Showing posts with label পানি আগ্রাসন. Show all posts
Showing posts with label পানি আগ্রাসন. Show all posts

Tuesday, May 6, 2025

ফারাক্কার ৫০ বছর: বাংলাদেশের নদনদীতে কী প্রভাব? টিকতে পারে কতদিন? by শুভজ্যোতি ঘোষ ও আবুল কালাম আজাদ

ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে অস্বস্তির কারণ হয়ে থেকেছে যে বিষয়টি, সেটি নি:সন্দেহে ফারাক্কা বাঁধ। ভারতে এটির পোশাকি নাম 'ফারাক্কা ব্যারাজ প্রজেক্ট', এবং বহু আলোচনা ও বিতর্ক পেরিয়ে চলতি বছরের এই মে মাসে প্রকল্পটি পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করছে।

বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে ফারাক্কা নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান অভিযোগ ছিল এই ফারাক্কার ফলেই প্রমত্তা পদ্মা শুকিয়ে গেছে। অন্য দিকে ভারত বরাবর যুক্তি দিয়ে এসেছে কলকাতা বন্দরকে রক্ষা করার জন্য ফারাক্কা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না!

ফারাক্কা চালু হওয়ার দু'দশকেরও বেশি সময় পর ১৯৯৬তে ভারত ও বাংলাদেশ যে ঐতিহাসিক গঙ্গা জলচুক্তি স্বাক্ষর করে, তাতে অবশ্য ভাগীরথী ও পদ্মায় গঙ্গার জল ভাগাভাগি নিয়ে একটা ফর্মুলায় দুই দেশ একমত হতে পেরেছিল।

তিরিশ বছর মেয়াদি সেই চুক্তির কার্যকালও প্রায় শেষের পথে, চুক্তির নবায়ন নিয়ে আলোচনাও শুরু হয়েছে। তবে ফারাক্কা নিয়ে বিতর্ক, বিরোধ বা দোষারোপের পালা কিন্তু কখনওই থামেনি।

তবে ফারাক্কার জন্যই পদ্মার দু'কূলে মানুষের জীবন-জীবিকা আজ বিপন্ন বলে যেমন বাংলাদেশের অভিযোগ – তেমনি ভারতেও কিন্তু ফারাক্কার সমালোচনা কম নয়।

যেমন মাত্র কয়েক বছর আগেই ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে দেওয়ারও দাবি তুলেছিল বিহার সরকার, যে রাজ্যটির অভিযোগ প্রতি বছর ফারাক্কার কারণেই তাদের বন্যায় ভুবতে হয়। ফারাক্কার উজানে ও ভাঁটিতে গঙ্গার ভাঙনও ওই এলাকার মানুষের জন্য খুব বড় সমস্যা।

তা ছাড়া অনেক বিশেষজ্ঞই মানেন কলকাতা বন্দরকেও সেভাবে বাঁচাতে পারেনি ফারাক্কা – যে কারণে উপকূলের কাছে তৈরি করতে হয়েছিল আর একটি স্যাটেলাইট বন্দর হলদিয়া।

তাহলে আজ ৫০ বছর পরে এসে ফারাক্কার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভারত ঠিক কী ভাবছে? পাশাপাশি, ফারাক্কা প্রকল্পটাতেই বা তখন ঠিক কী করা হয়েছিল এবং সেগুলো কী ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি করেছে?

ফারাক্কা ব্যারাজ প্রোজেক্ট বা এফবিপি-র সার্ধশর্তবর্ষপূর্তিতে সরেজমিনে ফারাক্কা ও আশেপাশের এলাকায় এবং কলকাতা বন্দরে গিয়ে ঠিক এই বিষয়গুলোতেই নজর দিয়েছে বিবিসি বাংলা – এই প্রতিবেদনে থাকছে তারই সারাংশ।

ফারাক্কা প্রকল্পটা আসলে ঠিক কী?

এক কথায় বলতে গেলে, ফারাক্কা হলো গঙ্গায় বাঁধ দিয়ে ও কৃত্রিম খাল কেটে পদ্মার দিক থেকে জলের প্রবাহ ভাগীরথীর দিকে সরিয়ে আনা – যাতে কলকাতা বন্দরকে বাঁচিয়ে রাখা যায়!

প্রকল্পের বর্তমান প্রধান, টেকনোক্র্যাট আর ডি দেশপান্ডের বলতে কোনো দ্বিধা নেই, "যে লক্ষ্য সামনে রেখে ফারাক্কা তৈরি করা হয়েছিল, আমরা জোর গলায় বলতে পারি সেটা পুরোপুরি সফল হয়েছে। কলকাতা বন্দর যে আজও টিঁকে আছে, তা ফারাক্কার জন্যই!"

আসলে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১৮ কিলোমিটার উজানে নির্মিত এই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্যই ছিল গঙ্গার প্রবাহ থেকে অতিরিক্ত জল ভাগীরথীতে সরিয়ে আনা ও তার মাধ্যমে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানো – যার জন্য কাটা হয়েছিল প্রায় ৪০ কিলোমিটার লম্বা একটি 'লিঙ্ক ক্যানাল' বা কৃত্রিম খাল।

ফারাক্কা ব্যারাজ প্রকল্পর সুন্দর সাজানো গোছানো টাউনশিপে নিজের বাতানুকূল অফিসঘরে বসে আর ডি দেশপান্ডে বিবিসিকে বলছিলেন, পদ্মা নয়, গঙ্গার মূল প্রবাহ আগে ভাগীরথী দিয়েই যেত – ফারাক্কা শুধু সেই 'পুরনো ইতিহাস'কেই কিছুটা ফিরিয়ে এনেছে।

তিনি জানাচ্ছেন, "গঙ্গোত্রী থেকে উৎপন্ন হয়েছে যে পবিত্র গঙ্গা নদী, সাতশো বছর আগেও তার পুরো প্রবাহটা কিন্তু এখনকার ভাগীরথী-হুগলী দিয়েই যেত আর মোহনায় তা সাগরদ্বীপের কাছে গিয়ে মিশত – ওটাই গঙ্গার আসল মোহনা ছিল বলে সেই তীর্থের নাম হয়েছিল গঙ্গাসাগর।"

"তখন পদ্মা ছিল গঙ্গার একটা ছোট শাখানদী। কিন্তু পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে ধীরে ধীরে সেই প্রবাহ পদ্মার দিকে সরতে থাকে।"

"ফলে ব্রিটিশ আমলে যখন দেখা গেল তাদের জাহাজ কলকাতা বন্দরে ন্যূনতম ড্রাফটও পাচ্ছে না, তখন ১৮৫৩ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার আর্থার কটন গঙ্গা থেকে সম্ভাব্য দুটো জায়গায় – রাজমহল বা ফারাক্কায় – খাল কেটে ভাগীরথীতে জল টানার প্রস্তাব দেন।"

ফারাক্কা থেকে খাল কাটলে দৈর্ঘ্য অনেক কম হবে বলে অবশেষে ফারাক্কাকেই এই কাজের জন্য বেছে নেওয়া হয়।

স্বাধীন ভারতে ১৯৬১ সালে অবশেষে সেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, আর ১৯৭৫ সালে এসে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন ফারাক্কা ব্যারাজ।

প্রকল্পের কাজ অবশ্য তারও বছরকয়েক আগেই প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু একাত্তরে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম ফারাক্কার কমিশনিং পিছিয়ে দিয়েছিল বলে অনেকেই মানেন।

ফারাক্কার কাজ যখন শুরু হয়, তখন গঙ্গার ভাঁটিতে ছিল 'শত্রু দেশ' পূর্ব পাকিস্তান – কিন্তু রাতারাতি সেখানে একটি 'বন্ধু দেশ' চলে আসার ফলে ফারাক্কায় একতরফাভাবে গঙ্গা থেকে জল প্রত্যাহার ভারতের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হয়ে উঠেছিল।

যদিও অবশেষে ১৯৭৫-এর গোড়ায় এসে ইন্দিরা গান্ধী শেখ মুজিবের সঙ্গে একটা বোঝাপড়ায় আসতে সক্ষম হন – ঠিক হয় এপ্রিল-মে মাসে প্রতি দশদিন অন্তর গঙ্গা থেকে পরীক্ষামূলকভাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ জল সরানো হবে। সেই 'পরীক্ষা' অবশ্য পরেও আরও বহু বছর ধরে চলতে থাকে।

সে বছরের মে মাসেই আনুষ্ঠানিকভাবে ফারাক্কার উদ্বোধন করেন দেশের সেচমন্ত্রী জগজীবন রাম, পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে যা কয়েক কোটি কিউসেক বাড়তি জল কলকাতায় এনে ফেলেছে!

ভূতাত্ত্বিক ও নদী গবেষক ড: পার্থসারথি চক্রবর্তী বলছিলেন, "কলকাতা বন্দরে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত কিন্তু আমাদের নাব্যতা (নেভিগেবিলিটি) ছিল, ২৬ ফুট ড্রাফট ছিল। এবং তাতে ২৯১ দিন এই বন্দরে জাহাজ ঢুকত, মানে ওই ২৬ ফুট ড্রাফটের জাহাজ ঢুকত। ১৯৬০ সালের পর থেকে কিন্তু মারাত্মক অবস্থা হয়।"

"এখন এই ফারাক্কা অঞ্চল কেন? ফারাক্কা অঞ্চলকে ব্যারাজ করার জন্য বাছা হলো, তার কারণ সেখানে একশো বছরের মধ্যে নদী নড়াচড়া করেনি, তার ব্যাঙ্কের মধ্যেই ছিল। এবং ওই ব্যারাজটা ওইখানে করলে, জলটা, ব্যারাজটার ঠিকমতো স্টেবিলিটি থাকবে।"

তিনি আরও জানাচ্ছেন, ফারাক্কায় এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, যাতে কলকাতায় সম্পূর্ণ 'সিল্ট-ফ্রি' বা পলিমুক্ত জল সরবরাহ করা যায়।

"তার জন্য ওখানে 'ছাঁকনি' দেওয়া আছে, যে কারণে ফারাক্কার জল কলকাতায় পানীয় জল হিসেবেও সাপ্লাই দেওয়া হয়", বলছিলেন মি চক্রবর্তী।

ফলে ১০০০ মাইলেরও বেশি পথ পেরিয়ে উত্তর ভারতের 'লাইফলাইন' গঙ্গা ফারাক্কাতে এসে ব্যারাজের বাধায় বাঁধা পড়েছে – আর সেখানে মোট ১০৯টি লকগেটেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে নদীর জলের প্রবাহ।

আর ফারাক্কাতে নদীর ডান দিক থেকে কাটা হয়েছে ৩৮.৩ কিলোমিটার লম্বা ভাগীরথী ফিডার ক্যানাল, যা জঙ্গীপুরের কাছে ভাগীরথীতে গিয়ে মিশেছে এবং পরে সেই নদী হুগলী নামে পরিচিতি পেয়েছে।

এককালের ছোট্ট গ্রাম ফারাক্কাকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে একটি আধুনিক উপনগরী, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ও দক্ষিণপ্রান্তের মধ্যে রেল ও সড়ক যোগাযোগও স্থাপন করেছে ব্যারাজের ওপর দিয়ে তৈরি ট্রেনলাইন ও রাস্তা।

ক্যানালের জলে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে, এমন কী ইলিশও! ভারতে হলদিয়া থেকে এলাহাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত '১ নম্বর জাতীয় জলপথে'রও অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই ক্যানাল।

আশির দশকে ফারাক্কাতে এনটিপিসি-র যে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়, তারাও ব্যবহার করে এই ক্যানালের জল। ভাঁটির দিকে মুর্শিদাবাদের সাগরদীঘিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারও একটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে, তারাও এই জলের ওপর নির্ভরশীল।

সব মিলিয়ে ফারাক্কা শুধুমাত্র একটি বাঁধ ও খালই নয়, এই প্রকল্পকে ঘিরে গত পঞ্চাশ বছরে একটা বিরাট ক্যানভাসই আঁকা হয়ে গেছে বলা চলে – যাকে বিশেষজ্ঞরা 'ফারাক্কা ইকোসিস্টেম' নামে বর্ণনা করে থাকেন।

ফারাক্কা নিয়ে ভারতেও এতো বিতর্ক কেন?

ফারাক্কার প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে ভারতেও অনেক বিশেষজ্ঞ সন্দিহান ছিলেন। তবে কলকাতা বন্দরকে বাঁচানোর যুক্তিটা এতটাই প্রবল ছিল যে সেই সব আপত্তি বিশেষ ধোপে টেঁকেনি।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেচ বিভাগের একজন শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশলী, কপিল ভট্টাচার্য তো ফারাক্কার বিরোধিতা করে সরকারি চাকরিও ছেড়ে দিয়েছিলেন।

ফারাক্কা প্রকল্প কেন বিপজ্জনক, তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি অনেক লেখালেখিও করেছেন। পরবর্তী জীবনে কপিল ভট্টাচার্য অ্যাক্টিভিস্টে পরিণত হন, যুক্ত ছিলেন মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআরের সঙ্গেও।

১৯৮৯ সালে মি ভট্টাচার্যের মৃত্যুর ২৭ বছর পর, ২০১৬ সালে বিহারের রাজ্য সরকার ফারাক্কা বাঁধ 'তুলে দেওয়ার জন্য' কেন্দ্রের কাছে আনুষ্ঠানিক দাবি জানায়।

তখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে দেখা করে যুক্তি দিয়েছিলেন, ফারাক্কার জন্যই তার রাজ্য প্রতি বছর বন্যায় ভেসে যাচ্ছে – অতএব বাঁধটাই তুলে দেওয়া হোক!

নীতীশ কুমার তখন প্রকাশ্যেই সাংবাদিকদের বলেছিলেন, "গঙ্গায় খুব বেশি পলি পড়ছে বলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।"

"আর যখন থেকে ফারাক্কা বাঁধ তৈরি হয়েছে তখন থেকেই এই অবস্থা। নইলে আগে নদীর প্রবাহের সঙ্গে অনেকটা পলি বঙ্গোপসাগরে চলে যেত, সমুদ্রে গিয়ে মিশত।"

দশ-বারো বছর ধরে ফারাক্কার 'প্যাটার্ন' স্টাডি করেই এ মন্তব্য করছেন, তখন এ কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।

নীতীশ কুমার আজও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী, তবে যে কোনো কারণেই হোক ফারাক্কা বিরোধিতার সুর তিনি অনেক স্তিমিত করে ফেলেছেন। এই মুহুর্তে তিনি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনৈতিক সঙ্গীও।

তবে ফারাক্কার উজানে ঝাড়খন্ড-বিহারের সীমান্ত এলাকায় গিয়েও দেখেছি, সেখানে আমজনতারও এই বাঁধকে নিয়ে বিস্তর অভিযোগ - বর্ষাতে যেমন, তেমনি শুকনা মৌসুমেও!

বিহারের আহমদাবাদ গ্রামের বাসিন্দা ওয়াহিদ শেখের কথায়, "বর্ষার সময় ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়া উচিত, নইলে বিহারবাসীর খুব দুর্দশা! অথচ বর্ষার সময়ই গেট বন্ধ রাখে, নদী ওভারফ্লো করলে তখনই গিয়ে গেট খোলে – যখন বিহার ডুবে গেছে!"

"বর্ষার মৌসুম এলেই যদি গেট খুলে দেয়, তাহলে বিহার একটু স্বস্তি পাবে!"

ঝাড়খন্ডের সাহেবগঞ্জ জেলায়, গঙ্গাতীরের লাধোপাড়া গ্রামের মিশির শেখ আবার বলছিলেন, "রাজমহলের ওপারে গঙ্গা যদি দেখেন – গরমে নদী তো একদম শুকিয়ে যায়!"

"ছোট একটা নালার মতো গঙ্গা বইতে থাকে, বাকি পুরোটা শুকিয়ে যায়। এখন সব জল (বাংলাদেশে) ছেড়ে দিলে কোনো ফসলই হবে না, কিষাণ তো না খেয়ে মরবে!"

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড: সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায় ফারাক্কা অঞ্চলে বাঁধের প্রভাব নিয়ে ফিল্ড স্টাডি ও গবেষণা করেছেন – এ ব্যাপারে তারও মিশ্র অভিজ্ঞতা।

"ফারাক্কায় নদীর বুকেও চর পড়েছে, মাঝনদীতে বক দাঁড়িয়ে আছে এটাও যেমন দেখেছি – তেমনি গঙ্গার বিধ্বংসী ভাঙনে পারের মানুষের জীবন ছারখার হয়ে যেতেও দেখেছি", বলছিলেন তিনি।

সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, "এই নদীর যে প্যাটার্নের চেঞ্জটা, ইটসেল্ফ নদীটার মধ্যে, তার দুই পারে সবটারই ওপরে একটা ইমপ্যাক্ট ফেলেছে ফারাক্কা ব্যারাজ। ডেফিনিটলি। তার পজিটিভগুলো আমরা পেয়েছি, নেগেটিভগুলোও আমরা দেখতে পাচ্ছি।"

ফারাক্কাতে তার শেষ ফিল্ড স্টাডিতে স্থানীয় গ্রামবাসীরা ফারাক্কা বাঁধকে তুলনা করেছিলেন একটা সাপের মাথা চেপে ধরার সঙ্গে!

