Sunday, September 28, 2025

ছোট দলের বড় ভুল ও প্রক্সি রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন by মনোজ দে

রাজনৈতিক পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক প্রভাবের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবটাই বেশি। খুব কমসংখ্যক দল কিংবা রাজনীতিবিদ এ বাস্তবতাকে মাথায় নিয়ে তাঁদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলে যাঁরা থাকেন, তাঁরা কখনোই দূরবর্তী ভবিষ্যতের কথা ভাবেন না। নগদ পাওনার কারবার করতে গিয়ে তাঁরা নিজের ও দলের পতন ডেকে আনেন, সমর্থক গোষ্ঠীকেও সংকটের মধ্যে ফেলে দেন। অতীত থেকে যে কেউ শিক্ষা নেন না—এ আপ্তবাক্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যতিক্রমহীনভাবে সত্য।

সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ দেয়, বাংলাদেশ গণ–অভ্যুত্থানের দেশ। প্রতিটি অভ্যুত্থানই এখানে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাস মিইয়ে যেতেও খুব বেশি দেরি হয় না। দেখা যায়, জনগণের ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো গেড়ে বসা প্রবল কোনো প্রতিপক্ষকে সরাতে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অনন্য ঐক্য তৈরি হয়। কিন্তু যে মুহূর্তে সেই প্রবল প্রতিপক্ষের পতন হয়, সে মুহূর্তেই রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজ নিজ দলীয় স্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় দলগুলোই নির্ধারক শক্তি। গণ–আন্দোলন, গণ–অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে ছোট অনেক দল ও তাদের নেতারা সামনের সারির মুখ হয়ে ওঠেন। কারও কারও ক্ষেত্রে বিকাশের প্রবল সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কিন্তু সে সম্ভাবনাও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারে, তার বড় একটা দৃষ্টান্ত জাসদ।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সমাজে পরিবর্তনের যে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে এসেছিল, তা থেকেই জন্ম হয়েছিল জাসদের। কিন্তু নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে পরিষ্কারভাবে সামনে আনার পরিবর্তে না জাতীয়তাবাদী, না সমাজতন্ত্রী—অস্পষ্ট একটা রাজনৈতিক অবস্থান নেয় জাসদ। বামপন্থী জোয়ারের সে সময়ে পরিবর্তনপ্রত্যাশী তরুণদের বড় একটি অংশকে ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল জাসদ। মাতৃসংগঠন আওয়ামী লীগকেও দুর্বল করে দিয়ে শেখ মুজিবের শাসনের পতন ত্বরান্বিত করে দিয়েছিল তারা।

জাসদের এ ভূমিকা নেওয়ার কারণ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর জন্মের ইতিহাসের দিকে ফিরে যেতে হবে। একটি বহুল প্রচলিত মত হচ্ছে, একাত্তরে জনযুদ্ধের সময় এ ভূমিতে সশস্ত্র বামপন্থার উত্থান যাতে না হয় সেটা ঠেকাতে মুক্তিবাহিনীর সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে মুজিব বাহিনী গড়ে তুলেছিল ভারত ও ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। মুজিব বাহিনীর নেতৃত্বের বড় অংশটাই পরবর্তী সময়ে জাসদ গড়ে তোলে। জাসদের নেতা–কর্মীদের আত্মত্যাগ ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে ন্যূনতম প্রশ্নের অবকাশ নেই। কিন্তু জাসদের তৎপরতা শেষ বিচারে রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও ইসলামপন্থী শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করেছিল।

নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—এই দুই ধারায় বিভক্ত। এর বাইরে মধ্যম মানের শক্তি জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি মূলত রংপুরকেন্দ্রিক দলে পরিণত হয়েছে। গৃহপালিত বিরোধী দল কিংবা মিত্রের ভূমিকায় আওয়ামী লীগের শাসনের বৈধতা দেওয়ায় দলটির গ্রহণযোগ্যতাও কমেছে। দেবর-ভাবির গৃহবিবাদে দলটির সাংগঠনিক শক্তিও দুর্বল হয়ে গেছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যেভাবে দমন ও তোষণ করা হয়েছে, তাতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামপন্থীদের ভোট ও সমর্থন কতটা বেড়েছে, তার পরিষ্কার কোনো চিত্র নেই। ডাকসু, জাকসু নির্বাচনে বড় বিজয়ই পরিষ্কার একটা বার্তা দিচ্ছে যে উঠতি মধ্যবিত্তের মধ্যে তাদের সমর্থন অনেকটা বেড়েছে। সব মিলিয়ে এটা ধারণা করা যায়, জনসমর্থন যা–ই থাক, সাংগঠনিক শক্তির বিচারে ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।

বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির দাবা খেলায় ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অনেকটা বোড়ের মতো। অনেক সময় তারা এমন সব কর্মসূচি নেয়, যাতে প্রশ্ন জাগে—তারা কি বড় কোনো শক্তির দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।

বাংলাদেশের ভোটের মাঠের যে বাস্তবতা, সেখানে ছোট দলের পক্ষে নির্বাচনে ভালো ফল করাটা কঠিন। ফলে মাঠের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ভোটের বৈতরণি পার হতে গেলে তাদের বড় দলের শরণাপন্ন হতে হয়। এ বাস্তবতা বড় দল ও ছোট দলের মধ্যে প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক তৈরি করে। তাৎক্ষণিক লাভের বিচারে বড় দলের ছেড়ে দেওয়া একটি–দুটি আসন পেলেও এতে দীর্ঘ মেয়াদে ছোট দলগুলোর রাজনীতিই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে বিকাশের সম্ভাবনাটা শেষ হয়ে যায়।

নতুন দল বিকাশের বাস্তবতা ও জনচাহিদা থাকার পরও দুই ধারার বিপরীতে তৃতীয় বড় ধারা সৃষ্টি না হওয়ার পেছনে এটি বড় কারণ। এ দায় যেমন ছোট দলের, নতুন দলের, আবার বড় দলেরও। বড় দল সব সময়ই চায় প্রথাগত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যেন জারি থাকে। ফলে তাদের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, এমন রাজনৈতিক শক্তিকে তারা কৌশলেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়। অভিজ্ঞতাহীন নতুন দল নগদ পাওনার স্বার্থে বড় দলের কৌশলের কাছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে বিক্রি করে দেয়। শুধু বড় রাজনৈতিক দল নয়, পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্ক আছে, এমন গোষ্ঠীগুলোও চাইবে না নতুন রাজনীতি নিয়ে কেউ তাদের চ্যালেঞ্জ জানাক।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। পরপর তিনটি পাতানো নির্বাচনের কারণে বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে না পারায় খুব স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের প্রস্তুতি নেওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা দেখছি, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতভেদ, তা নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

আবার এ মুহূর্তের ইস্যু নয়, এমন কিছু বিষয় নিয়ে যখন মাঠে হঠাৎই যে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা উদ্বেগজনকই। যেমন হঠাৎই জাতীয় পার্টি রাজনীতির ইস্যু হয়ে উঠল। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের গণ অধিকার পরিষদ জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে হাজির হলো। সেই দাবি ঘিরে কর্মসূচি একসময় সংঘাতেও রূপ নিল। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর লাঠিপেটায় মারাত্মকভাবে আহত হলেন নুর। সবারই প্রত্যাশা ছিল, গণ–অভ্যুত্থান নাগরিকের ওপর বাহিনীগুলোর বাড়াবাড়ি রকম বলপ্রয়োগের অবসান ঘটাবে। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনসহ কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ ও বাহিনীগুলোকে আচরণের ক্ষেত্রে আগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দেখছি।

নুরকে আহত করার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম হলো। তাঁরা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ কর্মসূচিতে গণ অধিকার পরিষদের রাজনৈতিক অর্জন কতটা, সেটা একটা বড় প্রশ্নই থেকে যায়।

মে মাসে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সময়ও হঠাৎই এ রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে আমরা দেখেছিলাম। চিকিৎসার জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ঘটনা ঘিরে এর সূত্রপাত। গাজীপুরে এনসিপির একজন নেতা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। শাহবাগ ও যমুনা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি আসে। শেষে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

দুটি ঘটনার সঙ্গে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমীকরণ যে আছে, সেটা বোঝা যায়। গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির সম্মেলন ঘিরে গোপালগঞ্জে যে সহিংস ঘটনা ঘটেছিল, সেটা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এনসিপির জুলাই পদযাত্রা ঘিরে সারা দেশেই আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গোপালগঞ্জের কর্মসূচির নাম হয়ে যায় ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’।

সংগঠনটির দু-একজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎই উসকানিমূলক পোস্ট দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর গুলিতে অন্তত পাঁচজন নিহত হন। এনসিপির নেতাদের সামরিক বাহিনীর গাড়িতে গোপালগঞ্জ ছাড়তে হয়। এ ঘটনার পর এনসিপির জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি স্বতঃস্ফূর্ততা হারায়। জুলাইযাত্রা গোপালগঞ্জে গিয়ে মার্চ ফর গোপালগঞ্জ হয়ে যাওয়ায় এনসিপি কী অর্জন করতে পেরেছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক প্রশ্ন।

