Wednesday, May 20, 2020

যে ৭টি উপায়ে পানি বিশুদ্ধ করা যায়

পানির ওপর নাম জীবন হলেও যদি সেটা দুষিত হয় তাহলে পানিই হতে পারে নানা রোগের কারণ।
ঢাকায় প্রতিদিন যে পরিমাণ পানির চাহিদা থাকে, তার প্রায় পুরোটাই সরবরাহ করে থাকে ওয়াসা।
ভূগর্ভস্থ পানি বা নদী থেকে যে পানি আহরণ করা হয় সেটা দুই দফায় পরিশোধনের মাধ্যমে পুরোপুরি দুষণমুক্ত করা হয় ঠিকই তারপরও ঢাকার বাড়িগুলোয় এই বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা যায় না।
তার কারণ যে পাইপ লাইনের মাধ্যমে এই পানি মানুষের বাসাবাড়িতে সরবরাহ করা হয় সেখানে লিকেজ বা পুরানো পাইপের কারণে পানি দুষিত হয়ে পড়ে।
এছাড়া বাড়ির ট্যাংকগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করাও পানি দুষিত হয়ে পড়ার আরেকটি কারণ।
ঢাকাসহ সারাদেশের সরবরাহকৃত পানির মান নিয়ে সম্প্রতি এক জরিপ চালায় বিশ্বব্যাংক।
তাদের প্রতিবেদন থেকে জানায় যায়, বাসাবাড়িতে যে পানি সরবরাহ হয় সেখানে এই ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ প্রায় ৮২ শতাংশ।
তবে এই পানিকে চাইলে ৯টি উপায়ে শতভাগ বিশুদ্ধ করা সম্ভব।
১. ফুটিয়ে:
পানি বিশুদ্ধ করার সবচেয়ে পুরানো ও কার্যকর পদ্ধতির একটি হল সেটা ফুটিয়ে নেয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, পানি ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় ৫ থেকে ২৫ মিনিট ধরে ফোটানো হলে এরমধ্যে থাকা জীবাণু, লার্ভাসহ সবই ধ্বংস হয়ে যায়।
তারপর সেই পানি ঠাণ্ডা করে ছাকনি দিয়ে ছেকে পরিষ্কার পাত্রে ঢেকে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন ওয়াটার এইডের পলিসি ও অ্যাডভোকেসি বিভাগের প্রধান আবদুল্লাহ আল মুঈদ।
পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের পাত্রের পরিবর্তে কাচ অথবা স্টিলের পাত্র ব্যাবহার করার কথাও জানান তিনি।
সেইসঙ্গে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন সেইসব পাত্র বা যে গ্লাসে পানি খাওয়া হচ্ছে সেটি যথাযথভাবে পরিষ্কার করা হয়েছে কিনা।
মিস্টার মুইদ জানান সেদ্ধ করা পানি বেশিদিন রেখে দিলে তাতে আবারও জীবাণুর আক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
এ কারণে তিনি ফোটানো পানি দুইদিনের বেশি না খাওয়ার পরামর্শ দেন।
২. ফিল্টার:
পানি ফোটানোর মাধ্যমেই ক্ষতিকর জীবাণু দূর করা সম্ভব হলেও পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত থাকতে ফিল্টারের মাধ্যমে বিশুদ্ধ করা যেতে পারে।
তাছাড়া যাদের গ্যাসের সংকট রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে ফিল্টারে পানি বিশুদ্ধ করাই সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি।
বাজারে বিভিন্ন ধরণের ফিল্টার পাওয়া যায়। যার মধ্যে অনেকগুলো জীবাণুর পাশাপাশি পানির দুর্গন্ধ পুরোপুরি দূর করতে সক্ষম।
বাজারে মূলত দুই ধরণের ফিল্টার পাওয়া যায়। যার একটি সিরামিক ফিল্টার এবং দ্বিতীয়টি সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত রিভার অসমোসিস ফিল্টার।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ সিরামিক ফিল্টার ব্যবহার করে থাকে।
তবে আবদুল্লাহ আল মুঈদের মতে, এই ফিল্টার থেকে আপনি কতোটুকু বিশুদ্ধ পানি পাবেন সেটা নির্ভর করে ফিল্টারটি নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় কিনা, তার ওপরে।
৩. ক্লোরিন ট্যাবলেট বা ব্লিচিং:
পানির জীবাণু ধ্বংস করতে ক্লোরিন বহুল ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক।
যদি পানি ফোটানো বা ফিল্টার করার ব্যবস্থা না থাকে তাহলে পানি বিশুদ্ধিকরণ ক্লোরিন ট্যাবলেট দিয়ে পানি পরিশোধন করা যেতে পারে।
সাধারণত দুর্গম কোথাও ভ্রমণে গেলে অথবা দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে বা জরুরি কোন অবস্থায় ট্যাবলেটের মাধ্যমে পানি শোধন করা যেতে পারে।
সাধারণত প্রতি তিন লিটার পানিতে একটি ট্যাবলেট বা ১০ লিটার পানিতে ব্লিচিং গুলিয়ে রেখে দিলে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া যায়।
এভাবে পরিশোধিত পানিতে কিছুটা গন্ধ থাকলেও সেটা পরিষ্কার স্থানে খোলা রাখলে বা পরিচ্ছন্ন কোন কাঠি দিয়ে নাড়াচাড়া করলে গন্ধটি বাতাসে মিশে যায় বলে জানান আবদুল্লাহ আল মুঈদ।
৪. পটাশ বা ফিটকিরি:
এক কলসি পানিতে সামান্য পরিমাণ ফিটকিরি মিশিয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা রেখে দিলে পানির ভেতরে থাকা ময়লাগুলো তলানিতে স্তর হয়ে জমে।
এক্ষেত্রে পাত্রের উপর থেকে শোধিত পানি সংগ্রহ করে তলানির পানি ফেলে দিতে হবে। অথবা পানি ছেকে নিয়ে সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন মিস্টার মুঈদ।
৫. সৌর পদ্ধতি:
যেসব প্রত্যন্ত স্থানে পরিশোধিত পানির অন্য কোনও উপায় নেই সেখানে প্রাথমিক অবস্থায় সৌর পদ্ধতিতে পানি বিশুদ্ধ করা যেতে পারে।
এ পদ্ধতিতে দুষিত পানিকে জীবাণুমুক্ত করতে কয়েকঘণ্টা তীব্র সূর্যের আলো ও তাপে রেখে দিতে হবে।
এতে করে পানির সব ব্যাকটেরিয়া নষ্ট হয়ে যায়।
জরুরি অবস্থায় দূষিত পানি জনিত রোগ ঠেকাতে এই পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
৬. আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি:
পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানি জীবাণু মুক্ত করার জন্য অতিবেগুনি বিকিরণ কার্যকরী একটা পদ্ধতি।
এতে করে পানির সব ধরণের ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়।
বাজারের বেশ কয়েকটি আধুনিক ফিল্টারে এই আল্ট্রাভায়োলেট পিউরিফিকেশন প্রযুক্তি রয়েছে।
তবে ঘোলা পানিতে বা রাসায়নিক-যুক্ত পানিতে এই পদ্ধতিটি খুব একটা কার্যকর নয়। তাছাড়া এই উপায়টি কিছুটা ব্যয়বহুলও।
৭. আয়োডিন:
এক লিটার পানিতে দুই শতাংশ আয়োডিনের দ্রবণ মিশিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখলেই পানি বিশুদ্ধ হয়ে যায়।
তবে এই কাজটি শুধুমাত্র দক্ষ কারও মাধ্যমে করার পরামর্শ দিয়েছেন মিস্টার মুঈদ। কেননা পানি ও আয়োডিনের মাত্রা ঠিক না থাকলে সেই পানি শরীরের ক্ষতি করতে পারে।

