Showing posts with label বেলজিয়াম. Show all posts
Showing posts with label বেলজিয়াম. Show all posts

Wednesday, July 29, 2026

পিএইচডি শেষে স্ত্রীকে নিয়ে নুডলসের দোকান, দৈনিক আয় ১২০০ ডলার

পড়ালেখার পাঠ চুকলেই জীবিকা নিয়ে শঙ্কায় পড়ে যাই আমরা। কি করবো, কীভাবে জীবন পরিচালনা করবো- তা নিয়ে একধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করে। অন্যদিকে কারও যদি উচ্চতর ডিগ্রি থাকে তাহলে তারা চাইলেই যেকোনো কাজে উৎসাহ সঞ্চয় করতে পারেন না। সামাজিক নানা ট্যাবু ঘিরে ধরে তাদের। তবে এবার এসবের ব্যত্যয় ঘটালেন চীনের পিএইচডি ডিগ্রিধারী এক দম্পতি। বেলজিয়ামে পিএইচডি শেষ করেই খুলে বসেছেন নুডলসের দোকান। আয় করছেন হাজার হাজার ডলার। স্বামী ডিং  দেশেই ডক্টরেট শেষ করেন। চলে যান বেলজিয়ামে। সেখানে মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা ও ফসল উৎপাদনে পোস্টডক্টরাল গবেষণা করেন। এ বিষয়ে অন্তত ৩০টি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছেন তিনি। স্ত্রী ওয়াংয়ের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই পরিচিত হন ডিং। এরপর ২০১৫ সালে তাদের বিয়ে হয়। বসবাস শুরু করেন বেলজিয়ামে। সেখানেই তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। গবেষণার বাইরে স্থিতিশীল কোনো কাজ না পেয়ে একপর্যায়ে স্ত্রীকে নিয়ে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন ডিং। যেই চিন্তা- সেই কাজ। দুজনে মিলে খুলে বসেন মটরশুঁটি দিয়ে রান্না করা সুস্বাদু নুডলসের একটি দোকান। যা অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। স্থানীয় জিমু নিউজ জানিয়েছে, মটরশুঁটির নুডলস বিক্রি করে দৈনিক ১২০০ ডলারের বেশি আয় করেন তারা। এ খবর দিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

এতে বলা হয়, গত মে মাস থেকে এই দম্পতি বেলজিয়ামের স্থানীয় বাজারগুলোতে মশলাদার মটরশুঁটির নুডলস বিক্রি করা শুরু করেন। এটি ওয়াংয়ের নিজ শহর চংকিংয়ের একটি সুস্বাদু খাবার। স্থানীয়দের রুচি অনুযায়ী ওয়াং নুডলসের ঝাল কিছুটা কমিয়ে দিয়েছেন। ওয়াং জিমু নিউজকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি এই খাবারটি খেয়ে বড় হয়েছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে তার নিজের একটি দোকান খোলার স্বপ্ন ছিল।
তাদের দোকানে খাবারের জন্য কয়েকটি চেয়ার রাখা আছে। রান্নার প্রয়োজনীয় উপকরণ আগে থেকে প্রস্তুত করে রাখায়, প্রতিটি বাটি তৈরি করতে মাত্র কয়েক মিনিট লাগে। ডিং জানান, তারা সপ্তাহে দু’দিন দোকান চালান এবং নুডলসের ধরন অনুযায়ী প্রতি বাটি ৮ থেকে ১১ ডলার বিক্রি করেন। সবচেয়ে ব্যস্ত দিনে তাদের আয় অন্যান্য দিনের চেয়ে অনেক বেশি হয়। এর পাশাপাশি অন্য কাজও করেন স্বামী ডিং। ওয়াং বলেন, দোকান চালানো গবেষণার মতোই, এটি কেবল আমাদের পরিবারকে সাহায্য করার একটি উপায়।

এই দম্পতির দোকানের ভিডিওগুলো চীনের সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে এবং তাদের অনুসারীর সংখ্যা ৭৮ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বয়স্কা ক্রেতা চপস্টিক ব্যবহারে কষ্ট করছেন। তবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত যত চীনা নুডলস খেয়েছি, এটি তার মধ্যে সেরা। একজন নিয়মিত ক্রেতা বলেন, আমি জানতাম না যে, মটরশুঁটি এত সুস্বাদু হতে পারে। এই দম্পতির গল্প অনলাইনে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। একজন অনলাইন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, তারা দারুণ উদ্যোক্তা- যারা চীনা স্ট্রিট ফুড বিদেশে নিয়ে গেছেন এবং তা থেকে অর্থ উপার্জন করছেন। আরেকজন লিখেছেন, চীনের অসংখ্য অসাধারণ খাবার রয়েছে, যা বিশ্বের সঙ্গে ভাগ করে নেয়া উচিত। 

mzamin

Tuesday, May 12, 2026

বেলজিয়ামের লুভেন যেন প্রাচীন এক রূপকথার শহর by খলিলউল্লাহ্‌

প্রকৃতির আলিঙ্গনে আবিষ্ট প্রাচীন, তবে আধুনিক এক শহর লুভেন। শহরটি পৃথিবীর অন্যতম গোথিক টাউন হল, ক্যাথেড্রাল আর প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘেরা। গ্রুট বেজিনহজের ছোট ছোট ভবনের মধ্য দিয়ে পথ, যেন অলৌকিক কোনো পুরোনো পরিত্যক্ত শহরের রূপকথার ছবি। তা ছাড়া পুরো শহরটাই যেন এক গা–ছাড়া ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রীষ্মকাল হওয়ায় কিছু পর্যটক আছেন, তবে কারও যেন কোনো তাড়া নেই।

