Tuesday, December 10, 2013

সংঘাতের শেষে কি অপেক্ষা করছে? by সাজেদুল হক

আসলে সবাই জানতেন সংঘাত-সংঘর্ষের মুখোমুখি হওয়াই হবে তাদের নিয়তি। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা ছিল তাদের মনে। ভাগ্য বদলাতে প্রার্থনাতেও বসেছিলেন তারা। কিন্তু কোন লাভ হয়নি।

দুচোখ ভরে ম্যান্ডেলাকে দেখেছি by রফিকুল ইসলাম রতন

দক্ষিণ আফ্রিকা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু যে মানুষটি সারা বিশ্বে এ দেশটিকে বিশেষভাবে পরিচিতি দিয়েছেন, সেই জীবন্ত কিংবদন্তিকে দেখেছি আমি। দু’চোখ ভরে হৃদয়-মন উজাড় করে দেখেছি একটি ইতিহাসকে। কোঁকড়ানো চুলের বিশালদেহী আজন্ম বিপ্লবী ও বর্ণবাদবিরোধী আপসহীন সেই কালো মানুষটিকে দেখে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিলাম পলকহীন চোখে। তাকে দেখে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে মাথাও নুয়েছিলাম। তেমনই শ্রদ্ধা জানিয়েছিলাম ইয়াসির আরাফাতকে দেখেও। আজ থেকে ১৬ বছর আগে অধিকার আদায়ের আজীবন সংগ্রামী, বিশ্ববরেণ্য এই নেতা পা রেখেছিলেন বাংলাদেশের মাটিতে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে অন্য দুই বিশ্ব নেতার সঙ্গে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট শান্তিতে নোবেল বিজয়ী নেলসন ম্যান্ডেলা। দিনটি ছিল ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ। এ অনুষ্ঠানে আরও ছিলেন আরেক অকুতোভয় সংগ্রামী নেতা ফিলিস্তিনবাসীর প্রাণের মানুষ প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সুলেমান ডেমিরেল।
তৎকালীন দৈনিক বাংলার একজন রিপোর্টার হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেই রজতজয়ন্তীর অনুষ্ঠান কভার করার বিরল সুযোগ আমার হয়েছিল। আর এ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল আমার সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান শিক্ষাগুরু, চিফ রিপোর্টার জহিরুল হকের বদান্যতায়। মূলত তিনি নিজেই এ রাষ্ট্রীয় অনন্যসাধারণ আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানটি কভার করেছিলেন। সঙ্গে রেখেছিলেন আমাকে। আমি সেদিন অনুষ্ঠানের টুকিটাকি ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন ও ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনাগুলো তুলে ধরেছিলাম। ১৯৭১ সালে যে স্থানটিতে দাঁড়িয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এবং যে স্থানটিতে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর পাক হানাদার বাহিনী মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল- ঠিক সেই স্থানটিতে নির্মিত ‘স্বাধীনতা মঞ্চে’ আয়োজন করা হয়েছিল তিন দিনব্যাপী সেদিনের অনুষ্ঠানমালার। এই বিশ্ব বরেণ্য নেতাদের লালগালিচা অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজও আমার কানে বাজে সেদিনের নেলসন ম্যান্ডেলার সংক্ষিপ্ত বক্তৃতার পঙ্ক্তিগুলো। আমরা সেদিন তন্ময় হয়ে শুধু শুনছিলাম এবং হৃদয়-মন উজাড় করে দু’চোখ ভরে তাদের দেখছিলাম। তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি মাথা নুয়ে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন বর্ণ বৈষম্যের অন্ধকার থেকে মুক্তির জন্য লড়াই করছি, তখন বাংলাদেশ দক্ষিণ আফ্রিকার শোষিত বঞ্চিত নিগৃহীত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলন সংগ্রামকে সমর্থন জানিয়ে আমাদের কৃতজ্ঞতা পাশে আবদ্ধ করেছে। শুধু এ কারণেই আমি বাংলাদেশের একজন বন্ধু হতে চাই। তিনি বলেন, বর্ণ বৈষম্যের অন্ধকার থেকে স্বাধীনতার ভোরের পথে আমরা যখন হামাগুড়ি দিচ্ছি, তখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পালন করছে। আমার পরম সৌভাগ্য এমন একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ পাওয়ার জন্য।’
দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী প্রিন্টের ফুলহাতা শার্ট ও অফ হোয়াইট প্যান্ট পরিহিত সদা হাস্যমুখের এই নেতা মঞ্চে উঠে যখন উপস্থিত সুধী ও জনতার উদ্দেশে হাত নাড়লেন, তখন সবাই দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে সেই সম্মানের জবাব দিয়েছিলেন, শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত করে তুলেছিলেন গোটা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। কোটরাগত গভীর চোখে অবাক বিস্ময়ে জনতার দিকে তাকিয়ে ঝকঝকে দাঁতের হাসি দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি এই ব-দ্বীপের অধিবাসীদেরও অকৃত্রিম বন্ধু।
সেদিনের সেই ছোট্ট ভাষণটির কী অপরিসীম গুরুত্ব, তখন হয়তো তা বুঝতেই পারিনি। তিনি হেলিকপ্টারে করে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পর শোক বইতে লিখেছিলেন, ‘বন্ধুরা, তোমাদের মৃত্যু নেই।’ তিনি স্মৃতিসৌধ চত্বরে একটি গাছের চারাও রোপণ করেছিলেন। সেদিন মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হয়েছিল এবং পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল, নেলসন ম্যান্ডেলা কিছুটা অসুস্থ অবস্থাতেই এসেছিলেন বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসার টানে। সাংবাদিকতার প্রায় তিন যুগ পার করতে চলেছি। কিন্তু জীবনে এমন মহত্তম ও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান দেশের মাটিতে আর কভার করার সুযোগ হয়নি। বিশ্বের বহু দেশে পেশাগত কাজে গেলেও ম্যান্ডেলা ও ইয়াসির আরাফাতের এ অনুষ্ঠানটিই ছিল আমার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল ঘটনা।
বর্ণবাদের জাঁতাকলে যে দেশটি ছিল নিষ্পেষিত, যন্ত্রণাকাতর এবং মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছিল যে জনপদটি, সেই পশ্চাৎপদ অন্ধকারাচ্ছন্ন জনপদে লাশের গন্ধ আর ধংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন এই মানুষটি। শ্বেতাঙ্গদের অত্যাচার-নির্যাতন আর শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে কালোদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সংগ্রামের অবিসংবাদী এই নেতাকে কঠোর ও অমানুষিক পরিশ্রম করে নিজেকে জায়গা করে নিতে হয়েছিল। প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে দিয়ে গণমানুষের কাতারে এসে বিশ্ব নেতায় উদ্ভাসিত নেলসন ম্যান্ডেলা সমগ্র বিশ্বকে কাঁদিয়ে গত ৫ ডিসেম্বর বিদায় নিলেন। তিনি তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন- সততা, সাহস, মহানুভবতা, উদারতা ও ক্ষমাই হতে পারে একটি জীবন্ত কিংবদন্তি হওয়ার পেছনের মূলমন্ত্র।
সেই ১৯৪৪ সালে মহাত্মা গান্ধীর গড়া রাজনৈতিক দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে (এএনসি) যোগদানের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর মতো একটি দিনের জন্যও তিনি শান্তিতে থাকতে পারেননি। কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তার বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল ও সংগ্রামী ভূমিকার সঙ্গে একাত্ম হয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকার সব কালো নির্যাতিত মানুষ। তার আহ্বানে দেশের উদারপন্থী সব শ্রেণী-গোত্রের মানুষই ঐকমত্যে এসেছিল ম্যান্ডেলার নেতৃত্ব মেনে নিতে। আফ্রিকার কালো মানুষদের ইতিহাসে এমন জাদুকরি নেতৃত্ব এর আগে আর কেউ দিতে পারেননি। তার নেতৃত্বেই ১৯৫৫ সালে ঘোষিত হয়েছিল স্বাধীনতার সনদ। তিনি আত্মগোপনে থেকে শেষ পর্যন্ত যে সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাতেই ভিত কেঁপে উঠেছিল অত্যাচারী শ্বেতাঙ্গ শাসকদের। তারপরও তারা শেষ চেষ্টা হিসেবে ১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট পাসপোর্ট ছাড়া বিদেশ যাওয়ার অভিযোগ এনে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয় এই নেতাকে। বর্ণবাদী স্বৈরশাসক ফেড্রিক ডি ক্লার্ক নেলসন ম্যান্ডেলার ওপর একের পর এক অত্যাচার-নির্যাতন করে প্রিটোরিয়াসহ বিভিন্ন জেলখানায় নিক্ষেপ এবং শেষে বিচ্ছিন্ন রোবেন দ্বীপে একটানা ১৮ বছরের কারাজীবনে নিক্ষেপ করে। ১৯৬৪ সালে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়ে রোবেন দ্বীপের ৮ ফুট বাই ৭ ফুটের ছোট্ট একটি প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপের পরও দমে যাননি তিনি। তার মনোবল এতটাই সুদৃঢ় ছিল যে, তিনি কারাগারে বসেই দূরশিক্ষণের মাধ্যমে লন্ডন থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের নিষ্ঠুর শিকার কালো মানুষদের প্রায় সবাই যখন সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, প্রতিশোধ আর জিঘাংসার আগুনে যখন জ্বলে-পুড়ে মরছে সবাই, যখন শ্বেতাঙ্গদের জীবন ও অস্তিত্ব চরম সংকটে, ঠিক তখনই ১৯৯০ সালে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় ক্লার্ক সরকার। কিন্তু মুক্তির পর নেলসন ম্যান্ডেলা আবির্ভূত হন এক নতুন মানুষরূপে। মহাত্মা গান্ধীর ‘অহিংসা’ই হয়ে ওঠে তার প্রধান রাজনৈতিক দর্শন। জীবন যুদ্ধে পরাস্ত এবং অত্যাচার-নিপীড়নে জর্জরিত দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষরা যখন প্রতিশোধ আগুনে পুড়ছে, ঠিক সেই রকম একটি উত্তেজনায় টানটান পরিস্থিতিতে তিনি তার মমত্ববোধ, প্রজ্ঞা, মানবতা ও মহানুভবতা দিয়ে গোটা জাতিকে প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে নিবৃত রেখে শান্তির পথে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। যা ছিল বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ও অনন্য দৃষ্টান্ত।
সেই ১৯১৮ সালে ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের পাহাড়ি ও ঘন গাছগাছালিতে ঘেরা নিভৃত পল্লী এমভোজা কুনু গ্রামের নিুবিত্ত পরিবারে জন্মের পর থেকেই যে মানুষটি জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে ঠেকে ঠেকে শিখেছিলেন মানুষকে আপন করে নেয়ার মূলমন্ত্র, যিনি কোনোদিন নীতির কাছে আপস করেননি, যার গুণ ও মহত্ত্ব সবাইকে চুম্বকের মতো কাছে টেনে নিয়েছিল- সেই ম্যান্ডেলা তো আর সাধারণ কাজ করতে পারেন না। তাই তিনি শ্বেতাঙ্গ আর কৃষ্ণাঙ্গের মধ্যে ঘটালেন এক মহান মিলন। যার মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে পরিণত হলেন মহান এক আদর্শের প্রতিভূ হিসেবে, শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে।
মাত্র ২৪ বছর বয়সে একজন শিক্ষানবিস সেবিকা এলভিস নিতোকো মাসকে বিয়ে, বিয়ের পর ৯ মাস বয়সে কন্যা ম্যাকজিউয়ের মৃত্যু এবং ১৩ বছরের বিবাহ জীবনের অবসান (বিবাহ বিচ্ছেদের প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতি।

