Showing posts with label পরিবহন. Show all posts
Showing posts with label পরিবহন. Show all posts

Sunday, February 8, 2026

সড়কে বিশৃঙ্খলা: জবাবদিহিমূলক নতুন সড়ক সংস্কৃতির সন্ধানে by সাজেদুল হক

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফলাফল। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন সাজেদুল হক। আজ প্রকাশিত হলো দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।

রাস্তায় গর্ত, বাসরুটের বিশৃঙ্খলা, অবৈধ পার্কিং, ট্রাফিক সিগন্যালের বিকল অবস্থা এবং ঘন ঘন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মধ্যে একধরনের বিশেষ মিল আছে; এসবের দায়ভার সব সময়ই ‘অন্য কারও’।

বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার প্রতিটি অংশ—সড়ক নির্মাণ, আইন প্রয়োগ, চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, নগর-পরিকল্পনা, জরুরি সেবা, জনসচেতনতা—এই সবই বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রণালয়, সংস্থা বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া আছে। কিন্তু কোনো সংস্থা এককভাবে এই বহুমুখী সমস্যাগুলোর সমাধান করার জন্য পর্যাপ্ত ক্ষমতা, অর্থায়ন বা সমন্বয়ের সুযোগ পায় না।

আমাদের পরিবহনসংকট এত জটিল ও ব্যাপক যে কোনো এক দপ্তরের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা এখন আর সম্ভব নয়। তবু আমরা যেন একাধিক অঙ্গের জটিল রোগবালাইকে বিচ্ছিন্ন সব চিকিৎসা দিয়ে সারানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। যদি আমরা সত্যিই আমাদের যোগাযোগব্যবস্থাকে সংস্কার করতে, নাগরিকদের জীবন বাঁচাতে এবং রাস্তায় স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে চাই, তবে প্রয়োজন সরকারের সর্বোচ্চ দপ্তরের নির্দেশনায় এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় একটি সম্মিলিত উদ্যোগ।

আজকের আলোচনার কেন্দ্রে রাখছি দুটি বিষয়। একটি হলো জবাবদিহি ও কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার। আরেকটি হলো আমাদের সড়ক ব্যবহারের সংস্কৃতির পরিবর্তন। এর কারণ হলো, কাঠামোগত ব্যর্থতা আর সংস্কৃতিগত বিশৃঙ্খলা একে অপরকে পুষ্ট করে আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় আমাদের বর্তমান নগর পরিবহনের সংকট।

সমন্বয়হীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা আর জবাবদিহির অভাব

বাংলাদেশের পরিবহনব্যবস্থার বড় সমস্যা হলো অকার্যকর দায়িত্বের বিভাজন। এর কিছুটা বিশ্লেষণ আমরা আগের পর্বে দেখেছি। বিআরটিএ ড্রাইভারদের লাইসেন্স দেয় এবং গাড়ি নিবন্ধন করে, কিন্তু তাঁরা রাস্তায় আইন প্রয়োগ করতে পারে না। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু সড়ক নকশা বা বাস রুট নির্ধারণে তাঁদের কোনো ভূমিকা নেই। সিটি করপোরেশন রাস্তা সংস্কার ও ফুটপাত মেরামতের কাজ করে, কিন্তু গণপরিবহন পরিকল্পনা থেকে তাঁরা প্রায়ই বাদ থাকে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবা বা ট্রমা কেয়ার সিস্টেমের কোনো অংশ নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও গণমাধ্যমকে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের সচেতনতা বা শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না।

এসবের ফলাফল হচ্ছে প্রশাসনিক ভাঙন। এক বিভাগের উদ্যোগ অন্য বিভাগের উদাসীনতায় থেমে যায়। যেমন সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন স্কুল বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পৌঁছায় না, আইন প্রয়োগ হয় বিচ্ছিন্নভাবে আর পরিকল্পনা কাগজে আটকে থাকে।

এ অবস্থায় দুর্নীতি ও স্বার্থান্বেষী মহল সহজেই প্রভাব বিস্তার করে। মালিক সমিতি বা শ্রমিক সংগঠনের চাপ, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় আর ঘুষের সংস্কৃতি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে বারবার বিফল বা স্তিমিত করে। এর ফলে জনগণের জীবন ঝুঁকিতে থেকেও কার্যকর কোনো জবাবদিহি নেই।

যে কারণে বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপগুলো ব্যর্থ হয়

বাংলাদেশে ট্রাফিক ও পরিবহন সংস্কারের বিভিন্ন কার্যক্রম বারবার ঘোষিত হয়েছে, কিন্তু এসবের অধিকাংশই হয় ক্ষণস্থায়ী। কখনো এক সপ্তাহের হেলমেট অভিযান, কখনো হঠাৎ ফিটনেস চেক, আবার কখনো বাসরুট পুনর্গঠনের নির্দেশনা। এসব পদক্ষেপ কখনো স্থায়ী ফল আনে না।

কারণ, এগুলোতে থাকে না দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আন্তপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়, কিংবা স্পষ্ট জবাবদিহি। ফলে কার্যক্রম ব্যর্থ হলে কেউ দায় নেয় না; সাফল্য পাওয়া গেলে হলে কেউ তা টিকিয়ে রাখতে চায় না এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক অগ্রগতি মাপার কোনো ব্যবস্থা হয় না। এভাবে এসব ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে একধরনের ‘প্রতিক্রিয়াশীল প্রশাসন’। অর্থাৎ যখন কোনো দুর্ঘটনা বা জনরোষ তৈরি হয় তখন শুরু হয় হঠাৎ অভিযান, তারপর আবার নীরবতা।

