Saturday, June 20, 2015

উদ্ধার হয়নি ফার্নেসবাহী ওয়াগন- তেল ছড়িয়ে পড়ছে কর্ণফুলী নদীতে

বোয়ালখালী খালে ডুবে যাওয়া তেলবাহী রেলের দুটি ও পাড়ে থাকা একটি ওয়াগন এখনো উদ্ধার করা যায়নি। ডুবে থাকা ওয়াগন থেকে তেল ছড়িয়ে পড়ছে ৯ কিলেমিটার দূরে থাকা কর্ণফূলী নদীতেও। উল্লেখ, শুক্রবার দুপুরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। গোমদন্ডি স্টেশন মাস্টার আবু জাফর আমাদের বোয়ালখালী সংবাদদাতাকে জানায়, শনিবার রিলিফ ট্রেন ৮টি ওয়াগনের মধ্যে ৫টিকে নিয়ে যায়। কাত হয়ে থাকা একটি ওয়াগন থেকে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তেল খালাস করে ড্রামে সংরক্ষণ করেছে। ইঞ্জিন ও ডুবে থাকা দু’টি ওয়াগন আগের মতোই রয়েছে। প্রতিটি ওয়াগনে ৩৩ হাজার ৬৪০ লিটার  ফার্নেস অয়েল রয়েছে।
শনিবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ মকবুল হোসেনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তারা  বলেছেন, ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়ায় আশেপাশের এলাকা ও কর্ণফুলী নদীতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। পানির উপরিতলে থাকা এই তেল জোয়ার-ভাটায় সামনে-পেছনে আসা-যাওয়া করছে। ফার্নেস তেলের আস্তরণ ছড়িয়ে পড়েছে কর্ণফূলী নদী পর্যন্ত। ফলে নদীর মাছ ও জমির ফসলের ব্যাপক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোজাম্মেল হক জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ওয়াগন থেকে তেল অপসারণ না করে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে গেলে নদীতে তেল পড়ে পরিবেশ বিপর্যয় হতে পারে এটি মাথায় রেখে উদ্ধার তৎপরতা চালাতে হচ্ছে। ফলে সময় লাগছে। ওয়াগন উদ্ধারের পর সেতুটি মেরামত করা হবে। এতে এক সপ্তাহ সময় লাগবে। চট্টগ্রাম-দোহাজারি লাইনে রেল চলাচল বন্ধ আছে। এই পথে প্রতিদিন একটি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে।
উদ্ধার হয়নি ফার্নেসবাহী ওয়াগন- কর্ণফুলীতে ভাসছে ফার্নেস অয়েল
উদ্ধার হয়নি চট্টগ্রাম দোহাজারী রেললাইনের বোয়ালখালী বেঙ্গুরা এলাকায় রেলওয়ের ব্রিজ ভেঙে লাইনচ্যুত হওয়া চারটি তেলবাহী ওয়াগন। এর ফলে হারগেজি খালে ছড়িয়ে পড়ছে ওয়াগনে থাকা ফার্নেস অয়েল। কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে এ খালটির সরাসরি সংযোগের ফলে কর্ণফুলী নদীর পানিতে মিশতে শুরু করেছে ওই ফার্নেস অয়েল।
শুক্রবার বিকেলে দোহাজারি যাওয়ার পথে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষ ছয় সদস্যবিশিষ্ট পৃথক দুইটি তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি দুই প্রকৌশলীকে বরখাস্ত করেছে। কর্ণফুলী নদীতে এ ফার্নেস অয়েল ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন। ধলঘাট স্টেশন মাস্টার অনুপম সেন জানান,"ডুবে যাওয়া ওয়াগন থেকে জ্বালানি তেল বের করতে না পারায় এবং উদ্ধার কাজ বন্ধ থাকায় চট্টগ্রাম-দোহাজারি লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। দোহাজারি পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের জন্য আটটি ওয়াগন ফার্নেস অয়েলবাহী চট্টগ্রাম নগরীর পাহাড়তলি থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি ওয়াগনে প্রায় ২৬ হাজার ৮০০ লিটার ফার্নেস অয়েল রয়েছে।"
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের ডিভিশনাল ট্রান্সপোর্টেশন অফিসার ফিরোজ ইফতেখার জানান,"বোয়ালখালীর বেঙ্গুরা রেলওয়ের ২৪ নং সাকিরাপুলে ফার্নেস অয়েলবাহী ট্রেনের তিন ওয়াগনসহ ইঞ্জিনটি লাইনচ্যুত হয়। এতে দুইটি ওয়াগন খালের পানিতে পড়ে গেলে সেখান থেকে আশেপাশের এলাকায় বিপজ্জনকভাবে তেল ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এখনও নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে ওই ছড়িয়ে পড়া তেল।"
পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান জানান, ডুবে যাওয়া ওয়াগন থেকে বিপুল পরিমাণ ফার্নেস অয়েল খালের সীমানা পেরিয়ে কর্ণফুলীতে ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থার উন্নতির দ্রুত চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কারণ চাষাবাদের জমিতে তেল ছড়িয়ে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।

বিজিবির সদস্যকে তিন দিনেও ছাড়েনি মিয়ানমার

আবদুর রাজ্জাক : ছবির সূত্র‍—বিজিপির ফেসবুক পেজ
টেকনাফের নাফ নদী থেকে অপহরণের তিন দিন পরও বিজিবির নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ফেরত দেয়নি মিয়ানমার বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। উল্টো তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে আটকে রাখার ছবি প্রকাশ করা হয়েছে বিজিপির ফেসবুক পেজে। এ ঘটনাকে অমানবিক উল্লেখ করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
গতকাল শুক্রবার ই-মেইল ও ফ্যাক্সযোগে বিজিবির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ পাঠানো হয় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে। এতে বলা হয়, বিজিবির একজন সদস্যকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও হাতকড়া পরিয়ে রাখা আন্তর্জাতিক কোনো আইনের মধ্যেই পড়ে না। বরং এগুলো মানবতাবিরোধী কাজ। এর মাধ্যমে শুধু বিজিবিকেই নয়, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকে অপমান করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ইতিমধ্যে এ বিষয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বিজিবির সদস্যকে ফেরত দিতে বলেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, মিয়ানমার শিগগিরই তাঁকে ফেরত দেবে।’
বিজিবির সূত্রে জানা গেছে, নায়েক রাজ্জাকের নেতৃত্বে বিজিবির ছয় সদস্যের একটি দল গত বুধবার সকালে নাফ নদীতে টহল দিচ্ছিল। দলটি বাংলাদেশের জলসীমায় মাদক চোরাচালানি সন্দেহে দুটি নৌকায় তল্লাশি করছিল। এ সময় মিয়ানমারের রইগ্যাদং ক্যাম্পের বিজিপির একটি দল ট্রলারে করে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। একপর্যায়ে টহল দলটি বিজিবির নৌযানের কাছে গিয়ে থামে। বিজিপির ট্রলারটিকে বাংলাদেশের জলসীমা ছেড়ে যেতে বলা হলে তারা নায়েক রাজ্জাককে জোর করে ট্রলারে তুলে নেয়। এ সময় বিজিবির অন্য সদস্যরা বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়।
এতে বিজিবির সিপাহি বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন। এরপর বিজিপির ট্রলারটি রাজ্জাককে নিয়ে মিয়ানমারের দিকে চলে যায়। বিপ্লবকে চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বিজিবি বলছে, আটক রাজ্জাককে ফেরত চেয়ে কয়েক দিন ধরেই যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে বিজিবি। এ বিষয়ে বিজিবি ও বিজিপির মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে টেকনাফ স্থলবন্দরের ডাকবাংলোতে পতাকা বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মিয়ানমার বলছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি না পাওয়ায় বৈঠক হয়নি। গতকাল আবার যোগাযোগ করা হলে বিজিপি জানিয়েছে, দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া রাজ্জাককে ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়।
বিজিবির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, রাজ্জাককে ফেরত না দিয়ে বৃহস্পতিবার রাত ১২টা ৪০ মিনিটে বিজিপির ফেসবুকে তিনটি ছবি প্রকাশ করা হয়। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাজ্জাকের নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে আর তাঁর পেছনে বিজিপির একজন সদস্য দাঁড়ানো। দ্বিতীয় ছবিতে দেখা যাচ্ছে, রাজ্জাকের সামনে তাঁর অস্ত্র ও অন্যান্য সামগ্রী রেখে তাঁকে আসামির মতো করে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আরেকটি ছবিতে তাঁকে হাতকড়া পরা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।
এই ছবির বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিজিবির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এসব ছবি বাংলাদেশের নজরে এসেছে। এ ঘটনায় বাংলাদেশ প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভের কথা তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিজিবি ও বাংলাদেশ সরকার মাথা ঠান্ডা রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
রাজ্জাকের বাড়ি নাটোরে। বিজিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিজিবি ইতিমধ্যেই তাঁর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানিয়েছে, রাজ্জাক নিরাপদ ও সুস্থ আছেন।
হঠাৎ করে কেন বিজিবির একজন সদস্যকে ধরে নিয়ে গেল—জানতে চাইলে বিজিবির একটি সূত্র জানায়, দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠানো ছাড়াও ইয়াবা ও মানব পাচারে জড়িত। সম্প্রতি বাংলাদেশে ইয়াবাবিরোধী অভিযান জোরদার হওয়ার পর সাগরেই বারবার ইয়াবার চোরাচালান ধরা পড়ছে। নাফ নদীর জাদিমোড়া, যেখান থেকে রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, সেখান থেকেই কয়েক বছরে ১২ লাখ ইয়াবা আটক করেছে বিজিবি।
রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যাওয়া এবং পতাকা বৈঠকে সাড়া না পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিজিবির সদস্য নায়েক রাজ্জাককে ফিরিয়ে দিতে ও পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সীমান্ত পরিস্থিতি সমাধান করতে রাষ্ট্রদূতকে আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। তবে এরপর ৩৬ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কোনো সাড়া দেয়নি বিজিপি।
জানতে চাইলে বিজিবির কক্সবাজার সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল আনিসুর রহমান জানান, মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশের কাছে পতাকা বৈঠকে বসার জন্য দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে এখনো সাড়া মেলেনি। তাই কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমেও নায়েক রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এর আগে গত বছরের ২৮ মে বান্দরবানের পাইনছড়ি সীমান্ত এলাকায় বিজিপির সদস্যরা বিনা উসকানিতে বিজিবির সদস্যদের ওপর গুলি চালান। ওই সময় বিজিবির সদস্য নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমানকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। দুই দিন পর বিজিবির সদস্যরা মিজানুরের লাশ ফেরত নিতে গেলে উল্টো বিজিপি ওই প্রতিনিধিদলের ওপর আবারও গুলি চালায়। পরে ৩১ মে মিজানুরের লাশ ফেরত দিয়েছিল বিজিপি।

