Thursday, July 24, 2014

গাজায় বোমা পড়ছে সর্বত্র

গাজায় গতকাল ইসরায়েলি বিমান হামলায়
আহত এক ফিলিস্তিনি শিশু। ছবি: এএফপি
সাদা চাদরে করে এক নারীর ছিন্নভিন্ন লাশ নামানো হচ্ছে সালাম টাওয়ারের ষষ্ঠ তলা থেকে। গাজা সিটির ওই বহুতল ভবনে গত সোমবার রাতে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১১ জন নিহত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ওই নারীর স্বামী এবং পাঁচ সন্তানও আছেন। তাঁরা সবাই জার্মান নাগরিক। মাত্র এক দিন আগে গাজার ‘মৃত্যুপুরী’ শাজাইয়া শহর থেকে পালিয়ে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন সালাম টাওয়ারে। খবর ইনডিপেনডেন্টের। আসলে গাজায় এখন নিরাপদ আশ্রয় বলতে কিছু নেই। বোমা পড়ছে সর্বত্র। মঙ্গলবার সকালে মরদেহগুলো সালাম টাওয়ার থেকে নামাচ্ছিলেন গাজার জরুরি বিভাগের কর্মীরা। পরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আল-শিফা হাসপাতালের মর্গে। হাসপাতালের সামনে ওই নারীর স্বজন সালেহ কেলানি জানান, তাঁর নিহত স্বজনদের সবার জার্মান পাসপোর্ট আছে। পশ্চিমাদের দ্বৈতনীতির কঠোর সমালোচনা করে সালেহ বলেন, জার্মান পাসপোর্টধারী হলেও তাঁদের মৃত্যুতে জার্মানি কেন কোনো কথা বলবে না?
যখন কোনো ইসরায়েলি নিহত হয়, তখন ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু গাজায় এত মানুষ হত্যা করা হলো কিন্তু তাদের কোনো কথা নেই। সালেহ বলেন, ‘আমরা হতাশ। তাঁরা (নিহত স্বজনেরা) মনে করতেন, বিপদে পড়বেন না। কিন্তু এখন সব শেষ।’ তিনি বলেন, কেন ওই ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হলো? ওখানে তো কোনো জঙ্গি ছিল না। কিন্তু ইসরায়েল তো নির্বিচারে গাজার প্রতিটি স্থানেই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘের নিয়ন্ত্রিত শরণার্থী শিবির থেকে শুরু করে হাসপাতাল—কোনো কিছুই বাদ নেই। শাজাইয়া শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর এক দিনের অভিযানেই নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। পুরো শহর পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। একই হাসপাতালে আছেন ২১ বছর বয়সী তরুণ মোহাম্মদ আবু ইয়াহিয়া। তিনি জাতিসংঘের একটি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গত শনিবার ওই শিবিরে হামলা চালালে আহত হয়ে আল-আকসা হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। ইয়াহিয়া বলেন, এই হাসপাতালেও ইসরায়েলি ট্যাংকের তিনটি গোলা আঘাত হানে। এতে পাঁচজন নিহত ও ৭০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে অন্তত ৩২ জন ছিলেন চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মী। এখানে দ্বিতীয়বারের মতো আহত হলেন তরুণ ইয়াহিয়া। ক্ষুব্ধ ইয়াহিয়া বলেন, হামাস অস্ত্র মজুত করে রেখেছে অভিযোগ করে শরণার্থী শিবিরে হামলা চালানো হলো, একই কথা বলে এবার হামলা চালানো হলো হাসপাতালে। এভাবে নির্বিচারে হামলা চালিয়ে পুরো গাজাকেই যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে ফেলেছে ইসরায়েল।

৪০ দেহাবশেষ নেদারল্যান্ডসে

মালয়েশিয়ার বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের ডাচ আরোহীদের দেহাবশেষ
নেদারল্যান্ডসে নেওয়ার উদ্দেশ্যে গতকাল ইউক্রেনের খারকিভ
বিমানবন্দরে উড়োজাহাজে তোলা হয়। ছবি: এএফপি
প্রথম দফায় বিধ্বস্ত মালয়েশীয় উড়োজাহাজটির আরোহীদের ৪০ জনের মৃতদেহ গতকাল বুধবার নেদারল্যান্ডসে পৌঁছেছে। লাশবাহী দুটি সামরিক বিমান গতকাল স্থানীয় সময় বিকেলে ইউক্রেন থেকে আইন্ডহোভেন শহরে অবতরণ করে। ভাবগম্ভীর পরিবেশে সামরিক কায়দায় সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে ডাচ প্রধানমন্ত্রী ও রাজপরিবারের সদস্যরা মরদেহ গ্রহণ করেন। উড়োজাহাজটির নিহত ২৯৮ জন আরোহীর মধ্যে ১৯৩ জনই নেদারল্যান্ডসের।
এদিকে বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটির ব্ল্যাক বক্স দুটি তথ্য বিশ্লেষণের জন্য যুক্তরাজ্যে পাঠানো হয়েছে। খবর বিবিসি, এএফপি ও সিএনএনের। আইন্ডহোভেন বিমানঘাঁটিতে সামরিক কায়দায় শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমে ৪০টি কফিন গ্রহণ করা হয়। একজন সেনা বিউগলে তোলেন বিদায়ী ‘লাস্ট পোস্টের’ সকরুণ সুর। লাশবাহী একটি ডাচ ও একটি অস্ট্রেলীয় বিমান আইন্ডহোভেনে অবতরণের আগে নেদারল্যান্ডসের গির্জাগুলো পাঁচ মিনিট ধরে ঘণ্টা বাজায়। অনুষ্ঠানস্থলে পালন করা হয় এক মিনিটের নীরবতা। নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে গতকালও এক দিনের জাতীয় শোক দিবস পালন করে নেদারল্যান্ডস। মরদেহগুলো পরে হিলভারসাম শহরের এক সেনা ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় শনাক্ত করা হবে। এতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। এর আগে গতকাল সকালে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইউক্রেনের সরকারনিয়ন্ত্রিত খারকিভ শহরের বিমানবন্দরে লাশবাহী বিমান দুটিকে বিদায় জানান। মঙ্গলবার রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তাদের এলাকা থেকে ২০০টি লাশ ট্রেনে করে খারকিভ শহরে পাঠিয়েছিল। তবে তারা কতগুলো লাশ পাঠিয়েছিল, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী খবর পাওয়া যায়। ট্রেনে লাশের সঙ্গে থাকা মালয়েশীয় একজন কর্মকর্তা বলেন, সেখানে ২৮২টি মৃতদেহ ও ৮৭টি দেহাংশ ছিল। কিন্তু ডাচ কর্মকর্তারা মাত্র ২০০টি লাশের কথা নিশ্চিত করেন।
অবশ্য একজন ডাচ কর্মকর্তা এ-ও জানান, ট্রেনের অন্যান্য কামরায় লাশ খোঁজা হচ্ছে এবং সবগুলো মৃতদেহ সেখানে থাকতে পারে। সোমবার কর্মকর্তারা বলেছিলেন, অন্তত ১৬টি লাশের খোঁজ মেলেনি। এগুলো হয়তো এখনো ধ্বংসাবশেষের স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ: মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালকের কার্যালয় বলেছে, উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে ইউক্রেনের রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সম্পৃক্ততা থাকার তথ্য-প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, এ ধারণার জোরদার ভিত্তি আছে যে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চল থেকে এসএ-১১ (ক্ষেপণাস্ত্র) ছুড়ে উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করা হয়েছে। তাঁরা বলেন, বিচ্ছিন্নতাবাদীরা খুব সম্ভবত যুদ্ধবিমান মনে করে ভুলবশত এটি ভূপাতিত করেছে। এদিকে ইউক্রেনের তথ্যসংক্রান্ত নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক ভিতালি নায়দা বলেছেন, যে ব্যক্তি উড়োজাহাজটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্রের বোতাম টিপেছেন, তিনি একজন ‘খাঁটি’ রুশ। তিনি ‘একজন রাশিয়ার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, সুদক্ষ, সুশিক্ষিত কর্মকর্তা।’ নায়দা বলেন, ‘আমরা একজন রুশ কর্মকর্তা ও মস্কোয় তাঁর কার্যালয়ের মধ্যে এ নিয়ে কথোপকথন রেকর্ড করেছি। আমরা নিশ্চিত, ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার কয়েক মিনিট আগে একজন রুশ কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে বার্তা পাঠানো হয়।’ মস্কো তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রথম থেকেই অস্বীকার করে আসছে। ইউক্রেনের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত: রুশপন্থী বিদ্রোহীরা গতকাল ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে দেশটির দুটি সামরিক বিমান ভূপাতিত করেছে। ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেন, পূর্বাঞ্চলীয় সাভুর মজিলা এলাকার কাছে ওই যুদ্ধবিমান দুটি ভূপাতিত হয়।

পাকিস্তানে তিনটি পার্লামেন্ট পর্যন্ত গণতন্ত্র নিরাপদ!

শেহলা রাজা
পাকিস্তানে তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে কোনো সামরিক আইন জারি হবে না। বিতর্কিত ‘জাতীয় আপস মীমাংসা অধ্যাদেশ’-এর (এনআরও) একটি ধারার আওতায় এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রধান বিরোধী দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেত্রী শেহলা রাজা এমন দাবি করেন। খবর ডনের। গতকাল বুধবার টেলিভিশন চ্যানেলে শেহলা রাজার ওই সাক্ষাৎকার সম্প্রচার করা হয়। বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রাদেশিক পরিষদের ডেপুটি স্পিকারের দায়িত্বে আছেন শেহলা। সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, তিনটি সাধারণ নির্বাচনের আগে পাকিস্তানে কোনো সামরিক আইন জারি না করার বিষয়ে এনআরওর একটি ধারার আওতায় সমঝোতা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের তৎকালীন প্রধান আশফাক পারভেজ কায়ানি (সাবেক সেনাপ্রধান)
এই বিষয়ে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন। বিশ্বশক্তিগুলোকে তাদের সেই প্রতিশ্রুতির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট ও পিপিপির নেতা আসিফ আলী জারদারি যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছিলেন বলেও জানান শেহলা। জারদারি গত মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে এক ইফতার অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ঠিক এই মুহূর্তে পিপিপির নেত্রী এমন মন্তব্য করলেন।অবশ্য শেহলার বক্তব্যের সঙ্গে পিপিপি একমত নয়। দলটি তাঁর মন্তব্যকে ব্যক্তিগত উল্লেখ করে বলেছে, ওই বক্তব্য ‘বিভ্রান্তিকর’ এবং ‘বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক’। পিপিপির একজন মুখপাত্র বলেন, শেহলার অবস্থান দলের অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে না। পাকিস্তানের সাবেক সেনাশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ২০০৭ সালের ৫ অক্টোবর এনআরও জারি করেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়াসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়। নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন বেনজির।

কোটিপতি ভিক্ষুক!

পেশায় তিনি ভিক্ষুক, তবে বাস করেন বিলাসবহুল বাড়িতে; রয়েছে নিজস্ব গাড়িও। সেই গাড়িতে চেপেই তিনি বিভিন্ন শহরে যান। এরপর নেমে পড়েন ভিক্ষাবৃত্তিতে। আর তাঁর সম্পদের পরিমাণ শুনলে চোখ কপালে উঠতে পারে: তিন লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার; বাংলাদেশি টাকায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা! কোটিপতি ওই ভিক্ষুককে সৌদি আরবের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। দেশটির গণমাধ্যম গতকাল বুধবার এ খবর দিয়েছে। খবর আইএনএসএর।
সৌদি আরবের ইংরেজি দৈনিক সৌদি গেজেট-এর খবরে বলা হয়, দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় বন্দর শহর ইয়ানবু থেকে ওই ভিক্ষুককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর নাম প্রকাশ করা হয়নি। আরব ভাষাভাষি হলেও তিনি কোন দেশের নাগরিক, তা জানানো হয়নি। মদিনা পুলিশের মুখপাত্র ফাহাদ আল-ঘানম পত্রিকটিকে বলেন, ভিক্ষা করার সময় ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। সৌদি আরবে ভিক্ষা নিষিদ্ধ। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ওই ভিক্ষুক একটি বিলাসবহুল বাড়িতে বাস করেন। নিজের গাড়িতে করে তিনি বিভিন্ন শহরে যাতায়াত করেন। এরপর ভিক্ষা শুরু করেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করেন স্ত্রী ও তাঁর তিন সন্তান। পুলিশ জানায়, ওই ব্যক্তি অবৈধভাবে সপরিবারে সৌদি আরবে বসবাস করছেন। অবশ্য, একটি দেশ থেকে তিনি বিনিয়োগের লাইসেন্স জোগাড় করেছেন।

‘মন্ত্রী সচল থাকলেও সড়কগুলো অচলপ্রায়’

