Wednesday, February 19, 2020

কবিতা- প্রকৃতির আহাজারি, মানুষের বিলাপ by আশরাফ আহমেদ

‘হারানোর মিছিলে প্রকৃতি’ নামে একটি কবিতাটি
ছাপার পর পড়ে মনে হলো অনেক কথা বলা হয়নি এতে;
অবশ্য, এ বিষয়ে কবিতা, কাহিনি, প্রবন্ধ, গবেষণা-চলতেই থাকবে-এসব শেষ হওয়ার মত নয়;
যদ্দিন বিশ্বে ধনতন্ত্র, মুনাফার ব্যাপার থাকবে
বায়ুদূষণ সঙ্গে চলবে অবিরত দুরন্ত অপ্রতিরোধ্য গতিতে
কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য, নির্গত ধোঁয়া কার্বন হয়ে বইবে নিরবধি আকাশে, বাতাসে, সমুদ্র ,পাহাড় পর্বতে
বিশ্ব চরাচরে ,পাতালে, অন্তরিক্ষে-সর্বত্র অব্যাহতভাবে।
কবিতায় বলেছিলাম ছোট এক দারকিনি প্রজাতির মাছের কথা আর সঙ্গে টক-মিষ্ট এক ফলের কথা;
কেমন করে, কখন, কোথায় উধাও হয়ে গেল সৃষ্টিগুলো?
বলেছিলাম মানুষের সীমাহীন লোভ, অবিবেচনার কথা;
আর ও বলেছি:
উফসী ধান আর মাছ চাষের কারণে
কেমিক্যাল সার, কীটনাশক ওষুধ
ফলন বাড়ানোর এই সব মহৌষধ প্রয়োগের কারণে
স্বাদে অতুলনীয় দেশজ মাছ ইদানীং প্রায় বিলীন
আমাদের বিশ্ব থেকে, অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের
পরিবেশ দূষণের অমোঘ নিয়মে!
বলেছিলাম প্রায় বৃক্ষশূন্য রঘুনন্দন পাহাড়ের কথা
শাল, সেগুন সুরভিত পাহাড়টিতে গজারি, সোনারু, নানা জাতের বাঁশ, ছন, উলু, কাঠসহ হাজারো নির্মাণ সামগ্রী যে পাহাড়টিতে অনায়াসে পাওয়া যেত।
লোভাতুর মহালদাররা হাতি দিয়ে টেনে আনত
মুনাফার আশে নির্বিচারে ছোট-বড় বাছ বিচার না করে।
ছোট বেলা দেখেছি রকমারি হরিণ, বাঘ, বনমোরগ,
বানর, হনুমান, নানা জাতের পাখি, বনকুকুর, মতুরা
কত সব বন্য প্রাণী হামেশাই এদের দেখা মিলত।
রঘুনন্দন আজ বিরান, সম্পদ লুণ্ঠনে আর নিধনের বলিকাষ্ঠে নিস্তর আর খোলা মাঠসম সমতল প্রান্তর।
পাহাড়ি জিভধর ছড়ার ঝিরঝির পানি, সোনালি বালি,
দু–চারটে ছোট মাছ, ঢলে ভাটি থেকে আসা
উজানি কই, মাগুর সন্ধ্যে হতেই বাঁশের কুপির আলোতে ঝুপড়ি পলো দিয়ে মাছ ধরা-সে সব আজ আর নেই ।
ঢল হয়, মাছ আসে না, নেই ভাটিতে মাছ, হাঁস কিছুই
উজানে প্রাণ কোম্পানি আরও কত কারখানা বর্জ্য দিয়ে
বিনাশ করেছে ভাটি অঞ্চলের এসব সম্পদ।
ইটের ভাটা, দালান কোঠা, যত্রতত্র কল-কারখানা,
দোকান-পাট দখল করেছে বিভিন্ন কায়দায় সব জায়গা
ধানি আর পতিত জমি, সবজি ফল-ফলাদি চাষের ভূমি
কিছুই বাদ পড়েনি-এমনকি শ্মশান স্থান, খেলার মাঠ
গো-চারণ ভূমি, খাল-বিল, নদী-নালা গিলেছে গোগ্রাসে নিতান্ত নির্দয়ে, অবহেলা, আর নির্মম নির্লজ্জে।
মানুষের নির্দয়তা, লোভ-লালসা, ক্ষমতার অপব্যবহার
কালো টাকা, মস্তানের দুর্দান্ত দাপটে সহায় সম্বলহীন আদম সন্তান, কষ্টে-সৃষ্টে বেঁচে আছে ধুঁকেধুঁকে মৃতপ্রায়!

