Thursday, January 1, 2026

অপ্রকাশযোগ্য শোকের মৃত্যুগুলোর জন্য মেকি শোক by রাফসান গালিব

প্রকাশ ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ঃ সব মানুষের রক্ত লাল—এই প্রবচনটার প্রচলন মূলত মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই সেটার প্রকাশ করতে। দুঃখজনক হচ্ছে, রক্ত বা রক্তের রংও আসলে সে ফয়সালা দেয় না। এর জন্য আমাদের দেখতে হয় অনুভূতির প্রকাশও। শুধু রক্তের রং না; সুখ, শান্তি, দুঃখ বা শোকের রং কেমন সেখানেই একজন মানুষ কতটা মানুষ হিসেবে মূল্যায়িত হচ্ছে, সেটি খোলাসা হয়ে যায়। মানে এভাবেই হয়ে আসছে আদিকাল থেকে। যদিও আমরা সাম্যের জয়গান গেয়ে বিষয়টিতে স্বস্তির প্রলেপ লাগাতে চাই।

কোনো কোনো সমাজতাত্ত্বিকের মতে, সমাজ নির্দিষ্ট কিছু জীবনকে ‘শোকযোগ্য’ হিসেবে ফ্রেমিং করে থাকে এবং অন্যদের ‘অ-শোকযোগ্য’ হিসেবে। কার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া সমাজ কীভাবে প্রকাশ করছে, তাতেই শ্রেণি রাজনীতি বোঝাটা খুবই সহজ বলা যায়। সিয়াম মজুমদারের নামটা এখনো এ দেশের অধিকাংশ মানুষই জানে না। যে কয়জন জানে, তাদেরও এ কয় দিনে ভুলে যাওয়ার কথা বা অল্প কয়েক দিনেই ভুলে যাবে। সিয়াম মগবাজার এলাকায় একটি দোকানের কর্মচারী ছিলেন।

২৪ ডিসেম্বর চা আনতে গিয়ে উড়ালসড়কের ওপর থেকে ছোড়া ককটেলে প্রাণটা হারালেন। তাঁর শরীরের রক্ত-মাংস চায়ের দোকানের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েছিল। মানুষের মৃত্যু তো নিশ্চিত একটা ঘটনা। তাই বলে এতটা বীভৎস মৃত্যু, কল্পনা করা যায়! কারা ককটেল ছুড়ল, কারা একটা তরতাজা তরুণের প্রাণ কেড়ে নিল, তা হয়তো আমাদের কখনো জানা হবে না। ঘাতকেরা ঠিকই আরও মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকবে।

খুলনার গ্রাম থেকে সিয়ামের পরিবারটি ঋণগ্রস্ত হয়ে ঢাকায় এসেছিল। তাঁর বাবা রিকশা চালানো শুরু করেন। মা হয়ে যান আমাদের ভাষায় বাসাবাড়ির ‘কাজের বুয়া’।  সিয়াম হয়েছিলেন দোকানের কর্মচারী। পরিবারের সবাই মিলে চেষ্টা করছিলেন ঋণমুক্ত হওয়ার। ছেলেকে হারিয়ে মা সিজু বেগমের বিলাপ, ‘আমি আর ঢাকায় থাকমু না। ঢাকায় আইস্যা সব শেষ হইয়্যা গেল।’ এই ‘জাদুর শহর’ ঢাকায় কেনই–বা তাঁরা আর থাকবেন!

এবার রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় আরেক হতভাগা ভ্যানচালক ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা করা যাক। চুরির অভিযোগে তাঁকে নির্যাতন করে মারা হয়েছে। শুনে নিশ্চয় ‘স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া’ কোনো গণপিটুনির মৃত্যুর কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এ হত্যার ঘটনা চরম নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়।

ভবানীগঞ্জের সিএনজি মালিক সমিতির সদস্যরা ওমর ফারুককে প্রথমে লোহার রড দিয়ে পেটাতে থাকেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে একটি প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে উভয় হাত ও পায়ে হাতুড়ি দিয়ে কয়েকটি লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তখনো মারধর চলতে থাকে। পানি পান করতে চাইলে নদীতে নিয়ে ওমর ফারুককে বিবস্ত্র করে চুবানো হয়। এরপর তাঁর পায়ুপথে শুকনা মরিচের গুঁড়া ঢেলে দেওয়া হয়।

নির্যাতনের একপর্যায়ে ওমর ফারুকের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে ওমর ফারুকের কাছ থেকে গাঁজা উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ওমর ফারুককে ১০০ টাকা অর্থদণ্ড ও ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।

এরপর ওমর ফারুককে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাজশাহী কারাগারে পাঠায় পুলিশ। সেখান থেকে তাঁকে পরদিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২০ ডিসেম্বর ওমর ফারুকের মৃত্যু হয়।

ডার্ক কমেডি হিসেবে একটি কৌতুক আমরা প্রায় সবাই শুনেছি। কৌতুকটি হলো: পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী কী? উত্তর: মানুষ। ওমর ফারুককে যেভাবে ধাপে ধাপে বিবিধ নির্যাতন করে মারা হলো, তাতে ডার্ক কমেডিটা নিশ্চয়ই নিছক কোনো কৌতুক থাকে না, চরম বাস্তব হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়।

ওমর ফারুকের মতো কত কত মানুষের গণপিটুনি, মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতায় বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে বীভৎস মৃত্যু ঘটেছে বা ঘটছে—তা ভদ্র শ্রেণির বিবেকের দরজায় সামান্য টোকাও দেয় না।

সিয়াম মজুমদার, ওমর ফারুকের মতো আরও অনেকের মৃত্যু—আমাদের শোকের ব্যাকরণে তাঁদের জন্য কোনো অধ্যায় তো দূরের কথা, একটা ছোট অনুচ্ছেদই নেই। যেহেতু তাঁরা সমাজের সুবিধাভোগী অংশের অন্তর্ভুক্ত নন, ফলে তাঁদের মৃত্যু ‘অশোকযোগ্যই’ থেকে যায় আমাদের কাছে। আর মৃত্যুর সঙ্গে যদি কোনো ‘রাজনীতি’ যুক্ত না থাকে, তাহলে আরও বেশিই ‘অশোকযোগ্য’।

এসব মানুষের জন্য রাষ্ট্র নেই, সরকার নেই, নাগরিক সমাজ নেই, বুদ্ধিজীবী নেই, মানবাধিকারকর্মী নেই, রাজনৈতিক মহল নেই—কেউ নেই। মার্ক্সীয় তত্ত্বের আলাপ থেকে বলতে হয়, একটি কারখানার যন্ত্র নষ্ট হলে যেমন সমাজ শোক প্রকাশ করে না, কেবল সেটি মেরামতের কথা ভাবে, শ্রমিক বা কর্মজীবী এসব মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সমাজ একই আচরণ করে। সিয়াম বা ওমর ফারুকদের মৃত্যুতে এমনটিই তো দেখতে পাই। ‘সব শেষ হইয়্যা গেল’ মানুষগুলোর জন্য ‘প্রকাশযোগ্য শোক’ করতে না পারার ব্যর্থতা আমরা কোথায় লুকাব?

* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- rafsangalib1990@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ককটেল বিস্ফোরণে নিহত যুবকের বাবা আলী আকবর মজুমদার ঘটনাস্থলে আহাজারি করছেন। গত বুধবার রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে
ককটেল বিস্ফোরণে নিহত যুবকের বাবা আলী আকবর মজুমদার ঘটনাস্থলে আহাজারি করছেন। গত বুধবার রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে। ছবি: প্রথম আলো

খালেদা জিয়ার অভিভাবকত্ব এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি ছিল by জাহেদ উর রহমান

বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে, সে নির্বাচনে নিজ হাতে গড়া দলটি (বিএনপির পত্তন জিয়াউর রহমানের হাতে হলেও এই একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠেছে খালেদা জিয়ার হাত ধরেই) দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় গেছে এবং সেই সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন খালেদা জিয়া—এমন একটা দৃশ্য না দেখার আফসোস সম্ভবত থেকে যাবে আমাদের। সত্যি বলতে, এটা দেখে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অধিকার ছিল তাঁরই।

শেখ হাসিনাবিরোধী লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় নামটি খালেদা জিয়া। প্রথম আলোতে আগে একটি কলামে লিখেছিলাম, শেখ হাসিনা কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের মতো করে আরও অনেক বেশি সময় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি কারণ, তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভেঙে ফেলতে পারেননি (যেটা পেরেছিলেন হুন সেন)।

এ ঘটনা ঘটতে পেরেছে একদিকে বিদেশে থেকেও দলকে চমৎকারভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারেক রহমান, অপর দিকে দেশে থেকেও কোনো চাপ বা সুবিধাপ্রাপ্তির বিনিময়ে দেশত্যাগ না করা আপসহীন খালেদা জিয়ার লড়াই।

খালেদা জিয়ার রাজনীতি এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের নানা দিক নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। তাঁর চরিত্রের একটি দিক আমাদের দেশের অনাগত সময়ে খুবই জরুরি।

পরিবার ও নিজের গড়া রাজনৈতিক দলের ওপরে তো বটেই, ব্যক্তিগতভাবেও এমন কোনো নিগ্রহ নেই, যেটার শিকার তিনি শেখ হাসিনার দ্বারা হননি। শেখ হাসিনার পতনের পর খালেদা জিয়া যদি শেখ হাসিনার প্রতি তাঁর যৌক্তিক ক্ষোভ প্রকাশ করতেন, সেটাকে মানুষ খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করতেন। কিন্তু ইতিহাসে লেখা থাকবে, ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত একটিবারের জন্যও তিনি এমনকি মৃদু ভাষায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেননি।

