষমতায় ছিল। তাদেরকে মানুষ দেখেছে। কিন্তু এর বাইরে গিয়ে জনগণের একটা বিশাল অংশ আছে, যারা নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভাব দেখতে চায়। সে জায়গা থেকে আমরা মনে করি আমাদের দল গঠিত হলে সেটা জনসমর্থন পাবে। ধীরে ধীরে আমরা একটা বড় দল হতে পারবো।

ওদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক দল কী করবে এই প্রশ্নও সামনে এসেছে। বিশেষ করে ছাত্রদের সমর্থনে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকার মধ্যে ছাত্ররা নতুন দল গঠনে সরকারের আনুকূল্য পাবে এবং ক্ষমতার ছায়ায় এটি কিংস পার্টির মতো হতে পারে- এমনটাও কেউ কেউ বলছেন। বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে কিছু দলকে নিয়ে রাজনৈতিক মোর্চাও করতে পারে নতুন দল। এক্ষেত্রে ইসলামপন্থি একটি দলের বড় ভূমিকা থাকতে পারে। অনেকে বলছেন, সামনে পরিস্থিতি ক্ষণে ক্ষণে বদলাবে। ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নতুন দলের অবস্থান কী হবে তা নির্বাচনের আগের পরিস্থিতিই নির্ধারণ করে দেবে।

mzamin

ট্রাম্পের শুল্ক নীতি, ঝুঁকিতে এশিয়ার শেয়ার বাজার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতিতে এশিয়ার শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। কানাডা, মেক্সিকো ও চীনের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পর সোমবার সকালে এশিয়ার শেয়ার বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। শেয়ারের দামে পতন হয়েছে বলে জানাচ্ছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য বাণিজ্য যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এশিয়ার প্রধান কোম্পানিগুলোর আয়ে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি। এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা ও মেক্সিকো। অন্যদিকে ‘পাল্টা প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা’ নেয়ার কথা জানিয়েছে চীন। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ট্রাম্পের পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করার প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে বেইজিং। এর আগে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসন এবং মাদক চোরাকারবারি বন্ধ করতে শুল্ক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়।

তবে শুল্ক আরোপের ফলে এশিয়ার শেয়ার বাজরে বিরাট পরিবর্তন শুরু হয়েছে। সবগুলো সূচকই নিম্নগামী। বিবিসি বলছে, হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ১ দশমিক ৩ শতাংশ, জাপানের নিক্কেই ২২৫ এর সূচকও ২ দশমিক ৪ শতাংশের নিচে ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার কোম্পির ৩ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ এর ১ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

পক্ষান্তরে মার্কিন ডলারের উল্লম্ফন হয়েছে। চীনের ইউয়ারে বিপরীতে ডলারের অবস্থান রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে কানাডিয়ান ডলার ২০০৩ সালের পর সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে।

আর্থিক পরিষেবা প্রতিষ্ঠান কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম বলেছেন, বিশ্বের দুটি বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্য বিরোধের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। ট্রাম্পের পরবর্তী শুল্ক আরোপের তালিকায় কোন কোন দেশ রয়েছে এ নিয়েও বেশ উদ্বিগ্ন বিনিয়োগকারীরা।

সপ্তাহান্তে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক শুল্ক নীতি যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে এখানেই ক্ষান্ত হবেন না বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প। ইতিমধ্যেই ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। তবে ট্রাম্পের এই নীতির গভীর সমালোচনা করেছেন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক স্যাক্সোর প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা। সতর্ক করে তিনি বলেছেন, এভাবে শুল্ক আরোপ স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে খোদ আমেরিকাকেই ঝুঁকিতে ফেলবে।

প্রসঙ্গত, গত শনিবার কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। চীনের ওপর দিয়েছেন ১০ শতাংশ। এতে তিন দেশই প্রতিশোধমূলক পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। যা বিশ্বে বাণিজ্য যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন এতে বিনিয়োগকারীরা বেশ বিপাকে পড়বেন।

mzamin

বাংলাদেশের ডুবোটেক কি আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে পারবে by মো. জান্নাতুল নাঈম

গুগল, ফেসবুক, রেডিট কিংবা স্ন্যাপচ্যাটের মতো বিখ্যাত উদ্যোগগুলোর মধ্যে একটা মিল আছে, বলুন তো কী? সব কটিরই জন্ম হয়েছিল ক্যাম্পাসে। ক্লাসের প্রজেক্ট কিংবা গবেষণা প্রকল্পের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছিল এমন সব আইডিয়া, যা এখন সারা দুনিয়ায় ‘রাজত্ব’ করছে।

ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন পরে পুরোদস্তুর স্টার্টআপ বা ব্যবসা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, বাংলাদেশে এমন নজির কম। তাই ‘ডুবোটেক’-কে ব্যতিক্রম বলা যায়। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গুটিকয় শিক্ষার্থীর হাত ধরে ‘ব্র্যাকইউ ডুবুরি’ নামের একটি প্রকল্পের মধ্য দিয়ে শুরুটা হয়েছিল। ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে সেটি এখন স্টার্টআপ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। স্বয়ংক্রিয় রোবট দিয়ে নদী বা সমুদ্রতলে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন তাঁরা। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গড়া এই দল দেশের বড় বড় জাহাজ কোম্পানিকে সেবা দিতে শুরু করেছে। বড় বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার স্বপ্ন দেখছে।

শুরুটা হয়েছিল যেভাবে

২০১৭ সালের কথা। রোবোটিকসে আগ্রহী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়জন শিক্ষার্থী একটা বিজ্ঞান প্রকল্প নিয়ে ভাবছিলেন। রোবট বানিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াই ছিল প্রাথমিক পরিকল্পনা। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সকার বট (রোবট গাড়ি দিয়ে ফুটবল খেলা বা গোল দেওয়া), লাইন ফলোয়িং বট (একটি নির্দিষ্ট লাইন অনুসরণ করে রোবটের চলা) বানানোর চল ছিল বেশি। কিন্তু এই দলের সদস্যরা ভাবছিলেন, একটু ভিন্ন কী করা যায়?

ডুবোটেকের চেয়ারম্যান ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সায়ন্তন রায় বলেন, ‘বাংলাদেশ নদী ও সাগরের দেশ। তাই পানি নিয়ে কাজ করার কথা আমাদের ভাবনায় ছিল। প্রথমে পানির মান নির্ণয় করতে চেয়েছি। একটু খোঁজখবর নিয়ে দেখি, অনেক দেশেই তখন পানির নিচের বিভিন্ন কাজে রোবট অবদান রাখছে। উদ্ধার অভিযান থেকে শুরু করে সম্পদের খোঁজ ও সংরক্ষণ, অনেক কিছুই করার আছে। বুঝলাম, এ নিয়ে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে।’

কয়েকটি প্রতিযোগিতায় ভালো ফলের সুবাদে কিছু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এসব শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। বন্দর ও সাগরে গবেষণাকাজের প্রস্তাব দেয়। তবে নৌদুর্ঘটনায় উদ্ধার অভিযানের সমস্যাগুলো দলটিকে বেশি উদ্বুদ্ধ করে। কারণ, প্রথাগত উপায়ে ডুবুরি দিয়ে নৌকাডুবি, লঞ্চডুবির উদ্ধারকাজে অনেক বেগ পেতে হতো।

ব্র্যাকইউ ডুবুরিরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পে থেমে না থেকে বড় পরিসরে একটা কোম্পানি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা করতে থাকেন। ২০২৩–এর শেষের দিকে রোবোসাবে (পানির তলে স্বয়ংক্রিয় রোবটের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা) দ্বিতীয় হন তাঁরা। সফটওয়্যারকেন্দ্রিক প্রযুক্তির জন্য মেলে সেরা উদ্ভাবক দলের স্বীকৃতি।

এরপর সেন্ট মার্টিন, কাপ্তাইয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ডুবোটেকের রোবট কাজ করতে শুরু করে। সরাসরি অর্ডার নেওয়ার মাধ্যমে শুরু হয় কোম্পানির যাত্রা।

বর্তমানে পানির নিচের উদ্ধার অভিযান, জাহাজের নিচের অংশের কাঠামো ও জাহাজের অবস্থা পরিদর্শন (ইন্সপেকশন), পানির নিচে সামুদ্রিক ও জীবতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজ চলমান। সমুদ্রে প্লাস্টিকের পরিমাণ নির্ধারণ, প্রবাল বা মাছের জীবনযাত্রায় জাহাজ বা কোনো প্রযুক্তি প্রভাব ফেলছে কি না, এসব নিয়ে কাজ করা দলগুলোকেও সাহায্য করে ডুবোটেক।

সায়ন্তন রায় বলেন, ‘যেহেতু এটা ডিপ টেক ও আমরা অত্যাধুনিক প্রযুক্তিপণ্য নিয়ে কাজ করি, তাই তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতা কম। এই খাতে বিশ্বের বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা কাজ করছি।’

