Saturday, December 2, 2023

এক বছর আগে থেকেই হামাসের হামলার পরিকল্পনার কথা জানতো ইসরাইল

গত ৭ই অক্টোবর হামাস যে নজিরবিহীন হামলা চালিয়েছে তার পরিকল্পনার খবর আগে থেকেই ছিল ইসরাইলের কাছে। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের আরও এক বছর আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার এই বিস্ফোরক খবর দিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।

খবরে বলা হয়, হামাসের ওই হামলায় প্রায় ১২০০ ইসরাইলি নিহত হয়েছে। কিন্তু ইসরাইলি কর্মকর্তাদের যখন হামাসের এই পরিকল্পনার কথা জানানো হয় তখন তারা এটিকে ‘অবিশ্বাস্য’ বলে উড়িয়ে দেয়। মার্কিন গণমাধ্যমটি ওই হামলা নিয়ে ৪০ পাতার একটি ব্লুপ্রিন্ট পেয়েছে। যেখানে হামাসের এই হামলার পরিকল্পনার একটি বিস্তর বিবরণ রয়েছে। ইসরাইলি গোয়েন্দারা এর কোড নাম দিয়েছিল ‘জেরিকো ওয়াল’। তবে তারা আসলে বিশ্বাস করেনি হামাস শেষ পর্যন্ত এমন আক্রমণ চালাবে।

হামাসের ৭ই অক্টোবরের ওই আক্রমণের সঙ্গে ইসরাইলের কাছে থাকা তথ্যের ব্যাপক মিল রয়েছে। ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে গাজার সঙ্গে ইসরাইলের সীমান্ত অকার্যকর করে দেয়ার বিষয়টিও আগে থেকেই জানতো ইসরাইল। এরপর প্যারাগ্লাইডার দিয়ে ইসরাইলের অভ্যন্তরে হামাস সদস্যদের প্রবেশের পরিকল্পনার বিষয়েও অবগত ছিল তারা।

নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, হামাস সদস্যরা জেরিকো ওয়াল পরিকল্পনা দারুণভাবে অনুসরণ করেছিল হামলার দিন।

গত বছর যখন ইসরাইলি গোয়েন্দারা এই পরিকল্পনার খবর পেয়েছিল তখন তারা বলেছিল যে, এমন কিছু করার ক্ষমতা হামাসের নেই। তাছাড়া তারা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার বিষয়েও নিশ্চিত না। যদিও গত জুলাই মাসে আরেক বিশ্লেষক ইসরাইলকে সাবধান করেছিলেন যে, হামাস সদস্যরা সাম্প্রতিক সময়ে এমন সব প্রশিক্ষণ নিচ্ছে যার সঙ্গে জেরিকো ওয়াল পরিকল্পনার মিল রয়েছে।

Monday, November 20, 2023

প্রেগন্যান্সি টেস্টের সেকাল-একাল by মুহসিনা মিঠা

আমাদের বর্তমান সময়ে একজন নারী গর্ভবতী কিনা তা সে চাইলে ঘরে বসে প্রেগন্যান্সি কিট ব্যবহার করেই জানতে পারে। কিন্তু পাঠক, কখনো কি মনে প্রশ্ন জেগেছে, প্রাচীনকালে গর্ভধারনের ব্যাপারে নিশ্চিত হবার জন্যে আমাদের পূর্বপুরুষেরা কী কী পদ্ধতি ব্যবহার করতেন?
আগেকার দিনে একজন নারী গর্ভবতী কিনা তা নিশ্চিত হতে প্রকৃতির উপরেই নির্ভর করতে হত, যা কিনা ছিল অনেকটা Wait and See এর মত। তবে মানবসভ্যতা কখনোই প্রকৃতির উপরে ভরসা করে চলেনি, বরং মানুষের নিজের মত করে প্রকৃতি জয় করার চেষ্টা ছিল সবসময়ই। আর এরই প্রমাণ বিভিন্ন মানবসভ্যতায় ব্যবহৃত অদ্ভুত সব গর্ভনিশ্চিতকরণ পদ্ধতি। এর ভেতরে অনেকগুলি পরে বৈজ্ঞানিকভাবে সত্যও প্রমাণিত হয়েছে। তারমধ্যে ঐতিহাসিক কয়েকটি পরীক্ষার কথা চলুন জেনে আসা যাক।
১. গম আর বার্লি বলবে গর্ভবতী কি না!
যীশু খৃষ্টের জন্মেরও প্রায় ১৩০০ বছর আগে মিশরীয় মেয়েরা গর্ভবতী কিনা তা জানতে এক অদ্ভুত পদ্ধতি ব্যবহার করত। ঋতুস্রাব বন্ধ অথবা বিলম্ব হলে গর্ভধারণ নিশ্চিত করার জন্যে মেয়েরা দুইটি পাত্রে রাখা গম আর বার্লির বীজের উপরে মূত্রত্যাগ করত। কিছুদিন মূত্রত্যাগের পর সেই বীজ থেকে গাছ হয়েছে কিনা তা দেখা হত। বলা হয়ে থাকে যে, গমের বীজ থেকে চারা বের হলে অনাগত সন্তান মেয়ে আর বার্লির বীজ থেকে চারা বের হলে সেক্ষেত্রে ছেলে হবার সম্ভাবনা বেশি ধরা হত। আর কোন বীজ থেকেই যদি চারা বের না হত সেক্ষেত্রে সেই নারী গর্ভবতী না বলে ধারণা করা হত।
ছেলে কিংবা মেয়ে হওয়ার ব্যাপারটা ব্যাখ্যা না করা গেলেও বীজ থেকে চারা বের হওয়াটা যে গর্ভধারণের সাথে সম্পর্কিত তা আবিষ্কার হয়েছে ১৯৬৩ সালে। গর্ভবতী নারীর মূত্রে থাকা অত্যাধিক ইস্ট্রোজেন বীজ থেকে চারা হবার জন্যে সহায়ক- ইংল্যান্ডের একদল গবেষক এমনটাই মত দিয়েছেন। তারা আরো বলেন, এই পদ্ধতিতে  মিশরীয়রা ৭০% ক্ষেত্রেই নির্ভুল ফল পেয়ে থাকত।
২. পি ফর পিঁয়াজও!
গর্ভধারণ নিশ্চিতকরণে প্রাচীন মিশরীয়দের মত প্রাচীন গ্রীকেরাও পিছিয়ে ছিল না। গ্রীকদের বরাবরই হিউম্যান এনাটমিতে ভাল দখল ছিল। সেই এনাটমির উপর ভর করেই তারা মিশরীয়দের থেকেও অদ্ভুত পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিল। পদ্ধতিটি ছিল এরকম, “কোন নারী যদি সন্দেহ করে সে গর্ভবতী, তবে তা নিশ্চিত হতে যেন সে ঘুমানোর আগে যোনীপথে পিঁয়াজ ঢুকিয়ে রাখে। যদি সকালে ঘুম থেকে উঠে তার মুখে পিঁয়াজের গন্ধ পাওয়া যায় তবে সে গর্ভবতী নয় আর যদি পাওয়া না যায় তবে সে গর্ভবতী।”
গম আর বার্লির বীজ- এটি ব্যবহার করেই মিশরীয় মেয়েরা গর্ভবতী কিনা নিশ্চিত হত
এইটার ব্যাখ্যা গ্রীকেরা দিয়েছিলেন এভাবে যে, “মুখ থেকে  যোনী পর্যন্ত পথখানা একটা টানেলের মত। এর মাঝখানে কিছু থাকলে অর্থাৎ গর্ভবতী হয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে পিঁয়াজের ঝাঁঝালো গন্ধ মুখে পৌঁছুবে না, অন্যথায় পৌঁছুবে। অবশ্য ফাদার অব মেডিসিনখ্যাত গ্রীক চিকিৎসক হিপোক্রেটস অন্য আরেকটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটস
হিপোক্রেটস বলেন,
***“কোন নারী গর্ভবতী কিনা তা নিশ্চিত হতে সে যেন রাত্রে ঘুমাতে যাবার আগে পানির সাথে অল্প মধু মিশিয়ে পান করে। গর্ভবতী হলে সেক্ষেত্রে সে তার পেট ফাঁপছে এমন বোধ করবে।”
৩. পিস প্রফেটস
ইউরোপে ১৬ শতকে একদল মানুষ নিজেদেরকে ‘পিস প্রফেটস’ (Piss Prophets) বলে পরিচয় দিত। তারা দাবী করত, মূত্র দেখেই তারা একজন নারী গর্ভবতী কিনা তা বলে দিতে পারে! তারা মূলত মূত্রের সাথে সামান্য মদ মিশিয়ে তা দেখে বলতে পারত গর্ভবতী কিনা।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা এটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে- গর্ভবতীদের মূত্রে থাকা অধিক প্রোটিন মদের সাথে বিশেষ বিক্রিয়া করত, যা দেখে সে নারী গর্ভধারণ করেছে বলতে পারাটা আদৌ কঠিন কিছু ছিল না।
৪. চোখ দেখে যায় চেনা
১৬ শতাব্দীর প্রখ্যাত চক্ষুবিদ ডা. জ্যাকিস গিলিমে বলেন, নারীর চোখ দেখে সে গর্ভবতী কিনা তা বলে দেয়া সম্ভব। একজন সন্তানসম্ভবা নারীর চোখের পিউপিল বা তারারন্ধ্র স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট থাকবে এবং চোখের আশেপাশের শিরাগুলিও সুস্পষ্ট হবে- এমনটাই দাবি করেন তিনি।
তার এই ব্যাখ্যার অবশ্য বিপক্ষে মতই বেশি পাওয়া যায়। তবে এটা মেডিকেল সায়েন্সে স্বীকৃত যে গর্ভকালীন অবস্থায় চোখের দৃষ্টিতে পরিবর্তন আসাটা অস্বাভাবিক নয়। এই কারণে ‘কেবল গর্ভাবস্থায়’ চোখের দৃষ্টিতে সমস্যা মনে হলে কোনরকম ওষুধপথ্য নিতে মানা করেন চিকিৎসকরা।
৫. চ্যাডউইক’স টেস্ট
১৮৮৬ সালে আমেরিকান গাইনাকোলজিকাল এসোসিয়েশনের একটি সভায় ডা. জেমস চ্যাডউইক নামের একজন চিকিৎসক প্রথম মত দেন যে, গর্ভকালীন ৬ষ্ঠ থেকে অষ্টম সপ্তাহে যোনীপথে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পায়। এতে করে সেখানে কোষগুলি গাঁঢ় নীলাভ অথবা লালচে বেগুনি মত রঙ ধারণ করে।
পিস প্রফেটসদের ব্যবহৃত ডায়াগ্রাম
সেই বিজ্ঞানীর নামানুসারে এই পদ্ধতিটির নাম রাখা হয় ‘চ্যাডউইক’স সাইন টেস্ট’। সেকালে অবশ্য এই পদ্ধতির অত জনপ্রিয় হতে পারেনি। এর কারণ ছিল দুইটি। এক হচ্ছে রঙ এর ভিন্নতা বেশ সূক্ষ্ম বিধায় কেবল অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরাই কেবল বুঝতে পারতেন। আর দুই হচ্ছে সেই সময়ে খোদ পশ্চিমা সমাজও ছিল যথেষ্ট রক্ষণশীল; তাই নারী চিকিৎসক যেমন ছিল না, নারীদের চিকিৎসাও এখনকার মত এত সহজ ছিল না।
৬. খরগোশ বলে দিবে গর্ভবতী কিনা
১৯২০ সালে দুইজন জার্মান বিজ্ঞানী আশেইম ও জোনদেক মত দেন যে, গর্ভবতী নারীদের মূত্রে এমন একটি হরমোন আছে যা কিনা খরগোশের গর্ভাশয় এর বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে। এই হরমোনটি আসলে HCG (হিউম্যান কোরিওনিক গোনাডোট্রপিন), হিউম্যান প্রেগনেন্সি কিটে যার মাধ্যমে গর্ভধারণ নিশ্চিত করা হয়।
ডা. জ্যাকিস গিলিমে- প্রখ্যাত চক্ষুবিদ ও গাইনি বিশেষজ্ঞ
এটি পদ্ধতিটি কাজ করে এভাবে- এক সিরিঞ্জ মূত্র একটি খরগোসের শরীরে প্রথমে ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে পুশ করানো হতো। এর ৫ দিন পর একে মেরে ফেলে দেখা হত এর ডিম্বাশয়ের বৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কিনা। এই পদ্ধতিতে ইঁদুরও পরীক্ষা করা হত এবং একইরকম ফল পাওয়া যেত। পরে অবশ্য বিজ্ঞানীরা ব্যাঙ ব্যবহার করতেন। ব্যাঙ এর ক্ষেত্রে সুবিধা ছিল যে ব্যাঙকে মেরে ফেলতে হত না। একজন নারী গর্ভবতী হোলে তার মূত্র ব্যাঙের শরীরে প্রবেশ করানোর ২৪ ঘন্টার মধ্যেই ব্যাঙটি ডিম দিত।
৭. প্রেগন্যান্সি কিট
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ‘প্রেগন্যান্সি কিট’ মূত্রে থাকা HCG  হরমোনের উপস্থিতি বলে দেয়, যে হরমোন কেবল গর্ভাবস্থায় একজন মায়ের শরীরে উৎপন্ন হয়। ১৯২০ সালে র‍্যাবিট টেস্টের হাত ধরেই পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে উদ্ভাবিত হয় এই প্রেগন্যান্সি কিট।
জেমস চ্যাডউইক- চ্যাডউইক টেস্টের আবিষ্কর্তা
মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রেগন্যান্সি কিট আবিষ্কার হয় আল্ট্রাসনোগ্রাফি আবিষ্কারেরও আট বছর পরে! এরপর ১৯৮০ সালের পর থেকে বিশ্বব্যাপী এর বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয়।
মেডিকেল সায়েন্সে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, P for Pee and P for Pregnancy. অবাক না হয়ে পারা যায় না, মিশরীয়রা সেটি আবিষ্কার করেছিল আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগেই! এরপরে বিভিন্ন সভ্যতায় বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছে, তবে অধিকাংশ পদ্ধতিতেই গর্ভবতী মায়ের মূত্রের ব্যবহার লক্ষণীয়। বর্তমানে প্রেগন্যান্সি কিটে গর্ভধারণের ১০ দিনের মাথায় জানতে পারা যায়। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত এমন প্রেগন্যান্সি টেস্ট আসবে যা কিনা আরো দ্রুত বলে দিতে পারবে গর্ভধারণের কথা, এমনটাই আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।
প্রেগন্যান্সি কিট

Wednesday, November 15, 2023

পাইলস কি অপারেশন করলে আবারো হয় by অধ্যাপক ডা. এ কে এম ফজলুল হক

পাইলসের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া, মলদ্বারে মাংসপিণ্ড ফুলে ওঠা, যা কখনো কখনো মলদ্বারের বাইরে ঝুলে পড়ে এবং হাত দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়। এ রক্ত সাধারণত টাটকা লাল হয়। মনে রাখতে হবে পায়ুপথে ক্যান্সার হলেও রক্ত যায়। অতএব নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না যে, আপনার পাইলস হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মলদ্বারের ভেতর বিশেষ ধরনের পরীক্ষা যেমন, সিগময়ডস্কপি বা কোলনস্কপি ছাড়া কারও পক্ষে সঠিক রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

আধুনিক প্রযুক্তির ফলে অপারেশন ছাড়াই বেশির ভাগ পাইলস রোগীর চিকিৎসা সম্ভব। এ পদ্ধতির নাম হচ্ছে রিং লাইগেশন পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে চিকিৎসার ফলে এখন ৮০-৯০% পাইলস রোগী অপারেশন ছাড়াই ভালো হচ্ছেন। লেখক বিগত নয় বছরে এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে চমৎকার ফল পেয়েছেন। প্রথিতযশা আমেরিকান কলোরেক্টাল সার্জন ডা. মারভিল এল করম্যান এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করে বলেন যে, আমি এখন ৮০-৯০% পাইলস রোগীকে অপারেশন এড়াতে পারছি।