পৃথিবীর অন্যতম সেরা রানওয়ে স্পর্শ করার মুহূর্তে by জনি হক

নিস কোত দা’জুর বিমানবন্দরের রানওয়ে
নতুন গন্তব্যে যাওয়া ভ্রমণপিপাসুদের জন্য বরাবরই রোমাঞ্চকর। বিশেষ করে উড়োজাহাজে চড়ে মুগ্ধকর কোথাও পৌঁছালে অন্যরকম আনন্দ হয়। যেমন ফ্রান্সের নিস। ইস্তানবুল হয়ে তার্কিশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজে চড়ে সেখানে পৌঁছাতে লাগলো সোয়া দুই ঘণ্টা। এর রানওয়ে দেখতে যেন ছবির মতো! বিমান অবতরণের চোখধাঁধানো রানওয়েগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক এভিয়েশন প্রতিষ্ঠান প্রাইভেট ফ্লাইয়ের দৃষ্টিতে— ২০১৯ সালে যেসব রানওয়েতে উড়োজাহাজের অবতরণ সবচেয়ে সুন্দর দেখাবে, সেই তালিকায় তৃতীয় হয়েছে ফ্রান্সের নিস কোত দা’জুর। এটি দেশটির ব্যস্ততম বিমানবন্দরের মধ্যে তৃতীয়। জানালায় তাকিয়ে যতদূর চোখ যায় শুধু নীল জলরাশি দেখেছি। ইচ্ছে হচ্ছিল, সাগরের জলে কিছুক্ষণ মন ভিজিয়ে দীর্ঘযাত্রার ক্লান্তি কাটানো গেলে ভালোই হতো।
নিস কোত দা’জুর বিমানবন্দর
নিসের রানওয়ে স্পর্শ করার সময় বিমানের আসনে বসে মনে হবে বুঝি সাগরের জল পা ছুঁয়ে যাবে! এই বিমানবন্দরে নামার ঠিক আগ মুহূর্তে উপভোগ করা যায় রূপবতী ভূমধ্যসাগর। ভ্রমণপ্রেমী সবারই মন জয় করার মতো রানওয়ে এটি। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর চারপাশের অপূর্ব দৃশ্য মুগ্ধ করে যাত্রীদের। সেখান থেকে মনোরম উপকূলীয় সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
বেসরকারি জেট বিমানের বুকিং প্ল্যাটফর্ম প্রাইভেট ফ্লাইয়ের বার্ষিক এই জরিপে অংশ নিয়েছে ভ্রমণ বিশেষজ্ঞ ও এভিয়েশন ভক্তদের একটি প্যানেল। বিশ্বের ১২৯টি বিমানবন্দরের মধ্য থেকে নির্বাচন করা হয়েছে সেরা ১০। এর মধ্যে নিস অন্যতম। প্রায়ই ভ্রমণকারীরা নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে তড়িঘড়ি করেন। তবে ফ্রান্সের এই শহরে যাওয়ার বেলায় জানালা দিয়ে নীল জলরাশির সুন্দর উপভোগ করতে চায় সবার মন।
নিস কোত দা’জুর বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১
নিস কোত দা’জুর ছিমছাম একটি বিমানবন্দর। খুব বেশি বড় নয়, কিন্তু বেশ পরিপাটী। এক নম্বর টার্মিনাল থেকে দুই নম্বরের কিছুটা দূরত্ব আছে। একটি থেকে অন্যটিতে যাওয়ার শাটল বাস আছে। তার্কিশ এয়ারলাইনস অবতরণ করেছে এক নম্বরে। উড়োজাহাজ থেকে নেমে ইমিগ্রেশনের দিকে এগোতেই বাইরে চোখে পড়লো, ‘নাইস টু মিট ইউ’। নিসের বানান ইংরেজি নাইস। বাইরে চোখ মেলে রানওয়ের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগের সুযোগ হাতছাড়া করিনি।
নিস কোত দা’জুর বিমানবন্দরের বাইরের চারপাশ নয়নাভিরাম
বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে সোজা তাকাতেই চোখে পড়লো ‘আই লাভ নিস’ লেখা লাল, নীল ও সাদা রঙা স্ট্যান্ড। পর্যটকরা এর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি ও সেলফি তোলায় ব্যস্ত। এক যুগল এসে তাদের ছবি তুলে দেওয়ার অনুরোধ করলো। হাতে অঢেল সময়, তাই আনন্দ নিয়ে তাদের ফ্রেমবন্দি করলাম। এখান থেকে দাঁড়িয়ে দূর পাহাড়ের হাতছানি উপভোগ্য মনে হলো। রাত ৭টা বেজে গেছে। কিন্তু সূর্য হাসিমুখে দিব্যি রোদ্দুর মেলে রেখেছে। ফ্রান্সে সে অস্ত যাবে রাত ৯টার পর!