১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যাচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, পিআর পদ্ধতির নির্বাচনসহ আট দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি ইসলামি দল ও গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচিতে যাচ্ছে এনসিপি। যদিও দলটির একজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি এখনো কোনো জোট বা যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। এনসিপি যদি সত্যি সত্যি ইসলামপন্থীদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে নামে, তাহলে মধ্যপন্থা হিসেবে দলটির যে নিজস্ব ভাবমূর্তি, সেটা অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

রাজনৈতিক দলের মূল পরিচয় তার ঘোষণা ও কর্মসূচিই। নাগরিকদের সঙ্গে কোনো একটি দলের সংযোগ তৈরি করে দেয় কর্মসূচি। রাজনীতির দীর্ঘ রেসে টিকে থাকতে হলে নতুন, পুরোনো যেকোনো দলকেই নিজস্ব কর্মসূচি নিয়েই এগোতে হয়। রাজনীতির নগদ কারবারের চেয়ে বাকির লোভটা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট দল, নতুন দল সেই ভুল করলে বড় দলের ছায়া বা প্রক্সি শক্তি হওয়ার নিয়তিই তাকে বরণ করতে হয়।

* মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-15%2Fps5apw13%2Fjatiyopartykk.JPG?rect=3%2C0%2C614%2C409&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সম্প্রতি জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত এইচএম এরশাদের ম্যুরাল ভাংচুর করা হয়। ছবি : প্রথম আলো

ভিসা বাতিল করে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র: কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো গতকাল শনিবার তাঁর মার্কিন ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত শুক্রবার নিউইয়র্কের রাস্তায় ফিলিস্তিনপন্থী একটি বিক্ষোভে যোগ দেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট। এ সময় তিনি মার্কিন সেনাদের প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদেশ না মানার অনুরোধ জানান। এর পরই যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তাঁর ভিসা বাতিল করা হবে।

গুস্তাভো পেত্রো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এখন থেকে আমার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ভিসা নেই; কিন্তু আমি পরোয়া করি না। আমার ভিসার দরকার নেই…আমি শুধু কলম্বিয়ার নাগরিক নই, ইউরোপেরও নাগরিক। আমি নিজেকে বিশ্বের একজন স্বাধীন মানুষ মনে করি।’

গুস্তাভো আরও বলেন, ‘(গাজায় ইসরায়েলের) জাতি হত্যার নিন্দা জানানোয় ভিসা বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ করেছে, তারা আর আন্তর্জাতিক আইনকে সম্মান করছে না।’

গাজায় জাতি হত্যার অভিযোগ বারবারই অস্বীকার করে আসছে ইসরায়েল। দেশটি বলছে, হামাসের হামলার পর তারা শুধু আত্মরক্ষা করছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ইসরায়েলি হামলায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত উপত্যকাটিতে ৬৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সেখানকার সব মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। একাধিক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও জাতিসংঘের এক তদন্ত বলছে, এ পরিস্থিতি জাতি হত্যার শামিল।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে পেত্রো বিশ্বব্যাপী একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠনেরও আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ বাহিনীর প্রধান কাজ হবে ফিলিস্তিনিদের মুক্ত করা। তিনি মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে বলেন, ‘মানুষের দিকে অস্ত্র তাক করবেন না। ট্রাম্পের আদেশ না মেনে মানবতার আদেশ মানুন।’

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বলেছে, বেপরোয়া ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর মার্কিন ভিসা বাতিল করা হচ্ছে।

জবাবে কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যেখানে জাতিসংঘ তার সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মতপ্রকাশের অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়, সেখানে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ভিসা বাতিল করা এ সংস্থার চেতনার পরিপন্থী।

ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কলম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। চলতি বছরের শুরুতে পেত্রো যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কৃত মানুষদের দেশে ফেরত পাঠানোর ফ্লাইট বন্ধ করে দেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়। পরে অবশ্য দুপক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা হয়।

চলতি বছরের জুলাইয়ে পেত্রো অভিযোগ করেন, মার্কিন কর্মকর্তারা তাঁর দেশে অভ্যুত্থান ঘটানোর ষড়যন্ত্র করছেন। এরপর উভয় দেশ তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়। ওয়াশিংটন অবশ্য এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালে পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং দেশটিতে কয়লা রপ্তানি নিষিদ্ধ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের বাইরে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিচ্ছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রয়টার্স

