Friday, October 30, 2015

ব্যক্তি আসবে-যাবে, দলে প্রভাব পড়বে না : মির্জা ফখরুল

ব্যক্তি আসবে-যাবে, কিন্তু এদে দলে প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ শুক্রবার দুপুরে সিলেটের শাহ পরান মাজার এলাকায় দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট সমশের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি একটি বিশাল দল, তিনবার ক্ষমতায় ছিল। ৩৫ বছর ধরে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। এখানে হাজার হাজার নেতা তৈরি হয়। একজন মানুষ চলে গেলে তেমন ক্ষতি হয় না।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, বিএনপি জিয়ার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়নি। এটা উনার ব্যক্তিগত চিন্তা। এ বিষয়ে আমি কোনো কমেন্ট করব না। তবে দল জিয়ার আদর্শেই পরিচালিত হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিএনপিতে কোনো ভাঙন নেই। বিএনপি ঐক্যবদ্ধ। প্রতিপক্ষ হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতারা এ ধরনের কথা বলতেই পারে।
আজ অনেকটা আকস্মিকভাবেই স্ত্রী রাহাত আরা বেগমকে নিয়ে মাজার জেয়ারত করতে সিলেটে আসেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুপুর পৌনে একটার একটি ফ্লাইটে সিলেট পৌঁছান তিনি। প্রথমে হজরত শাহজালাল (রহ.) এর মাজার জেয়ারত করেন। পরে হজরত শাহ পরান (রহ.) এর মাজার জেয়ারত শেষে তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। বিকেলের দিকে জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সাথে তার জরুরি বৈঠক করার কথা রয়েছে।

অদম্য মেধাবীদের অপরাজেয় দেশ by আনিসুল হক

ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবীদের
সংবর্ধনা আর বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে মেধাবীরা
বাংলাদেশ নিয়ে আমার আশা যায় না। ২০ বছর পরের বাংলাদেশ যে একটা আলোকোজ্জ্বল ঝলমলে দেশ হবে, এই বিষয়ে আমি শতকরা ৯৯ ভাগ নিশ্চিত। আর আমার এই আশার মূলে আছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। এক এক জন মানুষ কী কাণ্ডটাই না করছেন!
৮০-৮৫ জন কিশোর-তরুণ এসেছিল গতকাল। ঢাকার কারওয়ান বাজারে সিএ ভবনের ১০ তলার মিলনায়তনে। ব্র্যাক ব্যাংক-প্রথম আলো ট্রাস্ট অদম্য মেধাবীদের সংবর্ধনা আর বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিল তারা। তারা এসেছে দেশের নানা প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। কেউ সাতক্ষীরা থেকে, কেউ নাচোল থেকে, কেউবা এসেছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী থেকে। তাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প নিয়ে উপন্যাস লেখা যায়। বাবা অসুস্থ। মা এ–বাড়ি ও–বাড়ি কাজ করেন। মেয়ের পড়াশোনা বুঝি বন্ধ হয়ে যায়। মেয়ে ভালো ছাত্রী। ক্লাস ফাইভের পরে উপবৃত্তি পায়। বন্ধুরা সহযোগিতা করে। নিজে টিউশনি শুরু করে। সেই মেয়ে মাধ্যমিকে পেয়েছে জিপিএ-৫।
কিংবা বাবা জেলে। পড়ার খরচ জোগাড় করতে ছেলে চলে যায় নদীতে। মাছ ধরে। দিনের অনেকটা সময় তার কাটে নদীতে। তারপরও ছেলে মাধ্যমিকে পায় জিপিএ-৫।
একে তো দারিদ্র্য, তার মধ্যে দুই চোখে আলো নেই। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সে বলে, প্রথমে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম না। পরে বুঝতে পারলাম পড়াশোনার মূল্য। কষ্ট করে হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া চালিয়ে যাই। সে বলে, প্রতিবন্ধীদের পড়ার খরচ অনেক বেশি লাগে।
এরা হার না-মানা অদম্য মেধাবী। ৫৫ জন এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের বৃত্তি দিল ব্র্যাক ব্যাংক এবং প্রথম আলো ট্রাস্ট। আর দুই বছর আগে থেকে বৃত্তি পেয়ে আসছে, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় আবারও জিপিএ-৫ পেল, এমন ৩০ জনকে আবারও বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে।
এই ছেলেমেয়েরা কেবল মেধাবী নয়, দুর্দমও। এবং প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। এস আই টুটুল যখন মঞ্চে উঠলেন, তারা চিৎকার করে উঠল—ধ্রুবতারা, ধ্রুবতারা। ধ্রুবতারা নামের গানটা ধরলেন টুটুল, সবাই তাঁর সঙ্গে গেয়ে উঠল একযোগে।
শিক্ষা এদের পাল্টে দিয়েছে। একজনের বাবা দিনমজুর, সে মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে আবারও জিপিএ-৫ পেয়েছে উচ্চমাধ্যমিকে, ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে বুয়েটে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষের সামনে স্পষ্ট সুন্দর ভঙ্গিমায় কথা বলল, একটুও জড়তা নেই, একটু ভয়ও এরা পায় না মঞ্চকে, মাইক্রোফোনকে!
বাংলাদেশের মানুষের এই অবিনাশী আত্মায় আস্থা রাখতেই হয়। বটগাছের বীজ যেমন পাকা ভবনের দেয়ালে পড়লেও অঙ্কুরিত হয়, মাথা তুলে দাঁড়ায়, বাংলাদেশের মানুষও তেমনি, একটুখানি পরিসর দিলেই ডালপালা মেলে ধরতে পারে। একটুখানি শিক্ষা, একটুখানি প্রশিক্ষণ। তরুণ ক্রিকেটার মুস্তাফিজকে যেমন তৈরি করে সাতক্ষীরার সুন্দরবন ক্রিকেট একাডেমি। নামেই একাডেমি। আসলে তো একটা ক্রিকেট ক্লাব, মফস্বল শহরে যেমন হয়! কিন্তু বিকেএসপির মতো প্রতিষ্ঠান কত খেলোয়াড়ই না তৈরি করছে।
আমরা কয়েকজন অদম্য মেধাবীর কাহিনি মঞ্চের মাইক্রোফোনে শুনি। একটা বিষয় অভিন্ন: স্কুলের বৃত্তি, উপবৃত্তি এদের অনেকটাই কাজে লেগেছে।
আমরা আমাদের বর্তমান নিয়ে তৃপ্ত নই, কিন্তু বর্তমানের ১০০টা সূচক আমাদের আশাবাদী করে তোলে ভবিষ্যৎ নিয়ে। ভবিষ্যৎ ভালো হবে বলে বর্তমানের লড়াই থেমে থাকবে না বাংলাদেশের কোটি ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার ছেলেদের চেয়ে বেশি। হাজার হাজার ছেলেমেয়ে জিপিএ-৫ পায়। ২০ বছর পরে বাংলাদেশের কৃষক হবে শিক্ষিত কৃষক, শ্রমিক হবে শিক্ষিত শ্রমিক।
সেই বাংলাদেশ কী অপরূপ হয়ে উঠবে!
এখনই আমাদের কৃষকেরা আশ্চর্য রকমের কাণ্ডকারখানা করে দেখিয়েছেন। খাদ্য উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। ডিম, দুধ, মাছ, সবজি চাষে বিপ্লব ঘটে গেছে। এখন ফলও ফলছে বেশি। বিপ্লব ঘটে গেছে গার্মেন্টস শিল্পে। বিপ্লব ঘটে গেছে অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সপ্রাপ্তিতে। এই মানুষগুলোকে একটুখানি প্রশিক্ষণ দিলে তারা হয়ে উঠবে দক্ষ শ্রমিক। এখন প্রায় এক কোটি বাংলাদেশি বিদেশে আছে। ২০ বছর পরে সাধারণ হিসেবেই প্রবাসীর সংখ্যা হবে চার কোটি। টাকার কোনো অভাব থাকবে না। কেউ নিরক্ষর থাকবে না। নতুন প্রযুক্তি, চিন্তা, জীবনধারা গ্রহণে বাংলাদেশের মানুষের কোনো তুলনা হয় না। এই দেশের মানুষের দুই গুণ: সহিষ্ণুতা আর গ্রহিষ্ণুতা। তারা সইতে পারে, আর গ্রহণ করতে পারে।
কাজেই ১০ বছরের মধ্যেই আমরা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হব। ২০ বছর পরে বাংলাদেশ হবে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশ, শতভাগ শিক্ষিত মানুষের দেশ। সেই দেশে সুশাসন আসতে বাধ্য। পুঁজি নিজের স্বার্থে নিজেকে পাহারা দেবে, তখন তার দরকার হবে আইনের শাসন, দরকার হবে গণতন্ত্র আর মানবাধিকার, দরকার হবে আইনশৃঙ্খলা। ওই দেশে যানজট থাকতেই পারবে না। কারণ, তখন আমাদের সামর্থ্য থাকবে, অর্থনৈতিক সামর্থ্য আর প্রযুক্তিগত সামর্থ্য। বড়লোকেরা গাড়ি নিয়ে বেরোতে চাইলে তাদের তো রাস্তাও লাগবে।
দুটো দুশ্চিন্তা অবশ্যই খুবই বাস্তব। একটা হলো, শিক্ষার মান। গতকালের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদও জোর দিলেন মানসম্মত শিক্ষার ওপর।
আরেকটা বিষয় হলো, পরিবেশের ওপরে উন্নয়নের বিরূপ প্রতিক্রিয়া। আমাদের জমি কম, মানুষ বেশি। উন্নয়নের পাগলা ঘোড়া ছুটতে শুরু করলে বন-জঙ্গল-নদী-মাটি লন্ডভন্ড করে ফেলে। কোনো নীতি-নৈতিকতা সুবচন সে মানতে চায় না।
বিদেশের মাটিতে ২০ বছর আগে যাওয়া আমাদের মানুষেরা এখন ভালো করছেন। তাঁদের নিজেদের বাড়ি হয়েছে, যিনি জীবন শুরু করেছিলেন হোটেলে কাজ করার মাধ্যমে, আজ তিনি নিজেই হোটেলের মালিক। তেমনিভাবে গ্রামগঞ্জে মানুষের মনে তৈরি হয়েছে আশার জমিন।
সম্প্রতি আমার এক বন্ধু গিয়েছিল উত্তরবঙ্গ সফরে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষের মধ্যে ইতিবাচক কী দেখেছ? সে বলেছে, মানুষের মনে কোনো অভিযোগ নেই। জিজ্ঞেস করলে বলে, ভালো আছি। এর কারণ, সবার ছেলেমেয়ে স্কুলে যায়, সবাই দিনবদলের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ হয়ে উঠেছে।
তার মানে এই নয় যে খারাপ কিছু ঘটছে না। এক হাজারটা খারাপের উদাহরণ আমরা দিতে পারব। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সমস্যা থেকে শুরু করে মাদকের সমস্যা। মানুষ যে বিপজ্জনক পথে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টায় মারা পড়ছে, সেটাই তো বলে দেয়, দেশের অবস্থা এখনো অত ভালো নয়। কিন্তু নেতির মধ্যেও আমি ইতি খুঁজে পাই। এই যে মানুষের মরিয়া প্রচেষ্টা, নিজের ভাগ্য বদলের, পরিবারের অবস্থা উন্নয়নের, সেখানেই নিহিত রয়েছে বাংলাদেশের সাফল্যের বীজ। এখানেই আসে সুকান্তের কবিতা, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করে আমরা বাঁচব। সারাটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আমরা জাতির ভাগ্যের বদল ঘটাব। ‘বঙ্গমাতা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যে বলেছিলেন, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি, তার কারণ স্নেহার্দ্র বঙ্গভূমি তার সন্তানদের চিরশিশু করে আঁচলে বেঁধে রাখে। দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে লড়াই করে বাঁচে না। এখনকার বাংলাদেশের মানুষেরা সেই দুর্নাম ঘুচিয়েছে।
এখন বাংলাদেশ হচ্ছে সম্ভাবনার দেশ। একটা মানুষ একটা অনন্ত সম্ভাবনা। ১৬ কোটি মানুষ ১৬ কোটি সম্ভাবনা।
আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে মোম আছে। সলতে আছে। সলতেটায় অগ্নিসংযোগ করার অপেক্ষা মাত্র। শিক্ষা হলো সেই আগুন। একেকটা হৃদয় আলোক শিখা হয়ে জ্বলে উঠবে। আর একটা মোমবাতি থেকে জ্বালানো যায় ১০০টা মোমবাতি। একটা হৃদয় আলোকিত হলে তার প্রভাবে আলোকিত হবে তার চারপাশ।
আমি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই, সারা বাংলাদেশের কোটি হৃদয়ে আলো জ্বলছে। অনন্ত নক্ষত্রবীথির মতো আলোয় আলোয় ঝকমক করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এই দেশের হার না-মানা মানুষেরা আগুনের পরশমণি প্রজ্বলিত করেছে টেকনাফে, তেঁতুলিয়ায়, রূপসায়, পাথুরিয়ায়।
আমরা আমাদের বর্তমান নিয়ে তৃপ্ত নই, কিন্তু বর্তমানের ১০০টা সূচক আমাদের আশাবাদী করে তোলে ভবিষ্যৎ নিয়ে। ভবিষ্যৎ ভালো হবে বলে বর্তমানের লড়াই থেমে থাকবে না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মধ্যম আয়ের দেশ আর স্বল্পোন্নত দেশের মানুষের লড়াইয়ের রকমটা এক হয় না। এখন আমাদের লড়াই সুশাসনের জন্য, উন্নত মানের জন্য। কবিকে আরেকটু ভালো কবিতা লিখতে হবে, শিল্পীকে আরেকটু ভালো শিল্প রচনা করতে হবে। শিক্ষা আরেকটু মানসম্পন্ন করতে হবে, চিকিৎসাব্যবস্থা, যোগাযোগব্যবস্থা, মানবাধিকার, আইনশৃঙ্খলা তথা গভর্নেন্স আরেকটু উন্নত করতে পারতে হবে।
অনেক দিন ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্র ভ্রমণ শেষে আমরা দূরে দেখছি সবুজ দ্বীপ। মারায়া কেরির একটা গান আছে, দেয়ার ক্যান বি মিরাকলস হোয়েন ইউ বিলিভ। তাতে বলা হয়েছে, বহু রাত প্রার্থনা করেছি, বৃথাই, কোনো আশা ছিল না, কিন্তু এখন আমরা জানি আশা আছে। বিশ্বাস রাখতে হবে যে আমরা পারব, এই কথা ভেবে আমরা বিশ্বাস রেখে পথ হেঁটেছি, এখন আমরা প্রমাণ পাচ্ছি যে আমরা পারব। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস তাঁর গুরু উইলিয়াম ফকনারকে উদ্ধৃত করে যা বলেছিলেন, সেটা আমি এই কলামে অনেকবার বলেছি, আবারও বলি—মানুষের পরাজয় মেনে নিতে আমি অস্বীকার করি। মানুষের পরাজয় নেই, তা এ জন্য নয় যে তার ভাষা আছে, তা এ জন্য যে তার আত্মা আছে।
বাংলাদেশের মানুষের আছে অপরাজেয় আত্মা, বাংলাদেশের মানুষেরও পরাজয় নেই। ৮০ জনের বেশি অদম্য মেধাবীর সঙ্গে মাহমুদুজ্জামান বাবু যখন বাংলার গান গাইছিলেন, যখন মেধাবীরা এস আই টুটুলের ধ্রুবতারা গাইছিল একযোগে, তখন আমিও দেখতে পাচ্ছিলাম একটা ধ্রুবতারা—ভালোবাসার ধ্রুবতারা—বাংলাদেশের জয়।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