জাতীয় টাস্কফোর্স কেমন হওয়া উচিত


আমাদের পরিবহন অবকাঠামোর সংস্কার ও বিস্তারের জন্য প্রয়োজন একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের জাতীয় উদ্যোগ। একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা আবশ্যক, যা প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দপ্তরের অধীনে থাকবে এবং কাজ করবে।

এ রকম একটি জাতীয় পরিবহন সংস্কার ও সড়ক নিরাপত্তা টাস্কফোর্সের সভাপতি হিসেবে থাকতে হবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বা সচিবালয়ের প্রতিনিধিকে। সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (ট্রাফিক পুলিশ), স্থানীয় সরকার বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ (ডিজিটাল মনিটরিং ও অটোমেশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় (সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (ট্রমা ও জরুরি সেবা সমন্বয়), সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটির প্রতিনিধি। এ ছাড়া সিভিল সোসাইটি ও একাডেমিক বিশেষজ্ঞদেরও (পরামর্শক) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

এই টাস্কফোর্সের কার্যক্রমে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের দুর্বলতা মোকাবিলায় প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশ সাধারণ পুলিশ ইউনিট থেকে বদল হয়, যা প্রশিক্ষণ ও ধারাবাহিকতার অভাব তৈরি করে। একটি বিশেষায়িত, স্থায়ী কর্মী ও আধুনিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ বাহিনী গঠন অপরিহার্য। এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এই টাস্কফোর্সের মধ্যে সমন্বয় রেখে কাজ করবে।

টাস্কফোর্সের কাজ

টাস্কফোর্সের কাজ হবে জাতীয় পরিবহন এবং সড়ক নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন; বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও পৌরসভার মধ্যে নীতিমালাগত জোট এবং সমন্বয় বজায় রাখা; স্পষ্টভাবে লক্ষ্য, কর্মক্ষমতা সূচক এবং সময়সীমা নির্ধারণ, বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ ও অগ্রগতি নিয়ে ত্রৈমাসিক রিপোর্ট প্রকাশ; স্বচ্ছ তহবিল সংগ্রহ, সুষ্ঠু ক্রয় প্রক্রিয়া নিশ্চিতকরণ, কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড তৈরি (যেখানে দুর্ঘটনা, আইন লঙ্ঘন, সচেতনতা কর্মসূচির তথ্য নাগরিকেরা দেখতে পাবেন); আইন প্রয়োগ, চালক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল টিকেটিং, তথ্য ব্যবস্থাপনা, বাস কিংবা গণপরিবহনের রুট ইত্যাদির জন্য জাতীয় মান নির্ধারণ।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো এই টাস্কফোর্সের আইনগত ক্ষমতা থাকতে হবে, যাতে কেবল পরামর্শক নয়, বাস্তবায়নের দায়িত্বশীল সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।

সংস্কারের আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত

বেশ কিছু উন্নয়নশীল দেশ এ ধরনের সংস্কারের জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ এরই মধ্যে নিয়েছে এবং ফলে ভালো ফলও পেয়েছে। ভিয়েতনামের ট্রাফিক নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে, যার নেতৃত্বে থাকেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী এবং যা ভিয়েতনামের পরিবহনব্যবস্থার বার্ষিক ফলাফল পর্যালোচনা করে। উপরন্তু দেশটির প্রদেশগুলো সরাসরি এই কমিটিকে রিপোর্ট করে—যাতে তথ্যের বিচ্যুতি না হয়।

ইথিওপিয়া দাতাদের সমন্বয়ে ও আন্তমন্ত্রণালয় নেতৃত্বে একটি জাতীয় শহর পরিবহন নীতি গঠন করেছে, যা জমি ব্যবহার, দূষণ, সড়ক নিরাপত্তা এবং জনপরিবহন সংস্কার নিয়ে একত্রে কাজ করে।

ভারতের জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ এমন একটি উদাহরণ, যার চেয়ারম্যান হিসেবে থাকেন দেশটির পরিবহনমন্ত্রী। এই পরিষদের রাজ্য প্রশাসন স্তরে অংশগ্রহণ ও বিচার বিভাগীয় নজরদারি রয়েছে। এই পরিষদ নতুন আইন প্রণয়ন, ডিজিটাল আইন প্রয়োগ এবং সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে এখন পর্যন্ত সফলতা দেখিয়েছে।

এ উদাহরণগুলো প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র যখন সড়ক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে শাসনব্যবস্থায় অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে, তখন সত্যিকার অর্থে বাস্তব পরিবর্তন সম্ভব।

প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলো কেমন হতে পারে

জাতীয় নির্দেশিকা জারি: উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ট্রাফিক নিরাপত্তাকে জরুরি ঘোষণা করা। সরকারি গেজেট ব্যবহার করে ও রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বজায় রেখে ৯০ দিনের মধ্যে এই টাস্কফোর্স গঠন। নগর পরিবহনে জড়িত সব সংস্থা, প্রকল্প এবং তাদের বাজেটের একটি চিত্র তৈরি এবং এদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দূরীকরণের প্রস্তুতি।

কেন্দ্রীয় সড়ক নিরাপত্তা ড্যাশবোর্ড চালু করা: স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে একটি রিয়েল টাইম ড্যাশবোর্ড তৈরি করতে হবে, যা সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এতে সড়ক অবস্থা, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন, দুর্ঘটনা, আইন প্রয়োগ কার্যক্রম এবং জনসচেতনতা প্রচারের তথ্য থাকবে।