সব পক্ষকেই জয়ী হতে হবে by ড. মাহবুব উল্লাহ্

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিরোধীদলীয় জোটের অবরোধ কর্মসূচিতে গোটা দেশ অচল হয়ে পড়েছে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য জেলার যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন বলা চলে। রাজধানী ঢাকাতেও চলছে বিক্ষিপ্ত সহিংসতা ও সংঘর্ষের ঘটনা। পুলিশের গুলি ও সহিংসতার ফলে সর্বশেষ পর্যায়ে ৫০ জনের মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। প্রতিটি প্রাণ অমূল্য। কোনো ক্ষতিপূরণেই এসব জীবনের মূল্য পরিশোধ করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হল পেট্রল বোমার আগুনে পুড়ে যাওয়া মানুষগুলোর অবস্থা। এদের মধ্যে বেশ ক’জনের মৃত্যু ঘটেছে। অর্থনীতির কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এরকম অবস্থা চলতে থাকলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিুমুখী হবে। শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনেও নেমে এসেছে বিপর্যয়। বিগত সময়ে, বিশেষ করে গত তিন দশকে বাংলাদেশে অর্থনীতির চাকা গতি পেয়েছিল। এ ধারা চলতে থাকলে কিংবা আরও একটু বেগবান হলে অল্প ক’বছরের মধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে পারত। কিন্তু তা কী করে হবে? আমাদের সংঘাতময় রাজনীতি উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে সুশাসনের অভাব। সুশাসন না থাকায় বাংলাদেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এখানে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের একটি স্কুলের পরিচালনা কমিটি নিয়ে যে নোংরা রাজনীতির চর্চা হয়, তার ফলে চরম মূল্য দিতে হয় শিক্ষার্থীদের। শুধু শিক্ষা ব্যবস্থাই নয়, রাষ্ট্রের অন্য সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, যেমন- পাবলিক সার্ভিস কমিশন, নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেভাবে অনাচার ও দলীয়করণ শিকড় গেড়েছে তাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাহত হতে হয়। এর মধ্যেও বাংলাদেশের উদ্যোগী মানুষ যেভাবে নানা ধরনের সৃজনশীল উদ্যোগ নিচ্ছেন সেটাই বাংলাদেশকে অনেক স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে ব্যতিক্রমী করে তুলেছে। ডগলাস সি নর্থের মতো অর্থনীতিবিদরা যখন বলেন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্তম্ভ, তখন ভঙ্গুর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের উন্নয়ন একটি Paradox-এর জিন্ম দেয়। আসলেই এটি একটি Paradox। অসুস্থ রাজনীতি ও অগ্নিদগ্ধ গীতা রানী সরকারের ভাষায়, অসুস্থ সরকারের পরিবর্তে যদি সুস্থ রাজনীতি ও সুস্থ সরকার থাকত তাহলে অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে আমরা অনেক বেশি কিছু অর্জন করতে পারতাম।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে, কিন্তু সেই গণতন্ত্র অনুদার। এখানে প্রতি পাঁচ বছর পর নির্বাচন এলেই সমস্যার উদ্ভব হয়। এবারকার সমস্যাটি সবচেয়ে ভয়াবহ। ১৯৯৫-৯৬ সাল এবং ২০০৬-০৭ সালে যে সংকটের সৃষ্টি হয়েছিল, সেই সংকটকালেও আমরা ভয়াবহ সংঘাত-সংঘর্ষ দেখেছি, সহিংসতা দেখেছি। এবার সমস্যা আরও অনেক বেশি প্রকট। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে দেয়ার জন্যই এ সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করার ব্যবস্থা ১৯৯৬ সালে চালু করা হয়েছিল আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাসের প্রেক্ষাপটে। সেই আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস দিন দিন মহীরুহে পরিণত হয়েছে। যতদিন এই আস্থাহীনতা কাটিয়ে না ওঠা যাবে ততদিন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে যতই অগণতান্ত্রিক বলা হোক না কেন, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে সেটিকে বহাল রাখতে হবে। একে এক ধরনের স্টপ গ্যাপ এরেইনমেন্ট বলা যায়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেছিলেন, তিনি সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করবেন। কিন্তু সম্ভবত এর একদিন পরই তিনি নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে দিলেন। সেদিন থেকেই সমস্যার সূত্রপাত। বিরোধীদলীয় জোট চাইল তফসিল পিছিয়ে দিতে। কিন্তু তা হল না। বিরোধীদলীয় জোট নির্বাচনে এলো না। এরশাদের জাতীয় পার্টি নির্বাচনে যোগ দিলেও পরবর্তী সময়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াল। তারা বলল, তফসিল না পেছালে এবং সব দল অংশগ্রহণ না করলে তারাও নির্বাচনে যাবে না। কার্যত নির্বাচনটি একদলীয় নির্বাচনে পরিণত হতে চলেছে। এর ফলে যে সমস্যা হবে, এ কথা সরকারের অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেবও বলেছেন। সরকার নিজ অবস্থানে অনড়। বিরোধীদলীয় জোটও অনড়। কারও পক্ষ থেকে ছাড় দেয়ার দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখছি না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তিনি সর্বোচ্চ ছাড় দিতেও প্রস্তুত। কিন্তু কোনো ছাড়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রচণ্ড ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থায় পড়ে গেছে বাংলাদেশ।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীর সঙ্গে কী কথা হয়েছে তা আমরা জানি না। তবে এরশাদের সঙ্গে যে আলাপ হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এরশাদের মুখ থেকেই জানা গেছে। সুজাতা সিং এরশাদকে নির্বাচনে থাকতে অনুরোধ করেছেন, অন্যথায় বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে পারে বলে সাবধান করেছেন। এই জঙ্গিবাদের ধারক-বাহক হবে জামায়াত-শিবির। বাংলাদেশের প্রশ্নে ভারতীয় অবস্থানটি এখন স্পষ্ট। ভারত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার দেখে স্বস্তিবোধ করে। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দল ক্ষমতায় এলে ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে বলেও ভারতের ধারণা। সোজা কথায়, ভারত তার সব ডিম একটি ঝুড়িতেই রাখতে চায়। কিন্তু সেই ঝুড়ির তলা শূন্য কিনা সেটা ভেবে দেখছে না। অনেকেই মনে করেন, ভারতের এ অবস্থান আওয়ামী লীগ সরকারকে অনমনীয় করে ফেলেছে। হাজার হলেও ভারত বিশাল শক্তিশালী দেশ। বাংলাদেশের সীমান্ত-সংলগ্ন প্রতিবেশীও বটে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারে ভারতের তুলনায় অন্য কোনো শক্তির সামর্থ্য মেলে না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমস্যার মূলে এটি মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রবন্ধ, নিবন্ধ ও প্রতিবেদন থেকে একই ধারণা পাওয়া যায়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এখন বাস্তব অর্থেই অভ্যন্তরীণ থাকছে না।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ফার্নান্দেজ তারানকো ঢাকায় এসেছেন সবশেষে। তার সঙ্গে রয়েছে একটি শক্তিশালী টিম। এই টিমে রয়েছেন নিগোসিয়েশন এক্সপার্ট রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ। তারানকো ঢাকায় ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। তিনি ঢাকায় অবস্থিত কিছুসংখ্যক বিদেশী রাষ্ট্রদূত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী, জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং কয়েকজন বিশিষ্ট নাগরিকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি জামায়াত নেতাদের সঙ্গেও কথা বলবেন। তার সঙ্গে থাকা বিশেষজ্ঞরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন সবার বক্তব্যে কোনো অভিন্ন অবস্থান আছে কিনা। সেটাকে সূত্র ধরেই তারা আরও আলোচনা করবেন। শেষ পর্যন্ত কোনো ফল হবে কিনা তা কেবলমাত্র ভবিতব্যই জানে।
যদি শেষ পর্যন্ত সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হয়, তাহলে বাংলাদেশকে অধিকতর অস্থিতিশীলতার মধ্যে পড়তে হবে। জরুরি অবস্থা জারির কথা শোনা যাচ্ছে। যদিও এ পদক্ষেপটি সংবিধানসম্মত, তবুও এই পদক্ষেপের ফলে সমস্যার সুরাহা কতটুকু হবে বলা মুশকিল। কোনো একটি দৈনিক পত্রিকায় ক’দিন আগে দেখলাম জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হতে পারে। কিন্তু সেরকম কিছু নিঃসন্দেহে ভালো দৃষ্টান্ত হবে না। ড. কামাল হোসেন মনে করেন, সংবিধানের মধ্যেই সমস্যার সমাধান সম্ভব। কিন্তু সেই ফর্মুলাটি কী সেটা তিনি স্পষ্ট করেননি। সে কথাটি খুলে বললে সমাধান যদি দূরে চলে যায় তাহলে খোলাসা না করাই ভালো। বিষয়টি মিস্টার তারানকো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার গোচরীভূত হলেই হল।
বাংলাদেশের বর্তমান সংকটটি রাজনৈতিক। রাজনৈতিকভাবেই এর ফয়সালা করতে হবে। দোষারোপের রাজনীতির চর্চা করে, দমন-পীড়নের পথ ধরে কোনো সমাধান হবে না। আমরা তো সবাই বাংলাদেশের মানুষ। সরকার পক্ষ ও বিরোধী পক্ষে যারা আছেন তারাও বাংলাদেশের মানুষ। জনগণ এই সংকটের আশু সমাধান চায়। তারা সংঘাত চায় না। তারা আশা করে, সব প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ সবার জন্য সম্মানজনক একটি সমাধানে পৌঁছবে। যত বিরোধই থাকুক না কেন, মনে রাখতে হবে, সবার উপরে দেশ। কেউ কাউকে নির্মূল করে জয়ী হতে পারবে না। জয়ী হতে হলে সবাইকেই জয়ী হতে হবে।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

