Wednesday, August 19, 2026
হামাস কি তাহলে শেষ হয়ে গেল? by তামির আজরামি
তবে এই বাস্তবতাগুলো থেকে যদি সরাসরি এই সিদ্ধান্তে আসা হয়—‘হামাসের ইতি ঘটেছে’, তা হবে বড় ভুল। একটি আংশিক সামরিক পরাজয় মানেই একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিলুপ্তি নয়। শাসনক্ষমতা কমে যাওয়া মানেই প্রভাব একদম মুছে যাওয়া নয়। আর জনগণের একটি অংশের সমর্থন হারানো মানেই হামাস ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মুছে গেছে তা বলা চলে না।
এ কারণেই ‘হামাসের সমাপ্তি ঘটেছে’—এই ধারণার সঙ্গে আমি একমত নই। বরং এটি বলা বেশি যথার্থ যে, হামাস এই যুদ্ধ থেকে একটি ভিন্ন রূপ নিয়ে বের হয়েছে: সামরিকভাবে দুর্বল, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি ওজনদার; এখন শাসন করার ক্ষমতার চেয়ে টিকে থাকার সক্ষমতার ওপরই তারা বেশি নির্ভরশীল। তবুও, তারা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি বা তাদের বিকল্প অন্য কেউ তৈরি হয়নি। ফিলিস্তিনে এখনও এমন কোনো শক্তি উঠে আসেনি যা হামাসের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতে পারে।
মূল প্রশ্নটি এটা নয় যে: ৭ অক্টোবরের আগে হামাস যতটা শক্তিশালী ছিল, এখনো কি ততটাই আছে? এর উত্তর পরিষ্কার: না। আসল প্রশ্ন হলো: গাজার ভবিষ্যৎ কিংবা ফিলিস্তিন ইস্যুতে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা কি হামাস হারিয়ে ফেলেছে? এখানে উত্তরটি একদম ভিন্ন। বন্দী বিনিময় প্রক্রিয়া, যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তি, গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কিংবা যুদ্ধের পর ‘পরবর্তী’ পরিকল্পনা—সবক্ষেত্রেই হামাস এখনও একটি বড় ফ্যাক্টর। এমনকি যারা হামাসকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চায়, তারাও তাদের ভূমিকা, অস্ত্র কিংবা প্রভাবকে ঘিরে আলোচনা করতে বাধ্য হচ্ছে। এটিই প্রমাণ করে যে হামাসের অবসান ঘটেনি।
একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক ক্ষমতার পতন আর একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের বিলুপ্তির মধ্যে অনেক বড় পার্থক্য রয়েছে। হামাস হয়তো আগের মতো গাজা শাসন করতে পারবে না, কিন্তু সংঘাতের রাজনীতিতে তাদের কাছে এখনও বড় একটি শক্তি রয়ে গেছে: অন্য কাউকেও সহজে গাজা শাসন করতে না দেওয়ার ক্ষমতা।
রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখার জন্য সব সময় সরকারে থাকার প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো কোনো একটি পক্ষকে বাদ দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব বা অনেক কঠিন।
যারা হামাসের অবসান দেখছেন, তারা এই সত্যটি এড়িয়ে যাচ্ছেন যে খোদ ইসরায়েলও কিন্তু হামাস শেষ হয়ে গেছে—এমন আচরণ করছে না। হামাস সত্যিই শেষ হয়ে গেলে যুদ্ধ, অবরোধ, চাপ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাওয়ার ইসরায়েলি অজুহাতও শেষ হয়ে যেত। কিন্তু ইসরায়েল এখনও হামাসের অস্ত্র সমর্পণ, তাদের ফিরে আসা ঠেকানো এবং নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণের কথা বলছে। এর মানে, মুখের কথা যাই হোক না কেন, ইসরায়েল মনে মনে ভালো করেই জানে যে হামাস এখনও এই সমীকরণের অংশ।
মূলত, ‘হামাস একটি বড় হুমকি’—ইসরায়েলের এই অবস্থানটি দুটি উদ্দেশ্য পূরণ করে। এক. এটি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং গাজার বড় অংশ দখল করে রাখার অজুহাত দেয়। দুই. এটি যুদ্ধের পরের বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে—যেমন: যুদ্ধের পর গাজা কে চালাবে? ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ কী? স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কোনো পথ তৈরি হবে, নাকি কেবল স্থায়ী সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে? ‘হামাস আতঙ্ক’ বাঁচিয়ে রেখে তেল আবিব মূলত এই কঠিন প্রশ্নগুলো থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
গাজার ভেতরের পরিস্থিতি অবশ্যই জটিল। মানুষের চরম ক্ষোভ রয়েছে, অনেকেই এই বিপর্যয়ের জন্য হামাসকে আংশিক দায়ী ভাবছেন এবং যে কোনো স্লোগানের চেয়ে মানুষের কাছে এখন পানি, বিদ্যুৎ, খাবার, ওষুধ ও নিরাপত্তা পাওয়াটা বেশি জরুরি। তবে এই ক্ষোভের অর্থ এই নয় যে গাজাবাসী ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ বা বিকল্প মেনে নিচ্ছে। এর মানে এই নয় যে তারা আত্মসমর্পণ করতে চায় বা ফিলিস্তিনিরা তাদের স্বাধীনতার অধিকার ছেড়ে দিয়েছে।
যুদ্ধ না চাওয়া কোনো গাজাবাসী রাতারাতি আত্মসমর্পণের সমর্থক হয়ে যান না। আবার হামাসের সমালোচনা করা মানেই কেউ ইসরায়েলের সমর্থক হয়ে গেছে—এমনটা ভাবাও ভুল। নিজের দেশের নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তের বিচার করা আর যে জাতীয় সংগ্রামের ভেতর থেকে সেই নেতৃত্বের জন্ম, সেটিকে পুরোপুরি নস্যাৎ করে দেওয়া—এই দুটির মধ্যে স্পষ্ট তফাৎ রয়েছে।
হামাসের জনভিত্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে—এমন দাবি করার ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। গণহত্যার মতো যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া একটি সমাজ এত সহজে স্থায়ী রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারে না। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে, তাঁবুতে বসে মানুষ যে ক্ষোভ প্রকাশ করছে তা অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তাৎক্ষণিক ক্ষোভকে দশক ধরে টিকে থাকা একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ধরে নেওয়াটা তড়িঘড়ি বিশ্লেষণ হবে।
হামাস কেবল গাজার একটি সরকার নয়। এটি একটি সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিক নেটওয়ার্ক। এটি ফিলিস্তিনি ঐতিহ্যের এমন একটি অংশ, যা তাদের আগেও ছিল এবং পরেও থাকবে। তাই কেবল শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে এই আন্দোলন শেষ করা সম্ভব নয়। দখলদারির বিরুদ্ধে জন্ম নেওয়া সংগঠনগুলো তাদের নেতাদের মৃত্যু বা পরিকাঠামো ধ্বংসের কারণে একেবারে মরে যায় না। তারা আকারে ছোট হতে পারে, বদলাতে পারে, নতুন নামে ও নতুন কৌশলে আবার ফিরে আসতে পারে।
এখানেই আমাদের বুঝতে হবে আগের হামাস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য হামাসের মধ্যে পার্থক্য কী। হয়তো গাজার শাসক হিসেবে হামাসের পুরোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। অবরুদ্ধ ও ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি ভূখণ্ডে একই সঙ্গে সরকার পরিচালনা ও প্রতিরোধ আন্দোলন চালানোর মোহ হয়তো ভেঙে গেছে। হয়তো সংগঠনটি এখন অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান কোনো রূপ গ্রহণে বাধ্য হবে। কিন্তু এটি হামাসের ধ্বংস নয়, বরং এটি হামাসের একটি নির্দিষ্ট সংস্করণের সমাপ্তি মাত্র।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সঙ্গে মূল পার্থক্যটা এখানেই। অনেকে হামাসের ওপর আসা আঘাতগুলোকে তাদের বিলুপ্তির প্রমাণ হিসেবে দেখেন; আমি সেগুলোকে দেখি নতুন এক যুগে প্রবেশের আলামত হিসেবে। অবসান মানে ইতিহাস থেকে মুছে যাওয়া, আর রূপান্তর মানে পরাজয় ও নতুন বাস্তবতার চাপে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, যে কারণগুলো হামাসের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলো কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। দখলদারি শেষ হয়নি, অবরোধ ওঠেনি, বসতি স্থাপন থামেনি, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র তৈরি হয়নি, আর গাজাও কোনো মুক্ত বা নিরাপদ স্থান হয়ে ওঠেনি। যতক্ষণ এই কারণগুলো থাকবে, ততক্ষণ হামাস বা তার চেয়েও নতুন কোনো রূপ বা নতুন ধারার প্রতিরোধ জন্ম নেওয়ার মতো পরিবেশ থেকেই যাবে।
তাই ‘হামাসের কি অবসান ঘটেছে?’—প্রশ্নটি এভাবে করাটাই হয়তো ভুল। সঠিক প্রশ্নটি হওয়া উচিত: এই যুদ্ধের পর হামাস কী রূপ ধারণ করবে? তারা কি একটি শাসক দল হিসেবে থাকবে, নাকি শুধুই রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হবে? তারা কি তাদের সামরিক শাখা পুনর্গঠন করবে, নাকি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে কিছুটা পেছনে সরবে?
হামাসের অবসান ঘোষণা করা বস্তুনিরপেক্ষ বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বেশি। ইসরায়েল যখন বিজয়ের গল্প বলতে চায়, তখন বলে হামাস শেষ; আবার যখন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত দরকার হয়, তখন বলে হামাস এখনও বড় হুমকি। অন্যদিকে, হামাসবিরোধী অনেক গোষ্ঠীও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব থেকে এর অবসান দেখতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা সকলের ইচ্ছার চেয়েও অনেক বেশি জটিল।
হামাস শেষ হয়ে যায়নি, তবে তারা আর আগের মতো নেই। এটাই হয়তো সবার জন্য সবচেয়ে কঠিন সত্য—হামাসের নিজের জন্য, ইসরায়েলের জন্য, ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং এমন সবার জন্য যারা জটিল একটি সংকটের সহজ উত্তর খুঁজছেন।
একটি যুদ্ধে একটি দল হেরে যেতে পারে, তাদের মূল পরিকাঠামো ধ্বংস হতে পারে, তাদের সমর্থকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের উপস্থিতি বজায় থাকে এবং তাদের জন্ম দেওয়া মূল কারণগুলো বিদ্যমান থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের চূড়ান্ত অবসান ঘোষণা করা সম্ভব নয়।
তাই আসল প্রশ্ন হামাস শেষ হয়েছে কি না তা নয়। আসল প্রশ্ন হলো: এই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে কোন রূপের হামাস বের হয়ে আসবে?
* তামির আজরামি, বেলজিয়ামে বসবাসকারী লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।
![]() |
| হামাসের সশস্ত্র মহড়া। ফাইল ছবি: এএফপি |
Monday, July 27, 2026
ফিলিস্তিনের দুটি মসজিদে ইসরায়েলিদের অগ্নিসংযোগ
এর আগে শুক্রবার নাবলুসের দক্ষিণ-পশ্চিমে তাল গ্রামে সংঘর্ষে চার ফিলিস্তিনি এবং দুই ইসরায়েলি নিরাপত্তা সদস্য নিহত হন। নিহত ইসরায়েলিদের একজন পাশের একটি বসতির নিরাপত্তা সমন্বয়কারী ছিলেন। ওই ঘটনার পরপরই নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
শুক্রবারের ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় রোববার ভোরে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে হামলা চালায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বলে অভিযোগ করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
নাবলুসের দক্ষিণ-পূর্বে কুসরা গ্রামের কাউন্সিলপ্রধান আবদেল আজিম ওয়াদি জানান, নতুন নির্মিত একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মসজিদটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ হয়েছিল এবং নামাজ আদায়ের জন্য প্রস্তুত ছিল। ভেতরে আসবাবপত্রও রাখা হয়েছিল। হামলাকারীরা আগুন লাগিয়ে দেয় এবং দেয়ালে হিব্রু ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান লিখে যায়।
দেয়ালে লেখা স্লোগানগুলোর মধ্যে ছিল ‘ইহুদিদের প্রতিশোধ’ এবং তাল গ্রামের ঘটনায় নিহত এক ইসরায়েলির নাম।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে বলেছে, এ হামলা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান বৃহত্তর সহিংসতার অংশ।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে জানায়, ইসরায়েলি রাষ্ট্রের মদদপুষ্ট বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাস এখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে পরিকল্পিত গণহামলার রূপ নিয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, কুসরা গ্রামে গিয়ে তারা অগ্নিসংযোগ ও দেয়ালে লেখা স্লোগানের প্রমাণ পেয়েছে এবং হামলাকারীদের শনাক্তে অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রমাণ সংগ্রহে পুলিশও কাজ করছে।
সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলাসহ এ ধরনের সব ঘটনা আমরা কঠোরভাবে নিন্দা জানাই। এলাকায় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের দাবি, তুলকারম শহরের দক্ষিণ-পূর্বে কুর গ্রামের একটি মসজিদেও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একই সময়ে রামাল্লার কাছে কাফর মালিক শহরের একটি পাথর কাটার কারখানায় কর্মরত ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের ওপরও হামলা চালানো হয়।
কুর গ্রামের কাউন্সিল সদস্য ফরিদ জিয়ুসি বলেন, ভোরে তিনজন বসতি স্থাপনকারী মসজিদে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে। তবে মুসল্লিরা দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনায় মূল নামাজঘর রক্ষা পায়।
তিনি বলেন, আমাদের গ্রামে এ ধরনের হামলা এই প্রথম। হামলাকারীরা মসজিদের দেয়ালেও হিব্রু ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান লিখে গেছে।
ফিলিস্তিনি সূত্র জানায়, সশস্ত্র কিছু ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী তাল গ্রামে প্রবেশ করলে স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের বাধা দিতে বেরিয়ে আসেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ফিলিস্তিনি একজন বসতি স্থাপনকারীর অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দাবি, বসতি স্থাপনকারীরাই প্রথমে হামলা চালিয়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটায়। তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, উভয় পক্ষ থেকেই গুলি ছোড়া হয়েছিল।
জাতিসংঘ ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বসতি স্থাপনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন।
অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে কথিত সন্ত্রাসী হামলামোকাবিলায় পশ্চিম তীরে বড় ধরনের নিরাপত্তা অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এর অংশ হিসেবে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন এবং সদস্যদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
নেতানিয়াহুর সরকারের কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচসহ কয়েকজন মন্ত্রী ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় দখল করা পশ্চিম তীরকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
পশ্চিম তীরজুড়ে নিরাপত্তা অভিযান চালিয়ে শনিবার রাত থেকে প্রায় ৬০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী বলে জানিয়েছে প্যালেস্টিনিয়ান প্রিজনার্স ক্লাব, যারা ইসরায়েলি কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনিদের তথ্য সংরক্ষণ করে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘের অধিকাংশ সংস্থা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনবিরোধী বলে মনে করে। যদিও ইসরায়েল এ অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।
ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ড হিসেবে পশ্চিম তীরকে দাবি করে। অন্যদিকে ইসরায়েল ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ওই ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের দাবি তুলে ধরে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধী নেতানিয়াহু সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুতগতিতে নতুন বসতি সম্প্রসারণ করছে।
এদিকে রোববার পোপ লিও পশ্চিম তীরে বাড়তে থাকা সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে আলোচনার আহ্বান জানান এবং সব ধর্মের পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা ও প্রচলিত অবস্থান লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
![]() |
| ফিলিস্তিনের মসজিদে ইসরায়েলিদের অগ্নিসংযোগ। ছবি : সংগৃহীত |
Wednesday, July 15, 2026
সব দেশ ট্রাম্পের বশ্যতা মেনেছে, ব্যতিক্রম শুধু ইরান
আরব মিত্রদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে মঙ্গলবার ট্রাম্পের এই ১৮০ ডিগ্রি ডিগবাজি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনায় হোয়াইট হাউস কতটা দিশেহারা। যে অভিযানটিকে মাত্র ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের একটি ‘ক্লিন অপারেশন’ বা সহজ জয় ভাবা হয়েছিল, তা এখন ২০তম সপ্তাহের এক চরম গোলমেলে ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। স্পষ্টতই, ট্রাম্পের তাৎক্ষণিক খেয়ালখুশি আর আবেগনির্ভর রণকৌশল কোনো কাজে আসছে না।
নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বমঞ্চে পেশিশক্তি প্রদর্শনকে যিনি অভ্যাসে পরিণত করেছেন, সেই ট্রাম্প এবার ইরানে এমন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন—যারা সহজে মাথা নোয়াতে রাজি নয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় কড়া পোস্ট দিয়ে বা শুল্কের হুমকি ছুড়ে যে ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ জেতা যায় না, ইরান তা প্রমাণ করে ছাড়ছে।
জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অধ্যাপক ও মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ওয়ালি নাসর বলেন, ‘ট্রাম্প এবার এমন এক দেশের মুখোমুখি হয়েছেন যারা তার নিয়ম মেনে খেলতে রাজি নয়। ট্রাম্পের নিয়ম হলো—প্রথমে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তার স্তুতি গাইতে হবে, তারপর তিনি দয়া করে যেটুকু ছাড় দেবেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে।’
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফরেইন পলিসি বিভাগের পরিচালক সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক কূটনীতি কিছুটা ভাগ্য এবং প্রতিপক্ষের পিছু হটার সুযোগের ওপর ভর করে টিকে ছিল। কিন্তু গত ৪৭ বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে তেহরান যে এত সহজে মার্কিন ফাঁদে পা দেবে না, তা ট্রাম্পের বোঝা উচিত ছিল।’
