Saturday, November 1, 2014

স্মৃতিতে দৈনিক আমার দেশ দাঁড়ানোর জায়গা নেই by আবু সালেহ আকন

আমার দেশ। ঠিকানা এখনো রাজধানীর কারওয়ানবাজারের বিএসইসি ভবন। ভবনটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু ভেতরের ঠিকানা পুড়ে ছারখার আগুনের লেলিহান শিখায়। চারদিকে এখন শুধু বিচ্ছিন্নতার হাহাকার।  প্রতিদিনের মতো গতকাল শনিবার সকালেও সাংবাদিকেরা এসেছিলেন। কিন্তু অফিসে ঢোকার কোনোই পরিবেশ ছিল না। ভেতরের পোড়া গন্ধ তখনো মিলিয়ে যায়নি। কেউ ছিলেন ফুটপাথে, কেউ ভবনের ফোরে, কেউ পাশের টি কে ভবনের সিঁড়িতে। আবার কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে। অফিসটা আজ শুধুই স্মৃতি তাদের কাছে।  ছোট্ট মেয়ে রোজা, বয়স ৮। প্রায়ই অফিসে আসতো মায়ের সাথে। মা সাংবাদিক এমরানা আহমেদ আজো মেয়েকে নিয়ে এসেছিলেন। রোজার আজ ছোটাছুটি ছিল না। কাদা পানি দেখে ভেতরেও যায়নি সে। মায়ের আচল ধরে পেছন থেকে উঁকি মেরে দেখছিল সব।

>> বিএসইসি ভবনে গত শুক্রবারের আগুনে পুড়ে যাওয়া আমার দেশ কার্যালয় : নয়া দিগন্ত
গতকাল অনেকেই পুড়ে যাওয়া আমার দেশ কার্যালয় পরিদর্শনের জন্য এসেছিলেন। দেখেছেন ঘুরে ঘুরে। সাংবাদিকদের উৎকর্ষ সাধনের জন্য গচ্ছিত তথ্য প্রমাণাদিও অবশিষ্ট নেই। যতœ করে রাখা কাগজপত্র, আসবাবপত্র সব পুড়ে ছাই। আগুন নেভানোর এক ঘণ্টা পর আমার দেশের সিটি এডিটর এম আব্দুল্লাহসহ অনেকেই ছুটে গিয়েছিলেন। তাদের সেই প্রিয় চেয়ার পড়ে আছে, রয়েছে কম্পিউটার, রয়েছে ড্রয়ার, ফাইলপত্র সবই। কিন্তু কিছুই অক্ষত নেই। এর কোনোটির শুধুই ছাই, আর কোনোটি আধপোড়া। চার দিক শুধু বিপর্যস্ত আর বিধ্বস্ত। পত্রিকা অফিসটি এক সময় সাংবাদিক কর্মকর্তা-কর্মচারী রাজনীতিবিদসহ নানা কলাকুশলীদের পদচারণায় ছিল মুখর। কিন্তু আজ দাঁড়ানোর জায়গাটিও নেই। মাথার উপরের নানা রঙের ফেস্টুন বেলুনও ঝুলছে না। পায়ের নিচে হাঁটু সমান পুড়ে যাওয়া কাগজপত্র-আসবাবপত্র পানিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছে।
নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ, কবি আব্দুল হ্ইা শিকদার, বার্তা সম্পাদক জাহেদ চৌধুরীসহ আরো অনেকে গতকালও পত্রিকা অফিসে আসেন। কিন্তু কোথাও বসার স্থান না থাকায় নিচের একটি ভবনের সিঁড়িতেই দাঁড়ানো ছিলেন। এসেছিলেন পত্রিকাটির এমডি ফিরোজা মাহমুদ। প্রতিদিনের মতো সাংবাদিক কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই ছুটে এসেছিলেন। অনেকে গাড়িতে বসেই সবার সাথে কথা বলে চলে যান। নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, সব কিছুই তো পুড়ে গেছে, সার্ভার পুড়ে গেছে, আর্কাইভ নষ্ট হয়ে গেছে, এত বছরের রেকর্ডপত্র, কম্পিউটারসহ সব সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এখন আর দাঁড়ানোর মতো অবস্থাই নেই। তিনি বলেন, আমরা ভয়াবহ আর্থিক সঙ্কটে ছিলাম। এর মধ্যে ভাড়াসহ অফিস খরচা ছিল সাড়ে আট লাখ টাকা। এটা দেয়া সম্ভব ছিল না বলেই সব দেনাপাওনা মিটিয়ে একটি ছোট অফিস নিয়েছিলাম অন লাইনটি চালানোর জন্য। গত বৃহস্পতিবার দেনাপাওনা বুঝিয়ে দেয়া হয়। সব মালামাল প্যাকেট করা হচ্ছিল। এরই মধ্যে এই অগ্নিকাণ্ড। তিনি বলেন, ঘটনার ব্যাপারে তেজগাঁও থানায় একটি জিডি করা হয়েছে।  সিটি এডিটর এম আব্দুল্লাহ বলেন, সবই এখন স্মৃতি। পুড়ে সব ছাই হয়ে গেছে। এখন আর কিছুই বাকি নেই।
গতকাল বিকেল ৪টার দিকে সেখানে গিয়েছিলেন বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী। তিনি ঘুরে ঘুরে অফিসটি দেখেন। তিনি বলেন, যদি শত্রুতা করে কেউ আগুন না লাগায় তবে বলতে হবে সরকারি এই ভবনটি নির্মাণে ত্রুটি রয়েছে। আর সে কারণেই বারবার আগুন লাগছে।
এ দিকে অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারে এনটিভি এবং আরটিভির পক্ষ থেকেও পৃথক দু’টি জিডি করা হয়েছে। এ দিকে, ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলেছে ক্ষয়ক্ষতি এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। এটি নিছক দুর্ঘটনা না ইচ্ছে করেই আগুন লাগানো হয়েছে সে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। আমার দেশ-এর কয়েকজন সাংবাদিক বলেছেন, তাদের ধারণা পরিকল্পিতভাবেই এই আগুন লাগানো হয়েছে।

মানবজীবন by মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

মানুষের মন বড়ই বিচিত্র। মানুষের জীবনও বিচিত্র। যিনি ১০০ বছর বা ৮০-৯০ বছর পর্যন্ত বাঁচেন তার জীবন বৈচিত্র্যে ভরা। আমার বয়সও নেহায়েত কম হল না। ৬৪ বছর পার করতে চলেছি। আমার মা ৮৬-৮৭ বছর বয়সে মারা গেলেন। তার জীবনও বৈচিত্র্যে ভরা ছিল। জীবন সংসারে তিনি একজন সংগ্রামী নারী ছিলেন। ১৯২৭ সালে তার জন্ম। ব্রিটিশরা এ দেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় তার বয়স ছিল ২০ বছর। ততদিনে তিনি ব্রিটিশ শাসনের অনেক কিছু দেখে ফেলেছেন। তার এবং আমার উভয়েরই জন্ম পাবনা শহরের পশ্চিম-দক্ষিণে সে সময়ের প্রমত্তা পদ্মা নদীর ধারে। জায়গাটির নাম বাজিতপুর ঘাট। এ বাজিতপুর ঘাটের ঐতিহাসিক ঘটনা প্রায়ই মা আমাকে বলতেন। বলতেন, বড়লাটকে (গভর্নর) উত্তরবঙ্গে ঢুকতে হলে পদ্মা নদীর এই ঘাটকেই ব্যবহার করতে হতো। স্টিমার এসে ঘাটে ভিড়লে যে বটগাছটার সঙ্গে বাঁধা হতো সে গাছটা এখনও আছে। ২০০ বছরের বুড়ো বটগাছটি এখনও দাঁত বের করে হাসে। তার ডাল-পালা এখনও মানুষকে ছায়া দেয়। ছেলেবেলায় আমরা এ বটগাছের শেকড়ের ওপর বসে আড্ডা দিতাম। সে আজ প্রায় ৬০ বছর আগের কথা। তখন এলাকায় ক্লাব বা আড্ডা জমানোর কোনো জায়গা ছিল না। বটগাছটার উত্তর দিকে একটি বিরাট দোকান ছিল। তখনকার ওই দোকানটিকে বর্তমানকালের একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের সঙ্গে তুলনা করা চলে। কারণ সে দোকানে আলকাতরা থেকে শুরু করে সুঁই-সুতাসহ শতেক রকমের সওদা পাওয়া যেত। পদ্মা নদীতে মাছ ধরা জেলে নৌকাগুলো ভিড়িয়ে তেল, নুন, চাল, ডাল, আলকাতরা, কেরোসিন কিনত। এ নৌকাগুলো আবার প্রচুর ইলিশ ধরে সকালবেলা কূলে ভিড়ত। মা আমার হাতে একটি সিকি (চার আনা) ধরিয়ে দিয়ে একটা মাছ আনতে বলতেন। আমি ততক্ষণে গিয়ে দেখতাম নৌকার পাশে বয়স্ক লোকরা ভিড় করেছেন। তারা লম্বায় আমার দ্বিগুণ হওয়ায় আমি নৌকার কাছে ভিড়তে পারতাম না। শেষে কেউ বলতেন, ছেলেটাকে একটা মাছ নিতে দাও। সে সুযোগে চার আনায় একটা ইলিশ কিনে ঘরে ফিরতাম। মায়ের হাতের সে ইলিশ রান্নার তুলনা হয় না। বাড়ির আঙিনার তরকারি বাগানের চালকুমড়া বা বেগুন দিয়ে ইলিশ রান্না হতো। কত মজা করেই না সেসব রান্না খেয়েছি। সেই মা আমার ১৫ অক্টোবর হঠাৎ করে মারা গেলেন। সকালে তিনি প্রাতঃভ্রমণ করেছেন। দুপুরে নিজ হাতে রান্না করে খেয়েছেন। বিকালে হঠাৎ করেই মৃত্যু সংবাদ। আমার কাছে সংবাদটি ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। কারণ কদিন আগেই ঈদের সময় পাবনা গেলে তিনি সামনের চেয়ারটায় বসে আমার মাথা টেনে নিয়ে হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। মাথায় ফুঁ দিয়ে দোয়া করলেন। আমি ছেলেবেলায় নদীতে সাঁতরাতাম এজন্য সে সময়ই আমার বুকে ঠাণ্ডা লেগে এখন ফুসফুসে সমস্যা হচ্ছে একথা বলে সাবধানে থাকতে বললেন। সে মাকেই কবরে রেখে আসার সময় ভাবলাম এই তো মানুষের জীবন। কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মাকে বলে এলাম, মা তুমি ঘুমাও, আমরা যতদিন বেঁচে থাকব তোমার জন্য দোয়া করব। মহান আল্লাহর উদ্দেশে বললাম, আমার মায়ের কবরখানাকে যেন তিনি বেহেশত বানিয়ে দেন। তার কবরের সঙ্গে যেন বেহেশতের সংযোগ ঘটিয়ে দেন। একই গোরস্থানে আমার বাবাও শায়িত আছেন। তার উদ্দেশেও একই প্রার্থনা জানালাম।
আগেই বলেছি, আমার বয়সও ৬৪ পার হতে চলেছে। এ বয়সে আমি বেশ কয়েকটি রোগে আক্রান্ত। যার মধ্যে অন্যতম ফুসফুসের সংক্রমণ। মন খারাপ থাকলে শরীরও খারাপ হয়ে পড়ে। মা হারানোর শোকে আমার শরীর বেশ খারাপ হয়ে পড়ল। মাঝে মধ্যে শরীর কাঁপতে শুরু করল। সে অবস্থা একটুখানি সামাল দিয়ে বাংলাদেশ বিমানের একটি টিকিট কেটে দুদিনের জন্য সিঙ্গাপুর গেলাম। খুব সকালে রওনা করে বিকালে ডাক্তার দেখিয়ে হোটেলে ঢুকলাম। আলবার্ট কোর্ট ভিলেজ হোটেলে অনলাইনে বুকিং দিয়ে গিয়েছিলাম। রুমে ঢুকে বিশ্রাম নিয়ে রাত ৯টার দিকে নিচে নামলাম। হোটেলটির মাঝখানে বেশ খানিকটা চওড়া খোলা জায়গা। দুই পাশে হোটেল ভবন। মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় কিছু বামন তালগাছ। তার নিচেই চেয়ার-টেবিল পাতা। দুই পাশের হোটেল ভবনের নিচতলায় তিনটি করে রেস্টুরেন্ট। মাঝের ফাঁকা জায়গায় প্রচুর মানুষ খাবার খাচ্ছেন আর বিয়ার পান করছেন।
আবার মায়ের কথায় ফিরে আসি। আমার এবং মায়ের জন্মস্থান বাজিতপুর ঘাট ব্রিটিশ আমলে একটি ঐতিহাসিক নদীবন্দর ছিল। পাকিস্তান আমলে আমিও সে নদীবন্দরে হাজার-মণি নাও, লঞ্চ, স্টিমার ভিড়তে দেখেছি। সেই বাজিতপুর ঘাটে স্টিমার থেকে বড়লাট নামলে লাল পাগড়ি পরা পুলিশরা রাস্তার দুধারে কেমন দাঁড়িয়ে থাকত এবং বড়লাট কীভাবে যেতেন, মা আমাকে সে গল্প শোনাতেন। বটগাছটার সঙ্গে বড়লাটের স্টিমারকে শেকল দিয়ে কীভাবে বাঁধা হতো তাও বলতেন। সেই বটগাছটা এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথচ আমার মা নেই।
এই হল মানুষের জীবন। এটাই বাস্তবতা। তবুও মন মানে না। কারণ পুত্রের কাছে মায়ের কোনো বয়স নেই। বয়স ৮০, ৯০, ১০০ বছর যাই হোক, পুত্রের কাছে তিনি শুধুই মা। যেমন পুত্রের বয়স যত বেশিই হোক মায়ের কাছে সে সব সময়ই শিশু। জন্ম-জন্মান্তরে এটাই মাতা-পুত্রের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান। আর এ মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান নিয়েই আবহমানকাল ধরে মানবজীবন আবর্তিত হয়ে চলেছে। সব পাঠকের কাছে আমার মায়ের জন্য দোয়া চেয়ে লেখাটি শেষ করছি।
মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : মুক্তিযোদ্ধা ও কলাম লেখক

নিষিদ্ধ বোমামেশিনের তাণ্ডবে ধ্বংসের পথে জাফলং by এনামুল হক জুবের

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের জাফলং। পাহাড়, টিলা আর চা বাগানসংলগ্ন সীমান্তঘেঁষা জাফলং প্রকৃতিকন্যা নামেও পরিচিত। সিলেট নগরী থেকে ৫৯ কিলোমিটার দূরে জাফলংয়ের অবস্থান। গোয়াইনঘাট উপজেলার অধীন জাফলংয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিদিনই সেখানে আসেন বিভিন্ন বয়সের দেশী-বিদেশী পর্যটক। ঈদ ও অন্যান্য ছুটির সময়ে জাফলংয়ে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় পরিলক্ষিত হয়। এখানে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে স্বচ্ছ জলরাশির পিয়াইন নদী। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে এই নদী থেকে পাথর উত্তোলনের ফলে সৃষ্ট গর্তে বালু জমে চোরাবালির সৃষ্টি হওয়ায় এবং স্বচ্ছ জলধারায় গভীরতা কম দেখা যাওয়ায় কেউ কেউ পানিতে গোসল করতে নেমে তলিয়ে যান। পরে তাদের লাশ পাওয়া যায়। জাফলংয়ের নানা স্থানে পিয়াইন নদীতে মাসের পর মাস ধরে চলে আসছে বোমামেশিন দিয়ে (যান্ত্রিক পদ্ধতিতে) পাথর উত্তোলন। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রশাসনের সহায়তায় পর্যটন এলাকা জাফলংকে ধ্বংস করা হচ্ছে এমন অভিযোগ সচেতন মহলের। বোমামেশিনের তাণ্ডবে ভূমিধস ও অকাল বন্যার পাশাপাশি পিয়াইন নদীর গতিপথও পরিবর্তন হচ্ছে। কান্দুপট্টি, নয়াবস্তি, জাফলং বাজার ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ ভূমিতে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। তারা জাফলং রক্ষায় ও আইনের বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।

>>পর্যটন এলাকা জাফলংয়ে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বোমামেশিন দিয়ে (যান্ত্রিক পদ্ধতিতে) পাথর উত্তোলন চলছে : শিপন আহমদ
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, পরিবেশবিধ্বংসী বোমামেশিন দিয়ে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে দীর্ঘদিন থেকে কোয়ারি ও তৎসংলগ্ন এলাকার পিয়াইন নদীর ৫০-৬০ ফুট গভীর থেকে দিবারাত্রি পাথর উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। বোমামেশিন সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় জাফলংয়ে দীর্ঘ দিন ধরে এ ধ্বংসলীলা চলে আসছে। বিশেষ করে জাফলং চা বাগানসংলগ্ন কাটারী এলাকা, কান্দুপট্টি গ্রাম ও লন্ডনি বাজার পর্যন্ত অসংখ্য বোমামেশিনে পাথর উত্তোলন হলেও তা বন্ধ করতে নেই কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। জাফলংয়ে মাঝে মধ্যে টাক্সফোর্সের অভিযান চালানো হয়। কিন্তু অভিযানের খবর সংশ্লিষ্টদের কাছে পূর্বেই পৌঁছে যায়। ফলে আইনের বাস্তবায়ন হয় না। গত ২৭ জুলাই টাক্সফোর্সের অভিযানে ১৭টি বোমামেশিন জব্দ করা হলেও ওইগুলোসহ অর্ধশতাধিক বোমামেশিন কোয়ারিতে চলছে। ১৩ অক্টোবর টাক্সফোর্সের আরেকটি অভিযান হলেও এক দিন পর থেকে মেশিনগুলো আবার চলতে থাকে।
স্থানীয় একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রতিটি বোমামেশিন থেকে হাজার হাজার টাকা চাঁদা তুলে কয়েক লাখ টাকা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। যার ফলে বোমামেশিনের তাণ্ডব থামছে না। স্থানীয় এমপি ইমরান আহমদ ইতঃপূর্বে গোয়াইঘাটের একটি সভায় স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বোমামেশিন বন্ধের নির্দেশ দিলেও প্রশাসন বোমামেশিন বন্ধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা গ্রহণে রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছেন। এর ফলে শুধু লোক দেখানো অভিযানে রক্ষা পাচ্ছে না নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাফলং। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জাফলং চা-বাগানসহ গ্রাম, হাট বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ ব্যাপারে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম বলেন, বোমামেশিনের তাণ্ডব বন্ধ করে পরিবেশ রক্ষায় টাস্কফোর্সের অভিযান কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ, অভিযান তো প্রতিদিন সম্ভব নয়। পুলিশি টহল জোরদার ও নজরদারি থাকলে কেউ বেআইনি কাজ করতে সাহস পাবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, টাস্কফোর্সের অভিযানকালে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য পরিবেশ অধিদফতরকে অনুরোধ করার পরও তারা কোনো মামলা করেনি। জাফলংয়ে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধে স্থায়ী কী পদক্ষেপ নেয়া যায় সে প্রসঙ্গে ইউএনও নয়া দিগন্তকে বলেন, দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারলে ও পুলিশি টহল জোরদার করা হলে কেউ অপকর্ম করতে সাহস পাবে না। নিজের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি শুধু আইনগত সহযোগিতা করতে পারি। পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও জোর দেন ইউএনও।
গোয়াইনঘাট থানার ওসি আব্দুল হাই বলেন, জাফলংয়ে পরিবেশ বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। পরিবেশ অধিদফতর এ ব্যবস্থা নেবে। পাঁচ মাস আগে তিনি এ থানায় যোগদানের পর এখন পর্যন্ত পরিবেশ বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করা হয়নি বলে উল্লেখ করেন ওসি। তবে, এ সময়ের মধ্যে টাস্কফোসের্র অন্তত ১৫টি অভিযানে অনেক মেশিন ভেঙে ফেলা হয় ও পুড়িয়ে দেয়া হয়। আইনানুগ ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই অভিযানের পরও পবিবেশ বিনষ্টকারী তৎপরতা আবার শুরু হয়।
পরিবেশ অধিদফতর সিলেটের সহকারী পরিচালক মো: মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জাফলংয়ে বোমামেশিনের কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে জাফলং চা বাগান। তিনি বলেন, সর্বশেষ টাস্কফোর্সের অভিযানে কয়েকটি বোমামেশিন ভেঙে ফেলা হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় জাফলংয়ে পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি। পরিবেশ দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আপনারা কেন মামলা করছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ তথ্য সঠিক নয়। সাম্প্রতিককালে টাস্কফোর্সের অভিযানে বোমামেশিন পাওয়া গেলেও এগুলো পরিচালনার সাথে জড়িত কাউকে পাওয়া না যাওয়ায় মামলা হয়নি। তবে পরিবেশ অধিদফতর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের মাধ্যমে এ পর্যন্ত পরিবেশবিষয়ক অন্তত ৩০০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু জাফলংয়ের প্রায় ৫০টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। তিনি বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ রয়েছে, জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক জাফলংয়ে বোমামেশিন উচ্ছেদসহ পরিবেশ রক্ষায় পদক্ষেপ নেবেন।