মানবাধিকার দিবসের প্রত্যাশা by কাজী ফারুক আহমেদ

সিরিয়া, আফগানিস্তান, মিয়ানমারসহ দেশে দেশে মানবাধিকার লংঘন, বাংলাদেশে ক্ষমতার জন্য রাজনীতির নামে মানুষ হত্যা ও খেটে-খাওয়া, অসহায় মানুষের জীবনযাত্রায় চরম দুর্ভোগের প্রেক্ষাপটে এসেছে এবারের মানবাধিকার দিবস। আজীবন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত নেলসন ম্যান্ডেলার মহাপ্রয়াণ এর বিশেষ প্রেক্ষাপট রচনা করেছে। ‘সর্বজনীন মানবাধিকার দিবস’ হিসেবে ১৯৬৮ থেকে পালিত হয়ে আসা আজকের দিনটি (১০ ডিসেম্বর) মানুষের প্রাপ্য অধিকার ও মর্যাদার অপরিহার্যতা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরছে। উল্লেখ্য, প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটির একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা হল- ‘দুই দশক ধরে অধিকারের সপক্ষে কার্যক্রম’। দিবসের পটভূমি : ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা গৃহীত হয়। এই ঘোষণায় মোট ৩০টি ধারার মধ্যে উল্লেখযোগ্য : ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিন্তা, বিবেক ও ধর্মের স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নির্যাতন থেকে দেশে আশ্রয় চাওয়া ও আশ্রয় লাভ, ভয়, অভাব, নির্বিশেষে প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অধিকার। ঘোষণার ২৩ অনুচ্ছেদের ৩ ধারায় আছে : ‘কর্মরত প্রতিটি মানুষের কাজের ন্যায্য ও সন্তোষজনক পারিশ্রমিক পাওয়ার অধিকার আছে- যা পরিবার-পরিজন নিয়ে সম্মান ও মানবিক মর্যাদার সঙ্গে তার জীবনযাপন নিশ্চিত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রয়োজনমতো অন্যবিধ সামাজিক সুরক্ষা।’ ২৪ অনুচ্ছেদে আছে : ‘প্রত্যেকেরই যুক্তিসঙ্গত শ্রমঘণ্টার সীমারেখা ও প্রচলিত নিয়মে বেতন-ভাতাসহ বিশ্রাম ও অবকাশ ভোগের অধিকার আছে।’ ২৬ অনুচ্ছেদে বর্ণিত : ‘প্রত্যেকেরই শিক্ষা লাভের অধিকার আছে।’
দুই দশকের অর্জন : মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ এ বছর গত দুই দশকের অর্জনগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। ১৯৯৩ সালের ২৫ জুন ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব সম্মেলনে ৭ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারীর উপস্থিতিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের পদ সৃষ্টি ও কার্যক্রম গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এর পেছনে বড় উদ্যোগ ছিল বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা/সংগঠনের। লক্ষ্য ছিল একটি স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। যার মূল কাজ হবে যেখানেই মানবাধিকার লংঘিত হবে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। জাতিসংঘের শক্তি ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সবার জন্য প্রযোজ্য অধিকার নিশ্চিত করা। দুই দশক ধরে এক্ষেত্রে অর্জিত ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যই এবারের মানবাধিকার দিবসের প্রতিপাদ্য স্থির করা হয়েছে। উল্লেখ্য, এসব অর্জনের মধ্যে রয়েছে : ১. কোনো ভেদাভেদ না রেখে সব মানুষের আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার এবং উন্নয়নের অধিকারের স্বীকৃতি; ২. বিশ্বব্যাপী শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মানবাধিকারের স্বীকৃতি; ৩. শিশু, নারী, নির্যাতনের শিকার সব মানুষ, অক্ষম/বিশেষ চাহিদা প্রাপ্তির যোগ্য ব্যক্তি ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা লাভের অধিকারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি; ৪. নারীর অধিকার মানবাধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি এবং নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংস আচরণ মানবাধিকারের প্রত্যক্ষ লংঘন হিসেবে স্বীকৃতি। ৫. মানবাধিকার লংঘন করে কেউ পার পেতে পারবে না, নির্যাতিতের সুবিচার লাভের অধিকার, যুদ্ধাপরাধী ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনকারীদের আইনের আওতায় বিচারের অধিকার; ৬. প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদার মানুষদের সমঅধিকারের স্বীকৃতি; ৭. অভিবাসী ও অপর্যাপ্ত কাগজপত্র নিয়ে বিদেশে গমনকারী অভিবাসনে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের বাধাগুলো দূরীকরণের উদ্যোগের স্বীকৃতি; ৮. আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ও বৈষম্যহীন সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা/কার্যক্রমের স্বীকৃতি; ৯. বিশ্বব্যাপী মানুষের অধিকার ও স্বাধীনতার সপক্ষে সচেতনা বৃদ্ধিতে নাগরিক সমাজের অবস্থান ও সৃজনধর্মী উদ্যোগের স্বীকৃতি; ১০. জাতীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর স্বাধীন কার্যক্রম গ্রহণ। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ দেশে এ ধরনের সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা; ১১. অতীতে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের পূর্ণ মানবাধিকার; ১২. ব্যবসা-উদ্যোগে মানবাধিকার প্রসঙ্গের যুক্তকরণের সপক্ষে ক্রমবর্ধমান সচেতনতা; ১৩. স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকারের প্রতি সমর্থন ও একই সঙ্গে যা প্রত্যক্ষভাবে হিংসা বা সন্ত্রাসে উস্কানি দেয় তার বিরোধিতা জ্ঞাপক নীতিমালা নির্ধারণ; ১৪. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা/সংগঠনগুলোর প্রবীণদের অধিকার, সত্যের সপক্ষে অবস্থান গ্রহণের অধিকার, নির্মল পরিবেশ, বিশুদ্ধ খাদ্য ও পানীয় এবং স্বাস্থ্যকর পয়ঃনিষ্কাশনের অধিকারের স্বীকৃতি।
বাংলাদেশে মানবাধিকার : এখানে জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, যার মধ্যে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা দুজনই। প্রাথমিক স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে ছেলেদের চেয়ে এখন মেয়েরাই সংখ্যায় বেশি। শিক্ষকতায় বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তবে শিক্ষার্থী হিসেবে মেয়েরা যখনই উঁচু ধাপে উঠতে যায়, তখনই তাদের ঝরে পড়ার সংখ্যা বাড়তে থাকে। কোথায় নেই আমাদের নারীরা? শিক্ষকতায় তো আছেই। সাংবাদিকতা, শিল্প উদ্যোগ, ব্যবসা- প্রায় সর্বত্রই তাদের বিচরণ। বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ পদেও রয়েছে তাদের অবস্থান। বৈদেশিক দূতাবাস, সামরিক ও আইন-শৃংখলা বাহিনীতেও তাদের অবস্থান একেবারে অনুল্লেখযোগ্য নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার আগের সরকারের আমলে নিবন্ধন, সনদপত্র, ব্যাংক হিসাবসহ সব ক্ষেত্রে বাবার নামের সঙ্গে মায়ের নামও যুক্ত করেন। এবার মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এসবই এক একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। আমাদের মেয়েরা এখন হকি, ক্রিকেট, ফুটবল খেলছে। সাঁতার, বন্দুক চালনায় নৈপুণ্য দেখিয়ে দেশ-বিদেশের নানা পুরস্কারও এখন তাদের করায়ত্ত। তবে এরপরও বাংলাদেশে পরিবারে নারীর শ্রমের ও উদ্যোগের মূল্যায়ন নেই। নারী শ্রমিকের পারিশ্রমিক পুরুষের অর্ধেক অথবা তারও কম।

