Thursday, August 28, 2014

যেসব কারণে গাজা যুদ্ধে প্রতিরোধ যোদ্ধারা বিজয়ী

ইহুদিবাদী ইসরাইল গাজা উপত্যকায় আগ্রাসন শুরু করে ৮ জুলাই যা ২৬ আগস্ট কায়রোয় এক যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যদিয়ে শেষ হয়। এ যুদ্ধে ইহুদিবাদী ইসরাইল গাজার নিরীহ মানুষের উপর আকাশ, ভূমি ও স্থলপথে বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে অন্তত দুই হাজার মানুষকে হত্যা করে এবং হাজার হাজার ঘর-বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। কিন্তু তারপরও কেন ফিলিস্তিনিরা এ যুদ্ধে বিজয় দাবি করছে- তার কারণ বিশ্লেষণ করেছেন আমাদের ভাষ্যকার। তার মতে, যুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণের জন্য সবার আগে দু'পক্ষের যুদ্ধপূর্ব লক্ষ্যগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে।

>>দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে রাস্তায় নেমে উল্লাস প্রকাশ করে সাধারণ ফিলিস্তিনিরা। গত মঙ্গলবার গাজা উপত্যকার রাফা শহর থেকে তোলা ছবি l এএফপি
গাজা উপত্যকা নিয়ন্ত্রণকারী হামাস ও ইসলামি জিহাদ আন্দোলনকে 'সন্ত্রাসী' সংগঠন হিসেবে অভিহিত করে এ দু'টি সংগঠনকে 'নির্মূল' করার লক্ষ্যে ইসরাইল গাজায় আগ্রাসন চালায়। তেল আবিবের ঘোষিত আরেকটি লক্ষ্য ছিল, গাজা থেকে ইসরাইল অভিমুখে রকেট হামলা বন্ধ করা। এ ছাড়া, গাজায় স্থল অভিযান চালাতে গিয়ে অসংখ্য ভূগর্ভস্থ টানেলের সম্মুখীন হওয়ার পর ইসরাইল ঘোষণা করে এসব টানেল ধ্বংস করা হচ্ছে তাদের এ অভিযানের 'প্রধান লক্ষ্য'। সেইসঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই করার জন্য হামাসকে 'নিরস্ত্র' করার দাবিও তোলে ইসরাইল।

কিন্তু বাস্তবে এসব লক্ষ্যের একটিও পূরণ হয়নি তেল আবিবের। হামাস ও ইসলামি জিহাদ আন্দোলনের একজন রাজনৈতিক নেতাকেও তারা হত্যা করতে পারেনি। যুদ্ধের শেষের দিকে এসে তিনজন হামাস কমান্ডার শহীদ হলেও ইসরাইল অভিমুখে হামাসের রকেট হামলায় তার কোনো প্রভাব পড়েনি। অর্থাৎ প্রতিরোধ সংগঠনগুলোকে নির্মূল করতে ব্যর্থ হয়েছে ইসরাইল। পাশাপাশি গাজা থেকে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বন্ধ করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে তেল আবিব। মঙ্গলবার যুদ্ধবিরতি চুক্তি সই হওয়ার আগ মুহূর্তেও হামাসের নিক্ষিপ্ত রকেট হামলায় দুই ইসরাইলি সেনা নিহত হয়। অর্থাৎ, শেষ মুহূর্তেও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সামরিক ক্ষমতা অটুট ছিল যুদ্ধ শুরুর দিনের মতোই। এ ছাড়া, ইসরাইলি সেনারা ক্যামেরার সামনে গাজার সীমান্তবর্তী কয়েকটি টানেল ধ্বংস করতে পারলেও প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বিশাল টানেল নেটওয়ার্ক অক্ষুণ্ন রয়েছে। আর প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হামলায় পর্যদুস্ত ইসররাইল কায়রো চুক্তি সই করার সময় হামাসকে নিরস্ত্র করার দাবি তুলতেই ভুলে যায়।

অন্যদিকে হামাস শুরু থেকে বলে আসছিল, গাজা উপত্যকার ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেয়ার আগ পর্যন্ত তারা যুদ্ধবিরতি মানবে না। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের দাবিতে অটল ছিল। কায়রো চুক্তি অনুযায়ী এরইমধ্যে গাজায় প্রবেশের দু'টি ক্রসিং খুলে দিয়েছে ইসরাইল এবং আরো কয়েকটি অচিরেই খোলা হবে। এ ছাড়া, এর আগে গাজা উপকূলের তিন মাইলের মধ্যে মাছ ধরতে পারতেন ফিলিস্তিনি জেলেরা। কায়রো চুক্তিতে তার ব্যাপ্তি বাড়িয়ে ছয় মাইল করা হয়েছে।

জানমালের ক্ষয়ক্ষতির দিক দিয়ে দৃশ্যত গাজার অনেক বেশি ক্ষতি হলেও সে ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের। কিন্তু এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত সাত বছরের ইসরাইলি অবরোধের সময় অপুষ্টিজনিত কারণে প্রতিদিন গাজার দু'টি শিশু মারা গেছে। সে হিসেবে বছরে মারা গেছে অন্তত ৭০০ শিশু। সাত বছরে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫,০০০। অর্থাৎ অবরোধের শিকার গাজায় জীবনের ক্ষতি হচ্ছিল যুদ্ধের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই, যেকোনো মূল্যে অবরোধ তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করা ছাড়া হামাসের কোনো উপায় ছিল না। সে বিশাল লক্ষ্যটি এবারের যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে বলেই  এ যুদ্ধে প্রতিরোধ যোদ্ধারা বিজয় হয়েছেন বলে আমাদের ভাষ্যকার উল্লেখ করেছেন।

ড্রোন পাঠানোর আরো জবাব পাবে ইসরাইল: ইরানি কমান্ডার

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সামরিক বাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাসুদ জাযায়েরি বলেছেন, ইরানের আকাশসীমায় ড্রোন পাঠানোর জন্য আরো জবাব পাবে ইহুদিবাদী ইসরাইল। তিনি বলেন, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেই ইসরাইল এর জবাব পাবে।

ইরানের এ কমান্ডার বলেন, “ড্রোন ধ্বংস করে দেয়ায় আমাদের শেষ পদক্ষেপ নয় বরং আমরা শত্রুকে অধিকৃত ভূখণ্ডে জবাব দেব।”

জেনারেল জাযায়েরি বলেন, ইরানের আকাশসীমা পুরোপুরি দেশের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ইরানের আকাশসীমায় বিদেশি শক্তির যেকোনো কার্যক্রমের বিষয়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে নজর রাখা হচ্ছে। 

জেনারেল জাযায়েরি জানান, ইসরাইলের ওই ড্রোন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি দেশ থেকে ওড়ানো হয়েছে যার অবস্থান ইরানের উত্তরে।

গত রোববার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ইসরাইলের ড্রোনটি ক্ষেপণাস্ত্রের সাহায্যে ভূপাতিত করার কথা জানায়। ড্রোনটি ইরানের নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছিল।

কঠিন সময় পার করেছি, এ সংকটও কাটিয়ে উঠব

নওয়াজ শরিফ
পদত্যাগের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। গতকাল বুধবার জাতীয় পরিষদে দেওয়া ভাষণে তিনি এ প্রস্তাব দেন। চলমান সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি। সরকারের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীতে ইমরান খান ও তাহির-উল কাদরির অবস্থান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর জাতীয় পরিষদে দেওয়া প্রথম ভাষণে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। খবর ডন ও পিটিআইয়ের। নওয়াজের এই ভাষণের পর ইমরান খানের পিটিআই ও তাহির-উল কাদরির পিএটি দলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি। দল দুটির নেতা-কর্মীরা ইসলামাবাদের কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিকে সুপ্রিম কোর্ট দল দুটির নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওই সড়ক ছাড়ার জন্য নতুন করে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে। নওয়াজ পার্লামেন্টে দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘এটা ভাবতেই ভালো লাগে যে এই পার্লামেন্ট পাকিস্তানের ২০ কোটি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে। যাঁরা আমাকে এই পার্লামেন্টের নেতা বানিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
নওয়াজ আরও বলেন, ‘আমরা অনেক কঠিন সময় পার করেছি। এ সংকটও কাটিয়ে উঠব। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় আমাদের হাত বাঁধা ছিল। কিন্তু আমরা নির্বাচনে অংশ নিয়েছি, প্রচারণা চালিয়েছি। জালিয়াতির অভিযোগ তুলিনি।...আজ আমরা নিজেদের সংশোধন করে এগিয়ে গেলেই ইতিবাচক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা সম্ভব।’ নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার প্রসঙ্গে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সব রাজনৈতিক শক্তির উচিত ওই কমিটির সঙ্গে বসা ও নিজেদের মতামত তুলে ধরা। কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউয়ে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন পিটিআই ও পিএটির নেতা-কর্মীরা। দাবি আদায়ের জন্য তাঁদের কেউ কেউ ওই সড়কসংলগ্ন সবুজ চত্বরে ‘কবর’ খোঁড়া শুরু করেছেন। কারও কারও হাতে কাফনের কাপড়ও দেখা গেছে। বিক্ষোভকারীদের ভাষ্যমতে, কবর খুঁড়ে কাফনের কাপড় পরে তাঁরা দাবি আদায়ের আন্দোলন চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
পিটিআইয়ের প্রধান ইমরান খান ও পিএটির প্রধান তাহির-উল কাদরির সঙ্গে আলোচনার জন্য এই দুই নেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু কখন, কীভাবে এবং কারা তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে, তা বলা হয়নি। এদিকে পিটিআই ও পিএটির নেতা-কর্মীদের আজকের মধ্যে কনস্টিটিউশন অ্যাভিনিউ থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি নাসির-উল-মুলকের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের একটি বেঞ্চ গতকাল বার অ্যাসোসিয়েশনের করা এ-সংক্রান্ত একটি আবেদনের ওপর শুনানি করছিলেন। ওই আবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভকারীরা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে আদালত আজ সকালের মধ্যে পার্লামেন্টের সামনের রাস্তা থেকে সরে যেতে দুটি দলের বিক্ষোভকারীদের নির্দেশ দেন। পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং পিটিআইয়ের নেতা মেহমুদুর রশিদসহ দলটির ২৮ জন সদস্য গতকাল পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

ভারতে সরকারি কর্মীদের সম্পদের হিসাব দিতে হবে

ভারতের সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবশ্যই প্রতিবছর তাঁদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করতে হবে। দেশটিতে গত ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া দুর্নীতিবিরোধী লোকপাল আইনের অধীনে এ তথ্য প্রকাশ করতে হবে বলে সরকারি এক আদেশে বলা হয়েছে। খবর এনডিটিভির। গতকাল বুধবার প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ওই আদেশের ফলে অফিস সহকারীরা (পিয়ন) ছাড়া সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদসম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য প্রতিবছর জুলাইয়ের মধ্যে জমা দিতে হবে। তবে এ বছরের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর। ভারতে সরকারি কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। সম্পদের তথ্য প্রকাশের নতুন ফরমে কলামগুলোর একটি ‘মোটরযান, উড়োজাহাজ, প্রমোদতরি বা জাহাজ, স্বর্ণ ও রুপার অলংকার এবং এর বাঁট’ সম্পর্কে। যেসব সরকারি কর্মী বা তাঁদের পরিবারের সদস্য এ রকম সম্পদের মালিক হবেন, তাঁদের এ কলামটি পূরণ করতে হবে। ফরমে আরও যেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে হবে সেগুলোর মধ্যে আছে নগদ অর্থ, ব্যাংকে রাখা অর্থ, ঋণপত্র, ডিবেঞ্চার, শেয়ার মালিকানা ও কোম্পানি বা মিউচুয়াল ফান্ডের অংশীদারত্ব, বিমা পলিসি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও ব্যক্তিগত ঋণ ইত্যাদি। আদেশ অনুযায়ী সরকারি কর্মীরা এ তথ্য প্রকাশ করা থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন, যদি তাঁদের সম্পদের পরিমাণ চার মাসের মূল বেতন বা দুই লাখ রুপির বেশি না হয়। গত নির্বাচনে ভারতীয় জনতা দলের (বিজেপি)
বিপুল বিজয়ের পর দলটির নেতা ও গুজরাটের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মে মাসে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর পরপরই তাঁর সরকার মন্ত্রীদের সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করতে বলে। এ পদক্ষেপ ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সাবেক সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা (ইউপিএ) সরকারের গৃহীত ব্যবস্থারই ধারাবাহিকতা মাত্র। মোদি সরকার নতুন মন্ত্রীদের তাঁদের সমুদয় সম্পদের বিস্তারিত তথ্য দুই মাসের মধ্যে দাখিল এবং সেই সঙ্গে ব্যবসায়িক বা অন্যান্য স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথাও বলেছিল। মন্ত্রীদের জন্য আরোপিত কঠোর বিধিমালায় ন্যায়বিচারের সঙ্গে নিজেদের কাজ সম্পাদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা তাঁদের বিব্রত করে এমন উপহার, অন্যায্য সুবিধা বা ঋণ গ্রহণকেও এড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে চার দশকের পুরোনো সরকারি চাকরিসংক্রান্ত বিধিমালায় ১৯টি নির্দেশনা সংযোজন করে মোদি সরকার। এগুলোতে বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবশ্যই রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ হতে হবে। তাঁদের সিদ্ধান্ত হতে হবে যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে এবং পক্ষপাতহীন। কর্মীদের কেবলই জনস্বার্থে কাজ করতেও বলা হয় এ বিধিমালায়।