হিলশা, টুনা ও অক্টোপাস

গত বছর মার্চে ‘শার্ক ট্যাংক’ নামের একটি রিয়েলিটি শো থেকে বড় বিনিয়োগ পায় ডুবোটেক। নিজেদের অর্থ দিয়ে কোম্পানি দাঁড় করালেও এই বিনিয়োগ কোম্পানির কার্যক্রমকে ত্বরান্বিত করে।

বর্তমানে ডুবোটেক তিনটি হার্ডওয়্যার পণ্য তৈরি করে। পণ্যের নামগুলোও সমুদ্রকেন্দ্রিক। ‘হিলশা’ হলো পানির নিচের স্বয়ংক্রিয় যান, এটি মূলত গবেষণা ও উন্নয়নকাজে ব্যবহৃত হয়। ‘টুনা’ ও ‘অক্টোপাস’ হলো দূরনিয়ন্ত্রিত যান (রিমোটলি অপারেটেড ভেহিক্যাল বা আরওভি)। সোজা বাংলায়, দূর থেকে এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ছবি তোলা ও সামুদ্রিক প্রাণবিষয়ক গবেষণা কাজ করে ‘টুনা’। ‘অক্টোপাস’ ব্যবহৃত হয় জাহাজ পরিদর্শনের কাজে।

ডুবো ওএস ও ইন্সপেক্টর নামের দুটি সফটওয়্যার দিয়ে এসব রোবট পরিচালনা করা হয়।

ডুবোটেকের কার্যক্রম নিয়ে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাইম হোসেন বলেন, ‘আমাদের রোবট ইতিমধ্যে চট্টগ্রামের মেরিটাইম শিল্পের ভোক্তাদের সেবা দিয়েছে। একটি বড় কোম্পানির সঙ্গেও অংশীদারত্ব হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় ১২ হাজার ডলার রাজস্ব এসেছে। এতটুকু বলা যায়, গত বছরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমাদের সব লক্ষ্যই পূরণ হয়েছে। সামনে ‘টুনা’ রোবটের মডেল বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করতে চায় ডুবোটেক।’

আরও অর্জন

সম্প্রতি গ্লোবাল স্টুডেন্ট এন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাওয়ার্ডসের (জিএসইএ) বাংলাদেশ পর্বে জয়ী হয়েছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী ও ডুবোটেক লিমিটেডের সহপ্রতিষ্ঠাতা সৌমিক হাসান। পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন ও উদ্যোগে উৎসাহ দিতে প্রতিবছর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অর্গানাইজেশন। জিএসইএয়ের নবম আসরের গ্র্যান্ড ফিনাল অনুষ্ঠিত হয় গত ২২ জানুয়ারি। বিজয়ী সৌমিক এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে লড়বেন আগামী ১০ মার্চ। মে মাসে দক্ষিণ আফ্রিকায় হবে ফাইনাল।

সৌমিক হাসান বলেন, ‘কীভাবে স্টার্টআপ গড়েছি, কোম্পানির কাঠামো কেমন, কীভাবে আমরা এগোচ্ছি, শিক্ষার্থী অবস্থায় কীভাবে এ রকম কোম্পানির খোলা যায়, এই গল্পগুলো বৈশ্বিকভাবে উপস্থাপন করার মঞ্চই জিএসইএ। সেই ভাবনা থেকেই অংশ নেওয়া।’

বৈশ্বিক অনেক দেশের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতেও এসব মঞ্চ সাহায্য করতে পারে বলে মনে করেন সৌমিক। বললেন, ‘ভারত ও শ্রীলঙ্কারও বন্দর আছে। তাই এ দুটি দেশে আমাদের বড় বাজার আছে। একসঙ্গে কাজ করেই ওই বাজারে ঢোকা সম্ভব। স্থানীয় প্রযুক্তিকে বাইরে নেওয়াই আমাদের এখনকার পরিকল্পনা।’

পরামর্শক যা বলছেন

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. খলিলুর রহমান। ব্র্যাকইউ ডুবুরি ও ডুবোটেক, দুটোর যাত্রাতেই পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। বললেন, ‘প্রথমত, বিদেশে কিন্তু এই চর্চাটাই হয়। উচ্চশিক্ষায় এসে শিক্ষার্থীরা নতুন কিছু তৈরি করে। ধীরে ধীরে সেটা পণ্য হিসেবে শিল্প খাতে যুক্ত হয়। দ্বিতীয়ত, শিল্প খাতকে সাহায্য করে শিক্ষার্থীরা। ধরুন, একটা প্রুফ অব কনসেপ্ট তৈরি করা দরকার। নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে তারা পারছে না। তখন কোম্পানি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে আসে। নিজেদের সরঞ্জাম, কাঠামো বা অন্য রিসোর্স দিয়ে সেই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটা হলো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ল্যাবের কাজের প্রক্রিয়া।’

অধ্যাপক খলিল মনে করেন, ডুবোটেক যে খাত নিয়ে কাজ করছে, সে খাতে বিশাল বাজার অপেক্ষা করছে। তিনি বললেন, ‘বিদেশের বিভিন্ন দেশে আমাদের শিক্ষার্থীরা অনেক দিন ধরেই নানা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। অনেকে প্রশ্ন করে, এত বড় দল নিয়ে বিদেশে গিয়ে নাসা বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রোবট বানিয়ে লাভ কী? এই হলো সেই লাভ। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে এসে আমরা যে রকম কোম্পানি তৈরি করেছি, এমন কোম্পানি বিশ্বে খুব বেশি নেই। যদি ওই প্রতিযোগিতাগুলোয় না যেতাম, এসব প্রযুক্তি কখনোই আমরা আনতে পারতাম না।’

আপাতত দেশে কাজ করলেও ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে চায় তরুণ দলটি। রোবট তৈরি ও রোবটের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার সক্ষমতা তো আছেই, এখন শুধু মানোন্নয়ন করে এগিয়ে যাওয়াই লক্ষ্য।

ডুবোটেকের তৈরি দুই ডুবোযান
ডুবোটেকের তৈরি দুই ডুবোযান। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকায় স্কুলছাত্রীকে ‘হাত-পা বেঁধে ধর্ষণ’, রিকশায় করে নিয়ে লাশ ফেলা হয় হাতিরঝিলে by আসাদুজ্জামান

রাজধানীর দক্ষিণখানের একটি স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত মেয়েটি। মা–বাবার কাছে কেনাকাটার কথা বলে বাইরে বেরিয়েছিল সে। পরে আর বাসায় ফেরেনি। আজ রোববার হাতিরঝিল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবক পুলিশকে জানিয়েছেন, হাত–পা বেঁধে পাঁচজন মিলে ধর্ষণের পর ওই কিশোরীকে হত্যা করেন তাঁরা।

ওই কিশোরী নিখোঁজ হয় গত ১৬ জানুয়ারি। পরে ১৯ জানুয়ারি দক্ষিণখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ তারিখে একটি মামলা করেন তিনি। এরপর কিশোরীটির মুঠোফোন নম্বরের সূত্র ধরে ৩০ জানুয়ারি রবিন নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে রাব্বি মৃধা নামের আরও এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়।

দুজনকে গ্রেপ্তারের পর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে হাজির করা হয়। দুই দিন রিমান্ডে নিয়ে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুমতি দেন আদালত। এরপর রবিন ও রাব্বিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তাঁরা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন, পাঁচজন মিলে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করেন। এতে তাঁর মৃত্যু হলে মরদেহ হাতিরঝিলে ফেলে দেওয়া হয়।

রাব্বি ও রবিনের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরে আজ হাতিরঝিল থেকে ওই কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মেয়েটিকে হত্যার দায় স্বীকার করে আজ আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন রবিন ও রাব্বি মৃধা। সন্ধ্যায় তাঁদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উত্তরা বিভাগের সহকারী কমিশনার (দক্ষিণখান জোন)  মো. নাসিম এ-গুলশান প্রথম আলোকে বলেন, ফেসবুকের মাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীর সঙ্গে রবিনের পরিচয় হয়। পরে তাকে মহাখালীর একটা বাসায় নিয়ে ধর্ষণ করে হত্যা করেন রবিনসহ পাঁচজন। ধর্ষণের সময় কিশোরীটির হাত-পা বাঁধা এবং মুখে কাপড় গোঁজা ছিল। হত্যাকাণ্ডে জড়িত অপর তিনজনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

যেভাবে হত্যা করা হয়

হত্যাকাণ্ডের শিকার কিশোরীর বাবা ও মামলার কাগজপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই কিশোরীর বাবা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরিবার নিয়ে থাকেন রাজধানীর দক্ষিণখানে। ১৬ জানুয়ারি বেলা দুইটার দিকে সে মা–বাবাকে বলেছিল, জরুরি কেনাকাটা করে দ্রুত বাসায় ফিরবে। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও ফেরেনি।

কিশোরীটির বাবা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মেয়ে সেদিন দুপুরে বেরিয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যা হয়ে গেলেও বাসায় ফেরেনি। তখন আমি আত্মীয়স্বজনসহ সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করি। কিন্তু মেয়ের খোঁজ না পেয়ে তিন দিন পর দক্ষিণখান থানায় একটি জিডি করি।’