এমন এক শহরে যাওয়ার দিন পড়েছে ভয়াবহ গরম। বেলজিয়ামের আবহাওয়ায় এটা বেশ গরম। এ দেশে সাধারণত গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা থাকে ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খুব বেশি হলে সেটা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। উত্তর সাগরের প্রভাবে দেশটির দক্ষিণ দিকে তাপমাত্রা থাকে আরও কম। কিন্তু সেদিন তাপমাত্রা উঠেছিল ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে!

গায়ে রোদ মাখিয়ে খরতাপেই হেঁটে ঘুরে বেড়ালাম লুভেন ও এর চারপাশে। এত গরমেও অনীহা কাজ করছিল না। মাঝেমধ্যেই তাপের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম। কিন্তু থামতে ইচ্ছে করছিল না।

শহরের পাশেই এক মায়াময় জঙ্গল, যেন চাইলেই হারিয়ে যাওয়ার এক অপূর্ব সুযোগ। গরম থেকে বাঁচারও একটা উপায়। আমার মতো প্রথমবার এই জঙ্গলে ঢুকলে যথারীতি এক গা ছমছমে ভাব হবে, কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যাওয়ার অবারিত সুযোগও পাওয়া যাবে।

বনের ভেতর গিয়ে দেখা পেলাম লুভেনের সুখ-দুঃখের নদী ডাইলির। এই নদী জন্মলগ্ন থেকেই লুভেন শহরকে বন্যা দিয়ে কাঁদিয়েছে। তবে শহরের উন্নয়নে অবদানও রেখেছে অনেক। বনের ভেতর নদীর ধারে সুবিশাল সারি সারি গাছ, এলোমেলো দাঁড়িয়ে। তার নিচে একটা বসার বেঞ্চ। সেখানে বসেই লুভেনের গল্প বলতে এই লেখা লিখতে বসে গেলাম।

প্রাচীন ইতিহাস, আধুনিক জীবন ও প্রকৃতির শহর

লুভেন বেলজিয়ামের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ফ্ল্যান্ডার্স অঞ্চলের একটি শহর। এটি লেউভেন নামেও পরিচিত। ব্রাসেলস থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই শহর যেন প্রাচীন ইতিহাস আর আধুনিক জীবনের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। এক লাখের বেশি মানুষের এই শহর একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান, একটি প্রাণবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র এবং সংস্কৃতির মিলনস্থল।

লুভেনের গল্প শুরু হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। এর শত বছর পর প্রতিষ্ঠিত হয় লুভেন ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয় (কেইউ লুভেন)। এটি শুধু বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেই অন্যতম নয়, ইউরোপের অন্যতম সম্মানজনক বিদ্যাপীঠও বটে।

১৪২৫ সাল থেকে এই শহর অবিচ্ছিন্নভাবে এক বিশ্ববিদ্যালয় নগরী হিসেবে যাত্রা অব্যাহত রেখেছে। ইউরোপের ভাটি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত আধুনিক বেনেলাক্স দেশগুলো, অর্থাৎ বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যে লুভেনই সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় শহর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ই লুভেন শহরকে জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে।

২০২৫ সালে লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০০ বছর পূর্তি হয়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, এ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিলেন ১৯২০ সালে, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫০০ বছর পর। অন্যদিকে আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সময়ে ১৯২১ সালে, অর্থাৎ জন্মলগ্নেই প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে ভর্তি হন কমরেড লীলা নাগ।

ঢাকার আরমানীটোলা বালিকা বিদ্যালয়, কামরুন্নেছা গার্লস হাইস্কুল এবং শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এই নারী ১৯২৬ সালে নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে রাজনীতিচর্চা শুরু করতে ‘দীপালী ছাত্রী সংঘ’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকের নেত্রী লীলা নাগ বিয়ে করেছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম বিখ্যাত বিপ্লবী অনিল রায়কে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন সহশিক্ষার পরিবেশ ছিল না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য পিজে হার্টগ লীলা নাগের মেধা ও পড়াশোনার প্রতি একাগ্রতা বিচারে বিশেষ অনুমতি দিয়েছিলেন।

বেলজিয়ামের অন্যতম সুন্দর ভবন

মধ্যযুগে লুভেন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও বস্ত্রশিল্পকেন্দ্র। লুইন নামের একধরনের লিনেন কাপড়ের নামকরণ হয়েছে এই শহরের নাম অনুযায়ী। ফলে লুভেন হয়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ নগরী। শহরের স্থাপত্যে আজও সেই সমৃদ্ধির ছাপ স্পষ্ট দেখা যায়। এর সবচেয়ে উজ্জ্বল নিদর্শন হলো, লুভেনের টাউন হল এবং সেন্ট পিটার্স চার্চ।