সতর্ক অবস্থানে আওয়ামী লীগ by জাকির হোসেন লিটন

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান সমশের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগসহ দলটির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। রাজনীতির গতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে তার ব্যাপক বিচার-বিশ্লেষণ চলছে সরকারের ভেতরে। এসব ইস্যুতে আওয়ামী লীগের নেতারা প্রকাশ্যে সমালোচনামূলক নানা বক্তব্য দিলেও পরিস্থিতির ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, সমশের মবিন চৌধুরীর হঠাৎ অবসরের ঘোষণায় আপাতদৃষ্টিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বেশ ফুরফুরে মনে হলেও নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি খুব সতর্কভাবে দেখছেন। দেশের গুমোট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো মেরুকরণ হচ্ছে কি না তা নিয়ে চিন্তিত তারা। বিশেষ করে রাজনীতিতে কোনো মেরুকরণ হলে তার সাথে আওয়ামী লীগের কোনো প্রভাবশালী নেতা সম্পৃক্ত থাকছেন কি না বিভিন্ন মাধ্যমে তার ওপর নজর রাখছেন দলটির নীতিনির্ধারকেরা। তবে লন্ডন সফররত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দেশে ফিরলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে ধারণা করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসনের লন্ডন সফরকে কড়া নজরদারিতে রেখেছে সরকার। বিএনপির পক্ষ থেকে এ সফরকে নিছক পারিবারিক সফর বলা হলেও বিএনপির দলীয় রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে এ সফরকে ‘সন্দেহ ও ষড়যন্ত্রের’ চোখে দেখছেন ক্ষমতাসীনরা। সে জন্য পারিবারিক সফরের কথা বলে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও গত ২০ সেপ্টেম্বর লন্ডন যান। পরে নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের ৭০তম অধিবেশনে যোগ দিয়ে ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পরিবারের সদস্যদের সাথে দেখা করতে লন্ডন যান।
সরকার ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মহলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামই নন; খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরকালীন সরকারের অন্তত ডজনখানেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা সরকারি ও বেসরকারি কাজে দেশের বাইরে অবস্থান করেন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী তারানা হালিমও লন্ডন সফর করছেন। সরকারি কাজে বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নেয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তারা সেসব দেশের প্রতিনিধিদের অবহিত করেছেন।
জানা গেছে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চোখের ডাক্তার দেখাতে লন্ডন গেলেও তার এ সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। শুধু তাই নয়, খালেদা জিয়ার সফরের সময় বিএনপির প্রভাবশালী অনেক নেতার লন্ডনে অবস্থানকে আরো গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, দীর্ঘ আট বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এখন সঙ্কট ও দুরবস্থার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। তাই দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি ক্ষমতায় যেতে হলে অনেক ইস্যুই খালেদা জিয়া লন্ডনে বসে নিষ্পত্তি করতে পারেন বলে ধারণা করছেন তারা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন আদায়ই বিএনপির লন্ডন এজেন্ডা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সে জন্য খালেদা জিয়ার লন্ডন থেকে ফিরতে বিলম্ব, দেশে হঠাৎ করেই বিদেশী নাগরিক হত্যা, হোসনি দালানে বোমা হামলা এবং সর্বশেষ বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সমশের মবিন চৌধুরীর দল থেকে পদত্যাগের বিষয়টিকে খুব সতর্ক দৃষ্টিতে দেখছেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান লন্ডনে বসে ষড়যন্ত্র করে সরকার পতন ঘটানোর নীলনকশা আঁকছেন, এটা তারা সফল করতে পারবেন না।
সমশের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ সম্পর্কে তিনি বলেন, বিএনপির ধ্বংসাত্মক রাজনীতির কারণে বিরক্ত হয়েই তিনি পদত্যাগ করেছেন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। তাই বিএনপির দেশপ্রেমিক ও বিবেকবান নেতারা অচিরেই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের প্রতি অনাস্থা দিয়ে বিএনপি থেকে বেরিয়ে আসবেন।
আওয়ামী লীগের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, খালেদা জিয়া দেশের জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত ও পরিত্যক্ত হয়ে দেশ ও দেশের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেই লন্ডন গেছেন। তারই অংশ হিসেবে দেশে বিদেশী নাগরিক হত্যা ও হোসনি দালানে বোমা হামলা করা হয়। সেটি ইতোমধ্যেই বেরিয়ে এসেছে। এসব অপকর্মের কারণে সমশের মবিন চৌধুরীও দল ছেড়েছেন। আওয়ামী লীগ সব সময় সতর্ক রয়েছে। দেশের জনগণকে সাথে নিয়ে তাদের দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করা হবে।

সিরিয়া সঙ্কট সমাধানে পাঁচ জাতি পরিকল্পনা by জিমি কার্টার

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে আমি চিনি যখন তিনি লন্ডনে কলেজের ছাত্র তখন থেকে। ক্ষমতায় আসার পরও তার সাথে আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছি। মূলত যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুরোধেই তার কাছে গিয়েছি আমি। ওই সময় কূটনৈতিক বিরোধের জন্য দামেস্ক (সিরিয়ার রাজধানী) থেকে আমাদের (যুক্তরাষ্ট্র) রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
বাশার এবং তার বাবা হাফিজ আল আসাদ (সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ওই সময় একটি নীতি মেনে চলতেন, তারা আমেরিকান দূতাবাসের কোনো কর্মকর্তার সাথে কথা বলতেন না। তবে আমার সাথে আলোচনা করতেন। আমি লক্ষ করেছি, বাশার কখনোই তার কোনো অধস্তনের কাছ থেকে পরামর্শ বা তথ্য চাইতেন না। চরিত্রগতভাবেই তিনি অত্যন্ত জেদি। মানসিকভাবে তার পক্ষে নিজের মধ্যে পরিবর্তন আনা প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে যখন তিনি চাপের মধ্যে থাকেন।
২০১১ সালের মার্চ মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার আগে নানা জাতিগোষ্ঠী আর ধর্মের মানুষের পাশাপাশি হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে বাস করার একটি চমৎকার নজির তৈরি করেছিল সিরিয়া। দেশটিতে যেমন আরব, কুর্দি, গ্রিক, আরমেনীয় ও আসিরীয়রা বাস করেন তেমনি থাকেন খ্রিষ্টান, ইহুদি, শিয়া, সুন্নি ও আলাওয়াতিরা। ১৯৭০ সাল থেকেই আসাদ পরিবার দেশটির ক্ষমতায় রয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম-গোত্রের এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিয়ে একসময় তারা রীতিমতো গর্ব বোধ করতেন।
সিরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে যখন আন্দোলন শুরু হয়, গোড়ার দিকে প্রেসিডেন্ট বাশারের মনে হয়েছিল তার ‘বৈধ’ সরকারকে উৎখাত করতেই এই অবৈধ বিপ্লব। তিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে শক্তি প্রয়োগ করে এই আন্দোলন স্তব্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নানা জটিল সমীকরণের কারণে তিনি সেনাবাহিনী, খ্রিষ্টান, ইহুদি ও শিয়া মুসলমানদের সমর্থনও পেয়ে যান। এই গোষ্ঠীগুলোর মূল আশঙ্কা ছিল, বাশারকে সরালে কট্টরপন্থী সুন্নি মুসলমানেরা ক্ষমতা দখল করবে। ফলে বাশারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়ে।
আশির দশকের গোড়া থেকেই কার্টার সেন্টার সিরিয়ার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। ওয়াশিংটনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথেও এ নিয়ে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান হয় আমাদের। কার্টার সেন্টার বরাবরই এই দ্রুত বাড়তে থাকা সঙ্ঘাতের (সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ) একটি রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছে।
আর যুক্তরাষ্ট্র সমাধান চেয়েছে বাশারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। কার্টার সেন্টারও তখন থেকেই এর বিরোধিতা করেছে। যদিও তা ছিল গোপনে। গত চার বছরে বাশারকে সরিয়ে দেয়ার মতো সে রকম কিছু ঘটেনি। বরং পুরো বিষয়টি আরো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান এবং আলজেরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাখদার ব্রাহিমিকে জাতিসঙ্ঘের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে সিরিয়া সঙ্কট সমাধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট বাশার প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং অন্য দেশগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ না হয়ে পরিত্যক্ত হয়।
এ বছরের মে মাসে ‘মুরব্বি’ হিসেবে পরিচিত বিশ্ব নেতৃবৃন্দের একটি দল মস্কো সফর করে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়েভগেনি প্রিমাকভ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারগেই ল্যাভরভ এবং নানা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি সিরিয়া সঙ্কট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কারনেজিয়া সেন্টারের মস্কো শাখার বিশেষজ্ঞরাও উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় রাশিয়ার সাথে আসাদ সরকারের দীর্ঘ দিনের সুসম্পর্কের বিষয়টি উঠে আসে। একই সাথে বলা হয়, রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ হলো সুন্নি মুসলমান। ফলে দেশটিতে ইসলামিক স্টেটের (সুন্নিপন্থী জঙ্গি গোষ্ঠী) উত্থানের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। পরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের কাছে আমি তার প্রেসিডেন্ট বাশারকে সমর্থনের কারণ জানতে চাই। পাশাপাশি এ বছরই সিরিয়ার দুইটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রতিনিধির সাথে তার আলোচনার বিষয়েও জানতে চাই। তিনি জানান, অগ্রগতি খুব সামান্যই। তার মতে, এই সঙ্কটের সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সাথে ইরান, তুরস্ক ও সৌদি আরবকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। এই দেশগুলো মিলে একটি সমন্বিত শান্তি পরিকল্পনা তৈরি করবে। তার বিশ্বাস, ইসলামিক স্টেট বাদ দিয়ে সিরিয়ার বাকি পক্ষগুলো এই পরিকল্পনা মেনে নেবে। প্রসঙ্গত ইরান ও রাশিয়া প্রেসিডেন্ট বাশারের সমর্থক। অন্য দিকে বাকি তিনটি দেশ বিরোধীদের সমর্থন করে। এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট পুতিনের অনুমোদন পাওয়ার পর আমি বিষয়টি ওয়াশিংটনকে জানাই।
তিন বছর ধরে কার্টার সেন্টার সিরিয়ার রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত নানা গোষ্ঠী, সশস্ত্র বিরোধী গ্রুপগুলোর নেতৃবৃন্দ, জাতিসঙ্ঘের কূটনীতিক এবং ইউরোপের সাথে এই সঙ্কটের একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে কাজ করে যাচ্ছে। তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণা চালাচ্ছে কার্টার সেন্টার। এ গবেষণায় বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠীর অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এই গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সিরিয়ার কোনো পক্ষই সামরিকভাবে এই সমস্যার ইতি টানতে সক্ষম নয়।
সম্প্রতি রাশিয়া বাশার সরকারের পক্ষে বিরোধী সশস্ত্র পক্ষগুলোর ওপর বিমান হামলা চালায়। অন্য সামরিক শক্তিগুলোও তাদের লড়াই জোরদার করেছে। ফলে সঙ্ঘাত বেড়েছে। একই সাথে বেড়েছে প্রতিবেশী দেশ এবং ইউরোপমুখী শরণার্থীদের ঢল। পরিস্থিতি দুইটি পথ স্পষ্ট করে দিয়েছে। প্রথমত, সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য বাশার সরকারকে রাজনৈতিকভাবে আরো সুযোগ দিতে হবে। আর নয়তো ইসলামিক স্টেট আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে যা বিশ্বশান্তির পক্ষে হুমকিস্বরূপ। এসব বিকল্প মাথায় রেখেই পাঁচ দেশকে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি প্রস্তাব তৈরি করতে হবে। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের মধ্যে মতপার্থক্যও বিস্তর।
[জিমি কার্টার যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কার্টার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা তিনি। ২০০২ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী।]
অনুবাদ : তানজিলা কাওকাব