সড়কগুলো অচলপ্রায়
ঈদ সামনে। এ সময় স্বজনদের সান্নিধ্য পাওয়ার আশায় স্থান থেকে স্থানান্তরে আসা-যাওয়া করবে লাখ লাখ লোক। এ দেশের এককালীন নৌ ও রেল যোগাযোগনির্ভর মানুষ গত অর্ধশতাব্দী যাবৎ ক্রমান্বয়ে অধিকতর হারে সড়ক-মহাসড়কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। নৌ আর রেলপথকে ক্রমান্বয়ে উপেক্ষা করে বিশাল সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কও গড়ে উঠেছে। জনসংখ্যা আর মানুষের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ঈদে বেড়াতে যাওয়ার সংস্কৃতিও ক্রমান্বয়ে জোরদার হচ্ছে। জানা যায়, শুধু কক্সবাজারেই আসন্ন ঈদে যাওয়ার কথা দেড় লাখ লোকের। তাদের মধ্যে গুটি কয়েক ভাগ্যবান বিমানযাত্রী ছাড়া সবারই ভরসা সড়কপথ। অথচ ঢাকা থেকে কক্সবাজারে যেতেই এখন লাগছে ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা। স্বাভাবিক অবস্থায় তা হওয়ার কথা সাত থেকে আট ঘণ্টা। ছুটি কাটাতে যাওয়ার ব্যাপার বাদ রাখলেও প্রিয়জনের সান্নিধ্যে ঈদ করতে কত লাখ লোক ছোটে, তার সঠিক হিসাব কোথাও নেই। কিছু যায় নৌ আর রেলপথে। তাদেরও যথেষ্ট ভোগান্তি সহ্য করতে হয়। কিন্তু সিংহভাগ সড়কপথে যাত্রীর ভোগান্তি অন্য সবকিছুকে পেছনে ফেলছে আজ বেশ কয়েক বছর। অথচ ঠিক এমনটা ছিল না বছর দশেক আগেও। এ সময়ে যাত্রীসংখ্যার তুলনায় যানবাহনের অপ্রতুলতা ভোগান্তির একটি কারণ। কিন্তু মূল সমস্যা হলো সড়ক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের বেহাল অবস্থা। গত কয়েক দশক এ নেটওয়ার্কটির বিশাল অংশ চলাচলের প্রায় অযোগ্য হয়ে যায় বর্ষায়।
তার পরও অধিকতর যানবাহনের চাপে এসব সড়ক-মহাসড়ক এ সময়ে পাড়ি দিতে সৃষ্টি হয় অচলাবস্থার। আর সে অবস্থা দূরীকরণে নেওয়া হয় সাময়িক কিছু কার্যক্রম। এতে ভোগান্তি কিছুটা হ্রাস পায়। শেষ হয় ঈদ উৎসব। কিন্তু ব্যাপারটি পূর্ববর্তীই থেকে যায়। এসব সড়ক-মহাসড়ক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক ও জনপথ বিভাগের। এ সংস্থাটি নতুন করে যাত্রা শুরু করেছে ১৯৬২ সালে। এর আগে এটা ছিল কমিউনিকেশন ও বিল্ডিং (সিঅ্যান্ডবি) বিভাগের একটি অংশ। তখন এর আওতায় ছিল আড়াই হাজার কিলোমিটার সড়ক। আর এখন তার পরিমাণ ২১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয় ও আঞ্চলিক হাইওয়ে আর জেলা সড়ক রয়েছে। এ ছাড়া তাদের আওতায় আছে ২২ হাজার ব্রিজ ও কালভার্ট। অবশ্য এক হাজার ৫০০ মিটারের ঊর্ধ্বে সেতু, ফ্লাইওভার, ওভারপাসের দায়িত্বে রয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ নামে আরেকটি সংস্থা। সড়ক ও জনপথ বিভাগের এ বিশাল কাঠামো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছেন নয় হাজার ৩০০ স্থায়ী আর আট হাজার ৭০০ অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী। সুতরাং, অবকাঠামোর ব্যাপকতার সঙ্গে তাদের জনবলকাঠামোও সংগতিপূর্ণ বলেই বিবেচনা করা যায়। তাদের কাজের রূপকল্প দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের অনুকূল, টেকসই, নিরাপদ ও মানসম্মত সড়ক অবকাঠামো তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ। এ সংস্থার কাজ তদারকি, এ বিষয়ে প্রকল্প প্রস্তাবের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, বাজেট নিয়ন্ত্রণসহ সামগ্রিক নীতিনির্ধারণের দায়িত্বে রয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সড়ক বিভাগ। প্রায় এক দশক যাবৎ সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাজকর্মে একটি বিস্ময়কর জড়তা লক্ষণীয় হচ্ছে। এটা সত্যি, তারা তাদের এ বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সময়মতো পর্যাপ্ত বরাদ্দ পায় না। সীমিত সম্পদের দেশে এটা অস্বাভাবিক নয়। অতীতেও কখনো চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। তবে যতটুকু পাওয়া যায়, তা অগ্রাধিকার নির্ণয় করে সময়োচিত ব্যবহার করলে অবস্থা এ পর্যায়ে আসতে পারে না।
এটাও ঠিক, রাজনৈতিক চাপে সঠিক ঠিকাদার নিয়োগ ও তাদের থেকে কাজ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি এটাও জানা যায় যে সেই ঠিকাদার চক্রের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছেন এ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই বেহাল অবস্থায়ও তাঁদের মধ্যে প্রয়োজনীয় তৎপরতা অদৌ লক্ষণীয় হয় না। সংস্থাটি যেহেতু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন, তাই স্বাভাবিকভাবে এর নৈতিক দায় তাদের ওপর বর্তায়। সংসদ ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীকে। তিনি আজ প্রায় আড়াই বছর এ পদে বহাল আছেন। মন্ত্রণালয়টির আগের নেতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও দূর করতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এ–জাতীয় ঈদ উৎসবের আগে সড়ক নেটওয়ার্ক কার্যকর রাখার জন্য অবিরাম ছোটাছুটি করেন মাস খানেক আগে থেকেই। পাশাপাশি তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত ২৪টি কমিটিও তদারক করে যাচ্ছে বলে খবরে জানা যায়। পাশাপাশি এটাও বলার থাকে যে যাদের এ কাজগুলো করার কথা, তাদের দিয়ে তারা তা করাতে পারছে না। জনবল, যন্ত্রপাতি ও অতীত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সড়ক ও জনপথ বিভাগ নামের প্রতিষ্ঠানটিতে কার্যত গতি আনতে সক্ষম হয়নি এ মন্ত্রণালয়। এটা কার ব্যর্থতা, সেটা তলিয়ে দেখার আবশ্যকতা রয়েছে। রাজনৈতিক চাপ আর বিভাগীয় কর্মকর্তাদের এর সঙ্গে একাত্মতায় নিম্নমানের কাজের অভিযোগ শুধু এ সংস্থার ওপরই আসে না। এ দায় দেশের প্রায় সব বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকাজের জন্যই প্রযোজ্য। তাই বলে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে এতটা নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে, এমনটা বলা যাবে না। কোনো মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কিংবা এর কর্মকর্তাদের পরিদর্শন টিম এভাবে আর কোথাও ছুটছে না। হতে পারে ঈদের সময় সড়ক অবকাঠামোর ওপর ব্যাপক চাপ মোকাবিলার মতো চ্যালেঞ্জ অন্যদের নেই। এ ক্ষেত্রে বলতে হবে, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সামর্থ্য বিবেচনা করেই এ বিশাল সংস্থাটির সৃষ্টি ও বিকাশ হয়েছে। অনেক বড় সড়ক, মহাসড়ক, সেতু তৈরি আর রক্ষণাবেক্ষণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাদের। তাহলে গত কয়েক বছর সড়ক-মহাসড়কগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে এ রকম উদাসীনতা থাকবে কেন? আর কেনই বা মন্ত্রণালয় তার অধীন সংস্থাটিকে দায়িত্ব পালনে তৎপর করতে পারছে না? এভাবে মন্ত্রী ও তদারক কমিটিগুলোর নিরন্তর দৌড়–ঝাঁপ এ সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলছে। মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিবসহ অন্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব মূলত নীতি প্রণয়ন, লক্ষ্য নির্ধারণ এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তহবিল সংগ্রহ। পাশাপাশি অধীনস্থ সংস্থার কাজ তদারক, নির্দেশনা আর ক্ষেত্রবিশেষে আন্তমন্ত্রণালয় সম্পর্কবিষয়ক জটিলতা নিরসন। এভাবেই চলছে দেশের অন্য সব প্রতিষ্ঠান আর মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। সবকিছুই ঠিকঠাক চলছে এমন দাবি কেউ করে না।
তা সত্ত্বেও একটি সংস্থার কাজ নিয়ে মন্ত্রণালয় প্রত্যক্ষভাবে এ রকম সংশ্লিষ্ট হওয়ার নজির সম্ভবত সাম্প্রতিককালে নেই। পত্রিকান্তরের খবর থেকে জানা যায়, বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রী গত আড়াই বছরে ৬৪ জেলার ২০৪টি উপজেলায় ৩৮১ দিন সড়ক-মহাসড়ক পরিদর্শন করেছেন। তাঁর অধীন তদারক টিমগুলোও একইভাবে সক্রিয়। তবে গণমাধ্যম ফোড়ন কাটছে ‘মন্ত্রী সচল থাকলেও মহাসড়কগুলো এখনো অচলপ্রায়’। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সময়মতো মানসম্মত কাজ না করার কারণে এ অবস্থা হয়েছে। ঈদ অত্যাসন্ন। সক্রিয় ও আন্তরিক যোগাযোগমন্ত্রীর সদিচ্ছায় এবারও হয়তো বা অচলাবস্থা কিছুটা কেটে যাবে। তবে এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা স্থায়ীভাবে চলতে পারে না। সড়ক ও জনপথ বিভাগের এ নিষ্ক্রিয়তার অবসান ঘটাতে মন্ত্রণালয়কেই উদ্যোগী হতে হবে। তদারক টিম হয়তো থাকবে, কিন্তু মূল কাজ করাতে হবে সংস্থাকে দিয়েই। তাদের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ অনীহা দেখালে শাস্তি অবশ্যই দেওয়া যাবে। তবে প্রয়োজন রয়েছে সংস্থাটির ভেঙে পড়া কর্মসংস্কৃতি নতুনভাবে গড়ে তোলার। এটা অসাধ্য কোনো বিষয় হওয়ার কথা নয়। যার কাজ তাকেই করতে হবে। বিভিন্ন স্তর থেকে অবিরাম তদারকি ক্ষেত্রবিশেষে মাঠ কর্মকর্তাদের উদ্দীপনা শিথিল করে দেয়। তাঁরা নির্ভরশীল হয়ে পড়েন নির্দেশনার জন্য। পর্যাপ্ত ক্ষমতা অর্পণ আর যথোপযুক্ত তদারকিই আদর্শ কর্মসংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারে। আর এ তদারকির সিংহভাগই করার কথা সেই বিভাগের ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীদের। এ রকম না করলে মন্ত্রণালয়ের বর্তমান তদারকব্যবস্থা সাময়িক কিছু সুফল দেবে। কিন্তু ঘুরে দাঁড়াবে না ঐতিহ্যবাহী এ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানটি। তাই সময়ের দাবির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হোক। তাদেরও বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দৃঢ়তার সঙ্গে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সেদিকে অনুপ্রাণিত করতে পারে মন্ত্রণালয়। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য টেকসই যোগাযোগব্যবস্থা অপরিহার্য। আর সেই ব্যবস্থা যারা করবে, তাদের সক্ষমতার ক্রমহ্রাসমান অবস্থার অবসান অতি প্রয়োজনীয়।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

তাজউদ্দীন আহমদ এবং সরদার স্যার

তাজউদ্দীন আহমদ, সরদার ফজলুল করিম
১৯৮০ সালের একেবারে শুরুতে সবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছি। সবকিছু বড় বড় এবং নতুন। বলতে গেলে একেবারে কিছুই চিনি না। রুটিন এবং পাঠ্যসূচি হাতে পেয়ে সেগুলোই নাড়াচাড়া করি। মুখস্থ করে ফেলি ক্লাসরুম নম্বর, সিঁড়ির পথ, করিডর। অচেনা সবকিছুকে ঠেলে ঘড়ির কাঁটা ধরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকি রুমের সামনে। কিন্তু শিক্ষকের দেখা মেলে না, আমাদের ক্লাসও শুরু হয় না।
কিছুদিন পর একসময় সাহস করে ভেতরে ঢুকি। পরিচয় হয় একে একে। এরপর আরও কিছুদিন পর আমাদের রুটিনে শিক্ষকের নাম পরিবর্তন হয়। আমরা আমাদের প্রথম শিক্ষক হিসেবে পাই শওকত আরা আপাকে। তিনি আমাদের প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা পড়াতে শুরু করলেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর প্রতিটি ক্লাসে উপস্থিত থেকে শুনতাম তাঁর প্রতিটি কথা। সক্রেটিস (স্কুলজীবন থেকে যিনি আমার আদর্শ, অন্তরের খুব কাছের মানুষ), প্লেটো, অ্যারিস্টটল পড়তে গিয়ে আমার শুধু মনে হয় আরও জানতে হবে, আরও জানতে হবে। নিউমার্কেটে বইয়ের দোকানে দু-একজন সহপাঠীসহ বইয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়াই। সরদার ফজলুল করিমের অনুবাদগ্রন্থ প্লেটোর রিপাবলিক কিনি। দর্শন কোষ কিনি। সরদার ফজলুল করিম রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষক। স্যারকে সামনাসামনি দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যাই। সহপাঠী ছোটন আর আমার মাথায় ঢোকে সরদার স্যারের কাছে রাষ্ট্রতত্ত্ব পড়ব। একদিন স্যারের ক্লাসের বাইরে অপেক্ষা করতে থাকি। ক্লাস শেষে স্যারের পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে বললাম, রাষ্ট্রতত্ত্ব পড়তে চাই। স্যার থমকে দাঁড়ালেন। খুব খুশি হলেন। বললেন, ‘আমি তো অনার্সের ক্লাস নিই না, তবে তোমরা যখন এসেছ আগ্রহ করে, এই আগ্রহকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’ স্যার বললেন, ‘তোমরা আটজন এসো এক সঙ্গে, দেখি কী করা যায়।’ আমাদের প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু হয়েছে দেরিতে, সঙ্গে নতুন একটা বিষয়, কেউ রাজি হলো না। স্যারকে এ কথা জানাতে গেলে তিনি মাঝে মাঝে দেখা করতে বললেন। সেই শুরু সরদার ফজলুল করিম স্যারের কাছে আমার অল্প অল্প যাওয়া। অদ্ভুত লাগে মানুষটিকে। অসম্ভব পজিটিভ। বাবার সঙ্গে মিল খুঁজি।
নিজের ভেতরে নতুন করে সাজাই সংসার, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, বিশ্বচরাচর। অনন্ত জিজ্ঞাসা মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, স্বাধীন দেশে ১৫ আগস্টের নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও জেলহত্যা নিয়ে। স্যারের সঙ্গে মাঝে দিয়ে দেখা নেই অনেক দিন। ১৯৮৬ সালে হঠাৎ একদিন তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি আম্মার (সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন) কাছে ফিরিয়ে দিতে এলেন বদরুদ্দীন উমর। তাঁর সঙ্গে আরও দুজন এবং সরদার ফজলুল করিম স্যার। স্যার আমাকে এই বাসায় দেখে অবাক হলেন। আমি তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে জেনে বললেন, ‘কী সাংঘাতিক মেয়ে! এত দিন একবারও বলে নাই এর পরিচয়!’ স্যার স্বভাবসুলভ হাসতে হাসতে বললেন, ‘তাজউদ্দীন ও আমার জন্ম একই বছর, ১৯২৫ সালে। তাজউদ্দীন সম্পর্কে আমার একটা ধারণা অথবা বলা যায় দৃঢ় বিশ্বাস আছে, সেটা তোমাকে আরও আগে বলা যেত।’ স্যার ইংরেজিতে বলেন, ‘তাজউদ্দীন কেম বিফোর হিজ টাইম অ্যান্ড হি ইজ ইয়েট টু বি আন্ডারস্টুড।’ নিজেই বাংলা করলেন, ‘তাজউদ্দীন সময়ের অনেক আগে আবির্ভূত হয়েছেন, তাই তাঁকে বুঝতে আমাদের এখনো অনেক বাকি।’ আমি খাতায় লিখে রাখি। এর পর থেকে যখনই দেখা হয় অথবা দীর্ঘক্ষণ ফোনে কথা, স্যার তাজউদ্দীন প্রসঙ্গ টানতেন প্রায় একই ছন্দে, একই শব্দে—‘আমার জন্ম ১৯২৫, তাজউদ্দীনেরও। কিন্তু দেখো, তাজউদ্দীন তাঁর ডায়েরি লিখতে গিয়ে বরিশালের কোনো অখ্যাত সরদার ফজলুল করিম ছাত্রদের প্রতিবাদ সভায় যোগ দিয়েছিল, সে কথা লিখে রেখেছেন। আমি তো লিখিনি। মনেও রাখিনি কত কাউকে। তাজউদ্দীন লিখেছেন, সরদারের নাম, আরও অনেকের নাম।’
বাবার বন্ধু এবং শুভানুধ্যায়ী, যাঁদের প্রবল আগ্রহে ২৩ জুলাই ১৯৮৭ সালে প্রথম ছোট পরিসরে জন্মদিনের স্মরণ আয়োজন হয়েছিল, সরদার স্যার তাঁদের অন্যতম একজন। ১৯৭১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাংলা একাডেমি থেকে পাকিস্তান আর্মি সরদার স্যারকে ধরে নিয়ে টর্চার সেলে আটকে রাখে। স্যার সেই বর্ণনাও দিয়েছিলেন তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে, যা আজ শুধুই স্মৃতি। ছোটখাটো এই মানুষটিকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক অত্যাচার করার সময়ে পাকিস্তান আর্মির লোকেরা চিৎকার করে বলত, ‘ইউ পিপল দ্য বাস্টার্ড সানস অব তাজউদ্দীন, উই শ্যাল টিচ ইউ আ গুড লেসন।’ ‘আমি সরদার তখন ভাবতাম, তার মানে তাজউদ্দীন সঠিক পথেই আছে। আমাদের ভয় নাই। বঙ্গবন্ধু মুজিব তো ওদের হাতে বন্দী। তাই সব রাগ ওই তাজউদ্দীনের ওপর। তাজউদ্দীনকে পেলে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে—এমন ছিল তাদের দাঁত-মুখের ভঙ্গি।’ স্যার তাঁর স্ত্রীকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। স্ত্রীর জন্য দুষ্টুমিতে ভরা কথা শুনে নির্মল আনন্দ উপভোগ করতাম খুব। চাচি মাঝে মাঝে নালিশ করতেন, স্যার পাশে থেকে হাসতে থাকতেন। ছেলেমেয়েদের খুব ভালোবাসতেন। স্যারের ভালোবাসা ছিল একটু ভিন্ন প্রকৃতির। মানুষের নিজস্বতা যে বিষয়টি, তাকে তিনি মূল্য দিতেন সবকিছুর ঊর্ধ্বে। বড় ছেলেটিকে নিয়ে চিন্তিত থাকতেন। কিন্তু সেখানেও ছিল অদ্ভুত এক মূল্যায়ন। ঢাকার শ্যামলী, মগবাজার, মধুবাগ, ইন্দিরা রোডের বিভিন্ন বাসায় থেকেছেন তিনি। শক্ত মজবুত তাঁর মন। সতেজ তরুণ যুবক তিনি।
বয়স হার মানে। পা ভাঙে। জোড়া লাগে। বাস ধরে ছুটে চলেন গাজীপুরে অথবা পুরান ঢাকার সেন্ট্রাল উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পড়াতে। আমাদের পাঠচক্রেও আসেন। একালের সক্রেটিস ছোটখাটো ফরসা মানুষটি। প্রশ্ন আর উত্তরের সিঁড়ি ভাঙেন। দৃষ্টি প্রসারিত। মুখে আলোর বন্যা। ১৯৮৯ সালে দৈনিক সংবাদ–এর ২১ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় সরদার স্যার লেখেন, ‘হেগেলের দুর্বোধ্য ভাষায় ইতিহাসের দর্শন তত্ত্বের একটি পরিচিত উক্তি হচ্ছে, “বুদ্ধিমানরা ইতিহাসের সঙ্গে যায়, নির্বোধকে ইতিহাস টেনে নেয়”। তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন আমাদের সমকালীন সঙ্গীদের অন্যতম সেই ব্যক্তি, যিনি ইতিহাসের গতিপথকে সচেতনভাবে অনুসরণ করেছেন। যিনি ইতিহাসের সঙ্গে গেছেন।’ সরদার স্যার তাঁর অ্যারিস্টটলের পলিটিকস বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণের মুখবন্ধে লিখেছেন, ‘ব্যক্তি মানুষের মৃত্যু থাকে। কিন্তু যথার্থ চিন্তাবিদের কোনো মৃত্যু থাকে না। আমাদের স্মৃতিতেই তাঁদের জীবন। এবং তাঁদের জ্ঞান ও চিন্তার ভান্ডারের বিশ্লেষণ ও অনুধাবনের মধ্যেই যেকোনো বর্তমানের অচিন্তনীয় সমৃদ্ধি।’ সরদার স্যারের সুরে সুর মেলাই, তাজউদ্দীন আহমদের মতো মানুষেরা যুগে যুগে জন্ম নেন না। এই ক্ষণজন্মা মহাপ্রাণ মানুষেরা বিশ্বকে আলোকিত করেন তাঁদের চিন্তায়, কর্মে, আহ্বানে, যা প্রতিনিয়ত পথ দেখায় আজ, আগামী এবং অনাগত ভবিষ্যৎকে। সুন্দর ভবিষ্যৎ, আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমরা যেন তাঁদের অনুসরণ করতে পারি গর্বিত-ভালোবাসায়।
সিমিন হোসেন রিমি: সাংসদ, সমাজকর্মী ও লেখক। তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা।
simrim_71@hotmail.com

সরকারকে বাধা দেয় কে?