টাউন হলের জটিল নকশা ও অসাধারণ ভাস্কর্য বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। ১৪৩৯ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল ১৪৬৯ সালে। এই অনবদ্য গথিক শৈলীর ভবনে ২৩৬টি ভাস্কর্য আছে। তবে ভাস্কর্যগুলো ১৮৫০ সালের পর যুক্ত করা হয়। টাউন হলকে বেলজিয়ামের অন্যতম সুন্দর ভবন হিসেবে গণ্য করা হয়।

বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে ট্রেনে চেপে একা রওনা দিয়েছিলাম লুভেনের পথে। স্টেশনে নেমে এই টাউন হলের উদ্দেশ্যে হাঁটতে লাগলাম। প্রচণ্ড গরম পড়ায় রোদে বেশিক্ষণ হাঁটা যাচ্ছিল না। পথে একটা ক্যাফেতে বসে কিছু খাব বলে অর্ডার করতে বসলাম। কিন্তু যে তরুণী খাবারের অর্ডার নিতে এসেছিলেন, ভাষাগত জটিলতায় তিনি ও আমি দুজনই বিব্রতকর অবস্থায় পড়লাম। ফরাসি ভাষার লেখা টুকটাক বুঝি, কিন্তু দ্রুত কেউ বলা শুরু করলে আমার দফারফা। এর বাইরে আমার উপায় ছিল ডাচ্‌ বলা। কিন্তু সেটা আমার আসে না। আর ইংরেজিটা সেই তরুণীর পোষাচ্ছিল না।

অগত্যা সেই তরুণী আমাকে ক্যাফের ভেতর নিয়ে গেলেন স্বচক্ষে খাবার দেখাতে। ইউরোপের ছোট শহরে এই সুবিধা আছে। রাজধানী বা বড় শহরের চেয়ে তুলনামূলক ছোট শহরে ঘোড়দৌড় কম। সেই সুবাদেই ওয়েটার তরুণীর হাতে ব্যয় করার মতো এতটা সময় ছিল, বোঝা যায়।

যাহোক, সেই ক্যাফে থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম টাউন হলের সামনে। চত্বরটাজুড়েই রয়েছে টাউন হল, ক্যাথেড্রাল, চার্চ, বেশ কিছু ক্যাফে আর খাবারের দোকান। গ্রোট মার্ক হিসেবে পরিচিত এই জায়গা শহরের প্রাণকেন্দ্র। সব সময় ক্যাফে, রেস্তোরাঁ ও বারে পরিপূর্ণ থাকে। পাশেই লুভেন ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবন।

আজও শিক্ষাগত ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত লুভেন। প্রতিবছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী এই শহরে আসেন। তাঁদের তারুণ্যের স্পন্দনে শহরটি সব সময় মুখর থাকে। শহরের পাশে বনের মনোরম পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অনুষদ ও গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে, যা প্রকৃতির মাঝখানে জ্ঞানচর্চার এক বিরল সুযোগ করে দিয়েছে।

বেলজিয়ামের অন্যান্য শহরের মতো এখানেও রয়েছে বাইসাইকেলের চমৎকার সংস্কৃতি। হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে গেলাম ‘বিগ ব্যাং বাইসাইকেল রুট’। আধুনিক বিগ ব্যাং তত্ত্ব দিয়ে বিখ্যাত হওয়া জর্জ লোমাট্রা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, পড়িয়েছেন। ১৮৯৪ সালে বেলজিয়ামের শারলেরই শহরে জন্ম নেওয়া এই ক্যাথলিক পাদরি একাধারে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ ও গণিতবিদ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর স্মরণেই বাইসাইকেলের জন্য এই পথ তৈরি করা হয়েছে, যা লোমাট্রার দুটো ভাস্কর্য্যের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করেছে।

দ্য বেলজিয়ান শিন্ডলার

১৯২৯ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন পড়তে এসেছিলেন কিয়ান ঝাইয়োলিং নামের এক চীনা নারী। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটা সুন্দর মানবিক ও সাহসী গল্প। ১৯১৩ সালে চীনের জিয়াংসু প্রদেশে জন্ম নেওয়া এই নারী ‘বেলজিয়ান শিন্ডলার’ নামে পরিচিত। জার্মান শিল্পপতি অস্কার শিন্ডলার নিজে জার্মান নাৎসি দলের নেতা হয়েও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হলোকাস্ট থেকে ১ হাজার ২০০ ইহুদি ধর্মাবলম্বীকে নিজের কারখানায় কাজ দিয়ে তাঁদের জীবন রক্ষা করেছিলেন। ইহুদিদের জীবন বাঁচানোর জন্য তাঁকে নাৎসি দলের লোকদের ঘুষ ও নানা রকম আর্থিক প্রণোদনা দিতে হতো। ১৯৯৩ সালে তাঁর এই মহৎ প্রচেষ্টার গল্প নিয়ে তৈরি হওয়া স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘শিন্ডলার্স লিস্ট’ অস্কারে সেরা সিনেমার পুরস্কারসহ মোট ৭টি পুরস্কার জিতেছিল।

