Wednesday, October 8, 2025

ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় যে গ্যারান্টি চায় হামাস

গাজা যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে চুক্তিতে গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তা চায় যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাস। তারা চায় গাজা যুদ্ধ শেষ হবে এবং ইসরাইল সম্পূর্ণভাবে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে সরে যাবে। তবে তারা অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে মিশরে দ্বিতীয় দিনের পরোক্ষ আলোচনার শেষে মঙ্গলবার এমন মন্তব্য করেছেন সংগঠনটির কর্মকর্তারা।

ওদিকে হোয়াইট হাউসে যুদ্ধ শুরুর দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, গাজার বিষয়ে একটি বাস্তব চুক্তির সম্ভাবনা আছে। এদিন মিশরের শার্ম আল-শেখ শহরে হামাস ও মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনার সমাপ্তি হয়। বুধবার থেকে আবার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা। সেখানে কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগ দেয়ার কথা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এর আগে মঙ্গলবার হামাসসহ বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর জোট এক বিবৃতিতে জানায়- তারা ‘সব ধরনের উপায়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে’ এবং ‘ফিলিস্তিনিদের অস্ত্র সমর্পণের অধিকার কারও নেই।’ এটি মূলত ট্রাম্প পরিকল্পনায় থাকা হামাসের নিরস্ত্রীকরণের দাবির জবাব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হামাস নেতা ফাওজি বারহুম বলেন, তাদের মূল দাবি হলো যুদ্ধের সমাপ্তি ও ‘অধিকৃত এলাকা থেকে (ইসরাইলি) সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার।’ তবে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা রোডম্যাপ নেই। পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস ৪৮ জন ইসরাইলি বন্দি ফেরত দেয়ার পরই ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার শুরু হবে। ধারণা করা হয় ওই ৪৮ জিম্মির মধ্যে মাত্র ২০ জন জীবিত আছে।

একজন জ্যেষ্ঠ হামাস কর্মকর্তা আল-জাজিরাকে জানান, বন্দিদের ধাপে ধাপে মুক্তির প্রক্রিয়া ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের ধাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্পন্ন হবে। হামাসের শীর্ষ আলোচক খালিল আল-হায়া বলেন, আমরা দখলদারদের এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্বাস করি না।

তিনি অভিযোগ করেন, ইসরাইল আগের দুটি যুদ্ধবিরতির চুক্তিও লঙ্ঘন করেছে। তাই এবার ‘যুদ্ধ যেন স্থায়ীভাবে শেষ হয়’ সে বিষয়ে বাস্তব নিশ্চয়তা চান তারা।

অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের আক্রমণের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে বলেন, এটি আমাদের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের জন্য যুদ্ধ। তিনি জানান, ইসরাইল যুদ্ধের সব লক্ষ্য অর্জন না করা পর্যন্ত অভিযান চলবে। এর মধ্যে আছে সব বন্দির মুক্তি, হামাস শাসনের অবসান এবং গাজা যেন আর কখনো ইসরাইলের জন্য হুমকি না হয় তা নিশ্চিত করা।

কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, মধ্যস্থতাকারী তিন দেশ- কাতার, মিশর ও তুরস্ক নমনীয় অবস্থান বজায় রেখে আলোচনায় নতুন ধারণায় অগ্রগতি করছে। তিনি বলেন, আমরা আগেভাগে কোনো স্থির ধারণা নিয়ে আলোচনায় যাই না, আলোচনার মধ্য দিয়েই আমরা নতুন প্রস্তাব তৈরি করছি।

বুধবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি যুক্তরাষ্ট্রের জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ-এর সঙ্গে আলোচনায় যোগ দেয়ার কথা। আনসারি বলেন, এটি প্রমাণ করে যে মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে যুদ্ধ শেষের পর গাজা কে শাসন করবে এবং পুনর্গঠনের অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে- তা এখনও বড় প্রশ্ন।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু উভয়েই গাজা প্রশাসনে হামাসের কোনো ভূমিকা রাখার বিরোধিতা করেছেন।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন চালাবেন ফিলিস্তিনি ‘টেকনোক্র্যাটরা’ এবং একটি আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তীকালীন সংস্থা- ‘বোর্ড অব পিস’। ট্রাম্প ও বৃটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের তত্ত্বাবধানে থাকবে এই বোর্ড। হামাসের বারহুম জানিয়েছেন, তারা চায় একটি ফিলিস্তিনি জাতীয় সংস্থার তত্ত্বাবধানে পূর্ণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু হোক। সংগঠনটি যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা প্রশাসনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে।

