Wednesday, October 9, 2024

চীনে রহস্যময় পিরামিড পাহাড় এলো কোথা থেকে?

মিসরের পিরামিডের খ্যাতি জগত জোড়া। কিন্তু মিসর ছাড়াও মেক্সিকো, সুদান ও চীনের মতো দেশেও রয়েছে পিরামিড। এসব পিরামিড দেখতে প্রতি বছর ভিড় জমায় হাজারও দর্শণার্থী। তবে চীনেই এমন কিছু পাহাড় রয়েছে, যেগুলো দেখতে অবিকল পিরামিডের মতো। দেশটির দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলীয় গুইঝৌ প্রদেশের আনলং কাউন্টিতে ওই পাহাড়ের অবস্থান।

বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো পাহাড়। দেখতে এমন অনন্য হওয়ায় এই পাহাড় রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের কাছে। চীনের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন এই পাহাড় দেখতে আসছেন হাজার হাজার মানুষ। দর্শনার্থীরা চোখে এসব পাহাড় যেন পিরামিড হিসেবেই ধরা পড়েছে।

চলতি বছরের মার্চে আনলংয়ের কাছে পিরামিডের মতো এই পাহাড়ের ভিডিও ওপর থেকে ধারণ করেন একজন ফটোগ্রাফার। এরপর সেই ভিডিও চীনের টিকটকের মতো ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ডোইনে পোস্ট করেন। ভিডিওটি তিনি সূর্যাস্তের সময় ধারণ করেছিলেন। সেটি পোস্ট করার পর পরই ৪০ লাখের বেশি ভিউ হয়। কমেন্ট পরে এক হাজারের বেশি।

ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লেখেন, আমি মনে করি এই পাহাড় দেখতে অনেকটাই পিরামিডের মতো। এর উচ্চতা ও উচ্চতা কোণ এমনকি অক্ষাংশেরও পিরামিডের সঙ্গে খুব মিল রয়েছে।

কয়েক মাস আগে ধারণ করা আরেকটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সুউচ্চ ওই পাহাড়গুলো দেখতে পিরামিডের মতো। তবে এর বাইরের অংশ পুরোটাই সবুজের চাঁদরে ঢাকা। দর্শনার্থীদের কাছে তাই রহস্যেই আবৃত এই পিরামিড পাহাড়। এখন এই পাহাড়কে ঘিরেই ওই এলাকার পর্যটন ব্যবসা জমে উঠেছে। বানানো হচ্ছে বিভিন্ন উঁচু প্ল্যাটফর্ম, যেখান থেকে এই পাহাড় দেখা যায়।

মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পাঁচ দিনের ছুটিতে ৬১ হাজার দর্শনার্থী পিরামিড পাহাড় দেখতে গিয়েছিল। গুইঝৌর বাইরে থেকেও বেইজিং ও সাংহাই দেখে ছুটে যান দর্শনার্থীরা। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ২০ কোটি বছর আগে প্রাকৃতিকভাবেই এই পাহাড় গঠিত হয়েছে। ডলোমাইট নামে এক ধরনের চুনাপাথরের কারণে পিরামিডের আকৃতি ধারণ করেছে এই পাহাড়।

গুইঝৌ প্রদেশ চীনের দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত। এই অঞ্চলটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ১০০ মিটার উঁচু। এখানকার প্রায় ৯২.৫ শতাংশ এলাকা পাহাড়ি। এ কারণে এই অঞ্চলটি চীনের সবচেয়ে পার্বত্যময় অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত। পাহাড়ি অঞ্চল হওয়ায় গুইঝৌর আবহাওয়াও অন্য যেকোনো স্থান থেকে আলাদা।

সূত্র : সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট 

চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত পিরামিড সদৃশ পাহাড়। ছবি : সংগৃহীত
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত পিরামিড সদৃশ পাহাড়। ছবি : সংগৃহীত

কালো পতাকা নিয়ে মাঠে এরা কারা? by নাইম হাসান

সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কালেমা লেখা কালো ও সাদা পতাকা নিয়ে মিছিলের বেশকিছু ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব মিছিলে ফিলিস্তিনে গণহত্যা বন্ধ ও ইসলামী খেলাফত কায়েমের দাবি তোলা হয়েছে। সমাবেশে মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর কটূক্তির প্রতিবাদও করা হয়েছে। কিন্তু কারা এসব কর্মসূচি পালন করছে। তাদের নেপথ্যে কারা আছে এ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দারাও আশঙ্কা করছেন কোনো স্বার্থান্বেষী পক্ষ এই কাজে নেমে থাকতে পারে। সরকার পরিবর্তনের পর যখন সবকিছু স্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে এই মুুহূর্তে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই আইএস ধাঁচের এসব কর্মসূচি দিয়ে মাঠে নামিয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। একটি নিষিদ্ধ সংগঠন এসবের নেপথ্যে ভূমিকা রাখছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে। তথ্য জানার পর সরকারের বিভিন্ন সংস্থা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে পরিস্থিতির কারণে সব জায়গায় এসব কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ইসলামী দল সংশ্লিষ্টরাও জানিয়েছেন এই মুহূর্তে কালো পতাকা নিয়ে মিছিল করার কোনো কারণ নেই। যারা করছে তাদের পেছনে কারও কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে।

গত সপ্তাহে ঢাকার নটর ডেম কলেজ, ঢাকা কলেজ, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থীদের ঢাকায় আলাদা আলাদা মিছিল বের করতে দেখা যায়। ৬ই অক্টোবর ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবনের সামনেও মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। তাদের হাতে বাংলাদেশের পতাকা, ফিলিস্তিনের পতাকা এবং কালেমা লেখা পতাকাও ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে অনেকেই নানা সমালোচনা করেছেন। গত শুক্রবার কিশোরগঞ্জের একটি মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
এসব কর্মসূচির পেছনে হিযবুত তাহরিরের লোকজন উৎসাহ দিচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে। সর্বশেষ ৭ই অক্টোবর গাজায় হামলার বার্ষিকীর দিনে বড় ধরনের জমায়েতের প্রস্তুতি ছিল এ গ্রুপটির। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক ছিল। এসব গ্রুপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাদের কর্মসূচির ছবি প্রচার করছে। এসব কর্মসূচি কোনো রাজনৈতিক দল সাংস্কৃতিক সংগঠন সরাসরি জড়িত নয় বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক এডভোকেট হাসনাত কাইয়ূম বলেন, বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীল করা কিংবা সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কেউ নামছে। পরাজিত শক্তির এতে ইন্ধন থাকার সম্ভাবনা বেশি, অন্য কেউ হতে পারে যে তারা মাঝপথে ফায়দা লুটতে চায়। আমার ধারণা, এখানে মাফিয়াদের যে সকল সহায়ক শক্তি ছিল তারাই কোনোভাবে বিভিন্ন নামে যা যা করলে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিংবা আন্দোলনকারী সংস্থাগুলোর ভাবমূর্তির সংকট করা যায় সেটাই পরিকল্পিতভাবে করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

দেশের এমন অবস্থায় এই পতাকা নিয়ে মিছিল করার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করেন খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আবদুল জলিল। তিনি বলেন, এই ধরনের পতাকা নিয়ে মিছিল করার কোনো কারণ দেখি না। এগুলা বাংলাদেশকে বাহিরের দেশে অন্যভাবে চিহ্নিত করার কোনো পরিকল্পনা কিনা এটা নিয়ে আমাদের সন্দেহ আছে।
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা ও গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি জানান, এমন কয়েকটি মিছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি। তবে তাদের উদ্দেশ্য কী সেটি আমলে নিয়ে সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এই বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের ডিসি মুহাম্মদ তালেবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এটা আমরা তদন্ত করছি। দেখছি এর সঙ্গে কারও সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা। পর্যবেক্ষণ চলছে। তাদের একজনকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তদন্তে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া গেলে পরবর্তীতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

mzamin

চটপটির দোকানে ব্যাংকের ঋণ ২৩৪ কোটি টাকা

চট্টগ্রামে নওরোজ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তাদের একটি চটপটির দোকান ও দুটি রেস্তোরাঁ রয়েছে দেখিয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের ৩টি শাখা থেকে ২৩৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক নাজমি নওরোজ।

এর মধ্যে ইট অ্যান্ড ট্রিট নামের চটপটির দোকানটি নগরীর আসকার দিঘির পাড়ে। এর পাশেই ফিউশন ইটস নামের একটি রেস্তোরাঁ ও অপরটি লা এরিস্টোক্রেসি নামের রেস্তোরাঁটি তিনবার জায়গা বদল করে এখন নগরীর আগ্রাবাদে।

জানা গেছে, সামান্য ব্যবসার বিপরীতে এত বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া সম্ভব হয়েছে খোদ ব্যাংক মালিকের বিশেষ আগ্রহে। ফলে ঋণ শোধ না করে দিব্যি বিলাসী জীবনযাপন চালিয়ে আসছেন তিনি। এ ছাড়া ঋণ শোধ না করে তিনি ব্যাংক কর্মকর্তাদের খুশি রাখতেন ‘জোরপূর্বক উপহার’ দিয়ে। ব্যাংকের মালিকপক্ষও ঋণ পরিশোধ না করার সুবিধাটি অব্যাহত রাখতে তা খেলাপি না দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অশ্রেণিবদ্ধ (আনক্লাসিফায়েড) করে রাখে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লা এরিস্টোক্রেসি রেস্তোরাঁটির নামে ২ কোটি টাকার ঋণসীমা নেওয়ার সুযোগ থাকলেও নাজমি নওরোজ উত্তোলন করেছেন ৭০ কোটি টাকা, যা সুদ-আসলে ১১৭ কোটি টাকা হয়েছে। তিনি এই টাকা নিয়েছেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আসকার দিঘির পাড়ের মহিলা শাখা থেকে। একই প্রতিষ্ঠানের নামে নগরীর প্রবর্তক মোড়ে অবস্থিত ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক শাখা থেকে তিনি ঋণ নেন ৫৪ কোটি টাকা, যা সুদে-আসলে এরই মধ্যে ৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা হয়েছে। এর বাইরে ব্যাংকটির চকবাজার শাখা থেকে ২৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। তবে চকবাজার শাখার পুরো টাকা এস এলম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যাংকটির মালিক সাইফুল আলম মাসুদ নিয়ে নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন নাজমি নওরোজ।

আসকার দিঘির পাড়ের মহিলা শাখার মাধ্যমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে ২০১১ সাল থেকে লেনদেনের শুরু হয় নাজমি নওরোজের। বর্তমানে এই ঋণ সুদে আসলে ১১৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ব্যাংকের চাপাচাপিতে ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত তিনি শুধু ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। তবে ঋণের টাকা অশ্রেণিবদ্ধ (আনক্লাসিফায়েড) তালিকায় দেখানো হয়।

ব্যাংক সূত্র জানায়, মালিকপক্ষ চায়নি বলে নাজমি নওরোজকে ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। তাই ঋণটিকে অশ্রেণিবদ্ধ করে রাখা হয়। অবশেষে গত আগস্ট মাসে তাকে ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয় এবং পাওনা আদায়ে মামলা করা হয়।

ব্যাংক সূত্র জানায়, নাজমি নওরোজ ব্যাংক থেকে যে টাকা উত্তোলন করেন, বছর শেষে তা পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে কোনো কথা বলেনি। তবে ব্যাংকের টাকা ফেরত না পাওয়ায় শাস্তি হিসেবে আটকে দেওয়া হয় একাধিক কর্মকর্তার পদোন্নতি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকটির এক কর্মকর্তা বলেন, নাজমি নওরোজ ব্যাংকের কিস্তি জমা দেন না। কিন্তু মাঝেমধ্যে উপহার নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কাছে আসেন। কর্মকর্তারা এসব উপহার গ্রহণ করতে না চাইলে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দিয়ে প্রচণ্ডভাবে ধমকাতেন।

নাজমি নওরোজ বলেন, আমি যে পরিমাণ সম্পদ ব্যাংকে জামানত দিয়েছি তাতে ৪০ কোটি টাকাও পাওয়ার কথা নয়। যা কিছু হয়েছে সবই মাসুদ সাহেবের ইচ্ছায় হয়েছে। আমি যে আকিজ উদ্দিনকে টাকা দিয়েছি, সেই প্রমাণ আমার কাছে আছে। ব্যাংকের নতুন পর্ষদ গত রোববার আমার সঙ্গে বসেছে। আমি তাদেরকে এসব জানিয়েছি।

তাহলে ব্যাংকের এত টাকার দায় দেনা কে পরিশোধ করবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে নাজমি নওরোজ বলেন, কেন? মাসুদ সাহেব শোধ করবেন?