অসুস্থ রাজনীতি ও জাতিসংঘের উদ্যোগ by তারেক শামসুর রেহমান

ক’দিন আগে অগ্নিদগ্ধ গীতা সরকারের হৃদয়ছোঁয়া বক্তব্য ছাপা হয়েছে সংবাদপত্রে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের বেডে শুয়ে আছেন গীতা সরকার। তিনি একজন গৃহবধূ, তার সেখানে থাকার কথা নয়। অবরোধের সময় পেট্রল বোমায় দগ্ধ হয়ে তার আশ্রয় হয়েছে বার্ন ইউনিটে। প্রধানমন্ত্রী তাদের দেখতে গিয়েছিলেন। কোনো রকম রাখঢাক না রেখেই গীতা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘আমরা আপনাদের তৈরি করেছি। আপনারা আমাদের তৈরি করেন নাই। আমরা আমাদের স্বামীরটা খাই। আপনারা আমাদের নিয়ে ছিনিমিনি খেলবেন না।... আমরা ভালো সরকার চাই। আমরা অসুস্থ সরকার চাই না।’ গীতা সরকারের এ বক্তব্য ইউটিউবের মাধ্যমে পৌঁছে গেছে লাখ লাখ মানুষের কাছে। তার সেই মর্মস্পর্শী অথচ দৃঢ়চেতা বক্তব্যে হৃদয় ছুঁয়ে গেছে লাখো মানুষের। একজন গীতা সরকার যেন হয়ে উঠেছেন এ দেশের অগণিত মানুষের প্রতিচ্ছবি। তিনি যেন বলতে চেয়েছেন সবার কথা। এ কেমন রাজনীতি! অসুস্থ রাজনীতির বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বার্ন ইউনিটের এক-একজনের কাহিনী যখন পত্রিকায় পড়ি, তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। অন্তঃসত্ত্বা মহিলাও রেহাই পাননি দুর্বৃত্তদের ছোড়া পেট্রল বোমা থেকে। ঢাকা কলেজের একজন ছাত্র, যে আমার সন্তান হতে পারত, সেও রেহাই পায়নি। এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।
এই অসুস্থ রাজনীতি আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? রাজনীতি তো সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু এ কোন রাজনীতি? যে রাজনীতি গীতা সরকারকে দগ্ধ করে, যে রাজনীতি আগামী দিনের ভবিষ্যৎ ওহিদুর রহমান বাবুর জীবন কেড়ে নেয়, সে রাজনীতি আমাদের কী মঙ্গল বয়ে আনবে? মনে আছে, বছর দুয়েক আগে তুরস্কের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে একজন অধ্যাপকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তিনি আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন মওলানা ভাসানী সম্পর্কে, আজীবন যিনি সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। ক্ষমতার ‘দৌড়ে’ তিনি কোনোদিন হরতাল ডাকেননি। অবরোধ ডাকেননি। তার সাহসী উচ্চারণ তাকে অবিসংবাদিত পুরুষে পরিণত করেছিল। তিনি আজ যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে কি এই হিংস্র রাজনীতিকে সমর্থন করতেন?
একজন গীতা সরকারের সাহসী কণ্ঠস্বর যেন বলছে হাজারও মানুষের কথা- আমরা এই নষ্ট রাজনীতি চাই না! এই রাজনীতি অসুস্থ। এই রাজনীতি মানুষের মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। আমি খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্যেও উৎসাহিত হয়েছি। খালেদা জিয়ার বক্তব্য ছাপা হয়েছে এভাবে- ‘আমি বিস্মিত, হতবাক, ক্ষুব্ধ, বেদনাহত।’ যারা পেট্রল বোমায় আহত হয়ে বার্ন ইউনিটে পড়ে আছেন, চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের দুরবস্থার কথা ভেবে তিনি এই মন্তব্য করেছেন। খালেদা জিয়ার এ বক্তব্য গীতা সরকারদের কতটুকু আশ্বস্ত করতে পারবে আমি জানি না। তবে মনে করি, রাজনীতিকে সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনতে হলে এসব বোমাবাজকে চিহ্নিত করে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। আমরা এই জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চাই। আমরা ‘নষ্ট রাজনীতি’র কারণে আজ জিম্মি। হরতাল হচ্ছে। অবরোধ হচ্ছে। রেললাইন উপড়ে ফেলছে দুষ্কৃতকারীরা। আগুন লাগিয়ে হাজার কোটি টাকার তৈরি পোশাক কারখানা ধ্বংস করছে তারা। এটা তো কোনো সুস্থ রাজনীতির লক্ষণ হতে পারে না। যে প্রতিষ্ঠানটি রাষ্ট্রের জন্য বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলার অর্থ উপার্জন করে, যে প্রতিষ্ঠান ১৫ হাজার কর্মীর চাকরির সংস্থান করেছে, সেই প্রতিষ্ঠানটিতে আগুন দিয়ে ধ্বংস করার নাম আর যাই হোক রাজনীতি হতে পারে না। সংবিধানের ১৩নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, রাষ্ট্রের মালিকানা সাধারণ মানুষের ওপর অর্পিত। সেখানে গীতা সেনের মতো সাধারণ নাগরিকদেরই রাষ্ট্রে নিরাপত্তা নেই।
যারা পেট্রল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করেছে, তাদের ক’জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে জানি না। কিন্তু সংবাদপত্রে দেখেছি ‘কমান্ডো স্টাইলে’ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শাহবাগের বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর মালিবাগে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিএনপির শীর্ষস্থানীয় ১৫ জন নেতার নামে মামলা হয়েছে। তারা সবাই অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ‘হুকুমের আসামি’। এই নিবন্ধ যখন লিখছি, তখন একদিকে নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ অতিক্রান্ত হয়েছে, অন্যদিকে ১৮ দলের ডাকা লাগাতার অবরোধ চলছে। কিন্তু এরপর কী? আবারও কি অবরোধ আসছে? একটা ভালো নির্বাচনের জন্য দরকার সব দলের অংশগ্রহণ, বিশেষ করে তাতে প্রধান বিরোধী দলের অংশগ্রহণ জরুরি। দরকার স্থিতিশীলতা। দরকার পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা। কিন্তু সংবাদপত্রে যখন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের ছবিগুলো দেখি, তখন দেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। যেখানে বিরোধী দলের অংশগ্রহণটা জরুরি, সেখানে তাদের সবার নামেই মামলা! হয়তো আজ বা আগামীকাল আমরা দেখব আরেকটি ‘কমান্ডো স্টাইলে’ গ্রেফতারের কাহিনী! এতে করে কি আস্থার সম্পর্ক তৈরি হবে? এটা সত্য বিরোধী দল এই অবরোধ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে। কিন্তু আমাকে কি বিশ্বাস করতে হবে, এসব নেতা বাসে পেট্রল বোমা হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন! পত্রিকায় দু-একজন দুষ্কৃতকারীর ছবিও ছাপা হয়েছে, যারা বাসে হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে পারেনি কেন? এসব দুষ্কৃতকারীর সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এরা রাজনীতি করে না। এরা সন্ত্রাসী। যারা পেট্রল বোমা মেরে মানুষ মারে, সাধারণ মানুষদের পুড়িয়ে দেয়, অসহায় করে দেয় এক-একটি পরিবারকে, তারা তো জনগণের বন্ধু হতে পারে না। এরা জনগণের শত্র“। এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। তবে এটাও সত্য, হুকুমের আসামি হিসেবে যদি বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করা হয়, তাহলে আস্থার জায়গাটা আর থাকে না।
অবরোধের কারণে স্থবির হয়ে গেছে জনজীবন। প্রয়োজন ছাড়া মানুষ আজ আর ঘর থেকে বেরোতে সাহস পাচ্ছে না। এ পরিস্থিতি কোনো ভালো কথা বলে না। এমন পরিস্থিতিতে গুজব যে কত ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তার বড় প্রমাণ আমরা দেখলাম গাজীপুরে গত ২৯ নভেম্বর। পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নিহতের গুজব ছড়িয়ে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আগুন দেয়া হয় গাজীপুরের কোনাবাড়ীর জরুন এলাকায় অবস্থিত স্ট্যান্ডার্ড গ্র“পের পোশাক কারখানাগুলোতে। আগুন লাগার কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে ১ হাজার ২০২ কোটি টাকার সম্পদ। রোববার যুগান্তরের শেষের পাতায় ছাপা হয়েছে স্ট্যান্ডার্ড গ্র“পের মালিক প্রকৌশলী মোশাররফ হোসেনের কান্নার ছবি। এ ঘটনায় আমাদের কত বড় ক্ষতি হয়ে গেল, আমাদের রাজনীতিকরা তা কতটুকু বুঝতে পেরেছেন জানি না। কিন্তু বিশ্ব সম্প্রদায় যখন বাংলাদেশকে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে, তখন তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে একটা প্রশ্নের মাঝে ফেলে দেয় বৈকি!
এই ‘অসুস্থ রাজনীতি’ আমাদের একটি অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ৪ ডিসেম্বর ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের নয়া পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। ৬ ডিসেম্বর এসেছেন জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত তারানকো। এ নিয়ে তিনি একাধিকবার বাংলাদেশে এলেন। বোঝাই যায় বাংলাদেশের সহিংস ঘটনাবলীতে উদ্বিগ্ন বিশ্ব কমিউনিটি। এখন যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী দল যখন ‘সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন’ নিশ্চিত করতে পারছে না, তখন জাতিসংঘ কোনো বিশেষ উদ্যোগ নেবে কিনা? কিংবা তা উভয় পক্ষের মাঝে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা? প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ সংবিধান অনুমোদন করে কিনা? সংবিধানের সপ্তম ভাগে নির্বাচন কমিশন গঠন ও এর দায়িত্ব সম্পর্কে (১১৮-১২৬নং ধারা) বলা হয়েছে। সংবিধানের আওতায় জাতিসংঘকে এ ধরনের সুযোগ দেয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। দু’পক্ষ যদি রাজিও হয় তাহলে ‘সংবিধানের আওতায়’ কিভাবে জাতিসংঘকে অনুমতি দেয়া যায়, সে ব্যাপারে উচ্চ আদালতের মতামত নিতে হবে। তবে এটা সত্য, সংঘাত-গৃহযুদ্ধকবলিত দেশে জাতিসংঘ এ ধরনের ‘দায়িত্ব’ পালন করে থাকে। যেমন বলা যেতে পারে নেপাল, হাইতি, তিমুর, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, লাইবেরিয়া, কম্বোডিয়ার কথা। কম্বোডিয়ায় ১৯৯৩ সালে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, বাংলাদেশের সেনারা জাতিসংঘের অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের আওতায় সেই নির্বাচন পরিচালনা করেছিল। নেপালের কথা বলা হয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৭৪০নং রেজুলেশন অনুযায়ী সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি ‘সহায়তা গ্র“প’ গঠন করা হয়েছিল। এটা সত্য, জতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এসব দেশে নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে ওই সব দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কোনো মিল নেই। আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংকট রয়েছে, রয়েছে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতাও। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা একটা রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করাতে পেরেছি। একটা সংবিধান আছে। সংবিধানের ধারা-উপধারা নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, স্বাধীনতার পরপরই দেশ একটি সংবিধান পেয়েছে। কঙ্গো বা লাইবেরিয়ায় কোনো স্বীকৃত সংবিধান ছিল না। গৃহযুদ্ধ সেখানকার রাজনীতি নির্ধারণ করত। বাংলাদেশে এমনটি নেই। তবুও এটা আমাদের জন্য দুঃখজনক যে, জাতিসংঘের বিশেষ দূত ‘সমঝোতা’র জন্য এ দেশে এসেছেন। আমরা বারবার বলে আসছি, সমঝোতা হতে হবে প্রধান দুই শক্তির মধ্যে- একদিকে সরকার, অন্যদিকে বিরোধী দল। এখানে উভয় পক্ষকে কিছুটা ‘ছাড়’ দিতে হবে। ‘ছাড়’ না দিলে সমঝোতা হবে না। সুস্থ রাজনীতির স্বার্থেই একটা সমঝোতায় পৌঁছতে হবে। তবে ‘বিদেশীদের’ যত আমরা এড়াতে পারব, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। এজন্য দরকার রাজনৈতিক দূরদর্শিতার।
২ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময়সীমা পার হয়ে গেছে। এখন পুনঃতফসিলের সুযোগ আর আছে বলেও মনে হয় না। যদিও সিইসি বলেছেন, সেই সুযোগ আছে। কিন্তু আরপিও নিয়ে যাদের কিছুটা ধারণা আছে, তারা জানেন নতুন করে তফসিল ঘোষণার আর সুযোগ নেই। ২০০৭ সালে নবম জাতীয় সংসদের জন্য প্রস্তাবিত তফসিল বাতিল করা হয়েছিল বটে। কিন্তু তা করা হয়েছিল ‘জেনারেল ক্লজ অ্যাক্টে’র ধারাবলে। এখন এই মুহূর্তে এটা করা সম্ভব কিনা, সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে স্পষ্টতই একটা সমঝোতা দরকার। এক্ষেত্রে সংবিধান কোনো বাধা হবে না বলেও আমি মনে করি। আমাদের অভিজ্ঞতা আছে। সমঝোতার ক্ষেত্রে, ঐকমত্যের ক্ষেত্রে সংবিধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। সংবিধানের ১১তম সংশোধনী (বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের স্বপদে ফিরে যাওয়া) এর বড় প্রমাণ।
আজ সহিংসতা বন্ধে একটি সমঝোতা বড় প্রয়োজন। সরকার একটি নির্বাচন করে ফেলতে পারবে, এটা সত্য। কিন্তু ওই নির্বাচনই সব কথা নয়। নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা না থাকায় জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ অবস্থায় দেশের স্থিতিশীলতা, অর্থনীতি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এসব বিষয়ে সরকারকে ভাবতে হবে। সরকার এ জাতির অভিভাবক। আমরা চাই না আরেকজন গীতা সরকার বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করুক। এ ধরনের বিরূপ মন্তব্য অসাংবিধানিক শক্তিকেই উৎসাহ জোগাবে। সহিংসতা বন্ধ হোক। দুষ্কৃতকারীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হোক। একজন গীতা সরকারের আর্তি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এখনই।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম কোর্টই শেষ ভরসা

