Saturday, October 19, 2013

শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা কি স্বপ্নই থেকে যাবে? by মোঃ সিদ্দিকুর রহমান

শিশুর জন্মের পর পরই শুরু হয় তার ক্ষুধা নিবারণ, আদর-সোহাগ পাওয়ার অধিকার আদায়ে সংগ্রাম। এ সংগ্রামের প্রাথমিক ভাষা হল কান্না। ধীরে ধীরে শিশু বড় হতে শুরু করে। তার মুখে বোল ফুটতে শুরু করে। তার প্রতিবাদের ভাষাও পরিবর্তিত হয়। আমরা অভিভাবকরা তাদের ভাষা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হলে শিশুর স্বাভাবিক আচরণ পাল্টে যায়। জিনিসপত্র ভাংচুর বা ছুড়ে ফেলার মতো নেতিবাচক আচরণ দিয়ে তার প্রতিবাদ প্রকাশ করে। এর মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পেতে সে হয়ে ওঠে পরিবার তথা সমাজের যন্ত্রণা। শুধু শিশু নয়, জগতের সব প্রাণীই তার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে চায়। প্রাথমিক শিক্ষকরাও তাদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে আসছে। শিক্ষকতা জীবনের প্রারম্ভে পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের সময়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের সংগ্রাম করে ১২০ টাকা ও ১৩০ টাকার বেতন স্কেল আদায় করতে দেখেছি। তারপর স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম সরকারি মর্যাদা দেন। ৭৫ পরবর্তী সময়ে সে মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করার চক্রান্ত শুরু হয়। অবশেষে ১৯৮০ সালে ঢাকা মহানগরীর প্রাথমিক শিক্ষকদের ভাগ্যে নেমে আসে অমানিশা। ঢাকা মহানগরী ন্যস্ত করা হয় তৎকালীন ঢাকা পৌরসভার হাতে। বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে দেশব্যাপী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মঘট শুরু হয়। ২০ দিন ধর্মঘটের পর বার্ষিক পরীক্ষা নেয়ার তাগিদে ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার আগেই তৎকালীন সরকার সারাদেশের শিক্ষকদের গ্রাম সরকারের হাতে ন্যস্ত করে। ১৯৮১ সালের জানুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় ধর্মঘট চলে। প্রাথমিক শিক্ষকদের সরকারি মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে ক্ষমতাসীনরা ছাড়া সব রাজনৈতিক দল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সঙ্গে শুধু বিবৃতির মাধ্যমে নয়, বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে একই মঞ্চে অবস্থান করে প্রাথমিক শিক্ষকদের মহাবিক্ষোভের সঙ্গে একাÍতা ঘোষণা করেন। সব বিরোধী দল সর্বপ্রথম প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৮১ সালের ১০ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল ঘোষণা করে। সে সময়ও কিছু শিক্ষক শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনের সঙ্গে বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের মধ্যে ঢাকা শহরের মোসলেহ উদ্দিন হাওলাদার, এবিএম চাঁন মিয়া ও আঃ আউয়াল তালুকদারের ভূমিকা ন্যক্কারজনক। সেসময় তেজগাঁও থানার শিক্ষকনেত্রী শিল্প এলাকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুফিয়া আক্তারের নেতৃত্বে একটি মিছিল করে তেজগাঁও থানার বিজিপ্রেস প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করতে গিয়েছিলাম। দেশব্যাপী হরতালের ব্যাপক প্রস্তুতি দেখে সরকার বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সঙ্গে যৌথ চুক্তি করলে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শেষ হয়। তখন সারাদেশে থানা শিক্ষা অফিসার ছাড়া সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার পদ ছিল না। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো দেখাশোনার জন্য সারাদেশে সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার পদ সৃষ্টি করা হল। পরে তাদের দ্বিতীয় শ্রেণী ও থানা শিক্ষা অফিসারদের প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দেয়া হয়। মূলত ১৯৮১ সালের আন্দোলনের ফসল হল সহকারী থানা শিক্ষা অফিসার পদের জš§ এবং থানা শিক্ষা অফিসারদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি।
২০০৬ সালে শুরু হয় পদমর্যাদাসহ বেতন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন। সে আন্দোলনেও আঃ আউয়াল তালুকদাররা প্রাথমিক শিক্ষকদের ধর্মঘটের বিরোধিতা করেন। ফলে শাসকগোষ্ঠী সুযোগ পেয়ে সামান্য কিছু শিক্ষককে প্রতিপক্ষ সৃষ্টি করে কাক্সিক্ষত ফসল ঘরে তুলতে দেয়নি। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শুরু হয় ব্র্যাকবিরোধী আন্দোলন। সে আন্দোলন প্রাথমিক শিক্ষকরা তাদের সরকারি মর্যাদা অক্ষুণœ রাখেন। এ বছর (২০১৩) সরকারি প্রতিশ্র“তি মোতাবেক সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল আপগ্রেড ও প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদার সংগ্রামে সরকারের শেষ সময়ে কিছু পাওয়ার আগেই আবারও সেই বিশেষ মহলটি দৌড়ঝাঁপ, লম্ফ-ঝম্ফ দিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে।
প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সময়ক্ষেপণ বা প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সরকার। শিক্ষকদের এ আন্দোলনকে নস্যাৎ করা গেলেও পরে ভোটের আন্দোলনকে দমিয়ে রাখা যাবে না। প্রাথমিক শিক্ষকরা সমাজে মর্যাদার আসন নিয়ে পরিবার-পরিজনসহ সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হওয়ার বাসনা নিয়ে চিন্তিত। বাস্তবতার টানাপোড়েন কিংবা অসুস্থতা ও বার্ধক্যের বেখেয়ালিপনায় আপাত অবাস্তব এক স্বপ্নের ঘোরে একদিন ডুব দিলাম। স্বপ্নে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতাদের সঙ্গে আমি এক বিশেষ ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎপ্রার্থী। কিছুক্ষণ পর যিনি উপস্থিত হলেন তিনি আর কেউ নন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে আবেগ আপ্লুুত হয়ে প্রাথমিক শিক্ষকদের বললেন, জাতির জনক সর্বপ্রথম ১৯৭৩ সালে আপনাদের সরকারি মর্যাদা দিয়েছেন। সরকারি মর্যাদা অক্ষুণœ রাখার জন্য আপনারা ১৯৮১ সালে আন্দোলন করেছেন। ২০০৬ সালে বেতন বৈষম্য ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে আজও বাস্তবায়ন না হওয়ায় আমি দুঃখ প্রকাশ করছি। প্রাথমিক শিক্ষকরা এ দেশের সুনাগরিক তথা প্রথম শ্রেণীর নাগরিক তৈরির প্রধান স্থপতি। তাই প্রাথমিক শিক্ষকরা তৃতীয় শ্রেণীর থাকবে। তিনি কিছুতেই এ ব্যাপারে একমত হতে পারলেন না। তিনি বললেন, যেখানে প্রাথমিক শিক্ষকরা থাকবেন গেজেটেড, সেখানে আপনারা শুধু প্রধান শিক্ষকদের গেজেটেড মর্যাদা দেয়ার কথা বলছেন। যাক আমি আপনাদের বেতন স্কেল আপগ্রেডসহ প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা বাস্তবায়ন করছি। এ দাবি বাস্তবায়নে সরকারের শীর্ষ মহলে যারা সময়ক্ষেপণ করে আন্দোলন করতে বাধ্য করেছেন, সবার বিরুদ্ধে আমি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব। আপনাদের দীর্ঘসময় মর্যাদা না দেয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে আবারও দুঃখ প্রকাশ করছি। আমার ও আমার সরকারের জন্য দোয়া করবেন।
স্বপ্নের রেশ কাটলেও বক্তব্যটি নিছক কাল্পনিক মনে করতে চাই না। হিসাব কষতে গিয়ে মনে হল, দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করে যিনি চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছেন তার পক্ষে প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলনের মাহাÍত্ময বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রত্যাশা ও দোয়া যেন স্বপ্নে পর্যবসিত না হয়, এ কামনাই করছি।
মোঃ সিদ্দিকুর রহমান : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি ও প্রাথমিক শিক্ষাবিষয়ক গবেষক

কী হবে পঁচিশে অক্টোবর? by পলাশ কুমার রায়