শুধু এই সময়েই নয়, তিনি জেলে যাওয়ার আগেও শেখ হাসিনার নিজের মুখে এবং তাঁর দলের লোকজনের তাঁর প্রতি অকথ্য মিথ্যা কুৎসার জবাবে কখনোই কিছু বলেননি। পুরো রাজনৈতিক জীবনে তিনি গড়েছিলেন সভ্যতা, ভদ্রতা, মৃদুভাষণের এক অসাধারণ নজির। বেঁচে থাকলে এবং কর্মক্ষম থাকলে তিনি ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবেই তাঁর এই প্রকাশের ধরন অব্যাহত রাখতেন।

এ কাজটি খালেদা জিয়া (তাঁর সন্তান তারেক রহমানও) এমন সময়ে করছেন, যখন সারা পৃথিবীতে ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির জয়জয়কার চলছে। পপুলিস্ট ও ডেমাগগ রাজনৈতিক নেতারা মানুষের রাগ-ক্ষোভ, বিদ্বেষ, বিভেদ ক্রমাগত উসকে দেওয়ার জন্য ক্রুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করছেন। বৈশ্বিক এই প্রবণতা এসে হাজির হয়েছে বাংলাদেশেও। তার ওপর দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থেকে আমাদের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা একেবারে তলানিতে। এ কারণে আমাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।

এ যাত্রা বেগম খালেদা জিয়া যখন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তখন তাঁর অসুস্থতার যে বিস্তারিত বিবরণ আমাদের সামনে এসেছিল, তাতে তাঁর এবার ফিরে আসা নিয়ে বড় সংশয় ছিল। তখন থেকেই মনে হচ্ছিল, তিনি যদি চলে যান, আমাদের একটা বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। জীবনের পরের দিক থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত কষ্টসংকুল একটি জীবন কাটিয়েছেন তিনি। কিন্তু বিদায় নেওয়ার আগেই তিনি দেখে গিয়েছিলেন, একটি দলের প্রধান হলেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন দলমত–নির্বিশেষে সব মানুষের এক অভিভাবক।

এমনকি খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা (খালেদা জিয়াকে অন্যায় নিপীড়ন চালিয়েছে তাঁর সরকার) এবং তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের বার্তা দেখলে বোঝা যায়, তাঁর এই অভিভাবকত্বের বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারেননি তাঁরাও। খালেদা জিয়ার এই অভিভাবকত্ব আমাদের জন্য এ মুহূর্তে ছিল খুবই জরুরি।

গণ–অভ্যুত্থানের মুখে সরকার পতনের পরও শ্রীলঙ্কা ও নেপালে সবকিছুর দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসা দেখে অনেকে বাংলাদেশ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশকে এই দুটি দেশের সঙ্গে তুলনা করা ভুল; কারণ, এই দুটি দেশ দীর্ঘকালীন কোনো স্বৈরাচারের শাসনের ছিল না; গণ–অভ্যুত্থানের মুখে পতন হয়েছিল অবাধ–সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের।

এমন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ ভালোভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থাকলে কোনো দেশের সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। কারণ, স্বৈরাচারী সরকারকে তার ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এটা করতে হয়। এমন পটভূমিতে স্বৈরাচার–পরবর্তী দেশে স্থিতিশীলতা আসার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা থাকেই। এমনকি এমন কোনো দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরও এই ঝুঁকি থেকে যায়। ‘আরব বসন্তের’ পরবর্তী সময়ে এটা দেখা গেছে তিউনিসিয়া ও মিসরে।

একটা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা। আশা করা যায়, একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারটি গঠিত হবে। কিন্তু অপরাপর দেশের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সংঘাত দেখলে এটা মনে হওয়ার যৌক্তিক কারণ আছে, নির্বাচন–পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের সামনে স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ থাকবে।

এমন পরিস্থিতিতেই বেগম খালেদা জিয়ার এক ভূমিকা থাকতে পারত অভিভাবক হিসেবে। নির্বাচনের আগে কিংবা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যেকোনো কঠোর দ্বন্দ্ব কিংবা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এবং শক্তির অন্যান্য ভরকেন্দ্রের ওপরে তাঁর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি এসব প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। নিজেদের স্বার্থে এ কারণেই মনে হয়েছিল, তিনি আরও কিছু সময় থাকুন আমাদের সঙ্গে। কিন্তু সেটা হলো না।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁকে যখন সব মানুষ সম্মান জানাচ্ছেন, তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলছেন, তখন আমরা কামনা করি, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল তাদের নিজেদের মধ্যকার বিতর্কের ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার মতো অতটা অহিংসার পথ গ্রহণ করতে না পারলেও যেন তারা এমন পর্যায়ে চলে না যায়, যেটা সংঘাত উসকে দিয়ে দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে।

বেগম খালেদা জিয়াকে মূল্যায়নের জন্য আমরা যত বিশেষণ ব্যবহার করব, এর মধ্যে সবচেয়ে আগে আসবে সম্ভবত উদার, মধ্যপন্থী গণতন্ত্রের জন্য তাঁর আমৃত্যু সংগ্রাম। একটা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও অগ্রযাত্রার সাক্ষী তিনি হতে পারলেন না, এটা কষ্টের।

কিন্তু রাজনীতির মাঠে তাঁর মতো মার্জিত, ভদ্র আচরণ আমরা যেন করি, যাতে গণতন্ত্রে উত্তরণের ঝুঁকি এড়িয়ে গণতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে বিকশিত করতে পারি আমরা। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিকভাবে বিকশিত করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই বর্তমান পৃথিবীর প্রবণতা, ডানপন্থী, পরিচয়বাদী, জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির (যার প্রভাব বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশেও) বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে।

এক অবিশ্বাস্য শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শারীরিকভাবে বিদায় নিলেন বেগম খালেদা জিয়া; তাঁর জীবন, কর্ম বিদায় নেবে না কখনো। ঘোষিত স্থান ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া লোকে লোকারণ্য জানাজাস্থল (ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিশ্চয়ই যেতে পারেননি আরও অসংখ্য মানুষ) দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষ তাঁদের মনের কোথায় স্থান দিয়েছিলেন এই মানুষটিকে। বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ, শিক্ষা নিজেদের মধ্যে ধারণের মাধ্যমেই আমরা পারব তাঁর প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে।

জাহেদ উর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে দলমত–নির্বিশেষে জনতার ঢল নামে
খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে দলমত–নির্বিশেষে জনতার ঢল নামে। ছবি: প্রথম আলো

নিউইয়র্কের পরিত্যক্ত সাবওয়ে স্টেশনে পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিলেন জোহরান মামদানি

নিউইয়র্ক নগরের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম ও প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন জোহরান মামদানি। ৩৪ বছর বয়সী জোহরানের জন্ম উগান্ডায়। তবে তাঁর মা-বাবা দুজনই ভারতীয় বংশোদ্ভূত।

জোহরান নিউইয়র্ক নগরের এক শতাব্দীর ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র। নিউইয়র্কের ওল্ড সিটি হলের নিচের একটি পরিত্যক্ত সাবওয়ে (পাতালরেল) স্টেশনে তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হয়।

আজ বৃহস্পতিবার শপথ নেওয়ার পরপর জোহরান বলেন, ‘এটি সত্যিই জীবনের এক অনন্য সম্মান ও সুযোগ।’

এর আগে বার্তা সংস্থা এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নিউইয়র্কের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মেয়র পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন ছুঁয়ে শপথ নিতে যাচ্ছেন। জোহরানের এ শপথ গ্রহণ একই সঙ্গে শহরটির জন্য আরও কিছু ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল এ নগরে মুসলিম জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের প্রাণবন্ত উপস্থিতিরই প্রতিফলন হয়ে থাকবে পবিত্র কোরআন হাতে মেয়রের শপথ। স্বামী জোহরানের শপথের জন্য পবিত্র কোরআনের বহু পুরোনো কপিটি নির্বাচনে রমা দুওয়াজিকে সহায়তা করেছেন একজন গবেষক।

নিউইয়র্কের পূর্বসূরি মেয়রদের প্রায় সবাই পবিত্র বাইবেল হাতে শপথ নিয়েছেন। তবে ফেডারেল, স্টেট বা সিটির সংবিধানের বাধ্যবাধকতায় শপথের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগ্রন্থ ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই।

শপথের এ আয়োজনে জোহরান পবিত্র কোরআনের তিনটি কপি ব্যবহার করেন। কপিগুলোর একটি জোহরানের দাদার ও অন্যটি ১৮ শতকের শেষ ভাগ বা উনিশ শতকের শুরুর দিকের একটি পকেট কোরআন শরিফ।

পবিত্র কোরআনের ঐতিহাসিক এ ক্ষুদ্রাকৃতির কপি নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরির শমবার্গ সেন্টার ফর রিসার্চ ইন ব্ল্যাক কালচারের সংগ্রহ থেকে নেওয়া হয়েছে।

শপথ নেওয়ার সময় জোহরানের স্ত্রী রমা দুওয়াজি পবিত্র কোরআন হাতে ধরে রাখেন। তাতে হাত দিয়ে শপথ নেন জোহরান মামদানি। শপথবাক্য পাঠ করান নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস।

শপথ অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে জোহরানের মা-বাবা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদ মামদানি ও চলচ্চিত্রকার মিরা নায়ার উপস্থিত ছিলেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়াকে নিজের ‘রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা’ বলে মনে করেন জোহরান।