আমেরিকান থিংক ট্যাংক ‘জিসা’-এর সিনিয়র ফেলো এবং সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন হ্যানাহ অতীতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি রুখতে সীমিত সামরিক শক্তি ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। তবে তিনি মনে করেন, ইরানের শাসনব্যবস্থাকে এক ধাক্কায় গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ট্রাম্প মস্ত বড় ভুল করেছেন। তিনি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ইরানের শক্তিশালী ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোকে অবমূল্যায়ন করেছেন এবং মার্কিন সামরিক ক্ষমতার ওপর অতিরিক্ত ভরসা করেছেন।
হ্যানাহ সরাসরি বলেন, ‘পেছনের দিকে তাকালে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই যুদ্ধটি শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ ধারণার ওপর ভিত্তি করে। ট্রাম্প ভেবেছিলেন মার্কিন বিমান হামলা আর ট্রুথ সোশ্যালে কড়া পোস্ট দিলেই ইরানের বিপ্লবী সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। এর চেয়ে ক্ষতিকারক ধারণা আর হতে পারে না।’
তিনি আরো যোগ করেন, ‘ভুলটা আরো প্রকট হয়েছে কারণ প্রেসিডেন্টের চারপাশে এমন কোনো শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা দল ছিল না, যারা সত্য বলার সাহস রাখতেন। অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ, প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জ্ঞানকে উপেক্ষা করে প্রেসিডেন্টের ভুল সিদ্ধান্তগুলোকে বিনাপ্রশ্নে মেনে নেওয়া হয়েছে।’
সম্প্রতি ভেঙে পড়া যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি মোটেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান ছিল না। এটি ছিল মাত্র ৬০ দিনের একটি সাময়িক ব্যবস্থা, যাতে দুপক্ষ শান্ত হয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে পারে। কিন্তু একটি সাময়িক চুক্তিই যেখানে টিকল না, সেখানে স্থায়ী কোনো শান্তি চুক্তির আশা করা এখন সুদূরপরাহত।
পরিস্থিতি সামলাতে ট্রাম্প এখন দ্বিধাগ্রস্ত। তিনি আবার সামরিক পন্থায় ফিরে গিয়ে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-অবরোধের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরানের একটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনার কাছে অবস্থিত সুরক্ষিত ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ একটি ‘বড়সড় ও জবরদস্ত আঘাত’ হানার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। তবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনমত এই যুদ্ধের বিপক্ষে থাকায়, যুদ্ধের শুরুতে তিনি যেভাবে বেপরোয়া বোমাবর্ষণ করেছিলেন, তেমন কিছু করার সাহস এখন আর দেখাচ্ছেন না।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো এবং সাবেক মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, ‘ট্রাম্প এখন একটা খাঁচায় বন্দি। তিনি এমন এক নিষ্ঠুর ও জেদি প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েছেন, যারা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং পারস্য উপসাগরে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে তাকে জিম্মি করে ফেলেছে।’
এদিকে টোল বা শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আকস্মিক ডিগবাজি প্রমাণ করে যে, তিনি কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়াই দেশ চালাচ্ছেন। সোমবার যখন তিনি ঘোষণা করলেন যে হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তার জন্য কার্গো জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক নেওয়া হবে, তখন তিনি প্রকারান্তরে নিজের প্রশাসনের আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ক অবস্থানকেই লঙ্ঘন করেছিলেন। এরপর মঙ্গলবার উপসাগরীয় আরব নেতাদের একটি ফোনেই তিনি সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইরানিয়ান স্টাডিজের পরিচালক আব্বাস মিলানি বলেন, ‘আমি মনে করি না ইরানের বিষয়ে ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি আছে। এটাই আসল সমস্যা। তিনি পুরোপুরি সহজাত প্রবৃত্তির ওপর ভর করে চলছেন, যার মধ্যে দুটি পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য রয়েছে।
ট্রাম্পের সমালোচনা করে মিলানি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘তিনি এই শাসনব্যবস্থার আসল চরিত্র কখনোই বুঝতে পারেননি এবং এখনো বোঝেন না। ইরান আর দশটা দেশের মতো নয়। তারা সবসময় অভাবনীয় চাল চালে এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে যেকোনো সীমায় যেতে পারে।’
সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

Wednesday, June 17, 2026
মসজিদে আগুন দিয়ে হিব্রুতে স্লোগান লিখে গেলেন ইসরায়েলিরা
স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ভোরে একদল বসতি স্থাপনকারী জিলজিলিয়া গ্রামে প্রবেশ করে স্থানীয় মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে মসজিদের নারীদের নামাজের অংশ পুড়ে যায় এবং ভবনের বাইরের দেয়ালেরও ক্ষতি হয়।
বাসিন্দাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জিলজিলিয়া গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা বেড়েছে। গত মাসেও তারা গ্রামটিতে হামলা চালিয়ে একটি ভেড়ার পাল নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে পৃথক আরেক ঘটনায় মাজরা আল-নুবানি গ্রামেও একটি মসজিদে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে মসজিদের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলাকারীরা দুই মসজিদের দেয়ালেই হিব্রু ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান লিখে রেখে যায়।
স্থানীয় ও মানবাধিকার সূত্রগুলোর দাবি, অধিকৃত পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলা, অগ্নিসংযোগ, জমি দখল এবং কৃষকদের নিজ জমিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলি বসতিগুলোর আশপাশের এলাকায় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির ফলে অন্তত ১,১৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১২,৬৬৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ২৩ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
![]() |
| প্রতীকী ছবি |
Tuesday, June 9, 2026
ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের ভয়াবহ নির্যাতন
ইসরাইলি কারাগারে এমন নির্যাতনের শিকার হওয়া মুহাম্মদ আল-বাকরি তেমনি একজন। তাকে যে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয়েছিল সেই দিনটির কথা তিনি কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না। দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল, রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের ছুটির সময়।
বাকরি জানান, এই ঘটনার এক মাস আগে ইসরায়েলি সেনাদের হাতে তিনি গ্রেপ্তার হন। এরপর থেকে গাজার এই সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর, নির্যাতন, হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছিল।
আল-বাকরি বলেন, তাকে আরও সাতজন বন্দির সঙ্গে রাখা হয়েছিল। তাদের সবাইকে বিবস্ত্র করে, চোখে পট্টি বেঁধে ও হাতে হাতকড়া পরানো হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাপড় খুলে ফেলার পর ধর্ষণ করা হয়েছিল। আমরা আল্লাহ বলে চিৎকার করছিলাম, কিন্তু তারা শুধু হাসছিল আর আমাদের ভিডিও করছিল।
গাজার এই সরকারি কর্মকর্তা বলেন, বন্দিদের যৌন নির্যাতনের সময় ইসরাইলি রক্ষীরা কুকুরও ব্যবহার করত। তিনি বলেন, কুকুরগুলো কর্মকর্তাদের নির্দেশেই আমাদের আক্রমণ করছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-বাকরি তাদের মধ্যে একজন, যারা আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রামাণ্যচিত্র ‘বডিস অব এভিডেন্স: ইসরাইল’স ডার্কেস্ট ওয়েপন’ এর জন্য নিজেদের বন্দিজীবনের অভিজ্ঞতা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
এই প্রামাণ্যচিত্রে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত বলে অভিযোগ ওঠা ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনাগুলো তদন্ত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারকদের পর্যবেক্ষণ, জাতিসংঘের বিভিন্ন অনুসন্ধান এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনের জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রান্সেস্কা আলবানেজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি বাহিনীর যৌন সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন ব্যাপক ও পদ্ধতিগত আকার ধারণ করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
মানবাধিকার সংস্থা প্যালেস্টিনিয়ান সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস এবং ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরসহ বিভিন্ন সংস্থা ফিলিস্তিনি বন্দিদের সাক্ষ্য নথিভুক্ত করেছে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে ইসরাইলি সেনারা কুকুর ব্যবহার করে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের মতো সহিংসতা চালিয়েছে।
ইসরাইলি কারাগারে ফিলিস্তিনিদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়- এগুলো কয়েক দশক পুরোনো। তবে ২০২৩ সালের অক্টোবরে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাসের হামলার পর গাজায় গণহত্যা যুদ্ধ শুরু করে ইসরাইল যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ধর্ষণের ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইল কর্তৃক যৌন সহিংসতা, প্রজনন-সংক্রান্ত সহিংসতা এবং অন্যান্য লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ‘পদ্ধতিগত’ ব্যবহার সম্পর্কে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

Friday, June 5, 2026
প্রত্যাহারের পরিবর্তে গাজায় ইসরাইলের ৪০টি সামরিক ঘাঁটি
ইসরাইলি বাহিনী বর্তমানে তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ পর্যন্ত অবস্থান নিয়েছে। এই লাইন বলতে বাফার জোন ও সামরিক নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোকে বোঝানো হচ্ছে, যা গাজার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত। নেতানিয়াহু বলেন, আমরা বর্তমানে হামাসকে চেপে ধরছি; এখন আমরা ভূখণ্ডের ৬০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছি। এরপর জনতার মধ্য থেকে কেউ পুরো গাজা সংযুক্ত করার দাবি জানালে তিনি বলেন, ধাপে ধাপে এগোই। প্রথমে ৭০ শতাংশ। সেখান থেকেই শুরু করা যাক।
কবরস্থানের ওপর ঘাঁটি
স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসরাইল কেবল অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ পোস্ট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। নতুন স্থাপনাগুলো কৌশলগতভাবে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে দুটি উত্তর গাজায়, দুটি মধ্যাঞ্চলে, একটি নেতজারিম করিডোরের পূর্বে এবং তিনটি দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে নির্মিত হয়েছে। এই ভূখণ্ড দখল নীতির সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণগুলোর একটি হলো খান ইউনিসের ইস্টার্ন সেমেট্রি (পূর্বে কবরস্থান)-এর ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বরেই বুলডোজার দিয়ে সমতল করা কবরস্থানে প্রকৌশলগত কাজ শুরু হয়। ২০২৬ সালের ১৮ মে নাগাদ সেখানে সামরিক যানবাহন মোতায়েনের এলাকা এবং সারিবদ্ধ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হয়। সেগুলো সম্ভবত সেনাদের আবাসন ও সামরিক বৈঠকের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। উত্তর গাজাতেও একই ধরনের দ্রুত সামরিকীকরণের চিত্র দেখা গেছে। বেইত লাহিয়া এলাকায় ২০২৫ সালের অক্টোবরের ছবিতে যে স্থান সম্পূর্ণ খালি ছিল, সেখানে নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই প্রকৌশলগত কাজ শুরু হতে দেখা যায়। ২০২৬ সালের মে মাস নাগাদ সেখানে অভ্যন্তরীণ সুবিধাসম্পন্ন একটি পূর্ণাঙ্গ বেষ্টনীঘেরা সামরিক স্থাপনা গড়ে ওঠে।
সামনের সারির অবস্থান আরও শক্তিশালী করা
নতুন ঘাঁটি নির্মাণের পাশাপাশি ‘ইয়েলো লাইন’-এর ভেতরে আগে থেকেই থাকা সামরিক অবস্থানগুলোও দ্রুত সম্প্রসারণ করছে ইসরাইলি বাহিনী। ‘ইয়েলো লাইন’ মূলত সেই অস্থায়ী সীমারেখা, যেখানে পূর্ণ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলি সেনাদের অবস্থানের অনুমতি ছিল। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি সামরিক ঘাঁটির আয়তন ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সময়ে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সেখানে ব্যাপক অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, সাঁজোয়া যান মোতায়েনের নতুন এলাকা এবং শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। মধ্য গাজায় স্যাটেলাইট সেন্সর একটি বিদ্যমান সামরিক স্থাপনার চারপাশে গভীর প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খননের তথ্য শনাক্ত করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবস্থান ধরে রাখার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। এই অবকাঠামোর কৌশলগত উদ্দেশ্য সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় নেতজারিম করিডোর এলাকায়। এটি এমন একটি পথ, যা ব্যবহার করে ইসরাইলি বাহিনী উত্তর ও দক্ষিণ গাজাকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। আল জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিট করিডোরটির পূর্বাঞ্চল ও আশপাশে তিনটি পৃথক সামরিক ঘাঁটি শনাক্ত করেছে, যা গাজার দুই অংশের মধ্যে চলাচলের ওপর ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সহায়তা করছে। এই করিডোরের ঠিক পূর্বদিকে জুহোর আদ-দিক এলাকায় খোলা জমি ২০২৬ সালের মার্চে ভূমি খননকাজ শুরু হওয়ার পর দ্রুত একটি নতুন সামরিক ঘাঁটিতে রূপ নিতে শুরু করে।
অবরুদ্ধ জনসংখ্যাকে ঘিরে ফেলা
এই ৪০টি সামরিক ঘাঁটির ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, এগুলো একটি পরিকল্পিত অবরোধ কৌশলের অংশ। মাটির বাঁধ, পরিখা ও অভ্যন্তরীণ সামরিক সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত ঘাঁটিগুলো বিভিন্ন দিক থেকে ফিলিস্তিনি জনবসতিকে ঘিরে রেখেছে। এই অবরোধমূলক কাঠামো বেসামরিক জনগণের চলাচল এবং নিজেদের জমিতে প্রবেশের ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে ফেলেছে, বিশেষ করে ইসরাইলি মোতায়েন লাইনের সংলগ্ন এলাকাগুলোতে। এই ক্রমবর্ধমান দখলদারিত্ব ২০২৫ সালের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির সরাসরি লঙ্ঘন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তিটি ছিল প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবিত ২১ দফা শান্তি পরিকল্পনার ভিত্তিতে গঠিত। ওই কাঠামোতে যুদ্ধ বন্ধ, অবিলম্বে মানবিক সহায়তা প্রবেশ, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং ধাপে ধাপে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আক্রাবাউই বলেন, ৭ অক্টোবরের পর থেকে দখল, নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত আরও সামনে ঠেলে দেয়ার ধারণাই ইসরাইলের নিরাপত্তা মতবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তার মতে, ইসরাইলের নতুন কৌশল এমন অঞ্চল নিশ্চিত করা, যেখান থেকে ফিলিস্তিনি জনসংখ্যা ও নগর অবকাঠামো সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। আক্রাবাউই সতর্ক করে বলেন, নির্মাণকাজের ব্যাপকতা ইঙ্গিত দেয় যে এটি কোনো অস্থায়ী বাফার জোন রক্ষার পরিকল্পনা নয়। তিনি বলেন, এই নির্মাণ এবং জনবসতিগুলোকে অবরুদ্ধ করার মাধ্যমে তিনি (প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু) আবারও একটি নির্মূলমূলক যুদ্ধ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলছেন।
হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে ইসরাইলি হামলায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৯ জনের বেশি আহত হয়েছেন। হতাহতদের বেশিরভাগই নারী ও শিশু। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও সহিংসতা থামেনি। চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর গত সাত মাসে অন্তত ৯২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরও ২ হাজার ৮১১ জন আহত হয়েছেন।
Thursday, June 4, 2026
কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে গেলেন একজন ‘ট্যাংকম্যান’ by শামিমা নাসরিন
১৯৮৯ সাল। তিয়েনআনমেনে বিক্ষোভকারীদের ওপর চীনের সামরিক বাহিনীর চড়াও হওয়ার পরদিন ৫ জুন কয়েকটি ছবি বিশ্ববাসীর সামনে আসে। ছবিগুলোতে সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট পরা একজনকে সড়কের চলন্ত ট্যাংকবহরের সামনে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তাঁর দুই হাতে দুটি শপিং ব্যাগ ধরা, যেন সবে বাজার করে বাড়ি ফিরছেন। ছবিতে থাকা ওই ব্যক্তির পরিচয় আজও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সারা বিশ্ব তাঁকে ‘ট্যাংকম্যান’ নামে মনে রেখেছে।
কয়েকজন আলোকচিত্রী তিয়েনআনমেন স্কয়ারের কাছে সেদিনের সেই মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দী করতে পেরেছিলেন। তাঁদের একজন জেফ উইডনার। তিনি বেইজিং হোটেলের কক্ষ থেকে ছবিটি তুলেছিলেন। আরেক আলোকচিত্রী স্টুয়ার্ট ফ্রাঙ্কলিনের তোলা ‘ট্যাংকম্যান’ ছবি টাইম সাময়িকীতে ছাপা হয়। তিনি ছবি তুলেছিলেন বেইজিং হোটেলের ব্যালকনি থেকে।