৬৮ শতাংশ শিক্ষক কেন ফেল! by সিদ্দিকুর রহমান খান

পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বেসরকারি শিক্ষক ও হবু শিক্ষকদের পাসের হার প্রায় ৩২ শতাংশ হলে শিক্ষার্থী পাসের হার কীভাবে ৯২ শতাংশ হয়?
প্রায় একই পদ্ধতির পরীক্ষা এবং প্রায় একই পাঠ্যবই পড়ে ভিন্ন ভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় বসা শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পাসের হারে আকাশ-পাতাল ব্যবধান হয় কেন? এটা বোঝার আগে জেনে নিই বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য পাবলিক পরীক্ষা ও ফলাফলের আদ্যোপান্ত।
২১ আগস্ট দশম বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। এতে পাসের হার প্রায় ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ৬৮ শতাংশ ফেল। পরীক্ষার্থী ছিলেন সাড়ে তিন লাখের বেশি। এ পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়াধীন বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ বা এনটিআরসিএর।
এ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ বিভিন্ন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত, বাদবাকিরা হবু শিক্ষক। যদিও ২০০৫ সালের ২০ মার্চ থেকে কার্যকর হওয়া নিবন্ধন আইন অনুযায়ী বেসরকারি হাইস্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় এমপিও-ননএমপিওনির্বিশেষে সব শিক্ষকের নিবন্ধন সনদ বাধ্যতামূলক। জানামতে, শিক্ষক পদে চাকরির বাজারে নিবন্ধনধারী ব্যক্তির আকাল, সে বিবেচনায় নিবন্ধন সনদ ছাড়াই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে বাধ্য হচ্ছে স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষ।
চাকরিরত অনেকেই নিবন্ধন পরীক্ষা দেন। অনেকেই একাধিকবার পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারেননি। অথচ এ শিক্ষকেরাও জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসির প্রশ্নকর্তা, পরীক্ষার হলে পরিদর্শক, পরীক্ষক ইত্যাদি।
বিগত কয়েক বছরের নিবন্ধন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা যে পাঠ্যবই পড়ে এক হাজার ২০০ নম্বরের পাবলিক পরীক্ষায় বসে, শিক্ষকেরাও প্রায় একই বই পড়ে ২০০ নম্বরের নিবন্ধন পরীক্ষায় বসেন। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের জন্য আলাদা পরীক্ষায় ২০০ নম্বরের টানা চার ঘণ্টার পরীক্ষা দিতে হয়। এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার মতোই নির্দিষ্ট সিলেবাস থাকে এবং এর মধ্য থেকেই প্রশ্ন করা হয়। এ খাতাও মূল্যায়ন করেন স্কুল-কলেজের শিক্ষকেরাই।
২০০৫ সাল থেকে শুরু হয়ে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত মোট ১১টি শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার পাসের গড় হার ৩০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ ৭০ শতাংশ শিক্ষক তাঁদের জন্য পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করেন। এই হলো কর্মরত শিক্ষক বা হবু শিক্ষকদের গড় পাসের হার। দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি। এখানেই শিক্ষকতা করছেন নিবন্ধন পাস ও ফেল উভয় প্রকারের শিক্ষকেরা।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিসহ নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এসএসসি ও এইএসসি পরীক্ষার ফল। তবু তুলনার স্বার্থে সাম্প্রতিক এইচএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার পাসের হার উল্লেখ করছি। চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় ৩ শতাংশ বেশি।
১৩ আগস্ট প্রকাশিত আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ৭৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা গতবারের তুলনায় সাড়ে ৪ শতাংশ বেশি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবার জানা, ইংরেজি ও গণিত বিষয় দুটো পাবলিক পরীক্ষায় পাস-ফেলের নিয়ামক। চলতি ২০১৪ সালে ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ পরীক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছে। সামান্য কয়েকজন বাদে এ শিক্ষার্থীরাই ২০১৩ সালে দশম শ্রেণিতে ২০১২ সালে নবম, ২০১১ সালে অষ্টম, ২০১০ সালে সপ্তম ও ২০০৯ সালে ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া ছিল।
তারাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকাকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ও জেলা প্রশাসক এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত ১০০ নম্বরের প্রাক্-মূল্যায়ন সমীক্ষায় বসেছিল। পরীক্ষার নম্বর বিভাজন বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে মোট ৬০ এবং সমাজ ও বিজ্ঞানে ৩০ এবং ধর্মে ১০। পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে তৈরি করা প্রশ্নে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত প্রাক্-মূল্যায়ন সমীক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, শিক্ষার্থীরা কী ধরনের দুর্বলতা নিয়ে মাধ্যমিক শ্রেণিতে ভর্তি হয়, তা জানা।
আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা প্রায় সব জেলার মূল্যায়ন সমীক্ষার সমন্বিত ফলাফলের সারাংশ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জেলার উদাহরণ দিচ্ছি। ওই সমীক্ষায় ঢাকা মহানগরসহ ঢাকা জেলার মোট ২৬টি থানা/উপজেলার ষষ্ঠ শ্রেণির প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৩৯ শতাংশের বেশি ফেল করেছে। অর্থাৎ ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় বসে ২৯-এর কম নম্বর পেয়েছে।
এ সমীক্ষায় শূন্য থেকে ২৯ নম্বরধারীদের ফেল ও ৩০-এর বেশি পেলে পাস ধরা হয়। পাঠক, মিলিয়ে দেখুন, চলতি বছর এসএসসিতে ঢাকা বোর্ডের পাসের হার ৯৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ। মাত্র ৬ শতাংশ ফেল। আর এরাই যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল, তখন ফেলের হার ৩৯ শতাংশের বেশি। তা-ও আবার ঢাকা মহানগরসহ ঢাকা জেলায় যেখানে ভালো প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের সংখ্যা বেশি বলে দাবি করা হয়। এবার দেখুন, চট্টগ্রাম মহানগরসহ এ জেলার প্রায় ৭৭ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ফেল করেছে ৪৪ শতাংশ।
শিক্ষানগর হিসেবে খ্যাত রাজশাহী মহানগরসহ ১০ উপজেলার প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর ৪৬ শতাংশই ফেল। নানা বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ কুমিল্লা জেলা থেকে ৬৭ হাজার অংশ নিয়ে ফেল করেছে প্রায় ৪৮ শতাংশ। বরিশাল জেলার প্রায় ৩০ ও কিশোরগঞ্জের ৪৪ শতাংশ ফেল। শিক্ষামন্ত্রীর সিলেট বিভাগে এবার এসএসসিতে পাসের হার ৮৯ শতাংশের বেশি। কিন্তু ষষ্ঠ শ্রেণির প্রাক্-মূল্যায়ন সমীক্ষায় দেখা যায়, হবিগঞ্জের প্রায় ৫০ শতাংশ, সদরসহ সিলেট জেলার প্রায় ২৫ শতাংশ ও সুনামগঞ্জের প্রায় ৪৪ শতাংশ ফেল করেছে।
কেউ কেউ হয়তো বলতে চাইবেন, দক্ষ শিক্ষকদের সহায়তায় চার-পাঁচ বছরে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা অর্জন করে নিয়েছে এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী।
পাঠকের এ যুক্তির বিপরীতে বলতে চাই, ইংরেজি ও গণিতে হাজার হাজার দক্ষ শিক্ষক হঠাৎ নাজিল হওয়ার সুযোগ নেই। এরশাদের জমানায় ইংরেজি ও গণিত ছাড়াœ স্নাতক পাস করে যঁারা শিক্ষকতায় ঢুকেছিলেন, তাঁরাই এখন স্কুল-কলেজের সিনিয়র শিক্ষক। দু-চারজন ব্যতিক্রম বাদে কারা স্বেচ্ছায় বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক হন, তা–ও সবার জানা। কিন্তু কথা হচ্ছে, যা চলছে তাই কি চলতে থাকবে? কোথাও তো একটা ইতি টানতে হবে, যাতে করে একটা সুস্থ জায়গায় যাওয়া যায়।

সিদ্দিকুর রহমান খান, সাংবাদিক ও শিক্ষা গবেষক।

অনেক কঠিন সময় পার করেছি এটাও কেটে যাবে : নওয়াজ

‘কঠিন সময় অনেক পার করেছি, এই সংকটও কেটে যাবে’ এভাবেই বললেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। বুধবার পার্লামেন্টে ভাষণদানকালে পাকিস্তানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে গণতন্ত্রের বিজয় হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন নওয়াজ। ইমরান খান ও তাহির-উল কাদরির আন্দোলনে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার পর এই প্রথম পার্লামেন্টে ভাষণ দেন তিনি। পাক প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিই পাকিস্তান জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ২০ কোটি মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরছে।’ এ সময় নওয়াজ তার পদত্যাগের দাবি পরোক্ষভাবে এড়িয়ে গিয়ে বলেন, সবার সঙ্গে তিনি আলোচনা করতে রাজি আছেন। নওয়াজ বলেন, ‘১০টি রাজনৈতিক দলের ৯টিই গণতন্ত্রের পক্ষে রেজ্যুলেশনে ভোট দিয়েছেন। এটা পাকিস্তানের একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমার ভাবতে ভালো লাগছে তারা প্রধানমন্ত্রীর জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্য লড়ছেন।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যায় আর আসে, এক সরকারের পর আরেক সরকার আসে।
কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে সংবিধান ও গণতন্ত্র রক্ষা।’ তিনি আরও বলেন, ‘কত কঠিন সময় পার করে এলাম! ২০০৮ সালে আমাদের হাত-পা বাঁধা ছিল। আমরাও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। কই আমরা তো কারচুপি নিয়ে কান্না করিনি। পিপিপিকে আমরা পাঁচ বছর দেশ চালাতে দিয়েছি।’ ইমরানের বিরুদ্ধে নওয়াজ বলেন, ‘আমি নির্বাচিত হওয়ার পরে অসুস্থ ইমরানকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। তখন তিনি আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু এখন কারচুপি নিয়ে কান্না করছেন।’ এ সময় নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একটি কমিটি গঠনের কথা তুলে ধরেন নওয়াজ শরিফ।
নওয়াজের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণের নির্দেশ হাইকোর্টের
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফসহ পিএমএল-এন শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে এফআইআর নথিভুক্তের জন্য পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন লাহোর হাইকোর্ট। গত জুন মাসে লাহোর মডেল টাউনের সহিংসতার শুনানিতে মঙ্গলবার এ নির্দেশ দেন আদালত। পিটিআইয়ের ৩১ এমপির পদত্যাগপত্র গ্রহণ অবশেষে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) এমপিদের ‘পদত্যাগ নাটকের’ অবসান হয়ছে। গত মঙ্গলবার জাতীয় পরিষদ সচিবালয় পিটিআইয়ের পদত্যাগী ৩৩ এমপির মধ্যে ৩১ জনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে। জাতীয় পরিষদ সচিবালয়ের গণমাধ্যম শাখা জানিয়েছে, ৩১টি পদত্যাগপত্রের জন্য ২৬টি ঠিক ছিল। বাকি ৫টিতে সামান্য ত্র“টি থাকায় সংশোধন করে পুনরায় জমা দেয়ার জন্য পাঠানো হবে। পিটিআইয়ের তিন আইনপ্রণেতা গুলজার খান, নাসির খান খাত্তাক এবং মুসারাত আহমাদজেব এখনও তাদের পদত্যাগপত্র জমা দেননি। জাতীয় পরিষদে পিটিআইয়ের সংসদীয় দলের নেতা শাহ মেহমুদ কোরেশি দলের মধ্যে ভাঙনের কথা অস্বীকার করে জানান, তিন সদস্য ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য পদত্যাগপত্র জমা দিতে পারেননি।