জোহরান ম্যানহাটনের সিটি হল পার্কের নিচে অবস্থিত পুরোনো সিটি হল সাবওয়ে (পাতালরেল) স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শপথ নেন। স্টেশনটি ১৯৪৫ সাল থেকে পরিত্যক্ত। সাধারণ মানুষ এখানে যেতে পারেন না। শুধু মাঝেমধে৵ বিশেষ ভ্রমণের জন্য এটি খোলা থাকে।

১৯০৪ সালে নিউইয়র্কে প্রথম চালু ২৮টি স্টেশনের একটি হচ্ছে এ স্টেশন। পরে ১৯৪৫ সালে আধুনিকায়নের সময় এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৭৯ সালে এটিকে নিউইয়র্কের ‘ল্যান্ডমার্ক’ এবং ২০০৪ সালে জাতীয় ঐতিহাসিক স্থানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

নিউইয়র্ক নগরের সিটি হল প্লাজায় স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে বড় পরিসরে আরেকটি শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি প্রায় চার হাজার। এ অনুষ্ঠানে ডেমোক্রেটিক পার্টির আইনপ্রণেতা আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ নিউইয়র্ক নগরের নতুন মেয়র হিসেবে জোহরানকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন। এখানে সবার সামনে জোহরানকে আরেকবার শপথ পড়ানো হবে। শপথ পড়াবেন ভারমন্টের স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স।

নিউইয়র্কের ওল্ড সিটি হল স্টেশনে শপথ নিচ্ছেন জোহরান মামদানি। ১ জানুয়ারি ২০২৬
নিউইয়র্কের ওল্ড সিটি হল স্টেশনে শপথ নিচ্ছেন জোহরান মামদানি। শপথ নেওয়ার সময় জোহরানের স্ত্রী রমা দুওয়াজি পবিত্র কোরআন হাতে ধরে রাখেন। তাতে হাত দিয়ে শপথ নেন জোহরান মামদানি। শপথবাক্য পাঠ করান নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিসিয়া জেমস। ১ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

পাকিস্তান আবার বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করল

দ্য ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণঃ মার্কিনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট-এ প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েক বছর পর ২০২৫ সালে পাকিস্তান আবারও বৈশ্বিক কৌশলগত মনোযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সাময়িকীটি ২০২৫ সালকে পাকিস্তানের জন্য ‘কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের বছর’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। এতে দৃঢ় নিরাপত্তার বার্তা, নবায়িত আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা এবং সতর্ক অর্থনৈতিক সংস্কারকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। দ্য ডিপ্লোম্যাট-এর মতে, পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব দেশটির আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। উগ্রবাদ মোকাবিলায় শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বের স্পষ্ট বার্তাও এতে গুরুত্বসহ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকাশনাটিতে বলা হয়, এই অবস্থান দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করেছে এবং উগ্রবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ মোকাবিলায় ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সংঘটিত সামরিক সংঘর্ষকে দ্য ডিপ্লোম্যাট এমন এক বড় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা বৈশ্বিক মহলে দীর্ঘস্থায়ী মনোযোগ কাড়ে। এতে উল্লেখ করা হয়, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী কার্যকর প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছে, যা এ অঞ্চলে প্রতিবন্ধকতাভিত্তিক স্থিতিশীলতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এ অচলাবস্থায় পাকিস্তানের সামরিক পারফরম্যান্স আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। সংঘর্ষের পর পাকিস্তান-মার্কিন সম্পর্কের উন্নতি ঘটেছে বলে সাময়িকীটি পর্যবেক্ষণ করে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনে ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া সাময়িকীটি মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সম্পৃক্ততা সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সাথে একটি বড় প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অগ্রগতি’ হিসেবে অভিহিত করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা রপ্তানি নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ বেড়েছে, আর সংঘর্ষে ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে চীন সন্তোষ প্রকাশ করেছে। দ্য ডিপ্লোম্যাট আরও জানিয়েছে, তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ইস্যুতে পাকিস্তান আরও কঠোর ও কাঠামোগত অবস্থান গ্রহণ করেছে। এতে বলা হয়, ইসলামাবাদ তালেবান সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে এবং কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সীমান্তপারের জঙ্গিবাদ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে উদ্বেগ তোলার চেষ্টা করেছে।

দেশের ভেতরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে বহু দেশের সাথে উন্নত সহযোগিতার ফলে। তবে চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, ২০২৫ সালে সংস্কার ব্যবস্থায় পাকিস্তান অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে দ্য ডিপ্লোম্যাট জানায়। এটিকে ‘অনুকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে সৃষ্ট এক বিরল সুযোগ’ বলে অভিহিত করে।

mzamin

ভারতে হিন্দুত্ববাদীরা যেভাবে খ্রিষ্টানদের কোণঠাসা করছে by অমল চন্দ্র

কেরালা লোক ভবনে কর্মীদের বড়দিনের ছুটি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত সারা ভারতে ব্যাপক জনরোষের সৃষ্টি করে। এটি শুধু প্রশাসনিক রীতি মানার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। কর্মীদের ২৫ ডিসেম্বর পালিত গুড গভর্ন্যান্স ডে উপলক্ষে আয়োজিত সরকারি কর্মসূচিতে বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে বলা হয়। এই দিনটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়।

লোক ভবনকে ঘিরে বিতর্ক আরও তীব্র হয় এর আগে প্রকাশিত তাদের সরকারি ক্যালেন্ডার নিয়ে। সেই ক্যালেন্ডারের ফেব্রুয়ারি মাসের পাতায় ভি ডি সাভারকরের প্রতিকৃতি ছাপা হয়েছিল। এই অন্তর্ভুক্তি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে এবং অনেকের কাছে এটি নিরপেক্ষ ইতিহাসের বদলে একটি আদর্শগত বার্তা বলেই মনে হয়। এই দুই ঘটনা একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয় যে এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ।

যদিও ২৫ ডিসেম্বরের কর্মসূচিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়মিত সরকারি কার্যক্রম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল, তবু এর রাজনৈতিক প্রতীকী অর্থ উপেক্ষা করা যায় না। বড়দিন কেবল একটি সাধারণ তারিখ নয়। এটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। সেই দিনে বাধ্যতামূলক উপস্থিতির নির্দেশ বিশেষ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠানে, যা উল্লেখযোগ্য খ্রিষ্টান জনসংখ্যার রাজ্যকে প্রতিনিধিত্ব করে—তা নিরপেক্ষতার নয় বরং সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্য জাহির করার একটি সচেতন বার্তা দেয়।

এই ঘটনাপ্রবাহ আসলে আরও গভীর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি—ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠা হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির অধীনে জনজীবনে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সমন্বয়ের জায়গা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

এই ধারা নতুন নয় এবং শুধু কেরালাতেই সীমাবদ্ধ নয়। চলতি বছর উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ সরকার ঘোষণা করে যে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের ছুটি না দিয়ে স্কুল খোলা রাখা হবে। ওই দিন শিক্ষার্থীদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ীর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বাধ্যতামূলক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বলা হয়।

এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে খ্রিষ্টান সংগঠন ও নাগরিক অধিকারকর্মীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে কোণঠাসা করা হচ্ছে এবং সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে প্রতীকী অবহেলা আসলে আরও ভয়াবহ বাস্তবতার কেবল বাইরের দিক। ভারতে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতা ধারাবাহিকভাবে এবং প্রমাণযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ইভানজেলিক্যাল ফেলোশিপ অব ইন্ডিয়ার রিলিজিয়াস লিবার্টি কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য। হেট অ্যান্ড টার্গেটেড ভায়োলেন্স এগেইনস্ট ক্রিশ্চিয়ানস ইন ইন্ডিয়া ইয়ারলি রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী খ্রিষ্টানদের লক্ষ্য করে হামলার নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা ২০২৩ সালের ৬০১ থেকে ২০২৪ সালে অন্তত ৮৩০ তে পৌঁছেছে। গত এক দশকে এটি অন্যতম সর্বোচ্চ বার্ষিক সংখ্যা এবং এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অস্থিরতার ফল নয় বরং একটি কাঠামোগত প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।

এই সহিংসতার ভৌগোলিক বিস্তারেও একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ছক দেখা যায়। সবচেয়ে বেশি হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে উত্তর প্রদেশে। এরপর রয়েছে ছত্তিশগড়, রাজস্থান, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা। এসব রাজ্যে ক্রমে উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী বক্তব্য স্থানীয় শাসনব্যবস্থা, পুলিশি আচরণ ও রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরে প্রবেশ করেছে। এই রাজ্যগুলোতে হামলার ঘটনার ঘনত্ব দেখায় যে খ্রিষ্টানবিরোধী সহিংসতা কোনো প্রান্তিক ঘটনা নয় বরং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আদর্শিক পরিবেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

ছত্তিশগড় সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখায় কীভাবে শারীরিক সহিংসতা ও আইনি চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একাধিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রেলস্টেশন ও বিভিন্ন গণপরিবহন কেন্দ্রে খ্রিষ্টান সন্ন্যাসিনী ও যাজকদের মানবপাচার বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। এসব অভিযোগ তাঁরা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করেছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

নাগরিক স্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠনগুলোর মতে, এই গ্রেপ্তারগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেয়ে বেশি ভয়ভীতি প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যার উদ্দেশ্য জনপরিসরে খ্রিষ্টানদের উপস্থিতিকে অপরাধ হিসেবে তুলে ধরা।