‘ইশকুলে আইতে অখন ভালা লাগে’

‘ইশকুলে আইতে অখন ভালা লাগে। আর বাদ দিতাম নায়।’—বলছিল দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র বিজয় নায়েক। সে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার পূর্ব জুড়ী ইউনিয়নের ছোট ধামাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।

>>শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খুদে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ছোট ধামাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি ‘মিড ডে মিল (দুপুরের খাবার)’ কর্মসূচি চালু হয়েছে। এর অংশ হিসেবে আজ দুপুরে তাদের খিচুড়ি খেতে দেওয়া হয়। ছবি: কল্যাণ প্রসূন
কয়েক দিন আগে বিজয় স্কুল ফাঁকি দিলেও এখন সে আর সেটা করছে না। কারণ, গত বুধবার থেকে ছোট ধামাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চালু হয়েছে ‘মিড ডে মিল (দুপুরের খাবার)’ কর্মসূচি।
আজ শনিবার বেলা দেড়টার দিকে ওই স্কুলে গিয়ে দেখা যায়, পাঠদান কার্যক্রমের ফাঁকে খুদে শিক্ষার্থীদের সামনের টেবিলে প্লেট দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষকেরা খিচুড়ি পরিবেশন করেন।
স্কুলে থাকা চারজন শিক্ষক বলেন, স্কুলটিতে শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬৪ জন। এর মধ্যে বেশির ভাগই পার্শ্ববর্তী ধামাই চা-বাগানের দরিদ্র শ্রমিক পরিবারের সন্তান। কিন্তু গড়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি থাকত ৪৫ থেকে ৫০ জন। তাই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়াতে ‘মিড ডে মিল’ চালু হয়েছে।
প্রধান শিক্ষক অশোক রঞ্জন পাল হাজিরা খাতা দেখিয়ে বলেন, ‘মিড ডে মিল’ চালুর আগে শিশু থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি প্রতিদিন অর্ধেকের মতো হতো। কিন্তু, এখন এসব শ্রেণিতে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে। উপস্থিতি আরও বাড়বে বলে তিনি আশা করেন।
অশোক রঞ্জন পাল জানান, খিচুড়ি তৈরির জন্য সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে এক দিন বাড়ি থেকে মুঠো চাল আনে। এ ছাড়া এলাকাবাসীর অনুদানে অন্যান্য উপকরণ কেনা হয়। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিজ মিঞা বলেন, ‘উপজেলার ৭৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৪টিতে মিড ডে মিল কার্যক্রম চলছে। বাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এ কার্যক্রম চালু করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

ইতিহাসবিদ এ এফ সালাহউদ্দীন আহমদ by এবনে গোলাম সামাদ

সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক এ এফ সালাহউদ্দীন আহমদকে নিয়ে পত্রপত্রিকায় যথেষ্ট আলোচনা হচ্ছে। অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেবের সাথে আমি রাজশাহী বশ্বিবিদ্যালয়ে অনেক দিন চাকরি করেছি। আমি তার অন্তরঙ্গ ছিলাম না; কিন্তু তিনি আমার অপরিচিতও ছিলেন না। তার সাথে দেশ-দশ ও ইতিহাস নিয়ে কিছু কিছু কথাও হয়েছে। মরহুম অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেব সম্বন্ধে আমার মনে জমে থাকা স্মৃতি উঠছে ভেসে। আমি তার কিছু স্মৃতিচারণ করতে চাচ্ছি আমার এই বর্তমান লেখায়। তার সম্বন্ধে আমার মনে কৌতূহল জাগে। কারণ, শুনেছিলাম তিনি নাকি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের (গ ঘ জড়ু) একজন ভাবশিষ্য। রায় সম্বন্ধে আমার মনে যথেষ্ট কৌতূহল ছিল। রায়ের লেখা অনেক বই আমি পড়েছিলাম। তাই যখন জানলাম অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেব রায়ের একজন বিশেষ ভক্ত, তখন তার কাছ থেকে রায় সম্পর্কে কিছু জানা যায় কি না সেটা জানতে ইচ্ছা হয়; কিন্তু হতাশ হই তার সাথে টুকরো টুকরো আলাপচারিতায়। আমার মনে হয় রায় সম্পর্কে তিনি জানেন না। জানেন না বিশেষ কিছুই। তার ধারণা নেই রায়ের চিন্তাজগৎ সম্পর্কে। আমাদের পত্রপত্রিকায় সরবে প্রচার করা হচ্ছে, তিনি ছিলেন রায়পন্থী; কিন্তু সেটা আদৌ সত্য বলে ভাবতে পারছি না আমি।
মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রথম জীবনে ছিলেন একনিষ্ঠ মার্কসবাদী। কার্ল মার্কস ইতিহাসের অর্থনৈতিক ভাষ্যে আস্থাশীল ছিলেন; কিন্তু তিনি অর্থনীতি বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছিলেন তা নিয়ে আছে যথেষ্ট বিতর্ক। তিনি অর্থনীতি বলতে যেমন বুঝিয়েছিলেন অর্থনৈতিক উৎপাদনের সাজসরঞ্জামকে, তেমনি আবার বুঝিয়েছিলেন অর্থনীতিকে নির্ভর করে সমাজে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিরোধী অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্ঘাতকে, যাকে তিনি বলছেন শ্রেণিসঙ্ঘাত। উৎপাদনের সাজসরঞ্জামের ওপর মানবসমাজ কাঠামো ও তার ইতিহাস যে নির্ভর করে সে কথা এখন মোটামুটিভাবে স্বীকৃত। মানুষ যখন পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তখন তার সমাজজীবন যেমন ছিল, ধাতুযুগে এসে তা আর থাকেনি। একইভাবে মানুষ যখন হাত দিয়ে তাঁত চালিয়েছে, তখন তার সমাজজীবন যেমন ছিল, বাষ্পচালিত তাঁতের যুগে তা আর থাকেনি। বিলাতে ঘটেছে বিরাট শিল্পবিপ্লব। সমাজ গেছে বদলে। ইতিহাসকে বুঝতে গেলে তাই ভেবে দেখতে হয় মানুষ কী ধরনের উৎপাদনযন্ত্র ব্যবহার করছে। অন্য দিকে সমাজে অর্থনৈতিক পরিবর্তন আসতে পারে শ্রেণী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। মার্কসের এই ধারণা এখন আর আগের মতো আদৃত নয়। যদিও একসময় বিবেচিত হতো খুবই গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হিসেবে। মানবেন্দ্রনাথ রায় প্রথম জীবনে মার্কসবাদী হলেও পরবর্তী জীবনে হয়ে ওঠেন বিশেষভাবে মানবতন্ত্রী বা হিউম্যানিস্ট। তিনি বলেন, মানব ইতিহাস বিকশিত হচ্ছে, কারণ মানুষ হয়ে উঠছে মানবতন্ত্রী। স্বার্থপরতার জায়গায় অধিক স্থান অধিকার করছে পরার্থপরতা। মার্কস ইতিহাস ব্যাখ্যায় যোগ দিয়েছেন বস্তুবাদী দর্শনের ওপর। স্বার্থবাদী ধারণার ওপর। মানুষের কল্যাণবুদ্ধিকে তিনি বিবেচনায় নিতে চাননি। যেটা মার্কসবাদের সবচেয়ে বড় ভুল।
মানব ইতিহাস কেবল স্বার্থবুদ্ধির দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে না, পরিচালিত হচ্ছে শুভবুদ্ধি দ্বারা। রায় তার শেষজীবনে ভাবতে আরম্ভ করেন সব কিছুর অস্তিত্ব নিয়ে। মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারে; কিন্তু মানুষ, মানুষ হিসেবে নিজের অস্তিত্বের বাস্তবতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারে না। মানুষের কাছে মানুষই সবচেয়ে বড় সত্য। তাই মানুষের ভালো-মন্দ দিয়েই বিচার করতে হবে সব কিছুর ভালো-মন্দকে। মানুষ সব কিছু বিচারের শেষ মাত্রা। এ হলো রায়ের মানবতাবাদের অন্তিম ভিত্তি। এরকম কথা আরো অনেক দার্শনিক বলেছেন; কিন্তু রায় বলেছেন নতুন করে। অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেবের সাথে কথা বলে তাকে মনে হয়নি তিনি একজন মানবতন্ত্রী। তিনি গল্প করতে ভালোবাসতেন। তার প্রথম যৌবনে তিনি মানবেন্দ্রনাথ রায়ের নির্দেশে কাজ করতেন কলকাতার িিদরপুর ডক অঞ্চলে, ডক অঞ্চলের জাহাজী শ্রমিকদের সাথে। ল্য ছিল শ্রমজীবীদের একত্র করে সমাজ বিপ্লব ঘটানো; কিন্তু রায় এই সমাজ বিপ্লবের ধারণা বর্জন করেছিলেন পুরোপুরিভাবে। তিনি মনে করতেন, তার আগের ধারণা মোটেও সমর্থনীয় নয়। এই উপমহাদেশে মানুষ মূলত হলো কৃষিজীবী। তাদের মথাপিছু আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য গড়তে হবে সমবায়ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থা। কৃষকের ক্রয়মতার উন্নতি হলে তারা কিনতে চাইবে নানা শিল্পদ্রব্য। তাদের এই চাহিদার কারণে ধীরে ধীরে দেশে কলকারখানার অর্থনীতিও স্থাপিত হতে পারবে। কৃষিজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধি ছাড়া এই উপমহাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে না। অর্থনীতির আছে দুটো দিক। একটি হলো সম্পদ উৎপাদনের আর অপরটি হলো উৎপাদিত সম্পদ বিতরণের। উৎপাদনের মাত্রা না বাড়িয়ে বিতরণের মাত্রা বাড়ানো কখনোই সম্ভব নয়। তা আমরা যতই শ্রেণিসংগ্রাম করি; কিন্তু অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেব অহঙ্কার করতেন, তিনি একসময় ছিলেন শ্রমজীবী আন্দোলনের একজন সংগঠক। অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেব দ্বিজাতি তত্ত্বে আস্থাবান ছিলেন না; কিন্তু রায় দ্বিজাতিতত্ত্বকে সমর্থন দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দ্বিজাতিতত্ত্ব ব্যাপারটি যে কেবল ধর্মীয় কারণে ঘটছে তা নয়। এর মূলে আছে হিন্দু মনের বিশেষ সংস্কার। হিন্দুরা মনে করে যে, মুসলমান হলো যবন, ম্লেচ্ছ, অশুচি। তাদের এই ঘৃণাই এই উপমহাদেশের মুসলমানদের উদ্বুদ্ধ করেছে পৃথক রাষ্ট্র গড়তে। তিনি আরো বলেন, মানুষ নিয়েই রাষ্ট্র। মানুষ ধর্মনিরেপে না হলে রাষ্ট্র ধর্মনিরেপ হতে পারে না। ভারত ধর্মনিরপে রাষ্ট্র নয়। কেননা, ভারতের বেশির ভাগ মানুষ এখনো ধর্মনিরপে হতে পারেনি। মুসলমানদের তারা এখনো ভাবছে যবন, ম্লেচ্ছ, অশুচি। এই মনোভাব কোনোভাবেই ধর্মনিরপেতার সৃষ্টি করতে পারে না। রায়ের কথা বিশেষভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। ব্রিটিশ শাসনামলে বাবরি মসজিদ ভাঙেনি, ভেঙেছে স্বাধীন ভারতে ধর্মনিরপে দল কংগ্রেসের শাসনামলে।
বাংলাদেশের খুব খ্যাতনামা দৈনিক পত্রিকা হলো ‘প্রথম আলো’। প্রথম আলোতে (২৪ অক্টোবর, ২০১৪) অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেবের দেয়া একটি সাাৎকার পড়লাম। সাাৎকারটি তিনি দিয়েছিলেন তার মৃত্যুর এক মাস আগে। এতে তিনি বলেছেন, উপমহাদেশে রাজনীতির ধারা হলো দু’টি। একটি হলো ধর্মনিরপেতা আর অপরটি হলো বিচ্ছিন্নতাবাদ। তিনি কখনোই বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না। তার এই বক্তব্য আমার কাছে খুব অদ্ভুত মনে হলো। কেননা, ধর্মনিরপেতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদকে একত্র করে দেখা চলে না। অনেক দেশেই আছেন ধর্মনিরপেতাবাদী; কিন্তু তারা মোটেও বিচ্ছিন্নতাবাদী নন। দণি এশিয়ায় মুসলমানরা দাবি করেছিলেন, তারা হলেন একটা পৃথক জাতি। কোনো সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে নয়, পাকিস্তানের দাবি উঠেছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে। সালাহউদ্দীন সাহেব কেন ধর্মনিরপেতাবাদ আর দ্বিজাতিতত্ত্ববাদকে পরস্পরবিরোধীভাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন, সেটা পরিষ্কার নয়। তিনি বলেছেন, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদকে অর্থাৎ পাকিস্তানের দাবিকে কখনোই যথার্থ বলে মনে করেননি। এই সাাৎকারকে যদি ধরে নেয়া যায় সত্যি, তবে বলতে হবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সালাহউদ্দীন সাহেব ছিলেন অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী। তার মতে এখন আমরা যদি আস্থাবান হই তবে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব কি টিকবে? প্রশ্নটি আমার কাছে সঙ্গত মনে হচ্ছে। অনেক দিন আগের কথা, আমি সালাহউদ্দীন সাহেবকে কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করেছিলোম, আপনি পাকিস্তানে আস্থাবান নন; কিন্তু কলকাতা ছেড়ে প্রথমে ঢাকায় পরে রাজশাহীতে চাকরি করতে এলেন কেন? তিনি আমার কথার উত্তরে বলেন, তিনি জন্মসূত্রে ফরিদপুরের লোক। ফরিদপুর পাকিস্তানে পড়েছে। তাই তিনি জন্মভূমির টানে এসেছেন পূর্ব পাকিস্তানে। না হলে আসতেন না। তার এই উত্তর আমার কাছে খুব যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। আমার মনে পড়েছিল আরেকজন ব্যক্তির নাম। তিনি হলেন কাজী আবদুল ওদুদ। তিনি একসময় ঢাকা কলেজে চাকরি করতেন। ঢাকায় গড়ে তুলেছিলেন বুদ্ধি মুক্তির আন্দোলন। প্রকাশ করেছিলেন শিখা নামে পত্রিকা। ওদুদ সাহেব অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে গিয়েছেন বাংলাদেশের সমাজ- সংস্কৃতি সম্বন্ধে; কিন্তু তিনি যেহেতু পাকিস্তান আন্দোলনে আস্থাবান ছিলেন না, তাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তার ঢাকার বাড়ি বিক্রি করে ফরিদপুরের সহায়সম্পত্তি পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন কলকাতায়। গ্রহণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিা বিভাগে চাকরি। আমার মনে হয়েছিল কাজী আবদুল ওদুদ তার বিশ্বাসের ব্যাপারে যে পরিমাণ দৃঢ় ও সৎ, সালাহউদ্দীন সাহেব মোটেও তা নন। তিনি পাকিস্তানে এসেছিলেন বিশেষ সুযোগ-সুবিধা লাভের কথা বিবেচনা করেই। দ্বিজাতিতত্ত্বে তিনি বিশ্বাস না করেও নিজের নিরাপত্তার জন্য তিনি চলে আসতে বাধ্য হন কলকাতা ছেড়ে ঢাকায়। কাজী আবদুল ওদুদ কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন; কিন্তু তিনি ঢাকা কলেজে নিয়োজিত ছিলেন বাংলা বিভাগে। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান উল্লেখ্য হয়ে আছে।
সালাহউদ্দীন সাহেব পশ্চিমবঙ্গে বিশেষ খ্যাতি পেয়েছেন রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে লেখা অভিসন্দর্ভ রচনার কারণে। তিনি রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে গবেষণা করেন বিলাতে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে; কিন্তু কাজী আবদুল ওদুদ নিজ দেশে বসেই ব্রাহ্ম সমাজকে নিয়ে রচনা করেছেন প্রথম শ্রেণীর গ্রন্থ। তাকে বিলাতে যেতে হয়নি। তাকে রবীন্দ্রনাথ নিজে শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা ও রাজা রামমোহন রায়ের ওপর বক্তৃতা করার জন্য।
আর একদিনের কথা মনে পড়ে। সালাহউদ্দীন সাহেব হাজী শরীয়তুল্লাহ ও ফারায়েজী আন্দোলন সম্পর্কে করেছিলেন খুব বিরূপ মন্তব্য; কিন্তু হিন্দু সমাজে যখন জন্মেছেন রাজা রামমোহন রায়, তখন মুসলমান সমাজে জন্মেছিলেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। সালাহউদ্দীন সাহেবের কাছে হাজী শরীয়তুল্লাহ কেবলই ছিলেন একজন গোঁড়া মৌলবাদী মুসলমান। তিনি কোনো মুক্ত চিন্তার অধিকারী ছিলেন না। তিনি হাজী শরীয়তুল্লাহ সম্পর্কে খুবই নীচু ধারণা পোষণ করতেন, যা অন্য ঐতিহাসিকেরা করেননি। ১৯৮২ সালে মস্কো থেকে প্রকাশিত ভারতবর্ষের ইতিহাস নামক বইয়ের এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ‘ফারাজী’ আন্দোলন ছিল ওহাবীদেরই একটি উপশাখা। হিন্দু, মুসলিম জমিদার ও বৃটিশ নীলকর নির্বিশেষে সকল অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এরা অহিংস প্রতিশোধ গ্রহণ করত। বাংলায় এটি ছিল মূলত মধ্যযুগীয় ধরনের একটি কৃষক আন্দোলন। তাদের পূর্ববর্তী ওহাবীদের মতো এরাও বিশুদ্ধ ইসলামের আদর্শকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরত এবং খোদার দুনিয়ায় সকল মানুষের সমানাধিকারের কথা বলত। তারা ঘোষণা করত যে, তাদের সম্প্রদায়ের সকল সভ্যই সমান, জমির মালিক খোদা; তাই নিজ স্বার্থে কৃষকের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের অধিকার কারও নেই।’ অনেক ইতিহাসের অধ্যাপককে আমি বলতে শুনেছি যে, রামমোহন নয় বাংলাভাষী মুসলমানের ইতিহাস বিশ্লেষণে হাজী শরীয়তুল্লাহর গুরুত্ব বহু গুণে বেশি। ১৭৬০ সালের কাছাকাছি বিলাতে ঘটে কলকারখানার বিপ্লøব। কলকারখায় তৈরী সস্তা কাপড় আসতে থাকে বাংলাদেশে, যার সাথে পেরে ওঠে না আমাদের হস্তচালিত তাঁতশিল্প। যেহেতু দেশ ছিল ব্রিটিশ শাসনের অধীন। তাই কর বসিয়ে বিদেশী কাপড় আসা বন্ধ করা যায় না। অন্য দিকে আমাদের দেশে হতে পারে না শিল্পবিপ্লব। ফলে ধ্বংস হতে থাকে আমাদের দেশের সমৃদ্ধ তাঁতশিল্প। তাঁতশিল্পে প্রধানত নিয়েজিত ছিলেন মুসলমান তন্তুবায়রা (জুলহা)। তারা দ্রুত হয়ে পড়তে থাকেন কর্মসংস্থানহীন। শরীয়তুল্লাহর ফারায়েজী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন এসব কর্মসংস্থানহীন তন্তুবায়। পান্তরে রামমোহন চেয়েছিলেন ইংরেজদের সাথে সহযোগিতা করে মতা ভাগ করে নিতে। সরকারি চাকরিতে হিন্দু মধ্যবিত্তকে অধিক নিয়োজন দিতে। ফারায়েজী আন্দোলন ছিল দরিদ্র কৃষিজীবী মানুষের আত্মরার আন্দোলন; কিন্তু ব্রাহ্ম সমাজের ল্য ছিল অধিক সরকারি চাকরি লাভ করে মধ্যবিত্তের আর্থিক উন্নয়ন। দেশে যখন নীলকরবিরোধী আন্দোলন আরম্ভ হয়, তখন ব্রাহ্মরা বলেন, এরকম আন্দোলন করা উচিত হচ্ছে না। কারণ নীলকর সাহেবদের মাধ্যমে গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়তে পারছে ইউরোপীয় চিন্তাচেতনা। নীলকর সাহেবদের নির্ভর করে উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে দেশের শিা-দীা।
রামমোহন বাংলা ব্যাকরণ লিখেছিলেন। নিজে বাংলা গদ্য লিখে বাড়াতে সম হয়েছিলেন বাংলা গদ্যের প্রকাশ মতা; কিন্তু তিনি কখনোই ভাবতে পারেননি যে, বাংলা কখনো কোনো দেশের রাষ্ট্রভাষা হতে পারবে। হিন্দু কখনোই চায়নি বাংলাকে কোনো দেশের রাষ্ট্রভাষা করতে। বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ব্রিটিশ শাসনামলে প্রকাশিত তার ‘ভারতের ভাষা ও ভাষাসমস্যা’ নামে বইয়ে বলেন, ভারতের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত হিন্দি। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন প্রায় একই রকম কথা; কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর সাবেক পাকিস্তানের রাষ্ট্রিক কাঠামোর মধ্যে হয়েছিল বাংলাকে উর্দুর সাথে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়ার আন্দোলন। এই আন্দোলন সফল হয়েছিল। সাবেক পাকিস্তানে উর্দুর সাথে বাংলা হতে পেরেছিল রাষ্ট্রভাষা। পাকিস্তান না হলে বাংলাভাষাভাষী অঞ্চল সম্পূর্ণটাই হতো ভারতের অন্তর্গত। আর আমাদের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে শিখতে হতো হিন্দি। বাংলা কোনো দেশেরই রাষ্ট্রভাষা হতে পারত না। বাংলা রাষ্ট্রভাষা হতে পেরেছে বাংলাভাষী মুসলমানেরই সংগ্রামের ফলে। এই ইতিহাস এখন ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রভাষার কথা আসছে। কেননা, আমরা দেখতে পেলাম ভাষা শহীদদের মিনারে অধ্যাপক পিয়াস করিমের লাশ রেখে শ্রদ্ধা প্রকাশ করতে দেয়া হলো না। সরকার দিলো বাধা। অন্য দিকে অধ্যাপক সালাহউদ্দীন সাহেবের লাশ শহীদ মিনারে স্থাপন করে প্রদর্শন করা হলো বিশেষ শ্রদ্ধা। আমাদের কাছে মনে হলো, এটাকে একটা নোংরা রাজনীতি বলে। ভাষা আন্দোলনের পশ্চাতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কোনো আবদান ছিল না; কিন্তু আওয়ামী লীগের দাবি, ভাষা আন্দোলনের পেছনে ছিল শেখ মুজিবের বিশেষ অবদান। যেটা অনেক কারণেই স্বীকার্য নয়। শেখ মুজিব ছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের রাজনৈতিক শিষ্য। তিনি পরিচালিত হতেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নির্দেশেই। ১৯৫১ সালের ২৪ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের নেতৃত্বে গঠিত হয় পাকিস্তান জিন্নাহ আওয়ামী লীগ। ১৯৫২ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি সিন্ধুর হায়দরাবাদ শহরে সোহরাওয়ার্দী সাহেব বলেন, যে আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তদানুসারে উর্দুই হতে হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা; কিন্তু বর্তমান আওয়ামী লীগ যেতে চাচ্ছে এই ইতিহাস এড়িয়ে। আওয়ামী লীগ ও তার সাথীরা শহীদ মিনারের ওপর দাবি করছে একাধিকার। এই ইতিহাসও যথেষ্ট বিচিত্র এবং জটিল ব্যাখ্যাসাপে।
একদিনের একটি বিশেষ ঘটনার কথা আমার মনে পড়ছে। সেটা ১৯৭০ সাল। শেখ মুজিব এসেছিলেন রাজশাহীতে, নির্বাচনী প্রচার উপল।ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাযহারুল ইসলাম শেখ মুজিবকে আমন্ত্রণ করেছিলেন এক মধ্যাহ্নভোজে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন এই ভোজসভায়। ভোজসভার শেষে শেখ মুজিব শিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন। ঘটানাচক্রে আমি ও ড. সালাহউদ্দীন সাহেব উভয়ই ছিলাম সেই ভোজসভায়। ফিরতি পথে সালাহউদ্দীন সাহেব বলেন, দেশে যেমন নেতার প্রয়োজন, তার কাছে শেখ মুজিবকে তা মনে হলো না। তার মনে হয়েছে মতা পেলে শেখ মুজিব দেশ চালাতে সম হবেন না; কিন্তু আমরা দেখলাম পরবর্তীকালে শেখ মুজিবকে সালাহউদ্দীন সাহেব করলেন প্রভূত প্রশংসা। বদলে গেল তার শেখ মুজিব সম্পর্কে পূর্বমূল্যায়ন। কেন কী কারণে শেখ মুজিব সম্পর্কে তার চিন্তাচেতনা বদলালো, তার কোনো ব্যাখ্যা তিনি প্রদান করেননি তার লেখায়। মানুষের ধারণা বদলাতেই পারে; কিন্তু এই যে পরিবর্তন, এটা অনেককেই করেছে খুবই বিস্মিত।
পুরনো দিনের অনেক কথা মনে পড়ছে। সালাহউদ্দীন সাহেব গড়ে তুলতে পেরেছিলেন তার নিজের একটা অন্তরঙ্গ বন্ধুবলয়, যাদের অনেকে পরবর্তীকালে খ্যাতি পেয়েছেন বাংলাদেশের বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী হিসেবে। যেমন, বদরউদ্দীন উমর, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, মুস্তফা নূরউল ইসলাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জিল্লুর রহমান ও নূরউল ইসলাম সাহেব প্রকাশ করতেন একটি মাসিক পত্রিকা, যার নাম ছিল পূর্বমেঘ। বদরউদ্দীন উমর সাহেব ছিলেন প্রায় সালাহউদ্দীন সাহেবের অনুজপ্রতিম। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করার সময় সালাহউদ্দীন সাহেবের তত্ত্বাবধানে (আমার তাই মনে হয়) সাম্প্রদায়িকতা নামে একটি বই লিখেছিলেন। কেন জানি না রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক আমার চেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন হলেও উমর সাহেব তার লেখা বইটি অন্য কাউকে না দিয়ে আমাকে দিয়েছিলেন সমালোচনা করতে। আমি তার বইয়ের সমালোচনা করে ঢাকার তখনকার মাসিক সমকাল পত্রিকায় ছাপিয়েছিলাম; কিন্তু আমার সমালোচনা বদরউদ্দীন উমর সাহেবের মনে সৃষ্টি করেছিল খুবই বিরূপ প্রতিক্রিয়া। কেননা আমি বলেছিলাম, এই উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার জন্য কেবল মুসলমানদেরই দায়ী করা ঐতিহাসিক বাস্তবতা নয়। বদরউদ্দীন উমর সাহেব তার বইয়ে বলেন, সিপাহি বিদ্রোহ নাকি ছিল একটি প্রতিক্রিয়াশীল সামন্তবাদী অভ্যুত্থান। যেটাকে আমি সমর্থন করতে পারিনি। পরে জেনেছিলাম তার এই অভিমত সালাহউদ্দীন সাহেবও পোষণ করেন; কিন্তু সিপাহি অভ্যুত্থানের পশ্চাতে এসে দাঁড়িয়েছিল সারা উত্তর ভারতের মানুষ। সিপাহি অভ্যুত্থান জনসমর্থনবিহীন ছিল না। পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু তার বিখ্যাত ঞযব উরংপড়াবৎু ড়ভ ওহফরধ বইয়ে বলেছেন, সিপাহি বিদ্রোহ ছিল মতাচ্যুত ভারতীয় সামন্ততান্ত্রিক রাজন্যবর্গের মতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার চেষ্টা; কিন্তু আধুনিককালের গবেষণা থেকে এরকম বক্তব্যের আর সমর্থন মিলছে না। কেননা, অধিকাংশ সামন্ত রাজা বিদ্রোহকে সমর্থন দিতে চাননি। নিয়েছিলেন ব্রিটিশ শাসনেরই প। অন্য দিকে কার্ল মার্কস সিপাহি বিদ্রোহকে বলেছিলেন ভারতের স্বাধীনতার যুদ্ধ। বদরউদ্দীন উমর সাহেব এ সময় নিজেকে কিছুটা মার্কসবাদী বলে দাবি করতেন; কিন্তু তার জানা ছিল না, মার্কস নিজে সিপাহি বিদ্রোহ সম্পর্কে কী বলেছেন। অনেক দিনের কথা। এসব কথা আমার মনে আসছে, কারণ পরবর্তীকালে বদরউদ্দীন উমর পরিচিতি পেয়েছেন একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তক হিসেবে। আর তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতৃপ্রতিম সালাহউদ্দীন সাহেব খ্যাতি লাভ করেছেন একজন প্রথম শ্রেণীর ইতিহাসবেত্তা হিসেবে।
আমি ইতিহাসের গবেষক নই। ইতিহাস পড়েছিলাম নিজেকে কিছুটা আলোকিত করার জন্য। আমি সালাহউদ্দীন সাহেবের কোনো সমালোচনা করতে চাচ্ছি না। কেবল তুলে ধরতে চাচ্ছি তার ও তার ঘনিষ্ঠ সাথীদের সম্পর্কে আমার মনে জমে থাকা কিছু টুকরো টুকরো স্মৃতি। এই লেখাটিকে কোনোভাবেই উল্লেখ করা উচিত হবে না সালাহউদ্দীন সাহেবের মূল্যায়ন হিসেবে। আমি সে যোগ্যতা রাখি না।
প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