রোহিঙ্গা সমস্যা- দ্বীপান্তর সমস্যার সমাধান নয় by আলী ইমাম মজুমদার

ভারত বিভাগ–পূর্ব যুগে দেশে রাজনৈতিক অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের একটি কারাগারে পাঠানো হতো। নিয়ম-নীতির বেড়াজাল আর দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে তারা প্রায় সারা জীবনের জন্য পরিবারের সঙ্গে হয়ে পড়ত সম্পর্কবিহীন। একপর্যায়ে সশস্ত্র আন্দোলনের মাধ্যমে যাঁরা ভারতের স্বাধীনতার প্রচেষ্টা নেন, তাঁদের অনেককেও সেখানে পাঠানো হয়েছে। সেই শাস্তি ব্যাপকভাবে দ্বীপান্তর বলে পরিচিত ছিল। এখন এ ধরনের শাস্তির যুগ শেষ হয়েছে। বিভিন্ন দ্বীপে সাহসী মানুষ বসতি স্থাপন করছে বাঁচার তাগিদে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস তাদের নিত্যসঙ্গী। প্রায়ই তাদের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে অনেক আলোকিত ব্যক্তিত্বও এসব দ্বীপে বসবাস করেন। শিক্ষা-সংস্কৃতিরও ঘটেছে ব্যাপক প্রসার। তবে আলোচিত বিষয়টি এরূপ কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে চালান করে দেওয়া সম্পর্কে নয়; বরং শিবিরে জীবনযাপনকারী ৩২ হাজার লোকের একটি দ্বীপে স্থানান্তর প্রসঙ্গ।
খবরে প্রকাশ, কক্সবাজার জেলার দুটি শরণার্থী শিবিরে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর হাতিয়ার একটি চরে স্থানান্তরের প্রাথমিক প্রক্রিয়া চলছে। তারা মিয়ানমারের আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে এ দেশে এসেছিল ১৯৯১ সালে। এসেছিল প্রায় আড়াই লাখ। দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় অন্যরা স্বদেশে ফিরে গেছে বিভিন্ন পর্যায়ে। অবশিষ্টদের ভাগ্যে রয়ে গেছে সিকি শতাব্দীর শিবিরজীবন। ইতি অজানা। সেই সময়ে এখানে জন্ম লাভ করা বহু শিশু আজ শিশুর মা-বাবা। বাংলাদেশ সরকার ও উদ্বাস্তুবিষয়ক জাতিসংঘ হাইকমিশনের যৌথ ব্যবস্থাপনায় শিবির দুটি পরিচালিত হয়। শিবিরবাসীর অনেকেই শিক্ষা-দীক্ষাহীন। অনেকটা অমানবিক পরিবেশে বসবাস করছে দীর্ঘকাল। নিজের বলতে কিছুই নেই। উপেক্ষিত সর্বত্র। তাই এ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ স্থানীয় প্রভাবশালী দুর্বৃত্তদের হাতের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় কখনো কখনো। জড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে। তবে তারা সবাই অপরাধী নয়। অপরাধ দেশের সর্বত্রই ঘটে চলেছে। তবু পরিস্থিতির শিকার এ লোকগুলোকে পাইকারিভাবে অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছে কেউ কেউ।
শিবিরে বসবাসকারীদের বাইরেও প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজার ও পাশের জেলাগুলোর জনজীবনে মিশে আছে। হয়তোবা ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা বাড়ছেও। যে অবস্থায় তারা আরাকান প্রদেশে আছে, তা গণমাধ্যমের কল্যাণে সবারই জানা। তাই সেখান থেকে যে যেভাবে যেদিকে পারছে পালাতে চাইছে। এমনকি অকূল সমুদ্রে মাছ ধরার নৌকায় পাড়ি দিয়ে আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছে বিপুলসংখ্যক নর-নারী ও শিশু। এভাবে আমাদের দেশ থেকেও কিছু লোক যাচ্ছে বটে। তবে তাদের উদ্দেশ্য উন্নত জীবনযাত্রার সন্ধান। আর রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ, শিশুরা এটি ছাড়াও নিরাপত্তার সন্ধানে ছুটে বেড়াচ্ছে। মনে হয়, বিশ্ববাসীর তাদের জন্য তেমন কিছু করার নেই। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের মহাসচিব তাদের নাগরিকত্ব ও মানবাধিকারের বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার মিয়ানমারকে চাপ দিয়েছেন। এখন দিচ্ছেন আরও অনেকে। কিন্তু তাতে তেমন ফল পাওয়া যাবে, এমনটা মনে হয় না। সে দেশের মানবাধিকার আন্দোলনের জন্য বিশ্বনন্দিত নেত্রী অং সান সু চিও আজ চুপ মেরে আছেন। মনে হচ্ছে তাঁরা রোহিঙ্গাদের সে দেশ থেকে সমূলে বিতাড়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সম্প্রতি ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বহুজাতিক সম্মেলনেও তাঁদের অনড় অবস্থানের কারণে মানব পাচার প্রতিরোধ কার্যক্রমে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।
অন্যদিকে, পরিস্থিতির শিকার আমাদের জনবহুল দেশটি। সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী সব অনুপ্রবেশ সামলাতে পারে না। তাই প্রায়ই কিছু না কিছু ঢুকে পড়ছে আমাদের দেশে। অবশ্য শিবিরের বাইরে জনগণের সঙ্গে মিশে যাওয়া রোহিঙ্গারা পরিশ্রম করে জীবিকা অর্জন করে। কম মূল্যে শ্রম পাওয়া যায় বলে তাদের চাকরি জুটে যায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কল্যাণে। তাঁদেরই কেউ কেউ আবার বিভিন্ন সভা-সমাবেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ও সামাজিক বিরূপ প্রভাব নিয়ে সরব আলোচনায় লিপ্ত হন। শিবিরে বসবাসকারীদের হাতিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হলেও অচিহ্নিতরা থেকেই যাবে যার যার নতুন ঠিকানায়। সেটা যাই হোক, ধরে নেওয়া হয় শিবির দুটি অন্য পার থেকে শরণার্থী আসাকে হয়তো উৎসাহিত করছে। তবে বিষয়টি অনেক ব্যাপক ও গভীর। শিবির তুলে দিলেও প্রাণ বাঁচাতে ও পেটের টানে তাদের আসা ঠেকানো কঠিন।
মিয়ানমার সরকার তাদের দেশে অধিবাসী রোহিঙ্গাদের জন্য দেশটিকে জাহান্নামের অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে। কেড়ে নেওয়া হয়েছে নাগরিক অধিকার, সম্পদের মালিকানা এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারও। সেই রাষ্ট্রটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ এ হতভাগ্য আদম সন্তানেরা। আর এদের ৯০ শতাংশই বসবাস করে আরাকান অঞ্চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালেও রোহিঙ্গা বিতাড়ন কার্যক্রম চলে। আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে মিয়ানমার রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান চালায়। হাজার হাজার রোহিঙ্গা যুদ্ধবিধ্বস্ত দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। তখনকার বঙ্গবন্ধু সরকারের দৃঢ়তায় মিয়ানমার তাদের ফেরত নিতে বাধ্য হয়। আবার ’৭৭ সালে আসে প্রায় দুই লাখেরও অধিক। কূটনৈতিক চাপে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত তাদেরও ফেরত নেয় সে দেশ। তবে ১৯৯০ সালে যারা এল, রয়ে গেছে তাদের রেশ। আর অবশিষ্টদের বিতাড়নের প্রক্রিয়াও থেমে নেই। মিয়ানমারকে তাদের এ নীতি থেকে বিরত করতে না পারলে সমস্যাটি রয়েই যাবে।
কক্সবাজারের বনজঙ্গল কেটে এর পরিবেশ বিপর্যয় রোহিঙ্গারা করছে—এমন অভিযোগ হামেশাই করা হয়। আর এ বনজঙ্গল উজাড়ের মূল নায়কেরা সাধু সেজে থাকতে চান। আমাদের দু-তিনটি জেলাতেই রোহিঙ্গা রয়েছে। এর বাইরে দেশের সর্বত্র খাল–বিল, নদী–নালা, পাহাড়, জঙ্গল বিরান করছে কোন রোহিঙ্গারা? জঙ্গি কার্যক্রমও কিছু পরিমাণে আছে দেশের অন্যত্রও। তাই এসব বিষয়ে শুধু রোহিঙ্গাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। অবশ্য এ বক্তব্য তাদের এ দেশে আসা বা থাকতে দেওয়ার সপক্ষে নয়। রোহিঙ্গারা এ দেশে আসবে না এবং যারা এসেছে, তারা নিজ দেশে ফিরে যাবে—এটাই আমাদের নীতি। এ বিষয়ে কোনো বিতর্ক নেই। জনবহুল এ দেশটিতে আমরা নিজ জনগণকে স্থান দিতে পারছি না। আটকে পড়া পাকিস্তানিরা তো রয়েই গেল। তবে রোহিঙ্গারা আমাদের নিকট প্রতিবেশী দেশ থেকে বারংবার আসে, ক্রমান্বয়ে ধীরে ধীরেও আসে, তাদের ফেরত নেয় না মিয়ানমার সরকার। তাই এ বিষয়টি আমাদেরও সমস্যা বটে। এটা বিশ্বসমাজকে অব্যাহতভাবে জানাতে হবে। সব প্রচেষ্টা নেওয়া দরকার এর একটি স্থায়ী সমাধানে।
রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বিশ্বসমাজ একেবারে চুপ করে আছে, এমনটি বলা যাবে না। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনের সহায়তায়ই শিবিরগুলো পরিচালনা করা হয়। তবে এসব শিবিরবাসী রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসনের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ভুটান থেকে শরণার্থী হওয়া প্রায় এক লাখ নেপালিকে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ নিয়ে নিয়েছে। আর পত্রপত্রিকার তথ্য অনুসারে, ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মাঝে মাত্র ৯২৬ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন সম্ভব হয়েছে। এ দেশগুলো হলো কানাডা, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড, সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়া। সমস্যার ব্যাপকতা আর এসব দেশের সামর্থ্যের বিবেচনায় বলতে হবে, এ যেন পর্বতের মূষিক প্রসব। তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের ব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলো অত্যন্ত অনুদার নীতি অনুসরণ করছে। অথচ তাদের রয়েছে বিশাল ভূখণ্ড ও অঢেল সম্পদ। প্রয়োজন রয়েছে প্রচুর শ্রমশক্তির। মালয়েশিয়া অতিসম্প্রতি এ ধরনের কিছু করার কথা আলোচনায় এলেও এর আকৃতি ও প্রকৃতি অস্পষ্ট।
তবে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসন শেষ প্রচেষ্টাই বলতে হবে। প্রথমে দেখতে হবে মিয়ানমার যেন তাদের স্বীয় মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে। তখন সম্ভবত তারা অনেকেই অন্য কোথাও যেতে এমনভাবে আগ্রাসী প্রচেষ্টা নেবে না। আর আমাদেরও শিবিরবাসীর দ্বীপান্তরের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগটির সব দিক তলিয়ে দেখা দরকার। এতে আদৌ সমস্যা সমাধান না হয়ে নতুন সমস্যা সৃষ্টি করবে কি না, তা নিয়ে ভাবার আছে। আর বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা তো শুধু ৩২ হাজার নয়, কয়েক লাখ। তদুপরি সেই অবশিষ্টরা অচিহ্নিতও বটে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

বাংলাদেশী সীমান্তরক্ষীর সঙ্গে মিয়ানমারের আচরণে ক্ষোভ

মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে আটক এক বাংলাদেশী সীমান্ত রক্ষীর যে ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করেছে, তা বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছে। অনেকেই ছবিটি ফেসবুকে শেয়ার করছেন এবং আটক সীমান্তরক্ষীর সঙ্গে অবমাননাকর আচরণের অভিযোগ তুলছেন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডস বা বিজিবির সদস্য আবদুর রাজ্জাককে গত মঙ্গলবার টেকনাফের নাফ নদী থেকে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীরা ধরে নিয়ে যায়। সেদিন দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীদের মধ্যে গোলাগুলিতে বিজিবির অপর এক সদস্য আহত হন। অপহৃত বিজিবি সদস্য আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ গত কয়েকদিন ধরে চেষ্টা চালালেও এখনো কোন অগ্রগতি হয়নি। এ নিয়ে দুদেশের সম্পর্কে টানাপোড়েনও দেখা যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বাংলাদেশ সরকার।
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন যে ছবিটি ফেসবুকে অনেকেই শেয়ার করছেন সেটি বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্য আব্দুর রাজ্জাকের। ফেসবুকে শেয়ার করা ছবিতে দেখা যাচ্ছে আবদুর রাজ্জাককে হাতকড়া পরানো অবস্থায় একটি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়েছে। তাঁর পরনে লুঙ্গি আর বিজিবির ইউনিফর্ম। আরেকটি ছবিতে দেখা যায় তার সামনে কিছু অস্ত্র রাখা। মিস্টার রাজ্জাকের মুখে আঘাতের চিহ্ণও দেখা যাচ্ছে। তাঁর নাকের কাছে ক্ষতচিহ্ণ এবং শুকিয়ে কালচে হয়ে যাওয়া রক্তের দাগ।
বিবিসির বার্মিজ সার্ভিসের সাংবাদিক কো কো আং নিশ্চিত করেছেন যে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষই এই ছবিটি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট একটি সংবাদপত্র মায়াওয়াদিতে ছবিটি প্রকাশ করা হয়। তাদের ওয়েবসাইটে অবশ্য এখন আগের ছবিটি সরিয়ে একটি নতুন ছবি দেয়া হয়েছে যেটিতে আবদুর রাজ্জাককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেশী একটি দেশের একজন সীমান্ত রক্ষীকে ধরে নিয়ে গিয়ে মিয়ানমারের কর্তৃপক্ষ যে আচরণ করেছে তাকে বাংলাদেশের অনেকেই অবমাননাকর এবং চরম আপত্তিকর বলে মনে করছেন।
অনেকেই এটিকে জাতীয় লজ্জা বলে বর্ণনা করেছেন।
ফেসবুকে এম এম আমিনুর রহমান লিখেছেন , বার্মার মতো দুর্বল একটি দেশের সীমান্তরক্ষীরা ধরে নিয়ে বেঁধে রেখেছে? এই লজ্জা দেশের, এই লজ্জা পুরো জাতির । ফেসবুকে আরাফাত সিদ্দিকী নামে আরেকজন লিখেছেন , আমাদের বিজিবি সদস্য নায়েক রাজ্জাকের শিকল দিয়ে হাত বাঁধা ছবিটি যতবার চোখে পড়ছে ততবারই মনে হচ্ছে মিয়ানমার বাহিনী আমাকেই বেঁধে রেখেছে। আজ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন বলেন বিজিবি সদস্য অপহরনের ঘটনা জাতির জন্য লজ্জা । সূত্র- বিবিসি বাংলা

মার্কিন দূতাবাস থেকে মৃত্যুসনদ নেন ওসামার ছেলে: উইকিলিকস

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস থেকে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সাবেক প্রধান ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুসনদ নিয়েছিলেন তাঁর ছেলে। এ খবর জানিয়ে সৌদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিচার-বিষয়ক মন্ত্রীকে পাঠানো নথি ফাঁস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি গোপন নথি ফাঁস করে আলোচিত ওয়েবসাইট উইকিলিকস।
আজ শনিবার টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইনের খবরে জানানো হয়, উইকিলিকস ইন্টারনেটে পাঁচ লাখ সৌদি কূটনৈতিক নথি ফাঁস করতে যাচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় ইতিমধ্যে ৬০ হাজার নথি প্রকাশ করা হয়েছে বলে উইকিলিকস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে। এসব নথির বেশির ভাগই আরবি হরফের।
তাৎক্ষণিকভাবে এসব নথির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে উইকিলিকস যেহেতু সরকারি নথি ফাঁস করে আলোচিত হয়েছে, তাই ধরে নেওয়া যায় ফাঁস হওয়া নথিগুলোর সত্যতা আছে। এসব নথিগুলোর বেশির ভাগেই সবুজ কালিতে ‘কিংডম অব সৌদি আরাবিয়া’ ও ‘মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ লেখা ছিল। কিছু নথির ওপরে ‘জরুরি’ ও ‘গোপন’ লেখা ছিল। একটি নথি ছিল ওয়াশিংটনে সৌদি দূতাবাসের।
নথিগুলো যদি সঠিক হয়, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের প্রতি এবং মিসরের সেনা-সমর্থিত সরকারের প্রতি সৌদি সরকারের সমর্থনের নানা তথ্য পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফাঁস হওয়া ২০১২ সালে আবুধাবিতে অবস্থিত সৌদি দূতাবাস থেকে পাঠানো এক নথিতে দেখা গেছে, মিসরের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারককে সহায়তা না করতে সংযুক্ত আরব আমিরাত মিসরের সরকারের ওপর ‘প্রচণ্ড চাপ’ দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা এপি দাবি করেছে, তারা নথিতে থাকা অনেক টেলিফোন নম্বরে কল করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পেয়েছে। এ থেকে তারা ফাঁস হওয়া নথিগুলোর সত্যতা সম্পর্কে অনেকটাই নিশ্চিত। উইকিলিকসের মুখপাত্র ক্রিস্টিন রাফসন এপিকে বলেছেন, ফাঁস হওয়া তথ্যগুলো যে সঠিক, এ ব্যাপারে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
উইকিলিকস কীভাবে এসব নথি পেয়েছে, এটা স্পষ্ট না। উইকিলিকসের মুখপাত্রও এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু জানাতে চাননি। তিনি বলেন, তথ্যের উৎস না জানানোটা তাদের নীতি।
ওয়াশিংটনে সৌদি দূতাবাসও এ ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