প্রায়ই আমরা একটি বিব্রতকর সমস্যার সম্মুখীন হই। সেটি হচ্ছে সম্মানিত রোগীরা জিজ্ঞাসা করেন যে, শুনেছি পাইলস অপারেশন করলে আবার হয়, তাই আর অপারেশন করে লাভ কি? এক কথায় এর উত্তর দেয়া যায় না। রোগীদের এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পূর্বে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস পর্যালোচনা করা দরকার। রেকটাম ও মলদ্বারের অনেক রোগ আগের যুগে অপারেশন করে ভালো করা দুষ্কর ছিল। পাইলস বা ফিস্টুলা অপারেশন করলে আবার হওয়াই ছিল নিয়ম। এ প্রসঙ্গে আমি আমেরিকান সার্জন অধ্যাপক ডা. মারভিন এল করম্যানের লেখা ‘কোলন-এর রেকটাল সার্জারি’ নামক টেক্সট বই থেকে একটি উদ্ধৃতি দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে এবং এ জাতীয় সার্জারির অতীত পেক্ষাপট বুঝতে সুবিধা হবে। অধ্যাপক ডা. করম্যান তার বইয়ে লেখেন যে, বিগত দুই হাজার বছর ধরে মলদ্বারে ফিস্টুলার ওপর অসংখ্য বই ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা প্রমাণ করে যে এটি একটি বিশেষ সমস্যা এবং ফিস্টুলার অপারেশনের ব্যর্থতার জন্য সার্জনদের যত বদনাম হয়েছে অন্য কোনো অপারেশনে আজ পর্যন্ত তা হয়নি। এ কারণে ১৮৩৫ সালে ডা: স্যালমন লুনের কেন্দ্রে একটি আলাদা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন যার নাম দেয়া হয় সেন্ট মার্কস হসপিটাল ফর দ্য ডিজিজেস অব কোলন অ্যান্ড রেকটাম। যে হাসপাতালের উদ্দেশ্য ছিল বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথেরে বিভিন্ন রোগের চিকিৎ করা এবং এ জাতীয় বিশেষজ্ঞ সার্জন তৈরি করা। যারা এ জাতীয় রোগগুলো বিশেষজ্ঞ হিসবে নৈপুণ্যের সঙ্গে চিকিৎসা করবেন যাতে আবার হওয়ার বদনাম থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায়।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারছি সম্মনিত রোগীদের প্রশ্নের যথাযথ এবং এর ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতা। বিগত ১৬৫ বছর ধরে উন্নত দেশগুলোতে এ কারণেই বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ সার্জারি একটি আলাদা বিশেষজ্ঞ বিভাগ হিসেবে স্বীকৃত। এবার আসা যাক মূল প্রশ্নের তাত্ত্বিক আলোচনায়। প্রশ্ন হচ্ছে- পাইলস অপারেশনের পর আবার হয় কি না। মলদ্বারে সাধারণত হয় এমন তিনটি রোগ পাইলস, এনাল ফিশার ও ফিস্টুলা। কিন্তু সাধারণ রোগীরা সব রোগকেই পাইলস বলে মনে করেন। তাই এসব রোগের চিকিৎসার পর যখন কোনো সমস্যা হয় তখন তারা পাইলস আবার হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানে যাকে পাইলস বা হেমোরায়েড বলে সেটি অপারেশনের পর আবার হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২ ভাগ। বেশির ভাগ রোগী যারা পাইলস আবারো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন, তারা এটি বলতে সাধারণত বোঝান মলদ্বারে বাড়তি ত্বক বা মাংসপিণ্ড অথবা চুলকানি হয়েছে এটিকেও কেউ কেউ আবার পাইলস হয়েছে বলে ধরে নেন। এ সমস্যাগুলো দ্বারা পাইলস আবার হয়েছে বোঝায় না। মলদ্বারের চুলকানি বিভিন্ন রোগের একটি লক্ষণ মাত্র। খুবই কম অর্থাৎ ২% ক্ষেত্রে হলেও পাইলস আবার হতে পারে।

ব্যাপারটি কি করে ঘটে তা বোঝাতে বিস্তারিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন। এ ব্যাপারটি ঘটার পেছনে অপারেশনের একটি কৌশলগত কারণ রয়েছে। অপারেশনের সময় যে শিরাগুলো স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল পরবর্তী সময়ে মলদ্বারের চাপ বৃদ্ধি পাওয়া অথবা কোলাটারাল রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে কয়েক বছর পর এগুলো পাইলস আকারে দেখা দিতে পারে। তাছাড়া পাইলস যখন খুব বড় হয় তখন মনে হয় মলদ্বারের চতুর্দিকের সব এলাকাই পাইলসে ভর্তি। তখন একজন সার্জনের মনে হয় সব স্ফীত অংশই কেটে ফেলে দিতে হবে। না হলে পাইলস থেকে যাবে। যদি এভাবে সবকিছু কেটে ফেলে দেয়া হয় তাহলে মলদ্বার সঙ্কুচিত হয়ে মলদ্বারে বাধা সৃষ্টি হবে। এ ক্ষেত্রে সঠিক কৌশলটি হচ্ছে- দুটি পাইলসের মাঝখানে আমাদের বাধ্যতামূলকভাবে কিছু ঝিলি ও ত্বক সংরক্ষণ করতে হবে। যেহেতু এর তলদেশে পাইলসের শিরাগুলো বিস্তৃত থাকে তাই ঝিলির তলদেশে থেকে সতর্কতার সঙ্গে এ শিরাগুলোকে কেটে নিয়ে আসতে হবে। এ কৌশল অবলম্বন করলে পাইলসের শিরাগুলো যেমন সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করা সম্ভব, তেমনি দুটি পাইলসের মধ্যবর্তী ঝিলির এবং ত্বকও সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, যাতে মলদ্বারে সঙ্কুচিত (Anal Stenosis) হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে না।

যা হোক, অপারেশনের পর অল্প কিছু ক্ষেত্রে যখন আবারো পাইলস দেখা দেয়, তখন এগুলোর উপসর্গ ততটা তীব্র হয় না। এটিকে তখন বিনা অপারেশনে রিং লাইগেশন চিকিৎসা করা সম্ভব। সাধারণত আবার অপারেশনের প্রয়োজন হয় না।
ব্যক্তিগত মতামত : লেখক বিগত নয় বছরের ২৯,৬৩৫ জন পায়ুপথের সমস্যায় ভুগছেন এমন রোগীদের ওপর গবেষণা করে দেখেছেন যে, পাইলস ও ফিস্টুলা রোগ অপারেশন করলে আবার হয়, এ ধারণা সম্পূর্ণ অমূলক। তবে বিনা অপারেশনে রিং লাইগেশন পদ্ধতিতে পাইলস চিকিৎসা করলে ৯০ শতাংশ রোগী ভালো হন, বাকিদের অপারেশন প্রয়োজন হয়।

>>>লেখক : বৃহদন্ত্র ও পায়ুপথ বিশেষজ্ঞ, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, (অব) কলোরেকটাল সার্জারী বিভাগ, বিএসএমএমইউ, ঢাকা।
>>>চেম্বার : ইডেন মাল্টি-কেয়ার হসপিটাল, ৭৫৩, সাতমসজিদ রোড, (ষ্টার কাবাব সংলগ্ন) ধানমন্ডি, ঢাকা। ফোন : ০১৭৫৫৬৯৭১৭৩-৬

Friday, November 10, 2023

কোনো ইহুদিরাষ্ট্র ৮০ বছর টেকে না—যে ভয়ে ভীত ইসরায়েল by সারফুদ্দিন আহমেদ

দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশগুলো ইসরায়েলের ‘পকেটে’ থাকার পরও এই রাষ্ট্রটি অস্বাভাবিক রকম অস্থির আচরণ করছে। বিশেষ করে হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল গাজার মুসলমানদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে দানবের মতো যা করছে, তা ইসরায়েল কর্তৃপক্ষের ভেতরকার নাজুকাবস্থা ও অস্থিরতাকে আমাদের সামনে স্পষ্ট করে দিচ্ছে।

সর্বশেষ ঘটনায় ইসরায়েলের একজন মন্ত্রী বলেছেন, গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলা উচিত। মনে হচ্ছে, এক ধরনের আতঙ্ক বা ফোবিয়ায় ইসরায়েল আক্রান্ত হয়েছে। মনে হচ্ছে, অস্তিত্ব সংকটে পড়ার মতো কোনো অনুভূতি রাষ্ট্রটির নেতাদের আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

সব দিক থেকে সমৃদ্ধ ও সুসজ্জিত থাকার পরও ইসরায়েল এমন অস্থির আচরণ কেন করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এটি নিয়ে বাইরের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি হচ্ছে। এই প্রবন্ধটি লেখার ক্ষেত্রে সেসব সূত্র থেকে সহায়তা নেওয়া হয়েছে।

ইসরায়েল কেন গাজায় উন্মত্ত আচরণ করছে, কেন তারা গোটা গাজাকে গিলে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, তার জবাব খুঁজতে গিয়ে ইসরায়েলকে জড়িয়ে ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ শব্দগুচ্ছটি আবার জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে।

ইংরেজিতে এই টার্মটিকে বলে ‘কার্স অব এইট্থ ডেকেড’। আরবিতে বলে ‘লা'নাতুল আকদিস সামিন’।

‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ টার্মটির জন্ম হয়েছে ইহুদিদের অতিগুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ন্যায়শাস্ত্র তালমুদ-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী থেকে। (এইখানে বলে রাখা ভালো, তালমুদ কিন্তু ইহুদি সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত নয়।

এটি তাওরাতের আলোকে ইহুদি পণ্ডিতদের রচিত নীতি ও আইন শাস্ত্র যা ইহুদিদের প্রাত্যহিক জীবনের করণীয়, পালনীয়, পরিত্যাজ্য বিষয়গুলোকে বাতলে দেয়)।

এই তালমুদের একটি ভবিষ্যদ্বাণী হলো: কোনো ইহুদি রাষ্ট্র আট দশকের বেশি টিকবে না। ভেঙে যাবে। আর সে ভাঙন বাইরের কোনো শক্তির কারণে হবে না। হবে নিজেদের মধ্যকার জাতি-উপজাতির কোন্দল থেকে। বাস্তবিক দেখাও গেছে তাই।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গত দুই হাজার বছরে বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় সার্বভৌম ইহুদি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে কিং ডেভিডের (ইসলামে যিনি নবী দাউদ আঃ) রাজত্ব আর হাসমোনিয়ান রাজত্ব ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো ‘ইহুদি রাজ্য’ ৮০ বছরের বেশি টেকেনি।

কিং ডেভিডের রাজত্ব ও হাসমোনিয়ান রাজত্ব ৮০ বছরের বেশি টিকে থাকলেও এই দুই রাজত্বের ভাঙন ধরেছিল ৮০ বছরের মাথায়। এরপর সে দুটো রাজত্ব টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল।

আজকের আধুনিক এই ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ ইসরায়েলের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ১৪ মে। ২০২৮ সালে ৮০ বছর পূরণ হবে। তার মানে হাতে আছে চার বছর। তালমুদের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হলে আর তিন-চার বছরের মধ্যে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি ভেঙে যাওয়ার কথা। ইসরায়েলিদের অনেকের মনে ভয়, তা হলে কি সেটাই ঘটতে যাচ্ছে?

শুধুমাত্র ধর্ম কিংবা ভবিষ্যদ্বাণীতে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষের মধ্যে যদি এই প্রশ্ন সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে হয়তো এ নিয়ে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কোনো চর্চা হতো না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ কথাটি এমন সব নেতাদের মুখ থেকে উচ্চারিত হয়েছে যার প্রবল রাজনৈতিক প্রভাব আছে।

যেহেতু ইসরায়েলের ইহুদি সম্প্রদায়ের লোক তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতে বিশ্বাসী ও তালমুদের আদেশ-নিষেধ সংক্রান্ত প্রত্যাদেশের অনুসারী, সেহেতু ইসরায়েলের বাসিন্দাদের একটি বিরাট অংশ ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ নিয়ে নিজেদের মধ্যে সিরিয়াস আলাপ আলোচনা করে থাকেন।

লেবানন থেকে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের কোনো কোনো প্রতিবেদন বলছে, যেহেতু ইসরায়েলের বয়স এখন ৭৭ বছর, সেহেতু অনেক ইহুদি ইসরায়েলের ওপর কোনো দুর্যোগ নেমে আসলে কীভাবে সেখান থেকে সরে যাবেন, তা নিয়ে আলাপ আলোচনা করছেন। তারা এই ন্যাচারাল ফেনোমেনন বা প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ অমোঘ নিয়মে নেমে আসতে পারে বলে বিশ্বাস করেন।

ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক (যিনি কিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে দেশটির সেনাপ্রধান হিসেবে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সম্মানসূচক মেডেল পেয়েছিলেন) গত বছর ইসরায়েলের ‘ইয়েদিয়ত আহরোনত’ পত্রিকায় এক নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘ইহুদিদের গোটা ইতিহাসে দুটি ছাড়া ৮০ বছরের বেশি স্থায়ীত্বকালের কোনো রাষ্ট্র ইহুদিদের ছিল না। সে দুটির একটি হলো, কিং ডেভিডের রাজত্ব ও হাসমোনিয়ান রাজত্ব।

উভয় রাজত্বকালের ভাঙনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল অষ্টম দশকে। অষ্টম শতকের দ্বারপ্রান্তে এসে ফিকে হতে থাকা আগেকার সেই ইহুদি রাজ্যগুলোকে যে বিভাজন জর্জরিত করছিল, সেই বিভাজন থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।’

ওই নিবন্ধে এহুদ বারাক বলেছেন, ইসরায়েল সমাজে বিভাজন ও বিভেদ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। বামপন্থী বনাম ডানপন্থী; ধর্মীয় গ্রুপ বনাম সেক্যুলার গ্রুপ; ধর্মীয় জায়নবাদী বনাম ধর্মীয় ইহুদিবাদী গোটা ইসরায়েলি সমাজকে শতধা বিভক্ত করছে যা ইসরায়েল রাষ্ট্রটির জন্য হুমকি হয়ে পড়েছে।

এহুদ বারাকের মতোই বিভক্তি নিয়ে তারও আগে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছিলেন, ইসরায়েলের সাবেক প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিন। ২০১৭ সালে তিনি হার্জলিয়া কনফারেন্সে দেওয়া ভাষণে বলেছিলেন, ইসরায়েলে ৩৮ শতাংশ সেক্যুলার ইহুদি, ১৫ শতাংশ জায়নবাদী ইহুদি, ২৫ শতাংশ আরব এবং জায়নবাদী নয় এমন উগ্র অর্থোডক্স মৌলবাদীরা আছে ২৫ শতাংশ। রিউভেন বলেছিলেন, এরা নিজেদের মধ্যে যেভাবে বিবাদে জড়াচ্ছে তা উদ্বেগের বিষয়।

রিউভেন বলেছিলেন, ‘আমরা জায়নবাদীরা এই বাস্তবতা কি মেনে নিতে পারি? আমরা কি এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারি যে, ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক (আরব ও ফান্ডামেন্টালিস্ট ইহুদি) নিজেদের জায়নবাদী মনে করে না এবং আমাদের জাতীয় সংগীত গায় না?’

২০১৭ সালে ইসরায়েলের হারেৎজ পত্রিকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই অস্তিত্ব বিষয়ক হুমকির কথা মাথায় রেখে এক হয়ে থাকতে হবে।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের মাথায় রাখতে হবে, ১৪০ বছর ধরে কেনান শাসন করা হাসমোনিয়ান ইহুদিরাও ৮০ বছরের বেশি একতা ধরে রাখতে পারেনি।’
চলতি দফায় প্রধানমন্ত্রিত্ব নেওয়ার আগে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ইসরায়েলকে আট দশকের অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার নিশ্চয়তা তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারই দিতে পারে।

আর এর আগের প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ২০২০ সালে তাঁর নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন, একমাত্র তাঁর সরকারই অষ্টম দশকের অভিশাপকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের অবশ্যই দেশের ভেতর থেকে ভেঙে না পড়ার দিকে মনোনিবেশ করতে হবে; কারণ ইসরায়েলের মুখোমুখি সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা হলো অভ্যন্তরীণ বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি। আমরা সেই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছি যা ইহুদিদের পূর্ববর্তী রাজ্যগুলোর সঙ্গে ঘটেছিল।’

অর্থাৎ এই ‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ নিয়ে যে একটি ধারণা ইহুদিদের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, সেটি এই নেতাদের কথায় বোঝা যায়।

দ্য মিডল ইস্ট মনিটর পত্রিকায় ২০২২ সালের ১২ মে প্রকাশিত একটি কলামে লিগ অব পার্লামেন্টারিয়ানস ফর আল কুদস-এর মহাপরিচালক মোহাম্মাদ মাকরাম বালাবি বলেছেন, ইসরায়েলিদের মধ্যে নানা বিভেদ ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হচ্ছে। হেরেদি সম্প্রদায় ও ধর্মীয় জায়নবাদীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনেক গভীর হয়েছে।

হেরেদি সম্প্রদায় জায়নবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে থাকেন, তারা তাওরাতের শিক্ষার পরিপন্থী কাজ করে থাকেন এবং তাঁদের জুলুমের কারণেই মুসলমানদের দিক থেকে ইহুদিদের ওপর পাল্টা আঘাত আসে। আর জায়নবাদীরা হেরেদি সম্প্রদায়কে আরবদের তোষণকারী বলে থাকে। এ ইস্যুতে আদর্শগতভাবে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব গভীর হচ্ছে।

‘অষ্টম দশকের অভিশাপ’ শুধু যে ইহুদি সমাজে আলোচিত হয় তা নয়, ফিলিস্তিনি ও আরব নেতাদের কথার মধ্যেও সেই শাস্ত্রীয় অভিশাপের উল্লেখ অনেকবার এসেছে।
২৫ বছর আগে হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমাদ ইয়াসিন বলেছিলেন, ইসরায়েলের ভেঙে পড়ার সময়কাল শুরু হয়ে গেছে।

