Saturday, May 2, 2026
দেখুন, আমরা কতটা ভয়ংকর পৃথিবীতে বাস করছি by শওকত হোসেন
ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনে আর্নেস্ট জে মনিজ লিখেছেন, ‘“আ হাউস অব ডিনামাইট” নামের সিনেমাটি এমন এক সময়ে মুক্তি পেয়েছে, যখন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এক নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এর সূত্রপাত ক্রিস্টোফার নোলানের ওপেনহাইমার দিয়ে, আর সামনে আসছে জেমস ক্যামেরনের “ঘোস্টস অব হিরোশিমা”। এসব সিনেমা ও সিরিজ এমন সময়ে আসছে, যখন ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা আবার বাড়ছে। এগুলো মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে প্রায় ১২ হাজার পারমাণবিক অস্ত্র আছে এবং যেকোনো সময় একটি ভুল সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।’
সিনেমায় যা আছে
‘আ হাউস অব ডিনামাইট’ সিনেমাটি দেখে ঠিক এই অনুভূতিই হবে। অস্কার বিজয়ী পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলোর নতুন সিনেমা এককথায় ভয়ংকর এক সিনেমা। মাত্র ১৮ মিনিট সময়ের গল্প। প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ছুটে আসছে। কেউ জানে না, কে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল। হাতে সময় মাত্র ১৮ মিনিট। এ সময়ের মধ্যে কি ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করা যাবে? সিনেমায় ঠিক এই ১৮ মিনিটকেই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়েছে। যাঁরা ‘রশোমান’ সিনেমাটি দেখেছেন, তাঁদের এভাবে গল্প উপস্থাপনার ভঙ্গিটি জানা। সিনেমাটি মূলত দেখায়, এই ক্ষেপণাস্ত্র কে পাঠিয়েছে, আর এখন কী করা উচিত তা সেনাবাহিনী, হোয়াইট হাউস ও প্রেসিডেন্ট কীভাবে বোঝার চেষ্টা করছে।
এ রকম এক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেন মূলত একজনই—মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনিই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। অথচ কে এই হামলা চালিয়েছে, কেউ জানেন না। প্রেসিডেন্টের সামনে দুটি বিকল্প সিদ্ধান্ত। যেমন ক্ষেপণাস্ত্রটিকে শিকাগোতে পড়তে দেওয়া, যেখানে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে। অথবা নিশ্চিত না হয়েও কোনো এক শত্রু দেশের ওপর পাল্টা পারমাণবিক আক্রমণ চালানো। এর অর্থ আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুরাষ্ট্র মানেই রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়া।
‘আ হাউস অব ডিনামাইট’ সিনেমার নামটিই আসলে একটি প্রতীক। পরিচালক দেখালেন যে আমাদের পৃথিবীটা এক বিশাল বারুদের ঘর, যেখানে হাজারো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে রাখা আছে। আর একটিমাত্র ভুল বোতামে চাপ দিতেই পুরো এই ঘর ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আমরা সেই ডিনামাইট ভরা ঘরেই বাস করি। তবু প্রতিদিনের জীবনের মতো হাসি, কথা বলি, কাজ করি, যেন কিছুই ঘটছে না।
সিনেমায় দেখা যায়, ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও কীভাবে সংকটের সময় দ্বিধায় পড়ে যান। প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত জানেন না কী করবেন, তিনি স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে পরামর্শ চাইছেন। অন্যদিকে সেনাবাহিনী ও কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। কেউ বলছেন আঘাত করতে, কেউ বলছেন অপেক্ষা করতে। এই বিশৃঙ্খলা সবাইকে দেখিয়ে দিল, সত্যিকারের সংকটের সময় মানুষ কেমন ভীত ও অসহায় হয়ে পড়ে।
আর মৃত্যু যখন আসন্ন, তখন আসলে মানুষ কী করে। তখন নিজের প্রিয়জনদের কথাই ভাবে। যেমন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মেয়ে শিকাগোতে আছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে পারে। ফোনে মেয়ে জানায়, সে একা নয়, এক বন্ধুর সঙ্গে আছে। এ কথায় বাবা কিছুটা শান্ত হন। কারণ, অন্তত জানেন মেয়েটি একা একাই হয়তো মরবে না।
ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, আসছে শহর ধ্বংস করতে—এ রকম এক সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট কীভাবে নেন, সেই প্রক্রিয়াও সিনেমায় বিস্তারিত দেখানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে থাকতে ৯/১১ হামলার খবর পেয়েছিলেন। সেভাবেই এ সিনেমাতেও প্রেসিডেন্ট ছিলেন স্টেডিয়ামে শিশুদের সঙ্গে। তাঁকে দ্রুত সেখান থেকে হেলিকপ্টারে তোলা হয়। সেখানে বসে প্রেসিডেন্ট তাঁর সামরিক সহকারীকে জিজ্ঞেস করেন, কী করা যায়? সহকারী তাঁকে ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’, অর্থাৎ পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে তৈরি একটি বই দেখান। প্রেসিডেন্ট বইটি দেখে বলেন, এটি যেন রেস্তোরাঁর মেনু পড়ার মতো। সহকারী তখন বলেন, এখানে ‘রেয়ার, মিডিয়াম, ওয়েল-ডান’, অর্থাৎ আক্রমণের তীব্রতার বিকল্পগুলো বলা আছে। আর যদি আঘাত করেন, তাহলে সবচেয়ে শক্ত আঘাত দিন, যেন সব একবারেই শেষ হয়। প্রেসিডেন্ট কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটা জানতেই সিনেমাটি দেখতে হবে।
আলোচনা, সমালোচনা ও পেন্টাগনের অসন্তোষ
সিনেমার চিত্রনাট্যকার নোয়াহ ওপেনহেইম একজন সাবেক সাংবাদিক, এনবিসি নিউজের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নির্মাতারা পেন্টাগন, সিআইএ এবং হোয়াইট হাউসের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তাঁরা পারমাণবিক সংকটের সময়ে সরকার আসলে কী পদ্ধতি অনুসরণ করে, তা জানার চেষ্টা করেছিলেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ড্যান কার্বলার, যিনি স্পেস অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স কমান্ডের কমান্ডার ছিলেন, ছবিটির প্রযুক্তিগত পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।
নেটফ্লিক্সে মুক্তি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিনেমাটি নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। মুক্তির পর ছবিটি প্রথম তিন দিনেই নেটফ্লিক্সে ২ কোটি ২১ লাখ বার দেখা হয়েছে। অর্থাৎ নেটফ্লিক্সে টানা প্রথম স্থানে। তবে পেন্টাগন আপত্তি তুলেছে সিনেমার কিছু অংশ নিয়ে। পেন্টাগনের জারি করা একটি অভ্যন্তরীণ মেমোর কথা জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।
ছবিতে দেখানো হয় যে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়। প্রতিরক্ষা সচিব চরিত্রটি তখন বলেন, এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সফলতার হার প্রায় ৫০ শতাংশ। এই দৃশ্যের সঠিকতা নিয়েই পেন্টাগন আপত্তি জানিয়েছে। পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, ‘ছবিতে কাল্পনিক ক্ষেপণাস্ত্র বাধাদান ব্যবস্থা লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয়। আমরা বুঝি এটি মূলত দর্শকদের জন্য নাটকীয়তা বাড়ানোর উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব জগতে পরীক্ষার ফল একেবারেই ভিন্ন।’ তাদের দাবি, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এক দশকের বেশি সময় ধরে ১০০ শতাংশ সফলতার হার দেখিয়েছে।
তবে চিত্রনাট্যকার নোয়াহ ওপেনহেইম বলেছেন, তাঁরা এ বিষয়ে সম্মানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন। কেননা ছবিতে যা দেখানো হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দ্য হলিউড রিপোর্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোয়াহ ওপেনহেইম বলেছেন, ‘আমি নিজে আগে সাংবাদিক ছিলাম। আমার মনে হয়, যাঁরা সরকারে বর্তমানে কর্মরত নন, তাঁরা অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন এবং কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়াই বাস্তবতা তুলে ধরতে পারেন। তাই আমরা এমন ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করেছি, যাঁরা সম্প্রতি পেন্টাগন, গোয়েন্দা সংস্থা বা হোয়াইট হাউসে কাজ করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য ও বিশ্লেষণের ওপর আমাদের যথেষ্ট আস্থা আছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, যাঁরা এই ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে কাজ করছেন, তাঁরা বলেছেন, আমরা বিষয়টিকে সঠিকভাবে ধরতে পেরেছি। তাঁরা মনে করছেন, আমরা সেই বাস্তব জগৎটাই তুলে ধরেছি, যা তাঁরা সারা জীবন অধ্যয়ন করেছেন।’
নোয়াহ ওপেনহেইম আরও বলেছেন, ‘আমি অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অনেকখানি অসম্পূর্ণ। ছবিতে যা দেখানো হয়েছে, তা বাস্তবতার কাছাকাছি।’
ক্যাথরিন বিগেলো সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমাদের পারমাণবিক প্রতিরক্ষাকাঠামো নিখুঁত নয়। এ ব্যবস্থায় এমন অনেক নারী-পুরুষ আছেন, যাঁরা গোপনে নিরলসভাবে কাজ করেন এবং তাঁদের দক্ষতার কারণেই আমরা নিশ্চিন্তে বসে কথা বলতে পারছি। কিন্তু দক্ষতা মানে এই নয় যে তাঁরা ভুল করবেন না।’
সিনেমার শেষটা নিয়ে অবশ্য আলোচনা-সমালোচনা আছে। অনেকেই শেষটা পছন্দ করেননি। আবার নির্মাতারাও সুপার হিরো ধরনের কিছু করতে চাননি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সিনেমাটির সূত্র ধরে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটাই ‘আ হাউস অব ডিনামাইট’-এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। বিশেষ করে ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তি নিয়ে আবার আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিউ স্টার্ট হলো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। চুক্তিটি ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হয়, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। নতুন করে এ চুক্তি করার কথা বলা হচ্ছে। এ চুক্তির অধীন সর্বোচ্চ কতটি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র একটি দেশ রাখতে পারবে, কতগুলো উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে পারে ইত্যাদি ঠিক করা হয়। এসব কারণে সিনেমাটি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
কেবল বিনোদন নয়, সতর্কবার্তা
ডেমোক্র্যাট এডওয়ার্ড জে মার্কি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি কংগ্রেসের দ্বিপক্ষীয় (সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ উভয়ের) পারমাণবিক অস্ত্র ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকর্ম–বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের সহসভাপতি। এমএসএনবিসিতে তিনি ২৮ অক্টোবর নিজ নামে একটি লেখা লিখেছেন। শিরোনাম হচ্ছে, ‘আমি একজন মার্কিন সিনেটর, হাউস অব ডিনামাইট আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি করেছে।’
এডওয়ার্ড জে মার্কি লিখেছেন, ‘সিনেমার গল্প আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি করে যে দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো বিশ্বজুড়ে অস্ত্রভান্ডার কমানো। ছবির শুরু থেকেই বিগেলো এই ভুল ধারণা ভেঙে দেন যে প্রযুক্তি আমাদের সব সময় রক্ষা করবে।’
সিনেমায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাউন্ড–বেজড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো (যা প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ) লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয়। তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (অভিনয়ে জ্যারেড হ্যারিস) রাগে বলে ওঠেন, ‘মানে, এটা তো একেবারে কয়েন ছোড়ার মতো ব্যাপার! এই ৫০ বিলিয়ন ডলার খরচে এটাই পেলাম!’
আর উত্তরও আসলে সেটাই সত্য। বাস্তবে পরীক্ষাগারে করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরীক্ষায় সাফল্যের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ, তা–ও তখন, যখন লক্ষ্য আগেই জানা থাকে, কোনো বিভ্রান্তি বা ভুয়া টার্গেট থাকে না, আর সময় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু বাস্তব যুদ্ধের সময় এসব শর্ত কখনোই মেলে না। সেখানে প্রতারণা, বিভ্রান্তি, একসঙ্গে বহু ক্ষেপণাস্ত্র, আর মানবিক ভুলও থাকে। অর্থাৎ সিস্টেমটি ভঙ্গুর ও অস্থির।
সিনেটর এডওয়ার্ড জে মার্কি সবশেষে লিখেছেন, ‘বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যকর নয়, বরং তা পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসের পথে বাধা। যুক্তরাষ্ট্র শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এসব ব্যবস্থায়, কিন্তু এখনো তা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে না। বড় বড় চুক্তি চলছে, লবিস্টরা লাভবান হচ্ছে, জনগণ মিথ্যা আশায় বেঁচে আছে। কিন্তু মূল ধারণাটিই ভুল। প্রতিরক্ষা যত বাড়বে, প্রতিপক্ষ ততই নতুন অস্ত্র তৈরি করবে। সেই অর্থে এই প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টাই বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ায়। তাই এই সিনেমাকে শুধু বিনোদন ভেবে চলবে না।’
এটি এক সতর্কবার্তা। সিনেমাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অস্ত্র বাড়ালে নিরাপত্তা বাড়ে না। বাস্তব সমাধান হলো আরও প্রযুক্তি নয়, বরং কম অস্ত্র।
তথ্যসূত্র: ভ্যারাইটি, দ্য গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য হলিউড রিপোর্টার, পিপল, এমএসএনবিসি, ইনডিপেনডেন্ট
![]() |
| আ হাউস অব ডিনামাইট'-এর দৃশ্য। আইএমডিবি |
Sunday, September 8, 2019
অব্যবস্থাপনা ও আস্থার অভাবে তারল্যসংকট by শওকত হোসেন

• তারল্যসংকটে ভুগছে ব্যাংক খাত।
• আবার কমছে না সুদহার।
• এতে বাড়ছে না বিনিয়োগ।
ব্যাংক খাতে এখন হাহাকার। কান পাতলেই শোনা যায় টাকা নেই। টান পড়েছে নগদ টাকার। কমছে আমানত। কমেছে ঋণ আদায়। সংকট ডলারেরও। অথচ দুই বছর আগেও ব্যাংক যেন নগদ টাকার ওপর ভাসছিল। এই দুই বছরে দেশের অর্থনীতির বড় কোনো পালাবদল হয়নি। প্রবৃদ্ধি বেড়েছে, মাথাপিছু আয়ও বেড়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে প্রকট হয়েছে ব্যাংক খাতের তারল্যসংকট। কমেছে বিনিয়োগযোগ্য তহবিল। যে ব্যাংক দুই বছর আগেও সাধারণ মানুষের আমানত রাখতে আগ্রহী ছিল না, তারাই এখন হন্যে হয়ে আমানত খুঁজছে। এমনকি অর্থের পরিমাণ বেশি হলে সাড়ে ১০ শতাংশ সুদও দিতে রাজি কিছু ব্যাংক।
সরকার ও ব্যাংকমালিকদের সিদ্ধান্ত ছিল, ব্যাংক ঋণের সুদহার হবে ৯ শতাংশ আর আমানতের সুদ ৬ শতাংশ। সুদ কমলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের খরচ কমবে, এতে নতুন বিনিয়োগও বাড়বে। অথচ ঘটছে উল্টোটা। বাড়ছে সব ধরনের সুদহার।
অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, ভুল নীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের আস্থার অভাবের কারণেই ব্যাংক খাতের তারল্যসংকট তৈরি হয়েছে বলে ব্যাংকার ও গবেষকেরা মনে করেন।
তারল্য পরিস্থিতি
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০১৮ সালের জুলাই থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে ৪০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, আর ঋণ বেড়েছে ৬৭ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা।
ব্যাংকগুলোর গত মার্চভিত্তিক তারল্য পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা গেছে, সব মিলিয়ে ৯ থেকে ১০টি ব্যাংকের বিনিয়োগ করার মতো তহবিল আছে। বাকি ব্যাংকগুলো টাকা ধার করে ছোট আকারের বিনিয়োগ কার্যক্রম চালাচ্ছে।