চার দিনেও ছাড়েনি বিজিবি সদস্যকে, বৈঠকেও সাড়া দিচ্ছে না মিয়ানমার

মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ (বিজিপি) কর্তৃক অপহৃত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নায়েক আবদুর রাজ্জাককে চার দিন পার হয়ে গেলেও ফেরত দেয়নি মিয়ানমার পুলিশ। এমনকি ফেরত দেয়ার বিষয়ে পতাকা বৈঠকেও সাড়া দিচ্ছে তারা। ঘটনার চার দিন পার হয়ে গেলেও এখনো দু’ দেশের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়নি। এদিকে মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া বিজিবি সদস্য নায়েক আবদুর রাজ্জাককে হাতকড়া পড়িয়ে ফেইসবুকে ছবি প্রকাশ করেছে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ। বিজিবি সদস্য রাজ্জাককে মিয়ানমারের একটি সীমান্ত ক্যা¤েপ হাতকড়া পড়ে আটকে রাখা হয়েছে। ছবিতে দেখা গেছে নায়েক রাজ্জাকের মুখম-লে রক্তের দাগ রয়েছে। ছবিতে নায়েক রাজ্জাকের সামনে ১টি এম ২২ রাইফেল, গুলি, ৪টি মোবাইল সেট ও ২টি টর্চ লাইট দেখা গেছে। বিজিবি নায়েক রাজ্জাককে হাতকড়া দিয়ে অমানবিক ভাবে আটকে রাখায় বিজিবির পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। ৪২ বিজিবির অধিনায়েক লে.কর্নেল আবু জার আল জাহিদ ঘটনার পর থেকে যে কোন সময়য়ে পতাকা বৈঠক হতে পারে বলে দাবি করে আসলেও চার দিন পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
লে. কর্নেল আবু জার আল জাহিদ বলেন, নাফনদীতে গুলি বর্ষণ ও  নিয়ে যাওয়া নায়েক রাজ্জাককে ফেরতের বিষয়ে বৃহ¯পতিবার সকাল ১০টায় কক্সবাজার টেকনাফে স্থলবন্দর রেস্ট হাউজে মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশ (বিজিপি) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা  থাকলেও তা হয়নি। মিয়ানমার পুলিশ বৃহস্পতিবার পতাকা বৈঠকে আসার কথা ছিল শেষ পর্যন্ত তারা মিয়ানমার উধ্বর্তন কতৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় তারা আসেনি বলে জানান।
তিনি আরও বলেন, মিয়ানমার সঙ্গে আজ (শনিবার) যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা এখনও কোন সাড়া দেয়নি। তারা ঊধ্বর্তন কতৃপক্ষের অনুমতি পেলে বৈঠকে আসবে বলে বিজিবিকে জানিয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যহত রয়েছে। মিয়ানমার পক্ষ সাড়া দিলে পতাকা বৈঠক মাধ্যমে নায়েক রাজ্জাককে ফেরত আনা হবে বলে জানান কর্নেল আবু জার আল জাহিদ।
গত বুধবার সকালে নাফ নদীতে বাংলাদেশের জলসীমায় দুটি নৌকায় তল্লাশি চালায় টহলরত বিজিবির একটি দল। এ সময় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি পূর্ব দিক থেকে একটি ট্রলারে করে এসে বিজিবির টহল দলের ওপর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। এতে বিজিবির সিপাহি বিপ্লব কুমার (২১) গুলিবিদ্ধ হন। একপর্যায়ে আহত বিপ্লব কুমারকে নিয়ে বিজিবি দল নিরাপদ অবস্থানে চলে এলেও অপর সদস্য নায়েক আবদুর রাজ্জাককে তুলে নিয়ে যায় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।
এদিকে গোলাগুলির এই ঘটনাকে ভুল বোঝাবুঝি বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, টেকনাফে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির কারণেই মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) গুলি চালিয়েছে।

ইসরায়েল কী চায়?

গাজায় হামলা
‘ইসরায়েল কী করে একটি গণতান্ত্রিক এবং ইহুদি (রাষ্ট্র) থাকবে, যদি সে পশ্চিম তীরে বসবাসরত লাখ লাখ মানুষকে শাসন করতে চায়? সে কী করে শান্তিতে থাকবে যদি না সে সীমান্ত নির্ধারণ করতে চায়, দখলের অবসান না ঘটায় এবং ফিলিস্তিনিদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা না দেয়? আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি অন্য দেশের সমর্থন সে কী করে বন্ধ করবে, যদি না এটা দেখা যায় যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েল অঙ্গীকারবদ্ধ?’ এই প্রশ্নগুলো আমার নয়, এগুলো তুলেছিলেন ফিলিপ গর্ডন, যিনি হোয়াইট হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কার্যক্রমের সমন্বয়কারী।এই প্রশ্নগুলো গর্ডন তুলেছিলেন তেল আবিবে দেওয়া এক বক্তব্যে, এ বছরের ৮ জুলাই।বক্তব্য দেওয়ার তারিখটা উল্লেখযোগ্য; কেননা ওই দিনই ইসরায়েল গাজায় বিমান হামলার সূচনা করে। এখন ইসরায়েল গাজায় স্থল অভিযানও শুরু করেছে। বিমান হামলার কয়েক দিনের মধ্যেই বোঝা যাচ্ছিল যে ইসরায়েলিরা এ দফায় স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।আন্তর্জাতিক যত চাপ ও নিন্দাই হোক না কেন, ইসরায়েলিরা তাদের অভিযান থেকে পিছিয়ে আসেনি। আত্মরক্ষার এবং জাতীয় নিরাপত্তার যে যুক্তি ইসরায়েল দিয়ে আসছে, তা যে ধোপে টেকে না, সেটা সবাই জানেন। প্রতিবারের মতো এবারের অভিযানেও ইসরায়েলিরা তাদের সামরিক উদ্দেশ্য হিসেবে বলেছে হামাসের ধ্বংস সাধন। এই কথা বলে ইসরায়েল আগেও গাজায় হামলা করেছে।
তাও একবার নয়, একাধিকবার।কিন্তু তার ফলাফল কী হয়েছে আমরা জানি। হামাসের ধ্বংস সাধনে ‘সাফল্যের’ তো প্রশ্নই ওঠে না, বরং শেষ পর্যন্ত এই ধরনের হামলা ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড হামাসকে আরও বেশি শক্তিশালী করেছে। হামাসকে ধ্বংস করার কথা ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাসের অভাবনীয় বিজয়ের পর থেকে আরও জোরেশোরে বলা হচ্ছে। ২০০৮ সালের সেনা অভিযানের সময় এই কথা বলা হয়েছে, বলা হয়েছে ২০১২ সালের আক্রমণের সময়ও। এসব অভিযানের ফলে প্রাণ হারিয়েছে নিরপরাধ মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু এবং বয়স্ক মানুষ। সাংগঠনিকভাবে হামাসের দুর্বলতা থাকলেও ইসরায়েলের হামলার পরিণতিতে হামাস আরও বেশি করে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। এটা ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক নীতিনির্ধারকেরা জানেন না, তা নয়। তাঁরা সেটা জানার পরেও এই ধরনের হামলা, স্থল অভিযান, দখলদারি, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেছেন। আর যখন প্রত্যক্ষ যুদ্ধ পরিচালিত হয়নি তখন চলেছে বসতি স্থাপন, জমি দখল, পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ।এ ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ইসরায়েলকে দোষী সাব্যস্ত করেনি। মৃদু তিরস্কারের পাশাপাশি ইসরায়েলের টিকে থাকার অধিকারের, তার নিরাপত্তার অধিকারের কথা এমনভাবে বলা হয়েছে, যেন রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকেও সমর্থনে সামান্য ঘাটতি পড়েনি। শান্তি আলোচনায় কোয়ার্টেট (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ) কোনো রকম অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। ফলে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে বেড়েছে হতাশা; অব্যাহত নিপীড়ন এবং দখলদারির চাপে থাকা মানুষের সামনে আরও বেশি করে বিকল্প হিসেবে উপস্থিত হয়েছে হামাসের পথ।
তাহলে ইসরায়েল কী বিবেচনা থেকে বারবার এ ধরনের যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে? তাদের স্ট্র্যাটেজি বা কৌশলটি কী? ইসরায়েলের সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরায়েল এক দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের অংশ হিসেবেই এসব স্বল্পমেয়াদি সংঘাতে যুক্ত আছে। তঁাদের যুক্তি হলো, এটি হলো ইংরেজিতে যাকে বলে ‘লং ওয়ার অব অ্যাট্রিশন’; আমরা বলতে পারি ‘স্বল্প ক্ষতির দীর্ঘ লড়াই’। এর মূল কথাটি হলো যে ইসরায়েল একটি বড় যুদ্ধে বিজয়ী হবে না, তাই তাদের কাজ হচ্ছে আস্তে আস্তে হামাসের শক্তি ক্ষয় করা। তাঁরা মনে করেন যে এই কৌশলে তাঁরা সাফল্য লাভ করছেন। প্রমাণ হিসেবে তাঁরা ইসরায়েলি সরকারের একটি হিসাব তুলে ধরেন, যাতে বলা হচ্ছে যে হামাসের শক্তি ক্রমাগতভাবে দুর্বল হচ্ছে। ২০০৮ সালে হামাস তিন হাজার ৭১৬টি রকেট বা মর্টার হামলা করে। ২০১০ সালে ৩৬৯টি। ২০১২ সালে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের আগে হামাসের রকেট বা মর্টার হামলা ছিল দুই হাজার ৫৫৭; ২০১৩ সালে তা দাঁড়ায় মাত্র ৭৪টি। তাঁরা এও দাবি করেন যে ২০১২ সালের অভিযানের পর তিন মাসে হামাস মাত্র তিনটি হামলা চালাতে পেরেছে। তাঁরা এই সামরিক অভিযানের সাফল্যের সঙ্গে এটাও যুক্ত করেন যে এই সময়ে হামাস ক্রমাগতভাবে তার সমর্থন হারিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এ কথাও তাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন যে ২০১১ সালে ইসরায়েলে ‘আয়রন ডোম’ বা রকেট হামলা মোকাবিলার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর ইসরায়েলের নিজের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কম এবং তাতে করে আগে ইসরায়েলের ভেতরে এ ধরনের যুদ্ধের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের যে বিরোধিতা ছিল এখন তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ইসরায়েলের এই ‘স্বল্প ক্ষতির দীর্ঘ লড়াই’য়ের কৌশলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কোথায়?
তা হলো এই মতের অনুসারীরা বিস্মৃত হয়েছে যে গাজার জনসংখ্যা প্রায় ১৯ লাখ। তারা সবাই হামাসের সমর্থক না হলেও তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দেবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। আগ্রাসন এবং দখলদারির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ যে অচিরেই শেষ হয়ে যাবে না, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। এই কৌশলে যারা আস্থা রেখেছে তারা এও বিস্মৃত হয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হামাসের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পেলেও সর্বত্র তা হয়েছে, এই ধারণা সঠিক নয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরনের সহিংস গোষ্ঠীর উত্থান, যুদ্ধ ও সহিংসতার বিস্তারের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সরকারগুলোর মধ্যে যেকোনো ধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধের ব্যাপারেই এখন রয়েছে সংশয় এবং ভীতি। ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া, মিসর তাদের অবস্থানগত পার্থক্য সত্ত্বেও তারা মনে করে যে এখন হামাসের প্রতি খোলামেলা সমর্থন তাদের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। কিন্তু আরেক ধরনের পরিবর্তনও ঘটছে। ইউরোপের দেশগুলো প্রকাশ্যে ইসরায়েলের ব্যাপারে তাদের অস্বস্তি না জানালেও তারা ক্রমেই ইসরায়েলের আচরণে অখুশি। এই বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ইসরায়েল সফরের সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সে কথা জানিয়েছেন। ইসরায়েলিরা তা পছন্দ করেনি বটে, কিন্তু তার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই ব্রিটেনের সদ্য বিদায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগের দেওয়া শেষ বিবৃতিতে। এ বছরের গোড়ায় ফিলিস্তিনি নেতা মাহমুদ আব্বাস জন কেরিকে স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন যে শান্তি প্রচেষ্টায় অগ্রগতি না হলে তিনি হামাসের সঙ্গে জাতীয় ঐক্য সরকার প্রতিষ্ঠা করবেন। অনেকে সেটাকে হুমকি বলে মনে করেছিল; এখন তা বাস্তবায়িত হয়েছে, যা হামাসের জন্য ইতিবাচক বলেই গণ্য করতে হবে। ইসরায়েলের অনুসৃত কৌশলে হামাস আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে পড়বে বলে ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের যুক্তিটি আমাদের ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া দরকার অন্য কারণে। কেননা একার্থে তাঁরা ঠিক; কিন্তু তাঁরা যা ভাবছেন যে এতে করে ফলাফল তাঁদের অনুকূলে যাবে, সেটা ঠিক নয়। গত কয়েক বছরে আমরা দেখছি যে গাজায় হামাসের চেয়েও বেশি কট্টরপন্থী সংগঠনের উত্থান ঘটছে। তার পেছনে কাজ করেছে ইসরায়েলিদের সামরিক অভিযান,
নির্বিচার হত্যাকাণ্ড এবং দীর্ঘমেয়াদি শান্তিপ্রক্রিয়ার ব্যাপারে অনুৎসাহ। গত বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে ইসলামিক জিহাদ গাজার অধিবাসীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াতান সেন্টার ফর স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চের করা জনমত জরিপে দেখা যায় যে হামাসের জনপ্রিয়তা কমছে এবং ইসলামিক জিহাদের প্রতি সমর্থন আছে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের। ২০১০ সালে করা জরিপে ইসলামিক জিহাদের প্রতি সমর্থন ছিল মাত্র ১ শতাংশ। ফলে যদি ইসরায়েলিরা হামাসের দুর্বল অবস্থান দেখে আনন্দিত হয় এবং ভাবে যে এই ধরনের হামলা ও যুদ্ধ তাদের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে ভালো, তবে তারা বড় রকমের ভুল করছে। ইসরায়েলের এই আচরণের কারণে এখন সবাই প্রশ্ন করছেন, ইসরায়েল আদৌ শান্তি চায় কি না। শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েলের অঙ্গীকার নিয়ে যে প্রশ্ন ফিলিপ গর্ডন তুলেছেন, যার উদ্ধৃতি দিয়েছি এই নিবন্ধের শুরুতে, সেটা কেবল তাঁর প্রশ্ন নয়। সেই প্রশ্ন আগে কেবল ইসরায়েলের সমালোচকদের মধ্যে ছিল; এখন ইসরায়েলের বন্ধুদের মধ্য থেকেই এও প্রশ্ন উঠছে। ‘স্বল্প ক্ষতির দীর্ঘ যুদ্ধ’-এর কৌশল ইসরায়েল বিচার-বিবেচনা করেই নিয়েছে; হামাস সম্ভবত না বলেই সেই পথে পা বাড়িয়েছে। হামাসের নেতারা সম্ভবত মনে করেন যে বারবার যুদ্ধে জড়িত হয়ে ইসরায়েলের সামরিক ক্ষতি না হলেও রাজনৈতিক ক্ষতি এতটাই হবে যে তারা হামাসের দাবি মানতে বাধ্য হবে। সামরিক ক্ষতি কেন হবে না তার বিস্তারিত বলা অনাবশ্যক। এ ধরনের কৌশলে ইসরায়েল যেমন হামাসকে ধ্বংস করতে পারবে না; তেমনি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলকে ধ্বংস করার হামাসের লক্ষ্যও অর্জিত হওয়ার কারণ নেই। এই পথে সাফল্য অর্জনের চেষ্টায় নিরীহ গাজাবাসীকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। তাহলে সমাধান কোথায়? আমরা সবাই তা জানি। ফিলিপ গর্ডনের ভাষায় বলি, ইসরায়েল কী করে শান্তিতে থাকবে যদি না সে সীমান্ত নির্ধারণ করতে চায়, যদি না সে দখলের অবসান ঘটায় এবং যদি না সে ফিলিস্তিনিদের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা দেয়?
ইলিনয়, ১৯ জুলাই ২০১৪
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি

পাকিস্তানের একটি আদালত দেশটির সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে। ইসলামাদের জেলা ও দায়রা জজ কামরান বাশারত মুফতি শুক্রবার এ আদেশ দিয়েছেন। বিখ্যাত লাল মসজিদের পেশ ইমাম গাজী আবদুর রশিদ হত্যা মামলায় তার বিরুদ্ধে এ পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এ মামলায় আদালতে হাজিরা না দেয়ার যে আবেদন মোশাররফের পক্ষ থেকে করা হয়েছিল তাও নাকচ করে দিয়েছেন বিচারক। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন পারভেজ মোশাররফকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করার জন্য পুলিশের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আগামী ২৪ জুলাই এ মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন জেলা ও দায়রা জজ মুফতি। এর আগে এপ্রিলে একটি নিম্ন আদালতও মোশাররফের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জরি করেছিল।
একাধিকবার আদালতে হাজিরা দেয়ার নির্দেশ পালনে ব্যর্থ হওয়ার পর ওই আদেশ জারি করা হয়। সাবেক সেনা শাসক মোশাররফ অবশ্য তার আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতকে জানিয়েছেন, গাজী আবদুর রশিদ হত্যা মামলার তদন্তে পুলিশ তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পেয়ে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছিল। কাজেই একই মামলায় তাকে আদালতে টানাটানি করার প্রয়োজন নেই। ২০০৭ সালের ১০ জুলাই তৎকালীন সেনা শাসক জেনারেল মোশাররফের নির্দেশে ইসলামাবাদের লাল মসজিদে সেনা অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে বহু বেসামরিক নাগরিকের পাশাপাশি সস্ত্রীক নিহত হন মসজিদের পেশ ইমাম গাজী আবদুর রশিদ। ২০১৩ সালে ওই হত্যাকাণ্ডের দায়ে মোশাররফের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ।

ধর্ষিত পুরুষদের হাসপাতাল

যৌন নিগৃহীত পুরুষদের চিকিৎসার জন্য সুইডেনে খোলা হচ্ছে হাসপাতাল। এ ধরনের হাসপাতাল এই প্রথম। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে সাউথ জেনারেল হাসপাতালে ধর্ষিত বা নিগৃহীত নারীদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। এই হাসপাতাল ঘোষণা দিয়েছে, আগামী অক্টোবর থেকে তারা ধর্ষিত পুরুষদের চিকিৎসা দেবে। সুইডেনের গণমাধ্যম জানিয়েছে, ২০১৪ সালে দেশটিতে ৩৭০ পুরুষ ধর্ষণ বা যৌন নিগ্রহের শিকার হয়েছেন।
রেডিও সুইডেনকে সুইডিস চিকিৎসক লোতি হেলস্ট্রম বলেছেন, সাধারণভাবে মনে করা হয়, পুরুষরা ধর্ষিত হন না। কিন্তু পুরুষদের ধর্ষিত হওয়ার ঘটনা ‘মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। এটি যে মাত্রায় ঘটছে, মানুষ এ বিষয়ে ততটা সচেতন নয়। ফলে নারীদের মতো ধর্ষিত পুরুষদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। সাউথ জেনারেল হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা যৌন নিগৃহীত নারীদের সেবা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে পুরুষদের। সুইডেনের যৌনতা শিক্ষাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান অ্যাসোসিয়েশন ফর সেক্সুয়ালিটি এডুকেশন (আরএফএসইউ) সাউথ জেনারেল হাসপাতালের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ইনজার জোর্কলান্ড বলেছেন, পুরুষদের জন্য হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা করায় এতে ধর্ষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে পুরুষদের মধ্যেই সচেতনতা সৃষ্টি হবে। বিবিসি।

হাঁ-বাজেট না-বাজেট by মাহবুব তালুকদার

চাচা বললেন, দেশের অবস্থা নিয়ে তুমি এত কথা বলো। কিন্তু এবারের বাজেট নিয়ে তো তুমি কোন কথাই বললে না।
বললাম, আমি অর্থনীতিবিদ নই যে, বাজেট সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মতো মতামত দিতে পারবো। তবে বাজেট সম্পর্কে আমার নিজস্ব কিছু প্রতিক্রিয়া আছে।
কী রকম? চাচা জানতে চাইলেন।
চাচা! এবারের বাজেট হচ্ছে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী বাজেট। মাননীয় অর্থমন্ত্রী নিজেই একজন ব্যতিক্রমী মানুষ।
কী কারণে তাকে ব্যতিক্রমী বলছো?
তিনি একজন নমস্য ব্যক্তি। তার হাসিটি বড়ই প্রাণখোলা। ‘রাবিশ’, ‘স্টুপিড’ ইত্যাদি শব্দের সহজাত ব্যবহারের জন্য তিনি আলোচিত। তবে আমার মনে ও মননে তিনি আসন পেতেছেন সৃজনশীল চিন্তাভাবনার কারণে।
কি সেই সৃজনশীলতা?
ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে একবার তিনি বলেছিলেন, একদিন জোড় সংখ্যার গাড়ি এবং একদিন বেজোড় সংখ্যার গাড়ি চালালে সমস্যার সমাধান হবে। আরও একটা প্রস্তাব ছিল তার।
কি প্রস্তাব?
গাড়ি রাস্তায় চলতে হলে চারজনের কম যাত্রী থাকলে হবে না। একজন বা দুজন যাত্রী থাকলে গাড়ি চলবে না। তবে এ প্রস্তাবগুলো কার্যকর করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
কথাগুলো তার পক্ষে গেল, না বিপক্ষে গেল?
পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে আমি ভাবি না। তবে কথাগুলো খুবই মৌলিক চিন্তা বলে আমার মনে হয়েছে। এরকম ব্যতিক্রমী চিন্তার মানুষকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায় না।
চাচা গম্ভীরমুখে বললেন, মুহিত স্যারের কথা থাক। তার প্রণীত বাজেটকে তুমি ব্যতিক্রমী বলছো কেন?
আমি জানালাম, সেই আদিকাল থেকে দেখে আসছি বাজেট পেশের আগের দিন সরকারি দল ব্যানার-প্ল্যাকার্ড তৈরি করে বাজেটের স্বপক্ষে অভিনন্দন জানিয়ে রাজপথে মিছিল করে। অন্যদিকে বিরোধী দল গণবিরোধী বাজেট পেশের নিন্দা জানিয়ে পাল্টা শোভাযাত্রা করে। এবারের বাজেট পেশের পর তেমন পক্ষে-বিপক্ষে শো-ডাউনের আয়োজন দেখা যায়নি। এ জন্য এটা ব্যতিক্রম।
এটাও আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর হলো না।
তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটা চমক। সেদিক থেকে এটা ব্যতিক্রম। এ ধরনের বাজেট তারাই দিতে পারেন, যারা মনে মনে কবি।
মুহিত স্যার মনে মনে কবি?
অবশ্যই। আমি তাকে মনেপ্রাণে কবি বলিনি। মনে মনে কবি বলেছি।
বাজেটের সঙ্গে কবির সম্পর্ক কি?
চাচা! কেবল কবিদের পক্ষেই কল্পনাবিলাসিতা সম্ভব। সে জন্যই অর্থমন্ত্রীদের কবি হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কল্পনাবিলাসী না হলে তারা দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখাবেন কি করে? তাছাড়া, নিজে স্বপ্ন না দেখলে দেশের মানুষকে স্বপ্ন দেখানো সম্ভব নয়। মাননীয় অর্থমন্ত্রীর এ গুণটি রয়েছে।
তোমার আজকের কথার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। তুমি অর্থমন্ত্রীর কথা বাদ দিয়ে বাজেট সম্পর্কে সরাসরি কথা বলো।
ঠিক আছে। আমি তাই-ই বলছি। আমার মতে কোন বাজেট প্রণয়নের আগে পূর্ববর্তী বছরের বাজেটের সাফল্য ও ব্যর্থতার পর্যালোচনা করা উচিত। এডিপি’র বাস্তবায়ন কতখানি সম্ভব হয়েছে, কতখানি হয়নি, কেন হয়নি, তার মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল।
হুঁ। এটা একটা কথা হতে পারে।
এই মূল্যায়ন কেবল যে সরকার করবে, তা নয়। বিশেষভাবে বিরোধী দলের উচিত এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করে দেশের মানুষের কাছে বাজেটের সমালোচনার দিকগুলো তুলে ধরা।
শুধু সমালোচনার কথা বলছো কেন? সাফল্যের কথা বলছো না কেন?
বিরোধী দল যদি সরকারের সাফল্যের গীত গাইতে চায়, তাহলে তা তারা করতে পারে। অবশ্য আমাদের দেশের সংসদের বিরোধী দল তো সরকারেরই অংশ।
কেন? আমাদের সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ তো বাজেটের সমালোচনাও করেছেন।
কিছু সমালোচনা না করলে বিরোধী দলের তকমাটা থাকে না, সম্ভবত সে কারণেই করেছেন।
তুমি বাজেটের আলোচনা করতে গিয়ে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছো।
বাজেটে রাজস্ব আদায় বাড়াতে করের আওতা বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু করদাতাদের সেই অর্থের কত অংশ দুর্নীতি ও অপচয়ে খরচ হবে, তা বলা হচ্ছে না।
এ কথার অর্থ কি?
দুর্নীতি থেকে রক্ষা পেতে বাজেটে কিছু অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল।
সে তো আছেই। দুদককে সরকার যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে।
আমি দুদকের কথা বলছি না। তাদের দুর্নীতিমুক্তির সার্টিফিকেট জারি নিয়ে কোন প্রশ্ন তুলছি না।
তাহলে?
আমি ন্যায়পালের কথা বলতে চাই। আমাদের সংবিধানে ন্যায়পালের কথা আছে। কিন্তু মন্ত্রী-এমপিসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দুর্নীতির সুরক্ষা দিতে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
আশ্চর্য! মন্ত্রী-এমপি বা প্রভাবশালীদের সমালোচনা করা ছাড়া তোমার কি আর কোন কাজ নেই?
আছে। তবে চোখের সামনে যা দেখা যাচ্ছে, তার চিত্রটি প্রথমে তুলে ধরা উচিত।
ঠিক আছে। বলে যাও।
চাচা! সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ১৬ জন এমপি’র কর্মকাণ্ডে সরকার বিব্রত বলে খবর ছাপা হয়েছে। এরা খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা, চোরাচালান, জমি দখলসহ নানা অপকর্মে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত বলে পত্রিকাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পত্রিকায় তাদের নামও উল্লিখিত আছে। কিন্তু কেউ তা অস্বীকার বা প্রতিবাদ করেছেন বলে জানা যায়নি। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে উপর থেকে সবুজ সংকেত না মিললে কর্তৃপক্ষ নাকি এদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে না।
তুমি বাজেটের আলোচনা করতে গিয়ে অন্যদিকে চলে যাচ্ছো।
চাচা! বাজেটের আলোচনা তো কেবল কর আদায় আর খাতওয়ারি অর্থ বরাদ্দের বিষয় নয়। যারা রাজস্ব যোগাচ্ছেন, তাদের অর্থ লুটপাট হচ্ছে কিনা, কারা কিভাবে তা লুটপাট করছে, সে বিষয়টিও সারফেসে উঠে আসা দরকার। আমার মতে সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেই লুটপাটের প্রশ্রয় রয়েছে।
তুমি বড় কঠোর কথা বলছো।
হতে পারে। চোখের সামনে যা দেখছি, তাই বলছি। আমি জানালাম, একটা উদাহরণ দিতে চাই। অন্য একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার প্রধান খবরে বলা হয়েছে: ‘টেন্ডারবাজি রোধে সরকার ই-টেন্ডারের ঘোষণা দিলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সারা দেশের টেন্ডার এখন নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সরকারি দলের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, হানাহানি।’ আরও বলা হয়েছে ‘এমপিদের রামরাজত্ব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকারি দলে অব্যাহত সংঘাত-সংঘর্ষ’ চলছে। ই-টেন্ডার চালু হলে টেন্ডারবাজি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তা করা সম্ভব হচ্ছে না।
তুমি বাজেট সম্পর্কে কথা বলো।
সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা তো বাজেটেরই অংশ। যে দেশে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেলে কারও টনক নড়ে না। ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় না, সেখানে করদাতাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে রাজস্ব আদায়ের নৈতিক শক্তি থাকে কিনা, তা বিবেচনাযোগ্য।
তোমার আজ কি হয়েছে বলো তো? কিসব কথাবার্তা বলছো?
চাচা! দেশের আইন যেন কেবল সাধারণ মানুষের জন্য, প্রভাবশালীদের জন্য কোন আইন নেই। দুর্নীতির পেটেই যদি সিংহভাগ কর ঢুকে যায়, তাহলে বাজেটের আকার বাড়ানোর অর্থ দুর্নীতিরও আকার বাড়ানো। ক’দিন আগে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ অর্থাৎ টিআইবি দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী, কেবিনেট মন্ত্রী, উপদেষ্টা, আইনপ্রণেতা, বিচারক, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের সম্পদের বিবরণ প্রকাশ করে তা নিয়মিতভাবে আপডেট করা হোক। এটা করতে অসুবিধা কি?
এর সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক কি?
আছে। টিআইবি উল্লিখিত মাননীয় ব্যক্তিবর্গ নিয়মিত কর দেন কিনা, কতটা কর দেন, তাদের সম্পদ কি হারে বাড়ে, তা দেশবাসীর জানা প্রয়োজন। কিছুদিন আগে একজন এমপি বলেছেন, ‘ক্ষমতায় থাকলে সম্পদ তো বাড়বেই।’
টিআইবি’র কথা আর বলো না। ওরা সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি আমলেও টিআইবি’র বিরুদ্ধে একই অভিযোগ ছিল। ঐ সময়ে এ জন্য ডক্টর মোজাফ্‌ফর আহমদকে কম নিগ্রহ পোহাতে হয়নি। তার মানে টিআইবি এখন ঠিক লাইনেই আছে।
তুমি বাজেটের বিষয়ে বলো। বাজেটের ব্যাপারে তোমার কোন সুপারিশ আছে কি?
হ্যাঁ। আমার কমপক্ষে দুটি সুপারিশ আছে।
কী, কী, বলো।
প্রথমটি হলো, বাজেট বাস্তবায়নে দুর্নীতিমুক্ত আর্থিক ব্যবস্থাপনা। এটি না করা গেলে ব্যাপক রাজস্ব আদায় করা হবে কোন মুখে? মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রিপোর্টেও বলা হয়েছে: ‘রাজস্ব আদায়ে ন্যূনতম শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ’।
চাচা সরোষে বললেন, বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় নিয়ে কথা বলার তারা কে? যুক্তরাষ্ট্রকে এই অধিকার কে দিয়েছে?
এই অধিকার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ। আমি বললাম, যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র আর্থিক সাহায্য দিয়ে থাকে, তাদের ব্যাপারে মার্কিনিরা জানতে চায় তাদের ট্যাক্সের টাকা কোথায় কিভাবে খরচ হচ্ছে। যথাযথভাবে তাদের ট্যাক্সের টাকা ব্যয় হচ্ছে কিনা। এ সম্পর্কিত রিপোর্টে রাজস্ব খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশ মার্কিন সাহায্য না নিলে তারা এই খবরদারি করতে পারতো না।
চাচা চিন্তিতমুখে বললেন, হুঁ। বুঝলাম। তোমার আরেকটি সুপারিশ কি?
গণতন্ত্রের সংকট নিরসন করা। এটা করা হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া জিডিপির টার্গেট সাত শতাংশ বা যা-কিছুই ধরা হোক না কেন, তাতে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। আমি জানালাম।