১৮ জুলাই ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের দুটি সংগঠনের একটি করে অংশ যৌথভাবে এক ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছিল। তাদের আমন্ত্রণে সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সেখানে সাংবাদিকদের উদ্দেশে একটি বক্তৃতাও করেছেন, যার কিছু বিবরণ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর বক্তৃতার অনেক কথার মধ্যে যে অংশটি সংবাদমাধ্যমের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। তিনি সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে বলেন, ‘সরকারের সমালোচনা করুন, কিন্তু সরকারের সামনে বাধা সৃষ্টি করবেন না।’ আমাদের কৌতূহল, সংবাদমাধ্যম কীভাবে সরকারের সামনে বাধা সৃষ্টি করে? কী ধরনের বাধার কথা বলা হচ্ছে? সংবাদমাধ্যম কী করলে সরকারের কর্মসম্পাদনে বাধা সৃষ্টি হয়? প্রধানমন্ত্রীর উক্তির মধ্যে অবশ্য কিছু ইশারা মেলে। তিনি বলেছেন, ‘সরকারবিরোধীদের ইন্ধন বা উসকানি দেবেন না। এটা গণমাধ্যমের কাজ নয়।’
এ রকম পরামর্শের কারণ সম্ভবত এই যে বাংলাদেশে কিছু কিছু সংবাদমাধ্যম সরকারবিরোধীদের ইন্ধন বা উসকানি দিয়ে থাকে। তারা এমন অসত্য ও ভিত্তিহীন প্রচারণা চালায়, যার ফলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়। কিন্তু বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) যে অংশ ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) যে অংশ মিলিতভাবে ওই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছিল, তারা সরকারবান্ধব হিসেবেই পরিচিত। সে কারণেই তারা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছিল প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করতে এবং প্রধানমন্ত্রীও তাদের অনুরোধ রক্ষা করে ওই মাহফিলে যোগ দিয়েছিলেন। সরকারের সামনে বাধা সৃষ্টি না করা, সরকারবিরোধীদের ইন্ধন বা উসকানি না দেওয়ার পরামর্শ অন্তত তাদের দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, তারা সরকারবান্ধব; তারা সরকারবিরোধীদের ইন্ধন বা উসকানি দেয় না। বরং পারলে উল্টোটাই করে। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই যে প্রধানমন্ত্রী সেদিন সরকারবান্ধব সাংবাদিকদের মাহফিলে ওই কথাগুলো বলেছেন সাংবাদিক সমাজের সেই অংশের উদ্দেশে, যারা সরকারবান্ধব নয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যটি এমনভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যাতে মনে হয় সামগ্রিকভাবে গোটা সংবাদমাধ্যমকে উদ্দেশ করেই তিনি কথাগুলো বলেছেন। আসলে রাজনৈতিক দলের মুখপত্রের মতো আচরণ করে এমন হাতে গোনা দু-একটি সংবাদপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সামগ্রিকভাবে সংবাদমাধ্যমের উদ্দেশে এমন কথা বলার সুযোগ নেই। নির্দিষ্টভাবে কোনো সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলের আচরণে সরকারের অভিযোগ থাকলে সে ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ করা যায়, সেখানে সন্তোষজনক প্রতিকার না মিললে আদালতেও যাওয়ার বিধান রয়েছে। তা ছাড়া, সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে ‘ইন্ধন’ বা ‘উসকানি’র অভিযোগের মধ্যেও সুনির্দিষ্টতা থাকে না। আসলে দেখা উচিত কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান দেশের প্রচলিত আইনের পরিপন্থী আচরণ করছে কি না। সংবাদপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইনের পরিপন্থী আচরণের মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো অসত্য, মিথ্যা, ভিত্তিহীন সংবাদ বা গুজব প্রচার করা; এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করা, যার ফলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানের হানি ঘটা কিংবা জনশৃঙ্খলা বিনষ্ট হওয়া, দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের প্রতিটি আচরণের ক্ষেত্রেই আইনগত প্রতিকারের ব্যবস্থা অন্যান্য দেশের মতো এ দেশেও আছে। সে কারণে গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকারপ্রধানেরা সাধারণভাবে সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করে এ ধরনের শাসনমূলক কথা বলেন না।
তাঁরা সংবাদমাধ্যমকে গণতন্ত্র, সংবিধান, আইনের শাসন, সরকারের কর্মসম্পাদন ও জনস্বার্থের ‘ওয়াচডগ’ বা পাহারাদার হিসেবে দেখেন। এই আধুনিক যুগে কোনো শাসকই যেমন জনসাধারণকে লক্ষ্য করে হুঁশিয়ারিমূলক বা শাসনমূলক বক্তব্য দেন না, তেমনি পুরো সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করেও তা করেন না। কারণ, সংবাদমাধ্যম জনসাধারণের কণ্ঠস্বর, যে জনসাধারণ সরকারকে নির্বাচিত করে কিংবা কোনো শাসকের শাসনক্ষমতায় থাকা সহ্য করে। জনসাধারণের মতামত, আশা-প্রত্যাশা, অভিযোগ-অনুযোগ ইত্যাদির প্রতিফলন ঘটে সংবাদমাধ্যমেই। সরকারপ্রধানের এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংবাদমাধ্যমের ব্যাপারে সরকারের একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়, যা স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম প্রত্যাশা করে না। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জানেন এবং তিনি সেদিন বলেছেনও যে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সরকারের কাজের সহায়ক হতে পারে, সমাজের অসংগতি দূর করতে পারে। বস্তুত সরকারের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই বিচার করা উচিত। কিন্তু তা সব সময় করা হয় না। অনেক সময় বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রচারিত হলেই বরং সরকারের কোনো মহল ক্ষুব্ধ হয়, ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করে। বিশেষত সরকারি দল, সরকার ও আইন প্রয়োগকারী সশস্ত্র বাহিনীগুলোর সদস্যদের অনিয়ম, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ইত্যাদি সম্পর্কে বিশদ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশিত হলে তাঁরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া করেন, সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে সরকারবিরোধিতার অভিযোগ তোলেন এবং যে সংবাদপ্রতিষ্ঠান এভাবে সরকারের বিরাগভাজন হয়, তাকে নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করা হয়। সংবাদমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ফলে সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি হয় না, এই কথা সবাই জানে। বাধা সৃষ্টি হয় দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও আমলাদের বেআইনি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার পথে। তাঁদের কারও কারও মুখোশ খসে পড়ে কুৎসিত চেহারা জনসমক্ষে বেরিয়ে যায়। ক্ষমতাসীন দলের যেসব নেতা-কর্মী চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাস ও খুনখারাবি করেন, তাঁদের ওই সব অপরাধ সংঘটনের পথেও বাধা সৃষ্টি হয় সংবাদমাধ্যমের কারণে। ক্ষমতা ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী লোকদের হত্যা-অপহরণসহ নানা গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ ঘটানোর পরও আইনের ঊর্ধ্বে থেকে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে সংবাদমাধ্যমের কারণে। ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা যখন পরস্পরের মধ্যে খুনোখুনি করে, তখন সেই সংবাদ সরকার ও সরকারি দলকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিতে পারে। ঘুষের টাকাসহ মন্ত্রীর এপিএসের গাড়িচালক ধরা পড়লে সংবাদমাধ্যম যদি সে খবর জনসাধারণকে জানিয়ে দেয়, তাহলে ওই মন্ত্রী ও সরকারের মুখে চুনকালি লাগে। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বিদেশি বন্ধুদের দেওয়া সম্মাননা ক্রেস্টের সোনা-রুপা ষোলো আনাই মেরে দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের সরকারের মন্ত্রী-সচিবেরা মিলে—এই সংবাদ পরিবেশিত হলে সরকারের অবশ্যই বেকায়দা হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের নিরবচ্ছিন্ন চাপের কারণে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় র্যাবের মতো এলিট ফোর্সকেও বিব্রত হতে হয়, তার তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হতে হয় সরকারকে। সংবাদমাধ্যমের এসব কাজই যদি হয়ে থাকে সরকারের সামনে বাধা সৃষ্টি করা, তাহলে সংবাদমাধ্যম নাচার।
কারণ, এসব করাই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব। উপরন্তু নিজেকে জনগণের ভোটে নির্বাচিত দাবি করে যে সরকার, সে যখন দেশে সংবিধান বলবৎ থাকা অবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সভা-সমাবেশ-মিছিলসহ সব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দিয়ে সংবিধানপ্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে, এমনকি ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের মিলনায়তনের ভেতরে ঘরোয়া সভাও করতে দেয় না, তখন সেই খবর পরিবেশন করা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব বটে। এমনকি সরকারের এমন অগণতান্ত্রিক ও জবরদস্তিমূলক আচরণের সমালোচনা করে কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান যদি মন্তব্য প্রকাশ করে, তবে তাকে অন্যায়ও বলা যায় না। বিরোধী দলগুলোর নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা ক্ষমতাসীন দলের মাস্তান বাহিনী দিয়ে ভন্ডুল করার সমালোচনা সংবাদমাধ্যম অবশ্যই করবে। এটাকে সরকারবিরোধীদের ইন্ধন বা উসকানি দেওয়া বলা ঠিক হয় না। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন থেকে বিচ্যুত হওয়া চলবে না—এ কথা সংবাদমাধ্যম সব সময় বলে যাবে। সহনশীল ও পরমতসহিষ্ণু রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান সংবাদমাধ্যম সব সময়ই জানাবে। এমনকি ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন আইনসিদ্ধ হলেও দেশের সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি, এ কথাও যদি কোনো সংবাদপ্রতিষ্ঠান বারবার বলতে থাকে এবং সব দলের অংশগ্রহণে নতুন করে সাধারণ নির্বাচনের দাবি তুলতে থাকে, তবে সেটাকেও সরকারের সামনে বাধা সৃষ্টি করা বলা ঠিক হবে না। প্রধানমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে ছেড়ে দিয়ে বরং যদি নিজের দল ও সরকারের গভীরে নিবিড় দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, তাহলেই বরং সরকারের সামনের প্রকৃত বাধাগুলো খুঁজে পাবেন। সরকারের সামনে বাধা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের সেই সব নেতা-কর্মী, যাঁরা নানা রকমের গুরুতর অপরাধে লিপ্ত আছেন এবং মাঝেমধ্যেই পরস্পরের প্রাণ সংহার করছেন। সরকারের সামনে বাধা মন্ত্রিসভার সেই সব সদস্য, যাঁদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ব্যাপক, যাঁদের আত্মীয়স্বজনেরা দেশটাকে নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তি ভেবে নিয়েছেন। সরকারের সামনে বাধা সৃষ্টি হয় সেই সব আমলার কারণে, যাঁরা ব্যক্তিগত ভাগ্যোন্নয়নের জন্য দেশ ও জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেন, সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগ যাঁদের কারণে সফল হতে পারে না, যাঁরা অনিয়ম-দুর্নীতিতে আকণ্ঠ লিপ্ত থাকেন। সরকারের সেই সব বিভাগ সরকারের সৎ কাজে স্থায়ী বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলোতে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। শুধু অসৎ ও স্বার্থপর নয়, অদক্ষ মন্ত্রী-আমলারাও সরকারের পথের বিরাট বাধা। এসব বিষয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জানা থাকার কথা। তাঁর মন্ত্রী-আমলাদের তাঁর থেকে ভালো করে আর কে জানে? কাদের দ্বারা কীভাবে তাঁর শাসনযন্ত্র চলছে, তা তিনি বিলক্ষণ জানেন। তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের কার কী স্বভাব-চরিত্র, তা তাঁর চেয়ে ভালো করে কে আর বোঝে?
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@prothom-alo.info

গাজায় যুদ্ধাপরাধ করছে ইসরাইল -জাতিসংঘ

গাজায় ইসরাইলি হামলা বন্ধে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের এক জরুরি অনুষ্ঠানে ইসরাইলি সেনাদের প্রায় একতরফা হামলাকে যুদ্ধাপরাধ বলে সতর্ক করা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ইসরাইলি সহিংসতা বন্ধে তেলআবিবে বেনজামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এ সময় তিনি বেসামরিক নারী-পুরুষ হত্যার তীব্র নিন্দা জানান। এদিকে ইসরাইলি সেনাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলার আঘাতে বুধবার আরও ২০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে ১৬ দিনে নিহতের সংখ্যা সাড়ে ছয়শ’ ছাড়িয়েছে। এ ছাড়া হামলায় আহত হয়েছেন প্রায় ৪ হাজার। হতাহতদের দুই-তৃতীয়াংশই নারী ও শিশু। বিবিসি, আল জাজিরা ও এএফসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এসব তথ্য দিয়েছে।
বুধবার জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের জরুরি অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান কর্মকর্তা নাভি পিল্লাই বলেছেন, ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করছে। এটা যুদ্ধাপরাধ। তিনি বলেন, ইসরাইল বেসামরিক নাগরিকদের হামলা থেকে সুরক্ষার যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। গাজায় হামলা চালিয়ে বাড়িঘর ধ্বংস করে দিচ্ছে তারা। হত্যা করছে শিশুদের। এটা আন্তর্জাতিক আইনের লংঘন। তবে তিনি ফিলিস্তিনি হামাসের এলোপাতাড়ি রকেট ও মর্টার হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন। এদিকে ইসরাইল জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদকে পক্ষপাতদুষ্ট বলেই দাবি করে আসছে এবং জাতিসংঘের নেতৃত্বে কোনো তদন্তেও তারা সহযোগিতা করবে না বলেও মনে করা হচ্ছে। ইসরাইলের বিচারমন্ত্রী জিপি লিভনি জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদকে ইসরাইলবিরোধী প্রতিষ্ঠান আখ্যা দিয়েছেন।

ফিলিস্তিনের জরুরি বিভাগের কর্মর্তারা জানান, বুধবার সকালে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসে ইসরাইলি সেনাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ছয়জন নিহত ও ২০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। পরে দিনভর আরও হামলায় হতাহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। গাজার স্থানীয়রা জানান, ইসরাইলি সেনারা দুপুরের দিকে গাজার পাওয়ার প্ল্যান্টে হামলা চালায়। যেখান থেকে গাজার প্রায় অর্ধেক মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করা হয়। পাওয়ার প্ল্যান্টের এক কর্মকর্তা জানান, এর বেশিরভাগ ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন মাত্র ১০ ভাগ বাসিন্দা বিদ্যুৎ পাবেন। বিদ্যুতের পাশাপাশি সমগ্র গাজায় খাদ্য-পানীয় ও ওষুধের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, গত ১৬ দিন ধরে চলা সহিংসতায় কমপক্ষে ৬৪৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন প্রায় ৪ হাজারের বেশি। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী হতাহত ফিলিস্তিনিদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। এর মধ্যে বেশকিছু শিশুও রয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএর তথ্য অনুযায়ী ১ লাখ ১৮ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি বাড়িঘর ছেড়েছেন। যাদের বেশিরভাগ আশ্রয় নিয়েছেন জাতিসংঘের স্কুলগুলোতে। ইসরাইলি হামলা শুরুর পর থেকে জাতিসংঘের স্কুলগুলো আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, সহিংসতায় হামাসের হামলায় ইসরাইলের ৩০ জন নিহত হয়েছে। এদের মধ্যে ২৮ জন সেনা ও দুজন বেসামরিক নাগরিক। এদিকে হামাসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, গাজার উত্তর বেইত হানুন শহরে হামাসের সামরিক শাখা ইজাদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেডের যোদ্ধাদের হাতে বুধবার আরও একটি ইসরাইলি ট্যাংক ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া আগের রাতে তেলআবিব বিমানবন্দরে রকেট হামলা চালিয়েছে হামাস। পরে বিমানবন্দরটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
ইসরাইলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে গাজা থেকে হামাস সদস্যরা রকেট হামলা চালাচ্ছেন অভিযোগ করে গত ৮ জুলাই থেকে গাজায় বিমান হামলা শুরু করে ইসরাইলি বাহিনী। হামলা শুরু করার কয়েক দিন পর বিমান হামলার পামাপাশি স্থল হামলাও শুরু করে তারা।

