Tuesday, July 13, 2010

কর্মমুখী ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাস্তবায়ন কৌশল by ছিদ্দিকুর রহমান

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদন লাভ করেছে। সঠিক ও বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ নীতি বাস্তবায়ন। নীতি বাস্তবায়নে কত সময় লাগবে, কত টাকার প্রয়োজন হবে, কত মেধা ও শ্রম দিতে হবে—এ সবকিছুই নির্ভর করে নীতি বাস্তবায়নকৌশলের ওপর। কৌশল সঠিক হলে কম খরচে ও কম সময়ে বড় কিছু অর্জনও সম্ভব। শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নের ওপর ধারাবাহিকভাবে লিখতে হলে প্রথমেই আরম্ভ করতে হয় প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা দিয়ে। যেহেতু এখন জাতীয়ভাবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সপ্তাহ ২০১০ পালিত হচ্ছে, তাই বৃত্তিমূলক শিক্ষা দিয়েই শুরু করা হলো।
জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ ৫+ বছর বয়সের সব শিশুর জন্য এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং ৬+ থেকে ১৩+ বছর বয়সের সবার জন্য আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা হবে সর্বজনীন, অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক। প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিটি শিশুর মৌলিক শিখন-চাহিদা নিশ্চিত করবে, এ শিক্ষা থেকে শিশুরা একদিকে যেমন সুদৃঢ় ব্যবহারিক সাক্ষরতা অর্জন করবে, অন্যদিকে তেমনি জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় জীবন-দক্ষতা অর্জন করবে। অনেকের জন্য এ শিক্ষা হবে প্রান্তিক, আবার অনেকে এ শিক্ষা শেষে মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রবেশ করবে।
আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা কর্মবিমুখ। অভিভাবকেরা সন্তানদের পড়ায় ভালো চাকরিলাভের আশায়। কেউ কেউ পড়ায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা জজ-ব্যারিস্টার বানানোর জন্য। ছেলেমেয়েরাও পড়ে একই লক্ষ্যে। দক্ষ শ্রমিক বা কারিগর হওয়ার লক্ষ্য থাকে না বললেই চলে। অথচ একটি জাতির টিকে থাকা ও অগ্রগতির জন্য যেমন প্রয়োজন অনেক সুশিক্ষিত দক্ষ শ্রমিক, কর্মকার, কৃষক, কর্মচারী, তেমনি প্রয়োজন নির্ধারিতসংখ্যক সুশিক্ষিত শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, কর্মকর্তা। এর জন্য প্রয়োজন মৌলিক শিক্ষা পর্যায়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। শিক্ষা সবাইকে কর্মমুখী করবে। শ্রমমূলক কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি এবং শ্রম ও শ্রমিককে যথাযথ মর্যাদা দিতে শেখাবে।
শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষার (১ম থেকে ৮ম শ্রেণী) জন্য নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করতে হবে। উচ্চ-প্রাথমিক স্তরে (৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী) অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে প্রাক-বৃত্তিমূলক শিক্ষা হিসেবে কর্মমুখী শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকবে। কর্মমুখী শিক্ষার জন্য কোনো পাঠ্যপুস্তক থাকবে না, কিন্তু শিক্ষক সহায়িকা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। প্রতি শ্রেণীতে সপ্তাহে কমপক্ষে এক দিন রুটিনে শেষ দুই পিরিয়ড কর্মমুখী শিক্ষার জন্য বরাদ্দ থাকবে। একেক শ্রেণীর শিক্ষার্থীদেরকে ১৫ থেকে ২০ জনের দলে ভাগ করে একেক দলকে একেকজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে শ্রমমূলক কাজে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করানো হবে। শিক্ষার্থীরা গ্রামের রাস্তাঘাট মেরামত করবে; স্কুল, রাস্তাঘাট, ড্রেন, পুকুর পরিষ্কার করবে, গ্রামের বিভিন্ন বৃত্তির লোকজনের কাজে সহায়তা করবে। যেমন, কৃষকের সঙ্গে কৃষিজমি নিড়াবে, কামারের সঙ্গে মাটি মন্থন করবে, সুতারের সঙ্গে র্যাঁদা ঠেলবে। এর জন্য আলাদা কোনো ওয়ার্কশপ লাগবে না, যে গ্রামে যেসব কাজের সুযোগ আছে ওই কাজ করবে। একই কাজ বারবার করবে না। বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করবে। কারণ এ শিক্ষার উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট বৃত্তি বা কাজের জন্য তৈরি করা নয়, কায়িক শ্রমের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করা।
আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা সবার জন্য বাধ্যতামূলক। তাই সবাইকে তিন বছর (৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণী) বাধ্যতামূলকভাবে কর্মমুখী শিক্ষা নিতে হবে। এর জন্য এসবিএ-র (বিদ্যালয়ভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি) অধীনে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকবে। ৮ম শ্রেণী শেষে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার নম্বর ফর্দে কর্মমুখী শিক্ষার ধারাবাহিক মূল্যায়নের গড় নম্বর উল্লেখ থাকবে।
সন্তোষজনকভাবে আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে কেউ কেউ মাধ্যমিক শিক্ষায় যাবে, আবার কেউ কেউ বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যাবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষায় অর্জিত দক্ষতা উৎপাদনমূলক কাজে লাগিয়ে আয়রোজগার করবে। কেউ কেউ বৃত্তিমূলক শিক্ষা শেষে এবং কেউ কেউ মাধ্যমিক শিক্ষার দুই বছর শেষে উচ্চতর দক্ষতার বৃত্তিমূলক শিক্ষা নেবে। উচ্চতর দক্ষতার বৃত্তিমূলক শিক্ষা শেষে অনেকে কর্মজীবনে যাবে। আবার কেউ কেউ কারিগরি শিক্ষায় যাবে। চার বছরের মাধ্যমিক শিক্ষা শেষেও কারিগরি শিক্ষায় যাবে।
বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগলাভের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যেমন, সরকারি উদ্যোগে প্রতি উপজেলায় একাধিক বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা, বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরকে শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করা এবং সহযোগিতা প্রদান, প্রতি জেলায় আবাসিক সুবিধাসহ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ইত্যাদি সরকারের পিপিপি পলিসির আওতায় বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
কোথায় কী ধরনের বৃত্তিমূলক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হবে এ বিষয়ে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ, কাঁচামাল প্রাপ্তি, বাজারজাতকরণের সুযোগ ইত্যাদি বিবেচনায় রেখে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কার্যক্রম (ট্রেড কোর্স) চালু করা, বিভিন্ন কলকারখানার ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তির চাহিদা নিরূপণ করার জন্য গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা এবং কলকারখানার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপন করে চাহিদানুসারে বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদান এবং শিক্ষা শেষে কর্মে নিয়োগদান, বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তির চাহিদা নিরূপণের জন্য গবেষণা পরিচালনা, তা ছাড়া দেশে স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ চিহ্নিত করার জন্য গবেষণা পরিচালনা এবং সে অনুসারে বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদান ইত্যাদি। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ক্ষেত্রবিশেষে বিদেশি ভাষা (যেমন ইংরেজি, আরবি, কোরিয়ান ইত্যাদি) শিক্ষা বৃত্তিমূলক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
স্বকর্মসংস্থানের সুযোগভিত্তিক বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রদান এবং সন্তোষজনকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শেষ করার পর ব্যাংক থেকে কম সুদে ক্ষুদ্রঋণপ্রাপ্তির সুযোগ থাকা প্রয়োজন। প্রতি উপজেলায় একটি করে পরিবীক্ষণ সেল থাকবে, ব্যাংকসমূহের যৌথ অর্থায়নে ওই সেল পরিচালিত হবে। এর প্রধান কাজ হবে ঋণগ্রহীতারা ঋণের টাকা নির্ধারিত খাতে বিনিয়োগ করছে কি না তা তদারক করা এবং ঋণের টাকা যথাযথভাবে বিনিয়োগ করে কার্য পরিচালনায় উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করা।
সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে সবার জন্য সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার সম্প্রসারণ। বর্তমান সরকারের ঘোষিত নীতি অনুযায়ী, প্রত্যেক পরিবারের জন্য কমপক্ষে একজনের কর্মসংস্থান করতে হলে স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ ছাড়া অদক্ষ বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে কর্মমুখী শিক্ষাসহ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বৃত্তিমূলক শিক্ষা গ্রহণ করে ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে করা স্বকর্মসংস্থান দারিদ্র্য ও সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে পৌঁছাতে মুখ্য ভূমিকা রাখবে।
ড. ছিদ্দিকুর রহমান: অধ্যাপক, আইইআর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; সদস্য, জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটি ২০০৯।