রাষ্ট্রপতি যে মুহূর্তে মনে করবেন সংলাপ ও সমঝোতার পথ রুদ্ধ, সেই মুহূর্ত থেকে তিনি একটি অসাধারণ প্রতিকারের কথা ভাবতে পারেন। এই বিশেষ ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির যে আছে তার একটা আলোচনা ও গ্রহণযোগ্যতা সমাজে এখনই সৃষ্টি হওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম কোর্টের কোনো ‘স্বৈরতান্ত্রিক’ পদক্ষেপ যে স্বীকৃত সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের বাইরের যেকোনো পদক্ষেপের চেয়ে উন্নত, সেটা আগে মানতে হবে। খালি দুই নেত্রীকে আলোচনা করতে বলবেন না। বরং এই আলোচনাটা মাথায় রাখুন। মনে রাখুন, বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন যেকোনো প্রথা বা রীতিকে বাংলাদেশের ‘আইনের’ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর কোনো গ্রন্থনা এযাবৎ হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদীয় রীতির তালিকাও হয়নি। তাই ইংল্যান্ড প্রবর্তিত সংসদীয় রীতি রেওয়াজকেই ‘আইন’ হিসেবে মানার অনুশীলন করতে হবে। ভারতের রাষ্ট্রপতিকে তাদের সংবিধান অতিরিক্ত ক্ষমতা দিয়েছে। তাই তারা যা পারে, আমাদের রাষ্ট্রপতি বা সুপ্রিম কোর্ট তা পারেন না—এই ঘরানার তাত্ত্বিকদের কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন আছে। অতীত সাক্ষ্য দেবে, আমরা যত সহজে অসাংবিধানিক কর্তৃপক্ষকে হালাল মনে করি, তত সহজে সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের কঠোর পদক্ষেপ মানতে পারি না। নিয়োগকর্তার একটা সহজাত অধিকার থাকে অপসারণের। এ মুহূর্তে তারানকোর সফর সফল না হলে হতাশা আরও বাড়বে। নেলসন ম্যান্ডেলার নীতি-আদর্শ এই রাষ্ট্র মানে না। কিন্তু এই মহানায়ককে শ্রদ্ধা জানাতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে আর রাষ্ট্রপতি ম্যান্ডেলার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দক্ষিণ আফ্রিকা যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে গেলে বিভিন্ন মহলে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে আদৌ আলোচনা হলো কি না তা বঙ্গভবন মুখপাত্র বলেননি। প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণে রাজা বা রানির ক্ষমতা সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বীকৃত।
১৮৩৪ সালে রাজা চতুর্থ উইলিয়াম লর্ড মেলবোর্নকে কার্যত বরখাস্ত করেছিলেন। যদিও প্রকাশ্যে তাঁকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছিলেন। জনগণ অবশ্য প্রধানমন্ত্রী মেলবোর্নের পক্ষেই ভোট দিয়েছিলেন। মেলবোর্ন তাই নতুন নির্বাচনে আরেক মেয়াদে দেশ শাসন করেন। সংসদীয় রেওয়াজ সম্পর্কে ব্রিটিশ সংবিধান বিশেষজ্ঞ কিথ লিখেছেন, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন থাকা পর্যন্ত কোনো প্রধানমন্ত্রীর অপসারণ রাষ্ট্রপতি করবেন না। বাংলাদেশে এটা অত্যন্ত সীমিত অর্থে নিতে হবে। কারণ, ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর পরাস্ত হওয়ার প্রশ্ন অবান্তর। তবে কিথের এই কথাটি মনে রাখতে হবে ‘ব্রিটেনে ১৭৮১ এবং ১৮০৭ সালে সর্বশেষ মন্ত্রিসভা অপসারণের প্রকৃত কিংবা কার্যত অপসারণের ঘটনা ঘটেছিল। ১৮৩২ সালের রিফর্ম অ্যাক্ট পাসের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সরানোর ক্ষমতা জনগণকে দেওয়া হয়। কিথ লক্ষণীয়ভাবে বলেছেন এবং যেটা বাংলাদেশের জন্য এখন প্রাসঙ্গিক সেটা কিথের ভাষাতেই বলি, ‘এটা বলা অসম্ভব যে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এ ধরনের (প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের) কর্তৃত্বের প্রয়োগ একেবারেই অপ্রয়োজনীয় বলে গণ্য হবে (ব্রিটিশ কেবিনেট সিস্টেম, ১৯৫২, পৃ-২৭৯)। এরপর প্রখ্যাত ভারতীয় সংবিধান বিশেষজ্ঞ দুর্গাদাস বসু যা লিখেছেন তাকে আমরা সংবিধান থেকে নির্বাচনী ব্যবস্থাসংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনীকে ছুড়ে ফেলার ঘটনার আলোকে বিচার করব। বিচারপতি বসু লিখেছেন, ‘কেবল যথেষ্ট ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই একটি মন্ত্রিসভার অপসারণ যথার্থতা পেতে পারে। যেমন মৌলিক পরিবর্তন ঘটিয়ে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কোনো একটি দলের পক্ষে নেওয়ার মতো অসাংবিধানিক কাজ করা।’ ইংরেজি ভাষ্যটি এ রকম: ‘Only most exceptional circumstances would justify the dismissal of a ministry. Such as unconstitutional conduct like...fundamental modifications of the electroral system in the interest of one party...’ (Commentary on the Constitution of India, Durga Das Basu. 8th edition. LexisNexis. Volume-4, 2008, Page 4668).
ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিলোপ করা যে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে গেছে, তা কি আর বিতর্কিত বিষয়? আমরা মনে রাখব যে, বসুর মৃত্যুর পরে ওই বইটি ২০০৮ সালে সম্পাদনা করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি ওয়াই ভি চন্দ্রচুদ। এ বইয়ে প্রধানমন্ত্রীকে সরানোর ঐতিহাসিক তথ্য আছে। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে বলা ছিল, গভর্নর তাঁর বিশেষ দায়িত্ব পালনে মন্ত্রিসভার পরামর্শ অনুযায়ী চলতে বাধ্য নন। গভর্নর যদি মনে করেন সরকার জনস্বার্থের হানি ঘটাচ্ছে, তাহলে সংসদের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও গভর্নর প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণ করতে পারতেন। দুর্গাদাস বসুর ওই বইয়ের ৪৬৭১ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে, সিন্ধের মুখ্যমন্ত্রী আলা বক্স অপসারিত হয়েছিলেন। বেঙ্গলের মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হককে ১৯৪৩ সালের ২৯ মার্চ পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। যদিও সংসদে সে সময় তাঁর প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। ১৯৪৪ সালের ২৬ এপ্রিল পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শওকত হায়াত খান অসদাচরণের জন্য অপসারিত হন। বসু আরও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন থেকে গভর্নরের বিশেষ দায়িত্বের বিধান তুলে নেওয়ার পরও ১৯৫৩ সালে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দিনকে অপসারণ করেছিলেন। যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তিনি তাঁর দেশের পর্বতপ্রমাণ সমস্যার সুরাহা দিতে পারেননি। বসু লিখেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই, নীতিনির্ধারণবিষয়ক কোনো প্রশ্নে এভাবে মুখ্যমন্ত্রীর অপসারণের ঘটনা বিরল। আমরা মনে রাখব, বাংলাদেশের মতো ভারতের সংবিধানেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী অপসারণের ক্ষমতা দেয়নি। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতি এলে? বসু এ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ইংল্যান্ডে যদিও রাজার দ্বারা প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার অপসারণের রীতি পরিত্যক্ত হয়েছে। কিন্তু এটা স্মরণ রাখতে হবে, কেবল সেই ক্ষমতা প্রয়োগ না করার কারণে [রাষ্ট্রপতির]
বিশেষ অধিকার কখনো হারিয়ে যায় না। রাজারা ইংল্যান্ডের বাইরে তাঁদের ব্রিটিশ ভূখণ্ডগুলোয় এই ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন। কিংবা তাঁদের প্রাচীন উপনিবেশগুলো সংসদীয় পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। এবং তারা তাদের সাংবিধানিক প্রধান করেছে রাষ্ট্রপতিকে। তাই অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ভারতীয় সংবিধানের অন্তর্গত বিধিব্যবস্থাকে অনুধাবন করা সমীচীন ও লাভজনক হবে।’ এ কথা আমাদের জন্য হুবহু প্রযোজ্য। ব্রিটিশ ও ভারতের অভিজ্ঞতা স্মরণ রাখা এই মুহূর্তে আমাদের জন্য লাভজনক ও পথের দিশা পেতে সহায়ক। বসু লিখেছেন, ‘যে মন্ত্রিসভা এখন পর্যন্ত সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থা নির্ভর রয়েছে, তাকে অপসারণ করা সাধারণভাবে অসাংবিধানিক বা অযথাযথ।’ আমরাও সাধারণভাবে এটাই মানি ও মানব। গোলাম মোহাম্মদ তৈরি করতে আমরা কেন চাইব? যারা এটা নিয়ে চিৎকার জুড়বেন তাদের বলব, অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ হয় না। ৪৬৭২ পৃষ্ঠায় বসু যা লিখেছেন তাতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের দুই মেয়াদের রায় ও ৯০ দিনের পরে নির্বাচন করা-সংক্রান্ত বিচারপতি আবদুর রশীদের রায় মনে করিয়ে দেয়। এবং সেটা যে কোনো প্রধানমন্ত্রীকে প্রয়োজনে সরানোর সাংবিধানিক ভিত্তি দেয়। বসু লিখেছেন, ‘But even under this situation according to some scholars, the Crown might be justified in dismissing a Prime Minister, commanding a majority in the Legislature, if he seeks to subvert the democratic basis of the Constitution.
(এই পরিস্থিতি সত্ত্বেও কতিপয় সাংবিধানিক পণ্ডিতের মতে, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্থাভাজন কোনো প্রধানমন্ত্রীকেও অপসারণে রাজার ক্ষমতা গ্রহণযোগ্যতা পেতে পারে। যদি সেই প্রধানমন্ত্রী সংবিধানের গণতান্ত্রিক ভিত্তি সম্পর্কে জনগণের মনে যে প্রত্যয়, তা তিনি উৎখাত বা পরাহত করতে চান।) সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন যে গণতন্ত্রের ভিত্তি তা সন্দেহাতীত। আমরা মনে রাখব, যদিও দুই শতাব্দী ধরে ব্রিটেনে রাজার ওই ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটেনি কিন্তু বসু যে কতিপয় পণ্ডিতের কথা বলেছেন তাঁর মধ্যে আছেন দ্য স্মিথ ও হালসবারি। উভয়ে মস্ত বড় পণ্ডিত ও সংবিধানবিশারদ হিসেবে সমগ্র সংসদীয় দুনিয়ার উচ্চ আদালতগুলোয় সমাদৃত। আমি বিএনপি-জামায়াতের নাশকতা ও লাশ বানানোর আন্দোলনের তীব্র নিন্দা করি। এটা বিচারযোগ্য মনে করি। তারা ক্ষমতায় গেলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে বলে বিশ্বাস করি না। অথচ এটা হতেই হবে। এই বিচার এবং আরও অনেক মূল্যবোধের জন্য আওয়ামী লীগকে সমর্থন ও পছন্দ করি। কিন্তু সেটা দুই দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত না করার বিনিময়ে হতে পারে না। কারণ তা টিকবে না। আর রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগের ওই কণ্টকিত পথ বাতলে দিলাম এ জন্য যে, সংবিধান অনুযায়ী সংকট উতরানোর এটাও একটা উপায়। একটা বিকল্প। যেকোনো মূল্যে সংবিধান টিকে থাক। সুপ্রিম কোর্ট এই রূঢ় বাস্তবতা অস্বীকার করতে পারেন না। সংবিধান রক্ষার শপথ মানে মামলাসূত্রে সংবিধান ব্যাখ্যা করা বোঝায় না। সামরিক ফরমানকে তাঁরা যখন বৈধতা দেন, তখন তাঁরা আসলে রাজনীতিই করেন। সুপ্রিম কোর্ট রাজনীতি থেকে পালাতে চান। 
আসলে পারেন না। করেনও না। করেন প্রধানত শাসকের শর্তে। মানুষের শর্তের বেলায় নানা ওজর। বিচারককে স্যালুট না ঠুকলে কী হয়? সবাই জানে। শত শত নিরীহ প্রাণ ঝরলে কী হয়? আদালতের অবমাননা হয় না। এই লেখাটিতে তর্কের খাতিরে ধরে নিই সংলাপ-সমঝোতায় সুরাহা হবে না। ম্যান্ডেলা আফ্রিকান ট্রেডমার্ক শার্ট পরতেন। বিশপ বলেছিলেন, ‘মি. প্রেসিডেন্ট, আপনার সবই ভালো। কেবল এই শার্ট ছাড়া।’ ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘আসুন, আমরা একমত হই যে, যা সুরাহাযোগ্য নয়, তা নিয়ে আলোচনা না করা।’ আমরাও বুঝি, সুরাহা-অযোগ্য বিষয় নিয়ে দুই দলের সংলাপে লাভ কী। কিন্তু সুরাহা একটা লাগবেই। কারা করবেন? বিশ্বজুড়েই সুপ্রিম কোর্টের রাজনৈতিক ভূমিকা অনস্বীকার্য। অরাজনৈতিক সুপ্রিম কোর্টের একটি রাজনৈতিক ভূমিকা সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে অস্বীকৃত নয়। তাই হাতিয়ার হলো দুটি বেসামরিক ক্ষমতার সমন্বিত প্রয়োগ। সুপ্রিম কোর্ট দুই মেয়াদ বাতলে সর্বাগ্রে একটি দূরদর্শী রাজনৈতিক নির্দেশনা দিয়েছেন। সেটা মেনে রাষ্ট্রপতি দরকার হলে প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে আহ্বান জানাবেন। নাগরিকদের যে কেউ প্রশ্নটিকে এখনই সুপ্রিম কোর্টের সামনে নিতে পারেন। এর আগে প্রধান বিচারপতির ব্যর্থতায় এক-এগারো এসেছিল। এবার সুপ্রিম কোর্ট সুয়োমটো পার্টি হয়েছেন। এখন তাঁকে পতাকা বইতে হবে। যথাপ্রক্রিয়া নিয়ে মাননীয় বিচারকেরাও নিজেদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক সলাপরামর্শ শুরু করতে পারেন। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