নাজমি নওরোজ উল্টো প্রশ্ন করেন, টাকা জামানত ছাড়া আমি এত বিপুল পরিমাণ টাকা কীভাবে তুলতে পারলাম? পারলাম ওই ব্যাংকের মালিক মাসুদ সাহেবের ইচ্ছায়।

ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আকিজ উদ্দিনের বিশেষ আগ্রহে সামান্য চটপটির দোকান ও রেস্তোরাঁর নামে নাজমি নওরোজ এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে তোলার সুযোগটি পান।

নাজমি নওরোজের কাছে চটপটির দোকান ও রেস্তোরাঁর বছরে আয় কত? ব্যক্তিগত চলাফেরার গাড়ির দাম ও বিদেশে সন্তানদের লেখাপড়া সংক্রান্ত আরও কয়েকটি প্রশ্নের জবাব চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।

নাজমি নওরোজ ২০১২ সালে ৮১, শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ রোড ঠিকানায় লা এরিস্টোক্রেসি নামে একটি রেস্তোরাঁর ব্যবসা শুরু করেন। এখানে কম-বেশি ১০০ জনের বসার ব্যবস্থা ছিল। ২০২০ সালে হঠাৎ লা এরিস্টোক্রেসি নামের রেস্তোরাঁটি সেখান থেকে সরিয়ে প্রথমে শহীদ সাইফুদ্দিন খালেদ রোডের কর্ণফুলী টাওয়ারে (এস আলম টাওয়ার) এবং পরে নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার ১০৫ হোসাইন চেম্বারের নিচতলায় স্থানান্তর করেন। আর লা এরিস্টোক্রেসি হোটেলটির নতুন নাম দেন ফিউশন ইট। দামপাড়া পুলিশ লাইনের কাছে কেক বিক্রিরও একটি দোকান তিনি খুলেছিলেন, যেটি এখন নেই। নগরীর একমাত্র পাঁচতারা হোটেল রেডিসন ব্লু’র প্রবেশপথের বিপরীত পাশেও তিনি ইট অ্যান্ড ট্রিট নামের একটি চটপটির দোকান খুলেন। কয়েক মাসের মধ্যে বন্ধও করে দেন।

এভাবে নানা জায়গায় বারবার দোকান খোলা এবং বন্ধ করার কারণ জানতে চাইলে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা দিয়েছেন চাঞ্চল্যকর তথ্য। তারা বলেছেন, লেয়ারিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ উপায়ে ব্যাংক থেকে অধিক হারে ঋণ বরাদ্দের জন্য তিনি এই কৌশল নেন। অর্থের উৎস গোপন করা হয় এই প্রক্রিয়ায়। যেমন একটি ব্যাংক হিসাব থেকে অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর, বিদেশে অর্থ পাচার, ট্রাভেলার্স চেকে রূপান্তর, একটি ব্যাংক হিসাব থেকে অন্যান্য শাখায় বিভিন্ন নামে অর্থ সরানোর জন্য এই কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয়। নাজমি নওরোজ রেস্তোরাঁ ব্যবসায় আয় উন্নতি যা-ই হোক না কেন, তিনি বারবার শাখা বাড়ানো বা নাম পরিবর্তন করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের কূট কৌশলের আশ্রয় নেন।

একটি ভাতের হোটেল এবং একটি চটপটির দোকানে বিক্রি-বাট্টা কত- তা নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের রয়েছে প্রশ্ন। তবে নাজমি নওরোজের বিলাসী জীবনের সঙ্গে এই দুইটি দোকান মেলানো অসম্ভব। তার নিজস্ব চলাফেরার জন্য আছে একটি টয়োটা ক্রাউন সেডান কার। নগরীর অভিজাত এলাকা নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে আছে দুটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট। দুই ছেলে ও এক মেয়েকে লেখাপড়া করিয়েছেন লন্ডন ও কানাডায়।

এ বিষয়ে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক প্রধান (উত্তর) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, নাজমি নওরোজের বিরুদ্ধে আমরা আদালতে মামলা করেছি। ঋণের টাকা আদায়ের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত আছে।

সূত্র : আমাদের সময় 

ছবি : সংগৃহীত

হাসিনার খোঁজ পাচ্ছে না সরকার

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থানের বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। আমরা ভারতে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে খোঁজ করেছি। কোথাও তার সন্ধান পাইনি। তার অবস্থান সম্পর্কে কেউ কনফার্মেশন দিতে পারেনি। মঙ্গলবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পূর্ব নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। দেড় ঘণ্টার নোটিশে মন্ত্রণালয় জরুরি ওই সংবাদ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে। ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনা বর্তমানে আরব আমিরাতের আজমাইনে আত্মগোপনে রয়েছেন মর্মে খবর বেরিয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। আমরা অনেক জায়গায় খোঁজ করেছি। কোনো কনফার্মেশন পাইনি। মিডিয়ায় আপনারা যেমন দেখেছেন, আমরাও দেখেছি যে, আমিরাতের আজমাইনে গেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ভারত শেখ হাসিনাকে অন্য দেশে পাঠালো কিনা? এমন প্রশ্নে উপদেষ্টা বলেন, সেটা যুক্তরাষ্ট্রকেই জিজ্ঞেস করেন।

ভারতে পালিয়ে যাওয়া সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতারা ট্রাভেল পাস নিয়ে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের ট্রাভেল পাস ইস্যু করবে কিনা, এ প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ মিশন ট্রাভেল পাস ইস্যু করতে পারে শুধু দেশে ফেরার জন্য, অন্য দেশে যাওয়ার জন্য নয়। অন্য দেশে যাওয়ার জন্য পাসপোর্টের প্রয়োজন পড়ে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা খোলাসা করেই বলেন, বাংলাদেশ মিশন কেবলমাত্র পাসপোর্টহীন ব্যক্তিদের দেশে ফেরার জন্যই ট্রাভেল পাস ইস্যু করতে পারে, অন্য দেশে যাওয়ার জন্য নয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, তারা যদি দেশে ফিরতে চান, ট্রাভেল পাস ইস্যু করা যেতে পারে এবং তারা দেশে ফিরে আসতে পারেন। আদালত চাইলে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবেও বলে জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

২০ হাজার ভিসা আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির আশ্বাস ইতালির: এদিকে ঢাকার ইতালি দূতাবাস ডিসেম্বরের মধ্যে ২০ হাজার ভিসা আবেদন নিষ্পত্তি করবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অনেক ভিসা আবেদন আটকে আছে। ২০ হাজার ভিসা কেস রোম থেকে ক্লিয়ার্ড (নিষ্পত্তি) হয়েছে। সে ভিসাগুলো দেয়ার অগ্রগতি খুব কম। ইতালি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার কথা হয়েছে, উনি আশ্বস্ত করেছেন যে ডিসেম্বরের মধ্যে এ ভিসাগুলো দিয়ে দিবেন। এ ছাড়া ইতালি দূতাবাস অতিরিক্ত দুই-তিনজন কর্মকর্তা নিয়ে আসছেন কাজ করতে, তারা এলে কাজের গতি বাড়বে। ইতালি দূতাবাসে প্রায় ৪০ হাজার ভিসা আবেদন জমা আছে। দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষারত ইতালির ওয়ার্ক ভিসাপ্রত্যাশীদের মধ্যে থেকে ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার সকালে সেগুনবাগিচায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে ভিসা ইস্যুকরণে দীর্ঘসূত্রতার কারণে তাদের নানাবিধ ভোগান্তিসহ এ সমস্যার দ্রুত সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের সর্বাত্মক সহযোগিতার অনুরোধ জানান ভিসাপ্রত্যাশীরা। তাদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আমরা প্রতিনিধিদলকে মিছিল-মিটিং ও ঘেরাও কর্মসূচি না করার জন্য বলেছি। এগুলো করলে ভিসাপ্রত্যাশীদের কোনো লাভ হবে না, দেশেরও কোনো লাভ হবে না। কারণ, তারা যদি ভয় পায়, তাহলে বরং আরও অফিসার চলে যাবেন। দেখা যাবে, ভিসা ইস্যু হচ্ছেই না। উপদেষ্টা বলেন, আমরা ইতালি দূতাবাসকে চাপ দিয়ে যাচ্ছি। আশা করছি, বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হবে। তৌহিদ হোসেন বলেন, ভিসা দেয়া বা না দেয়া একটি দেশের সার্বভৌম অধিকার। ভিসা কেন দেয়া হয়েছে বা দেয়া হয়নি, সেটা আমরা জিজ্ঞাসা করতে পারি না।

লেবানন থেকে ফ্লাই করা রিস্কি, বিকল্প পথে ফেরতের চেষ্টাও করছে সরকার: ওদিকে লেবানন থেকে প্রবাসীদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, লেবানন থেকে যারা ফিরে আসতে চান, তাদের তালিকা করতে বলা হয়েছে। তাদের (প্রবাসীদের) বলা হয়েছে, ওয়ার জোন (যুদ্ধকবলিত এলাকা) থেকে তারা যেন একটু উত্তরে সরে যান। আমরা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাকে (আইওএম) অনুরোধ করেছি, তারা যেন ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে দেয়, যাতে তারা চলে আসতে পারেন। লেবানন থেকে ফিরতে আগ্রহী প্রবাসী বাংলাদেশিদের তালিকা তৈরি করতে বলা হয়েছে এমনটা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সমস্যা হলো বৈরুত এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাই করা রিস্কি। সে কারণে বিকল্প পথে ফ্লাই করা যায় কিনা, সে চেষ্টাও করছি। উল্লেখ্য, লেবাননে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা আতঙ্কে রয়েছেন। কেউ কেউ আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।

mzamin

আরব বসন্তের ‘আঁতুড়ঘর’ তিউনিসিয়ায় গণতন্ত্রের দুর্দশা

বিরোধীদের ধরপাকড় ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগের মধ্যেই গত রোববার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হলো তিউনিসিয়ায়। উল্লেখ করার মতো কোনো নির্বাচনী প্রচার ও বিতর্ক ছাড়াই প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ টানা দ্বিতীয় মেয়াদে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন। ২০১১ সালের আরব বসন্তের আঁতুড়ঘর হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তিউনিসিয়া যে কৃতিত্বের দাবি করে আসছিল, এবারের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেখা গেছে, সেই অবস্থান থেকে অনেকটা পেছনে সরে গেছে দেশটি।

তিউনিসিয়ার ভোটারের সংখ্যা ৯০ লাখ। গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে দেশটির মাত্র ১১ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ভোটার উপস্থিতি ছিল কম, মাত্র ২৯ শতাংশ ভোট পড়েছে এ নির্বাচনে। যে ভোট পড়েছে, তার ৯০ দশমিক ৬৯ শতাংশ ভোট পেয়ে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন কাইস সাইদ।

