Tuesday, October 28, 2014

খাদ্যসাহায্যের মৃত্যুচক্র by মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করে বাজারে খাদ্যশস্যের দাম পড়ে যাওয়া ঠেকাতে উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য সাগরে ফেলে দেওয়ার প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছেন তাঁর একটি বক্তৃতায়। পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, এই ব্যাপারটি ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত পর পর পাঁচ বছর ঘটিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের কৃষি খাতে উৎপাদনের যে স্ফীতি দেখা দিয়েছিল, তার মোকাবিলায় ওই পাঁচ বছর একাধারে আটলান্টিক মহাসাগরে উদ্বৃত্ত খাদ্য নিক্ষেপ করতে হয়েছিল অভ্যন্তরীণ খাদ্য বাজারে খাদ্যশস্যের দাম স্থিতিশীল রাখার প্রয়োজনে। এই ঘটনার মাধ্যমেই জন্ম হয়েছিল খাদ্যসাহায্যের।
পাঠকদের ইতিহাসের আরেকটু পেছনে নিয়ে গেলে বুঝতে সুবিধা হবে, কেন বছরের পর বছর এহেন খাদ্যশস্য উদ্বৃত্তের ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। সমস্যার গোড়াটা রয়ে গেছে ১৯২৯-১৯৩৫ সালের বিশ্ব মহামন্দার মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট কর্তৃক গৃহীত ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচির মধ্যে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৩২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী ছিলেন রুজভেল্ট। ওই নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী ইশতিহারের নাম ছিল ‘নিউ ডিল’। রুজভেল্ট প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ১৯৩৩ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে ওই ‘নিউ ডিল’ কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন, যার অন্যতম প্রধান কর্মসূচি ছিল কৃষিতে খাদ্যশস্যের দাম স্থিতিশীল করার জন্য ‘নিম্নতম দাম নির্ধারণনীতি’ এবং উৎপাদন না করে জমি পতিত রেখে দেওয়ার জন্য জমির মালিককে একরভিত্তিক ‘ক্ষতিপূরণ’ প্রদান। এই দুটি নীতির মধ্যে বোধগম্য কারণেই প্রথম নীতিটা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠা স্বাভাবিক, কারণ সুনির্দিষ্ট দামে কৃষক যত বেশি উৎপাদন করবেন, তত বেশি তাঁর আয় সুনিশ্চিত হবে।
কিন্তু এই নীতির ফলে উদ্বৃত্তের ঝামেলা সৃষ্টি হওয়ার আগেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় আসল ঝামেলাটা টের পাওয়া গিয়েছিল যুদ্ধের পর। প্রথমে মার্কিন সরকার উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য নির্দিষ্ট দামে কিনে নতুন নতুন গুদামে মজুত করতে শুরু করল। কিন্তু পর পর দু-তিন বছর যখন ক্রমাগতভাবে উদ্বৃত্তের পাহাড় জমে উঠতে শুরু করল, তখন ভুলটা বোঝা গেল। সরকার পড়ল বিপাকে। উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য কেনার জন্য বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ, ক্রয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সংগৃহীত খাদ্যশস্য পরিবহন, গুদামজাতকরণ এবং মজুত করা খাদ্য বিক্রয় বা বিতরণ—প্রতিটি বিষয়ই ব্যয়বহুল। এক মৌসুমের গুদামজাত খাদ্য বিক্রি বা বিতরণ করে গুদাম খালি না করলে পরের মৌসুমের খাদ্য সংগ্রহের ঝামেলা বেড়ে যাচ্ছিল। আবার বিক্রির চেষ্টা করলে খাদ্যশস্যের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজার দামে ধস নামছিল। এই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে পর পর পাঁচ বছর উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য জাহাজে বোঝাই করে আটলান্টিক মহাসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা হিসাব-নিকাশ করে দেখল, মহাসাগরে ফেলে না দিয়ে জাহাজগুলোর খাদ্যশস্য যদি বিভিন্ন মার্কিনপন্থী দেশে ‘খাদ্যসাহায্য’ প্রদানের জন্য প্রেরিত হয়, তাহলে খাদ্যশস্যের কোনো মূল্য আদায় না করলেও সংগ্রহ-খরচ, মজুত খরচ, পরিবহন খরচ ও জাহাজভাড়া দিতে সাহায্যগ্রহীতা দেশ রাজি হলে ওই ব্যবস্থাটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিরাট ব্যয়সাশ্রয়ী হবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ঠিক এহেন হিসাব-নিকাশ থেকেই ১৯৫৪ সাল থেকে তদানীন্তন ঠান্ডাযুদ্ধের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মার্কিন-মক্কেল রাষ্ট্র পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিসর, তুরস্ক ও ফিলিপাইনে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য সাহায্যের প্রক্রিয়াটি শুরু করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপিত হয়েছে ইউএসএইডের একজন সাবেক কর্মকর্তা টেরেসা হেয়টার রচিত বিশ্বের বেস্ট সেলার এইড অ্যাজ ইমপেরিয়ালিজম গ্রন্থে।
ওই সময়টায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ‘মোহাম্মদ আলী বগুড়া’, গভর্নর জেনারেল ছিলেন জাঁদরেল আমলা গোলাম মোহাম্মদ। এর পরের পাঁচ বছরের টালমাটাল পাকিস্তানি রাজনীতিতে উত্থান-পতনের যে গোপন ষড়যন্ত্রের ইতিহাস রচিত হয়েছিল, তার প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কুশীলবের ভূমিকা পালন করেছে মার্কিনরাই। ওই পর্যায়ের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্যঘাটতি না থাকলেও পাকিস্তানের ভুল নীতি, অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে প্রথমবারের মতো ১৯৫৭ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তান ক্রমবর্ধমান ‘খাদ্যশস্য ঘাটতি অঞ্চলে’ পরিণত হয়েছিল। সস্তায় পাওয়া খাদ্য দিয়ে শুরু করা হয়েছিল ওয়ার্কস প্রোগ্রাম ও টেস্ট রিলিফ, সম্প্রসারিত হয়েছিল রেশনিং। একই সঙ্গে, পাকিস্তানের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পূর্ব পাকিস্তানের কৃষি উন্নয়ন অবহেলার শিকার হয়ে স্থবিরতার পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছিল। ওই পরিকল্পনা প্রণয়নে পরামর্শক ছিল ‘হার্ভার্ড গ্রুপ অব ইকোনমিস্টস’। খাদ্যসাহায্যের ক্ষেত্রে প্রস্তুত করার জন্য কৃষিকে অবহেলা করা হয়েছিল কি না বলা মুশকিল, তবে পূর্ব পাকিস্তানের খাদ্যঘাটতি ১৯৫৭ সালে শুরু হয়ে ক্রমেই বাড়তে বাড়তে ১৯৭০ সালে প্রায় ৩৫ লাখ টনে পৌঁছে গিয়েছিল।
সমস্যার উল্টো পিঠে দেখা যাবে, খাদ্যসাহায্যের জালে বিভিন্ন দেশকে আটকে ফেলার পর খাদ্যশস্য আর ‘সাহায্য’ থাকেনি। সাহায্যের শর্তগুলো ক্রমান্বয়ে এমন শক্ত ও জটিল করে ফেলা হয়েছিল যে পুরো ব্যাপারটাই একটা নিষ্ঠুর ব্ল্যাকমেলিংয়ের খেলায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিএল ৪৮০’ খাদ্য কর্মসূচির টাইটেল ১ থেকে টাইটেল ৪ পর্যন্ত প্রতিটি কর্মসূচির শর্তাবলি ক্রমেই কঠোর থেকে কঠোরতর করা হয়েছে, এবং এগুলো সবই পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে গলাধঃকরণ করতে হয়েছে প্রায় ৫০ বছর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া ক্রমেই বড়সড় খাদ্যসাহায্যদাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পিএল ৪৮০ কর্মসূচির মতো এত অপমানজনক শর্ত আর কোনো দেশ বাংলাদেশের ওপর চাপায়নি।
পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকেই খাদ্যশস্যের উচ্চ দাম নির্ধারণ শুরু করা হয়েছে, এবং খাদ্যের মোট মূল্যের অর্ধেক স্থানীয় মুদ্রায় পরিশোধ করার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ওই মূল্য বাবদ প্রাপ্ত অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের ইচ্ছেমতন পাকিস্তান ও বাংলাদেশে খরচ করতে পারত, কিন্তু কোথায় খরচ করা হচ্ছে, তা জানার কোনো অধিকার দেশের সরকারের ছিল না। টেরেসা হেয়টার বলছেন, সন্দেহ করার কারণ রয়েছে যে মার্কিনপন্থী রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক নেতা, সামরিক অফিসার, সিভিল আমলা, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এবং সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোর আনুগত্য কেনার জন্য এই অর্থ দেদার ব্যবহার করা হতো বিশ্বের দেশে দেশে। প্রয়োজনে, সামরিক অভ্যুত্থান এবং গণ-আন্দোলন উসকে দেওয়ার জন্যও এই ফান্ড ব্যবহার করা হয়েছে বিভিন্ন দেশে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করায় তাদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য নেবে না বলে জানিয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সরকার। কিন্তু খোন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন মার্কিন লবি ক্রমেই বঙ্গবন্ধুর মন জয় করে নিয়েছিল। তাই অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীনের জোর আপত্তি অগ্রাহ্য করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফকে আহ্বান জানিয়েছিল বাংলাদেশ। কেউ কেউ মনে করেন, বিশাল খাদ্যঘাটতি মোকাবিলায় ব্যর্থ হওয়ার ভয় বঙ্গবন্ধুকে ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের সে সময়ের প্রকট খাদ্যঘাটতি ও অর্থনৈতিক সংকটের পূর্ণ সুযোগ নিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক। প্রথমে পাকিস্তানের ঋণের দায় নিতে হবে দাবি জানিয়ে সময়ে ক্ষপণের চাণক্যনীতি গ্রহণ করেছিল তারা। পরে বাংলাদেশ কিউবার কাছে পাটের বস্তা রপ্তানি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-আরোপিত অবরোধ কেন লঙ্ঘন করল, তার কৈফিয়ত চেয়ে ১৯৭৪ সালে খাদ্যশস্যবাহী কয়েকটি জাহাজের যাত্রা বিলম্বিত করে দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওই জাহাজগুলো সময়মতো বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারলে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে অনেক মানুষের মৃত্যু এড়ানো যেত হয়তো বা! অধ্যাপক নুরুল ইসলামের বই মেকিং অব আ নেশন বাংলাদেশ: অ্যান ইকোনমিস্ট’স টেইল-এ এই কাহিনির বর্ণনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর এ দেশে বৈদেশিক সাহায্যের বান ডেকেছিল, যার প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশই থাকত খাদ্যসাহায্য। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান জিডিপির ১৩ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল বলে দাবি করেছেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান।
১৯৫৭ সালে খাদ্যঘাটতি শুরু হওয়ার ৫৪ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ২০১১ সালে বাংলাদেশ আবার ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ১৯৭২ সালে দেড় কোটি টন ধান লাগত আমাদের, অথচ উৎপাদন করতে পারতাম মাত্র এক কোটি ১০ লাখ টন। গত বছর এ দেশে তিন কোটি ৬০ লাখ টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যশস্য জোগান দিয়েও এখন প্রতিবছর মোটা ধান উদ্বৃত্ত হচ্ছে আমাদের। অবশ্য প্রায় ২০ লাখ টন গম আমদানি করতে হচ্ছে, কিন্তু খয়রাত করতে হচ্ছে না। নিজেদের রপ্তানি আয় এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের অর্থে আমদানি করতে পারছি। বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান এখন এ দেশের জিডিপির ২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, যার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশই প্রকল্প ঋণ ও অনুদান। মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ খাদ্যসাহায্য। এখন আমরা আর পণ্যসাহায্য নিই না। এই সাফল্যকে যেন আমরা খাটো করে না দেখি। আল্লাহর রহমতে খাদ্যসাহায্যের মরণচক্র থেকে এই জাতিকে উদ্ধার করেছে এ দেশের কৃষক সমাজ। তাদের সঠিক প্রণোদনা দিয়ে দেশে একটি কৃষিবিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি।

তথ্য কমিশনই তথ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা by বদিউল আলম মজুমদার

সম্প্রতি রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মমিনুল ইসলামের আমন্ত্রণে আমার সেখানে যাওয়ার সুযোগ হয়। সেই ইউনিয়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘ইউনিয়ন পরিষদ গভর্নেন্স প্রজেক্ট’ প্রকাশিত একটি পোস্টার আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পোস্টারে লেখা ছিল: ‘তথ্য দিতে বাধ্য সবাই/আপনি যদি চান/সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান’। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। স্মরণ করা যেতে পারে যে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ২০০৮ সালে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নাগরিকদের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তথ্য অধিকার অধ্যাদেশ, ২০০৮ জারি করা হয়। অধ্যাদেশটি বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের সঙ্গে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হয়। নির্বাচনের পর নবম জাতীয় সংসদ অধ্যাদেশটি অনুমোদন করে। ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হওয়ায় এটি একটি শক্তিশালী আইন হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতিও পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কানাডাভিত্তিক সংগঠন ‘সেন্টার ফর ল অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’র মূল্যায়ন অনুযায়ী, আমাদের আইনটি বিশ্বের ২০টি শক্তিশালী আইনের মধ্যে একটি।
নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার একটি বহুল স্বীকৃত বিষয়। আদালত অনেক দিন থেকেই তথ্য প্রাপ্তির অধিকারকে নাগরিকের বাক্স্বাধীনতার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসছেন। কারণ, নাগরিকের মতামত সৃষ্টি ও মত প্রকাশের সহায়তার জন্য তথ্য আবশ্যক। স্টেট অব ইউপি বনাম রাজ নারায়ণ [(১৯৭৫)৪এসএসসি ৪২৮] মামলায় ভারতীয় আদালত আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে ঘোষণা করেন যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের ‘এজেন্ট’ হিসেবে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের দায়বদ্ধ হতে হয়, ফলে তাঁদের কোনো কিছু, সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া, জনগণের কাছ থেকে গোপন রাখার অবকাশ নেই। তথ্য অধিকার আইনের প্রস্তাবনায় আইনটির উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘যেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে চিন্তা, বিবেক ও বাক্স্বাধীনতা নাগরিকদের অন্যতম মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত এবং তথ্য প্রাপ্তির অধিকার চিন্তা, বিবেক ও বাক্স্বাধীনতার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ; এবং যেহেতু জনগণ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক ও জনগণের ক্ষমতায়নের জন্য তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক; এবং যেহেতু জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা হইলে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাইবে, দুর্নীতি হ্রাস পাইবে ও সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হইবে; এবং যেহেতু সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থা এবং সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নে সৃষ্ট বা পরিচালিত বেসরকারি সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়;’ তাই ‘তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার বিধান করিবার লক্ষ্যে’ তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করা হলো।
দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে আমাদের সমাজে তথ্য গোপনের একটি অশুভ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এ সংস্কৃতি থেকে পরিত্রাণের লক্ষ্যে এবং তথ্য অধিকার আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে আইনে একটি তথ্য কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়। আইনের ১৩ ধারা অনুযায়ী তথ্য কমিশনের উদ্দেশ্য হলো, মূলত তথ্য চেয়ে প্রত্যাখ্যাত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের অভিযোগ নিষ্পন্ন করা। এ ছাড়া আইনে তথ্য কমিশনকে স্ব–প্রণোদিত হয়ে অথবা কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে উত্থাপিত বিষয় সম্পর্কে অনুসন্ধান করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ২০০৯ সালে আইনটি সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হলেও গত পাঁচ বছরে আমরা নাগরিকেরা এর সুফল পাওয়া থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত। প্রতিবেশী ভারতের মতো তথ্য অধিকারের দাবিতে আমাদের দেশে এখনো একটি আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। বিরাজমান তথ্য গোপন করে রাখার সংস্কৃতিতেও কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। এ পরিস্থিতির পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তবে একটি বড় কারণ দলীয় অনুগত ব্যক্তিদের নিয়ে সরকারের আজ্ঞাবহ একটি তথ্য কমিশন গঠন, যে কমিশনের সদস্যরা নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের খুশি করার, অন্তত নাখোশ না করার ব্যাপারেই যেন বেশি আগ্রহী। রাজনৈতিক দলের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব পাওয়ার আমাদের দীর্ঘ তিন বছরের একটি ব্যর্থ ও তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে তথ্য কমিশনের এমন জনবিরোধী ভূমিকা আমাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়েছে।
রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে প্রতিটি নিবন্ধিত দলকে প্রতিবছর তাদের আয়-ব্যয়ের অডিট করা হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হয়। এই বাধ্যবাধকতার উদ্দেশ্য হলো, সংবিধান-স্বীকৃত ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তাই জনগণের অবগতির জন্য নির্বাচন কমিশনের এ তথ্য প্রকাশ করার কথা। আর যদি প্রকাশ না-ই করা হয়, তাহলে কমিশনের পক্ষে এ তথ্য নেওয়া অযৌক্তিক। বস্তুত, তা হবে রাজনৈতিক দলকে হয়রানি করার শামিল।
২০১১ সালের ৩ আগস্ট সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের অডিট করা হিসাবের কপি চেয়ে আমি নির্বাচন কমিশনে লিখিত আবেদন করি। তথ্য না পেয়ে ২০১২ সালের ১৮ জুলাই ও ৫ আগস্ট এবং ২০১৩ সালের ১৬ এপ্রিল ও ১২ জুন আমি পুনরায় আবেদন করি। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ১৪ জুলাই কমিশনের পক্ষ থেকে আমাদের জানানো হয় যে ‘নির্বাচন কমিশনে জমাকৃত রাজনৈতিক দলের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাব (অডিট রিপোর্ট) নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব তথ্য নয়,’ তাই আমি যেন এগুলো সংশ্লিষ্ট দলের কাছ থেকে সংগ্রহ করি। এরপর কমিশনের আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেও আমি তথ্য পেতে ব্যর্থ হই।
পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালের ৯ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলের আয়-ব্যয়ের হিসাবের কপি পাওয়ার লক্ষ্যে আমি তথ্য কমিশনের দ্বারস্থ হই। উভয় পক্ষকে শোনার পর কমিশন তার ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবরের রায়ে আমাকে পুনরায় নির্বাচন কমিশনে আবেদন করতে বলে। একই সঙ্গে আইনের ৯(৮) ধারার অধীনে রাজনৈতিক দলের সম্মতির ভিত্তিতে আবেদনকৃত তথ্য আমাকে প্রদান করতে
নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেয়। এরপর ২৩ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন আমাকে লিখিতভাবে জানায় যে মাত্র তিনটি দল, যার মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অন্তর্ভুক্ত নয়, তাদের দলের আয়-ব্যয়ের হিসাবের কপি আমাকে দিতে সম্মত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আমি তথ্য কমিশনের কাছে ২০১৪ সালের ১ জুন অভিযোগ দায়ের করি যে নির্বাচন কমিশন তথ্য অধিকার আইনের অধীনে একটি ‘কর্তৃপক্ষ’ এবং কমিশনের কাছে জমা দেওয়া সকল তথ্য ‘পাবলিক ডকুমেন্ট’, কারও গোপনীয় তথ্য নয় এবং এগুলো প্রকাশ করতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য। তথ্য কমিশনের নির্দেশে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে তথ্য অধিকার আইনের ধারা ৯(৮)-এর ভিত্তিতে ‘তৃতীয় পক্ষে’র মতামত নেওয়ার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে আইনের সঠিক পাঠ ও প্রয়োগ প্রতিফলিত হয়নি। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ১৬ জুলাই তথ্য কমিশনে আরেকটি শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিকালে আমি যুক্তি উত্থাপন করি যে রাজনৈতিক দল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয় এবং দলের আয়-ব্যয়ের হিসাবও গোপন তথ্য নয়। কারণ, এসব তথ্য জনগণের স্বার্থে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বিধিমালা অনুযায়ী কমিশনকে প্রদান করা হয়েছে। তাই আইনের ৯(৮) ধারা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। একই সঙ্গে আমি রাজনৈতিক দলকে তথ্য অধিকার আইনের অধীনে ‘কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করারও দাবি করি। প্রসঙ্গত, গত বছর ভারতীয় তথ্য কমিশন রাজনৈতিক দলকে কর্তৃপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে, যার ফলে ভারতীয় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের তথ্য অধিকার আইনের অধীনে জনগণকে তথ্য দিতে বাধ্য হবে।
দুর্ভাগ্যবশত, শুনানি শেষে তথ্য কমিশনের ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবরে দেওয়া রায় বহাল রাখা হয়। অর্থাৎ আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলো সম্মতি দেয়নি বলে তাদের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের হিসাবের তথ্যপ্রাপ্তি থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়। আমরা মনে করি যে কমিশনের এই রায় তথ্য অধিকার আইনের বিধান ও চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং এর মাধ্যমে জনস্বার্থকে নগ্নভাবে জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে। মূলত এতে করে তথ্য অধিকার আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যই ভণ্ডুল হয়ে গেছে।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন।

