Showing posts with label সুজন সুপান্থ. Show all posts
Showing posts with label সুজন সুপান্থ. Show all posts

Saturday, June 21, 2025

ইরানিদের জীবনযুদ্ধ, যে যুদ্ধে সাইরেন বাজে না by সুজন সুপান্থ

‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।’ আর যাঁরা বেঁচে যান? তাঁদের কাছে যুদ্ধ মানে আতঙ্ক, মৃত্যু, ধ্বংস, আহাজারি, পঙ্গুত্ব, খাদ্যসংকট, বিভীষিকা—মানুষের তৈরি সবচেয়ে ভয়াল সম্মেলন। এ সবকিছুর সঙ্গে সামলে নিতে তাঁদের প্রতিনিয়ত পরিস্থিতির সঙ্গে, নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলতে হয়। তার মানে রাজায় রাজায় যুদ্ধের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও একধরনের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কোনো সাইরেন বাজানো হয় না।

ঠিক তেমনি ইসরায়েল আগ্রাসন চালানোর পর থেকে ইরানে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষদের জীবনে নেমে এসেছে ভয় ও অনিশ্চয়তা। সংঘাত শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সাধারণ ইরানিদের বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ দুষ্কর হয়ে পড়েছে। ইন্টারনেট ও মুঠোফোন নেটওয়ার্ক বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। খাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে, বাজার প্রায় বন্ধ। এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কে তেহরান ছাড়ছেন অনেকে। এ ছাড়া প্রতিদিন আরও নানা ধরনের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইরানিদের।

ধ্বংস ও হতাশা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধকে বলা হয়েছিল ‘আ ওয়ার টু এন্ড অল ওয়ারস’। কিন্তু সব যুদ্ধ শেষ করার জন্য এই যুদ্ধ হলেও ২০ বছর পেরোতে না পেরোতেই আবার যুদ্ধ দেখেছে বিশ্ববাসী। তার মানে, যুদ্ধ চলতেই থাকবে। যাঁরা যুদ্ধে গেলেন, যাঁরা ঘরে অপেক্ষা করলেন—সবাই যুদ্ধের ভেতর আরেক ভয়ংকর যুদ্ধ করে চলেছেন। নেটফ্লিক্সে ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’ নামে একটি ওয়েব সিরিজ আছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিকায় তৈরি এই সিরিজে বার্মিংহাম শহরকে দেখানো হয়েছে। এই গল্পের নায়ক যুদ্ধ শেষের একজন সৈনিক। তিনি প্রতি রাতে ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেন, যেন এখনো বাংকারে শুয়ে আছেন। তাঁর বন্ধুও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বেঁচে ফিরে এসেছেন। মাঝে মাঝেই এই বন্ধু হিংসাত্মক হয়ে যান। সে সময় সামনে যাকে পান, তাঁকেই মেরে ফেলতে চান।

বৃহস্পতিবার সিএনএনকে ঠিক একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ইরানের ২৭ বছর বয়সী এক সেনাসদস্য। সামরিক শৃঙ্খলার কারণে তেহরানে তিনি ফোন বা অন্য কোনো ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন না। তিনি বলেছেন, ‘মনে হয় যেন একটা ক্ষেপণাস্ত্র আমার পিছু নিয়েছে। আমি কারাজ যাই, ওরা সেখানে বোমা মারে। তেহরানে ফিরি, ওরা এখানেও আঘাত হানে।’

দক্ষিণ ইরানের শিরাজ শহরে একটি সেলুনে কাজ করা একজন নারী বলেন, ‘আমি জানি না কী বলব! ভিডিও, ছবি দেখুন—মানুষ মারা যাচ্ছে, আমাদের দেশ লুটপাট হচ্ছে, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’

তেহরানের একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে থাকা ২২ বছর বয়সী একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, ‘এত ধ্বংস মেরামত করতে দশক লেগে যাবে, তা–ও যদি সম্ভব হয়। আর এ খরচটা আমাদেরই বহন করতে হবে।’