সম্প্রচার কমিশনই–বা কী সুরক্ষা দেবে? by বদিউল আলম মজুমদার

৮ আগস্ট সিলেটে এক আলোচনা অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী সাংবাদিকদের অত্যন্ত অশালীন ভাষায় গালিগালাজ করেন। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘এরা সব খবিশ, চরিত্রহীন! স্বাধীন কমিশন হলে পরে দেখে নেব, তোমরা (সাংবাদিকেরা) কতটুকু যেতে পারো!’ অন্যদিকে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ১১ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সম্প্রচার নীতিমালা গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের জন্য নয়, বরং এর প্রতিটি ধারা গণমাধ্যমের জন্য কল্যাণকর ও সম্প্রচারে সহায়ক। তাঁর দাবি, সম্প্রচার নীতিমালায় তথ্য মন্ত্রণালয়কে কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয়নি; বরং মন্ত্রণালয় সম্প্রচার মাধ্যমের ওপর থেকে বিদ্যমান দায়িত্ব গুটিয়ে নিয়ে কমিশনের হাতে সেই দায়িত্ব অর্পণের জন্য স্বপ্রণোদিত হয়ে এই নীতিমালা প্রণয়ন করেছে (প্রথম আলো, ১২ আগস্ট ২০১৪)।

দুজন মন্ত্রী স্বাধীন সম্প্রচার কমিশনের ভূমিকা সম্পর্কে বিপরীতমুখী বক্তব্য দিয়েছেন। আমরা কাকে বিশ্বাস করব? আমরা কি শঙ্কিত হব, না আশ্বস্ত থাকব? এটা নির্ভর করবে ক্ষমতাসীনদের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর। এই সরকার অনেকগুলো কমিশন গঠন করেছে এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বহু নিয়োগ দিয়েছে। সৎ, যোগ্য, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনচেতা ব্যক্তিদের কি এসব ক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে? কমিশনগুলো কি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আচরণ করেছে এবং জনস্বার্থ সমুন্নত রেখেছে? নাকি ক্ষমতাসীনদের স্বার্থই হাসিল করেছে? এসব প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করবে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা।
সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকেই সন্দিহান এবং তার কারণও আছে। সরকার একটি ভোটারবিহীন জবরদস্তিমূলক তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে গত ৫ জানুয়ারি ক্ষমতায় ফিরে আসে। সেই নির্বাচনের আগে তাদের আশ্বাসবাণী শোনা যাচ্ছিল যে নির্বাচনের পর সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে, বছর দুইয়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করবে। কিন্তু নির্বাচনের পর তারা তাদের ভোল পাল্টে ফেলেছে এবং পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করছে। একই সঙ্গে তারা অতীতের দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, সহিংসতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অপশাসন অব্যাহত রেখেছে। তাই জনসমর্থনের দিক থেকে সরকার আরও চাপের মুখে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম এবং এর মাধ্যমে জনগণের কণ্ঠ স্তব্ধ করার দুরভিসন্ধি নিয়েই সরকার সম্প্রচার নীতিমালা করেছে, পরে এর ভিত্তিতে আইন করতে যাচ্ছে।
সম্প্রচার নীতিমালার অপব্যবহার করে সরকার গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিকের বাক্স্বাধীনতা হরণ করতে পারবে। কিন্তু এ ধরনের স্বাধীনতার ওপরই গণতন্ত্রের কার্যকারিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বহুলাংশে নির্ভরশীল। গত এপ্রিলে মার্কিন ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া অ্যাসিস্ট্যান্স’ কার্যক্রমের উদ্যোগে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিয়ে গত পাঁচ বছরের বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতার ওপর একটি গবেষণা চালানো হয়। বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশের ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে দেখানো হয় যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের বিকাশের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র আছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠারই পূর্বশর্ত। কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়।
এবার সরকারের গত পাঁচ বছরে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের অভিজ্ঞতার দিকে নজর দেওয়া যাক। সুপ্রিম কোর্টে ৬০ জনের অধিক বিচারক নিয়োগ দেওয়া ছাড়াও সরকার নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনে অনেকগুলো নিয়োগ দিয়েছে। এসব নিয়োগের অনেকগুলোরই যথার্থতা নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের বিষয়ে আসা যাক। ড. শামসুল হুদা, ছহুল হোসাইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন অত্যন্ত সম্মান ও যোগ্যতার সঙ্গে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার প্রাক্কালে কমিশনের পুনর্গঠন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মাননীয় রাষ্ট্রপতির উদ্যোগে সংলাপের আয়োজন করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তা ছিল লোক দেখানো ব্যাপার। কারণ সংলাপের পর যে অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়, তার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। অনুসন্ধান কমিটির অন্তত একজন সদস্য সম্পর্কে আমরা জানি, যিনি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের প্যানেলে ঢাকা বারের সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও জুন মাসে হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান (নিউ এজ, ২৮ জানুয়ারি ২০১২)। অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশে ২০১২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি সাবেক সচিব কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আমাদের দাবি সত্ত্বেও অনুসন্ধান কমিটি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো রূপ স্বচ্ছতা প্রদর্শন করেনি। কমিটি অন্য কাদেরকে মনোনয়নের জন্য বিবেচনা করেছিল এবং কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই পাঁচজনকে মনোনীত করেছিল, তা প্রকাশ করেনি (প্রথম আলো, ৩০ জানুয়ারি ২০১২)।
কাজী রকিবউদ্দীনের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কথা সবারই জানা। এই কমিশনের সহযোগিতার ফলেই বর্তমান ক্ষমতাসীন দল গত ৫ জানুয়ারির কলঙ্কজনক নির্বাচন অনুষ্ঠানে সক্ষম হয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও সহিংসতার পর নির্বাচন কমিশন তার দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অথচ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এটা স্পষ্ট যে, একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠনের ব্যাপারে সরকার সম্পূর্ণ ব্যর্থ। দুর্ভাগ্যবশত, অন্যান্য কমিশন গঠনের ব্যাপারেও সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। দুর্নীতি দমন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন ও তথ্য কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও জনমনে ব্যাপক সংশয় রয়েছে। কারণ, এগুলো হয় সরকারের স্বার্থ হাসিলের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে, না হয় ক্ষমতাসীনেরা অসন্তুষ্ট হবে এমন সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থেকেছে। তাই সম্প্রচার কমিশন গঠনের মাধ্যমে যে সরকার গণমাধ্যম ও জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার টুঁটি চেপে ধরবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। কারণ, এ ব্যাপারে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই বললেই চলে। সুতরাং সম্প্রচার কমিশন গঠন গণমাধ্যম ও নাগরিকের বাক্স্বাধীনতার রক্ষাকবচ নয় এবং সম্প্রচার নীতিমালা–সম্পর্কিত সরকারের উদ্যোগে নাগরিক হিসেবে আমরা সত্যিই শঙ্কিত।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক।

কেন জরুরি সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর by মো. নজরুল ইসলাম

ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর স্বভাবতই বঙ্গোপসাগরবিধৌত বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিপুল সম্ভাবনা।

উল্লে­খ করা যেতে পারে, বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রতিবছর গড়ে ৬ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে স্বভাবতই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের মাধ্যমে প্রতিবছর আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিবছর জাহাজ আগমন বৃদ্ধির হার ১১ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশের বর্তমান সমুদ্রবন্দরগুলো দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ফলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক-ব্যবসায়িক সুবিধা অর্জন করতে পারেনি। অর্থাৎ, ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা আদায়ে বাংলাদেশ কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।

বর্তমানে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের পোতাশ্রয়ে মাদার ভেসেল ও বৃহৎ​​ কনটেইনার নোঙর করতে পারে না। গভীরতা কম হওয়ায় মাত্র ১৮ শতাংশ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে প্রবেশ করতে পারে। আধুনিকায়ন করা হলেও অবস্থার বিশেষ উন্নতি হবে না। বড় জাহাজগুলো গভীর সমুদ্রে নোঙর করার পর ছোট ছোট জাহাজ বা ট্রলারে মালামাল চট্টগ্রাম বন্দরে আনা-নেওয়া করা হয়। ফলে একদিকে সময় বেশি লাগে, অন্যদিকে ব্যয় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্দর দুটিতে জাহাজজটের কথাও প্রায়ই শোনা যায়।

এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়েই দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ঐকমত্য পোষণ করে। বেশ কয়েকটি স্থান জরিপ করার পর জাপানি প্রতিষ্ঠান পেসিফিক কনসালট্যান্ট ইন্টারন্যাশনাল কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সুপারিশ করেছে। প্রস্তাবিত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ জাহাজ প্রবেশ করতে সক্ষম হবে। এক প্রতিবেদনে তারা বলেছে, সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোর সংযোগ সাধন করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটাবে। সম্ভাব্যতা যাচাই ২০০৯ সালে সম্পন্ন হলেও সামর্থ্যের অভাবে বন্দর নির্মাণের কাজ এখনো শুরু করা সম্ভব হয়নি। বন্দর নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। ২০৫৫ সালের মধ্যে তিন পর্যায়ে বন্দর নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হয়েছিল। বিভিন্ন কারণে বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হয়নি। ফলে সময় আরও বাড়বে, ব্যয়ও সে হারে বৃদ্ধি পাবে।

সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্রে এ অঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিণত হবে। বন্দরটি ব্যবহার শুরু হলে পরিবহন ব্যয় আনুমানিক ১৫ শতাংশ হ্রাস পাবে। এ ছাড়া বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক বিনিয়োগ হবে, সারা দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে। কালক্রমে ব্যবসা-বাণিজ্যের দিক থেকে বাংলাদেশ সিঙ্গাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশে রূপান্তরিত হবে বলে আশা করা যায়। প্রতিবেশী দেশগুলো এ বন্দর ব্যবহার করলে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে লাভবান হবে। এ বন্দরকে কেন্দ্র করে নিকটবর্তী এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, অবকাঠামোগত ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হবে। ফলে কর্মসংস্থান বিপুলভাবে বাড়বে। আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়বে। তেল-গ্যাস ও অন্যান্য সমুদ্রসম্পদ আহরণ ও ব্যবহারের সুযোগ বাড়বে। সার্বিকভাবে বাৎসরিক জিডিপি বৃদ্ধির হার ২ শতাংশ হবে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। অন্যদিকে, নিরাপত্তার হুমকি দেখা দিলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য বিকল্প নৌঘাঁটি হিসেবে বন্দরটি ব্যবহার করা যাবে।

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে সনাতন ধারার সমুদ্রবন্দরগুলো বিকাশমান অর্থনীতির ভার বহনে যে আর সক্ষম হবে না, তা প্রতিবেশী দেশগুলো অনেক আগেই উপলব্ধি করে এবং ক্রমবর্ধমান ব্যবসা-বাণিজ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ইতিমধ্যে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। ভারতও বঙ্গোপসাগরে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে বলে জানা যায়। অবশ্য এতে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা বা গুরুত্ব কোনোভাবেই কমবে না। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যের চাহিদা পূরণে যে সুবিধা দেবে, অন্য কোনো আঞ্চলিক বন্দর ততটা করবে না বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। সোনাদিয়া সমুদ্রবন্দর ব্যবহারকারী দেশের সংখ্যাও বেশি হবে বলে আশা করা যায়।

বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনসহ কয়েকটি দেশ আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে যে দেশের সঙ্গেই বন্দর নির্মাণের চুক্তি হোক, দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। গভীর সমুদ্রবন্দরের নকশা, নির্মাণ ও পরিচালনায় বাংলাদেশকে সম্পৃক্ত থাকতে হবে। অবশ্যই গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসংক্রান্ত চুক্তি সব ধরনের বিতর্ক বা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের গোয়ারদার ও শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করেছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কুয়াকফুতে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করছে। এই প্রেক্ষাপটে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাববলয় বিস্তৃত হওয়া নিয়ে কৌশলগত কারণে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অস্বস্তি আছে। সামরিক ও নিরাপত্তাগত কারণে চীন ও ভারত উভয়েই বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ চায়। বাংলাদেশের জন্য ভূকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমার ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরি।