"এমনিভাবে দেখাল যে, একটা সাপ রয়েছে তার মুখটা আপনি চেপে ধরলেন – মানে মাথাটা, তাহলে সে তো দেখবেন ছটফট করছে বেরোনোর জন্য।"

"অ্যাজ ইফ ব্যারাজটা যেন একটা সাপের মুখটা চেপে ধরার মতো জিনিস – এবং নদী তখন, নদীর কোর্সটা তো পাল্টাচ্ছে – সে আর একভাবে যেতে পারছে না, সে যেহেতু রেস্ট্রিক্টেড, বাউন্ডেড ... তাই সে আরও বেশি করে ... প্যাটার্নটা, কার্ভসগুলো আরও বেশি হচ্ছে, ছটফট করার মতো ... ওরা সুন্দর একটা এক্সপ্ল্যানেশন দিয়েছিল", জানাচ্ছেন তিনি।

ফারাক্কার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি আবার জানাচ্ছেন, নদীর ভাঙন ঠেকাতে না-পারলে ফারাক্কা অচিরেই তাদের জন্য চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে!

ফারাক্কা আসনের এমএলএ (বিধায়ক) মনিরুল ইসলাম বিবিসিকে বলছিলেন, "ফারাক্কার জন্য আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাটা অবশ্যই ভাল হয়েছে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের মেলবন্ধন এটা তৈরি করেছে ঠিক, কিন্তু আমাদের আপিল কি গঙ্গার ড্রেজিং-টা করে দিলে আমরা কিন্তু বিপদমুক্ত হব আর কী!"

"এই ড্রেজিং না করলে আগামী পঞ্চাশ বছর বলছেন কেন, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমরা নদীর গর্ভে চলে যাব। তো আমাদের কাছে ব্যারাজ একরকম অভিশাপের কারণ হয়েও দাঁড়িয়ে গেছে আর কী!"

তিনি আরও বলছিলেন, "মুর্শিদাবাদের মোরগ্রাম থেকে নিয়ে আপনার মালদা পর্যন্ত আমাদের এই ভৌগোলিক অবস্থানটা দেখবেন – আমরা একটা সরু রাস্তার ওপর বাস করছি। ওদিকে ঝাড়খন্ড, এদিকে নদী, বাংলাদেশ – এইটুকুনটা!"

"তাই আমাদের হাজার হাজার একর যে নদীর গর্ভে গিয়েছে, মাঝনদীটাকে যদি ড্রেজিং করে পাথর দিয়ে বেঁধে দেয় আর কী, তাহলে অনেক লোক ওখানে চাষবাস করে, বাড়িঘর করে থাকতে পারবে", কেন্দ্রের কাছে দাবি জানান তিনি।

তবে ফারাক্কা নিয়ে এরকম অনেক বিতর্ক থাকলেও বাঁধ তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে কাজ কিন্তু বিশেষ এগোয়নি!

ফারাক্কা বাঁধ 'ডিকমিশন' করতে নীতিশ কুমার প্রস্তাব দেওয়ার পর দেশের জলসম্পদ মন্ত্রণালয় কিন্তু একটি বিশেষজ্ঞ কমিটিও গঠন করেছিল – যাতে কেন্দ্রের তরফে পাঁচজন আর বিহার সরকারের তরফে পাঁচজন সদস্য ছিলেন।

সেই কমিটিতে বিহারের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন দেশের সুপরিচিত নদী বিশেষজ্ঞ ও গবেষক হিমাংশু ঠক্কর।

মি. ঠক্কর বিবিসিকে বলছিলেন, "আমাদের দায়িত্ব ছিল ফারাক্কা বিহারের ওপর ঠিক কী প্রভাব ফেলেছে, তা নিরূপণ করা।"

"কিন্তু ফারাক্কা হওয়ার আগে ও পরে নদীতে ড্রেইনেজ কনজেসশন কী, বন্যার তীব্রতা ও কত ঘন ঘন বন্যা হয়েছে, নদীর ধারণক্ষমতা কত, সে সব ব্যাপারে সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন আমাদের কোনো তথ্য-উপাত্তই দেয়নি, ফলে আমরাও কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি।"

তবে ফারাক্কার 'বিরূপ প্রভাব' যে গোটা এলাকায় পড়েছে তাতে মি. ঠক্করের কোনো সন্দেহ নেই, নীতিশ কুমারের প্রস্তাবেও যথেষ্ঠ যুক্তি ছিল বলে তিনি মনে করেন।

আগামী পঞ্চাশ বছরে ফারাক্কার ভবিষ্যৎ কী?

ফারাক্কা থেকে টানা ফিডার ক্যানালে শুষ্ক মৌসুমে কতটা জল টানা যাবে, আর মূল নদী দিয়ে পদ্মায় কতটা জল ছাড়া হবে – ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তির মূল কথা কিন্তু সেটাই।

এখনকার চুক্তি বলছে, প্রতি বছরের ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে মে – এই শুকনা মৌসুমের সময়টায় প্রথম দশদিন ক্যানাল আর পরের দশদিন করে পদ্মা অন্তত ৩৫০০০ কিউসেক পরিমাণ জল পাবেই ('অ্যাশিওর্ড অ্যামাউন্ট' বা প্রতিশ্রুত পরিমাণ)।

এই জলের প্রবাহ ঠিকঠাক যাচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য ব্যারাজ থেকে কয়েকশো মিটার দূরে ভাঁটির দিকে মনিটরিং স্টেশন-ও আছে, যেখানে ভারত ও বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা একসঙ্গে সার্বক্ষণিক অবস্থান করেন।

ঠিক একই ধরনের যৌথ মনিটরিং স্টেশন আছে বাংলাদেশের দিকে পদ্মার ওপরে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছেও।

এখন আগামী বছর (২০২৬) কোন শর্তে সেই গঙ্গা চুক্তির নবায়ন হয় – বা আদৌ হয় কি না – যথারীতি তার ওপরও অনেকটা নির্ভর করছে ফারাক্কার ভবিষ্যৎ।

এদিকে উজানের বিহারে কিংবা ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানিকচক-ধুলিয়ানে ফারাক্কাকে নিয়ে যতই বিতর্ক থাক, খোদ ফারাক্কা এলাকার গ্রামবাসীরা কিন্তু প্রকল্পের কারণে খুশি - তারা চান বাঁধের দীর্ঘায়ু।

ফারাক্কা উপনগরী লাগোয়া পলাশিগ্রামের বাসিন্দা তপন মিশ্র যেমন বলছিলেন, "অনেক কিছু থেকে সুবিধা হয়েছে। যেমন কৃষকরা জল পাচ্ছে, জেলেরা মাছ ধরে দুটো খেতে পাচ্ছে।"

"এই বাঁধ হওয়াতে এখানে শহর তৈরি হয়েছে মোটামুটি ছোটমোট একটা, কেউ বিজনেস করে খাচ্ছে, কেউ চাকরি করে খাচ্ছে ... দূর দূর ঝাড়খন্ড-ফাড়খন্ড কোথায় বন্যা হচ্ছে ওটা তো ধরলে চলবে না! ভালো হয়েছে, খারাপ হয়নি!"

ফারাক্কা ব্রিজ হওয়ায় স্থানীয় মৎস্যজীবী খগেন প্রামাণিকের আবার খুব সুবিধা হয়েছে দূরদূরান্তে মাছের চালান পাঠাতে।

তিনি পাশ থেকে যোগ করেন, "এই গঙ্গায় যে ব্রিজটা হওয়া, ব্রিজটা হওয়াতে কি উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দারুণ যোগাযোগ হয়ে গেছে – এইটা মেইন মেরুদন্ড হয়ে গেছে উত্তরবঙ্গের জন্য!"

"আগে এখানে সকালে নৌকাতে চাপলে দুপুর, বৈকালে গিয়ে পৌঁছাত ওপারে – সেই জিনিসটা এখন আর নেই!"

ফারাক্কার 'হিউম্যান জিওগ্রাফি' নিয়ে কাজ করেছেন যে গবেষকরা, তারা অবশ্য নিশ্চিত নন সাধারণ লোকের ভাবনা প্রকল্পে কতটা গুরুত্ব পেয়েছে।

সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন বলছিলেন, "আমার রেজিলিয়েন্স বিল্ডিংয়ের মধ্যে যদি আমি মানুষের মতামত, তাদের চোখে দেখা বা তাদের এক্সপেরিয়েন্স – কীভাবে তারা দেখছে নদীটাকে, সেটা যদি আমরা না ধরতে পারি, তাহলে কিন্তু একটা গ্যাপ রয়ে গেল।"

"আর যেটা আপনি বলছেন যে পঞ্চাশ বছর পরে কী হবে, এই গ্যাপটা কিন্তু আগাগোড়া রয়েই গেছে। আমরা কিন্তু কখনও দেখছি না এই রেজিলিয়েন্স বিল্ডিংয়ের মধ্যে মানুষকে ইনভলভ করা হচ্ছে বা কমিউনিটিগুলোকে ইনভলভ করা হচ্ছে।"

তিনি আরও মনে করেন, ফারাক্কাকে ঘিরে যে প্রযুক্তিগত সমাধানগুলো ভাবা হয়েছে - কত বছর তার মেয়াদ, বা তার পরে কী হবে – এগুলো নিয়ে একটা অস্পষ্টতা আছেই, আর সেখানে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের সঙ্গে প্রোজেক্টের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

"কারণ এটা একটা শক্তিশালী নদী, সেটাও তো আমাদের মেনে নিতে হবে যে তার একটা ন্যাচারাল প্রসেস বা স্বাভাবিক গতি ও ছন্দ আছে! সেটা গ্রামের মানুষ যেভাবে বুঝছে আমরা বুঝছি না", বলছিলেন সুমনা বন্দ্যোপাধ্যায়।

আবার এই প্রেক্ষাপটেই কোনো কোনো পর্যবেক্ষক মনে করেন, বাঁধটা কিন্তু বর্তমান আকারে আর না রাখলেও চলে!

হিমাংশু ঠক্কর বিবিসিকে বলছিলেন, "আমেরিকা, ইউরোপ ও সারা দুনিয়া জুড়ে অজস্র বাঁধের ডিকমিশনিং হচ্ছে – শুধু আমেরিকাতেই গত ৩০ বছরে ২০০০রও বেশি ড্যাম ডিকমিশন করা হয়েছে, ইউরোপেও হয়েছে শত শত।"

"তবে এটাও ঠিক, গঙ্গার মতো বিশাল একটা নদীতে কোনো ড্যাম ডিকমিশন করার পূর্ব অভিজ্ঞতা কিন্তু তেমন নেই। তবে তার পরেও কাজটা খুবই সম্ভব – আর নানাভাবেই এই ডিকমিশনিং করা যায়।"

এখানে তিনি প্রস্তাব দিচ্ছেন 'অপারেশনাল ডিকমিশনিং'-এর, অর্থাৎ ব্যারাজের ওপরে ট্রান্সপোর্ট লিঙ্কটা রেখে গেটগুলো সব খুলে রাখার বা তুলে দেওয়ার, যাতে রেল ও সড়ক সংযোগ রেখেও নদীকে স্বাভাবিকভাবে বইতে দেওয়া যায়।

"পাশাপাশি ক্যানালটা এখন যে সুবিধাগুলো দিচ্ছে, সেটা কীভাবে বজায় রাখা যায় তাও দেখতে হবে। এতে কী হবে, ড্যামের মূল কাঠামোটা অক্ষত রেখেও ফারাক্কার অপারেশনাল ডিকমিশনিং করা যাবে", বলছিলেন মি ঠক্কর।

আবার এর একদম উল্টো মতবাদটা হল – কলকাতার স্বার্থেই ফারাক্কাকে যেভাবে হোক বর্তমান আকারেই রক্ষা করতে হবে!

এই মতে বিশ্বাসী ড: পার্থসারথি চক্রবর্তীর কথায়, "কলকাতা নদীবন্দরকে বাঁচাতেই হবে। কারণ কলকাতা নদীবন্দর শুধু কলকাতা কলকাতা বললে হবে না, সমগ্র পূর্ব ভারত এবং নর্থ-ইস্টার্ন রিজিওন – তার একটাই পোর্ট ভারতবর্ষের বলতে গেলে, আমাদের কলকাতা বন্দর। সেখানে কোনও কম্প্রোমাইজ নেই।"

"এর জন্য ফারাক্কা ব্যারাজটাকে যেভাবে হোক রেনোভেট করতে হবে, ইঞ্জিনিয়ারিং স্ট্রাকচার কীভাবে রেনোভেট করবে সেটা পুরোপুরি প্রকৌশলীদের ওপর।"

"আমার নদীটা তো আছে, নদীর খাত আছে ... আর আপনারা যেটা ভাবেন নদীর পার ভাঙছে, সব নদীরই পার ভাঙে! আমি নদীর ধারে থাকবো কেন? নদীর ধারে একটা বাফার থাকবে তো, সেই বাফার জোনটা দিয়ে রাখতে হবে", যুক্তি দিচ্ছেন তিনি।

এটা ঠিকই, পৃথিবীতে কোনো নদীবাঁধের আয়ুই অনন্তকাল নয় - কখনও তিরিশ, কখনও চল্লিশ বা কখনও আশি বছর পর একটি ব্যারাজ ডিকমিশনিং করা বা তুলে দেওয়ার বহু নজির নানা দেশে আছে।

ফারাক্কার ক্ষেত্রে ঠিক কী করা হবে আর কখন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ভারতের জলসম্পদ মন্ত্রণালয়ের – কিন্তু সেই লক্ষ্যে নির্দিষ্ট ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছে বলে এখনও কোনো প্রমাণ নেই।

ফারাক্কা ব্যারাজ কর্তৃপক্ষ কিন্তু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এই প্রকল্পের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণই নেই।

ফারাক্কা ব্যারাজ প্রকল্পের মহাপরিচালক আর ডি দেশপান্ডে বিবিসিকে বলছিলেন, "দেখুন, এটা তো শুধু একটা ডাইভারশান বা জল টানার প্রকল্প, এখানে কিন্তু তেমন স্টোরেজ বা জলাধার কিছু নেই।"

"স্টোরেজ প্রকল্পগুলোর আয়ু হয়তো একশো বছর হয়, কারণ পলি পড়ে তার ধারণক্ষমতা পূর্ণ হয়ে যায়। ফারাক্কায় সে সমস্যা নেই, ফলে এটা অনায়াসে একশো বছরেরও বেশি টিঁকতে পারে।"

তবে তিনি স্বীকার করেন ফিডার ক্যানালের বেড (খাত) আর দু'পারের ক্ষয় ও ভাঙন একটা বড় সমস্যা, যেটা হয়তো 'ক্রস রেগুলেটরে'র মতো কিছু বসিয়ে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মোকাবিলা করতে হবে।

"কিন্তু ফারাক্কা বাঁচবেই, বাঁচাতেই হবে – কারণ কলকাতা শহর, কলকাতা বন্দর আর গত পঞ্চাশ বছরে নদীকে ঘিরে যে ইকোসিস্টেম তৈরি হয়ে গেছে তাকে রক্ষা করতে হলে ফারাক্কাই একমাত্র ভরসা", খুব আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গীতে বলেন প্রকল্পের প্রধান।

ফলে ফারাক্কা নিয়ে আগামী দিনে কী করা উচিত, সে সম্বন্ধে ভারতেও নানা ধরনের মতামত আছে।

ফারাক্কার ভবিষ্যত ঠিক কোন পথে, তা এখনও কারও জানা নেই, কিন্তু এটা বলা যায়, ফারাক্কাকে নিয়ে বিতর্ক বোধহয় পরের ৫০ বছর ধরেও চলবে!