অনুপ চেটিয়া এবং নূর হোসেনের বিনিময় প্রসঙ্গে by ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী

২২ জুলাই যুগান্তরে অরবিন্দ রায় অনুপ চেটিয়ার বিনিময়ে নূর হোসেন! শিরোনামে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী (উলফা) নেতা অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে নূর হোসেনের বিনিময় হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, অনুপ চেটিয়ার সঙ্গে নূরের বিনিময় করা হলে বিনিময় হার সমান থাকবে কি? এ প্রশ্নের জবাব পেতে হলে উভয়ের তুলনামূলক পরিচিতি জানা দরকার। অনুপ চেটিয়া হচ্ছেন আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা, তিনি আসামকে ভারতের থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চান। যদি কোনোদিন সফল হন তাহলে তিনি অসমিয়াদের চোখে হবেন আসামের স্থপতি। এককথায় জাতির জনক বলতে যা বোঝায়, তিনি হবেন সেই অভিধার একজন। .... বাংলাদেশের কাছে ভারতের দাবি অনুপ চেটিয়াকে যেন তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়। অনুপ চেটিয়া একটি রাজ্যের কেন্দ্রীয় নেতা, শুদ্ধ-নিষিদ্ধ পরের বিষয়। ...
অরবিন্দ রায়কে তার এ সময়োচিত মন্তব্যের জন্য সাধুবাদ জানাতে হয়। অনুপ চেটিয়াকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার জন্য ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। ভারতের দিক থেকে সেটা স্বাভাবিক। কারণ, অনুপ চেটিয়াকে ছাড়া স্বাধীন আসামের দাবিতে লড়াইরত উলফার সঙ্গে কোনো কার্যকর সমঝোতার জন্য তার সম্মতি অত্যাবশ্যক বলে মনে হয়। কিন্তু সাত-সাতজন মানুষকে প্রকাশ্য দিবালোকে অপহরণ করে ঠাণ্ডা মাথায় নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করে বস্তাবন্দি অবস্থায় নদীতে ফেলে দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তেমন একজনের সঙ্গে আসামের জনগণের অন্তত একাংশের এ নন্দিত নেতাকে বিনিময় করার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। ভারত যদি তেমন আবদার করে থাকে, তাহলে বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে।
অনুপ চেটিয়া দীর্ঘদিন বাংলাদেশের কারাগারে আটক আছেন। ১৯৯৭ সালের ২১ ডিসেম্বর তাকে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করার অভিযোগে ফরেনার্স ও পাসপোর্ট আইনে গ্রেফতার করা হয়। অতঃপর তিনি আদালতের রায়ে কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। দণ্ড শেষে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। সরকার এখন এ ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে। অনুপ চেটিয়া ও তার সহকর্মীরা বাংলাদেশের শত্র“ নন। তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হলে তারা নিগৃহীত হতে পারেন। জীবন সংশয়ের আশংকাও রয়েছে।
আমাদের আগের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও একবার বলেছিলেন, অনুপ চেটিয়াকে শিগগিরই ভারতের হাতে তুলে দেয়া হবে। একসময় এ কথাও বলা হয়েছিল যে, বন্দি বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিনিময়ে অনুপ চেটিয়াকে ভারতের কাছে হস্তান্তর করা হবে। অনুপ চেটিয়াকে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে তুলনা করাও গুরুতর অন্যায়। কারণ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনুপ চেটিয়ারা আমাদের অকৃত্রিম সুহৃদ ও সহযোগী ছিলেন।
আসাম, কাশ্মীরসহ ভারতের কিছু রাজ্যে স্বাধীনতা সংগ্রাম নতুন কিছু নয়। আমরা নীতিগতভাবে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার বিরোধী। কিন্তু কোনো দেশের স্বাধীনতাকামী বা সরকারবিরোধী কোনো ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক নিগ্রহ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করেন, তাহলে তাকে আশ্রয় প্রদান করা যে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। তিনি যদি স্বেচ্ছায় তার দেশে ফিরে যেতে চান ভিন্ন কথা। কিন্তু তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফেরত পাঠিয়ে বিপদের মুখে ঠেলে দেয়া গুরুতর অন্যায় হবে। সেটা হবে আন্তর্জাতিক রীতির খেলাফ।
ভারত সরকার আসামের স্বাধীনতাকামী নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ নিয়েছে আমরা তার সাফল্য কামনা করব। এর আগে উলফার শীর্ষ নেতা অরবিন্দ রাজখোয়াসহ বেশ কয়েকজনকে বাংলাদেশের অভ্যন্তর থেকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিভাবে, কোন আইন বা রীতি অনুসরণ করে তা করা হয়েছে- সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। শোনা যায়, বাংলাদেশ সরকারই তাদের সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর কাছে হাজির হতে বাধ্য করেছে। কিন্তু তারপরও আসামের স্বাধীনতাকামীদের আন্দোলন থেমে যায়নি। কাজেই, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত হবে না, যাতে করে আমাদের এ প্রতিবেশী অঞ্চলের জনগণ বা জনগণের কোনো অংশ বাংলাদেশের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের চিরস্থায়ী বৈরিতা সৃষ্টি হয়।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকার এ রকম অসম ও অনৈতিক বিনিময়ের প্রস্তাবের সম্মতি দিতে পারে না।
দুই
আসামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিটি রাজ্যেই স্বাধীনতার দাবি নিয়ে গড়ে উঠেছে সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনী। সাত-আটটি সংগঠিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী দীর্ঘকাল ধরে দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নিরন্তর লড়াই করে চলেছে। ভারত সরকারকে তাদের মোকাবেলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেজন্য সেখানে প্রায় ৭ লাখ নিয়মিত সৈন্য মোতায়েন রয়েছে। দুর্গম পার্বত্য এলাকায় বিদ্রোহীদের দমন করে প্রশাসন চালিয়ে যেতে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে বিপুল অর্থ, অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ খরচ করতে হচ্ছে ভারত সরকারকে।
এ বিদ্রোহীদের স্বাধীনতার দাবি কতটা যৌক্তিক সে বিচারে আমরা যাব না। তার বিচার করবেন সংশ্লিষ্ট জনগণ। রাষ্ট্র হিসেবে স্বীয় অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য ভারত সরকার এ বিদ্রোহ দমনে কঠোর অবস্থান নেবে, সেটাও স্বাভাবিক। সে ব্যাপারেও আমাদের কিছু বলার নেই।
স্পষ্টত এ বিরোধে আমরা উভয় সংকটে রয়েছি। ভারত আমাদের বিশাল ও শক্তিধর প্রতিবেশী। কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রতিরক্ষা-সর্ব ক্ষেত্রেই দুদেশের আদান-প্রদান ব্যাপক ও সুগভীর। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও ভারতের সঙ্গে সংঘাত বাংলাদেশের কাম্য হতে পারে না। অপরদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক আবহমানকালের। আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মিজোরামের সঙ্গে রয়েছে আমাদের অভিন্ন সীমান্ত। সেই সীমান্তবর্তী এলাকায় বিরাজ করে বহু সহস্র বছরের অবিভাজিত সমাজ-সংস্কৃতি ও অর্থনীতি। অদূরেই মনিপুর, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল। দিল্লির সঙ্গে এসব রাজ্যের দূরত্ব অনেক; কেবল ভৌগোলিক দূরত্বই নয়, মানসিক দূরত্বও বিস্তর। ইংরেজ আগমনের আগে এসব অঞ্চলে কখনোই দিল্লির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মনে রাখা দরকার, ইংরেজের ঔপনিবেশিক শাসনেও এ সমুদয় অঞ্চল সামগ্রিকভাবে দিল্লির প্রত্যক্ষ শাসনে ছিল না। অপরদিকে ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক, ভৌগোলিক- সবদিক থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের সম্পর্ক অনাদিকালের। বিশেষ করে আসাম ও ত্রিপুরার ভাষা, বর্ণমালা, সংস্কৃতি-লোকাচারের সঙ্গে বাংলার ভাষা, বর্ণমালা ও সংস্কৃতি-লোকাচারের ভিন্নতা বুঝতে গবেষণা করতে হয়। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও এ সম্পর্ক বহাল থাকবে অনন্তকাল অবধি। পৃথিবী যতই এগিয়ে যাচ্ছে, এ একদা দুর্গম অঞ্চলের মানুষও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে এসব অঞ্চল এখন আর আগের মতো দুর্গম নয়। অতি দ্রুত বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে। আর সেই সম্পৃক্ততায় বাংলাদেশ থাকছে প্রকৃতি-নির্ধারিত সন্ধিস্থল হয়ে। ভারত নিজেই এ অঞ্চলে যাতায়াতের তার নিত্যনতুন পথ খুঁজছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। সেসব পথন্ম উন্মুক্ত হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে এ অঞ্চলের যোগাযোগ ও পরস্পর নির্ভরশীলতা ততই বাড়তে থাকবে।
আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে এ অঞ্চলের জনগণের বিভিন্ন অংশ নিঃস্বার্থভাবে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। একাত্তরে এসব রাজ্যের বিভিন্ন শহর ও গ্রামাঞ্চলে গিয়ে তাদের আন্তরিকতায় অভিভূত হয়েছি। আমাদের স্বাধীনতায় তাদের সেই অবদান ভুলে যাওয়া হবে চরম অকৃতজ্ঞতা। তাই আসাম, তথা এ সাত রাজ্যের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নির্ধারণের সময় এ বাস্তবতা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার অর্জনের সংগ্রামে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা দিতে না পারলেও তাদের কোনোভাবে হেনস্থা করা যাবে না।
তিন
মনে রাখা দরকার, ইংরেজ শাসনের ১২১ বছর ছাড়া (১৮২৬-১৯৪৭) আসাম কখনোই পরাধীন ছিল না। আসামের জনগণের একটা বড় অংশ সেই স্বাধীনতা ফিরে পেতে চায় সেটা অপরাধ হতে পারে না। তারা তা অর্জন করতে পারবে কি-না, আমরা বলতে পারব না। ইতিহাস সেটা নির্ধারণ করবে। আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ স্বাধীনতা চায় কি-না, সেটাও স্পষ্ট নয়। (আমরা যখন স্বাধীনতা চাওয়া শুরু করেছিলাম, তখন আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ কি তার পক্ষে ছিল?)। কিন্তু এ স্বাধীনতাকামী মানুষগুলোকে দুর্বৃত্ত কিংবা অপরাধী আখ্যা দেয়ার ব্যাপারে আমার ঘোরতর আপত্তি আছে। তারা স্বাধীনতা চাচ্ছে। আসামে তাদের সমর্থকের সংখ্যা যে নিতান্তই কম নয়, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দিল্লি তাদের দমন করার জন্য লাখ লাখ সৈন্য মোতায়েন করেছে। রাজনৈতিকভাবেও নানা প্রক্রিয়ায় তাদের দমন করার চেষ্টা করছে। তাদের প্রতিপক্ষে তাঁবেদার গোষ্ঠী খাড়া করে সর্বাÍক সহায়তা দিয়ে রাজ্য সরকারে ক্ষমতায় রাখছে। পাশাপাশি নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে। তাদের আলোচনার টেবিলে বসানোর চেষ্টা চলছে। যাদের সঙ্গে এত বড় সংঘাত, তাদের সঙ্গেই যখন সমঝোতার এত প্রয়াস, তখন বুঝতে কষ্ট হয় না এ বিদ্রোহীদের অবস্থান সেখানে কতটা ব্যাপক ও শক্ত। স্পষ্টতই তাদের পক্ষে জনসাধারণের একটি বিরাট অংশ রয়েছে। তাদের আমাদের প্রতিপক্ষ বানানো বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক নয়।
চার
অনুপ চেটিয়ারা তাদের সংগ্রামে জয়ী হবেন কি-না সেটা ইতিহাসই নির্ধারণ করবে। আমরা চাইব উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনগণ তাদের ইচ্ছার আলোকে নিজেরাই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করুন। তবে উপমহাদেশজুড়ে মুঘল-ইংরেজের পদাংক অনুসরণকারী সাম্রাজ্যবাদ-উপনিবেশবাদসুলভ কর্তৃত্ববাদী শাসনের যে কালো ছায়া শান্তিকামী মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে, সেই কালো ছায়া থেকে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ মুক্ত হোক, সেই মুক্তির আলোকচ্ছটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য বনভূমিতেও বিচ্ছুরিত হোক, সেটাই হবে আমাদের প্রত্যাশা। অনুপ চেটিয়ারাও নিশ্চিতরূপে সেই প্রত্যাশা নিয়েই লড়ছেন।
আলেকজান্ডারের দস্যুবাহিনী পাঞ্জাবের একটি ক্ষুদ্র রাজ্য তছনছ করে দিয়ে সেই রাজ্যের রাজাকে শিকলে বেঁধে হাজির করেছিল তাদের সর্দার সম্রাটের সামনে। সম্রাট বন্দিকে জিজ্ঞাসা করেন, বন্দি তুমি আমার কাছে কেমন ব্যবহার প্রত্যাশা কর? শৃংখলিত রাজা পুরু শির উঁচু করে বলেছিলেন, রাজার মতো।
দস্যু সম্রাট তক্ষুনি বন্দির শৃংখল খুলে নেয়ার নির্দেশ দেন এবং তাকে রাজার মর্যাদায় আপ্যায়িত করেন। অনুপ চেটিয়াদেরও সেই দৃষ্টিতে দেখতে হবে।
ড. ফেরদৌস আহমদ কোরেশী : রাজনীতিক, ভূ-রাজনীতি ও উন্নয়ন গবেষক
shapshin@gtlbd.com

মৃত্যুপুরী গাজা অন্ধকারে

প্রাণহীন, বিদ্যুৎবিহীন, মৃত্যুপুরী গাজা এখন অন্ধকারে। ইসরাইলি আগ্রাসনের ১৬তম দিন বুধবার বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এছাড়াও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে ৬ জন নিহত হয়েছে। এ নিয়ে মৃত্যু উপত্যকায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৬৪৮। আহত ৪ হাজার।
এদিকে, খান ইউনিসের বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার ফলে মৃত্যুপুরীতে এখন অন্ধকার। মাত্র ১০ শতাংশ গাজাবাসী এখন বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করছেন বলে জানিয়েছেন এক বিদ্যুৎকর্মী।

ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী রামি হামদাল্লাহ বলেছেন, গাজা উপত্যকার ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়ার বিষয়টি অবশ্যই যে কোনো অস্ত্রবিরতি চুক্তির অংশ হতে হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সফরকালে মঙ্গলবার ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন ‘অবরোধ তুলে’ নেয়ার সময় এসেছে। হামাস অস্ত্রবিরতির শর্ত হিসেবে গাজার ওপর থেকে ইসরাইল ও মিসরের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের যে আহ্বান জানিয়েছিল হামদাল্লাহর বক্তব্য তার প্রতিফলন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গাজায় গত ১৫ দিন চলা যুদ্ধে ৬৪০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি ও ৩১ ইসরাইলি নিহত হয়েছে। গাজা থেকে ইসরাইলে রকেট হামলা বন্ধে সেখানে অপারেশন প্রটেকটিভ এজ শুরু করা হয়েছে বলে দাবি তেলআবিবের। গাজা উপত্যকায় মঙ্গলবার রাতেও যুদ্ধ অব্যাহত ছিল। উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিসে ইসরাইলি বিমান হামলায় কমপক্ষে ৫ জন নিহত হয়েছে। এ সময় ইসরাইলি সৈন্যও নিহত হয়।
জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে এ অঞ্চলে অবস্থান করছেন। তারা অবিলম্বে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, মিসরের অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব বাতিলের জন্য হামাসকেই দায়ী থাকতে হবে। হামাস গত সপ্তাহে মিসরের অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। সংগঠনের সশস্ত্র শাখা বলেছিল, প্রস্তাবে রাজি হওয়া আত্মসমর্পণের শামিল।
হামাস ও ফাতাহ সমর্থিত নতুন ঐকমত্যের সরকারের প্রধানমন্ত্রী হামদাল্লাহ বলেন, ‘আমরা দেশের মানুষের জন্য- যারা প্রতিনিয়ত ও ইসরাইলি দখলদারিত্বের শুরু থেকে গত ৪৭ বছর ধরে দখলদারিত্বের শিকার হচ্ছে তাদের জন্য ন্যায়বিচার চাই।’ তিনি বলেন, এখন আগ্রাসন বন্ধ ও অবরোধ তুরে নেয়ার সময় এসেছে।
সম্প্রতি দখলকৃত পশ্চিমতীরে তিন ইসরাইলি কিশোর ও জেরুজালেমে এক ফিলিস্তিনি কিশোরকে হত্যার পর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ইসরাইলি তিন কিশোরকে হত্যার জন্য হামাসকে দায়ী করা হয়। তবে হামাস এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। এর কয়েকদিন পর পূর্ব জেরুজালেমে এক ফিলিস্তিনি কিশোরকে অপহরণের পর পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ সন্দেহভাজন ৬ ইহুদিকে আটক করে। এরপর মূলত ইসরাইল ও হামাস পাল্টপাল্টি হামলা শুরু করে। গাজা থেকে ইসরাইলে জঙ্গিদের রকেট হামলা বন্ধে তেলআবিব কয়েকদিন ধরে ব্যাপক বিমান হামলা ও নৌঘাঁটি থেকে গোলাবর্ষণের পর বৃহস্পতিবার থেকে স্থল অভিযান শুরু করেছে। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে ফিলিস্তিনিরা সংগ্রাম শুরু করে। এর পর থেকে নিয়মিত রক্ত ঝরলেও আজও তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এএফপি।

গাজায় হামলা যুদ্ধাপরাধ -জাতিসংঘ

ইসরাইলকে সতর্ক করলেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই। তিনি বললেন, বলা যায় তারা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে। এটাকে যুদ্ধাপরাধ বলা যেতে পারে। গাজায় যে পরিমাণ বেসামরিক মানুষ, বিশেষ করে নারী  
ও শিশু মারা যাচ্ছে, বাড়িঘরে, মসজিদে, বিভিন্ন কমপ্লেক্সে হামলা করা হচ্ছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি এ কথা বলেন। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের জরুরি সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমন মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি হামাসের রকেট ও মর্টার হামলার নিন্দা করেন। গাজা উপত্যকায় এমন সামরিক হামলায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক এই শীর্ষ কর্মকর্তা হতবাক। তিনি বলেন, ইসরাইল যে অভিযান চালাচ্ছে তা বেসামরিক মানুষকে রক্ষায় যথেষ্ট নয়। এতে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হওয়ার জোর আশঙ্কা রয়েছে। এটা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। এর জবাবে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলকে পক্ষপাতী হিসেবে অভিহিত করেছে ইসরাইল। তারা জাতিসংঘের অন্যান্য তদন্তের মতো তাদেরকে সহায়তা না-ও করতে পারে। গত ১৫ দিনের এ যুদ্ধে কমপক্ষে ৬৪৯ ফিলিস্তিনি ও ৩১ ইসরাইলি নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনের নিহতদের মধ্যে বেশির ভাগই বেসামরিক মানুষ। তাদের মধ্যে রয়েছে শিশু ও নারী। নাভি পিল্লাই বলেন, গাজা উপত্যকায় যে বিপুল সংখ্যক শিশুকে হত্যা করা হয়েছে তা মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ওদিকে চলমান যুদ্ধে শান্তি প্রক্রিয়া চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গতকাল ইসরাইলে পৌঁছেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে তিনি গতকাল তেল আবিবের কাছে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে পৌঁছেন। ওদিকে মঙ্গলবার রাতভরও হামলা অব্যাহত রাখে ইসরাইল। খান ইউনুস এলাকায় বিমান হামলায় নিহত হন কমপক্ষে ৫ জন। গাজায় ধ্বংসস্তূপের ভিতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল এক ফিলিস্তিনি নারীকে। কিন্তু ক্ষতের কারণে তিনি মারা যান। ওই হামলায় তার পরিবারের ১০ সদস্য নিহত হয়েছেন। এ পরিবারটি জার্মান। এ পরিবারের বেঁচে আছেন মাত্র একজন। তার নাম সালেহ কেলানি। যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমারা দ্বিমুখী নীতি নিয়েছে বলে তার অভিযোগ। তিনি বলেন, কেন জার্মানি এ বিষয়ে কোন কথা বলছে না? তাদের কাছে আছে জার্মানির পাসপোর্ট। তিনি প্রশ্ন করেন, এসব হত্যার বিরুদ্ধে জার্মানিতে, আনগেলা মেরকেল-এর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ কই? ইসরাইলিরা যখন হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তখন ইউরোপ, আমেরিকাসহ সরা বিশ্ব কি এ বিষয়ে সচেতন? তারা সচেতন নয় বলেই এ বিষয়ে কিছুই বলা হচ্ছে না। তিনি বলেন, আমরা যে এলাকায় বসবাস করি সেটা তো কোন হামাসের জায়গা নয়। সেখানে হামাস থাকেও না। তাহলে কেন সেখানে বোমা মারা হলো? কেন আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়া হলো? জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি-মুন ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানালেও তাতে কর্ণপাত করছে না ইসরাইল। ওদিকে এ যুদ্ধের মধ্যে আটকেপড়া পরিবারগুলো নিরাপত্তার জন্য হন্যে হয়ে ছুটছে। কিন্তু গাজার সর্বত্রই যুদ্ধক্ষেত্র। তারা যাবেন কোথায়? শুজাইয়া এলাকায় শামালিস পরিবারের ওপর তিনবার বোমা হামলা হয়েছে তিন স্থানে। তারা দেখেছেন চোখের পলকে ধুলোয় মিশে যাচ্ছে বাড়ি। এ অবস্থায় এ পরিবারটি গাজা সিটিতে পৌঁছে এক আত্মীয়ের বাসায়। কিন্তু সোমবার রাতে সেখানেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে নিহত হন ৮ জন। আহত হন অনেকে। এর মধ্যে রয়েছে ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ শামালি। পরিবারের অন্য সদস্যরা আশ্রয় নেন অন্যের বাড়িতে। সেখানেও গতকাল সকালে বোমা হামলা হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন।
কাতারের আমীর ও সৌদি বাদশাহ্‌র বৈঠক: উপসাগরীয় ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে নজিরবিহীনভাবে দূরত্ব ও ফাটল সৃষ্টির পর প্রথমবারের মতো কাতারের আমীর মঙ্গলবার রাতে সৌদি আরব পৌঁছেছেন। আকস্মিক এ সফরে কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল-থানি উপকূলীয় শহর জেদ্দায় সৌদি আরবের বাদশাহ্‌ আবদুল্লাহ্‌র সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফিলিস্তিন অধ্যুষিত গাজায় যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে বৈঠক করেন তারা। এ সময় তারা যুদ্ধবিরতিতে ইসরাইল ও হামাসকে রাজি করাতে সম্ভাব্য বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স সালমান ও ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মুকরিন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন- বাদশাহ্‌ আবদুল্লাহ্‌র নিরাপত্তা উপদেষ্টা যুবরাজ বানদার বিন সুলতান ও বাদশাহের পুত্র যুবরাজ মিতেব। মিতেব সৌদি আরবের ন্যাশনাল গার্ডের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন।
অবরোধ প্রত্যাহার দাবি: যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে গাজার ওপর থেকে অর্থনৈতিক ‘অবরোধ’ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী রামি হামদাল্লাহ। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন মধ্যপ্রাচ্য সফরে থাকার সময় এ দাবি জানান তিনি। সহিংসতা বন্ধে মধ্যপ্রাচ্য সফরে রয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। তারা অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান এবং এর কারণগুলো খুঁজে বের করে সেগুলো সমাধানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। ফিলিস্তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের জনগণের জন্য সুবিচার চাই, যারা প্রতিদিন এবং গত ৪৭ বছর ইসরাইলি দখলদারিত্বের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অবিচারের শিকার হচ্ছেন। তিনি বলেন, সময় হয়েছে এ আগ্রাসন বন্ধের এবং অবরোধ অবসানের। গাজায় হামাস ক্ষমতা নেয়ার পর ২০০৭ সালে ইসরাইল ও মিশর এ অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছিল। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, মিশরের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের জন্য দায়ী থাকবে হামাস। পক্ষান্তরে, হামাস তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ফিলিস্তিনি সীমান্তে মানুষ যেখানে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারবে না ও স্বাধীনভাবে মালামাল আনা-নেয়া যাবে না- তেমন এমন শর্ত-সংবলিত যুদ্ধবিরতিতে তারা সম্মত হবেন না।
গাজায় বাড়ছে শিশুর লাশ
গাজা উপকূলে ইসরাইলি আগ্রাসনের তৃতীয় সপ্তাহ পূরণ হতে চলেছে। এই সংঘর্ষ শিশুদের ওপর খুব মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। গাজা থেকে যেসব প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে, সে সবের মধ্যে রয়েছে ট্যাংকের গোলার আঘাতে বেসামরিক মানুষের বসতি ধ্বংসের পাশাপাশি শিশু মৃত্যুর ঘটনাও। ট্যাংকের গোলার আঘাতে নিহত হয়েছে ৫ মাস বয়সী শিশু। এক হামলায় সৈকতে ক্রীড়ারত ৪ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ইসরাইলে যখনই রকেট হামলার সাইরেন বাজানো হয়, তখনই সাধারণ ইসরাইলিরা শিশু সন্তান কোলে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ছোটে। ঘনবসতিপূর্ণ গাজায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী কর্তৃক ২ সপ্তাহ ধরে বিমান হামলার পর গত সপ্তাহে স্থল অভিযান শুরু হয়। পরিসংখ্যান খুব নির্মম। জেরুজালেমে ইউনিসেফ-এর যোগাযোগ প্রধান ক্যাথরিন ওয়েবেল বলেছেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ৮ই জুলাই সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে ১৮ বছরের কমবয়সী অন্তত ১২১ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে এই সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ। তিনি আরও বলেন, ২০ ও ২১শে জুলাইয়ের মধ্যে অন্তত ২৮ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। জাতিসংঘের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ৪৭৯ ফিলিস্তিনি ও ২৭ ইসরাইলি নিহত হয়েছে এই সংঘর্ষে। কিন্তু নিরপরাধ শিশুদের মৃত্যুর বিষয়টি মানবাধিকার সংগঠন, বিশ্বনেতা ও সমালোচকরা সোচ্চার হয়েছেন। ২২শে জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি-মুন যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নিজের সন্তানকে কবর দিতে হচ্ছে অনেক মায়ের। একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, বেসামরিক মানুষের মৃত্যু থামানো উচিত। তবে এর বেশির ভাগ ঘটনার দায় ইসরাইলের। ইসরাইলি মনোবিদরা বলছেন, যুদ্ধের প্রভাব ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনি শিশুদের মনে দাগ কাটছে। অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত না হলেও, অনেক শিশুই মানসিক আঘাতে ভুগতে পারে। জাতিসংঘের একটি সংস্থা বলছে, অন্তত ৭২৩৯০ জন শিশুর সরাসরি ও বিশেষ মনোসাহায্য প্রয়োজন। গাজার ১৩ বছর বয়সী সামিরা আক্তার এক লাখ শিশুর মধ্যে একজন, যাদের পরিবার উদ্বাস্তু হয়ে জাতিসংঘের একটি স্কুলে সাহায্যের আশায় দিন গুনছে। সামিরা বলে, আমি এই স্কুলকে ঘৃণা করি। আমি আমার বোনদের নিয়ে খেলতে চাই, অন্যদের মতো স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চাই। ১২ বছর বয়সী শাদ মাজেদ গাজার শিফা হাসপাতালের বেডে পড়ে আছে। সে বলে, আমি যুদ্ধ ঘৃণা করি। আমি এর শেষ চাই। আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই। দয়া করে আমাদের বাঁচতে দিন।

আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের ​বিপরীতে ব্রিকস ব্যাংক by মইনুল ইসলাম

১৫ জুলাই ২০১৪ ব্রাজিলের ফোর্টালেজা নগরে বিশ্বের নব্য শক্তিধর ব্রিকস দেশগুলো ব্রিকস ব্যাংক নামের একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে, যা কালের পরিক্রমায় এই নগরকে একদিন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রেটন উডস শহরের সঙ্গে তুলনীয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিতে পারে। ১৩ জুলাইয়ের বিশ্বকাপ ফাইনালের রেশ কাটতে না–কাটতেই এই সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার কারণে বিশ্ব মিডিয়ায় এটাকে নিয়ে তেমন মাতামাতি হয়নি। তবে ঘটনাটি যে ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসবে, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ, ব্রিকস ব্যাংক প্রতিষ্ঠার এই সিদ্ধান্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর ওপর আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের অসহনীয় দাদাগিরি রুখে দাঁড়ানোর একটি সাহসী প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত হবে।