৫ জুন পশ্চিমা আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে ট্যাংকম্যানের ছবি ফলাও করে ছাপা হয়েছিল। পরে এক সাক্ষাৎকারে স্টুয়ার্ট ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন, ‘এ ছবির মধ্য দিয়ে লোকটির অসাধারণ সাহস ফুটে উঠেছে। সমাজে ন্যায়বিচার ফিরিয়ে আনার জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে যেন তৈরি ছিলেন তিনি।’
কর্তৃত্ববাদী শাসকের অপ্রতিরোধ্য শক্তির বিরুদ্ধে শুধু ব্যক্তিগত সাহসে ভর করে রুখে দাঁড়াবার প্রতীক হয়ে আছেন তিনি। বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির সামনে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মাথানত করতে বাধ্য হয়েছিল শাসকের দুর্নিবার অস্ত্র। এরপর তাঁর কী হয়েছিল, জানা যায়নি। কেউ কেউ তাঁকে ‘ওয়াং উইলিন’ বলে সন্দেহ করলেও চূড়ান্তভাবে কেউ তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেননি।
এদিকে আলোকচিত্রী চার্লি কোল তিয়েনআনমেনে তাঁর তোলা ‘ট্যাংকম্যান’ ছবির জন্য ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অব দ্য ইয়ার পুরস্কার-১৯৮৯ পেয়েছিলেন।
ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবির ছোট্ট তালিকা করা হলেও সেখানে নিশ্চিতভাবেই জায়গা করে নেবে ‘ট্যাংকম্যান’। এ ছবির পটভূমি জানতে হলে ফিরে যেতে হবে অতীতে, ১৯৮৯ সালে, যখন চীন বিক্ষোভে উত্তাল।
দেশে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে রাজধানী বেইজিংয়ে টানা বিক্ষোভ চলছে। বিক্ষোভের মূলকেন্দ্র ছিল শহরের তিয়েনআনমেন স্কয়ার। ১৯৮৯ সালের ৪ জুন এ স্কয়ারে যেন নরক নেমে এসেছিল, লেখা হয়েছিল দমন–পীড়ন আর নির্বিচার হত্যার এক কলঙ্কিত অধ্যায়, যার প্রকৃত চিত্র চীনের কর্তৃত্ববাদী সরকার বিশ্ববাসীর সামনে কোনো দিন আসতে দেয়নি।
তবে আলোকচিত্রীদের কয়েকটি ক্লিক সেদিন তিয়েনআনমেন ও এর আশপাশের এলাকায় কী ঘটেছিল, তা বোঝার জন্য যথেষ্ট ছিল।
সে বছর এপ্রিল থেকে টানা বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে চীন সরকার মে মাসের শেষ ভাগে সামরিক আইন জারি করে। কিন্তু তাতেও বিক্ষোভকারীদের দমানো যায়নি।
জুনে সেনাবাহিনী-বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ বাধতে শুরু করলে সরকার সেনাবাহিনীকে বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল তিয়েনআনমেন স্কয়ার খালি করার নির্দেশ দেয়।
৪ জুন ট্যাংকের একটি বড় বহর তিয়েনআনমেন স্কয়ারের দিকে যাচ্ছিল। জলপাই সবুজ রঙের বিশালাকারের ভয়ালদর্শন ট্যাংক একের পর এক সারি বেঁধে এগিয়ে যাচ্ছে।
ট্যাংকের সারি এগিয়ে আসছিল, হঠাৎই দেখতে খুব সাধারণ ঘরানার এক ব্যক্তি সড়কের মাঝখানে ট্যাংকবহরের গতিপথ আটকে দাঁড়িয়ে পড়েন।
চলন্ত ট্যাংকের বিশাল বহরটি এই ব্যক্তিকে ভয় দেখাতে পারেনি। তিনি অবিচল দাঁড়িয়ে আছেন, প্রথম ট্যাংকটি তাঁর একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। তিনি হাত নেড়ে সেগুলোকে ফিরে যেতে ইশারা করেন। সামনের ট্যাংকটি তাঁকে এড়িয়ে যেতে এদিক-ওদিক ঘুরে সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। তিনিও ঘুরে ঘুরে ট্যাংকের সামনে গিয়ে দাঁড়ান। একপর্যায়ে তাঁকে একটি ট্যাংকের ওপর উঠে যেতে দেখা যায়, সেই ছবিও রয়েছে।
পরে অজ্ঞাতনামা আরও দুই ব্যক্তি তাঁকে সেখান থেকে টেনে সরিয়ে নেন। সব মিলিয়ে মাত্র মিনিট পাঁচেকের মধ্যে এত সব ঘটনা ঘটে যায় বলে পরে নানা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিতি আলোকচিত্রীরা।
বিক্ষোভের শুরু যে পথে
গত শতকের আশির দশকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে বড় ধরনের বদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল চীন। দেশটিতে বেসরকারি খাতে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুমতি দিয়েছিল ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি। বিদেশি বিনিয়োগও আসা শুরু করেছিল। চীনের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমানকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সেই সময়ে দেশটির নেতা দেং জিয়াওপিং।
অর্থনীতির বিকাশে সরকারের এই তৎপরতা ঘিরে দুর্নীতির উৎসবও শুরু হয়। কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা বিভক্ত হয়ে পড়েন। দলের অনেকেই মনে করতেন, অর্থনীতির এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হওয়া উচিত। অনেকে আবার কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলেন। এমন এক পরিস্থিতিতে আশির দশকের মাঝামাঝি চীনে ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে।
ছাত্রদের ক্ষোভের কারণ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছিল, তার বাস্তবায়নে ধীরগতি ও দুর্নীতি। ১৯৮৯ সালের শুরুতে আন্দোলন জোরেশোরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
ছাত্র বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে কমিউনিস্ট পার্টির উদারপন্থী নেতা হু ইয়াওবাংয়ের মৃত্যু। ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিল তিনি মারা যান। হু ইয়াওবাং দেশে অর্থনৈতিক বিকাশের পক্ষে ছিলেন।
১৯৮৬-৮৭ সালে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে চীনে ছাত্রদের নেতৃত্বে যে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, হু ইয়াওবাং সেই আন্দোলন দমনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। আন্দোলন কয়েক সপ্তাহ ধরে চলার জেরে ১৯৮৭ সালের শুরুতে হু ইয়াওবাংকে কমিউনিস্ট পার্টির মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। ইয়াওবাংয়ের মৃত্যু বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতাকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিল।
হু ইয়াওবাংয়ের মৃত্যুর পরদিন চীনের কয়েকটি শহরে ছাত্ররা শোক প্রকাশ করতে জড়ো হন। শোকসভাগুলো দ্রুতই বিক্ষোভ-সমাবেশে পরিণত হয়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ জানাতে চীনের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছাত্ররা রাজধানী বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ারে জড়ো হতে শুরু করেন।
১৩ মে প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী তিয়েনআনমেন স্কয়ারে অনশনে বসেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের আলোচনায় বসতে রাজি করানো। শিক্ষার্থীরা যে সংস্কারের দাবি তুলেছিলেন, তাতে সমর্থন জানিয়ে সে সময় সারা দেশ থেকে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বেইজিংয়ে জড়ো হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।
১৯ মে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা। সেদিন সন্ধ্যায় অনশন শেষ করেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু পরদিনই অবস্থান বদল করে সরকার, কঠোর হাতে বিক্ষোভ দমন করতে বেইজিংয়ে সামরিক আইন জারি করা হয়। ক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠেন বিক্ষোভকারীরা।
রাজধানীসহ সারা দেশের রাজপথে নামেন লাখ লাখ বিক্ষোভকারী। এদিকে সামরিক আইন কার্যকর করতে রাজধানী ঘিরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার সেনা জড়ো করা হয়।
২ জুন চীনের পিপলস আর্মির সঙ্গে প্রথমবার মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়ান বিক্ষোভকারীরা। খালি হাতে সশস্ত্র সেনাদের অগ্রগতি ঠেকিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা।
৪ জুন রাতে সরকার বেইজিংয়ের তিয়েনআনমেন স্কয়ার খালি করতে প্রয়োজনে গুলি চালাতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয় বলে জানা যায়।
রাতের আঁধারে চীনের সেনাবাহিনী ট্যাংক, মেশিন গান, লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস নিয়ে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেনারা নির্বিচারে গুলি চালান। সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানগুলো যখন তিয়েনআনমেন স্কয়ারে পৌঁছায়, বিক্ষোভে ক্লান্ত ছাত্ররা তখন ছিলেন ঘুমিয়ে।
কত মানুষ মারা গিয়েছিলেন
৪ জুন তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষে প্রায় ৩০০ মানুষ নিহত হন বলে সে সময় জানিয়েছিল চীন সরকার। তাঁদের মধ্যে শতাধিক সেনাসদস্য ছিল বলেও দাবি করেছিল তারা।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব অনুযায়ী, সেদিন নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে।
তবে সে সময়ে চীনে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত অ্যালেন ডোনাল্ড গোপন কূটনৈতিক চ্যানেলে যে খবর পাঠিয়েছিলেন, তাতে ১৯৮৯ সালের ৩ ও ৪ জুন চীনে অন্তত ১০ হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানানো হয়। ২০১৭ সালে গোপন ওই তথ্য প্রকাশ করা হয়।
৪ জুন থেকেই গণহারে ধরপাকড় চালায় চীন সরকার, ১ হাজার ৬০০–এর বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়, ২৭ জনকে দেওয়া হয় ফাঁসি।
চীনে বহুদিন তিয়েনআনমেনের বিক্ষোভ ও ‘ট্যাংকম্যান’ নিয়ে কথা বলা নিষেধ ছিল। সেই সঙ্গে ট্যাংকম্যানের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা-ও রয়ে গেছে পর্দার আড়ালেই।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমস, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
![]() |
| তিয়েনআনমেন স্কয়ারে জড়ো হয়েছেন হাজারো বিক্ষোভকারী। ছবিটি ১৯৮৯ সালে জুনের শুরুতে তোলা। ছবি: এএফপি |
Monday, April 6, 2026
হিটলারের মুখোমুখি সুভাষ বসু by সরাফ আহমেদ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তুঙ্গে। মধ্য ইউরোপের দেশগুলো ইতিমধ্যে জার্মানির দখলে; কিন্তু হিটলারের চোখ আরও পুবের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে। নাৎসি বাহিনী ইতিমধ্যে সোভিয়েত ককেশীয় অঞ্চল পেরিয়ে পৌঁছে গেছে ভলগা অববাহিকায়, কিন্তু স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধে ঘেরাও হয়ে পড়েছে সোভিয়েত রেড আর্মির হাতে। জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাডলফ হিটলারের কপালে চিন্তা ও উদ্বেগের ছাপ। এ রকম সন্ধিক্ষণে, ১৯৪২ সালের ২৯ মে হিটলারের সঙ্গে অবশেষে দেখা হলো ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী সুভাষচন্দ্র বসুর।
ঘটনার পূর্বাপর
সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২১ সালে আইসিএস পরীক্ষা শেষে ইংল্যান্ড থেকে ফিরে মুম্বাই গিয়ে সাক্ষাৎ করেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে। ৫১ বছর বয়স্ক গান্ধী তখন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সুভাষচন্দ্রকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যুক্ত করেছিলেন চিত্তরঞ্জন দাশ। তিনি কেবল গান্ধীর অহিংস আন্দোলন না করে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিলেন। সে সময় বাংলায় ব্রিটিশবিরোধী এই আওয়াজ সুভাষচন্দ্র বসুর মতো অনেক আদর্শবাদী তরুণ-যুবককে আকৃষ্ট করেছিল।
সুভাষচন্দ্র বসু ১৯২৩ সালে মাত্র ২৬ বছর বয়সে সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে তিনি দুবার সর্ব ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনীতির কারণে বিশ বছরে এগারোবার জেল খেটে, অত্যাচারিত ও অপমানিত হয়ে তিনি খুব ভালো করে বুঝেছিলেন, এইভাবে ভারতবর্ষকে ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না। তাই বিকল্প পথ খুঁজেছিলেন।১
সুভাষচন্দ্র ১৯৪১ সালের ১৬ জানুয়ারি রাতে কলকাতা ছাড়েন। কোন পথে কোথায় যাবেন, সেই ছক এঁকে নিয়েছিলেন আগেই। তাঁর বড় ভাই শরৎ বসুর বাড়ি ছিল কলকাতার এলগিন রোডে। সেই বাড়ির কাছেই উডবার্ন পার্কের বাড়িতে থাকতেন শরৎ বসুর ছেলে, ভাইপো শিশির বসু। পরিকল্পনা অনুযায়ী শিশির বসু জার্মানির চেমনিজ শহরে তৈরি ভান্ডারা ডব্লিউ-৪ মডেলের একটি গাড়ি সেই বাড়িতে এনে পার্ক করে রাখেন। সুভাষ বসু সেই গাড়িতে করে কলকাতা থেকে যাত্রা শুরু করেন ১৬ জানুয়ারি রাত দেড়টায়; তখন তাঁর পরনে পাঠান পোশাক, মাথায় টুপি, মুখভর্তি দাড়ি। কলকাতা থেকে ঝাড়খন্ড (পূর্ব বিহার), ঝাড়খন্ডের গোমো স্টেশনে তিনি উঠে বসেন দিল্লি-কালকা মেইলে। সেই ট্রেন তাঁকে নিয়ে পৌঁছায় উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ার স্টেশনে। মুহম্মদ জিয়াউদ্দিন ছদ্মনামে সুভাষ বসু পেশোয়ার স্টেশনে নামেন ১৯ জানুয়ারি। সেখানে তাঁর দল ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতা আকবর শাহ তাঁকে গ্রহণ করেন; তিনি দুর্গম যাত্রাপথে তাঁর সহায়তার দায়িত্বে নিয়োগ করেন ফরোয়ার্ড ব্লকের তিন কর্মীকে: আবাদ খান, মহম্মদ শাহ ও ভগৎ রাম তালোয়ার। সুভাষ বসু প্রথমে পেশোয়ারের একটি হোটেলে ওঠেন, কিন্তু সেখানে নিরাপত্তার অভাববোধ হলে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করা হয় আবাদ খানের বাড়িতে। ২৬ জানুয়ারি আবাদ খানের গাড়িতে মহম্মদ শাহ ও ভগৎ রাম তালোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে সুভাষ বসু রওনা করেন ইংরেজদের সীমান্ত চেকপোস্ট জামরুদের দিকে। গন্তব্য কাবুল।
দুঃসাহসিক রাজনীতির সমরযাত্রা
১৯১৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত অবিভক্ত ভারতবিষয়ক নানা নথিপত্র রয়েছে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাফেজখানায়। বিভিন্ন ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে আদান-প্রদানকৃত চিঠিপত্র, তারবার্তা এবং আরও নানা ধরনের তথ্যসমৃদ্ধ কাগজপত্র। আরও আছে ইতালি, ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান, রাশিয়াসহ নানা দেশ–সম্পর্কিত নথিপত্র। সেখানেই খুঁজে পাওয়া গেল সুভাষ বসুর কাবুল আগমন এবং সেখানে তাঁকে নিয়ে কূটনৈতিক যোগাযোগের তথ্য। জানা গেল সুভাষ বসুকে নিয়ে জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বার্লিন, রোম ও মস্কোতে যোগাযোগের নানা তথ্য। সেগুলো থেকে জানা যায় নানা কূটনৈতিক কৌশলের খুঁটিনাটি।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের দুর্গম উপজাতি এলাকার মধ্য দিয়ে সুভাষ বসুর সেই কাবুলযাত্রা ছিল খুবই কষ্টসাধ্য, দুঃসাহসিক ও রোমাঞ্চকর। তিনি তাঁর বন্ধু-সহযোদ্ধা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অধিবাসী ভগৎ রাম তালোয়ারের সঙ্গে কাবুল পৌঁছান ১৯৪১ সালের ২৭ জানুয়ারি বেলা ১১টায়। তাঁরা আশ্রয় নেন লাহোরি গেটের কাছে একটি সাধারণ সরাইখানায়।
কাবুলে সুভাষ বসু প্রথমে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছিলেন। তাঁর জানা ছিল যে ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও জার্মানির মধ্যে একটি গোপন অনামক্রণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে (মলোতভ-রিবেনট্রপ চুক্তি) এবং তখন পর্যন্ত জার্মানি সেই চুক্তি লঙ্ঘন করে সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ চালায়নি। জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয় দেশ ব্রিটিশদের সাধারণ শত্রু। শত্রুর শত্রু বন্ধু হবে—এই ধারণা থেকে সুভাষ বসুর প্রত্যাশা ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাঁর প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কাবুল পৌঁছার এক দিন পরেই তিনি সেখানকার সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সোভিয়েত দূতাবাস কর্তৃপক্ষ তাঁদের দূতাবাস ভবনের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। এমনকি সোভিয়েত বাণিজ্য প্রতিনিধির মাধ্যমে দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাও সেই প্রতিনিধির অনীহার কারণে ব্যর্থ হয়।২
সোভিয়েতদের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে সুভাষ বসু জার্মানির দিকে ঝোঁকেন। তিনি বার্লিনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মুক্তিসংগ্রাম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন এবং সেই পরিকল্পনা জার্মানদের জানানোর সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ভগৎ রাম তালোয়ারকে সঙ্গে নিয়ে কাবুলের জার্মান দূতাবাসে যান। সেখানে তাঁদের স্বাগত জানান জার্মান রাষ্ট্রদূত হান্স পিলজার। সুভাষ বসু তাঁকে তাঁর পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করেন। সেই সঙ্গে তিনি জার্মান রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন সোভিয়েত দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে সোভিয়েত ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বার্লিন যাওয়ার অনুমতি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। রাষ্ট্রদূত পিলজার সেদিনই বার্লিনে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরে একটি তারবার্তা পাঠান। তিনি লেখেন:
‘কাবুল, ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪১, টেলিগ্রাম নং ৩২; অত্যন্ত গোপনীয়।
ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু ছদ্মবেশে গোপনে কাবুলে চলে এসেছেন। তিনি আজ আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুরোধ করেছেন, আমি যেন তাঁকে সোভিয়েত দূতাবাসের মাধ্যমে বার্লিনে যাত্রা করতে সাহায্য করি, যাতে তিনি সেখান থেকে ভারতে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। আমি দ্রুত আপনাদের সিদ্ধান্ত প্রার্থনা করছি, কারণ বসু এখানে ভয়ংকর আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। তাঁর আশঙ্কা, তিনি আফগানদের দ্বারা গ্রেপ্তার হয়ে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরিত হতে পারেন। এই কারণে জরুরি তারবার্তা নির্দেশনা প্রার্থনা করছি। পিলজার।’৩
এই তারবার্তার উত্তরে জার্মান পররাষ্ট্রসচিব আর্নস্ট ফন ভাইজেকার কাবুল দূতাবাসকে জানান, সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি সুভাষ বসুকে ট্রানজিট ভিসা দেয়, তাহলে বসু জার্মানি আসতে পারেন। বার্লিনের ভিলহেল্ম সড়কে অবস্থিত জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোকেরা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রাম সম্পর্কে বেশ আগ্রহী ছিলেন। হিটলারের জাতীয় সমাজতন্ত্রের প্রতি সুভাষ বসুর সমালোচনামূলক মনোভাব দৃশ্যত এই আগ্রহকে কমিয়ে দেয়নি। বার্লিনের পররাষ্ট্র দপ্তরে ১৯৪০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকেই ভারতের বিষয়ে আগ্রহ ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছিল।
