Thursday, August 30, 2018

শহিদুল আলমের গ্রেপ্তার দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি সম্পর্কে কী বার্তা দেয় by আদিত্য অধিকারী

বাসচাপায় রাজপথে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে ছাত্রবিক্ষোভ সৃষ্টি হয় তা নিয়ে ৫ই আগস্ট আল জাজিরা টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকার দেন বাংলাদেশি আর্টিস্ট, লেখক ও সংগঠক শহিদুল আলম। তিনি বলেন, তরুণ  ছাত্রদের এই বিক্ষোভ শুধু পরিবহন খাত নিয়েই নয়, দেশের করুণ অবস্থাও এ ক্ষোভে রশদ যুগিয়েছে। বাংলাদেশে যেসব অনিয়ম হচ্ছে তিনি তার সবকিছু তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংক লুট হচ্ছে। মিডিয়ার গলা চেপে ধরা হয়েছে। বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। গুম হচ্ছে। সব স্তরে ঘুষ চলছে। শিক্ষায় দুর্নীতি হচ্ছে।
ওইদিনই সাদা পোশাকে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা মধ্যরাতে তার ঢাকার বাসায় হাজির হন। কোনো ব্যাখ্যা বা ওয়ারেন্ট ছাড়াই তাকে তুলে নিয়ে যান। যখন তাকে আদালতে হাজির করা হয় তখন তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন অন্যের ওপর ভর করে।
তাকে অবশ্যই নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী প্রচারণা ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অধীনে অভিযোগ গঠন করা হয়। তার জামিন আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। যদি তিনি অভিযুক্ত হন তাহলে তার সাত বছরের জেল হতে পারে।
শহিদুল আলমকে অশোভন, অন্যায়ভাবে ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হচ্ছে। বিশ্বের সব স্থান থেকে তার মুক্তি দাবি করা হচ্ছে। এই মনোযোগ আকৃষ্ট হয়েছে শহিদুল আলমের ব্যতিক্রমী অর্জন ও তার আন্তর্জাতিক খ্যাতির জন্য। একজন ফটোসাংবাদিক হিসেবে তিনি ব্যাপক প্রশংসা পেয়েছেন।
তিনি তুলে ধরেছেন ভিকটিমরা নয়, সক্রিয় এজেন্ট হলেন প্রান্তিক মানুষ। এ ছাড়া তিনি রাষ্ট্রীয় নৃশংসতার চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি সমানভাবে একজন ইনস্টিটিউট বিল্ডার ও তরুণ ফটো সাংবাদিকদের প্রদর্শক। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন ফটো বিষয়ক এজেন্সি দৃক পিকচার লাইব্রেরি, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অভিজাত ছবির উৎসব ছবিমেলা ও পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট। পাঠশালায় নেপালিসহ শত শত ফটোগ্রাফারকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
একজন শহিদুল আলমকে অতিক্রম করে এমনকি বাংলাদেশের বাইরেও এ ঘটনার বড় প্রভাব রয়েছে।  তাকে গ্রেপ্তার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার দিকে দৃষ্টিপাত করে, যার প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশসহ বিশ্বের বড় অংশগুলোতে।
আরো খোলামেলাভাবে বলতে গেলে, এটা করেছে রাষ্ট্র, যারা মাঝে মাঝেই মত প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকারের যেকোনো সমালোচককে ক্রিমিনালাইজ বা অপরাধী হিসেবে নিয়ে তাদের বিচার করছে দক্ষিণ এশিয়ার সরকারগুলো। তার মধ্যে রয়েছে সুপরিচিত ব্যক্তি এবং সামাজিক মিডিয়ায় ব্যক্তিগত মত প্রকাশকারী নাগরিকরা। 
ফেসবুকে সরকারের সমালোচনামূলক পোস্ট অথবা মন্তব্য শেয়ার করার কারণে বেশ কিছু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বাংলাদেশে। এখানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের পরিবর্তে আরো কঠোর একটি লেজিসলেশন আনার পরিকল্পনা করছে সরকার। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে রিপোর্ট করার কারণে দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেট আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত সপ্তাহে ভারতে বেশ কিছু উচ্চ মাপের অধিকারকর্মী ও বোদ্ধাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এটা সুস্পষ্টভাবে সরকারের প্রতিশোধ। নেপালেও সরকার একটি প্রস্তাব পাস করেছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকরা রিপোর্ট করতে পারবেন না। 
সরকারগুলো দাবি করেছে যে, জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার জন্য এসব পদক্ষেপ জরুরি। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এ অঞ্চলের শাসকরা জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে তেলার চেষ্টা করেছে। যেসব সংগঠন অধিকতর সুবিচারের জন্য প্রচারণা চালায় তাদেরকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর চর হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
এসব উদ্দেশের নেপথ্য কারণ স্পষ্ট। সরকারগুলো তাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণাকে ইতিহাসে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাদের সামনে যে ইভেন্ট আছে তাকেই একমাত্র বৈধ বলে মনে করে। নিরপেক্ষ নাগরিক সমাজের গ্রুপগুলোর সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে তারা মুক্তভাবে তাদের সিদ্ধান্তকে দমিয়ে রাখতে চায়। এ প্রক্রিয়ায় তারা চেষ্টা করছে একটি আতঙ্কগ্রস্ত, নিজেদের দিকে তাকিয়ে থাকা ও বিদেশাতঙ্ক জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে।
শহিদুল আলমকে মুক্তির যে প্রচারণা শুরু হয়েছে তা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, যাকে অন্যায়ভাবে বিচার করা হচ্ছে। আরো বেশি করে বলা যায়, সমগ্র অঞ্চলজুড়ে গণতান্ত্রিক স্পেসের ওপর যে আগ্রাসন তার বিরুদ্ধে একটি প্রতিরোধ। এটা হলো সংকীর্ণ মানসিকতার জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। খেয়াল-খুশিমতো ক্ষমতার ব্যবহারের প্রতিবাদ। এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হলো সহনশীলতা, আইনের শাসন ও বেশির ভাগ প্রান্তিক মানুষের অধিকার।
বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো অনুধাবন করে থাকবেন শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার করে তার সরকার শুধুই আন্তর্জাতিক বৈধতা হারিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃস্থাপনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে শহিদুল আলমের মুক্তি।
নেপাল সফরে থাকা অন্য সরকারগুলোর প্রধানদের একই বিষয়ে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। তাহলো সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের সদস্যদের ওপর হামলা বড় ধরনের শত্রুতা ও ক্ষমতাসীনদের প্রতি ক্ষোভ বৃদ্ধি পায়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাধা এমন যেসব লেজিসলেশন আছে তা বাতিল করা হবে জরুরি, যদি রাষ্ট্রগুলো তাদের জনগণের আস্থা ফিরে পেতে চায়।
(নেপাল টাইমসে প্রকাশিত ‘দ্য ডেথ অব ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ)

