Tuesday, December 31, 2019

১৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এক টাকাও বেতন পাননি

সুকুমার সাহা
ঝিনাইদহের পি ডি আর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক ছিলেন সুকুমার সাহা। তিনি এই বিদ্যালয়ে ১৫ বছর ধরে শিক্ষকতা শেষে অবসরে যান। কিন্তু এই ১৫ বছরে তিনি এক টাকাও বেতন পাননি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় সুকুমারকে বিনা বেতনে পাঠদান করতে হয়েছে। তাঁর জন্ম ১৯৫৮ সালে মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার সারঙ্গদিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা মৃত ফণীন্দ্রনাথ সাহা ব্যবসায়ী ছিলেন। ব্যবসার প্রয়োজনে ফণীন্দ্রনাথ ১৯৬৭ সালে চলে আসেন ঝিনাইদহে। এই শহরের মদনমোহন পাড়ায় বসবাস শুরু করেন। আজও বাবার রেখে যাওয়া সেই বাড়িতেই সুকুমার বসবাস করছেন।
সুকুমার বলেন, বিএসসি কোর্স শেষে বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দেখাশোনা করতেন তিনি। বাবার তখন মুদিদোকান ছিল। ১৯৮৯ সালে তিনি পৃথক দোকান নেন। কালীগঞ্জ শহরের বিমল কুমার সাহার মেয়ে উৎপলা সাহাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাঁদের সংসার ভালোই চলছিল। তাঁদের ঘরে আসে সজীব কুমার সাহা ও দীপ্ত সাহা নামের দুই সন্তান। বর্তমানে তারা দুজনই পড়ালেখা করছে। সুকুমার আরও জানান, ১৯৭৫ সালে ঝিনাইদহ নিউ একাডেমি থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন তিনি। ১৯৭৮ সালে ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এইচএসসি ও ১৯৮১ সালে বিএসসি কোর্স সম্পন্ন করেন। ১৯৮২ সালে এমএসসি কোর্স করতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সেখানে পড়ালেখা করে পারিবারিক সমস্যার কারণে বাড়ি ফিরে আসেন। বাড়িতে এসে বাবার ও নিজের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। এরই মধ্যে ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার দিঘলগ্রাম গ্রামে প্রতিষ্ঠা করা হয় পি ডি আর (পীড়াগাতি-দিঘলগ্রাম-রূপদাহ) মাধ্যমিক বিদ্যালয়। ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এখানে পড়ানোর জন্য কোনো গণিতের শিক্ষক পাচ্ছিলেন না। তখন তাঁকে যোগদানের জন্য অনুরোধ করেন। কর্তৃপক্ষ ২০০৪ সালে তাঁকে নিয়োগ দেন। এরপর থেকে তিনি ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর তিনি অবসরে যান। কিন্তু এই চাকরির সময়ে তিনি কোনো বেতন পাননি। এমনকি বিদ্যালয়টি হতদরিদ্র এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেখানেও তেমন আয় ছিল না। যে কারণে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও তিনি কিছুই পাননি। আবার প্রতিষ্ঠানে বেশি সময় দেওয়ায় নিজে কোনো প্রাইভেট পড়ানোর সঙ্গেও যুক্ত হননি। এরই মধ্যে আরও ভালো পাঠদানের স্বার্থে ২০০৯ সালে তিনি বিএড কোর্স সম্পন্ন করেন।
সুকুমার দুঃখ করে বলেন, কর্মজীবন শেষ করলেন বেতন ছাড়া। যাওয়ার সময়ও কিছুই পেলেন না। এ অবস্থায় পরিবারের সদস্যদের সামনে মুখ দেখাতে এখন খুব কষ্ট হয়। স্ত্রী উৎপলা একটি প্রি-ক্যাডেট স্কুলে শিক্ষকতা করেন। বাড়িতে কিছু বাচ্চা পড়ান স্ত্রী। স্ত্রীর টাকায় চলে সংসার। তাঁর এই কঠিন জীবন নিয়ে কারও কি কিছুই করার নেই—এ প্রশ্ন সুকুমারের।
ওই বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক আকরামুল কবির জানান, কিছু শিক্ষানুরাগী ২০০০ সালে এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১০০ শতক জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে ২৪৫ জন ছেলেমেয়ে পড়ালেখা করছে। আটজন শিক্ষক আর তিনজন কর্মচারী রয়েছে প্রতিষ্ঠানে। রয়েছে সাতটি শ্রেণিকক্ষ, একটি শিক্ষকদের কক্ষ ও একটি শিক্ষার্থী কমন রুম। পীড়াগাতি, দিঘলগ্রাম, রূপদাহ, মান্দারতলা, করিমপুর ও আশুরহাট গ্রামের ছেলেমেয়েরা এ প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে। এ পর্যন্ত তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে ১০টি ব্যাচ এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। এখান থেকে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশের বেশি পাসের হার। এরপরও প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়নি। যে কারণে সুকুমারকে বেতন ছাড়াই চলে যেতে হয়েছে। আরও কয়েকজন আছেন, তাঁদের অবস্থাও একই। প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত এমপিওভুক্ত না হলে ওই শিক্ষকদের অবস্থাও সুকুমারের মতো হবে।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শামীম আহম্মেদ খান জানান, এসব শিক্ষক নিয়ে তাঁদের কিছুই করা ও বলার নেই। তবে শিক্ষকেরা উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করে দেখতে পারেন, কিছু হয় কি না।

Friday, December 27, 2019

বিলুপ্তির হুমকিতে ১০ লাখ প্রজাতি

প্রায় ১০ লাখ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকিতে আছে। পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ স্থলভূমি ও সামুদ্রিক পরিবেশের তিন ভাগের দুই ভাগই মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে। মাত্র ৩০ বছরের মধ্যে শহরগুলোর জনসংখ্যা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ৮৫ শতাংশেরও বেশি জলাভূমি গেছে হারিয়ে। আর এসবের প্রতিক্রিয়ায় বিলুপ্তির হুমকিতে পড়েছে পৃথিবীর সামগ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদকুল।
ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স-পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ৬ মে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ১৫ হাজার গবেষণাপত্রের সমন্বয়ে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পৃথিবীর ৪০ শতাংশেরও বেশি উভচর প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আছে। এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী, হাঙর ও কোরালও হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় আছে। এমনকি ১০ শতাংশ কীটপতঙ্গও বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ও অ্যামিবার মতো এককোষী প্রাণীদের হিসাবের বাইরে রাখলে পৃথিবীতে প্রায় ৮০ লাখ প্রজাতির জীবজন্তু ও উদ্ভিদ আছে বলে একমত বিজ্ঞানীরা। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব ন্যাচারের (আইইউসিএন) তথ্য ব্যবহার করে এই প্রতিবেদনে গবেষকেরা কত শতাংশ জীবজন্তু ও উদ্ভিদ বিলুপ্তির শঙ্কায় আছে, সেটিই দেখাতে চেয়েছেন।
আইইউসিএনের আশঙ্কা, প্রায় চার ভাগের এক ভাগ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় আছে। অনেক মেরুদণ্ডী প্রজাতি থাকলেও বিলুপ্তির শঙ্কায় থাকা প্রজাতিদের মধ্যে বেশির ভাগই অমেরুদণ্ডী। সে তুলনায় কীটপতঙ্গের বিলুপ্ত হওয়ার হার অনেকটা কম বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীতে থাকা ৮০ লাখ জীবজন্তু ও উদ্ভিদের প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৫৫ লাখ প্রজাতিই পতঙ্গ। এই ৫৫ লাখের মধ্যে ১০ শতাংশ বা সাড়ে ৫ লাখ প্রজাতির পতঙ্গ বিলুপ্তির মুখে আছে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
মানুষের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের কারণে বিলুপ্তির মুখে পড়ছে লাখ লাখ প্রজাতির উদ্ভিদ ও সামুদ্রিক প্রাণী। ছবি: রয়টার্স

Thursday, December 26, 2019

বরফে ঢাকা কাশ্মীর -ছবি

কাশ্মীরকে বলা হয় ভূস্বর্গ। পৃথিবীর বুকে এক টুকরো স্বর্গ। সম্প্রতি ভারী তুষারপাতে ছেয়ে গেছে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর। এর মধ্যে জীবনের তাগিদে রাস্তার পাশে ফলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন এক ফল ব্যবসায়ী। শ্রীনগর, জম্মু-কাশ্মীর, ভারত। ছবি: এএফপি
ভারী তুষারপাতের মধ্যে সতর্ক পাহারায় থাকা এক ভারতীয় সেনা। শ্রীনগর, জম্মু-কাশ্মীর, ভারত। ছবি: এএফপি
স্বাভাবিক সময়ে এসব ছোট ছোট নৌকায় করে পর্যটকেরা ঘুরে বেড়ান। তবে বরফের কারণে জনজীবন অনেকটাই বিপর্যস্ত। পর্যটকেরও তেমন দেখা নেই। অলস পড়ে আছে নৌকাগুলো। শ্রীনগর, জম্মু-কাশ্মীর, ভারত। ছবি: এএফপি
ভারী তুষারপাতের কারণে কাশ্মীরে পর্যটকের তেমন দেখা নেই। তাই অলস পড়ে আছে পর্যটক বহনকারী ছোট ছোট নৌকাগুলো। শ্রীনগর, জম্মু-কাশ্মীর, ভারত। ছবি: এএফপি
তুষারপাতের মধ্যে নিরাপদে নৌকা নোঙর করার চেষ্টায় ব্যস্ত মাঝিরা। শ্রীনগর, জম্মু-কাশ্মীর, ভারত। ছবি: এএফপি

হার্টের অসুখ ও ডায়াবেটিসের জন্য সুখবর!

মানুষের কেন হৃদপিন্ডের নানা রকম অসুখ হয় এবং কেন ডায়াবেটিসে আক্রন্ত হয় তার জেনেটিক কারণ অনুসন্ধানে নতুন করে গবেষণা শুরু হয়েছে বৃটেনের ব্রাডফোর্ডে। সেখানে বসবাস করেন বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত অথবা এই দুটি দেশের নাগরিক। বৃটেনে এই এলাকাতে অনেকের স্বাস্থ্যের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বৃটেনে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের যে হার, ব্রাডফোর্ডে এই হার তার চারগুণ। এ ছাড়া এসব রোগের কারণের সঙ্গে বৃটিশদের উপসর্গ হুবহু মেলে না। তাই ওই এলাকায় নতুন করে গবেষণা শুরু হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বৃটেনের অনলাইন দ্য টেলিগ্রাফ অ্যান্ড ড্রাগস।
এতে বলা হয়, হার্টের অসুখ কিভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ডায়াবেটিস কিভাবে বেড়ে ওঠে তার জেনেটিক কারণ অনুসন্ধানে উচ্চাভিলাষী এই গবেষণা শুরু হয়েছে ব্রাডফোর্ডে।
দক্ষিণ এশিয়ার যেসব মানুষ বৃটেনে বসবাস করেন তাদের এবং দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের চিকিৎসার ধরণ এতে পাল্টে যেতে পারে। এ লক্ষ্যে যে প্রকল্প নেয়া হয়েছে তার নাম দেয়া হয়েছে ‘বর্ন ইন ব্রাডফোর্ড’ (বিআইবি)। ব্রাডফোর্ড রয়েল ইনফারমেরির (বিআরআই) ওপর ভিত্তি করে এটা করা হচ্ছে। বর্তমানে তারা ১৩৫০০ শিশুর জন্মের আগে থেকে তাদের বয়ঃপ্রাপ্তি পর্যন্ত সময়কালের ওপর গবেষণা করছে। এ ছাড়া ইস্ট লন্ডন জিনস অ্যান্ড হেলথ-এর গবেষণায় স্বেচ্ছায় অংশ নিচ্ছেন ৩৬ হাজারের বেশি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক।
ব্রাডফোর্ডে দক্ষিণ এশিয়ার ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের জিন নিয়ে বিশ্লেষণ করার পরিকল্পনা করেছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। একই কাজ করা হচ্ছে পূর্ব লন্ডনে। মানুষের জিনগত কারণে তার স্বাস্থ্য কেমন হবে সে বিষয়ে যে পূর্বাভাস দেয়া হবে, তা অঙ্গীভূত হবে বৃটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক স্কিমে।
এ জন্য বৃটেনে বিশাল আকারের একটি গবেষণায় ইউকে বায়োব্যাংক যুক্ত করেছে ৫ লাখ মানুষ। কিন্তু তারা সবাই ভাল স্বাস্থ্যবান। সম্পদশালী এবং ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গ। এর অর্থ হলো ওই গবেষণার ফল দক্ষিণ এশিয়ানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাই ব্রোডফোর্ড জিনস অ্যান্ড হেলথ বিষয়টিকে আরো ব্যাপক অর্থে নিয়েছে। তারা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জিন নিয়ে গবেষণা করছে, যাতে সব সম্প্রদায় স্বাস্থ্যসুবিধা পায়।
এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন ব্রাডফোর্ড ইন্সটিটিউট ফর হেলথ রিসার্চ (বিআইএইচআর)-এর পরিচালক প্রফেসর জন রাইট। তিনি বলেছেন, এই গবেষণা বলে দেবে জিন কিভাবে আমাদেরকে স্বাস্থ্যবান রাখে। আমরা আশা করছি, এই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বিজ্ঞানীরা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের জন্য নতুন ওষুধ তৈরি করতে পারবেন। আমরা পেশাগত জীবনে মাঝে মাঝেই দেখতে পাই যে, ইউরোপীয়ান শ্বেতাঙ্গ সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে যে ওষুধ সফলতা দিচ্ছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের ক্ষেত্রে কাজ করছে না। তাই আমরা যেসব মানুষের দেহে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রায় ও অত্যন্ত নি¤œ মাত্রায় কোলেস্টেরল আছে তাদের জিন পরীক্ষা করতে চাইছি, যাতে হার্টের বিভিন্ন রকম রোগের কারণ ও স্ট্রোকের বিষয় জানা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশী ও পাকিস্তানি প্রাপ্ত বয়স্কদের জিন পরীক্ষা করা হবে।
এ গবেষণায় নেয়া হবে ১৬ বছরের ওপরে বয়স এমন পাকিস্তানি, পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বৃটিশ, বাংলাদেশী, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৃটিশদের। স্বাস্থ্যগত কোনো সমস্যা থাক বা না থাকÑ তবু তাদেরকে এই গবেষণার আওতায় নেয়া হবে।