এই সবকিছুই যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটছে, তা থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। বিজেপি শাসিত একাধিক রাজ্যে কার্যকর হওয়া ধর্মান্তর বিরোধী আইন খ্রিষ্টানদের জন্য আইনি অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে। এর ফলে স্বাভাবিক ধর্মীয় কার্যক্রমও সহজেই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বাস্তবে এসব আইন অনেক সময় জোরজবরদস্তি রোধের চেয়ে বেশি করে উগ্র নজরদারি ও জনতার হস্তক্ষেপকে বৈধতা দেয়। এই সময়টিকে বিশেষভাবে বিপজ্জনক করে তুলছে এই ধরনের ‘বর্জন’ ও বৈষম্যের ক্রমবর্ধমান স্বাভাবিকীকরণ।

যখন ধর্মীয় ছুটি বাতিল, যাজকদের ওপর হামলা বা গির্জা ভাঙচুর আর সাংবিধানিক সংকট হিসেবে নয় বরং নিয়মিত খবর হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন তা গণতন্ত্রের অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়। এটি শুধু খ্রিষ্টানদের নয়, সব ভারতীয় নাগরিকের জন্যই উদ্বেগের বিষয়। ভারতের সংবিধান ধর্মের স্বাধীনতা ও সমান নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ক্রমশ দেখাচ্ছে যে এই অধিকারগুলো রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে কেরালা লোক ভবনে বড়দিনের ছুটি না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কোনো সাধারণ প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখা যায় না। বরং এটি একটি বৃহত্তর আদর্শিক পরিবর্তনের স্পষ্ট লক্ষণ। এমন এক পরিবর্তন যেখানে জনপরিসর ধীরে কিন্তু পরিকল্পিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠের অগ্রাধিকারের দিকে ঝুঁকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে জাতির সামষ্টিক কল্পনায় সংখ্যালঘুদের প্রতীকী ও বাস্তব জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

অমল চন্দ্র, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- দ্য ওয়্যার থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ভারতের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমাগত হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ
ভারতের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমাগত হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

চীন কি আসবে ভেনেজুয়েলাকে বাঁচাতে by ইয়াং শিয়াওটং

ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধের প্রান্তসীমায় চলে গেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাতে সরব হয়েছে চীন। বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ, যেমন ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ, মাদক পাচারের অভিযোগে নৌযানে হামলা ও ভেনেজুয়েলার উপকূলে নৌ অবরোধ—আমেরিকান একতরফাবাদের পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ। এ ধরনের কর্মকাণ্ড অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপের শামিল এবং জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

১৭ ডিসেম্বর ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভান গিলের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্রের ‘একতরফা শক্তিপ্রয়োগের’ বিরোধিতা করেন। একই সঙ্গে তিনি ভেনেজুয়েলার ‘সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষার অধিকারের’ প্রতি চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। কথার খেলার বাইরে ভেনেজুয়েলাকে বাস্তব কোনো সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে বেইজিং। ভূরাজনৈতিক ফাঁদে পা দেওয়ার বিষয়ে চীনের সতর্কতা অত্যন্ত স্পষ্ট। এ নিষ্ক্রিয়তায় লাতিন আমেরিকায় চীনের প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরছে।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে চীন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিস্তার করে চলেছে। চীন আজ দক্ষিণ আমেরিকার শীর্ষ বাণিজ্যিক অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একটি মেক্সিকোও চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহ্যগতভাবে লাতিন আমেরিকাকে তার প্রভাববলয়ের দেশ বলে মনে করে। খুব স্বাভাবিকভাবেই  লাতিন আমেরিকায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সন্দিহান ও শত্রুভাবাপন্ন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একজন প্রকাশ্য চীনবিরোধী। এর আগে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিকে ‘দুষ্ট, গণহত্যা চালানো শাসনব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে চীনবিরোধী কূটনৈতিক অভিযান চালান। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করার চেষ্টা করান রুবিও।

যদিও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সামনে যুক্তরাষ্ট্র কোনো বিকল্প অর্থনৈতিক সহযোগিতার মডেল দিতে পারেনি; বরং শুল্কের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রভাবের লড়াইয়ে ওয়াশিংটন মূলত প্রাধান্য ধরে রেখেছে।

প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র একটি বড় জয় অর্জন করেছে। ট্রাম্প–সমর্থিত রক্ষণশীল নাস্রি আসফুরা হন্ডুরাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতেছেন। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার এবং তাইওয়ানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের অধীন কয়েকটি লাতিন আমেরিকান দেশ মার্কিন চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে পানামা আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ থেকে সরে আসে। এরপর মার্চে পানামা খাল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা হংকংভিত্তিক কোম্পানি ঘোষণা করে যে তারা তাদের অংশের বেশির ভাগ বিক্রি করে দেবে মার্কিন একটি সংস্থার কাছে। ডিসেম্বর মাসে মেক্সিকো ঘোষণা করে যে ১ জানুয়ারি থেকে তারা চীনা পণ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করবে।

ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন চাপ চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে নয়; বরং এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি জড়িত। রুবিও তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণ করতে চাইছেন। এর লক্ষ্য হচ্ছে ভেনেজুয়েলা ও কিউবা থেকে আসা মার্কিন ভোটারদের সন্তুষ্ট করা।

কারাকাসে বর্তমান শাসনব্যবস্থার যেকোনো পরিবর্তন নিঃসন্দেহে চীনের স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। যদিও চীন ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর নির্ভরশীল নয় (ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেলের শীর্ষ ১০ সরবরাহকারী দেশের মধ্যে চীন অন্তর্ভুক্ত নয়), তবু যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলার তেল ট্যাংকার আটক করার ঘটনা চীনের জ্বালানি কৌশলকে দুর্বল করে।

ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা বৃদ্ধির বিষয়টিকে চীন কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছে না, ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখছে। যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, সেই বৃহত্তর পটভূমি থেকে এটা গুরুত্বপূর্ণ। ভেনেজুয়েলার সীমিত অর্থনৈতিক মূল্য ও ভূরাজনৈতিক দূরত্ব বিবেচনা করে চীন সরকার লাতিন আমেরিকার দেশটিকে রক্ষা করার জন্য কোনো সম্পদ ব্যয় করবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ করলে চীন সম্ভবত সেটিকে ব্যবহার করবে নিজের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারের কাজে। চীন নিজেকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করবে। যদিও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়াকে চীন ইতিবাচক বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু এটা প্রায় নিশ্চিত যে চীন ভেনেজুয়েলাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না।

যাহোক যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনেজুয়েলায় সরকার উৎখাত করে, তবে সেটি লাতিন আমেরিকায় চীনের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা উদ্‌ঘাটন করবে। এমন পরিস্থিতি লাতিন আমেরিকার অনেক দেশকে এটা পুনর্বিবেচনা করতে উৎসাহিত করবে যে একটি আগ্রাসী যুক্তরাষ্ট্রের এত কাছাকাছি অবস্থান করে চীনের সঙ্গে জোট বাঁধা কতটা ভালো সিদ্ধান্ত।

* ইয়াং শিয়াওটং, সিঙ্গাপুরভিত্তিক হরাইজন ইনসাইটস সেন্টারের গবেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-28%2Fpni04zye%2Fuswarshipreuters.jpg?rect=0%2C12%2C1200%2C800&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভেনেজুয়েলায় সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ক্যারিবীয় সাগরে মার্কিন রণতরি। ছবি: রয়টার্স

ইয়েমেনের বন্দরে বোমা হামলার ব্যাখ্যা দিল সৌদি আরব

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী মুকাল্লায় জোট বাহিনীর বিমান হামলা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে সৌদি আরব। এই হামলাকে ঘিরে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেন থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। খবর আলজাজিরার।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি মঙ্গলবার ভোরে চালানো সামরিক অভিযানের বিভিন্ন ছবি ও তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, মুকাল্লা বন্দরে প্রবেশের পর দেখা যায়, দুটি জাহাজে ৮০টির বেশি যানবাহন এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদভর্তি কনটেইনার ছিল। তার দাবি, এসব যানবাহন, কনটেইনার ও আমিরাতি সেনাদের সৌদি আরবকে না জানিয়ে আল-রাইয়ান ঘাঁটিতে স্থানান্তর করা হয়।

মেজর জেনারেল আল-মালিকি বলেন, অভিযানের সময় জোট বাহিনী সম্পূর্ণভাবে যুদ্ধের নিয়মকানুন মেনে চলেছে।

এদিকে সৌদি আরবের অভিযোগের পরপরই ইয়েমেন থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় ইউএই। আবুধাবি জানায়, ইয়েমেনে তাদের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ শেষ হয়েছে। এর আগে রিয়াদ অভিযোগ করেছিল, ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সমর্থন দিচ্ছে ইউএই।

মঙ্গলবার এই ঘোষণা আসে এমন এক সময়ে, যখন ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউএইকে তাদের সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। সৌদি আরবও এই দাবির প্রতি সমর্থন জানায়।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনী মুকাল্লা বন্দরে হামলা চালায়। রিয়াদের দাবি, ওই বন্দরে সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পর্কিত একটি অস্ত্রের চালান ছিল, যা ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) কাছে পাঠানো হচ্ছিল।

উল্লেখ্য, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শুরুতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষে থাকলেও চলতি মাসে সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে এসটিসি। দক্ষিণ ইয়েমেনে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে তারা এই আক্রমণ চালায়।

এসটিসির সাম্প্রতিক অগ্রগতিতে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভেঙে পড়ে। তারা হাদরামাউত ও মাহারা প্রদেশসহ দক্ষিণ ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নেয়, যা সৌদি আরবের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেই করা হয়েছে। হাদরামাউত সৌদি সীমান্তবর্তী এবং মাহারা প্রদেশ ওমান সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত।