নিস বিমানবন্দরের বাইরে লেখক

খুশকি দূর করে অ্যালোভেরা

অ্যালোভেরা
ঝলমলে খুশকিমুক্ত চুলের জন্য অ্যালোভেরা ব্যবহার করতে পারেন। অ্যালোভেরার রস ও জেল চুলে নিয়ে আসবে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা। জেনে নিন চুলের যত্নে কীভাবে ব্যবহার করবেন অ্যালোভেরা।
*অ্যালোভেরা পেস্ট করে চুলের গোড়ায় লাগান। ১ ঘণ্টা পর ভেষজ শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন চুল। মাসে দুইবার ব্যবহার করুন।
*সপ্তাহে দুইবার অ্যালোভেরার রস দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। এটি নিয়মিত করলে দূর হবে খুশকি। এছাড়া শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত অ্যালোভেরার রস লাগান। তারপর সুতির কাপড় দিয়ে ১৫ মিনিট মুড়ে রাখুন। চুল খুলে প্রাকৃতিকভাবে শুকিয়ে নিন।   
*অ্যালোভেরার জেল চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগান। পুরোপুরি না শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। শুকিয়ে গেলে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
*৩ টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জেলের সঙ্গে ১ টি ডিমের সাদা অংশ মেশান। মিশ্রণটি চুলে লাগান। নিয়মিত এটি ব্যবহার করলে খুশকি দূর হওয়ার পাশাপাশি জৌলুস বাড়বে চুলের।  
*অ্যালোভেরার পেস্ট তৈরি করুন। পেস্টটি মাথার তালুতে ঘষে লাগান। শুকিয়ে গেলে হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন মাথা। প্রতি মাসে দুইবার করলে খুশকি থেকে মুক্তি পাবেন।
তথ্য: বোল্ডস্কাই

বর্ষপূর্তি বিশেষ: গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট কিংবা সাংবাদিকতার নতুন যুগ by বাধন অধিকারী

শাসকশ্রেণির মতাদর্শ প্রচারের স্বার্থ থেকে উৎপত্তি হলেও বিকাশের একপর্যায়ে এসে সংবাদমাধ্যম স্বীকৃত হয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ফোর্থ এস্টেট (চতুর্থ স্তম্ভ) হিসেবে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের তিনটি বিভাগের (আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ) প্রতি ওয়াচ ডগের ভূমিকা পালনকারী হিসেবে দেখা হয় সংবাদমাধ্যমকে। সে হিসেবে সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক এলিটদের বিপরীতে সাধারণ মানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথা। তবে আদতেও কি তা হয়? হয় না। নোম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যান তাদের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট: দ্য পলিটিক্যাল ইকোনমি অব ম্যাস মিডিয়া’ বইতে করপোরেট সংবাদমাধ্যমের চরিত্র উন্মোচন করেছিলেন। মুনাফাভোগী সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে শাসকশ্রেণির পক্ষে ভূমিকা পালন করে তা দেখিয়েছিলেন প্রচারণা মডেলের মধ্য দিয়ে। সব দেশেই সংবাদমাধ্যমের ‘ফোর্থ এস্টেট’ ভূমিকা তাই প্রশ্নবিদ্ধ। স্বতন্ত্র ও ওয়াচডগ স্টেট/স্তম্ভ হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের আর তিনটি স্তম্ভের মতো করেই সংবাদমাধ্যমকে তাই রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গ হিসেবেই অবতীর্ণ হতে দেখা যায়।
ইরাক যুদ্ধের কালে আমরা দেখতে বাধ্য হয়েছি ‘এমবেডেড জার্নালিজম’র নামে কী করে সাংবাদিকতা ক্ষমতাশালী মার্কিন রাষ্ট্র ও মিলিটারি করপোরেশনের ‘রক্ষিতা’য় রূপান্তরিত হয়েছিল। অবজারভার পত্রিকা ২০০৩ সালে হিসাব কষে দেখিয়েছিল ইরাক যুদ্ধের কাভারেজ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার মুনাফার পরিকল্পনা করেছে রয়টার্স। লন্ডনভিত্তিক নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় লেখা নিবন্ধে সাংবাদিক জন পিলজার পরিসংখ্যান হাজির করেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের সময় বিবিসি’র যুদ্ধবিরোধী কাভারেজের হার ছিল ২ শতাংশ। গার্ডিয়ান পত্রিকার তথ্যানুসারে, ১৯৯১ সালে বিবিসি তার সংবাদকর্মীদের বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর ছবি দেখানোর ব্যাপারে ‘সতর্ক’ থাকতে নির্দেশ দিয়েছিল। কিছুদিন পরেই ১৯৯১ সালের ক্রিসমাসের আগে লন্ডনের মেডিক্যাল এডুকেশন ট্রাস্ট জানায়, ‘নিখুঁঁত আঘাত’ এবং এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় দুই লাখেরও বেশি ইরাকি নারী-পুরুষ-শিশু মারা গেছে। এই চরম সত্য সংক্রান্ত একটি সংবাদও বিবিসি প্রচার করেনি। কমবেশি সেই এমবেডেড বাস্তবতার মধ্যেই আমাদের মূলধারার সাংবাদিকতা ঘুরপাক খাচ্ছে এখনও।
ইরাক যুদ্ধ নিয়ে উইকিলিকস-এর ভূমিকা ছিল অনন্য। ২০১০ সালে উইকিলিকস-এর ফাঁস করা গোপন নথির মধ্যে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান যুদ্ধ সম্পর্কিত ৭৬ হাজার এবং ইরাক যুদ্ধ সম্পর্কিত আরও ৪০ হাজার নথি ছিল, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও পেন্টাগনকে চরম বেকায়দায় ফেলে দেয়। অ্যাসাঞ্জ নথি ফাঁসের পর এক সংবাদ সম্মেলনে নিজেই বলেছিলেন, ইরাক যুদ্ধের আগে থেকেই যে সত্য আড়ালের প্রচেষ্টা চলছে, দলিল ফাঁস করে দিয়ে সেই সত্যটিকেই মানুষের সামনে আনা হয়েছে। উইকিলিকস-এ মার্কিন সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক বিশ্লেষক চেলসি ম্যানিং কর্তৃক ফাঁস করে দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, মার্কিন সেনাবাহিনী আফগানিস্তানে শত শত বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে। ২০১০ সালে উইকিলিকস-এর ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে ছিল একটি ভিডিও, যেখানে দেখা গেছে, ইরাকের বাগদাদে মার্কিন হেলিকপ্টার থেকে চালানো হামলায় কীভাবে বেসামরিক নাগরিকদের মরতে হয়েছে। ভিডিওতে একটি কণ্ঠকে বলতে শোনা গেছে, ‘সবাইকে জ্বালিয়ে দাও’। উইকিলিকস-এর উন্মোচন ছাড়া এসব কি আমরা জানতে পারতাম, ‘রক্ষিতা সাংবাদিকতা’র মধ্য দিয়ে?