বসনিয়ার মুসলিম ও বলকানের কসাই সমাচার by মু. ওমর ফারুক আকন্দ

ইউরোপ মহাদেশের বলকান অঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। অড্রিয়াটিক উপসাগরের তীরে ত্রিভুজ আকৃতির দেশটির আয়তন ৫১ হাজার ১২৯ বর্গকিলোমিটার। লোকসংখ্যা ৩৫ লাখ দুই হাজার ৬৩৬ জন। রাজধানী সারায়েভো।
অতীতে এটি যুগোস্লাভিয়া প্রজাতন্ত্রের একটি অংশ ছিল। ১৯৯২ সালের মার্চ মাসে এটি স্বাধীনতা লাভ করে। প্রাচীনকালে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে বলা হতো ইলিরিকাম। পূর্ব ইউরোপের জাতি সার্বরা সপ্তম শতাব্দীতে ওই অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। ১২০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বসনিয়া হাঙ্গেরির কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় এবং এর পরের ২৬০ বছরের মধ্যে এটি স্বাধীন খ্রিষ্টান রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ১৪ শতকে রাজপুত্র শাসিত বসনিয়া দক্ষিণের ডিউক শাসিত হার্জেগোভিনার সাথে মিলে একটি ক্ষণস্থায়ী মধ্যযুগীয় রাজ্য গঠন করেছিল। তারপর ১৫ শতকে সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ বসনিয়াকে উসমানীয় সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। তারপর উনিশ শতকের শেষ দিকে রাশিয়ার সাথে উসমানীয় সাম্রাজ্যের যুদ্ধের ফলে দেশটি উসমানীয় সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অস্টীয়-হাঙ্গেরি রাজ্যের অধীনে চলে যায়। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটি যুগোস্লাভিয়ার অংশ ছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষে বসনিয়া স্বাধীনতা লাভ করে।
পরবর্তীতে বলকানে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সম্প্র্রসারণের ফলে ওই অঞ্চলে ভিন্ন সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ধর্মীয় অবকাঠামো গড়ে ওঠে। আনুমানিক সাড়ে ৪০০ বছর বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় উসমানীয় সাম্রাজ্যের শাসন ছিল। ওই সময় অনেক খ্রিষ্টান স্লাব মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে। বসনিয়ার মুসলিম সম্প্রদায় ধীরে ধীরে প্রভাবশালী হতে থাকে এবং উসমানীয় সাম্রাজ্যের পক্ষে তারা দেশ শাসন করতে থাকে। উসমানীয় সাম্রাজ্যে সঙ্কুচিত হতে থাকলে উনিশ শতকে বলকানের অন্য মুসলিমরা বসনিয়ায় চলে যেতে থাকে। একই সময়ে বসনিয়ায় ইহুদি জনসংখ্যা বাড়তে থাকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে যুগোস্লøাভিয়া থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) স্বীকৃতি চাওয়া হয়। ১৯৯২ সালের মার্চে এক গণভোটে বসনিয়ার ভোটারেরা স্বাধীনতা বেছে নেয়। ১৯৯২ সালের ৫ এপ্রিল বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা সংসদ যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এমন সিদ্ধান্ত নিলেও বসনিয়ার সার্বরা এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করে এবং বেলগ্রেডের সহায়তায় পরদিন ৬ এপ্রিল মুসলমানদের জাতিগত নিধন শুরু করে। মুসলমানেরা সভ্য ইউরোপে এমন হবে, তা ভাবতেও পারেনি। তাই তাদের প্রতিরোধের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। এই নির্মূল অভিযান সভ্য ইউরোপে সাড়ে তিন বছর চলতে থাকে। হাজার হাজার মুসলমান নর-নারী হত্যাযজ্ঞের শিকার হয় এবং ২০ লাখ মুসলমান দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
সার্বদের তাণ্ডবলীলার সবচেয়ে বড় শিকার সেব্রেনিৎসা শহরের মানুষ। জাতিসঙ্ঘ ওই শহরটিকে নিরাপদ শহর ঘোষণা করার পরও ১৯৯৫ সালে সার্বরা সেখানে আগ্রাসন চালায় এবং জাতিসঙ্ঘের পর্যবেক্ষক সেনাদলের সামনেই তারা আট হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে। বসনিয়ার যুদ্ধে দেশটির এক লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।
৪৪ মাস ধরে সারায়েভো অবরোধের ঘটনা ও হত্যাযজ্ঞ চালানোর অন্যতম নায়ক সাবেক সার্ব সেনাপ্রধান জেনারেল রাদোভান কারাদজিচ। যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালত কুখ্যাত এই ‘বলকানের কসাই’কে ২০১৬ সালে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেয়।
ওই সময় বিচারক অলফোনস অরিয়ে তার রায়ে বলেন, সেব্রেনিৎসায় বসবাসরত মুসলমানদের ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে অপরাধীরা ওই অপরাধ সংঘটিত করেছিল। ‘বসনিয়ার কসাই’ হিসেবে খ্যাত রাদোভান কারাদজিচের বিরুদ্ধে ১১ অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত বসনিয়ার এই যুদ্ধে কারাদিজিচের নেতৃত্বে তার বাহিনী এসব অপরাধ সংঘটিত করে।
আদালত কারাদজিচকে দেয়া ৪০ বছরের কারাদণ্ড বহাল রেখেছে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য শহর সেব্রেনিৎসায় গণহত্যা চালানোর দায়ে তাকে দেয়া এই দণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল রেখেছেন যুগোস্লাভিয়ায় যুদ্ধাপরাধ তদন্তে গঠিত জাতিসঙ্ঘ ট্রাইব্যুনাল।
দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করেছিলেন রাদোভান কারাদজিচ। কিন্তু বিচারক জোয়েনসেন এই রায় ঘোষণার সময় বলেন, কারাজদিচ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন, বসনিয়ার সার্ব সেনাদের কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে অপরাধের তদন্ত করা ও অপরাধীদের শাস্তি দেয়া কারাদজিচের দায়িত্ব ছিল বলে বিচারিক ট্রাইব্যুনাল যে রায় দিয়েছে, তাতে ত্রুটি প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন কারাদজিচ।
৭৩ বছর বয়সের কারাদজিচ বসনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৯৫ সালে সেব্রেনিৎসায় গণহত্যায় ভূমিকার জন্য তাকে ‘বলকানের কসাই’ বলা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের মাটিতে এটি সবচেয়ে খারাপ জঘন্য গণহত্যা।
এই রায় বহাল থাকায় অনেকেই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। এই রায় ন্যায়বিচারের জন্য ঐতিহাসিক বলেছেন অনেকে। যদিও অনেকেই তাকে বাকি জীবন কারাগারেই দেখতে চেয়েছিলেন। তবে তার এই রায় দেশটিতে যে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