সৌদি আরব মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানায়, হাদরামাউত ও মাহারা প্রদেশে সামরিক অভিযান চালাতে এসটিসির ওপর ইউএই যে ‘চাপ প্রয়োগ করেছে’, তাতে তারা হতাশ। রিয়াদের মতে, এসব পদক্ষেপ তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। 

ছবি : সংগৃহীত

লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা by মহিউদ্দিন আহমদ

আমি জ্যোতিষী নই। নিশ্চিত করে বলতে পারি না, কাল কিংবা পরশু কী ঘটবে। ছয় মাস বা এক বছর পর কী হতে পারে, তা আন্দাজ করা তো দূরের কথা। কারণ, আমাদের দেশ, সমাজ, জীবন কোনোটাই সরলরেখায় চলে না। সেখানে নানান বাঁক, খানাখন্দ। যেকোনো সময় ছন্দপতন হতে পারে।

তারপরও আমরা অভিজ্ঞতা আর কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতের কথা বলি। কাঙ্ক্ষিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত যা-ই আসুক না কেন, তার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিই। কিন্তু যেখানে আমি একা নই, আমার চারপাশে আছে হাজারো মানুষ ও প্রতিষ্ঠান, সেখানে আমার ব্যক্তিগত অনুমাননির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি কোনো কাজে আসে না, যদি না সেটি সম্মিলিত প্রয়াস হয়। এ রকম ঘটনা ঘটে প্রায়ই।

যা চাই না, যা প্রত্যাশিত নয়, তাকে আমরা বলি অঘটন। এ রকম কিছু ঘটে গেলে আমরা অবাক হই। আমাদের মন ভাঙে। হতাশা জেঁকে বসে।

সম্প্রতি কিছু ঘটে গেছে, যা আমাদের অনেকের কাছে ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু ঘটনা তো আপনা–আপনি ঘটে না। এটি ঘটানো হয়। তার পেছনে থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত প্রয়াস। এর জন্য থাকে পরিকল্পনা। অনুঘটকেরা তো আটঘাট বেঁধেই নামেন। তিনিই ভালো পরিকল্পনাকারী, যিনি অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে পদক্ষেপ নেন। সামরিক পরিভাষায় এটাকে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বলা যেতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপের একটা উদ্দেশ্য থাকে—হুঁশিয়ার হয়ে যাও; আমরা আসছি বিপুল বিক্রমে।

আপাতত দেখছি, দুটি জনপ্রিয় দৈনিক আর দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা হয়েছে। এটা কি হুট করে হলো? মোটেই না। অনেক দিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার হচ্ছিল। ফেসবুক ও ইউটিউব ঘাঁটলেই জানা যাবে, কে কখন কীভাবে উসকানি দিয়েছে। জানাই ছিল, অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠান চালু থাকার ঘোর বিরোধী। কিন্তু এভাবে আক্রমণ, লুটপাট এবং আগুন দেওয়া হবে, তা আন্দাজ করা যায়নি।

এ দেশে একদল লোক যখন-তখন যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউকে শত্রু বানায়, নিমেষেই তার বিচার করে ফেলে এবং বিচারের রায় বাস্তবায়ন করতে একমুহূর্ত অপেক্ষা করে না। এটাকে ‘মব জাস্টিস’ বলে গৌরবান্বিত করার চেষ্টা হয়। আদতে এটা জাস্টিস, নাকি ভায়োলেন্স। এ ধরনের সংঘবদ্ধ আচরণের পেছনে একটা উদ্দেশ্য থাকে। সেখানে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনি আছে বদমতলব থেকে ভিন্নমত ও পথের লোককে শায়েস্তা করার ফন্দি।

একটা সমাজে যখন বিচারব্যবস্থা বলে কিছু থাকে না, কাঠামোগত যে ব্যবস্থা আছে, সেটি খুব সময় নেয় এবং অনেক খরচ হয়। ভুক্তভোগীকে বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর। আদালত আর উকিলের খরচ জোগাতে তাকে সর্বস্বান্ত হতে হয়। সে জন্য অনেকেই নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। আইনের শাসন নিয়ে আমরা যতই আহাজারি করি না কেন, সহজে, কম খরচে এবং অতি দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে এ রকম মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স বন্ধ করা যাবে না। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অবস্থানে যেতে আর কত শতাব্দী লাগবে, কেউ বলতে পারে না।

এ তো গেল বিচার না পাওয়ার কারণে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপার। কিন্তু এর বাইরেও কিছু আছে। আমাদের সমাজটা এখনো পশ্চাৎপদ। পশ্চিমের শিল্পোন্নত সমাজের ভাষায় বলা যেতে পারে, আমরা মধ্যযুগীয় ‘ট্রাইবাল’ কালচারে আছি। এখানে নানান মতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে গোত্র বা গোষ্ঠী।

প্রতিটি গোত্র বা গোষ্ঠী মনে করে, সে-ই সঠিক। বাকি সবাই ভ্রান্ত এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তার চোখে যে খারাপ, তাকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব বর্তেছে গোত্রপতির ঘাড়ে। এখানে তিনি নিছক নেতা নন, একজন ‘ত্রাতা’। তাঁর কাজ হলো বাকি সবাইকে নির্দশ দেওয়া। তিনি স্লোগান দেন—জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো। অমনি তাঁর অনুসারীরা আগুন হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো আছে মধ্যযুগে, যেখানে চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, জানের বদলে জান—এই হচ্ছে ন্যায়বিচার। আমাদের স্লোগানগুলোও তেমন—একটা-দুইটা ‘অমুক’ ধর, ধরে ধরে জবাই কর। চাষাভুষা, জেলে-তাঁতি, মুটে-মজুরেরা এসব স্লোগান দেয় না। এসব স্লোগান আমরা শুনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা রাজনৈতিক দলের মিছিলে-সমাবেশে।

প্রবল পরাক্রান্ত মোগল বাদশাহ জালালুদ্দিন আকবর ‘অপরাধীর’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। একটা হাতিকে মদ খাইয়ে মত্ত করা হতো। তারপর দণ্ডিতকে হাত-পা বেঁধে ওই হাতির পায়ের নিচে ছুড়ে ফেলা হতো। বাদশাহ তাঁর সভাসদদের নিয়ে এটা দেখতেন, আমোদ পেতেন। তাঁর ছেলে নুরউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরও কম যান না। তিনি দণ্ডিত ব্যক্তিকে জীবিত অবস্থায় গাধার সদ্য ছাড়ানো চামড়ায় মুড়ে সেলাই করিয়ে দিতেন। চামড়া যতই শুকায়, সেটি আঁটসাঁট হয়ে ভেতরের মানুষটির ওপর চেপে বসে। তার হাড়গোড় ভেঙে যায়। একসময় সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। যন্ত্রণা দিয়ে তিলে তিলে মারা।

প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের স্লোগানগুলো অনেকটা সে রকম। আমরা রাস্তায় নেমে যে কারও বিরুদ্ধে ফাঁসি দাবি করি। আমরা অনেকেই বলি, অমুককে প্রকাশ্যে ফাঁসি বা ফায়ারিং স্কোয়াডে দেওয়া হোক, যাতে আশপাশের লোকেরা এটা দেখে বিনোদন পায়। আমাদের স্লোগানে, বক্তৃতায়, বিবৃতিতে আমরা কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে এমন সব কথা উচ্চারণ করি, যা হাজার বছর আগের সমাজ-সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।

আজকাল বক্তৃতায় উত্তেজক কথাবার্তা এবং স্ল্যাং যে যত বেশি ব্যবহার করে, তার জনপ্রিয়তার পারদ ততই ওপরে উঠতে থাকে। হেরে মাইরা ফালামু, তোরে ছিঁড়া ফালামু, ওইডা ভাইঙা ফালামু—এ রকম হুংকার দিলে হাততালি পাওয়া যায়। একশ্রেণির মানুষ তাদের পেছনে ছোটে পঙ্গপালের মতো।

আমি গানবাজনা করি। এতে আমি আনন্দ পাই। আপনার ভালো লাগে না। আপনি গাইবেন না। তাই বলে আপনি আমার ওপর চড়াও হবেন? আপনি রায় দিয়ে দিলেন, এটা ইসলামবিরোধী এবং এর বিরুদ্ধে জিহাদ করা কর্তব্য। আপনি গিয়ে আমার বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে হামলা করলেন, আগুন দিলেন, বাদ্যযন্ত্র লুট করলেন।

এ দেশে পত্রিকার পাঠক হচ্ছে মধ্যবিত্ত। তাদের একটা ভগ্নাংশ পত্রিকা পড়ে। আমার ধারণা, দেশের সব ছাপা পত্রিকার মোট সার্কুলেশন হবে বড়জোর ১০ লাখ। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি মানুষ নগদ টাকা দিয়ে কেনে। বাকিগুলোর তেমন বাজার নেই। আপনি বলছেন, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকাটি জনগণের দুশমন, অমুকের দালাল, গাদ্দার। তো জনগণ আপনার পছন্দের পত্রিকা পড়ে না কেন—এটা কখনো ভেবে দেখেছেন? আপনি কোন জনগণের কথা বলছেন?