পদবঞ্চিত by সৈয়দ আবুল মকসুদ

কয়েক বছর আগে আমরা আরব বসন্ত দেখেছি। তিউনিিসয়া থেকে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের অর্ধেক উত্তাল। ওই সব দেশের রাজপথে তারুণ্যের সেকি দুর্বার বিস্ফোরণ। ঠিক আরব বসন্তের ধাঁচেই ঢাকার রাস্তায় ৪৯ বছরের কম বয়সী ছাত্র-যুবকদের বৈপ্লবিক বিস্ফোরণ দেখল দেশবাসী। দেশে রগড় করার জন্য মিছেমিছি যদি বিরোধী দল বা ওই জাতীয় কোনো সংগঠন বলে: বুধবার বিকেলে তোপখানা রোডে আন্দোলনে নামব যেখান থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঘটানো হবে সরকারের পতন—ঘোষণাটি শোনামাত্র সরকার বারুদের মতো জ্বলে ওঠে। অদৃশ্য গোয়েন্দা বিভাগ থেকে অলৌকিক বাণীর মতো ঘোষিত হয়: বুধবার সন্ধ্যায় নাশকতা হবে। মঙ্গলবার কিছু গুলি–বারুদও এদিক-ওদিকে পাওয়া যায়। কিন্তু গত সপ্তায় যখন আরব বসন্তের মতোই ‘নয়াপল্টন বসন্তে’ উত্তাল হলো ঢাকার রাজপথ সেই বৈপ্লবিক তৎপরতা উপভোগ করলেন সরকারের সাড়ে তিনজন মন্ত্রী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
১৪ অক্টোবর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ২০১ সদস্যবিশিষ্ট (আংশিক) নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। তার পরই ঢাকার রাজপথ রূপ নেয় উনসত্তরের গণ-আন্দোলনে। নবগঠিত কমিটি বাতিলের দাবিতে পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীদের আন্দোলন। কোনো অদৃশ্য জায়গা থেকে আন্দোলনটি যে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা পায় তা বাংলার অনেক বেকুফ পর্যন্ত বুঝতে পারে।
নয়াপল্টন বসন্তের প্রাথমিক পর্যায়েই বেগম খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন: সরকার বিরোধী দলে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করছে। এ কথাও তিনি যোগ করেন, তবে তাতে সরকার সফল হবে না। যেমন তিনি বা তাঁর সরকার সফল হননি সেকালের বিরোধী দল আওয়ামী লীগে ভাঙন ধরাতে। খুব বড় দলে, বিশেষ করে নীতিপ্রধান নয় নেতৃত্বপ্রধান দলে, ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করে কোনো লাভ হয় না।
যা হোক, আন্দোলনকারীদের বক্তব্য থেকে বোঝা গেল, বিএনপি যেমন সরকারের পতন না ঘটিয়ে ঘরে ফিরবে না (আসলে ঘরের ভেতর থেকে তাঁরা বেরই হননি), তেমনি নবগঠিত কমিটি বাতিল না করে ‘পদবঞ্চিতরা’ আন্দোলন ‘অব্যাহত’ রাখবেন। সারা দিন আন্দোলন করবেন এবং সন্ধ্যায় তাঁরা কেউ ফিরে যাবেন ঘরে, কেউ কোনো দপ্তরের কর্মকর্তার কক্ষে।
বাংলা ভাষা অতি সমৃদ্ধ, প্রতিশব্দে ভরপুর। বিধাতা আমাদের দুটি হাতের মতো দুখানা পা-ও দিয়েছেন। পা-কে পদ, চরণ, ঠ্যাং প্রভৃতিও বলা হয়। পদবঞ্চিতদের আন্দোলন দেখে মনে হলো, এ যেন খালেদা জিয়া তাদের দুটি পদ বা পা থেকে বঞ্চিত বা বিচ্ছিন্ন করেছেন। দুই পা ছাড়া একজন তাজা মানুষ যেমন আধা, তেমনি কোনো একটি পদ বা পোস্ট ছাড়া ওই ‘নেতা’রা আধাও নয়, সিকিও নয়, আনি-দোয়ানিও নয়—ফুটো পয়সা মাত্র। সুতরাং নেতা হিসেবে মর্যাদার অধিকারী হতে হলে ‘পদ’ দরকার।
পদ পেতে গিয়ে আন্দোলন ফাইটিংয়ে রূপ নেয়। যে নয়াপল্টন অফিসে পুলিশ-গোয়েন্দাদের পারমিশন ছাড়া একটি বিড়াল পর্যন্ত উঁকি দিতে পারে না, সেখানে বীরবিক্রমে পদবঞ্চিতরা গিয়ে বিপ্লব শুরু করেন। ফাইটিংয়ে জখম হন অনেকে। পুলিশ ফাইটিং উপভোগ করে টেলিভিশনের দর্শকদের মতোই। পদবঞ্চিত কেউ কেউ এতটাই জখম হলেন যে নিজেদের পৈতৃক পদ দুখানির চলার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেন। তাঁদের অনেককে তাঁদের সহফাইটাররা পাঁজাকোলা করে শূন্যে তুলে ধরেন। টিভির সংবাদে দেখেছি এবং খবরের কাগজেও দেখলাম, পদবঞ্চিতদের অনেকের পা দুটি আকাশের দিকে, তাঁদের মাথার দিক কোনো দরদির কোলের মধ্যে। বাংলার ছাত্ররাজনীতিতে পা ও পদ গুরুত্বপূর্ণ।
রাস্তার মধ্যে দুই দোকানদার, দুই ভাই, দুই ভায়রা অথবা বাপ-বেটা মারামারি করলে তা পুলিশ গিয়ে ঠেকাতে পারে। কিন্তু এঁদের ক্ষেত্রে পুলিশ দূরে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে মনে মনে বলছিল: বাচ্চালোকের বাবারা তালিয়া বাজাও, জোরসে তালিয়া বাজাও। ভেলকি ভালোমতো লাগুক। ছানা ও চিনি ছাড়া শুধু ময়দার গোল্লায় যেমন রসগোল্লা হয় না, তেমনি কোনো পদ ছাড়াও ‘নেতা’ হওয়া যায় না। পদ বা পোস্ট ছাড়া দাম নেই। পদবঞ্চিত নেতা জীবনের অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত। কোনো প্রতিষ্ঠান ও দোকান-মালিকেরা বা ঠিকাদারেরা চাঁদা থেকে বঞ্চিত করবেন। পদবঞ্চিত হলে নিজেদের সংগঠনের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে অথবা প্রতিপক্ষ দলের মধ্যে মারামারির হুকুম
দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। পদে বঞ্চিত হওয়ার যে ক্ষতি তা অপূরণীয়।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ছাত্রনেতারা ছিলেন আদর্শে অবিচল। তখনো দল ভেঙেছে। কেউবা দল থেকে বেরিয়ে গেছেন আদর্শগত কারণে, পদবঞ্চিত হয়ে নয়। বর্তমান মন্ত্রিসভায় সাবেক ছাত্রনেতা আছেন অনেকে। বড় দলগুলোতেও সেকালের ছাত্রনেতারা আছেন। পদবঞ্চিত হওয়া কাকে বলে তা ছিল তাঁদের অজানা। পদবঞ্চিতদের আন্দোলনে যাঁদের পদশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাঁরা দ্রুত আরোগ্য লাভ করুন এবং আশীর্বাদ করি পদপ্রাপ্ত হয়ে পদগৌরবে তাঁরা ধন্য হোন।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

বিরোধী নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার- অভিযোগ সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে

যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া যুবদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে এই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক যে দেশে কি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে? আটক করার পর তাঁদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে, কিন্তু ‘নাশকতার পরিকল্পনা’ বা এ ধরনের কিছুর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনো দৃশ্যমান নয়। বিষয়টিকে বিরোধী দল ও এর নেতা-কর্মীদের ওপর দমনপীড়ন হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে।
যুবদলের সভাপতি বা বিভিন্ন দলের এই পর্যায়ের নেতাদের বাসায় নেতা-কর্মীদের এ ধরনের সমাবেশ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সমাবেশ বা বৈঠকের ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা থেকে না থাকলে এ বৈঠকে পুলিশের অভিযানের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুলিশ বৈঠকের খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালিয়ে সবাইকে আটক করেছে এবং পরে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে। বিরোধীপক্ষকে দমন করতে সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ ও কৌশল বাংলাদেশে নতুন নয়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ সেই পুরোনো সংস্কৃতিতেই এখনো আটকে রয়েছে।
দেশকে নাশকতা বা এ ধরনের তৎপরতা থেকে মুক্ত রাখার দায় সরকারেরই। এ ক্ষেত্রে সরকার কঠোর অবস্থান নিক, সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু এর নাম করে যদি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমনের চেষ্টায় নামে, তবে গণতন্ত্রের নামে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে চরম অগণতান্ত্রিক কাজটিই করা হয়। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি, যা গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়। ‘নিয়মরক্ষার’ নির্বাচনের পর এখন যদি সরকার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে, তবে গণতন্ত্রের বর্তমান ভঙ্গুর দশা আরও শোচনীয় হতে বাধ্য।
বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর কোনো ধরনের দমনমূলক আচরণ নয়, আবার নাশকতা বা এর ষড়যন্ত্রের ব্যাপারেও কোনো ছাড় নয়। আমরা চাই, সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তদন্ত হোক স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য।

বিরোধী নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার- অভিযোগ সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে

যুবদলের সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল এবং তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়া যুবদলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে ও হচ্ছে, তাতে এই প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক যে দেশে কি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে? আটক করার পর তাঁদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে, কিন্তু ‘নাশকতার পরিকল্পনা’ বা এ ধরনের কিছুর কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনো দৃশ্যমান নয়। বিষয়টিকে বিরোধী দল ও এর নেতা-কর্মীদের ওপর দমনপীড়ন হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে।
যুবদলের সভাপতি বা বিভিন্ন দলের এই পর্যায়ের নেতাদের বাসায় নেতা-কর্মীদের এ ধরনের সমাবেশ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। সমাবেশ বা বৈঠকের ওপর কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা থেকে না থাকলে এ বৈঠকে পুলিশের অভিযানের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুলিশ বৈঠকের খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালিয়ে সবাইকে আটক করেছে এবং পরে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করেছে। বিরোধীপক্ষকে দমন করতে সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ ও কৌশল বাংলাদেশে নতুন নয়। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ সেই পুরোনো সংস্কৃতিতেই এখনো আটকে রয়েছে।
দেশকে নাশকতা বা এ ধরনের তৎপরতা থেকে মুক্ত রাখার দায় সরকারেরই। এ ক্ষেত্রে সরকার কঠোর অবস্থান নিক, সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু এর নাম করে যদি সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দমনের চেষ্টায় নামে, তবে গণতন্ত্রের নামে দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে চরম অগণতান্ত্রিক কাজটিই করা হয়। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি, যা গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয়। ‘নিয়মরক্ষার’ নির্বাচনের পর এখন যদি সরকার বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর খড়্গহস্ত হয়ে ওঠে, তবে গণতন্ত্রের বর্তমান ভঙ্গুর দশা আরও শোচনীয় হতে বাধ্য।
বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর কোনো ধরনের দমনমূলক আচরণ নয়, আবার নাশকতা বা এর ষড়যন্ত্রের ব্যাপারেও কোনো ছাড় নয়। আমরা চাই, সুনির্দিষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তদন্ত হোক স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য।

অর্থনীতিতে নারীর অবদান- বিপুল ভূমিকার প্রতিফলন নারীর জীবনেও ঘটুক

‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার সত্য যখন অর্থনীতির গবেষণায় প্রতিফলিত হয়, তখন বিস্মিত হতে হয় বৈকি!
সম্প্রতি উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) একটি গবেষণা দেখাচ্ছে: দেশের মোট দেশজ জাতীয় উৎপাদনের কাছাকাছি নারীর অবদান! অথচ এখনো সমাজে ও রাষ্ট্রে নারীরাই সবচেয়ে বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এই সত্যের প্রতিফলন পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রে আসতে তাই আর কত দেরি পাঞ্জেরী!
দৈনন্দিন জীবনের দিকে তাকালেই সিপিডির গবেষণার বাস্তবতা স্পষ্ট হয়। পরিবার হলো সমাজ ও রাষ্ট্রের একক। সেই পরিবারের প্রজনন, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচর্যাসহ সংসার ও আবাসকে গতিশীল রাখার মূল কাজটি করেন নারী, যিনি কন্যা, জায়া অথবা জননী। পরিবার না চললে পরিবারের সদস্যদের কাজকর্ম ও জীবনযাপন অসম্ভব হতো। নারীর এই নীরব অবদানের অর্থমূল্য ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা; যা গত বছরের মোট জিডিপির ৭৮.৮ শতাংশ। এ গবেষণা থেকে এটাও প্রমাণ হয় যে, অর্থনীতি তথা সামগ্রিকভাবে সমাজে নারীর নীরব অবদানেক অন্তর্ভুক্ত করার মতো অর্থনৈতিক পদ্ধতির গুরুতর সংকট রয়েছে।
ঘরে ১০ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার কাজ করেন নারী গবেষণায় আরও দেখানো হয়েছে যে প্রতিদিন একজন নারী গড়ে একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সময় এমন কাজ করেন, যা জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। সুতরাং অর্থ রোজগারের জোরে পুরুষ যে ক্ষমতা চর্চা করেন, তা কতটা যুক্তিসংগত? নারীর অবদান অস্বীকারের ওপরই তো পুরুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ভরশীল!
জাতীয় অর্থনীতিতে নারী সরাসরি যে শ্রম ও উদ্যোগ যুক্ত করেন, তার জন্য পোশাকশ্রমিক, খুদে নারী উদ্যোক্তাসহ অন্যরা অভিনন্দিত হন। কিন্তু সাংসারিক কাজের মাধ্যমে তাঁরা যে অবদান রাখেন, তার স্বীকৃতি ও প্রতিদানও প্রয়োজন। যুগ বদলাচ্ছে, নারীর অবস্থার উন্নতি ও পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো দেশের পক্ষেই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং অর্থনীতিতে, আইন কাঠামোয়, রাজনীতি ও অধিকারের ক্ষেত্রে নারীর অবদানের প্রতিদান থাকা উচিত। শিক্ষার মতোই একে সমাজ বিকাশের বিনিয়োগ ভাবা উচিত। এতে করে নারী-পুরুষের মিলিত সমাজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বাড়বে বৈ কমবে না।

পদ্মা সেতু মামলায় দায়মুক্তি- সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এখন রাজনীতির হাতিয়ার

দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় এনে দুর্নীতি দমনের জন্য স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠান মনে হচ্ছে কাজের পরিধি বদলে ফেলেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন এখন সরকারের লোকজনকে দায়মুক্তির প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। দুদক ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য কিংবা আমলাদের একের পর এক দুর্নীতির দায় থেকে অব্যাহতি দিয়ে চলেছে। সর্বশেষ দুর্নীতি দমন কমিশন পদ্মা সেতু মামলার সব অভিযুক্তকে অব্যাহতি দিয়েছে। বলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়নি কমিশন।
বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির ব্যাপারে যখন অভিযোগ তোলা হয়, তখন সরকারের মন্ত্রীরা তা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। পরে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে যখন বিভিন্ন ধরনের তথ্যপ্রমাণ দিয়ে সরকারকে চাপ দেয়া হয়, তখন দুর্নীতি দমন কমিশন তা তদন্ত শুরু করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ কয়েকজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। সে সময় দুর্নীতির গন্ধও খুঁজে পেয়েছিল দুদক। শেষ পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগের কারণে বিশ্বব্যাংকসহ অপর দাতা সংস্থাগুলো পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এরপর এই মামলা নিয়ে দুদকের অবস্থানের পরিবর্তন হতে থাকে। সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনকে আগেই অব্যাহতি দেয়া হয়। ধীরে ধীরে অন্যরাও অব্যাহতি পান।
বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে এই মামলার সমাপ্তি হলেও পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএনসি নাভালিনের বিরুদ্ধে কানাডার আদালতে মামলা চলছে। সেই মামলায় বাংলাদেশের অনেকের নাম বেরিয়ে আসতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশন নিজেরা তদন্ত করে যদি দুর্নীতির কোনো তথ্য-প্রমাণ না পেয়েই থাকে তবুও কমিশনের উচিত ছিল অন্তত কানাডার আদালতের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করা। অভিযুক্ত সবাইকে দায়মুক্তি দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আরেক দফা প্রশ্নবিদ্ধ হলো।
দুর্নীতি দমন কমিশন ক্ষমতাসীন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য না পেলেও বিরোধী দলের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট সবার বিরুদ্ধে তথ্য পাচ্ছে এবং মামলা চালিয়ে নিচ্ছে। এমনকি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা চূড়ান্তপর্যায়ে আছে। আমরা লক্ষ করছি, বিরোধী রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট একজনকেও দুদক কিন সার্টিফিকেট দেয়নি। এমনকি ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তিরাও দুদকের মামলা থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের একাধিক মন্ত্রী, তাদের পুত্র ও সংসদ সদস্যরা কিন সার্টিফিকেট পেয়ে গেছেন।
একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রশ্নবিদ্ধ মামলা প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দমনের হাতিয়ার হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন ব্যবহার হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এভাবে চললে বাংলাদেশ দুর্নীতিবাজদের দমনের নয়, বরং লালনের ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।

উজানে বাঁধ দিয়ে গঙ্গাচুক্তি লঙ্ঘন করতে ভারতকে নিষেধ করেছে বাংলাদেশ by সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ

গঙ্গার উজানে ভারতের বাঁধ নির্মাণে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এসব বাঁধ নির্মাণ বা পানি প্রবাহ বন্ধে সব ধরনের প্রকল্প যে গঙ্গাচুক্তির লঙ্ঘন হবেÑ সে ব্যাপারে ভারতকে সতর্ক থাকতেও বলেছে বাংলাদেশ। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত গঙ্গাচুক্তির ৯ ধারায় সুস্পষ্ট করে বলা আছে যে, ভারত গঙ্গাসহ সব অভিন্ন নদীর ওপর এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, গঙ্গার উজানে আরো ১৬টি বাঁধ নির্মাণের খবরটি উল্লেখ করে বাংলাদেশ ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত গঙ্গাচুক্তির ৯ ধারা লঙ্ঘন না করতে বলেছে ভারতকে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. জাফর আহমেদ খান নয়া দিগন্তকে বলেন, গঙ্গার উজানে আরো ১৬টি বাঁধ নির্মাণের খবরে বাংলাদেশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। গঙ্গার উজানে এসব বাঁধ কী কারণে নির্মিত হতে যাচ্ছেÑ সে ব্যাপারে ভারতের কাছে তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতকে বলেছে, গঙ্গার উজানে তারা (ভারত) কী কী প্রকল্প নিচ্ছে সে ব্যাপারে জানার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। কারণ ১৯৯৬ সালে দুই দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করতে পারে না ভারত। তবে ভারতের কাছে জবাব চেয়ে পাঠানো চিঠির তাৎক্ষণিক জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানান ড. জাফর আহমেদ খান। তিনি বলেন, এটির উত্তর পেতে একটু সময় লাগবে।
সম্প্রতি ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া গঙ্গার উজানে আরো ১৬টি বাঁধ নির্মাণের খবর প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার এলাহাবাদ থেকে হলদিয়ার ১৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গা-হুগলির ওপর ১০০ কিলোমিটার অন্তর একটি করে বাঁধ দেবে। এসব ব্যারাজের মাধ্যমে ধরে রাখা পানি ভারত শুষ্ক মওসুমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কৃষি সেচ সুবিধা বিস্তারে ব্যবহার করবে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও উৎপাদিত হবে। তবে যেহেতু বর্তমানে ব্যারাজ নির্মাণ একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প, তাই ভারত ব্যারাজের জন্য ব্যয়ের অর্থ তুলে নিতে এ ক্ষেত্রে নৌপথের প্রকল্পও সংযুক্ত করেছে। উজানে ভারতের এ ধরনের নতুন প্রকল্প নেয়ার আগেই প্রায় চার শত ড্যাম ব্যারাজ নির্মাণ করে ফেলেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের অজুহাত তুলে ভারত গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত করছে বাংলাদেশকে। গঙ্গাচুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি ভাগাভাগি কার্যক্রম শুরু হয়, চলে প্রতি বছরের মে’র ৩০ তারিখ পর্যন্ত।
গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ৩০ বছরমেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী ফারাক্কা পয়েন্টে ২০১১ সালে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ৬৬ হাজার ২২৪ কিউসেক পানি কম পেয়েছে বাংলাদেশ। চুক্তির ইন্ডিকেটিভ শিডিউল অনুযায়ী ১০ কিস্তিতে ভারত এই পরিমাণ পানি কম দিয়েছে বাংলাদেশকে।  বাংলাদেশ ওই তিন মাস ১০ দিনে প্রতি কিস্তিতে গড়ে ছয় হাজার কিউসেক পানি কম পেয়েছে।
গঙ্গা চুক্তি শর্তের বিপরীতে ২০০৬ সালে চার মাসে বাংলাদেশ  এক লাখ ১৭ হাজার ৮৩৪ কিউসেক পানি কম পেয়েছিল। ওই বছর ফারাক্কায় বাংলাদেশ মার্চের শেষ ১০ দিনে সবচেয়ে পানি কম পেয়েছে। এটা ছিল স্মরণকালের সর্বনিম্ন প্রবাহ।
২০০৮ সালে জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম ১০ দিন পর্যন্ত চার কিস্তিতে বাংলাদেশকে ৩৮ হাজার ৭২ কিউসেক পানি কম দিয়েছে ভারত।
২০০৯ সালে দুই মাসে ফারাক্কা পয়েন্টে ৪১ হাজার ৫১৩ কিউসেক পানি কম দিয়েছিল ভারত।
তবে ২০০৭ সালে চুক্তি অনুযায়ী কয়েকটি কিস্তিতে বাংলাদেশ চুক্তির চেয়ে বেশি পানি পেয়েছে।
১৯৯৮ সালেও সব কিস্তিতে ইন্ডিকেটিভ শিডিউলের চেয়ে বাংলাদেশ পানি বেশি পেয়েছিল। এ ছাড়া ২০১৩ সালে গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী পানি পেয়েছে।

বন্দরে শুল্ক ফাঁকির মহোৎসব! by মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী

দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল শুধু নয়, দেশের সব স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর এবং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার যেন মহোৎসব চলছে, তা দেখার কেউ নেই। অভিযোগ, যাদের দেখার কথা, তাদের বাসায় আগেই প্যাকেট বা বড় খাম হাজির হয়ে যায় বলেই তারাও নীরব-নির্বিকার। প্রায় প্রতিদিন বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে বিনা শুল্কে পার হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান পণ্যসামগ্রী। কাস্টমসের একশ্রেণীর কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে বন্দরটিতে শুল্ক ফাঁকির এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটই বেনাপোল বন্দরের সব কিছু দেখভাল করে থাকে। এতে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হলো, বন্দরগুলোতে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা চরম আকারে দেখা দিয়েছে। জানা গেছে, স্থানীয় ও জাতীয়পর্যায়ে সরকারদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের তদবির ও প্রশ্রয়ে অসৎ কাস্টমস কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা বেআইনি এ কাজে লিপ্ত। বেনাপোল স্থলবন্দরের মাধ্যমে বছরে প্রায় পাঁচ-ছয় হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি-রফতানি হয়ে থাকে। রাজস্ব আদায়ে চট্টগ্রাম বন্দরের পরই এর অবস্থান। বৈধ পথে পণ্য আমদানি করে ব্যবসায়ীরা এখানে বছরে তিন-চার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব দেন সরকারি কোষাগারে। তবে এ বিপুল রাজস্ব জমা দেয়ার ক্ষেত্রে এখানে চলে বিভিন্ন অনিয়ম, চুরি, দুর্নীতি ও শুল্ক ফাঁকি দেয়ার মতো ঘটনা।
আরো অভিযোগ রয়েছে যে, শুল্ক ফাঁকি দিতে অসাধু কাস্টমস কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ব্যবসায়ীদের বাধ্য করে থাকেন। এমনকি বৈধভাবে পণ্য আনলেও বিভিন্ন অজুহাতে আমদানিকারকদের বিড়ম্বনা ও হয়রানি করা হয়ে থাকে এবং এ ক্ষেত্রে বিপুল টাকা কাস্টমস কর্তাব্যক্তিদের দিতে হয়। দীর্ঘ দিন যাবৎ এ ধরনের অনিয়ম চলছে দেশের সব বন্দরে। দুর্নীতিবাজ কাস্টমস কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ব্যাংক ব্যালান্স, ফ্যাট, জমাজমিসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যা দুদকের তদন্তের মাধ্যমে বের হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কে করবে তাদের বিচার এবং কে দেবে তাদের শাস্তি? এনবিআর শুধু নয়, অর্থ মন্ত্রণালয় খুব ভালোভাবে এসব বিষয় জানে। এ দিকে, রাজনৈতিক প্রভাবে দেশ হারাচ্ছে শত শত কোটি টাকার রাজস্ব। আমাদের দেশে বিমানবন্দর থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর আমদানি-রফতানি পণ্যে শুল্ক ফাঁকি দেয়ার আরেক মহোৎসবের ঘাঁটি। এখানে বড় বড় চালানে কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেয়া হয়, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা দুষ্কর। অথচ কাস্টমস বিভাগের কেউ কারো বিরুদ্ধে এ সব বিষয়ে কোনো অভিযোগ করে না। লোভী ব্যক্তিরা সরকারের শুল্ক কম দেখিয়ে বাকিটা নিজেদের পকেটে ভরছে। এ অবস্থা থেকে দেশবাসী পরিত্রাণ পেতে চান। অবিলম্বে স্থল ও নদীবন্দরগুলো থেকে লুণ্ঠনের দৌরাত্ম্য দূর করতে হলে কাস্টমসকে আরো বেশি যতœশীল হতে হবে। জনগণের টাকা এভাবে যারা পকেটে ভরে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে আমাদের দেশের বন্দরগুলোতে সৎ ও নিষ্ঠাবান শুল্ক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগ দানের জন্য সরকারের সচেষ্ট হওয়ার অনুরোধ জানাই।

মেরন সান স্কুল চান্দগাও ক্যাম্পাস এর জে এস সি পরীক্ষার্থীদের দিক নিদের্শনা মূলক আলোচনা ও দোয়া মাহফিল

মেরন সান স্কুল চান্দগাও ক্যাম্পাস এর জে এস সি পরীক্ষার্থীদের দিক নিদের্শনা মূলক আলোচনা ও দোয়া মাহফিল।
মেরন সান স্কুল চান্দগাও ক্যাম্পাস এর জে এস সি পরীক্ষার্থীদের নিদের্শনামূলক বক্তৃতা দিচ্ছেন অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্

রাজধানীর গণপরিবহন- ঠাঁই নাই, আছে ঝুঁকি–ভোগান্তি by সামছুর রহমান

যে শহরের গণপরিবহনব্যবস্থা যত ভালো ও সুশৃঙ্খল, সে শহর তত বেশি নাগরিকবান্ধব, বাসযোগ্য। সে বিচারে রাজধানী ঢাকার অবস্থা কী? গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করে ঢাকায় যাতায়াত যে কী যন্ত্রণার, তা কেবল ভুক্তভোগীরা বলতে পারেন। ঢাকার গণপরিবহন নিয়ে আজ থাকছে বাসে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা
সোমবার সকাল নয়টা। রাজধানীর কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে শ খানেক মানুষ বাসের অপেক্ষায়। গাবতলী থেকে যাত্রাবাড়ী পথে চলাচলকারী (২২/এ নম্বর রুট) একটি মিনিবাস আসামাত্রই ওঠার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন ২০-২৫ জন। কিন্তু টেকনিক্যাল মোড়ের দিক থেকেই মিনিবাসটি এসেছে যাত্রীতে পূর্ণ হয়ে, তিলধারণের ঠাঁই নেই। যাওয়ার তাড়ায় দরজার পাদানিতে কোনোরকমে পা রেখে হাতল ধরে ঝুলে পড়লেন কয়েকজন।
পাদানিটি মূলত বাসের চালকের সহকারীর দাঁড়ানোর জন্য। এখান থেকেই যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে হাঁকডাক করে সহকারী। এই মিনিবাসে ঝুলন্ত যাত্রীর সংখ্যা এত বেশি ছিল যে চালকের সহকারীও বলতে বাধ্য হন, ‘গেটে ঝুইলেন না ভাই, কইতাসি না ভাই, ঝুইলেন না।’
গণপরিবহনে এই ভোগান্তি কতটা, তা দেখতে এই প্রতিবেদকও হাতল ধরে ঝুলে পড়েন মিনিবাসটিতে। চলতে শুরু করে মিনিবাস। এই যাত্রা শেষ হয় যাত্রাবাড়ী মোড়ে গিয়ে। কিছুক্ষণ পর অবশ্য ঠেলে কোনোরকমে দরজায় দাঁড়ানো সম্ভব হয়। দরজায় কোনোমতে দাঁড়ানো যাত্রীদের একটু পর পরই চালকের সহকারী বলছিলেন, ‘ভাই, একটু চাইপা দাঁড়ান’, ‘আপনি ওই পাশের রডটা ধরেন।’ কিন্তু দরজা আর বাসের ভেতর—সব স্থানেই রড ধরার জায়গা পেতেও সংগ্রাম করতে হচ্ছিল।
প্রতিবেদক যাত্রাবাড়ী নেমে আরেকটি মিনিবাসে চড়ে কুড়িল বিশ্বরোডে যান। সেখান থেকে একটি মিনিবাসে চেপে মহাখালীতে যখন নামেন, তখন বিকেল সোয়া চারটা। ভ্রমণ দূরত্ব ৩৯ কিলোমিটার। কিন্তু সময় লেগেছে সোয়া সাত ঘণ্টা। সব পথেই বাস-মিনিবাসের চিত্র প্রায় এক, পুরোটাই ভোগান্তি আর ঝুঁকিতে ভরা। বাস–মিনিবাসই অধিকাংশ নগরবাসীর যাতায়াতের মূল ভরসা।
রাজধানীর গণপরিবহনের চিত্র বর্তমানে এমনই; বিশেষ করে সকালে দাপ্তরিক কাজকর্ম শুরুর আগে এবং বিকেলে ছুটির পর একসঙ্গে অনেক মানুষ রাস্তায় নেমে এলে। যাত্রীর এই চাপ রাজধানী ও এর আশপাশে চলা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বাস-মিনিবাসের পক্ষে নেওয়া একেবারেই অসম্ভব।

