Showing posts with label ফুটবল. Show all posts
Showing posts with label ফুটবল. Show all posts

Thursday, August 20, 2026

রবার্তো কার্লোস কি সত্যিই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, আসল ঘটনা কী

গুঞ্জনটা শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে, ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি ফুটবলার রবার্তো কার্লোস নাকি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আসলে সত্যিটা কী? দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন রবার্তো কার্লোস নিজেই। এ খবরকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে জানিয়ে দিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই লেফটব্যাক।

কীভাবে গুঞ্জনের শুরু

বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছিল, কয়েক সপ্তাহ আগে ব্রাজিলের মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শেখ জিহাদ হামাদার সঙ্গে দেখা করেছেন কার্লোস। পাশাপাশি অনলাইনে এমন কিছু ছবিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় একজন কাজির উপস্থিতিতে ইসলামিক রীতিতে বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে এবং সেখানে রবার্তো কার্লোসও আছেন। এতেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, কার্লোস ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং ইসলামিক রীতিতে একজনকে বিয়ে করেছেন।

আসলে কী ঘটেছিল


ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই লেফটব্যাক সম্প্রতি মরক্কোর ব্যবসায়ী সোহাইলা তাহিরির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ছবিগুলো দেখে মনে হতেই পারে, স্ত্রীর ধর্ম অনুসরণ করে তিনিও বুঝি মুসলিম হয়েছেন। তবে গুঞ্জনের জট ছাড়াতে সম্প্রতি সৌদি আরবের দৈনিক পত্রিকা ওকাজের সঙ্গে কথা বলেছেন রবার্তো কার্লোস।

জেদ্দাভিত্তিক ওকাজে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কার্লোস বলেছেন, ‘ইসলাম ধর্মের প্রতি আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রয়েছে। আমার স্ত্রীকে নামাজ পড়তে দেখাটা সত্যিই চমৎকার এক অভিজ্ঞতা। তবে আমার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের যে গুঞ্জন চারপাশে ঘুরছে, তা সত্য নয়।’

২০০২ বিশ্বকাপজয়ী এই লেফটব্যাক জানান, পারিবারিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানাতেই একাধিক রীতিতে সোহাইলা তাহিরির সঙ্গে তাঁর বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যরা ক্যাথলিক। তাদের বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে যেমন আয়োজন ছিল, তেমনই আমার মরোক্কান স্ত্রী ও তাঁর মুসলিম বন্ধুদের ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা মাথায় রেখে সেই ধর্মীয় রীতিও রাখা হয়েছিল।’

মূলত স্ত্রীর ধর্মীয় অনুভূতি ও বন্ধুদের সম্মানে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানের কারণেই অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কার্লোস স্পষ্ট করেছেন, স্ত্রীর ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অর্থ এটা নয় যে তিনি নিজে ধর্ম পরিবর্তন করেছেন।

মরোক্কান স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয়ের গল্প

সাক্ষাৎকারে রবার্তো কার্লোস কীভাবে সোহাইলা তাহিরির সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল, সে গল্পও শুনিয়েছেন। ফুটবল–সম্পর্কিত এক ব্যবসায়িক বৈঠকে তাঁদের প্রথম পরিচয় হয়। কার্লোস জানান, সোহাইলা একজন অত্যন্ত সফল নারী ব্যবসায়ী। দুই বছর ধরে তাঁদের সম্পর্ক। এ দুই বছরে ব্যক্তিগত ও পেশাগত—উভয় দিক থেকেই তাঁদের বোঝাপড়া অনেক বেড়েছে।
মরক্কো ও ব্রাজিলে এ বিয়ে নিয়ে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়েছে। একদিকে সোহাইলার মরোক্কান পরিচিতি, অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ কার্লোসের বিশ্বব্যাপী পরিচিতি—সব মিলিয়ে তাঁদের এ বিয়ে বিশ্বজুড়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।

এটা কার্লোসের কত নম্বর বিয়ে

আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ৫৩ বছর বয়সী কার্লোসের তৃতীয় বিয়ে। প্রথম স্ত্রী আলেকজান্দ্রা পিনহেইরোর সঙ্গে ২০০৩ সালে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। সেই সংসারে তাঁর তিন সন্তান। এরপর ২০০৯ সালের জুনে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়ানা লুকনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় সংসার করার পর ২০২৫ সালের শুরুতে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। এই সংসারে কার্লোসের ২টি কন্যাসন্তান রয়েছে।  
সব মিলিয়ে ৭ জন নারীর গর্ভে কার্লোসের ১১ সন্তান। ২০১৭ সালের অক্টোবরে তাঁর মেয়ে জিওভানা এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেওয়ায় তিনি এরই মধ্যে নানাও হয়ে গেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রবার্তো কার্লোসের বিয়ের ছবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রবার্তো কার্লোসের বিয়ের ছবি। মরোক্কান ওয়ার্ল্ড নিউজ

Wednesday, August 19, 2026

‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম’—রবার্তো কার্লোসকে কাবার ইমামের অভিনন্দন

ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবর সামনে আসার পর তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. ইয়াসির আদ-দোসারি।

বুধবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে রবার্তো কার্লোসের অতীত এবং বর্তমান ছবি শেয়ার করে তাকে স্বাগত জানিয়ে তিনি লেখেন, ‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম।’

সাবেক এই ব্রাজিলিয়ান তারকার জন্য দোয়া করে শায়খ ইয়াসির আদ-দোসারি পোস্টে আরও লেখেন, ‘হে আল্লাহ! তাকে আপনার দ্বীনের ওপর অটল রাখুন, তার অন্তরে হেদায়েত দান করুন, তার ইসলাম গ্রহণে বরকত দিন এবং তাকে দৃঢ় ও হেদায়েতপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’

রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবরটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে মঙ্গলবার। তুরস্কের ক্ষমতাসীন একে পার্টির গাজিয়ানতেপের সংসদ সদস্য আলি শাহিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ দাবি করেন।

আলি শাহিন জানান, সম্প্রতি ব্রাজিল সফরের সময় দেশটির মুসলিম সম্প্রদায়ের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। সেখানেই ব্রাজিলের ইসলামী ব্যক্তিত্ব শায়খ জিহাদ হাম্মাদের কাছ থেকে রবার্তো কার্লোসের ইসলাম গ্রহণের খবর জানতে পারেন তিনি। পরে সাবেক এই ফুটবলারকে অভিনন্দনও জানান শাহিন।

তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রবার্তো কার্লোসের সঙ্গে শায়খ জিহাদ হাম্মাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। প্রায় চার সপ্তাহ আগে সাও পাওলোতে তাদের সাক্ষাৎ হয়। ওই সময় রবার্তো কার্লোস শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।

‘রহমতের ধর্মে তোমাকে স্বাগতম’—রবার্তো কার্লোসকে কাবার ইমামের অভিনন্দন
মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. ইয়াসির আদ-দোসারি (বামে) তার ফেসবুক পোস্টে শেয়ার করা রবার্তো কার্লোসের ছবি (ডানে)।

Wednesday, August 12, 2026

৫ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বিয়ে করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো-জর্জিনা রদ্রিগেজ

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ভক্তদের চমকে দিতে জানেন। তবে এবার ফুটবল মাঠে নয়, মাঠের বাইরের এক বিশেষ খবর দিয়ে সবাইকে চমকে দিলেন পর্তুগিজ ফুটবল তারকা। দীর্ঘদিনের পার্টনার জর্জিনা রদ্রিগেজকে ১১ই আগস্ট (মঙ্গলবার) বিয়ে করেছেন রোনালদো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিয়ের ছবি প্রকাশের পরই বিষয়টি সবার সামনে আসে। এ খবর দিয়ে অনলাইন এনডিটিভি জানায়- রোনালদো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবিতে দু’জনকে পরস্পরের হাত ধরে থাকতে দেখা যায় এবং দু’জনের হাতেই আছে বিয়ের আংটি। জানা গেছে, পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের কাছে পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় শহর কাসকাইসে একেবারে ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ পরিবেশে তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানে তাদের পাঁচ সন্তানও উপস্থিত ছিল বলে জানিয়েছে ব্রান্সউইক গ্রুপ।

রোনালদো ও জর্জিনার পাঁচ সন্তানের নাম ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়র, যমজ ইভা ও মাতেও, আলানা মার্টিনা এবং বেলা এসমেরাল্ডা। বিয়ের ছবি পোস্ট করে রোনালদো ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘সি হার্ট ইমোজি জি’। রোনালদোর ঘনিষ্ঠ বৃটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানও বিয়ের পর এই দম্পতির একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন। ছবিতে তাদের বিয়ের আংটি পরা অবস্থায় দেখা যায়।

রোনালদো ও জর্জিনা রদ্রিগেজের সম্পর্কের শুরু ২০১৬ সালে মাদ্রিদে। গত এক দশকে তাদের সম্পর্ক একটি আকস্মিক পরিচয় থেকে পরিণত হয়েছে ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধনে। স্পেন, ইতালি, বৃটেন ও সৌদি আরবে বসবাসের মধ্য দিয়ে তারা পাঁচ সন্তানকে নিয়ে পরিবার গড়ে তুলেছেন। জানা যায়, মাদ্রিদের একটি গুচি বুটিকেই প্রথম রোনালদোর সঙ্গে জর্জিনার পরিচয় হয়। তখন জর্জিনা সেখানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। সে সময় রোনালদো খেলতেন লা লিগার অন্যতম বড় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে। কয়েক দিন পর একটি ব্র্যান্ডের অনুষ্ঠানে তাদের আবার দেখা হয়। সেখানে কাজের সময়ের বাইরে অপেক্ষাকৃত স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দু’জনের কথা বলার সুযোগ হয়।

২০১৭ সালের নভেম্বরে জর্জিনা তাদের মেয়ে আলানা মার্টিনার জন্ম দেন। এর কয়েক মাস আগে সারোগেসির মাধ্যমে রোনালদোর যমজ সন্তান মাতেও ও ইভার জন্ম হয়। জর্জিনা তাদেরও নিজের পরিবারের অংশ হিসেবে সাদরে গ্রহণ করেন। এর সঙ্গে ছিলেন রোনালদোর বড় ছেলে ক্রিশ্চিয়ানো জুনিয়র। পর্তুগালের হয়ে ১৪৬ গোল করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনালদো। তিনি পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। সম্প্রতি পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে নিজের রেকর্ড গড়া ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও খেলতে দেখা গেছে তাকে। তবে সেই বিশ্বকাপ অভিযান রোনালদো কিংবা পর্তুগাল- কেউই দীর্ঘদিন মনে রাখতে চাইবে না। ক্লাব ফুটবলে বর্তমানে সৌদি প্রো লিগের দল আল নাসরের হয়ে খেলছেন রোনালদো। শনিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া ঘরোয়া মৌসুমের প্রথম ম্যাচেই তাকে মাঠে দেখা যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

৫ সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বিয়ে করলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো-জর্জিনা রদ্রিগেজ

Tuesday, July 21, 2026

আগামীর কিংবদন্তি লামিনে ইয়ামাল by নজরুল ইসলাম

বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজার পর যখন ১৯ বছর বয়সি স্প্যানিশ তরুণ লামিনে ইয়ামাল অশ্রুসিক্ত লিওনেল মেসিকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন ফুটবল বিশ্ব এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হলো। এটি কেবল সান্ত্বনার কোলাকুলি ছিল না, বরং ছিল বিশ্বফুটবলের রাজদণ্ড এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরের প্রতীক।

নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক যখন ৩৯ বছর বয়সি মেসির নাম ধরে চিৎকার করছিলেন, তখন হয়তো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ক তার শেষ বিশ্বকাপ মঞ্চকে বিদায় জানাচ্ছিলেন। আর ঠিক সে মুহূর্তে বার্সেলোনার বর্তমান ১০ নম্বর জার্সিধারী ইয়ামাল জড়িয়ে ধরলেন ক্লাবটির ইতিহাসের সবচেয়ে কিংবদন্তি ১০ নম্বরকে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের র‍্যাফেলের অংশ হিসেবে ২০ বছর বয়সি মেসির কোলে থাকা ছয় মাসের শিশু ইয়ামালের সেই ভাইরাল ছবিটির বৃত্ত যেন আজ সম্পূর্ণ হলো। সেই শিশুটিই আজ বিশ্বজয়ী পুরুষ।

দুবছর আগে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে স্পেনের ইউরো জয়ের নায়ক ইয়ামাল এবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে একপ্রকার ‘পূর্ণতা’ দিলেন। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট কাটিয়ে টুর্নামেন্টে খেলতে আসা এই তরুণ মাত্র ১৯ বছর ছয়দিন বয়সে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একইসঙ্গে বিশ্বকাপ ও ইউরো জয়ের অনন্য কীর্তি গড়লেন।

ফাইনালের মঞ্চে ইয়ামালের উপস্থিতি ছিল স্পেনের নিখুঁত ও নান্দনিক কৌশলের মূল ভিত্তি। বিপরীতে আর্জেন্টিনার আক্রমণাত্মক ও শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। স্পেনের হয়ে খেলা ২৮টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের একটিতেও হারেননি ইয়ামাল। তাছাড়া বড় টুর্নামেন্টে মূল একাদশে থেকে টানা ১৩ ম্যাচ জেতার রেকর্ড গড়েছেন, যা ইউরোপীয় ফুটবলে আর কোনো খেলোয়াড়ের নেই। পেলে (১৯৫৮), জিউসেপ্পে বার্গোমি (১৯৮২) এবং কিলিয়ান এমবাপ্পের (২০১৮) পর ইতিহাসের মাত্র পঞ্চম তরুণ হিসেবে বিশ্বকাপ ফাইনালের মূল একাদশে খেলে শিরোপা জেতার গৌরব অর্জন করলেন ইয়ামাল ও তার সতীর্থ পাউ কুবার্সি।

আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোসহ প্রতিপক্ষের চরম শারীরিক ও মানসিক চাপ উড়িয়ে দিয়ে মাঠে শান্ত ছিলেন ইয়ামাল। তার এই পরিপক্বতা দেখে ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক ও বিবিসি স্পোর্টসের পণ্ডিত জো হার্ট বলেন, ‘লামিনে ইয়ামাল কেবল প্রতিক্রিয়াই দেখায়নি, সে বুক চিতিয়ে লড়েছে। পুরো দল তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শান্ত ছিল সে। ১৯ বছর বয়সেই সে ফুটবলকে পূর্ণতা দিয়েদিল।’

অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের জয়সূচক গোলে স্পেনের নতুন এই সোনালি অধ্যায় লেখা হয়েছে। ম্যাচ শেষে স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ইয়ামালের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ‘ও দারুণ ফুটবল খেলেছে, যা তাকে আরো পরিপক্ব হতে সাহায্য করবে। দলের জন্য ও নিজেকে উজাড় করে দিয়েছে।’

রদ্রিগোর মতো অভিজ্ঞ অধিনায়কের ছায়ায় এবং নিজের অবিশ্বাস্য প্রতিভায় ভর করে ১৯ বছর বয়সেই ইয়ামাল বিশ্বজয় করেছে। ক্যারিয়ারের একদম শুরুতে দাঁড়িয়ে থাকা এই তরুণের সামনে যে আরো কত সাফল্য অপেক্ষা করছে, তা সময়ই বলে দেবে।

আগামীর কিংবদন্তি লামিনে ইয়ামাল
বিশ্বকাপ শিরোপা হাতে লামিনে ইয়ামাল

Monday, July 20, 2026

স্পেনের জয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী মানুষকে আনন্দিত করেছে, বলল ইরান

বিশ্বকাপে স্পেনের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ে দেশটিকে অভিনন্দন জানিয়েছে ইরান। সোমবার এক বিবৃতিতে তেহরান জানায়, স্পেনের এই জয় বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্বাধীনতাকামী মানুষকে আনন্দিত করেছে।

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কঠোর নিন্দা ও ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতের সমালোচনা করায় সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল সমর্থন কুড়ায় স্পেন সরকার ও তাদের জাতীয় ফুটবল দল। কয়েক মাস ধরেই ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার বিরুদ্ধে ছিল দেশটি।

আরেক দিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রকাশ্যে ইসরায়েলের নীতিগুলোকে সমর্থন করেন। আর্জেন্টিনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন অনেক ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ও সমর্থকও। রোববার নিউইয়র্ক–নিউ জার্সিতে আর্জেন্টিনাকে ১–০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছে স্পেন।

এরপর ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএকে সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের পক্ষে খেলোয়াড়দের অবস্থান এবং ইরানের প্রতি স্পেনের সমর্থন প্রমাণ করে যে স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা সেই (স্পেন) বুদ্ধিমান ও সম্মানীয় জাতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।’

বাঘের গালিবাফ আরও বলেন, ‘এই জয় কেবল স্পেনের জনগণের হৃদয়কেই স্পর্শ করেনি, বরং বিশ্বের বহু স্বাধীন, সার্বভৌম ও ন্যায়বিচারকামী মানুষের হৃদয়কেও আনন্দিত করেছে।’

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইও স্পেনকে সমর্থনের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আগ্রাসন, গণহত্যা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পেনের সার্বিক অবস্থান এবং তাদের জাতীয় ফুটবল দলের আচরণ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও মূল্যবান ছিল।’

স্পেন তারকা লামিনে ইয়ামাল
স্পেন তারকা লামিনে ইয়ামাল। রয়টার্স

শতবর্ষের ২০৩০ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলবে ছয় দেশ

২০২৬ বিশ্বকাপের পর্দা নামতেই ফুটবল বিশ্বের নজর এখন ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে। কারণ, এবারের আসর শুধু নতুন চ্যাম্পিয়ন খোঁজার নয়, উদযাপন করবে বিশ্বকাপের শতবর্ষও। সেই বিশেষ উপলক্ষে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তিন মহাদেশের ছয়টি দেশে অনুষ্ঠিত হবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।

ফিফার অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ বিশ্বকাপের মূল আয়োজক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। তবে বিশ্বকাপের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উদ্বোধনী তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে দক্ষিণ আমেরিকার উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়েতে। এরপর টুর্নামেন্টের বাকি অংশ ইউরোপ ও আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে ছয়টি দেশই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল পর্বে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার ছয়টি স্বাগতিক দল সরাসরি চূড়ান্ত পর্বে খেলবে।

ফিফা জানিয়েছে, ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বকাপ। শতবর্ষ উপলক্ষে সেই ইতিহাসকে সম্মান জানাতেই উদ্বোধনী ম্যাচ ও বিশেষ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে রাজধানী মন্টেভিডিওতে।

অন্যদিকে, ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের রানার্সআপ ছিল আর্জেন্টিনা। আর দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল কনফেডারেশন (কনমেবল)-এর সদর দপ্তর হওয়ায় প্যারাগুয়েকেও শতবর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে একটি করে ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এই পরিকল্পনাকে ‘ফুটবলকে একত্রিত করার প্রতীক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপন হবে অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা, বর্তমানের উদযাপন এবং ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণা।

২০৩০ বিশ্বকাপে অংশ নেবে ৪৮টি দল। ২০২৬ সালের মতোই এই আসরেও ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তবে প্রথমবারের মতো তিনটি মহাদেশ—ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকাজুড়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের নজির গড়তে যাচ্ছে ফিফা।

ফলে ২০৩০ বিশ্বকাপে ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছে ছয় দলের অংশগ্রহণ। তারা হলো—স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো, উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। বাকি ৪২টি দল বাছাইপর্ব পেরিয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নেবে।

বিশ্বকাপের শতবর্ষকে ঘিরে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ইতোমধ্যেই ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ফিফার সবচেয়ে প্রতীকী আসরগুলোর একটি।

বিশ্বকাপ মাতালেন এমবাপ্পে, রদ্রি আর স্পেন; ব্যক্তিগত পুরস্কারে কার ঝুলিতে কী?
২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা নেমেছে স্পেনের শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে। তবে দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা পারফর্মাররাও। বিশ্বকাপ শেষে ফিফা ঘোষণা করেছে বিভিন্ন ব্যক্তিগত পুরস্কার, যেখানে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখিয়েছে নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে স্পেন। সেই সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের (গোল্ডেন বল) স্বীকৃতি পান দলের মিডফিল্ডার রদ্রি। পুরো আসরজুড়ে মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ, বলের দখল ধরে রাখা এবং ম্যাচের গতি নির্ধারণে অসাধারণ ভূমিকা রাখেন তিনি। গোল করার লড়াইয়ে আবারও সবার ওপরে ছিলেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে। সেমিফাইনালে ফ্রান্স বিদায় নিলেও ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। এর সুবাদে নিজের ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুট জেতেন ফরাসি অধিনায়ক। স্পেনের আরেক নায়ক উনাই সিমন জিতেছেন সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার (গোল্ডেন গ্লাভস)। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা ধরে রেখে তিনি স্পেনের রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা ছিলেন। অন্যদিকে স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাও কুবারসি জিতেছেন সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের (বেস্ট ইয়াং প্লেয়ার) পুরস্কার। ফলে বিশ্বকাপের চারটি প্রধান ব্যক্তিগত পুরস্কারের মধ্যে তিনটিই জিতে নিয়েছে স্পেন। শুধু গোল্ডেন বুট গেছে ফ্রান্সের এমবাপ্পের হাতে।

Tuesday, July 14, 2026

বিশ্বকাপ ২০২৬: ইউরোপে মুসলিম ফুটবলারদের পরিচয়ই নতুন চ্যালেঞ্জ

ইউরোপে ইসলামকে ঘিরে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বহুদিনের। তবে ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে এক নতুন প্রজন্মের মুসলিম ফুটবলার নিজেদের পারফরম্যান্স ও বিশ্বাসের প্রকাশের মাধ্যমে সেই প্রচলিত ধারণাকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। স্পেনের লামিন ইয়ামাল, সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারি থেকে শুরু করে কেপ ভার্দের ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলাররা দেখিয়ে দিচ্ছেন, ইসলাম ইউরোপের সমাজ ও সংস্কৃতিরই একটি বাস্তব অংশ।

বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম বসবাস করেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ফলে ১৩টি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইসলামি বিশ্বাসের প্রকাশ অস্বাভাবিক নয়। তবে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন এমন অনেক ফুটবলার, যারা খ্রিস্টান-সংখ্যাগরিষ্ঠ ইউরোপীয় দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

স্পেন ও বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোলের পর সিজদাহ দিয়ে উদযাপন করেন। এর আগেও মার্চে স্পেন-মিশর প্রীতি ম্যাচে তার ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে দর্শকদের একটি অংশ বিদ্বেষমূলক স্লোগান দেয়। জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইয়ামাল লিখেছিলেন, আমি মুসলিম, আলহামদুলিল্লাহ। ফুটবল মানুষের বিনোদন ও আনন্দের জন্য, কারও বিশ্বাসকে অসম্মান করার জন্য নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামকে ‘বহিরাগত’ হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বেড়েছে। অথচ ইয়ামালের মতো ফুটবলারদের উপস্থিতি সেই ধারণার বিপরীত বাস্তবতাই তুলে ধরছে।

জার্মানির ডিফেন্ডার আন্তোনিও রুডিগারও ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশের কারণে বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। ২০২৪ সালে রমজান উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাওহিদের প্রতীক হিসেবে তর্জনী উঁচিয়ে ছবি পোস্ট করার পর সেটিকে উগ্রবাদী সংগঠনের প্রতীক বলে দাবি করা হয়। পরে তিনি মানহানি ও বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ নেন।

একইভাবে, তিউনিসিয়ার বিপক্ষে গোল করে সিজদাহ দিয়ে উদযাপন করেন সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারি। তিউনিসিয়ান বংশোদ্ভূত হলেও সুইডেনের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দেশটিতে নতুন করে পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তবে আয়ারির বাবা আজুজ আয়ারি স্পষ্টভাবে জানান, তার সন্তানরা সুইডেনেই জন্মেছে ও বেড়ে উঠেছে, তাই সুইডেনের প্রতিনিধিত্ব করাই তাদের স্বাভাবিক অধিকার।

ইউরোপে শুধু অভিবাসী পরিবার থেকেই নয়, ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারের সংখ্যাও বাড়ছে। নেদারল্যান্ডসের কিংবদন্তি ক্লারেন্স সিডর্ফ, ফরাসি বংশোদ্ভূত ফ্রেডেরিক কানুতে এবং ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী পল পগবার পর এবার ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জেড স্পেন্সও ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলার হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অভিষেকের মাধ্যমে তিনি ইংল্যান্ডের প্রথম মুসলিম ফুটবলার হিসেবে ইতিহাস গড়েন। স্পেন্স বলেন, ইতিহাসের অংশ হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি এটি বিশ্বের তরুণদের অনুপ্রাণিত করবে।

অন্যদিকে, কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ দলে ইউরোপে বেড়ে ওঠা তিন ইসলাম গ্রহণকারী ফুটবলারও বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন। জ্যামিরো মন্টেইরো, লোগান কস্তা ও স্টিভেন মোরেইরা পেশাদার ফুটবল ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাদের ভাষ্য, মুসলিম সতীর্থদের জীবনযাপন ও ধর্মীয় অনুশীলন কাছ থেকে দেখেই তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন।

কেপ ভার্দে দলে ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে ইতিবাচকভাবেই দেখা হয়। মুসলিম খেলোয়াড়দের জন্য নিয়মিত হালাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয় এবং দলটির মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও ঐক্য বজায় রাখা হয়। লোগান কস্তার ভাষায়, আমরা মুসলিম হই বা খ্রিস্টান, আমাদের শক্তি হলো আমরা সবাই কেপ ভার্দিয়ান।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপে মুসলিম ফুটবলারদের এই উপস্থিতি ও আত্মবিশ্বাসী পরিচয় প্রকাশ শুধু ক্রীড়াঙ্গনের নয়, ইউরোপের বহুসাংস্কৃতিক সমাজ ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে চলমান বিতর্কেও নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

বিশ্বকাপ ২০২৬: ইউরোপে মুসলিম ফুটবলারদের পরিচয়ই নতুন চ্যালেঞ্জ

Monday, July 13, 2026

ফিফা নিরপেক্ষ নয়, এটি রাজনীতির হাতিয়ার হয়ে গেছে by জাভিয়ের আবু ঈদ

বিশ্বকাপ যত এগোচ্ছে, ততই প্রশ্নের মুখে পড়ছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং তার নেতৃত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের পর এক মার্কিন ফুটবলারের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে বিতর্ক তৈরি করেছে। একই সঙ্গে মিসর ও কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার পক্ষে রেফারিদের পক্ষপাতের অভিযোগও উঠেছে।