দমননীতি: প্রতিবাদ থেমে থাকে না by আসিফ নজরুল

বাংলাদেশের কিছু মানুষের মধ্যে বেশি কথা বলার রোগ আছে। এই রোগ সবচেয়ে বেশি রাজনীতিবিদদের মধ্যে। মন্ত্রিত্ব পেলে তাঁদের অনেকের কথা অসংলগ্নও হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সরকারের আমলে কিছু কিছু মন্ত্রী পিলে চমকানো বা হাস্যকর বক্তব্য দেওয়ার জন্যও ‘প্রসিদ্ধি’ অর্জন করেছেন। কারও কারও বক্তব্যে হাস্যরস আর বিরক্তি ছাপিয়ে ওঠে দুর্ভাবনা। মন্ত্রী হলে কি দেশের মানুষকে বোকা ভাবার বা বোকা বানানোর রোগ জন্মে অনেকের মধ্যে?
আমার ধারণা, তা-ই হয়। না হলে আমাদের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এই ইংগিত দেন কী করে যে বিরোধী দলের মানববন্ধন কর্মসূচিও ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য? ৭ জুলাই এক ঘণ্টার এই নিরীহ কর্মসূচিকে নস্যাৎ করার জন্য পুলিশ পিটিয়েছে কিংবা ছত্রভঙ্গ করেছে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের। অতীতে মানববন্ধনের ওপর এ রকম চড়াও হওয়ার নজির সম্ভবত দেশে নেই। ‘দিনবদল’ এখানেও হচ্ছে বুঝলাম। কিন্তু মানববন্ধন কর্মসূচির সঙ্গে মন্ত্রীর দাবিমতো যুদ্ধাপরাধী বিচার নস্যাৎ করার সম্পর্ক কোথায়, এটা তো বোঝা যাচ্ছে না!
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করে সরকারের লাভ হয়েছে। অন্য কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতা সত্ত্বেও এই একটি কারণে দেশের অনেক মানুষের সমর্থন এখনো পাচ্ছে তারা। কিন্তু এই মহান দায়িত্ব পালনের অজুহাতে অন্য সব ক্ষেত্রে জবাবদিহির বাইরে থাকার যে চেষ্টা সরকারের মন্ত্রীরা বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতিতে চালাচ্ছেন, তা হাস্যকর। একই সঙ্গে অগ্রহণযোগ্য।

২.
বিএনপির সামপ্রতিক হরতালের বিরোধিতা করতে গিয়েও কোনো কোনো মন্ত্রী হরতালকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিএনপি যেসব দাবিতে হরতাল ডেকেছিল, তার মধ্যে যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রসঙ্গের কোনো উল্লেখই ছিল না। হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল পানি-বিদ্যুৎ সমস্যা, বিরোধী দলের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন, বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ নানা ইস্যুতে। অতীতে প্রায় অবিকল এসব ইস্যুতে আওয়ামী লীগ বহুবার হরতাল পালন করেছে। হরতালের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কোনো সম্পর্ক আগে না থাকলে এখন থাকবে কোন যুক্তিতে?
হরতাল প্রতিবাদের ভাষা বা কর্মসূচি হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে হরতালের আগের রাত থেকে শুরু করে হরতালের দিন জনগণকে এটি পালনে বাধ্য করার জন্য যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়, তা গণতন্ত্রের ভাষা নয়। হরতালের সমালোচনা হওয়া উচিত মূলত এ কারণে। এ ছাড়া হরতালের আরও সমালোচনার জায়গা রয়েছে। আমরা বিভিন্ন সময় বলেছি, সরকারের যেসব ব্যর্থতার প্রতিবাদে বিএনপি হরতাল ডেকেছিল, সরকারের থাকার সময় তারাও একইভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। বিদ্যুতের ইস্যুতে সরকারের সমালোচনার আগে বিএনপিকে তাই এই খাতে তার নিজের অতীত ব্যর্থতার জন্য ক্ষমা চেয়ে ভবিষ্যতে তারা কী কী কর্মসূচি নিয়ে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করবে, তার বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত। সন্ত্রাস, দলীয়করণ, দুর্নীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এসব বিষয়ে সংসদে বলার পর্যাপ্ত চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেই কেবল শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল কর্মসূচি দেওয়া উচিত।
সরকারের মন্ত্রীরা এ ধরনের যৌক্তিক কথা বলে হরতালের সমালোচনা করলে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু সরকার অব্যাহতভাবে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিরোধী দলের নেতাদের ‘গুম’ করে ফেললে, সীমাহীন দলীয়করণ চালালে বা সংসদে কথা বলতে না দিলেও হরতাল করা যাবে না, এটি ঠিক নয়। ঠিক নয় এসবের সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ইস্যুকে অযৌক্তিকভাবে সম্পর্কিত করা। হরতালের তুলনায় মানববন্ধন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য কর্মসূচি। এই কর্মসূচিতে বাধা দিলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আর কি পথ খোলা থাকবে?

৩.
বিএনপির মানববন্ধন কর্মসূচি ছিল হরতালের দিন গ্রেপ্তার করা তাদের তিন নেতার মুক্তির দাবিতে। আমাদের প্রশ্ন, মীর্জা আব্বাস, বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা শমশের মবিন চৌধুরী এবং স্বাধীনতাযুদ্ধকালে শিশুবয়সী শহীদ উদ্দীন এ্যানী কি যুদ্ধাপরাধী? তাঁদের মুক্তির দাবির সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে নস্যাৎ করার সম্পর্ক কোথায়? এই দাবিতে কর্মসূচি দিলে সরকারকে এমনভাবে চড়াও হতে হবে কেন?
মানববন্ধন কর্মসূচি দিয়েছিল জামায়াতও। জামায়াতের মানববন্ধনের দাবি ছিল তাদের দলের তিন নেতার (নিজামী, মুজাহিদ ও সাঈদী) মুক্তির দাবিতে। তাঁদের সরকার যুদ্ধাপরাধের জন্য গ্রেপ্তার করেনি। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ১৯৭৩ সালের আইন অনুসারে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হলে এবং তখন জামায়াত এর প্রতিবাদে কোনো কর্মসূচি দিলে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা অবশ্যই সরকার করতে পারে। তার আগ পর্যন্ত তিন নেতার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রোধ করার কর্মসূচি হিসেবে আখ্যায়িত করার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৯৫-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছিল। অপশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অধিকার তখন জামায়াতের থাকলে এখনো তা আছে। তবে এই আন্দোলনকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নস্যাৎ করার দিকে ধাবিত করার অধিকার জামায়াত, বিএনপি বা অন্য কারও নেই। দেশের একটি প্রচলিত আইনে এই বিচার করা হচ্ছে। এই বিচারের বিরোধিতা শুধু নৈতিকভাবে নয়, আইনগতভাবেও তাই অবৈধ। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে বলে এই সরকারের দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা দমননীতির বিরুদ্ধে কোনো কর্মসূচি দেওয়া যাবে না, এটা বলাও অনুচিত ও অযৌক্তিক।
আমরা মনে করি, আগের বিএনপির সরকারের তুলনায় দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে লক্ষণীয় সাফল্য দেখাতে পারলেই বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পরিবেশ আরও সুশক্ত হবে। এটি করা গেলে সরকরের জনসমর্থন বহু গুণে বাড়বে। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধপক্ষ একে নস্যাৎ করার কোনো কর্মসূচি দিতে ভয় পাবে, দিলেও আদৌ সফল হবে না। আওয়ামী লীগের সরকারকে বুঝতে হবে দলীয়করণ, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বা নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দিয়ে জনসমর্থন হারালে, মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়ে দুর্নাম কুড়ালে সরকার পতনের যে পরিবেশ সৃষ্টি হবে, তাতেই বরং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হবে।

৪.
আওয়ামী লীগের সরকার দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে তার ব্যর্থতা ঢাকতে যুদ্ধাপরাধের বিচার বা জামায়াত ইস্যুকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে আরও বহুভাবে। আওয়ামী লীগের প্রতি মানুষের অসন্তোষ ও অভিযোগের একটি বড় কারণ ছাত্রলীগের অব্যাহত নৈরাজ্যকর এবং কখনো কখনো পাশবিক সন্ত্রাস। দেশে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এতে যে বীতশ্রদ্ধ তার বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে। তার পরও এ সমস্যার কোনো সমাধান সরকার করতে পারেনি কেন?
সরকারের মন্ত্রীদের একটি তৈরি উত্তর আছে এই প্রশ্নের। তাঁদের বক্তব্য, ছাত্রলীগের ভেতর শিবির ঢুকে গেছে, তারাই অনেক ক্ষেত্রে এসব সন্ত্রাস করছে। আমরা বুঝতে অক্ষম আওয়ামী লীগের অভিভাবকত্বে থাকা এই সংগঠনে শিবির ঢোকে কীভাবে, কারা এ জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কেন তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না?
প্রশ্ন আরও আছে। ঢাকা বা অন্য কোথাও ছাত্রলীগের হাতে খুন-জখম হলে কেন গ্রেপ্তার করা হয় শুধু গুটিকয়েক মাঠপর্যায়ের কর্মীকে? দেশের সব পত্রপত্রিকায় জাহাঙ্গীরনগরের পাশবিক সন্ত্রাসের ঘটনায় সেখানকার ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়ী করা হলেও তাঁদের দুজনকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো না? শমশের মবিন চৌধুরী গাড়ি পুড়িয়েছেন, এহসানুল হক মিলন হাতঘড়ি ছিনতাই করেছেন এমন অদ্ভুত অভিযোগে তাঁদের রিমান্ডে নেওয়া গেলে হত্যা, সন্ত্রাস আর চাঁদাবাজির পর ছাত্রলীগের আসল হোতাদের কেন রিমান্ডে নেওয়া হয় না?
আমার খবর পাই, গোটা দেশের পুলিশ প্রশাসন ছাত্রলীগের সন্ত্রাস দমনে অনীহ থাকে অন্য একটি কারণে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার ছাত্রলীগ বা এর নেতাদের আশ্রয়ে থাকা সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের কোনো পদক্ষেপ নিলেই তাকে ‘জামায়াত-শিবিরের লোক’ হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয় ছাত্রলীগ এমনকি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের তাই গ্রেপ্তার করা হয় কেবল ব্যাপক সন্ত্রাস সংঘটিত হওয়ার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ পেলে। এর আগ পর্যন্ত এমনকি সংঘর্ষ চলাকালেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তারের সাহস পায় না। হরতাল চলাকালে বিরোধী দলের ওপর পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সামনেই ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা এ ধরনের পরিস্থিতিতে আইন অনুসারে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করলে তাকে জামায়াত-শিবিরের লোক বলে অপদস্থ করা হবে না এই গ্যারান্টি কেউ কি দিতে পারবে?
এই গ্যারান্টি সরকারকেই দিতে হবে। বাছবিচার না করে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের সুস্পষ্ট ও আন্তরিক নির্দেশ পুলিশের ওপর না থাকলে, ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালন করলে জামায়াত-শিবির অপবাদ পেতে হবে, এই আশঙ্কায় পুলিশ গুটিয়ে থাকলে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের কোনো দিনও দমন করা যাবে না, এই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনটির আগের সুনামও ফিরিয়ে আনা যাবে না।