>>ভিড় ঠেলে প্রতিদিন গণপরিবহনে উঠতে হচ্ছে যাত্রীদের। গতকাল বিকেল সাড়ে চারটায় ফার্মগেটে বাসটি এলে হুমড়ি খেয়ে পড়েন যাত্রীরা l ছবি: প্রথম আলো
কল্যাণপুর থেকে যাত্রাবাড়ী: কল্যাণপুর থেকে চলতে শুরু করা ২২/এ নম্বর রুটের মিনিবাসটি শ্যামলী, শিশুমেলা, কলেজগেট, আসাদগেট—সব স্থানে থেমেছে। দু-একজন যাত্রী নামার বিপরীতে ওঠার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন কয়েকজন। সংকেত, যানজটে আটকে থাকার পরও যাত্রীতে পূর্ণ মিনিবাসটি সব জায়গায় থেমেছে তিন থেকে পাঁচ মিনিট পর্যন্ত। এ সময়ে প্রাণান্ত চেষ্টায় কষ্টকর যাত্রায় শামিল হয়েছেন কয়েকজন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর মাঝামাঝি এসে চালক ইঞ্জিন বন্ধ করে দেন। কারণ, সামনে আটকে থাকা যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ফার্মগেটের খামারবাড়ী মোড় থেকে সারি দীর্ঘ হতে হতে তখন সেখানে ঠেকেছে। সব বাস-মিনিবাসেই যাত্রীতে ভরপুর। অবস্থা বেগতিক দেখে যাত্রীদের অনেকেই নেমে ফার্মগেটের দিকে হাঁটা শুরু করেন। ফলে কিছুটা ফাঁকা হয় মিনিবাস। প্রতিবেদকের সুযোগ হয় ভেতরে প্রবেশের। সুযোগও হয় বসার। পাখাহীন ভেতরটায় গুমোট অবস্থা। হাঁটু লেগে যাচ্ছিল সামনের আসনে। যানজটের সুযোগে বাসের ভেতরে, জানালার পাশে হাঁকডাক শুরু হয় বাদাম, আমড়া, পপকর্ন, চিপসের হকাররা। কেউ কেউ কিনলেনও।
খেজুরবাগান পার হওয়ার পর আটকা পড়ে খামারবাড়ী সিগন্যালে। এভাবে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, রূপসী বাংলা মোড়, শাহবাগ যেন একেকটি বিভীষিকার নাম। প্রতিটি স্থানে যানজট, যেখানে-সেখানে যাত্রী নামানো-ওঠানো আর ধীরগতির চালনায় কল্যাণপুর থেকে যাত্রাবাড়ী পৌঁছতে সময় লাগল সাড়ে তিন ঘণ্টা। এই পথের এক নিয়মিত বাসযাত্রী জানান, সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে এই পথ যেতে লাগে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা।
যাত্রাবাড়ী থেকে কুড়িল-বিশ্বরোড: যাত্রাবাড়ী থেকে গ্রেট তুরাগ নামের টঙ্গীগামী মিনিবাসে উঠতে তেমন সমস্যা হয়নি। কারণ, এর যাত্রা শুরুই সেখান থেকে। যাত্রাবাড়ীর মেয়র হানিফ উড়ালসড়কের (ফ্লাইওভারের) নিচে চলাচলের জায়গা সংকীর্ণ। এর ওপর বাস-মিনিবাস সারি করে রেখে পথ আরও সংকীর্ণ করা হয়েছে। ফলে ধীরগতির কারণে যানজট লেগেই থাকে। তবে সায়েদাবাদ আসতে না-আসতেই মিনিবাস যাত্রীতে ভরে যায়। জনপথ মোড় থেকে গোলাপবাগ পর্যন্ত রাস্তার বেহাল অবস্থায় এক যাত্রীর সরস মন্তব্য, ‘মাজা ব্যথার ওষুধ কেনার টাকা দিবে কে?’
বাসযাত্রীদের অভিযোগ, সিটিং সার্ভিসের কথা বলে ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে, আবার দাঁড়িয়েও যাত্রী নিচ্ছে। কিন্তু প্রতিবাদ করেও কোনো লাভ হয় না। বেশির ভাগ যাত্রী এর প্রতিবাদও করেন না। এ বিষয়ে মিনিবাসের চালক-সহকারীর বক্তব্য, ‘রাস্তায় গাড়ি নাই। মানুষ কী করবে। আমরা তো উঠাইতে চাই না। পাবলিক জোর করে ওঠে।’
মালিবাগ চৌধুরীপাড়া থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে মিনিবাসে উঠলেন শহীদা বেগম। মহিলা ও শিশুদের জন্য সংরক্ষিত আসনে পুরুষেরা বসে ছিলেন। আসন ফাঁকা করে দিতে বললেও চালকের সহকারী নিরুপায়। সহকারী মো. রাকিব বললেন, ‘মহিলা সিটে ব্যাটারা বইসা থাকে। কইলেও সিট ছাড়ে না। মহিলাগোরে এমন ভিড় গাড়িতে উঠতে মানা করলেও শুনে না।’
যানজট ঠেলে যাত্রাবাড়ী থেকে কুড়িল বিশ্বরোডে পৌঁছতে লাগল তিন ঘণ্টা।
কুড়িল বিশ্বরোড থেকে কারওয়ান বাজার: কুড়িল বিশ্বরোড় থেকে বলাকা পরিবহনের একটি মিনিবাসে মহাখালী আসতে আসতে বিকেল সোয়া চারটা। সেখানে এক সহকর্মীকে পেয়ে কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচার জোগাড় হয়। কারণ, তাঁর সঙ্গে ছিল মোটরসাইকেল। যানজট থাকলেও বাকি পথ পাড়ি দিতে কোনো বেগ পেতে হয়নি।
মোটরসাইকেলে আসার পথে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজারে আবারও কয়েক শ যাত্রীকে বাসের অপেক্ষায় থাকতে দেখা যায়। দু-একজন বাসের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে উঠতে না পেরে হাঁপাচ্ছিলেন। মিরপুর ১০ নম্বরগামী বাসে উঠতে ব্যর্থ হওয়া ব্যাংক কর্মকর্তা রফিকুল আলম বললেন, ‘পাবলিক বাস কী জিনিস, তা এর পেছনে না দৌড়ালে বোঝা যায় না। প্রতিদিন একই যুদ্ধ। কিন্তু বাড়ি তো যাওয়া লাগবে। আর এটি তো শুধু ফার্মগেটের নয়, এখন পুরো ঢাকার রোজকার চিত্র।’

উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় মামলা করেও হতাশ ভুক্তভোগী পরিবার by কাজী আনিছ

উত্ত্যক্ত করার ঘটনায় থানায় মামলা করার পরও স্বস্তি পাচ্ছে না ভুক্তভোগী পরিবার। তদন্তে ধীরগতি, পুলিশের অবহেলা এবং আসামি গ্রেপ্তারের পর দ্রুত জামিনে বের হয়ে আসায় পরিবারগুলো হতাশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বখাটেদের উৎপাতে আত্মহত্যা করেছে ১০ নারী। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে একজন, প্রতিবাদ করায় খুন হয়েছে সাতজন, বখাটেদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছে ১৩০ জন, উৎপাতকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে আহত হয়েছে ৫৭ জন এবং বখাটেদের উৎপাতে পাঁচজনের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এসব ঘটনার প্রতিটিতেই মামলা হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কিন্তু উত্ত্যক্ত করাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনায় মামলার বাদীপক্ষ বলছে, থানায় মামলা করে তারা স্বস্তিতে নেই। ঘটনা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রকাশিত কিংবা প্রচারিত হলেই পুলিশ তৎপর হয়। আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পর সব থেমে যায়। এই সুযোগে জামিনে বের হয়ে আসে আসামিরা।
গত ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর খিলগাঁওয়ের নন্দীপাড়ায় কীটনাশক খেয়ে আত্মহত্যা করে নবম শ্রেণির ছাত্রী উম্মে কুলসুম ওরফে ঋতু। পরিবার ও স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, স্থানীয় বখাটে শিমুলসহ কয়েক যুবকের উৎপাত সইতে না পেরে কুলসুমের এমন আত্মহনন। ঘটনার পর কুলসুমের মা সাথী আক্তার বাদী হয়ে শিমুলসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পুলিশ শিমুলসহ এজাহারভুক্ত পাঁচজনের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি। শুধু গত ৮ সেপ্টেম্বর পুলিশ সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে শেখ মো. নেওয়াজ ইবনে আকরাম ওরফে জিহাদ নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু এক মাসের মাথায় জিহাদ জামিনে বেরিয়ে যায়। এ ঘটনায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া রফিক নামের আরেক সন্দেহভাজন এখন কারাবন্দী। এখন পুলিশসহ সবাই চুপ।
কুলসুমের স্কুলের এক শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, এলাকাবাসী পুলিশকে তথ্য দিয়ে জিহাদকে গ্রেপ্তার করিয়েছে। অন্যদিকে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের ওপর চাপ দিলে তারা রফিককেও পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। শুরু থেকেই এ ঘটনায় পুলিশকে পেশাগত জায়গা থেকে নিজেদের উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। কুলসুমের বাবা মো. আশিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ একদম ঠান্ডা। এখন পর্যন্ত মূল আসামিদেরই ধরতে পারেনি। জিগাইলে বলে, ধরতেছে। এ আশায় থাকতে থাকতে একজন জামিন পাইয়া গেল। আপনারা একটু লিখছিলেন বইলাই পুলিশ কিছু কাজ করছিল। এখন বন্ধ। মেয়ে হারাইছি, যন্ত্রণা ভুলতে পারি না। মামলা কইরা যে বিচার পামু, সে আশাও আর দেখতাছি না।’
জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহজাহান বলেন, ‘আসামি জিহাদ গত ১২ অক্টোবর জামিনে বের হয়ে গেছে বলে শুনেছি। তবে এখনো কাগজপত্র হাতে পাইনি।’ এজাহারভুক্ত আসামিরা কোথায়? জবাবে এসআই বলেন, আসামিদের অবস্থান এখনো শনাক্ত হয়নি। ফোনের কল তালিকা নিয়ে দেখেছি, তাদের সর্বশেষ অবস্থান ছিল চট্টগ্রামে।
রাজধানীর ভাষানটেকের নাসির হোসেন হত্যার ঘটনায়ও মামলা করে নিরাপত্তাহীনতায় আছে ভুক্তভোগী পরিবার। কারণ, এখন পর্যন্ত অর্ধেকেরও বেশি আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। মামাতো বোনকে উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদের জের ধরে নাসির হোসেনকে (২৫) পিটিয়ে হত্যা করে ভাষানটেকের সন্ত্রাসীরা। ঘটনায় নাসিরের বড় ভাই মো. মোশারফ বাদী হয়ে সাতজনের নাম উল্লেখ করে থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে আরও সাতজন আসামির নাম পুলিশের কাছে জমা দেন তিনি।
তবে এ ঘটনায় আসামি না ধরে বাদীপক্ষকে সামাল দিতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে ভাষানটেক থানার পুলিশ। ঘটনাকে ‘উত্ত্যক্তের প্রতিবাদে হত্যা’ নয় বলে দাবি করে থানার পুলিশ। এ মর্মে নাসিরের মামাকে দিয়ে জোর করে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করারও অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। আসামিদের সঙ্গে পুলিশের সখ্যেরও অভিযোগ ওঠে। এ কারণে নাসির হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ভাষানটেক পুলিশ ফাঁড়ির ১৯ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। প্রত্যাহার করা হয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও পরিদর্শককে (তদন্ত)।
এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) টাঙ্গাইল থেকে এজাহারভুক্ত আসামি মো. শরীফ ওরফে চোক্কা ও রাজধানীর গাবতলী থেকে এজাহারভুক্ত বাবুল ব্যাপারী ওরফে বাবলু ও সন্দেহভাজন আলতাফ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। এই তিনজন ছাড়া এখন পর্যন্ত ১১ জন এজাহারভুক্ত ও সন্দেহভাজন আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে। অর্ধেকেরও বেশি আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় আতঙ্কে আছে ভুক্তভোগী পরিবার। এরই মধ্যে ভয়ে ভাষানটেক এলাকা ছেড়েছেন নাসিরের দুই বোন। নাসিরের বড় ভাই মো. মোশারফ বলেন, এখন নাসিরের পরিবার বলতে তিনিই এলাকায় আছেন। আসামিরা এলাকার আশপাশেই আছে এবং তাঁকে হুমকি দিয়েই যাচ্ছে। মামলাটি বর্তমানে তদন্ত করছে ডিবি। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ডিবি।

সংলাপ ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি

দিলমা রুসেফ
ব্রাজিলে গত রোববারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অল্পের ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থী দিলমা রুসেফ। জয়ী হওয়ার পরপরই তিনি দ্বিধাবিভক্ত ব্রাজিলীয়দের প্রতি ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি সবার সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন, হাতে নেবেন নানা সংস্কার কর্মসূচি। খবর এএফপি ও বিবিসির। বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অর্থনীতি ব্রাজিলের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট রুসেফ দ্বিতীয় দফা (রান-অফ) নির্বাচনে ভোট পেয়েছেন ৫১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ও বাজারবান্ধব হিসেবে পরিচিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এসিও নেভিস পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ ভোট। ৯৯ শতাংশেরও বেশি ব্যালট পেপার গণনা করার পর এই ফল জানিয়েছেন দেশটির নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। জয়ী হওয়ার পর ঐক্যের ডাক দিয়েছেন ৬৬ বছর বয়সী সাবেক বামপন্থী গেরিলা রুসেফ। বলেছেন, ব্রাজিলীয়রা যে পরিবর্তন চান, তা তিনি জানেন। পরিবর্তন তিনি আনবেন সংলাপের মাধ্যমে। রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় জড়ো হওয়া সমর্থকদের উদ্দেশে রুসেফ বলেন, ‘আপনাদের এই প্রেসিডেন্টের সংলাপের জন্য দিল-খোলা। আমার দ্বিতীয় মেয়াদে এটাই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাবে।’ রুসেফ যখন এসব কথা বলছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা।
সিলভার কাছ থেকে চার বছর আগে রুসেফ যখন দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন যে চাঙা প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি পেয়েছিলেন, তার গতি শ্লথ হতে হতে চলতি বছরে প্রায় মন্দা অবস্থায় ঠেকেছে। বিষয়টি স্বীকারও করে নিলেন রুসেফ। প্রতিশ্রুতি দিলেন, নতুন মেয়াদে নিজের কর্মপথের উন্নয়ন ঘটানোর এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরারও। বললেন, ‘এখন পর্যন্ত যা আছি, তার চেয়ে অনেক ভালো প্রেসিডেন্ট হতে চাই আমি।’ দেশে শান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় রুসেফ যে ডাক দিয়েছেন, তাতে সমর্থন দিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নেভিসও। ৫৪ বছর বয়সী এই সিনেটর জানিয়েছেন, তিনি ফোন করে রুসেফকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মিনাস গেরাইস প্রদেশের রাজধানী বেলো হরিজন্তে শহরে জড়ো হওয়া হতাশ সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নেভিস বলেন, ‘আমি তাঁকে (রুসেফকে) বলেছি, ব্রাজিলকে ঐক্যবদ্ধ করাই হবে সবচেয়ে অগ্রাধিকারভিত্তিক কাজ।’ এই প্রদেশেই দুই মেয়াদে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছেন নেভিস। রুসেফ ও নেভিস উভয়েরই জন্ম ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মিনাস গেরাইস প্রদেশে। দেশটির দ্বিতীয় জনবহুল এই প্রদেশে রুসেফ ৫২ দশমিক ৪ এবং নেভিস ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এটাই দুই প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দিয়েছে। ব্রাজিলে এমন প্রবাদই প্রচলিত আছে যে, যিনি মিনাস জয় করেন, তিনিই ব্রাজিল জয় করেন। দেশের দরিদ্র উত্তরাঞ্চল সব সময়ই রুসেফের বামপন্থী ওয়ার্কার্স পার্টির (পিটি) ঘাঁটি। আর সমৃদ্ধ দক্ষিণাঞ্চলে নেভিসের সমর্থন অনেক বেশি। সে হিসেবে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মধ্যবিত্ত ভোটাররা রুসেফের দিকে মুখ তুলে তাকানোয় তিনি উতরে গেছেন।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ: এবারে নির্বাচনকে বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে ব্রাজিলে বামপন্থীদের ১২ বছরের শাসনের ওপর একটা গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ভোটারদের মূল বিবেচনায় ছিল পিটি সরকারের ঐতিহাসিক সামাজিক অগ্রগতির যথার্থতার বিপরীতে নেভিসের ডানপন্থী সোশ্যালিস্ট পার্টির বাজারবান্ধব নীতির মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি। এই দুই ইস্যু সামনে নিয়ে এসে দুই শিবির নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় একে অপরকে তুলাধোনা করেছে। দেশটির জনগণ এখন এতটাই দ্বিধাবিভক্ত যে, আগামী চার বছর রুসেফকে দেশের শাসনভার পরিচালনা করতে গিয়ে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। গেতুলিও ভারগাস ফাউন্ডেশনের রাজনীতি বিশ্লেষক ড্যানিয়েল বারসেলোস ভারগাস বলেন, ‘দিলমার সামান্য ব্যবধানের জয় একটা বড় চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এসেছে: তাঁকে এখন ভীষণ বিদ্বেষের দ্বারা বিভাজিত ব্রাজিলকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।’
১৯৪৭ বেলো হরিজন্তে শহরে জন্ম
১৯৭০-৭২ সামরিক শাসনামলে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের শিকার
১৯৭৭ অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন
২০০০ ওয়ার্কার্স পার্টিতে (পিটি) যোগদান
২০০৩-২০০৫ লুলা দা সিলভার সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী
২০১১-২০১৪ ব্রাজিলের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট
২৬-১০-২০১৪ দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত

কাশ্মিরের আত্মনিয়ন্ত্রণের সমর্থনে লন্ডনে লাখো মানুষের সমাবেশ

ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের জনগণের কয়েক দশক ধরে চলা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাথে একাত্মতা প্রকাশের জন্য রোববার ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডনের রাস্তায় নেমে এসেছিলেন লাখ লাখ মানুষ। লন্ডনভিত্তিক একটি গ্রুপ কাশ্মির ইস্যুকে সামনে তুলে আনতে এই সমাবেশের আয়োজন করে। প্ল্যাকার্ড ও পতাকা নিয়ে হাজার হাজার লোক যোগ দেন ট্রাফালগার স্কয়ারের এই সমাবেশে। পরে তারা ভারত অধিকৃত কাশ্মিরে ভারতীয় পুলিশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে মিছিল নিয়ে ডাউনিং স্ট্রিটের দিকে রওনা হন। তা ছাড়া কাশ্মির ইস্যু সমাধানে ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়ে ব্রিটিশ সরকার বরাবর একটি আবেদন জমা দেয়া হয়। হুররিয়াত নেতা সৈয়দ আলী গিলানি এক বিবৃতিতে মিলিয়ন মার্চকে একটি অতি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে ঘোষণা করেন এবং বলেন, এ সমাবেশ বিশ্বসমাজকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সন্ত্রাসবাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো সম্পর্ক নেই। কাশ্মিরি জনগণ তাদের ন্যায্য অধিকারের জন্য সংগ্রাম করছে।

>> লন্ডনে অবস্থিত কাশ্মিরি ও পাকিস্তানিরা গত রোববার লন্ডনে লাখো মানুষের বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেন। এতে বক্তারা ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের সঙ্কট নিরসনে নিরপেক্ষ গণভোট অনুষ্ঠানের দাবি জানান : এএফপি
আজাদ কাশ্মিরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ব্যারিস্টার সুলতান মাহমুদ চৌধুরী ওই সমাবেশের আয়োজন করেন। ব্রিটিশ এমপি লর্ড নাজির আহমেদ এতে সমর্থন জানান। ব্যারিস্টার সুলতান মাহমুদ বলেন, ভারতপন্থীরা সমাবেশটি বানচাল করতে চেয়েছিল। আমরা এখানে সমবেত হয়েছি কাশ্মিরি জনগণের সাথে সংহতি প্রকাশ এবং কাশ্মিরের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য। তিনি আরো বলেন, কাশ্মির স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। এ সমাবেশে উপস্থিত হন পাকিস্তান পিপলস পার্টির তরুণ চেয়ারপারসন বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ও তার বোন আসিফা জারদারি। কাশ্মিরি জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ ও তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের সংগ্রামে নিঃশর্ত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করার জন্য এতে যোগ দেন পিপিপি নেতা বিলাওয়াল। উৎফুল্ল জনতা তাকে মঞ্চে অভ্যর্থনা জানায়। অবশ্য কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি সমাবেশটি নিছক কাশ্মিরি জনগণের বলে সেখানে বিলাওয়ালের উপস্থিতির প্রতিবাদ জানায় এবং তার প্রতি বোতল নিক্ষেপ করে। ব্রিটিশ পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