‘শিক্ষকদের দাবি ইতিবাচকভাবে দেখছে সরকার’ by মোশতাক আহমেদ

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের দাবির বিষয়টি সরকার ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত অনেক ইতিবাচক, যাতে শিক্ষকদের মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে। অন্যদিকে শিক্ষামন্ত্রীর এমন আশ্বাসে আন্দোলনরত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা তাঁদের কর্মসূচি ১ নভেম্বর সকাল ১০টা পর্যন্ত স্থগিত রাখবেন বলে জানিয়েছেন।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যার পরে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ফরিদউদ্দিন আহমেদ ও মহাসচিব এ এসএম মাকসুদ কামাল শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে তাঁর সরকারি বাসভবনে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী ও দুই শিক্ষক নেতা তাঁদের নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষকদের দাবির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আগামী রোববার বেতন বৈষম্য নিরসন সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির প্রথম বৈঠক ডাকা হয়েছে। সেখানে এ বিষয়গুলো আলোচনা হবে।
তিনি বলেন, ‘আশা করি, আজকের পর থেকে শিক্ষকেরা ক্লাস-পরীক্ষা চালিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন।’
শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের সভাপতি ফরিদউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমরাও আশা করছি, ওই কমিটির সভার মধ্যদিয়ে দাবি পূরণের প্রক্রিয়াটি শুরু হবে। ১ নভেম্বর সকাল ১০টায় ফেডারেশনের সাধারণ সভা হবে। সেখানে বিষয়গুলো আলোচনা করে পরবর্তী অবস্থান জানানো হবে। তবে আমরা আশা করি একটি সুষ্ঠু সমাধানে এগিয়ে যাওয়া যাবে।’
পূর্ব ঘোষিত ১ নভেম্বর থেকে লাগাতার কর্মসূচি পালনের যে বিষয়টি ছিল তা স্থগিত থাকবে কিনা, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ফেডারেশনের মহাসচিব এ এসএম মাকসুদ কামাল বলেন, ‘সেরকই বলতে পারেন।’

ক্ষমতা কারও জন্য ‘চিরস্থায়ী নয়’

ক্ষমতা কারও জন্য চিরস্থায়ী নয় বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আজ শুক্রবার সকালে বেগমগঞ্জ কারিগরি উচ্চবিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তি ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ‘আজ ক্ষমতা আছে, কাল নাও থাকতে পারে। মন্ত্রী হলেই সুনাম অর্জন করা যায় না। আর ভাষণ দিয়েও সুনাম হয় না। কাজ দিয়ে, অ্যাকশন দিয়ে, সৎ-সততা দিয়ে সুনাম অর্জন করতে হয়।’
এর আগে সকালে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে চৌমুহনীর বড়পোল নামক স্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজী আমিন উল্লাহ সড়কের (ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়ক) উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে সমশের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগকে বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতির হতাশাজনক বহিঃপ্রকাশ বলে মন্তব্য করেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘এর আগে বিএনপি ছেড়েছেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। তিনি বিএনপির প্রথম সারির নেতা ছিলেন। এগুলো বিএনপির অভ্যন্তরীণ কলহ আর কোন্দলের বহিঃপ্রকাশ।’
বেগমগঞ্জ কারিগরি উচ্চবিদ্যালয়ের পুনর্মিলনীতে নতুন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা শুধু পরীক্ষা আর সার্টিফিকেট কেন্দ্রিক হলে হবে না। গুণগত শিক্ষা অর্জন করতে হবে। শুধু জীবিকার জন্য শিক্ষা হলে মানুষ হওয়া যাবে না। শিক্ষা হতে হবে জীবনের জন্য। সার্টিফিকেট আর জ্ঞান অর্জন এক নয়, জ্ঞান অর্জন করতে না পারলে আগামী প্রজন্মকে জ্ঞানী করে তোলা যাবে না।
ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, বর্তমানে ছাত্র রাজনীতিতে শিক্ষকদের প্রবেশ আর শিক্ষক রাজনীতিতে ছাত্রদের প্রবেশ রাজনীতিকে ভয়ংকর করে তুলেছে। তিনি শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, শিক্ষকদের কোনো না কোনো রাজনৈতিক আদর্শ থাকতে পারে, তা অপরাধ নয়। তবে শিক্ষকের রাজনীতি যদি শিক্ষার্থীদের মাঝে খোলামেলা হয়ে যায়, তাহলে আর আদর্শ থাকবে না।
বিদ্যালয়টির ৫০ বছর পূর্তির এ অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে স্থানীয় সাংসদ (নোয়াখালী-৩) মামুনুর রশীদ কিরণ, নোয়াখালী-২ আসনের সাংসদ মোরশেদ আলম, টিএইচএস অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মীর হোসেন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর ও সচিব মো. সোহরাব হোসেন, সাবেক সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, জাতীয় পরিকল্পনা উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক কে এম মোজাম্মেল হক, জেলা প্রশাসক বদরে মুনির ফেরদৌস, পুলিশ সুপার ইলিয়াছ শরীফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আজ শুক্রবার সকালে বেগমগঞ্জ কারিগরি উচ্চবিদ্যালয়ের ৫০ বছর পূর্তি ও প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেনওবায়দুল কাদের।

‘আইএসের ওপর দোষ চাপাচ্ছে বিএনপি-জামায়াত’

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও গোপালগঞ্জ-২ আসনের সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেছেন, ‘দেশে আইএসের কোনো অস্তিত্ব নেই। যেখানে জঙ্গিবাদ দমন করে শেখ হাসিনা জাতিসংঘ থেকে পুরস্কার পেয়েছেন, সেখানে বিএনপি-জামায়াত দেশে নাশকতা সৃষ্টি করে আইএসের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’
গোপালগঞ্জের এস এম মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৪০ তম প্রতিষ্ঠা-বার্ষিকী উপলক্ষে আজ শুক্রবার দুপুরে এক পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান উদ্বোধন করে তিনি বক্তব্য দেন।
শেখ সেলিম বলেন, বিএনপি-জামায়াত বিদেশি নাগরিকদের হত্যা করে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তদন্তে বিএনপি নেতাদের নাম আসছে। ইতিমধ্যে বিএনপি নেতা কমিশনার কাইয়ুমের নাম উঠে এসেছে। তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারলে বাকিদের নামও বেরিয়ে আসবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে র‍্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার এস এম এমরান হোসেন, আইনজীবী নওশেরুজ্জামান ও মৃণাল কান্তি রায় চৌধুরীও বক্তব্য করেন।

‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জঙ্গি সংগঠন’

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেছেন, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের পক্ষে কথা বলে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বিচার চেয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রমাণ করেছে, এটি একটি মানবতাবিরোধী ও জঙ্গি সংগঠন।
আজ শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন তিনি।
গণজাগরণ মঞ্চ ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ধৃষ্টতাপূর্ণ ও ন্যক্কারজনক বক্তব্যের প্রতিবাদে’ এই সমাবেশের আয়োজন করে।
সমাবেশে ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় বোমা মেরে নারী ও শিশুসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করছে, তখন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটা টু শব্দও করে না। অথচ বাংলাদেশে যখন কোনো যুদ্ধাপরাধীর রায় কার্যকরের সময় আসে, তখন তারা বেশ সক্রিয় হয়ে যায়, সোচ্চার হয়ে উঠে। এত দিন তারা বলবার চেষ্টা করেছে তারা মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে, তাই বিচার বন্ধ চায়। কিন্তু যুদ্ধাপরাধী ছাড়াও তো অনেকের মৃত্যুদণ্ড হচ্ছে, তাঁদের ব্যাপারে অ্যামনেস্টির বক্তব্য কোথায়?’
ইমরান এইচ সরকার অ্যামনেস্টিকে তার ‘ধৃষ্টতাপূর্ণ’ বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। তা না হলে বিশ্বব্যাপী কর্মসূচি দেওয়া হবে। তাদের ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হবে। আগামী সোমবার এই বক্তব্যের প্রতিবাদে লন্ডনে সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে যুক্তরাজ্যে থাকা গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী-সংগঠকেরা বিক্ষোভ করবেন।
সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লাকী আক্তার, মুক্তিযোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বীরবিক্রম, ভাস্কর রাশা প্রমুখ বক্তব্য দেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

ইমরান খানের ডিভোর্স : নেপথ্যে রেহামের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ

বিশ্বকাপ জয়ী পাকিস্তান ক্রিকেট অধিনায়ক ইমরান খান তার দ্বিতীয় স্ত্রী রেহাম খানকে ডিভোর্স দিয়েছেন। বেশ ধুমধাম করে আনুষ্ঠানিকভাবে গত জানুয়ারি মাসে বিবিসির সাবেক প্রেজেন্টার রেহামকে বিয়ে করেন রাজিনীতিবিদ ৬৩ বছর বয়সী ইমরান।
ইমরানের ডিভের্সের বিষয়টি শুক্রবার নিশ্চিত করেছেন তেহরিক ই ইনসাফের মুখপাত্র নাঈম উল হক।
দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘সমঝোতার ভিত্তিতে পিটিআই চেয়ারমম্যান ইমরান খান এবং রেহাম খান একে অপরের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিষয়টি স্পর্শকাতর ও বেদনাদায়ক হওয়ায় গণমাধ্যমে কোনো প্রকার গুজব না ছড়াতে অনুরোধ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে তারা আর কিছু বলা হবে না।’
ইমরান এবং রেহামের মধ্যে সম্পর্ক ভাল যাচ্ছেনা বলে গত সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। পাকিস্তান টুডে’র খবরে বলা হয়েছে, রেহামের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাস সৃষ্টি হওয়ায় ইমরান খুশি ছিলেন না। তাছাড়া ইমরান পরিবারও শুরু থেকে এই বিয়েটি মেনে নিতে পারছিল না।
ইমরান এবং রেহাম উভয়েরই এটা ছিল দ্বিতীয় বিয়ে। ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে রেহাম খানও।

ট্রাফিক জ্যামে শিশুর জন্ম হলো অটো-রিকশায়

সন্তান জন্ম দিতে রওনা হয়েছিলেন হাসপাতালে। কিন্তু ভিআইপিদের বিশেষ সুবিধা দিতে তিন ঘণ্টা ধরে রাস্তা বন্ধ। ফলে অটো-রিকসাতেই জন্ম হলো নবজাতকের। ঘটনাটি ঘটেছে বৃহস্পতিবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে।
হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, রোশনি নামের এক নারী তার শাশুড়িকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হয়েছিলেন। তাদের ঠিক পেছনে পেছনে আসছিলেন তার স্বামী সালমান, মোটরসাইকেলে করে। কিন্তু সন্ধ্যার ব্যস্ত সময় রাস্তায় ছিল ভযাবহ জ্যাম। সালমান ট্রাফিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে তার সমস্যার কথা বলে সহায়তা কামনা করেন। কিন্তু কারো কাছ থেকেই সহায়তা পাননি।
সন্ধ্যার দিকে দিল্লির রাস্তা এমনতেই জ্যাম থাকে। সেইসাথে ভারত-আফ্রিকা সম্মেলন উপলক্ষে ভিআইপিদের বিশেষ সুবিধা দিতে হচ্ছিল। এ কারণে জ্যাম আরো বেড়ে গিয়েছিল। তারা বিকল্প পথে হাসপাতালে যেতে চেয়েও ব্যর্থ হন।
তারা তখন নির্ধারিত হাসপাতালে না গিয়ে কাছে একটি হাসপাতালে যান। কিন্তু যাওয়ার আগেই শিশুটির আগমন ঘটে যায়।
তবে ওই হাসপাতালের চিকিৎসক এবং অন্যদের সহায়তায় বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি। শিশুটি সুস্থ আছে, তবে মায়ের ৫০টি সেলাই লেগেছে।