এ অঞ্চলের সাগর-মহাসাগরে প্রভাব বিস্তারে চীন ও ভারতের নৌবাহিনীর প্রতিযোগিতা বেশ পুরোনো। আবার এ অঞ্চলে চীনের নৌশক্তি বৃদ্ধি পাক, তা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নয়। চীনের সঙ্গে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ চুক্তি হলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র যাতে বিরোধিতা না করে, সে জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশকেই নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, প্রতিবেশী দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গিদের টার্গেট হতে পারে এ বন্দর।

কৌশলগত কারণে চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ। চীনের আগ্রহের পেছনে কারণ মূলত দুটি: প্রথমত, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের উপস্থিতি জোরদার করা, যার ফলে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে দেশটির প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে চীনের আমদানি করা তেলের সিংহভাগ এই পথেই পরিবাহিত হয়ে থাকে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নিকটবর্তী চীনের ভূবেষ্টিত ইউনান প্রদেশের উন্নয়ন জোরদার করা। চীনের কুনমিন প্রদেশও প্রস্তাবিত বন্দরটি ব্যবহার করতে পারবে। ফলে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে চীনের নৌ ও সড়কপথের দূরত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

একইভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য, কলকাতা ও হালদা বন্দর, মিয়ানমার এবং ভূবেষ্টিত নেপাল ও ভুটান তাদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে এ বন্দর ব্যবহার করবে বলে আশা করা যায়। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর-পূর্ব এশিয়ার কেন্দ্রস্থলে অবস্থানের কারণে আশিয়ান ও উপসাগরীয় দেশগুলোরও এ বন্দর ব্যবহারের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতা ও যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এসব দেশের সঙ্গে কার্যকর বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে সব পক্ষই লাভবান হবে। প্রকৃতপক্ষে, অবস্থানগত কারণে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট সব দেশই পণ্য পরিবহনে ব্যয় ও সময় সাশ্রয়ের সুযোগ পাবে। এ কথা বলা অতিরঞ্জিত হবে না যে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে ভারত, চীন, নেপাল ও ভুটানও অর্থনৈতিক দিক থেকে বিপুলভাবে লাভবান হবে।

অতএব, দেশের ক্রমবর্ধমান ব্যবসা-বাণিজ্য এগিয়ে নিতে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ জরুরি হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক নৌ–চলাচল বর্তমানে খুবই প্রতিযোগিতামূলক। বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর আন্তর্জাতিক নৌপথের নিকটবর্তী এবং সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত না হলে আমরা বিশাল সমুদ্র এলাকার ও দেশের ভৌগোলিক অবস্থানের সুবিধা লাভে ব্যর্থ হব। অতএব, কালক্ষেপণ না করে এ বিষয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা প্রয়োজন।

মো. নজরুল ইসলাম: বিশেষ প্রতিনিধি ও বিশ্লেষক, প্রথম আলো।

রিগ্যান থেকে রাষ্ট্রদূত by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বাঙালির শত শত বছরের আইন-আদালত ও মামলা-মোকদ্দমার ইতিহাসে যিনি ছিলেন সবচেয়ে শক্তিধর আসামি, তাঁর নাম রোনাল্ড রিগ্যান। তাঁর প্রিয়তমা পত্নী ন্যান্সি তাঁকে আদর করে ডাকতেন রন। রিগ্যানের জীবনে সংকট দেখা দিয়েছিল দুবার। একবার ১৯৮১-তে যখন তিনি হিলটন হোটেলের সামনে আততায়ীর দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েও ঈশ্বর ও ডাক্তারদের কৃপায় বেঁচে যান। তাঁর জীবনের দ্বিতীয় বিপদ দেখা দেয় এক দেওয়ানি মামলার আসামি হিসেবে যখন ঢাকার তৃতীয় মুন্সেফ কোর্টের সমন জারি হয় তাঁকে সশরীরে আদালতে হাজিরা দিতে। আমেরিকার ৪০তম প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশের আদালত সমন জারি করেন। কাজ-কাম ফেলে ঢাকা জেলা জজকোর্টে হাজিরা দেওয়া তাঁর জন্য বেশ ঝামেলার ব্যাপারই ছিল।
ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস নির্মাণের জন্য জমি দরকার। সোভিয়েত ইউনিয়ন না ভাঙলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই দুনিয়ার এক নম্বর সুপারপাওয়ার। তাদের দূতাবাসের জন্য একটি জুতসই জায়গা চাই। আমাদের সামরিক সরকার একটি ফাঁকা জায়গা পেল তৎকালীন শেরাটন হোটেলের পশ্চিম দিকে পিজি হাসপাতালের পেছনে। জায়গাটি ছিল ঢাকার নবাবদের। মার্কিন দূতাবাসের জন্য সরকার সেটা বরাদ্দ করে।
ঢাকার খাজা পরিবারের ‘কোর্ট অব ওয়ার্ডে’র কেউ একজন সোজা চলে যান জজকোর্টে। সেখানে তৃতীয় মুন্সেফের আদালতে ওই জমি বরাদ্দের বিরুদ্ধে এক মামলা ঠুকে দেন। তার এক নম্বর আসামি মি. রোনাল্ড রিগ্যান। পিতা মৃত অমুক। সাকিন হোয়াইট হাউস। ওয়াশিংটন ডিসি। অভিনয় ছেড়ে দিয়ে বর্তমান পেশা রাজনীতি। আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।
মামলায় মুন্সেফের নির্দেশে পেশকার সমন জারি করেন। সমন নিয়ে আটলান্টিকের ওপারে বিমান ছাড়া যাওয়া সম্ভব নয় বলে সাইকেলে চড়ে পেয়াদা ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে যান। খবর পেয়ে দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা গেটের কাছে এসে পেয়াদাকে বলেন, যাঁর বিরুদ্ধে সমন হয়েছে তিনি এখানে থাকেন না। থাকেন ওয়াশিংটনে। সেখানেই সমন পাঠিয়ে দিন। সমন পেলে তিনিই সিদ্ধান্ত নেবেন যে ঢাকার তৃতীয় মুন্সেফের কোর্টে এসে হাজিরা দেবেন, নাকি দেবেন না। না এলে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।
পেয়াদা ফিরে আসার পর ব্যাপারটা আর বেশি দূর গড়ায়নি। কাগজে খবর বেরোনোর পরই সরকার বলে, কম্ম কাবার। আসামিকে প্রটোকল ও নিরাপত্তা দেওয়ার সাধ্য বাংলাদেশ সরকারের নেই। তাড়াতাড়ি সরকার মার্কিন দূতাবাসের জন্য বারিধারায় জমি বরাদ্দ দেয়।
উল্লেখযোগ্য যে নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগের সরকার ওই জমিটি তাদের একজন প্রিয় ব্যবসায়ী ও ওষুধ কোম্পানির মালিককে বরাদ্দ দেয়। এবারও তা নিয়ে কোর্ট-কাছারি হয়। আওয়ামী শিল্পপতির সেই মামলায় আইনজীবী ছিলেন একজন বিখ্যাত ব্যারিস্টার, যিনি বিএনপির একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা।
কথায় আছে, কাজ না থাকলে বাঙালি চাচার নামে মামলা দেয়। সম্পাদক-প্রকাশক-রিপোর্টারদের বিরুদ্ধে যখন-তখন মামলা ঠুকতে ঠুকতে বাঙালি এখন যার-তার বিরুদ্ধে মামলা হাঁকাচ্ছে। এবার আসামি বাংলাদেশে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি ইয়ুন-ইয়াং। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দায়ের করা মামলায় তাঁকে সমন দেওয়া হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে সমনটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঢাকার প্রথম যুগ্ম জেলা আদালত ১০ সেপ্টেম্বর সকাল নয়টায় লি ইয়ুন-ইয়াংকে হাজির হতে গত ১০ জুলাই নোটিশ দেন।
মান্যবর রাষ্ট্রদূত প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘আমি আশা করব, ভবিষ্যতে কোনো কূটনীতিককে সমন করার আগে আদালত ভিয়েনা কনভেনশন অনুসরণের মাধ্যমে সতর্কভাবে পদক্ষেপ নেবেন।’ এটা ছিল কূটনীতির ভাষার কথা।
মান্যবর রাষ্ট্রদূত জানেন না যে ভিয়েনা কনভেনশন বস্তুটি কী, তা আমাদের সব বিজ্ঞ বিচারক এবং আইনজীবী জানতে বাধ্য নন। আর সতর্কতা বলে কোনো শব্দ যদি বাঙালির জীবনে থাকবে তাহলে ১২০ বছর আগে স্বভাবকবি গোবিন্দ দাস কেন লিখবেন: ‘বাঙালি মানুষ যদি প্রেত কারে কয়?’
বাস্তবতা হলো, লক্ষ্মণ সেন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত কোনো বাঙালিরই রাষ্ট্র চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। এ রাষ্ট্রে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ছাড়া আর কাউকেই জবাবদিহি করতে হয় না তাঁর অকাজ-কুকাজের জন্য। যে মুন্সেফ রিগ্যানকে সমন করেছিলেন, তাঁকে জবাবদিহি করতে হয়নি। মিস্টার লিকে সমন জারির যে [ফজলে] এলাহি কাণ্ড—এই মাননীয় জজকেও কোনো জবাবদিহি করতে হবে না। আইন মন্ত্রণালয় যদি তাঁকে কোনো চিঠিপত্র দেয়, তিনি এক কথায় সব শেষ করে দেবেন: তখন আমি শোক দিবসের অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, ব্যস।
মিস্টার লি এবং অন্যান্য বিদেশি কূটনীতিক বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা নিয়ে যাঁর যাঁর দেশে ফিরে যাবেন।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে by মুনির হাসান

সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ব্যারোফোর্ড প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন। তাঁর সেই চিঠি বিবিসি প্রকাশ করার পর থেকে তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। চিঠিতে প্রধান শিক্ষক কেবল লিখিত পরীক্ষাই যে জীবনের সব নয়, সে কথাটি তাঁর শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। সেই চিঠিতে তিনি যা লিখেছেন, তার ভাবার্থ হলো—
প্রিয় চার্লি ওয়েন,
‘আনন্দের সঙ্গে আমি তোমার পরীক্ষার ফলাফল এর সঙ্গে পাঠাচ্ছি। তোমাকে নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত, কারণ এই কৌশলী সপ্তাহে তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে অনেক পরিশ্রম করেছ।
‘কিন্তু আমরা এও জানি, এই পরীক্ষাগুলো তোমাদের বিশেষত্ব বা এককত্বকে কখনো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। এগুলো যারা তৈরি করেছে এবং মূল্যায়ন করে তোমাকে নম্বর দিয়েছে, তারা তোমাদের প্রত্যেককে চেনে না, যেমনটি তোমাদের শিক্ষকেরা চেনেন বা তোমাদের পরিবার জানে। তারা জানে না যে তোমাদের মধ্যে অনেকেই দুটো ভাষা জানো। তুমি যে একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারো, পারিবারিক অনুষ্ঠানে গান গাও কিংবা চমৎকার ছবি আঁকতে পারো, তার খবর তারা রাখেই না। তারা তো জানে না, তোমার হাসি কেমন করে একটি দিনকে রাঙিয়ে তুলতে পারে, খেলার মাঠে তোমার বন্ধুরা তোমার জন্য কেন অপেক্ষার প্রহর গোনে। তোমার কবিতা, গান লেখার খবর যেমন তারা রাখে না, তেমনি স্কুল ছুটির পর তুমি যে তোমার ছোট ভাই বা বোনকে পরম মমতায় আগলে রাখো, সেটাও কিন্তু তারা জানে না। ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমার ভাবনা, পৃথিবীর সুন্দর সুন্দর দেশ ঘুরে বেড়ানোর তোমার অভিজ্ঞতা—এগুলোও কী তারা জানে? জানে না। তুমি যে চমৎকার গল্প করতে পারো, নিকটজনের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসো—এগুলোর খবরও তারা পরোয়া করে না। কাজে তারা জানে না যে তুমি একজন বিশ্বস্ত, চিন্তাশীল এবং প্রতিদিনই তুমি ক্রমাগত ভালো করার চেষ্টা করছ। পরীক্ষার নম্বরগুলো তোমাকে কিছু বিষয় জানাবে বটে, তবে তা কখনো সবকিছু নয়।
‘কাজেই তোমার পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে গর্ব করো, সেটিকে উপভোগ করো। কিন্তু মনে রাখবে, জীবনে চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে।’
চিঠিটি আমি যতবারই পড়ি, আমার চোখের সামনে আমার বন্ধুর মুখ ভেসে ওঠে। তার মেয়েটি এবার সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছে। প্রতিটি পরীক্ষার শেষে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়, স্কুল তাকে ছাড়পত্র দিয়ে দেবে যদি না সে পরীক্ষায় আরও ভালো করে। মেয়েটি ভালো ছবি আঁকে, কয়েকটি বিষয়ে ভালোও করে। কিন্তু তার মুখস্থের ক্ষমতা কম। ফলে সে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পায় না। স্কুল তাকে নিয়ে চিন্তিত, কারণ তার জন্য জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলে স্কুলের পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্কুলের র্যাঙ্কিং নিচে নেমে যাবে!
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে এমন অনেক অভিভাবকের সঙ্গে আমার নিয়ত দেখা হয়। তাঁরা ঠিক বুঝতে পারেন না, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েকে এত তাড়াতাড়ি দু-দুটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হবে, যেখানে কিনা কেবল কিছু প্রশ্নের লিখিত উত্তর দিতে হয়! শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবলই লিখতে পারা? আর সবারই বা কেন জিপিএ-৫ পেতে হবে?
অভিভাবকদের কোনো সদুত্তর দিতে পারি না। কারণ, মনে হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার সব উদ্দেশ্য পাসের মধ্যে গিয়ে ঠেকেছে। অনেক ভালো উদ্যোগও কিন্তু ওই পাস-ফেলের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসচেতনতার কথাই ধরা যাক। এখন আলাদা করে প্রতিটি ক্লাসে এই বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু যখনই কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবেন, দেখবেন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ভালো করে হাত না ধুয়েই খাবার টেবিলে বসে পড়ছে। খাওয়া শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুতে সবারই কিন্তু আগ্রহ আছে! তাদের অনেকেই কিন্তু জানে, ‘খাওয়ার আগে ভালোমতো হাত পরিষ্কার করতে হয়’। শুধু যে জানে তা নয়, বরং খবর নিলে দেখা যাবে, সেগুলো পরীক্ষার খাতায় লিখে রীতিমতো শতভাগ নম্বর পাচ্ছে। কিন্তু ওই নম্বর দিয়ে ওর কী লাভ হচ্ছে? ও কি আদতেই স্বাস্থ্যসচেতন হতে পারছে?
১১ আগস্ট প্রথম আলোয় ‘শিক্ষার্থীরা পড়ছে না কেন?’ শিরোনামের আমার একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে। সেটি পড়ে একজন আমাকে লিখেছেন, ‘আপনার এই লেখাটি পড়ে আমি অনেক কষ্ট পাচ্ছি এই সময়ের স্টুডেন্টদের জন্য। আমার ছোট ভাইও এবার পিএসসি পরীক্ষা দেবে, অথচ তার পাঠ্যবই পড়ার কোনো রকম আগ্রহ নেই, গল্পের বই পড়ার তো প্রশ্নই আসে না। আগে আমি যখন বছরের শুরুতে নতুন বই হাতে পেতাম, অনেক আগ্রহের সঙ্গে নতুন বইগুলো পড়তাম, কিন্তু আমার ভাই কারণ ছাড়া বইগুলো হাতেও নেয় না। ওর স্কুল থেকে বলে দিয়েছে, ওই গাইডটা কিনতে। এরপর ওই গাইড কিনে এনে সে পরীক্ষার প্রশ্নগুলো মুখস্থ করছে। এভাবে পড়ে যদি সে এ-প্লাসও পায়, তাহলেই বা কী?’
শিক্ষার উদ্দেশ্য কিন্তু কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করা নয়; বরং শিক্ষা তখনই সফল হয়, যখন কিনা একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, জানা বিষয়গুলো প্রয়োগ করতে পারে, আশপাশের প্রকৃতিকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, সতীর্থদের সঙ্গে যেমন আনন্দের সঙ্গে কাটাতে পারে, তেমনি বড়দের সম্মান আর ছোটদের স্নেহ করতে শেখে। কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়ে আর যাই হোক, শিক্ষার্থীর নানান দিক কোনোভাবেই জানা সম্ভব হয় না। আধুনিক শিশুশিক্ষার অন্যতম সূচনাকারী মন্টেসরি তো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার চেয়ে সার্বক্ষণিক মূল্যায়নে জোর দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা কি পরস্পরকে সহযোগিতা করছে, ক্লাসের শৃঙ্খলা মেনে চলছে—এসবও কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠার ব্যাপারটা প্রভাবিত করে। আমাদের পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় এসব মূল্যায়নের সুযোগ কই? কেবল মুখস্থ ক্ষমতার দৌড় দেখা ছাড়া?
আমাদের শিক্ষাকর্তাদের কাছে আমার আবেদন থাকবে, অনুগ্রহ করে প্রাথমিক সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রভাব এবং এগুলো আদৌ কোনো উপকার করছে কি না, তা ঠিকমতো জেনে এ ব্যাপারে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিন। আমাদের ছেলেমেয়েরা জানুক, চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে এবং তাদের শৈশব আনন্দময় হোক।
মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক, প্রথম আলো এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি

পদোন্নতির ভারে নড়বড়ে জনপ্রশাসন by আলী ইমাম মজুমদার

কোনো প্রতিষ্ঠান তার তুলনামূলক কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মেধাবী, দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পদোন্নতি দিয়ে ওপরের স্তরে ক্রমান্বয়ে নিয়ে যায়। সে পদোন্নতি হয় প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও কর্মপরিধির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এতে প্রতিষ্ঠানের কাজে বাড়ে গতিশীলতা। পাশাপাশি পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা উচ্চতর বেতন, সুযোগ-সুবিধাদি ও মর্যাদা উপভোগ করেন। বৃদ্ধি পায় তাঁদের কর্মপরিধি। এ ধরনের পদোন্নতি কর্মকর্তাদের জন্যও প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। এর সুফলও ভোগ করে সে প্রতিষ্ঠানটি। জনপ্রশাসনও এমনই একটি প্রতিষ্ঠান। যুগে যুগে এখানেও এ উদ্দেশ্যেই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু গত কয়েকটি সরকারের সময়ে এর লক্ষ্য থেকে বিচ্যুতি নজরে আসতে থাকে। পরিণতিতে পদোন্নতির সুফল চাপা পড়ে গেছে। বরং এটা ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে ফেলছে জনপ্রশাসনকে। পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে পদ-পদবি সংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বেশি। আবার সে পদোন্নতি বিবেচনায় রাজনৈতিক প্রেক্ষিতকে ব্যতিক্রমহীনভাবে সামনে রাখা হচ্ছে।

নির্বাচনের আগে জাতির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও কোনো সরকারই এ প্রবণতা থেকে পিছু হটছে না। তাই প্রশাসনকাঠামোটি ক্রমান্বয়ে হয়ে পড়ছে নড়বড়ে। পদোন্নতি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাঠামোকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে নড়বড়ে আর কর্মকর্তাদের একটি অংশকে হতোদ্যমও করতে পারে। সেটা আমাদের প্রশাসনের হালচাল পর্যালোচনা করলে সহজেই বুঝতে পারা যায়।

সব দেশেই যেকোনো ধরনের সরকারব্যবস্থায় একটি বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো থাকে। সে কাঠামোটি যত মজবুত আর কার্যকর হয়, তত বেশি দক্ষ হয় সে সরকার। সুফল ভোগ করে জনগণ। আর তা করতে প্রয়োজন নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, পদায়ন ও পদোন্নতিকালে মেধা ও উপযুক্ততার যথার্থ মূল্যায়ন। তদুপরি আবশ্যক উপযুক্ত বেতনকাঠামো। আরও প্রয়োজন আইনানুগ দায়িত্ব সম্পাদনে তাদের ওপর অকারণ হস্তক্ষেপ বন্ধ করা। দুর্ভাগ্যবশত আমরা কয়েক যুগ ধরে এর কোনোটিই যথার্থভাবে করতে পারছি না। এখানে রয়েছে নিয়োগে কোটার বিবেচনাহীন বৈষম্যমূলক অনুপাত। ফলে সূচনাতেই মেধাবীদের একটি অংশ হয় নির্বাসিত। নেই উপযুক্ত প্রশিক্ষণব্যবস্থা। বেতন-ভাতাদিও অপ্রতুল। পদায়ন ও পদোন্নতিতে চলছে যথেচ্ছ দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি।

আইনানুগ দায়িত্ব সম্পাদনে সব স্তরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এখন অনেকটা প্রশাসনিক সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে গেছে। কয়েকবার সরকার পরিবর্তনেও এসব বিষয়ে ইতিবাচক কোনো ধারা চালু হয়নি। ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রশাসন-যন্ত্রটির কার্যকারিতা ক্রমহ্রাসমান। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সরকারের দক্ষতায়। এ অভিযোগ দেশি-বিদেশি সব মহলে। এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘকাল অনেক লেখালেখি, সভা-সেমিনার হয়েছে ও হচ্ছে। কিন্তু অবস্থার ক্রমাবনতি মোটেই থেমে নেই।

এ অবনতিশীল অবস্থার জন্য বেশ কিছুকাল ধরে পদোন্নতির যে সংস্কৃতি চলছে, তা অনেকাংশে দায়ী। পর্যালোচনা করা আবশ্যক এসব পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নতুন কর্মপরিধি আর বঞ্চিত ব্যক্তিদের অবস্থান নিয়ে। পদোন্নতি দেওয়ার জন্য এখন প্রাতিষ্ঠানিক চাহিদা অনেকটাই সংগতিহীন। নচেৎ বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবের এক হাজার ৩৬৭ নিয়মিত পদের বিপরীতে দুই হাজার ৪৮৭ জন নিয়োজিত থাকতেন না। অর্থাৎ চাহিদার দ্বিগুণ কর্মকর্তা রয়েছেন এ তিনটি স্তরে। আরও পদোন্নতি প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন। আশা করা যায়, শিগগির বেশ কিছু হবে। মধ্যম ও সিনিয়র স্তরের এ তিনটি পদে দ্বিগুণ সংখ্যক কর্মকর্তা থাকলেও ভিত্তিস্তরে (সহকারী সচিব/সিনিয়র সহকারী সচিব) কিন্তু শূন্য রয়েছে প্রায় অর্ধেক পদ। স্বাভাবিক নিয়মে কোনো সংস্থার সাংগঠনিক কাঠামো হওয়ার কথা পিরামিড আকৃতির। তবে এখন হয়ে পড়েছে হালকা ভিতের ওপর স্থূলকায় একটি কাঠামো। ফলে নড়বড়ে হওয়ারই কথা।

প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়: অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিবের নিয়মিত ১০৭, ৪৩০ আর ৮৩০টি পদের বিপরীতে ‘কর্মরত’ রয়েছেন যথাক্রমে ২৭৩, ৯১৯ আর এক হাজার ২৯৪ জন কর্মকর্তা। তাঁদের ভারে সচিবালয় এমনকি কোনো দপ্তর-অধিদপ্তর বা সংস্থাও আজ ভারাক্রান্ত। তাঁদের বেশির ভাগই এক ধাপ নিচে কাজ করেন। অনেকেই প্রাধিকার অনুযায়ী পাননি অফিস, সহায়ক কর্মচারী আর গাড়ি।

সংবিধানের নির্দেশনা অনুসারে রাষ্ট্রপতি প্রণীত রুলস অব বিজনেসে সরকার পরিচালনার বিধানাবলি সন্নিবেশিত আছে। এতে মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকেন মন্ত্রীর পরেই সচিব। এর পরের স্তরের নাম অনুবিভাগ। অনুবিভাগের প্রধান হবেন অতিরিক্ত সচিব কিংবা যুগ্ম সচিব। এর নিচের স্তর অধিশাখার প্রধান হবেন উপসচিব। অর্থাৎ যুগ্ম সচিবেরা অতিরিক্ত সচিবের অধীনে নন। অথচ এখন প্রায় সব মন্ত্রণালয়-বিভাগে যুগ্ম সচিবেরা নথি পেশ করছেন অতিরিক্ত সচিবের মাধ্যমে। এটা রুলস অব বিজনেসের সরাসরি ব্যত্যয় আর অযাচিত কালক্ষেপণ। প্রকৃতপক্ষে, যুগ্ম সচিবদের অনেকেই উপসচিবদের অধিশাখা দখল করে বসে আছেন। উপসচিব সামাল দিচ্ছেন শাখা। এতে পদোন্নতিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কর্মপরিধি বেড়েছে, এমনটা বলা যাবে না। তাই তাঁদের মাঝে পদোন্নতির তৃপ্তি পরিপূর্ণ হওয়ার কথা নয়।