বিশেষ করে একটি সহজবোধ্য সামগ্রিক অগ্রগতি সূচক বা ‘পরিবহন স্বাস্থ্য সূচক’ থাকবে, যা সংস্কার কার্যক্রমের সামগ্রিক প্রভাব পরিমাপ করে জনগণকে জানাবে। এই ড্যাশবোর্ডকে নিয়মিত হালনাগাদ করা হলে এই প্ল্যাটফর–সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার জবাবদিহি বাড়বে এবং নাগরিকেরা জানতে পারবে কীভাবে প্রতিটি পদক্ষেপ নিরাপদ ও কার্যকরভাবে রাস্তায় ভূমিকা রাখছে। যেসব মন্ত্রণালয় সমন্বিত কর্মক্ষমতা সূচকে ভালো করবে, তাদের বাজেটের মাধ্যমে সমন্বয়ের প্রণোদনা প্রদান করা।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাদের প্রয়োজনমতো সংশ্লিষ্ট করা: পরিবহন শ্রমিক সমিতি, বেসরকারি বাসমালিকেরা, সিভিল সোসাইটি, করপোরেট লজিস্টিক কোম্পানি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদিকেও এই সংস্কার সম্পাদন এবং পর্যবেক্ষণের কাজে সাহায্য করতে হবে।

নাগরিক সংস্কৃতির সংস্কার

যত বড় কাঠামোই তৈরি করা হোক, তা সফল হবে না, যদি না আমাদের নাগরিক আচরণ বদলায়। বর্তমানে বাংলাদেশের রাস্তায় প্রভাবশালী মানেই জয়ী। লাল বাতি মানা হয় না, অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে, পথচারী হয় বিপন্ন। একটি নতুন সড়ক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পথচারীর অধিকার সংরক্ষিত হবে; অ্যাম্বুলেন্সকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে; শিশুরা নিরাপদে বাইসাইকেল চালাতে পারবে; বয়স্করা নিশ্চিন্তে ফুটপাতে হাঁটতে পারবে; এসব শুধু দুর্ঘটনা কমাবে না, নাগরিক জীবনে সহমর্মিতা ও আস্থাও ফিরিয়ে আনবে।

সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন

এই পরিবর্তন শুধু রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়। প্রয়োজন বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ।

সরকার: সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্কুল পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা, স্থায়ী ট্রাফিক পুলিশ বাহিনী।

বেসরকারি খাত: রাইড শেয়ার ও করপোরেট যানবাহনে নিরাপদ চালনা নীতি, সঠিক পার্কিং ব্যবস্থাপনা।

গণমাধ্যম: ভিআইপি গাড়ির কীর্তন আর স্তুতি বন্ধ করা, আর মানবিক গল্প প্রচার।

তরুণ সমাজ ও নাগরিক সংগঠন: ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চেতনা দীর্ঘ মেয়াদে কাজে লাগানো, ট্রাফিক আইল্যান্ড এবং ফুটপাতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান
: সাপ্তাহিক খুতবা বা বক্তব্যে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বার্তা অন্তর্ভুক্ত করা।

প্রযুক্তি খাত: দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানের তথ্য, ড্রাইভার স্কোরকার্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ঝুঁকির পূর্বাভাস।

সংস্কারকে দৃশ্যমান করতে হবে

জনসাধারণের আস্থা অর্জনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো অগ্রগতিকে দৃশ্যমান করা। ওপরে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় সড়ক নিরাপত্তা ড্যাশবোর্ডে একটি সংস্কারের অগ্রগতির সূচক থাকতে পারে, যা নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে এবং যা দেখাবে কার্যক্রমের অগ্রগতি। যেমন: প্রশিক্ষণ, আইন বাস্তবায়ন, সচেতনতামূলক প্রচারণা কীভাবে সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করছে এবং যানজট, দুর্ঘটনা কিংবা মানুষের হতাশা কমাচ্ছে। যখন মানুষ দেখবে, তখন বিশ্বাস গড়ে উঠবে; তারাও অংশগ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত হবে; আচরণ বদলাতে মনোযোগী হবে। দৃশ্যমানতা সংস্কারকে গ্রহণযোগ্য করবে আর গ্রহণযোগ্যতা সেই সংস্কারকে গতিশীল করবে।

শেষ কথা

রাষ্ট্রকে কখনো না কখনো ভাবতেই হয়, নগরের সড়ক এবং উন্মুক্ত স্থানগুলোয় নাগরিকদের কী দেওয়া উচিত অথবা সর্বসাধারণের এসব থেকে কি পাওয়ার কথা? আমরা তো আমাদের রাস্তাঘাটকে দৈনন্দিন অবিচার বা নৈরাজ্যের প্রতীক হয়ে থাকতে দিতে পারি না। এই লেখায় নীতি, অনুশীলন এবং জনমনের ভাবনাকে নতুনভাবে দেখার একটি উপায় তুলে ধরেছি।

কিন্তু এই সবই অর্থহীন হবে যদি আমরা বর্তমান বিশৃঙ্খলতার ব্যাপারে নিষ্ক্রিয় থাকি। কারণ, দিন শেষে সড়ক ও যানজট আসল সমস্যা নয়—এসবের ব্যাপারে অবজ্ঞাই হলো মূল সমস্যা। এবং আমরা সবাই মিলে এর থেকে বেরিয়ে আসার পথ বেছে নিতে পারি। এটি শুধু যানজট কিংবা সড়কের প্রশ্ন নয়, বিশ্বায়নের এই যুগে এটি আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন। সিদ্ধান্ত এখন আমাদের হাতে।

সাজেদুল হক, উন্নয়নবিশেষজ্ঞ ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ফোরাম
- মতামত লেখকের নিজস্ব