সরকার তার প্রয়োজনে আইএস’র নাম ব্যবহার করছে : আ স ম রব

সাবেক মন্ত্রী ও জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেছেন, সরকার তার প্রয়োজনে জঙ্গী-আইএস’র নাম ব্যবহার করছে। আবার গভীর অনুসন্ধান ছাড়াই আইএস’র উপস্থিতি অস্বীকার করছে। কখনো জঙ্গী আছে আবার কখনো আইএস নাই- এসব বলে জঙ্গীর মোকাবেলায় সরকারের স্ববিরোধীতা প্রকাশ হচ্ছে। আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মুল ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে সরকার বিরোধী দলগুলোকে দমন করতেই উৎসাহী।
জেএসডির ৪৩তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আজ শুক্রবার, বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে দলের শহীদ ও যারা মারা গেছেন এবং এর পাশাপাশি সাবেক নেতা-সংগঠকদের অবদানের স্মরণে এক আলোচনা সভায় আ স ম রব এ কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, সরকারের ভুল রাজনীতি-গণতান্ত্রিক চর্চাকে সঙ্কুচিত করা, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ভিন্ন মত ও পথকে দমন করা, জনগনের সম্মতি-সমর্থন ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা করা, নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে সঙ্কট ও শূন্যতা সৃষ্টি করেছে সে সঙ্কট ও শূন্যতার সুযোগে সন্ত্রাসী তৎপরতা মাথাচাড়া দিচ্ছে। সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ, শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ-রাজনৈতিক অচলাবস্থাকে কাজে লাগানোর অনুকুল পরিবেশ পাচ্ছে সন্ত্রাসীরা।
আমরা ভারতের বংশবদ আজ্ঞাবহ হয়ে বসে আছি : ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী
একই অনুষ্ঠানে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, আমাদের সরকার নেপাল, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার থেকেও কিছু শিখিনি। তারা তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে ভারতের কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ বরদাশত করছে না। কিন্তু আমরা ভারতের বংশবদ আজ্ঞাবহ হয়ে বসে আছি। আমরা শুধু ভারতকে দিয়েই যাচ্ছি, বিনিময়ে কিছুই পাচ্ছি না।
বিভিন্ন স্থানকে বিভাগ করার ঘোষণাকে একটি ধাপ্পাবাজ বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, বিভাগ ঘোষণার মাধ্যমে লাভ হবে আমলাদের। সরকারের পছন্দনীয় লোকই সেখানে প্রশাসন চালাবে। রাজনীতিবিদদের কিছুই হবে না। জনগণ সব সময়ের মতই অবহেলিত থাকবে। তিনি বলেন, বিভাগ ঘোষণার মাধ্যমে আসলে সরকার জনগণকে বেকুব বানাচ্ছে।
অন্যদের মধ্যে খালেকুজ্জামান, অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, আবদুল মালেক রতন, এস এম আকরাম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

দ্বিতীয় স্ত্রীকেও তালাক দিলেন ইমরান খান

দ্বিতীয় স্ত্রীকেও তালাক দিলেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ও বর্তমান রাজনীতিবিদ ইমরান খান। এ বছরের জানুয়ারিতে সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র সাবেক উপস্থাপক ও মডেল রেহামকে বিয়ে করেন ইমরান খান। কিন্তু বিয়ের মাত্র ১১ মাসের মাথায় ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল তাদের। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ইমরান খানের রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ-এর মুখপাত্র নাঈম উল হক। দু’জনের সমঝোতায় তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এই বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে তিনি তিক্ত সম্পর্ক ও বোঝাপড়ার অভাবের কথা বলেছেন। তবে নির্দিষ্ট কোনো কারণের কথা বলেন নি। পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী এ অধিনায়ক ১৯৯৫ সাল ব্রিটেনের জেমিমা গোল্ডস্মিথকে বিয়ে করেন। কিন্তু নানা নাটকীয়তার পর ২০০৪ সালে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এরপর ১১ বছর একা ছিলেন ইমরান খান। গত বছর শেষে দিকে রেহামের সঙ্গে ইমরান খানের রোমান্টিকতার খবর দেয় বৃটিশ গণমাধ্যম। ইমরান খান প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে ৪২ বছর বয়সী রেহামের সঙ্গে ৬৩ বছর বয়সী ইমরানের বিয়ে হয়। আগের ঘরে ইমরানের দুই সন্তান ছিল। আর রেহামের আগের ঘরে ছিল ৩ সন্তান। ইজাজ রেহমান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে ১৫ বছর সংসারের পর ২০০৫ সালে তাকে ডিভোর্স দেন রেহাম। তিনি ১০ বছর একা থাকার পর এবার গাট বাঁধেন ইমরান খানের সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইমরান খানের কাছের একজন তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে বলেন, ‘রেহাম রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু ইমরান খান কিছুই চাইছিলেন না, তার স্ত্রী রাজনীতিতে আসুক। রেহাম কখনও ঘরে থাকতে চাইতেন না। এটা নিয়ে প্রায় দু’জনের মধ্যে মনোমলিন্য হতো। তাই বাধ্য হয়ে শেষমেশ তারা ছাড়াছাড়ির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’ ডিভোর্সের বিষয়টি নিশ্চিত করে রেহাম খান টুইটও করেছেন। তিনি লেখেন, ‘আমরা বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ডিভোর্স ফাইল পূরণ করেছি।’ ইমরান খানও টুইট করে রেহামের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির কথা জানিয়েছেন।
ইমরান-রেহামের বিবাহ বিচ্ছেদের নেপথ্যে রাজনীতি
সমঝোতার মাধ্যমে রেহাম খানকে তালাক দিয়েছেন পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ পার্টির চেয়ারম্যান ও দেশটির সাবেক বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়ী অধিনায়ক ইমরান খান।
শুক্রবার তেহরিক ই ইনসাফের মুখপাত্র নিয়ামুল হক পাকিস্তানের পত্রিকা ডনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বিয়ের মাত্র ১০ মাসের মাথায় তারা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটালেন।
গত ছয় মাস ধরে এই দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদের গুঞ্জন চলে আসছিল। কিন্তু বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইমরান-রেহামকে একসঙ্গে দেখা গেছে। গত মাসেও এক টুইটের মাধ্যমে টিভি চ্যানেলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইমরান বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা সত্য নয়। এসব গুজব। আপনারা এ ধরনের ভিত্তিহীন খবর প্রচার থেকে বিরত থাকুন।
ইমরানের বরাত দিয়ে নিয়ামুল হক বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদের বিষয়ে মিডিয়াগুলোকে সংবেদনশীল খবর প্রকাশের কথা বলেছেন।
এদিকে টুইট বার্তায় ইমরান বলেন, বিবাহ বিচ্ছেদ তার, রেহামের এবং তাদের পরিবারের জন্য খুবই বেদনাদায়ক। তাদের পারিবারিক বিষয়কে সম্মান করতে সবার প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
ইমরান খান বলেন, বিচ্ছেদের বিষয়ে আমাদের মাঝে আর্থিকভাবে কোনো সমঝোতা হয়নি। তিনি বলেন, রেহামের নৈতিক চরিত্র এবং সমাজের সুবিধধাবঞ্চিতদের নিয়ে কাজ করাকে আমি যথেষ্ট সম্মান করি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইমরানের একজন ঘনিষ্ট ব্যক্তি জানান, রেহাম রাজনীতিতে আসতে চেয়েছিলেন। ঘরে বসে থাকতে চাননি। কিন্তু বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি ইমরান। ইমরান চাননি রেহমা রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ুক।
তিনি বলেন, এছাড়া আরো অনেক সমস্যা ছিল যেগুলো সমাধান করা যেত। কিন্তু রাজনীতিতে আসার বিষয় নিয়ে তাদের মাঝে এ বিচ্ছেদ।
ইমরানের কাছের আরো একজন ডনকে জানান, ইমরানের পরিবার থেকে রেহামকে ডিভোর্স দেয়ার জন্য যথেষ্ট চাপ ছিল। তবে এ বিষয়ে রেহাম কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি একটি টুইট করেন। যেখানে তিনি লেখেন, আমরা আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে টিভি সাংবাদিক রেহামকে বিয়ে করেন ইমারন খান। এর আগে ২০০৪ সালে ইংলিশ সাংবাদিক জেমিমার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় ইমরানের। ইমরানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে রেহাম ইজাজ নামে এক মনোবিজ্ঞানীকে বিয়ে করেছিলেন। তাদের ঘরে তিন সন্তান আছে।
যুগান্তর

ইলিশের প্রজননের সঠিক সময় কোনটি? by হারুনুর রশীদ

বিগত ২০১০ থেকে আমরা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের একটি টিম চাঁদপুর ও বরিশাল অঞ্চলের ইলিশ মাছ নিয়ে গবেষণা করছি। চেষ্টা করছি এই মাছের প্রজনন ঋতু সঠিকভাবে নির্ধারণের। আমরা প্রজনন ঋতু নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্ত্রী মাছের জিএসআই (Gonado Somatic Index) পরিমাপপদ্ধতি ব্যবহার করছি। জিএসআই হলো মাছের ডিমের ওজন ও দেহের ওজনের অনুপাতের শতকরা হার। সাধারণত প্রজনন ঋতুতে ডিমের আকার বড় হতে থাকে বলে জিএসআই বাড়তে থাকে এবং ভরা প্রজনন মৌসুমে গিয়ে তা সর্বোচ্চ হয়। প্রজনন ঋতুতে পূর্ণিমা ও অমাবস্যার সময়ে বিগত পাঁচ বছরের জিএসআইর পরিমাপ থেকে দেখা গেছে যে বাংলাদেশে ইলিশ সাধারণত সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত প্রজনন করে। সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগে জিএসআই ১০-১১ থেকে বাড়তে বাড়তে অক্টোবরের মাঝামাঝি কিংবা শেষের দিকে এসে সর্বোচ্চ ১৫-১৭ পর্যন্ত পৌঁছায় এবং নভেম্বরে এসে তা হঠাৎ করে কমে যায়। ১৫-১৭ জিএসআই ইলিশের ভরা প্রজনন মৌসুম নির্দেশ করে।
অন্য অনেক মাছ, কাঁকড়া কিংবা চিংড়ির মতো ইলিশ মাছও প্রজননের ক্ষেত্রে চন্দ্রনির্ভর আবর্তন অনুসরণ করে। অর্থাৎ এই মাছ ভরা পূর্ণিমা বা অমাবস্যায় প্রজনন করে। মাছের প্রজননের ক্ষেত্রে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো তাপমাত্রা। প্রজননের জন্য চন্দ্রনির্ভর আবর্তনের ওপর নির্ভরশীল মাছ সারা বছরের মধ্যে তার পছন্দনীয় তাপমাত্রা যে মৌসুমে পাওয়া যায়, সেই মৌসুমের পূর্ণিমা কিংবা অমাবস্যায় প্রজনন করে। ইলিশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। আমরা ২০১০ থেকে এই বছরের অমাবস্যা পর্যন্ত গবেষণা করে দেখেছি যে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত যে পূর্ণিমা বা অমাবস্যা পড়ে, সেই সময়ে এই মাছের জিএসআই সর্বোচ্চ থাকে। এ বছরের সেপ্টেম্বরে ইলিশ ধরা বন্ধের আগে এবং অক্টোবরে পুনরায় মাছ ধরা শুরুর পর আমরা জিএসআই পরিমাপ করে দেখেছি যে তা বেড়েই চলেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বরের নমুনায় আমরা জিএসআই পেয়েছি প্রায় ১১। আর ১০ অক্টোবরের নমুনায় জিএসআই ছিল প্রায় ১৪। অর্থাৎ আগামী পূর্ণিমা (২৭ অক্টোবর) পর্যন্ত তা আরও বাড়তে পারে। কিন্তু মন্ত্রণালয়-নির্ধারিত ভরা প্রজনন মৌসুম শেষ হয়েছে ৯ অক্টোবর।
অন্য অনেক মাছ, কাঁকড়া কিংবা চিংড়ির মতো ইলিশ মাছও প্রজননের ক্ষেত্রে চন্দ্রনির্ভর আবর্তন অনুসরণ করে। অর্থাৎ এই মাছ ভরা পূর্ণিমা বা অমাবস্যায় প্রজনন করে ইলিশ শুধু পূর্ণিমাতেই প্রজনন করবে—এ ধারণা ভুল। চন্দ্রনির্ভর আবর্তন অনুসরণ করে এমন অন্যান্য মাছের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দেখে জানা যায় যে পূর্ণিমা কিংবা অমাবস্যা যেকোনো সময়েই এসব মাছ প্রজনন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সাধারণত ওই নির্দিষ্ট পূর্ণিমা কিংবা অমাবস্যার দিনসহ আগে ও পরের কয়েক দিন ধরে মাছ সবচেয়ে বেশি প্রজনন করতে দেখা যায়। কিন্তু ইলিশ মাছের প্রজনন ঋতু নির্ধারণ এবং ভরা প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে এসব বিষয় বৈজ্ঞানিকভাবে গবেষণা করা হয়েছে বলে মনে হয় না। ২০১০ সালের অক্টোবরের ১৬ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইলিশ ধরা বন্ধ ছিল, আর পূর্ণিমা ছিল ২৩ অক্টোবর। পূর্ণিমার দুই দিন পর থেকে কি মাছের প্রজনন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল? পরবর্তী দুই বছর ইলিশ আহরণ নিষেধের সময় ১০ দিন করে এগিয়ে আনা হলো। ২০১১ সালের অক্টোবরের ৬ থেকে ১৬ এবং ২০১২ সালে সেপ্টেম্বরের ২৫ থেকে অক্টোবরের ৫ তারিখ পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু ২০১২ সালে পূর্ণিমা ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর।
২০১০ সালে যে ইলিশ ২৩ অক্টোবর প্রজনন করেছিল, ২০১২ সালে এসে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে সেই ইলিশ প্রায় এক মাস আগে প্রজনন করবে তা অসম্ভব। ২০১৩ সালে এসে ১৩ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করা হলো এবং এ সময় পূর্ণিমা ছিল ১৯ অক্টোবর। ২০১৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত আবার আগের নিয়মে ১০ দিন করে এগিয়ে আনতে আনতে এ বছর ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময় ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে ৯ অক্টোবর। তাহলে কি আমরা ধরে নেব যে ইলিশের ক্ষেত্রে প্রতি তিন বছর পরপর প্রজননের চন্দ্রনির্ভর আবর্তন পরিবর্তন হয়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়? জৈবিকভাবে সেটি এত দ্রুত ঘটা কি সম্ভব? হ্যাঁ, জলবায়ু পরিবর্তন, হাইড্রোলজিক সাইকেলের ব্যাপক পরিবর্তন প্রভৃতি কারণে ইলিশের প্রজনন ঋতু এক মাস এগিয়ে বা পিছিয়ে যেতে পারে, কিন্তু সেটি তিন বছরের মতো এত কম সময়ে সম্ভব নয়।
ভরা প্রজনন মৌসুম নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু ‘ইলিশ আশ্বিনের পূর্ণিমায় প্রজনন করে’ এই সনাতন ধারণার ওপর নির্ভর করে এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের ব্যবস্থাপনাপদ্ধতি নির্ধারণ করাটা সঠিক হবে না। আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণানির্ভর তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে এর সঠিক ব্যবস্থাপনা করলে আরও অধিক ইলিশ উৎপাদন সম্ভব হবে।
ড. হারুনুর রশীদ: অধ্যাপক, মাৎস্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।
rashid@bau.edu.bd