এনএসজি সদস্যপদ পাওয়ার যোগ্যতা by ড. জাফর নওয়াজ জসপাল

ভারত ও পাকিস্তান ২০১৬ সালের জুন থেকে পরমাণু সরবরাহ গ্রুপের (এনএসজি) সদস্য হওয়ার চেষ্টা করছে। উভয় দেশই বেসামরিক ব্যবহারের জন্য আন্তর্জাতিক পরমাণু জ্বালানি সংস্থার (আইএইএ) তদারকিতে পরমাণু প্রযুক্তি ও সামগ্রী রফতানিতে আগ্রহী। কিন্তু তারা পরমাণু বিস্তার রোধ চুক্তি (এনটিপি) বা ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তিতে (সিটিবিটি) সই না করায় গ্রুপের সদস্য হতে পারেনি। তাছাড়া তারা জেনেভার নিরস্ত্রবিষয়ক ফিসাইল ম্যাটেরিয়াল কাট অফ ট্রিটিতেও সই করেনি। এটি ৪৮টি দেশের গ্রুপ।
১৯৭৪ সালে ভারতের ‘স্মাইলিং বুদ্ধা’ ছদ্মনামের পরমাণু পরীক্ষার প্রতিক্রিয়ায় এই গ্রুপের জন্ম হয়। বর্তমানে এই গ্রুপের সদস্য হচ্ছে আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলারাস, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, ফিনল্যান্ড, কানাডা, চীন, ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্টোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, জাপান, কাজাখস্তান, কোরিয়া প্রজাতন্ত্র, লাতভিয়া, লিথুনিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, নিউজিল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, রাশিয়া, সার্বিয়া, স্লোভাকিয়া, স্লোভানিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।
কাজাখস্তানের আস্তানায় (বর্তমান নাম নুর সুলতান) গত ২০-২১ জুন এনএসজি প্লেনারি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। লাতভিয়ার কাছ থেকে গ্রুপের চেয়ারম্যান পদটি লাভ করে কাজাখস্তান। বৈঠকে তাদের কারিগরি, আইনগত ও রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা হয়।
বর্তমানে এর সদস্যপদ দিতে যেসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে এনএসজির নির্দেশনা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহের সক্ষমতা, রফতানি নিয়ন্ত্রণ নিদের্শনা অনুসরণের সামর্থ্য, পরমাণু প্রযুক্তির বিস্তাররোধের শর্তাবলী পালন করা, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধের কার্যক্রমে সহায়তা করা। এসব শর্ত পূরণ করতে না পারার কারণেই ভারত বা পাকিস্তানের কেউই এনএসজির সদস্যপদ লাভ করতে পারেনি।
ভারত ও পাকিস্তান উভয়ে পরমাণু অস্ত্রের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, তাদের কাছে এই অস্ত্র আছে। ভারত ১৯৭৪ সালে শান্তিপূর্ণ পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটায়, তারপর ১৯৯৮ সালের মে মাসে কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটায়। তারা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত উপাদান দিয়ে ওই বোমা বানিয়েছিল। ফলে তারা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। আর পাকিস্তান নিজস্বভাবে তৈরি উপাদান দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল।
পাকিস্তান কখনো সরবরাহকারী দেশ ও আইএইএর সাথে করা কোনো চুক্তি লঙ্ঘন করেনি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও সমমনা দেশগুলো ভারতকে এই গ্রুপের সদস্য করার জন্য চেষ্টা করলেও পাকিস্তানের ব্যাপারে আপত্তি উত্থাপন করছে। এ প্রেক্ষাপটে সদস্য করার অভিন্ন নীতি প্রণয়নের দাবি ওঠেছে।
অবশ্য কয়েকটি সদস্য দেশ যেমন বেলারাস, কাজাখস্তান, চীন, নিউ জিল্যান্ড,আয়ারল্যান্ড, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রিয়া নীতিগতভাবে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করছে।
তারা ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের জন্য বৈষম্যহীন ও পক্ষপাতমুক্ত নীতিতে পূর্ণ সদস্যপদ দেয়ার পক্ষে। তারা ভারতকে সদস্যপদ দেয়ার জন্য বিশেষ ছাড় দেয়ার পক্ষপাতী নয়। তারা মনে করে, কোনো বিশেষ দেশকে সুবিধা দেয়া হলে তা এনএসজিকে আরো দুর্বল করে ফেলবে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই এনএসজির সদস্য পাওয়ার জন্য খুবই উপযুক্ত। কারণ তাদের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি কারিগরিভাবে খুবই উন্নত। তারা এনএসজি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় থাকা বেশ কিছু আইটেম উৎপাদন করে এবং তারা আগ্রহী দেশে তা রফতানি করতে সক্ষম।
আবার পাকিস্তান কখনো আইএইএ সুরক্ষা বা এ জাতীয় কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করেনি। কিন্তু ভারত করেছে। তাই ভারতের চেয়ে পাকিস্তানই এনএসজির পূর্ণ সদস্য হওয়ার জন্য বেশি উপযুক্ত।
>>>লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, স্কুল অব পলিটিক্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স, কায়েদে আযম বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামাবাদ

Wednesday, December 25, 2019

আমেরিকায় চার্চের ভেতর নামাজ আদায়! by তারিক চয়ন

অনেক সময় বাস্তবতা স্বপ্নকেও হার মানায়। তেমনি এক ভালোবাসা আর সম্প্রীতির বাস্তব কাহিনী এটি। আমেরিকার শহর বোস্টন, যেখানে মুসলমানদের দেয়া হয়েছে এক বিরল মর্যাদা। বোস্টনের ডাউনটাউনে ১৮১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়‘ ক্যাথেড্রাল চার্চ অব সেন্ট পল’ যা গোটা আমেরিকার স্বনামধন্য চার্চগুলোর একটি। কিন্তু সেখানকার অধিবাসীদের মতে এই চার্চের বিশেষত্ব এর সুনামের নয় বরং সেই ভালোবসার সম্পর্কে যা এটি মুসলমানদের সঙ্গে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে রক্ষা করে চলছে। এই চার্চের ভেতর মুসলমানরা পবিত্র জুম্মার নামাজ আদায় করে চলেছেন ২০ বছর ধরে।
শুরুর গল্পটা এমন ২০ বছর পূর্বে সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলামনদের নামজের জন্য বরাদ্দ জায়গায় স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। বোস্টনের জনৈক মুসলিম ইব্রাহীম বলেন, সেসময়কার স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমাদের জুম্মার নামাজের জন্য জায়গা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সপ্তাহে মাত্র দুই ঘণ্টার জন্যেও কোন জায়গায় মিল ছিল না।
তখন চার্চের কাছে সাহায্য চাই এবং তারা রাজি হয়ে যায়! আমরা চার্চের নামাজ আদায় করা শুরু করি। চার্চ বলে, ‘আমরা যেই সৃষ্টিকর্তার এবাদত করি, আপনারাও তো তারই এবাদত করেন’।
ক্যাথেড্রাল চার্চ অব সেন্ট পল এ অন্যান্য গির্জার মতো বেঞ্চের ব্যবস্থা নেই যেখানে বসে প্রার্থনা করা হয়। খ্রিস্টানরা সহজে বহনযোগ্য চেয়ারে বসে হলের মধ্যে এবাদত করে থাকেন। আর প্রতি শুক্রবার মুসলমানদের জন্য হল খালি করে দেয়া হয়। ছয় বছর আগে চার্চ লাখ ডলার খরচ করে মুসলমানদের জন্য অযুখানা বানিয়ে দেয়। ওসমান নামের একজন নামাজী বলেন, সব সময় মনে প্রশ্ন জাগে-তারা যেমন আমাদের প্রার্থনার জন্য চার্চ খুলে দিয়েছে আমরাও কি প্রয়োজনে তাদের জন্য মসজিদ খোলে দিবো।
উল্লেখ্য, চার্চের এই ভালোবাসার প্রতিদানে এখানকার নামাজীরা প্রতি বছর হাজার হাজার উদ্বাস্তু আমেরিকানদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করে থাকেন। সারা বিশ্ব এখন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে দগ্ধ, তখন ক্যাথেড্রাল চার্চ অব সেন্ট পল এর উদারতা নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণা জোগায় বলে বিশিষ্টজনদের মন্তব্য।
(ভয়েস অব আমেরিকা অবলম্বনে)

Tuesday, December 24, 2019

২৭ বছরে ৪৪ সন্তানের জন্ম

মরিয়ম নাবাতানজি। বয়স ৩৯ বছর। ১২ বছরে বিয়ে হয় তার। বিয়ের প্রথম বছরেই জমজ সন্তানের জন্ম দেন তিনি। মাত্র ২৭ বছরে ৪৪ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন উগান্ডা বসবাসকারী এই নারী৷ অবাক করা হলেও সত্যি ঘটনা এটি৷ বিশাল এই পরিবারের ভার একাই সামলান সাহসী মরিয়ম৷
প্রথম বার ছাড়াও দুটি করে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন আরো পাঁচবার৷ তিনটি করে সন্তান হয়েছে চারবার৷ আর চারটি করে সন্তান প্রসব করেছেন পাঁচবার৷ তিন বছর আগে স্বামী ছেড়ে যায় তাকে৷ ৩৯ বছরের মরিয়ম এখন জীবিত ৩৮ সন্তানের জননী৷ মৃত সন্তান আছে আরো ৬টি। তারা কখনো জন্মের সাথে সাথে আবার কেউ কেউ কিছুদিন পরে মারা যায়। সে হিসাব মতে তিনি ২৭ বছরে মোট জন্ম দিয়েছেন ৪৪টি সন্তান।
সন্তানদের নিয়ে পূর্ব কাম্পালার মুকোনো জেলার কাসায়ো নামের একটি গ্রামে বসবাস করেন নাবাতানজি৷ প্রথম জমজের জন্মের পর তিনি সেখানকার এক ডাক্তারের কাছে যান৷ ডিম্বাশয়ের আকার বড় হওয়ার কারণে স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে– এমন তথ্য জানিয়ে ডাক্তার তাকে জন্মবিরতিকরণ পিল খেতে নিষেধ করেন৷ এরপর একের পর এক সন্তান আসতে থাকে নাবাতানজির কোলজুড়ে৷
শুধু নাবাতানজির নন, গোটা আফ্রিকায় পরিবারগুলোর আকারই তুলনামূলকভাবে বড়৷ উগান্ডা তার মধ্যে অন্যতম৷ সেখানে প্রতিজন নারীর সন্তান জন্মের হার ৫ দশমিক ৬ জন, বৈশ্বিক গড় সেই তুলনায় অনেক কম– ২ দশমিক ৪৷
নাবাতানজি সবশেষ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন আড়াই বছর আগে৷ ষষ্ঠ এই জমজের একটি শিশু মারা যায় জন্মের সময়ই৷ এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ছয়টি সন্তানের মৃত্যু হয়েছে৷ সবশেষ সন্তানের জন্মের পরই স্বামী নাবাতানজিকে ছেড়ে যায়৷ পরিবারটিতে এখন তার নামটিও যেন এক অভিশাপ৷ ‘আমি চোখের জল ফেলেই জীবন কাটিয়েছি৷ আর আমার পুরুষ এই বিপর্যয়ের মধ্যে আমাকে ছেড়ে গেছে,’ বলেন নাবাতানজি৷
সন্তানদের দেখাশোনা আর তাদের ভরণপোষণের জন্য আয়রোজগারেই দিন পার করেন নাবাতানজি৷ এজন্য একাধিক কাজ করতে হয় তাকে৷ চুল সজ্জা, মানুষের ঘর সাজানো, ফেলনা জিনিপত্র সংগ্রহ ও সেগুলো বিক্রি, হার্বাল ঔষধ বিক্রি– একা সবই করেন তিনি৷ আর দিনশেষে যা আয় হয়, সবই চলে যায় সন্তানদের খাবার, চিকিৎসা, কাপড় আর স্কুল ফি-র পেছনে৷
নাবাতানজির সন্তানদের একজন সাত বছর বয়সের ইসাক মুবিরো৷ একটি কক্ষে লোহার খাটে পাতলা ম্যাট্রেসের উপর ঘুমায় বারো সন্তান৷ বাকিরা ময়লা মেঝেতেই রাত পার করে৷
নাবাতানজি জানান, দৈনিক ২৫ কিলোগ্রাম ভুট্টার আটা লাগে পুরো পরিবারের খাওয়ার জন্য৷ এই একটি খাবারই সারাদিন চলে৷ মাছ আর মাংস খাওয়ার ঘটনা ঘটে খুবই কম৷
নাবাতানজির সন্তানদের প্রত্যেকেই ঘরের কাজ ভাগ করে নেয়৷ বড়রা ছোটদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করে৷ প্রত্যেকেই রান্নাসহ ঘরের সব কাজ করে৷ দেয়ালের একটি কাঠের বোর্ডে দৈনিক কাজের তালিকা ভাগ করে দেয়া থাকে৷

গর্ভাবস্থায় যেসব ফল খাবেন না

গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে এমন কোনো খাবার খাওয়া ঠিক নয়।তবে এ সময়ে আমরা অনেক ধরনের ফল খেয়ে থাকি। তবে কিছু ফল আছে যা মা ও শিশুর জন্য ক্ষতিকর।
চিকিৎসকদের মতে, গর্ভাবস্থায় মাছ, মাংস, ডিমের পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় ফল থাকে। তবে কিছু ফল আছে যা ক্ষতির কারণ হতে পারে। এমন কোনো ফল খাওয়া যাবে না। আসুন জেনে নেই গর্ভাবস্থায় যেসব ফল ভুলেও খাবেন না।
আনারসঃ
গর্ভাবস্থায় আনারস না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। এ সময় আনারস খেলে জরায়ুর সংকোচন হয়। ফলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
আঙুরঃ
গর্ভাবস্থায় আঙুর খেলে মর্নিং সিকনেসের প্রবণতা বাড়ে।এছাড়া ওই মায়েরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।
তেঁতুলঃ
গর্ভাবস্থায় তেঁতুল না খাওয়া ভালো। তেঁতুলে থাকা প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি প্রোজেস্টেরন হরমোনের ক্ষরণ কমায়। শরীরে এই হরমোন কমে গেলে জরায়ুর সংকোচন হয়। তখন গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
পেঁপেঃ
পেঁপেতে থাকা ল্যাটেক্স জরায়ুর সংকোচন ঘটায়। ফলে এ সময় গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে।
কলাঃ
গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস বা অ্যালার্জি থাকলে কলা খাওয়া ঠিক নয়। এতে থাকা কাইটিনেজ উপাদান ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ায়।
তরমুজঃ
তরমুজ শরীরে আর্দ্রতা বজায় রেখে টক্সিন দূর করে। তবে টক্সিন বের হওয়ার সময় গর্ভাবস্থায় ভ্রুণ অতিরিক্ত টক্সিনের সংস্পর্শে এলে তা ক্ষতিকারক।
খেজুরঃ
খেজুরে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও আয়রন রয়েছে। তবে গর্ভাবস্থায় খেজুর খাওয়া উচিত নয়। খেজুর শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়ার ফলে পেশীর সংকোচন হয়। জরায়ুর পেশী সংকুচিত হলে গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়ে।