সড়কে বিশৃঙ্খলা: জবাবদিহিমূলক নতুন সড়ক সংস্কৃতির সন্ধানে

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকটের কারণ কী by সাজেদুল হক

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফল। ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট নিয়ে দুই পর্বে লিখেছেন সাজেদুল হক। আজ প্রকাশিত হলো প্রথম পর্ব।

২৯ জুলাই ২০১৮, ঢাকার এয়ারপোর্ট রোড। জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস বেপরোয়া গতিতে আরেকটি বাসকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীদের ওপর উঠে যায়। ঘটনাস্থলেই মারা যায় রাজীব ও দিয়া নামে শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী।

বাসটির রুট পারমিট ছিল না। চালকের বৈধ লাইসেন্স ছিল না। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার একটি উদাহরণ।

এরপর যা ঘটেছিল, তা ছিল আমাদের জন্য এক নির্ণায়ক সময়। হাজারো শিক্ষার্থী, অনেকেই ইউনিফর্ম পরে সড়কে নেমে এসেছিল। কিন্তু তারা সড়কে কোনো ভাঙচুর করেনি।

শিক্ষার্থীরা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল, ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করল, জেব্রা ক্রসিং এঁকে দিল। তারা দলবদ্ধ হয়েছিল নিরাপদ সড়কের দাবিতে।

কিছু সময়ের জন্য তখন মনে হয়েছিল, বহুদিনের অবহেলিত বিষয়টি অবশেষে রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারে উঠে আসতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস, মন্ত্রীদের জরুরি বৈঠক—সবই হলো। কিন্তু ছয় বছর পার করে বাস্তবিক অর্থে কিছুই বদলাল না।

আমাদের দেশের সড়ক ও যানজটের অবস্থা এখন আর কেবল যন্ত্রণাদায়ক নয়; এটি আজ দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় বিপর্যয়, জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মারাত্মক ঝুঁকি আর কোটি মানুষের প্রতিদিনকার জীবনযাত্রার মান নষ্ট করার কারণ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার যানজট প্রতিবছর অর্থনীতিতে ৩৭ হাজার কোটি থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা (৩ দশমিক ৫ থেকে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ক্ষতি করে। এটি জিডিপির ৫ থেকে ১০% হারানোর সমান।

শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, যানজটের স্বাস্থ্যঝুঁকিও মারাত্মক। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে পরিবেশদূষণ, বিশেষ করে যানবাহনজনিত বায়ুদূষণ বাংলাদেশে ৭৮ হাজার থেকে ৮৮ হাজার মানুষের অকালমৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল, যা জিডিপির প্রায় ৪% ক্ষতির সমান।

গড় গতির কথা ভাবলে দেখা যায়, এক দশক আগে যেখানে ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি ছিল ২১ কিমি/ঘণ্টা, আজ তা নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৫ কিমি/ঘণ্টায়।

আমাদের শহরের সড়কগুলো এখন বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক ও বিশৃঙ্খল সড়কব্যবস্থা হিসেবে পরিগণিত হয়। ২০১৮ সালের ছাত্রদের
দাবি আর আন্দোলনের পর একই ফিটনেসবিহীন বাস, একই অদক্ষ ও প্রশিক্ষণহীন ড্রাইভার, একই ধরনের আইনভঙ্গকারী মানসিকতা—সব চলছে আগের মতোই।

যারা একদিন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে রাস্তায় নেমেছিল, তারা আজ শ্রেণিকক্ষে ফিরে গেছে। কিন্তু যে অবস্থা তাদের আন্দোলনে নামতে বাধ্য করেছিল, সেটি থেকে আমরা ন্যূনতম মুক্তিও পাইনি।

প্রতিদিনের দুর্ভোগ ও অর্থনীতির ক্ষয়

সাধারণ নাগরিকের জন্য ঢাকা শহরে যাতায়াত করা এখন এক অন্তহীন যন্ত্রণা। আট কিলোমিটার পথ যেতে লাগে দেড় ঘণ্টা, কখনো কখনো এমন অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। অফিসগামীদের ভোরে বেরোতে হয়, ফিরতে হয় গভীর রাতে। স্কুলপড়ুয়া শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানোর বদলে অভিভাবকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় যানজটে। প্রতিদিনের এই চাপ থেকে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় হতাশা, ক্লান্তি আর একধরনের নীরব ক্ষোভ।

এসবের ভেতর আরেক উদ্বেগের বিষয় হলো, অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে কারও যেন আর কোনো আশা বা দাবির জায়গা নেই। এই বিশাল ক্ষয়ক্ষতি জেনেও নাগরিকদের মনে গেঁথে গেছে একধরনের আত্মসমর্পণের চিন্তা: ‘এটাই নাকি মেগাসিটিতে বাস করার মূল্য’।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমাদের যানবাহনের চালকেরা যখন বিদেশে যান কিংবা দেশের ভেতরই সেনানিবাসের মতো নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করেন, তখন তাঁরা অনায়াসে সব নিয়ম মেনে চলেন। এ থেকে স্পষ্ট যে সড়কের বিশৃঙ্খলার পেছনে ব্যক্তিগত অসচেতনতা যেমন আছে, তেমনি আছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা।

পরিবহনবিষয়ক দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা

সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ে আমাদের এই সংকট কেবল যানজটে সীমাবদ্ধ নয়, এটি এক গভীর প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতিফলনও বটে। ঢাকার ভেতর সড়ক ব্যবস্থাপনায় জড়িত প্রধান তিনটি সংস্থা হলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) এবং বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)।