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করার পর থেকেই প্রধান বিরোধী দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে নানাভাবে আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। বিরোধী দলের এসব আন্দোলন সরকার শুরু থেকে অদ্যাবধি পাত্তাই দেয়নি বরং বিরোধী দলকে দমন নিপীড়নের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে। এদিকে সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বরাবরই বলে আসছেন, পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন পরিচালনা করে সেভাবেই অর্থাৎ সংবিধান অনুসারে (পঞ্চদশ সংশোধনী) সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আসন্ন সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে চলছে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা। কখন, কিভাবে, কোন সরকারের নেতৃত্বে, কী পদ্ধতিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবেÑ এসব প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। কিন্তু কেউই পরিষ্কার করে এসব প্রশ্নের যুতসই জবাব দিতে পারছে না। এমনকি আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা থেকে শুরু করে মহাজোট সরকারের শরিক দলগুলোর নেতারাও জানেন না নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে এবং কবে অনুষ্ঠিত হবে।
প্রধান বিরোধী দল এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে ২৫ অক্টোবরের মধ্যে সংবিধান সংশোধন করে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। বিরোধী দলের এ দাবির যৌক্তিকতা আছে বলেই অনুমান করেন অনেকেই। কেননা, ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সমমর্যাদা সম্পন্ন কর্তাব্যক্তিরা এবং সংসদ সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাবে। এ অন্যায় ও অবৈধ সুযোগ আওয়ামী লীগের অনেক নেতা গ্রহণ করবেন না, তার নিশ্চয়তা কী? বর্তমান মন্ত্রিসভা তথা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা (যারা নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকবেন) সরকারের নির্দেশে কাজ করবেন না, সেটাও হলফ করে বলা যাবে না। কেননা, যতই দিন গড়াচ্ছে ততই সরকারি কর্মকর্তারা নিজের আদর্শ, অস্তিত্ব ও ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেনÑ সাময়িক সুবিধা পাওয়ার স্বার্থে। অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তাকে যতটা না জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়, তদপেক্ষা সরকারের তোষামোদি আর ক্ষমতাসীন দলের তৃণমূল নেতাদের অন্যায় দাবি বাস্তবায়নে বেশি তৎপর হতে দেখা যায়। যেন এটাই বাস্তবতা। কিন্তু সরকার এমন বাস্তবতায় আÍপক্ষ সমর্থন করে বলছে, নিকট অতীতে যতগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোতে সরকার কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি। বিরোধী দল বলছে, এ খোঁড়া যুক্তি দাঁড় করালে চলবে না। স্থানীয় সরকার আর সাধারণ নির্বাচন এক বিষয় নয়। সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদে বসা যায়, তাই এ নির্বাচন যেনতেন প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে দেয়া হবে না বলে বিরোধী দল বরাবরই সতর্ক করে দিয়েছে সরকারকে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দেশের প্রধান দুই দল পালাক্রমে ক্ষমতার মসনদে বসতে জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করে। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলেও আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে টালবাহানা করেন। অতীতে দুই দলই এ রকম আচরণ করেছে। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে নিয়েও আওয়ামী লীগ এ রোগে আক্রান্ত এবং কোনোভাবেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না করার ব্যাপারে অনড় অবস্থানে রয়েছে। পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর দেশের বড় দুটি দলই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে ভয় পায়। দেশের উন্নয়ন করলে, মানুষের কল্যাণ করলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে ভয় পাওয়ার কথা। অতীতে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য যতটা চিৎকার-চেঁচামেচি করেছে, বিরোধী দল তার সিকি অংশও করেনি। তাছাড়া আওয়ামী লীগ একটি নির্বাচনমুখী দলÑ তাহলে তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্পন্ন করতে নিজেদের বিতর্কিত করছে কেন? আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে মনে রাখতে হবে এটাই শেষ নির্বাচন নয়, নির্বাচন ভবিষ্যতে আবারও আসবে। যারা ক্ষমতায় থেকে বিরোধী দলের দাবির প্রতি সম্মান না জানিয়ে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে নানা ধরনের ফন্দি-ফিকির করে, তাদের আÍজিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন, তারা বিরোধী দলে থাকলে কি সেই পুতুল-পুতুল খেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত?
আমাদের রাজনীতিকরা উত্তম আদর্শ স্থাপন করে ভবিষ্যৎ প্রজšে§র জন্য ভালো কিছু উদাহরণ রেখে যেতে চান না। শুধু নগদ নারায়ণ নিয়ে ব্যস্ত অধিকাংশ রাজনীতিক। বর্তমানে যারা ছাত্র সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারা ভবিষ্যতে রাজনীতিক হয়ে কী ধরনের আদর্শ স্থাপন করবেন তা আমাদের প্রবীণ রাজনীতিকরা ভাবেন কি? জাতীয় সংকটেও বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের এক টেবিলে বসে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংকট নিরসন না করে বরং ওই সংকটের জন্য এক পক্ষ অপর পক্ষকে দায়ী করার মনোভাব লক্ষ্য করা যায়। এ নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে বেরোনোর জন্য দুদলকেই এগিয়ে আসতে হবে, প্রয়োজনে ত্যাগ স্বীকার করে হলেও। আর সেটি যদি সম্ভব না হয়, তাহলে আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে সংকট ক্রমশই বাড়বে এবং ইউরোপ-আমেরিকার কূটনীতিকরা চায়ের টেবিলে বসে আমাদের জ্ঞানদান করার সুযোগ পাবে। দেশের মঙ্গলের স্বার্থেই আমাদের রাজনীতিকদের কখনও কখনও ছাড় দেয়ার মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে।
গণমাধ্যমের বদৌলতে পুরো দেশবাসী জানতে পেয়েছে, ২৫ অক্টোবর থেকে ঢাকাসহ সারাদেশ অচল হয়ে যাবে। আবারও প্রকাশ্যে হত্যাযজ্ঞ চলবে! নিরীহ মানুষ মারা যাবে। পথচারী আতংকিত হয়ে চলাফেরা করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়বে। খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে যাবে। সিএনজি-বাস-ট্রাকচালকরা পেটের দায়ে, সংসারের ভরনপোষণের খাতিরে কাজে বের হয়ে লাশ হয়ে ফিরবে। পুলিশের লাঠিপেটা খাবে সাধারণ মানুষ। এ আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট সুবিধাদি ভোগ করবে রাজনীতিকরা, যারা আন্দোলনের সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে রিমোট কন্ট্রোলের মতো কলকাঠি নেড়েছে।
দীর্ঘদিন প্রবাস জীবন কাটিয়ে সম্প্রতি দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী আমার এক মক্কেলের বাড়িতে ঈদের ছুটিতে দাওয়াত খেতে গেলে তিনি টেলিভিশনের খবরাখবর শুনে আমাকে সতর্ক করে বললেন, উকিল সাহেব, ২৫ অক্টোবর বাসা থেকে বের হবেন না। খুব সাবধান। বাঁইচ্যা থাকলে বহু ওকালতি করবার পারবেন। মইরা গেলে সব শেষ। বাঁইচ্যা থাকেন, বাপ, মা, বউ পোলাপাইনরে দেইখ্যা শুইন্যা খাওয়াইতে পারবেন, মইরা গেলে তখন আপনার বুড়া বাপ-মায়েরে দেখবো কেডা? এই যে, এতগুলা বেডায় মরলো, হেগো খবর কেউ লয়? আপনি মরলেও আপনার খবর কেউই লইবো না। এজন্য কই পঁচিশ তারিখ বাসায় বইসা টিভিতে খবর দেখবেন, এরপর ...। সত্যিই কি ২৫ তারিখে ভাড়া বাসা থেকে মরার ভয়ে বের হব না? গণতন্ত্রের জন্য, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য, স্বাভাবিকভাবে দেশ পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা আরও কত মানুষের জীবন চান, কত মানুষের তাজা রক্ত ঝরাতে চানÑ বলবেন কি?