মেয়েটির বাবা আরও বলেন, ‘আমার যে মেয়েটি স্কুলে যেত, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করত, আজ সে লাশ হয়ে বাসায় ফিরেছে। যারা আমার মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

এ বিষয়ে দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তাইফুর রহমান মির্জা প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়েটির বাবা থানায় জিডি করার পর গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত শুরু করি। অনেক জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে মেয়েটির সন্ধান না পেয়ে তার মুঠোফোনের সিডিআর (ফোনকলের বিস্তারিত তথ্য) জোগাড় করি। সেখানে একটি সন্দেহজনক নম্বর পাই। সেটিই ছিল রবিনের মুঠোফোন নম্বর।’

রবিনের মুঠোফোনের সূত্র ধরে কীভাবে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটিত হলো, সে বিষয়ে তদন্ত তদারক কর্মকর্তা মো. নাসিম এ-গুলশান প্রথম আলোকে বলেন, রবিনের মুঠোফোন নম্বরের সিডিআর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কিশোরীটির সঙ্গে ঘটনার দিনই (১৬ জানুয়ারি) তাঁর প্রথম কথা হয়েছিল। রবিনের মুঠোফোনের সূত্র ধরে মহাখালীর একটি বাসার সন্ধানও পাওয়া যায়। এর মধ্যে গাজীপুর থেকে রবিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর রাব্বিকেও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রথমে দুজনের কেউই কিশোরীর বিষয়ে তথ্য দিচ্ছিলেন না। পরে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তাঁরা হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানান।

সহকারী কমিশনার নাসিম এ-গুলশান আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে রবিন স্বীকার করেন, কিশোরীটিকে ‘ফাঁদে ফেলে’ সেদিন দুপুরে মহাখালীর একটি বাসায় নিয়ে যান তাঁরা। এরপর তার হাত–পা বেঁধে ফেলেন। মুখে গুঁজে দেন কাপড়। তারপর পাঁচজন মিলে তাকে ধর্ষণ করেন। একপর্যায়ে কিশোরীটি অচেতন হয়ে পড়ে। পরে সে মারা গেলে লাশ গুম করার পরিকল্পনা করা হয়।

পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিশোরীটিকে হত্যা করার পর মরদেহ বস্তাবন্দী করা হয়। এরপর ১৬ জানুয়ারি ঘটনার দিন মধ্যরাতেই মহাখালী থেকে রিকশায় করে মরদেহ হাতিরঝিলের পুলিশ প্লাজার সামনের সেতুতে নিয়ে আসেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। মরদেহটি সেতু থেকে হাতিরঝিলে ফেলে দেন রবিন। এরপর যে যার বাসায় চলে যান।

সহকারী কমিশনার (দক্ষিণখান জোন) মো. নাসিম এ-গুলশান জানান, আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবিন পেশায় একজন গাড়িচালক। রাব্বি মৃধারও নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। অভিযুক্ত অন্য তিনজনও রবিনের পূর্বপরিচিত।

কিশোরীটির বাবা আজ সন্ধ্যা সাতটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল, মেয়েটি লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হবে। কিন্তু এই সন্ধ্যার সময় আমি মেয়েকে কবরে শুইয়ে দিচ্ছি। আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী প্রত্যেককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যাতে আর কোনো মেয়ে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার না হয়।’

কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনায় এই দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আজ হাতিরঝিল থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে
কিশোরীকে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে হত্যার ঘটনায় এই দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আজ হাতিরঝিল থেকে কিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ছবি: প্রথম আলো

সাক্ষাৎকার: বিদ্যমান সংবিধান এক ব্যক্তির শাসনের পথ তৈরি করেছে -আলী রীয়াজ

আলী রীয়াজ। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কমিশনগুলোর অন্যতম সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। ইতিমধ্যে সংস্কার নিয়ে তার কমিশন প্রধান উপদেষ্টাকে একটি প্রস্তাবনাও দিয়েছে। যে প্রস্তাবনার আলোকে আলোচনা হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের মধ্যে। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনাগুলোর যৌক্তিকতা কী, আগের সংবিধানে গলদ কোথায় ছিল- এসব বিষয়ে কথা বলেছেন ‘জনতার চোখ’-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকারের চুম্বক অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।

