Showing posts with label এমাজউদ্দীন আহমদ. Show all posts
Showing posts with label এমাজউদ্দীন আহমদ. Show all posts

Friday, February 26, 2016

জনগণ ও রাজনীতিক by এমাজউদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশের জনগণের কাছে গণতন্ত্রের আবেদন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। গণতন্ত্রের প্রতি তাদের দুর্বলতা প্রবল। যুগে যুগে তাই জনগণ গণতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। গণতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আদর্শ ব্যবস্থা বলে সব সময় চিহ্নিত করেছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সৈনিকরূপে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ত্যাগ স্বীকারও করেছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশীদার হয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রণোদনা লাভ করে পাকিস্তানের বলদর্পী শাসনকারী এলিট গোষ্ঠী যখন ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী পূর্ব পাকিস্তানের আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়ার পথ রুদ্ধ করে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হয় এভাবে যখন পেশিশক্তির মাধ্যমে জনগণের রায়কে বিধ্বস্ত করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য, এখন পর্যন্ত গণতন্ত্র রয়ে গেছে তাদের আকাঙ্ক্ষায়, তাদের প্রত্যাশায়। শুধু বিদ্যমান রয়েছে তাদের দুচোখ ভরা স্বপ্নে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তাদের কাছে এখনো সেই মোহনীয় সোনার হরিণ। আকর্ষণীয় কিন্তু বাস্তবে রূপায়িত হয়নি। কাক্সিক্ষত, কিন্তু তাদের জীবনকে স্পর্শ করেনি।
পাশ্চাত্যের উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্র সফল হয়েছে প্রধানত দু’টি কারণে। এক. যে সামাজিক উপত্যকায় গণতন্ত্রের সুর ঝঙ্কৃত, তা মোটামুটিভাবে মসৃণ এবং সমতল। বৈষম্য, তা সম্পদসৃষ্ট হোক আর জাতিগত বা ধর্মের ভিন্নতাজনিত হোক, ওই সব সমাজে অনতিক্রম্য নয়। নয় অজেয়। আজ যিনি নির্ধন, আগামীকাল সমাজপ্রদত্ত সুযোগ-সুবিধার ফলে তিনিও শীর্ষে অবস্থান গ্রহণ করতে পারেন। জাতি-ধর্ম বা নৃতাত্ত্বিক ভিন্নতা তার অগ্রগতির অভিযাত্রা রুদ্ধ করতে সক্ষম নয়। তাই সমতল সমাজ ভূমিতে নাগরিকদের জীবন হয়ে উঠেছে শ্যামল, সমৃদ্ধ, সুষমামণ্ডিত।
দুই. অর্থনৈতিক সুখ-সুবিধাও ওই সব সমাজে এমনভাবে বিস্তৃত যে, প্রত্যেকেই জীবনের সর্বনিম্ন চাহিদা মিটিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন। যার কোনো কর্মসংস্থান নেই, তিনিও দরিদ্র্যের অভিশাপে অভিশপ্ত নন। এসব ক্ষেত্রে সমাজই এগিয়ে আসে ওই সব দুস্থ ও দরিদ্র্যের সর্বনিম্ন প্রয়োজন মেটানোর জন্য, সহায়তার ডালা সাজিয়ে। দেশের আইন এমনভাবে বিন্যস্ত যে, শুধু আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেই সবাই মানবিক জীবনযাপন করতে সক্ষম। এসব সমাজে কাউকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হতে হয় না। সুতরাং উন্নত গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণে প্রবৃত্ত হোন, দেখবেন গণতন্ত্রকে সফলভাবে বাস্তবায়নের সব শর্তই প্রায় সামাজিক, রাজনৈতিক নয়। নয় রাজনৈতিক কাঠামো বা রাজনৈতিক কার্যক্রম সংক্রান্ত।
কার্যত পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের জন্ম হয়েছিল সামাজিক এক ব্যবস্থারূপে। সমাজেই তার দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়। পরে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার সার্থক প্রয়োগ ঘটে। আগে সমাজ গণতান্ত্রিক হয়েছে। দেখাদেখি পরে রাষ্ট্র হয়েছে গণতান্ত্রিক। বাংলাদেশ, এমনকি বিশ্বের এই অংশে রাজনৈতিক গণতন্ত্রকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, বৈষম্যক্লিষ্ট হাজারো প্রকরণে বিভক্ত, জাতি-ধর্মের ভিন্নতাপীড়িত সমাজে। এসব জনপদে সামাজিক মূল্যবোধ এখনো গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠেনি। হয়ে ওঠেনি পারস্পরিক সমঝোতা ও সহিষ্ণুতার অমৃতরসে সিক্ত। সহনশীলতার পাঠ সমাজজীবনে এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। তাই এসব সামাজিক মূল্যবোধহীন জনপদে রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতি পদে হোঁচট খাচ্ছে। প্রতিটি ক্ষণ টিকে রয়েছে টলটলায়মান অবস্থায়, হাজারো অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। তাই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার নির্দেশনা হলো- সৃজনশীল রাজনৈতিক নেতাদের গতিশীল নেতৃত্বের আলোকে গণতন্ত্রের সঠিক বিকাশের জন্য সমাজে গণতন্ত্রের জন্য উর্বর ক্ষেত্র রচনা করা। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, রাজনৈতিক নেতারা এখনো তেমন সৃষ্টিশীল উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। এ দিকে দৃষ্টি দেয়ার সময়ও পাননি। এসব বিষয়ে খেয়ালও করেননি। এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রের এমন মহামূল্যবান মণি-মুক্তা তাদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতাকে তারা শুধু দেখেছেন ব্যক্তিগত এবং দলীয় পর্যায়ে প্রভাব-বৈভব অর্জনের মাধ্যমরূপে। কখনো ভেবে দেখেননি, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ব্যবহার করে পুরো সমাজকে নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ ভুলটি প্রায় সবাই কমবেশি করছেন এবং করেছেন। যারা ক্ষমতা দখলে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তারাও এ বিষয়ে সজ্ঞাত নন।
বাংলাদেশের জন্মক্ষণ থেকেই এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কোনো পর্যায়ে এই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে বলে মনে হয় না। পাশ্চাত্যে গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য জনগণের সচেতনতা যতটুকু ভূমিকা রেখেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ভূমিকা ছিল রাজনৈতিক নেতাদের গণতন্ত্রকে সফল করা তথা সাংবিধানিক নিয়মতান্ত্রিকতাকে বাস্তবায়িত করার দৃঢ়সঙ্কল্প এবং সৃজনশীল মনমানসিকতার।
বাংলাদেশে প্রথমটি বিদ্যমান থাকলেও দ্বিতীয়টির বড় আকাল দেখা যায় সব সময়। এই অভাবটা পূরণ করতে হবে আমাদের রাজনীতিকদের। আমার বিশ্বাস, তারা তা পারবেন। তাদের শুধু একটু আকাশমুখী হতে হবে। মাত্র দুই হাজার ফুট উঁচুতে উঠে এই মাটিকে যেমন সুদৃশ্য ছবির মতো সুন্দর মনে হয়, তেমনি আদর্শিক অঙ্গীকারের খানিকটা ধারণ করে অগ্রসর হলে যে সমস্যাগুলোকে সবচেয়ে জটিল বলে মনে হয়, তা-ও নিয়ন্ত্রণে আসবে। পারবেন কি আমাদের রাজনীতিকেরা এ দেশের গণতন্ত্রকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাতে? জনগণ কিন্তু চেয়ে রয়েছে তাদেরই দিকে।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Tuesday, January 26, 2016

দেশের অর্থনীতি কোন পথে? by এমাজউদ্দীন আহমদ

মাত্র কিছু দিন আগেও অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকেই (Economic Growth) বলা হতো অর্থনৈতিক উন্নয়ন (Economic Development)। GNP (Gross National Product) ক্ষেত্রে অগ্রগতি এবং কোনো কোনো সময় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলে চিহ্নিত করা হতো। কোনো কোনো অর্থনীতিবিদ বলেছেন, একটি দেশ উন্নত হয় যখন দেশটির তার নিজের উদ্যোগেই এক উন্নত পর্যায়ে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। জাতিসঙ্ঘ পর্যন্ত তার দ্বিতীয় উন্নয়ন দশকের (Second Development Decade) প্রস্তাবে মাথাপিছু আয়ের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করেছিল অর্থনৈতিক উন্নয়ন হিসেবে। ওই সময়ে অর্থনীতিবিদদের ধারণা বা প্রতীতি ছিল ‘উন্নত জীবনের সূচনা হয় উন্নত পর্যায়ের মাথাপিছু আয়ের বিশ্বে’ (Real life begins at a higher level of per capital income), কেননা অর্থনৈতিক বৃদ্ধি তখন নিচের দিকে চুঁইয়ে পড়ে (Filter down) এবং দেশে দরিদ্রদের জীবনমান উন্নত করে। অর্থনীতিবিদদের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। উচ্চতর মাথাপিছু আয়ের পেছনে ছুটতে যাওয়াটা শেষ পর্যন্ত অলীক প্রমাণিত হয়েছে। এই ধরনের অর্থনীতির দেশের এক দিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে আয়ের ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য, দারিদ্র্য, অপুষ্টি-ব্যাধি-অশিক্ষা-নিরক্ষরতা-অস্বাস্থ্যকর অবস্থানে বসবাস, তেমনি বেড়েছে বেকারত্ব, আধা-বেকারত্ব এবং জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ যা চূড়ান্তপর্যায়ে রূপ গ্রহণ করতে পারে বিস্ফোরণধর্মী রাজনীতিতে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ হওয়া উচিত দারিদ্র্য দূরীকরণের মাধ্যমে ওইসব ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধের উন্মেষ ঘটানো, আত্মশক্তিতে বলীয়ান করে নিজের ভাগ্য রচনায় উদ্যোগী করানো, সম্মানজনক কর্মের জন্য প্রণোদিতকরণ, বিশেষ করে সমাজব্যাপী এমন রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টি করা যাতে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুষম বণ্টন ত্বরান্বিত হতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষেত্রে সব ধরনের বৈষম্য ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যাত হতে পারে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ক্ষেত্রে সকলের সমান অধিকার সুনিশ্চিত হতে পারে। এ জন্য সব ধরনের সামন্তবাদী ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে সমাজে গণতন্ত্রের শিকড়কে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের (Participatory) মানসিকতা সুদৃঢ় করা একান্ত প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এই ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি, কেননা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে প্রায় সব নাগরিকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগঠিত মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে, সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে। বাংলাদেশে ছোটখাটো বৈষম্য বিপ্লবাত্মক হয়ে উঠতে পারে। কেননা জনগণ এসব বিষয়ে ভীষণ সচেতন। তা ছাড়া, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অনুপস্থিতি তথা কার্যত একদলীয় শাসন এবং দলীয় নেতাদের উচ্চবাচ্য ও পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ পরিবেশকে উত্তপ্ত করতে পারে।
২০১৪ সালের ২০ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় পেশকৃত বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছে জনগণের মাথাপিছু আয় ১৪৬ ডলার বৃদ্ধি পেয়ে এ বছরে তা হয়েছে এক হাজার ১৯০ মার্কিন ডলার। বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ হয়েছে ২১ হাজার ৫০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমরা অনেকে আশাও করি, দু-চার বছরের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। এসবই ভালো কথা। আশার কথা। কিন্তু অন্য দিকে দৃষ্টি দিলে ভীত হই। দেশে প্রতি বছর যে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে তা কুক্ষিগত হচ্ছে অল্পসংখ্যক ব্যক্তির হাতে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের শীর্ষ ধনীদের সম্পদের হিসাব প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, মাত্র ১৬ ব্যক্তির মালিকানায় রয়েছে দেশের মোট সম্পদের সাড়ে ১০ শতাংশের অধিক। আবার আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট (Ultra Wealth Report) অনুযায়ী মাত্র ৯০ জনের মালিকানায় রয়েছে দেশের ১১ শতাংশ সম্পদ। এই ক’জন ব্যক্তির সম্পদ ১৬ কোটি মানুষের মাথায় ফেলে মাথাপিছু আয় হিসাব করা হচ্ছে। করারোপের মাধ্যমে সরকার সম্পদ বণ্টনের চেষ্টা করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। কর ফাঁকির মাধ্যমে তা অকার্যকর থেকেই যাচ্ছে। রাজস্ব বোর্ডের এক হিসাবে দেখা যায়, শীর্ষ করদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫টি রাজস্ব খেলাপি। বিশ্ব আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৩ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৫০ কোটি টাকা সম্পদের মালিকদের সংখ্যা ৯৫। তাদের কাছে গচ্ছিত মোট সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা যা মোট জিডিপির ১১ শতাংশ। এক বছর আগে এমন ধনীর সংখ্যা ছিল ৮৫ জন। তাদের কাছে গচ্ছিত সম্পদ ছিল এক লাখ চার হাজার কোটি টাকা। অন্য কথায়, এক বছরের ব্যবধানে জিডিপি প্রবৃদ্ধির তুলনায় ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার আড়াই গুণ। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৬ হলেও কিছু সম্পদ কুক্ষিগতকারীর প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের বেশি। ২০০৯ সালে ২৫০ কোটি টাকার মালিকদের সংখ্যা ছিল ৫০ জনের মতো।
২০১৫ সালের অর্থনৈতিক খাতে আলোচিত ঘটনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে বিদেশে টাকা পাচারের কাহিনী। ওয়াশিংটন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জিএফআই (Global Financial Integrity-GFI) ২০০৪-২০১৩ সময়কালে বাংলাদেশ থেকে এক বছরেই প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা পাচারের সংবাদ প্রকাশ করে তার ৮ ডিসেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদন- 'Illicit Financial close from Developing countries'এ। প্রতিবেদন মতে ২০০৯-২০১৩ সময়কালে পাচার হয়েছে দুই লক্ষ ২৬ হাজার কোটি টাকা। বিভিন্ন সময়ে ওভার ইনভয়েসিং এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাচারের অভিযোগ পাওয়া যায়। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন পাঁচটি ব্যাংকের তথ্য দিয়ে দুদককে সহযোগিতা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু দুঃখের বিষয় দুর্নীতি দমন কমিশন এসব বিষয়ে চুপ করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোনো দৃশ্যমান বিনিয়োগ না থাকলেও গত অর্থবছরের ১০ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতির প্রবৃদ্ধি দেখানো হয় প্রায় ২৫ শতাংশ। আর আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলার প্রবৃদ্ধি দেখানো হয় ১৫ শতাংশ। যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে পাওয়া গেছে ছাই, ইট, বালু ও পাথর। শুল্ক গোয়েন্দাদের তদন্তে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে খালি কনটেইনারও পাওয়া গেছে। শুধু আমদানির নামে টাকা পাচার হচ্ছে তা-ই নয়, রফতানি নামেও টাকা পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সমাজের উঁচু স্তরের ব্যক্তিরা টাকা পাচার করেছেন, বিশেষ করে প্রভাবশালী রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, এনজিও ব্যক্তিত্ব। এই টাকা দিয়ে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, ভারত প্রভৃতি দেশে তারা বাড়ি বানিয়েছেন অথবা ব্যবসা কেন্দ্র গড়ে তুলেছেন।
খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত সম্পদশালীদের ‘লুটেরা’ উল্লেখ করে বলেন, ‘এই দুর্বৃত্তরা’ কোনো সম্পদ সৃষ্টি করে না, বরং অন্যের বিত্ত ‘দখল-হরণ ও আত্মসাৎ’ করে নিজেরা বিত্তশালী হয়েছেন। এই প্রক্রিয়ায় তারা এখন জনসমষ্টির ওপর তলার ১ (এক) শতাংশ লোক যারা দেশের বেশির ভাগ সম্পদের মালিক। অধ্যাপক বারকাত তার লোক বক্তৃতা ২০১৪ তে বলেছেন, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক কাঠামো বিকাশ প্রবণতা থেকে এটি সুস্পষ্ট যে, গত ২৪ বছরে ‘সার্বিক দারিদ্র্য-বৈষম্য-অসমতা’ অবস্থার অধোগতি হয়েছে। অন্য কথায়, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দারিদ্রের হার গতিধারা সুস্পষ্ট। এক দিকে এই গণ-দরিদ্র এবং ব্যাপক অসমতা আর অন্য দিকে মধ্যবিত্তের অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতা এবং নগণ্য সংখ্যক ব্যক্তির হাতে অঢেল সম্পদ সমগ্র সমাজব্যাপী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে যা কালে বিস্ফোরণধর্মী রাজনীতির জন্ম দেবে। তাই বলি, এখনো সময় আছে, সমবণ্টন, দারিদ্র্যদূরীকরণ ও বিত্তশালীদের ওপর উচ্চহারে কর আরোপের মাধ্যমে দেশে সামগ্রিকভাবে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হয়েছে তার সমাধান অপরিহার্য। এর কোনো বিকল্প নেই।