বিলাওয়ালকে ডিম টমেটো নিক্ষেপ

বিলাওয়াল ভুট্টো
পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টোকে লক্ষ্য করে ডিম, টমেটো আর বোতল ছুড়েছে একদল বিক্ষুব্ধ জনতা। গত রোববার লন্ডনে এক বিক্ষোভ কর্মসূচিতে বক্তৃতা দিতে গেলে অপ্রীতিকর এ ঘটনার শিকার হন তিনি। খবর এনডিটিভির। কাশ্মীর বিষয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক পাকিস্তানপন্থী একটি গোষ্ঠী ট্রাফালগার স্কয়ার থেকে ডাউনিং স্ট্রিট অভিমুখে ‘মিলিয়ন মার্চ’ শিরোনামের ওই বিক্ষোভ অভিযাত্রার আয়োজন করে। আয়োজকদের দাবি, কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে তাঁরা ওই বিক্ষোভ অভিযাত্রার আয়োজন করেন। কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে ভারতকে চাপ দিতে যুক্তরাজ্যের সরকারের কাছে একটি আবেদন জমা দেওয়ারও পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা। তবে বিরোধীদের দাবি, এই অভিযাত্রা জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী।
আইনজীবী সুলতান মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে আয়োজিত ওই অভিযাত্রায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজারো মানুষ অংশ নেয়। পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা লর্ড নাজির আহমেদ এতে সমর্থন দেন। কিন্তু বিলাওয়াল অস্থায়ী মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দিতে গেলে বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েন। তখনই ওই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। একদল বিক্ষুব্ধ জনতা দুয়োধ্বনি দিতে শুরু করে। একপর্যায়ে তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম, টমেটো ও খালি বোতল ছুড়তে থাকে। এতে ঘটনাস্থল ছেড়ে যেতে বাধ্য হন পিপিপির চেয়ারম্যান। পরে নিরাপত্তা বলয় সৃষ্টি করে তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিরোধী অংশটি এর আগের দিন শনিবার লন্ডনে বিক্ষোভ করে। ডিম, টমেটো ও বোতল নিক্ষেপের এ ঘটনা ‘ভারতীয় চরদের’ কাজ বলে মন্তব্য করেছেন বিলাওয়ালের বোন আসিফা ভুট্টো।

মোদির প্রশংসা

নরেন্দ্র মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষিত পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় অভিনেতা ঋত্বিক রোশন ও নাগার্জুনের প্রশংসা করেছেন মোদি। এ দুই অভিনেতা মোদির ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’ নামের ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় তা অন্যদের উৎসাহিত করবে বলে মন্তব্য করেছেন মোদি। এক টুইটার বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিশ্চিত যে আপনারা ঋত্বিকের প্রচেষ্টায় উৎসাহিত হবেন।
স্বচ্ছ ভারত কর্মসূচিতে তাঁর অংশ নেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’ ২ অক্টোবর ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকীতে স্বচ্ছ ভারত কর্মসূচির উদ্বোধন করেন মোদি। ওই দিন তিনি নিজে রাস্তায় নামেন ঝাড়ু হাতে।
টাইমস অব ইন্ডিয়া

২৮ অক্টোবরের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের কালো অধ্যায় -জামায়াত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দীন বলেছেন, ২৮ অক্টোবরের পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছে। বিশ্ববাসী এ ধরনের নির্মম ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড আর কখনো দেখেনি। সেদিন প্রকাশ্য দিবালোকে শুধু মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়নি বরং লাশের উপর নর্তন-কুর্দন করে নিজেদের কুৎসিত ও বিভৎস চেহারা বিশ্ববাসীর কাছে উন্মুক্ত করেছে। মূলত বর্তমান ক্ষমতাসীনদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ইতিহাসের নির্মম ও রক্তাক্ত অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছিল। আজ পর্যন্ত এই খুনীদের বিচারের আওতায় আনা হয়নি।
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের খুনীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবীতে কেন্দ্র ঘোষিত দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচীর অংশ হিসাবে আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাড্ডায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী আয়োজিত বিক্ষোভ পরবর্তী এক সমাবেশে তিনি একথা বলেন। বিক্ষোভ মিছিলটি বসুন্ধরা আবাসিক গেইট থেকে শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে নর্দ্দা বাসস্ট্যান্ডে এসে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ড. মু. রেজাউল করিম, ঢাকা মহানগরীর মজলিশে শুরা সদস্য অধ্যাপক আ জ ম কামাল উদ্দীন, সালাহ উদ্দীন ও মওলানা মুহিব্বুল্লাহ, শিবিরের ঢাকা মহানগরী উত্তরের সভাপতি আনিসুর রহমান বিশ্বাস ও সেক্রেটারী তারিক হাসান প্রমূখ।

সেলিম উদ্দীন বলেন, ২৮ অক্টোবরের নির্মম হত্যাযজ্ঞ বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয় বরং এটি ছিল আমাদের জাতিস্বত্ত্বা, দেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব, ভৌগলিক অখণ্ডতা, ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধের বিরুদ্ধে গভীর ও সুদুরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ। সেদিনের পৈশাচিকতা দেখে জাতি কেঁদেছে এবং বিশ্ববিবেক স্তম্ভিত হয়েছে। নেপথ্যে হেসেছে খুনী ও তাদের দোসররা। বর্তমান সরকার বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেড়িয়ে আসার কথা বললেও তারা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ২৮ অক্টোবরের চিহ্নিত খুনীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করে হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও পুনর্বাসন করা হয়েছে।  মূলত আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের ষড়যন্ত্রেই ইতিহাসের এই জঘন্য অপকর্ম সংঘঠিত করে বর্হিবিশ্বে জাতি হিসাবে আমাদেরকে অপমানিত ও কলঙ্কিত করা হয়েছিল। তাই জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে এবং ২৮ অক্টোবরের শহীদদের খুনের বদলা নিতে এই ফ্যাসিবাদী ও খুনী সরকারের পতন ঘটিয়ে ন্যায়-ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কোন বিকল্প নেই।
তিনি সরকারকে ষড়যন্ত্র ও অপরাজনীতি পরিহার করে অবিলম্বে ২৮ অক্টোবরে চিহ্নিত খুনীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবি জানান।
আসাদ গেটে মিছিল : জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি মোবারক হোসাইনের নেতৃত্বে  রাজধানীর আসাদ গেট থেকে আরেকটি মিছিল বের হয়। বিক্ষোভ মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন, ঢাকা মহানগরীর মজলিশে শুরা সদস্য এ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন তালুকদার, মাহফুজুর রহমান, শেখ শরীফ উদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক নূর নবী মানিক, আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, আব্দুস সালাম ও সোলাইমান হোসেন, জামায়াত নেতা ডা. শফিউর রহমান, আ ন ম হাসান নো’মান, অধ্যাপক আনোয়ারুল করীম,আহমদুল্লাহ, আব্দুল বারী, শিবিরের ঢাকা মহানগী পশ্চিমের সভাপতি তামীম আহমদ, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম ও ঢাকা কলেজের সভাপতি নাজিমুদ্দীন প্রমূখ।
পল্টন-মতিঝিল জোন  : জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরীর পল্টন জোনের উদ্যোগে আরেকটি মিছিল মালিবাগ মোড় থেকে শুরু হয়ে মৌচাকে গিয়ে সমাবেশে মাধ্যমে শেষ হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ঢাকা মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য এ্যাডভোকেট ড. হেলাল উদ্দীন ও অধ্যাপক মোকাররাম হোসাইন খান, ঢাকা মহানগরী মজলিশ শুরা সদস্য শামসুর রহমান ও আবু নাবিল, শাহজাহানপুর থানা সেক্রেটারী শহীদুল ইসলাম ও শিবিরের মহানগরী পূর্বের সেক্রেটারী শামীম প্রমূখ।

রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করলেই রাষ্ট্রদ্রোহ হয়ে যায় -আদালতে ড. কামাল

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির ফজলুর রহমানের পক্ষে দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানিতে সিনিয়র আইনজীবী ড. কামাল হোসেন বলেছেন, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একটি জনসভায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করেছেন। তাই তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়েছে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এখন সব সমালোচনার ঊর্ধ্বে। তাদের সমালোচনা করলেই তা রাষ্ট্রদ্রোহ হয়ে যায়। আমাদের দেশে গণতন্ত্র এখন এই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবীও। এক সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন, এখন করেন না। একটি জনসভায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করায় এখন তিনি রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে গেলেন!
গতকাল বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চে ড. কামাল এ কথা বলেন। আদালত পরে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার বা হয়রানি না করতে নির্দেশ দেন। ফজলুর রহমান বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছেন। তিনি বাংলাদেশে আসার পর বিমানবন্দর থেকে কিশোরগঞ্জ জেলা আদালতে আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত সময়ে তাকে গ্রেফতার বা হয়রানি না করতে এই নির্দেশ দেয়া হয়।
গত ১৯ মার্চ কিশোরগঞ্জে নিজ নির্বাচনী এলাকা ইটনার এক জনসভায় সরকারের সমালোচনা করায় মো: আলী হোসেন নামে সরকারদলীয় এক কর্মী ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে থানায় একটি জিডি করেন। সেই জিডির ওপর ভিত্তি করে ১৮ আগস্ট চার্জশিট দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। সরকারের অনুমতিতে জিডিটি পরে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় রূপান্তর হয়।
ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে গত ৩১ আগস্ট গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আগাম জামিন পেতে ফজলুর রহমানের পক্ষে ১৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করা হয়। সেই রিট শুনানি শেষে গতকাল আদেশ দেন আদালত।
জিডিতে বলা হয়, ওই দিন জনসভায় তিনি রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে বলেন- ‘আবদুল হামিদ খন্দকার মোস্তাকের দল করত যিনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে। এই কথা আমি কিশোরগঞ্জে হাজার হাজার লোকের সম্মুখে কইছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এইটা শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ না, হাসিনা লীগ ...।’

সুন্দরবন থেকে হরিণ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা- অবাধ শিকার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না by এরশাদ আলী

সুন্দরবন থেকে হরিণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে! ব্যাপারটা কল্পনা করতে কষ্ট হলেও রূঢ় বাস্তবতা সেটাই বলে আশঙ্কা করছেন সুন্দরবন সংশ্লিষ্ট এবং বন বিভাগের লোকেরা। অবাধে হরিণ শিকার এবং ট্যুরিস্টদের (ভিআইপি ও সাধারণ) হরিণের গোশত খাবার প্রবণতা দমন করতে না পারলে সুন্দরবন থেকে মহিষ ও গণ্ডারের মতো হরিণ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল। সুন্দরবনের প্রিয়দর্শন জন্তু হরিণ। এই বনে হরিণের সংখ্যা সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে সংখ্যাটা কয়েক লাখ হবে বলে ধারণা করা হয়। এখন এই সংখ্যাও দ্রুত কমে আসছে বলে জানিয়েছেন বন বিভাগ সূত্র ও সুন্দরবন বিশেষজ্ঞরা। হরিণ শিকার বর্তমানে মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়েছে। সব শ্রেণীর মানুষ ইচ্ছেমতো হরিণ শিকার করছে। এক সময় ফাঁস দিয়ে হরিণ ধরা হতো এবং পরে বন্দুক দিয়ে গুলি করা হতো। এখন যোগ হয়েছে জাল পেতে হরিণ ধরা। বন বিভাগ বনের সর্বত্র হরিণ শিকার নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু আইনের তোয়াক্কা করছে না কেউই। সাম্প্রতিককালে দেশের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি সরকারি ব্যবস্থাপনায় সুন্দরবন ভ্রমণে গেছেন এবং বনের রেস্ট হাউজে রাত যাপন করেছেন। এসব ভ্রমণ হয়েছে অত্যন্ত গোপনে। অনেক ভিআইপিকে আস্ত হরিণ রোস্ট করে রসনা তৃপ্ত করা হয় বলে জানা গেছে।
এ এফ এম আব্দুল জলিল রচিত সুন্দরবনের ইতিহাস বইয়ে লেখা হয়েছে, ‘কোনো হোমরাচোমরা ব্যক্তি সুন্দরবনে প্রবেশ করলে ডজনখানেক হরিণ শিকার না করিয়া নিরস্ত হন না।’ এখন অবশ্য ভিআইপিরা নিজে শিকারের কষ্ট করেন না। পেশাদার শিকারিদের দিয়ে হরিণ ধরা হয়, ভিআইপিরা শুধু খাওয়ার কষ্টটুকু স্বীকার করেন। ভিআইপিরা একবার হরিণ শিকার করলে তাদের অনুসারীদের জন্য ইচ্ছেমতো শিকার করা হালাল হয়ে যায়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, অন্য সরকারি অফিসের ব্যবস্থাপনায় এসব ট্যুর হয়েছে। হরিণ ধরে রোস্ট করার কথা স্বীকার করে তারা বলেন, ‘আমাদের চুপ থাকা ছাড়া উপায় নেই।’ একইভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যারা বনে ট্যুর করতে যান তাদের বেশির ভাগই হরিণের গোশত দিয়ে ভূরিভোজ সেরে তারপর ফেরেন। এ ব্যাপারে ট্যুরিস্টদের সহায়তা করেন বলে অনেক ট্যুর অপারেটরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বন বিভাগের কর্মচারীরাও টাকার বিনিময়ে ‘ম্যানেজড’ হন।
সুন্দরবনে শিকার নিষিদ্ধ থাকায় হরিণ শিকারে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয় না। বন্দুকের শব্দে আকৃষ্ট হয়ে বন বিভাগের লোকজন অকুস্থলে উপস্থিত হয়ে ঝামেলা পাকান। পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় দড়ির ফাঁস। তার সাথে যোগ হয়েছে জাল। বন বিভাগ সূত্র জানায়, ভেটকি মাছ ধরার জাল বলে সেগুলো নিয়ে লোকজন বনে ঢোকে। তারপর বনে সেই জাল পেতে হরিণ তাড়া করা হয়। দল ধরে হরিণ জালে আটকা পড়ে। কটকা, কচিখালী এলাকায় এখন এ পদ্ধতিতে ব্যাপক হরিণ ধরা হচ্ছে। পাথরঘাটা এলাকা থেকে ট্রলারে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে কটকা পৌঁছে শিকারিরা হরিণ নিয়ে আবার ফিরে যায়। পাথরঘাটার জ্ঞানপাড়া গ্রাম হরিণ বিকিকিনির অতি পরিচিত স্থান বলে বন বিভাগ সূত্র জানায়। সেখানে অনেক বাড়িতে আন্ডারগ্রাউন্ড কুঠুরি আছে। সেখানে হরিণ রাখা হয়। কেউ গিয়ে কিনতে চাইলে দাম দর ঠিক করে ভূগর্ভস্থ কক্ষ থেকে বের করে দেয়া হয়। পিরোজপুরের অন্য একটি সূত্র থেকেও জ্ঞানপাড়ার হরিণ বিক্রির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ‘তিন বছর আগে অফ সিজনে (আগস্ট মাসে) আমি বনের কচিখালীর একটি মাঠে কয়েক লাখ হরিণ দেখেছিলাম। এবারে একই সময়ে গিয়ে আমি আর হরিণ দেখতে পাইনি।’ ব্যাপক শিকারের কারণে হরিণসংখ্যা মারাত্মকভাবে কমেছে বলে তিনি জানান।
এ ছাড়া বনের পাশের অধিবাসীরা সবসময় হরিণ শিকার করে থাকেন। বিশেষ করে কাঠ কাটা, গোলপাতা সংগ্রহ, মাছ ধরা বা মধু সংগ্রহের জন্য যারা বনে যান তাদের হরিণ ধরে খাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা। সাতক্ষীরার বনের পাশের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুল আজিজ এক সময় বাদায় নিয়মিত কাঠ কাটতেন। তার ভাষায়, কয় শ’ হরিণ খাইছি তার হিসেব নেই। দস্যু বাহিনীর লোকজনের খানাপিনা তো হরিণের গোশত আর বনের মাছ দিয়েই চলে। কয়েক দিন আগে খুলনার কয়রা থেকে হরিণের চামড়া উদ্ধার হয়েছে। হরিণের গোশত ও চামড়াসহ প্রায়ই লোকজন আটক হয়। পুবে পাথরঘাটা থেকে পশ্চিমে সাতক্ষীরার বুড়ি গোয়ালিনী পর্যন্ত হরিণের গোশত বিক্রির অনেক নেটওয়ার্ক আছে। খুলনা মহানগরী, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট প্রভৃতি শহরের অনেকেই এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হরিণের গোশত এনে খেয়ে থাকেন।
গণহারে হরিণ শিকারের জন্যে সবচেয়ে বড় সুযোগ হয় দুবলার চরের রাসমেলা অনুষ্ঠানের সময়। মেলায় যাওয়ার নামে সারা দেশ থেকেই হাজার হাজার মানুষ নানা ধরনের নৌযান নিয়ে বনে যান। সেখানে তিন দিন থাকার অনুমতি নিয়ে এসব লোকজন সাত-আট দিন পর্যন্ত বনে অবস্থান করেন এবং ব্যাপক হারে হরিণ নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠেন। হরিণ শিকারিদের ব্যবসায়ের এটা মোক্ষম সময়। বন বিভাগ সূত্রগুলো জানায়, রাসমেলার সময় অন্তত তিন লাখ হরিণের প্রাণ যায়। এবার রাসমেলা ৫ নভেম্বরে প্রথম হবে বলে জানা গেছে। আগে থেকেই হরিণ শিকারি এবং গোশত ভক্ষণে আগ্রহীদের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে হরিণ নিধন বন্ধে নানা পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু সুন্দরবনের ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ্য তাতে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না।
এ ব্যাপারে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক কার্তিক চন্দ্র সরকারের সাথে কথা বলা হয়। তিনি জানান, আমরা কোস্ট গার্ড, র‌্যাব নিয়ে হরিণ শিকার বন্ধের চেষ্টা করছি। তারপরও কিছু হচ্ছে। সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা যাচ্ছে না।