অর্থের সংকট

সিএনএনের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতকালীন অদ্ভুতভাবে চলছে ইরানিদের জীবন। পাড়ায় পাড়ায় দোকানপাট এখনো খোলা থাকলেও অনেকেই খরচ করছেন বাকিতে বা ঋণে। ব্যাংকগুলো থেকে চাহিদামতো নগদ অর্থ তোলা সম্ভব না হওয়ায় এই ঋণই এখন তাঁদের ভরসা।

নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইরানের এক ব্যক্তি বলেছেন, ব্যাংক থেকে রিয়াল তোলা সম্ভব না হওয়ায় এখন ঋণের ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। তাঁদের বিদ্যুৎ আছে। কিন্তু পেট্রল কোনো কাজে লাগছে না। কারণ, তেহরানের বাইরে যাওয়ার মতো তাঁদের কোনো জায়গা নেই।

শিরাজ শহরের ৫৫ বছর বয়সী একজন শিক্ষক বলেন, নগর কেন্দ্রের একটি ব্যাংকে শাখার সামনে ‘রিয়াল তোলার জন্য মানুষের বিশাল সারি’ দেখা গেছে। এসব নগদ অর্থ তোলার অনুরোধ সামাল দিতে ব্যাংকের কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। আতঙ্ক থেকেই মানুষ এসব করছে।

ফাঁকা দোকান, আতঙ্কিত হৃদয়

যেকোনো যুদ্ধ বা সংঘাতের বাড়তি চাপ বহন করতে হয় সাধারণ মানুষদের। বৃহস্পতিবার দ্য ইনডিপেনডেন্টকে উত্তর-পূর্ব তেহরানের একজন স্থানীয় খাবার বিক্রেতা বলেছেন, ‘মানুষের মুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। অভিভাবকেরা সন্তানদের নিয়ে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। আর যাঁদের হাতে সামান্য অর্থ আছে, তাঁরা এই কয়েক দিনেই কয়েক বছরের বুড়ো হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, দোকানগুলো থেকে বোতলজাত পানি ও প্যাকেটজাত খাবার দ্রুতই বিক্রি হয়ে গেছে। যারা কিনতে পারেনি, তারা এখন গভীর মানসিক ও আর্থিক চাপে আছে।

এই খাবার বিক্রেতা আরও বলেন, ‘যুদ্ধ শুধু বোমা আর ড্রোন দিয়ে মানুষকে আঘাত করে না। এটা মানসিক স্বাস্থ্যও ধ্বংস করে দেয়। প্রতিটি বিস্ফোরণে কতজন হার্ট অ্যাটাক বা নার্ভাস ব্রেকডাউনে আক্রান্ত হয়, কেউ জানে না। সরকার এসবের কোনো দায় নেবে না, কিন্তু আমরা আমাদের চোখে এসব দেখছি।’

দ্য ইনডিপেনডেন্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে জানিয়েছেন, দোকানগুলো থেকে বিস্কুটের মতো হালকা খাবারও শেষ হয়ে গেছে। দক্ষিণ তেহরানের মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি বলেন, কয়েকটি দোকান ঘুরে তিনি কেবল দুটি মুরগি কিনতে পেরেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি খাবার দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যুদ্ধকে এখন গায়ে লেগে থাকা বাস্তবতা হিসেবে অনুভব করছে।

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ

দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৫ জুন তেহরানের আলাদ্দিন মলে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন। আবার এই দোকান খুলতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে তাঁরা জানেন না।

এই দৃশ্য শুধু আলাদ্দিন মলের নয়; তেহরানের পূর্ব থেকে পশ্চিম এবং অন্যান্য শহরের শপিং সেন্টারগুলোরও একই অবস্থা। ফারজাম স্ট্রিটের কাছে একজন পোশাক বিক্রেতা বলেন, ‘প্রায় সবাই দোকান বন্ধ করে ফেলেছে। কেউ কেউ শুধু দিনে অন্তত একটা পণ্য বিক্রির আশায় দোকান খোলা রাখছে। কারণ, কিছু বিক্রি না হলে রাতে হয়তো রুটি জুটবে না।’

ইরান-ইসরায়েল সংঘাত শুরুর আগে থেকেই মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও করের চাপে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা হিমশিম খাচ্ছিলেন। এখন এই সংঘাত সেই চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, তাঁর পাশের দোকানদার কয়েকজনের কাছ থেকে ধার করে ১০ লাখ তুমান (রিয়ালের একক) জোগাড় করেছেন কেবল খাবার কিনে রাখার জন্য। এই অর্থ হয়তো তিনি শোধও করতে পারবেন না।