পদোন্নতি দেওয়ার সময় কারও রাজনৈতিক আনুগত্য ‘যাচাই’ আর প্রতিকূল মনে হলে তাঁকে বঞ্চিত করা আজ অন্তত দুই দশকের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর সে ‘যাচাই প্রক্রিয়াও’ অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও যথার্থ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদেরই একটি অংশ প্রতিটি সরকারের সময়ে ‘আমাদের লোক’ হয়ে যায়। তারাই তালিকা বানায় ‘ওদের লোকদের’। ফলে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাদ পড়ে যান নিছক ছাপোষা কর্মকর্তারা। বিশেষ করে নিরপেক্ষ ও অনমনীয় চরিত্রের অধিকারী বেশ কিছু কর্মকর্তা সব সরকারের সময়েই চিহ্নিত হচ্ছেন ‘ওদের লোক’ বলে। ফলে ওঁরা আজ জনপ্রশাসনে বিপন্ন প্রজাতি হতে চলছেন। অধিকতর দক্ষ, মেধাবী ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করে তুলনামূলকভাবে সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা বেশ কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছেন।

এটা মেনে নিতে হবে যে, চাকরিতে সবাই পদোন্নতি পাবেন না। ওপরের দিকে ক্রমান্বয়ে পদ কমতে থাকে। তাই প্রতি স্তরেই বেশ কিছু বাদ পড়ে যাবেন। এ বাছাই–প্রক্রিয়াটি যদি স্বচ্ছ ও বস্তুনিষ্ঠ হয়, তাহলে বাদ পড়ে যাওয়া কর্মকর্তারা ব্যথিত হলেও কারও কিছু করার নেই। তাঁদের বঞ্চিতও বলা যাবে না। কিন্তু বেশ কিছু ক্ষেত্রে ঠিক এমনটি ঘটছে না, এ অভিযোগ অতিশয়োক্তি নয়।

মেধাবী, দক্ষ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতিবঞ্চনা আর ক্ষেত্রবিশেষে ওএসডি করার ঘটনা এখন আর আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার আবশ্যকতা নেই। অথচ এসব বঞ্চিত কর্মকর্তার মধ্যে বেশ কিছু অধিকতর যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। সমৃদ্ধ হতো সরকারের কার্যাবলি।

এ ধরনের পদোন্নতিতে ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড। যুগবাহিত ঐতিহ্যে আজ ধস নেমেছে। অকারণে পদোন্নতিবঞ্চিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাজ করতে হচ্ছে কনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের অধীনে। ক্ষেত্রবিশেষে অধীন কর্মকর্তারা মেধা ও মননে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চেয়ে উঁচু মানের।

একই মন্ত্রণালয়ে একই ব্যাচের উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও অতিরিক্ত সচিব কাজ করছেন। পদোন্নতি–প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও নৈর্ব্যক্তিক হলে এ বিষয়ে তেমন কোনো প্রশ্ন থাকত না। তবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে তা নয় বলে এ ধরনের অধীনস্থদের কাছে উপরস্থ কর্মকর্তারা সহজাত আনুগত্য আশা করতে পারেন না। পেতে পারেন নিছক আইনি আনুগত্য। মাঠ প্রশাসনেও কিছু ক্ষেত্রে এমনটা ঘটছে বলে জানা যায়। ফলে কাজকর্মে বেশ কিছু ক্ষেত্রে একটি নীরব অনীহা বিঘ্নিত করছে গতিশীলতা। অদক্ষতাও চেপে বসেছে স্তরে স্তরে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সংস্কৃতিতে এমনটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতি এখনো শক্ত ভিত নিতে পারেনি। বরং পারস্পরিক বৈরিতায় আজ প্রধান দুটি দলের মুখ-দেখাদেখিও বন্ধ। এ অবস্থায় একটি শক্তিশালী ও দলীয় বৃত্তের বাইরে থাকা জনপ্রশাসন যেকোনো অবস্থায় যেকোনো সরকারকে সেবা দিতে পারে। বিপন্ন এ প্রতিষ্ঠানটি বহুতর সমস্যার মধ্য দিয়ে চলছে। সরকার চাইলেই এর বেশ কিছু সমাধান সম্ভব। তার মধ্যে রয়েছে পদোন্নতিজনিত বর্তমান অবস্থা পরিহার, যা হওয়ার হয়ে গেছে৷ নির্দিষ্ট পদসংখ্যায় পদোন্নতি সীমিত রেখে নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিবেচনায় পদোন্নতি দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও কিছুটা গতিশীল হবে। শুভবুদ্ধির উদয় হোক, এ কামনা সবার। তবে আশঙ্কা থেকে যায়—হবে কি?

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

ইরাক ও সিরিয়ায় ইউরোপের দোদুল্যমানতা by পিটার কাস্টার্স

এ এক বিরল ক্ষণ, নীতিপ্রণেতারা নিজে থেকেই একটি বড় ভুল শোধরালেন। নাকি এটা একটা ঠান্ডা মাথার স্বার্থপর পিঠটান? ১৫ আগস্ট ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো চাইলে ইরাকের উত্তরাঞ্চলে সুন্নি জঙ্গি আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইরত কুর্দি বিদ্রোহীদের অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবে। এমনকি জার্মানিও কুর্দিদের অস্ত্রবাহী গাড়ি ও অন্যান্য হার্ডওয়্যার সরবরাহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ আগে দেশটি সাধারণত যুদ্ধংদেহী অঞ্চলগুলোয় অস্ত্র সরবরাহ করতে চাইত না।
এ সিদ্ধান্তে অনেকেই হয়তো চমকে যাবেন, কারণ মাত্র ১৬ মাস আগে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন সিরিয়ার তেল আমদানিবিষয়ক সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার কারণটা ছিল একদম পানির মতো পরিষ্কার, যাতে আইএস অধিকৃত সিরিয়ার উত্তর-পূর্ব এলাকা থেকে তেল সরবরাহ সম্ভব হয়৷ সেখানকার অনেকগুলো তেলক্ষেত্রের ওপর এই সুন্নি জঙ্গি সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ ছিল। সিরিয়ার তেল নিয়ন্ত্রণের দাবিদার শুধু আইএস নয়, আরও অনেক সংগঠনই এর দাবিদার ছিল। তার পরও এ ব্যাপারে একটু সন্দেহ রয়েই যায় যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্তের কারণে আইএসের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে, ফলে তারা ইরাকের উত্তরাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোতেও নিজেদের আধিপত্য স্থাপন করেছে।
ব্রাসেলসে গৃহীত ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্তটি আগের একটি বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত উল্টে ফেলার মতো। বিষয়টি আরেকটু খোলাসা করতে হলে সুন্নি জঙ্গি আইএস ইরাক ও সিরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলোয় কী পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পেরেছে, সেটা বোঝা দরকার। সিরিয়ার তেলক্ষেত্রগুলো অধিকাংশই ডেইয়ার-এজ-জর প্রদেশে অবস্থিত, এটা ইরাকের নিকটবর্তী একটি প্রদেশ। বিশ্ববাজারে সরবরাহের তুলনায় সিরিয়ায় উত্তোলিত তেলের পরিমাণ খুবই কম হওয়ায় দেশটির তেল ও শোধনাগারগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়াটা আইএসের যুদ্ধের অর্থায়নের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে ইরাকের তেলক্ষেত্রগুলো আবার সিরিয়ার মতো কোনো একটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ নয়। ইরাকের তেলক্ষেত্রগুলোর বেশির ভাগই দেশটির দক্ষিণে অবস্থিত, আর আইএসের অবস্থান এখনো উত্তরে। বাস্তবে ইরাকের তেলের মাত্র এক-সপ্তমাংশ আইএস ও কুর্দি যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তথাপি খবর এসেছে, আইএস ইরাকের সাতটি বড় তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করছে। সিরিয়ার তেলক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে আইএস ভালোই অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, তারা এখন সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এই তেল বিক্রি ও চোরাচালান করে বিপুল মুনাফা লাভ করছে। কথা হচ্ছে, ইরাক ও সিরিয়ায় আইএসের এই তেল থেকে প্রাপ্ত অর্থভিত্তিক যে গৃহযুদ্ধ চলছে, সে কারণে পশ্চিমা বিশ্বের শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের এক ঠান্ডা চোরা স্রোত বয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ২০১৩ সালের এপ্রিলে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা যদি আইএসের বর্তমান সফলতার কারণ হয়ে থাকে, তাহলে সেটা ঐতিহাসিকভাবে এক অভিনব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আমার জানামতে, কোনো বিদ্রোহী গ্রুপ এর আগে তেলের ওপর ভর করে গৃহযুদ্ধ চালায়নি। এটা সত্য যে আফ্রিকায় ৩০ বছর ধরে যে গৃহযুদ্ধ চলছে, সে ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের সফলতার কারণ হচ্ছে তারা সেখানকার কাঁচামালের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছিল। অ্যাঙ্গোলা, সিয়েরা লিওন, লাইবেরিয়া, কঙ্গো (ডিআরসি) ও সুদানের দিকে নজর দিন, দেখবেন, সেখানে এই কাঁচামালই প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেছে। তার পরও সেই সব দেশে তেলের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের হাতেই ছিল। অ্যাঙ্গোলার ডানপন্থী বিদ্রোহী দল ইউনিটার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে কাঁচা হীরা চোরাচালানের মাধ্যমে। সেখানকার তেলক্ষেত্রগুলো ইউনিটার অধিকৃত এলাকা থেকে অনেক দূরে অবস্থিত ছিল। সুদানের তেলক্ষেত্রগুলো দেশটির দক্ষিণে অবস্থিত, দক্ষিণের বিদ্রোহীদের অধিকৃত এলাকার কাছাকাছি। কিন্তু আল বশিরের সরকার সেখানে এক অমানবিক নীতি গ্রহণ করেছিল, তারা সেখানে আকাশ থেকে বোমাবর্ষণ করে এলাকাটিকে জনশূন্য করে ফেলে—সেখানকার অসহায় মানুষকে কচুকাটা করে এবং জীবিত ব্যক্তিদের এলাকাছাড়া হতে বাধ্য করে। একই প্রক্রিয়ায় বিদ্রোহীরা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, আর তেলের নিয়ন্ত্রণ লাভে ব্যর্থ হয়। মানে, সব বিচারেই দেখা যায় যে তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কেউই এর আগে গৃহযুদ্ধ চালাতে পারেনি।
হ্যাঁ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন যে আইএসের কার্যত সমর্থক থেকে বিরোধীতে পরিণত হলো, এর পেছনে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ইরাকের উত্তরে আইএসের ঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ শুরু করেছে। একসময় আইএসের নিরন্তর সংখ্যালঘু নিধনে জোর গলায় সমর্থন দিলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে তার অবস্থান পরিবর্তন করল, সেটা তার নিজের স্বার্থের কারণেই সে করছে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের মাথায় এখন অস্ত্র ও তেলের যুগলবন্দীর ব্যাপারটিই কাজ করছে। ওবামা প্রশাসন ২০১১ সালের অক্টোবরে ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাক সরকারের কাছে ১২ বিলিয়ন ডলারের এফ-১৬ বিমান বিক্রি করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় পাঁচটি সমর করপোরেশনের মধ্যে অন্তত চারটি লাভবান হয়েছে। যুগপৎভাবে এই অস্ত্র বিক্রির চুক্তি যখন হয়, তখন ইরাকের দৈনিক অপরিশোধিত তেল উত্তোলনের পরিমাণ আগের জায়গায় চলে যায়, ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল দৈনিক তিন মিলিয়ন ব্যারেল, চুক্তির সময় এটা সেই সীমাও ছাড়িয়ে যায়। ইরাকি সরকার যখন তেল আহরণ ও রপ্তানি থেকে বিপুল পরিমাণ আয় করছিল, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী অস্ত্র উৎপাদক রাশিয়া ইরাকে অস্ত্র সরবরাহের প্রতিযোগিতায় নামে। এই তেল ও অস্ত্রের যুগলবন্দী দীর্ঘস্থায়ী হবে, সেটা নিয়ে ব্যাপক আত্মবিশ্বাসও রয়েছে। পশ্চিমা তেল ক্রেতাদের সংগঠন আইইএর মতে, ভবিষ্যতে দুনিয়ার অপরিশোধিত তেল সরবরাহে ইরাক এগিয়ে থাকবে।
পশ্চিমা নীতিপ্রণেতারা হন্যে হয়ে শিয়া মুসলিম, খ্রিষ্টান ও ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকারের প্রতি সমর্থন দিচ্ছেন। আবার এই আইএস যে এই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ইরাকের উত্তরাঞ্চলে কতল করছে, সেটা নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। সুন্নি চরমপন্থী জঙ্গিরা মুসলিম ও অমুসলিম সব সম্প্রদায়ের মানুষকেই নিপীড়ন করছে। কিন্তু কেউ কি বলতে পারবেন, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো ধারাবাহিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষা করেছে? যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধভাবে ইরাক দখলের পর এ চিন্তাটির উদয় হয়েছে।
কিন্তু ইসরায়েলের মুসলিম ও খ্রিষ্টান আরব, বাহরাইন ও সৌদি আরবের শিয়া ও অন্য গোষ্ঠীগুলো, যারা পশ্চিমের মিত্রদের হাতে নিগৃহীত হয়েছে, তারা কি ইরাকের ইয়াজিদিদের রক্ষায় পশ্চিমের এই সংকল্প দেখে পুলকিত হবে? যা-ই হোক, সময় এসেছে, ব্রাসেলসে নীতিপ্রণেতাদের এই নীতি পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হবে।
স্মরণ করা যেতে পারে, ইরাক ও সিরিয়ায় চলমান এই দুই গৃহযুদ্ধ নিয়ে এই মতি পরিবর্তন দুবার ঘটেছে। প্রথমত, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সিরিয়ার বিনিয়োগ ও দেশটির তেল রপ্তানিতে সাধারণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এতে আসাদের সরকার ও বিরোধী পক্ষ উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ২০১৩ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কার্যত এই সুন্নি জঙ্গিদের পক্ষে অবস্থান নেয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা তাঁদের পাপ বুঝতে পারলেও সংস্থাটির মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতির মৌলিক পরিবর্তন না হলে এ ক্ষতের উপশম হবে না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
ড. পিটার কাস্টার্স: অস্ত্রবাণিজ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ।