৫.
সরকারকে আরেকটি জিনিস বুঝতে হবে। জামায়াত-শিবির অপবাদে চাকরি হারানোর ভয়ে পুলিশ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিস্ক্রিয় থাকতে পারে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বাধাদানের অপবাদ পেতে হতে পারে এই ভয়ে দেশের বিরোধী দলগুলো সরকারের কোনো ব্যর্থতার প্রতিবাদ করবে না, কর্মসূচি দেবে না, এটা আশা করা ঠিক নয়।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে প্রকৃতই কোনো বাধা থাকলে বা এলে তার উপযুক্ত প্রতিকার অবশ্যই সরকারকে করতে হবে। কিন্তু সবকিছুকে যুদ্ধাপরাধী বিচারের বাধা হিসেবে দেখালে আসল বাধাকে বরং দূর করা সরকারের জন্য দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে।
সরকারকে বুঝতে হবে, একটি ভালো কাজ করলে সাত খুন মাফ হয়ে যায় না। তেমনি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করলেই সরকারের অন্য নানা ব্যর্থতা
ঘুচে যাবে না। এর প্রতিবাদও থেমে থাকবে না।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থা -স্বার্থান্বেষী মহলের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিন

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চট্টগ্রাম বন্দরে একধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থনীতির জীবনপ্রবাহ বলে পরিচিত এই বন্দরের কাজকর্মে যে গতি এসেছিল, তা ব্যাহত করতে উঠেপড়ে লেগেছে একটি স্বার্থান্বেষী মহল। হালে সাধারণ পণ্যবাহী জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস নিয়ে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ব্যবসা-বাণিজ্য যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য।
বন্দরের পণ্য খালাসে গতি ফিরিয়ে আনতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ডক ওয়ার্কার্স ব্যবস্থাপনা বোর্ড ভেঙে দিয়ে বেসরকারি অপারেটর নিয়োগ করা হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা তার সুফলও পেয়েছিলেন। কিন্তু স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বর্তমান সরকার উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ছয়টি বেসরকারি অপারেটর কোম্পানি নিয়োগ দেয়। অপারেটররা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেটি দেখার দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের। কিন্তু ডক শ্রমিক ফেডারেশনের নামে একশ্রেণীর শ্রমিকনেতা অপারেটরদের কাজে বাধা দিচ্ছেন এবং তাঁদের তালিকা অনুযায়ী শ্রমিক নিয়োগের আবদার তুলেছেন, আইন অনুযায়ী যা তাঁরা করতে পারেন না।
এ ব্যাপারে দেশের ব্যবসায়ী মহল তো বটেই, সাধারণ মানুষও উদ্বিগ্ন। বন্দরে পণ্য খালাসে বিলম্ব হলে শেষ পর্যন্ত তার দায় গিয়ে পড়ে ভোক্তাসাধারণের ওপর। ব্যবসায়ীরা নৌ ও পরিবহনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি হয়েছে বলা যাবে না। বন্দরের সাধারণ শ্রমিকদের ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী মহল আগেও বন্দরে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। যখন চট্টগ্রাম বন্দর আধুনিকায়ন তথা এর দক্ষতা ও যোগ্যতা বাড়াতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন এই অশুভ তৎপরতা কিসের ইঙ্গিত দেয়? আশা করি, সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করবে এবং স্বার্থান্বেষী মহলের অশুভ তৎপরতা বন্ধে যেকোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।

স্বতন্ত্র রেল মন্ত্রণালয় প্রয়োজন -সংস্কারের অর্থ রেলওয়ের পুনরুজ্জীবনে ব্যয় হোক

বহুদিন হলো রেল-যোগাযোগ খাতের পুনরুজ্জীবনে কোনো সুসংবাদ নেই। সর্বশেষ, সিদ্ধান্তহীনতার কারণে রেলওয়ে ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর প্রকল্পও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গত শনিবারের প্রথম আলোর সংবাদে জানা যাচ্ছে, রেল-যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে উন্নয়ন-সহযোগীদের দেওয়া পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সহযোগিতার ভবিষ্যৎও অস্পষ্ট। এ খাত যেন রূপকথার সুয়োরানি, সব গুণ থাকা সত্ত্বেও তার ভাগ্যে জোটে কেবলই অবহেলা।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা এ খাতকে গতিশীল করার জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ার দাবি করে আসছেন। কিন্তু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের আমলাদের আগ্রহ একে তাঁদের কর্তৃত্বের অধীনে রাখা। মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রস্তাবে যোগাযোগমন্ত্রী ও যোগাযোগসচিবকেই সর্বেসর্বা করা হয়েছে। অথচ প্রতিবেশী ভারতে রেলের সাফল্য এসেছে স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী মন্ত্রণালয়ের অধীনে। বাংলাদেশেও রেলওয়েকে বাঁচাতে স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় করার সুপারিশ করেছে যোগাযোগ বিষয়ক সংসদীয় কমিটি। তাঁদের এ সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
রেলওয়ের বর্তমান পরিণতির জন্য কেবল সরকারই নয়, উন্নয়ন-সহযোগীরাও দায়ী। সড়ক পথকেই তাঁরা উন্নয়নের প্রধান অবকাঠামো ভেবে নিয়েছিলেন এবং সে অনুযায়ী তাদের পরামর্শ ও চাপে রেলের বেসরকারিকরণের পদক্ষেপও বাস্তবায়িত হচ্ছিল। নব্বইয়ের দশক থেকে এশিয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর পরামর্শে তিনবার রেলওয়ের সংস্কার হয়। এ সময় সারাদেশে অন্তত পৌনে তিন’শ কিলোমিটার রেলপথ বন্ধ করা হলেও লাভজনক পথে নতুন রেলপথ সম্প্রসারণ করা হয়নি। তবে আশার কথা যে, উন্নয়ন সহযোগীরা বর্তমানে রেলকেই যোগাযোগের প্রধান অবকাঠামো করে উন্নয়নের চিন্তাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তনকে ফলপ্রসূ করার দায়িত্ব এখন সরকারের।
বর্তমানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে রেলের অংশ মাত্র পাঁচ শতাংশ। শনিবারের প্রথম আলোরই আরেকটি সংবাদ বলছে, দিনে ১২টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল হচ্ছে। রেলওয়ের এই পরিণতির জন্য স্পষ্টতই পরিবহন ব্যবসায়ী ও গাড়ি বিক্রেতাদের পক্ষে সরকারি নীতিও দায়ী। ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রেলওয়ের ১২ ভাগের বিপরীতে সড়কপথে বরাদ্দ যায় ৮৬ ভাগ। বর্তমান বাজেটেও রেলওয়ের উন্নয়নে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়নি। এভাবে গণপরিবহন-ব্যবস্থাকে দুর্বল করে বাস-ট্রাকনির্ভর ব্যয়বহুল ও পরিবেশবিনাশী পরিবহন ব্যবসা জোরদার করে রেল-যোগাযোগ খাতের পুনর্জীবন সম্ভব নয়। এরশাদ সরকারের আমলে রেলওয়েকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিভক্ত করা হয়েছে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে স্টেশনের সৌন্দর্যবর্ধনে ১০০ কোটি টাকা অপচয় করা হলেও নতুন ইঞ্জিন ও কোচ কেনা এবং লোকবল বাড়ানোয় মনোযোগ দেওয়া হয়নি। রেলওয়ের অধিকাংশ ইঞ্জিন ও কোচ চলছে মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায়। রেলওয়ের ইঞ্জিন, কোচ ও ওয়াগন মেরামতের ছয়টি কারখানার একটিরও উৎপাদনক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো বিনিয়োগ হয়নি। সম্প্রতি একনেকের বৈঠকে চীনের কুনমিংয়ের সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারিত করার প্রস্তাব নেওয়া হয়েছে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে অনুমোদিত অনেক প্রকল্প বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাস্তবায়িত না হওয়ায় এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়েও সন্দেহ থেকে যায়।
রেলওয়েকে বাঁচাতে হলে অবিলম্বে সংস্কার নিয়ে রেল কর্তৃপক্ষ, বিশ্বব্যাংক-এডিবি এবং মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মতবিরোধের মীমাংসা হতে হবে। সংস্কারের উদ্দেশ্য হতে হবে রেলকে জাতীয় পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সক্ষম করে তোলা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রেল-যোগাযোগ খাত সরকারি ব্যবস্থাপনায় লাভজনকভাবে চলতে পারলে বাংলাদেশে পারবে না কেন?