Tuesday, January 19, 2016

একজন জাতীয়তাবাদী সৈনিক জিয়া by এমাজউদ্দীন আহমদ

সত্যিই জিয়াউর রহমান আমৃত্যু একজন সৈনিক। সৈনিক হিসেবেই তিনি এই জাতির জীবনে সবচেয়ে সঙ্কটাপন্ন সময়ে আবির্ভূত হন। সৈনিক হিসেবেই তিনি সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেন। সৈনিক হিসেবেই তিনি শাহাদত বরণ করেন। সারা জীবন তিনি সৈনিক হয়ে রইলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রেই কাটালেন। তার জীবনে রণাঙ্গন বদলেছে। রণকৌশল পাল্টেছে। পাল্টেছে যুদ্ধাস্ত্রও। পাল্টায়নি শুধু তার সৈনিকজীবন। কোনো পরিবর্তন আসেনি বাংলাদেশ রাজনীতির ক্ষেত্রে তার সৈনিকসুলভ বলিষ্ঠ ভূমিকায়।
এক অর্থে প্রত্যেকেই সৈনিক। জীবনটা যেন যুদ্ধক্ষেত্র। যুদ্ধ করেই সবাইকে টিকে থাকতে হয়। যা কিছু গৌরবের তা অর্জন করতে হয়। এ অর্থে জিয়াউর রহমান সৈনিক নন। তিনি সৈনিক দেশকে ভালো বেসে, দেশের জন্য অর্থপূর্ণ কিছু করতে উদগ্র আকাক্সক্ষার জন্য। তিনি সৈনিক একজন সাচ্চা জাতীয়তাবাদী হিসেবে জাতির আশা-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে নিশ্চিত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করার জন্য রাজনীতিকে তাদের মধ্যে টেনে আনার পক্ষে দুর্লঙ্ঘ বাধা-বিপত্তি অপসারণের জন্য। এদিক থেকে বিচার করলে বলা যায়, উন্নয়নশীল বিশ্বে দেশপ্রেমিক সব রাষ্ট্রনায়কই সৈনিক। জাতীয় অগ্রগতি অর্জনের জন্য প্রতি পদে পদে তাকে লড়তে হয়। লড়তে হয় কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে, তা দেশেরও হয়, হয় বিদেশেরও। সর্বক্ষণ তাকে যুদ্ধকালীন সতর্কতার এক পরিবেশের মধ্যে থাকতে হয়। সব প্রতিবন্ধকতাকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে শত্রুর ওপর বিজয় অর্জনের কৌশল সদা তৈরি রাখতে হয়। লক্ষ্য অর্জনে সর্বাধিক স্বল্প ব্যয়ে যেন তা সম্ভব হয় সে সম্পর্কেও তিনি সদাজাগ্রত। এ অর্থেও জিয়াউর রহমান একজন সৈনিক এবং বলতে কোনো দ্বিধা নেই, তিনি ছিলেন এক সফল সৈনিক। শ্রেষ্ঠতম মুক্তিযোদ্ধাদের একজন তিনি। জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের প্রধান সেনাপতি। জনস্বার্থের অতন্দ্র প্রহরী। তার যুদ্ধক্ষেত্র শুধু মুক্তিযুদ্ধের মহান ক্ষেত্রেই সীমিত নয়, তা সম্প্রসারিত ছিল মাঠে-ঘাটে, কৃষকদের দোরগোড়ায়, শ্রমিকের কারখানার প্রান্তে, দেশের তরুণদের আত্মবিশ্বাস জাগ্রত করার লক্ষ্যে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে পল্লী উন্নয়ন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন চত্বরে।
খ্যাতনামা নাট্যকার হেনরিক ইবসেন তার অত্যন্ত জনপ্রিয় নাটকে (An Enemy of the people) লিখেছেন, ‘একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায় একটি জাহাজের মতো। এই জাহাজ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রত্যেককে তৈরি হওয়া উচিত’ (A community is like a ship; everyone ought to be prepared to take the helm.)। সত্যিই তো, পরিচালনার দায়িত্ব নিতে রাষ্ট্রীয় জাহাজের প্রত্যেক যাত্রীকেই প্রস্তুত থাকতে হয়। প্রত্যেককেই নাবিকের ভূমিকা পালনের জন্য তৈরি হতে হয়। এই তো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মহান শিক্ষা। অংশগ্রহণকারী নাগরিক (তথা পারটিসিপেন্ট সিটিজেন) হিসেবে প্রত্যেককে গড়ে উঠতে হবে। তা না হলে, এ ব্যবস্থা সার্থক হবে না। স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য অর্থপূর্ণ হবে না। গণ-অধিকার হারাবে তার মর্মবাণী। মুক্তিযুদ্ধের অনলকুণ্ড থেকে প্রাণ পাওয়া বাংলাদেশে জনগণের জীবনে আসবে না পরিবর্তনের কোনো ছাপ। লাগবে না অগ্রগতির বিন্দুমাত্র ছোপ। কিন্তু এই পরিবর্তন তো আপনা-আপনি আসবে না। অনগ্রসর তৃতীয় বিশ্বে গণ-অধিকারের প্রত্যয় তো এমনিতেই আসেনি। সব ক্ষেত্রে এ জন্য প্রয়োজন হয়েছে একজন যুগদর্শীর। একজন জননেতার। একজন সৈনিকের বাংলাদেশে এই যুগদর্শী হলেন জাতীয়তাবাদী দর্শনের প্রধান সেনাপতি জিয়াউর রহমান। তারই সার্থক নেতৃত্বের পরশমণির স্পর্শ গ্রাম-বাংলার কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে সৃষ্টি করে এই পরিবর্তনের মৃদু তরঙ্গ। নতুনভাবে জনগণকে ভাবিয়ে তোলে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের ভূমিকা সম্পর্কে। তাদের অধিকার এবং দায়িত্ব সম্পর্কে।
এর মূল নিহিত জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির অভ্যন্তরে। গ্রাম-বাংলাকেই তিনি চিহ্নিত করেছিলেন তার মূল কর্মক্ষেত্ররূপে। লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত গ্রামীণ জনসাধারণকে। সূচনা করেছিলেন শেকড়স্পর্শী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের। তিনি সঠিকভাবে অনুধাবন করেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সনাতন জীবনব্যবস্থায় অভ্যস্ত মানুষকে নতুন পৃথিবীতে টেনে আনতে হলে শাসনব্যবস্থায় তাদের সক্রিয় অংশ নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি পল্লী অঞ্চলকে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্যে রূপান্তরিত করেন। এ দেশের ইতিহাসে তিনিই সর্বপ্রথম গ্রামবাসীর নিজস্ব সরকার- গ্রামসরকার সৃষ্টি করেন যেখানে নিজেদের মতো করে গ্রামপর্যায়ে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের চেষ্টা তারা করতে পারেন। গ্রামপর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সর্বপ্রথম এ দেশের গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী বা ভিডিপি গড়ে তোলার ব্যবস্থা করেন। গ্রামাঞ্চলে যুবশক্তিকে বিভিন্ন অর্থপূর্ণ কাজে লাগানোর জন্য যুব-কো-অপারেটিভ কমপ্লেক্সের ব্যবস্থা করেন। পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পল্লী এলাকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের ব্যবস্থা করেন।
এভাবেই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম গ্রামীণ সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদের উন্নয়ন, স্বাস্থ্য এবং বয়স্ক শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ঘটে। ১৯৭৬-৭৭ সালে গৃহীত পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প-১-এর মাধ্যমে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ের উন্নয়ন কর্মসূচি, ১৯৭৭-৭৯ সালে গৃহীত উন্নয়ন প্রকল্প-২-এর মাধ্যমে বৃহত্তর পাবনার ৭২ কোটি টাকা কর্মসূচি এবং ১৯৭৮-৭৯ সালে নোয়াখালী সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচির সাফল্য এ ক্ষেত্রে নতুন দিগদর্শন। ১৯৭৮ সালে গৃহীত দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনায় যেসব লক্ষ্য চিহ্নিত হয় সে দিকে দৃষ্টি দিলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল উন্নয়নের হার বাড়ানো, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে পরনির্ভরশীলতা কমানো, সম্পদের সুষম বণ্টন, জনসংখ্যা বাড়ার হার কমিয়ে আনা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, নিরক্ষরতা দূর করা এবং রফতানি আয় বাড়ানোর মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন।
দেশকে স্বনির্ভর ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক অবকাঠামোর উন্নয়নে কৃষকদের মধ্যে সর্বপ্রথম তিনিই স্বল্পমেয়াদি ঋণদানের ব্যবস্থা চালু করেন। এ ক্ষেত্রে ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কৃষকদের মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ১০০ কোটি টাকার বিশেষ ঋণ বিতরণ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
শুধু প্রকল্প প্রণয়ন এবং আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তার উদ্যোগকে সীমিত না রেখে পল্লী অঞ্চলের মানুষের অবস্থা সরাসরি দেখার জন্য তিনি গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে ছুটে গেছেন। কথা বলেছেন কৃষকদের সাথে, জেলে-মুটে মজুরদের সাথে। প্রত্যেকের মনে জাগ্রত করেছেন একধরনের অদম্য স্পৃহা। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য নতুন উন্মাদনা। এমনি এক ঘটনার বিবরণ দিয়ে এ কে এম শামসুল বারী মিয়া মোহন লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট জিয়া এক সভাশেষে ফেরার সময় হঠাৎ ওই কৃষকের বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়েন। বাড়ির মহিলাকে বলেন, ‘আমাকে বসতে দিন’। মোড়ায় বসে তিনি বলেন, ‘মা আমাকে কি খেতে দেবেন?’ মহিলা তো আর তাকে চেনে না। তাই বলল, ‘কী খাবেন আপনি?’ তিনি বললেন, ‘পেঁপে খাবো।’ মহিলা বলল, ‘পেঁপে তো নেই আমাদের।’ তিনি বলেন, ‘তবে কী আছে? কলা, লেবু ডাব?’ মহিলাটি বলল, ‘তা-ও নেই।’ ‘তবে দুধ আছে তো? তাই দিন’। জিয়া বলেন, ‘একটা ছাগল তো পালতে পারেন। আর লেবুগাছ, কলাগাছ, পেঁপেগাছ লাগানো তো সহজ। এ জন্য বেশি জায়গাও লাগে না। এসব লাগাবেন, আমি আবার আসব মেহমান হয়ে, কেমন?’ এরই মধ্যে বাড়ির মালিক এবং অন্য সব লোক এসে হাজির হলো। লোকটি বলেছিল, ‘বাবা আমি লেবুগাছ, পেঁপেগাছ, কলাগাছ লাগিয়ে, ছাগল কিনে আপনার জন্য অপেক্ষা করব।’ এভাবে জিয়াউর রহমান গ্রাম-বাংলায় সৃষ্টি করেছিলেন জাগরণের নতুন স্পন্দন। খাল কাটা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে গ্রাম-বাংলার লাখো মানুষকে তিনি সম্পৃক্ত করেছিলেন সামগ্রিক কার্যকলাপে। নিরক্ষরতা দূরীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ জনসাধারণের মধ্যে জাগিয়েছিলেন নতুনভাবে ভাগ্য গড়ার প্রত্যাশা। পরিকল্পিত পরিবারব্যবস্থার শুভসূচনা করে বলিষ্ঠ জীবনবোধে সংযোজন করেন নতুন অধ্যায়। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপচয়প্রবণ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজতন্ত্রকে পাল্টে, বেসরকারি উদ্যোগকে প্রাণবন্ত করে, বিশেষ করে শিল্পক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়িয়ে এবং রফতানি বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে নতুনভাবে ঢেলে সাজিয়ে যে দিকনির্দেশনা দান করেন আজ তা বিকশিত হয়েছে ফুলে-ফলে। কিন্তু কিভাবে তা সম্ভব হলো? কিভাবে একজন পেশাদার সৈনিক জাতি গঠনের সৈনিকে রূপান্তরিত হলেন?
এমন রূপান্তরের কারণের দিকে না তাকিয়ে শুধু ইতিহাসের পাতায় দৃষ্টি দিলেও এমন দৃষ্টান্ত মেলে অনেক। ‘ইউরোপের অসুস্থ মানুষ।’ (সিক-মেন অব ইউরোপ) রূপে নিন্দিত, নিগৃহীত এবং পদদলিত তুরস্কের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল কামাল আতাতুর্কের ভগ্নস্তূপ থেকে মিসরের উত্থানের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল গামাল নাসেরের। চতুর্থ রিপাবলিকের জন্য প্রয়োজন হয়েছিল ফ্রান্সকে আলোয় টেনে আনার জন্য জেনারেল দ্য গলের। তার প্রয়োজনীয়তার কথা ফরাসি জাতি মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে। লিবিয়াকে আধুনিকতার আলোয় আনার কৃতিত্ব কর্নেল গাদ্দাফির একার। ঘানা যে আজ বিশ্বরাজনীতির ক্ষেত্রে পরিচিত হয়েছে তার মূলে রয়েছে এন ক্রুমার অবদান।
জিয়ার সাথে এসব নেতার আত্মিক সম্পর্ক। সবাই ছিলেন প্রথম শ্রেণীর দেশপ্রেমিক। সবাই ছিলেন এক নম্বরের জাতীয়তাবাদী। সবারই চিন্তাভাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে জাতীয় শ্রীবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ স্বপ্ন, জাতীয় সংস্কৃতির অনস্বীকার্য স্বাতন্ত্র্য, জাতীয় রাজনীতির স্বাধীনচেতা বৈশিষ্ট্য। সবাই চেয়েছেন জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সমগ্র জাতির, বিশেষ করে পল্লীবাসীর, কৃষক-শ্রমিক ও জনসমষ্টির অবহেলিতদের অংশ নেয়া। সবারই চোখে একই আলো- ‘আমার দেশ, আমার জাতি কোনো দিন কারো কাছে মাথা নত করবে না। ভিক্ষার হাত কারো কাছে প্রসারিত করবে না।’ প্রত্যেকেই চেয়েছেন, রাজনীতি ক্ষমতার দ্বন্দ্ব অথবা সংগ্রামে পরিণত না হয়ে হোক জনকল্যাণ অর্জনের সুষ্ঠু মাধ্যম। প্রত্যেকে তাই এখনো বেঁচে রয়েছে জাতীয় চেতনায়, জাতির শ্রেষ্ঠতম সন্তানদের অন্যতম হয়ে। কে তাদের ভুলতে পারে? কার সাধ্য ভোলে জিয়াকে? প্রত্যেকে চেয়েছেন জাতিকে স্বয়ম্ভর করে গড়ে তুলতে যেন নিজেদের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যের মর্যাদা ভুলে গিয়ে অন্যের ওপর নির্ভর করতে না হয়। হেনরিক ইবসেনের কথা, এসব জাতীয় সৈনিক বিশ্বাস করতেন যে, ‘যে সংসার ঋণের ওপর নির্ভরশীল সেখানে থাকতে পারে না কোনো স্বাধীনতা, থাকে না কোনো সৌন্দর্য (There can be no freedom or beauty about a home life that depends on borrowing or debt!- A Doll's House, Act-I').
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Wednesday, January 6, 2016