জাহাজভাঙা শ্রমিক: স্যাঁতসেঁতে ছোট ঘরে বাস, মজুরি দিনমজুরের অর্ধেকও নয় by কৃষ্ণ চন্দ্র দাস

৬৪ বর্গফুটের একটি ছোট কক্ষ। স্যাঁতসেঁতে মেঝের এক কোনায় থালাবাসন, গ্যাস সিলিন্ডার, চুলাসহ রান্নার সরঞ্জাম রাখা। বাকি অংশে ঘুমানোর জন্য কাঁথা-বালিশ। কক্ষের ওপরের দিকে বাঁধা দড়িতে ঝুলে আছে কিছু পোশাক। কক্ষটিতে সুমন মোল্লাসহ চারজন জাহাজভাঙা শ্রমিক গাদাগাদি করে থাকেন। রাত হলেই মেঝেতে কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে পড়েন।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বক্তারপাড়া এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে এমআই শ্রমিক কলোনির চিত্র এটি। কলোনিটিতে ১০৪টি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষে তিন থেকে পাঁচজন শ্রমিক থাকেন। সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২২টি কক্ষে থাকেন ১১০ জনের মতো শ্রমিক। বাকি কক্ষগুলো এখন ফাঁকা।

এই কলোনি থেকে এক কিলোমিটার দক্ষিণে গেলে দেখা মেলে জামাল কলোনির। সেখানকার অবস্থা আরও খারাপ। কলোনির কক্ষগুলো একই রকম হলেও লম্বা আকৃতির ঘর মুখোমুখি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে হাঁটাচলা করতেই অসুবিধা হয়। রয়েছে খাবার ও গোসলের পানির সমস্যা।

শুধু এমআই ও জামাল কলোনি নয়, সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা কারখানার শ্রমিকদের প্রায় সব কলোনির অবস্থাই এমন।
সারি সারি ঘরগুলোতে থাকেন জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে
সারি সারি ঘরগুলোতে থাকেন জাহাজ ভাঙা শিল্পের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকেরা। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে। প্রথম আলো
খুপরিতে অস্বাস্থ্যকর জীবন

উপজেলায় মোট কতটি শ্রমিক কলোনি রয়েছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিরা, সোনাইছড়ি, ভাটিয়ারী ও সলিমপুর ইউনিয়নে অন্তত ৬০টি শ্রমিক কলোনি রয়েছে। এসবের মধ্যে বড় তিনটি শ্রমিক কলোনি ঘুরে দেখা গেছে, কোনোটিই বসবাসের উপযোগী নয়। এ তিনটি কলোনির অন্তত ২৫ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। প্রত্যেকের তথ্য অনেকটা একই রকম। কলোনিগুলোর প্রতিটি কক্ষের ভাড়া দুই হাজার থেকে চার হাজার টাকা হলেও নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ।

এমআই কলোনির সুমন মোল্লা সীতাকুণ্ডের একটি গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ফিটারম্যান হিসেবে কাজ করেন। ওই কারখানার সবচেয়ে পুরোনো ফিটারম্যান তিনি। ২০ বছর ধরে জাহাজভাঙা কারখানায় কাজ করছেন। কাজ শুরু করেছিলেন শ্রমিক হিসেবে। এরপর ফিটারম্যানের সহকারীর কাজ করেন। ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলেও তিনি এখনো ঘণ্টাপ্রতি ৫৫ টাকা বেতন পান। সে হিসাবে দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ করে পান ৪৪০ টাকা। এটাই ওই কারখানার শ্রমিকদের সর্বোচ্চ বেতন। জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকদের বেতন হয় ঘণ্টা হিসাবে। এই বেতন দেশের বড় শহরগুলোতে কর্মরত দিনমজুরদের দৈনিক আয়ের প্রায় অর্ধেক। সরকার ঘোষিত দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ টাকা।

ওই কলোনির পাশে থাকা পুকুরঘাটে বসে কথা হয় সুমন মোল্লার সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে কথা বলা শুরু করতেই আরও অন্তত ১৫ জন শ্রমিক ঘাটে আসেন। শুরুতে কারখানার মালিকের ভয়ে কর্মক্ষেত্র ও আবাসন সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছিলেন না তাঁরা। তবে একপর্যায়ে তাঁরা কথা বলতে শুরু করেন। ৪৭ বছর বয়সী সুমন মোল্লার বাড়ি নওগাঁ জেলায়। তাঁর দুই মেয়ে, স্ত্রী ও মা-বাবা থাকেন গ্রামের বাড়িতে। তিনি অন্য তিনজন শ্রমিকের সঙ্গে কক্ষ ভাগাভাগি করে থাকেন।