একইভাবে চীনা এই নারী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু বেলজিয়ান নাগরিকের জীবন বাঁচিয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালে বেলজিয়ান এক চিকিৎসককে বিয়ে করে তাঁরা হেরবুমো নামক শহরে স্থায়ী হন। ১৯৪০ সালে বেলজিয়ামের এক তরুণ রেললাইনের নিচে মাইন পুঁতে জার্মানির একটি সামরিক রেলগাড়ি উড়িয়ে দেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সে বছর জুন মাসে জার্মান বাহিনী হেরবুমো শহর দখল করে এবং সেই তরুণকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কিয়ান ঝাইয়োলিং সেই তরুণকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন।

তখন জার্মান জেনারেল ছিলেন আলেক্সান্ডার ভন ফলকেনহজেন। কিয়ান এই জেনারেলকে চিনতেন; কারণ, চীনে থাকাকালীন তিনি চীনা-জার্মান সহযোগিতার অংশ হিসেবে কাজ করেছেন। আর তখন ফলকেনহজেন ছিলেন চীনা জাতীয়তাবাদী নেতা চিয়াং কাইশেকের উপদেষ্টা। সে হিসেবে কিয়ানের এক ভাইয়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন ফলকেনহজেন। আর সেই সুবাদে কিয়ান মানবতার খাতিরে সেই তরুণকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করে সফল হন।

কিন্তু কিছুদিন পর পাশের আরেক শহরে নাৎসি জার্মানির গোপন পুলিশ বাহিনী গেস্টাপোর তিন সদস্যকে হত্যার দায়ে ৯৭ জন বেলজিয়ানকে মৃত্যুদণ্ড দেয় জার্মান বাহিনী। কিয়ানের পেটে তখন তাঁর প্রথম সন্তান। সে অবস্থায় তিনি আবারও ফলকেনহজনের কাছে গিয়ে ৯৭ জনের জীবন বাঁচাতে অনুরোধ করেন। শুরুতে রাজি না হলেও জার্মান এই জেনারেলকে শেষমেশ রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন কিয়ান। তবে কিয়ান ঝাইয়োলিংয়ের এই ঘটনা বেশির ভাগ মানুষেরই জানা ছিল না। ২০২১ সালে চীন-বেলজিয়াম কূটনৈতিক সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর উপলক্ষে ঝু ফেঙ এই সাহসী নারীকে নিয়ে প্রথম কোনো বই প্রকাশ করেছেন। বইয়ের শিরোনাম হলো ‘ফরগেট মি: মাদাম কিয়ান ঝাইয়োলিং-দ্য বেলজিয়ান শিন্ডলার’।

বিখ্যাত দারদেনে ব্রাদার্সও লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। সিনেমায়ও তাঁরা প্রায়ই এই শহরকে তুলে ধরেছেন।

বর্তমানে ইউরোপে পড়াশোনা করতে যাওয়ার জন্য ইরাসমাস মুন্ডাস বৃত্তি খুব পরিচিত। এই বৃত্তির নামকরণ হয়েছে যে পণ্ডিতের নামে, তিনি দেসিদেরিয়াস ইরাসমাস। রেনেসাঁর কালে ১৪৬৬ সালে জন্ম নেওয়া ডাচ্‌ এই মানবতাবাদী পণ্ডিত ছিলেন লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একই সঙ্গে আধুনিক হিউম্যান অ্যানাটমির জনক আন্দ্রিয়াস ভেসালিয়াসও এখানে শিক্ষকতা করেছেন।

অন্যদিকে, শিক্ষার পাশাপাশি লুভেনের রয়েছে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক জীবন। এখানে রয়েছে বেশ কিছু জাদুঘর, গ্যালারি ও থিয়েটার। সারা বছর নানা উৎসব ও ইভেন্ট স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করে।

লুভেনের অন্যতম আকর্ষণ হলো গ্রোট বেজিনার্ড, যা ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে একটি। এটি মধ্যযুগীয় ‘বেজিন’ অর্থাৎ ধর্মপ্রাণ নারীদের বাসস্থান ছিল, যাঁরা সন্ন্যাসি না হয়েও সম্মিলিত জীবন যাপন করতেন। সুসংরক্ষিত ঐতিহাসিক ভবন ও সরু রাস্তার এই এলাকায় রয়েছে সুনসান উঠান। এখানকার রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় যেন কোনো প্রাচীন নগরীতে হারিয়ে গেছি। সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা, যা ছবি বা ভিডিওতে তেমন বোঝা যায় না।

সুখ-দুঃখের নদী ডাইলি

লুভেন শহরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ডাইলি নদী। অতীতে এটি লুভেনের বাণিজ্য ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। মধ্যযুগে লুভেন যখন বস্ত্রশিল্পের কেন্দ্র ছিল, তখন এই নদীর পানিই কলকারখানার চালিকা শক্তি ছিল। নদীপথেই পণ্য পরিবহন করা হতো। শহরের অর্থনৈতিক উন্নয়নে দারুণ ভূমিকা রেখেছে এই নদী।

লুভেনের পুরোনো এলাকাগুলোয় ডাইলি নদীর উপস্থিতি শহরের স্থাপত্য ও বিন্যাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নদীর বাঁকে বাঁকে গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক ভবন। ফলে এই শহর পেয়েছে এক অনন্য চরিত্র।