বাড়ছে ভয়

ইরানে বোমা থেকে বাঁচার জন্য নির্ধারিত কোনো আশ্রয়কেন্দ্র নেই। ১৫ জুন শহর কর্তৃপক্ষ মেট্রোরেল স্টেশনগুলোকে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দিয়েছে এবং মানুষকে মসজিদে যেতে বলেছে। যদিও এসব ভূমি-উপরস্থ আশ্রয়কেন্দ্র কতটা সুরক্ষা দিতে পারে, তা অনিশ্চিত। দ্য ইনডিপেনডেন্টের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এর এক দিন পর ১৬ জুন সকালে তেহরানের মেট্রো স্টেশন বন্ধ দেখা গেছে। আর স্টেশনের বাইরে ছিল আতঙ্কিত মানুষদের ভিড়।

ইস্পাহানসহ অন্যান্য শহরেও একই অবস্থা। চার দশক আগের যুদ্ধের পরও কেন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়নি—এমন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে মানুষের মনে।

তেহরান সিটি কাউন্সিলের প্রধান মেহেদি চামরান বলেন, ‘আমাদের এখনো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। এমনকি ১৯৮০–এর যুদ্ধেও যথাযথ অভিজ্ঞতা ছিল না।’

এসব কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে গ্লাস যেন না ভাঙে, এ কারণে জানালায় ক্রস আকৃতি করে টেপ লাগিয়ে দিচ্ছেন। তেহরানের নাজাফাবাদ এলাকার ৬০ বছর বয়সী এক নারী বলেন, ‘আমার মানসিক অসুস্থতা আছে। বিস্ফোরণের প্রতিটি শব্দে মনে হয়, আমার জীবনের অর্ধেকটা ঝরে যাচ্ছে।’ এই নারী আরও বলেন, তাঁর ৮৭ বছর বয়সী বাবাও ভয় চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিস্ফোরণের শব্দে তিনিও গভীরভাবে বিচলিত হন।

ইন্টারনেট সেবা বিঘ্নিত

ইসরায়েলি হামলার কারণে অনেক ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। এ কারণে ইন্টারনেট ও মুঠোফোন নেটওয়ার্ক বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।

দেশটির উপযোগাযোগমন্ত্রী এক্সে বলেছেন, ‘আমরা চাই ইন্টারনেট থাকুক, কিন্তু এটা আমাদের হাতে নেই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ইরানিপ্রবাসী বলেন, ‘আমার বাড়ির কাছে হামলা হয়েছিল। আমি পারিবারিক গ্রুপে খুদে বার্তা দিয়েছিলাম, কিন্তু সেটা পৌঁছায়নি। তিন ঘণ্টা কোনো উত্তর পাইনি। পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম।’

তেহরান ছাড়ছে মানুষ

বিবিসির মঙ্গলবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের কারণে আতঙ্কে ইরানের রাজধানী ছেড়ে চলে যাচ্ছে মানুষ। অধিকাংশই গাড়িতে, কেউ মোটরসাইকেল আর কেউবা হেঁটেই নিরুদ্দেশের দিকে যাত্রা করেছেন। পেট্রলপাম্পগুলোয়ও গাদাগাদি ভিড়। কোথাও তিলধারণের জায়গা নেই।

দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সীমান্তে তেহরানবাসীর লম্বা সারি দেখা গেছে। বিশেষ করে তুরস্কগামী বাজারগানে। উড়োজাহাজ বন্ধ। তাই মানুষ গাড়ি বা বাসের ওপর নির্ভর করছে।

রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়তো একদিন থেমে যায়। কিন্তু এই সংঘাতেই শুরু হওয়া সাধারণের জীবনের ছোট ছোট যুদ্ধ কিছুতেই শেষ হয় না। মূল যুদ্ধ শেষে তাঁদের শুরু হয় বেঁচে থাকার নতুন আরেক যুদ্ধ।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, দ্য ইনডিপেনডেন্ট বিবিসি