ফিলিস্তিনের অভিজ্ঞতা আরও দীর্ঘ এবং তিক্ত। বহু বছর ধরেই সেখানে ফিফার আচরণকে পক্ষপাতদুষ্ট ও দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে করা হচ্ছে। অথচ ফিফার নিজস্ব সংবিধানেই স্পষ্টভাবে মানবাধিকার রক্ষার কথা বলা রয়েছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি ফুটবলের ক্ষেত্রে সেই নীতির ধার ধারেনি সংস্থাটি।

ফিলিস্তিনি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বহুবার দাবি জানিয়েছে, ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনকে নিষিদ্ধ করা হোক। কারণ, তাদের লিগের ম্যাচগুলো এমন জমিতে খেলা হয়, যা দখল করা এবং ছিনিয়ে নেওয়া ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, যেখানে অবৈধ বসতিতে থাকা দলগুলো খেলায় অংশ নেয়। কিন্তু ফিফা বারবার সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।

শুধু তা–ই নয়, ফিলিস্তিনি ফুটবলারদের ওপর গণহত্যা চালানো, তাঁদের পঙ্গু করে দেওয়া, এমনকি তাঁদের আটক করার ঘটনাগুলোর বিরুদ্ধেও কোনো অবস্থান নেয়নি ফিফা। সম্প্রতি ফিলিস্তিনি নারী ফুটবল দলের সদস্য র‌্যান্ড হালাওয়ানি এবং নাতালি আবু দায়্যেহকে আটক করা হলেও সে বিষয়ে কোনো প্রতিবাদ জানায়নি সংস্থাটি।

সম্প্রতি ধ্বংস করা হয়েছে ফিলিস্তিনের ফুটবল স্টেডিয়াম। কিন্তু তাতেও ফিফার কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। ফিলিস্তিনি দলগুলোকে যাতায়াতের অনুমতি না দেওয়াসহ নানা নীতির মাধ্যমে তাদের ফুটবলকে বাধাগ্রস্ত করা হলেও সে বিষয়ে কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি ফিফা।

ইসরায়েলি ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন শুধু বর্ণবাদ, দখলদারি ও বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করে তোলেনি, বরং গাজা ও লেবাননে যুদ্ধাপরাধে যুক্ত ইসরায়েলি ফুটবলারদের অংশগ্রহণকে অভিনন্দন জানানোর মতো কাজেও যুক্ত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের একাধিক রায় এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও ফিফা বারবার দাবি করে এসেছে, এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘অত্যন্ত জটিল’ এবং পশ্চিম তীরের চূড়ান্ত আইনি অবস্থান এখনো নির্ধারিত হয়নি।

বাস্তবে এটি ইসরায়েলের বক্তব্যকেই সমর্থন করা, যা ট্রাম্প প্রশাসনও তাদের মিত্র ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এবং ফিলিস্তিনি জমি দখলকে বৈধতা দিতে ব্যবহার করেছে।

ইসরায়েল যেমন পর্যটন, প্রত্নতত্ত্ব, ধর্ম বা কৃষিকে ব্যবহার করে তাদের অবৈধ দখলদারি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে, তেমনই ফিফার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন নিয়ে ফুটবলকেও সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে।

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে ফিফার এই ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইতিমধ্যেই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযোগ জানিয়েছে। তাদের দাবি, তিনি জেনেশুনে এমন কাজ করেছেন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন, বর্ণবৈষম্য এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত। তাদের দাবি, এ বিষয়ে একাধিক রিপোর্ট ও চিঠি তিনি উপেক্ষা করেছেন।

ফিফার নেতৃত্ব শুধু নীরব বা নিষ্ক্রিয় থাকেনি, বরং সক্রিয়ভাবে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে আড়াল করার কাজেও অংশ নিয়েছে।

গত মাসে ফিফা প্রস্তাব দেয়, অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করা হোক। তার কয়েক সপ্তাহ আগে ইনফান্তিনো নিজে ফিলিস্তিনি ফুটবল সংস্থার প্রধানকে ইসরায়েলি ফুটবল সংস্থার প্রধানের সঙ্গে করমর্দন করতে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন।

ফিফা যে আর নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা নেই, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী রাজনীতি থেকে দূরে থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের পররাষ্ট্রনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

ইনফান্তিনোর কর্মকাণ্ডই তার প্রমাণ। ২০১৮ সালে তিনি কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ওয়াশিংটনে আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল আরব বিশ্বের সম্মিলিত আলোচনায় ফিলিস্তিন প্রসঙ্গকে সরিয়ে দেওয়া। ২০২১ সালে তিনি ডানপন্থী ইসরায়েলি সংবাদপত্র জেরুজালেম পোস্ট আয়োজিত এক সম্মেলনে অংশ নেন। আর ওই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল জেরুজালেমের মামিল্লাহ অঞ্চলের এক মুসলিম কবরস্থানের ওপর নির্মিত স্থানে।

এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফিফা প্রধান তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই সংস্থার লক্ষ্য জাতিসংঘকে ফিলিস্তিন প্রশ্ন থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং ইসরায়েলি দখলদারি ও গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি প্রয়াস বন্ধ করা। সেখানে তিনি ফুটবলের মাধ্যমে শান্তি ও পুনর্গঠনের নামে একটি কৌশলগত অংশীদারত্বের ঘোষণাও করেন।

বিশ্বকাপ ঘিরে চলা বিতর্কগুলোকেও এই প্রেক্ষাপটে দেখা দরকার। ফিফা তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়েছে এবং ফুটবলকে রাজনীতির বাইরে রাখার দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়িয়েছে।

আয়োজক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলার, রেফারি এবং দর্শকদের বিরুদ্ধে যে নানা নিয়মভঙ্গ করেছে, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ইনফান্তিনোর প্রতিক্রিয়া ছিল—সবাইকে ‘শান্ত থাকতে’ হবে।

এই সব ঘটনা আন্তর্জাতিক সংস্থা হিসেবে ফিফার ওপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে নষ্ট করছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ফুটবল এবং তার সর্বজনীনতার ভাবমূর্তি। ইনফান্তিনো যদি তাঁর পথ আমূল পরিবর্তন না করেন, তবে তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ধ্বংসের এক ইতিহাস হিসেবেই বিবেচিত হবে।

তবে ফিলিস্তিনি ফুটবল হার মানবে না। ১৯০৪ সালে জেরুজালেমে সেন্ট জর্জ স্কুল দলের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজও চলছে। ফিলিস্তিনের জীবনের প্রতিটি স্তরে ফুটবল জড়িয়ে রয়েছে। আর ফিলিস্তিনের মতোই এই খেলাও দখলদারি, গণহত্যা এবং একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ফিফার বিরুদ্ধেও টিকে থাকার শক্তি রাখে।

* জাভিয়ের আবু ঈদ, ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের পিএইচডি গবেষক ও ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা।
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফিফা প্রেসিডেন্ট
ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফিফা প্রেসিডেন্ট। ছবি: রয়টার্স

Saturday, July 11, 2026

বিশ্বকাপের একটি মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচ যেভাবে ফিলিস্তিন ইস্যুর প্রতীক হয়ে উঠল

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশর ও আর্জেন্টিনার লড়াই শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিতর্কিত রেফারিং, ভিএআর ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন এবং গ্যালারিতে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শনের ঘটনায় ম্যাচটি দ্রুতই ফিলিস্তিন ইস্যুকে ঘিরে বৈশ্বিক রাজনৈতিক বিতর্কের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ম্যাচে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় মিশরের দ্বিতীয় গোল বাতিল করা হয়। এছাড়া আর্জেন্টিনার একটি গোলের আগে ভিএআর পর্যালোচনার আবেদনও গ্রহণ করা হয়নি। এতে অনেক সমর্থক ও বিশ্লেষক অভিযোগ করেন, ভিএআর সমানভাবে ব্যবহার করা হয়নি এবং মিসরের ৩-২ গোলের হার ন্যায়সংগত ছিল না।

মিশরের কোচ হোসাম হাসান ম্যাচ শেষে বলেন, খেলাটি ‘ন্যায্য হয়নি’। তিনি ইঙ্গিত দেন, ফিফা হয়তো আর্জেন্টিনা ও তাদের তারকা লিওনেল মেসিকে জেতাতে চেয়েছিল। পরে মিসর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয়।

এই বিতর্কের আড়ালে আরও বড় একটি বিষয় সামনে এসেছে। ফিলিস্তিন ইস্যু এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হচ্ছে।

ম্যাচের আগে থেকেই কোচ হোসাম হাসান প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে আসছিলেন। ৩ জুলাই প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মিসরের জয় পাওয়ার পর তিনি মাঠে ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান এবং সেই জয় ফিলিস্তিনের জনগণকে উৎসর্গ করেন।

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনেও তিনি ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ নিয়ে আবেগঘন বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ‘যার ফিলিস্তিনিদের জন্য সহানুভূতি নেই, সে মানুষই নয়।’

ম্যাচ চলাকালে গ্যালারিতেও এই রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রকাশ দেখা যায়। গাজার ফিলিস্তিনিরা মিসরের পতাকা উড়িয়ে দলটিকে সমর্থন জানান। অন্যদিকে স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার কিছু সমর্থক ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শন করলে মিসরের সমর্থকেরা ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরেন।

আর্জেন্টিনার জনগণের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের সমালোচক হলেও দেশটির বর্তমান সরকার ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই নিজেকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে জায়নবাদপন্থী প্রেসিডেন্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ইসরায়েলের দৃঢ় সমর্থক।

ট্রাম্প ও ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথাও কারো অজানা নয়। তাদের এ সম্পর্ক ফিফার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফিফা ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর দ্রুত রাশিয়াকে নিষিদ্ধ করলেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে একই ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি। এ নিয়েও ক্রীড়াঙ্গনে সমালোচনা রয়েছে।

এসব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণেই মিসর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্ককে অনেকেই কেবল একটি ফুটবল ম্যাচ হিসেবে দেখেননি। বরং অনেক সমর্থকের কাছে এটি এমন একটি বিশ্বব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে, যেখানে শক্তিশালী পক্ষ তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায় । এতে করে আস্থার সংকট তৈরি হয় নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।

এর মানে এই নয় যে ফিফা গোপনে আর্জেন্টিনাকে জেতানোর ষড়যন্ত্র করেছে। ক্ষমতার প্রভাব সব সময় পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে কাজ করে না, কখনও তা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকটের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায়।

মিশর-আর্জেন্টিনা ম্যাচের বিতর্ক হয়তো দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে। তবে একইসঙ্গে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে কোচ হোসাম হাসানের ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ানো এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরার ঘটনাও অনেকের মনে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। 

বিশ্বকাপে আর্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেয় মিশর। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বকাপে আর্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেয় মিশর। ছবি: সংগৃহীত

Thursday, July 9, 2026

মিসর ম্যাচের ‘ডাকাতি’ নিয়ে মুখ খুললেন নিউইয়র্কের মেয়র

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে শেষ ষোলোয় মিসরের হারের ম্যাচে রেফারিং নিয়ে বিতর্ক এখনো থামেনি। নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি মিসরের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, এ ম্যাচে আফ্রিকান দলটির সঙ্গে ‘ডাকাতি’ করা হয়েছে।

আটলান্টায় আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২–০ গোলে এগিয়ে ছিল মিসর। এরপর আর্জেন্টিনা অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩ গোল করে ম্যাচ ৩–২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। বিদায় নেয় মিসর। ম্যাচে ৫৮ মিনিটে মিসরের একটি গোল ফাউলের কারণে বাতিল হয়। সেই গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েই বিতর্ক হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

গত বুধবার ভোটারদের সঙ্গে আলাপকালে মামদানি বাসের সেবা উন্নত করার একটি নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। সেখানে মিসর ম্যাচের প্রসঙ্গ টানেন তিনি।
মামদানি বলেন, ‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাসে আপনাদের যাতায়াতের সময় ২৪ ঘণ্টা কমে আসবে। আর এক বছর পূর্ণ হতে হতে যাতায়তের সময় থেকে আপনারা বাঁচিয়ে ফেলতে পারবেন দুটির বেশি দিন। এর অর্থ হলো, আপনারা পরিবারের সঙ্গে সকালের নাশতা খাওয়ার সময় পাবেন। সন্তানের লিটল লিগ (বেসবল) ম্যাচে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত নিয়ে তর্ক করার মতো বাড়তি সময় পাবেন। এর মানে হলো, রাতে ঘুমানোর আগে সময়মতো বাড়িতে ফিরতে পারবেন।’

উগান্ডায় জন্ম নেওয়া মামদানি এরপর বলেন, ‘এর মানে হলো, বন্ধুদের আড্ডায় বসে এ বিষয়ে একমত হওয়ার সময় পাওয়া যে, গতকালের ম্যাচে মিসরকে সত্যিই “ডাকাতি” করে হারানো হয়েছে। আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে, আসল অর্থ হলো—নিউইয়র্কবাসীদের সেই মহামূল্যবান সময় ফিরিয়ে দেওয়া, যার ভীষণ অভাব রয়েছে তাঁদের জীবনে।’

দ্রুতগতির বাসের কল্যাণে প্রতিদিন যে ছয় মিনিট সময় বাঁচবে, তা দিয়ে তিনি কী করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বিতর্কিত রেফারিংকে আরও একবার খোঁচা দেন মামদানি, ‘বেঁচে যাওয়া ওই ছয় মিনিটে আমি সম্ভবত মিসরকে কীভাবে ডাকাতি করে হারানো হলো, সেই রিপ্লেগুলোই দেখব। বারবার দেখব।’

ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি তথা ভিএআরের দিকে ইঙ্গিত করে মামদানি রসিকতা করে বলেন, ‘আপনারা তো জানেন, এখন কেবল ভিএআর স্ক্রিনের মতো চারকোনা ইশারাটাই করার বাকি আছে।’

আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হারের পর মিসরের কোচ হোসাম হাসান রেফারিংয়ের তীব্র সমালোচনা করেন। মেসি ও আর্জেন্টিনার প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে হোসাম হাসান বলেন, ‘হয়তো তারা চেয়েছিল, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক। হয়তো তারা চেয়েছিল, মেসি প্রতিযোগিতায় থাকুক।’

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি। এএফপি

Wednesday, June 17, 2026

‘সেক্স আইকন’ জেমস রদ্রিগেজের বর্ণিল প্রেম, পর্নো তারকার সঙ্গে সম্পর্ক এবং...

