Sunday, November 15, 2015

প্যারিসে কালাশনিকভবোঝাই গাড়ি উদ্ধার

প্যারিসে বিপুলসংখ্যক কালাশনিকভ রাইফেলভর্তি একটি গাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
হামলার ঘটনার আগে সন্ত্রাসীরা ওই গাড়িটি চড়ে প্যারিসে ঘোরাঘুরি করেছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। হামলার পরেও গাড়িটি ব্যবহার করা হয়েছে। যেহেতু গাড়িটির হদিশ মিলেছে প্যারিসের পূর্ব প্রান্তের একটি মফস্বল শহর মন্ত্রিউইয়ে, তাই পুলিশের অনুমান, প্যারিসে বার, রেস্তোরাঁ ও বাতাক্লাঁ মিউজিক হলে হামলার ঘটনার পর জনাকয়েক সন্ত্রাসী কালো রঙের ওই সিয়াট গাড়িটি নিয়ে মন্ত্রিউইয়ের দিকে পালিয়েছিল। পুলিশ তাদের পিছু নিতে পারে ভেবে, তারা পরে গাড়িটিকে মন্ত্রিউইয়ে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। ফেলে রেখে যায় প্রচুর কালাশনিকভ রাইফেল, গোলা-বারুদ আর বিস্ফোরক লাগানো বেল্ট। আত্মঘাতী বন্দুকধারীরা যে ধরনের বেল্ট গায়ে বা কোমরে বেঁধে রাখে।
প্যারিসে হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বেলজিয়ামেও তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন ধরা পড়েছে ব্রাসেলসে। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী শার্ল মিশেল বলেছেন, ‘‘দেখা হচ্ছে, ব্রাসেলসে যে ধরা পড়েছে, শুক্রবার রাতে সে প্যারিসে ছিল কি না। তবে একটা ব্যাপারে আমরা মোটামুটিভাবে নিশ্চিত যে, তিনটি দলে ভাগ হয়েই প্যারিসে হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা।’’ প্যারিসে নিহত এক ফরাসি জঙ্গির ঘনিষ্ঠ ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আটক করেছে।
জঙ্গিদের ব্যবহার করা আরো দু’টি গাড়ির খোঁজেও চালানো হচ্ছে জোর তল্লাশি। প্রথমটি একটি কালো পোলো গাড়ি। প্যারিসের দু’টি জায়াগায় হামলা করার জন্য যে গাড়িতে চড়ে গিয়েছিল সন্ত্রাসীরা। গাড়িটি আপাতত বেহদিশ। আরও একটি কালো রঙের ফোক্সভাগেন গাড়ি ব্যবহার করেছিল জঙ্গিরা। সেই গাড়িটি চড়েই জঙ্গিরা গিয়েছিল বাতাক্লাঁ মিউজিক হলে। গাড়িটিতে বেলজিয়ামের নাম্বার প্লেট লাগানো ছিল। গাড়িটা ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সেই গাড়ির চালক ছিলেন এক জন ফরাসি নাগরিক। সেই চালককে দুই যাত্রী নিয়ে শনিবার সকালে বেলজিয়াম সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকতে দেখা গিয়েছে বলে বেলজিয়াম পুলিশ জানিয়েছে। কারও মতে, ওরা আদতে ওই জঙ্গিদেরই আরও একটি টিম। তাদের রাখা হয়েছিল ‘রিজার্ভ’-এ। যে জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছে, তারা ব্যর্থ হলে ওই টিমটাকে ব্যবহার করা হতো। প্যারিসে হামলার ঘটনার পরপরই তারা পালিয়ে গিয়েছিল।

সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে প্যারিসের বাংলাদেশীদের

প্যারিসে ব্যাপক হামলার পরের দিনটি আতঙ্কে কাটিয়েছেন শহরে বসবাসরত বাংলাদেশীরা। অনেকেই ঘর থেকে বের হননি। আর যারা বের হয়েছেন, তাদের মনে হচ্ছে সবাই যেন তাদেরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছে। নিজেরাও ভুগছেন সন্দেহ আর অবিশ্বাসের দোলাচলে।
প্যারিসের একটি দোকানে কাজ করেন জাহিদুল ইসলাম। তিনি শুক্রবার গভীর রাতের হামলার প্রত্যক্ষদর্শী। তার সাথে কথা বলার জন্য বিবিসি বাংলা থেকে যোগাযোগ করা হলে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, 'আপনাদের কোনো নম্বর আমার ফোনে ওঠেনি। আমাকে আগে নিশ্চিত হতে হবে আপনারা সত্যিই বিবিসি কিনা।’
পরে তার কাছে থাকা বিবিসির ফোন নাম্বারে তিনি ডায়াল করেন এবং একটি সাক্ষাৎকার দেন।
বিবিসিকে জাহিদ জানান, তিনি ঘটনার পরদিন কাজে বেরিয়েছেন। দোকানে যদিও দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করেন, কিন্তু শনিবার কাজ করেছেন মোটে চার ঘণ্টা। ক্রেতা একেবারেই ছিল না বললেই চলে। সব দোকানের একই অবস্থা। বেশিরভাগ দোকানপাটই ছিল বন্ধ। রাস্তায় মানুষজন যা বেরিয়েছে, তাদের মধ্যে ফরাসী খুব কমই ছিল।
জাহিদের ভাষ্য, ‘ক্ষোভ বা বিদ্বেষ নয়, সন্দেহ প্রবণতা কাজ করছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছিল প্রচণ্ড সন্দেহ নিয়ে।’
'এমনকি ফুল দিয়ে ও মোমবাতি জ্বেলে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালেও তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। হাজার হাজার পুলিশ মোতায়েন থাকলেও মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা বোধ এখনো ফিরে আসেনি বলে মনে হচ্ছে।'
তিনি বলেন, এখানে বিদেশীদের বিশেষ করে যারা শ্বেতাঙ্গ নন তাদেরকে খুবই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে এবং এটাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক বলেই তিনি মনে করেন।
'এদেশের নিয়ম হচ্ছে রাস্তাঘাটে কেউ কারো দিকে তাকায় না। কিন্তু আজ রাস্তাঘাটে সবাই ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছে বিশেষ করে আমাদের মতো বিদেশীদের দিকে। পাশের লোকের দিকে খুব তাকাচ্ছে। মানুষ খুব সতর্কভাবে চলাফেরা করছে।'
চলতি বছরের গোড়ার দিকে শার্লি হেবদো পত্রিকায় হামলার ঘটনা স্মরণ করে জাহিদ বলেন, 'সেটা ছিল আমার বাসার খুব কাছে, তখনো মানুষকে এমন আচরণ করতে দেখা যায়নি, আজকে যেটা দেখছি।'
জাহিদ আরো জানান, তিনি বাংলাদেশী কমিউনিটির অনেকের সাথে যোগাযোগ করেছেন। তারা ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। অনেকেই কাজে আসেনি। বিশেষ করে যারা অবৈধভাবে ফ্রান্সে অবস্থান করছে তারা ঘর থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিয়েছে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা

নিজেকেই নিন্দিত করল অ্যামনেস্টি by মফিদুল হক

বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের শেষাশেষি নির্মিত হয়েছিল রুশ পরিচালক মিখাইল কোজিনৎসভের হ্যামলেট। সাদা-কালোয় নির্মিত এই ছবির অনেক দৃশ্যের চিত্রায়ণ ছিল অসাধারণ, যেমন পাথুরে সমুদ্র-উপকূলে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সামনে বসে থাকা হ্যামলেটের স্বগতোক্তি, টু বি অর নট টু বি, ফুটে উঠেছিল গভীর ব্যঞ্জনা নিয়ে সর্বকালের মানুষের জীবনে আলোড়িত জিজ্ঞাসা উত্থাপনে। পূর্ববাংলার মানুষ তখন কাটিয়ে উঠতে চাইছে দ্বিধা, প্রত্যয়ী হয়ে উঠছে টু টেক আর্মস অ্যাগেইনস্ট এ সি অব ট্রাবলস, বিপদ-বাধা উপেক্ষা করে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ সমুদ্রে তরি ভাসাতে উদ্গ্রীব। তরি তারা ভাসিয়েছিল এবং যে তরণির কান্ডারি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, স্বাধীনতার পর মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিক-রাজনীতিক হীরেণ মুখার্জি এই ঘটনাধারা চিহ্নিত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পঙ্‌ক্তি ধার করে, ‘দেখি নাই কভু দেখি নাই আহা, এমন তরণী বাওয়া’।
বিশ্বব্যবস্থা তথা ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটির কাছে বাংলাদেশ ছিল এক ধন্দ, তৃতীয় দুনিয়ার দরিদ্র পশ্চাৎপদ ভূখণ্ডের মানুষ কীভাবে বিশ্বের পরাক্রমী শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ঐক্যবদ্ধ দৃঢ়পণ লড়াই করে বিজয় ছিনিয়ে আনল যুদ্ধের ময়দানে, সে এক অবাক করা ঘটনা। ফলে বাংলাদেশের উত্থান মান্য করা শক্তিধরদের জন্য সহজ ছিল না। সে জন্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকার করে নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বের অন্ত ছিল না তাদের। জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রবেশের অধিকার পেয়েছিল ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে, একাত্তরের সুমহান বিজয়ের প্রায় তিন বছর পর। বাংলাদেশের গণহত্যার স্বীকৃতি প্রদান ও বিচারানুষ্ঠানের জন্য বিশ্বসমাজ তখন প্রস্তুত ছিল না, আন্তর্জাতিক কোনো প্ল্যাটফর্ম বা উদ্যোগ ছিল না, যেখানে জেনোসাইডের শিকার রক্তাপ্লুত জাতি বিচারের দাবি নিয়ে হাজির হতে পারে। বিশ্বসমাজের এই উদ্যোগহীনতার কালে বাংলাদেশ স্বীয় প্রচেষ্টায় প্রণয়ন করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ তথা জেনোসাইড, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আইন। সদ্য-প্রণীত সংবিধানে প্রথম সংশোধনী এনে এই আইনকে সংবিধানের অংশ হিসেবে পরিগণিত করা হলো যেন প্রচলিত ফৌজদারি কিংবা অন্য আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনাল) অ্যাক্টই মান্য বিবেচিত হতে পারে এবং হবে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যাত্রা শুরু করেছিল সত্তরের দশকে, যখন মানবাধিকার রক্ষায় মানবিক উদ্যোগ বলতে কোনো সংস্থা অথবা সম্মিলিত প্রয়াস বিশেষ ছিল না। ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন থেকে জন্ম নিয়েছিল আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠ সামাজিক শক্তি, যার ফলে জন্ম নেয় অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার রক্ষায় ব্রতী সংগঠন, যারা পক্ষপাতমুক্তভাবে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ভূমিকা নিতে শুরু করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বা এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন শন ম্যাকব্রাইড, আয়ারল্যান্ডের মুক্তি আন্দোলনের প্রেরণাদীপ্ত ব্যক্তিত্ব। তিনি আইনজীবী হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, একাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ছিলেন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী, তাঁর মামলা লড়ার জন্য শন ম্যাকব্রাইড উদ্যোগী হয়েছিলেন। বলা বাহুল্য, সেই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি।
জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামলে বাংলাদেশে মানবাধিকারের চরম বরখেলাপ ঘটে এবং বিচারের প্রহসন ঘটিয়ে গোপন সামরিক আদালতে সংক্ষিপ্ত শুনানির পর সন্দেহভাজন সামরিক অফিসার ও সৈনিকদের পাইকারি হারে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এই ঘটনায় শন ম্যাকব্রাইড বিশেষভাবে পীড়িত হয়েছিলেন এবং ওই বৃদ্ধ বয়সে ঢাকা এসে জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। পরে লন্ডন ফিরে সহকর্মীদের কাছে তাঁর ঢাকার অভিজ্ঞতা তিনি মেলে ধরেছিলেন। শন ম্যাকব্রাইডের ব্রিটিশ যে সহকর্মীর কাছ থেকে এই ঘটনার কথা জেনেছিলাম, তাঁর নাম এখানে ঊহ্যই রাখলাম। তিনি জানান, ওই বয়সেও যে শন ঢাকা ছুটে গিয়েছিলেন ফাঁসিতে বহু মানুষের জীবন হরণ ঠেকাতে, তার পেছনে ছিল ব্যক্তিগত এক দুঃখ-অভিজ্ঞতা, শন ম্যাকব্রাইডের পিতামহ ছিলেন আইরিশ বিপ্লবী, ফাঁসিকাষ্ঠে তাঁর জীবনাবসান ঘটেছিল। জেনারেল জিয়ার সঙ্গে শন ম্যাকব্রাইডের একান্ত সাক্ষাৎ ঘটেছিল মধ্যরাতের পর, অনেক কথা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে। কেমন মনে হয়েছিল জেনারেল জিয়াকে, এমন প্রশ্নের উত্তরে শন ম্যাকব্রাইড জানিয়েছিলেন, জেনারেল জিয়াকে তাঁর মনে হয়েছিল যেন রাজা ম্যাকবেথ, স্মেলিং ডেথ অল অ্যারাউন্ড হিম। যে কারণেই হোক এই সাক্ষাতের পর ঢালাও ফাঁসিদান বন্ধ হয়েছিল। আর মৃত্যুগন্ধ অচিরেই সর্বগ্রাসী হয়ে আলিঙ্গন করেছিল জেনারেল জিয়াকে, ম্যাকবেথের মতোই।
দুই.
বাংলাদেশে গণহত্যা সংঘটনের জন্য দায়ী এ দেশীয় সহযোগীরা দীর্ঘকাল ধরে ছিল আইনের আওতার বাইরে, তারা জাতির ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল বিচার থেকে অব্যাহতি, ফোর্সড ইমপিনিউটি। এই নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং এর বিরুদ্ধে জাতির যে দীর্ঘ সংগ্রাম তার কোনো পর্বেই অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে সহায়তা অথবা বক্তৃতা-বিবৃতি পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সংগ্রামের পর ২০০৮ সালের নির্বাচনী রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ আবার বিচারের শক্তি ফিরে পেল, স্বীকৃত হলো বিচারের অধিকার এবং ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হলো বিচার-প্রক্রিয়া। সেই সঙ্গে শুরু হলো অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ধারাবাহিক বিবৃতি প্রদান, যার মোদ্দাকথা গণহত্যার বিচারে বাংলাদেশের উদ্যোগ চ্যালেঞ্জ ও প্রশ্নবিদ্ধ করা, অভিযুক্তদের রক্ষা করা। তাদের এই একাদিক্রম ও একনিষ্ঠ প্রয়াসের সর্বশেষ উদাহরণ ২৭ অক্টোবর ২০১৫ প্রদত্ত বিবৃতি, যেখানে ফাঁসির দণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে বাঁচাতে নিজেদের ভূমিকা অ্যামনেস্টি উন্মোচন করে এবং মহৎ আদর্শের পতাকাবাহী এক আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মান ধুলোয় নামিয়ে দেয়।
এলসিনোর দুর্গপ্রাকারে হেঁটে হেঁটে বই পড়ছিলেন হ্যামলেট, কী পড়ছেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, শব্দ, শব্দ আর শব্দ। শব্দ দিয়েই বোঝা যায় বইয়ের অন্তর্নিহিত নির্যাস। একই কথা অ্যামনেস্টির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এই বিবৃতির ভাষ্য ও শব্দ ব্যবহার থেকেই তাদের ভূমিকা প্রকাশ পায়, যার কিছু উদাহরণ এখানে পেশ করা যেতে পারে। একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য অভিযুক্তদের অ্যামনেস্টি সর্বদা পরিচিত করে এসেছে ‘ইসলামি নেতা’ হিসেবে। ঘৃণ্য অপরাধে অভিযুক্তরা এমন অভিধা লাভের যোগ্য কি না, সেই প্রশ্নের বাইরেও থাকে প্রচলিত রীতির প্রশ্ন, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ব্যক্তিরা গণহত্যার জন্য অভিযুক্ত হিসেবেই গণ্য, বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে তাঁরা ‘গণহত্যাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হবেন। এখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যবসায়ী, নাকি কলেজশিক্ষক, নাকি ওয়াজ-নসিহতকারী, নাকি জমির দালাল, নাকি দ্বিতীয়বার দার-পরিগ্রহণকারী—এসব পরিচয় তো অবান্তর। সেই অবান্তর পরিচিতি অ্যামনেস্টির কাছে হয়েছে গুরুতর এবং তার চেয়েও বড়ভাবে তারা হয়েছে কেবল রাজনীতিক নেতা নন, ইসলামি রাজনৈতিক নেতা। তবে সাকা ও মুজাহিদের ক্ষেত্রে অন্তত সাকাকে ‘ইসলামি রাজনীতিবিদ’ বলা অ্যামনেস্টির পক্ষেও দুষ্কর হয়েছিল, আর তাই এবারের বিবৃতিতে তাদের বলা হয়েছে ‘বিরোধী নেতা’, কখনোই গণহত্যার দায় বহনকারী নয়।
বিবৃতিতে সেই গৎবাঁধা অভিযোগ অ্যামনেস্টি আবারও উত্থাপন করেছে যে, বাংলাদেশের বিচার আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হচ্ছে না, তবে এবারও আন্তর্জাতিক মান বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, কোথায় মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে সেটা তারা কখনো বিশদ করেনি। সম্প্রতি আইসিসি বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কার্যক্রম নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, এই আদালত বিচার পরিচালনায় যে দীর্ঘ সময় ব্যয় করে তার ফলে বিচারের বাণী অনেক ক্ষেত্রে নিভৃতে কেঁদে ফিরছে। আরও যেসব ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে আইসিসি, সেই তালিকা দীর্ঘ। বড় অভিযোগ উঠেছে যে, আইসিসি আফ্রিকা-দুষ্ট, তারা এই মহাদেশের বাইরে আন্তর্জাতিক অপরাধের আর কোনো নিদর্শন খুঁজে পাচ্ছে না। জাতিসংঘের সম্পৃক্তিতে প্রতিষ্ঠিত ক্যাম্বোডীয় আদালতের জটিলতাও কম নয়। সেখানে সময় ও অর্থ দুইয়েরই শ্রাদ্ধ ঘটছে, বিচার কবে শেষ হবে কেউ সঠিক বলতে পারছেন না। আন্তর্জাতিক আদালতের তুলনায় যখন বাংলাদেশের অপরাধ আদালত অনেক কার্যকরভাবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচার সম্পন্ন করছে, তখন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল যে অবস্থান নিয়েছে তা গর্হিত অপরাধ এবং এর জন্য জবাবদিহি তাদের করতে হবে।
সবচেয়ে বড় যে অন্যায় অ্যামনেস্টি ধারাবাহিকভাবে করে চলেছে তা একাত্তরে বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত জেনোসাইড ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ অস্বীকার করা। জেনোসাইড অস্বীকার করার প্রবণতা গণহত্যার ঘটনার অঙ্গাঙ্গি অংশ। জেনোসাইড ওয়াচের প্রতিষ্ঠাতা গ্রেগরি স্ট্যানটন গণহত্যার যে ধাপগুলো চিহ্নিত করেছিলেন, তার সর্বশেষ সোপান হচ্ছে গণহত্যার অস্বীকৃতি। গণহত্যাকারীরা তাদের বর্বরতা নানাভাবে আড়াল করতে চাইবে সেটা বোধগম্য, তবে এর চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে জেনোসাইড ডিনাইয়াল একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া এবং দেখা যায় পরবর্তী যুগে এসে এই অস্বীকৃতির রূপবদল ঘটে। খুব আগ্রহোদ্দীপকভাবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বিবৃতিতে সচেতনভাবে কখনো ‘জেনোসাইড’ এবং ‘ক্রাইমস অ্যাগেইনস্ট হিউম্যানিটি’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেনি। ২৭ অক্টোবরের বিবৃতিতে একাত্তরের গণহত্যাকে তারা অভিহিত করেছে নিছক ‘স্বাধীনতা যুদ্ধকালে সংঘটিত অপরাধ’ হিসেবে, অপরাধের ধরন যে ‘ক্রাইম অব দ্য ক্রাইমস’ বা মানবজাতিকে স্তম্ভিত করে দেওয়া নিষ্ঠুরতা, সেটা স্বীকার করতে অ্যামনেস্টি সদা কুণ্ঠিত। বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি নিরপেক্ষতার ভান করে বলেছে, ‘স্বাধীনতাযুদ্ধকালে সংঘটিত অপরাধ ছিল ভয়ংকর (হোরিফিক), তবে মৃত্যুদণ্ড ভায়োলেন্সের আবর্তন তৈরি করবে।’ এখানেও অপরাধকে ভয়ংকর বলা হয়েছে, কিন্তু ‘জেনোসাইড’ বলাটা নৈবচ নৈবচ।
তারা বিবৃতিতে যেসব শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে, যে-ভাষায় একাত্তরের ইতিহাস বিবৃত করেছে, কেবল সে দিকটাতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেও আমরা জেনোসাইড অস্বীকৃতির নিষ্ঠুর আচরণ লক্ষ করে স্তম্ভিত না হয়ে পারি না। একবারই কেবল অ্যামনেস্টি আইসিটি-বিডির বরাতে বলেছে যে, উভয়কে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে যুদ্ধাপরাধ এবং জেনোসাইডের অভিযোগে। তবে নিজেদের বরাতে অ্যামনেস্টি বারবারই বলেছে, বিচার হচ্ছে একাত্তরে সংঘটিত ‘ক্রাইম’-এর জন্য, কখনো-বা ‘সিরিয়াস ক্রাইম’ শব্দ তারা ব্যবহার করেছে, কিন্তু কখনোই ‘জেনোসাইড’ নয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ‘জেনোসাইড’ অস্বীকৃতি ছাপিয়ে এখন আরও গুরুতর অবস্থান নিয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের বিচারের দাবি তুলে, একাত্তরে তাদের ‘ক্রাইমের’ জন্য। অ্যামনেস্টির দৃষ্টিভঙ্গির কদর্য রূপ এখানে ফুটে উঠেছে এবং তারপরও তারা এমন বলার ধৃষ্টতা পায়নি যে মুক্তিযোদ্ধারা জেনোসাইড অথবা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে। কেননা, তারা জানে জেনোসাইডের সংজ্ঞা, কোনো জাতি বা ধর্মগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার প্রয়াস, সেটা পাকিস্তানিরা ও তাদের দোসররা করেছিল, তাহলে কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের একই কাতারে দাঁড় করিয়ে অভিযুক্ত করা যায়।
উত্তর-আধুনিক যুগে শব্দ ব্যবহার দ্বারা বিশ্লেষণ করা হয় রচয়িতার মন ও মানস। অ্যামনেস্টির বিবৃতির শব্দ-ব্যবহার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সুকুমার রায়ের শব্দকল্পদ্রুম, ‘ঠাস ঠাস ফোটে ফুল ভয়ে কান বন্ধ/ সাঁই সাঁই ছুটে যায় সে-ফুলেরই গন্ধ’।
ফুল ফোটানোর কথা ছিল অ্যামনেস্টির, কিন্তু তাদের ফুল ফুটছে ঠাস ঠাস করে বোমার মতো, ফুলের গন্ধ ছুটে যাচ্ছে সাঁই সাঁই করে গুলির মতোই। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তৃতীয় বিশ্বের গণহত্যার শিকার এক দুর্ভাগা জাতির বিচার-ধারাকে নিন্দিত করতে চেয়ে নিজেকেই করল চিহ্নিত ও নিন্দিত।
বাংলাদেশের গণহত্যার বিচার নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্বীয় অবস্থানের জন্য দায়ী থাকবে ইতিহাসের কাছে, গণহত্যার শিকার অগণিত মানুষের কাছে, জেনোসাইড মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী মানবতার সংগ্রামের কাছে।
মফিদুল হক: লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