আমার দেশ কার্যালয়ে রহস্যময় আগুন- মিডিয়ার প্রতি বৈরিতার অবসান প্রয়োজন

সরকারের নির্দেশে প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার দেড় বছরের মাথায় কার্যালয় অন্যত্র স্থানান্তরের আগ মুহূর্তে এক রহস্যময় আগুনে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার পুরো অফিস ভস্মীভূত হয়ে গেল। অগ্নিকাণ্ডে ওই ভবনে থাকা দুই টিভি চ্যানেল এনটিভি ও আরটিভির তেমন কোনো তি না হলেও সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। বিএসইসি ভবনটির নিয়ন্ত্রক শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী জানিয়েছেন, এর আগে ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এই ভবনে আগুন লেগে এনটিভি, আরটিভি ও আমার দেশসহ ১০টি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় পুড়ে যাওয়ার যে ঘটনা ছিল তার তদন্ত— প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি। নতুন অগ্নিকাণ্ডেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে; কিন্তু প্রতিবেদন এই সময়ের মধ্যে আদৌ দেয়া হবে কি না, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।
আমার দেশ কার্যালয়ের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বিশ্লেষণ করে এ ঘটনা রহস্যজনক বলে বিভিন্ন পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে যথাযথ তদন্ত করে এর পেছনে কোনো নাশকতা থাকলে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও দাবি করা হচ্ছে। ভিন্ন মতের পত্রিকা হিসেবে বিশেষভাবে খ্যাত এই জনপ্রিয় পত্রিকাটি কয়েক বছর ধরে বারবার বৈরিতার শিকার হচ্ছে। পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ এবং এর সম্পাদককে কারাগারে বন্দী করে রাখা হয়েছে দীর্ঘ দিন ধরে। এর নিজস্ব ভবন ও ছাপাখানা সিল করে রাখা হয়েছে।
২০১৩ সালের ৬ জুন থেকে সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়ার পর এর পাঁচ শতাধিক সংবাদকর্মী এখন বেকার হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যে নতুন উদ্যমে অনলাইন সংস্করণ প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এরই অংশ হিসেবে ব্যয়বহুল অফিস ছেড়ে ছোট পরিসরের অফিস নিয়ে কাজ করার জন্য গুলশানের নিকেতনে কর্তৃপক্ষ অফিস নিয়েছিল। লক্ষ্য ছিল ভাড়ার খরচ কমিয়ে পত্রিকাটির স্টাফদের যথাসম্ভব বেতন পরিশোধ করা। এর মধ্যে এই ঘটনা ঘটল।
গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ এবং সমাজের দর্পণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেকোনো দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর থাকার জন্য গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া প্রধান শর্ত মনে করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গণমাধ্যম বারবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। সাংবাদিকেরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিভিন্ন সংবাদপত্র ও টেলিভিশন নানা প্রক্রিয়ায় বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এর মূল শিকার হচ্ছে ভিন্ন মতের পত্রিকাগুলো। সরকারের যেকোনো ধরনের সমালোচনা এবং বিরোধী মত প্রকাশ বন্ধ করতে কিছু নীতিনির্ধারক এটাকে অবলম্বন করে নিতে চাইছেন। এতে সরকারের ভুলত্রুটি ও শাসনব্যবস্থার অসঙ্গতিগুলো জনগণ জানতে না পারায় সাময়িকভাবে রাষ্ট্রে একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হতে পারে; কিন্তু মত প্রকাশ হতে না দিলে ক্ষোভ অসন্তোষ ধূমায়িত হতে থাকে আর এর প্রকাশ ঘটে অস্বাভাবিক কোনো উপায়ে, যা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা মনে করি, মিডিয়া-বৈরিতা শেষ পর্যন্ত কারো জন্যই কল্যাণকর হয় না। ভিন্ন মত প্রকাশ এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ব্যাপারে সরকারের আরো সহনশীল হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের পদক্ষেপই রাষ্ট্র এবং জনগণের জন্য চূড়ান্তভাবে কল্যাণ বয়ে আনবে।

সারা দেশে পুলিশের ধরপাকড়- দেশকে আরো অস্থিতিশীল করে তুলবে

দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার সাথে সাথে পুলিশের নির্যাতন ও গ্রেফতার অভিযান বেড়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন শত শত বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। গত ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের আগে সারা দেশে যে সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তাতে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার অভিযোগ এনে হাজার হাজার মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এখন পুলিশ যাদের গ্রেফতার করছে, তাদের সেসব মামলায় আসামি হিসেবে দেখানো হচ্ছে। আবার বিভিন্ন ধরনের মামলার ভয় দেখিয়ে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায় করা হচ্ছে যা ‘গ্রেফতারবাণিজ্য’ নামে বহুলালোচিত।
এ ধরনের পরিস্থিতির শিকার যে শুধু বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা হচ্ছেন, এমন নয়। সাধারণ মানুষকে আটকের পর পুলিশের অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, কোনো ব্যক্তি পুলিশের হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর পুলিশের আর্থিক চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার পর যারা টাকা, অর্থাৎ উৎকোচ দিতে পারছেন তাদের অনেককে ছেড়ে দেয়া হলেও যারা টাকা দিতে পারছেন না, তাদের বিভিন্ন মামলায় আসামি হিসেবে দেখিয়ে পাঠানো হচ্ছে কারাগারে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্মূল করতে দেশকে কার্যত একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হচ্ছে। পুুলিশ যখন খুশি যাকে ইচ্ছা গ্রেফতার করছে। এরপর তাদের বিরোধী দলের রাজনীতিক, বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা সন্ত্রাসী ও নাশকতায় লিপ্ত বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।
দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার এখন নির্বাসনে চলে গেছে অনেকটাই। পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে পরিচালিত হচ্ছে দলীয় রাজনীতি দিয়ে। ক্ষমতাসীন দল যেভাবে, এসব বাহিনীকে ব্যবহার করতে চাইছে, তারা সেভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গত এক সপ্তাহ ধরে দেশে যে ব্যাপক ধরপাকড় চলছে, তাতে কৃষক, স্কুলশিক্ষক, ছাত্র, ব্যাংক কর্মকর্তা- কেউই রেহাই পাচ্ছেন না। বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে সংশ্লিষ্ট আছে, এমন পরিবারের সদস্যরা এখন ভীতিকর সময় পার করছেন।
সরকার ভিন্ন মতাবলম্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ‘শায়েস্তা করা’ যে মিশন নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করছে, তাতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না বরং দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরো মারাত্মক রূপ নিতে যাচ্ছে। দমনপীড়নের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার এই কৌশল অতীতেও বিভিন্ন শাসকেরা নিলেও শেষ পর্যন্ত তা বুমেরাং হয়ে উঠেছিল। তখন সাধারণ মানুষ আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। দেশ আরো পিছিয়ে পড়ে। আমরা আশা করব, নিপীড়নমূলক শাসনের পরিবর্তে সরকার দেশে স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে। ধরপাকড় বন্ধ করে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনের উদ্যোগ নেবে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা- সরকারের অবস্থান ন্যায়সঙ্গত নয়

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবি বার বার অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। সাংবিধানিকভাবে অনেক কিছু বলার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ এতটাই প্রবল যে, বিচার বিভাগ কার্যত রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক অধিকার অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হচ্ছে।
গত আট মাসে কয়েক দফায় ১০৩ জন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে বদলি ও পদায়নের আদেশ দিয়েছে সরকার। এসব বদলি ও পদায়নে আইন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে সুপ্রিম কোর্টের অনুমতির কথা উল্লেখ করা হলেও এ ক্ষেত্রে বরাবরই নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব প্রাধান্য পেয়েছে।
এর মধ্যে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৬ জন, ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৪ জন, ৩ মার্চ ২৭ জন, ১ এপ্রিল ১৫ জন, ৯ জুন ২১ জন এবং সর্বশেষ গত ২০ আগস্ট আটজন, এরপর আরো দু’জন জেলা ও দায়রা জজকে বদলি, পদোন্নতি ও পদায়ন করা হয়েছে। এ ধরনের কাজগুলোকে রুটিন কাজ হিসেবে দেখানো হলেও এর নেপথ্যে নির্বাহী বিভাগের ইচ্ছার প্রতিফলন স্পষ্ট।
সাধারণভাবে মনে করা হয়, সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় যত দিন পর্যন্ত না হবে, তত দিন নিন্ম আদালতের বিচারকদের ওপর আইন মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব বহাল থাকবে। নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বও বহাল থেকে যাবে। এর ফলে যে উদ্দেশ্যে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করা হয়েছিল, তা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
বাস্তবতা হচ্ছে, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিচার বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃথকীকরণের ঘোষণা দেয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়ার কথা বলা হলেও তাদের নীতিগত ও কার্যকর অবস্থান স্পষ্টত বিপরীতধর্মী। নিম্ন আদালত থেকে সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির কথা উল্লেখ থাকলেও এর সবই চলছে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও পরিকল্পনা মতো। যা সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন মাত্র। অথচ পুরো বিষয়টির একক এখতিয়ার শুধুই সুপ্রিম কোর্টের।
এখন যা চলছে তা বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার রায়ের সাথে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার রায়ে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় করার নির্দেশনা থাকলেও বর্তমান সরকারের এক মেয়াদ শেষ হয়ে আরেক মেয়াদের ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ ব্যাপারে তাদের জবাবদিহিতার মানসিকতাও নেই। এ ধরনের অবজ্ঞা শুধু অনৈতিকই নয়, সরকার পরিচালনায় উচ্চ আদালত, আইন ও একটি গ্রহণযোগ্য রায়কে ধৃষ্টতার সাথে এড়িয়ে চলার মতো অপরাধ। আমরা এর অবসান চাই। নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব ও সরকারের রাজনৈতিক অভিলাস পূরণের মন্দ তৎপরতা বন্ধের উদ্যোগ চাই। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালত ভূমিকা পালন না করলে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায় এড়ানোও সম্ভব হবে না।