সচিবালয়ের আন্দোলন ও ১৯৯৬ সালের জনতার মঞ্চ by এমাজউদ্দীন আহমদ

প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয় পর্যন্ত আন্দোলনের উত্তপ্ত ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। বেতনবৈষম্যকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সচিবালয়ের ভেতরে ও বাইরে। বিসিএসের ২৮টি ক্যাডারের মধ্যে শুধু প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ছাড়া অন্যরা বেতনবৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আন্দোলন শুরু করেছেন। এর সাথে সংশ্লিষ্ট হয়েছেন নন-ক্যাডার কর্মকর্তারাও। প্রশাসন ক্যাডার ছাড়া অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা সচিবালয়ের অভ্যন্তরে কাজ করছেন কালো ব্যাজ ধারণ করে। এই অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে দেরি হলে সরকারের কর্মকাণ্ডে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হবে। দেশে ক্যাডার ও নন-ক্যাডারভুক্ত মিলিয়ে রয়েছেন প্রায় চার লাখ ১০ হাজার কর্মকর্তা। এর মধ্যে প্রশাসন ও পররাষ্ট্র ক্যাডারে রয়েছেন প্রায় ছয় হাজারের মতো এবং নন-ক্যাডার কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় সাড়ে তিন লাখ। বেতন স্কেলে সিলেকশন গ্রেড, টাইম স্কেল পুনর্বহাল এবং ক্যাডার ও নন-ক্যাডার বৈষম্য নিরসনসহ কয়েকটি দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলছেন প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, চিকিৎসক ও অন্য ২৬টি ক্যাডারের বিসিএস কর্মকর্তারা। অন্য কথায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা ধীরে ধীরে গড়ে তুলছেন তীব্র এক আন্দোলন। সরকার এই আন্দোলন দমনের লক্ষ্যে শক্তিশালী উদ্যোগ এখনো নেয়নি। কিন্তু দমন করার কোনো বিকল্প আছে কি? এর কোনো বিকল্প নেই, তবে এর একটি অতীত আছে। এ জন্য এই আন্দোলনের যেমন রয়েছে তীব্র এক গতি, তেমনি এই আন্দোলন দমনের গরজও বড্ড বেশি। অতীতটা অনেকটা সেই কল্পকাহিনী, যা নররূপী দানব ফ্রাঙ্কেস্টাইনের মতোই। বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সেই ‘জনতার মঞ্চে’ ফেসলেস আমলাদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যককে আহ্বান করে রাজনীতির সাথে সরকারি কর্মকর্তাদের সরকারবিরোধী আন্দোলনে একাত্ম করার ‘অশুভ’ পদক্ষেপের কাহিনী।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনিক নেতৃত্বের মধ্যে যে পার্থক্য সে সম্পর্কে প্রত্যেক সচেতন নাগরিক সজ্ঞাত। নীতিনির্ধারণ করেন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তা বাস্তবায়ন করেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। রাজনৈতিক ব্যবস্থার শীর্ষে অবস্থানকারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিকনির্দেশ করেন। প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কর্মচঞ্চল থেকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। সুষ্ঠু নীতির জন্য যেসব তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা তা সংগ্রহ করেন, সমন্বয় করেন, সংরক্ষণ করেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি একান্তভাবে অনুগত থেকে সহযোগিতা করেন। রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে মানবদেহের সাথে তুলনা করলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেকটা মস্তিষ্কের মতো এবং প্রশাসন হাত, পা, নাক, কান, চোখের মতো। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রদীপের সাথে তুলনা করলে প্রশাসন অনেকটা পিলসুজের মতো। অপরিহার্য বটে, কিন্তু মুখ্য নয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ বটে; কিন্তু মৌল নিয়ামক নয়। গণতন্ত্রে প্রশাসন রাজনৈতিক নেতৃত্বের আজ্ঞাবহ মাত্র। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে প্রতিনিয়ত অধোবদন।
গণতন্ত্র এক অর্থে দলীয় শাসন। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, শাসন পরিচালনার দায়িত্ব সে দলের ওপর ন্যস্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে সে দল শাসন পরিচালনার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করে। এ দিক থেকে বলা যায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনশীল। প্রশাসন কিন্তু স্থায়িত্বের প্রতীক। স্থায়ীভাবে নিয়োজিত এবং প্রশিক্ষিত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়েও ঝড়ের মুখে স্থায়িত্বের খুঁটি হিসেবে টিকে থাকেন। মোট কথা, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং প্রশাসনের বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতি ও অবস্থান ভিন্নমুখী। একটি দৃশ্যমান, অন্যটি কিন্তু নিয়মপদ্ধতির আড়ালে ঢাকা। একটি গতিশীল অন্যটি কিন্তু রুটিনের ছকে বাঁধা। একটি জাতীয়, অন্যটি কিন্তু দাফতরিক অথবা বিভাগীয়। একটি নির্দেশ দেয়, অন্যটির দায়িত্ব হলো নির্দেশ পালন করা। একটি সৃজনশীলতায় সচকিত, অন্যটি পেশাদারিত্ব অর্জনের গৌরবে তৃপ্ত। কোনো বিচ্যুতি ঘটলে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে জবাবদিহি করার জন্য তৈরি থাকতে হয়। প্রশাসন কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের আড়ালে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকা দিতে পারে।
ভিন্ন প্রকৃতির হয়েও গণতন্ত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন এক ঘনিষ্ঠ সূত্রে আবদ্ধ। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অক্ষুণœ রেখে অথচ দু’টিকে স্বতন্ত্র অবস্থানে স্থাপন করতে হয়। দুয়ের সুষম সম্পর্ক বিনষ্ট হলে দেশের শাসন-প্রশাসনে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। গণতান্ত্রিক নর্ম বিধ্বস্ত হয়। শাসন-প্রশাসনে ষড়যন্ত্র বাসা বাঁধে। দলীয় চেতনা মুখ্য হয়ে ওঠে। কর্মকর্তাদের মধ্যে বিদ্যমান স্বাতন্ত্র্য অবলুপ্ত হয়ে সরকার এক ফ্যাসিস্ট চরিত্র ধারন করে। দেশে গণতন্ত্রের কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও ওই কাঠামোয় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে থাকে ফ্যাসিবাদী স্লোগান- এক দেশ, এক জাতি, এক দল, এক নেতা। চূড়ান্ত পর্যায়ে গণতন্ত্র ওই সমাজ থেকে নির্বাসিত হয়।
এত কথা বলা হলো এ কারণে যে, আজ বাংলাদেশের সচিবালয়ে যে আন্দোলন গতিশীল রয়েছে এবং এই আন্দোলনকে বানচাল করার জন্য সরকারের নির্মম ষড়যন্ত্র যেভাবে প্রসারিত, তার মূল নিহিত রয়েছে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণের সামনে আজকের ক্ষমতাশ্রয়ী ক্ষমতাসীনদের ‘জনতার মঞ্চে’। ক্ষমতালাভের উদগ্র কামনায় তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণার জন্য নির্মিত এই মঞ্চে আহ্বান করে ছাত্র-শিক্ষক, ব্যবহারবিদ-প্রকৌশলী, কৃষিবিদ-চিকিৎসক, শ্রমজীবী, সংস্কৃতিসেবী, বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিক, এমনকি সরকারের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিরোধী দলের অবিবেচনাপ্রসূত ডাকে সাড়া দিয়ে জনতার মঞ্চে এসে উপস্থিত হন বেশ কিছুসংখ্যক প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ‘ব্যুরোক্র্যাটিক’ নর্মকে দুমড়ে মুচড়ে, এতদিনের গড়া প্রশাসন ব্যবস্থার সব নিয়ম-নীতি ভঙ্গ করে, একেক জন খুদে রাজনীতিকের অবয়বে, লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে।
এ ক্ষেত্রে যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন পরে অতি অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষমতাসীন সরকারপ্রধানের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রশাসন ছেড়ে রাজনৈতিক নেতায় রূপান্তরিত হয়েছেন এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক- উভয় ক্ষেত্রের সুবিধা উপভোগ করে এবং (যেহেতু তিনি উভয় ক্ষেত্রের দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত) দুই দিকেই ছড়ি ঘুরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়কে দেশের প্রধান শক্তিকেন্দ্রে পরিণত করেছেন। এই শক্তিকেন্দ্রই আজ বাংলাদেশের একধরনের ভাগ্যনিয়ন্তা। দুই ক্ষেত্র থেকে যা কিছু লাভ করা সম্ভব, তা তিনি এবং ‘জনতার মঞ্চে’ আরোহণকারীরা তার সহযোগিতায় লাভ করেছেন। শক্তিমত্তার দাপটে প্রশাসনের সবাইকে ভীতসন্ত্রস্ত রেখেছেন।
আজকের বাংলাদেশে যেসব সমস্যা আজ বিষধর সাপের মতো ফণা উদ্যত করে রয়েছে, তাদের বেশির ভাগের মূল তাই চিহ্নিত করা যায় ওই ‘জনতার মঞ্চ’ নির্মাণের অর্বাচীনতায়। বিভক্ত হয়েছে সমাজ এবং সমাজের প্রায় সব শ্রেণীর পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীরা। বিভক্ত আজ প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। কোনো উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এমনটি হতে কখনো দেখা যায়নি। যে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জাতীয় দুর্যোগের দিনেও স্থায়িত্বের প্রতীক হিসেবে, সমাজে নিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে, ঝড়ের মুখেও জাতীয় স্বার্থ এবং জনস্বার্থের জাহাজটি নিরাপদে নোঙর করেছেন অতীতে, তারাও আজ বিভ্রান্তির মধ্যে। এই অবস্থা শুধু অনাকাক্সিক্ষত নয়, জাতীয় স্বার্থের পুরোপুরি পরিপন্থী।
‘জনতার মঞ্চে’র কর্মকর্তাদেরই একাংশ সচিবালয়ের সাধারণ আন্দোলনকে, তাদের রুটি-রুজির এই দাবিকে রাজনৈতিক আন্দোরন রূপে চিহ্নিত করে, স্বল্প বেতনের কর্মচারীদের জীবনে টেনে এনেছেন এক অভিশাপ। কারণ তারাও রাজনীতি ও প্রশাসনের মধ্যে বিদ্যমান পার্থক্যকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে কোনো দ্বিধা করেননি। অফিসের টাইমিং তাদেরই পরামর্শে পরিবর্তন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। ভাবখানা, উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের মতো উন্নত বাংলাদেশ সমাজে পাঁচ দিনের বেশি কাজ করবেন কেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা? কেন তাদের প্রয়োজন হবে অত বেশি অর্থের? প্রধানমন্ত্রী এসব স্বার্থান্বেষীর হাতে প্রায় বন্দী। নিজের এবং নিজের আত্মীয়-স্বজনের স্মৃতি রক্ষার্থে হাজার কোটি ব্যয় করলেও এসব ‘নিম্নস্তরের’ কর্মচারীদের জন্য কোনো ভাবনা তিনি ভাবতে পারেন না, যা তাদের প্রাপ্য। অর্থাৎ ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর দন্তনখর তারা আঁচ করুক। দেখুক, আন্দোলনে যাওয়ার মজাটা।
ক’দিন আগে একজন অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক দুঃখ করে বলেছিলেন, মাত্র দু-একজনের জন্য বাংলাদেশ ব্যুরোক্র্যাসির মূল যেভাবে শিথিল হয়েছে, ব্যুরোক্র্যাসির মর্মবাণী যেভাবে অপমানিত হয়েছে তার তুলনা নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমান এ সম্পর্কে একবার উক্তি করেছিলেন বটে; কিন্তু এই নিয়মশৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তিনি কিছুই করেননি। কোনো কোনো সময়ে সুপ্রিম কোর্ট ‘সুয়োমটো’ ব্যবস্থা গ্রহণ করলেও এমন স্বার্থপরদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়নি। অথচ ‘জনতার মঞ্চে’র ওই পদক্ষেপ দেশের রাজনীতিকে করেছে নীতিহীন এবং দরিদ্র, এবং প্রশাসনকে করেছে দায়িত্বহীন ও পক্ষপাতপূর্ণ। আইনের শাসনের কথা বলা হয়; কিন্তু আইনের শাসনে বিঘ্ন সৃষ্টিকারীদের সম্পর্কে এখনো কেউ তেমন সোচ্চার হয়ে ওঠেননি।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Thursday, December 24, 2015