মসজিদুল আকসা ও গুম্বাদে সাখরা by আফতাব চৌধুরী

বায়তুল মুকাদ্দাসের সব এরিয়া পূর্ণ হয়ে শহরে অলিতে-গলিতে রাস্তাঘাট সম্প্রসারিত হয়। ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর পশ্চিম অংশ তারা দখলে নিয়ে নেয়। মসজিদে আকসাসহ বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্বাংশ জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের জুনে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে জর্ডান, মিসর, সিরিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মসজিদুল আকসাসহ পুরো বায়তুল মুকাদ্দাস দখলে নিয়ে সীমান্ত আরও ৪৫ কিলোমিটার জর্ডানের দিকে সরিয়ে আনে। মুসলমানদের কাছে মর্যাদার দিক দিয়ে পবিত্র মক্কা ও পবিত্র মদিনার পর বায়তুল মুকাদ্দাস নগরী। কিন্তু বায়তুল মুকাদ্দাসকে মুসলমানদের পাশাপাশি ইহুদি ও খ্রিস্টানরা পবিত্র নগরী হিসেবে গণ্য করে থাকে। উঁচু পাহাড়-পর্বতবেষ্টিত বায়তুল মুকাদ্দাস নগরী। এ নগরীতে একটি সুউচ্চ বরকতময় পাহাড় রয়েছে। যার ওপর মসজিদে আকসা। এ মসজিদে আকসা ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ইসরাইলের জবরদখলে রয়েছে। এ উঁচু পাহাড়ের উপরিভাগে ১ লাখ ৪০ হাজার ৯০০ বর্গমিটার এলাকা নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস হিসেবে স্বীকৃত। এখানকার ঠিক মাঝামাঝি স্থানে গুম্বাদে সাখরা। পাহাড়ের এক পাশে কেবলার দিকে মূল আকসা মসজিদ। এ পাহাড়ের ওপর আরও রয়েছে মসজিদে নিসা, একাধিক মাদ্রাসা ও বোরাকের স্থান।
বিশ্বের বুকে দৃষ্টিনন্দন ইমারতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি ইমারতকে গম্বুজে সাখরাও বলা হয়ে থাকে। সাখরা অর্থ পাথর। এ পাথর নিয়ে রয়েছে নানা বরকতময় ইতিহাস। বিশাল পাথরটি শূন্যের ওপর ভাসমান মনে হবে। বিশ্বের বুকে এটি শূন্যে ভাসমান বরকতময় পাথর হিসেবে স্বীকৃত। মানব জাতির পিতা হজরত আদম (আ.) এ পাথরের কাছে নামাজ পড়তেন। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) এ পাথরের কাছে এবাদতখানা নির্মাণ করেন। নবী ইয়াকুব (আ.) একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। নবী হজরত ইউশা (আ.) এর ওপর গম্বুজ নির্মাণ করেন। নবী হজরত দাউদ (আ.) এর সংলগ্ন মেহরাব এবং নবী হজরত সুলেমান (আ.) পবিত্র ইবাদতগাহ ‘হাইকলে সুলাইমানি’ নির্মাণ করেছিলেন।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজে গমনের পথে এখানে যাত্রাবিরতি দিলে সব নবী-রাসুলকে নিয়ে এখানে নামাজের ইমামতি করেন। এ পাথরের ওপর বসেন। এখান থেকেই আল্লাহপাকের সান্নিধ্যে রওনা হন। মূলত পাথরটি গুহার ওপর। পাথরটির আয়তন হচ্ছে ৭ মি. ী ৫ মি.। পাথরের নিচে গুহায় প্রবেশ করে ৩০ থেকে ৪০ জনের মতো নর-নারী নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হয়।
মসজিদে গম্বুজে সাখরা থেকে মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ মিটার দূরত্বে মূল মসজিদে আকসা। একতলা বিশিষ্ট বিশ্বের তৃতীয় বরকতময় মসজিদটির দৈর্ঘ্য ৮০ মিটার, প্রস্থ ৫৫ মিটার। এ আকসা মসজিদের পশ্চিম পাশে বোরাকের স্থান। অর্থাৎ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) পবিত্র মেরাজে গমনকালে পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারাম থেকে যাত্রাবিরতিতে এখানে এসে বোরাক রেখেছিলেন। বায়তুল মোকাদ্দাসে এক আজান দুই একামতে দুটি জামাত হয়। একটি হলো বায়তুল মোকাদ্দাস তথা মূল মসজিদে আকসায়, আরেকটি জামাত হয় গম্বুজে-সাখরায়। কিন্তু জুমার নামাজ ব্যতিক্রম। সব মিলে জুমার নামাজ একটিমাত্র হয়। ইমাম সাহেব থাকেন মূল মসজিদে আকসায়। মসজিদে গম্বুজে সাখরা মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকে। জুমায় লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি মুসলমানের সমাগম হয়। তখন বায়তুল মুকাদ্দাসের সব এরিয়া পূর্ণ হয়ে শহরে অলিতে-গলিতে রাস্তাঘাট সম্প্রসারিত হয়।