Monday, December 23, 2019

মোটর মেকানিক ‘রাব্বি’ আপা by মোছাব্বের হোসেন

কাজে ব্যস্ত রাবেয়া সুলতানা রাব্বি
ছয়-সাত বছর আগের কথা। দিনাজপুরের বাহাদুর বাজার এলাকার অগ্রণী ব্যাংকে একটি কাজে গিয়েছিলেন রাবেয়া সুলতানা রাব্বি। তিনি গাড়ির মেকানিক—এ পরিচয় শুনে ব্যাংকের ব্যবস্থাপকের চোখ কপালে উঠে গেল! কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইলেন না। বাধ্য হয়ে রাব্বি তাঁর পরিচয়পত্র দেখালেন। তারপরও বিস্ময় কাটে না, একজন নারী কীভাবে গাড়ির মেকানিক হন!
শুধু ব্যাংকের ব্যবস্থাপকই নন, অনেকেই রাব্বির পেশা শুনে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন। যাঁকে নিয়ে কথা হচ্ছে, সেই রাবেয়া সুলতানা রাব্বি ২০০৬ সাল থেকে বেসরকারি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা কেয়ারে গাড়ির মেকানিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজধানীর পান্থপথে কেয়ারের গ্যারেজে বসে রাব্বি জানালেন তাঁর জীবনযুদ্ধের কথা। ২০০৫ সালে টাকার অভাবে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হলো না। বাবা আবদুল আজিজ ফরাজী তরিতরকারির ব্যবসা করলেও প্রায়ই নানা অসুখ-বিসুখে বাড়িতেই বসে থাকতেন। ছয় ছেলেমেয়ের সংসার তাঁর।
একদিন কেয়ারের মাঠকর্মীরা রাব্বিদের বাড়িতে এসে কেয়ারের পক্ষ থেকে নারীদের গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণের কথা জানালেন। একেবারেই ভিন্ন
একটি পেশার কথা শুনে রাব্বি যোগ দিলেন সেই প্রশিক্ষণে।
রাব্বি বলছিলেন, ‘গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণে নাম লেখালাম। প্রশিক্ষণ শেষে কয়েকজন নারীকে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ডাকা হয় কেয়ার থেকে। কিন্তু আমার চাকরি হলো না। কিছুদিন পর কেয়ার থেকে বলা হলো মেকানিক হিসেবে কাজ করার জন্য। সেই সুযোগ লুফে নিয়ে শুরু করলাম গাড়ি দেখভালের কাজ। সেই থেকে এখন পর্যন্ত করেই চলছি। কেয়ারের বিভিন্ন গাড়ি, মোটরসাইকেল সার্ভিসিংয়ের কাজ করি। সেখানে সবার কাছে আমার পরিচয় “মেকানিক রাব্বি আপা”। আমিও তাঁদের এই ডাকে সাড়া দিই।’
গাড়ির ব্রেক ঠিক করা, গাড়ির মবিল বদলানো, ফিল্টার পরিবর্তনসহ নানা কাজ করতে হয় রাব্বিকে। রাব্বি গর্বের সঙ্গেই বললেন, ‘গাড়ির চাকায় হাত দিলেই বুঝতে পারি কোন গাড়িতে কী সমস্যা হয়েছে।’
তিন বছর বয়সী ছেলের মা রাব্বি। স্বামী একরামুল হক একটি নিরাপত্তা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। সন্তানকে দেখভাল করার জন্য তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষ এখন রাব্বি। গ্রামে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খরচও চালান রাব্বি। বলছিলেন, ‘প্রতি মাসে বাবা-মায়ের জন্য পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। অন্য পাঁচ ভাইবোন থাকলেও বাবা-মায়ের মাসিক খরচ আমাকেই দিতে হয়।’
মূল বেতন আর ওভারটাইম মিলে ৪৪ থেকে ৪৫ হাজার টাকা বেতন পান রাব্বি। নিয়মিত ট্যাক্স দেন। রাব্বি বললেন, ‘আমার বেতনের কথা শুনে আরও নারীরা যাতে এই পেশায় আসে, সেই জন্য কত বেতন পাই তা বললাম।’ হাসতে হাসতে বললেন, ‘গ্রামে গেলে মানুষ আমার চারপাশে ভিড় করে। কী কী কাজ করি, কীভাবে করি, জানতে চায় আর অবাক হয়। ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে আমার ভালো লাগে।’
কেয়ারের সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রাব্বি জানালেন, কেয়ারে কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান, কোনো বৈষম্য নেই।
রাব্বির কাজের সম্পর্কে কেয়ারের পরিবহন ব্যবস্থাপক মো. সেলিম শেখ বললেন, রাব্বি শুধু মেকানিকের কাজই নিখুঁতভাবে করেন না, ফাইলিং থেকে শুরু অফিসের বেশ কিছু কাজেও সাহায্য করেন। কোনো কাজের কথা বললে ‘না’ করেন না। সব মিলে দারুণ এক কর্মী তিনি।
কাজে ব্যস্ত রাবেয়া সুলতানা রাব্বি। ছবি: সাবিনা ইয়াসমিন

ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা by পিয়াস সরকার

দীর্ঘ ছয় বছর ধরে বুকে বয়ে বেড়াচ্ছেন তীব্র যন্ত্রণা। প্রতিটা মুহূর্ত কাটে এক অজানা আতঙ্কে। চোখের পাতা এক হলেই যেন ধেয়ে আসে মরণ যন্ত্রণা। চোখের সামনে ভেসে আসে দুঃসহ সেই স্মৃতি। নিলুফা বেগমের জীবনটাই যেন এক নরক। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একাই বললেন তিনি। বলেন, ভোররাতে ঘুম আসলেও খানিক বাদেই তা ভেঙ্গে যায়। পায়ে অসহ্য ব্যথা বয়ে বেরাচ্ছেন ৬ বছর ধরে।
সাভারের রানা প্লাজা তার জীবনকে তছনছ করে দিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, জীবন্মৃত হয়ে বেঁছে আছেন তিনি। তাইতো তিনি বলেন, এভাবে বেঁছে থেকে কি লাভ? তার চেয়ে দেয়াল চাপায় মারা গেলে এ যন্ত্রণা সইতে হতোনা।
নিলুফা চাকরি করতেন রানা প্লাজায়। ভবনের অষ্টম তলায় প্যান্টন অ্যাপারলেস কারখানায়। ছিলেন সুইং অপারেটর। ২০১৩ সালের ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় তার পায়ের উপর পড়েছিলো বিম। আটকা পড়েছিলেন প্রায় ৯ ঘণ্টা। সেই বিমের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত হয় তার ডান পা। এরপর থেকে বিছানাই তার সঙ্গি। নিলুফার বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। স্বামীর নাম শাহিদুল ইসলাম। পেশায় চা দোকানদার। তারা থাকেন সাভারের আমতলা বস্তিতে। তিন সন্তানের জননি তিনি। বড় ছেলে পড়েন নবম শ্রেণিতে। মোজো মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে। আর ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। এই দুই মেয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন মায়ের।
সকাল ৮টায় দুই মেয়ে সকালের রান্না সেরে চলে যায় স্কুলে। আর তাদের বাবা সকাল ১০টায় বেরিয়ে যান দোকানের উদ্দেশ্যে। তিন ছেলে মেয়ে ও স্বামী বাইরে চলে যাবার পর একাই অবস্থান করেন বাড়িতে। দুপুর নাগাদ ছেলে মেয়েরা ফেরে বাড়িতে। বাড়িতে এসে দুই মেয়েকেই করতে হয় বাড়ির কাজ। দুপুরের রান্না। দুপুরে বাবা খেতে আসেন। এরপর ছেলেকে নিয়ে যান দোকানে কাজে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে।
পায়ে ব্যাথা নিয়েই কেটে যাচ্ছিল নিলুফার জীবন। তবে ইদানিং ঘটছে নতুন বিপত্তি। পায়ে নতুন করে ধরেছে পচন। ডাক্তার দেখিয়েছেন। বলেছেন অস্ত্রোপচার করে পা কেটে ফেলতে। তবে পারছেন না টাকার অভাবে।
রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর সরকারি বেসরকারি সহযোগিতা পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এই টাকার অধিকাংশ চলে যায় তার চিকিৎসার পিছনে। এই টাকা থেকে তার স্বামী দিয়েছেন একটি চায়ের দোকান। সেখানে খরচ হয়ে যায় প্রায় ৮০ হাজার টাকা। এখন প্রতিদিন ৩শ’ থেকে সাড়ে ৩শ’ টাকার ওষুধ প্রয়োজন হয়। যা মাস শেষে দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার টাকায়। এই টাকার যোগান দেবার পর পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটির।
ইয়াসমিন সুলতানা। বাড়ি রংপুর পীরগঞ্জ উপজেলার দোহাটা গ্রামে। কয়েকটি পোশাক কারখানায় চাকরি করে শেষে যোগ দেন রানা প্লাজার একটি পোশাক কারখানায়। ধীরে ধীরে মিলছিলো তার অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তুতার জীবনে নেমে আসে অশুভ ছায়া। পড়ে যান রানা প্লাজা ধ্বসের মাঝে। হাতে ও পায়ে আঘাত পান। চিকিৎসাধীন থাকতে হয়েছিলো প্রায় প্রায় বছর খানেক।
এরপর থেকেই ভাইয়ের বাসায়। সেখানে অসহায় হয়ে পড়ে আছেন। সহযোগিতা পেয়েছেন প্রায় লাখ দুয়েক টাকার মতো। তা পুরোটাই ব্যয় হয় চিকিৎসার পেছনে। এখন চলাফেরা সীমিত তার। তারপর করেন হাতের কাজ। এই দিয়ে ভাইয়ের সংসারে যদি একটু হেল্প করা যায়?
রানা প্লাজায় নির্মম দুর্ঘটনায় বাম হাত হারিয়েছেন লাবনি খানম। তিনি এখন থাকেন খুলনায় দৌলতপুরে। রানা প্লাজার পাঁচ তলায় ফ্যান্টম গার্মেন্টের চিকিৎসা কেন্দ্রের নার্স ছিলেন তিনি। সেদিনের দুর্ঘটনার কথা মানুষকে বলতে বলতে কিছুটা বিরক্ত। তারপরেও বলেন, দুর্ঘটনার আগের দিন ২৩শে এপ্রিল রানা প্লাজায় ফাটল ধরেছিলো। আমরা কাজে যাবো কি যাবো না এই নিয়ে দ্বিধাগ্রস্থ ছিলাম। রান্না প্লাজায় গেলেও আমরা সেদিন অফিসে যাই নাই। কিন্তু পরদিন বেতন যাতে না কাটে সেই ভয়ে ছিলেন তারা। এরপর পরদিন সকালে অফিসে প্রবেশের ১০ মিনিটের মাথায় ধ্বসে পড়ে ভবনটি। তার হাতের উপর ছিলো একটি বিম। হাত কেটেই তাকে বের করা হয় সেখান থেকে। এখন তিনি ঢাকা ছেড়ে এলাকাতে থাকেন।
নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জের নীলুয়া পাড়া গ্রামে থাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া শিশু সবুজ। মাকে হারিয়ে দাদা বাড়িতে হয়েছে আশ্রয়। তার মা কাজ করতেন রানা প্লাজায় আর বাবা চালাতেন রিকশা। সেদিনের ঘটনায় মাকে হারিয়ে ফেলে সবুজ ইসলাম।  তার মায়ের স্মৃতি বলতে শুধুই এক টুকরা ছবি। যে ছবিতেও দাগ পড়েছে। ভালো করে বোঝা যায় না মুখটা। তখন তারা থাকতেন সাভারে। বাবা-মায়ের আদরের একমাত্র সন্তান সবুজ। মারা যাবার আগের দিন তাকে ভাত খাইয়ে গিয়েছিলো মা। ঘটনার পর থেকে তার মা নিখোঁজ। দেখতে পারেননি মায়ের লাশটাও।
এভাবেই দুঃখের সাগরে বাবার সঙ্গে মায়ের লাশ খুজতে কেটে যায় মাস ছয়েক। এরপর ফের বিয়ে করেন বাবা। আর সবুজকে রাখা হয় তার দাদা বাড়িতে। দাদা বাড়িতে বাবা মা ছাড়া সবুজের দিন কাটে বিষণ্নতায়। সবুজ মাঝে মধ্যেই রাতের বেলা আম্মা আম্মা বলে চিৎকার করে উঠে।

নারী চরিত্রগুলো তাদের অবয়বে তুলে ধরতে চেয়েছি: পাকিস্তানি লেখিকা সরবত হাসিন

‘ইউ ক্যান’ট গো হোম এগেইন।’ ২৬ বছর বয়স্ক পাকিস্তানি সাহিত্যিক সরবত হাসিনের নতুন এ বইটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানের শহুরে তরুণ- যারা করাচি আর লন্ডনে ছুটাছুটিতে মত্ত, অতীত-বর্তমান, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, ভয়, নিরাপত্তাহীনতায় হিমশিম খেতে থাকা চরিত্রগুলোকে তুলে ধরছেন তিনি তার এই ছোট গল্পের বইটিতে। তার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল ‘দিস ওয়াইড নাইট’ দিয়ে ২০১৬ সালে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর তার ওই বইটি থেকে এবারেরটি ভিন্ন।
হাসিনকে এখন পাকিস্তান সাহিত্যের নতুন কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত করা হচ্ছে। তার লেখা তুলনা করা হচ্ছে মোহসিন হামিদ ও কামিলা শামসির সাথে। নিজের লেখালেখি নিয়ে স্ক্রলডট ইনকে একটি সাক্ষাতকার দিয়েছেন। এখানে তা প্রকাশ করা হলো।
প্রশ্ন: ইউ ক্যান’ট গো হোম এগেইন বইতে আপনি অনেক প্রেক্ষাপটকে একসাথে হাজির করেছেন।
হাসিন: খুবই স্বাভাবিকভাবে তা এসেছে। আমি প্রথমে গল্প লিখেছি। তারপর অন্যান্য চরিত্র সহজাতভাবেই এসে গেছে। উপন্যাসের চেয়ে ছোট গল্পে অনেক বেশি আবিষ্কারের বিষয় থাকে।
প্রশ্ন: আপনার প্রতিটি যাত্রায় জিন-পরীদের কথা আছে। এসব চরিত্রের সবগুলোই আবার বয়সে ছোট, শিক্ষিত ও বেশ স্বচ্ছল পরিবারের। এ প্রেরণা পেলেন কিভাবে?
হাসিন: আমার শৈশবে নগর কিংবদন্তিগুলো গোলকধাঁধা সৃষ্টি করত। আমি কুসংস্কার আর ঐতিহ্যের ধারণা নিয়ে কাজ করতে চেয়েছি। আমার কাছে বাড়ি কেবল একটি ভৌত কাঠামো নয়, এটি একটি সংস্কৃতিও। বাড়ি হলো পরিবার, বিশ্বাস আর প্রত্যাশার বাসা।
প্রশ্ন: আপনি আপনার মায়ের ব্যক্তিগত পাঠাগারের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম দিকে আপনি কী ধরনের বই পড়েছেন?
হাসিন: আমার পরিবারের সবাই খুবই পড়ুয়া। তবে আমার মায়ের পড়ার ব্যাপ্তি ছিল বিরাট। আমার চেয়েও অনেক বেশি বিষয় নিয়ে তিনি পড়েছেন। অনেক বিষয়ে তার আগ্রহ। এসবের কিছু কিছু আমি পড়েছি।
প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে বাস করছেন লন্ডনে। আর বেড়ে ওঠেছেন করাচিতে। আপনার বইতেও এসব বিষয় স্থান পেয়েছে।
হাসিন: একটা পর্যায়ে এই ভাগ সহজ বিষয়ে পরিণত হয়। আমি করাচিতে আমার পরিবারের সাথে সময় ব্যয় করেছি। আর কাজ করার জন্য লন্ডনে অনেক ভালো পরিবেশ রয়েছে। সব জায়গারই আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
প্রশ্ন: পাকিস্তানের মতো দেশে লেখালেখিতে রাজনীতি টেনে না আনতে পারাটা কতটা কঠিন কাজ?
হাসিন: আমি মনে করি, গল্প নিজেই এগিয়ে যাবে। আমার লেখালেখি রাজনৈতিক আবহবিমুখ বলে মনে করি না। প্রতিটি চরিত্রই তার দেশ, শ্রেণি, শিক্ষার আলোকে আত্মপ্রকাশ করে, এগিয়ে যায়। তাদের জীবন শূন্যতায় থাকে না।
প্রশ্ন: আপনি স্টকহোম রিভিউয়ের ফিকশন এডিটর। একইসাথে সম্পাদনা ও লেখালেখির কাজটি কিভাবে করেন?
হাসিন: ভেতর থেকেই লেখালেখির প্রেরণা পাওয়া যায়। আবার সম্পাদনাতেও এক ধরনের আনন্দ আছে। অন্যে পড়বে, সেজন্য আমি লিখি। আর আরো গভীরভাবে পড়ার জন্য সম্পাদনা করি।
প্রশ্ন: আপনার পরবর্তী গ্রন্থ কী?
হাসিন:  নতুন বই নিয়ে ভাবছি। তবে আরো কয়েকটি প্রবন্ধ ও কবিতাও লিখছি।