বাংলাদেশ চায় রাষ্ট্রনায়ক by এমাজউদ্দীন আহমদ

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রাষ্ট্রনায়কের (Statesman), রাজনীতিকের (Politician) নয়। রাজনীতিকেরা দল ভাঙেন, রাষ্ট্রনায়কেরা দল গড়ে তোলেন, শুধু বর্তমানের জন্য নয়, ভবিষ্যৎকে সামনে রেখেও। রাজনীতিকেরা বিতর্ক সৃষ্টি করেন, রাষ্ট্রনায়কেরা কিন্তু বিতর্কিত হয়েও ভবিষ্যৎ বিতর্কের শত ছিদ্র বন্ধ করেন। রাজনীতিকেরা জাতিকে বিভক্ত করেন এবং জাতীয় বিভক্তির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সদা ব্যগ্র। রাষ্ট্রনায়ক কিন্তু জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় সঙ্কল্পবদ্ধ এবং নিজের জীবন বিপন্ন করেও জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করেন। রাজনীতিকেরা বর্তমানকেই মুখ্যজ্ঞান করে বর্তমানেই বসবাস করতে চান। রাষ্ট্রনায়ক কিন্তু বর্তমানে বসবাস করেও অতীতকে ভোলেন না এবং ভবিষ্যৎকে দৃষ্টিতে রাখেন। রাজনীতিকেরা রাজনৈতিক দলকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, রাষ্ট্রনায়ক কিন্তু রাজনৈতিক দলকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে দলের ঊর্ধ্বে যে জনগণ এবং জাতি তার প্রতিই হন অধিক আকৃষ্ট। রাজনীতিকদের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রক্ষমতাই প্রধান। এ ক্ষমতাকে তারা উপভোগ করেন তাদের প্রভাব, বৈভব ও প্রতিপত্তির মাধ্যম হিসেবে। রাষ্ট্রনায়কের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রক্ষমতা উপায় বটে, কিন্তু তা জনকল্যাণ এবং রাষ্ট্রীয় অগ্রগতির লক্ষ্যে কোনো সময়ে উপেয় নয়।
রাজনীতিকেরা বাংলাদেশে রাজনীতিকে অসুস্থ করে তুলেছেন। জাতি আজ বিভক্ত। ধনী-দরিদ্র, গ্রামবাসী-নগরবাসী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত পর্যায়ে যে বিভক্তি ছিল আজ তার ওপর এসেছে রাজনৈতিক বিভাজন। চুয়াল্লিশ বছর আগের স্বাধীনতাযুদ্ধকে কেন্দ্র করে আজো কেউ স্বাধীনতার পক্ষের, কেউ বা নতুনভাবে চিহ্নিত হচ্ছেন স্বাধীনতাবিরোধী রূপে। তা ছাড়াও শুরু হয়েছে নতুনভাবে জাতীয়তার প্রশ্নের বিভাজন। কেউ কেউ বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। কেউ প্রচার করছেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের কথা। সব মিলিয়ে জাতির একাংশ হয়েছে আওয়ামীপন্থী এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। অন্য অংশটি জাতীয়তাবাদী, বাংলাদেশী জাতীয়তায় বিশ্বাসী। এই বিভাজন এমন প্রকট হয়ে উঠেছে যে, দুই-এর মধ্যে নেই কোনো যোগসূত্র, নেই কোনো ‘হাইফেন’। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার এই যে, এই বিভাজন প্রতিদিন যেমন দৃঢ়তর হচ্ছে, তেমনি সমাজ জীবনের প্রায় প্রতি ক্ষেত্রে তা পরিব্যাপ্ত হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে, শ্রমিক সংগঠনে, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে, এমনকি প্রশাসনেও এর দীর্ঘ ছায়া সব কিছুকে মলিন করে তুলেছে। এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুধু জাতীয় ঐক্য নয়, জাতীয় অগ্রগতির গতিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং করবেও।
আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরে বাংলাদেশ অগ্রগতির কোন স্তরে উপনীত হবে, রোগব্যাধি-কুসংস্কার-দারিদ্র্যের ওপর কতটুকু বিজয় অর্জন করবে, শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রে উন্নতির স্পর্শ কতটুকু লাভ করবে এ সম্পর্কে রাজনীতিকেরা এতটুকু ভাবেননি। বাংলাদেশের জনশক্তিকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তরের কোনো চিন্তাভাবনা তাদের নেই। দক্ষিণ এশিয়ার প্রান্তসীমায় অবস্থিত প্রান্তিক বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার একটি অগ্রগামী রাষ্ট্র হিসেবে কিভাবে তারা দেখতে চান, এ বিষয়েও তাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। প্রস্তুতি নেই আগামী শতাব্দীতে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর উন্নয়ন সমারোহে কিভাবে সংশ্লিষ্ট হবে সে সম্পর্কেও। তাই বলি, বাংলাদেশ অনেক রাজনীতিক দেখেছে। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অচ্ছেদ্য গ্রন্থিতে আবদ্ধ হয়ে শ্বাসকষ্ট ভোগ করছে দীর্ঘ দিন। জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড থেকে স্বাধীনতার পতাকা ছিনিয়ে এনেছে। আপন গৌরবে সার্বভৌমত্বের আশীর্বাদ লাভ করে বিজয়তিলক কপালে পরেছে। ওইসব সঙ্কটময় মুহূর্তে রাজনীতিকেরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, এ দেশের সাদামাটা নিরক্ষর দরিদ্র জনসাধারণ তথা ছাত্র-শ্রমিকেরা তারচেয়ে কোনো অংশে কম গৌরবময় ভূমিকা পালন করেননি। রাজনীতিকদের স্বপ্ন জনগণকে যতটুকু প্রভাবিত করেছে, জনগণের অগ্রগামী পদক্ষেপ রাজনীতিকদের তার চেয়ে অনেক বেশি প্রেরণা জুগিয়েছে।
রাজনীতিকেরা ব্যক্তিস্বার্থে, কোনো কোনো সময় দলীয় স্বার্থে, এমনকি কখনো পারিবারিক স্বার্থে, রাজনীতি পরিচালনা করছেন। জনগণের কথা বলেছেন বটে, কিন্তু তাদের কর্মপ্রচেষ্টায় জনগণ কোনো দিন মুখ্য হয়ে ওঠেনি। রাজনীতি হয়নি জনকল্যাণমূলক সুসংহত উদ্যোগ। নিজেরা দলাদলি করেছেন। নিজেরা দল ভেঙেছেন। ভেঙেছেন পরের ঘরও। কখনো কিন্তু এ কারণে লজ্জায় তাদের মুখ লাল হয়ে ওঠেনি। সংসদে তারা যা বলেন এবং যেভাবে ও ভাষায় বলেন, কোনো দিন কেউ ভেবে দেখেননি যাদের জন্য এসব কথা, তারা কিভাবে তা গ্রহণ করবেন অথবা বক্তাদের সম্বন্ধে তারা কী ধারণা পোষণ করবেন। গাঁয়ের ঝগড়া গাঁয়ে মানায়। গ্রাম্য মুড়লিও গ্রামবাসীর জন্য। জাতি কিন্তু চায় উন্নতমানের বিতর্ক, সৃজনশীল ধারণার প্রকাশ। জাতি উত্তম কথা শুনতে চায়। অন্য দেশে যা ঘটে এবং যেভাবে, তার প্রতিফলন দেখতে চায় নিজেদের সমাজে। দেখতে চায় তুলনামূলক সৌকর্য, কৃতিত্বের অভিব্যক্তি, সুরুচিসম্পন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা। মেঠো বাচালতায় তারা ক্লান্ত। নিম্নমানের ঝগড়াটে কথাবার্তায় তাদের তীব্র অনীহা। কোন নেতা কখন কী স্বপ্ন দেখলেন, সে সম্পর্কে জনগণের তেমন আগ্রহ নেই। তারা আগ্রহী মানবেতর জীবন থেকে কিভাবে রেহাই পাবেন। অশিক্ষা ও নিরক্ষরতার কবল থেকে কখন তারা মুক্ত হবেন। বেকারত্বের অভিশাপ থেকে কিভাবে তারা বেরিয়ে আসবেন। এসব বিষয়ে জনগণ আগ্রহী। সম্প্রতি অনেক নেতানেত্রী একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কথা বলে থাকেন। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য সবার আগে রাজনীতিকদের চিন্তা-ভাবনা, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, রুচিশীলতা-আন্তরিকতায় আমূল পরিবর্তন সাধিত হতে হবে। যে দৈন্যদশায় এখন রাজনীতিকেরা প্রপীড়িত, তার হাত থেকে তাদের অব্যাহতি পেতে হবে। নিজেদের মান উন্নত করতে হবে তাদের। ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে, দলীয় স্বার্থকে জাতীয় স্বার্থে রূপান্তরিত করতে হবে। জাতীয় স্বার্থ কিভাবে সমুন্নত রাখতে হবে, সে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। অন্তত পঞ্চাশ বছর সামনে দৃষ্টি দিতে হবে। প্রতিটি পদক্ষেপে সে লক্ষ্য যেন বাস্তবায়ন হয় তা চিন্তায় রাখা প্রয়োজন। বিরোধী দলের অবস্থানে যা বলেছি, ক্ষমতাসীন দলে তার আর প্রয়োজন নেই- এ মানসিকতা বলদর্পীর। ক্ষমতাসীন থেকে যা করেছি, বিরোধী দলে এসে তা ভুলে যাওয়া এক ধরনের হীনম্মন্যতা। দুই-এর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করাই রাষ্ট্রনায়কোচিত কাজ। বাংলাদেশে এখন তাই প্রয়োজন রাষ্ট্রনায়কের। রাজনীতিকেরা রাষ্ট্রনায়কোচিত গুণে বিভূষিত না হলে শুকনো পাতার মতো তারা ঝরে পড়বেন বাংলাদেশ রাজনীতির আধমরা গাছ থেকে। তারা তখন এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলার জন্য কাউকে পাবেন না। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাস তা-ই বলে।
রাষ্ট্রনায়ক মাটিতে অবস্থান গ্রহণ করেও আকাশচারণ করেন। বর্তমানকে অবহেলা না করেও ভবিষ্যৎ দর্শন করেন। অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করেন। অনেকটা ওয়ার্ডসওয়ার্থের (Wordsworth) ভরত পাখির (Skylark) মতো, পা রয়েছে মাটিতে, কিন্তু অপূর্ব সুরের ঝঙ্কারে আকাশ-বাতাস মুখরিত করছে। দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত থেকেও সমগ্র জাতিকে আহ্বান করছেন ভবিষ্যতের স্বপ্নসাধ মেটানোর জন্য। জাতীয় ধী এবং মনীষার সৌধ নির্মাণে। সব সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের চিরন্তন বাণী নিয়ে সবার মনে সৃষ্টিশীল প্রয়াসের ঐকতান সৃষ্টি করতে। প্রতিহিংসার স্পৃহা ত্যাগ করে আকাশের উদারতায় সবাইকে জাতীয় প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগের আহ্বান। এটি রাজনীতিকদের নয়, রাষ্ট্রনায়কের ভাষা। আজ বাংলাদেশে তাই প্রয়োজন রাষ্ট্রনায়কের। সঙ্কীর্ণমনা, হিংসুটে, প্রতিহিংসাপরায়ণ, ঝগড়াটে, স্থূলবুদ্ধির রাজনীতিকের নয়। বাংলাদেশ চায় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, উদার হৃদয় বিচক্ষণ রাষ্ট্রনায়ক, কোন্দলপ্রিয় রাজনীতিক নয়।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Thursday, December 17, 2015