জেমস রদ্রিগেজ হয়তো কখনো সেই কিংবদন্তি ফুটবলার হয়ে উঠতে পারেননি, যেভাবে তাকে নিয়ে একসময় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। তবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত প্রেম, বিচ্ছেদ এবং মডেলিং জগতের ঝলমলে উপস্থিতির কারণে কলম্বিয়ার অবিসংবাদিত ‘সেক্স আইকন’ হিসেবে তার পরিচিতি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী জেমস বৃহস্পতিবার উজবেকিস্তানের বিপক্ষে কলম্বিয়ার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামবেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হয়ে গোল্ডেন বুট জিতে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। সে সময় মোনাকোর হয়ে খেলা এই প্লেমেকার রাতারাতি তারকাখ্যাতি অর্জন করেন।

বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ তাকে ৬ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের চুক্তিতে দলে ভেড়ায়। এই দলবদলই তার জীবনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এরপর শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও নজর কাড়তে শুরু করেন জেমস রড্রিগেজ। নতুন খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার ফ্যাশন ব্র্যান্ড এক্সিতোর সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি করেন তিনি। একই বছরে স্প্যানিশ সংস্করণের পিপল ম্যাগাজিন তাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে আবেদনময় পুরুষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর এক বছর পর নিজের জে১০ জেমস অন্তর্বাস ব্র্যান্ড বাজারে আনার সময় একটি ফটোশুটেও অংশ নেন তিনি। এরপর একের পর এক বাণিজ্যিক চুক্তি আসতে থাকে তার ঝুলিতে।

সে সময় জেমসের স্ত্রী ছিলেন দানিয়েলা ওসপিনা। ২০১৬ সালে তিনি অন্তর্বাস ব্র্যান্ড কেলভিন ক্লেইনের বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হন। বিভিন্ন বিলবোর্ডে তাকে শুধু ওই ব্র্যান্ডের অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। কৈশোরেই দানিয়েলার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দানিয়েলা ছিলেন আর্সেনালের সাবেক তারকা এবং জেমসের কলম্বিয়ান সতীর্থ দাভিদ ওসপিনার বোন। পেশাদার ভলিবল খেলোয়াড় দানিয়েলাকে ২০১০ সালে বিয়ে করেন জেমস। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। তাদের সংসারে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। তার নাম রাখেন সালোমে। একসময় কলম্বিয়ার ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয় দম্পতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন তারা।

কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেয়ার পর জেমসের ক্রমবর্ধমান খ্যাতি তাদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। জীবনের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার বদলে যেতে থাকায় দু’জনের দূরত্ব বাড়ে। অবশেষে ২০১৭ সালে ছয় বছরের বেশি সময়ের দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন তারা। এর আগেই মডেল হেলগা লাভেকাতির সঙ্গে জেমসের সম্পর্কের গুঞ্জন শোনা যায়। পরে বায়ার্ন মিউনিখে ধারে খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তও সম্পর্কে ভাঙনের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দানিয়েলা জার্মানিতে যেতে আগ্রহী ছিলেন না।

একাকী জীবনে ফেরার পর জেমসের নাম বিভিন্ন নারীর সঙ্গে জড়িয়ে আলোচনায় আসে। ইনস্টাগ্রামে পরস্পরকে অনুসরণ করায় মার্কিন পর্নো তারকা কেন্দ্রা লাস্টের সঙ্গেও তার সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে মায়ামি সফরে মডেল শ্যানন দে লিমার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা মিউনিখে একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন। এক বছর পর গর্ভ ভাড়ার মাধ্যমে তাদের ছেলে স্যামুয়েলের জন্ম হয়। কিন্তু পরে জেমসের এভারটনে ধারে খেলা এবং পরবর্তীতে কাতারের আল-রাইয়ানে যোগ দেয়ার ফলে দূরত্ব তৈরি হয় তাদের সম্পর্কে। দীর্ঘ দূরত্বে সম্পর্কের চাপের কারণে ২০২১ সালে বিচ্ছেদ ঘটে তাদের।

পরবর্তীতে কলম্বিয়ান গায়িকা কারোল জি-এর সঙ্গে একটি ছবি প্রকাশের পর তাদের সম্পর্ক নিয়েও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ব্রাজিলিয়ান মডেল এরিকা শ্নাইডারের সঙ্গেও তার সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরের পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানানো এবং প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপস্থিত হওয়ার কারণে এই জল্পনা তৈরি হয়। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে কলম্বিয়ার একটি ম্যাচেও গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন শ্নাইডার। তবে গত বছরের শুরুতে কলম্বিয়ান মডেল লুইসা দুকের সঙ্গে জেমসের নতুন সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয়। মেজর লিগ সকারে যোগ দেয়ার পর মিনেসোটা টিম্বারউলভসের একটি এনবিএ ম্যাচে তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। কলম্বিয়ার গণমাধ্যমে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে, জেমস তার পরিবারের সঙ্গে লুইসার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এমনকি সাম্প্রতিক কলম্বিয়া ম্যাচগুলোর ভিআইপি গ্যালারিতে জেমসের মেয়ে সালোমের সঙ্গেও লুইসাকে সময় কাটাতে দেখা গেছে।

এই গ্রীষ্মে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলতে নামার আগে জেমস হয়তো ফিরে তাকাবেন এক বর্ণিল কিন্তু অপূর্ণতার ছাপ থাকা ক্যারিয়ারের দিকে। তিনি কখনো ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম হৃদয়জয়ী তারকা হিসেবে নিজের আলাদা পরিচয় ঠিকই গড়ে তুলেছেন।
(সূত্র দ্য সান)

Monday, June 15, 2026

ইরান দলের সংবাদ সম্মেলনে ফুটবল নিয়ে প্রশ্নই হলো না

২০২৬ বিশ্বকাপে সম্ভবত সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সংবাদ সম্মেলন ছিল এটি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ, ভিসা পাওয়া নিয়ে জটিলতা, বেস ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ইরানের ফুটবল দল এবারের বিশ্বকাপের আলোচিত দলগুলোর একটি। নিউজিল্যান্ড ম্যাচ সামনে রেখে এক দিন আগে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পা রেখেছে ইরানের ফুটবল দল।

সেই দলের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে রাজনীতির প্রসঙ্গ আসারই কথা। আর তা এতটাই বেশি যে ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি বলতে বাধ্য হয়েছেন—কেউ তো ফুটবল নিয়ে প্রশ্ন করলেন না!

ইরান বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এই ম্যাচ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা একের পর এক প্রশ্ন করেছেন দলটির বিশ্বকাপ প্রস্তুতি রাজনৈতিক প্রভাব ও তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের ভূমিকা নিয়ে।

সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই এ সব প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমরা এখানে ফুটবল খেলতে এসেছি। ইরানের ভেতরের এবং বাইরে থাকা সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা আমাদের কাজ। আমরা রাজনীতির মানুষ নই।’

লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের ম্যাচের ভেন্যু সোফি স্টেডিয়ামের বাইরে প্রবাসী ইরানিরা বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর বিরোধিতায় বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছেন খবর প্রকাশ হয়েছে। এ নিয়ে ইরানের কোচ বলেন, ‘ইরানি জাতি হিসেবে আমরা প্রতিটি ইরানিকে সম্মান করি।’

ট্রেনিং ক্যাম্প স্থানান্তরসহ প্রস্তুতির সময় দল যেসব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন করার জন্য গালেনোই সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান। ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি কোচের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘আমরা এখানে ফুটবল খেলতে এসেছি, আর ফুটবল সব সময় সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।’

ইরানের হয়ে ১০০টির বেশি ম্যাচ খেলা এবং বর্তমানে গ্রিক ক্লাব অলিম্পিয়াকোসে খেলা এই ফুটবলার আরও বলেন, ‘বহু বছর ধরে ইরান একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি, যারা একটি সভ্যতার অংশ। আমরা সেই ঐক্যটাই দেখাতে চাই। আমরা বিশ্বকাপে এসেছি বিশ্বের যেখানেই ইরানিরা থাকুক, তাদের মনে আনন্দ দিতে। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মতামত থাকতে পারে এবং আমরা তাকে সম্মান করি। তবে আমরা এখানে ফুটবলার হিসেবে এসেছি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে। আমরা রাজনীতিতে জড়াতে চাই না।’

তারেমি সাংবাদিকদের খোঁচা মারেন সংবাদ সম্মেলনে একেবারে শেষদিকে। তিনি বলেন, ‘কেউই ফুটবল নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না। আমরা নিউজিল্যান্ডের মতো দারুণ একটি দলের বিপক্ষে খেলছি। আমি আশা করি এটি একটি ভালো ম্যাচ হবে। রাজনীতির খবরের জন্য আপনাদের অন্য শহরের রাজনৈতিক সংবাদ সম্মেলনে যাওয়া উচিত।’

সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই ও ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি
সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই ও ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি। এএফপি

Friday, June 12, 2026

ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘অননুমোদিত’ পতাকা বা স্লোগান উঠলেই ম্যাচ বন্ধ!

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ শুরুর আগেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ইরান। স্টেডিয়ামে ‘অননুমোদিত’ পতাকা প্রদর্শন কিংবা জাতীয় দলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হলে ম্যাচ বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দেশটির ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।

ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমাদ দোনিয়ামালির বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, এ বিষয়ে ইতোমধ্যে ফিফাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। বিশ্বকাপে ইরানের ম্যাচ চলাকালে যদি অনুমোদনহীন পতাকা প্রদর্শন করা হয় অথবা দলের বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়, তাহলে দলের ম্যানেজার খেলা বন্ধ করার উদ্যোগ নেবেন।

আগামী ১৫ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ইরান। এরপর একই ভেন্যুতে ২১ জুন বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে তারা। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ২৬ জুন সিয়াটলে প্রতিপক্ষ মিসর।

বিশ্বকাপকে ঘিরে ইরানের এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বিতর্ক। বিশেষ করে সিয়াটলে ইরান-মিসর ম্যাচকে স্থানীয় আয়োজকেরা ‘প্রাইড ম্যাচ’ হিসেবে ঘোষণা করায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সিয়াটলের প্রাইড সপ্তাহের সঙ্গে মিল রেখে ম্যাচটি আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

এ নিয়ে আগেই ইরান ও মিসরের ফুটবল ফেডারেশন ফিফার কাছে যৌথভাবে অনুরোধ জানিয়েছিল, যাতে ম্যাচ চলাকালে এলজিবিটিকিউ-সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রম বা প্রতীকী আয়োজন মাঠের ভেতরে না থাকে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইরানকে ঘিরে আরও কয়েকটি বিতর্ক সামনে এসেছে। গত এপ্রিলে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসের বাইরে বিক্ষোভকারীরা ইরানকে বিশ্বকাপ থেকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, জাতীয় দলটি দেশের জনগণের পরিবর্তে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রতিনিধিত্ব করছে।

এর পাশাপাশি টিকিট বিতরণ নিয়েও সমস্যায় পড়েছে ইরান। দেশটির ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করেছে, টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে তাদের জন্য নির্ধারিত টিকিট বরাদ্দ প্রত্যাহার করা হয়। ফলে অনেক সমর্থক আগেই ভ্রমণের পরিকল্পনা করলেও প্রিয় দলের ম্যাচ দেখার সুযোগ হারিয়েছেন।

বর্তমানে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় অনুশীলন করছে ইরান দল। যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভিসা নীতির কারণে তারা ম্যাচের ঠিক একদিন আগে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি পাবে বলে জানিয়েছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ।

সব মিলিয়ে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই রাজনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, ভিসা জটিলতা এবং সমর্থকদের উপস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্নের কেন্দ্রে চলে এসেছে ইরান। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপের মঞ্চে এসব বিতর্ক কতটা প্রভাব ফেলে দলটির পারফরম্যান্সে।

ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি, ‘অননুমোদিত’ পতাকা বা স্লোগান উঠলেই ম্যাচ বন্ধ!