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালীন বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর পশ্চিম অংশ তারা দখলে নিয়ে নেয়। মসজিদে আকসাসহ বায়তুল মুকাদ্দাসের পূর্বাংশ জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের জুনে মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে জর্ডান, মিসর, সিরিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মসজিদুল আকসাসহ পুরো বায়তুল মুকাদ্দাস দখলে নিয়ে সীমান্ত আরও ৪৫ কিলোমিটার জর্ডানের দিকে সরিয়ে আনে। ইসরাইলিরা ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের এ যুদ্ধে মিসরের সিনায় উপদ্বীপ, গাজা, গোলান মালভূমি এবং জর্ডানের পূর্ব বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের যুদ্ধে ইসরাইল মিসরের কাছে শোচনীয় পরাজয়ের সম্মুখীন হয়। এতে আমেরিকা শক্ত হাতে ইসরাইলের পক্ষ অবলম্বন করে। ফলে মিসর যুদ্ধবিরতিতে আসতে বাধ্য হয়। এর পরবর্তী সময়ে ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির মাধ্যমে মিসর থেকে অধিকৃত বিশাল সিনাই উপদ্বীপ ও গাজা ইসরাইল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু জর্ডান ও সিরিয়া থেকে অধিকৃত অঞ্চলগুলো আজও ইসরাইলের জবরদখলে রয়েছে।  জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস নগরীর দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় এ বায়তুল মুকাদ্দাস নগরী। বায়াতুল মুকাদ্দাস থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরত্বে আরেক নগরী হেব্রন। এখানে মসজিদে ইব্রাহিম অবস্থিত। এ মসজিদের নিচ তলায় হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও স্ত্রী হজরত সারা (আ.), পুত্র হজরত ইসহাক (আ.) ও স্ত্রী হজরত রেবকা (আ.) সহ একাধিক নবী-রাসুল ও তাদের পরিবার শায়িত। ঐতিহাসিক এ মসজিদের বহিরাঙ্গনে হজরত ইউসুফ (আ.) শায়িত।
বস্তুত, বায়তুল মোকাদ্দাসসহ ফিলিস্তিন নবী-রাসুলদের কেন্দ্রস্থল। এখানে বহু নবী-রাসুল শায়িত। নবী পাক (সা.) ইসলামের প্রারম্ভে ১৭ থেকে ১৮ মাস বায়তুল মুকাদ্দেসের মসজিদে আকসার দিক হয়ে নামাজ পড়েছিলেন। অতঃপর পবিত্র কাবা মুসলমানদের কেবলা হয়ে যায়। সব নবী-রাসুল হজ করার জন্য পবিত্র মক্কায় আসতেন। কিন্তু তারা দ্বীন প্রচারের জন্য নিজ নিজ স্থানে ফিরে যেতেন। যেহেতু পবিত্র কাবাকেন্দ্রিক জাজিরাতুল আরব মহান আল্লাহ পাকের প্রিয় হাবিব হজরত মোহাম্মদ মোস্তফাও (সা.) খাস এলাকা হিসেবে রেখে দিয়েছিলেন।
হজরত ইসমাইল (আ.) ও তার মা হজরত হাজেরা (আ.) কে কেন্দ্র করে পবিত্র মক্কা আবাদ হওয়ার সূত্রপাত এবং ইসমাঈল (আ.) এর বংশধর থেকে হজরত মোহাম্মদ (সা.) এর আবির্ভাব। অন্যদিকে, হজরত ইবরাহিম (আ.) এর অপর ছেলে নবী হজরত ইসহাক (আ.) এর রক্তধারায় অসংখ্য নবী-রাসুলের আগমন যারা ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাসসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আল্লাহপাকের একত্ববাদ প্রচার করে গেছেন। বস্তুত, বায়তুল মুকাদ্দাস বিশ্বের বুকে মুসলমানদের কাছে তৃতীয় পবিত্রতম নগরী। যেহেতু এখানে রয়েছে মসজিদে আকসা ও মসজিদে গম্বুজে সাখরা। বর্তমানে বায়তুল মোকাদ্দাস ইসরাইলের জবরদখলে রয়েছে।

কাঁঠাল চাষ করে সফল হতে চাইলে

কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে কাঁঠাল পাকে। তখন ঘরে ঘরে কাঁঠাল খাওয়ার ধুম পড়ে। ফলে কাঁঠাল চাষ করেও সফল হওয়া যায়। কারণ বাজারে কাঁঠালের চাহিদা কম নয়। তাই আসুন জেনে নেই কাঁঠাল চাষ করার নিয়ম-

জমি নির্বাচন: পানি দাঁড়ায় না এমন উঁচু ও মাঝারি সুনিষ্কাষিত উর্বর জমি কাঁঠালের জন্য উপযোগী।

চারা তৈরি: কাঁঠালের বীজ থেকে কাঁঠালের চারা তৈরি করা হয়। ভালো পাকা কাঁঠাল থেকে পুষ্ট বড় বীজ বের করে ছাই মেখে ২-৩ দিন ছায়ায় শুকিয়ে বীজতলায় বপন করলে ২০-২৫ দিনে চারা গজাবে। এছাড়া গুটি কলম, ডাল কলম, চোখ কলম, চারা কলমের মাধ্যমেও চারা তৈরি করা যায়।