আল আকসা মসজিদ বন্ধ করে দেয়া- পবিত্র স্থান নিয়ে জবরদস্তি নয়

জেরুসালেমের আল আকসা মসজিদ কমপ্লেক্স বন্ধ করে দিয়েছে ইসরাইল। সামান্য একটি ঘটনাকে অছিলা ধরে মসজিদটি বন্ধ করে দেয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের পর আর কখনো এভাবে পুরো মসজিদটি মুসল্লিদের জন্য সিলগালা করা হয়নি। মসজিদটির অবস্থান পূর্ব জেরুসালেমের আল হারাম আল শরিফ চত্বরে। জর্দান ও ফিলিস্তিনের যৌথ একটি কর্তৃপক্ষ এর তত্ত্বাবধায়ক হলেও ইসরাইল জোরপূর্বক এটি বন্ধ করে দিয়েছে। মক্কা ও মদিনার পর মুসলমানেরা এটিকে সবচেয়ে পবিত্র এলাকা হিসেবে বিবেচনা করে। সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গিতে পরিচালিত রাষ্ট্র ইসরাইলের ধর্মীয় কাজে বাধা দিতে একটুও বাধেনি। গত বুধবার রাতে একজন ইহুদি গুলিবিদ্ধ হন। ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন একজন ফিলিস্তিনিকে গুলি করে হত্যা করেছে ইসরাইলি পুলিশ। একজন ব্যক্তি আহত হওয়ার বিপরীত সুনর্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই একজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হলো। বাড়তি হিসেবে বন্ধ করে দেয়া হলো আল আকসা মসজিদ। ইয়েহুদা হিক নামের আহত ব্যক্তি প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক চিন্তার ইহুদি; যিনি টেম্পল মাউন্ট এলাকায় পবিত্র স্থানগুলোতে ইহুদিদের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর প্রচারণা চালাচ্ছিলেন। সেদিন জেরুসালেমে একটি সম্মেলন কেন্দ্রের বাইরে গুলিবিদ্ধ হন দণিপন্থী ইহুদি এই নেতা।
মসজিদ বন্ধের প্রতিবাদে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ক্ষোভ-উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে তারা বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এ ঘটনাকে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন। এ ধরনের পদেেপর বিরুদ্ধে তারা আইনি ব্যবস্থা নেবেন বলে জানিয়েছেন। মাহমুদ আব্বাসের এ ধরনের প্রতিক্রিয়া মূলত একটি আনুষ্ঠানিকতার প্রকাশ। বর্ণবাদী ও সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ইসরাইলের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণের হুমকি প্রকৃতপক্ষে দুর্বলের আত্মতুষ্টির হুঙ্কার ছাড়া অন্য কিছু নয়। মানবতার বিরুদ্ধে ইসরাইল যেসব অপরাধ করে চলেছে সে জন্য তারা কাউকে থোড়াই কেয়ার করে। মসজিদ বন্ধের জন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা বহু দূরের বিষয়।
মসজিদ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। সেখানে কারো প্রবেশে বাধা থাকে না। মসজিদুল আকসা নিয়ে মুসলিমদের দীর্ঘ স্মৃতি জড়িত। এটি খ্রিষ্টান ও ইহুদিদেরও পবিত্র স্থান। এটির ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা বন্ধ রাখার অধিকার কারো নেই। আকসার বৈধ কর্তৃপক্ষ হচ্ছে জর্দান ও ফিলিস্তিনি ওয়াকফ। যেভাবে ইসরাইল জোরপূর্বক এটি বন্ধ করেছে তাতে অনুভূতিশীল প্রত্যেক মানুষকে আঘাত করেছে। পবিত্র স্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক মনোভাবের প্রকাশ ঘটাতে পবিত্র স্থান আক্রান্ত হতে পারে না। মসজিদুল আকসাকে ইহুদি আগ্রাসন থেকে বাঁচানোর জন্য সবাইকে একযোগে কথা বলা ও প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজন।

গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে কেউ পার পাবে না :ড. কামাল হোসেন

বিশিষ্ট আইনজীবি এবং গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আমাদের সংবিধানে আছে জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক। সেখানে সকল মানুষের সমান অধিকার রয়েছে। তাদের ভোটের অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত করতে পারবে না। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন জনগণের হাতে ক্ষমতা থাকবে। গণতন্ত্রকে ধ্বংশ করে কেউ পার পাবে না। ভাষা মতিন আমাদেরকে শিখিয়ে গেছেন, আমরা সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে না বলব।
শনিবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের স্মরণ সভায় তিনি এসব কথা বলেন। ভাসানী অনুসারী পরিষদ এ স্মরণ সভার আয়োজন করে।

ড. কামাল হোসেন বলেন, গত ৪২ বছরে কম অন্যায় হয়নি। আমাদের স্বাধীনতার মূল ইতিহাসকে নিয়ে বিতর্ক করা ঠিক নয়। আমাদেরকে ন্যায় সঙ্গত বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। সারা বিশ্বে যেখানে বাঙালি আছে সেখানেই আব্দুল মতিন সম্মানিত হবেন। এর থেকে বড় সম্মান আর কি হতে পারে ? তিনি চির জীবন আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।
তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়ার জিনিষ না। আব্দুল মতিন এ সম্মান চান নাই পানও নাই। এ ধরণের সম্মান তার মাপের মানুষকে ছোট করে। তার সমগ্র জীবনে অনৈতিক কোন সিদ্ধান্ত নেয়া তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। জনগণের অধিকারের বিষয়ে আব্দুল মতিন সারা জীবন আপোষহীন ছিলেন বলে এসময় তিনি মন্তব্য করেন।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফর উল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে স্মরণ সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দিন আহমদ, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)‘র সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, জাতীয় পার্টির একাংশের সভাপতি মোস্তফা জালাল হায়দার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো, জাবির সাবেক ভিসি ড. জসীম উদ্দীন আহমদ, নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, সাংবাদিক ও কলামিস্ট কাজী সিরাজ, ভাসানী অনুসারী পরিষদের সদস্য সচিব শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু, আব্দুল মতিনের স্ত্রী গুলবদন নেছা মনিকা প্রমুখ।
ড. এমাজউদ্দিন আহমদ বলেন, আব্দুল মতিন তার নিজের জন্য কিছুই রাখেননি। তিনি তার চোখ এমনকি নিজের দেহ পর্যন্ত দান করে গেছেন। আমরা জাতি হিসেবে কত অকৃতজ্ঞ। তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান পর্যন্ত দেয়া হল না। রাষ্ট্রীয় সম্মান দেয়া হলে ব্যক্তিগতভাবে তিনি সবচেয়ে বেশী খুশি হতেন বলেন মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, আর কিছু সম্ভব না হোক তার পরিবারটি যেন ভালোভাবে থাকতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় আমাদের এ অকৃতজ্ঞতা আরো বৃদ্ধি পাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আ স ম আব্দুর রব বলেন, যারা বাংলায় কথা বলেন তারা সবাই আব্দুল মতিন। তিনি সেদিন আন্দোলন না করলে আজকের ক্ষমতাসীনরা সিংহাসনে বসতে পারতেন না। সম্মানিত মানুষদেরকে সম্মান দিতে শেখেন। যাদের দেশের জন্য অবদান আছে তাদের অবদানের স্বীকৃতি দেয় উচিৎ বলে এসময় তিনি মন্তব্য করেন।
মোস্তফা জালাল বলেন, আমাদের চলার পথে আব্দুল মতিনের স্মৃতি এবং আদর্শ সারা জীবন অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
মাহবুবুর রহমান বলেন, ভাষা মতিন দেশের জন্য সবকিছুর মধ্যে থেকেছেন নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে নো বলতে শিখিয়েছেন। আমাদের দেশের ষোল কোটি মানুষ যদি নো বলে ওঠে তাহলে অত্যাচারী বিদায় নিতে বাধ্য। শহীদ মিনারের থেকে ভালো কোন জায়গায় আব্দুল মতিনকে সম্মান জানানো যেত না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হায়দার আকবর খান রনো বলেন, বর্তমান সরকার একটা প্রতারণা মূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন। এদের কাছ থেকে আব্দুল মতিনের মতো মানুষের সম্মান নেয়াটা ঠিক হতো না।
ড. জসীম উদ্দীন বলেন, শহীদ মিনার আর আব্দুল মতিন সমার্থক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে আব্দুল মতিনের নামে একটি চেয়ার প্রতিষ্ঠার আহবান জানান তিনি।
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের নামে ভন্ডামী হয়ে গেল। এখন জাপান, যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে সবাই সাথে আছে এমন নির্জলা মিথ্যা কথা বলছেন। এর বিরুদ্ধে না বলতে শিখিয়েছেন আব্দুল মতিন। আজ দেশে অনর্গল সত্যের অপালাপ হচ্ছে। আব্দুল মতিনকে সম্মান না দিয়ে রাষ্ট্র যারা চালায় তারা ছোট হয়ে গেছে। তারা ছোট লোক। আব্দুল মতিন এ ধরণের ফালতু ঠুনকো স্ট্যাটাসের যোগ্য নয় বলে এসময় তিনি মন্তব্য করেন।
গুলবদন নেছা বলেন, আব্দুল মতিনের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য এখনই ব্যবস্থা নিতে হবে। তার ইতিহাস যাতে বিকৃত না হয় সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। পাঠ্যবইয়ে তার ইতিহাস সংযুক্ত করতে হবে। তাহলে ভবিষ্যত প্রজন্ম তার সম্পর্কে জানতে পারবে। আব্দুল মতিন কখনো স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রীয় সম্মান চাননি বলে এসময় তিনি মন্তব্য করেন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. জাফর উল্লাহ বলেন, দেশের অধিকাংশ সংগ্রামই হয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার পরেও সে বৈষম্য শেষ হয়নি। যারা এক সময় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল, যারা সুবিধা ভোগী তারা সাহসী মানুষের নাম নিশানা মুছে দিতে চায়। যে কারণে পাঠ্য বইয়ে ভাসানী মতিনের নাম নেই। দেশের আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহবান জানান তিনি।

রাতেই স্বাভাবিক হতে পারে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি

জাতীয় গ্রিডে কারিগরি সমস্যার কারণে এখনো প্রায় পুরো দেশ বিদ্যুৎ–বিচ্ছিন্ন। তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেছেন, রাতের মধ্যেই ঢাকাসহ অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে।
জাতীয় গ্রিডে কারিগরি সমস্যার কারণে আজ শনিবার বেলা ১১টা ২৭ মিনিটে সারা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। গ্রিডের এই সমস্যার প্রতিক্রিয়ায় বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব কয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র। গ্রিডের সমস্যা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। এ জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ কায়কাউসকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আজ শনিবার দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছয় হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের পর ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়। কিন্তু ১২টার দিকে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পর্যায়ক্রমে ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে ৭০ মেগাওয়াট, সিলেটে ভাড়াভিত্তিক ২০ মেগাওয়াট ও কাপ্তাইসহ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়।
বিকেল চারটার দিকে বিদ্যুতের উৎপাদন প্রায় ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছে। কিন্তু সোয়া চারটার দিকে জাতীয় গ্রিড আবার বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় কাপ্তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র ছাড়া অন্য সবগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
দেশে বিদ্যুৎ বিপর্যয়এরপর আবার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যায়ক্রমে চালু করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। রাত আটটা পর্যন্ত বিদ্যুতের উৎপাদন প্রায় ৭০০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য সার্বিকভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক, ভৈরব ও বাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, জাতীয় গ্রিডের বিপর্যয়ের কারণে দেশের বৃহত্তম আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের চালু নয়টি ইউনিটের উৎপাদন একযোগে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহে বিপর্যয় দেখা দেয়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে নয়টি ইউনিটে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ। এ কারণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, ঢাকাসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি বিভাগের পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান জানান, ভেড়ামারা বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় দেখা দেয়। দুপুর পৌনে একটায় আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছয়টি ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের উৎপাদন একযোগে বন্ধ হয়ে যায়। জাতীয় গ্রিডে প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তিনি জানান, জাতীয় গ্রিডের ত্রুটি সারাতে নিজস্ব প্রকৌশলীরা কাজ করছেন। তবে কখন সবকটি ইউনিট চালু হবে, তা তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ-ভারত সঞ্চালন লাইনের ভেড়ামারা গ্রিডের ব্যবস্থাপক আলমগীর হোসেন বলেন, পাওয়ার গ্রিডের কোথাও সমস্যা হয়েছে। তবে সেটা ভেড়ামারায় কি না, এখন পর্যন্ত তা নিশ্চিত না। এ ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের সরবরাহ তারা ১১টা ২৭ মিনিটে বন্ধ করে দেন। তখন ভারত থেকে বাংলাদেশে ৪৩৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছিল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে বিদ্যুৎ আসবে না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আজ বেলা সাড়ে ১১টা থেকে তিনটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ ছিল না। এ সময় বিদ্যুতের অভাবে একটি অস্ত্রোপচার কক্ষে অস্ত্রোপচার হয়নি। বাকি অস্ত্রোপচার কক্ষগুলোতে জেনারেটরের বিদ্যুৎ দিয়ে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়।

এ যেন জনসমুদ্র! by অহিদুল হক

এ যেন জনসমুদ্র। চার দিকে শুধু মানুষ আর মানুষ। গোটা শহর লোকে লোকারণ্য। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নেই। জনসভার পূর্ব নির্ধারিত স্থান নাটোর নবাব সিরাজউদ্দৌলা সরকারী কলেজের মাঠ কানায় কানায় পূর্ণতো বটেই, শহরের কোনো রাস্তায়ও দাঁড়াবার জায়গা নেই। এক সঙ্গে এতো মানুষ নাটোরবাসী অতীতে কখনো দেখেনি।

দুপুর ৩টায় জনসভা শুরুর ঘোষণা থাকলেও সকাল ৯টা থেকেই জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিলসহ লোকজন আসতে থাকে। হাতে ধানের শীষ, মাথায় ক্যাপ, গায়ে দলীয় পরিচয়সহ গেঞ্জি, সুদৃশ্য ব্যানার, ফেস্টুনসহ লোকজন স্রোতের মত আসতে থাকে জনসভাস্থল এনএস কলেজ মাঠে। সাঈদী, নিজামীসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবি সম্বলিত সাদা গেঞ্জি পড়ে জামায়াত নেতাকর্মীরা সমাবেশে যোগ দেন। দুপুর ১টার আগেই জনসভাস্থল কানায় কানায় ভরে যায়। মাঠে জায়গা না পেয়ে বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্য শুনতে দুর-দুরান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষ মাঠ সংলগ্ন রাস্তায় অবস্থান নেন। যার ফলে শহরের ছায়াবাণী সিনেমা হলের মোড় থেকে শুরু করে স্টেশন বাজার পর্যন্ত রাস্তা ছিল লোকে লোকারণ্য। কলেজ মাঠের চারপাশের উঁচু ভবনের ছাদ ও বিভিন্ন গাছের ডালে বসে মানুষজনকে বেগম জিয়ার বক্তব্য শুনতে দেখা গেছে। এনএস কলেজ মাঠে স্থান সংকুলান না হওয়ায় গোটা শহরই যেন জনসভায় পরিণত হয়েছিল। ঢাকা থেকে এনে শহর জুড়ে ২শ’ মাইক লাগানো হয়। ফলে শহরের প্রতিটি প্রান্ত থেকে মানুষ নির্বিঘেœ নেতৃবৃন্দের বক্তব্য শুনতে পেরেছেনে।
বেগম খালেদা জিয়া এর আগে ২০১০ সালের অক্টোবরে জেলার বনপাড়ায় উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লা নুর বাবু হত্যার পর শোক সভায় এবং ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নাটোরের কানাইখালী খেলার মাঠে মধ্যরাতে নির্বাচনী জনসভায় অপেক্ষমান জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। নাটোরে বর্তমান সরকারের আমলে নানা নিপীড়ন-নির্যাতনে মানুষ যেমন অতিষ্ঠ, তেমনি দীর্ঘদিন পর বেগম জিয়ার নাটোরে আগমণকে ঘিরে গোটা জেলার নেতাকর্মীরা ছিলেন দারুণ উজ্জীবিত। এ জন্য নেতাকর্মীদের উপচে পড়া ভীড় লক্ষ্য করা গেছে। এ সময় নেতাকর্মীরা শ্লোগানে শ্লোগানে খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে সমর্থন জানানোর পাশাপাশি সরকারের নানা ব্যর্থতা আর নির্যাতন-নিপীড়নের কথা তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়া সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন নেতাকর্মীরা। সমাবেশে আগত সত্তরোর্ধ আব্দুস সাত্তার বলেন, জীবনে বহু সভা-সমাবেশ দেখেছি। খালেদা জিয়ার জনসভাও দেখেছি। কিন্তু এতো লোক কোন জনসভায় দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এবারের উপচে পড়া ভীড় দেখে আমরা অভিভূত। জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসাইন খান বলেন, জনসভাকে সার্বিকভাবে সফল করতে জামায়াত নেতাকর্মীরা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। জনসভায় পুরো জেলা থেকে কমপক্ষে এক লাখ জামায়াত-শিবির নেতাকর্মী অংশ গ্রহণ করেছেন। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক বলেন, জেলার সর্বস্তরের নেতাকর্মী বিপুল উদ্যমে যোগ দেয়ায় জনসভা জনসমুদ্রে রুপ নিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে নাটোর জেলা বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের ঘাঁটি বলে প্রমাণিত হয়েছে।
বেগম জিয়াকে পথে পথে ফুলেল শুভেচ্ছা
ঢাকা থেকে সড়ক পথে নাটোরের সমাবেশে আসার সময় পথে পথে বেগম জিয়াকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ২০ দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। মহাসড়কের দু’পাশে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে থেকে হাত নেড়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। এ সময় বেগম জিয়া হাত তুলে তাদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। তাঁকে একনজর দেখার জন্য বিপুল সংখ্যক মহিলাকে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তার যাওয়ার পথ বনপাড়া-হাটিকুমরুল ও নাটোর-পাবনা মহাসড়কের দুই পাশে সারি সারি জাতীয় ও দলীয় পতাকা, বিলবোর্ড, শত শত তোরণ দিয়ে ইতিপূর্বেই সুন্দরভাবে সাজানো হয়। বিভিন্ন এলাকায় টবে ধান গাছ লাগিয়ে মহাসড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয়। এছাড়া বনপাড়া পৌরসভার শুরুতে গাজী অটো রাইস মিলের সামনে বসানো শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান ও এ্যাড. এম রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর ভাস্কর্য জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ সবার দৃষ্টি কাড়ে। কাছিকাটা, নয়াবাজার, রয়না ভরট হাট, রাজ্জাক মোড়, বড়াইগ্রাম চৌরাস্তা, আগ্রাণ, পারকোল বাজার, বনপাড়া বাইপাস, আহম্মেদপুর বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন পয়েন্টে সমবেত লোকজন রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে শ্লোগানে শ্লোগানে বেগম জিয়াকে বরণ করে নেন।
সমাবেশে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের নজর কাড়া সহাবস্থান
জনসভা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ থাকলেও কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা দেখা যায়নি। সবার মধ্যে ছিল আন্তরিকতা আর সহযোগিতার মনোভাব। বিশেষ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মঞ্চের কাছাকাছি বসাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলেও নাটোরের সমাবেশে তার লেশমাত্র ছিল না। আগে থেকেই পরিকল্পিতভাবে মাঠে বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠণসহ জামায়াত-শিবিরের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করে রাখায় মাঠে বসা নিয়ে ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেনি। ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের এ সুন্দর সহাবস্থান সবার দৃষ্টি কেড়েছে।