Friday, December 19, 2025

ফিলিস্তিনের ফুটবল যেভাবে মুছে ফেলছে রাজনীতির বিভাজন by খালেদ হরুব

সীমাহীন যন্ত্রণার ভেতরেই কাতারে আরব ফুটবল কাপে জাতীয় দলের টানা জয় ফিলিস্তিনিদের ভেতর জাগিয়ে তুলেছে এক বিরল ঐক্যের অনুভূতি। ফিলিস্তিনের জয়ের উচ্ছ্বাস গাজায় বৃষ্টিভেজা বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু থেকে শুরু করে পৌঁছে যায় লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার শরণার্থীশিবিরে। একই সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বের ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়ে।

ফিলিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের কোচ ইহাব আবু জাজার নিবাস রাফায়। কোচের পরিবারের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, তাঁর মা আশ্রয় নিয়েছেন মাওয়াসি এলাকার একটি তাঁবুতে। তিনিই হয়ে উঠেছেন ফিলিস্তিনের আশা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক। সব বাস্তবতার বিপরীতে তাঁর দল মাঠে এনে দিয়েছে বিজয়ের স্বাদ, উত্তীর্ণ হয়েছে পরের রাউন্ডে। এই জয় তাঁরা প্রথমেই উৎসর্গ করেছেন গাজাকে। এরপর পৃথিবীর পুরো ফিলিস্তিনকে।

‘ফিদায়ি’ নামে পরিচিত এ দলের পেছনে তৈরি হয়েছে এক যৌথ মনোভাব। এ নামের অর্থ যোদ্ধা। এটি শুধু খেলা নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যেখানে তারা বিভক্তি ও হতাশার দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে আবারও এক অখণ্ড পরিচয় ফিরে পেতে চায়।

ক্যামেরার ফ্রেমে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোয় দেখা যাচ্ছে, বিভিন্ন বয়সের নারী, গৃহিণী, প্রবীণ—সবাই সীমাহীন উচ্ছ্বাসে উল্লাস করছেন। কেউ স্টেডিয়ামে, কেউ ক্যাফেতে, কেউবা নিজের ঘরে।

ফুটবল বিশ্বজোড়া এক নেশা, কিন্তু আজ ফিলিস্তিনিদের জন্য এর অর্থ সাধারণ খেলার চেয়ে অনেক বেশি। এ দলের প্রতিটি জয় প্রতিরোধের মতো, গাজায় চলমান গণবিধ্বংসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক প্রতীকী ওঠে দাঁড়ানো। প্রতিটি গোল যেন ঘোষণা দেয়, ‘আমরা এখনো আছি।’ অনেক ফিলিস্তিনের কাছেই এটা ঠিক ছাই থেকে উঠে দাঁড়ানো ফিনিক্স পাখির মতো বিষয়।

ইসরায়েল যখন মানচিত্র থেকে ফিলিস্তিনকে মুছে দিতে চায়, তখন এই খেলোয়াড়দের পায়ের জবাব যেন বলে দেয়, ফিলিস্তিনিরা বিরাজমান এবং অটল। এটি তাদের জন্য একধরনের প্রতীকী চপেটাঘাত। প্রতীকের এই শক্তি গভীর। বহুদিন পর ফিলিস্তিনের নাম ও পতাকা ভেসে উঠছে এমন এক রূপে, যেখানে কোনো দলীয় রং বা রাজনৈতিক বোঝা নেই।

আরব বিশ্বজুড়ে সমর্থক ও খেলোয়াড়েরা ফিদায়ি দলের পাশে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতিতে যে সংহতি বহুদিন চাপা রাখা হয়েছিল, তা এখন উন্মোচিত হয়েছে খেলার ময়দানে।

এটি একভাবে আরব ঐক্যের পুনরুত্থানও বটে, যা রাজনৈতিক সীমানা পেরিয়ে আরবদের একত্র করে। কাতারের সাম্প্রতিক বিশ্বকাপেও আমরা এমন অনুভূতির প্রকাশ দেখেছি।

তিউনিসিয়ার এক খেলোয়াড় ফিলিস্তিনের বিপক্ষে গোল করার পর দৌড়ে গিয়ে ফিলিস্তিনি কোচকে জড়িয়ে ধরেন, যেন ক্ষমা চান। আরব দর্শকেরা নিজেদের পতাকার পাশাপাশি ফিলিস্তিনি পতাকাও উড়িয়ে সমর্থন জানান।

এক ফিলিস্তিনি খেলোয়াড় মাঠ ঘুরে বেড়ান হাতে জড়ানো সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো দৃশ্যটিকে একসূত্রে বেঁধে রাখে কেফিয়াহ।

অনেকের কাছে স্টেডিয়াম হয়ে ওঠে সেই একমাত্র জায়গা, যেখানে তারা স্বাধীনভাবে এমন কিছু প্রকাশ করতে পারে, যা কিছু আরব দেশে কর্তৃপক্ষ নিষিদ্ধ করে রেখেছে। স্টেডিয়ামে পতাকা আর ফিলিস্তিনের ধ্বনি অবাধে প্রবাহিত হয়। আর সেখানেই অগণিত প্রতিকূলতার পরও ফিলিস্তিনি দল উপহার দেয় দুর্দান্ত মানের ফুটবল।

অথচ ফিলিস্তিনের দল গঠন করা ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। অনুশীলনের সুযোগ ছিল খুবই কম, আর সম্পদ প্রায় ছিল না বললেই চলে। দেশের ঘরোয়া লিগ বহু বছর ধরে বন্ধ। ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়েছে স্টেডিয়াম ও ক্রীড়া–সুবিধা। এই বাস্তবতা তাদের সাফল্যকে আরও বিস্ময়কর করে তুলেছে। মনে হয় শুধু ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় মনোভাব এবং ফিদার আত্মা প্রতিটি প্রযুক্তিগত ঘাটতিকে পুষিয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর সহায়তায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনিকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে দুই বছরের নির্মম গণহত্যার ভয়াবহতার পরও কীভাবে এই দল আবার একত্র হয়ে এমন পারফরম্যান্স দেখাল! এই প্রশ্নটাই নিজেই অনেক কিছু বলে দেয়।

ফিলিস্তিনি সমাজতাত্ত্বিক জামিল হিলাল দীর্ঘদিন ধরে লিখে আসছেন যে সংস্কৃতি একটি ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি পরিচয় রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই পরিচয় রাজনীতি, দল এবং গোষ্ঠীর সীমা ছাড়িয়ে যায়। সাহিত্য, কবিতা, শিল্প, সংগীত, নৃত্য, লোকগীতি, রান্না, সূচিশিল্প, প্রতীক, ঐতিহ্য, পুরোনো এবং আধুনিক সব মিলেই গড়ে ওঠে একটি সম্মিলিত চেতনার ভিত্তি। এই সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রকে রক্ষা করাই ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।

আমরা জানি কীভাবে বারবার ফিলিস্তিনির সংস্কৃতি, প্রতীক, সূচিশিল্প এমনকি কুনাফা এবং খাবার পর্যন্ত ইসরায়েলের বলে দাবি করা হয়েছে। একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভিত্তি ভেঙে গেলে তারা দিগ্‌বিদিক ছড়িয়ে যায়, তাদের জাতীয় পরিচয় এবং সামাজিক সংহতি বিপদের মুখে পড়ে।

ফিলিস্তিনের জাতীয় ক্রীড়াক্ষেত্র এখন সম্মিলিত সচেতনতা এবং পরিচয়ের একটি স্তম্ভ হয়ে উঠেছে। এটি এমন এক দিকনির্দেশনা দেয়, যা মাতৃভূমির একত্বর দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে সবাই রাজনৈতিক পরিচয় ঝেড়ে ফেলে এক জায়গায় মিলিত হতে পারে। দলটির খেলাগুলোয় সারা বিশ্বের কোটি ফিলিস্তিনি শুধু কয়েকজন খেলোয়াড়কে দেখছিল না। তারা দেখছিল ফিদাইয়িনদের, যোদ্ধাদের। তারা দেখছিল ইতিহাসের বাহকদের, যারা শুধু একটি খেলা জেতার ইচ্ছার চেয়ে অনেক বড় বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।

* খালেদ হরুব, শিক্ষক ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ
- মিডিল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

ফিলিস্তিনের জয়ের উচ্ছ্বাস গাজায় বৃষ্টিভেজা বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু থেকে শুরু করে পৌঁছে যায় লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার শরণার্থীশিবিরে।
ফিলিস্তিনের জয়ের উচ্ছ্বাস গাজায় বৃষ্টিভেজা বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু থেকে শুরু করে পৌঁছে যায় লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ার শরণার্থীশিবিরে। ছবি: এএফপি

Thursday, August 7, 2025

ইসরায়েলের হামলায় নিহত ফিলিস্তিনি ফুটবলের ‘পেলে’

ফিলিস্তিন জাতীয় দলের সাবেক ফরোয়ার্ড সুলেইমান আল–ওবেইদ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছেন। গাজার দক্ষিণাঞ্চলে মানবিক সাহায্য পেতে অপেক্ষমাণ ফিলিস্তিনি জনতার ওপর ইসরায়েলি বাহিনী হামলা চালালে প্রাণ হারান ৪১ বছর বয়সী এই ফুটবলার। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (পিএএফ) গতকাল তাদের ওয়েবসাইটে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সুলেইমানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।

পিএএফের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে মানবিক সাহায্যের জন্য অপেক্ষমাণ মানুষের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় শহীদ হয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় ও বিচ সার্ভিসেস দলের তারকা সুলেইমান আল–ওবেইদ। ফিলিস্তিন ফুটবলে সুলেইমান “দ্য গ্যাজেল (হরিণ)”, “দ্য ব্লাক পার্ল (কালো মুক্তা)”, “হেনরি অব প্যালেস্টাইন” এবং “পেলে অব প্যালেস্টাইন ফুটবল” নামে পরিচিত ছিলেন। পাঁচ সন্তান রেখে মারা গেছেন ফিলিস্তিন ফুটবলের এই পেলে।’

গাজায় জন্ম নেওয়া সুলেইমান সার্ভিসেস বিচ ক্লাবের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন। এরপর পশ্চিম তীরে গিয়ে সেখানকার ক্লাব আল আমারি ইয়ুথ সেন্টারে ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত খেলেন। ২০১০–১১ মৌসুমে ফিলিস্তিনের প্রথম পেশাদার ফুটবল লিগ জেতেন সুলেইমান। আল আমারি ছেড়ে আল শাতিয়া ক্লাবে এক মৌসুম খেলেন সুলেইমান। এরপর গাজা স্পোর্টস ক্লাবের হয়ে সাউদার্ন গভর্নরেটস প্রিমিয়ার লিগে ২০২৬–১৭ মৌসুমে ১৭ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। পরের মৌসুমে আল খাদামা ক্লাবের হয়েও লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।

পিএএফের বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, দুর্দান্ত গতি ও দক্ষতার জন্য ২০০৭ সালে ফিলিস্তিন জাতীয় দলে জায়গা করে নেন সুলেইমান। ২০১৩ সালে জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলার আগে ২৪ ম্যাচে করেন ২ গোল। এর মধ্যে সুলেইমানের বিখ্যাত গোলটি ২০১০ সালে পশ্চিম এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন চ্যাম্পিয়নশিপে। ইয়েমেনের বিপক্ষে ‘সিজর্স কিকে’ চোখধাঁধানো গোলটি করেছিলেন।

সুলেইমানের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কিংবদন্তি এরিক ক্যান্টোনা নিজের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলে লিখেছেন, ”‘সাহায্য পাওয়ার আশায় রাফায় অবস্থান করার সময় ফিলিস্তিন জাতীয় দলের তারকা সুলেইমান আল–ওবেইদকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। তাকে “ফিলিস্তিনের পেলে” ডাকা হতো। আমরা তাদের আর কত গণহত্যা করতে দেব? ফিলিস্তিন মুক্ত হোক।’”

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘লম্বা ক্যারিয়ারে সুলেইমান আল–ওবেইদ ১০০–এর বেশি গোল করে ফিলিস্তিন ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল তারকায় পরিণত হয়েছিলেন।’ তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে খেলাধুলা ও স্কাউটিং–সংশ্লিষ্ট পরিবারে শহীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৬৬২, যেটা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নির্মূলীকরণ যুদ্ধের মাধ্যমে শুরু হয়। ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন–সংশ্লিষ্ট মৃত মানুষের সংখ্যা ৩২১। এর মধ্যে রয়েছেন খেলোয়াড়, কোচ, প্রশাসক, সংগঠক, রেফারি ও ক্লাবের বোর্ড সদস্য।’

তবে গত ২৩ জুলাই পিএএফের এক্সে করা পোস্টের বরাত দিয়ে ফুটবলপ্যালেস্টাইন ওয়েবসাইট জানিয়েছে, গত ৬৬৯ দিনে ইসরায়েলের হামলায় ৪০০–এর বেশি ফুটবলার নিহত হয়েছেন। সেই পোস্টে তখন জানানো হয়েছিল, সর্বশেষ ৬৫৬ দিনে খেলাধুলা ও স্কাউটিং–সংশ্লিষ্ট ৮০০–এর বেশি নিহত হয়েছেন ইসরায়েলের হামলায়।

গত ২৯ জুলাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ফিলিস্তিন অলিম্পিক কমিটি জানিয়েছে, শুধু জুলাই মাসেই গাজা ও দখলকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের হামলায় ৪০ জন ফিলিস্তিনি অ্যাথলেট নিহত হয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘একেকটি দিন যায় আর ফিলিস্তিনের ক্রীড়াঙ্গনে বিয়োগান্ত ঘটনার নতুন অধ্যায় যোগ হয়।’

গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে ৬১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নাগরিক মারা গেছেন। আহত হয়েছেন দেড় লাখের বেশি; তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগই নারী ও শিশু বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম প্রেসটিভি।

সুলেইমান আল–ওবেইদ
সুলেইমান আল–ওবেইদ। এক্স

Tuesday, June 24, 2025

ইনফান্তিনো-ট্রাম্প ‘ব্রোমান্স’–এর ভেতরে কী আছে

প্রায় সাত বছর আগের কথা। ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। জিয়ান্নি ইনফান্তিনো হোয়াইট হাউসে তাঁর ওভাল অফিসে গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে ফুটবলের লাল ও হলুদ কার্ডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