চারা রোপণ: চারা সতর্কতার সাথে তুলে মূল জমিতে রোপণ করতে হয়। সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত চারা বা কলম মধ্য জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য শ্রাবণ মাসে রোপণ করতে হয়। গাছ ও লাইনের দূরত্ব ১২ মিটার করে রাখা দরকার।

সার: রোপণের সময় প্রতি গর্তে গোবর ৩৫ কেজি, টিএসপি সার ২১০ গ্রাম, এমওপি সার ২১০ গ্রাম প্রয়োগ করতে হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রতি গাছের জন্য সারের পরিমাণ বাড়ানো দরকার।

সেচ: চারা বা কলমের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পরিমিত ও সময়মতো সেচ দেওয়া দরকার।

রোগ-বালাই: এক ধরনের ছত্রাকের আক্রমণে কাঁঠালের রোগ হয়। এ রোগের আক্রমণে ফলের গায়ে বাদামি রঙের দাগ হয়। শেষপর্যন্ত আক্রান্ত ফল গাছ থেকে ঝরে পড়ে।

প্রতিরোধ: আক্রান্ত গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল পুড়িয়ে ফেলতে হয়। ছত্রাকনাশক ০.০৫% হারে পানিতে মিশিয়ে গাছে ফুল আসার পর থেকে ১৫ দিন পর পর ৩ বার স্প্রে করা দরকার। ফল ঝরে পড়লে ডাইথেন এম ৪৫ বা রিডোমিল এমজেড ৭৫ প্রতিলিটার পানিতে ২.৫ গ্রাম করে মিশিয়ে স্প্রে করতে হয়।

ফল সংগ্রহ: কাঁঠাল পাকতে ১২০-১৫০ দিন সময় লাগে। সাধারণত জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে কাঁঠাল সংগ্রহ করা হয়। এসময় বাজারে প্রচুর কাঁঠাল পাওয়া যায়।

সাদাত হোসাইনের ‘‌ছদ্মবেশ’ by ড. মো. আদনান আরিফ সালিম

‘জীবন কখনো কখনো প্রিয়তম মানুষদের মধ্যেও অদ্ভুত অভিমানের দেয়াল তুলে দেয়। ভালোবেসে কাছে এসে সেই দেয়াল ভাঙা হয় না বলে তা ক্রমশই মহাপ্রাচীর হয়ে উঠতে থাকে। এক সময় হয়ে ওঠে অলঙ্ঘনীয়।’ কংক্রিটের জঙ্গলঘেরা আমাদের যে আটপৌরে জীবন তা নিয়ে এই কথাগুলো পেয়েছি নতুন একটা উপন্যাসে, নাম ‘ছদ্মবেশ’।

উপন্যাসের শুরুতে লেখক সাদাত হোসাইন এমন বর্ণনা দেন—“বাড়ির নাম ‘অপেক্ষা’। অপেক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন অধ্যাপক লতিফুর রহমান। তিনি এই বাড়ির মালিক। তার চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চশমা ছাড়া তিনি খুব একটা ভালো দেখতে পান না, তারপরও চশমার ফাঁক দিয়েই তিনি তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে শেষ মুহূর্তে বাড়ির নামটা আরেকবার দেখে নিলেন। তারপর সন্তুষ্ট গলায় বললেন, ‘এবার ঠিক আছে’।”

এই ঠিক বেঠিকের দোলাচলেই এগিয়ে যায় পুরো উপন্যাস। আমরা যারা কমবেশি আগাথা ক্রিস্টি কিংবা জেমস রলিংসের লেখা পড়ে অভ্যস্থ তাদের কাছে গল্পটি সাদামাটা লাগতে পারে। তবে পুরো উপন্যাস যখন শেষ করেছি তখন এর পরিণত গল্প ও শৈলী অনেক আনন্দ দিয়েছে। সাদাত হোসাইনের কাহিনীর পরিণতি, বিন্যাস, শব্দচয়ন আর রহস্যের জাল বোনার যে দক্ষতা তা নিঃসন্দেহে প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

বইটি পড়তে পড়তে পাঠক নিশ্চয়ই খেয়াল রাখবেন যে, গল্পটি ঘুরেফিরে আমাদের আটপৌরে জীবনের নানা চিত্রই ফুটো উঠেছে। রহস্য খোঁজা বাদ দিয়ে কেউ কেউ নিজেকেও খুঁজে ফিরতে পারেন।

আবার একটু পড়া যাক—“আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে। খোলা জানালায় সেই চাঁদ দেখে লতিফুর রহমানের মন খারাপ হয়ে গেলো। এতো বড় বাড়ি বানালেন, কিন্তু সেই বাড়ির ছাদে বসে চাঁদ দেখার উপায় নেই।” নিজের বাসার ছাদে উঠে চাঁদ দেখতে পারেন এমন সৌভাগ্য আমাদের ক’জনের হয়, একটু বলবেন?

তারপর একটি পর্যায়ে এসে লেখক বলছেন—“লতিফুর রহমান ঘরের তালা খুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়লেন। নতুন তালা লাগিয়েছিলেন প্রতিটি দরজায়। সেই তালা প্রায় আট-দশ দিন খোলা হয়নি বলে শক্ত হয়ে আটকে আছে। অনেক কসরত করে খুলতে হলো তালাগুলো। কিন্তু ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই বিকট দুর্গন্ধে লতিফুর রহমানের পেট গুলিয়ে উঠলো। পাকস্থলী যেন উল্টে বের হয়ে আসতে চাইছে।”... “তিনি তীব্র আতঙ্ক নিয়ে আরো একবার চোখ মেলে তাকালেন। বাথরুমের মেঝেতে কাঁত হয়ে পড়ে আছে একটা লাশ। লাশটার গলা থেকে মাথাটা প্রায় ছুটে এসে বিভৎসভাবে ঝুলে আছে বুকের ওপর। পচে যাওয়া লাশটার শরীর বেয়ে ভনভন করে উড়ছে মাছি।”

এমন ঘটনা আমরা সচরাচর প্রায় সব রহস্য উপন্যাসে পেয়ে থাকি। তাহলে প্রশ্ন থাকছে অন্য লেখায়ও যা আছে এখানেও তা আছে। সেক্ষেত্রে নতুন উপন্যাস হিসেবে ‘ছদ্মবেশ’ থেকে পাঠক কী পাচ্ছেন?