আবদুল আলী খুনের মিশনে শরিক ছিল শামীম বাহিনীও by ওয়েছ খছরু

শুধু আলফু বাহিনীই নয়, আবদুল আলীর খুনের সঙ্গে জড়িত ছিল শামীম বাহিনীও। দুই গ্রুপের সদস্যরা এক সঙ্গে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিল আবদুল আলীমের ওপর। আবদুল আলী খুনের ঘটনার পর গ্রেপ্তার হওয়া তিন জনের স্বীকারোক্তি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। আদালতে প্রথমে আলফু বাহিনীর প্রধান আলফু চেয়ারম্যান খুনের ঘটনা স্বীকার করার পর শামীম বাহিনীর ‘অন্যতম নেতা’ সফিক মেম্বারও দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে। শনিবার রাতেই গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের মধ্যে তিনজন সিলেটের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ স্বীকারোক্তি দেয়। গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশের কাছে জানিয়েছে, খুনের ঘটনার পর আলফুকে রক্ষা করতে যুবলীগ নেতা ও কোয়ারির একাংশের নিয়ন্ত্রক শামীম আহমদ দৌড়ঝাঁপ করে। সে আলফুকে রক্ষা করতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ইমরান আহমদকে  ম্যানেজ করার চেষ্টা করেছে। স্থানীয় এমপিকে ম্যানেজে ব্যর্থ হয়ে শামীমও ঘটনার পর থেকে আড়ালে রয়েছে। আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিতে আলফু চেয়ারম্যান জানিয়েছে, কোয়ারির নিয়ন্ত্রণ নিয়েই খুন করা হয়েছে আবদুল আলীকে। আর আলফুকে খুন করার পরিকল্পনা নেয়া হয় সিলেট নগরীর একটি হোটেলে বসে। ওই বৈঠকে আলফু ও শামীম বাহিনীর নিয়ন্ত্রকরা উপস্থিত ছিল। এই পরিকল্পনায় কোম্পানীগঞ্জের অনেক প্রভাবশালীর মৌন সমর্থন ছিল। সুযোগ পেলেই যে কোন সময় আবদুল আলীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছিল হত্যার পরিকল্পনাকারীরা। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শুক্রবার আলফু মিয়ার সহযোগী আলী হোসেন ও আকদ্দছ ফোন করে আলফু মিয়াকে জানায়, ‘আজই আবদুল আলীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার সুযোগ আছে।’ তখন আলফু বলে, ‘তোমরা যেটা ভাল মনে করো সেটাই করো।’ জবানবন্দিতে আলফু বলে, গত শুক্রবার সন্ধ্যার পর আলী হোসেন ও আকদ্দছ ফোনে জানায় ‘আবদুল আলীকে খতম করে দিয়েছি। আপনি শুধু সাবধানে থাকবেন।’ এদিকে, নিহত আবদুল আলীর স্ত্রী হালিমা বেগম গ্রেপ্তার হওয়া আলফু চেয়ারম্যান, কোম্পানীগঞ্জের যুবলীগ নেতা শামীম আহমদ, আওয়ামী লীগ নেতা মাহফুজুর রহমান, আজমলসহ কোম্পানীগঞ্জের ৩১ জন আসামির নাম উল্লেখ করেছেন। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আবদুল আলী নিহত হওয়ার আগে প্রায়ই বলতেন আলফু চেয়ারম্যান, শামীম, আকদ্দছ আলী, আলী হোসেন, ভুট্টো, আজমল বৈঠক করেছেন। সেখানে আবদুল আলীকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তিনি জানতে পেরেছিলেন বলে তার স্ত্রী হালিমা বেগমকে বলেছেন। শামীমের সহযোগী সফিক মেম্বারও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। সে-ও এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি সফিউল কবির জানান, আবদুল আলী হত্যার ঘটনায় দুটি মামলা হয়েছে। একটি নিহতের স্ত্রী হালিমা বেগম বাদী হয়ে করেছেন। এর প্রধান আসামি আলফু চেয়ারম্যানসহ ৪ জন আটক রয়েছে। অপর মামলাটি করেছেন পুলিশের এসআই রাশেদুল আলম খান বাদী হয়ে। এ মামলায় আটক রয়েছে ৩জন। সব মিলিয়ে দুই মামলায় ৭জন আটক রয়েছে। নিহত আবদুল আলীর ভাই আবদুল হক জানিয়েছেন, তার ভাইকে খুন করতে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। ৬ মাস আগেও আবদুল আলীর ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। তখন আবদুল আলী প্রাণে বেঁচে গেলেও দু’জন মারা যান। তিনি জানান, তার ভাই বৈধ ব্যবসা করতেন। এ কারণে অবৈধরা তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে ছিল সব সময়। অপরদিকে, আবদুল আলীর প্রধান প্রতিপক্ষ কোম্পানীগঞ্জের যুবলীগ নেতা  শামীমের সঙ্গে একাধিকবার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়েছে। আলফু মিয়ার সঙ্গে ততটা বিরোধ ছিল না। আবদুল আলীর পরিবারের সদস্যরা জানান, আলফু মিয়ার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল শামীম। দু’টি গ্রুপের সদস্যরা আবদুল  আলীর গতিবিধি লক্ষ্য রাখতো। শুক্রবার আবদুল আলীকে একা পেয়ে তারা কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে।

প্রেমিকের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছে লিনা

গিয়াস উদ্দিন মাতব্বরের স্ত্রী লাভলী আক্তার লিনা। কিন্তু এই পরিচয় গোপন করে বিয়ে করেছিল কলেজ ছাত্র তানভীর আহমেদকে। তাকে নিয়ে স্বামীর মতই বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছে সে। ঈদের আগে তানভীরকে সঙ্গে নিয়ে কেনাকাটা করেছে। তানভীরের সঙ্গে সময় কাটিয়েছে রাজধানীর একটি আবাসিক হোটেলে। এভাবে প্রায়ই তানভীর-লিনা একান্তে সময় কাটাতো। তিন দিনের রিমান্ডে পুলিশকে বিভিন্ন তথ্য দিলেও স্বামী হত্যার অপরাধ স্বীকার করেনি সে। লিনার পরিকল্পনাতেই তার স্বামী গিয়াসকে হত্যা করে তানভীর ও তার দুই বন্ধু। তানভীর ও তার বন্ধুরা আদালতে এসব কথা স্বীকার করলেও স্বামী হত্যার দায় প্রেমিক ও তার বন্ধুদের ওপর চাপিয়েছে লিনা। যদিও লিনার প্রেমিক কলেজ ছাত্র তানভীর আহমেদ ও তার দুই বন্ধু ইতিমধ্যে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি দিয়েছে। গতকাল নিহত গিয়াসের স্ত্রী লিনা ও কমার্স কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র আকিবুল ইসলাম জিসান আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এদিকে, নিহতের স্বজনরা দাবি করেছেন লিনাকে রক্ষা করতে তৎপর হয়ে উঠেছে একটি মহল। যে কারণে নামকাওয়াস্তে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে লিনাকে। তারা এই মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

আদালতে জবাবন্দিতে প্রেমিক তানভীর ও তার দুই বন্ধুর ওপর খুনের দায় চাপিয়েছে লাভলী আক্তার লিনা। সে বলেছে, প্রেমের সম্পর্কের কারণেই লিনাকে কাছে পেতে চাইছিল তানভীর। সে অনেক দিন থেকে লিনার বাসায় আসার জন্য পীড়াপীড়ি করছিল। ঘটনার দিন ১৯শে অক্টোবর রাতে লিনার সঙ্গে দেখা করার জন্য বাসায় যায় তানভীর। তবে তানভীরের দুই বন্ধু মুক্ত ও জিসান বাসায় কখন ঢুকেছিল তা বুঝতে পারেনি বলে আদালতকে জানায় লিনা। তারা বাসায় ঢুকে লিনার হাত, পা ও মুখ বেঁধে রাখে। একই ভাবে অন্য কক্ষে তার সন্তানদের জিম্মি করে রাখে তানভীর ও তার দুই বন্ধু। এর মধ্যেই রাত পৌনে ১১টার দিকে ফ্ল্যাটের গেট নিজ হাতে থাকা চাবি দিয়ে খুলে বাসায় ঢুকেন গিয়াস উদ্দিন মাতব্বর। সঙ্গে সঙ্গে গিয়াসকে তানভীর ও তার দুই বন্ধু আঘাত করে। এভাবেই গিয়াসকে হত্যা করে তারা পালিয়ে যায়। গিয়াসকে হত্যা করতে চায়নি দাবি করে লিনা জানায়, গিয়াসের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে সে অতিষ্ঠ ছিল। বিষয়টি সে তানভীরকে বলেছে। কিন্তু গিয়াসকে হত্যা করতে সে বলেনি। তার অজান্তেই প্রেমিক তানভীর ও তার দুই বন্ধু এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে বলে লিনা জানায়। কিন্তু জিসান আদালতে জানিয়েছে, লিনার পরিকল্পনাতেই গিয়াসকে হত্যা করা হয়েছে। লিনা দীর্ঘদিন থেকেই গিয়াসকে হত্যার জন্য তানভীরকে চাপ দিচ্ছিল। এই কারণেই গত ঈদের আগে জিসান ও মুক্তকে গিয়াসকে হত্যার প্রস্তাব দেয় তানভীর। জিসানকে তখন তার মা-বাবা বাড়ি থেকে বের করে দেন। যে কারণে সে সহজে রাজি হয়। কিন্তু ওই সময়ে জিসানকে বাধা দিয়েছে মুক্ত। মুক্ত বলেছে, কাউকে খুন করা ঠিক হবে না। কিন্তু কিছু দিন পরে পারিবারিক কারণে মুক্তকে বাড়ি থেকে বের করে দেন তার বাবা-মা। ঠিক তখনই তানভীরের দেয়া প্রস্তাবে রাজি হয় জিসান ও মুক্ত। হত্যাকা-ের আগে তানভীরকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিল লিনা। ওই টাকা দিয়ে খুনের সময় ব্যবহৃত সরঞ্জাম ক্রয় করে তানভীর। জিসান জানায়, তারা মূলত ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে এই হত্যাকা-ে সম্পৃক্ত হয়। হত্যার পর তাদের ১৫ হাজার টাকা দেয় তানভীর। বাকি টাকা পরে দেয়ার কথা ছিল। গতকাল দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ ইউনুছ খানের আদালতে জবানবন্দি দেয় লিনা। পরে বেলা ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট অশোক কুমার দত্তের আদালতে জবানবন্দি দেয় জিসান। তার আগে ২৪শে অক্টোবর জিসানের মতো প্রায় একই রকম জবানবন্দি দেয় সরকারি বিজ্ঞান কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র সাদমান ইসলাম মুক্ত। হত্যাকা-ের পর ২২শে অক্টোবর হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে বিএন কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র তানভীর আহমেদ।
এদিকে, আদালতে লিনা হত্যার দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও পুলিশের কাছে জিজ্ঞাসাবাদে নানা তথ্য দিয়েছে সে। ১৫ই অক্টোবর কাজীপাড়ার বিয়ে করে লিনা ও তানভীর। বয়সে ১০ থেকে ১২ বছরের ছোট তানভীরকে বিয়ে করার পর থেকেই তাকে কাছে পেতে বিভোর ছিল লিনা। লিনার মতে, তানভীরকে সে অনেক টাকার মালিক বানাতে চেয়েছিল। সে বলেছে, শুনেছি তানভীর তার দাদা রমজান আলীর টাকায় বিএন কলেজে পড়ালেখা করে। এজন্য তাকে সুখী করতে চেয়েছিলাম। বিয়ে সম্পর্কে লিনা জানিয়েছে, বিয়ের পর তাকে তানভীরের বাসায় নিয়ে যায়। ওই দিন তানভীরের বাসায় কেউ ছিল না। তারা তখন অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছে। বিয়ের দিন গোলাপি রঙের একটি থ্রি পিস পড়েছিল লিনা। এছাড়াও লিনা তার এক বান্ধবীর বাসায় নিয়ে যেতো তানভীরকে। ওই বাসায় কয়েকদিন যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। পরে মাঝে মাঝে একটি আবাসিক হোটেলে ঘণ্টা দুয়েক সময় কাটাতো তারা। গত ঈদের আগে গাউছিয়া, নিউ মার্কেটে কেনাকাটা করেছে দু’জন। এসময় একটি আবাসিক হোটেলে প্রায় দুই ঘণ্টা অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়েছে তানভীর ও লিনা। এছাড়াও কখনও কখনও মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনে সময় কাটাতো তারা। শ্বশুরবাড়ির লোকজন লিনাকে সন্দেহ করতো। তাই মাঝে মাঝে নিজের সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে বের হতো সে। তানভীরকে আব্বু বলে ডাকতো তার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান নিহাল। স্ত্রী হিসেবে লিনাকে সব সময় কাছে পেতে চাইতো তানভীরও। অন্যদিকে শুরু থেকেই স্বামী গিয়াস উদ্দিন মাতব্বরকে মেনে নিতে পারেনি লিনা। দুবার বাসায় নিজ প্রেমিকসহ ধরা পড়ার পর থেকে গিয়াস তাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে অত্যাচার করতো বলে জানায়। এ থেকেই সে গিয়াসের প্রতি অতিষ্ঠ ছিল সে। উল্লেখ্য, গত ১৯শে অক্টোবর রোববার রাতে মিরপুর-১০-এর সি ব্লকের ১৫ নম্বর লেনের নিজ বাড়ির পঞ্চম তলায় হত্যা করা হয় গিয়াস উদ্দিন মাতব্বরকে। তিনি একজন ঝুট ব্যবসায়ী। ২০০৩ সালের ১৪ই অক্টোবর গিয়াসের সঙ্গে লিনার বিয়ে হয়। লাভলী আক্তার লিনা মিরপুর-১১ এর সি ব্লকের ১০ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর লাইনের লিয়াকত আলী মোল্লার কন্যা। এই দম্পতির নয় বছর বয়সী ইশিকা নামে এক কন্যা ও পাঁচ বছর বয়সী নিহাল নামে এক পুত্র রয়েছে। গিয়াস হত্যার পরপর তার স্ত্রী লাভলী আক্তার লিনাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে গত ২১শে অক্টোবর রাতে মিরপুরের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তানভীর, জিসান ও মুক্তকে। তানভীর আহমেদ মিরপুর ১০-এর পল্লবীর ১৪ নম্বর সড়কের ১৪ নম্বর বাসার আবু সাঈদ আজাদের পুত্র। তাদের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলা সদরে। তার বন্ধু আকিবুল ইসলাম জিসান মাদারীপুর জেলা সদরের লেকেরপাড় এলাকার মিজানুর রহমানের পুত্র। অপর বন্ধু সাদমান ইসলাম মুক্ত টাঙ্গাইলের আদালতপাড়ার বাসিন্দা আবদুল লতিফের পুত্র। সে মিরপুর ১০-এর পল্লবীর এ ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাসায় থাকে।

ফোন না ধরার অভিযোগ সত্য নয়

*কোন নাটকের শুটিং করছেন এখন?
**নতুন একটি ধারাবাহিক নাটকের শুটিং করছি। আউটডোর ও ইনডোর শুটিং নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটছে। এছাড়া আরও শুটিং শুরু করেছি ‘নাইনটি নাইন পাতলা খান লেন’ নামের নতুন ধারাবাহিক নাটকের।
*অন্যান্য নাটকের খবর কী?
**ধারাবাহিক সহজ সমাধান, বাতিঘর কত দূর, অনন্তযাত্রা, নজরবিহীন নজর আলী প্রচার হচ্ছে বিভিন্ন চ্যানেলে। এছাড়া প্রচারের অপেক্ষায় আরও কিছু নাটক।
*খণ্ডনাটকে আপনাকে কম দেখা যাচ্ছে কেন?
**ধারাবাহিক নাটকের সিডিউল যেভাবে দেয়া, তাতে নতুন করে খণ্ডনাটকে সময় দিতে পারি না। দেখা যায়, একটি ধারাবাহিক নাটক শেষ হতে না হতেই আরও দুটি ধারাবাহিকের প্রস্তাব এসে বসে আছে। এগুলোর কাজ করতে গিয়েই খণ্ডনাটকে সময় কম দেয়া হয়েছে। এবার একটু বেশি নজর দেব খণ্ডনাটকের দিকে। আশা করি, দর্শক আবারও আমাকে খণ্ডনাটকে দেখতে পারবেন।
*নতুন চলচ্চিত্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন কি?
**নতুন কোনো চলচ্চিত্রে চুক্তিবদ্ধ হইনি। প্রস্তাব পেয়েছি বেশকিছু। পছন্দ না হওয়ায় তা ফিরিয়ে দিয়েছি। তবে ভালো চরিত্রের অপেক্ষায় আছি। সেরকম প্রস্তাব পেলে দর্শকরা আবারও আমাকে ছবিতে দেখতে পারবেন।
*ইদানীং ফোন রিসিভ না করার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে আপনার বিরুদ্ধে?
**এটা মিথ্যা অভিযোগ। ব্যস্ততার কারণে হয়তো ফোন ধরা হয় না। ধারাবাহিক নাটকে হিসেব করে সিডিউল দিই। কাজও টানা শেষ করতে হয়। তাই শুটিংয়ের সময় ফোন অফ বা সাইলেন্ট রাখতে হয়। ইচ্ছা থাকলেও রিসিভ করতে পারি না। ব্যস্ততার জন্যই আসলে আমাদের এ সমস্যাটা হয়। বিষয়টি মিডিয়া সংশ্লিষ্টদের বোঝা উচিত। তাছাড়া পরিচিত নাম্বার হলে কাজ শেষে আমি ব্যাক করি।