প্রশ্ন: দেশের নাম পরিবর্তন করে জনগণতন্ত্রী বাংলাদেশ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। সংবিধান সংস্কার কমিশন কেন এটি পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করছে?
আলী রীয়াজ: দু’টো কারণে। এক নম্বরে রিপাবলিক শব্দের বাংলা ‘প্রজাতন্ত্র’ বলে আমাদের কাছে সঠিক মনে হয় না। প্রজা কথাটার মাঝে এক ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব আছে। আর ইংরেজি নামটা হচ্ছে পিপলস রিপাবলিক। সেই ক্ষেত্রে আমরা জনগণের কথাটা আগে আনতে চেয়েছি। তদুপরি বাংলাদেশের ইতিহাস যদি আপনি দেখেন, ১৯৬৯ সালে যখন প্রথম বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলা হয় তখন কিন্তু ‘জনগণতান্ত্রিক স্বাধীন পূর্ব বাংলা’র কথাই বলা হয়েছে। আমরা যেটা প্রস্তাব করেছি সেটার ভিত্তি হচ্ছে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
প্রশ্ন: জাতি হিসেবে বাঙালি কেন পরিবর্তন করতে বলছে কমিশন?
আলী রীয়াজ: জাতি হিসেবে সবাই বাঙালি হওয়া তো অবাস্তব। সকলকে আপনি বাঙালি বানানোর চেষ্টা করছেন কেন? এটার মধ্যে এক ধরনের জাতিবাদী চেতনা থাকে- যে আমাদের সবাইকে বাঙালি হতে হবে। বাংলাদেশ একটা বহুজাতিক দেশ। এখানে বহু জাতি, বহু ধর্ম, বহু ধরনের মানুষ আছে। আমরা কেউ সমতলে থাকি, কেউ পাহাড়ে থাকি। আমরা এক ধরনের বিশ্বাসের মধ্যে থাকি। কিন্তু জাতিগতভাবে বড় জাতির পরিচয় চাপিয়ে দেয়া তো অগ্রহণযোগ্য। আমরা কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে যে পরিচয় বিদ্যমান সংবিধানে আছে তাই রেখেছি। আমরা বলছি যে, জাতি হিসেবে যিনি চাকমা, মারমা, গারো, তারা কিন্তু বাঙালি না। তাহলে সাংবিধানিকভাবে জোর করে আপনি বাঙালি বলছেন কেন? আমরা মনে করি, সেটা সঠিক নয়। আমাদের অংশীজনরা যারা এসেছেন তারাও এটা বলেছেন। এটা সঠিক নয়। আমরা নাগরিকের পরিচয় নিয়ে কোনো প্রশ্নই তুলিনি, এটা আমাদের পরামর্শও নয়। সেটা সংবিধানে সঠিক আছে- বাংলাদেশের নাগরিকরা বাংলাদেশি বলে পরিচিত হবেন।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ বাদ দেয়া কেন জরুরি বলে মনে করছেন, আর বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য কী?
আলী রীয়াজ: আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে যেতে চেয়েছি। আমাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে- প্রথম সংবিধান যেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। সেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার। আমরা মনে করি, এটাই রাষ্ট্রের মূলনীতি হওয়ার কথা ছিল। ১৯৭২ সালে এটাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এটা আমাদের কাছে মনে হয়েছে অগ্রহণযোগ্য। দ্বিতীয়ত আপনি যদি দেখেন যে, চারটা মূলনীতির কথা বলা হয়েছে- গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রের কথা। এ চার নীতি প্রকৃতপক্ষে একটি দলীয় নীতি। সেটাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবর্তন করা হয়। এটার উদাহরণ হচ্ছে এই যে, বাংলাদেশের সংবিধান লেখা শেষ হওয়ার আগেই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে বলা হচ্ছিল এগুলো চারটি মূলনীতি। তখনো কিন্তু ড্রাফটিং হয়নি। তাছাড়া এই চার নীতি যে আদর্শের লক্ষ্য সেটা হচ্ছে মুজিববাদ। সেই মুজিববাদের পরিণতি কী হয়েছে আমরা জানি। একবার যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে একদলীয় ব্যবস্থা ও এক ব্যক্তিতান্ত্রিক একটা স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে গেছি। সে সময় এক নেতায় এক দেশে পরিণত করা হয়েছিল। আবার আওয়ামী লীগের সেই চার নীতির ভিত্তিতে একটা স্বৈরতন্ত্রের মধ্যে গেছি। আবার দেশে একনায়কতান্ত্রিক একটা শাসনব্যবস্থা তৈরি হয়। মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। তাহলে সংবিধানের এগুলো রাখার কোনো যৌক্তিকতা আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। এখানে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নটা অনেকেই তুলছেন। আমরা প্রস্তাব করেছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে ভিত্তি, তিনটাকে আমরা যুক্ত করতে বলেছি। আমরা চতুর্থ প্রস্তাবে বলেছি গণতন্ত্রের কথা। কারণ গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার জন্যই বাংলাদেশের মানুষ লড়ে যাচ্ছে। গত ১৬ বছর লড়েছে, অতীতে লড়েছে। আর যেটা বলেছি বহুত্ববাদের কথা। কারণ বাংলাদেশ প্রকৃতপক্ষে একটা বহু জাতের সমাজ। এটা বলার মধ্যদিয়ে যেটা হয় সেটা হচ্ছে ধর্মের বাইরেও আমরা চলে যাচ্ছি। একটি ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন রকমের জাত-পাত আছে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, বহুত্ববাদী সমাজ সমস্ত ভিন্নতাকে ধারণ করতে পারে। শুধু ধারণ করে না, সম্মানের সঙ্গে ধারণ করে। কেউ যেন রাষ্ট্রের চোখে অসমভাবে বিবেচিত হতে না পারে। আমরা বলছি- আমাদের দ্বিতীয় মূল আদর্শ মানবিক মর্যাদা। তাহলে মানবিক মর্যাদাকে আমরা যেন আরও বিশালভাবে দেখতে পারি। সকলকে যেন অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। সেটা শুধু ধর্মের ভিত্তিতে নয়, জাতির ভিত্তিতে, সংস্কৃতির ভিত্তিতে। হিন্দু ধর্মের মধ্যেও তো বিভিন্ন রকম জাত-পাত আছে। ইসলাম ধর্মের মধ্যে বিভিন্ন রকম মাযহাব আছে। তাহলে সবকিছুকে আমরা ধারণ করতে চাই। বাংলাদেশের মধ্যে এটা শত শত বছর ধরে আছে। আমরা বলছি যে, আসুন সবাইকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়ে এক ছাতার নিচে নিয়ে আসি। রাষ্ট্র সকলকে সমান মর্যাদায় যেন অভিষিক্ত করতে পারে।
প্রশ্ন: মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে ভোটাধিকার, ইন্টারনেট ও তথ্য প্রাপ্তি, ভোক্তা সুরক্ষা, গোপনীয়তাসহ বেশ কিছু বিষয় যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।
আলী রীয়াজ: গণতান্ত্রিক সমাজে ভোটের অধিকার হচ্ছে একটা মৌলিক অধিকার। খুব বিস্ময়কর যে, এখনকার বিদ্যমান সংবিধানে সেটা নাই। আমরা দেখেছি এই মৌলিক অধিকারটা কীভাবে লুণ্ঠিত ও লাঞ্ছিত হয়েছে। আমরা যে আদালতে গিয়ে বলবো যে, আমার অধিকার লুণ্ঠিত হয়েছে। আমার অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছে। আদালত যদি এটা আমাকে বলতো যে, এই অধিকার তো আপনার ছিলই না। আমরা মনে করি ভোটাধিকার একটা নাগরিকের থাকতেই হবে। রিপাবলিক যদি আপনি তৈরি করেন সেখানে অধিকারটা থাকতেই হবে। ইন্টারনেট ও তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের কথা আমরা বলছি এই কারণে যে, আজকের যুগে তথ্যপ্রাপ্তির একটা বড় জায়গা হচ্ছে ইন্টারনেট। বেশিদিন আগের কথা না, এই জুলাই মাসে কী পরিস্থিতি হয়েছিল সেটা কি আমরা জানি না। সারা পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে এখানে একটা নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। এগুলো তো অধিকার মানুষের। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংবিধানেও আপনি যদি দেখেন এগুলোকে একেবারে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। একটা গণতান্ত্রিক সমাজের নাগরিক হিসেবে এগুলো আমাদের পাওয়ার কথা।
প্রশ্ন: নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ন্যূনতম বয়স ২৫ থেকে কমিয়ে ২১ করার প্রস্তাব করেছেন, এটি কি খুব আরলি হয়ে যাচ্ছে? আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে এটা করা হয়েছে কি-না?
আলী রীয়াজ: কাউকে সুবিধা দেয়ার জন্য এটি করা হয়নি। বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফির দিকে তাকান দেখবেন বিশাল সংখ্যক তরুণ। তাদের কীভাবে রাজনীতিতে আনবেন। তাদের কণ্ঠস্বর কি শুধু রাজপথেই থাকবে না সংসদেও আসবে। আমরা সেই পথটা আনতে চাচ্ছি। আমরা চাচ্ছি তাদের যেন প্রতিবার রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবির কথা বলতে না হয়। জুলাই মাসের আন্দোলনেও সমাজের অন্যান্য মানুষের সঙ্গে বেশির ভাগ তরুণ মাঠে নেমে এসেছেন। তারা নেতৃত্ব দিয়েছেন। ১৯৯০-এর আন্দোলনেও একই বিষয় ছিল। তাদের সেই কণ্ঠস্বর কি শুধু রাজপথে থাকবে, কেন তারা আইন প্রণয়নে যুক্ত হতে পারবে না। তাদের আইন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত করুন। কারণ ভবিষ্যৎ রাজনীতিটা তারাই করবে। কোন ধরনের দেশ তারা দেখতে চান তাদের সেই জায়গাটা তৈরি করে দিতে হবে। স্থায়ীভাবে বলার জায়গাটা করে দিতে হবে। এর মানে তো এমন না যে, ৩০০ আসনে সবাই ২১-২২ বছর বয়সে নির্বাচন করবেন। আমরা কেবল পথটা তৈরি করে দিতে চেয়েছি। যেন তরুণদের অংশগ্রহণটা নিশ্চিত করা যায়। রাজনৈতিক দলের কাছেও আমাদের আহ্বান থাকবে যে আপনাদের এক দশমাংশ পারলে তরুণ দেন। যেন তরুণদের অংশগ্রহণের একটা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকে। আমরা আশা করছি, রাজনৈতিক দলগুলো এটা বিবেচনায় নেবে। বিশেষ কারও পক্ষপাতের ব্যাপার নেই। কে সংসদে আসবে- সেটা জনগণ নির্ধারণ করবে।