দেশে এখন মোট আমানতের মাত্র ২৮ শতাংশ আছে সরকারি ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে। বাকি ৭২ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে। আবার সরকারি ব্যাংকের ঋণের হার আমানতের ৬৭ শতাংশ, বেসরকারি ব্যাংকে তা ৮৭ শতাংশ। অথচ ঋণ দেওয়ার সীমা সাড়ে ৮৩ শতাংশ। এর মধ্যে বেসিক ও পদ্মা (সাবেক ফারমার্স) ব্যাংকের ঋণের হার যথাক্রমে ১১০ ও ১১৩ শতাংশ। এর বাইরে আরও ১০ ব্যাংক ঋণ দিয়েছে আমানতের ৯০ শতাংশের বেশি। ফলে বেসরকারি ব্যাংকের বড় অংশেরই ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা কমে গেছে।
ব্যাংকঋণের একটি বড় অংশ যায় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকে আগের চেয়ে টাকা কমে গেছে, সুদহারও বেড়ে গেছে। এখন ১৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিতে হচ্ছে। ব্যবসার জন্য সুদহার আরও কমানো প্রয়োজন।
কেন ভালো নেই ব্যাংক
আশির দশক থেকেই নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে গেছে দেশের ব্যাংক খাত। দাতাদের পরামর্শ ও ঋণে একাধিক সংস্কার কর্মসূচি নেওয়া হয়। গঠন করা হয় একাধিক কমিশন ও কমিটি। অনুসরণ করা হয় ব্যাংক পরিচালনার আন্তর্জাতিক রীতিনীতি। এতে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের অবস্থা কিছুটা ভালো হয়েছিল। কিন্তু এক দশক ধরে উল্টো পথে চলেছে ব্যাংক খাত। নজরদারি শিথিল হয়েছে। ঘটেছে বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি। বেড়েছে খেলাপি ঋণ। অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে।
গত এক দশকের মধ্যে ব্যাংক খাতে প্রথম ধাক্কা ছিল হল-মার্ক কেলেঙ্কারি। ২০১১ সালের এই কেলেঙ্কারির পর দেশের সবচেয়ে বড় সোনালী ব্যাংক ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে রক্ষণশীল হয়ে পড়ে। এরপরই ঘটে বেসিক ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের একাধিক কেলেঙ্কারি। এরপরও নিয়মনীতি মানেনি অনেক ব্যাংক। তারা নিয়মের বাইরে ঋণ দেয়।
সবশেষ ঘটে ২০১৮ সালের ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারি। আমানতের তুলনায় বেশি ঋণ দেয় তারা। একপর্যায়ে নগদ টাকা না থাকায় গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয় ব্যাংকটি। এতে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান আমানত তুলে নেওয়া শুরু করলে এর প্রভাব পড়ে অন্য ব্যাংকের ওপর। আস্থার সংকটে তাদের আমানতও কমে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ব্যাংক খাতে যে সমস্যাগুলো চলছে, তা একদিনে আসেনি। ব্যবসায়ী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আইনকানুন ঠিক করে দিচ্ছেন। এ কারণেই এত সমস্যার উদ্ভব। সমস্যা সবারই জানা, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ। কিন্তু অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কাউকে তো শাস্তি দিতে দেখা গেল না। অথচ ব্যাংক খাতে এমন পরিস্থিতি চললে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নও সম্ভব না।
তারল্যসংকটের আরও কারণ
অন্যান্য খাত থেকেও ব্যাংকের আয় কমে গেছে। যেমন, আমদানি ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, রপ্তানি ও প্রবাসী-আয় সেভাবে বাড়েনি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়ে আমদানি ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৭৮৩ কোটি ডলার। সেবা, ঋণ ও সুদ পরিশোধে খরচ হয়েছে আরও ৮৮৬ কোটি ডলার। অন্যদিকে এ সময়ে প্রবাসী আয় এসেছে ১ হাজার ১৮৬ কোটি ডলার, রপ্তানি আয় ৩ হাজার ৯০ কোটি ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি ১ হাজার ৬৯ কোটি ডলার।
এর আগের অর্থবছরে ব্যয় ছিল আরও বেশি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছিল ২৫ শতাংশ হারে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি আমদানি করতে ওই সময়ে প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়। এতে ডলারের সংকট দেখা দিলে এর দর বেড়ে যায়। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে যে ডলার ছিল ৮০ টাকা, তা এখন ৮৪ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
চাহিদার তুলনায় ডলারের সরবরাহ এখনো কম। আমদানি দায় মেটাতে গত জুলাই-মার্চ সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১৮৭ কোটি ডলার কিনেছে ব্যাংকগুলো। এর বিপরীতে ১৫ হাজার ৮৯৫ কোটি টাকা চলে গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। যা তারল্যসংকট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শিল্পের কাঁচামাল ও সাধারণের ভোগ্যপণ্যের বড় অংশই আমদানি করতে হয়। ডলারের দাম বৃদ্ধি পেলে এসব পণ্যের দামও বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে জীবনযাত্রার ব্যয়ে। চলতি অর্থবছরের প্রথম থেকেই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে।
এর মধ্যেই আবার সরকার ঋণখেলাপিদের নতুন করে ছাড় দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। খেলাপিরা ৯ শতাংশ সুদহারে ঋণ নিয়মিত করতে পারবে। এতেও ব্যাংকগুলোর ঋণ আদায় কার্যক্রমে বড় ধাক্কা লেগেছে।
একজন বড় উদ্যোক্তা এই প্রতিবেদককে জানালেন, চলতি মাসেই তাঁর শিল্পগ্রুপের নেওয়া ঋণের কয়েকটা কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা ছিল। এখন তিনি একটু দেরি করছেন। কারণ, খেলাপি হলে সুবিধা বেশি, কম সুদে ঋণ পরিশোধ করা যাবে।
ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বড় অঙ্কের টাকা খেলাপিদের কাছে আটকে পড়েছে। চাহিদামতো আমানতও মিলছে না। আবার ৯ শতাংশ সুদে টাকা পরিশোধের সুযোগ আসবে—এমন ঘোষণায় অনেকেই টাকা শোধ বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে ব্যাংকগুলোতে তারল্যে বড় চাপ এসেছে।
আস্থার সংকট
ব্যাংক খাতের এবারের তারল্যসংকটের অন্যতম কারণ আস্থার অভাব। এ সংকট কাটাতে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও তা কাজে আসেনি। যেমন, ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল সোনারগাঁও হোটেলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে সরকার ব্যাংকগুলোর নগদ জমা সংরক্ষণের (সিআরআর) হার ১ শতাংশ কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নেয়। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়, যা আগে ছিল সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ।
এরপরও চাহিদামতো আমানত আসেনি ব্যাংক খাতে। গ্রাহকেরা এখন মূলত টাকা খাটাচ্ছে জাতীয় সঞ্চয়পত্রে। মুনাফার হার বেশি থাকায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সঞ্চয়পত্রই এখন টাকা রাখার বড় ভরসার জায়গা হিসেবে তৈরি হয়েছে। যেমন, চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু অর্থবছরের আট মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৬১ হাজার ১২ কোটি টাকা।
গত ১০ বছরে জিডিপির অংশ হিসেবে বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। বিনিয়োগ বাড়ছে না বলে কর্মসংস্থানের সুযোগও খুব বাড়েনি। এই উচ্চ প্রবৃদ্ধিকে অনেক গবেষক কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি বলে আখ্যা দিয়েছেন। এ অবস্থায় যখন বিনিয়োগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন, সেই সময়ে দুর্বল ব্যাংক খাত, তারল্যসংকট ও উচ্চ সুদহার বিনিয়োগ সুযোগকে আরও কমিয়ে দিচ্ছে।
মীর নাসির হোসেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি। প্রথম আলোকে তিনি বললেন, একজন উদ্যোক্তা হিসেবে বিনিয়োগের জন্য জরুরি হচ্ছে জ্বালানির প্রাপ্যতা। বিশেষ করে গ্যাস। অনেক দিন ধরে এ নিয়ে কথা হলেও এখনো প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তরলীকৃত বা এলএনজি গ্যাস আসতে বেশি সময় নিয়েছে। অন্যদিকে সংকট কমলেও মানসম্পন্ন ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এখনো নিশ্চিত হয়নি। জ্বালানির এসব চাহিদা পূরণ হলে তবেই আসবে ব্যাংকঋণের প্রশ্ন। কিন্তু ব্যাংক খাত বিশৃঙ্খল, জবাবদিহিও কম। তার ওপর অনেক আর্থিক কেলেঙ্কারির কারণে খেলাপি ঋণ ও সুদহার দুটিই বেড়েছে। সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে। ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমাতে চাইছে। এসব উদ্যোগ ভালো। কিন্তু জ্বালানি ও ব্যাংক সমস্যার সমাধান না হলে বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়বে না।
Saturday, July 13, 2019
‘রাজহাঁসের ব্যথা’ কি কমবে by শওকত হোসেন

অর্থমন্ত্রীর এই প্রতিশ্রুতিপূর্ণ নতুন বাজেট গত ১ জুলাই সোমবার থেকে বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। এই দিন আবার নতুন অর্থবছরেরও প্রথম দিন। আর নতুন অর্থবছর শুরুই হলো নিজের পকেট থেকে ১৭৫ টাকা বাড়তি খরচের বোঝা নিয়ে। এটা কেবল রান্নাঘরের গ্যাসের চুলায় প্রতি মাসে বাড়তি খরচ। এতেই পার পাওয়া যাবে না। কারণ, বেড়েছে সব ধরনের গ্যাসের দাম, গড়ে ৩২ দশমিক ৮০ শতাংশ। সুতরাং এর প্রভাব পড়বে জীবনযাপনের সব ক্ষেত্রে। গ্যাসভিত্তিক শিল্পকারখানায় বাড়বে উৎপাদন খরচ, বাড়বে পণ্যমূল্য। প্রভাব পড়বে পরিবহনেও। চাপে পড়বেন সীমিত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষেরা।
একটি সরকারের জাতীয় বাজেট ও একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত বাজেটের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। সরকার আগে ব্যয়ের খাত ঠিক করে, এরপর আয়ের উৎস দেখে। ঘাটতি পূরণে সরকার ধার নিতে পারে এবং সেই ধার পরের অর্থবছরগুলোতে চালিয়ে নিতে পারে। কিন্তু একজন ব্যক্তির বাজেট ঠিক উল্টো। আগে আয়, সেই অনুযায়ী ব্যয়ের চিন্তা। সামর্থ্যের বাইরে ধার করার সুযোগ ব্যক্তির নেই। সুতরাং যেকোনো ধরনের বাড়তি ব্যয় সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত বাজেটকেই এলোমেলো করে দেয়। নতুন অর্থবছর আরও অনেক ক্ষেত্রেই বাজেট এলোমেলো করে দেবে।
এখন অর্থমন্ত্রী বলতে পারেন, গ্যাসের দাম তো বাজেটে বাড়ানো হয়নি, তাই এটি তাঁর এখতিয়ারের বাইরে। আসলে এবারের বাজেটের অনেক প্রস্তাবই চাপে ফেলবে অসংখ্য মানুষকে। এর অনেক চাপ আর্থিক, বেশ কিছু চাপ অবশ্যই মানসিক। সৎ ও নিয়মিত করদাতাদের কোনো রকম ছাড় না দিয়ে কালোটাকার মালিকদের বিশেষ সুযোগ দেওয়াটা এ রকমই এক চাপ।
ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ বছর ধরে বাড়েনি, বাংলাদেশে সম্ভবত এটি একটা নতুন রেকর্ড। যদিও এ সময়ে প্রায় ৩১ শতাংশ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। এর মানে হলো, আগের চেয়ে কম প্রকৃত আয় করেও মানুষ করের আওতায় চলে আসছেন। আবার চাকরিজীবীরা কর এড়িয়ে যাবেন, সে সুযোগ নেই। কেননা, কর বিবরণী বা রিটার্ন না দিলে প্রতিষ্ঠান বেতন দিতে পারবে না। সুতরাং এখানে স্বস্তি নেই। আবার ব্যক্তি করদাতারা কম্পিউটার অথবা ল্যাপটপ কিনে বিনিয়োগ দেখিয়ে কিছুটা কর ছাড় পেতেন। সেটা তুলে নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
কিন্তু ধনীদের সম্পদে সারচার্জে ঠিকই ছাড় দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ বছর থেকে তিন কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে তবে সারচার্জ দিতে হবে, যা আগে ছিল দুই কোটি টাকা। সাদাচোখে অবশ্য অতিধনীদের কাছ থেকে কিছু টাকা আদায়ের চেষ্টা হয়েছে। যেমন ৫০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে তার সম্পদ মূল্যের দশমিক ১ শতাংশ অথবা আয়ের ৩০ শতাংশ, যেটা বেশি সেটা সারচার্জ হিসেবে দিতে হবে। আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশে সম্পদ বাজারমূল্যে না দেখিয়ে ক্রয়মূল্যে দেখানো হয়। এ ছাড়া ধনীদের গাড়িসহ অন্যান্য সম্পদ কোম্পানির নামে দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। ফলে এই খাতে কর আদায় হয় সামান্যই।
বাজেট বাস্তবায়ন প্রতি অর্থবছরের চ্যালেঞ্জ।
ব্যক্তির করমুক্ত আয়সীমা পাঁচ বছর ধরে বাড়েনি, দেশে এটি নতুন রেকর্ড।
ধনীদের সম্পদে সারচার্জে ঠিকই ছাড় দেওয়া হয়েছে বাজেটে।
পরোক্ষ কর সব শ্রেণির মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বাজেটে এবার প্রত্যক্ষ করে সাধারণ করদাতাদের কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি, কিন্তু চাপানো হয়েছে পরোক্ষ করের বোঝা। এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে বড় উৎস হচ্ছে মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। এটি সবচেয়ে বড় পরোক্ষ কর, যা সরাসরি দেবেন ব্যবসায়ীরা, কিন্তু টাকাটা যাবে মূলত সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকেই। সারা পৃথিবীতে যেখানে প্রত্যক্ষ কর আদায়ে জোর দেওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে পরোক্ষ করের মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষের ওপর চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এমনিতে কর-জিডিপি অনুপাতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় সর্বনিম্নে। যাঁরা এই অনুপাত বাড়িয়েছেন, তাঁরা মূলত ভর করেছেন প্রত্যক্ষ করের ওপর। অথচ আমরা বাড়িয়ে চলেছি পরোক্ষ কর।
যদিও অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় মোটা হরফে বলেছেন, ‘আমাদের সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো, আমরা কোনোভাবেই কোনো করদাতার ওপর বোঝা হিসেবে কর চাপিয়ে দেওয়ার বিপক্ষে।’ এরপর অর্থমন্ত্রী ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের অর্থমন্ত্রীর একটি উক্তির কথা বলেছেন। তাঁর মতে, কর আদায়ে এটাই অনেকটা তাঁর সরকারের নীতি। আর উক্তিটি হলো, ‘রাজহাঁস থেকে পালক ওঠাও যতটা সম্ভব ততটা, তবে সাবধান, রাজহাঁসটি যেন কোনোভাবেই ব্যথা না পায়।’
আমরা সবাই জানি, পরোক্ষ কর আদায়ে ব্যথা পাওয়া যাবেই। আর প্রত্যক্ষ করের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো সেই সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসটির মতো। বারবার ডিম দেয় বলেই তার ওপরই যত ভরসা, যত নির্যাতন। দেখা যায় বাংলাদেশে যাঁরা নিয়মিত আয়কর দেন, চেষ্টা থাকে তাঁদের কাছ থেকেই যত বেশি আদায় করা যায়। আর যাঁরা দেন না বা ফাঁকি দেন, তাঁরা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সুখের কথা, অর্থমন্ত্রী নিজেও তা স্বীকার করেছেন। বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশে একবার যাঁরা কর প্রদান করেন, তাঁরাই প্রতিবছর সরকারকে কর প্রদান করে থাকেন। অন্যরা কর প্রদানে শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও তাঁরা কর প্রদান করেন না। এই অপসংস্কৃতি থেকেও আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।’ অর্থমন্ত্রী এই প্রতিশ্রুতি রাখবেন আশা করি।
একটা সাধারণ কিন্তু বহু চর্চিত কথা হচ্ছে বাজেট বাস্তবায়নই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। আসলে এ নিয়ে কথা কম বলাই ভালো। কেননা, এই চ্যালেঞ্জ সরকার নেবে বলে মনে হয় না। বরং গতানুগতিক পথেই হবে বাজেট বাস্তবায়ন। যেমন অর্থবছরের শুরুতে বড় বাজেট পেশ, কিন্তু অর্থবছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আয় হবে না, কমাতে হবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার। ফলে বাস্তবায়িত হবে না মূল বাজেট, করতে হবে সংশোধন। বছরের পর বছর এটি চলে আসছে। একই কাঠামোতে এবারের বাজেটটিও দেওয়া হয়েছে। সুতরাং এই বাজেটের ভাগ্যও হবে একই রকম। নাকি নতুন অর্থমন্ত্রী সত্যিকার অর্থে বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জটি নেবেন, সেটাই এখন প্রশ্ন।
