Showing posts with label এবনে গোলাম সামাদ. Show all posts
Showing posts with label এবনে গোলাম সামাদ. Show all posts

Sunday, January 24, 2016

উনিশশো একাত্তরের যুদ্ধে জ্যাকবের ভূমিকা by এবনে গোলাম সামাদ

জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। ভারতে গণতন্ত্রের সাফল্যের একটি কারণ হলো, ভারতের সেনাবাহিনীর গণতন্ত্রকে মেনে নেয়া। ভারতের সেনাবাহিনী কখনো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে প্রয়াসী হয়নি। তারা থেকেছে বেসামরিক নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদেরই বিশেষ নিয়ন্ত্রণে। যেটা পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে হতে পারেনি। যদিও পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য হলো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর রেখে যাওয়া। ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক রূপ হলো একই রকম। যেটা ছিল ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীর। কিন্তু ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মনোভাব ঠিক একই খাতে প্রবহমান হতে পারেনি। গণতান্ত্রিক চিন্তাচেতনা ভারতের সেনাবাহিনীতে যতটা প্রথিত হতে পেরেছে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে সেটা হতে পারেনি, যদিওবা ঐতিহাসিক কারণে হতে পারত। কেননা, এই তিন দেশের সেনাবাহিনী বহন করে চলেছে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সংগঠন কাঠামো। তবে একটা বিষয়ে ছিল বড় রকমের ফাঁক। ভারত পেয়েছিল যথেষ্ট সংখ্যক সিভিলসার্ভেন্ট। সাবেক পাকিস্তান তা পেয়েছিল না। তার ছিল দেশ চালাবার লোকের অভাব। সরকার হয়ে পড়েছিল দুর্বল। সেনাবাহিনী ছিল দেশের সবচেয়ে সুসংগঠিত অংশ। তাকে তাই এগিয়ে আসতে হয়েছিল রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে দেশ চালাবার কাজে। ভারতে যে প্রয়োজন উত্থাপিত হয়নি। এ ছাড়া ভারতের জনসাধারণ ছিলেন অনেক রাজনীতিসচেতন। যে সচেতনতার অভাব ঘটেছিল সাবেক পাকিস্তানে।
একটা কথা প্রচলিত আছে, যে দেশের মানুষ যেমন সে দেশের মানুষ তেমন সরকারই লাভ করে থাকে। কথাটা সম্ভবত প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের। ভারতের সংবিধান অনুসারে ভারতের সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ নির্দেশদাতা হলেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট বা রাষ্ট্রপতি। তিনি হলেন Commander-in-Chief of all the Defence Forces অর্থাৎ স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনীর প্রধান। কিন্তু ভারত একটি প্রেসিডেন্ট শাসিত দেশ নয়। ভারতের প্রেসিডেন্টকে চলতে হয় মন্ত্রিপরিষদের নির্দেশে।মন্ত্রিপরিষদকে মানতে হয় বিধান পরিষদের মতামত। ভারতের সমরনীতি নির্ধারণের দায়ভার মন্ত্রিসভার ওপর ন্যস্ত। তবে এ জন্য রয়েছে একটি বিশেষ কমিটি। যার চেয়ারম্যান হলেন প্রধানমন্ত্রী এবং এতে থাকেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রী। আরো থাকেন স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান নির্দেশক বা Chief of the Staff। এ ছাড়া থাকেন প্রতিরক্ষা সচিব এবং সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা। এই বিশেষ কমিটিতে রণনীতি নির্ধারণের সময় বিবেচনা করা হয় পররাষ্ট্রনীতি, দেশের অর্থনৈতিক ক্ষমতা এবং সেনাবাহিনীর বিদ্যমান অবস্থা নিয়ে; রণ কৌশল নিয়ে নয়। সেটা স্থির করা বিশেষভাবে ন্যস্ত থাকে সেনাবাহিনীরই ওপর। রণনীতি ও রণকৌশলকে এক করে দেখা হয় না। রণনীতি ঠিক করার জন্য একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি হলো বিশেষ বিবেচ্য। কোন রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ হতে পারে আর কোন রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ হতে পার না, সেটা নিয়ে আলোচনা রণনীতি ঠিক করার ক্ষেত্রে পেতে চায় বিশেষ বিবেচনা। সেনাপতিদের পক্ষে সেটা ঠিক করা সম্ভব নয়। অন্য দিকে, রণকৌশল সেনাবাহিনীর বিরাজমান অবস্থার ওপর নির্ভর করে থাকে। তাই সেটা সেনাবাহিনীর বিশেষ বিবেচ্য বলে মনে করা হয়।
ভৌগোলিক দিক থেকে ভারতের স্থলবাহিনীকে (Army) চারটি এলাকায় বিভক্ত করা হয়েছে। এদের প্রত্যেক এলাকার প্রধানকে বলা হয় Lieutenant-General । ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলের সেনাসদর হলো মহারাষ্ট্রের পুনা (পুনে), মধ্য অঞ্চলের সামরিক কর্মকর্তার সদর দফতর যুক্ত প্রদেশের লাখনৌ শহরে। পশ্চিম কমান্ডে সেনা সদর দফতর হলো সিমলা। আর পুবের সেনা কমান্ডের সদর দফতর কলকাতা। প্রত্যেক লেফটেন্যান্ট জেনারেলের এলাকা আবার ছোট ছোট এলাকায় বিভক্ত থাকে। যার নিয়ন্ত্রণ থাকে Major-General-এর ওপর। মেজর জেনারেলের এলাকা আবার বিভক্ত থাকে ব্রিগেড এলাকায়। যার নিয়ন্ত্রণ থাকে Brigadier-এর ওপর। এই কাঠামো বাংলাদেশেরই মতো।
ভারতের নৌবাহিনীর আছে চারটি ঘাঁটি। এই ঘাঁটিগুলো একেকটি নৌ-কমান্ডের অধীন। পশ্চিমের নৌ-কমান্ড অবস্থিত বোম্বে (মুম্বাই)। দক্ষিণের নৌঘাঁটি অবস্থিত কেরেলার কোচিনে। পুবের নৌঘাঁটি অবস্থিত অন্ধ্র রাজ্যের বিখ্যাত বন্দর বিশাখাপত্তনমের লাগোয়া। চতুর্থ ঘাঁটি প্রয়োজনে স্থাপন করা হয় সমুদ্রের বুকে রণতরীর সমন্বয়ে। যাকে বলে Fleet।
ভারতে বিমানবাহিনীর চারটি কমান্ড কাছে। এর ট্রেনিং কমান্ড অবস্থিত হলো কর্নাটক প্রদেশের রাজধানী ব্যাঙ্গালরে (ব্যাঙ্গালুরু)। সামরিক বিমান রক্ষণাবেক্ষণের কমান্ড হলো মধ্যপ্রদেশের নাগপুর। পশ্চিম কমান্ড হলো দিল্লির কাছে পালামে। কেন্দ্রীয় কমান্ড হলো কলকাতায়। আর পূর্ব কমান্ড হলো মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যে প্যারাসুট বাহিনী ভারত টাঙ্গাইলে পাঠিয়েছিল, তা এসেছিল শিলং থেকে।
১৯৭১ সালে ভারতের পূর্ব কমান্ডে ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত সিং অরোরা। তার অধীনে ছিলেন মেজর জেনারেল জ্যাকব। এরা উভয়ই ছিলেন চিফ অব দি আর্মি স্টাফ। সাম মানেকশ (Sam Manekshaw)-এর কমান্ডে। মানেকশ ধর্মে ছিলেন পার্সিক অর্থাৎ অগ্নিপূজারী। তার মাতৃভাষা ছিল গুজরাটি। জগজিৎ সিং অরোরা ছিলেন ধর্মে শিখ। তার মাতৃভাষা ছিল পাঞ্জাবি। যা লেখা হয় গুরুমুখী অক্ষরে; দেবনাগরী অক্ষরে নয়। জে এফ আর জ্যাকব ধর্মে ছিলেন ইহুদি। তার পূর্বপুরুষ বাইরে থেকে এসে কলকাতায় উপনিবিষ্ট হন। জ্যাকব জন্মেছিলেন কলকাতায়। তিনি তাই বাংলা বুঝতে ও বলতে পারতেন। যদিও তার ভাষা কার্যত ছিল ইংরেজি। মানেকশ ও অরোরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন পেশাজীবী সৈনিক হিসেবে, কোনো আদর্শের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে নয়। কিন্তু জ্যাকব যোগ দিয়েছিলেন একজন ইহুদিবাদী হিসেবে। তিনি চেয়েছিলেন হিটলারের পরাজয়। তিনি ছিলেন সাবেক প্যালেস্টাইনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও পক্ষে। ইহুদিদের সাথে আরব মুসলমানদের বৈরিতার কারণে তিনি সাধারণভাবেই হয়ে উঠেছিলেন মুসলিমবিদ্বেষী। তিনি চেয়েছিলেন পাকিস্তানকে ভেঙে দিতে এমনকি বিলুপ্ত করতে। যে মনোভাব মানেকশ ও অরোরার মধ্যে ছিল না।
জে এফ আর জ্যাকব ছিলেন ভারতের পূর্ব রাণাঙ্গনের একজন মেজর জেনারেল। তিনি সেনাবাহিনীতে খুব জনপ্রিয় ছিলেন না। কিন্তু ছিলেন একজন কৃতী রাজনীতিবিদ। করতেন জিওনিস্ট রাজনীতি। তিনি একটি বই লিখেছেন। যার নাম Surrender At Dacca : Birth of a Nation । যাতে তিনি লিখেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে দেখা করেন প্রাবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দীনের সাথে। তাজ উদ্দীনের সাথে তার দীর্ঘ আলাপ হয়। অনেকে মনে করেন, জ্যাকবের মাধ্যমেই ইসরাইলের কর্মকর্তাদের সাথে তাজ উদ্দীনের প্রথম যোগাযোগ ঘটে। পরে তাজ উদ্দীন আব্দুস সামাদ আজাদকে পাঠিয়েছিলেন তেলআবিব। ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সারা বিশ্বের ইহুদি-অর্থে পরিচালিত পত্রপত্রিকায় প্রচার শুরু হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে। জ্যাকব তার বইতে লিখেছেন, ১৯৭১-এর যুদ্ধের ব্যাপারে ভারতকে উপদেশ দিয়ে ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা সমর বিশারদেরা। যাদের উপদেশের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন মানেকশ।
জ্যাকব ভারতের সেনাবাহিনী থেকে অবসর পান ১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে। হাসিনা সরকার তাকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করেন ২০১২ সালের ২৭ মার্চ। সম্মাননা নেয়ার সময় জ্যাকব মঞ্চে দাঁড়িয়ে দর্শকদের সামরিক অভিবাদন দেন এবং বলেন, জয়বাংলা (বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১৪ জানুয়ারি ২০১৬)। কেন এতদিন পরে জ্যাকবকে বীর উত্তম উপাধি দেয়া হয়েছিল তা নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত আছে। একটি মত হলো জগজিৎ সিং অরোরা বাংলাদেশ হওয়ার পর হয়ে ওঠেন স্বাধীন শিখরাজ্য প্রতিষ্ঠার বিশেষ সমর্থক। ভারতে শিখদের খালিস্থান আন্দোলন ইন্দিরা গান্ধী কঠোরহস্তে দমন করেন। এটা করতে গিয়ে তিনি ভেঙে ফেলেন শিখদের অমৃতসরের বিখ্যাত স্বর্ণমন্দির, যা পরে আবার নির্মাণ করা হয়। বহু শিখ এর জন্য ইন্দিরা গান্ধীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। দিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধীর দুজন দেহরক্ষী গুলি করে ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করে (১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর)। এরা ছিলেন শিখ স্বাধীন রাষ্ট্র, বা খালিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। দিল্লিতে হিন্দুরা অতর্কিতে শিখদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে প্রায় তিন হাজার শিখকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার এখনো হয়নি। সারা ভারতে শিখ বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে। একসময় ভারতের সেনাবাহিনীতে শিখরা ছিলেন শতকরা ৩০ ভাগ। এখন আর ভারতের সেনাবাহিনীতে শিখদের আগের মতো নেয়া হচ্ছে না। ভারতের সেনাবাহিনীতে শিখদের সংখ্যা নেমে এসেছে শতকরা ১০ ভাগের নিচে। জগজিৎ সিং অরোরা ছিলেন শিখ। তা ছাড়া তিনি হয়ে উঠেছিলেন খালিস্তান আন্দোলনের সমর্থক। এ জন্য ১৯৭১-এর যুদ্ধে জগজিৎ সিং অরোরার অবদানকে ভারত সরকার মুছে ফেলার চেষ্টা করেন। তার স্থলে বিশেষভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন জে এফ আর জ্যাকবের ভাবমর্যাদা। ভারত সরকার নাকি শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করেন জ্যাকবকে বীর উত্তম খেতাব দেয়ার জন্য। তবে বিষয়টি এখনো হয়ে আছে রহস্যঘেরা। এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলা যায় না। ভারতের আর কাউকে ১৯৭১-এর যুদ্ধের জন্যে বীর উত্তম খেতাব দেয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। শুধু কেবল জ্যাকবকেই বীর উত্তম খেতাব দেয়া হলো। সেটা হয়ে আছে একটা জিজ্ঞাসার ব্যাপার। জ্যাকব মারা গেলেন হাসপাতালে পরিণত বয়সে (১৯২৩-২০১৬)। তার মৃত্যুর পর আমাদের এক পত্রিকায় লেখা হলো, আর নেই মুক্তিযুদ্ধের সেই নায়ক জেনারেল জ্যাকব। কিন্তু ১৯৭১ সালে জ্যাকব ছিলেন মেজর জেনারেল। তাকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নির্দেশে। জ্যাকব লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে উন্নিত হন ১৯৭২ সালে। জ্যাকব রাজনীতি করেছিলেন। তাজউদ্দীন সরকারের সাথে যোগাযোগ ঘটিয়েছিলেন ইসরাইল সরকারের। কিন্তু তিনি ১৯৭১ এর রণকৌশল গঠনে কোনো বিশেষ অবদান যে রেখেছিলেন, তা নয়। রণকৌশল রচনা করেছিলেন প্রধানত জগজিৎ সিং অরোরা। আর তিনি সেটা করেছিলেন সাম মানেক’শ-এর অনুমোদন সাপেক্ষে। বলা হয় জ্যাকব নাকি রচনা করেছিলেন পাকিস্তানের পূর্ব কমান্ডের লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিল। এটা কত দূর তা বিচার করে দেখার মতো তথ্য আমাদের হাতে নেই। সাধারণত এসব দলিল রচনার সময় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন একটা দেশের আইন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু জ্যাকব কোনো আইন বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। বলা হয় নিয়াজি শর্তহীনভাবে ভারতের পূর্ব কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু মনে করার কারণ আছে, নেপথ্যে ভারতের সাথে কিছু সমঝোতা (Agreement) চুক্তি হতে পেরেছিল। যে কারণে পাকিস্তানের পূর্ব কমান্ডের সব আত্মসমর্পণকারী সৈন্যদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভারতে। কাউকেই রাখা হয়েছিল না বাংলাদেশে। এসব বন্দীর (POW) সবাইকেই ছেড়ে দেয়া হয় ১৯৭২ সালের ৩ জুলাই সিমলায় ভারত-পাকিস্তান চুক্তি হওয়ার পর। সিমলা সম্মেলনে কেবল উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তান ও ভারতের প্রতিনিধিরা। সিমলা চুক্তিপত্রে ভারতের পক্ষ থেকে সই করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, আর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সই করেছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। সিমলা সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে কেউ উপস্থিত ছিলেন না। বাংলাদেশের কাউতে এই সম্মেলনে ডাকাই হয়নি। সিমলা চুক্তিতে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে উল্লেখ করা হয়েছে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। বলা হয়নি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ভুট্টো নাকি কথা দিয়েছিলেন, যে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধাপরাধ করেছেন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তাদের বিচার করা হবে পাকিস্তানে কোর্টমার্শালে। কিন্তু এসব সামরিক কর্মকর্তা পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধাপরাধ করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। যা ছিল পূর্ব পাকিস্তান তাই পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রে। এ জন্য তাদের বিচার হওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশে। কিন্তু তা হতে পারেনি।
জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের আমন্ত্রণে ১৯৭৪ সালের ২৭ জুন বাংলাদেশে এসেছিলেন সরকারি সফরে। তিনি ২৯ জুন ঢাকা ত্যাগ করেন। যাওয়ার আগে তিনি শেখ মুজিবকে পাকিস্তানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানান। শেখ মুজিব তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। শেখ মুজিব জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে কিছু আলোচনা করেছিলেন বলে শোনা যায় না। ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সেক্রেটারি অব স্টেট ২৯ ঘণ্টার জন্য ঢাকায় সরকারি সফরে আসেন। এ সময় তিনি শেখ মুজিবের সাথে কথোপকথনে ১৯৭১-এর যুদ্ধকে উল্লেখ করেন গৃহযুদ্ধ (Civil War) হিসেবে। শেখ মুজিব তার এই উক্তির কোনো প্রতিবাদ করেছিলেন না। ১৯৭১ এর যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ ছিল, না সাবেক পাকিস্তানের মধ্যে একটা গৃহযুদ্ধ ছিল, সেটা নিয়ে থেকে গিয়েছে একটা অস্পষ্টতা। কেননা, শেখ মুজিব হেনরি কিসিঞ্জারের উক্তির কোনো প্রতিবাদ করেননি।
শেখ মুজিব ১৯৭১ সালে ঠিক কী চেয়েছিলেন আমরা তা আন্দাজ করতে পারি না। কেননা এ বিষয়ে আন্দাজ করতে পারার মতো যথেষ্ট তথ্য আমাদের হাতে নেই। তবে কতগুলো ঘটনার কথা মনে করা যেতে পারে। শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন। তিনি রাওয়ালপিন্ডি থেকে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের একটি বিশেষ বিমানে করে যাত্রা করেন লন্ডনে। সাংবাদিক মাসকারেনহাস তার লিখিত Bangladesh : A Legacy of Blood  বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে লিখেছেন, শেখ মুজিব তাকে লন্ডনে ৮ জানুয়ারি বলেন যে, তিনি পাকিস্তানের সাথে সব সম্পর্ক ছেদ করতে যাচ্ছেন না। রাখতে যাচ্ছেন একটা বিশেষ সম্পর্ক (Link)। শেখ মুজিব এরপর ব্রিটেনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্থ হিথের সাথে ঘরোয়া বৈঠক করেন। ১০ জানুয়ারি তিনি লন্ডন থেকে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর একটি বিমানে করে যাত্রা করেন দেশের উদ্দেশে। ঢাকা আসার পথে তিনি দিল্লিতে যাত্রা বিরতি করে দেখা করেন ইন্দিরা গান্ধীর সাথে। দিল্লি থেকে তিনি ঢাকায় ফিরতে চান রয়েল এয়ারফোর্সের একই বিমানে করে। কিন্তু ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রয়েল এয়ারফোর্সের বিমানে করে ঢাকায় না যেয়ে ভারতের একটি বিমানে করে যেতে। কেননা, ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশকে তখনো একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল না। ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশকে একটা পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি প্রদান করে ৪ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু শেখ মুজিব দিল্লি থেকে ভারতীয় বিমানে করে ঢাকায় আসতে চান না। তিনি ঢাকায় ফেরেন ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর বিমানে করে। কেন তিনি এটা করেছিলেন, তা এখনো জানা যায়নি।
দেশে ফেরার পর তার গুরুতর মতভেদ ঘটে তাজউদ্দীনের সাথে। তাজউদ্দীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সাথে সমঝোতা চুক্তি (Agreement) করেছিলেন যে, বাংলাদেশের কোনো পৃথক সেনাবাহিনী থাকবে না, থাকবে কেবল একটা প্যারা-মিলিশিয়া বাহিনী। তিনি তার এই সমঝোতা চুক্তিতে আরো বলেছিলেন যে, বাংলাদেশ সরকার তার পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করবে ভারত সরকারের সাথে আলোচনা করে। শেখ মুজিব তাজউদ্দীনকৃত সমঝোতা চুক্তি মানতে রাজি হন না। তিনি যদি এই সমঝোতা চুক্তি বাতিল করতে না পারতেন, তবে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র না হয়ে পরিণত হতো ভারতের একটি করোদমিত্র রাজ্যে (Protectorate)। এসব কথা বলেছেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তার এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে। জনাব চৌধুরী প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের দিল্লি মিশনের প্রধান ছিলেন। স্বাধীনতার পর দিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ও পরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এক সময় জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হন। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী এই সাক্ষাৎকারটি প্রদান করেন ২৭ ডিসেম্বর ১৯৮৯ সালে (দ্রষ্টব্য : বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ; মাসুদুল হক। প্রচিন্তা প্রকাশনী- ঢাকা। চতুর্থ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১৪০-১৪৩)।
কিন্তু আমাদের পত্রপত্রিকায় লেখা হলো জে এফ আর জ্যাকব ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি না থাকলে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় হতে পারত না।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Saturday, January 2, 2016