জনসংখ্যায় চীনকে ছাড়াবে ভারত

গত ১০০ বছরে ভারতের জনসংখ্যা পাঁচ গুণ বেড়েছে এবং দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বলছে ২০৫০ সাল নাগাদ জনসংখ্যায় চীনকে ছাড়িয়ে যাবে ভারত। ভারতের সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৪। একই সময়ে চীনে জনসংখ্যা বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ হারে।
২০০৯ সালে ভারতের মোট জনসংখ্যা ছিল ১১৯ কোটি ৮০ লাখ, চীনের ছিল ১৩৪ কোটি ৫০ লাখ এবং পাকিস্তানের ১৮ কোটি। সরকারি পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ হারে জনসংখ্যা বাড়লে ২০৫০ সাল নাগাদ ভারতের জনসংখ্যা বেড়ে হবে ১৬১ কোটি ৩৮ লাখ। একই সময়ে চীনের জনসংখ্যা হবে ১৪১ কোটি ৭০ লাখ। গত পাঁচ বছরে উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল পাকিস্তানে ২ দশমিক ২ শতাংশ।
ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ ‘জনসংখ্যা স্থিরতা কোষ’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান হারে ভারতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে আগামী ৫০ বছরের মধ্যে তা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। ২০২৬ সাল নাগাদ ভারতকে অতিরিক্ত ৩৭ কোটি ১০ লাখ মানুষের ভার বহন করতে হবে।
মজার একটি তথ্য হলো, ভারতের অনেক রাজ্যের জনসংখ্যাই অনেক দেশের সমান। যেমন, মহারাষ্ট্রের জনসংখ্যা ১০ কোটি ৪০ লাখ। মেক্সিকোতেও সমপরিমাণ মানুষ বসবাস করে। বিহারের জনসংখ্যা জার্মানির সমান। মহারাষ্ট্রে বাস করে ১৮ কোটি ৩০ লাখ মানুষ যা ব্রাজিলের জনসংখ্যার (১৮ কোটি ৭০ লাখ) কাছাকাছি।

রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে শুরু করেছে কিউবা

প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কিউবা সরকার শনিবার থেকে রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে শুরু করেছে। প্রথম দফায় একদল অসুস্থ রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিউবা যে ৫২ জন ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক বন্দীকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেছে, এঁরা তাঁদেরই অন্তর্ভুক্ত।
মুক্তি পাওয়া বন্দীদের আত্মীয়স্বজনেরা জানিয়েছেন, তিনজন বন্দীকে জ্ঞাত স্থান থেকে শনিবার মুক্তি দেওয়া হয়। ১৭ জন বন্দীর যে দলটির মুক্তির পর স্পেন যাওয়ার কথা রয়েছে, মুক্তি পাওয়া এই তিনজন সে দলের।
কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো ও কার্ডিনাল জেইম ওর্তেগার মধ্যে এ সপ্তাহের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর এসব রাজনৈতিক বন্দীকে ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। বিগত কয়েক দশকের মধ্যে কিউবায় এত বেশিসংখ্যক রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি দেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।
এদিকে ভিন্নমতাবলম্বী হোসে লুইস গার্সিয়া প্যাকুয়ে তাঁর পরিবারের লোকজনকে ফোন করে বলেছেন, তাঁকে লাস টুনাস প্রাদেশিক কারগার থেকে হাভানার অজ্ঞাত এক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ভিন্নমতাবলম্বী পাবলো পাচিকো ও লুইস মিলানের স্ত্রীরা জানিয়েছেন, তাদের স্বামীরা ফোন করে তাঁদের মুক্তি পাওয়ার কথা বলেছেন।
এর আগে কিউবার রোমান ক্যাথলিক গির্জার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ১০ জন বন্দীকে শিগগিরই মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। মুক্তির পর তাঁরা স্পেন চলে যাবেন।
কিউবা ২০০৩ সালে ৭৫ জন ভিন্নমতাবলম্বী রাজনীতিক, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেপ্তার করে। এর মধ্যে ৫২ জনকে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তাঁরা সবাই সাজা পাওয়া। তাঁদের ছয় থেকে ২৮ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি মুক্তির দাবিতে অনশনরত একজন রাজনৈতিক বন্দী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই রাজনৈতিক বন্দীদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। চাপের মুখে অবশেষে কিউবা সরকার ৫২ জন রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

মার্কিন কারাবন্দীকে মুক্তি দিতে উ. কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান

উত্তর কোরিয়ার জেলখানায় বন্দী আইজালোন মাহলি গোমেজ নামের এক মার্কিন নাগরিককে মুক্তি দেওয়ার জন্য পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। গোমেজ কারাগারে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এ আহ্বান জানানো হলো।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তা গত শুক্রবার জানান, সুইডেনের কূটনীতিকেরা গোমেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে পারিবারিক গোপনীয়তার প্রতি সম্মান দেখানোর কথা উল্লেখ করে গোমেজের (৩১) বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাতে অস্বীকৃতি জানান ওই কর্মকর্তা।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মার্ক টোনার বলেন, ‘মানবিক দিক বিবেচনা করে গোমেজকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমরা আবারও উত্তর কোরিয়ার প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ তিনি বলেন, সুইডেন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা আটবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন।
উত্তর কোরিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা গত শুক্রবার জানায়, আট বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত গোমেজ সম্প্রতি কারাগারে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।
কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়, অপরাধবোধ ও হতাশাবোধে তাড়িত হয়ে গোমেজ আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তাঁর মুক্তির জন্য কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের প্রতি তিনি হতাশ ছিলেন বলে খবরে মন্তব্য করা হয়।
গত ২৫ জানুয়ারি গোমেজকে গ্রেপ্তার করা হয়। আর এপ্রিলে তাঁকে আট বছরের কঠোর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে ভোট গ্রহণ

জাপানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ কাউন্সিলর পরিষদের নির্বাচনে গতকাল রোববার ভোট নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান ও ক্ষমতাসীন জোটের জন্য এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলে মনে করা হচ্ছে।
ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপানের (ডিপিজে) নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট কাউন্সিলর পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। তবে নির্বাচনের আগের কয়েকটি জরিপে ক্ষমতাসীন জোট উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে না বলে আভাস দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানের কর বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়টি নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হয়। গতকাল সকাল থেকে শুরু হয়ে স্থানীয় সময় রাত আটটা পর্যন্ত ভোট নেওয়া হয়।
ক্ষমতাসীন জোট ২৪২ আসনের উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে যেকোনো আইন পাস করা নিয়ে দারুণ সমস্যার মুখোমুখি হবে। এতে দেশটি রাজনৈতিক অচলবস্থার ঝুঁকির মুখে পড়বে।
নির্বাচনের তহবিল সংগ্রহ-সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি ও প্রতিশ্রুতি দিয়েও ওকিনাওয়া থেকে মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে না নেওয়ার জের ধরে পদত্যাগ করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউকিয়ো হাতোইয়ামা। এরপর ৮ জুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন নাওতো কান।

চীনে বন্যায় ৫০ জনের প্রাণহানি

চীনের দক্ষিণাঞ্চলে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ৫০ জন প্রাণ হারিয়েছে। নিখোঁজ রয়েছে আরও ১৫ জন।
চীনের বেসামরিক মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে গত শনিবার এ কথা জানানো হয়েছে।
ওয়েবসাইটে দেওয়া মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এ মাসে শুরু হওয়া বন্যায় নয়টি প্রদেশে এ পর্যন্ত এক কোটি ৭০ লাখ লোক আক্রান্ত হয়েছে। ৪২ হাজার বাড়িঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। আরও এক লাখ ২১ হাজার বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার একর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩০ কোটি ডলার।
এর আগে গত জুন মাসের বন্যায় চীনে প্রায় ৪০০ জন প্রাণ হারায়। ঘরবাড়ি ও ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, চীনের সবচেয়ে বড় নদী ইয়াংজির পানি বর্তমানে বিপৎসীমার প্রায় ১০ ফুট ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

তেল নিঃসরণ বন্ধের নতুন চেষ্টায় বিপি

মেক্সিকো উপসাগরে বিস্ফোরিত তেলক্ষেত্র থেকে তেল নিঃসরণ বন্ধের নতুন চেষ্টা শুরু করেছে ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি)। এবার তারা আগের চেয়েও বড় ও মজবুত ছিপি লাগিয়ে তেলকূপের ছিদ্র বন্ধের অভিযানে নেমেছে।
গত শনিবার তেল নিঃসরণ বন্ধে বড় ধরনের শক্ত ছিপি লাগানোর চেষ্টার প্রথম ধাপেই বিপি আগের লাগানো ছিপিটি সরিয়ে নিয়েছে। এখন পানির নিচে রোবোটের সাহায্যে নতুন করে ছিপি লাগানোর চেষ্টা চলছে।
নতুন ছিপি লাগাতে চার থেকে সাত দিন সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছে বিপি। তার মানে, এই কদিনও অবাধে নিঃসৃত হতে থাকবে তেল।
কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ছিপি লাগানোর পর তেল পড়া বন্ধ হবে।
বিপির তেল অনুসন্ধান ও উৎপাদনবিষয়ক ঊর্ধ্বতন ভাইস প্রেসিডেন্ট নেট ওয়েলস বলেছেন, আগের আর এখনকার ছিপির তফাত হচ্ছে, আগেরটি পুরোপুরিভাবে ছিদ্র বন্ধ করতে পারেনি, কিন্তু এবারেরটা তা পারবে।
মেক্সিকো উপসাগরে তেলকূপ বিস্ফোরণের দুর্ঘটনাটি ঘটে গত এপ্রিল মাসে। এতে নিহত হন ওই কূপের ১১ জন কর্মী। তার পর থেকেই ক্রমাগত কূপটি থেকে গ্যালন গ্যালন তেল নিঃসৃত হচ্ছে। তেলে ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি উপকূলীয় অঞ্চল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এ দুর্ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবেশ বিপর্যয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

গাজা অভিমুখী ত্রাণবাহী জাহাজ মিসরে নোঙর করেছে

ইসরায়েলের হুমকির মুখে গাজা অভিমুখী লিবিয়ার ত্রাণবাহী জাহাজ অ্যামালথিয়া মিসরের এল আরিস বন্দরে নোঙর করেছে। গতকাল রোববার ইসরায়েল ঘোষণা দেয়, জাহাজটি কোনোভাবেই গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।
লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফি পরিচালিত গাদ্দাফি ইন্টারন্যাশনাল চ্যারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের ত্রাণ নিয়ে জাহাজটি গত শনিবার গাজার উদ্দেশে যাত্রা করে। গ্রিসের পোর্ট অব লাভিরো থেকে যাত্রা করা ওই জাহাজে প্রায় দুই হাজার টন খাদ্য, ভোজ্যতেল, ওষুধ ও গৃহনির্মাণের সামগ্রী রয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ৯২ মিটার দীর্ঘ ওই জাহাজে অনেকেই আছেন, যাঁরা ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একাত্ম।
ইসরায়েলি মন্ত্রী গতকাল ইসরায়েলি বেতারে বলেন, ইসরায়েল ত্রাণবাহী ওই জাহাজটি কোনোভাবেই গাজায় প্রবেশ করতে দেবে না। এটি গাজায় প্রবেশ করতে দেওয়া হলে ইসরায়েলের নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়বে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক গাজায় ঢোকার চেষ্টাকে ‘অপ্রয়োজনীয় উসকানি’ বলে মন্তব্য করেন।