সেখানে অপর শ্রমিক আবুল কালাম বলেন, তিনি কাটারম্যানের সহকারী হিসেবে কাজ করেন। আট ঘণ্টায় বেতন ২৮০ টাকা। তিনি বলেন, দৈনিক ২৮০ টাকা বেতন নিয়ে ২ হাজার টাকার ঘর ভাড়া নিলে খাব কী? বাড়িতে থাকা পরিবারের চারজনের ভরণপোষণ করব কীভাবে?
সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড
সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড। প্রথম আলো
কত মজুরি পান শ্রমিকেরা

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাহাজভাঙা শিল্পে কাটার (জাহাজ ও সমতল), ফিটার, লোডিং মিলে মোট সাত ধরনের শ্রমিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ফিটারশ্রমিকেরা সবচেয়ে বেশি মজুরি পান। দক্ষ একজন ফিটারশ্রমিক দৈনিক আয় করেন ৪৪০ টাকা। কাটার বা ওয়্যারশ্রমিকদের আয় দিনে ২৪০-৩৫০ টাকা।

জাহাজভাঙা শিল্পের অধিকাংশ শ্রমিকের নিয়োগপত্র, শ্রম আইন অনুযায়ী সবেতন ছুটি বা উৎসব বোনাস নেই বলে জানান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) পরিচালিত জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক তথ্যকেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির। তিনি বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, দুর্ঘটনা ও পেশাগত রোগ থাকলেও নেই চিকিৎসাসুবিধা। ২০১৮ সালে ঘোষিত নিম্নতম মজুরিও বাস্তবায়িত হয়নি। নেই ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) ফিল্ড কো-অর্ডিনেটর মনিরা পারভীন বলেন, এ শিল্পের শ্রমিকেরা অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মরত থাকেন বলে তাঁদের দায় নেন না জাহাজভাঙা শিল্পের মালিকেরা। জাহাজে রয়েছে ক্যানসার সৃষ্টি করার মতো বিষাক্ত উপাদান অ্যাসবাস্টাস, পিসিবি ও টিবিটি। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী শ্রমিকদের ছোট্ট একটা ঘরে বেশ গাদাগাদি করে থাকতে হয়। সেই ঘরে নেই স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। শীত, বর্ষা—সব ঋতুতেই তাঁরা মাটিতে বিছানা করে থাকেন।

তবে গ্রিন শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডগুলো ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করছে বলে জানান কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক (সেফটি) মো. টিপু সুলতান। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, তাঁদের জানামতে, খুব কমসংখ্যক কারখানায় দু-একটা পদে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করছে না বলে তাঁরা জেনেছেন। ওই সব জাহাজভাঙা কারখানাকে তাঁরা নোটিশ দিয়েছেন। মজুরি বাস্তবায়নের জন্য আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

তবে শ্রমিকেরা যে মজুরি পাচ্ছেন, তা বেশি বলে দাবি করেন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘শুধু জাহাজভাঙা কারখানা বলে মনগড়া বেতনকাঠামো আমাদের ওপর চাপিয়ে দিলে ঠিক হবে না। শিল্প বিবেচনায় বেতনকাঠামো ঠিক করতে হবে। গার্মেন্টসের মতো জায়গায় ১২ হাজার টাকা বেতন। জাহাজভাঙা শিল্পে তা ১৮ হাজার কিংবা তারও বেশি।’
https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2F9cdkfc82%2FCtg-1.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
একটি কক্ষে রান্না ও ঘুমানোর ব্যবস্থা। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের এম আই কলোনিতে। ছবি প্রথম আলো

তুরস্ক কি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য? by এলিস গ্যাভোরি

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ উপসাগরীয় মিত্র এবং ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ হিসেবে স্বীকৃতগত। কিন্তু গত সপ্তাহে ইসরাইল সেখানে হামলা চালায়। এরপরই ইসরাইলপন্থি মহল দৃষ্টি ঘোরায় তুরস্কের দিকে। ওয়াশিংটনে আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো মাইকেল রুবিন সতর্ক করে বলেন, ইসরাইলের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে তুরস্ক এবং দেশটির ন্যাটো সদস্যপদকে রক্ষাকবচ মনে করা উচিত নয়। ইসরাইলি একাডেমিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মেয়ির মাসরি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন- ‘আজ কাতার, কাল তুরস্ক।’ আঙ্কারা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগানের এক শীর্ষ উপদেষ্টা লিখেছেন, জায়নবাদী ইসরাইলের প্রাণি, শিগগিরই তোমার মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার পর বিশ্বে শান্তি আসবে।