সৌদি আরবকে ৫ ও ইরাককে ৩ টুকরো করার নীল নকশা আইএস'র by আল্লামা মুহম্মদ ওয়ালীউর রহমান

মার্কিন, ব্রিটিশ ও ইহুদীবাদী ইসরাইলিদের মুসলিম দেশসমূহ ভাঙ্গার বিস্তৃত পরিকল্পনা এখন বাস্তবে প্রকাশ পাচ্ছে। সউদী আরবকে পাঁচ ও ইরাককে তিন টুকরো করাসহ অন্যান্য মুসলিম দেশও টুকরো টুকরো করার চক্রান্তই বাস্তবায়ন করছে। হযরত নবী আলাইহিমুস সালামগণের পবিত্র মাযার শরীফ একের পর এক ধ্বংস করেও ক্ষ্যান্ত হচ্ছেনা তারা। ইহুদী-নাছারাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়ে প্রতিহত করতে সক্রিয় হতে হবে মুসলমানদের।

সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসআইএল (ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক এন্ড লিভান্ট ) বা সংক্ষেপে আইএস এর বর্তমান নেতা আবু বকর বাগদাদি ১৯৭১ সালে ইরাকের সামারা শহরে জন্মগ্রহণ করে। তার আগের নাম ছিল আওয়াদ ইব্রাহিম আলী আল-বাদরি আল-সামারাই। নিজেকে খলিফা ঘোষণার লক্ষ্যে পরবর্তীতে নিজেই আবু বকর নাম ধারণ করে। বাগদাদের ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজ এন্ড হিস্টোরি’র ওপর সে পিএইচডি করেছে বলে দাবি করেছে এই সন্ত্রাসী।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০১২ সালে জর্দানে আইএসআইএলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার উদ্দেশ্যে ওই প্রশিক্ষণ দেয় মার্কিনীরা। তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল-এর নেতা ও স্বঘোষিত খলিফা আবুবকর বাগদাদির প্রকৃত নাম ‘শামউন ইয়লুত’ এবং সে ইহুদী বাবা-মায়ের সন্তান।

আমেরিকার জাতীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএ'র (ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি) সাবেক কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা দলিল-দস্তাবেজ থেকে এই তথ্য বেরিয়েছে।

মুসলমানদেরকে ও বিশেষ করে সুন্নি সম্প্রদায়ের মুসলমানদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করার জন্যই কথিত এই খলিফা আবুবকর নামটি বেছে নিয়েছে নিজের জন্য। চাঞ্চল্যকর এই খবরটি পরিবেশন করেছে লেবাননের দৈনিক আদদিয়ার।

এর আগে এনএসএ’র সাবেক কর্মকর্তা এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা দলিল-দস্তাবেজ থেকে এই তথ্য জানা গেছে যে, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ কথিত আবুবকর বাগদাদিকে এক বছর ধরে ধর্মীয় ও সামরিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। জিহাদ ও ইসলামের নামে ইসরাইলের নিরাপত্তা বিরোধী দেশগুলোতে সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্যই ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্স, ইসরাইলের মোসাদ ও মার্কিন এনএসএ’র তত্ত্বাবধানে জন্ম দেয়া হয়েছে ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আইএসআইএল’ বা ‘আইএস’।

ইহুদীবাদী সন্ত্রাসী ‘আইএসআইএল’-এর কিছু বৈশিষ্ট্য:

১. ইহুদীবাদী এই সন্ত্রাসীদের বেশিরভাগই হচ্ছে বহিরাগত অর্থাৎ বিদেশী এবং তাদের খুব কম সংখ্যকই ইরাকের অধিবাসী। আর এদের প্রতি রয়েছে সৌদি ওয়াহাবি সমর্থন। ওয়াহাবিদের মতে তারা নিজেরা ও হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছাড়া হানাফি ও অন্য মাজহাবগুলোর সব ইমাম ও তাদের অনুসারীরা সবাই কাফির এবং এদের হত্যা করা বৈধ। অর্থাৎ সুন্নিদের বাকী তিন মাযহাব অনুসারীরা সবাই কাফির এবং এদের হত্যা করা বৈধ। 'আইএসআইএল'-এর সন্ত্রাসীদের প্রত্যেককেই প্রতি মাসে ১০০০-১৫০০ ডলার বেতন দেয়া হয়। এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও আরব আমিরাত যোগান দিয়ে যাচ্ছে।

২. এইসব সন্ত্রাসীরা যে সব অঞ্চল দখল করেছে সেখানেই নৃশংস ও জঘন্য হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা কাউকে এরা রেহাই দেয়নি। শুধু তাই নয় এর আগে সিরিয়ায় দেখা গেছে, এইসব সন্ত্রাসীরা মানুষ হত্যা করে নিহতদের বুক ও পেট চিড়ে হৃদপিন্ড, কলিজা ইত্যাদি বের করে এনে চিবিয়ে খেয়েছে এবং এ সব দৃশ্যের সচিত্র ভিডিও ফুটেজও এরা প্রকাশ করছে ইন্টারনেটে।

'আইএসআইএল'-এর সন্ত্রাসী সেনারা এরই মধ্যে তাদের দখলকৃত অঞ্চলে হাজার হাজার বন্দী সেনাকে নির্মমভাবে হত্যা করে সেসবের ছবি ইন্টারনেটে পোস্ট করেছে। তাদের সেনারা নানা অঞ্চলে ইরাকি নারীদের সম্ভ্রমহরণ করেছে বলেও খবর এসেছে। সন্ত্রাসী ‘আইএসআইএল’-এর উৎসাহদাতা ওয়াহাবি মুফতিদের ফতোয়া অনুযায়ী বিজিত অঞ্চলের নারীদের স্ত্রীর মত ব্যবহার করা হালাল বা বৈধ। (নাউযুবিল্লাহ)

এরইমধ্যে মসুলে জোর করে নারীদের বিয়ের অথবা সম্ভ্রমহরণের ঘটনার পর চার জন নারী আত্মহত্যা করেছেন বলে খবর দিয়েছে জাতিসংঘ।

ইরাকে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠা বিদেশি মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী দল আইএসআইএল মসুলে শত শত সুন্নি আলেমকে শহীদ করেছে। দলটির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই শত শত সুন্নি আলেমকে তারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছে বলে আল ইরাকিয়া চ্যানেল খবর দিয়েছে।

অন্য এক ঘটনায় আইএসআইএল-এর সন্ত্রাসীরা মসুলের কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমামকে হত্যার পর তার লাশকে টুকরো টুকরো করে। তাদের দৃষ্টিতে ওই ইমামের অপরাধ ছিল এটা যে তিনি তাদের দলে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। স্থানীয় আলেমরা এই নৃশংস ঘটনা ঘটার কথা জানিয়েছেন।

৩. 'আইএসআইএল'-এর সন্ত্রাসীরা সম্মানিত দ্বীন ইসলামসহ নানা ধর্মের অনুসারীদের পবিত্র স্থানগুলোকে ধ্বংস করছে এবং লুটপাট ও নির্বিচারে গণহত্যায় লিপ্ত হচ্ছে। অথচ সম্মানিত দ্বীন ইসলাম যুদ্ধ-কবলিত অঞ্চলে বেসামরিক পুরুষ, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা তো দূরের কথা সেখানকার গাছপালা, ফসল, ক্ষেত-খামার, পশু, পানি ও পরিবেশের ক্ষতি করাকেও নিষিদ্ধ করেছে।

এমনকি সম্মানিত ইসলামী নীতি অনুযায়ী যুদ্ধ-বন্দী বা আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিকেও হত্যা করা নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক আইন ও রীতি ছাড়াও জাহেলি যুগেও আত্মসমর্পণকারী ব্যক্তিকে হত্যা করা কাপুরোষোচিত কাজ বলে বিবেচিত হত।

সম্মানিত দ্বীন ইসলাম যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত কাফির বা অবিশ্বাসী ব্যক্তির লাশকে বিকৃত করাও নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু 'আইএসআইএল'-এর সন্ত্রাসীরা যুদ্ধে নিহত মুসলিম সেনাদের লাশ বিকৃত করা, গাড়ী-চাপা দেয়া ও পদদলিত করা ছাড়াও নিহতদের মাথাকে ফুটবল বানিয়ে ক্রীড়া-কৌতুক করার মত পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠেছে।

পবিত্র কুরআন শরীফে বলা হয়েছে, কেউ যদি একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে তাহলে সে যেন গোটা মানব জাতিকে হত্যা করলো।

৪. 'আইএসআইএল'-এর সন্ত্রাসীদের অনেকেই আরব দেশগুলোতে হত্যাকান্ড ও ডাকাতির মত সন্ত্রাসী তৎপরতায় জড়িত হওয়ায় তাদের মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের মত কঠোর শাস্তি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিদেশে গিয়ে কথিত জিহাদের নামে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালানোর শর্তে এদের মুক্তি দেয়া হয়েছে।

৫. ইহুদীবাদী এই সব তাকফিরি সন্ত্রাসী যারা নিজেদেরকে জিহাদি বা মুজাহিদ বলে দাবী করে তারা ফিলিস্তিন দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলের দিকে ভুলেও একটি গুলি ছুঁড়েনি। একজন ইসরাইলি সেনাকেও হত্যা করেনি। অথচ এ সব সৌদি-কাতারি-তুর্কি-মার্কিন-ইঙ্গ-ফরাসি-জার্মান সমর্থনপুষ্ট তাকফিরি (সালাফী) ওয়াহাবি সন্ত্রাসীরা যেমনিভাবে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরাকে (ওয়াহাবি নয় এমন) লক্ষ লক্ষ নিরীহ মুসলমানকে হত্যা করছে, ঠিক সেভাবেই তারা সিরিয়ায়ও যারা ওয়াহাবি মতাবলম্বী নয় তাদের মধ্য থেকে গত তিন বছরে হাজার হাজার মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে।

৬. এইসব বিদ্রোহী ও তাকফিরি ওয়াহাবি (সালাফি) সন্ত্রাসী গ্রুপ ও সংগঠন সাম্রাজ্যবাদী বিধর্মী পাশ্চাত্য মদদে সৌদি-কাতারি-তুর্কি-শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সমর্থিত ও সাহায্যপ্রাপ্ত।

৭. এই ইহুদীবাদী সন্ত্রাসীরা সিরিয়ায় হযরত ছাহাবায়ে কিরাম রদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুম উনাদের মাজার শরীফ ধ্বংস করেছে। ইরাকেও আহলে বাইত শরীফ আলাইহিমুস সালাম উনাদের অন্যতম দুই ইমাম হযরত ইমাম হাসান আসকারী আলাইহিস সালাম এবং ইমাম আলী নাকী আলাইহিস সালামের মাজার শরীফ ও গম্বুজ ধ্বংস করেছে।