কাশ্মীরের অধিকাংশ এলাকা থেকে কারফিউ প্রত্যাহার

ভারত শাসিত কাশ্মীরের অধিকাংশ এলাকা থেকে গতকাল রোববার কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়েছে। রাজ্যে বিক্ষোভ বেড়ে যাওয়ায় ছয় দিন আগে এ কারফিউ জারি করা হয়েছিল। কারফিউ তুলে নেওয়া হলেও বেসামরিক লোকজন হত্যার প্রতিবাদে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ডাকা ধর্মঘটের কারণে গতকাল রাজ্যের অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ ছিল।
মুসলিম-অধ্যুষিত এ রাজ্যে গত মাসে নিরাপত্তা বাহিনী ১৫ জনকে গুলি করে হত্যা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই কিশোর। এর প্রতিবাদে রাজ্যে বিক্ষোভ-সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এ বিক্ষোভ সামাল দিতে গত সপ্তাহে কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরের কিছু এলাকা ছাড়া গোটা কাশ্মীর থেকেই কারফিউ তুলে নেওয়া হয়েছে। আরেকজন পুলিশ কর্মকর্তা মুজাফফর আহমেদ জানান, কাশ্মীর উপত্যকা বর্তমানে শান্ত। দু-একটি ইটপাটকেল নিক্ষেপের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া গোটা রাজ্যের অবস্থাই এখন মোটামুটি ভালো।
গত মঙ্গলবার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর গুলিতে তিনজন নিহত হওয়ার পর শ্রীনগরে কারফিউ জারি করা হয়।
বেসামরিক লোকজনকে নির্বিচারে হত্যার প্রতিবাদে কাশ্মীরের চরমপন্থী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলো গতকাল সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে রাজ্যের অধিকাংশ দোকানপাট, স্কুল-কলেজ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। এ সময় শ্রীনগরের বিভিন্ন রাস্তায় নিরাপত্তা বাহিনীর হাজার হাজার সদস্যকে টহল দিতে দেখা যায়।
টানা দুই বছর স্থগিত থাকার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আগামী সপ্তাহে শান্তি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। কাশ্মীরের সাম্প্রতিক এই বিক্ষোভ শান্তি আলোচনায় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই কাশ্মীরকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কাশ্মীর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দুই দফা যুদ্ধ হয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় মন্ত্রীর অনশন ভাঙালেন প্রেসিডেন্ট

শ্রীলঙ্কার গৃহায়ণমন্ত্রী বিমল বিরাবানসা গতকাল শনিবার আমরণ অনশন ভেঙেছেন। প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে তাঁর অনশন ভাঙান।
দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে জাতিসংঘ তদন্ত প্যানেলের কার্যক্রম বন্ধের দাবিতে কলম্বোয় সংস্থাটির কার্যালয়ের সামনে গত বৃহস্পতিবার থেকে অনশন শুরু করেন মন্ত্রী বিমল বিরাবানসা। গত বছর তামিল টাইগারদের সঙ্গে চূড়ান্ত লড়াইয়ের সময় দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ওঠে।
গতকাল প্রথমে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোতাভায়া রাজাপক্ষে ও পরে প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে মন্ত্রী বিমলকে দেখতে যান। প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে তাঁকে পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান। এর কয়েক মিনিটের মধ্যে মন্ত্রী বিমলকে স্ট্রেচারে করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এ সময় সমর্থকেরা তাঁর পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেন। মন্ত্রীর শুভ কামনা করে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনেরও ঘোষণা দেওয়া হয়।
অনশনের আগে বিমল জাতিসংঘের কার্যালয়ের সামনে সমর্থকদের নিয়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। জাতিসংঘ এই বিক্ষোভকে ‘অপ্রীতিকর’ অভিহিত করে জাতিসংঘের দূতকে প্রত্যাহার করে।
জাতিসংঘের অভিযোগ, শ্রীলঙ্কার সেনারা গত বছরের মে মাসে তামিল টাইগার গেরিলাদের সঙ্গে লড়াইয়ের একেবারে শেষদিকে কমপক্ষে সাত হাজার বেসামরিক তামিলকে হত্যা করে।

মিয়ানমারের নির্বাচনে অংশ নেবে নবগঠিত এনডিএফ

মিয়ানমারের নবগঠিত রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফোর্স (এনডিএফ) সে দেশে এ বছরের আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে। সম্প্রতি গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) ভেঙে গঠিত হয়েছে এনডিএফ। খিন মোং সুয়ের নেতৃত্বে গঠিত দলটির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার এই সিদ্ধান্ত এনএলডির সিদ্ধান্তের বিপরীত।
সু চির নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারের প্রচলিত ধারার গণতন্ত্রপন্থী নেতারা সেখানকার সামরিক শাসকদের জারি করা নতুন আইনের অধীনে এনএলডিকে নিবন্ধন করাতে রাজি হননি। সমালোচকেরা বলছেন, মিয়ানমারে ২০ বছরের মধ্যে অনুষ্ঠেয় প্রথম এই নির্বাচন আসলে সামরিক শাসকদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যেই আয়োজন করা হচ্ছে। এর আগে সর্বশেষ ১৯৯০ সালের নির্বাচনে এনএলডি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সামরিক জান্তা তাদের ক্ষমতা গ্রহণ করতে দেয়নি।
নিজস্ব আইনজীবীর মাধ্যমে দলের এই ভাঙনের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সু চি। গত দুই দশকের বেশির ভাগ সময় গৃহবন্দিত্বের মধ্যে কাটিয়েছেন নোবেল পুরস্কারজয়ী এই নেত্রী।
এনএলডির নেতারা অভিযোগ করেছেন, ভোট পাওয়ার জন্য নবগঠিত এনডিএফ তাদের দলীয় প্রতীক (বাঁশ থেকে তৈরি টুপি) চুরি করেছে। তবে খিন দাবি করেছেন, তাঁদের দলের প্রতীক এনএলডির থেকে আলাদা। কারণ তাঁদের প্রতীকে টুপির ওপর দুটি তারকা রয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, এনএফডি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত রাখবে।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পত্রিকা আহলিন-এর খবরে বলা হয়েছে, নতুন দলটি আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অনুমতি পেয়েছে। নিবন্ধিত আরও ৩৭টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তবে জান্তা সরকার এখনো নির্বাচনের কোনো সময়সূচি ঘোষণা করেনি।
এনএফডির চেয়ারম্যান ড. থান নিয়েইন আশা প্রকাশ করে বলেছেন, নতুন নির্বাচন পরিবর্তন আনবে। সু চির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁকে গণতন্ত্রের একজন সত্যিকারের প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেন নিয়েইন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবসময়ই তাঁর সাহস, বিশ্বাস ও আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাই।’

পাঁচ সদস্যকে র্ভৎসনা ও আর্থিক জরিমানা করল আইসিএবি

দেশে হিসাব পেশা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) পেশাগত অসদাচরণ ও নৈতিকতাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের দায়ে পাঁচ সদস্যকে ভর্ৎসনা ও আর্থিক জরিমানা করেছে।
যেসব সদস্যকে ভর্ৎসনা ও আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে: মেসার্স আতা খান অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার মকবুল আহমেদ, মেসার্স মোহাম্মদ আতা আসলাম অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার এ এস এম আতাউল করিম, আশরাফ উদ্দিন অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার এনামুল কবির, নুরুল আজিম অ্যান্ড কোম্পানির অংশীদার বেগ মোহাম্মদ নুরুল আজিম এবং এ হাফিজ অ্যান্ড কোম্পানির প্রোপ্রাইটর মোল্লা হাফিজুল হক।

ইউনাইটেড এয়ারের শেয়ার লেনদেন আজ শুরু

দেশের পুঁজিবাজারে আজ সোমবার থেকে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের শেয়ার লেনদেন শুরু হতে যাচ্ছে।
পুঁজিবাজারে এটিই হচ্ছে বিমান পরিবহন খাতের কোনো কোম্পানির শেয়ার লেনদেন।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ পুঁজিবাজারে এক কোটি শেয়ার ছেড়ে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। ১০০ টাকা অভিহিত মূল্যের ৫০টি শেয়ার মার্কেট লট নির্ধারণ করা হয়েছে। কোম্পানির আইপিও-প্রক্রিয়ায় এক কোটি শেয়ারের বিপরীতে মোট আট কোটি ৪৪ লাখ শেয়ারের জন্য আবেদন জমা পড়ে। আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পর কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ২০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ২০০৭ সালের ১০ জুলাই যাত্রা শুরু করে।

মাদারীপুরে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ৮১তম শাখা চালু

মাদারীপুরের পুরান বাজারে গতকাল রোববার ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডের ৮১তম শাখা উদ্বোধন করা হয়।
ব্যাংকের অন্যান্য শাখার মতো এটিও শুরু থেকেই গ্রাহকদের অত্যাধুনিক অনলাইন ব্যাংকিং সুবিধা দিচ্ছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইয়াছিন আলী এ শাখার উদ্বোধন করেন।
মো. ইয়াছিন আলী বলেন, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এবং দেশের সর্বত্র এ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ব্যাংক বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ অল্প সময়ের মধ্যে প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবিকাশে আর্থিক সহযোগিতা প্রদানে ব্যাংক এ বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়েছে