ইনফান্তিনো তত দিনে ফিফা সভাপতি হলেও বৈশ্বিকভাবে তেমন পরিচিতি পাননি। কয়েক সপ্তাহ আগে ২০১৮ বিশ্বকাপের আয়োজন শেষ করেছেন। ২০১৫ সালে ফিফায় সংকটের পরের বছর ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির দায়িত্ব পান।

২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব যুক্তরাষ্ট্রের পাওয়ার পেছনে ইনফান্তিনোর প্রচেষ্টার জন্য তখন এই সুইস-ইতালিয়ানের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন ট্রাম্প। তবে এই বলে অনুযোগও করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ যখন আয়োজিত হবে, তখন তিনি প্রেসিডেন্ট অফিসে থাকবেন না। আর না থাকলে তাঁর ভাষায়, ‘সংবাদমাধ্যম হবে খুব বিরক্তিকর।’ তিনি না থাকলে ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের লগ্নে হোয়াইট হাউসকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম কেমন হবে, তা নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘খুব বিরক্তিকর হবে। ওদের হয়তো কোনো কাজই থাকবে না।’

ট্রাম্পের এ কথাগুলোর ফাঁকেই ইনফান্তিনো তাঁর কাজ সেরে নেওয়ার চেষ্টা করেন। যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে আসা লাল ও হলুদ কার্ড দেখিয়ে ফিফা সভাপতি বলেন, ‘হলুদ কার্ড হলো সতর্ক করে দেওয়ার জন্য। আর যখন আপনি কাউকে বের করে দিতে চাইবেন...এভাবে’—বলে লাল কার্ড উঁচিয়ে ধরেন ইনফান্তিনো। ট্রাম্পকে দেখে বেশ উৎফুল্ল মনে হয়েছিল। ইনফান্তিনোর কাছ থেকে লাল কার্ডটি নিয়ে তিনি সেটা উপস্থিত সংবাদকর্মীদের দেখান।

সুইস আইনজীবী ইনফান্তিনোর বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বেসর্বা হিসেবে উত্থান অসাধারণ এক গল্প। ফিফা সভাপতির ভিত তৈরি হয়েছে ট্রাম্পের পৃষ্ঠপোষকতায় যুক্তরাষ্ট্রে দুটি বিশ্বকাপ আয়োজন এবং সৌদি আরবকে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব দেওয়ার মাধ্যমে। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব পাওয়ার পথটা ট্রাম্পই সুগম করে দিয়েছেন বলে গুঞ্জন আছে।

২০১৮ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে সেই বৈঠক থেকে একটি বিষয় শিখে নিয়েছিলেন ইনফান্তিনো—ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে এবং জনসমক্ষে কীভাবে সামলাতে হবে। সে বিদ্যাটা এখনো কাজে লাগাচ্ছেন ফিফা সভাপতি। চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি বসেছিলেন।

গত বৃহস্পতিবার জুভেন্টাসের খেলোয়াড় ও ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন ইনফান্তিনো। ট্রাম্প জুভেন্টাসের দুই যুক্তরাষ্ট্রের খেলোয়াড় ওয়েস্টন ম্যাকেনি ও টিমোথি উইয়াহর সঙ্গে হাত মেলান। এরপর ট্রাম্পের চারপাশে দাঁড়ান জুভেন্টাসের খেলোয়াড়, ম্যানেজমেন্ট ও ইনফান্তিনো। ট্রাম্প তখন ক্লাব বিশ্বকাপের প্রসঙ্গে আর যাননি, এর চেয়ে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে কথা বলতেই তাঁর আগ্রহ ছিল বেশি।

তবে কিছুক্ষণ পরপরই বিভিন্ন বিষয় জানতে মুখ ফিরিয়েছেন তাঁর বন্ধু ইনফান্তিনোর প্রতি। জুভেন্টাসের ম্যাচে টিকিট অপ্রতুলতা নিয়ে কথা বলেছেন। মজাও করেছেন। ট্রাম্প যতবার মজা করেছেন, ইনফান্তিনো ততবারই জানতেন কী করতে হবে। ফিফার দুটি টুর্নামেন্ট সেখানে আয়োজনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর বারবার গুরুত্ব আরোপ করেছেন ইনফান্তিনো।

২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনে ট্রাম্পের কাছ থেকে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সাহায্য পেয়েছেন ইনফান্তিনো। এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত প্রজেক্টেও—৩২ দলের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ—যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন তিনি পেয়েছেন। এই ক্লাব বিশ্বকাপ আসলে উয়েফা ও ইউরোপিয়ান লিগগুলোর সূচির বিরুদ্ধাচরণ করে আয়োজিত টুর্নামেন্ট। এটা বলাই যায়, ফিফা সভাপতির আদেশে এটা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী টুর্নামেন্ট।

এই টুর্নামেন্ট কতজন দেখছেন, কতজন স্ট্রিম করছেন, সেসব অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইনফান্তিনো বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর দুজন মানুষের সঙ্গে নিজের ক্ষমতা একীভূত করতে পেরেছেন, তা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বকাপ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে বসেছেন। টিফানি অ্যান্ড কোম্পানির ডিজাইন করা ক্লাব বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে পোজ দিয়েছেন। ইনফান্তিনোর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন আর ক্রাউন প্রিন্স বিন সালমান করেছেন আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তিনি পুরো আয়োজনের খরচ মিটিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইনফান্তিনো এ পর্যন্ত আসতে পারলেন কীভাবে? মানে ট্রাম্পের কাছাকাছি।

ফিফায় দুর্নীতির পর ইনফান্তিনোর উত্থান

১০ বছর আগে ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটারের দুর্নীতির জঞ্জাল থেকে উত্থান ইনফান্তিনোর। উয়েফার সাবেক সভাপতি মিশেল প্লাতিনিও তাঁর সাবেক ‘বস’। তিনি ফিফার সর্বময় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হন বিখ্যাত ‘ফিফা ২.০’ টিকিট দিয়ে—ফিফাকে অতীতের সব দুর্নীতিমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন।

২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নিশ্চিত হয়েছিল ২০১০ সালের ভোটাভুটিতে। তখন যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রার্থী হলেও তাদের স্বপ্নপূরণ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং জুরিখের সেই ভোটাভুটিতে তিনিও ছিলেন, যেখানে প্রথম রাউন্ডে ফিফার নির্বাহী কমিটির মাত্র তিনটি ভোট পেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পাঁচ বছর পর কি দেখা গেল?

২০১৫ সালের ২৭ মে জুরিখের এক হোটেল থেকে ফিফার নির্বাহীদের গ্রেপ্তার করে সুইস পুলিশ। এফবিআইয়ের ফিফা বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযানের অংশ ছিল সে গ্রেপ্তার কার্যক্রম। এর মাধ্যমে ফিফায় ব্লাটারের প্রশাসনিক কার্যক্রমও ভেঙে পড়ে।
২০১৫ সালের মে মাসের সেই ঘটনার পর ফিফা ক্লিনটনের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং ‘ফিফা ২.০’ কার্যক্রম শুরু করে। এর অংশ ছিলেন ক্লিনটনের কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টা যাঁরা তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২২ বিশ্বকাপের প্রার্থিতায় কাজ করেছেন।

সে বছরই পরবর্তী সময়ে ভোটের মাধ্যমে ফিফার সংস্কার কমিটিতে জায়গা পান ইনফান্তিনো এবং পরের বছর ফেব্রুয়ারিতে ফিফার সভাপতি হন। আট মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে ক্ষমতাসীন হন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্পের ইচ্ছাপূরণ করেন ইনফান্তিনো

২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশকে দেওয়ার প্রয়োজন ছিল ইনফান্তিনোর। তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর প্রথম যে বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব দেওয়া হয়, সেটাও ২০২৬ বিশ্বকাপ। বড় বড় বাণিজ্যিক চুক্তি ও আন্তর্জাতিক বড় বড় ব্র্যান্ডগুলোকে ফিফায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন ছিল ইনফান্তিনোর। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনেরও প্রয়োজন ছিল ফিফার। ট্রাম্প নিজেও এটা পছন্দ করেছেন, যেমনটা তিনি পছন্দ করেন ইনফান্তিনোকে। এর পেছনে আরেকটি কারণ হতে পারে ট্রাম্পের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান ১৯ বছর বয়সী ব্যারন ফুটবলভক্ত। সে হয়তো বাবাকে বলেছে ইনফান্তিনো ফুটবলে কত বড় মানুষ!

২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার ব্যাপারটি ট্রাম্প খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিলেন। এ কারণে পারিবারিক সদস্যকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেন। হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সকার ফেডারেশন এর যোগাযোগের মাঝে সেতুবন্ধ ছিলেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। এই বিশ্বকাপ আয়োজনে ট্রাম্প বাকি দুটি সহ–আয়োজক দেশের নাম সংবাদমাধ্যমের সামনে খুব কমই উল্লেখ করেছেন। কিন্তু গত মাসে হোয়াইট হাউসে সংবাদ সম্মেলনে ইনফান্তিনো সুযোগটি নিয়ে দুটি সহ–আয়োজক দেশের নামও উল্লেখ করেন, পরে যার প্রশংসাও করেন ট্রাম্প।

২০১৯ সালে দাভোস সম্মেলনে ট্রাম্পকে অতিথি করেছিলেন ইনফান্তিনো। সে বছর যুক্তরাষ্ট্র নারী ফুটবল দলের একাংশ হোয়াইট হাউসে যেতে অস্বীকৃতি জানানোর পর সেটাও সামাল দেয় ইনফান্তিনো প্রশাসন। ফিফা কংগ্রেসে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে মরক্কোর দ্বিগুণ ভোট পায় যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ ট্রাম্পের ইচ্ছাপূরণ করেন ইনফান্তিনো।

ইনফান্তিনোর ঝুঁকিও আছে

২০১৮ সালে ট্রাম্প অনুযোগ করেছিলেন, ফিফা বিশ্বকাপ আসতে আসতে তিনি হয়তো হোয়াইট হাউসে থাকবেন না। কিন্তু গত বছর ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন জিতে তিনি ক্ষমতায় আসার পর ফের চাঙা হয় দুজনের সম্পর্ক। ট্রাম্পের আরও কাছে যাওয়া এবং তাঁর ব্যক্তিগত বলয়ে ঢোকার কোনো সুযোগ নষ্ট করেননি ইনফান্তিনো। এমনকি ট্রাম্পের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য সফরে বেশি সময় কাটানোর কারণে গত মে মাসে প্যারাগুয়েতে তিনি নিজের অনুষ্ঠান ফিফা কংগ্রেসেও সময়মতো উপস্থিত হতে পারেননি।

ইনফান্তিনো হয়তো বলতে পারেন, তাঁকে ট্রাম্পের নিয়মনীতি মেনে চলতে হয়েছে। আগামী ১৩ মাসের জন্য ফিফা আসলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ‘বিবাহবন্ধনে’ আবদ্ধ। ২০২৬ বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সাফল্য ইনফান্তিনোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ফিফা সভাপতির ক্ষমতা ধরে রাখতে ২১১টি সদস্যদেশকে রাজস্ব এনে দেওয়া ইনফান্তিনোর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ট্রাম্প তাঁর শক্তিশালী মিত্র। তবে প্রয়োজনে ট্রাম্প যে ইনফান্তিনোর পাশ থেকে সরে যেতে কার্পণ্য করবেন না, সেটাও সত্যি। ইনফান্তিনোর তাই ঝুঁকিও আছে।

তবে ইনফান্তিনোও ট্রাম্পকে খুব ভালোভাবে জানেন। পর্দার আড়ালে ট্রাম্প প্রশাসনের ভিসা নীতি শিথিল ও কর মওকুফ করতে হবে ফিফাকে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে থাকা ব্যক্তির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ার বিকল্প নেই ইনফান্তিনোর। এই ব্যবসায়িক সম্পর্ক তাঁর বিন সালমানের সঙ্গেও আছে।

২০২৬ বিশ্বকাপে কোনো স্থানীয় আয়োজক কমিটি নেই, যেটা ’৯৪ বিশ্বকাপে ছিল যুক্তরাষ্ট্রে। বিশ্বকাপ আয়োজনে ফিফা মায়ামিতে অফিস নিয়ে নিজেরাই পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সকার ফেডারেশনও এই পরিকল্পনায় খুব একটা নেই। গত মাসে ট্রাম্পের ঘোষিত টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জিউলিয়ানির—তিনি আবার ট্রাম্পের বন্ধুর ছেলে—সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে ফিফার। সব মিলিয়ে আগামী ১৩ মাসে ফিফা কোন পথে এগোবে যুক্তরাষ্ট্রে, সেটা আসলে ট্রাম্প ও ইনফান্তিনোর সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে—যেটা এরই মধ্যে অনেকের কাছে ‘ব্রোমান্স’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তাঁদের সম্পর্কের শুরু অবশ্য আরও আগে
ক্লাব বিশ্বকাপের শিরোপা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তাঁদের সম্পর্কের শুরু অবশ্য আরও আগে। রয়টার্স