যেসব শিশুর সামনে পিতামাতাকে গুলি করেছে মিয়ানমারের সেনারা

কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শিশুদের মধ্যে ৬ হাজারের বেশি এতিম অথবা তাদের সঙ্গে তাদের পরিবারের কেউ নেই। এসব শিশুর বেশির ভাগের পিতামাতাকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের চোখের সামনে গুলি করে হত্যা করেছে। তাদের একজন রায়হান। তার বয়স ১০ বছর। তাদের গ্রামে যখন সেনাবাহিনী হানা দেয় তখন রায়হান তার বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলছিল। অকস্মাৎ সে দেখতে পায় তাদের এক প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে ধোয়া উঠছে। আস্তে আস্তে আগুনের শিখা আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। রায়হান বুঝে নেয় কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। এক বছর আগে এমন ঘটনা ঘটে তার গ্রামে। রায়হান বলে, এমন অবস্থায় আমার পিতামামা ও বোনেরা আমাকে জড়িয়ে ধরে দৌড়ে পালাতে চেষ্টা করে। কিন্তু আমার পিতামাতাকে ধরে ফেলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা আমাদের সামনেই গুলি করে হত্যা করে। এ সময় আমার বোনেরা তাদের দিকে দৌড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে সেনারা তাদেরকেও গুলি করে হত্যা করে। তখন কি করতে হবে আমি বুঝতে পারি নি। ভয়ে আমার হাতপা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল আমার দেহ থেকে সব রক্ত শেষ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল আমি অচল হয়ে গেছি। বুঝতে পারছিলাম না দৌড়ে পালাতে পারবো কিনা। বুঝতে পারি নি কোথায় যাচ্ছি আমি। মাটিতে পড়ে আছেন আমার পিতামাতা ও বোনদের লাশ। সে দৃশ্য আমাকে হৃদয়ে ঝড় তুলছে। তবু তাদেরকে পিছনে ফেলে আমি ছুটতে থাকি।
দৌড়াতে দৌড়াতে রায়হান পৌঁছে যায় সামনের এক গ্রামে। সেখান থেকে রোহিঙ্গা মুসলিমদের একটি গ্রুপ পালাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় রায়হান। তারপর তিন দিন ধরে হাঁটতে থাকে। এরপরই নাগাল পায় বাংলাদেশের। রায়হান বলে, আমাকে ওই গ্রুপের কেউই চিনতো না। আমি বুঝতে পারি নি কি করতে হবে। আমি শুধু ওই দলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ছুটতে থাকি। ওই দিনগুলোতে আমার আর কিছু খাওয়া হয় নি।
গত বছর আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী যে নৃশংসতা চালায় তাতে কমপক্ষে ৭ লাখ মানুষ পালিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে বিপন্ন অবস্থায় যারা আছে তারা হলো এতিম, নিঃসঙ্গ শিশুরা। এ সপ্তাহে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, পিতামাতা বা অভিভাবক নেই এমন রোহিঙ্গা শিশুকে আলাদা করা হয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের জরিপে দেখা গেছে ১৩৯টি রোহিঙ্গা শিশু নিঃসঙ্গ বা তাদের পিতামাতা নেই। এমন শিশুদের আলাদা করে তাদের দূরবর্তী পরিবার বা পালক পিতামাতার কাছে দেয়া হয়েছে ক্যাম্পে। কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে জটিলতা। ইউনিসেফের মতে, কক্সবাজারে পুরো শরণার্থী শিবিরের মোট জনসংখ্যার মধ্যে শতকরা ১০ ভাগই অভিভাবক ছাড়া অবস্থান করছে।
রায়হান এখন তার পিতামাতাকে ভীষণ মিস করে। সে আশ্রয়শিবিরে তার এক নিকট আত্মীয়াকে খুঁজে পেয়েছে। এতে রায়হান নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করে। তারপরও তার মধ্যে হতাশা। সে বলে, এখন আমার ওই আন্টি ছাড়া আমি জানি না আর কোথায় আমার জায়গা আছে। আবার আমি আগের মতো ফুটবল খেলা শুরু করেছি।
রায়হানের মতো আরেক শিশু আরেফা। যখন সেনাবাহিনী তার গ্রামে হানা দেয় তখন তার বয়স ১৬ বছর। সে তখন পানি আনতে গিয়েছিল। ফিরতে গিয়ে সে দূর থেকে দেখতে পায় তাদের বাড়ির বাইরে সেনাবাহিনী। তা দেখে সে একটি জঙ্গলের আড়ালে লুকায়। দেখতে থাকে সেনারা গুলি ছুড়ছে। প্রথমে তারা গুলি করছে বয়স্ক মানুষদের দিকে। তারপর শিশুদের দিকে। যখন প্রাপ্ত বয়স্করা তাদেরকে থামার অনুরোধ করে তখন সেনারা তাদের দিকেও গুলি ছোড়ে। এ সময় আরেফার সামনে যাদেরকে হত্যা করা হয় তার মধ্যে ছিল তার পিতা, মাতা, সাত ভাই ও বোন। তাদের লাশ পিছনে ফেলে সে পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। এখন একা একা অবস্থান করছে। মাঝে মাঝে কাউন্সিলিং পাচ্ছে। ২৩ বছর বয়সী বাংলাদেশী নৃবিদ্যার ছাত্রী কেয়া তার সঙ্গে সপ্তাহে একবার সাক্ষাত করেন। কেয়া সেভ দ্য চিলড্রেনের হয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেছেন, আরেফার মনের ভিতর এতটাই ক্ষত যে সে পালক পিতামাতার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে না। এখন আরেফার বয়স ১৭ বছর। সে একা একা বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে এরই মধ্যে সবাইকে হারিয়েছে। সে অন্য কোন পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতে চায় না।
কেয়া যাদেরকে দেখাশোনা করেন তাদের মধ্যে আরেকজন তাসমিন। তার বয়স ১৫ বছর। মারাত্মক বিকলাঙ্গ সে। তার রয়েছে জন্মগত ত্রুটি। সে তার পা ব্যবহার করতে পারে না। মিয়ানমারে তার পিতা একজন বেকারির ব্যবসায়ী ছিলেন। তার ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হতো তাকে। তাসমিনকে দেখাশোনার জন্য পৃথিবীর বুকে একমাত্র তার পিতাই ছিলেন। গত বছর যখন সেনাবাহিনী তাদের বাড়িতে হানা দেয় তখন তাসমিন রান্নাঘরে পালায়। সে দেখতে পায় গ্রামের ২০ থেকে ৫০ বছর বয়সী পুরুষদেরকে সেনারা লাইন দিয়ে দাঁড় করাচ্ছে। এরপর তাদেরকে গুলি করে হত্যা করছে। তাদের মধ্যে ছিলেন তার পিতাও। এ ঘটনার পর হামাগুঁড়ি দিয়ে ১২ দিন ধরে বাংলাদেশের দিকে অগ্রসর হয় সে। নিজের হাতের ওপর ভর করে সামনে এগুতে থাকে শরীরটাকে নিয়ে। কেয়া বলেন, বাংলাদেশে এই আশ্রয়শিবিরে যখন সে আসে তখন তার শরীর ভরা ছিল রক্ত। তার হাতে কেটে গিয়েছিল। সেখানে সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল। তাসমিন এখন এক পালক পরিবারের আশ্রয়ে আছে। সহায়তা কর্মীরা তাকে একটি হুইল চেয়ার দিয়েছে। দেয়া হচ্ছে মানসিক কাউন্সিলিং।
এ অবস্থায় সেভ দ্য চিলড্রেন বলছে, এই আশ্রয় শিবিরে এসব এতিম শিশু অপহরণ, যৌনতা ও শ্রমে নিয়োজিত হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশে সেভ দ্য চিলড্রেনের ডিরেক্টর মার্ক পিয়ার্স বলে, ১২ মাস আগে আমাদের টিমের সদস্যরা দেখতে পান এসব শিশু একা একাই বাংলাদেশে আসছে। তখন তারা এতটাই হতাশায়, ক্ষুধার্ত ও নিঃশেষিত অবস্থায় ছিল যে, কথা পর্যন্ত বলতে পারছিল না। (লন্ডনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবলম্বনে)

জর্ডানে জেসমিনের ওপর বর্বরতা by রিপন আনসারী

‘মদ খেয়ে প্রতিরাতে বাসার মালিক ও তার ছেলে যৌনক্ষুধা মিটাতো। মারধর, গরম খুন্তি দিয়ে পিঠে ছেঁকা আর  সারাদিন পায়ে শিকল দিয়ে বেঁধে আটকে রাখতো। এভাবে ওই বাসায় কয়েক মাস নির্যাতনের পর তুলে দেয়া হয় সোনিয়া নামের এক বাংলাদেশির কাছে। জর্ডানের দাম্মাম শহরের সোনিয়ার বাসাটি ছিল মিনি পতিতালয় তা জানা ছিল না।  ভেবেছিলেন বাঙালির কাছে আশ্রয় পেয়েছি ভালো থাকবো। তা আর হলো না।
আমার মতো আরো ২০ নারীকে দিয়ে ওই নারী যৌনকাজে বাধ্য করতো। একবার  পালিয়ে গিয়েও রক্ষা পাইনি। আবার ধরে নিয়ে  আমাকে তার বাসার নিচতলায় ভারতের নাগরিক নির্মাণ শ্রমিক গরজিদের কাছে তুলে দেয়।  কোনোভাবেই নিজেকে আর রক্ষা করতে পারলাম না। এক পর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। পরে সোনিয়া  টের পেয়ে আমাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। দুই মাস জেল খাটার পর পেটে সন্তান বহন করে ১৮ই এপ্রিল ওই দেশের সরকারের সহায়তায় দেশে ফিরে আসি।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে লোমহর্ষক নির্যাতনের এই কাহিনী তুলে ধরেন জর্ডান ফেরত এক নারী।  মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার বাস্তা গ্রামের দরিদ্র এক রিকশাচালক তারা মিয়ার মেয়ে এখন কন্যা সন্তানের জননী। এ দায় কার, এনিয়ে দিশাহারা পরিবারটি। তাছাড়া, সমাজ এই পরিবারের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। গেল বৃহস্পতিবার সিংগাইরের একটি ক্লিনিকে পিতার নাম অন্য পরিচয়ে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন। তার দাবি এই সন্তানের পিতা ভারতীয় নাগরিক গরজিদ।
ওই নারী জানান, ১০ মাস তাকে বাসায় আটকে রেখে যৌনকাজে বাধ্য করা হলেও একটি টাকাও তুলে দেয়া হয়নি তার হাতে। শূন্য হাতেই তিনি বাড়ি ফিরেছেন। তিনি তার জীবনটা নষ্ট করার জন্য সোনিয়া আক্তারের উপযুক্ত শাস্তি দাবি করেন। সেই সঙ্গে এই কন্যা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সামাজিক ভাবে কি পরিচয় দেবেন এই সন্তানের। প্রতিবেশীরা নানা ধরনের কথা  শোনাচ্ছেন তাকে ও তার পরিবারকে। তিনি জানান, শেষমেশ কোনো উপায় না পেয়ে মঙ্গলবার সিংগাইর থানায় মামলা করতে বাধ্য হয়েছি।
কথা হয় তার পিতা তারা মিয়ার  সঙ্গে। তিনি পেশায় একজন রিকশাচালক। নিজের জমি নেই। শ্বশুরবাড়িতে ছোট একটি টিনের দোচালা ঘরে বসবাস করেন। তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে এই মেয়ে সবার বড়। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে ১৫ বছরের মেয়েকে ২৫ বছর দেখিয়ে পাসপোর্ট করে দেয় স্থানীয় আদম ব্যবসায়ী কাশেম আলী। এরপর ১০ হাজার টাকা ঋণ করে ২০১৬ সালের ২৩শে অক্টোবর জর্ডানে পাঠানো হয়। কথা ছিল তার মেয়েকে নিয়ে বাসাবাড়িতে কাজ দেবেন। কিন্তু জর্ডানে যাওয়ার পর মেয়ের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। দালাল কাশেমের কাছে মেয়ের খোঁজ নিলে সে জানিয়ে দেয় জর্ডানে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু সেখান থেকে সে  পালিয়ে গেছে। এর দায়িত্ব সে নিতে পারবে না। মেয়ের সন্ধান চেয়ে কাসেমের বিরুদ্ধে একটি  মামলাও করা হয়েছিল। দেড় বছর পর জানা যায় সিংগাইর উপজেলার চান্দহুর ইউনিয়নের চরচামটা গ্রামের নিহাজ উদ্দিনের মেয়ে সোনিয়ার কাছে জর্ডানে আছে। সোনিয়ার সঙ্গে মোবাইলফোনে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হই।  
তারা মিয়া জানান, অবিবাহিত মেয়ে বিদেশ থেকে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে ফিরেছে। এলাকায় কানাঘোষা হচ্ছে। লজ্জায় বাড়ির বাইরে বের হতে  পারি না। নানাজনে নানা কথা বলে। সমাজের মাতবর আলেক উদ্দিন কোরবানি ঈদের আগে জানিয়ে দেন সমাজ থেকে তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। সমাজের মানুষ তাদের পাশে নেই। কিন্তু যাদের জন্য আজ তার মেয়ের এই অবস্থা তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চান তিনি। এছাড়া বাধ্য হয়ে জর্ডান প্রবাসী সোনিয়াসহ আরো ৫ জনের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার  সিংগাইর থানায় মামলা করা হয়েছে।
তিনি জানান, বড় আশা করে মেয়েকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মেয়ে নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন। মেয়ের কন্যা সন্তান কার পরিচয়ে বড় হবে তা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তায় তিনি।
স্থানীয় দালাল আবুল কাশেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অনেক নারী শ্রমিককে তিনি বিদেশে পাঠিয়েছেন। এমন ঘটনা কারো সঙ্গে হয়নি। এর জন্য তিনি দায়ী নন, সোনিয়া নামের নারী তাকে দিয়ে খারাপ কাজ করিয়েছে। তারা মিয়া মামলা করেছিল, পরে বিদেশ থেকে ফেরার পর স্থানীয়ভাবে বসে মামলাটি আপোষ করা হয়েছে।
সিংগাইর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খন্দকার ইমাম হোসেন জানান, অন্তঃসত্ত্বা হয়ে নারী শ্রমিক দেশে এসে সন্তান প্রসবের ঘটনার খবর শোনার পর  মেয়েটির পরিবারকে আইনগত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছি। মঙ্গলবার  ভুক্তভোগী ওই নারী থানায় ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করলে এদের মধ্যে দুই আসামিকে আটক করা হয়েছে।