রাশিয়া বিশ্বের পরাশক্তি নয়: যুক্তরাষ্ট্র

নিম্নমুখী অর্থনীতির কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘স্পেনেরও পেছনে’ থাকা রাশিয়া আর বিশ্বের পরাশক্তি নয় বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের তুলনায় মস্কোর প্রভাবও আগের মতো নেই বলে মনে করে তারা।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব জোশ আর্নেস্ট শুক্রবার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব মন্তব্য করেন।  তিনি বলেন, ‘রাশিয়া এখন আর বিশ্বশক্তি নয়। গত কয়েক সপ্তাহের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাশিয়ার অর্থনীতি নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ভবিষ্যতে দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।’
রাশিয়া বর্তমানে বিশ্বের ১৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাশিয়া স্পেনের চেয়েও পিছিয়ে আছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও জানান, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো সেই প্রভাব আর অর্থনৈতিক শক্তি রাশিয়ার নেই।
আর্নেস্ট বলেন, ‘রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। উল্লেখযোগ্যভাবে দেশটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।’
ইউক্রেন ও সিরিয়ার মতো বেশকিছু ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে তীব্র মতভেদ রয়েছে বলেও জানান আর্নেস্ট।

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান প্রণবের

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা জোরদার করতে ভারত ও আফ্রিকাকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী। বৃহস্পতিবার রাতে তৃতীয় ভারত আফ্রিকা ফোরাম সম্মেলনে উপস্থিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্মানে দেয়া ভোজসভায় তিনি এ আহ্বান জানান।
সন্ত্রাসবাদের কোন সীমানা নেই এবং ব্যাপক ধ্বংস ছাড়া এর কোন আদর্শ নেই উল্লেখ করে প্রণব মুখার্জী বলেন, ভারত ও আফ্রিকা একে অপরকে ভালভাবে বুঝতে পারে কারণ আমাদের ভূমি খুবই বৈচিত্রময়। দেশ দুটিতে ধর্ম, জাতীয়তা, উপজাতি, ভাষা, উচ্চারণ ও সংস্কৃতির বৈচিত্র রয়েছে।
তিনি বলেন, ভারত ও আফ্রিকায় বৈচিত্র আমাদের রক্তের সঙ্গে মিশে রয়েছে। এটা আমাদের সমৃদ্ধ এমনকি শক্তিশালী করেছে। মানব জাতির উন্নয়ন এবং সংঘাত ও সংকট মোকাবেলার জন্য আমরা একসঙ্গে বাকি বিশ্বে অবদান রাখতে পারি।
বলেন, ভারত যে আফ্রিকার সঙ্গে সম্পর্কে গুরুত্ব দেয় তার ফসল হচ্ছে এই সম্মেলন। এই ফোরামে আফ্রিকার সকল দেশের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুই দেশ ও লোকজনের মধ্যে স্থায়ী অংশীদারিত্ব গড়তে সদস্য দেশগুলোর আগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি আস্থা প্রকাশ করে দেশটির রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিরুপণে আমাদের লোকজনের ভবিষ্যতের জন্য সমন্বিত লক্ষ্য নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আফ্রিকা ও ভারতে বিশ্বের মোট জনগোষ্ঠীর এক তৃতীয়াংশ বসবাস করে। তাই দুই দেশের সম্পর্ক বিশ্বের টেকসই উন্নয়নে নিশ্চিতভাবে প্রভাব রাখবে।

ডাকাতি, অপহরণ আর মুক্তিপণে সর্বস্বান্ত জেলেরা by নেছারউদ্দিন আহমেদ টিপু

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে গত তিন মাসে শতাধিক মাছ ধরার ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতেরা ট্রলারগুলো থেকে জাল, জ্বালানি ও মাছ লুটের পাশাপাশি জেলেদেরও অপহরণ করে। আর অপহৃতদের উদ্ধারে মুক্তিপণ দিতেই সর্বস্বান্ত হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য বন্দরের মৎস্য ব্যবসায়ীদের এক হিসাব মতে, গত তিন মাসে কুয়াকাটা সংলগ্ন সাগরে অন্তত ১১০টি ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতেরা পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও পাথরঘাটা এবং বরগুনার এ উপকূলীয় এলাকার অন্তত ১০০ জেলেসহ ২০টি ট্রলার অপহরণ করেছে। এ ছাড়াও জাল, জ্বালানি তেল ও মাছসহ কোটি টাকার জিনিসপত্র লুট করেছে। মুক্তিপণ দিয়ে অপহৃত জেলেদের কেউ কেউ ফিরলেও এখন পর্যন্ত জিম্মি রয়েছেন অন্তত ২৫ জন।
আলীপুর মৎস্য বন্দরের আড়তদার ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি অক্টোবর মাসে তিন দফায় অন্তত ৫৫টি ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) গভীর রাতে মাছ ধরে ফেরার সময় ‘এফবি এলমা আক্তার’ নামে এ মৎস্য বন্দরের আবুল কোম্পানির ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। এতে জাল, জ্বালানি তেল ও মাছসহ অন্তত ১০ লাখ টাকার মালামাল লুট হয়েছে বলে দাবি করেছেন ট্রলারটির মালিক। ডাকাতেরা ওই ট্রলারে করেই রুহুল আমীন মাঝি (৪০), মো. শুক্কুর আলী (৪২) এবং মো. শানু মিয়া (৫০) নামে তিন জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া মো. আল আমীন (২৫), মো. নাঈম (২২) ও মো. বজলুর রহমান (৪৫) নামে অন্য দিন জেলেকে সাগরে নিক্ষেপ করেছে। এখন পর্যন্ত ট্রলার ও ওই জেলেদের হদিস পাওয়া যায়নি।
এর আগে ১৩ অক্টোবর বঙ্গোপসাগরে জেলেদের ট্রলারে ডাকাতেরা গুলি করে। এতে ফয়সাল (৩০), আহসান আলী (৩২), শাহ আলম (৪০) ও কাইয়ুম (২৯), আবদুল মান্নান মৃধা (৩০) ও আমির হোসেন (৩৩) নামে পাঁচ জেলে আহত হন। ওই দিন ডাকাতেরা আলীপুর মৎস্য বন্দরের মো. আনসার উদ্দিন মোল্লার ‘এফ বি মার্জিয়া’ ট্রলারে করে নয়া মিয়া, আল-আমিন ও আবুল কালাম নামে তিন জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
‘এফ বি মার্জিয়া’ ট্রলারের মালিক জানান, দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে নয়া মিয়া ফেরত এসেছেন। কিন্তু মুক্তিপণ না দেওয়ায় মুক্তি মেলেনি আল-আমিন ও আবুল কালামের।
তার​​ ও আগে ২৪ আগস্ট দুপুরে বঙ্গোপসাগরে অন্তত ৫০টি ট্রলারে গণডাকাতি হয়েছে। ওই সময় ডাকাতেরা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার ‘এফবি তিমন’ ট্রলারের মাঝি লালচান (৩২) ও ‘এফবি মায়ের আশীর্বাদ’ ট্রলারের মাঝি মো. বশির হোসেনকে (৩৫) অপহরণ করে নিয়ে যায়। এখন পর্যন্ত ওই দুই জেলে মুক্তি পাননি।
আলীপুর মৎস্য বন্দরের আড়তদার আবুল হোসেন কাজীর ভাষ্য, ‘সাগরে ডাকাতি করার সময় ডাকাতেরা নিজেদের দয়াল, মজনু, মাস্টার, আলীফ, বাচ্চু ও এনামুল বাহিনী নামে পরিচয় দেয়। এগুলো মূলত ছদ্ম নাম। এ ডাকাত চক্রের পেছনে খুলনা ও বাগেরহাটের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। এর মধ্যে খুলনার ফুলতলার দামোদর এলাকার বাচ্চু বেগ (গালা বাচ্চু) ওরফে ব্লাক বাচ্চুর নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। তিনি ভারতে অবস্থান করে তাঁর সহযোগী খুলনার ডুমুরিয়ার এনামুলের মাধ্যমে ট্রলারগুলোতে ডাকাতি করান। এ কাজে ডাকাতেরা উচ্চ কার্যক্ষমতা সম্পন্ন ইঞ্জিন ব্যবহার করে।’
মুক্তিপণ দিয়ে ফেরত আসা জেলেদের বরাত দিয়ে কুয়াকাটা-আলীপুর মৎস্য আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আনসার উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘আমরা শুনেছি ৩০ জেলের মুক্তিপণ বাবদ যে অর্থ পাওয়া যায়, তা খুলনা এলাকার প্রশাসন, নেতা ও সাংবাদিকদের জন্য ব্যয় হয়। এ জন্য ওদের ৫০ জনের মতো জেলেকে জিম্মি করতে হয়। বাকি ২০ জেলের মুক্তিপণের অর্থ জলদস্যু এবং তাদের নিয়ন্ত্রণকারীরা ভাগাভাগি করে নেয়।’
মহিপুর মৎস্য আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. ফজলু গাজি বলেন, ‘এ বছর দফায় দফায় ডাকাতির কবলে পড়ে জেলেরা ছাড়াও আমরা মৎস্য ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। প্রতি বছরই ডাকাতদের মুক্তিপণ দিতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা মৎস্যজীবীরা কিচ্ছু চাই না, সাগরে নিরাপদে মাছ ধরার নিশ্চয়তা চাই।’
একই সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিমাই চন্দ্র দাস বলেন, ‘সাগরে জল দস্যুতা রোধ হচ্ছে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে জেলেরা বেকার সময় কাটায়। আর আবহাওয়া ভালো হলে সাগরে মাছ ধরতে গেলে ডাকাতেরা অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পর মুক্তিপণ দাবি করে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে জেলেরা যেমন এ পেশা ছেড়ে দেবে, তেমনি আমরাও ব্যবসা গুটাতে বাধ্য হব।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘সাগরে ডাকাতিগুলো সাধারণত খুলনা-বাগেরহাটের জলসীমানায় হয়ে থাকে। ডাকাতির শিকার হওয়া কলাপাড়া উপজেলার জেলেরা এসে জানালে আমরা সঙ্গে সঙ্গে আইনি পদক্ষেপ নিই। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশ-কোস্টগার্ডকে অবহিত করি।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে কোস্ট গার্ডের পশ্চিমাঞ্চলীয় জোনের স্টাফ অফিসার (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কমান্ডার ফজলুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলেরা সত্যিকারভাবে চিহ্নিত করে বলতে পারছে না কোন জায়গায় নিয়ে জেলেদের আটকে রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে, যেসব জেলে মুক্তিপণ দিয়ে বের হয়ে আসে, তাঁরাও এসে আর মুখ খুলছেন না। তাঁরা যদি আমাদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতেন, তাহলে আমরা সেভাবে ব্যবস্থা নিতে পারতাম।’
ফজলুল করিম আরও বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কারা জেলে, কারা ডাকাত তা চিহ্নিত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। যদি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জেলেদের আইডি কার্ড দেওয়া হতো, তাহলে আমাদের কাজ করতে সুবিধা হতো। আমরা মনে করি, সে ক্ষেত্রে সাগরবক্ষে ডাকাতিও বহুলাংশে কমে যেত। তা ছাড়া সুন্দরবন বিশাল জায়গা, সেখানে কাজ করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে বন বিভাগের জনবল বৃদ্ধি করলে, তাঁদের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হলে জল দস্যুতা রোধে অন্য বাহিনীর সঙ্গে তাঁরাও ভূমিকা রাখতে পারতেন।’

‘মরে যাব, তবু দাবি থেকে একচুলও নড়ব না’