ভোট পড়ার হার এত কম হওয়ায় এটা স্পষ্ট, কাইস সাইদের প্রতি দেশটির মানুষের আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কাইস সাইদ। এর পর থেকে তিনি নিজের ইচ্ছামতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করছেন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাঁর সরকারের হস্তক্ষেপ দিন দিন বাড়ছে।

নথিপত্র নেই, এমন কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ধরপাকড় শুরুর নির্দেশ দেন কাইস সাইদ। তাঁর এ নির্দেশ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। কিন্ত এরপরও অবৈধভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আসা ঠেকাতে তিউনিসিয়ার সঙ্গে ১০ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ডের একটি চুক্তি করেছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।

বিভিন্ন পথ দিয়ে তিউনিসিয়ায় আসেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঠেকাতে কাজ করে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিশেষায়িত শাখা। বিশেষায়িত ওই শাখার বিরুদ্ধে নারী অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ওপর যৌন সহিংসতার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি গার্ডিয়ানের অনুসন্ধানে এর প্রমাণও পাওয়া গেছে। কিন্তু এমন অভিযোগের পরও চুক্তির বিনিময়ে ইইউর কাছ থেকে পাওয়া অর্থ এই বাহিনীকে বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তিউনিসিয়ার এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী ছিলেন ১৭ জন। কিন্তু নির্বাচনের আগে ১৪ জন প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করে দেশটির ইনডিপেনডেন্ট হাই অথরিটি ফর ইলেকশনস (আইএসআইই)। নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার ক্ষেত্রে যেসব কারণের কথা বলা হয়েছিল, সেগুলো নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শেষ পর্যন্ত যে তিনজন প্রার্থী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন দেশটির সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য আয়াচি জামমেল। ভোটের মাত্র ৫ দিন আগে নথি জালিয়াতির মামলায় তাঁকে ১২ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন দেশটির আদালত। কারাবন্দী এই প্রার্থীই প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, পেয়েছেন ৭ শতাংশ ভোট।

এ নির্বাচনে কোনো প্রচার, মিছিল, বিতর্ক হয়নি। রাস্তায় যেসব পোস্টার সাঁটানো হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবই ছিল প্রেসিডেন্টের পক্ষের।

মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক উপপরিচালক বাসাম খাজা গার্ডিয়ানকে বলেন, তিউনিসিয়ায় এবারের নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হয়েছে গত ১৪ জুলাই। এর পর থেকে দেশটিতে অন্তত ৯ জন সম্ভাব্য (প্রেসিডেন্ট) প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা, সাজা নয়তো গ্রেপ্তার করার ঘটনা ঘটেছে।

গত মাসের শেষ দিকে তিউনিসিয়ার পার্লামেন্টে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় একটি প্রস্তাব পাস হয়। তাতে নির্বাচন কমিশনের কোনো সিদ্ধান্ত দেশটির আদালত পাল্টে দেওয়ার যে অধিকার পেতেন, তা কেড়ে নেওয়া হয়। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনজন প্রার্থীকে অযোগ্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, তা বাতিল করে দেন আদালত। এরপরই মূলত কাইস সাইদের দল পার্লামেন্টে ওই প্রস্তাব তুলেছিল।

নির্বাচনের আগে আগে পার্লামেন্টে পাস হওয়া এ বিধানসহ সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে নিজেকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলেন কাইস সাইদ। রোববারের নির্বাচনে জয়ী হয়ে এখন তিনি আরও পাঁচ বছরের জন্য দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কর্মসূচির একজন জ্যেষ্ঠ ফেলো সারাহ ইয়েরকেস গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘তিউনিসিয়ার এবারের নির্বাচন প্রায় নিশ্চিতভাবেই আরব বিশ্বের একমাত্র গণতান্ত্রিক (শাসনব্যবস্থার) দেশটির গতিপথ যে তলানিতে গিয়ে ঠেকবে, তারই নজির হতে যাচ্ছে।’

২০১১ সালে গণবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন তিউনিসিয়ার দীর্ঘদিনের শাসক বেন আলী। তিউনিসিয়া থেকে সেই বিক্ষোভ পুরো আরব বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, যা আরব বসন্ত নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। এরপর অঞ্চলটিতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিউনিসিয়াকে সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হতে থাকে। পরপর দুটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটির সেই সুনাম আরও বেড়েছিল।

সবশেষ ২০১৯ সালে তিউনিসিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছে। সেবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন কাইস সাইদ। ২০১১ সালের পর থেকে দেশটির সরকারে ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে পরিচিত দুটি অংশের মতপার্থক্যের কারণে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারণায় আরও শক্তিশালী একটি সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন কাইস সাইদ। রাজনৈতিকভাবে অখ্যাত হলেও গত নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন কাইস সাইদ। গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপে ৭৩ শতাংশ ও দ্বিতীয় ধাপে ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার দুই বছরের মাথায় ২০২১ সালে বিরোধী নিয়ন্ত্রিত পার্লামেন্ট ভেঙে দেন এবং প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন কাইস সাইদ। এরপর ২০২২ সালে গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রবর্তন করা হয় একক সরকারব্যবস্থা। এর মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদের হাতে চলে যায় নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। কাইস সাইদ ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাচন কমিশনের সাতজন সদস্যকে প্রেসিডেন্টের ডিক্রি জারির মাধ্যমে নিয়োগ ও বরখাস্ত করার ক্ষমতা নিজের কাছে নিয়ে নেন।

কাইস সাইদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রধান বিরোধী দল এন্নাহদার এক ডজনের বেশি শীর্ষস্থানীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার এসব নেতার মধ্যে দেশটির সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য সাইদ ফেরজানিও আছেন। ২০১১ সালে ক্ষমতাচ্যুত বেন আলীর সময়েও তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া দেশটির প্রধান বিরোধী দলের অনেক নেতা এখন বন্দী।

এ প্রসঙ্গে এইচআরডব্লিউর বাসাম খাজা গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘(বিরোধী নেতাদের) এ ধরনের নিপীড়ন ও ধরপাকড়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করার অর্থ হলো তিউনিসিয়ার মানুষের সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের যে অধিকার, তা নিয়ে মশকরা করা।’

কাইস সাইদ আবার প্রেসিডেন্ট হওয়ায় তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা আরও অধঃপতনের মুখে পড়বে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সারাহ ইয়েরকেস গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ব্যবহার করে তিউনিসিয়ার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ফেরার পথে কফিনে আরও একটি পেরেক ঠুকে দিয়েছেন কাইস। আর এটা তিনি করেছেন নির্বাচনের বহু আগেই।’

নির্বাচনে জয়ের পর রাজধানী তিউনিসে সমর্থকদের সঙ্গে বিজয় উদ্‌যাপন করছেন প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ
নির্বাচনে জয়ের পর রাজধানী তিউনিসে সমর্থকদের সঙ্গে বিজয় উদ্‌যাপন করছেন প্রেসিডেন্ট কাইস সাইদ ছবি: এএফপি

‘ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে গাজার যোদ্ধারা’

ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠবে। সংগঠনটি আবারও অস্ত্র ও সৈনিক সংগ্রহ শুরু করেছে। সংগঠনটির স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা নেতা খালেদ মেশাল রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন।

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস গত বছরের ৭ অক্টোবর আকস্মিক ইসরায়েলে হামলা করে তাণ্ডব চালায়। নজিরবিহীন এ হামলায় গোষ্ঠীটির যোদ্ধারা প্রায় ১২০০ ইসরায়েলিকে হত্যা এবং আড়াই শতাধিক ব্যক্তিকে জিম্মি করে। সেসব জিম্মিকে আন্তর্জাতিক আহ্বান সত্ত্বেও মুক্তি না দেয়নি। এদিকে এর জেরে ইসরায়েলি বাহিনীর হামাসবিরোধী অভিযানে ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ওই সময় থেকে একের পর এক ফাঁকা বুলি আওরালেও ইসরায়েলি বাহিনীর গতিরোধ করে বেসামরিক নাগরিকদের বাঁচাতে পারেনি সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। তা সত্ত্বেও সংগঠনটি কখনো বিবৃতি বা নেতারা ব্যক্তিগতভাবে হুংকার দিয়ে যাচ্ছেন।

মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে খালেদ মেশাল বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের চলমান যুদ্ধ ৭৬ বছর আগে শুরু হওয়া সংঘাতের বৃহত্তর অংশ। ইতিহাস চক্রাকার। আমরা এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাই, যেখানে অনেকে শহীদ হন। সামরিক সক্ষমতার কিছুটা হারাই। কিন্তু তারপর ফিনিক্সের মতো ফিলিস্তিনি চেতনা আবার জেগে ওঠে। এ জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা।

রয়টার্সের প্রশ্নে এ নেতা হামাসের গতানুগতিক বুলি ছুড়েন। তিনি বলেন, হামাস এখনো ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে অতর্কিত হামলা চালাতে সক্ষম। যোদ্ধারা গোলাবারুদ ও অস্ত্রশস্ত্রের কিছু অংশ হারিয়েছে। কিন্তু হামাস এখনো তরুণদের নিয়োগ দিচ্ছে। তারা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গোলাবারুদ ও অস্ত্র তৈরি অব্যাহত রেখেছে।

কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে কীভাবে তারা আবার প্রতিরোধের প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে; তার স্পষ্ট বিবরণ দিতে ব্যর্থ হন খালেদ।

প্রসঙ্গত, নির্বিচার বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালিয়ে গাজা উপত্যকাকে যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে ইসরায়েল। এ পর্যন্ত ৪১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে তারা। যাদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। অভিযান চালিয়ে হামাসের হাজারো যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করেছে তারা। পাশাপাশি তাদের সুড়ঙ্গের বিশাল নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের অতর্কিত হামলায় লাভবান আসলে কারা এবং এক বছর পর বাস্তবে হামাসকে কতটা নির্মূল করা গেল? 