কাবুলের জার্মান দূতাবাসের সঙ্গে বার্লিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তারবার্তা বিনিময় থেকে বোঝা যায়, জার্মান সরকার নিজেদের পররাষ্ট্রনীতির প্রসার ঘটাতে সেই সময় ভারতে ব্রিটিশবিরোধীদের সহযোগিতার জন্য উন্মুখ ছিল। কাবুলের জার্মান দূতাবাস সুভাষ বসুর বার্লিনে পৌঁছার বিষয়ে মস্কো ও ইতালির সঙ্গে যোগাযোগ করে খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
জার্মান রাষ্ট্রদূত পিলজার ১৯৪১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বার্লিনে আরেকটি তারবার্তা পাঠান; তিনি লেখেন, ‘(সুভাষ) বসু নিজের নিরাপত্তার ঝুঁকি উপেক্ষা করে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দূতাবাসে এসেছিলেন। আফগান নজরদারি ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে আমি তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে পরামর্শ দিই, তিনি যেন এখানে তাঁর ভারতীয় বন্ধুদের মধ্যে আত্মগোপন করে থাকেন। আমি তাঁর বিষয়ে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে কথাবার্তা বলেছি। সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বসুকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব এবং বসুর সোভিয়েত ইউনিয়ন যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশের পেছনে ইংরেজদের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে; এ থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আফগানিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে। এই সন্দেহের কারণ বসু গোপনে আফগান সীমান্ত পার হয়ে এসেছেন। সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত বসুর প্রতি তাঁর অবিশ্বাসের কথা মস্কোকে তারবার্তায় জানিয়েছেন এবং মস্কোর নির্দেশনা চেয়েছেন। বসুর যাত্রার জন্য মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করা অত্যাবশ্যক। ইতালীয় রাষ্ট্রদূত রোমের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।৪
সুভাষ বসু ইউরোপে পৌঁছে কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বনের পরিকল্পনা করেছেন, রাষ্ট্রদূত পিলজার তা বার্লিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরকে অবহিত করেন। তিনি ১৯৪১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এক তারবার্তায় বার্লিনকে লেখেন, বসু ইউরোপ থেকে রেডিও সম্প্রচারের মাধ্যমে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশদের অন্যায়-অনাচার সম্পর্কে ভারতীয়দের অবহিত করতে চান। কারণ, ভারতীয়দের এমন বিশ্বাস ছিল না যে বহির্বিশ্ব তাদের ইংরেজদের শোষণ-শাসন থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসবে; তারা ইংরেজদের পরাজয়ে বিশ্বাস করত না। সুভাষ বসু নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি ভারতীয় জনগণকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হবেন। জার্মানি বিজয়ী হলে স্বাধীন ভারতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথাও তিনি ভেবেছিলেন।৫
রাষ্ট্রদূত পিলজার কাবুলে সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করে সুভাষ বসুর বিষয়ে সোভিয়েতদের মনোভাব বদলাতে সক্ষম হননি। তবে ১৯৪১ সালের ৪ মার্চ জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব বার্লিন থেকে তাঁকে জানান, তাঁর পাঠানো ৪৭০ নম্বর তারবার্তার উত্তরে সোভিয়েত পররাষ্ট্র দপ্তর মস্কো থেকে জানিয়েছে, বসু আফগানিস্তান থেকে জার্মানি যাওয়ার জন্য মস্কোর ট্রানজিট ভিসা পেতে পারেন। বসু বার্লিনে পৌঁছে ইতালির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন।৬
সুভাষ বসুর বার্লিন যাত্রায় কাবুলে ইতালীয় রাষ্ট্রদূত পিয়েত্রো কোয়ারনির সহযোগিতা করেন। তাঁর দূতাবাসের রেডিও অপারেটর অরলান্দো মাজোতার ইতালীয় পাসপোর্টে আফগান কর্তৃপক্ষ বহির্গমন ভিসা যুক্ত করার পর মাজোত্তার ছবি সরিয়ে সেখানে সুভাষ বসুর ছবি সেঁটে দেওয়া হয়। জার্মান পাসপোর্টের পরিবর্তে তাঁকে ইতালীয় পাসপোর্ট দেওয়ার কারণ সম্ভবত এই যে কাবুলে অবস্থানরত জার্মান কূটনীতিকেরা আফগানদের কাছে বেশি পরিচিত ছিলেন।
আফগান সরকার যাতে এই ভ্রমণ অভিযান সম্পর্কে জানতে না পারে, তা নিশ্চিত করার বিষয়েও কাবুলের জার্মান দূতাবাস গুরুত্ব আরোপ করেছিল। সুভাষ বসু ভেঙ্গার নামে একজন প্রকৌশলী এবং লুফথানসার দুই কর্মচারী শোয়ার্জ ও হিলপার্টকে সঙ্গে নিয়ে ৩১ মার্চ মস্কো পৌঁছান। সেখানে তিনি জার্মান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বলেন এবং একই দিনে বার্লিন রওনা হয়ে যান।
মস্কোর জার্মান রাষ্ট্রদূত ফ্রিডরিখ ভের্নার গ্রাফ ফন শুলেনবুর্গ এক তারবার্তায় বার্লিনকে জানান:
মস্কো, ৩১ মার্চ ১৯৪১
বসু অরলান্দো মাজোতা নামের ইতালীয় পাসপোর্টধারী হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার ভেঙ্গারের সাহচর্যে আজ দূতাবাসে উপস্থিত হয়েছিলেন। এই তারবার্তা নির্দেশনার আগেই ভেঙ্গার ও বসুকে জানানো হয়েছে যে সহযাত্রী শোয়ার্ৎস ও হিলপার্ট যেন বসুর পরিচয় জানতে না পারে। বসু বার্লিনে পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।৭
মস্কোয় সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালে সুভাষ বসুকে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ যদি কিছুটা আভাস দিত, তাহলে তিনি হয়তো মস্কোকেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে ভাবতেন। তিনি সে সময় তাঁর সাম্যবাদী ভাবাদর্শ ও রাজনৈতিক নীতির সঙ্গে সোভিয়েত রাশিয়ার রাজনীতির মিল রয়েছে বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এগিয়ে আসেনি। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সোভিয়েত রাশিয়া সম্ভবত ব্রিটিশবিরোধী ফ্রন্ট খুলতে আগ্রহী ছিল না।
ভারতবর্ষ নিয়ে হিটলারের ভাবনা
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে হিটলারের চিন্তাভাবনা ও আচরণ ছিল বিক্ষিপ্ত ও পরম্পরাহীন। এই ক্ষেত্রে তিনি নানা দোলাচলে ভুগতেন। আজ যাঁকে বন্ধু ভাবতেন, কিছুদিন পরেই তাঁকেই স্থান দিতেন শত্রুর খাতায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো স্তালিনের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেওয়ার সময়, ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট তিনি স্তালিনের সঙ্গে এই মর্মে এক গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন যে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকবে (মলোতভ-রিবেনট্রপ চুক্তি), কিন্তু সে চুক্তি লঙ্ঘন করে ১৯৪১ সালের ২২ জুন সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ শুরু করেন। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার ভান করেছেন, আবার তাদের বিস্তারে ঈর্ষান্বিত হয়েছেন এবং বৈরী আচরণ করেছেন।
ভারতবর্ষের ব্যাপারে হিটলারের চিন্তাভাবনা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের পক্ষে অনুকূল ছিল না। ১৯৩২ সালের ২৭ জানুয়ারি ডুসেলডর্ফ শহরে জার্মান শিল্পপতিদের উদ্দেশে এক নীতিনির্ধারণমূলক ভাষণে তিনি স্পষ্টভাবে ভারতের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, ইংরেজদের ভারত শাসন করার অধিকার আছে, কারণ শ্বেতাঙ্গ জাতি হিসেবে তারা স্থানীয় অধিবাসীদের তুলনায় বহুগুণ শ্রেষ্ঠ। তিনি ভারতকে একটি উপনিবেশিত ও অসমর্থ জাতি হিসেবে দেখতেন, যা তাঁর বর্ণবাদী নাৎসি মতাদর্শের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন ভারতীয়রা নিজেদের শাসন করতে সক্ষম নয়।
অবশ্য ভারত কখনো হিটলারের রাজনৈতিক চিন্তা বা কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে ছিল না। তাঁর লক্ষ্য ছিল ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোনো এক ধরনের সমঝোতায় পৌঁছানো। তাই তিনি কখনো প্রকাশ্যে কোনো ‘ভারতপন্থী’ নীতি গ্রহণ করতে চাননি। কিন্তু ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জার্মানির যুদ্ধ শুরু হলে হিটলার ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের অনিচ্ছুক সহযোগী হয়ে ওঠেন। তবু তিনি ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন না।
অথচ অ্যাডলফ হিটলারের জন্মের অনেক আগেই ভারতবর্ষের সঙ্গে জার্মানির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। শিল্প, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে বিনিময়সহ নানা ক্ষেত্র দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। ১৮৭১ সালে জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তদানন্তীন ব্রিটিশ ভারতে জার্মান স্বার্থসমূহ সমন্বয় করতে ১৮৮৬ সালে কলকাতায় স্থাপিত হয় ইম্পেরিয়াল জার্মান কনস্যুলেট জেনারেল বা কাইজারলিশ-ডয়েচস জেনারেল কনস্যুলেট। জার্মান সম্রাটের ইংল্যান্ডের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার আগ্রহ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধিতেও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করে। দক্ষিণ এশিয়ায় জার্মানির কোনো ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল না। বরং তারা ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের মাধ্যমে ভারতের শাসন কৌশলকে প্রশংসা করত।৮
হিটলারের ক্ষমতায় আরোহণের আগে ভাইমার প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্ব ছিল ১৯১৮ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত। জার্মান কবি-দার্শনিকদের তীর্থভূমি ভাইমার শহরকে ঘিরে মানবতাবাদী ও উদারপন্থীদের সমন্বয়ে সবকিছু ভালোভাবে চলছিল। কিন্তু এই প্রজাতন্ত্র সৃষ্টির আগে রাজতন্ত্রীদের রাজ্যজয়ের আকাঙ্ক্ষা ছিল বলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল। আবার অভ্যন্তরীণ শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গড়ে ওঠা শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতি দমন–পীড়ন, গৃহযুদ্ধ ইত্যাদি অস্থিরতা ছিল। অনৈক্য ছিল জার্মান বাম ও সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক দলগুলোর মধ্যে। বাম রাজনীতির জন্মভূমি জার্মানিতেও ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল। জার্মান ইতিহাসবিদদের এক বিরাট অংশ এখনো মনে করে, জার্মানির বামপন্থীদের মধ্যে আপস-সমঝোতার অভাবের কারণেই ফ্যাসিবাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল।
১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি হিন্ডেনবুর্গের আনুকূল্য নিয়ে হিটলার নতুন সরকার গঠন করেন। রাইখ বা জার্মানির চ্যান্সেলর হয়ে ন্যাশনাল সোশ্যালিজমের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার কাজ শুরু করেন তিনি। ন্যাশনাল সোশ্যালিজমকে একটি জাতীয় সংস্কৃতির ধারক মনে হলেও আসলে তা ছিল স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির শত্রু।
ভাইমার প্রজাতন্ত্রের (১৯১৮-১৯৩৩) সময়টা ছিল জার্মানি ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের যুগ। সে সময় যেসব বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্ব জার্মানি সফর করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বামী বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরু, তাঁর পিতা মোতিলাল নেহরু, সরোজিনী নাইডু প্রমুখ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) সময়ে বার্লিনে বেশ কিছু উচ্চশিক্ষিত ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী তরুণ-যুবকের সমাবেশ ঘটেছিল, তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মার্ক্সবাদী ভাবাদর্শের অনুসারী; তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাঙালিও ছিলেন। তাঁরা বার্লিনে ভারতীয় স্বাধীনতা কমিটি গঠন করেছিলেন এবং ইউরোপজুড়ে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে পত্রপত্রিকা প্রকাশ ও প্রচারসহ নানা রকম কর্মকাণ্ডে তৎপর ছিলেন। কিন্তু ত্রিশের দশকে হিটলার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ভারতীয়দের বার্লিনকেন্দ্রিক কর্মতৎপরতা ক্রমে থেমে যায়। জার্মানদের মনোভাব বর্ণবাদী চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকে।
ভারতীয়দের নিয়ে হিটলারের তাচ্ছিল্য
ভারত সম্পর্কে অ্যাডলফ হিটলারের ধারণা ও মনোভাবের প্রকাশ ঘটে তাঁর মাইন ক্যাম্ফ গ্রন্থে। সেখানে তিনি লেখেন:
আমি এখনো স্মরণ করি, ১৯২০–২১ সালের দিকে তথাকথিত ‘জাতীয়তাবাদী’ মহলে এক শিশুসুলভ ও অযৌক্তিক আশা জেগেছিল যে ভারতে নাকি ইংল্যান্ডের শাসন চাপের মুখে মুখ থুবড়ে পড়ছে। কিছু এশীয় ভণ্ড কিংবা সত্যিকারের ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামী তখন ইউরোপে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তারা সাধারণ মানুষদেরও এই ধারণায় বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিল যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, যার কেন্দ্রবিন্দু ভারত, সেখানে নাকি ব্রিটিশরা নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে।…ইংল্যান্ড যদি প্রশাসনিক যন্ত্রে বর্ণগত অবক্ষয়ে পতিত হয়, তবেই কেবল ভারতবর্ষে পরাজিত হবে, যা আপাতত সম্পূর্ণভাবে অপ্রাসঙ্গিক। অথবা ভারতে ব্রিটিশদের পরাজয় ঘটতে পারে যদি ভারতীয় বিদ্রোহীরা কোনো শক্তিশালী শত্রুর তরবারির সহযোগিতায় তাদের পরাজিত করে। তারা তা কখনোই করতে পারবে না।…তা ছাড়া আমি একজন জার্মান হিসেবে অন্য যেকোনো শাসনের চেয়ে ইংরেজ শাসনের অধীনেই ভারতকে দেখতে বেশি পছন্দ করি। কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র, যে নিজের অস্তিত্বের জন্য শেষ রক্তবিন্দুটিও দিতে প্রস্তুত, তাকে কিছু অক্ষম মানুষের জোট দিয়ে ধ্বংস করা অসম্ভব। একজন জাতীয়তাবাদী মানুষ হিসেবে আমি মনুষত্বের মূল্য বর্ণগত ভিত্তিতেই নির্ধারণ করছি। এই তথাকথিত ‘দমিত জাতিগুলোর’ (প্রান্তিক জাতিগুলোর) বর্ণগত অধমতার (নিকৃষ্টতম) স্বীকৃতি থেকেই আমি আমার জাতির ভাগ্য তাদের সঙ্গে বেঁধে দিতে পারি না।৯
অ্যাডলফ হিটলারের দৃষ্টিতে ভারত কেমন, তা নিয়ে নানা কথা রয়েছে। ঔপনিবেশিক নিষ্পেষণে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রাম, জার্মানিতে সংগঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজ বা সুভাষ বসুকে সহযোগিতার বিষয়ে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ রয়েছে। এসব বিশ্লেষণ এসেছে ভারতীয়, জার্মান ও ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ ও লেখকদের কাছ থেকে।
তবু কেন হিটলারের কাছে
এত কিছু জানার পরও সুভাষ বসু কেন হিটলারের সহযোগিতা চেয়েছিলেন? সুভাষ ছিলেন বাম ঘরানার বা সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও কৌশলের মধ্যে পার্থক্য ছিল। তিনি প্রথমে ভারতীয় স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা ছিল তাঁর প্রথম লক্ষ্য। সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর ঝোঁক সর্বজনবিদিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘যেকোনো মূল্যে ভারতকে মুক্ত করতে হবে।’ ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল তাঁর প্রধান শত্রু এবং সেই সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শক্তিগুলোর সাহায্য নেওয়াকে তিনি কৌশলগতভাবে যৌক্তিক মনে করেছিলেন। তাঁর নিজের কথায়, ‘আমার শত্রুর শত্রুই আমার সম্ভাব্য মিত্র।’ তিনি হিটলারের ফ্যাসিবাদ বা বর্ণবাদী নীতির সঙ্গে একমত ছিলেন না। হিটলারও প্রথমে তাঁকে খুব গুরুত্ব দিতে চাননি। কিন্তু সুভাষ বসু মনে করতেন, বিশ্বযুদ্ধ একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। ব্রিটিশরা যখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, এই সময় বিদেশি সমর্থন নিয়ে সশস্ত্র সংগ্রাম চালানো সম্ভব।
সুভাষ বসু হিটলারের কাছ থেকে যা চেয়েছিলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা: জার্মানিতে অবস্থানরত ব্রিটিশ ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন; আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি, ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণা ও জার্মান সামরিক সহায়তা।
বাবাকে নিয়ে সুভাষ-কন্যা অনিতা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অশান্ত পরিবেশ। সেই সময় সুভাষ বসুর ব্যক্তিগত জীবনেও ঘটে যায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৯৪২ সালের ২৯ নভেম্বর ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন একমাত্র কন্যা, তাঁর নাম রাখা হয় অনিতা। এখন তাঁর বয়স ৮৩। বহু বছর জার্মানির অউগসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে অধ্যাপনার পর তিনি তাঁর স্বামী মার্টিন ফাফের সঙ্গে অবসর জীবন যাপন করছেন। তাঁর বাবার জীবন ছিল যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি তাঁর কন্যার জীবনেও রয়েছে নানা ঘটনার গল্প। তিনি মাত্র তিন বছর বয়সে পিতাকে হারান; অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন তিনি।
সম্প্রতি আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আলাপ করার উদ্দেশ্য তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। নানা কথার মধ্যে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘আপনার বাবা ভারতের স্বাধীনতার জন্য নাৎসি জার্মানির সঙ্গে মৈত্রী করেছিলেন। এ বিষয়টি নিয়ে জার্মানিসহ অন্যান্য দেশে অনেক বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। আপনি এ বিষয়ে কী বলেন?’