মিশরে আলোচনা চলাকালেই ইসরাইল গাজায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালায় গাজা সিটির সাবরা ও তাল আল-হাওয়া এলাকায় এবং শাতি শরণার্থী ক্যাম্পের সংলগ্ন সড়কে হামলা হয়। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানায়, মঙ্গলবারের হামলায় কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়েছেন।

শুক্রবার ট্রাম্প বোমাবর্ষণ বন্ধের আহ্বান জানানোর পর থেকে কমপক্ষে ১০৪ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। পুরো যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৬৭ হাজার।

আল-জাজিরার সাংবাদিক হিন্দ খুদারি গাজা থেকে জানান, সবাই শান্তিচুক্তির অপেক্ষায়, অথচ বোমা হামলা থামছে না। তিনি বলেন, ইসরাইলি বাহিনী সম্পূর্ণ আবাসিক এলাকাগুলো ধ্বংস করছে, যেখানে মানুষ একদিন ফিরে গিয়ে জীবনের নতুন শুরু আশা করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংঘর্ষ পর্যবেক্ষক সংস্থা এসিএলইডি জানিয়েছে, দুই বছরে গাজায় ১১,১১০টি বিমান ও ড্রোন হামলা এবং ৬,২৫০টির বেশি গোলাবর্ষণ হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সংঘাতে যত মানুষ মারা গেছেন, তার ১৪ শতাংশই গাজার নাগরিক। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে ১,৭০১ জন চিকিৎসাকর্মী নিহত হয়েছেন।

mzamin

অভ্যুত্থানের ১ বছর: বাংলাদেশের আশা পরিণত হচ্ছে হতাশায়

এক বছর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম দমন-পীড়ন চালান বাংলাদেশের সাবেক স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সময় হাসিনার পুলিশ বাহিনীর সামনে প্রতিরোধের ঢাল হয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ান রংপুরের আবু সাঈদ। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে তার মৃত্যু হয়। তিনি ছিলেন প্রায় ১৪০০ জনের মধ্যে একজন, যারা ওই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ দিয়ে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটান। পরে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। তিনি এমন একটি দেশ রেখে যান, যা ছিল বিশৃঙ্খলার দ্বারপ্রান্তে। তবে সেখানে কিছু আশাও ছিল। শিক্ষার্থীদের আশা ছিল বাংলাদেশকে একটি ন্যায়সঙ্গত এবং দুর্নীতিমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠন করবেন তারা। তাদের ইচ্ছাতেই শান্তিতে  নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা হয়। যার কাজ ছিল দেশকে অরাজকতা থেকে মুক্ত করা। কিন্তু এখন অনেকেই মনে করছেন, পরিবর্তনের গতি খুবই ধীর। তারা প্রশ্ন তুলছেন, আবু সাঈদদের মতো মানুষদের আত্মত্যাগ কি তবে বৃথা গেল?

ড. ইউনূসের অধীনে দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দীর্ঘদিনের জটিল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের ফলে এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে জনগণের প্রবল ক্ষোভের জন্ম হয়েছে। ছাত্ররা গণতান্ত্রিক সংস্কারের দ্রুত বাস্তবায়ন চাইছে। তারা চায় শেখ হাসিনা ও অভ্যুত্থানে হামলার জন্য দায়ী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং পুলিশ সদস্যদের দ্রুত বিচার হোক। আবু সাঈদের বড় ভাই রমজান আলী বলেন, আমার খুব কষ্ট লাগে। আমরা ভেবেছিলাম দেশ নৈতিকভাবে ভালো হবে, বৈষম্য থাকবে না, সুষ্ঠু নির্বাচন হবে, খুনিরা শাস্তি পাবে, আর সেই শাস্তি দেখে অন্যরা অপরাধ করতে ভয় পাবে। কিন্তু এর কিছুই হয়নি। তবে আলী এটাও বলেন, ড. ইউনূস না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতো।