‘যেন কারবালার ময়দান থেকে ফিরে এসেছি’

কঙ্কালসার দেহ। পরনে জীর্ণ বসন। উষ্কখুষ্ক চুল। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। নির্যাতনের আঘাতে শরীরে কালচে দাগ। কারও আবার গভীর ক্ষত। এসব নিয়েই দেশে ফিরেছেন সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় উদ্ধার হওয়া ৬২ বাংলাদেশী। দেশে ফিরে বর্ণনা দেন সাগর থেকে উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ওপর চালানো বর্বর ও অমানুষিক আচরণের। তাদের বর্ণনায় উঠে আসে- দিনের পর দিন খেতে না দেয়া, নিয়মিত শারীরিক নির্যাতনসহ নানা লোমহর্ষক কাহিনী। বলেন, কখনও কখনও এক মুঠো ভাত দিলেও পানি দেয়নি। যেন কারবালার ময়দান। পানির জন্য বুক ফেটে গেলেও পানি পাওয়া যায়নি। পানির কথা বললেই নেমে আসতো নির্যাতন। সে নির্যাতনের মাত্রা এতই ভয়াবহ ছিল যে, সইতে না পেরে তাদের অনেক সঙ্গীই মারা গেছেন। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অর্ধমৃত অবস্থায়ই সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছে তাদের। চোখের সামনে এমন মৃত্যু দেখে ভুলেই গিয়েছিলেন বেঁচে ফেরার কথা। কিন্তু ভাগ্য তাদের সহায় হয়েছে, তাই ফিরতে পেরেছেন- আর দেশের মাটিতে পা রেখে তারা বললেন, যেন কারবালার ময়দান থেকে ফিরে এসেছি। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় বাংলাদেশ বিমানের বিজি-১৮৭ ফ্লাইটে করে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান হতভাগা এই ৬২ বাংলাদেশী। এদের মধ্যে রয়েছেন ৪০-৪৫ বছর বয়সীরা। রয়েছেন ২০-২৫ বছরের যুবক। আবার ১২-১৩ বছরের কিশোরও রয়েছে। এরা সবাই দালালের খপ্পরে পড়ে অবৈধ সমুদ্রপথে পা বাড়িয়েছিলেন। কেউ জেনে, কেউ না জেনে। বাড়ি থেকে রওনা দেয়ার আগেই কারও কাছ থেকে দালালরা হাতিয়ে নিয়েছিল মোটা অঙ্কের টাকা। আবার কাউকে জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করেছে মুক্তিপণ। বৃহস্পতিবার বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদেরকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। আইওএম-এর ঢাকার সিনিয়র সমন্বয়কারী শাকিল মনসুর জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় উদ্ধার হওয়া ৭১৬ জন বাংলাদেশীর মধ্যে প্রথম দফায় এই ৬২ জন দেশে ফিরলেন। সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় গত ১১ই মে লংকাবি দ্বীপের উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয় তাদের। কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন তাদের শনাক্ত করে নামের তালিকা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যাচাই-বাছাই করে তাদের যাবতীয় কাগজপত্র মালয়েশিয়ার বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠানো হয়। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঈদের আগেই বাকিরা নিরাপদে দেশে ফিরতে পারবেন। ফিরে আসা বাংলাদেশীদের অধিকাংশই কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, জয়পুরহাটের বাসিন্দা। এর আগে সোমবার সন্ধ্যায় থাইল্যান্ড থেকে ৪৭ জন বাংলাদেশী অভিবাসীকে ফিরিয়ে আনা হয়।  বৃহস্পতিবার ফিরে আসা ৬২ জনের মধ্যে ছিল ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার বড়বাড়ি গ্রামের আবদুল মজিদের ছেলে কিশোর রাজিব ও মনির হোসেনের ছেলে মোস্তফা কামাল। বিমানবন্দরে তাদের নিতে আসা চাচা আবুল কালাম জানান, আমরা ভেবেছিলাম তারা মারা গেছে। এদের হারানোর শোকে গত ৪ মাস ধরে বাড়িতে সবার খাওয়া-দাওয়া বন্ধ। রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়ায় এদের মা-বাবা। তারা নিখোঁজ হওয়ার পর যশোর জেলার জগদীশপুর গ্রামের ওয়াহিদ দালাল তাদের ফিরিয়ে দেবে বলে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। পরে একেক জনের পরিবার ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা দেয়  তাকে। কিন্তু ৩ মাসেও তাদেরকে ফেরত দিতে পারেনি। এরপর মামলা করার কথা বললে দালাল ওয়াহিদ নানা ধরনের হুমকি দেয়। সে বলে- আমার ভাই সচিব। কেউ আমার কিছু করতে পারবে না। তারপর থেকে তাদের ফিরে আসার আশা ছেড়ে দিয়েছিল সবাই। কিন্তু গত ১৯দিন আগে পুলিশ বাড়িতে গিয়ে জানায় তারা বেঁচে আছে। এরপর থেকেই বাড়িতে খুশির বন্যা। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। আবুল কালাম আরও জানান, একইসঙ্গে যাওয়া আরও দুই কিশোর তাদের গ্রামের মৃত সাঈদের ছেলে উজ্জ্বল এবং সামাদের ছেলে উজ্জ্বল এখনও ফেরেনি। তারা এখনও মালয়েশিয়াতেই আছে। তিনি দালালের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। একই জেলার শৈলকুপা উপজেলার আড়ুয়াকান্দি গ্রামের কালাম বলেন, হাটগোপালপুর গ্রামের মনোয়ারের মাধ্যমে ৩ মাসে আগে এ পথে গিয়েছিলেন। কিন্তু তখন বুঝতে পারেননি তাদের সঙ্গে এমন করা হবে। বলেন, দেড়মাস একটি পাহাড়ে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করেছে তারা। পরে ট্রলারে করে সাগরে নিয়ে গিয়েও নির্যাতন করেছে। বগুড়ার সালাম। কঙ্কালসার দেহ। দেখে মনে হয় বহুদিন ধরে অভুক্ত রয়েছেন এ মানুষটি। তার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই তিনি দুই বাহু ও পিঠ বের করে দেখান। সেসব জায়গায় কালচে দাগ। পেশায় কৃষিজীবী সালামের বাড়ি কাহালু উপজেলার পাঁচখুর গ্রামে। বলেন, ৬ মাস আগে স্ত্রীকে জানিয়েই তিনি মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য একইগ্রামের কামরুল দালালের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু কামরুল তাকে টেকনাফ পৌঁছে দিয়েই উধাও হয়ে যায়। পরে অন্যরা তাকে ট্রলারে উঠিয়ে নেয়। এরপর ট্রলারে চলতে থাকে নির্যাতন। ওই সময় বাড়িতে ফোন করে দালাল কামরুলকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন পানির ওপরে থাকতেই টাকা চেয়েছিল। বাড়ি থেকে টাকাও দিয়েছে। কিন্তু নির্যাতন থামেনি। তিনি বলেন, প্রতিদিন খুব মারধর করতো। ২ বেলা একমুঠো করে শুধু ভাত দিতো। কিন্তু পানি দেয়নি। পানি চাইলে আরও মারধর করতো। তাদের মারধরের কারণে অনেকেই মারা গেছে। আবার অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ায় জ্যান্তই সাগরে ফেলে দিয়েছে। দীর্ঘ তিনমাস তারা এভাবেই কাটিয়েছেন সাগরে। বেঁচে ফিরবেন এ আশা কখনই ছিল না। ভেবেছিলেন অনেক সঙ্গীর মতো একদিন তিনিও মারা যাবেন। তিনি আরও বলেন, তারা যে ট্রলারে ছিলেন তাতে ৪৫০ জন মানুষ ছিল। এদের সবাই বাংলাদেশী। এর মধ্যে ৬৫ জন মারা গেছে। এদের বেশির ভাগই নির্যাতন এবং পানির অভাবে মারা গেছেন। অসুস্থ হয়ে গেলে আধমরা অবস্থায়ই সাগরে ফেলে দিয়েছে। নির্যাতনে চিহ্ন তার শরীরে লেগে থাকা দাগ দেখিয়ে বলেন, দেশে জেল খাটলেও ভাল। প্রতিদিন এত মারধর তো কবরে না। ফিরে আসা প্রত্যেকের জীবনেই ঘটেছে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা। প্রত্যেকের শরীরেই রয়েছে ক্ষত। অনেকেই কথাও বলতে পারছেন না ঠিকমতো। সেই বিভীষিকাময় দিনের কথা মনেই করতে চান না তারা। বলেন, এসব কথা বলে বুঝানোর না। আইওএম-এর কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাকিল মনসুর বলেন, ফিরে আসা ৬২ জনের মধ্যে বাবুল নামে ১ জন অসুস্থ থাকায় তাকে বিমান থেকে নামানোর পরেই অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। তিনি উদ্ধার হওয়ার পর মালয়েশিয়াতে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন।
শাকিল আরও বলেন, দেশটিতে উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে অনেক রোহিঙ্গা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার কোনভাবেই তাদের আনবে না। এজন্য ভেরিফিকেশনের জন্য একটু সময় লাগছে। সেদেশে উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ৭১৬ জনের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঈদের আগেই তাদের ফেরত আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