পাঠকের রায়ে তো আপনার অপছন্দের পত্রিকাটিই বেশি জনপ্রিয়। আর আপনি যাদের মধ্যে জনপ্রিয়, তারা তো পত্রিকাই পড়ে না। অথচ আপনি বা আপনারা দলবল উসকে দিয়ে আপনার অপছন্দের পত্রিকার ওপর হামলা চালালেন। সঙ্গে কাকে পেলেন? সমাজের যত চোর-ছেঁচড়-লুটেরা। তারা কম্পিউটার, চেয়ার-টেবিল, টাকাপয়সা লুট করে নিয়ে গেল। তারপর আগুন দিল।

একশ্রেণির লোক সব সময় তক্কে তক্কে থাকে, কখন কোথায় লুটপাট করতে পারবে। সুযোগ পেলেই তারা অন্যের ওপর চড়াও হয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখন তো লুটের মচ্ছব চলছে। তার মধ্যে হাতে গোনা দু-একজন পণ্ডিতকে বলতে শুনি, এদের মব বলা যাবে না। এরা হচ্ছে প্রেশার গ্রুপ। যারা মব বলে, তারা হচ্ছে স্বৈরাচারের দোসর। লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা!

* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা

শোকের জনসমুদ্র, খালেদা জিয়ার জানাজা

এ এক মহাকাব্যিক প্রস্থান। একটি কফিনের পাশে পুরো বাংলাদেশ। বিরল রাষ্ট্রীয় সম্মান। কোটি জনতার হৃদয়নিংড়ানো শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় শেষ বিদায়। দেশের আপামর জনতার কান্নাভেজা শ্রদ্ধায় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার শেষ বিদায়ের এই যাত্রায় শরিক হয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সরকারের প্রতিনিধি, ৩২টি দেশের কূটনীতিক।

দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বেগম জিয়ার জানাজা হয়ে ওঠে স্মরণকালের বৃহৎ সমাগম। শুধু দেশ নয়, মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয় এটি। বিশ্বের কোনো নারী রাজনীতিকের প্রতি মানুষের এমন ভালোবাসার ঘটনাও বিরল। যে মানিক মিয়া এভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি লাখ লাখ মানুষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তার জানাজায় অংশ নিয়েছেন সেখানেই ৪৪ বছর আগে তার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি এমন এক শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল। জিয়ার জানাজাও হয়েছিল ঐতিহাসিক সমাগম। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, জিয়ার জানাজার পর খালেদা জিয়ার জানাজাই দেশের ইতিহাসে বৃহৎ জানাজা। বেগম জিয়ার জানাজায় দেশের সব দল-মত ও পথের মানুষ মিলিত হয় মানিক মিয়া এভিনিউর মোহনায়। জানাজার ব্যাপ্তি জাতীয় সংসদের মাঠ, মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে। রাস্তা, অলি-গলিতে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্রোত।  

পুরো রাজধানী পরিণত হয় শোকের নগরীতে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ৪৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম আর ত্যাগের প্রতি মানুষের এই সম্মান রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক নজির তৈরি করেছে। ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় সমাহিত করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে।

এর আগে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিউতে ৩৭ দিন লড়াই করে ৩০শে ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভোর ৬টায় না ফেরার দেশে চলে যান বেগম খালেদা জিয়া। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর খবর আলোর গতিতে ৫৬ হাজার বর্গমাইল ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা প্রকাশ করেন শোক। ফেসবুকের পাতা ভরে শোকের বার্তা। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে পুরো দেশ। রাতে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ এভারকেয়ারের হিমঘরে রাখা হয়। সেখান থেকে সকাল সোয়া ৯টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও কঠোর নিরাপত্তায় লাল-সবুজের পতাকার আদলের এম্বুলেন্সে করে আনা হয় গুলশানের বাসভবনে। স্বজনদের কান্নায় সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। মায়ের কফিনবাহী এম্বুলেন্সের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেন বড় ছেলে তারেক রহমান। পাশে তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং ভ্রাতৃবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথি দোয়া-দরুদ পড়েন।

স্বজনদের দেখার জন্য দীর্ঘ দুই ঘণ্টা খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী এম্বুলেন্স রাখা হয় গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনের সামনে। বেলা ১১টার দিকে চোখে জলে বাসভবন থেকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় দেন পরিবারের সদস্যরা। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনীর কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে খালেদা জিয়ার কফিনবাহী এম্বুলেন্স রওনা হয় মানিক মিয়া এভিনিউমুখী। এম্বুলেন্সের সামনে সিটে বসেন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেএড এম জাহিদ হোসেন। কফিনবাহী এম্বুলেন্সের সঙ্গে বুলেট প্রুফ বিশেষ বাসে করে রওনা হন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খালেদা জিয়ার কফিনবাহী এম্বুলেন্স পৌঁছে সংসদ ভবন এলাকায়। ততক্ষণে লোকারণ্য হয়ে পড়ে সংসদ ভবন, মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে। আশপাশের কয়েক কিলোমিটার মূল সড়কের দুই পাশে মানুষ, ফুটওভার ব্রিজে মানুষ, রাস্তার পাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে মানুষ, অলিগলি, ফুটওভার ব্রিজ, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে জুড়ে শোকাহত মানুষ। কেউ স্লোগান দিচ্ছেন না, কেউ নির্দেশনা দিচ্ছেন না, তবু সবাই একইদিকে যাচ্ছে। এক নীরব শৃঙ্খলা। সুশৃঙ্খলা এসব মানুষের কারও হাতে শোকের কালো পতাকা, কারও বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেন। কফিন পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালীন যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেসব বক্তব্য জানাজাস্থলে প্রচার করা হয়। সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে নারীদের জন্য আলাদা জানাজার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে খালেদা জিয়ার পরিবারের নারী সদস্যরা অংশ নেন। বেলা ২টায় জানাজা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মানুষের ভিড়ের কারণে মরদেহবাহী এম্বুলেন্স সংসদ ভবনের দক্ষিণপ্লাজায় আনতে এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বেলা তিনটার কিছু আগে জানাজার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। জানাজার আগে খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এরপর তার বড় সন্তান ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মায়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান এবং ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বুধবার বিকাল ৩টা ৩ মিনিটে শুরু হয় জানাজা। জানাজার নামাজ পড়ান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বামপাশে দাঁড়ান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ডানপাশে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, এরপর জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান এবং তারপরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান দাঁড়ান। প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি তার সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান, আ ফ ম খালিদ হোসেন, আলী ইমাম মজুমদার, সি আর আবরার, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রমুখ। জানাজা শেষে খালেদা জিয়ার কফিন বহন করে যারা এম্বুলেন্সে তুলেন তাদের মধ্যে মাওলানা মামুনুল হক ও মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারি, শায়খ আহমদুল্লাহকেও দেখা যায়।  

গুলশানের বাসভবন থেকে অশ্রুসিক্ত শেষ বিদায়: রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ নেয়া হয় গুলশানের বাসভবনে। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে লাল-সবুজের পতাকার রংয়ে মোড়ানো এম্বুলেন্সে করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ আনা হয়। এম্বুলেন্স ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন। খালেদা জিয়াকে শেষবারের মতো দেখানোর জন্য স্বজনরা আগে থেকেই গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনে জড়ো হন। লাশবাহী এম্বুলেন্সটি প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। কেউ কেউ দু’হাত তুলে মোনাজাত করেন। আবার কোরআন তেলাওয়াত করেন। স্বজন, আর নেতাকর্মীদের চোখের পানিতে গুলশানের ১৯৬ বাড়ির আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।

সবাই যখন নীরবে চোখের পানি ফেলে দেশের আপসহীন নেত্রীকে বিদায় জানাচ্ছেন, ঠিক তখনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে পড়ে। অশ্রুসিক্ত শেষ বিদায়ের মুহূর্তে মায়ের কফিনের এক পাশে বসে একাগ্রচিত্তে কোরআন তেলাওয়াত করতে থাকেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পুরো সময় জুড়ে তারেক রহমান ছিলেন, ধীর স্থির।  এ সময়  তারেক রহমানের পাশে মেয়ে জাইমা রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে দেখা যায়। তারেক রহমানের এই নীরব প্রার্থনা অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। দলীয় নেতাকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।  বেলা ১১টা ৫ মিনিটে বাসভবন থেকে জানাজার উদ্দেশ্যে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পথে রওনা হয় লাশবাহী গাড়িটি। গাড়ির পেছনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা সম্বলিত বাসে ওঠেন তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। শোক, ভালোবাসা আর স্মৃতির ভার বুকে নিয়ে এগিয়ে চলে শেষ যাত্রা এক অধ্যায়ের সমাপ্তি আর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে।
কফিন বহন করলেন তিন আলেমেদ্বীন: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কফিন বহন করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ, আলোচিত ইসলামী বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। গতকাল রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে বেগম জিয়ার স্বজনদের সঙ্গে এই তিন আলেম তার কফিন বহন করেন।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে।

অংশগ্রহণকারী অন্য সদস্যরা হলেন- দলটির নায়েবে আমীর মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমীর আবদুর রহমান মুসা, দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন প্রমুখ।  