পলাশ কুমার রায় : আইনজীবী; আহ্বায়ক, সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন (সুপ্রা)

বৌদ্ধ প্রবারণা : ধর্মীয় ও সামাজিক আবেদন by ড. সু কোমল বড়– য়া

শুভ প্রবারণা। এটি বৌদ্ধদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। শুধু বাংলাদেশের বৌদ্ধরা নন, বিশ্বের সব বৌদ্ধ এ শুভ তিথিটি যথাযথ মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপন করছেন। এই দিনে আমি দেশের সব ধর্ম সম্প্রদায় এবং বিশ্ববাসীকে জানাই প্রবারণার শারদীয় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আবহমান কাল থেকে এ সংস্কৃতি এখানে বহমান। এখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বলতে কিছু নেই। এ দেশ আমাদের সবার। এটা আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি। তাই তো আমরা এখানে নানা জাতি, গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দেখতে পাই। দেখতে পাই নানা ধর্মীয় উৎসব ও পূজা-পার্বণ। এটাই হল আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি। এটাই আমাদের ঐক্য, সংহতি ও সম্প্র্রীতির মেলবন্ধনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দেখুন, কী অপূর্ব মিলন আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে! ভাবলে অবাক হই। এই তো কদিন আগেই শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হল মহাসাড়ম্বরে। এটি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। এর রেশ কাটতে না কাটতেই উদযাপিত হল বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। দুটি উৎসবের অপার আনন্দ আমরা সবাই ভাগাভাগি করে উপভোগ করেছি। বেশ উৎসবমুখর ছিল গত কটা দিন। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে বৌদ্ধ আর কে খ্রিস্টানÑ এর মাঝে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। সবাই আমরা কেনাকাটা করেছি, আনন্দ করেছি। মিলেমিশে সব জায়গায় ঘুরেছি, বেড়িয়েছি। আজ উদযাপিত হচ্ছে বৌদ্ধ প্রবারণা। প্রতিটি বৌদ্ধ পল্লী, জনপদ আর পার্বত্য বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরগুলো যেন আনন্দে মুখরিত। সমতল-পার্বত্য এলাকার মধ্যে কোনো রকম বৈষম্য দেখছি না। সব জায়গায় চলছে যেন রং-বেরংয়ের ফানুস আর কল্পতরু তৈরির মহা ধুমধাম।
প্রবারণা বৌদ্ধ বিনয়ভিত্তিক একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রতকর্ম ও অধিষ্ঠান। এর কার্যকারিতা শুধু বৌদ্ধ ভিক্ষু-শ্রামনদের জীবনের জন্য নয়, সামগ্রিক বৌদ্ধ জীবন তথা বৌদ্ধ নর-নারী, উপাসক-উপাসিকাসহ মানবজীবনের সর্বাবস্থায় এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বলা আছে, এসব নীতি-আদর্শের মধ্যে কোনো প্রকার শৈথিল্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই। তাই বৌদ্ধ প্রবারণা শুধু ধ্যানের দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এতে আÍশুদ্ধিতা, আÍসংযম ও আÍোপলব্ধির মতো ভাবনাগুলো বেশ কার্যকর হয়ে ওঠে। এছাড়া মানবজীবনের বহুমাত্রিকতার গুণেও বৌদ্ধ প্রবারণা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়। যেমনÑ সেবা, দান, পরোপকার, বিনয় ও পারস্পরিক সৌজন্য প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য এবং পাশাপাশি আÍজিজ্ঞাসা, কর্তব্য, ধ্যাননিষ্ঠতা ও বিবেকবোধের মতো অন্তর্মুখী গুণগুলোও। এগুলো কোনো একটি ধর্ম সম্প্রদায়ের জন্য নয়, সমগ্র মানবসত্তার জন্য প্রয়োজন। এ জন্য বলা হয়, বৌদ্ধ প্রবারণার আবেদন সবার জন্য, সর্বজনীন ও সর্বকালীন। সংঘশক্তি বৃদ্ধিতেও এর কর্মপ্রবাহ অসাধারণত্বের পরিচয় দেয়। জাতীয় ঐক্য, সংহতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনে এর অবদান অতুলনীয়। বৌদ্ধ শাস্ত্রে আরও উল্লেখ আছে, সুখ সঙঘস্স সাম¹ি সাম¹নং তপো সুখো। অর্থাৎ একত্রে বাস করা সুখকর, একত্রে মিলনও সুখকর এবং একসঙ্গে তপস্যা করা আরও বেশি সুখকর। সুতরাং তিন মাস প্রবারণার ধ্যানে শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞা শিক্ষার জন্য সবাইকে একসঙ্গে তপস্যা করতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ঐক্য তৈরি করতে হয়।
পাপকে বারণ করা, পাপকর্ম থেকে বিরত থাকার নামই প্রবারণা। একে ধ্যানের অভিলাষ পূরণও বোঝায়। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা দীর্ঘ তিন মাস বৌদ্ধরা যে ধ্যানের অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন, তারই সমাপ্তি দিবসকে বলা হয় প্রবারণা। এটি ইসলামের রোজাভঙ্গের শেষ দিন ঈদুল ফিতরের মতো আনন্দঘন একটি দিবস। বৌদ্ধরা বহির্মুখী শিক্ষার চেয়ে অন্তর্মুখী ভাবনাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। চিত্তের উৎকর্ষই হল অন্তর্মুখী শিক্ষা। এতে মানবিক গুণাবলি তথা মনুষ্যত্বের পূর্ণ বিকাশ ঘটে। তাই তো বলা আছে, মনুষ্যত্বের গুণেই মানুষ বড় হয়। বিত্তে নয়, চিত্তের গুণে।
সামাজিক দৃষ্টিতে বৌদ্ধ প্রবারণা একটি জাতীয় উৎসবও বটে। এদিন বৌদ্ধ পাড়া-মহল্লা ও প্রতিটি বিহারকে নানা আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়। পতাকা, ব্যানার ও ফেস্টুন দিয়ে বিহার ও বিহারের চারপাশ বর্ণাঢ্যভাবে সাজানো হয়। রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। শিশু-কিশোর, বালক-বালিকা, বৃদ্ধ-প্রৌঢ় সব বয়সের মানুষ যেন এদিন আনন্দে মেতে ওঠে। ছেলেমেয়েরা বাগান থেকে নানা বর্ণের ফুল ও পুষ্পপাতা এনে গৃহ ও বিহারকে সাজিয়ে তোলে। বাড়িতে তৈরি করা হয় নানা রকমের সুস্বাদু খাবার, পায়সান্ন আর পিঠা। প্রবারণার দিন অতি ভোর থেকেই বৃদ্ধ নর-নারী ও নানা বয়সের ছেলেমেয়েরা নতুন ও পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করে। সারিবদ্ধভাবে শোভাযাত্রা করে। পরস্পর কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময় করে। বড়দের প্রণাম করে। পূজার অর্ঘ্য আর দানীয় সামগ্রী নিয়ে বিহারে যায়। পঞ্চশীল, অষ্টশীল গ্রহণ করে। বুদ্ধপূজা দেয়। ধর্ম শ্রবণ করে। বারবার সাধুবাদ দেয়। বিহারে নানা রং-বেরংয়ের সুদৃশ্য কল্পতরু বৃক্ষ তৈরি করা হয়। এতে ছেলেমেয়েরা মনের আনন্দে যার যার সামর্থ্য ও ইচ্ছানুযায়ী দানীয় সামগ্রী বেঁধে দেয়। বেশ আনন্দ করে। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই নানা রংয়ের ফানুস ওড়ানো হয়। এটি করা হয় বুদ্ধের কেশধাতু পূজার উদ্দেশেই। নেচেগেয়ে কীর্তন করা হয়। ঢাকঢোল বাজানো হয়। নদী ও সাগরে রঙিন কাগজ এবং কাপড়ের তৈরি জাহাজ ও নৌকা ভাসানো হয়। তারপর সবাই বিহারে বসে দেশ, জাতি ও বিশ্ব শান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনা ও মঙ্গল কামনা করেন। ভিক্ষুরা সীমাঘরে বসে কিংবা বুদ্ধের সামনে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রবারণার বিনয়কর্ম সম্পাদন করেন। ত্রৈমাসিক বর্ষাবাস ব্রত ভঙ্গ করেন। এর পরদিন থেকেই শুরু হয় শুভ কঠিন চীবর দানোৎসব। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা-চরথ ভিক্খবে চারিকং, বহুজন হিথায়, বহুজন সুখায়Ñ বুদ্ধের এই মহামন্ত্র বাণী নিয়ে ধর্ম প্রচারের জন্য চারদিকে বের হন। সদ্ধর্ম প্রচারে ব্রতী হন। বিহারগুলোতে চলে মাসব্যাপী কঠিন চীবর দানোৎসব ও ধর্মীয় সভা। এতে অনেক লোকের সমাগম হয়। অতএব, বৌদ্ধ প্রবারণা ধর্মীয় জীবনে যেমন অর্থবহ দিকনির্দেশনা করে, তেমনি সামাজিক ও জাতীয় জীবনেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান বহন করে। চলুন, আমরা সবাই প্রবারণার শিক্ষায় ব্রতী হই। আর এদিনে দেশের এই ক্রান্তিকাল ও সংকট থেকে উত্তোরণের জন্য সবাই প্রার্থনা করি। সব্বে সত্তা সুখীতা হোন্তুÑ জগতের সকল জীব সুখী হোক। বাংলাদেশ সমৃদ্ধময় হোক। সমগ্র বিশ্বে শান্তি বিরাজ করুক। ভবতু সব্ব মঙ্গলংÑ সকলেই মঙ্গল লাভ করুক।