পাকিস্তানের এজেন্ট : বিএনপি বনাম আওয়ামী লীগ by এবনে গোলাম সামাদ

বেগম জিয়া সম্প্রতি তার এক বক্তৃতায় বলেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে কতগুলো মানুষ মারা গিয়েছে তার হিসাব এখনো জানা যায়নি। তিনি কী পটভূমিতে কথাটি বলেছেন, তা আমার জানা নেই। তবে ১৯৭১ সালে ঠিক কতগুলো লোক মারা গিয়েছেন তার সঠিক তথ্য যে আছে অজানা, সেটা কোনো বিতর্কের বিষয় হয়ে নেই। বিশেষ করে শর্মিলা বসুর ‘ডেট রেকনিং’ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর। ১৯৭১-এ অনেক ব্যক্তিই মারা গিয়েছেন। তারা যে সবাই ছিলেন বাংলাভাষী, তা নয়। একমাত্র শান্তাহারেই নাকি মারা গিয়েছেন ১৫ হাজার বিহারি বা উর্দুভাষী। ১৯৭১ সালের মৃত্যুর হিসাব নিতে হলে অবাঙালিদেরও মৃত্যুর হিসাব নিতে হবে। কেননা এ সময় সবাই ছিলেন পাকিস্তানের নাগরিক, বাংলাদেশের নাগরিক নন। বেগম জিয়া ইতঃপূর্বে ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনি তার প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে এ বিষয়ে একটি জরিপ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। হঠাৎ করেই কেন তিনি প্রসঙ্গটি টেনে আনা প্রাসঙ্গিক মনে করলেন, তা আমি জানি না। যা হয়ে গিয়েছে তা হলো অতীতের ঘটনা। অতীত নিয়ে জাবর কেটে আমাদের কোনো লাভ হবে না। আমাদের এখন যা ভাবা দরকার তা হলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যা করণীয় সে সম্বন্ধে। কেননা আমাদের বেঁচে থাকতে হবে বর্তমানে; অতীতে নয়।
ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক Leopold Von Ranke (1795-1886) বলেছেন যে, একজন ইতিহাসবিদকে ইতিহাস লিখতে হবে ঘটনা নির্ভরভাবে; মতবাদ নির্ভরভাবে নয়। কারণ মানুষ যদি প্রকৃত তথ্য না জানে, তবে ইতিহাস পাঠ করে সে কিছু শিখতে পারবে না। আসবে বিভ্রান্তিকর উপসংহারের মধ্যে। তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক জাতি বা রাষ্ট্রের স্বাধীন অস্তিত্ব নির্ভর করে তার অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির ওপর। ভুল পররাষ্ট্রনীতি তাকে জড়িয়ে ফেলতে পারে ক্ষতিকর যুদ্ধে। একটা জাতির জীবনে তার নিজের ইতিহাস পর্যালোচনার গুরুত্ব আছে নানা দিক থেকেই। এর মধ্যে একটি হলো তার নিজের উপযোগী পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ। ভুল ইতিহাস একটা জাতিকে তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে করে তুলতে পারে বিভ্রান্ত। কিন্তু আমাদের ইতিহাসবিদেরা যেভাবে ইতিহাস রচনা করছেন, তাতে কেবলই থাকছে ১৯৭১-এর আবেগ; ১৯৭১-এর ঘটনাবলির প্রকৃত বিবরণ নয়। ১৯৭১-এর যুদ্ধ ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর দ্বারা পরিচালিত যুদ্ধ। ১৯৭১-এ বাঙালি-বিহারি সঙ্ঘাতে ইন্ধন জুগিয়েছিল ভারতীয় গোয়েন্দাচক্র। এসব কথা আমাদের ইতিহাসবিদেরা তাদের লেখায় বিবৃত করতে চাচ্ছেন না। ফলে আমরা জানছি কার্যত ভুল ইতিহাস। আর তা থেকে পেতে পারছি নীতি নির্ধারণে ভুল নির্দেশ।
বর্তমান পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে আছে ১৭০০ কিলোমিটার দূরে। বাংলাদেশে নেই কোনো খান সেনা। ভারত ডিঙিয়ে এসে পাঞ্জাবি খান সেনারা এখন আর কোনোভাবেই বাংলাদেশকে দখল করতে সক্ষম হবে না, এটা ধরে নেয়া যায় স্বতঃসিদ্ধভাবেই। ভারতঘেরা বাংলাদেশ দখল করার চেষ্টা করতে পারে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, পাকিস্তান নয়। কিন্তু আমরা যেন ভারতকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে সেভাবে গুরুত্ব না দিয়ে দিতে চাচ্ছি বর্তমান পাকিস্তানকে। যেটা অবশ্যই বলতে হবে বিভ্রান্তিকর বিশ্লেষণ। সম্প্রতি সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, খালেদা জিয়া হলেন পাকিস্তানের এজেন্ট। তার উচিত পাকিস্তানে চলে যাওয়া (আলোকিত বাংলাদেশ, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫)। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলছেন, ভারত পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ চায় না। সে পাকিস্তানের সাথে গড়ে তুলতে চায় মসৃণ সম্পর্ক। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানে নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে জড়িয়ে ধরেছিলেন বুকে। ভারত কেন এটা করছে আমরা তা জানি না। তবে মনে হচ্ছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে আসছে পরিবর্তন। কেননা বিশ্বে শুরু হতে পারে একটা বড় রকমের যুদ্ধ। ভারত চাচ্ছে না সে যুদ্ধে জড়িত হতে। সে চাচ্ছে না দক্ষিণ এশিয়ার কোনো দেশ এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ুক। আর যুদ্ধ এসে যাক ভারতের দুয়ারে। ভারত চাচ্ছে, তার প্রতিবেশী সার্কভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে পক্ষে নিয়ে একটি বিশেষ ব্লক তৈরি করতে; যা তাকে শক্তি জোগাবে বিশ্ব রাজনীতির ধারা নিয়ন্ত্রণে।
১৯৭১-এর বিশ্ব পরিস্থিতি আর আজকের বিশ্ব এক নয়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি তাই হয়ে উঠতে চাচ্ছে অনেক ভিন্ন। কিন্তু আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন দল পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে যেন আঁকড়ে থাকতে চাচ্ছে সাবেক ধ্যান ধারণাকে নিয়ে। হতে চাচ্ছে না এ ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ। রাজনীতি করতে চাচ্ছে কেবলই পাকিস্তানকে সমালোচনা করে। অথচ পাকিস্তান এখন ভৌগোলিক কারণেই আমাদের শত্রু বলে বিবেচিত হতে পারে না। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষতাকে নির্ভর করেই শেষ পর্যন্ত গঠিত হওয়া উচিত একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি। ভারতে মোদির সমালোচনা উঠেছে পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য। একই রকম সমালোচনা উঠছে বিএনপি পাকিস্তানের সাথে অতীত বিবাদ বজায় রাখতে চাচ্ছে না বলে। ভারতে কংগ্রেস যেভাবে মোদির সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে, এ দেশে আওয়ামী লীগ যেন খালেদা জিয়ার সমালোচনায় অনুসরণ করতে চাচ্ছে একই বাগধারা। মনে হচ্ছে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ রাজনীতি করতে চাচ্ছে ভারতের কংগ্রেসের অনুসরণে। কিন্তু ভারতে কংগ্রেস এখন আর ক্ষমতায় নেই। ক্ষমতায় আসার আশু সম্ভাবনা অনুমান করা যাচ্ছে না। ভারতে কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ কংগ্রেসের নীতি অনুসরণ করে শক্তি সঞ্চয় করতে পারত, কিন্তু এখন কংগ্রেসের সাথে একসূত্রে রাজনীতি করতে গেলে সে পেতে পারবে না বর্তমান ভারত সরকারের সাহায্য ও সভানুভূতি। তাই বলতে হয় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভুল পথে হাঁটছে। আর এর ফলে এ দেশের রাজনীতিতে হয়ে পড়তে পারে একদিকে যেমন জনবিচ্ছিন্ন, তেমনি অন্য দিকে হয়ে পড়তে পারে তার শক্তির আদি উৎস ভারত থেকেও যথেষ্ট বিচ্ছিন্ন।
প্রতিটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হয় সে দেশের পার্লামেন্ট অথবা যথাযথভাবে আলোচনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের বর্তমান সরকার সেটা করতে চাচ্ছে না। যদিও পার্লামেন্ট আছে, আর হচ্ছে তার অধিবেশন। কিন্তু সব সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে যেন প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায়। রাষ্ট্র ও প্রধানমন্ত্রী হয়ে পড়েছেন সমার্থক। যা আমাদের রাজনৈতিক সঙ্কটকে করে তুলছে ঘনীভূত। দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মধ্যে পররাষ্ট্রনীতিতে দেখা যাচ্ছে দু’টি ভাগ। এক ভাগ হয়ে উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচক। তারা বলছেন, ইসলামি স্টেটপন্থীরা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এজেন্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের শত্রুরাষ্ট্র নয়। কিন্তু মন্ত্রীপর্যায়ে হতে পারছে তার সমালোচনা। যেটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে আমাদের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে। এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষতি করে বাংলাদেশ কিভাবে লাভবান হবে সেটা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। বাংলাদেশ সিরিয়ার সন্নিকটের দেশ নয়। সিরিয়া সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট জ্ঞাতও নই। অথচ আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলছেন, আমরা সিরিয়ার ব্যাপারে থাকব সৌদি আরবের সাথে। পাকিস্তানও বলছে যে, সে সৌদি আরবের সাথে থাকবে। কিন্তু এমন কিছু করবে না, যা পাকিস্তানের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরানের মিত্রতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সে কোথায় সৈন্য পাঠাবে না পাঠাবে, সেটা ঠিক করবে নিজের জাতি ও স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এ রকম কিছু চাচ্ছে না বলতে।
আসলে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে বর্তমান সরকার ভুগছে স্ববিরোধিতায়। আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা বামচক্র সমর্থন করতে চাচ্ছে রাশিয়াকে। অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন অংশ করতে চাচ্ছে এর বিরোধিতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রুশ দ্বন্দ্ব চলেছে আওয়ামী লীগের মধ্যে। পররাষ্ট্রনীতির ব্যাপারে এভাবে বিভক্ত একটি দল দেশের স্বার্থে যে একটি সুষ্ঠু পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে চলতে পারবে, তা মনে হচ্ছে না। একটি অংশ বলছে, তারা আইএসবিরোধী। আইএস হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা সৃষ্ট। আর মার্কিন স্বার্থে পারিচালিত। অন্য অংশ বলছে, বাংলাদেশে কোনো আইএস নেই। আইএস বাংলাদেশের কোনো সমস্যা নয়। ‘প্রথম আলো’র খবরে প্রকাশ (৩০ নভেম্বর ২০১৫) : কামরাঙ্গীচরে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিমদের সাথে এক আলোচনা সভায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাংলাদেশকে জঙ্গিরাষ্ট্র বানিয়ে কোনোভাবে এ দেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।’ ওই একই সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন- ‘বাংলাদেশে আইএস-এর কোনো কার্যকলাপ বা অস্তিত্ব নেই।’ অর্থাৎ দুই মন্ত্রীর বক্তব্য এ সভাতেই হতে পারছে দুই রকম। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা বলতে পারেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অথবা প্রধানমন্ত্রী, অন্য মন্ত্রীরা নন। কিন্তু এখন অনেক মন্ত্রী কথা বলছেন পররাষ্ট্র বিষয়ে। মনে হচ্ছে, পররাষ্ট্র বিষয়ে এই কলরব হচ্ছে না আমাদের সংবিধানসম্মত। আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রনীতি দেশকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে পারে এক গভীর বিপদের মধ্যে। খালেদা জিয়াকে পাকিস্তানের এজেন্ট বলে সমালোচনা করে সে বিপদকে কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে করতে চাচ্ছেন পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন। অন্য দিকে আমরা রাজনীতি করতে চাচ্ছি যেন কেবলই পাকিস্তানের সমালোচনা করে। কিন্তু পাকিস্তান এখন আর আমাদের কোনো সমস্যা নয় ভৌগোলিক দূরত্বের কারণেই। বিএনপি এখন ক্ষমতায় নেই, নেই বিরোধী দলেও। কিন্তু বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র বিএনপিকে দিচ্ছে যথেষ্ট গুরুত্ব। খালেদা জিয়াকে কাবু করতে হলে তার পেছন থেকে এই আন্তর্জাতিক সমর্থন সরিয়ে নিতে হবে। কিন্তু যেভাবে বিএনপির সমালোচনা করা হচ্ছে, তাতে তার গুরুত্ব আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে না কমে বৃদ্ধি পাওয়াই হবে সম্ভব।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Sunday, March 22, 2015