Saturday, March 22, 2025

হামজার বাংলাদেশ দলে যোগ দেয়া নিয়ে বৃটেনে আলোড়ন

ইংল্যান্ডের বয়সভিত্তিক দলে খেলেছেন, নিয়মিত খেলছেন দেশটির শীর্ষ ফুটবল লীগেও। সেখান থেকে বাংলাদেশ জাতীয় দলে যোগ দিয়েছেন হামজা দেওয়ান চৌধুরী। আগামী ২৫শে মার্চ শিলংয়ে ভারতের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হবে এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের। আর হামজার লাল-সবুজ জার্সি পড়া, মাতৃভূমিতে ফেরা নিয়ে আলোড়ন উঠেছে বৃটেনে। এ নিয়ে বৃটিশ পত্রিকাগুলোও ছাপছে ঢাউস সংবাদ।

ইংলিশ দৈনিক দ্য সান হামজাকে নিয়ে বড় একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশে আসার পর জন্মভূমি সিলেটে তাকে অনাড়ম্বর আয়োজনে বরণ করে নেওয়া হয়। সারাদিন তাকে নিয়ে উচ্ছ্বাসের শেষ ছিল না মানুষের। হামজার ছোটবেলার ছবিসহ ওইদিনের কিছু ভিডিও ফেসবুকে আপলোড দেন হামজা। সেটাকে নিয়েই রিপোর্ট শুরু করে সান। তারা লিখেছে, ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলের সাবেক ফুটবলার হামজা বাংলাদেশে তাকে স্বাগত জানানোর দারুণ একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন। লেস্টার সিটির এই ডিফেন্ডার বর্তমানে শেফিল্ড ইউনাইটেডে ধারে খেলছেন। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের মধ্যে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে ৭টি ম্যাচ খেলেছেন হামজা। বিশ্বসেরা ক্লাব বার্সেলোনাতে যোগ দেওয়ার কাছাকাছিও ছিলেন তিনি।
এরপর সান লেখে, যাই হোক ইংল্যান্ড দলে যোগ দেওয়ার রাস্তা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছিল তার জন্য। পরে সে মায়ের দেশ বাংলাদেশকে বেছে নেয়। চৌধুরী যে কিনা বাংলাতেও কথা বলতে পারে, সে তার মা ও সৎ বাবার সঙ্গে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে বড় হয়েছে। ছোট থেকেই সে নিয়মিত বাংলাদেশে তার জন্মশহরে যাতায়াত করতো।

২০২৪ সালে সে বাংলাদেশের পাসপোর্ট পায় আর ওই বছরের ডিসেম্বরে ফিফা তাকে দেশটির হয়ে খেলার অনুমতি দেয়। ২০২১ সালে লেস্টারের হয়ে এফএ কাপ জয়ী হামজার প্রথম ডাক আসে ভারতের বিপক্ষে এএফসি এশিয়ান কোয়ালিফায়ারের ম্যাচে। এই ম্যাচ খেলার জন্য বাংলাদেশে পৌঁছালে তাকে দারুণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। এরপর সে তার পরিবার, ছোটবেলার ছবির সঙ্গে এবারের অভ্যর্থনার কিছু ভিডিও আপলোড করে।
সেখানে একজন কমেন্ট করেন, ‘প্রিয় হামজা, তুমি আমাদের আবার স্বপ্ন দেখা শেখাচ্ছো। আমি আশা করি তুমি সাফল্য বয়ে আনবে যার জন্য আমরা অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছি। একজন নেতা হও, যেটা আমরা চাই। এবং আমাদের সাফল্যে ভাসতে দাও। বাংলাদেশ তোমাকে ভালোবাসে।’

দ্য সান আরও লিখেছে, চৌধুর অলিভিয়া নামের এক ইংলিশ নারীকে বিয়ে করেছেন, তাদের ৩ সন্তান আছে। হামজা প্রথম বাংলাদেশি খেলোয়াড় হতে যাচ্ছেন যিনি কিনা ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ খেলেছেন। হামজার একটি কোট দিয়েছে সান, ‘বাংলাদেশ ছোটবেলায় আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে যেটা এখন আমি আমার বাচ্চাদের শেখাতে পারবো। এটা কৃতজ্ঞতা স্বীকার ও সবাইকে একভাবে ট্রিট করা। ইংল্যান্ড অবশ্যই আমার বাড়ি এবং বাংলাদেশও। নিজের শিকড়ে ফিরে যাওয়া ও নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা আমার জন্য সবকিছু। এটা আমাকে গর্বিত করে। ১৬ বছর পর্যন্ত প্রতি বছর আমি বাংলাদেশে যেতাম কখনও সেটা বছরে দুইবার। ওই বছরগুলোতে বাংলাদেশে পরিবারের সঙ্গে ভ্রমণের সময় আমার প্রচুর স্মৃতি আছে।’

mzamin

Tuesday, March 18, 2025

তাইনে আমরার হামজা

হামজা চৌধুরী। হবিগঞ্জের সন্তান। বৃহত্তর সিলেটের তরুণ তুর্কি। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে লেস্টার সিটির হয়ে খেলার সময় নজর কাড়েন ফুটবল দুনিয়ার। বৃটেনের বাঙালি কমিউনিটিতে তাকে ঘিরে তৈরি হয় উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা। এই উচ্ছ্বাস আর উম্মাদনার ঢেউ সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এসে  পৌঁছেছে হামজার পিতৃভূমিতে। দেশের ফুটবলের হয়ে লড়তে এই তরুণ ছুটে এসেছেন দেশে। লন্ডন থেকে সরাসরি সিলেটে পৌঁছে ছুটে যান হবিগঞ্জের বাহুবলে। বিমানবন্দর থেকে বাহুবল, সর্বত্র তাকে ঘিরে অন্য এক উন্মাদনা, উচ্ছ্বাস। ফুটবলপ্রেমীদের ভালোবাসায় সিক্ত হামজা খুব বেশি কথা বলার সুযোগ পাননি। তবে  দেশের হয়ে খেলে জয়ী হওয়ার আবেগময় বার্তা দিয়েছেন নিজের ভাষায়।

লেস্টার সিটি ছেড়ে হামজা এখন শেফিল্ডে। খেলছেন নিয়মিত। ক্লাবের অন্যতম তারকা তিনি। সবার নজর তার দিকে। সেই হামজা এবার খেলবেন বাংলাদেশের হয়ে। লাল-সবুজের জার্সিতে। আগামী মঙ্গলবার ভারতের বিপক্ষে হবে তার অভিষেক।

সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত দু’টায় বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে ম্যানচেস্টার থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হন হামজা। স্মরণীয় এ সফরে তার সঙ্গী মা, স্ত্রী ও সন্তানেরা। বাংলাদেশে ১১.৪০ মিনিটে হামজাকে বহনকারী বিমানটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এর আগেই সিলেটে হামজাকে রিসিভ করতে আসা বাফুফের এক কর্মকর্তা বলেন, এতটা আশাবাদী ছিলাম না আমরা। হামজা আসবে। দেশের কথা শুনলেই অনেকেই চোখ ফিরিয়ে নেন। কিন্তু হামজা ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের হয়ে খেলার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন। দেশকেই দিলেন প্রাধান্য। নাগরিকত্ব জটিলতা কাটিয়ে হামজা হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের একজন। এখন তিনি বাংলাদেশ ফুটবলের মহাতারকা। ছোটবেলায় পিতা মোর্শেদ দেওয়ান চৌধুরীর সঙ্গে দেশে এসেছিলেন। এবার এলেন বহুদিন পর। তারকা হয়ে। বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করতে তার এই আসা। সিলেট বিমানবন্দরের ভিআইপি গেট দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সিঁড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই ভিড়ে চিঁড়েচ্যাপটা হওয়ার জোগাড় হামজা চৌধুরীর। বাফুফে কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর উৎসুকদের ফাঁক গলে যখন সামনে এলেন, চোখের সামনে শত শত ক্যামেরা, মুঠোফোন আর মানুষের ভিড়। সবাই হামজার কাছ থেকে কিছু শুনতে চান। কিন্তু হামজা শোনাবেন কী, চারপাশের শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা। কে কী বলছে, বোঝা ভার। মিনিট তিনেক ধরে সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা চালালেন হামজার আশপাশে থাকা কয়েকজন। হামজার দেশে ফেরা নিয়ে গত কয়েকদিন দেশের ফুটবলে আলোড়ন উঠলেও বিমানবন্দরে সংবাদ সম্মেলনের কোনো ব্যবস্থা করেনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)। প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমকর্মীদের পাশাপাশি প্রচুর ইউটিউবার ক্যামেরা হাতে বিমানবন্দরে হাজির হন। হামজাকে অভিনন্দন জানানো ব্যানার নিয়ে হাজির হওয়া সমর্থকেরাও জড়ো হন একই জায়গায়। সব মিলিয়ে বিমানবন্দরের ভিআইপি প্রবেশপথের সামনে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়। হামজার বাংলাদেশ দলে অভিষেক হওয়ার কথা রয়েছে আগামী মঙ্গলবার এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে প্রথমে হট্টগোলের কারণে বুঝতেই পারেননি হামজা। নিজেই পাল্টা জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি বুঝছি না, বুঝছি না।, এরপর আবার বুঝিয়ে বললে হামজা বলেন, ‘ইনশাআল্লাহ্‌ আমরা উইন খরমু। আমার বড় স্বপ্ন আছে। কোচ হাভিয়েরের সঙ্গে কাজ করবো। ইনশাআল্লাহ্‌ আমরা উইন করিয়া প্রোগ্রেস করতে পারমু।’ এরপর আরও প্রশ্নের উত্তর দিতে চেয়েছিলেন হামজা।

তবে বাফুফে কর্মকর্তারা তাকে সরিয়ে নিয়ে যান। সিলেট বিমানবন্দর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হবিগঞ্জের দিকে রওনা দেন হামজা। একফাঁকে বেরিয়ে আসেন হামজার পিতা বাহুবলের স্নানঘাটের সন্তান মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। সাংবাদিকের কাছে অনুভুতি জানাতে গিয়ে বলেন; হামজা দেশকে ভালোবাসে। সে ফুটবলের উন্নতি চায়। এর এই ভালোবাসা থেকে তার দেশে আসা। এজন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়াও চান। হামজার সঙ্গে এবার দেশে এসেছেন তার পরিবারের প্রায় সবাই। স্ত্রী -সন্তানও। ছাদখোলা জিপে করে এয়ারপোর্টের ভিআইপি’র সামনে থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন হামজা চৌধুরী। তখনও উৎসব চলছিল বাইরে। হামজা সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে হাসি দিয়ে রওয়ানা দিলেন হবিগঞ্জের পথে। হামজা গতকাল বিকাল ৩ টায় বাহুবলের নিভৃত জনপদ স্নানঘাট গ্রামে প্রবেশ করেন।  সেহ্‌রির খাওয়ার পর থেকেই মূলত দু’-একজন করে লোক আসতে শুরু করে হামজা চৌধুরীদের গ্রামের বাড়িতে। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইট-সিমেন্টের প্রাচীরে ঘেরা বাড়ি লোকে লোকারণ্য হয়ে ওঠে। সেখানে নারী, শিশুসহ সব বয়সী মানুষ ছিলেন। সবাই উদগ্রীব; কখন দেখা মিলবে ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলানো সেই টগবটে তরুণ তুর্কির। এক সময় প্রহর গুনা শেষ হয়। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে তিনি বাড়িতে প্রবেশ করেন বাড়িতে। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়লো তাকে এক নজর দেখার জন্য। একপর্যায়ে জনমানুষের এ স্রোত স্বেচ্ছাসেবী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন আর সামাল দিতে পারলেন না। এ অবস্থায়ই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা ভক্ত, অনুরাগী, পাড়া-প্রতিবেশী, স্বজন-পরিজনরা ফুলের তোড়া দিয়ে এবং ফুল ছিটিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। এ সময় ‘হামজা’ ‘হামজা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। হামজা চৌধুরী তখন ‘আই প্রাউড’, ‘ইমেজিং’ ইত্যাদি ইংরেজি শব্দ বলে সমবেত লোকজনের ভালোবাসার জবাব দেন।
বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে তার জন্য বাড়ির উঠানে স্থাপিত অস্থায়ী মঞ্চে কথা বলার জন্য তাকে তোলা হয়। এ সময় ‘হামজা’ ‘হামজা’ স্লোগান দিতে দিতে বাঁধভাঙা মানুষের ঢল আছড়ে পড়ে ছোট্ট মঞ্চের উপর। আয়োজকরা এ পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে থাকেন। এ সময় লোকজনকে আশপাশের বাড়িঘরের ছাদ, চাল ও গাছের ডালে ঝুলে উঁকি দিয়ে হামজা চৌধুরীকে দেখার চেষ্টা করেন। সব বাধা ঢেলে বিপুলসংখ্যক মানুষ মঞ্চের উপর উঠে পড়লে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। এ অবস্থায় মাইক্রোফোনের কাছে গিয়ে হামজা চৌধুরী সবার উদ্দেশ্যে কথা বলেন, ‘আস্‌সালামুআলাইকুম, আমার খুব ভালা লাগছে, আপনারা হকলে আইছন আমারে দেখার লাগি।’ এককথা বলে তিনি ‘বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিতে শুরু করেন। এ সময় সমবেত লোকজনও তার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগানে স্লোগানে দেশপ্রেমের আবহ তৈরি করেন। একপর্যায়ে সবাইকে ইংরেজিতে অভিবাদন জানিয়ে তার ও বাংলাদেশ ফুটবল দলের ভারত জয়ের জন্য দোয়া চেয়ে কথা বলা শেষ করেন। এ সময় সমবেত লোকজন ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
এর আগে হামজা চৌধুরীকে বহনকারী গাড়িবহর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বাহুবল উপজেলার পুটিজুরী বাজারে পৌঁছলে সেখান থেকে মোটরসাইকেল শোভাযাত্রার মাধ্যমে তাকে গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে স্থানীয় লোকজন হাত উঁচিয়ে এবং ফুল ছিটিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। এ সময় তিনিও হুডখোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে স্থানীয় লোকজনকে জবাব দেন।

mzamin

ফুটবলের নতুন ইতিহাস রচনায় ইপিএল তারকা হামজা চৌধুরী সিলেটে by ওয়েছ খছরু

হামজা চৌধুরী। হবিগঞ্জের সন্তান। বৃহত্তর সিলেটেরও। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ লেস্টার সিটির হয়ে খেলার সময় নজর কাড়েন সবার। বৃটেনের বাঙালীর কমিউনিটিতে তাকে ঘিরে প্রথমেই শুরু হয় উচ্ছ্বাস। আর এই উচ্ছ্বাসের ঢেউ সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে এসে লাগে বঙ্গেয় সাগর তীরের দেশ বাংলাদেশে। আর লাগবেই বা না কেনো। কারণ ইপিএল কাঁপানো তরুণ এই তুর্কির বাড়ি বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেটের হবিগঞ্জে। তখন থেকেই রাতজেগে খেলা দেখা বাংলাদেশের ফুটবল প্রেমীদের চোখ হামজার দিকেই। ইপিএলের হামজার খেলা দেখতে টিভি পর্দায় মুখিয়ে থাকেন সিলেটের শুভাকাঙ্খীরা। লেস্টার সিটি ছেড়ে হামজা এখন শেফিল্ডে। খেলছেন নিয়মিত। ক্লাবের অন্যতম তারকা তিনি। সবার নজর তার দিকে। বাংলাদেশের ফুটবল তাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতেই পারে। দেখাটা অস্বাভাবিক নয়। বাফুফে থেকে আন্দাজে ঢিল ছোড়া হয়েছিলো হামজার দিকে। টেস্ট করে দেখা আর কী।