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন by এমাজউদ্দীন আহমদ

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং অধিকার সংরক্ষণের জন্য যদি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়ে থাকে তাহলে বিচার বিভাগ হলো এর যথার্থতার মাপকাঠি। ব্রিটেনের সংবিধান বিশেষজ্ঞ লর্ড ব্রাইস (Bryce) বলেছেন, ‘কোনো জাতি রাজনৈতিক অগ্রগতির কোন স্তরে রয়েছে, তা নির্ণয় করার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো নাগরিকদের পরস্পরের মধ্যে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নাগরিকদের মধ্যে বিচারব্যবস্থা কতটুকু ন্যায়ানুগ ও আইনানুগ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তা বিচার করে দেখা। বলা হয়, আইন পরিষদ না থাকলেও রাষ্ট্র চলতে পারে, কেননা আইন পরিষদ ছাড়া আইনের অন্যান্য উৎস রয়েছে। আইন প্রথাভিত্তিকও হতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগ ছাড়া কোনো সুসংগঠিত সমাজ হতে পারে না। বিচার বিভাগ ছাড়া রাষ্ট্র অনেকটা ‘মাৎস্যন্যায়ের’ মতো, যেখানে বলপ্রয়োগই একমাত্র আইন। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আইনবিশারদ রউল (Rawle) বলেছেন, ‘বিচার বিভাগ অপরিহার্য, কেননা তার মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যায়ের শাস্তি বিধান করা হয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। নির্দোষ ব্যক্তিগণকে অন্যের হস্তক্ষেপ ও অন্যায় থেকে রক্ষা করা যায়।’
এসব যুক্তির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংগঠিত হয়েছে আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করার প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের সমন্বয়ে এবং প্রাচীনকাল থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে। সরকারের শ্রেণিবিভাগে ‘আইনভিত্তিক সরকার’ (The Government of Laws) এবং ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরকার’ (The Government of Men)-এর মধ্যে যে পার্থক্য অ্যারিস্টটল তার Politics গ্রন্থের তৃতীয় বিভাগে উল্লেখ করেছেন, তা-ও এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। তাই বিচার বিভাগ হচ্ছে সরকারের এক অপরিহার্য অঙ্গ।
কিন্তু বিচার বিভাগকে তার ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হলে সরকারের জন্য দু’টি বিভাগ- আইন পরিষদ ও নির্বাহী কর্তৃত্ব থেকে শুধু স্বতন্ত্র হলেই চলবে না, স্বাধীনও হতে হবে; যেন তা আইন প্রণেতা এবং নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রভাবমুক্ত হয়ে শুধু আইনের নিরিখে বিচারকেরা বিচার্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং আইন হলো অ্যারিস্টটলের কথায় ‘এক আবেগমুক্ত যুক্তি’। এই আবেগহীন যুক্তিকে পুরোপুরি ধারণ করতে হলে বিচারকদের শুধু নির্মোহ হলেই চলবে না, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তারা যেন কারো ওপর নির্ভরশীল না হন, কারো অনুরাগ অথবা বিরাগের পাত্র হিসেবে পিচ্ছিল পথে চলতে বাধ্য না হন তা নিশ্চিত হতে হবে এবং তা হতে হবে রাষ্ট্রের মাধ্যমে। তাই যুগে যুগে সরকারের তিনটি বিভাগ পৃথক করা এবং তাদের স্বতন্ত্র কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করা হয়েছে হাজার হাজার মঞ্চ থেকে।
ফেডারালিস্ট পেপার ৫১ (Federalist 51)-তে জেমস ম্যাডিসেন যা লিখেছিলেন তা উল্লেখযোগ্য। তার মতে, জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সরকারের ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারিত হতে হবে এবং সরকার যেন তার ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে তারও রক্ষাকবচ থাকতে হবে। মানুষ যে স্বার্থপর এবং ক্ষমতালোভী, সুযোগ পেলেই যে একজন অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে এবং এ কারণেই যে সরকারের উৎপত্তি হয়েছে তা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে সরকারও সুযোগ পেলে নাগরিকদের অধিকারে অবলীলাক্রমে হস্তক্ষেপ করবে। তার নিজের কথায়, ‘মানুষ যদি দেবদূত হতো তাহলে কোনো সরকারের প্রয়োজন হতো না। যদি দেবদূতরা শাসনকাজে নিয়োজিত থাকতেন, তাহলে সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতো না। মানুষের ওপর মানুষের শাসন পরিচালনার জন্য গঠিত সরকারব্যবস্থার এই হলো সবচেয়ে বড় অসুবিধা। শাসিতদের ওপর শাসকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সবার আগে করতে হবে এবং এর পরপরই সরকারকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা ফাউন্ডিং ফাদার আলেকজান্ডার হ্যামিলটন জেমস ম্যাডিসন থেকে আরো জোরেশোরে ফেডারালিস্ট পেপার-৭৮-এ (Federalist 78) লিখেছেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের দুষ্কর্ম অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী প্রভাবশালীদের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের মুখে সংবিধান এবং জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য বিচারকদের স্বাধীনতাই হলো প্রকৃষ্ট রক্ষাকবচ।’
শুধু তখন কেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করে চলেছেন। ১৯৫৫ সালে American Political Science Review-APSR(49)-এ প্রকাশিত ‘Judicial Self Restraint’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে জন রচে (John P. Roche) লিখেছেন- ‘জনগণকে জনগণের কাছ থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার অভিভাবকত্ব ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান উপযোগী নয়, কেননা এটি দেশে আইনের শাসনের অঙ্গীকারে নিবেদিতপ্রাণ’। তিনি এখানেই থামেননি। তার কথায় ‘রাষ্ট্রদেহে সত্যের রস সঞ্চারের প্রশ্নাতীতভাবে সবচেয়ে বড় ভরসা হলো যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর আস্থা।’
উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে ব্রিটেনের খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞ এভি ডাইসি (AV Dicey) তার খধি Law of the Constitution (1885) গ্রন্থে যেভাবে তিনি ব্রিটেনে আইনের শাসনের ব্যাখ্যা দিলেন তাতে বিচার বিভাগের শ্র্রেষ্ঠত্বকে প্রায় আকাশচুম্বী করে তোলেন। তার মতে, জনগণের অধিকার কোনো সাংবিধানিক আইন থেকে উদ্ভূত নয়; বরং গণ-অধিকারের ভিত্তিতেই সাংবিধানিক আইন রচিত হয়েছে। অন্য কথায়, ডাইসির কথায়, অন্যান্য দেশে জনগণের অধিকারের রক্ষাকবচ যেমন সংবিধানে বিধিবদ্ধ আইন, ব্রিটেনে কিন্তু বিভিন্ন আদালতের রায়ে সুনির্দিষ্ট, সুনির্ধারিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারগুলোই সাংবিধানিক আইনে রূপান্তরিত হয়েছে। ব্রিটেনের সাধারণ আদালতের সিদ্ধান্তে নাগরিকদের অধিকারের সনদ রচিত হয়েছে। সুতরাং ব্রিটেনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ভিত্তিতেই নাগরিকদের অধিকারমালা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই এখানে অধিকার রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো দাবি নেই। দাবি করার আগেই তা প্রতিষ্ঠিত, অনেকটা স্বতঃসিদ্ধের মতোই। অনেকটা সুসভ্য জীবনব্যবস্থার মৌল উপাদান রূপেই, উন্নততর রাজনৈতিক সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ফল হিসেবে।
সংবিধান গণ-অধিকারের মূল নয়, বরং গণ-অধিকারই সংবিধানের মূল এবং তা সাধারণ আদালতেরই সৃষ্টি। কিন্তু বাংলাদেশে বিচার বিভাগের এই দুরবস্থা কেন? স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পরও কেন বাংলাদেশের জনগণকে আজো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মিটিং-মিছিল করতে হয়? কেন এখনো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবিতে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে হয়? এ দেশে বুদ্ধিজীবীরা জানেন, পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত সার্থক যেকোনো গণ-আন্দোলনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সব সময় উত্থাপিত হয়েছে। প্রত্যেকের মনে রয়েছে, ১৯৫৪ সালের ২১ দফা দাবিনামার ১৫তম দাবিটি ছিল প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে ১১ দফা দাবি উত্থাপিত হয়, এর নবম ও ১১তম দফায় ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি। এরও আগে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষাপটে ১৯৫৬ সাল ও ১৯৬২ সালের পাকিস্তানের সংবিধানে বিচার বিভাগ আলাদা করার প্রস্তাব স্থান পায়।
এক রক্তের নদী সাঁতরে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা চিনিয়ে আনলে নতুন সংবিধানে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য অনুচ্ছেদে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের সময়ও তিনদলীয় জোটের যে ক’টি ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশে স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কিত বক্তব্য। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধন আইনেও এই প্রস্তাবটি স্থান পেয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই জনপদে যে ক’টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নির্ভুলভাবে এ দাবিটি স্থান পেয়ে এসেছে যে, বাংলাদেশে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হবে। এর পরও এই এলাকা আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল না এখনো। এর পরও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে বিভ্রান্তির কোনো অবসান হলো না। বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে পৃথক করা হলো না।
শুধু বাংলাদেশে নয়, বিদেশেও বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে প্রচুর হতাশা। বার্লিন-ভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বাংলাদেশের বিচার প্রার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যক ব্যক্তিকে বিচার কিনতে হয়। অর্থ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকলে কর্মকর্তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহের প্রকাশ ঘটে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এই বক্তব্য অবশ্য বাংলাদেশের বিচার বিভাগের নি¤œ পর্যায় সম্পর্কে। এত ঘন অন্ধকারের মধ্যেও কিন্তু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট জ্বালিয়ে রেখেছে গণমনে আস্থা ও বিশ্বাসের উজ্জ্বল এক দীপশিখা। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত ‘কান্ট্রি রিপোর্ট’গুলোতে রয়েছে এর উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ১৯৯৯ সালের কান্ট্রি রিপোর্টে লিখিত হয়েছে, ‘বিচার বিভাগের উচ্চতর পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বাধীনতা পরিলক্ষিত হলেও এবং এই পর্যায় থেকে ফৌজদারি, সিভিল, এমনকি বিতর্কিত রাজনৈতিক মামলায় বিচার বিভাগ সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিলেও নি¤œপর্যায়ের আদালতগুলো এখনো রয়েছে নির্বাহী বিভাগের চাপের মুখে। আইনগত প্রক্রিয়া দুর্নীতিপূর্ণ, বিশেষ করে নি¤œপর্যায়ে।’
এ দেশের বড় দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যে শীর্ষ পর্যায় হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে রয়েছে তার বিরুদ্ধেও রচিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের কালো কুণ্ডলি। বিষধর সর্প যেন নতুনভাবে ফণা উদ্যত করেছে বিচার বিভাগের শীর্ষের বিরুদ্ধে। নি¤œস্তর তো এরই মধ্যে দুর্নীতি ও নির্বাহী কর্তৃত্বের করালগ্রাসের মধ্যে এসে গেছে, যা এখনো দেশের বিচার প্রার্থীদের শেষ ভরসাস্থল তাও বুঝি নিঃশেষ হয়। ক’বছর আগে, সাধারণ উত্তেজিত জনতা কর্তৃক নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের বেশ ক’জন মন্ত্রী ও দলীয় নেতার নেতৃত্বে পল্টন ময়দান থেকে লাঠি উঁচিয়ে, মাথায় ও গলায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে যে মিছিলের আয়োজন হয়, তা কি কোনো সাময়িক উত্তেজনার ফল? প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফিরে এসে ওই মিছিলের পক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য দেন, তা কি কোনো অশনিসঙ্কেত? এই নিবন্ধে তার বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।
দুই.
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাস মোটেই উজ্জ্বল নয়। অনল কুণ্ড থেকে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার রক্তরঞ্জিত পতাকা ছিনিয়ে আনে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে প্রবর্তিত হবে আইনের শাসন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানে কারণে-অকারণে সরকার যেভাবে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, বাংলাদেশে তার অবসান ঘটবে। তাই ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয়, ১৬ ডিসেম্বর থেকে যা কার্যকর হয়, সেই সংবিধান জনগণের ২২টি মৌলিক অধিকার স্বীকার করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগকে মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার ক্ষমতা দিয়ে এবং সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কোনো ব্যবস্থা না রেখে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মনে হয়েছিল, জনগণের প্রত্যাশা এত দিন পরে বুঝি পূর্ণ হলো। কিন্তু না, সে অবস্থা বেশি দিন টেকেনি। বাংলাদেশ সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাত্র ৯ মাস সাত দিন পরে, ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, জাতীয় সংসদ সংবিধান (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন প্রণয়ন করে নির্বাহী বিভাগের হাতে মৌলিক অধিকারপরিপন্থী ক্ষমতা অর্পণ করে। সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদকে বিনা বিচারে আটক রাখা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা দেয়া হয় এই সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে এই সংশোধনী আইন সংযোজিত হওয়ার মাত্র চার মাস ১০ দিনের মধ্যেই ১৯৭৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণীত হয়, যা এখনো বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে কুখ্যাত কালাকানুন রূপে। সংবিধানের (দ্বিতীয় সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা দেয়া হয়। জরুরি অবস্থা জারি করা হলে নাগরিকদের ছয়টি মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ছয়টি মৌলিক অধিকার হলো চলাফেলার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা, পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হলো এসব অধিকার। জরুরি অবস্থায় যেকোনো মৌলিক অধিকার বলবৎ করার লক্ষ্যে আদালতে মামলা করার অধিকার স্থগিত করার ক্ষমতাও দেয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার এক বছর তিন মাস পরে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বরে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক জীবন বিপদের মুখোমুখি হয়েছে, এই অজুহাতে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
জরুরি অবস্থা কার্যকর থাকাকালেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন প্রণয়ন করে বাংলাদেশ থেকে সংসদীয় ব্যবস্থাকে নির্বাসন দিয়ে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি সরকার প্রবর্তন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলোর যেকোনো একটিকে কার্যকর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতিকে একটি মাত্র ‘জাতীয় দল’ গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয় এবং বিধান থাকে যে, জাতীয় দল গঠিত হলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অবস্থা অব্যাহত তাকে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে পর্যন্ত। ২৮ মে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশের ফলে সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের যে স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে এখতিয়ার কেড়ে নেয়া হয়, তা সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং এর পাঁচ মাস পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের কুপ্রভাব সম্পর্কে অষ্টম সংশোধনীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় ঘোষণা করেছিলেন সেই রায়ে তখনকার অন্যতম বিচারপতি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) বাংলাদেশ সংবিধানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন সব পরিবর্তন আনে, যা তার মৌল কাঠামো পর্যন্ত পাল্টে দেয়। বহুদল-ভিত্তিক সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার রাতারাতি পাল্টে সৃষ্টি করা হয় একদল-ভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। সংগঠনের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। সরকারি দল ছাড়া অন্যান্য সব দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। জনগণের নির্বাচিত সত্ত্বেও জাতীয় সংসদের যেসব সদস্য এই সরকারি দলে যোগ দেননি তাদের আসন শূন্য হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করা হয়।’
এই সংশোধনী আইনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিভাবে ক্ষুণ করা হয় তার বিবরণ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘প্রধান নির্বাহীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর বিচারপতিদের অপসারণ নির্ভরশীল করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কমানো হয়।’ অধস্তন আদালতগুলোর ওপর সুপ্রিম কোর্টের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বিলোপ ঘটিয়ে, তা সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে ন্যস্ত করা হয় সরকারের ওপর। এসব পরিবর্তন এত মারাত্মক এবং তাৎক্ষণিক ছিল যে, স্বাধীনতার বন্ধুরা হন বিভক্ত। স্বাধীনতার শত্রুরা প্রতিশোধ নিলেন। সমালোচকেরা উচ্ছ্বাস ভরে বললেন, ‘গণতন্ত্রের এই বিনাশ সাধনের প্রক্রিয়া একই, তা সে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়েই হোক আর সামরিক অভ্যুত্থানের মতো পদ্ধতিতেই হোক।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তার পূর্বতন অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো দু-চারটি পদক্ষেপ নেয়া হয় মাত্র। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে রাষ্ট্রপতি সায়েম তার দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশে চতুর্থ সংশোধনী আইনে সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তা পুনঃস্থাপিত হয়। তা ছাড়া চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে যেখানে বলা হয়েছিলÑ ‘বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরীকরণসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ব্যস্ত থাকিবে’, সে ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালে গৃহীত সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে ‘ন্যস্ত থাকিবে’ শব্দ দু’টির পরে সংযোজিত হয় ‘এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে’। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে কিন্তু ব্যবস্থা ছিল সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় পদে অথবা বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশ ও পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তারা নিযুক্ত হবেন। চতুর্থ সংশোধনী আইনের বিষক্রিয়া বিচার বিভাগের ওপর এতই মারাত্মক ছিল যে, আজো এতগুলো সংশোধনীর পরও বিচার বিভাগ তার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরে পায়নি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে জোরেশোরে বিঘোষিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৫ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ ছিল তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হাজার হাজার যোজন দূরে ঠেলে ফেলে বরং নির্বাহী বিভাগের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই অবস্থার আংশিক পরিবর্তন এসেছিল বটে, কিন্তু স্বাধীনতার কাছাকাছি তা আসেনি।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Tuesday, December 15, 2015