চলতি বছরের জুন মাসে চীনের পণ্য রপ্তানি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারসাম্যে উদ্বৃত্তাবস্থা।
এ বছর জুন মাসে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত উন্নীত হয়েছে দুই হাজার কোটি ডলারে, যা এই বছরের ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
জুন মাসে চীনের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৭৪০ কোটি ডলারে, যা গত বছরের জুন মাসের চেয়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ বেশি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীনের এই রপ্তানি ও বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে যে ইউরোপের ঋণসংকট এখানে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি।
বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, চীন সরকার গত মাসে ইউয়ানকে মাার্কিন ডলারের বিপরীতে অধিকতর মুক্তভাবে ওঠানামা করতে দেওয়ার প্রভাবও এতে পড়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলো অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে চীন কৃত্রিমভাবে মুদ্রার মান কমিয়ে রেখে নিজ দেশের রপ্তানিকারকদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

আমেরিকায় স্লিপিং ব্যাগ রপ্তানিতে জিএসপি সুবিধা অব্যাহত থাকবে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিনা শুল্কেই রপ্তানি করা যাবে বাংলাদেশে প্রস্তুত করা ‘স্লিপিং ব্যাগ’। বাংলাদেশি স্লিপিং ব্যাগ রপ্তানিতে জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা অব্যাহত থাকবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘এক্সেল আউটডোর’ নামের একটি কোম্পানির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশি স্লিপিং ব্যাগ রপ্তানিতে জিএসপি সুবিধার ব্যাপারে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। ওবামা প্রশাসনের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে ওই অনিশ্চয়তা কেটে গেছে।
এক্সেল আউটডোর নামক মার্কিন কোম্পানিটি চলতি বছরের শুরুতে ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভে (ইউএসটিআর) এক আবেদনে জানায়, বাংলাদেশি স্লিপিং ব্যাগ একটি টেক্সটাইল পণ্য। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রে এ পণ্য রপ্তানিতে জিএসপি সুবিধা প্রত্যাহার করে নেওয়া হোক।
এরপর ইউএসটিআর জিএসপি সুবিধা পর্যালোচনা করার উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চেষ্টা চলতে থাকে সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেল, বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাসহ (সিইপিজেড) স্লিপিং ব্যাগ কারখানার মালিকেরা এক্সেল ডোরের আবেদনটি নিয়ে পর্যালোচনা করেন। তারপর বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়।
গত ১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এক সিদ্ধান্তে জানায়, বাংলাদেশি স্লিপিং ব্যাগ পণ্যটি জিএসপি সুবিধা প্রাপ্য হবে এবং বিনা শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি করা যাবে।
বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের ৮৮টি কারখানায় স্লিপিং ব্যাগ প্রস্তুত করা হয়। বিভিন্ন ক্যাম্পে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে স্লিপিং ব্যাগ অত্যন্ত জনপ্রিয়। হংকং ও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে স্লিপিং ব্যাগের দুই উদীয়মান রপ্তানিকারক দেশ।
২০০৯ সালে ৭৬ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৫৩২ কোটি ৭০ লাখ টাকার সমপরিমাণ স্লিপিং ব্যাগ আমদানি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তার আগের বছরের আমদানির পরিমাণ ছিল ৯৫ দশমিক ২০ মিলিয়ন ডলার বা ৬৬৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্লিপিং ব্যাগ বাজারের ৯৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে ছয় লাখ ১১ হাজার ৯২৭ ডলার মূল্যের স্লিপিং ব্যাগ, যা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের শূন্য দশমিক আট শতাংশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রপ্তানি ১৬ হাজার ডলার বা শূন্য দশমিক শূন্য দুই শতাংশ।

শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধক দূর করতে কাজ চলছে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের অনেক সুযোগ রয়েছে। কিন্তু নানামুখী শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতার কারণে তা সম্ভব হয়ে উঠছে না।
তবে এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। শিগগিরই তার ইতিবাচক ফল দেখা যাবে।
গতকাল রোববার সচিবালয়ে ভারতের সাবেক জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং রাজ্যসভার সদস্য মণিশংকর আয়ারের নেতৃত্বাধীন ৩১ সদস্যের এক ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান এসব কথা বলেন।
বাণিজ্যসচিব গোলাম হোসেন, ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (আইবিসিসিআই) সভাপতি মাতলুব আহমাদ, ভারতের মার্চেন্টস চেম্বার অব কমার্সের সদস্য মনিষ ঝাঁঝারিয়া এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
ভারতীয় প্রতিনিধিদলটি গত ১০ জুলাই চার দিনের জন্য বাংলাদেশ সফরে এসেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান জানান, স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে যা বাণিজ্য হতো, তা ছিল তাদের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৫ শতাংশ।
নানামুখী শুল্ক ও অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা আরোপের কারণে কমতে কমতে তা পাঁচ শতাংশে নেমে এসেছে।
ফারুক খান বলেন, এই অঞ্চলের বাণিজ্য চলে গেছে অন্য জায়গায়। সম্পর্কোন্নয়নের মাধ্যমে এই বাণিজ্য আরও এবং আবারও সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
মণিশংকর আয়ার বলেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর হলে এই অঞ্চল হবে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল। সে লক্ষ্যেই কাজ করতে হবে।
মণিশংকর আয়ার বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সীমা থাকলেও আমরা অর্থনৈতিক সীমা রাখতে চাই না। আমরা চাই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ বাংলাদেশে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাক।’
বৈঠকে আইবিসিসিআই ও মার্চেন্টস চেম্বার অব কমার্সের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। আইবিসিসিআই সভাপতি মাতলুব আহমাদ ও মার্চেন্টস চেম্বার অব কমার্সের সদস্য মনিষ ঝাঁঝারিয়া এতে স্বাক্ষর করেন।
উল্লেখ্য, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ঘাটতি ছিল ২৫৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এই বছর বাংলাদেশ ভারতে ২৭ কোটি ৬৫ লাখ ডলারের সমপরিমাণ পণ্য রপ্তানি করেছে। আর একই সময়ে ভারত থেকে আমদানি করা হয়েছে ২৮৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পণ্য।
তবে তার আগের বছর অর্থাৎ ২০০৭-০৮ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে রেকর্ড ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল। অবশ্য ওই বছর আমদানিও করেছিল ৩৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারের পণ্য। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ৩০০ কোটি ডলারের ওপরে।
আর ২০০৯-১০ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বাংলাদেশ ভারতে ২৫ কোটি ৭৪ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

বালাককে সমর্থন শোয়েনস্টাইগারের

জার্মানির বিশ্বকাপ অভিযান শেষে এখন বড় প্রশ্ন, অধিনায়কত্বের বাহুবন্ধনী থাকবে কার হাতে? তবে জার্মানির মিডফিল্ডার বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগার প্রশ্নের কোনো যৌক্তিকতাই খুঁজে পাচ্ছেন না। তাঁর সাফ কথা, মাইকেল বালাকই থাকুন জার্মানির অধিনায়ক।
জার্মানি দলের অধিনায়কত্ব নিয়ে বিতর্কটা তৈরি হয়েছে বিশ্বকাপে। নিয়মিত অধিনায়ক বালাক চোটের কারণে ছিটকে পড়ার পর নেতৃত্বের আর্মব্যান্ড দেওয়া হয়েছে ফিলিপ লামকে। স্পেনের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগে জার্মানির বিল্ড পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাম বলেছিলেন, ইচ্ছে করে অধিনায়কত্ব তিনি ছাড়বেন না।
এ নিয়ে কথাবার্তা হয়েছে অনেক। কোচ জোয়াকিম লো দাঁড়িয়েছেন লামের পক্ষে। কাল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে উরুগুয়েকে হারানোর পর বালাকের পক্ষ নিয়ে শোয়েনস্টাইগার বললেন, ‘সেই (বালাক) জার্মানি জাতীয় দলের অধিনায়ক। দলে ফিরলে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ডটাও ফিরে পাবে মাইকেল। ফিলিপ (লাম) মাইকেলের চোটের কারণে অধিনায়কত্ব পেয়েছিল। সে ভালোভাবেই দায়িত্ব পালন করেছে। তবে এক দলে দুই অধিনায়ক থাকার ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়িই হয়ে যায়!’