মকবুলার ভাই, এ কেমন চলে যাওয়া? by সোহরাব হাসান

মকবুলার রহমান
সংবাদ থেকে বন্ধু হারাধন গাঙ্গুলি যখন টেলিফোনে খবরটি দিলেন, নিজেকে অপরাধী মনে হলো। বেশ কিছুদিন ধরে মকবুল ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েও যাওয়া হয়নি। তিনি খুব অসুস্থ ছিলেন, বলা যাবে না। দুদিন আগেও ঘনিষ্ঠ বন্ধু মঈদুল হাসানের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তিনি গাইবান্ধায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার আগেই ২৮ অক্টোবর রাতে চলে গেলেন না–ফেরার দেশে।
মকবুল ভাই। ড. মকবুলার রহমান। এ প্রজন্মের মানুষ হয়তো তাঁকে চেনে না। চেনার কথাও নয়। গেল শতকের পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে একগুচ্ছ উজ্জ্বল মেধাবী তরুণ বামপন্থায় দীক্ষা নিয়েছিলেন, মকবুলার রহমান ছিলেন তাঁদেরই একজন। মেধা, মনন, চিন্তা ও সহৃদয়তায় তাঁর সমকক্ষ মানুষ খুব কম দেখেছি। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের চৌকস শিক্ষার্থী ও ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। সেই সূত্রে পাকিস্তান আমলের নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে ষাটের দশকের একেবারের গোড়ার দিকে মকবুলার রহমান তখন বিরোধী কণ্ঠ হিসেবে পরিচিত দৈনিক ইত্তেফাক–এর সহকারী সম্পাদক পদে যোগ দেন। সে সময়ে তাঁর সহকর্মী এবং রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ছিলেন মঈদুল হাসান, আহমেদুর রহমান প্রমুখ। ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, তাঁদের ‘লাল মিয়া’ বলে সম্বোধন করতেন। সম্পাদক হিসেবে তিনি ছিলেন পাকা জহুরি, নিজে কমিউনিস্টবিরোধী হয়েও মেধাবী বাম তরুণদের কাজে লাগিয়েছেন। উভয় পক্ষ সীমা মেনে চলত। আলাপ প্রসঙ্গে একবার মকবুল ভাই বলেছিলেন, কমিউনিজমের বিরুদ্ধে কিছু লিখতে হলে মানিক মিয়া অন্যদের দিয়ে লেখাতেন; তাঁদের
লিখতে বলতেন না। সে সময়ে লেখাপড়া ও রাজনীতির সূত্রে মকবুলার রহমান আরও যাঁদের কাছাকাছি আসেন, তাঁরা হলেন দ্বিজেন শর্মা, দেবদাস চক্রবর্তী, আমিনুল ইসলাম, বজলুর রহমান, মোহাম্মদ ফরহাদ, আবদুল হালিম, এনায়েতউল্লাহ খান, আনোয়ার জাহিদ, আতাউস সামাদ প্রমুখ।
বছর খানেক পর মকবুলার ইত্তেফাক ছেড়ে পাকিস্তান বিজ্ঞান গবেষণা পরিষদের পত্রিকায় চাকরি নিয়ে করাচি চলে যান। সেখান থেকে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে যোগ দেন। ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান পিএইচডি করতে এবং সেখানে অধ্যয়ন ও শিক্ষকতায় ১১ বছর কেটে যায়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে নাইজেরিয়ায় যান ১৯৭৭ সালে, সেখানেও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দশকেরও বেশি সময় অধ্যাপনা করেন। ১৯৮৯ সালে মকবুল ভাই দেশে ফিরে আসেন। সেটি ছিল তাঁর অবসর নেওয়ার সময়। কিন্তু অবসর নেওয়া হয় না। একদিন পুরোনো বন্ধু বজলুর রহমানের সঙ্গে দেখা হলে তিনি মকবুলার রহমানকে সংবাদ-এ যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। সেই থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি সংবাদ পত্রিকায় কাটিয়ে দিলেন।
মকবুলার রহমান ছিলেন বিজ্ঞানের মানুষ। কিন্তু সাংবাদিকতা থেকে সাহিত্য, রাজনীতি থেকে দর্শন, ভূগোল থেকে পরিবেশ—সব বিষয়ে তাঁর ছিল অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ও উৎকর্ষ। যেকোনো জটিল বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি ধীরস্থিরভাবে বুঝিয়ে দিতেন। ইংরেজি বানান জিজ্ঞেস করলে জানা থাকলেও নিশ্চিত হতে আরেকবার অভিধান দেখে নিতেন। এ রকমই শুদ্ধতাবাদী ছিলেন তিনি।
জ্ঞানজগতের সব শাখায়ই মকবুলার রহমানের ছিল সমান পদচারণ। ছাত্রজীবনেই তিনি জাঁপল সাত্রের অস্তিত্ববাদের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তা নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতেন। বিজ্ঞানের মানুষ হয়েও তিনি কবিতাকে এত গভীরভাবে ভালোবেসেছেন যে, মনে হতো কবিতামগ্ন মানুষ। সমকালীন ইংরেজি কবিতার নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন। তিনি ছিলেন জীবনানন্দ দাশ, সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে, সমর সেন, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের নিবিড় ও নিমগ্ন পাঠক। তাঁদের পদ্য তো বটেই, গদ্যও পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি মুখস্থ বলে যেতে পারতেন। তিনি জীবনানন্দ দাশের ‘হাওয়ার রাত’ কবিতাটির নিচের কয়েকটি পঙ্ক্তি প্রায়ই আবৃত্তি করতেন:
অন্ধকার রাতে অশ্বত্থের চূড়ায় প্রেমিক চিলপুরুষের শিশির-ভেজা চোখের
মতো ঝলমল করছিলো সমস্ত নক্ষত্রেরা;
জ্যোৎস্নারাতে বেবিলনের রাণীর ঘাড়ের ওপর চিতার উজ্জ্বল চামড়ার
শালের মতো জ্বলজ্বল করছিলো বিশাল আকাশ!
কাল এমন আশ্চর্য রাত ছিলো।
প্রেমিক চিলপুরুষের শিশির ভেজা চোখ সবাই দেখতে পায় না। সবাই জ্যোৎস্নারাতে চিতার উজ্জ্বল শালের মতো জ্বলজ্বলে আকাশও দেখেন না। মকবুলার রহমান দেখেছিলেন।
তিনি ছিলেন একই সঙ্গে প্রচণ্ড জীবনবাদী ও জগৎবিরাগী মানুষ। অর্থবিত্ত–প্রভাব-প্রতিপত্তির জন্য তীব্র প্রতিযোগিতার এই সমাজে কী করে একজন মানুষ এসবের প্রতি এতটা নিরাসক্ত থাকতে পারেন, মকবুলার রহমানকে না দেখলে বোঝা যেত না। বিচিত্র বিষয়ে গভীর অভিনিবেশ ছিল তাঁর। কিন্তু কখনো পাণ্ডিত্য জাহির করতেন না। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল নিরপেক্ষ, দৃষ্টি ছিল নির্মোহ। সূক্ষ্ম রসবোধের মধ্য দিয়ে তিনি নানা বিষয়ে নির্মম সত্য উচ্চারণ করতেন। তিনি কখনো হতাশ হননি। হয়তো নশ্বর পৃথিবীর কাছে তাঁর তেমন আশাই ছিল না।
মনে আছে, কবি মাহমুদ আল জামানের অনুরোধে সংবাদ সাময়িকীতে তিনি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে একটি আশ্চর্য সুন্দর নিবন্ধ লিখেছিলেন। পড়ে মনে হয়েছিল তিনি কবিকে যতটা নিবিড় ও গভীরভাবে দেখেছেন, জীবনানন্দ গবেষকেরাও তা পারেননি। বেশির ভাগ গবেষক জীবনানন্দের কবিতার দাঁড়ি-কমা সেমিকোলন, উপমা-অনুপ্রাস নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। মকবুলার রহমান সেখান থেকে বেরিয়ে এসে তাঁকে দেখেছেন, পরিবেশ প্রতিবেশের সঙ্গে মিলিয়ে। তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, জীবনানন্দ বরিশালে না জন্মালে হয়তো এ রকম কবিতা লিখতে পারতেন না।
আমাদের সমাজে বেশির ভাগ মানুষ জীবনকে দেখে নিজের সুখস্বাচ্ছন্দ্য, পদপদবি ও ক্ষমতার মাপকাঠিতে। কিন্তু মকবলার রহমান ছিলেন ব্যতিক্রম। দেশ, সমাজ ও সম্প্রদায় নিয়েও তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সব ধরনের পক্ষপাতমুক্ত। তিনি প্রচুর পড়াশোনা করলেও লিখেছেন কম। একাডেমিক বিষয়ের বাইরে আরও কম। তিনি দ্য অ্যাটম বইয়ের অনুবাদ করেছেন। সবার মাঝে ও সবার সঙ্গে থেকেও অনেকটা আলাদা ছিলেন তিনি।
আমাদের এই অস্থির সমাজে মকবুলার ভাই ছিলেন স্থির, অচঞ্চল। কোনো যশ, খ্যাতি কিংবা পদের মোহ তাঁর ছিল না। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ-কষ্ট–গ্লানি কিছুই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। অফিসে কিংবা বাড়িতে মৃদু হাসিতে তিনি সবাইকে অভ্যর্থনা জানাতেন। প্রচুর বই পড়তেন। পড়া শেষ হলে অনেক বই অনুরাগীদের দিয়ে দিতেন।
মকবুলার রহমান জীবনকে ভোগ করেননি, উপভোগ করেছেন। তিনি কিছু হতে চাননি। এই যে দেশে কত রাজনৈতিক উত্থান-পতন আলোড়ন বিলোড়ন—সব তুচ্ছ বলে পাশ কাটিয়ে গেছেন। তিনি কারও সঙ্গে না থেকেও সবার সঙ্গে ছিলেন। তিনি কখনো মন খারাপ করেছেন, মনে পড়ে না। তিনি নিজে স্বপ্নের পেছনে ঘোরেননি। বরং অনেককেই স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করেছেন।
মকবুলার ভাইয়ের আরও বহু দিন বেঁচে থাকার প্রয়োজন ছিল। সেটি তাঁর জন্য যতটা না আমাদের জন্য তার চেয়ে বেশি। মেনে নেওয়া কঠিন যে, তাঁর সঙ্গে আর দেখা হবে না। মকবুলার ভাই, এ কেমন চলে যাওয়া?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