স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজায় পরিণত হয়। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জানাজায় মানুষের সমাগম হবে আগেই ধারণা করা হয়েছিল। জানাজার স্থল থেকে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার সড়ক, অলিগলিতে মানুষের ঢল ছড়িয়ে পড়ে। লোকসমাগম মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে দক্ষিণে ফার্মগেট, কাওরান বাজার পার হয়ে বাংলামোটর, শাহবাগ, ওদিকে ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর, কলাবাগান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। উত্তরে চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র পার হয়ে আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, পশ্চিমে আসাদগেট, লালমাটিয়া পার হয়ে কল্যাণপুর পর্যন্ত লোকারণ্য হয়ে পড়ে। পূর্বদিকে বিজয় সরণি ফ্লাইওভার, জাহাঙ্গীরগেট, তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত অবস্থান নেয় মানুষ। জায়গা না পেয়ে মেট্রোরেল স্টেশন, ফ্লাইওভার, আশপাশের বাসা-বাড়ির ছাদ, বারান্দা, অলিগলি থেকেও জানাজায় অংশ নিতে দেখা যায় অনেককে। কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। সরজমিন দেখা যায়, খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ভোর থেকেই বানের স্রোতের মতো মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউমুখী আসতে থাকে। চারপাশের প্রধান সড়ক ও অলিগলি দিয়ে শোকের মিছিল শুরু হয়। জানাজার জন্য মানিক মিয়া এভিনিউর চারপাশের প্রধান সড়কে যান চলাচল আগে থেকেই বন্ধ করে দেয়ায় দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে মানুষ উপস্থিত হন।  বেলা ১২টার দিকেই মানিক মিয়া এভিনিউ সড়ক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। পরে আশপাশের আসাদগেট, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর, ধানমণ্ডি ৩২, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, লালমাটিয়া,  সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল রোড, শিশুমেলা, আগারগাঁও সড়ক ও শ্যামলী পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়। গণভনের প্রধান ফটক থেকে শিশুমেলা হয়ে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে লাখ লাখ মানুষ বেগম জিয়ার জানাজায় অংশ নেয়। এ ছাড়া আড়ং থেকে মিনাবাজার হয়ে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর বাংলাদেশ চক্ষু হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাজা নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। মানিক মিয়া এভিনিউ সড়কের শেষ মাথায় আড়ংয়ের পেছন পাশে লালমাটিয়ার অলিগলিতে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা আদায় করেন। জানাজায় উপস্থিত শোকাহত লোকজন খালেদা জিয়ার ত্যাগ নিয়ে নানা মন্তব্য করেন। তারা বলেন, দেশের মানুষের অধিকারের জন্য গণতন্ত্রের জন্য জীবনে প্রায় সব রকম মানবিক কষ্টই ভোগ করে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে দুই শিশু সন্তানসহ বন্দি হন,  ১৯৭৫ সালে স্বামীর সঙ্গে গৃহবন্দি হন, ১৯৮১ সালে তরুণী বয়সে হারান স্বামী জিয়াউর রহমানকে,  এরপর দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ৩০  বছর দুই দু’টি স্বৈরাচারের নির্যাতন-নিপীড়ন, শেষ ১৮ বছর পরিবারহীন নিঃসঙ্গতা, গুলশান কার্যালয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় ছোট সন্তানকে হারানোর বেদনা, বড় সন্তানকে পঙ্গু করে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানোর যন্ত্রণা, বিনা অপরাধে পরিত্যক্ত কারাগারে দুই বছর কাটানোর যন্ত্রণা হাসিমুখে সহ্য করেন। সহজ পথ এড়িয়ে তিনি স্বেচ্ছায় এই কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন শুধু দেশবাসীর মুক্তির জন্য।

স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকাল সাড়ে ৪টায় স্বামীর কবরের পূর্বপাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এ সময় তার বড় ছেলে ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্য, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। দাফন শেষে খালেদা জিয়ার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিন বাহিনীর সদস্যরা। এরপর বড় ছেলে তারেক রহমানও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর বুলেটপ্রুফ বাসে করে  তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা গুলশানের বাসভবনে ফিরেন।

বিভিন্ন দেশে ও জেলায় গায়েবানা জানাজা: এদিকে ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় বেগম খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর গায়েবানা জানাজা পড়েন। এদিকে চীনের শেনজেন শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদে বুধবার রাতে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহত্তর চায়না বিএনপি’র আয়োজনে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীসহ দলমত নির্বিশেষে চীন প্রবাসী বাংলাদেশিরা এতে অংশগ্রহণ করে। ওদিকে বুধবার বাদ আসর মালদ্বীপের মালে শহরে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন।

জানাজায় অসুস্থ হয়ে একজনের মৃত্যু:
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেয়া একজন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। বুধবার দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণের পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের নাম মো. নীরব হোসেন (৫৬)। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ডালিমিয়া এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নীরব নামের ওই ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। তিনি মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রচুর ভিড়ে ও মানুষের চাপে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। ওসি বলেন, আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি- গরম ও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিতে জাপানের প্রতি আহ্বান মাহমুদ আব্বাসের

আসাহি সিম্বুনকে সাক্ষাৎকারঃ ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আশা করছেন ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে জাপান এবং গাজা উপত্যকার পুনর্গঠনে অবদান রাখবে। এক সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরও জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন শান্তি উদ্যোগ এবং দীর্ঘ দুই বছরের সংঘর্ষে বিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ৯০ বছর বয়সী আব্বাস ২৫ ডিসেম্বর পশ্চিম তীরের রামাল্লাহ শহরে প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে দেয়া সাক্ষাৎকারে জাপানের আসাহি শিম্বুন-এর সাংবাদিককে বলেন, আমরা চাই আপনাদের সরকার ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিক। আমার মনে হয় না এতে অস্বীকৃতির কোনো কারণ আছে। এই স্বীকৃতি ইসরাইলের বিরুদ্ধে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির স্বার্থে।

গত ১০ই অক্টোবর ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটি ছিল কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাথে তার প্রথম এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের সাথে বৈঠক করার কথা রয়েছে। জিম্মি ও বন্দি বিনিময়কে কেন্দ্র করে যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপ প্রায় সমাপ্ত বলে ধরা হচ্ছে। এখন পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নিতে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা। এতে সম্ভাব্য আলোচ্যসূচির মধ্যে রয়েছে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে একটি বোর্ড অব পিস বা অন্তর্বর্তী শাসন কাঠামো গঠন, গাজায় নিরাপত্তা ও যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স মোতায়েন।

এই উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানালেও আব্বাস বলেন, এসব পদক্ষেপ অবশ্যই ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সম্মতি এবং তার সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান বজায় রেখে বাস্তবায়িত হওয়া উচিত।

যুদ্ধবিরতি চলমান থাকলেও ইসরাইলি হামলায় আরও ৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। ফলে গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়েছে। এখনও কিছু সীমান্ত পারাপার বন্ধ রয়েছে এবং ফিলিস্তিনি শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি বিরাজ করছে। তিনি ট্রাম্প এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর ভূমিকার প্রশংসা করলেও গাজার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। বলেন, ক্রমাগত নিয়ম লঙ্ঘন, বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা- এসবই এই চুক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং ভেঙে পড়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আব্বাস জানান, যুদ্ধপরবর্তী সময়ে গাজা শাসন ‘বৈধ ফিলিস্তিনি সরকার’-এর হাতে ফিরিয়ে আনার পক্ষে তারা প্রস্তুত অর্থাৎ হামাসের শাসনের অবসান চান তিনি। ২০০৭ সাল থেকে গাজা কার্যত হামাসের নিয়ন্ত্রণে। আর ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রশাসন সীমিত কেবল পশ্চিম তীরেই। তিনি বলেন, এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন এবং এক বৈধ অস্ত্র- এই নীতির ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষই বৈধ শাসন কাঠামো। হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি না থাকলেও তিনি বলেন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং তাদের শাসনের অবসান শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপের অপরিহার্য অংশ। শান্তি পরিকল্পনায় গাজার ভবিষ্যৎ শাসন যে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে যাবে- এমন নিশ্চয়তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই, যা ফিলিস্তিন ও আরব দেশগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়- যুদ্ধবিরতির পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে দক্ষিণ ইসরাইলে গঠিত সিভিল-মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (সিএমসিসি)। প্রায় ৫০টি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধি থাকলেও সেখানে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। আব্বাস বলেন, সিএমসিসি-এর ক্ষেত্রে আমরা স্পষ্ট করছি, যে কোনো পুনর্গঠন বা সমন্বয় কাঠামো ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকাকে সম্পূরক হবে, বিকল্প নয়। কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটানো স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদি সফলতার সম্ভাবনা দুর্বল করে। বোর্ড অব পিস কাজ চালিয়ে যাবে- যতদিন না ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সুশাসন, আইনের শাসন ও স্বচ্ছতাসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করে, যা আন্তর্জাতিক মহল দাবি করে আসছে। তিনি একটি ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ২০০৬ সালের পর থেকে নির্বাচন না হওয়ায় ফিলিস্তিনি আইন পরিষদের দ্রুত নির্বাচন আয়োজনেরও আহ্বান জানাচ্ছে। আব্বাস তার পুরোনো অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার এক বছরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা হবে। তবে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার। এক কর্মকর্তা জানান, দুই বছরের সংঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হওয়ায় ভোটার নিবন্ধন ও যাচাইয়ে সময় লাগবে। ইসরাইলি বাহিনী অবস্থান করলে এ কাজ সম্ভব নয়। শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী কোনোভাবেই সরাসরি, পরোক্ষ বা অন্য কোনোভাবে গাজার শাসনে অংশ নেবে না।