Sunday, December 22, 2019

ক্যান্সার চিকিৎসায় বড় অগ্রগতির খবর গবেষকদের

ক্যান্সার চিকিৎসায় বড় অগ্রগতি
ক্যান্সার চিকিৎসায় নতুন সাফল্যের খবর দিলেন যুক্তরাজ্যের গবেষকরা এবং একই সাথে তারা চিকিৎসার জন্য নতুন কিছু ধারণাও নিয়ে এসেছেন।
তারা বলছেন, এখন থেকে ক্যান্সারের চিকিৎসায় পুরো শরীরের জন্য ঔষধ না দিয়ে শুধুমাত্র আক্রান্ত কোষগুলোর চিকিৎসা সম্ভব।
ওয়েলকাম স্যাঙ্গার ইন্সটিটিউট এর একটি দল ত্রিশ ধরণের ক্যান্সার থেকে ক্যান্সারের কোষগুলো ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।
এখানে ঔষধ প্রয়োগ করে প্রায় ছয়শো নতুন ধরনের ঝুঁকি নিরসন করা সম্ভব হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
এ মুহূর্তে ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি দেওয়া হয় এবং এর প্রতিক্রিয়ায় পুরো শরীরেই কমবেশি ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
গবেষকদের একজন ডা. ফিওনা বেহান। তার মা ক্যান্সারে দু'বার আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন।
প্রথম দফায় ডা. বেহানের মাকে যে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিলো তাতে তার হৃদযন্ত্রের ক্ষতি হয়েছিলো।
ফলে দ্বিতীয় বার তিনি যখন আবার ক্যান্সার আক্রান্ত হলেন তখন চিকিৎসা নেওয়ার মতো অবস্থা আর তার ছিলো না।
ডা. বেহান বিবিসিকে বলছেন, "এখন যে চিকিৎসা আমরা করছি তা ক্যান্সার রোগীর পুরো শরীরের চিকিৎসা। আমরা সুনির্দিষ্টভাবে ক্যান্সার কোষগুলোকে চিহ্নিত করছিনা।"
"এ গবেষণায় আমরা ক্যান্সার কোষগুলোর দুর্বলতম স্পটগুলোকে শনাক্ত করেছি এবং এটি আমাদের ঔষধ তৈরিতে সহায়তা করছে।"
তিনি বলেন, "এগুলো শুধু ক্যান্সার কোষগুলোরই চিকিৎসা দেবে এবং ভালো কোষগুলোকে অক্ষত রাখবে।"

জিনগত অস্বাভাবিকতা

ক্যান্সার মানুষের শরীরের ভেতরের কোষগুলোকে পরিবর্তন করে দেয়। ফলে ডিএনএ নির্দেশনাও পরিবর্তন হয়ে যায়।
পরে ধীরে ধীরে আক্রান্ত কোষগুলো ছড়াতে থাকে ও এক পর্যায়ে মানুষকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।
এখন গবেষকরা বলছেন, তারা ক্যান্সার জিনগুলো অকার্যকরের পথে অগ্রগতি অর্জন করেছেন এবং তারা দেখতে চেয়েছেন যে কোনগুলো বেঁচে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ৩০ ধরনের ক্যান্সার থেকে ল্যাবরেটরিতে বেড়ে ওঠা ৩০০টির বেশি টিউমারের জিন বাধাগ্রস্ত করেছেন তারা।
এজন্য তারা বিশেষ ধরণের জেনেটিক টেকনোলজি ব্যবহার করেছেন, যেটি গত বছর চীনে ব্যবহৃত হয়েছিলো।
ডিএনএতে কাজ করার জন্য এটি মোটামুটি সহজ ও নতুন।
নতুন এ গবেষণা ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য যে ধারণা নিয়ে এসেছে সেটি চিন্তা করা এক দশক আগেও অসম্ভব ছিলো বলে মনে করা হচ্ছে।
জার্নাল নেচারে এ গবেষণার বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে যেখানে গবেষক ৬ হাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিন চিহ্নিত করেছেন।
ডা. বেহান বলছেন, "আমি বুঝতে পারছি ক্যান্সার সেলগুলোতে কী হচ্ছে - যাতে করে সুনির্দিষ্টভাবেই ওই কোষগুলোর দিকে বন্দুক তাক করা যায়।"
গবেষকদের প্রধান লক্ষ্য প্রত্যেকটি ধরণের ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য একটি 'ক্যান্সার ডিপেনডেন্সি ম্যাপ' প্রণয়ন করা।
এর ফলে চিকিৎসকরা টিউমারগুলো টেস্ট করে ক্যান্সার আক্রান্ত কোষগুলোকে ধ্বংসের জন্য ঔষধ দিতে পারবেন।
"এটা লেজার সাইট প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ," বিবিসিকে বলেছেন ডা. বেহান।
গবেষকদের বিশ্বাস তাদের কাজ ক্যান্সারের নতুন ঔষধ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

Thursday, December 19, 2019

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে করণীয়

উচ্চ রক্তচাপ একটি পরিচিত সমস্যা। অনেকের আজকাল অল্প বয়সেই এই সমস্যা ধরা পড়ছে। কেউ কেউ দু’বেলা ওষুধ খেয়েও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক্ষেত্রে ওষুধের পাশাপাশি জীবনযাপন পদ্ধতি পরিবর্তন করা জরুরি।

১. চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত মেদ  ঝরাতে পারলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।এ কারণে খাদ্যাভাস ও শরীরচর্চার মাধ্যমে মেদ ঝরানোর চেষ্টা করুন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেদ কমাতে সপ্তাহে ১৫০ মিনিট, অর্থাৎ পাঁচদিন ৩০ মিনিট করে হালকা থেকে ভারী শরীরচর্চা করুন। এছাড়া ঘাম ঝরিয়ে হাঁটলে, সাইক্লিং করলে অথবা সাঁতার কাঁটলেও শরীর  ঝরঝরে থাকে। সেই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপও থাকে নিয়ন্ত্রণে।

২. উচ্চ রক্তচাপ কমাতে নিয়মিত পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার, শাক সবজি, ফল এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন।  নিয়মিত খাদ্যতালিকায় কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। 

৩. খাবারে কাঁচা লবণ খাবেন না। রান্নায় যথাসম্ভব লবণ কমিয়ে দিন। প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া বর্জন করুন।

৪. ধূমপান ছাড়তে পারলে স্বাভাবিক নিয়মেই হৃৎপিণ্ডের অবস্থার উন্নতি হবে। সেই সঙ্গে অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় এড়িয়ে চলতে হবে।

৫. যারা নিয়মিত কফি খান, তারা হয়তো  পরিবর্তনটা বুঝতে পারবেন না।  কিন্তু যাদের সেই অভ্যাস নেই,, তারা হঠাৎ করে শুরু করলেই পার্থক্যটা বুঝতে পারবেন। এজন্য কফি পানের ৩০ মিনিট আগে একবার উচ্চ রক্তচাপ মাপুন। এরপর  কফি খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে আবার  মাপুন। এতে দেখা যাবে উচ্চ রক্তচাপের পরিমাণ কতটা বেড়েছে। এ কারণে ঘন ঘন কফি পানের অভ্যাস পরিহার করুন।

৬. মানসিক চাপ , উচ্চ রক্তচাপ বাড়ার অন্যতম কারণ। মানসিক চাপ , উদ্বেগ আসতে পারে, এ ধরণের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলুন। সাংঘাতিক উচ্চাশা থাকলে চাপ হবেই। আপনি যা কিছু নিজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তা নিয়েই কাজ করুন।

৭. উচ্চ রক্তচাপ মাপার মেশিন আজকাল অনেকের ঘরেই থাকে। নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। একটু কম বেশি হলে ক্ষতি নেই। তবে হঠাৎ অনেক ওঠানামা করলে অবশ্যই চিকিৎকের পরামর্শ নিন। সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে মীর মশাররফের স্মৃতি চিহ্ন by কুদরতে খোদা সবুজ

মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি পাঠাগার ও অডিটোরিয়াম
বাংলা ভাষার অন্যতম গদ্যকার ও বাঙালি মুসলিম সাহিত্যিকদের পথিকৃৎ মীর মশাররফ হোসেন। ১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর কুষ্টিয়ার কুমারখালির লাহিনীপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।  ২০০৮ তার জন্ম ভিটায় গড়ে তোলা হয় মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি পাঠাগার ও অডিটোরিয়াম। তবে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে তার স্মৃতিচিহ্নগুলো।
মশাররফ হোসেনের ব্যবহৃত পালকি
বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা মীর মোশাররফের লেখাপড়ার জীবনের শুরু কুষ্টিয়ায়। এরপর ফরিদপুর ও কৃষ্ণনগরের বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তিনি লেখাপড়া করেছেন। তার জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় কেটেছে ফরিদপুরের নবাব এস্টেটে চাকরি করে। কিছুকাল তিনি কলকাতায়ও বসবাস করেন। মীর মশাররফের তার বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে উপন্যাস, নাটক, কাব্য ও প্রবন্ধ রচনা করে আধুনিক যুগে মুসলিম রচিত বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ ধারার প্রবর্তন করেন। ১৯১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এরপর ২০০৮ সালে কুমারখালি লাহিনীপাড়া গ্রামে ৭ শতক জমির ওপর  তার বসতভিটায় গড়ে তোলা হয় মীর মশাররফের স্মৃতি পাঠাগার ও অডিটোরিয়াম। এখানে তার জীবদ্দশায় ব্যবহার্য প্রায় ১২২টি সামগ্রী রয়েছে। এরমধ্যে আয়না, সুরমা দানি, আতর দানি, কলের গান, তালা-চাবি, হুক্কা, ঘড়ি, গুগলি (পান পাত্র), কুয়ার পানি ওঠানোর কাটা, খাবার প্লেট, ইজি চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ, পালকি, ফলের রস রাখার পেয়ালা ইত্যাদি। এসব সামগ্রীর বয়স প্রায় দেড়শ বছর।
মশাররফ হোসেনের ব্যবহৃত বেঞ্চ
স্মৃতি পাঠাগার ও অডিটোরিয়ামে সপ্তাহে ৫ দিন বিনামূল্যে ঘুরে দেখতে পারেন দর্শনার্থীরা। এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ৩০০ দর্শনার্থী ঘুরতে আসেন।
স্মৃতি পাঠাগার ও অডিটোরিয়ামের তত্ত্বাবধায়ক মীর মাহবুব উল আরিফ বলেন, ‘মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি পাঠাগারটি আসলে অডিটোরিয়াম হিসেবে তৈরি হয়েছে। এটি জাদুঘরের আদলে তৈরি হাওয়া দরকার। না হলে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে তার স্মৃতি চিহ্ন।  সামগ্রীগুলো খোলা স্থানে রাখার ফলে দিন দিন এর স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে।’
মশাররফ হোসেনের ব্যবহৃত চেয়ার
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে স্মৃতি পাঠাগারটি জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের অধীনে নিলে রক্ষণাবেক্ষণ আরও ভালো হতো। স্মৃতি পাঠাগারটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের অধীনে নেওয়ার জন্য প্রায় ৭ বার আবেদন করা হয়েছে। তারা তিনবার পরিদর্শন করে গেছে। কিন্তু এখনও এটি তাদের অধীনে নেওয়া হয়নি।
মশাররফ হোসনের ব্যবহৃত আয়না