নতুন সূচনা: বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র ও দুর্নীতিগ্রস্ত একটি দেশের সংস্কারের ভার পড়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর। যেখানে রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র এবং প্রায় ৬০টি রাজনৈতিক দল সক্রিয়। মুহাম্মদ ইউনূসের প্রথম কাজ ছিল আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। বিপ্লবের পর লুটপাট, দাঙ্গা ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলে। যদিও বাংলাদেশ এখন কিছুটা স্থিতিশীল, তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে- সরকার হিন্দু সংখ্যালঘু এবং শেখ হাসিনার সমর্থকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা দমনে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অন্যদিকে ইসলামী কট্টরপন্থিরা প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করছে। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য ব্যাপক সংস্কার কর্মসূচি চালু করা। ইউনূস ১১টি কমিশন গঠন করেন, যাদের কাজ ছিল নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ এবং পুলিশের কাঠামোগত সংস্কার প্রস্তাব দেয়া। মূল লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনার মতো কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দৃঢ় করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত পরিবর্তনের হার অতি সামান্য। গত সপ্তাহে ইউনূস ঘোষণা দেন, ফেব্রুয়ারিতে সংস্কার করা ভোটব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন হবে। তবে এখনো অনেক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতানৈক্য আছে। তিনি বলেন, উত্তরাধিকার হিসেবে একটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া দেশ পেয়েছে তার সরকার। তবে এখন তা পুনরুদ্ধার হচ্ছে।

রাজনৈতিক ভাঙন:
১৭ কোটি জনগণের দেশ বাংলাদেশে নেতৃত্ব যদি প্রকৃত গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচন করা যায় তাহলে সেটি হবে ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই দেশটি মূলত দু’টি বংশীয় রাজনৈতিক দল দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে। যার একটি আওয়ামী লীগ। এই দলের প্রতিষ্ঠাতা শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান। আরেকটি জিয়াউর রহমানের গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তিনি ছিলেন একজন সেনা কর্মকর্তা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন জিয়া। বর্তমানে লন্ডন থেকে দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার ছেলে। এই দুই দল একে অপরের সঙ্গে পালা করে ক্ষমতা ভাগাভাগি করলেও, পরে শেখ হাসিনা দীর্ঘকাল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেন। বিএনপি ২০২৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে। এদিকে আসন্ন ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না আওয়ামী লীগ। কেননা, অভ্যুত্থানে ব্যাপক মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন রাজনৈতিক দলগুলো গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ ইসলাম, ইউনূসের সরকার ছেড়ে ফেব্রুয়ারিতে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন করেন। জুলাই মাসে তিনি ন্যাশন-বিল্ডিং পদযাত্রা করেছেন। তরুণ ভোটাররা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মধ্যম বয়স্ক প্রায় ২৬ বছর এবং এই প্রজন্ম শেখ হাসিনার শাসন ছাড়া অন্য কিছু দেখেনি।

অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া বাংলাদেশের একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা সাঈদ খান সাগর বলেন, আমরা- এই প্রজন্ম, গণতন্ত্র কী সেটা ঠিকমতো জানিই না। কারণ আমরা কখনো তা দেখিনি। রাষ্ট্রের উচিত হবে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নাগরিকরা ভয় ছাড়াই শান্তিতে বসবাস করতে পারে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক তাহিতুন মারিয়াম বলেন, নারীদের প্রতি সমাজের অবহেলা নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। কেননা, উল্লেখযোগ্য সামাজিক পরিবর্তন ছাড়া নির্বাচন ও সংস্কার কেবল পুরুষকেন্দ্রিক, পুরুষ-শাসিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই পুনর্গঠন করবে।

দ্বান্দ্বিক আবেগ: ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের বর্ষপূর্তিতে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকায় একত্রিত হন। সন্ধ্যার হালকা বৃষ্টির মধ্যে ড. ইউনূসের ভাষণ শুনতে আসেন তারা। ইউনূস যখন বলেন, যারা গত বছরের গণ-অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন, তারা জাতীয় বীর হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং সরকার শহীদ, আহত যোদ্ধা ও ছাত্র আন্দোলনকারীদের পরিবারকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করবে, তখন উপস্থিত জনতা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। তবে এই উৎসবের আড়ালে ছিল ছাত্রদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ। একটি অপ্রাপ্ত প্রতিশ্রুতি। গত বছরের জুলাই মাসের হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো না হওয়ায় চাপা ক্ষোভ পোষণ করছেন শিক্ষার্থীরা।