ফারাক্কার ৫০ বছর: পদ্মাসহ বাংলাদেশের নদনদীতে কী প্রভাব পড়েছে? by আবুল কালাম আজাদ

পদ্মা নদীর উজানে ভারতের গঙ্গায় নির্মিত ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর ৫০ বছর হলো। আন্তসীমান্ত নদীর গতিপথে এই বাঁধ বিরূপ প্রভাব ফেলেছে বাংলাদেশের পদ্মাসহ এর শাখা নদ-নদীর ওপর।

ভারতে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে পাঁচ দশকে বাংলাদেশের পদ্মায় চর জেগেছে, শুকিয়ে মরে গেছে পদ্মার উৎস থেকে সৃষ্ট বেশকিছু নদ-নদী।

বাংলাদেশ-ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে সবচেয়ে বেশিদিন ধরে অস্বস্তির কারণ হয়ে থেকেছে যে বিষয়টি–– সেটি হচ্ছে ফারাক্কা।

এই বিতর্কিত বাঁধের কারণে বহু নদীর মৃত্যু, জীবন-জীবিকা ও জীববৈচিত্রের ক্ষতিসহ বহুমাত্রিক প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশ-এমনকি ভারতের কিছু অংশেও এর জোরালো বিরোধিতা রয়েছে।

গত ৫০ বছরে ফারাক্কা ব্যারাজ বাংলাদেশের নদ-নদীতে যে বিরূপ প্রভাব রেখেছে তার বড় সাক্ষী বাংলাদেশে পদ্মা পাড়ের মানুষ।

ফারাক্কা পয়েন্টে ভারত পানি সরিয়ে নেওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় মারাত্মক পানি সংকট তৈরি হচ্ছে। এক সময়ের খরস্রোতা প্রমত্তা পদ্মার বুকে বিশাল চর জেগেছে, নদীর গতিপথ সংকীর্ণ হয়ে গেছে, নদীটিই অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।

আবার বর্ষাকালে সেই ফারাক্কারই সবগুলো গেট খুলে দেওয়া হচ্ছে। এরে ফলে প্রায় প্রতিবছরই গঙ্গা ও পদ্মা অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বন্যা ও ভাঙনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

পদ্মায় ফারাক্কার প্রভাব

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পদ্মা নদী। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এ নদীটি উত্তরবঙ্গে রাজশাহী বিভাগ থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

নদী গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের দীর্ঘতম এ নদীর গতিপথ থেকে শুরু করে এর শাখা নদনদীর প্রবাহে মারাত্মক ক্ষতি করেছে ফারাক্কা।

শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা যায় ধু ধু বালুচর।

রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন জানান, তাদের এক গবেষণায় দেখেছেন উজানে ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগের সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান নদী পদ্মার ৮০ শতাংশ পানির প্রবাহ কমে গেছে এখন।

পদ্মা নদী-তীরবর্তী হাকিমপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ সানাউল্লা ৭০ বছর ধরে দেখে আসছেন পদ্মা নদী। ফারাক্কা বাঁধের আগে-পরে পদ্মার চরিত্র এবং পানির প্রবাহ নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয় রাজশাহীর গোদাগাড়ি ঘাটে।

দুই সময়ের তুলনা করে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, আগে অনেক স্রোত ছিল, নদী বড় ছিল। এখন তো পুরো চর।

"এখন আর তখনের বহুত ডিফারেন্স। বাঁধ ছিল না। যখন তখন পানির খুব বেগ, ক্ষমতা আর স্রোত ছিল। এ নদীর একটা পাড়ে নৌকা ভেড়াতে চারজন লোকও ঘাবড়ে গেছে, কারণ পানির এত স্রোত ছিল। এখন তো শুধু ডাঙ্গা।"

ছোট বেলা থেকেই রাজশাহী এলাকায় পদ্মা নদীতে মাছ শিকার করেন মোহাম্মদ রাব্বির হোসেন। পদ্মা নদীতে তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় নদীর পানি কমে যাওয়ায় মাছও অনেক কমে গেছে।

অতীতে তারা যেসব মাছ পেতেন, এখন আর সে ধরনের মাছ নদীতে ধরা পড়ে না। বর্ষা মৌসুমে কিছু মাছ ধরা পড়লেও বছরের অন্যান্য সময় বড় বড় মাছ এখন নদীতে মিলছে না।

অনেকে মাছ ধরা পেশা ছেড়ে দিয়েছেন বলেও জানান রাব্বির হোসেন।

প্রায় ৩৫ বছর নদীতে থাকার অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে মি. হোসেন বলেন, "পদ্মার অনেক শাখা নদীও গত ৫০ বছরে শুকিয়ে গেছে। আগে পদ্মা কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত ছিল। শুষ্ক মৌসুমে এখন অনেক যায়গায় সরু খালের মতো পানি প্রবাহিত হচ্ছে।"

"চর পড়ে নদীর কন্ডিশন খারাপ। নদী আগে অনেক বড় ছিল। বড় বড় ডিঙি নৌকায় মাল লিয়া যাইতো। যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থাইকা ঢাকা যাইতো মাল লিয়া; আপনার আম, সবজি-তরকারি লিয়া ঢাকা যাইতো, আমার বয়সে আমি দেখেছি। সেরকম এখন যায় নাতো আর।"

পদ্মা নদী শুকিয়ে যাওয়ার সঙ্গে রাব্বির হোসেন আশপাশের বেশকটি শাখা নদী মরে যেতে দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

পদ্মার শাখা নদ-নদীর মৃত্যু

ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে পদ্মার বেশ কিছু শাখা নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। পানি প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় সবগুলো শাখা নদীর।

পানি সংকটের কারণে পদ্মার যে শাখা নদীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বড়াল। রাজশাহী থেকে ভাটিতে চারঘাটে বড়াল নদীর উৎসমুখ।

সরেজমিনে গিয়ে বড়ালের উৎসমুখে দেখা যায় বিশাল চর জেগেছে, সেখানে পানির প্রবাহ নেই। বড়ালের দুই পাশে চর পড়ে উঁচু হয়ে গেছে। মাঝখানে সরু নালার মতো।

পদ্মা থেকে রাজশাহী, নাটোর হয়ে বড়াল নদীর গতিপথ যমুনা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ নদীর জীবন মৃত্যুর সাক্ষী চারঘাট এলাকার শিক্ষক মোহাম্মদ রেজাউল করীম। এ নদীতে বড় বড় নৌকা চলতে দেখেছেন বলে জানান তিনি।

তার বর্ণনায়, বড়ালে মালবাহী নৌযানের সঙ্গে যাত্রীবাহী নৌকাও চলাচল করতো। ষাটের কাছাকাছি নিজের বয়স উল্লেখ করে মি. করীম বলেন, কলেজ জীবনে বড়াল নদীতে নৌকায় চলাচল করতেন তিনি। এমনকি শিক্ষকতা জীবনের শুরুতেও কলেজ থেকে বাড়িতে বড়াল নদী দিয়েই তার যাতায়াত ছিল।

"যখন কলেজে পড়ি তখন তো নদীপথে এসে কলেজ করছি। এ নদীর শুকিয়ে যাওয়ার দুটি কারণ। একটা হলো ফারাক্কার বাঁধের জন্য এ নদীতে পানি আসছে কম। নদীটা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আর আরেকটা কারণ হলো এখানে স্লুইচ গেট দিয়ে পানি এদিকে যেতে পারছে না," নদীর পাশে দাঁড়িয়ে বলেন রেজাউল করীম।

পানি সংকটে পদ্মার যে শাখানদীগুলো সংকটে তার মধ্যে অন্যতম কুষ্টিয়ার গড়াই নদী অন্যতম।

অর্ধশতাব্দির বেশি সময় পদ্মা আর গড়াই নদীতে মাছ ধরে জীবন-জীবিকা চলছে নায়েব আলীর। তার মতে, পদ্মার শাখা নদী গড়াইকে এখন জীবিত বলা চলে না। এই নদীতে আগের মত মাছ নেই। চর জেগেছে। আর খনন করলেও প্রতিবছর আবার পলি পড়ে ভরাট হয়ে যায়।

তিনি বলেন, "এ নদী মরে গেছে, নদী বেঁচে নেই। খালি বর্ষাকালডায় থাকে একটু পানি। বর্ষা চলে গেলি আর থাকে না।"

পদ্মায় গড়াই নদীর উৎসমুখে গিয়েও দেখা যায় বিশাল চর জেগেছে। ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করে গড়াই নদী বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।

কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুর রহমান বিবিসিকে বলেন, গড়াই নদী হলো পদ্মার একমাত্র পানির উৎস। আর এই গড়াই নদী সুন্দরবন পর্যন্ত মিঠা পানির প্রধান সোর্স।

"আমাদের গড়াই নদীটায় টোটাল ৪৪ কিলোমিটার চর পড়ে গিয়েছিল। বর্তমানে আমরা গড়াই নদী ড্রেজিং ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে সচল রাখছি। আর আমাদের কুষ্টিয়াতে ১১টা নদী আছে। এই নদীগুলো পদ্মা এবং গড়াই নদীর সঙ্গে লিংকআপ (যুক্ত)। এখন যদি টোট্যালি পদ্মায় পানি না পাওয়া যায় তাহলে এই নদীগুলো মৃতপ্রায় হয়ে যাবে।"

নদনদীর পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটা বড় দুশ্চিন্তা গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প নিয়ে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এই সেচ প্রকল্প সম্পূর্ণ পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল।

চারটি জেলার প্রায় এক লাখ হেক্টর জমিতে সেচের জন্য ষাটের দশকে এই সেচ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানি সংকটে সেচ প্রকল্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে বিভিন্ন সময়।

গত বছর পানির সংকটে শুষ্ক মৌসুমে জিকে সেচ প্রকল্প সেচের পানি পদ্মা থেকে উত্তোলন করে সরবরাহ করতে পারেনি।

পদ্মার আরও বেশ কিছু শাখা নদী ফারাক্কার প্রভাবে মৃতপ্রায় বলে উল্লেখ করেন নদী নিয়ে কাজ করা রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন।

"কপোতাক্ষ, ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, কুমার এই সবগুলো নদী যেগুলো সুন্দরবনে পানিপ্রবাহ নিয়ে যায় এগুলো মরে গেছে। আক্ষরিক অর্থে কার্যত মরে গেছে। আপনি কপোতাক্ষ নদের কাছে গিয়ে দেখবেন কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও পানিই নেই। যে হাঁটু পানি দেখা যায় এটা বৃষ্টির পানি। গঙ্গা থেকে আর আসে না," বলেন মি. রোকন।

"ভারতে জলাঙ্গী তারপর বাংলাদেশে মাথাভাঙ্গা, কুমার, নবগঙ্গা, গড়াই এবং চন্দনা–– এই সবগুলো নদী একসময় গঙ্গার মূল প্রবাহ ছিল। এই সবগুলো নদীই শাখানদীও টেকে নাই। সবগুলো মরে গেছে। ৬০ থেকে ৮০ ভাগ প্রবাহ যদি কমে যায় তাহলে সেই নদীর যে বায়োলজিক্যাল ক্যারেক্টার সেটা আর ঠিক থাকার কোনো কারণ নাই," তিনি যুক্ত করেন।

নদী গবেষকরা জানাচ্ছেন, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকেই বাংলাদেশে পদ্মা ও শাখানদীগুলোতে পানি সংকট শুরু হয়েছে।

রিভারাইন পিপলের শেখ রোকন পদ্মা ও এর শাখা নদনদীগুলোর বর্তমান সংকটের পেছনে ফারাক্কা ব্যারাজকে দায়ী করেন।

"নিঃসন্দেহে ফারাক্কার প্রভাব। আমরা আমাদের গবেষণায় দেখেছি যে ফারাক্কা চালু হলো ১৯৭৫ সালে, তার আগ পর্যন্ত এই নদীগুলো ঠিক ছিল। যখন ফারাক্কা বাঁধ চালু হলো তারপর এই নদীগুলো মরে যাওয়া শুরু হয়েছে।"

"আমরা একটি চুক্তি করেছি ১৯৯৬ সালে যেটা ২০২৬ সালে শেষ হবে– সেই চুক্তির পর আমরা কিছু পানি পেয়েছি। কিন্তু তার আগে ২০ বছরে যে পানি আসে নাই তখন এই নদীগুলো মরে গেছে। গড়াইয়ের মতো নদীগুলো উঁচু হয়ে গেছে। যখন নদীখাত উঁচু হয়ে যায়, তখন পরে পানি দিয়ে খুব বেশি লাভ পাওয়া যায় না।"

শেখ রোকন বলছেন, পদ্মার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অবিলম্বে গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নসহ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।

"দ্রুত চুক্তি নবায়ন করতে হবে। আর আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচগুলো থাকতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে আন্তসীমান্ত নদীর জন্য দুটো সনদ আছে জাতিসংঘ থেকে। একটা হচ্ছে ইউএন ওয়াটার কনভেনশন ১৯৯২। আরেকটা হলো ইউএন ওয়াটার কোর্সেস কনভেনশন ১৯৯৭। তো এই দুটোর ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে দ্রুত র‍্যাটিফাই (অনুমোদন) করতে হবে।"

"৯৭ সালেরটা আমরা ভোট দিয়েছি, কিন্তু এখনও রেটিফাই করিনি সংসদে। এটা করতে হবে। আর '৯২ সালেরটা সাক্ষর করার জন্য বাংলাদেশ নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই মাসেই। তো এটা দ্রুত অনুসাক্ষর করতে হবে," বলেন শেখ রোকন।

ফারাক্কা ব্যারাজ ও সংলগ্ন ফিডার ক্যানাল, আকাশ থেকে তোলা ছবি
ফারাক্কা ব্যারাজ ও সংলগ্ন ফিডার ক্যানাল, আকাশ থেকে তোলা ছবি

Sunday, April 27, 2025

রয়টার্সের এক্সপ্লেইনার: সিন্ধু পানি চুক্তি কী, ভারত কি এটি বাতিল করতে পারে

কাশ্মীরে পর্যটকদের ওপর বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু পানি চুক্তি তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে ভারত। প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক কমানোর পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ভারত এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গত বুধবার নয়াদিল্লি সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগ পর্যন্ত এ দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে তিনটি যুদ্ধ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও চুক্তিটি টিকে ছিল।

সিন্ধু পানি চুক্তি কী

ভারতের উজান থেকে পাকিস্তানের সিন্ধু অববাহিকায় প্রবাহিত নদীগুলোর পানি ব্যবহার নিয়ে পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে বিরোধ দীর্ঘদিনের।

সিন্ধু পানি চুক্তি অনুসরণ করেই এসব নদীর পানি ব্যবহার করা হয়। ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় এ চুক্তি হয় এবং ভারত ও পাকিস্তান তাতে স্বাক্ষর করে।

চুক্তিটির মাধ্যমে সিন্ধু ও এর উপনদীগুলোর পানিকে দুই দেশের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হয় এবং পানিবণ্টনের নিয়ম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। সিন্ধু অববাহিকার পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি নদী ইরাবতী, বিপাশা ও শতদ্রুর পানি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয় ভারতকে। আর পাকিস্তানকে পশ্চিমাঞ্চলের তিনটি নদ-নদী সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাবের অধিকাংশ পানি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।

চুক্তিটি কোনো দেশ একতরফাভাবে স্থগিত বা বাতিল করার বিধান নেই। বরং এতে সুস্পষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

পানি নিয়ে যে উদ্বেগ কাজ করছে

পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশী এ দুই দেশ বহু বছর ধরে ভারতীয় ভূখণ্ডে সিন্ধু ও এর উপনদীগুলোর ওপর বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে বিরোধ ও বিতর্কে জড়িয়েছে।

জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচের জন্য পাকিস্তান এই নদীব্যবস্থার পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটি বলছে, ভারত উজানে বাঁধ নির্মাণ করে অন্যায়ভাবে পানি সরিয়ে নিচ্ছে। তবে ভারত এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভারতীয় বাঁধগুলো নদীর পানির প্রবাহ কমিয়ে দেবে বলে উদ্বিগ্ন পাকিস্তান। দেশটির সেচনির্ভর কৃষির ৮০ শতাংশ পানি জোগায় এসব নদী। দেশটি সাম্প্রতিক দুটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং পরে একটি সালিশি আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছে।

ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে। দেশটি বলেছে, সিন্ধু চুক্তির আওতায় কিশানগঙ্গা ও রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ বৈধ। অভিযোগ নিষ্পত্তিতে এমন বিলম্ব এড়াতে চুক্তি সংশোধনের দাবিও তুলেছে ভারত।

চুক্তি স্থগিতের সিদ্ধান্তে কী পরিবর্তন আসতে পারে

চুক্তি স্থগিত করা হলেও পাকিস্তানে পানি প্রবাহে তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়বে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, পানি সংরক্ষণের যথেষ্ট সক্ষমতা নেই ভারতের।

তবে ভারতের এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের কৃষিব্যবস্থাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, চুক্তি স্থগিতের ফলে ভারত ব্যারাজ বা বাঁধ থেকে পানি ছাড়ার তথ্য বা বন্যাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভাগাভাগি না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা আরও জানান, শুষ্ক মৌসুমে ভারতের ন্যূনতম পানি ছাড়ার বাধ্যবাধকতাও আর থাকছে না।

ভারতের এ সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া কী

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের দপ্তর থেকে গত বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চুক্তিটি একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি, যা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায়। এটি একতরফাভাবে স্থগিত করার কোনো বিধান নেই।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ‘সিন্ধু পানি চুক্তির আওতায় পাকিস্তানের প্রাপ্য পানি আটকে দেওয়া বা অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা এবং ভাটি অঞ্চলের অধিকার হরণ করাকে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল বলে বিবেচনা করা হবে এবং পূর্ণ শক্তি দিয়ে এর জবাব দেওয়া হবে।