প্রশ্ন: আইনসভার স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি বিরোধী দল থেকে মনোনীত করার প্রস্তাব করেছেন। বাস্তবায়ন কতোটুকু সম্ভব বলে মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আমরা আশাবাদী। করবেনই এমন মনে করার কারণ নেই। কারণ শেষ পর্যন্ত সরকার আলোচনা করবেন, রাজনৈতিক দলগুলোও এ বিষয়ে তাদের মত দেবে। তবে এটার উদ্দেশ্য হচ্ছে জবাবদিহিতা। স্থায়ী কমিটিগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন বিষয়ে নজরদারি করে। আমরা দেখেছি এ নজরদারিটা নেই। সেটি গত বছরগুলোতেই নয়, আমরা যদি দেখি একেবারে শুরু থেকেই ছিল না। আমাদের সংবিধানে এতটা শক্তিশালী বিষয় নেই যে, কমিটিগুলো নজরদারি করবে। তাই আমরা নজরদারির কথা বলেছি। একটা স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় সরকারের তো কোনো বিষয় লুকানোর কথা না। তাদের প্রতিনিধিও তো থাকবেন। তারা চাইলে সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোর প্রধানদের ডাকতে পারবেন। এ ছাড়া সারা পৃথিবীতে যেখানে ওয়েস্ট মিনিস্টার স্টাইলে সরকার আছে সেখানে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসসি) সব সময় বিরোধী দলের হয়। এর মূল কারণ হচ্ছে যাতে করে সরকারের ওপর একটি নজরদারি ব্যবস্থা থাকে। আমরা এ নজরদারি বাড়াতে চাচ্ছি।
প্রশ্ন: অর্থ বিল ছাড়া অন্যসব বিলে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়ার প্রস্তাব রেখেছেন।
আলী রীয়াজ: বাংলাদেশের সংবিধানে যে ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। বৃটেনে দেখেন সর্বশেষ কতোজন প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরে যেতে হয়েছে। দল ক্ষমতায় আছে কিন্তু ব্যক্তি সরে যেতে হয়েছে। কারণ সে সব দেশে ঐরকম ব্যবস্থা তারা গড়ে তুলেছে। আমাদের সংবিধানের আর্টিকেল ৭০-এ সে রকম ব্যবস্থা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। এ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের তাদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অপসারণ মানেই তো সে দল ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া নয়। কনজারভেটিভ পার্টির প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ২/৪ জন চলে গেলেন। কিন্তু দল ক্ষমতায় থেকেছেন। আমরা জবাবদিহিতার জায়গা থেকে এটা অপসারণের জন্য বলেছি। প্রধানমন্ত্রীকে জবাবদিহিতার আওতায় থাকতে হবে, এমনকি তার নিজ দলের কাছেও জবাবদিহি থাকতে বাধ্য হবে। বাজেটের বিষয়টা পুরোপুরি লোয়ার হাউজের, কোনোভাবেই এটা আপার হাউজে যাবে না। জনগণকে কোনোভাবেই জিম্মি করা যাবে না। একটা দল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় আছে। কিন্তু তার কিছু সদস্য বাজেটের বিপক্ষে ভোট দিলো তাহলে তো বাজেট আটকে যাবে। জনগণ ভোগান্তির শিকার হবে। তাই এক্ষেত্রে আমরা বলেছি, না অর্থ বিলে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেয়া যাবে না।
প্রশ্ন: উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের ক্ষেত্রে নানা প্রস্তাবনা থাকলেও সংখ্যালঘু এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য কোনো সংরক্ষিত আসনের কথা বলা হয়নি। যদিও দাবিটি পুরনো?
আলী রীয়াজ: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শব্দটিই আপত্তিকর। আমরা যে উচ্চকক্ষে প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে ৫ জনের মনোনয়নের কথা বলেছি- আশা করছি প্রেসিডেন্ট সেটি বিবেচনায় নেবেন। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে আমরা বলেছি যে, তারাও যেন ৫ শতাংশ সমাজে বঞ্চিত শ্রেণি থেকে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু তালিকায় তো সবাইকে যুক্ত করা যাবে না। যুক্ত করতে গেলে এটা তো অনেক লম্বা হয়ে যাবে। আমাদের সেন্সটা হলো যারা সুবিধাবঞ্চিত, যাদেরকে আমরা সংখ্যালঘু বলি। শুধু সংখ্যালঘুর বিষয়টি একটি ধর্মীয় বিষয় হয়ে যায়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের সংসদে দলিতদের প্রতিনিধিত্ব থাকুক এটি চাই। এই সমাজে তাদের একটা স্টেক আছে। তাহলে এ রকম অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত আছে। আমরা বলছি রাষ্ট্রপতি যখন দেবেন তখন এবং রাজনৈতিক দল যখন দেবেন তারা যেন অন্তত পাঁচজনকে দেন। নারীদের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রেও বলতে গেলে সকলের প্রতিনিধিত্ব থাকবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সকলের প্রতিনিধিত্ব করা। আসুন, আমরা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা করি, সকলের প্রতিনিধিত্ব করি। আমরা যে ৪০০ জন প্রতিনিধির কথা বলেছি; তার মধ্যে ১০০ জন নারীর বিষয়টা অনেকদিন থেকে আলোচিত। অতীতে যে ৫০ জনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তারা প্রতিনিধিত্বশীল নয়। আমি মনে করি নারীদের অবমাননার মধ্যদিয়ে গেছে। এই ১০০ জনের প্রতিনিধিত্ব একই জাতি গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করবে- এমন নয়। সকলের অংশগ্রহণের সব জায়গায় তার প্রতিনিধিত্ব থাকবে। আমাদের এই জায়গায় এসে দেখুন কেন বহুত্ববাদের কথা বলেছি। একটা বহুত্ববাদের সমাজ সবাইকে প্রমোট করবে। আইনের মধ্যে করবে, সংসদের মধ্যে ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে করবে- সব জায়গায় সমান প্রতিনিধিত্ব করবে।
প্রশ্ন: প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী দুইবারের বেশি নয় প্রস্তাব করেছেন। একই সঙ্গে তাদের ক্ষমতার ভারসাম্যের দাবি ছিল। সেটি কতোটুকু বাস্তবায়ন হবে?
আলী রীয়াজ: আমাদের বিদ্যমান সংবিধানে প্রেসিডেন্টের দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় না থাকার বিধান রয়েছে, নতুন করে এ বিষয়ে কোনো সুপারিশ করিনি। আমরা সুপারিশ করেছি প্রধানমন্ত্রীর দুই মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় রাখা যাবে না। যেটি দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচনা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে ক্ষমতার এককেন্দ্রিক শাসন চলে আসে। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি প্রস্তাব করেছি যে, তিনি দলের প্রধান ও সংসদ নেতা হতে পারবেন না। এটার কারণ হচ্ছে যাতে করে ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণ না হয়। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতা যেন এক ব্যক্তির হাতে চলে না যায়। সে বিবেচনা থেকে আমরা বলেছি যে, প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়াদের বেশি থাকা ঠিক নয়। এটা নাগরিকদের মধ্যেও চাওয়া আছে। আমরা সেটিরই প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করেছি। এটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে; কারণ আমরা ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণ দেখেছি। তাই ক্ষমতার এককেন্দ্রিকরণের বিভাজনটা আমরা করতে চেয়েছি। ক্ষমতার ভারসাম্যের বিষয়ে বিগত বছরে বলা হয়েছে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ভাগ করে দেয়া হলেই ভারসাম্য হবে আমরা সেদিকে যাইনি। প্রেসিডেন্টের কিছু ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। কারণ সংবিধানে আছে সকল  ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেবেন। প্রেসিডেন্টের সুনির্দিষ্ট দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে কোনো অবস্থাতেই তার প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেয়ার দরকার নেই। এর বাইরে ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য আমরা ন্যাশনাল কন্সটিটিউশনের কথা (এনসিসি) বলেছি। এনসিসি বলার দুটো কারণ রয়েছে, এক নম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের সঙ্গে কখনোই বসে না। পার্লামেন্টে যখন বসে একে অপরকে আক্রমণ করে কথা বলেন। এর জন্য আমরা রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেছি। নির্বাহী বিভাগের দিক থেকে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট আসছেন, আবার আইনসভার দিক থেকে বিরোধীদলীয় নেতা আসছেন। আবার প্রধানমন্ত্রীও আসেন সেখান থেকে। আমরা প্রধান বিচারপতির কথা বলেছি। সংবিধানিক পদগুলোতে নিয়োগের  ক্ষেত্রে আমরা বিষয়টি এনসিসিতে নিয়ে গিয়েছি। যাতে সবাই পরামর্শ করে সবকিছু করতে পারেন। প্রতিরক্ষা বাহিনীর তিন বিভাগের নিয়োগের বিষয়টিও আমরা এনসিসিতে যুক্ত করেছি। যাতে ন্যাশনাল ইস্যুতে আমরা একসঙ্গে কাজ করবো।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকারের সুপারিশ করেছেন। এটি নিয়ে তো বিতর্কও ছিল। আবার কেন অনির্বাচিত সরকারের পরামর্শ করতে হয়েছে। আমরা কি স্থায়ী কোনো ব্যবস্থায় যেতে পারি না?