মাসের পর মাস ধরে ইসরাইলপন্থি গণমাধ্যম তুরস্ককে ‘ইসরাইলের সবচেয়ে বিপজ্জনক শত্রু’ আখ্যা দিয়ে আসছে। ইসরাইলি ভাষ্যকাররা পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের উপস্থিতিকে হুমকি এবং যুদ্ধপরবর্তী সিরিয়া পুনর্গঠনে তার ভূমিকাকে নতুন বিপদ বলে প্রচার করছে।

আঞ্চলিক আধিপত্যের দ্বন্দ্ব: ইসরাইলের আগ্রাসী নীতি ও গাজায় চলমান গণহত্যার প্রেক্ষিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আগস্টে ইসরাইলের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করেন। আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো ওমর ওজকিজিলসিক আল জাজিরাকে বলেন, আঙ্কারায় এই কথাবার্তাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইসরাইলকে আঞ্চলিক আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করতে দেখা হচ্ছে। তুরস্কের বিশ্বাস, ইসরাইলের আগ্রাসনের কোনো সীমা নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র এর পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে।

কাতারে হামলার পর আঙ্কারার সন্দেহ আরও গভীর হয়- ন্যাটো মিত্র হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই তুরস্কের ওপর হামলাকে নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে দেখবে?

ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী স্বপ্ন: ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে তিনি ‘গ্রেটার ইসরাইল’-এর ধারণায় বিশ্বাসী। ফিদান আল জাজিরাকে বলেন, এই ধারণা সিরিয়া, লেবানন, মিশর ও জর্ডান পর্যন্ত বিস্তৃত, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোকে দুর্বল ও বিভক্ত রাখা। গত কয়েক সপ্তাহেই ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালানোর পাশাপাশি পশ্চিম তীরে দৈনিক অভিযান, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় হামলা, এমনকি তিউনিশিয়ায় গাজা সহায়তা বহরেও হামলা চালিয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত তুর্কি অ্যাডমিরাল সেম গুরদেনিজ সতর্ক করে বলেন, তুর্কি-ইসরাইলি সংঘাতের প্রথম ক্ষেত্র হবে সিরিয়ার স্থল ও আকাশে। একই সঙ্গে সাইপ্রাসে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতিকে আঙ্কারা ঘেরাও কৌশল হিসেবে দেখছে, যা তুর্কি সামুদ্রিক স্বাধীনতা ও তুর্কি সাইপ্রিয়ট জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

সিরিয়া প্রশ্নে দ্বন্দ্ব: ইসরাইল স্পষ্ট করে বলেছে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু ফেডারেল কাঠামোর হতে পারে, যেখানে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসন থাকবে। বিপরীতে, তুরস্ক নতুন সিরীয় প্রশাসনকে সমর্থন করছে, যারা কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে। সেটার গবেষণা পরিচালক মুরাত ইয়েসিলতাস বলেন, সিরিয়ায় তুরস্কের সুস্পষ্ট লাল রেখা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আঞ্চলিক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা আরও বিভাজন সৃষ্টি করছে। তিনি আরও বলেন, যদি তেল আবিব এই পথেই এগোয়, তবে আঙ্কারা-তেল আবিব সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে উঠবে।

সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ: তবে কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ মনে করেন পূর্ণাঙ্গ দ্বন্দ্ব অনিবার্য নয়। তার মতে, ইসরাইল সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালাবে না; বরং সিরিয়া, পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও দক্ষিণ ককেশাসে তুরস্কের স্বার্থকে লক্ষ্য করে অপ্রকাশ্য কৌশল- গোপন অভিযান, বিমান হামলা, প্রক্সি যুদ্ধ অবলম্বন করবে। ক্রিগ বলেন, ওয়াশিংটনের নিঃশর্ত সমর্থনের প্রেক্ষিতে আঙ্কারার কৌশল হওয়া উচিত প্রতিরক্ষা জোরদার করা, আঞ্চলিক জোট গড়া (কাতার, জর্ডান, ইরাকের সঙ্গে), আর একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে খোলা সংলাপ বজায় রাখা যাতে কৌশলগত বিচ্ছিন্নতা এড়ানো যায়।