প্রফেসর ড. সুকোমল বড়–য়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি এন্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

সুন্দরবন ধ্বংস মানে অরক্ষিত বাংলাদেশ by আনু মুহাম্মদ

বিশেষজ্ঞ মত ও জাতীয় জাগরণ উপেক্ষা করে গত ৫ অক্টোবর, নির্ধারিত তারিখের ১৭ দিন আগে, ২৫০ কিলোমিটার দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে রামপালে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ভিত্তিফলক উšে§াচন করেছেন। লংমার্চের মধ্য দিয়ে সুন্দরবন রক্ষার জাতীয় জাগরণের মুখে এটা বেশ চাতুর্যপূর্ণ পদক্ষেপ সন্দেহ নেই। কিন্তু এসব ‘চালাকি’ সরকারের শক্তির নিদর্শন নয়, বরং তাদের নৈতিক পরাজয়ের লক্ষণ। এটা প্রমাণ করে যে, বৈজ্ঞানিক তথ্য-যুক্তির সামনে দাঁড়ানোর কোনো তথ্য-যুক্তি সরকারের নেই; গণরায়ের সামনে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস তাদের নেই। সে জন্যই এই ফলক বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় স্বার্থবিরোধী সুন্দরবন ধ্বংসের তৎপরতার একটি চিহ্ন হয়ে থাকবে। ‘উন্নয়ন’ নামের এই ধ্বংসের প্রকল্পকে বাংলাদেশ ও ভারতের বন্ধুত্বের নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও এটি কার্যত ভারতের সঙ্গে বৈরিতা বৃদ্ধির একটি প্রকল্প। সরকার এ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হওয়ার মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের পথ আরও সংকুচিত করেছে। ভারতের আগ্রাসী নীতি এবং দুই দেশের কতিপয় গোষ্ঠীর মুনাফা আগ্রাসী তৎপরতার কাছে সরকার আÍসমর্পণ করেছে। সুন্দরবনকে ধ্বংস করার এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ফলক উšে§াচনের দিনটি তাই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কেও একটি কলংক হয়ে থাকবে।
এর আগে গত ৩-৫ মার্চ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফর করেন। তিনি ঢাকায় প্রদত্ত বক্তব্যে সুন্দরবন রক্ষায় দুই দেশের যৌথ ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমরা স্বস্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু ক্রমান্বয়ে দেখতে পাচ্ছি, দুই দেশের সরকার যৌথভাবে রামপাল বিদ্যুৎ প্লান্টের মাধ্যমে বরং সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন করছে। আশার কথা এই যে, দুই দেশের জনগণের পক্ষ থেকেই এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সংগঠিত হচ্ছে। ইতিমধ্যে সুন্দরবন রক্ষার লক্ষ্যে তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ বিদ্যুৎ ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বানে লংমার্চ কর্মসূচিতে অসংখ্য মানুষ সাড়া দিয়েছেন।
দেশের শিল্প, কৃষি, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা, জীবনযাপন এবং সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য যথাসম্ভব কম দামে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যাবশ্যক। এর জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাবলীর সুপারিশ আমরা বিভিন্ন সময়ে করেছি। আমাদের এসব সুপারিশের মূল কথা হল, জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের সম্পদ শতভাগ জনগণের মালিকানায় রেখে তার পুরোটা বর্তমানে ও ভবিষ্যতে দেশের কাজে লাগানো, খনিজ সম্পদ রফতানি নিষিদ্ধকরণ, নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানির সংমিশ্রণে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। দেশ ও জনগণ এতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট থেকে খুব দ্রুত মুক্ত হতে পারত। কিন্তু এভাবে অগ্রসর হলে বহুজাতিক কোম্পানি, দেশী কতিপয় ব্যবসায়ী ও কমিশনভোগী বিরাট লুটপাট থেকে বঞ্চিত হতোÑ সেটাই নীতিনির্ধারকদের জন্য সমস্যা।
সুন্দরবনের আঙিনায় রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ সময় ধরে সমীক্ষা করে এ প্রকল্পের ভয়াবহতা সম্পর্কে এর আগেই সতর্ক করেছেন। পরে এ নিয়ে অন্য বিশেষজ্ঞরাও প্রায় একই রকম বক্তব্য রেখেছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞ মত ও জনগণের বিরোধিতা উপেক্ষা করে, পরিবেশ অভিমত সমীক্ষা (ইআইএ) না করে সরকার এলাকার মানুষের জমি দখল করেছে এবং মানুষ উচ্ছেদ করেছে। প্রতিবাদকারীদের ওপর পুলিশ ও সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে বহুবার। জমি অধিগ্রহণ ও প্রাথমিক চুক্তি সম্পন্ন করার পরেই ইআইএ রিপোর্ট সম্পন্ন করা হয়েছে।
গত ১২ এপ্রিল ইআইএ রিপোর্ট পর্যালোচনার জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় একটি পর্যালোচনা সভার আয়োজন করে। ওই সভায় বিশেষজ্ঞরা ইআইএ রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে নতুন ইআইএ রিপোর্ট প্রণয়নের দাবি জানান। একই সভায় নতুন রিপোর্ট না হওয়া পর্যন্ত এ প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখারও দাবি জানানো হয়। ইআইএ রিপোর্ট এভাবে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরও গত ২০ এপ্রিল রামপাল বিদ্যুৎ প্লান্ট নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারত যে চুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে দুই দেশের সরকার যৌথভাবে আন্তর্জাতিক বিধি লংঘন করে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, প্রাণবৈচিত্র্যের অসাধারণ আধার এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাকৃতিক রক্ষাবর্ম সুন্দরবন ধ্বংস করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করেছে। উপরন্তু এ চুক্তিতে ভারতীয় কোম্পানির উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার জন্য কর মওকুফ, বিদ্যুতের দাম অনির্ধারিত রাখাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাÍক পরিবেশ দূষণ ঘটায় বলে সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংরক্ষিত বনভূমি ও বসতির ১৫ থেকে ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয় না। ভারতীয় কোম্পানি বাংলাদেশে সুন্দরবনের ৯-১৪ কিলোমিটারের মধ্যে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে যাচ্ছে। বাফার জোন বিবেচনা করলে এই দূরত্ব ৪ কিলোমিটার। অথচ ভারতেরই ‘ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন অ্যাক্ট ১৯৭২’ অনুযায়ী, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১৫ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে এবং ভারতের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় প্রণীত পরিবেশ সমীক্ষা বা ইআইএ গাইডলাইন ম্যানুয়াল ২০১০ অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো বাঘ/হাতি সংরক্ষণ অঞ্চল, জৈব বৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বনাঞ্চল, জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য কিংবা অন্য কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চল থাকা অনুমোদন করা হয় না। ভারতীয় পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ‘তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত গাইডলাইন, ১৯৮৭’ অনুসারেও কোনো সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ২৫ কিলোমিটারের মধ্যে কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ স্থাপন করা যায় না। এ জন্য গত কয়েক বছরে ভারতের কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে তিনটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হয়েছে। অর্থাৎ ভারতীয় কোম্পানি এনটিপিসিকে বাংলাদেশে সুন্দরবনের যত কাছে পরিবেশ ধ্বংসকারী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে দেয়া হচ্ছে, তার নিজ দেশ ভারতে হলে সেখানকার আইন অনুযায়ী তা তারা করতে পারত না!