তেহরানে ইসরায়েলি হামলা চলার সময়কার ছবি
তেহরানে ইসরায়েলি হামলা চলার সময়কার ছবি। ছবি: এক্স থেকে

Wednesday, June 18, 2025

তেহরানে ধবধবে খেলনা রাজহাঁস ও শিশুর হাতে রক্তের দাগ by সুজন সুপান্থ

শিশুদের মন কত দূর পৌঁছাতে পারে? এই মন কি পৌঁছাতে পারে তেরো নদী সাত সমুদ্দুর? এসব চেনে? এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে বলা যেতে পারে—তেরো নদী সাত সমুদ্দুরের জল নয় বরং শিশুরা যে জল চেনে, তাতে বড়জোড় কাগজের নৌকা ভাসানো যায়। আর সেই নৌকায় যাত্রী বলতে শুধুই শিশুর কল্পনা। পানিতে ঢেউ দিলে দুলে দুলের নৌকা চলে যাবে দূরে।

কিন্তু শিশুদের কি কেবল এই-ই নিয়তি? না। নিয়তি তাদের একদিন ছোট থাকতেই শিশুজীবন থেকে বের করে নিয়ে আসে। পুতুলের জন্য মালা গাঁথবে বলে বসে ছিল যে শিশু, তাকে একদিন ছোট বয়সেই বড়দের মতো ভার নিতে হয়। ছোট্ট জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভার নিতে হয় তার সব খেলনার। কারণ, খেলনার সঙ্গে তো তার হৃদয়ের সম্পর্ক। ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার দিনে সব ছেড়ে তুলতুলে কোমল হাতে কোলে তুলে নিতে হয় প্রিয় খেলনা। যে করেই হোক গুলি বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত থেকে বাঁচাতে হবে তাকে।

যেমনটা করেছে তেহরানের ছোট্ট এ মেয়েটি। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, সামনে ইসরায়েলি হামলায় আহত হয়ে রক্তাক্ত ইরানি একজন নারী। আর তাঁর পেছনে ছোট্ট শিশুটি ডান হাতে জড়িয়ে আছে প্রিয় খেলনা রাজহাঁস। রাজহাঁসটির গায়ে রক্ত বা কোনো কিছুর দাগ নেই। একদম পরিষ্কার। আর শিশুটির বাম হাতে রক্তের দাগ।

বার্তা সংস্থা এএফপি এই ছবিটি প্রকাশ করেছে। গত ১৫ জুন তেহরানের কেন্দ্রস্থল কেশাভার্জ বুলেভার্ডে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক ভবন। নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য এই নারী ও ছোট্ট মেয়েটি নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে। কিন্তু শুধু নিজে বাঁচলে হবে! খেলনাগুলোর কী হবে—এই ভাবনায় হয়তো ছোট্ট শিশুটি আঁতিপাঁতি করে খুঁজেছে খেলনাগুলো। হাতের কাছে এই রাজহাঁসটি পেয়ে বুকে জড়িয়ে নেমে পড়েছে অনিশ্চিত পথে। এই পথে হয়তো আবারও তাদের মুখোমুখি হতে হবে বুলেট-গুলির।

শিশুদের হৃদয়ে কী মায়া দেখুন, ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া ঘর থেকে জীবনের ঝুঁকি যেন কোনো রকমে সে বের করে এনেছে খেলনা রাজহাঁসটিকে। নিজে কোথায় আশ্রয় নেবে, সেই ভাবনা হয়তো তার নেই। তবু গুলি থেকে বাঁচিয়ে এনে খেলনা রাজহাঁস বুকে আগলে সে তাকে দিচ্ছে শুশ্রূষা। সে কী অদ্ভুত মায়া! কী আশ্চর্য একটা আদর!