জুমল্যান্ড গঠনের স্বপ্ন by এবনে গোলাম সামাদ

জুম চাষ বলতে বোঝায় সাধারণত টিলার গায়ে গর্ত করে বীজ বপন করে চাষ করাকে। টিলার গায়ের গাছপালাকে কেটে আগুন ধরিয়ে প্রথমে বন পরিষ্কার করা হয়। কাঠ পোড়া ছাইয়ের স্তরের মধ্যে গর্ত করে বীজ বপন করা হয়। জুম শব্দটা হতে পারে কোলভাষা পরিবার থেকে আগত। কিন্তু শব্দটা ব্যাপক ব্যবহার শুরু করেন ইংরেজরা। সর্বত্র যে জুম কথাটা এই উপমহাদেশে প্রচলিত ছিল, তা নয়। যেমন উত্তর ভারতে এই চাষপ্রথাকে বলা হতো ‘দাহি’। যেহেতু বন পুড়িয়ে বা দাহ করে করা হতো এরকম চাষ; তাই একে বলা হয় দাহি। কিন্তু জুম কথাটাই হতে পেরেছে বিশেষভাবে প্রচলিত। জুম নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। কারণ চাকমা নেতা সন্তু লারমা (জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা) বলছেন, জুমল্যান্ড গড়ার কথা। কিন্তু জুম চাষ যে কেবল চাকমারাই করেন, তা নয়। ভারতে এখন জুম চাষ করা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু একসময় দক্ষিণ ভারতের উরালী উপজাতিরাও জুম চাষ করতেন। মানবধারার দিক থেকে উরালীরা চাকমাদের মতো মঙ্গলীয় মানবধারাভুক্ত নন। তাদের বলতে হয় ইন্দো-অস্ট্রালয়েড। এদের গায়ের রং সাঁওতালদের মতো কালো। চুল মসৃণ তরঙ্গাকৃতি। চোখ আয়ত। নাকের অগ্রভাগ মাংশল। কপালের মধ্যভাগ একটু চাপা। এদের চেহারার সঙ্গে কিছুটা মিল আছে আস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদের। তাই নৃতাত্ত্বিকরা এদের বলতে চান ইন্দো-অস্ট্রালয়েড। পক্ষান্তরে চাকমাদের মাথার চুল খরখরে। মুখে থাকতে দেখা যায় দাড়িগোঁফের অভাব। চোখের ওপর পাতার কোণে থাকতে দেখা যায় বিশেষ রকমের ভাঁজ। যে কারণে এদের চোখ দেখে মনে হয় ছোট। এদের গণ্ডের হাড় অনেক উঁচু। তাই মুখমণ্ডল দেখে মনে হয় সমতল। কেন, কী কারণে চাকমারা জুম চাষ করেন উরালীদের মতো, তার ব্যাখ্যা পাওয়া কঠিন। কিন্তু সন্তু লারমা বলছেন যেহেতু চাকমা, মারমা, গারো, খাসিয়ারা সবাই মঙ্গলীয় মানবধারাভুক্ত, আর তারা সবাই করেন জুম চাষ, তাই এদের সবাইকে নিয়ে গড়তে হবে একটি দেশ, জুমল্যান্ড। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, খাসিয়ারা যেমন জুম চাষ করেন, তেমনি আবার লাঙল দিয়ে চাষাবাদও করেন। কেবলই যে জুম চাষ করেন, তা কিন্তু নয়।
সন্তু লারমা ২০০১ সালের ৩১ মার্চ গড়েন ‘বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম’। এই ফোরামে তিনি গ্রহণ করেছেন সাঁওতালদের। কিন্তু সাঁওতালরা কখনো জুম চাষ করেন না। সাঁওতালরা একসময় ছোট নাগপুরের বনজঙ্গলে শিকার করে এবং ফলমূল আহরণ করে জীবন যাপন করতেন। পরে এরা আরম্ভ করেন লাঙল দিয়ে চাষাবাদ। তবে সাঁওতালদের লাঙল হয় কিছুটা ছোট। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এখন অনেক সাঁওতালের বাস। ছোট নাগপুর অঞ্চল থেকে এসব সাঁওতালকে প্রথম নিয়ে আসেন নীলকর ইংরেজ সাহেবরা, নীলচাষ করার জন্য। সেখান থেকে এরা রাজশাহী অঞ্চলে আসেন ১৯০০ সালে, তার আগে নয়। রাজশাহী জেলার মোট জনসংখ্যার শতকরা দুই ভাগ হলো সাঁওতাল। এরা বাস করেন রাজশাহী জেলার তিনটি উপজেলায়- গোদাগাড়ী, তানোর ও পবা। এদের নিয়ে বিশেষ ধরনের রাজনীতি করছেন ওয়ার্কার্স পার্টি। সন্তু লারমার কথা যে সব সাঁওতাল শুনছেন, এমন নয়। সাঁওতালরা হলেন বাংলাদেশের উপজাতিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ। সাঁওতালরা যদি রাজশাহী ছেড়ে রাঙ্গামাটিতে যেতে চান এবং সেখানে বসতি করতে চান, সন্তু লারমা কি তাতে রাজি হবেন? অনেক অতীতে সাঁওতালরা পার্বত্য অঞ্চলে যেতে চায়নি যে, তা নয়। কিন্তু সেখানে তাদের স্থান হয়নি। বাংলাদেশের চা বাগানে শ্রীহট্ট অঞ্চলে অনেক সাঁওতাল কাজ করেন। চট্টগ্রামের চা বাগানেও তারা যেতে পারতেন; কিন্তু যাননি। সব উপজাতি, চাকমা উপজাতি নন। চাকমাদের সাথে মানবধারাগত মিল আছে মারমাদের। কিন্তু বান্দরবানের মারমাদের সাথে চলেছে রাঙ্গামাটির চাকমাদের বিবাদ। মারমারা বান্দরবানে জুম চাষ করলেও তাদের সাথে চাকমা জুমচাষিদের কোনো আত্মীয়তার বন্ধন গড়ে উঠতে পারেনি। চাকমা এবং মারমারা উভয়ই এসেছেন আরাকান অঞ্চল থেকে। চাকমারা এসেছিলেন আগে, মারমারা এসেছিলেন পরে। কিন্তু মারমারা এসে তাদের ঠেলে দিয়েছেন রাঙ্গামাটি অঞ্চলে। চাকমারা আগে ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগের দক্ষিণ অঞ্চলে। কিন্তু সেখানে এখন চাকমাদের কোন বসতি নেই। বাংলাভাষী মানুষ চাকমাদের রাঙ্গামাটির গভীর অরণ্যে যেতে বাধ্য করেনি, তাদের রাঙ্গামাটির গভীর অরণ্যে সরে যেতে বাধ্য করেছেন মারমারা। যাদের সাধারণত বলা হয় মগ। অর্থাৎ যারা এই জুম চাষ করেন, সন্তু লারমা যে তাদেরই একমাত্র প্রতিনিধি, তাও নয়। ১৯৪৭ সালে চাকমারা রাঙ্গামাটিতে উড়িয়েছিলেন ভারতের পতাকা। রাঙ্গামাটি দখল করতে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার সরকারকে পাঠাতে হয়েছিল সৈন্য। বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যরা গিয়ে দখল করেন রাঙ্গামাটি, নামান ভারতীয় পতাকা এবং উড়ান পাকিস্তানের পতাকা। এটা হলো ইতিহাস।
খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান আগে ছিল একটি মাত্র জেলা। যাকে সাধারণভাবে বলা হতো চট্টগ্রামের পার্বত্য মহাল। ইতিহাস বলে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহাল সৃষ্টি হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনামলে। তার আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহাল বলে কোনো কিছু ছিল না। কিন্তু সন্তু লারমার কথা শুনে মনে হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছিল একটি স্বাধীন অঞ্চল। আর পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ববাংলা সরকার জোর করে সেটা দখল করেছে। যেটা ঘটনা নয়। ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম পূর্ববাংলার সাথে যুক্ত হয়েছে র‌্যাডক্লিফরয়েদাদ অনুসারে। বাংলাভাষী মুসলমান গায়ের জোরে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে দখল করেননি। ইংরেজ আমলে একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে যুক্ত করার কথা হয় তখনকার আসাম প্রদেশের সাথে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী এর বিরোধিতা করেন এবং থাকতে চান চট্টগ্রাম বিভাগেরই অংশ হয়ে। এটাও ইতিহাস।
পার্বত্য চট্টগ্রাম, অর্থাৎ খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবানকে পৃথক করে নিয়ে সন্তু লারমা গড়তে চাচ্ছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। যেটা গড়তে দিলে বাংলাদেশ হারাবে তার দশ ভাগের এক ভাগ ভূমি। জানি না কেন আওয়ামী লীগ সরকার সন্তু লারমার সাথে একটা চুক্তি করতে গিয়েছিল। তারা কি ভেবে দেখার সুযোগ পাননি যে, এর ফলে বাংলাদেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চলে গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ হয়ে পড়বে খুবই অনিশ্চিত। চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ নিয়েও আওয়ামী লীগ সরকার কিছু ভেবেছিলেন বলে মনে হয় না। অথচ ১৯৭৩ সালে ১৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব রাঙ্গামাটিতে গিয়ে এক সভায় ঘোষণা করেন, ‘দেশের সকল লোক বাঙালি বলে বিবেচিত হবে।’ আওয়ামী লীগ দাবি করে যে, তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করেন। শেখ মুজিব হলেন বাঙালি জাতির জনক। কিন্তু শেখ মুজিবের বাঙালিত্বকে বাদ দিয়ে তারা করে বসেন সন্তু লারমার সাথে বিশেষ চুক্তি। যা হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আওয়ামী লীগ অবশ্য তাদের ভুল ধরতে পারে। আর তাই চায় না পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন করতে। সন্তু লারমা যতদূর জানা যায়, একসময় করতেন বাম রাজনীতি। তিনি ছিলেন মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের সাথে।
বর্তমান আওয়ামী লীগের মধ্যে বিশেষভাবে অনুপ্রবেশ ঘটেছে মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, আবুল মাল আবদুল মুহিত, দীলিপ বড়ুয়া, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, আ ফ ম রুহুল হক, নুরুল ইসলাম নাহিদ, বেগম মতিয়া চৌধুরী, শাহজাহান খান, অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান, ইয়াফেস ওসমান, নূহ-উল আলম লেনিন। এই তালিকাটি দেয়া হয়েছিল দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ -এর ২০১৩ সালের ২৭ জুন সংখ্যায়। মনে করার কারণ আছে যে, এদের প্ররোচনায় আওয়ামী লীগকে ভ্রান্তপথে পরিচালিত হতে হয়েছিল এবং গ্রহণ করেছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল সম্পর্কে বাংলাদেশবিরোধী নীতি।
দেশের রাজনীতি এখন কোন পথে যাচ্ছে আমরা জানি না। খালেদা জিয়া শান্তিচুক্তির পক্ষে ছিলেন না। তিনি বলেছিলেন, শান্তিচুক্তি হলে সাঁওতালরাও দাবি করবেন স্বাধীনতা। বাংলার উত্তরাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চলে যেমন অনেক সাঁওতালের বাস, তেমনি ভারতের বরেন্দ্র অঞ্চলেও বহু সাঁওতালের বাস। এদের অনেকেই এখন খ্রিষ্টান হয়েছেন। যদি বাংলাদেশের বরেন্দ্র অঞ্চলের খ্রিষ্টান সাঁওতালরা এবং ভারতের বরেন্দ্র অঞ্চলের সাঁওতালরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়তে চান, তবে পরিস্থিতি অবশ্যই জটিল হয়ে উঠবে। সাঁওতালরা দাবি করছেন তাদের ভাষার স্বাতন্ত্র্যকে মেনে নিতে হবে। ভারতে এখন প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে ঝাড়খ নামে একটি নতুন প্রদেশ। সেখানে সাঁওতালরা হলেন সংখ্যাগুরু। কিন্তু ঝাড়খণ্ড প্রদেশের সরকারি ভাষা সাঁওতালি করা হয়নি। ঝাড়খণ্ড প্রদেশের সরকারি ভাষা করা হয়েছে নাগরি অক্ষরে লেখা হিন্দি। অথচ বাংলাদেশে সাঁওতালরা দাবি করছেন তাদের ভাষার স্বাতন্ত্র্য। একসময় সাঁওতালি ভাষা লেখা হতো বাংলা অক্ষরে। কিন্তু এখন তা লেখা হচ্ছে রোমান অক্ষরে। এ দেশের অনেক বাম রাজনীতিক করছেন সাঁওতালদের সমর্থন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী বাম রাজনীতিকেরা অনেকে পড়েছেন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। কেননা, ঝাড়খণ্ডে বাংলাভাষী হিন্দুরা পড়তে চলেছেন উপজাতিদের, বিশেষ করে সাঁওতালদের কোপে। ঝাড়খণ্ডের মধ্যে পড়ে জামসেদপুর। যেটা হলো টাটা কোম্পানির ইস্পাত ও লোহা নিষ্কাশনের কারখানা। জামশেদপুরে বহু হিন্দু বাংলাভাষীর বাস। সেখানেও তারা হতে পারেন উপজাতিদের কোপের শিকার। তাদের ঝাড়খণ্ড ছেড়ে ভবিষ্যতে সরে আসতে হতে পারে পশ্চিমবঙ্গে।
উপজাতি মানেই যে অসহায় নিরীহ মানুষ, তা নয়। একদিন মগদের অত্যাচারে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে পড়েছিল জনশূন্য। মেজর জেমস রেনেলের মতে, এখন যেখানে সুন্দরবন, সেখানে একসময় ছিল বর্ধিষ্ণু জনপদ। মগদের অত্যাচারে পালিয়ে যাওয়ার কারণে অঞ্চলটি হয়ে পড়ে জনশূন্য। গড়ে ওঠে গভীর বন। যাকে এখন বলে সুন্দরবন। জেমস রেনেল ১৭৬৪ সালে তখনকার বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল জরিপ করে প্রস্তুত করেন বাংলার নির্ভরযোগ্য মানচিত্র। তিনি সুন্দরবনের মানচিত্র অঙ্কনের জন্য সুন্দরবন অঞ্চলে যান। সুন্দরবন অঞ্চলের কাছে অবস্থিত বরিশাল জেলার অনেক প্রাচীন ব্যক্তির মুখে তিনি শুনতে পান যে, তারা তাদের প্রাচীনদের মুখ থেকে শুনেছেন, সুন্দরবন অঞ্চলে একসময় কোনো বন ছিল না। ছিল জনবসতি। মগদের অত্যাচারে মানুষ পালাবার ফলে সেখানে গড়ে ওঠে বন। ইংরেজ আমলে মণিপুর অঞ্চল থেকে কুকিরা এসে চট্টগ্রামে লুটপাট করত। খুন করত মানুষকে। ইংরেজরা কুকিদের দমন করে। উপজাতিদের নিয়ে রাজনীতি করা তাই হয়ে উঠতে পারে যথেষ্ট বিপজ্জনক। বাংলাদেশে যাদের বলা হচ্ছে উপজাতি, তাদের সবাইকে গণনা করলে তাদের মোট জনসংখ্যা হতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা এক ভাগের কাছাকাছি। এই এক ভাগ লোককে নিয়ে কেন বামপন্থীরা রাজনীতি করতে চাচ্ছেন, সেটা বোঝা বেশ কঠিন। ভারতে নকশালপন্থীরা এখন উপজাতিদের নিয়ে রাজনীতি করছেন। হতে পারে আমাদের দেশের বামপন্থীরা এদের চিন্তা চেতনার দ্বারাও হতে চাচ্ছেন কিছুটা প্রভাবিত।
উপজাতিদের অনেকে বলতে চাচ্ছেন, আদিবাসী। আদিবাসী শব্দটার করা হচ্ছে অপব্যবহার। কেননা, প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে, এ দেশে যারা সংখ্যাগুরু তাদেরই বলতে হয় আদিবাসী। তারা বাইরে থেকে আসেননি। আমাদের জনসংখ্যার অনেকের পূর্বপুরুষই একসময় ছিলেন তাম্র-প্রস্তর যুগের মানুষ। পরে তারা হয়ে উঠেছেন আরো সভ্য। একসময় সব মানুষই ছিলেন অরণ্যবাসী। অনেকে থেকে গেছেন অরণ্যবাসী হয়েই। তাদের জোর করে কেউ অরণ্যবাসী করে তোলেননি।
সন্তু লারমা তার বক্তৃতায় এমন অনেক কথাই বলছেন যে, আমাদের ইতিহাস জ্ঞানের সাথে তা মোটেও খাপ খেতে পারছে না। সন্তু লারমা যদি মনে করেন, জোর করে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে তিনি বাংলাভাষী মুসলমানদের তাড়িয়ে দিতে পারবেন, তবে তারাও যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খাবেন, এমন নয়। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য তারাও বাধ্য হবেন পাল্টা বল প্রয়োগ করতে। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এখন উপজাতি ও বাংলাভাষী মুসলমানের সংখ্যা প্রায় দাঁড়িয়েছে সমান সমান। উপজাতিরা কম করে ১০-১২টি বিভিন্ন উপজাতিতে বিভক্ত। কিন্তু বাংলাভাষী মুসলমানেরা তা নন। শক্তির মহড়া দেখিয়ে তাই লাভ হবে না। যেমন লাভ হয়নি ১৯৪৭ সালে রাঙ্গামাটিতে ভারতের পতাকা উড়িয়ে।
এবনে গোলাম সামাদ
চাকমাদের এখন আর কোনো নিজস্ব ভাষা নেই। তারা যে ভাষায় কথা বলেন, তা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক বাংলা ভাষারই একটি রূপ মাত্র। তাদের কোনো নিজস্ব বর্ণমালাও নেই। মারমাদের একটা নিজস্ব ভাষা আছে এবং তারা সেটা লেখেন প্রাচীন বর্মী অক্ষরে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১২টি উপজাতির মধ্যে ভাষার পার্থক্য বিদ্যমান। তারা যখন একে অন্য উপজাতির মানুষের সাথে কথা বলতে চান, তখন তাদের গ্রহণ করতে হয় বাংলাভাষারই সাহায্য। কেবল জুম চাষ করেই জুমল্যান্ড গঠন করার স্বপ্ন দেখা ভুল।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Saturday, March 14, 2015

নর-নারীর সমান অধিকার by এবনে গোলাম সামাদ

বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির -কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর
মানুষ স্তন্যপায়ী প্রাণী। নারী তার গর্ভে সন্তান ধারণ করে। পুরুষ করে না। মাতৃদুদ্ধ পান করে বাঁচে মানবশিশু। মায়ের ওপর তারা নির্ভর করে খাদ্যের জন্য। কেবল খাদ্যের জন্যই নয়, মানসিক পুষ্টির জন্যও। মায়ের অনুপস্থিতিতে কেঁদে ওঠে সন্তান। কিন্তু বাবার অনুপস্থিতিতে এতটা কান্নাকাটি করে না। সন্তানের ভালোবাসাতেই মা আটকা পড়ে গৃহকর্মে। যদিও এখন বলা হচ্ছে, পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়েরা বাধ্য হয় গৃহকর্মে লিপ্ত থাকতে। নারী-পুরুষের মধ্যে আরো অনেক বিষয়ে পার্থক্য আছে। যেমনÑ গড়পড়তা পুরুষ যতটা ভার উত্তোলন করতে পারে, মেয়েরা তা পারে না। পেশিশক্তিতে ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি মতাসম্পন্ন। এই পার্থক্য নারী-পুরুষের মধ্যে এনে দিয়েছে শ্রমবিভাজন। যাতে বেশি কায়িক শক্তি প্রয়োজন হয়, সেসব কাজ করেছে ছেলেরা, মেয়েরা তা করেনি। যেসব সমাজ এখনো পড়ে আছে আদিম জীবনধারায়, সেখানে মেয়েদের দেখা যায় গৃহকর্মে নিযুক্ত থাকতে। কিন্তু ছেলেরা যায় বনেজঙ্গলে শিকার করতে। যেসব সমাজে মানুষ প্রধানত মৎস্যজীবী, সেখানে নৌকা করে ছেলেদের দেখা যায় দূর সমুদ্রে মাছ ধরতে। কিন্তু মেয়েরা থাকে ঘরে, যায় না দূর সমুদ্রে মাছ ধরতে। নর-নারীর শ্রমবিভাজনকে তাই বলা যায় না পুরুষ ষড়যন্ত্রের ফল। এর আছে একটি বাস্তব দৈহিক ভিত্তি। যেটাকে বিবেচনায় না নিলে ভুল করা হয়।
মানসিক দিক থেকেও নর-নারীর মধ্যে পার্থক্য পরিলতি হয়। যেমন গড়পড়তা মেয়েদের সৌন্দর্যচেতনা ছেলেদের চেয়ে বেশি। তাই তারা ঘরদোর অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে পারে। ছেলেরা যা পারে না। সব দেশেই গড়পড়তা মেয়েরা ফুলদানিতে ছেলেদের তুলনায় সুন্দর করে ফুল সাজাতে পারে। মেয়েদের বর্ণসমাবেশের প্রবণতা ছেলেদের তুলনায় হতে দেখা যায় উন্নত। তাই তারা সেলাইয়ের কাজে নানা রঙের সুতা দিয়ে অনেক সহজে সেলাই করতে পারে, নানা রঙের ফুলের নকশা। এ ছাড়া ছেলে-মেয়ের মধ্যে আরো অনেক জন্মগত পার্থক্য আছে। যেমনÑ মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় কথা বলতে শেখে অনেক তাড়াতাড়ি। গড়পড়তা মেয়েরা তাদের জীবনে ছেলেদের চেয়ে বেশি কথা বলে থাকে। ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে কম দিন বাঁচে। কিন্তু মেয়েদের জীবনে বার্ধক্য আসে তাড়াতাড়ি। পৃথিবীতে তাই বৃদ্ধের তুলনায় বৃদ্ধার সংখ্যা হতে দেখা যায় বেশি।
এসব পার্থক্য পরিবেশগত কারণে ঘটে না। এসব পার্থক্য হলো জন্মগত।
মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় কম খেয়ে বাঁচে, কেননা তাদের শরীর থেকে তাপ ছড়ায় কম। কিন্তু ছেলেরা মেয়েদের মতো অত কম খেয়ে বাঁচতে পারে না। কারণ তাদের দেহ থেকে তাপ ছড়ায় বেশি। তাদের দেহে তাপ ধরে রাখবার মতো চর্বির স্তর থাকে না। মেয়েরা যত কম খেয়ে যত কাজ করতে পারে, পুরুষেরা তাই তা পারে না। এসব পার্থক্যকে ভুলে গিয়ে নর-নারীর সমান অধিকারের কথা ভাবতে গেলে ভুল করা হয়। এসব কথা আমার মনে হচ্ছিল ক’দিন আগে নারী দিবস উপলে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার ক্রোড়পত্র পড়ে। যাতে আলোচিত হয়েছিল মেয়েদের অধিকার নিয়ে অনেক কথা। আর বলা হয়েছিল পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়েদের অধিকারবঞ্চনার কথা। কিন্তু মেয়েরা কি পুরুষের মতো সব কাজ করতে সম? না পুরুষেরাই মেয়েদের মতো সব কাজে দেখাতে পারেন একই রকম পারদর্শিতা। সব দেশেই দেখা যায় মেয়েরা ছোট ছেলেমেয়েকে যেভাবে লেখাপড়া শেখাতে পারছেন, ছেলেরা সেটা পারছেন না। অনেক দেশে তাই প্রাথমিক শিার ব্যাপারে মেয়ে শিককে পুরুষ শিকের চেয়ে দেয়া হচ্ছে অগ্রাধিকার। এই বৈষম্য করা হচ্ছে নারী-পুরুষের পার্থক্যকে নির্ভর করে। প্রাথমিক শিায় অর্থাৎ লিখতে, পড়তে ও গুনতে শেখার েেত্র প্রয়োজন হয় যথেষ্ট ধৈর্যের। যেটা মেয়েরা পারেন অনেক সহজে ধারণ করতে। ছেলেরা নয়।
আমাদের দেশে মেয়েরা এখন রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি করছেন। যেটা আগে ছিল না। এ প্রসঙ্গে ভারতের এককালের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কিছু উক্তি উদ্ধৃত করা যেতে পারে। ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, ‘এই কাজের (প্রধানমন্ত্রিত্বের) ব্যাপারে আমি নিজেকে নারী হিসেবে চিন্তা করি না। কোনো নারীর যদি যেকোনো পেশার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকে, তবে তাকে সেই পেশায় কাজ করার সুযোগ দেয়া উচিত।... আমি নারীবাদী নই, আমি একজন মানবসন্তান। যখন আমি নিজের কাজ করি, তখন নিজেকে নারী হিসেবে চিন্তা করি না।...’ কিন্তু আমাদের দেশে মেয়েরা দাবি করছেন এমপি হওয়ার জন্য সংরতি আসন। যেটা নর-নারীর সমান অধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করা যায় না। জার্মানিতে অ্যাঞ্জেলা মার্কেল চ্যান্সেলর হয়েছেন পুরুষদের সাথে ভোটে প্রতিযোগিতায় জিতেই। আর তিনি তার কাজে পরিচয় দিতে পারছেন যথেষ্ট দতার।
অনেকের ধারণা, মেয়েরা গৃহকাজে আটকা থাকে বলে অন্য কাজে রাখতে পারে না দতার স্বার। কিন্তু এ ধারণাকেও আমি যথেষ্ট সঙ্গত বলে মনে করি না। অনেক নারী গৃহকর্ম করেও হতে পেরেছে যথেষ্ট খ্যাতিমান। এ েেত্র আমার মনে পড়ে, মারি স্লোভদয়াস্কা কুরির (১৮৬৭-১৯৩৪) কথা। মারি কুরি ছিলেন পোল্যান্ডের মেয়ে। তিনি ফ্রান্সে আসেন লেখাপড়া শিখতে। বিয়ে করেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিয়ের কুরিকে। তারা দু’জন রেডিয়াম ধাতু আবিষ্কার করেন। রেডিয়াম নিয়ে গবেষণা করে লাভ করেন বিশ্বখ্যাতি। পিয়ের কুরি ও মারি কুরি নবেল প্রাইজ লাভ করেন ১৯০৩ সালে। পিয়ের কুরি হঠাৎ মারা যান পারিতে রাস্তায় গাড়িচাপা পড়ে। রেখে যান দুই শিশুকন্যাকে। মারি কুরি এদের রান্না করে খাইয়ে ঢুকতেন ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে। রেডিয়াম নিয়ে গবেষণা করে পরে তিনি রসায়ন শাস্ত্রে একা লাভ করেন নবেল প্রাইজ, ১৯১১ সালে। এ ছিল তার বিরাট কৃতিত্ব। তিনি দেখাতে সম হন যে, তেজস্ক্রিয় রেডিয়াম পরমাণুরা বিশেষ হারে ভেঙে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় সিসার পরমাণুতে। ঘর সামলেও এ রকম গবেষণা করার নজির খুব কমই আছে। তবে এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শিশুসন্তানদের রান্না করে খাইয়েও খুব উন্নত মানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা সম্ভব। এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, তার দুই কন্যার মধ্যে এক কন্যা, আইরিন জোলিয় কুরি তার স্বামী জোলিয় কুরির সাথে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করে নবেল প্রাইজ লাভ করেন ১৯৩৫ সালে। আইরিন জোলিয় কুরিও সাংসারিক কাজে অবহেলা করেননি। তিনিও ছিলেন তার মায়ের মতো গৃহকর্মে নিষ্ঠাবান। এ রকম দৃষ্টান্ত অবশ্য খুবই বিরল, কিন্তু আছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীরা লেখাপড়া জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় অনেক এগিয়ে গেছেন। তথাপি যে ছেলেদের সমক হতে পেরেছেন, তা নয়। প্রতি বছর মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় খুব কম েেত্রই নবেল প্রাইজ লাভ করে থাকেন। নবেল প্রাইজ অবশ্য জ্ঞানবিজ্ঞানের মাপকাঠি নয়। তবুও এর দ্বারা সাধারণভাবেই নারী-পুরুষের অর্জনের কিছুটা মূল্যায়ন করা চলে। মেয়েরা ছেলেদের মতো নবেল প্রাইজ পাচ্ছেন না বলেই যে তারা ছেলেদের চেয়ে গড়পড়তা বুদ্ধিতে কম, এ রকম সিদ্ধান্তে আসা যায় না। তবু পার্থক্যটা ল করবার মতো। এ পর্যন্ত সাহিত্যে মহিলারা তেরোজনের বেশি নবেল প্রাইজ পেয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই। এটাকে নিশ্চয় পুরুষ শাসিত সমাজের একটি ষড়যন্ত্রের ফল বলে চিহ্নিত করা চলে না। খোলাধুলার েেত্রও দেখা যাচ্ছে নর-নারীর পার্থক্য। অলিম্পিকে ছেলেমেয়েদের প্রতিযোগিতা হচ্ছে এখনো আলাদা করে; একত্রে নয়। এটাকেও বলা চলে না পুরুষ ষড়যন্ত্রের ফল। নর-নারীর সমান অধিকারের প্রশ্নকে তাই বিচার করতে হবে এসব পার্থক্যের কথা বিবেচনা করেই।
ইসলামে মেয়েদের ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার দেয়া হয়েছে (আল কুরআন, সূরা ৪: ৩২)। বলা হয়নি তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করার যোগ্যতা রাখেন না। রাজনীতি করার েেত্র সরাসরি কিছু না বলা হলেও আল কুরআনে সাবার রানী বিলকিসের খুব প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন শাসক হিসেবে যোগ্যতাসম্পন্না এবং দেশ শাসন করতেন দেশবাসীর সাথে পরামর্শ করে, স্বেচ্ছাচারিতা করে নয় (সূরা ১৭ : ৩২)। বিলকিসের মতো রানী ইতিহাসে খুব বেশি নেই। কিন্তু কুরআনে বলা হয়নি মেয়েরা দেশ শাসনে যোগ্যতা রাখেন না। তবে মেয়েদের মধ্যে যোগ্য শাসক সচরাচর পাওয়া যায় না। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো মহিলা প্রেসিডেন্টের পদ অলঙ্কৃত করতে পারেননি। এখনো বিশ্বে সাধারণভাবে মনে করা হয়, মেয়েদের পে রাজনীতি সামাল দেয়া হলো যথেষ্ট কঠিন কাজ।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Sunday, March 8, 2015