‘ঐক্য হলে সরকার হেরে যাবে’ by কাফি কামাল

রাজনীতিতে পরিবর্তন ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা জাতীয় ঐক্যের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের মধ্যে গড়া ঐক্য প্রক্রিয়ায়  বিএনপিসহ আরো রাজনৈতিক দলগুলোকে যুক্ত করায় ভূমিকা রাখছেন তিনি। গতকাল ঐক্য প্রক্রিয়ার বিষয়ে মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকারীরা মনে করেন, ঐক্য হলে সরকার হেরে যাবে। কারণ দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। পরিবর্তনের জন্য একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দরকার। একবার নয়, ভবিষ্যতেও যেন সুষ্ঠু নির্বাচন হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে এখন সুশাসন নেই, সুবিচার নেই। মামলার ফ্যাক্ট ডিসাইড করে আইনমন্ত্রী। বা অন্য জায়গা থেকে। উল্টোদিকে এই জাতীয় ঐক্য যদি নির্বাচনে জিতে তারাও কী ১ লাখ লোককে কারাগারে পাঠিয়ে দেবে? তারা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, কোনোরকম জিঘাংসা হবে না। ন্যায়বিচারের ব্যত্যয় ঘটবে না। তিনি বলেন, ড. কামাল হোসেন যখন আইনমন্ত্রী ছিলেন তখন দেশে লোক ছিল ৭ কোটি এবং অ্যাটর্নি জেনারেলসহ তার অফিসে ছিল একজন ডেপুটি ও একজন সহকারী। এখন দেশের লোক ১৬ কোটি। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিসে ১০০ জন লোক। আর একশ’জন থাকায় তারা মামলা তৈরি করে, হয়রানি তৈরি করে। আগে কখনও কোনো সরকারই খুন-খারাবির আসামি ছাড়া রাজনৈতিক কেসে হাইকোর্টে ফাইট করতো, সুপ্রিম কোর্টে নয়। যেটা এখন খালেদা জিয়া ও শহিদুলের ক্ষেত্রে করছে।
এ ধরনের জিঘাংসা হবে না। পুলিশ ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করা হবে না। তারা এসব প্রতিশ্রুতি দিতে চায়। এই যে কোটা আন্দোলন, এখানে কোটা উঠিয়ে দিলেই হবে না। সেখানে সংস্কারের দরকার আছে। সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের মূল লক্ষ্য- নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নীতি প্রতিষ্ঠা। জনগণ যেন দ্রুত বিচার ও নায্যবিচারটা পায়। সব ব্যাপারেই উনারা ওয়ার্ক করছেন। সে ওয়ার্কের ভিত্তিতে পরিবর্তন করতে চান। ডা. জাফরুল্লাহ বলেন, সবাই একত্রে না হলে কিছুই হবে না। এটা তো আইনের সরকার নয়, আইন দিয়ে তো চলে না। সবাই সম্মিলিত না হলে দেশের মঙ্গল হবে না, নিজেদেরও মঙ্গল হবে না। দেশের স্বার্থেই আজকে সবাইকে সম্মিলিত হয়ে, যৌথভাবে অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, তারা বিশ্বাস করেন- জনগণ পরিবর্তন চায়। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সম্মিলিত জাতীয় ঐক্য নির্বাচিত হবে। তখন অবশ্যই এ সম্মিলিত ঐক্য প্রক্রিয়া সংবিধানসহ সর্বক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে পারবে। তারা নির্বাচিত হলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবেন। এখন যে নিবর্তনমূলক আইন আছে তা থাকবে না। পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয়করণের অবসান করবেন। ছাত্ররা যে আন্দোলন করেছেন তারা সে আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে করেন। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি ও ন্যায়পাল প্রতিষ্ঠা করবেন। কেন্দ্রিকতা কমাবেন। সংবিধানের ১৫, ৫৯, ৬০ বিধিগুলো বাস্তবায়ন করবেন। এ জন্য তারা একটি গ্রুপ করেছেন। সে গ্রুপ জনগণ কি চায়, কোথায় কোথায় কি কাজ করতে হবে তা ঠিক করবে।
সম্মিলিত ঐক্য নির্বাচিত হলে সে সরকারের নেতৃত্বে নিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলের গুঞ্জন সম্পর্কে তিনি বলেন, বি. চৌধুরী বলেছেন- উনি কোনোটাই হতে চান না। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো পদ-পদবির দাবি করেননি। তিনি ক্ষমতার ভারসাম্য চান। বিএনপি যদি এ প্রক্রিয়ায় আসে এবং তারা যদি নির্বাচনে ১৫০টির বেশি আসন পায় তাহলে বাকিদের পরোয়া করবে না, ভুলে যাবে, তখন কি হবে? তবে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বি. চৌধুরীর প্রস্তাব গৃহীত বা আলোচিত হয়নি। অতএব এটা নিয়ে এখন আর কথা না বলাই ভালো। আর ড. কামাল হোসেন তো এ প্রসঙ্গে কোনো কথাই বলেননি। জাফরুল্লাহ বলেন, ঐক্যপ্রক্রিয়ায় যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে সেটা হচ্ছে- প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর। আর ভারসাম্য হচ্ছে সেটা, যেখানে ১০ জনের মন্ত্রিসভা হলে বিএনপিরই ৮ জন থাকবে না।
কিন্তু নির্বাচনে না জিতলে কিছুই করা যাবে না। আসন বণ্টন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসন বন্টন নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। কথা হয়েছে, যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে। যারা রাজনীতিকে ব্যবসা নয়, সেবা হিসেবে দেখেন। সেক্ষেত্রে রাজি হলে রাজনীতির বাইরে থাকা কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিও রাজনীতিতে আসতে পারেন, বিভিন্ন দলের প্রার্থী হতে পারেন। তবে এটা প্রাক আলোচনায় এসেছে যে, বিএনপি ২০০ আসনে নির্বাচন করুক, অন্যদের ১০০টি আসন ছেড়ে দিক। সেক্ষেত্রে বিএনপি ১৪০টিও পেতে পারে। আর আওয়ামী লীগও সিট পাবে। তবে এভাবে ভাগ বাটোয়ারা করে কোনো লাভ হবে না।
আগামী নির্বাচন কাদের অধীনে চায় জাতীয় ঐক্যের অংশীজনেরা- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রবীণ এ পেশাজীবী বলেন, একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনেই হওয়া উচিত। জাতীয় ঐক্যের আহ্বানকারীরাও বলেছেন নিয়ম অনুযায়ী সংসদ ভেঙে দিতে হবে। একটি সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য আলোচনা করতে হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী গোঁ-ধরে বসে আছেন- তিনি সংবিধানের মধ্যেই থাকবেন। উনি উনার কথা বলছেন না, উনি বলছেন, আমি সংবিধানের বাইরে কিছু করবো না। সংবিধান হলে আউটগোয়িং প্রাইম মিনিস্টার থাকেই। এটাই হচ্ছে উনার চালাকি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন হবে। প্রধানমন্ত্রীর অধীনে নির্বাচনকালীন একটি ক্ষুদ্র মন্ত্রিসভা হবে। সেখানে টেকনিক্যাল কারণে বিএনপির মতো যারা সংসদে নেই তাদের মনোনীত ব্যক্তিরাও থাকতে পারেন, বাইরে থেকে কয়েকজন উপদেষ্টাও নেয়া যেতে পারে।
তবে তাদের নিরপেক্ষতা দৃশ্যমান ও প্রমাণিত হতে হবে। আর যদি শেখ হাসিনার অধীনে না হয়, আবার বিদ্যমান সংবিধানও রক্ষা করতে হয় সেক্ষেত্রে বর্তমান সংসদের মধ্য থেকেই কেউ একজন সে সরকারের নেতৃত্ব দিতে পারেন। ধরেন, তোফায়েল আহমেদ বা অন্য কেউ একজন। এতে আওয়ামী লীগেরই কথাও থাকলো। আপাতত, এ সংবিধানে বাইরে যাবার সুযোগ নেই। আর সংবিধান পরিবর্তন করে বিকল্প কিছু করার সময়ও কম। যদি আরো আগে থেকে আন্দোলনের মাধ্যমে সেটা হতো তাহলে অন্য কথা ছিল।
জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো দাবি আদায়ে কবে আন্দোলনে যেতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাস্তায় কবে নামবে সেটা এখনো জাতীয় ঐক্য ঠিক করতে পারেনি। যুগপৎ আন্দোলনটা কখন হবে? নির্বাচন তো গায়ে এসে গেছে। আন্দোলন আর বেশি করার সময় নেই। আন্দোলনের সময় আছে মাত্র এক থেকে দুই মাস। বড়জোর দুই মাস। তারপর তো নির্বাচনের জন্য প্রত্যেককেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তে হবে। এই দুই মাসে তাদের জনগণকে জানাতে হবে, তারা কি চায় এবং কীভাবে চায়।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরাম যে আহ্বান জানিয়েছে সেখানে জামায়াত ও স্বাধীনতা বিরোধী দল ছাড়া সবার অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। বিএনপির সে প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের বেশিরভাগই সেটা চায়। এছাড়া জামায়াতকেও বাস্তবতা বুঝতে হবে। আমি মনে করি, জামায়াতকে ছাড়া ঐক্য হলেও তাদের অখুশি হওয়ার কিছু নেই। বরং তাদের এ প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানানো উচিত। তারা বলতে পারে, যদি আমাদের কারণে ঐক্যপ্রক্রিয়ায় অন্তরায় তৈরি হয় তবে আমাদের বাদ দেন। আমাদের সঙ্গে না নিলেও আমরা চাই আপনাদের এ যাত্রা সফল হোক। জামায়াত এটাও বলতে পারে যে, ক্ষমতায় গেলে আপনারা আমাদের প্রতিও ন্যায়বিচার করবেন। আবার পরিবর্তনের আন্দোলনে অংশ নেয়ার অধিকার তো তাদের আছেই। সেক্ষেত্রে তারা এ ঐক্যপ্রক্রিয়ার বাইরে তাদের মতো আন্দোলন করতে পারে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তির প্রসঙ্গে জাতীয় ঐক্যের মনোভাব সম্পর্কে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমি সব সময় বলি- সুষ্ঠু বিচার হলে খালেদা জিয়া খালাস পাবেন। সরকার উনাকে হয়রানি করছে। তার মানে এটা নয় যে, উনি গণতন্ত্রের জন্য কারাভোগ করছেন। জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কেউ তার মুক্তির ব্যাপারে দ্বিমত নয়। তারা সবাই বলছে, খালেদা জিয়ার প্রতি ন্যায়বিচার হোক, সুবিচার হোক। এছাড়া যুক্তফ্রন্ট ও গণফোরামের বৈঠকে যে ৭ দফা প্রস্তাব উঠে এসেছে সেখানে কিন্তু পরিষ্কার বলা আছে, নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক মামলার আসামিদের মুক্তি দেয়া হোক এবং নির্বাচনের আগে নতুন করে কাউকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি যেন না করা হয়।
নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যের বিজয় হলে যে সংসদ গঠন হবে তাতে কে নেতৃত্ব দেবে- বিএনপি নাকি অন্য দল? এমন প্রশ্নের উত্তরে ঐক্যপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এগুলো এখন পর্যন্ত আলোচনায় আসেনি। তবে বিশ্বে এখন বহু নজির তৈরি হচ্ছে। ভারতের কর্ণাটকে কংগ্রেস মেজরিটি পেয়েও ছেড়ে দিয়েছে। মালয়েশিয়ায় আনোয়ার ইবরাহীমের দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ছাড় দেয়ায় মাহাথির মুহাম্মদ ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু এসব আসলে পরের ধাপ। আগে আন্দোলন, আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচনের দাবি আদায় এবং নির্বাচনে বিজয়ের পর বাকি সব।
আগামী জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কূটনীতিকদের ভূমিকা প্রসঙ্গে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দিল্লি বা ওয়াশিংটন নয়, আমি মনে করি- আমাদের মূল ফ্যাক্টর হলো জনগণ। দিল্লি বা ওয়াশিংটনের দিকে চেয়ে থেকে লাভ নেই। আমাদের ঘর যদি ঠিক থাকে তারা কেউ কিছু করতে পারবে না। আমাদের উচিত সবার আগে জনগণকেই মর্যাদা দেয়া এবং তাদের সঙ্গে কথা বলা। কেবল ভারত ও আমেরিকাকে না ধরে থেকে সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক গড়তে হবে। বিশেষ করে আমাদের ওআইসির দেশগুলোর সঙ্গে আরো ভালো এবং বেশি সম্পর্ক থাকা দরকার। সর্বোপরি আমাদের মূলশক্তি জনগণ।