আবু সাঈদের ভাই বলেন, তিনি তার ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা করেছেন। যা শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর অগ্রগতি খুব কম। এখন ওই ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে বিচার করছে। শেখ হাসিনা সমপ্রতি ভারতে থেকে একটি বিবৃতি দিয়েছেন, যেখানে তিনি ছাত্র আন্দোলনকে ‘কষ্টার্জিত গণতন্ত্রে এক সহিংস ব্যাঘাত’ বলে উল্লেখ করেন। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, নতুন বাংলাদেশে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিভাগের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি সামপ্রতিক এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, অস্থায়ী সরকার যেন আটকে আছে। বাংলাদেশের অপরিবর্তিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কখনো কখনো সহিংস ধর্মীয় চরমপন্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলো বাংলাদেশের নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করার পরিবর্তে হাসিনার সমর্থকদের প্রতি প্রতিশোধ নেয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

mzamin

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে নৈতিক জাগরণ by ইব্রাহিম নেগম

বিশ্বজুড়ে এক নৈতিক জাগরণ দেখা দিচ্ছে। ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের লাগাতার যুদ্ধ, বিশেষ করে গাজায় চলমান গণহত্যা, ইসরায়েলকে দিন দিন আরও একঘরে করে দিচ্ছে।

এ হত্যাযজ্ঞের প্রতিক্রিয়ায় একের পর এক দেশ দাঁড়িয়ে বলছে, ‘যথেষ্ট হয়েছে’। ইউরোপ থেকে শুরু করে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা পর্যন্ত দেশগুলো অভূতপূর্বভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির এ ঢেউ কোনো শূন্য জায়গা থেকে আসেনি। এটি ইসরায়েলের গাজায় বর্বর অপরাধের সরাসরি প্রতিক্রিয়া।

এ ঐতিহাসিক মুহূর্তের সামনের সারিতে রয়েছে মিসর। মিসর বিশ্বকে আহ্বান জানাচ্ছে—ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দাও, ইসরায়েলকে জবাবদিহির আওতায় আনো আর গণহত্যা বন্ধ করো। বার্তাটি স্পষ্ট—ইসরায়েলের দায়মুক্তি বিশ্বজনমতকে ক্লান্ত করে দিয়েছে। সবাই মনে করছে, ন্যায়বিচারের সময় এখনই।

বর্তমানে বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশের বেশি দেশ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে এ বছর পর্যন্ত ১৪৭টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরায়েলের গাজায় আগ্রাসনের পর এ সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। শুধু গত এক বছরেই একাধিক দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এটি ইসরায়েলের নিষ্ঠুরতার প্রতি সরাসরি প্রতিবাদ। নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড ও স্পেন ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়, যা ইউরোপের দীর্ঘদিনের দ্বিধাকে ভেঙে দেয়।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া তার একঘরে অবস্থানকেই স্পষ্ট করেছে। তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে, এমনকি ওই দেশগুলো থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু এতে বিশ্ব ভয় পায়নি; বরং ইসরায়েলের একগুঁয়েমিই বিশ্বজনমতকে আরও দৃঢ় করেছে।

ইতিমধ্যে আরও কয়েকটি দেশ, যেমন স্লোভেনিয়া, মাল্টা ও বেলজিয়াম এ স্বীকৃতি নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। আসলে নরওয়ে, আয়ারল্যান্ড ও স্পেনের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি ক্যারিবীয় দেশ (বাহামা থেকে শুরু করে ত্রিনিদাদ ও বার্বাডোজ) এখন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ গতিপ্রবাহ এখন সব মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

এমনকি ইসরায়েলের কিছু ঐতিহ্যগত মিত্রও এখন অবস্থান বদলেছে। এটি এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি দেখাচ্ছে, বিশ্ব সম্মানে ইসরায়েলের পতন কত গভীর। যে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া দশকের পর দশক ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছিল, তারাও এখন আনুষ্ঠানিকভাবে তা করেছে।

তাদের এ পদক্ষেপ এসেছে সমন্বিত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে নতুন করে এগিয়ে নিতে। ফ্রান্সও ঘোষণা দিয়েছে যে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেবে।

এটি কোনো ছোটখাটো কূটনৈতিক পরিবর্তন নয়, পশ্চিমা এই স্বীকৃতিগুলো অতীত নীতির সঙ্গে ঐতিহাসিক বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে। এর পেছনে রয়েছে গাজার গণহত্যার প্রতি তীব্র ক্ষোভ।

আন্তর্জাতিক স্রোত বদলে গেছে। আজ ইসরায়েল নিজেকে প্রায় বন্ধুহীন অবস্থায় খুঁজে পাচ্ছে। কেবল অল্প কয়েকটি দেশ এখনো দেশটিকে সমর্থন করছে। আরব ও মুসলিম বিশ্ব থেকে শুরু করে আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং এখন ইউরোপের বড় অংশ—সব জায়গায় ফিলিস্তিনের পক্ষে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।