ইসলাম ও মুক্তচিন্তার অধিকার by এবনে গোলাম সামাদ

এবনে গোলাম সামাদ
ইসলাম ধর্মে মুক্তচিন্তার অধিকার দেয়া হয়েছে। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ধর্মের নামে কোনো জবরদস্তি নেই (সূরা-২: ২৫৬)। একই সূরায় আরো বলা হয়েছে, যারা তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে কিন্তু যুদ্ধের সীমা ছাড়াবে না। কেননা আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না (সূরা- ২: ১৯০)। সে সূরায় বলা হয়েছে, মুসলমানদের হতে হবে মধ্যপন্থী (সূরা- ২: ১৪৩)।
এ বিষয়ে ইসলামি ধ্যানধারণার সাদৃশ্য থাকতে দেখা যায় প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের (৩৮৪-৩২২ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দ) চিন্তাধারার। আল কুরআনে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে (সূরা-৫: ৮০)। বলা হয়েছে, মানুষকে যুক্তির মাধ্যমে ধর্মের কথা বোঝাবে (সূরা-১৬: ১২৫)। এসব থেকে বোঝা যায় যে, ইসলাম একটি যুক্তিবাদী ধর্ম। এতে মানুষের মুক্তচিন্তার অধিকার আছে। বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইমাম আল গাজ্জালি বলেছেন কুরআনের সূরা নূরের ৩৫ নম্বর আয়াতের হতে পরে ৭০ হাজার রকম ব্যাখ্যা। অর্থাৎ আল কুরআনের বিভিন্ন সূরার বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা করার সুযোগ আছে। ইসলামে মুক্তচিন্তার পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়নি। ইসলামে আল্লাহ হলেন সব সৃষ্টির অন্তিম ভিত্তি। আল্লাহ হলেন নিরাকার। সূরা নূরে বলা হয়েছে আল্লাহ হলেন আলোর আলো। অর্থাৎ এক পরম শক্তির উৎস। তাপ গতিবিদ্যার নিয়মানুসার তাপ ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শীতল হয়ে যেতে পারত, কিন্তু বিশ্বব্রহ্মাণ্ড শীতল হয়ে যায়নি। অনেক বৈজ্ঞানিক তাই মনে করেন, শক্তির একটি অফুরন্ত উৎস আছে, মহাশক্তির এই উৎসই হচ্ছেন আল্লাহ। সব বৈজ্ঞানিক নাস্তিক নন। অনেক নামকরা বৈজ্ঞানিকই আস্তিক। যেমন আইজাক নিউটন, ম্যাক্স প্লাঙ্ক, আলবার্ট আইনস্টাইন প্রমুখ। তাই বিজ্ঞানের ইতিহাস বলে না যে, বৈজ্ঞানিক হতে হলে নাস্তিক হতেই হবে। কিন্তু মুক্তচিন্তাবাদীরা বোঝাতে চেয়েছেন যে, মুক্তচিন্তার অধিকারী হতে হলে আস্তিক হওয়া যাবে না। আস্তিক্যবাদ মুক্তচিন্তার পরিপন্থী।
বিজ্ঞান বলে অকারণে কিছু ঘটে না। ধর্ম মানব জীবনে একটা বিরাট বাস্তবতা। ধর্মের উদ্ভবের মূলেও আছে নিশ্চয় কোনো-না-কোনো কারণ। কিন্তু মুক্তচিন্তাবাদীরা এই কারণকে খুঁজে দেখতে চান না। তারা বলতে চান, ধর্ম কেবলই হলো মানুষের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের ফল। যদিও আমরা দেখতে পাই ধর্ম ছিল এবং হয়ে আছে মানুষের নীতিচেতনার উৎস।
এসব কথা আমার মনে আসছে, কারণ সম্প্রতি অভিজিৎ রায় নিহত হওয়ার পর একদল বলছেন এর মূলে আছে ইসলামি মৌলবাদীদের হাত। কেবল তা-ই নয়, প্রমাণেরও চেষ্টা চলেছে। এরা বলে, আসলে ইসলাম হলো যুক্তিবুদ্ধিহীন মানুষের ধর্ম। কিন্তু তাদের বক্তব্য সত্য বলে ধরা যায় না। ইসলামের ইতিহাস এটা প্রমাণ করে না।
মুসলিম বিশ্বে এক সময় জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা হয়েছে, এটা হতে পারত না, যদি ইসলাম হতো গোঁড়া একটা ধর্মবিশ্বাস। ইউরোপ ও আমেরিকায় এখন জ্ঞানবিজ্ঞানের হচ্ছে চর্চা। কিন্তু তা বলে ধর্মবিশ্বাসের বিলুপ্তি ঘটেনি। অনেকেই দিতে চাচ্ছেন ধর্মের একটি সদার্থক ব্যাখ্যা। মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী হবহাউজের মতে, মানুষের নীতিজ্ঞান ও ধর্ম চেতনাকে পৃথক করা যায় না। ধর্ম আসলে হলো আবেগমথিত নীতিচেতনা মাত্র ।
বিজ্ঞান বলতে পারে না নরহত্যা কেন খারাপ। কিন্তু ধর্ম বলে মানব জীবন হলো পবিত্র। তাই মানব হত্যা পাপ। বিজ্ঞান নীতিচেতনানিরপেক্ষ। আমরা আমাদের নীতিচেতনার জন্য ধর্মের ওপর নির্ভর করে থাকি। মানুষের জীবন কেবলই যুক্তিনির্ভর নয়। মানুষের জীবন পরিচালিত হতে চায় বিশ্বাসকে নির্ভর করে। তাই মানব জীবনে বিশ্বাসের আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
ফরাসি নৃতাত্ত্বিক দুরকেইমের মতে, বিধাতা হলেন সমাজসত্তার দেবরূপমাত্র। আর ধর্ম হলো সমাজ জীবনকে ধারণ করে রাখার আধারমাত্র। ইংরেজি ও ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় আমরা দেখি, রিলিজিওন শব্দটা এসেছে রেলিগার শব্দ থেকে, যার একটি অর্থ হলো বন্ধন করা। অর্থাৎ রিলিজিওন হলো তাই, যা মানব জীবনকে চেয়েছে সুশৃঙ্খল করতে। বাংলা ভাষায় ধর্ম শব্দটার উদ্ভব হয়েছে ধৃ ধাতু থেকে, যারও অর্থ হলো ধারণ করে রাখা। মানুষ চেয়েছে ধর্মের মাধ্যমে তার সমাজ জীবনকে সুশৃঙ্খল করতে; উন্নত মানব সম্বন্ধ স্থাপন করতে। ধর্ম কেবলই মানুষের অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের ঐতিহ্যবহ নয়। যদিও মুক্তচিন্তাবাদীরা সেটাই প্রমাণ করতে চাচ্ছেন।
মৌলবাদ কথাটা আমরা এখন যথেষ্ট শুনতে পাচ্ছি। মৌলবাদ বা ফান্ডামেন্টালিজমের উদ্ভব হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ প্রচারের পর। একদল প্রটেস্ট্যান খ্রিষ্টান করেন এই মতের বিরোধিতা। কেননা এই মত মেলে না বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে। তারা ছিলেন বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বের আক্ষরিক বর্ণনার পক্ষে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২৪টি অঙ্গরাজ্যে এখনো যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অনুদান নিয়ে চলে, সেখানে ডারউইনের মতবাদকে সত্য বলে পড়ানো যায় না। ডারউইনের মতবাদের পাশাপাশি পড়াতে হয় সৃজনীবাদ। ক্যাথলিক খ্রিষ্টানেরা এখন আর মৌলবাদী নয়। কেননা পোপ  ১৯৪৮ সালে  ঘোষণা করেন যে, বাইবেলের সৃষ্টিতত্ত্বকে গ্রহণ করতে হবে রূপকভাবে, আক্ষরিক অর্থে নয়।
মুসলমান সমাজে মৌলবাদ কথাটা প্রচলিত ছিল না। প্রচলিত হয়েছে হাল আমলে। বলা হচ্ছে, মুসলিম মৌলবাদীরা নাকি হত্যা করেছেন অভিজিৎ রায়েকে। কেবল তাই বলা হচ্ছে না, বলা হচ্ছে, এর পেছনে নাকি আছে জামায়াতে ইসলামী দল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী দল কোনো মৌলবাদী দল নয়। এরা ইসলামের অর্থনীতিকে বাস্তবে চাচ্ছে প্রয়োগ করতে। কুরআন শরিফে বলা হয়েছে, ধন কেবল ধনীদের মধ্যে সঞ্চালিত হতে দেয়া যাবে না। তাকে প্রয়োগ করতে হবে জনকল্যাণের কাজে (সূরা-৫৯: ৭)। তারা গ্রহণ করেছেন আধুনিক গণতন্ত্রের কল্যাণব্রতী রাষ্ট্রের ধারণা। অন্তত বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামীর প্রচারপত্র পড়ে এই ধারণাই করতে হয়।
অভিজিতের মৃত্যু একটা করুণ ঘটনা। আমরা এ রকম মৃত্যুকে সমর্থন করি না। কিন্তু মনে করি, এর সাথে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলকে যুক্ত করা যথাযথ নয়। এর আগে নিহত হয়েছিল বিশ্বজিৎ। তাকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করেছিল একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের ছেলেরা। কিন্তু সে সময় কোনো প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীকে এ জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করতে দেখিনি। কিন্তু এখন একদল বামপন্থী বুদ্ধিজীবীকে দেখছি দুঃখ প্রকাশ করতে। আর সেই সাথে দেখছি, একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে অভিযুক্ত করতে। এটা কত দূর সঙ্গত হচ্ছে, আমরা তা বলতে পারি না।
এই সাথে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, এই সব বাম চিন্তক মনে করেন তারা যা ভাবেন তার বাইরে অন্য কিছু ভাবাটা হলো অবৈজ্ঞানিক এবং হলো অজ্ঞতা কুসংস্কারের পরিচায়ক। একদিন আমাদের দেশের বাম চিন্তকেরা বলতেন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক। কিন্তু তাদের অনেকের সন্তান সন্ততি এখন যাচ্ছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং হচ্ছেন মার্কিন নাগরিক। এটাও আমাদের কাছে যথেষ্ট বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। অভিজিৎ মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন। জানি না, কেন তিনি আবার এসেছিলেন বাংলাদেশে। শুনেছিলাম তার একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল, যা বিক্রি হচ্ছিল এবারের একুশের বইমেলায় বাংলা একাডেমি চত্বরে। তিনি এসেছিলেন বইমেলায় তার বই কেমন বিক্রি হচ্ছে সেটা নিজ চোখে দেখতে। কিন্তু তিনি খুন হলেন বইমেলা দেখে ফেরার পথে বইমেলার খুব কাছেই। যেখানে ছিল যথেষ্ট পুলিশ প্রহরা। তার বইতে তিনি কী লিখেছেন, আমরা তা পড়ে দেখিনি। তিনি নাকি ইসলামবিরোধী কথাবার্তা প্রচার করতে চেয়েছেন।
ইসলাম ধর্মের সমালোচনা করা আর নিন্দা করা সমার্থক নয়। বাংলাদেশ একটি মুসলিমঅধ্যুষিত দেশ। এখানে ইসলাম নিন্দা মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তুলতেই পারে। বাংলাদেশে ইসলামবিরোধী না হয়েও প্রগতিশীল ভাবধারার প্রচার সম্ভব। প্রগতিশীলতা আর ইসলাম নিন্দাকে একত্র করে ফেলা হবে ভুল। আমরা মানুষের মুক্তচিন্তার অধিকারে বিশ্বাস করি। কিন্তু নির্বিচারে  কোনো ধর্মের নিন্দা করাকে সমর্থন করি না।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Saturday, February 28, 2015

দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভেঙে যেতেও পারে by এবনে গোলাম সামাদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক কিছুর হিসাব মেলানো কঠিন। আমরা কেউ ধারণা করতে পারিনি যে, বাংলাদেশের এক কালের দুই কার্ল মার্কস ভক্ত নেতা, জাসদের হাসানুল হক ইনু আর ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন, তাদের পুরনো ধ্যান-ধারণা একেবারে পরিত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সাথে হাত মেলাবেন। হবেন মন্ত্রী। কেউই ভাবতে পারেননি যে, এই দুই নেতা হজ করতে যাবেন এবং হবেন আলহাজ। আলহাজ হওয়া দোষণীয় নয়। কিন্তু মার্কসবাদ বলে ধর্ম হচ্ছে আফিমের নেশার মতো, ধর্ম মানুষকে পরকালবাদী করে তোলে। আর ইহজাগতিক সমস্যা সম্পর্কে করে তুলতে চায় উদাসীন। জানি না, এই দুই নেতা এখন কী ভাবছেন, মার্কসবাদের এই মৌল দর্শন নিয়ে। ধর্ম সম্পর্কে এদের মনোভাব, অনুমান করা চলে, নিশ্চয় আর আগের মতো নেই। হাসানুল হক ইনু এক সময় বিশ্বাস করতেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে হাসানুল হক ইনুর দল জাসদ অনেক আগেই আস্থাহীন হয়ে পড়েছিল। রাশেদ খান মেনন কিছু দিন আগেও বলেছেন, দুনিয়ার মজদুর এক হও। কিন্তু এখন তিনি আওয়ামী লীগের সাথে হাত মিলিয়েছেন। তার বক্তব্য, তিনি বাংলাদেশকে একটি মুসলিম মৌলবাদী দেশ হিসেবে দেখতে চান না। তিনি হজ করে ফিরেছেন নিজেকে একজন খাঁটি মুসলমান প্রমাণ করার জন্য। তিনি খাঁটি মুসলমান হলেও ইসলামি মৌলবাদে আস্থাবান নন। সমস্ত আওয়ামী লীগ এখন পরিচালিত হতে চাচ্ছে এক কালের দণিপন্থী (মস্কোপন্থী) কম্যুনিস্টদের চিন্তাচেতনার দ্বারা। এ রকমই এখন সাধারণ জনরব। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতারা আর আওয়ামী লীগে আগের মতো আদ্রিত নন। আওয়ামী লীগে চলেছে গুরুতর মতবাদিক দ্বন্দ্ব; যা আওয়ামী লীগকে ভেঙে দিতেই পারে।
আওয়ামী লীগ এখন পরিচালিত হচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। শেখ হাসিনাকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগে এমন আর কোনো নেতা নেই, যাকে বলা যেতে পারে প্রকৃত আওয়ামী লীগপন্থী। কিন্তু শেখ হাসিনা একজন মানুষ। যেকোনো মানুষ যেকোনো সময় মৃত্যুবরণ করতে পারেন। শেখ হাসিনার অবর্তমানে আওয়ামী লীগ হয়ে পড়বে নেতাহীন। নেতাহীন আওয়ামী লীগ ভেঙে পড়তেই পারে। এটাও একটা বিশেষ সম্ভাবনা। আওয়ামী লীগে কোনো বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না। এর ফলে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ হয়ে পড়ছে দুর্বল। তোফায়েল ও আমির হোসেন আমু দু’জন খুবই প্রাচীন আওয়ামী লীগ নেতা। কিন্তু এদের প্রভাব আওয়ামী লীগের মধ্যে খুব প্রবল বলে মনে হচ্ছে না। এদের পে সম্ভব হবে না আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব প্রদান করা। কারণ এদের দু’জনের কারোরই নেই শেখ হাসিনার তুল্য ভাবমূর্তি। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আছেন। কিন্তু জয় কি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন? অনেকে ভেবেছিলেন কংগ্রেসে নেহরু পরিবার চিরদিন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে। কিন্তু রাহুল গান্ধী এখন পড়েছেন চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে। আমরা দেখতে পেলাম রাজধানী দিল্লিতে কংগ্রেসের কোনো পদপ্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারলেন না। নেহরু পরিবারের ঐতিহ্য আর এখন আগের মতো জনপ্রিয় নেই। জয় হলেন দ্বি-নাগরিক। তিনি যেমন বাংলাদেশের নাগরিক, তেমনি আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন বলে যে, তার দেশের নাগরিক অন্য কোনো দেশে গিয়ে রাজনৈতিক পদ দখল করতে পারবে না। জয়কে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে ছাড়তে হবে মার্কিন নাগরিকত্ব। কেননা, মার্কিন আইন এমনটাই বলে।
তোফায়েল আহমেদ একসময় ছিলেন সারা বাংলাদেশের একজন খুবই জনপ্রিয় নেতা। তিনি শেখ মুজিবকে সভা ডেকে প্রদান করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের অনুকরণে, ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোপা। যেটা এখন আওয়ামী লীগ ব্যবহার করে চলেছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট তোফায়েল আহমেদ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের এক অংশ তুলেছিলেন গুরুতর অভিযোগ। তারা বলেছিলেন, তোফায়েল আহমেদ যদি নিষ্ক্রিয় না থেকে যথা সময়ে রীবাহিনীকে ডাকতেন, তবে শেখ মুজিবের মৃত্যু হতো না। রীবাহিনীর অলিখিত ভার ছিল তোফায়েল আহমেদেরই ওপর। এখনো আওয়ামী লীগে অনেকে আছেন যারা মনে করেন, তোফায়েল আহমেদকে বিশ্বাস করা যায় না। তাই শেখ হাসিনার স্থান তোফায়েল আহমেদ নিতে পারবেন, এমন অনুমান করা যথেষ্ট সঙ্গত নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অভাবে ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে ভেঙে যেতেই পারে। শেখ হাসিনার উচিত আওয়ামী লীগে তার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন নেতা তৈরি করে যাওয়া। কিন্তু তিনি তা করছেন বলে মনে হচ্ছে না। অবশ্য আমরা এ কথা বলছি, বাইরে থেকে দেখে। আওয়ামী লীগের ভেতরের কথা আমরা ঠিক সেভাবে যে জানি, তা নয়। তবে বিশ্বের নানা দেশের ইতিহাসে দেখা যায়, উপযুক্ত নেতার অভাবে একটি রাজনৈতিক দলের বিলুপ্তি ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটা অসম্ভব নয়।
দেশে এখন বিতর্ক উঠেছে, আওয়ামী লীগ উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে কি করে না, এই প্রশ্ন নিয়ে। কেননা, আওয়ামী লীগ বলছে আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র। যা এক সময় দেশে দেশে কম্যুনিস্টরা বলতেন। রাশিয়ার কম্যুনিস্ট পার্টি এই যুক্তি তুলে মতায় ছিল প্রায় ৭৪ বছর। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। এখন খোদ রাশিয়ার মানুষ চাচ্ছেন তাদের দেশে বহুদলীয় উদার গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। শেখ মুজিব কেন বাকশাল গড়েছিলেন, আমরা তা জানি না। কারণ তিনি এক সময় দেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছিলেন। আর সেই কারণে পেতে পেরেছিলেন বিপুল জনপ্রিয়তা। শেখ মুজিব তার গণতান্ত্রিক দর্শন পরিত্যাগ করে যদি বাকশাল গঠন না করতেন, তবে তার রাজনৈতিক জীবনের ও রকম করুণ বিয়োগাত্মক পরিণতি ঘটতে পারত বলে ভাবা যায় না। হয়তো তিনি নির্বাচনে মতা হারাতেন, কিন্তু আবার নির্বাচনের মাধ্যমেই আসতে পারতেন মতায়। নির্বাচনের মাধ্যমেই কেবল হতে পারে এক দলের হাত থেকে আর এক দলের হাতে রক্তপাতহীনভাবে মতার হস্তান্তর। যতগুলো কারণে দেশে দেশে মানুষ গণতন্ত্র চেয়েছে এবং চাচ্ছে, তার একটা বড় কারণ হলো এটাই। বিলাতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ চার্চিল নির্বাচনের মাধ্যমে মতা হারিয়েছিলেন। আবার মতায় আসতে পেরেছিলেন নির্বাচনের মাধ্যমে। তিনি বলেছিলেন গণতন্ত্রে গলদ আছে অনেক, কিন্তু মানুষ এর চেয়ে ভালো রাজনৈতিক পদ্ধতি এখনো আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে চার্চিলের এই বক্তব্য আমার মনে পড়ছে।
বাংলাদেশে আমার মনে হয় একটা অন্তর্বর্তী নির্বাচন হওয়া হবে যুক্তিযুক্ত। তাতে আসবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের একটা সমাধান। তা না হলে দেশের রাজনৈতিক সমস্যা আরো জটিল হয়েই উঠবে। এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যেও সঙ্কট দেখা দিতে পারে। ভেঙে পড়তে পারে আওয়ামী লীগ।
বিএনপি জোট বেঁধেছে আরো ১৯টি দলের সাথে। কিন্তু এই মোট ২০টি দলের মধ্যে আছে মূল্যবোধের একটি সাধারণ ঐক্য। যাকে বলা হচ্ছে, ইসলামি মূল্যবোধ। কিন্তু ১৪ দলের মধ্যে এ রকম মূল্যবোধের ঐক্য আছে বলে মনে হচ্ছে না। হাসানুল হক ইনু আর রাশেদ খান মেনন হাসিনার সাথে অনেক বিষয়েই পারছেন না ঐকমত্য গড়তে। এ রকমই মনে হচ্ছে আমাদের বাইরে থেকে দেখে। ২০ দলে যে পরিমাণ তাত্ত্বিক আছেন, ১৪ দলের ঐক্যজোটে আছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। নিকট ভবিষ্যতে ১৪ দলের জোটে তাই মতবাদিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগ তাই উপকৃত হতে পারবে। এ রকমই আমাদের বিশ্বাস।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Saturday, February 7, 2015

ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন ও ড. শামসুজ্জোহা by এবনে গোলাম সামাদ

ব্রিটিশ শাসনামলে তখনকার বাংলায় একটি বিধি চালু ছিল, বিধিটির সংপ্তি নাম Police Regulation of Bengal, যাকে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হতো PRB হিসেবে। এতে বলা হয়েছিল- Illegal order should not be carried out অর্থাৎ পুলিশকে বলা হয়েছিল, বেআইনি নির্দেশ পালন করা চলবে না। পালন করলে পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হতে পারবে। ব্রিটিশ শাসন কেবলই পুলিশনির্ভর হতে চায়নি। হতে চায়নি স্বৈরতান্ত্রিক। ব্রিটেন চেয়েছে এ দেশের মানুষের সাথে বোঝাপড়া করে শাসন পরিচালনা করতে। কথাগুলো মনে পড়ছে; কারণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ক’দিন আগে পুলিশকে বললেন ‘কঠিন ব্যবস্থা নিন, দায়িত্ব আমি নেব’ (প্রথম আলো; ২৯ জানুয়ারি ২০১৫)। তিনি কেন এমন কথা বললেন, আমরা তা জানি না। কেননা পুলিশ যদি বেআইনি নির্দেশ মানে তবে দেশের প্রচলিত আইনানুসারে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব। আমার মনে পড়ছে সাবেক পাকিস্তান আমলের কথা। আইয়ুব খান মতায় এসেছিলেন বন্দুকের নল উঁচু করে। কিন্তু তিনি পুলিশকে কখনো বলেননি, আপনারা কঠিন ব্যবস্থা নিন, দায়িত্ব আমি নেব।’ প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে তাকে ছাড়তে হয়েছিল মতা। আইয়ুব খান যথাসময়ে পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সরে গিয়েছিলেন মতা থেকে। কেননা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, জনগণই মতার উৎস। আমার মনে পড়ছে, ১৯৬৯ সালের ফেব্র“য়ারি মাসের উত্তাল গণ-আন্দোলনের স্মৃতি। সে কথা নিয়ে কিছু আলোচনা করা মনে হচ্ছে দেশের আজকের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।
রাজশাহী মোটামুটি শান্তিপূর্ণ শহর। কিন্তু এখানে ১৯৬৯ সালের ফেব্র“য়ারিতে গণ-আন্দোলন গ্রহণ করেছিল প্রকট রূপ। তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস যাকে সংেেপ বলা হয় ইপিআর, তাদের গুলিতে মারা যান ড. শামসুজ্জোহা; যা নড়িয়ে দিয়েছিল আইয়ুব শাসনের ভিত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: মাহবুবর রহমান তার লিখিত বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৪৭-৭১ গ্রন্থে বলেছেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক ড. শামসুজ্জোহা পুলিশের বেয়নেট চার্জের ফলে মৃত্যুবরণ করেন (১৮ ফেব্রুয়ারি ৬৯)। ড. জোহার মৃত্যু সংবাদে সারা দেশে এমন ব্যাপক গণবিােভ সৃষ্টি হয় যে, সরকার ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্র“য়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয় (বাংলাদেশের ইতিহাস ১৯৪৭-৭১। সময়, ঢাকা। তৃতীয় সংস্করণ- ২০০৩। পৃষ্ঠা- ২০৫)।’ খ্যাতনামা অধ্যাপকের লেখার মধ্যে একটা বড় রকমের ভুল থেকে গিয়েছে। ড. জোহাকে পুলিশ বেয়নেট চার্জ করেনি। পুলিশ সে দিন উপস্থিত ছিল না বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের সামনে বা অন্য কোথাও। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে কেবলই উপস্থিত ছিল ইপিআর-এর লোকেরা এবং ইপিআর গুলি চালিয়েছিল তাদের নিজেদের খেয়ালখুশিতে নয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ নাছিম। খন্দকার মমতাজ বেগম (সাবেক প্রফেসর ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা, রাজশাহী কলেজ), তার প্রবন্ধে বলেছেন যে, ‘ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সমগ্র বাংলাদেশ যখন উত্তাল, ঠিক সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে পাক সেনাদের গুলি ও বেয়নেট চার্জে মৃত্যুবরণ করেন ণজন্মা মহান শিক ড. শামসুজ্জোহা। ড. জোহা ছিলেন প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। তিনি জীবন দিয়ে এ দেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মুক্তির আন্দোলনকে এগিয়ে দিয়েছিলেন।’ (ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন ও ড. শামসুজ্জোহা। রাজশাহী উৎসব-২০১১, প্রকাশক: রাজশাহী জেলা সমিতি, ঢাকা। পৃষ্ঠা- ১৭)। লেখিকা জোহার আত্মীয় (চাচাতো বোনের কন্যা)। প্রবন্ধটি পড়ে জোহা সম্পর্কে বহু তথ্য জানা যায়। কিন্তু এখানে বলা দরকার যে, পাক সেনাদের গুলি ও বেয়নেট চার্জে ড. জোহার মৃত্যু ঘটেনি। সে দিন অথবা তার পরে কোনো পাক সেনা আসেনি শহর অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারে কাছে। সে সময় রাজশাহীতে পাক সেনা বাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট ছিল তেরখাদা নামক স্থানে। ঘটনার দিন এবং তারপরেও সেনাবাহিনীর লোকেরা ছিল ক্যান্টনমেন্টের চৌহদ্দির মধ্যে। রাজশাহীতে ইপিআর সেক্টর কমান্ডের দফতর ছিল কাজীহাটা নামক স্থানে। ইপিআর এবং পাক সেনার মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেলা কোনোক্রমেই উচিত নয়। পাক সেনাবাহিনী চলত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে। অন্য দিকে ইপিআর ছিল পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এখন মনে হয় অনেক লেখক ইচ্ছা করেই এই দুই সংস্থার মধ্যে পার্থক্যকে এক করে ফেলছেন। এটা যুক্তিসঙ্গত হচ্ছে বলে মনে হয় না আমাদের কাছে। আর একটি বিষয়ও ল করার মতো, তা হলো ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলন হয়েছিল সে সময়ের সারা পাকিস্তানে। এটা কেবলই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কোনো আন্দোলন ছিল না। এর ল্য ছিল আইয়ুব খানের প্রবর্তিত বুনিয়াদি গণতন্ত্রের স্থলে ব্রিটিশ ধাঁচের পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের প্রবর্তন।
জোহার মৃত্যুটা আমার কাছে এখনো হয়ে আছে অনেক পরিমাণে রহস্যঘেরা। জোহা ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের রিডার। পদটা তখন ছিল খুবই সম্মানের। রিডারদের পড়াশোনা করতে হতো প্রচুর। তারা সাধারণত সময় পেতেন না অন্য কিছু করার। রসায়নে প্রতিদিনই নতুন কিছু আবিষ্কৃত হচ্ছে। এর সংপ্তি বিবরণী পড়তে হলেও লেগে যায় অনেক সময়। জোহা রিডার হয়েও নিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদ। তিনি স্বেচ্ছায় কেন এই পদটি গ্রহণ করেছিলেন, আমি তা জানি না। সে সময় এই পদে তাদেরই নিযুক্তি দেয়া হতো, যাদের মনে করা হতো, দেশের সরকারের জন্য নিরাপদ। অর্থাৎ যারা কোনোভাবেই সরকার বা বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নন। জোহা কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন না; যদিও এখন অনেকে দাবি করতে চান যে, তিনি ছিলেন একজন বামঘরানার লোক। এটা আদৌ সত্য নয়। এ সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন প্রফেসর শামসউল হক। তিনি নিজে রাজনীতি না করলেও রাজনীতির ব্যাপারে ছিলেন খুবই ওয়াকেবহাল। তিনি বেছে নিয়েছিলেন জোহাকে। আইয়ুবের পতনের পর, সাবেক পাকিস্তানে কিছু দিনের জন্য তিনি শিামন্ত্রী হন। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় তিনি হন স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এমন একজন ব্যক্তি বাছাই করেছিলেন ড. শামসুজ্জোহাকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের পদ গ্রহণ করতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গুজব উঠেছিল যে, জোহা নাকি বামপন্থী ছাত্রনেতাদের সম্বন্ধে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে ‘নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করেন’। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তখন ছিল বিশেষভাবে বাম আন্দোলনের ঘাঁটি। সরকার থেকে মনে করা হয়েছিল, জোহাকে প্রক্টর করলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিকদের বামপ্রবণতা কিছুটা কমানো যাবে। জোহা নিহত হন ইপিআরের ছোড়া গুলিতে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দণি দিক দিয়ে গিয়েছে নাটোর-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়ক। এর দেিণ সে সময় ছিল একটা বড় নয়ানজুলি। তার ওপারে ছিল উলুখড়ের বন। বনের মধ্যে অবস্থিত ছিল রাজশাহী সরকারি বেতার কেন্দ্রের ট্রান্সমিটার ভবন। গুজব উঠেছিল, ছাত্ররা নাকি এই উলুবনে আগুন ধরাতে পারে। উলুবন থেকে প্রতি বছর উলুখড় বিক্রি করা হতো। অনেক উলুখড় কেটে শুকিয়ে খড় করা হয়েছিল। ছাত্ররা চেয়েছিল গাদা করে রাখা শুকনো উলুখড়ে আগুন দিতে। ছাত্রদের মধ্যে কিছু ছিল খুবই উগ্র বাম। তারা মনে করত, দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে হবে। আর অরাজকতা এনে দেবে সমাজ বিপ্লবের সুযোগ। তাদের বলা চলে Situationists। তাই গ্রহণ করা হয়েছিল বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। এসেছিল ইপিআর বাহিনীর লোক। তবে এই সাথে ছিলেন স্থানীয় প্রশাসনেরও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। যেমন প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ নাসিম। ইপিআর প্রথমে গুলি চালিয়েছিল মিছিলকারী ছাত্রছাত্রীদের ভয় দেখানোর জন্য। ছাত্ররা যাতে মিছিল করে বড় রকমের কোনো হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য জোহা ছাড়া আরো অনেক শিক ছিলেন নাটোর-চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহাসড়কের ওপরে। কিন্তু পরে তাদের মনে হয়, ইপিআর গুলি চালাতে পারে। তাদের অনেকেই চলে আসেন ক্যাম্পাসের মধ্যে। তিনজন শিক আশ্রয় নেন সড়কের দেিণ নয়ানজুলির মধ্যে। ছাত্রছাত্রীরা ঢুকে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে। কিন্তু জোহা দাঁড়িয়ে থাকেন সড়কের ওপর। শোনা যায় তাকে ছাত্রনেতা ভেবে গুলি করেন ইপিআরের একজন ক্যাপ্টেন। তার ওপর নির্দেশ ছিল পরিস্থিতি জটিল হলে গুলি চালানোর। আমি অকুস্থলে ছিলাম না। তাই ঠিক কী ঘটেছিল, জানি না। পরে অনেক কথাই শুনেছিলাম বিভিন্ন অধ্যাপকের মুখ থেকে। জোহা ভাবতে পারেননি, তাকে কেউ গুলি করতে পারে। ভাইস চ্যান্সেলর শামসউল হক নাকি তাকে সড়কের ওপর থাকতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। জোহার গায়ে গুলি লাগে সকাল প্রায় ১০টা নাগাদ। ইপিআর বিশেষ পিকআপ ভ্যানে করে আহত জোহাকে নিয়ে যায় দুই মাইল দূরে শহরে। এরপরে নিয়ে যায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে; যেখানে অপারেশন থিয়েটারে তার মৃত্যু হয়। ল করার বিষয়, এই দিন অর্থাৎ ১৮ ফেব্র“য়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোনো অধ্যাপকের গায়ে গুলি লাগেনি। গুলিতে আহত হয়নি মিছিলকারী কোনো ছাত্রছাত্রী। তাই জোহার মৃত্যু অনেকের কাছে এখনো হয়ে আছে রহস্যময়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে রাজশাহী শহরে ১৮ ফেব্র“য়ারি আন্দোলন হয়েছিল অনেক জোরালোভাবে। শহরের সোনাদীঘির মোড়ে ছাত্রনেতা নুরুল ইসলাম খোকা নিহত হন ইপিআরের গুলিতে। গুলি এসে লেগেছিল তার মাথায়। ইনি ভাসানী ন্যাপের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং পড়তেন রাজশাহী সিটি কলেজে। আর একজন ছাত্র গুরুতরভাবে আহত হয় ইপিআরের ছোড়া গুলিতে। গুলি এসে লেগেছিল তার পা ও বুকে। তার দেহের নিচের অংশ অসাড় হয়ে যায়। হাসপাতালে ছয় মাস ভুগে সে মারা যায়। এ ছাত্রের নাম আবদুস সাত্তার। এর বাড়ি ছিল শহরের পাঠানপাড়া মহল্লায়। সে ছিল রাজশাহী সরকারি মাদরাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। রাজশাহীতে ইতঃপূর্বে গুলিতে কোনো ছাত্র মারা যাওয়ার কথা আমার জানা নেই। রাজশাহী শহর ছিল খুবই শান্তিপূর্ণ। এই শহর ছিল অনেকটা ‘আইয়ুব ভক্ত’। কেননা আইয়ুব আমলে রাজশাহী শহরের হতে পেরেছিল প্রভূত উন্নতি। এ ছাড়া আইয়ুব মুসলিম পারিবারিক আইনের েেত্র যে পরিবর্তন আনেন, তা হতে পেরেছিল এই শহরের বার সমিতির কাছে বিশেষ প্রশংসিত। ইতঃপূর্বে আইয়ুব একবার এসেছিলেন রাজশাহী শহরে। তিনি পেয়েছিলেন নাগরিক সংবর্ধনা। কেবল একজন ছাত্র তার গাড়ি ল্য করে ছুড়েছিল একটা আধভাঙা ইট। এটা ছিল বিশেষ ব্যতিক্রম। যে ইট ছুড়েছিল সে তখন ছিল রাজশাহী কলেজের ছাত্র। তার ছিল বাম প্রণোদনা। সে পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েছিল এবং ঘটনাচক্রে হয়েছিল আমার ছাত্রদের একজন। আমার ছাত্ররা আমাকে অনেক কথাই বলত। আর ভাবত, হয়তো আমার লেখায় পেতে পারবে তাদের দেয়া তথ্য যথাযথ স্থান। আমি এই ছাত্রটির নাম ভুলে গিয়েছি। তাই নামটি দিতে পারলাম না।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলন প্রধানত পরিচালিত হচ্ছিল রাশেদ খান মেনন (বর্তমানে আলহাজ) ও বেগম মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে। তারা দুজনেই এখন মন্ত্রী। তাদের চিন্তাচেতনায় এসেছে বিরাট পরিবর্তন। তারা এখন বলছেন, ছাত্রদের রাজনীতি না করে লেখাপড়া করতে, জ্ঞানচর্চা করতে। কিন্তু তখন তারা দুজনেই ছিলেন বিশেষভাবে ‘জঙ্গি’, আর এক কথায় লড়াকু; ‘ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’ মনোভাবাপন্ন।
অনেক কিছুই ঘটতে দেখলাম আমার এই সুদীর্ঘ জীবনে। দেখলাম বিরাট ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়তে। দেখলাম পাকিস্তান সৃষ্টি হতে। দেখলাম সাবেক পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হতে। এসব ঘটনা থেকে আমার কাছে এই সত্য বিশেষভাবে ফুটে উঠতে চাচ্ছে যে, কেবল বন্দুকের জোরে মতায় থাকা যায় না। প্রয়োজন হয় জনসমর্থনের। রাজনীতির অন্যতম গোড়ার কথাই হলো, কে আমাকে শাসন করবেন, আর কেনই বা আমি মেনে নেব তার এই শাসন করাকে। এর শাসন মতার যুক্তি কোথায়? জঁ জাক রুশোর (১৭১২-১৭৭৮) ‘সামাজিক চুক্তি’ মতবাদকে এত দিন পরও আমার কাছে মনে হয়, যথেষ্ট সত্য। রাজনীতিতে আমি বিশ্বাস করি জনগণের সার্বভৌমত্বকে। জনগণের উত্তাল আন্দোলনের ফলে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুবকে ছাড়তে হয়েছিল মতা।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Saturday, January 31, 2015