মহাকাশের মাপজোখ যেভাবে হয় by ইবরাহীম খলিল

প্রতিনিয়ত গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি প্রভৃতি আবিষ্কার করছেন বিজ্ঞানিরা। কোটি কোটি কিলোমিটার কিংবা শত শত আলোক বর্ষ দূরে এসব মহাকাশীয় বস্তুর অবস্থান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এরা যে এত দূরে অবস্থান করে তা কীভাবে নির্ণয় করেন বিজ্ঞানীরা? বেশ নিশ্চিত হয়ে বিজ্ঞানীরা কীভাবে বলেন “এত আলোক বর্ষ দূরে অবস্থান করছে অমুক গ্যালাক্সিটি”?
দূরের গ্রহ নক্ষত্রের দূরত্ব বোঝাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘আলোক বর্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। সৌরজগতের বাইরে মহাকাশের বস্তুগুলোর দূরত্ব মাপতে সাধারণ কিলোমিটার একক ব্যবহার করা সুবিধাজনক নয়। এত বিশাল দূরত্ব পরিমাপ করতে ‘আলোক বর্ষ’ নামক বিশেষ এই এককটি ব্যবহার করা হয়। আলোক বর্ষের (Light year) বিশালত্ব মানুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। আলোর বেগ প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার। আলো যদি এই বেগে টানা এক বছর ভ্রমণ করে, তাহলে যে দূরত্ব অতিক্রম করবে, তাকে বলে এক আলোক বর্ষ। কিলোমিটারের মাধ্যমে আলোক বর্ষকে প্রকাশ করলে দাঁড়াবে, এক আলোক বর্ষ সমান ৯ মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার (9×10×12 কিলোমিটার)। আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র প্রক্সিমা সেন্টারির দূরত্ব ৪.২ আলোক বর্ষ। দূরের গ্যালাক্সিগুলো শত শত কিংবা হাজার হাজার আলোক বর্ষ পর্যন্ত দূরে অবস্থান করে। এত বিশাল দূরত্ব মাপার কৌশলটা কী?
অকল্পনীয় দূরে অবস্থান করলেও আমাদের পক্ষে এদের দূরত্ব পরিমাপ করা সম্ভব। গ্যালাক্সিগুলোতে অবস্থান না করেও চমৎকার কিছু কৌশল ব্যবহার করে তাদের দূরত্ব বের করে ফেলা যায়। তুলনামূলকভাবে নিকটবর্তী নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব পরিমাপে ‘প্যারালাক্স’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। শব্দটি শুনতে অন্যরকম মনে হলেও, এটি আসলে একদমই সহজ একটি ট্রিক। এই ট্রিকটি হাতে কলমে এখনই আমরা শিখে ফেলতে পারি।
প্রথমে মুখের সামনে হাতের একটি আঙ্গুল তুলে ধরতে হবে। এরপর বাম চোখ বন্ধ করে শুধুমাত্র ডান চোখ দিয়ে আঙ্গুলটির দিকে তাকাতে হবে। এরপর আবার ডান চোখ বন্ধ রেখে বাম চোখ দিয়ে আঙ্গুলের দিকে তাকাতে হবে। একবার ডান চোখ আরেকবার বাম চোখ, এভাবে কয়েকবার করলে মনে হবে আঙ্গুলটির অবস্থান এদিক ওদিক হচ্ছে। আদতে আঙ্গুলটি কিন্তু একই স্থানে আছে, দুই চোখের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কারণে আঙ্গুলটিও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানে আছে বলে মনে হয়।
আঙ্গুলকে চোখের আরো কাছে নিয়ে আসলে আঙ্গুলের নড়াচড়া আরো বেড়ে যাবে। কাছে না এনে যদি আঙ্গুলকে দূরে নেয়া হয় তাহলে নড়াচড়া অল্প স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে। এখান থেকে আমরা বুঝতে পারছি, দুই চোখের দুই ভিন্ন অবস্থানের সাপেক্ষে আঙ্গুলের অবস্থান পাল্টে যাবার পরিমাণ বেশি হলে, সেটি নিকটে অবস্থিত আর অবস্থান পরিবর্তনের পরিমাণ কম হলে, সেটি দূরে অবস্থিত। যদি কোনোভাবে আমরা দুই চোখের পারস্পরিক দূরত্ব ও লক্ষ্যবস্তুর বিচ্যুত হবার পরিমাণ বের করতে পারি, তাহলে ত্রিকোণমিতির সূত্র প্রয়োগ করে বের করতে পারবো লক্ষ্যবস্তুর দূরত্ব কত। নক্ষত্রদের বেলাতেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে তাদের দূরত্ব পরিমাপ করা সম্ভব।
এই পদ্ধতিতে নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করার জন্য আঙ্গুলের বদলে নক্ষত্রকে লক্ষ্য করে ডান চোখ ও বাম চোখ দিয়ে তাকালে দেখা যাবে, কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ নক্ষত্র এতই বেশি দূরে অবস্থান করে যে, দুই চোখের কাছাকাছি অবস্থান তেমন কোনো কৌণিক বিচ্যুতি তৈরি করতে পারে না। দুই চোখ যদি পরস্পর থেকে কয়েক মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করতো, তাহলে এদের দ্বারা প্যারালাক্স পদ্ধতিতে নক্ষত্রদের দূরত্ব পরিমাপ করা যেত।
খালি চোখে নক্ষত্রের প্যারালাক্স পর্যবেক্ষণ করতে হলে দুই চোখকে পরস্পর থেকে মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করতে হবে।
চোখকে হয়তো মিলিয়ন মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করানো সম্ভব না, কিন্তু বিজ্ঞানীরা এর বিকল্প পদ্ধতি খুঁজে নিয়েছেন। আসলে কোনো কিছুকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করলে, তার মধ্যে হাজার রকমের সমস্যা দেখা দেয় এবং এসব সমস্যার বিপরীতে হাজার রকমের চমকপ্রদ সমাধানও এসে ধরা দেয়। বিজ্ঞানীরা মহাকাশীয় বস্তুর দূরত্ব মাপতে পৃথিবীর কক্ষপথীয় ঘূর্ণনকে ব্যবহার করেন। সূর্যের চারপাশে পৃথিবীর কক্ষপথের ব্যাস ১৮৬ মিলিয়ন মাইল। আজকে পৃথিবী কক্ষপথের যে অবস্থানে আছে এবং ঠিক ছয় মাস পরে যে অবস্থানে থাকবে তাদের পারস্পরিক দূরত্ব হবে ১৮৬ মাইল। এটি মোটামুটি যথেষ্ট লম্বা দূরত্ব। এত পরিমাণ দূরত্বে দূরবর্তী নক্ষত্রের প্যারালাক্স অনায়াসেই শনাক্ত করা যাবে।
কক্ষপথের কোনো অবস্থান থেকে নক্ষত্রের অবস্থানের মাপ নিয়ে, ছয় মাস পর আবারো ঐ নক্ষত্রের মাপ নিলে প্যারালাক্স পদ্ধতির মাধ্যমে তার দূরত্ব নির্ণয় করা যাবে। এখানে যেহেতু ছয় মাস আগে ও ছয় মাস পরে পৃথিবীর দুই অবস্থানের দূরত্ব জানা আছে এবং নক্ষত্রের অবস্থান চ্যুতি জানা আছে, তাই ত্রিকোণমিতির সূত্রের মাধ্যমে এখান থেকে নক্ষত্রের দূরত্ব বের করা খুব কঠিন কিছু নয়।
কিন্তু এত বিশাল দূরত্বকে ব্যবহার করার পরেও সকল নক্ষত্রের দূরত্ব এর মাধ্যমে বের করা যায় না। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র নিকট দূরের নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব পরিমাপ করা যায়। অতীব দূরের নক্ষত্রগুলোর বেলায় এই পদ্ধতিতে দূরত্ব বের করা যায় না। এরা এতটাই দূরে যে, ১৮৬ মিলিয়ন মাইলের প্যারালাক্স দূরত্বও এখানে কিছু না।
এদের দূরত্ব পরিমাপ করতে হলে প্যারালাক্স পদ্ধতির বিকল্প কিছু একটা ভাবতে হবে। এর বিকল্প হতে পারে উজ্জ্বলতা। কোনো নক্ষত্র বা কোনো গ্যালাক্সি কতটুকু উজ্জ্বল তার মাধ্যমে দূরত্ব বের করা যেতে পারে। কোনো নক্ষত্র যদি কাছে থাকে তাহলে তাকে অধিক উজ্জ্বল দেখাবে আর কোনো নক্ষত্র যদি দূরে থাকে তাহলে তাকে কিছুটা অনুজ্জ্বল দেখাবে।
উজ্জ্বলতা বিবেচনা করে দূরত্ব পরিমাপ করার ব্যাপারটি আপাতভাবে সুন্দর হলেও, এতে বেশ কিছু ঝামেলা আছে। সব নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা সমান নয়। নক্ষত্রের আকার ও ভরের উপর তার উজ্জ্বলতা নির্ভর করে। অনুজ্জ্বল নক্ষত্রটি যদি কাছে থাকে আর উজ্জ্বল নক্ষত্রটি যদি দূরে থাকে, তখন এই ব্যাপারটির মীমাংসা কীভাবে করা হবে? মৃদু উজ্জ্বল মোমবাতি যদি কাছে থাকে আর অধিক উজ্জ্বল মোমবাতি যদি দূরে থাকে, তাহলে আপেক্ষিকভাবে তাদের উজ্জ্বলতা সমান বলে মনে হতে পারে। কিংবা এমনও হতে পারে, অবস্থানের কারণে হালকা উজ্জ্বলতার মোমবাতিটিকেই বেশি উজ্জ্বল বলে প্রতিভাত হচ্ছে। নক্ষত্রদের বেলাতেও এরকম ব্যাপার প্রযোজ্য। তাই উজ্জ্বলতা দিয়ে দূরত্ব পরিমাপ করতে গেলে তা সমস্যার সৃষ্টি করবে।
সৌভাগ্যক্রমে, বিজ্ঞানীরা বিশেষ ধরনের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে দূরবর্তী নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করতে পারেন। তারা বিশেষ কিছু নক্ষত্রকে ‘প্রমাণ নক্ষত্র’ হিসেবে ধরে নেন এবং এদের সাপেক্ষে অন্য নক্ষত্রের দূরত্ব পরিমাপ করতে পারেন। এসব নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা ও তীব্রতা নির্দিষ্ট থাকে। বিজ্ঞানীরা এও জানেন, কীভাবে এরকম প্রমাণ নক্ষত্র (Variable Star) খুঁজে বের করতে হবে। এরকম নক্ষত্রের সাহায্যে, প্রতিষ্ঠিত কিছু গাণিতিক সূত্রাবলি প্রয়োগ করে বের করা যায় দূরবর্তী নক্ষত্রগুলো কত দূরে অবস্থিত। গ্যালাক্সি বা নক্ষত্র যত দূরেই থাকুক, কোনো না কোনো ভাবে আমরা তাদের অবস্থান ও দূরত্ব বের করতে পারি। নিকটবর্তী নক্ষত্রের জন্য আমাদের আছে প্যারালাক্স পদ্ধতি আর দূরবর্তী নক্ষত্রের জন্য আমাদের আছে ‘প্রমাণ নক্ষত্র’ পদ্ধতি।
বিজ্ঞান এই একটা দিক থেকে অনন্য। কোনো একটা ব্যাপার যতই ধরাছোঁয়ার বাইরে হোক না কেন, বিজ্ঞানকে ব্যবহার করে মানুষ কিছু একটা উপায় ঠিকই খুঁজে নেয়। বিজ্ঞানের মারপ্যাঁচে সমস্যার সমাধান বের হয়ে যায় ঠিকই।

গরুর দুধে শিশুর অ্যালার্জি by অধ্যাপক প্রণব কুমার চৌধুরী

গরুর দুধে প্রায় ২০ ধরনের প্রোটিন আছে, যার মধ্যে পাঁচটি বেশ অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী। যেমন: বিটা ও আলফা ল্যাকটো গ্লোবুলিন, কেসিন, বোভাইন সিরাম এলবুমিন ও গামা গ্লোবুলিন। অনেক শিশুরই গরুর দুধে অ্যালার্জি হওয়াটা বিচিত্র নয়। শিশুকে মাতৃদুগ্ধ থেকে ধীরে ধীরে গরুর দুধে অভ্যাস করানোর সময় এটি ধরা পড়ে। সে কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর দুই-তিন বছর বয়সের দিকে এটা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এসব শিশুর শুধু গরুর দুধ নয়, দুধের তৈরি যেকোনো খাবারে অ্যালার্জি হতে পারে।
গোদুগ্ধ অ্যালার্জির প্রায় ৮০ শতাংশ হলো তীব্র মাত্রার। এতে রক্তে আইজি-ই বেশি পাওয়া যায়। স্কিন টেস্ট পজিটিভ হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পারিবারিক ইতিহাস থাকে।
কারও কারও (২০ শতাংশ) অ্যালার্জি ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়, ফলে সহজে নির্ণয়যোগ্য নয়। এগুলোতে রক্তে আইজি-জি বা এম বেশি থাকতে পারে। এসব শিশুর অনেকে ঠিকভাবে বাড়ে না, অসুখ লেগেই থাকে।
১-২ শতাংশ শিশুর গরুর দুধে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া প্রথম বছরেই দেখা দেয়। লক্ষণগুলো হলো: বমি, ডায়রিয়া, পেটব্যথা, শরীরে র‌্যাশ, অ্যাকজিমা, নাকের অ্যালার্জি, কানপাকা অসুখ, অ্যাজমার মতো দীর্ঘমেয়াদি কাশি ও বুকে শোঁ শোঁ শব্দ। এরা রক্তস্বল্পতায় ভোগে ও ওজনে কম বাড়ে। ভগ্নস্বাস্থ্য থাকে।
কী করবেন?
১. শিশুর প্রথম বছরে গোদুগ্ধ বা দুগ্ধজাত খাবার পরিহার করা উচিত। প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ এবং তারপর মায়ের দুধের সঙ্গে অন্যান্য স্বাভাবিক খাবার দিন। এক বছর পার না হলে গরুর দুধ বা দুধের তৈরি কোনো খাবার দেবেন না।
২. গরুর দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার খাওয়ার পর পেটব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, ত্বকে র‌্যাশ ইত্যাদি দেখা দিলে সন্দেহ করতে হবে যে এতে অ্যালার্জি আছে। সে ক্ষেত্রে চিকিৎসক রক্ত পরীক্ষা ও স্কিন টেস্ট করে নিশ্চিত হতে পারেন। সমস্যা শনাক্ত হলে দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে যেতে হবে। কারও কারও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকে, যাদের দুগ্ধজাত খাবার খেলেই পেট ফাঁপে ও বদহজম হয়। তারাও দুধ এড়িয়ে চলবে।
৩. গরুর দুধের অ্যালার্জির কারণে যদি শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, বারবার রক্তস্বল্পতায় বা শ্বাসকষ্টে পড়ে, তবে তার খাবার তালিকা থেকে গোদুগ্ধ উপাদান বাদ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমিষের চাহিদা পূরণ করতে অন্যান্য আমিষযুক্ত খাবার, যেমন: মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, টফি, সয়া ইত্যাদি বেশি করে দিতে হবে। কখনো দেখা যায়, দুধে অ্যালার্জি বা ইনটলারেন্স থাকলেও দই খেলে কিছু হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শিশুর খাদ্যতালিকা পরিকল্পনা করুন।
বিভাগীয় প্রধান, শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