এখন এত দেশ কেন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে আসছে? কারণ, গাজার ভয়াবহ নৃশংসতা দেখে নিরপেক্ষ থাকা বা দোটানায় থাকার আর কোনো জায়গা নেই। ইসরায়েলের গাজায় যুদ্ধ নিছক যুদ্ধ নয়, এটি সরাসরি গণহত্যা। জাতিসংঘের একটি কমিশন স্পষ্টভাবে বলেছে, ইসরায়েল গাজার ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে। পুরো মহল্লা মুছে ফেলা হয়েছে। পরিবারগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে। নিহত মানুষের সংখ্যা অকল্পনীয়। এখন পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ৬০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এটি ইতিহাসে নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ, যা বিশ্ববাসী সরাসরি চোখের সামনে টেলিভিশনের পর্দায় দেখছে।

গাজায় যা ঘটছে, তা আসলে একটি জাতিকে মুছে ফেলার ইচ্ছাকৃত চেষ্টা—এটাই গণহত্যার সংজ্ঞা।

যেকোনো বিবেকবান দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে আগের মতো স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে পারে না। তাই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ নয়; বরং এটি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির পক্ষে দাঁড়ানো। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আসলে ইসরায়েলকে বলছে, তুমি জাতিগত নিধন চালিয়ে যেতে পারবে না, এসব করে বিশ্বের সাধারণ সদস্য হয়ে থাকতে পারবে না।

মানবাধিকার সংগঠন থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আইনি প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাই এখন জবাবদিহির দাবি তুলছে। এমনকি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশের উদ্যোগে ইসরায়েলকে নির্দেশ দিয়েছেন গাজায় গণহত্যা ঠেকানোর ব্যবস্থা নিতে। বার্তাটি একদম স্পষ্ট—মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য ইসরায়েলকে জবাবদিহি করতে হবে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া মানে হলো দেশগুলো একদিকে ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার অধিকারকে সমর্থন করছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের একটি জাতিকে মুছে ফেলার চেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করছে।

বিশ্বব্যাপী এ আন্দোলনের মধ্যে মিসর এক নৈতিক নেতৃত্বের আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে। গাজার প্রতিবেশী দেশ হিসেবে, ফিলিস্তিনি অধিকার রক্ষায় দীর্ঘদিনের অবস্থানের কারণে এবং আরব ও আফ্রিকান বিশ্বে সম্মানজনক কণ্ঠস্বর হিসেবে মিসরের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আর সেটাই এখন মিসর করছে।

গাজায় যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন থেকেই মিসর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের তাঁদের ভূমি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।

কূটনৈতিক অঙ্গনেও কায়রোর প্রচেষ্টা ছিল নিরলস। যুদ্ধবিরতি ও মানবিক করিডরের জন্য মিসর গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে। দিনরাত অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে গেছে যাতে যুদ্ধ কিছুটা থেমে যায় এবং সাহায্যসামগ্রী গাজায় পৌঁছাতে পারে। মিসরীয় কর্মকর্তারা রাফাহ সীমান্তপথ দিয়ে শত শত সাহায্যবাহী ট্রাক গাজার ভেতরে প্রবেশের সমন্বয় করেছেন। ইসরায়েল যাতে গাজার জনগণকে অনাহারে না রাখে, সে ব্যাপারে মিসর দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে মিসর হয়ে উঠেছে নিঃশব্দদের কণ্ঠস্বর।

* ইব্রাহিম নেগম, মিসরের গ্র্যান্ড মুফতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা
- আল আহরাম থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় যোগ দিতে তিউনিসিয়ার বন্দরে একটি নৌযানকে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে বিদায় জানাচ্ছেন একজন আন্দোলনকর্মী। ১৪ সেপ্টেম্বর, এএফপি
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় যোগ দিতে তিউনিসিয়ার বন্দরে একটি নৌযানকে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে বিদায় জানাচ্ছেন একজন আন্দোলনকর্মী। ১৪ সেপ্টেম্বর, এএফপি

রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়া কি মিথে পরিণত হচ্ছে by বুলবুল সিদ্দিকী