স্যালুট আপনাকে কিংবদন্তি

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী
আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা
অনলাইনে প্রথম আলো (prothom-alo.com) নিয়মিত পড়া হয় ১৯০টি দেশ থেকে। পড়ার পাশাপাশি পাঠকেরা প্রতিদিন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, খেলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত দেন। তাঁদের এ মতামত চিন্তার খোরাক জোগায় অন্যদের। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠকদের কিছু মন্তব্য ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
বিদায় ম্যান্ডেলা

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুর খবরে আহসান হাবিব তাঁর অনুভূতি জানিয়েছেন: স্যালুট আপনাকে হে কিংবদন্তি। আপনার মতো নেতার কিছুটা ছিটেফোঁটা আমাদের নেতারা পেলে আমরা হয়তো খুন, ধ্বংস ও স্বৈরাচারী অবস্থা থেকে মুক্তি পেতাম। সালাম: এসব নেতা যুগে যুগে একবারই আসেন। এঁরা নিজের জন্য আসেন না, নিজেকে বিলিয়ে দিতে আসেন। আমাদের নেতাদের মতো ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ি করেন না। শুভ বিদায় নেলসন ম্যান্ডেলা। হূদয়: স্যালুট অবিসংবাদিত নেতা। আপনার মতো নেতা আমাদের খুব প্রয়োজন। বিশ্ব এমন এক নেতাকে হারাল, যাঁর অভাব কখনো পূরণ হওয়ার নয়। সাজেদ সোহেল: সব সময় বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকবে এই মহান মানুষটির প্রতি। কালো মানুষদের কণ্ঠস্বর, নির্যাতিত মানুষের প্রতিচ্ছবি এই মাদিবা। বিশ্ব মুক্ত হোক বর্ণপ্রথা থেকে। শান্তা: কিছু মানুষ আমাদের জন্য পথ তৈরি করে দেন, আর আমরা সে পথে চলি। ম্যান্ডেলা মানবমুক্তির পথের অন্যতম স্রষ্টা। বিনম্র শ্রদ্ধা থাকল এই মহান প্রাণের জন্য। আবুল হাসনাত: এ পৃথিবী থেকে চলে গেলেন আরেক মহামানব। আমাদের এ দুর্ভাগা দেশে যদি তাঁর মতো একজন রাজনীতিবিদ থাকত, তবে দেশবাসীকে জ্বলেপুড়ে মরতে হতো না। কবে আমাদের দেশে এমন তর্কাতীত নেতারা আসবেন, যাঁকে নিয়ে আমরা গর্ব করব?
এবার তফসিল ১০ দিন পেছানোর শর্ত এরশাদের
কয়েক দিন ধরে নির্বাচন বর্জন ও ‘সর্বদলীয়’ সরকার থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ অবশেষে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নতুন শর্ত দিয়েছেন। এ খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাচ্চু লিখেছেন: সময়ের বিবর্তনে ও দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বৈরশাসক এরশাদের জাতীয় পার্টি এখন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতার লড়াইয়ে তুরুপের তাসে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই রাজনৈতিক দলই এরশাদকে নিয়ে ভোটের হিসাবনিকাশ কষে ব্যস্ত সময় পার করছে। দুই দলের আদর্শহীন রাজনীতির কারণে এরশাদ আজ এমন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসতে পেরেছেন। বিশ্বে আর কোনো স্বৈরশাসকের ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি। শফিক: এইচ এম এরশাদ যত কথা কম বলবেন, তত ভালো। জামিউল হাসান: এরশাদ হলো বাংলাদেশে নষ্ট রাজনীতির জনক। মোহসিন চৌধুরী: এরশাদের নাটক কখনো শেষ হবে না? তবে সে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চের নায়ক থেকে অচিরে খলনায়কে পরিণত হবে। রওনক: আওয়ামী লীগ এরশাদকে নির্বাচনে নেওয়ার জন্য যতখানি উদগ্রীব, ততটা যদি বিএনপির ক্ষেত্রে দেখাত, তবে সবাই স্বাগত জানাত এবং খুশি হতো।
এরশাদ ‘ছুটে গেলে’ জরুরি অবস্থা?
বিশেষ প্রতিবেদনে সাংবাদিক শরিফুজ্জামান দেশে জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। এতে মতামত জানিয়ে আকাশ ঘোষ লিখেছেন: নির্বিচারে মানুষ হত্যা বন্ধে জরুরি অবস্থা জারিই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। এফ রহমান: ক্ষমতা ধরে রাখতে আওয়ামী সরকারকে যদি সেনাবাহিনীর কাঁধে চাপতে হয়, তবে দলটি কীভাবে পাকিস্তানি সেনাশাসকদের ক্ষমতা দখলের নির্লজ্জ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করবে? মীর মোহাম্মদ মোফাজ্জাল হোসেন: সেনা মোতায়েন করতে যত দেরি হবে, ভাঙচুর ও হত্যা তত বাড়বে। একবার ঠিকমতো পিটুনি দিতে পারলে বিএনপি-জামায়াত কোথায় পালাবে, খুঁজে পাওয়া যাবে না। সরকার কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছে না বলে সবাই দেশটিকে মগের মুল্লুক বলে মনে করছে। জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। যারা জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তারা দুষ্কৃতকারী। তাদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে। মোহাম্মদ নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর: এরশাদ ছুটে না গেলেও লাভ হবে না। কারণ, সরকারের নির্বাচনী ফন্দি জনগণ বুঝে গেছে। ভারত থেকে লোক নিয়ে এসে তদবির করানোর কাজটিও জনগণ ভালোভাবে নেয়নি।
শনিবার থেকে আবার ৭২ ঘণ্টার অবরোধ
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের নতুন দফা অবরোধের খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মোহাম্মদ শামিম হোসেন লিখেছেন: নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করাটাই একমাত্র দাবি হতে পারে না। পাঁচ বছর পর পর তথাকথিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা একদল দুর্বৃত্তের হাত থেকে আরেক দল দুর্বৃত্তের কাছে হস্তান্তরের একটা প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু তা ছাড়াও নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বা সমস্যার মীমাংসা হওয়া দরকার। যদি তা না হয়, তবে মানুষের ক্রোধ চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেবে। শাহেদ মাহবুব: দেশটা আপনাদের (খালেদা-হাসিনার) পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে যা খুশি করবেন। আমাদের রুটিরুজি হরণের অধিকার আপনাদের কেউ দেয়নি। মো. শিহাব উদ্দিন: যাদের প্রতি আপনাদের (১৮-দল) বিদ্বেষ, পারলে তাদের মারেন। আমাদের মারেন কেন? সালোক: এত কথা না বাড়িয়ে সরাসরি বলুন, আপনাদের (১৮-দল) দাবি না মানলে আরও মানুষকে আপনারা মারবেন। সারা জীবন তো বলে গেলেন জনগণ অমুক চায়, তমুক চায়। আসলে জনগণ কী চায়, তা আপনাদের জানা নেই। সরকারকে ভয় দেখাতে সাধারণ মানুষ হত্যা না করে মানুষকে ভালোবাসুন। মো. সাজির আলী: এভাবে অবরোধ-হরতাল দিতে থাকলে আমাদের জনগণের কী হবে, দেশটার কী হবে, কেউ ভেবেছেন একবার?