ভিন্নমত গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ -ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট

ভিন্নমত হলো গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। তাই ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ না দেয়া হলে গণতন্ত্রের এই রক্ষাকবচ বিস্ফোরিত হবে। বুধবার একটি পিটিশনের জবাবে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই মন্তব্য করেছেন। ভারতের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার অভিযানকে চ্যালেঞ্জ করে ওই পিটিশনটি দাখিল করা হয়। এর জবাবে প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের ওই বেঞ্চ বলেছে, গ্রেপ্তারকৃত বুদ্ধিজীবীদের জেলে পাঠানো যাবে না। বড়জোর তাদের গৃহবন্দি রাখা যেতে পারে। আগামী ৬ই সেপ্টেম্বর এই বিষয়ে পরবর্তী শুনানি না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ নিজগৃহে তাদের ওপর নজরদারি করতে পারবে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
এ খবর দিয়েছে এনডিটিভি ও আল জাজিরা।
খবরে বলা হয়, বর্ণভিত্তিক সহিংসতা উস্কে দেয়া ও মাওবাদী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে মঙ্গলবার পাঁচজন বুদ্ধিজীবীকে গ্রেপ্তার করে মহারাষ্ট্র পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে মানবাধিকার সংগঠন পিইউসিএলের প্রধান সুধা ভরদ্বাজ, মানবাধিকার কর্মী ও প্রাবন্ধিক গৌতম নওলাখা ও মাওবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল কবি ভারভারাও রয়েছেন। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা গত বছরের শেষের দিকে কোরেগাঁও অঞ্চলে সংঘটিত সহিংসতায় উস্কানি দিয়েছেন। তখন উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে দলিত হিন্দুদের সহিংসতা হয়। এতে অন্তত একজন নিহত হন। এর প্রেক্ষিতে তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরে বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরকে এভাবে গ্রেপ্তারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেন বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রোমেলা থাপার, বামপন্থি বুদ্ধিজীবী প্রভাত পট্টনায়ক, সতীশ দেশপাণ্ডেসহ আরো কয়েকজন। ওই রিটের প্রেক্ষিতে বুধবার সুপ্রিম কোর্টে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিচারপতিরা প্রশাসনের ভূমিকার সমালোচনা করেন। বিচারপতি ওয়াইবি চন্দ্রচূড় বলেন, মনে হচ্ছে সরকার সবপক্ষকে স্তব্ধ করে দিতে চায়। পরে সুপ্রিম কোর্ট পিটিশনের পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত গ্রেপ্তারকৃত বুদ্ধিজীবীদের গৃহবন্দি করার জন্য সরকারকে অনুমতি দেন। এছাড়া, পাঁচ বুদ্ধিজীবী গ্রেপ্তারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়েরকৃত পিটিশনের বিষয়ে কেন্দ্র ও মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারকে নোটিশ পাঠিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। পিটিশনের জবাব দেয়ার জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে আগামী বুধবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। পরেরদিন বৃহস্পতিবার এই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবারো শুনানি হবে। পাশাপাশি দেশব্যাপী অভিযান ও গ্রেপ্তারের ঘটনা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