করপোরেট সংবাদমাধ্যম সংবাদ নির্মাণে তার নিজস্ব মুনাফামুখীন দৃষ্টিভঙ্গি আর সামগ্রিক নব্য উদারবাদী বাজার ব্যবস্থার পক্ষে যে নিত্য প্রচারণা জারি রেখেছে একটি ক্রম-কর্তৃত্বতান্ত্রিক কর্তৃপক্ষীয় ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে, অ্যাসাঞ্জের উইকিলিকস তার বিপরীতে জনগণের মিডিয়া আকারে হাজির হওয়া এক অনন্য সংবাদপ্রতিষ্ঠান, যেখানে সংবাদসূত্র হতে পারেন বিশ্বের যে কেউ। আর নয়া যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধাকে সঙ্গে নিয়ে বৃহৎ পুঁজির কারবার না হওয়ার কারণে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে করপোরেট মিডিয়ার মতো মুনাফামুখীন দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে থাকার কারণে উইকিলিকস-এর কোনও স্ব-আরোপিত সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে যেতে হয় না। সে কারণে করপোরেট মিডিয়া যেখানে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের নামে রাষ্ট্রের চতুর্থ অঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে, উইকিলিকস সেখানে আবির্ভূত হয়েছে ‘গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট হিসেবে’।
গ্লোবাল ফোর্থ এস্টেট বিষয়টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কথিত জাতীয় স্বার্থের বিরোধাত্মক সম্পর্কের প্রশ্ন। রাষ্ট্রপরিচালনাকারী ক্ষমতাশালীদের পক্ষ থেকে জাতীয় স্বার্থ আর জনস্বার্থকে এক করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়। জাতীয় স্বার্থের অজুহাতেই জনগণের কাছ থেকে গোপন করা হয় জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
তবে রাষ্ট্র যদি জনগণের হয়, জনগণ যদি রাষ্ট্রের মালিক হয়, তাহলে তাদের কাছে থেকে তথ্য গোপন করার নাম জাতীয় স্বার্থ হতে পারে কি? এই প্রশ্ন থেকেই উইকিলিকস-এর সাংবাদিকতার সূচনা। এই প্রশ্ন থেকেই উইকিলিকস-এর স্লোগান ‘উই ওপেন গভর্নমেন্ট। কথিত জনস্বার্থের বিপরীতে জনগণের স্বার্থকে সামনে এনে উইকিলিকস আমাদের সামনে নতুন দিনের সাংবাদিকতার নিশানা হয়ে হাজির হয়। জাতীয় স্বার্থের নামে সংঘটিত ইরাক আগ্রাসন, যুদ্ধবাজ অর্থনীতি, ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’র পেছনের রাজনীতিকে উন্মোচন করে অভাবনীয় সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে।
অগ্রসর প্রযুক্তির যুগে দক্ষ প্রযুক্তিবিদ হিসেবে উইকিলিকস-এর কারিগরেরা এমন একটি যোগাযোগ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যেখানে কোনও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী প্রযুক্তি দক্ষতায় পৌঁছাতে পারে না। কে উইকিলিকসকে তথ্য দিলো, তা আজও যান্ত্রিক পদ্ধতিতে বের করা যায়নি। উইকিলিকস তার সংবাদসূত্রের শতভাগ গোপনীয়তা নিশ্চিত করে কোনও ধরনের সেন্সরশিপ ও তথ্যগত সম্পাদনা ছাড়া জনসম্মুখে হাজির করে। ইতিহাসকে তারা ‘অতীত’ থেকে টেনে বের করে বর্তমানে স্থাপিত করেছে। সত্যিকারের সাংবাদিকতার অপরাধেই যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক-ইকুয়েডরের বিচারিক সন্ত্রাসের বলি হচ্ছেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের মধ্য দিয়ে হ্যাকিং ও গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে বিচারিক হত্যাকান্ডের মুখোমুখি করতে তৎপর ক্ষমতাশালীরা। তার সুরক্ষার প্রশ্ন আজ সাংবাদিকতার সুরক্ষার প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়েছে।

বইমেলার দিগন্ত-ছোঁয়া আকাশ by সেলিনা হোসেন