ভারতীয় কোম্পানির মাত্রাতিরিক্ত মুনাফা নিশ্চিত করতে ও দেশী কিছু সুবিধাভোগীর স্বার্থে প্রণীত এই ধ্বংসাÍক প্রকল্পের সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় বলা হচ্ছে যে, এই প্রকল্পে সুপারক্রিটিক্যাল টেকনোলজি ব্যবহার করা হবে, সে জন্য সুন্দরবনের কোনো ক্ষতি হবে না। আমাদের প্রশ্নÑ প্রথমত, এই প্রযুক্তিতে কিছু ক্ষেত্রে শতকরা ১০ ভাগ ক্ষতি কম হয় ঠিক, কিন্তু তাতে সুন্দরবনের ধ্বংসের সামগ্রিক ক্ষতি কীভাবে কমবে? দ্বিতীয়ত, এই প্রযুক্তি যদি সুন্দরবনের ধ্বংস ঠেকানোর মতো এত নিশ্চিত প্রযুক্তি হয়, তাহলে ভারতীয় কোম্পানি কেন ভারতে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সব ক্ষতি দূরীভূত করে না? কেন গত তিন বছরে তাদের তিনটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল হয়?
সরকার যখন একদিকে বিদ্যুৎ সংকটের সমাধানের কথা বলে সুন্দরবন ধ্বংসী তৎপরতায় লিপ্ত, ঠিক সে সময়ই বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্ভাব্য মজুদের ওপর বাংলাদেশের কর্তৃত্ব বিনাশ করে এ সম্পদের বিশাল সম্ভাবনা নষ্ট করছে। গ্যাস সংকট চলছে, কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে রফতানিমুখী চুক্তিও বলবৎ আছে। এর মধ্যে পুঁজির অভাবের কথা বলে অগভীর সমুদ্রের তিনটি ব্লক দুটি মার্কিন ও ভারতীয় কোম্পানিকে দেয়া হয়েছে। অথচ তারা পাঁচ বছরে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবে, তার সমপরিমাণ ‘গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে’ অলস পড়ে আছে।
সম্প্রতি সরকার বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির দাবি অনুযায়ী পিএসসি-২০১২ সংশোধন করে আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই সংশোধনীতে কোম্পানিগুলোর সুবিধা এত বেশি বাড়ানো হয়েছে, এরপর থেকে বাংলাদেশকে নিজের গ্যাস আমদানি করা আন্তর্জাতিক দামের বেশি খরচে কিনতে হবে। উপরন্তু সম্পূর্ণ জিম্মি থাকতে হবে এসব কোম্পানির হাতে। তাদের কাছ থেকে গ্যাস কেনার জন্য গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে শতকরা প্রায় ৫০ থেকে ৭০ ভাগ। তাছাড়া যে কোনো দামে তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির সুবিধা দিয়ে পুরো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে অসম্ভব ব্যয়বহুল করে ফেলার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এরপরও বিদেশী কোম্পানির কর মওকুফ করা হচ্ছে। গ্যাসের ওপর তাদের কর্তৃত্বের অনুপাতও বাড়ানো হচ্ছে। কস্ট রিকভারি হিসেবে তাদের মালিকানা শতকরা ৫৫ ভাগের স্থলে করা হচ্ছে ৭০ ভাগ। জ্বালানি নিরাপত্তা ও জ্বালানি সংকট সমাধানের যে শক্তিশালী সম্ভাবনা বাংলাদেশে আছে, পিএসসি ২০১২ অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষর হতে থাকলে তা সম্পূর্ণ নিঃশেষ হবে। সম্পদ পরিণত হবে অভিশাপে।
বিশেষজ্ঞরা তো বটেই, এমনকি পিডিবির মধ্য থেকেও বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্লান্ট মেরামত করলে খুব কম খরচে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বাড়তি বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। সেটা না করে ৮ গুণ বেশি দামে তার থেকে কম বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের ফাঁদে দেশকে ফেলে ভয়াবহ ঋণের বোঝা তৈরি করেছে সরকার। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিশাল সম্ভাবনাও ক্ষুদ্র কিছু উদ্যোগের মধ্যে আটকে রেখে বিদেশী কোম্পানির ওপর পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে বিপজ্জনকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্লান্ট অনুমোদন করা হয়েছে। সুন্দরবন ধ্বংসের আয়োজন চলছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসনের নামে দেশী-বিদেশী এই লুটেরা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সরকার বারবার দেশের জন্য সর্বনাশা পথ গ্রহণ করছে। এ কাজে বৃহৎ দল ও তাদের সরকারগুলোর মধ্যে আমরা নীতিগত পার্থক্য দেখি না। জনস্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে কিছু দেশী-বিদেশী গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিচালিত হওয়ায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের নামে যেসব তৎপরতা চলছে, তা দেশের জন্য একের পর এক বিপদ তৈরি করছে। সুন্দরবন-কৃষিজমি-শহরধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাটি-পানি-মানুষ বিনাশী ফুলবাড়ী-বড়পুকুরিয়ার উš§ুক্ত খনির চক্রান্ত অব্যাহত রাখা, বঙ্গোপসাগরের গ্যাস ব্লক একতরফা সুবিধা দিয়ে বিদেশী কোম্পানির কাছে ইজারা, কুইক রেন্টালের নামে ১৪ থেকে ১৭ টাকা কিংবা তারও বেশি দরে বিদ্যুৎ ক্রয়, কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি না করে, জনবল তৈরি না করে, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা না করে বিদেশী কোম্পানিনির্ভর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্যোগ ইত্যাদি প্রকৃতপক্ষে জনস্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে কিছু গোষ্ঠীর মুনাফা ও লুটপাটের আয়োজন ছাড়া আর কিছু নয়।
আমরা বারবার বলছি, বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনেক বিকল্প আছে, সুন্দরবনের কোনো বিকল্প নেই। সুন্দরবন না থাকলে একেকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে কমপক্ষে ৩ থেকে ৫ লাখ মানুষ জীবন হারাবেন। সুন্দরবন ধ্বংস মানে অরক্ষিত বাংলাদেশ। এই পথ থেকে সরকারকে অবশ্যই সরে আসতে হবে। রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ সুন্দরবন ধ্বংসী সব তৎপরতা বন্ধ করে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে জাতীয় কমিটির ৭ দফার ভিত্তিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হলে টেকসই বিদ্যুতের জোগানও সুলভ ও নিশ্চিত হবে।
প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের কোনো সরকারই সুন্দরবন ধ্বংস করে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে পারবে না, কারণ সুন্দরবন রক্ষায় এখন জাতীয় জাগরণ তৈরি হয়েছে। ভারতের কোনো সরকার সুন্দরবন ধ্বংসের প্রকল্প গায়ের জোরে বাংলাদেশের ওপর চাপাতে পারবে না, কারণ ভারতের সজাগ মানুষরাও আমাদের এ আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। সেখানে এই ধ্বংসাÍক প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ইতিমধ্যে এনটিপিসিকে স্মারকলিপি দেয়া হয়েছে, স্বাক্ষর সংগ্রহ চলছে। কলকাতা থেকে সুন্দরবন অভিমুখে লংমার্চেরও প্রস্তুতি চলছে। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের সজাগ মানুষও সুন্দরবন ধ্বংসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মীরা উদ্বেগ নিয়ে যোগাযোগ করছেন। কারণ এটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বেরও সম্পদ।
আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

নদী রক্ষায় আরও বলিষ্ঠ পদক্ষেপ প্রয়োজন by হাসান কামরুল

নদী দখল এদেশে সবচেয়ে সহজ কাজ। যদি রাজনীতির তকমা গায়ে থাকে তাহলে অনায়াসে নদীর দু’তীরে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে ব্যবসা-বাণিজ্য করা যায়। ঢাকার তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তুরাগ, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যার শুধু তীর দখল হয়নি, নদীর ভেতরে জেটি করে বালু ও পাথর ওঠানামার যে দৃশ্য, তা বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। প্রতিটি সরকারের আমলেই খুব ঘটা করে নদীর দখল অবমুক্ত করার কর্মসূচি নেয়া হয়। কিন্তু লোক দেখানো সে কর্মসূচি মূলত অবৈধ দখলদারিত্বের হাত থেকে নদীকে রক্ষা করতে বরাবরই ব্যর্থ হয়। ব্যর্থতার মূল নিয়ামক হচ্ছে রাজনৈতিক প্রভাবশালী বলয়। যারা ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে নদীকে গলাটিপে হত্যা করছে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের জন্য, তারা সব সময়ই প্রভাবশালী ও নদী দখলে পারদর্শী। পুলিশ, র‌্যাবের যৌথ অভিযানে একদিকে কিছু অস্থায়ী কাঠামো ধ্বংস করা হলেও স্থায়ী কাঠামোগুলো বহাল তবিয়তেই নদীর তীর ঘেঁষে দণ্ডায়মান।