হামাসের বর্তমান মুখপাত্র আবু উবায়দাও তাঁর সর্বশেষ ঘোষণায় ইহুদিদের উদ্দেশে বলেছেন, ইসরায়েলের সময় শেষ। এই যুদ্ধই চূড়ান্ত যুদ্ধ।

অবশ্য ইতিহাসবেত্তাদের অনেকে বলছেন, যেহেতু এর আগের সবগুলো ইহুদি রাজ্য ৮০ বছরের মধ্যে ভেঙে পড়েছে, সে কারণে ভবিষ্যতে যাতে ইহুদিরা নিজেদের মধ্যে হানাহানি করে শেষ না হয়ে যায়; তাঁরা যাতে একতাবদ্ধ থাকে; সে জন্য ধর্মীয় নেতারা এই অভিশাপের কথা বলেছেন।

অনেকে বলছেন, ৮০ বছরে তৃতীয় প্রজন্মের উদ্ভব হয়। তাঁরা বলছেন, একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজন্ম সাধারণত ঐক্যবদ্ধ থাকে। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে, অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রজন্মের মধ্যে কিছুটা বিরোধ তৈরি হয়।

আর দ্বিতীয় প্রজন্মের সন্তানদের মধ্যে, অর্থাৎ তৃতীয় প্রজন্মের মধ্যে সেই বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। এতে মোটামুটি ৮০ বছর সময় লেগে যায়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে ইসরায়েলের নাগরিকদের পারস্পরিক মতানৈক্য হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ২০২৮ সালের মধ্যে ইসরায়েল নামক শক্তিশালী রাষ্ট্রটি অন্তর্কোন্দলে ভেঙে যাবে তা কোনো যুক্তির কথা নয়।

তাঁরা এই অভিশাপের ধারণাটিকে ধর্মীয় কুসংস্কার বলে উড়িয়ে দিতে চান।
কিন্তু যেহেতু ইসরায়েলের জনগণের মনে এ নিয়ে একটা আতঙ্ক রয়ে গেছে, সেহেতু হামাসের সর্বশেষ এই হামলাকে তাঁদের অনেকে ‘অষ্টম দশকের অভিশাপের’ সঙ্গে মিলিয়ে ফেলছেন।

এতে তাঁরা প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছেন এবং সে কারণেই হয়তো ইসরায়েল সরকার সাধারণ জনমানসকে আশ্বস্ত করতে দানবের মতো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

* সারফুদ্দিন আহমেদ, প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক
_ sarfuddin2003@gmail.com

মনে হচ্ছে, এক ধরনের আতঙ্ক বা ফোবিয়ায় ইসরায়েল আক্রান্ত হয়েছে
মনে হচ্ছে, এক ধরনের আতঙ্ক বা ফোবিয়ায় ইসরায়েল আক্রান্ত হয়েছে। ছবি: এএফপি

Wednesday, October 18, 2023

পাইলস রোগে ইউনানি চিকিৎসা by ডা: মো: শাহজালাল চৌধুরী

রিয়াজ, একজন ছাত্র। বয়স ২০ বছর। বিগত তিন থেকে চার বছর সে পেটের আমাশয় রোগের পাশপাশি, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া সমস্যায় ভুগছিলেন, তারপর বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে চিকিৎসক তার রোগের উপসর্গ ইতিহাস শুনে এবং দৈহিক পরীক্ষা করে জানালেন- তার দ্বিতীয় পর্যায়ের পাইলস বা হেমোরয়েড হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক তাকে মুখে খাওয়ার কিছু পাইলসের ওষুধ দিলেন এবং পায়ুপথে লাগানোর একটা মলম দিলেন। এতে তিনি রোগের কিছুটা উন্নতি পেলেও পুরোপুরি সেরে উঠলেন না। একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি ইউনানি চিকিৎসকের পরামর্শ নেন।
চিকিৎসকের পরার্মশক্রমে প্রায় দুই থেকে তিন মাস হামদর্দের এ সমস্যার চিকিৎসা গ্রহণ করলেন। তারপর থেকে তার রক্তবিহীন স্বাভাবিক পায়খানা হয় এবং পায়ুমুখে বাহ্যিক আর কোনো ফুলাও অনুভূত হয় না। রিয়াজের মতো বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৫০ বছরের নিচে বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে পাইলসের উপসর্গ বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়।
হেমোরয়েড় সাধারণত পায়ুপথে ত্বকের নিচের ও মলাশয়ের ভেতরে এক ধরনের রক্তজালিকা। যখন পায়ুপথের এসব শিরার সংক্রমণ এবং প্রদাহ হয়, চাপ পড়ে, তখন হেমোরয়েড বা পাইলস সৃষ্টি হয়। সাধারণ কথায় যাকে অর্শ রোগ বলা হয়। আর ইউনানি পরিভাষায় বাওয়াসির বলে।
বাওয়াসির বা হেমোরয়েড বা অর্শ রোগের অবস্থান সাধারণত দুই ধরনের যথা-
* পায়ুপথের বহিঃ অর্শ রোগ।
** পায়ুপথের অন্তঃ বা ভেতরের অর্শ রোগ।
*** আবার কখনো দুটো প্রকার বা অবস্থা একসাথেও থাকতে পারে।

পায়ুপথের ভেতরের অর্শ রোগ বা হেমোরয়েড ফুলে পায়ুমুখের বাইরে বের হয়ে আসার ডিগ্রির ভিত্তিতে চারটি পর্যায় বিভক্ত যথা :
প্রথম পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে আসে না, প্রলেপস হয় না)। দ্বিতীয় পর্যায়, (পায়খানার পর হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে এবং তারপর আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যায়)। তৃতীয় পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে এবং নিজে ঠিক করতে হয়। চতুর্থ পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে আসে বা প্রলেপস হয়ে এবং তা আর নিজে ঠিক করা যায় না)
পাইলসের (বাওয়াসির) প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- দীর্ঘ দিন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা, ক্রনিক ডায়রিয়া, মলত্যাগে দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা ও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা। এ ছাড়া পারিবারিক ইতিহাস, আশযুক্ত খাবার কম খাওয়া, ভারী মালপত্র বহন করা, স্থূলতা, কায়িক শ্রম কম করা, গর্ভকালীন পায়ুপথে যৌনক্রিয়া, যকৃত রোগ বা লিভার সিরোসিস ইত্যাদি কারণে রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সর্বোপরি পোর্টলি ভেনাস সিস্টেমে কোনো ভাল্ব না থাকায় উপরিউক্ত যেকোনো কারণে পায়ু অঞ্চলে শিরাগুলোতে চাপ পড়ে, ফলে হেমোরয়েড সৃষ্টি হয়।
অর্শ রোগে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তা হচ্ছে- পায়ুপথের অন্তঃ বা ভেতরের অর্শ রোগে সাধারণত তেমন কোনো ব্যথা বেদনা, অস্বস্তি থাকে না। অন্যদিকে পায়ুপথের বহিঃ অর্শ রোগে- পায়ুপথ চুলকায়, বসলে ব্যথা করে, পায়খানার সাথে টকটকে লাল রক্ত দেখা যায় বা শৌচ করা টিস্যুতে তাজা রক্ত লেগে থাকে, মলত্যাগে ব্যথা লাগা, পায়ুর চারপাশে এক বা একের অধিক থোকা থোকা ফোলা থাকে।
চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করে ও রোগীর উপসর্গ শুনেই অর্শ রোগ শনাক্ত করতে পারবে। এ ছাড়া পায়ুনালীর সমস্যাগুলো খুব খারাপ কি না বা অন্য কোনো রোগ আছে কি না তা জানতে অ্যানোস্কপি বা সিগময়ডস্কপি বা কলোনস্কপি পরীক্ষা, মলের লুকায়িত রক্ত নির্ণয় পরীক্ষা (ওবিটি), মলের আণুবীক্ষণিক পরীক্ষা করাতে পারেন।
একটা কথা আমরা সবাই জানি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম, অর্শ রোগ যেহেতু জীবনধারা ও খাদ্যাভাসের সাথে অনেকাংশে জড়িত। তাই শৃঙ্খলিত জীবন যাপনই রোগ প্রতিকারের চেয়ে রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় তথা প্রথম মাধ্যম। তাই নিয়ম করে অতিরিক্ত কোথ না দিয়ে সাবলীলভাবে মলত্যাগ করা, যেগুলো ফল খোসাসহ খাওয়া যায়, তা খোসাসহ খাওয়া। আশযুক্ত খাবার শাকসবজি বেশি খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত ব্যয়াম করা, লাল গোশত পরিহার করুন, প্রাথমিক অবস্থায় উষ্ণ পানি এবং ক্রনিক বা রোগ পুরনো হলে শীতল পানিতে নিতম্ব স্নান করতে পারেন।
অর্শ রোগ প্রতিকারের আগে মূল লক্ষ্য হবে অর্শ রোগ হওয়ার মূল কারণগুলো শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করা। অর্শ রোগ প্রতিকারে যেসব ভেষজ উপাদান কার্যকর তা হচ্ছে- বাসক, থানকুনি, আমলকী, হরিতকি, মেহেদি পাতা, ইসবগুল, নিমপাতা ও নিমতেল, ভাংপাতা, মুকিল, জিংগবিলোবা।
অর্শ রোগকে রোগের ধরনভেদে চারটি ডিগ্রিতে ভাগ করে এর পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় ডিগ্রির সাধারণত ওষুধ দিয়ে সারে। রক্তপাতযুক্ত অর্শ রোগে বাসক পাতার রস ১ চামচ করে দিনে তিনবার সেবন করুন।
অথবা হরিতকি ওই এক চামচ পরিমাণ দৈনিক একবার গরম পানিসহ সেবন করুন।
সাতটি নিমফুল বা নিম বীজের মজ্জা পানিসহ সকালে সেবন করুন। ইসবগুল এক চামচ পরিমাণ পানিসহ রাতে সেবন করুন। আর ইসবগুল, নিমপাতা ও নিমতেল, মুকিল এ-জাতীয় বিভিন্ন ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি ইউনানি ওষুধ ট্যাবলেট টোনালেক্স, হ্যানরয়েড, হ্যানরয়েড বি, কবি, মুকিল, মাজুন ওশবা, সফুফ ইন্দেমালি, ট্যাবলেট পিবলিউ (বন্দিশ খুন) হামদর্দের ক্লিনিকগুলো থেকে চিকিৎসকের পরার্মশ মতো খেতে পারেন। এ ছাড়া অর্শ রোগ যদি ভেষজ ওষুধ যা অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ ও প্রতিরোধ চিকিৎসায় না সারে, তাহলে একজন কলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ মতো চিকিৎসা নিতে পারেন। যদি এ রোগ ডায়াগনোসিস না করানো হয় বা চিকিৎসা না নেয়া হয়, তাহলে দেহ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে, পায়ুপথে ক্যান্সার হতে পারে।
তাই আসুন, আমরা প্রাকৃতিকভাবে অর্শ রোগ প্রতিরোধ করে, চিকিৎসা নেই, অর্শ রোগজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দূর করি। এতে অর্শ রোগজনিত অস্ত্রোপচার/সার্জিক্যাল/শল্য চিকিৎসা বা খরচ যেমন অনেক কমবে, তেমনি আমাদের জীবন হবে সুস্থ, সুন্দর ও আনন্দময়।
>>>লেখক : লেকচারার, কমিউনিটি মেডিসিন, হাকিম সাঈদ ইস্টার্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, নিমতলী, ঢাকা। ফোন : ০১৬৭৮৭৬৪৬৬০