হামাস নেতা খালেদ মেশাল। ছবি : রয়টার্স
হামাস নেতা খালেদ মেশাল। ছবি : রয়টার্স

এবার লেবাননের দক্ষিণ–পশ্চিমে স্থল হামলা ইসরায়েলের

লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের স্থল হামলার পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লেবাননের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলেও স্থল হামলা শুরু করেছেন তাদের সেনারা। বিগত কয়েক দিনে দেশটিতে নতুন করে সেনা পাঠানোর পর স্থল হামলার পরিসর বাড়ানোর এ ঘোষণা দিল ইসরায়েল।

গাজা যুদ্ধ শুরুর পর গত এক বছরের বেশি সময় ধরে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের আন্তসীমান্ত সংঘাত চলছিল। গত মাসের মাঝামাঝি দেশটিতে বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। গত ২৭ সেপ্টেম্বর লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হন হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ।

হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হওয়ার তিন দিন পর ৩০ সেপ্টেম্বর দেশটির দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে ঢুকে ইসরায়েলি সেনারা স্থল হামলা শুরু করেন। বিমান হামলার পাশাপাশি এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে লেবাননের দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে ইসরায়েলি সেনাদের সম্মুখ লড়াই চলছিল।

গতকাল ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, লেবাননের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলেও স্থল ‘অভিযান’ শুরু করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ১৪৬তম ডিভিশন। তবে বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সীমিত পরিসরে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় হিজবুল্লাহর অবস্থান ও স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে।

লেবাননে এখন পর্যন্ত কতজন সেনা পাঠানো হয়েছে, সেই হিসাব জানায়নি ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। তবে টাইমস অব ইসরায়েল–এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ দিনে লেবাননে ১৫ হাজারের বেশি সেনা পাঠিয়েছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর ১৪৬তম ডিভিশন একটি রিজার্ভ ডিভিশন। এর আগে অবরুদ্ধ গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ‘অভিযানে’ এই ডিভিশনের সেনাদের মোতায়েন করেছিল ইসরায়েল।

দুই সপ্তাহ ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলার মুখে গতকাল হিজবুল্লাহর উপপ্রধান নাইম কাসেম বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে সমর্থন রয়েছে হিজবুল্লাহর। টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে নাইম কাসেম বলেন, ‘লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি যুদ্ধবিরতির জন্য যে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন, তাতে আমাদের (হিজবুল্লাহর) সমর্থন রয়েছে।’

ইসরায়েলে আবার হামলা

গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের মতো ইসরায়েলের তৃতীয় বৃহত্তম শহর হাইফা ও এর আশপাশের এলাকায় রকেট হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। গোষ্ঠীটি গতকাল এক বিবৃতিতে জানায়, উত্তর ইসরায়েলের শহরটি লক্ষ্য করে প্রায় ১০০ রকেট ছুড়েছে তারা।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লেবানন থেকে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ছোড়া অন্তত ৮৫টি রকেট শনাক্ত করেছে তারা। এর মধ্যে কিছু রকেট প্রতিহত করে তারা। তবে কতটি রকেট ইসরায়েলের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে, এ বিষয়ে কিছু জানায়নি।

এর আগে গত সোমবার হাইফাসহ ইসরায়েলের বেশ কয়েকটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। সেদিন একযোগে গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাস, গাজার আরেক প্রতিরোধ সংগঠন ইসলামিক জিহাদ ও ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলের বিভিন্ন শহরে হামলা চালায়।

লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি ট্যাংক
লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি ট্যাংক। ফাইল ছবি: এএফপি

গাজার ৭৫ ভাগ ভবন ধ্বংসস্তূপ, জিম্মিদের জীবন ইসরাইলের ওপর নির্ভর করে

ইসরাইলি বিমানবাহিনীর মুহুর্মুহু বিমান হামলা। আর্টিলারি শেল নিক্ষেপ। বাড়িঘরকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। তার নিচে চাপা পড়ে কত মানুষ নিহত হয়েছেন তার সঠিক হিসাব কারো কাছে নেই। সব মিলিয়ে গাজা এখন যেন কোনো জনপদ নয়- পুরোপুরি একটি মৃত্যুপুরী। চারদিকে বিধ্বস্ত ভবন। কংক্রিট পাহাড়সমান স্তূপ। আকস্মিকভাবে কেউ দেখছে ভেবে বসতে পারেন কয়েক হাজার বছর আগের কোনো পরিত্যক্ত শহরের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু না। তার মধ্যেই কোনো রকমে জীবন বাজি রেখে বেঁচে আছেন পোড় খাওয়া গাজাবাসী।

গত এক বছরে ইসরাইলের নৃশংস হামলায় গাজার অবকাঠামোর শতকরা ৭৫ ভাগই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড এখন এক অচেনা রূপ ধারণ করেছে। এরপরও বিশ্ববাসীর চোখের সামনে গাজা, পশ্চিমতীর এবং লেবাননে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। শুধু সোমবার গাজা উপত্যকায় তারা কমপক্ষে ৭৭ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। হামাস প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা যুদ্ধের বদলা নেবে। এর পর থেকেই হামলা জোরালো করেছে ইসরাইল।

ওদিকে ইসরাইলের বন্দরনগরী হাইফা এবং তেল আবিবে সামরিক ঘাঁটির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে লেবাননের যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। তবে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর সদর দফতরে হামলা করার দাবি করেছে ইসরাইল। তারা লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষকে সরে যাওয়ার নতুন নির্দেশ দিয়েছে। গত বছর ৭ই অক্টোবর থেকে ইসরাইলের হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত কমপক্ষে ৪১,৯০৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় এক লাখ। পক্ষান্তরে ইসরাইলে হামাসের হামলায় নিহত হয়েছে ১১৩৯ ইসরাইলি। হামাস জিম্মি করে প্রায় আড়াইশ মানুষকে। তার মধ্যে অনেককে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। কিছু মানুষ মারা গেছেন। এখনও প্রায় একশত জিম্মি আছে তাদের হাতে। গাজা যুদ্ধের প্রথম বার্ষিকীতে এ যুদ্ধের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করলে বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে নিউ ইয়র্ক পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

ফিলিস্তিনপন্থি এই বিক্ষোভ করেন তারা ম্যানহাটানে সোমবার দিনের শেষের দিকে রাতে। কয়েক হাজার মানুষ এতে অংশ নেন। তারা গাজা যুদ্ধবিরতির দাবি করতে থাকেন। ইসরাইলকে অস্ত্র দেয়া বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা যায় টাইমস স্কয়ারে বিক্ষোভে অংশ নেয়া ব্যক্তিদের পিছনে সরে যেতে বাধ্য করছে পুলিশ। দিনের শুরুর দিকে কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন কয়েক শত ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারী।

ওদিকে হামাসের সামরিক শাখার মুখপাত্র আবু ওবেইদা যুদ্ধের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এক বিবৃতিতে বলেছেন, তাদের হাতে থাকা জিম্মিদের পরিণতি নির্ভর করছে ইসরাইলের হাতে। দীর্ঘ মেয়াদে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে হামাস। তিনি বলেন, জিম্মিদের বিষয়ে আমরা বলছি- দখলদার এবং জিম্মিদের পরিবারকে বলছি- এক বছর আগেই সব জিম্মিকে আপনারা জীবিত অবস্থায় মুক্ত করে নিতে পারতেন। কিন্তু জিম্মিদের জীবন এবং তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে সবসময় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর উচ্চাকাঙ্ক্ষা কাজ করেছে। প্রথম দিন থেকেই আমরা জিম্মিদেরকে একটি নিরাপদ স্থানে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ, আমাদের ধর্ম এবং মানবতার আইন অনুসরণ করি আমরা। বন্দিবিনিময়ের জন্য তাদেরকে আমরা নিরাপদ স্থানে রেখেছি।
সোমবার গাজা উপত্যকার উত্তরে লড়াইয়ে নিহত হয়েছে ইসরাইলের ২০ বছর বয়সী এক সেনা সদস্য। এ কথা জানিয়েছে ইসরাইলি পাবলিক ব্রডকাস্টিং করপোরেশন।

তাদের তথ্যমতে, গত বছর ৭্ই অক্টোবর থেকে ইসরাইলি ৭২৯ সেনা সদস্য ও ৬৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইলি বাহিনী গাজা ও পশ্চিমতীর থেকে মোট ১০৮ জন সাংবাদিককে আটক করেছে বলে দাবি করেছে ফিলিস্তিনি অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো। প্রিজনার সাপোর্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস এসোসিয়েশন- যা আদামির নামে পরিচিত, তারা বলেছে, এখনও পর্যন্ত কমপক্ষে ৫৮ জন সাংবাদিক ইসরাইলি কারাগারে রয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন নারী সাংবাদিক। কমপক্ষে ১৬ জন সাংবাদিককে প্রশাসনিক ডিটেনশনে রাখা হয়েছে।
mzamin

প্রেসিডেন্ট পদের পর মেয়রপ্রার্থী রড্রিগো দুতের্তে

রড্রিগো দুতের্তে। ছিলেন মেয়র। তারপর ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট। আবার তিনি ডাভাও শহরে  মেয়র নির্বাচন করছেন। ৭৯ বছর বয়সী এই রাজনীতিক ওই শহরে টানা দুই দশক মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু আগামী বছর সেখানে যে মেয়র নির্বাচন হবে তাতে এরই মধ্যে তিনি প্রার্থিতা নিশ্চিত করেছেন। অর্থাৎ দক্ষিণের মিন্দানাও দ্বীপের ডাভাও শহরের মেয়র নির্বাচনের জন্য সোমবার নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এই শহরে বর্তমান মেয়র তার ছেলে সেবাস্তিয়ান দুতের্তে। নির্বাচনে  সেবাস্তিয়ান হবেন পিতার রানিংমেট। ডাভাও শহর দুতের্তে পরিবারের শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু রড্রিগো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছেন। এর ফলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তদন্তের দাবি ওঠে। বর্তমানে দেশটিতে দুতের্তের মেয়ে সারা দুতের্তে হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। সোমবার মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে রড্রিগো দুতের্তে বলেছেন, আমি আপনাদের সেবা করতে চাই। তিনি আরও বলেছেন, আগের চেয়ে ডাভাওকে তিনি আরও সুন্দরভাবে চালাতে চান। কিন্তু একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট তিনি কেন মেয়র নির্বাচন করবেন! এর কারণ হলো ফিলিপাইনে আগামী ২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। সেই নির্বাচনে তিনি মেয়ে সারা দুতের্তেকে প্রার্থী করতে চান। তাই তাকে সমর্থন দিতে তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন। ওই নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। কারণ, সেখানে প্রেসিডেন্ট পদে এক মেয়াদের বেশি নির্বাচন করার বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আছে।  তবে মার্কোস জুনিয়রের কাজিন মার্টিন রোমুয়ালদেজ বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার। তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাই ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ের নির্বাচনকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই দুই পরিবারের জন্য একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ওদিকে রড্রিগো দুতের্তের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। এই তদন্ত বর্তমান প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়রের অধীনে অব্যাহত আছে। এ ছাড়া মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে শুনানি করছে প্রতিনিধি পরিষদের কমিটি। দুতের্তের ক্ষমতার সময়ে ফিলিপাইনে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে পুলিশ বাহিনী কমপক্ষে ৬ হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। তবে আইসিসি প্রসিকিউটরদের হিসাবে এই সংখ্যা ১২ হাজার থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাননি রড্রিগো দুতের্তে।
mzamin

সরকারি খাতেই ৫ লাখ চাকরির সুযোগ by পিয়াস সরকার

বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের তোড়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা। এই আন্দোলনের শুরুটা ছিল সরকারি চাকরিপ্রত্যাশীদের। তারা  মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরির দাবি তুলে আন্দোলনে নেমেছিলেন। সেই আন্দোলনের জেরে সরকারের পতন হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সমর্থনেই নতুন সরকার গঠন হয়েছে। কিন্তু তাদের কাঙ্ক্ষিত চাকরির বিষয়ে স্থবিরতা কাটেনি এখনো। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অন্তত ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে এই মুহূর্তে। এই পদ পূরণ হলে চাকরি প্রত্যাশীদের বড় অংশের কর্মসংস্থান হতে পারে। এই পদ পূরণে নিয়োগ সংক্রান্ত একটি কমিশন করে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ বেসামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে ৫ লাখ ৩ হাজার ৩৩৩টি পদ খালি। বিপুল পরিমাণ এই শূন্যপদ থাকলেও অনুষ্ঠিত হচ্ছে না চাকরি পরীক্ষা। আবার আগে অনুষ্ঠিত হওয়া চাকরি পরীক্ষাও সম্পন্ন হচ্ছে না।