নিয়ম অনুযায়ী সংস্থাগুলোর সমন্বিতভাবে কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠান যার যার মতো বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সড়ক নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু রোড ডিজাইন বা রুট পরিকল্পনায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই।

রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি লাইসেন্স ও রেজিস্ট্রেশন দেয়, কিন্তু মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা আবার তাদের নেই।

ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি সমন্বয়কারী সংস্থা হলেও এর কার্যকর কর্তৃত্ব নেই বললেই চলে।

ঢাকার বাইরে গেলেও পরিস্থিতি একই রকম। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) হয়তো রাস্তা নির্মাণ করে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের। উপরন্তু এসব বিষয়ে নীতিনির্ধারণী কর্তৃত্ব ছড়িয়ে রয়েছে সড়ক পরিবহন, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভেতর।

ফলাফল হলো প্রতিটি সংস্থা আলাদা আলাদা নীতি নিচ্ছে; একে অন্যের বিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আর নাগরিকেরা আটকে থাকছেন বিশৃঙ্খলার জালে।

যদি ঢাকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানের দিকে তাকাই, যেমন মিরপুরের কালশী ফ্লাইওভার, সেখানে দেখি রোড মার্কগুলো কেমন এলোমেলো। অনেক রাস্তায় ট্রাফিক সাইন ভুল কিংবা অদৃশ্য।

প্রশ্ন থেকে যায়, এই প্রকল্পে অংশ নেওয়া প্রকৌশলীদের এসব রাস্তার সাইন আর মার্কগুলো করার জন্য পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ছিল কি না? এমনকি বিমানবন্দর সড়কের মতো উচ্চনিরাপত্তাসম্পন্ন এলাকার কাছাকাছিও সঠিক রোডমার্ক নেই। এর ফলে অভিজ্ঞ চালকেরাও বিভ্রান্ত হন। এগুলো কেবল দৃষ্টিকটু নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগত দায়িত্বহীনতার প্রতিচ্ছবি।

দুর্নীতি ও অরাজকতা

প্রতিষ্ঠানগত বিশৃঙ্খলার পেছনে আরও একটি বিষয় কাজ করে; সেটা হলো দুর্নীতি। হাজার হাজার যানবাহনের চালক ভুয়া লাইসেন্স নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন; কেউ টাকা দিয়ে, কেউ রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়। ফিটনেসবিহীন বাস, অনিরাপদ মিনিবাস সবই চলে অবাধে।

পরিবহনমালিকদের লবি প্রায়ই রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত। ফলে কোনো সংস্কার কার্যত তাঁদের ইচ্ছার বাইরে যেতে পারে না। এই দায় এড়ানোর সংস্কৃতিই আমাদের ট্রাফিক–ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার মূল চালিকা শক্তি এবং জনগণের আস্থা ধ্বংসের ভিত্তি।

বিআরটিএ যেখানে পরিবহন খাতের একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তারাই দীর্ঘদিন ধরে ‘দুর্নীতির আখড়া’ হিসেবে পরিচিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেমন পুলিশ ও মোবাইল কোর্ট, তারাও পক্ষপাতদুষ্ট নজরদারি ও চাঁদাবাজিতে জড়িত, এমন অভিযোগ রয়েছে। গণপরিবহনব্যবস্থার বিশৃঙ্খলার পেছনে কাজ করছে এক শক্তিশালী পরিবহন সিন্ডিকেট, যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

কিন্তু পরিস্থিতি সব সময় এমন ছিল না। মাত্র দুই-তিন দশক আগেও ঢাকার রাস্তায় নিয়মকানুনের কিছুটা হলেও ছোঁয়া ছিল। পুলিশের উপস্থিতি নিয়মিত দেখা যেত, লাইসেন্স বা ফিটনেস–সংক্রান্ত কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ছিল তুলনামূলক বেশি আর গণপরিবহনব্যবস্থাও কিছুটা হলেও নিয়মতান্ত্রিক ছিল।

এখনকার মতো এমন চরম বিশৃঙ্খলা ও আইনভঙ্গের দৃষ্টান্ত তখন এত ব্যাপক ছিল না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও অব্যাহত দুর্নীতি ধীরে ধীরে নিয়মশৃঙ্খলার ভিত্তিগুলো ভেঙে দিয়েছে। আজ আমরা যা দেখছি, তা হঠাৎ ঘটে যাওয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবক্ষয়ের ফল। যত দিন না আমরা এই মুনাফাভিত্তিক দুষ্টচক্র ভেঙে ফেলতে পারব, তত দিন পর্যন্ত যেকোনো সংস্কার, তা যত ভালো পরিকল্পিত বা সদিচ্ছাসম্পন্নই হোক না কেন, ব্যর্থই হয়ে যাবে।

নীতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

এসবের মধ্যেও যখনই কোনো নীতি প্রণয়ন করা হয়, বাস্তব প্রেক্ষাপট থেকে তা হয় প্রায়ই বিচ্ছিন্ন। একদিকে শহরজুড়ে বাস রুট রেশনালাইজেশনের মতো পরিকল্পনা করা হলো, যার মাধ্যমে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামক ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল রুটগুলো একীভূত করা, শৃঙ্খলা আনা।

কিন্তু সেই উদ্যোগ আটকে গেল মালিকদের চাপে। সরকারকেও শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে হলো। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব অংশীদারের মতামত নিয়ে এ ধরনের পরিকল্পনায় তাঁদের ব্যবসায়িক বা স্বার্থের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে অগ্রসর হওয়া উচিত।