অধ্যাপক লতিফুর রহমান চেষ্টা করছেন লাশ গুম করতে। সবক্ষেত্রে যা হয় এখানে তেমনটা হয়নি। তিনি হাতে দস্তানা পরে লাশ গুম করছেন অনেক কষ্টে। গন্ধে গা গুলিয়ে আসে। তবুও তিনি গ্রিল কেটে উপর থেকে লাশটাকে নাইলনের দড়ি বেঁধে নামিয়ে দিলেন নিচে। তারপর বৃষ্টি উপেক্ষা করে রেইনকোট পরে গুম করতে যান স্বয়ং।

মানুষ বিপদে পড়লে কিভাবে যন্ত্রতাড়িতের মতো কাজ করে এরপর সেই বর্ণনা। ফেরিওয়ালারা যেভাবে বাঁকে করে মাল টানে বয়সের ভারে ক্লান্ত অধ্যাপক ওইভাবেই কাজ করছেন। বৃষ্টির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে ঘেমে-নেয়ে একাকার। বিপদে পড়লে মানুষের ষষ্ঠইন্দ্রিয় কিভাবে কাজ করে তার বর্ণনা আছে এখানে। বিশেষ করে দারোয়ানকে ঘুমিয়ে পড়তে দিয়ে অধ্যাপক কিভাবে লাশ গুম করেছেন সেই বর্ণনাটা বেশ চমকপ্রদ। তবে সবথেকে অবাক কাণ্ড অধ্যাপক সাহেব শেষপর্যন্ত ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছেন না তার বাসায় তালাবদ্ধ ঘরে কিভাবে ঐ লাশটি এসেছে।

একে একে পরিণতি পেয়েছে অনেকগুলো চরিত্র—রেজা, শরিফুল, চুন্নুসহ আরও অনেকে। কোনো কোনো চরিত্র ঠিকঠাক পরিণতি পেলেও অনেকগুলো চরিত্র গল্পের প্রয়োজনে এসে হারিয়েও গেছে সবার দৃষ্টিসীমার বাইরে।

অধ্যাপকের বাসার সামনে থেকে টু-লেট লেখা প্লেটটি সরানো দেখে হঠাৎ সন্দেহ জাগে রেজার। তার প্রশ্ন এই বাড়ি পুরো তৈরি করার ক্ষমতাও যেখানে অধ্যাপকের নাই সেখানে নতুন ভাড়াটিয়া আনা বন্ধ করলেন কেনো? চুন্নু মিয়া চটে গিয়ে দাবি করে তার ভাগ্নেকে খুন করেছেন গোলাম মাওলা। তারপর তার লাশ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কিন্তু লেখকের কলমে গোলাম মাওলা হয়ে উঠেছেন অন্যরকম এক চরিত্র। নিচের কয়েকটা লাইন পড়লে অজান্তেই পাঠকের মনে ঠাঁই নিতে শুরু করবেন গোলাম মাওলা:

“গোলাম মাওলা ধীর স্থির মানুষ। কঠিন বিপদেও মেজাজ হারান না। শান্ত গলায়, হাসিমুখে কথা বলেন। এই কারণেই খুব দ্রুত তিনি সাধারণ মানুষের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন। তিনি যে রাজনীতির সাথে খুব বেশিদিন যুক্ত, তাও না। বরং তার জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে ইতালিতে। খুব অল্প বয়সেই শ্রমিক হিসেবে ইতালিতে চলে গিয়েছিলেন। ফিরেছেন প্রায় বছর কুড়ি পর। এই কুড়ি বছরে তিনি তার ভাগ্য ফিরিয়েছেন। ইতালিতে নিজের একাধিক রেস্টুরেন্ট হয়েছে তার। হয়েছে নানান ধরনের ব্যবসাও। এই ব্যবসা দেখাশোনার জন্য একে একে ছোট তিন ভাইকেও তিনি ইতালি নিয়ে গেছেন। তারা ব্যবসাটা বুঝে উঠতেই বেশ ক’বছর হয় দেশে ফিরে এসেছেন গোলাম মাওলা। এসে ইট-বালির ব্যবসা শুরু করেছেন গ্রামে। যদিও অর্থ তার যথেষ্টই হয়েছে, এখন দরকার সামাজিক সম্মান, পরিচিতি। সেই লক্ষ্যেই রাজনীতিতে নেমেছিলেন তিনি। দুহাতে টাকাও খরচ করেছেন।”

এখন চুন্নু মিয়া সন্দেহের তীর যখন এই গোলাম মাওলার দিকেই তুলেছেন সেখানে পাঠকের আগ্রহ থাকাটা তো স্বাভাবিক। শেষ পর্যন্ত কী হতে যাচ্ছে? তবে কি চুন্নু মিয়া নির্বাচনের ফিল্ড নিজের দিকে নিতে লোক দিয়ে আপন ভাগ্নেকে খুন করিয়েছেন? এটা যদি আমি বলে দেই তাহলে পাঠকের পড়ার জন্য থাকলো কী? বাকিটা জানতে পড়ে দেখতে পারেন সাদাত হোসাইনের রহস্য উপন্যাস ‘ছদ্মবেশ’।