কেঁপে উঠল প্যারিস by পামেলা ড্রাকারম্যান

এটা একেবারেই স্বাভাবিক ডিনার পার্টি ছিল, যতক্ষণ না কেউ একজন উঠে দাঁড়িয়ে মুঠোফোন দেখে বলল, আমার মনে হয়, ফ্রান্সের জাতীয় স্টেডিয়ামে বোমা বিস্ফোরণ হয়েছে।
আমার স্বামী একজন সাংবাদিক, তিনি সেই ডিনার পার্টিতে ছিলেন না, ছিলেন সেই স্তাঁদ দ্য ফ্রঁসে। সবাই নিজেদের মুঠোফোন বের করা শুরু করল। তখন আমি এমন এক কথা বললাম, যেটা প্যারিসের ডিনার পার্টিতে আমি কখনো বলিনি: আমরা কি টিভি ছাড়তে পারি?
শিগগিরই মানুষের চোখ মুঠোফোনের পর্দায় স্থির হয়ে গেল, তাঁরা পরিচিত স্থানের নাম উচ্চারণ করছিলেন: লা ক্যামবোজ রেস্তোরাঁ ও সেন্ট মার্টিন ক্যানেলের পাশে হিপস্টার নুডল শপ। এই ডিনার পার্টিতে আসার সময় আমি এটার পাশ দিয়েই এসেছি (পরবর্তী সময়ে আমরা জানতে পারলাম, লা পেটিট ক্যামবোজের বর্ধিত অংশে এই গুলিবর্ষণ হয়েছে)। দৃশ্যত, লা বাতাক্লঁতে মানুষকে জিম্মি করে রাখা হয়েছে, যে কনসার্ট হলের পাশ দিয়ে আমি ছেলেকে চোখের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিকেল পাঁচটার সময় হেঁটে গিয়েছি, সেখানে একটি বড় বাস দাঁড় করানো ছিল।
ফরাসি টিভি বা যে টিভি চ্যানেলই আমরা দেখেছি, তারা কেউই বলতে পারছিল না যে আসলে কী হয়েছে। কিন্তু ডিনার পার্টির অতিথিরা টুইটারে ঢুঁ মারছিলেন, আর নিহত মানুষের সংখ্যার হিসাব দিচ্ছিলেন। কে কীভাবে জানবে, কত মানুষ মারা গেছে? এমনকি আমরা একটা ক্যামেরাও দেখলাম না, যেটা লা বাতাক্লঁতে যে মানুষের জিম্মি করে রাখা হয়েছে, তাদের ছবি দেখাচ্ছে।
আমি আমার স্বামীকে ফোনে পেলাম, তিনি জাতীয় স্টেডিয়ামের ভেতরেই ছিলেন, সেখান থেকে তিনি টুইট করছিলেন, আর একটি ডাচ্ বেতারকে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। এক ঘণ্টা পর আমি তাঁকে বিবিসির সঙ্গে কথা বলতে শুনলাম। তিনি বললেন, বিস্ফোরণ হওয়ার পরও খেলা চলেছে আর ফরাসি দলের ভক্তরা প্রিয় দলের গোল উদ্যাপন করেছে, গ্যালারিতে ‘ঢেউ’ তুলেছে।
নিউইয়র্কের এক বন্ধু টুইটারে দেখেছেন, আমার স্বামী স্টেডিয়ামের ভেতরেই আছেন, সেই বন্ধুটির আবার নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ আছে। গোলাগুলি হলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা দিয়ে তিনি আমাকে খুদে বার্তা পাঠিয়েছেন: ‘যতটা পারা যায় মাটির সঙ্গে লেপ্টে থাকুন, সরতে হলে বুকে ভর দিয়ে চলাচল করুন।’ এই বার্তাটা আমি আমার স্বামীকে ই-মেইল করলাম। তিনি এমনিতেই মনে করেন, আমি একটু বেশি সতর্ক, তিনি কি এবারও তা-ই ভাববেন?
কেউ একজন খোঁজ নিল, লা বাতাক্লঁতে কারা গান গাচ্ছিল। জানা গেল, ক্যালিফোর্নিয়ার ব্যান্ড দল ইগলস অব ডেথ মেটাল সেখানে গান গাচ্ছিল। ডিনার পার্টির এক দম্পতি তাঁদের কিশোর সন্তানদের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। আমি আমার বেবিসিটারকে ফোন করলাম, ভাইকে খুদে বার্তা পাঠালাম। টুইটারে চিনি এমন একজন মানুষও আমাকে খুদে বার্তা পাঠালে আমি তার জবাব দিই। ডিনার পার্টির দুজন সদস্য তাঁদের সাবেক প্রেমিকার কাছ থেকে খুদে বার্তা পান।
আমি বললাম, ‘এটা শার্লি এবদোর চেয়েও ভয়ংকর।’ এক ঘরভর্তি মানুষকে লক্ষ করে আমি এ কথা বললাম, যাঁরা তার কয়েক মিনিট আগেই বুনো শূকরের মাংস দিয়ে তৈরি পাস্তা খাচ্ছিলেন অথবা মারজিপান চেখে দেখছিলেন। দৃশ্যত, এর মাত্রা ইতিমধ্যে সবার কাছেই দৃশ্যমান ছিল। আরেকটি কথা, লা বাতাক্লঁ কিন্তু শার্লি এবদোর আগের কার্যালয়ের কাছাকাছি।
টেলিভিশনের পর্দায় দুটি মানচিত্র ভেসে উঠল, সেখানে যে দুটি স্থানে গোলাগুলি হয়েছে, তা চিহ্নিত করা হয়েছে। আমার বাড়ি আবার ওই দুটি স্থানের ওপারেই। আবারও খবরে যে প্যারিসের কথা বলা হচ্ছে, সেটা আমারই প্যারিস। এই শহরটিতেই একসময় শ্রমিক শ্রেণির পদচারণা ছিল, যেখানে এখন আমাদের মতো বুর্জোয়া বোহেমিয়ানরা থাকে।
যেসব মানুষ রাস্তায় আটকা পড়েছে, তাদের সহায়তা করার জন্য ফরাসি জনগণ টুইট করছে, দরজা খুলে দাও। আমরা সবাই বুঝতে পারি, এই আহ্বানে মানুষের প্রতি উন্মত্ত ভালোবাসা আছে, কিন্তু এ সময় কে দরজা খুলবে? খবরে বলা হচ্ছে, বন্দুকধারীরা এখনো রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুলিশ মানুষকে সতর্ক করছে, তারা যেন বাড়ির বাইরে না যায়।
আমাদের আতিথ্যকর্ত্রী সে রাতের জন্য অতিরিক্ত কয়েকটি বিছানা পাড়লেন। ডিনার পার্টির সেই দম্পতি বোঝার চেষ্টা করলেন, তারা প্যারিসের পশ্চিমে গাড়ি চালিয়ে যেতে পারবেন কি না। তাদের বাচ্চারা ভালো আছে, কিন্তু ওরা বাড়িতে একা। আমার স্বামী তখনো স্টেডিয়ামের ভেতরে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট নিজেও স্টেডিয়ামে জার্মানি-ফ্রান্স ম্যাচ দেখছিলেন, তিনি সেখান থেকে বের হয়ে এসে ঘোষণা দেন, ফ্রান্সের সীমান্ত বন্ধ। নিশ্চিতভাবে স্কুলগুলোও বন্ধ থাকবে। আমি কারফিউ শব্দের ফরাসি প্রতিশব্দ শিখলাম: কুভর-ফু। খবরে প্রতিবেদন প্রচারিত হচ্ছে, লা বাতাক্লঁর ভেতরে অনেক মানুষ মারা গেছে। সংখ্যাটা এখনো ধারণা করা যাচ্ছে না।
আমার বাচ্চারা ঘুমিয়ে আছে, কিন্তু বেবিসিটার ঘুমাননি। আমি শুধু ভাবছিলাম, ওরা ঘুম থেকে জেগে উঠলে আমি কী বলব?
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
পামেলা ড্রাকারম্যান: প্যারিসে বসবাসরত মার্কিন লেখক।