ভারতের নদীগুলো উজানে আর পাকিস্তানের নদীগুলো ভাটিতে অবস্থিত।

পাকিস্তান কৃষি গবেষণার হেড অব প্রোডাক্ট ঘশারিব শাওকত সিন্ধু চুক্তিকে দেশের কৃষি খাতের মেরুদণ্ড বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এটি (ভারতের চুক্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত) আমাদের কৃষির ভবিষ্যৎকে টালমাটাল করে তুলবে। পানির প্রবাহ অনিয়মিত হয়ে গেলে গোটা ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে—বিশেষত যেসব ফসল সেচের ওপর নির্ভরশীল যেমন গম, চাল এবং আখ।’

ঘশারিব শাওকত আরও বলেন, ‘ফসলের ফলন কমে যেতে পারে। খরচ বৃদ্ধি পেতে পারে। খাদ্যের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। আর ক্ষুদ্র কৃষক, যারা স্বল্প মুনাফায় কাজ করেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ভুগবেন।’

পাকিস্তানের জাতীয় কৃষক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খালিদ হুসেইন বাট ভারতের এ পদক্ষেপকে আক্রমণাত্মক হিসেবে অভিহিত করেছেন। লাহোর থেকে তিনি বলেন, ‘এটি আসলেই যুদ্ধের শামিল। আমরা ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির সংকটে আছি। এ বছর বৃষ্টি কম। তুষারও কম গলেছে। ফলে পানির স্তর গত বছরের তুলনায় ২০-২৫ শতাংশ কম।’

চেনাব নদীর ওপর ভারতের নির্মিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ‘বাগলিহার হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার প্রজেক্ট’–এর একটি দৃশ্য। কাশ্মীরের পেহেলগামে গত মঙ্গলবার বন্দুকধারীদের হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি একতরফা স্থগিত করেছে ভারত
চেনাব নদীর ওপর ভারতের নির্মিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ‘বাগলিহার হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার প্রজেক্ট’–এর একটি দৃশ্য। কাশ্মীরের পেহেলগামে গত মঙ্গলবার বন্দুকধারীদের হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি একতরফা স্থগিত করেছে ভারত। ছবি: এএনআই

আমাদের পানি অথবা তাদের রক্ত সিন্ধু নদে প্রবাহিত হবে: বিলাওয়াল

পহেলগাম ট্রাজেডিকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান যখন উত্তেজনা তুঙ্গে তখন আরও জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো-জারদারি। শুক্রবার তিনি বলেন, পাকিস্তানিরা ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং সিন্ধু নদীতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগ্রাসনের তীব্র জবাব দেবে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন জিও নিউজ। এতে বলা হয়, সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত করা ভারতের একতরফা সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে তিনি নয়াদিল্লিকে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। বলেন- সিন্ধু আমাদের এবং আমাদেরই থাকবে। হয় এর ভিতর দিয়ে আমাদের পানি এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হবে, নয়তো তাদের রক্ত। সুক্কুরে এক জনসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।

বিলাওয়াল আরও বলেন, সিন্ধু আবারও আক্রমণের মুখে পড়েছে- এবার ভারতের আক্রমণের মুখে। তিনি বলেন, ভারতের অবৈধভাবে অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরে একটি সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে। এর জন্য নয়াদিল্লি পাকিস্তানের উপর মিথ্যাভাবে দোষ চাপিয়েছে। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের তীব্র নিন্দা করে। কারণ সন্ত্রাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশ পাকিস্তান। তিনি বলেন, নিজের ব্যর্থতা লুকানোর জন্য মোদি পহেলগামের ঘটনা নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলেছেন। পরবর্তীতে সিন্ধুর পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন।

বিলাওয়াল বলেন, আমরা এখন আবার লড়াই করব। পাকিস্তানের জনগণ সাহসী- আমরা পূর্ণ শক্তি নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সীমান্তে উপযুক্ত জবাব দেবে। তিনি আরও বলেন, ভারত যদি একদিন সিন্ধুর পানি চুক্তিকে আর স্বীকৃতি না দেয় এবং তা বাস্তবে পরিণত হবে বলে আশা করে, তাহলে তা অগ্রহণযোগ্য। এই ধরনের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা পাকিস্তানের জনগণ গ্রহণ করবে না। তিনি এই কঠিন সময়ে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং ভারতকে উপযুক্ত জবাব দেওয়ার আহ্বান জানান। বিলাওয়াল বলেন, ভারত তার একতরফা সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত নদী রক্ষার সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। তিনি নিশ্চিত করেন, ভারতের ইস্যুতে পিপিপি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজের পাশে দাঁড়িয়েছে। এ জন্য পিপিপি ১লা মে মিরপুরখাসে একটি বিশাল জনসমাবেশ করবে।

mzamin

Saturday, April 26, 2025

ভারতকে ছাড় দিতে নারাজ পাকিস্তান, চূড়ান্ত জবাবের প্রস্তুতি

কাশ্মীর হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে টানটান উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে পাল্টা পদক্ষেপ নিয়েছে পাকিস্তানও। এই অবস্থায় ভারতকে হুঁশিয়ারি দিয়ে আজাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী আনোয়ারুল হক বলেছেন, সীমান্ত অতিক্রম করে ভারত যদি পাকিস্তানে কোনো আগ্রাসন চালায়, তাহলে পাকিস্তান তার ‘চূড়ান্ত জবাব’ দেবে।

দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, আজাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ভারতের সাহস নেই পাকিস্তানের সীমান্ত লঙ্ঘনের। কিন্তু যদি করে, তাহলে শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়বে। তিনি ভারতের কূটনৈতিক আচরণকে চাণক্য নীতি বা ‘কূটনীতির আবরণে ছুরি মারা’ বলেও আখ্যা দেন।

আনোয়ারুল হক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘ভারত কোনো তৃতীয় পক্ষকে ব্যবহার করে আজাদ কাশ্মীরকে অস্থির করতে পারে। যদি তারা এমন কোনো দুঃসাহস দেখায়, তাহলে উপযুক্ত জবাব দেবে পাকিস্তান।’ পাকিস্তান যে কোনো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বলেও জানান তিনি।

ভারত-পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিন্ধু নদের পানি চুক্তি। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা দুই দেশের মধ্যে বিরল এক সহযোগিতার উদাহরণ হিসেবে এতদিন ধরে টিকে ছিল। এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান সিন্ধু নদের জলাধার ব্যবস্থার ওপর অধিকতর নির্ভরশীল, কারণ দেশটির কৃষি ব্যবস্থার প্রায় ৯০ শতাংশ এই পানির ওপর নির্ভর করে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান তার পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করবে না। ইতোমধ্যে ইসলামাবাদও স্পষ্ট করে বলেছে, চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তানের পানির প্রবাহ বন্ধ বা সরিয়ে দেওয়ার যে কোনো চেষ্টা ‘যুদ্ধ ঘোষণার’ শামিল হবে এবং তার জবাব দেওয়া হবে ‘সব ধরনের প্রচলিত ও অপ্রচলিত’ অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে।

পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বা এনএসসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পানি হচ্ছে পাকিস্তানের ‘জীবনরেখা’, যা ২৪ কোটিরও বেশি মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত। তাই পানির প্রবাহ বন্ধ করা হলে তা ‘যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর জবাবে পাকিস্তান সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেও দ্বিধা করবে না।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত যদি পাকিস্তানের পানির প্রবাহ থামাতে কোনো জলাধার বা বাঁধ নির্মাণ করে, তাহলে পাকিস্তান সেই স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেবে। এতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতেও দ্বিধা করবে না ইসলামাবাদ। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের পপ্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি : সংগৃহীত
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের পপ্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। ছবি : সংগৃহীত

Wednesday, February 19, 2025

তিস্তা পাড়ে উত্তরাঞ্চলবাসীর জনস্রোত ‘পানির হিস্যা কারও করুণার বিষয় নয়’

‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগানে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে পদযাত্রা করেছে তিস্তা রক্ষা আন্দোলন কমিটি। তিস্তা অভিমুখে এই পদযাত্রায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীসহ উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার মানুষের ঢল নামে। কর্মসূচি থেকে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বক্তারা। ৪৮ ঘণ্টার কর্মসূচির সমাপনী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, উত্তরাঞ্চলের পানির ন্যায্য হিস্যা বঞ্চিত এই মানুষরা আজকে সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চায়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫৪টি যে অভিন্ন নদী- এই নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তি কারও কোনো করুণার বিষয় নয়। এটা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রাপ্য। অথচ তিস্তা নদীর ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য আজকে আমাদের আন্দোলন করতে হচ্ছে।

মঙ্গলবার তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির উদ্যোগে তিস্তা রেলসেতু লালমনিরহাট পয়েন্টে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে গত সোমবার থেকে ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলায় ১১টি পয়েন্টে দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি একসঙ্গে শুরু হয়। পদযাত্রাটি লালমনিরহাট প্রান্তের তিস্তা ব্রিজ থেকে শুরু হয়ে রংপুরের কাউনিয়া বাজারে গিয়ে শেষ হয়। তিস্তা বিস্তৃত রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের ১১টি পয়েন্টে স্মরণকালের এই বৃহৎ কর্মসূচিতে যোগ দেন এ অঞ্চলের সর্বস্তরের লাখো মানুষ। প্রথম দিনের মতো সমাপনী দিনেও সকাল থেকেই ১১টি পয়েন্টে সমাবেশ, পদযাত্রা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনার আয়োজন করে ‘তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটি’। সেইসঙ্গে প্রতিবাদ হিসেবে দেশীয় সংগীত, নৃত্য, খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হয়।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, এই পানি বণ্টন নিয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে অপ্রতিবেশীমূলক আচরণ করেই চলেছে। আজকে প্রায় ৫০ বছর হলো ফারাক্কার অভিশাপ থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পায় নাই। এখন তিস্তা বাংলাদেশের জন্য আরেকটা অভিশাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সব আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আমাদের প্রতিবেশী উজানের গজলডোবায় একটা বাঁধ নির্মাণ করেছে। এটা করে তিস্তার স্বাভাবিক এই পানি প্রবাহকে তারা নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে। তাদের এই অপ্রতিবেশীমূলক আচরণের কারণে আজকে উত্তরাঞ্চলের এই কোটি জনগণ বন্যায়, খরায় দুর্বিষহ জীবন পার করছে। পানির অভাবে তিস্তার বুকে আজকে ধু-ধু বালুচর। একদিকে পানির অভাবে নষ্ট হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল। আবার  হঠাৎ করেই উজান থেকে ছেড়ে দিচ্ছে পানি! সেই পানির কারণে বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে সাধারণ মানুষের ঘর-বাড়ি। শস্যের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় লাখ কোটি টাকার।
বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে চুক্তির প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ মনে করে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে প্রয়োজনে সকল অন্যায্য এবং একতরফা যে সকল চুক্তি, এগুলোর পুনর্মূল্যায়ন কিংবা পুনর্বিবেচনা করা দরকার। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’- আমাদের পররাষ্ট্রনীতির এটাই মূলনীতি। কিন্তু সময়ের প্রয়োজনে এই নীতিটি পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী ভারত যদি পানির ন্যায্য হিস্যা না দেয় কিংবা দিতে যদি দেরি করে এবং তিস্তা চুক্তি করতে অনীহা দেখায় তাহলে দেশ ও জনগণের স্বার্থে আমাদেরই আমাদের পথ খুঁজে নিতে হবে। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য জাতিসংঘসহ সংশ্লিষ্ট সকল আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে বাংলাদেশের দাবি তুলে ধরতে হবে। একইসঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গেও আমাদের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে হবে। আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলকে মরূকরণ থেকে বাঁচাতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। বিএনপি জনগণের সমর্থনে রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব পেলে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, গণতান্ত্রিক দলগুলোর পক্ষ থেকে জাতীয় নির্বাচনের কথা শুনলেই অন্তর্বর্তী সরকারের কেউ কেউ বিচলিত হয়ে ওঠেন। আমাদের অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন, জাতীয় নির্বাচন নিয়ে একেক উপদেষ্টার একেক রকমের বক্তব্য এই খুনি ও মাফিয়া চক্রের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পথ সুগম করে দেয়। এজন্য বিএনপি বারবার এই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি তাদের কর্মপরিকল্পার রোডম্যাপ ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে।  

ওদিকে দ্বিতীয়দিনের কর্মসূচিতেও সকাল থেকেই তিস্তা নদীর তীরে নামে মানুষের ঢল। তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নসহ পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের দাবিতে স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে তিস্তার দুই পাড়ের এই সমাবেশস্থল। তিস্তাপাড়ে হাজারো মানুষ ‘জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই’ স্লোগান সম্বলিত পতাকাসহ ব্যানার, পোস্টার, ফেস্টুন ও প্ল্যাকার্ড হাতে জড়ো হন। এই পদযাত্রায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীসহ তিস্তাপাড়ের সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন তিস্তা রক্ষা আন্দোলন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক বিএনপি’র রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু।

সমাপনী সমাবেশে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, পানি সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে তিস্তা নিয়ে ভারত আমাদের ব্ল্যাকমেইল করতে না পারে। আর আগামীদিনে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে কোনো রকম নাক গলাবেন না। আমার দেশ, আমরা সমস্যা। আমরাই সমাধান করবো। সেক্ষেত্রে বিদেশিদের যদি পরামর্শ প্রয়োজন হয়, সেটা আমরা নেবো।
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আজকে তিস্তাকে দেখে আমার হৃদয়ে রক্তরক্ষণ হচ্ছে। পানির অভাবে এই অঞ্চলে ১৫ লাখ টন চাল কম উৎপাদন হচ্ছে। আর আজকে তিস্তার পানি কেন নাই, কারণ উজান থেকে যে পানি আসছে সেটাকে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ন্যায্য পানি পাওয়া থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। আর অপেক্ষা করা সম্ভব না। যেকোনো উপায়ে তিস্তার পানি প্রবাহিত করতে হবে।

বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এই পানি আমাদের ন্যায্য অধিকার। এটা আমাদের মানবাধিকার। কিন্তু তিস্তা নদী একতরফাভাবে প্রবাহিত করে ভারত মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।
বিএনপি’র রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলুর সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন রংপুর বিভাগীয় বিএনপি’র সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল খালেক প্রমুখ।

তিস্তার তীরে লক্ষাধিক মানুষের ৪৮ ঘণ্টার অবস্থান
‘কোনঠে সগায়, জাগো বাহে তিস্তা বাঁচাই।’ স্লোগানে, স্লোগানে মুখোরিত তিস্তা নদী অঞ্চল। গতকাল মঙ্গলবার তিস্তা নদীতে নেমে প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান  আন্দোলনকে ঘিরে তিস্তার তীরে লক্ষাধিক মানুষের ঢল। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে উত্তাল রংপুর অঞ্চলের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুরসহ পাঁচ জেলা। কৃষক, জেলে, শ্রমিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সর্বস্তরের পদচারণায় মুখোরিত ছিল তিস্তারপাড়। এ যেন এক মিলনমেলা। অন্যরকম দৃশ্য। দুই দিনব্যাপী তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের শেষ দিনেও তিস্তা বেষ্টিত এলাকায় ১১ পয়েন্টে সাজ-সাজ রব। পাঁচ জেলার সর্বস্তরের জনগণ তিস্তা অভিমুখে পদযাত্রা এবং নদীর দুই তীরে ২৩০ কিলোমিটার জুড়ে অবস্থান কর্মসূচি, বিভিন্ন রঙ-বেরঙে সাজানো চোখ ধাঁধানো দৃশ্য। দিন-রাত উৎসবমুখর পরিবেশকে ঘিরে ভাওয়াইয়া গান, পালাগান, পল্লী গীতি, জারিগান, ব্যান্ডপার্টি, বাঁশির সুর, তিস্তাপাড়ের মানুষদের নিয়ে নাটক, হস্তশিল্প, কুটির শিল্পসহ বিভিন্ন স্টল ও দোকানপাট গড়ে উঠেছে। চলছে সমান তালে বেচাকেনা। রাত্রী যাপনের জন্য টাঙানো হয়েছে শত শত তাঁবু। নারীদের জন্য রয়েছিল আলাদা ব্যবস্থা। আন্দোলনে আসা একজোট জনতার এক রঙের টি-শার্ট, মাথায় ক্যাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। ৪৮ ঘণ্টার আন্দোলনের আগের দিন থেকে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষজন গুড়, চিঁড়া, মুড়ি, খই পুঁটলিতে বেঁধে নিয়ে আসেন খাওয়ার জন্য। আয়োজক কমিটির উদ্যোগে ২৫ হাজার মানুষের জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল। তিস্তা রক্ষা ও মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে যেন সবাই এক। চোখে-মুখে নতুন স্বপ্ন। তিস্তা ফিরবে আগের রূপে।

mzamin

Thursday, October 17, 2024

‘মেগা বাঁধ’ ঘিরে চীন-দিল্লি উত্তেজনা by রিতু শর্মা

ইয়ারলুং সাংপো নদীতে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ‘মটুও মেগা-ড্যাম’ নির্মাণ করে চীন ভারতের দিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। এই ইয়ারলুং সাংপো নদী ভারতে ব্রহ্মপুত্র নদী নামে পরিচিত। গালওয়ান সংঘর্ষের পরবর্তী সময়ে নয়াদিল্লি উদ্বিগ্ন যে বাঁধটি বেইজিংকে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা দেবে। এটি চীন, ভারত, ভুটান ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশগুলোর আনুমানিক ১.৮ বিলিয়ন মানুষকে পানি সরবরাহ করে।