Friday, October 13, 2023

গল্প- অন্ত্যজা by শাশ্বত নিপ্পন

এ অঞ্চলে নদী বলতে এই একটিই। নাম মৌরি। নামটা অনেকটা পাহাড়ী নদীর মত। যদিও মৌরি নদী জড়িয়ে আছে পাঁচ গ্রামকে, তারপরও মৌরি পাড়ের মানুষ বলতে বুঝায় মনোহরপুর বাজার আর কামদেবপুর গ্রামের পাশ ঘেসে মৌরি যেখানে বাঁক নিয়েছে নিজস্ব ঢংঙে ঠিক তার পূর্ব পার্শে মাইল খানেক উচু জায়গায় গড়ে ওঠা বেশ্যা পল্লীটিতে যারা বসবাস করে তাদেরকে। এক সময়ের দোর্দন্ড প্রতাপ মৌরির বাঁকের মুখে কবে এই পতিতা পল্লীর জন্ম -এ নিয়ে এ অঞ্চলের কারো ভাবনা নেই। তবে পরিচিতির কমতি নেই। এই পাড়ায় দূর দুরান্ত থেকে খদ্দের আসে যন্ত্রচালিত নৌকা ভাড়া করে। সন্ধ্যায় আসে সকালে চলে যায়, আবার দুই একদিন থেকেও যায় কখনো কখনো। তাই মৌরি এখানকার মানুষের নির্ভরতার অনেকখানি। এরা মৌরি জলে স্নান সেরে পবিত্র হয়, মৌরির জলেই বাঁচে, আবার ভেসেও যায়। বর্ষার মুখে মৌরির যৌবন আসতে শুরু করে। আষাঢ়ের শুরতে মৌরির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালে মনে হয় নদীটি কেমন যেন দুলছে। বৃষ্টির চাপ বাড়ার সাথে সাথে নদীও হিংস্র হয়ে উঠতে থাকে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ে। পরিণত খরিস সাপের মত ফনা দোলাতে থাকে। সারা বছরের অবজ্ঞার প্রতিশোধের নেশায় উন্মাদ হয়ে ওঠে। পাঁচ গ্রাম ধোয়া ঘোলা জলে ঘুর্ণি খেলতে শুরু করে। সেই ঘুর্ণিতে দূর থেকে ভেসে আসে মরা পেট ফোলা গরু, ছাগল, ঘরের টিন, ঘুমানোর চৌকি আবার মানুষের লাশ -যার চোখ খেয়েছে মাছে। পেট ফোলা লাশের উপর নিশ্চুপ বসে থাকে কাক। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে মৌরির ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে থাকে। এ সময় বেশ্যা পাড়ার রোগা ডিগডিগে কালো কালো ছেলেদের সামান্যতম বেয়াদবী, দুষ্টুমি অথবা ছেলেমানুষী মৌরি সহ্য করেনা। ভেসে আসা অভিশপ্ত টিন অথবা চৌকিতে প্রলুব্ধ হয়ে বেশ্যা পাড়ার অভাবী মানুষগুলো ঘোলা জলে ঝাপ দিলেই মৌরি আবার তার জলে ঘুর্ণি তোলে। একটানে তাকে নিয়ে যায় বহুদূর। যেখানে বেশ্যাপাড়ার নিত্যদিনের হিসেব নিকেষ, হাহাকার আর বেবুশ্যেদের চিৎকার অথবা হা-হুতাশ পৌঁছেনা। এভাবে বহু প্রাণ ভেসে গেছে আজ অবধি। তবু লোভ যায়না অভাবি মানুষগুলোর। চৌকিতে শোয়ার লোভ সামলাতে পারেনা এখানকার মানুষগুলো। প্রিয়জনকে নদীর পাড়ে অপেক্ষায় রেখে ওরা ভেসে যায় নদীর জলে। শোকের তুফান ওঠে বেশ্যাপাড়ায়। বুক চাপড়ে প্রলাপ করতে থাকে আরতি, পূর্ণিমা, রেবতিরা। সেই শোকে সংক্রামিত হয় শাবানা, অলিভিয়া, ববিতাদের মাঝেও। এ সবই নিজেদের রাখা নাম। এরা নিজে নিজেই নিজের নাম রাখে অথবা খালা দিয়ে দেয় একটা বাহারী নাম; অথবা খদ্দেরে। খদ্দেরের পছন্দ মোতাবেক বেশ্যারা কেউ হিন্দু অথবা মুসলমান হয়। মৌরির জলে যেদিন কেউ ভেসে যায় সেদিন আর হাঁড়ি চড়েনা বেশ্যাপাড়ার হেঁসেলে। পিতৃ পরিচয়হীন শিশুর শোকে নামহীন গোত্রহীন বেশ্যারা সেদিন নাওয়া-খাওয়া ভুলে যায়। সবাই সেদিন একত্র হয় হরেন মাস্টারের ঘরে। হরেন মাস্টার এদের ভগবান, এদের আল্লাহ, এদের প্রাণ। পাড়ার সকলেই মাস্টারকে মান্য করে। নতুন পুরাতন সব মেয়েমানুষ তাকে পথে দেখলে পথ ছেড়ে দেয়। হরেন মাস্টারের কি জাত তা এরা জানে না- এ নিয়ে এদের মাথাব্যথাও নাই কারো। শুধু বেশ্যাগুলো জানে হরেন মাষ্টার ওদের এক ধরণের আশ্রয়। সামান্যতেই এদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে যায়। চুল ছেড়াছিড়ি ঝগড়া; খিস্তি-খেউর। খদ্দেরের ফেলে যাওয়া বাংলা বোতলের তলানিটুকু গিলে এক ঘরের মাগী অন্য ঘরের মেয়েছেলের উপর চড়াও হয়। এও ছাড়ার পাত্র নয়; একজন অন্যজনকে ‘খানকি’‘বেশ্যা’ বলে গালাগাল দেয়। বাড়াবাড়ির রূপ নিলেই গলা খেঁকরে বেরিয়ে আসে হরেন মাস্টার। গম্ভীর গলা বলে ওঠে,
– যাও, অনেক হয়েছে, এখন শান্ত হও।
জোঁকের মুখে নুনের ছিটে যেন। কুঁকড়ে যায় দু’পক্ষ। তারপর দু’জনেই ফিরে যায় দু’জনের ঘরে।
অদ্ভুত রহস্যময় এই মানুষটি। সুন্দর সুপুরুষ এই মানুষটিকে সহজেই এখানকার মানুষগুলোর মধ্য থেকে আলাদা করা যায়। বর্তমানে সে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত নয়; অতীতেও ছিল কিনা জানেনা কেউ- তবু তিনি মাস্টার। এই নিষিদ্ধ পাড়ার পিতৃ পরিচয়হীন শিশুগুলোকে কলা-পাউরুটির লোভ দেখিয়ে নিজের ঘরের মেঝেতে পড়তে বসায় হরেন মাস্টার। নিজের অন্যান্য খরচ বাঁচিয়ে সস্তা পেনসিল, কাগজ, স্লেট আর পাউরুটি নিজের পয়সাতেই শহর থেকে কিনে আনে সে। শিশুরা দুলে দুলে সুর করে পড়তে থাকে। পড়তে পড়তে ভুল হলে হাত পাখার লাঠি দিয়ে সেই ভুল শুধরে দেয় হরেন মাস্টার। কখনো কোন চিঠি পত্র উড়ে পাড়ায় এসে পড়লে হরেন মাস্টারই তা পড়ে দেয়। বেশ্যাদের টাকা কড়ির হিসাবও হরেন মাস্টার রাখে সারা বছর। পড়া শেষে সব ছেলেগুলোকে কাছে বসিয়ে নিজেই খাওয়ায় হরেন মাস্টার আর বলে,
– খা, খা, খেয়ে জোয়ান হয়ে ওঠ তো দেখি তাড়াতাড়ি; মস্ত বড় বিদ্যান হবি একদিন, তখন এই মাস্টার দাদুকে একটা লজেন্স কিনে দিস। ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে আদরের ফুলি তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়,
– তখন তো তুমি বুড়ো হয়ে যাবে, তোমার দাঁত পড়ে যাবে, চকলেট খাবা কি করে?
খিলখিল করে হেসে ওঠে শিশুগুলো। সে হাসিতে হরেন মাস্টারও যোগ দেয়। তখন অন্য গ্রামের ভদ্র পাড়ার মত সুন্দর হয়ে ওঠে মৌরি নদীর পাড়ের বেশ্যা পাড়াটা। সারা রাতের ধকল সহ্য করা ক্লান্ত বেশ্যাগুলো দুর থেকে এই পবিত্র দৃশ্য দেখে। তাদের সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চোখে চকিতে একচিলতে স্বপ্ন খেলে যায়। হরেন মাস্টারের প্রতি ওদের শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা বাড়ে।
ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে মেয়ে শিশুর সংখ্যায় বেশি। এ পাড়ায় মেয়ে জন্মায় বেশি। আর মেয়ে জন্মালেই এ পাড়ার খালা/ মাসী খুশি হয়। বাঁচলে এরাই হবে পাড়ার লক্ষি। ছেলে হলে খুশি যে একেবারে হয় না তাও ঠিক না। ছেলে বড় হলে মাস্তান হবে। চুরি করবে; পুলিশে ধরবে; হাজত খাটবে; বের হবে আবার। এক সময় খুনের মামলায় পড়িয়ে পড়বে; অবশেষে দাগী আসামী হয়ে কোন মাগীর ঘরে লুকিয়ে চুরি করে বাংলা মদ, গাঁজা বিক্রি করবে। তারপর এক সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়বে। জেলে যাবে বড় সময়ের জন্য অথবা ক্রসফায়ার। আর মেয়েগুলো পাড়াতেই থাকে। বড় হয়ে ওঠে কলাগাছের মত। তারপর একদিন সন্ধ্যায় গন্ধ তেলে চুল ভিজিয়ে, টাইট ব্লাউজ আর রঙিন সায়া পরে দাঁড়িয়ে থাকে তার মায়ের ঘরের সামনে। এটাই যেন নিয়ম এখানকার। এর ব্যতিক্রম নেই। শুধু ব্যতিক্রম ঘটেছিল ফুলির জন্মের সময়। শেফালী যে পোয়াতী ছিল তা পাড়ার মেয়েছেলেরা ভালো করে জানতো না। যেদিন শেফালী পাড়া কাঁপিয়ে ‘ওয়াক’ করতে লাগল, তখন সবাই তার দিকে তাকালেও তেমন গায়ে মাখলো না কেউ, …… এ দৃশ্য পাড়ায় নতুন না। তারপরও ছুটে এসেছিল খালা। এক বালতি জল এনে চোখে মুখে জলের ছিটে মেরে মমতাময়ী হয়ে বলেছিল, – প্রথম তো; এ সময় এমন হয়; চিন্তা করিসনি; মেটার্নীতে গিয়ে ঠিক করে দেব।
অন্যরা বলেছিল,
– খালা সোহাগি মাগীর ছিনালী; আবার মেটার্নী হাসপাতাল! কতই আর দেখবো লো; এখনই ছমিরন ধাইকে খবর দিলেই হয় ; হাত ভরে দিয়ে টেনে আনবে আপদ।
খিলখিল করে হেসে উঠেছিল উপস্থিত সবে। শুধু হাসেনি হরেন মাস্টার। উতলা হয়ে অযথা দৌড়ে বেড়িয়েছে সারা পাড়া। আর মাঝে মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে শেফালীর ঘরে। আস্তে ধীরে সব অস্থিরতা থেমে আসে। শুধু স্থিরতা আসে না খালা আর শেফালীর বুকে। শেফালী দেখতে শুনতে ভাল। ভদ্র বাড়ীর মেয়েদের মত দেখায়। পাড়াতে তার দামও কিছুটা বেশী। থানার বাবুরা মাঝ রাতে এলে শেফালীকেই খোঁজে। তাই খালা তাকে লক্ষিজ্ঞান করে -আর সে কারণেই শেফালী অন্যদের চক্ষুসুল। তাই শেফালীর অবস্থা যত তাড়াতাড়ি মেটানো সম্ভব হবে ততই খালার ব্যবসার জন্য ভাল। আর এজন্যই মেটার্নীর ব্যবস্থা। হরেন মাস্টার নির্বাক। কেবল প্রতিবাদ করেছিল শেফালী। ও বলল,
– আমি হাসপাতালে যাব না; ছমিরণ দাইকে মাছ কাটা বটি দিয়ে ফালা ফালা করে ফেলব আমি। খালা বলল,
– তোর ও পাপ তুই কতদিন বইবি?
– ও পাপ না-বিধাতার অমোঘ লিখন-আশীর্বাদ; না হলে ও বেশ্যার পেটে আসবে কেন? তীক্ষè গলায় উত্তর করে শেফালী।
তারপর অনেক কথা জল্পনা-কল্পনা শেষ করে শেফালী একদিন সাধ খেল পাড়ার এক বেশ্যার ঘরে। অবশ্য এর ব্যবস্থা হরেন মাস্টারই করেছিল। সাধ খেতে বসে মাস্টার যখন শেফালীকে একটা নতুন কাপড় দিয়ে আশীর্বাদ করতে গেল, শেফালী তখন বলল,
– আশীর্বাদ কর মাস্টার, আমার যেন জুঁই ফুলের মত সাদা ধবধবে একটা মেয়ে হয়।
শুনেই সবাই দাঁতে জিব কেটেছিল। একে পাপ তারপর আবার মেয়ে -এ তুই কি বলছিস শেফালী? রেবতির প্রশ্নে ফুঁসে উঠেছে শেফালী,
– এ পাপ না; মুখ সামলে কথা বলবি তোরা।
শেফালীর রুদ্র মুর্তির সামনে রেবতি যেন চুপসে গিয়েছিল সে সময়।
তারপর সামনের বর্ষার শুরুতে এক রাতে যন্ত্রণায় ছটফটিয়ে উঠল শেফালী। দিশে না পেয়ে খালা দৌড়ে গিয়ে মাস্টারকেই ডাকতে লাগল,
– মাস্টার, ও মাস্টার একবার এদিকে এস দিকিনি, শেফালীর যে ব্যথ্যা উঠেছে …
শুনেই লাফ দিয়ে মাস্টার। তারপর পড়িমরি করে ছুটে আসে শেফালীর ঘরের দিকে। ছমিরণ দাইকেও ডাকা হলো। একজন একজন করে অন্যরাও এসে হাজির হল শেফালী ঘরের। শেষ রাতের দিকে যমে মানুষে টানাটানি শেষে শেফালী শান্ত হলো। মুহূর্তে সে সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল মৌরি পাড়ার বেশ্যা পাড়ার কোনে কোনে। হঠাৎ একটা মহা খুশির রোল পড়ে গেল সবার মাঝে। একটি মেয়ে শিশুকে সাহসের সাথে জন্ম দেওয়ার আনন্দে আজ সকলেই আনন্দিত। শেফালীর যে চরম শত্রু ছিল সে ছুটে এসে সদ্যজাতকে কোলে নিয়ে আনন্দে চিৎকার করতে লাগল,
– ওরে দেখে যা আমাদের কি টুকটুকে একটা মেয়ে হয়েছে; ও মাস্টার একটা নাম রাখ দিকিনি আমাদের মেয়ের।
ঘরের সামনের এক কোনায় দাঁড়িয়ে চুপচাপ সবকিছু দেখছিল মাস্টার। রেবতির কথায় চেতন ফিরে পেল হরেন মাস্টার। মিন মিন করে জিজ্ঞেস করল,
– শেফালী কেমন আছে? ভাল তো?
ছমিরণ ধাই জবাব দেয়,
– চিন্তা করো না মাস্টার, ও মাগী ভালই আছে।
– ফুলের মত মেয়ের নাম তাহলে ফুলকুমারী থাক; ছোট করলে দাঁড়ায় ফুলি। সেদিন থেকে ফুলি সবার মেয়ে হয়ে গেল। পিতৃপরিচয়হীন বেশ্যার মেয়ে ফুলি আর পাঁচটা মেয়ের মত সকলের মেয়ে হয়ে বাড়তে লাগল মৌরি পাড়ের বেশ্যা পাড়ায়।
গোল বাধল ফুলির বয়স যখন আট মাস। তখন ফুলি হাসতে শিখেছে; অল্প অল্প হামাও দেয়। আর দিনের বেশি সময় হরেন মাস্টারের কাঁধে কাঁধে থাকে তখন। একদিন সকালে সামান্য কারণে যথারীতি বেধে যায় তুমুল ঝগড়া। ঝগড়ার এক ফাঁকে খালা বলেই দেয়,
– তোর দেমাগ আমি শেষ করে দেব। তুই কার পাপ জন্ম দিয়েছিস আমি জানিনা ভেবেছিস, কচি খুকি পেয়েছিস; ছি! ওরকম মানুষটার সাথে শুতে তোর লজ্জাও করল না; তোর কি নরকেরও ভয় নেই লো মাগী?
শেফালী চিৎকারা করে কিছু বলতে গিয়েও যেন বলতে পারল না শেষ পর্যন্ত। তারপরও খালা চালিয়ে গেল বেশ কিছুক্ষণ তারপর আস্তে ধীরে সেদিনকার মত সব শান্ত হয়ে আসে। সূর্য ডুবল আবার মৌরি পাড়ের বেশ্যা পাড়া জীবন ফিরে পায়। গন্ধ তেলে চুল ভিজিয়ে বেশ্যাগুলো খদ্দেরের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। লঘু তামাশায় হাসির বন্যা বয়। কেউ কেউ সস্তা গানও গায়। শুধু শেফালীর ঘরে লন্ঠন জ্বলে না; শেফালী আজ চুল বাঁধেনি। শুধু বিকেল বেলা হরেন মাস্টারের কোলে ফুলিকে দিয়ে সে চলে আসে। আর কোন হদিস মেলেনি এ পর্যন্ত। যখন শেফালীর হদিস মিলল তখন, তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে। বিষক্রিয়ায় তার মুখ কালচে হয়ে গেছে। ঠোঁটের কোনে জমে থাকা ফেনা শুকিয়ে গেছে। কোথা থেকে যে শেফালী বিষ জোগাড় করল তা আজো রহস্য। শেফালীর মৃত্যু সমস্ত পাড়াকে স্তব্ধ করে দেয়। শেফালীর এই মৃত্যু সংবাদের বিষে পাড়াটা যেন নীল হয়ে পড়ে। পাগলের মত কাঁদতে লাগল ববিতা, আরতি, পূর্ণিমা, শাবানারা। এমনকি পাষাণ হৃদয় খালাও শেফালীর লাশের পরে আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদেছে দীর্ঘক্ষণ। শুধু নির্বাক ছিল হরেন মাস্টার। শুধু শেফালীর মাথার কাছে বসে এলোমেলো চুলগুলো মুখের উপর থেকে একটি একটি করে সরিয়ে দিচ্ছিল ও। আর বিড় বিড় করে বলছিল,
– এ কি করলি গো তুই’ নিজে পালিয়ে গেলি অভিমানী’।
এক পর্যায়ে ছমিরণ ধাই বলে ওঠে,
– উঠ মাস্টার, এখন অনেক কাজ!
এখন যে অনেক কাজ তা মাস্টারের অজানা নয়। বেশ্যা পাড়ায় কোন অপঘাত মৃত্যুতে পুলিশী ঝামেলা নেই। সমাজপতিরনা এদেরকে পতিতা করেছে। এখানে কেই মরলে শ্মশানে তাদের যাওয়ার অধিকার নেই আবার কবরস্থানেও তাদের জায়গা হয় না। কারণ এদের জাতের ঠিক নেই। অবশ্য এসব নিয়ম এ পাঁচ গ্রামের সমাজপতিদের তৈরী করা। কিন্তু তারা গোপনে এখানে আসেন। নানা ছুতোতে তারা ওদের ঘরে ঢোকে। বেশ্যাগুলোর শরীর হাতরায়। কখনো কখনো এদের শরীরের মধ্যে ডুব দিয়ে আকন্ঠ পান করে নর্দমার নোংরা সুস্বাদু সুধা। কিন্তু এসব ঘরে অন্ধকারে। দিনের আলোতে এদের সাথে কথা বললে সমাজপতিদের মান যায়। তাই এরা মরলে লাশের স্থান হয় মৌরির বুকে। যথাসম্ভব রীতিনীতি মেনে লাশের বুকে একটা ভারি কিছু বেঁধে হরেন মাস্টার
কাঁধে নিয়ে মৌরির দিকে এগুতে থাকে; পিছনে শোকস্তব্ধ একদল নামহীন জাতহীন, গোত্রহীন বেশ্যা আর ফুলকুমারী। মৌরির পাড়ে দাঁড়িয়ে ওরা সর্বশক্তিমানের কাছে প্রার্থনা করে, যিনি ওদের সৃষ্টি করেছেন, ওদের বেশ্যা বানিয়েছেন। তারপর ওরা মৌরি নদীকে ওদের ভক্তি নিবেদন করে, যে নদী এই বেশ্যা পাড়ার জীবন প্রবাহকে বাঁচিয়ে রাখে তারপরও শেফালীকে শুইয়ে দেওয়া হয় মৌরির জলে। মুহূর্তে শেফালী তলিয়ে যেতে থাকে। পা হাত বুক মাথা এক সময় চুলও। এক অন্ধকার জীবনে তলিয়ে যাওয়া শেফালী আর এক অন্ধকারে হারিয়ে যায় মুহূর্তেই। এক এক করে সবাই ফিরে আসে নিজেদের কুঁড়েতে। শুধু হরেন মাস্টার মৌরির পাড়ে বসে থাকে ফুলিকে নিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্বাক।
এসব পুরনো কথা। সবাই ভুলেছে। বেশ্যাদের এত অনুভূতিপ্রবণ হলে চলেনা। কিন্তু ফুলি বড় হয়েছে এখন। ফুলির সাথে যারা কলা পাউরুটির লোভে হরেন মাস্টারের ঘরে যায় তারা এখনো পর্যন্ত শুধু যায়-ই। ফুলিই ব্যতিক্রম। এখন ফুলি বেশ ক’টি ইংরেজী ছড়া পড়তে পারে; ছোট ছোট হিসেব কষতে পারে। চিঠি লিখতে ও পড়তে শিখেছে সে ইতিমধ্যে। এমনকি ওর খালা/মাসীদের যৌন রোগের ঔষধের খোসাগুলো পড়ে দেয় মাঝে মধ্যে। ফুলি পাড়ার আশা-আকাঙ্খার সলতে। আজ হরেন মাস্টার সবাইকে তার ঘরে ডেকেছেন। সকলেই হাজির হয়েছে এই পড়ন্ত বেলায়। তবে কিছু নতুন মেয়ে আসেনি এখনো। পাড়ায় কিছু নতুন মেয়েও এসেছে এখন; তাদের কাছে হরেন মাস্টার বুড়ো বৈ আর কিছুই নয়। তবুও অনেকেই তাকে মানতে বাধ্য হয়। খানিক পর হরেন মাস্টার ফুলিকে কাঁধে নিয়ে সবার সামনে এসে দাঁড়ায়। অবিকল আগের মত ফুলি মাস্টারের গলা জড়িয়ে ধরে আছে। অনেকেই সেই পুরনো দিনের কথা মনে পড়ে আর চোখ ভিজেক উঠল নিজেদের অজান্তে। এর মাঝে হরেন মাস্টার বলে উঠল,
– তোমরা সবাই আসাতে আমি খুশি; আজ একটা বিশেষ কারণে তোমাদেরকে এখানে ডেকেছি;
ছমিরণ ধাই এখন কানে শোনে না ভাল। সেও একটু এগিয়ে আসে। মাস্টার বলে চলে,
– ফুলি আজ পড়তে লিখতে শিখেছে; ও তোমাদের সন্তান; তোমরা সবাই ওর মা।
‘মা’ কথাটা শুনেই পুর্ণিমা, শাবানা আঁচল দিয়ে চোখটা মুছে নেয়। মাস্টার বলে,
– আগামী কাল ফুলিকে উজ্জ্বলপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে যাব। সবই মুখ চাওয়া-চায়ি করে। এ পাড়ার কেউ স্কুলে ভর্তি হওয়া, এমনকি পড়া লেখা করার কথা কল্পনা করাও গতকাল পর্যন্ত পাপ ছিল। আজ এই আনন্দ সংবাদে মৌরি পাড়ের বেশ্যারা হু হু করে কেঁদে ওঠে। আনন্দে বিস্ময়ে। হরেন মাস্টার বলে,
– তোমরা সকলেই ফুলির মা, ফুলি তোমাদের সন্তান; পরীক্ষায় পাশ করলেই সে স্কুলে ভর্তির যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তোমরা সকলেই তোমাদের সন্তানের জন্য প্রার্থনা কর;
কথা শেষ করে হরেন মাস্টার ফুলিকে নামিয়ে চোখের জল আড়াল করতে দ্রুত ঘরে চলে যায়। রেবতি দৌড়ে এসে ফুলিকে কোলে নিয়ে কাঁদতে থাকে। কাঁদছে সবাই, আবার হাঁসছেও সবাই। কান্না-হাসির দোলায় দুলছে মৌরি পাড়ের বেশাপাড়া। এর মধ্যে সুর্য পশ্চিমে ডুব দেয়।
পরদিন বেশ্যা পাড়ায় সকালটা হল একটু অন্য রকমের । সকলেই মৌরির জলে ¯œান সেরে নিজেকে পবিত্র করেছে। সারিবদ্ধ ভাবে জড় হয়ে মৌরির পাড়ে প্রতিক্ষা করছে তারা কখন হরেন মাস্টার ফুলিকে নিয়ে নৌকায় উঠবে। বলতে বলতে মাষ্টার আর ফুলিকে আসতে দেখা যায়। আজ ফুলি হেঁটে আসছে; ফুলির পিছনে ওর এ পাড়ার বন্ধুরা; খালি গায়ে; খালি পায়ে। হরেন মাস্টার নৌকায় পা দেওয়ার আগে বলল,
– তোমরা ফুলিকে আদর করে দাও; ও যেন পরীক্ষায় ভাল করে।
রেবতি, পূর্ণিমা, শাবানা সকলেই ফুলির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে, আঁচলে চোখ মুছল। মাাস্টার বলল,
– মাঝি নৌকা ছাড়, বেলা বাড়ছে।
মাঝি নৌকার দাড়ি তুলে নেয়। মৌরির ঢেউ কেটে নৌকা এগিয়ে চলে উজ্বলপুরের দিকে। এ পাড়ের বেশ্যাগুলো মানুষ সেজে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের পিতৃপরিচয়হীন এক দঙ্গল কঙ্কালসার ছেলেমেয়েদের নিয়ে। নৌকার উপর দাঁড়িয়ে ওদের আশা-আকাঙ্খার সলতে ফুলি, ওদের উদ্দেশ্যে হাত নাড়ে। সকালের আলো এসে পড়েছে মাস্টার আর ফুলির মুখে। সেই চকচকে আলোয় ফুলির মুক্তা দানার মত মুখটা অবিকল ওপারের ভদ্র মানুষের বাচ্চার মত দেখাচ্ছে।