অন্যদিকে নীতিনির্ধারকেরা নিজেরা থাকেন সাধারণ নাগরিকের ভোগান্তি থেকে বিচ্ছিন্ন। ভিআইপি বহর নিয়ে সাইরেন বাজিয়ে সড়ক খালি করে নীতিনির্ধারকেরা চলে যান, একজন সাধারণ নাগরিকের অ্যাম্বুলেন্স হয়তো তখন ট্র্যাফিক জ্যামে আটকে থাকে।

বিলম্ব, ঝুঁকি অথবা অস্বস্তি—সাধারণ মানুষকে পরিবহনব্যবস্থার কারণে এসব যেভাবে পোহাতে হয়, নীতিনির্ধারকদের গাড়ির কাচ ভেদ করে তা ঢুকতে পারে না। ফলে তৈরি হয় এক বিশাল দূরত্ব, যা শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবে নয়, বরং অভিজ্ঞতার বিচ্ছিন্নতার কারণেও গভীরতর হয়।

পরিবহন খাতের দায়িত্বে যাঁরা, তাঁদের বিবেচনায় অগ্রাধিকার পায় সেই সব কাজ, যেগুলো সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় আসে সহজে বা খবরের শিরোনাম হয়। বাংলাদেশে বাস্তবতা হলো, বেশির ভাগ পরিবহন প্রকল্পে ব্যবহারযোগ্যতার চেয়ে দৃশ্যমানতাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।

সমস্যার মূলে অকার্যকর শাসনব্যবস্থা

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থার সংকট কেবল একটি ‘সেক্টরাল’ সমস্যা নয়। এটি এক গভীর শাসনব্যবস্থার সংকট। আমাদের রাস্তাগুলোর বিশৃঙ্খলা কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, দুর্নীতি ও নীতিবিচ্ছিন্নতার অনিবার্য ফলাফল।

২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিল যে পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু এই বোঝা শিক্ষার্থীদের একার নয়। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই দায়িত্ব নিতে হবে। প্রশ্ন হলো, কে এই দায়িত্ব নেবে? ব্যর্থ হলে তাদের জবাবদিহি কে করবে?

যদি আমরা সত্যিই সুষ্ঠু নাগরিক সড়কব্যবস্থা চাই, তবে প্রথমে আমাদের এই বিরাজমান শাসনব্যবস্থার ভাঙনকে স্বীকার করতে হবে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং শাসনব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের সবার আগে রাস্তায় বিরাজমান এই দুর্নীতির সংস্কৃতির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, যানজট বা দুর্ঘটনা কেবল উপসর্গ; আসল রোগ হলো দুর্বল শাসন ও দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা।

* সাজেদুল হক, উন্নয়নবিশেষজ্ঞ ও প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ট্রাফিক অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট ফোরাম
- মতামত লেখকের নিজস্ব

যানজটে স্থবির রাজধানীর বনানী এলাকার একটি সড়ক
যানজটে স্থবির রাজধানীর বনানী এলাকার একটি সড়ক। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