২০১৭ সালের ডিসেম্বরের ২১ তারিখে শুরু হয়েছিল খড়দহ বইমেলা। ১৮ বছর ধরে এই বইমেলা বছরে একবার আয়োজিত হচ্ছে। আমার কখনো এই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে এই বইমেলার খবর পত্রিকায় পড়েছি। যাদের এই বইমেলায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাদের কাছে বইমেলা সম্পর্কে গল্প শুনেছি। তারা ভালোলাগার কথাই বেশি করে বলত। আমার ধারণা হয়েছিল ছোট বইমেলার বড় পরিসর নিয়ে খড়দহ বইমেলা লেখক-পাঠকের প্রাণের বইমেলা হয়েছে। এ বছর মেলা আয়োজক কমিটি সিদ্ধান্ত নেন যে এখন থেকে বাংলাদেশের একজন লেখককে এই মেলার উদ্বোধনী দিনে আমন্ত্রণ জানান হবে। বইমেলা কমিটির সিদ্ধান্ত আমার পক্ষে আসে। বইমেলার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন শ্রী কাজল সিনহা। আমি উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য মানস চক্রবর্তীর কাছ থেকে আমন্ত্রণ পত্র পাই। খড়দহ বইমেলা দেখার সুযোগ আমি পাই। সেদিন মঞ্চে অনেকে ছিলেন। ছিলেন কথাসাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী। সবার বক্তৃতার পরে গান গেয়েছিলেন সংস্কৃতি মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন।
খড়দহ মেলার পরিসর অনেক বড় নয়। চারদিকের বসতির মাঝে একটি মাঠ ব্যবহৃত হয় এই মেলার জন্য। দেখলাম ৪০টি বইয়ের স্টল আছে। মাঠভর্তি মানুষের উপস্থিতি দেখে মনে হয়েছে ছোট বইমেলার বড় দিগন্ত। মেলাজুড়ে মানুষের উপস্থিতি বইয়ের হাত ধরে। এমন দৃশ্যটি আমার মাঝে সীমান্ত পেরিয়ে আসার আনন্দ আকাশ-ছোঁয়া করে ফেলে। এই বইমেলার যে বিষয়টি আমার আরও ভালো লেগেছে তাহলো ঘনবসতির মাঠে অনুষ্ঠিত মেলা মানুষের দোরগোড়ার আয়োজন। শিশুদের হাত ধরে বাবা-মায়েরা মেলায় আসছে। বই কিনছে। গাড়ি ভাড়া করে দূরে কোথাও যেতে হচ্ছে না। হাতের কাছে এত বই না কিনে কি উপায় আছে! দুচারটা তো কিনতেই হয়। এভাবে বইমেলার ছোট আয়োজনে মানুষ হাতের কাছে বই পায়। বই পৌঁছে যায় বড়দের কাছে, ছোটদের কাছেও। খড়দহ মেলা প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আমি প্রাণের টান অনুভব করি।
একজন লেখক হিসেবে বইমেলা আমার কাছে আপন অস্তিত্বের মতোই একটি বিষয়। বাংলা একাডেমিতে ৩৪ বছর চাকরি করে অমর একুশে গ্রন্থমেলা আমি দেখেছি খুব কাছে থেকে প্রতিদিন, প্রতিটি সময়ে। এর চরিত্র শুধু বই প্রকাশ এবং বিক্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই বইমেলা ভাষা আন্দোলনের শহীদের রক্তে প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত এবং একুশে ফেব্রুয়ারির উপলক্ষ হলেও সারা মাস জুড়ে বইমেলার আবেদন জাতীয় মননের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি জানি না সারা মাস জুড়ে অন্য কোনো দেশে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয় কি না। বাংলা একাডেমি আয়োজিত ফেব্রুয়ারি বইমেলাটি আমাদের একদম নিজস্ব বইমেলা। নিজেদের লেখক, নিজেদের প্রকাশনা এবং নিজেদের ভাষার পাঠকের মহাসম্মেলন এই মেলাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। জাতিসত্তার এমন অসাধারণ রাখিবন্ধন করেছে আমাদের অমর একুশে গ্রন্থমেলা।
এছাড়াও আমি বিভিন্ন সময়ে ভারতের তিনটি প্রদেশের বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। ১৯৯৬ সালে প্রথম যাই দিল্লিতে। ৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ দিন ধরে চলেছিল এই মেলাটি। এটি ছিল দিল্লির দ্বাদশ বিশ্ব বইমেলা। মেলার থিম ছিল ‘সার্ক দেশসমূহ’। সার্কদেশসমূহের সাতজন লেখক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। মেলার উদ্বোধন করেছিলেন পাকিস্তানের কবি আহমদ ফরাজ। আমাকে দেয়া হয়েছিল ইংরেজি ও হিন্দি বইয়ের তালিকা (ক্যাটালগ) অবমুক্ত করার জন্য। সাতটি দেশের সাতজন লেখকই কিছু না কিছু করেছিলেন। বইমেলাটির আয়োজন করেছিল ‘ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া। আমার লিখিত ভাষণে আমি বলেছিলাম, ‘আমি মনে করি বইমেলা এমন সম্মেলনের ও অঙ্গীকারের প্রতীক, যা একটি বিশেষ দেশের সীমানাকে ছাড়িয়ে যায়। বই যেভাবে দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনা হ্রাস করে মানুষকে শান্তি ও সৌহার্দ্যরে পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তেমনটি আর কিছু পারে বলে আমি মনে করি না এবং বইমেলাই আমি বিশ্বাস করি, মারণাস্ত্র, সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, অসাম্য এবং অন্য যা কিছু মানুষকে মানুষ হিসেবে খর্ব করে, তার বিরুদ্ধে শপথ উচ্চারণ করার এবং নিজেদের আত্মাকে বিকিয়ে না দেয়ার জন্য অঙ্গীকার ঘোষণার সর্বোত্তম সুযোগ এনে দেয়। এই বিশ্বমেলা আয়োজনের জন্য আমি ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে অভিনন্দন জানাই।’ মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছিল দিল্লির প্রগতি ময়দানে। পাশাপশি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠান। অসংখ্য লেখক, অজস্র বই আমার জন্য ছিল এক বিপুল অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন দেশ থেকে, বিশেষ করে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লেখক এবং প্রকাশকরা আমার মনোযোগ কেড়েছিল। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমি অনেক কিছু জানতে পারি। মোজাম্বিক থেকে এসেছিলেন একজন নারী, তার নামটা ভুলে গেছি, তিনি অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ মহিলা। তার নিজের প্রকাশনা সংস্থা ছিল এবং আফ্রিকার কোনো একটি বইয়ের সংগঠনের তিনি সভাপ্রধান ছিলেন।
ওয়াইএমসিএ’র গেষ্ট হাউসে আমরা একসঙ্গে ছিলাম। তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে বেশ কয়েকটি বই কিনি। পরিচয় হয়েছিল দিল্লির ‘কালি ফর উইম্যান’-এর স্বত্তাধিকারী উর্বশী বুটালিয়ার সঙ্গে। তার সংস্থাটি সে সময়ে নারী বিষয়ে বই প্রকাশের জন্য বেশ নাম করেছিল। উর্বশী এখন জুবান (Zuban) নামে প্রকাশনা সংস্থা চালায়। প্রগতি ময়দান একটি বিশাল এলাকাজুড়ে, অনেক সময় এই মাথা থেকে ঐ মাথায় যেতে গাড়ি ব্যবহার করছিল মেলা কর্তৃপক্ষের লোকজন। অন্যথায় সাধারণের জন্য গাড়ি প্রবেশ নিষেধ। ব্যাংক, পোস্ট অফিস, টেলিফোন অফিস ইত্যাদিসহ প্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল সে মেলা প্রাঙ্গণে। পরে শুনেছিলাম এই ময়দানটি বিভিন্ন ধরণের মেলা আয়োজন করার জন্য স্থায়ী জায়গা। প্রগতি ময়দানে গিয়ে পরিচিত হওয়ার অসংখ্য মানুষ এখনো আমার স্মৃতির এক গভীর সঞ্চয়। বইমেলা আমার জন্য দেশের সীমানা তুলে দিয়েছিল প্রত্যক্ষভাবে।
পরে যে বইমেলাটি আমাকে টেনেছে সেটি হলো ‘আগরতলা বইমেলা। ২০০০ সালে অনুষ্ঠিত হয় অষ্টাদশ আগরতলা বইমেলা।
ঐ বইমেলায় উপস্থিত থাকার জন্য আমি নিমন্ত্রণ পেয়েছিলাম ত্রিপুরা সরকারের তথ্য, সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী জীতেন্দ্র চৌধুরীর কাছ থেকে। বইমেলা আয়োজিত হয়েছিল ‘রবীন্দ্র শতবার্ষিকী ভবন’ প্রাঙ্গণে। বইমেলার উদ্বোধক ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী কবি অনিল সরকার। বিশেষ অতিথি ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গ্রন্থাগার মন্ত্রী নিমাই পাল এবং ত্রিপুরার প্রবীণ কথাসাহিত্যিক বিমল চৌধুরী। প্রদীপ জ্বালিয়ে বইমেলা উদ্বোধন করা হলে সঙ্গে সঙ্গে জ্বলে উঠে পুরো প্রাঙ্গণজুড়ে আলোর মালা। অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলা ও ককবরক ভাষায় রবীন্দ্রনাথ লিখিত জাতীয় সঙ্গীত পরিবশেন করে শিল্পীরা। আয়োজনটি ছোট ছিল কিন্তু প্রাণের আবেগে ভরপুর ছিল। স্থানীয় লেখকরা আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। তাদের আলোচনা থেকে ত্রিপুরা সাহিত্যের একটি ধারণা পাওয়া যায়। কয়েকদিন ত্রিপুরা থেকে তাদের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বইমেলার আবহকে আমার একটি ভিন্নমাত্রার অনুষঙ্গ মনে হয়েছিল। ছোট আয়োজনটি মাতিয়েছিল অনেক বেশি করে।
কলকাতার বইমেলায় আমি অনেকবার গিয়েছি। এই বইমেলাটিও আমার জন্য অনেক বড় একটা স্মৃতি হয়ে আছে। কারণ, মাতৃভাষায় লেখা বই কিন্তু অন্যদেশ ও সংস্কৃতির মানুষের কথা তাই এই বইমেলায় যেতে তাগিদ অনুভব করি। ১৯৯৯ সালে কলকাতা বইমেলার থিম ছিল ‘বাংলাদেশ’। আমাকেও একটি প্রবন্ধ পড়তে হয়েছিল। সেবার গড়ের মাঝে বইমেলা হয়েছিল।
এই মেলায় একটুখানি ধাক্কা খাই, কারণ প্রতিষ্ঠিত লেখকরা ভালো ব্যবহার করেননি। বাংলাদেশ থিম কান্ট্রি হলেও বাংলাদেশের লেখকদের আলোচনা অনুষ্ঠানের সময় তারা মেলায় উপস্থিত থেকেও আড্ডা দিয়েছেন অন্যত্র। মনে হয়েছিল, লেখকদের সঙ্গের দরকার নেই। বই কেনা হোক আনন্দের। লেখকদের উদাসীনতা দেখে ভেবেছিলাম এই বইয়ের প্রাচুর্য কিন্তু লেখকদের হৃদয় খোলা নয়। বই চাই, লেখকের উষ্ণতা চাই না এটা তো হয় না, যেটা আমি দিল্লি কিংবা আগরতলায় পাইনি।
দিল্লি এবং আগরতলায় যেসব লেখকের সঙ্গে দেখা হয়েছে তারা বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। সালটা মনে নেই, মনে আছে কোনো এক সময়ে ঢাকার ‘মুক্তধারা’র স্বত্বাধিকারী চিত্তরঞ্জন সাহা ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিজের বইয়ের পসরা বসিয়েছিলেন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। ঘাসের উপর চট বিছিয়ে রেখে দেয়া বইগুলো ফুলের মতো ফুটেছিল।
পাঠক উবু হয়ে বসে বই দেখেছিলেন। মনে হচ্ছিল এ এক অন্য জগৎ। এই মেলাকে আস্তে আস্তে বড় হতে দেখেছি। স্টল তৈরি হতে দেখেছি। ছোট পরিসরে মেলার আয়োজন দেখেছি। এসব সত্তর দশকের কথা। মানুষের ভিড় কম ছিল। স্টলের সংখ্যা কম ছিল। ঘুরে ঘুরে বই দেখার আনন্দ ছিল বেশি। বই খুঁজতে ঠেলাঠেলি করতে হয়নি। অনায়াসে পেয়ে যেতাম নিজের পছন্দের বই।
আশির দশকে মেলার বড় পরিবর্তন হয়। ১৯৮৪ সালে বইমেলার আনুষ্ঠানিক নাম রাখ হয় ‘অমর একুশে বইমেলা।’ এ বছর একাডেমি প্রাঙ্গণের বিভিন্ন জায়গায় মাটি ফেলে ভরাট করে মেলার আয়তন বাড়ানো হয়। মাটি ফেলা হয় পুকুরের পশ্চিম পাড়ে। ভরাট করা হয় বর্ধমান ভবনের উত্তর ও ক্যাফেটেরিয়া ভবনের দক্ষিণ দিক। আশির দশকে এটি একটি দিক ছিল যে মেলার আয়তন বাড়ানো। আরেকটি দিক ছিল এই বছরে মেলার দিনও বাড়ানো হয় ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আগে একুশের বইমেলার সময় ছিল মাত্র কয়েকদিন। এ সময়ের বইমেলা উদ্বোধন করতেন দেশের বরণ্যে কেউ।
মেলার এমন পরিবেশে বিশ্বাস করতাম বইমেলা মানুষের সাংস্কৃতি চেতনাকে পরিশীলিত করে। তথ্য প্রযুক্তির এই সময়েও বলতে চাই বইয়ের বিকল্প নেই। বড় করে শ্বাস নিলে একুশের চেতনায় প্লাবিত হয়ে থাকা মেলা প্রাঙ্গণ জাতির ঐতিহ্যের সমৃদ্ধ জায়গা।
নব্বইয়ের দশকে বইমেলা আরো বড় হয়। বইমেলা উদ্বোধন করতে আসেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এখন পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এই অনুষ্ঠান বিভিন্ন চ্যানেলে সরাসারি প্রচারের ব্যবস্থা করার ফলে দেশের দূর অঞ্চলের মানুষ দেখতে পাচ্ছে।
প্রতিদিন বইমেলার খবর প্রচারিত হয় দৈনিক পত্রিকা ও ইলেক্ট্রনিক চ্যানেলে। এভাবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের নানা কর্মকাণ্ড একুশের বইমেলাকে সম্প্রসারিত করেছে। ফলে সমস্যা দেখা দিয়েছে জায়গার। তাই প্রশ্ন উঠেছে বইমেলাকে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া যায় কিনা তা ভেবে দেখার জন্য। বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী ময়দানের বিশাল প্রাঙ্গণ জুড়ে বইমেলা আয়োজিত হয়।
আরও একটি বইমেলার কথা উল্লেখ করতে চাই। এই বইমেলার আয়োজন করেছিল আদিবাসী মান্দি জনগোষ্ঠী। বইমেলার স্লোগান ছিল ‘বই হোক মান্দিদের আত্মবিকাশের মন্ত্র।’ আত্মবিকাশের অর্থ অনেক বড়, আমি মনে করি বইমেলা দিয়ে শুধু বই কেনা বা পড়ার অভ্যাসটা গড়ে তোল নয়। এর অর্থ নিজের বিকাশকে পূর্ণাঙ্গ করা। ব্যক্তিমর্যাদাকে বিকশিত করা এবং জাতিগোষ্ঠীর মর্যাদাকে রাষ্ট্রীয় অধিকার আদায়ের মধ্য দিয়ে সমুন্নত করা। বই আত্মবিকাশের সহায়ক শক্তি। আজকের এই আলোকিত মুখের কাছে আমার দাবি, তারা তারুণ্যপ্রদীপ্ত হয়ে বইয়ের মাধ্যম নিজেদের যোগ্য করে তুলবে।