আর মানুষ, যারা বড়! মানুষের দ্বন্দ্বময় মন। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে মানুষ ছুড়ছে গুলি, ছুড়ছে ক্ষেপণাস্ত্র। গুলির আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে আর সব মানুষের ঘরবাড়ি। রক্তে ভেসে যাচ্ছে শিশুসহ বড়রাও। কী হিংস্র, কী ভয়ংকর সেই সব দৃশ্য! মানুষ হত্যা করছে মানুষকে, শিশুকে।

যে শিশুটি এত দিন জেনে এসেছে এ পৃথিবী নয়নাভিরাম, যে শিশুটি খেলনা কোলে আড়াল করে শোক। ইচ্ছা করে ডাক দিয়ে বলি—মাতৃমনা পরির সঙ্গে তোমার লুকিয়ে দেখা হোক।

ইরান ইসরায়েল সংঘাতে ১৫ জুন তেহরানের কেন্দ্রস্থল কেশাভার্জ বুলেভার্ডে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক ভবন। নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য এই মা ও মেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে
ইরান ইসরায়েল সংঘাতে ১৫ জুন তেহরানের কেন্দ্রস্থল কেশাভার্জ বুলেভার্ডে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে অনেক ভবন। নিজেদের বাড়িঘর হারিয়ে প্রাণে বাঁচার জন্য এই মা ও মেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করছে। ছবি: এএফপি

Tuesday, April 22, 2025

গাজাবাসীও কি সুবর্ণরেখার মতো ঘরের স্বপ্ন দেখে by সুজন সুপান্থ

নতুন বাড়ির প্রতি দুর্নিবার টান ছিল ছোট্ট সীতার। স্বপ্ন ছিল ঘরের। তাই সে একদিন দাদার কাছে জানতে চেয়েছিল, ‘দাদা সারা দিন কোথায় ছিলে? তোমার খালি খালি লাগত না?’ দাদার জবাব, ‘আমাদের নতুন বাড়িটা খুঁজছিলাম রে।’ ‘পাওয়া গেছে?’—এ প্রশ্নের কাছে অনেক্ষণ নির্বিকার থেকে দাদা নিচু স্বরে শুধু বললেন, ‘চল।’ কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋত্বিক কুমার ঘটকের দেশভাগ নিয়ে সিনেমা ‘সুবর্ণরেখা’র এ দৃশ্যের কথা মনে আছে?

বাড়ির প্রতি, ঘরের প্রতি মানুষের যে টান, তা ‘সুবর্ণরেখা’ সিনেমা দেখলে স্পষ্ট হয়ে যায়। আরেকটি দৃশ্যে দেখা যায়, ছাতিমপুর স্টেশন থেকে নতুন বাড়ি যাওয়ার পথে সীতা মুখুজ্জেবাবুর কাছে জানতে চেয়েছিল, ‘কোথায় সেই নতুন বাড়ি?’ মুখুজ্জেবাবু নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। দূরে আঙুল দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘উই যে দূরে নীল নীল পাহাড় আকাশে পিঠটি মেলে দেইছে, তার পাশ দিয়ে নদীটি এঁকেবেঁকে চলে গেছে। ঠিক উইখানটিতে তোমাদের নতুন বাড়ি। কত ফুল, কত পাখি, কত প্রজাপতি, কত বড় বড় শূন্য ঘর, কত গান, কত বাজনা—সুবর্ণরেখা। সোনার রেখাটি, তার পাশেই তোমার বাড়িটি।’ এরপর সীতার হৃদয়ে এই বাড়ির দৃশ্য গাঁথা হতে থাকে। কল্পনায় সে এই বাড়িতে ঘোরাফেরা করে। ফুল-পাখি-প্রজাপতিদের সঙ্গে খেলা করে সীতা। কিন্তু বাস্তবে এই বাড়ি পৌঁছানোর দিশা খুঁজে পায়নি সে।

বাস্তবে বাড়ির দিশা খুঁজে না পেলেও সে সময় হৃদয়ে একটা বাড়ির ছবি আঁকা হয়ে গিয়েছিল সীতার। ওটাই মূলত তার বাড়ি। বাড়ি তাহলে কী? এ প্রশ্নের একটাই জবাব, হৃদয় যেখানে থাকে, সেটাই বাড়ি। হয়তো এ কারণে ১৯৬২ সালে কিংবদন্তি সংগীত তারকা কিং অব রক অ্যান্ড রোল এলভিস প্রিসলিও গেয়েছিলেন—‘হোম ইজ হয়্যার দ্য হার্ট ইজ’।

আমার মনে হয়, নিজের কাছে নিজে ফেরার নামই ঘর বা বাড়ি। কারণ, ঘর বাঁধতে বাঁধতে মানুষ আশ্চর্য আটনে নিজেকেই বেঁধে রাখে তার চারপাশে। এক অপরিমেয় মমতায় সেই ঘরে নিজেকে হারিয়ে ফেলে যাপন করে মানুষ। নইলে কাজ ফুরানো বিকেলে ঘরের দাওয়ায় বা আধভাঙা জলচৌকিতে কেন কথাহীন বসে থাকে মানুষ!