গত আমলের সরকারি চাকরির পরীক্ষায় ছিল ব্যাপক অনিয়ম। এছাড়াও ছিল পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) বিসিএস’র প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ। আটকে আছে তিনটি বিসিএসসহ একাধিক নন-ক্যাডারের নিয়োগ কার্যক্রম। হচ্ছে না পদোন্নতির পরীক্ষাও। আন্দোলনের সময় স্থগিত করা হয় ৪৪তম বিসিএস’র মৌখিক পরীক্ষা। পরবর্তীতে ৪৬তম বিসিএস’র লিখিত পরীক্ষাও স্থগিত হয়। ১৪ই সেপ্টেম্বর ক্যাডারভুক্ত ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের অর্ধবার্ষিক বিভাগীয় পরীক্ষা স্থগিত হয়। আর দীর্ঘদিন ধরে ৪৫তম বিসিএস’র লিখিত পরীক্ষার ফলও আটকে আছে।

৪৬তম বিসিএস’র প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ১০ হাজার ৬৩৮ জন প্রার্থী। এসব প্রার্থীই লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেবেন। এই বিসিএস’র মাধ্যমে ৩ হাজার ১৪০ জন ক্যাডারে নিয়োগ দেয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া ৪৪তম বিসিএস-এ বিভিন্ন ক্যাডারে ১ হাজার ৭১০ জন কর্মকর্তা নেয়া হবে। ৪৫তম বিসিএস’র মাধ্যমে ২ হাজার ৩০৯ জন কর্মকর্তা ও নন-ক্যাডারে নেয়া হবে ১ হাজার ২২ জন। জনপ্রশাসনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে ৩ লাখ ৫৮ হাজার ১২৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এগুলোর মধ্যে প্রথম শ্রেণির পদ ৪৩ হাজার ৩৩৬টি এবং দ্বিতীয় শ্রেণির ৪০ হাজার ৫৬১টি। বাকিগুলো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে নিয়োগের সুপারিশ করে পিএসসি।

২০২৩ সালের জুনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলীর ৬৫৬টি পদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়। এখনো হয়নি পরীক্ষা। ২০১৯ সালে বিজ্ঞপ্তি হওয়া কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শন (সেফটি) ৪১টি পদের পরীক্ষা হয়নি। জটিলতায় ভেস্তে যাওয়া সেই প্রজ্ঞাপন পুনরায় প্রকাশ করে পিএসসি গতবছরের জুনে। এরপরও পরীক্ষা নিতে পারেনি পিএসসি। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে হওয়া বাংলাদেশ রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলীর চাহিদা ছিল ৫১৬ জনের। ২০২৩ সালে হয় পুনঃবিজ্ঞপ্তি। গত জুলাইয়ে রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই পরীক্ষায় চাউর হয় প্রশ্ন ফাঁসের। এতে পিএসসি’র সাবেক বর্তমান ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। এছাড়াও জনপ্রশাসন থেকে গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, শিক্ষা প্রকৌশল, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে চাহিদাপত্র দেয়ার পরও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে পারেনি পিএসসি। আবার পরীক্ষার তারিখ ঘোষণার পর স্থগিত রয়েছে পেট্রোবাংলার লিখিত পরীক্ষা, সাধারণ বীমা করপোরেশনের এমসিকিউ পরীক্ষা স্থগিত করেছে, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সাঁটমুদ্রাক্ষরিক-কাম-কম্পিউটার অপারেটর এবং কম্পিউটার অপারেটর পদের লিখিত পরীক্ষা, শ্রম অধিদপ্তরের মৌখিক পরীক্ষা, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, বাংলাদেশ পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্মচারী নিয়োগ, মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের জুনিয়র অফিসার, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাক-নির্বাচনী পরীক্ষা এবং লিখিত পরীক্ষা।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেই হয় রদবদল। কিন্তু অদৃশ্য কারণে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পিএসসি’তে লাগেনি এর আঁচ। এমনকি পিএসসি হাত গুটিয়ে বসে থাকার পরও। পিএসসি নিয়ে সোচ্চার হয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম। গত শনিবার তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন- এ সপ্তাহের মধ্যে পিএসসি সংস্কার করে চাকরিপ্রত্যাশীদের চাকরির পরীক্ষাগুলো শুরু করতে হবে। যে তরুণ প্রজন্ম এই অভ্যুত্থানের অগ্রনায়ক তাদের প্রায়োরিটির কথা ভুলে গেলে চলবে না। গত সোমবারও চাকরিপ্রত্যাশীরা পিএসসি অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেন। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় রাত আটটার দিকে বের হন তারা। এরপর গতকাল পুরো কমিশনসহ পদত্যাগ করেন পিএসসি চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের তোড়ে নতুন করে সেজে উঠছে বাংলাদেশ। কিন্তু আন্দোলনের শুরুটাই হয় সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে। কিন্তু নতুন করে সংস্কারের ব্যাপক উদ্যোগ নেয়া হলেও চাকরিপ্রত্যাশীদের দাবিই বাদ পড়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণের দু’মাস পেরিয়ে গেলেও নেয়া হয়নি চাকরির জন্য কোনো ব্যবস্থা। এতে হতাশ হয়ে পড়েছেন চাকরিপ্রত্যাশীরা।

আন্দোলনে শুরু থেকেই সক্রিয় কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী আসিফ ইসলাম বলেন, আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমাদের কাছে একটা সরকারি চাকরি পাওয়া মানে সোনার হরিণ পাওয়া। এজন্য দিনরাত এক করে প্রস্তুতি নিচ্ছি। বৈষম্যমুুক্তভাবে চাকরিতে প্রবেশের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলন করলাম। কিন্তু সব সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, সব সচল হচ্ছে কিন্তু চাকরি পরীক্ষা আর সচল হয় না। তিনি বলেন, এসব পরীক্ষার আয়োজন হওয়া উচিত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম কাজ। পিএসসি কিছুই করছে না সেদিকে কোনো নজরই নেই সরকারের।

ক্ষোভ প্রকাশ করে চাকরিপ্রত্যাশী তোফায়েল হোসেন বলেন, শুধু প্রস্তুতিই নিয়ে যাচ্ছি। কবে পরীক্ষা হবে না হবে কিছুই জানি না। আমরা তো আন্দোলন করেছি মেধার মূল্যায়নের জন্য। কিন্তু মূল্যায়নের স্থানটাই পাচ্ছি না। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধানের কাছে আবেদন করে বলেন, শুধুমাত্র স্থগিত হওয়া পরীক্ষা নেয়ার জন্য একটা কমিশন গঠন করুন। পরবর্তীতে পিএসসি নতুন করে সাজিয়ে তুলুন কিন্তু জরুরি ভিত্তিতে এই পরীক্ষাগুলো নেয়া ও পদায়নের ব্যবস্থা করুন।

এদিকে নিয়োগের তিন বছর পর শূন্যপদের তালাশ করছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)।  বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি) অনলাইনে ই-রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে তথ্য চাইছে। প্রায় ৫০ হাজারের অধিক শূন্য পদ রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু নিয়োগে ধীরগতি ও হয়রানির সদর দপ্তরে পরিণত হওয়া এনটিআরসিএ কয়েক বছর ধরেই ঝুলিয়ে রেখেছেন এসব চাকরিপ্রত্যাশীদের। সদিচ্ছার অভাবে নিয়োগ পাচ্ছেন না তারা। আর নিয়মিত করে যেতে হচ্ছে আন্দোলন। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর নতুন করে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ পদে। ৬ষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে চাকরিপ্রত্যাশী আহসানুল কবির বলেন, দ্রুততার সঙ্গে হয়রানিমুক্তভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানটির। এটা নতুন বাংলাদেশ নতুন করে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা পরিচালনা করা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, শিক্ষার্থীদের বুকের তাজা রক্তে নতুন বাংলাদেশ হয়েছে। তাদের দাবি ছিল বৈষম্য দূর করা। কিন্তু তাদের পরীক্ষাগুলো স্থগিত হয়ে আছে। এই পরীক্ষাগুলো আয়োজনের জন্য আশু পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন সরকারের। পিএসসি দ্রুত সময়ের মধ্যে পিএসসি’র চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন। এটা বিলম্বিত হলে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রয়োজনে স্থগিত পরীক্ষা আয়োজনে স্বল্প সময়ের জন্য একটা কমিশনও গঠন করা যেতে পারে।

mzamin

চোখে বুলেটবিদ্ধ আবেদের পরিবারকে কে দেখবে? by জাভেদ ইকবাল

১৯শে জুলাই বৃহস্পতিবার। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে উত্তাল রংপুর। দফায় দফায় ছাত্র-জনতার সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছিল নগরীতে। সুপার মার্কেটে নিয়মিত মাস্ক বিক্রি করে সংসার চালানো আবেদ সেদিনও বেরিয়েছেন, তবে সেদিন শুধু মাস্ক বিক্রির উদ্দেশ্যে নয়, আবেদ বেরিয়েছেন ছাত্রদের পাশে দাঁড়াতেও। সেদিন ছাত্রদের বিক্ষোভ-স্লোগানের সঙ্গে মিশেছিল তারও প্রতিবাদী চিৎকার। হঠাৎ বিক্ষোভে পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। বেশ কয়েকটি রাবার বুলেট লাগে আবেদের শরীরে। তারই একটি আঘাত করে চোখে। তাকে নেয়া হয় হাসপাতালে। সেদিন থেকেই আবেদের চোখে পৃথিবীর একটিই রং, সেটি কালো।

রংপুর নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার আবেদুল ইসলাম আবেদ লুঙ্গি-গেঞ্জি ও কালো চশমা চোখে বসে আছেন তার জীর্ণ-শীর্ণ বাড়ির উঠানে। পাশে বসে স্ত্রী মৌসুমী বেগম। উঠানে খেলা করছে আবেদের দেড় বছরের শিশু। কিন্তু এর কিছুই দেখতে পারছেন না আবেদ।  বৃদ্ধ বাবা-মাসহ ৫ জনের সংসার আবেদের। আবেদ জানান, ১৯শে জুলাই নগরীর সুপার মার্কেটের সামনে মাস্ক বিক্রি করছিলেন তিনি। বিকালে ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ মিছিল নিয়ে আসলে সিটি করপোরেশনের সামনে পুলিশ বাধা দেয় এবং ছাত্রদের ওপর গুলি ছোড়ে। শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা দেখে অন্যদের মতো আবেদও ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান। এতে তার শরীরে ও চোখে রাবার বুলেট লাগে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আবেদের শরীরের রাবার বুলেট অপসারণ করা হলেও চোখের আলো ফেরানো সম্ভব হয়নি। গত ২১শে জুলাই চিকিৎসকের পরামর্শে ঋণ করে পরিবারের সদস্যরা জাতীয় চক্ষু হাসপাতালে আবেদকে ভর্তি করে। দু’দিন চিকিৎসা করে দৃষ্টিশক্তি না ফেরায় ঢাকার ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২৪শে জুলাই পর্যন্ত তার চিকিৎসা চলে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন আবেদ চিরতরে অন্ধ হয়ে গেছে। তবে কর্নিয়া স্থাপন করা গেলে তার দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসতে পারে। এতে প্রয়োজন বিপুল অঙ্কের টাকা। একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি দৃষ্টি হারানোয় আবেদের পরিবার দিশাহারা হয়ে পড়েন। তার ওপর ঋণ করে আবেদের চিকিৎসা করানোয় পাওনাদাররা টাকার জন্য প্রতিদিন চাপ দিচ্ছে।

ভুক্তভোগী আবেদ বলেন, কতোদিন হলো আমার শিশু সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মা’র মুখ দেখি না। আর তাদের মুখ দেখতে পারবো কিনা, এটি ভেবে খুবই খারাপ লাগে। স্ত্রী মৌসুমী বেগম বলেন, আমার স্বামীর উপার্জন দিয়ে সংসার চলতো। এখন বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি, আমার সন্তান ও আমাকে কে দেখবে। বাবা নুরুল হক বলেন, ঢাকায় ডাক্তাররা বলছে কর্নিয়া যদি স্থাপন করা যায় তবে আবেদ চোখে দেখতে পারবে। সেজন্য অনেক টাকা লাগবে। আমি সেই টাকা কোথায় পাবো। গায়ে তো শক্তি নাই যে কাজ করে টাকা যোগাড় করবো। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি তারা যেন আমার ছেলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে এই সংসারের ৫ জনকে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে সহযোগিতা করে। মা রবেদুন নেছা বলেন, আমাদের বাড়ির ভিটা ছাড়া আর কোনো সম্পদ নাই। আবেদের চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা খরচ হয়েছে। সরকার আমাদের দিকে যেন দৃষ্টি দেয়।

mzamin

জল্পনা: ভূমিকম্প না ইরানের পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা!