ব্রেটনউড থেকে ডাভোস by এম আবদুল হাফিজ

‘এখন শতকরা এক ভাগ শীর্ষ ধনীর হাতে সব বিশ্ববাসীর অর্জিত সম্পদেরও অধিক সম্পদ।’ ব্রিটেনভিত্তিক চ্যারিটি সংগঠন ‘অক্সফাম’ তাদের এই গবেষণালব্ধ তথ্য সুইস স্কি রেসোর্ট’ ডাভোসে চলমান বিশ্ব ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক অধিবেশনকে জানিয়ে সেখানকার সবাইকে অবাক করেছে। কিন্তু এই অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী প্রায় দেড়শ’ দেশের অবিশ্বাস্য ধনী রাষ্ট্রনায়ক, শিল্পপতি, ব্যবসা- প্রতিষ্ঠানের মালিক, সমাজ-সংস্কৃতি-সাহিত্যে নতুন ধারার জন্মদাতা নোবেল লরিয়েট ও জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন পরিবর্তনের সূচনাকারী সেলিব্রিটিরা এবং তাবৎ ব্র্যান্ড ও ফ্যাশন গুরুরা এই তথ্যে অবাক হননি। কেননা তারাই তো প্রকারান্তরে এসব প্রবণতার নেপথ্যে সক্রিয় থাকেন এবং তাদের অবদানের জন্য যা কিছু পাওয়ার তা তারা পেতে থাকেন। এক কথা তারাই এর বেনিফিসিয়ারি।
বিষয়টি বুঝতে একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ব্রিটেন ও তার কিছু পর ইউরোপের অন্যান্য দেশে শিল্প বিপ্লব ঘটলে এবং মুনাফাভিত্তিক পুঁজিবাদের উত্থান হলে তারই সমান্তরালে তা ‘জীবন ব্যবস্থা’ হিসেবে সমাজতন্ত্রকে উসকে দেয়। শুরু হয় উভয়ের মধ্যে একটি অসম প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় ধনতান্ত্রিক বিশ্ব অনেকটা এগিয়ে তার অন্তর্নিহিত শোষণে সমাজতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান মানবিক আবেদন ধনতন্ত্রকে ঘিরে যে জীবন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তার প্রতি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিংশ শতাব্দীতে দুটি প্রলয়ঙ্করী বিশ্বযুদ্ধে যদিও আলোচ্য দুই মতাদর্শের স্পষ্ট প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি এবং তা নেহায়েত ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর বাজার সম্প্রসারণে ও  প্রভাববলয় বিস্তৃত করতেই সংঘটিত হয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ ভাগে এসে মিত্র শক্তি যা মূলত ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক উভয় শিবিরের সমন্বয়ে সংগঠিত হয়েছিল উত্তর শিবিরের অভিন্ন শত্রু হিটলারের দুর্দমনীয় প্রতিপত্তি লিপ্সাকে মোকাবিলায় তাতে ঘটনাচক্রে উভয় শিবিরের দেশগুলোর ‘জাতীয় স্বার্থের’ সংঘাতে চিড় ধরে এবং তারা পরস্পরকে অবিশ্বাস করতে শুরু করে।
জার্মানির নাৎসি নেতা এডলফ হিটলারের থার্ডবাইখের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত হলেও এই দুর্ধর্ষ নেতা মতাদর্শে কম ধনতান্ত্রিক ছিলেন না এবং তার দেশও ছিল শীর্ষ শিল্পোন্নত দেশগুলোর অন্যতম। তবু ধনতান্ত্রিক বিশ্বের সঙ্গে তার বিরোধ বাধে তার শক্তির অনুপাতে বিশ্ব ব্যবস্থায় তার স্থান নিরূপণ করার দাবি করলে। কিন্তু মিত্র শক্তির অন্তর্গত একমাত্র সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মিত্র শক্তির ধনতান্ত্রিক অংশের সঙ্গে সংঘর্ষ ছিল মতাদর্শগত। তাই মিত্র শক্তির নেতারা ভবিষ্যৎ বিশ্বের রূপরেখা প্রণয়ন করতে সোভিয়েত নেতা স্তালিনের চোখে ধুলো দিয়ে যুদ্ধ সমাপ্তির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসার পূর্বেই গোপনে আটলান্টিকের ওপারে পাড়ি জমান। আমেরিকার অঙ্গরাজ্য নিউ হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউডে রচিত হয় আগামী দিনের বিশ্ব ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী ব্যবস্থাপত্র, যা বাস্তবায়নের জন্য সব আনুষঙ্গিক প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্বে না আসলেও সেগুলোরও সব খুঁটিনাটি ব্যবস্থাপত্রে সংযোজিত হয়েছিল। সুচিন্তিতভাবে ব্রেটেনউডে প্রণীত ব্যবস্থাপত্রে বিশ্বব্যাংক বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বায়ন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং ক্রমে ক্রমে পরবর্তীতে সেগুলোর অস্তিত্বে আসাও আমরা দেখেছি। ব্রেটনউডেই সম্ভবত আজকে এতদিন পর আমরা যে ভয়ঙ্কর অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখছি, হাজার কোটি টাকার এলিট শ্রেণী এবং তার গা ঘেঁষেই দেখছি সমাজের তলানিতে আন্ডারডগ ও ছিন্নমূলদের অবস্থান তার ব্যবস্থাও ব্রেটনউডে স্থিরিকৃত হয়েছিল।
ডাভোসে শীর্ষ ধনীদের বিলাসবহুল পুনর্মিলনী এবং ধনতান্ত্রিক বিশ্বকে আপন মর্যাদায় স্থায়িত্ব দেয়ার কৌশল প্রণয়নে ব্রেটনউড মডেলকেই অনুসরণ করা হয়। আমার জানা মতে ডাভোসে অংশগ্রহণকারী একমাত্র সম্ভবত আমাদের দেশের একটি রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের ফসল অস্বাভাবিক ও অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। তিনি সরকারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে ওই সেলিব্রেটি সম্মেলনে গিয়েছিলেন এবং হামিদ কারজাই প্রমুখদের সঙ্গে কাঁধ ঘেঁষাঘেঁষি করেছিলেন। হায়রে সমাজতন্ত্র যাকে বঙ্গবন্ধু ছয় দফা আন্দোলনের ছাত্র সমাজের চাপে সমাজতন্ত্রের দাবি সংবলিত এগোরো দফা গ্রহণ করেছিলেন। স্বাধীনতার পর সমাজতন্ত্র রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির সঙ্গে সংবিধানে স্থান পেয়েছিল। এখন হাজার কোটি টাকার সুপার রিচদের দাপটে সমাজতন্ত্র এ দেশে নির্বাসিত।
তবু সমাজতন্ত্রের বাতি আজো ধিকি ধিকি জ্বলছে সুদূর লাতিন আমেরিকায় ‘সোশ্যাল ফোরামের’ ব্যানারে।  ব্রেটনউডের কাছে সোভিয়েতরা হার মানলেও বিশ্বের কোটি কোটি মুক্তিকামী মানুষ এখনো আশায় বুক বাঁধে এবং সোশ্যাল ফোরামে সংঘবদ্ধ হয় এশিয়ায়, আফ্রিকায় এবং লাতিন আমেরিকায়। তারাও দেখে তারা বলিভিয়ায়, হুগো শ্যাভেজ, চে গুয়েভারা ও ফিদেল ক্যাস্ট্রোর দেশে।
লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কলামিস্ট। সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস

দলবদলের হিড়িক by কাফি কামাল

আওয়ামী লীগে যোগদানের হিড়িক পড়েছে বিরোধীজোটের তৃণমূলে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক হয়রানি থেকে বাঁচতে সরকারি দলে আশ্রয় নিচ্ছেন মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত বিরোধী জোটের কর্মী-সমর্থকরা। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর শুরু হয়েছিল এ দলবদল। সেটা ত্বরান্বিত হয় ২০১৫ সালের শুরুতেই অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে। একদিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অসহনীয় হয়রানি অন্যদিকে বিরোধী জোটের গন্তব্যহীন আন্দোলন। অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা বিরোধী জোটের তৃণমূল নেতাকর্মী-সমর্থকরা অস্তিত্ব রক্ষায় বাধ্য হয়েই ছেড়ে যাচ্ছেন নিজ নিজ দল। মন্ত্রী-এমপিদের ফুলের তোড়া দিয়ে, সংবাদ সম্মেলন করে তারা ভিড়ছেন ক্ষমতাসীনদের ছায়াতলে। আওয়ামী লীগও দলে টেনে নিচ্ছে তাদের। বিরোধী জোটের শক্তিক্ষয় করতে বাছ-বিচারহীনভাবেই দলে বেড়াচ্ছেন বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সমালোচনা থাকলেও বিরোধী জোটের আন্দোলনকে দুর্বল, তৃণমূল পর্যায়ে দল ভারি করার নানাদিক বিচার করে প্রতিপক্ষ দলের নেতাকর্মীদের দলে টানতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও উৎসাহী। ২০১৫ সালের প্রথম সাড়ে পাঁচ মাসে সারা দেশে কমপক্ষে ২০ হাজার কর্মী-সমর্থক যোগ দিয়েছেন আওয়ামী লীগে। প্রতিদিনই দেশের কোন না কোন জেলায় চলছে এ যোগদান পর্ব। অনেকে আবার আনুষ্ঠানিকভাবে দলবদল না করলেও সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলছেন। বিএনপি নেতারা অভিযোগ করে বলছেন, বিএনপি-জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত এলাকাগুলোকেই টার্গেট করেছে আওয়ামী লীগ। তৃণমূল নেতা-কর্মী ভাগানোর জন্য চাপ দেয়ার পাশাপাশি লোভ দেখানো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এমনকি মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীদের চাপ দেয়া হচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমেও। বিএনপির জেলা পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা জানান, দল ক্ষমতার বাইরে প্রায় এক দশক। পুরো সময়টা মামলা-হামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীদের বুকে কষ্টে পাহাড় জমে উঠেছে। বিশেষ করে আন্দোলনে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা কিছুটা ক্ষুব্ধও করেছে তৃণমূলকে। এছাড়া হতাশা ও ক্ষোভ-বিক্ষোভের কারণেও কেউ কেউ দলবদলে বাধ্য হচ্ছেন। তবে নেতাকর্মী বাগিয়ে নিয়ে বিএনপিকে দুর্বল করা যাবে না। নতুন কর্মী-সমর্থকরা তাদের স্থান পূরণ করবে। তৃণমূলে দল বদলের ব্যাপারে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান বলেন, সারা দেশে বিএনপি নেতাকর্মীরা মামলা-হামলায় অনেকটা দুর্বল অবস্থায় পড়েছে। তার ওপর বিএনপি ছেড়ে সরকারি দলে যোগ দেয়ার জন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন তাদের ওপর চাপ দিচ্ছে। ফলে নতুন মামলা-হামলা থেকে বাঁচার জন্য বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল পর্যায়ে কিছু কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগে সঙ্গে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তবে এরকম কর্মী বাগিয়ে বিএনপিকে দুর্বল করা যাবে না।
২০১৫ সালের ১৭ই জানুয়ারি ২০দলের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে সুকুমার রঞ্জন ঘোষ এমপির হাতে ফুল দিয়ে উপজেলা যুবদলের প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ আলীসহ অর্ধশতাধিক, ১৮ই জানুয়ারি সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ শাহজাহান আলী সরদারের নেতৃত্বে তিন শতাধিক, ২রা ফেব্রুয়ারি মেহেরপুর সদর উপজেলার অর্ধশতাধিক ও ১৯শে ফেব্রুয়ারি বরগুনার পাথরঘাটায় জনসভার মাধ্যমে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শতাধিক, ১০ই মার্চ ভোলা-২ আসনের এমপি আলী আজম মুকুলের হাতে ফুল দিয়ে সদর উপজেলার দ্বীপ ইউনিয়ন মদনপুরের বিএনপির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান একেএম নাছির উদ্দিন নান্নু’র নেতৃত্বে সহস্রাধিক ও ১৪ই মার্চ জামালপুরের সরিষাবাড়িতে শতাধিক কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯শে মার্চ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মে. জে. (অব.) সুবিদ আলী ভূঁইয়া এমপি’র হাতে ফুল দিয়ে কুমিল্লার দাউদকান্দি পৌর বিএনপি সভাপতি ও মেয়র এবং চারজন চেয়ারম্যানসহ কয়েক শতাধিক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২১শে মার্চ ঢাকা-১৯ আসনের এমপি ডা. এনামুর রহমানের হাতে ফুল দিয়ে আশুলিয়া বিএনপির ৩৪ জন কর্মী ও  জেলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জয়পুরহাট সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়ন বিএনপির শতাধিক কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ৫ই এপ্রিল মৌলভীবাজার কমলগঞ্জ ইউনিয়ন জামায়াতের সহ-সভাপতি সাব্বিরুল হক তালুকদার শামীমের নেতৃত্বে জামায়াতের অর্ধশতাধিক ও ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার দুল্লা ইউনিয়নের ৭ ইউপি সদস্যসহ দুই সহস্রাধিক এবং ১০ই এপ্রিল রাজশাহীর বাগমারায় আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে ফুল দিয়ে উপজেলা জামায়াতের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাওলানা নুরুল ইসলাম শতাধিক সমর্থক নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৪ই এপ্রিল কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে বাংলা বর্ষবরণের এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সহস্রাধিক, ১৭ই এপ্রিল সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জামাল আকন্দের নেতৃত্বে দুই শতাধিক এবং ১৮ই এপ্রিল পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এমপির হাতে ফুল দিয়ে সদর উপজেলার চর তারাপুর ইউনিয়ন বিএনপির দুই শতাধিক কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২১শে এপ্রিল জয়পুরহাট সদর উপজেলার জামালপুর ইউনিয়ন বিএনপি নেতা আবদুল কুদ্দুস সরকারের নেতৃত্বে শতাধিক, ২১শে এপ্রিল কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে সৌদি আরব আওয়ামী লীগের নেতা জাকির হোসেনের হাতে ফুল দিয়ে উপজেলার বিপুলাসার ইউনিয়ন বিএনপি ও যুবদলের অর্ধশতাধিক ও ২২শে এপ্রিল চাঁদপুরের কচুয়ায় ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এমপি’র  হাতে ফুল দিয়ে বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২রা মে সিরাজগঞ্জে ডা. হাবীবে মিল্লাত মুন্না এমপির হাতে ফুল দিয়ে কালিয়া হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে সহস্রাধিক, ৮ই মে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে দুই শতাধিক ও একইদিন ভোলা জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সামসুদ্দিন রাঢ়িসহ বিএনপি ও বিজেপির সহস্রাধিক কর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ৯ই মে গাজীপুরের টঙ্গীতে এক অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেল এমপির হাতে ফুল দিয়ে বিএনপি নেত্রী ও সিটি কাউন্সিলর রিনা হালিম ও জামায়াত নেতা মাওলানা শরীফ হোসাইনের নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াতের দুই শতাধিক কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ৯ই মে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বিএনপির ২ শতাধিক, ১২ই মে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মইনুদ্দীন মণ্ডলের হাতে ফুল দিয়ে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আফজাল হোসেন পিন্টু ও সুন্দরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মতিউর রহমান আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এর কিছুদিন আগেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় জামায়াত-বিএনপির সহস্রাধিক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। ১৩ই মে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রেদোয়ান চৌধুরী নয়ন ভোলা-২ আসনের এমপি আলী আজম মুকুলের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যান। ১৫ই মে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলা শ্রমিক দলের সহসভাপতি দীলবারসহ বিএনপির পাঁচ শতাধিক কর্মী-সমর্থক স্থানীয় এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষের হাতে ফুল দিয়ে এবং ২৪শে মে নোয়াখালীতে বিএনপি-জামায়াতের শতাধিক নেতাকর্মী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী এমপির হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ২৫শে মে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বিএনপির দুই শতাধিক ও শহর বিএনপির ২৫ জন  আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ৪ঠা জুন সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার খাজাঞ্চি ইউনিয়ন বিএনপির নেতা ফজর আলী মেম্বারসহ ৮০ জন, ৬ই জুন ভোলা পৌরসভার প্যানেল মেয়র ও বিএনপি নেতা মঞ্জুর আলম এবং একইদিন জামালপুর সরিষাবাড়ীর যুবদল নেতা রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে দুই শতাধিক, একইদিন জয়পুরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় এমপি শামসুল আলম দুদুর উপস্থিতিতে পাঁচবিবি উপজেলা জামায়াত নেতা আবদুস সালামের নেতৃত্বে পাঁচ শতাধিক কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। ৬ই জুন  জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়ার হাতে ফুল দিয়ে মৌকরণ ইউপি বিএনপি’র শতাধিক এবং ১৪ই জুন টেংরাখালীর শতাধিক বিএনপি কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এছাড়াও গাইবান্ধা-৪ আসনের এমপি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে গোবিন্দগঞ্জে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শতাধিক, মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার আমলসার ইউনিয়ন বিএনপির তিন শতাধিক, লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য ইব্রাহীম হোসেন রতনসহ ২৫ জন, বরগুনা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভানেত্রী নাসিমা ফেরদৌসী এমপির হাতে ফুল দিয়ে পাথরঘাটায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের শতাধিক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এদিকে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ডৌবাড়ী ইউপি বিএনপির তিন শতাধিক, বরিশাল জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কবির সিকদারের নেতৃত্বে শতাধিক, আড়াইহাজার থানা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে দুই শতাধিক ও আড়াইহাজার পৌরসভা ও ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের শতাধিক এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেলের হাতে ফুল দিয়ে গাজীপুরের গাছা ইউনিয়নের শতাধিক কর্মী-সমর্থক আওয়ামী লীগে যোগ দেন। নাটোরের সিংড়ায় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে শতাধিক, জামালপুরের বকশীগঞ্জে সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের হাতে ফুল দিয়ে উপজেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম সওদাগরের নেতৃত্বে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পাঁচ শতাধিক এবং জয়পুরহাট জেলা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি মাহমুদুল হাসান বিএনপির পাঁচ শতাধিক কর্মী-সমর্থক নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। চাঁদপুরে ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে জেলা বিএনপির আপ্যায়নবিষয়ক সম্পাদক ও ফরাজীকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন দানেশ দুই শতাধিক কর্মী-সমর্থক নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের প্রাক্কালে কুষ্টিয়াতেই শুরু হয়েছিল এ দলবদল। ২০১৪ সালের ১লা জানুয়ারি কুষ্টিয়া জেলা জামায়াত নেতা নওশের আলী স্থানীয় যুবলীগ আয়োজিত এক নির্বাচনী সভায় দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ৪ঠা জুন খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা যুবদল ও মহিলা দলের দুই শতাধিক, ১৫ই জুন দিঘীনালা বিএনপি ও বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন থেকে শতাধিক এবং ১৮ই জুলাই বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজমের হাতে ফুল দিয়ে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকছুদুর রহমান আনসারীসহ মুক্তিযোদ্ধা দল, কৃষক দল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ওলামাদল, তরুণ দল ও মহিলা দলের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ৯ই নভেম্বর খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি’র হাতে ফুল দিয়ে সাবেক উপজেলা যুবদল সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান মেম্বার ও জাতীয় পার্টির নেতা মনির ফরাজীসহ ১৫শ’ নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। ২৪শে নভেম্বর রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে  জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য মাহবুবুর রহমানকে ফুল দিয়ে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির শতাধিক, ২৯শে নভেম্বর মাদারীপুরের শিবচরে সাবেক হুইপ ও স্থানীয় এমপি নুর-ই-আলম চৌধুরীর হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে উপজেলা বিএনপি নেতা ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ হাওলাদারসহ পাঁচ শতাধিক এবং ১৬ই ডিসেম্বর লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা যুবদলের সহসভাপতি শাজাহান বিশ্বাস ও ছাত্রদলের সহসভাপতি আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে ছাত্রদল-যুবদলের তিন শতাধিক আওয়ামী লীগে যোগ দেয়।

এক বছরেও নূর হোসেনের মামলায় চার্জ গঠন হয়নি by পরিতোষ পাল

নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশের দায়ে ফরেনার্স আইনে করা মামলা এক বছর পেরিয়ে গেলেও আদালতে চার্জ গঠন করা সম্ভব হয়নি। ফলে তাকে বাংলাদেশের ফেরত পাওয়া এখনও দুরূহ বলে মনে করছেন আইনজীবীরা। গ্রেপ্তারের এক মাসের মধ্যেই অবশ্য উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাতের মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিমের আদালতে নূর হোসেনকে ফেরত চেয়ে বাংলাদেশ যে আবেদন করেছে সেটি নথিভুক্ত হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সরকারি কৌঁসুলি বিকাশরঞ্জন দে। তারপর আর এ নিয়ে আদালতে সরকারি কৌঁসুলির তরফে নতুন করে আর কোন আবেদন জানানো হয়নি। তবে গত একবছরে একডজনেরও বেশি বার আদালতে নূর হোসেনকে নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু গত ১৮ই আগস্ট পুলিশ চার্জশিট দাখিল করলেও প্রত্যেকবারই মামলার তিন আসামি একসঙ্গে হাজির না থাকায় চার্জ গঠন করা যায়নি বলে তদন্তকারী পুলিশ অফিসার জানিয়েছেন। তবে ফরেনার্স আইনের ১৪ ধারায় করা এই মামলায় নূর হোসেনের সর্বোচ্চ ৫ বছর জেল হতে পারে। নূর হোসেন বর্তমানে দমদম সংশোধনাগারে রয়েছেন। বন্দিদের সঙ্গে তিনি খোশ মেজাজেই সময় কাটান বলে জেল সূত্রে জানা গেছে। শেষবার গত ২২শে এপ্রিল নূর হোসেনকে তার এক সঙ্গীসহ বারাসাত আদালতে হাজির করা হয়। কিন্তু মামলার অপর জামিনে থাকা আসামি উপস্থিত না থাকায় শুনানি হয়নি। পরবর্তী হাজিরার দিন ধার্য হয়েছে ২২শে  জুলাই। যদিও এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে মন্ত্রী থেকে শুরু করে পুলিশ কর্তারা বারে বারে নূর হোসেনকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তৎপরতার কথা জানালেও ভারতে সেই ধরনের কোন তৎপরতার প্রতিফলনের কথা মামলার সঙ্গে যুক্ত পদাধিকারীরা জানাতে পারেননি। মামলায় এখনও পর্যন্ত নূর হোসেন কোন আইনজীবী দেননি। তবে তার সঙ্গে অন্য দুইজন আইনজীবী দিয়ে জামিনের চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যে খান সুমন ধরা পড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই জামিন পেয়ে গিয়েছেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে, ১০ই জুন বৈধ কাগজপত্র নিয়েই তিনি বিমানে করে কলকাতায় এসেছিলেন। মনে করা হচ্ছে, মামলা প্রলম্বিত করার কৌশল হিসেবেই তিন আসামিকে এক করা সম্ভব হচ্ছে না।  গত বছরের ১৪ই জুন  কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অদূরে কৈখালিতে ভিআইপি রোডের উপর সুবিশাল ইন্দ্রপ্রস্থ আবাসনের এ ব্লকের একটি বাড়ির চার তলার ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগী খান সুমন ও ওহিদুল জামান। গত ১৫ই জুন বারাসাত আদালতে পুলিশ যে কেস ডায়েরি পেশ করেছে তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার শিমরাইলের বাসিন্দা নূর হোসেন ওরফে চেয়ারম্যান, বন্দর থানার কুড়ি পাড়ার ওহিদুল জামান শালিম ওরফে শালিম ও ফতুল্লা  থানার বাসরবাদের খান সুমন ওরফে বিট্টুকে অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশের দায়ে বিদেশী আইনের ১৪ ধারায় মামলা করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এরা বসিরহাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল। এদের কাছে ভারতের ও বাংলাদেশের ১১টি সিম কার্ড এবং ভারত ও বাংলাদেশের কয়েক হাজার টাকা পেয়েছে। তবে এদের কাছে কোন অস্ত্র পাওয়া যায়নি বলে পুলিশ আদালতে জানিয়েছে। পুলিশ প্রথম দিকে নূর হোসেনকে হেফাজতে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশী অপরাধী ও তার কনটাক্টম্যানদের খোঁজে তল্লাশি চালালেও পরবর্তী সময়ে আর রিমান্ডে নেয়া হয়নি। এরপর থেকে সে জেল হেফাজতে রয়েছে। ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, গত বছরের ২৭শে এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজন অপহৃত হন। অপহরণের পরপরই নজরুলের পরিবারের পক্ষ থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলা করা হয়। মামলার পর অভিযোগ অস্বীকার করে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দিলেও তিন দিনের মাথায় শীতলক্ষ্যা নদীতে অপহৃতদের লাশ ভেসে ওঠার পর লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান নূর হোসেন। নূর হোসেন ও তার সহযোগীরা র‌্যাবকে ছয় কোটি টাকা দিয়ে নজরুলসহ সাতজনকে হত্যা করিয়েছেন বলে নজরুল ইসলামের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম অভিযোগ করেন। তার অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব-১১-এর তখনকার অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এমএম রানাকে অবসরে পাঠানো হয়। এরপর হাইকোর্টের নির্দেশে র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হন। আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে আরিফ ও রানা ওই ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন। নূর হোসেনের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বিনিময়ে তারা নজরুলসহ সাতজনকে খুন করেছেন বলে স্বীকারোক্তি দেন। তবে ঘটনার পর থেকেই নূর হোসেন পলাতক ছিলেন। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, নূর হোসেন কলকাতায় পালিয়ে গেছেন। তাকে ধরার জন্য ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। ভারতের কাছেও পাঠানো হয়েছিল সেই আবেদন। সেই নোটিশের ভিত্তিতেই নূর হোসেনকে শনাক্ত করেছিল বিধান নগর পুলিশ কমিশনারেটের গোয়েন্দারা। আদালতে হাজির হবার প্রথম দিকে নূর হোসেন সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন যে, তিনি রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার। আর বাংলাদেশে মামলা হওয়াতেই তিনি ভারতে চলে এসেছেন। কে তাকে ফাঁসিয়েছে তার নাম বলতে অস্বীকার করলেও তিনি জানিয়েছেন, যে তাকে ফাঁসিয়েছে সেই তাকে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছে। একপর্যায়ে তিনি দাবি করেছিলেন, নজরুলের সঙ্গে তার কোন বিরোধ ছিল না। তিনি র‌্যাবকে কত টাকা দিয়েছেন জানতে চাইলে রাগত ভঙ্গীতে নূর হোসেন বলেছিলেন, র‌্যাবকে কেন টাকা দেব ? কোন টাকাই আমি দিইনি। তবে পরবর্তী কালে নূর হোসেন সাংবাদিকদের কাছে আর কোন কথাই বলেন নি।