এই বহুদূর শহর থেকে দীর্ঘ অপেক্ষা পেরিয়ে বাড়ি ফিরে একটু দূর থেকে দেখি, সেই কবে বাড়িতে রেখে যাওয়া আরেকটি বয়সের আমি—হাফপ্যান্ট পরা আরেকটা আমি তাকিয়ে আছে এই আমির দিকে। এই চোখে দেখি তার টলটলে চোখ। দুজনের চোখের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে একই পৃথিবীর রং। চোখ বুজে আলতো করে তার চুলে বিলি কেটে দেখি, হেসে উঠছে দুজনের বুকের জখম। তাহলে এবার বলুন, বাড়ি মানে কি নিজের কাছেই নিজের ফেরা নয়!

তাহলে ফিলিস্তিনের বাস্তুচ্যুত, ঘরহারা মানুষেরা কীভাবে, কোথায় ফিরছে? আল–জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধ হওয়ার পর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয়শিবিরে থেকে নিজের বাড়ির কথা মনে হয়নি ১১ বছর বয়সী কারেম সামরার। তার বারবার শুধু মনে হয়েছে স্কুলের কথা। তার মন পড়ে ছিল শ্রেণিকক্ষের জানালার কাছে, যে জানালার শিক ধরে সে ক্লাসের ফাঁকে আকাশ দেখত। দেখত স্কুলের বাগানে ফুটে থাকা ফুল, ফুলে উড়ে বসা প্রজাপতি আর পাখিদের কিচিরমিচির। শ্রেণিকক্ষের এক কোনায় রাখা থাকত সব শিক্ষার্থীর বই-খাতা আর ক্রেয়ন। নিজেদের ঘরের বদলে কারেম সামরার ওই ক্রেয়নগুলোর কথা খুব মনে পড়ত। ভাবত, স্কুলে গিয়ে কি আর খুঁজে পাবে নিজের আঁকিবুঁকি করার ওই ক্রেয়নগুলো!

যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর কারেম সামরা পরিবারের সঙ্গে ফিরে নিজের ঘর ও ক্রেয়নগুলো খুঁজে পেয়েছিল কি না, জানা যায়নি। ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া গাজায় তা খুঁজে পাওয়ার কথাও নয়। তার হৃদয় যেখানে পড়ে ছিল, বিধ্বস্ত হয়ে গেছে সেই স্কুলঘর। অথচ কারেম সামরার কাছে এই স্কুলঘরই ছিল ঘরের বাইরে আরেক আপন ঘর।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামাস হামলা চালায়। ওই দিন থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। আল–জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ মাস ধরে চলা যুদ্ধে গাজা উপত্যকায় নারী ও শিশু মিলিয়ে ৫১ হাজার ২৫ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা ১ লাখ ১৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে বাড়ি ফেরা অবরুদ্ধ গাজার ফিলিস্তিনিদের ভেতরে–ভেতরে যেন বেজে উঠেছিল পুরোনো শুশ্রূষার সুর। খান ইউনিস, গাজাছবি: রয়টার্স

জাতিসংঘ বলছে, গত ১৮ মার্চ হামাসের সঙ্গে সই হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে দেয় ইসরায়েল। এর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ লাখ গাজাবাসী নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এর আগে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন আরও লাখো মানুষ।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে হামাসের সঙ্গে সই হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর আশপাশে আশ্রয় নেওয়া মানুষেরা হোক ভাঙা, তবু ঘরের টানে ফিরতে শুরু করে। বোমার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া আস্ত এক উপত্যকায় ফিরলেও আদতে ঘরে ফেরা হয়নি তাঁদের। কারণ, বাড়িতে যে কিছুই নেই। ইসরায়েলি হামলায় সবই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

দেইর আল বালা এলাকার এমনই এক বাসিন্দা আবদুল ফাত্তাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা বাড়ি ফিরে দেখি, কিছুই নেই। ঘর নেই, বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই। এমন ঘরে ফিরলাম, পোশাকও বদলাতে পারি না। জন্মের সময়ের মতো নিঃস্ব আমি। আমার আর কিছুই নেই। ঘরের খোঁজ নিতে বাড়ি ফিরে দেখছি ধ্বংসস্তূপ। কোথায় আমার ঘর?’

দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে বাড়ি ফেরা অবরুদ্ধ গাজার ফিলিস্তিনিদের ভেতরে–ভেতরে যেন বেজে উঠেছে পুরোনো শুশ্রূষার সুর। এই সুরে মানুষের ভিড় ঠেলে একজন মানুষ কি একা হয়ে নিজের ঘরের দরজার চিহ্ন খুঁজে তার পাশে বসতে চেয়েছে কিছুক্ষণ? জিরেন চেয়েছে কিছুটা? আর পর মুহূর্তে যেন ভীষণ জ্বরের শেষে নিজেদের ভেতর জেগে উঠেছে সূর্যধোয়া ঘর।

জানালার শিক গলে আকাশ, ফুল, প্রজাপতি, পাখি দেখবে বলে ঘরহীন শিশুটির ছিল সেই কত দিনের পিত্যেশ! অথচ সেই হা-পিত্যেশের ওপারে দাঁড়িয়ে আছে বিধ্বস্ত শহর। কল্পনায় অসহায় ওই শিশুটির ভাষাহীন চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, নিজের বুকের ভেতর এঁকে দিই তার চৌকো জানালার আলো।

ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে হয়ে গেছে বাড়ি। ধ্বংসস্তূপের ভেতর যতটুকু পেয়েছেন, তা–ই নিয়ে বের হয়েছেন এই ব্যক্তি। খান ইউনিস, গাজা
ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে হয়ে গেছে বাড়ি। ধ্বংসস্তূপের ভেতর যতটুকু পেয়েছেন, তা–ই নিয়ে বের হয়েছেন এই ব্যক্তি। খান ইউনিস, গাজা। ছবি: রয়টার্স

Thursday, August 8, 2024

প্রায় সরকারহীন দেশে আমরা উলুখাগড়ার প্রাণ, বাঁচান by সুজন সুপান্থ

ছাত্র-জনতার তুমুল আন্দোলনের মুখে দেশে বড় এক পরিবর্তন আসছে। টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। গত সোমবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে দেশত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। ওই দিন বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে এ তথ্য জানিয়েছেন। আমরা আমজনতা টেলিভিশনের সামনে অধীর আগ্রহে বসে এ বক্তব্য শুনেছি।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিন দিন পেরিয়ে গেছে। অথচ যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আশায় অধীর আগ্রহে দেশবাসী, সেই পরিবর্তনের দেখা এখনো মেলেনি। এখন পর্যন্ত নতুন সরকার গঠিত না হওয়ায় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া শিক্ষার্থী-জনতার ভাষা বুঝতে পারেনি ক্ষমতাসীন দল। তাই সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগ করে এই আন্দোলন দমাতে চেয়েছিল সরকার। এর ফল অসংখ্য ছাত্র-জনতার প্রাণহানি। যেসব প্রাণহানি এখন শুধুই সংখ্যা হয়ে আছে।

আমরা যাঁরা আমজনতা, আমরা যাঁরা একদম সাধারণ মানুষ, যাঁরা কেবল দুবেলা দুমুঠো খাবার আর নিশ্চিন্তে-নিরাপদে বেঁচে থাকার আশায় বেঁচে থাকি; এই আন্দোলন চলাকালে তাঁরা একদিকে আশায় বুক বেঁধেছিলেন, আরেক দিকে ছিলেন আতঙ্কিত। আশায় বুক বেঁধেছিলেন কারণ, দীর্ঘদিনের একচেটিয়া শাসনের অবসান হতে যাচ্ছে। আপামর মানুষ শান্তি ফিরে পাবে, বদল আসবে। আর আতঙ্কিত ছিলেন কারণ, এসব মানুষেরই সন্তান, ভাই, বোন ও স্বজন রাস্তায় নেমে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। আর সরকারি বাহিনীর বলপ্রয়োগে, গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছেন তাঁরাই। এই আতঙ্কে ঘুমাতে পারেননি অনেকেই।