Sunday, November 29, 2009

ধীরে চালাও তরণী -চিরকুট by শাহাদুজ্জামান

ওয়াশিংটনের একটি মেট্রো স্টেশনে সকালবেলা বেহালা বাজাতে শুরু করেন একজন। স্টেশনে শত শত মানুষের ঢল। মহা ব্যস্ততায় কাজে যাচ্ছেন সবাই। বেহালাবাদকের দিকে লক্ষ করার ফুরসত নেই কারও। বেহালাবাদক মহান সুরকার সিবাস্তিয়ান বাখের সুর বাজাতে থাকেন।
একজন মাঝবয়সী লোক বেহালাবাদকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁর গতি একটু শ্লথ করেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মেট্রো আসতেই দ্রুত চলে যান তিনি। কিছুক্ষণ পর সেই বাদক তাঁর দিনের প্রথম কয়েনটি পান। আরও কিছু সময় পেরিয়ে গেলে একজন মহিলা চলতে চলতেই ফ্লোরে উল্টে রাখা বেহালাবাদকের টুপিতে ছুড়ে দেন আরেকটি কয়েন। মানুষের স্রোত চলেছে বেহালাবাদকের চারপাশ দিয়ে। একজন লোক সামনের দেয়ালে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ বেহালা শোনেন কিন্তু একটু পরই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে সরে পড়েন। বেহালাবাদকের দিকে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেয় একটি তিন বছরের শিশু। শিশুটি বেহালাবাদকের সামনে দাঁড়িয়ে একাগ্র হয়ে বেহালা শোনার চেষ্টা করে। কিন্তু তার মা তাকে ঠেলে নিয়ে যেতে থাকলে শিশুটি হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ঘুরিয়ে যতক্ষণ সম্ভব বেহালাবাদককে দেখতে থাকে। বেহালাবাদক ঘণ্টাখানেক পর তাঁর বাজনা থামান। বলা বাহুল্য, কোনো তালি বাজে না। মেট্রো স্টেশনে হঠাত্ নেমে আসে সংগীতহীন নীরবতা। বেহালাবাদক তাঁর টুপির কয়েনগুলো গুনে দেখেন, রোজগার হয়েছে সাকল্যে ৩২ ডলার।
কেউ টের পায় না, মেট্রোতে এতক্ষণ যিনি বেহালা বাজালেন তিনি আসলে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাদকদের একজন, জোসুয়া বেল, যাঁর সংগীত বিক্রি হয় মিলিয়ন ডলারে। মাত্র দুই দিন আগে বোস্টনে যাঁর কনসার্ট হয়ে গেছে, যে কনসার্টের প্রতিটি টিকিটের দাম ছিল ১০০ ডলার; কিন্তু একটি সাধারণ স্থানে, অনুপযোগী একটি সময়ে, অপ্রত্যাশিত একটি পরিস্থিতিতে কেউই চিনে উঠতে পারেনি জোসুয়া বেলকে। বেল মেট্রোতে ভিখারি সেজে বেহালা বাজিয়েছিলেন বস্তুত একটি গবেষণার অংশ হিসেবে। গবেষকেরা প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, মানুষ যখন তাড়ায় থাকে তখন তার পক্ষে সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব হয় না। তার সামনে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী শ্রেষ্ঠতম সুর বাজালেও তা তার নজর এড়িয়ে যায়।
তাড়াহুড়ায় হয়তো অবিরাম আমরা জীবনের এমনি ছোট-বড় অগণিত মাধুরী উপেক্ষা করে যাচ্ছি। আমরা সবাই বস্তুত একেকটি তাড়া খাওয়া প্রাণীতে পরিণত হয়েছি। সিংহের হুঙ্কারে ভীত তাড়া খাওয়া জেব্রা যেমন ছুটে চলে প্রান্তরে। জীবিকার প্রতিযোগিতায় সিংহ হুঙ্কার দিচ্ছে পেছনে আর আমরা ছুটে চলেছি সবাই। প্রান্তরেই ছুটছি। জানি না, কোথায় ঠিক নিরাপদ আশ্রয়। ছুটে চলা মানুষের সময় কোথায় কাচপোকার ওড়াওড়ি দেখার। কান পেতে শোনার, কে গাইছে ‘পাগলা মনটারে তুই বাঁধ’। সৌন্দর্য উপভোগ করানোর জন্য চাই অবসর। ছুটে চলা মানুষ একে অন্যকেও বা জানবে কী করে? জীবনের লেনদেন এতটাই ব্যস্ত করে ফেলেছে আমাদের যে আমরা একে অন্যের কাছ থেকে কেবলই দূরে সরে যাচ্ছি, যেমন মহাশূন্যে তারারা নিরন্তর একে অন্যের কাছ থেকে দূরে সরে যায়। সব পাখি ঘরে ফিরলে, জীবনের সব লেনদেন ফুরালে যে অন্ধকার নামে সেখানে স্থির হয়ে মুখোমুখি বসলেই কেবল বনলতা সেনকে চেনা যায়।
জীবনের লেনদেন পশ্চিমা দুনিয়ায় এসে ঠেকেছে ভোগে আর আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে নিছক টিকে থাকায়। দুটোর জন্যই ছুটতে হচ্ছে দুই পক্ষকে। সব মিলিয়ে আমাদের তুমুল ব্যতিব্যস্ত রাখছে জীবন। পশ্চিমা দুনিয়ার দ্রুততা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন এখানকার চিন্তাবিদেরাও। লেখক মিলান কুন্ডেরা সম্প্রতি উপন্যাস লিখেছেন স্লোনেস নামে। দ্রুততাকে তিনি তুলনা করেছেন বিস্মৃতির সঙ্গে, গতির মানসিক নেতিবাচকতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়েছেন তিনি। বাংলা উপন্যাসের পাঠকের কাছে অবধারিত মনে পড়ে যাবে যাযাবরের সেই পুরোনো সংলাপ, ‘বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কেড়ে নিয়েছে আবেগ’। শুধু আবেগ নয়, পশ্চিমা দুনিয়ায় এখন জীবনই কেড়ে নিচ্ছে বেগ। ডায়রিয়া, যক্ষ্মা নয় পশ্চিমা বহু দেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ এখন মোটরগাড়ি অ্যাকসিডেন্ট। নিজেদের তৈরি বাহারি গাড়িতে দ্রুততম সময় ছুটতে গিয়ে অবিরাম মরছে তারা। বহুকাল আগে জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, ‘মোটরগাড়ি আমার কাছে একটা বড় খটকার ব্যাপার মনে হয়। আমি যেখানে যেতে চাই সেখানে পায়ে হেঁটে যাবার অবসর আমার আছে।’ ব্যাপারটিকে নেহাত কবিসুলভ রোমান্টিকতা মনে হলেও কৌতূহলোদ্দীপকভাবে দেখতে পাচ্ছি, মোটরগাড়ি একটা খটকার ব্যাপার বলেই আজকাল জোরে আওয়াজ তুলছে পশ্চিমা দেশের বহু মানুষ। পরিবেশবিদেরা গাড়ির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন।
ইউরোপের প্রায় ৪০টি দেশ বছরে এক দিন গাড়িবিহীন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ করে উচ্চ পার্কিং মূল্য ধার্য করে গাড়িকে নিরুত্সাহিত করার চেষ্টা চলছে। খটকার মোটরগাড়িগুলো আমাদের মতো চাপা শহরগুলোতে গাদাগাদি করে পাঠিয়ে ইউরোপের শহরগুলোতে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে বাইসাইকেল। বিপদ টের পেয়ে গতি শ্লথ করার একটা হাওয়া ওঠালেও ব্যাপারটি অত সহজ হচ্ছে না, কারণ পেছন থেকে শিং দিয়ে ঠেলছে গাড়ি ব্যবসায়ীর দল। আর শিং তো মনের ভেতরেই গজিয়েছে সবার, যে শিং বিলাসের, প্রতিযোগিতার। সেই শিংয়ের গুঁতোয় ছুটে চলা আর থামছে না। ছুটতে গিয়ে ওরা মরছে আর আমরা জট পাকিয়ে বসে আছি। কে জানে হয়তো রক্ষা হতো পুরোপুরি ডোবার আগে কেউ যদি সবার কানে কানে বলে যেত, ‘নাইয়া, ধীরে চালাও তরণী।’
শাহাদুজ্জামান: কথাসাহিত্যিক।