এমপিওভুক্তির দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আমরণ অনশন কর্মসূচি পালন করছেন নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক শ শিক্ষক। আজ শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে এই কর্মসূচি চলছে।
নিম্নমাধ্যমিক-মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, কারিগরি ও মাদ্রাসার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার দাবিতে এই শিক্ষকেরা আন্দোলন করছেন।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষকদের অনেকে বুকে-পিঠে বিভিন্ন স্লোগান লিখে সড়কে শুয়ে আছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নারী শিক্ষকও রয়েছেন।
আন্দোলনরত শিক্ষকেরা তাঁদের দাবি পূরণে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। ছবি: আসাদুজ্জামান
বরিশালের বানারীপাড়া সৈয়দকাঠি ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষক রুনা খানম বলেন, ‘দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আমরণ অনশন কর্মসূচি চলবে। মরে যাব, তবু দাবি থেকে একচুলও নড়ব না।’
অমল কান্তি দে নামের এক শিক্ষকের বুকে-পিঠে লেখা, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এমপিও দিয়ে জীবন বাঁচান। এমপিওবিহীন ১৫ বছর—কী যে কষ্ট, কী যে যন্ত্রণা!’
অমল কান্তির ভাষ্য, তিনি চট্টগ্রামের ফতেহাবাদ কলেজের কম্পিউটার বিভাগের শিক্ষক। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি বলেন, ‘এমপিও না দিলে আমি আর ঘরে ফিরব না। আমরা কেউ ঘরে ফিরব না।’
শিক্ষকদের একজন সড়কে শুয়ে আছেন। ছবি: আসাদুজ্জামান
আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, এমপিওভুক্তির দাবিতে কয়েক দিন ধরে তাঁরা আন্দোলন করছেন। দাবি পূরণের ব্যাপারে কোথাও থেকে কোনো আশ্বাস না পেয়ে তাঁরা আমরণ অনশন কর্মসূচির পথ বেছে নিয়েছেন।
নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি এশারত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে আছি। তিনি আমাদের দাবি পূরণ করবেন বলে আশা করছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরণ অনশন কর্মসূচি চলবে।
এমপিওভুক্তির দাবিতে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আমরণ অনশনে নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। ছবি: আসাদুজ্জামান

টিআইবি ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থা

জাতীয় সংসদ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা না চাইলে টিআইবির (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ  করার হুমকি দিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল। জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, সংসদ নিয়ে টিআইবি যে ভাষা ব্যবহার করেছে তা অমার্জনীয় শুধু নয় গর্হিতও। এ জন্য টিআইবিকে ক্ষমা চাইতে হবে। না হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গতকাল বিকালে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের এক বৈঠকে জোটের শীর্ষ নেতারা টিআইবির বক্তব্যকে শিষ্টাচার বহির্ভূত, দুরভিসন্ধিমূলক ও রাজনৈতিক আখ্যায়িত করে সংগঠনটির বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বক্তব্য রাখেন। নেতারা টিআইবির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাসহ অযাচিত মন্তব্যের জন্য সংগঠনটির সদর দপ্তরে অভিযোগ দাখিলেরও দাবি তোলেন। বৈঠক সূত্র জানায় মূলত রুটিন বৈঠক হলেও গতকাল ১৪ দলের বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল টিআইবিকে নিয়ে। পাশাপাশি দলীয় পরিচয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ সাম্প্রতিক দুই বিদেশী ও পুলিশ হত্যা এবং পবিত্র আশুরার রাতে হোসেনি দালানে বোমা হামলার ঘটনাও আলোচনায় ওঠে আসে। গতকালের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ১৪ দলের এমন একাধিক শীর্ষ নেতা মানবজমিনকে জানান, টিআইবির বক্তব্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ বলে ১৪ দলের নেতৃবৃন্দ মনে করে। টিআইবির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সংগঠনটির সদর দপ্তরে অভিযোগ দাখিলের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। নেতারা আরও বলেন, টিআইবির বক্তব্যকে বিএনপির বক্তব্য বলে মনে হচ্ছে। এসব বক্তব্য শিষ্টাচার বহির্ভূত, রাজনৈতিক ও দুরভিসন্ধিমূলক। সরকারের অনেক ভালো কাজ আছে। কিন্তু এগুলো নিয়ে তারা কথা বলে না। ১৪ দলের নেতাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে জোটের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম টিআইবির বক্তব্যকে জাতীয় সংসদকে অবজ্ঞার  শামিল বলে উল্লেখ করেন। বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ড. আবদুর রাজ্জাক টিআইবির বক্তব্য ও তাদের কার্যক্রমকে কূটনৈতিকভাবে মোকাবিলার পরামর্শ দেন। এদিকে গতকালের বৈঠকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় পরিচয়ে করার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ও জোটগতভাবে না-কি এককভাবে নির্বাচন করা হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা জানান, নির্বাচনের বিষয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেই এখনও কোন আলোচনা হয়নি। ১৪ দলের সঙ্গে এ বিষয়ে পরবর্তী বৈঠকে আলোচনা হবে বলে জানিয়ে দেন তিনি। 
বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, জাতীয় সংসদ নিয়ে টিআইবির এ ধরনের মন্তব্যে আমরা বিস্মিত, ক্ষুব্ধ। যে ভাষায় তারা বক্তব্য দিয়েছে তার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। যে অমার্জনীয় ও গর্হিত ভাষা তারা ব্যবহার করেছে তা কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষেও করা সম্ভব নয়। টিআইবির কঠোর সমালোচনা করে সংগঠনটির অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে তাদের অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানান তিনি। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এরা কারা? এদের পরিচয় কি?  নির্বাচন চাওয়ার অধিকার তাদের কে দিয়েছে? তারা কি দেশে অসাংবিধানিক সরকার চায়? এদের মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে।  পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করবো, এদের অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে। তিনি বলেন, এই সংসদে যারা আছেন তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। বিগত প্রায় দুবছর ধরে সংসদ সফলভাবে চলছে। সংসদ কিভাবে চলে তা প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিত করেছেন। এটা কোন গোপন চেম্বার নয়। সংসদে কি হয় তা জনগণ দেখতে ও শুনতে পাচ্ছে। অতীতে সংসদে যা হয়েছে তা বর্তমান সংসদে হচ্ছে না। সংসদে এখন গালাগালি হচ্ছে না। তাহলে তারা কিভাবে এমন কথা বলতে পারে। তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খালেদা জিয়া কি উদ্দেশ্যে নির্বাচন বানচাল করার জন্য আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করলেন? সম্প্রতি দুই বিদেশী ও একজন পুলিশ হত্যা এবং পবিত্র আশুরার দিনে হোসেনি দালান মসজিদে বোমা হামলা একই সূত্রে গাঁথা উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের এই শীর্ষ নেতা বলেন, একজন নেত্রী (বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া) বিদেশে গেলেন। তখন থেকেই একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। হত্যার ঘটনায় যাদের নাম এসেছে তারা একটি রাজনৈতিক দলের মুখচেনা। এভাবে তারা তাদের চক্রান্ত সফল করতে চায় কি-না এখন সে প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। বিএনপি নেতা শমসের মবিন চৌধুরীর পদত্যাগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এটা তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। বিএনপিতে পদত্যাগ শুরু হয়ে গেল না-কি? একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নাসিম বলেন, তাদের ভাষা ও পাকিস্তানীদের ভাষা একই। সংবাদ সম্মেলনে সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি দুই বিদেশী ও পুলিশ হত্যায় জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার এবং দুর্গা পূজা সুষ্ঠুভাবে পালন করতে ভূমিকা রাখার জন্য ১৪ দলের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ জানান মোহাম্মদ নাসিম। এর আগে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিএম মোজাম্মেল হক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য এস এম কামাল, এনামুল হক শামীম, সুজিত রায় নন্দি, দলের দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ড. আবদুর রাজ্জাক, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলি। ১৪ দলের শরীক দলের নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া, জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ/মোজাফফর) সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক, সহ-সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, গণতন্ত্রী পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুর রহমান সেলিম, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহ্বায়ক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, গণআজাদী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস কে শিকদার, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির সাধারণ সম্পাদক ডা. জাকির হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আহ্বায়ক রেজাউর রশিদ খান প্রমুখ।

জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করে বিদেশিরা প্রভাব বিস্তার করতে চায় : আমু

শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেছেন, জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করে বিদেশিরা দেশে প্রভাব বিস্তার করতে চায়। কিন্তু এদেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষার জন্য আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তা প্রতিহত করছেন। শেখ হাসিনাকে এখন পর্যন্ত ১৯ বার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়েছে। তারপরও তিনি এখনও বেঁচে আছেন, খুনীরা ব্যর্থ হয়েছে।
শিল্পমন্ত্রী আজ শুক্রবার নাটোরের লালপুর উপজেলার নর্থবেঙ্গল চিনিকলের ২০১৫-১৬ মৌসুমের আখ মাড়াই কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
তিনি আরো বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর পাকিস্তানের মত বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। সব রাস্তাঘাটে অরাজকতরা সৃষ্টি এবং পেট্রল বোমা মেরে শত শত মানুষকে হত্যা করে ও ১৭ জন পুলিশকে হত্যা করে দেশকে অকার্যকর করার চেষ্টা করেছিল বিএনপি জামায়াত।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেন আর তার মেয়ে শেখ হাসিনা দেশের জল ও স্থল সীমানা নির্ধারন করেছেন। দেশের সমুদ্রের তলদেশে যে সম্পদ আছে তা ব্যবহার করতে পারলে পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশ সবচাইতে ধনী দেশে পরিনত হতে পারে বলেও তিনি দাবি করেন।
শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, নর্থবেঙ্গল চিনিকলে অমৌসুমে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং র-সুগার থেকে বার্ষিক ৪০ হাজার টন ক্ষমতা সম্পন্ন সুগার রিফাইনারি স্থাপনের কাজ চলছে। এ ছাড়া নর্থবেঙ্গল ও ঠাকুরগাঁও চিনিকলে একটি করে ডিস্টিলারী, বায়ো ফার্টিলাইজার প্লান্ট ও ব্যায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চিনির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে ও চিনি শিল্প লাভজনক হবে। নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রীডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এ কে এম দেলোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে চিনিকল চত্বরে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস এমপি, সাবেক সভাপতি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক সাজেদুর রহমান খান, সিনিয়র সহসভাপতি ও স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ এবং মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আব্দুল আজিজ। অনুষ্ঠানে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সকল চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকেরা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান এ কে এম দেলোয়ার হোসেন সভাপতির বক্তব্যের সময় মিলের কোনো শ্রমিক-কর্মচারী সঠিকভাবে কাজ না করলে ফায়ার করার ঘোষণা দেন।
প্রায় ৬০ কোটি টাকার ১৬ হাজার মেট্রিন টন অবিক্রিত চিনির বোঝা বহন করতে থাকা নর্থবেঙ্গল চিনিকল গত মৌসুমে দুই লাখ ৪০ হাজার টন আখ মাড়াই করে ১৯ হাজার ২০০টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। পরে মিলটি এক লাখ ৪১ হাজার ৫৪৫ টন আখ মাড়াই করে মাত্র ১০ হাজার ২১৩টন চিনি উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এতে মিলটির লোকসান গুণতে হয় প্রায় ৩৬ কোটি টাকা। চলতি মাড়াই মৌসুমে আবারো দুই লাখ ৪০ হাজার টন আখ মাড়াই করে মিলটি ১৯ হাজার ৫৬০ টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

রাস্তার বেহালদশায় কোমর ব্যাথা হয়ে যায় : ওবায়দুল কাদের

রাজধানীর যানজট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন খোদ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেছেন, আমাদের এতো উন্নয়ন, এতো অগ্রগতির সাথে রাজধানী ঢাকাকে মেলানো যায় না। বিদেশিরা যখন এসে দীর্ঘ যানজটে পড়ে থাকেন, তখন দেশের উন্নয়নের সাথে এই ঢাকা মেলে না। এজন্য অবৈধ, রাস্তা দখল এবং অবৈধ যানবাহন চলাচলকে দায়ী করে মন্ত্রী ঢাকার দুই মেয়রের উদ্দেশে বলেন, বিড়াল মারতে হলে প্রথম রাতেই মারতে হবে। পরে আর পারবেন না।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) ইফাদ অটোস লিমিটেডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাক্সারি এবং কর্পোরেট বাসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী একথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, ইফাদ গ্রুপের চেয়ারম্যান ইফতেখার আহমেদ টিপু, ভারতের অশোক লেল্যান্ডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বালাচন্দ্রান ভেনকাট সুব্রামানিয়াম।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রী বলেন, ‘ল মেকাররা ল’ ব্রেকার হলে কি কিছু করা যায়?’ তিনি প্রশ্ন রাখের, আমাদের ভিআইপিরা রাস্তার উল্টো সাইড দিয়ে হন হন করে গাড়ি চালিয়ে চলে যান। আর রাস্তায় রোগী, শিশু, স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে পরে থাকেন। তাদের কথা একবারও চিন্তা করেন না। শুধু তাদেরই কাজ থাকে অন্যদের কাজ থাকে না। এ অবস্থা হলে কোনোভাবেই যানজট কমানো যাবে না।
তিনি আরো বলেন, আমরা যতই ফ্লাইওভার করি, মেট্রোরেল করি, এমআরটিএ করি কোনো লাভ হবে না, যদি ফুটপাথ, সড়ক দখলমুক্ত করতে না পারি। এজন্য ঢাকার দুই মেয়রকে বলবো এখনই এগুলো পরিষ্কার করে দিন। বিড়াল মারতে হলে প্রথম রাতেই মারতে হবে। তা না হলে পরে ভোটের রাজনীতি চলে আসবে, তখন আর পারবেন না।
বন্দরনগরী চট্টগ্রামেরও একই অবস্থা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিমানবন্দর থেকে আসতে গেলে রাস্তার বেহাল দশার কারণে কোমর ব্যথা হয়ে যায়। গণপরিবহনে বড় গাড়ি কমে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলোকে আমি ‘ইগনর’ করি। বিশেষ করে ঈদের সময় যা অবস্থা তাতে গাড়ির দিকে তাকানোই যায় না। তাই ইফাদ গ্রুপকে আগামী ২০১৬ সালের নভেম্বরের মধ্যে ১ হাজার ৫২ সিটের এসি ও নন এসি গাড়ি রাস্তায় নামানোর আহবান জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, অশোক লেল্যান্ড ভালোমানের গাড়ি আমাদেরকে দিয়েছে। বিআরটিসির বেশিরভাগ গাড়িই তো অশোক লেল্যান্ডের। চায়না থেকে আনা বিআরটিসি বাসগুলো তো ঝুলে ঝুলে পরছে। কে এনেছিলো নাম বলতে চাই না।