সিলেটে হামজাকে রিসিভ করতে আসা বাফুফের এক কর্মকর্তা জানালেন, এতোটা আশাবাদী ছিলাম না। হামজা আসবে। দেশের কথা শুনলেই অনেকেই চোখ ফিরিয়ে নেন। কিন্তু হামজা ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের হয়ে খেলার প্রস্তাবে সাড়া দিলেন একটু ভেবে চিন্তে। সেখানে দেশকেই দিলেন প্রাধান্য। নাগরিকত্ব জটিলতা কাটিয়ে হামজা হয়ে উঠেন বাংলাদেশের একজন। এখন তিনি বাংলাদেশ ফুটবলের মহাতারকা। ছোটবেলায় পিতা মোর্শেদ দেওয়ান চৌধুরীর সঙ্গে দেশে এসেছিলেন। এবার এলেন বহুদিন পর। তারকা হয়ে। বাংলাদেশের মুখ উজ্জল করতে তার এই আসা। তার উদ্দেশ্য আগামী ২৫ শে মার্চ ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে লাল সবুজের জার্সি গায়ে জড়ানো।

দিন-ক্ষণ ঠিক হওয়ার পর হামজা চৌধুরীর জন্য সিলেটে কেবল অপেক্ষা। দেখতে দেখতে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১৭ই মার্চ ২০২৫। দিনটি স্মরণীয় হয়ে থাকতে পারে বাংলাদেশের ফুটবলে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে খেলা কোনো বাংলাদেশি বিশেষ করে সিলেটি নিজের দেশের হয়ে খেলতে প্রথম পা রাখেন দেশের মাটিতে। বেলা তখন ১১টা। সিলেট ওসমানী আর্ন্তজাতিক বিমানবন্দর। ওসমানী এয়ারপোর্টের আকাশ তখন রৌদ্রজ্জল। এয়ারপোর্টে সামনে উৎসবের আমেজ। লাল-সবুজের জার্সি গায়ে অনেকেই উপস্থিত। জার্সি গায়ে ব্যান্ড পার্টির তালে তালে নাচছেন তরুণরা। দিনটি তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। রং ছিটানোর দিন। কেউ কেউ রং হাতে নিয়ে উপস্থিত। ছিটাচ্ছেন তরুণদের মধ্যে। অন্য এক আবেগ। সবার চোখ আকাশের দিকে। কিছু একটা খুঁজছেন সবাই। এমন সময় আকাশের গায়ে ভেসে উঠলো ছোট্ট একটি বিমান। কাগুজের তৈরি বিমানের ফ্লাইট যেনো আকাশে উড়ছে। দেখতে দেখতে সেটি কাছে আসছে। বড় হচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানের লেটেস্টে ভার্সন ৭৮৭ এর একটি বিমান। লন্ডন থেকে সোজা উড়ে আসছে সিলেটে। ১১ ঘণ্টার জার্নিতে ‘ক্লান্ত’ বিমান যখন ছুলো ওসমানীর মাটি তখন অন্য ধরনের এক অনুভুতি ছুঁয়ে যায় এয়ারপোর্টে।

বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে ‘হামজা হামজা’ বলে চিৎকার শুরু করেন তরুণরা। সাংবাদিকরা প্রস্তুত হচ্ছেন। এয়ারপোর্টে ভিড় বেশি। অনেকেই এসেছে একনজর হামজাকে দেখতে। বাফুফে কর্মকর্তা গেলেন ভেতরে। খবর এলো হামজাই এসেছেন। সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে হামজাকে নিয়ে আসা হলো ভিআইপি লাউঞ্জে।

খানিক সময় নিয়ে বাফুফে কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ভিআইপি’র ফটক দিয়ে বাইরে বের হলেন হামজা। হাসিমাখা মুখ। সহজ-সরল ভঙ্গি। হাত তুলে অভিবাদন জানালেন। একটু লাজুকতা দেখালেন। তাকে দেখে উপস্থিত থাকা ভক্তরা ‘হামজা’ ‘হামজা’ বলে স্লোগান ধরলেন। ভিড়, ঠেলাঠেলি সবই হচ্ছে। হামজা এসে দাঁড়ালেন মিডিয়ার সামনে। ক্রাউড বেশি থাকায় কথা শুনছিলেন না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বারবারই বলছিলেন- কিছু বুঝছি না। প্রশ্ন শোনার জন্য মাথা এগিয়ে আনেন। প্রশ্ন শুনে বলে উঠেন- ‘ইনশাল্লাহ আমরা উইন খরমু। কোচের সঙ্গে কথা হয়েছে। তার সঙ্গে কাজ করে এগিয়ে যেতে পারবো।’

এর আগে যখন তিনি এয়ারপোর্টের বাইরের দৃশ্য দেখেন তখন বলে উঠেন- আ্যামাজিং, আ্যামাজিং। মাত্র কয়েকটি শব্দে বুঝা গেলো হামজা খুশী। এখন কাজ। কথা শেষ করে ফের ভিআইপিতে ঢুকে গেলেন। ততোক্ষণে বাইরে স্লোগানে আরো ভারী হচ্ছিলো। হামজা, হামজা বলে চিকৎকার করা হচ্ছিলো।

এক ফাঁকে বেরিয়ে আসেন হামজার পিতা হবিগঞ্জের বাহুবলের শ্মসানঘাটের সন্তান মোর্শেদ আহমদ চৌধুরী। সাংবাদিকের কাছে অনুভুতি জানাতে গিয়ে বলেন; হামজা দেশকে ভালোবাসে। সে ফুটবলের উন্নতি চায়। এর এই ভালোবাসা থেকে তার দেশে আসা। এজন্য তিনি দেশবাসীর কাছে দোয়াও চান। হামজার সঙ্গে এবার দেশে এসেছেন তার পরিবারের প্রায় সবাই। স্ত্রী ও সন্তানও। লাল-সবুজের জার্সি গায়ে অভিষিক্ত হচ্ছেন হামজা চৌধুরী। এটি দেখতেই লন্ডন থেকে একসঙ্গে পরিবারের সবার দেশে আসা। ছাদখোলা জিপে করে এয়ারপোর্টের ভিআইপি’র সামন থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন হামজা চৌধুরী। তখনও উৎসব চলছিলো বাইরে। হামজা সবার উদ্দেশ্যে হাত নেড়ে হাসি দিয়ে রওয়ানা দিলেন হবিগঞ্জের পথে।

mzamin

Friday, March 14, 2025

খোঁয়াড়ের মতো নোংরা এক বাসায় কেটেছে ম্যারাডোনার শেষ দিনগুলো

ডিয়েগো ম্যারাডোনার শেষ দিনগুলোয় তাঁর চিকিৎসায় নিয়োজিত ছিলেন যে আটজন, তাঁদের মধ্যে সাতজনের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগে বিচার চলছে বুয়েনস এইরেসের সান ইসিদ্রো আদালতে। গতকাল শুনানি কার্যক্রম চলার পর আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত বিচারকার্যে বিরতি ঘোষণা করা হয়। শুনানিতে ম্যারাডোনার দুই কন্যা দালমা ও জিয়ানিন্নার পক্ষের আইনজীবী ফের্নান্দো বার্লান্দো জানিয়েছেন, সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে কতটা অযত্নে শেষ দিনগুলো কাটাতে হয়েছে।

আদালতে বার্লান্দো অভিযোগ করেন, ২০২০ সালের ১১ নভেম্বর থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত যে বাসায় ১৯৮৬ বিশ্বকাপের নায়কের শেষ দিনগুলো কেটেছে, তা কোনো রোগীর থাকার জন্য উপযোগী ছিল না। বার্লান্দোর ভাষায়, ‘বাসাটা ছিল শূকরের খোঁয়াড়ের মতো, এতটা নোংরা খুব কমই দেখা যায়।’

মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচারের সপ্তাহ দুয়েক পর ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ম্যারাডোনা। বুয়েনস এইরেসের এক অভিজাত এলাকায় ভাড়া করা বাড়িতে জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছে তাঁর।

সর্বকালের অন্যতম সেরা এ ফুটবলার যে বাড়িতে থাকতেন, আদালতের সামনে বার্লান্দো সেই বাসার একটি মডেল উপস্থাপন করেন। বাসার ভেতরের অবস্থা, কী কী সুবিধা-অসুবিধা ছিল, আদালতকে তা বোঝাতে মডেলটি উপস্থাপন করা হয়। বার্লান্দোর ভাষায়, ‘বাসাটি ঘরোয়া হাসপাতালের উপযোগী ছিল না।’ বাথরুম নিয়ে বার্লান্দো বলেন, ‘এক মিটারেরও কম প্রশস্ত’, যা কঠিন ছিল ‘ডিয়েগোর চলাফেরার জন্য।’

বার্লান্দো সেই বাসার কক্ষগুলোর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন শুনানিতে। ম্যারাডোনার দেখাশোনার জন্য নার্সরা অবস্থান করেছেন বাসায়। কিন্তু তাঁরা যে কক্ষে থাকতেন, সেখান থেকে ম্যারাডোনার কক্ষের বেশ দূরত্ব ছিল। অর্থাৎ ম্যারাডোনা কোনো দরকারে তাঁদের ডাকলে নিজেদের কক্ষ থেকে সেই ডাক শোনা অসম্ভব ছিল নার্সদের জন্য।

আগামী মঙ্গলবার বিচারকার্যে সাক্ষ্য দেবেন পুলিশ কর্মকর্তা লুকাস গ্যাব্রিয়েল, দুই কমিশনার রদ্রিগো বোর্হে ও হাভিয়ের লিওনার্দো মেন্দোজা। ম্যারাডোনার মৃত্যুর দিন তাঁরা সবার আগে সেই বাসায় প্রবেশ করেছিলেন। সপ্তাহে দুই দিন (মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার) এই বিচারকার্যে চিকিৎসকসহ অন্তত ১০০ জন সাক্ষ্য দেবেন, যা জুলাই পর্যন্ত চলতে পারে।

এদিকে আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে দেশটির সাংবাদিক ভিভিয়ানা কানোসার অনুষ্ঠান ‘ভিভিয়ানা এন ভিভো’য় উপস্থিত হয়ে বার্লান্দো ম্যারাডোনার চিকিৎসায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের ‘৮ থেকে ২৫ বছরের কারাবাস’ দাবি করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ‘গুন্ডাদের দল’ অভিহিত করে বার্লান্দো বলেছেন, ‘তাঁরা ম্যারাডোনাকে পুরোপুরি অনুপযুক্ত পরিবেশে থাকার জন্য পাঠিয়েছিলেন। ঠিকমতো দেখাশোনা না করে তাঁর পরিবারের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন কিংবা দেখাশোনার নামে আসলে হত্যা করছিলেন।’

মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন একজন নিউরোসার্জন, একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ, একজন মনোবিজ্ঞানী, একজন মেডিকেল কো-অর্ডিনেটর, একজন নার্স কো-অর্ডিনেটর, একজন চিকিৎসক এবং রাতের পালার নার্স। দিনের বেলায় ম্যারাডোনাকে দেখভাল করতেন যে নার্স, তাঁর বিচার করা হবে আলাদাভাবে।

বুয়েনস এইরেসে ম্যারাডোনার একটি দেয়ালচিত্র। কিংবদন্তিকে এখনো খুব ভালোবাসেন আর্জেন্টাইনরা
বুয়েনস এইরেসে ম্যারাডোনার একটি দেয়ালচিত্র। কিংবদন্তিকে এখনো খুব ভালোবাসেন আর্জেন্টাইনরা। এএফপি