সড়ক কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে -সিলেটের ‘ভিআইপি’ সড়কের করুণ অবস্থা

সড়ক ও জনপথের সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের অবস্থা খুবই করুণ। ‘ভিআইপি’ প্রকল্পভুক্ত পাঁচ কিলোমিটার সড়ক খানাখন্দে ভরে গেছে। কার্পেটিং উঠে মাটিও দেবে গেছে বেশ কিছু জায়গায়। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে লোকজন। অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের।
বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোর এক সচিত্র প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘ভিআইপি’ প্রকল্পের আওতাধীন সড়কটির উন্নয়নে ২২ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও এটি ২২ মাসও টেকেনি। কাজ সম্পন্ন করার পর ছয় মাস যেতে না যেতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে গর্ত ও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আবার সংস্কার করা হয়। কিন্তু সংস্কার করা অংশেও খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাত্ সংস্কারের সময় যথাযথভাবে কাজটি করা হয়নি, মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি। কেন তা হয়নি, তা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। সংস্কারের জন্য বরাদ্দ করা অর্থ যথাযথভাবে খরচ না করে পকেটে পুরে ফেলা হলেই এমন হওয়ার কথা।
সড়ক উন্নয়ন খাতে দুর্নীতির সংবাদ প্রতিনিয়ত পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও লাগামহীন দুর্নীতি পরিস্থিতি ভয়াবহ করে তুলেছে। তাই সিলেটের সড়কটি সংস্কার হওয়া সত্ত্বেও এত দ্রুত কেন এ অবস্থা হলো, তা তদন্ত হওয়া দরকার। উন্নয়নকাজের দায়িত্ব যারা পেয়েছিল, তারা কী প্রক্রিয়ায় পেয়েছিল আর কীভাবে তা বাস্তবায়িত হলো, তা খতিয়ে দেখা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। আর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজ তদারকির দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা কী করেছে সেটাও দেখতে হবে। কোনো ভাগবাটোয়ারার ব্যাপার না থাকলে তো এই নিম্নমানের কাজ অনুমোদন হওয়ার কথা নয়।
ভালো যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার ওপর। সন্দেহ নেই, সড়কের করুণ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে কর্তৃপক্ষের অযত্ন ও অবহেলা অনেকাংশে দায়ী। জবাবদিহির অভাবে তারা পার পেয়ে যায়। সংস্কারের পরও সড়কের করুণ অবস্থা কেন হলো, এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষকে দিতে বাধ্য করা হলে এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা গেলে এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটবে বলে আশা করা যায়।

Tuesday, September 15, 2009

ঈদে পরিবহন-ভোগান্তি নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরার বন্দোবস্ত করা সরকারেরই দায়িত্ব

ঈদের আগে ঘরে ফেরা মানুষের পরিবহন-ভোগান্তি যেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে বসেছে। বছরের পর বছর যাত্রীসেবার বেহাল দশা। জনপরিবহন যেন আমাদের সার্বিক অব্যবস্থাপনার মূর্তিমান প্রতীক।
জানা কথা, ঈদের আগে লাখ লাখ মানুষ ঘরে ফেরার তাড়ায় থাকবে। এটাও জানা কথা, এ খাতে পরিবহনসংকট, টিকিট নিয়ে কালোবাজারি, নিম্নমানের যাত্রীসেবাও বহাল থাকবে। যেখানে চাপটা পড়ে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলাগামী পরিবহনে, সেখানে ঈদের জন্য অতিরিক্ত যানবাহন জেলাগুলো থেকে আনা হয় না কেন? সর্বোপরি, সড়কপথে আরও সরকারি ট্রেন-বাস এবং নৌপথে আরও সরকারি লঞ্চ-স্টিমারের বন্দোবস্ত করতে অসুবিধা কোথায়? সদিচ্ছার অভাব? তাহলে এর উত্স— সরকার যে জনগণের সেবক, এই প্রয়োজনীয় কথাটি মান্য না করার মধ্যে। পরিবহন ব্যবসায়ীরাও কম যান না। ঈদে ভাড়া বাড়ে, যাত্রীদের টিকিট পাওয়া হয়ে দাঁড়ায় সোনার হরিণ পাওয়ার মতো অসাধ্য।
ভোগান্তিটা বেশি হয় ঢাকা নগরে এবং নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তরাই এর বেশি শিকার হয়। অন্যদিকে রাতের যাত্রীরা প্রায়ই ছিনতাই-রাহাজানির শিকার হয়। তাই পুলিশ প্রশাসনের আরও তত্পর হওয়া চাই। ঈদ ও শারদীয় দুর্গোত্সব এবার পর পর হওয়ায় গ্রামে ফেরার টানও বেশি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উচিত, সরেজমিনে তদারক করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং টিকিট বিক্রয়কেন্দ্র ও বাসস্টপে নজরদারি বাড়ানো।
বাংলাদেশে সমাজের শেকড় এখনো গ্রামে; শহরবাসী মানুষের মনের শেকড়ও গ্রামেই পোঁতা থাকে। দেশের মানুষ তখন ‘দেশের’ মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়। এই সুযোগ থেকে কেউই যাতে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
শহরের মানুষের এভাবে গ্রামে ফেরা গ্রাম-শহরের দেওয়া-নেওয়াকেও বাড়ায়। ঈদ নিছক উত্সব নয়, উেস ফেরার ডাক। সেই ডাক আরও বহুকাল আসুক, মানুষ নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরুক—সেটাই প্রত্যাশা।