ঐতিহাসিকভাবে ডাইলি নদীর কারণে লুভেন বারবার বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। তবে লুভেনে গিয়ে দেখলাম, শহর কর্তৃপক্ষ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। আমাদের দেশে শহরের পাশ দিয়ে নদী গেলেই সেটাকে চিপে মেরে ফেলার প্রতিযোগিতা চলে।

যথেচ্ছার দখলের শিকার হওয়া আর ময়লা-আবর্জনার ভাগাড় হওয়াই যেন আমাদের দেশে শহরের পাশে বয়ে চলা নদীর ‘নিয়তি’। কিন্তু ডাইলি নদীর ক্ষেত্রে দেখলাম ভিন্ন চিত্র। কিছু স্থানে নদীর ওপর নির্মিত পুরোনো কাঠামো ভেঙে নদীকে উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে বন্যার ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নদীর আশপাশে মনোরম জনপরিসর তৈরি হয়েছে।

ডাইলি নদী বেলজিয়ামের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। এটি মেখেলেনের কাছে রুপেল নদীর সঙ্গে মিশেছে, যা আবার শ্কেলদে নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে উত্তর সাগরে পতিত হয়েছে।

মজার ব্যাপার হলো, ঐতিহাসিক দলিলপত্রে লুভেনের নাম যখন প্রথম পাওয়া যায়, তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল এই নদী। খ্রিষ্টাব্দ ৮৮০-এর দশকে ভাইকিংরা এই নদীর পথ ধরেই লুভেনে ক্যাম্প স্থাপন করে। ধারণা করা হয়, সেই ক্যাম্প স্থাপনই লুভেন শহরের গোড়াপত্তন করেছিল, যদিও শহরটি নগরের মর্যাদা পেয়েছিল বারো শতকে একটি পাথরের দেয়াল নির্মাণের মধ্য দিয়ে। ৮৯১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভাইকিংদের সঙ্গে পূর্ব ফ্রাঙ্কিয়ার সেই যুদ্ধ ‘ডাইলি নদীর যুদ্ধ’ নামেই পরিচিত।

এই নদীর পাড়ে দীর্ঘক্ষণ বসে এই লেখার খসড়া লিখে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। কিছুদূর হেঁটে পাওয়া গেল অ্যারেনবার্গ দুর্গ। ষোড়শ শতকের শুরুর দিকে পিকার্ড (ফরাসি) বংশোদ্ভূত ক্রয়স পরিবার এই দুর্গ নির্মাণ করতে শুরু করে। চমৎকার এই দুর্গ তৈরি হয়েছিল গথিক ও রেনেসাঁ পদ্ধতির নির্মাণশৈলীর মিশেলে। কিন্তু বৈবাহিক সূত্রে এই দুর্গের মালিকানা চলে যায় অ্যারেনবার্গ পরিবারের কাছে। এই পরিবার ছিল জার্মান বংশোদ্ভূত। আর তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিসহ অক্ষশক্তির পরাজয় ঘটলে এই দুর্গ বাজেয়াপ্ত করা হয়। তখন অ্যারেনবার্গ পরিবারের কাছ থেকে মালিকানা চলে যায় লুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে।

সেই দুর্গের উল্টো পথ ধরে মূল রাস্তা দিয়ে শহরে চলে এলাম। গথিক নকশার সেই টাউন হলের সিঁড়িতে বসে হালকা নাশতা সেরে ব্রাসেলসের উদ্দেশ্যে সেই লুভেন স্টেশনের দিকে দৌড় দিলাম, যেখানে নেমেই পেয়েছিলাম এমন মনোমুগ্ধকর এক শহর। 

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-11%2Fkmiago5u%2FWhatsApp-Image-2025-08-10-at-10.15.52-PM-1.jpeg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
লুভেন স্টেশন থেকে নেমে টাউনহলে যাওয়ার রাস্তা। ছবি: খলিলউল্লাহ্‌

Thursday, September 4, 2025

ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেবে বেলজিয়াম, ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা

ফিলিস্তিনকে এ মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে বেলজিয়াম। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো এ ঘোষণা দিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, মঙ্গলবার ভোরে এক্স প্ল্যাটফর্মে দেয়া বার্তায় প্রেভো লিখেছেন, জাতিসংঘ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে বেলজিয়াম! আর ইসরাইলি সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।