কিন্তু কার্যত সরকারহীন এই দেশে একই আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটছে আমাদের মতো আমজনতার। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন, গণভবন, জাতীয় সংসদ ভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এই দৃশ্য দেশবাসীসহ সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। বিশ্বের গণমাধ্যমগুলোও এই লুটপাটের ছবি প্রকাশ করেছে। দেশের সম্পদ এভাবে লুট করার ঘটনা কি আতঙ্কের নয়? শুধু তা–ই নয়, শিক্ষার্থী-জনতার আন্দোলনের মুখে সরকার পতনের ঘটনায় আনন্দমিছিল থেকে সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়ি, থানা, গণমাধ্যমের কার্যালয়, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা ও পিটুনিতে পুলিশ সদস্যসহ দেড় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আন্দোলনের আগেও মৃত্যু দেখেছে জনতা, আন্দোলনের পরে বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরও রক্তে রঞ্জিত হলো নানা প্রান্ত। এসব নিহত মানুষও আমজনতা, কারও না কারও স্বজন।

বিজয় মিছিলের পরদিনও সারা দেশে ভিন্নমত, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা হয়েছে, এখনো হচ্ছে। সন্ধ্যার পর মূল সড়ক থেকে গলি পর্যন্ত অস্ত্র হাতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ভীতি ছড়াচ্ছে। ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। গভীর রাতে অস্ত্র নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় শোডাউন চলছে। বাসাবাড়িতে ডাকাতি হচ্ছে, দোকান ভেঙে জিনিসপত্র লুট করা হচ্ছে। সন্ত্রস্ত হয়ে আছে মানুষ। থানায় পুলিশ নেই, কোথাও কোনো পাহারাদার নেই। তাই কোনো দিক থেকেই প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। আগে মানুষ একচেটিয়া শাসনব্যবস্থায় জোর গলায় কোনো কথা বলতে পারেনি, এখনো পারছে না। কারণ, এ কথা শোনার মতো কোনো কর্তৃপক্ষ দেশে এখনো নেই। তাহলে আমজনতা তাদের অধিকারের কথা কী সব সময় বুকে ব্যথা নিয়ে গিলে খাবে! কোনো পরিবর্তনই কী তাদের কথা বলার সুযোগ দেবে না?

সোমবার দুপুর থেকে যাঁরা নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন, তাঁরা কেন সেই দায়িত্ব পালন করছেন না, জানা নেই। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সড়কে কোনো ট্রাফিক–ব্যবস্থা ছিল না। গত সরকারের সময় মানুষ গুলির শব্দ আর অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনেছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে আন্দোলনে যোগ দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেও সেই একই অস্ত্রের ঝনঝনানি সুর বেজে যাচ্ছে। তাহলে পরিবর্তন কোথায় এল! দীর্ঘদিন পর আশার সঞ্চার হয়েও তাই হতাশ হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

যখনই ক্ষমতার পালাবদলের প্রসঙ্গ, যখনই আন্দোলন, তখনই সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি হয়। তাহলে কি এই দেশে সাধারণ মানুষ উলুখাগড়ার প্রাণ! রাজায় রাজায় যুদ্ধ হবে আর শুধু যাবে উলুখাগড়ার প্রাণ! কিন্তু যুগে যুগে তো এই উলুখাগড়াই আন্দোলনে, গণবিস্ফোরণে সাহস জুগিয়ে গেছে। আন্দোলনের আগে ও পরে এত এত মানুষের প্রাণ গেলে, আর কারা আপনাদের পেছনে যাবে? আতঙ্কিত হয়ে থাকলে আর কি আপনাদের পেছনে সাহস জোগাতে যাবে এই উলুখাগড়া? তাই সবার আগে দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। দেশের সম্পদ রক্ষা করুন, সাহস দিন, বাঁচান আমাদের মতো উলুখাগড়ার প্রাণ।