উত্তরে অনিতা বললেন, ‘এ বিষয়ে সেই সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। আমার বাবা ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে ভারত থেকে ছদ্মবেশে প্রথমে কাবুল যান। সেখানে তিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তাতে সফল হননি। কয়েক সপ্তাহ ধরে জার্মানি, ইতালি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সরাসরি আলোচনা হয়েছিল, কীভাবে তারা এই প্রচেষ্টায় তাঁকে সহযোগিতা করবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে জড়াতে রাজি ছিল না, তবে বাবাকে জার্মানিতে যাওয়ার জন্য একটি ট্রানজিট ভিসা দিতে প্রস্তুত ছিল। শেষ পর্যন্ত জার্মানি ও ইতালি তাঁকে জার্মানিতে প্রবেশের অনুমতি দেয়।
‘একজন সমাজতন্ত্রী রাজনীতিক হিসেবে সুভাষ বসুর পক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন পাওয়া নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রগুলোর চেয়ে বেশি কাম্য ছিল। সে সময় বোঝা যায়নি কেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সহায়তা করতে চায়নি। তবে কয়েক মাস পর, যখন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণ করে বসে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ব্রিটিশদের মিত্রে পরিণত হয়। বিষয়টি তখন আরও পরিষ্কার হয়, তারা কেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করতে নারাজ ছিল।
‘১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সমঝোতা হয়, যা হিটলার-স্টালিন প্যাক্ট বলে পরিচিত। তাতে কিছু গোপন বিষয় ছিল। পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশসমূহ ভাগাভাগি করে নেওয়াসহ আরও একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় ছিল। বিষয়টি হলো, ভবিষ্যতে কার কর্তৃত্বে যাবে উপনিবেশ ভারত। কেউ জানত না যে জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ইউরোপীয়দের উপনিবেশগুলো ভাগ করে নেবে। গোপন চুক্তি অনুসারে সেই ভাগাভাগিতে ভারতের কর্তৃত্ব যেত সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। সেই কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতার বিষয়ে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেনি। স্তালিন ছিলেন একজন কৌশলী রাজনীতিবিদ।’
বাবা বার্লিনে কেন এলেন
অনিতা বললেন, ‘আমার বাবা যদি সোভিয়েত ইউনিয়নে থেকে যেতেন, তাহলে তাঁর কপালে কী ঘটত, তা কেবল কিছুটা অনুমান করা যায়। সেখানেও তখন জার্মানির মতোই নিষ্ঠুর পদ্ধতিতে হত্যা ও নির্যাতন চলছিল। স্তালিনীয় কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক বিরোধীদের, এমনকি বিদেশ থেকে যেসব কমিউনিস্ট পালিয়ে গিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের ওপরেও দমন-পীড়ন চালাচ্ছিল। এ থেকে বোঝা যায় ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে সেখানে বিশেষ আশার কিছু ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, জার্মান কমিউনিস্ট হার্বার্ট ভেরনার যুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যান। পরে তিনি লিখেছিলেন, সেই নির্বাসন জার্মান কমিউনিস্টদের জন্যও অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল।’
হার্বার্ট ভেরনার ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত মস্কোর হোটেল লাক্সে নির্বাসিত ছিলেন। স্তালিনবাদী শুদ্ধি অভিযানে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি বটে, তবে তিনি নির্যাতন থেকে রেহাই পাননি। তিনি প্রাণ হাতে নিয়ে জার্মানি ফিরতে পেরেছিলেন এবং পরে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পক্ষ থেকে জার্মান পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন, একপর্যায়ে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীও হয়েছিলেন।
অনিতা আরও বলেন, দুই বাঙালি কমিউনিস্ট বিপ্লবী বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, যাঁর পৈতৃক বাড়ি ছিল মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কনকসার গ্রামে এবং সিরাজগঞ্জের আমলাপাড়ায় জন্মগ্রহণকারী গোলাম আম্বিয়া খান লুহানী বার্লিন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নে গিয়েছিলেন; কিন্তু দুজনেই মস্কোতে স্তালিনের নৃশংস ‘শুদ্ধি অভিযানের’ শিকার হয়ে প্রাণ হারান।
অনিতা বলেন, ‘আমার বাবা জার্মানি ও দূরপ্রাচ্যে থাকার সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতের স্বাধীনতা বিষয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয়। তবে জার্মানি ও ইতালি বাবাকে সমর্থন দিতে রাজি হয়। “আমাদের শত্রুর শত্রুই আমাদের বন্ধু”—এই চিন্তায় পৌঁছান আমার বাবা। তাঁর পক্ষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সহজ ছিল না। তিনি কোনোভাবেই ফ্যাসিস্ট ছিলেন না। তিনি ছিলেন পুরোপুরি একজন সমাজতন্ত্রী। তবে তাঁর কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার ছিল ভারতের স্বাধীনতা।
‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের কংগ্রেস পার্টির একাংশ ব্রিটিশদের পাশে দাঁড়ায়। সেই অংশের রাজনীতিকেরা বলতেন, আমাদের ফ্যাসিস্টবিরোধী শক্তিগুলোকে সমর্থন করতে হবে, যাতে তারা যুদ্ধের পর ভারতের স্বাধীনতা দিয়ে দেয়। এর অর্থ ছিল ব্রিটিশদের দয়া ও সদিচ্ছার ওপর ভরসা করা। কিন্তু আমার বাবা সব সময় এর বিরোধিতা করতেন। ব্রিটিশদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতা ভিক্ষা করে নিতে হবে, তা তিনি কখনোই চাননি।’
অনিতা আরও বলেন, ‘অনেকে মনে করেন, আমার বাবার পক্ষ থেকে জার্মানি, ইতালি ও জাপান—তথাকথিত অক্ষশক্তির সাহায্য চাওয়া একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আমি মনে করি, তিনি ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামের নেতা হিসেবে বাস্তববাদী রাজনীতি অনুসরণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি সেই সব দেশেই গিয়েছিলেন, যারা মূলত ব্রিটেনের বিরুদ্ধে লড়ছিল এবং যেখানে প্রচুর ব্রিটিশ-ভারতীয় যুদ্ধবন্দী ছিল। তিনি অক্ষশক্তি এবং ভারতীয় যুদ্ধবন্দীদের সাহায্য নিয়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য লড়তে চেয়েছিলেন।
‘ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দেশগুলো ছাড়া আর কোন দেশই-বা ভারতের পাশে দাঁড়াত? তবে নেহরুসহ কতিপয় স্বাধীনতাসংগ্রামী ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কাছ থেকে সহযোগিতার বিপক্ষে ছিলেন। তাঁরা বরং ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু সুভাষ বসুর কাছে ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য ছিল না।’
ভারত সফরের অভিজ্ঞতা থেকে অনিতা বলেন, ‘অনেক ভারতীয় মনে করেন, নাৎসি জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আন্তরিকভাবে ভারতের মুক্তিসংগ্রামকে সমর্থন করেছিল। এই ধারণা অবশ্যই শিশুসুলভ এবং ভুল। প্রকৃতপক্ষে জার্মানি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী শুধু যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ভারতের সংগ্রামকে সমর্থন করেছিল। ভারতের মুক্তির প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জার্মান নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। জার্মান প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের কিছু অংশ সুভাষ বসুর দাবি ইতিবাচক বিবেচনা করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, গণহত্যাকারী জার্মান প্যারামিলিটারি বাহিনী এসএস বা শুটসস্টাফেল-এর প্রধান হাইনরিখ হিমলার ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামকে সমর্থন করেছিলেন; হিটলারের ব্যর্থ হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িত অ্যাডাম ফন ট্রট জু সোলজ সুভাষ বসুর পরিকল্পনার সমর্থক ছিলেন। কিন্তু অ্যাডলফ হিটলার শুরু থেকেই সুভাষ বসুর প্রতি বিরূপ ছিলেন। হিটলারের মুখোমুখি সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য সুভাষ বসুকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। হিটলারের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, ভারতের ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবেই থাকা উচিত। উপরন্তু, তাঁর প্রচারিত বর্ণবাদের তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারতীয়রা ছিল “নিকৃষ্ট জাতি”। কিন্তু ভারতে গিয়ে আমি শুনে অবাক হয়েছি, কেউ কেউ হিটলারকে মহান ব্যক্তি মনে করেন। বেশির ভাগ জার্মান এই মূল্যায়ন সমর্থন করেন না।’
অনিতা আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কি জানো যে ভারতের মুক্তির জন্য জার্মানি ও পূর্ব এশিয়ায় গঠিত আজাদ হিন্দ ফৌজে হিন্দু, মুসলিম, শিখ সব ধর্ম ও জাতের মানুষ একসঙ্গে বসবাস ও আহার করতেন? তাঁরা একে অপরকে সম্মান করতেন এবং নিজেদের ধর্মীয় উৎসবে অন্যদের আমন্ত্রণ জানাতেন। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল এমনটিই হবে স্বাধীন ভারতবর্ষ। যদি তিনি ভারত বিভাগের সময়ের দাঙ্গা ও হত্যাকাণ্ড দেখতে পেতেন, তবে তা হতো তাঁর জন্য হৃদয়বিদারক।’
খুঁজে পাওয়া দলিল
সুভাষ বসু ও হিটলারের মধ্যে আলোচনার কোনো দলিল কি উদ্ধার করা সম্ভব? বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি। আসলেই হিটলারের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন ছিল, তা খুঁজতে বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটির পাশাপাশি ১৯৪২ সালের ২৭ মে বার্লিনে হিটলারের সঙ্গে সুভাষ বসুর সাক্ষাতের মূল প্রটোকলটি খুঁজতে থাকি। জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আর্কাইভে নানা দলিল-দস্তাবেজ খুঁজে পেলেও এই দলিলটি পাওয়া যায়নি। অবশেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনীতিবিষয়ক মহাফেজখানার মিসেস লুসিয়া ভন লিন্ডেকে চিঠি লেখার বেশ কিছুদিন পর জার্মান ভাষায় লিখিত ১৫ পৃষ্ঠার সেই দলিলটি হাতে পেলাম। হিটলার ও সুভাষ বসুর মধ্যকার আলোচনাটি রেকর্ড করা হয়েছিল, তা থেকে লিপিবদ্ধ করা হয়। দুজনের কথোপকথন পড়লে উভয়ের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে প্রকৃত ধারণা পাওয়া যাবে।
বার্লিনে অনেক অপেক্ষার পর অবশেষে সুভাষচন্দ্র বসু হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পান। তিনি একাই গিয়েছিলেন হিটলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। দিনটি ছিল বুধবার, ২৭ মে ১৯৪২। বিকেল নাগাদ তিনি পৌঁছান ভস সড়কে নতুন চ্যান্সেলর ভবনে। সেখানে প্রথমে দেখা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপের সঙ্গে, তারপর আসেন হিটলার।
সুভাষ বসু দীর্ঘ সময় ধরে এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন, কারণ তিনি জার্মানির সঙ্গে একটি সাধারণ রাজনৈতিক ভিত্তি স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জার্মানির কাছ থেকে এ যাবৎ যে সমর্থন পেয়েছেন, তার জন্য প্রথমেই হিটলারকে ধন্যবাদ জানান। তারপর হিটলারকে একজন পুরোনো ও অভিজ্ঞ বিপ্লবী হিসেবে বর্ণনা করে তাঁর পরামর্শ চান।
হিটলার-সুভাষ বসু সাক্ষাৎ
২৭ মে ১৯৪২
ফুয়েরার সদর দপ্তরে ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলার ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাষচন্দ্র বসুর কথোপকথনের রেকর্ড। উপস্থিত ছিলেন: আর এ এম বা পররাষ্ট্রসচিব কেপলার এবং সচিব হেভেল।
সুভাষ বসু প্রথমেই ফুয়েরারকে (নেতা) একজন প্রবীণ বিপ্লবী হিসেবে শুভেচ্ছা জানান এবং এই সাক্ষাতের মাধ্যমে যে সম্মান তিনি তাকে প্রদান করলেন, তার জন্য ধন্যবাদ জানান; এই দিনটি তাঁর জীবনের একটি ঐতিহাসিক দিন হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন। গত এক বছরের বেশি সময় ধরে তিনি জার্মান সরকারের যে আতিথেয়তা ও সৌজন্য পেয়েছেন, তিনি তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর দেশকে মুক্ত করার জন্য ভারতীয় লেজিয়ন (আজাদ হিন্দ ফৌজ) গঠনের কাজে তিনি জার্মানির সহায়তা পেয়েছেন।
সুভাষ বসু বলেন, গত বছরের জানুয়ারিতে যখন তিনি ভারত ত্যাগ করেন, তখন তাঁর সহকর্মীরা তাঁর ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ ও ভারতের স্বাধীনতার জন্য তাঁর সংগ্রাম নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু তিনি তাঁর প্রজ্ঞা ও দায়িত্ববোধ থেকে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং এখন তিনি বলতে পারেন, দেশের সর্বোত্তম স্বার্থেই তিনি কাজ করেছেন। আজ তিনি পেছনে তাকিয়ে বলতে পারেন যে তিনি তাঁর দেশের সর্বোত্তম স্বার্থে কাজ করেছেন।
ভারতের জন্য ত্রিদেশীয় চুক্তিবদ্ধ শক্তিগুলোর সাহায্য প্রয়োজন, যদিও প্রকৃত স্বাধীনতাসংগ্রামের জন্য ভারতকেই লড়তে হবে। ভারত যদি এই সংগ্রামকে একান্তই নিজের কর্তব্য মনে করে, তবু তার বহির্বিশ্বের সহানুভূতি ও সমর্থনের প্রয়োজন। এখন জাপানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা শুরু করার সময় এসেছে। মুক্ত ভারত গড়তে জার্মানি ও ইতালির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক স্থাপন এবং এই দেশগুলোর সহানুভূতি ও সহায়তা অর্জন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারত কেবল জাপানের ওপর নির্ভর করতে চায় না।
এরপর সুভাষ বসু তাঁর পূর্ব এশিয়ার যাত্রার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, তিনি এমন একটি স্থানে যেতে চান, যা ভারতের যতটা সম্ভব নিকটে অবস্থিত, যেন তিনি সেখান থেকে ভারতে বিপ্লব পরিচালনা করতে পারেন। স্বাভাবিকভাবেই জার্মানিতে তাঁর অনুপস্থিতির সময় তাঁর রেখে যাওয়া বিশ্বস্ত সহকর্মীরা তাঁর বক্তব্যের প্রচারণা আগের মতোই চালিয়ে যাবেন।
আলোচনার শেষে সুভাষ বসু একজন পুরোনো ও অভিজ্ঞ বিপ্লবী হিসেবে হিটলারের কাছে পরামর্শ চান। ভারত যদিও জার্মানি থেকে অনেক দূরে এবং সেখানকার পরিস্থিতি জার্মানি ও ইউরোপের পরিস্থিতি থেকে ভিন্ন, তবু বিপ্লবের কিছু মৌলিক নীতি আছে, যেগুলো সর্বত্রই প্রযোজ্য। তিনি বলেন, ইংরেজদের প্রচারাভিযান ভারতকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। তিনি যে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন, তা পুরোনো দার্শনিক ভারত নয়, বরং একটি আধুনিক, সক্রিয় ও নতুন ভারত।
উত্তরে হিটলার জার্মানি ও ভারতের অভিন্ন শত্রুদের (বিশেষ করে ইংল্যান্ড) প্রসঙ্গ টেনে একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ দেন। তিনি বলেন, ইংল্যান্ড ভারত দখল করে রেখেছে এবং ইউরোপের অভ্যন্তরে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে রেখে সেখানে আধিপত্য বিস্তার করেছে। এটা খুব স্পষ্ট যে সমস্যা কেবল ইংল্যান্ডের সামরিক পরাজয়ের মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব। পরাজিত হলে ইংল্যান্ড তার প্রভাব বজায় রাখার সুযোগ হারাবে।
ব্রিটিশদের পাশাপাশি বলশেভিক ও আমেরিকানরা জার্মানির অভিন্ন শত্রু। ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং রাশিয়া একে অপরের সঙ্গে ন্যায্য আচরণ করছে না। আমেরিকা ইংল্যান্ডের উত্তরাধিকার চায়, রাশিয়া চায় উভয়ের উত্তরাধিকার। জার্মানি ও ভারতের ক্ষেত্রে তা নেই, তারা নিজেরাই নিজেদের উত্তরাধিকার। আমেরিকা ইংল্যান্ডের উত্তরাধিকারে প্রতারণা করেছে নাকি রুশরা শেষ পর্যন্ত উভয় অ্যাংলো-স্যাক্সন দেশকে প্রতারণা করেছে, তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি বলেন, নেহরুর বলশেভিকপন্থী চিন্তাভাবনা তাঁকে উদ্বিগ্ন করে। ভারত যেন রাশিয়ার দিক থেকে বিপদের আশঙ্কা অগ্রাহ্য না করে বা চোখ বন্ধ করে না রাখে।
জার্মানি ও ভারতের মধ্যে বিশাল দূরত্ব। উভয় দেশের শত্রুরা এক ও অভিন্ন, তবু সেই শত্রুদের বিরুদ্ধে ভিন্ন ভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে। দূরত্ব সত্ত্বেও ভারত ইউরোপে জার্মানির বিজয়ের প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভব করছে। গত আড়াই বছরে জার্মানির সাফল্য না থাকলে জাপানের পক্ষে পূর্ব এশিয়ায় এ রকম অগ্রগতি অর্জন করা তো দূরের কথা, যুদ্ধেই প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হতো। সুতরাং ভারত ও জার্মানি একই শত্রুর বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধ লড়ছে, তা তারা যেখানেই এই শত্রুর সম্মুখীন হোক না কেন। ইংরেজ শাসন উৎখাত করবার জন্য সোভিয়েতের করায়ত্ত না হয়েও ভারতের সামনে এখন অন্যান্য সুযোগ এসেছে। তা ছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন অচিরেই জার্মানির হাতে সম্পূর্ণরূপে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে।
হিটলার নিজের দেশ জার্মানির জন্য যে যুদ্ধ পরিচালনা করছেন, তা কেবল একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে বা প্রচারণার জন্য নয়। মূলত একজন সৈনিক হিসেবে ক্ষমতার রাজনীতির জন্য তিনি তা করছেন। এটা করার সময়, তিনি মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী না করার নীতি দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। তিনি কখনো নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করেননি। এমনকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও নয়। তিনি বলেন, যা তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই, তা সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে তিনি রাজি নন। এ কারণেই তিনি এখন মিসর সম্পর্কে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করছেন না।