মান্দী ভাষার উদীয়মান তরুণ কবি মিঠুন রাকসাম যখন এই বইমেলার আয়োজন করে, এটি কোনো সামান্য ঘটনা নয়, এটি একটি শুভ, বি-শা-ল ঘটনা। আমরা যখন বলব যে আমাদের বৈচিত্র্য আছে, আমাদের জাতিসত্তার মধ্যে যে বৈচিত্র্য আছে, যাদের নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে সারা বিশ্বের দরবারে যেতে পারবে, বলতে পারবে- এই আমি, এই আমার মান্দি জনগোষ্ঠী, এই আমি, এই আমার আইন, এই আমার ইতিহাস, এই আমার ঐতিহ্য, এই আমার গল্প, এই আমার কবিতা, এই আমার নাটক, এই আমার পাহাড়, মধুপুরের গড়, পর্বত-জঙ্গল সবকিছুর ভেতরে আমাদের অস্তিত্ব আছে। এই অস্তিত্বের যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আজকের বইমেলার শুরু, উদ্বোধন তার ভেতর দিয়ে।
বই কোনো একটি কাগজের পাতা নয়, বই কোনো একটি দুই মলাটের কোনো কিছু নয়, বই একটি অসাধারণ শক্তি। আমি মনে করি, আজকের প্রযুক্তির দিনে, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, ইমেইল, মোবাইল, সবকিছুর পরও বই আমাদের সেই শক্তি, যে শক্তির ভেতর দিয়ে আমরা আমাদের নিজেদের আবিষ্কার করতে পারি। প্রতিটি লেখা প্রতিটি অক্ষর আমাদের জীবন হয়ে থাকবে।
ইদানিং বাংলাদেশের প্রকাশকরা বিভিন্ন স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বইমেলার আয়োজন করে। তাদের লক্ষ্য ছেলেমেয়েদের হাতের নাগালে বই পৌঁছে দেয়া। একবার ছায়ানট ভবনের নালন্দা স্কুলে আয়োজিত হয়েছিল বইমেলা। আমি আমন্ত্রিত অতিথি ছিলাম। দেখলাম ছেলেমেয়েরা বই কিনছে। ষষ্ঠ শ্রেণির একটি মেয়ে আমার ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটি এনে আমাকে বলল, ‘আপনার এই বইটি আমাকে দিতে হবে। আমার কাছে যে টাকা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে।’ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বই আর বইমেলার বিষয়টি গভীর ভালোবাসায় দেখতে পাই। আমি ওর মাথায় হাত রেখে বলি, ‘মাগো তোমার যে বই ভালোলাগে তা নাও। টাকার কথা ভাবতে হবে না।’ একটি বইয়ের জন্য ও দাবী জানিয়েছে, আবদার করেনি। বইমেলার সার্থকতা এখানে।
এমন অনেক ছোট ছোট বইমেলার নানা অভিজ্ঞতা আমার আছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে গিয়েছিলাম হুগলির কোন্নগরের নবগ্রাম হীরালাল পাল কলেজে। অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল কলেজের বাংলা বিভাগ। হুগলি শহরে অনেক ছোটবড় বইমেলা দেখে প্রাণমাতানো আনন্দ নিয়ে দেশে ফিরে আসি। বারবারই ভাবি এভাবে বইমেলা মানবজীবনের প্রগতির ধারাকে অক্ষুণ রাখবে। জনজীবনের অধিকারের লড়াইয়ে প্রেরণা দেবে।
জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রক্ষার সহায়ক শক্তি হবে। যত ছোট আকারের হোক না কেন কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্ত হবে না। বইমেলা ধারণ করবে মানবজাতির সৃজনশীল মেধা। বিকশিত হবে জ্ঞান। চর্চিত হবে শুভ ও কল্যানের বোধ।
২০১৯ সালের ৫ জানুয়ারি খড়গপুর বইমেলায় আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছিলাম। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় অনুষ্ঠিত এই মেলা আমার সামনে আর এক দিগন্ত। লেখক-পাঠকের মিলনমেলায় স্নাত হই। নিজের বইয়ের নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় পাঠককে।
আমরা সবাই জানি বইয়ের সীমান্ত নেই। সীমান্ত ছাড়িয়ে বই পৌঁছে যায় মানুষের কাছে। এশিয়ার মানুষ হয়ে জানতে পারি আফ্রিকার সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের রূপরেখা। জানতে পারি ইউরোপ-আমেরিকা-ল্যাটিন আমেরিকার জীবন। বই মানবজাতির অক্ষয় সাধনা।