আলী রীয়াজ: বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্রের কাঠামোগুলো তৈরি হয়নি। হঠাৎ করে একটি প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। গণতন্ত্র চর্চার বিষয়। যেকোনো প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যাবে অনেক ভুলভ্রান্তির মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে। আমি তো বলি যুক্তরাষ্ট্র যেখানে ২৫০ বছরের দিকে আগাচ্ছে আমরা প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি ৫০ বছরে। তাতে আমাদের প্রাণ দিতে হয়েছে, লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু দুর্বল জায়গাগুলো হচ্ছে আমরা প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে পারিনি। গণতন্ত্রের চর্চাটা প্রতিষ্ঠান দিয়ে করতে হয়। একটা স্বাধীন বিচার বিভাগ থাকতে হবে। যে কারণে আমরা বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সেক্রেটারিয়েট দেয়ার কথা বলেছি। আমরা বলেছি, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা দরকার। এগুলো যখন আস্তে আস্তে দাঁড়াবে তখন আর এটার প্রয়োজন হবে না। বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পৃথিবীতে একটি ইউনিক জিনিস বাংলাদেশ অফার করেছে। অন্যত্র কিন্তু ছিল না। এরপর কোথাও কোথাও এটি অনুসরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা এত সব সমস্যার মধ্যে থেকেও একটা পথ বের করেছেন। অনেকে রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করেন। কিন্তু আমি বলি তারা তো সংকট থেকে উত্তরণের জন্য একটা পথ বের করেছেন। এটার জন্য কোনো বিশেষজ্ঞ লাগেনি। তাহলে আমরা এখন ওটা থেকে বের হতে পারছি না কেন, কারণ আমরা এখনো প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করতে পারিনি। ধরুন, আগামী দশ বছর যদি এনসিসি (জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ) ঠিকমতো কাজ করে, দুটো ভালো নির্বাচন হয়, বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারি দলের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক হয়, আস্থার জায়গা তৈরি হয়, তখন এটার দরকার হবে না। এটা তারাই সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কারণ পথ কেউ বন্ধ করেনি। দশ বছর পর বিরোধী দল, সরকারি দল সবাই যদি দেখেন যে, আমার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এত শক্তিশালী যে তত্ত্বাবধায়কের দরকার নেই, তুলে দেবেন। কিন্তু এ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার যে সংকট গত ৩০ বছর ধরে চলছে সে জায়গা থেকে বের হতে এটা প্রয়োজন। যখন প্রয়োজন হবে না, তখন বাতিল হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: মানবাধিকার কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি করতে পারাটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত হবে রাষ্ট্রের জন্য...
আলী রীয়াজ: আমরা মনে করি এটি বাস্তবায়ন করা জরুরি। বিশেষ করে মানবাধিকার কমিশনের কথা বলেছি এ কারণে যে, আমরা যদি জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি করতে চাই তখন দেখতে হবে এমন প্রতিষ্ঠান আছে কিনা- যারা এ প্রশ্নটা তুলতে পারে। আমাদের দেশে গুম হয়েছে, বিচার বহির্ভূত হত্যা হয়েছে- মানবাধিকার কমিশন কিচ্ছু করতে পারেনি। আমি আবার তাকে প্রশ্নও করতে পারি না। এখন মানবাধিকার কমিশন যদি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হয়, তার যদি জবাবদিহিতা থাকে, সে জবাবদিহিতার ক্ষেত্র যদি সংসদ হয়, আমরা যদি একটি ভালো সংসদ পাই। তাহলে বিরোধী দল সেই প্রশ্নটা সত্যিই করতে পারবে। রাষ্ট্র যদি সত্যি নিপীড়ক হয়ে ওঠে তখন বিরোধী দল মানবাধিকার কমিশনকে প্রশ্ন করতে পারবে। আমরা এটাও বলছি- মানবাধিকার কমিশন যেকোনো জায়গা থেকে তথ্য চাইলে সরকার দিতে বাধ্য থাকবে। তাতে করে আমরা চেয়েছিলাম, তারা দেননি এ বলে পার পাওয়ার সুযোগ হবে না। সংবিধান, প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা করা। নাগরিকের সবচেয়ে বড় অধিকার হচ্ছে বেঁচে থাকার অধিকার। একটা  গণতান্ত্রিক সমাজে সে যেন কথা বলতে পারে, সমাবেশ করতে পারে। যখন সেটি লঙ্ঘিত হবে তখন মানবাধিকার কমিশন বলবে এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনের জুডিশিয়ারি ক্ষমতা নেই। কিন্তু নাগরিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে আদালতে যেতে পারবেন।
প্রশ্ন: অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছেন, এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো কতোটা শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আমি পুরোপুরি আশাবাদী। এই কারণে যে, গত ১৬ বছরের তিক্ত অভিজ্ঞতা, প্রাণঘাতী অভিজ্ঞতা। কী মর্মান্তিক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে আমরা গেলাম। আমরা কি শিখিনি? নিশ্চয় শিখেছি। রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি সবাই তো শিখেছে। তাহলে এ রকম একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করার ক্ষেত্রে তারা কেন প্রতিবন্ধক হবেন। তারাও তো চান। আজকে যারা রাজনীতিক আছেন তারা তো বিরোধী দলে ছিলেন ৫ই আগস্ট পর্যন্ত। কী নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যদিয়ে তারা গেছেন- তারা জানেন না। আমার থেকে তো তারা বেশি জানেন। কারণ তারা সেটির শিকার হয়েছেন। তাই তারাই তো এরকম পরিস্থিতি বন্ধ করার পথ খুঁজবেন। ভবিষ্যতে তাদেরও তো সে জায়গায় যেতে হবে। সবাই তো অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকে না। যারা স্বপ্ন দেখেন তাদের কী হয় তা তো আমরা ৫ই আগস্ট দেখেছি। যারা অনন্তকাল ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখেন তাদের শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে হয়।
প্রশ্ন: আপনাদের প্রস্তাবনা নিয়ে তো রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্টদের অনেকের আপত্তি আছে। এ বিতর্কের অবসান হবে কীভাবে?
আলী রীয়াজ: আলোচনা তো হবেই। আলোচনা করার জন্যই তো আমরা প্রস্তাব দিয়েছি। ৫২ বছর আমরা সংবিধান নিয়ে কথা বলতে পারিনি। আজকে যদি আমরা একটু বেশিই বলি, সে বলার তো আমার অধিকার রয়েছে। যতগুলো সংশোধনী হয়েছে কারও সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনীতে অধিকাংশ মানুষ বলেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করবেন না। কারও কথায় কর্ণপাত করা হয়নি। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় সবকিছু হয়েছে। আজকে সারা দেশ কথা বলতে পারে। আপনি, আমি সবাই কথা বলতে পারছি। আসুন আলাপ আলোচনা করি। আমি যেকোনো সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে দেখি। তার মানে এটার একটা গুরুত্ব বিবেচিত হচ্ছে। আমার প্রস্তাব হিসেবে নয়, বিষয় হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে সকলে যুক্ত হচ্ছে। তাহলে আসুন সকলে কথা বলি।
প্রশ্ন: ছাত্ররা ১৯৭২-এর সংবিধানকে মুজিববাদী সংবিধান বলছে, যেটি শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচার করে তুলেছে। আপনারা কী মনে করেন?
আলী রীয়াজ: আজকের বিদ্যমান সংবিধান ৭২-এর সংবিধান নয়। ৭২-এর সংবিধানের প্রথম পুনর্লিখন হয়েছে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ মুজিব যখন চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে একদলীয় ব্যবস্থা প্রেসিডেন্সিয়াল রুল চালু করেছেন। ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রথম লঙ্ঘিত হয়েছে আওয়ামী লীগ দ্বারা। যারা ’৭২-এর সংবিধানের মর্যাদা নিয়ে কথা বলেন তাদের কাছে বিনীত অনুরোধ ’৭৫-এর চতুর্থ সংশোধনী কি ’৭২-এর সংবিধানের লঙ্ঘন নয়। আবার পঞ্চদশ সংশোধনীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আপনি সমস্ত ব্যবস্থা বদলে দিচ্ছেন। জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই। নির্বাচনের আগে কোনো ম্যান্ডেট নেই, সংবিধান সংশোধনীর জন্য কোনো গণভোট হচ্ছে না। ছাত্ররা রাজনৈতিক শক্তি। তাদের কথা বলার অধিকার রয়েছে। এটা বাস্তবতা যে, বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধান এক ব্যক্তির শাসন তৈরির পথ তৈরি করেছে। অন্যথায় বাংলাদেশ এই পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যেতো না। সংবিধানকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যেটা ব্যক্তিতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। ১৬ বছর বাংলাদেশের মানুষ তা হাড়ে হাড়ে, শিরায় শিরায় অনুভব করেছে।
প্রশ্ন: সংবিধান সংস্কার কমিশনে সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি- এ নিয়েও তো বিতর্ক রয়েছে।
আলী রীয়াজ: এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক আমাদের কমিশনে কাঠামোগতভাবে সকলের প্রতিনিধিত্ব আমরা অন্তর্ভুক্ত করতে পারিনি। এটা আমাদের দুর্বলতা। এতে ধর্মীয়ভাবে যারা সংখ্যালঘু, জাতি গোষ্ঠীর বিবেচনায় যারা তাদের অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এই কমিশনের এ দুর্বলতা থেকে গেছে। এটা আমি প্রথম দিন থেকেই স্বীকার করি। কিন্তু অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে করতে হয়েছে। তাতে ওই দুর্বলতা শেষ হয়ে যায় না। তারপর আমরা কী করেছি। আমরা যখন জানি এটা আমাদের দুর্বলতা, আমরা চেষ্টা করেছি সে দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সমস্ত রকম মানুষকে যুক্ত করার। তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। যারা ভিন্ন ভিন্ন জাতি গোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্ব করেন তাদেরকে আমরা ডেকেছি, তাদের কথা শুনেছি। ধর্মীয় বিবেচনায় যারা সংখ্যালঘু বিবেচিত হন তাদেরকেও ডেকেছি। তাদের কথা তো শুনতে হবে। তারা তো এ দেশের নাগরিক। সংবিধান তো তাদের জন্যও।
প্রশ্ন: জাতীয় ঐকমত্য গঠনের প্রক্রিয়া কবে থেকে শুরু হবে?
আলী রীয়াজ: জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজ এখনো পুরোপুরি শুরু হয়নি। ছয়টি সংস্কার কমিশনের প্রধানরা নিয়মিত আমরা বসছি। কিছু ভিন্নমত থাকলে সেটার সমন্বয় করছি। যাতে আমাদের সুপারিশগুলোতে সামঞ্জস্য থাকে। এটার কাজ প্রায় শেষ হয়ে আসছে। আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে শেষ করতে পারবো। অন্তত চার পাঁচটি কমিশনের পুর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে পারবো। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু হবে। তার আগে রাজনৈতিক দলগুলো পুরো প্রতিবেদন পেয়ে যাবে। সে আলোকে তারা তাদের মত দিতে পারবে। 