গত পরশু দিন থেকে জেনারেল রোমেল আক্রমণ শুরু করেছেন। এই অভিযান ইংরেজ ফ্রন্টকে ধ্বংস করতে পারবে কি না, তা তিনি এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। যা–ই হোক না কেন, জার্মানি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। রক্ত ও শ্রমের চেয়ে বেশি কিছু দেওয়া সম্ভব নয়। যদি রোমেল সীমিত সাফল্য অর্জন করেন, তাহলে এখন মিসর নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী শুধু ক্ষতিই ডেকে আনবে। কিন্তু যদি রোমেল শত্রুকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম হন, তাহলে পরবর্তী পর্যায়ে সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। এ জন্য তিনি এখন মিসরের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলছেন না। রোমেলের অভিযান সফল হলে তিনি মিসরীয় জনগণকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহ্বান জানাবেন, তখনই তা যুক্তিযুক্ত হবে। হিটলার বলেন, তিনি অন্য জাতিগুলোকে বিপদে ফেলতে চান না, যেমনটা ইংরেজরা করে। তিনি সত্যিকারের বিজয় এনে দিতে চান। এখনই আরবদের বিদ্রোহে আহ্বান জানানো দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। সময়োপযোগী আহ্বানের পেছনে জার্মানির শক্তি ও সদিচ্ছা থাকবে।
হিটলার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিদেশি শাসনকে অপসারণ করার আহ্বান জানাতে সব সময় খুব সতর্ক থেকেছেন। তাঁর মাতৃভূমি অস্ট্রিয়া সম্পর্কে তিনি অস্ট্রিয়ানদের কাছে প্রথম আবেদনটি জানিয়েছিলেন ১৯৩৮ সালের ১২ মার্চ, অর্থাৎ আক্রমণের এক দিন আগে। একজন রাজনীতিবিদ সব সময় চাইবেন তাঁকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করা হোক, তাই তিনি চাইলেই সবকিছু করতে পারেন না।
আরব প্রশ্নে তিনি একই মনোভাব গ্রহণ করছেন। যদি জার্মানি ইতিমধ্যে ককেশাসের দক্ষিণে উপস্থিত থাকত এবং যদি তার কাছে অর্ধডজন ট্যাংক ডিভিশন এবং কয়েকটি মোটরচালিত ডিভিশন থাকত, তাহলে তা মিসরীয় এবং আরব বিদ্রোহীদের সাহায্য পাঠানো যেত। তখন তিনি আরবদের উদ্দেশে একটি আহ্বান জানাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করতেন না। কিন্তু এখন জার্মানি আরবের যুদ্ধাঞ্চল থেকে এক হাজার কিলোমিটার দূরে। তাই এখন এমন আহ্বান জানানো সম্পূর্ণভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। হিটলার ইংরেজ নন। তিনি অন্য জাতিগুলোকে কেবল আহ্বানের মাধ্যমে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে চান না। তিনি মিসর ও বিপ্লবী আরবদের ধ্বংস চান না, বরং তিনি চান তাদের একটি বাস্তব সফলতার ভিত্তিতে সাহায্য করতে। তিনি ব্রিটিশদের মতো শুধু একটি গৌণ বা ছোটখাটো আক্রমণ পরিচালনা করতে চান না।
তিনি অন্য জাতিগুলোকে আহ্বান করে সর্বনাশের পথে ঠেলে দিতে চান না। তিনি মিসর ও বিপ্লবী আরবদের ধ্বংস চান না, বরং তাদের প্রকৃত সাফল্য অর্জনে সাহায্য করতে চান। তিনি নিজের স্বার্থে কোনোভাবেই তাদেরকে একটি দায়মুক্তিমূলক অভিযান চালানোর জন্য ব্যবহার করতে চান না, যার মূল্য দিতে হবে তাদের নিজেদের রক্তের বিনিময়ে। মিসরের উদ্দেশে একটি আহ্বান জানানো সেই মুহূর্তেই দায়িত্বপূর্ণ হবে, যখন সেই পরিস্থিতি তৈরি হবে। সেটা হয়তো তিন মাস পর কিংবা এক বা দুই বছর পর হতে পারে। তখন যেকোনোভাবেই হোক জার্মানি মিসরের দ্বারপ্রান্তে সেনাশক্তি জড়ো করতে পারবে, যাতে দেশটির মুক্তি নিশ্চিত হয়। আরবের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
ভারত জার্মানি থেকে অনেক দূরে। জার্মানির সঙ্গে তার কেবল স্থলপথে ও আকাশপথে সংযোগ স্থাপনের উপায় রয়েছে। যদি দক্ষিণ দিকের পথ বেছে নেওয়া হয়, তবে স্থলপথটি পারস্য উপসাগরের উপকূল দিয়ে যাবে। উত্তর দিক থেকে হলে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যেকোনো ক্ষেত্রেই হোক, এই পথ শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করেই উন্মুক্ত করা সম্ভব।
গত ছয় মাসের বৈশ্বিক ঘটনাগুলোর মধ্যে হিটলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন জাপানের বিস্ময়কর দ্রুত অগ্রগতিকে; জাপানি সেনাবাহিনী কার্যত ভারতের সীমানা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। তিনি জাপানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য জানতেন না। তিনি জানতেন না জাপানিরা প্রথমে চিয়াং কাই-শেকের হুমকি থেকে তাদের মুক্ত করা এবং তার সঙ্গে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে, নাকি তারা প্রথমে অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঝুঁকতে চায় নাকি ভারতের দিকে। পূর্ব এশিয়ায় ব্রিটিশদের আধিপত্য ধ্বংস করা গেলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে পতনের দিকে নিয়ে যাওয়া যাবে। ব্রিটিশদের পতন অবশ্যই জার্মানির জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয় হবে এবং তার ফলে জার্মান রক্তক্ষয় হ্রাস পাবে। এ কারণেই জার্মানি পূর্ব এশিয়ায় ঘটমান ঘটনাবলি গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজে থেকে সম্ভাব্য সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিচ্ছে। এটা আমরা করছি, যেখানে সম্ভব সেখানেই আমরা ব্রিটিশ শাসনকে আঘাত করছি।
এ প্রসঙ্গে ফুয়েরার হিটলার সাবমেরিন যুদ্ধের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যা পূর্ব এশিয়ার যুদ্ধের জন্য একটি পরোক্ষ সহায়তা হিসেবে কাজ করছে। যেমন ব্রিটিশ শিল্পকেন্দ্রগুলোর ওপর বিমান হামলা ও উত্তর আফ্রিকায় যুদ্ধ। যুদ্ধক্ষেত্রে ধ্বংস হওয়া প্রতিটি ইংরেজ ডিভিশন থেকে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাদের বন্দী করা হয়, যেন পরবর্তী সময়ে ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামের লড়াইয়ে তাদের ব্যবহার করা যায। এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু করা জার্মানির পক্ষে সম্ভব নয়।
জার্মানি যদি এখনই জাপানের মতো ভারতের সীমান্তে উপস্থিত থাকত বা যেখানে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে পৌঁছাতে পারত, তাহলে ফুয়েরার হিটলার সুভাষ বসুকে অনুরোধ করতেন তাঁর সঙ্গে থেকে জার্মান সেনাদের সঙ্গে ভারতে প্রবেশ করতে, যাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিপ্লব প্রজ্বলিত করা যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনি সুভাষ বসুকে কেবল এই পরামর্শই দিতে পারেন যে তিনি যেন জাপানিদের কাছে যান এবং ভারতের সীমান্ত থেকে দেশের ভিতরে বিপ্লবী সংগ্রাম ছড়িয়ে দেন।
হিটলার একজন পুরোনো বিপ্লবী হিসেবে সুভাষ বসুকে কেবল এই পরামর্শই দিতে পারেন যে ভারতের ভেতরে একটি বিপ্লবের সুযোগ তখনই কাজে লাগানো উচিত, যখন বাইরের দিক থেকে শত্রুর চাপ শুরু হয়। নেহরুর ফ্যাসিবাদবিরোধী ও জাতীয় সমাজতন্ত্রবিরোধী চিন্তাধারা বা গান্ধীর অহিংস প্রতিরোধ দ্বারা দীর্ঘ মেয়াদে কোনো ফল পাওয়া যাবে বলে হিটলার মনে করেন না। তিনি মনে করেন, ব্রিটিশ শাসনকে কেবল তখনই দমানো যাবে, যখন ভারতের জনগণ বাইরের আক্রমণের সঙ্গে ভেতরেও জেগে উঠবে। এমন একটি অভিযান আরও ভালোভাবে সংগঠিত করা সম্ভব, যখন যতটা বেশি সেই দেশটির কাছাকাছি থাকা যায়। তাই বসুর পক্ষে সবচেয়ে ভালো হবে সেখানে যাওয়া, যেখানে তিনি ভারতের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকবেন এবং যেখান থেকে ভারতে ইংরেজদের ওপর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে। জাপানিরা এই চাপ সত্যিই প্রয়োগ করতে চায় কি না, তা হিটলার জানেন না। তারা জার্মানিকে এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেনি। অন্যদিকে তিনি বিশ্বাস করেন না যে বাইরের সাহায্য ছাড়াই একটি বিদ্রোহ ভারতীয়দের স্বাধীনতা এনে দিতে পারবে।
পুরোনো বিপ্লবী হিসেবে হিটলার জানেন, আধুনিক অস্ত্রপ্রযুক্তির বিকাশের ফলে তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক সৈন্য যদি সঠিকভাবে সংগঠিত করা যায় এবং তারা অস্ত্র ব্যবহারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকে, তবে একটি বড় দেশকে আটকে ফেলা সম্ভব হতে পারে। যখন বাইরের দিক থেকে সামরিক চাপ যুক্ত হবে এবং দেশের অভ্যন্তরের বিপ্লবী শক্তিগুলো যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস করে রসদ সরবরাহ ও সৈন্য পরিবহনে বাধা দিতে সক্ষম হবে, কেবল তখনই সামরিক পতনে তা অবদান রাখতে পারবে।
পরিস্থিতি যেমন দাঁড়িয়েছে, তাতে হয়তো ভারতে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে জার্মানির আরও অন্তত দু-এক বছর লেগে যাবে। কিন্তু জাপানের প্রভাব কয়েক মাসের মধ্যেই দেখতে পাওয়া সম্ভব। তাই বসুর উচিত জাপানিদের কাছে যাওয়া, যাতে তিনি শুধু নিজের দেশের ওপর প্রভাব বিস্তার নয় বরং উপযুক্ত পরামর্শ দিয়ে জাপানিদের মনস্তাত্ত্বিক ভুল করা থেকেও বিরত রাখতে পারেন।
তবে ফুয়েরার হিটলার সুভাষ বসুকে আকাশপথে যাত্রা সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলেন। ইংরেজরা তাদের রাত্রিকালীন নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে তাঁকে জরুরি অবতরণ করতে সহজেই বাধ্য করতে পারে। তিনি (সুভাষ বসু) একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বিধায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন পরীক্ষামূলক যাত্রায় অংশ নেওয়া তাঁর উচিত হবে না। তার জন্য অবশ্যই একটি নিরাপদ পথ নির্বাচন করতে হবে। একটি জাপানি সাবমেরিন ইউরোপে পৌঁছেছে এবং সেটি যদি শিগগিরই ফিরে যায়, তবে সেটি সুভাষ বসুকে নিয়ে যেতে পারবে। অন্যথায় তিনি (ফুয়েরার হিটলার) বসুর জন্য একটি জার্মান সাবমেরিন প্রদান করবেন, যা তাঁকে ব্যাংকক পৌঁছে দেবে। তারপর ফুয়েরার সুভাষ বসুকে একটি মানচিত্র দেখিয়ে সম্ভাব্য যাত্রাপথ ব্যাখ্যা করেন, যা উত্তমাশা অন্তরীপ বা কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যাবে এবং তাঁর হিসাবে যাত্রাকাল প্রায় ছয় সপ্তাহ হবে।
হিটলার সুভাষ বসুকে ব্যাখ্যা করেন, কীভাবে নেটাল ও পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে এবং মাদাগাস্কার ও ভারতের উপকূলে ইউ-বোট ব্যারিকেড স্থাপনের মাধ্যমে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ইংল্যান্ড ও আমেরিকার রসদ সরবরাহের পথ বন্ধ করা যেতে পারে।
আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে সুভাষ বসু হিটলারকে আরও দুটি অনুরোধ করেন। ব্রিটিশরা প্রচারণার মাধ্যমে ফুয়েরার হিটলারের মাইন ক্যাম্ফ বইটিতে প্রকাশিত ভারতবিষয়ক মন্তব্যগুলো খুবই বিকৃতভাবে উপস্থাপন করছে এবং তা জার্মানির বিরুদ্ধে প্রচারণার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই তিনি ফুয়েরারকে অনুরোধ করেন, তিনি যেন কোনো উপযুক্ত সময়–সুযোগে ভারতের ব্যাপারে জার্মানির অবস্থান সম্পর্কে কিছু স্পষ্ট কথা বলেন। এটি ভারতীয় জনগণের কাছে কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতা নিয়ে আসবে। এরপর সুভাষ বসু আবারও ভারতের পক্ষে জার্মানির নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থনের অনুরোধ জানান, যাতে ভারতকে শুধু জাপানের ওপর নির্ভরশীল থাকতে না হয়।
উত্তরে ফুয়েরার হিটলার ভারতের জন্য যেসব করণীয় নির্ধারণ করেন, সেগুলো এই: ব্রিটিশ প্রভাব অপসারণ, সোভিয়েত প্রভাব পরিহার, জাপানের সঙ্গে ভারতের পূর্ব সীমা–সম্পর্কিত একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা এবং ভারতের ঐক্য অর্জনের লক্ষ্যে অভ্যন্তরীণ সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যা জার্মান ঐক্য প্রতিষ্ঠার মতো ১০০ থেকে ২০০ বছর সময় নিতে পারে।
ফুয়েরার হিটলার তাঁর বইটির বক্তব্যের বিকৃত উপস্থাপন বিষয়ে বলেন, তিনি শুধু এমন কিছু প্রবণতার বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছিলেন, যা শোষিত জাতিগুলোকে তাদের শোষকদের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত ফ্রন্ট গঠনে উৎসাহিত করবে। তিনি অত্যাচারিত জাতিগুলোর অক্ষমতার প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণভাবে ভুল বলে মনে করতেন। বিশেষ করে জার্মানিতে যে মহলগুলো এই ধরনের চিন্তাধারার পেছনে ছিল, তারা জার্মান সাম্রাজ্যের জন্যও ভারতের ধাঁচে একধরনের নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ সমর্থন করত, যা একইভাবে সম্পূর্ণ ভুল পন্থা ছিল।
যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রতি জার্মানির সমর্থন প্রসঙ্গে ফুয়েরার মন্তব্য করেন, সমর্থন শুধু অর্থনৈতিক সহায়তাবিষয়ক হতে পারে। সুভাষ বসু যেন ভুলে না যান যে একটি দেশের শক্তি কেবল তত দূর পর্যন্তই বিস্তৃত, যত দূর তার নিজের তলোয়ার পৌঁছায়।
বিদায়ের সময় ফুয়েরার সুভাষ বসুকে তাঁর যাত্রা ও পরিকল্পনার সফলতার জন্য আন্তরিক শুভকামনা জানান।
বার্লিন, ৩০ মে ১৯৪২, স্মিট।
(রেকর্ড করা আলোচনা ৩০ মে ১৯৪২ টাইপ করা হয়। আর্কাইভ, জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ১৯৪২)১০
ভারতীয় রাজনীতিবিদ সুভাষ বসুকে সেদিন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মতো সম্মান দিয়ে গ্রহণ করা হয়েছিল। সুভাষ বসু এই সাক্ষাৎকারটিকে ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বজনীন স্বীকৃতি হিসেবে দেখেছিলেন।
শেষ কথা
সুভাষচন্দ্র বসুর আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ছিল ব্যাপক। আজ থেকে প্রায় ৮০ বছর আগে তিনি কীভাবে সেসব যোগাযোগ সমন্বয় করতেন, তা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। তিনি ১৯৪২ সালে তাঁর জরুরি কিছু লেখা বইয়ে লেখেন, ‘অতীতে ভারতের অধঃপতনের অন্যতম কারণ ছিল বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নতা। ভবিষ্যতের জন্য ভারতের উচিত অন্যান্য দেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা। ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতের অবস্থান পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝামাঝি হওয়ায় নিজস্ব এক সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পেরেছে। কিন্তু যে জাপান, ইতালি ও জার্মানি এখন ভারতের শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক স্থাপন করাই হবে ভারতের পক্ষে স্বাভাবিক কাজ।’ তাঁর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় বার্লিনে জার্মান সাময়িকী ইচ্ছা ও ক্ষমতার আগস্ট ১৯৪২ সংখ্যায়।১১
মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরু অক্ষশক্তি অর্থাৎ জার্মানি, ইতালি ও জাপানের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের ও পরে মিত্রশক্তির লড়াইয়ে ভারতের অংশ নেওয়ার বিরোধিতা করেননি। তবে তাঁরা শর্ত দিয়েছিলেন যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে ভারতের ঔপনিবেশিক অবস্থানের পরিবর্তন করতে হবে এবং স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাঁদের এই অবস্থান সুভাষচন্দ্র বসুর কাছে বিপ্লবাত্মক বা ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়নি।
তৎকালীন বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সুভাষ বসু ঔপনিবেশিক জোয়াল থেকে ভারতের দ্রুত মুক্তির জন্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শত্রু অক্ষশক্তির সঙ্গে একটি জোট বাঁধতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামের ব্যাপারে নাৎসি নেতৃত্বের কিছু নিজস্ব হিসাব-নিকাশ ও কৌশল ছিল। তারা ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করলেও ভারতীয় মুক্তিসংগ্রামকে সরাসরি সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
হিটলারের ফ্যাসিস্ট রাজনীতির কৌশল ও বর্বরতা সম্পর্কে বলার শেষ নেই। বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার ও তাঁর সঙ্গীরা জার্মানি তথা ইউরোপে যে বর্বরতা চালিয়েছিল, তা ইতিহাসের একটি নৃশংস অধ্যায়। হিটলারি বর্বরতার উদাহরণ পৃথিবীতে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। নাৎসি বাহিনী শুধু প্রতিবেশী জাতিগুলোকেই ধ্বংসের চেষ্টা করেনি, নিজের জাতির মধ্যেও শুদ্ধীকরণের নামে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার প্রায় আশি বছর পর আজও সে যুদ্ধের ভয়াল স্মৃতি ইউরোপ তথা সারা পৃথিবীর মানুষ ভুলতে পারেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মোট প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
জার্মান ফ্যাসিবাদের পতন সম্ভব হয়েছিল মূলত বাইরের শক্তিগুলোর রণকৌশলের মাধ্যমে। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী স্বল্পসংখ্যক প্রতিবাদী গোষ্ঠী ছিল। অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদবিরোধী গোষ্ঠী হয় দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিল, নয়তো হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে প্রাণ হারিয়েছিল। মিত্রশক্তির নৈতিক জোর ও রণকৌশলের কারণে শেষ পর্যন্ত বর্বরতম ফ্যাসিস্ট শক্তির পতন হয়েছিল। জার্মান ফ্যাসিবাদ শুধু ইউরোপ এবং পৃথিবীর জন্য যুদ্ধ, ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প ও রাজ্য জয়ের বর্বর লিপ্সাই উসকে দেয়নি, জার্মান জাতির জন্যও এটি ছিল তাদের ইতিহাসের করুণতম অধ্যায়।
সুভাষ বসু ও হিটলারের মধ্যে আলোচনাটি ছিল ঐতিহাসিক। পরবর্তী সময়ে সুভাষ বসু ও আজাদ হিন্দ ফৌজের অধিকাংশ কর্মপরিকল্পনা ও অভিযানের ছক সেই আলোচনা থেকেই উঠে এসেছিল।
সূত্র
১. Gordon, L A (1964). Brothers against the Raj: eine Biographie des indischen Nationalisten Sarat und Subhas Chandra Bose. Columbia University Press. New York, USA.