‘সরাসরি গুলি বন্ধ করুন, আন্দোলন দেখিয়ে দেবো’ -খালেদা জিয়া by কাফি কামাল

নাটোরবাসীকে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি বলেছেন, এই অবৈধ সরকারকে হঠাতে আমাদের করতে হবে। তবে এখনই কর্মসূচি ঘোষণা দিতে চাই না। আপনারা প্রস্তুতি নিয়ে রাখবেন। যখনই আন্দোলনের ডাক দেবো তখনই ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে নেমে আসবেন। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, পুলিশকে দিয়ে সরাসরি গুলি করা বন্ধ করুন। কথায় কথায় গুলি চালাবেন না। বিএনপি  আন্দোলন করতে পারে কিনা তা দেখিয়ে দেবো। আজ বিকালে নাটোরের নবাব সিরাজউদ-দৌলা সরকারি কলেজ মাঠে ২০ দল আয়োজিত বিশাল জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার শখ আমার নেই। আগামীতে তরুণরা নেতৃত্ব দেবে। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বলতে চাই- আমি আরেকবার আন্দোলন করবো দেশের মানুষের ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে। বিএনপি ক্ষমতায় এলে মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধ শ্রমবাজার খুলে যাবে মন্তব্য করে বিরোধী জোট নেতা বলেন, শেখ হাসিনা আরব আমিরাত গিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুই করতে পারেননি। কারণ আওয়ামী লীগ  মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করে ফেলেছে। কিন্তু আমরা ক্ষমতায় এলে মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধ শ্রমবাজার  খুলে দিতে পারবো। সেই বিশ্বাস আমাদের আছে।  শেখ হাসিনাকে ‘নব্য হিটলার’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, মানুষ বলে শেখ হাসিনা  স্বৈরাচার। আমি বলবো তিনি শুধু স্বৈরাচার নন, তিনি নব্য হিটলার। হিটলারের মতো তিনি মানুষ হত্যা করছেন। খালেদা জিয়া বলেন, শেখ হাসিনা সরকার হামলা-মামলার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে আছে। তারা পুরো দেশটাকে কারাগারে পরিণত করেছে। বিরোধী জোটের কোন নেতাকর্মী আজ মামলার বাইরে নেই। দেশে আজ আর কোনো গণতন্ত্র নেই। তিনি বলেন, দেশে প্রতিনিয়ত গুম, খুন চলছে। জনগণের নিরাপত্তা নেই। এভাবে দেশ চলতে পারে না। চলতে  দেয়া যায় না। তিনি বলেন, আজ সারাদেশে বিদ্যুৎ নেই। সরকার লুটপাটের জন্য বারবার বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এখন আবার দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। এবার দাম বাড়ালে জনগণ মেনে নেবে না। জনসভার বক্তব্য যাতে সারা দেশে সম্প্রচার করতে না পারে সেজন্য সরকার  বিদ্যুৎ বন্ধ করে রেখেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।  এদেশে বিনিয়োগ আসছে না অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন,  দেশী-বিদেশী কেউ বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছে না। কেউ বিনিয়োগ করলেই ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগকে চাঁদা দিতে হয়। তাই  দেশে বিনিয়োগ হচ্ছে না। দেশে দরিদ্রতা বেড়ে যাচ্ছে। খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে দেশপ্রেম নেই। তাদের মধ্যে একটাই প্রেম ‘টাকা আর টাকা’। তাই দেশকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরই এগিয়ে  আসতে হবে। দুদককে দুর্নীতিবাজ কমিশন আখ্যায়িত করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, দুদক এখন দুর্নীতি দমন কমিশন নয় তারা দুর্নীতিবাজ কমিশন। ক্ষমতাসীন দলের সব দুর্নীতিবাজকে দায়মুক্তি দিচ্ছে তারা। এখনও যারা দুর্নীতি করছে তাদেরও দায়মুক্তি দিচ্ছে। নির্বাচন কমিশনকে অথর্ব আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, এই অথর্ব অপদার্থ নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এরা যতদিন দেশে থাকবে ততদিন দেশে মঙ্গল হবে না। এদের বিদায় করতে হবে। বিচারকরা ন্যায় বিচার করতে পারছে না মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, বিচারকরা শপথ নেন ন্যায় বিচার করার জন্য। কিন্তু তারা ন্যায় বিচার করতে পারছে না। আদালতগুলোতে দলীয় লোক বসিয়েছে আওয়ামী লীগ। এর উদাহরণ হলো- মই্নউদ্দিন-ফখরুদ্দিন সরকার আমলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে  ১৫টি মামলা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৮ হাজার মামলা দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাদের সব মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কিন্তু আমাদের একটি মামলাও প্রত্যাহার করা হয়নি। দেশে এখন আওয়ামী লীগের জন্য একরকম বিচার আর বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের জন্য আরেক রকম বিচার। বিচারকদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, দল দেখে নয়, সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখে ন্যায় বিচার করবেন। কারণ একদিন আল্লাহর কাছে আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে। তখন কি জবাব দেবেন।   নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর সভাপতিত্বে জনসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও বিএনপির কেন্দ্রীয়  এবং স্থানীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।

সুরক্ষিত রাখুন কম্পিউটার by আহমেদ ইফতেখার

কম্পিউটারের সুরা নিয়ে আমরা সবাই কম-বেশি চিন্তিত। শুধু অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করেই আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন না। আপনি হয়তো কোনো একটি অ্যান্টিভাইরাস ব্যবহার করছেন পিসির সুরায়। ভাইরাস ঠেকাতে সেটি সমর্থ হলেও অন্যান্য তিকর উপাদান থেকে হয়তো সেটি পূর্ণাঙ্গ সুরা দিতে সম নয়। ফলে আপনার ডিজিটাল তথ্যগুলো যেমন হুমকির মুখে পড়তে পারে, তেমনি আপনার হার্ডওয়্যারের নিরাপত্তাও নিশ্চিত থাকবে না। আপনার কম্পিউটারে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে বিনামূল্যেই কম্পিউটারের পূর্ণাঙ্গ সমস্যার সল্যুশন নিতে পারবেন অনলাইন থেকেই।  লিখেছেন আহমেদ ইফতেখার

প্রতিনিয়ত প্রযুক্তি সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে যাচ্ছে। আর তাই আমাদের ডিজিটাল জীবনযাত্রায় নিরাপত্তা আর প্রতিরাও হয়ে উঠেছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে যারা পিসি ব্যবহার করে থাকেন, তাদের সবারই অন্যতম প্রধান মাথাব্যথার কারণ হলো ভাইরাস। বিশেষ করে যারা ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকেন, তাদের নানা ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি একটু বেশিই। এ ছাড়া ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার, স্প্যাম, ফিশিং, স্ক্যাম প্রভৃতির আক্রমণ থেকে বাঁচিয়ে চলা অনেক েেত্রই কঠিন হয়ে পড়ে। সব ধরনের সাইবার আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ একটি সিকিউরিটি স্যুট। বিনামূল্যের বিভিন্ন সফটওয়্যার স্যুট ব্যবহার করে এ েেত্র আপনি নিজেই তৈরি করে নিতে পারেন এমন একটি শক্তিশালী পূর্ণাঙ্গ সিকিউরিটি স্যুট।
অ্যান্টিভাইরাস
পিসির সুরায় সর্বপ্রথম আপনাকে যে কাজটি করতে হবে, তা হলো একটি ভালো অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করা। বেশির ভাগ অ্যান্টিভাইরাসই টাকা দিয়ে কিনতে হলেও এর বিনামূল্যের সংস্করণও পাওয়া যায়। বিনামূল্যের অ্যান্টিভাইরাসের মধ্যে যেগুলো সবচেয়ে বেশি নির্ভরযোগ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে আসছে তার মধ্যে রয়েছে নরটন, এভিজি, অ্যাভিরা, ম্যাকঅ্যাফি, ক্যাসরপারস্কি, ইসেট, পান্ডা প্রভৃতি। উইন্ডোজের নিজস্ব বিল্ট-ইন অ্যান্টিভাইরাস উইন্ডোজ ডিফেন্ডারও ব্যবহার করতে পারেন। তবে ভাইরাস থেকে সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে সুরা দিতে সম নয়। তাই ভালো একটি অ্যান্টিভাইরাসের বিনামূল্যের সংস্করণটি ইনস্টল করে নেয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
অ্যান্টিম্যালওয়্যার
ভালো একটি অ্যান্টিভাইরাসের সাথে সাথে আপনার পিসিতে নির্ভরযোগ্য একটি অ্যান্টিম্যালওয়্যার টুলও ইনস্টল করে নিতে পারেন। এটি আপনার পিসিকে ম্যালওয়্যার, স্পাইওয়্যার, স্প্যাম, ফিশিং ঠেকাতে বাড়তি সুবিধা প্রদান করবে। অ্যান্টিম্যালওয়্যার টুলস নির্বাচনে আপনার পছন্দের তালিকায় থাকতে পারে স্পাইট সার্চ অ্যান্ড ডেসট্রয়, ম্যালওয়্যার বাইটস অ্যান্টিম্যালওয়্যার, সুপার অ্যান্টিস্পাইওয়্যার, কম্পোফিক্স, হাইজ্যাক দিস প্রভৃতি। পিসিতে যেকোনো ধরনের তিকর উপাদানের আনাগোনা দেখলেই এগুলো ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সম। অ্যান্টিভাইরাসের ব্যাকআপ হিসেবে এই অ্যান্টিম্যালওয়্যার টুলগুলো অত্যন্ত কার্যকর।
ফায়ারওয়াল
পিসির সুরায় তৃতীয় ধাপে আপনাকে ব্যবহার করতে হবে শক্তিশালী একটি ফায়ারওয়াল। এর জন্য উইন্ডোজের বিল্ট-ইন ফায়ারওয়ালের বাইরে বিনামূল্যের কয়েকটি শক্তিশালী ফায়ারওয়াল সার্ভিসের ওপর নির্ভর করতে পারেন। একটি শক্তিশালী ফায়ারওয়াল হ্যাকারদের অনাকাক্সিত এবং অবৈধ প্রবেশ থেকে আপনার পিসিকে অনেকটাই সুরতি রাখবে। উইন্ডোজের বিল্ট-ইন ফায়ারওয়ালটি মূলতই ‘ইনবাউন্ড’ কার্যক্রমে বেশি কার্যকর। এ ক্ষেত্রে পিসিটুলস আউটপোস্ট ফায়ারওয়াল, জোন অ্যালার্ম ফায়ারওয়াল, কমোডো ফায়ারওয়াল, অ্যাসাম্পু ফায়ারওয়াল কিংবা পিসি টুলস ফায়ারওয়াল প্লাসের মধ্য থেকে একটি ফায়ারওয়াল বেছে নিতে পারেন।
ব্রাউজার
বিশ্বস্ত সব ওয়েবসাইটের বাইরে তাই অপরিচিত বা নতুন ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহার করার সময় প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। আপনার ওয়েব ব্রাউজারটিকে তাই এই কাজে সাজিয়ে নিতে হবে সুরার দেয়ালে। এমনিতে ওয়েব ব্রাউজার হিসেবে এ ক্ষেত্রে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে গুগল ক্রোম। তবে সুরা নিশ্চিত করার জন্য ওয়েব অব ট্রাস্ট বা ম্যাকঅ্যাফি সাইট অ্যাডভাইজারের মতো ব্রাউজার প্লাগ-ইন্স বা এক্সটেনশন ব্যবহার করা আপনাকে নিশ্চিন্ত রাখতে পারে।
সফটওয়্যার
প্রতিটি সফটওয়্যারের হালনাগাদ সংস্করণগুলোতে সাধারণত আগের সংস্করণের চেয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত হয়ে থাকে। তাই আপনার পিসিতে ব্যবহৃত প্রতিটি সফটওয়্যারেরই আপডেট সংস্করণটি থাকা ভালো। নতুন নতুন আপডেট এলে সেগুলোও গ্রহণ করে নিতে হবে। তাই নিয়মিত সফটওয়্যার আপডেটের দিকে নজর রাখুন। তবে প্রতিটি সফটওয়্যারের আপডেট চেক করাটা ঝামেলার লাগতে পারে। আর এই কাজটি করতে পারেন সেকুনিয়া পার্সোনাল সফটওয়্যার ইন্সপেক্টর বা অন্য কোনো সফটওয়্যার ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে। সেকুনিয়া নিজে থেকেই আপনার পিসিতে ইনস্টল করা প্রতিটি সফটওয়্যারের সর্বশেষ সংস্করণ খুঁজে নিয়ে আপডেট করে দিতে সম।
পাসওয়ার্ড
অনলাইনে ই-মেইল, সোস্যাল নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন অ্যাকাউন্টের সুরায় ব্যবহার করতে হয় শক্তিশালী সব পাসওয়ার্ড। এত পাসওয়ার্ড মনে রাখা নেহায়েত কম ঝামেলার নয়। তাই শক্তিশালী একটি পাসওয়ার্ড ম্যানেজারের শরণাপন্ন হয়ে সেই ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে উইন্ডোজ প্ল্যাটফর্মে কিপাস, মাইপ্যাডলক, কিওয়ালেট, ওয়ানপাস, লাস্টপাস, ড্যাশলেন থেকে বেছে নিতে পারেন যেকোনো একটি। আবার পাসপ্যাক, মেলডিয়াম, মাইনওয়ান লগইন, কিপারজ, মিট্রোর মতো অনলাইন অ্যাপ্লিকেশনেও রাখতে পারেন ভরসা।
সোস্যাল নেটওয়ার্ক
ফেসবুক, টুইটার, গুগল প্লাস ছাড়া এখন একটি দিনও চলে না। সোস্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের এসব সাইট থেকেও হতে পারে আক্রমণ। সে কারণে এসব সাইট থেকেও সতর্ক থাকতে হবে।
সর্বোপরি পিসির নিরাপত্তায় ব্যাঘাত যাতে না ঘটে, সে জন্য একটি প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যারও ব্যবহার করতে পারেন। উইন্ডোজ এসেনশিয়াল সফটওয়্যার প্যাকেজে আপনি পাবেন মাইক্রোসফট ফ্যামিলি সেফটি ওয়েবসাইট। এর বাইরেও বেশ কিছু প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যার পাওয়া যায়।
আর ল্যাপটপের সুরার ক্ষেত্রে অবশ্য চুরি হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও মাথায় রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ‘প্রে’ নামের সফটওয়্যারটি দিয়ে দূর থেকেও মনিটর করতে পারবেন ল্যাপটপ। আবার এনক্রিপশন সফটওয়্যার ব্যবহার করে আপনার ল্যাপটপের হার্ডডিস্ক এনক্রিপ্ট করেও তথ্যের সুরা নিশ্চিত করতে পারেন।

জিনবিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী by মামুন আল করিম

আবেদ চৌধুরী অযৌন বীজ উৎপাদন (এফআইএস) সংক্রান্ত তিনটি নতুন জিন আবিষ্কার করেন, যার মাধ্যমে এই জিনবিশিষ্ট মিউটেন্ট নিষেক ছাড়াই আংশিক বীজ উৎপাদনে সম হয়। তার এই আবিষ্কার এপোমিক্সিসের সূচনা করেছে, যার মাধ্যমে পিতৃবিহীন বীজ উৎপাদন সম্ভব হয়।
তিনি পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে, যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন স্টেট ইনস্টিটিউট অব মলিকুলার বায়োলজি এবং ওয়াশিংটন স্টেটের ফ্রেড হাচিনসন ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। শিকতা ও গবেষণা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট হেলথ, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি এবং ফ্রান্সের ইকোল নরমাল সুপিরিয়রের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে।
‘খাছালত’ নামে বাংলাদেশী হারিয়ে যাওয়া একটি ধান নিয়ে বিশ্বে হইচই পড়ে গেছে। নেচার নামে এক সাময়িকীতে এ ধানকে ভারতীয় বুনো ধান হিসেবে দাবি করা হলে তিনি তার প্রতিবাদ করে প্রমাণ করে দিলেন আসলে এটি বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া একটি উন্নত জাতের ধান। ম্যানিলায় আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (ইরি) রীতিমতো তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ড. আবেদ চৌধুরী প্রমাণ করলেন কাসালথ আমাদের হারিয়ে যাওয়া একটি ধান, এটি ভারতের নয়। কাসালথ ধান বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের কৃষকের প্রিয় একটি ধান। আঞ্চলিকভাবে এ ধানের নাম ‘খাছালত’।

তিনি তার গ্রামের বাড়ি হাজীপুর এলাকায় গড়ে তুলেছেন ধান পরীা মাঠ। আড়াই বছর ধরে এখানে চলছে ধানবীজের পরীা-নিরীা। তিনি দেশের হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন জাতের ধান নিয়ে গবেষণা করছেন। এখানে ধানের একটি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলারও চেষ্টা করছেন বলে জানান। এ ছাড়া তার গবেষণায় কৃষকদের জন্য একই চাষাবাদে দুইবার ফসল উৎপাদন একটি ব্যতিক্রমী মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কেটে ফেলা ধানের মোথা থেকে দ্বিতীয়বার ধান উদ্ভাবন করেছেন বিশিষ্ট জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী।
২০১০ সালের ডিসেম্বর মাসে জিনবিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের নিজগ্রাম কানিহাটি এলাকার ২৫ বর্গমিটারের একটি প্রদর্শনী েেত বোরো ধানের চারা রোপণ করেন।
সঠিকভাবে সেচ ও পরিচর্যা করে ১৩০ দিনের মধ্যে ৮৫ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটার উচ্চতার গাছে প্রথমবারের মতো ফসল বেরিয়ে আসে। আর এই সময়ের মধ্যেই মাটি থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় পরিকল্পিতভাবে ধান কেটে নিতে হয়েছে। কোনো প্রকার চাষাবাদ ছাড়াই প্রথম দফা ধান কেটে নেয়ার পর ধানের মোথায় পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে মাত্র ৫২ দিনের মাথায় দ্বিতীয়বারের মতো ফসল উৎপাদন করা হয়। প্রথমবারের নতুন ধান কেটে নেয়ার পর দেখা গেছে, হেক্টরপ্রতি এ ধান উৎপাদন হয়েছে ৬.৪ মেট্রিক টন এবং দ্বিতীয়বার চাষাবাদবিহীন ধানের মোথায় বিঘাপ্রতি মাত্র ৩০০ টাকার ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদন হয়েছে ৩ মেট্রিক টন। যেখানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদন হয়ে থাকে ৩ থেকে ৪ মেট্রিক টন।
ঐকান্তিক পরিশ্রম ও নিষ্ঠা থাকলে যেকোনো কাজে সফলতা পাওয়া যায়, তার অন্যতম উদাহরণ আবেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, নেচার সাময়িকীতে কাসালথের উৎপত্তিস্থল নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের পর ম্যানিলায় ইরিতে তিনি প্রতিবাদ পাঠান। ইতোমধ্যে তিনি পরীামূলক কাসালথ ধান চাষাবাদও শুরু করেছেন বলে জানান। তার গ্রামের বাড়ি হাজীপুর এলাকায় তিনি ধান পরীার মাঠ গড়ে তুলেছেন। আড়াই বছর ধরে এখানে চলছে ধানবীজের পরীা-নিরীা। তিনি দেশের হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন জাতের ধান নিয়ে গবেষণা করছেন। এখানে ধানের একটি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলারও চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

হেমন্তের নিমন্ত্রণ by সুহৃদ আকবর

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতুবৈচিত্র্যের পালাবদলে এদেশে প্রতি দু’মাস পরপর ঋতু বদল হয়। আর এ ঋতুর পালাবদলে শরতের পরে নবান্নের উৎসব নিয়ে আসে হেমন্ত। হেমন্তের বাতাসে হলুদ ধানের শীষ দোল খায়। তা দেখে আমাদের মন দুলে ওঠে। দখিনা বাতাসে পাকা ধানের সুবাস এসে নাকে লাগে। পাকা ধানের ম-ম গন্ধে ব্যাকুল হয় মন। আকুল হয়ে ওঠে প্রাণ। এমন সময় দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের পর মাঠ পেরিয়ে দূরে বহু দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করে। ধান ক্ষেতে ঝাঁকে ঝাঁকে বাবুই পাখি আসে। কিচিরমিচির গানে মুখর করে তোলে ধান ক্ষেতের আঙিনা। তখন আমাদেরও পাখি হয়ে যেতে মন চায়। হেমন্তের সকালে নরম রোদে চিকচিক করে হলুদ ধানের শীষ।