Monday, June 3, 2019
ঋণখেলাপিরা কি ভালো হয়ে যাবেন by শওকত হোসেন

এবার অভিনন্দন জানাই বছরের পর বছর ধরে ঋণখেলাপির অবস্থান যাঁরা ধরে রেখেছেন, তাঁদের। ধৈর্যের পুরস্কার তাঁরা পেয়েছেন। সরকার বিশাল এক ছাড় দিয়েছে। কোনো তিরস্কার না, কোনো শাস্তিও না, বরং অনেক বড় পুরস্কার। সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ, ২ শতাংশ এককালীন কিস্তি, আর বাকি টাকা ১০ বছরে পরিশোধ। কেবল তা-ই নয়, তাঁরা নতুন ঋণও পাবেন।
ভালো ঋণগ্রহীতারাও ধন্যবাদ পাবেন। সমাজে তাঁরাও যে আছেন, সরকার এবার অন্তত স্বীকৃতি দিল। নইলে বছরের পর বছর ধরে ঋণখেলাপিরা যেভাবে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন, মনে হতো তাঁদের অস্তিত্বই একমাত্র সত্য। নতুন নীতিমালায় ভালো গ্রহীতা ১০ শতাংশ অর্থ ফেরত পাবেন।
এ ক্ষেত্রে সরকারকেও ধন্যবাদ দিতে হয়। জানা ছিল, কেবল ঋণখেলাপিরাই বড় পুরস্কার পাবেন। যেমন আগেও পেয়েছেন। কিন্তু যতবার ঋণখেলাপিরা পুরস্কৃত হয়েছেন, ততবার সরকারের তীব্র সমালোচনা হয়েছে। কেননা, এতে নিয়মিত ও ভালো গ্রাহকেরা ঋণ ফেরত দিতে নিরুৎসাহিত হয়েছেন। এমনকি তা অনৈতিকও। কিন্তু সরকার সব সময় কালোটাকার মালিকদের অর্থ সাদা করার সুযোগ দেওয়ার মতো করে ঋণখেলাপিদের নিয়মিতভাবে সুযোগ দিয়ে আসছে। এবারই সম্ভবত প্রথম ভালো গ্রহীতাদের পুরস্কারের ঘোষণা দিল। তবে কোনো সংশয় নেই যে ঋণখেলাপিদের বিশাল ছাড় দেওয়ার সমালোচনা থেকে খানিকটা রেহাই পেতেই ভালো গ্রহীতাদের প্রতি এই আলাদা নজর। তারপরও সরকারকে ধন্যবাদ।
পুঁজি খাতের নিয়ন্ত্রকেরাও বিশেষভাবে ধন্যবাদ পাবেন। দীর্ঘদিন ধরে বাজার মন্দা। মাঝেমধ্যে জোর করে সূচক ওঠানো ছাড়া ভালো কোনো সংবাদ অনেক দিন ধরেই শেয়ারবাজারে নেই। বাজারে অর্থের সংকট আছে, তার চেয়েও বেশি আছে আস্থার সংকট। বাংলাদেশ ব্যাংক গত বৃহস্পতিবার ঋণ পুনঃ তফসিল বিষয় ছাড়াও পুঁজিবাজার নিয়েও আলাদা একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সেখানে শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা বাড়ানোর উদ্যোগের কথা রয়েছে। আশা করা যায়, এখন শেয়ারবাজারের তারল্যসংকট খানিকটা কমবে, বাজার চাঙা হবে। তবে এ থেকে আস্থার সংকট কতটা কমবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ধন্যবাদের পালা শেষ। এবার আশাবাদের পালা। আশা করা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই প্রজ্ঞাপন অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে, ঋণখেলাপিরা সবাই ভালো হয়ে যাবেন। তাঁরা এরপর থেকে নিয়মিতভাবে ঋণ শোধ করবেন, ঋণের অর্থে ভালো উদ্যোগে বিনিয়োগ ঘটবে, তাতে কর্মসংস্থান হবে, মানুষের আয় বাড়বে। এতে বিনিয়োগের সংকট যেমন কাটবে, তেমনি অর্থ পাচারও কমবে। ঋণ নিয়ে কেউ আর অন্য খাতে নিয়ে যাবেন না।
এবার শঙ্কার কথা বলি। খুব বেশি পেছনে যেতে হবে না। ২০১৫ সালেই দেশের বড় ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ আছে—এমন ১১ প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। শর্ত ছিল, এরপর তাঁরা নিয়মিত কিস্তি দিয়ে ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, মাত্র দুটি কোম্পানি ছাড়া আর কেউই কিস্তির টাকা পরিশোধ করেননি। আরও দুঃখজনক হলো, নতুন করে যে ছাড় দেওয়া হলো, এর পেছনেও আছেন পুনর্গঠন–সুবিধা নেওয়া ব্যবসায়ীদেরই কেউ কেউ। বিশেষ সুবিধা পেয়ে ঋণখেলাপিরা ভালো হয়ে গেছেন, এমন উদাহরণ বাংলাদেশে কখনো দেখা যায়নি। সুতরাং, আবার যে একই ঘটনা ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কী।
বাংলাদেশে ভালো গ্রাহক হওয়ার চেয়ে খারাপ গ্রাহক হলে লাভ বেশি। ঋণের টাকা পাচার বা অন্য কাজে ব্যবহার করেও বছরের পর বছর আয়েশে কাটানো যায়। নতুন নীতিমালা তাঁদের এই আয়েশ আরও বাড়াবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। এমনকি সরকার অর্থনীতি বা ব্যবসার স্বার্থে নাকি কিছু ব্যবসায়ীর জন্য নতুন নীতিমালাটি জারি করেছে, সেই সন্দেহও থেকে গেল।
Sunday, April 14, 2019
ব্যাংকের আসল ‘ডাকাত’ কারা by শওকত হোসেন

বাণিজ্যমন্ত্রী পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ছিলেন। উচ্চ সুদহারে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের সমস্যার কথাও তিনি জানেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় সুদের হার ১ অঙ্কে নামিয়ে আনাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যে ব্যাংকগুলো মানছে, সে কথাও বলেছেন।
কেবল বাণিজ্যমন্ত্রীর নয়, সুদহার কেন কমছে না—এই প্রশ্ন তো সবার। তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর ‘ব্যাংক ডাকাত’দের নিয়ে একটু তত্ত্বতালাশ করা যেতে পারে। ব্যাংকের আসল ‘ডাকাত’ কারা, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা যায়।
এক বছর আগে ২০১৮ সালের ২০ জুন সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ঘোষণা দিয়েছিল, ১ জুলাই থেকে আমানত ও ঋণের সুদহার হবে যথাক্রমে ৬ শতাংশ ও ৯ শতাংশ। এর পরের দিন সরকারি ব্যাংকগুলো একযোগে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই সিদ্ধান্ত পালনের কথা জানিয়ে দেয়। তখনই এভাবে সুদহার ঠিক করাকে অনেকে ঠাট্টা করে ‘নয়-ছয়’ বলেছিলেন। রসিকতাটা যে ভুল ছিল না, সেই প্রমাণ তো বাণিজ্যমন্ত্রীর কথাতেই আছে।
ব্যাংক খাত কীভাবে চলবে, তার কিছু আন্তর্জাতিক রীতিনীতি আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তা অনুসরণ করে। ব্যাংক বিষয়ে যেকোনো নীতি–সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকেরই। অথচ সুদহার ঠিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি নীতি–সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়াকে তো ‘ডাকাতি’ বলা যায়।
ব্যাংক মালিকদের সুদহার ‘নয়-ছয়’ করার কারণ অবশ্য একটা ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো এবং টানা ৯ বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকা ও এক পরিবারের ৪ জনকে ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগ করে দেয়। সরকারি আমানত রাখার সীমাও ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়। এত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিনিময়েই ব্যাংক মালিকেরা সুদের হার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি না রেখেই সব সুযোগ-সুবিধা ব্যাংক মালিকেরা ঠিকই ভোগ করছেন।
সুদের হার বৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণ না করে কেবল নির্দেশ দিয়ে তা কখনোই কমানো যায় না। আর সুদের হার বাড়ার অনেক কারণ থাকে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে আছে তারল্যসংকট। কোনো কোনো ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানতই সংগ্রহ করছে। এমন ব্যাংকও আছে যাদের ঋণ-আমানতের সুদের হারের পার্থক্য প্রায় ৮ শতাংশ। সুদের হার কমাতে এই তারল্যসংকটের সমাধান করতে হবে। তা ছাড়া, এখন সুদের হার নির্ধারণ করে বাজার, চাহিদা-জোগানের ভিত্তিতে। তবে তারপরও সুদের হার কিছু কমানো সম্ভব। যেমন খেলাপি ঋণ কমাতে পারলে ব্যাংকগুলো আরও ১ থেকে ২ শতাংশ হারে সুদ কমাতে পারত।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতে আলোচিত ‘ডাকাত’দের কথা বলা যায়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন গত বছরের ৯ জুন সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ‘একশ্রেণির লোক আছেন, যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের টাকা তছরুপ করেছেন, ব্যাংকের টাকা ডাকাতি করেছেন। আমরা তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
সুতরাং খেলাপি ঋণ কমাতে হলে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অথচ ঋণখেলাপিদের আরও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। যেমন ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশ হলে উদ্যোক্তাকে ফেরত দিতে হবে সব মিলিয়ে ১৩ শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি হারে। আর খেলাপি হলে দিতে হবে ৯ শতাংশ হারে, তাও দীর্ঘ সময় ধরে। এই সুবিধা আগামী মে মাস থেকে কার্যকর হবে বলে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে ব্যাংকে ঋণ ফেরত দিতে কে আর আসবেন।
এবার বাণিজ্যমন্ত্রী আপনিই বলুন, ব্যাংকের আসল ‘ডাকাত’ কারা।
Friday, February 12, 2016
‘হোয়েন টু রব আ ব্যাংক’ by শওকত হোসেন
যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়ার শেলডন ন্যাশনাল ব্যাংকে অভিনব এক ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা পাওয়া গেল বইটিতে। ব্যাংকটির মালিক উইলিয়াম গেইজার। তাঁরই মেয়ে বার্নি গেইজার কাজ করতেন ক্যাশ বিভাগে। ১৯৬১ সালের এক সকালে গ্রেপ্তার হলেন বার্নি। অভিযোগ ২০ লাখ ডলার আত্মসাতের। ৩৭ বছর ধরে তিনি এই অর্থ সরিয়েছেন। বার্নির নাম ইতিহাসে লেখা হয়ে আছে। কারণ, এর আগে আমানতের অর্থের বিমা করার বাধ্যবাধকতা ছিল না। এ ঘটনার পর আইন বদলাতে হয়।
তবে স্টিভেন লেভিট ও স্টিফেন ডুবনার ঘটনাটি তুলে এনেছেন অন্য কারণে। বার্নি গেইজার ব্যাংকে চাকরি করার সময় কখনো ছুটি নেননি। হিসাবের দুটি খাতা ছিল তাঁর। বার্নির ভয় ছিল, ছুটি নিলে অন্য যিনি তাঁর জায়গায় কাজ করবেন, সব ধরে ফেলবেন। তাই বছরের পর বছর বিনা ছুটিতে কাজ করে গেছেন। বদলি হলে হয়তো আত্মসাতের সুযোগটা পেতেন না বার্নি। মজার ব্যাপার হলো, পাঁচ বছর জেল খেটে মুক্তি পাওয়ার পর বার্নিকে ব্যাংক নজরদারি করার কাজে নিয়োজিত করেছিল সরকার। ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের ফাঁকফোকর তাঁর চেয়ে আর বেশি কে জানবে?
বার্নি গেইজারের অর্থ আত্মসাৎকে তাহলে আমরা ডাকাতি বলছি কেন? বলছি, কারণ কোনো কোনো আত্মসাৎকে ডাকাতির পর্যায়েই ফেলা যায়। এই তো সেদিন (৩ ফেব্রুয়ারি) আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বললেন, ‘বেসিক ব্যাংকে দুর্নীতি হয়েছে আর সোনালী ব্যাংকে হয়েছে ডাকাতি।’ অনেকের নিশ্চয়ই মনে আছে, হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার মধ্যে একমাত্র সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা (শেরাটন) শাখা থেকেই আত্মসাৎ হয়েছিল সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। এই শাখার ব্যবস্থাপক পদে এ কে এম আজিজুর রহমান নিয়ম অনুযায়ী তিন বছরের জায়গায় ছিলেন টানা পাঁচ বছর। একে তো আমরা ডাকাতি বলতেই পারি।
একটু ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দিয়েও ব্যাংক ডাকাতদের দেখা যায়। আল পাচিনোর ভক্তরা নিশ্চয়ই ১৯৭৫ সালের সেই বিখ্যাত চলচ্চিত্র ডগ ডে আফটারনুন দেখেছেন। প্রথমবারের মতো ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে দেখল ভুল সময়ে এসেছে তারা। তখন দিনের নগদ জমা প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া শেষ, ক্যাশে আছে মাত্র ১ হাজার ১০০ ডলার। গল্পের শেষটা তো আরও মর্মান্তিক। আল পাচিনোর প্রতি সহানুভূতিটাই থেকে যায় সিনেমাটির শেষে।
স্টিভেন ডি লেভিট আর স্টিফেন জে ডুবনারও একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন ব্যাংক ডাকাতদের। ২০০৯ সালের ব্যাংক ডাকাতির কিছু পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই। ওই বছর ছিল অর্থনীতিতে মন্দা। অথচ আগের বছরের তুলনায় ব্যাংক ডাকাতির সংখ্যা ছিল কম। এ তথ্য বিশ্লেষণ করে লেভিট ও ডুবনার বলছেন, হতে পারে ব্যাংক ডাকাতেরা খুব ভালো করেই জানে ব্যাংকগুলোর দুরবস্থার কথা।
তবে ব্যাংক ডাকাতদের যে অর্থনীতি জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, এমন কথাও কিন্তু অর্থনীতিবিদেরা বলছেন। তিন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ সাসেক্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ব্যারি রেইলি এবং সারে ইউনিভার্সিটির নেইল রিকম্যান ও রবার্ট উইট ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে একটি অর্থনৈতিক তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, অপরাধও একধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এর মুনাফা আছে, লোকসান আছে, ঝুঁকি আছে এবং এর রিটার্ন বা প্রাপ্তিও আছে। এ কাজেও উপকরণ ব্যবহার করতে হয়, শ্রম দিতে হয়, পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয় এবং এর একটি ব্যয়ও আছে।
ব্যাংক ডাকাতি নিয়ে অনেকেরই একটি রোমান্টিক ধারণা আছে। দু-তিনজনের একটি দল নিয়ে বন্দুক ঠেকিয়ে কোটি কোটি অর্থ বস্তায় ভরে দে ছুট। তারপর সারা জীবন বসে বসে খাও। কিন্তু এই তিন অর্থনীতিবিদ বলছেন, বিষয়টি আসলে সে রকম নয়। তাঁরা মোট ব্যাংক ডাকাতির সংখ্যা, ডাকাতি করা অর্থের পরিমাণ ও ধরা পড়ার হার বিচার-বিশ্লেষণ করে বলেছেন, ২০০৫ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে সংঘটিত ব্যাংক ডাকাতির ক্ষেত্রে একেকজনের গড় আয় হয়েছে ১২ হাজার ৭০৬ পাউন্ড। এই অর্থ দিয়ে সারা জীবন বসে বসে খাওয়ার কোনো উপায়ই নেই। ব্রিটেনে সে সময় যাঁদের পূর্ণ কাজ ছিল, তাঁদের গড় আয় ছিল বছরে ২৬ হাজার পাউন্ড। সুতরাং, একবার ব্যাংক ডাকাতির অর্থ দিয়ে বড়জোর ছয় মাস কাটানো যেত। এরপরেই নামতে হবে আবার ব্যাংক ডাকাতিতে। একাধিকবার ব্যাংক ডাকাতি মানেই ধরা পড়ার আশঙ্কাও বেশি। তিন অর্থনীতিবিদ গবেষণার সবশেষে বলেছেন, ‘ব্যাংক ডাকাতি খুবই খারাপ ধারণা। একটি ব্যাংক ডাকাতি থেকে যে প্রাপ্তি, তা থেকে খুব খোলামেলাভাবেই বলা যায়, রাবিশ (দ্য রিটার্ন অন অ্যান এভারেজ ব্যাংক রবারি ইজ, ফ্রাঙ্কলি, রাবিশ)।’
আমরা জানি, আমাদের অর্থমন্ত্রী প্রায়ই ‘রাবিশ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এই যে সোনালী ব্যাংকে ডাকাতি হওয়ার কথা এখন বলছেন, তিন বছর আগেও তিনি একে রাবিশ বলেছিলেন। ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ সিলেটে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘দুষ্টু প্রতিষ্ঠান হল-মার্ক জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করেছে। হল-মার্কের এমডি জেলে রয়েছে, তার শাস্তি হবেই। বিষয়টি নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও ব্যাংকাররা হইচই শুরু করেছেন। তাঁদের কথাবার্তা বোগাস ও রাবিশ। সারা পৃথিবীতে ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি হয়। বাংলাদেশেও হয়েছে। তবে এটা তেমন ভয়ংকর কিছু নয়।’
ওই তিন ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ব্যাংক ডাকাতিকে যতই নিরুৎসাহিত করুন না কেন, বাংলাদেশে কিন্তু এর উল্টোটা। এখানে ঝুঁকি অনেক কম, লাভ বেশি। বাংলাদেশে ‘ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটের কাহিনি’ মূলত ব্যাংক ডাকাতিরই গল্প। সেই জিয়া-এরশাদের জামানা থেকে শুরু, এখনো চলছে। ধরন পাল্টেছে মাত্র। শুরুতে ছিল ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে মেরে দেওয়া। এখন পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৪ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে অবলোপন করা আছে আরও প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যাংক আর ফেরত পাবে না বলেই ধরা যায়। তাহলে এটা ব্যাংক ডাকাতি না তো কী!