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন by এমাজউদ্দীন আহমদ

এক. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং অধিকার সংরক্ষণের জন্য যদি রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়ে থাকে তাহলে বিচার বিভাগ হলো এর যথার্থতার মাপকাঠি। ব্রিটেনের সংবিধান বিশেষজ্ঞ লর্ড ব্রাইস (Bryce) বলেছেন, ‘কোনো জাতি রাজনৈতিক অগ্রগতির কোন স্তরে রয়েছে, তা নির্ণয় করার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো নাগরিকদের পরস্পরের মধ্যে এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নাগরিকদের মধ্যে বিচারব্যবস্থা কতটুকু ন্যায়ানুগ ও আইনানুগ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে তা বিচার করে দেখা। বলা হয়, আইন পরিষদ না থাকলেও রাষ্ট্র চলতে পারে, কেননা আইন পরিষদ ছাড়া আইনের অন্যান্য উৎস রয়েছে। আইন প্রথাভিত্তিকও হতে পারে। কিন্তু বিচার বিভাগ ছাড়া কোনো সুসংগঠিত সমাজ হতে পারে না। বিচার বিভাগ ছাড়া রাষ্ট্র অনেকটা ‘মাৎস্যন্যায়ের’ মতো, যেখানে বলপ্রয়োগই একমাত্র আইন। এসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আইনবিশারদ রউল (Rawle) বলেছেন, ‘বিচার বিভাগ অপরিহার্য, কেননা তার মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। অন্যায়ের শাস্তি বিধান করা হয়। ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়। নির্দোষ ব্যক্তিগণকে অন্যের হস্তক্ষেপ ও অন্যায় থেকে রক্ষা করা যায়।’
এসব যুক্তির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংগঠিত হয়েছে আইন প্রণয়ন, আইন প্রয়োগ এবং বিচারকার্য সম্পন্ন করার প্রাতিষ্ঠানিক কর্তৃত্বের সমন্বয়ে এবং প্রাচীনকাল থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে। সরকারের শ্রেণিবিভাগে ‘আইনভিত্তিক সরকার’ (The Government of Laws) এবং ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক সরকার’ (The Government of Men)-এর মধ্যে যে পার্থক্য অ্যারিস্টটল তার Politics গ্রন্থের তৃতীয় বিভাগে উল্লেখ করেছেন, তা-ও এই প্রেক্ষাপটে তাৎপর্যপূর্ণ। তাই বিচার বিভাগ হচ্ছে সরকারের এক অপরিহার্য অঙ্গ।
কিন্তু বিচার বিভাগকে তার ব্যক্তিত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হলে সরকারের জন্য দু’টি বিভাগ- আইন পরিষদ ও নির্বাহী কর্তৃত্ব থেকে শুধু স্বতন্ত্র হলেই চলবে না, স্বাধীনও হতে হবে; যেন তা আইন প্রণেতা এবং নির্বাহী কর্তৃত্বের প্রভাবমুক্ত হয়ে শুধু আইনের নিরিখে বিচারকেরা বিচার্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং আইন হলো অ্যারিস্টটলের কথায় ‘এক আবেগমুক্ত যুক্তি’। এই আবেগহীন যুক্তিকে পুরোপুরি ধারণ করতে হলে বিচারকদের শুধু নির্মোহ হলেই চলবে না, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তারা যেন কারো ওপর নির্ভরশীল না হন, কারো অনুরাগ অথবা বিরাগের পাত্র হিসেবে পিচ্ছিল পথে চলতে বাধ্য না হন তা নিশ্চিত হতে হবে এবং তা হতে হবে রাষ্ট্রের মাধ্যমে। তাই যুগে যুগে সরকারের তিনটি বিভাগ পৃথক করা এবং তাদের স্বতন্ত্র কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া হয়েছে, বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা ঘোষণা করা হয়েছে হাজার হাজার মঞ্চ থেকে।
ফেডারালিস্ট পেপার ৫১ (Federalist 51)-তে জেমস ম্যাডিসেন যা লিখেছিলেন তা উল্লেখযোগ্য। তার মতে, জনগণের অধিকার সংরক্ষণের জন্য সরকারের ক্ষমতার সীমারেখা নির্ধারিত হতে হবে এবং সরকার যেন তার ক্ষমতার অপব্যবহার না করতে পারে তারও রক্ষাকবচ থাকতে হবে। মানুষ যে স্বার্থপর এবং ক্ষমতালোভী, সুযোগ পেলেই যে একজন অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে এবং এ কারণেই যে সরকারের উৎপত্তি হয়েছে তা যেমন সত্য, তেমনি সত্য যে সরকারও সুযোগ পেলে নাগরিকদের অধিকারে অবলীলাক্রমে হস্তক্ষেপ করবে। তার নিজের কথায়, ‘মানুষ যদি দেবদূত হতো তাহলে কোনো সরকারের প্রয়োজন হতো না। যদি দেবদূতরা শাসনকাজে নিয়োজিত থাকতেন, তাহলে সরকারের ওপর অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক কোনো নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হতো না। মানুষের ওপর মানুষের শাসন পরিচালনার জন্য গঠিত সরকারব্যবস্থার এই হলো সবচেয়ে বড় অসুবিধা। শাসিতদের ওপর শাসকদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সবার আগে করতে হবে এবং এর পরপরই সরকারকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তথা ফাউন্ডিং ফাদার আলেকজান্ডার হ্যামিলটন জেমস ম্যাডিসন থেকে আরো জোরেশোরে ফেডারালিস্ট পেপার-৭৮-এ (Federalist 78) লিখেছেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীদের দুষ্কর্ম অথবা বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী প্রভাবশালীদের বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারের মুখে সংবিধান এবং জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য বিচারকদের স্বাধীনতাই হলো প্রকৃষ্ট রক্ষাকবচ।’
শুধু তখন কেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করে চলেছেন। ১৯৫৫ সালে American Political Science Review-APSR(49)-এ প্রকাশিত ‘Judicial Self Restraint’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে জন রচে (John P. Roche) লিখেছেন- ‘জনগণকে জনগণের কাছ থেকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বিচারব্যবস্থার অভিভাবকত্ব ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান উপযোগী নয়, কেননা এটি দেশে আইনের শাসনের অঙ্গীকারে নিবেদিতপ্রাণ’। তিনি এখানেই থামেননি। তার কথায় ‘রাষ্ট্রদেহে সত্যের রস সঞ্চারের প্রশ্নাতীতভাবে সবচেয়ে বড় ভরসা হলো যুক্তরাষ্ট্রীয় আদালত, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের ওপর আস্থা।’
উনিশ শতকের শেষপ্রান্তে ব্রিটেনের খ্যাতনামা সংবিধান বিশেষজ্ঞ এভি ডাইসি (AV Dicey) তার খধি Law of the Constitution (1885) গ্রন্থে যেভাবে তিনি ব্রিটেনে আইনের শাসনের ব্যাখ্যা দিলেন তাতে বিচার বিভাগের শ্র্রেষ্ঠত্বকে প্রায় আকাশচুম্বী করে তোলেন। তার মতে, জনগণের অধিকার কোনো সাংবিধানিক আইন থেকে উদ্ভূত নয়; বরং গণ-অধিকারের ভিত্তিতেই সাংবিধানিক আইন রচিত হয়েছে। অন্য কথায়, ডাইসির কথায়, অন্যান্য দেশে জনগণের অধিকারের রক্ষাকবচ যেমন সংবিধানে বিধিবদ্ধ আইন, ব্রিটেনে কিন্তু বিভিন্ন আদালতের রায়ে সুনির্দিষ্ট, সুনির্ধারিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারগুলোই সাংবিধানিক আইনে রূপান্তরিত হয়েছে। ব্রিটেনের সাধারণ আদালতের সিদ্ধান্তে নাগরিকদের অধিকারের সনদ রচিত হয়েছে। সুতরাং ব্রিটেনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ভিত্তিতেই নাগরিকদের অধিকারমালা সুপ্রতিষ্ঠিত। তাই এখানে অধিকার রক্ষার জন্য বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো দাবি নেই। দাবি করার আগেই তা প্রতিষ্ঠিত, অনেকটা স্বতঃসিদ্ধের মতোই। অনেকটা সুসভ্য জীবনব্যবস্থার মৌল উপাদান রূপেই, উন্নততর রাজনৈতিক সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ ফল হিসেবে।
সংবিধান গণ-অধিকারের মূল নয়, বরং গণ-অধিকারই সংবিধানের মূল এবং তা সাধারণ আদালতেরই সৃষ্টি। কিন্তু বাংলাদেশে বিচার বিভাগের এই দুরবস্থা কেন? স্বাধীনতার প্রায় তিন দশক পরও কেন বাংলাদেশের জনগণকে আজো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য মিটিং-মিছিল করতে হয়? কেন এখনো বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবিতে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে হয়? এ দেশে বুদ্ধিজীবীরা জানেন, পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত সার্থক যেকোনো গণ-আন্দোলনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সব সময় উত্থাপিত হয়েছে। প্রত্যেকের মনে রয়েছে, ১৯৫৪ সালের ২১ দফা দাবিনামার ১৫তম দাবিটি ছিল প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে ১১ দফা দাবি উত্থাপিত হয়, এর নবম ও ১১তম দফায় ছিল স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি। এরও আগে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দাবির প্রেক্ষাপটে ১৯৫৬ সাল ও ১৯৬২ সালের পাকিস্তানের সংবিধানে বিচার বিভাগ আলাদা করার প্রস্তাব স্থান পায়।
এক রক্তের নদী সাঁতরে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা চিনিয়ে আনলে নতুন সংবিধানে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল সংবিধানের ১১৫ ও ১১৬ অনুচ্ছেদসহ অন্যান্য অনুচ্ছেদে। নব্বইয়ের গণ-আন্দোলনের সময়ও তিনদলীয় জোটের যে ক’টি ক্ষেত্রে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বাংলাদেশে স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্পর্কিত বক্তব্য। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধন আইনেও এই প্রস্তাবটি স্থান পেয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই জনপদে যে ক’টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে নির্ভুলভাবে এ দাবিটি স্থান পেয়ে এসেছে যে, বাংলাদেশে বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন হবে। এর পরও এই এলাকা আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠল না এখনো। এর পরও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে বিভ্রান্তির কোনো অবসান হলো না। বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে পৃথক করা হলো না।
শুধু বাংলাদেশে নয়, বিদেশেও বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকাশিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে প্রচুর হতাশা। বার্লিন-ভিত্তিক ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল এক প্রতিবেদনে বলেছে, ‘বাংলাদেশের বিচার প্রার্থীদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যক ব্যক্তিকে বিচার কিনতে হয়। অর্থ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকলে কর্মকর্তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহের প্রকাশ ঘটে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের এই বক্তব্য অবশ্য বাংলাদেশের বিচার বিভাগের নি¤œ পর্যায় সম্পর্কে। এত ঘন অন্ধকারের মধ্যেও কিন্তু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার শীর্ষ পর্যায়, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট জ্বালিয়ে রেখেছে গণমনে আস্থা ও বিশ্বাসের উজ্জ্বল এক দীপশিখা। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রকাশিত ‘কান্ট্রি রিপোর্ট’গুলোতে রয়েছে এর উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ১৯৯৯ সালের কান্ট্রি রিপোর্টে লিখিত হয়েছে, ‘বিচার বিভাগের উচ্চতর পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বাধীনতা পরিলক্ষিত হলেও এবং এই পর্যায় থেকে ফৌজদারি, সিভিল, এমনকি বিতর্কিত রাজনৈতিক মামলায় বিচার বিভাগ সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিলেও নি¤œপর্যায়ের আদালতগুলো এখনো রয়েছে নির্বাহী বিভাগের চাপের মুখে। আইনগত প্রক্রিয়া দুর্নীতিপূর্ণ, বিশেষ করে নি¤œপর্যায়ে।’
এ দেশের বড় দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের যে শীর্ষ পর্যায় হাজারো প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মাথা উঁচু করে রয়েছে তার বিরুদ্ধেও রচিত হচ্ছে ষড়যন্ত্রের কালো কুণ্ডলি। বিষধর সর্প যেন নতুনভাবে ফণা উদ্যত করেছে বিচার বিভাগের শীর্ষের বিরুদ্ধে। নি¤œস্তর তো এরই মধ্যে দুর্নীতি ও নির্বাহী কর্তৃত্বের করালগ্রাসের মধ্যে এসে গেছে, যা এখনো দেশের বিচার প্রার্থীদের শেষ ভরসাস্থল তাও বুঝি নিঃশেষ হয়। ক’বছর আগে, সাধারণ উত্তেজিত জনতা কর্তৃক নয়, বরং ক্ষমতাসীন দলের বেশ ক’জন মন্ত্রী ও দলীয় নেতার নেতৃত্বে পল্টন ময়দান থেকে লাঠি উঁচিয়ে, মাথায় ও গলায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে যে মিছিলের আয়োজন হয়, তা কি কোনো সাময়িক উত্তেজনার ফল? প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফিরে এসে ওই মিছিলের পক্ষ সমর্থন করে যে বক্তব্য দেন, তা কি কোনো অশনিসঙ্কেত? এই নিবন্ধে তার বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে।
দুই.
বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ইতিহাস মোটেই উজ্জ্বল নয়। অনল কুণ্ড থেকে বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতার রক্তরঞ্জিত পতাকা ছিনিয়ে আনে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে প্রবর্তিত হবে আইনের শাসন। স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানে কারণে-অকারণে সরকার যেভাবে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, বাংলাদেশে তার অবসান ঘটবে। তাই ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের যে সংবিধান রচিত হয়, ১৬ ডিসেম্বর থেকে যা কার্যকর হয়, সেই সংবিধান জনগণের ২২টি মৌলিক অধিকার স্বীকার করে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগকে মৌলিক অধিকারগুলো বলবৎ করার ক্ষমতা দিয়ে এবং সংবিধানে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কোনো ব্যবস্থা না রেখে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। মনে হয়েছিল, জনগণের প্রত্যাশা এত দিন পরে বুঝি পূর্ণ হলো। কিন্তু না, সে অবস্থা বেশি দিন টেকেনি। বাংলাদেশ সংবিধান কার্যকর হওয়ার মাত্র ৯ মাস সাত দিন পরে, ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর, জাতীয় সংসদ সংবিধান (দ্বিতীয় সংশোধন) আইন প্রণয়ন করে নির্বাহী বিভাগের হাতে মৌলিক অধিকারপরিপন্থী ক্ষমতা অর্পণ করে। সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদকে বিনা বিচারে আটক রাখা সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা দেয়া হয় এই সংশোধনী আইনের মাধ্যমে সংবিধানে এই সংশোধনী আইন সংযোজিত হওয়ার মাত্র চার মাস ১০ দিনের মধ্যেই ১৯৭৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন প্রণীত হয়, যা এখনো বাংলাদেশে বিদ্যমান রয়েছে কুখ্যাত কালাকানুন রূপে। সংবিধানের (দ্বিতীয় সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে যুদ্ধ বা বহিরাক্রমণ বা অভ্যন্তরীণ গোলযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক জীবন বিপন্ন হলে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে প্রেসিডেন্টকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার ক্ষমতা দেয়া হয়। জরুরি অবস্থা জারি করা হলে নাগরিকদের ছয়টি মৌলিক অধিকার স্থগিত করার বিধান সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ছয়টি মৌলিক অধিকার হলো চলাফেলার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের অধিকার, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা ও বাকস্বাধীনতা, পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা এবং সম্পত্তির অধিকার। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি হলো এসব অধিকার। জরুরি অবস্থায় যেকোনো মৌলিক অধিকার বলবৎ করার লক্ষ্যে আদালতে মামলা করার অধিকার স্থগিত করার ক্ষমতাও দেয়া হয় রাষ্ট্রপতিকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা সংক্রান্ত বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার এক বছর তিন মাস পরে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বরে অভ্যন্তরীণ গোলযোগের ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক জীবন বিপদের মুখোমুখি হয়েছে, এই অজুহাতে বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
জরুরি অবস্থা কার্যকর থাকাকালেই ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইন প্রণয়ন করে বাংলাদেশ থেকে সংসদীয় ব্যবস্থাকে নির্বাসন দিয়ে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি সরকার প্রবর্তন করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে খর্ব করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। রাষ্ট্রীয় মূলনীতিগুলোর যেকোনো একটিকে কার্যকর করার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতিকে একটি মাত্র ‘জাতীয় দল’ গঠনের ক্ষমতা দেয়া হয় এবং বিধান থাকে যে, জাতীয় দল গঠিত হলে দেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দল আপনাআপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এই অবস্থা অব্যাহত তাকে ১৯৭৬ সালের ২৮ মে পর্যন্ত। ২৮ মে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশের ফলে সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে বিচার বিভাগের যে স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে এখতিয়ার কেড়ে নেয়া হয়, তা সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তৃতীয় ঘোষণাপত্র অনুযায়ী মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং এর পাঁচ মাস পরে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিলে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং মৌলিক অধিকার বলবৎ করার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) আইনের কুপ্রভাব সম্পর্কে অষ্টম সংশোধনীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ যে রায় ঘোষণা করেছিলেন সেই রায়ে তখনকার অন্যতম বিচারপতি, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারির সংবিধান (চতুর্থ সংশোধনী) বাংলাদেশ সংবিধানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন সব পরিবর্তন আনে, যা তার মৌল কাঠামো পর্যন্ত পাল্টে দেয়। বহুদল-ভিত্তিক সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার রাতারাতি পাল্টে সৃষ্টি করা হয় একদল-ভিত্তিক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার। সংগঠনের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। সরকারি দল ছাড়া অন্যান্য সব দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। জনগণের নির্বাচিত সত্ত্বেও জাতীয় সংসদের যেসব সদস্য এই সরকারি দলে যোগ দেননি তাদের আসন শূন্য হয়। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করা হয়।’
এই সংশোধনী আইনে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কিভাবে ক্ষুণœ করা হয় তার বিবরণ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘প্রধান নির্বাহীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর বিচারপতিদের অপসারণ নির্ভরশীল করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কমানো হয়।’ অধস্তন আদালতগুলোর ওপর সুপ্রিম কোর্টের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার বিলোপ ঘটিয়ে, তা সুপ্রিম কোর্টের পরিবর্তে ন্যস্ত করা হয় সরকারের ওপর। এসব পরিবর্তন এত মারাত্মক এবং তাৎক্ষণিক ছিল যে, স্বাধীনতার বন্ধুরা হন বিভক্ত। স্বাধীনতার শত্রুরা প্রতিশোধ নিলেন। সমালোচকেরা উচ্ছ্বাস ভরে বললেন, ‘গণতন্ত্রের এই বিনাশ সাধনের প্রক্রিয়া একই, তা সে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়েই হোক আর সামরিক অভ্যুত্থানের মতো পদ্ধতিতেই হোক।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তার পূর্বতন অবস্থানে ফিরিয়ে নেয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। মাঝে মধ্যে ছোটখাটো দু-চারটি পদক্ষেপ নেয়া হয় মাত্র। ১৯৭৬ সালের ২৮ মে রাষ্ট্রপতি সায়েম তার দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (সপ্তম সংশোধনী) আদেশে চতুর্থ সংশোধনী আইনে সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক অধিকার বলবৎ করার যে ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল, তা পুনঃস্থাপিত হয়। তা ছাড়া চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে যেখানে বলা হয়েছিলÑ ‘বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনে রত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান ও ছুটি মঞ্জুরীকরণসহ) ও শৃঙ্খলা বিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ব্যস্ত থাকিবে’, সে ক্ষেত্রে ১৯৭৯ সালে গৃহীত সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইনের মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদে ‘ন্যস্ত থাকিবে’ শব্দ দু’টির পরে সংযোজিত হয় ‘এবং সুপ্রিম কোর্টের সহিত পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তাহা প্রযুক্ত হইবে’। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে কিন্তু ব্যবস্থা ছিল সংবিধানের ১১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় পদে অথবা বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের সুপারিশ ও পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে তারা নিযুক্ত হবেন। চতুর্থ সংশোধনী আইনের বিষক্রিয়া বিচার বিভাগের ওপর এতই মারাত্মক ছিল যে, আজো এতগুলো সংশোধনীর পরও বিচার বিভাগ তার স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরে পায়নি।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে জোরেশোরে বিঘোষিত হয়েছে। ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৫ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ ছিল তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। ২২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’ চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হাজার হাজার যোজন দূরে ঠেলে ফেলে বরং নির্বাহী বিভাগের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এই অবস্থার আংশিক পরিবর্তন এসেছিল বটে, কিন্তু স্বাধীনতার কাছাকাছি তা আসেনি।
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Monday, October 12, 2015

দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই -সাক্ষাৎ​কারে : এমাজউদ্দীন আহমদ by এ কে এম জাকারিয়া