দলে দলে কৃষেকেরা পাকা ধান কাটে আর মনের আনন্দে গান গায়। গায়েঁর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বাঁশের ঝুড়ি হাতে ঝরা ধান সংগ্রহ করে। মাটির গর্তে ইঁদুরের লুকিয়ে রাখা ধান বের করে আনতে ভয় পায় না দস্যু ছেলেরা। সে ধান বিক্রি করে ছেলেরা চিঁড়ার মোয়া খায় আর শখের খেলনা কেনে তারা। মেয়েরা ফেরিওয়ালার কাছ থেকে  কেনে আয়না, চুলের ফিতা-খোঁপার ফুল আর লিপস্টিক । রাস্তাঘাট খড়ের আস্তরণে ঢেকে যায়। উঠোনের কোণে ধানের আঁটি জমা করে কৃষকেরা। সে ধানের আঁটিকে ছোট ছোট টিলার মতো দেখায়। শুরু হয় ধান মাড়াই আর ধান ভানার কাজ। বেশির ভাগ সময় বাড়ির বউ-ঝিরা ধান সংগ্রহ করে। এ সময় গাঁয়ের প্রতিটি বাড়িতে তৈরি হয় বাহারি পিঠা। নবান্নের আমেজে পুরো গ্রাম হয় মাতোয়ারা। ধান কাটা জমিতে কেউ মটর কেউ বা সরিষার বীজ বপন করে। কিছুদিন পর মটরগাছ বড় হয় আর সরিষা ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় পুরো মাঠ। হলুদ সরিষাক্ষেতের আল দিয়ে কিশোর-কিশোরীরা ছুটে বেড়ায়। মেয়েরা চুলের খোঁপায় সরিষা ফুল পরে। এই হলো হেমন্তের চিরচেনা বাংলার রূপ। হেমন্তের রূপ মাধুর্য আমদের আমোদিত করে।

প্রাণীদের মজার কথা- তিমি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণী by মৃত্যুঞ্জয় রায়

ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। এক সাগরে এক জাহাজডুবি হয়। নাবিক কোনো রকমে সে জাহাজের একটা ভাঙা কাঠের টুকরো ধরে সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছিল আর তীরের সন্ধান করছিল; কিন্তু গভীর সাগরে তীর আসবে কোত্থেকে? হঠাৎ ছোট একটা দ্বীপ দেখে সে আনন্দিত হয়ে উঠল। কোনো রকমে সাঁতার দিয়ে সে দ্বীপে উঠল। কান্ত শরীরে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল দ্বীপটির মাটিতে; কিন্তু কিছুণ পরই কী যে হলো, দ্বীপটা তলিয়ে গেল। আর নাবিকও ডুবে মরল। আসলে সেটা তো কোনো দ্বীপ ছিল না, বিরাট আকারের একটা তিমি সাগরের বুকে ভেসে ছিল। সেটা দেখেই দ্বীপের মাটি বলে ভুল হয়েছিল নাবিকের। সুতরাং বুঝতেই পারছ যে তিমিরা কত্ত বড়!
শুধু সাগর কেন, পৃথিবীর বুকে নীলতিমির মতো অত বড় আর কোনো প্রাণী নেই। একটা নীলতিমিকে বড় মাঠের মধ্যে শুইয়ে রাখলে সেটা প্রায় ৯ তলা বিল্ডিংয়ের সমান উঁচু হবে। লম্বায় কম করে হলেও ১০০ ফুট তো হবে। ওজন হবে প্রায় ১০০ টন যা কিনা প্রায় ২৫টা হাতির সমান! একটা নীলতিমি রোজ প্রায় চার টন খাবার খায়। ছোট ছোট মাছই ওদের খাবার। তবে একমাত্র মানুষ ছাড়া নীলতিমিকে কিন্তু খাওয়ার কেউ নেই। তাই বলে ভেবো না যে সব তিমিই অত বড়। সাগরে যত তিমি আছে তাদের মধ্যে নীলতিমিই হলো সবচেয়ে বড়, আর সবচেয়ে ছোট হলো স্পার্ম তিমি। একটি স্পার্ম তিমির দৈর্ঘ্য মাত্র সাড়ে আট ফুট থেকে ৬০ ফুট। তিমি অত বড় প্রাণী হলেও ওরা কিন্তু দিব্যি স্বচ্ছন্দে সাগরে সাঁতার কেটে বেড়ায়, ভেসে থাকে এমনকি অত বড় দেহ নিয়েও সাগরে লাফিয়ে খেলা করে। স্থলচর কোনো প্রাণীর পইে ওদের মতো অত বড় দেহ নিয়ে চলাফেরা সম্ভব নয়, দেহের চাপেই পাগুলো গুঁড়িয়ে যাবে; কিন্তু ওদের কিছু হয় না। কেননা, সাগরে লবণ জলের প্লবতার জন্যই অত বড় দেহটা অনায়াসে ভেসে থাকে।
অনেকের ধারণা, সাগরে সাঁতরে বেড়ানো তিমিরা হলো একধরনের মাছ; কিন্তু তিমি কোনো মাছ নয়, স্তন্যপায়ী প্রাণী। বলতে পারো তোমার-আমার মতো একধরনের জীব। অত্যন্ত সুন্দর আর বুদ্ধিমান জীব। মাছের মতো ওরা ফুলকা দিয়ে নিঃশ্বাস নেয় না, আবার ডিমও পাড়ে না। শ্বাস-প্রশ্বাস চলে আমাদেরই মতো ফুসফুস দিয়ে। আর শ্বাসও নেয় আমাদের মতো বাতাস থেকে। অথচ ওরা থাকে সাগরের পানিতে। আরো অনেক আশ্চর্যজনক মিল আছে আমাদের সাথে ওদের। আমাদের যেমন চুল আছে তেমন ওদেরও চুল গজায়, তবে তিমিরা বড় হলে ওগুলো আর তেমন দেখা যায় না। আমাদের মতো তিমিও উষ্ণ রক্তের প্রাণী। আমাদের হৃৎপিণ্ডের মতো ওদেরও হৃৎপিণ্ডে চারটি প্রকোষ্ঠ আছে। বিস্ময়ের কথা হলো তিমিরা সরাসরি বাচ্চার জন্ম দেয় আর সেসব বাচ্চা মায়ের দুধ খেয়ে বড় হয়। জন্মের সময়ই নীলতিমির এক- একটা বাচ্চা হয় হাতির মতো, বাচ্চার ওজন দাঁড়ায় প্রায় ২৭ টন আর দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৭ ফুট।
সাগরের বুকে কত রকমের তিমি যে আছে! তবে সব তিমিকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে ওদের দাঁত দেখে। একধরনের তিমির বড় বড় গোজ বা হাতির দাঁতের মতো দাঁত আছে। ওরা স্কুইড, বড় মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী শিকার করে খায়। এদের একটামাত্র নাকের ফুটো থাকে। প্রায় ৬৬ প্রজাতির তিমি আছে এই দাঁতাল তিমি শ্রেণীতে। আর এক ধরনের তিমি আছে যাদের দাঁতগুলো চিরুনির দাঁতের মতো, অনেকটা ছাঁকনির কাজ করে ওগুলো। এ শ্রেণীর তিমি ছোট ছোট মাছ ছেঁকে মুখে পুরে নেয়। এদের নাকে দুটো ফুটো। ১০ প্রজাতির তিমি আছে এ শ্রেণীতে।
কোনো কোনো তিমি কিন্তু অত বড় দেহ নিয়েও বেশ ভালো সাঁতার কাটতে পারে। কিলার তিমি আর শর্টফিন পাইলট তিমিরা হলো তিমি জগতের সবচেয়ে দ্রুততম তিমি। ওরা ঘণ্টায় প্রায় ৩০ কিলোমিটার বেগে সাঁতরাতে পারে। তিমিরা ওদের লেজের ওঠানামা দ্বারাই মূলত সাঁতার কাটে। আর মাছ সাঁতার কাটে লেজকে ডানে-বামে ঘুরিয়ে। ওভাবে সাঁতরাতে সাঁতরাতে কোনো কোনো সময় তিমিরা ওদের আবাস ছেড়ে অনেক দূরে চলে যায়। বিশেষ করে ঠাণ্ডা পানির স্রোত থেকে প্রায়ই তারা দূরের কোনো গরম পানির স্রোতের সন্ধানে সাঁতরাতে সাঁতরাতে চলে যায়। আর এ ক্ষেত্রে ধূসর তিমির কোনো জুড়ি নেই। বছরে ওরা সাগরে গড়ে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মাইল পথ পরিভ্রমণ করে।
অনেক তিমিই কিন্তু খেলতে পছন্দ করে। যেমন কোনো তিমির ইচ্ছা হলো তো হঠাৎ সাগর জল থেকে লাফিয়ে শূন্যে উঠে পড়ল খানিকটা। আবার ধপাস করে পানি ছিটিয়ে পড়ল সাগরের বুকে। তবে ওটা যে নেহাত খেলার জন্যই ওরা করে তা ভেবো না। অনেক সময় ওদের বিশাল বপুতে কিছু পরজীবী প্রাণী বাসা বাঁধে যেমন আমাদের মাথায় উকুন হয়। ওগুলোকে ঝেড়ে ফেলে দিতেও ওরা এমনটি করে থাকে। মাঝে মধ্যে তিমিরা সাগরের বুকে শুধু মাথাটা উঁচু করে একবার ঘুরিয়ে চার পাশটা দেখে নেয়, দেহকে পানির উপরে তোলে না। তিমিরা কিন্তু বেশ সামাজিক। ওরা দলে দলে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। তিমির দলকে বলে পড। তবে কোনো বিপদ দেখলে পানির উপরে বাতাসে খাড়া করে লেজ উঠিয়ে ছুটতে থাকে। এ সময় বিকট আওয়াজ হয়। সে শব্দেই দলের অন্য তিমিরা সতর্ক হয়ে যায়। তবে তিমিদের দলটা প্রধানত হয় মায়ের সাথে শিশু তিমিদের নিয়ে। দাঁতাল তিমিরা তো দল ছাড়া নড়েই না, শিকার করলেও দলেবলে করে।
মা তিমি সাধারণত এক থেকে তিন বছর পর একটা বাচ্চার জন্ম দেয়। ওদের গর্ভধারণ কাল ৯ থেকে ১৮ মাস। তবে অবাক কাণ্ড কি জানো? তিমির বাচ্চা পেট থেকে বেরিয়েই কিন্তু সাঁতার কাটে। তাহলে কি তিমির বাচ্চারা পেটে থাকতেই সাঁতার শিখে যায়? আর এক অবাক ব্যাপার হলো, মা তিমি তার বাচ্চাকে প্রায় এক বছর পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ায় ও যত্ন নেয়। শিশু তিমিরা তত দিন মায়ের সাথে সাথেই ঘুরে বেড়ায়। দুধ খেয়ে খেয়ে শিশু তিমির ওজন দিনে প্রায় ১০০ কেজির মতো বাড়তে থাকে।
তিমিরা নানা রকম শব্দ করে নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান করে। এমনকি তিমিরা গানও গায়। বিশেষজ্ঞরা হ্যাম্পব্যাক বা কুব্জপৃষ্ঠ তিমির ৩০ মিনিট পর্যন্ত গান রেকর্ড করেছেন। তিমি কেন গান গায়, সে আর এক রহস্যের জাল। দাঁতাল তিমিরা অন্য তিমিদের চেয়ে বেশ জোরে শিস দেয়ার মতো করে গান গায় ওদের সাথীকে কাছে ডাকতে অথবা বাচ্চাদের ঠিক পথে চলার কথা বলতে। অবশ্য ভবঘুরের মতো শিকারের সন্ধানে ঘোরার সময়ও দাঁতাল তিমিরা গান গায় বলে জানা গেছে। তবে অন্য তিমিরা গান গায় খুব নিচু স্বরে, কোমল করে। তবে নীলতিমি যত জোরে শব্দ করতে পারে অত জোরে পৃথিবীর আর কোনো প্রাণী শব্দ করতে পারে না। সাগরে নীলতিমির কণ্ঠস্বর ৫০০ কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায়।

কিশোর গল্প- জমিদার by জসীম আল ফাহিম

তিনি জমিদার নন। তবে অনেক জমির মালিক। নাম শুকুরালি। শুকুরালির এত জমির মালিক হওয়ার পেছনে বিরাট গল্প আছে। সে গল্পই বলছি, শুনুন।
শুকুরালি তখন খুব ছোট। বয়স পাঁচ কি ছয়। বাবা দিনমজুর। সারা দিন তেখামারে কাজ করেন। সন্ধ্যায় তিনি কিছু চাল ডাল আর ছেলের জন্য একটি কাঠি লজেন্স কিনে বাড়ি ফিরতেন। কাঠি লজেন্সটি ছেলের হাতে দিয়ে বলতেন, ‘বড় হ বাবা। বড় হ। বড় হয়ে অনেক জমির মালিক হ।’
বাবা সে দিন কাজে যেতে পারেননি। শরীর কিছুটা খারাপ। কাজ নেই, তাই উপার্জনও নেই। ফলে সন্ধ্যায় চাল ডাল আর কাঠি লজেন্স এলো না। কাঠি লজেন্স না পেয়ে বেচারা শুকুরালি জুড়ে দিলো কান্না। ছেলের কান্না থামাতে বাবা শেষে মিছে করে গল্প পাতলেন।

‘ছিল এক জমিদার। নাম তার তফাদার। তার ছিল ছেলে এক। নাম তার দফাদার ... ...।’
বাবার গল্প শুনে শুকুরালির কান্না থামে। গল্পে মন দেয় সে।
বাবা বলতে থাকেন, ‘দফাদার রোজ খেতো দশ হালি ডিম। বাবা তো জমিদার, তাই রোজ রোজ দশ হালি ডিমের জোগান দিতে কোনো সমস্যা হতো না। সমস্যা হয় কেবল আমার। সামান্য চাল ডাল আর একটি কাঠি লজেন্স জোগাতেই আমার সমস্যা হয়।’
বাবার গল্প শুনে শুকুরালি হঠাৎ প্রশ্ন করে, তোমার কেন সমস্যা হয় বাবা?
ছেলের প্রশ্নের জবাবে বাবা বলেন, কারণ আমি জমিদার না। দিনমজুর।
বাবার জবাব শুনে শুকুরালি মনে মনে ভাবে, বাবা দিনমজুর বলে কাঠি লজেন্স কিনে দিতে পারছেন না। জমিদার হলে নিশ্চয় পারতেন। পরে বলে, বাবা, আমি জমিদার হতে চাই। জমিদার হতে হলে আমাকে কী করতে হবে?
ছেলের কথা শুনে বাবা অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকান। বলেন, তুই জমিদার হবি বাবা! ভালো কথা; কিন্তু এ যুগে জমিদার হতে হলে যে তোকে পড়ালেখা করতে হবে। অনেক অনেক পড়ালেখা।
বাবার কথা শুনে শুকুরালি সে দিনই পণ করে, সে অনেক পড়ালেখা করবে। তারপর একদিন না একদিন সে জমিদার হয়েই তবে ছাড়বে।
গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আরো আছে। শুনুন ধৈর্য ধরে। পড়ালেখা করে শুকুরালি একদিন উচ্চশিতি হলো। একটি ভালো চাকরিও পেলো। ভূমি অফিসের চাকরি। চাকরিতে শুকুরালি অনেক বেতন পায়। তবে বেতন যা পায়, তার চেয়ে বেশি পায় উৎকোচ।
এভাবে ভালোই যেতে থাকে শুকুরালির দিন। আর প্রতি বছরই সে কিছু-না-কিছু জমি কিনতে থাকে। জমি কিনতে কিনতে একদিন সে অনেক জমির মালিক হয়ে যায়। শুকুরালির জমি কেনা তবু থামে না।
শুকুরালির মনে পড়ে সে দিনের কথা, যে দিন তার বাবা তাকে সামান্য একটি কাঠি লজেন্স কিনে দিতে পারেননি। অথচ আজ সে কতই না জমির মালিক! ইচ্ছা করলে এখন সে কাঠি লজেন্স কেন রোজ রোজ কোরমা, পোলাওও খেতে পারে।
ভাবুন তো একবার বিষয়টা! মানুষের কী ভাগ্য! কপাল কত সহজেই না ফেরে! শুকুরালি অভাবকে জয় করে এখন ধনের রাজ্যে বাস করছে। তার বাবা-মা গত হলো বছর কয়েক আগে। বাবা-মায়ের কথা, তাদের অভাবী সংসারের কথা এখন শুকুরালির খুব মনে পড়ে।
মানুষ ধনী হলে আবার নানান বদঅভ্যাসের চর্চা শুরু করে দেয়। শুকুরালিও বাদ যায় না। সেও চর্চা করে।
এই যেমন শক্ত পানীয় পান। যা পান করলে শরীরের তাল ঠিক থাকে না। শরীরের ওপর নিজের দখল লোপ পায়। শুকুরালি একদিন এমনি শক্ত পানীয় (শরাববিশেষ) পান করে বাড়ি ফিরছিল। ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত। জোনাক পোকা জ্বলছে আর নিভছে। জোনাক পোকা জ্বলা দিয়ে কী হবে? ওই আলোতে তো আর পথ দেখা যায় না। অন্ধকারে পথ দেখতে হলে টর্চ দরকার। শুকুরালির সাথে আবার কোনো টর্চ নেই। শেষে অন্ধকারে টলতে টলতে পা ফসকে বেচারা ঢাকনা খোলা এক ম্যানহোলে এসে পড়ে। ম্যানহোলে পড়ার সাথে সাথে তার হার্ট অ্যাটাক হয়।
আশপাশে কোনো লোক না থাকায় সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি। ম্যানহোলেই দেহ রাখে বেচারা।
ম্যানহোল থেকে তুলে নিয়ে শুকুরালিকে মার্কিন সাদা কাফনে মোড়ানো হয়। পরে তার জন্য তৈরি করা চিরস্থায়ী ঘরে এনে শোয়ানো হয়। ওই ঘরে শোয়ানোর পর তার আত্মা শূন্যে ভেসে ভেসে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকে। আর আফসোস করে বলে, হায়, মন্দ ভাগ্য আমার! কত কত জমির মালিক আমি! অথচ জমিগুলো আমার কোনো কাজেই লাগল না। মাত্র সাড়ে তিন হাত জমির মালিক হলাম আমি। হায়...!