তবে ‘ব্যাংক ডাকাতি’র ধরনও পাল্টেছে। নতুন প্রবণতা হচ্ছে ব্যাংকের মালিক বা প্রতিনিধি সেজে অন্যকে অর্থ আত্মসাতের অবাধ সুযোগ দিয়ে নিজেও লাভবান হওয়া। হল-মার্ক, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি এরই উদাহরণ। এ জন্য অর্থনীতির তত্ত্ব মেনে উপকরণ, শ্রম বা পুঁজি নিয়োগেরও তেমন প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের। আর এই সম্পর্কের জোরেই সরকারি ব্যাংকে চেয়ারম্যান ও পরিচালক হয়ে অর্থমন্ত্রীর ভাষায় এখানে ‘ব্যাংক ডাকাতি’ বেশ সফলভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। কোনো ঝুঁকি নেই। ধরা পড়ার প্রশ্নও নেই। খুব বেশি হইচই হলে শেষ ভরসা দুদক তো ‘দায়মুক্তি’র সার্টিফিকেট নিয়ে বসেই আছে।
তাহলে বিখ্যাত সেই গল্পটা বলি। দুজন মিলে ঠিক করল ব্যাংক ডাকাতি করবে। একজন অভিজ্ঞ ডাকাত, আরেকজন নতুন, শিক্ষানবিশ। এক সকালে তারা একটা বন্দুক নিয়ে চলে গেল ব্যাংকে। তারপর চিৎকার করে বলল, ‘কেউ নড়বেন না। যে যেখানে আছেন, সেখানেই শুয়ে পড়ুন। মনে রাখবেন, টাকার বিমা আছে, টাকার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কিন্তু জীবনটা আপনার।’—এ হচ্ছে মন বদলের ধারণা। অর্থাৎ, প্রথাগত চিন্তাভাবনা বদলে দাও, ভালো কাজে দেবে।
এক নারী একটু অন্যভাবে বসে ছিলেন। সহজেই চোখ যায় সেদিকে। অভিজ্ঞ ডাকাতটা তাকে বলল, ‘শালীন হয়ে বসুন। মনে রাখবেন, এটি ডাকাতি, ধর্ষণ না।’—এর নাম হচ্ছে পেশার প্রতি একনিষ্ঠ থাকা। প্রশিক্ষণ যেখানে, তাতেই মনোনিবেশ করা উচিত।
এরপর তারা সব টাকা ব্যাগে ভরল। এবার শিক্ষানবিশ ডাকাতটা বলল, ‘ওস্তাদ, গুনে দেখি কত পেলাম।’ অভিজ্ঞ ডাকাত ধমক দিয়ে বলল, ‘দূর বোকা, এত টাকা কী করে গুনব! তারচেয়ে টিভি খুলে বসে থাকো, জানতেই পারবে কত টাকা পেলাম।’—এর নাম হচ্ছে অভিজ্ঞতা। আজকাল কাগুজে দক্ষতার চেয়ে অভিজ্ঞতাই বেশি দামি।
ডাকাত দুজন চলে যাওয়ার পর ব্যাংকের এক সহকারী এবার ম্যানেজারকে বলল, ‘স্যার, দ্রুত পুলিশকে খবর দেন।’ ম্যানেজার মৃদু হেসে বলল, ‘আরে অপেক্ষা করুন। আগে ডাকাতির সমপরিমাণ পাঁচ কোটি টাকা দ্রুত সরিয়ে ফেলুন।’—এর নাম হচ্ছে স্রোতের পক্ষে হাঁটা। বিপরীত পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে নিয়ে আসা।
ওই রাতে সংবাদে বলা হলো, ১০ কোটি টাকা ডাকাতি হয়েছে। শুনে দুই ডাকাত বারবার গুনেও পাঁচ কোটি টাকার বেশি অর্থ পেল না। এবার প্রচণ্ড রাগ হলো তাঁদের। শিক্ষানবিশ ডাকাতটা বলল, ‘এটা কী হলো? আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঁচ কোটি টাকা ডাকাতি করলাম। আর ওই ব্যাংক ম্যানেজার বসে বসেই তুড়ি মেরে পাঁচ কোটি টাকা আয় করে ফেলল! তাহলে চোর-ডাকাত হওয়ার চেয়ে শিক্ষিত হয়ে ব্যাংক ম্যানেজার হওয়াই তো ভালো।’—এর নাম হচ্ছে জ্ঞানই শক্তিই, শিক্ষাই সবচেয়ে মূল্যবান।
ব্যাংকের ওই ব্যবস্থাপক এবার খানিকটা হেসে ভাবল, ‘যাক, ব্যাংকের এই পদে আসতে দুই কোটি টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। তারপরেও তিন কোটি টাকা লাভ।’—এর নাম হচ্ছে সুযোগের সদ্ব্যবহার।
তাহলে কে বড় ডাকাত?
শওকত হোসেন: সাংবাদিক।
massum99@gmail.com
Saturday, December 19, 2015
গণতন্ত্রই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সরকারব্যবস্থা -সাক্ষাৎকারে : কৌশিক বসু by শওকত হোসেন
![]() |
| কৌশিক বসু, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক |
প্রথম আলো: অর্থনীতিবিদই হতে চেয়েছিলেন?
কৌশিক বসু: অর্থনীতিতে আমার আসাটা অপ্রত্যাশিত ছিল। কারণ, আমার বাবা আইনজীবী ছিলেন এবং ছোটবেলা থেকেই মানুষ হয়েছি যে বড় হয়ে আইনজীবী হব। আমাকে আইন পড়তে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল। কথা ছিল গোড়ায় একটু অর্থনীতি পড়ে তারপর আইন পড়ব। কিন্তু তখন আমার ওপর বিরাট একটা প্রভাব ফেলল অমর্ত্য সেনের লেকচার। তিনি তখন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াচ্ছেন। অভূতপূর্ব অমর্ত্যদার লেকচার। সেই লেকচার শুনে এত বেশি উৎসাহ পেলাম যে সিদ্ধান্ত নিলাম অর্থনীতিই পড়ব। সেই থেকে অর্থনীতিতেই আমার ক্যারিয়ার। গোড়ার দিকে দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকসে অনেক বছর। এরপর আমেরিকায় চলে আসি। তারপর আবার ভারতে ফিরে এলাম। তখনকার দিনে কিন্তু পিএইচডি করে তেমন কেউ ফিরত না। আমি সেই স্বল্প কয়েকজনের একজন, দেশে ফিরে এসেছিলাম। এই হচ্ছে আমার অর্থনীতিতে আসার গল্প।
প্রথম আলো: একজন বাঙালি অর্থনীতিবিদ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনার কাজ করার অভিজ্ঞতাটি কেমন?
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকে খুবই ভালো অভিজ্ঞতা আমার। তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছি। একটা হচ্ছে বৈশ্বিক সংযোগ, যেটা আমি খুব উপভোগ করি। বিভিন্ন দেশে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে কথা বলা। আমি একবার লিখেছিলামও যে আমার ভেতরে অর্থনীতির সঙ্গে নৃতত্ত্বের একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে। কারণ, একজন নৃতাত্ত্বিক গ্রামে গিয়ে বসে থাকে। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এটা আমার সব সময়ই খুব ভালো লাগে। বিশ্বব্যাংকে এসে সেই অভিজ্ঞতাটি পাচ্ছি। বিভিন্ন দেশে গিয়ে তাদের নীতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলা, গল্প করা—এসব তো মজাই। বাংলাদেশে আসাটা ভিন্ন কিছু না আমার জন্য, কারণ পাশের কলকাতায় মানুষ হয়েছি। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন ছোট্ট একটা দ্বীপরাষ্ট্রে চলে যাই, সাব-সাহারান আফ্রিকার কোনো দেশে যাই, সেটা একদম অন্য ধরনের পরিস্থিতি, তখনকার সেই অভিজ্ঞতা অন্য রকম। এর সঙ্গে দৈনন্দিন প্রশাসনিক চাপ তো আছেই। এটা হচ্ছে এসব সুবিধা পাওয়ার একটা মূল্য।
প্রথম আলো: আপনি যখন অর্থনীতিবিদ ছিলেন, তখন একরকমভাবে বিশ্বব্যাংককে দেখেছেন, হয়তো সমালোচনাও করেছেন। আবার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সময় আরেকভাবে দেখেছেন। এখন আপনি নিজেই বিশ্বব্যাংকে কাজ করছেন। অভিজ্ঞতাগুলো কী রকম?
কৌশিক বসু: আমি জানি, বিশ্বব্যাংক বিশাল একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। এর ভেতরে তার একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। আমি যখন ভারতে কাজ করি, তখন কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমার অনেক কথাই হতো। আমি অনেক কিছু জানতে চাইতাম। ব্রাজিলে একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা কীভাবে হয়েছে, সেটা জানতে চাইতাম। এ ব্যাপারে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল যে এটা একটা অনেক বড় কার্যকরী প্রতিষ্ঠান এবং আমি তাদের সঙ্গে সেই সম্পর্কটাই রাখব।
প্রথম আলো: ক্যারিয়ারের শুরুতে কখনো বিশ্বব্যাংকে কাজ করতে চাননি?
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কিন্তু আমার প্রথম কথাবার্তা হয়েছিল আরও আগে, যখন আমি পিএইচডি শেষ করি। বিশ্বব্যাংকে ইয়াং প্রফেশনাল নামে একটি কর্মসূচি আছে, সেখানে গেলে সারা জীবনের জন্য চাকরি হয়ে যায়। আমি আবেদন করলাম। ইন্টারভিউতে ডাকল। শেষ রাউন্ডের ইন্টারভিউ হলো প্যারিসে। বিশ্বব্যাংকের চাকরি বলে আমার বাবা-মা খুব উত্তেজনার মধ্যে ছিলেন। আমি যদিও খুব বেশি উত্তেজনার মধ্যে ছিলাম না। পেলে ভালো, না পেলে না। চাকরি কিন্তু পেলাম না। পাস করতে পারলাম না শেষ ইন্টারভিউতে। আমি এখন সত্যি মনে করি, জীবনের কিছু কিছু ব্যর্থতা আশীর্বাদও হয়।
আমি আপাদমস্তক একজন গবেষক। যদি বিশ্বব্যাংকের ওই চাকরিতে চলে যেতাম, তাহলে এটা আর হতো না। তাহলে পুরো চাকরিজীবন আমার আরেক ধরনের হতো। আমি যা করেছি সত্যিই আমি উপভোগ করতাম। আমার কাছে পেপার লেখা বা ক্লাসরুম লেকচার দেওয়া সত্যি দারুণ আনন্দদায়ক। আমি আমার নিজে ছেলেমেয়েদেরও বলি যে আমি ভাগ্যবান। কারণ, আমি যা করতে ভালোবাসি, তা করতে পেরেছি। একটা চাকরি ভাগ্যে পাইনি, আর আইনটা যদি পড়তাম, তাহলে কলকাতাতেই থেকে যেতাম, পৈতৃক আইন পেশারই হয়তো চর্চা করতাম।
প্রথম আলো: একাধিকবার আপনার লেখায়, বক্তৃতায় বলেছেন আপনি গবেষণাকেই বেশি পছন্দ করেন। আর গবেষণা হচ্ছে একটা খেলার মতো, অনেকে হয়তো একই বিষয় নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু সবার আগে যিনি কাজটা শেষ করতে পারবেন তিনিই বিজয়ী। এটা কি এখন মিস করেন?
কৌশিক বসু: আমার কাছে গবেষণাটা মনে হয়, এটা একটি লজিক। আমি এতে আগ্রহ পাই। অমর্ত্যদার গোড়ার কাজ ছিল পুরোপুরি লজিকনির্ভর। তিনি গাণিতিক লজিক ব্যবহার করতেন অর্থনীতিতে। এটা আমার প্যাশন। সেটা আমি উপভোগ করতাম এবং এখন মিস করি। তবে ভাগ্য ভালো যে বিশ্বব্যাংকে একটা বড় গবেষণা বিভাগ আছে। তারা আমার অধীনে। যদিও এমন নয় যে আমি তাদের সঙ্গে বসে গবেষণা করতে পারছি। আবার কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের আমি শ্রদ্ধা করি, তাঁদের সঙ্গে কিন্তু আমি এখন কাজ করতে পারছি। এ জন্য ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদ দেব। সম্প্রতি আমি জোসেফ স্টিগলিজের সঙ্গে কাজ করেছি। ইউরো জোন-সংকট কীভাবে ভালোভাবে মোকাবিলা করা যায়, তার একটি অংশ নিয়ে একটা পেপার লিখেছি। এখানেও আমরা আবার ‘গেম থিউরি’ ও গেম থিউরির লজিক ব্যবহার করেছি। তারপরেও বলব, গবেষণাকে আমি অনেক মিস করি এটাই সত্য।
প্রথম আলো: শুনেছি, আপনার কাজ প্রসঙ্গে আপনার মাকে নিয়েএকটা মজাদার স্মৃতি আছে?
কৌশিক বসু: এই অংশটা মজাদার। আমি লিখেছিও। আমার মা মারা যান ৯১ বছর বয়সে। শেষ দুই বছর মা শব্দ একটু গুলিয়ে ফেলতেন। একবার আমি কলকাতায় এসে মাকে বললাম যে একটা কনফারেন্সে যাচ্ছি। আর মাকে যেমন বাড়িয়ে-টাড়িয়ে বলতে হয় সে রকমভাবে খুশি করতে বললাম, সারা বিশ্বের বড় বড় ইকোনমিস্ট আসছেন। আমাকেও যেতে হবে। তারপর শুনি, মা কাকে যেন বলছে আমার ছেলে খুব ভালো করছে, একটা কনফারেন্সে যাচ্ছে, যেখানে সারা পৃথিবীর কমিউনিস্টরা আসবে।
প্রথম আলো: এবার একটু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। আপনি ২২ বছর পর বাংলাদেশে এলেন। এসে অনেক প্রশংসাও করছেন। আপনার এত প্রশংসার ভিত্তি কী?
কৌশিক বসু: একটা বিষয় আছে যে নিজেদের লোকেরা অনেক বেশি সমালোচনা করেন। ভারতেও সেটা দেখি। এর মাধ্যমে সরকার বা নীতিনির্ধারকেরা কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য হন। এটা ভালো। তবে এখানে এসে আমার নিজের যা মনে হয়েছে সেটাই বলেছি। কেবল একজন বাঙালি বলে নয়, আমি ওয়াশিংটনে বসে পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখেছি। আমার ওখানে প্রসপ্রেক্টস গ্রুপ নামে একটি বিভাগ আছে। তাদের ডেকে আমি বাংলাদেশের তথ্য-উপাত্ত ঘাঁটছিলাম। তারাও আমাকে জানাল যে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এখন খুব কম জায়গায়ই হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবৃদ্ধি এখন ১ শতাংশেরও কম। ব্রাজিলে মাইনাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ভেনেজুয়েলাতেও নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি। জাপানে তৃতীয় প্রান্তিকে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফিনল্যান্ডে আমি ছিলাম, তারই ভেতরে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধির খবর এল। বিশ্বব্যাপী এ রকম এক মন্দার সময়ে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। এটা এখানকার লোকদেরও বোঝা দরকার। তাদেরও প্রশংসা করা উচিত। কার জন্য হচ্ছে সেটা জানি না, কিন্তু এটা অবশ্যই বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি।
আমাদের নিজস্ব প্রাক্কলন হচ্ছে আগামীবার বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা হবে চীনের প্রবৃদ্ধির সমান। পাঁচ বা সাত বছর আগেও ভাবা যেত না যে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে চীনের সঙ্গে পাল্লা দেবে বাংলাদেশ। ভারতের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হবে। বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র কিন্তু অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের মানুষের আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। আবার একটা কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আশাবাদটা আমি দিতেও চাই। কারণ, এটা একসঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগ্রহ জন্ম দেয়।
প্রথম আলো: বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির বাধা প্রসঙ্গে আপনি জঙ্গিবাদ নিয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন। রাজনৈতিক কিছু সমস্যার কথাও বলেছেন। একটু ব্যাখ্যা করবেন?