৫ই অক্টোবর। ইরানের সেমনান প্রদেশ। সেখানে ৪.৫ মাত্রার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। এই ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন ইসরাইলের সঙ্গে উত্তেজনাকর এক অবস্থার মুখোমুখি দেশটি। এমন সময় এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার নিচে এবং ইরানের একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি। ফলে পশ্চিমা মিডিয়ায় নতুন এক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, ইরান প্রথমবার তার পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে। তার কারণে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইরানের কোনো সুস্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন সংবাদ সূত্রকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন হিন্দুস্তান টাইমস।

এতে বলা হয়, ভূমিকম্পের সময় এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ইরানের কোনো কর্মকর্তাও বিষয়টি নিশ্চিত বা প্রত্যাখ্যান করেননি। তবে কিছু মানুষ মানচিত্র এবং গ্রাফ শেয়ার করে ব্যাখ্যা করেছেন, কেন এটা পারমাণবিক বোমা হতে পারে।

একজন বলেছেন, ওই কম্পন হতে পারে মাটির নিচে টেস্ট সাইটে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা থেকে। অথবা প্রচলিত অস্ত্র দিয়ে ইরান ভুয়া পারমাণবিক পরীক্ষা চালিয়েছে। অন্য একজন লিখেছেন, ৪.৫ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে ইরানে। গুজব ছড়িয়ে পড়েছে যে, এটা পারমাণবিক পরীক্ষা। ২০১৩ সালে উত্তর কোরিয়ায় একটি ভূমিকম্পকে পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়েছিল। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ইরানে যে ভূমিকম্প হয়েছিল সেটাকেও পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা হিসেবে মনে করা হয়। সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন রকম সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে সক্ষম ইরান। বাস্তবতা কি?

এতে আরও বলা হয়, পশ্চিমারা কয়েক দশক ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি শুরু করেছে। ইরান-ইসরাইল চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে ইরানের এই কর্মসূচিকে অনেকটা পিছিয়ে দিতে বলা হয়।

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা কয়েক দশক ধরে চলমান। কিন্তু গত বছর ৭ই অক্টোবর হামাসের ইসরাইলে হামলার পর এই উত্তেজনা বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিশোধ নিতে সেই থেকে গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। এর মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি তারা। রোববার ইসরাইল বৈরুতে বোমা হামলা চালিয়েছে। একই দিন আলাদা আরেক হামলায় বৈরুতের দক্ষিণ-পূর্বে কামাতিয়ে শহরে কমপক্ষে ৬ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তিনটি শিশু।

mzamin

সাড়ে ৪ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি

বাজারে সরবরাহ ঘাটতির কারণে সম্প্রতি ডিমের দাম অনেক বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার ৭টি প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে ৪ কোটি ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে। এ ছাড়া বাজারে ডিমের দাম কমাতে ডিম আমদানির ওপরে থাকা শুল্ককর সাময়িকভাবে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন। গতকাল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে ডিম আমদানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। আর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের কাছে লেখা এক চিঠিতে ডিম আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ককর প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছে ট্যারিফ কমিশন।

এনবিআরের কাছে পাঠানো চিঠিতে ট্যারিফ কমিশন বলেছে, সম্প্রতি স্থানীয় বাজারে ডিমের সরবরাহে ঘাটতির কারণে এর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ডিমের এমন অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে পণ্যটি আমদানিতে সাময়িক সময়ের জন্য শুল্ককর প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

ট্যারিফ কমিশন জানায়, সম্প্রতি বাজারে ডিম ছাড়াও পিয়াজ, আলুসহ বেশকিছু অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম বাড়ে। এ অবস্থায় গত ২১শে আগস্ট পিয়াজ, আলু ও ডিম আমদানিতে শুল্ককর কমানোর বিষয়ে এনবিআরকে একটি প্রতিবেদন পাঠায় ট্যারিফ কমিশন। প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী গত ৪ই সেপ্টেম্বর আলু ও পিয়াজ আমদানিতে শুল্ক কমায় এনবিআর। এর ফলে স্থানীয় বাজারে এই দুটো পণ্যের দাম কিছুটা কমে স্থিতিশীল পর্যায়ে এসেছে। তবে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ডিম আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের বিষয়ে এনবিআর থেকে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করে ট্যারিফ কমিশন। সংস্থাটি জানায়, শর্তসাপেক্ষে আমদানিযোগ্য পণ্য হওয়ায় সরকারের অনুমতি ছাড়া ডিম আমদানি করা যায় না।

এখানে দেশের পোল্ট্র্রি শিল্পের সুরক্ষার বিবেচনা কাজ করে। তবে সুনির্দিষ্ট মেয়াদে ডিম আমদানিতে শুল্কছাড় দেয়া হলে তাতে পোল্ট্র্রি শিল্পের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদে শুল্ককর ছাড়ের ফলে সরকারের রাজস্ব ক্ষতিরও আশঙ্কা নেই। বর্তমান ডিম আমদানিতে মোট ৩৩ শতাংশ শুল্ককর রয়েছে বলে জানায় ট্যারিফ কমিশন। সংস্থাটি মনে করছে, এই শুল্ককর অব্যাহত রাখলে আমদানি করা ডিম স্থানীয় বাজারে দামের ক্ষেত্রে তেমন প্রভাব রাখবে না। ট্যারিফ কমিশন চিঠিতে বলেছে, এজন্য আমদানি পর্যায়ে ডিমের ওপরে থাকা শুল্ককর স্বল্প সময়ের জন্য প্রত্যাহার করা হলে সাধারণ জনগণ স্বস্তির জায়গা খুঁজে পাবে। এ অবস্থায় অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য হিসেবে স্বীকৃত ডিমের ওপর সুনির্দিষ্ট মেয়াদে শুল্ককর প্রত্যাহারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এনবিআর চেয়ারম্যানের কাছে পুনরায় অনুরোধ জানায় ট্যারিফ কমিশন।

এদিকে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ও বাজারদর স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে সাময়িকভাবে ও সীমিত সময়ের জন্য সাতটি প্রতিষ্ঠানকে ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। আগামী ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠান মোট সাড়ে চার কোটি ডিম আমদানি করতে পারবে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন পাঁচ কোটি ডিমের চাহিদা রয়েছে। অনুমতি পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঢাকার মিম এন্টারপ্রাইজ, হিমালয় ও যশোরের তাওসিন ট্রেডার্স এক কোটি করে ডিম আমদানি করতে পারবে। এ ছাড়া ঢাকার প্রাইম কেয়ার বাংলাদেশ ও জামান ট্রেডার্স ৫০ লাখ, রংপুরের আলিফ ট্রেডার্স ৩০ লাখ এবং সাতক্ষীরার সুমন ট্রেডার্স ২০ লাখ ডিম আমদানির অনুমতি পেয়েছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসেও একদফায় ডিম আমদানির অনুমতি দিয়েছিল সরকার।

এ দফায় ডিম আমদানি করার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত দেয়া হয়েছে। এর প্রথমটি হলো এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু-মুক্ত দেশ থেকে ডিম আমদানি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমদানি করা ডিমের প্রতিটি চালানের জন্য রপ্তানিকারক দেশের সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের দেয়া এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু ভাইরাস ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ামুক্ত সনদ দাখিল করতে হবে। তৃতীয়ত, ডিম আমদানির প্রতিটি চালানের কমপক্ষে ১৫ দিন আগে সংশ্লিষ্ট সঙ্গনিরোধ কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। চতুর্থত, আমদানির অনুমতি পাওয়ার পরে সাতদিন পর পর অগ্রগতি প্রতিবেদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে হবে।

mzamin

ওসমানী মেডিকেল কলেজ: দিদারের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ by ওয়েছ খছরু