বিশ্বের শীর্ষ ধনাঢ্য নারীরা by মো: বাকীবিল্লাহ

আসুন বিশ্বের শীর্ষ কয়েকজন ধনী নারীর সাথে পরিচিত হই। তারা সবাই বিলিয়নিয়ার। সম্প্রতি ওয়েলথ-এক্স নামের একটি ওয়েবসাইট ওই নারীদের তালিকা প্রকাশ করেছে।

উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, প্যাসিফিক, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা- এই সাতটি অঞ্চলের ধনাঢ্য নারীদেরকে মোট সম্পদের ভিত্তিতে বাছাই করা হয়। এরপর ওয়েবসাইটি তাদের মাঝে র‌্যাংকিং করে।
ওয়েলথ-এক্সের তালিকায়  প্রথম স্থানে আছেন নর্থ আমেরিকার ক্রিস্টি ওয়ালটন। তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৩৭ দশমিক নয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তার স্বামী ছিলেন ওয়ালমার্টের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জন টি ওয়ালটন। ২০০৫ সালে স্বামীর মৃত্যুর পর তিনি এ সম্পদের অধিকারী হন।
দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন লিলিয়ান বেটেনকোর্ট। ফ্র্যান্সের কসমেটিক্স জায়ান্ট এল’ ওরিয়েল-এর মালিক তিনি। তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণ ৩১ দশমিক তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিনি ইউরোপীয় অঞ্চলের শীর্ষ ধনী নারী। তার বয়স এখন ৯২ বছর।
তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে আছে প্যাসিফিক অঞ্চলের গিনা রেইনহার্ট। তার সম্পদের পরিমাণ ১৪ দশমিক আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ সম্পত্তি নিয়ে তালিকার চতুর্থ অবস্থানে আছেন ল্যাটিন আমেরিকার ভ্যানিসা পাওলা স্লিম, হাজমারিয়া সুমাইয়া স্লিম ডি রোমেরো ও জোহানা মনিক স্লিম আইউব।
পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম অবস্থানে আছেন যথাক্রমে- এশিয়ার ইয়ান হুয়ান (৬.৩ বিলিয়ন), মধ্যপ্রাচ্যের সারি এরিসন (৪.২ বিলিয়ন) ও আফ্রিকার ফলোরুনশো আলাকিজা (১.২ বিলিয়ন)।

আল-আকসা নিয়ে নতুন ইন্তিফাদার কথা ভাবছে ফিলিস্তিনি তরুণরা

হিশাম। বয়স ১৪ বছর। তার জন্ম হয়েছে দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার (প্রতিরোধ) শুরুর সময়। এখন সে স্বপ্ন দেখছে, জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদ ‘রক্ষায়’ ভূমিকা পালন করতে। হিশাম এবং তার সমবয়সীদের কানে কেবল ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ আল-আকসার কথাই বাজে।

জেরুসালেমের ওল্ড সিটির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মসজিদ কমপ্লেক্স তাদের কাছে ইসরাইলি দখলদারিত্ব আর নির্যাতনের প্রতীক। এর অবসানে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা অবশ্য তাদের আসল নাম অপরিচিত কারো কাছে প্রকাশ করে না।
অবশ্য ইসরাইলিরা তাদের দমিতে দিতে সক্রিয়। যখন তখন তারা হানা দিয়ে এসব তরুণকে আটক করে। তাদের ভাগ্য যেন কারাগারে প্রবেশ আর বের হওয়ার মধ্যেই নিহিত। হিশামকেও নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে অংশ নেয়ার অভিযোগে এক সপ্তাহ কারাগারে থাকতে হয়েছে। ২০ বছরের  মোহাম্মদকে চার মাস কারাগারে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু বন্দিজীবন তাদের ভীত করতে পারেনি। তার কথা : ‘জেরুসালেমে শান্তি নেই। তাই দরকার ইন্তিফাদা।’ আবারো ইসরাইলি সৈন্যদের সাথে লড়তে সে তৈরি।
সে জানায়, মুসলমানদের আল-আকসায় প্রবেশ করতে না দেয়া হলেও ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের ঠিকই দেয়া হচ্ছে।
ইসরাইলিরা প্রায়ই ৫০ বছরের কম বয়স্ক কোনো মুসলমানকে আল-আকসায় প্রবেশ করতে দেয় না। এক সংঘর্ষে ফিলিস্তিনি তরুণ নিহত হওয়ার পর বৃহস্পতিবার ইসরাইলিরা আল-আকসা বন্ধই করে দিয়েছিল।
ওয়েল মাহমুদ নামে এক সমাজকর্মী জানান, পূর্ব জেরুসালেমে আরব এলাকাগুলো ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা অব্যাহতভাবে দখল করতে থাকায় ক্রোধের সৃষ্টি হচ্ছে। পূর্ব জেরুসালেমে ইহুদিদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন দুই লাখে পৌঁছেছে। আর ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে তিন লাখে। এ কারণেই ক্ষোভ বাড়ছে তাদের মধ্যে।
সূত্র : মিডল ইস্ট আই।

সবজির দাম বাড়তি

হরতাল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রাজধানীর বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে দাম বেড়েছে অধিকাংশ পণ্যের। বিশেষ করে শাকসবজি ও কাঁচা পণ্যের দাম বেড়েছে অনেক বেশি। এক দিনের ব্যবধানে সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানান বিক্রেতারা। ঊর্ধ্বমূল্যে অপরিবর্তিত আছে চাল, ডাল, তেল, মাছ, মুরগির বাজার।

গতকাল রাজধানীর কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, শীতকালীন সবজি হিসেবে পরিচিত প্রতিটি ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকাদরে। দুই দিন আগেও এ সবজি বিক্রি হয় ২০ থেকে ২৫ টাকায়। ১৫ থেকে ২০ টাকার বাঁধাকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। ৪০ টাকার লাউ গতকাল ৬০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়েছে কাঁচা মরিচের কেজি।
ঢাকায় গতকাল প্রতি কেজি মুলা ৩০ থেকে ৪০ টাকা, শসা ৪৫ থেকে ৫০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৭০ টাকা, করলা ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ঢেঁড়স ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কচুর লতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, কচুর মুখি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, পেঁপে ২০ থেকে ২৫ টাকা, আলু ২৫ থেকে ২৮ টাকা, ধুন্দল ৫০ থেকে ৬০ টাকা এবং শিম ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।
বাজারে গতকাল মানভেদে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয় প্রতিকেজি বেগুন। কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে টমেটো বিক্রি হয় ১২০ টাকাদরে। পটোলের কেজি ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা। গাজর বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। লাউ শাকের আঁটি ২০ থেকে ৪০ টাকা, লাল শাক ১০ টাকা, মুলা শাক ১০ টাকা, সবুজ ডাঁটা শাক ১০ টাকা, পুঁইশাক ২০ থেকে ৩০ টাকা, কলমি শাক ৫ টাকা, ধনে পাতার কেজি ৩০০ টাকা। প্রতি হালি লেবু ২০ থেকে ৩০ টাকা ও কাঁচাকলা ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি করেন বিক্রেতারা।
মাছের বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি রুই ২৫০ থেকে ৩৮০ টাকা, কাতল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, পাবদা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, মলা ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, পুঁটি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, সিলভার কার্প ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, পাঙ্গাস ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা, রুপচাঁদা ১০০০ থেকে ১১০০ টাকা, বেলে ৪৫০ থেকে ৬৫০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, ফলি ৩০০ থেকে ৪০০, তেলাপিয়া ১৪০ থেকে ২০০, কৈ ২২০ থেকে ৩০০ টাকা, ছোট চিংড়ি ৪৫০ থেকে ৫৫০ টাকা, বড় চিংড়ি ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা, টেংরা ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা, শিং মাছ ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকা, দেশী মাগুর ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং প্রতিজোড়া ইলিশ আকার ভেদে ১০০০ থেকে ১৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাজারে গতকাল প্রতি কেজি খেসারি ডাল ৫০ টাকা, দেশী মসুর ডাল ১০৫ থেকে ১১০ টাকা, ভারতীয় মসুর ডাল ৮০ থেকে ৯০ টাকা, অস্ট্রেলিয়ান মসুর ডাল ১১০ থেকে ১১৫ টাকা, ছোলা ৬০ থেকে ৬৫ টাকা, মুগ ডাল ১১০ থেকে ১১৫ টাকা, মটর ডাল ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, অ্যাঙ্কর ডাল ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা, বুট ডাল ৭০ থেকে ৭৫ টাকা, প্রতি কেজি ডানো ৬৮০ থেকে ৬৮৫ টাকা ও ৪০০ গ্রাম প্যাক বিক্রি হচ্ছে ২৬৫ থেকে ২৭০ টাকা। রেডকাউ প্রতি কেজি ৬৪৫ থেকে ৬৫০ এবং মার্কস ৫০০ গ্রাম ২৬৫ থেকে ২৭০ টাকা। প্রতি কিজি ডিপ্লোমা গুঁড়োদুধ গতকাল বিক্রি হয় ৬৫০ থেকে ৬৬০ টাকা, নিডো ৭০০ গ্রাম ৫৭০ টাকা ও ৪০০ গ্রাম ২৯০ টাকা, ফ্রেশ ৪০০ গ্রাম ২০৫ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়।
মুদি দোকানগুলোয় ভারতীয় পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৩৩ থেকে ৩৮ টাকা, দেশী পেঁয়াজ ৪২ থেকে ৪৫ টাকা দরে বিক্রি হয়, দেশী রসুনের কেজি ৭০ থেকে ৮০ টাকা, বিদেশী রসুন ৮০ থেকে ৮৫ টাকা, দেশী আদা ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা এবং চায়না আদা ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা যায়। খোলা চিনি ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা, প্যাকেট চিনি ৫০ থেকে ৫২ টাকা, আটা ৩২ থেকে ৩৪ টাকা, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেল ১০৫ থেকে ১১০ টাকা ও পামলিন ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া ফার্মের মুরগির লাল ডিম ৩০ টাকা এবং হাঁসের ডিম ৪০ টাকা হালিদরে বিক্রি হয়। ব্রয়লার মুরগির কেজিতে ৫ টাকা বেড়ে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা, লেয়ার মুরগি ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা, গরুর গোশত ৩০০ টাকা এবং খাসির গোশত ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

এডিপি বাস্তবায়নে বেহাল দশা- ব্যর্থতা ঢাকতে আইএমইডির তথ্যের গরমিল; ‘অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতাও কমে আসছে’ by হামিদ সরকার

দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলেও সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে বেহাল অবস্থা বিরাজ করছে। অতীতের বছরগুলোর তুলনায় চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাস্তবায়নের হার মাত্র ৯ শতাংশ। উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরও গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এই হার ১১ শতাংশ দেখানো হয়েছিল। কিন্তু এবার বাস্তবায়নের হার কম হওয়ায় আগের বছরের প্রথম প্রান্তিকের হার ১ শতাংশ কমিয়ে ১০ শতাংশ দেখানো হয়েছে পরিবীণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সর্বশেষ হিসাবে। এমনকি বিদেশী সহায়তার অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রা ব্যয়ের সক্ষমতাও ক্রমে কমে আসছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নে হতাশাজনক অবস্থা বিরাজ করছে। বিশাল আকারের এডিপি করা হলেও অর্থবছরের সূচনাতেই জুলাই মাসে এটির বাস্তবায়নে করুণ অবস্থা দেখা গেছে। শুরুতেই বাস্তবায়ন হার শতভাগ করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে নানা কথা বলেছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। কিন্তু বাস্তবে সেসব উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অন্য দিকে নিজেদের ব্যর্থতা চাপা দেয়ার জন্য গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে ১১ শতাংশ দেখানো হয়েছিল, এবার আইএমইডির প্রতিবেদনে সে হার কমিয়ে ১০ শতাংশ দেখানো হয়েছে; যাতে করে ব্যবধানটি ১ শতাংশ হয়। কিন্তু আইএমইডির প্রতিবেদনে দুই ধরনের তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করা হয়েছে।
২০১৩-১৪ র্অথবছরের প্রথম তিন মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ১১ শতাংশ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৩ শতাংশ ও ২০১১-১২ অর্থবছরে ১১ শতাংশ। যখন রাজনৈতিক চরম অস্থিরতা ও সহিংসতা ছিল সে সময়েও বাস্তবায়নের গতি থাকলেও এখন স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে এডিপি বাস্তবায়ন চরম হতাশাজনক। স্থানীয় মুদ্রা ব্যয়ে করুণ অবস্থা বিরাজ করছে এ বছর। ২০১১-১২ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে স্থানীয় অর্থ ব্যবহারের হার ছিল ১৫ শতাংশ, পরের বছর ২০১২-১৩ তে সেটা কমে আসে ১৪ শতাংশে এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আরো কমে দাঁড়ায় ১২ শতাংশে। আর চলতি বছর একই সময়ে এই হার হলো মাত্র ১০ শতাংশ। তিন বছরে এই অর্থ ব্যবহারের সক্ষমতা ক্রমেই কমে আসছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্যানুযায়ী গত তিন মাসে বরাদ্দ পাওয়া সবচেয়ে বড় ১০ মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়নে বেহাল দশা বিরাজ করছে। তা ছাড়া তিন মাস পেরিয়ে গেলেও চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দকৃত কোনো অর্থই খরচ করতে পারেনি চারটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে ৪৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুকূলে কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনও এডিপি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করতে পারেনি। এমনকি এডিপি বাস্তবায়নের কাজ শুরুই করতে পারেনি তারা। এবারের প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই সর্ববৃহৎ এডিপি। জুলাই মাসে মাত্র ২ ভাগ এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। সেই হিসাবে এক ধরনের হতাশা দিয়েই ২০১৪-১৫ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন শুরু করল। তবে ২০১১-১২, ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে একই সময়ে এক শতাংশ বেশি এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অগ্রগতি ছিল মাত্র ১৫ শতাংশ। প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) অর্থব্যয় এবং এডিপির অগ্রগতির হার ছিল মাত্র ২৭ শতাংশ। এবার তার চেয়েও বেহাল অবস্থা।
এডিপি বাস্তবায়নে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। তিন মাসে বরাদ্দের ৪৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে। দ্বিতীয় অবস্থানে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, এটির বাস্তবায়ন হার ৩৪ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া ১০ মন্ত্রণালয় ও বিভাগেও এডিপি বাস্তবায়নে বেহাল চিত্র বিরাজ করছে। বৃহৎ ১০ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে মাত্র তিনটির এডিপি বাস্তবায়ন ১০ শতাংশের বেশি। অপর সাত মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন জাতীয় গড় ৯ শতাংশের সমান বা আরো কম। স্থানীয় সরকার বিভাগ সবচেয়ে বেশি ১৩ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে ব্যয় করেছে দুই হাজার ৮১ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন হার ১৬ শতাংশ। ৯ হাজার এক কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ ব্যয় করতে পেরেছে মাত্র ৭১০ কোটি টাকা। উন্নয়ন অগ্রাধিকারে সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়া বিদ্যুৎ বিভাগের এডিপি বাস্তবায়ন তিন মাসে ৮ শতাংশ। রেলপথ মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এডিপি বাস্তবায়ন হার ৬ শতাংশ।
আইএমইডির সর্বশেষ হিসাবে তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নে সাত হাজার ৫৮৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে পাঁচ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। বিদেশী সহায়তার তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। আর সংস্থাগুলোর তহবিল থেকে ব্যয় হয়েছে ৫৬২ কোটি টাকা।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে বিশ্বব্যাংকের শীর্ষ অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ২০১৫ সালে সার্বিক অর্থনীতির েেত্র বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তার মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) গুণগত বাস্তবায়ন বাড়ানো অন্যতম চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, এডিপি বাস্তবায়ন হারও কম। এডিপি ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নে কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। প্রবৃদ্ধি ৭.৩ শতাংশ করতে হলে এডিপি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন, পদ্মা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ হাইওয়ে, ডাবল ট্র্যাক অব ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে, মেট্রোরেল, বিবিয়ানা গ্যাস ফিল্ড প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার প্রবৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা ধরেছে তাতে বিনিয়োগ ৫ শতাংশ বাড়াতে হবে। প্রকৃত পক্ষে এই প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশের বেশি হবে না। তার বিশ্লেষণ ছিল, এ বছর বিনিয়োগ হার ২৮.৭ শতাংশ থেকে ৩৪ শতাংশ করার কথা বলেছে সরকার। কিন্তু এ ধরনের বৃদ্ধির হারের কোনো নজির নেই। সরকারি বিনিয়োগের মানও বাড়েনি। আর ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে হলে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়া দরকার। কোনোভাবেই ৫ শতাংশ বিনিয়োগ বৃদ্ধি এক বছরে সম্ভব নয়। ফলে প্রবৃদ্ধি ৬.২ শতাংশের বেশি হবে না।
অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখতের মতে, পদ্মা সেতুর মতো বেশ কিছু বড় প্রকল্প রয়েছে এবার। সেগুলো শুরু হলে হয়তো বাস্তবায়নের হার বাড়বে। তা ছাড়া প্রথম দিকে প্রকল্পের ডিজাইনসহ বেশ কিছু কারণে বাস্তবায়ন কম হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগ ও এডিপি বাস্তবায়নের যে হার তাতে ৭.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি।
এ দিকে গত অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের বাস্তবায়ন হার এ বছর এসে ১ শতাংশ কমিয়ে দেখানোর বিষয়ে আইএমইডির ব্যাখ্যা জানার জন্য ভারপ্রাপ্ত সচিব শহিদ উল্লাহ খন্দকারকে মুঠোফোনে কল করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে অন্য একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এটা সচিব স্যারই ভালো বলতে পারবেন। আমি জানি না। তথ্যের গরমিলের ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ও পরিকল্পনা সচিব ভুঁইয়া সফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

দেশজুড়ে আবারো গণগ্রেফতার- পুলিশের বিরুদ্ধে বাণিজ্যের অভিযোগ by আবু সালেহ আকন

জামায়াতের কর্মসূচিকে ঘিরে আবারো শুরু হয়েছে গণহারে গ্রেফতার। শুধু জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীই নয়, বিএনপিসহ বিরোধীজোটের নেতাকর্মী, এমনকি সাধারণ মানুষও রয়েছেন এই গ্রেফতারের তালিকায়। অভিযোগ উঠেছে পুরনো স্টাইলে পুলিশ এই রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ঘিরে আবারো শুরু করেছে বাণিজ্য। গ্রেফতার বা আটক হলেই পুলিশের ‘পোয়া বারো’। যত আটক বা গ্রেফতার হচ্ছে ততই পকেট ভারী হচ্ছে পুলিশের। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিন দিন ধরে ব্যাপক অভিযান চলছে। রাজধানীর বস্তি, আবাসিক এলাকা, বিভিন্ন মেস, আবাসিক হোটেল এবং বিভিন্ন টার্মিনালে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। পুলিশের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, নাশকতারোধে তারা এই অভিযান চালাচ্ছে। পুলিশের ভয়ে বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মী আবারো ঘরছাড়া হয়েছেন।