mzamin


যুবদল নেতার মৃত্যু: পুরনো বিরোধ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আলোচনায় by মারুফ কিবরিয়া

মহানগরী থেকে চার কিলোমিটার দূরত্বে ইটাল্লা গ্রাম। গ্রামে প্রবেশ করলেই নিহত যুবদল নেতা তৌহিদদের বাড়ি। বাড়ির ফটক থেকে ভেতরে যেতেই দেখা যায়, স্বজনরা উঠানে বসে আহাজারি করছেন। প্রতিবেশীরাও আসা-যাওয়া করছেন। শোকের আবহ। তৌহিদের স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিচ্ছেন। ৩১শে জানুয়ারি যৌথবাহিনীর হেফাজতে মারা যান তৌহিদুল ইসলাম। তিনি কুমিল্লা সদর উপজেলার পাঁচথুবী ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক ছিলেন। তৌহিদুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন, যৌথবাহিনীর সদস্যরা তুলে নিয়ে বেধড়ক পেটায় তৌহিদকে। সেই আঘাতের চিহ্নও ছিল তার শরীর জুড়ে।

কেন তৌহিদুলকে তুলে নেয়া হয়েছিল। কারা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছিল। এসব বিষয় নিয়ে এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়েছে মানবজমিন। স্থানীয়দের কাছ থেকে উঠে এসেছে এসব বিষয়ে নানা তথ্য। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধের জেরেই তৌহিদকে জীবন দিতে হয়েছে। এ ছাড়া যুবদলের আহ্বায়ক হওয়ায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বিষয়টিও সন্দেহে রেখেছে পরিবার।

গ্রামের মানুষ ও পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, পাশের বাড়ির তানজিল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তৌহিদ পরিবারের দ্বন্দ্ব প্রায় ১৫ বছরের। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সেই দ্বন্দ্ব আরও চরমে উঠে। স্থানীয়রা বলেন, বাড়ির পাশেই মসজিদ ও পারিবারিক কবরস্থানের জন্য জায়গা দিয়েছিলেন তৌহিদের পূর্বপুরুষরা। সেই জায়গার বেশ কিছু অংশের মালিকানা দাবি করে আসছিলেন পাশের বাড়ির তানজিলের পরিবার। এ নিয়ে বরাবরই তাদের মধ্যে বিবাদ লেগে থাকতো। সম্প্রতি তৌহিদের সঙ্গে ওই পক্ষের খানিকটা হাতাহাতিও হয়। তারই জের ধরে মিথ্যা অভিযোগ তুলে যৌথবাহিনীর কাছে গিয়েছিলেন তানজিল। তাকে ক্ষমতাধর কোনো পক্ষ সহযোগিতা করেছে এমনও আলোচনা আছে। স্থানীয়রা আরও জানান, তৌহিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়, তার কাছে অস্ত্র রয়েছে। তাই ৩০শে জানুয়ারি রাতে তাকে আটকের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি দল বাড়িতে আসে। সেই দলের সদস্যরা রাতে ঘরে ঢুকে তৌহিদকে তুলে নিয়ে যায়। রাতেই কয়েক দফা মারধর করে। পরদিন আবারো মারধরের পর পুলিশে দেয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেন তৌহিদ। পরে তাকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

রোববার তৌহিদের বড় ভাই আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমার ভাই তৌহিদ স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সে ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক। তার সঙ্গে কারও কখনো কোনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল না। এখানে আমরা জানি না কেন সেনাবাহিনী তাকে নিয়ে গেছে। আমার ভাইয়ের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। কখনোই ছিল না। কিন্তু অস্ত্র থাকার অভিযোগে তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে লাশ হয়ে ফিরে আসে।

আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, ঘটনার দিন আমি বাড়িতে ছিলাম। পরদিন বাবার কুলখানি। আমরা সবাই সেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি। ভাইও আসছে অনেক রাতে। এর মধ্যেই হঠাৎ ২টার পর সেনাবাহিনীর গাড়ি বাড়ির চারপাশে আসে। ঘরে ঢুকেই তারা আমার ভাইকে নিয়ে যাবে। অস্ত্র কোথায় রেখেছে সেই প্রশ্ন বারবার করে। তারাও তল্লাশি চালায়। কিন্তু কোনো অস্ত্র পায়নি। এরপর নিয়ে যায়। সকালেও আবার সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি এসে আমাদের বাড়িতে তল্লাশি চালায়। তখন তৌহিদকে গাড়িতে রাখা হয়। এরপর আবার নিয়ে যায়। সেখান থেকে সেনাবাহিনীর লোকজন আমাদের ফোন দিয়ে বারবার অস্ত্রের কথা বলে। তাদের কথা, আমরা অস্ত্র দিয়ে দিলে আমার ভাইকে ছেড়ে দেবে। পরে জানতে পারি পুলিশের কাছে দিয়ে দিয়েছে। মেডিকেলে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তৌহিদের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা এখনো পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নিইনি। আগে দেখি কী হয়। তবে আমরা একটি হত্যা মামলা করবো।
কার বিরুদ্ধে মামলা করবেন জানতে চাইলে তৌহিদের ভাই বলেন, আমাদের প্রতিবেশী তানজিলসহ চার-পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করবো। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের সঙ্গে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ছিল না। কিন্তু এবার ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হওয়ায় কয়েকজনের মন খারাপ হয়েছে। তাদেরও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে মনে হয়।
তৌহিদুল ইসলামের স্ত্রী ইয়াসমিন নাহার বলেন, আমার চারটি মেয়ে এখনো ছোট। আমি জানি না কীভাবে তাদের নিয়ে বাঁচবো। আমার স্বামী কোনো অপরাধ করেনি। তাকে কেন নির্যাতন করে হত্যা করা হলো? আমি পুরো ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং বিচার চাই।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা মানবজমিনকে জানান, তৌহিদুলের মৃত্যুর কিছুদিন আগে পাশের বাড়ির প্রতিবেশী তানজিলদের সঙ্গে বিবাদ হয়। সেই ঘটনায় তানজিলের পক্ষে কথা বলতে আসেন গ্রামের আরেক ব্যবসায়ী সাইফুল। এই সাইফুল তানজিলের উকিল বোন জামাই বলে পরিচিত। জমির বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তৌহিদুলের সঙ্গে কথা বলতে আসেন তিনি। এ সময় ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক সাইফুলকে কথা বলতে নিষেধ করেন। এক পর্যায়ে এ নিয়ে দু’জনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সেখান থেকেই তৌহিদুলের ওপর ক্ষোভ আরও বাড়তে থাকে।

তৌহিদুলের চাচাতো ভাই মামুন মানবজমিনকে বলেন, বাড়ির পাশের কবরস্থানের জমি নিয়ে অনেকদিন থেকেই আমাদের সঙ্গে ওদের ঝামেলা চলছে। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তারা আরও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ওই জায়গা তো আমাদের পূর্বপুরুষের। তারা তাদের দাবি করে। সরকার পতনের পর প্রতি সপ্তাহেই একবার করে বিচার বসায় তানজিল। এলাকার লোকজন কেউ বিচারে থাকে না। বাইরে থেকে বিএনপি’র লোকজন পরিচয় দিয়ে নিয়ে আসে। বাড়িতে এসে বসে থাকে। কয়েকদিন আগে সাইফুলকে তাড়িয়ে দেয় আমার ভাই। সেখান থেকেই হয়তো সে সেনাবাহিনীর কাছে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে থাকতে পারে।

গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, তানজিল আর সাইফুলই এই ঘটনার জন্য দায়ী। তারা পরিকল্পনা করে তৌহিদুলকে মারিয়েছে। তৌহিদুলের বিরুদ্ধে কোনো মামলাও ছিল না। কিছুই ছিল না। এলাকার মধ্যে কখনো কোনো খারাপ কথাও শোনা যায়নি।
স্থানীয়রা আরও জানান, যে রাতে তৌহিদুলকে তুলে নিয়ে গেছে সে সময় সেনাবাহিনীর একটি গাড়িতে সাইফুলকে দেখা গেছে। এ ছাড়া তানজিলকেও মুখোশ পরা অবস্থায় দেখা গেছে বলে তারা জানিয়েছেন।

এদিকে তৌহিদুলের মৃত্যুর পর ইটাল্লা গ্রাম থেকে তানজিল পালিয়েছেন বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। সেইসঙ্গে সাইফুলকেও আর দেখেননি কেউ। গতকাল তানজিলের বাড়িতে সরজমিন যান এই প্রতিবেদক। এ সময় তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি।

এ ঘটনায় স্থানীয় সেনা ক্যাম্পের কমান্ডারকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার এবং মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটনে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্তদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার এ মৃত্যুর ঘটনায় জরুরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস যেকোনো ধরনের হেফাজতে নির্যাতন ও হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জরুরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