এমাজউদ্দীন আহমদ
দুই বিদেশি হত্যায় দেশে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে জঙ্গিদের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো
প্রথম আলো: দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াত জড়িত থাকতে পারে বলে সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটা করা হয়েছে। আপনার মন্তব্য কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ: যে দুটি ঘটনা ঘটেছে, তা জাতির জন্য লজ্জাজনক। আমরা নিজেরা যতই ঝগড়াঝাঁটি করি না কেন, এ ধরনের ঘটনার কোনো নজির আমাদের দেশে নেই। এর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতকে জড়িত হিসেবে অভিযুক্ত করা আমাদের রাজনীতির বহু পুরোনো ব্লেম গেম সংস্কৃতিরই অংশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে যা বলেছেন তা অপ্রত্যাশিত। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু তদন্ত চলছে, তাই এর আগে এ নিয়ে কথা বলা উচিত হয়নি।
প্রথম আলো: বিদেশি নাগরিক খুনের ঘটনাটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ: ঘটনাটি আমাদের দেশে বা জাতীয় পর্যায়ে হয়তো ঘটেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকেও আমাদের বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে। আইএসের বিরুদ্ধে রাশিয়ার চলমান অভিযান সিরিয়া বিষয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন অবস্থার তৈরি করেছে। এ ব্যাপারে ইরানের ভূমিকা বা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অবস্থান—এসব বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়। আমি মনে করি, আমাদের দেশে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা পর্যালোচনার সময় এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
প্রথম আলো: আমাদের দেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ বিস্তারের আশঙ্কা কতটুকু?
এমাজউদ্দীন আহমদ: আমি মনে করি আমাদের দেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ কখনো বিস্তার লাভ করতে পারেনি। এর অস্তিত্ব নেই, থাকার কারণও নেই। আমাদের দেশের মানুষ জঙ্গিবাদ পছন্দ করে না। এখানকার আবহাওয়া, পরিবেশ, প্রকৃতি ও জনগণের মানসিকতা এর সহায়ক নয়। তবে কোনো কারণে বা কোনোভাবেই জঙ্গিবাদ যাতে এ দেশে বিস্তারের সুযোগ না পায়, সে জন্য জাতীয় স্বার্থে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। দুজন বিদেশি নাগরিক খুন হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানো উচিত। আমি বলি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে না লাগিয়ে বরং বিদেশিদের নিরাপত্তার কাজে লাগান।
প্রথম আলো: কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশে জঙ্গিদের তৎপরতা নিয়মিতই উদ্‌ঘাটন করছে। অনেক সহিংসতায় যে তারা জড়িত, সেটি তদন্তে বের হয়ে আসছে। জঙ্গিরা ধরাও পড়ছে। আর বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে আমরা আবদুর রহমান বা বাংলা ভাইদের কর্মকাণ্ড দেখেছি।
এমাজউদ্দীন আহমদ: ওটা ছিল, কিন্তু এখন আর অস্তিত্ব নেই। নানা পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে তারা নির্মূল হয়েছে। তবে এ ধরনের কিছু যাতে আর কখনো মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তারা জঙ্গিবাদ ঘৃণা করে।
প্রথম আলো: বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোটের কারণেই কি তখন জঙ্গি তৎপরতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?
এমাজউদ্দীন আহমদ: জামায়াতের সঙ্গে জোট শুধু বিএনপি করেনি। সব দলই কোনো না কোনো সময়ে জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্ক রেখে চলেছে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি—সবাই। আসলে আমাদের কারও হাতই পরিষ্কার নয়। সমস্যা হয়েছে যে কিছু একটা হলেই বিএনপি আর জামায়াতকে এক ব্রাকেটে বন্দী করে ফেলা হয়। দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পরও আমরা দেখলাম কোনো তদন্ত ছাড়াই বিএনপি-জামায়াতকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
প্রথম আলো: কোনো দেশে জঙ্গিবাদের বিকাশ ও বিস্তারের সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ: একটি সুস্থ ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক পরিস্থিতি জঙ্গিবাদের জন্য সহায়ক হতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখুন, রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল বা এ ধরনের কিছু করার সুযোগ নেই। একটা মুক্ত পরিবেশ বজায় থাকলে, প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকলে অনেক কিছু লাঘব হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে দেশে একটা বদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ, এরপর বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে ঢালাওভাবে। এগুলো স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। জঙ্গিবাদ বিস্তারের ভয় দূর করতে হলে সুস্থ, স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করা দরকার।
প্রথম আলো: ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া বিএনপির ভুল বলে মনে করেন কি? বা এর পরে বিএনপি আন্দোলনের যে কৌশল নিয়েছিল?
এমাজউদ্দীন আহমদ: আমি তো মনে করি ৫ জানুয়ারি এভাবে নির্বাচন করাটা সরকারের ভুল ছিল। নির্বাচনটি যাতে সবার অংশগ্রহণে হয়, সেই চেষ্টা তাদের থাকা উচিত ছিল। সরকারের উচিত ছিল এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে সবাই নির্বাচনে অংশ নেয়। অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে সেই নির্বাচনের কোনো গুরুত্ব থাকে না। এরপরও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচনটি করতে হচ্ছে। এটা ধরে নেওয়া হয়েছিল যে এই বাধ্যবাধকতার নির্বাচনের পর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু তা আর পরে দেখা গেল না; বরং সরকারি দলের জেদই স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখলাম। বিএনপি আন্দোলন শুরু করেছিল, সেটা ব্যর্থ বা সার্থক হয়েছে কি না, সেটা জরুরি নয়। আসল কথা হচ্ছে, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে আলাপ-আলোচনা করতে হবে, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। এসব ছাড়া গণতন্ত্র হয় না।
প্রথম আলো: বিএনপি কি জামায়াত ছাড়বে?
এমাজউদ্দীন আহমদ: জামায়াত বিএনপির সঙ্গে ২০-দলীয় জোটে রয়েছে। সেখান থেকে দলটিকে বের করা হবে কোন অজুহাতে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে সংগঠন হিসেবে জামায়াতও এই অপরাধে অভিযুক্ত বলে বলা হয়েছে। আমার কথা হচ্ছে, তা হলে দল হিসেবে সরকার জামায়াতকে আগে নিষিদ্ধ করুক। এর আগে বা তেমন কিছু না করে জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার দায়টা বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। সরকারই তো জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
প্রথম আলো: আপনি দেশের বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বললেন, এমন পরিস্থিতিতে দেশের নাগরিক সমাজ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না কেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ: বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের ভূমিকা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা শুনতে পাই যে সরকারের সমালোচনা করেন এমন ব্যক্তিদের টিভি টক শোতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বয়স, সম্মান, ভয়-ভীতি- এসব নানা কিছু মিলিয়ে অনেকে কথা বলতে পারেন না। দিগন্ত টিভি ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলো: নাগরিক সমাজ দলীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলেই কি এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না?
এমাজউদ্দীন আহমদ: আসলে আমাদের সব সামাজিক ও পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোই দলীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে। একক নাগরিক সমাজ বলে কিছু নেই। সমাজ এভাবে বিভক্ত হয়ে পড়া খুবই খারাপ লক্ষণ। দলমতধর্ম-নির্বিশেষে আমরা যখনই এক হতে পেরেছি তখনই আমরা কিছু অর্জন করতে পেরেছি। আমাদের ভাষার অধিকার, আমাদের স্বাধীনতা—সবই আমরা এক হয়ে পেয়েছি। আর এখন আমরা বিভক্তির মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।
প্রথম আলো: বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখন দেশের বাইরে আছেন। চিকিৎসা এবং পরিবারের লোকজনের সঙ্গে সময় কাটানোই এই সফরের ঘোষিত লক্ষ্য বলে আমরা জানি। কিন্তু এর কি কোনো রাজনৈতিক তাৎপর্য নেই? খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পর বিএনপির রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখেন কি?
এমাজউদ্দীন আহমদ: দীর্ঘদিন পরে বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ছেলে ও পরিবারের লোকজনের সঙ্গে সময় কাটাতে গেছেন। নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক সময়গুলো পার করেছেন তিনি। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান মারা গেছেন। ব্যক্তিগত শান্তি ও স্বস্তির জন্য তাঁর এই সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সঙ্গে এই সময়টুকু কাটানো তাঁর জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। তবে এর নিশ্চয়ই রাজনৈতিক একটি দিকও রয়েছে। সেখানে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হবে। আমি ধারণা করি, এই সফরের মধ্য দিয়ে একধরনের উদ্দীপনা ও নতুন চিন্তাভাবনা নিয়েই খালেদা জিয়া দেশে ফিরবেন।
এমাজউদ্দীন আহমদ: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Tuesday, July 28, 2015

আমাদের স্বপ্নের শিক্ষায়তন by এমাজউদ্দীন আহমদ

আজ থেকে চুরানব্বই বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামক দেশের অন্যতম প্রধান উচ্চ বিদ্যাপীঠটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। চুরানব্বই বছর পরে সেই দিনের সঙ্গে আজকের বাস্তবতা মেলাতে গেলে আমরা কোনো কূলকিনারা পাব না। এই প্রতিষ্ঠানটি আজ যেমন আঙ্গিকে অনেক বিস্তৃত তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্বের মধ্যে অন্যভাবে পরিচিতও। এ দেশের গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন-সংগ্রামে এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা কতটা উজ্জ্বল এর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নতুন করে নিষ্প্রয়োজন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশ-জাতির অস্বিত্বের সঙ্গে নানাভাবে মিশে আছে। ১৯২১ সালের ২১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। সংক্ষেপে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাবি নামে এখন সমধিক পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমানে বহু অনুষদভিত্তিক গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত। দেশের অন্যতম এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আমি এক সময় দায়িত্ব পালন করেছি এটি আমার জীবনের আলোকিত অধ্যায়। বাংলাদেশের উচ্চ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ের।
আমার মতো অনেকের জীবনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক মাতৃসম প্রতিষ্ঠান। আমার প্রিয় অষসধ সধঃবৎ। যেমনি প্রিয় তেমনি শ্রদ্ধেয়। মাতৃস্নেহের পরশমণি সন্তানকে যেমন আদর-যতেœর সজীব স্পর্শে পরিণত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত করে, আত্মপ্রত্যয়ে সুদৃঢ় করে, মর্যাদা সিক্ত করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের জীবনে তেমনি এক পরশমণি। আমার প্রয়াত মা এখনো যেমন আমার চারপাশ ঘিরে বর্তমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তেমনি আমার এবং আমার মতো হাজারো মনের সচেতনতাকে ঘিরে প্রতি মুহূর্তে বিদ্যমান। এই প্রিয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আগামী ১ জুলাই চুরানব্বই বছর পূর্ণ করবে।
২০২১ সালের ১ জুলাইতে একশ’ বছরে পা দেবে। সেই স্মরণীয় মুহূর্তকে মনে রেখে এই ছোট লেখাটি।
১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুরু করে তার জয়যাত্রা। মাত্র তিনটি অনুষদের কলা, বিজ্ঞান এবং আইন মাত্র বারোটি বিভাগে ৮৭৭ জন ছাত্রছাত্রী এবং ৮৪ জন শিক্ষক নিয়ে। একটি বিভাগীয় শহরে প্রতিষ্ঠিত এই মহতী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তখন প্রভাব এবং অবয়বে ছিল ছোট একটি চারাগাছ। দীর্ঘ ৯০ বছরে হাজারো চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে, অনেক অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়ে এখন পরিণত হয়েছে এক বিরাট মহীরুহে। পরিণত হয়েছে একটি জাতি রাষ্ট্রের জাতীয় প্রতিষ্ঠানে, গোটা জাতির আশা-আকাঙ্খা ধারণ করে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় অর্জনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পর্শ। জাতীয় পর্যায়ে কল্যাণমুখী প্রত্যেকটি উদ্যোগের উৎসও এই মহতী প্রতিষ্ঠানটি। এর কুশলী পরিচর্যায় এবং স্নেহ-স্পর্শে বেড়ে উঠেছেন এ দেশের অধিকাংশ রাজনীতিক, প্রশাসক, সংস্কৃতিসেবী, ব্যবহারবিদ এবং বিভিন্ন পেশার শীর্ষ স্থানীয়দের অধিকাংশই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষ গবেষকদের গবেষণা সক্ষম হয়েছে জ্ঞানভাণ্ডারে অসংখ্য মণিমাণিক্য সংযোজনে। সফল হয়েছে জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত প্রথম সমাবর্তনে বাংলার গভর্নর এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর লড লিটন বলেছিলেন, ‘জনসমক্ষে আমি এই ঘোষণা দিয়েছি, আমার মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো ঢাকার সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং অন্যসব কিছুর ঊর্ধ্বে এই বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকার খ্যাতি বৃদ্ধি করবে এবং তা বাংলা, এমন কী ভারতের সীমারেখা ছাড়িয়ে যাবে।’ তার ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষা, সংস্কৃতি চর্চা এবং গবেষণা ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানের স্বীকৃতি ঢাকা ছাড়িয়ে বাংলা কেন, ভারতের বিস্তৃত পরিধি ছাড়িয়ে বিশ্বময় বিস্তৃত হয়েছে।
ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম : অন্যান্য স্বাধীন জনপদে বৃদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং শিক্ষা সংস্কৃতির মানোন্নয়নকল্পে বিশ্ববিদ্যালয় যেমন স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে উঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম কিন্তু সেভাবে হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর পি জে হার্টগ (---) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোর্টের প্রথম সভায় (১৯২১ সালের ১৭ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রাজনৈতিক জন্মের কথা’ সবাইকে স্মরণ করিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় কীভাবে পরিচালিত হবে তার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। লড লিটনও সুস্পষ্টভাবে বলেছেন যে, এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বরে দিল্লি দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ বিলুপ্তির কারণে এই অঞ্চলের বৃহত্তর জনসমষ্টি মুসলমানদের যে ক্ষতি হয় তার এক খেসারত স্বরূপ, লর্ড লিটনের কথায় ‘এক চমৎকার রাজকীয় ক্ষতিপূরণ।’
সৃষ্টির শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ে। কলকাতার তৎকালীন একটি শিক্ষিত মহল ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে। বিশেষ করে যারা ১৯০৬ সালে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল তারাই তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা মেনে নিতে পারেনি। নানা রকম প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আলোকিত প্রতিষ্ঠান পরিচয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে অনেক অনেক কিছু যা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বর্ণনা করা খুবই দুরূহ। আমাদের গর্বের ধন, আলোকিত প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য আমাদের আরো আলোকিত করুক।
লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

Friday, May 15, 2015

শিগগিরই নির্বাচনের নতুন ফর্মুলা আসবে -সাক্ষাৎকার: এমাজউদ্দীন আহমদ by ​​মিজানুর রহমান খান