আব্বাস পরিষ্কার করেন, কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী শাসন বা প্রশাসনে অংশ নিতে পারবে না। তবে হামাস রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হলে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা খোলা রয়েছে। তিনি বলেন, যে কোনো ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর জন্য রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক জীবনে অংশগ্রহণের দরজা খোলা। শর্ত শুধু একটাই- তারা যেন রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়ে ফিলিস্তিনি আইন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার মেনে চলে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইল পশ্চিম তীরেও অভিযান জোরদার করেছে, পাশাপাশি ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলাও বেড়েছে। আব্বাস আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বলেন, বসতি সম্প্রসারণ, কার্যত ভূমি দখল এবং বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসী হামলা- এসবই আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে নস্যাৎ করার ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা। প্রায় ১৬০টি দেশ দুই-রাষ্ট্র সমাধানের অংশ হিসেবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র আপত্তি জানালেও, সেপ্টেম্বরে প্রথমবারের মতো জি-৭ দেশগুলোর মধ্যে বৃটেন, কানাডা ও ফ্রান্স স্বীকৃতি দেয়।

mzamin

সোমালিল্যান্ডে যে কোনো ইসরাইলি উপস্থিতিই হবে লক্ষ্যবস্তু: হুতি নেতা

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা সতর্ক করে বলেছেন, সোমালিল্যান্ডে যে কোনো ইসরাইলি উপস্থিতিকে তারা ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করবে। সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেয়ার ইসরাইলি সাম্প্রতিক ঘোষণার পর এটাই হলো সর্বশেষ কঠোর প্রতিক্রিয়া। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। বিদ্রোহীদের অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতি অনুযায়ী, গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতা আবদুল মালিক আল হুতি বলেন, আমরা সোমালিল্যান্ডে যে কোনো ইসরাইলি উপস্থিতিকে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করি। কারণ এটি সোমালিয়া ও ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসন এবং অঞ্চলটির নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

শুক্রবার ইসরাইল ঘোষণা করে যে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ১৯৯১ সালে সোমালিয়া থেকে একতরফা বিচ্ছিন্নতার ঘোষণা দেয়ার পর এটিই হলো স্বঘোষিত প্রজাতন্ত্রটির জন্য প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। হুতি নেতা সতর্ক করে বলেন, এই সিদ্ধান্ত ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। তার ভাষায়, এই স্বীকৃতি হলো ‘সোমালিয়া ও তার আফ্রিকান পরিবেশ, তেমনি ইয়েমেন, লোহিত সাগর এবং লোহিত সাগরের উভয় তীরবর্তী দেশগুলোর বিরুদ্ধে শত্রুতামূলক অবস্থান।’

দশক ধরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য চাপ দিয়ে আসা সোমালিল্যান্ডের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি আদেন উপসাগরের তীরে অবস্থিত এবং তাদের নিজস্ব মুদ্রা, পাসপোর্ট ও সেনাবাহিনী রয়েছে। আঞ্চলিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন ইসরাইলের জন্য লোহিত সাগরে আরও শক্তিশালী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। ফলে তারা ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর অভিযান চালাতে পারবে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলের বিধ্বংসী হামলা শুরু হওয়ার পর হুতি গোষ্ঠী ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইল একাধিকবার ইয়েমেনে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। হুতিরা বলেছিল, এই হামলাগুলো গাজার ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির অংশ। তবে গাজায় অক্টোবর থেকে যে নাজুক যুদ্ধবিরতি চলছে, তার পর থেকে হুতিরা তাদের হামলা স্থগিত রেখেছে।

সোমালিল্যান্ড ১৯৯১ সালের একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মূলত বিচ্ছিন্নই রয়ে গেছে। যদিও সোমালিয়ার তুলনায় অঞ্চলটি তুলনামূলক বেশি স্থিতিশীল, সেখানে রাজধানী মোগাদিশুতে আল-শাবাব জঙ্গিরা প্রায়ই হামলা চালায়।

ইসরাইলের এই স্বীকৃতির সমালোচনা করেছে আফ্রিকান ইউনিয়ন, মিশর, তুরস্ক, ছয় জাতির উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) এবং সৌদি আরবভিত্তিক ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। ইউরোপীয় ইউনিয়নও জোর দিয়ে বলেছে, সোমালিয়ার সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানাতেই হবে।

mzamin

ভারতে বাড়ছে গণপিটুনি, পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই

অচেনা বা বিদেশি মানুষ ও সংস্কৃতির প্রতি ঘৃণা ও ভয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো ভারতেও বাড়ছে। বিদ্বেষমূলক মনোভাবের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা অনেক সময় আগন্তুকদের প্রতি সহিংস হয়ে ওঠেন। ঘটে গণপিটুনির মতো ঘটনা। ভারতে বিজেপির টানা তৃতীয় মেয়াদের শাসনে সমাজে ঘৃণা-বিদ্বেষ বেড়েছে। তারপরও সরকারের তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই। চলতি মাসে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বিদেশি সন্দেহে অন্তত তিনজনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। এই ভয়ংকর প্রবণতা নিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া গত রোববার একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে।

ভিন্ন একটি দিন, ভিন্ন একটি রাজ্য, ভিন্ন একটি রোমহর্ষক গণপিটুনির ঘটনা। চলতি মাসে এটি নিয়ে এ রকম তিনটি ঘটনা ঘটল। তাই বলতে হয়, লজ্জা ও আতঙ্কজনক একটি পাদটীকা নিয়ে বছরটি বিদায় নিচ্ছে। এমন একটি বছর শেষ হতে চলেছে, যেখানে আমরা ‘অপর করে দেওয়া’ (আদারিং) ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে দেখছি। প্রশ্ন উঠেছে—তরুণ ও কর্মজীবী মানুষ কি নিজ দেশে নির্ভয়ে-নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন না?

উত্তরাখন্ডের একদল মানুষ সম্প্রতি দেরাদুনে এক তরুণকে ছুরিকাঘাত করে। ২৪ বছর বয়সী ভুক্তভোগী তরুণ এমবিএ শিক্ষার্থী ছিলেন। এক বছর ধরে তিনি ওই শহরে থাকছিলেন। তাঁকে নিয়ে বর্ণবিদ্বেষী কটূক্তি করা হলেও তিনি শান্ত ছিলেন। তা সত্ত্বেও হামলাকারীরা তাঁকে ছুরিকাঘাতে ক্ষতবিক্ষত করে। পরে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান।

চলতি মাসে আরও দুজন পরিযায়ী শ্রমিক গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। একজন ওডিশায়। তাঁর বয়স ১৯-২০ বছর। আরেকজন কেরালা রাজ্যের ছত্তিশগড়ে। তাঁর বয়স ৩১ বছর। তাঁরা উভয়ে বাঙালি। তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা বাংলাদেশি ছিলেন না। এ দুই ঘটনা সারা দেশে প্রান্তিক পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আফ্রিকা ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিক্ষার্থী ও শ্রমিকেরা কয়েক দশক ধরে দিল্লিসহ উত্তর ভারতের নানা রাজ্যে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকার বর্ণবাদ বা বিদ্বেষপ্রসূত অপরাধের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। উল্টো বিপজ্জনক দৃষ্টিভঙ্গি এবং চরম সহিংসতাকে পুলিশ প্রায় সময় ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে দায় সারে, যা আদতে বিচ্ছিন্ন নয়। এই বর্ণবাদ ও ‘আদারিং’–এর সুস্পষ্ট ধরন আছে। তারপরও এসবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ না থাকায়, এসব ঘটনা এখন ঘন ঘন ঘটছে এবং নগ্ন-সহিংস রূপ নিচ্ছে।

ভারতীয় শিক্ষার্থীরাও বিদেশে, বিশেষ করে ট্রাম্পের আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। ভারতের সুবিধাভোগী ও উচ্চবিত্তরা পশ্চিমা দেশে নিজেদের ‘অ-শ্বেতাঙ্গ’ হিসেবে চিহ্নিত হতে দেখে এবং সেসব দেশে যেসব জনগোষ্ঠীর মানুষের দিকে অনেক সময় তাচ্ছিল্যভরে তাকানো হয়, সেই জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের এক কাতারে দেখে হতভম্ব হয়ে যেতেন। কিন্তু তাঁরা এখন ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ—যা মাগা নামে পরিচিত) প্রচারের ধাঁচে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি আদারিংয়ের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু অন্য দেশে ভুক্তভোগী হলেও নিজ সমাজে বিদ্যমান বর্ণবাদী মনোভাব নিয়ে আমরা চুপ।

সরকারের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফোর ট্রান্সফর্মিং ইন্ডিয়া বা নীতি আয়োগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্য পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এক লাখ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে আসবেন বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু বর্ণ ও গায়ের রঙের প্রশ্নে বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা শতভাগ নিশ্চিত করা না গেলে, তা সম্ভব হবে না। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ অনেক দিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, তাঁরা নিজ দেশে আদারিংয়ের শিকার হচ্ছেন। মনে রাখতে হবে, এটা বৃদ্ধি হতে দিলে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া অনিবার্য।

আদারিং দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করলেও বছরের পর বছর ধরে সরকার বিষয়টির প্রতি উদাসীনতা দেখিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার ও ভুয়া খবর বা বাস্তব জীবনে বিদেশিদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। দেখা গেছে, অপরাধীরা সহজে পার পেয়ে যায়। পুলিশ ও সরকার ঘটনা ঘটার পরই কেবল প্রতিক্রিয়া দেখায়।

বেশ কয়েক বছর আগে গুজব রটেছিল—‘শহরে অপহরণকারীরা’ ঘুরে বেড়াচ্ছে। ফলে গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। তখন পুলিশের কঠোর মনোভাবের কারণে মিথ্যা প্রচার নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। রাজনৈতিকভাবে অস্থির পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কেরালার বিধানসভা নির্বাচনের আগে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’–বিষয়ক জুজু অসহিষ্ণুতাকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আদারিং একধরনের পদ্ধতিগত বিষ। এর বিস্তার রোধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে সরকারকে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেক নাগরিককে একে অপরের কাছ থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।

গণপিটুনি
গণপিটুনি। প্রতীকী ছবি