>> বৃহস্পতিবার রাতে ও গতকাল সকালে আটকদের গতকাল আদালতে হাজির করা হয় : নয়া দিগন্ত
গত তিন দিনে দেশে আটক ও গ্রেফতারের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। গত বৃহস্পতিবার জামায়াতের ডাকা হরতালের দিনকে কেন্দ্র করেই দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রেফতার হয়েছে পাঁচ শতাধিক। এর বাইরেও আটক হয়েছেন অনেকে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তাদের ছয় শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেফতারের দাবি করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে জনপ্রতিনিধিও রয়েছেন। এর মধ্যে অন্যতম হলেন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল মাজেদ মারজান। আগামীকাল রোববার এবং পরের দিন সোমবারও জামায়াতের হরতাল রয়েছে।
সূত্র জানায়, এই হরতালকে ঘিরে গত দুই দিন ধরেই চলছে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশি অভিযান। গ্রেফতারও হচ্ছেন অনেকে। যেসব এলাকায় জোরালো অভিযান চলছে সেসব এলাকা হচ্ছে রাজধানী ঢাকা, সিলেট, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, বগুড়া, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নওগাঁ, মুন্সীগঞ্জ, পাবনা, যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, লক্ষ্মীপুর, নীলফামারী, নেত্রকোনা, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, চুয়াডাঙ্গা ও নোয়াখালী। গতকালও বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২০০ গ্রেফতার হয়েছে।
আমাদের রংপুর সংবাদদাতা জানান, গত বৃহস্পতিবার রংপুর বিভাগে ৯৮ জন জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীসহ মোট ৩০৮ জন গ্রেফতার হয়েছেন। পুলিশের এসআই শরিফুল ইসলাম বলেছেন, জামায়াত-শিবিরের বাইরে যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা রয়েছে। গতকাল শুক্রবার আটজন শিবির কর্মীসহ ৬২ জন গ্রেফতার হয়েছেন। তবে স্থানীয় সূত্র জানায়, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন নিরপরাধ মানুষ। পুলিশ তাদের নানা অজুহাতে গ্রেফতার করেছে।
আমাদের রাজশাহী সংবাদদাতা বলেছেন, বৃহস্পতিবার গ্রেফতার হয়েছেন ৩৩ জন। দলীয় পরিচয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।
আমাদের যশোর সংবাদদাতা জানিয়েছেন, দুই দিনে এই এলাকায় গ্রেফতার হয়েছেন মোট ২৭ জন। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই এলাকায় গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে অনেকেই আছেন নিরপরাধ মানুষ। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে অনেকের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। যারা অর্থ দিতে পারেননি এমন অনেক নিরপরাধ মানুষকে পুলিশ আদালতে পাঠিয়েছে। জানা গেছে ঝিকরগাছায় মো: শাফী নামে এক যুবককে পুলিশ আদালতে পাঠিয়েছে। তিনি কৃষিকাজ করেন। পুলিশ তার কাছে টাকা চেয়ে ব্যর্থ হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। অপর এক মাদরাসা শিক্ষকের কাছ থেকে ১৮ হাজার টাকা নিয়ে তাকে ছেড়ে দিয়েছে। আরেক হাফেজকে ছেড়ে দিয়েছে প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ফোনে।
সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানিয়েছেন, গত তিন দিনে অর্ধ শতাধিক গ্রেফতার হয়েছেন। যার মধ্যে ৩৬ জনই সাধারণ মানুষ, যাদের রাজনীতির সাথে কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এখনো সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলছে। এভাবেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় জামায়াতের কর্মসূচিকে ঘিরে চলছে গ্রেফতার অভিযান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পুলিশের টার্গেট সাধারণ মানুষ। যাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এসব মানুষকে আটক করে দেনদরবার করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। টাকা দিতে না চাইলে তাদের বিভিন্ন পেন্ডিং মামলায় আদালতে সোপর্দ করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে রিমান্ডের আবেদন করা হচ্ছে।
বরিশাল ব্যুরো জানায়, জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া এবং এর প্রতিবাদে ঘোষিত কর্মসূচিকে সামনে রেখে বরিশাল পুলিশ ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করছে। জামায়াত ও শিবির নেতাকর্মীদের বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কড়া নজরদারি এবং বেপরোয়া অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গত তিন দিনে বরিশাল মহানগর ও জেলার কমপে শহস্রাধিক নেতাকর্মীর বাসাবাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ ও র‌্যাব। এ সময় তারা জামায়াত-শিবিরের ১১ নেতাকর্মীসহ নিরীহ অনেককে গ্রেফতার করেছে। জামায়াতের দেয়া তথ্য মতে বরিশাল মহানগর থেকে পাঁচজন এবং জেলার বিভ্ন্নি থানা থেকে সাতজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অপর দিকে পুলিশের দেয়া তথ্যের আলোকে গ্রেফতার সংখ্যা বলা হয়েছে ২৪ জন। আটক নেতাকর্মীদের পুলিশ পুরনো মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে কোর্টে চালান দিয়েছে। আদালত তাদের জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। আটককৃতদের মধ্যে ছাত্র ও পরীার্থীও রয়েছে।
পুলিশের হাতে আটক নেতাকর্মীরা হলেন বরিশাল মহানগর জামায়াতের মো: আরিফুল ইসলাম, সিকদার মো: দোলন, মো: মাহাদী এবং শিবিরকর্মী আবু হোরায়রা, জেলা জামায়াতের বানারীপাড়ার জামায়াত কর্মী ইব্রাহীম, আগৈলঝাড়ার শিবির সেক্রেটারি গোলাম মোর্শেদ, হিজলা থানা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক নুরুল আমীন, মুলাদির জামায়াত কর্মী আবদুস সালাম, বাকেরগঞ্জের মো: শামীম, বাবুগঞ্জের আবুল বাশার।
এ দিকে আটককৃতদের স্বজনরা ােভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ বিনা অপরাধে বাসাবাড়ি থেকে গ্রেফতার করে যাকে-তাকে জামায়াত-শিবির বলে চালিয়ে দিচ্ছে। থানায় নিয়ে পুলিশ নানা ধরনের হয়রানিসহ হুমকি দিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। থানা হাজতে থাকা অবস্থায় আটককৃতরা মানবেতর জীবনযাপন করছে।
অপর দিকে পুলিশের প থেকে বলা হচ্ছে, পুলিশ নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে সবসময় টহল অব্যাহত রাখে। তবে জামায়াতের হরতাল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের রায়কে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে কাজ করা হচ্ছে। আমরা যাদের আটক করেছি তারা কোনো-না-কোনো অভিযোগের সাথে সম্পৃক্ত। নিরপরাধ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে না।
মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির আমিনুল ইসলাম খসরু জানান, পুলিশ কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের বাসাবাড়িতে অভিযানের নামে হয়রানি করছে। মহানগর জামায়াতের আমির অ্যাডভোকেট হেলালের বাসায় পুলিশ বারবার অভিযান চালায়, যা নিন্দনীয়। এ ছাড়া প্রতিটি নেতাকর্মীর বাসাবাড়িতে অভিযানের নামে পুলিশ যে তাণ্ডব চালায় যা নজিরবিহীন। আমরা পুলিশ প্রশাসনের এমন অগণতান্ত্রিক আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই এবং সব ধরনের হয়রানি বন্ধের আহ্বান জানাই। তিনি এ সময় বিগত শান্তিপূর্ণ হরতালকে সামনে রেখে বিনা অপরাধে গ্রেফতারকৃত সব নেতাকর্মীর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা জানান, জেলার বিভিন্ন উপজেলায় গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ৮০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে নাশকতা প্রতিরোধকল্পে জামায়াত শিবিরের ১২ জন এবং বিভিন্ন মামলায় ৬৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নাশকতা প্রতিরোধে বিভিন্ন উপজেলায় পুলিশের অভিযান চলছে। এ ছাড়া গ্রেফতারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে বিভিন্ন থানায় ৮০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, হরতালের প্রথম দিন থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত মানিকগঞ্জ জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে পাঁচ জামায়াত কর্মীসহ মোট ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তারা হলেন সদর থানা এলাকা থেকে মো: লোকমান হোসেন, রফিকুল ইসলাম, এনামুল হক, সাটুরিয়া থেকে হাজী মো: সাইফুল ইসলাম, মো: আলী হোসেন, দৌলতপুর এলাকা থেকে আবদুল মান্নান ও বজলুর রশিদ।
জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, সম্পূনণ রাজনৈতিক কারণে এবং হয়রানির উদ্দেশ্যেই এ মিথ্যা মামলা দেয়া হয়েছে।
কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, কমলনগরে মো: ইস্রাফিল নামে জামায়াতের এক কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার ভোরে পুলিশ উপজেলার পাটোয়ারীরহাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃত ইস্রাফিল উপজেলার পাটোয়ারীরহাট ইউনিয়ন জামায়াতের কর্মী।
কমলনগর থানার ওসি মো: হুমায়ূন কবির জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গত বছরের আগস্ট মাসে হরতাল চলাকালে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় তিনি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। এ ছাড়া হরতাল-অবরোধে নাশকতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে তিনি জানান।
রাজারহাট (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে হরতালে পিকেটিংয়ের সময় পুলিশ জামায়াতের ইউনিয়ন সেক্রেটারি ও শিবিরকর্মীসহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলেন আ: সালাম, জহুরুল ইসলাম, ফারুক ও রায়হান বিন সোলায়মান।
মনিরামপুর (যশোর) সংবাদদাতা জানান, মনিরামপুরে নাশকতার অভিযোগে জামায়াত-শিবিরের ১২ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে যশোর শহর ও মনিরামপুর থেকে তাদের আটক করা হয়। আটককৃতরা হলো আব্দুস সালাম, নজরুল ইসলাম, মোহম্মদ জিন্নাহ, মুস্তাকিন হোসেন, রফিকুল ইসলাম, রাজবাড়ীয়া গ্রামের আজগর আলী, শাহাজান আলী, জাহাঙ্গীর হোসেন, রেজাউল করিম, নাসির উদ্দীন, জুয়েল হোসেন ও সাদ্দাম হোসেন। তাদের বাড়ি উপজেলার এড়েন্দা, ইত্যা, রাজবাড়ীয়া ও দেবিদাসপুর গ্রামে। মনিরামপুর থানার ওসি মোল্লা খবির আহমেদ জানান, নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে তাদের আটক করা হয়েছে।

রহস্যময় আগুনে পুড়ে ছাই আমার দেশ কার্যালয়

রহস্যময় আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার কার্যালয়। সরকারের নির্দেশে  পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হওয়ার প্রায় দেড় বছরের মাথায় পত্রিকা কার্যালয় রাজধানীর কারওয়ান বাজার থেকে অন্যত্র স্থানান্তরের আগ মুহূর্তে গতকাল শুক্রবার আগুন লেগে পুরো কার্যালয় ভস্মীভূত হয়। এ ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারওয়ান বাজারে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি) ভবনের ১১তলায় আমার দেশের কার্যালয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ২০টি ইউনিট দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিকাণ্ডে ওই ভবনে অবস্থিত দুই টিভি চ্যানেল এনটিভি ও আরটিভির কোনো ক্ষতি হয়নি বলে জানা গেছে। তবে সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকে আরেকটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের সহযোগিতায় এনটিভি তাদের সম্প্রচারকার্যক্রম শুরু করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আরটিভি বিএসইসি ভবনের স্টুডিও থেকে সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) শেখ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া বিএসইসি কর্তৃপক্ষও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এর আগে ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এই ভবনে আগুন লেগে এনটিভি, আরটিভি ও আমার দেশসহ ১০টি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় পুড়ে যায়। মৃত্যু হয় তিনজনের। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদন আজো আলোর মুখ দেখেনি।
গতকাল অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এনটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুসাদ্দেক আলী ফালু, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মাদ আলী আহমেদ খান, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দসহ অনেকে। এ ছাড়া ওই ভবনের রাস্তার দুই পাশে ভিড় জমান উৎসুক জনতা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার থাকায় ওই ভবনের অনেক অফিসই বন্ধ ছিল। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে আগুন আগুন চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ভবনের অন্যান্য তলায় থাকা লোকজন দ্রুত লিফট ও সিঁড়ি দিয়ে নেমে যান। খবর পেয়ে প্রথম দফায় ফায়ার সার্ভিসের ১৬টি ইউনিট গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। পরে আরো পাঁচটি ইউনিট যোগ দেয়। বেলা ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময়ের মধ্যে আমার দেশ পত্রিকার অফিসের কম্পিউটার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি, চেয়ার টেবিল ও অফিসের অন্যান্য জিনিসপত্র পুড়ে যায়। এই ১১তলায় ল’ অফিস ব্যারিস্টার তানজিব আলম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস ও সার্ভারনেট নামে একটি গার্মেন্ট এক্সেসরিজ সরবরাহের প্রতিষ্ঠান ছিল। অগ্নিকাণ্ডে এই দু’টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সার্ভারনেটের সব আসবাবপত্র ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে গেছে। এ ছাড়া আগুন লাগার সময় ওই ভবনে অবস্থিত এনটিভি ও আরটিভির সম্প্রচার চলছিল। বেলা ১২টা ৪০ মিনিটে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চ্যানেল দু’টির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
দৈনিক আমার দেশের অফিস সহকারী আব্বাস আলী হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা অফিস পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি এসি ও চেয়ার লিফটে নামিয়েছি। আরো মাল নামানোর প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উত্তর-পূর্ব দিকের স্টোররুমে আগুনের ফুলকি দেখা যায়। স্টোররুম তালাবদ্ধ ছিল। স্টোররুমের চাবি যার কাছে থাকে, তাকে ফোন করে ডেকে আনা হয়। পরে চাবি দিলে খুলে নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দিই।
ভবন থেকে নেমে আসা আমার দেশের একজন কর্মী জানান, কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা হঠাৎ কালো ধোঁয়া দেখতে পান। এরপরই তারা নিচে নেমে আসেন। তখন কার্যালয়ে আর কেউ ছিল না। এনটিভি ও আরটিভির কর্মীরাও আগুন লাগার পর নিচে নেমে আসেন। আগুন লাগার সময় ওই ভবনে একটি কর্মশালাও চলছিল। আগুন লাগার পর ওই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ও অতিথিরা দ্রুত নিচে নেমে যান।
আমার দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাসির উদ্দীন শোয়েব জানান, দীর্ঘ দিন ধরে অফিস পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বিএসইসি কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। গত বৃহস্পতিবার বিএসইসি কর্তৃপক্ষের সাথে আমার দেশ কর্তৃপক্ষের দেনা-পাওনা মিটিয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে গুলশানের নিকেতনে অফিস পরিবর্তনের কথা ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় সকালে ইলেকট্রিশিয়ান আহমদ আলী, পারভেজ, স্টোরকিপার মহসিন, ঝাড়–দার তরুণ দাস, স্টাফ আব্বাস আলীসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক অফিস স্থানান্তরের কাজ করছিল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকেরা স্টোররুমে ধোঁয়া দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে তারা নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন বলে জানান নাসির উদ্দীন শোয়েব। পত্রিকা স্থানান্তরের দিন আগুন লাগার ঘটনা নাশকতা হতে পারে বলেও সন্দেহ করেন তিনি। পত্রিকাটির কম্পিউটারসহ যাবতীয় মালামাল পুড়ে গেছে বলেও জানান শোয়েব।
ওই তলায় পত্রিকার গোডাউন ও স্টোররুম ছিল। এ ছাড়া ১১তলায় ব্যারিস্টার তানজিম আলমের চেম্বারটি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তবে ৯, ৮, ৭ তলায় এনটিভি ও ৬ তলায় আরটিভির কারো কোনো তি হয়নি। চ্যানেলের কর্মীরা নিরাপদে বের হয়ে যান ভবন থেকে। তবে আর্থ স্টেশনের তি হওয়ায় চ্যানেল দু’টির সম্প্রচার বন্ধ রয়েছে।
আমার দেশের রিপোর্টার মাহমুদা ডলি জানান, আমার দেশ পত্রিকার অফিস নিকেতনে স্থানান্তর করার কথা ছিল। এ জন্য অফিসের মালপত্র নামানো হচ্ছিল। বেলা সোয়া ১১টার পর অফিসের সিকিউরিটি গার্ড মাসুম তাকে ফোনে অগ্নিকাণ্ডের কথা জানান। আমার দেশ পত্রিকার সার্ভার ও আর্কাইভ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে বলে জানান তিনি।
মাহমুদা ডলি অভিযোগ করেন, অফিস পরিবর্তনের মুহূর্তে এমন ঘটনা যে পরিকল্পিত তা বোঝা যাচ্ছে। সরকারের লোকজন পরিকল্পিতভাবে আমার দেশ অফিসে অগ্নিসংযোগ করেছে। সরকার আগে আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করেছে, এখন অফিসে আগুন দিয়ে এর কবর রচনা করল।
আমার দেশের টেকনিশিয়ান আহমদ আলী জানান, অফিসের চার কর্মী ও ছয় শ্রমিক নিয়ে অফিস স্থানান্তরের কাজ করছিলেন তিনি। এ সময় অফিসের ৩৫টি এসির মধ্যে প্রথমে আটটি এসি নিচে রেখে ওপরে উঠেই পূর্ব কর্নারে স্টোররুমে ধোঁয়া উঠতে দেখেন। এরপর বৈদ্যুতিক সুইচ বন্ধ করে নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে তারা দ্রুত নেমে যান।
তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, শর্ট সার্কিট থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। নির্দিষ্ট করে ক্ষতির পরিমাণও জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।
গতকাল দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দু’টি সিঁড়ি লাগিয়ে ১১ তলায় পানি দিচ্ছেন। একপর্যায়ে আগুনের তেজ কমে এলেও ভবনের ভেতরে প্রচুর ধোঁয়া জমে যায়। ধোঁয়া বের করতে ভবনের বেশ কিছু জানালার কাচ ভেঙে ফেলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বেলা ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরোপুরি নির্বাপন করতে বিকেল ৪টা গড়িয়ে যায়। বিএসইসি ভবন থেকে আগুনের হলকা ও ধোঁয়া আশপাশের ভবনে ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে আশপাশের ভবনের অনেকেও নিচে নেমে আসেন। আশপাশের ভবনে পানিও ছিটানো হয়। ভবন ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড় জমে যায়। পরে র‌্যাব-পুলিশ জনতাকে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরিয়ে দেয়। ভবন থেকে ভেঙে পড়া কাচের টুকরো লেগে ঘটনাস্থলে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের প্রতিবেদক মারুফ আল মুহিত আহত হন। বিকেলে ১১ তলায় আমার দেশ অফিসে ঢুকে দেখা যায় কয়েকটি কম্পিউটার ছাড়া পুরো অফিস পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
তদন্ত কমিটি গঠন : অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) শেখ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের কাছে জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব করা হয়েছে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোনের উপপরিচালক মাসুদুর রহমানকে, বাকি তিনজনকে সদস্য করা হয়েছে।
অন্য দিকে বিএসইসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইমতিয়াজ হোসেন চৌধুরী জানান, সংস্থার পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ মোজাম্মেল হককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেন যারা : অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে দুপুরে ঘটনাস্থলে আসেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শিল্পমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই ভবনে ২০০৭ সালের অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। তবে এবার দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড জড়িত আছে কি না তা তদন্ত করা হবে। তদন্তে নাশকতার অভিযোগ প্রমাণ হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
মন্ত্রী জানান, ওই ভবনের সিঁড়িও ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। আগুনের ঘটনা দুঃখজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি। মন্ত্রী ভবনের তিগ্রস্ত অংশ ঘুরে দেখেন। এ ছাড়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি তদন্তাধীন। তদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রহস্যজনক : মির্জা ফখরুল
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল পুড়ে যাওয়া আমার দেশ কার্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন, এই ভবনে এর আগের অগ্নিকাণ্ডের সঠিক তদন্ত হয়নি বলে বারবার এমন ঘটনা ঘটছে। এবারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা রহস্যজনক মনে হচ্ছে। এটা নাশকতা নয় তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের গণতন্ত্র রায় যে সংবাদমাধ্যমটি সবচেয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছে তার মধ্যে আমার দেশ অন্যতম। কিন্তু এ পত্রিকাটিকে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সম্পাদককে জেলে রাখা হয়েছে। তারপরেও পত্রিকাটির অনলাইন মাধ্যমটি চালু ছিল। শনিবার (আজ) পত্রিকাটির অফিস স্থানান্তরের কথা। এর মধ্যে পত্রিকাটির অফিসে অগ্নিকাণ্ড রহস্যজনক। তিনি বলেন, ২০০৭ সালের পর এবার আবার বিএসইসি ভবনে অগ্নিকাণ্ড দেশের স্বাধীন গণমাধ্যমে ওপর বিরাট আঘাত। কারণ এ ভবনে আরটিভি, এনটিভি, আমার দেশের মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যগুলোর অফিস রয়েছে। ২০০৭ সালের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এবারের এ অগ্নিকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা উচিত এবং এর পেছনে কেউ জড়িত কি না তা বের করার দাবি জানাচ্ছি।
সরকারি নাশকতার শিকার : বিএনপি
আমার দেশ পত্রিকা, এনটিভি ও আরটিভি সরকারি নাশকতার শিকার বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলের যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভী গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে আমার দেশ কার্যালয়ে অগ্নিকাণ্ড সরকারের গভীর ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের অংশ বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, সরকারের এজেন্টরাই অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। সরকার বিরোধী দল ধ্বংসের যে পাঁয়তারা করছে আমার দেশে আগুন সে পরিকল্পনারই অংশ। নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন হয়। রিজভী এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
এনটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দেক আলী ফালু বলেন, বারবারই এ ভবনে আগুন লাগে, আর আমি বারবারই তিগ্রস্ত হই। তদন্ত হয় কিন্তু রিপোর্ট পাই না। তদন্ত কী হয় তা জানা যায় না। যে কারণে এটা হয়েছে, তা শনাক্ত করতে হবে। এটা যেন ফের না ঘটে। ওই ভবন থেকে না হলেও বিকল্প ব্যবস্থায় আজকেই (গতকাল) এনটিভির সম্প্রচারের কাজ শুরু করার কথা জানান তিনি।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান জানান, এই ভবনে অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি ছিল না। এ ছাড়া ভবনটি খুবই অপরিচ্ছন। যেখানে-সেখানে কাগজপত্র ও সিগারেটের টুকরো পড়ে থাকে। আগুনের তীব্রতা বৃদ্ধির জন্য এসবও একটি কারণ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ইলেকট্রনিক ডিভাইস স্থানান্তরের সময় হয়তো শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ওই ভবনের অগ্নিকাণ্ডের তদন্তের রিপোর্টের ব্যাপারে তিনি বলেন, ওই রিপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এটি জনসমক্ষে প্রচার করা হয়নি।
জামায়াতের উদ্বেগ : বিএসইসি ভবনের ১১ তলায় অবস্থিত আমার দেশ পত্রিকা অফিসসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অফিসে রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা: শফিকুর রহমান গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, অগ্নিকাণ্ডে আমার দেশ পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে গেছে। এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে কোনো রহস্য আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ২০১৩ সালের ৬ জুন থেকে সরকার আমার দেশ পত্রিকাটি বন্ধ করে দিয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে অগ্নিকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করবে এবং রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তিনি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি গভীর সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আরটিভির বার্তা সম্পাদক আখতার হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এই ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। ওই সময় আমি অফিসেই  ছিলাম। সে দিনকার ভয়াবহ দৃশ্য মনে হলে এখনো আঁতকে উঠতে হয়। সেই আগুন কিভাবে লেগেছিল তা আজো জানতে পারিনি। এরপর থেকেই ভবনের বিভিন্ন ফোরে মাঝে মধ্যে আগুন আতঙ্কের কথা ছড়িয়ে পড়ে। এতে স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা আত্মীয়স্বজনেরা থাকেন আতঙ্কে। ওই একই ভবনে আবারো আগুন লেগেছে বলে যখন শুনি তখন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ি। বারবার অগ্নিকাণ্ডে বিল্ডিংয়ের কী অবস্থা তা বুয়েটের প্রকৌশলীদের দিয়ে পরীক্ষা করে দেখা দরকার। কারণ এমনিতেই পাঁচ মিনিট ভবনে বিদ্যুৎ না থাকলে ভুতুড়ে পরিবেশ নেমে আসে।