ফিফার অন্ধকার ও অনুসন্ধানী জেনিংস by মনজুরুল আহসান বুলবুল

গত ২৭ মে ভোরে সুইজারল্যান্ড পুলিশের ফোন পেয়ে কিছুটা বিরক্তই হন অ্যান্ড্রু জেনিংস। ইংল্যান্ডের পাহাড়ি উত্তরের বাড়ি থেকে তিনি বলছিলেন: তখন সকাল ছয়টা, আমার ফোনটি বেজেই চলেছে। ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে আমি রিংটোনটি বন্ধ করে আরও কিছু সময় ঘুমাতে পাশ ফিরে শুই। ভাবছিলাম যা সকাল ছয়টায় ঘটতে পারে, তা ঘটতে পারে দুপুরের খাবারের সময়ও, আমার তাতে হেরফের নেই। জেনিংস তখন জানতেও পারেননি, সেই ভোরেই তাঁর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কাঁপিয়ে দিয়েছে গোটা বিশ্বকে। তিনি যখন ফোনের রিংটোন বন্ধ করে ঘুমাচ্ছেন, তখন দুনিয়াকাঁপানো এক খবর জন্ম নিচ্ছে তাঁর অনুসন্ধানের সূত্র ধরেই। সুইস পুলিশ জুরিখের বিলাসবহুল পাঁচতারা হোটেল থেকে সে মুহূর্তেই বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সাত শীর্ষ কর্তাকে ধরে ফেলেছে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের ঘুষ কেলেঙ্কারির দায়ে। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে অ্যান্ড্রু জেনিংস ২০০৬ সালেই লিখেছিলেন: ফাউল! দ্য সিক্রেট ওয়ার্ল্ড অব ফিফা: ব্রাইবস, ভোট রিগিং অ্যান্ড টিকিট স্ক্যান্ডালস [ফাউল! ফিফার গোপন কথা: ঘুষ এবং ভোট চুরি ও টিকিট কেলেঙ্কারি]। শুনতে খবরের শিরোনাম মনে হলেও এটি ফিফার অন্ধকার জগৎ নিয়ে এক ঢাউস বই। এই লেখার জন্য ২০১১ সালে ফিফাকে নিয়ে ব্রাজিলে এক গণশুনানিতে তাঁকে অংশ নিতে হয়। কিন্তু হুমকি-ধমকিতে থেমে থাকেননি জেনিংস। ফুটবল কেলেঙ্কারি নিয়ে অনুষ্ঠান করেছেন বিবিসির ‘প্যানোরোমা’য়। ২০১৪ সালে লিখেছেন ওমেরটা: সেপ ব্ল্যাটারস ফিফা অর্গানাইজড ক্রাইম ফ্যামিলি।
জেনিংস অর্ধশতাব্দী ধরে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল নাম। একজন আদর্শ অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে তিনি কেতাবি ধারারই অনুসারী, অর্থাৎ ধীরগতির পরিকল্পিত সাংবাদিকতারই পথিক তিনি। জটিল বিষয়ে সময় নিয়ে সংঘবদ্ধ অপরাধের রহস্য উন্মোচনে তাঁর মুনশিয়ানার পরিচয় মেলে থাইল্যান্ডের হেরোইন ব্যবসা বা ইতালির সংঘবদ্ধ অপরাধজগৎ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী রিপোর্টে। নব্বইয়ের দশকে ক্রীড়াজগতের অপরাধ ঘেঁটে দেখতে তিনি পা রাখেন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দুর্নীতির অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে। ১৫ বছর ধরে তিনি ফিফাকে অনুসরণ করছেন ছায়ার মতো। অন্য ক্রীড়া সাংবাদিকেরা যখন খেলার গ্ল্যামার নিয়ে ব্যস্ত, তখন জেনিংস ঘেঁটে চলেছেন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার নেপথ্যের নোংরা জগৎ।
জেনিংস জন্মেছেন স্কটল্যান্ডে, শিশুকাল থেকেই থিতু হন ইংল্যান্ডে। তাঁর দাদা নামী ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন, তবে খেলার পায়ের চেয়ে জেনিংসের সাংবাদিকতার নাক ছিল সবচেয়ে সজাগ। পেশার শুরুতেই জেনিংস যোগ দেন সানডে টাইমস-এ, পরে বিবিসিতে। বিবিসি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের দুর্নীতি নিয়ে তাঁর এক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান প্রচারে অস্বীকৃতি জানালে তিনি বিবিসি ছাড়েন। পরে অপর এক টিভিতে তঁার ‘স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডস কোকেইন কানেকশন’ প্রামাণ্যচিত্রটি ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
এরপর জেনিংসের অনুসন্ধানী চোখ খেলার জগতে, কিন্তু মাঠে নয়, নেপথ্যের অন্ধকার অনুসন্ধানে। জেনিংস নিজেই বলেন: আমি প্রামাণ্য খুঁজে বেড়াই। হাতভর্তি প্রমাণ পেলে সাংবাদিকতার কাজটি সহজ হয়। কোনটি সঠিক নয় তা সবাই জানে, কিন্তু সাংবাদিকতা চায় প্রমাণ। সময় নাও, অন্ধকারে হাতড়াতে থাকো এবং ক্ষমতাধরদের বিশ্বাস করবে না—জেনিংস তাঁর নিজের কাজেও এসব শর্ত মেনে চলেছেন বরাবর। জেনিংস বলেন, এভাবেই সূত্রবিহীন এক ক্রীড়ামোদী হিসেবে আমি ঢুকে পড়ি আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির অন্দরমহলে। এবং অচিরেই আবিষ্কৃত হয় এই সংস্থার প্রধানের কুৎসিত চেহারা। জেনিংসের অনুসন্ধানেই বের হয়ে আসে ২০০২ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে ঘুষ ও মাদকের ভয়াবহ চিত্র। তাঁর প্রতিবেদনের কারণেই সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন অলিম্পিক কমিটির লৌহমানব চেয়ারম্যান হোয়ান আন্তনিও সামারাঞ্চ। চাকরি হারান কয়েক ডজন কর্মকর্তা। জেনিংস বলেন, সাধারণ ক্রীড়া সাংবাদিকেরা ক্রীড়া তারকাদের এসব অন্ধকার নিয়ে রিপোর্ট করতে চান না, পাছে আবার এই তারকাদের সঙ্গে তাঁদের সখ্য নষ্ট হয়। পরিশ্রম ছাড়াই গ্ল্যামার বিক্রি করা খবর নিয়েই তাঁরা খুশি। বোধ করি সে কারণেই সাধারণ খেলা ও তারকা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে চান তাঁরা।
দৃশ্যত আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির অনুসন্ধানে সাফল্যের পরই জেনিংস নজর দেন ফিফার দিকে। কীভাবে তিনি ফিফার অন্দরমহলে ঢুকলেন? জেনিংসের জবাব: যখন একটি সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ে দুর্নীতি হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের মাঝারি পর্যায়ের সৎ কর্মীরা সব বুঝেও চুপচাপ থাকেন, কিন্তু তাঁরা সব সময়ই এমন এক অস্বস্তিতে ভোগেন যে তাঁরা দেখছেন অন্যায় হচ্ছে কিন্তু চাকরি হারানোর ভয়ে কিছু বলতে পারছেন না। একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে এই অংশটিকেই হাত করা, তাঁদের আস্থাভাজন হওয়া এবং তাঁদের আস্থায় নেওয়া। এ পথেই হাঁটেন জেনিংস।
২০০২ সালে প্রথমবারের মতো ফিফার শীর্ষ বস সেপ ব্ল্যাটারের সংবাদ সম্মেলন কভার করার কথা বলছিলেন জেনিংস। তাঁর বর্ণনা—জুরিখে ফিফা সদর দপ্তরে গিয়ে দেখি, ফিফার ব্লেজার পরা ডজন ডজন কর্মী দেয়ালের পাশজুড়ে দাঁড়ানো, সবাই যেন কাজ করছে রোবটের মতো। আমি ঠিক করলাম এদের মধ্য থেকেই আমার সূত্র বের করতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য শেষ করার পরই মাইক্রোফোন হাতে নেন জেনিংস। সরাসরি প্রশ্নটি ছুড়ে দেন, মি. ব্ল্যাটার আপনি কি কখনো ঘুষ নিয়েছেন? চারপাশে ঘিরে থাকা বনেদি, অভিজাত ক্রীড়া সাংবাদিকদের সামনে যেন বোমা ফাটালেন জেনিংস। বর্ণনা দেন জেনিংস: আমি যেন সাজানো একটি পার্টি গুঁড়িয়ে দিলাম। সব প্রতিবেদক আমার দিকে তাকিয়ে, আমি যেন পচা খাবারের গন্ধ ছড়াচ্ছি; আমিও আসলে এমনটিই চাচ্ছিলাম। আমি তাকাচ্ছিলাম ফিফার ব্লেজার গায়ে দেওয়া রোবটগুলোর দিকে এবং মনে হলো আমার যা প্রত্যাশা তা পেয়ে গেছি। যথারীতি ব্ল্যাটার অভিযোগ অস্বীকার করলেন, কিন্তু গণমাধ্যমগুলোয় শিরোনাম হলো বিষয়টি।
পরের রোমাঞ্চকর বর্ণনা শুনুন সাংবাদিক অ্যান্ড্রু জেনিংসের মুখেই: এ ঘটনার ছয় সপ্তাহ পরে, একজনের আমন্ত্রণে জুরিখে লেকের পাড়ে মধ্যরাতে উনিশ শতকের এক কফিশপের সামনে চলে গেলাম। একসময় দরজা খুলল, আমাকে নেওয়া হলো এক জমকালো অফিসের সামনে। আধা ঘণ্টা পর একজন ফিফা কর্মকর্তা সেখানে আমার হাতে তুলে দিলেন ফিফার দুর্নীতির বিস্তারিত দলিল। এবং সেখান থেকেই শুরু। সেই দলিলেরই তথ্য তুলে ধরছে ফিফার অন্ধকার জগৎ। ব্ল্যাটার নিজেই নিজেকে দিয়েছেন ছয় ডিজিটের বোনাস, ব্যক্তিগত জেট যেন ছিল তাঁর নিত্যদিনের যান। বড় মার্সিডিজ তাঁর দুয়ারে খাড়া থাকত সারাক্ষণ। এই খবর প্রকাশিত হলে ব্ল্যাটার তাঁর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার হুমকি দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে আর এগোননি। জেনিংস থেমে থাকেননি। এ সময় তাঁর ফোনে আড়ি পাতা হয়, হ্যাক করা হয় কম্পিউটারে। ফিফা কেলেঙ্কারি নিয়ে জেনিংসের বই প্রকাশিত হলে ফিফার বিগ বসরা তা শুধু প্রত্যাখ্যানই করেননি; তাঁরা জেনিংসকে দৈহিকভাবেও অপদস্থ করেন। ফিফা ভাইস প্রেসিডেন্ট (এখন আটক) জ্যাক ওয়ার্নার জেনিংসকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করেন, তাঁর মুখে থুতু ছোড়েন। ক্যামেরার সামনেই। অভিযোগ তোলা হয় জেনিংস কোনো কোম্পানির কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে বইটি লিখেছেন।
বইটি প্রকাশের তিন বছর পর ঘটে আরেক নাটকীয় ঘটনা। লন্ডনের ডাউনটাউনে এফবিআইয়ের অর্গানাইজড ক্রাইম স্কোয়াডের তিনজন স্পেশাল এজেন্ট জেনিংসের সঙ্গে কথা বলেন। জেনিংস বুঝতে পারছিলেন ইউরোপীয় পুলিশ এ বিষয়ে কিছুই করবে না, তাই শেষ পর্যন্ত সব প্রামাণ্য তথ্য দিয়ে তিনি এফবিআইকেই সহায়তা করেন। কিন্তু তাঁকে অপেক্ষা করতে হয় আরও তিন বছর। ২০০৬-০৯ এবং শেষে ২০১৫। তাঁর অনুসন্ধানী কাজের ফল দেখে উচ্ছ্বসিত জেনিংস। ২৭ মের ভোরের দৃশ্যপট বর্ণনা করে ওয়াশিংটন পোস্টকে তিনি বলেছেন: কী চমৎকার দৃশ্য! মঙ্গলবার রাতভর ফিফার টাকায় শ্যাম্পেন পান করে, ফিফার টাকায় বিল পরিশোধ করা জুরিখের বিলাসবহুল পাঁচ তারকা হোটেলে আপনি ঘুমাতে গেলেন, আর বুধবার কাকডাকা ভোরে দরজায় টোকা, পুলিশ বলছে, কাপড় পরে নিন, আপনাকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে, স্যার!!
ফিফায় নিশ্চয়ই বড় পরিবর্তন আসবে, দুর্বৃত্তদের নিশ্চয়ই সাজা হবে, এই তৃপ্তি নিয়েই ৭১ বছর বয়সী অনুসন্ধানী সাংবাদিক অ্যান্ড্রু জেনিংস অবসর নিতে চান পেশা থেকে। বাকি জীবন কাটাতে চান বাগানের আর পরিবারের পরিচর্যা করে।
মনজুরুল আহসান বুলবুল: সাংবাদিক।
bulbulahsan@gmail.com