সব পরিস্থিতিতে সব কিছু গ্রহণযোগ্য নয় by এবনে গোলাম সামাদ

সব পরিস্থিতিতে সব কিছু গ্রহণযোগ্য নয়। শোক প্রকাশও নয়। বিশেষ করে শোকের প্রাণহীন সমারোহ। যাতে থাকে না কোনো আবেগের প্রণোদনা। কেবলই থাকে আনুষ্ঠানিকতার প্রগলভতা। একজনের পুত্র মারা গেলেন। মা তার পুত্রশোকে হয়ে পড়েছেন প্রায় বাকহীন। এ অবস্থায় আরেকজন তাকে সমবেদনা জানাতে যেতেই পারেন। এভাবেই চলেছে আমাদের সমাজজীবন। মৃত্যু সব পরিবারেই আসে। এক পরিবার আরেক পরিবারকে জানাতে চায় সমবেদনা। সমবেদনা দুঃখকে করে তোলে সহনীয়। কিন্তু এটা সাধারণ জীবনে খাটলেও রাজনীতিকদের জীবনে যে খাটে, তা বলা যায় না। বিশেষ করে যাদের মধ্যে চলেছে আদর্শিক ও মতার দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্ব বিরোধিতার স্তর ছেড়ে পৌঁছেছে প্রায় শত্র“তার মাত্রায়। বেগম জিয়ার পুত্র আরাফাত রহমান অকালেই মারা গেলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে কিছু না জানিয়েই ছুটে গেলেন সমবেদনা জানাতে। কিন্তু বেগম জিয়া চাইলেন না অথবা পারলেন না এই আনুষ্ঠানিকতাকে গ্রহণ করতে। আমরা দেখলাম, এক দিকে শেখ হাসিনা ছুটে গেলেন শোক প্রকাশ করতে, অন্য দিকে একই সাথে শুনলাম তার দলের নেতাদের খালেদা জিয়াকে কারারুদ্ধ করার কথা বলতে। কেবল দলের নেতারাই নয়, উচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও বলতে দেখা গেল, প্রমাণ মিললেই খালেদাকে গ্রেফতার করা হবে। কোনো গণতান্ত্রিক দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এভাবে রাজনৈতিক ধাঁচে কথা বলতে পারেন বলে মনে হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে পারেন। গণতন্ত্রে আমরা জানি, রাষ্ট্র ও সরকারকে এক করে ফেলা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে হচ্ছে। রাষ্ট্র একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কোনো দল অথবা জোট গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার লাভ করে থাকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। চিরকালের জন্য নয়। এছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ, যথা আইনসভা, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে চেষ্টা করা হয় পরস্পরের থেকে পৃথক রাখার। যাতে করে, এদের একটি বিভাগ আর একটি বিভাগের মতার অপব্যবহারকে প্রশমিত করতে পারে। গণতন্ত্র আর আইনের শাসনের ধারণা অতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে এ েেত্র খুবই ঘাটতি। গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্যে প্রয়োজন হয় জনমত, রাজনৈতিক দল এবং অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন। কিন্তু জনমত গঠনের েেত্র সৃষ্টি করা হচ্ছে বাধা। বিরোধী দলের পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনকে দেয়া হচ্ছে বন্ধ করে। দেয়া হচ্ছে না, রাজনৈতিক দল গড়ার অবাধ সুযোগ। আর অবাধ নিরপে নির্বাচন এ দেশে হতে পারছে না। তাই দেশে শুরু হয়েছে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছেন এই আন্দোলনের প্রতীক। তিনি একজন সাধারণ নাগরিক নন। তাই তার পুত্রের মৃত্যুতে শেখ হাসিনা শোক প্রকাশ করতে যাওয়াকে মনে হতে পেরেছে বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আর এই কারণেই হতে পারেনি খালেদা জিয়ার সাথে শেখ হাসিনা সাাৎকার। এটা নিয়ে হইচই করার কিছু নেই। ইতিহাসে এটা বিরল ব্যাপারও নয়। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার সভায় কে বা কাহারা করেছিল গ্রেনেড হামলা। এতে নিহত হয়েছিলেন বেশ কয়েকজন মহিলা। যার মধ্যে ছিলেন জিল্লুর রহমানের (পরে রাষ্ট্রপতি) স্ত্রী আইভী রহমান। বোমা বিস্ফোরণের আওয়াজে শেখ হাসিনা কিছু দিনের জন্য হয়ে পড়েছিলেন বধির। খালেদা জিয়া তখন প্রধানমন্ত্রী। তিনি শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে চান। কিন্তু শেখ হাসিনা তার সাথে দেখা করতে জানান অস্বীকৃতি। বেগম জিয়া জিল্লুর রহমানের সাথে দেখা করতে চাইলে, জিল্লুর রহমান আপত্তি করেন না। এই জন্য জিল্লুর রহমানকে আওয়ামী লীগের মধ্যে হতে হয়েছিল সমালোচিত। ল করার বিষয়, জিল্লুর রহমানের সাথে সাাতের আগে খালেদা জিয়া নিয়েছিলেন তার যথাযথ সম্মতি। হঠাৎ করেই তিনি ছুটে যাননি তার কাছে। খালেদা জিয়া বজায় রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল। কিন্তু শেখ হাসিনা সেটা করেননি। তিনি জানতে চাননি, শোকসন্তপ্ত খালেদা জিয়া তার সাথে সাাৎ করবেন কি না। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা যদি দুইজনেই হতেন সাধারণ মহিলা, তাহলে দুইজনের মধ্যে সমবেদনা সহজেই গ্রহণযোগ্য হতে পারত। কিন্তু রাজনীতির প্রাচীর সেটা হতে দেয়নি।
রাজনীতি আর সমাজনীতি এক নয়। প্রখ্যাত ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক মন্তব্য করেছেন (বাংলাদেশে প্রতিদিন, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৫) হেলায় সুযোগ নষ্ট করল বিএনপি। কিন্তু কিসের সুযোগ? শেখ হাসিনা কোনো আপসরফা করতে যে গিয়েছিলেন, তা ভাবার কারণ নেই। তিনি তারেক রহমানকে বিলাত থেকে ফেরত এনে বিচার করতে চাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে তারেক রহমানের প্রাণদণ্ড। ব্রিটেন তারেক রহমানকে ফেরত দেবে কি না বলা যাচ্ছে না। কেননা, বিলাতের আইনে এখন আর প্রাণদণ্ড নেই। প্রাণদণ্ড হতে পারে এমন কাউকে তারা ফেরত দিতে রাজি নয়। এ রকম পরিস্থিতিতে সমবেদনার প্রশ্ন বিশেষভাবেই অবান্তর। তবে অনেক বুদ্ধিজীবীই মনে করছেন, খালেদা জিয়া দিয়েছেন ধৃষ্টতার পরিচয়। এসব বুদ্ধিজীবী রাজনীতির ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞাত নন। ব্রিটেন নেপোলিয়নকে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে বন্দী করে রাখে। প্রাণদণ্ড প্রদান করে না। কিন্তু খাদ্যের সাথে অল্প অল্প আর্সেনিক মিশিয়ে তাকে খেতে দিয়ে ধীরে ধীরে মেরে ফেলে। নেপোলিয়নের চুল কাটতেন যে নাপিত, তিনি তার কোনো বন্ধুকে নেপোলিয়নের কিছু চুল উপহার দিয়েছিলেন। তার এই চুল নিয়ে অনেক পরে হয়েছিল গবেষণা। আর তার এই চুলের মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল আর্সেনিকের পরিচয়। খাদ্যের মধ্যে আর্সেনিক থাকলে তা চুলে গিয়ে জমতে পারে। অনেক কিছুই ঘটে রাজনীতির কারণে। নেপোলিয়নকে বিষ প্রয়োগ করেন মারার ঘটনাও এর মধ্যে একটি। বলা হচ্ছে, বিএনপি নেত্রীর হুকুমে তার অনুসারীরা যাত্রীবাহী বাসে ছুড়ে মারছে পেট্রলবোমা। খালেদা জিয়া এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। কিন্তু তার ওপর চাপানো হচ্ছে বিশেষ অভিযোগ। মানুষ পুড়িয়ে মারা কেউ সমর্থন করে না। কিন্তু এ কথাও ঠিক যে, যুদ্ধের আইন আর শান্তির আইন এক নয়। তা যদি হতো, তবে জাপানের ওপর পরমাণু বোমা নিপেকে বিবেচনা করা হতো একটি ভয়ঙ্কর যুদ্ধাপরাধ হিসেবে। কিন্তু সেটা করা হয়নি। পারমাণবিক অস্ত্র যারা বানিয়েছেন তাদের মধ্যে আটজন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। কিন্তু তাদের বিবেকে বাধেনি এ রকম নরঘাতী অস্ত্র নির্মাণে। সাধারণ পটকা ফুটালে তাকে ধরা হচ্ছে সন্ত্রাসী হিসেবে; কিন্তু পরমাণু বোমা নিপেকে কেউ সন্ত্রাসবাদী কর্ম বলে চিহ্নিত করতে চাচ্ছে না। আক্রান্ত হলে মানুষের মধ্যে দুই রকম প্রেরণা দেখা দিতে পারে। কেউ ভয়ে পালানোর উদ্যোগ নিতে চাই, আবার কেউ চায় মরণপণ লড়াই করতে। তাদের সন্ত্রাসী বলে চিহ্নিত করা যায় না। এ দুনিয়ায় শান্তিপূর্ণ যুদ্ধ বলে কিছু হওয়া সম্ভব নয়। আমি আমার ছাত্রজীবনে ধর্মঘটের ওপর লেখা একটি বই পড়েছিলাম। তাতে বলা হয়েছিল, ধর্মঘটে কারো-না-কারো তি হবেই। যে ধর্মঘটে কারও তি হয় না, সে ধর্মঘট সফল হয় না। এ হলো ধর্মঘটের দর্শন।
আমরা শান্তি চাই। কিন্তু অশান্তির কারণগুলোকে বজায় রেখে শান্তি আসতে পারে না। শান্তি আসতে হলে আওয়ামী লীগকে আসতে হবে আলোচনার টেবিলে। আজকের বাস্তবতা এই কথাই বলে। ঢাকায় থাকি না। টেলিভিশনে দেখলাম আরাফাতের নামাজে জানাজা হতে। যে বিরাট জনসমাগম এই নামাজে জানাজায় হতে পেরেছে, তাকে বলা চলে না ভাড়া করে আনা। মানুষের ঢল নেমেছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এটাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অনেক পত্রিকায় লেখা হচ্ছে, দেশের লোক নাকি বিএনপির হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বহু মানুষ বিএনপিকে সমর্থন করছে। আর বিএনপি একটি জনসমর্থনহীন দল নয়।
অনেক পত্রপত্রিকায় বলা হচ্ছে, ঢাকার বাইরে বারোটি জেলায় জামায়াতে ইসলামী করছে আন্দোলন। কিন্তু ঢাকাতে আরাফাত রহমানের নামাজে জানাজায় যে জনসমাগম হতে দেখলাম, তা কি কেবলই জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক? তা যদি হয়, তবে বলতে হবে খালেদা জিয়া শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লেও আন্দোলন মাঝপথে থেমে যাবে না। জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বে তা হতে থাকবে পরিচালিত। আর তাই আওয়ামী লীগকে শেষ পর্যন্ত একটা সমঝোতায় আসতে হবে জামায়াতে ইসলামীর সাথে। তাদের রাজাকার বলে দূরে সরিয়ে রেখে কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান আসবে না। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হতে হবে রাজনৈতিকভাবেই।
দেশে ঠিক কী হতে যাচ্ছে আমরা তা জানি না। কিছু দিন আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা হয়েছে। অনেক ব্রিটিশ এমপি মনে করেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক গোলযোগ চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত সেনাশাসন এসে যেতে পারে। সেনাশাসন এলে, এ দেশে বর্তমান দুই নেত্রীর রাজনীতিতে ছেদ পড়া সম্ভব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ব্যাপারে ঠিক কী চায় তা আন্দাজ করা যাচ্ছে না। তবে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্কিন সিনেটে বলেছিলেন, তিনি মনে করেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যথাযথ হয়নি। এতে প্রতিফলন ঘটেনি জনমতের। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে প্রকৃত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। মাত্র ক’দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা এসেছিলেন ভারত সফরে। তিনি কেন ভারত সফরে এসেছিলেন আমরা তা জানি না। তবে একটি মত হলো, তিনি ভারতে এসেছিলেন চীনকে সংযত করার ল্েয। চীন ও ভারতের মধ্যে অরুণাচল নিয়ে একটি যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। সেটাকে ঠেকানোই হলো ওবামার ভারত সফরের ল্য। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমনই যে, চীন ভারত কোনো যুদ্ধ শুরু হলে সে-ও জড়িয়ে পড়তে পারে এই যুদ্ধের মধ্যে। বাংলাদেশে যদি একটি জাতীয় নির্বাচন হয়, তবে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। আর তার পে অনেক সহজ হবে এই জটিল পরিস্থিতিতে যথেষ্ট মনোবল নিয়ে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। জাতিক এবং আন্তর্জাতিক উভয় কারণেই এখন বাংলাদেশে হওয়া উচিত কোনো দলনিরপে সরকারের অধীনে একটি অবাধ ও নিরপে নির্বাচন।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Thursday, January 29, 2015