(অনলাইন আল জাজিরা থেকে অনুবাদ)

mzamin

মোদি সরকার যেভাবে প্রবাসীদের মুখ চেপে ধরছে by রাউল লাই

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিনস্টারে রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রফেসর নিতাশা কৌল ১৯৯৭ সালে পোস্টগ্র্যাজুয়েট পড়াশোনার জন্য ইউনিভার্সিটি অব হালে আসেন। এর পর থেকেই তিনি যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তিনি গণতন্ত্র, ডানপন্থী রাজনীতি, ভারতীয় রাজনীতি ও কাশ্মীর নিয়ে কয়েকটি বই লিখেছেন এবং দেড় শতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন।

ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নেওয়ার পরও কৌল ‘ওভারসিজ সিটিজেন অব ইন্ডিয়া’ বা ওসিআই মর্যাদার মাধ্যমে নিজের জন্মভূমির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। এই বিশেষ মর্যাদা ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের দেওয়া হয়। ওসিআই কার্ডধারীরা ভ্রমণ বা বসবাসের ক্ষেত্রে আজীবন ভিসার মতো বিস্তৃত সুবিধা পান। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৪০ লক্ষাধিক মানুষ এই মর্যাদা ভোগ করছেন।

কিন্তু হঠাৎ গত মে মাসে কৌলের ওসিআই বাতিল করা হয়। ভারতের সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট ১৯৫৫–এর ৭ডি ধারায় বলা আছে, কিছু বিশেষ কারণে ওসিআই বাতিল করা যেতে পারে, যেমন ১. জালিয়াতির প্রমাণ মিললে, ২. ভারতের সংবিধানের প্রতি অনুগত না হলে, ৩. ভারতের শত্রু কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধকালে যোগাযোগ বা ব্যবসা করলে, ৪. দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড পেলে, ৫. ভারতের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা, বৈদেশিক সম্পর্ক কিংবা জনস্বার্থের খাতিরে প্রয়োজন মনে করলে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এসব আইন প্রয়োগ অনেক সময় আইনসম্মত বাতিল নয়; বরং একধরনের শাস্তিমূলক সেন্সরশিপে পরিণত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা রক্ষা করা হয় না, যা আইনের মৌলিক নীতির বিরোধী। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি ও আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। যদিও দেশের ভেতরে আদালতগুলো এখনো অনেক ক্ষেত্রে সরকারের এসব পদক্ষেপের বিরোধিতা করছেন।

নিতাশা কৌলকে যে নোটিশ দেওয়া হয়, সেখানে বলা হয় তিনি ‘ভারতবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত’। তাঁর এই কর্মকাণ্ড নাকি বিদ্বেষপ্রসূত ও ইতিহাসকে অগ্রাহ্য করেছে। কিন্তু নোটিশে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ ছিল না।

কৌল আসলে ভারতের গণতন্ত্রের প্রবল সমর্থক এবং সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত সমালোচনা করে আসছেন। তিনি বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ওপর দমননীতি আর হিন্দু ডানপন্থী সংগঠন আরএসএসের বিভাজনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে লেখালেখি করে আসছেন।

আন্তর্জাতিক সূচকগুলোয়ও কৌলের কথার সত্যতা মেলে। উদাহরণস্বরূপ, ফ্রিডম হাউসের গ্লোবাল ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারতকে ‘আংশিক মুক্ত’ বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) বৈষম্যমূলক নীতি নিচ্ছে এবং মুসলমানদের লক্ষ্য করে নিপীড়ন বাড়িয়েছে। একইভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও অবনতির কথা বলা হয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস জানিয়েছে, ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম কার্যত ‘অনানুষ্ঠানিক জরুরি অবস্থায়’ আছে।

কৌল একা নন। গত ৯ বছরে ১২০ জনের বেশি মানুষের ওসিআই বাতিল করেছে ভারত সরকার। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার–এর তথ্য বলছে, এ প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। শুধু ২০২৪ সালেই ৫৭ জনের ওসিআই বাতিল করা হয়েছে, আর ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে আরও ১৫ জন এই শাস্তির মুখে পড়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগই সাংবাদিক, কর্মী বা শিক্ষাবিদ। তাঁরা বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সমালোচনা করেছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২২ সালে সুইডেনভিত্তিক একাডেমিক অশোক স্বাইনের ওসিআই বাতিল করা হয়। অভিযোগ ছিল তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলো ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেছে’ এবং ‘ভারতের সামাজিক বন্ধন দুর্বল করেছে’। কিন্তু অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি। পরে স্বাইন দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করেন এবং ২০২৩ সালে আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন।

আবার ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাংবাদিক রাফায়েল স্যাটারের ওসিআই বাতিল করা হয়। তিনি রয়টার্সে কাজ করেন এবং সাইবার নিরাপত্তা, গুপ্তচরবৃত্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে রিপোর্ট করেছেন। ভারত সরকার তাঁর সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে কারণ দেখালেও তিনি এখন সরকারের বিরুদ্ধে মামলা লড়ছেন।