জেনারেলের মন by জাহিদ হায়দার

মানুষের মন ব্যাখ্যাতীত। পৃথিবীর সাত শ কোটি মানুষের মন সাত শ কাটি রকমের। ‘আমার মনের সঙ্গে তোমার মনের অনেক মিল’, এই কথা বলে যাঁরা যুগল হয়ে যান, দেখা গেছে, একদিন তাঁদের মনে অনেক বেশি অমিল। মন চড়ে বেড়ায় ঝোড়ো মেঘের পিঠে। মন কখন চরিত্রের আচরণ বদলে দেবে, মনের বাহক তার সময়-ক্ষণ সব সময় বলতে পারেন না। অনেক বছর আগে ঢাকার এক দেয়ালে পড়েছিলাম: ‘এরশাদের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র’। আমরা দেখেছিলাম, ওই দেয়াললিখন পড়ে মানুষ মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে, চোখে সন্দেহবাচক প্রশ্ন তুলে হাসত। কী কারণে হাসত আমি জানি না। জেনারেলকে তাঁর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যে ‘ক্যারেকটার সার্টিফিকেট’ দিয়েছিলেন, তাতে কি ‘ফুল’ শব্দটি ছিল? এই প্রয়োজনীয় তথ্যও আমার অজানা। কেউ কর্নেলকে চিঠি লেখে না গার্সিয়া মার্কেজের একটি বই। জেনারেলেকে জানতে লিখেছিলেন গ্রাহাম গ্রিন। পরিসরের অভাবে এই লেখায় আমি বিখ্যাত বই দুটির বিষয়-কথা বলব না। এই লেখার শিরোনাম পড়ে পাঠক ভাবতে পারেন, একজন জেনারেলের মন বোঝা বা বিশ্লেষণ করা বেসামরিক নাগরিকের পক্ষে কি সম্ভব? কারও মন বুঝতে মনোবিজ্ঞানীরা ব্যক্তির সমগ্র জীবনপর্বের সব কথা শুনতে চান, বুঝতে চান।
এরশাদের শৈশব-কৈশোরের এবং সৈনিক জীবন শুরুর পর্ব-অধ্যায় আমি কতটুকু জানি? বেসামরিক জনগণ জেনারেলদের মনমানসিকতার সব ‘কুচকাওয়াজে’র গভীর অর্থও বোঝে না। রাস্তায় ট্যাঙ্ক নেমে এলে বুঝতে চেষ্টা করে, জেনারেল তাঁর কাঁধের উজ্জ্বল সোনালি তলোয়ার গণতন্ত্রের কথা বলে কত দিন ঘোরাবেন পাবলিকের মাথার ওপর। এরশাদ ক্যাপ্টেন, মেজর, কর্নেল ইত্যাদি পদ সাফল্যের সঙ্গে পার করে একদিন হয়েছিলেন জেনারেল এবং এই দেশের রাষ্ট্রপতি। একসময় কবিতা লিখতেন (কবি মোহাম্মদ রফিক জেনারেলের কবি হওয়া পছন্দ করেননি, লিখেছিলেন: সব শালা কবি হতে চায়)। এরশাদের কার্যকলাপ ও মন এক পাল্লায় এবং এই দেশের অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানের মন ও কার্যকলাপ আরেক পাল্লায় রাখলে দেখা যাবে, মাপ হবে সঠিক। (এই বাক্যে ‘কলাপ’ শব্দটি বড় ব্যঞ্জনা ধরে, ‘শতবরণের ভাব-উচ্ছ্বাস কলাপের মতো করেছ বিকাশ’—কবি রবীন্দ্রনাথ ময়ূরপুচ্ছ অর্থে লিখেছেন। আমাদের জেনারেলের মন কখন মেঘের উড়ালে, ডান-বাঁয়ে ছাতা ধরার স্বভাবে ভাব-উচ্ছ্বাসে নেচে ওঠে, ধরে শতবরণ, সে কথা তিনিও ভালোমতো জানেন না। বলেছেন: ‘সকালে বলি এক কথা, বিকেলে আর এক কথা।’ কী জেনুইন পোয়েট!)
লর্ড ক্লাইভ নামে একটি বই লিখেছিলেন লর্ড মেকলে। লেখক তাঁর বইয়ে বাঙালির চরিত্র ও আচার-আচরণ সম্পর্কে ভালো মন্তব্য করেননি। ‘মিথ্যাবাদী’, ‘ঠগ’, ‘প্রতারক’, ‘পরশ্রীকাতর’, ‘সুবিধাবাদী’, ‘ভণ্ড’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে বাঙালি কী জিনিস মেকলে বলেছিলেন। মেকলেরাও ভালো ছিলেন না। মেকলের বলা বাঙালির মধ্যে সনাতন ধর্মের বাঙালিও ছিল। আমাদের জেনারেল স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। কে না ভালোবাসে স্বপ্ন দেখতে! বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তিনি স্বপ্ন দেখতেন শুক্রবার কোন মসজিদে নামাজ পড়বেন (অনেক দিন তিনি স্বপ্ন দেখে আর নামাজ পড়তে যান না। তিনি দামি পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে এবং অনুমান করি সুগন্ধি আতর মেখে জুমা শুরু হওয়ার বেশ আগেই চলে যেতেন স্বপ্নে দেখা মসজিদে। কী ধর্মপ্রাণ মানুষ! কেউ কেউ জেনারেলের স্বপ্ন-বয়ান বিশ্বাসও করতেন। এদের মধ্যে আনোয়ার জাহিদের থাকার কথা। তিনি বলেছিলেন, জেনারেল যদি তাঁকে রাস্তায় ঝাড়ু দিতে বলেন, তিনি দেবেন।
তিনি বড় সাংবাদিক ছিলেন। জেনারেল একজন বাঙালি মুসলমান, তাঁর মনের মধ্যে আসলেই কি নির্দিষ্ট মসজিদে নামাজ পড়া নিয়ে লর্ড মেকলে বর্ণিত ‘ভণ্ডামি’ ছিল? কদিন আগে দেখলাম, ‘নারীরা তেঁতুল’—এই তত্ত্বের জনক শফী হুজুরের কাছে জেনারেল গেছেন। হেফাজতের সমাবেশকে তিনি সমর্থন করেন। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেছিলেন এই জেনারেল। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এরশাদকে দুর্নীতির কারণে জেলে পুরেছিলেন। বাংলাদেশ একসময় পাঁচবার দুর্নীতিতে ১ নম্বরও হয়েছিল; এখনো আমরা দুর্নীতি করতে বড় পারদর্শী। বিভিন্ন দেশ লুণ্ঠন করে বিশ্ববীরের খ্যাতি পেয়েছিলেন আলেকজান্ডার। তিনি এই উপমহাদেশে এসে তাঁর লুণ্ঠনসঙ্গী সেলুকাসকে বলেছিলেন: ‘কী বিচিত্র এই দেশ, সেলুকাস!’ আমার ধারণা, আলেকজান্ডার উপমহাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য দেখে ওই মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর কথাকে এখন ব্যবহার করা হয় আমাদের আচার-আচরণের বহুবিধ অসংগতির ধারা মিলিয়ে। জেনারেলকে কোন বিশেষণে রাখব? আমার সঙ্গে অনেকে একমত হতে পারেন, না-ও পারেন; আমাদের জেনারেল শৈশবেই ভালো ডিগবাজি দেওয়া শিখেছিলেন। সেদিন আফ্রিকান এক ফুটবল খেলোয়াড়কে দেখলাম, গোল করে দু-তিনটি ডিগবাজি দিলেন।
তাঁর সহখেলোয়াড়েরা তাঁকে জড়িয়ে ধরার জন্য করছিলেন ছোটাছুটি। আমাদের দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা এরশাদের ডিগবাজি বড় ভালোবাসেন, কখন কোন দলের পক্ষে ও বিপক্ষে গোল করবেন এবং ডিগবাজি দেবেন সে বিষয়ে তিনি এবং তাঁকে দলে নেওয়া লোকজনও জানেন না। এরশাদকে নিজেদের অপসুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় করে তুলেছে আমাদের দুই বড় রাজনৈতিক দল। দুই দলের নেতারা জেনারেলের সঙ্গ পেতে কত কিছু করেন! জেনারেলের সৈনিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন, কবিপ্রেমিক মন, ধর্মীয় মন, ডিগবাজির কসরত এবং বাঙালির মন ও কর্ম সম্পর্কে মেকলে বর্ণিত কথামালা—এ সবকিছু পাওয়া যাবে এই দেশের অনেক বাঙালির মধ্যে। এই জেনারেল আমাদের সব কর্ম-অপকর্মের সমষ্টি। জেনারেলকে যখনই দেখি, মনে হয় ভদ্রলোক আমাদের জাতির সার্থক প্রতিনিধি। তাঁকে অনুরোধ, তিনি যেন আত্মহত্যা না করেন। তাঁর কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের যদি আরও কিছু শিক্ষা হয়, শিক্ষা মানুষকে সৎ করে, সুন্দর করে, তা হলে জেনারেলকে আগামী দিনের বাঙালিরা সূত্র (রেফারেন্স) হিসেবে ব্যবহার করবেন এবং বলবেন, জেনারেল এরশাদের জীবনকর্ম থেকে যা কিছু শিখেছ, তা করো না!
জাহিদ হায়দার: কবি, উন্নয়নকর্মী।