২০১৭ সালে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বসবাসের ৮ বছর হলেও তাদের প্রত্যাবাসনের কোনো ফলপ্রসূ অগ্রগতি আমরা দেখতে পাইনি। বিগত সময়ে আমরা কেবল তাদের প্রত্যাবাসনের নানা রকম আশার বাণীই শুনে এসেছি, যা ছিল বাস্তবতাবিবর্জিত এবং জনতুষ্টিবাদী পদক্ষেপ।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন যে দিন দিন জটিল থেকে জটিলতর দিকে যাচ্ছে, সেটা বোঝার জন্য কাউকে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে হবে না। প্রত্যাবাসনের জটিলতার সঙ্গে রয়েছে তহবিলের সংকট। সে কারণেই হয়তো সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যেও এক দীর্ঘ হতাশা কাজ করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জটিলতা ও অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো বিবেচনা করে বেশ কয়েক বছর আগে লিখেছিলাম যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন একটি মিথে পরিণত হচ্ছে কি না। আমরা এখনো সে প্রশ্নের উত্তর জানি না।

এ সংকট মোকাবিলায় বর্তমান সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ হাতে নিলেও এর মাধ্যমে আসলে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা কতটা বৃদ্ধি পেল, তা বলা মুশকিল। তবে রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়টিকে তারা যে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে, সেটা বোঝা যায়।

আমরা জানতে পেরেছি, সামনের দিনগুলোয় উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, যার শুরু হবে কক্সবাজারে তিন দিনব্যাপী একটি সম্মেলনের মাধ্যমে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারে বাকি দুটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন হওয়ার খবর আমরা জানতে পারি।

আমরা ধারণা করতে পারি, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলার আলোচনা কক্সবাজারের এই সম্মেলনে হবে, যা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার দিকনির্দেশনা খুঁজে পেতে আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যেহেতু প্রত্যাবাসন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, এর দ্রুত সমাধান এখানে পাওয়ার সম্ভাবনা কম, তাই এ সম্মেলনে যদি তহবিল সংগ্রহে কিছু অগ্রগতি আসে, সেটাও সহায়ক একটি বিষয় হবে। কেননা, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনার জন্য তহবিল কমে যাওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল বন্ধ করার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা।

এর সঙ্গে এটিও মাথায় রাখতে হবে যে রোহিঙ্গা বিষয়কে কেন্দ্র করে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক জটিলতাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো সক্ষমতা বাংলাদেশের কম। এর পেছনে রয়েছে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার মধ্যে একটি হলো রাখাইনকে ঘিরে ভারত ও চীনের অন্তর্নিহিত স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল আগ্রহ।

রাখাইনকে কেন্দ্র করে ভারতের কালাদান প্রকল্প এবং চীনের জ্বালানি পাইপলাইনের অবস্থানের কথাও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ জোরেশোরে জানা যাচ্ছে, যা বিগত সময়ে এতটা প্রকাশিত হয়নি। এর সঙ্গে রয়েছে রাখাইনে চলমান আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমারে সামরিক জান্তার যুদ্ধ। এ প্রসঙ্গে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, আরাকান আর্মির উত্থান ও রাখাইনে তাদের প্রভাবের কারণে সেখানে বিদ্যমান রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মিয়ানমার সামরিক জান্তা, আরাকান আর্মি ও স্থানীয় রাখাইন জনগোষ্ঠীর যুদ্ধের মাঝখানে পড়ে রোহিঙ্গাদের জীবনমানের সংকট আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা একদিকে মিয়ানমার জান্তার হাতে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, আবার আরাকান আর্মিও তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিগত ১৮ মাসে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

এই দমন–পীড়নে অনেক রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ চালিয়ে আসছে বলে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে। যদিও আরাকান আর্মি মনে করছে, এর পেছনে বাংলাদেশের ইন্ধন রয়েছে, যা বাংলাদেশ বেশ জোরেশোরেই খারিজ করেছে। শরণার্থীশিবিরে বসবাসরত অনেক রোহিঙ্গাও এই সশস্ত্র প্রতিরোধের বিষয়কে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বলে আমাদের সাম্প্রতিক রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের মাঠপর্যায়ের গবেষণায় উঠে এসেছে।

এ প্রসঙ্গে এটাও ভেবে দেখা দরকার, এ ধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে দর-কষাকষির জন্য কতটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। তবে এর মাধ্যমে যে রোহিঙ্গা ও আরাকান আর্মির মধ্যকার সম্পর্কের আরও অবনতি হচ্ছে, সেটি অনুমেয়।