সিলেট ওসমানী হাসপাতালে যেমনি দুর্নীতির শেকড় গেড়েছিলেন ব্রাদার সাদেক, তেমনি মেডিকেল কলেজে দুর্নীতিতে নাম এসেছে মাহমুদুর রশীদ দিদারের। তিনি হচ্ছেন পিএ টু প্রিন্সিপাল। পিএ হয়েও দাপটের সঙ্গে কলেজের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর থেকে তার দুর্নীতির কথা কলেজ ও হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মুখে মুখে রটছে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল ছিলেন  মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। তিনি পরবর্তীতে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাহীন দুর্নীতির ঘটনায় দুদকের মামলার আসামি হয়েছেন। সেই মোর্শেদ আহমদ চৌধুরীর সময় ২০১৮ সালে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ‘ব্লকপোস্ট’ ক্যাশিয়ার পদ থেকে পিএ টু প্রিন্সিপাল পদে পদোন্নতি নেন। কলেজের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দিদার যে পদে রয়েছে সেটি সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে নিতে হয়। কিন্তু তখনকার প্রিন্সিপাল নিয়ম লঙ্ঘন করে দিদারকে সে পদে পদায়ন করেন। অথচ এ পদের জন্য তারই সহকর্মী স্টেনোটাইপিস্ট অনুজের জন্য প্রাপ্য ছিল। কিন্তু অনুজকে ওই পদে নেয়া হয়নি। এ কারণে অনুজ ২০২৩ সালে ক্ষুব্ধ হয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি শিক্ষা বরাবর আবেদন করেছিলেন। তখন অনুজকে নানাভাবে হুমকি দেয়া হয়। বর্তমানেও চাপের মুখে রয়েছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান তিনি।  কোনো কথা বলতে রাজি হন না। তবে, অনুজের সেই অভিযোগটি শেষ মুহূর্তে ডিজি শিক্ষার কাছে তামাদি করে রাখা হয়েছে। এটি নিয়ে পরবর্তীতে কোনো কার্যক্রম চালানো হয়নি। কলেজের কয়েকজন কর্মচারী জানিয়েছেন, হাসপাতালে সীমাহীন দুর্নীতি হলেও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছেন দিদার। দুই বছর আগে সচিবের দায়িত্ব পাওয়ার পর ‘ডাবল ক্ষমতার’ অধিকারী এখন তিনি। এ কারণে তার বিরুদ্ধে কলেজের ভেতরের কেউ টু শব্দও করেন না। দীর্ঘদিন ধরে চাকরির সুবাদে দিদার কলেজের সব শাখাতেই দাপট খাটাচ্ছেন। বিশেষ করে কলেজে বার্ষিক  কেমিক্যাল ক্রয়, লাইব্রেরি নির্মাণ ও বই ক্রয়, নিয়মিত কলেজ ও ছাত্রবাস মেরামত, আসবাবপত্র ক্রয়, রি-এজেন্টের নামে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। এর বাইরেও তো নানা ধরনের টেন্ডার বাণিজ্য রয়েছে। কলেজের বিভিন্ন কাজে নামমাত্র ঠিকাদার নিয়োগ করা হলেও কাজ সম্পূর্ণটাই দিদারের তত্ত্বাবধানেই হয়ে থাকে। বর্তমানেও ছাত্রাবাসে সড়কের কাজ চলছে। এই কাজও তার নিয়ন্ত্রণেই হচ্ছে বলে জানান কর্মচারীরা। দু’বছর আগে কলেজের শিক্ষার্থীরা আবাস সমস্যা নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিল। তখনো দুর্নীতির ঘটনায় উঠে এসেছিল দিদারের নাম। তারা জানিয়েছেন, হাসপাতালের পিএ ব্যক্তিগতভাবে কোনো গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন না। কিন্তু ডক্টরদের ব্যবহৃত একটি গাড়ি নিয়মিতই ব্যবহার করেন। কয়েক মাস আগে কলেজে ৪০ জনের মতো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। এই নিয়োগে যথানিয়মে পরীক্ষা, ভাইবা সবকিছু হলেও টাকা ছাড়া কেউ নিয়োগ পাননি। এই নিয়োগের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা দুর্নীতি করা হয়েছে। এই দুর্নীতির তীরও দিদারের দিকে বেশি। কলেজের কর্মকর্তা-কর্মচারী কোয়ার্টারে দিদার পরিবার নিয়ে থাকেন না। তবে তার এক ভাই পরিবার পরিজন নিয়ে এ কোয়ার্টারে থাকেন। সম্প্রতি বিষয়টি নজরে এসেছে কলেজ কর্তৃপক্ষেরও। এ কারণে তার ভাইকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে মেডিকেল কলেজের লাইব্রেরি নির্মাণের সময় দুর্নীতি করা হয়। ওই লাইব্রেরি ১৪ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হলেও বেশির ভাগ টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে পকেটস্থ করা হয়েছে। দিদার এই লাইব্রেরি নির্মাণে কোটি টাকার মতো হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। কলেজের ভেতরে আধিপত্য বিস্তার করে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়া দিদার বিশাল সম্পদের মালিক। তবে, এসব সম্পদের বেশির ভাগই হচ্ছে বেনামী। তার আত্মীয়স্বজনদের নামে। কয়েক বছর আগে দিদার ও মধুশহীদ এলাকার সাদ্দামকে নিয়ে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার খুলেছিলেন। কয়েক বছর ব্যবসা করার পরে ডাক্তারদের কাছে ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার বিক্রি দেন। প্রায় দু’বছর আগে তিনি নগরের শেখঘাটের শুভেচ্ছা আবাসিক এলাকায় একটি তিনতলা বাসা ক্রয় করেন। ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকায় কেনা ওই বাসা দিদারের টাকায় ক্রয় করা হয়েছে বলে কলেজের সবাই জানেন। সম্প্রতি সময়ে নগরের ঘাষিটুলা এলাকায় আরেকটি তিনতলা বাসা নির্মাণাধীন রয়েছে। এই বাসাও তার টাকায় হচ্ছে। তবে দুটি বাসা তার নামে নয়। ভাইদের নামে বাসা ক্রয় করা হয়েছে।  শেখঘাটের বাসায় দিদার পরিবার পরিজন নিয়ে নিজেও বসবাস করেন। সাদ্দাম নামে একজনের সঙ্গে পার্টনার হয়ে মেডিকেল এলাকার রজনীগন্ধ্যা আবাসিক হোটেল চালাচ্ছেন তারা। এ হোটেল নিয়ে এলাকার মানুষের অভিযোগের অন্ত নেই। এর বাইরে  শেখঘাট এলাকায় তার ফার্মেসি ব্যবসা রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ছাড়া নগরের জিন্দাবাজার এলাকায় লাইব্রেরি সহ স্টেশনারি ব্যবসায় তার শেয়ার রয়েছে। ভাতালিয়া এলাকায় জমি রয়েছে তার।  মেডিকেল কলেজের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানিয়েছেন, দিদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কয়েক বছর আগে দুদকে একটি অভিযোগ দেয়া হয়েছিল। পরে দিদার লবিং করে ওই অভিযোগ গায়েব করে ফেলেন। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ডা. শিশির চক্রবর্তী জানিয়েছেন, দিদার পিএ’র দায়িত্ব থাকায় তাকে পরে সচিবের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তার জন্য এটি অস্থায়ী পদ। যেকোনো সময় তাকে বাদ দেয়া যেতে পারে। আর তার নিয়োগের বিষয়টি তিনি প্রিন্সিপাল হওয়ার আগে হয়েছে। সুতরাং এ ব্যাপারে তিনি অবগত নন। দখলে রাখা বাসা ছেড়ে দেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, কোয়ার্টারের বাসা ছেড়ে দিতে দিদারের লোকজনকে বলে দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে পিএ মাহমুদুর রশীদ দিদার জানিয়েছেন, তিনি বৈধভাবেই পিএ পদে এসেছেন। কোনো অনিয়ম হয়নি। নগরের শেখঘাট ও ঘাষিটুলা এলাকার দুটি বাসা সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা ভাইরা দুটি বাসা ক্রয় করেছেন। তিনি দেখভাল করছেন। তার তো টাকা নেই। বিদেশ থেকে ভাইরা টাকা  দেয়ায় তিনি বাসা ক্রয় করেছেন বলে জানান।   
mzamin

কমিউনিটি ক্লিনিকে মিলছে উচ্চ রক্তচাপের বিনামূল্যে ওষুধ উপজেলায় যেতে অনীহা by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে ডায়াবেটিসের ওষুধ পেয়ে ভীষণ খুশি ৪৫ বছর বয়সী চানমুন খাতুন। সাত বছর ধরে তিনি এই রোগে ভুগছেন। দেহে আছে উচ্চ রক্তচাপও। রাজশাহীর পবা উপজেলার হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে সরজমিন কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, বাড়ির কাজ ফেলে ছয়-সাত কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে (উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স) যাওয়া আমাদের জন্য একটু কঠিন। অনেক সময় ওষুধ শেষ হলেও হাসপাতালে যাওয়া হয় না। পরে অসুস্থ হয়ে পড়ি। কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সরাসরি এই ওষুধ দেয়ার ব্যবস্থা করলে আমার জন্য ভালো হয়।

৩রা অক্টোবর সকালে পবা উপজেলার কুমড়াপুকুর কমিউনিটি ক্লিনিক ও হুজুরিপাড়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া কমিউনিটি ক্লিনিকে অন্তত ২০ জন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের চিকিৎসা নিতে এসেছেন। দুই ক্লিনিকেই ডায়াবেটিসের ওষুধ দেয়া হলেও এক সপ্তাহের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দেয়ার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা। সেন্টারে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ পৌঁছালেও উপজেলার ব্যবস্থাপত্র ছাড়া রোগীদের দিচ্ছে না ক্লিনিকগুলো।

দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সরকারিভাবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পায় সাধারণ মানুষ। এসব ক্লিনিকে বিভিন্ন রোগের মোট ২২ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ। কিন্তু ওষুধ পেতে হলে যেতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে লিখে দিলেই মেলে ওষুধ। এতেই চরম অনীহা মানুষের।
পবা উপজেলার নওহাটা ইউনিয়নের কুমড়া পুকুর কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে দেখা যায়, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে এসেছেন আরিফা বেগম। বয়স ৩৭ বছর। ১৬ বছর ধরে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস আক্রান্ত তিনি। প্রতি মাসে ওষুধের পেছনেই ব্যয় হতো ছয় হাজার টাকা। কৃষক পরিবারের স্বল্প আয়ে সে ব্যয় মেটানো কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। তবে সরকারি উদ্যোগে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে বিনামূল্যে ওষুধ ও পরামর্শের পর তার কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়েছে। এজন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হলেও তার খরচ কমেছে দুই-তৃতীয়াংশ। জুরিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকের কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) মফিজুল ইসলাম বলেন, ক্লিনিকটিতে প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪০ জন মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, কৈশোরকালীন সেবা, নবজাতক ও গর্ভবতী নারীরা সেবা নিতে আসেন। এর বাইরে অসংক্রামক রোগাক্রান্ত (উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস) মানুষ ওষুধ ও পরামর্শের জন্য আসেন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে রোগীদের লিখে দিলে আমরা তাদের দেই। াজশাহী জেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নেয়া ৫৬ ভাগ রোগীর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর এটি সম্ভব হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনসিডিসি) এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের একটি যৌথ উদ্যোগের ফলে। প্রকল্পের অংশ হিসেবে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের শনাক্ত করে তাদের চিকিৎসার আওতায় এনে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবন দিতে সহায়তা করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও উচ্চ রক্তচাপের রোগী বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। ডব্লিউএইচওর ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের ৩০-৭৯ বছর বয়সী ৫৫ শতাংশ মানুষ জানে না তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসাসেবা গ্রহণের হার খুবই কম, মাত্র ৩৮ শতাংশ। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে মাত্র ১৫ শতাংশ; অর্থাৎ প্রতি ৭ জনে একজন।

এমন পরিস্থিতিতে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ২০১৮ সালে এই প্রকল্প নেয় সরকার। এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে রাজশাহীর ১১টি উপজেলার ২৩৬ কমিউনিটি ক্লিনিক এবং দেশের ১৮২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে। রাজশাহীতে এই প্রকল্প শুরু হয়েছে ২০২৩ সালে। দেশব্যাপী এই কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচআই) সহায়তায় গবেষণা এবং অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা’র (প্রগতির জন্য জ্ঞান) মাধ্যমে মিডিয়া অ্যাডভোকেসির কাজ চলছে। এর উদ্দেশ্য, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস শনাক্ত করা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ প্রদান এবং ফলোআপ করা। গত প্রায় দুই বছরে রাজশাহীতে ২২ হাজার ৫০৩ জন মানুষকে সেবা দেয়া হয়েছে। তারা নিয়মিত ওষুধ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক নানা পরামর্শ পাচ্ছেন। এর মধ্যে শুধু উচ্চ রক্তচাপের রোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৮০০ জন এবং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস উভয় রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯ হাজার ৭০৩ জন। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ জেলায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার ছিল শতকরা ৫৬ ভাগ। তবে উচ্চ রক্তচাপ রোগীদের মধ্যে ৪৫ ভাগ রোগী নিয়মিত চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন না। তাদের সচেতন করতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির বিভাগীয় প্রোগ্রাম অফিসার এহসানুল আমিন ইমন মানবজমিনকে বলেন, কমিউনিটি পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ওষুধ বিনামূল্যে দিচ্ছে সরকার। তবে দূরত্ব, সময় ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে ৫ হাজারের অধিক উচ্চ রক্তচাপের রোগী ফলোআপে প্রতি মাসে নিয়মিত আসেন না। বিশেষ করে পুরুষ রোগীদের মধ্যে অনীহা বেশি। কারণ তাদের মধ্যে অনেক রোগী আছেন যারা ফসলের ক্ষেত্রে মৌসুমি কাজ করেন। তিনি জানান, অনিয়মিত রোগী বাড়ানোর জন্য কাউন্সেলিং হচ্ছে। সেবাকে কমিউনিটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চলছে। কমিউনিটিতে নানা গ্রুপকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৮ সাল থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনসিডিসি) ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ দেশের ২৩ জেলার ১৮২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং চারটি সদর হাসপাতালের এনসিডি কর্নারে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। যার উদ্দেশ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্ত করা, চিকিৎসা ও ফলোআপ কার্যক্রম শক্তিশালী করা। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে তৃণমূল পর্যায়ে প্রকল্পটি আরও সফল করতে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেট জেলার চারটি উপজেলার (গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বিশ্বনাথ ও বিয়ানীবাজার) ৮৬টি কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে সরকারিভাবে বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দেয়া শুরু হয়। গত বছর ১৪ই মে ওই সভায় কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চ রক্তচাপের জন্য অ্যামলোডিপিন ৫ মিলি গ্রাম ও ডায়াবেটিসের জন্য মেটফরমিন ৫০০ মিলি গ্রাম সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই মধ্যে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে দেশে অকাল মৃত্যুও কমে আসবে। কারণ মৃত্যুর প্রধান তিন কারণের অন্যতম উচ্চ রক্তচাপ। যদি অকাল মৃত্যু কমাতে হয় তাহলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, সরকারের তো একটা টার্গেট আছে অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা। এজন্য ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রান্তিক পর্যায়ে ওষুধ কিনে খেতে না পারলে ওষুধ সরবরাহ করা সরকারের দায়িত্ব। কিছু রোগী অনিয়মিত হয়ে যাচ্ছে তাদের বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে ডা. সোহেল রেজা বলেন, এটা একটা চ্যালেঞ্জ। তবে ওষুধ শেষ হলে এখন তাদেরকে মোবাইলে মেজেস দেয়া হচ্ছে। এতে বেশ সাড়াও পাওয়া যাচ্ছে।