এ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই নদী দখলমুক্ত করার জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করে। ২০০৯ সালে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢাকা ও তার আশপাশের নদীগুলো পুনরুদ্ধারে একনেক থেকে ৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এবং বিআইডব্লিউটিএ বালু, তুরাগ, বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার বিভিন্ন জায়গায় ৩২৬টি অবৈধ দখল চিহ্নিত করে। এবং একক অভিযানে প্রায় ৫০ শতাংশ এলাকা দখলমুক্ত করতে সমর্থ হয়।
হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে ২০০৯-এর জুনে নদীর তীর দখলমুক্ত করার জন্য সরকারের প্রতি রুল জারি করেন। রুলের উল্লেখযোগ্য দিক ছিলÑ দখলদারিত্বমুক্ত নদীর সীমানা পুনর্নির্ধারণ, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য ড্রেজিং বা খননে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করাসহ পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালককে ঢাকার চারটি নদী এলাকাকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার নির্দেশ প্রদান। হাইকোর্টের রুলের পরে সরকার নড়েচড়ে বসে এবং নদীর দূষণ রোধে ও দখলদারিত্বমুক্ত করতে নৌপরিবহন মন্ত্রীর সমন্বয়ে ২৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করে। অক্টোবরে টাস্কফোর্সের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং ওই সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় পরবর্তী সাতদিনের মধ্যে ঢাকার আশপাশের নদীগুলোকে দখলমুক্ত করা হবে। কিন্তু দু’মাস অতিবাহিত হলেও অবৈধ দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে দখলকারীরা একের পর বাধা সৃষ্টি করলে টাস্কফোর্স ডিসেম্বরের সভায় নদীর দু’তীরে স্থায়ী পিলার বসানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
জানুয়ারি ২০১০-এ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স ঢাকা ও ঢাকার আশপাশের জেলা ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসককে স্ব-স্ব নদীর সীমানা নির্ধারণ ওই বছরের ১৫ মার্চের মধ্যে সম্পন্ন করার নির্দেশ প্রদান করে। এবং সেই সঙ্গে জেলা প্রশাসকদের কাজের সুবিধার্থে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য সারাহ বেগম কবরী ও সানজিদা বেগম এমপিকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে আরও একটি কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটির কাজ হল নদীগুলো যাতে নতুন করে দখল ও দূষণের শিকার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা এবং নদী দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব জনসাধারণের মধ্যে তুলে ধরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।
১৪ জানুয়ারি ২০১০-এ টাস্কফোর্সের জরুরি সভায় নদীর দু’পাশে সীমানা নির্ধারণ পিলার বসানোর জন্য টেন্ডার আহ্বান এবং নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তিসহ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০১০ সালে একনেক দেশের সব নদীর তীর সংরক্ষণে ১০০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে। কিন্তু উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স নদীর দখল উচ্ছেদ করতে গিয়ে জটিলতার মুখোমুখি হওয়ায় নদী দখলমুক্ত করা কঠিন পড়ে এবং অনেকাংশে টাস্কফোর্স নদীর দখল অবমুক্ত করতে গিয়ে শূন্য হাতে ফিরে আসে। এমনকি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে স্থানীয় ও প্রভাবশালী দখলবাজরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ফলে টাস্কফোর্স অবৈধ নদী দখলকারীর অনেক স্থাপনাই সরাতে পারেনি। আর এ না পারার পেছনে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোর অভাবকে দায়ী করা হয়। টাস্কফোর্সের ব্যর্থতায় হাইকোর্ট আবার রুল রাজি করেন। বারবার উচ্চ আদালতের তাগিদ সত্ত্বেও কাক্সিক্ষত ফল না আসায় পরিবেশবাদী ও সুশীল সমাজের অব্যাহত সমালোচনায় টাস্কফোর্স দীর্ঘ এক বছর পর ১২ এপ্রিল ২০১১ তারিখে বিআইডব্লিউটিএ’র তত্ত্বাবধানে তুরাগ নদীর দু’পাশে সীমানা পিলার বসানোর কাজ শুরু করে।
মে ২০১১, বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠনের অব্যাহত আপত্তির কারণে টাস্কফোর্স তুরাগের দু’পাশে সীমানা পিলার বসানোর কাজ থেকে সরে আসে। পরিবেশ সংগঠনগুলো সরেজমিন অনুসন্ধান করে দেখে নদীর প্রকৃত তীর থেকে অনেক ভেতরে পিলার বসানো হচ্ছে। এর মূল কারণ রাজনৈতিক বিবেচনা অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রভাবশালী দখলদারদের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদের দখলি স্থাপনাকে ঠিক রাখতে সীমানা পিলার প্রকৃত তীর থেকে সরিয়ে ভিন্ন জায়গায় বসানো হচ্ছে। এ নিয়ে হাইকোর্ট আবার সমন জারি করে। হাইকোর্টের নির্দেশনা পেয়ে সরকার তড়িঘড়ি করে ভূমি প্রতিমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে পরিবেশ সংগঠনগুলোর আপত্তি নজরে আনার চেষ্টা করে। এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী পরিবেশ সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নদীর প্রকৃত তীর সংরক্ষণে যথাযথ পদক্ষেপ ও যেসব ভুল জায়গায় এরই মধ্যে সীমানা পিলার বসানো হয়েছে সেগুলো তুলে ফেলার ত্বরিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কিন্তু সে সিদ্ধান্তও আলোর মুখ দেখতে ব্যর্থ হওয়ায় ২ জুলাই ২০১১ তারিখে পরিকল্পনা, অর্থ, শিপিং, যোগাযোগ, পানিসম্পদ, ভূমিজরিপ অধিদফতর, পরিবেশ অধিদফতর, বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান এবং ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে এক সপ্তাহের মধ্যে জবাব চেয়ে উচ্চ আদালত থেকে আবারও সমন জারি করা হয়।
১২ জুলাই ২০১১-এ হাইকোর্ট আবার ১১ জন সরকারি কর্মকর্তাকে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বিলম্ব ও নদী দখলমুক্ত করতে না পারার কারণ সশরীরে কোর্টে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানে হুকুম প্রদান করেন।
মার্চ ২০১২-এ বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) টাস্কফোর্সের কাজের অগ্রগতি দেখার জন্য বুড়িগঙ্গার তীরসংলগ্ন হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, আমলিগলা ও লালবাগের বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করে দেখতে পায়, বুড়িগঙ্গার শাখা নদীতে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করে ভরাট করে ফেলা হয়েছে।
জুলাই ২০১২-এ বাপা টাস্কফোর্সকে ত্র“টিপূর্ণ নদী অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া বন্ধ করার আহ্বান জানায় এবং সেই সঙ্গে দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার আহ্বান জানানো হয়।
সেপ্টেম্বর ২০১৩-এ পরিবেশবাদী ও সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে বিআইডব্লিউটিএ এবং ঢাকা ও আশপাশের জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে এক সভায় অভিযোগ করা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ব্যক্তিরা ভুল সীমানা নির্ধারণ ও দখলমুক্ত করতে না পারার জন্য দায়ী।
সেপ্টেম্বর ৭, ২০১৩-এ বাপা ও গ্রিন ভয়েস নদীর দখলমুক্ত ও সঠিক সীমানা পিলার নির্ধারণে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে। তারা দাবি করে মৌসুমে নদীর পানি সর্বোচ্চ যে স্থান পর্যন্ত পৌঁছায় সে স্থানকে নদীর তীর ধরে সীমানা নির্ধারণের।
৩০ জুলাই ২০১৩-এ টাস্কফোর্স তাদের ২২তম সভায় নদীর কিছু অংশের সীমানা পিলার উঠিয়ে নতুন করে বসানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