মেগা ড্যামটি সাংপোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য চীন যে সিরিজ বাঁধ তৈরি করেছে এটি তার সম্প্রসারিত অংশ। চীনের ‘মাদার অব অল ড্যামস’-এর কারণে   নদী প্রবাহ বাধা পেতে পারে এবং বর্ষাকালে কৃত্রিম বন্যা দেখা দিতে পারে। গোটা পরিস্থিতি দেখে উদ্বিগ্ন ভারত, এজন্য অরুণাচলের সিয়াং জেলার সিয়াং নদীতে ১১ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। বাঁধের নকশায় বর্ষাকালে ৯ বিলিয়ন কিউবিক মিটারের বেশি পানির একটি ‘বাফার স্টোরেজ’ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি একটি রিজার্ভ হিসেবে কাজ করবে, যখন পানির প্রবাহ হ্রাস পাবে বা চীন হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে অরুণাচল ও আসামের নিম্নধারার অঞ্চলগুলোর জন্য বাফার হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত বাঁধের লক্ষ্য হলো একটি নদী প্রধান রাজ্য হিসাবে ভারতের পানিবন্টন অধিকারকে শক্তিশালী করা।

ভারতের আশঙ্কা অমূলক নয়। ২০২১ সালে চীন পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই তিন সপ্তাহের জন্য মেকং নদীর পানি প্রবাহ ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। বিদ্যুৎ লাইন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নদী প্রবাহকে দৃশ্যতভাবে হ্রাস করা হয়েছিল। এটি কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে নদীর পাশে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষকে প্রভাবিত করেছিল। ২০১৯ সালে মেকং নদীর উপরিভাগে অবস্থিত চীনের বাঁধগুলো রেকর্ড পরিমাণ পানি ধরে রেখেছে, এমনকি আর্দ্র মৌসুমে এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বেশি হলেও এই বাঁধ পানি ধরে রেখে নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছে। ফলস্বরূপ, নিম্নধারার দেশগুলো আর্দ্র মৌসুমে খরার সম্মুখীন হয়েছে।

২০১৯ সাল থেকে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম সবচেয়ে গুরুতর এবং দীর্ঘায়িত খরার সম্মুখীন হয়েছে। এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। কৃষকরা ফসল হারিয়েছে, মাছের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে এবং জলাশয়ের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এখন ইয়ারলুং সাংপো বিশ্বের বৃহত্তম ট্রান্সন্যাশনাল নদী ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে একটি। দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের কিংহাই-তিব্বত মালভূমিতে এর উৎস। হিমালয় হয়ে দক্ষিণ তিব্বতজুড়ে ২৯০০ কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে এই নদী প্রবাহিত হয়। এটি আসাম ও অরুণাচল প্রদেশের (যা চীন দক্ষিণ তিব্বত বলে দাবি করে) মধ্য দিয়ে ভারতে প্রবেশ করে, সেখানে এটি ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত।

সিয়াং ব্রহ্মপুত্রের একটি উপনদী। ২০১৭ সালে সিয়াং-এর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল এবং পানীয়ের অনুপযোগী হয়ে উঠেছিল। কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করে মানুষের জীবন-জীবিকার ক্ষতি করেছিল। এর জন্য ভারতীয় কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে চীনকে দায়ী করেছেন। তা সত্ত্বেও চীন এই অভিযোগগুলো অতিরঞ্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীতে বাঁধ নির্মাণের ফলে চীন নিচের দিকে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। রিপাবলিক অব কোরিয়ার দক্ষিণ পার্লি পলিসি ইনিশিয়েটিভের উপদেষ্টা নীরজ সিং মানহাস ইউরো এশিয়ান টাইমসকে বলেছেন, চীন ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে পানিকে ব্যবহার করতে পারে। সম্ভাব্যভাবে সেচ, বিদ্যুৎ উৎপাদন বা বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য পানির স্তরকে হেরফের করে ভারত ও বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে চীন।

নীরজ সিং মানহাসের মতে, প্রধান নদীগুলোর পানি নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে নিম্নধারার দেশগুলোর সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে চীন নিজের ভূমিকা খাটাতে পারে। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান মোতাবেক এর বেশিরভাগ পানি চীন থেকে প্রবাহিত নদী থেকে উদ্ভূত, যার জেরে ভারত অসুবিধার সম্মুখীন। ভারত তার কৃষি ও পানি সুরক্ষার জন্য উজানের প্রবাহের উপর নির্ভরশীল, আর তাই চীনের কাছ থেকে হুমকির সম্মুখীন হতে পারে ভারত। মানহাস সিয়াং-এ বাঁধ নির্মাণের জন্য ভারতের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে কৌশল হিসেবে দেখেন মানহাস। তিনি মনে করেন, পানির অধিকার নিশ্চিত করতে এবং চীনের উপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ন্যাশনাল হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশন আপার সিয়াং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্মাণ করবে ভারত।

কেন্দ্রীয় সরকারের থিঙ্ক ট্যাংক নীতি আয়োগ দ্বারা ২০১৭ সালে বাঁধ নির্মাণের প্রথম প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিলো-এটি ১০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসহ দেশের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে। এনএইচপিসি সিয়াং নদীর তীরে তিনটি স্থান নির্বাচন করেছে। উগেং, ডিত্তে ডিমে ও পারং-এই এলাকায় বাঁধটি সম্ভব কিনা তা মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বাঁধের সম্ভাব্য ব্যয় এবং এই এলাকায় এটি নির্মাণ করা যাবে কিনা তা মূল্যায়ন করা হয়েছে। সমীক্ষার সময় শিলা পৃষ্ঠের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য ২০০ মিটার গভীর গর্ত খনন করা হয়েছে। তবে বাঁধটি স্থানীয় জনগণের যথেষ্ট বিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে।

হিমালয়ে পানি যুদ্ধ

ইয়ারলুং সাংপো তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ এবং আসামে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার অঞ্চলজুড়ে প্রবাহিত এবং তারপর বাংলাদেশের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে মেশে। এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ নদী, যা গড়ে ৪ হাজার মিটার উচ্চতায় বয়ে চলেছে। গত কয়েক বছর ধরে চীন জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নদীটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে গ্রেট বেন্ড নামে পরিচিত নদীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রস্তাবিত মেগা বাঁধটি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। বাঁধের স্থানটি ভারতের অরুণাচল প্রদেশ রাজ্যের বিতর্কিত সীমান্তের কাছে হিমালয়ের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে নদীটি ইউটার্ন নেয়। এখানে ভারতের দিকে গতিপথ পরিবর্তন করার আগে ৫০ কিলোমিটারের মধ্যে নদীর উচ্চতা ২৭০০মিটার নেমে গেছে। চীন দাবি করছে, ২০৩০ সালের আগে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্য করার লক্ষ্য নিয়ে তিব্বতের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি ও পানির ঘাটতি পরিচালনা করার জন্য এই প্রকল্পটি তৈরি করা হচ্ছে।

কিন্তু বাঁধ নির্মাণও ভূ-রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। ২০১৬ সালে ভারত-চীন সীমান্তের কাছে তিব্বতে অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র উপনদী জিয়াবুকু নদীর প্রবাহে বাধা দেয় চীন। লালহো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে নদীর গতিপথ বাধা পায়। এটি এমন এক সময়ে ঘটেছিলো, যখন ভারত উরি হামলার পর পাকিস্তানের সাথে সিন্ধু পানিবন্টন চুক্তির পর্যালোচনার কথা ভাবছিল।

একটি গবেষণাপত্রে মানহাস ও ড. রাহুল এম. লাড দাবি করেছেন, এই প্রবণতাটি আন্তঃসীমান্ত পানি সম্পদের সম্ভাব্য ‘অস্ত্রীকরণ’কে নির্দেশ করে, যা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় যেখানে বাংলাদেশের লক্ষাধিক মানুষ বসবাস করে, সেখানেও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে বিরূপ প্রভাব পড়বে।

ভারতের সঙ্গে ডোকলাম অচলাবস্থার পর পূর্বের চুক্তি সত্ত্বেও চীন হঠাৎ ব্রহ্মপুত্র নদের জন্য জলবিদ্যুৎ সংক্রান্ত তথ্য শেয়ার করা বন্ধ করে দিয়েছে। বিপরীতে চীনের কাছ থেকে নিরবচ্ছিন্ন তথ্য পাচ্ছে বাংলাদেশ। চীনের এই আচরণ দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে পানি সম্পদকে ব্যবহারের অভিপ্রায়কে প্রতিফলিত করে।

লেখক: রিতু শর্মা। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ে লিখেছেন। তিনি জার্মানির এরফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কনফ্লিক্ট স্টাডিজ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অব পিস-এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

সূত্র: ইউরেশিয়ান টাইমস

mzamin

Saturday, September 7, 2024

তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান করতে হবে -অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস

তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে মতপার্থক্য দূর করতে সরকার কাজ করবে উল্লেখ করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য দূর করতে তার সরকার কাজ করবে। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকায় কোনো দেশেরই লাভ হচ্ছে না। ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি। ঢাকায় নিজ সরকারি বাসভবনে এই সাক্ষাৎকার দেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের সমস্যা অবশ্যই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সমাধান করা উচিত। বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশগুলোর এ বিষয়ে অধিকার রয়েছে। আমাদের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। পানিবণ্টন ইস্যুটি ঝুলিয়ে রেখে কোনো উদ্দেশ্য সাধন হচ্ছে না উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভাটির দেশগুলোর কিছু অধিকার আছে এবং আমরা সেই অধিকার চাই। এই ইস্যুটি (পানিবণ্টন).... ঝুলিয়ে রেখে কোনো উদ্দেশ্য সাধন হচ্ছে না। আমি যদি জানি, আমি কতটুকু পানি পাব, সেটা ভালো হতো।

এমনকি পানির পরিমাণ নিয়ে যদি আমি খুশি নাও হই, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। এই বিষয়টি সমাধান হতেই হবে। দ্রুত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির জন্য ভারতকে অন্তর্বর্তী সরকার চাপ দেবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘চাপ একটি বড় শব্দ। আমি এটা বলছি না। তবে আমাদের একসঙ্গে বসে সমাধান করতে হবে। তিনি বলেন, এটা নতুন কোনো সমস্যা নয়, অনেক পুরনো সমস্যা। এ বিষয়ে আমরা একাধিকবার কথা বলেছি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় পাকিস্তান আমলে। আমরা সবাই চেয়েছিলাম এই চুক্তি হোক, এমনকি ভারত সরকারও এর জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমাদের এটি সমাধান করতে হবে। সমপ্রতি বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভয়াবহ বন্যার জন্য ভারতকে দায়ী করে ঢাকার গণমাধ্যমের খবরের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের সংকটে আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একসঙ্গে কাজ করে এর সমাধান করতে পারি।

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণ করার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সাক্ষাৎ করেন। বিষয়টি তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভারতের হাইকমিশনার যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, আমি বলেছি যে কীভাবে বন্যা মোকাবিলা করা যায় সে ব্যাপারে আমরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারি। দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের সমন্বয়ের জন্য কোনো চুক্তিরও প্রয়োজন নেই। মানবিক দিক বিবেচনা করেই এই সমস্যা সমাধানে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি। কেননা, এটি গণমানুষের দুর্দশা লাঘব করবে। এ ধরনের মানবিক পদক্ষেপ সত্যিকার অর্থেই সহায়তা করবে। সীমান্ত হত্যার নিন্দা জানিয়ে ড. ইউনূস বলেন, হত্যাকাণ্ড কোনো সমাধান নয়। কাউকে হত্যা করা কোনো সমাধান নয় কারণ এটি মোকাবিলার আইনি উপায় রয়েছে। সীমান্ত হত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সীমান্ত হত্যা একতরফা ব্যাপার। আপনার দেশ দখলের জন্য কেউ সীমান্ত অতিক্রম করছে না। এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। এছাড়া দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) চেতনার পুনরুজ্জীবন হওয়া দরকার বলে মনে করেন ড. ইউনূস। পিটিআই’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, আটটি  দেশের এ জোট আঞ্চলিক অনেক সমস্যার সমাধানে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। একটি মহৎ উদ্দেশ্যে সার্ক প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি এখন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ, এর কোনো দৃশ্যমান কার্যকারিতা নেই। দক্ষিণ এশিয়ার ৮টি দেশ নিয়ে গঠিত এই সংস্থার সদস্য দেশগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান। ড. ইউনূস বলেছেন, তিনি এই মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সার্বিক বিষয়ে আলাপ করার চেষ্টা করবেন। তিনি সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের একত্র করার চেষ্টা করবেন বলেও উল্লেখ করেন। পিটিআই’কে প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন অবশ্যই, আমরা (প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির) সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করবো।

সার্কভুক্ত দেশগুলোর সব রাষ্ট্রপ্রধান একত্রিত হয়ে একটি ছবি তোলার চেষ্টা করবো। সার্ক একটি মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য গঠিত হয়েছিল। এটি এখন কেবল কাগজে-কলমে বিদ্যমান। আমরা সার্কের নাম ভুলে গেছি, আমি সার্কের চেতনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি। জাতিসংঘ কর্তৃক জারি করা বক্তাদের একটি অস্থায়ী তালিকা অনুসারে প্রধানমন্ত্রী মোদির ২৬শে সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে। সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশন ২৪শে সেপ্টেম্বর শুরু হবে। চলবে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ইউনূস বলেন, অনেকদিন সার্ক সম্মেলন হচ্ছে না। আমরা যদি একত্র হই তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে। আঞ্চলিক এই সংস্থাকে সক্রিয় করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নেপাল, যা ২০১৬ সালের পর থেকে খুব একটা কার্যকর নয়। সে বছর সার্কের শীর্ষ সম্মেলন ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই বছরের ১৮ই সেপ্টেম্বর জম্মু ও কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনা ক্যাম্পে ‘সন্ত্রাসী’ হামলার পর, ভারত বিরাজমান পরিস্থিতিতে শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করে। বাংলাদেশ, ভুটান এবং আফগানিস্তানও ইসলামাবাদ বৈঠকে অংশ নিতে অস্বীকার করার পরে শীর্ষ সম্মেলনটি স্থগিত করা হয়েছিল।  নোবেলজয়ী ইউনূস উল্লেখ করেছেন যে, সার্কের মতো আঞ্চলিক স্বার্থে গঠিত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন যদিও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে অনেক কিছু অর্জন করেছে, সেক্ষেত্রে সার্ক এখনও তেমন কিছুই অর্জন করতে পারেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের দেশগুলো অনেক কিছু অর্জন করেছে। ড. ইউনূস বলেছেন- সার্ক যাতে কাজ করে তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে তাকান এবং এটি কতটা উজ্জ্বলভাবে কাজ করছে। পাকিস্তানের ব্যাপারে কোনো সমস্যা হলে, অন্য উপায়ে কাজ করা যেতে পারে। কিন্তু সার্কের কার্যক্রম বন্ধ করা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।

২০১৬ সালের পর থেকে সংস্থাটি কার্যকর নয় কারণ ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে যে দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল তা অনুষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ইউনূস বলেছিলেন যে, তিনি মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে রাজি করার জন্য ভারতের সঙ্গে কাজ করবেন। ড. ইউনূস আরও বলেন, সংকট মোকাবিলায় ঢাকার ভারত ও চীন উভয়ের সহায়তাই প্রয়োজন।  রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের জন্য আমাদের ভারত ও চীনের সাহায্য দরকার। প্রায় এক মিলিয়ন মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। কিছু এ পর্যন্ত যারা মিয়ানমারে ফিরে গেছে তাদের সংখ্যা খুব সামান্য। ভারতের মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে,  রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারকে রাজি করাতে বাংলাদেশের ভারতের সাহায্য প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন ড. ইউনূস। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নৃশংস সামরিক দমন-পীড়নের পর ২০১৭ সালে এক মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল, যা জাতিসংঘ এবং অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা জাতিগত নিধন হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মূলত তাদের নাগরিকত্ব এবং  মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত।

Friday, September 6, 2024

তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান করতে হবে -পিটিআইকে প্রধান উপদেষ্টা

তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে মতপার্থক্য দূর করতে সরকার কাজ করবে উল্লেখ করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য দূর করতে তার সরকার কাজ করবে। বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকায় কোনো দেশেরই লাভ হচ্ছে না।

ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি। ঢাকায় নিজ সরকারি বাসভবনে এই সাক্ষাৎকার দেন ড. ইউনূস।