ওদিকে যৌথবাহিনীর পরিচয়ে তুলে নেয়ার পর যুবদল নেতা তৌহিদুল ইসলামের মৃত্যুতে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ উদ্বেগ ও বিচার দাবি করে বলা হয়, তৌহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো অস্ত্র থাকার অভিযোগ ছিল না এবং তাকে অজ্ঞাত কারণে গভীর রাতে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরিবারের সদস্যরা থানায় যোগাযোগ করেও কোনো খোঁজ পাননি। নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকায় পরিবারের সদস্যরা এ মৃত্যুকে পরিকল্পিত ও সন্দেহমূলক দাবি করেছেন। আসক মনে করে, এ ধরনের ঘটনা মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। আটক ব্যক্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আসক এ ঘটনার স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও দ্রুত বিচারিক তদন্ত এবং দায়ীদের যথাযথ আইনি শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছে।

mzamin

গাড়ি আমদানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল শ্রীলঙ্কানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসের পতনের পর শ্রীলঙ্কায় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসছে। এ কারণে শ্রীলঙ্কাকে অনেক দেশ আদর্শ হিসেবে মনে করে। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে নিজেদের তুলনা করে অনেক দেশ। এবার বলা হচ্ছে, কিছু যানবাহন আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে দেশটি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- গাড়ি আমদানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল করলেই কি দেশটির জনগণ একটি নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য রাখেন? অনলাইন বিবিসিতে এ প্রশ্নটির বিশ্লেষণ করেছেন সাংবাদিক আনবারাসান ইথিরাজন। তিনি লিখেছেন, ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে বাস, ট্রাক ও বিভিন্ন ব্যবহার্য গাড়ি আমদানি শুরু করার কথা দেশটির। অন্য যানবাহন আমদানিতে বিধিনিষেধ আস্তে আস্তে তুলে নেয়া হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশটির বহু নাগরিক অপেক্ষা করছেন কখন প্রাইভেটকার আমদানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন কর্তৃপক্ষ। বিশেষ করে স্পোর্টসে ব্যবহৃত গাড়ি এবং তিন চাকার গাড়ি। তিন চাকার গাড়ি ব্যাপকভাবে ট্যাক্সি হিসেবে ব্যবহার করা হয় সেখানে। কিন্তু নতুন গাড়ির দাম বেড়ে যাবে। তার সঙ্গে আছে দুর্বল মুদ্রা মান এবং উচ্চহারে শুল্ক। ফলে এ অবস্থায় খুব কম মানুষেরই একটি নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য থাকবে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কা ভয়াবহভাবে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে পড়ে। এর ফলে দেশটির ইতিহাসে ঋণদাতাদের কাছে তারা স্বীকার করে যে, তারা দেউলিয়া হয়ে গেছে। ঋণদাতাদেরকে যে অর্থ ফেরত দিতে হয়, তা দিতে অক্ষম তারা। দেশটিতে বসবাস করেন প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ মানুষ। সেখানে আর্থিক এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে দেখা দেয় জ্বালানি, খাদ্য এবং ওষুধের অস্বাভাবিক সংকট। এতে দেশ টালমাটাল হয়ে পড়ে। ব্যাপক গণআন্দোলন গড়ে ওঠে। তার স্রোতের কাছে টিকে থাকতে পারেননি তখনকার প্রেসিডেন্ট গোটাবাইয়া রাজাপাকসে। তাকে কয়েক মাসের মধ্যেই সব গুটিয়ে বিদায় নিতে হয়। সাংবাদিক ইথিরাজন আরও লিখেছেন, রাজাপাকসের উত্তরসূরিরা উচ্চ শুল্ক, জ্বালানিতে ভর্তুকি দেয়া বন্ধ সহ বিভিন্ন রকম কৃচ্ছ্রসাধন করতে থাকে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল আইএমএফ’র কাছ থেকে ২৯০ কোটি ডলার বেইলআউট নিয়ে সমঝোতা শুরু করে কলম্বো। তখন থেকে দেশটির অর্থনীতি উন্নত হতে শুরু করে। অর্থনীতি ধ্বংসস্তূপ থেকে আস্তে আস্তে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। তাই বলে দেশবাসীর হাতে যে একেবারে অঢেল কাঁচা টাকা এসে পড়েছে এমন নয়। গাড়ি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা শ্রীলঙ্কানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা একটি নতুন গাড়ি বা একটি ভ্যান কেনার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করছিলেন। কলম্বোভিত্তিক অর্থনৈতিক থিঙ্কট্যাংক এডভোকেটা’র চেয়ারম্যান মুর্তাজা জাফিরজি বলেছেন, তিনি মনে করেন সরকারের এই পদক্ষেপ ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষিত। তিনি আরও বলেন, গাড়ি আমদানিতে সরকারের শুধু রাজস্ব বাড়াবে এমন নয়। একই সঙ্গে এতে অর্থনৈতিক অন্যান্য কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাবে। যেমন গাড়ির খাতে অর্থায়ন হবে, ডিলাররা রাজস্ব পাবেন, কার  সার্ভিসিং খাতে যারা আছেন তারা সুবিধা পাবেন। অন্যরা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কর্মকাণ্ডে জড়িত হবেন। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কিন্তু মঙ্গলবার দেশটির তথ্যমন্ত্রী নালিন্দা জয়াতিসা মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলেছেন, দেশ খুব সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। আমরা ব্যাপক হারে আমদানি চাই না। কারণ, তাতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবে।

উল্লেখ্য, জাপান ও ভারতসহ অনেক দেশের মতো কার ও ট্রাক প্রস্তুতের কোনো রকম বড় কারখানা নেই শ্রীলঙ্কায়। সবরকম গাড়ি তারা আমদানি করে। এখন চীনা গাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, বিশেষ করে বিদ্যুৎচালিত গাড়ি। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কায় ব্যবহৃত গাড়ির দাম অনেক বেড়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞা দেয়ার আগে যে দাম ছিল, এখন কিছু মডেলের ব্যবহৃত গাড়ির দাম দুই থেকে তিনগুণ। গায়ানা ইন্ডিকা’র মতো মানুষদের জন্য এই বিধি-নিষেধ প্রত্যাহার করে নেয়ার প্রভাব অনেক কঠিন। কারণ, তারা বিয়েতে গাড়ি সবরাহ করতেন। গায়ানা ইন্ডিকা একজন পার্টটাইম ক্যাবচালক।  তিনি বলেন, আমি একটি নতুন গাড়ি কিনতে চাই যাতে আমার কাজ করতে পারি। আমার প্রাইভেট ক্যাব ভাড়া দেয়ার কাজটা শুরু করতে পারি। একটি গাড়ি ছাড়া, চলাচল করা ছাড়া আমিতো রাজস্ব হারাচ্ছি। ক্যান্ডি শহরের একজন সফ্‌টওয়্যারের পেশায় যুক্ত শশীকুমার বলেন, দেশে গণপরিবহন নাজুক। এক্ষেত্রে একটি গাড়ি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আমাদের ভালো গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই, দেশের অন্য স্থানগুলোতে সফর করার জন্য একটি গাড়ি অত্যাবশ্যক। হয়তো সরকারকে গাড়ির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে, না হয় তাদেরকে গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।

নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগের বছরে শ্রীলঙ্কা প্রায় ১৪০ কোটি ডলারের যানবাহন আমদানি করেছিল। এ বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, তারা যানবাহন আমদানির জন্য একশ’ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করেছে। কিন্তু এই অর্থ ছাড় দেয়া হবে আস্তে আস্তে।  ভেহিক্যাল ইমপোর্টার্স এসোসিয়েশন অব শ্রীলঙ্কার আরোশা রড্রিগো বলেন, কমপক্ষে চার দশক ধরে গাড়ির ডিলারশিপ পরিচালনা করেন তিনি ও তার পরিবার। নিষেধাজ্ঞার আগে

মাসে প্রায় ১০০ যানবাহন আমদানি করেছে তার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিধিনিষেধ আরোপ হওয়ার পর তারা একটি গাড়িও আমদানি করতে সক্ষম হননি। তিনি বলেন, যদি এই নিষেধাজ্ঞা আরও শিথিল করা হয়, যদি যাত্রীবাহী গাড়ি  এবং অন্য যানবাহন আমদানি অনুমোদন দেয়া হয়, তাহলে বহু মানুষ এগুলো কিনতে সমর্থ হবেন না। কারণ, ট্যাক্স বৃদ্ধি পেয়েছে। শ্রীলঙ্কান মুদ্রা দুর্বল হয়েছে। সরকার আমদানি করা গাড়ির ওপর এক্সসাইজ ডিউটি বা শুল্ক নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি করেছে। ইঞ্জিনের আকারের ওপর নির্ভর করে নতুন এবং সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়িতে এই শুল্ক হার যথাক্রমে শতকরা ২০০ ভাগ এবং ৩০০ ভাগ। অর্থাৎ যদি ধরা হয় একটি নতুন গাড়ির দাম ১০০ ডলার। কিন্তু তাতে শতকরা ২০০ ভাগ শুল্ক আরোপ করায় মূল্য দাঁড়াবে ৩০০ ডলার। এখানেই শেষ নয়। এক্সসাইজ ডিউটির শীর্ষে আছে শতকরা ১৮ ভাগ ভ্যাট। বিদেশ থেকে আনা যেকোনো গাড়ির জন্য এই ভ্যাট প্রযোজ্য। বিশ্বের বড় সব মুদ্রার, যেমন ডলার, বিপরীতে শ্রীলঙ্কার রুপি মারাত্মক দুর্বল। এর ফলে আমদানি করা গাড়ির দামে বড় রকম প্রভাব ফেলবে। এর ফলে আর যশোদার মতো স্কুল শিক্ষকদের মতো মানুষদের গাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়বে। যশোদা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা একটি গাড়ি কেনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু যদি ট্যাক্স এবং মূল্য হিসাব করি, তাহলে একটি গড় মাপের গাড়ির মূল্য ২৫ লাখ রুপি থেকে দ্বিগুণ হয়ে ৫০ লাখ রুপি হয়েছে। এটা আমাদের জন্য কোনো সুযোগ এনে দেয়নি।

mzamin