কৌশিক বসু: পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই এখন রাজনৈতিক ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। আমরা বিশ্বব্যাংক থেকে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে দেখছি যে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আরও কমে গেলে এর কিছু প্রভাব পড়বে। চীনের অর্থনীতির গতি শ্লথ হলে এর ফলাফল হবে। কিন্তু এখন রাজনৈতিক ঝুঁকিটাকেই উচ্চমাত্রায় বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ঝুঁকি সব দেশের জন্যই। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো জায়গায় নেই। কিন্তু অবশ্যই অনেক সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যেতে পারে, যদি সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি থাকে। ভারতকে এ জন্য চিন্তা করতে হবে, বাংলাদেশকেও চিন্তা করতে হবে। সচেতন থাকতে হবে। তবে ভাগ্য ভালো, এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি তা অত্যন্ত স্থিতিশীল। হ্যাঁ, কিছু ঘটনা তো ঘটেছেই। সব দেশেই তা হয়। তবে অবশ্যই যতটা সম্ভব তা কমানো যায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। তবে আমি বলব, সাধারণ মানুষদের বুঝতে হবে যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধ কেবল সরকারকে দিয়ে হয় না। সাধারণ মানুষেরা যদি অনুভব করে যে সমাজ আগালেও সন্ত্রাসবাদ তা নষ্ট করে দিতে পারে,তাহলে সাধারণ মানুষদেরও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধে যুক্ত হতে হবে। তাহলেই এর ঝুঁকি কমবে। সাধারণ মানুষের প্রতি আমার এটাই পরামর্শ। আর হ্যাঁ, দুর্নীতির মাত্রা নিয়ে মানুষেরা অনেক রেগে যায়। রাগার কথাও। তাই বলে পুরো দেশটাই যে নষ্ট হয়ে গেছে তা নয়। দুর্নীতিবাজদের ধরতে হবে, ব্যবস্থাও নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধের যুদ্ধটাও চালিয়ে যেতে হবে।
প্রথম আলো: গণতন্ত্রের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্কটা তাহলে আপনি কীভাবে দেখেন?
কৌশিক বসু: আমার মতামত অমর্ত্যদার কাছাকাছি, তবে একদমই এক নয়। একনায়ক বা ‘ডিকটেটরিয়াল কন্ট্রোল’ যেসব দেশে আছে, সেখানে অভিজ্ঞতাটা বিভিন্ন রকমের দেখা গেছে। কোনো কোনো দেশ খুবই ভালো করছে, আবার পুরোপুরি বিপর্যয়ও হয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও বিপদ দুটোই।
এ ক্ষেত্রে প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আমার এই চাকরির একটা আনন্দ যে অনেক চমকপ্রদ মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। নিকারাগুয়ার বিপ্লবী নেতা ও প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার সঙ্গে মানাগুয়াতে দেখা করেছিলাম। আমিই তাঁর সাক্ষাৎ চেয়েছিলাম। বলেছিলাম সামোজা সরকারের বিরুদ্ধে সান্দানিস্তাদের সংগ্রাম নিয়ে ছাত্রজীবনে আমার খুব আগ্রহ ছিল। এ কারণে সান্দানিস্তার সেই বিপ্লবী নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তারপর তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। নিকারাগুয়ায় একনায়ক সামোজা সরকারের সময়ে কিন্তু বিপর্যয় ঘটেছিল। পুরো দেশ বড় সংকটে পড়ে গিয়েছিল। এ রকম প্রচুর উদাহরণ আছে।
আবার কিছু কিছু দেশ আছে, যাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্ত এবং তারা ভালো করছে। চীন এ রকম একটি বড় উদাহরণ। তাদের সরকার অনেক শক্তিশালী এবং করছেও অনেক ভালো। আরেকটি উদাহরণ সিঙ্গাপুর। কিন্তু যদি বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে বেছে নেওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। সেটা ঠিক হবে না। কারণ, বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, গণতন্ত্র ছাড়া শক্ত নিয়ন্ত্রণ পুরো দেশকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। ১৯৬০ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি মন্দ ছিল না। তারপরে তা বিশ্রী কাণ্ড হয়ে গেল।
আমি এ ব্যাপারে খুবই দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে গণতন্ত্রই একমাত্র কাঙ্ক্ষিত বিষয়। উন্নয়নের জন্য সরকার ও মানুষকে অবশ্যই গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে হবে। গণতন্ত্রে অনেক সমস্যা আছে। প্রথমত, নীতি সংস্কার ঝটপট করা যায় না। ভারতে কাজ করে দেখেছি, সবারই একটা মতামত আছে। একটা নীতি বদল করতে গেলে চারদিক থেকে বিভিন্ন মতামত আসে। কিন্তু আমি তখন সরকারকে বলতাম, এটা একটা সমস্যা বটে কিন্তু এর মধ্যেই থাকতে হবে। আর মানুষকেও বলা, তাদেরও দায়িত্বপূর্ণ হতে হবে। সবকিছুতে বাধা দিয়ে সরকারকে থামিয়ে দিলে দেশ অচল হয়ে যাবে। গণতন্ত্র এমনই একটা জিনিস, যা আস্তে আস্তে পরিপক্ব হয়। আমি যখন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর দিকে তাকাই, তখন মনে হয় অনেক দিক থেকেই তাদের গণতন্ত্র অনেক পরিপক্ব। সেখানেও অনেক বিতর্ক হয়, সমালোচনা হয়। কিন্তু তারপরেও পুরো সমাজ তাতে অংশ নেয় এবং এর মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। সুতরাং কোনো প্রশ্নই নেই যে গণতন্ত্রই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সরকারব্যবস্থা।
প্রথম আলো: আবার বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রসঙ্গে আসি। আপনি বাংলাদেশের বিনিয়োগ হারের প্রশংসা করেছেন। অথচ দেখছি বেসরকারি বিনিয়োগ ১০ বছর ধরেই এক জায়গায়, ২২ শতাংশে স্থির হয়ে আছে। সরকার নিজের বিনিয়োগ বাড়িয়ে সেটিকে জিডিপির ২৯ শতাংশে নিয়ে গেছে। যদিও এই বিনিয়োগের গুণগত মান নিয়ে বিশ্বব্যাংকেরই বড় ধরনের অভিযোগ আছে।
কৌশিক বসু: দেখুন, সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিন্তু যথেষ্ট ভালো। এটাও সত্যি, বাংলাদেশের পক্ষে ৮ শতাংশে যাওয়া সম্ভব। আমার তো ধারণা, বিনিয়োগের হার ৩২-৩৩ শতাংশে এসে গেলে প্রবৃদ্ধিও বেড়ে যাবে। এর মধ্যে যদিও বিশ্ব অর্থনীতির ওঠানামার সঙ্গে একটা সম্পর্ক থাকবেই। তবে দীর্ঘ মেয়াদে তা বাড়বে। আর সরকারি বিনিয়োগের কথা যা বললেন, ভারতেও কিন্তু তাই হয়েছে। ভারত বিনিয়োগের হার ৩০ শতাংশ অতিক্রম করল ২০০৩ সালে। তার চার-পাঁচ বছর আগ পর্যন্ত তা ২২-২৩ শতাংশে আটকে ছিল। এরপর চরচর করেগোটা কয়েক বছরে তা বেড়ে গেল। তখন সরকার সঞ্চয়ের ভূমিকায় চলে গেল, যা তারা আগে ছিল না। বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কিন্তু মোটামুটি ভালো হচ্ছে। সরকার সঞ্চয় না করে বিনিয়োগকারীর ভূমিকায়। বেশির ভাগ দেশও তাই করে। তবে এখানে যে জায়গায় মনোযোগ দিতে হবে, তা হচ্ছে বৈদেশিক বিনিয়োগ আরও আনতে হবে। এখন জিডিপির ১ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তা খুব খারাপ নয়। কিন্তু এই হার আরও বাড়িয়ে ২ বা ৩ শতাংশে আনা যেতে পারে। এ জন্য অবশ্যই অবকাঠামোকে আরও ভালো করতে হবে। বাইরে থেকে যারা আসছে তারা বিদ্যুৎ চায়, রাস্তা চায়, পথটা দিয়ে তাড়াতাড়ি যেতে চায়, ব্যবসার পরিবেশ অনেক ভালো চায়। যাতে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলো আরও দ্রুত হয়।
আমি যখন ভারতে কাজ করতাম, তখন আগে উপনিবেশ হিসেবে ছিল, এ রকম দেশগুলোর সঙ্গে অনেক কথা বলেছি। মনে আছে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে অনেক সময় কাটাতাম। সবাই উত্তরাধিকারসূত্রে একই ব্যবস্থা পেয়েছি। বাংলাদেশও পেয়েছে। কিন্তু ব্রিটেন নিজে সংস্কার করেছে। ওদের ফাইল চলার গতি অনেক দ্রুত। অস্ট্রেলিয়াও প্রচুর সংস্কার করেছে। অথচ আমরা সেই ঔপনিবেশিক চর্চা বদলাতে পারিনি। সুতরাং আমাদের এদিক থেকে দ্রুত আগাতে হবে, যাতে ফাইল দ্রুত আগায়। নীতি বদল করে এটা করা যায়। আবার আমাদের আমলাদের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে, যাতে তারাও দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শামিল হয়। সুতরাং বলতে পারি, অবকাঠামোর যদি আরও উন্নতি করা যায়, আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে। কারণ, এখানে সস্তা শ্রমের বড় আকর্ষণ আছে। চীনের সেই সুবিধা কিন্তু চলে গেছে। সেখানে মজুরি বেড়ে যাচ্ছে। ভারতে মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে কিছু বেশি হলেও ভারত আরও কয়েক বছর এই সুবিধা পেতে থাকবে। চীন যে জায়গাটা ছাড়বে সেটি এত বড় যে ভারত তো খুব ভালোভাবেই পাবে, বাংলাদেশও পাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হবে না। দুই দেশই বিশ্বকে দিয়ে যেতে পারবে।
প্রথম আলো: আপনি আমলাতন্ত্র বা দুর্নীতির যে কথা বলছেন তা সুশাসনের অংশ। আগে বিশ্বব্যাংক এ নিয়ে অনেক সোচ্চার ছিল। কিন্তু এখন আর তেমন শোনা যায় না। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বদলের পরে। আপনারা কি নীতির পরিবর্তন এনেছেন?
কৌশিক বসু: আমি তো তিন বছর ধরে বিশ্বব্যাংকে আছি। এমন তো মনে হয় না। আমরা যে ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট তৈরি করি, তার পরেরটা বের হচ্ছে ‘ডিজিটাল টেকনোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামে। এটি বের হবে আগামী জানুয়ারিতে। পরেরটি বের হবে ‘গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রুল অব ল’ শিরোনামে। আমরা জানি, এটা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিতর্ক তৈরি হবে। এখানে দুর্নীতির ওপর আলোচনা থাকবে, সরকার পরিচালনা নিয়ে আলোচনা থাকবে। আর আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা যখন সরকার পরিচালনা ও দুর্নীতি নিয়ে করা হয়, তখন বুঝতে হবে এ নিয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছি।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে চায়। ৭ বা ৮ শতাংশে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চায়। এ ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কৌশিক বসু: ভালোভাবে শাসন পরিচালনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর প্রবৃদ্ধির কথা বলতে পারি, এটা কম-বেশি ‘অটো পাইলটের’ মতো করে চলবে। আর যেটা বললাম, অবকাঠামো আর আমলাতন্ত্র কমালে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হতে পারবে। কিন্তু সুশাসন এমন একটা বিষয়, যেখানে সাধারণ মানুষ অনেক স্বস্তি বোধ করে। কিন্তু কাজটা অত্যন্ত কঠিন। আমরা যে বলি সুশাসন বাড়াও, এটা আসলে খুবই জটিল প্রক্রিয়া। চাইলেও অনেক সময় করা যায় না। আমি যখন ভারতে কাজ করতাম, দেখতাম অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কাজটা করতে চায়। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে, সেটাই বুঝতেন না। আমরা আশা করছি, কীভাবে সরকার পরিচালনার মান বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আমাদের পরবর্তী রিপোর্টে অনেক আইডিয়া দিতে পারব।
প্রথম আলো: একটু প্রসঙ্গ বদল করি। প্রশ্নটা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ট্রানজিট নিয়ে। এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু একটি সাধারণ ধারণা হচ্ছে, ভারত যা চায় তাই পাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রাপ্তি কম। এ ধারণা থেকে সাধারণ মানুষদের বের করার উপায় কী?
কৌশিক বসু: দেখুন, এটা হতে বাধ্য। একটা বড় দেশের সঙ্গে যখন লেনদেন হয়, তখন মনেই হয় যে বড় দেশটিই বেশি পাচ্ছে। ভারত যখন আমেরিকার সঙ্গে কোনো চুক্তি করে, তখন ভারতেও বলা হয় আমেরিকা বড় অংশটাই পেল, ভারত পেল না। একটা কথা অবশ্যই বলব যে নিজের স্বার্থ নিজেকেই দেখতে হবে। যখন আরেক দেশের সঙ্গে একটা ডিল বা চুক্তি করা হয়, তখন সে নিজের স্বার্থ দেখছে, বাংলাদেশ দেখছে তারটা। তবে দুটো দিকই ভুল আছে। লোকেরা ধরে নেয়, যাকে আমরা অর্থনীতির ভাষায় বলি ‘জিরো সাম গেম’, ওর লাভ হওয়া মানে আমার ক্ষতি হচ্ছে। সুতরাং যে-ই দেখা গেল একটা ডিল হওয়ার পর ভারতে সবাই উৎসব করছে, তখন তুলনামূলক আরেকটি ছোট দেশের মনে হবে ওরা উৎসব করছে মানে তাদের ক্ষতি হয়ে গেল। এটা ঠিক নয়। অর্থনীতিতে এমন অনেক ডিল আছে, যা থেকে উভয় দেশই লাভবান হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, ভালোভাবে চুক্তি করতে পারলে তা উভয়ের জন্য ভালো হয়। ভারত যখন আরেক দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে যাবে, তখন প্রধানত দেখা হয় কী লাভ হবে। কারণ, কেউ তো চ্যারিটি করতে যায় না। বাংলাদেশও দেখবে তাদের জন্য কী লাভ থাকবে। এই যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বা ট্রানজিট—এ থেকে কারোরই ক্ষতি নেই। মেধাভিত্তিক সামর্থ্য দুটো দেশেরই যথেষ্ট আছে। আমি সত্যিই মনে করি, ভারতের সঙ্গে খুব ভালোভাবে আলোচনা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। এই পরামর্শ আমি সবাইকে দিই না, বিশেষ করে যাদের সেই সক্ষমতা নেই। বরং তাদের বলি, বহুজাতিক কারও সঙ্গে ডিল করবে খুব সাবধানে। একটা খারাপ চুক্তি করলে সারা জীবন পস্তাতে হবে। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা নয়। দুই দেশেরই সামর্থ্য আছে। আর সম্প্রতি যে চুক্তিগুলো হয়েছে, আমি তো মনে করি, তা থেকে উভয় দেশের জন্যই সুবিধা পাওয়ার অনেক সুযোগ আছে, সুবিধা পাবেও।
প্রথম আলো: পদ্মা সেতুর পুরো ঘটনা নিয়ে বিশ্বব্যাংক কী শিক্ষা পেল?