তিনি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের সমস্যা অবশ্যই আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সমাধান করা উচিত। বাংলাদেশের মতো ভাটির দেশগুলোর এ ব্যাপারে অধিকার রয়েছে। আমাদের আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

পানিবণ্টন ইস্যুটি ঝুলিয়ে রেখে কোনো উদ্দেশ্য সাধন হচ্ছে না উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ভাটির দেশগুলোর কিছু অধিকার আছে এবং আমরা সেই অধিকার চাই। এই ইস্যুটি (পানিবণ্টন) ঝুলিয়ে রেখে কোনো উদ্দেশ্য সাধন হচ্ছে না। আমি যদি জানি, আমি কতটুকু পানি পাব, সেটা ভালো হতো। এমনকি পানির পরিমাণ নিয়ে যদি আমি খুশি নাও হই, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। এই বিষয়টি সমাধান হতেই হবে।'

দ্রুত তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির জন্য ভারতকে অন্তর্বর্তী সরকার চাপ দেবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘চাপ একটি বড় শব্দ। আমি এটা বলছি না। তবে আমাদের একসঙ্গে বসে সমাধান করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘এটা নতুন কোনো সমস্যা নয়, অনেক পুরনো সমস্যা। এ বিষয়ে আমরা একাধিকবার কথা বলেছি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয় পাকিস্তান আমলে। আমরা সবাই চেয়েছিলাম এই চুক্তি হোক, এমনকি ভারত সরকারও এর জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। আমাদের এটি সমাধান করতে হবে।’

সম্প্রতি বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে ভয়াবহ বন্যার জন্য ভারতকে দায়ী করে ঢাকার গণমাধ্যমের খবরের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের সংকটে আমরা মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একসঙ্গে কাজ করে এর সমাধান করতে পারি।’

অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণ করার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা সাক্ষাৎ করেন। বিষয়টি তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভারতের হাইকমিশনার  যখন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসেন, আমি বলেছি যে কীভাবে বন্যা মোকাবিলা করা যায় সে ব্যাপারে আমরা আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারি। দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের সমন্বয়ের জন্য কোনো চুক্তিরও প্রয়োজন নেই। মানবিক দিক বিবেচনা করেই এই সমস্যা সমাধানে আমরা একসঙ্গে কাজ করতে পারি। কেননা, এটি গণমানুষের দুর্দশা লাঘব করবে। এ ধরনের মানবিক পদক্ষেপ সত্যিকার অর্থেই সহায়তা করবে।’

সীমান্ত হত্যার নিন্দা জানিয়ে  ড. ইউনূস বলেন, ‘হত্যাকাণ্ড কোনো সমাধান নয়। কাউকে হত্যা করা কোনো সমাধান নয় কারণ এটি মোকাবিলার আইনি উপায় রয়েছে।’

সীমান্ত হত্যা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সীমান্ত হত্যা একতরফা ব্যাপার। আপনার দেশ দখলের জন্য কেউ সীমান্ত অতিক্রম করছে না। এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।’

Monday, June 4, 2018

তিস্তার বরফ গলছে নাকি দিল্লি বহুদূর? by আমীন আল রশীদ

কলকাতা থেকে দিল্লির দূরত্ব এক হাজার ৪৯০ কিলোমিটার। কিন্তু ঢাকা থেকে কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৩১৩ কিলোমিটার। তার মানে কলকাতার জন্য দিল্লির চেয়ে ঢাকা অনেক বেশি নিকটবর্তী। এই দূরত্বের সমীকরণ মাথায় রেখে আমরা বাংলাদেশ-ভারতের অমীমাংসিত সমস্যা, বিশেষ করে অভিন্ন নদী তিস্তার পানি বণ্টনের রাজনীতিটা বোঝার চেষ্টা করতে পারি।
সবাই জানেন, তিস্তা এখন আর বাংলাদেশ-ভারত কিংবা হাসিনা-মোদির ইস্যু নয়। বরং এটি ঘুরপাক খাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার এবং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক টানাপড়েনের বৃত্তে। যে কারণে ঢাকা-কলকাতার দূরত্ব ৩১৩ কিলোমিটার হলেও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি অনেক সময়ই ‘দিল্লি বহুদূর’ বলেই প্রতীয়মান হয়।
এই বাস্তবতার পরও আমরা আশাবাদী হই। বিশেষ করে যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বন্ধুসুলভ বক্তৃতা দেন।
বিশ্বকবির প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে হাসিনা-মোদি ও মমতা একই সুরে এবং বন্ধুসুলভ বক্তৃতা দিয়েছেন। সেখানে পলিটিক্যাল রেটোরিক কিংবা বাহুল্য যাই থাকুক না কেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ইতিহাসে ২০১৮ সালের ২৫ মে তারিখটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। মনে রাখা দরকার, দিনটি ছিল বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী এবং যাঁর জন্ম এই পশ্চিমবঙ্গেই।
উল্লেখ করার মতো বিষয়, কোনও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে দুটি দেশের প্রধামন্ত্রী এবং একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিও বিরল ঘটনা। এটি বাংলাদেশ-ভারতের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বেরই নিদর্শন, যে নিদর্শনের একটি বড় স্থাপনা বাংলাদেশ ভবন। কবিগুরুর প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতনে এই ভবনটি শুধু বাংলাদেশেরই প্রতিনিধিত্ব করবে এমন নয়, বরং দু’দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্কের একটি বড় প্রতীক হয়ে থাকবে।
মমতা বলেছেন, বাংলাদেশ সম্মত হলে তারা পশ্চিমবঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি ভবন করতে চান। তার মানে বাংলাদেশ-ভারত বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গ, যার সঙ্গে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির মিল অনেকখানি, সেই রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্কের নদীতে যদি একটু জোয়ার আসে, তাহলে একসময় তিস্তার জল নিয়ে এই বাংলার শুষ্ক মৌসুমে হাহাকার হবে না বলেই প্রত্যাশা করা যায়।
বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে নরেন্দ্র মোদি তার ভাষণে বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার স্থল সীমানার মতো জটিল সমস্যার সমাধান হয়েছে; যা একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হতো। উপকূলীয় অঞ্চলে নৌ চলাচল ও যোগাযোগে দুই দেশের সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে মোদি বলেছেন, ভারত বাংলাদেশের ২০২১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সব রকম সহযোগিতা করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অন্যান্য দেশের জন্য একটি শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার বিষয় বলেও মোদি উল্লেখ করেন।
একই অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, অতীতে অনেক জল গড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও গড়াবে, তবে আমি মনে করি দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরো জোরদার হবে। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত বন্ধুত্ব বিশ্বের জন্য ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে যখনই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কথা ওঠে, জোরেশোরে সামনে আসে তিস্তা ইস্যুটি। ভারতের সঙ্গে এরকম আরও অনেক অভিন্ন নদী থাকলেও তিস্তা এখন একটি সিম্বলে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ তিস্তা চুক্তিটা করে ফেলতে পারলে সেটি আওয়ামী লীগের কূটনৈতিক সাফল্যে যেমন আরও একটি পালক যুক্ত করবে, তেমনি এই সাফল্যের কৃতিত্ব নেবে ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপিও। সমস্যাটা এখানেই। তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুতে প্রধান স্টেকহোল্ডার যে পশ্চিমবঙ্গ, তারা ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রতিপক্ষ। আগামী নির্বাচনে বিজেপিকে হারানোর ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন মমতা। সুতরাং বিজেপির আমলে তিস্তাচুক্তি হয়ে গেলে তাতে বিজেপির যে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সাফল্য আসবে, মমতা সেই পালে হাওয়া দেবেন কিনা, সেটি একটি বড় প্রশ্ন। অর্থাৎ রাজনীতিটা এখন কেন্দ্র বনাম রাজ্যের; তৃণমূল কংগ্রেস বনাম বিজেপির। সেই জটিল সমীকরণ আর রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে তিস্তা শেষ পর্যন্ত দিল্লি বহুদূর হয়েই থাকবে নাকি বিশ্বভারতীর সমাবর্তনে তিন নেতা যেরকম বন্ধু ও সুপ্রতিবেশীসুলভ বক্তৃতা দিয়েছেন, কূটনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটবে, তা দেখার জন্য আমাদের হয়তো বাংলাদেশ ও ভারতের আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
তবে এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নদী বিগত কয়েক বছরে যথেষ্ট বেগবান হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় শান্তিনিকেতনে দুজন প্রধানমন্ত্রী এবং একজন মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে, যে টোনে, যে ভাষায় পরস্পরকে সম্বোধন করে কথা বলেছেন, সেটি অত্যন্ত ইতিবাচক। কূটনীতিতে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে হাসিনা-মোদি ও মমতার যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আমরা দেখেছি, তাতে আগামীকালই অমীমাংসিত সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে এমনটি না ভাবলেও, দুদেশের সম্পর্ক যে ভালো যাচ্ছে, তাদের কথাবার্তায় সেটির ইঙ্গিত ছিল।
বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক নদী বলে এই নদীর জলে বাংলাদেশের যে অধিকার, ভারতেরও তাই। সুতরাং আমরা চাইলেই তারা তিস্তা চুক্তি করে ফেলবে এবং আমাদের খরার মৌসুমে গলগল করে পানি ছেড়ে দেবে, বিষয়টি এত সহজে হবে না। ফলে অভিন্ন নদীর চুক্তি হওয়া যেমন জরুরি, তার আগে জরুরি যেসব রাজ্য ও অঞ্চলের ভেতর দিয়ে নদীটি প্রবাহিত, সেই অঞ্চলসমূহের মানুষ যাতে চুক্তির বিরোধিতা না করে বা এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা। অর্থাৎ সম্পর্ক ভালো হলে এবং সমঝোতা হলে শুধু নদীর পানি কেন, আরও অনেক কিছুই আদান-প্রদান সম্ভব।
লেখক: সাংবাদিক
আমীন আল রশীদ

Friday, February 12, 2016

তিস্তার পানি কমছেই, দিল্লির সাড়া নেই by রাহীদ এজাজ

বাংলাদেশে তিস্তা নদীর পানির প্রবাহ সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এতে তিস্তার পানিনির্ভর এলাকায় সেচকাজসহ আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
অভিন্ন নদীটির পানি বণ্টনে দ্রুত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি সইয়ের জন্য ভারতকে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের সেচ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত এবং নদী রক্ষার লক্ষ্যে ‘যুক্তিসংগত’ ও ‘ন্যায়সংগত’ পরিমাণ পানি দিতে দিল্লিকে অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। কিন্তু দিল্লি কোনো সাড়া দিচ্ছে না।
যৌথ নদী কমিশনের (বাংলাদেশ) উপাত্ত বিশ্লেষণ করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল বুধবার সকালে প্রথম আলোকে বলেন, চলতি বছরের পুরো জানুয়ারি এবং ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিনে ডালিয়া পয়েন্টে যে পানি পাওয়া গেছে তার ১৯৭৩-৮৫ সময়কালের গড়ে পানি প্রবাহের মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফেব্রুয়ারিতে প্রবাহ আরও কমছে। পশ্চিমবঙ্গে গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণ শুরুর আগে ১৯৭৩-৮৫ সময়কালে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার পানির প্রবাহ বেশ ভালো ছিল বলে তুলনার জন্য ওই সময়কালের হিসাব উল্লেখ করা হয়।
ডালিয়া পয়েন্টে ১৯৭৩-৮৫ সময়কালে জানুয়ারির প্রথম ১০ দিন, দ্বিতীয় ১০ দিন ও শেষ ১০ দিনে গড়ে পানির প্রবাহ ছিল যথাক্রমে ৭০১০, ৬০১০ ও ৫৬৬৮ কিউসেক। এ বছরের জানুয়ারির প্রথম ১০ দিন, দ্বিতীয় ১০ দিন ও শেষ ১০ দিনে পানির প্রবাহ ছিল যথাক্রমে ২৩৮৪, ১৭৬০ ও ১১৯০ কিউসেক। চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে এ প্রবাহ ১ হাজার কিউসেকে নেমে এসেছে। ১৯৭৩-৮৫ সময়কালে এই সময়ে পানির প্রবাহ ছিল ৫৯৮৬ কিউসেক।
জানতে চাইলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব জাফর আহমেদ খান গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, তিস্তার পানি কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে দ্রুত চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া অনুরোধ জানিয়ে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য ন্যায়সংগত পরিমাণ পানি ছাড়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে ওই চিঠিতে। এ ছাড়া সম্প্রতি পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি তুলেছেন। তিনি জানান, ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি কমে যাওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে বাংলাদেশ ডিসেম্বরে যে চিঠি দিয়েছে, ভারত এখনো তার কোনো জবাব দেয়নি।
এদিকে দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, ১ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের পররাষ্ট্রসচিবদের বৈঠকে তিস্তা নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো অগ্রগতি নেই। অভিন্ন নদীটির পানি বণ্টন চুক্তি সইয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তরিকতার বিষয়টি ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যকে আস্থায় নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের চুক্তি সইয়ের প্রক্রিয়ার বিষয়টিও এসেছে। ওই আলোচনা থেকে এমন আভাস পাওয়া গেছে যে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা খুব কম। এ বছরের এপ্রিলে শুরু হয়ে মে মাসে ওই নির্বাচন শেষ হওয়ার কথা।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আমাদের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জানান, যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) পরবর্তী বৈঠকে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে দুই দেশ বিস্তারিত কথা বলতে রাজি হয়েছে। বিশেষ করে চুক্তি সইয়ের আগে সেচকাজের জন্য পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যাপারে দুই দেশ কথা বলতে পারে। দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় পর এ বছরের মাঝামাঝি জেআরসির বৈঠক হতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
তিস্তা ৩৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে ভারতে প্রবাহিত ২৪৯ কিলোমিটার ও বাংলাদেশে ১১৭ কিলোমিটার। তিস্তার আওতায় মোট সেচ এলাকার পরিমাণ ১৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর। এর মধ্যে বাংলাদেশে ৭ দশমিক ৪৯ লাখ হেক্টর ও ভারতে ১২ দশমিক ১৪ লাখ হেক্টর।
শীতের শেষে এসে তিস্তা নদীর পানি শুকিয়ে হাঁটু পর্যন্ত বা কোথাও কোথাও আরও নিচে নেমে এসেছে। চর থেকে কাশফুলের শুকনো গাছ কেটে ঘোড়ার গাড়িতে চাপিয়ে নদীর বুক দিয়েই পাড়ি দিয়েছেন স্থানীয় এক বাসিন্দা। তিস্তার ডালিয়া পয়েন্ট থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর ঘাট থেকে গত মঙ্গলবার সকালে ছবিটি তুলেছেন মঈনুল ইসলাম