কেন শুধু পুরুষ, কেন শুধু নারী? by আকারি সাসাকি

কেন শুধু নারী?
টোকিওর বিদেশবিদ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানি শিক্ষার্থীর রচনাঃ >>> ‘এই যে পুরুষ, টেবিলটা সরিয়ে দিন।’ ‘তুমি নারী, চা নিয়ে এসো।’ এই কথাগুলো আমাকে সেদিন ভাবিয়েছিল। কেন? এটা ঠিক যে আমি নারী। কিন্তু কেন আমাকে চা নিয়ে আসতে হবে? টেবিলটা তো আমিও সরাতে পারি, তাই না? বরং বৃদ্ধ যেসব পুরুষ এখানে আছেন তাঁদের চেয়ে ভালো করে সেই কাজ আমি করতে পারি।
এটা আমার দাদির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময়ের কথা। আমার বয়স তখন ১৮ বছর। জাপানে আত্মীয়রা মিলিত হওয়ার সময় নারীকে সব সময় সবার জন্য চা পরিবেশন করতে হয়। আর ভারী জিনিস সরানো হচ্ছে পুরুষের কাজ। তবে আমি এটা সেদিন বুঝতে পারিনি। নারী আর পুরুষকে কেন আলাদা কাজ করতে হয়? সেই ঘটনা থেকে লিঙ্গ সমস্যা নিয়ে শেখার আগ্রহ আমি পেয়েছি।
আমি ছোটবেলা থেকে ভেবেছিলাম কেন শুধু মা রান্না করেন। আমার বাবা ও মা দুজনই চাকরি করেন। আমার মা রোজ কাজ থেকে বাড়িতে ফিরে এসে রাতের খাবার তৈরি করেন। আমার বাবা তা করেন না। সকালেও একই রকম। মা ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠে নাশতা তৈরি করেন। আর এটা শুধু রান্না নিয়ে নয়। বাড়ির অনেক কাজ—যেমন কাপড় ধোয়া আর ঘর পরিষ্কারের কাজ, এর সবটাই মা করেন। টিভি নাটক বা সিনেমাতেও ঠিক এভাবেই নারী বাড়ির কাজ করেন। তবে কেন?
জাপানে অল্প কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রায় সব বাড়িতে বাবা বাইরে চাকরি করতেন আর মা করতেন বাড়ির কাজ। তবে মাও চাকরি করছেন তেমন বাড়িও জাপানে আজকাল অনেক আছে। আমার নিজের বাড়িও তাই। তাহলে বাবারও তো মায়ের মতোই বাড়ির কাজ করা দরকার। কিন্তু সেই যে আগে যখন শুধু বাবা বাইরে চাকরি করতেন, সেই সময়ের অভ্যাস মনে হয় এখনো থেকে গেছে।
শুধু বাড়ির কাজ নিয়েই অনেক আগে থেকে আমি ভাবিনি। আরও যে একটি প্রশ্ন আমার মনে দেখা দিয়েছিল তা হলো, কেন শুধু নারীকে মেকআপ নিতে হয়? আমি এটাও জানি, অনেক নারীর মেকআপ পছন্দ। তবে কেন ‘সব’ নারীকেই সেটা পরতে হয়? মেকআপ পছন্দ করে না সে রকম নারীও নিশ্চয় আছে। আমি যখন পার্টটাইম কাজ করতে শুরু করেছিলাম, তখন আমাকে সব সময় বলা হতো যে, ‘মেকআপ করে আসুন’ ‘মেকআপ না করে আসবেন না’।
জাপানে নারীর মেকআপ পরা হচ্ছে ভদ্রতার প্রতিফলন। সেটা হচ্ছে এমন কিছু নারীকে যা অবশ্যই করতে হয়। যে নারী মেকআপ করে না, সে কি নারী নয়? কেন শুধু নারীকেই মেকআপ নিতে হয়? আর যদি পুরুষ মেকআপ করে তাহলে মানুষ মনে করবে সেটা হচ্ছে অদ্ভুত। মেকআপ করা পুরুষের জন্য ভদ্রতা নয়। যে পুরুষ মেকআপ নিচ্ছে সে কি পুরুষ নয়? আজকাল জাপানে মেকআপ নেওয়া পুরুষও অনেক আছে। তবে এদের দেখা হয় লিঙ্গ নিরপেক্ষ মানুষ হিসেবে। এটা থেকেও আমরা দেখতে পাই, মেকআপ হচ্ছে শুধু নারীদের জিনিস, পুরুষদের নয়। তাই যে পুরুষ মেকআপ করছে সেই পুরুষ হচ্ছে ‘নারীর মতো’ পুরুষ।
আমার মনে আরও যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল তা হলো, রঙেও কেন লিঙ্গ আছে। নারীর মতো রং ও পুরুষের মতো রং কেন আছে? আমি ছোটবেলায় আকাশি রং পছন্দ করতাম। কিন্তু আমার বন্ধুরা এ রকম বলেছিল যে, মেয়েরা গোলাপি বা কমলা রং পছন্দ করে আর ছেলেদের পছন্দ নীল বা সবুজ রং। আমার তাই মনে হয়েছিল, আমি হয়তো নারীর মতো নই।
ছেলের মতো রং? মেয়ের মতো রং?
স্টেশনারি থেকে পোশাক পর্যন্ত ছেলেদের জিনিস ও মেয়েদের জিনিস বেশির ভাগ সময় আলাদা রঙের হয়ে থাকে। ছেলের জিনিসগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নীল রঙের আর মেয়ের জিনিসে গোলাপি রং বেশি। আর জাপানের স্কুলব্যাগও ছেলেদের ও মেয়েদের আলাদা রঙের হয়। যখন আমি প্রাথমিক স্কুলে যেতাম তখন প্রায় সব ছেলের ব্যাগ ছিল কালো বা নীল রঙের আর মেয়েদের ব্যাগের রং ছিল লাল বা গোলাপি। আজকাল এটা একটু বদলে যাওয়ায় বাদামি বা বেগুনি রংও দেখা যায়। এ রকম করে ছোটবেলা থেকে ছেলের মতো বা নারীর মতো রং ঠিক করে দেওয়া আছে। বাচ্চাদের জন্য এর প্রভাব ভালো নয় বলে আমার মনে হয়। কারণ, বাচ্চারা মনে করে নেবে যে ছেলে বা মেয়ের মতো করে তাদের থাকতে হবে।
এবার আমার নিজের অভিজ্ঞতার বাইরের একটি উপাত্ত থেকে জাপানের লিঙ্গ সমস্যা নিয়ে আমি বলব। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০১৮ সালের লিঙ্গবৈষম্য সূচকে জাপানের অবস্থান হচ্ছে ১৪৯ দেশের মধ্যে ১১০। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর রাজনীতির ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মধ্যে কতটা বৈষম্য বিরাজমান, সেই উপাত্ত থেকে এই সূচক ঠিক করে নেওয়া হয়। এই চারটি ক্ষেত্রের মধ্যে রাজনীতিতে জাপানের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। এর কারণ হলো জাপানে কখনো কোনো নারী প্রধানমন্ত্রী হয়নি এবং জাতীয় সংসদে নারী সদস্যের সংখ্যা খুব কম। আর অর্থনীতির ক্ষেত্রেও জাপান খুব খারাপ অবস্থায় আছে। জাপানে এখনো নারী-পুরুষের মধ্যে আয়ের ব্যবধান বেশ বড় আর ব্যবস্থাপনার কাজ, অন্য কাজের চেয়ে বেতন যেখানে বেশি, সেই কাজে নারীর আনুপাতিক হার যথেষ্ট কম।
জাপানের বিপরীতে লিঙ্গবৈষম্য সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম। এটা হচ্ছে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় স্থান। এই ফলাফল অর্জনে রাজনীতির ক্ষেত্রে ভালো উপাত্ত বড় প্রভাব রেখেছে। বাংলাদেশ রাজনীতির ক্ষেত্রে সব দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম স্থানে। এর কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নারী। আর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৫০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত। এসব কারণে রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক উঁচুতে। রাজনীতির সূচকে জাপানের অবস্থান সবচেয়ে খারাপ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের অবস্থা তাই জাপানের জন্য মডেল হবে বলে মনে হয়।
এ পর্যন্ত যা আমি বললাম তা হলো, আমার দেখা জাপানে লিঙ্গের অবস্থা। আমি রোজ লিঙ্গ নিয়ে অনেক কিছু ভাবি। এই সেপ্টেম্বর থেকে ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি যাচ্ছি। উদ্দেশ্য হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার লিঙ্গ সমস্যা নিয়ে লেখাপড়া করা। আমি বলেছি, বাংলাদেশে লিঙ্গ সমতা জাপানের জন্য মডেল হতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে আমি এখন জাপানের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। দিল্লি গিয়ে আরও বেশি লেখাপড়া করলে জাপানের লিঙ্গ সমস্যা নিয়েও নতুন কিছু হয়তো আমি দেখতে পারব। এরপর জাপানের লিঙ্গ পরিস্থিতির মধ্যে যেগুলো আমি এখনো বুঝতে পারি না, সেগুলো যেন ধীরে দূর হয়ে যায়, সেই আশা আমি করছি।
আমার বাবা-মা। তাঁদের দেখে আমি লিঙ্গ সমস্যা নিয়ে অনেক উপলব্ধি করেছি

শ্রীমঙ্গলের ‘শান্তিবাড়ি’ -ইকোনমিস্ট’র রিপোর্ট by এম ইদ্রিস আলী

বৃটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট’র গত ৬ই মে, ২০১৯ সংখ্যায় ব্যতিক্রমী পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে শ্রীমঙ্গলের শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্ট’র ওপর একটি সচিত্র প্রতিবেদন ছাপা হয়। এতে বাঁশ দিয়ে তৈরি এবং টিভি-এসির মতো আধুনিক উপকরণ না থাকা সত্ত্বেও এই পর্যটন কেন্দ্রটি দেশি-বিদেশি পর্যটকদের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে বলে রিপোর্টে প্রশংসা করা হয়।
শ্রীমঙ্গল। বাংলাদেশের পাহাড়ি চা-চাষ অঞ্চলের একটি শহর। তানভীর আরেফিন লিংকন যখন এখানে ইকো রিসোর্ট স্থাপন করেছিলেন, তখন সেখানে প্রধানত বিদেশি পর্যটকরাই ভিড় করতেন। স্থানীয় লোকেরা হাসাহাসি করতেন। কারণ কত বেশি সুবিধাসম্পন্ন হোটেল-মোটেলের পাশে এত কম আধুনিক সুবিধার রিসোর্ট করে লাভ কী। এতে কারা থাকতে আসবেন? অতিথিরা এসে প্রশ্ন করবেন, টিভি কোথায়? এসি কোথায়? আমরা কিসের জন্য টাকা দেব?
জনাব লিংকন জবাব দিতেন: ‘আপনি চাঁদ এবং তারকারাজি দেখার জন্য অর্থ প্রদান করছেন।
আপনি একটি বিলাসবহুল পরিবেশের জন্য অর্থ প্রদান করছেন, বিলাসবহুল রুমের জন্য নয়।’
সেটা ছিল পাঁচ বছর আগের কথা। এখন তার বেশিরভাগ অতিথি বাংলাদেশি। ২০০০ সালে মাত্র ৩ লাখ বাংলাদেশি তাদের দেশে ছুটি কাটিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে সেটা বেড়ে ৭০ লাখ হয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের প্রধান ভুবন বিশ্বাস বলেছেন, গত বছরে এবং এবারে এই সংখ্যা আরো উচ্চতর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তার কথায়, ‘পর্যটন ব্যবসা রমরমা।’
রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদের কারণে সামপ্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক পর্যটন ব্যাপকভাবে অচল হয়ে পড়েছিল। ২০১৬ সালে বিশেষ করে বিদেশিদের ওপর মারাত্মক আক্রমণ ঘটে। রাজধানী ঢাকায় বিদেশি অভিবাসীরা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হন। তাই বিদেশিরা ভয় পেলেন, কিন্তু স্থানীয়রা তাদের জায়গা করে নিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ রশিদুল হাসান বলেন, গত দশ বছরে মানুষের আয় তিন বা চারগুণ বেড়েছে। প্রথমত, পরিবারগুলো গোড়াতে আধুনিক জীবনযাপনের অনুষঙ্গ, যন্ত্রপাতি এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের উপর অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে থাকে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, পরে তাদের আয় ক্রমাগতভাবে বাড়তে থাকায় তারা ছুটি কাটানোর মতো পরিসেবাগুলোর দিকে নজর দেন।
অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের অধিকাংশ প্রচারণা পছন্দ করেন। শান্তিবাড়ি থেকে খুব কাছেই গ্রান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গল্‌ফ এবং দি প্যালেস লাক্সারি রিসোর্ট আছে। তাদের সুইমিং পুল, মার্বেল-খোদাই ঝকঝকে কমপ্লেক্স। আছে গেমস উপকরণ। উচ্চবিত্তের হোটেলগুলো অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ১২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত আছে কক্সবাজারে। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হলো কক্সবাজার শহর। কিন্তু শান্তিরবাড়ি দেখিয়েছে, পরিবেশ ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটনেও বাংলাদেশিদের আগ্রহ বাড়ছে।
প্রথমেই আসে স্থানীয়দের পর্যটনের ভাবনা। তারপর বিদেশিদের প্রশ্ন। অথবা বলা চলে তেমনটিই সরকার আশা করে। তবে কক্সবাজারে বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি বিশেষ অঞ্চল স্থাপন করছে। মি. বিশ্বাস বলেন, বিদেশিদের জন্য এমন একটি জায়গা প্রদান করা দরকার যেখানে তারা নিরাপদে এমনভাবে আচরণ করতে পারেন, যা দেশের অন্যান্য রক্ষণশীল অংশে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।্থ তিনি আরো বলেন, ‘বিদেশি পর্যটকদের প্রস্তাব করার জন্য বাংলাদেশের কাছে অনেক কিছুই আছে, কিন্তু বাংলাদেশিরা সম্ভবত বিকিনির জন্য প্রস্তুত নয়’।
ইকোনমিস্টের রিপোর্ট ছাপা হওয়া নিয়ে তানভীর আরেফিন লিংকন বললেন, ‘আসলেই খুব ভালো লাগছে। এটা একটা স্বীকৃতি।’

স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ মিল হলে যা হয়

ছবি-প্রতীকী
বিয়ের আগে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বামী ও স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে নেয়া। কিন্তু আমরা অধিকাংশ মানুষই এই বিষয়টার দিকে কোনও ধরনের নজর দেই না। এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে নেয়া যাক:

স্বামী ও স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ এক হলে কোনও সমস্যা হয় কি? অনেকেই ভাবেন এর ফলে সন্তান সুস্থ হবে না ৷ কিন্তু চিকিত্‍সকদের মতে, এতে কোনও সমস্যাই হয় না। এশিয়াতে প্রায় ৪৬ ভাগ মানুষের রক্তের গ্রুপ ‘বি’। এশিয়ায় নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ ৫ শতাংশ, সেখানে ইউরোপ আমেরিকাতে প্রায় ১৫ শতাংশ। যেখানে উপমহাদেশে সিংহভাগ মানুষের রক্তের গ্রুপ 'বি'। সেখানে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপের মিল হবে সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু, যদি স্ত্রীর নেগেটিভ রক্তের গ্রুপ থাকে এবং স্বামীর পজিটিভ গ্রুপ থাকে তাহলে সমস্যা হয়ে থাকে। সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। কারণ, থ্যালাসেমিয়া রোগ ক্রোমোজোম অ্যাবনরমালিটি থেকে হয়।