>>>লেখক : শিক্ষক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

বছরে একবার জাগে গ্রামটি

কুর্দি গ্রামের সালাউলিম বাঁধ
ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গোয়ার একটি গ্রাম কুর্দি। বছরে মাত্র এক মাস জেগে থাকে গ্রামটি। বাকি ১১ মাস থাকে পানির নিচে। গ্রামের বাসিন্দাদের সবাই আশপাশের গ্রামগুলোয় বসতি গড়েছে। শুধু মে মাসে যখন পানি নেমে যায়, তারা ফিরে আসে কুর্দিতে। পুরোনো বাড়িঘর, খেত, ফলের গাছ, উপাসনালয়ের স্মৃতি রোমন্থন করে। এক বুক কষ্ট নিয়ে পরিচয় হারানোর ব্যথায় কাতর হয়।
কুর্দি গ্রামটি পশ্চিমঘাট পর্বতমালার দুটি পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত। এর মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে সালাউলিম নদী। সালাউলিম গোয়ার অন্যতম প্রধান নদী জুয়ারির একটি উপনদী। গোয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি সমৃদ্ধিশালী গ্রাম ছিল এই কুর্দি। প্রায় তিন হাজার বাসিন্দা ছিল এ গ্রামে। তবে ১৯৬১ সালে পর্তুগিজ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার পর গোয়ার চিত্র বদলে যেতে শুরু করে। গোয়ার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী দয়ানন্দ বন্দোড়কার কুর্দি সফরে এসে ঘোষণা করলেন, গোয়ার প্রথম বাঁধটি নির্মিত হবে এই গ্রামেই। তিনি গ্রামবাসীকে জড়ো করে বোঝালেন, গোয়ার পুরো দক্ষিণাঞ্চলের সব মানুষের জন্য এই বাঁধ উপকারী হবে। তবে বাঁধটি নির্মাণের ফলে কুর্দি গ্রামটি ডুবে যাবে। বৃহত্তর স্বার্থের জন্য গ্রামবাসীকে এই ত্যাগ স্বীকার করার অনুরোধ জানান মুখ্যমন্ত্রী।
কুর্দির আদি বাসিন্দা গজানন কুর্দিকার (৭৫) বলেন, তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ মেনে নিয়ে বসতভিটা স্থানান্তরে রাজি হন। তবে প্রতিশ্রুতি ছিল, এই বাঁধ গোয়ার দক্ষিণাঞ্চলের সব গ্রামে খাওয়ার পানি, সেচের পানি ও শিল্পের পানি জোগান দেবে।
মুখ্যমন্ত্রীর অনুরোধ রেখে কুর্দির ছয় শতাধিক পরিবার সে সময় বসতি স্থানান্তর করে। এর বিনিময়ে অন্য এলাকায় জমি ও ক্ষতিপূরণ পেলেও তাদের ভোগান্তি কম পোহাতে হয়নি।
বাঁধটি এখন পুরোপুরি চালু থাকলেও প্রতিশ্রুতিমতো খাওয়ার পানি দক্ষিণের গ্রামগুলোতে পৌঁছায়নি। কুর্দির বাসিন্দারা যেসব গ্রামে ঘর বেঁধেছেন, এখনো সেসব গ্রামে পানের জন্য কূপের পানিই মূল উৎস। কিন্তু এপ্রিল–মে মাসে কূপের পানিও শুকিয়ে যায়। সরকারের জলাধারগুলোয় তখন লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করা ছাড়া ওই গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের সামনে আর কোনো বিকল্প থাকে না।

রুয়ান্ডা গণহত্যা: বর্বরতার এক নিষ্ঠুরতম উদাহরণ by ​সঞ্জয় বসাক পার্থ

সময়ের ব্যবধান মাত্র ১০০ দিন। তারমধ্যেই ঝরেছিলো প্রায় ৮লাখ প্রাণ! জাতিগত বিদ্বেষের স্বীকার হয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনা ইতিহাসে বিরল নয়, কিন্তু রুয়ান্ডার গণহত্যার মতো এতো নিষ্ঠুর ও বর্বর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে খুবই কম। কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হুতুদের হাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন সংখ্যালঘু তুতসিরা, সেই নিষ্ঠুর কাহিনী নিয়ে আজকের আয়োজন।