Wednesday, January 27, 2016

উত্তরাঞ্চলে দুই শ’ নদী ও এক হাজার বিল ভরাট- সেচ সঙ্কটে পাঁচ লাখ হেক্টর বোরোজমি

গ্রীষ্মকাল আসার আগেই পানিশূন্য
তাড়াশের নন্দকুজা নদী : জাকির আকন্দ
ভারত অভিন্ন নদীতে বাঁধসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ করে ইচ্ছেমতো পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে ভাটির বাংলাদেশের শত শত নদ-নদী, খাল, বিল, হাওর, বাঁওড়ে পর্যাপ্ত পানির প্রবাহ থাকছে না। বছরের পর বছর পলি জমে সঙ্কুচিত হচ্ছে বিল ও নদীগুলোর আয়তন। ফলে শুষ্ক মওসুমে উত্তরাঞ্চলের দুই শতাধিক নদী, শাখানদী, উপনদীসহ এক হাজারের বেশি বিল ভরাট হয়ে আবাদী জমিতে রূপান্তরিত হয়েছে। এতে নদী ও বিলনির্ভর প্রায় পাঁচ লাখ হেক্টর বোরোজমিতে সেচসঙ্কট দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, ১৯৬৪-৬৫ সালে দেশে হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ শুরু হয়। সেই সময় থেকে সেচের জন্য শ্যালো মেশিন ব্যবহার হয়ে আসছে। তখন নদী, বিল, জলাশয় থেকে শ্যালো মেশিনের সাহায্যে ফসলি জমিতে সেচ দেয়া হতো। ১৯৭৩ সালের পর থেকে ভারত অভিন্ন নদ-নদীতে নানা অবকাঠামো নির্মাণ করে পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। ফলে শুষ্ক মওসুমে পর্যাপ্ত পানিপ্রবাহ না থাকায় দেশের উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলো মরা পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া বছরের পর বছর নদ-নদী, খাল, বিল, জলাশয়ে পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেচকার্যক্রম সম্পূর্ণ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভশীল হয়ে পড়েছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের একসময়ের খড়স্রোতা নন্দকুজা, ভদ্রাবতী, সরস্বতী, ইছামতি, গুমানী, আত্রাই, গুড় নদী, করতোয়া, ফুলঝোর, তুলসী, চেঁচুয়া, ভাদাই, চিকনাই, বানগঙ্গা, ঝরঝরিয়া, কাকন, কানেশ্বরী, মুক্তাহার, কাকেশ্বরী, সুতিখালি, গোহালা, গাড়াদহ, স্বতী, ভেটেশ্বর, ধরলা, দুধকুমার, সানিয়াজান, তিস্তা, ঘাগট, ছোটযমুনা, নীলকুমার, বাঙ্গালী, বড়াই, মানস, কুমলাই, সোনাভরা, হলহলিয়া, জিঞ্জিরাম, বুড়িতিস্তা, যমুনেশ্বরী, মহানন্দা, টাঙ্গান, কুমারী, রতœাই, পুনর্ভবা, ত্রিমোহনী, তালমা, ঢেপা, কুরুম, কুলফি, বালাম, ভেরসা, ঘোড়ামারা, মালদহ, চারালকাঁটা, পিছলাসহ দুই শতাধিক নদী, শাখানদী ও উপনদী নব্যতা হারিয়ে মরা নদীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
এ ছাড়া পাবনা, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী জেলার ঘুঘুদহ বিল, গাজনার বিল, শিকর বিল, কাজলকুড়ার বিল, ধলকুড়া বিল, ইটাকাটা বিল, গন্ডার বিল, পাইকশার বিল, বেহুলার বিল, হাড়গিলার বিল, দীঘলাছড়ার বিল, বোছাগাড়ীর বিল, ইউসুফ খাঁর বিল, নাওখোয়া বিল, ঢুবাছরি বিল ও কাঁকড়ার বিলসহ সহস্রাধিক বিল শুকিয়ে সমতলভূমিতে পরিণত হয়েছে। একসময় এসব বিলে সারা বছরই পানি থাকত। আর এখন বছরের নয় মাসই পানি থাকে না। ফলে কৃষকেরা নানা রকম ফসলের আবাদ করছেন।
কুড়িগ্রামের ১৮২টি বিলের মধ্যে দীঘলাছড়ার বিল, বোছাগাড়ীর বিল, ইউসুফ খাঁর বিল, নাওখোয়া বিল, চুবাছরির বিল, কুশ্বার বিল, মেরমেরিয়ার বিল, চাছিয়ার বিল, হবিছরি বিল, পেদিখাওয়া বিল, কয়রার বিলসহ বেশির ভাগ বিলে ফসলের আবাদ হচ্ছে। অন্য বিলগুলোতে বছরের আট মাসের বেশি সময় পানি থাকে না। দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, লালমনিরহাট জেলার বিলগুলোর একই অবস্থা। চলনবিলে এক হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বেঁচে আছে ৩৬৮ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ৮৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় সারা বছর পানি থাকে। পানি শুকিয়ে গেলে বিলগুলো ফসলি জমিতে রূপান্তরিত হয়।
নদী-বিলের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় পাঁচ লাখ হেক্টর বোরোজমিতে সেচ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষিকাজ হয়ে পড়েছে গভীর-অগভীর নলকূপনির্ভর। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। খনন ও সংস্কারের অভাব, অপরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণ, বাঁধ দিয়ে মাছ চাষ ও বিল রক্ষায় পর্যাপ্ত উদ্যোগ না নেয়ায় উত্তরাঞ্চল থেকে নদী-বিলের অস্তিত্ব এক এক করে মুছে যাচ্ছে।
রাজশাহী ও রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলে দুই শতাধিক নদী ও সহস্রাধিক বিল শুকিয়ে যাওয়ায় ভূ-উপরিস্থ পানির অভাবে প্রায় ১২ লাখ হেক্টর এক ফসলি জমি তিন ফসলিতে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে পাবনা জেলায় এক লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর, সিরাজগঞ্জে ৯১ হাজার হেক্টর, রাজশাহী জেলায় ৯০ হাজার হেক্টর, নওগাঁ জেলায় এক লাখ ২০ হাজার হেক্টর, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮৭ হাজার হেক্টর, নাটোর জেলায় ৬৬ হাজার হেক্টর, বগুড়া জেলায় ৩১ হাজার হেক্টর, জয়পুরহাট জেলায় ১৪ হাজার হেক্টর, গাইবান্ধায় ৬৯ হাজার হেক্টর, রংপুর জেলায় ৬৭ হাজার হেক্টর, নীলফামারী জেলায় ৬৭ হাজার হেক্টর, লালমনিরহাট জেলায় ৫১ হাজার হেক্টর, কুড়িগ্রাম জেলায় এক লাখ হেক্টর, দিনাজপুর জেলায় এক লাখ ২৫ হাজার হেক্টর, ঠাকুরগাঁও জেলায় ৬৩ হাজার হেক্টর এবং পঞ্চগড় জেলায় ৭৯ হাজার হেক্টর এক ফসলি জমি সেচের পানির অভাবে তিন ফসলিতে রূপান্তর করা যাচ্ছে না।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সমতার এক জরিপ প্রতিবেদনে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলে বিলের সংখ্যা এক হাজার ৫৬১টি। এর মধ্যে সহস্রাধিক বিলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। পলি জমে বিলের মুখ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বছরের বেশির ভাগ সময় এসব বিল শুকনা থাকে। বছরের পর বছর বিলগুলোতে পলি জমছে। গভীরতা হৃাস পাচ্ছে। পরিণত হচ্ছে নিচু সমতল ভূমিতে। দীর্ঘ দিন সংস্কার ও খননের উদ্যোগ না নেয়ায় বিলের পানির নির্দিষ্ট ধারাটিও হারিয়ে যাচ্ছে।
উত্তরাঞ্চলে বন্যার সময় আসা পলি জমছে বিলে। বন্যার পানি নেমে গেলে থেকে যাচ্ছে পলি। একপর্যায়ে গোটা বিল এলাকাই পরিণত হচ্ছে ধুধু প্রান্তরে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী ড. মো: রেদওয়ানুর রহমানের প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ২৬ বছর আগেও চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদী, ৩৯টি বিল ও ২২টি খাড়িতে বছরজুড়েই ৬ থেকে ১২ ফুট পানি থাকত। ফলে সারা বছরই নৌচলাচল করত। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে এসব নদী, বিল ও খাড়ি ভরাট হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে এবং ১৯৮০-এর দশকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বড়ালের (পদ্মা) উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে চলনবিলের বিভিন্ন নদী বিল জলাশয় ও খাড়িগুলোয় পলি জমে ক্রমে ভরাট হয়ে গেছে। তা ছাড়া বিলের মাঝ দিয়ে যথেচ্ছভাবে সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, ভূমি দখল করে বসতি ও দোকাপাট স্থাপন করায় নদী, বিল ও খাড়িগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে।

Thursday, January 14, 2016

ফারাক্কায় ৩২,৫১৬ কিউসেক পানি কম পেয়েছে বাংলাদেশ by সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ

ফারাক্কা পয়েন্টে চলতি মাসের প্রথম ১০ দিনে ৩২ হাজার ৫১৬ কিউসেক পানি কম পেয়েছে বাংলাদেশ। চুক্তির ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী ভারত এই পরিমাণ পানি কম দিয়েছে বাংলাদেশকে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শুষ্ক মওসুমে গঙ্গায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ এবার বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। গঙ্গার পানি নির্ভর এলাকায় কৃষি ও সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ভরসা করতে হবে বাংলাদেশকে। এতে করে বাংলাদেশে গঙ্গা অববাহিকায় কৃষকের কৃষি কাজে ব্যয় বেড়ে যাবে।
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির আওতায় চলতি বছরে ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত যৌথ নদী কমিশন কর্তৃক বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন সম্পর্কিত পাওয়া তথ্য-উপাত্তে এসব জানা গেছে।
যৌথ নদী কমিশনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, এবারে চলতি মাসে ১ থেকে ১০ দিনে চুক্তির ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী বাংলাদেশ ফারাক্কা পয়েন্টে পাওয়ার কথা রয়েছে ৬৭ হাজার ৫১৬ কিউসেক পানি। কিন্তু বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি। হিসাব মতে, এই ১০ দিনে ভারত ৩২ হাজার ৫১৬ কিউসেক পানি কম দিয়েছে বাংলাদেশকে। দেশটি চুক্তির সংলগ্নি-১ এর বণ্টন ফর্মুলা মেনেছে। সে অনুযায়ী এবার ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দিয়েছে বাংলাদেশকে।
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী ভারত প্রথম ১০ দিনে ফারাক্কায় মোট পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার কথা এক লাখ সাত হাজার ৫১৬ কিউসেক পানি। গঙ্গা চুক্তির ঐতিহাসিক প্রবাহ অনুযায়ী এই প্রবাহ চুক্তির ধারা অনুযায়ী প্রতি কিস্তিতে কী পরিমাণ পানি নিশ্চিত করবে তার একটি হিসাব রয়েছে। সে হিসাব অনুযায়ী জানুয়ারি এ সময়ে এক লাখ সাত হাজার ৫১৬ কিউসেক পানি নিশ্চিতের কথা থাকলেও দেশটি তা করেনি। এবার এই ১০ দিনে ছিল ৭৭ হাজার ৩৩৫ কিউসেক পানি। এবারে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি এসেছে ৪২ হাজার ৪২২ কিউসেক পানি।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ভারত বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে গঙ্গার পানি কম পাওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করলেও বরাবরই একই উত্তর পেয়েছে বাংলাদেশ। ফারাক্কা পয়েন্টে এই পানি কমে যাওয়াকে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণই বলা হয়ে থাকে ভারতের পক্ষ থেকে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর এই গঙ্গা চুক্তি সম্পাদিত হয়। দেখা গেছে, ভারত বাংলাদেশ চুক্তি সংলগ্নি-১এর বণ্টন ফর্মুলা অনুযায়ী পানি নিশ্চিত করলেও ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পাচ্ছে না। পানি বণ্টনের অধিকাংশ সময়েই ভারত ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী পানি নিশ্চিত করেনি।

Saturday, October 31, 2015

খুলছে জলকপাট, হচ্ছে কোথাও ভরাট by মলয় ভৌমিক

একদিকে নদী ভরাট, অন্যদিকে খুলছে জলকপাট। নদী রক্ষা কমিশনের এমন বিপরীত কর্মের খবর জানা গেল একই দিনের প্রথম আলো পাঠ করে। ১০ অক্টোবর প্রথম আলোর ‘সোনাই নদে ভবন নির্মাণ’ শীর্ষক সম্পাদকীয় থেকে জানা যাচ্ছে, হবিগঞ্জের মাধবপুরে সোনাই নদের ওপর স্থাপিত ভবন নির্মাণের কাজ আবার শুরু হয়েছে নদী রক্ষা কমিশনের অনুমতি নিয়েই। ওই দিনই বিশাল বাংলা পাতায় প্রকাশিত খবরের শিরোনাম হলো ‘চারঘাটে খুলবে জলকপাট, পানিতে ভরে যাবে বড়াল’। রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদের উৎসমুখ পরিদর্শন শেষে নৌপরিবহনমন্ত্রী ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান এ সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের জানান আগের দিন।
নদী রক্ষা কমিশন ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের উল্টোপাল্টা কর্মকাণ্ড যে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কৃষিজীবী ও পরিবেশবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশে ভরাট হয়ে যাওয়া নদ-নদী খননের দাবি করে আসছেন। প্রধানমন্ত্রীও এ দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে নদী খননের কর্মসূচি হাতে নেওয়ার কথা নানা সময়ে উল্লেখ করেছেন। এ লেখাটি লিখতে লিখতেই জানতে পারলাম, মেহেরপুরে ভৈরব নদও খনন করা শুরু হয়েছে।
নদ-নদীর স্লুইসগেট বা জলকপাট খোলা এবং খননের খবরে সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের মধ্যে নতুন করে আশা জাগছে। পাশাপাশি তাদের মধ্যে এসব কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে কাজ করছে শঙ্কা। এই শঙ্কা দুটি দিক থেকে: প্রথমত, নদীর যে বিরাট অংশ ইতিমধ্যে জবরদখলকারীদের হাতে গেছে, সেই অংশগুলো এই খনন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে উদ্ধার হবে কি না, তা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ আছে। মাধবপুরে সোনাই নদের ওপর ভবন নির্মাণের কাজ পুনরায় শুরু হওয়ার খবরে এই সন্দেহ বেড়ে গেছে অনেকটাই।
বেশির ভাগ নদীই দখল হতে হতে এখন আর আগের মতো চওড়া নেই। নতুন করে খননের সময় যদি বর্তমানের ক্ষীণপ্রবাহটুকুই রেখে দেওয়া হয়, তাহলে জবরদখলকারীরা এর মধ্য দিয়ে একটা বৈধতা পেয়ে যেতে পারে। কাজেই অনেক প্রত্যাশার এই প্রকল্পগুলো যেন শেষ পর্যন্ত দখলবাজদের বৈধতা দেওয়ার প্রকল্পে রূপ না নেয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে বলছেন নদীতীরের মানুষেরা।
দ্বিতীয়ত, নদীতীরের মানুষের সব থেকে বড় শঙ্কা হলো, নদী খনন করার পর তাতে পানি থাকবে কি না। পানির প্রাপ্যতা নিয়ে এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। যেমন রাজশাহীর চারঘাটে বড়াল নদের জলকপাট খোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং এর উৎসমুখে ভরাট হওয়া ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ কাজ সম্পন্ন হলেও পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? বড়াল হলো পদ্মার (গঙ্গা) শাখা নদ। উজানে ভারতের ফারাক্কায় নির্মিত ব্যারাজের মাধ্যমে পদ্মার পানির স্বাভাবিক প্রবাহের বিরাট অংশই নিয়ে ফেলা হচ্ছে ভাগিরথিতে। ফলে পানি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি থাকছে না পদ্মায়।
৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ বড়াল নদের প্রায় পুরোটাই গেছে দেশের সব থেকে বড় জলাশয় চলনবিলের মধ্য দিয়ে। এ বিলের মধ্যে ছোট-বড় ১০টির মতো নদ–নদী প্রবাহিত হলেও চলনবিলের মূল পানির উৎস হলো আত্রাই ও বড়াল। নৌপরিবহনমন্ত্রী ও নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান বড়াল নদের উৎসমুখ পরিদর্শন করেন ৯ অক্টোবর। ১০ অক্টোবর একটি কাজে আমি মধ্য চলনবিলের উপজেলা সিংড়ায় যাই। রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিশাল এলাকায় বিস্তৃত চলনবিল। এর মধ্যে বিলের একেবারে ভেতরে যে কটি উপজেলা রয়েছে, নাটোরের সিংড়া তার একটি। সিংড়া উপজেলা সদর আত্রাই নদের তীরে। আবার ‘বিলের নাম চলন, গ্রামের নাম কলম’ খ্যাত কলম গ্রামটিও সিংড়া সদরের সঙ্গেই। সিংড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট ওহিদুর রহমান শেখ, চলনবিল মহিলা কলেজের অধ্যাপক মো. আমির হামজা, মোহম্মদ রোকনুজ্জামান ও মো. গোলাম মোস্তফার সঙ্গে বড়াল নদের জলকপাট খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিষয়ে কথা হয়। এর সুফল সম্পর্কে আমি তাঁদের মতামত জানতে চাই। সবাই বড়াল নদে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা নিয়ে আশঙ্কার কথা জানান। অবশ্য তাঁরা এ ব্যাপারে একমত হন যে বড়াল খনন করা হলে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে ইদানীং যে ‘পকেট বন্যা’ (বিভিন্ন পকেটে পানি আটকে থাকা) হচ্ছে, তার হাত থেকে কিছুটা রেহাই মিলতে পারে। কেননা, নদে প্রতিবন্ধকতা না থাকলে দ্রুত পানি ভাটিতে নেমে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বড়াল নদ নিয়ে ইতিপূর্বে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকাণ্ডে চলনবিলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ রয়েছে। ‘বড়াল-ক্লোজার’ বা বড়ালের উৎসমুখে স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয় ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সালের মধ্যে। আশ্চর্য হওয়ার মতো ব্যাপার হলো, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মার পানি প্রত্যাহার শুরু হয় ১৯৭৩ সাল থেকে। পানি প্রত্যাহার শুরুর দশ-এগারো বছর পর পদ্মা যখন মৃতপ্রায়, তখন ঠিক কী কারণে রাজশাহীর চারঘাটে উৎসমুখে বড়াল-ক্লোজার নির্মাণ করা হলো, তা কারও কাছেই বোধগম্য ছিল না। পদ্মার পানিতেই বড়াল সচল থাকত। সেই পদ্মায় যখন পানি নেই, তখন বড়ালের মুখ বেঁধে ফেলার অর্থ হলো বড়াল প্রবাহের শরীরে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া। অনেকেই বিশ্বাস করেন, নদী দখলদারদের সুযোগ করে দেওয়া অথবা প্রকল্পের মাধ্যমে কাউকে কাউকে ‘করে খাওয়া’র সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই আত্মঘাতী এই কর্মকাণ্ডটি হাতে নেওয়া হয়েছিল।
বড়াল-ক্লোজার নির্মাণের কারণে গত তিন দশকে কেবল বড়াল নদই কঙ্কালসার হয়নি, ফসল ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়েছে, উধাও হয়েছে মাছের অভয়াশ্রম। এমনিতেই সময়ের বিবর্তনে চলনবিল ঐতিহ্য হারাচ্ছিল, এর মধ্যে বড়াল-ক্লোজারের ধাক্কায় সেখানকার মানুষ আজ এক ভিন্ন জীবন-জীবিকায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে বাধ্য হয়েছে।
চলনবিলের এক প্রান্তে বাড়ি হলেও ওই বিলের মধ্যাঞ্চলে আমি প্রথম যাই ১৯৭০ সালে। আমি সে সময় নবম শ্রেণির ছাত্র। শীতকালে চাটমোহর উপজেলার অষ্টমনিষা গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গেলাম। ট্রেনে চড়ে নামতে হলো বড়াল ব্রিজ স্টেশনে। বোঝাই যাচ্ছে স্টেশনটির নামকরণ হয়েছে বড়াল নদের নামানুসারে। বড়াল অষ্টমনিষা গ্রামের বুক চিরে বেরিয়ে গেছে। শীতকালেও ওই নদের ভয়াল রূপ উজ্জ্বল হয়ে আছে আমার স্মৃতিতে। অবশ্য পলি জমায় এ সময়ের আগে থেকেই চলনবিল অনেক স্থানে জেগে উঠতে শুরু করেছিল। উত্তরাঞ্চলে খরিপ মৌসুমে ইরি-বোরোর আবাদ শুরু হয় এই সময় থেকেই। বড়ালের দুই পারে ইরি-বোরোর আবাদও আমার চোখে পড়েছে।
১৯৮৫-৮৬ সালে দেশব্যাপী মুক্ত নাটক আন্দোলন গড়ে তোলার কাজের অংশ হিসেবে আমাদের চলনবিল এলাকায় অনেকবার যেতে হয়। নাট্যকার মামুনুর রশীদ, মান্নান হীরা, অভিনেতা আজিজুল হাকিম, মাসুম রেজা, তপন দাশ, স্বদেশবন্ধু সরকারসহ অনেকেই আমরা চলনবিল এলাকায় কার্যকর মুক্ত নাটক আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হই। এ সময় আমাদের সঙ্গে মাঝেমধ্যেই শামিল হতেন চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। চলনবিলের করতকান্দি গ্রাম নিয়ে দৈনিক সংবাদ-এ প্রকাশিত তাঁর সিরিজ প্রতিবেদনের কথা অনেকেরই মনে থাকতে পারে। আমরা চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়া উপজেলার গ্রামগুলোতে যখন কাজ করছিলাম, তখন বড়ালের উৎসমুখে দেওয়া জলকপাটের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ওই সময়ে প্রথম যে সমস্যাটি আমাদের চোখে পড়ে, তা হলো যাতায়াত ও পরিবহনব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতা। আগে চলনবিলে সারা বছর পানি থাকায় নৌকায় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া যেত, কিন্তু বড়াল-ক্লোজার নির্মাণের পর সেই সুবিধাও বন্ধ হয়ে গেল। না নৌকা, না পায়ে হাঁটার সুবিধা। সব মিলিয়ে এলাকার মানুষের এক দুর্বিষহ অবস্থা আমাদের চোখে পড়ে।
ত্রিশ-বত্রিশ বছর পর আজ চলনবিলের পেট চিরে অনেক পাকা রাস্তা হয়েছে। জীবন-জীবিকায় এসেছে পরিবর্তন। নতুনভাবে অভ্যস্ত হওয়া জীবনে তাই বড়ালের জলকপাট খোলার ঘোষণা ওই এলাকার মানুষের মধ্যে বড় কোনো বার্তা নয়। বরং মানুষের মাঝে বাড়ছে সন্দেহ। এ সন্দেহ নদী রক্ষা কমিশনকেই দূর করতে হবে।
একদা চলনবিলই ছিল দেশে সব থেকে বড় মাছের অভয়াশ্রম। চলনবিলের বিরাট একটা অংশে সারা বছর পানি থাকায় এবং সেই পানিতে জলজ উদ্ভিদ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করায় জাল ফেলা সম্ভব হতো না। মা-মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়তে পারত। এখন প্রাকৃতিক সেই অভয়াশ্রম নেই। সিংড়া থেকে ফেরার সময় অনেক হতাশার মধ্যেও আশার বাণী শোনান চলনবিল মহিলা কলেজের অধ্যাপক তেলিগ্রামের আমির হামজা। তিনি জানান, সিংড়ায় ‘সিংড়াদহ’ ছাড়াও কড়েরগ্রাম এবং গুড় নদ এলাকার স্থানীয় মানুষের প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি মাছের অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে নতুন করে। ছোট ছোট এই অভয়াশ্রমে সারা বছরই মাছ ধরা নিষেধ। বর্তমান সরকারও এ ব্যাপারে বাড়িয়ে দিয়েছে সহায়তার হাত।
মলয় ভৌমিক: অধ্যাপক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। নাট্যকার।