কৌশিক বসু: কী শিক্ষা পেলাম জানি না। তবে এইটুকু জানি, ইতিহাস যা-ই হোক না কেন, হতে পারে ওই ইতিহাসটির কারণেই ফল যেটা এসেছে, সেটি খুবই ভালো হয়েছে। এই ফল হয়তো হতো না, যদি ওই ঘটনা না ঘটত। আমি বলছি না যে আবার ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক, তবে নিজে থেকে পদ্মা সেতু করার কথা কিন্তু সাত-আট বছর আগে ভাবাও যেত না। এটা হচ্ছে শেষ পাঁচ-ছয় বছরের ব্যাপার। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ, ২০০৯-এ ছিল ৮ বিলিয়ন। এখন ২৭ বিলিয়ন। সুতরাং বাংলাদেশ এখন যা পারে, তা সাত-আট বছর আগেও ভাবতে পারত না। আমার কাছে মনে হয়, একটা দেশ করতে পারে এবং করে দেখাচ্ছে। আর আমি আশা করছি, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও ভালো সংযোগ তৈরি হবে এবং সেটি হবে পার্টনারশিপের ভিত্তিতে। আর আশা করি, আমি অন্তত যত দিন এখানে আছি, আমি সাহায্য করব যাতে পার্টনারশিপ আরও ভালো হয়।
প্রথম আলো: কিন্তু পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক যে অভিযোগ তুলেছিল, তার তো সুরাহা হয়নি। দুর্নীতির ইচ্ছার অভিযোগটা থেকেই গেল। এতে কি দেশের ভাবমূর্তির সংকট হবে?
কৌশিক বসু: ভবিষ্যতে ভাবমূর্তির কোনো ক্ষতি আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে দুর্নীতি এমনই একটা বিষয়, যা প্রতিটা দেশকেই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতি কমানোর পরামর্শ তো আমি সব উন্নয়নশীল দেশকেই দেব।
প্রথম আলো: সব দেশ মিলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়নে অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের কী ভূমিকা থাকবে?
কৌশিক বসু: এটা এখনো একটি ওপেন কোশ্চেন হয়ে আছে। যেটাতে আমাদের সামর্থ্য সেটা হলো, এসডিজির গোটা কতক লক্ষ্য আমরা পরিসংখ্যানের দিক থেকে নিয়মিত নজর রাখব। এই কাজে বিশ্বব্যাংক খুবই ভালো। এই যে দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে আমরা প্রচুর সমালোচনা পাই বটে, কিন্তু বিশ্বব্যাংকের যে গ্রুপ এ নিয়ে কাজ করে, তারা অত্যন্ত দক্ষ। এটা আগে আমি জানতাম না, এখানে এসে দেখি, এ কাজে তারা আসলেই অনেক দক্ষ। কাজটা অত্যন্ত জটিল। এখন সারা পৃথিবীর দারিদ্র্য হার গণনা করা হচ্ছে, যেটাকে আমরা ‘পভক্যালনেট’ বলি, এটা খুব ভালোভাবে করা হয়। আমি আশাবাদী যে এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যের মধ্যে গোটা কয়েকের ক্ষেত্রে এর তথ্য ও উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব নেবে। তবে এটাতে রাজনৈতিক একটা ব্যাপার এসেই যায়। কারণ, কিছু উপাত্ত নিয়ে লোকজন এদিক-সেদিক করতে চায়। আশা করছি বিশ্বব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আর আমি একটা কমিশন গঠন করেছি। আমাদের যে দারিদ্র্য নিরূপণ হয় সেটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে এই কমিশন। সেটার প্রধান হচ্ছেন খুব বড় একজন অর্থনীতিবিদ, টনি অ্যাটকিনসন। কমিটির উপদেষ্টাদের মধ্যে অমর্ত্য সেন আছেন। আমরা যে এখন কেবল দারিদ্র্য হার পরিমাপ করি, সেখান থেকে আরও বৃহত্তর জায়গা থেকে কী করতে পারি, তা নিয়ে কমিশন আমাদের সুপারিশ করবে। দেখেন, ভারতের দারিদ্র্য হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। অথচ অনেক সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে। দারিদ্র্য হার তো শুধু টাকা দিয়ে পরিমাপ করার বিষয় নয়। দারিদ্র্যকে আরও বহুমাত্রিক জায়গা থেকে দেখতে হবে। দারিদ্র্য কেবল ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। এ কমিশন এসব নিয়েই কাজ করছে। রিপোর্টটি পেতে মে-জুন হয়ে যাবে। রিপোর্টটি পেলে এটা আমরা এসডিজির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করব এবং আমাদের কাজটা কী হবে, তাও ঠিক করব তখন।
প্রথম আলো: বিশ্বব্যাংকে ধনী দেশগুলোর কণ্ঠ অনেক বেশি জোরালো, তাদের ভোটাধিকারও বেশি। আপনি আমাদের মতো একটি দেশ থেকে বিশ্বব্যাংকে আছেন। এ বিষয়ে কিছু কি করার আছে আপনার?
কৌশিক বসু: এটা সত্যি যে ধনী দেশগুলোর কণ্ঠ এখানে অনেক বেশি। কিন্তু যেসব দেশের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা কিছুটা ভালো, সে দেশের অনেক মানুষ এখন বিশ্বব্যাংকে কাজ করে। এটা ঠিক যে এসব দেশের ভোটের ক্ষমতা খুবই কম। কিন্তু এখন বিশ্বব্যাংকে কাজ করে প্রচুর ভারতীয়, প্রচুর বাংলাদেশি। এদের উপস্থিতির মাধ্যমে কিন্তু ওই দেশগুলো তাদের কণ্ঠ বাড়াতে পারছে। কারণ, তাদের নিজের দেশের প্রতি একধরনের সম্পৃক্ততা কিন্তু তাদের ভেতর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করে। এই সুবিধা কিন্তু সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর নেই।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
কৌশিক বসু: আপনাকেও ধন্যবাদ।
শেষ হলো শূন্য সুদহারের যুগ by শওকত হোসেন
![]() |
| জ্যানেট ইয়েলেন, চেয়ারম্যান, ফেডারেল রিজার্ভ |
সুদহার সামান্য বাড়লেও বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব অতটা সামান্য হবে না। এর প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকা মার্কিন অর্থনীতিকে একটু টেনে ধরার জন্যই সুদহার বাড়ানো হয়েছে। এতে অবশ্য অনেক দেশের ক্ষেত্রে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে। আর যুক্তরাষ্ট্র সেটাই চায়।
গত বুধবার ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জ্যানেট ইয়েলেন এই সুদহার বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এর আগে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি বা এফওএমসি এ নিয়ে দুই দিন বৈঠক করেছে। বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে সুদহার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। এরপর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, অর্থনীতি চাঙা হচ্ছে আর এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। কমিটি মনে করছে, এই অবস্থায় ফেডারেল ফান্ডের সুদহার সামান্য বাড়ানোই যথাযথ হবে।
ফেডারেল রিজার্ভের এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়েই। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন পর্যন্ত যত সিদ্ধান্ত হয়েছে তার মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে প্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত। জরিপেও দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনই নিশ্চিত ছিল যে এই ঘোষণা আসবে। ফলে সব পক্ষই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এবং বাজারও সেভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সর্বশেষ সুদের হার বাড়িয়েছিল ২০০৬ সালে। এরপর তা কমে ২০০৮ সালে শূন্যের কাছাকাছি পৌঁছায়। সুদ হার ছিল দশমিক ২৫ শতাংশ, যাকে প্রায় শূন্যই বলা যায়। বড় ধরনের মন্দার সময় যুক্তরাষ্ট্র শূন্য সুদহারের নীতি নিয়েছিল। এখন দেশটি মনে করছে সেই নীতি থেকে সরে আসার সময় হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের আশা, এবার প্রবৃদ্ধি আরেকটু বাড়বে, হবে ২ দশমিক ৪ শতাংশ।
প্রায় এক দশক আগে ফেডারেল রিজার্ভের সে সময়ের চেয়ারম্যান বেন বার্নানকে সুদহার শূন্যে নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। প্রত্যাশা ছিল, এর ফলে মানুষের হাতে বাড়তি টাকা আসবে, ঋণ সস্তা হবে, উৎপাদন বাড়বে, অর্থনীতি চাঙা হবে। এটা সত্যি, তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে। ইউরোপ মন্দা থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। চীন ও অন্যান্য উঠতি অর্থনীতির দেশও নানা সংকটে আছে। এ অবস্থায় মূলত ২০১৩ সাল থেকেই মুদ্রানীতি বদলের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে সুদহার বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছিল। এর মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে বাড়ানোর কথাও হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ের অর্থনীতির টালমাটাল পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত আর এ পথে এগোয়নি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। বিশেষ করে গত আগস্টে চীন হঠাৎ করে তাদের মুদ্রা ইউয়ানের দুই দফা অবমূল্যায়নের পর বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাযুদ্ধ শুরু হয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির হার নিয়ে কিছুটা দ্বিধা থাকায় পিছিয়ে যায় ফেডারেল রিজার্ভ।
মূলত দুটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে মুদ্রানীতি পরিচালনা করে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ। এর একটি হচ্ছে সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান, অন্যটি স্থিতিশীল মূল্যস্তর। সাধারণত অর্থনীতি যখন দুর্বল থাকে তখন মূল্যস্ফীতিও কমতে থাকে। আবার অর্থনীতি যখন সর্বোচ্চ কর্মসংস্থানের দিকে যায় তখন মজুরি বাড়ানোর চাপ তৈরি হয় এবং এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকে। অর্থনীতি খুব দ্রুতগতিতে এগোতে থাকলে ফেডারেল রিজার্ভ তার বেঞ্চমার্ক সুদহার বাড়িয়ে দেয়। তাতে মানুষ খরচ কমিয়ে দেয় এবং সঞ্চয় বেশি করে। এর ফলে অর্থনীতি একটু শ্লথ হয় এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যায়। আবার অর্থনীতি বেশি শ্লথ হয়ে গেলে ফেড তখন সুদহার কমিয়ে দেয়। যেমন ২০০৮ সালের মন্দার পর কমাতে কমাতে প্রায় শূন্য হারে নিয়ে আসা হয়েছিল।
ফেডারেল রিজার্ভ মনে করছে, মূল্যস্ফীতি এখন কম। তেলসহ অন্যান্য পণ্যের দাম কম থাকায় চাপটি কমই থাকবে। কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও যথেষ্ট ভালো। সুতরাং এখন সুদহার কম থাকায় মানুষ হয়তো ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ বাড়াবে, যা ভবিষ্যতের জন্য ভালো হবে না। ফলে এখনই সুদহার বাড়ানোর উপযুক্ত সময়।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, সুদহার বাড়ানোর ফলে শক্তিশালী থাকা ডলার আরও শক্তিশালী হবে। আর এতে অনেক দেশ ও কোম্পানি ঋণ নিতে সমস্যায় পড়বে। আর এতে ঝামেলায় পড়বে ইউরোপ। মন্দাকবলিত ইউরোপ এখন ঋণ নেওয়া আরও সহজ করতে চাচ্ছে। আর যুক্তরাষ্ট্র নিল উল্টো পথ।
তবে খুব প্রত্যাশিতভাবেই ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী সুদহার বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব দেখা দিয়েছে। ইউরোপিয়ান শেয়ারের দর কিছুটা বেড়েছে। ডলারের মানও বেড়েছে। আবার লন্ডন আন্তবাজার সুদহার বা লাইবর ২০০৯ সালের পর বেড়ে হয়েছে সর্বোচ্চ। তবে তেলের দাম কমেছে। এখন আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে ইউরোপ ও উঠতি অর্থনীতি আরও কী প্রতিক্রিয়া দেখায় তার জন্য। তবে শেষ কথা হচ্ছে সস্তায় বিনিয়োগের দিন আপাতত শেষ।
Thursday, December 3, 2015
এক লাখ কোটি অলস টাকা নিয়ে বসে আছে ব্যাংক by শওকত হোসেন
আক্ষরিক অর্থেই টাকা নিয়ে বসে আছে ব্যাংক। কিন্তু ঋণ নিচ্ছেন না শিল্পোদ্যোক্তারা। বাড়ছে না বেসরকারি খাতের ঋণ নেওয়ার হার। দেশে নতুন বিনিয়োগ তেমন হচ্ছে না। এর ফলে ব্যাংকে বাড়ছে অলস টাকার পরিমাণ। দেশে না করলেও উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগের জন্য দেশের বাইরে যেতে চাচ্ছেন।
অর্থনীতির তত্ত্ব অনুযায়ী, অর্থনীতির গতি বাড়লে ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত বা উদ্বৃত্ত তারল্য থাকে না। অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, দেশের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছে তা হয়তো বলা যাবে না, তবে একধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। গতি কমেছে অর্থনীতির। তারই প্রমাণ হচ্ছে ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অলস অর্থ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে মূলধনের অভাব নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আর উদ্যোক্তারা বলছেন, তাঁরা বিনিয়োগ করতে চান। অর্থও আছে। কিন্তু দেশে বিনিয়োগের পরিবেশের ঘাটতি আছে। অবকাঠামোর সমস্যা তো ছিলই। নতুন করে গ্যাস পাওয়া নিয়ে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিনিয়োগ না বাড়ার এখন সবচেয়ে বড় কারণ গ্যাস-সংকট। নতুন করে গ্যাসের সংযোগ আর সরকার দিচ্ছে না। আবার দাম বেশি দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ।
অলস টাকার পাহাড়: নিয়মানুযায়ী দেশের ব্যাংকগুলোকে নগদ ও বিধিবদ্ধ (সিআরআর ও এসএলআর) বিভিন্ন উপকরণে অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। সব মিলিয়ে এ জন্য রাখতে হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে দৈনন্দিন লেনদেনের জন্য রাখতে হয় আরও কিছু নগদ অর্থ। অথচ এখন আছে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ নগদ অর্থ বেশি আছে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত তারল্য ছিল প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। বিনিয়োগ স্থবিরতায় অলস টাকা তিন গুণ বেড়েছে বলেই ব্যাংকাররা জানান।
ব্যাংকে টাকা অলস থাকার বিষয়টি মূলত সরবরাহ-জোগানের ওপর নির্ভর করে। এখন অর্থের সরবরাহ ঠিক আছে। কিন্তু চাহিদা নেই। এমনিতেই বিনিয়োগ কম। তার ওপর দেশের উদ্যোক্তারা এখন বিদেশ থেকে কম সুদে ঋণ নিতে পারছে। ফলে ঋণের চাহিদা আরও কমে গেছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান, বেসরকারি মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘একসময় আমরা ব্যাংকাররা বলতাম তারল্যের সংকটের কথা। এখন অতিরিক্ত তারল্যই বরং সংকটে পরিণত হয়েছে।’
এ পরিস্থিতিতে অর্থ অলস পড়ে থাকায় ব্যাংকের লাভ কমে যাচ্ছে বলে জানালেন মোহাম্মদ নুরুল আমিন। তিনি বলেন, লাভ কমলে লভ্যাংশও কম হবে। লাভ কমলে খরচ কমানোর কথাও ভাবতে হয়। পাশাপাশি সরকারেরও রাজস্ব আয় কমছে। ব্যাংকগুলো কিন্তু বৃহৎ করদাতা ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত। করপোরেট কর দিতে হয় ৪০ শতাংশ। ১০০ কোটি টাকা মুনাফা কমা মানেই সরকার পেল না ৪০ কোটি টাকা। মূলত গত বছর থেকেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিনিয়োগের বিদেশ যাত্রা: দেশের মধ্যে বিনিয়োগ পরিবেশ না থাকায় দেশের উদ্যোক্তারা এখন বিনিয়োগ করতে চান বিদেশে। দেশের বাইরে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ দেশের উদ্যোক্তাদের হাতে আছে বলেও জানালেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে কয়েকজন উদ্যোক্তা বিদেশে বিনিয়োগ করার অনুমোদন চেয়েছেন। এর মধ্যে বস্ত্র ও পোশাক খাতের দুলাল ব্রাদার্স (ডিবিএল) ইথিওপিয়ায় কম্পোজিট টেক্সটাইল মিল করার অনুমোদন পেয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা এখন ইথিওপিয়া ছাড়াও হাইতিতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এরই মধ্যে হংকংয়ে বাংলাদেশের কয়েকজন ব্যবসায়ীকে দাওয়াত করে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে ইথিওপিয়াও বিনিয়োগে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের সুযোগ-সুবিধাগুলোর কথা বলেছে।
এ কে আজাদ প্রথম আলোকে জানান, হাইতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পতম সময়ে পণ্য পাঠানো যায়। সেখানে আছে জলবিদ্যুৎ, যার দাম অনেক কম। আর যে জমিতে শিল্প স্থাপন করা হবে, সেখানকার ভাড়া দিতে হবে না পাঁচ বছর। ইথিওপিয়ার সুযোগ-সুবিধা আরও ভালো। এসব কারণে দেশের উদ্যোক্তারা ওই সব দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ না করে উদ্যোক্তারা কেন অন্য দেশে যেতে চাচ্ছেন, জানতে চাইলে এ কে আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ক্রেতারা চায় সব ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যেও আমরা যেন পণ্য সরবরাহ করতে পারি। সুতরাং হাইতি বা অন্য কোনো দেশে বিনিয়োগ করলে সরবরাহের দ্বিতীয় একটি উৎস সব সময় খোলা থাকবে। তিনিও মনে করেন, গ্যাস-সংকটই এখন দেশে বিনিয়োগ না হওয়ার বড় কারণ।
প্রবৃদ্ধির ফাঁদ: মূলত, বর্তমান সরকার প্রথম থেকেই বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সফল হয়নি। ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর এখন সেই বিনিয়োগ মাত্র দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ। বেসরকারি বিনিয়োগ মূলত বছরের পর বছর একই জায়গায় স্থবির হয়ে আছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছে না বলেই জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারও ৬ শতাংশের ঘরে আটকে আছে। স্বাধীনতার পর প্রতি দশকে বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ১ শতাংশ হারে। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবিরতায় ১২ বছর ধরে দেশের গড় প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ঘরেই। এটিকে এখন বলা হচ্ছে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ফাঁদ। কেবল বিনিয়োগের অভাবে এই ফাঁদ থেকে বের হতে পারছে না দেশ।
বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার জন্য সরকার কয়েক বছর ধরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বাড়িয়েছে। এর ফলে ২০০৮-০৯ সময়ে জিডিপিতে সরকারি বিনিয়োগ ছিল ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, আর এখন সেটি হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। যদিও সরকারি বিনিয়োগের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্বব্যাংক।
সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে এখন বিনিয়োগের হার প্রায় ২৯ শতাংশ। তবে বিশ্বব্যাংক মনে করে, বাংলাদেশের যে মাথাপিছু আয়, সে অনুযায়ী এ দেশে বিনিয়োগের হার হওয়া উচিত ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে বিনিয়োগযোগ্য অর্থ থাকলেও তা বিনিয়োগে আসছে না।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বিনিয়োগ স্থবিরতার চিত্র পাওয়া যায়। ২০১০-১১ অর্থবছরেও বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৪ শতাংশেরও বেশি। সেটি এখন ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের লক্ষ্য ছিল সাড়ে ১৫ শতাংশ।
রিজার্ভের যন্ত্রণা: বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও জমছে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ এখন ২ হাজার ৬৩৪ কোটি ডলার। সাধারণত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান বৈদেশিক মুদ্রার মজুত রাখার রীতি রয়েছে। কিন্তু দেশে এখন প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয়ের সমান অর্থ মজুত আছে। এই অর্থ ব্যয়েরও পথ পাচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ৮৫ শতাংশই এখন বাংলাদেশের বাইরে রাখা আছে এবং এ জন্য বাংলাদেশের আয় হচ্ছে মাত্র ১ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে যে ৪৮৯ কোটি ডলার ঋণ নিয়েছে, তার গড় সুদ হচ্ছে ৪ শতাংশ। ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকেও তেমন আয় হচ্ছে না।
Friday, August 7, 2015
আবদুল হাই বাচ্চুকে ধরার সাধ্য কার? সংবাদ বিশ্লেষণ: বেসিক ব্যাংকে অনিয়ম by শওকত হোসেন
![]() |
| আবদুল হাই বাচ্চু |
এখন তাহলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কী বলবেন? কারণ, অর্থমন্ত্রী গত ৮ জুলাই সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘যতই ক্ষমতাশালী হোক না কেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুকে আইনের আওতায় আনা হবে’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘ব্যাংকটিতে হরিলুট হয়েছে। আর এর পেছনে ছিলেন ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু। তাঁর ব্যাংক-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের কারণেই বেসিক ব্যাংক সমস্যায় জর্জরিত হয়েছে। তাঁর ব্যাংক-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের অনেক প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কোনো সমস্যা হবে না।’
স্মরণ করা যেতে পারে, এর আগে গত ৩০ জুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী ‘হল-মার্ক কেলেঙ্কারি ও বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি নিয়ে বলেছিলেন, ‘জালিয়াতদের ধরতে বাধা নিজের দলের লোক।’ অর্থমন্ত্রী কি এবার ওই সব দলের লোকদের নাম বলবেন?