২. Talwar, B R (1976). The Talwars of Pathan Land and Subhas Chandras Great Escape (pp. 81-88). People Publishing House. New Delhi, India.
৩. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 1). Telegramm Nr. 32 [Telegram]. AA-PA/R29534. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৪. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 5). Telegramm Nr. 39 [Telegram]. AA-PA/R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৫. Ges. Kabul (Pilger) an AA. (1941, February 25). Telegramm Nr.71 [Telegram]. AA-PA/R29615 Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৬. AA/USt Pol (Woermann) an AA/StS (Weizsäcker). (1941, March 4). Telegramm Nr.176 [Telegram] AA-PA/ R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৭. Bot.Moskau (Schulenburg) an AA. (1941, March 31). Telegramm Nr.744 [Telegram] AA-PA/R29615. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
৮. Gunther, L (1999). Remer Hans Joachim, Inder, Indien und Berlin, 100 Jahre Geschichte (p. 24). Lotus Publishing. Berlin.
৯. Hitler A (1925). Mein Kampf (pp. 746-747). Franz Eher Nachf. Verlag. München, Germany.
১০. RZ 248-27848. 19 /42 gRs. Archive of the German Foreign Office (Auswärtiges Amt). Berlin. Germany.
১১. বোস, এস কে, অ্যান্ড বোস, এস (ইডিএস), ২০২৩, জরুরি কিছু লেখা (পৃ. ২০৬) আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। কলকাতা, ভারত।
![]() |
| সুভাষচন্দ্র বসু ও অ্যাডল্ফ হিটলার, বাঁয়ে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দোভাষী পাউল ওটো স্মিট। বার্লিন, জার্মানি, ২৭ মে ১৯৪২। সূত্র: জার্মান কেন্দ্রীয় মহাফেজখানা |
Thursday, April 2, 2026
অস্ত্রোপচারে এআই: ভুল চিকিৎসা ও ভুল অঙ্গ শনাক্তের অভিযোগ
জনসন অ্যান্ড জনসনের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান অ্যাক্লারেন্ট জানিয়েছিল, তাদের তৈরি ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’-এর সফটওয়্যারে এখন থেকে ‘মেশিন-লার্নিং অ্যালগরিদম’ ব্যবহার করা হবে; যা নাক, কান ও গলাবিশেষজ্ঞদের অস্ত্রোপচারের সময় সহায়তা করবে।
এই চিকিৎসা সরঞ্জাম এর আগে বাজারে প্রায় তিন বছর ধরে প্রচলিত ছিল। সেই সময় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) যন্ত্রটির ত্রুটি নিয়ে সাতটি ও একজন রোগীর আহত হওয়ার বিষয়ে একটি ‘নিশ্চিত না হওয়া’ প্রতিবেদন পেয়েছিল। তবে যন্ত্রটিতে এআই যুক্ত করার পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০০টি যান্ত্রিক ত্রুটি ও নেতিবাচক ঘটনার প্রতিবেদন জমা পড়েছে এফডিএর কাছে।
প্রতিবেদনগুলো অনুযায়ী, ২০২১ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে অন্তত ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছেন। অভিযোগগুলোর বেশির ভাগই ছিল এমন—অস্ত্রোপচারকালে রোগীর মাথার ভেতর চিকিৎসকের ব্যবহৃত যন্ত্রটি ঠিক কোথায় অবস্থান করছে, সে সম্পর্কে ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’ ভুল তথ্য দিয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে আরও জানা গেছে, এআই প্রযুক্তির সহায়তায় অস্ত্রোপচারের সময় এক রোগীর নাক দিয়ে মস্তিষ্কের তরল (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) চুইয়ে পড়েছিল। অন্য এক ঘটনায়, একজন সার্জন ভুলবশত রোগীর মাথার খুলির নিচের অংশ ফুটো করে ফেলেছিলেন। আরও দুটি ঘটনায়, প্রধান ধমনি দুর্ঘটনাবশত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দুই রোগী স্ট্রোকের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এফডিএর কাছে আসা প্রতিবেদনগুলো অসম্পূর্ণ হতে পারে এবং এগুলো চিকিৎসা বিভ্রাটের কারণ নিরূপণের জন্য তৈরি করা নয়। ফলে ঘটনাগুলোতে এআইয়ের ভূমিকা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু ছিল, তা স্পষ্ট নয়।
তবে স্ট্রোকের শিকার দুই ব্যক্তি টেক্সাসে মামলা করেছেন। তাঁরা দাবি করেছেন, ট্রুডি সিস্টেমের এআই তাঁদের শারীরিক ক্ষতির জন্য দায়ী। একটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ‘সফটওয়্যারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার আগে পণ্যটি যতটা নিরাপদ ছিল, পরিবর্তনের পর এটি ততটা থাকেনি।’
বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে মামলার এসব অভিযোগ যাচাই করতে পারেনি।
ট্রুডি ডিভাইস নিয়ে এফডিএর প্রতিবেদনের বিষয়ে জনসন অ্যান্ড জনসন কর্তৃপক্ষকে প্রশ্ন করা হলে তারা ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেসের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলে। ২০২৪ সালে ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস অ্যাক্লারেন্ট ও ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম কিনে নেয়।
ইনটেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস বলেছে, প্রতিবেদনগুলো শুধু এটুকুই প্রমাণ করে যে যেখানে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ট্রুডি সিস্টেমটি ব্যবহৃত হচ্ছিল। তারা আরও বলেছে, ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম বা এআই প্রযুক্তির সঙ্গে কোনো আঘাত বা ক্ষতির সরাসরি যোগসূত্র থাকার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।’
এমন এক সময়ে এ ঘটনাগুলো সামনে আসছে; যখন এআই স্বাস্থ্যসেবার জগৎকে ‘বদলে’ দিতে শুরু করেছে। এর প্রবক্তারা ভবিষ্যদ্বাণী করছেন যে নতুন এই প্রযুক্তি বিরল রোগের নিরাময় ও নতুন ওষুধ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে, সার্জনদের দক্ষতা বাড়াবে এবং রোগীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
কিন্তু রয়টার্স যখন নিরাপত্তা ও আইনি নথিপত্র পর্যালোচনা এবং চিকিৎসক, নার্স, বিজ্ঞানী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে; তখন চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের কিছু ঝুঁকিও উঠে এসেছে। ডিভাইস নির্মাতা, প্রযুক্তি জায়ান্ট ও সফটওয়্যার নির্মাতারা এখন এ প্রযুক্তি দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
বর্তমানে এফডিএ অন্তত ১ হাজার ৩৫৭টি এআই–চালিত চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন দিয়েছে; যা ২০২২ সালের তুলনায় দ্বিগুণ।
শুধু ট্রুডি সিস্টেমই নয়, আরও অনেক এআই-চালিত যন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এফডিএ ডজনখানেক এআই-চালিত যন্ত্রের ত্রুটির প্রতিবেদন পেয়েছে। এর মধ্যে এমন একটি হার্ট মনিটর আছে; যেটি হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং একটি আল্ট্রাসাউন্ড যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে; যা ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে শনাক্ত করেছে।
গত আগস্টে জামা হেলথ ফোরামে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জনস হপকিন্স, জর্জটাউন ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা জানিয়েছেন, এফডিএ অনুমোদিত ৬০টি এআই-চালিত চিকিৎসা সরঞ্জাম–সংশ্লিষ্ট ১৮২টি পণ্য প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে। তাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ৪৩ শতাংশ ক্ষেত্রে ডিভাইসগুলো অনুমোদনের এক বছরের মধ্যেই বাজার থেকে তুলে নিতে হয়েছে। সাধারণ চিকিৎসা সরঞ্জামের তুলনায় এআই-চালিত যন্ত্রের বাজার থেকে প্রত্যাহারের হার প্রায় দ্বিগুণ।
এফডিএর পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক বিজ্ঞানী রয়টার্সকে বলেন, এআইয়ের এ জয়জয়কার সংস্থাটির জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে। গুরুত্বপূর্ণ কর্মীদের হারানোর পর এআই–সমৃদ্ধ চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো অনুমোদনের আবেদনের যে জোয়ার শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। এফডিএর অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠান মার্কিন স্বাস্থ্য ও জনসেবা বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাঁরা এ খাতে সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরেক রূপ ‘জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট’ এখন চিকিৎসা খাতে জায়গা করে নিচ্ছে। অনেক চিকিৎসক সময় বাঁচাতে রোগীর তথ্য সংরক্ষণের মতো কাজে এআই ব্যবহার করছেন। তবে চিকিৎসকেরা এ–ও বলছেন যে অনেক রোগী নিজের রোগনির্ণয় করতে বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শের বিরোধিতা করতে চ্যাটবট ব্যবহার করছেন; যা নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
প্রায় তিন বছর আগে চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর ব্যবসায়িক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক সাড়া ফেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। চ্যাটজিপিটি ও গুগলের জেমিনাই বা অ্যানথ্রোপিকের ক্লদ-এর মতো জনপ্রিয় চ্যাটবটগুলো কনটেন্ট (আধেয়) তৈরির জন্য ‘জেনারেটিভ এআই’ ব্যবহার করে। এগুলো মূলত লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি; যা মানুষের ভাষা বুঝতে ও তৈরি করতে বিপুল পরিমাণ তথ্য এবং ডেটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এখন এসব এআই টুল সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা অ্যাপের মতো চিকিৎসাক্ষেত্রেও যুক্ত করা হচ্ছে।
তবে এআই শুধু এলএলএমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় এবং চ্যাটবট আসার অনেক আগে থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ খাতের ইতিহাস ৭০ বছরের বেশি পুরোনো। ১৯৫০ সালে ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টুরিং যখন তাঁর এক গবেষণাপত্রে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?’, সেটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
এফডিএ ১৯৯৫ সালে প্রথম এআই-সমৃদ্ধ চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদন দেয়। সেই ব্যবস্থা জরায়ুমুখের ক্যানসার শনাক্ত করতে দুটি ‘প্যাটার্ন-ম্যাচিং’ সফটওয়্যার ব্যবহার করত। বর্তমানে চিকিৎসা সরঞ্জামে ব্যবহৃত এআই-কে প্রায়ই ‘মেশিন লার্নিং’ বলা হয়; যার একটি অংশ হলো ‘ডিপ লার্নিং’। এগুলো নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য ডেটার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। যেমন রেডিওলজিতে চিকিৎসকদের নজর এড়িয়ে যেতে পারে, এমন টিউমার শনাক্ত করে ক্যানসার নির্ণয়ে এ প্রযুক্তি সাহায্য করে।
এমন ব্যবস্থা অস্ত্রোপচারের যন্ত্রপাতিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২২ সালের জুনে টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের একটি হাসপাতালে এরিন রালফ নামের এক নারীর সাইনাসের অস্ত্রোপচারের সময় তাঁর মাথায় একটি ছোট বেলুন প্রবেশ করানো হয়। রালফের করা মামলা অনুযায়ী, মার্ক ডিন নামের এক চিকিৎসক ওই সময় তাঁর মাথার ভেতর যন্ত্রের অবস্থান নিশ্চিত করতে এআই-চালিত ‘ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেম’ ব্যবহার করছিলেন।
‘সাইনো প্লাস্টি’ নামের এ অস্ত্রোপচার দীর্ঘমেয়াদি সাইনোসাইটিস চিকিৎসার একটি আধুনিক পদ্ধতি। এতে সাইনাসের ছিদ্র বড় করার জন্য একটি বেলুন ফুলিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তরল বেরিয়ে যেতে পারে ও প্রদাহ কমে।
তবে ডালাস কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে অ্যাক্লারেন্ট ও অন্যদের বিরুদ্ধে করা রালফের মামলায় অভিযোগ করা হয়, ট্রুডি সিস্টেম ডা. ডিনকে ‘ভুল পথে পরিচালিত’ করেছিল। এতে তাঁর একটি ক্যারোটিড ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়; যা মস্তিষ্ক, মুখ ও ঘাড়ে রক্ত সরবরাহ করে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা তৈরি হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, রালফের আইনজীবী বিচারককে জানিয়েছেন যে ডা. ডিনের নিজস্ব রেকর্ডেই দেখা গেছে, তিনি বুঝতেই পারেননি যে তিনি ক্যারোটিড ধমনির এত কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন।
তবে রয়টার্স স্বতন্ত্রভাবে সেই রেকর্ডগুলো যাচাই করতে পারেনি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর স্পষ্ট হয় যে রালফ স্ট্রোক করেছেন। চার সন্তানের মা রালফকে আবার হাসপাতালে ফিরতে হয় এবং পাঁচ দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) কাটাতে হয়। তাঁর চিকিৎসার খরচ জোগাতে খোলা একটি ‘গো ফান্ড মি’ পাতায় জানানো হয়, যদি তাঁর মস্তিষ্ক ফুলে যায়, সে ক্ষেত্রে জায়গা করে দিতে খুলির একটি অংশ অপসারণ করা হয়েছিল।
এ ঘটনার এক বছরের বেশি সময় পর স্ট্রোকের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ব্লগে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রালফ বলেন, ‘আমি এখনো ফিজিওথেরাপি নিচ্ছি। ব্রেস (সহায়ক কাঠামো) ছাড়া হাঁটা এবং আমার বাঁ হাতটিকে আগের মতো সচল করা এখনো অনেক কঠিন।’
২০২৩ সালের মে মাসে ডা. ডিন যখন আরেকজন রোগী ডোনা ফার্নিহাফের ‘সাইনোপ্লাস্টি’ অস্ত্রোপচার করছিলেন, তখনো ‘ট্রুডি’ ব্যবহার করেন তিনি। ফোর্ট ওয়ার্থের আদালতে করা ফার্নিহাফের মামলা অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের সময় হঠাৎ তাঁর ক্যারোটিড ধমনি ‘ফেটে যায়’। রক্ত চারদিকে ‘ছিটে পড়তে থাকে।’ এমনকি অস্ত্রোপচার পর্যবেক্ষণ করতে আসা অ্যাক্লারেন্টের একজন প্রতিনিধির গায়েও সেই রক্ত লাগে। মামলায় বলা হয়, ডোনা ফার্নিহাফের একটি ক্যারোটিড ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অস্ত্রোপচারের দিনই তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হন।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অ্যাক্লারেন্ট কর্তৃপক্ষ জানত বা তাদের জানা উচিত ছিল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে এই নেভিগেশন সিস্টেমটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ ও অনির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি ছিল।
আদালতের নথি অনুযায়ী, অ্যাক্লারেন্ট উভয় মামলার অভিযোগই অস্বীকার করেছে। মামলাগুলো বর্তমানে চলমান রয়েছে। কোম্পানিটি দাবি করেছে, তারা ট্রুডি সিস্টেমের নকশা বা এটি তৈরি করেনি, শুধু বাজারজাত করেছে। অ্যাক্লারেন্টের বর্তমান মালিক ইন্টেগ্রা লাইফ সায়েন্সেস রয়টার্সকে বলেছে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে অস্ত্রোপচারকালে কোনো আঘাত বা ক্ষতির যোগসূত্র থাকার কোনো প্রমাণ নেই।
ফেডারেল ডেটাবেজ ‘ওপেন পেমেন্টস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ডা. ডিন ২০১৪ সাল থেকে অ্যাক্লারেন্টের পরামর্শক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ২০২৪ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছ থেকে ফি বাবদ ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি গ্রহণ করেন। এর মধ্যে অন্তত ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার ছিল ট্রুডি সিস্টেম–সংশ্লিষ্ট।
ডা. ডিনের একজন আইনজীবী জানিয়েছেন, রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা এবং মামলা চলমান থাকায় চিকিৎসক এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না। ইন্টেগ্রা বলেছে, ডা. ডিন এখন আর ট্রুডির পরামর্শক নন এবং অ্যাক্লারেন্ট কিনে নেওয়ার পর তাঁকে যে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তা শুধু তাঁর খাবারের খরচ বাবদ ছিল।
ফার্নিহাফের মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২১ সালে অ্যাক্লারেন্টের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেফ হপকিন্স ট্রুডি ডিভাইসে এআই যুক্ত করার পেছনে ‘বিপণন কৌশলে’ জোর দিয়েছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, যন্ত্রটিতে ‘নতুন ও আধুনিক প্রযুক্তি’ রয়েছে, এমন দাবি করা।
লিংকডইনে অ্যাক্লারেন্টের একটি পোস্ট অনুযায়ী, ট্রুডির এআই সফটওয়্যারটি রোগীর শারীরবৃত্তীয় কাঠামোর নির্দিষ্ট অংশ শনাক্ত এবং চিকিৎসকের নির্ধারণ করা দুটি বিন্দুর মধ্যে ‘সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও সঠিক পথ’ খুঁজে বের করতে সহায়তা করে। এই প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য হলো, অস্ত্রোপচারের পরিকল্পনা সহজ করা এবং সাইনাস অপারেশনের মতো প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক তথ্য সরবরাহ করা।