ভারতে এখন সমালোচকদের দমনের ঘটনা প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে। রাজনীতিবিদ, এনজিও কর্মী, আন্দোলনকারী, সাংবাদিক বা সামাজিক নেতা—যিনিই সরকারকে নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাঁকেই নানা উপায়ে চুপ করানো হচ্ছে। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে, কারও মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, আবার অনেককে ভীতি প্রদর্শন বা শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে।

এই দমন–পীড়ন আরও বেড়েছে ‘অপারেশন সিঁদুর’ চালানোর পর। পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর সরকার এই অভিযান শুরু করে। এরপর এক্স প্ল্যাটফর্মকে প্রায় আট হাজার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে বলা হয়। এসবের মধ্যে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের অনেক অ্যাকাউন্টও ছিল। যেমন ফ্রি প্রেস কাশ্মীর, বিবিসি উর্দু ও দ্য ওয়্যার।

দেশের ভেতরে ভিন্নমত দমনের পাশাপাশি ভারত সরকার এখন প্রবাসীদের দিকেও নজর দিয়েছে। ওসিআই মর্যাদাকে তারা কার্যত ‘ব্ল্যাকমেলের হাতিয়ার’ বানাচ্ছে। ফলে প্রবাসী ভারতীয়রা ভয় পাচ্ছেন—সরকারের সমালোচনা করলে হয়তো ভারতে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমালোচনাকারী সাংবাদিকদের চুপ করাতেই ওসিআই ব্যবহার করা হচ্ছে। প্ল্যাটফর্ম ফর ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেসির এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৪ শতাংশ ব্রিটিশ ভারতীয় ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন।

আমি যেসব প্রবাসী ভারতীয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের অনেকেই স্পষ্ট বলেছেন, তাঁরা মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা প্রকাশ্যে বলতে ভয় পান। কারণ, তাঁরা আশঙ্কা করেন, এতে ভারতে যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

কিন্তু আমাদের, মানে ব্রিটিশ ভারতীয়দের এভাবে ভয় পাওয়া উচিত নয়। আমাদের ওসিআইয়ের মতো আইনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। কারণ, আমরা পরিবার, বন্ধু, সংস্কৃতি ও কমিউনিটির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিজেপি সরকার প্রবাসীদের যেভাবে চাপে রাখছে, তা ভারতের সংবিধানে প্রতিশ্রুত ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত।

যুক্তরাজ্যে ২০ লাখের বেশি ভারতীয় থাকলেও ব্রিটিশ সরকার ভারতের সঙ্গে বড় বাণিজ্যচুক্তি করেছে, কিন্তু ভারতের গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। অথচ যুক্তরাজ্য চাইলে এই বিশেষ সম্পর্ক ব্যবহার করে ভারত সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করতে পারত। চুপ করে থাকলে কেবল বিজেপির অবস্থানই আরও শক্ত হবে।

প্রধানমন্ত্রী মোদি এখন বিদেশে থাকা ভারতীয়দের দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে ডাক দিচ্ছেন। কিন্তু উন্নয়নে অংশ নেওয়ার মানে হওয়া উচিত—ভয় ছাড়া মতপ্রকাশ ও সমালোচনার সুযোগ। যদি সরকারকে প্রশ্ন করলেই প্রবাসীদের শত্রু মনে করা হয়, তাহলে একসময় এমন অবস্থা আসবে, যখন আমরা কেবল শাসক দলের শর্তে ভারতে যেতে পারব। এতে ভারতের অগ্রগতিতে আমাদের অবদান রাখার সুযোগও সীমিত হয়ে যাবে।

আসলে প্রবাসীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কই ভারতের গণতন্ত্রের মূল শক্তি। এই সম্পর্ক ছিন্ন হলে ভারতের গণতন্ত্রও দুর্বল হয়ে পড়বে।

রাউল লাই, ব্রিটিশ ভারতীয়দের একত্র করে ভারতের গণতন্ত্র রক্ষায় কাজ করা ‘প্ল্যাটফর্ম ফর ইন্ডিয়ান ডেমোক্রেসি’ নামের একটি সংগঠনের নেতৃত্ব দেন
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-09%2Fbah1sqrd%2FScreenshot-2025-09-09-190953.jpg?rect=52%2C0%2C525%2C350&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
যুক্তরাজ্যে ২০ লাখের বেশি ভারতীয় আছেন। ছবি: পিটিআই