ঢাবি শিক্ষকদের ‘যৌন কেলেঙ্কারি’ - নামেই তদন্ত by ফররুখ মাহমুদ

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি)। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে একের পর এক ঘটছে যৌন নির্যাতনের ঘটনা। খোদ বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষকদের লালসার শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। গত পাঁচ বছরেই অন্তত ২০টি যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সুষ্ঠু বিচার হয়নি একটিরও। এসব কেলেঙ্কারির ঘটনায় তদন্ত কমিটি হলেও প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য ইশারায় পার পেয়ে যান অভিযুক্তরা। থেকে যান বহাল তবিয়তে। এ কারণে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক মাহমুদুর রহমান বাহলুল। ২০১০ সালে থেকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ওই বিভাগের দুই ছাত্রীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি। ২০১৩ সালে  অন্য মেয়েকে বিয়ে করতে গেলে বেরিয়ে আসে থলের বেড়াল। ফাঁস হয়ে যায় লম্পট ওই শিক্ষকের অপকর্ম।  ভিসি বরাবর অভিযোগ করেন ওই দুই ছাত্রী। অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। এক বছরের জন্য অব্যাহতি দেয়া হয় বিভাগের সকল কর্মকা- থেকে। তদন্ত করে প্রমাণ পায় গঠিত কমিটি। সুপারিশ করে সর্বোচ্চ শাস্তি। কিন্তু এখানেই শেষ। রাজনৈতিক কারণে তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রমোশন দিয়ে ওই শিক্ষককে করা হয় সহকারী প্রক্টর। পাশাপাশি সূর্যসেন হলের আবাসিক শিক্ষক। সমপ্রতি বিভাগে যোগদানের জন্য আবেদন করেছেন তিনি। সর্বশেষ ছাত্রলীগ কর্মীদের চুরির ঘটনায় তদন্ত কমিটিতেও রাখা হয়েছে তাকে। গত ১৫ই সেপ্টেম্বর নাট্যকলা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে ওই বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। সব ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তবে ভুক্তভোগী ছাত্রীর সহপাঠীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে ওই শিক্ষকের স্থায়ী চাকরিচ্যুতির দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নামে। ১৫ দিন পর গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। অনেকটা দায়মুক্তি দিতেই এতদিন পর এই গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক এটিএম ফখরুল ইসলাম। তার বিভাগের ৩য় বর্ষের এক ছাত্রীর সঙ্গে একই ছাদের নিচে বসবাস করেন দীর্ঘদিন। বিষয়টি গড়ায় শিক্ষকের পরিবার পর্যন্ত। হাতেনাতে ধরাও পড়েন তারা। ইট দিয়ে ছাত্রীর মাথা ফাটান। পরে কিছুদিন শিক্ষক এবং কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী পালিয়ে থাকেন। ওই শিক্ষক আবার ক্যাম্পাসে এলেও ওই ছাত্রীটিকে আর দেখা যায়নি। তদন্ত কমিটি হলেও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। একই অভিযোগ ফার্সি বিভাগের শিক্ষক ড. আবু মূসা আরিফ বিল্লাহ বিরুদ্ধে। কলা ভবনের ৪র্থ তলায় কথা বলার সময় এক ছাত্রীকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরেন তিনি। এরপর ওই ছাত্রীর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিতে থাকেন ওই শিক্ষক। এসময় অন্য ছাত্রীরা এসে তাকে  উদ্ধার করেন। কিন্তু লজ্জায় ওই ছাত্রী আর ক্যাম্পাসে আসেননি। তবে ওই শিক্ষক আছেন বহাল তবিয়তে। ঘটনা তদন্তে তদন্ত কমিটি গঠন হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। পরিসংখ্যান, প্রাণ পরিসংখ্যান ও তথ্য পরিসংখ্যান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. জাফর আহমেদ খানের বিরুদ্ধে পরকীয়া, নিপীড়ন ও যৌতুকের অভিযোগ আনেন তারই স্ত্রী। তিনি জাফরের বিরুদ্ধে একাধিক ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক গিয়াস উদ্দিন মোল্লার বিরুদ্ধে এক ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। এরপর ওই শিক্ষককে এক বছর একাডেমিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ২০১০ সালে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের তখনকার চেয়ারম্যান অধ্যাপক আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ২০১১ সালে উর্দু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ইসরাফিলের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন এক শিক্ষার্থী। ২০০৯ সালে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের শিক্ষক মুমিত আল রশিদের বিরুদ্ধে ওই বিভাগেরই এক ছাত্রী তার স্ত্রী দাবি করেন। একইভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এমরান হোসেন, মৎস্য বিজ্ঞান বিভাগের মাহমুদ হাসান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের আমানুল্লাহ ফেরদৌস, ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মো. সালাহউদ্দিন চৌধুরী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এসএম মফিজুর রহমান, মো. জাকারিয়া, মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে তদন্ত কমিটি হলেও রিপোর্ট অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে অনেক সময় প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও লঘু শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। উর্দু বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক জাফর আহমেদ ভূইয়ার বিরুদ্ধে পরীক্ষার্থীর খাতায় লিখে দেয়ার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও কমিটির সদস্য ড. এএম আমজাদকে জানানো হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। পরবর্তীতে ফাইলটি হারিয়ে যায় বলে জানা যায়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, তদন্ত একটি সময় সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। তাই রিপোর্ট প্রকাশ ও শাস্তি বাস্তবায়নে কিছু সময় লাগে। একটি কমিটি অভিযুক্ত শিক্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করলেও তা এখনও কেন বাস্তবায়ন করা হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাগজপত্র দেখে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে।
পাঁচ বছর পর কমিটি: দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নের ঘটনা তদন্তে ২০০৯ সালে যৌন নিপীড়ন বিরোধী তদন্ত কমিটি গঠন করার নির্দেশ দেয় আদালত। হাইকোর্টের নির্দেশনার পাঁচ বছর পর বুধবার এ সংক্রান্ত কমিটি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে এর আগেও একটি কমিটি ছিল বলে দাবি তাদের। তবে গত পাঁচ বছরে এ কমিটি একটি মিটিং করতে পারেনি।

সন্ত্রাস মোকাবিলায় ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করছে by পরিতোষ পাল

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণের প্রাথমিক তদন্তে ভারতের জাতীয় ইনভেস্টিগেটিং এজেন্সি (এনআইএ) পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর অসংখ্য মডিউলের সন্ধান পেয়েছে। এ ব্যাপারে সমস্ত তথ্য বাংলাদেশের অনুরোধ মেনে তাদের হাতে এক সপ্তাহের মধ্যেই তুলে দেয়া হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। তবে রিপোর্ট চূড়ান্ত করার আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান আসিফ ইব্রাহিম মির্জা, এনআইএ ডিরেক্টর শারদকুমার ও এনএসজির প্রধান জয়ন্ত নারায়ণ চৌধুরী গতকাল বর্ধমানে বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শন করার পাশাপাশি তদন্তকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। পরে নবান্নে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে অজিত দোভাল এনআইএ-র তদন্তে রাজ্য সরকারের সহযোগিতা চান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দূত হিসেবেই মমতার সঙ্গে দোভাল বৈঠক করেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। তার সঙ্গে ছিলেন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশেষ স্বরাষ্ট্র সচিব প্রকাশ মিশ্র। তবে এদিন দিল্লি থেকে কলকাতায় আসার আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল সাংবাদিকদের জানান যে, জঙ্গি সন্ত্রাস মোকাবিলায় ভারত ও বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অসাধারণ পর্যায়ে রয়েছে। আমরা একসঙ্গে মিলেই কাজ করছি। তিনি আরও জানান, বর্ধমান কা- তদন্তে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীর বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। তাই এর গুরুতর প্রভাব রয়েছে। এ জন্যই সমন্বিত তদন্তের প্রয়োজন। তবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে দোভাল রাজ্যের জঙ্গি নেটওয়ার্কের পুরো চিত্রটি তুলে ধরে তার সহযোগিতা চান। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন যে, তার সরকার জঙ্গি-সন্ত্রাস মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে সব রকমের সহযোগিতা করবেন। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য বর্ধমান কা-ের তদন্তভার রাজ্য সিআইডির হাত থেকে এনআইএ-র হাতে তুলে দেয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এদিন নবান্নে বৈঠক শেষে বিশেষ স্বরাষ্ট্র সচিব প্রকাশ মিশ্র বলেন, রাজ্য ও কেন্দ্র একসঙ্গে সন্ত্রাস মোকাবিলায় কাজ করছে। তিনি বলেন, বর্ধমান বিস্ফোরণ একটি সন্ত্রাসের ইস্যু। তাই এই তদন্ত একটি যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তে পৌঁছবে। এদিন সকালে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে আইবি, এনআইএ, এনএসজি’র প্রধানরা দিল্লি থেকে বিশেষ বিমানে কলকাতা বিমানবন্দরে আসেন। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তারা খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণ স্থলে পৌঁছান। তারা বাড়িটির যে ঘরে বিস্ফোরণ হয়েছে সেটি ঘুরে দেখার পাশাপাশি এটির অবস্থান কি ধরনের জায়গায় তা দেখতে ছাদে উঠেও পরিদর্শন করেন। এমনকি বিস্ফোরণে নিহত ও আহত জঙ্গিদের শিশু সন্তানরা কোথায় থাকতো তারও খোঁজ করেন। এর আগে গত ২৪শে অক্টোবর তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-র প্রধান শারদ কুমার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এর পরেই এনআইয়-এর পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে জানানো হয় যে, বাংলাদেশের নিষিদ্ধ জেএমবি’র সদস্যরাই পশ্চিমবঙ্গে মডিউল তৈরি করে গ্রেনেড তৈরি করতো। সেই গ্রেনেড পাঠানো হতো বাংলাদেশে হামলা চালানোর উদ্দেশ্য নিয়ে। এনআইএ সূত্রে জানানো হয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত প্রাথমিক তদন্তে ৫৮টি জঙ্গি মডিউলের সন্ধান পেয়েছেন।

ডিসেম্বরে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন রানা প্লাজার শ্রমিকরা by এমএম মাসুদ

অবশেষে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের পরিবার ও আহতদের সব দাবিদারকে সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। আইএলও’র তত্ত্বাবধানে গঠিত তহবিল থেকে এই অর্থ দেয়া হবে। বিজিএমইএ ও আইএলও’র সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। এর আগে ২৩৫৮ জনকে মোট ১৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে, যা শতাংশের হিসেবে ৪০ শতাংশ। গত শুক্রবার সাভারের রানা প্লাজা ধসের দেড় বছর পূরণ হয়। কিন্তু এখনও যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাননি ক্ষতিগ্রস্তরা। সরকার, মালিকপক্ষ এবং বিদেশী ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ প্রদানে অনেক আশ্বাস দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত কেউ পেয়েছেন আংশিক, আবার কেউ পেয়েছেন খুবই সামান্য। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ মুহূর্তে আইএলও’র এ ধরনের ঘোষণা বেশ আশাব্যঞ্জক। আর ডিসেম্বরে এ অর্থ পেলে শ্রমিকরা খুবই উপকৃত হবেন। সূত্র জানায়, এর আগে ৪০ শতাংশ দেয়ার পর আইএলও তত্ত্বাবধানে গঠিত তহবিল রানা প্লাজা ট্রাস্ট ফান্ডে এ পর্যন্ত ২০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ হয়েছে। প্রাপ্য ১০০ ভাগ ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্য আরও ৩১ মিলিয়ন ডলার দরকার। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকের পরিবার ও আহতরা একেক জন সর্বোচ্চ ৬২ লাখ থেকে সর্বনিম্ন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে। আইএলও কনভেনশন-১২১ অনুযায়ী এ ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছে বলে সূত্র জানায়।

ক্ষতিপূরণে আইএলও গঠিত কমিটির সদস্য বিজিএমইএ’র সহসভাপতি শহীদুল্লাহ আজিম মানবজমিনকে বলেন, ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় ক্ষতিপূরণে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্ক ঠিক করা হয়েছে। প্রত্যেক শ্রমিক পদবি ও জীবনকালীন (বেঁচে থাকার গড় আয়ু হিসেবে) টাকা পাবে। এই অর্থের পরিমাণ জনপ্রতি সর্বনিম্ন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৬২ লাখ টাকা পর্যন্ত পাবে।  ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে যারা ক্ষতিপূরণ নিয়েছে, তাদের ওই টাকা মোট ক্ষতির পরিমাণ থেকে বাদ দেয়া হবে। তিনি বলেন, পর্যায়ক্রমে ২৮৪৯ শ্রমিক এ ক্ষতিপূরণ পাবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ট্রাস্ট ফান্ড থেকে শিগগিরই তৃতীয় কিস্তিতে ৮৫৮ নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকের পরিবারের সদস্য ও আহত শ্রমিক ক্ষতিপূরণের ৪০ শতাংশ পাচ্ছেন। এর মধ্যে আছেন নিহত ১৩১ ও নিখোঁজ ৩৪ শ্রমিকের পরিবার এবং আহত ৬৯৩ শ্রমিক। তাদের স্বজনেরা পাবেন মোট ৩১ কোটি ৪৮ লাখ ৬৭ হাজার ১৫০ টাকা। এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে দুই কিস্তিতে ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন নিহত শ্রমিকদের পরিবারের এক হাজার ৫৫২ সদস্য ও আহত ৩৫ শ্রমিক। ট্রাস্ট ফান্ড থেকে তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে ক্ষতিপূরণ বাবদ ১২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেয়া হয়। অবশ্য এই ৪০ শতাংশ অর্থ থেকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে দেয়া অর্থ কর্তন করে রাখা হয়েছে। সমন্বয় কমিটি ও ক্লিন ক্লথ ক্যাম্পেইনের দেয়া তথ্য অনুয়াযী, ২৮৪৯ জন আহত, নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিক পরিবারের ৫০৯৯ জন সদস্য দাবিনামা (ক্লেইম ফরম) পূরণ করেছেন। তাদের মধ্যে নিখোঁজ শ্রমিক আছেন কমপক্ষে ১৪১ জন। তাদের সবার জন্য আলাদা ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে দাবিনামা পূরণের কাজ শেষ হয়।
সূত্র মতে, নিহত শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল স্বজনদের ক্ষতিপূরণের অর্থ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেই বিবেচনায় নিহতের স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা বা তাদের অবর্তমানে ভাই-বোনকে নির্ভরশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এসব সদস্যকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের প্রাপ্য অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। এর আগে কয়েক ধাপে আরও অর্থ দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, আইএলও এবং আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিল যৌথভাবে রানা প্লাজার ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে ৪ কোটি ডলারের (প্রায় ৩১০ কোটি টাকা) এই তহবিল গঠন করে। তহবিলে রানা প্লাজার ৫টি কারখানা থেকে পোশাক ক্রয় করত এমন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অর্থ প্রদানের আহ্বান জানানো হয়। রানা প্লাজায় ৫টি গার্মেন্ট কারখানা থেকে পোশাক রপ্তানি হতো ২৯টি ব্র্যান্ডের কাছে। এর মধ্যে ১৬টি প্রতিষ্ঠান তহবিলে অর্থ দেয়নি। আইএলওর উদ্যোগে গঠিত সমন্বয় কমিটি এসব ব্র্যান্ডকে ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে গঠিত তহবিলে অর্থ প্রদান করার জন্য চিঠি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন ব্যাংক, অর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ১২৭ কোটি টাকা জমা পড়েছে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের ইতিমধ্যে ২২ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। এখনও ১০৫ কোটি টাকা ওই তহবিলে রয়েছে।
শ্রমিক নেত্রী তাসলিমা নাসরিন অভিযোগ করে বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মৃত্যুপুরী থেকে যারা প্রাণ ফিরে পেয়েছেন তারা আজ বেঁচে থেকেও মরা মতো। অথচ সরকার ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে গোলকধাঁধা শুরু করেছে। সব শ্রমিককে তাদের সারা জীবনের আয়ের সমপরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান করার দাবি জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত বছরের ২৪শে এপ্রিল সকালে সাভারে আটতলাবিশিষ্ট রানা প্লাজা ধসে পড়ে। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে চলে উদ্ধার অভিযান। ওই বছরের ১৩ই মে উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। এ সময় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ১১৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও কিছুদিন পরপরই ঘটনাস্থল থেকে মানুষের হাড়গোড়, কঙ্কাল পাওয়া যাচ্ছে।

আজ রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর by আবু সালেহ আকন

আজ রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর। ২০০৬ সালের এই দিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতায় নিহত হয় ১৩ জন। আহত হয় কয়েক শ’ মানুষ। খোদ রাজধানীতেই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছয়জন এবং ছাত্রমৈত্রীর এক কর্মী প্রাণ হারান। লগি-বৈঠার নির্মম প্রহার, গুলিবর্ষণ আর ইটপাটকেলের আঘাতে রাজধানীর পল্টন এলাকায় নিহত হন ছয়জন। প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর চড়ে নৃত্যের দৃশ্য সারা বিশ্বকে হতভম্ব করে দেয়। টিভির পর্দায় হত্যাকাণ্ডের সে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন বিশ্ববাসী। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পল্টন ও শাহবাগ থানায় পৃথক পাঁচটি মামলা করা হয়। পল্টন থানায় দায়েরকৃত পাল্টাপাল্টি দু’টি মামলার একটি ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরই প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ১৪ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অন্য মামলাগুলোও পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ওই মামলায় ১৪ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা আসামি ছিলেন। অপর দিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের আসামি করে যে মামলাটি দায়ের হয়েছিল তা উচ্চ আদালত স্থগিত করেছে। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল আহূত অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরেই ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের হতাহতের ঘটনা ঘটে। ওই দিন প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে রাস্তায় মহড়া দিতে দেখা যায় বেশ কিছু পেশাদার সন্ত্রাসীকে। অভিযোগ রয়েছে ওই সব পেশাদার সন্ত্রাসীর অনেকে এখনো বহাল তবিয়তে ঘুরছে। ছবি দেখে তাদের নাম-পরিচয় বের করে নিহতদের স্বজনেরা পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের অবহিত করেছে, এমনকি খুনিদের বাড়ি চিনিয়ে দেয়া হয়েছে, তার পরও তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না বলে নিহতদের স্বজনেরা অভিযোগ করেছেন।