স্বামী পজিটিভ (+) স্ত্রী পজেটিভ (+) হলে সুস্থ সন্তান। স্বামী নেগেটিভ (-) স্ত্রী নেগেটিভ (-) হলে সুস্থ সন্তান ৷ স্বামী নেগেটিভ (-) স্ত্রী পজেটিভ (+) হলে সুস্থ সন্তান। স্বমী পজিটিভ (+) স্ত্রী নেগেটিভ (-) হলে প্রথম সন্তান সুস্থ, দ্বিতীয় থেকে সমস্যা হয়।

Wednesday, December 18, 2019

ভারতের ঐতিহাসিক চারমিনার মসজিদ

চারমিনার মসজিদটি পুরাতন হায়দ্রাবাদ শহরের মুসি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। এটি ভারতের একটি ঐতিহাসিক মসজিদ।
চারমিনার মসজিদটি ১৫৯১ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত ভারতের তেলঙ্গানার হায়দ্রাবাদের অন্যতম একটি প্রাচীন মসজিদ। এই স্থাপনাটি হায়দ্রাবাদকে বিশ্ব দরবারে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। এটি ভারতের তালিকাভুক্ত সর্বস্বীকৃত একটি স্থাপনাও। এর উত্তরপূর্বকোণে লাদ বাজার এবং পশ্চিম দিকে গ্রানাইটের তৈরি খুবই উচ্চ কারুকাজ সম্পন্ন মক্কা মসজিদ অবস্থিত।
চারমিনার দুইটি উর্দু শব্দ চার এবং মিনার এর সমন্বয়ে গঠিত মসজিদ যার ইংরেজী অনুবাদ “Four Towers”। স্থাপনাটিতে ৪টি মিনার সংযুক্ত যা এই স্থাপনাটিকে ৪টি খিলানের মাধ্যেমে মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করেছে।
>>>দি ঢাকা টাইমস্

পাইলস রোগে ইউনানি চিকিৎসা by ডা: মো: শাহজালাল চৌধুরী

রিয়াজ, একজন ছাত্র। বয়স ২০ বছর। বিগত তিন থেকে চার বছর সে পেটের আমাশয় রোগের পাশপাশি, পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়া সমস্যায় ভুগছিলেন, তারপর বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে চিকিৎসক তার রোগের উপসর্গ ইতিহাস শুনে এবং দৈহিক পরীক্ষা করে জানালেন- তার দ্বিতীয় পর্যায়ের পাইলস বা হেমোরয়েড হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক তাকে মুখে খাওয়ার কিছু পাইলসের ওষুধ দিলেন এবং পায়ুপথে লাগানোর একটা মলম দিলেন। এতে তিনি রোগের কিছুটা উন্নতি পেলেও পুরোপুরি সেরে উঠলেন না। একপর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি ইউনানি চিকিৎসকের পরামর্শ নেন।
চিকিৎসকের পরার্মশক্রমে প্রায় দুই থেকে তিন মাস হামদর্দের এ সমস্যার চিকিৎসা গ্রহণ করলেন। তারপর থেকে তার রক্তবিহীন স্বাভাবিক পায়খানা হয় এবং পায়ুমুখে বাহ্যিক আর কোনো ফুলাও অনুভূত হয় না। রিয়াজের মতো বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৫০ বছরের নিচে বেশির ভাগ মানুষের মধ্যে পাইলসের উপসর্গ বিভিন্ন মাত্রায় দেখা যায়।
হেমোরয়েড় সাধারণত পায়ুপথে ত্বকের নিচের ও মলাশয়ের ভেতরে এক ধরনের রক্তজালিকা। যখন পায়ুপথের এসব শিরার সংক্রমণ এবং প্রদাহ হয়, চাপ পড়ে, তখন হেমোরয়েড বা পাইলস সৃষ্টি হয়। সাধারণ কথায় যাকে অর্শ রোগ বলা হয়। আর ইউনানি পরিভাষায় বাওয়াসির বলে।
বাওয়াসির বা হেমোরয়েড বা অর্শ রোগের অবস্থান সাধারণত দুই ধরনের যথা-
* পায়ুপথের বহিঃ অর্শ রোগ
* পায়ুপথের অন্তঃ বা ভেতরের অর্শ রোগ
* আবার কখনো দুটো প্রকার বা অবস্থা একসাথেও থাকতে পারে।
পায়ুপথের ভেতরের অর্শ রোগ বা হেমোরয়েড ফুলে পায়ুমুখের বাইরে বের হয়ে আসার ডিগ্রির ভিত্তিতে চারটি পর্যায় বিভক্ত যথা :
প্রথম পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে আসে না, প্রলেপস হয় না)। দ্বিতীয় পর্যায়, (পায়খানার পর হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে এবং তারপর আপনা-আপনি ঠিক হয়ে যায়)। তৃতীয় পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে এবং নিজে ঠিক করতে হয়। চতুর্থ পর্যায়, (হেমোরয়েড ফুলে বাইরে বের হয়ে আসে বা প্রলেপস হয়ে এবং তা আর নিজে ঠিক করা যায় না)
পাইলসের (বাওয়াসির) প্রধান কারণগুলো হচ্ছে- দীর্ঘ দিন কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা, ক্রনিক ডায়রিয়া, মলত্যাগে দীর্ঘক্ষণ টয়লেটে বসে থাকা ও দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা। এ ছাড়া পারিবারিক ইতিহাস, আশযুক্ত খাবার কম খাওয়া, ভারী মালপত্র বহন করা, স্থূলতা, কায়িক শ্রম কম করা, গর্ভকালীন পায়ুপথে যৌনক্রিয়া, যকৃত রোগ বা লিভার সিরোসিস ইত্যাদি কারণে রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সর্বোপরি পোর্টলি ভেনাস সিস্টেমে কোনো ভাল্ব না থাকায় উপরিউক্ত যেকোনো কারণে পায়ু অঞ্চলে শিরাগুলোতে চাপ পড়ে, ফলে হেমোরয়েড সৃষ্টি হয়।
অর্শ রোগে যেসব লক্ষণ দেখা যায় তা হচ্ছে- পায়ুপথের অন্তঃ বা ভেতরের অর্শ রোগে সাধারণত তেমন কোনো ব্যথা বেদনা, অস্বস্তি থাকে না। অন্যদিকে পায়ুপথের বহিঃ অর্শ রোগে- পায়ুপথ চুলকায়, বসলে ব্যথা করে, পায়খানার সাথে টকটকে লাল রক্ত দেখা যায় বা শৌচ করা টিস্যুতে তাজা রক্ত লেগে থাকে, মলত্যাগে ব্যথা লাগা, পায়ুর চারপাশে এক বা একের অধিক থোকা থোকা ফোলা থাকে।
চিকিৎসক শারীরিক পরীক্ষা করে ও রোগীর উপসর্গ শুনেই অর্শ রোগ শনাক্ত করতে পারবে। এ ছাড়া পায়ুনালীর সমস্যাগুলো খুব খারাপ কি না বা অন্য কোনো রোগ আছে কি না তা জানতে অ্যানোস্কপি বা সিগময়ডস্কপি বা কলোনস্কপি পরীক্ষা, মলের লুকায়িত রক্ত নির্ণয় পরীক্ষা (ওবিটি), মলের আণুবীক্ষণিক পরীক্ষা করাতে পারেন।
একটা কথা আমরা সবাই জানি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম, অর্শ রোগ যেহেতু জীবনধারা ও খাদ্যাভাসের সাথে অনেকাংশে জড়িত। তাই শৃঙ্খলিত জীবন যাপনই রোগ প্রতিকারের চেয়ে রোগ প্রতিরোধের একমাত্র উপায় তথা প্রথম মাধ্যম। তাই নিয়ম করে অতিরিক্ত কোথ না দিয়ে সাবলীলভাবে মলত্যাগ করা, যেগুলো ফল খোসাসহ খাওয়া যায়, তা খোসাসহ খাওয়া। আশযুক্ত খাবার শাকসবজি বেশি খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত ব্যয়াম করা, লাল গোশত পরিহার করুন, প্রাথমিক অবস্থায় উষ্ণ পানি এবং ক্রনিক বা রোগ পুরনো হলে শীতল পানিতে নিতম্ব স্নান করতে পারেন।
অর্শ রোগ প্রতিকারের আগে মূল লক্ষ্য হবে অর্শ রোগ হওয়ার মূল কারণগুলো শনাক্ত করে তা প্রতিরোধ করা। অর্শ রোগ প্রতিকারে যেসব ভেষজ উপাদান কার্যকর তা হচ্ছে- বাসক, থানকুনি, আমলকী, হরিতকি, মেহেদি পাতা, ইসবগুল, নিমপাতা ও নিমতেল, ভাংপাতা, মুকিল, জিংগবিলোবা।
অর্শ রোগকে রোগের ধরনভেদে চারটি ডিগ্রিতে ভাগ করে এর পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় ডিগ্রির সাধারণত ওষুধ দিয়ে সারে। রক্তপাতযুক্ত অর্শ রোগে বাসক পাতার রস ১ চামচ করে দিনে তিনবার সেবন করুন।
অথবা হরিতকি ওই এক চামচ পরিমাণ দৈনিক একবার গরম পানিসহ সেবন করুন।
সাতটি নিমফুল বা নিম বীজের মজ্জা পানিসহ সকালে সেবন করুন। ইসবগুল এক চামচ পরিমাণ পানিসহ রাতে সেবন করুন। আর ইসবগুল, নিমপাতা ও নিমতেল, মুকিল এ-জাতীয় বিভিন্ন ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি ইউনানি ওষুধ ট্যাবলেট টোনালেক্স, হ্যানরয়েড, হ্যানরয়েড বি, কবি, মুকিল, মাজুন ওশবা, সফুফ ইন্দেমালি, ট্যাবলেট পিবলিউ (বন্দিশ খুন) হামদর্দের ক্লিনিকগুলো থেকে চিকিৎসকের পরার্মশ মতো খেতে পারেন। এ ছাড়া অর্শ রোগ যদি ভেষজ ওষুধ যা অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ ও প্রতিরোধ চিকিৎসায় না সারে, তাহলে একজন কলোরেক্টাল সার্জনের পরামর্শ মতো চিকিৎসা নিতে পারেন। যদি এ রোগ ডায়াগনোসিস না করানো হয় বা চিকিৎসা না নেয়া হয়, তাহলে দেহ থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে পারে, পায়ুপথে ক্যান্সার হতে পারে।
তাই আসুন, আমরা প্রাকৃতিকভাবে অর্শ রোগ প্রতিরোধ করে, চিকিৎসা নেই, অর্শ রোগজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দূর করি। এতে অর্শ রোগজনিত অস্ত্রোপচার/সার্জিক্যাল/শল্য চিকিৎসা বা খরচ যেমন অনেক কমবে, তেমনি আমাদের জীবন হবে সুস্থ, সুন্দর ও আনন্দময়।
লেখক : লেকচারার, কমিউনিটি মেডিসিন, হাকিম সাঈদ ইস্টার্ন মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল, নিমতলী, ঢাকা। ফোন : ০১৬৭৮৭৬৪৬৬০

নারী

হাজী সাহেবের বউ মারা গিয়েছে অল্প কয়দিন হলো মাত্র। এরই মধ্যে নতুন বউ ঘরে তুলছে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পাড়া-প্রতিবেশীরা এই নিয়ে কত রং ঢং করে তার ইয়ত্তা নেই। পুরো এলাকা যেন হাসি-তামাশার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। কি বুড়ো আর কি-বা যুবক; সবার মুখে একটি বচন-বুড়ো হাজীর শরীর থেকে যৌবনের তাপ এখনো যায় নাই। এক পা কবরে গেছে আর এক পা টেনে হিঁচড়ে চলে— তবু সালার বউ দরকার। এই বুড়ো বয়সে বউয়ের শখ মজে নাই। চমড়াগুলো তো টান দিলে দুই-তিন হাত লম্বা হয়। লাঠি ভর দিয়ে চলা-ফেরা করে— বউ দিয়া কি করব?

ছেলে-মেয়েদের বিয়ে-শাদী হয়ে যাওয়ায় নিজেদের সংসার নিয়ে মহাব্যস্ত। তাদের ছেলে-মেয়েরাও অনেক বড়-সড় হয়েছে। মেয়েরা স্বামীর বাড়িতে সুখে-শান্তিতে আছে আর ছেলেরা বউ পোলাপাইন নিয়া দিব্যি ভালো আছে। সবাই সবার কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। সংসারের বুড়ো আর বুড়ি; দুই জনেই ছিল একে অপরের সহযোগী; সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেয়ার মতো সঙ্গী। কিন্তু বুড়িটা চলে যাওয়ায়-বুড়াটার জ্ঞানশক্তি লোপ পেয়েছে। বুড়ি ছাড়া বুড়োর যেন একটি মুহূর্ত কাটতে চায় না। খোদায় যদি বুড়ো আর বুড়ি দুইটাকে এক সঙ্গে নিয়ে যেত— তাহলে এতো জ্বালা-যন্ত্রণা বুকে নিয়ে আধ মরা হয়ে বেঁচে থাকার দরকার হতো না-বুড়োর। গ্রামের ময়-মুরব্বিরা বলা বলি করতে লাগল, না জানি বুড়িটার শোকে এমন হয়েছে।

সব কিছু মিলিয়ে বুড়ার মনে শান্তি নেই। কিসের অশান্তিতে বুড়ো মনমরা হয়ে আছে। তা পৃথিবীর কাউকে বুঝানো যাবে না। এটা একমাত্র বুড়োই জানে। খাওয়া-দাওয়া, চলা-ফেরা সবই ঠিক আছে কিন্তু হূদয়ের মধ্যে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে; তার খবর কে রাখে। সবাই তো দেখতে পায়, হাজী সাহেবের কোন সমস্যা নেই। নায়-নাতনি নিয়ে খুবই ভালো আছে। কেউ দাদা বলে ডাক দেয় আবার কেউ বা নানা বলে ডাক দেয়। কেউ বা বুড়োর মাথা থেকে পাকা চুলগুলো নিয়ে খেলা করে। আবার কখনো শরীরের ঢিলে চামড়া ধরে টেনে টেনে দেখে— কতটুকু লম্বা হয়। বুড়ো বয়সে শরীরের গঠন এমন-যৌয়ান বয়সে যে কেমন শক্তিশালী ছিল— তা নিয়ে নাতি-নাতনিরা আলাপ আলোচনা করে।

ছেলে-মেয়েদের পীড়াপীড়িতে পাড়ার ময়-মরব্বিরা বৈঠকে বসল। হাজী সাহেবের কি অসুবিধা, কিসের অভাব-যে নতুন বউ ঘরে আনতে হবে। সংসারে আগুন জ্বালাতে চায়। নতুন ভাগিদার তৈরি করে— একটা যুদ্ধক্ষেত্র বানাতে চায়।

এছাড়া এলাকার বিভিন্ন মানুষজন বিভিন্নভাবে আলোচনা সমালোচনা করে। নিজেদের মান-সম্মানে আঘাত লাগে। তাই ছেলে-মেয়েরা এক পায়ে দাঁড়িয়েছে— যত কষ্টই হোক; তারা বুড়ো বাপকে আদর-যত্ন করবে। সেবা-যত্নের কোনো রকম ঘাটতি করবে না। কিন্তু নতুন করে বিবাহ করতে দিবে না— এক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই বুড়োকে বিভিন্নভাবে যুক্তি দিয়ে জ্ঞান দিচ্ছে। শেষ বয়সে সংসারে বিভাজন সৃষ্টি করে কি লাভ। আল্লা-খোদার নাম নিয়ে কবর দেশে যেন ভালোভাবে যাওয়া যায়; সেই চিন্তা-চেতনা যেন মশগুল হয়। বিয়ে-শাদীর বিষয়টা মাথায় থেকে একেবারে বিদায় করে দেয়। আল্লা-রাসুলের নাম জপে জপে মসজিদে বসে বসে জিকির করে সময়টা কাটিয়ে দেয়। বয়স তো আর কম হয়নি— কমছে কম সত্তর আশি তো হবেই। এখন আর বউ বউ করার কি দরকার?