এমন একটি জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে এই রোহিঙ্গা সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আরও বেশি কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। গবেষকেরা সব সময়ই বলে আসছেন, এ সংকটের কোনো সহজ ও দ্রুত সমাধান নেই। যেহেতু আরাকান আর্মি রাখাইনের একটি বড় অংশের দখলদারিত্বে রয়েছে, যা খুব শিগগির তাদের হাত থেকে চলে যাবে বলে মনে হচ্ছে না। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ আরাকান আর্মির সঙ্গে একধরনের দর–কষাকষির সুযোগ তৈরি করতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে।

মিয়ানমার জান্তার সঙ্গে যুদ্ধের কারণে আরাকান আর্মি রাখাইনের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তাদের নানা ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে তাদের যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ার ফলে রাখাইনে খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যবহার্য জিনিসের সংকট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীও রয়েছে। এর থেকে উত্তরণের একটা সহায়ক মাধ্যম হতে পারে বাংলাদেশ।

যেহেতু মানবিক করিডর নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে, যা অনেক দেশের প্রেক্ষাপটে আর মানবিক থাকেনি, তাই বিকল্প হিসেবে আরাকানের সঙ্গে একধরনের অনানুষ্ঠানিক ব্যবসার ধারণা কাজে লাগানো যেতে পারে। এটি তাদের জন্য একটি প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে, যাতে করে রাখাইনে খাদ্য এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর একটি প্রবাহ শুরু হবে।

সীমান্তবর্তী এলাকায় এ ধরনের ব্যবসা আসলে নতুন কোনো উদ্যোগ নয়, সীমান্ত এলাকায় সব দেশে এটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে থাকে। রাখাইনের সঙ্গেও বাংলাদেশের এমন ব্যবসায়িক বন্দোবস্ত দীর্ঘ সময় ধরে ছিল, এখনো কোনো না কোনোভাবে তা সীমিত আকারে রয়ে গেছে।

এ উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার উন্নয়ন ঘটবে, যা রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় ভবিষ্যৎ সংলাপে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। এর সঙ্গে দ্বিতীয় যে বিষয় সামনে নিয়ে আসতে হবে, সেটি হলো আরাকান আর্মিকে বোঝাতে হবে যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের উদ্যোগের মাধ্যমে আরাকান আর্মি আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারবে, যা আরাকান আর্মির জন্য একটি বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে।

এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের কৌশলগত তৎপরতাও চালিয়ে যেতে হবে। যেমনটি আমরা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মালয়েশিয়া সফরের একটি সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি, আসিয়ানের আঞ্চলিক একটি দল মালয়েশিয়ার নেতৃত্বে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি শান্তি মিশন মিয়ানমার যাবে রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে আলোচনার জন্য। বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার এ ধরনের সহযোগিতার পূর্ণ ব্যবহার করতে চায়।

আমাদের সব সময় মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গাদের পরিপূর্ণ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনই হতে হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। একে এখন প্রকল্পিত একটি বিষয় মনে হলেও যতটুকু সুযোগ আমাদের রয়েছে, তার যথাযথ ব্যবহার করার উদ্যোগ আমাদের হাতে নিতে হবে। অতীত কূটনৈতিক হস্তক্ষেপ যেহেতু এই সংকটের কোনো সমাধান খুঁজে বের করতে পারেনি, তাই বাংলাদেশকে বিকল্প সমাধানেরও অন্বেষণ করতে হবে।

এর সঙ্গে রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নানা ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার দিকেও মনোযোগ দিতে হবে, যাতে তারা এ দক্ষতা দেশে ফেরত গেলে কাজে লাগাতে পারে। তহবিলসংকটের এই সময়ে প্রত্যাবাসন আরও দীর্ঘায়িত হলে যেন আমাদের হাতে বিকল্প পরিকল্পনা থাকে, সেদিকেও মনোযোগ দিতে হবে। নির্যাতনের শিকার ও বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভাগ্য উন্নয়নের দায় যেহেতু আমাদের কাঁধেই, তাই এর যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সাহায্য নিয়ে সমাধানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

* বুলবুল সিদ্দিকী, অধ্যাপক, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচনা চললেও এখনো এই সংকটের সমাধান হয়নি। ছবি: রয়টার্স
রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে দীর্ঘদিন যাবৎ আলোচনা চললেও এখনো এই সংকটের সমাধান হয়নি। ছবি: রয়টার্স