আপনার শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে? তার স্বাস্থ্য বৃদ্ধির জন্য আপনি যা খাওয়াবেন

বাংলাদেশের মা ও শিশু
কলা, ছোলা আর চিনাবাদাম দিয়ে তৈরি খাবার অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে বলে এক গবেষণায় জানা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে চালানো এক মার্কিন গবেষণায় জানা যাচ্ছে, এসব খাদ্য শিশুদের পাকস্থলীতে স্বাস্থ্যবর্ধক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
শিশুর হাড়, মস্তিষ্ক এবং শারীরিক বিকাশে এই খাবারগুলো খুবই কার্যকর বলে গবেষকরা জানতে পেরেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিবিআর-এর বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই গবেষণা চালান।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সারা বিশ্বে ১৫ কোটি শিশু এখন অপুষ্টিতে ভুগছে।
এসব শিশু যেমন শারীরিকভাবে দুর্বল হয়, আকারে ছোট হয়, তেমনি এদের পাকস্থলীতে যে স্বাস্থ্যবর্ধক 'ভাল' ব্যাকটেরিয়া থাকে তাদের সংখ্যাও থাকে কম।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, দেহের দুর্বলতার জন্যও এসব ব্যাকটেরিয়ার অভাব অনেকাংশে দায়ী।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের সুস্থ শিশুদের পাকস্থালীতে যেসব প্রধান ব্যাকটেরিয়া থাকে তার পরীক্ষা করেন।
এরপর ইঁদুর এবং শূকরের ওপর পরীক্ষা করে দেখেন যে কোন্ ধরনের খাবার দিলে এসব ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
এরপর এক মাসব্যাপী এক পরীক্ষায় অপুষ্টিতে ভোগা ৬৮টি বাংলাদেশী শিশুকে বিভিন্ন ধরনের ডায়েট খেতে দেন।
শিশুদের অপুষ্টি কেটে গেলে তারা দেখেন এক ধরনের ডায়েট তাদের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী।
আর তা হলো কলা, সয়া, চিনাবাদামের গুড়া আর ছোলার গুড়ান তৈরি বিশেষ মিশ্রণ।
এই খাদ্য ব্যবহারে শিশুদের হাড়ের বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের ক্ষমতা যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বেড়ে যায় বলে গবেষণার ফলাফলে জানা যায়।
পাকস্থলীর ভাল ব্যাকটেরিয়াগুলিকে মাইক্রোবাইওম নামে ডাকা হয়।

Tuesday, October 10, 2023

টমেটোর এতো গুণ!

টমেটো আমাদের কাছে একটি সুস্বাদু সবজি হিসেবে পরিচিত। টমেটোকে বলা হয় গরিবের আপেল। এটা শুধু কথার কথা না কি সত্যিই এটি একটি মূল্যবান সবজি, তা উঠে আসল গবেষণায়। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, বেশি পরিমানে টমেটো খাওয়া আপনার লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করবে, যেই ক্যান্সার সাধারণত অধিক চর্বি জাতিয় খাবার গ্রহণ থেকে ঘটে থাকে। ‘ক্যান্সার প্রিভেনশন রিসার্চ’ জার্নালে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
ইদুরের ওপর করা ওই গবেষণায় দেখা যায় টমেটোতে প্রচুর পরিমানে লাইকোপিন থাকে, যা প্রদাহ প্রতিরোধক, ক্যান্সার প্রতিরোধক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই টমেটো মেদবহুল লিভারের নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাষ্ট্রের তাফত্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিয়াং ডং ওয়াং বলেন, আস্ত টমেটো, টমেটোর সস, টমেটো থেকে তৈরি নানা দ্রব্য প্রচুর পরিমানে লাইকোপিনের যোগান দিয়ে থাকে। তিনি বলেন, ‘মজার বিষয় হল, আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, পরিশোধিত লাইকোপিনের চেয়ে টমেটো গুঁড়ো লিভার ক্যান্সার নিরাময়ে বেশি কর্যকর। কারণ, টমেটোতে ভিটামিন-ই, ভিটামিন-সি, মিনারেলস, ফেনোলিক কম্পাউন্ড এবং ডায়েটারি ফাইবার থাকে।’
এছাড়া টমেটো গুঁড়ো খাবার হিসেবে গ্রহণের ফলে উপকারি মাইক্রোবাইয়োটার বৈচিত্র ও উন্নতি আসে এবং প্রদাহের সাথে সম্পৃক্ত কিছু ব্যাক্টেরিয়ার অতিবৃদ্ধি রোধ হয়।
অন্যান্য ফল, যেমন, পেয়ারা, তরমুজ, জাম্বুরা, পেঁপে প্রভৃতি ফলের মধ্যেও লাইকোপিন থাকে।
কিন্তু টমেটোর তুলনায় তাতে থাকা লাইকোপিনের পরিমান খুবই কম। টমেটো ও টমেটো জাতীয় খাবার লিভার ক্যান্সার ছাড়াও কার্ডিওভেস্কুলার রোগ, অস্টেওপরোসিস, ডায়াবেটিস, এবং অন্যান্য ক্যান্সার, প্রোস্টেট, লাঞ্জ, ব্র্যাস্ট এবং কোলোন ক্যান্সারের মতো রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

Monday, October 9, 2023

ফিলিস্তিনি শিশুদের প্রাণ কি এতই তুচ্ছ by রাফসান গালিব

আজকের দিনটি আগামী দিনের থেকে হয়তো ভালো,

কেবল মৃত্যুগুলোই আজ নতুন

প্রতিদিনই জন্ম নেয় যে নতুন শিশুরা

তারা ঘুমোতে যাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে, মৃত্যুতে ।

তাদের গণনা করা মূল্যহীন।

—ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার কবি মাহমুদ দারবিশ

গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে বিশেষ করে টুইটারে একটি কার্টুন অনেকেরই নজর কেড়েছে। কার্টুনটিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ফিলিস্তিনি নারীকে দুইভাবে আঁকা হয়েছে। এক পাশে দেখা যাচ্ছে, তিনি অন্তঃসত্ত্বা। আরেক পাশে সেই মা বহন করছেন শিশুসন্তানের মরদেহ। শিশুটি রক্তাক্ত, তার দেহে জড়ানো ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যবাহী রুমাল ও লাল-সবুজ পতাকা। আর মায়ের চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

আলা আল লাগতা নামে এক কার্টুনিস্ট এ কার্টুনটি এঁকেছেন। তিনি আরবিতে একটি ক্যাপশনও দিয়েছেন। সেটির ইংরেজি করা হয়েছে এভাবে: ইন প্যালেস্টাইন, দ্য মাদার ক্যারিজ হার সন টুয়াইজ! এর মানে দাঁড়ায়, একজন ফিলিস্তিনি মা তার ছেলেকে দুইবার বহন করেন—একবার গর্ভধারণের সময়, আরেকবার মৃত্যুর সময়।

কোনো মা-বাবার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ, সন্তানের মরদেহ বহন করা। আর সেই কঠিন কাজটিই করতে হয় ফিলিস্তিনিদের। কারণ, ইসরায়েলিদের হামলার লক্ষ্যবস্তুই থাকে ফিলিস্তিনি ছেলেশিশু, কিশোর ও তরুণেরা। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড গাজায় ইসরায়েলের সর্বশেষ হামলাতেও তেমনটি আমরা দেখি। তাদের ভাষায়, সেটি অভিযান। এর একটি চটকদারি নামও দিয়েছে—‘ট্রুথফুল ডোন’ (সত্য ভোর)।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, গত শুক্রবার থেকে গাজা উপত্যকায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। অথচ গাজা থেকে ইসরায়েলের দিকে কোনো রকেট ছোড়া হয়নি, অন্যান্য সময় যে যুক্তি দিয়ে হামলা চালানো হয়। গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামিক জিহাদের হামলার আশঙ্কা থেকে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। এরপর পাল্টা জবাব দেয় ইসলামিক জিহাদ।

তিন দিন ধরে পাল্টাপাল্টি হামলার পর মিসরের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতিতে যায় দুই পক্ষ। এবারের ঘটনায়ও বরাবরের মতো ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের শিকার হয়েছে ফিলিস্তিনিরাই। ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৪ ফিলিস্তিনি, এর মধ্যে শিশু ১৫টি। ফেসবুক ও টুইটারে রক্তাক্ত ফিলিস্তিনি শিশুদের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। যার প্রেক্ষিতেই ফিলিস্তিনি মায়েদের নিয়ে বেদনাদায়ক কার্টুনটি আমরা দেখতে পাই।

অন্যান্যবার হামাস যুক্ত থাকলেও, এবার তাদের দেখা যায়নি। হামাস যুক্ত হলে যুদ্ধপরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হতো। ইসরায়েলও সম্ভবত তেমনটি চাইছিল। কিন্তু গাজার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চাপে আছে হামাস, যেহেতু সেখানকার সরকার তারা। ফলে ইসরায়েলের আশা পূর্ণ হলো না বলা চলে!

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গত বছর রমজানের শেষ দিকে ইসরায়েল সবচেয়ে বড় হামলা চালায় গাজায়। সেবার হামাস, ইসলামিক জিহাদসহ সাধারণ ফিলিস্তিনি সবাই পাল্টা জবাবে জড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলের হামলায় গাজা শহর রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। টানা এগারো দিনের হামলায় আড়াই শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হয়। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের ছোড়া রকেটে ইসরায়েলি মারা যান বারো জন। নিহত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শিশুই ছিল ৬৬টি। ইসরায়েলি হামলায় একসঙ্গে এত ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু স্মরণকালে আর ঘটেনি।

বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর দাবি করেছিল, ইসরায়েল যুদ্ধাপরাধ করেছে। এর তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু এ বিশ্বে ইসরায়েলের বিচার কে করবে!

সেবার ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে গাজাবাসীর প্রতি সংহতি জানিয়েছিল বিশ্বের অনেক মানুষ। মুসলিম দেশগুলো ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, ফ্রান্সের মতো দেশের শহরে শহরে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এমনকি ইসরায়েলি দূতাবাসের সামনেও জমায়েত হয়। এবারের হামলায় তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখা যায়। গতবারের তুলনায় এবারের হামলা তীব্র না হলেও বা দীর্ঘায়িত না হলেও তুলনামূলকভাবে বিশ্ববাসীর তেমন প্রতিবাদ দেখা যায়নি।

যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনিদের জমিতে অবৈধ দখলদার ইসরায়েল। একটু একটু করে ফিলিস্তিনের প্রায় গোটা মানচিত্রই গিলে ফেলছে দেশটি। একটি সার্বভৌম ভূখণ্ডের ওপর এমন দখলদারি ও আগ্রাসন বিশ্ববাসী শুরু থেকেই মেনে নেয়নি। ফলে ফিলিস্তিনের কোথাও ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় বিশ্বের নানা জায়গা থেকে প্রতিবাদের আওয়াজ ওঠে।

এবারের চিত্র ভিন্ন হওয়ার প্রধান কারণ, বিশ্বের মনোযোগ এখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে। তাছাড়া করোনা মহামারি পরবর্তী এ যুদ্ধের ধাক্কায় বৈশ্বিক অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা। দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রাস্ফীতি ছড়িয়ে পড়েছে। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। সাম্প্রতিক তীব্র দাবদাহ ও দাবানলের কারণে ইউরোপের পরিস্থিতিও ভয়াবহ।

এবারের ইসরায়েলি হামলায়ও পশ্চিমা মোড়লদের একই সুর আমরা পাই। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের ভাষ্য ছিল এমন, ইসরায়েলের নিজেকে রক্ষার অধিকার রয়েছে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে একই বাক্যই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে থাকেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাসও ইসরায়েলের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মূলত ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের হামলার ন্যায্যতাই দেওয়া হয়।

আরও লক্ষণীয় বিষয় ছিল, এবারের ঘটনায় আরব দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদও খুব একটি চোখে পড়েনি। আরব লীগ প্রতিক্রিয়া জানালেও সেটি তেমন জোরালো ছিল না। ফিলিস্তিনিদের প্রতি বরাবরই এমন আচরণ কি করে না আরব বিশ্ব? আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে সরাসরি স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে—বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিকভাবে সম্পর্ক স্থাপন করার মাধ্যমে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টায় সেটি শুরু হয়।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সফরকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবের আকাশও উন্মুক্ত হয়ে গেল ইসরায়েলের জন্য। ফলে এমন পরিস্থিতিতে নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের পাশে আরব বিশ্বকে আশা করাই এখন ভুল।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে পশ্চিমা মিডিয়ার একচোখা নীতি নতুন নয়। গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে একটি প্রাথমিক স্কুলে ১৯ জন শিশু নিহত হয়েছিল বন্দুকধারীর হামলায়। এমন ঘটনায় গোটা বিশ্বের মিডিয়াই মানবিক হয়ে ওঠে। এমন ঘটনায় আমরাও স্তব্ধ হয়ে যাই। সেটিই স্বাভাবিক। তবে ফিলিস্তিনি শিশুদের ক্ষেত্রে তেমন মানবিকতা আমরা পাই না পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর কাছে।