Thursday, October 29, 2015

জল নিয়ে জলঘোলা আর নয় by মহিউদ্দিন আহমদ

তিব্বতের মানুষের বিশ্বাস, হিমালয়ের চূড়ায় একসময় একটা হ্রদ ছিল। একজন বোধিসত্ত্ব (জ্ঞানী) ভাবলেন, মানবকল্যাণে হ্রদের জল জনপদে বয়ে যাওয়া দরকার। পর্বতের একটা জায়গা কেটে তিনি জলধারা উন্মুক্ত করে দিলেন। জন্ম নিল সাংপো। এর অর্থ হলো পবিত্রকারী। কেউ কেউ মনে করেন, এই জলধারা বয়ে গেছে স্বর্গের দিকে—সাংগ্রিলা। চীনা উচ্চারণে সাংপো হলো জাংবো।
চীনের ভূখণ্ড পেরিয়ে সাংপো ঢুকল ভারতের উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে, এখন যে এলাকার নাম অরুণাচল। এখানে তৈরি হলো আরেক পুরাণ। ঋষি শান্তনুর স্ত্রী অমোঘা পৃথিবীর স্রষ্টা ব্রহ্মের দ্বারা সন্তানবতী হলেন। ছেলেসন্তান জন্ম নিল জলের আকারে। শান্তনু সন্তানকে কৈলাস, গন্ধমাদন, জারুধি এবং সম্বর্তক—এই চারটি পর্বতের মাঝে শুইয়ে দিলেন। ফলে তৈরি হলো বড় একটা হ্রদ, নাম ব্রহ্মকুণ্ড। পিতার আদেশে পরশুরাম কুঠার দিয়ে খুন করলেন নিজের মাকে। পাপমোচনের জন্য তাকে বলা হলো একটা পবিত্র স্থানে যেতে। পরশুরাম ব্রহ্মকুণ্ডের একটা ধার কেটে দিলেন। ফলে বের হলো জলধারা—ব্রহ্মপুত্র। কুঠারে লেগে থাকা রক্ত ব্রহ্মপুত্রের জলে ধুয়ে সাফ হলো, জল হলো লালচে। আসামের মানুষ ব্রহ্মপুত্রকে বলে লুইত (লোহিত), সংস্কৃত ভাষায় যা হলো রক্ত। কুপিয়ে জমি নরম করতে করতে (আবাদ করে) পরশুরামের ‘লাঙল’ সোনারগাঁ এসে ‘বন্ধ’ হলো (থামল)। ওই জায়গার নাম হলো লাঙ্গলবন্দ। এখন এটা পবিত্র তীর্থ। এই হলো ব্রহ্মপুত্র নদের জন্মকথা।
ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশে ঢুকেছে কুড়িগ্রাম জেলার মধ্য দিয়ে। বাহাদুরাবাদের কাছে এটা ময়মনসিংহ জেলার বুক চিরে বয়ে গেছে ভৈরব অবধি, মিশেছে মেঘনার জলে। অপেক্ষাকৃত নতুন একটা জলধারা সোজা নেমে গেছে দক্ষিণে। এটাই এখন ব্রহ্মপুত্রের মূলধারা, নাম যমুনা। আদি ব্রহ্মপুত্র এখন ক্ষীণকায়। ১২ অক্টোবর দৈনিক প্রথম আলো একটা ছবি ও সংবাদ ছেপেছে। শিরোনাম—বর্জ্য ফেলে নদের সর্বনাশ। পবিত্র ব্রহ্মপুত্র এখন জামালপুর পৌরসভার ভাগাড়।
ব্রহ্মপুত্র মাঝেমধ্যে সংবাদ শিরোনাম হয়। ১৪ অক্টোবর ঢাকার কয়েকটি দৈনিক ভারতের একটি পত্রিকায় ছাপা সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছে, ব্রহ্মপুত্রে চীনারা জলবিদ্যুৎ তৈরির প্রকল্প বাস্তবায়ন করেই ফেলেছে। বিদ্যুৎ শিগগিরই চীনের জাতীয় গ্রিডে যাবে। এ রকম প্রকল্প আরও হবে। কেউ কেউ আশঙ্কা জানিয়েছেন, এর ফলে ভাটির দেশে সমস্যা হবে, সমস্যায় পড়বে ভারত ও বাংলাদেশ।
ব্রহ্মপুত্র পৃথিবীর বড় নদীগুলোর একটি। এর দৈর্ঘ্য এবং আওতাধীন এলাকার পরিমাণ নিয়ে নানা রকমের হিসাব আছে। যে হিসাবটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত, তাতে দেখা যায়, এই নদের দৈর্ঘ্য ২ হাজার ৯০০ কিলোমিটার। বাংলাদেশের যৌথ নদী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী এর অববাহিকা ৫ লাখ ৫২ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। এই বিশাল এলাকার অর্ধেক (৫০ দশমিক ৫ শতাংশ) পড়েছে চীনে, ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশ ভারতে, ৮ দশমিক ১ শতাংশ বাংলাদেশে এবং ৭ দশমিক ৮ শতাংশ ভুটানে। ভারতে এই নদের অববাহিকায় আছে ছয়টি রাজ্য—অরুণাচল, আসাম, নাগাল্যান্ড, মেঘালয়, পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিম। বাংলাদেশের ৩৯ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার মধ্যে। অর্থাৎ আমাদের দেশের চার ভাগের এক ভাগেরও বেশি এলাকার মানুষ এই নদের ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং বলা চলে, ব্রহ্মপুত্র নারাজ হলে এবং এর ওপর কোনো আঘাত এলে বাংলাদেশের একটা বড় জনগোষ্ঠী বিপদে পড়বে, বিপর্যস্ত হবে।
ব্রহ্মপুত্র-বাহিত এলাকায় ৬২ কোটি মানুষের বাস। এত দিন এই নদের ৯৪ শতাংশ জল বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে—নির্দ্বিধায়, নীরবে। আমরা এই বিপুল জলরাশি, এই বিশাল সম্পদের দিকে চোখ তুলে তাকাইনি। এখন আমরা একটু নড়েচড়ে বসতে শুরু করেছি। এই অঞ্চলের দুই বড় প্রতিবেশী—চীন ও ভারত এই নদের দিকে নজর দিয়েছে। চীন অনেক বছর ধরেই ব্রহ্মপুত্রের জল আটকে জলবিদ্যুৎ তৈরির আয়োজন করে আসছে। ভারত তার শুকনো এলাকাগুলো সবুজে ভরিয়ে দিতে ব্রহ্মপুত্রের জল নিয়ে আসার চিন্তা করছে। তৈরি হয়েছে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প। আমরা ব্রহ্মপুত্র নিয়ে চীন-ভারতের রশি টানাটানি দেখছি, অনেকটা তৃতীয় ছাগশিশুর মতো। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই সত্য যে আমরা এযাবৎ দুবার স্বাধীন হয়েছি, তবু গত সাত দশকে ব্রহ্মপুত্রের এক ফোঁটা জলও জনস্বার্থে ব্যবহার করার জন্য কোনো পরিকল্পনা হাতে নিইনি। এখন এই জলে ভাগীদারের থাবা পড়েছে। হয়তো আমরা খুব শিগগির হইচই শুরু করব, ব্রহ্মপুত্রের জলের ‘ন্যায্য হিস্যা চাই’।
ব্রহ্মপুত্র নদের জল থেকে জলবিদ্যুৎ তৈরির সম্ভাবনা ৬৬ হাজার থেকে ২ লাখ মেগাওয়াট। ভারতে ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত ২ হাজার ১২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়েছে। নির্মাণাধীন আছে আরও ৫ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র। চীনের পরিকল্পনায় আছে ৪০ হাজার মেগাওয়াট। এ ছাড়া চীন ব্রহ্মপুত্রের পানি উত্তরাঞ্চলে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছে সেচ ও গৃহস্থালির প্রয়োজনে। ভারত তো আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েই রেখেছে। দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির থাবার নিচে বাংলাদেশ তার প্রয়োজনের পানিটুকু কীভাবে পাবে? অথচ পানির ওপর নির্ভর করছে প্রাণ—আবেহায়াত।
চীন এখন পর্যন্ত বলে আসছে যে পানি প্রত্যাহার করবে না। কিন্তু চীনের সঙ্গে পানিসম্পদ ভাগাভাগির কোনো চুক্তি কিংবা সমঝোতা এই অববাহিকার অন্য কোনো দেশের নেই। যদি চীন ব্রহ্মপুত্রের পানি সেচের জন্য ব্যবহার করে, তাহলে ভাটি এলাকায় পানির প্রবাহ কমে যাবে, যেমনটি হয়েছে পদ্মায়, তিস্তায় এবং এ রকম আরও অনেক নদীতে। যদি এমন অবস্থা সত্যি সত্যিই তৈরি হয়, তা মোকাবিলা করার জন্য আমাদের কোনো আয়োজন চোখে পড়ে না।
ব্রহ্মপুত্রের পানিতে যদি চীন থাবা বসায়, তাহলে ভারত, বাংলাদেশ ও ভুটান—এই তিনটি দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ জন্য ব্রহ্মপুত্র নিয়ে এর অববাহিকার সবগুলো দেশের একসঙ্গে বসা দরকার, দরকার কথা বলা, একটা সমঝোতায় আসা। ভারত আর চীন দ্বিপক্ষীয়ভাবে বিষয়টার একটা ফয়সালা তাদের নিজ নিজ স্বার্থে করে ফেললে বাংলাদেশকে পরে পস্তাতে হবে। প্রতিটি দেশ তাদের জাতীয় স্বার্থেই প্রকল্প নেয়, অন্য দেশের সঙ্গে চুক্তি করে। বাংলাদেশকেও তাই জাতীয় স্বার্থেই নদী নিয়ে বহুপক্ষীয় আলোচনায় বসার তাগিদ দিতে হবে।
চীন ও ভারতের মধ্যে নানা বিষয়ে বিবাদ আছে। বাংলাদেশের এই বিবাদে জড়ানো মোটেও উচিত হবে না। এখানে চীন বড় বন্ধু না ভারত, তার চেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের স্বার্থের দিকে কার নজর কতটুকু। বাংলাদেশ নিয়ে নানা ক্ষেত্রে চীন-ভারতের দ্বৈরথ আছে। আমাদের উচিত হবে আমাদের স্বার্থে চীন ও ভারত উভয়ের সঙ্গেই যত দূর সম্ভব দর-কষাকষি করা। একটা বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় এটা হলে ভালো হয়। আমরা গঙ্গা নিয়ে এটা চেষ্টা করেছিলাম, হয়নি। হিমালয়ের জলসম্পদ নিয়ে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার কথা আমরা অনেক বছর ধরে বলে আসছি। তাতে কাজের কাজ হয়নি।
চীন ও ভারত আগামী ৫০ কিংবা ১০০ বছর হিসাবে রেখে পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো ‘অ্যাডহক’। আজ যদি ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে আমাদের একটা বড় প্রকল্প থাকত, আমরা চীনকে বলতে পারতাম, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এত দিন ব্রহ্মপুত্রের পানি গোয়ালন্দ-চাঁদপুর হয়ে বঙ্গোপসাগরে চলে গেছে। আমরা তা ব্যবহার করিনি। কিন্তু চিরদিন এমন থাকবে না। ব্রহ্মপুত্র দিয়েই আমরা বুঝতে পারব, চীন আমাদের কত কাছের বন্ধু। জল নিয়ে ভারতের সঙ্গে জল অনেক ঘোলা হয়েছে। এটা আর বাড়তে দেওয়া উচিত হবে না। ব্রহ্মপুত্র নিয়ে এখনই আমাদের চিন্তাভাবনাগুলো গুছিয়ে চীনের সঙ্গে দরবার করা দরকার। ভারত সমমর্যাদার ভিত্তিতে সঙ্গে থাকলে ভালো হয়। পৃথিবীর অনেক দেশই এ ধরনের সমস্যা আলোচনার মাধ্যমেই মিটমাট করেছে। আমরাও পারব। পারতেই হবে। তবে দেরি হয়ে যাচ্ছে।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।
mohi2005@gmail.com