ব্রিকস (​বিআরআইসিএস) শব্দটি বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগ ও ব্যবসায়-গবেষণা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান-স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নীলের প্রবর্তিত একটি টার্ম, যা তিনি উদ্ভাবন করেছেন ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, চায়না ও সাউথ আফ্রিকা—বিশ্বের এই পাঁচটি দ্রুত উত্থানশীল অর্থনীতির ইংরেজি নামের আদ্যক্ষরের সমন্বয়ে। এই পাঁচটি দেশ বিশ্বের আয়তনের প্রায় ২৫ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত, এগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বিশ্বের মোট জিডিপির ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ তারা উৎপাদন করছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনবহুল দুটো দেশ চীন ও ভারত যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আয়তনের দিক থেকে সর্ববৃহৎ দেশ রাশিয়া। এই দেশগুলোর কোনোটাকেই মাথাপিছু জিডিপির বিবেচনায় উন্নত দেশ বলা যাবে না। রাশিয়ার মাথাপিছু জিডিপি ১৪ হাজার ৬০৪ মার্কিন ডলার, এই পাঁচটি দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। ব্রাজিলের মাথাপিছু জিডিপি ১১ হাজার ১৭১ মার্কিন ডলার হলেও অত্যন্ত উচ্চমাত্রার আয়বৈষম্যের কারণে দেশটির সাধারণ মানুষ এখনো উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত রয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাথাপিছু জিডিপি সাত হাজার ৮১০ মার্কিন ডলার, কিন্তু ওখানকার অশ্বেতাঙ্গ জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও এখনো অর্থনৈতিক বঞ্চনার শিকার। চীনের মাথাপিছু জিডিপি ছয় হাজার ৭৬৮ মার্কিন ডলার হলেও চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং এখানকার জনগণের জীবনযাত্রার মান দ্রুত বর্ধনশীল। ভারতের মাথাপিছু জিডিপি মাত্র এক হাজার ৪১৮ মার্কিন ডলার। তাই ভারতকে এখনো অনায়াসে একটি নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশ বলা যায়। মাথাপিছু আয়ের বিচারে এই পাঁচটি দেশের কোনোটিকেই উন্নত দেশের কাতারে ফেলা না গেলেও বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গত দুই দশকের ধারাবাহিকতায় এই ব্রিকস নামধারী দেশগুলো চমকপ্রদ সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে নিঃসন্দেহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পর্বের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার অবস্থানে চলে এসেছে। ক্রয়ক্ষমতা সাম্যের (পারসেসিং পাওয়ার প্যারিটি বা পিপিপি) ভিত্তিতে হিসাব করা হলে চীনের জিডিপি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপিকে ছাড়িয়ে যাবে এবং এই ভিত্তিতে ভারতও ২০৩০ সালের মধ্যেই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। তার মানে, পিপিপি পদ্ধতিতে হিসাব করলে ব্রিকসের অবদান বিশ্বের জিডিপির ৪০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলা যায়। অতএব, এই জোটটিকে বিশ্ব অর্থনীতির নব্য পরাশক্তি হিসেবে অভিহিত করলে অত্যুক্তি হবে না।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিকস দেশগুলো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহণের প্রয়াস নিয়ে চলেছে এবং তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ার অঙ্গরাজ্যের ব্রেটন উডস শহরে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত অনুসারে, উপনিবেশ-উত্তর উন্নয়নশীল তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং পরে গ্যাট ও এর উত্তরসূরি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৯৪৫ সাল থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন উন্নত, শিল্পায়িত পুঁজিবাদী দেশগুলো নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টা জোরদার করে চলেছে, ব্রিকসের নেতৃত্বে এখন তৃতীয় বিশ্ব তার বিরুদ্ধে প্রায়ই সফল প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে।
প্রধানত, এহেন প্রতিরোধের কারণেই ২০০২ সালে শুরু হওয়া ডব্লিউ­টিওর ‘দোহা উন্নয়ন রাউন্ডের’ আলোচনা গত ১২ বছরেও সম্পন্ন করা যায়নি, কেননা ওই আলোচনায় উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলো নিজেদের পাতে ঝোল টেনে নেওয়ার অবস্থান ছাড়তে রাজি হচ্ছে না। তারা এখনো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে অন্যায্য চুক্তি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার জন্য অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, আর ব্রিকসের নেতৃত্বে তাকে প্রতিরোধ করে চলেছে তৃতীয় বিশ্ব।
এই নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থাকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘আধিপত্য-পরনির্ভরতা তাত্ত্বিক কাঠামোর’ অনুসারী অনুন্নয়নের রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বগুলো পুঁজিবাদী কেন্দ্রসমূহ কীভাবে তৃতীয় বিশ্বের প্রান্তীয় দেশগুলো থেকে পুঁজি পাচারের নানা মেকানিজমকে ব্যবহার করে চলেছে তার বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছে। এর ফলে আফ্রো-এশীয় ও লাতিন আমেরিকার জনগণের মধ্যে গত চার দশকে এই বিষয়টি সম্পর্কে গভীর সচেতনতার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও বিংশ শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকের প্রতিবিপ্লবের জোয়ারে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দাবিদার রাষ্ট্রগুলোর পতন ঘটেছে, তবু কেন্দ্র-প্রান্ত পুঁজি পাচারকে ঠেকাতে হলে নব্য সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার আগ্রাসনকে যে রুখতেই হবে—এই চেতনাটুকু ক্রমেই সঞ্চারিত হচ্ছে উন্নয়নশীল বিশ্বের জনমানসে। তারই প্রতিফলন ঘটছে লাতিন আমেরিকার আটটি দেশে বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি কর্তৃক নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ঘটনাবলিতে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, ভেনেজুয়েলা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, উরুগুয়ে ও নিকারাগুয়ায় এখন বামপন্থী সরকার ক্ষমতাসীন। সমাজতান্ত্রিক কিউবায় তো ১৯৫৯ সাল থেকেই বামপন্থী সরকার টিকে রয়েছে মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও।
অন্যদিকে, পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বর্তমান পর্বে বিংশ শতাব্দীর আশির দশকের শুরু থেকেই ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ ছদ্মবেশধারী বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সারা বিশ্বের একক মতাদর্শিক ব্যবস্থা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার আগ্রাসী তৎপরতাকে দিন দিন জোরদার করে চলেছে। ব্রিটেনের ‘থ্যাচারিজম’ এবং মার্কিন ‘রেগানোমিক্স’কে এই তৎপরতার দার্শনিক ভিত্তি বলে মনে করা হয়। এই প্রয়াসের অংশ হিসেবেই ১৯৭৯ সালে উইলিয়ামসন কথিত ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ প্রণীত হয়েছিল মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (অর্থ মন্ত্রণালয়), আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের মধ্যে। এই ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমেই এগিয়ে চলেছে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংককে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ সারা বিশ্বের দেশে দেশে প্রচলনের মূল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সাম্রাজ্যবাদী খেলা।
১৯৭৯ সালেই বাংলাদেশ এই আগ্রাসনের জালে আটকা পড়েছিল। ওই সময় বাংলাদেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টসে প্রতিবছর মারাত্মক ঘাটতি হতো। এ দেশের রপ্তানি–আয় দিয়ে আমদানি ব্যয়ের ৩০-৩২ শতাংশের বেশি মেটানো যেত না, যার ফলে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের ওপর অর্থনীতির নির্ভরশীলতা ছিল মারাত্মক। একপর্যায়ে জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল ওই খয়রাত-নির্ভরতা। তাই বাধ্য হয়ে জিয়াউর রহমানের সরকারকে আইএমএফের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল এক্সটেন্ডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি বা ইএফএফ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার ঋণের জন্য। ১৯৮০ সালে ওই ঋণ অনুমোদন করা হলেও ঋণের সঙ্গে বিরাট একটা শর্তের তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশকে। ওই শর্তগুলো এতই কঠোর ছিল যে জিয়াউর রহমানের সরকার ওগুলো পূরণে ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করে। ফলে, শর্ত পূরণের অপারগতার অজুহাতে ঋণের প্রথম কিস্তির ২০ মিলিয়ন ডলার ছাড় করার পর আইএমএফ রুষ্ট হয়ে বাকি ৭৮০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ বাতিল করে দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের আমলে ওই শর্তগুলোর অনেকটাই পূরণ করা হয়েছিল। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এই শর্তগুলোকে ‘কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি’ বা ‘স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ হিসেবে অভিহিত করে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক তাদের ঋণ পাওয়ার প্রায় অভিন্ন শর্তাবলিতে রূপান্তর করেছে। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলো তিন দশক ধরে এই দুটো সংস্থা থেকে যত ঋণ নিয়েছে, তার সব কটিতেই ঘুরেফিরে এই শর্তগুলো জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি অন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোও তাদের এই জবরদস্তি থেকে রেহাই পায়নি। প্রাইভেটাইজেশন, ডিরেগুলেশন, লিবারালাইজেশন এবং গ্লোবালাইজেশন—এই চারটি ডাইমেনশনে অর্থনীতির ওপর ব্যক্তি খাতের নিয়ন্ত্রণকে যথাসম্ভব নিরঙ্কুশ করা এবং রাষ্ট্রের ভূমিকাকে ক্রমান্বয়ে সংকুচিত করার এই মতাদর্শিক জবরদস্তি তৃতীয় বিশ্বের সচেতন জনগণের মধ্যে ক্রমেই প্রতিরোধ স্পৃহা জাগ্রত করছে। থাইল্যান্ডের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা যেদিন তাঁর দেশ আইএমএফের ঋণমুক্ত হয়েছিল, ওই দিনটিকে ‘জাতীয় শোকরানা দিবস’ হিসেবে পালনের জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন, পালনও করা হয়েছিল। অথচ আমাদের দেশের অর্থমন্ত্রীরা তিন দশক ধরে প্রয়োজন না থাকলেও আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের তাবৎ​ অপমানজনক শর্তাধীন ঋণ পাওয়াকে তাঁদের বাহাদুরি হিসেবে জাহির করে চলেছেন।
এখন তো জিডিপির এক শতাংশের কাছাকাছি পর্যায়ে নেমে গেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ-নির্ভরতা, এখনো তারা এই অভ্যাস ছাড়তে পারছে না কেন বুঝি না! বর্তমানে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও আইএমএফ থেকে যে ঋণ গ্রহণ করেছে সরকার, তার শর্তের কারণে খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রমে এখন হস্তক্ষেপ করছে আইএমএফ। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংককে ফেরত আনতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী দেশের অপূরণীয় ক্ষতি ও সম্মানহানি ঘটিয়েছেন।
বিশ্বব্যাংকের নিষ্ঠুর দাদাগিরির প্রত্যক্ষ শিকার হয়েছিল বাংলাদেশ পদ্মা সেতুর ওই নাটকে। ঋণ বাতিলের মাধ্যমে যেভাবে বর্তমান সরকারকে মারাত্মক রাজনৈতিক সংকটে নিক্ষিপ্ত করা হয়েছিল, তা থেকে ক্ষমতাসীন জোট আজও পরিত্রাণ পেয়েছে বলে মনে করি না। যথাসম্ভব শিগগির ব্রিকস ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার হিসেবে বাংলাদেশের যোগদান এহেন ব্ল্যাকমেলিং থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য আমাদের সক্ষমতা বাড়াবে।

মইনুল ইসলাম: প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

স্বাধীনতা হরণ করবেন মন্ত্রী! by সোহরাব হাসান

সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী এবার সরাসরি গণমাধ্যম তথা সাংবাদিকদের হুমকি দিয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। গত বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সভায় নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনার যা খুশি তাই দেখাবেন, বারবার দেখিয়ে একটা সেন্টিমেন্ট তৈরি করবেন, মানুষকে উত্তেজিত করছেন। আপনাদের জন্য এমন আইন করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে আপনাদের স্বাধীনতাই থাকবে না।’ (প্রথম আলো, ২৩ জুলাই, ২০১৪)

এর মাধ্যমে মন্ত্রী জানিয়ে দিলেন যে বর্তমান সরকারের আমলে সাংবাদিকেরা যতটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছেন, সেটি থাকা উচিত নয়। সাংবাদিক বা গণমাধ্যমের কোনো স্বাধীনতা থাকতে পারে না। স্বাধীনতা থাকবে কেবল মন্ত্রী-সাংসদ ও তাঁদের ​সাঙ্গপাঙ্গদের। এর বাইরে এ দেশে সবাইকে পরাধীন হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।
সৈয়দ মহসিন আলী ব্যক্তিমাত্র নন। তিনি সরকারের একজন পূর্ণ মন্ত্রী ও সাংসদ। তাই তাঁর এই বচনকে অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই। কেন তিনি কঠোর আইন করবেন, তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জসহ সারা​ দেশে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা যে হত্যা, লুটপাট, চাঁদাবাজি, দখলবাজির ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তা লেখা যাবে না, বারবার দেখানো যাবে না। মামাবাড়ির আবদার! আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেরা খুনোখুনি, লাঠালাঠি করবেন। নিজেরা না পারলে ভাড়াটে দিয়ে খুন করিয়ে লাশ নদীতে ভাসিয়ে কিংবা গাড়িতেই পুড়িয়ে দেবেন। মন্ত্রী-নেতারা তা চেয়ে চেয়ে দেখবেন, কিন্তু সাংবাদিকেরা প্রচার করতে পারবেন না। দেখালেই আইন করে বন্ধ করে দেবেন। কেন বন্ধ করবেন? নিহত ব্যক্তিদের শোকাহত স্বজনদের ছবি বারবার দেখলে সম্ভবত মন্ত্রীপ্রবরের সুখ ও আনন্দ মাটি হয়ে যায়। ঘুম নষ্ট হয়।
সম্ভবত এ জন্যই তিনি সাংবাদিকেরা যাতে স্বাধীনভাবে ছবি তুলতে না পারেন, খবর প্রকাশ করতে না পারেন—সে ধরনের আইন করার কথা ব​েলছেন। গণতান্ত্রিক সরকারের গণতান্ত্রিক মন্ত্রী বটে!
কেবল সৈয়দ মহসিন আলী নন, ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের বদৌলতে নির্বাচিত হওয়া সাংসদ ও মন্ত্রীদের অনেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। আবোলতাবোল বলছেন। সমাজকল্যাণমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের কোনো কাজে কৃতিত্ব দেখাতে না পারলেও সৈয়দ মহসিন আলী এর আগে প্রকাশ্য সভায় মঞ্চে বসে সিগারেটে সুখটান দিয়ে পত্রিকায় খবর হয়েছিলেন।
সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হরণসংক্রান্ত মন্ত্রীর এই বক্তব্যকে অসার প্রলাপ বলে অগ্রাহ্য করা যেত, যদি না গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের নানা আনজাম সরকারের ভেতর থেকেই শুরু না হতো। গতকাল বুধবার প্রথম আলোয় দুটি খবরই পাশাপাশি প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কলামের খবরটির শিরোনাম ছিল: স্বাধীনতাই থাকবে না। দ্বিতীয়টি: সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ, তথ্য মন্ত্রণালয়ই আইন সংশোধনের উদ্যোক্তা
এ মাসের গোড়ার দিকে জেলা প্রশাসক সম্মেলন সামনে রেখে ঢাকার জেলা প্রশাসক ১৯৭৩ সালের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইনের সংবাদপত্র বন্ধ করার ধারাটি পুনরুজ্জীবিত করার প্রস্তাব করেন। তাঁর এই বদমতলবের কথা প্রথম আলো ফাঁস করে দিলে সাংবাদিক সমাজের পক্ষ থেকে ব্যাপক সমালোচনা হয়। সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই অংশ, সম্পাদক পরিষদ এর প্রতিবাদ জানায়। এমন​কি তথ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদের স্থায়ী কমিটিও সংশোধনীটি সুপারিশ না করার জন্য মন্ত্রণালয়কে বলে। শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসক সম্মেলনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় সবাই ধারণা করেছিলেন, সরকারের সুমতি হয়েছে। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুও আমাদের আশ্বস্ত করে​ছিলেন যে সরকার ১৯৭৩ সালের প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইন সংশোধনের কথা ভাবছে না। তিনি বা তাঁর মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নয়।
কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো মন্ত্রীর জ্ঞাতে হোক, অজ্ঞাতে ​হোক তাঁর মন্ত্রণালয়ই প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। গতকাল প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ৫ জানুয়ারির অস্বাভাবিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর ‘বর্তমান সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে এই উদ্যোগ নেয়। সংশোধিত আইনটি চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকরের প্রস্তাব করা আছে। দ্য প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ২০১৪ শিরোনামে এই সংশোধিত আইনের খসড়ায় রাষ্ট্রবিরোধী ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে সংবাদপত্র বন্ধ করার বিধান রাখা হয়।’
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ‘তথ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে গোপনে অনেক দূর এগিয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে প্রথমে আট সদস্যের কমিটি করা হয়। কমিটি আইনের খসড়া তৈরির জন্য মন্ত্রণালয়ের অধীন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরকে (ডিএফপি) দায়িত্ব দেয়। এই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের দুজন যুগ্ম সচিব, প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, ডিএফপির মহাপরিচালক, ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (জেলা প্রশাসক), আইন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) একজন করে প্রতিনিধি।’
কমিটির প্রথম সভা হয় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। সভায় ‘দ্য প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট, ১৯৭৩’ যুগোপযোগী করার সিদ্ধান্ত হয়। ১৮ মার্চ ডিএফপি থেকে সংশোধনীসহ আইনের খসড়াটি তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠান ডিএফপির সাবেক মহাপরিচালক।
২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত কমিটির দ্বিতীয় সভায় খসড়ার ওপর আলোচনা হয়। খসড়ায় বলা হয়, রাষ্ট্র ও ধর্মবিরোধী যেকোনো অভিযোগে পত্রিকার প্রকাশনা বাতিল করতে পারবেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তবে এটা কার্যকর করবে তথ্য মন্ত্রণালয় বা আদালত। সে ক্ষেত্রে অভিযুক্ত সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবে। আদেশ দেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ভুক্তভোগী প্রেস আপিল বোর্ডে আপিল করতে পারবে।
এ ব্যাপারে তথ্যমন্ত্রীর সাফাই হলো: কর্মকর্তাদের দিয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশে কিছু আসে যায় না। রাজনৈতিক পর্যায়ে সংবাদপত্রের প্রকাশনা নিষিদ্ধবিষয়ক আইন প্রণয়নের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। রাজনৈতিক পর্যায়ে ​চিন্তাভাবনা না থাকলে তাঁর অধীন কর্মকর্তারা এই দুঃসাহস কোথায় পেলেন? তাঁরাই কি সরকারের ভেতরে আরেকটি সরকার, না তথ্য মন্ত্রণালয়ে অনেক কিছু হচ্ছে, যার খবর খোদ মন্ত্রীই জানেন না?
প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনসের আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাবলে অতীতের সরকারগুলো বিরুদ্ধমতের সংবাদপত্র বন্ধ করে দিত। যিনি আজ তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়েজিত, সেই হাসানুল হক ইনুর দল জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ ১৯৭৪ সালে কীভাবে বন্ধ হয়েছিল, সেটি নিশ্চয়ই তাঁর অজানা নয়।
এই আইনটি প্রথম আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রণীত বলে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। কিন্তু তারাও ক্ষমতায় এসে বাতিল করেনি; বরং রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এই আইন বলেই স্বৈরাচারী এরশাদ আশির দশকে বাংলার বাণী, সাপ্তাহিক একতা, সাপ্তাহিক রোববার, সাপ্তাহিক যায়যায়দিনসহ বহু পত্রিকা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
এসব কারণেই স্বৈরাচারের পতনের পর সাহাবুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকা​র প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস আইনের সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিলসংক্রান্ত ধারাটি বাতিল করে দেয়। এটি ছিল দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ​বিজয়। এখন গণতান্ত্রিক সরকারই ফের সেই বিজয়কে এখন ছিনিয়ে নিতে চাইছে।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, সংশোধিত আইনের ২২ ধারায় ‘প্রমাণীকরণ বাতিল’ শীর্ষক ১(চ) উপধারায় বলা হয়েছে, সংবাদপত্রে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত বা রাষ্ট্রদ্রোহ কোনো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে মর্মে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হলে তিনি ঘোষণাপত্রের নিবন্ধন বাতিল করতে পারবেন। সদ্য শেষ হওয়া জেলা প্রশাসক সম্মেলনের কার্যপত্রেও এই দুটি বিষয় উল্লেখ ছিল। তবে জেলা প্রশাসক সম্মেলনের কার্যপত্রে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ ও ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ শব্দগুচ্ছ উল্লেখ থাকলেও মন্ত্রণালয়ের খসড়া আইনে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ এবং ‘ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত’ কথাগুলো উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রস্তাবের সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ের করা খসড়া সংশোধনীর মিল রয়েছে। আইনের ১(ঙ) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, ডিএফপি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সংবাদপত্রের প্রকাশক বা সম্পাদকের শর্ত অনুযায়ী শিক্ষাগত বা সাংবাদিকতার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতায় ঘাটতি থাকলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পত্রিকার প্রমাণীকরণ বাতিল করতে পারবেন।
এসব মন্ত্রী, মন্ত্রণালয় বা ডি​িস সাহেবদের কর্মকাণ্ডে এটা পরিষ্কার যে সরকার আগের কালো আইনটিই ফিরিয়ে আনতে চাইছে কিছুটা ঘোরপ্যাঁচ করে। আগের আইনে জেলা প্রশাসক চাইলেই যেকোনো সংবাদপত্রের প্রকাশনা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিতে পারতেন। অর্থাৎ​ সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই তাকে হত্যা করতে হবে। সাংবাদিক সমাজের আপত্তির মূল কারণও ছিল এটি। কোনো সংবাদপত্র অসত্য বা উসকানিমূলক সংবাদ পরিবেশন করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান দেশের প্রচলিত আইনেই আছে। কিন্তু এই ব্যবস্থা নেওয়ার অর্থ এই নয় যে পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ​ প্রকাশনা বন্ধ করা। পৃথিবীর অনেক গণতান্ত্রিক দেশেই পত্রিকা প্রকাশের জন্য আলাদা ছাড়পত্র নিতে হ​য় না। কেবল সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করলেই হয়।
প্রস্তাবিত সং​েশাধনীতে প্রেস আপিল বোর্ডে আপিল করা বা আত্মপক্ষ সমর্থনের যে সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে, তার ফল কী হবে তাও বুঝতে কারও অসুবিধা হয় না। এটি হবে নিছক লোক দেখানো বা আইওয়াশ।
সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিলসংক্রান্ত ধারাগুলো বাতিল হয়েছে ২৩ বছর আগে। ইতিমধ্যে বিএনপি দুবার, আওয়ামী লীগ দুবার পাঁচ বছর করে ক্ষমতায় ছিল। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল দুই বছর। এই দীর্ঘ সময়ে দেশ পরিচালনায় কোনো সরকারেরই সেই বাতিল হওয়া কালো আইনটির প্রয়োজন হয়নি। এখন কেন হলো?

সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

র‌্যাবকে পুলিশ থেকে আলাদা করার প্রস্তাব by রোজিনা ইসলাম

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব) পুলিশ থেকে আলাদা করে সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি এই বাহিনীকে সংস্কারেরও প্রস্তাব তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। র‌্যাব এখন পুলিশের একটি বিশেষ ব্যাটালিয়ন।
সংস্কারের প্রস্তাবে এই বাহিনীর সদস্যদের পদায়ন, শৃঙ্খলা, কোটা ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ছাড়পত্রের বিষয়ে বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, একটি কম্পোজিট (সমন্বিত) বাহিনী হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে পুলিশ বাহিনীর একটি ইউনিট হিসেবে র‌্যাবের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে র‌্যাবের অপারেশনে পুলিশ বাহিনীর কোনো কার্যকর ভূমিকা নেই। প্রস্তাবে বলা হয়, একটি সমন্বিত বাহিনীকে অন্য একটি বাহিনীর অধীনে রাখা ঠিক নয়।
পুলিশের অধীন বিশেষ ব্যাটালিয়ন হলেও র‌্যাব ও পুলিশের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব গত কয়েক বছরে প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে। নিজেদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে। গত বছরের জুলাই মাসে র‌্যাবে কর্মরত সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ১৬টি অপ্রীতিকর ঘটনার বিবরণ দিয়ে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়। এতে বলা হয়, কর্মস্থলে দুই বাহিনীর সদস্যরা পরস্পরকে সহ্য করতে পারছেন না। একে অপরের কাজে বাধা দিচ্ছেন। এসব নিয়ে মামলা ও সাধারণ ডায়েরি করার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় এ বাহিনী নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিএনপির শাসনামলে এ বাহিনী গঠিত হলেও দলটির প্রধান খালেদা জিয়া সম্প্রতি এ বাহিনী বিলুপ্তির দাবি জানান। ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি তুলেছে। দেশীয় নানা সংগঠনও এ বাহিনীর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছে।
এ অবস্থায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় র‌্যাবকে সংস্কারের এ প্রস্তাব তৈরি করেছে। প্রস্তাবটি ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিবের অনুমোদনের পর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এর অনুমোদন চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার‌্যালয়ে পাঠানো হবে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রস্তাবটি আমরা পর‌্যালোচনা করছি। তবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী।’
সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সন্ত্রাস দমন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য একটি দক্ষ, আধুনিক ও কার্যকর বাহিনী হিসেবে পুলিশের অতিরিক্ত এলিট ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে র‌্যাব গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে গত এক দশকের বেশি সময়ে দায়িত্ব পালনকালে র‌্যাবের গঠন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অন্যান্য কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা গেছে। এ অবস্থায় র‌্যাবের সংস্কার করা জরুরি হওয়ায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা অনেক দিন থেকেই র‌্যাব সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছি। অনেক বিষয়ই সংস্কার প্রস্তাবে উঠে এসেছে। তবে আমরা মনে করি, কোনো বাহিনী থেকে না এনে নতুনভাবে রর‌্যাব কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে বাহিনীর উপযোগী করে প্রশিক্ষিত করা উচিত। সশস্ত্র বাহিনী থেকে র‌্যাবে কোনো কর্মকর্তাকে আনা উচিত নয়। তবে এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে পরিপূর্ণ একটি সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো উচিত।’
পদায়ন: সংস্কার প্রস্তাবের পর‌্যালোচনায় বলা হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ থেকে আসা র‌্যাবের সদস্যরা সরাসরি র‌্যাবে যোগ দেন। কিন্তু এ বাহিনীতে আসা পুলিশ সুপার এবং এর ওপরের পদমর‌্যাদার কর্মকর্তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পদ স্থাপন করে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও নিম্ন পদমর‌্যাদার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুলিশ অধিদপ্তর সরাসরি র‌্যাবে পদায়ন করে।
সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়, সরকারের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি বিভাগে কর্মরত সদস্যরা প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয়ে যোগদান করে পরবর্তী সময়ে প্রেষণে নির্ধারিত কর্মস্থলে যাবেন। কিন্তু র‌্যাবে পদায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডারের সদস্যরা ছাড়া অন্যদের পদায়নে প্রেষণ নীতিমালা অনুসরণ করা হয় না।
প্রস্তাবে বলা হয়, র‌্যাবে প্রেষণে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেষণ নীতিমালা অনুযায়ী সব বাহিনী থেকে আসা সদস্যরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পদায়নের জন্য ন্যস্ত হবেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিধিবিধান অনুযায়ী তাঁদের র‌্যাবে বিন্যস্ত করবে।
শৃঙ্খলা: সংস্কার প্রস্তাবের পর‌্যালোচনা অংশে বলা হয়েছে, র‌্যাবে কর্মরত সব সদস্যের শৃঙ্খলা নিজ নিজ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ফলে এ বাহিনীতে কর্মরত সামরিক সদস্যসহ অন্য বাহিনীর সদস্যরা একই ধরনের অনিয়ম বা অপরাধ করলে তাঁদের নিজ নিজ মাতৃবাহিনীর বিধিবিধান অনুযায়ী শৃঙ্খলামূলক শাস্তি দেওয়া হয়। একই বাহিনীতে কর্মরত থেকে একই ধরনের অনিয়ম বা অপরাধ করলেও শাস্তি হয় ভিন্ন ভিন্ন। ফলে সদস্যদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়, সামরিক ও অন্য যে বাহিনী থেকেই আসুক না কেন, র‌্যাবে কর্মরত অবস্থায় অনিয়ম বা অপরাধ করলে সবার জন্য একই ধরনের শৃঙ্খলামূলক বিধিবিধান অনুসরণ করা উচিত। এ ক্ষেত্রে র‌্যাবের জন্য একটি বিশেষ বিধি (শৃঙ্খলা ও আপিল) প্রণয়ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ: র‌্যাবের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি আছে উল্লেখ করে সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়, র‌্যাবে কাজ করার সময় দেখা যায়, সামরিক বাহিনী থেকে আসা সদস্যরা বেসামরিক আইন, বিধিবিধান, প্রথা ইত্যাদি সম্পর্কে পর‌্যাপ্ত প্রশিক্ষিত নন। আবার পুলিশ-বিজিবি-আনসার থেকে আসা সদস্যরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি বিশেষায়িত সমন্বিত বাহিনীতে কাজ করার মতো প্রশিক্ষণ ও মানসিকতার সামর্থ্য থাকে না।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, র‌্যাবে নিয়োগ পাওয়ার পর এর আইন ও বিধিবিধানের ওপর প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁদের পদায়ন করা উচিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে।
কোটা ব্যবস্থাপনা: সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, আনসার ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে র‌্যাব একটি সমন্বিত বাহিনী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্বাহী আদেশে গঠিত এ বাহিনীতে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ৪৪ শতাংশ, পুলিশ ৪৪ শতাংশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ ০৬ শতাংশ, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ৪ শতাংশ, কোস্টগার্ড ১ শতাংশ ও বেসামরিক প্রশাসন ১ শতাংশ হারে কোটা বিভাজন করা আছে। র‌্যাবের নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ পুলিশ অধিদপ্তর।
সংস্কার প্রস্তাবে বলা হয়, এ ক্ষেত্রে বেসামরিক প্রশাসনের অনুপাত বাড়ানো হলে র‌্যাবের দায়িত্ব পালন ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। র‌্যাবের অর্থ, জমি, গণমাধ্যম, ক্রয়, আইনি ব্যবস্থাপনাসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ করার সুপারিশ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা ছাড়পত্র: প্রস্তাবে বলা হয়, র‌্যাবে পদায়নের ক্ষেত্রে সব বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা ছাড়পত্র নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং বেসামরিক বাহিনীর সদস্যদের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা অধিদপ্তর (এনএসআই) ও পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেট: র‌্যাবের ব্যবহৃত অস্ত্র, যানবাহন, সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী অনেক ক্ষেত্রে ভিন্নতর। এ বিবেচনায় র‌্যাবের বাজেট পৃথক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে র‌্যাবের সদর দপ্তর ছাড়া ১৪টি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। এ বাহিনীর জনবল ১১ হাজার ১০৩।
এ সংস্কার উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইস্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অবশ্যই বিষয়টি ইতিবাচক, সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি ভালো দিক যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশেষে এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, সশস্ত্র বাহিনী থেকে র‌্যাবে সদস্য আনা বাদ দেওয়া উচিত। বিশেষ করে মৌলিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা থাকা ঠিক নয়। এ ছাড়া সংস্কারে মানবাধিকারের বিষয়ে স্পষ্ট সুপারিশ রাখা উচিত।’ প্রস্তাবটি অনুমোদন হওয়ার আগে মানবাধিকার সংস্থা, অংশীদারসহ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ মূল্যায়ন করা উচিত বলেও মত দেন তিনি।

গাজা আগ্রাসন -এ যুদ্ধে কে জিতবে? by ইউরি আভনেরি

উইনস্টন চার্চিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পাঁচ বছর লন্ডনের অধিবাসীদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। লন্ডন শহরের মানুষদের রকেট ও বোমাবর্ষণের মুখে ঠেলে দিয়ে তিনি নিজে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের নিচে সুরক্ষিত বাঙ্কারে গিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। জার্মানির নেতারা শান্তির প্রস্তাব দিলেও তিনি উদ্ভট আদর্শিক কারণে তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
সময় সময় তিনি এই গোপন ডেরা থেকে বেরিয়ে এসে ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেন, তারপর আবার সেই ইঁদুরের গর্তে ঢুকতেন। আর লন্ডনের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলতেন, ‘ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বলবে, এটাই আপনাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়’। ফলে বোমাবর্ষণ ছাড়া জার্মান বিমানবাহিনীর হাতে আর কোনো উপায় ছিল না। যদিও এই বাহিনীর কর্তারা বলেছেন, তাঁরা শুধু সামরিক স্থাপনায় আঘাত করেছেন।

জার্মান বিমানবাহিনী লন্ডন শহরের অধিবাসীদের শহর ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল, ফলে অনেক শিশুকেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ লন্ডনবাসী চার্চিলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে শহরে থেকে যায়। পরিণামে তারা এই যুদ্ধের ‘পরোক্ষ ক্ষতি’র শিকার হয়।
ওদিকে জার্মান বাহিনী ধারণা করেছিল, লন্ডনবাসীর ঘরবাড়ি ধ্বংস ও তাদের পরিজনদের হত্যা করলে তারা চার্চিল ও তাঁর যুদ্ধংদেহী সমরনায়কদের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠবে। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। উল্টো চার্চিলের গ্রহণযোগ্যতা দিনের পর দিন বাড়তে থাকে, আর যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে চার্চিল রীতিমতো ঈশ্বরে পরিণত হন।
চার বছর পর চাকা একদম উল্টো দিকে ঘুরে যায়। ব্রিটিশ ও মার্কিন বিমানবাহিনী জার্মান শহরগুলোয় বোমা মেরে সেগুলো একদম গুঁড়িয়ে দেয়। সেখানে একটা পাথরখণ্ডও আর আস্ত ছিল না, গৌরবময় প্রাসাদগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ‘নিরপরাধ বেসামরিক’ মানুষজন তুলোর মতো উড়ে যায়, তাদের পুড়িয়ে মারা হয় বা তারা নিছক হারিয়ে যায়। ইউরোপের অন্যতম সুন্দর শহর ড্রেসডেন কয়েক ঘণ্টার অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে কয়লা হয়ে যায়।
কাগজে-কলমে এর উদ্দেশ্য ছিল জার্মান যুদ্ধশিল্প গুঁড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু সেই অভীষ্ট অর্জিত হয়নি। আসল লক্ষ্য ছিল, বেসামরিক মানুষকে আতঙ্কিত করা, যাতে তারা তাদের নেতাদের সরিয়ে দেয় বা আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। সেটা হয়নি। হিটলারের বিরুদ্ধে গুরুতর বিদ্রোহ করেছেন কয়েকজন ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা, সেটাও সফল হয়নি। আমজনতা সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামেনি। উল্টো গোয়েবলস বলে বসেন, ‘তারা আমাদের ঘর ভাঙতে পারে, কিন্তু আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে ভাঙতে পারবে না।
শেষমেশ জার্মানি আত্মসমর্পণ করে যুদ্ধের একদম অন্তিম সময়ে। মিলিয়ন মিলিয়ন টন বোমা মেরেও কোনো কাজ হয়নি। তারা শুধু জনগণের নৈতিক শক্তি চাগিয়ে দিয়েছে আর নেতার (ফুহরার) প্রতি আনুগত্য অটুট রাখার চেষ্টা করেছে।
গাজার ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। সবাই জিজ্ঞাসা করছে, এই দফায় কে জিতল? ইহুদিদের আদলে প্রশ্নটির উত্তর আরেকটি প্রশ্ন দিয়ে দেওয়া যায়: কীভাবে তা নিরূপণ করা যায়? জয়লাভের ধ্রুপদি সংজ্ঞা হচ্ছে, যুদ্ধের ময়দানে যাঁরা শেষ পর্যন্ত থাকেন, তাঁরাই জয়ী। কিন্তু এখানে কেউই সরেনি। এখন পর্যন্ত হামাস ও ইসরায়েল উভয়েই আছে।

প্রুশিয়ার প্রখ্যাত যুদ্ধতত্ত্ববিদ কার্ল ভন ক্লজউইটজের একটি বিখ্যাত কথা হচ্ছে এ রকম, যুদ্ধ আসলে ঘুরপথে নীতিরই সম্প্রসারণ মাত্র। কিন্তু এই যুদ্ধে কোনো পক্ষেরই পরিষ্কার রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই। সে কারণে জয়-পরাজয় এভাবে নিরূপণ করা যাবে না। গাজায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেও হামাসকে আত্মসমর্পণে রাজি করানো যায়নি। অন্যদিকে, হামাসের রকেট হামলাও সফল হয়নি। তারা রকেট মারলে ইসরায়েল সেগুলো আকাশেই নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে। ফলে এখন পর্যন্ত উভয় পক্ষই জয় থেকে দূরে আছে।
এ ডামাডোলের মধ্যে অনেকে ভুলে যেতে পারেন, হামাস আসলে ইসরায়েলেরই সৃষ্টি। ফাতাহ ছিল ইসরায়েলের ঘোর শত্রু, একে বিশ্বসন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষ আরাফাতকে ইসলামপন্থীরা ঘৃণা করত। কিন্তু ইসরায়েলের কাছে এই ইসলামপন্থীরাই কম ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত হলো, যাদের আবার গোপন মিত্রও বানানো যায়। শিন বেটের প্রধানকে আমি একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁরা হামাসকে সৃষ্টি করেছেন কি না। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, না। তবে হামাস তাঁদের কাছে সহনীয়।
কিন্তু প্রথম ইনতিফাদার পর হামাসের প্রধান শেখ আহমেদ ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করা হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। আর ফাতাহ হয়ে যায় ইসরায়েলের মিত্র, হামাস হয় সন্ত্রাসী। কিন্তু ব্যাপারটা কি এ রকম? কয়েকজন ইসরায়েলি কর্মকর্তার মতে, হামাস বলে কিছু নেই, এটাকে উদ্ভাবন করতে হয়। গাজা উপত্যকা হামাসের নিয়ন্ত্রণে। সেখানে কিছু হলে হামাসকে দায়ী করা যায়। তারাই সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে। ফলে যুদ্ধবিরতির ক্ষেত্রেও তারা নির্ভরযোগ্য অংশীদার।
ফিলিস্তিনের গত নির্বাচনে হামাস বিজয়ী হলেও তাদের ক্ষমতায় যেতে দেওয়া হয়নি। ফলে তারা জোর করে গাজা উপত্যকা দখল করে নেয়। সব নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, সেখানকার অধিকাংশ মানুষই হামাসের প্রতি অনুগত।
ইসরায়েলের সব বিশেষজ্ঞের মতে, গাজা যদি হামাসের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে সেখানে অধিকতর চরমপন্থী দলের উদ্ভব হতে পারে। সেটা হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ফলে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্যকে মহীয়ান করে বলা যায়, এটা হামাসকে ধ্বংস করার জন্য নয়, বরং একে আরও দুর্বল অবস্থায় ক্ষমতায় রাখার জন্যই এ যুদ্ধ। কিন্তু সেটা কীভাবে করা সম্ভব? ইসরায়েল সরকারের অতি ডানপন্থীদের মতে, পুরো গাজার দখল নেওয়ার মধ্য দিয়েই এটা করা সম্ভব। কিন্তু তারপর?