উল্লেখ্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ম্যাক্সিম প্রেভো। তার ঘোষণা অনুযায়ী ইসরাইলের বিরুদ্ধে বেলজিয়াম মোট ১২টি নিষেধাজ্ঞা দেবে। এর মধ্যে রয়েছে দখলকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইসরাইলি বসতি থেকে পণ্য আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইসরাইলি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারি ক্রয়নীতি পুনর্বিবেচনা। প্রেভো বেলজিয়ামের মধ্যপন্থি ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেট দলের সদস্য। তিনি বলেন, গাজা বিশেষ করে ফিলিস্তিনে চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, সবশেষ বন্দি মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত এবং হামাস ফিলিস্তিন পরিচালনায় কোনো ভূমিকা না রাখা পর্যন্ত এই স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে না। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট দে ওয়েভার ফ্লেমিশ জাতীয়তাবাদী দলের। তিনি গত মাসে বলেন, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়া উচিত কঠোর শর্তসাপেক্ষে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ঘোষণা করেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অধিবেশন চলাকালীন বিশ্বনেতারা যখন মিলিত হবেন, তখন ফ্রান্স ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে। ২২ সেপ্টেম্বরের ওই অধিবেশনে ফিলিস্তিন স্বীকৃতি নিয়ে বৈঠক যৌথভাবে আয়োজন করবে ফ্রান্স ও সৌদি আরব। এ মাসেই অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং বৃটেনও শর্তসাপেক্ষে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত জাতিসংঘের ৭৫ শতাংশ সদস্য রাষ্ট্র তথা ১৪৭টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র এসব উদ্যোগকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফ্রান্সের ঘোষণাকে অবিবেচক সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দেন। তার মতে এটা শুধু হামাসের প্রচারণাকেই শক্তিশালী করবে। তিনি আরও জানান, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে নিউ ইয়র্কে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা বাতিল এবং অস্বীকার করবে। ইসরাইলের চরম ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ গত বছর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে, প্রতিবারই পশ্চিম তীরে নতুন একটি অবৈধ বসতি স্থাপন করা হবে। বর্তমানে স্মোত্রিচ অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে ও বৃৃটেনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দু’জন ইসরাইলি মন্ত্রীর একজন। জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ দেশগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলের গাজায় যুদ্ধ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে। যার মধ্যে রয়েছে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং অস্ত্র সরবরাহে অবরোধ। প্রেভোর ঘোষিত ১২টি নতুন নিষেধাজ্ঞা মূলত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতিগুলোকে কেন্দ্র করেই।

গত মাসে নেদারল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাসপার ভেল্ডক্যাম্প মন্ত্রিসভায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা আদায়ে সমর্থন না পাওয়ায় পদত্যাগ করেন। ২২ আগস্ট জাতিসংঘ সমর্থিত একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে, যা সেপ্টেম্বরের শেষে মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বেলজিয়ামের এই সিদ্ধান্ত এসেছে এমন সময়ে যখন ইসরাইলের গাজায় যুদ্ধে কমপক্ষে ৬৩,৪৫৯ জনকে হত্যা করেছে এবং আরও ১,৬০,২৫৬ জনকে আহত করেছে। গত জুলাইয়ে বেলজিয়ান প্রসিকিউটররা গাজায় নৃশংসতায় অংশ নেয়ার অভিযোগে দুই ইসরাইলি সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ মামলার আবেদন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠিয়েছেন।
https://mzamin.com/uploads/news/main/178281_Abul-4.webp

Tuesday, December 3, 2024

যৌনকর্মীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে আইন পাস বেলজিয়ামে

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে বেলজিয়ামে যৌনকর্মীদের জন্য নতুন একটি আইন পাস করা হয়েছে।

এই আইনে তাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা, অবসরভাতা এবং অসুস্থতার জন্য ছুটি নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ, যৌনকর্মীরাও এখন অন্যান্য চাকরির মতো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন। খবর বিবিসি।

সোমবার (০২ ডিসেম্বর) বেলজিয়াম ভিত্তিক দ্য ব্রাসেল’স টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেশটির সরকার জানায়, এই আইনের মাধ্যমে যৌনকর্মীরা কর্মক্ষেত্রে আর বৈষম্যের শিকার হবেন না এবং তারা সামাজিকভাবে সুরক্ষিত থাকবেন।

নতুন আইনে যৌনকর্মীদের দেওয়া হবে একটি কর্মসংস্থানের প্রশংসাপত্র, যার মাধ্যমে তারা স্বাস্থ্যবিমা, নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা পাবে। এছাড়া, তারা কাজের সময় যে কোনো অস্বস্তি বা বিপদে পড়লে ‘প্যানিক বাটন’ ব্যবহার করে সহায়তা চাইতে পারবেন। যৌনকর্মীদেরও অধিকার থাকবে খদ্দেরকে ‘না’ বলার।

এই আইনের পেছনে অনেকটা ইতিহাসও রয়েছে। করোনা মহামারির সময় যৌনকর্মীরা তাদের জীবিকা নিয়ে গভীর সংকটে পড়েছিলেন, যার ফলে তারা আন্দোলন শুরু করেন। যদিও আইনের প্রস্তাবের আগে কিছু সমালোচনা হয়েছিল, তবে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো এই আইনের পক্ষে দাঁড়িয়ে তাদের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন।

বিশ্বে অনেক দেশেই যৌনকর্মী কাজ করেন, তবে বেলজিয়াম প্রথম দেশ হিসেবে তাদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে যৌনকর্মীরা অবশেষে একটি সুরক্ষিত ও সম্মানজনক পরিবেশে কাজ করতে পারবেন।

বেলজিয়ামের যৌনকর্মীরাও এখন থেকে অন্যান্য চাকরির মতো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন। ছবি : সংগৃহীত
বেলজিয়ামের যৌনকর্মীরাও এখন থেকে অন্যান্য চাকরির মতো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পাবেন। ছবি : সংগৃহীত