আক্রান্ত প্যারিস- জরুরি অবস্থা ঘোষণা, সীমান্ত বন্ধ, আইএসের দায় স্বীকার

রক্তস্নাত প্যারিস। আক্রান্ত প্যারিস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারিসে এমন ভয়াল রাত আর কখনও আসেনি। ফ্রান্সের রাজধানী শহরটি দুনিয়াব্যাপী পরিচিত ছবি আর কবিতার শহর হিসেবেই। শুক্রবার রাতটি অন্যান্য দিনের মতোই শুরু করেছিলেন নগরের বাসিন্দারা। তবে মুহূর্তের মধ্যে তাদের জীবনে নেমে আসে বিভীষিকা। ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন তারা। একের পর এক বিস্ফোরণ আর গুলিতে প্যারিস পরিণত হয় এক মৃত্যুপুরীতে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এ হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১২৮ জন। আহত হয়েছেন কয়েক শ। আট হামলাকারীও নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে সাত জন মারা যায় আত্মঘাতী বিস্ফোরণে। একজন নিহত হয় পুলিশের গুলিতে।
এ হত্যাযজ্ঞের পর ফ্রান্সজুড়ে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। কর্তৃপক্ষ স্থানীয় অধিবাসীদের ঘরের বাইরে বের হতে নিষেধ করেছে। আশেপাশের এলাকার স্কুলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত সেনা। এ হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদেও এ হামলার জন্য আইএসকে দায়ী করেছেন। এ হামলায় নিন্দার ঝড় উঠেছে সারা দুনিয়াতে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ থেকেই হামলার প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। নাইন ইলেভেনের হামলার পর এ হামলাকেই ইউরোপে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই প্যারিসে সবচেয়ে ভয়াবহ আক্রমণ।
স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৮টা নাগাদ প্রথম হামলাটি হয় স্ট্যাডে ডি স্টেডিয়ামের বাইরে। সেখানে তখন ফ্রান্স-জার্মানি প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচ চলছিল। স্টেডিয়ামে হাজির ছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঁসোয়া ওঁলাদে। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে স্টেডিয়াম থেকে বের করে নেয়া হয়। একের পর এক হামলা শুরু হয় প্যারিসের বিভিন্ন প্রান্তে। সবচেয়ে বড় হামলাটি হয়েছে বাতাক্লাঁ কনসার্ট হলে। স্লোগান তুলে ভিড়ে ঠাসা হলে ঢুকে পড়ে আত্মঘাতী বাহিনী। শুরুতেই শতাধিক দর্শককে পণবন্দি করে নেয় সন্ত্রাসীরা। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, পণবন্দিদের অনেককেই সন্ত্রাসীরা একে একে গুলি করে মারছিল। এরপর সেনা অভিযান শুরু হতেই একের পর এক আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে সন্ত্রাসীরা। কনসার্ট হলে হামলাতেই শ’খানেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। একই সময় আলাদা আলাদা হামলা চলতে থাকে পানশালা, রেস্তরাঁ, শপিং সেন্টারে। মোট ছয় জায়গায় হামলা চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা।
সন্ত্রাসীদের নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পর ফ্রান্সজুড়ে বিরাজ করছে আতঙ্ক। শোকে মুহ্যমান জনতা। আক্রান্ত প্যারিসে দম বন্ধকরা এক পরিবেশ। রাস্তাগুলোতে এখন ভয় আর শঙ্কা। চারদিকে শ্বাসরুদ্ধকর এক অবস্থা। হামলার খবরে ফ্রান্সের মানুষ যেন হিম হয়ে গেছে। ঘরের বাইরে পা পড়ছে না। শুধু কয়েকটি শব্দ উচ্চারিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘হরর’ ‘ম্যাসাকার’ আর ‘ওয়ার’। টেলিভিশন খুললেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে ভয়াবহ রক্তাক্ত একটি রাতের বিভীষিকা। তা দেখে গা শিউরে উঠছে প্যারিস, তথা ফ্রান্সের মানুষের।
১০ মাস আগে জানুয়ারিতে শার্লি হেবদোতে সন্ত্রাসী হামলায় বিপর্যস্ত হয়েছিল প্যারিস। এবারে আবারও সন্ত্রাসের ভয়াল থাবা আঘাত হেনেছে শহরটিতে। ফরাসি সংবাদিক অ্যান শার্লোট হিনেট সিএনএনকে বলেন, এ মুহূর্তে প্যারিস একপ্রকার অবরুদ্ধ। ফ্রান্স রেডিওর ডেপুটি এডিটর গ্রেগরি ফিলিপস বলেন, প্যারিসের পরিস্থিতি খুবই থমথমে। মানুষজন আতঙ্কিত। হামলার সময় বা এর পরে যারা নিজ বাড়ি থেকে দূরে ছিলেন তারা স্থানীয় দোকানপাট বা বন্ধু-স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নানা পোস্টে দেখা গেছে অপরিচিত ব্যক্তিরাও বাইরে আটকে পড়া মানুষদের আশ্রয় দিচ্ছেন। সবমিলিয়ে বিরাজ করছে, আতঙ্ক, বেদনা আর শোকের আবহ। নির্মম সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এসব হামলার জবাবও হবে নির্মম (রুথলেস)। এ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে ফ্রান্সকে সহায়তা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
হামলার সময় বাতাক্লাঁ কনসার্ট হলে উপস্থিত ছিলেন পিয়ারস নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, যাতে গুলি না লাগে সেজন্য আমরা মেঝেতে শুয়ে পড়ি। তখন শ্বাসরুদ্ধকর এক অবস্থা। সন্ত্রাসীরা আমাদের দিকে গুলি চালায় ১০ থেকে ১৫ মিনিট। এর মধ্যেই কনসার্ট হল পরিণত হয় রক্তস্রোতে। এর ভেতরে ফরাসি সেনারা প্রবেশ করার আগেই সন্ত্রাসীরা জিম্মি করে অনেককে। পুলিশ গিয়ে সেখান থেকে উদ্ধার করেছে প্রায় ১০০ মানুষকে। এখানে অভিযানে অংশ নেয়া সন্ত্রাসীদের মধ্যে তিনজনের পরনে ছিল বিস্ফোরকে তৈরি বেল্ট। প্রসিকিউটরের মুখপাত্র অ্যাগনেস থিবাল্ট-লেসুইভরে বলেন, প্যারিস ও পার্শ্ববর্তী ছয়টি স্থানে হামলার সময় আটজন সন্ত্রাসী আত্মঘাতী হামলায় নিহত হয়েছে। তবে তারা বলতে পারেন নি যে, সব সন্ত্রাসীই নিহত হয়েছে কিনা। এছাড়া, অপারেশনে মোট কি পরিমাণ সন্ত্রাসী অংশ নিয়েছিল তাও তারা আন্দাজ করতে পারছেন না।
লি পেটিট ক্যামবোজ রেস্তরাঁয় সন্ত্রাসীরা হত্যা করেছে কমপক্ষে ১৪ জনকে। এছাড়া, প্যারিসের ১০ম জেলায় অন্য একটি ক্যাম্বোডিয়ান রেস্তরাঁয় হামলায় নিহত হয়েছেন চারজন। এভিনিউ দি লা রিপাবলিকে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছেন চারজন। লা বেলে ইপুইপে বারের বাইরে হত্যা করা হয়েছে ১৯ জনকে। ফ্রান্স রেডিও’র উপ-সম্পাদক গ্রেগরি ফিলিপস বলেছেন, প্যারিসের অবস্থা এখন ভীষণ উত্তেজনাকর। লোকজন ঘরের বাইরে যাচ্ছে না। এখনও হামলাকারীদের কেউ কেউ বাইরে রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এসব হামলায় স্তব্ধ বিশ্ব বিবেক। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন, আমরা এ লড়াই চালিয়ে যাবো এবং তা হবে নির্মম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এ হামলায় শোক প্রকাশ করে ফোন করেছেন ওঁলাদেকে। এ সময় তিনি সহযোগিতার প্রস্তাব দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই ও হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্ট পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এখনও কোন বিশ্বাসযোগ্য বা বিশেষ কোন হুমকি নেই। পরে হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ওঁলাদে ও ওবামা দু’নেতা একত্রে বাকি বিশ্বকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল বলেছেন, হামলাকারীরা স্বাধীনতায় ঘৃণা করে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তার দেশ সমর্থন দেবে। এ হামলার পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
দায় স্বীকার আইএস-এর, ফের হুমকি
প্রকাশিত এক ভিডিওতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস। জঙ্গি কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারিমূলক প্রতিষ্ঠান সাইট (এসআইটিই) ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ আইএস-এর দায় স্বীকারের কথা উল্লেখ করেছে। এর পরিচালক রিটা কাটজ তার টুইটারে বলেন, ফরাসি ও আরবি ভাষায় লেখা বিবৃতিতে দায় স্বীকার করেছে আইএস। ওদিকে গতকালই আইএস একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে ফ্রান্সে আরও হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। তারা বলেছে, যদি তাদের যোদ্ধাদের ওপর ফ্রান্স বোমা হামলা অব্যাহত রাখে তাহলে তারা ফ্রান্সে আরও হামলা চালাবে। এসব খবর প্রকাশিত হয়েছে আল-জাজিরা, বার্তা সংস্থা রয়টার্সসহ বিভিন্ন মাধ্যমে। প্যারিসে ভয়াবহ বোমা হামলার পরদিনই আইএস’র বৈদেশিক মিডিয়া শাখা আল হায়াত মিডিয়া সেন্টার ওই হুমকি দেয়। এতে তারা ফরাসি মুসলমানদের হামলা চালানোর আহ্বান জানায়। ওই ভিডিওতে শশ্রূমণ্ডিত আরবিভাষী এক জঙ্গি বলতে থাকে, যতদিন তোমরা বোমা হামলা চালানো অব্যাহত রাখবে ততদিন তোমরা শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না। এমনকি তোমরা বাজারে যেতেও আতঙ্কিত হবে। প্রসঙ্গত, শুক্রবার দিবাগত রাতে সন্ত্রাসী হামলায় প্যারিসে কমপক্ষে ১৫৩ জন নিহত হন। ফ্রান্স সরকার এ ঘটনায় দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করেছে। ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো রয়েছে সতর্কাবস্থায়। ওদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ এ হামলার জন্য আইএসকে দায়ী করেছেন। তিনি এ হামলাকে বর্বরোচিত বলে আখ্যায়িত করেছেন। মধ্যরাতে জাতির উদ্দেশে তিনি এক ভাষণে এ হামলাকে একটি ভীতিকর অবস্থা বলে মন্তব্য করেন। ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। একই সঙ্গে সমস্ত সীমান্ত অস্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছেন, যাতে কোন ঘাতক পালাতে না পারে। ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি রক্তপাতের স্থান তিনি পরিদর্শন করেন। সেটি হলো বাটাক্লাঁ মিউজিক হল। সেখানে ওঁলাদ ঘোষণা করেন তিনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নির্দয়ভাবে লড়াই চালিয়ে যাবেন। ওদিকে গতকাল প্যারিসের মেট্রো রেল, স্কুল, ইউনিভার্সিটি, মিউনিসিপ্যাল ভবনগুলো বন্ধ ছিল। পরের দিকে কিছু রেল ও বিমান চলাচল শুরু হওয়ার কথা।
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও ভারতে উচ্চসতর্কতা
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে বিশ্বের অনেক দেশে। হামলার পর পর তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক, বোস্টন, শিকাগো ও অন্যান্য শহরের কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ইউরোপজুড়ে চলছে উচ্চমাত্রার সতর্কতা। বৃটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-ফাইভ লন্ডনেও একই ধরনের হামলার আশঙ্কা করছে। দেশটির গ্যাটউইক বিমানবন্দর নিরাপত্তাজনিত কারণে খালি করে ফেলা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ‘কোবরা’য় বসেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এ ছাড়া নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে ভারতের দিল্লি, মুম্বই ও আহমেদাবাদেও। এ খবর দিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস, ব্রিজবেন টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান ও এনডিটিভি।