সর্বশেষ সরেজমিন দেখা গেছে, নদীর সীমানা নির্ধারণ পিলার প্রভাবশালী স্থানীয়দের ছকে বসানো হচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দখলকারীরা রাজনৈতিক ব্যানার ব্যবহার করে নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনা রক্ষায় দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রেখেছে। এমনকি পিলার বসানোর কাজে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা অবৈধ অর্থের বিনিময়ে নদীর তীরে নিজেদের ইচ্ছামতো পিলার বসাচ্ছে। যার ফলে নদীর তীর কোথাও কোথাও সরু হতে হতে খালে পরিণত হয়েছে। জিপিএস রিডিংয়ের মাধ্যমে পুরোদস্তুর মানচিত্র প্রস্তুত করে নদীর দু’পাশের প্রকৃত তীর সংরক্ষণে সরকারকে আরও বলিষ্ঠ হওয়ার অনুরোধ রইল। কারণ নদীই আমাদের প্রাণ। নদী বাঁচলে আমরা বাঁচব, আর নদী না বাঁচলে মানুষের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে।
হাসান কামরুল : জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক

দুর্নীতিবাজদের পলায়ন পরিকল্পনা by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

দুর্নীতিপ্রবণ দেশগুলোতে দুর্নীতিবাজরা সাধারণত সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে দুর্নীতিকর্মে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ সরকারের মন্ত্রী, নেতা ও প্রশাসনকে হাত না করে এককভাবে দুর্নীতি করতে গেলে পদে পদে বিপদে পড়ার ঝুঁকি থাকে। আর দুর্নীতিবাজরা যদি সরকারের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে রাখতে পারে, তাহলে তাদের সুবিধা হয়। একদিকে তারা সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স-পারমিট থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিতে পারে; অন্যদিকে দুর্নীতি করতে গিয়ে ধরা পড়লে সরকার-ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তদবির করে সহজে ছাড়া পায়। এ জন্য দুর্নীতিবাজরা সরকারের নেতা-মন্ত্রী ও ঘনিষ্ঠজনকে নিজ দুর্নীতিকর্মের সঙ্গে রাখার জন্য তাদের দুর্নীতির মাধ্যমে আয় করা লভ্যাংশের একটি বড় অংশ দিতে কার্পণ্য করে না। এর ফলে দুর্নীতিবাজরা অনেকটা ঝুঁকিমুক্তভাবে ফ্রি-স্টাইলে দুর্নীতি করে রাতারাতি ব্যাপক অর্থবিত্তের মালিক হয়ে যায়। আর এদের সহায়তাকারী রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসকরাও নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর দুর্নীতি চর্চার গতিধারা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এসব দেশের দুর্নীতিবাজরা রাজনৈতিক অঙ্কে বিশেষ পারদর্শী। কোন দল কখন ক্ষমতায় থাকবে সে হিসাব কষতে তারা খুব একটা ভুল করে না। একটি দল নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতিবাজরা তাদের সঙ্গে ভিড়তে শুরু করে। তারা ওই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের ক্ষমতা ও পদমর্যাদা ব্যবহার করে দুর্নীতির সাম্রাজ্য বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু সরকারের মেয়াদান্তে এসে তারা আবার নতুন করে অঙ্ক কষে দেখে কোন দলের জনপ্রিয়তা কতটা এবং কোন দল পরবর্তী নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করবে। ওই হিসাবে তারা যদি দেখে ক্ষমতাসীনদের অবস্থা ভালো নয়, তাহলে তারা অন্য জনপ্রিয় দলের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই আঁতাত গড়ে নিতে চেষ্টা করে। আর এ কাজে সফল না হলে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে হয় তারা বিদেশে পাড়ি জমায়, না হলে গা-ঢাকা দিয়ে ঘাপটি মেরে থেকে পরে ধীরে ধীরে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিতে প্রয়াস চালায়। ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন সরকার গঠিত হলে দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয়দানকারী রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রী এবং প্রশাসকরাও একই রকম নাজুক পরিস্থিতিতে পড়ে। দুর্নীতিবাজদের মতো তারা রাতারাতি পরিচয় গোপন করতে পারে না। এ জন্য অনেক ক্ষেত্রে এরা ভাব বুঝে আগে থেকেই বিদেশে পাড়ি জমায়; আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিরাপদ জীবনযাপনের চেষ্টা করে। আর এমন কাজে সফল হতে না পারলে নতুন সরকারের সঙ্গে যে কোনো উপায়ে আপস করে নিজ কাজে টিকে থাকতে চায়।
বাংলাদেশ যেহেতু একটি উচ্চ মাত্রার দুর্নীতিপ্রবণ দেশ, সে কারণে এ দেশের দুর্নীতি পরিস্থিতি এ থেকে ভিন্ন নয়। বাংলাদেশ ২০০০ সাল থেকে শুরু করে পাঁচবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) প্রকাশিত দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করে। এ দেশের দুনর্িিতবাজরাও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠে এবং দুর্নীতি চর্চার স্বার্থে এরা রাজনৈতিক বর্ণ পরিবর্তনে দ্বিধা করে না। এ দেশে দুর্নীতিবাজদের কোনো স্থায়ী দল নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে এরা সে দলের সঙ্গে সখ্য স্থাপন করে তাদের দুর্নীতি কর্ম নির্বিঘœ করতে সচেষ্ট হয়। এ চরিত্র কেবল সাধারণ দুর্নীতিবাজদের নয়, প্রশাসনের মধ্যে দুর্নীতি চর্চাকারীরাও এ রকম চরিত্র লালন করে। সরকারের পরিবর্তনে এরাও ভাব বুঝে বর্ণ পরিবর্তনে চেষ্টা করে। দুর্নীতিতে জড়িত বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কখনও কখনও মামলা হলেও তারা নিজ দল ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা আখ্যা দিয়ে ওই মামলা থেকে রেহাই পেতে সক্ষম হন। তবে সে চেষ্টায় সফল না হলে তাদের ভাগ্যে জোটে গুরুত্বহীন স্থানে বদলি বা ওএসডি হয়ে বসে থাকা।
বাংলাদেশে সরকারের মেয়াদান্তে এসে দুর্নীতিবাজরা রাজনৈতিক অঙ্ক কষে কারা আগামীতে সরকার গঠন করবে সে হিসাব মিলিয়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক নির্মাণের চেষ্টা করে। এ কঠিন কাজে সক্ষম না হলে অনেক দুর্নীতিবাজ বিদেশে পাড়ি জমায়। বাংলাদেশে মহাজোট সরকার আমলে দুর্নীতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। এর অর্থ এ নয় যে, এর আগের চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দুর্নীতি কম ছিল। তবে সামাজিক ভাইরাস হিসেবে সাধারণত দুর্নীতির ক্রমান্বয় বৃদ্ধিই লক্ষ্য করা গেছে। এক সরকারের আমলে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়, পরের সরকারের আমলে সাধারণত দুর্নীতি হয় তার চেয়ে বেশি। তবে চারদলীয় জোট সরকার আমলের দুর্নীতির চেয়ে মহাজোট আমলে যে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এর মধ্যে বড় আকারে যেসব দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে শেয়ারবাজারের শত শত কোটি টাকার পরিকল্পিত লুটপাট, হলমার্ক কেলেঙ্কারি, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্র“পসহ আরও অনেক এমএলএম কোম্পানির ব্যাপক আর্থিক লুটপাট, রেলওয়ের নিয়োগ দুর্নীতি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি প্রভৃতি অন্যতম। লক্ষ্যণীয়, এ সরকারের আগে এ দেশে যেসব দুর্নীতি হয়েছে তা দেশীয় পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু মহাজোট আমলে প্রথম বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মিতব্য পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ওই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের দুর্নীতি দেশীয় পরিমণ্ডল ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে ব্যাপক পরিচিতি পায়।