ইউক্রেনেও রাশিয়ার হামলায় নিহত হচ্ছে শিশুরা। গত মাসের মাঝামাঝিতে রুশ হামলায় নিহত হয় লিজা নামে তিন বছর বয়সী এক ইউক্রেনীয় শিশু। পরির মতো ফুটফুটে শিশুটির মৃত্যুই প্রমাণ করে যুদ্ধের ভয়াবহতা। কিন্তু পশ্চিমা মিডিয়া যেভাবে ইউক্রেনের একটি শিশুর নামকে এককভাবে তুলে আনল, তেমনটি আমরা দেখি না ফিলিস্তিনি শিশুদের ক্ষেত্রে। ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনের এত এত শিশু নিহত হয়, তাদের কারও নামটি জানা হয় না আমাদের।

বিষয়টি খুবই করুণভাবে ওঠে আসে ফিলিস্তিনি পলিসি নেটওয়ার্ক আল-শাবাকার সদস্য ইয়ারা হাওয়ারি কণ্ঠে। ৯ আগস্ট কাতারভিত্তিক আলজাজিরায় এক নিবন্ধে তিনি বলেছেন, ‘আমরা জানি, আমরা ইউক্রেন না। আমরা জানি, আমরা ইউক্রেনীয়দের মতো একই ধরনের সমর্থন পাব না। দখলধারী শক্তিকে প্রতিরোধ করতে আমাদের যে অধিকার, সেটিকে রক্ষা করতে কেউ এগিয়ে আসবে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো আমাদের শহীদদের মহিমান্বিত করে কোনো ছবি প্রকাশ করবে না। পপ তারকা, হলিউড অভিনেতা এবং প্রধানমন্ত্রীরা গাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আমাদের পরিবারগুলোকে দেখতে আসবে না।’

এমন সহজ-সরল বয়ানের মাধ্যমে পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে ইসরায়েলি দখলদারির নির্মম শিকার ফিলিস্তিনিদের প্রতি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে সামনের দিনগুলোতেও হয়তো আমরা ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্তাক্ত হতে দেখব।

একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে তার শিশুদেরই আগে শিকার করতে হয়, সেটি কে না জানে। তবে তা হতে না দিতে ফিলিস্তিনি নারী বা মায়েরা কতটা বদ্ধ পরিকর সেটিও আমাদের জানা আছে। সন্তানের লাশ কাঁধে নেওয়া এসব মায়েরা একেকটি সাহসী ও নির্ভীক প্রজন্মই জন্ম দিয়ে যান, ইসরায়েলি দখলদারির বিরুদ্ধে লড়তে। মাহমুদ দারবিশও তাঁর কবিতায় বলে গেছেন—

‘আমাদের এই ভূমি বন্ধ্যা নয়

প্রতিটি ভূমির রয়েছে একটি জন্মক্ষণ

প্রতিটি সকালেই রয়েছে বিপ্লবের জন্য প্রতিশ্রুতি।’

* রাফসান গালিব প্রথম আলোর সহসম্পাদক। ইমেইল: galib.mujahid@prothomalo.com

ফিলিস্তিনি মায়েদের নিয়ে আঁকা আলোচিত কার্টুন।
ফিলিস্তিনি মায়েদের নিয়ে আঁকা আলোচিত কার্টুন। টুইটার থেকে সংগৃহীত

Friday, September 15, 2023

গল্প- বোবা রাজহাঁস by দেবনারায়ণ চক্রবর্তী

‘ইলিশ নিবেন গো মা – ইলিশ মাছ – পদ্মার ইলিশ – ’

মাছওয়ালা পাড়ায় হেঁকে বেড়াচ্ছে অনেকক্ষণ থেকে। বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁকে গেল কয়েকবার।  কার্তিকবাবু রাস্তার দিকের ঝুলবারান্দায়। বর্ষার ভিজে বাতাসে ইলিশের আমন্ত্রণ! তৃতীয়বার লোকটা আসতেই – চাকরির প্রবাস থেকে বউ গোলাপবালার কাছে ফেরার মতো অমোঘ আকর্ষণে মাছের ব্যাগ নিয়ে নিঃশব্দে পথে নেমে এসেছেন কার্তিকবাবু।

‘ওগো শুনছ, দেখে যাও একটা জিনিস, একটু বারান্দায় এসো – ’ যদিও কার্তিকবাবু ডাকলেই গোলাপবালা কিশোরী, কিন্তু বাস্তবে হাঁটুর মচমচানি ব্যথা নিয়ে আসতে সময় লাগে।

হাঁপানি, হার্টের অসুখ, চর্বির বরফ সরিয়ে পিত্তথলির পাথর নাকি বার করা যায়নি। এই সুইট সেভেনটি এইটেও মসৃণ ত্বক, কুচকুচে কালো মাথায় চুল, ভ্রু, আঁখিপল্লব। একটু যা পৃথুলা। তা নব্বই-পঁচানব্বই কী আর এমন ওজন। এখনো হাসলে মনে হয় যেন নতুন বউ। বুক ধড়ফড় করতে থাকে কার্তিক নস্করের।

বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছেন গোলাপবালা। রুপালি ইলিশে সকালের মিঠে রোদ্দুর পড়ে ছিটকে এসে জিভ ঝলসে দেয় যেন তাঁর। ইশারায় দাম জেনে নেন, বারোশো টাকা কেজি।

বউ জিভে ঠোঁট ভিজিয়ে সম্মতি জানিয়েছেন – কার্তিকবাবু নিচে বড় ছেলে, ওপরে ছোট ছেলের জানালায় চোখ বুলিয়ে নেন। মোটা পর্দা ঝুলছে, তবু ছেলের বউদের চোখে পড়ে যেতে পারে! অত জোরে গিন্নিকে ডাকা উচিত হয়নি। কিন্তু গোলাপবালার অনুমতি ছাড়া কার্তিকবাবু কোনো কাজ করতে পারেন না।

ছেলের বউরা অসহায় রাক্ষুসীর মতো জুলজুল চোখে গোলাপবালার সুখের সংসারের ওপর নজর রাখে সারাক্ষণ। নানা অছিলায় শাশুড়ির সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়ে দেয়। বড় বউ তার পোষা বেড়ালের নাম রেখেছে গোলাপি। দুপুরে কলমিশাক ভাজা দিয়ে ভাত খেয়ে উচ্ছিষ্ট কলপাড়ে ঢেলে পোষা বেড়ালকে চিৎকার করে ডাকবে, গোলাপি মাছ খেয়ে যা!

ছেলেগুলো যেন রথের মেলার ঘাড়-নাড়া মাটির পুতুল। বউদের কিচ্ছুটি বলবে না। গোলাপবালাও ছাড়বার পাত্রী নন। সেদিন কী নিয়ে যেন বড় বউ শাশুড়ির মুখে মুখে কথা বলে যাচ্ছে। বড় ছেলে ব্রত তখন বাড়িতেই।

ব্রতর মার সব রাগ গিয়ে পড়ে ছেলের ওপর। বলেন, ব্রত তর রক্ত খামু একদিন দেখিস! বউরে, তুই কিচ্ছুটি বলিস না। আমারে সকল সুমায় অপমান করে!

কার্তিকবাবু ছুটে গিয়ে উত্তেজিত গোলাপবালাকে অনেক বুঝিয়ে ঘরে নিয়ে আসেন। উত্তেজনার বশে পড়ে গেলে আর দেখতে হতো না। নির্ঘাত হার্ট অ্যাটাক!

আজ সকালে ব্রত যখন বেরোচ্ছিল, কার্তিকবাবু তখন ছাদে পায়চারি করছিলেন। পরিষ্কার কানে এলো, বড় বউ ব্রতকে বলছে, টাকা তো কিছু দিয়ে গেলে না। রান্না কী করব?

ব্রত বলে, চাল তো আছে। কাল রাতে যে পুঁইশাক আনলাম, ওই দিয়ে আজকের দিনটা চালিয়ে নিও।

ছমাস ব্রতর কারখানা বন্ধ। পাড়ার ক্লাবে আটশো টাকায় রাতপাহারা দেয়। ভোরে ফেরে, একটু গড়িয়ে নিয়ে চা প্যাকেটবোঝাই দুটো ব্যাগ সাইকেলে চাপিয়ে দুপুর পর্যন্ত দোকানে দোকানে ফেরি করে –

আজ সাইকেল নিয়ে বেরোয়নি। কারখানা নাকি খুলছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হচ্ছে এখন। কবে থেকে শ্রমিকরা কাজে যোগ দিতে পারবে খবর নিতে আজ কারখানায় গেল ব্রত।

পুঁইশাক। কানে যেতেই – ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে পুঁইশাক, ইলিশের নানা পদ ছাড়াও ভাজা আর ইলিশ মাছের তেল দিয়ে একটা সবুজ কাঁচালংকা কামড়ে গরম ভাত, আহ্! জিভে জল এসে গিয়েছে কার্তিকবাবুর। সেই তখন থেকে একটা জ্যান্ত ইলিশ মাছ কার্তিক নস্করের পেটের মধ্যে যেন খলবল করছে। ব্রতর মা গোলাপবালার গর্ভ হলে যেমন –

সিঁড়ির মুখে ওপরে ছোট ছেলের বউ। হাতে তোয়ালে-সাবান। নিচে স্নান করতে নামছে। নিচের বাথরুম ভাড়াটে আর দুই ছেলের সংসারের জন্য। ওপরে কার্তিক-দম্পতির বাথরুমে অন্য কারো প্রবেশাধিকার নেই।

ছেলেবউদের সঙ্গে কথা নেই কার্তিকবাবুদের। সে-কথা যত না বলে ততই ভালো। নিজেরা সুখে-শান্তিতে থাকো তাহলেই হবে।

বড়বউ কাপড়ের ব্যবসা করে। বিশ-পঞ্চাশখানা কাপড় আড়তদারদের কাছ থেকে কিনে আনে। বাড়ি এসে পছন্দ করে কাপড় নিয়ে যায় পাড়ার লোক। কিস্তিতে টাকা শোধ করে। মেয়ের ক্লাস টেন, ছেলের ফাইভ।

ছোট ছেলের কারখানাও এখন টালমাটাল অবস্থায়। বন্ধ হয়ে যাবে। মাসে পনেরো দিন কাজ পায়। ছোট বউ কোনো বীমা কোম্পানির এজেন্সি নিয়েছে। ওর মেয়ের সিক্স, ছেলের ওয়ান।

ছেলেরা নিজেদের সংসার চালিয়ে নেয়। মাঝেমধ্যে যৎসামান্য সাহায্য করলেই চলে। বিদ্যুতের বিল, খাজনা-ট্যাক্স, সুইপার এমনকি ব্রত যে রাতপাহারার জন্য পাড়ার ক্লাব থেকে আটশো টাকা পায় সেখানেও কার্তিকবাবুর চাঁদা আছে। কেননা বাড়িটা তাঁর। দুছেলের জন্যই ওপর-নিচে একখানা করে ঘর আর বারান্দায় রান্নার জায়গা বরাদ্দ। নিচে রান্নাঘরসহ একখানা বড় ঘর ভাড়াটে না থাকলে তালা দেওয়া পড়ে থাকে।

‘অত চিল্লাও ক্যান, মরণ নাই তুমার!’

সোফার গদিতে শরীর ডুবিয়ে বসে আছেন গোলাপবালা। কার্তিকবাবুকে দেখেই হুংকার। হাতের কাছে চিরুনি পেয়ে সেটাই ছুড়ে মারেন সোয়ামির দিকে।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান ব্রতর বাবা। বুঝতে পারেন না কী অন্যায় করেছেন। গোলাপবালার ক্ষরদৃষ্টির বাইরে যেতে পারেন না। আবেগভরা মোলায়েম গলায় বলেন, ‘কী আবার হইল। অত রাগ করো ক্যান? তুমারে না জিগাইয়া -’

রান্নাঘর থেকে রাঁধুনি ছুটে আসে। মাছ দেখে সেও খুব খুশি। বলে, ‘কত বড় ইলিশ ঠাকমা! কিন্তু বাবা কী ঠান্ডা! যেন মর্গের লাশ।’ ‘আস্তে কথা তুই বলতেই পারিস না, না? আর ঠাকমা আবার কী ডাক? মাসিমা বলতে পারিস। বউদি বললেই-বা দোষের কী আছে!’ দাঁত খিঁচিয়ে ওঠেন কার্তিকবাবু।

রাঁধুনি মুখে আঁচল চেপে হাসে।

‘বুলটি, এখানে মেঝেয় খবরের কাগজ বিছিয়ে কাট। পরে মুছে দিবি। ইলিশ মাছ কাটা দেখতে আমার খুব ভালো লাগে।’

খিক্খিক্ করে হাসেন গোলাপবালা। হাসতে হাসতে কাশি এসে যায়। ‘আহা অমন অস্থির হও ক্যান। শরীর খারাপ লাগতাছে?’

কার্তিকবাবু বউয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দেন, মৃদু মুষ্ঠাঘাত করেন পিঠে।

গোলাপবালার হাঁটুতে, কোমরে, ঘাড়ে সর্বত্রই ব্যথা। সোহাগের। তবু দেখ না দেখ, যে না সে-ই কুদৃষ্টি দেয়। সেদিনই যেমন, বিকেলে স্নান করে, পাটভাঙা হলুদ শাড়ি পরে, কপালে বড় সিঁদুরের টিপ – তখনই এসেছে বড়দার বড় মেয়ে। গল্প করতে করতে আচমকা জিজ্ঞেস করে, ‘কাকিমা আপনার বয়েস কত হইল?’

ফোঁস করে ওঠেন কার্তিকবাবু, ‘মাইয়ালোকের বয়েস জিগাইতে নাই সোনা! এমনিতেই শরীর ভালো না তুমার কাকিমার।’

ভাইঝি চলে গেলেই গোলাপবালার হাত টেনে নিয়ে মণিখচিত অঙ্গুরীশোভিত কনিষ্ঠায় মৃদু কামড় দিয়ে দেন কার্তিকবাবু। নজর লেগে থাকলে কেটে যাবে।

গরম তেলে ইলিশ পড়তে সারাবাড়িতে সুঘ্রাণ – বারান্দায় বড় খাঁচায় কোকিল-দম্পতিও চিৎকার করছে। কার্তিকবাবুর এক কলিগ বলেছিলেন, ‘কোকিল পুষলে সারাবছর বাড়িতে বসন্তকাল বিরাজ করে।’

কোকিলের খাঁচায় নাক ঠেকিয়ে আদরের সুরে কার্তিকবাবু বলেন, ‘আরে পাখি ছটফট করো ক্যান! জানি তো ইলিশের ঝোল দিয়া মাখা ভাত খাইতে তুমরা ভালোবাস -’

তখনই নিচতলা থেকে ব্রতর ছেলের কান্না ভেসে আসে। ইস্কুলে যাবে, পুঁইশাক চচ্চড়ি দিয়ে ভাত মেখে তাড়াতাড়ি খেতে গিয়ে শাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা কাঁচালংকা কামড়ে ফেলে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে। ব্রতর বউ আবার ছেলের পিঠে দুঘা বসিয়ে দেয়।

মুখগহ্বরে ঝাললংকা-মেশা বিষ অন্ন, দুচোখে জলের ধারা। ব্রতর বউ যেন বিশ্বরূপ দেখতে পায় ছেলের মুখগহ্বরে। ভয়ে চমকে উঠে তাড়াতাড়ি জলের গ্লাস ধরে ছেলের মুখে। বলে, ‘খা, জল খা। দেখে খেতে পারিস না! অতবড় ছেলে ক্লাস ফাইভে পড়িস!’

ইলিশের গন্ধ পেয়ে ওপরে ছুটে এসেছে কার্তিকবাবুর মেয়ে। বলে, ‘আজ একাদশী আর আজই ইলিশ মাছ কিনলা!’

‘একদিন একাদশী না করলে কিছু হয় না।’ খিঁচিয়ে ওঠেন গোলাপবালা। মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। এক মাস পর জামাই বলে, ‘আপনার মেয়ে পাগল, লুকিয়ে বিয়ে দিয়েছেন!’