পৃথিবীর সম্পদ ও এর ভোগব্যবস্থা by এবনে গোলাম সামাদ

পত্রিকায় অক্সফাম প্রদত্ত বর্তমান বিশ্বের সম্পত্তির হিসাবসংক্রান্ত বিবরণ পড়ছিলাম। অক্সফামের হিসাব অনুসারে বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ শতকরা ১ ভাগ মানুষের হাতে গিয়ে পড়েছে। অন্য দিকে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের কাছে আছে মাত্র ৫.৫ শতাংশ সম্পদ। অক্সফাম সম্পদ বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। সাধারণ অর্থনীতির বইতে প্রাকৃতিক সম্পদ আর সম্পদকে (Wealth) এক করে দেখা হয় না। সম্পদ বলতে বোঝায়, প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে মানুষ যা তৈরি করে তাকে; যেমন- কলকারখানা। বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ শতকরা ১ ভাগ লোকের হাতে, এ কথায় ঠিক কী বুঝতে হবে সেটা স্বচ্ছ নয় অনেকেরই কাছে। পত্রিকার খবর পড়ে এ বিষয়ে কিছু অনুমান করা যাচ্ছে না। আমাদের হাতে এর বিস্তারিত প্রতিবেদন এসে পৌঁছায়নি। এই সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় রেখেই বর্তমান আলোচনার অবতারণা। মানুষের ভোগের সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ হলো, মানুষের শরীর এমনভাবে তৈরি যে, সে মানতে বাধ্য হয় তার দেহের ভোগ করার সীমানাকে। আমার ঘরে যথেষ্ট চাল থাকার অর্থ এই নয় যে, প্রতিদিন ১০ থালা ভাত খেতে পারব। আমার খাদ্য গ্রহণের একটা বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে। বেশি ভোগ করতে গেলে ভোগ দুর্ভোগে পরিণত হতে পারে। কথায় বলে ‘গরিব মরে না খেয়ে, আর বড়লোক মরে বেশি খেয়ে’। সব মানুষই মরে। মানুষ মরণশীল। মৃত্যুর সীমানা দিয়ে ঘেরা মানুষের জীবন। এর বাইরে সে যেতে পারে না। প্রশ্ন উঠছে, শতকরা এই ১ ভাগ লোক আসলে কতটা ভোগ করছেন। তারা যদি বিশ্বের অর্ধেক সম্পদের সবটুকুই ভোগ করতে চান এবং অন্যদের কিছুই না দিতে চান, তবে বিশ্বে এত লোক বাঁচছে কী করে। তাদের জন্য স্বাভাবিক ছিল না খেয়ে মরে যাওয়া। তাই বলা চলে না যে, বিশ্বের শতকরা ১ ভাগ মানুষের হাতে অর্ধেক সম্পদ চলে যাওয়ার মানে হচ্ছে, এই সম্পদের আয় থেকে আর সবাই হচ্ছে বঞ্চিত। এটা কখনোই হতে পারে না। কিন্তু অক্সফামের হিসাব থেকে এই রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারছে। কোনো ব্যক্তি যখন তার ব্যক্তিমালিকানায় একটি কারখানা স্থাপন করেন, তখন তাকে নিয়োগ করতে হয় শ্রমিক। নিয়োগ করতে হয় নানা পর্যায়ে কর্মকর্তা যারা কারখানার প্রশাসন পরিচালনা করে। কোনো ব্যক্তি একা কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারে না। তাই একটি কারখানার আয় কেবল যে একজন ভোগ করেন, তা নয়। তিনি যখন কোনো কারখানা স্থাপন করেন, তখন হতে পারে বহু লোকের কর্মসংস্থান। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত, অক্সফামের প্রতিবেদন পড়ে মনে হচ্ছেÑ ‘বিশ্বের শতকরা ১ ভাগ লোকই কেবল ভোগ করছেন বিশ্বের শতকরা ৫০ ভাগ সম্পদের আয়। আর এ জন্যই ঘুচছে না বিশ্বের অভাব অনটন।’ গরিবেরা গরিব, কারণ তাদের হাতে কোনো সম্পদ নেই। পৃথিবীর শতকরা ৫০ ভাগ সম্পদ নাকি চলে গেছে শতকরা মাত্র ১ ভাগ মানুষের হাতে। অক্সফামের প্রতিবেদন পড়ে বোঝা যাচ্ছে না, বিশ্বের আর শতকরা ৫০ ভাগ সম্পদ কাদের হাতে কী পরিমাণ আছে। প্রতিবেদন অনুসারে এই সম্পদের শতকরা ৫ দশমিক ৫ ভাগ আছে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের হাতে। অক্সফাম বলছে, দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে ধনিক শ্রেণীর ওপর বাড়াতে হবে আয়কর। বন্ধ করতে হবে আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা। কিন্তু সব দেশেই দেখা যায়, আয়কর বাড়ালে বাড়ে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা। সাদা টাকা পরিণত হয় কালো টাকায়। ‘কালো’ টাকা বলতে বোঝায় কর ফাঁকি দেয়া টাকা। তা দিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য চলে সরকারি হিসাবের বাইরে। আয়কর অতিরিক্ত বাড়ালে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ হতে চায়। আর তাই হতে দেখা যায় বেকারত্বের বৃদ্ধি। বেকার বাড়ার অর্থ দাঁড়ায়, ক্রেতার সংখ্যা কমা। ক্রেতার সংখ্যা কমার অর্থ দাঁড়ায় উৎপাদিত পণ্যের বাজার সঙ্কুচিত হয়ে পড়া। আর বাজার সঙ্কোচনের ফলে দেখা দেয় বাণিজ্যের মন্দা। অর্থনৈতিক সমস্যা তাই হয়ে উঠতে পারে খুবই জটিল।
এক সময় সমাজতন্ত্রীরা বলতেন, ‘ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রকে নিতে হবে অর্থনীতি পরিচালনার ভার। রাষ্ট্রিক পরিকল্পনা অনুসারে চলবে একটা দেশের অর্থনৈতিক জীবন।’ কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সমাজতন্ত্রের যুক্তিটা আর জোরালো শোনাচ্ছে না। রাষ্ট্রকে পরিণত করা যায় না একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। অন্য দিকে চীন সমাজতন্ত্রের পথ ছেড়ে গ্রহণ করেছে বাজার অর্থনীতির পথ। চীন বলছে না সমাজতান্ত্রিক সমাজ জীবন গড়ার কথা। বলছে না, সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব। তাই আজ নতুন করে দেখা দিয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালনার উপযোগিতা। কেউ বলছে না, ব্যক্তিগত মালিকানায় ব্যবসাবাণিজ্য করা বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘আমরা আরো অঙ্গীকার করছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল ল্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ আমাদের সংবিধানে যখন সমাজতন্ত্রের প নিয়ে এই কথাগুলো লিখিত হয়, তখন কেউ ভাবতে পারেনি, সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়বে। আর চীন মাও জে দং-এর নীতি পরিত্যাগ করে গ্রহণ করবে মুক্তবাজার অর্থনীতির পথ। বিশ্বের পরিস্থিতি এখন ব্যাপকভাবেই বদলে গেছে। আমাদের সংবিধানের ওই অংশটি তাই পরিত্যক্ত হওয়া উচিত। কেননা সমাজতন্ত্রে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে কিছু থাকে না। সমাজতন্ত্র বাস্তব েেত্র হয়ে দাঁড়ায় বিশেষভাবেই আমলাতন্ত্র। মানুষ হয়ে পড়ে আমলাতন্ত্রের শাসন ও শোষণের অধীন। সম্পত্তি জাতীয়করণ মানুষকে করে তোলে বিশেষভাবে রাষ্ট্রনির্ভর। সমাজতন্ত্রে অর্থনৈতিক উৎপাদন কমে যায়, মানুষ হারায় তার স্বাবলম্বিতা।
অক্সফাম যেভাবে অর্থনীতিকে গড়ে তুলতে চাচ্ছে, তা কিছুটা হলো সমাজতন্ত্রেরই অনুরূপ। এর ফলে অর্থনীতি হয়ে উঠবে আমলাতান্ত্রিক। কমে যাবে ব্যক্তিউদ্যোগের সুযোগ; আর সেই সাথে অর্থনৈতিক বিকাশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে ব্যক্তির উদ্যোগে। এটা বন্ধ করলে অর্থনীতির হবে সমূহ তি, যেটা আমরা করতে পারি না। আমরা আমাদের দেশের ইতিহাসের পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই, ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেছিল এক ব্যাপক জাতীয়করণ অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়করণ কর্মসূচি। এই নীতি অনুসারে সব চটকল, বস্ত্র ও সুতাকল, চিনিকল, বিমান ও জাহাজ চলাচল জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারি মালিকানায় আসে। এগুলো আর ব্যক্তিমালিকানায় থাকেনি। সরকারি মালিকানায় আসে অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌযান। বহির্বাণিজ্যের বৃহদংশও জাতীয়করণের ফলে সরকারি প্রচেষ্টার অন্তর্ভুক্ত হয়। এ ছাড়া ১৫ লাখ টাকা ও তার বেশি মূল্যের সব পরিত্যক্ত এবং অনুপস্থিত মালিকের সম্পত্তিও রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। বিদেশী ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি ছাড়া সব দেশী ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি আনা হয় সরকারি নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে অর্থনীতিতে নেমে আসে বিরাট বিপর্যয়। দেখা দেয় পরিচালনার সঙ্কট। আমাদের পাটশিল্প হয়ে যায় ধ্বংস। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলজুড়ে সৃষ্টি হয় এক বিরাট দুর্ভি। এতে কম করে হলেও মারা যায় ৬৫ হাজার লোক। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এ রকম ভায়বহ দুর্ভি ইতঃপূর্বে হয়েছে বলে জানা নেই। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন অর্থনীতিকে ব্যক্তিমালিকানায় ফিরিয়ে আনতে। তার সময় ব্যক্তিমালিকানায় শুরু হয় তৈরী পোশাক শিল্প, যা আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের েেত্র বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। এতে কাজ করছে প্রায় ১৬ লাখ শ্রমজীবী। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে আরম্ভ হয় বিদেশে শ্রমশক্তি রফতানি। শুরু হয় ব্যক্তিমালিকানায় চিংড়ি ঘের তৈরি, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করে তোলে। আওয়ামী লীগ এখনো বলেছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কথা। বলছে আগে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরে গণতন্ত্রের কথা। কিন্তু বিএনপি তা বলছে না। বিএনপি বলছে না, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একে অপরের পরিপন্থী। কেননা, গণতন্ত্র উন্নয়নের পরিপন্থী হলে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধি পেতে পারত না। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের লড়াই কেবল মতার লড়াই নয়; এর গোড়ায় আছে আদর্শিক পার্থক্য। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে সমাজতন্ত্র কিন্তু বিএনপি চাচ্ছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থনীতি, যা পরিচালিত হবে দাম, লাভ ও উৎপাদনের খরচ নির্ভর করে; সরকারি আমলাদের পরিকল্পনা অনুসারে নয়। আমাদের অর্থনীতি এখনো হয়ে আছে মূলত কৃষি অর্থনীতি। এ অর্থনীতি হয়ে আছে দণি-পশ্চিম মওসুমি বায়ুনির্ভর। যে বছর কোনো কারণে দেখা দেয় খরার সমস্যা, অর্থাৎ বৃষ্টি হয় কম অথবা হলেও ঠিক সময় হয় না, সে বছর ফসল মার খায়। আবার যে বছর মওসুমি বায়ুর কারণে অতিবৃষ্টি হয় (বাতাসে আসে সমুদ্র থেকে অধিক পরিমাণে জলীয়বাষ্প), সে বছর সৃষ্টি হয় বন্যার সঙ্কট। বন্যার ফলেও ঘটে ফসলের বিরাট তি। আমাদের দেশের কৃষি এমন যে, শতকরা ১০ ভাগ ফসল কম হলেই দেখা দিতে পারে দুর্ভিরে পরিস্থিতি। মানুষ মরতে পারে অনাহারে। আমাদের দারিদ্র্যের কারণ কেবলই ধনিক শ্রেণীর শোষণের ফল নয়। এর মূলে আছে প্রাকৃতিক কারণও। তবে দুর্ভিরে পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ব্যবসায়ীরা খাদ্যশস্য কিনে মজুদ করে পরে বেশি দামে বেচে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে দুর্ভি নিতে চায় ভয়াবহ রূপ। এটা যাতে না হতে পারে, তার জন্য সরকারি প্রচেষ্টার অবশ্যই প্রয়োজন।
আমাদের অর্থনীতির মূল সমস্যা এখনো হয়ে আছে, দুর্ভি প্রতিরোধের সমস্যা। কিন্তু কৃষি অর্থনীতিতে উন্নতি ঘটছে। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি ধান উৎপাদন করতে পারছি। আমাদের কৃষিক্ষেত্রে তেমজুরের অবস্থার ঘটেছে বিরাট উন্নতি। তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আয় করছে। এটাকে উপো করা চলে না আমাদের দেশের অর্থনীতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে। এসবই ঘটতে পারছে ব্যক্তিগত মালিকানায়; সরকারি মালিকানায় নয়। আমরা আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গড়ে তুলছি না সরকারি যৌথ খামার। সেটা যদি করতে চাই, তবে আমাদের কৃষি অর্থনীতিতেও আসবে বিরাট বিপর্যয়। এ বিষয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। রাশিয়ায় যত কারণে কৃষি উৎপাদন কমেছিল, তার একটি বড় কারণ হলো সরকারি যৌথ খামার গড়া। এ েেত্র আমলাতান্ত্রিক গাফিলতি পৌঁছেছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। অক্সফাম বলছে, দরিদ্র মানুষকে দিতে হবে আর্থিক সহায়তা। কিন্তু এ েেত্র মনে রাখতে হবে, অক্সফাম যেভাবে দরিদ্র মানুষকে রাষ্ট্রিক সহায়তা দিতে বলছে, এতে সৃষ্টি হতে পারে একদল পেশাদার ভিখারি। যারা রাষ্ট্রের ওপর হয়ে উঠতে চাইবে একটা বিরাট অর্থনৈতিক বোঝা; যেটা কাম্য নয়। এসব কথা বলছি, কেননা সমাজতন্ত্র গড়ার হুজুগে আমাদের দেশের অর্থনীতি হয়েছিল ভয়ঙ্করভাবে তিগ্রস্ত। আবার যদি সেই হুজুগ ওঠে, তবে অর্থনীতি অচল হয়েই পড়বে। পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ শতকরা ১ ভাগ মানুষের হাতে গিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের সম্পদ এখন শতকরা কত ভাগ মানুষের হাতে আছে, তার হিসাব আমরা জ্ঞাত নই। কিন্তু আমাদের দেশে ছোট ছোট কৃষিজীবী অনেক। তারা যেভাবে কৃষিকাজ করছেন, তা না করে যদি সমবায় কৃষি পদ্ধতিতে নিজেরা স্বেচ্ছায় চাষাবাদ করেন, তবে ফসলের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া মানেই মানুষ খেতে পাওয়া নয়। কারণ বেকাররা খাদ্য কিনতে পারে না। তাই থাকতে হবে কর্মসংস্থান। আমাদের রাজশাহী অঞ্চলে আলুর ফলন যথেষ্ট হচ্ছে। আলু রাখা হচ্ছে হিমঘরে। কিন্তু অনেক সময় ক্রেতার অভাবে আলু থেকে যাচ্ছে হিমঘরেই। আর পচে নষ্ট হচ্ছে সেখানেই। একইসাথে আমরা কিনছি বিদেশ থেকে আমদানি করা পটেটো চিপ্স। অথচ এটা আমরা আমাদের দেশে উৎপাদিত আলুকে ভেজেও অবাধে করতে পারি। এ েেত্র কেউ অর্থ যদি বিনিয়োগ করেন, আমার মনে হয়, তিনি লাভবান হবেন। কারণ, দেশে পটেটো চিপ্স কেনার মতো যথেষ্ট ক্রেতা আছে। অভাব মানুষের নিত্যদিনের সাথী। অভাব ছিল এবং আছে। অভাবের সমস্যা সর্বতোভাবে বোধহয় মানুষ কখনোই সমাধান করতে পারবে না। আমরা যা করতে পারি, তা হলো অভাবের সমস্যাকে সহনশীল সীমানার মধ্যে বজায় রাখা।
পাদটিকা : প্রকাশ থাকে যে, ১৯৪২ সালে বিলাতে অক্সফাম নামের সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দফতর হলো অক্সফোর্ড। অক্সফামের লক্ষ্য হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গরিবদের আর্থিক সাহায্য দেয়া, বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আর্থিক সাহায্য প্রদান এবং আর্থসামাজিক সমস্যার সমাধানে নীতি নির্ধারণের জন্য গবেষণা করা। এবার পত্রপত্রিকায় যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে, তা অক্সফামের গবেষণার ফল। তবে এক সময় অক্সফামের গবেষণার যে কদর ছিল, বর্তমানে তা আর নেই। এর একটা কারণ হলো, বিলাত বা ব্রিটেন আর এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রস্থল নয় এবং বর্তমানে আর পারছে না অন্য দেশকে আগের মতো আর্থিক সাহায্য প্রদান করতে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