নিউ ইয়র্ক পুলিশ বিভাগ বলছে, হামলা ঠেকানোর জন্য নয় বরং পূর্বসতর্কতা হিসেবেই নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যস্ততম এ শহরে ২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর চালানো হয়েছিল কুখ্যাত হামলা। ওই হামলায় বাংলাদেশীসহ নিহত হন প্রায় ৩ হাজার মানুষ। ধ্বংস হয়ে যায় ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ার। তবে পরে নতুন করে নির্মিত টুইন টাওয়ার ও এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংজুড়ে জ্বল জ্বল করছে নীল ও লাল রঙের আভা। ফ্রান্সের পতাকা নীল ও লাল রঙের। ফ্রান্সের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের জন্যই এ উপায় বেছে নিয়েছে ভবন দুটির কর্তৃপক্ষ। একই সাজ নিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি অপেরা হাউজ ও ব্রিজবেনের স্টোরি ব্রিজ। তবে অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, তার দেশ বিদ্যমান সতর্কাবস্থাই বহাল রাখবে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিচার করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সতর্কাবস্থা পরিবর্তন করা হবে কিনা।
লন্ডনে বন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নেয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, এ নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে। প্যারিস হামলার পর পর বৃটেনের গ্যাটউইক বিমানবন্দর নিরাপত্তাজনিত কারণে খালি করে দেয়া হয়। হামলার পর পর হোয়াইট হলে মন্ত্রণালয়ের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। বৃটেনের কর্মকর্তারা এ ধরনের হামলার আশঙ্কা করছেন। দেশটির গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ফ্রান্সের পরিস্থিতির দিকে তীক্ষ্ন নজর রাখছেন। এ ধরনের হামলা ঘটতে পারে ধরে নিয়েই প্রস্তুতি শুরু করেছে বৃটিশ পুলিশ।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়িয়েছে। বেলজিয়াম জানিয়েছে, তারা ফ্রান্সের সঙ্গে সীমান্ত সাময়িকভাবে বন্ধ করে রেখেছে। নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে জার্মানির বার্লিনেও।
এদিকে ভারতের রাজধানী দিল্লি ও মুম্বইয়ে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা। মুম্বইয়ের আগেও হামলার শিকার হয়েছিল। ভারতের ইহুদি সিনাগগগুলোতে নেয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা।
বিশ্ব নেতাদের নিন্দা
ফ্রান্সের প্যারিসে ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিশ্ব নেতারা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এসব হামলাকে নিরপরাধ সাধারণ মানুষের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টির গর্হিত প্রচেষ্টা বলে আখ্যা দেন। দোষীদের বিচারের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করার প্রতিশ্রুতিও দেন ওবামা। এ হামলাকে পুরো মানবতার ওপর হামলা বলে আখ্যা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বক্তব্যেও একই কথা প্রতিধ্বনিত হয়। কেরি আরও বলেন, ফরাসি সরকারের যত ধরনের সহায়তা প্রয়োজন তা দিতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুন প্যারিসের ‘অত্যন্ত গর্হিত সন্ত্রাসী হামলাগুলোর’ নিন্দা জানান। হামলাগুলোকে ‘বর্বর এবং কাপুরোষিত’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল বলেছেন, প্যারিস থেকে সেসব খবর আর ছবি আমাদের কাছে আসছে তাতে আমরা গভীরভাবে দুঃখভারাক্রান্ত। এক বিবৃতিতে তিনি হামলায় ভুক্তভোগীদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেন, প্যারিস হামলায় তিনি ‘স্তব্ধ’। এক টুইট বার্তায় ক্যামেরন বলেন, ফরাসি নাগরিকদের প্রতি আমাদের প্রার্থনা রইলো। আমরা সহায়তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু করবো। চীনের প্রধানমন্ত্রী শি জিনপিং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদেকে ফোন করে বলেছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ফ্রান্স ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগ দিতে চীন প্রস্তুত। এছাড়াও তিনি ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকেও নিন্দা জানানো হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশ কার্টার নিন্দা জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ফরাসি জনগণের পাশে রয়েছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বলেছেন, কালো আর ভয়াবহ এ সময়ে আমাদের ফরাসি ভাইদের প্রতি হৃদয়ের অন্তস্তল থেকে সমবেদনা ও প্রার্থনা রইলো। ফরাসি সরকারকে তার সরকার সকল ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে বলেও তিনি জানান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী এক টুইট বার্তায় নির্মম সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, ভারত কঠিন এ সময়ে ফ্রান্সের জনগণের পাশে রয়েছে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, শুক্রবার রাতের ভয়াবহ ওই সিরিজ হামলায় মারা গেছেন কমপক্ষে ১৫৩ জন। গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতারা শোক ও নিন্দা প্রকাশ অব্যাহত রেখেছিলেন।
বেঁচে আছি, শুধুই মৃত্যু...
ব্যাটাক্লাঁ থিয়েটার হলের দরজা আটকে তাণ্ডবলীলা চালাচ্ছে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। চোখের সামনে বেঞ্জামিন কেজনোভস দেখতে পাচ্ছেন, সন্ত্রাসীদের কালাশনিকভের গুলি নিমিষে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিচ্ছে দর্শকদের। সেই অবস্থাতেও হাল হারান নি তিনি, চালু রেখেছেন নিজের ফেসবুক। প্যারিসের ব্যাটাক্লাঁ কনসার্ট হলে জিম্মি অবস্থায় ফেসবুকে নিজের কথা জানিয়েছেন তিনি। ফেসবুকে আতঙ্কে ভরা সেসব পোস্ট ভাইরাল হতে সময় লাগেনি। এ খবর দিয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
ফরাসি ভাষায় লেখা বেঞ্জামিনের পোস্ট বিং ট্রান্সেলটর অনুবাদ করার পর যা দাঁড়ায়, তা হলো: ‘আমি এখনও ব্যাটাক্লাঁয় আটকে। আঘাত খুব গভীর। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলছে। অনেকেই ভেতরে আটকে আছে। সবাইকে মেরে ফেলছে। একজনের পর একজন। দোতলায়, তাড়াতাড়ি!’
বেঞ্জামিনের এ ফেসবুক পোস্ট থেকে হিমশীতল আতঙ্কের চিত্র সপষ্ট হয়ে দেখা দিয়েছে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এই পোস্ট ২০ হাজার বার ফেসবুকে শেয়ার হয়েছে। কয়েক ঘণ্টা পর ফের ফেসবুকে নিজের অবস্থার কথা জানান বেঞ্জামিন। এবার তিনি লেখেন: ‘বেঁচে আছি। শুধুই মৃত্যু... ভয়ঙ্কর হত্যাযজ্ঞ... চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে লাশ। এবার বেঞ্জামিনের পোস্টে শ’ শ’ মন্তব্য পড়ে। তিনি কেমন আছেন, তা জানতে চান অনেকে। বেঞ্জামিন যে বেঁচে আছেন, তাতেই স্বস্তির শ্বাস ফেলেন সবাই।
‘যেনো রক্তস্নান’
সন্ত্রাসীরা যখন প্যারিসের বাটাক্ল্যাঁ থিয়েটারে প্রবেশ করে এলোপাতাড়ি গুলি করা শুরু করে তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন জুলিয়েন পিয়ার্স। তিনি একজন রেডিও রিপোর্টার। নির্মম হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিতে গিয়ে পিয়ার্স বলেন, রক্তস্নান চলছিল। থিয়েটারের ভেতরে উপস্থিত অনেককে জিম্মি করে নেয় জঙ্গিরা। সিএনএনকে পিয়ার্স বলেন, মানুষজন চিৎকার করছিল। কমপক্ষে ১০ মিনিট তাদের আর্তচিৎকার শোনা গেছে। প্রত্যেকে তখন নিজেদের মাথা ঢেকে ফ্লোরে বসে পড়ে। পিয়ার্স বলেন, গোলাগুলি যখন শুরু হয় তখন তিনি মঞ্চের ওপরের দিকের কাছাকাছি ছিলেন। দুজন সন্ত্রাসীকে প্রবেশ করতে দেখেন তিনি। ওরা ছিল ‘অত্যন্ত শান্ত আর সংকল্পবদ্ধ’। তারা এলোপাতাড়ি গুলি করা শুরু করে। তারা কালো পোশাক পরেছিল। তবে কোন মুখোশ ছিল না। পিয়ার্স জানান, তিনি একজন হামলাকারীর চেহারা দেখতে পেয়েছিলেন। তার বয়স খুব বেশি হলে ২৫ বলে উল্লেখ করেন তিনি। পিয়ার্স বলেন, বন্দুকধারীরা কক্ষের পেছনের দিকে দাঁড়িয়ে ফ্লোরে বসে থাকা মানুষগুলোর দিকে গুলি করা শুরু করে। বন্দুকধারীদের বর্ণনা দিতে গিয়ে পিয়ার্স বলেন, ওরা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল। আর আমাদের দিকে গুলি করছিল। যেন আমরা একদল পাখি আর তারা পাখিগুলোর দিকে নির্বিচারে গুলি করছে। অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, পুরো নরকের দৃশ্য আবির্ভূত হয়েছিল যেন। পিয়ার্স জানান, তিনি তার আশেপাশের মানুষদের পড়ে থেকে মরার অভিনয় করতে বলেন। বন্দুকধারীদের ম্যাগাজিনের গুলি শেষ হওয়া পর্যন্ত তারা অপেক্ষা করেন। জঙ্গিরা যখন বন্দুক রিলোড করছিল তখন পিয়ার্সরা দৌড়ে একটা খালি কক্ষে চলে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন বের হওয়ার কোন পথ নেই। পিয়ার্স বলেন- আমরা আটকে পড়েছিলাম। আরও পাঁচ মিনিট গোলাগুলি চললো। বন্দুকধারীরা গুলি করা বন্ধ করে। এরপর তারা আবারও রিলোড করে। ওই সুযোগে আবার দৌড় দেন পিয়ার্স। সামনে একটা দরজা দেখতে পেয়ে তা দিয়ে বাইরে চলে আসেন পিয়ার্স। বের হওয়ার পথে এক তরুণীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি।  রক্ত বইছিল তার পা দিয়ে। তাকে ধরে পিঠে উঠিয়ে দৌড় দেন পিয়ার্স। ২০০-৩০০ মিটার যাওয়ার পর মেয়েটিকে একটি ট্যাক্সিতে উঠিয়ে দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। রাস্তায় পৌঁছে ২০-২৫ জনকে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। এদের বেশিরভাগই মৃত বা আহত হয়ে পড়েছিল। বাইরে বেরিয়ে প্রথমে কোন পুলিশ সদস্যকে দেখেননি। সিএনএন-এর সঙ্গে পিয়ার্স যখন প্রথম কথা বলেন তখন তিনি জানান, তার অনেক বন্ধু তখনও ব্যাটাক্লাঁর মধ্যে আটকে ছিলেন। পরে বাইরে থেকে মোবাইলে টেক্স মেসেজে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন পিয়ার্স। ওরা সবাই লুকিয়ে ছিল। ভাঙা কণ্ঠে পিয়ার্স বলেন, এটা ভয়াবহ ছিল। ভয়ঙ্কর। ব্যাটাক্লাঁ থিয়েটারে কমপক্ষে মারা যায় ১১২ জন। এছাড়া পৃথক হামলায় রু বিচাত এলাকায় ১৪ জন, রু দে শারোন এলাকায় ১৯ জন, ডে লা রিপাবলিকা এভিনিউতে ৪ জন ও অপর চার জন মারা যায় স্টাডে দে ফ্রান্স স্টেডিয়ামের বাইরে। সবমিলিয়ে সিরিজ সন্ত্রাসী হামলায় ঝরে যায় ১৫৩টি প্রাণ। পুলিশ ব্যাটাক্লাঁতে প্রবেশ করার পর বোমা বিস্ফোরণ ও গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল বাইরে থেকে। অভিযানে চার হামলাকারী নিহত হয়। এদের তিনজন ছিল আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী। তাদের শরীরে বোমা স্থাপন করা ছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কমপক্ষে ১০০ জন জিম্মি ব্যক্তিকে তারা বের করে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