ওই দিন ১৪ দল এবং চারদলীয় জোটের সংঘর্ষে পল্টন এলাকায় ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছয়জন এবং ওয়ার্কার্স পার্টির ছাত্রসংগঠন ছাত্রমৈত্রীর একজন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে হতাহতের ঘটনা ঘটে। জামায়াত-শিবিরের নিহত নেতাকর্মীরা হলেনÑ মোজাহিদুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন (১), জসিম উদ্দিন (২), গোলাম কিবরিয়া শিপন, ফয়সাল ও হাবিবুর রহমান। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে হাজার হাজার মানুষের সামনে তাদেরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি; দেখা গেছে, লাশের ওপর উঠে নৃত্য করতে। জামায়াতের আহত অপর একজন সাইফুল্লাহ মো: মাসুম ঘটনার দুই দিন পর হাসপাতালে মারা যান। একই সময় পল্টন মোড়ে নিহত হন ছাত্র মৈত্রীর খিলগাঁও থানা সাধারণ সম্পাদক রাসেল খান। সহিংস ঘটনায় পল্টন ও আশপাশের এলাকাতেই আহত হয়েছেন কমপক্ষে এক হাজার মানুষ।
এই ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে পল্টন থানায় মামলা দায়ের করেন পল্টন থানা জামায়াতের তৎকালীন আমির এ টি এম সিরাজুল হক। মামলা নম্বর ৬১, তারিখ ২৯.১০.২০০৬। এই মামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, আবদুর রাজ্জাক, জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননসহ ৪০ জন এজাহার নামীয় আসামিসহ সহস্রাধিক আসামি করা হয়। আহত মাসুম মারা যাওয়ার পরে ৩ নভেম্বর আর একটি সম্পূরক এজাহার দাখিল করা হয়। এই এজাহারে যুবলীগ সভাপতি জাহাঙ্গির কবির নানকসহ ২৩ জন এজাহার নামীয়সহ দুই শতাধিক লোককে আসামি করা হয়। এই অভিযোগপত্রটি দাখিল করেন মাসুমের ভাই মো: শামসুল আলম মাহবুব। অপর দিকে ছাত্রমৈত্রীর রাসেল খান নিহতের ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ মোট ১০ জনকে আসামি করে পল্টন থানায় একটি মামলা করা হয়। মামলার বাদি হয়েছেন ঢাকা মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান। মামলা নম্বর ৬২(১০)২০০৬। এই মামলায় ৬১ নম্বর মামলার বাদি সিরাজুল হককেও আসামি করা হয়। এ ছাড়া সহিংস ঘটনায় আহত মিজানুর রহমান, রেজাউল করিম এবং অপর এক আহত আমানুর রহমান আমানের পক্ষে তার স্বজন আবদুর রাজ্জাক বাদি হয়ে পল্টন থানায় আরো পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেন। আশরাফুজ্জামান নামে অপর এক আহত রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় একটি মামলা দায়ের করেন।
পল্টন থানায় দায়েরকৃত ৬১ নম্বর মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো: আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ২০০৭ সালের ১০ এপ্রিল ৪৬ জনকে অভিযুক্ত করে এই মামলায় আদালতে চার্জশিট প্রদান করা হয়। চার্জশিট নম্বর ১৪৪। ধারা ১৪৩/১৪৮/১৪৯/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩০২/১০৯/১১৪ দণ্ডবিধি। যাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট প্রদান করা হয় তারা হলেনÑ আব্দুল জলিল, নাসিম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, সাহারা খাতুন, হাজী সেলিম, ডা: এইচবিএম ইকবাল, আব্দুস সালাম ওরফে সেলিম, সবুজ, আলী, মনা, রতন, আবুল, বাবু ওরফে নাজির আহম্মদ, জাকির ওরফে জাকির হোসেন, শফিকুল ইসলাম, সালাউদ্দিন খোকন, সুলতান মিয়া, আবুল কাশেম, আলমগীর ওরফে গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর, নওসের আলী, আব্দুল লতিফ ওরফে ক্ষ্যাপা, মো: জাকির হোসেন, শাহরিয়ার ওরফে সোহেল শাহরিয়ার, শাহাবুদ্দিন কিরন, জাহাঙ্গির হায়দার চৌধুরী, আশরাফ হোসেন, টিটু, ওমর ফারুক, শেখ হাসিনা, জাহাঙ্গির কবির নানক, সিদ্দিক নাজমুল আলম, রাসেল, মজিবুর রহমান মাইজ্জা, বেলায়েত হোসেন, আবু সাঈদ, বশির আহম্মদ, কিরণ ওরফে আব্দুল মালেক, শাহরিয়ার, জাহাঙ্গির আলম, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী, মোস্তাকিম বিল্লাহ, মুকুল, রায় মোহন শীল ও সুমন।
অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এই চার্জশিট ২০০৭ সালের ২৪ এপ্রিল আদালতে গৃহীত হয় এবং আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে পরোয়ানা মুলতবি করা হয়। ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতা গ্রহণের পরে ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট এই মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়। অপর দিকে কামরুল আহসানের দায়েরকৃত মামলায় জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। ২০০৯ সালের ৫ মে এই মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবেদন করা হয়। কিন্তু মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়নি। উচ্চ আদালতে মামলাটি কোয়াশমেন্টের আবেদন করা হলে মামলাটি স্থগিত করে রাখা হয়। অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মামলাটি প্রত্যাহারের যে আবেদন করা হয় সেই সার্টিফাইড কপিটি গত ৫ বছরেও সরবরাহ করা হয়নি। আব্দুর রাজ্জাক বলেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকার মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তিনি বলেন, এই মামলাটি হলো ইতিহাসের জঘন্যতম পরিকল্পিত নৃশংস হত্যা মামলা। এই মামলার বিচার এক দিন হবেই।
২৮ অক্টোবর একটি কলঙ্কিত দিন : মকবুল আহমাদ
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের পল্টন হত্যাকাণ্ড উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ২৮ অক্টোবর আমাদের জাতীয় ইতিহাসের একটি কলঙ্কিত দিন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সন্ত্রাসীরা হাইকমান্ডের নির্দেশে লগি-বৈঠার সন্ত্রাসী তাণ্ডব চালিয়ে সেদিন পল্টনে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের আটজনসহ ১৪ জন নেতাকর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করে। আহত করে সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সন্ত্রাসীরা পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে নৃশংসভাবে তাদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা নিহতদের লাশের উপর উঠে উল্লাস-নৃত্য করেছিল। সেই লোমহর্ষক ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড দেশ ও সারা বিশ্বের মানুষ বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে বিস্ময়ের সাথে অবলোকন করেছেন। ওই দিন ১৪ দলসহ আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা যে বর্বরতা সংঘটিত করেছে, তা মানব সভ্যতার এ যুগে কল্পনাও করা যায় না। আমি এ ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছি। আমি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সেদিনের শহীদদের স্মরণ করছি এবং তাদের শাহাদাত কবুল করার জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করছি এবং তাদের পরিবার-পরিজনদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

মহাসড়কে মধ্যরাতে বিভীষিকা by শরিফুল হাসান

বিস্ময়, আতঙ্ক, কান্না, আর্তনাদ, রক্ত। ঢাকা-যশোর মহাসড়কে গতকাল রোববার দিবাগত রাত তিনটায় সোহাগ পরিবহনে ডাকাতির পর বাসের ভেতরের চিত্রটি ছিল এমনই। ডাকাতেরা ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার আড়ুয়াকান্দি সেতুর কাছে রাস্তায় গাছ ফেলে বাসটিকে আটকায়। তারপর কুড়ালসহ ধারালো অস্ত্র হাতে উঠে পড়ে গাড়িতে। তারা যাত্রীদের টাকাপয়সা, মোবাইল ও অন্যান্য দামি জিনিস নিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, এলোপাতাড়ি কুপিয়েছে অন্তত ১০ জনকে। ঢাকা থেকে সাতক্ষীরায় যাচ্ছিল বাসটি। ঢাকা থেকে মাইক্রোবাসে যাচ্ছিলাম মাগুরা। দিবাগত রাত তিনটায় আড়ুয়াকান্দি সেতু এলাকায় এসে থেমে গেলেন চালক। পাশে থামল আরও দুটি বাস। সামনে একটি বাস থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু কোনো গাড়ি থেকে কেউ নেমে সামনে যাচ্ছে না।

>>এই যাত্রীর পিঠে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে ডাকাতেরা। মাগুরা সদর হাসপাতালে তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।ছবি: শরিফুল হাসান
গাড়িতে বসেই ফরিদপুরের মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদকে ফোন করে রাস্তায় গাড়ি আটকে থাকার কারণ জানতে চাইলাম। ওসি জানালেন, রাস্তায় গাছ ফেলে রাখার কারণে গাড়ি যেতে পারছে না। মাইক্রোবাস থেকে নেমে ওই বাসটিতে গিয়ে উঠলাম। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই যাত্রীদের কান্না তীব্র হলো। তাঁরা জানালেন, কয়েক মিনিট আগে ডাকাতেরা নেমে গেছে। এলোপাতাড়ি কুপিয়েছে যাত্রীদের।
ওসির সঙ্গে আবার কথা হলো। আরও পুলিশ এল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাস্তা পরিষ্কার করে গাড়ি রওনা হলো। মধুখালীর পর কামারখালী সেতু পার হলেই মাগুরা জেলা শুরু। মিনিট দশেক পর বাসটি এসে থামল মাগুরা সদর হাসপাতালের সামনে। একে একে নামানো হলো আহত যাত্রীদের। ডাক্তার-নার্সরা ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। গুরুতর আহত ১০ জনকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া শুরু হলো। জরুরি বিভাগজুড়ে মানুষের আর্তনাদ।
আবদুল্লাহ আল মামুন নামের এক যাত্রীর হাত থেকে রক্ত ঝরছে। মামুন জানালেন, তিনি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত। সাতক্ষীরায় যাচ্ছিলেন। মধুখালী আসার পর রাস্তায় গাছ দেখে বাসটি থেমে গেল। সঙ্গে সঙ্গে দুই পাশ থেকে গাড়ির দিকে ডাকাতেরা ঢিল ছোড়া শুরু করল। দরজা-জানালার কাচের ওপর কোপ দিচ্ছিল। একপর্যায়ে তিন ডাকাত ভেতরে ঢুকে পড়ে। তারা এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করল। মামুন বললেন, ‘আমার কাছে সাত হাজার টাকা ছিল, দিয়ে দিয়েছি। তবু আমাকে কুপিয়েছে।’

>>ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় মহাসড়কে ডাকাতির কবলে পড়া সোহাগ পরিবহনের বাসটিতে সামনের আসনে বসা আতঙ্কিত এক নারী যাত্রী। ডাকাতদের ধারালো অস্ত্রের আঘাত থেকে তিনিও রেহাই পাননি।ছবি: শরিফুল হাসান
মধ্যবয়সী রওশনা বানুকে বাসেই কাঁদতে দেখেছিলাম। হাসপাতালে এসেও তাঁর কান্না থামছে না। তিনি জানালেন, স্বামী রফিকুল ইসলামকে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। তাঁদের কাছে থাকা ১৮ হাজার টাকাই নিয়ে গেছে ডাকাতেরা। বাসের প্রথম সিটেই তাঁরা ছিলেন। দুজনকেই কুপিয়েছে। তাঁর স্বামীর দুই পায়ের আঘাত গুরুতর। তাঁকে জরুরি বিভাগ থেকে সার্জারি ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহিম রক্তাক্ত। জানালেন, তাঁর কাছ থেকে ডাকাতেরা ছয় হাজার টাকা নিয়ে গেছে, আবার দা দিয়ে কোপও দিয়েছে। ৬০ বছরের বৃদ্ধ নজরুল ইসলামের সাদা পাঞ্জাবি রক্তে লাল। তাঁর পিঠে কুপিয়েছে ডাকাতেরা। তাঁর বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছায়। আরেক বৃদ্ধ মোসলেম উদ্দিন ঢাকায় ছেলেকে দেখে বাড়ি ফিরছিলেন। তাঁকেও কুপিয়েছে ডাকাতেরা।

>>হাঁটুতে জখমপ্রাপ্ত এই যাত্রীকে মাগুরার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। ডাকাতেরা তাঁর দুই হাঁটুতেই কোপ দেয়।ছবি: শরিফুল হাসান
৩০ বছরের যুবক আবুল কালাম আজাদের কাছে নিজের দেশ বাংলাদেশ এখন এক আতঙ্কের নাম। তিনি জানালেন, চার বছর পর রোববারই মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় এসেছেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত হরতাল থাকার কারণে রাতে সাতক্ষীরার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। তাঁর হাতে কুপিয়েছে ডাকাতেরা। নিয়ে গেছে মোবাইল ফোন, টাকা।
সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মমতাজ মজিদ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ১০ জনকে চিকিৎসা দিয়েছেন। এঁদের অবস্থা গুরুতর। ধারালো অস্ত্র মাংস ভেদ করে হাড়েও আঘাত করেছে কয়েকজনের।
বাসের সুপারভাইজার জি এম ফারুক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রাত আটটায় ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তাঁরা। মধুখালী উপজেলার রেলস্টেশন থেকে কিছুটা এগিয়ে দেখেন, সামনে গাছ ফেলে রাখা। এরপর চারপাশ থেকে ঢিল। দা দিয়ে গ্লাসে কোপাচ্ছিল। বাধ্য হয়ে বাসের দরজা খুলে দিতে হয়েছে।
ঘটনাস্থল থেকে মধুখালী থানার দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘ওই এলাকায় আমাদের চারটি টহল দল রয়েছে। কিন্তু পুলিশ যেখানে থাকে, ডাকাতেরা সেখানে থাকে না। কয়েক দিন আগে আমরা এমন এক জায়গায় দ্রুত পৌঁছার কারণে ডাকাতেরা কেটে পড়েছিল। কিন্তু কাল রাতে আমরা ঘ্টনাস্থলে যাওয়ার আগেই ডাকাতেরা ডাকাতি করে চলে যায়।’
মামলার প্রক্রিয়া চলছে জানিয়ে ওসি বলেন, এই এলাকাটি জঙ্গলের মতো। হঠাৎ করে গাছ ফেলে চলে যায়। আবার অনেক সময় ঢাকা থেকেও যাত্রীবেশী ডাকাত আসে। কয়েক দিন আগে কলকাতাগামী একটি বাসে এভাবে আধা ঘণ্টাজুড়ে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতি প্রতিরোধে আপনারা কী করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সারা রাত টহল দেই। আমরা চেষ্টা করছি। তবে সামনে শীত। কুয়াশা। এই এলাকাটা জঙ্গলের মতো।’
রাত তিনটায় যখন পুলিশ মহাসড়ক থেকে গাছ সরাচ্ছিল, তখন তাদের চোখেমুখেও ছিল আতঙ্ক। পুলিশের কয়েকজন সদস্য বলছিলেন, ভাই, দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে যান। কয়েকজন পুলিশÿক্ষোভ নিয়ে বললেন, ফরিদপুরের করিমপুরে হাইওয়ে পুলিশের একটি ফাঁড়ি আছে। কিন্তু কোনো গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে কেবল তাদের দেখা যায়। মহাসড়কের নিরাপত্তার দায়িত্ব তো তাদেরও।
জানতে চাইলে করিমপুরের পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমরা এখানে ৫৪ কিলোমিটার মহাসড়ক দেখি। মধুখালী এলাকায় যেখানে বারবার ঘটনা ঘটে, সেটি মধুখালী থানার দুই কিলোমিটারের মধ্যে। সেখানে তাদের টহল দেওয়ার কথা। বড় কথা হলো, বারবার একই এলাকায় ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।’
ফরিদপুর মোটর ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সভাপতি মান্নান হাওলাদার বললেন, ‘আমরা পুলিশকে বারবার বলেছি, ব্যবস্থা নিন। কিন্তু আমরা বুঝি না, পুলিশ কী করছে। আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হাইওয়ে পুলিশ করা হলো। কিন্তু নিরাপত্তা পাচ্ছি না।’
বাসমালিকদের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে আমাদের ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, গত শুক্রবার থেকে রোববার পর্যন্ত মহাসড়কের মধুখালী-কামারখালী অংশে তিনটি বাস ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার দিবাগত রাতে রায়পুর ইউনিয়নের ছুকরিকান্দি এলাকায় গাছ ফেলে একটি যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতি হয়। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে মধুখালী সদর ইউনিয়নের পরীক্ষিতপুর এলাকায় আরেকটি বাস ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
ফরিদপুর বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতির জন্য সড়কে বাস ডাকাতি বেড়ে গেছে।
তবে মধুখালী থানার ওসি বলেন, ‘পর পর তিন দিন বাস ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, তা আমাদের জানা নেই।’ তিনি বলেন, মহাসড়কে নিরাপত্তার দায়িত্ব হাইওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট থানার। তবে মাথা যেহেতু আমার, মাথাব্যথা আমাদেরই বেশি। হাইওয়ে পুলিশ সড়ক দুর্ঘটনার পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকে।’
ফরিদপুর হাইওয়ে পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার বি এম আশরাফও বললেন, ‘পর পর তিন রাতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে, এজাতীয় কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। কেউ অভিযোগও করেনি। তবে গত সপ্তাহে এ মহাসড়কের রাজবাড়ীর খানখানাপুর এলাকায় সৌদিয়া ও সোহাগ পরিবহনের দুটি বাসে ডাকাতি হয়েছিল। এ ব্যাপারে গোয়ালন্দ থানায় দুটি মামলা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে পুলিশ গত রোববার রাতে এক ডাকাতকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশ রাতে রাজবাড়ীর রাস্তার মোড় থেকে বসন্তপুর ও রাজবাড়ী রাস্তার মোড় থেকে মধুখালীর মাঝকান্দি জুট মিল পর্যন্ত টহল দেয়। বাকিটুকু মধুখালী থানার দেখার কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা যারা জান ও মালের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছি, তাদের সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। দায়দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন মাগুরা প্রতিনিধি]