উত্তাল গুজরাটের রাজনীতি: বাংলাদেশি পাটের বস্তা আমদানি কেলেঙ্কারি

চার হাজার কোটি টাকার কথিত চিনাবাদাম কেলেঙ্কারি নিয়ে গুজরাটের রাজনীতি উত্তাল ছিল। কিন্তু মঙ্গলবার গুজরাটের গান্ধীনগরে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে সেই একই কথিত কেলেঙ্কারিতে যুক্ত করা হলো বাংলাদেশের নাম।
গুজরাটের বিধান সভার বিরোধী দলীয় নেতা ও সিনিয়র কংগ্রেস নেতা পরেশ ধানানি এদিন বলেছেন, আরো একটি ‘নতুন কেলেঙ্কারি’ উদ্ঘাটিত হয়েছে। আর সেটা হলো রাজ্যের বিজেপি সরকার ওই চিনেবাদাম বোঝাই করার জন্য বাংলাদেশের কয়েকটি সংস্থার কাছ থেকে পাটের থলি আমদানি করেছিল। আর তাতেও তারা দুর্নীতি করেছে।
বাংলাদেশের কোন কোন সংস্থার কাছ থেকে বিজেপি সরকার পাটের থলি আমদানি করেছে, সে বিষয়ে কংগ্রেস নেতা কোনো ইঙ্গিত দেননি। তবে বিধান সভার বিরোধী দলীয় নেতা আরো আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ‘পাটের থলে কেলেঙ্কারির উৎপত্তিটা বাংলাদেশেই নিহিত থাকতে পারে।’ (দি অরিজিন অব দি হেসিয়ান স্যাকস স্ক্যাম মে লে ইন বাংলাদেশ।’)
বিরোধী দলীয় নেতা মি. ধানানির অভিযোগ, এই পাটের থলে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করতে গিয়ে রাজ্য সরকার বাংলাদেশে প্রায় ৫০ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার রাজ্য কৃষিমন্ত্রী আর সি ফালদুর সঙ্গে বৈঠকের পরপরই তিনি ওই সংবাদ সম্মেলন ডাকেন।
কংগ্রেস নেতা ধানানি বংলাদেশে কার কার কাছ থেকে পাটের থলে সংগ্রহ করেছে, তাদের প্রত্যেকের নাম, কত দরে এবং মোট কি পরিমাণ কেনা হয়েছে, তার হিসাব অবিলম্বে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি এ বিষয়ে তদন্ত চালানোর দাবি করেছেন। তিনি বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত যতো পাটের থলে কেনা হয়েছে, তার মধ্যে কতোটা ইতিমধ্যে ব্যবহৃত এবং কতোটা অব্যবহৃত এবং সেসব থলে এখন কোথায় কি অবস্থায় রয়েছে, তার তথ্য প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন।
মি. ধানানি এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ করেন যে, চিনেবাদাম কেলেঙ্কারি তদন্তে এর আগে বারংবার বিজেপি সরকারের কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানালেও সরকার সে বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। তিনি বলেন, চার হাজার কোটি টাকার চিনেবাদাম কেলেঙ্কারির ঘটনায় সরকার যদি বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ প্রদান না করে তাহলে আমি আবারও ৭২ ঘণ্টার আমরণ অনশনে বসবো।
কংগ্রেস নেতা এর আগে একই বিষয়ে রাজ্যের আমেরেলিতে ৭২ ঘণ্টার এক অনশন ধর্মঘটে অংশ নিয়েছিলেন।
ওই সংবাদ সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা পরেশ ধানানি অভিযোগ করেন যে, কৃষিতে ভর্তুকির নামে গুজরাটের বিজেপি সরকার গত ৩ বছরের ব্যবধানে এক লাখ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি করেছে। তার কথায়, কৃষি খাতে ‘মোদিফিকেশন’ চলছে। আর তার আওতায় প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে কৃষকদের ‘লুট’ করে সর্বস্বান্ত করার লাইসেন্স দিয়েছে। নামকরণ করেছে শস্যবীমা স্কিম, যার আওতায় এক কোটি রুপির বেশি প্রিমিয়াম দিয়েছেন কৃষকরা। কিন্তু সরকারের কাজ হলো কৃষকদের ফতুর করা। তিনি এই স্কিম বাতিল করে বরাদ্দকৃত টাকা গ্রাম পঞ্চায়েতদের মাধ্যমে সরাসরি বিতরণের দাবি জানিয়েছেন।

জনকল্যাণের জন্যই রাজনীতি ভোটের জন্য নয়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করে, ভোটের জন্য নয়। ক্ষমতা আমাদের কাছে কোনো ভোগের বস্তু নয়, এটা আমাদের দায়িত্ব। গতকাল গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে গোপালগঞ্জে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং গোপালগঞ্জের পার্শ্ববর্তী ৮ জেলার ২০ উপজেলায় কমিউনিটি ভিশন সেন্টারের উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনীতি করি জনগণের জন্য। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য। ভোট দেয়া না দেয়া এটা জনগণের অধিকার। কিন্তু জনসেবা করবো, জনগণকে একটু সুখ শান্তি দেবো, তাদের রোগে চিকিৎসা দেবো, তাদের একটু উন্নত জীবন দেবো, তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো-এটাতো রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আমাদের অঙ্গীকার। শেখ হাসিনা বলেন, কি অদ্ভুত আমাদের দেশের মানুষের চরিত্র যে বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০১ সালের পর ক্ষমতায় এসেই এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দিলো।
শুধু এই একটা অজুহাতে যে এই ক্লিনিকে যারা কাজ করবে এবং যারা স্বাস্থ্যসেবা পাবে, তারা সব নৌকায় ভোট দেবে। তিনি বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি, ক্ষমতায় আসলো বিএনপি-জামায়াত জোট। তারা ক্ষমতায় এসেই এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো বন্ধ করে দিয়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবা বন্ধ করলো। স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার এ কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এজন্যই জাতির পিতা স্বাধীনতার পর যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে প্রতিটি গ্রামে অন্তত ১০ শয্যার একটি করে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এই স্বাস্থ্যসেবা আধুনিকায়নের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ২০ উপজেলার কমিউনিটি ভিশন সেন্টারের কর্মকর্তা, চিকিৎসক এবং উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালিক এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বাস্থ্য বিভাগের সচিব সিরাজুল হক খান অনুষ্ঠানে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন।
এছাড়া, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, প্রখ্যাত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. দীন মোহাম্মদ নুরুল হক এবং ভারতের মুম্বাইয়ের অরবিন্দ চক্ষু হাসপাতালের চেয়ারম্যান আর. ডি. রবীন্দ্রান বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গোপালগঞ্জ থেকে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় অন্ধত্ব নিবারণ কর্মসূচির আওতায় গোপালগঞ্জে এই চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং ২০ উপজেলায় কমিউনিটি ভিশন সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে। অরবিন্দ আই কেয়ার সিস্টেম ভারত থেকে সরবরাহকৃত আধুনিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে কমিউনিটি ভিশন সেন্টারগুলোতে চক্ষু চিকিৎসা পাবে জনগণ। পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এই কমিউনিটি ভিশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সরকারের রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এর আওতায় হতদরিদ্র রোগীদের চক্ষু চিকিৎসার জন্য ২০ কোটি টাকার একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠনেরও ঘোষণা দেন অনুষ্ঠানে। কমিউনিটি ভিশন সেন্টার স্থাপিত ২০ উপজেলা হচ্ছে- গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া, কোটালিপাড়া, কাশিয়ানী এবং মকসুদপুর, বাঘেরহাটের ফকিরহাট, নড়াইলের লোহাগড়া ও কালিয়া, মোল্লারহাট, চিতলমারি, রামপাল, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, সদরপুর, আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারি, খুলনার রূপসা, দিঘলিয়া, তেরোখাদা, মাদারীপুরের রাজৈর, পিরোজপুরের নাজিরপুর ও রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ। চক্ষু চিকিৎসার এই প্রতিষ্ঠানগুলো উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের চোখে ছানি পড়া, গ্লুকোমা, ডায়াবেটিক চক্ষু রোগী, রেটিনোপ্যাথি, কিশোর চক্ষুরোগ, চোখের আঘাতসহ অন্যান্য চক্ষু রোগ শনাক্ত করা এবং এর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেয়া হবে এসব সেন্টারে।
এরপর আরো উন্নত সেবার জন্য তারা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব চক্ষু হাসপাতাল ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা সেবা নিতে পারবে। চক্ষু রোগে আক্রান্তদের সচেতনতা ও চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি চক্ষু চিকিৎসকসহ এ সেবায় জড়িতদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়ে এসেছি অন্ধজনে দাও আলো। এর চেয়ে মহৎ কাজ আর কিছু হতে পারে না। তিনি বলেন, একজন মানুষের দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবে, সে তার আপনজনকে দেখবে, এই সুন্দর পৃথিবীকে দেখবে, এটা অনেক বড়, মানবতার কাজ। এ সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে আজীবন ত্যাগ স্বীকার করে যাওয়া মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদানের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, আমি সব সময় মনে রাখি যে আমার বাবা দেশ স্বাধীন করে গেছেন।
কাজেই জনগণের সেবা করাটাই আমার প্রথম কর্তব্য। মানুষের সেবা করাটাকে আমি কর্তব্য হিসেবে নেই। সরকার প্রধান বলেন, আমরা জেলা পর্যায়ে মেডিকেল কলেজ করেছি। দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছি। দুটো মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে করা হয়েছে। আরো একটা করার পরিকল্পনা আছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে আমাদের লক্ষ্য, প্রতিটি ডিভিশনাল হেডকোয়ার্টারে আমরা একটা করে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করে দেবো।