মহাজোট সরকারের শেষ বছর দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, অসৎ আমলা এবং অনিয়মকারী ও ঘুষখোর সরকারি কর্মকর্তারা দুর্নীতি থেকে বাঁচার উপায় খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এদের মধ্যে অভিজ্ঞ ও সতর্করা নিজেদের বিপদকালে নিজেকে নিরাপদে রাখার জন্য অনেক আগেই বিদেশে অর্থ পাচার ও থাকার জায়গা তৈরি করে রেখেছেন। এ কারণে এ আমলের শেষ দিকে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম কেনার পরিসংখ্যান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম সুবিধা নিতে হলে ওই দেশের ব্যাংকে মোটা অঙ্কের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখতে হয়। দুর্নীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন কাছাকাছি আসায় অনেক দুর্নীতিবাজ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদ নিরাপদে বিদেশে গা ঢাকা দেয়ার জন্য মালয়েশিয়াকে নিরাপদ দেশ হিসেবে বেছে নেয়ায় ওই দেশে সেকেন্ড হোম সুবিধা গ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ গত বছর (২০১২) ষষ্ঠ থেকে এক লাফে নিজ অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে নিয়ে আসে। ২০১১ সালে যেখানে ২৭৬ জন বাংলাদেশী মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম সুবিধা নেন, সেখানে ২০১২ সালে এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩২৫-এ দাঁড়ায়। এ পরিসংখ্যান থেকে অনুধাবন করা যায়, নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে দুর্নীতিবাজদের মধ্যে দেশের বাইরে নিরাপদ আবাস গড়ার প্রবণতা ততই জোরালো হচ্ছে। এমন প্রবণতা সাম্প্রতিক নয়, এর আগের সরকার আমলের শেষ দিকেও তাদের আচরণে একই প্রবণতা লক্ষিত হয়েছিল।
প্রশাসনে সুবিধাভোগীরা যেসব যোগ্য কর্মকর্তাকে কোণঠাসা করে রেখে নিজেরা সরকারি আনুকূল্যে আখের গুছিয়েছেন, নির্বাচন এগিয়ে আসায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কট্টরভাবে সরকারি দল না করায় এবং মধ্যপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত যেসব কর্মকর্তা ওএসডি বা পদোন্নতিবঞ্চিত হয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন, তারা এখন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠেছেন। প্রকাশিত সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন কাছাকাছি আসায় বিরোধী শিবিরের বঞ্চিত-বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা সরকারকে প্রশাসনে বন্ধুহীন করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছেন। প্রশাসনের øায়ুকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত সচিবালয়ে সরকারের মেয়াদান্তে জাতীয়তাবাদী ঘরানার কোণঠাসা কমিটিগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। সাতটি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত মোর্চাÑ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদ নতুন উদ্যমে পুনর্গঠিত হয়েছে। মধ্য-২০১৩ সালে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সরকারি দলের নেতিবাচক ফলাফলে প্রভাবিত হয়ে এ মোর্চা নতুন উৎসাহে কাজ শুরু করলে সরকারপন্থী সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এরা বিরোধী শিবিরের সব কর্মকর্তাকে ঐক্যবদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে সুবিধাভোগী আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের তালিকা তৈরি শুরু করেছে। এছাড়া কট্টর সরকারপন্থী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তালিকা করে গোপনে তাদের দুর্নীতির শ্বেতপত্র তৈরির কাজ শুরু হয়েছে, যা সরকারবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রকাশ করে প্রশাসনে সরকারবিরোধীদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তবে এসব কার্যক্রম যত গোপনেই করা হোক না কেন, তা সরকারপন্থী প্রশাসকদের অগোচরে নেই। ফলে সরকারি দলের হ্রাসকৃত জনপ্রিয়তা সম্বন্ধে ধারণা থাকায় সতর্ক সরকারপন্থী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা সরকার পরিবর্তনের পর বিপদ এড়াতে আগেভাগেই বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে রাখছে। তবে এ প্রক্রিয়ার ওপর বিরোধীদলীয় নজরদারিতে রয়েছে। ১৮-দলীয় জোটনেত্রী তার ৫ অক্টোবর, সিলেটের জনসভার বক্তৃতায় এসব দুর্নীতিবাজকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার জন্য তারিখ না বসানো ওপেন টিকিট করে রাখার তথ্য ফাঁস করেছেন।
একই রকম পলায়নপর মনোবৃত্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে। যারা এতদিন সরকারি নির্দেশে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্বিচার নিপীড়ন করত, নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ায় এবং সরকারি দলের হ্রাসকৃত জনপ্রিয়তা বিবেচনা করে তারা এখন হতাশায় ভুগছে। এসব পুলিশ কর্মকর্তার অনেকে এখন বড় মেয়াদের ছুটির জন্য দরখাস্ত করেছেন। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বিরোধীদলীয় আন্দোলন দমনে নিষ্ঠুরতা দেখিয়ে সমালোচিত হয়েছিল, তাদের অনেকেই এখন ছুটি নিতে ব্যস্ত। এদের অনেকের ছুটির দরখাস্ত মঞ্জুর হয়নি; পরিবর্তে কতিপয় এমন আবেদনকারীকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে তিরস্কার করা হলে এরা মানসিকভাবে হতাশ হয়ে পড়েছেন। বড় মেয়াদের ছুটি নিতে না পেরে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা রাজধানী ছেড়ে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ জেলা সদরে পোস্টিংয়ের জন্য তদবির করছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে (ডিএমপি) আসার জন্য যেসব পুলিশ কর্মকর্তা আগে ব্যাকুল ছিলেন, তারাই এখন ডিএমপি ছেড়ে নিরাপদ এসবি, সিআইডি বা অন্য কোনো অগুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ পোস্টিং পছন্দ করছেন। সরকারের প্রাথমিক বছরগুলোতে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনকারী পুলিশ কর্মকর্তারা পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী ফলাফল দেখে আগামী সংসদ নির্বাচনের ফলাফল অনুমান করে ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ ভেবে চুপসে গিয়ে নিরাপদ এক্সিট অনুসন্ধান করছেন।
সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে চলমান সংকটের সমাধান না করে সরকার একতরফা নির্বাচন করার উদ্যোগ নেয়ায় যে রাজনৈতিক সহিংসতার আশংকা দেখা দিয়েছে সে বিষয়টি ভেবেই পোশাকধারী বাহিনীর সদস্যরা রাজধানীর বাইরে পোস্টিং পেতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কারণ এরা ভালো করেই জানেন, একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করতে যে ঐক্যবদ্ধ বিরোধীদলীয় আন্দোলন শুরু হবে তার তীব্রতা সবচেয়ে বেশি হবে রাজধানী ঢাকায়। আর এ আন্দোলন মোকাবেলা করতে গিয়ে তাদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে। লন্ডনে তথ্যমন্ত্রীর ওপর হামলা, হালুয়াঘাটে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারীর লাঞ্ছিত হওয়া প্রভৃতি ঘটনায় এসব কর্মকর্তা এখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। আগামীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বিরোধীদলীয় আন্দোলন দমনে সরকারি কর্মকর্তা ও পোশাকধারী বাহিনীর সদস্যরা চাকরির ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎ ভেবে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর সরকারি নির্দেশে অমানবিক ভূমিকা পালনে আগের মতো উৎসাহী হতে পারছেন না।
নির্বাচন আসন্ন হওয়ায় দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তাদের পলায়নপর মনোবৃত্তি সরকারি দল ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেও সংক্রমিত হয় কিনা সে সম্পর্কে সরকারি নীতিনির্ধারকরা শংকিত হয়ে পড়েছেন। জনমত উপেক্ষা করে সরকারের একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান উদ্যোগ প্রতিহত করার লক্ষ্যে ১৮ দলীয় জোটনেত্রীর ৫ অক্টোবর সিলেটের জনসভায় কেন্দ্রভিত্তিক সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠনের আহ্বানের পর সহিংসতা ও রক্তপাত সম্ভাব্য হয়ে ওঠায় সরকারি প্রশ্রয়ে ফ্রি-স্টাইল দুর্নীতিবাজরা দুর্নীতিকর্ম বাদ দিয়ে সরকার পরিবর্তন হলে কিভাবে নিরাপদ থাকবে সে পরিকল্পনা করছে। কারণ নির্দলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোন দল জয়ী হবে এবং নতুন সরকারের অধীনে দুর্নীতিবাজদের অবস্থা কেমন যাতনাময় হবে সে সম্পর্কে মহাজোট আমলের দুর্নীতিবাজদের ধারণা রয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়