গ্রাম্য সর্দার অলি মিয়া বলল— আল্লা-বিল্লা কর হাজী। বিয়া-টিয়া কইরা আর সংসারে জ্বালা বাড়ানোর কাম নাই। নায়-নাতনি নিয়া হাসি-খুশির মধ্যে কয়েকটা দিন বালায় বালায় কাটাইয়া যাও মিয়া। কি পাগলের মতো চিন্তা-ভাবনা শুরু করছ। মাইনষে হুনলে কি কইব। তা ছাড়া তোমারে নিয়া সারা গ্রামে কি রব উঠছে— তুমি কি তার খবর রাখ!

বুড়ো হাজী সেকান্দার আলী বলল, সর্দারী-মাতবরী তোমার বাড়ি গিয়া কর। আল্লা-রাসুল আমারে শিখাতে আইয় না। কম বুঝে আর অজ কইরা আইছি না। ধর্ম-কর্ম; তোমার চাইতে কম বুঝি না। আমার সয়-সম্পত্তি কম নাই। বউ আইলে কি সমস্যা- হ্যাঁ। ছেলে-মেয়েরা যদি চায়; তাদের ভাগ নিয়া যাক। তাতে আমার কোনো আপত্তি নাই। ধর্মের বিধান মতে-ভাগ ভাটোয়া করে দিয়া যাও। এছাড়া আর কোনো জ্ঞান-বুদ্ধি দিতে চায় না। আমার মাথা নষ্ট অয় নাই; এখন ঠিক আছে। হুশ-জ্ঞান হারাইছি না।

এদিকে কমলার বাপ-মারা গেছে এক যুগ গেল। কমলার দিকে চেয়ে চেয়ে যুগ-যুগান্তর কাটিয়ে দিল-কমলার মা। কমলার বাপ যখন মারা যায়— তখন সবেমাত্র যৌবনের আলোর ফুটেছে। কাঁচা হলুদের মতো শরীরটা ছিল। এখনো দেখলে মনে হয়-নব বধূ। লাল শাড়ি পড়লে জোয়ান-বুড়ো কারো চোখ ফিরে না। অল্প বয়সে তার বিয়েটা হয়েছিল। প্রাইমারি স্কুল ছেড়ে হাই-স্কুলে যায় কি-যায় নাই, তা বলতে পারে না-কমলার মা। তবে তার বিয়েটা খুব অল্প বয়সে হয়েছে— সেই কথা মনে আছে। স্বামীর সুখ উপলব্ধি করার পূর্বেই স্বামীকে হারাতে হয়েছে। পার্থিব অভাব অনটন না থাকলেও মনের গহিনে যে অভাব রয়েছে; তা তো অপূরণীয়ই থেকে গেল। ছোট্ট একটি শিশু কন্যার ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে নিজের সব চাহিদাকে বিসর্জন দিল। তাছাড়া কমলার নানার কুলে ও দাদার কুলে কারোই দ্বিতীয় বিয়ের রীতি নেই। দুই পরিবারের ঐতিহ্য বলে কথা। তাদের মেয়ে বা পুত্র বউদের কঠিন নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হয়। স্বামী চলে গেলেও তার আঁচল ধরে বাকি জীবন কাটাতে পারলেই সতী সাধবী নারী হিসেবে স্বীকৃতি পায়। একজন নারী দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে যাবে— এটা যেন কেমন কথা। সমাজ এটাকে কোন মতে মেনে নিতে চায় না।

দ্বিতীয় পাত্রী কোনো সংসারে গিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে খুবই কষ্ট হয়। কত রকমের জ্বালা-যন্ত্রণা তাদেরকে সহ্য করে নিতে হয়। স্বামী মরে গেছে বলে তাদের কপালও পুড়েছে। না পারবে অন্যের সঙ্গে সংসার গড়তে; না পারবে নিজের সংসারে সুখে শান্তিতে থাকতে। তারা যেন একটা অভিশাপের বোঝা নিয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। তাদের চাওয়া-পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। শখ আহ্লাদ বলতে কিছুই নেই। তারা শুধু মাত্র মরে যাওয়া স্বামীর শোক মালা গাঁথবে আর পরপারে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করবে। তাছাড়া কোন শুভ কাজে তাদের অংশগ্রহণ করতে মানা। সমাজে তাদের স্বামী খাওয়া নারী হিসেবে ডাকে। অন্য নারীদের বিশ্বাস যে তারা স্বামী খেয়ে ফেলেছে। তাদের কোন কাজের আগে রাখা যাবে না। তারা যদি থাকতে চায়; তবে সবার পেছনে পেছনে থাকবে কিন্তু কোন কিছু ছুঁতে পারবে না। মোটা সাদা কাপড় হলো তাদের পরিধানের একমাত্র পোশাক। অলংকার ব্যবহার করা ও সাজ-গোছ করা নিষেধ।

এখন কমলার মায়ের মনে আর কোন শখ আহলাদ জাগে না। মনটা একেবারে পাথর হয়ে গেছে। তাই মনের মধ্যে নতুন করে কোন স্বপ্ন বা ভালবাসার জন্ম হয় না। এই মনের জমিনটা মরু সাহারায় পরিণত হয়েছে। এই জমিতে কোন কিছুই জন্মাবার নয় শুধু খা খা করে শেষ প্রান্তের দিকে ধাপিত হওয়াই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। কমলাটা দিন দিন বড় হচ্ছে। তাকে কিভাবে সুখি করা যায়। সেই চিন্তা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। বাপ মরা মাইয়্যা। বাপের অভাব তো আর পূরণ করতে পারবে না। তবু চেষ্টা করতে দোষের কিছু নেই। তিনিই তার বাপ-মা। জীবন যৌবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়েছে-এই মেয়েটার জন্য। তাকে কিভাবে মানুষের মতো মানুষ করা যায়-সেটাই এখন তার একমাত্র চাওয়া পাওয়া। তাই শত কষ্ট বুকে ধারণ করে স্বামীর ভিটেবাড়িতে বসবাস করছে।

যে কাজে বিবেক আত্মতৃপ্তি পায় সে কাজে সৃষ্টিকর্তা সন্তুষ্টি হয়। বিবেক মানুষকে কখনো খারাপ কাজের দিকে ধাপিত করতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে বিবেকহীন না হয়। প্রত্যেকটি মানুষের অন্তরে দুটি সত্তা বিরাজ করে। একটি পবিত্র সত্তা আর অন্যটি অপবিত্র সত্তা। পবিত্র সত্তার প্রকৃত পরিচয় বিবেক আর অপবিত্র সত্তার পরিচয় বিবেকহীন কর্মপন্থা। পবিত্র সত্তার কারণে মানুষের মনে অনুশোচনার জন্ম হয়; ফলে তার মনের অন্তগহিনে লুকায়িত অপবিত্র সত্তার কূ-মন্ত্রণার বন্ধন থেকে আলোর দিকে ছুটে যায়; আত্ম-মুক্তির প্রয়াসে। তবুও মানুষ কোন কোন সময় বিবেকহীন কাজ করে থাকে। মনের খায়েসে অথবা অন্য কারো কূমন্ত্রণায়। হাজী সাহেবও তাদের মনের চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়ে শরীরটাকে চালাতে চাচ্ছে কিন্তু শরীর তো আর লোহা বা পাথর নয় যে চিরকালই এক রকম থাকবে। তবে কোন কোন সময় লোহাতেও মরিচা ধরে। যে যত কথা বলুক আর যত যুক্তি উপস্থাপন করুক কিন্তু হাজী সাহেবের কাছে তা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। কেন না, তার হৃদয়ে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে এবং তিনি যা অনুধাবন করেন-তা বাহ্যিক দৃষ্টি উপলব্ধি করার সাধ্য কারো নেই। বিধির বিধান লঙ্গন করবে কে? হাজী সেকান্দর আলীর এক কথা-তিনি তার শয্যাসঙ্গী চান; এছাড়া কোন কথা তার মাথায় আসছে না। শয্যাসঙ্গীর প্রত্যাশায় তার দিন কাটে। টাকা-পয়সা সয়-সম্পত্তি কোন বিষয় না। তার অনেক সম্পত্তি আছে। কিন্তু মনে সুখ নেই-শান্তি নেই। তাই নজু মোক্তারকে খবর দেয়। খবর পেয়ে নজু মোক্তার হাজীর কাছে ছুটে আসে। নজু মোক্তারের ধারণা যে হাজীর নিকট থেকে ভালো একটা কমিশন পাওয়া যাবে। তাই এই সুযোগটা কাজে লাগাতে সে ভুল করতে পারে না। এক সময় ঘটকালী ব্যাপারটা ছিল সামাজিক কাজের অংশ। মানুষ ছওয়াব পাওয়ার আশায় ছেলে-মেয়েদের বিয়ে সাদীর ব্যবস্থা করে দিত। কিন্তু বর্তমানে ঘটকালিটা হয়ে গেছে ব্যবসা ও পেশা। অনেকেই এখন ঘটকালি করে উপার্জন করে সংসারে চাহিদা মেটায়।

হাজী সাহেব মোক্তারকে বলেন, ঐ মুক্তাইরা। কিতা করচ। এতো দিন অইল-আমার লাইগ্যা কি বউ পাওয়া গেল না।

তোর কত ট্যাহা দরকার-ক? আমার বউ চাই! যত তাড়াতাড়ি পারছ-বিয়ার ব্যবস্থা কর! আমার বিয়ার কথা হুইন্না পোলা মাইয়ার মাথা খারাপ অইয়া গেছে। নজু মুক্তার বলে, হাজী সাব। হেচা কতা কইলে আপনে চেইত্তা যাইবেন। বুড়া মাইনষের কাছে কেডায় মাইয়া দিত চায়।

হাজী সাহেব খুব রাখ হলে বলেন, ঐ নউজ্জ্যা। আমি বুড়া, হে বুইড়া অইয়া গেছি। তাতে কি সমস্যা ক? টেয়া-পইসা, জাগা জমিন যা লাগে আমি দেয়াম। আমার বউ চাই। দেহি কোন ব্যাডায় আমারে থামায়।
পাশের গ্রামের ছলিম মিয়া— মা মরা মেয়ে নিয়ে বিপাকে আছে। বর্তমানের যৌতুকের যে চাহিদা। তাতে বিবাহ দেয়ার মতো তার সর্ঙ্গ্যে নেই। রিকশা চালিয়ে যে কয় টাকা পায়-তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলে। টাকা পয়সার অভাবে মেয়ের বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বিয়ে দিতে পারছে না। এই সুযোগটাকে নজু মোক্তার কাজে লাগানোর ফন্দি করেছে। তাই ছলিম মিয়াকে বিভিন্নভাবে বুঝায় যে, তার মেয়েকে যদি হাজী সেকান্দর আলীর কাছে বিয়ে দেয়; তার কোনো খরচ লাগবে না। তা ছাড়া হাজী তো কয়েক মাস বা বছর পরেই কবর দেশে চলে যাবে। তখন সয়-সম্পত্তির মালিক তো মিয়া তুমি হবে। তোমার মেয়ের নামে জমি দলিল করে দিবে বলছে।

তাছাড়া হাজীর যে অবস্থা বিয়ে যাবতীয় খরচ পাতির ব্যবস্থা করে দেবে। তোমার এক কানা কড়িও লাগবে না। সময় অসময় টাকা পয়সা নিয়ে চলতে পারবে। নজু মোক্তারের কথা ছলিম মিয়ার মনপোক্ত হয়। তাই সে তার মেয়ের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে কথা বলে— মা গো। তোরে বিয়া-সাদী দেউনের ব্যবস্থা করার মতো আমার কাছে কোন ট্যাহা পইসা নাই; কি করি মা-তুই ক?

তবে নউজ্জা মুক্তারে কইছে; পাশের গ্যারামের সেয়ান্দার হাজীর নাকি বউ মইরা গেছে। তার লগে তর বিয়া দিত চায়। তুই নাকি এতে বেশি সুখ পাইবি। তুরে জমি লেইখ্যা দিব। মেয়ে উত্তর দেয়-বাবা; মা নাই ঘরে। তোমার ট্যাহা নাই। কি করবা। যা বালা অয় তাই কর। এতে আমারে কওয়ার কি আছে। যা কপাল আছে তা অইব। পায়জামা পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে হাজী নতুন বউ নিয়ে বাড়ি যাচ্ছে। অবিবাহিত বউ পেয়ে বুড়ো মুচকি মুচকি হাসে আর লাঠি ভর দিয়ে ধীরে ধীরে পা চালাচ্ছে।

কমলাদের বাড়ির পাশ দিয়ে হাজী সাহেবদের বাড়িতে যেতে হয়। ওই দিকে কমলার মা-আওতা বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখতে থাকে লাল শাড়ি পরা নতুন বউকে আর মনে মনে হাসে। এমন একদিন সেও তো লাল শাড়ি পরে এই বাড়িতে এসেছিল। কিন্তু লাল শাড়ির বাঁধন বেশি দিন ধরে রাখতে পারেনি। সেভাবে এই কেমন সমাজ। স্বামীর মারা গেলে স্ত্রী আর কারো সঙ্গে ঘর বাঁধতে পারে না কিন্তু স্ত্রী মারা গেলে স্বামী চল্লিশ দিনও যেতে দেয় না; নতুন করে কারো সঙ্গে ঘর বাঁধতে কালক্ষেপণ করে না। এটাই খোদার দুনিয়া এটাই নিয়ম! এটাই নারীর জীবন!