আবদুল হাই বাচ্চুর ক্ষমতার উৎস এতটাই শক্ত যে কেউই তাঁকে স্পর্শ করতে পারছেন না। বেসিক ব্যাংকের জালিয়াতি নিয়ে আলোচনা ও লেখালেখি শুরু হয়েছে ২০১২ সাল থেকেই। অর্থমন্ত্রী নিজেও গত ৮ জুলাইয়ের আগে কখনোই আবদুল হাই বাচ্চুর নাম উচ্চারণ করে সরাসরি তাঁকে দায়ী করেননি। তবে ইদানীং ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও দুদক অর্থমন্ত্রীর কথা আমলেই নিল না। বরং বলা যায়, দুদক প্রভাবশালীদের দায়মুক্তির যে কমিশনে পরিণত হয়েছে, তার আরেকটি উদাহরণ এই ঘটনা।
এর আগে হল-মার্ক কেলেঙ্কারির জন্য সোনালী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে দায়মুক্তি দিয়েছিল দুদক। যুক্তি ছিল, হল-মার্ককে যে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার ঋণসুবিধা দেওয়া হয়েছিল, তা পরিচালনা পর্ষদে অনুমোদিত ছিল না। ফলে পর্ষদ সদস্যদের দায় পায়নি দুদক। কিন্তু বেসিক ব্যাংকের পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে সবকিছুই করা হয়েছে পর্ষদের মাধ্যমে। আর এর সব ধরনের প্রমাণ বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৪ সালেই দিয়েছিল দুদককে।
খুব সরাসরিই বলা যায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ দেওয়া পরিচালনা পর্ষদই ডুবিয়েছে বেসিক ব্যাংককে। ১৯৮৯ সালে ব্যংকটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিল্পসচিবই পদাধিকারবলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হতেন। পরিচালকও হতেন বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তারা। এই ধারা চলেছে ২০০৮ সাল পর্যন্ত। সরকার মালিক থাকলেও একটি ব্যাংক যে ভালোভাবে চলতে পারে, তার উদাহরণ ছিল বেসিক ব্যাংক।
প্রতিষ্ঠার ২৮ বছর পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার ঠিক পরপরই বেসিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় প্রথম বড় পরিবর্তন আনা হয়। সরকারি কর্মকর্তাদের বদলে নিয়োগ দেওয়া হয় রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও অবসরপ্রাপ্ত আমলাদের। আর তারপর থেকেই শুরু হয় বেসিক ব্যাংকের ভরাডুবি। এখন তাহলে প্রমাণ হচ্ছে যে ব্যাংকের অর্থ লুটপাটের জন্যই নীতির পরিবর্তন করা হয়েছিল।
বেসিক ব্যাংকের ভরাডুবির কারণ তিনটি। কাছের লোকদের ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানানোর নীতি নেয় সরকার এবং সে অনুযায়ী নিয়োগ পান আবদুল হাই বাচ্চু। আবার দিনের পর দিন বেসিক ব্যাংক নিয়ে লেখালেখি হলেও অর্থমন্ত্রী তা আমলেই নেননি। যখন নিয়েছেন তখন আর বেসিক ব্যাংক বাঁচানোর পথ ছিল না। আর সর্বশেষ হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকও লুটপাট ঠেকাতে পারেনি।
সুতরাং বলা যায়, আবদুল হাই বাচ্চুর যেমন শাস্তি হওয়া দরকার, তেমনি দায় নিতে হবে সরকার, অর্থমন্ত্রীর ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। দায় তো কেউই নিচ্ছেই না, বরং প্রভাবশালী আবদুল হাই বাচ্চুর দায়মুক্তির সব আয়োজন করে দিচ্ছে সরকারেরই একটি সংস্থা দুদক। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর শক্তির উৎস কী?
আবদুল হাই বাচ্চু এরশাদ আমলে বাগেরহাট-মোল্লারহাট থেকে একবার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। আর আওয়ামী লীগ সরকার গত মেয়াদে আসার পর তিনি প্রথম মেয়াদে ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে তিন বছরের জন্য চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। ২০১২ সালে তাঁকে আবার দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
চেয়ারম্যান আবদুল হাইয়ের সময় বেসিক ব্যাংকের পরিচালক ছিলেন সরকারেরই সাবেক একজন যুগ্ম সচিব এ কে এম রেজাউর রহমান। তিনি ২০১৩ সালের ১১ জুলাই ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব এম আসলাম আলমের কাছে একটি চিঠি দিয়েছিলেন। তাতে আবদুল হাই বাচ্চুর নানা অনিয়মের বিবরণ দেওয়া ছিল। আবদুল হাই সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ছাড়া অন্য কাউকে পরোয়া করেন না তিনি। কার্যত ব্যাংকটি চলে এই চেয়ারম্যানের নির্দেশে। তিনি লোকবল নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি, সব ক্ষেত্রেই একচ্ছত্র প্রভাব রাখেন।’
সেই প্রভাবের নমুনাও আছে অনেক। যেমন, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদকে সরাসরি দায়ী করে একাধিকবার চিঠি দিয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়কে। বেসিক ব্যাংকের অনিয়ম, জালিয়াতি ও দুর্নীতির বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথম চিঠিটি দেয় ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে। চিঠিতে বলা ছিল, ‘এর সব দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের। ব্যাংকের ঋণ শৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়। প্রধান কার্যালয়ের ঋণ যাচাই কমিটি বিরোধিতা করলেও বেসিক ব্যাংকের পর্ষদ ঋণ অনুমোদন করে দেয়। ৪০টি দেশীয় তফসিলি ব্যাংকের কোনোটির ক্ষেত্রেই পর্ষদ কর্তৃক এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় না।’
এরপরও অর্থ মন্ত্রণালয় বেসিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে ব্যাংকটির অবস্থা আরও খারাপ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে ২০১৪ সালের ২৯ মে সরকারের কাছে সুপারিশ করে। এর আগে ২৬ মে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কাজী ফখরুল ইসলামকে দুই বছরের জন্য অপসারণ করে। আর এর পরদিন ঢাকার গুলশান, দিলকুশা ও শান্তিনগর শাখার নতুন ঋণ অনুমোদন বন্ধের নির্দেশ দেয়।
এরপরও বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভাঙেননি অর্থমন্ত্রী। বরং সে সময়ে অর্থমন্ত্রী পাল্টা সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘পর্ষদ ভাঙা হলে দায়িত্ব (ব্যাংকটির) নেবে কে?’
এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে ২০১৪ সালের ৬ জুলাই পদত্যাগ করেন আবদুল হাই বাচ্চু। তিনি অর্থমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে পদত্যাগপত্র দিয়ে আসেন। এর দুই দিন পর সরকার ব্যাংকের গোটা পর্ষদও অবশ্য বাতিল করে দেয়। অর্থাৎ তাঁকে সম্মানজনক পদত্যাগেরই সুযোগ করে দেয় সরকার। কারণ পর্ষদ বাতিল হলে আবদুল হাই এমনিতেই চেয়ারম্যান থাকতে পারতেন না। সুতরাং তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে—এ কথাটাও বলার সুযোগ রাখেনি সরকার।
২০০৮ সাল পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৫ শতাংশেরও কম। আর এখন খেলাপি ঋণ প্রায় ৫৭ শতাংশ। কেবল তা-ই নয়, ব্যাংকটি চালাতে এখন দুই হাজার কোটি টাকার মূলধন দিতে হবে সরকারকে। এই অর্থ দেওয়া হবে সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকে। এসবই হচ্ছে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির ফল।
প্রশ্ন হচ্ছে, এর দায় এখন কে কে নেবে?