বাল্যবিয়ের অভিযোগে বরসহ ৩ জনের কারাদণ্ড

রব এসেছে, বরযাত্রী এসেছে, খাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এমন সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটসহ পুলিশ বিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির। পুলিশসহ ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে হাজির হয়েছে বিয়ের অনুষ্ঠানের দাওয়াত খেতে নয় বাল্য বিবাহ বন্ধ করতে। ডিমলা জেলা পরিষদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেনীর ছাত্রী শিল্পি আক্তারের (১৫) বিয়ে অনুষ্ঠানে বৃহস্পতিরার রাতে এ ঘটনা ঘটে। ডিমলা সদর ইউনিয়নের রামডাঙ্গা গ্রামে বিয়ের আসর থেকে বর, বরের পিতা ও কনের পিতাকে আটক করে। আটককৃতরা হলেন পুলিশ টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের পূর্ব খড়িবাড়ী গ্রামের বিশা ভুইয়ার পুত্র বর লেবু ইসলাম (২২), মৃতু আশান ভুইয়ার পুত্র (বরের পিতা) বিশা ভুইয়া ও ডিমলা সদর ইউনিয়নের রামডাঙ্গা গ্রামের মৃত্য আব্দুল লতিফের পুত্র কনের পিতা আযম আলী (৫০)। রাতেই ভ্র্যাম্যমান আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কর্মকর্তা (ভূমি) মিল্টন চন্দ্র রায় ভ্র্যাম্যমান আদালতে আটককৃত ৩ জনকে ৩দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন। সাজাপ্রাপ্তদের শুক্রবার সকালে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে ডিমলা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী ও বালাপাড়া ইউনিয়নের দক্ষিন সুন্দরখাতা গ্রামের হামিদুল ইসলামের কন্যা রুমা আক্তারে বাল্যবিয়ের অনুষ্ঠানে পুলিশ অভিযান চালায়। এ সময় পুলিশ ও ম্যাজিষ্ট্রেটের উপস্থিতির সংবাদ টের পেয়ে বাড়ীর সকলে পালিয়ে যায়। পুলিশ বিবাহের প্যান্ডেলসহ যাবতীয় জিনিসপত্র তচনছ করে দেয়। এ সময় ছাত্রীটির দাদা নমির উদ্দিনকে ১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

পরি by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

শিরিন কী করে জানত যে আমার এ রকমই কিছু একটা হবে? কী করে আগেভাগে বুঝে নিল একটা রুজিরোজগারের চেষ্টায় শহরে গেলে কাজের কাজ কতটা হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা তো নেই-ই, বরং কোনো না কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে লেজেগোবরে অবস্থা হবে আমার?
বলতে গেলে আমার পরিবারে সবচেয়ে বেশি পড়াশোনা জানা মানুষ আমিই। টেনেটুনে বিএ পাস করেছি। জমি-জিরেত, চাষ-বাস, গঞ্জের হাটে একটা মুদির দোকান চালিয়ে যে পরিবারটি মোটের ওপর ভালোই চলে যাচ্ছে, সেই পরিবারের একমাত্র শিক্ষিত ছেলেটি শহরে গেলে করে-কম্মে খেতে পারবে না, এই ধারণা বাড়ির লোকজনের কেন হলো, এই কথাটা মাথায় ঢোকে না আমার। আমি একটু বোকাসোকা ধরনের, এমনকি ভালো মানুষও—পরিবারের লোকজনের এই ধারণা। আমার আব্বা যত দিন বেঁচে ছিলেন, তিনিও বিশ্বাস করতেন এ কথা, বলতেনও কথায় কথায়। সে কথায় হয়তো সস্নেহ প্রশ্রয় ছিল, কিন্তু আমার এই সর্বনাশটাও তো করে দিয়ে গিয়েছিলেন তিনিই। খুব রাগ-অভিমান হয়, বড় দুই ভাই ক-অক্ষর গোমাংস, সে তুলনায় আমি মোটের ওপর স্কুল পাস দিলাম, কলেজে ভর্তি হলাম, কিন্তু আব্বার কাছে আস্থার জায়গাটা পেলাম না। আর উচ্চমাধ্যমিকের বেড়াটা যখন পেরিয়ে গেলাম, তখন তো তিনি ছিলেন না। তবে আম্মা আর বড় দুই ভাই-ভাবি খুব খুশি, বংশের মুখ উজ্জ্বল করার কথাও কে জানি বলেছিল। রোখ চেপে বসেছিল মাথায়। গ্রাম থেকে একটু দূরে একটা কলেজে গিয়ে বিএ পড়তে গিয়েছিলাম। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তৃতীয় শ্রেণিতে বিএ পাস করে যখন বাড়িতে ফিরেছি, তখন এই দিিগ্বজয়ের সংবাদে যেন উচ্ছ্বসিত হয়েছিল পুরো বাড়ি, এমনকি আশপাশের পাড়া পর্যন্ত।
.কিন্তু আমি যে একজন বোকা টাইপের ভালো মানুষ এবং বিষয়বুদ্ধির অভাবে আমার সে ধরনের উন্নতি হওয়ার সুযোগ বিশেষ নেই, এ ব্যাপারে মোটামুটি একমত ছিল সবাই। বরং গঞ্জের হাটটার ক্রেতাসমাগম ক্রমেই বাড়ছে, আর আমাদের চাল-ডাল-নুনের দোকানটার অবস্থাও বেশ জমজমাট, তার পাশেই একটা বইপত্র, খাতা-কলম আর মেয়েদের প্রসাধনসামগ্রীর দোকান করার ব্যাপারে আমাকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগল আমার দুই ভাই। খুব মনঃকষ্ট পেয়েছিলাম। অবশেষে ক্লাস সিক্সের রুলটানা খাতা আর মেয়েদের ত্বক ফরসা করার ক্রিম বিক্রি করে শেষ হয়ে যাবে একজন বিএ পাস যুবকের সব সম্ভাবনা!
আমার মনঃকষ্টের ব্যাপারটা বুঝে শহরে গিয়ে নাইট শিফটে আইন কলেজে ভর্তির পরামর্শ দিয়েছিলেন আমার স্বপন মামা। নিজে তিনি পেশায় উকিল, বললেন, ‘ল-কলেজে ভর্তি অইয়া যা, দিনের বেলা কয়েকটা দিন কোর্টবিল্ডিংয়ে ঘোরাঘুরি কর আমার লগে...তারপর দেখা যাক, কিছু একটা অইয়া যাইব...।’
 আমিও ভেবেছিলাম, দেখা যাক। সবাই আমার সম্পর্কে কী ভাবে আর আমি আসলে কী—এটা প্রমাণ করার একটা দায় নিয়েছিলাম নিজের কাঁধে। কিন্তু শিরিন, আমার বড় ভাবির ছোট বোন, ভ্রু নাচিয়ে দুচোখে শয়তানি হাসি খেলিয়ে বলেছিল, ‘বেহুদা শহরে যাইতাছ আকবর ভাই, তুমি সোজা মানুষ, ওইহানে তোমার অইব না কিছু...।’
‘ক্যান অইব না ক্যান, আমি লেহাপড়া শিখি নাই?’
‘আরে লেহাপড়া দিয়া সব অয় না। উল্টা শহরে কুনো চাল্লু মাইয়ার হাতে পড়লে জীবনডা ছ্যাড়াবেড়া...।’
মেজাজটা বিগড়ে গিয়েছিল, খেঁকিয়ে উঠে বলেছি, ‘কিয়ের সাথে কী, পান্তা ভাতে ঘি, আমি যাইতাছি কোরিয়ারের লাইগা...শহরের মাইয়ার লগে এইডার সম্পর্ক কী?’
বাচাল মেয়েটা তবু ছাড়ে না, বলল, ‘তোমার তো মাশাল্লাহ টমেটোর লাহান চেহারা, সিনেমায় কত দেখছ না গ্রামের পোলা শহরের মাইয়া, আবার শহরের পোলা গ্রামের মাইয়া...।’ দেখেছি অনেক দেখেছি। আমি পূরবী সিনেমা হলে মাঝে মাঝে বাংলা সিনেমা দেখতে যাই। তাতে শিরিনের বর্ণনামতো শহর-গ্রামের প্রেমের সম্পর্কও দেখেছি। এই শিরিনই তো কতবার আমার কাছে আবদার করেছে তাকে একবার সিনেমা হলে নিয়ে যেতে, নিইনি। সে ঘরে বসে টেলিভিশনেই দেখে। আমি গায়ে-পড়া মেয়েটার ঠাট্টার জবাবে শিক্ষিত মানুষের মতো গাম্ভীর্যে বলেছিলাম, ‘সবকিছু নিয়ে ফাইজলামি কইরো না শিরিন, সিনেমা আর বাস্তব জীবন এক জিনিস না।’ ‘স্বপন মামারও একটা মাইয়া আছে কলেজে পড়ে, হেব্বি সুন্দরী, এট্টু সাবধানে থাইকো।’—বলে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টিতে হেসে শিরিন সরে পড়েছিল সামনে থেকে। না, স্বপন মামার মেয়ের প্রেমে পড়িনি আমি। আমার ব্যাপারটা আরও জটিল। স্বপন মামার বাসাতেই থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে লজিং মাস্টারের দায়িত্ব পেলাম। তাঁর বিচ্ছু টাইপের ক্লাস সিক্সের ছেলে দীপনকে পড়াই, রাতে বঙ্গবন্ধু ল টেম্পলে নিজে পড়তে যাই, আর সকালের দিকে যাই কোর্টবিল্ডিংয়ে। স্বপন মামার কলেজপড়ুয়া মেয়েটা শিরিনের বর্ণনামতো তত সুন্দরী না হলেও স্মার্ট। হাঁটুর ওপর স্কার্ট পরে ঘুরে বেড়ায় ঘরে। তবে আমার দিকে কখনো আলাদা করে তাকায়নি। সামনাসামনি দু-একবার পড়েছে, তাতে তার চেহারায় উটকো লোকটাকে নিয়ে তেমন বিরক্তি যেমন দেখা যায়নি, আবার বাড়তি একটু মনোযোগের ব্যাপারও নেই। মেয়েটার নাম ঝুম্পা, সে প্রায় সারা দিন কানে হেডফোন লাগিয়ে রাখে আর লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটে। শিরিনবর্ণিত আমার ‘টমেটোর লাহান চেহারা’ যে তাকে মোটেও বিচলিত করেনি, এটা বুঝতে পেরে আমার মনে সামান্য একটু উপেক্ষার বোধ জেগেছে বটে, তবে স্বস্তিও পেয়েছি। কোর্টবিল্ডিংয়ে কাজ তেমন নেই, স্বপন মামার ফাইলপত্র গুছিয়ে রাখি, তিনি আদালতে যাওয়ার সময় পেছনে হাঁটি। মনে মনে ভাবি, কখন স্বপন মামার মতো সাদা শার্ট-প্যান্টের ওপর কালো কোর্ট পরে এজলাসে গিয়ে দাঁড়াতে পারব। আসল কাজ শিখতে আরও বহুদিন সময় যে লেগে যাবে, সেটা বেশ বুঝতে পারি। চট্টগ্রামের কোর্টবিল্ডিংটা পাহাড়ের ওপর। কেউ বলে, কাছারির পাহাড়, কেউ বলে পরির পাহাড়। একসময় যখন এই পাহাড়ে কোর্টবিল্ডিংটা হয়নি, কিংবা হলেও এত লোকজনের আনাগোনা ছিল না, তখন নাকি পরিরা নেমে আসত এই পাহাড়ে, তাই পরির পাহাড়। লোকজন এ কথা বিশ্বাস করে কি না জানি না, কিন্তু মুখে মুখে গল্পটা বেশ চালু আছে। নতুন কোনো লোককে এই গল্প বিশ্বাস করাতে অনেকে প্রবীণ লোকজনকে সাক্ষী রাখে। বছর বিশ-পঁচিশ আগেও এই প্রবীণদের অনেকে দূর থেকে পরিদের দেখেছে স্বচক্ষে। গায়ে পরির বাতাস লেগে পাগল হয়ে বাকি জীবন কাটিয়েছে এমন লোকও নাকি ছিল অনেক। এই পাহাড়ে এখন অজস্র মানুষের আনাগোনা। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের কত অভিযোগ! মামলা-মোকদ্দমার শেষ নেই, কত বিচার হচ্ছে প্রতিদিন, অবিচারও হচ্ছে আকছার। ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, উকিল-ব্যারিস্টার, চোর-বাটপার, দালাল—নানা কিসিমের মানুষের ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলে নিজের যেন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উঠে গেলে লাল ইটের দালান। দালানের আদল দেখলেই বোঝা যায় ব্রিটিশ আমলে তৈরি। আশপাশে অবশ্য নতুন ভবনও তৈরি হয়েছে অনেক। সেই পাহাড়ের চড়াই বেয়ে হেঁটে ওঠার সময় একদিন প্রথম দেখেছিলাম তাকে। ভিড়-কোলাহলের মধ্যে বেমানান, ব্যস্ততাহীন নিরুদ্বিগ্ন চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটি। এত সুন্দর মুখ, দেখলে বুকের ভেতর কেন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। ইহজীবনে এমন সুন্দর মুখ আমি দেখিনি। শ্যামলা মেয়ে একটু সাজগোজ করেছে, মুখে পাউডার, চোখে কাজল, ঠোঁটে রং, পিঠ ছাপিয়ে প্রায় কোমরে নেমে আসা সাপের মতো একটা লম্বা বেণি, তার আগায় একগোছা বেলি ফুল। ব্যস্ত-সমস্ত মানুষের সময় নেই, তারা তেমন ফিরেও তাকায় না। কিন্তু আমি থমকে যাই, আরেকবার ফিরে তাকাতেই হয়। দৃষ্টিবিনিময় হতেই কালো মেঘ দুফালি করে বিজলি চমকাল যেন সেই চোখে, ঠোঁটে চাপা একটু হাসি। আমি বোকা মানুষ, বোকার মতো কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকি। তারপর ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সরে আসি, ধীর-পায়ে পাহাড়ের চড়াই বেয়ে উঠতে থাকি আদালত ভবনের দিকে। বড় একটা শিমুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল। আসা-যাওয়ার পথে আমার মতো কতশত মানুষ তাকে দেখেছে। কেউ মনে রাখেনি। কিন্তু আমাকেই শুধু রাতে ঘুমছাড়া করে রাখল মেয়েটি। চোখ বুজলে তার ঠোঁট-চাপা হাসি মনে পড়ে, মাথায় বাজপড়া মানুষের মতো নিঃসাড় হয়ে থাকি আমি, তার চুলের বেণি আমার কপালে দু-ভ্রুর মাঝখানে সাপের ফণা দোলায়। কোর্টবিল্ডিংয়ের পাহাড়ে কী কাজ তার জানি না, আরও দু-একবার দেখেছি, সেই শিমুলগাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। আড়চোখে একবার তাকিয়ে আমি দ্রুত সরে গেছি। কিন্তু মাথা থেকে তো সরাতে পারি না, রাতে ঘুম হয় না বলে দিনের কাজকর্মে মন বসাতে পারি না। ছাত্রকে পাঠদান আর আইন কলেজে নিজের পাঠগ্রহণ—সব কাজই এলোমেলো হয়ে যায়। আমার এ অবস্থার কথা জানাব যে এমন কাউকেও তো পাই না। শিরিন থাকলে নাহয় বুদ্ধিমতী মেয়েটার সঙ্গে আলাপ-পরামর্শ করা যেত। সেদিন হনহন করে উঠে যাচ্ছিলাম আদালত ভবনের দিকে। সেই একই শিমুলগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। ঝলমলে শাড়ি-ব্লাউজ পরেছে প্রায় নব-বিবাহিতা নারীর মতো। পা আটকে গেল। তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল আরও একটি মেয়ে। তবে আমার চোখ থেকে তখন এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লোকারণ্যই হারিয়ে গেছে, পাশের মেয়েটাকে আলাদা করে লক্ষ করার সময় কোথায়। দৃষ্টি বিনিময় হলো, আর তার চোখে ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ। দৃষ্টি ফেরাতে পারি না। এবার ঠোঁট-চাপা হাসিটা একটু বিস্তৃত হলো। অবশেষে আমাকে হাত তুলে ডাকল। বেদেনীর ইশারাকে যেমন অনুসরণ করে সাপ, সেভাবেই যেন সুরসুর করে পৌঁছে গেলাম শিমুলগাছের নিচে। কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াতেই বলল, ‘যাইবেন?’
গলাটা কর্কশ, তার মুখশ্রীর সঙ্গে বেমানান।
বললাম, ‘কোথায়?’
‘আরে মিয়া, যাইবেন কি না কন?’
প্রায় ধমকের সুরে এই প্রশ্ন শুনে কোথায় যাব, কেন যাব—এসব নিয়ে কৌতূহল প্রকাশের সাহস হারিয়ে ফেলেছি, বললাম, ‘যাব।’ পাশের দাঁড়ানো মেয়েটাকে বলল, ‘তুই থাক, আমি আসতাছি।’ সে ইঙ্গিতে হাসল। গন্তব্য জানি না, আমি পিছু নিলাম। কোর্টবিল্ডিং থেকে হেঁটে লালদীঘির পাড় এলাকায় একটি হোটেলের ভেতর ঢুকে রিসেপশন কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চাবি দ্যান...।’ রিসেপশনের লোকটা নিশ্চয় পূর্বপরিচিত, আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে একটা চাবি দিয়ে বলল, ‘দোতলা, ২১৯ নম্বর...।’
অপরিচ্ছন্ন আলো-অন্ধকার ছোট একটি ঘর। একটি সিঙ্গেল খাট, একপাশে টেবিলের সঙ্গে একটি চেয়ার, এক কোণে একটি টেলিভিশনও আছে।
সুইচ টিপে ঘরের আলো জ্বালিয়ে মেয়েটি আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘সাত শ টাকা দ্যান।’
আমি একটু অবাক হয়ে তাকাতেই বলল, ‘রুম ভাড়া দুই শ টাকা, আমার পাঁচ শ।’
বুঝে না বুঝে বাধ্য ছেলের মতো আমি গুনে গুনে ওর হাতে সাত শ টাকা তুলে দিলাম। টাকাটা নিয়ে অদ্ভুত করে হাসল। তারপর একটানে পরনের শাড়িটা খুলে ছুড়ে দিল খাটের ওপর। শাড়ি-সায়া পরা মেয়েটার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছি না। কেমন বিভ্রান্ত বোধ করলাম। আমি বোকা মানুষ, কিন্তু এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো যেন। বললাম, ‘না না, আমি এই জন্য আসি নাই...।’
বিস্ফারিত চোখ, বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তাইলে কী কামে আসছেন? আমার লগে আপনের কামডা কী?’
‘না, আমি মানে...।’
‘আমি মানে কী? আমার লগে লাভ-মেরিজ করতে আসছেন? কোথ্থাইকা জানি আসে এইসব মাল। হালার দিনডা বরবাদ গেল আইজ...।’
গজগজ করতে করতে খাট থেকে তুলে শাড়িটা জড়িয়ে নিতে শুরু করল শরীরে।
খুবই বিব্রত কণ্ঠে বললাম, ‘তুমার নাম কী?’
‘আমার নাম দিয়া আপনের কাম কী? আমার নাম পরি।’
‘পরি!’—চমকে উঠি আমি। পরির পাহাড়ে শিমুলগাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে, তার নাম পরি!
‘আপনের কী নাম?’—গলায় তখনো প্রচণ্ড বিরক্তি।
‘আকবর।’
‘আকবর!’—এবার হেসে ফেলল পরি, রসিকতার সুরেই বলল, ‘তো বাদশা আকবর, আমার কাছে আপনার কী দরকার কন তো?’
কথা বেরোয় না মুখ দিয়ে, আমার কী দরকারের কথা জানাব পরিকে। আমি মনে মনে নানা কথা আওড়াই, কিন্তু কোনো কথাই জুতসই মনে হয় না। এই নিরুপায় অবস্থায় হঠাৎ বেপরোয়া হয়ে বলে বসি, ‘আমি তোমারে, মানে...তোমারে ভালোবাসি।’—কী করে যে এ কথা বেরিয়ে গেল আমারই মুখ দিয়ে!
এবার হাঁ হয়ে গেল পরির মুখ। ওকে এ রকম বিহ্বল অবস্থায় দেখে সাহস বেড়ে গেল যেন, মুখের ওপর বলে ফেললাম, ‘তোমারে বিয়া করতে চাই আমি।’
নিজেকে সামলে নিয়েছে ততক্ষণে। এবার কাচভাঙা শব্দে ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠল পরি, ধপ করে বসে পড়ল খাটের ওপর, ‘এত্ত বড় দুনিয়ায় আপনে আর মাইয়া মানুষ খুঁইজা পাইলেন না বাদশা আকবর। গেরাম থিকা নতুন আসছেন মনে অয়। যান বাইত যান, গিয়া বড় ভাবির ছোট বইনরে বিয়া কইরা সুখে-শান্তিতে দিন কাটান গিয়া...দুনিয়ায় ভালোবাসার কুনো অভাব নাই।’
আশ্চর্য! ভাবির বোনের কথা বলল কেন? পরি কী করে জানল আমার বড় ভাবির বোন শিরিন আমার প্রতি দুর্বল।
‘ভাবির বইনের কথা বললা ক্যান?’
‘ক্যান আবার, গেরামে খালাতো বইন, তালতো বইনের লগেই তো যত ভাব-ভালোবাসা। শেফালী ঘোষের গান শোনেন নাই—“অ পরানের তালতো ভাই...”।’
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি পরির দিকে।
পাঁচ শ টাকা ফেরত দিয়ে পরি বলল, ‘নেন, আপনার ট্যাকা ফিরায়া দিলাম, হোটেলের ভাড়া দুই শ ট্যাকা কিন্তু দেওন লাগব।’
‘ট্যাকা আমার লাগব না, তুমি রাইখা দাও।’
‘কাজ-কাম ছাড়া টাকা লই না আমি, আমাগোর কুনো নীতি নাই মনে করছেন?’
টাকা ফিরিয়ে নিই। কেন জানি দুচোখ ভিজে আসে আমার। দেখে করুণা হলো পরির, কাছে এসে আমার মাথাটা টেনে নিল বুকের কাছে। সস্তা দামের পাউডার আর ঘামের গন্ধটা আমাকে কী এক ঘোরের মধ্যে নিয়ে যায়। বেশ কিছুটা সময় মুখ ডুবিয়ে রাখি পরির বুকে।
পরি বলল, ‘আমরা বাজারি মাইয়া বাদশা আকবর, আমার কাছে ভালোবাসা আছেনি পাগল? যাও বাড়ি ফিইরা যাও, তুমার কথা কইলাম আমার অনেক দিন মনে থাকব।’
আমি করুণ চোখে তাকিয়ে থাকি পরির দিকে। সে আনমনে বিড়বিড় করে, ‘এই বাজারে আল্লা কত পাগলের দেহা পাই!’