মূল নায়ক বেলজিয়াম শাসকরা
রুয়ান্ডার গণহত্যা সম্পর্কে জানতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯১৬ সালে। ১৯৯৪ সালের এপ্রিল ও জুনের মাঝামাঝি সময়ে সংঘটিত এই বর্বরতম হত্যাকান্ডের বীজবপন করা হয়েছিলো এই সময়েই। সে সময় পূর্ব আফ্রিকার প্রকৃতির অপরূপ রঙ-রসে ভরা ছোট্ট এই দেশটিকে দখল করে নেয় বেলজিয়ামের সেনাবাহিনী। জাতিগতভাবে রুয়ান্ডার জনগোষ্ঠী মূলত দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল, হুতু আর তুতসি। হুতুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও দুই সম্প্রদায়ের মানুষ বেশ শান্তিপূর্ণভাবেই মিলেমিশে বসবাস করতো একই দেশে। চালচলন ও আচার আচরনেও দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য ছিলো না। পার্থক্য যা ছিলো তা কেবল শারীরিক গঠনে। প্রকৃতিগতভাবে হুতুরা ছিল বেশ খাটো ও মোটা, আর তুতসিরা ছিল চিকন ও লম্বা প্রকৃতির। হুতুরা বিশ্বাস করতো, তুতসিরা রুয়ান্ডার আদি নিবাসী নয়, তাদের পূর্বপুরুষেরা ইথিওপিয়া থেকে এই দেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিলো। সে কারণেই উচ্চতার দিক থেকে লম্বা ছিলো তুতসিরা।
শারীরিক এই পার্থক্যকেই বেলজিয়ান শাসকেরা ব্যবহার করতে শুরু করলো। তারা হুতু ও তুতসিদের জন্য আলাদা পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করলো, প্রশাসনিক কাজেও হুতুদের চেয়ে তুতসিদের বেশি প্রাধান্য দিতে শুরু করলো। তুতসিরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিলো, কারণ সংখ্যালঘু হয়েও তারা হুতুদের চেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছিলো। কিন্তু হুতুরা এই সিদ্ধান্তকে মোটেও স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। আর এভাবেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাথমিক দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হলো।
হুতুদের হাতে যখন ক্ষমতা
নিজেদেরকে বৈষম্যের শিকার মনে করা হুতুদের মধ্যে দিনে দিনে ক্ষোভের সঞ্চার হতে থাকে। সেই ক্ষোভের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫৯ সালে। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে একটি জাতিগত দাঙ্গা লাগে, যেটিতে প্রায় ২০ হাজারেরও বেশি তুতসি নাগরিক মারা যায়। অনেকে প্রাণভয়ে প্রতিবেশী দেশ বুরুন্ডি ও তানজানিয়াতেও আশ্রয় নেয়। তবে খুব বেশিদিন আর বৈষম্যের শিকার হতে হয়নি হুতুদের। ১৯৬২ সালে বেলজিয়ানরা রুয়ান্ডা ছেড়ে চলে যায়। তবে যাওয়ার আগে আসল চালটা ঠিকমতোই খেলে যায় তারা! শাসনকালে তুতসিদের প্রাধান্য দিলেও যাবার সময় হুতুদের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করে যায় তারা।
১৯৭৩ সালে প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় বসেন হুতুদের একনায়ক নেতা জুভেনাইল হাবিয়ারিমানা। কিন্তু সাধারণ জনগণের কাছে জনপ্রিয় হতে পারেননি তিনি। মূলত দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন অবনতি হবার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেন তিনি। অপরদিকে এই একনায়ক নেতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য উগান্ডাতে পালিয়ে যাওয়া তুতসিদের নিয়ে রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট (আরপিএফ) নামে একটি সামরিক বাহিনী গঠন করেন বর্তমানে দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে থাকা পল কাগামে। আরপিএফের মূল উদ্দেশ্য ছিল একনায়ক নেতা হাবিয়ারিমানাকে ক্ষমতাচ্যুত করে পালিয়ে থাকা সব তুতসিদের আবার নিজ দেশে ফেরত আনা।
আশঙ্কা ও আতঙ্কের সৃষ্টি
আর এটিকেই নিজের জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দুরভিসন্ধি আঁটেন হাবিয়ারিমানা। তুতসিরা হুতুদের উপর হামলা করে রুয়ান্ডা দখল করে নিতে চায়, এমন একটি প্রচারণা চালাতে শুরু করেন তিনি। রুয়ান্ডাতে অবস্থানরত তুতসিরাও আরপিএফকে মদদ দিচ্ছে, এটিও ছড়িয়ে দেন তিনি। ফলে ধীরে ধীরে রুয়ান্ডার সাধারণ হুতু জনগোষ্ঠীর মনে একটি আশঙ্কা ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এদিকে ১৯৯৩ সালে রুয়ান্ডার সরকারী সামরিক বাহিনী ও আরপিএফের বাহিনীর মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানা ও আরপিএফের নেতৃবৃন্দের মাঝে একটি শান্তিচুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চুক্তি হলেও বাস্তবে সংঘর্ষ পুরোপুরি থামেনি। পুরো রুয়ান্ডা জুড়েই তখন হুতু ও তুতসিদের মধ্যে বিরাজ করছিল চাপা উত্তেজনা।
সেই উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে হঠাৎ হাবিয়ারিমানা হত্যাকান্ডের পর। ১৯৯৮ সালের ০৬ এপ্রিল রাজধানী কিগালার বিমানবন্দর থেকে প্রতিবেশী দেশ বুরুন্ডির প্রেসিডেন্টকে নিয়ে বিমানে উঠেছিলেন হাবিয়ারিমানা। অজ্ঞাতনামা দুষ্কৃতিকারীরা মিসাইল ছুঁড়ে বিমানটিকে ভূপাতিত করে ফেলে। ফলে প্রেসিডেন্ট হাবিয়ারিমানার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনার পরই…
মূলত এই ঘটনার পরেই রুয়ান্ডায় বিধ্বংসী ও ভয়াবহ জাতিগত সহিংসতা শুরু হয়। অকাট্য কোনো প্রমাণ না থাকলেও প্রেসিডেন্ট হত্যার দায় গিয়ে পড়ে আরপিএফ ও তুতসি সম্প্রদায়ের উপর। সাধারণ হুতু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আর এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার কাজটা করে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আরটিএলএম ও কাঙ্গুরা নামের একটি পত্রিকা। এই হত্যাকান্ডের জন্য তুতসিরাই দায়ী, তুতসিরা রুয়ান্ডা দখল করে নিতে চাইছে তাই যেকোনো মূল্যে তুতসিদের নিধন করতে হবে, সরাসরি এরকম সহিংস বার্তা প্রচার করতে থাকে তারা।
ফলাফল হিসেবে ৭ এপ্রিল ভোর হবার আগে থেকেই সাধারণ তুতসি নাগরিকদের উপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালাতে শুরু করে রুয়ান্ডার সেনাবাহিনী। সকাল হতেই ‘হুতু পাওয়ার রেডিও’তে পরিচিত সব তুতসিদের হত্যা করার নির্দেশ দেয়া হয় হুতুদের। প্ররোচনায় পড়ে অনেক সাধারণ হুতু নাগরিকও এই বীভৎস হত্যাকান্ডে অংশ নেয়। এমনকি এতদিনের প্রতিবেশী তুতসিদের হত্যা করতে একটুও হাত কাঁপেনি হুতুদের। যারা সরাসরি হত্যাকান্ডে অংশ নেননি, তারাও সরকারী বাহিনীকে তুতসিদের খোঁজ দিয়ে, রাস্তায় তাদের গাড়ি আটকে ধরিয়ে দিতে সহায়তা করেছেন। তুতসি হত্যার বিনিময়ে খাবার, টাকাসহ নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয় সাধারণ হুতুদের। এমনকি হত্যার পর তুতসিদের বাড়িঘর লুট করার অবাধ স্বাধীনতাও দেয়া হয় তাদের। শুধু তাই নয়, যেসব হুতুরা তুতসিদের পক্ষে ছিলেন (এদেরকে মডারেট হুতু বলা হতো) তারাও নিস্তার পাননি এই হত্যাযজ্ঞ থেকে।
তুতসিদের হাতে যখন ক্ষমতা
প্রায় ১০০ দিন অব্যাহত ছিলো এই হত্যাকান্ড। অবশেষে জুলাই মাসে আরপিএফের সৈন্যরা কিগালি দখল করে নিলে সমাপ্তি ঘটে এই হত্যাকান্ডের। তুতসিরা ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে এটা বুঝতে পারার পর প্রাণভয়ে প্রায় ২০ লাখ হুতু দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে প্রেসিডেন্ট হত্যাকান্ড নিয়ে এতো ভয়ঙ্কর গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, সেটির আজ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। হুতুদের দাবি, ক্ষমতা দখলের জন্য কাগামের নির্দেশে তুতসি বিদ্রোহীরাই প্রেসিডেন্টকে হত্যা করেছিলো। অপরদিকে আরপিএফের দাবি, প্রেসিডেন্টের দলের লোকেরাই চক্রান্ত করে তাকে হত্যা করেছিলো। আর রুয়ান্ডার গণহত্যার কথাও ইতিহাসের পাতায় সর্বদা লেখা থাকবে বর্বরতম ধ্বংসযজ্ঞের উদাহরণ হিসেবে।