Monday, December 2, 2024

বিশ্বে প্রথম যৌনকর্মীদের জন্য পেনশন আনছে বেলজিয়াম, সঙ্গে মাতৃত্বকালীন ছুটি

যৌনকর্মীদের জীবন সুনিশ্চিত করে নয়া আইন আনল বেলজিয়াম। যৌনকর্মীরা পাবেন পেনশন, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সামাজিক সুরক্ষার বেশ কিছু সুযোগ। তাঁদের দীর্ঘ দিনের দাবিকে স্বীকৃতি দিয়ে আইন আনল বেলজিয়াম, যা বিশ্বে প্রথম এবং ঐতিহাসিকও বটে। অসুস্থতার সময় নিতে পারবেন সিক লিভ-ও। শুধু তাই নয়, যৌনপল্লির নিরাপত্তার দিকেও জোর দেওয়া হয়েছে নয়া আইনে। অপরাধের রেকর্ড রয়েছে, এমন লোকজনের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে বলা হয়েছে। যৌনকর্মীদের ঘরে অ্যালার্ম বসাতে বলা হয়েছে, যাতে বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে পারেন তাঁরা। অপরাধের রেকর্ড রয়েছে, এমন ব্যক্তিকে যৌনপল্লি চালানোর অনুমতি দেওয়াও হবে না বলে জানানো হয়েছে। বেলজিয়ামে যৌনকর্মীদের জন্য যে আইন আনা হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে, প্রত্যেকের কাজের অধিকার অক্ষুণ্ন থাকা উচিত। কর্মক্ষেত্রে বঞ্চনা দূর করতে নয়া আইনে যৌনকর্মীদের দেওয়া হবে কর্মসংস্থানের শংসাপত্র। সেটা দেখিয়ে তাঁরা স্বাস্থ্যবিমা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং আইনি সুরক্ষা পাবেন।

২০২২ সালে বেলজিয়ামে যৌনবৃত্তি অপরাধমুক্ত হয়।  আর তার পরই নাগরিক হিসেবে যৌনকর্মীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা নিয়ে শুরু হয় ভাবনা-চিন্তা। আসলে অতিমারি করোনার সময়ে রুজিরুটি নিয়ে সংশয়ের মধ্যে পড়েছিলেন যৌনকর্মীরা। ওই সময়ে বেলজিয়ামে আন্দোলনও হয়। সেই নিয়ে লাগাতার প্রতিবাদ, আন্দোলনের জেরেই নায় আইন পাস হল বেলজিয়ামে। যৌনকর্মীদের প্রাপ্য অধিকার বুঝিয়ে দিতে নয়া আইন চালু হল। এই আইন তৈরির আগে বিরোধিতাও ছিল। সমালোচকেরা যুক্তি দেন, আইন এনে যৌনকর্মীদের সুরক্ষা প্রদানের অর্থই হল দেহব্যবসা এবং নারী  পাচারের মতো সমস্যাগুলিকেও আইনি বৈধতা দেওয়া। এদিক স্বেচ্ছাসেবী সংঘটনগুলির দাবি,  যৌনকর্মীদের জন্য এই আইন আনলে এই পেশায় যাঁরা ‘নিয়োগকর্তা’, তাঁদের জুলুম বন্ধ করা যাবে।  বেলজিয়ামে ইউনিয়ন অফ সেক্স ওয়ার্কার্স-এর প্রেসিডেন্ট ভিক্টোরিয়া সংবাদমাধ্যমে বলেন, "পেশা যদি বেআইনি হয়, সেখানে সুরক্ষা  থাকে না। এতদিনে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার সুযোগ পেলাম আমরা।" ভিক্টোরিয়ার পাঁচ সন্তান রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, টাকার জন্য গর্ভাবস্থাতেও কাজ করে যেতে হয়েছে তাঁকে।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

mzamin


Sunday, December 1, 2024

বেলজিয়ামে যৌনকর্মীদের জন্য নতুন আইন, বিশ্বে এই প্রথম

‘আমি যখন নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখনো আমাকে কাজ করতে হয়েছে। সন্তান জন্ম দেওয়ার এক সপ্তাহ আগেও গ্রাহকের সঙ্গে আমাকে শারীরিক সম্পর্ক করতে হয়েছে।’

বেলজিয়ামের যৌনকর্মী সোফিয়া এভাবেই নিজের জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর কাজ ‘সত্যই খুব কঠিন’।

সোফিয়ার পাঁচটি সন্তান রয়েছে। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এ নারীর পঞ্চম সন্তানের জন্ম হয়। সেবার চিকিৎসক তাঁকে ছয় সপ্তাহের জন্য সম্পূর্ণ বিশ্রামে (বেড রেস্ট) থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সে সুযোগ পাননি। তাঁকে দ্রুত কাজে ফিরতে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘কাজ বন্ধ রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। কারণ, আমার অর্থের প্রয়োজন।’

সোফিয়া মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং সে সময়ে নিয়োগকর্তার কাছ থেকে ভাতা পেলে তাঁর জীবন অনেকটা সহজ হয়ে যেত।