রোহিঙ্গা ইস্যু: জাতিসংঘে আলাপ হলো, উদ্যোগ নেই

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোরালো বিতর্ক হয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে। সেখানে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নৃশংস নির্যাতনের বিচার  দাবি করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁ। পাশাপাশি মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি মিয়ানমারের এ অপরাধকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে নেয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছে সুইডেন ও নেদারল্যান্ডস।
কিন্তু মিয়ানমারের ঘনিষ্ঠবন্ধু রাষ্ট্র চীন মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করে মিয়ানমার সরকারকে রোহিঙ্গা শরণার্থী প্রত্যাবর্তনে কাজ করতে দেয়া উচিত। ওদিকে অস্কার বিজয়ী অভিনেত্রী ও জাতিসংঘের শুভেচ্ছাদূত কেট ব্লানচেট বলেছেন, আমরা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছি। তিনি মঙ্গলবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমার পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বক্তব্য দেন।
ব্লানচেট বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর যে ভয়াবহ গণহত্যা চালিয়েছে তার বীভৎস চিত্র তার মনের ভেতর। এমন অভিজ্ঞতার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরে তাদের ভয়াবহ দুর্ভোগ নিজের চোখে দেখেছেন তিনি। কেট ব্লানচেট নিজে একজন মা। তাই শরণার্থীদের প্রতিটি শিশুকে দেখে তার মনে নিজের সন্তান যেন জেগে উঠেছিল। আবেগতাড়িত কেট ব্লানচেট নিরাপত্তা পরিষদের কাছে প্রশ্ন রাখেন, নিজের শিশুকে আগুনে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে এই দৃশ্য কোনো মা সহ্য করতে পারেন? আমাদের সামনে কোনো বিকল্প নেই। আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা যেন আবার ব্যর্থ না হই। বার্তা সংস্থা এপির খবরে এ কথা বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংস নির্যাতনের বছরপূর্তিতে মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসে। সেখানে জাতিসংঘ মহাসচিব ওই আহ্বান জানান।
বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদেরকে দেখা হয় বহিরাগত হিসেবে, যদিও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা সেখানে বসবাস করছে। ১৯৮২ সাল থেকে সেখানে প্রায় সব রোহিঙ্গার নাগরিকত্ব প্রত্যাখ্যান করা হয়। এর ফলে তারা হয়ে পড়ে রাষ্ট্রহীন। তাদের চলাফেরা ও মৌলিক অধিকার প্রত্যাখ্যান করা হয়। গত বছর ২৫শে আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি (আরসা) হামলা চালায় নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ওপর। এতে তাদের কয়েকজন নিহত হয়। এর প্রতিশোধ নিতে সেনারা নিরস্ত্র সাধারণ রোহিঙ্গাদের ওপর চালাতে থাকে নৃশংস নির্যাতন। ধর্ষণ, হত্যা, নির্যাতন, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেয়।
বিষয়টিকে জাতিসংঘ মহাসচিব জাতি নিধন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মঙ্গলবার নিরাপত্তা পরিষদের কাছে জাতিসংঘের তদন্ত ও সুপারিশের বিষয়ে কথা বলেন। বলেন, এসব তদন্ত ও সুপারিশ জাতিসংঘের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পরিষদ বা সংগঠনের গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি রাখে। তিনি বলেন, জবাবদিহি বা বিচারের মেকানিজম বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ, পক্ষপাতহীন, নিরপেক্ষ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি মিয়ানমারের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘে নিযুক্ত সুইডেনের উপ রাষ্ট্রদূত কার্ল স্কাউ আরো একটু এগিয়ে বলেছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী যে ভয়াবহ মাত্রায় নৃশংসতা চালিয়েছে তাতে তার দেশ রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর আহ্বান জানায়। তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি সামনে এগিয়ে যাওয়ার এখনই সময়। এ বিষয়ে পরিষদের সদস্যদের মধ্যে একটি প্রস্তাবের বিষয়ে আমাদের উচিত পরামর্শ করা।
নিরাপত্তা পরিষদের ওই অধিবেশনে বক্তব্য দেন মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ হাউ ডো সুয়ান। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের সঙ্গে তার সরকার কেন সহযোগিতা করেনি সে বিষয়ে তিনি বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তারা পক্ষপাতিত্বহীন হবে কি না এ নিয়ে উদ্বেগ ছিল বলে তার সরকার ওই মিশনকে সহযোগিতা করেনি। তিনি বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের এই বৈঠকের আগে প্রকাশ করা হয়েছে ওই রিপোর্ট। ফলে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের উদ্দেশ্য, পক্ষপাতিত্বহীনতা ও আন্তরিকতা নিয়ে গুরুত্বর প্রশ্ন রয়েছে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় উগ্রপন্থি একটি গ্রুপ যে হামলা চালিয়েছিল তার প্রেক্ষিতে প্রতিটি নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য মিয়ানমারের নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা অভিযান চালিয়েছে। এর ফলে অনেক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে মিয়ানমার সরকার একটি ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন অব ইনকুয়ারি গঠন করেছে।
তারা এক বছরের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। এতে নেতৃত্বে রয়েছেন ফিলিপাইনের সাবেক উপ পরারাষ্ট্রমন্ত্রী রোজারিও মানালো। তার সঙ্গে আছেন জাতিসংঘে নিযুক্ত জাপানের সাবেক রাষ্ট্রদূত কেনজো ওশিমা ও মিয়ানমারের দুজন সদস্য। নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য দেন চীনের জাতিসংঘে নিযুক্ত উপ রাষ্ট্রদূত উউ হাইতাও।
তিনি বলেন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে রাখাইন ইস্যুটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান করা উচিত। এখন যে বিষয়ে জোর দেয়া উচিত তা হলো যত তাড়াতাড়ি পারা যায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন শুরু করা। এক্ষেত্রে কোনো পূর্বশর্ত দেয়া উচিত নয়। প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া চলাকালে অবাধে চলাফেরা ও নাগরিকত্বের মতো বিষয়গুলো আস্তে আস্তে সমাধান করা উচিত। এক্ষেত্রে রাখাইনে যে দারিদ্র কমে আসছে সেদিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।
তাই ধৈর্য ধরা উচিত এবং মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনাকে প্রমোট করা উচিত। এক্ষেত্রে একটি ভারসাম্য ও সংঘাতহীন একটি পদক্ষেপের আহ্বান জানান জাতিসংঘে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া। তিনি বলেন, রাখাইনের গভীর সমস্যাকে শান্তিপূর্ণ ও কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করা উচিত। তিনি আশা করেন, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ধৈর্যের পরিচয় দেবেন।
পরিষদে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেন, প্রতি সপ্তাহেই রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন নতুন প্রমাণ মিলছে। তাদের বিরুদ্ধে যে নৃশংস অপরাধের প্রমাণ বেরিয়ে আসছে তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, কিন্তু তা এখন পর্যন্ত ন্যূনতমভাবে শুরুও করা যায়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের তাদের নিরাপরাত্তা, নিজেদের বাড়ি ফেরা, চলাফেরার স্বাধীনতা, কাজ করার সুযোগ, মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্বের দাবি মেটানো হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না।
নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বৃটিশ মন্ত্রী লর্ড তারিক আহমাদ। তিনি বলেন, অনেক দেশই এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করছে। বাংলাদেশকে সহায়তা করার নতুন করে প্রতিশ্রুতি রয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধানের একটি চুক্তি রয়েছে। তবে যা করার তার মধ্যে জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যারা এসব অপরাধ করেছে তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। ২০১৭ সালের আগস্টের পর জাতিসংঘের এজেন্সি ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।

লেখক ও সমাজকর্মীদের গ্রেপ্তারে ভারতে তীব্র প্রতিক্রিয়া

ভারতের পুলিশ মঙ্গলবার বিভিন্ন রাজ্যে হানা দিয়ে ৫ জন খ্যাতনামা লেখক, বুদ্ধিজীবী ও মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন  বুদ্ধিজীবী থেকে রাজনীতিবিদ সকলেই। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার, অর্থনীতিবিদ প্রভাত পট্টনায়েক, সতীশ দেশপান্ডে, মায়া দারনাল প্রমুখ ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ধৃত ৫ জনের মুক্তি দাবি জানিয়ে বুধবারই আবেদন করেছেন। বুধবার বিকেলেই এই আবেদনের শুনানী হওয়ার কথা। মঙ্গলবার হায়দরাবাদ থেকে কবি ভারভারা রাও, ফরিদাবাদ থেকে শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন পিপলস ইউনিয়ন অফ সিভিল লিবার্টিজ বা পিইউসিএলের প্রধান সুধা ভরদ্বাজ, দিল্লি থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী গৌতম নওলাখা, মহারাষ্ট্র্রের থানে থেকে আইনজীবী  ও মানবাধিকার কর্মী অরুণ ফেরেরা এবং মুম্বই থেকে আইনজীবী ভেনন গঞ্জালভেজকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা প্রত্যেকেই বামপন্থী হিসেবে সুপরিচিত। পুলিশের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে হত্যার এক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে এদের যোগসাজশ পাওয়া গিয়েছে। এই গ্রেপ্তারের নিন্দা করে লেখিকা অরুন্ধতী রায় বলেছেন, ঠিক যেন জরুরি অবস্থা। ওদের উচিত গোরক্ষার নামে যাঁরা গণপিটুনি দিয়ে সাধারণ মানুষকে হত্যা করছে এবং উস্কানি দিচ্ছে, তাঁদের গ্রেপ্তার করা। ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ টুইটারে গ্রেপ্তারের নিন্দা করে বলেছেন, এটি খুবই উদ্বেগজনক। দেশের স্বাধীন কন্ঠগুলো রুদ্ধ করার এই অভিযান বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টের এখনই হস্তক্ষেপ করা উচিৎ। সমাজবিজ্ঞানী রণবীর সমাদ্দার বলেছেন, এই গ্রেপ্তারের ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয়। দেশজুড়ে এরকম ঘটনা আরও ঘটছে। রাজনীতি নিয়ে সুস্থ আলোচনার পরিবেশটাই নষ্ট হতে চলেছে। বিরুদ্ধে কথা বললেই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। মানবাধিকার কর্মী রণজিৎ সুর বলেছেন, যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরা প্রত্যেকেই বিজেপি-আরএসএসের অসাধু কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছিলেন। দেশজুড়ে দলিত-আদিবাসী এবং মুসলিমদের উপরে যে ভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে, তার প্রতিবাদ করছিলেন এঁরা। গুজরাটের দলিত নেতা জিগ্নেশ মেবাণি, সাংবাদিক পরঞ্জয় গুহঠাকুরতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা নকুল সিংহ, সমাজকর্মী স্বামী অগ্নিবেশ ও আরও অনেকে এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন,  বিজেপির বিরুদ্ধে যাঁরাই সুর চড়িয়েছেন, তাঁদেরই পরিণতি ভয়ানক হয়েছে। ধৃত ৫ জনই পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য লড়াই চালাচ্ছেন। এঁদের গ্রেপ্তারের একটাই উদ্দেশ্য, ভয় দেখানো। ২০১৯ লোকসভা ভোটের আগে এভাবে মেরুকরণের রাজনীতি করতে চাইছে বিজেপি।  ৫ বিশিষ্ট লেখক ও সমাজকর্মীকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়ে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, ভয়-ভীতির পরিবেশ সৃষ্টির বদলে ভারতের উচিত মত প্রকাশ, সভা সমিতি গঠন এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা। এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্বজ্জনদের প্রতিবাদী ভাবমূর্তি এবং কাজকর্মের জন্যই কি তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে?