mzamin


এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি by ডা. এবিএম আবদুল্লাহ

অসুখ হলে ওষুধ খেতে হয়, একথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এবং সঠিক নিয়মে ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকেই অনুভব করি না। ওষুধ খেতে আমরা যতটা তৎপর, ওষুধ খাবার নিয়ম মানতে ততটাই উদাসীন। আমাদের এই অবহেলা জীবন রক্ষাকারী ওষুধকে করে তুলতে পারে জীবনবিনাশী। ওষুধ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা প্রথমেই যে অনিয়মটা করি, তা হলো চিকিৎসকের পরামর্শ না নেয়া। আমরা নিজেরাই নিজেদের চিকিৎসা করি, কখনো আত্মীয়, কখনো বন্ধুর পরামর্শ নিই, কখনো চিকিৎসকের চেয়ে ওষুধ বিক্রেতার ওপর বেশি নির্ভর করি।

এন্টিবায়োটিক ওষুধ বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সমাদৃত এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে যার অবদান অবিস্মরণীয়। ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে মানবজাতির জীবন রক্ষার প্রধান অস্ত্র হচ্ছে এন্টিবায়োটিক। দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, বর্তমানে অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহারের কারণে ওষুধের ক্ষমতা কোনো কোনো জীবাণু ধ্বংসের ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে যাচ্ছে। এর যথেচ্ছ ব্যবহারে জীবন রক্ষাকারী এন্টিবায়োটিক  জীবাণু প্রতিরোধী এন্টিবায়োটিক হয়ে উঠছে, জীবাণুগুলো ওষুধ প্রতিরোধী এবং ওষুধের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এমন পরিস্থিতিকে বলা হয় এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স অর্থাৎ এন্টিবায়োটিক প্রতিবন্ধকতা, যা মানুষের জন্য প্রাণঘাতী। অনেক সময় দেখা যায় জীবাণুগুলো একাধিক এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে, তাকে বলে মাল্টি ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স, অনেক সময় একে বলা হয় সুপারভাগ, যা আরও ভয়ঙ্কর।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশেও এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার কম নয়। মানুষ কোনো রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হলেই প্রাথমিকভাবে তার নিকটবর্তী দোকান থেকে ওষুধ কিনে খেতে পারে। ওষুধ কিনতে কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় এবং ডাক্তারের কোনো প্রেসক্রিপশন না লাগায় মানুষ সহজেই এ কাজটি করছে। এটি হচ্ছে জনসচেতনতার অভাবে। ফলে অপরিমিত ও মাত্রাহীন ওষুধ খাওয়ার ফলে এর জীবাণুনাশক ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এবং এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে যা স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি অনাগত ঝুঁকি। এরপরও এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হয়েই চলছে। একটা এন্টিবায়োটিক কাজ না করলে অন্য এন্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় সেটিও কাজ করছে না। তখন অধিক কার্যকরী এবং অনেক দামি এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস পাচ্ছে। সাধারণ এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে যে ফল পাওয়া সম্ভব ছিল, দেখা যায় অধিক কার্যক্ষমতাসম্পন্ন এন্টিবায়োটিক ব্যবহারেও সে ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে অপব্যবহার আর  যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে এন্টিবায়োটিক তার কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে এবং রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে। জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রথাগত এন্টিবায়োটিক কাজে আসছে না। এটি মানুষ ও পশু স্বাস্থ্য এবং কৃষি সেক্টরের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঠিক এন্টিবায়োটিক দিয়ে যে রোগ শুরুতেই ভালো করা যেত, ভুল ব্যবহারের কারণে তা আর সম্ভব হচ্ছে না, নতুন ওষুধ দরকার হচ্ছে, কখনো তাতেও কাজ হচ্ছে না।

এন্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানোর আরও কিছু কারণ:
(১) প্রায় সময়েই দেখা যায় এন্টিবায়োটিক খাওয়া দরকার ৭ থেকে ১০ দিন। অনেক রোগীও কয়েকটা এন্টিবায়োটিক খেয়ে সুস্থতাবোধ করলে মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করে দেয়। মনে করে, ‘আমি তো ভালোই হয়ে গেলাম, ওষুধ খাবার আর দরকার কী’? এটি খুবই ক্ষতিকর। এভাবে ওষুধের মেয়াদ পূরণ না করায় এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে এবং রোগীর বিপদও বাড়ছে।  এন্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলেই এমন ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে এবং দিন দিন তা বেড়েই চলছে।
(২) আমাদের দেশে জীবাণুগুলো ওষুধ প্রতিরোধী  হয়ে ওঠার অন্যতম কারণগুলোর একটি হলো ওষুধের দোকানগুলোতে কোনো ধরনের ব্যবস্থাপত্র বা প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এন্টিবায়োটিক ওষুধ বিক্রি করা হয়। যে কেউ চাইলেই ফার্মেসিতে গিয়ে ইচ্ছামতো এন্টিবায়োটিক কিনতে পারে, ডোজ মানছে না, নিয়ম মানছে না, যেমন ইচ্ছা হলো খাচ্ছে, যখন ইচ্ছা খাচ্ছে, বন্ধ করছে, যেগুলো আরও ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
(৩) অনেক রোগীই আর্থিক অসঙ্গতির কারণে ডাক্তারের পরামর্শ না নিয়ে নিজেই ওষুধ বিক্রেতার কাছ থেকে এন্টিবায়োটিক চেয়ে নিচ্ছে। কিছু কিছু ওষুধ বিক্রেতাও মুনাফার স্বার্থে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ বিক্রি করছে। এমনকি  অনেক সময় রোগী ও তাদের লোকজনও চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন গ্রহণ ও সে অনুযায়ী ওষুধ কেনার প্রয়োজন অনুভব করেন না। এর সঙ্গে ওষুধ প্রতিরোধী বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থা খুব ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
(৪) আবার আমাদের দেশে পাস করা রেজিস্টার্ড ডাক্তার ছাড়াও অনেকেই প্রতিনিয়ত রোগীর চিকিৎসা করেন, এমনকি মাঝে মাঝে ভুয়া ডাক্তারের কথাও শোনা যায়। যাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানে পড়াশোনা কম, তারা উপযুক্ত মাত্রা এবং মেয়াদ সম্পর্কে না জেনেই রোগীকে এন্টিবায়োটিক দিচ্ছে, এটাও একটা খারাপ দিক।
(৫) এ ছাড়াও আমাদের দেশে প্রায়ই দেখা যায় অধিকাংশ ফার্মেসি ডিগ্রিধারী বা উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট দিয়ে চালানো হয় না। মোটামুটি লেখাপড়া জানা অনেকেই ওষুধের দোকানে বিক্রেতা হিসেবে কিছুদিন কাজ করেই নিজেরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করছে। প্রায়ই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাক্তার না থাকায় এ ধরনের বিক্রেতারাই রোগীকে ব্যবস্থাপত্র এবং এন্টিবায়োটিক দিচ্ছে। এক্ষেত্রে দেখা যায় রোগীর বয়স ও ওজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রায় এন্টিবায়োটিক দেয়া হয় না। এমনকি খাবারের আগে-পরে বা কতোদিন খেতে হবে তারও নির্দেশনা থাকে না বা রোগীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা হয় না। ফলশ্রুতিতে রোগীর শারীরিক এবং আর্থিক উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।

প্রতিরোধে করণীয়: আমাদের হাতে কার্যকর এন্টিবায়োটিকের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে।  উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সংক্রামক রোগ বেশি,  এন্টিবায়োটিকের প্রয়োজনও বেশি। তাই  এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে অবশ্যই সচেতনতা দরকার এবং এন্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা রোধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া দরকার।
(১) ডাক্তারদের অবশ্যই রোগীকে এন্টিবায়োটিক লেখার সময় উপযুক্ত মাত্রা এবং মেয়াদের ব্যাপারে রোগীকে ভালো করে বুঝিয়ে দিতে হবে।
(২) রোগীদেরও সচেতন হতে হবে, তারা যেন যখন তখন নিজে থেকেই বা ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো ওষুধ কিনে না খান। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তনের আগে ডাক্তারকে অবহিত করতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে এবং অবশ্যই উপযুক্ত মাত্রা এবং মেয়াদ অনুযায়ী। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী মা এবং বয়স্কদের ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

(৩) ওষুধ বিক্রেতার কর্তব্য: ওষুধ বিক্রেতাকে অবশ্যই কিছু দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে হবে। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি করা উচিত। শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া সব ওষুধ বিক্রি করা উচিত নয়। তবে ‘ওভার দ্য কাউন্টার’ বিক্রির জন্য, যা আইনগতভাবে বৈধ, শুধু সেগুলোই বিক্রি করা যাবে। সুন্দরভাবে প্যাকেটের ওপর প্রয়োজনীয় মাত্রা, কতোবার, কীভাবে সেবন করতে হবে, খাওয়ার আগে বা পরে, তা ভালোভাবে লিখে দেয়া উচিত। তা না হলে রোগীকে বা রোগীর লোকজনকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে।

(৪) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব: ওষুধ যেহেতু একটি অতি প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী পণ্য, তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও অনেক বেশি। দোকানে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ করা ও সার্বিক তত্ত্বাবধান করা উচিত। শিক্ষিত বা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট ছাড়া অন্য কেউ যেন ওষুধ বিক্রি না করে, তার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অননুমোদিত ওষুধপত্র বিক্রি বন্ধ করা উচিত। মাঝেমধ্যে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় রেখে পরিদর্শন টিম থাকা ভালো, যাদের কাজ হবে মাঝে মাঝে বিভিন্ন ওষুধের দোকানে নিয়মিত চেকআপ এবং ওষুধের ব্যবহার নিশ্চিত করা। সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি। দেশে বিভিন্ন ধরনের অপচিকিৎসা, কুচিকিৎসা, তাবিজ-কবজ বা ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি অবৈজ্ঞানিক পন্থায় যেসব কুচিকিৎসা চলে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।
মোট কথা, আমাদের ভালোভাবে বেঁচে থাকতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন সুস্থভাবে সুস্বাস্থ্য নিয়ে গড়ে ওঠে, তার জন্য এন্টিবায়োটিক সহ অন্যান্য ওষুধের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ওষুধের অপব্যবহার, বিশেষ করে এন্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স থেকে নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া দরকার। মনে রাখতে হবে চিকিৎসার অভাবে মানুষের যেমন মৃত্যু হতে পারে, ভবিষ্যতে হাতের কাছে অসংখ্য ওষুধ থাকলেও যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে সবই অকার্যকর হওয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে।

mzamin