ভাগ্যের সঙ্গে পেরে উঠিনি: মারউইক

ভাগ্যকে দোষারোপ করা ছাড়া আর কী-ইবা করতে পারেন হল্যান্ড কোচ বার্ট ফন মারউইক। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় নীল হতে হলে হল্যান্ডকে। টানা ছয়টি ম্যাচ জিতে বিশ্বকাপের ফাইনালে এসে আসল ম্যাচটাই কেবল জিততে পারল না টোটাল ফুটবলের জনকেরা। স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে স্বপ্নসাধের অপমৃৃত্যু ঘটার দুঃখবোধ হয়তো ডাচদের তাড়িয়ে বেড়াবে বিশ্বকাপের একটি শিরোপা হাতে না আসা পর্যন্ত।
ফাইনাল শেষে সংবাদ সম্মেলনে হল্যান্ড কোচ বার্ট ফন মারউইক পরাজয়ের জন্য নিজেদের ভাগ্যকেই দোষারোপ করেছেন। যোগ্যতর দল হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের পুরো কৃতিত্ব দিয়েছেন স্পেন দলকে। তিনি বলেছেন, ‘হল্যান্ড যে বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্যন্ত আসতে পারবে—এটাই তো অনেকে ভাবেনি। আমরা ভালো খেলেই বিশ্বকাপ জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত ভাগ্যের সঙ্গে আর পেরে উঠিনি।’
আরিয়েন রোবেনের নিশ্চিত দুটি গোলের সুযোগ হাতছাড়া করাই ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট মনে করেন ডাচ কোচ। তিনি বলেছেন, ‘রোবেন ওই দুটি সুযোগের একটিও যদি কাজে লাগাতে পারত, তাহলে বিশ্বকাপের শিরোপা আমাদের ঘরেই আসত। কিন্তু ভাগ্য রোবেনের সঙ্গে ছিল না, হল্যান্ডের সঙ্গেও ছিল না।’
ফাইনালের রেফারিং নিয়ে দারুণ বিরক্ত মারউইক। তিনি খেলায় মোট ১৪টি হলুদ কার্ড ও একটি লাল কার্ড কিছুতেই মানতে পারছেন না। তিনি মনে করেন, হেইটিঙ্গার লাল কার্ডটিতে রেফারি ওকে লঘু পাপে গুরুদণ্ড দিয়েছেন। তবে দলের পরাজয়ের জন্য তিনি রেফারিকে দায়ী না করেও বলেছেন, ‘ফাইনালের রেফারিংটা ভালো হতে পারত।

মাশরাফিদের কৃতিত্ব দিচ্ছেন স্ট্রাউস

এটাও লেখা ছিল ইয়ান বেলের কপালে! ফিল্ডিংয়ের সময় পায়ে ব্যথা পেয়ে মাঠ ছাড়ার পর যখন বাংলাদেশকে ২৩৬ রানে ইনিংস শেষ করতে দেখলেন, নিশ্চয়ই ভাবেননি সার্জিকাল বুট পরে শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁকেও ব্যাট করতে নামতে হবে। সেই নামাটাও হলো দেখার মতো। রানার এউইন মরগানকে নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠে ঢুকছেন আগের ম্যাচেই অপরাজিত ৮৪ রান করে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়া বেল!
বেল তবু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠে এলেন, শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটা ইংল্যান্ড কিন্তু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়েও জিততে পারল না। শফিউল ইসলামের করা শেষ ওভারে দরকার ছিল ১০ রান। প্রথম দুই বলে ২, ২ করে ৪ রান। তৃতীয় বলেই কট বিহাইন্ড জনাথন ট্রট। বেল একটি বলও না খেলে কোনো রান না করে অপরাজিত, আর ট্রট সেঞ্চুরি থেকে ৬ রান দূরে থাকতে যেকোনো ধরনের ক্রিকেটে বাংলাদেশের কাছে প্রথম হারের সাক্ষী হলেন ম্যাচের ৩ বল বাকি থাকতে।
ইংল্যান্ড অধিনায়ক অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের কথা মানলে এই পরাজয় তাদের প্রাপ্যই ছিল এদিন, ‘ব্যাপারটা খুবই সহজ, আজ (পরশু) আমরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ই ছিলাম না।’ আর বাংলাদেশের কাছে যে একদিন না একদিন হারতেই হবে, সেটাও যেন জানতেন তিনি, ‘কোনো না কোনো দিন তারা আমাদের হারাতই। আমরা শুধু চাইছিলাম, সেটা যত দেরিতে ঘটে। এখন সেটা ঘটে গেছে।’
বাংলাদেশ সিরিজের ঠিক আগের সিরিজটাতেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অনায়াস জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড। পাঁচ ম্যাচ সিরিজের প্রথম তিনটাতেই জয়, শেষ দুই ম্যাচে হেরেও সিরিজ জয় ৩-২-এ। অথচ র‌্যাঙ্কিংয়ের তলানির দিকে পড়ে থাকা বাংলাদেশের বিপক্ষে আজ সিরিজের শেষ ম্যাচটা কিনা সেই ইংল্যান্ডের জন্যই হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই! সিরিজ জিততে এ ম্যাচের আগে ভুল সংশোধন ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছেন না ইংল্যান্ড অধিনায়ক, ‘এখন আমাদের একটাই কাজ। মাঠে নেমে আগের ভুলগুলো শুধরে নিতে হবে।’
সেই ভুলগুলো কী? স্ট্রাউসের মতে, পরশু ব্রিস্টলে তাদের বোলিং ভালো হলেও ব্যাটিং-ফিল্ডিং সন্তোষজনক ছিল না। স্ট্রাউস অবশ্য ব্যর্থতার দায় শুধু নিজেদের ওপরই নিচ্ছেন না, কৃতিত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ দলকেও, ‘ওই রান নিয়েও যেভাবে তারা খেলে গেল, তার জন্য বাংলাদেশ দলকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। ইনিংসের যেকোনো সময়ই তারা উইকেট নিতে পেরেছে, আমাদের ওপর চাপটা ধরে রেখেছে।’
সিরিজের শেষ ম্যাচ আজ হলেও বেলের জন্য সিরিজটা শেষ হয়ে গেছে পরশুই। তাঁর জায়গায় শেষ ম্যাচের জন্য দলে ডাকা হয়েছে রবি বোপারাকে।

‘নতজানু ইংল্যান্ড’

ইংল্যান্ড ফুটবল দলের বিশ্বকাপ-ব্যর্থতায় ইংলিশ সংবাদমাধ্যম স্বমূর্তি ধারণ করে মুণ্ডুপাত করছিল স্টিভেন জেরার্ড, ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডদের। এই সুযোগে খোঁচা দিয়েছিলেন গ্রায়েম সোয়ানও। ইংলিশ স্পিনার বলছিলেন, ফুটবলারদের নয়, ক্রিকেটারদেরই সোনালি প্রজন্ম বলা উচিত। কথাটা ঠিকমতো হজম করার সময় পেলেন না সোয়ান। এর আগেই দেখলেন, তাঁরই ‘সোনালি প্রজন্মের’ সতীর্থরা আত্মসমর্পণ করে বসেছে বাংলাদেশের বিপক্ষে। আর সঙ্গে সঙ্গে সোয়ানের বুঝে ফেলার কথা, ইংলিশ সংবাদমাধ্যম কারও বন্ধু না।
বাংলাদেশের কাছে ৫ রানে ইংল্যান্ডের ‘অবমাননাকর’ পরাজয়ের পরই তোপ দাগা শুরু করে দিয়েছে ইংলিশ সংবাদমাধ্যম। কেউ লিখছে এই পরাজয় ইংল্যান্ডের জন্য অসম্মানজনক, কেউ বলছে আত্মতৃপ্তিতে ভেসে যাওয়া ইংলিশদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা আবার কেউ লিখছে ইংলিশদের ‘অপমানের চূড়ান্ত’ করেছে বাংলাদেশ।
দ্য সানডে টাইমস লিখেছে, ‘ইংল্যান্ড হয়তো এখন নিজেদের ফিল্ডিং, দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিং এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত—এসব বিষয়ে আলোচনা করবে। কিন্তু বাংলাদেশের এই জয়ের পুরো কৃতিত্ব প্রাপ্যই।’
বাংলাদেশের কৃতিত্বটাকে দ্য মেইল বর্ণনা করেছে এভাবে, ‘নতজানু ইংল্যান্ড। আত্মতৃপ্ত ইংল্যান্ড এখন বিব্রত।’ এই পত্রিকাতেই লেখা হয়েছে, ‘লোকে এটাকে বাংলাদেশের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের হার হিসেবে দেখছে। কিন্তু এটা আসলে ইংল্যান্ডের জন্য চূড়ান্ত অপমান।’
দ্য সানডে টেলিগ্রাফ পত্রিকা এই পরাজয়কে ‘অবমাননাকর’ উল্লেখ করে লিখেছে, ‘দুর্দান্ত ফিল্ডিং, স্পিন বোলিং এবং সাফল্যের তীব্র ক্ষুধা দিয়ে জয়টা পেল বাংলাদেশ।’ নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড পরাজিত এই ইংল্যান্ড দলকে ‘ক্লান্ত, মসৃণ, হাতড়ে বেড়ানো একটা দল এবং অলস, শৃঙ্খলাহীন ও কিঞ্চিৎ উদ্ধত দল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘ক্যাচ পড়েছে, রানআউট মিস হয়েছে, ব্যাটসম্যানরা উইকেট ছুড়ে দিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে অ্যান্ড্রু স্ট্রাউসের দল বছরের জঘন্যতম পারফরম্যান্স করল। ইংল্যান্ডের এই ম্যাচে কখনোই জয় প্রাপ্য ছিল না।’
দ্য অবজারভার লিখেছে, ‘রুখে দাঁড়ানো বাংলাদেশের কাছে ইংল্যান্ডের শোচনীয় পরাজয়। ব্রিস্টলের একটি লোকও বাংলাদেশের এই জয়ে অখুশি হননি। কারণ এটা পুরোপুরিই তাদের প্রাপ্য ছিল।’ দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট আবার বাংলাদেশের জয়টাকে দেখছে এভাবে, ‘নায়কদের দল বাংলাদেশ। পাঁচজন বোলার দুটি করে উইকেট নিয়েছেন।’
আর সানডে মিরর লিখেছে, ‘মাশরাফি বিন মুর্তজার ‘‘ব্যাঙ্গার’’রা অসহায় ইংলিশ ব্যাটিংকে বিব্রতকরভাবে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে।’