সম্প্রতি বেলজিয়ামে নতুন একটি আইন পাস হয়েছে। ওই আইনে সোফিয়াও এখন মাতৃত্বকালীন ছুটির দাবিদার হতে পারবেন।

বিশ্বে এই প্রথম এই ধরনের কোনো আইন চালু হয়েছে। নতুন আইনে, যৌনকর্মীরাও আনুষ্ঠানিক নিয়োগ চুক্তি, স্বাস্থ্যবিমা, অবসরভাতা, মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং অসুস্থতার জন্য ছুটির আবেদন করার যোগ্য হবেন। সর্বোপরি, এ কাজকে অন্য যেকোনো চাকরির মতো গণ্য করা হবে।

সোফিয়া বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য মানুষ হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেওয়ার সুযোগ।’

সারা বিশ্বে কয়েক লাখ যৌনকর্মী রয়েছেন। ২০২২ সালে বেলজিয়ামে যৌন পেশাকে বৈধতা দেওয়া হয়। জার্মানি, গ্রিস, নেদারল্যান্ডস, তুরস্কসহ আরও কয়েকটি দেশে যৌনবৃত্তি এখন বৈধ। কিন্তু পেশাজীবী হিসেবে যৌনকর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাঁদের চুক্তির আওতায় আনার ঘটনা বেলজিয়ামেই প্রথম।

এ বিষয়ে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের গবেষক এরিন কিলব্রিডে বলেন, ‘এটা আমূল পরিবর্তন এবং এটা বিশ্বে এখন পর্যন্ত আমার দেখা সেরা পদক্ষেপ। প্রতিটি দেশকে আমাদের এ লক্ষ্য অর্জনে রাজি করাতে হবে।’

তবে অনেকে এ আইনের সমালোচনা করেছেন। তাঁরা বলছেন, এ ব্যবসার কারণে মানবপাচার, শোষণ ও নিপীড়নের যেসব ঘটনা ঘটে, সেগুলো নতুন আইন দিয়ে প্রতিহত করা যাবে না।

বেলজিয়ামে ভাসমান যৌনকর্মীদের সহায়তায় কাজ করে বেসরকারি সংস্থা ‘ইসালা’। সংস্থাটিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন জুলিয়া ক্রুমি রে। তিনি বলেন, ‘এটা বিপজ্জনক। কারণ, এটি এমন একটি পেশাকে স্বাভাবিকের মর্যাদা দিচ্ছে, যে পেশার মূলে সর্বদাই ছিল নৃশংসতা।’

কোভিড–১৯ মহামারির সময় সরকার থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ার কারণে বেলজিয়ামে ২০২২ সালে কয়েক মাস ধরে যৌনকর্মীরা বিক্ষোভ করেছিলেন। বিক্ষোভকারী যৌনকর্মীদের অন্যতম একজন ছিলেন ভিক্টোরিয়া। তিনি ১২ বছর যৌনকর্মীর কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি বেলজিয়ামের ইউনিয়ন অব সেক্স ওয়ার্কার্সের প্রেসিডেন্ট। ভিক্টোরিয়ার কাছে এটা ব্যক্তিগত লড়াই। তিনি মনে করেন, যৌনবৃত্তির মাধ্যমে তাঁরা সমাজের সেবা করে যাচ্ছেন।

কিন্তু ২০২২ সালের আগে বেলজিয়ামে যৌনবৃত্তি অবৈধ থাকায় তাঁকে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছিল। তাঁকে অনিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে হয়েছিল। গ্রাহকদের সামনে তাঁর কথা বলার সুযোগ ছিল না। এজেন্সি থেকে তাঁর আয়ের বেশির ভাগটা নিয়ে নেওয়া হতো।

এমনকি একজন গ্রাহক তাঁকে ধর্ষণ করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন ভিক্টোরিয়া। তিনি সেই অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন। সেখানে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর সঙ্গে ‘রূঢ় আচরণ’ করেছিলেন বলেও দাবি করেন এই নারী।

ভিক্টোরিয়া বলেন, ‘ওই পুলিশ সদস্য আমাকে বলেছিলেন, যৌনকর্মী ধর্ষণের শিকার হতে পারেন না। তাঁর আচরণে আমার মনে হয়েছিল, আমিই দোষী। কারণ, আমি এই কাজ করি।’

বেলজিয়ামের নতুন আইন তাঁদের জীবন আরও উন্নত করবে বলেই বিশ্বাস ভিক্টোরিয়ার।

ভিক্টোরিয়া বলেন, ‘যদি কোনো আইন না থাকে এবং আপনার কাজ অবৈধ বলে গণ্য হয়, তবে আপনাকে সাহায্য করার কোনো প্রক্রিয়া থাকে না। এই আইন মানুষের হাতে আমাদের নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা তুলে দিয়েছে।’

বেলজিয়ামে নতুন আইনে যৌনকর্মী ও গ্রাহকদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করাকেও বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে তাদের কঠোর নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে। যদি কেউ গুরুতর অপরাধে দোষীসাব্যস্ত হন, তবে তাঁকে আর যৌনকর্মীদের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে না।

 প্রতীকী ছবি