আক্রান্ত প্যারিস: জঙ্গি হামলার দুই অভিশাপ by ফারুক ওয়াসিফ

প্রচলিত যুদ্ধের লক্ষ্যটা ঘোষিত থাকে, কিন্তু সন্ত্রাসী হামলার দুটি লক্ষ্য—একটি প্রকাশ্য ও অন্যটি লুকানো। সেই লুকানো উদ্দেশ্যটা সন্ত্রাসীদের সত্যিকার পরিচয়ের মতোই জানা কঠিন। প্যারিসে হামলায় সন্দেহভাজন সব জঙ্গি নিহত, তাদের সঙ্গে নিহত দেড় শ’শর মতো নিরীহ মানুষ। যারাই করুক, এই দেড় শ মানুষ হত্যা তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়, তাদের উদ্দেশ্য বিশ্বকে আরও হানাহানির দিকে চালিত করা।
প্যারিস হামলার দুদিন আগে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে দুটি আত্মঘাতী বোমায় ৪৩ জনের প্রাণ গিয়েছে। প্রায় একই সময় আফগানিস্তানে নয় শিশুর মুণ্ডুহীন দেহ পাওয়া গেছে। তারও কিছু আগে মিসরের সিনাই উপত্যকায় রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ায় ২২৪ জনের মৃত্যু ঘটেছে। ঘটনাগুলো যখন ঘটছে, তখন সিরিয়ায় রাশিয়া বনাম ন্যাটো জোট (যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক) মুখোমুখি। সৌদি আরব ইয়েমেনে বিমান হামলা করেও সুবিধা পাচ্ছে না। এর সমান্তরালে চীন সাগরে আমেরিকা ও চীনা নৌবাহিনী পরস্পরকে হুমকিতে রাখছে। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে মার খেয়ে সিরিয়া-ইরাককেন্দ্রিক আইএস সন্ত্রাসবাদ ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে দিতে আগ্রহী বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত গবেষণা সংস্থা র‍্যান্ড করপোরেশনের নতুন এক প্রতিবেদন। জঙ্গি হামলা আর আধিপত্য বিস্তারের যুদ্ধকে তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা কঠিন।
প্যারিস হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ‘অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কাউকে দায়ী করছি না’ বললেও অনেকেই ধরে নিচ্ছেন, সিরিয়ায় মার খাওয়া আইএস-ই রয়েছে এর পেছনে। লেবাননে হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে আইএস এর নামে। লক্ষ করার বিষয়, দেশে দেশে হামলার লক্ষ্যবস্তুগুলো প্রগতিশীল ও জঙ্গিবাদবিরোধী শক্তি ও প্রতীক। প্যারিসের হামলার শিকার এলাকাটি তরুণ ও প্রগতিশীলদের মুক্তাঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। লেবাননে হামলা হয়েছে শিয়া-অধ্যুষিত এলাকায়। লেবানন ইরানবান্ধব শিয়া হিজবুল্লাহর প্রভাবাধীন এবং উভয়েরই শত্রু আইএস। রাশিয়া একই সঙ্গে আইএস ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। চীন মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরায়েল-সৌদি নীতির বিপক্ষে।
ধরে নেওয়া চলে, এসব সন্ত্রাসী হামলার লক্ষ্য আইএস ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলবিরোধীদের বিপর্যস্ত করা। যেমন রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর রুশ জনমতের মধ্যে সিরিয়ায় রাশিয়ার জড়ানো নিয়ে অস্বস্তি শুরু হয়েছে।
সিরিয়া নিয়ে ডামাডোলের মধ্যে দারুণ সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। ফিলিস্তিনি ভূমি জবরদখলের আওতা বেড়েছে। পূর্ব জেরুজালেম থেকে আরবদের বিতাড়ন করে মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্র স্থান আল আকসা মসজিদের নিয়ন্ত্রণও তারা নিতে চাইছে। এর জবাবে স্বতঃস্ফূর্ত ফিলিস্তিনি প্রতিরোধে প্রতিদিনই আরব ও ইহুদিদের কেউ না কেউ নিহত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি পেছনে রেখে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ওয়াশিংটনে বারাক ওবামার সঙ্গে দেখা করেছেন। রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুটনিক জানিয়েছে, ওবামার কাছে ১৯৮১ সালের যুদ্ধে দখল করা সিরিয়ার গোলান উপত্যকা ইসরায়েলের অংশ করে নেওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিকভাবে ইসরায়েল এখন কোণঠাসা। বয়কট ইসরায়েল আন্দোলন জোরদার হচ্ছে, বিবেকি ইউরোপীয়রা ইসরায়েলের নিন্দা করছেন। মানবতাবাদীদের চাপে কোনো কোনো ইউরোপীয় সংসদে ইসরায়েলের নিন্দা উঠেছে। মনে হচ্ছে, সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা বেকায়দায়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পশ্চিমা জনমতের সাম্প্রতিক কিছু উপলব্ধি। তালেবান-আল কায়েদা ও আইএস সৃষ্টিতে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর অবদান এখন সুবিদিত। প্রায় সব ক্ষেত্রেই এগুলো বুমেরাং হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য তো বটেই, এসব সংগঠন বিশ্ব নিরাপত্তার হুমকি। পরিণামে, পশ্চিমা ভোটারদের মধ্যে তাদের সরকারগুলোর ‘সাপ হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়া’র কৌশলের সমালোচনা বাড়ছে।
এমন সময়ই ফ্রান্সে বর্বরতম সন্ত্রাসী হামলা ঘটল। কিন্তু ফ্রান্স কেন? প্রথমত, ফ্রান্সেই রয়েছে ইউরোপের সবচেয়ে বেশি মুসলমান। ফ্রান্স আলজেরিয়াসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশে সরাসরি উপনিবেশ কায়েম করে রেখেছিল ষাটের দশকের শেষ পর্যন্ত। সেসব সাবেক কলোনির মুসলমানরা ফ্রান্সে বসত গাড়ে। দ্বিতীয়ত, লিবিয়ায় গাদ্দাফি আর সিরিয়ায় আসাদ সরকার উচ্ছেদের যুদ্ধে ফ্রান্স সরাসরি জড়িত ছিল। দৃশ্যপটে রাশিয়ার যুদ্ধবিমান ঢোকার পর ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্য পরিকল্পনা নিয়ে দোনোমনায় পড়ে। তৃতীয়ত, ফ্রান্সে মুসলিম-বিদ্বেষী ডানপন্থীদের উত্থান ঘটছে। ব্যঙ্গ পত্রিকা শার্লি এবদো আক্রান্ত হলে তারা আরও জনপ্রিয় হয়। মুসলমানদের ওপর হামলার মাত্রাও সমানতালে বাড়তে থাকে। যেকোনো জঙ্গি হামলা মুসলিম ও অমুসলিম উভয় চরমপন্থাকেই চাঙা করে।
এ অবস্থায় সিরীয় শরণার্থীদের আশ্রয় পাওয়া কঠিন হয়ে গেল। জার্মানির মতো উদার দেশও এখন ভেতর ও বাইরের ডানপন্থীদের বাধার মুখে পড়বে। কী করুণ পরিহাস! যে সিরীয়রা আইএসের ধ্বংসলীলা থেকে বাঁচতে ইউরোপে ছুটছিল, তাদেরই আবার আইএসপন্থী বলে দোষানো হচ্ছে। আইএসের সমর্থক হলে তো তাদের আর স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে এসে করুণা ভিক্ষা করতে হতো না। ভেতরে আইএস, বাইরে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের আতঙ্ক: বিশ্বের মুসলমানরা দুদিক থেকেই আক্রান্ত।
এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে সন্ত্রাসী হামলার দুমুখো লক্ষ্য সম্পর্কে ধারণা করা যায়। সন্ত্রাসী হামলার তাৎক্ষণিক শিকার লোকদের হত্যা করে সন্ত্রাসীরা আসলে অন্যদের বার্তা দিতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য বৃহত্তর সমাজকে বিভক্ত, ভীত ও মারমুখী করে তোলা। ইসলামের নামে হামলা হলে মুসলমান বনাম বাকিদের শত্রুতা আরও বাড়ে। তারা এক ঢিলে মুসলমান ও অমুসলিম উভয়কেই চরমপন্থী করে তুলতে চায়। একদিকে থাকবে প্রগতিশীল মুসলমান ও ইউরো-মার্কিন জোট, অন্যদিকে থাকবে বিক্ষুব্ধ ও প্রতিশোধকামী মুসলমান তরুণ। এরই আলামত দেখা যাচ্ছে ইউরোপে। ইতিমধ্যে ফরাসি শহর ক্যালাইসে একটি মুসলিম শরণার্থীশিবিরে আগুন দেওয়া হয়েছে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং বলেছেন, ‘হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষমাহীন যুদ্ধ চলবে।’ হামলাকারীদের নাম-পরিচয় জানার আগেই মুসলমানদের ওপর হামলা থেকে অনুমান করা যায়, কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে ইউরোপে। একদিকে সিরীয়-লিবীয় শরণার্থীদের ঢল, অন্যদিকে ইউরোপীয় মুসলিম নাগরিকদের সংখ্যা বৃদ্ধিতে মৌলবাদী শ্বেতাঙ্গরা ভীষণভাবে ক্ষিপ্ত। একসময় যেভাবে ডানপন্থীরা ইহুদিদের ইউরোপের অভিশাপ ঘোষণা করে বিতাড়ন করতে চেয়েছিল এবং সেই বিদ্বেষ পুঁজি করে হিটলারের নাৎসি পার্টি ইহুদি নিধনকে জায়েজ করতে লেগেছিল; ইউরো-মুসলিমদেরও সে রকম দশায় যে পড়তে হবে না, তা কে বলতে পারে? বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক মন্দার পরিস্থিতিতে মুসলিমদের সব নষ্টের গোড়া ভাবার লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। মুসলিম-অমুসলিমে এই বিভাজন যুদ্ধবাজ স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর ‘ভাগ করো শাসন করো’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মওকা এনে দেবে এবং পরিণামে শক্তিশালী করবে খোদ জঙ্গি ও তাদের রক্ষকদের।
প্যারিসে হামলার এক দিন আগে ফরাসি জরিপ সংস্থা আইএফওপির (IFOP) একটি জরিপের ফল প্রকাশিত হয় প্রখ্যাত লা ফিগারো পত্রিকায়। ওই জরিপে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আবশ্যকীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ফরাসিরা অগণতান্ত্রিক ধরনের সরকার মেনে নেবে কি না? ৬৭ শতাংশ অনির্বাচিত টেকনোক্র্যাটদের পক্ষে বলেছে। ৪০ শতাংশের পছন্দ অনির্বাচিত কর্তৃত্ববাদী সরকার।
শার্লি এবদোর একটি সন্ত্রাসী ঘটনা ফরাসি জনমতকে কতটা বদলে দিয়েছিল, এই জরিপ তার ইঙ্গিত দেয়। নতুন নাশকতার প্রতিক্রিয়া আরও তীব্র হবে। ফরাসি মুসলমানদের ওপর রাষ্ট্রীয় এবং ডানপন্থী বর্ণবাদীদের দমন-পীড়ন বাড়লে তাদের অনেকেই জঙ্গিবাদী দলে নাম লেখাবে। অথবা নিজেরাই আপনা থেকে হাতের কাছে যা পায়, তা নিয়ে ঘৃণার রাজনীতিতে জড়াবে। মনে রাখা দরকার, ফ্রান্সের বেকার ও দরিদ্র মুসলিম তরুণেরা কয়েক বছর আগে বঞ্চনার প্রতিবাদে প্যারিসে দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আইএস তাঁদের আরও ভয়ংকর পথে হাতছানি দিচ্ছে। সিরীয় যুদ্ধে যোগ দেওয়া ৩ হাজার ১০০ ইউরোপীয় নিজ নিজ দেশে নাশকতা শুরু করলে কী ভয়ংকর পরিস্থিতি হবে, কল্পনা করা যায়?
আইএস যতই রহস্যময় গুপ্তশক্তি হোক, আন্তর্জাতিক শক্তির মদদ, প্রশিক্ষণ ও রক্ষাকবচ ছাড়া তাদের পক্ষে বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাস চালানো সম্ভব নয়। সুতরাং আইএস দমনের নামে ইউরোপ অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারবিরোধী পথ নিলে শুধু ইউরোপীয় সংহতিই নষ্ট হবে না, বিশ্বব্যাপী সাম্প্রদায়িক হানাহানি অভূতপূর্ব স্তরে উঠবে। আইএসের ষড়যন্ত্রের গোড়া রয়েছে পশ্চিমা দেশগুলোর গোয়েন্দা নীতিতে। আরেকটি গোড়া হলো মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোর প্রতি তাদের বৈরী আচরণ। তাই জঙ্গি মদদ ও জঙ্গিবাদ সহায়ক অসন্তোষের জমিন বানানো বন্ধ করতে হবে।
জঙ্গিবাদের অভিশাপ দ্বিমুখী। জঙ্গি হামলার পর অনেক ‘সভ্য’ মানুষও প্রতিহিংসায় অন্ধ হন। তেমনি নিপীড়িতদের মধ্যে জন্ম দেয় আরও বেশি জঙ্গি। এবং পরিণামে দুইয়ে মিলেই মানবিকতা, ন্যায় ও সত্যের সম্ভাবনা ধ্বংস করে।
বর্বরোচিত জঙ্গি হামলার শিকার লেবানন ও ফ্রান্সের পাশে আমরা দাঁড়াব। বলব আমরাও লেবানন, আমরাও ফ্রান্স। পাশাপাশি আশা করব, ঐক্যবদ্ধ ফ্রান্স ‘জঙ্গিদের’ উসকানিতে পা দিয়ে তাদেরই অনুকরণে নির্বিচার আচরণ করবে না। অশুভ জঙ্গিবাদের শক্তিটা এখানেই যে, তা আক্রান্তকে যেমন চরমপন্থার পথে টেনে নিয়ে যায়, তেমনি হতাশ ও বঞ্চিতদেরও জঙ্গিবাদের দিকে টানে। এই দুইয়ের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার দায় সবার। ইউরোপ কেবল যুদ্ধ ও বাণিজ্যের কেন্দ্রভূমি নয়; মানবতা, ন্যায়, স্বাধীনতা ও শান্তির বৃহত্তম খুঁটিও কিন্তু এই ইউরোপ। সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ডাক দেওয়া প্যারিস কমিউনের বর্তমান উত্তরসূরিরা ঐক্যবদ্ধভাবে জঙ্গি হিংসা ও জাতিবিদ্বেষ মোকাবিলা করবে, এটাই আশা। এই দুর্দিনে শুভবুদ্ধি ও শুভশক্তির জয় হোক।

বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া

প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ঢাকায়। ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে সরকার। হতাহতের ঘটনায় শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। সন্ত্রাস বিরোধী লড়াইয়ে দেশটির পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টকে বার্তা পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল  দেশজুড়ে দিনভর আলোচনায় ছিল হামলার ঘটনা। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশী বসবাস করেন ফ্রান্সে। তাদের উদ্বিগ্ন স্বজনরা খোঁজ-খবর নিয়েছেন দিনভর। অনেকের চোখ ছিল টেলিভিশনের পর্দায়, অনলাইন পত্রিকায়। যদিও গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশী কেউ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ভয়াবহ এ হামলার পর ঢাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্রান্সে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশকে আরও সতর্ক হতে হবে। এ সন্ত্রাসী হামলায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশে যাতে কেউ নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড না চালাতে পারে সেজন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের তৎপর হতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। প্যারিসে নৃশংস হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ। একই সঙ্গে তারা হামলায় নিহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর শোকবার্তা
সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ। দেশটির প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদের কাছে পাঠানো এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অঙ্গীকার করেন। শুক্রবার রাতে প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের সরকার প্রধান ওই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান। এদিকে ব্যাপক প্রাণহানির ওই ঘটনায় প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ শোক প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেই রাতে প্যারিসের কয়েকটি স্থানে হামলার ঘটনা ঘটে। যাতে শতাধিক ব্যক্তি নিহত এবং কয়েক শ’ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ঘটনার পরপরই প্রধানমন্ত্রী দেশটির প্রেসিডেন্ট বরাবর শোকবার্তাটি পাঠান বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় বহু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি এবং আরো অনেক আহত হওয়ায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের সঙ্গে আমি এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি এবং ফ্রান্সের সরকার ও জনগণের প্রতি সংহতি জানাচ্ছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সন্ত্রাসীরা কেবলই সন্ত্রাসী এবং সভ্য সমাজে তাদের কোন স্থান নেই। সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে আমরা একত্রে লড়াই চালিয়ে যাবো। ফরাসি প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আপনার প্রতি এবং আপনার মাধ্যমে ফ্রান্সের জনগণের প্রতি আমার গভীর শোক প্রকাশ করছি। হতাহত পরিবারের সদস্যদের জন্য আমাদের সমবেদনা। নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।
প্রেসিডেন্টের শোক: প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় নিরীহ জনগণের প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ। এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট শোক প্রকাশ করেন বলে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন তার প্রেস সচিব জয়নাল আবেদীন। এই হামলায় বহু নিরপরাধ মানুষ নিহত ও আহত হন। প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ নিহতদের বিদেহী আত্মার পারলৌকিক শান্তি কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। উল্লেখ্য, শুক্রবার রাতে প্যারিসে একটি কনসার্ট হলসহ পরপর কয়েকটি জায়গায় ওই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে এটি সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা।
ফরাসিদের পাশে থাকার ঘোষণা খালেদার: ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় দেড় শতাধিক নিহতের ঘটনায় গভীর শোক ও নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় আমি বিস্মিত, হতবাক ও ক্ষুদ্ধ। সন্ত্রাসী এই ঘটনায় কমপক্ষে ১৫৩ জন নিহত এবং কয়েকশ’ মানুষ আহত হওয়ার খবরে আমি উদ্বিগ্ন, শোকাহত। আমি এই বর্বরোচিত ও নৃশংস হামলার নিন্দা জানাচ্ছি এবং এর হোতারা দৃষ্টান্তমূলক বিচারের মুখোমুখি হবে বলেও আশা করছি। ফ্রান্স সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বেগম জিয়া বলেন, ‘সব ধরনের উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ফ্রান্সসহ বিশ্বের শান্তিকামী সকল মানুষের পাশে আছি এবং থাকবো।’ এদিকে এ বর্বরোচিত হামলার নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন বিএনপি’র মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপন। শনিবার দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনির পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে আমরাও ফ্রান্সের জনগণের এই দুঃসময়ে তাদের পাশে রয়েছি এবং আমাদের দলের পক্ষে সংহতি প্রকাশ করছি।
স্পিকারের শোক
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী  ও ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া গভীর শোক ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন। শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক শোকবার্তায় তারা এ ঘটনাকে দুঃখজনক ও মর্মান্তিক বলে উল্লেখ করেন। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা ও শোকসস্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ.স. ম ফিরোজও শোক প্রকাশ করেছেন।
বিরোধী নেতার নিন্দা: এদিকে প্যারিসে একই সময়ে কয়েকটি স্থানে সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা ও হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ।  শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্যারিসে এই সন্ত্রাসী হামলার ভয়াবহতায় বিশ্ব আজ বিস্মিত, মর্মাহত ও হতবাক। তিনি নিহতদের আত্মার শান্তি, শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান এবং একই সঙ্গে আহতদের উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে দ্রুত আরোগ্য লাভের কামনা করেন।
জামায়াতের প্রতিক্রিয়া
প্যারিসে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ বলেন, এ নৃশংস ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ধরনের হামলা বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক হুমকি। তিনি বলেন, এ নৃশংস ঘটনায় ফ্রান্সের জনগণের মতো বাংলাদেশের জনগণও গভীরভাবে শোকাহত। এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা বন্ধ করার জন্য শান্তিকামী বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা যাদের জিম্মি করে রেখেছে তাদের উদ্ধারের জন্য ফ্রান্স সরকার জরুরিভিত্তিতে সকল ধরনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবেন বলে আমরা আশা করি।
ঢাকায় নিরাপত্তা জোরদার
প্যারিসে ভয়াবহ হামলার ঘটনার পর রাজধানী ঢাকার কূটনৈতিকপাড়ায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকায় ফ্রান্সের দূতাবাসের সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে খ্যাত গুলশান-বনানী ও বারিধারা এলাকায় অতিরিক্ত চেকপোস্ট মোতায়েনসহ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নেয়া হয়েছে। অন্যান্য দিনের চেয়ে শনিবার সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে রাজপথে অবস্থান করেছে। সরকারি-বেসরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সারা বিশ্বে এখন অস্থিরতা বিরাজ করছে, বাংলাদেশেও তার ছোটখাটো প্রভাব পড়ছে। তবে, সরকার তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্সে অবস্থান করছে। প্যারিসে হামলার ঘটনায় আতঙ্কিত হওয়ার কোন কারণ নেই, কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না। কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, দুই বিদেশী ও পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে হত্যার পর আগেই দেশব্যাপী নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্যারিসে হামলার পর বিদেশী দূতাবাস এবং বিদেশী নাগরিকদের নিরাপত্তা জোরদার করার সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়। ঢাকার গুলশান এবং বারিধারা এলাকায় অধিকাংশ বিদেশি দূতাবাসের অবস্থান আর বিদেশী নাগরিকরাও থাকেন এসব অভিজাত এলাকায়। প্যারিস হামলার পর ওইসব এলাকার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে ফ্রান্স দূতাবাসসহ সব কূটনৈতিক মিশন অফিসে। বাড়তি পুলিশ ছাড়াও সাদাপোশাকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে নজরদারির জন্য। গুলশান বারিধারা এলাকায় পুলিশের টহল চৌকিতে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা যানবাহনের গতিবিধি নজরে এলেই পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। বাংলাদেশের স্থল, নৌ এবং বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। সীমান্ত এলাকায় টহল জোরদার করা হয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম জানান, সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে সারা দেশে সতর্ক অবস্থায় রয়েছে পুলিশ। কূটনৈতিকপাড়ায় আগে থেকেই কড়া নিরাপত্তা জোরদার রয়েছে। প্যারিসে হামলার ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে। গোয়েন্দা তথ্য পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ।
পুলিশ সূত্র জানায়, প্যারিসে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর রাজধানী ঢাকার ফ্রান্সের দূতাবাসের পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়টি জানানো হয়। এমনিতে দূতাবাসের সামনে পুলিশের একটি দল থাকে। দূতাবাসের অনুরোধে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশের সিনিয়র এএসপি আলমগীর হোসেন শিমুল বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা রয়েছে। এই ধরনের ঘটনা যেকোন দেশে হতে পারতো। প্যারিসে হামলার পর শাহজালাল বিমানবন্দরেও সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অন্যান্য দেশের বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান করা হচ্ছে।
সতর্কতার পরামর্শ বিশ্লেষকদের
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে নৃশংস হামলার ঘটনা বাংলাদেশের জন্য সতর্ক বার্তা বলে মনে করেন নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে আরও সতর্ক হতে হবে। অভ্যন্তরীণ বিভেদ দূর করে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন- প্যারিসের ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা নয়। যেভাবে কমান্ডো স্টাইলে হামলা হয়েছে তাতে মনে হয় এটি কোন যুদ্ধ। আইএস একটি শক্তিধর সংগঠনের নাম। বাংলাদেশে সরাসরি আইএস সদস্যরা আছে কিনা এ তথ্য আমাদের জানা নেই। সরকারও মনে করে দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের যোগাযোগ রয়েছে। একারণেই তারা ইন্টারনেটের কিছু সুবিধাকে সীমিত করতে চায়। হোয়াটসঅ্যাপ ও ভাইবার বন্ধ করে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বন্ধ করা যাবে না। কারণ এ মাধ্যম ছাড়াও তাদের যোগাযোগের আরও মাধ্যম রয়েছে। তারা সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করেও যোগাযোগ করতে পারে। এ সমস্যা এখনও বড় সমস্যা না হলেও সামনে আরও বড় সমস্যা হতে পারে।
তিনি বলেন, দেশের ভেতরে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ বন্ধ করতে হলে ঘটনার প্রকৃত তদন্ত করতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য হয় না এমন তদন্ত করে লাভ নেই। বিদেশীরা আমাদের বিশ্বাস করতে পারছে না। এ সংকট নিরসনে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। শুধু নির্বাচনের জন্য নয়, নিরাপত্তার জন্য হলেও সকল দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য গড়ে  তোলা প্রয়োজন। আর এ দায়িত্ব সরকারের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শাহীদুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে আইএসের কার্যক্রমের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তবে দেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটাতে পারে। তারা চেষ্টা করবে প্যারিসের এ ঘটনায় নিজেদের উজ্জীবিত করতে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর ও জোরদার করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসীন বলেন, আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের হামলার কোন সম্ভাবনা নেই। তবে দেশে তাদের মতবাদে বিশ্বাসী সংগঠন রয়েছে। তারা ফ্রান্সের এ হামলার ঘটনায় প্রভাবিত হতে পারে। তাই দেশে ঘটে যাওয়া প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তের আগে যদি সরকারের পক্ষ থেকে কোন দলকে দায়ী করা হয় তবে প্রকৃত দোষীরা পার পেয়ে যায়। এসব বিষয়গুলো রাজনৈতিকভাবে দেখলে হবে না। জঙ্গিবাদের প্রতিটি বিষয় তদন্ত করে দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন- সন্ত্রাসবাদ আন্তর্জাতিক সমস্যা। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশই এর শিকার হচ্ছে। আমাদের দেশ সম্পর্কে বিদেশীদের নেতিবাচক ধারণা হচ্ছে সন্ত্রাসবাদের কারণে নয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে। তাই প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই এ বিষয়টি বুঝতে হবে।

হামলার পর প্যারিসে এখন আতঙ্ক আর বিভ্রান্তি

সন্ত্রাসী হামলার পর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে এখন আতঙ্ক আর বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। কী করণীয় তারা বুঝতে পারছে না। শুক্রবার রাতে ছয়টি স্থানে প্রায় একযোগে হামলা চালানো হয়। এতে অন্তত ১৫৩ জন নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া জানিয়েছে। তবে ফরাসি কর্তৃপক্ষ ১২৮ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত ২০০ ব্যক্তি। এদের ৯৩ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হামলায় অংশ নেয়া ৮জনও নিহত হয়েছে। হামলার দায়িত্ব কেউ স্বীকার না করলেও মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গোষ্ঠী আইএসকেই সন্দেহ করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ বলেছেন, 'আমরা জানি, কারা এই সন্ত্রাসী।'
গুলি চালানোর পর ওই সন্ত্রাসীরা বেশ কয়েকজনকে অস্ত্রের মুখে আটক করেছিল। পরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে তারা সবাই নিহত হন বলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ জানিয়েছেন।
টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে ওলাঁদ বলেন, 'এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয় সন্ত্রাসীরা। তারা সবাই নিহত হয়েছেন।'
বাটাক্লঁ কনসার্ট হলে হামলার পর তার কাছাকাছি নিরাপত্তা বাহিনীর একটি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, যারা হামলা চালিয়েছে তাদের প্রতি কোনো দয়া দেখানো হবে না।
প্যারিসের পাবলিক প্রসিকিউটর ফ্রাঙ্কোয়িস মোলিনসের মুখপাত্র জানিয়েছেন, হামলাকারী আটজনই নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন বিভিন্ন স্থানে নিজেদের শরীরে বেঁধে রাখা বিস্ফোরকের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের উড়িয়ে দিয়েছেন। আর একজন হামলাকারী পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন।
ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ শুক্রবার প্যারিসে প্রায় একই সময়ে কয়েকটি স্থানে বোমা হামলা ও বন্দুকধারীদের গুলিতে প্রায় দেড়শ জন নিহত হয়েছেন।
সবচে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বাটাক্লঁ কনসার্ট হলে। মার্কিন ব্যান্ড দল ইগলস অব ডেথ মেটালের কনসার্ট দেখতে তারা জড়ো হয়েছিলেন। সেখানে অন্ততপক্ষে ৮৭ জন নিহত হয়েছেন।
স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় এই সন্ত্রাসী হামলার পর পুরো ফ্রান্সে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ; বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সীমান্ত।