আজ হোক স্পেনে সিয়েস্তা-ফিয়েস্তার দিন

ইংরেজিতে বলে, ‘অল গুড থিংস কাম টু অ্যান এন্ড’। বিশ্বকাপও শেষ হয়ে গেল। আর শোনা যাবে না অক্লান্ত ঝিঁঝি পোকার কায়দায় ভুভুজেলার মাথা ধরানো প্যাঁ-পোঁ শব্দ। প্রতিটি ম্যাচের শুরুতে বলস্ট্যান্ড থেকে বলটি নিয়ে রেফারির মাঠে প্রবেশের দৃশ্যটি আবার চার বছরের জন্য স্মৃতি হয়ে যাবে। আবার আমাদের চোখ ফিরে আসবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ওপর। বিশ্বকাপ ফুটবলের ঘোর কাটিয়ে এখন হয়তো আস্তে আস্তে জাগ্রত হচ্ছি আরেকটি বিস্ময়কর অনুধাবনের দিকে, আরে তাই তো, বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে ৫ রানে হারিয়ে দিয়েছে যে! গ্রেট! বিশ্বকাপের ডামাডোলে ক্রিকেটে বাংলাদেশের এ কীর্তিও আমরা নিশ্চয়ই অনেকে খেয়াল করছিলাম না। অথচ আমাদের এ অর্জন স্পেনের (সম্ভাব্য) বিশ্বকাপ জয়ের চেয়ে কম কিসে?
হ্যামলেট বলেছিলেন না, উপলক্ষ বড় না ছোট, তা কোনো ব্যাপার নয়, ব্যাপার হলো, যেখানে আত্মমর্যাদার প্রশ্ন জড়িত থাকে সেখানে লড়াই করাটাই হলো মহত্বের লক্ষণ। গতকাল তাই বাংলাদেশের জেতার মধ্যে যেমন মহত্বের ছায়া ছিল, তেমনই ছিল উরুগুয়ের বিশ্বকাপে চতুর্থ হওয়ার মধ্যেও। বিশ্বাস করুন, একেবারে মন চায়নি যে উরুগুয়ে জার্মানির কাছে হারুক। এত দিন ডিয়েগো ফোরলানের খেলায় দেশপ্রেমের ছোঁয়া আমাকেও উজ্জীবিত রেখেছিল।
হঠাৎ মনে পড়ছে, যে ঘটনাটির কারণে আমি বিশ্ব ফুটবলের দিকে আগ্রহী হয়ে পড়ি, সেটা ঘটেছিল ১৯৮০ সালে।
উরুগুয়ের রাজধানী মন্টেভিডিওতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তী প্রতিযোগিতা। তখন বাংলাদেশে সাপ্তাহিক ছুটি ছিল রোববার। প্রতি রোববার বিটিভি ঠিক বেলা ১১টায় ওই প্রতিযোগিতার রেকর্ড করা এক একটি খেলা দেখাত। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। কেন জানি না, চ্যাপম্যানের অনুবাদের মাধ্যমে গ্রিক মহাকবি হোমারকে জানতে পেরে কবি কিটসের মধ্যে যে শিহরণ জেগেছিল, আমার মনে ওই ঘটনা যেন সে রকমই অনুভূতি জাগিয়েছিল। ‘তুমি যে সুরের আগুন লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে’!
সেই থেকে উরুগুয়ে আমার একটি প্রিয় দল।
ফোরলানের শেষ মিনিটের ফ্রি-কিকটি যদি গোলবারে না লেগে ঢুকে যেত! কিন্তু বিধি বাম। জার্মানির বিজয়ের কারণে একটা অতৃপ্তির কাঁটা খচখচ করছে। মুলার ছেলেটি এসে ঠিকই একটা গোল করে ফেলল। জায়গা করে নিল গোল্ডেন বুট কাড়ার প্রতিযোগিতায়—ফোরলান, ভিয়া আর স্নাইডারের সঙ্গে। মুলারের উপস্থিতি যদি জার্মানিকে জিতিয়ে দেয়, তা হলে এ অনুমান কি করতে হবে যে সেদিন মুলার থাকলে স্পেন জিততে পারত না? জানি না। কী হলে কী হতো এর উত্তর জীবনে যেমন মেলে না, খেলায়ও না। অবশ্য ক্লোসা, পোডলস্কি আর লামকে ছাড়াও জার্মানি যে ম্যাচটা বের করে নিয়েছে, তাতে তাদের শক্তিটা বোঝা যায়।
আবার তাদের নিয়ে খেলেও যে স্পেনের সঙ্গে পারেনি, তাতে স্পেনের শক্তিও নিশ্চয়ই বোঝা যায়।
আজকে স্পেনের লাল জার্সির সঙ্গে হল্যান্ডের কমলা জার্সির লড়াই। জার্মান জ্যোতিষী অক্টোপাস পল স্পেনের পক্ষে রায় দিলেও সিঙ্গাপুরের টিয়াপাখিটা ঠোঁট দিয়ে যে খামটি তুলেছে, তার ভেতরে আছে হল্যান্ডের নাম। অতিলৌকিক জগৎ থেকে একটা সংঘর্ষের পূর্বাভাসই পাচ্ছি। সেটাই তো সবাই চায় ফাইনাল ম্যাচে। মাঠের ভাষায় বললে, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই আশা করা যায়। তবে রোবেনকে আটকাতে গিয়ে স্পেন যেন ব্রাজিলের ভুলটা করে না বসে। ব্রাজিল রোবেনকে নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে অন্য ডাচ খেলোয়াড়েরা অনেকটা ফাঁকা মাঠ পেয়ে যান।
আজকেও রোবেন সে কৌশলটা নেবেন মনে হয়। প্রতিটি ট্যাকলের সময় ছলচাতুরী করে মাটিতে ঝাঁপ দেবেন আর ইংলিশ রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েব সেটি বুঝতে না পারলে ফাউলও আদায় করে নেবেন।
ইংরেজ এই সাবেক পুলিশ অফিসার রেফারিকে নিয়ে স্পেন একটু ভয়ে আছে বলে খবর এসেছে। ২০০৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়ন প্রতিযোগিতার সময় তিনি অস্ট্রিয়া-পোল্যান্ডের খেলায় অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি দিয়ে পোলিশ সমর্থকদের কাছ থেকে মৃত্যু পরোয়ানা পেয়েছিলেন।
পরে তাঁর ওপর একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয় কিল দ্য রেফারি নামে। ওই ছবি সম্পর্কে ওয়েবের মন্তব্য হলো, ‘আমরা রেফারিরা ছুরির ফলার ওপরে বাস করি।’ এর মধ্যে ফুটবল গুরু ইয়োহান ক্রুইফ খবর দিয়েছেন, যদিও তিনি একজন ডাচ কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকবে স্পেনের কাছে। কারণ স্পেন আজকে যে অবিরাম বলকে অধিকারে রাখার শিল্পে মেতেছে, সেটি তিনিই বার্সেলোনা ক্লাবে খেলার সময় প্রবর্তন করেছিলেন।
আর আমার কেন স্পেনের ফিয়েস্তা বা উৎসবে যোগ দিতে ইচ্ছা, তারও একটা কারণ আছে।
নিজের ছোট ভাইয়ের বউ স্প্যানিশ, কাজেই তারা তালুইয়ের দেশ। সেই সূত্রে একবার স্পেনে গিয়ে দেখি, তারা আমাদের মতোই হাত নেড়ে নেড়ে জোরে জোরে কথা বলে, যখন-তখন খেতে ভালোবাসে, আর নিয়ম করে দিবানিদ্রা দেয়, যার নাম হলো সিয়েস্তা।

যেখানে এগিয়ে জার্মানি

বিশ্বকাপের দলীয় রেকর্ডগুলোতে ব্রাজিলকে টেক্কা দিতে পারে একমাত্র জার্মানিই। সবচেয়ে বেশি পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন, সবচেয়ে বেশি জয় (৬৭) ও গোল (২১০) ব্রাজিলের। জার্মানি খেলেছে সবচেয়ে বেশি সেমিফাইনাল (১২) ও ফাইনাল (৭)। এই বিশ্বকাপেই সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডে জার্মানি টপকে গেছে ব্রাজিলকে।
জার্মানির রেকর্ডের তালিকায় যোগ হলো আরেকটি অধ্যায়। বিশ্বকাপ ইতিহাসে টানা দ্বিতীয়বার তৃতীয় হওয়া একমাত্র দল এখন জার্মানিই। সবচেয়ে বেশিবার তৃতীয় হওয়ার রেকর্ডটা আগে থেকেই ছিল জার্মানদের। পরশু সেটির পরিধি বাড়ল। জার্মানি চারবার তৃতীয় হয়েছে।
রেকর্ড বইয়ে ১৯ বিশ্বকাপের প্রতিটিরই তৃতীয় হওয়া দলকে খুঁজে পাওয়া যাবে। তবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ হয়েছে ১৭টি। প্রথম ও চতুর্থ বিশ্বকাপে ছিল না কোনো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। ১৯৩০ বিশ্বকাপের তৃতীয় দলকে বের করতে গলদঘর্ম হতে হয়েছে ফিফাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুগোস্লাভিয়া, দুদলই সেমিতে হারে ৬-১ গোলে। গ্রুপ পর্বে দুদলই পেয়েছিল ৪ পয়েন্ট করে, গোলও করেছিল সমান ৬টি করে। শেষে যুক্তরাষ্ট্রকে তৃতীয় ঘোষণা করা হয় কোনো গোল না খাওয়ায়। ১৯৫০ বিশ্বকাপে কোনো ফাইনাল ছিল না। প্রাথমিক রাউন্ডে ৪ গ্রুপের সেরা দল নিয়ে লিগভিত্তিক চূড়ান্ত রাউন্ড হয়েছিল সেবার। চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে, তৃতীয় সুইডেন।
পাঁচবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলে চারবারই জিতেছে জার্মানি। উরুগুয়ে এ নিয়ে তিনবার খেলল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ, হারল তিনবারই। তিনবার খেলেছে ফ্রান্সও, জিতেছে দুবার। দুবার তৃতীয় হয়েছে সুইডেনও। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে বুলগেরিয়াকে ৪-০ গোলে হারিয়ে পাওয়া সুইডেনের জয়টা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়। এবার জার্মানির আগে টানা দুবার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলেছিল ব্রাজিল (১৯৭৪, ১৯৭৮) ও ফ্রান্স (১৯৮২, ১৯৮৬)।