‘বিএনপির সঙ্গে আলাপ হবে’ -ড. কামাল

জাতীয় ঐক্যের ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে আলাপ হবে বলে জানিয়েছেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেছেন, দেশে এখন স্বৈরতন্ত্র চলছে। আমাদের লক্ষ্য হবে  গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। ডিসেম্বরের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কিনা উপস্থাপিকার এমন প্রশ্নে ড. কামাল বলেন, অংশগ্রহণমূলক হবে বলে আশা করি। কিন্তু আশা দেখি না। বেসরকারি টেলিভিশন ‘ডিবিসি নিউজ-এর টকশো ‘রাজকাহন’-এ গণফোরাম সভাপতি এসব কথা বলেন। মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়।
এতে ড. কামাল ছাড়াও অংশ নেন সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নবনীতা চৌধুরী। শুরুতেই সঞ্চালক ড. কামাল হোসেনকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেন জাতীয় ঐক্য মূলত কিসের জন্য? এই জোটে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কিনা? ড. কামাল হোসেন বলেন, বিএনপি বলছে, তারা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় ঐক্যেরও লক্ষ্য গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া। এ হিসেবে বিএনপির সঙ্গে আমাদের আলাপ হবে।
উপস্থাপিকা জানতে চান বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে একান্ত আলাপে সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বি. চৌধুরী বলেছেন- জোট ১৫০টি আসন চায়। তাহলে একটা ব্যালেন্স অব পাওয়ার নিশ্চিত হবে। জবাবে ড. কামাল বলেন, কি ধরনের ইলেকশন হয় তা দেখতে হবে। প্রথমত দেখবো গ্রহণযোগ্য ইলেকশন হবে কিনা। দ্বিতীয়ত, জনগণ নির্ভয়ে ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তন করার সুযোগ পাবে কিনা।
একই প্রশ্নে মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, এই জোটে যে ফেসগুলো দেখি তাদের সবার একটি রাজনৈতিক অতীত আছে।
নবনীতা চৌধুরীর প্রশ্ন- ঐক্য প্রক্রিয়া মালয়েশিয়া মডেলকে মাথায় রেখে কিনা? ক্ষমতায় যাওয়া হবে এবং আনোয়ার ইব্রাহীমের মতো খালেদা জিয়াকে কারামুক্ত করা হবে?
ড. কামাল বলেন, দুই দেশের সঙ্গে তুলনা করলে হবে না। আমরা মূলত গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাই। ভোট হয়ে যাবার পর কেউ হেরেছে, কেউ জিতেছে- এর মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয় না।
উপস্থাপিকার প্রশ্ন- বিএনপির ভোট রয়েছে। আপনারা কি ঠিক করলেন রাশ টেনে রাখবেন। এই ব্যবস্থাটা কি গণতান্ত্রিক? ড. কামাল বলেন, এরকম দাবি তো আমরা করি নাই। জোটবদ্ধভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেইনি। ড. কামাল বলেন, সিট নিয়ে আলোচনা অবশ্যই হবে। তখন কে কত সিট চাচ্ছে, পাচ্ছে তার সুরাহাও হবে।
উপস্থাপিকার প্রশ্ন-কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, সরকার গঠন করলে আপনাকে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করবেন। এই প্রস্তাব কোথা থেকে এলো? ড. কামাল বলেন, আসলে এটা আমার কথা ছিল না।
নবনীতার প্রশ্ন- আওয়ামী লীগ কেন মনে করে আপনি ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। তাদের নেতারা বলছেন- ১/১১-এর মতো অনির্বাচিত সরকার আনার কুশীলবদের মধ্যে আপনি একজন। আইনমন্ত্রী বলছেন আপনি জুডিশিয়াল ক্যু করার চেষ্টা করছেন?
ড. কামাল বলেন, এটা ভিত্তিহীন এবং মানহানিকর বক্তব্য। এটা টোটালি মিথ্যা। মানহানির মামলা করে সময় নষ্ট করতে চাই না। আমি মনে করি এটা সম্পূর্ণ মানহানিকর।
ড. কামাল বলেন, ২০০৭ সালে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হলে শেখ হাসিনা কি কি বিষয় আলোকপাত করেছেন সেটা দেখেন। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সকলে সমান সুযোগ পায় না। সংবিধানের কথা এলে ড. কামাল বলেন, আইন-সংবিধান আমাকে দেখানোর দরকার নেই। দেশে তথাকথিত ইলেকশন হয়েছে। এখন স্বৈরশাসন চলছে দেশে। আমাকে সংবিধানের কথা বললে দুঃখ লাগে।

প্রধানমন্ত্রী নেপাল যাচ্ছেন আজ: বিমসটেক সম্মেলনে থাকছেন না সুচি, রোহিঙ্গা ইস্যুও নেই!

বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে আজ দিনের শুরুতে নেপাল যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ৭ রাষ্ট্রের ওই জোটের এবারের সম্মেলনে মিয়ানমারের কার্যকর নেতা অং সান সুচি অংশ নিচ্ছেন না। রোহিঙ্গা নিপীড়ন প্রশ্নে বাংলাদেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের চাপের মুখে থাকা মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করবেন  দেশটির প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট। বহুমাত্রিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত ওই জোটের ৪র্থ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার সুযোগ খুব একটা নেই- এমনটাই বলছেন ঢাকার কর্মকর্তারা। যদিও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বসভা এখন সরব।
দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় উদ্যোগে পুঞ্জিভূত ওই সংকটের সমাধানই চাইছে ভুক্তভোগী বাংলাদেশ। তবে ঢাকা মনে করে বিমসটেকের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মিয়ানমার রোহিঙ্গা নিপীড়ন প্রশ্নে চাপে থাকলেও জোটের কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে এটি কোনো বাধা হবে না। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতে, ওই জোটের অত্যাসন্ন শীর্ষ সম্মেলনের মূল ফোকাস হচ্ছে- সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিমসটেক গ্রিড কানেকটিভিটি প্রতিষ্ঠা এবং  ফৌজদারি ও আইনি বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করা।
এ নিয়ে পৃথক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল প্রধানমন্ত্রীর বিমসটেক সম্মেলনে অংশগ্রহণ প্রস্তুতির বিস্তারিত জানাতে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করেন প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। পররাষ্ট্র ভবনের সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন-  রোহিঙ্গা সংকট বিমসটেকের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে না, কারণ এই জোটের মূল লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা। আমরা আশা করছি, এই সম্মেলন  থেকে আমাদের একটি বড় অর্জন হবে গ্রিড কানেকটিভিটি নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই হওয়া। মিয়ানমারসহ সব সদস্য দেশ ইতিমধ্যে এ বিষয়ে একমত হয়েছে।
আজ থেকে কাঠমান্ডুতে দুইদিনের ওই সম্মেলন শুরু হচ্ছে। যার উদ্বোধনীতে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর  নেতারা অংশ নেবেন। উদ্বোধনীতে  নেপালের প্রধানমন্ত্রীর স্বাগত বক্তব্যের পরপরই বক্তৃতা করবেন শেখ হাসিনা। রোহিঙ্গাদের বর্বর অত্যাচারের মাধ্যমে দেশত্যাগে বাধ্য করার জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উভয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের উপস্থিতি এই প্রথম কোনো আঞ্চলিক বৈঠক হচ্ছে।
সেখানে সঙ্গতকারণেই এ বিষয়টি আসবে। কিন্তু এ নিয়ে আলোচনা কতটা গুরুত্ব পাবে? সেই জিজ্ঞাসার জবাবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে- বিমসটেক সম্মেলনের মূলপর্বে  রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে রিট্রিট সেশনে নেতৃবৃন্দের আলোচনায় বিষয়টি আসতে পারে। যদিও শীর্ষ সম্মেলনের আগে দু’দিন ধরে কাঠমান্ডুতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা অর্থাৎ সচিব পর্যায়ের বৈঠক এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের  বৈঠকের আওতায় যেসব আলোচনা হয়েছে তার কোথাও রোহিঙ্গা বা বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের বাসিন্দাদের ঘিরে সৃষ্ট সংকট নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
পররাষ্ট্র্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে মন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী আর সচিব পর্যায়ের বৈঠকে নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক। তবে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শহীদুল হক।  গতকাল এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি মানবজমিনকে বলেন- এটি আলোচনায় আসেনি। কারণ বিমসটেক বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ নেই। আগামীকাল একটি সমন্বিত  ঘোষণার মধ্যদিয়ে (কাঠমান্ডু ঘোষণায়) বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটবে। যে ঘোষণায় নেপালের কাছ থেকে সংস্থাটির পরবর্তী সামিট চেয়ারের দায়িত্ব পাবে শ্রীলঙ্কা।
মোদির সঙ্গে হবে বৈঠক, নেপালের আতিথেয়তাও গ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী: এদিকে বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের সাইড লাইনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। আজ বিকালেই ঘনিষ্ঠ দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সরকার প্রধানদ্বয়ের মধ্যকার তাৎপর্যপূর্ণ সেই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য মতে, শীর্ষ দুই নেতার বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার সুযোগ হবে। কাঠমান্ডু সফরের প্রথম দিনই প্রধানমন্ত্রী  নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং তার দেয়া মধ্যাহ্নভোজে অংশ  নেবেন। রাতে সম্মেলনে আসা  নেতাদের সম্মানে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির দেয়া  নৈশভোজেও যোগ দেবেন তিনি। সফর শেষে শুক্রবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ প্রতিবেদনের প্রশংসা, মিয়ানমারের বক্তব্য গুরুত্বহীন: রাখাইনে রোহিঙ্গা ‘গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ হোতা হিসেবে মিয়ানমারের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের দায়ী করে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিশনের প্রতিবেদনের প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদন প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বুধবার বলেন, “বাংলাদেশ বিশ্বাস করে ২০১৭ সালের ২৫শে আগস্টের হামলার পর এটাই সবচেয়ে সমন্বিত, তথ্যবহুল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন।”
প্রধানমন্ত্রীর কাঠমান্ডু সফর বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “মিয়ানমার যে এটা প্রত্যাখ্যান করবে, তা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এতে কিছু যায় আসে না। পুরো বিশ্ব জানে, বাংলাদেশ প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে খুব ধৈর্যের সঙ্গে এই সংকট মোকাবিলা করেছে।”
রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর  সেনাবাহিনীর দমন অভিযানের এক বছরের মাথায় গত ২৭শে আগস্ট জাতিসংঘ গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ‘গণহত্যার অভিপ্রায়’ থেকেই রাখাইনের অভিযানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটিয়েছে।
আর মিয়ানমারের নোবেলজয়ী নেত্রী অং সান সুচির বেসামরিক সরকার ‘বিদ্বেষমূলক প্রচারকে উস্কে’ দিয়ে, গুরুত্বপূর্ণ ‘আলামত ধ্বংস’ করে এবং সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ থেকে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে রক্ষা না করে  সেই নৃশংসতায় ‘ভূমিকা’ রেখেছে। আইন প্রয়োগের নামে ভয়ঙ্কর ওই অপরাধ সংঘটনের জন্য মিয়ানমারের  সেনাপ্রধান এবং জ্যেষ্ঠ পাঁচ  জেনারেলকে বিচারের মুখোমুখি করার সুপারিশ করা হয়েছে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে।
পরে ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জ হাতোইকে উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল নিউজ লাইট অব মিয়ানমারের খবরে বলা হয়, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠন করা হয়েছিল হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে। মিয়ানমার সরকার যে হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের  রেজুলেশনের সঙ্গে নেই, তা সব সময়ই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। “এ কারণে আমরা ওই প্রক্রিয়ায় অংশ  নেইনি।
ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনকে আমরা মিয়ানমারে ঢুকতে দেইনি। তাই হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের  কোনো রেজুলেশনের সঙ্গে আমরা একমত নই, তা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্যও নয়।” রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরাতে এই সংকটের তিনটি বিষয়কে বাংলাদেশ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে ব্রিফিংয়ে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। এগুলো হলো- মানবিক দৃষ্টিকোণ, প্রত্যাবাসন এবং রাখাইনে অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহিতা।

নির্বাচনের আগে ডিসিদের ক্ষমতা বাড়ছে by দীন ইসলাম

জাতীয় নির্বাচনের আগেই ডিসিদের ক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এজন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারায় এক্স অফিসিও ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসেবে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এমনটা হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরা (ডিসি) অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা ফিরে পাবেন।
ফলে বাড়বে ডিসিদের ক্ষমতা। পাশাপাশি মর্যাদাও আগের মতো ফিরে পাবেন। বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এরই মধ্যে এ বিষয়ে একটি ধারণাপত্র তৈরি করা হয়েছে। ওই ধারণাপত্রের ওপর কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় কিনা ওই সব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ তে ২০০৭ সালের সংশোধনীর আগ পর্যন্ত ওই কোডের ২৫ ধারা অনুসারে অন্যান্যের মধ্যে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটরাও এক্স অফিসিও ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
কিন্তু ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের ওই ক্ষমতা ও মর্যাদা রহিত করা হয়। বর্তমানে জেলা পর্যায়ে সেশন জজ, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটসহ অন্য জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা এ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রিভেনটিভ ও জুডিশিয়াল দুটি দায়িত্ব পালন করতেন। বর্তমানে ডিসিদের পিউরলি জুডিশিয়াল ক্ষমতা নেই কিন্তু প্রিভেনটিভ ক্ষমতা আগের মতোই বিদ্যমান রয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তৈরি করা ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’-এর বাস্তব যে প্রয়োগ ও ঐতিহাসিক পরম্পরা শুধু বিচার কাজের সঙ্গে জড়িত নয়। এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক কাজেও ব্যবহার করা হয়। তাই প্রিভেনটিভ কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিবেচনায় ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারায় ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসাবে বর্তমানে বিদ্যমান এক্স অফিসিওদের সঙ্গে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নাম আগের মতো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। এর বিপরীতে ২২টি যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে।
বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৬৪ ও ৬৫ ধারামতে কোনো এক্সিকিউটিভ বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা এক্সিকিউটিভ ও জুডিশিয়াল দুই ধরনের ম্যাজিস্ট্রেটেরই রয়েছে। কিন্তু সংশোধিত ২৫ ধারায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণকারী চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসেবে গণ্য করা হলেও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণকারী ডিসিদের গণ্য করা হয়নি।
এটা যৌক্তিক নয়। এতে বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০ (৪) বিধান মতে সরকার চাইলে কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কোনো এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা দিতে পারেন। তাই এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে ডিসিকে ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসেবে গণ্য থাকা জরুরি। এছাড়া এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটরা যখন বিভিন্ন প্রিভেনটিভ ধারায় সাক্ষ্য নেন তখন তারা সাক্ষীদের শপথ পড়ান। এ শপথ ভঙ্গ হলে তাদের বিরুদ্ধে শপথ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া যায়। তাই শপথ পাঠের বিষয়টি নিশ্চিতকারী হিসেবে ডিসিদের নৈতিকভাবে ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসেবে ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।
ধারণাপত্রে বলা হয়েছে, জেল কোড অনুসারে কারাগারের ওপর সাধারণ নিয়ন্ত্রণ, কারাগার পরিদর্শন, বন্দিদের ডিভিশন প্রদান, বন্দিদের শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা, বন্দিদের বিভিন্ন আবেদন বিবেচনা ও অগ্রায়ন, সদাচরণের জন্য লঘু অপরাধের বন্দিদের মুক্তির বিষয়ে বিবেচনার জন্য সুপারিশ, কারা শৃঙ্খলা রক্ষা, মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করাসহ বিভিন্ন কাজ ডিসিদের নিয়ন্ত্রণে আগে থেকেই হয়ে আসছে। এসব কাজের সমর্থনে ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসেবে ডিসিদের নাম পুনঃস্থাপন করা জরুরি। এতে বলা হয়েছে, জেলা ট্রেজারিতে রাষ্ট্রের পক্ষে সব ধরনের স্ট্যাম্পস সংরক্ষণ ও বিতরণ এবং নিয়ন্ত্রণ ডিসিদের সাধারণ তত্ত্বাবধানে হয়ে থাকে।
‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসেবে ডিসিদের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলে কাজ করতে সহায়ক হবে। এছাড়া কোনো এলাকায় শান্তি ভঙ্গ হলে বা চাঞ্চল্যকর কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সরজমিন পরিদর্শন করে ডিসিদের প্রতিবেদন পাঠাতে হয়। একই সঙ্গে সরকারি ভবন ও জমি অবৈধ দখল উচ্ছেদসহ অবৈধ দখল বন্ধ করার ক্ষমতা ডিসিরা কার্যকর করেন। এসব বিবেচনায় ‘জাস্টিস অফ দ্য পিস’ হিসেবে আগের মতো অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। যৌক্তিকতায় বলা হয়েছে, পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা, প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা, সব ধরনের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলাসহ সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পালনসহ যেকোনো প্রাকৃতিক ও মানুষের সৃষ্টি হওয়া দুর্যোগে জনজীবনের শান্তি রক্ষা ডিসিরা করে থাকেন। এছাড়া ত্রাণ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য সরবরাহ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুষ্ঠু বাস্তবায়ন মনিটরিং, দুই শতাধিক কমিটিতে সভাপতির দায়িত্ব পালন ডিসিদের করতে হয়।
এ জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ২৫ ধারায় অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মানবজমিনকে বলেন, বিষয়টি মাঝামাঝি পর্যায়ে আছে। আমরা এনিয়ে কাজ করছি।