গোলাপ-দম্পতি জামাইয়ের মুখের ওপর বলতে পারেননি, সব মেয়েরই বিয়ের আগে একটু-আধটু মাথার দোষ থাকে। বিয়েটা হলে, সন্তান হলেই ঠিক হয়ে যায়। কপালও মেয়েটার খারাপ। এক মাস তো সংসার করেছে, সন্তান এসে যেতেই পারত। জামাইয়ের ব্যবসাপত্র ভালোই। বাবা-মা, ভাইবোনদের নিয়ে একান্নবর্তী সংসার। ওরা অনেক চেষ্টাও করেছিলেন মেয়েজামাইকে ও বাড়ির ঘেরাটোপ থেকে বার করে আনতে। প্রয়োজনে টাকা খরচ করতেও রাজি ছিলেন। কিন্তু জামাই বেঁকে বসল। দানসামগ্রীসহ মেয়েটাকে ফিরিয়ে দিয়ে গেল একদিন। আর কী মেজাজ হারামজাদার। কার্তিক নস্করের মতো রাশভারী মানুষ, মোটা অংকের পেনশনভোগী রাজকর্মচারী। তাঁর মুখের ওপর টক্টক্ করে কথা বলে জামাই! আইনি ছাড়াছাড়িটাও করিয়ে নিল তাড়াতাড়ি। আবার বিয়ে করেছিল সে; কিন্তু ভালোটা কী হলো তোর। ঘটনার দুবছরের মাথায় ক্যান্সার ধরা পড়ল।

সত্যিই মেয়েটা বোধহয় পাগল। এখনো স্বামীর স্মৃতি আঁকড়ে আছে। যতদিন মানুষটা বেঁচে ছিল শাঁখা-সিঁদুর পরেছে। মৃত্যুর খবর পেয়ে খুব কাঁদল কদিন। তারপর থেকে বিধবার মতো একাদশী, অম্বুবাচী – আরে সে তোর কদিনের স্বামী ছিল? দুদিনের পরিচয়! মেয়েকে সেসব কথা বোঝাবে কে। শ্বশুরবাড়ি থেকে ফেরত আসা আসবাবে সাজানো একটা ছোট ঘরে থাকে সে নিচে সিঁড়ির পাশে একটেরে। মেয়ের যত রাগ-অভিমান সব বাবা-মার ওপর।

তিনটে ব্যাংকের কাজ সেরে ফিরতে বেলা একটা বাজল কার্তিকবাবুর। ব্যাংক থেকে ফেরার সময় কানে গিয়েছিল, ব্রতর বউ অস্থিরভাবে হইচই করছে। ব্রতর প্রেসক্রিপশনের ফাইলটা কোথায় রেখেছে খুঁজে পাচ্ছে না – মেয়ে দেখেছে কি না। সে কেন কাজের জিনিস গুছিয়ে রাখেনি!

কারখানা থেকে ফেরার পথে ব্রত অসুস্থ হয়ে পড়েছে। খেয়াঘাটে বসিয়ে রেখে পথের মানুষ ফোন করেছিল। ব্রতর সঙ্গেও ওর বউয়ের কথা হয়েছে। ব্রতর কথা অস্পষ্ট জড়ানো, যেন দূরে কোথাও ছুটতে ছুটতে চলে যেতে যেতে কিছু বলে গেল। পথের মানুষ বলেছে, এখনই ভর্তি করতে হবে। অবস্থা ভালো না। খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে! এসব কথা মেয়েকে বলছিল বড় বউ।

গোলাপবালা ব্যাংকের পাশবইগুলো দেখছিলেন। মুখে তৃপ্তির হাসি। দেখে খুব ভালো লাগছিল কার্তিকবাবুর। ছেলের অসুস্থ হয়ে পড়ার কথাটা বলতে ভুলেই গেলেন।

সত্যিই টাকা গচ্ছিত রাখলে টাকার গাছ ফল ফুল হয়!

প্রতিবেশীরা মাঝেমধ্যে বোঝায়, সব ছেলেদের নামে লিখে দিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে দিন। কার্তিকবাবু শুধু হাসেন। বলেন, ‘খান পাঁচ-ছয় ক্যাশ সার্টিফিকেট আর এই পেনশনের কয়টা টাকা ছাড়া আমার আর কিছুই নাই। অবশ্য চাকরির শেষ বেতন যা পাইতাম,  এখন সাতাশ-আটাশ বছর পর পেনশনেই পাই তার তিনগুণ। ছেলেদেরও কিছু কিছু সাহায্য করতে হয়। ওদের নামে সব টাকা নমিনি করা আছে। আমরা দুজন না মরলে তো আর ছেলেরা কিছু পাবে না।’

তবে তিনি খুব হিসেবি। মনে পড়ে, সে অনেকদিনের কথা –

অসুস্থ মেজদাকে দেখতে গিয়েছেন ফল নিয়ে। দেখে মনে হলো মেজদার বাঁচার আশা নেই। অফিসের ছুটি শেষ। উইদাউট পে চলছে। সংসারে খুব অভাব। মেজবউদির হাতে পঞ্চাশটা টাকা দিয়ে এসেছেন।

মেজদা সুস্থ হলে, খবর পেয়ে দেখতে এলেন, সঙ্গে লিস্ট। কোন কোন তারিখে মেজদাকে দেখতে এসে নগদ টাকা মেজবউদির হাতে কত দিয়েছেন সব মিলিয়ে। সে-টাকা তখনই শুধতে হবে!

কার্তিকবাবু বললেন, ‘ফলের দামটা না হয় ছেড়েই দিলাম।’

শেষে মেজবউদি তাঁর কানের দুল বিক্রি করে তখনই দেওরের ঋণ শোধ করে দিয়েছেন। চল্লিশ বছরে সেই টাকা এখন নিশ্চয়ই অনেক হয়েছে। এভাবে হিসাব করে চলেছেন বলেই না এখন কার্তিকবাবু চোখ বুজলেই দেখতে পান তাঁর চারদিকে টাকার গাছ!

দুপুরে রোজ ভাতঘুমে চোখজুড়ে আসে কার্তিকবাবুর। আজ খুব শীত লাগছে! এসি মেশিন কমিয়ে দিতে গিয়ে ধমক খেলেন গোলাপবালার কাছে। এত ঠান্ডা যেন হিমঘর!

দূরাগত কান্নার ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে কোথা থেকে? কোকিলদুটোও খুব ছটফট করছে খাঁচার মধ্যে। বড় বউয়ের পোষা বেড়ালটা মাঝেমধ্যে হামলা করে কোকিলের খাঁচার ওপর। পাখিদুটো খাওয়ার মিথ্যে আশায়। কত মোটা তারের খাঁচা। অবুঝ বেড়াল তা বুঝবে কেন?

বউকে না জানিয়ে সন্তর্পণে বাইরে এলেন কার্তিকবাবু। ঘরের দরজা টেনে বন্ধ করে দিলেন।

নিচে ব্রতর ছেলেমেয়েরা কাঁদছে। ওদের পিসি বোঝাচ্ছে, ‘নবেন্দুকাকু তোর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে এখনই ফিরে আসবে দেখিস। কাঁদিস না অমন করে!’

কার্তিকবাবু ইশারায় মেয়েকে ডাকেন, ‘ওর বড়দা কেমন আছে কোন খবর পাইছিস?’ মেয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘বড় বউদি ছন্দা মাসিরে ফোন করছিল। বড়দার অবস্থা ভালো না। আইসিইউতে রাখছে। তাও ভাগ্য ভালো রাস্তায় নবেন্দুদার লগে দেখা হইছে।’

নবেন্দু ব্রতর বন্ধু। ছেলেটা খুব গায়েপড়া। ঠেস দিয়ে দিয়ে কথা বলে আর অকারণে হাসে। কোকিলের খাঁচার সামনে কুহু-কুহু করে ডাকে। কার্তিকবাবুকে ভেঙায় বোধহয়। কী রান্নাবান্না হচ্ছে। শরীর কেমন আছে। সব খবর তার জানা চাই। সাংবাদিকদের মতো কার্তিকবাবুর পেছনে লেগে থাকে। খুব রাগ হয়। একদিন সহ্য করতে না পেরে কড়া করে দুকথা শুনিয়ে দিয়েছিলেন, ‘শোনো নবেন্দু, আমরা হচ্ছি রাজকর্মচারী। তুমাগো লগে আমাদের ওঠাবসা চলে না!’

মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে নিচে নেমে গিয়েছে নবেন্দু।

নিচে গিয়ে সে কি হাসি! ওপর থেকে কার্তিকবাবুর কানে যায়, ব্রতর ছেলে বিহান জিজ্ঞেস করছে, ‘হাসছো কেন কাকু?’

‘রাক্ষসের মুখের সামনে আয়না ধরলেই রাক্ষস রেগে যায়!’ বলে আবার হো-হো হাসি।

রাক্ষসের মুখের সামনে আয়না ধরলে মানে কী? বোধগম্য হয়নি কার্তিক নস্করের।

সন্ধেবেলা ব্রতর মৃতদেহ বাড়ি ফিরল।

বড় বউ, ছোট বউ, ছেলেমেয়েদের আর্তকান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে বাড়ির বাতাস। শুধু কার্তিকবাবু আর গোলাপবালার চোখে জল নেই।

যতবার কান্না ঠেলে উঠছে বুক নিংড়ে ততবারই ইলিশ মাছের ঢেকুর এসে কান্নার পথ আগলায়।

প্রতিবেশীরা অনেকে এসে ভিড় করেছে, সবারই চোখে জল। বলাবলি করছে, ছেলেটা খুবই কষ্ট পেয়ে মরল!

সবার সামনে একটু কাঁদা জরুরি বলে মনে হলো গোলাপ-দম্পতির। দুজনই আলাদা আলাদা এবং একা হয়ে চোখে জল আর গলায় কান্না আনার মহড়া দিয়ে দুজনই একসঙ্গে ছুটতে ছুটতে ওপর দিকে নেমে এসে ব্রতর মৃতদেহে হাত বুলিয়ে একটু কাঁদবে – বড় বউ ক্রুদ্ধ বাঘিনির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ওদের সরিয়ে দেয়। অসহায় আক্রোশে চিৎকার করে বলে, ‘না, না। আপনারা আমার স্বামীর গায়ে হাত দেবেন না।’ কার্তিকবাবু এখন ক্ষমতায় থাকলে, সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীকে নির্দেশ দিতেন, লাঠিপেটা করে এই বিদ্রোহ দমন করতে!

তখন অনেক রাত। ঘর অন্ধকার। গোলাপ-দম্পতির ঘরের দরজা  হাট করে খোলা। ঘুম আসছিল না ওদের। কার্তিকবাবু মাঝেমধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে খোলা ছাদে পায়চারি করছেন। চারদিকে থইথই জোছনায় তখনো ব্রত যেন হেঁটে বেড়াচ্ছে রাতপাহারায়। যদি হঠাৎ ফু-র-র করে ব্রতর বাঁশি বেজে ওঠে, সেই ভয়ে কার্তিকবাবু বেশিক্ষণ বাইরে ছাদে বেড়াতেও পারছেন না। ঘরে এসে বউয়ের পাশে শুয়ে পড়ছেন।

হঠাৎ ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠেন গোলাপ-দম্পতি, ‘কে রে’!

দরজায় শুভ্র বসন পরা ব্রতর ছেলে সাড়া দেয়, ‘দাদু আমি বিহান।’

‘এত রাতে কী ব্যাপার?’ ধমকে ওঠেন কার্তিকবাবু।

‘নবেন্দুকাকু চলে যাওয়ার সময় বলে গিয়েছিল, তোর ঠাকুরদার সঙ্গে একবার দেখা করে আসিস। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই একটু দেরি হয়ে গেল।’

শিশু দেখে কোকিলরা ডানা ঝাপটায়। জোছনার আলগা আভায় বোঝা যাবে কেন, বিহানের গালে চোখের জলের দাগ। শুধু শিশুর হাসিকে সেলাম করে জোছনা। খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে কুহু-কুহু করে ডেকে ওঠে বিহান। কার্তিক-দম্পতি দুহাতে কান চেপে ধরেন।

পূর্বদিকে, পাঁচিলের ওপাশে চক্রবর্তীদের পুকুরপাড়ে ঝোপঝাড়ের মধ্যে কিসের যেন ঝটপটানির শব্দ। পরক্ষণেই কার্তিকবাবু দেখেন, বিহান ছুটে গিয়ে পাঁচিলের ওপর উঠে পড়ল। হাতে লাঠি। চিৎকার করছে, ‘ধর – ধর – ধর -’

‘ওরে বিহান, তুই ওইখানে, জলে পইড়া যাবি তো! রাইতবিরেতে কত রকমের বিষাক্ত প্রাণী -’

দাদুর বারণ ওর কানে গেলে তো! বিহান লাফিয়ে পড়ল পাঁচিলের ওপারে।

খানিক পরই দেখা গেল একটা রাজহাঁসকে কোলে নিয়ে এলো বিহান। পাঁচিল টপকে হাঁসটা বাড়ির মধ্যে ফেলে দিলো। ওপরে তাকিয়ে বলে, ‘এত রাতে তুমি ছাদে কী করছ? ঘুমাওনি? তোমাকে একদিন বলেছিলাম না দাদু, একটা রাজহাঁস বোবা কালাও মনে হয়। দলের তিনজন কখন বাড়ি চলে গিয়েছে। এটা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। অন্ধকারে পথ চিনে বাড়ি যেতে পারেনি। ঝটপটানির শব্দে ছুটে না এলে বনবিড়ালে একে খেয়ে নিত।’

রাজহাঁসটা যন্ত্রণায় ছটফট করছে, ওকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরে চলে গেল বিহান।

হঠাৎ কী যে হলো কার্তিকবাবুর। মাথায় চক্কর দিয়ে উঠল – সারাশরীর কেঁপে হড়হড় করে বমি উঠে এলো। ইলিশ মাছের বিষবমি।

কার্তিকবাবু বমির মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে গেলেন।

বিহান কখন ছুটে এসেছে ওপরে। বলছে, ‘দাদু তোমার কাছে তুলো লাল ওষুধ আছে? রাজহাঁসটার পিঠে বনবিড়ালে কামড়ে দিয়েছে। খুব রক্ত পড়ছে!’ বিহানের কথা শুনতে পাচ্ছেন, কিন্তু কার্তিকবাবু কথাই বলতে পারছেন না। হাঁ করে নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। খুব কষ্ট হচ্ছে ওঁর বুকের ভেতরটায় –