এই সন্ত্রাসীরা পবিত্র মাজার শরীফ ধ্বংসের ধারাবাহিকতায় বিশিষ্ট নবী-রসূল আলাইহিমুস সালামদের পবিত্র রওজা শরীফও বাদ দেয়নি। তারা ইরাকের মুসুল শহরে হযরত দানিয়েল আলাইহিস সালাম এবং সর্বশেষ হযরত ইউনুস আলাইহিস সালামের রওজা শরীফও ভেঙ্গে ফেলেছে। (নাউযুবিল্লাহ)

এই সন্ত্রাসীরা ইমামুছ ছালিছ মিন আহলি বাইতিন নাবিয়্যি ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও শুহাদায়ে কারবালা হযরত ইমাম হুসাইন আলাইহিস সালামের রওজা শরীফ ধ্বংসের প্রতিজ্ঞা করেছে। তাছাড়া পবিত্র ক্বাবা শরীফও ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছে এই ইহুদীবাদী সন্ত্রাসীরা । (নাউযুবিল্লাহ)

প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা আরও বাড়বে by মইনুল ইসলাম

১৮ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংবিধানের প্রস্তাবিত ষোড়শ সংশোধনীর খসড়া অনুমোদিত হয়েছে, যাতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা ১৯৭২ সালের সংবিধানে যেভাবে সংসদের কাছে ন্যস্ত ছিল, সেভাবে সংসদকে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ক্ষমতা ১৯৭৫ সালে গৃহীত সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী মোতাবেক সংসদের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে হস্তান্তরিত হয়েছিল এবং ১৯৭৮ সালে সংসদ বিলুপ্ত থাকা অবস্থায় জিয়াউর রহমানের সামরিক ফরমানবলে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে অর্পণ করা হয়েছিল। পরে তা ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান প্রবর্তিত সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী চূড়ান্তভাবে বাতিল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে সংবিধানের যে পঞ্চদশ সংশোধনী সংসদে পাস হয়েছে, তাতেও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে অর্পিত ক্ষমতাটি বহাল রাখা হয়েছিল। তিন বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর বিচারকদের অভিশংসনের ক্ষমতাটি আবার সংসদে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন কেন নতুন করে উপলব্ধি হচ্ছে, তা বোঝা মুশকিল বৈকি! তবে সন্দেহ করার কারণ রয়েছে যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের মাথার ওপর ‘সোর্ড অব ডেমোক্লিস’ বা খড়্গ ঝোলানোর জন্য এই ব্যবস্থাটি মোক্ষম দাওয়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কিন্তু এতে যে সরকারের তিনটি অঙ্গ—সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের ওপর প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত হবে, সে ব্যাপারটি কি বুঝতে পারছি না আমরা? সংবিধানের ৭০ ধারার কারণে সংসদের সরকারি দল বা জোটের সাংসদদের নিরঙ্কুশ আনুগত্য প্রধানমন্ত্রীর করতলগত রয়েছে। এই অবস্থায় দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদের সমর্থনের প্রয়োজনীয়তার শর্ত অন্যায়ভাবে কোনো বিচারপতির অভিশংসনের বিরুদ্ধে কোনো অর্থবহ রক্ষাকবচ হতে পারবে না, কারণ সংসদ নেত্রী তথা প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা সরকারি দল বা জোটের সাংসদদের নেই।
এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর যদি ইচ্ছা হয় যে তিনি কোনো বিচারপতিকে অপসারণ করবেন, তাহলে সংসদের সরকারদলীয় বা জোটভুক্ত সদস্যদের ভোট এবং রাষ্ট্রপতির অনুমোদন দুটোই পাওয়ার পথে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করেছে আমাদের সংবিধান, কারণ মহামান্য রাষ্ট্রপতিরও ক্ষমতা নেই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের বাইরে কিছু করার। তাই প্রকৃত বিচারে প্রধানমন্ত্রীকে সরকারের তিনটি অঙ্গের ওপরেই একক ক্ষমতাধর করে ফেলার এই সাংবিধানিক ব্যবস্থাটি বিচারপতিদের নিরপেক্ষতার জন্য বিপজ্জনক হবে বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস। স্বীকার করতে বাধা নেই যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগে দলবাজি চালু হয়ে যাওয়ার কারণে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই ষোড়শ সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে আরও চিন্তাভাবনার প্রয়োজন রয়েছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং বর্তমানে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খায়রুল হক শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। কারণ, তাঁর নেতৃত্বে প্রদত্ত ঐতিহাসিক রায়গুলো এই জাতিকে সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর কলঙ্কজনক অধ্যায় থেকে মুক্তি দিয়েছে। সম্প্রতি তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দিলে বিচারপতিদের ভয়ের কারণ নেই। আমার অজানা কোনো তথ্যের ভিত্তিতে হয়তো তিনি তাঁর এই অভিমত দিয়েছেন, কিন্তু তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তাঁর এই আশ্বাসে আমি আশ্বস্ত হতে পারছি না। তাঁকে বিনীতভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি যে তিনি নিজেই সংবিধানের ৭০ ধারার প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করেছিলেন, ‘এর ফলে সাংসদেরা নিজেদের দলের কাছে বন্দী হয়ে আছেন’ (প্রিজনারস টু দেয়ার ওন পার্টিজ)।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যান্য দেশে সংসদের কাছে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা ন্যস্ত থাকার নজির উল্লেখ করে এ দেশেও তা সংসদে ফিরিয়ে দেওয়ার যে যুক্তি তিনি তুলে ধরেছেন, তা কতখানি যুক্তিসংগত হচ্ছে, বুঝতে পারছি না। বরং এ ব্যাপারে আরেকজন শ্রদ্ধেয় সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামালের আশঙ্কাটাই বেশি যৌক্তিক মনে হচ্ছে। কারণ, গত বছর শ্রীলঙ্কায় স্রেফ সংসদের ভোটের জোরে যেভাবে ওই দেশের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি শিরানী বন্দরনায়েককে প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য অভিশংসনের শিকার হতে হয়েছিল, সেটাই তো আমাদের মতো দেশগুলোর প্রকৃত বাস্তবতার প্রতিফলন!
আমাদের সংবিধানে তো প্রকৃত গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত সরকারের তিনটি অঙ্গের ‘ব্যালান্স অব পাওয়ার’ কিংবা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি মূল সংবিধান প্রণয়নের সময় বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে সব ক্ষমতা তাঁর হাতে পুঞ্জীভূত করার কারণে। ১৯৭৫ সালে পাস হওয়া সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপতির কাছে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাসের সময় রাষ্ট্রপতির এসব ক্ষমতা আবার প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। আরও দুঃখজনক হলো, বিএনপির চাণক্য প্রবরেরা বেগম খালেদা জিয়াকে আরও বেশি সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রদানের উদ্দেশ্যে দ্বাদশ সংশোধনীতে সুচিন্তিতভাবে অধিক ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যস্ত করেছিল।
এভাবে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা পুঞ্জীভূত করা এবং উল্লিখিত ওই সব সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতাকে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ‘একনায়কসুলভ’ করে ফেলা হয়েছে, যেটাকে আমাদের সংবিধানের মারাত্মক ত্রুটি বলে মনে করি। সুপ্রিম কোর্টের সব বিচারপতির নিয়োগ ১৯৭২ সাল থেকেই এ দেশে পুরোপুরি প্রধানমন্ত্রীর বা রাষ্ট্রপতির একক ইচ্ছাধীন বিষয়ে পরিণত হয়েছে, যার ফলে যে দল বা জোট যখন ক্ষমতায় এসেছে, তারা তাদের দল বা জোটের সক্রিয় সমর্থকদের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বানিয়েছে। ১৯৭৫-১৯৯১ পর্বের সামরিক শাসকেরাও এই ভারসাম্যহীন সুবিধাটুকু নিজেদের জন্য বহাল রেখেছেন।
১৯৭৫ সালের নভেম্বরে এ দেশে ঘোষিত সামরিক শাসনব্যবস্থায় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছিলেন দেশের তদানীন্তন প্রধান বিচারপতি। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তাঁকে ওই পদ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। জিয়া জাগদল ও বিএনপির গঠন পর্বে ওই দলের আন্তর্জাতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকারী যে ব্যক্তিকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বানিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন, তাঁকে ২০০৬ সালে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানাতে গিয়ে খালেদা জিয়া জাতিকে মহাবিপদে ফেলে দিয়েছিলেন। বিভিন্ন সামরিক শাসক একাধিকবার বিচারপতিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনার বানিয়ে ভুয়া নির্বাচনী নাটক মঞ্চস্থ করেছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাকে যে বিচারপতি আওয়ামী লীগ এবং প্রতিবেশী দেশের ষড়যন্ত্র বলে মনগড়া গল্প ফেঁদেছিলেন, তাঁকে ওই ভুয়া তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে খালেদা জিয়া কিছুদিনের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি বানিয়েছিলেন! (তিনি এখনো দাবি করে চলেছেন যে তাঁর প্রতিবেদন ছিল একেবারেই সাচ্চা!!) ২০০৬ সালে বিচারপতি আজিজের কীর্তিকাহিনি নিশ্চয়ই জনগণ বিস্মৃত হননি।
উল্লিখিত গুটি কয়েক নজির তুলে ধরেছি এ কথাটা বলার জন্যই যে এ দেশের সুপ্রিম কোর্টসহ পুরো বিচার বিভাগে ৪৩ বছরের দলীয়করণের ধারাবাহিকতায় দল–অনুগতদের প্রাধান্য পেতে আর বেশি দেরি নেই। জাতির এই সর্বনাশটা আমরা মহাসুখেই মেনে নিচ্ছি মনে হচ্ছে! আমি দৃঢ়ভাবেই বলতে চাই, বিচার বিভাগকে এভাবে প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার খেলা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষমতার প্রতি অন্ধ মোহ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বিবেকবর্জিত দেউলিয়াত্বেরই ফল, যা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভীপ্সার অভিপ্রকাশ। বহুদিন জাতিকে এর খেসারত দিতে হবে।
১৯৭২-৭৫ পর্বের বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অভিশংসনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের বছরগুলোতে বিচার বিভাগের আচরণ নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে কোনো দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়নি। ওই সময়ে সংসদে আওয়ামী লীগের প্রায় ৯৭ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকার পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিত্বের কারণে সরকারের নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের সংঘাত হওয়ার তেমন অবকাশ ছিল না। আর রাজনৈতিক দলবাজি এখন যেভাবে বিচারক ও বিচারপতি নিয়োগকে কলুষিত করছে, তাও তখন ছিল অচিন্তনীয়। দলীয় আনুগত্যের কারণে আটজন বিচারপতি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানি শুনতে বিব্রত বোধ করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে। এর বিপরীতে রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার অভিযোগ উঠেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সাঈদীর বিরুদ্ধে প্রদত্ত ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মামলার রায় বিলম্বিত করার ঘটনায়। এ বিষয়ে সন্দেহটা ক্রমেই পাকাপোক্ত হচ্ছে। সর্বোচ্চ বিচারালয়ের প্রতি আস্থার ক্রমবর্ধমান ঘাটতি জনগণের মধ্যে বিরাজমান রাজনৈতিক বিভাজন যে দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাও কি আমরা বুঝতে চাইছি না?
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ক্ষমতাসীন জোট আগামী সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠেয় সংসদের অধিবেশনেই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাস করতে বদ্ধপরিকর। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমার আহ্বান, অভিযুক্ত বিচারপতির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ তদন্তের দায়িত্বভার অন্ততপক্ষে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ওপর অর্পণ করা হোক এবং সেখানে তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হোক। আরও গুরুত্বপূর্ণ, বিচারপতির অভিশংসনের পক্ষে-বিপক্ষে ভোট প্রদানের ব্যাপারে সাংসদদের ওপর সংবিধানের ৭০ ধারার বিধান কার্যকর হবে না মর্মে আইন প্রণীত হোক। আমিও নির্দ্বিধায় বলছি, জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হচ্ছে দেশের জনগণের নির্বাচিত সংসদ। বিচারপতিরা অভিশংসনের ঊর্ধ্বে থাকবেন, তাও হয়তো যৌক্তিক নয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের সংবিধান সরকারের অঙ্গসমূহের ‘ব্যালান্স অব পাওয়ার’ যেভাবে বিনষ্ট করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে উল্লিখিত দুটি প্রস্তাব কিছুটা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ প্রতিষ্ঠা করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।