ফার্নিহাফের মামলায় বলা হয়, এআই যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে অ্যাক্লারেন্ট কর্মকর্তারা যখন চিকিৎসক ডিনের কাছে গিয়েছিলেন, তখন তিনি হপকিন্স ও অ্যাক্লারেন্টকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে ‘কিছু সমস্যা রয়েছে; যা সমাধান করা প্রয়োজন।’
মামলায় দাবি করা হয়েছে, এ সতর্কতা সত্ত্বেও অ্যাক্লারেন্ট তাদের নিরাপত্তার মান কমিয়ে নতুন প্রযুক্তিটি বাজারে আনার তোড়জোড় শুরু করে। এমনকি ট্রুডি সিস্টেমে যুক্ত করার আগে এই নতুন প্রযুক্তির কিছু ক্ষেত্রে নির্ভুলতার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল মাত্র ৮০ শতাংশ।
ডিন সত্যিই এমন কোনো সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন কি না, তা রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ছাড়া ফার্নিহাফের দাবির সপক্ষে জমা দেওয়া নথিপত্রগুলো আদালতের গোপনীয়তার আদেশে থাকায় সংবাদদাতারা সেগুলো যাচাই করতে পারেননি।
অ্যাক্লারেন্টের সাবেক প্রেসিডেন্ট জেফ হপকিন্স এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো সাড়া দেননি।
‘ভুল অঙ্গ শনাক্ত’
এফডিএ সতর্ক করেছে, চিকিৎসা সরঞ্জামের ত্রুটি বা প্রতিকূল ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায়ই এগুলোতে বিস্তারিত তথ্যের অভাব থাকে, ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষার খাতিরে অনেক তথ্য মুছে ফেলা হয় এবং শুধু প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। এ ছাড়া একই ঘটনা নিয়ে সংস্থাটি একাধিক প্রতিবেদনও পেয়ে থাকে।
রয়টার্স দেখেছে যে ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে এফডিএ-তে জমা পড়া অন্তত ১ হাজার ৪০১টি প্রতিবেদন এমন সব চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে, যেগুলো সংস্থাটির অনুমোদন দেওয়া এআই-চালিত ১ হাজার ৩৫৭টি পণ্যের তালিকায় রয়েছে। যদিও সংস্থাটি বলছে, এ তালিকা সম্পূর্ণ নয়।
২০২৫ সালের জুন মাসের এক এফডিএ প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রসবপূর্ব আল্ট্রাসাউন্ডের জন্য ব্যবহৃত একটি এআই সফটওয়্যার ভ্রূণের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভুলভাবে শনাক্ত করছে। ‘সোনিও ডিটেক্ট’ নামের সফটওয়্যারটি ভ্রূণের ছবি বিশ্লেষণে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘সোনিও ডিটেক্ট সফটওয়্যারের এআই অ্যালগরিদম ত্রুটিপূর্ণ এবং এটি ভ্রূণের শারীরিক গঠন ভুলভাবে শনাক্ত ও সেগুলো ভুল অঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করছে।’ তবে এতে কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
‘সোনিও ডিটেক্ট’-এর মালিক স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান স্যামসাং মেডিসন। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, এই প্রতিবেদন কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয় না এবং এফডিএ এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধও করেনি।
এ ছাড়া অন্তত ১৬টি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান মেডট্রনিকের তৈরি এআই-চালিত হার্ট মনিটরগুলো হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিক ছন্দ বা সাময়িক বিরতি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এতে কেউ আহত হওয়ার তথ্য নেই। মেডট্রনিক এফডিএ-কে জানিয়েছে, কিছু ঘটনা ‘ব্যবহারকারীর বিভ্রান্তির’ কারণে ঘটেছে।
মেডট্রনিক তাদের হার্ট মনিটরের এআই অ্যালগরিদমকে ‘ডিপ লার্নিং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ হিসেবে বর্ণনা করে। তাদের দাবি, এটি ভুল সতর্কবার্তার হার কমিয়ে সঠিক তথ্য দেয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ওয়েবসাইটে এ–ও স্বীকার করেছে, তাদের এই প্রযুক্তি প্রকৃত অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন শনাক্তের ক্ষেত্রে ভুল করতে পারে।
মেডট্রনিক রয়টার্সকে জানিয়েছে, ১৬টি ঘটনার মধ্যে মাত্র একটিতে তাদের যন্ত্র ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং এতে রোগীর কোনো ক্ষতি হয়নি।
ট্রাম্প আমলে এফডিএতে জনবল ছাঁটাই
রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে এফডিএর পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, নতুন চিকিৎসাযন্ত্রের জোয়ার সামলানোর মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির নেই। প্রায় চার বছর আগে এফডিএ এআই–বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীর সংখ্যা বাড়িয়েছিল। দলটি এআইয়ের নিরাপত্তা যাচাইয়ে সংস্থাটির প্রধান সম্পদে পরিণত হয়েছিল। গত বছরের শুরুর দিকে এ দলে সদস্যসংখ্যা ছিল প্রায় ৪০।
একজন সাবেক কর্মী বলেন, ‘কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার এই প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। আমরা তাঁদের পাশে বসে বুঝিয়ে বলতাম, কেন এ প্রযুক্তিটি বাজারের জন্য নিরাপদ বা অনিরাপদ।’
তবে গত বছরের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইলন মাস্কের ব্যয় সংকোচন অভিযানের অংশ হিসেবে এই এআই টিম ভেঙে দিতে শুরু করে। এফডিএর অভ্যন্তরীণ সূত্র অনুযায়ী, ৪০ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে প্রায় ১৫ জন চাকরি হারিয়েছেন বা নিজে থেকে চলে গেছেন। ডিজিটাল হেলথ সেন্টার অব এক্সিলেন্স নামের আরেকটি বিভাগও তাদের এক-তৃতীয়াংশ কর্মী হারিয়েছে।
মার্কিন স্বাস্থ্য বিভাগের মুখপাত্র অ্যান্ড্রু নিক্সন অবশ্য দাবি করেছেন যে এফডিএ এআই-চালিত যন্ত্রের ক্ষেত্রেও আগের মতোই কঠোর মান বজায় রাখছে। তিনি বলেন, ‘রোগীর নিরাপত্তাই এফডিএর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
তবে এফডিএর সাবেক কর্মীদের মতে, ছাঁটাইয়ের পর কর্মীদের কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ফলে অনেক ত্রুটি নজর এড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এফডিএর নিয়ম অনুযায়ী, বেশির ভাগ এআই-চালিত যন্ত্র বাজারে আনার আগে রোগীদের ওপর পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয় না। নির্মাতারা শুধু পুরোনো কোনো এআই-বিহীন যন্ত্রের ‘আপডেট’ হিসেবে এগুলো বাজারে ছাড়ার অনুমতি পান।
সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আলেকজান্ডার এভারহার্ট বলেন, ‘চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এফডিএর প্রথাগত পদ্ধতি এআই-চালিত প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা নির্মাতাদের ওপর নির্ভর করছি যে তারা ভালো পণ্য দেবে; কিন্তু এফডিএর কাছে এর কোনো কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে কি না, আমার জানা নেই।’ রয়টার্স
![]() |
| লিংকডইনে অ্যাক্লারেন্টের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তাদের ট্রুডি নেভিগেশন সিস্টেমের একটি এআই সুবিধা দেখানো হয়েছে। ‘ট্রুপাথ’ নামের এই ফিচার সার্জনদের দুটি নির্ধারিত বিন্দুর মধ্যে ‘সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত ও কার্যকর পথ’ দেখায়। ভিডিওর স্ক্রিনশট: রয়টার্স |
Thursday, March 26, 2026
‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’ উম্মে কুলসুম কীভাবে মোসাদের লক্ষ্যবস্তু হলেন
উম্মে কুলসুমকে স্মরণ করা হয় ‘লেডি অব অ্যারাবিক সং’ বা আরবি সংগীতের সম্রাজ্ঞী হিসেবে। কয়েক দশক ধরে তাঁর কণ্ঠ এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল আরব বিশ্বকে। রেডিওতে তাঁর মাসিক লাইভ কনসার্টের প্রচার চলাকালে শহরগুলোর ব্যস্ততা থমকে যেত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রেম, বিরহ আর আকুলতার ভাষা হয়ে উঠেছিল তাঁর গান।
তবে কুলসুমের প্রভাব শুধু মঞ্চেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মৃত্যুর ৫০ বছর পর সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা কিছু তথ্য নতুন করে আলো ফেলছে এ কিংবদন্তির জীবনের ওপর। দাবি করা হচ্ছে, তাঁর কণ্ঠস্বর এতটাই শক্তিশালী ছিল যে কয়েক দশক আগেই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ‘হিট লিস্ট’ বা গুপ্তহত্যার তালিকায় নাম উঠেছিল তাঁর।
ফিলিস্তিনের ‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’
ব্যাপক সংঘাতে সীমান্তগুলো এত বিভক্ত হওয়ার আগে লেভান্ট অঞ্চলে (ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলীয় মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল) সংযোগের সেতু হিসেবে কাজ করত উম্মে কুলসুমের গান। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে তিনি অন্তত তিনবার ফিলিস্তিন সফর করেন। জাফা, হাইফা ও জেরুজালেমের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে গান গেয়েছেন তিনি।
বিখ্যাত ফিলিস্তিনি সংগীতশিল্পী ওয়াসিফ জওহরিয়ার নথিতে উম্মে কুলসুমের সেই সফরের বর্ণনা পাওয়া যায়। ট্রেনের বগিতে শহর থেকে শহরে ঘুরে তিনি গেয়েছেন ‘এন কোন্ত আসমেহ’–এর (যদি আমি ক্ষমা করি) মতো কালজয়ী গানগুলো। জনশ্রুতি আছে, ফিলিস্তিনের এক থিয়েটারে তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে এক ভক্ত চিৎকার করে তাঁকে ‘কাওকাব আল-শার্ক’ বা ‘প্রাচ্যের নক্ষত্র’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
কুলসুমের এই পরিবেশনাগুলো ছিল সমৃদ্ধ ফিলিস্তিনি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রমাণ। সেখানে প্রাণবন্ত থিয়েটার ও সাহিত্যজগৎ গড়ে উঠেছিল। জামিল আল-বাহরি ও নাজিব নাসসারের মতো ব্যক্তিত্বরা ছিলেন সেই অঙ্গনের অংশ। ১৯৪৮ সালের নাকবার (ফিলিস্তিনিদের ওপর নেমে আসা বিপর্যয়) পর এই জগৎ অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে যায়।
জাতীয় মিশন ও মোসাদের নজর
ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে উম্মে কুলসুমকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়। ১৯৪৯ সালের জুলাইয়ে মিসরীয় সংবাদপত্র ‘আল বালাগ’ খবর প্রকাশ করে যে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় রেডিওতে উম্মে কুলসুম ছাড়াও সালিমা পাশা মুরাদ, সিহাম রিফকিসহ বেশ কয়েকজন আরব শিল্পীর বিরুদ্ধে ‘মৃত্যুদণ্ড’ ঘোষণা করা হচ্ছে।
এই শিল্পীদের ‘অপরাধ’ ছিল, ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় আরব সেনাবাহিনী ও জনগণের মনোবল চাঙা করা। ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সেই কথিত দণ্ড তুলে নেওয়া হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ উম্মে কুলসুমের গানকে নিছক বিনোদন নয়; বরং নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা শুরু করেছিল।
তবে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পরাজয় বা ‘নাকসা’র পর উম্মে কুলসুমের রাজনৈতিক ভূমিকা আরও বলিষ্ঠ হয়। পরে তিনি সেই সময়ের কথা স্মরণ করেন। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে আল-হিলাল ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘১৯৬৭ সালের নাকসার পর আমি হতাশার কাছে আত্মসমর্পণ করিনি। আমার সামনে দুটো পথ ছিল। চুপ করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া অথবা আমার অস্ত্র—“আমার কণ্ঠ” নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ও যুদ্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা দেওয়া। আমি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলাম।’
মিসরীয় সামরিক বাহিনীকে পুনর্গঠনের জন্য কুলসুম ব্যাপক তহবিল সংগ্রহের অভিযান শুরু করেন। একে তিনি অভিহিত করেন ‘জাতীয় মিশন’ হিসেবে। এই মিশন তাঁকে আরব বিশ্বের বিভিন্ন মঞ্চে নিয়ে যায়। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে তিনি প্যারিসের অলিম্পিয়া থিয়েটারেও গান পরিবেশন করেন। সেখানে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়।
এ কনসার্ট ছিল ব্যতিক্রমী। ইতিহাসবিদ নামিক সিনান তুরান বলেন, প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের অনুরোধে অলিম্পিয়ার পরিচালক ব্রুনো কোকাত্রিক্স কুলসুমকে আমন্ত্রণ জানান। অলিম্পিয়া থিয়েটারে গান পরিবেশনের আগে মিসরের বেতার উপস্থাপক জালাল মোয়াওয়াদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আজ প্যারিসে গাইছেন উম্মে কুলসুম, কাল গাইবেন অধিকৃত জেরুজালেমে’।
এ কথা শুনে থিয়েটারের পরিচালক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পর্দার পেছনে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু উম্মে কুলসুম নিজ অবস্থানে অটল ছিলেন। কুলসুম দৃঢ়ভাবে বলেন যে তিনি একটি জাতীয় মিশনে রয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এতে যদি আপনাদের লজ্জা হয়, তবে আমরা সব গুছিয়ে চলে যাব।’ শেষ পর্যন্ত তিনি সেই দ্বন্দ্বে জয়ী হন। ঘোষণাটি আবার দেওয়া হয় এবং দর্শকদের তুমুল করতালিতে থিয়েটার মুখর হয়ে ওঠে।
‘অপারেশন কাউ’স আইজ’
সাংবাদিক তৌহিদ মাগদির লেখা ‘উম্মে কুলসুম অ্যান্ড দ্য মোসাদ: সিক্রেটস অব অপারেশন কাউ’স আইজ’ বইয়ে মার্কিন ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা নথির বরাতে বলা হয়, মোসাদ কীভাবে তাঁর ওপর নজরদারি চালাত। কায়রোতে কুলসুমের বাড়িতে আড়িপাতার চেষ্টা থেকে শুরু করে তাঁকে ভয় দেখিয়ে তহবিল সংগ্রহ বন্ধ করার নানা ছক এঁকেছিলেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, উম্মে কুলসুম একক প্রচেষ্টায় ১২টি আধুনিক ট্যাংক বা পাঁচটি যুদ্ধবিমান কেনার মতো অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। বইটিতে দাবি করা হয়েছে, মোসাদ তাঁকে হত্যার জন্য একজন গ্রিক এজেন্টকে নার্স সাজিয়ে পাঠানোর পরিকল্পনাও করেছিল। তাঁর হাঁটুর দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সুযোগ নিয়ে বিষপ্রয়োগে হত্যার সেই চেষ্টা সফল হয়নি। অভিযানটি ব্যর্থ হলেও এটি প্রমাণ করে যে আরব প্রতিরোধের স্তম্ভ হিসেবে তাঁর অবস্থান কতটা উঁচুতে ছিল।
বিতর্ক ও উত্তরাধিকার
২০২০ সালে ইসরায়েলের লোদ ও হাইফা পৌরসভা উম্মে কুলসুমের নামে রাস্তার নামকরণের সিদ্ধান্ত নিলে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। সমালোচকেরা তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইহুদি নিধনের’ গান গাওয়ার বানোয়াট অভিযোগ আনেন। মূলত বিতর্কটি ছিল ১৯৬৮ সালের ‘আসবাহা আনদি আলানা বুন্দুকিয়াহ’ (আমার এখন একটি রাইফেল আছে) গানটি নিয়ে। সিরীয় কবি নিজার কাব্বানির লেখা সেই গানে প্রকৃতপক্ষে ছিল (আরব) প্রতিরোধ ও ঘরবাড়ি হারানোর আর্তনাদ।
ব্যক্তিগত জীবনে উম্মে কুলসুম অনেক ইহুদি শিল্পীর সঙ্গে কাজ করেছেন। সুরকার দাউদ হোসনি ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ। তাঁর এক প্রিয় বন্ধু ছিলেন ইহুদি অভিনেত্রী রাকিয়া ইব্রাহিম। তবে রাজনৈতিকভাবে কুলসুম ছিলেন জায়নবাদ ও উপনিবেশবাদের ঘোর বিরোধী। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে তিনি তাঁর শিল্পকে আলাদা করেননি।
১৯৭০–এর দশকের শুরুর দিকে উম্মে কুলসুমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তাঁর শেষ পরিবেশনা ‘লাইলাত হোব’ (ভালোবাসার এক রাত)–এ সংগীতশিল্পীরা লক্ষ করেন, প্রকৃতির শক্তির মতো যে কণ্ঠ একসময় গর্জে উঠত, তাতে ভঙ্গুরতা দেখা দিয়েছে। শেষবারের মতো পর্দা নামার পর মঞ্চে নেমে আসে এক ‘সীমাহীন নীরবতা’।
মৃত্যুর অর্ধশতক পরও উম্মে কুলসুম শুধু একজন গায়িকা নন। তিনি রেডিওর প্রতিধ্বনি, হারিয়ে যাওয়া বহু সাংস্কৃতিক ফিলিস্তিনের প্রতীক এবং মধ্যপ্রাচ্যে একটি গানও যে দুর্গের মতো শক্তিশালী হতে পারে; তার স্মারক হয়ে আছেন।
অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্
![]() |
| মিসরের গায়িকা, গীতিকার ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী উম্মে কুলসুমের প্রতিকৃতি। তিনি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এক সাংস্কৃতিক আইকনে পরিণত হন। ছবিটি তোলা হয় ২০২৪ সালের ২ জুলাই কায়রোর একটি ক্যাফেতে আয়োজিত প্রদর্শনীতে। ছবি: রয়টার্স |
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...