Tuesday, August 4, 2015
মর্যাদা বেড়েছে নিম্ন মধ্যম আয়ের বাংলাদেশের by শওকত হোসেন
![]() |
| বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ |
কোন দেশ নিম্ন আয়ের, আর কোন কোন দেশ উচ্চ বা মধ্যম আয়ের, তা নির্ধারণ করে একমাত্র বিশ্বব্যাংক। মূলত কোন দেশগুলোকে তারা কী ধরনের ঋণ দেবে, সেটা ঠিক করতেই এই শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। বিশ্বব্যাংকের পরিমাপ অনুযায়ী, ১ হাজার ৪৫ ডলার থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ ডলার পর্যন্ত মাথাপিছু জাতীয় আয় হলে একটি দেশ মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় ঢুকে পড়বে। তবে যেহেতু সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ আয়ের মধ্যে পার্থক্যটি অনেক বড়, তাই মধ্যম আয়কে আবার দুটি উপখাতে ভাগ করেছে বিশ্বব্যাংক। অনেকটা উচ্চ মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্তের মতো। আর এই ভাগ অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় ঢুকেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) এখন ১ হাজার ৩১৪ ডলার। তবে বিশ্বব্যাংকের পরিমাপ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৮০ ডলার। অর্থাৎ সামান্য ওপরে আছে বাংলাদেশ। সুতরাং ঝুঁকিও আছে বাংলাদেশের। যেমন, গৃহযুদ্ধ ও জাতীয় তেল খনি নিয়ে বিপত্তির কারণে দক্ষিণ সুদান নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে নিচে নেমে নিম্ন আয়ের দেশে চলে গেছে।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার ফলে দেশ হিসেবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হবে। দেশের ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এ অর্জন ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কিন্তু তাতে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। এই অর্জনের ফলে এখন আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়াও একটু কঠিন হতে পারে। কারণ, ঋণদাতারা এখন হয়তো কিছুটা কঠিন শর্ত জুড়ে দিতে পারে। তাই সরকারকে এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এ ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ যেসব সুবিধা পেয়ে থাকে, সেগুলো যেন অব্যাহত থাকে, এ ব্যাপারেও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে।
![]() |
| বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ |
আয় বৃদ্ধিই উন্নয়ন নয়: মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধিকেই সূচক হিসেবে গণ্য করে বিশ্বব্যাংক। কেবল মাথাপিছু জাতীয় বৃদ্ধির প্রবণতা থেকে তারা এই তালিকা করে থাকে। আর কোনো সূচক বিবেচনা করা হয় না। অথচ প্রবৃদ্ধির সুফল গড়িয়ে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে যাওয়ার তত্ত্ব বাতিল হয়ে গেছে সেই ষাটের দশকেই। সে সময়ে অর্থনীতিবিদেরা গবেষণা করে দেখান, অনেক দেশে প্রবৃদ্ধি বাড়লেও এর সুফল দরিদ্র মানুষেরা পাননি। অনেক দেশে বৈষম্য বেড়েছে, অপূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থান বেড়েছে কৃষি খাতে এবং সাধারণ মানুষের জীবনমানেরও অবনতি ঘটেছে।
সত্তরের দশকেই অর্থনীতিবিদেরা এটা মেনে নেন যে কেবল মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি একটি দেশের উন্নয়নের সঠিক বা যথাযথ নির্দেশক নয়। এরপরই উন্নয়ন তত্ত্বে পুনর্বণ্টন এবং সামাজিক সূচক বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
এলডিসি থেকে উত্তরণ: জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকের ভিত্তিতে বিশ্বের দেশগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করে। যেমন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি), উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশ। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত বা এলডিসি। বর্তমানে এলডিসিতে আছে ৪৮টি দেশ। অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এলডিসি থেকে উত্তরণ। কারণ, এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য আয় বাড়ানোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়।
বিশ্বব্যাপী এখন নিম্ন আয়ের দেশের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। ১৯৯৪ সালে নিম্ন আয়ের দেশ ছিল ৬৪টি, এখন তা মাত্র ৩১টি। বিশ্বে এখন সবচেয়ে বেশি আছে মধ্যম আয়ের দেশ। এই দেশগুলোর বেশির ভাগই ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই জায়গায় রয়ে গেছে। বেশির ভাগ দেশ মধ্যম আয়ের দেশ হয়েই আছে, উচ্চ আয়ের দেশ হতে পারছে না। একে এখন বলা হচ্ছে মধ্যম আয়ের ফাঁদ। এ থেকে এমনকি রাশিয়া, চীন, ব্রাজিল বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশও বের হতে পারছে না।
তিনটি কারণে এবার বাংলাদেশ ২০২১ সালের আগেই মধ্যম আয়ের দেশ হতে পেরেছে। যেমন প্রবৃদ্ধির হার ধারাবাহিকভাবে ৬ শতাংশ হওয়ায় গড়ে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৪ শতাংশ হারে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় আয়কে সূচক হিসেবে নেওয়ায় প্রবাসী-আয় এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে আয়ও বেশি দেখানো যাচ্ছে। আর ডলার ও টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকার সুবিধাও বাংলাদেশ পেয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, ডলারের তুলনায় টাকার অবমূল্যায়ন হয় এবং এতে টাকায় জাতীয় আয় বাড়লেও ডলারে তা বাড়ে না।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ধরে এলডিসি নিয়ে কাজ করছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দ্রুততর সময়ে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ায় উৎফুল্ল হলেও তৃপ্ত হওয়া যাচ্ছে না। কারণ, কেবল আয় বৃদ্ধিকে এখন আর উন্নয়ন বলা যায় না। এ কারণেই এলডিসি থেকে উত্তরণকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ, এর সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনীতির ভঙ্গুরতার বিষয়টি জড়িত আছে। যেমন এক পণ্যের ওপর নির্ভরতা। বাংলাদেশ যেমন তৈরি পোশাকের মতো এক পণ্যে নির্ভর। সুতরাং এসব বিষয়ে নজর দিলেই বাংলাদেশ বেশি লাভবান হবে।
Friday, July 3, 2015
বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ by শওকত হোসেন
বিশ্বব্যাংক মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। একটি হচ্ছে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ, অন্যটি উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। বাংলাদেশ এখন থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিচিত হবে।
প্রতিবছর ১ জুলাই বিশ্বব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় অনুসারে দেশগুলোকে চারটি আয় গ্রুপে ভাগ করে। যাদের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৪৫ ডলার বা তার নিচে, তাদের বলা হয় নিম্ন আয়ের দেশ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর থেকে এ তালিকাতেই ছিল।
যোগাযোগ করা হলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন ও স্বীকৃতি এটি। জাতি হিসেবে এটি আমাদের জন্য অবশ্যই একটি বড় অর্জন ও মাইলফলকও বটে। এটির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব যেমন রয়েছে, তেমনি বাস্তবেও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়টি হয়েছে। সেসঙ্গে রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও।’
নির্ধারণের পদ্ধতি: মূলত ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু করে যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার, তারা মধ্যম আয়ের দেশের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে আবার আয় ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু করে ৪ হাজার ১২৫ পর্যন্ত হলে তা হবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং আয় ৪ হাজার ১২৬ ডলার থেকে শুরু করে ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার হলে দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। এর চেয়ে বেশি মাথাপিছু জাতীয় আয় হলে সেই দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ আয়ের দেশ।
বিশ্বব্যাংক ‘এটলাস মেথড’ নামের বিশেষ এক পদ্ধতিতে মাথাপিছু জাতীয় আয় পরিমাপ করে থাকে। একটি দেশের স্থানীয় মুদ্রায় মোট জাতীয় আয়কে (জিএনআই) মার্কিন ডলারে রূপান্তরিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে তিন বছরের গড় বিনিময় হারকে সমন্বয় করা হয়, যাতে করে আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের ওঠা-নামা সমন্বয় করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১ হাজার ৩১৪ ডলার। তবে বিশ্বব্যাংকের পদ্ধতি অনুযায়ী তা এখন ১ হাজার ৪৫ ডলারকে ছাড়িয়ে গেছে। এ কারণেই নতুন তালিকায় মধ্যম আয়ের দেশ হতে পেরেছে বাংলাদেশ। সরকারের ১০ বছরের প্রেক্ষিত পরিকল্পনায় ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কথা বলা আছে। এর আগেই মধ্যম আয়ের দেশ হলো বাংলাদেশ।
নতুন তালিকায় চারটি দেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের তালিকায় নতুন করে ঢুকতে পেরেছে। যেমন: বাংলাদেশ, কেনিয়া, মিয়ানমার ও তাজিকিস্তান। সার্কভুক্ত ভারত ও পাকিস্তান নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে অন্তর্ভুক্ত। সব মিলিয়ে এখন নিম্ন আয়ের দেশ ৩১টি, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ ৫১টি, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ ৫৩টি এবং উচ্চ আয়ের দেশ ৮০টি।
সামনে আরও চ্যালেঞ্জ: সামগ্রিক বিষয়ে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখন যে অর্জন, তাতে দেশ হিসেবে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের মর্যাদা এবং অবস্থান আরও সুসংহত হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ঋণবাজার থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থা তৈরি হবে। বাংলাদেশকে এখন কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে গণ্য করা হবে। অন্য দিক থেকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে শর্তও কিছুটা কঠিন হতে পারে। তাই এ জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি রাখা দরকার।
নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে চলে গেলেও বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকাতেই থাকবে। ফলে এলডিসির সুবিধাগুলোও বহাল থাকবে। এ তালিকা থেকে বেরোতে হলে তিনটি সূচক অতিক্রম করতে হবে। যেমন: অর্থনীতির নাজুকতার সূচক, মানব উন্নয়ন সূচক ও মাথাপিছু আয়ের সূচক। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এর মধ্যে প্রথম সূচকটি আমরা অতিক্রম করলেও অন্য দুই সূচক অতিক্রম করতে পারিনি।’
মধ্যম আয়ের ফাঁদ: আয় বাড়লেই তাকে এখন আর উন্নয়ন বলা হয় না। ফলে কেবল আয় বাড়িয়ে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পর ‘মধ্যম আয়ের ফাঁদ’-এ পড়ে আছে অসংখ্য দেশ। এর মধ্যে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো আটকে আছে বহুদিন ধরে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা। এমনকি চীন ও রাশিয়াও আটকে আছে মধ্যম আয়ের ফাঁদে। মূলত যারা কেবল আয় বাড়াতেই মনোযোগ দিয়েছে বেশি, অবকাঠামো, শিক্ষাসহ মানবসম্পদ উন্নয়ন, রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামুখী থাকার দিকে নজর দেয়নি, তারাই আটকে আছে এই ফাঁদে।
Tuesday, June 30, 2015
বাজেট বক্তৃতারই সংস্কার প্রয়োজন by শওকত হোসেন
৪ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে বাজেট উপস্থাপন করলেন, তার মূল বক্তৃতা ৯০ পৃষ্ঠার। তবে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা নয়; ২০১১-১২ অর্থবছরের মূল বাজেট বক্তৃতা ছিল ১৪৮ পৃষ্ঠার, ২০১২-১৩ অর্থবছরেরটি ১২৩ পৃষ্ঠার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বক্তৃতা ছিল ১১৯ পৃষ্ঠার।
ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি একসময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে। ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের সেই বাজেট বক্তৃতা শুনে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘দ্য শর্টেস্ট ফিন্যান্স মিনিস্টার হ্যাজ ডেলিভারড দ্য লংগেস্ট বাজেট স্পিচ।’ একটু বড় বাজেট বক্তৃতা হলে আজকাল অনেকেই এ কথাটি ব্যবহার করেন। অর্থমন্ত্রীদের এসব দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা শুনেই হয়তো অক্সফোর্ডের অধ্যাপক রবার্ট সার্ভিস বলেছিলেন, আপনি তখনই দীর্ঘ বক্তৃতা দিতে পারবেন, যখন শ্রোতাদের পালিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। সংসদ অধিবেশন থেকে সরকারি দলের কারোরই পালানোর সুযোগ আসলেই নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের বর্তমান অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির দেওয়া বাজেট বক্তৃতাটি ছিল দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিটের। আর বক্তৃতাটি ছিল ৪৪ পৃষ্ঠার। দীর্ঘ বক্তৃতার এর আগের রেকর্ডটি ছিল প্রণব মুখার্জির, তাঁর শেষ বাজেট ২০১২-১৩ অর্থবছরের, আর পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৩৬। বলা হয়ে থাকে, ইতিহাসের দীর্ঘতম বাজেট বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন সাবেক ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম গোল্ডস্টোন, ১৮৫৩ সালের ১৮ এপ্রিল। ওই বক্তৃতাটি ছিল চার ঘণ্টা ৪৫ মিনিটব্যাপী। এর প্রায় পৌনে ২০০ বছর পর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতাদাতা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় আমাদের অর্থমন্ত্রী স্থান পাবেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
সংবাদপত্রকর্মী হিসেবে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা পুরোটাই শুনতে হয়। বলতে দ্বিধা নেই, পুরো বক্তৃতা শোনাটা কষ্টকর। আকর্ষণীয় হলে দীর্ঘ বক্তৃতার শ্রোতা পাওয়া যায়। কিন্তু বাজেট বক্তৃতা আকর্ষণীয় করা সহজ নয়। এখন গুগল সব জানে। গুগলের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রীদের বাজেট বক্তৃতা পাওয়া কঠিন নয়। বেশ কয়েকটি বাজেট বক্তৃতা পড়ে মনে হয়েছে, আমাদেরটাই কম আকর্ষণীয়। শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে হয়, আমাদের বাজেট বক্তৃতার ধরনটি পাকিস্তানের মতোই।
এবারের বাজেট বক্তৃতায় অধ্যায় ১০টি, আর অনুচ্ছেদ আছে ২৩৩টি। এর মধ্যে ৩৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আছে ছয়টি অধ্যায়। এখানে মূলত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বাজেট সংশোধনী ও নতুন বাজেট এবং সরকারের উন্নয়ন কৌশলের বর্ণনা রয়েছে।
এগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়, পড়াটাও কষ্টকর নয়। অষ্টম অধ্যায়টি মূলত মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সাফল্যের ফিরিস্তি। এ জন্য বরাদ্দ ১৪ পাতা। এরপরেই আছে সংস্কার ও সুশাসন নামে সাত পাতার একটি অধ্যায়। এ দুই অধ্যায় থেকে নতুন তথ্য পাওয়া গেল সামান্য কয়েকটি। এর মধ্যে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা পাঁচ হাজার থেকে বাড়িয়ে দশ হাজার করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়া গেল না। অরুণ জেটলি যেমনটি করেছেন, আমাদের অর্থমন্ত্রী তা করলেই পারতেন। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এসব ফিরিস্তি অরুণ জেটলি পরিশিষ্টে রেখে দিয়েছেন। কারও আগ্রহ থাকলে সেখান থেকেই পড়ে নিতে পারবেন।
অথচ বাজেট বক্তৃতা আগে এত দীর্ঘ ছিল না। আগে বক্তৃতা দেওয়া হতো দুই পর্বে। রাজস্ব কার্যক্রম ছিল দ্বিতীয় পর্বের বক্তৃতার অংশ। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যতিক্রমী সময়টা বাদ দিলে বাজেট বক্তৃতা এক পর্বে শেষ করার কাজটি শুরু করেছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী। বক্তৃতায় আরও একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে অর্থমন্ত্রীরা বাজেটে কবিতার অংশ ব্যবহার করতেন। থাকত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ বা সাবেক কোনো রাষ্ট্রনায়কের কথা। এ ধারার প্রথম পরিবর্তন আনেন এম সাইফুর রহমান। ২০০১ সালে দ্বিতীয় দফায় বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে প্রশংসার অংশবিশেষ বাজেটে স্থান পেতে শুরু করল। কবিতাকে ছুটি দিয়ে দাতাদের সার্টিফিকেটের কেন প্রয়োজন হয়েছিল, সেটি একটি প্রশ্ন।
বাজেটের আগের দিন প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, তাঁর বাজেট দীর্ঘ, কারণ এখানে সবকিছু বিস্তারিত বলা থাকে। এবার দেখা যাক বিস্তারিত বাজেটের নমুনা। অর্থমন্ত্রী ৬২ পৃষ্ঠায় বলেছেন, ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আর গৃহীত পদক্ষেপগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। খবর নিয়ে যা জানা গেল, বেতন অংশ এবার কার্যকর হচ্ছে আর ভাতার অংশ কার্যকর হবে পরের অর্থবছর থেকে। এ কথাটা পরিষ্কার বললেই হতো।
১৯৭৫ থেকে শুরু করে ২০০৮ পর্যন্ত বাজেট বক্তৃতাগুলোতে প্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য থাকত। কী কী পদ্ধতিতে কালোটাকা সাদা হবে, তার বিস্তারিত যেমন বলা হতো, তেমনি আগের দেওয়া সুযোগ কতজন নিয়েছেন এবং এই উদ্যোগ সফল হলো কি না, তারও বিবরণ থাকত। এখন হয় উল্টো। যেমন: ২০১০-১১ অর্থবছরে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ না করেই অর্থমন্ত্রী কালোটাকা সাদা করার বিধানটি আয়কর আইনে স্থায়ী করে দিয়েছিলেন, যা বাতিল করেছিল সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর এবার ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে কালোটাকার মালিকদের আরও বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর কিছুই উল্লেখ করেননি অর্থমন্ত্রী।
সবচেয়ে চমকপ্রদ কাজটি হয়েছে চিনি নিয়ে। বাজেটে অপরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক টনপ্রতি দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে চার হাজার টাকা এবং পরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক সাড়ে চার হাজার থেকে বাড়িয়ে আট হাজার টাকা করা হয়েছে। অথচ বাজেট বক্তৃতায় এর উল্লেখ নেই।
বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বললেন, এ রকম কিছু তিনি বক্তৃতায় বলেননি। তাহলে কীভাবে এল? সে কথাটি ফাঁস করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনেই তিনি অর্থমন্ত্রীকে জানান, ‘স্যার, রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুযায়ী আপনার বক্তৃতায় এটা রাখা হয়নি, তবে ছকে রয়ে গেছে।’ এই হচ্ছে আমাদের বাজেট বক্তৃতা। বাজেটে অনেক বেশি কথা বলা হয়, জরুরি অনেক কথাই বলা হয় না। আবার অনেক সময় বেশি কথা বলা হয় বলেই হয়তো আসল কথাটি হারিয়ে যায়।
অনেক দেশেই এখন বাজেটের মৌলিক প্রস্তাবগুলো আগেই প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে আলোচনা হওয়ার পর গ্রহণযোগ্য হলে তবেই তা বাজেটে স্থান পায়। আমাদের পথটা উল্টো। কাজটি শুরু করেছিলেন শাহ এম এস কিবরিয়া। এর পেছেনে রাজনীতি আছে বলেই ধারণা করা যায়। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। অর্থমন্ত্রী জুনের প্রথম বৃহস্পতিবার বাজেট উপস্থাপন করেন। আর বাজেট পাসের দিন প্রধানমন্ত্রী কিছু প্রস্তাব সংশোধনের জন্য অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন। আর অর্থমন্ত্রী তা মেনে নেন। এরপরেই পাস হয় বাজেট। এতে সরকার যে সাধারণ মানুষের কথা কতটা ভাবে, সেটি প্রমাণ করা যায়।
এই জনতুিষ্টমূলক কর্মকাণ্ডে সমস্যা হয় অন্যত্র। আজি হতে শতবর্ষ পরে না হলেও ১০ বছর পরও যদি কোনো গবেষক অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে বাজেট বক্তৃতাগুলো পড়েন, তাহলে অনেকগুলো ভুল তথ্য পাবেন। কারণ, বক্তৃতায় লেখা অনেক প্রস্তাবই পরে বদলে গেছে। সে তথ্যটি কিন্তু ওয়েবসাইটে নেই। একটি উদাহরণ দিই। ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলা আছে—ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ১ লাখ ৮০ হাজারই থাকবে, কোনো পরিবর্তন হবে না। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বক্তৃতায় আছে, ওই করমুক্ত আয়ের সীমা এখন দুই লাখ টাকা। তাহলে সিদ্ধান্তটা বদলে গেল কবে? ২০১২ সালের ২৮ জুন জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আয়সীমা বাড়ানোসহ জনতুষ্টির এই কাজটি করেছিলেন অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে।
আমরা অনেক কিছুরই সংস্কার করতে বলি। এখন সময় এসেছে বাজেট বক্তৃতার সংস্কারের। কাজটি কি অর্থমন্ত্রী করবেন? তাহলে কি বাজেটে নতুন কিছুই নেই? আছে তো। এবারের বাজেট বক্তৃতার বইটির প্রচ্ছদ সবুজ, আগের সবগুলোই ছিল সাদা-কালো।
শওকত হোসেন: সাংবাদিক।
massum99@gmail.com
BNM Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1536)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...