Thursday, September 14, 2023

জ্যঁ-বিডেল বোকাসা: আফ্রিকার স্বঘোষিত সম্রাটের অভিষেক যেভাবে হয়েছিল

সিংহাসনে আসীন সম্রাট বোকাসা।
উনিশশো সাতাত্তর সালে ডিসেম্বর মাস। মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের নতুন সম্রাট হিসেবে অভিষেক নিলেন জ্যঁ-বিডেল বোকাসা।
সেই দিনটির কথা স্মরণ করছিলেন তার ছেলে জ্যঁ চার্লস বোকাসা এবং ফরাসি সাংবাদিক বার্নার্ড এডিংগার।
সম্রাট হিসেবে জ্যঁ-বিডেল বোকাসার অভিষেকের ওপর বিবিসি ১৯৭৭ সালে একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছিল। জ্যঁ চার্লস বোকাসা বলছিলেন, ঐ অভিষেক ছিল খুবই ব্যতিক্রমী এক ঘটনা। সবাই এভাবে সম্রাট হতে পারে না বলে তিনি বলছিলেন।
সম্রাট বোকাসাকে ইতোমধ্যেই মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।
মি. বোকাসা ছিলেন এমন এক ব্যক্তি যিনি ১৯৬৬ সালে এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সে দেশের ক্ষমতা দখল করেছিলেন।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র আফ্রিকার সবচেয়ে দরিদ্র দেশগুলোর একটি হলেও তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল অঢেল।
চরম নৃশংসতা দেখানোর ব্যাপারে তার বেশ কুখ্যাতি ছিল। বলা হয়ে থাকে বন্দীদের মারপিটের সময় তিনি নিজে হাজির থাকতেন।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ১৯৬০ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল।
কিন্তু তার পরও জ্যঁ-বিডেল বোকাসা ফরাসিদের সব কিছুই খুব পছন্দ করতেন।
বিশেষভাবে তিনি ছিলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের দারুণ ভক্ত।
"সম্রাট বোকাসার কাছে চার্লস দ্যা গল ছিলেন ভগবানের মতো," বলছিলেন রয়টার্সের সাংবাদিক বার্নার্ড এডিংগার, "বলা হয়ে থাকে যে শুধুমাত্র জেনারেল দ্য গলের সাথে দেখা করার জন্য ফ্র্যাংকো-আফ্রিকান শীর্ষ সম্মেলনের সময় তিনি প্যারিস গিয়েছিলেন।"
অভিষেক অনুষ্ঠানে সম্রাটের বেশে জ্যঁ-বিডেল বোকাসা।
"সে সময় তিনি দ্য গলকে 'পাপা' (বাবা) বলে ডাকতেন। দ্য গল তাকে বলেছিলেন: 'বোকাসা তুমি আমাকে পাপা বলে ডেক না।' তিনি জবাব দিয়েছিলেন, 'উই পাপা (হ্যাঁ বাবা)।"
ক্ষমতা গ্রহণের আগে জ্যঁ-বিডেল বোকাসা ২০ বছরেরও বেশি সময় ফরাসি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন।
যদিও তিনি ছিলেন একটি স্বাধীন আফ্রিকান দেশের নেতা, কিন্তু ফ্রান্সের ব্যাপারে তিনি ছিলেন মোহগ্রস্ত।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ভ্যালেরি দঁস্ত্যাকে নিয়ে তিনি বাঘ-ভাল্লুক শিকারে যেতেন।
তার অভিষেকের জন্য সব সামগ্রী তিনি ফ্রান্স থেকে আনানোর ব্যবস্থা করেছিলেন।
বার্নার্ড এডিংগার বলছিলেন, "তিনি বিশাল একটা সিংহাসন এনেছিলেন। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি থেকে এনেছিলেন ৪০টা ঘোড়া। ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন যেরকমটা ব্যবহার করতেন, তেমন ধরনের ঘোড়ার গাড়ি এনেছিলেন। সবুজ এবং সোনালি রঙের এই ঘোড়ার গাড়ির জন্য বহু অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল।"
"দু:খজনক ব্যাপার হলো ঘোড়াগুলোর অনেকগুলোই মারা গিয়েছিল। কারণ ফরাসী ঘোড়া আফ্রিকার আবহাওয়া সহ্য করতে পারেনি।"
অভিষেক অনুষ্ঠানের ব্যয়ে কোন ধরনের কার্পণ্য করা হয়নি। ফ্রান্স থেকে ১৫ টন ফুল এবং পেটি বোঝাই করে শ্যাম্পেন আনা হয়েছিল।
সম্রাট বোকাসা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্যা গলের (ডান উপবিষ্ট) ভক্ত ছিলেন।
বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে জ্যঁ-বিডেল খুব গর্ব করে তার মুকুটের হীরের টুকরোগুলো দেখিয়েছিলেন।
অভিষেকের দিন ঠিক করা হয় ৪ঠা ডিসেম্বর। আর অনুষ্ঠানের স্থান ঠিক করা হয়েছিল বোকাসা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি বোকাসা স্ট্রিটের ওপর বোকাসা স্টেডিয়ামে।
সেই অনুষ্ঠানে পোপ আসতে না পারলেও তিনি বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছিলেন। বোকাসাকে হাতে রাখার জন্য পশ্চিমা দেশগুলো থেকে শীর্ষ কর্তারা হাজির হয়েছিলেন।
"পুরো হল ঘরটি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ," সাংবাদিক বার্নার্ড এডিংগার বলছিলেন, "ফরাসি দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রবার্ট গালিস রোমান সম্রাটের মতো কিম্ভুতকিমাকার পোশাক পরা বোকাসার প্রতি বার বার করে কুর্নিশ করছিল। পুরো ব্যাপারটা ছিল হাস্যকর।"
"কোন কারণে ঐ হলঘরে কোন এয়ারকন্ডিশনের ব্যবস্থা করা হয়নি। ঘরের মধ্যে ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড গরমে সবাই বসে দরদর করে ঘামছিল।"
সম্রাটের ছেলে জ্যঁ চার্লস বোকাসা বলছিলেন, পুরো বঙ্গি শহরের প্রায় সবাই সেই অভিষেক অনুষ্ঠান দেখতে হাজির হয়েছিলেন।
গান বাজনার জন্য ফরাসি সেনাবাহিনীর অর্কেস্ট্রা দল উপস্থিত ছিল।
কোন রাষ্ট্রপ্রধান ঐ অভিষেক অনুষ্ঠানে হাজির না থাকলেও বেশ কয়েকজন প্রধানমন্ত্রী, প্রধানত আফ্রিকার দেশগুলো থেকে, সেখানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র পশ্চিম আফ্রিকার সবচেয়ে গরীব দেশগুলোর একটি।
জ্যঁ চার্লস বোকাসা বলছিলেন, "স্টেডিয়ামে সম্রাট দেশের নতুন রাজকীয় সংবিধানের শপথ নিলেন। এরপর আমরা শোভাযাত্রা নিয়ে নটরডেম গির্জায় গেলা। দিনটা ছিল খুবই গরম।"
"ঘোড়াগুলোকে শান্ত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। চারটি ঘোড়া সেই দিনই মারা যায়। গির্জাটি খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল। পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল রূপকথার মতো।"
কিন্তু এই রূপকথায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের অনুপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আর তা হলো সাধারণ মানুষ, বলছিলেন সাংবাদিক বার্নার্ড এডিংগার।
"দেশের সাধারণ নারী-পুরুষকে অভিষেক অনুষ্ঠান থেকে ১০০ গজ দূরে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তারা খুব আগ্রহ নিয়ে অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিল। কিন্তু সৈন্যরা তাদের কাছে আসতে দিচ্ছিল না। কাছে আসার চেষ্টা করলেই সৈন্যরা কার্তুজের বেল্ট দিয়ে তাদের মারছিল।"
"আমি যখন কাছে গিয়ে তাদের সাথে কথা বললাম তখন বুঝলাম ঐ অনুষ্ঠান আসার পেছনে তাদের অন্য আরেকটা কারণ ছিল। তারা ছিল ক্ষুধার্ত। তারা অনুষ্ঠানে রাখা খাবার দেখিয়ে বলছিল সেগুলো তারা খেতে চায়।"
যে দেশে বেশিরভাগ মানুষ দু'বেলা খেতে পায় না, সে দেশে এই ধরনের আড়ম্বর করে অভিষেক করা ছিল খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার।
দেশ থেকে পালিয়ে সম্রাট বোকাসা ফ্রান্সের এই প্রাসাদে বসবাস করতেন।
এক হিসেব অনুযায়ী পুরো অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল। দেশের বাজেটের একটা বড় অংশ এই কাজে খরচ করা হয়েছিল।
এই ব্যয়ের একটা বড় অংশ এসেছিল ফ্রান্সের কাছ থেকে। কারণ শীতল যুদ্ধের সময় তাদের ঐ সাবেক উপনিবেশকে তারা 'হাতে রাখতে' চেয়েছিল।
সাংবাদিক বার্নার্ড এডিংগার বলছিলেন, "বোকাসাকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র বলে মনে করা হতো। কিন্তু তাকে একই সাথে একটা সঙ হিসেবেও দেখা হোত। কিন্তু সে ছিল নিজেদের পক্ষের সঙ। সে সময় পশ্চিম আফ্রিকার বহু ফরাসী-ভাষী দেশেই এই ধরনের নেতা ছিল। তেমনি ছিল পূর্ব আফ্রিকায়। যেমন ইদি আমিন।"
কিন্তু সেই অভিষেকের এক বছরর মধ্যে ক্ষুধার্ত মানুষ মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে বিক্ষোভ শুরু করে।
সরকার নিষ্পেষণের মধ্য দিয়ে এর জবাব দিতে থাকে।
এর অবসান ঘটে যখন একদল শিশুকে হত্যা করা হয়।
এরা নতুন স্কুল ইউনিফর্মের প্রতিবাদ করছিল। সম্রাট বোকাসার স্ত্রী কোম্পানির তৈরি করা এসব ইউনিফর্ম কেনার সামর্থ্য তাদের ছিল না।
দেশে ফিরে আসার পর সম্রাট বোকাসার বিচার।
তবে সম্রাট বোকাসা ঐ ঘটনার দায়দায়িত্ব অস্বীকার করেছিলেন।
ঐ ঘটনার পর ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফরাসি সেনাবাহিনী মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে অভিযান চালিয়ে সম্রাট বোকাসাকে উৎখাত করে এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ডেভিড ড্যাকো-কে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে।
সম্রাট বোকাসা নির্বাসনে চলে গেলেও ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরে আসেন।
তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র্রদ্রোহ, খুন, অর্থ আত্মসাৎ, এমনকি নরমাংস ভক্ষণের অভিযোগে তার বিচার হয়।
একমাত্র নরমাংস ভক্ষণ ছাড়া তিনি সব মামলায় দোষী প্রমাণিত হন।
আদালত প্রথমে তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও পরে সেটা বদলে যাবজ্জীবন নির্জন কারাদণ্ড করা হয়।
তবে ছয় বছর কারাবাসের পর ১৯৯৩ সালে তাকে মুক্তি দেয়া হয়।
এর তিন বছর পর একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে জ্যঁ-বিডেল বোকাসার মৃত্যু হয়।

Saturday, August 26, 2023

মাদার তেরেসা’র বিরুদ্ধে যত অভিযোগ! by নাফিস নাদভী

আমাদের ইতিহাসে মাদার তেরেসা এক কিংবদন্তীর নাম। আমরা তাকে জানি মানবতার মূর্ত প্রতীক হিসেবে, সেবা ও মমতার দৃষ্টান্ত হিসেবে। মাদার তেরেসার গল্প শুনতে শুনতে আমাদের মনে তার পরিশুদ্ধ রুপের এক স্থায়ী চিত্র আঁকা হয়ে গিয়েছে সেই ছোটবেলা থেকেই।
আমাদের এই স্থায়ী ভাবনায় যদি কেউ আঘাত করে? যদি কেউ এসে বলে, না, আমরা যা দেখছি তার পুরোটা সত্য নয় অথবা পুরোটা সত্য আমরা দেখছি না? পর্দার আড়ালে কিছু গল্প লুকিয়ে আছে, যা মাদার তেরেসার ভাবমূর্তির মত এতটা উজ্জ্বল নয়? পাঠক, আজকে আমরা এমনই কিছু কথা তুলে ধরব।
মাদার তেরেসার মূল নাম ছিল আনিয়েজ গঞ্জে বয়াজিউ। তিনি ১৯১০ সালের ২৬শে আগস্ট বর্তমান ম্যাসিডোনিয়ার স্কোপিয়েতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি মিশনারী হবার উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগ করে “সিস্টার অফ লরেটো” নামক একটি সংস্থায় যোগ দেন। সংস্থার কাজে ১৯২৯ সালে তিনি কলকাতায় আসেন। ১৯৫০ সালে রোগাক্রান্ত ও দরিদ্র মানুষের সেবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন “মিশনারিজ অফ চ্যারিটি” নামে একটি সেবা প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৯ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার এবং ১৯৮০ সালের ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান “ভারতরত্ন” লাভ করেন।
মাদার তেরেসা আজীবন দুঃস্থ মানুষের সেবা করেছেন, এই কথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। তবে অভিযোগটা আরেকটু গভীরে। মাদার তেরেসার বিরুদ্ধে অভিযোগ হল, তার সেবাদানের উদ্দেশ্য ও প্রণালী খালি চোখে যতটা মনে হয়, ঠিক ততটা মানবতাবাদী নয়।
ডাক্তার-লেখক অরুপ চট্যোপাধ্যায় এর লেখা “Mother Teresa: The Final Verdict” নামে বইটি ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয়, যাতে মাদার তেরেসার সেবা-পদ্ধতি ও আরও নানা স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে গুরুতর কিছু অভিযোগ তুলে ধরা হয়। একইভাবে, তার কর্মপদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা করেছেন ক্রিস্টোফার হিচেন্স (লেখক-কলামিস্ট), মাইকেল প্যারেন্টি (রাষ্ট্রবিজ্ঞানী), বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মত ব্যক্তি ও সংস্থা।
শৈশবে মাদার তেরেসা।
মাদার তেরেসার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি সেবা গ্রহণ করতে আসা অসহায় দুঃস্থ মানুষদের খৃস্টধর্মে দীক্ষিত হতে চাপ দিতেন। ডঃ অরুপ চট্যোপাধ্যায় বলেছেন, ১৯৯২ সালে মাদার তেরেসা নিজেই স্বীকার করেছেন যে, তিনি প্রায় ২৯ হাজার লোককে মৃত্যুকালে তাদের না জানিয়ে খৃস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করেছেন। তার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তারা দাবী করে, মাদার তেরেসা হিন্দুধর্মকে শয়তানের ধর্ম বলে চিহ্নিত করেন। যদিও একজন মানুষের অজান্তে কিভাবে তাকে “ধর্মান্তরিত” করা যায়- এ ব্যাপারটিই প্রশ্নবিদ্ধ।
মিশনারিজ অফ চ্যারিটি এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করে। এ ব্যাপারে মাদার তেরেসার মুখপাত্র ও সহকর্মী সুনিতা কুমারের উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি-
  • *“তিনি ধর্মের অনেক ঊর্ধ্বে ছিলেন – ফলে তার কাউকে ধর্মান্তরিত করার প্রশ্নও ওঠে না। সেটা কখনোই তার উদ্দেশ্য ছিল না, আর তাই যদি হত আমার তো মনে হয় গোটা ভারত এতদিনে খ্রিষ্টান হয়ে যেত।”
মাদার তেরেসার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে, তিনি শারীরিক কষ্টকে ঈশ্বরের নৈকট্যলাভের পথ বলে বিশ্বাস করতেন বলে অসুস্থ ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করতেন না। বরং তিনি রোগমুক্তির জন্য রোগীকে যিশুর কাছে প্রার্থনা করার উপদেশ দিতেন।
ব্যাপারটা সহজভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি। ধরুন, একজন অসুস্থ ব্যক্তির জন্য প্রেসক্রাইবড ওষুধ আপনার কাছে আছে। কিন্তু আপনি তাকে ওষুধ না খাইয়ে কেবল সেবা করে গেলেন, সারারাত জেগে তার পাশে বসে রইলেন, মুখে তুলে ভাত খাইয়ে দিলেন এই ভেবে যে, অসুখ ভালো করার মালিক আল্লাহ- আপনার সেবাপদ্ধতি কি ঠিক?
অভিযোগগুলো তলিয়ে দেখলে, মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মানবতার মোড়কের আড়ালে ধর্ম বিক্রি করে গেছেন মাদার তেরেসা- এমন একটা দৃশ্যই আঁকা হয়ে যায়। মাদার তেরেসার “নিরাময় কেন্দ্র” এর পরিবেশ নিয়েছে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। বলা হয়, এর পরিবেশ ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন, অস্বাস্থ্যকর। এই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোগের প্রকোপ কমার পরিবর্তে আরও বেড়ে যেত, আর সহজেই ছড়িয়ে পড়ত ছোঁয়াচে রোগগুলো। একাধিক ব্যক্তির জন্য একই সিরিঞ্জ ও অন্যান্য স্পর্শকাতর সরঞ্জাম ব্যবহার করা হত।

শুনে মনে হতে পারে, আর্থিক সীমাবদ্ধতার জন্যই হয়তো সকল সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা সম্ভব হত না। ব্যাপারটা তেমন না। মাদার তেরেসা বিভিন্ন উৎস থেকে যথেষ্ট পরিমাণ আর্থিক অনুদান পেতেন সেবাকর্মের জন্য। বিখ্যাত পত্রিকা গার্ডিয়ান সুজান শিল্ডের (মিশনারিজের তৎকালীন কর্মী) উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশ করে যে, অনুদানের অধিকাংশ টাকা দুঃস্থদের সেবায় ব্যয় হবার পরিবর্তে ব্যাংকেই পড়ে থাকত। এখানে অভিযোগটা অসততার নয়, অবহেলার।
এই অনুদান সংক্রান্ত আরেকটি অভিযোগ হল, তিনি কিছু অসৎ ও অনৈতিক উৎস থেকে অনুদান গ্রহণ করেছেন। যেমন, হাইতির কুখ্যাত স্বৈরশাসক ডুভালিয়ার পরিবার,  লিংকন সেভিংস অ্যান্ড লোন কেলেঙ্কারীর সাথে জড়িত চার্লস কীটিং।
মাদার তেরেসা ছিলেন গর্ভপাত ও জন্মনিরোধকের বিরুদ্ধে উচ্চকন্ঠ। গর্ভপাত ও জন্মনিরোধকের ব্যবহারকে তিনি অনৈতিক ও অমঙ্গলজনক বলে মনে করতেন। গর্ভপাত নারীর জন্মগত অধিকার, নানা পারিপার্শ্বিক কারণে সে গর্ভপাতের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পারে। জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের মত জনবহুল অঞ্চলে নতুন করে ব্যাখ্যা করার কিছু নেই। অথচ, এই দু’টিকে মাদার তেরেসা ঈশ্বরের ইচ্ছার পরিপন্থী বলে বিশ্বাস করতেন এবং এদের বিরুদ্ধে মতপ্রকাশ করতেন, এমনই ঘোর কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিলেন তিনি। নোবেল শান্তি পুরষ্কার গ্রহণের সময় বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বলেন,
  • *“গর্ভপাত হচ্ছে পৃথিবীর শান্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।”
এ ভাষণে তিনি বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন “জন্ম না নেওয়া মানবশিশুর প্রতি সহিংসতা” হিসেবে। তবে জন্ম নেওয়া একটি শিশু মানবেতর জীবন যাপন করলে সে ব্যাপারে কি করণীয় সে ব্যাপারে তেমন বাস্তবিক কোন দিকনির্দেশনা দেননি তিনি, বরং পুরো বিষয়টি ঈশ্বরের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন।
ক্রিস্টোফার হিচেন্স তার “The Missionary Position: Mother Teresa in Theory and Practice” প্রবন্ধে মাদার তেরেসা সম্পর্কে বলেছেন-
  • *“একজন ধর্মীয় মৌলবাদী, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় একজন ব্যক্তি, সেকেলে ধর্মোপদেশ দানকারী এবং পার্থিব ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির অনুচর।”
মাদার তেরেসা সাধুও হতে পারেন, শয়তানও হতে পারেন। একেকজন হয়তো একেকভাবে ব্যাখ্যা করবেন।  তবে, আমরা সাদা চোখে যা দেখি, তা সবসময় পুরোপুরি সত্য না-ও হতে পারে, এই বিষয়টি স্মরণে রাখাও বাঞ্চনীয়।