পুরো গাজার দখল নেওয়াটা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কাছে দুঃস্বপ্নের মতো। সেটা হলে ১৮ লাখ মানুষের দেখভাল ও ভরণপোষণেরও দায়িত্ব নিতে হবে (এদের অধিকাংশই ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল থেকে পালিয়ে যাওয়া উদ্বাস্তু ও তাদের বংশধর)। একটি চিরস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধ শুরু হবে, ইসরায়েলের কেউই তা চায় না।
দখল করে চলে এলে কেমন হয়? কথাটা সহজে বলা গেলেও এরূপ অভিযানে ব্যাপক রক্তক্ষয় হবে। হাজার খানেক ফিলিস্তিনি মারা যাবে। ‘মোল্টেন মতবাদ’ (অলিখিত) অনুযায়ী একজন ইসরায়েলি সেনার জীবন বাঁচাতে দরকার হলে ১০০ জন ফিলিস্তিনি হত্যা করা জায়েজ। কিন্তু যদি ডজন খানেক ইসরায়েলি সেনারও মৃত্যু হয়, তাহলেও সে দেশটির অবস্থা বদলে যাবে। সেনাবাহিনী সে ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
গত বৃহস্পতিবার মনে হচ্ছিল, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। এতে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অনেকটাই আশ্বস্ত হয়েছিলেন। কিন্তু এটা একরকম বিভ্রমই ছিল। এই যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারী হচ্ছেন মিসরের নতুন স্বৈরশাসক। তিনি ইসরায়েলের একজন প্রকাশ্য মিত্র, যুক্তরাষ্ট্রের ধামাধরা। সারা দুনিয়ার ইসলামপন্থীরা তাঁকে ঘৃণা করেন। তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের হাজার খানেক কর্মীকে মেরে ফেলেছেন ও জেলে পুরেছেন। হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শিক মিল থাকায় তিনি হামাসকে প্রচণ্ড ঘৃণা করেন।

আমার মত হচ্ছে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন নিজেরা বসে আলোচনা করে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করুক। দুনিয়াতে সমর কমান্ডাররাই এক পক্ষ অন্য পক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠায়, তারপর আলোচনার মাধ্যমে কিছু একটা হয়। অথচ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল–সিসি নির্বোধের মতো ইসরায়েলের কথায় একতরফা যুদ্ধবিরতি ডেকে বসলেন আর হামাস এককথায় তা প্রত্যাখ্যান করে।
এর শেষ কোথায়? রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এ পরিস্থিতি চলতেই থাকবে। রকেট ও বোমা বন্ধ করুন, গাজার মানুষদের স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে দেওয়া হোক, প্রকৃত ঐকমত্যের সরকারের অধীনে ফিলিস্তিনিদের ঐক্য, শান্তি আলোচনা শুরু করা হোক, শান্তি বর্ষিত হোক।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন।
ইউরি আভনেরি: ইসরায়েলি লেখক।

যোগাযোগমন্ত্রীর এলাকার রাস্তায় চলা দায় -কোম্পানীগঞ্জের অর্ধেক সড়কই খারাপ

‘সড়ক নয়, যেন মরণফাঁদ। কার্পেটিং উঠে গিয়ে ভাঙাচোরা, ছোট-বড় গর্তের এই সড়কে হাঁটাও দায়। আট-নয় বছর ধরে এ হাল। এ সময় সরকারের পরিবর্তন হলেও এ সড়কের উন্নয়ন হলো না।’ নিজ বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া চরকাঁকড়া-বামনী বাইপাস সড়ক দেখিয়ে এমন আক্ষেপ করলেন আবুল কালাম।

আবুল কালাম নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরকাঁকড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। সড়ক নিয়ে এমন আক্ষেপ এই উপজেলার অনেক বাসিন্দার। সরকারি হিসাবে এই উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) ৫০% সড়কই খারাপ। স্থানীয় লোকজন জানান, এসব সড়কে চলাচল করা কষ্টকর।
কোম্পানীগঞ্জ ও পাশের কবিরহাট উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের নোয়াখালী-৫ আসনের সাংসদ হলেন যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তাঁর বাড়ি কোম্পানীগঞ্জে। কবিরহাটের সড়কগুলোর অবস্থা তুলনামূলক ভালো। এ দুই উপজেলায় যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বেশির ভাগ সড়কের অবস্থাও ভালো। এলজিইডি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন।
গত রোববার দিনভর এ দুই উপজেলায় গিয়ে কোম্পানীগঞ্জের অন্তত ১৫টি সড়কের দুরবস্থা দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে চাপরাশির হাট-নতুন বাজার, সাহজির হাট সড়ক, চাপরাশির হাট-চর এলাহী সড়ক, বাংলাবাজার-মুছাপুর সড়ক, চাপরাশির হাট-বসুরহাট সড়ক, বসুরহাট-চৌধুরীর হাট সড়ক, বাংলাবাজার-রংমালা বাজার সড়ক, চরকালি-বদুমিয়া সড়ক, পেশকার হাট-ভূমিহীন বাজার সড়ক, সিরাজপুর-হাসপাতাল সড়ক ও হানিফ পাটোয়ারী সড়ক। এসব সড়কের বেশির ভাগ অংশেই খানাখন্দ ও ছোট-বড় গর্ত। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কগুলো যেন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কোম্পানীগঞ্জের প্রধান কয়েকটি সড়ক ছাড়া বেশির ভাগ গ্রামীণ সড়কই বেহাল।
বসুরহাট-চাপরাশির হাট সড়কে চলাচলকারী অটোরিকশাচালক কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সড়কটি প্রায় দুই বছর আগে মেরামত করা হয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের কাজ হওয়ায় একতা বাজার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। গর্তের কারণে যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করতে ইচ্ছে হয় না।’
চর ফকিরার বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, তাঁদের বাড়ির সামনের চাপরাশির হাট-চর এলাহী সড়কে সাত-আট বছর ধরে কোনো সংস্কার নেই। ফলে সড়কের বেশির ভাগ অংশেরই কার্পেটিং উঠে গেছে। বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। পুরো সড়কটিই চলাচলের অনুপযোগী।
চর কাঁকড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সমর্থক মো. হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ইউনিয়নের পেশকার হাট-ভূমিহীন বাজার সড়কসহ বেশির ভাগ সড়কের অবস্থাই অত্যন্ত নাজুক। এ নিয়ে প্রায়ই এলাকার লোকজনের কথা শুনতে হয়। বিষয়টি মন্ত্রীকেও অবহিত করেছেন। এখন পর্যন্ত আশ্বাস ছাড়া কিছুই পাননি।
বেহাল সড়ক দেখা গেছে চাপরাশির হাট পূর্ব ও পশ্চিম বাজারজুড়ে। একটু বৃষ্টি হলেই সড়কের গর্তে জমা পানি আর ময়লা-আবর্জনা একাকার হয়ে যায়। ওই সড়কে চলাচলকারীদের পড়তে হয় সীমাহীন ভোগান্তিতে।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খিজির হায়াত খান প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন এলাকায় গেলে লোকজন তাঁদের ধরেন রাস্তাঘাট পাকা করার জন্য। এ নিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁদের সব সময় কথা হয়। কিন্তু বেশির ভাগ রাস্তাই এলজিইডির অধীন হওয়ায় কাজ কিছুটা ধীর গতিতে হচ্ছে।
উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানীগঞ্জে এলজিইডির অধীন ৭৭টি সড়ক রয়েছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ সড়কই খারাপ। উপজেলা প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল বলেন, ‘গ্রামীণ সড়কগুলো মেরামতে তেমন অর্থ বরাদ্দ থাকে না। এর দরুন ওই সড়কগুলো ইচ্ছে থাকলেও মেরামত করা সম্ভব হয় না। প্রতিবছর যে পরিমাণ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোই মেরামতের চেষ্টা করা হয়।’
সওজের অধীন বসুরহাট-বাংলাবাজার সড়কের বিভিন্ন স্থানে কার্পেটিংয়ে ফাটল দেখা গেছে। সওজের নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মো. তারেক ইকবাল প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট উপজেলায় সওজের প্রায় ৭০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এগুলোর সবটাই ভালো।
জানতে চাইলে স্থানীয় সাংসদ ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বুধবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকায় সওজের সব সড়কই ভালো। এলজিইডির যেসব রাস্তা খারাপ সেগুলোর জন্য ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ হয়ে গেছে। বর্ষার পর এগুলোর কাজ শুরু হবে।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন হয়তো কল্পনাও করেন নি by সাজেদুল হক

এক বেসামরিক অভ্যুত্থানে মৃত্যু হয়েছিল বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার। চারটি বাদে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল সব সংবাদপত্র। সে অন্ধকার সময় থেকে আলোতে আসতে নানা কাঠখড় পোহাতে হয়েছে সংবাদ মাধ্যমকে। লড়াই ছিল অত্যন্ত কঠিন। এরশাদ জমানায় সাপ্তাহিক খবরের কাগজে দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য লিখে সরকারি রোষানলে পড়েছিলেন সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী। রূপকাশ্রয়ী ওই লেখা প্রকাশের পর পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়া হয়।  লেখকের বিরুদ্ধে জারি করা হয় হুলিয়া। তখন তিনি উপ-সাগরীয় যুদ্ধ কভারের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন। এরপর আদালত পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি। সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায় দেন। যে রায়ে খবরের কাগজের প্রকাশনা আবার শুরু হয়। সম্পাদক-প্রকাশকের উপর থেকে হুলিয়া প্রত্যাহার করা হয়। সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার পথ খোলে। পরে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন তখন সংবাদ মাধ্যমের ওপর থেকে কালাকানুন তুলে দেন। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সংবাদ মাধ্যম সবসময় অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেছে সে কথা হয়তো সত্য নয়। নানামুখী চাপের মধ্যে থেকেই মিডিয়াকে কাজ করতে হয়েছে। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে যখন-তখন উপদেশ নাজিলের ঘটনা ঘটেছে। টকশো নিয়ে সরকারি মহলের মাথাব্যথা নতুন কিছু নয়। তবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী কোন রাখডাক রাখেননি। ‘সাংবাদিকতার এই নতুন শিক্ষক’ সাংবাদিকদের সাংবাদিকতা শেখানোর পাশাপাশি ঘোষণা দিয়েছেন- এমন আইন করা হবে যে মিডিয়ার কোন স্বাধীনতা থাকবে না। অবশ্য তিনি অভিবাদন পাওয়ারও যোগ্য। গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় বাংলাদেশের স্থান এখন কোথায় তা আরও একবার পরিষ্কার করে দিলেন সৈয়দ মহসিন আলী। যদিও তিনি সরকারি একটি গোপন পরিকল্পনাও হয়তো ফাঁস করে দিয়েছেন। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর এমনিতেই বাংলাদেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। এ যে এক নতুন কিসিমের শাসন ব্যবস্থা তা সবাই মেনে নিয়েছেন। বহু পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতেই এ সময়ের সংবাদ মাধ্যম যেন অর্ধমৃত। টিভি টকশোগুলোতে প্রাণ নেই। যেন সবাই মেপে মেপে কথা বলছেন। অতিথিরাও বহুক্ষেত্রে পূর্বনির্ধারিত। তবে স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমকে গলা টিপে ধরার আয়োজন চলছে পুরোদমেই। দ্য প্রিন্টিং প্রেসেস অ্যান্ড পাবলিকেশনস (ডিক্লারেশন অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন) অ্যাক্ট ২০১৪ শিরোনামে সংশোধিত আইনের খসড়া তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আর রাষ্ট্রবিরোধী কাজের অভিযোগে সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা তুলে দেয়া হচ্ছে জেলা প্রশাসকদের হাতে। পুরো ব্যাপারটিতেও অবশ্য রাজচালাকির আশ্রয় নেয়া হয়েছে। তথ্য মন্ত্রণালয় পুরো বিষয়টির উদ্যোক্তা হলেও তা উত্থাপন করা হয়েছে একজন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে। আর ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী কাজের মতো স্পর্শকাতর দু’টি বিষয় সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। নিজেদের গণতান্ত্রিক দাবি করা একটি সরকারের উজির প্রকাশ্যে কেন সংবাদ মাধ্যমের কণ্ঠরোধের ঘোষণা দিচ্ছেন আর কেনই বা সরকার এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে তা কৌতুহলোদ্দীপক। কারণ, গণতান্ত্রিক দুনিয়ায় গণতন্ত্র আর সংবাদ মাধ্যম একে অন্যের হাত ধরে এগিয়ে গেছে। সংবাদপত্রকে ফোর্থ স্টেটের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান আর সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে। তারপরও কেন এ উদ্যোগ-আতঙ্ক। পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশে এখন সরকারকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোন রাজনৈতিক শক্তি নেই। নীতিনির্ধারকদের ধারণা, একমাত্র স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের কাছ থেকেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে সরকার। যে কারণে সংবাদ মাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার এ আয়োজন। সাংবাদিক আশরাফ কায়সার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন- ‘দুর্বল গণভিত্তির সরকারই মিডিয়া নিয়ে বেশি আতঙ্কে ভোগে। টকশো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ধারাবাহিক সমালোচনা, সংবাদপত্রের প্রকাশনা বাতিলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ আর মিডিয়ায় স্বাধীনতা নিয়ে মন্ত্রীদের উষ্মা সরকারের দুর্বলতা ও অপরিপক্বতার প্রকাশ।’ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসনের বিখ্যাত উক্তি- সকলের সকল নিরাপত্তা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে নিহিত। বাংলাদেশে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা আজ হুমকির মুখে। সকলের স্বাধীনতাও কি হুমকির মুখে নয়? বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমেদ বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনে এক শ্রদ্ধেয় নাম। প্রধান উপদেষ্টা এবং প্রেসিডেন্টের আসনে বসেও তিনি প্রায় সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছেন। যদিও যারা তার দ্বারা স্বার্থ হাসিল করতে পারেনি তাদের কাছে তিনি অপ্রিয়। স্বাধীন সাংবাদিকতা বিরোধী কালাকানুন তুলে দেয়ায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম সবসময়ই তার প্রতি কৃতার্থ। প্রবীণ এ সাবেক প্রেসিডেন্ট হয়তো কোনদিন কল্পনাও করতে পারেননি দুই যুগ পর তার জীবদ্দশাতেই বাংলাদেশ কালো আইনে ফেরার আয়োজনে মগ্ন থাকবে।