দুই.
আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন আমার সফল হওয়ার নয়—এ কথা বুঝতে পেরে শহরের পাট চুকিয়ে আবার ফিরে এসেছি গ্রামের বাড়িতে। আমার উলাঝুলা চেহারা দেখে শিরিন বলেছে, ‘কইছিলাম না ছ্যাড়াবেড়া অইয়া যাইব। তোমারে আমার চেয়ে বেশি আর চিনছে কে?’
আমাকে এতই যখন চেনে শিরিন, ভাবলাম তাকেই বিয়ে করি। এ কথা বাড়িতে জানাতেই ভাই-ভাবি সবাই খুশি। শিরিন তো লজ্জায়-আনন্দে মুখে ওড়না চাপা দিয়ে কেঁদেই ফেলে। বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আমি বাজারে মনিহারি দোকান খোলার আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। শিরিনকে পরির সব কথা খুলে বলেছি। সে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে, বলে, ‘কইছিলাম না ধরা খাইবা তুমি।’
কত কথা বলেছি, কিন্তু এত যে বোকা মানুষ আমি, তা-ও একটা কথা গোপন রাখতে পেরেছি। কাউকে বলিনি, এমনকি শিরিনকেও না যে, সস্তা পাউডার আর ঘামের গন্ধটা নাকে লেগে আছে আমার।
কেউ জানে না, একা একা খালপাড়ে বসে পরির কাছে ফোন করি আমি। কোনো দিন ফোন ধরেই পরি বলে, ‘এহন না পরে, ঘরে এহন কাস্টমার আছে।’ আবার কোনো দিন বলে, ‘সারা দিন শিমুলগাছের তলায় দাঁড়ায়া আছি, কাস্টমারের দেহা নাই। তুমি কেমুন আছ বাদশা আকবর?’
বুকের ভেতর বর্ষার ভরা খালের খলবল জলের শব্দ শুনতে পাই তখন। আমি আকুল হয়ে বলি, ‘তুমার জন্য বড় মন পোড়ে, পরি।’
পরি বলে, ‘মনের হিসাব তো আমি বুঝি না বাদশা আকবর, শরীর ছাড়া আমার আর কিছু নাই।’
পরি আমার আম্মা, ভাই-ভাবির কথা জানতে চায়, শিরিনের কথাও জানতে চায়। আমি সব বলি। কিন্তু পরি বলে না। তার বাবা-মার কথা জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘জানি না।’ ঘর-বাড়ি কোথায়, তার ঠিকানাও নাকি জানে না। তাহলে পরি কোথা থেকে এল?
এককালে কোর্টবিল্ডিংয়ের জনবিরল পাহাড়ে পরিরা নেমে আসত। আকাশে উজ্জ্বল আলো ফুটে ওঠার আগে, অথবা খুব ভোরে; হয়তো গাছে গাছে যখন সূর্যাস্তের লাল আভা ছড়িয়ে পড়ত, সেই শেষ বিকেলে। আমার কেন জানি মনে হয়, সেই পরিদের কেউ একজন ভুলে তার ছোট্ট শিশুটিকে ফেলে রেখে গিয়েছিল। সেই পরিই এখন বড় হয়ে কাস্টমারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে শিমুলগাছের ছায়ায়।