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের নেতৃত্বে সহস্র নাগরিক কমিটি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আদর্শ ঢাকা আন্দোলন কমিটি গঠিত হয়। কমিটি দুটি দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে সক্রিয় ছিল। এখানে দুই কমিটির দুই নেতা সিটি নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
প্রথম আলো : আপনি বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অনিবার্য অংশ হচ্ছে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। একটা বিরাট আশাবাদ জাগিয়ে আপনারা নির্বাচনে গেলেন। কিন্তু যা ঘটে গেল, তা কতটা আপনি আশা করেছিলেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : নির্বাচন কমিশন যে নিজেই একটি নির্বাচন এভাবে নষ্ট করতে পারে, সেটা আমি আশা করিনি। আশা করেছিলাম, আমরা একটু একটু করে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। একটা পর্যায়ে গিয়ে আমরা ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছাব। কিন্তু সিটি নির্বাচনে যে ব্যাপক কারচুপি হলো, বিশেষ করে ইসি যেভাবে তা সমর্থন করল, তা একেবারেই আশা করিনি। আমি খুবই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।
প্রথম আলো : এই নির্বাচন কমিশনের কাছে কেন আপনি ভালো কিছু আশা করেছিলেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : ভদ্রলোক (সিইসি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার থেকে তিনি প্রায় নয় বছরের কনিষ্ঠ। তাঁকে বলেছিলাম, আমরা বেশি কিছু চাই না, দুটো জিনিস চাই। প্রথমত, প্রত্যেক ভোটার যাতে তাঁদের মনমতো প্রার্থীদের ভোট দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক প্রার্থী যেন ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারেন। বললাম, এটুকু না পারলে এখানে আপনারা আছেন কেন? পরে দেখা গেল তাঁর অফিসের পাশে বসেই লোকজন সিল মারছে। পরে বলেছেন, নিয়মমাফিক হয়েছে। এই বয়সের মানুষ যদি এটা বলতে পারেন, তাহলে আমরা কোথায় যাব?
প্রথম আলো : বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সাধারণ নির্বাচন করার যে অবস্থান আপনি নিয়েছিলেন, তাতে কি চিড় ধরল? নাকি আপনি অটল থাকবেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : না, আর অটল থাকতে পারছি না। যখন আমি ওই কথাটা বলেছিলাম, তখনো কতগুলো শর্তসাপেক্ষে বলেছিলাম। সেগুলো ছিল ইসিকে সর্বতোভাবে শক্তিশালী করা। রিটার্নিং অফিসারসহ যাঁরা নির্বাচনী ব্যবস্থাটা চালু রাখবেন, তাঁদের নিরপেক্ষ হতে হবে; দলীয় লোক যাতে না থাকে। যেমন, একটা নির্বাচন ব্রিটেনে দেখলাম। ভারতেও তা-ই চলছে। ভারতে পাঁচজন কমিশনার নেই, একজন সিইসি সুষ্ঠু নির্বাচন করছেন।
প্রথম আলো : তার মানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে রেখে আর নির্বাচন নয়?
এমাজউদ্দীন আহমদ : না, শর্তগুলো তো মানাই হলো না। আমি তো এর আগে ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিছু লোকের সঙ্গে কিছু কথা হয়েছিল। আমি চাই, সারা বিশ্বে যেটা চলছে, প্রধানমন্ত্রীকে রেখে নির্বাচন করতে। ২০৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ১৬৬টি রাষ্ট্রে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু কোথাও সংসদ অক্ষত রেখে নির্বাচন হয় না। আমাদের সংবিধানে ১২৩ ক অনুচ্ছেদে যেভাবে পুরোনো সংসদ রেখে নতুন সংসদ করার বিধান আছে, এমনটা কোথাও নেই।
প্রথম আলো : সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে নির্বাচন করার যে ধারা ছিল, সেটা তো আমরা শেষ করেছি। বিএনপিও মনে হয় এই বিধানের পুনরুজ্জীবন চাইছে না। তাহলে একটি বিকল্প রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করা আপনাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না?
এমাজউদ্দীন আহমদ : পড়ে। একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের নেতৃত্ব দরকার।
প্রথম আলো : এই নির্ভরযোগ্য কে কীভাবে হবেন, সেটা বিএনপির তরফ থেকে নির্দিষ্টভাবে না বলার কারণে রাজনীতিতে একটা বিভ্রান্তি চলছে। সরকারি দল নাকচ করতে পারে কিন্তু একটা ফর্মুলা তো চাই।
এমাজউদ্দীন আহমদ : হ্যাঁ, আমি কিন্তু এখন সেই ফর্মুলাটা প্রস্তুত করার চেষ্টা করছি। আসলে এই ফর্মুলা প্রস্তুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই আমি খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসতে রাজি করিয়েছিলাম।
প্রথম আলো : কবে নাগাদ এই ফর্মুলা জাতির সামনে পেশ করা সম্ভব হতে পারে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এটা খুব বেশি দিন নয়। দিন সাত-আটেক।
প্রথম আলো : সাত দিনের মধ্যে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : না, সময়-সুযোগ বুঝে। পরিস্থিতিটা একটু অনুকূল হোক।
প্রথম আলো : আগামী ৯০ দিনের মধ্যে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : তা নিশ্চয় হতে পারে। একটা সম্ভাবনা থাকবে। আগে আমি একটি খসড়া তৈরি করব, এরপর আলোচনা করব। এ জন্য একটি সংবাদ সম্মেলন করব।  
প্রথম আলো : কিন্তু নির্বাচন ছাড়া বিএনপির মুখে শাসনগত সংস্কারের বিষয়ে কথা নেই। আপনার ভাবনা কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ : সুশাসন প্রশ্নে আমি নিজের লেখায়ও বলেছি যে বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলছে, তাকে ব্রিটেনের সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট নামকরণ করেছে যে টক্সিক পলিটিক্স বা বিষাক্ত রাজনীতি। আর এই বিষাক্ত রাজনীতির কারণে যেসব রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকে, সেগুলো তখন অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেগুলো আর স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে না, বিকৃত হয়ে যায়। সিটি নির্বাচনে আমরা তারই নমুনা দেখলাম। এখন চ্যালেঞ্জ হলো বিষাক্ত রাজনীতিকে ঝেড়ে ফেলা। সবকিছু দলীয়করণ হওয়া ঠিক নয়।
প্রথম আলো : আপনি কি তাবিথ আউয়াল বা মির্জা আব্বাসকে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করার সুপারিশ করছেন? মানুষকে ট্রাইব্যুনালের রায় মূল্যায়ন করার সুযোগ দেবেন না?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এখনো ভাবিনি। তবে ভাবব। এটা দাখিল করার পরে এ দেশের কিছু জ্যেষ্ঠ নাগরিককে নিয়েও আমি কথা বলব।
প্রথম আলো : বর্জন সত্ত্বেও বিএনপি যে এত ভোট পেল, সেটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এটা জনমতকে বিভ্রান্ত করার একটা কৌশল হতে পারে। ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরে এত ভোট পাওয়ার কোনো কারণ ছিল না। ভোট বর্জনের পরে ইচ্ছা করে কিছু বেশি ভোট দেখিয়ে এ দেশের মানুষ ও বিদেশিদের সন্তুষ্ট করতে চেয়েছে।
প্রথম আলো : কেমব্রিজ থেকে সদ্য প্রকাশিত একটি বইয়ে ‘জামায়াত বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে আখ্যায়িত মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেছেন, ‘বিএনপি যখন দুর্বল হবে, তখন জামায়াত সাফল্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে সংগঠিত করতে পারবে। দীর্ঘ মেয়াদে এটা প্রকৃত সম্ভাবনা। কারণ, খালেদা জিয়ার পরে বিএনপি ভেঙে যাবে।’ আপনার মন্তব্য?
এমাজউদ্দীন আহমদ : আমি এ কথার সঙ্গে একমত নই। তার কারণ হলো, বিএনপি এমন একটি দল, যার তৃণমূল পর্যন্ত সমর্থন ও ভিত্তি রয়েছে। এবং কোথাও কোথাও একটু শিথিল হচ্ছে বটে কিন্তু এখন পর্যন্ত দলটি এই পর্যায়ে যায়নি যে খালেদা জিয়ার পরে দলটি ভেঙে যাবে।
প্রথম আলো : সিটি নির্বাচন থেকে জামায়াতের প্রাপ্তি কী? প্রশ্নটি এ কারণে যে আপনাদের বর্জন সত্ত্বেও তারা কিছু জায়গায় জিতেছে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : জিতেছে, তবে আমি বলব ২০-দলীয় জোটভুক্ত দল হিসেবে এর ফলে তাদের দিক থেকে একটা অনৈতিক কাজও হয়েছে। কারণ, সবাই যখন বর্জন করছে, তারা তাদের প্রার্থী রেখে দিয়েছে। এটা ঠিক হয়নি।
প্রথম আলো : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
এমাজউদ্দীন আহমদ : ধন্যবাদ।

Tuesday, April 14, 2015

সংলাপের ভূমিকা পালন করছে সিটি নির্বাচন -বিশেষ সাক্ষাৎকারে : এমাজউদ্দীন আহমদ by এ কে এম জাকারিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ নাগরিক সংগঠন শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। ঢাকা সিটি নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের নির্বাচন পরিচালনার জন্য সম্প্রতি গঠিত আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের আহ্বায়ক হিসেবেও তিনি এখন দায়িত্ব পালন করছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া

প্রথম আলো : বিএনপির আন্দোলন কার্যত ব্যর্থ হলো। আপনি কি তা মনে করেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : ব্যর্থ হলো কোথায়? এক ঢাকা ছাড়া তো দেশের কোথাও পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল না। সেখানে শাসন-প্রশাসন বলে কিছু কাজ করেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করে চলতে হয়েছে। দেশজুড়ে সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছে। আন্দোলন কাজে না দিলে তো এসবের প্রয়োজন পড়ত না। আন্দোলন দমনে সরকারকে গুম, খুন ও দমন-নিপীড়নের আশ্রয় নিতে হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে এই সরকারের ধরন ও আচরণ সবার সামনে স্পষ্ট হয়েছে।

প্রথম আলো : এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপি কী অর্জন করল?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এখন যে তিনটি সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এটা গত তিন মাসের আন্দোলনের ফল। এই নির্বাচনকে যদি এখন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা যায়, তবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার একটি পরিস্থিতি তৈরি হবে। ইকোনমিস্ট-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতি দূষিত হয়ে পড়েছে। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাভাবিক কাজ করতে পারছে না। যে র‍্যাব জনগণের নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো, তাদের কেউ কেউ আজ ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করছে। এ ধরনের একটি বিষাক্ত পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারের পথ হচ্ছে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপ। এই নির্বাচন সেই সংলাপের ভূমিকা পালন করছে

প্রথম আলো : তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে আপনি সংলাপ মনে করছেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এই নির্বাচনগুলো একধরনের সংলাপের ভূমিকা পালন করছে। নির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। প্রার্থীদের মাধ্যমে যে যোগাযোগ হচ্ছে, সেটাও একধরনের সংলাপ। এই নির্বাচনের পরও এর প্রভাব থাকবে। ভোটার ও ভোটপ্রার্থীদের মধ্যে এই সংলাপ ও আদান-প্রদানকে আমি খুবই ইতিবাচক মনে করছি। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এখন পরিচালিত হচ্ছে দুজন প্রশাসকের মাধ্যমে, সেখানে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসবেন।

প্রথম আলো : এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার ব্যাপারে আপনি কতটুকু আশাবাদী?
এমাজউদ্দীন আহমদ : আমি মনে করি না যে পুরোপুরি অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। নির্বাচন কমিশন অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি উপেক্ষা করছে। তবে আমি আশাবাদী যে তারা দেখে শিখবে। ভারতের নির্বাচন কমিশন যেভাবে নির্বাচন করে, তারাও সে ধরনের কাজ করার চেষ্টা করবে। আমরা চাই ইউরোপের উন্নত গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন যেভাবে কাজ করে, তা থেকে তারা শিখুক। নিরপেক্ষভাবে দেখার দৃষ্টিকোণ অর্জন করুক। এই নির্বাচন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মতো হবে বলে আমি মনে করি না। আর বিষয়টি শুধু নির্বাচন কমিশনেরও নয়, জনগণের দায়িত্ব রয়েছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে। নির্বাচন কমিশন ঠিক-বেঠিক যা-ই করুক না কেন, জনগণ কিন্তু সবই দেখবে ও বিবেচনায় নেবে। বলা যায় জনগণের পর্যবেক্ষণের মধ্যে থাকবে নির্বাচন কমিশন।

প্রথম আলো : আপনি এই তিন সিটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনার জন্য নির্বাচন কমিশনে গিয়েছিলেন, কী ধারণা হলো?
এমাজউদ্দীন আহমদ : নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার জন্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে কথা বলেছি। একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে, ভোটার যেন তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে, তা নিশ্চিত করা। আর ভোটপ্রার্থীও যেন ভোট চাওয়ার জন্য ভোটারদের কাছে যেতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে একজন প্রার্থীর পক্ষে যেহেতু সব ভোটারের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই প্রয়োজন সভা-সমাবেশ ও মিছিলের। সব প্রার্থীর জন্য সমতল ক্ষেত্র তৈরি করা হলো নির্বাচন কমিশনের কাজ। আমরা এসবই বলে এসেছি। তারা সচেতনভাবে তা চাইলে করতে পারবে। নির্বাচন কমিশন যদি প্রজ্ঞা ও নিরপেক্ষতার মনোভাব নিয়ে কাজ করে, তবে তাদের ভুল হওয়ার সুযোগ কম।

প্রথম আলো : এই নির্বাচনের প্রভাব কি জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এই নির্বাচন জাতীয় পর্যায়ে একধরনের মর্যাদাবোধ ও চিন্তাভাবনার উন্মেষ ঘটাবে বলে আমি মনে করি। জনগণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যখন এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং জনগণের ভোট পেয়ে যখন কেউ নির্বাচিত হবেন, তখন তাঁর মধ্যে একটি মর্যাদাবোধের পরিস্থিতি তৈরি হবে। যাঁরা একটি ভোট না পেয়েও সংসদে গেলেন, তাঁরা এটা বুঝতে পারবেন যে আইনগতভাবে সিদ্ধ হলেও এ ধরনের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া সম্মানজনক নয়। এই নির্বাচন তাই আমাদের পরবর্তী রাজনীতির রূপরেখার মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারে, বর্তমান চিন্তাভাবনাকে পাল্টে দিতে পারে।

প্রথম আলো : এটা আশার কথা, কিন্তু বর্তমান রাজনীতির যে ধারা, তাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : সমস্যা হচ্ছে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ধ্বংস বা নিঃশেষ করতে চায়। এটা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলের ক্ষেত্রেই সত্য। কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহিষ্ণুতা থাকতে হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে এটা মানতে হবে যে দুই পক্ষের কোনো পক্ষই অপর পক্ষকে ধ্বংস করতে পারবে না। সংসদীয় রাজনীতির মূল বিষয় হচ্ছে, দুই পক্ষকেই একসঙ্গে থাকতে হবে। পাশের দেশ ভারতের কথাই বলি, সেখানে প্রধানমন্ত্রী যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ করেন, বিষয়টি অবহিত করেন। এসব থেকে আমরা অনেক দূরে আছি। এসব সমস্যা দূর হতে আরও সময় লাগবে।

প্রথম আলো : বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করেছে, এর এক বছরের মাথায় নতুন নির্বাচনের জন্য বিএনপি এক নজিরবিহীন আন্দোলন করল। আগাম বা নির্ধারিত সময়ে যখনই পরবর্তী নির্বাচন হোক, তা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হবে, বিএনপির অংশগ্রহণ কি নিশ্চিত করা যাবে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : যখনই নির্বাচন হোক, নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য, সুষ্ঠু ও অবাধভাবে অনুষ্ঠানের জন্য কতগুলো শর্ত সংসদীয় ব্যবস্থায় আছে। প্রথমেই সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচন যখন হবে, তখন নির্বাচন কমিশনই সব ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করবে। তখন যেমন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীও থাকেন না, বিরোধী দলের নেতাও থাকেন না। ভারতের উদাহরণকে আমরা বিবেচনায় নিতে পারি, দেশ চালায় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সেখানে তখন মূল ভূমিকায় থাকে নির্বাচন কমিশন। ফলে ভারতে নির্বাচনের সময় কে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, সেটা কোনো বিবেচনার বিষয় নয়।

প্রথম আলো : আপনি আগে এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও বিএনপি নির্বাচনে যেতে পারে।
এমাজউদ্দীন আহমদ : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ও তা কার্যকর হয়েছিল বিশেষ পরিস্থিতিতে। তখনো ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, এটা কয়েক মেয়াদ পর্যন্ত চলবে। সর্বশেষ উচ্চ আদালতের যে রায়, সেখানেও বলা হয়েছিল যে পরের দুই মেয়াদের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। সব সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে, সেটা চাওয়া হতে পারে না। আসলে নিজেদের স্বার্থেই রাজনৈতিক দলগুলোকে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। এমনভাবে নির্বাচন হতে হবে যে কে প্রধানমন্ত্রী বা কে বিরোধীদলীয় নেত্রী, সেটা নির্বাচনের সময় বিবেচ্য থাকবে না। কিন্তু এ জন্য পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, নির্বাচন কমিশনকে সেভাবে কাজ করতে দিতে হবে।

প্রথম আলো : আগামী নির্বাচনের সময় তবে কী ধরনের সরকার আশা করছেন, বা এর আগে করণীয় কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এখন দেশে যে রাজনীতি চলছে, তাতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তো আমরা ফেরেশতা নিয়ে আসতে পারব না। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের মধ্যে অনেক বিচক্ষণ ব্যক্তি রয়েছেন। তাঁরা যদি তাঁদের প্রজ্ঞার উচ্চতম ব্যবহার করতে পারেন, তবে পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা ও একটি পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

প্রথম আলো : কিন্তু বর্তমানে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, সেখান থেকে শুরুটা হবে কীভাবে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : প্রথমেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা থাকতে পারে। সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কমিশন গঠন করতে হবে। এখন যেভাবে হয়েছে সেভাবে নয়। ফলে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি প্রক্রিয়ার সূচনা হতে পারে।

প্রথম আলো : নির্বাচনকালীন সরকার?
এমাজউদ্দীন আহমদ : ভারতে যে ধরনের নির্বাচনকালীন সরকার হয়, এখানেও সে ধরনের কিছু হতে পারে। এই সরকার অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে কাজ করবে। নির্বাচনের সময় বিশেষ কোনো ক্ষমতা প্রয়োগ করবে না, উন্নয়নমূলক কাজ বা এ ধরনের কোনো উদ্যোগ বা প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারবে না। নির্বাচন কমিশনই তখন নির্বাচনকালীন প্রধান শক্তি হিসেবে সব কাজ করবে।

প্রথম আলো : সিটি নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে অরাজনৈতিক, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এর যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তা আপনি শুরুতে বলেছেন। এই নির্বাচনকে ঘিরে আপনি সক্রিয় হয়েছেন। আপনার এই যুক্ততার পেছনে কী কাজ করছে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : তিন মাস ধরে যে আন্দোলন চলেছে, তাতে মানুষ মরেছে, সাধারণ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, দেশের অর্থনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থা চরম বিপর্যস্ত হয়েছে। তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনকে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একটি পথ হিসেবে দেখছি। তাই এই বয়সেও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি। আমি মনে করি, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া যাবে। নগর পরিচালনা ও এর ব্যবস্থাপনার দোহাই দিয়ে ঢাকাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা দেখেছি যে এর মধ্য দিয়ে বরং আমলাতন্ত্র বেড়েছে। এই নির্বাচন ঢাকার জন্য ইতিবাচক হবে বলে আমি মনে করি। একই সঙ্গে জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে সামনের দিনগুলোতে।

প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
এমাজউদ্দীন আহমদ : ধন্যবাদ।