Saturday, November 1, 2014

ইতিহাসবিদ এ এফ সালাহউদ্দীন আহমদ by এবনে গোলাম সামাদ

সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক এ এফ সালাহউদ্দীন আহমদকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে। অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেবের সাথে আমি রাজশাহী বশ্বিবিদ্যালয়ে অনেক দিন চাকরি করেছি। আমি তার অন্তরঙ্গ ছিলাম না; কিন্তু তিনি আমার অপরিচিতও ছিলেন না। তার সাথে দেশ-দশ ও ইতিহাস নিয়ে কিছু কিছু কথাও হয়েছে। মরহুম অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেব সম্বন্ধে আমার মনে জমে থাকা স্মৃতি উঠছে ভেসে। আমি তার কিছু স্মৃতিচারণ করতে চাচ্ছি আমার এই বর্তমান লেখায়। তার সম্বন্ধে আমার মনে কৌতূহল জাগে। কারণ, শুনেছিলাম তিনি নাকি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের (গ ঘ জড়ু) একজন ভাবশিষ্য। রায় সম্বন্ধে আমার মনে যথেষ্ট কৌতূহল ছিল। রায়ের লেখা অনেক বই আমি পড়েছিলাম। তাই যখন জানলাম অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেব রায়ের একজন বিশেষ ভক্ত, তখন তার কাছ থেকে রায় সম্পর্কে কিছু জানা যায় কি না সেটা জানতে ইচ্ছা হয়; কিন্তু হতাশ হই তার সাথে টুকরো টুকরো আলাপচারিতায়। আমার মনে হয় রায় সম্পর্কে তিনি জানেন না। জানেন না বিশেষ কিছুই। তার ধারণা নেই রায়ের চিন্তাজগৎ সম্পর্কে। আমাদের পত্রপত্রিকায় সরবে প্রচার করা হচ্ছে, তিনি ছিলেন রায়পন্থী; কিন্তু সেটা আদৌ সত্য বলে ভাবতে পারছি না আমি।
মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রথম জীবনে ছিলেন একনিষ্ঠ মার্কসবাদী। কার্ল মার্কস ইতিহাসের অর্থনৈতিক ভাষ্যে আস্থাশীল ছিলেন; কিন্তু তিনি অর্থনীতি বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন তা নিয়ে আছে যথেষ্ট বিতর্ক। তিনি অর্থনীতি বলতে যেমন বুঝিয়েছিলেন অর্থনৈতিক উৎপাদনের সাজসরঞ্জামকে, তেমনি আবার বুঝিয়েছিলেন অর্থনীতিকে নির্ভর করে সমাজে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিরোধী অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্ঘাতকে, যাকে তিনি বলছেন শ্রেণিসঙ্ঘাত। উৎপাদনের সাজসরঞ্জামের ওপর মানবসমাজ কাঠামো ও তার ইতিহাস যে নির্ভর করে সে কথা এখন মোটামুটিভাবে স্বীকৃত। মানুষ যখন পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তখন তার সমাজজীবন যেমন ছিল, ধাতুযুগে এসে তা আর থাকেনি। একইভাবে মানুষ যখন হাত দিয়ে তাঁত চালিয়েছে, তখন তার সমাজজীবন যেমন ছিল, বাষ্পচালিত তাঁতের যুগে তা আর থাকেনি। বিলাতে ঘটেছে বিরাট শিল্পবিপ্লব। সমাজ গেছে বদলে। ইতিহাসকে বুঝতে গেলে তাই ভেবে দেখতে হয় মানুষ কী ধরনের উৎপাদনযন্ত্র ব্যবহার করছে। অন্য দিকে সমাজে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসতে পারে শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। মার্কসের এই ধারণা এখন আর আগের মতো আদৃত নয়। যদিও একসময় বিবেচিত হতো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে। মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রথম জীবনে মার্কসবাদী হলেও পরবর্তী জীবনে হয়ে ওঠেন বিশেষভাবে মানবতন্ত্রী বা হিউম্যানিস্ট। তিনি বলেন, মানব ইতিহাস বিকশিত হচ্ছে, কারণ মানুষ হয়ে উঠছে মানবতন্ত্রী। স্বার্থপরতার জায়গায় অধিক স্থান অধিকার করছে পরার্থপরতা। মার্কস ইতিহাস ব্যাখ্যায় যোগ দিয়েছেন বস্তুবাদী দর্শনের ওপর। স্বার্থবাদী ধারণার ওপর। মানুষের কল্যাণবুদ্ধিকে তিনি বিবেচনায় নিতে চাননি। যেটা মার্কসবাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
মানব ইতিহাস কেবল স্বার্থবুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না, পরিচালিত হচ্ছে শুভবুদ্ধি দ্বারা। রায় তার শেষজীবনে ভাবতে আরম্ভ করেন সব কিছুর অস্তিত্ব নিয়ে। মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারে; কিন্তু মানুষ, মানুষ হিসেবে নিজের অস্তিত্বের বাস্তবতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারে না। মানুষের কাছে মানুষই সবচেয়ে বড় সত্য। তাই মানুষের ভালো-মন্দ দিয়েই বিচার করতে হবে সব কিছুর ভালো-মন্দকে। মানুষ সব কিছু বিচারের শেষ মাত্রা। এ হলো রায়ের মানবতাবাদের অন্তিম ভিত্তি। এরকম কথা আরো অনেক দার্শনিক বলেছেন; কিন্তু রায় বলেছেন নতুন করে। অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেবের সাথে কথা বলে তাকে মনে হয়নি তিনি একজন মানবতন্ত্রী। তিনি গল্প করতে ভালোবাসতেন। তার প্রথম যৌবনে তিনি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নির্দেশে কাজ করতেন কলকাতার িিদরপুর ডক অঞ্চলে, ডক অঞ্চলের জাহাজী শ্রমিকদের সাথে। ল্য ছিল শ্রমজীবীদের একত্র করে সমাজ বিপ্লব ঘটানো; কিন্তু রায় এই সমাজ বিপ্লবের ধারণা বর্জন করেছিলেন পুরোপুরিভাবে। তিনি মনে করতেন, তার আগের ধারণা মোটেও সমর্থনীয় নয়। এই উপমহাদেশে মানুষ মূলত হলো কৃষিজীবী। তাদের মথাপিছু আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য গড়তে হবে সমবায়ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থা। কৃষকের ক্রয়মতার উন্নতি হলে তারা কিনতে চাইবে নানা শিল্পদ্রব্য। তাদের এই চাহিদার কারণে ধীরে ধীরে দেশে কলকারখানার অর্থনীতিও স্থাপিত হতে পারবে। কৃষিজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধি ছাড়া এই উপমহাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না। অর্থনীতির আছে দুটো দিক। একটি হলো সম্পদ উৎপাদনের আর অপরটি হলো উৎপাদিত সম্পদ বিতরণের। উৎপাদনের মাত্রা না বাড়িয়ে বিতরণের মাত্রা বাড়ানো কখনোই সম্ভব নয়। তা আমরা যতই শ্রেণিসংগ্রাম করি; কিন্তু অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেব অহঙ্কার করতেন, তিনি একসময় ছিলেন শ্রমজীবী আন্দোলনের একজন সংগঠক। অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেব দ্বিজাতি তত্ত্বে আস্থাবান ছিলেন না; কিন্তু রায় দ্বিজাতিতত্ত্বকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দ্বিজাতিতত্ত্ব ব্যাপারটি যে কেবল ধর্মীয় কারণে ঘটছে তা নয়। এর মূলে আছে হিন্দু মনের বিশেষ সংস্কার। হিন্দুরা মনে করে যে, মুসলমান হলো যবন, ম্লেচ্ছ, অশুচি। তাদের এই ঘৃণাই এই উপমহাদেশের মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেছে পৃথক রাষ্ট্র গড়তে। তিনি আরো বলেন, মানুষ নিয়েই রাষ্ট্র। মানুষ ধর্মনিরেপে না হলে রাষ্ট্র ধর্মনিরেপ হতে পারে না। ভারত ধর্মনিরপে রাষ্ট্র নয়। কেননা, ভারতের বেশির ভাগ মানুষ এখনো ধর্মনিরপে হতে পারেনি। মুসলমানদের তারা এখনো ভাবছে যবন, ম্লেচ্ছ, অশুচি। এই মনোভাব কোনোভাবেই ধর্মনিরপেতার সৃষ্টি করতে পারে না। রায়ের কথা বিশেষভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে বাবরি মসজিদ ভাঙেনি, ভেঙেছে স্বাধীন ভারতে ধর্মনিরপে দল কংগ্রেসের শাসনামলে।
বাংলাদেশের খুব খ্যাতনামা দৈনিক পত্রিকা হলো ‘প্রথম আলো’। প্রথম আলোতে (২৪ অক্টোবর, ২০১৪) অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেবের দেয়া একটি সাাৎকার পড়লাম। সাাৎকারটি তিনি দিয়েছিলেন তার মৃত্যুর এক মাস আগে। এতে তিনি বলেছেন, উপমহাদেশে রাজনীতির ধারা হলো দু’টি। একটি হলো ধর্মনিরপেতা আর অপরটি হলো বিচ্ছিন্নতাবাদ। তিনি কখনোই বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না। তার এই বক্তব্য আমার কাছে খুব অদ্ভুত মনে হলো। কেননা, ধর্মনিরপেতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদকে একত্র করে দেখা চলে না। অনেক দেশেই আছেন ধর্মনিরপেতাবাদী; কিন্তু তারা মোটেও বিচ্ছিন্নতাবাদী নন। দণি এশিয়ায় মুসলমানরা দাবি করেছিলেন, তারা হলেন একটা পৃথক জাতি। কোনো সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে নয়, পাকিস্তানের দাবি উঠেছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। সালাহউদ্দীন সাহেব কেন ধর্মনিরপেতাবাদ আর দ্বিজাতিতত্ত্ববাদকে পরস্পরবিরোধীভাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, সেটা পরিষ্কার নয়। তিনি বলেছেন, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদকে অর্থাৎ পাকিস্তানের দাবিকে কখনোই যথার্থ বলে মনে করেননি। এই সাাৎকারকে যদি ধরে নেয়া যায় সত্যি, তবে বলতে হবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সালাহউদ্দীন সাহেব ছিলেন অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী। তার মতে এখন আমরা যদি আস্থাবান হই তবে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব কি টিকবে? প্রশ্নটি আমার কাছে সঙ্গত মনে হচ্ছে। অনেক দিন আগের কথা, আমি সালাহউদ্দীন সাহেবকে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলোম, আপনি পাকিস্তানে আস্থাবান নন; কিন্তু কলকাতা ছেড়ে প্রথমে ঢাকায় পরে রাজশাহীতে চাকরি করতে এলেন কেন? তিনি আমার কথার উত্তরে বলেন, তিনি জন্মসূত্রে ফরিদপুরের লোক। ফরিদপুর পাকিস্তানে পড়েছে। তাই তিনি জন্মভূমির টানে এসেছেন পূর্ব পাকিস্তানে। না হলে আসতেন না। তার এই উত্তর আমার কাছে খুব যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। আমার মনে পড়েছিল আরেকজন ব্যক্তির নাম। তিনি হলেন কাজী আবদুল ওদুদ। তিনি একসময় ঢাকা কলেজে চাকরি করতেন। ঢাকায় গড়ে তুলেছিলেন বুদ্ধি মুক্তির আন্দোলন। প্রকাশ করেছিলেন শিখা নামে পত্রিকা। ওদুদ সাহেব অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে গিয়েছেন বাংলাদেশের সমাজ- সংস্কৃতি সম্বন্ধে; কিন্তু তিনি যেহেতু পাকিস্তান আন্দোলনে আস্থাবান ছিলেন না, তাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তার ঢাকার বাড়ি বিক্রি করে ফরিদপুরের সহায়সম্পত্তি পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়। গ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিা বিভাগে চাকরি। আমার মনে হয়েছিল কাজী আবদুল ওদুদ তার বিশ্বাসের ব্যাপারে যে পরিমাণ দৃঢ় ও সৎ, সালাহউদ্দীন সাহেব মোটেও তা নন। তিনি পাকিস্তানে এসেছিলেন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা লাভের কথা বিবেচনা করেই। দ্বিজাতিতত্ত্বে তিনি বিশ্বাস না করেও নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি চলে আসতে বাধ্য হন কলকাতা ছেড়ে ঢাকায়। কাজী আবদুল ওদুদ কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন; কিন্তু তিনি ঢাকা কলেজে নিয়োজিত ছিলেন বাংলা বিভাগে। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান উল্লেখ্য হয়ে আছে।
সালাহউদ্দীন সাহেব পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ খ্যাতি পেয়েছেন রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে লেখা অভিসন্দর্ভ রচনার কারণে। তিনি রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে গবেষণা করেন বিলাতে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে; কিন্তু কাজী আবদুল ওদুদ নিজ দেশে বসেই ব্রাহ্ম সমাজকে নিয়ে রচনা করেছেন প্রথম শ্রেণীর গ্রন্থ। তাকে বিলাতে যেতে হয়নি। তাকে রবীন্দ্রনাথ নিজে শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা ও রাজা রামমোহন রায়ের ওপর বক্তৃতা করার জন্য।
আর একদিনের কথা মনে পড়ে। সালাহউদ্দীন সাহেব হাজী শরীয়তুল্লাহ ও ফারায়েজী আন্দোলন সম্পর্কে করেছিলেন খুব বিরূপ মন্তব্য; কিন্তু হিন্দু সমাজে যখন জন্মেছেন রাজা রামমোহন রায়, তখন মুসলমান সমাজে জন্মেছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। সালাহউদ্দীন সাহেবের কাছে হাজী শরীয়তুল্লাহ কেবলই ছিলেন একজন গোঁড়া মৌলবাদী মুসলমান। তিনি কোনো মুক্ত চিন্তার অধিকারী ছিলেন না। তিনি হাজী শরীয়তুল্লাহ সম্পর্কে খুবই নীচু ধারণা পোষণ করতেন, যা অন্য ঐতিহাসিকেরা করেননি। ১৯৮২ সালে মস্কো থেকে প্রকাশিত ভারতবর্ষের ইতিহাস নামক বইয়ের এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ‘ফারাজী’ আন্দোলন ছিল ওহাবীদেরই একটি উপশাখা। হিন্দু, মুসলিম জমিদার ও বৃটিশ নীলকর নির্বিশেষে সকল অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এরা অহিংস প্রতিশোধ গ্রহণ করত। বাংলায় এটি ছিল মূলত মধ্যযুগীয় ধরনের একটি কৃষক আন্দোলন। তাদের পূর্ববর্তী ওহাবীদের মতো এরাও বিশুদ্ধ ইসলামের আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরত এবং খোদার দুনিয়ায় সকল মানুষের সমানাধিকারের কথা বলত। তারা ঘোষণা করত যে, তাদের সম্প্রদায়ের সকল সভ্যই সমান, জমির মালিক খোদা; তাই নিজ স্বার্থে কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের অধিকার কারও নেই।’ অনেক ইতিহাসের অধ্যাপককে আমি বলতে শুনেছি যে, রামমোহন নয় বাংলাভাষী মুসলমানের ইতিহাস বিশ্লেষণে হাজী শরীয়তুল্লাহর গুরুত্ব বহু গুণে বেশি। ১৭৬০ সালের কাছাকাছি বিলাতে ঘটে কলকারখানার বিপ্লøব। কলকারখায় তৈরী সস্তা কাপড় আসতে থাকে বাংলাদেশে, যার সাথে পেরে ওঠে না আমাদের হস্তচালিত তাঁতশিল্প। যেহেতু দেশ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীন। তাই কর বসিয়ে বিদেশী কাপড় আসা বন্ধ করা যায় না। অন্য দিকে আমাদের দেশে হতে পারে না শিল্পবিপ্লব। ফলে ধ্বংস হতে থাকে আমাদের দেশের সমৃদ্ধ তাঁতশিল্প। তাঁতশিল্পে প্রধানত নিয়েজিত ছিলেন মুসলমান তন্তুবায়রা (জুলহা)। তারা দ্রুত হয়ে পড়তে থাকেন কর্মসংস্থানহীন। শরীয়তুল্লাহর ফারায়েজী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এসব কর্মসংস্থানহীন তন্তুবায়। পান্তরে রামমোহন চেয়েছিলেন ইংরেজদের সাথে সহযোগিতা করে মতা ভাগ করে নিতে। সরকারি চাকরিতে হিন্দু মধ্যবিত্তকে অধিক নিয়োজন দিতে। ফারায়েজী আন্দোলন ছিল দরিদ্র কৃষিজীবী মানুষের আত্মরার আন্দোলন; কিন্তু ব্রাহ্ম সমাজের ল্য ছিল অধিক সরকারি চাকরি লাভ করে মধ্যবিত্তের আর্থিক উন্নয়ন। দেশে যখন নীলকরবিরোধী আন্দোলন আরম্ভ হয়, তখন ব্রাহ্মরা বলেন, এরকম আন্দোলন করা উচিত হচ্ছে না। কারণ নীলকর সাহেবদের মাধ্যমে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়তে পারছে ইউরোপীয় চিন্তাচেতনা। নীলকর সাহেবদের নির্ভর করে উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে দেশের শিা-দীা।
রামমোহন বাংলা ব্যাকরণ লিখেছিলেন। নিজে বাংলা গদ্য লিখে বাড়াতে সম হয়েছিলেন বাংলা গদ্যের প্রকাশ মতা; কিন্তু তিনি কখনোই ভাবতে পারেননি যে, বাংলা কখনো কোনো দেশের রাষ্ট্রভাষা হতে পারবে। হিন্দু কখনোই চায়নি বাংলাকে কোনো দেশের রাষ্ট্রভাষা করতে। বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশ শাসনামলে প্রকাশিত তার ‘ভারতের ভাষা ও ভাষাসমস্যা’ নামে বইয়ে বলেন, ভারতের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত হিন্দি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন প্রায় একই রকম কথা; কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে হয়েছিল বাংলাকে উর্দুর সাথে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার আন্দোলন। এই আন্দোলন সফল হয়েছিল। সাবেক পাকিস্তানে উর্দুর সাথে বাংলা হতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তান না হলে বাংলাভাষাভাষী অঞ্চল সম্পূর্ণটাই হতো ভারতের অন্তর্গত। আর আমাদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শিখতে হতো হিন্দি। বাংলা কোনো দেশেরই রাষ্ট্রভাষা হতে পারত না। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতে পেরেছে বাংলাভাষী মুসলমানেরই সংগ্রামের ফলে। এই ইতিহাস এখন ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রভাষার কথা আসছে। কেননা, আমরা দেখতে পেলাম ভাষা শহীদদের মিনারে অধ্যাপক পিয়াস করিমের লাশ রেখে শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে দেয়া হলো না। সরকার দিলো বাধা। অন্য দিকে অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেবের লাশ শহীদ মিনারে স্থাপন করে প্রদর্শন করা হলো বিশেষ শ্রদ্ধা। আমাদের কাছে মনে হলো, এটাকে একটা নোংরা রাজনীতি বলে। ভাষা আন্দোলনের পশ্চাতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কোনো আবদান ছিল না; কিন্তু আওয়ামী লীগের দাবি, ভাষা আন্দোলনের পেছনে ছিল শেখ মুজিবের বিশেষ অবদান। যেটা অনেক কারণেই স্বীকার্য নয়। শেখ মুজিব ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের রাজনৈতিক শিষ্য। তিনি পরিচালিত হতেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নির্দেশেই। ১৯৫১ সালের ২৪ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে গঠিত হয় পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামী লীগ। ১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি সিন্ধুর হায়দরাবাদ শহরে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বলেন, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তদানুসারে উর্দুই হতে হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা; কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ যেতে চাচ্ছে এই ইতিহাস এড়িয়ে। আওয়ামী লীগ ও তার সাথীরা শহীদ মিনারের ওপর দাবি করছে একাধিকার। এই ইতিহাসও যথেষ্ট বিচিত্র এবং জটিল ব্যাখ্যাসাপে।
একদিনের একটি বিশেষ ঘটনার কথা আমার মনে পড়ছে। সেটা ১৯৭০ সাল। শেখ মুজিব এসেছিলেন রাজশাহীতে, নির্বাচনী প্রচার উপল।ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাযহারুল ইসলাম শেখ মুজিবকে আমন্ত্রণ করেছিলেন এক মধ্যাহ্নভোজে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন এই ভোজসভায়। ভোজসভার শেষে শেখ মুজিব শিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন। ঘটানাচক্রে আমি ও ড. সালাহউদ্দীন সাহেব উভয়ই ছিলাম সেই ভোজসভায়। ফিরতি পথে সালাহউদ্দীন সাহেব বলেন, দেশে যেমন নেতার প্রয়োজন, তার কাছে শেখ মুজিবকে তা মনে হলো না। তার মনে হয়েছে মতা পেলে শেখ মুজিব দেশ চালাতে সম হবেন না; কিন্তু আমরা দেখলাম পরবর্তীকালে শেখ মুজিবকে সালাহউদ্দীন সাহেব করলেন প্রভূত প্রশংসা। বদলে গেল তার শেখ মুজিব সম্পর্কে পূর্বমূল্যায়ন। কেন কী কারণে শেখ মুজিব সম্পর্কে তার চিন্তাচেতনা বদলালো, তার কোনো ব্যাখ্যা তিনি প্রদান করেননি তার লেখায়। মানুষের ধারণা বদলাতেই পারে; কিন্তু এই যে পরিবর্তন, এটা অনেককেই করেছে খুবই বিস্মিত।
পুরনো দিনের অনেক কথা মনে পড়ছে। সালাহউদ্দীন সাহেব গড়ে তুলতে পেরেছিলেন তার নিজের একটা অন্তরঙ্গ বন্ধুবলয়, যাদের অনেকে পরবর্তীকালে খ্যাতি পেয়েছেন বাংলাদেশের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী হিসেবে। যেমন, বদরউদ্দীন উমর, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মুস্তফা নূরউল ইসলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিল্লুর রহমান ও নূরউল ইসলাম সাহেব প্রকাশ করতেন একটি মাসিক পত্রিকা, যার নাম ছিল পূর্বমেঘ। বদরউদ্দীন উমর সাহেব ছিলেন প্রায় সালাহউদ্দীন সাহেবের অনুজপ্রতিম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করার সময় সালাহউদ্দীন সাহেবের তত্ত্বাবধানে (আমার তাই মনে হয়) সাম্প্রদায়িকতা নামে একটি বই লিখেছিলেন। কেন জানি না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক আমার চেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন হলেও উমর সাহেব তার লেখা বইটি অন্য কাউকে না দিয়ে আমাকে দিয়েছিলেন সমালোচনা করতে। আমি তার বইয়ের সমালোচনা করে ঢাকার তখনকার মাসিক সমকাল পত্রিকায় ছাপিয়েছিলাম; কিন্তু আমার সমালোচনা বদরউদ্দীন উমর সাহেবের মনে সৃষ্টি করেছিল খুবই বিরূপ প্রতিক্রিয়া। কেননা আমি বলেছিলাম, এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার জন্য কেবল মুসলমানদেরই দায়ী করা ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়। বদরউদ্দীন উমর সাহেব তার বইয়ে বলেন, সিপাহি বিদ্রোহ নাকি ছিল একটি প্রতিক্রিয়াশীল সামন্তবাদী অভ্যুত্থান। যেটাকে আমি সমর্থন করতে পারিনি। পরে জেনেছিলাম তার এই অভিমত সালাহউদ্দীন সাহেবও পোষণ করেন; কিন্তু সিপাহি অভ্যুত্থানের পশ্চাতে এসে দাঁড়িয়েছিল সারা উত্তর ভারতের মানুষ। সিপাহি অভ্যুত্থান জনসমর্থনবিহীন ছিল না। পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু তার বিখ্যাত ঞযব উরংপড়াবৎু ড়ভ ওহফরধ বইয়ে বলেছেন, সিপাহি বিদ্রোহ ছিল মতাচ্যুত ভারতীয় সামন্ততান্ত্রিক রাজন্যবর্গের মতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা; কিন্তু আধুনিককালের গবেষণা থেকে এরকম বক্তব্যের আর সমর্থন মিলছে না। কেননা, অধিকাংশ সামন্ত রাজা বিদ্রোহকে সমর্থন দিতে চাননি। নিয়েছিলেন ব্রিটিশ শাসনেরই প। অন্য দিকে কার্ল মার্কস সিপাহি বিদ্রোহকে বলেছিলেন ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধ। বদরউদ্দীন উমর সাহেব এ সময় নিজেকে কিছুটা মার্কসবাদী বলে দাবি করতেন; কিন্তু তার জানা ছিল না, মার্কস নিজে সিপাহি বিদ্রোহ সম্পর্কে কী বলেছেন। অনেক দিনের কথা। এসব কথা আমার মনে আসছে, কারণ পরবর্তীকালে বদরউদ্দীন উমর পরিচিতি পেয়েছেন একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তক হিসেবে। আর তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃপ্রতিম সালাহউদ্দীন সাহেব খ্যাতি লাভ করেছেন একজন প্রথম শ্রেণীর ইতিহাসবেত্তা হিসেবে।
আমি ইতিহাসের গবেষক নই। ইতিহাস পড়েছিলাম নিজেকে কিছুটা আলোকিত করার জন্য। আমি সালাহউদ্দীন সাহেবের কোনো সমালোচনা করতে চাচ্ছি না। কেবল তুলে ধরতে চাচ্ছি তার ও তার ঘনিষ্ঠ সাথীদের সম্পর্কে আমার মনে জমে থাকা কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি। এই লেখাটিকে কোনোভাবেই উল্লেখ করা উচিত হবে না সালাহউদ্দীন সাহেবের মূল্যায়ন হিসেবে। আমি সে যোগ্যতা রাখি না।
প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট