Friday, March 13, 2015

‘পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেই সঙ্কটের অবসান হবে’ -খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
প্রিয় সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা,
আসসালামু আলাইকুম।

মহান স্বাধীনতার মাসে শুরুতেই আমি স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গকারী বীর শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত করেছিলেন, সেই শহীদ জিয়াউর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাপ্রিয় দেশবাসীর প্রতি জানাচ্ছি মোবারকবাদ। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠকদের স্মরণ করছি পরম শ্রদ্ধায়। একটি শান্তিময়, সুখী-সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক স্বদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশের বীর সন্তানেরা জীবন দিয়েছিলেন। অপরিমেয় ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সেই দেশ আজ গভীর সংকটে। এ সংকট রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক। আর এ সংকটের ¯্রষ্টা আওয়ামী লীগ এবং আরো সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে শেখ হাসিনা। জনগণের সম্মতি ছাড়া কারসাজির মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়ে সেই ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার উদগ্র বাসনা আজ সমগ্র জাতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
অনেক বিবাদ-বিসম্বাদের পর বাংলাদেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল এই মর্মে একমত হয়েছিল যে, কোনো দলীয় সরকারের অধীনে এখানে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
তারই আলোকে জাতীয় সংসদে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান আমরা প্রজাতন্ত্রের সংবিধানে অন্তর্ভূক্ত করেছিলাম। এই ব্যবস্থার অধীনে কয়েকটি নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
‘ট্রায়াল এন্ড এরর’-এর মধ্য দিয়ে যে-কোনো পদ্ধতিই সংশোধিত ও পরিশোধিত হতে পারে।
প্রয়োগের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় পরিলক্ষিত ত্রুটি-বিচ্যুতিও ঐক্যমতের ভিত্তিতেই সংশোধনের সুযোগ ছিল এবং উচিত ছিল সেটাই করা । আওয়ামী লীগ তা না করে একতরফা সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। তারা দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিধান করে। এ লক্ষ্যে তারা সংবিধানের যে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছে তাতে শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও স্বাভাবিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সব পথই প্রায় রুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের কোনো সুযোগই রাখা হয়নি। সংকটের মূল উৎস সেখানেই।
এই মহাবিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনীর আওতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নামে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এক নির্লজ্জ প্রহসনের মধ্য দিয়ে তারা গণতন্ত্রের নাম-নিশানাও মুছে দিয়েছে। এই প্রহসনের অংশ হিসাবে অপকৌশলের মাধ্যমে তারা ভোট ছাড়াই সংসদের ১শ’ ৫৩টি অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করে। এই ঘৃণ্য কারসাজির মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্বহীন একটি অবৈধ ও স্বেচ্ছাচারী সরকার জগদ্দল পাথরের মতো জাতির কাঁধে চেপে বসেছে। জবাবদিহিতাহীন এ সরকারের দেশ পরিচালনার কোনো নৈতিক অধিকার, ভিত্তি ও এখতিয়ার নেই।
মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে এমন ন্যক্কারজনক জালিয়াতি করার পর গণতন্ত্র কিংবা জনগণের অধিকার নিয়ে কথা বলার কোনো নৈতিক অধিকারও তাদের নেই।
সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা সকলেই জানেন, ঐ মহাকারসাজির নির্বাচনী প্রহসনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে এটি একটি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। শেখ হাসিনা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে একটা সমঝোতা হলে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচনের অঙ্গীকারও করেছিলেন। কিন্তু যথারীতি তিনি তার সেই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন। আসলে প্রতিশ্রুতি রক্ষার কোনো দৃষ্টান্ত তাদের নেই।
১৯৮৬ সালে প্রতিশ্রুতি লংঘণ করে স্বৈরাচারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারা আত্মস্বীকৃত জাতীয় বেঈমানে পরিণত হয়েছিলেন। ৫৭ বছর বয়সে রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার অঙ্গীকারও অবলীলায় ভঙ্গ করতে দেশবাসী দেখেছে। এ রকম আরো বহু উদাহরণ রয়েছে।
তবুও তাদের প্রতিশ্রুতির কারণে ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর পর আন্দোলনের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার কথা বিশ্বাস করে আমাদের সেই সিদ্ধান্ত নেয়া যে সঠিক ছিলনা তা আমরা অচিরেই বুঝতে পারি। কারণ, আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করার পর সারা দেশে যৌথবাহিনীর অভিযানের নামে তারা এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।
বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম, খুন, অপহরণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। বিরোধী দলমতের শত শত নেতা-কর্মীকে হত্যা ও গুম করা হয়। তাদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের ওপরেও নির্যাতন চালানো হয়। রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত পল্লী পর্যন্ত চলতে থাকে এই হত্যা ও উৎপীড়নের তান্ডব। রাজনীতি করার স্বাভাবিক অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়া হয়। এত কিছু সত্ত্বেও আমরা দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষা করেছি। বারবার আলোচনার আহ্বান জানিয়েছি। কারণ আমরা সমঝোতা ও শান্তিতে বিশ্বাসী।
অতীতেও আমরা সব সময়েই রাজনীতিতে সহিষ্ণুতা,সংযম, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সমঝোতার জন্য সব সময় এগিয়ে গিয়েছি। কিন্তু তারা বরাবরই সংঘাত ও সংঘর্ষের পথ বেছে নিয়েছে। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের পর ১৯৯১ সালে জনগণের ভোটে আমরা নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব নিলে তারা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, এক দিনও শান্তিতে থাকতে দেবো না। তারপর তারা কেমন সহিংস পন্থায় তাদের সেই ঘোষণা কার্যকর করেছে তা দেশবাসী দেখেছেন।
এবারেও তারা অস্ত্রের ভাষায় আমাদেরকে দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। সচেতন ও বিবেকবান কোনো নাগরিক সমঝোতার কথা বললেই তারা তাকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করেছে।
আমরা আলোচনার ভিত্তি হিসাবে সাত দফা প্রস্তাব তুলে ধরি। তারা সঙ্গে সঙ্গে তা নাকচ করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে সংকট নিরসন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ভোটাধিকারসহ জনগণের সকল অধিকার ফিরিয়ে আনতে আন্দোলন ছাড়া আর কোনো পথ আমাদের সামনে খোলা রাখা হয়নি। তাই আমরা বাধ্য হয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি দিয়েছি।
আপনারা জানেন, গত ৫ জানুয়ারি প্রহসনের নির্বাচনের বর্ষপূর্ত্তির দিনটিকে আমরা গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে পালনের কর্মসূচি দিয়েছিলাম। ঢাকায় আমাদের সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি ছিল। সেই কর্মসূচি বানচালের উদ্দেশ্যে ক্ষমতাসীনেরা ৩ জানুয়ারি থেকে অঘোষিত ভাবে দেশ অবরুদ্ধ করে ফেলে।
সড়ক ও নৌপথে সব যানবাহন চলাচল বন্ধ করে রাজধানীকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়।
আমাদের কর্মসূচির আগের রাতেই আমাকে এই কার্যালয়ে বালু ও ইট বোঝাই ট্রাক, জলকামান ও সাঁজোয়া যান দিয়ে ঘিরে অবরুদ্ধ করা হয়। পুলিশ বাইরে থেকে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়। ৫ জানুয়ারি বিকেলে আমি সমাবেশে যোগদানের উদ্দেশে বেরুতে চাইলে বাধা দেয়া হয়। আমিসহ ভেতরে অবস্থানরত সকলের ওপর বাইরে থেকে দফায় দফায় বিষাক্ত পিপার স্প্রে ছোঁড়া হয়। প্রাণহানির আশংকা থাকায় মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই পিপার স্প্রে ব্যবহার আমাদের দেশেও উচ্চ আদালত নিষিদ্ধ করেছেন। সেই পিপার স্প্রে প্রয়োগের কারণে আমি এবং সাংবাদিকসহ অনেকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এর আগে গাজীপুরেও আমার জনসভা ১৪৪ ধারা জারি করে বন্ধ করা হয়। আমি আদালতে হাজিরা দিতে গেলে আমার গাড়ি বহরে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সশস্ত্র হামলা করে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাদের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সহ অনেককে গ্রেফতার করা হয়।
এভাবে বিরোধী রাজনীতি ও ভিন্নমতকে এরা দমন করে দেশে কার্যত একদলীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করে ফেলেছে। সংবাদ-মাধ্যমকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রচারযন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। মানুষের সব অধিকার তারা কেড়ে নিয়েছে।
এর বিরুদ্ধে লড়াই না করলে আমাদের স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে। তাই আমরা আন্দোলনের ডাক দিয়েছি। জনগণের সেই গণতান্ত্রিক আন্দোলন এখন চলছে। শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ স্বাভাবিক করতে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বরং একের পর এক উস্কানিমূলক আচরণ করে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটানো হচ্ছে। কাজেই যৌক্তিক পরিণতিতে না পৌঁছা পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
আন্দোলনে দেশবাসী ও নেতা-কর্মীর কষ্ট ও ক্ষয়ক্ষতির কথা আমরা জানি ও বুঝি। এ সম্পর্কে সকলেই সচেতন। কেবল ক্ষমতাসীনদের কোনো বোধোদয় নেই। জনগণের দুদৃশা লাঘবের চেয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকাই তাদের কাছে বড়।
সাহসিকতার সঙ্গে সবাই অংশগ্রহণ করলে এ আন্দোলন অচিরেই সফল হবে ইনশাআল্লাহ্। এই সাময়িক কষ্ট জাতির বৃহত্তর স্বার্থে স্বীকার করার জন্য আমি সকলের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।
সংবাদ-মাধ্যমের প্রিয় সদস্যবৃন্দ,
অবৈধ স্বৈরাচারী শাসকেরা হত্যা ও উৎপীড়ন চালিয়ে বহু মায়ের কোল খালি করে চলেছে। প্রতিটি জনপদে আজ স্বজনহারা মানুষের কান্নার রোল। এই কান্না অত্যাচারীদের কানে পৌঁছায় না। কে কখন গুম, খুন ও ক্রসফায়ারের শিকার হবে তা নিয়ে সকলে আতঙ্কিত। শত শত তরুণকে আটক করে গুলি ও নির্যাতনে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যেও সারা দেশে যারা আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন আমি তাদেরকে সাধুবাদ দেই।
গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে সকল শ্রেণীর জনগণ, দল-জোটের নেতা-কর্মী, শুভানুধ্যায়ী, সমর্থক ও সাংবাদিক বন্ধুরাসহ সবাই যে নির্যাতন, জেল-জুলুম ও দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন তার জন্য প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানাই। যারা নিহত, আহত ও গুম হয়েছেন বেদনাহত চিত্তে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সমাবেদনা জানাই। আল্লাহ্র রহমতে দিন পরিবর্তন হলে আমরা অবশ্যই আপনাদের পাশে দাঁড়াবো।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের যে সব বন্ধুরাষ্ট্র এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন এবং গণমাধ্যম ও সিভিল সমাজের সদস্যবৃন্দ উদ্বেগ প্রকাশ করে সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলেছেন আমি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক মানুষ জীবন দিয়েছে, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে। উন্নত কিংবা অনুন্নত কোনো দেশেই গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই এবং সংগ্রামী মানুষের আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায়নি। বাংলাদেশেও তা বৃথা যাবেনা ইনশাআল্লাহ্।
বিএনপি হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, গণতন্ত্রিক রাজনীতিতে হত্যা ও সন্ত্রাসের কোনো স্থান নেই। তারপরও আমরা লক্ষ্য করেছি যে, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের বর্তমান আন্দোলন চলাকালে সরকার বিভিন্ন হিংসাত্মক পন্থার আশ্রয় নিয়েছে। সরকারের এই দমন-পীড়ন জাতীয় ঐক্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মনে করি যে, বিরাজমান সমস্যা সমাধানে:
ক.     জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে সারাদেশে যে সব নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার     করা হয়েছে তাদেরকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
    গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ করতে হবে। পুলিশী ও যৌথবাহিনীর হয়রানি বন্ধ করতে     হবে এবং নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে     হবে। বিচার বহির্ভূত প্রতিটি হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি     দিতে হবে।
খ.     সভা-সমাবেশ-মিছিলসহ রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর আরোপিত সকল প্রকার বিধিনিষেধ অবিলম্বে     প্রত্যাহার করতে হবে।
গ.     সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণে অনতিবিলম্বে জাতীয় সংসদের     অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সুনির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সংলাপের আয়োজন করতে হবে।
আমাদের বিশ্বাস, এই প্রক্রিয়াতেই আমরা সমস্যা সমাধানের পথে এগিয়ে যেতে পারবো। আন্দোলনকে দ্রুত নিয়ে আসতে পারবো শান্তিপূর্ণ সমঝোতার পথে।
জীবনের এই প্রান্তে ক্ষমতা আমরা কাছে বড় কিছু নয়। দেশবাসীর ভালবাসায় সিক্ত হয়ে আমি অতীতে কয়েকবার দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছি। প্রিয় সেই দেশবাসীর জন্য তাদের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতেই আমরা লড়াই করছি। এই আন্দোলন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তির নয়। কোনো দলের বিরুদ্ধে কোনো দলের নয়। এ আন্দোলন আদর্শের। এ আন্দোলন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার। এ আন্দোলন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সকলের।
আজকের এই আন্দোলন ক্ষমতা দখলের আন্দোলন নয়। এই আন্দোলন একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার আন্দোলন।
স্বাীনতার ঘোষণাপত্রে যে সমতা, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলা হয়েছে তার বাস্তবায়নের মাধ্যমেই একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। দেশের মালিকানা আমরা তাই দেশের মানুষের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই। যাতে ভোটের অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তারাই সিদ্ধান্ত দিতে পারে তাদের পক্ষে কারা দেশ পরিচালনা করবে।
আমি এ আন্দোলনে দল-মত-পেশা-শ্রেণী নির্বিশেষে সকল ব্যক্তি ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে শামিল হবার উদাত্ত্ব আহ্বান জানাচ্ছি। আমার আহ্বান, যারা এখনো নিষ্ক্রীয় আছেন তারা সক্রিয় হোন। নিজ নিজ অবস্থান ও এলাকায় আন্দোলন গড়ে তুলুন। আন্দোলনের মধ্যদিয়ে বৃহত্তর গড়ে তুলুন জাতীয় ঐক্য।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
আমরা যখনই জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করেছি, তখনই বিভ্রান্তি ছড়াবার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগ অপপ্রচারণার নোংরা পথ বেছে নিয়েছে। কখনো তারা বলেছে মুজিব হত্যার বিচার ঠেকাতে এবং কখনো বলেছে যুদ্ধপরাধীদের বিচার রোধে নাকি আমরা আন্দোলনে নেমেছি।
তাদের এসব অপপ্রচার জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি।
এবারেও গণবিচ্ছিন্ন শাসকগোষ্ঠী জনগণের আন্দোলনে ভীত হয়ে হত্যা-উৎপীড়নের পাশাপাশি ষড়যন্ত্র, নাশকতা ও অপপ্রচারণায় মেতে উঠেছে। তারা এখন পুরোপুরি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে চাইছে। সেই উদ্দেশ্যে এসব বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের ভার কতিপয় দলবাজ কর্মকর্তার হাতে তুলে দিয়ে তাদের মাধ্যমে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও আনসার বাহিনীকে বিরোধী দল ও জনগণকে নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত করছে। আমরা বারবার বলেছি, আজ আবারো আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে আইনসম্মতভাবে কর্তব্য পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।
হত্যা, বিচার বহির্ভূত হত্যা, গুম, অপহরণ, নির্যাতন, বন্দী অবস্থায় গুলী করে পঙ্গু করা, বাড়িঘরে হামলা, পাইকারি গ্রেফতার ও মিথ্যা মামলা দায়েরের বেআইনি প্রক্রিয়া থেকে তাদেরকে দূরে থাকতে বলছি।
দেশবাসী জানেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি বরাবরই সন্ত্রাস ও সহিংসতা-নির্ভর। অতীতে আন্দোলনের নামে তারা যে ভয়াবহ সন্ত্রাস চালিয়েছে তা সকলেরই জানা। মাসের পর মাস টানা হরতাল-অবরোধ-অসহযোগ কর্মসূচির নামে তারা নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের সময়ে যাত্রীবাসে গান পাউডার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে যাত্রাবাড়িতে ১৮ জন এবং শেরাটন হোটেলের কাছে ১১ জন যাত্রীকে তারা জীবন্ত পুড়িয়ে মেরেছিল। ঐ দুটি পৈশাচিক ঘটনায় দগ্ধ আরো ১২ জন পরে হাসপাতালে প্রাণ হারান। এছাড়া বোমা ও ককটেল মেরে এবং পিটিয়ে তারা বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপরেও আক্রমণ করেছে। তাদের সন্ত্রাসের কারণে এসএসসি পরীক্ষা তিন মাস পর্যন্ত পিছাতে হয়েছে। পবিত্র রমজান মাসেও তারা হরতাল করেছে। যমুনা সেতুর নির্মাণ কাজ উদ্বোধনের দিনে হরতাল দিয়েছে।
স্বল্পমেয়াদী ৭ম সংসদদের নিয়ম রক্ষার নির্বাচন বর্জন করে সেই নির্বাচন ঠেকাতে তারা ‘গণকার্ফু’ জারি করে দেশব্যাপী হত্যা ও ধ্বংসের তান্ডব চালিয়েছিল।
এই আওয়ামী লীগ আন্দোলনের নামে জামায়তে ইসলামী ও জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল এবং রেল স্টেশন, যানবাহন, অফিস-আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করেছে। অফিসগামী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকাশ্য রাজপথে বিবস্ত্র করেছে। লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করেছে। এসব পৈশাচিক তা-বের প্রকাশ্য নির্দেশ শেখ হাসিনা নিজে দিয়েছেন এবং এসবের বহু দালিলিক প্রমাণও রয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগ আজ বিচার বিভাগের মর্যাদার কথা বলে। অথচ তারা রায় পছন্দ না হওয়ায় বিচারকদের বিরুদ্ধে লাঠি মিছিল করেছে। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বস্তি বসিয়েছে। দেশের প্রধান বিচারপতির এজলাসে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ভাংচুর করেছে। ক্ষমতায় বসেই তারা নিজেদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করেছে। সাজাপ্রাপ্ত খুনের আসামীদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমায় মুক্ত করেছে।
সন্ত্রাসের দানব সেই আওয়ামী লীগ এবার আন্দোলন শুরুর পর থেকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ছত্রছায়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলের কর্মীদের হত্যা, গুম ও বন্দী অবস্থায় গুলী করে পঙ্গু করা শুরু করে।
আমাদের দল-জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে গুলি চালানো হয়। গুলিতে রিয়াজ রহমানের মতো সজ্জন ব্যক্তি গুরুতর আহত হন। প্রবীণ রাজনীতিক তরিকুল ইসলামসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাদের বাড়ি-ঘর, অফিস ও যানবাহনে গুলি, বোমা হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আমাদের দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ সারা দেশে প্রায় দশ হাজার নেতা-কর্মীকে গত দু’মাসে তারা কারারুদ্ধ করেছে। লাখ লাখ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।
বিরোধী দলের সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে তাদেরকে নজীরবিহীনভাবে দীর্ঘদিন ধরে রিমান্ডে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
আমাদের দলের অন্যতম যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী আহমেদকে একের পর এক মিথ্যা মামলায় প্রায় এক মাস ধরে দফায় দফায় রিমান্ডে নিয়ে নানা ভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। জনগণের বিপুল ভোটে নির্বাচিত বিরোধী দল সমর্থক মেয়রদের মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে দলীয় লোক বসানের জন্য তাদের বরখাস্ত করা হচ্ছে। বিনা ভোটে ক্ষমতায় আসা শাসকদের কাছে জনগণের ভোটের যে কোনো মূল্য নেই তা তারা হাতে নাতে প্রমান করছে। অথচ আমাদের আমলে আওয়ামী লীগের নেতা হিসাবে ঢাকার মেয়র তথাকথিত ‘জনতার মঞ্চ’ গঠন করে রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন।
একই দলের নেতা হিসাবে চট্টগ্রামের মেয়র সমুদ্র বন্দর অচল করায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আমরা তাদের বরখাস্ত করিনি।
আমাদের দলের অন্যতম যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে আপনারা জানেন। তাকে গ্রেফতার করেও গত তিন দিনেও সরকার স্বীকার করেনি। এখন পর্যন্ত তার কোনো হদিস নেই। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার ব্যাপারেও সরকার প্রথম অস্বীকার করে পরে নাটক সাজিয়ে ২১ ঘন্টা পর তাকে গ্রেফতার দেখায়।
আপনারা জানেন, সম্প্রতি ক্ষমতাসীনেরা বিরোধী দলের বক্তব্য-বিবৃতি সংবাদ-মাধ্যমে প্রচার না করার নির্দেশ দেয়।
তারপরেও বিএনপি ও  ২০ দলের পক্ষে সালাহউদ্দিন আহমেদের দেয়া বক্তব্য-বিবৃতি প্রচারিত হতে থাকায় তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি আবারো অবিলম্বে সালাহউদ্দিন আহমেদকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় এর পরিণতি শুভ হবে না।
আমাকে কত হীন পন্থায় হয়রানি ও হেনস্থা করা হয়েছে ও হচ্ছে; আমি তার বিবরণ দিতে চাইনা। দেশবাসী সব জানেন এবং দেখছেন।
প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,
এত কিছু করেও উদ্দেশ্য হাসিল না হওয়াতে আওয়ামী লীগ অন্তর্ঘাত ও নাশকতার পথ বেছে নিয়েছে। পূর্ণ নিরাপত্তা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর প্রহরায় কিছু যানবাহন রাস্তায় নামায়।
সেসব যানবাহনে পেট্রোল বোমা মেরে নারী-শিশুসহ নিরপরাধ মানুষকে দগ্ধ করে শোচনীয় মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আমরা এসব পৈশাচিক বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছি। হীন সন্ত্রাসে জড়িতদের সঠিক ভাবে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তিরও দাবি করে চলেছি। কিন্তু আমাদের আহ্বানে তারা কর্ণপাত করেনি। তারা তাদের ষড়যন্ত্রের নীলনক্সা বাস্তবায়নে এগিয়ে গেছে এবং নিরপরাধ মানুষের শোচনীয় মৃত্যুকে তারা তাদের ঘৃণ্য রাজনীতির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে চলেছে।
দেশে যখন নিরপরাধ মানুষকে নির্বিচারে হত্যার মতো পৈশাচিক ঘটনা ঘটছে তখন বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও তথ্য প্রমাণের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের সনাক্ত করে গ্রেফতারের কোনো উদ্যোগ নেই। তার বদলে চলছে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে একতরফা অপপ্রচার। কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিনা তদন্তে ও তথ্য-প্রমাণ ছাড়া মামলা দায়ের করা হচ্ছে। সেই সঙ্গে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মীদের দায়ী করে ক্রমাগত বক্তব্য রাখা হচ্ছে। যার ফলে তদন্ত প্রভাবিত এবং ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হচ্ছে।
অথচ সরকারি দলের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বোমাসহ গ্রেফতার এবং এর কোনো কোনো খবর সংবাদ-মাধ্যমে প্রচারিত হবার পরেও উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আওয়ামী নেতারা সার্টিফিকেট দিয়েও তাদের ছাড়িয়ে নিচ্ছে। এতে প্রকৃত অপরাধীরা আড়ালে চলে যাচ্ছে এবং পার পাচ্ছে।
দেশবাসী প্রতিনিয়ত দেখছেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীরা দখল ও টেন্ডারবাজীতে জড়িয়ে গোলাগুলি করছে, সশস্ত্র সংঘাতে জড়াচ্ছে। আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্য ও সাংবাদিকদের ওপরেও সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে। বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ, মিছিলে হামলা করছে। তাদের নিজেদের মধ্যেও সশস্ত্র সংঘাত হচ্ছে। কিন্তু কাউকেই ধরা হচ্ছেনা।
আমাদের অফিসগুলো তালাবন্ধ করে রাখা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ মিছিল-সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছেনা। অথচ আমাদের বিরুদ্ধে একতরফা অপপ্রচারের উদ্দেশ্যে আইন-শৃংখলা বাহিনীর ছত্রছায়ায় শাসক দলের মুষ্টিমেয় সংখ্যক লোক দিয়ে বিভিন্ন স্থানে মহড়া করানো হচ্ছে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ‘দেখা মাত্র গুলি’ করার বেআইনি আদেশ দেয়া হয়েছে। সন্ত্রাসের জন্য কলংকিত ছাত্রলীগের সদস্যদের অপরাধী ধরিয়ে দেয়ার নামে রাষ্ট্রীয় অর্থে পুরষ্কৃত করা হচ্ছে। এসবের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতিকে আরো নৈরাজ্যকর করে তোলা হচ্ছে।
আমি পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই যে, জনগণের জান-মালের নিরপত্তা দিতে ব্যর্থ এই শাসক মহলই সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিয়ে যানবাহনে তুলে পরিকল্পিতভাবে শোচনীয় মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এসব পরিকল্পিত বোমা হামলার সঙ্গে তারাই জড়িত বলে দেশের বেশির ভাগ মানুষ মনে করে। নিরপরাধ মানুষের জীবনকে যারা রাজনীতির পণ্যে পরিণত করে তাদের ক্ষমতায় থাকার কোনো অধিকার নেই।
রাজনৈতিক সংকট সমাধানের কোনো সদিচ্ছা এই সরকারের নেই। তারা সংকটকে দীর্ঘয়িত করতে চায়। সেই উদ্দেশ্যেই আন্দোলন চলাকালে তারা অন্তর্ঘাত ও নাশকতা চালিয়ে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে জঙ্গী তৎপরতা বলে দেশে-বিদেশে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সকলেই জানেন যে, তাদের শাসনামলেই এ দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান ও বিস্তার ঘটেছিল। আমরা সরকারে আসার পর জঙ্গীবাদী নেতাদের গ্রেফতার ও বিচার করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করেছিলাম। তাদের নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দেয়া সম্ভব হয়েছিল। আজ বর্তমান ক্ষমতাসীনদের সহায়তায় জঙ্গীদের আটকাবস্থা থেকে পালাবার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।
জনগণের ন্যায্য দাবী অগ্রাহ্য করার উদ্দেশ্যেই তারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে জঙ্গী তৎপরতা হিসেবে অপপ্রচার করছে। এর ফল কখনো ভালো হতে পারনা। এতে প্রকৃত জঙ্গীবাদীরাই সুবিধা পাবে; যা কারোরই কাম্য নয়।
আমি আবারো দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই যে, বিএনপি ও ২০ দল নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করার ভয়ংকর রাজনীতিতে বিশ্বাস করেনা। আমাদের আন্দোলন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন। তাদের জীবন নাশের আন্দোলন নয়। কাজেই পক্ষপাতহীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে এইসব জীবনসংহারী সন্ত্রাসের প্রকৃত হোতাদের সনাক্ত করে কঠিন শাস্তির দাবি আমি পুনর্ব্যক্ত করছি।
এসব ঘটনায় জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তিবিধান কল্পে বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছি।
সাংবাদিক ভাই-বোনেরা,
আমরা জনগণের ভোটের অধিকারসহ সকল গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য আন্দোলন করছি। কাজেই জনগণ আমাদের সঙ্গে আছেন। আমরা তাদেরকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারি না। সাধারণ মানুষকে বোমা মেরে ও পুড়িয়ে হত্যা এবং এ নিয়ে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে প্রচারণা এবং নির্যাতন চালিয়ে ক্ষমাতাসীনরাই সুবিধা পাবে। কাজেই ক্ষমতাসীনেরা সুবিধা পায় এমন কোনো অপকর্মে আমাদের কেউ জড়িত থাকার প্রশ্ন উঠেনা।
ইতিহাস সচেতন সকলেই জানেন যে, জার্মানীর নাৎসী নেতা হিটলার ১৯৩৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাইখস্ট্যাগে আগুন লাগিয়ে সেই দায় বিরোধীদের উপর চাপিয়ে অনুগত মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলেন। এরপর নির্মম ও নিষ্ঠুর পন্থায় বিরোধী দল ও মতকে তিনি দমন করেছিলেন। বাংলাদেশে হিটলারের ক্ষুদে প্রেতাত্মারা আজ সেই পথ অনুসরণের ব্যর্থ অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এসব অপতৎপরতায় হিটলারের যেমন শেষ রক্ষা হয়নি তার অনুসারী বাংলাদেশী ক্ষুদে হিটলাররাও চূড়ান্ত বিবেচনায় পরাজিত হবে ইনশাআল্লাহ।
ক্ষমতাসীনেরা প্রতিনিয়ত আমাকে জেল-জুলুম ও ফাঁসীর ভয় দেখাচ্ছে। নানা ভাবে হেনস্তা করছে। আমাদেরকে টার্গেট করে অশ্রাব্য ভাষায় অপপ্রচার চালাচ্ছে। এসবে কোনো লাভ হবেনা। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সকলের অংশগ্রহণে দ্রুত একটি নির্বাচনের আয়োজন করলেই কেবল চলমান সংকটের সুরাহা হবে।
এ নিয়ে ক্ষমতাসীনরা যদি কোনো আলোচনা করতে না চায় তাহলে সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব এককভাবে তাদের ওপরেই বর্তাবে। তথাকথিত হলেও একটি সংসদের অধিবেশন চলছে। একতরফাভাবে যে বিতর্কিত পঞ্চদশ সংশোধনী তারা পাশ করেছে তা তারা একতরফাভাবে বাতিলও করে দিতে পারে। তাতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের পথ খুলবে। এই সংশোধনীর পর বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা পদত্যাগ করে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেই দেশে সংকটের অবসান ঘটবে।
সংকট নিরসনের জন্য ১৯৯৬ সালে আমরা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন করে সংবিধান সংশোধনের পর পদত্যাগ করে আমাদের অঙ্গীকার পূরণ করেছিলাম। এখন শেখ হাসিনা অন্তত: এবার যদি তার অঙ্গীকার পূরণ করেন তাহলেই দেশে শান্তি, স্বস্তি ও সমঝোতার পরিবেশ ফিরে আসবে। মানুষ মুক্তি পাবে।
সামনে মহান স্বাধীনতার দিবস। জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে।
সেই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে, জনগণের স্বাধীনতা এবং মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার পুন:প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের তেমন জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। আজকের সংকট সমাধানের চাবিকাঠি ক্ষমতাসীনদের হাতে। সংকট নিরসনের মাধ্যমে তারা সেই কাঙ্খিত জাতীয় ঐক্যের পথ খুলে দিতে পারে। তাহলেই আমরা সংকট মুক্ত হয়ে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে জাতির ৪৫তম স্বাধীনতা দিবস পালন করতে পারবো।
আমি আশা করি, ক্ষমতাসীনদের শুভবুদ্ধির উদয় হবে। তারা সমঝোতার পথে ফিরে আসবে। আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সংকট দ্রুত নিরসনের উদ্যাগ নিবে। আজ এখানেই শেষ করছি। আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ।
আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

লন্ডনে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তাবে রাজি জুলিয়ান অ্যাসঞ্জ

সুইডেনের সরকারি কৌশুলিরা ব্রিটেনে এসে উইকিলিক্সের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসঞ্জকে জিজ্ঞাসাবাদের ইচ্ছা প্রকাশ করার পর মি. অ্যাসঞ্জের একজন আইনজীবী এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছেন।
এর আগে তারা সাড়া জাগানো এই হ্যাকারকে তাদের হাতে তুলে দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলো।
যৌন হয়রানির মামলায় সুইডেনে প্র্যত্যর্পন ঠেকাতে মি. অ্যাসঞ্জ প্রায় তিন বছর ধরে লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে অবস্থান করছেন। জুলিয়ান অ্যাসঞ্জকে লন্ডনে ইকুয়েডরিয়ান দূতাবাসেই জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তাব আগেও দেয়া হয়েছিল, কিন্তু সুইডিশ তদন্তকারীরা আগে এতে রাজি হয়নি।
কিন্তু এখন তারা মত পাল্টেছেন। তারা বলছেন, যে সময়সীমার মধ্যে সুইডেনে মিস্টার অ্যাসঞ্জকে বিচার করা যেতে পারে, তার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছে। সে কারণেই তারা লন্ডনে এসে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এই মামলাকে ঘিরে যে আইনী এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, সেটি এখন কাটানো যাবে বলে আশা করছেন জুলিয়ান অ্যাসঞ্জের আইনজীবী পার স্যমুয়েলসন।
সুইডিশ কর্তৃপরে এই সিদ্ধান্ত জুলিয়ান অ্যাসঞ্জের জন্য এক বিরাট বিজয় বলে বর্ণনা করেন তার আইনজীবি পার স্যামুয়েলসন।
তিনি বলেন, গত চার বছর ধরে তারা এর জন্য অপো করেছেন। সুইডিশ তদন্তকারীরা যে এই সিদ্ধান্ত নিতে চার বছর দেরী করলো, তার ফলে দূতাবাসে চার বছর ধরে কার্যত ঘরবন্দী মিস্টার অ্যাসঞ্জের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জুলিয়ান অ্যাসঞ্জের বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির যে অভিযোগ রয়েছে, শুরু থেকেই তা অস্বীকার করছেন তিনি। এই মামলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য তিনি সুইডেনে যেতেও অস্বীকৃতি জানান এবং তাকে যেন সেখান পাঠানো না যায়, সেজন্যে লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে গিয়ে আশ্রয় নেন।
উইকিলিক্স ওয়েবসাইটে বহু গোপন মার্কিন দলিল ফাঁস করে দেয়ায় তাকে সুইডিশ কর্তৃপক্ষ বিচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেবে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।
সূত্র : বিবিসি

মংলায় উদ্ধারকাজ শেষ

মংলা বন্দরের শিল্পাঞ্চল এলাকায় গতকাল সেনাকল্যাণ সংস্থার মংলা
সিমেন্ট ফ্যাক্টরির নির্মাণাধীন একটি গুদামের ছাদ ধসে পড়ে।
এতে সাতজন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়।
ঘটনা তদন্তে সেনাকল্যাণ সংস্থার পক্ষ থেকে তিন সদস্যের
তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ছবি: ফোকাস বাংলা
মংলা বন্দরের শিল্পাঞ্চল এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আজ শুক্রবার দুপুরে ধ্বংসস্তূপ থেকে আরেকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে ভবনধসের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে পৌঁছাল। গতকাল বৃহস্পতিবার সেনাকল্যাণ সংস্থার মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরির নির্মাণাধীন একটি গুদামের ছাদ ধসে যায়। আজ শুক্রবার বেলা একটায় উদ্ধারকাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। মংলা সিমেন্ট কারখানার উপমহাপরিচালক (ডিডিজি) ক্যাপ্টেন সৈয়দ হেলাল হোসেনের ভাষ্য, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আর কেউ নেই। সব মিলে সাতজন নিহত ও ৪৬ জন আহত হয়েছেন। এ কারণে তাঁরা উদ্ধারকাজ সমাপ্ত ঘোষণা করেছেন। সৈয়দ হেলাল বলেন, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহায়তা দেবে সেনাকল্যাণ কর্তৃপক্ষ। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভারও তাঁরা বহন করবেন।
মংলা উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাহিদুজ্জামানের ভাষ্য, সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। আহত ব্যক্তিদের পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।
গতকাল ভবনের ছাদ ধসে যাওয়ার পর নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। ধসে পড়া ছাদের নিচে আরও ৩০-৪০ জন শ্রমিক রয়েছেন বলে দাবি করেন আহত শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজন।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনের পরিচয় মিলেছে। তাঁরা হলেন রামপাল উপজেলার রাজনগর গ্রামের বাসিন্দা মাহারুফ হাওলাদার, গৌরম্ভা গ্রামের আমির আকন্দ ও খুলনা মহানগরের বাগমারা এলাকার আল আমিন। অন্যদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাটে পাঠানো হয়েছে। ঘটনা তদন্তে সেনাকল্যাণ সংস্থার পক্ষ থেকে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সেনাকল্যাণ সংস্থার মালিকানায় ১৯৯৪ সালে পশুর নদের তীরে প্রতিষ্ঠিত মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলিফ্যান্ট ব্র্যান্ড নামে সিমেন্ট বাজারজাত শুরু করে। কারখানাটি গুদাম নির্মাণে ১৪২ কোটি টাকায় চীনের সিএনবিএম ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেয়। ২০১৪ সালের ১০ নভেম্বর ভবনটির কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ১০ নভেম্বর ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। পরবর্তী সময়ে চীনা কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশ আইটিসিএল নামক অপর একটি কোম্পানি এ কাজের সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করে।
বাংলাদেশি এই কোম্পানি গতকাল সকালে মোট ১৮০ জন শ্রমিক নিয়ে ১৪ দশমিক ৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট এ ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে। এঁদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক ছাদে ছিলেন এবং অন্যরা ভবনের নিচে কাজ করছিলেন।
কয়রার শ্রমিক মিজান ও খুলনার দোলখোলার শ্রমিক দেলোয়ার জানান, গতকাল বেলা একটার দিকে ভবনটির চারতলার নির্মাণকাজ চলার সময় হঠাৎ ছাদটি ধসে পড়ে। তাঁরা দাবি করেন, নির্মাণকাজের ত্রুটির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
ফায়ার সার্ভিসের খুলনা ও বরিশাল বিভাগীয় উপপরিচালক মিজানুর রহমান জানান, ঘটনার পর তিনজন শ্রমিককে মৃত ও ৩৮ জন শ্রমিককে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। রাত আটটায় ও সর্বশেষ রাত পৌনে ১১টায় ধ্বংসস্তূপ থেকে দুই শ্রমিককে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে একজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়।
মংলা সিমেন্ট কারখানার উপমহাপরিচালক (ডিডিজি) ক্যাপ্টেন সৈয়দ হেলাল হোসেন বলেন, আহত শ্রমিকদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের হাসপাতাল, রামপাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সেরা পাঁচে মাহমুদউল্লাহ

মাহমুদউল্লাহ ছবি: শামসুল হক, হ্যামিল্টন থেকে
এবারের বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ পাঁচ রান স্কোরারের তালিকায় ঢুকে পড়লেন মাহমুদউল্লাহ। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অপরাজিত ১২৮ রানের সুবাদে সেরা পাঁচের তালিকায় এখন চতুর্থ অবস্থানে তিনি। পর পর দু'ম্যাচে শতক হাঁকানো মাহমুদউল্লাহর এখনো পর্যন্ত বিশ্বকাপের মোট রান ৩৪৪।
গত ম্যাচেই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম সেঞ্চুরির গৌরব অর্জন করেন মাহমুদউল্লাহ। আজ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও শতক হাঁকিয়ে নিজেকে নিয়ে এলেন টুর্নামেন্টের সেরা পাঁচ ব্যাটসম্যানের তালিকায়। এক্ষেত্রেও প্রথম বাংলাদেশি খেলোয়াড় তিনি। এর আগে কোনো বিশ্বকাপেই সর্বোচ্চ রান স্কোরারের তালিকায় নাম আসেনি কোনো বাংলাদেশির। এমনকি বিশ্বকাপের টানা দুম্যাচে সেঞ্চুরি পাওয়া প্রথম ব্যাটসম্যানও তিনি।
প্রথম দুটো ম্যাচে তেমন রানের দেখা পাননি অবশ্য। মধ্যিখানে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলাটি পরিত্যাক্ত হয় বৃষ্টির কারণে। আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রান পেয়েছিলেন যথাক্রমে ২৩ ও ২৮। স্কটল্যান্ডের সঙ্গে প্রথম জ্বলে ওঠেন তিনি। সেই ম্যাচে রান মেলে ৬২। তারপরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন ১৩৮ বলে ১০৩ রানের রেকর্ড সেই ইনিংস। ওই ম্যাচে জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।
আজকের ম্যাচে তাঁর ১২৮ রানের ইনিংসটি এসেছে ১২৩ বলে। ১২টি চার ও ৩টি ছয়ে সাজানো এই ইনিংসটি ছিল অসম্ভব দৃষ্টি নন্দন। বিশেষ করে ইনিংসের শুরুর দিকে ট্রেন্ট বোল্ট আর টিম সাউদির তোপ তিনি যেভাবে সৌম্য সরকারকে সঙ্গে নিয়ে সামাল দিলেন, তা ছিল এক কথায় অসাধারণ। অথচ, ইনিংসের শুরুতেই দুই-দুইবার জীবন পেয়েছিলেন তিনি। তাঁকে জীবন ফিরিয়ে দেওয়া যে এত দামী জিনিস হয়ে উঠবে, সেটা বোধহয় ভাবেননি নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক ব্রেন্ডন ম্যাককালাম।
সর্বোচ্চ পাঁচ রান সংগ্রাহক (ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০১৫)
ব্যাটসম্যান        মোট রান          সর্বোচ্চ
কুমার সাঙ্গাকারা       ৪৯৬            ১২৪
এবি ডি ভিলিয়ার্স      ৪১৭            ১৬২*
তিলকরত্নে দিলশান   ৩৯৫            ১৬১*
মাহমুদউল্লাহ           ৩৪৪            ১২৮*
শিখর ধাওয়ান          ৩৩৩            ১৩৭

তাঁর বদলে যাওয়ার গল্প by রানা আব্বাস

বিশ্বকাপে দুর্দান্ত মাহমুদউল্লাহ। ছবি: শামসুল হক
ঘরের মাঠে গত বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজ ও এশিয়া কাপে মাহমুদউল্লাহর নিদারুণ ব্যর্থতায় নানা প্রশ্ন শুনতে হয়েছে তখনকার অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমকে। অন্য অধিনায়কের মতো সতীর্থ মাহমুদউল্লাহকে আগলে রাখতে চাইলে অযাচিতভাবে অনেকেই টানলেন দুজনের আত্মীয়তার সম্পর্কও! পরে ভারত ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেও মাহমুদউল্লাহর দুঃসময় কাটল না। ২০১৪ সালের প্রায় পুরোটা সময়ই ব্যর্থতার চোরাবালিতে হাবুডুবু খেলেন মাহমুদউল্লাহ। নিজেকে ফিরে পাওয়ার দারুণ এক সুযোগ এল নভেম্বর-ডিসেম্বরে ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে। সুযোগটা কাজে লাগালেন ২৯ বছর বয়সী অলরাউন্ডার। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের দুই ফিফটিতে করলেন ১৭৯ রান। এর মধ্যে তিনটি ইনিংসেই (৩৩, ৮২, ৫১) ছিলেন অপরাজিত। চতুর্থ ম্যাচটা তো বিপর্যয় থেকে দলকে উদ্ধার করে পেলেন ম্যাচসেরার পুরস্কারও। বিশ্বকাপ-মিশনের আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘জিম্বাবুয়ে সিরিজে আত্মবিশ্বাসটা বেড়েছে। চেষ্টা করব এটার ধারাবাহিকতা ধরে রেখে দলের জন্য বড় কিছু করার।’
বিশ্বকাপে ‘বড়’ কিছুই করে দেখিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। এ বিশ্বকাপে তাঁর ইনিংস—২৩, ২৮, ৬২, ১০৩ ও ১২৮ (অপরাজিত)। মাহমুদউল্লাহর রান ক্ষুধা বেড়েই চলেছে! সব ব্যর্থতা যেন একবারেই পুষিয়ে নিচ্ছেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে পেলেন সেঞ্চুরি। আজ নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর রেকর্ড পাতায় সংযোজন হলো আরও কিছু রেকর্ড। বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে পেলেন টানা দুই সেঞ্চুরি। এক বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড এখন মাহমুদউল্লাহর। পাঁচ ম্যাচে তাঁর সংগ্রহ ৩৪৪ রান। চলতি বিশ্বকাপে কুমার সাঙ্গাকারার পর মাহমুদউল্লাহ পেলেন টানা দুই সেঞ্চুরি। ওয়ানডে ইতিহাসে বাংলাদেশের পক্ষে টানা দুই সেঞ্চুরি করা দ্বিতীয় ব্যাটসম্যানও তিনি। ২০০৬ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টানা দুটি সেঞ্চুরি করেছিলেন শাহরিয়ার নাফীস।
ব্যর্থতার দিনগুলোয় ব্যাটিং পজিশনে একটু নিচেই খেলতে হয়েছে মাহমুদউল্লাহকে। কিন্তু এ বিশ্বকাপে প্রায় নিয়মিত খেলছেন ৪ নম্বরে। আর এ পজিশনেই রানের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন এ ডানহাতি। দুদিন আগে সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার এক আলাপচারিতায় বলছিলেন, ‘মাহমুদউল্লাহ এখন প্রতিটি ম্যাচে পারফর্ম করতে মুখিয়ে থাকে। এ মানসিকতার কারণেই সে এগিয়ে যাচ্ছে। মাহমুদউল্লাহর সবচেয়ে বড় গুণ, কঠিন পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রেখে খেলতে পারে।’
বিশ্বকাপের আগে মাহমুদউল্লাহ নিজেকে ফিরে পেতে শুধু পারফরম্যান্স নয়, পরিশ্রম করেছেন মেদহীন ঝরঝরে শরীর পেতেও। ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের পর থেকেই মেদ কমিয়ে ফেলায় বেড়েছে শারীরিক ফিটনেসও। এ জন্য তালিকা থেকে বাদ দিতে হয়েছে অনেক প্রিয় খাবার।
এসব বিসর্জনে কেবল শারীরিক ফিটনেসই বদলায়নি; বদলেছে মাহমুদউল্লাহর ফর্মও।

নিউজিল্যান্ডকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ

নিউজিল্যান্ডকে ঘাম ঝরিয়ে ছাড়ল বাংলাদেশ! ছবি: এএফপি
এ বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স নিউজিল্যান্ডের। সেই নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আজ হ্যামিল্টনে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সও হলো বলার মতোই। জিততে পারলে হয়তো প্রাপ্তির ষোলোকলা পূর্ণ হতো। তবে ৩ উইকটে হারের পরও বাংলাদেশের প্রাপ্তি নেহাত মন্দ নয়। নিউজিল্যান্ডকে কাঁপিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতাটাও বলতে হবে দারুণই। ২৮৯ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে শুরুতেই কিউইদের ছন্দপতন। সাকিব আল হাসানের ঘূর্ণিতে ৩৩ রানেই ২ উইকেটের পতন। তৃতীয় উইকেটে কিউইদের কক্ষপথে ফেরায় মার্টিন গাপটিল ও রস টেলরের জুটি। এ জুটিতে আসে সর্বোচ্চ ১৩১ রান। জুটি ভাঙেন সাকিব। বাংলাদেশের বাঁহাতি অলরাউন্ডারের ভেলকিতে ফেরার আগে গাপটিলের সংগ্রহ ১০৫ রান। চতুর্থ উইকেটে গ্রান্ট এলিয়টকে নিয়ে আরেকটি জুটি গড়েন টেলর। এ জুটিতে আসে ৪৬ রান। রুবেলের বলে ফেরার আগে এলিয়টের সংগ্রহ ৩৯ রান। এরপর ৫৬ রান করা টেলরকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলে ফেরান নাসির হোসেন। এ সময় দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে আসে বাংলাদেশ। ৩ উইকেটে ২১০ রান থেকে ৬ উইকেটে ২৪৭—৩৭ রানে কিউইদের ৩ উইকেট নেই! শেষ দিকে বাংলাদেশের কাছ থেকে জয়টা কেড়ে নেয় মূলত কোরি অ্যান্ডারসনের ২৬ বলে ৩৯, ড্যানিয়েল ভেট্টোরির ১০ বলে ১৬ ও টিম সাউদির ৬ বলে ১২ রানের ছোট ছোট তিনটি ঝোড়ো ইনিংস। বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ৪ উইকেট সাকিবের দখলে। ২ উইকেট নিয়েছেন নাসির আর রুবেলের সংগ্রহে ১টি।
এর আগে প্রথমে ব্যাট করে মাহমুদউল্লাহর অপরাজিত ১২৮ ও সৌম্য সরকারের ৫১ রান ও শেষ দিকে সাব্বির রহমানের ২৩ বলে ৪০ রানের ঝোড়ো ইনিংসে ভর করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ২৮৮ রান করে বাংলাদেশ। এ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড যা করতে পারেনি, বাংলাদেশ সেটা করেছে। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চলতি বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো দল খেলেছে পুরো ৫০ ওভার। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের করা ৭ উইকেটে ২৮৮ রানও কিউইদের বিপক্ষে করা এ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ রান। নিজেদের ধারটা ভালোই দেখিয়েছে বাংলাদেশ! এ ম্যাচ হারলেও বাংলাদেশের আক্ষরিক অর্থে কোনো ক্ষতি নেই। তবে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর রসদ জোগানোর দারুণ সুযোগ ছিল। সেটা পুরোপুরি না হলেও একেবারে ব্যর্থও বলা যাবে না বাংলাদেশকে। ১৯ মার্চ মেলবোর্নের কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হওয়ার আগে বাংলাদেশের সামনে থাকবে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয় আর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দারুণ লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা।

এখন দরকার একটি দৃঢ়প্রত্যয়- ‘নেভার এগেইন’ by মিনার রশীদ

প্রত্যেক কারবালা বা হলোকাস্টের পরে নতুন একটি অধ্যায় শুরু হয়। যেখানে কারবালা হয়, যেখানে হলোকাস্ট হয় সেখানে একটি নতুন সম্ভাবনা বা নতুন অধ্যায় অবধারিত হয়ে পড়ে।
আমাদের দেশে যা হচ্ছে তারও একটা পরিণতি বা সিকোয়েন্সিয়াল কনসিকোয়েন্স স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। বিরোধী দলের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য সরকারের শতমুখী কার্যকলাপ এবং বলদ, খাসি ও খোজা বানানো মিডিয়ার একতরফা প্রচারণার পরেও দুই মাস যাবৎ এই আন্দোলনকে অব্যাহত রাখতে পারা।
এই আন্দোলনের মুখে সরকার বাইরে থেকে একটা শক্ত ভাব প্রদর্শন করলেও ভেতরে য়ের লণটি স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। কারণ এই শক্ত ভাবটির মধ্যেই সরকারের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে। হজরত সুলাইমান আ: মৃত্যুর পরেও আল্লাহ ঠায় দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন জিন শ্রমিকদের দিয়ে হাতের কাজটি শেষ করানোর জন্য। পোকারা তার হাতের লাঠিটি খেয়ে ফেললে তিনি মাটিতে পড়ে যান এবং জিন শ্রমিকেরা বুঝতে পেরে কাজ বন্ধ করে দেয়। তত দিনে অবশ্য নির্মাণের কাজটি শেষ হয়ে গেছে।
সুলাইমান আ:-এর জিনদের দিয়ে মহৎ কাজ করানো হয়েছিল। এই সরকারের জন্য যে বদজিনরা কাজ করছে, তারাও টের পাচ্ছে না যে সরকারের কিনিক্যাল মৃত্যু হয়ে গেছে। এই সরকার মরে গেলেও একটা অপশক্তি দাঁড় করিয়ে রেখেছে প্রশাসনের মেধা, প্রজ্ঞা ও বিবেকহীন জিনদের দেখানোর জন্য। সবপর্যায়ে সেট করা মেধাহীন জিনরা আমাদের ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে এসেছে।
তবে যে খুঁটির ওপর ভর দিয়ে এই মরা সরকার দাঁড়িয়ে রয়েছে, তা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। আমার মনে হচ্ছে, জাতিকে পরবর্তী প্রস্তুতি এখনই নেয়া দরকার। এটা শুধু মতায় যাওয়ার জন্য পাঞ্জাবি ইস্ত্রি করা নয় বা তার জন্য গোঁফে তেল দেয়া নয়। গত সাত-আট বছরে আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, গণমাধ্যম, শিা, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের যে ভয়াবহ তি সাধন করা হয়েছে, তার রিপিটেশন কিংবা প্রতিশোধস্পৃহা থেকে জাতিকে রা করার প্রত্যয় ঘোষণা করতে হবে।
এ জন্যই আজকের লেখার শিরোনামটি নিয়েছি নিচের বাক্যগুলো থেকে। আমি একজন চরম আশাবাদী মানুষ। আগামী কয়েকটি সংখ্যায় এই আশা ও প্রত্যয়টি নিয়ে লেখার ইচ্ছে রাখছি।
After the Holocaust, the world united behind two simple words : Never Again. These words represent a promise to past and future generations that we will do everything we can to ensure the horrors of the Holocaust are not repeated.
অর্থাৎ হলোকাস্টের পর সারা পৃথিবী দু’টি শব্দের পেছনে একত্রিত হয়েছিল- আর কখনোই নয়। এই দু’টি শব্দ অতীত এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রত্যয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়- হলোকাস্টের নির্মমতা যেন আবারো পুনরাবৃত্তি হতে না পারে সে জন্য সম্ভব সব কিছু করতে হবে।
আমার এই পরামর্শটি শুধু ২০ দলীয় জোটের জন্য নয়। সরকারের ভেতরে গণতান্ত্রিক শক্তির জন্যও (যারা অগণতান্ত্রিক জিন বা ইলেমেন্টের কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন) এই প্রত্যয়টি ঘোষণার আহ্বান রয়েছে। পুরো জাতিকেই আজ এগিয়ে আসতে হবে। এই সরকারকে যে ভূতেরা বাঘের পিঠে চড়িয়ে দিয়েছে, জাতির সম্মিলিত প্রজ্ঞায় সেখান থেকেও নিরাপদে নামানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
শান্তির জন্য ব্রিটিশ সরকার আয়ারল্যান্ডের সশস্ত্র সংগ্রামীদের সাথে আলোচনায় বসেছে। দণি আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকার তাদের চরম শত্রু নেলসন ম্যান্ডেলার সাথেও আলোচনায় বসেছে । যুক্তরাষ্ট্র তার পরম শত্রু তালেবানের সাথেও আলোচনায় বসেছে। এমনকি ইসরাইল সরকার পিএলওর সাথে আলোচনায় বসেছে। কিন্তু শেখ হাসিনা তার প্রতিপ তিন-তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দুই-দুইবারের বিরোধীদলীয় নেত্রীর সাথে আলোচনায় বসতে পারছেন না।
কারণ খালেদা জিয়া জঙ্গি নেত্রী হয়ে পড়েছেন। অথচ এই তিনি নিজে শান্তিবাহিনী প্রধানের সাথেও সংলাপ করেছেন। তিনি সর্বহারাদের সাথেও সংলাপ করেছেন। যেকোনো সামরিক বা আধা সামরিক বাহিনীর বিদ্রোহের প্রথম ও একমাত্র নির্দেশটি হলোÑ সাথে সাথে পাল্টা আক্রমণ। সামরিক বিজ্ঞানের এই অলঙ্ঘনীয় নিয়মটি লঙ্ঘন করে তিনি (বিডিআরের ডিজিসহ অনেক অফিসারের নিহত হওয়ার সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পরেও) বিডিআরের সেসব খুনিকে পাঁচতারা হোটেলে খানাপিনা করিয়ে সংলাপ করেছেন। সেই মারাত্মক সংলাপী শেখ হাসিনা পুরো বিশ্ব চাইলেও আজ খালেদা জিয়ার সাথে সংলাপে বসতে পারছেন না।
শেখ হাসিনা আজ যাকে জঙ্গি নেত্রী ঠাওড়াচ্ছেন, সেই জঙ্গি নেত্রীকে দেখতে গিয়েছেন বর্তমান দুনিয়ার সুপার পাওয়ারদের ষোলোজন রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধি। ক্রিকেট জগতে যেমন অনেক কিছিমের রেকর্ড থাকে, এটিও কূটনৈতিক জগতে একটি নতুন রেকর্ড। মাত্র দু’টি গাড়িতে চড়ে ষোলোজন এমন হেভিওয়েট কূটনীতিকের একজন নেত্রীর আবাসস্থলে গমন চাট্টিখানি কথা নয়। বর্তমান গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বিশ্বসম্প্রদায়কে এভাবে সম্পৃক্ত করতে পারাটাও ব্যক্তি বেগম জিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি বড় সাফল্য।
সেখানে গিয়ে এই কূটনীতিকেরা যে বিবৃতি দিয়েছেন, তার মর্মার্থ উপলব্ধি করতেও দেশের বলদ ও খোজামার্কা মিডিয়াগুলো ব্যর্থ হয়েছে। বিষকে যেকোনো মধুর নামেই অভিহিত করা হোক না কেন, এর ক্রিয়া বা সিকোয়েন্সিয়াল কনসিকোয়েন্স থেকে পানকারী রা পাবে না।
কূটনৈতিক ভাষায় সব সময় একটি বৈশিষ্ট্য থাকে। পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনায় নিয়ে সেই ভাষার সঠিক অর্থটি বের করতে হয়। সরকারের লাঠি অথবা গাজর (Stick or carrot) পলিসির মাধ্যমে পোষ মানানো বা নিস্তেজ করা মিডিয়া সেই মেসেজটিও ঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেনি বা করেনি। বিশ্বসংস্থা ও বিশ্বশক্তির প্রতিনিধিরা যে স্পষ্ট বিবৃতি দিয়েছেন, তাকেও False equalization করে তার গুরুত্বকে হালকা করে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।
দু’টি পকে আস্থা ও পারস্পরিক বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। এখন এই পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার জায়গা থেকে কোন দল কতটুকু দূরে তা স্পষ্ট করতে দ্বিধায় পড়ে গেছে আমাদের মিডিয়া। অর্থাৎ এই ষোলোজন কূটনীতিক যে তীরটি ছুড়েছেন, তা সরকারকেই বেশি ঘায়েল করেছে এই কথাটি বলতে আমাদের মিডিয়া সঙ্কোচ বোধ করছে।
আমাদের দেশের জ্ঞানীগুণী মানুষ দু’টি দলের মধ্যে এই পার্থক্যটি টানতে ভয় পেলেও গ্রামের এক অশিতি মহিলা চমৎকারভাবে তা বিশ্লেষণ করেছেন, ‘খালেদাকে তাও হিডিহাডি সরানো যায়, হাছিনাকে তাও করা যায় না।’ এই চরম সত্যটি গ্রামের সেই অশিতি মহিলাসহ (তার বক্তব্য ইউ টিউবে ছড়িয়ে আছে) বিশ্বশক্তি জেনে গেছে। আমাদের মিডিয়া জেনেও তা না জানার ভান করছে।
আমরা যদি প্রধান দু’টি দলের দিকে নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকাই, তবে দেখতে পাবো বিএনপি মতায় থাকতে কখনোই সুধা সদনের সামনে বালু বা ময়লার ট্রাক ফেলে রাখেনি। ১৯৯৪-১৯৯৬ সালে জামায়াতকে পাশে নিয়ে তুমুল আন্দোলনের সময়েও শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেনি। তার বাসা বা অফিসের গেটে তালা মারেনি। তার খাবার সরবরাহ বন্ধন করা হয়নি। শেখ হাসিনা কখন কোথায় থাকবেন সেই নির্দেশও কখনোই সংসদে দাঁড়িয়ে বা অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়া দেননি বা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকসহ অন্য কোনো বড় মাপের নেতাকে রাজনৈতিক কারণে দিনের পর দিন বন্দী করে রাখা হয়নি। গাজার জন্য প্রসিদ্ধ নড়াইলের বাসিন্দা আবদুল জলীল দীর্ঘ দিন ট্রাম্পকার্ডের ভয় দেখালেও সেই ট্রাম্পকার্ড হস্তগত করার জন্য তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়নি।
বিরোধী দলের কোনো রাজনৈতিক নেতার পায়ে কোনো দিন ডাণ্ডাবেড়ি পরানো হয়নি। রাজনৈতিক প্রতিপকে গুম বা হত্যা করা হয়নি। বাপের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ছেলে বা মেয়েকে হত্যা করা হয়নি। পুলিশ, র‌্যাব, বিডিআর প্রধান বিরোধী দলের নেতাকর্মীকে কখনোই গুলির হুমকি দেয়নি। পুলিশনেতা রাজনৈতিক নেতার মতো ভাষণ দেয়নি। ক্রিমিনালদের ছেড়ে দিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপ দিয়ে জেলখানা ভরে ফেলা হয়নি।
মিডিয়ার গলা কখনোই চেপে ধরা হয়নি। বিএনপি নেতৃত্ব বিশেষ করে তারেক রহমানের ওপর মিডিয়া নির্মম সমালোচনা করেছে। অনেক তিলকে তাল বানিয়েছে (প্রশাসনে যে জিনদের বসানো হয়েছে তাদের দিয়েও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত একটি অভিযোগও প্রমাণ করতে পারেনি)। তার পরেও প্রতিহিংসাবশত কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেল বন্ধ করা হয়নি বা মিডিয়ার জন্য বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়নি। টকশোওয়ালাদের ‘টকমারানী’ বলে গালি দেয়া হয়নি। তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেয়ার হুমকি দেয়া হয়নি। টকশো থেকে বের হওয়া মাত্র আক্রমণ করা হয়নি বা গ্রেফতার করা হয়নি। কাদের কাদের টকশোতে ডাকা হবে এবং টকশোর সেট কেমন হবে সেই নির্দেশ টিভি চ্যানেলগুলোকে কখনোই দেয়া হয়নি।
বিএনপির সময়ে একটি টিভি চ্যানেল বন্ধ করা হয়েছিল, তা-ও সুনির্দিষ্ট কিছু অনিয়মের কারণে। কিন্তু কোনো ভিন্নমতাবলম্বী পত্রিকার সম্পাদককে বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটক রাখা হয়নি। কোনো টিভি চ্যানেলের মালিককে (অতীতে পর্নোগ্রাফি প্রচারের অজুহাতে) গ্রেফতার করা হয়নি।
ওপরের এই কথাগুলো যদি সত্যি মনে করেন তবে সবার মুখ খুলতে হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্কেলটির কোন জায়গায় কার অবস্থান নির্মোহভাবে তা বলে দিতে হবে। দুই দলই খারাপ বললে চলবে না, কে কতটুকু খারাপ তা বলতে হবে।
সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলার সাহস রাখতে হবে। তা না হলে যে খাদে এসে পড়েছি, সেই খাদ থেকে বের হতে পারব না।
বিএনপি নিজের দলের সন্ত্রাসীকে র‌্যাব দিয়ে ক্রসফায়ারে দিয়েছে কিন্তু কখনোই বিরোধী দলের কোনো নেতা বা কর্মীকে শুধু রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে ক্রসফায়ারে দেয়নি। বিএনপির সময়ে র‌্যাব এ কারণেই দেশের মানুষের আস্থা অর্জন করেছিল। যদিও এভাবে বিনাবিচারে মানুষ মারার মূল ভাবনাটি (অপরাধী হলেও) কখনোই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না।
কাজেই সেই বিএনপি নেতৃত্ব যদি বলেন যে, আমরা প্রতিহিংসাবশত এই সরকারের কাজগুলোর পুনরাবৃত্তি করব না, তবে সহজেই এ দেশের জনগণ ও বিশ্বসংস্থাগুলো তাদের কথায় আস্থা স্থাপন করতে পারবে।
আজ এই কথাগুলো আরো স্পষ্ট করে বিএনপি নেতৃত্বকে বলে যেতে হবে। গতবার রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের যে ভুলত্রুটি হয়েছিল, তারও একটি সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করতে হবে এবং বিএনপি নেতৃত্বের এই উপলব্ধি জনগণের গোচরে বা অনুভবে আনতে হবে। কারেক্টিভ অ্যাকশনগুলোও স্পষ্ট করতে হবে। ইতোমধ্যে এ জাতির অনেক সময় ও শক্তি নষ্ট হয়েছে। আর সময় নষ্ট করা যাবে না।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও বর্তমান সরকার বিএনপির বেশ কয়েকটি উপকার করে দিয়েছে। এখন কে সুহৃদ আর কে সুযোগসন্ধানী সেটা নির্ণয়ের ফর্মুলা বের করা বিএনপির জন্য অনেক সহজ হয়েছে। স্বাধীনতার পরে অনেকটা সময় ধরে মতায় থাকায় এই কাজটি বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।
আরেকটি উপকার বিএনপির করেছে, তা হয়তো আওয়ামী লীগ কল্পনাতেও টানতে পারবে না। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এক ডজন (বিনা মেহনতি) ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এই এক ডজন ডক্টরেট ডিগ্রিলব্ধ আত্মবিশ্বাস তাকে নোবেল প্রাইজের দিকে দৃষ্টি ফেলতে প্রলুব্ধ করে। মনে হয় অনেক চেষ্টা তদবির করা হয়েছে। তার জন্য সৈয়দ আশরাফরা যে অনেক কিছু খেয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ ডক্টর ইউনূস নাকি একই জিনিস খেয়ে এই পুরস্কারটি কব্জা করেছেন। নোবেল প্রাইজের এই গোপন রহস্যটিও সৈয়দ বংশের সন্তান ও ব্রাহ্মণ ঘরের জামাই ঠিক সময়ে জেনে গিয়েছিলেন; কিন্তু কাজ হয়নি।
শেষমেশ আঙুর ফল টক বলে নিজেরা সান্ত্বনা নিলেও দেশের একমাত্র নোবেল লরিয়েটকে শান্তিতে থাকতে দেননি।
নিজের জন্য যা পারেননি, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য অনেকটাই ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। কারণ ভাই এরশাদের নয় বছর, পিসতুত ভাই উদ্দীনদের দুই বছর আর নিজের ছয় বছরের ওপরে স্বৈরশাসন একজন নেত্রীকে গণতন্ত্রের সংগ্রামে বিশ্বের প্রথম কাতারে ঠেলে দিয়েছে। অং সান সু চির চেয়েও তার এই সংগ্রাম কোনো ক্রমেই কম সমস্যাসঙ্কুল নয় । ব্যক্তিগত ত্যাগ ও ট্র্যাজেডিও কম নয়।
গণতান্ত্রিক ও শান্তিকামী বিশ্বের মনোযোগটি তার ওপর কেমন পড়েছে তাও বিশ্বসংস্থা ও বিশ্বশক্তির ইদানীংকালের নড়াচড়ায় তা স্পষ্ট হয়েছে। তার সব কিছুই রেকর্ড হচ্ছে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট থেকে সাংবাদিক হওয়া শফিক রেহমান একজন স্থপতির চেয়েও দ হাতে গণতন্ত্রের জন্য বেগম জিয়ার কষ্টের ম্যাপ তুলে ধরেছেন। তার সেই লেখায় কোনো মেদ বা তেল নেই। আছে শুধু মাপজোখ আর পরিসংখ্যান। যে মাপজোখ আর পরিসংখ্যান বিশ্বনেতাদের খুব প্রিয়।
কাজেই এক ইউনূসের নোবেল যতটুকু মনোকষ্টে ফেলেছে, সেখানে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অগত্যা আরেকটি পেয়ে গেলে সৈয়দ আশরাফদের বাকি জীবন ঘোরের ওপরই কাটাতে হবে।
পুরো লেখাটি যদি এদের চোখ না খোলে, তবে নিচের চুটকিটি খুলতে পারে। ঢাকার মিরপুরের এক সাবেক এমপি। খুব ছোট পজিশন থেকে আজ এত বড় হয়েছেন। তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশ করে একটি কথা প্রায়ই বলেন, ‘আবি দেখ, আল্লাহ যদি চুলে ধইরা আমাকে উপরে টাইন্যা তুলতে চায়, তোরা আমারে পায়ে ধইরা টাইন্যা নিচে নামাইতে পারবি না।’
minarrashid@yahoo.com

লোহালিয়া-বাউফল-দশমিনা সড়ক, পাঁচ কিলোমিটার অংশ খানাখন্দে ভরা

পটুয়াখালীর লোহালিয়া-বাউফল-দশমিনা সড়কের লোহালিয়া অংশের পাঁচ
কিলোমিটারে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কাঁকড়াবুনিয়া এলাকার ছবি l প্রথম আলো
পটুয়াখালীর লোহালিয়া-বাউফল-দশমিনা সড়কের লোহালিয়া অংশের পাঁচ কিলোমিটার খানাখন্দে ভরে গিয়ে যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নির্মাণের পর আর সংস্কার না হওয়ায় সড়কের এ দশা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, জেলা সদরের সঙ্গে দশমিনা ও বাউফল উপজেলার সড়ক যোগাযোগ সহজ করতে ২০০৫ সালে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ এই সড়ক নির্মাণ করে। এতে সড়কপথে দশমিনা ও বাউফলের সঙ্গে উপজেলা সদরের দূরত্ব অর্ধেক কমে যায়। এর আগে জেলা সদর থেকে দশমিনা যেতে ৪৭ কিলোমিটার এবং বাউফল যেতে ৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো।
বিকল্প এই সড়ক হওয়ার পর জেলা সদর থেকে দশমিনার দূরত্ব ২২ এবং বাউফলের ১৭ কিলোমিটারে এসে দাঁড়িয়েছে। সময় ও অর্থ সাশ্রয় হয় বলে ওই দুই উপজেলার মানুষের কাছে সড়কটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এক দশক আগে সড়কটি নির্মাণ করা হয়। এটির পটুয়াখালী সদরের লোহালিয়া থেকে কাশিপুর এলাকার পাঁচ কিলোমিটার অংশ ১০ বছরে একবারও সংস্কার করা হয়নি। এতে সড়কের পিচ ও খোয়া উঠে যানবাহন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতে সড়কটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
কাশিপুর এলাকার বাসিন্দা মোতাহার হোসেন বলেন, ২ মার্চ হঠাৎ বৃষ্টিতে সড়কটির গর্তে পানি জমে যায়। এ সময় যানবাহন চলাচল কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মোটরসাইকেল ও টমটমের চালকেরা নিজেদের উদ্যোগে ইট-বালু ফেলে গর্তগুলো ভরাটের চেষ্টা করেন।
দশমিনা উপজেলা শহরের ফয়েজুর রহমান জানান, তিনি প্রায়ই মোটরসাইকেল নিয়ে এই সড়ক দিয়ে জেলা শহরে যাতায়াত করেন। কিন্তু কাশিপুর অংশ এতটাই খারাপ যে চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই পাঁচ কিলোমিটারের জন্য এই পথে যানবাহন চলাচল বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী কাশিপুর এলাকার বাসিন্দা জসিম খান বলেন, বছরের পর বছর সংস্কার না করায় সড়কটি এখন ব্যবহারের অনুপযোগী। এটি সংস্কারে এলজিইডির কার্যালয়ে অনুরোধ জানানো হলেও কাজ হচ্ছে না। বর্ষার আগে সংস্কার না হলে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।
এলজিইডি পটুয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু সালেহ মো. হানিফ বলেন, আসলেই এটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সড়কটি মেরামত জরুরি। অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় এটি মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে শিগগিরই সড়কটি মেরামতের কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বাবা হত্যায় পুতিন রাজনৈতিকভাবে দোষী

রাশিয়ার বিরোধীদলীয় নেতা বরিস নেমৎসভের মেয়ে ঝানা নেমৎসভ তার বাবার হত্যার ঘটনায় দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনকে দায়ী করেছেন। সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘তিনি বিশ্বাস করেন, এ হত্যাকাণ্ডে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ‘রাজনৈতিকভাবে’ দোষী।’
সাবেক রুশ উপপ্রধানমন্ত্রী এবং উদাপন্থী নেতা নেমৎসভ গত ২৭ ফেব্র“য়ারি নিজের গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে পায়চারী করার সময় রাজধানীর মস্কোর ক্রেমলিনের কাছে আততায়ীদের গুলিতে নিহত হন। তিনি পুতিনের কড়া সমালোচকদের একজন ছিলেন। তবে পুতিন এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা করেছেন এবং খুনিদের খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে এর মধ্যে পাঁচজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃতদের একজন এ হত্যার দায় স্বীকারও করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। অবশ্য পরে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, জোরপূর্বক তার কাছ থেকে এই স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ঝানা বলেছেন, তার বাবার মিত্ররা এর আগে এ হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বলে অভিহিত করেছেন। তাদের সুরেই কথা বলেন তিনি। তার ভাষায়, ‘তিনি ছিলেন পুতিনের কড়া সমালোচকদের একজন। রাশিয়ায় তিনিই ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমতাধর বিরোধীদলীয় নেতা। তাকে হত্যা করার পর অন্য নেতারা সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। এখন তারা সবাই ভয় পাচ্ছেন।’ ঝানা আরও বলেছেন, ‘এখন আর রাইশয়ায় তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ এবং অভিজ্ঞ নেতা নেই যিনি রুশ সরকারের অন্যায় কাজের সমালোচনা করতে পারেন।’

প্রতিশোধস্পৃহারও কি কোনো সীমা থাকতে নেই? by সিরাজুর রহমান

সময়টা ১৯৬৯ সালের আগস্ট মাস। হঠাৎ করে বাজেট পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ায় বিবিসি আমাকে ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে দৃষ্টিপাতমূলক এক প্রস্থ অনুষ্ঠান নির্মাণের অনুমতি দেয়। তখন ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল না। ভারতের ভিসা পাওয়া যায়নি বলে প্রথমে পশ্চিম পাকিস্তানে জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের কয়েকটি সাক্ষাৎকার নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যাই। তত দিনে আগস্ট গড়িয়ে সেপ্টেম্বর হয়ে গেছে। অন্তত কারো কারো জন্য পটভূমিকার বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এর আগেই ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খানের পাকিস্তান সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমানকে বিচারে চড়িয়েছে। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিবাদ আন্দোলন যে ১৯৬৯-এ পাকিস্তানব্যাপী গণ-আন্দোলনে রূপান্তরিত হবে, সেটা তারা ভাবতে পারেনি। বলদর্পী আইয়ুব খান তার ‘ডিকেড অব ডেভেলপমেন্টের’ ভণিতা ছেড়ে ক্ষমতা প্রধান সেনাপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে তুলে দেন। দেশজুড়ে বলাবলি হচ্ছিল যে, ইয়াহিয়া খান অন্তত পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচন দিতে বাধ্য হবেন।
মুজিব ভাই আমাকে ভোরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে যেতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, ভাবী আমাকে নাশতা খেতে দেবেন। সাক্ষাৎকার রেকর্ড করার পর মাংসের ঝুরিভাজা আর পরোটার নাশতা খেতে খেতে আমরা গল্প করছিলাম। অনিবার্যভাবেই আলোচনার বিষয়বস্তু নির্বাচনের প্রসঙ্গে এসে পড়ে। আমি বললাম, তার জনপ্রিয়তা যেমন সর্বজনীন, তাতে পূর্ব পাকিস্তানে কে বিজয়ী হবেন, বলার অপেক্ষা রাখে না। মুজিব ভাই বললেন, জানিরে, পূর্ব পাকিস্তানে লোকে আমাকে ভোট দেবে, কিন্তু দেশের বাইরে কে আমাকে চেনে? বললাম, সেটা বড় সমস্যা নয়। লন্ডন সারা বিশ্বের মিডিয়া ক্যাপিটাল। আপনি লন্ডনে আসুন, বিশ্বমিডিয়ার সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দেবো।
কয়েক দিন পরই মুজিব ভাই ফোন করলেন। বললেন, নভেম্বর মাসে তিনি লন্ডনে আসবেন স্থির করেছেন। আমি এবং কয়েকজন পূর্ব পাকিস্তানি উচ্চশিক্ষার্থী মিলে বিশ্বমিডিয়ার সাথে তার ৪১টি সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম। প্রায়ই তাকে বলতাম, মিডিয়ার সাথে তিনি মন খুলে কথা বললে তার বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে। দেশে ফিরে গিয়ে তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতে বিশ্বমিডিয়াকে শেখ মুজিবুর রহমানের পরিচয় দিতে আমাদের খুব একটা সমস্যায় পড়তে হয়নি।
স্বপ্ন ও স্বাধীনতা
স্বাধীনতা সম্বন্ধে আমাদের স্বপ্ন দুর্ভাগ্যবশত সঠিক হয়নি। পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই। গণতন্ত্রের হত্যা এবং বাকশাল নামে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার জের ধরে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট একটা নিবিড় আঁধারে ডুবে গেল বাংলাদেশ। মুজিবের দুই মেয়ে হাসিনা ও রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দুই বোনকে দিল্লিতে এনে রাজনৈতিক আশ্রয় দেন। তাদের তত্ত্বাবধানের ভার দেয়া হয় ভারতের বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থা র-কে। দিল্লির সুশীলসমাজের সাথে তাদের যোগাযোগের সুযোগ বড় বেশি ছিল না।
এ দিকে, পরপর কয়েকটি রক্তঝরা সামরিক অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের কার্যকর ক্ষমতা হাতে পান। বহু প্রমাণ আছে যে, গোড়ার মুহূর্ত থেকেই তিনি হারানো স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সঙ্কল্প নিয়েছিলেন। হাসিনা ও রেহানাকে দেশে ফিরিয়ে আনার কূটনৈতিক উদ্যোগ তিনি কিছু দিনের মধ্যেই নিয়েছিলেন। শেষে তিনি পঞ্চম সংশোধনী মোতাবেক সংবিধানে নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল পুনরুজ্জীবিত করার পর আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাককে দিল্লি পাঠিয়ে দুই বোনকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের এই দুই নেতার দিল্লি সফরের কথা শেখ হাসিনা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু তার স্বামী, পরলোকগত পরমাণুবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ মিয়া তার স্মৃতিকথায় সে সময় দিল্লিতে ড. হোসেন ও আবদুর রাজ্জাকের শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন। সমস্যা এখানেই। নেতানেত্রীদের কেউ কেউ বাংলাদেশের ইতিহাসের অর্ধেক অস্বীকার করেন। অন্য অর্ধেককে বাঁকা চোখে দেখেন।  দেশে ফেরার পর সদ্য বৈধঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতারা শেখ হাসিনাকে দলনেত্রী নির্বাচিত করতে বিলম্ব করেননি। পরের বছর আওয়ামী লীগ থেকেই বিবিসিতে আমাকে জানানো হয় যে, নেত্রী শেখ হাসিনা লন্ডন সফরে আসবেন। স্থির করে ফেললাম, শেখ হাসিনাকে তার পিতার মতো বিশ্বমিডিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করব। প্রথমেই আমি তার সম্মানে বিবিসির বুশ হাউজের কেন্দ্রীয় বার্তাকক্ষে এক চা-চক্রের আয়োজন করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল, আওয়ামী লীগ নেত্রী বিবিসির সিনিয়র সাংবাদিকদের সাথে মনখোলা মতামত বিনিময় করবেন।
বুশ হাউজে হাসিনার সম্মানে চা-চক্র
শেখ হাসিনা প্রায় দুই ডজন সহচর নিয়ে বুশ হাউজে হাজির হলে আমরা হতাশ হয়েছিলাম। সহকর্মী জন রেনার ও আমি স্থির করলাম যে, আমরা দু’জন নেত্রীকে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্টুডিওতে নিয়ে যাবো এবং সেখানে সব বিষয়ে তার মতামত জানার চেষ্টা করব। প্রথমেই শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নেবেন জন রেনার। আলোচনার সূত্রপাত তিনি করেছিলেন ইংরেজিতে এভাবে : শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন। দলনেত্রী হয়ে আপনার ভালো লাগছে?
শেখ হাসিনা : (ইংরেজিতে) না, মোটেও ভালো লাগছে না। আমি রাজনীতি ভালোবাসি না, রাজনীতিকে ঘৃণা করি।
জন রেনার : (বিস্মিত হয়ে) তাহলে আপনি কেন রাজনীতিতে এলেন? কেন দলনেত্রী হতে গেলেন আপনি?
শেখ হাসিনা : (ক্রুদ্ধ, ইংরেজিতে) ওরা আমার বাবাকে খুন করেছে, আমার মাকে খুন করেছে, আমার ভাইদের খুন করেছে, তাদের জন্য কেউ এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলেনি। আমি তার প্রতিশোধ নেবো। প্রতিশোধ নেবো বলেই রাজনীতিতে এসেছি।
চোখে চোখে জনের অনুমতি নিয়ে স্টুডিও ম্যানেজারকে রেকর্ডিং বন্ধ করতে বলি। তারপর বাংলায় নেত্রীকে বললাম, আপনি দলনেত্রী হয়েছেন, আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রী হবেন আপনি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশের প্রত্যাশা অনেক। শুধু প্রতিশোধ নিতেই মানুষ কেন ভোট দিয়ে আপনাকে প্রধানমন্ত্রী করবে? তাদের সবার বাবা-মা তো খুন হয়নি! শেখ হাসিনা জবাব দেননি। কিন্তু আমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল না যে, এরপর আমার কোনো কথায় তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না।
প্রতিটি কাজের পেছনে প্রতিশোধস্পৃহা
সে মুহূর্ত থেকে আওয়ামী লীগের সব কথা ও কাজে প্রতিশোধস্পৃহার লক্ষণ খুবই প্রকট। দুই বোন দিল্লি থেকে ঢাকা এসেছিলেন ১৯৮১ সালের ১৭ মে। তার ১৩ দিনের মাথায় অত্যন্ত জটিল একটা সামরিক ষড়যন্ত্রে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। চট্টগ্রাম জেলার এক মাঠের মধ্যে যেভাবে তার লাশ লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল ধারণা করা স্বাভাবিক যে, তার পরিচয় বরাবরের জন্য গুম করে ফেলাটাই ছিল উদ্দেশ্য।
সে বছরের ২৯ ডিসেম্বর ঢাকায় শহীদ জননী জাহানারা ইমামের বোন-ভগ্নিপতি শামসুন্নাহার ও আবদুল আজিজের জ্যেষ্ঠ কন্যা শিরীনের সাথে আমার পুত্র সাইফুর রহমানের বিয়ে। বিবিসি আমাকে যাওয়ার অনুমতি দেবে না জানতাম। অগত্যা আমাকে বাদ দিয়েই বরযাত্রীরা ঢাকায় চলে গেলেন। কিন্তু অপূর্ব সুযোগ এসে গেল হঠাৎ। সেনাপ্রধান লে. জেনারেল এরশাদ সদ্য নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সাথে বিরোধ বাধিয়ে তুললেন জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের দাবি তুলে। আমাকে অবিলম্বে ঢাকা যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো। স্থির হলো, আমার সহকর্মী রিচার্ড অপেনহাইমারও কয়েক দিনের মধ্যেই আমার সাথে যোগ দেবেন।
রিচার্ড আর আমি রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের সাক্ষাৎকার নেই। বঙ্গভবনের প্রেস রুমে ১৯৮২ সালের ১৫ জানুয়ারি। সেখানে আরো উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতির প্রেস উপদেষ্টা দাউদ খান মজলিস আর তার সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল সাদিকুর রহমান চৌধুরী। শেরাটন হোটেলে নিজের কামরায় গিয়ে সবে বসেছি। টেলিফোন বাজল। একটা অপরিচিত ভারী গলা জানতে চাইল ভিআইপি (রাষ্ট্রপতি) তার সাক্ষাৎকারে আমাকে কী বলেছেন।
রাষ্ট্রপতির সাথে আমাদের কথাবার্তা এতই স্পষ্ট ছিল যে, কোনো কিছু গোপন করার প্রয়োজন বোধ করিনি। বললাম, রাষ্ট্রপতি বলেছেন মাত্র অল্প দিন আগে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে, সংবিধানের প্রয়োজন মিটেছে। লোকটি জিজ্ঞেস করলেন প্রেসিডেন্ট তো আপনাকে আরো বলেছেন যে, সেনাপ্রধানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠনের দাবি তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
আমি বললাম, হ্যাঁ, সে কথা তিনি আমাকে বলেছেন, কিন্তু আপনি জানলেন কী করে? হেসে বললাম, বঙ্গভবনের কার্পেটের কান আছে বলে তো শুনিনি। কলার টেলিফোনে বললেন, আপনি এই টেলিফোনের কাছেই থাকুন। আপনাকে আরেকটা ভিআইপি ইন্টারভিউ নিতে হবে। সারা দিন অপেক্ষা করার পর সন্ধ্যায় নতুন বেয়াই-বেয়ানের বাড়িতে খেতে গেছি। হোটেলে টেলিফোন নম্বর রেখে গিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর পরিচিত এক ব্যক্তি এলেন সেখানে। প্রস্তাবিত ভিআইপির প্রতিনিধি হয়ে এসেছেন বলে দাবি করলেন। আমার স্ত্রীর সহপাঠী ছিলেন, লন্ডনে আমাদের বাড়িতে বেড়াতেও এসেছিলেন। আরো পরিচয় দিলেন তিনি। তিনি সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদের ভগ্নিপতি। সেনাপ্রধান স্থির করেছেন, তার প্রকাশ্য বিবৃতি দেয়ার সময় হয়নি। ভগ্নিপতিকে পূর্ণ ব্রিফিং দিয়ে তিনি তার বক্তব্য আমাকে বুঝিয়ে বলতে পাঠিয়েছেন।
ভগ্নিপতি যা বললেন, তাতে রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। সেনাপ্রধান বলে পাঠিয়েছেন একটা জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের ব্যাপারে তিনি আপসবিমুখ; রাষ্ট্রপতি ও ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্তের ওপর এ কাউন্সিলের ভেটো ক্ষমতা থাকতে হবে। তার দাবি মেনে নেয়া না হলে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা স্বহস্তে তুলে নিতে বাধ্য হবেন। আমার জন্য বিশেষ সমস্যা ছিল, তার বক্তব্য অবশ্যই বিবিসি থেকে প্রচারের অনুরোধ জানিয়েছেন ভিআইপি। অনেক ভেবেচিন্তে পরের দিন ভোরের ফ্লাইটে কলকাতা চলে যাই। ঢাকার পরিবর্তে কলকাতা থেকে এই স্পর্শকাতর প্রতিবেদন পাঠানো বেশি নিরাপদ বোধ করেছিলাম।
ঢাকপেটানো সামরিক অভ্যুত্থান
পরের ইতিহাস সবারই জানা। দুই মাস পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থান করে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। বিএনপির নতুন অনভিজ্ঞ নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া অবিলম্বে সেনা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করলেও দেশের প্রাচীনতম ও অধিকতর শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে স্বাগত জ্ঞাপন করেছিল। আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণে তিনি অখুশি হননি। আওয়ামী লীগের পত্রিকা দৈনিক বাংলার বাণী প্রথম সম্পাদকীয় নিবন্ধে সামরিক সরকারের সাফল্য কামনা করে।
এ কথা কমবেশি সবারই স্বীকার করে যে, সামরিক স্বৈরতন্ত্র গেড়ে বসতে পারে গণতন্ত্রের শেকড় উপড়ে ফেলে। স্বৈরতন্ত্র আর গণতন্ত্র কখনোই একসাথে টিকে থাকতে পারে না। আর স্বৈরতন্ত্র যত বেশি দিন বজায় থাকে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা ততই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এরশাদের অভ্যুত্থানে গণতন্ত্রের যে ক্ষতি হবে, রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা যে অনেক পিছিয়ে যাবে, সে সম্পর্কে আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো সন্দেহ ছিল না। তা সত্ত্বেও সভানেত্রীসহ আওয়ামী লীগ এরশাদের স্বৈরতন্ত্রকে স্বাগত করেছিল। ওয়াকিবহাল মহলের অভিমত, মূলত আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনেই এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্র প্রায় নয় বছর স্থায়ী হতে পেরেছিল। এর একটিমাত্র ব্যাখ্যাই সম্ভব। রাষ্ট্রের এবং গণতন্ত্রের ক্ষতি হবে জেনেও প্রতিশোধস্পৃহা থেকে আওয়ামী লীগ এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনে ইন্ধন জুগিয়েছিল।
ছাত্রজনতার ঐক্যবদ্ধ দাবিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও খালেদা জিয়ার সাথে একযোগে স্বৈরতন্ত্র উচ্ছেদের আন্দোলনে যোগ দিতে বাধ্য হয়। এরশাদের পতন ঘটে। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দৃষ্টান্তমূলক নির্বাচনের আয়োজন করেছিলেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আরো একটা অপূর্ব সুযোগ এসেছিল। এমনকি সে নির্বাচনে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাও অনেকেই বাস্তব মনে করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের দুই দিন আগে ১৯৯১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে টেলিভিশনে তার ৪৫ মিনিট স্থায়ী বক্তৃতায় অর্থহীন বিষোদগার প্রচারের পর সারা বিশ্বের পর্যবেক্ষকেরা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন।
সম্ভাবনার অঙ্কুরেই বিনাশ
আসলে কী বলেছিলেন শেখ হাসিনার সে রাতের টেলিভাষণে? বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, সে সম্ভাবনাই সেদিন নস্যাৎ হয়ে যায়। এর পুনরাবৃত্তি আরো অনেকবার ঘটেছে। এখন আমরা জানি, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনটা ছিল একটা দেশী-বিদেশী-সামরিক-মিডিয়া আঁতাতের ফসল। যা-ই হোক, সে নির্বাচনে শেখ হাসিনা বিরাট জয় পেয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে তার নিজের কিংবা দেশের কী লাভ হলো? সংসদের ফোরে দাঁড়িয়ে বেগম জিয়া ও জিয়াপরিবারের বিরুদ্ধে গালিগালাজের কোনো প্রয়োজন ছিল কি? তাতে ব্যক্তি, রাজনীতিক, এমনকি মুজিবকন্যা হিসেবেও তার সামান্যতম মর্যাদা বৃদ্ধি ঘটেছে কি? এর বদলে তখন থেকেই যদি তিনি সুশাসন ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দিতেন তাহলে এত দিনে জাতীয় পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যেতে পারত, জাতি সম্ভবত ভোট দিয়েই তাকে প্রধানমন্ত্রী করে রাখতে চাইত। কিন্তু সেটা কি তাদের কাম্য ছিল? আমার সন্দেহ হয়। প্রায়ই মনে হয়- ক্ষমতা, দেশ শাসন, এমনকি রাজনীতিক হিসেবে দেশের ও বিশ্বের সম্মান ও মর্যাদা আওয়ামী লীগের কাম্য নয়।
এরশাদের সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে স্বাগত জানিয়ে সেই যে শুরু করেছিলেন, সেই যে ভূতটাকে তিনি বোতল থেকে বের করে দিয়েছিলেন, তার হাত থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় আজো তিনি খুঁজে পাননি। তার দল ও সরকারের কাজের মধ্যেই কোথায় যেন জাতিকে শাস্তি দেয়ার, প্রতিশোধ নেয়ার একটা বাসনা প্রচ্ছন্ন থাকে।
যে হাত খেতে দেয় সে হাত কামড়ানো
ভাগ্যহত বাংলাদেশও মাঝে মাঝে সৌভাগ্যের মুখোমুখি হয়েছিল। একটা বঞ্চিত ও নির্যাতিত জাতি সংগ্রাম করে স্বাধীন হয়েছে, শত প্রতিকূলতা জয় করেও জাতি-সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াতে চেয়েছে। সারা বিশ্বের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে সে প্রয়াস দেখেছে। সাহায্য, বাণিজ্য ইত্যাদি নিয়ে তারা এগিয়ে এসেছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশ বাংলাদেশের মতো এত ঋণ, অনুদান, বাণিজ্যিক সুবিধা পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। কিন্তু তাতে চূড়ান্ত লাভ আমাদের কী হয়েছে? পদ্মায় সেতু তৈরির মূলধন সংগ্রহ করতে আমাদের অসুবিধা হয়নি। বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য দাতা দেশ ও সংস্থা খুবই সহজ শর্তে আমাদের ঋণ দানের প্রস্তাব দিয়েছিল। আমরা যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮ দেশে শুল্কমুক্ত তৈরী পোশাক রফতানির বাজার পেয়েছিলাম। সে সুযোগ নষ্ট না করলে পোশাক রফতানির ব্যাপারে আমরা এত দিনে বিশ্বের সেরা দেশে পরিণত হতে পারতাম। কিন্তু সেসব সুযোগ আমরা হেলায় নষ্ট করেছি। পোশাক রফতানির জিএসপি সুবিধা আমরা হারিয়েছি ক্রেতাদেশগুলোর সাথে অহেতুক বিবাদ ও বিতর্ক করে। আমদানিকারক দেশগুলো এ শিল্পের উন্নতির যেসব প্রস্তাব করেছিল, তাতে কার ক্ষতি হতো? সরকারের? কারখানা মালিকদের? পোশাক শ্রমিকদের? কিংবা বাংলাদেশের? এখন যে এ শিল্প ধ্বংস হতে বসেছে, এ বাজার যে আমাদের হাতছাড়া হতে চলেছে, তাতে লাভবান হচ্ছে কে? আমাদের সাফল্যে যারা ঈর্ষাতুর ছিল তারা। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের ন্যায্য কিছু অভিযোগ ছিল। সেগুলো সম্বন্ধে তদন্তে সরকারের অমন প্রবল আপত্তির কারণ কী? অথচ সে জন্য আমরা যা হারিয়েছি তার তুলনা হয় না। সেই কবে পদ্মা সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল শুরু হয়ে যেতে পারত। এখন সরকার বলছে বটে যে, নিজেদের সম্পদ থেকে তারা সেতু তৈরি করবে। কিন্তু তাতে মোট ব্যয় যে কত গুণ বেড়ে যাবে, হিসাব করে দেখেছেন কেউ? প্রায়ই শুনছি সেতুর কাজ শুরু ‘হচ্ছে, হলো’ বলে। সর্বশেষ, পত্রিকায় পড়লাম সেতুর জন্য দুই ষাঁড়, দুই পাঁঠা আর দুই মোরগ ‘উৎসর্গ‘ (বলি) দেয়া হয়েছে, ‘কোরবানি’ দেয়ার কথা কেউ বলছেন না। আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য আর ধর্মীয় সংস্কৃতিও এখন আমরা ভুলতে বসেছি।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব, মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, চীন-জাপানসহ বহু দেশের সরকার-প্রধান কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বাংলাদেশে এসেছেন এক হাতে সাহায্যের ডালি আর অন্য হাতে বাংলাদেশে শান্তি ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে। তাদের কথা আমরা শুনিনি। প্রত্যেককে আমরা অপমান করেছি। অবশিষ্ট ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু দিল্লিও এখন গণভবনের ওপর নাখোশ মনে হচ্ছে। ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরটিও নিশ্চয়তামূলক নয়।
স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে প্রতিশোধ?
কিছু দিন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলাম। বাংলাদেশের দৈনন্দিন ঘটনাবলির সাথে যোগাযোগ রাখা সম্ভব ছিল না। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এসে শুনি- মিডিয়ায় প্রশ্ন উঠছে, দুই বাংলা এক হয়নি কেন? কী অদ্ভুত আর বিস্ময়কর প্রশ্ন? সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে কেন? চাঁদকে কেন আমরা রাতের আকাশেই ভালো দেখি? কারণ কী? কারণ এই যে সুদূর অতীতে কিছু প্রাকৃতিক কার্যকারণ ঘটেছিল। দুই বাংলা এক হয়নি কেন? এসব প্রশ্নও উঠেছিল অতীতে; ১৯৪৬-৪৭ সালে। মীমাংসা তখনই হয়ে গেছে। দুই বাংলা এবং ভারতবর্ষ অভিন্ন থাকার সুযোগ উপমহাদেশের মানুষকে দেয়া হয়েছিল। সে সুযোগের তারা সদ্ব্যবহার করেনি বলেই দেশ ভাগ হয়েছে এবং সে সঙ্গে বহু আনুষঙ্গিক ঘটনা। সে প্রশ্ন এখন কেন? যে যার দেশ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলেই তো সমাধান হয়ে যায়? পশ্চিমবঙ্গ তো ভারতেই আছে, কিন্তু অবশিষ্ট ভারত কি পশ্চিমবঙ্গকে অথবা পশ্চিমবঙ্গ কি অবশিষ্ট ভারতকে নিয়ে সন্তুষ্ট? উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতবোন নামে পরিচিত রাজ্যগুলোও পশ্চিমবঙ্গ অথবা অবশিষ্ট ভারতের সঙ্গে সদ্ভাবে আছে কি? তাহলে অর্ধশতাব্দী ধরে কেন তারা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করছে? দুই বাংলা এক থাকলে যে মমতা ব্যানার্জি আর শেখ হাসিনা পরম সৌহার্দ্যরে সঙ্গে সে রাজ্য শাসন করতেন, তারই বা নিশ্চয়তা কী?
বাংলাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৬-১৭ জন কূটনীতিকের উদ্যোগের খবর পেলাম হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে। কিছুটা আশাবাদীও হয়েছিলাম হয়তো। তাদের প্রস্তাবে গ্রহণযোগ্য কিছু দিক ছিল। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের বিশেষ প্রতিনিধি অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো গত বছর যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাতেও গ্রহণযোগ্য দিক ছিল। অনুসন্ধান করা হলে এসব প্রস্তাবের মধ্য থেকে সমাধান অবশ্যই পাওয়া যেত। ঢাকা থেকে এক বন্ধু ফোনে বলছিলেন, দেশের মানুষ কিছুটা আশাবাদী কূটনীতিকদের প্রস্তাব নিয়ে। এর পরেই কিন্তু মুখ খুললেন শেখ হাসিনা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তিনি ঘোষণা দিলেন, বাংলাদেশের মাটিতে খালেদা জিয়ার স্থান হবে না। কেন হবে না? বাংলাদেশ কি এতই ছোট দেশ? নাকি বিশেষ কোনো নেতা-নেত্রী বা দল বাংলাদেশের মালিক?
প্রধানমন্ত্রী কি ভয় করছিলেন যে কূটনীতিকদের চেষ্টা সফল হলে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে না? সে জন্যই কি আরেক প্যাঁচ মোচড় দেয়া হলো? ৩৫ বছর ধরে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। কী লাভ হয়েছে তাতে? দেশের অগ্রগতি হচ্ছে না। হাজারে হাজারে মানুষ খুন হয়েছে। খুন কে করেছে, জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। সরকার ও আওয়ামী লীগ এক কথায় বলবে, খালেদা জিয়া ও বিএনপি। সকাল-সন্ধ্যা খালেদা জিয়াকে খুনি না বললে পেটের ভাত হজম হয় না।
দেশ-বিদেশের মানুষ জানে অন্য কথা। ‘ক্রসফায়ার’ আর ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কথাগুলো এখন কদর্য ও নিষ্ঠুর রসিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গুম-খুনগুলো কারা ঘটাচ্ছে, সবাই জানে। ব্রিটিশ সরকার এখনো ইলিয়াস আলীর মুক্তির জন্য এ সরকারের ওপর চাপ দিয়ে যাচ্ছে।
ক্ষমতালাভের গোড়ার দিকে জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সরকার বিদেশীদের ‘ইমপ্রেস’ করার চেষ্টা করেছিল; দাবি করেছিল যে, তারা বাংলাদেশ থেকে আলকায়েদা ও ইসলামি সন্ত্রাস দূর করার চেষ্টা করছে সুতরাং সবার উচিত তাদের সমর্থন দেয়া। অভিজিৎ হত্যা নিয়ে নতুন চাল চেলেছেন তারা। বিদেশীদের তারা বলতে চাইছেন, বাংলাদেশে নতুন করে ইসলামি সন্ত্রাস দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ গদিতে না থাকলে সে সন্ত্রাস দূর হবে না।
ইরাকের আইএস বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু কোনো দেশের কোনো সরকার এ প্রচারণার ফাঁদে পা দিচ্ছে বলে মনে হয় না। পুলিশ যেখানে হাজির ছিল সেখানে কী করে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারল, সে ব্যাখ্যাই সবাই চায়। অভিজিতের বাবা বলেছেন, ফারাবীকে গ্রেফতার করে কী লাভ হলো, সে তো সে চারুকলাতেই ছিল না।
আমরা জানি ১৯৮১ সালে যে প্রতিশোধস্পৃহাকে বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে ছেড়ে দেয়া হয়েছে, দেশের লোকসান এবং বিভিন্ন খুনের জন্য সেটাই দায়ী। কিন্তু সেই স্পৃহার কি সীমা-পরিসীমা থাকতে নেই?
লন্ডন, ০৯.০৩.১৫
serajurrahman34@gmail.com

বাবার ‘কারাগারে’ মাদকাসক্ত ছেলে

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামে মাদকাসক্ত
ছেলেকে শিকল দিয়ে বেঁধে রেখেছেন বাবা। ছবি -প্রথম আলো
টাঙ্গাইলের সখীপুরে মাদকাসক্ত ছেলে বিল্লাল হোসেনকে (৩৭) নেশার জগৎ থেকে ফেরাতে না পেরে নিজের ঘরে দুই মাস ধরে শিকলে বেঁধে রেখেছেন বাবা মুক্তিযোদ্ধা হাছেন আলী। বিল্লালের বাড়ি উপজেলার কচুয়া বেপারিপাড়া গ্রামে।
হাছেন আলী জানান, মাদকের টাকা না পেলে বিল্লাল বাড়িঘর, থালা-বাটি ভেঙে ফেলে। মাঝেমধ্যে তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে মারধর করে। এলাকায় চুরি হলে সবাই বিল্লালের দিকে অভিযোগ করে। বিল্লালের অত্যাচারে ওর স্ত্রী দুই সন্তান রেখে তালাক দিয়ে চলে গেছে। উপায়ান্তর না পেয়ে অবশেষে ছেলেকে শিকলে বেঁধে রাখার এ পথ বেছে নিয়েছেন হাছেন আলী।
গতকাল বৃহস্পতিবার কচুয়া গ্রামের ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বিল্লালকে একটি ঘরে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। প্রতিবেশীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে বিল্লাল গাঁজা ও হেরোইনে আসক্ত। নেশা থেকে ফেরাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন তাঁর বাবা। কয়েক বছর আগে পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়েছিল। নয় মাস জেল খেটে ছয় মাস আগে তিনি বাড়ি ফেরেন। এরপর আগের মতোই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন। ওই গ্রামের বাসিন্দা আক্কাছ আলী জানান, ছেলের কারণে বৃদ্ধ বয়সেও ওই মুক্তিযোদ্ধা দুই নাতি-নাতনিসহ পাঁচ সদস্যের অভাবী সংসারের অভাব ঘোচাতে যুদ্ধ করেই যাচ্ছেন। হাছেন আলী গ্রামে ফেরি করে সরিষার তেল বেচে ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা দিয়ে সংসার চালান।
সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বজলুর রশীদ বলেন, উপজেলাকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশ সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে। বিল্লাল ও আবুর ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশের আবদার! by সোহরাব হাসান

৫ মার্চ প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে পুলিশ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবটিতে আইনের অধিকাংশ ধারার পরিবর্তন ও বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। পুলিশ বিভাগের দাবি, নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলার অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন বেসামরিক সংস্থার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন এর ফলে বাধাগ্রস্ত হবে। এ আইনের কারণে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ, অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম থেকে জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকে যায়। পুলিশ বিভাগের এই দাবি মোটেই ঠিক নয়। বরং আইনটি বহাল থাকা সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বিরোধী দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে ‘অবারিত’ মামলা করে যাচ্ছে এবং অনেককে দফায় দফায় রিমান্ডেও নিচ্ছে। এ কথাও সত্য নয় যে, এই আইনের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জনগণের জানমালের হেফাজত দিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সারা দেশে বিরোধী দলের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে বেশুমার মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের কারণেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর প্রতি মানুষ আস্থা হারাচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, সরকার কাউকে ধরে আনতে বললে তারা বেঁধে আনে। বিএনপি-জামায়াতের আমলে কানসাট কিংবা শনির আখড়ার কথা আমরা ভুলে যাইনি। কিংবা সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ঘটনাও।
আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘জনজীবনে নিরাপত্তা বিধানে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত, আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলার’ অঙ্গীকার করা হয়েছিল। জনগণ আশা করেছিল, ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াতের পুরোনো পথে হাঁটবে না এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যুগোপযোগী করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। তারা এমন একটি আইন করবে, যাতে নিরাপত্তা হেফাজতে কেউ নির্যাতন ও হয়রানির শিকার না হন। কিন্তু সেটি যখন হয়নি, তখন সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী (বর্তমানে আন্তর্জাতিক সংসদ ইউনিয়নের সভাপতি) নবম জাতীয় সংসদে একটি বেসরকারি বিল আনেন, যার লক্ষ্য ছিল নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সনদের কার্যকারিতা দেওয়া। ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই বিলটি পাস হয়। এই বিলের প্রেক্ষাপটটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সাবের হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্লেট-গ্লাস চুরির মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করে এবং তাঁকে রিমান্ডে নেয়। সে সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী দলের বহু নেতা-কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানো হয়েছিল। এমনকি ভিন্নমতের লেখক-বুদ্ধিজীবীরাও সরকারের জিঘাংসার শিকার হয়েছিলেন। ময়মনসিংহের সিনেমা হলে বোমা হামলা করেছিল জঙ্গিবাদীরা। আর এই ঘটনার দায়ে সরকার গ্রেপ্তার করে ও রিমান্ডে নেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ও লেখক শাহরিয়ার কবিরকে।
আবার সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতা একইভাবে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের শিকার হয়েছিলেন (বর্তমান সরকারের আমলে সেই অপসংস্কৃতি রহিত হয়েছে ভাবার কারণ নেই)।
বিল পেশের সময় এর উদ্দেশ্য ও কারণ ব্যাখ্যাসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, ‘ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার মানুষের মৌলিক মানবাধিকার। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব এবং সংবিধানের সকল নাগরিকের এই অধিকার সংরক্ষিত আছে।…কিন্তু রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যারা আইনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা ভুলে যায়, ফলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। জনগণকে বিভিন্ন অজুহাতে সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের মাধ্যমে এবং পুলিশ বাহিনীর মাধ্যমে নির্যাতন করা হয়। বিভিন্ন সময়ে আইনের হেফাজতে রেখে নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতন করা হয়। এমনকি নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে অহরহই।
সাধারণ মানুষের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে, আইনের শাসন সুরক্ষিত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে, সাধারণ মানুষকে সরকারি প্রশাসনযন্ত্র ও পুলিশের বেআইনি আচরণ, অত্যাচার-নির্যাতন থেকে রক্ষাকল্পে ও সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের সুবিধা নিশ্চিত করতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে এ বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে।’
বর্তমান পুলিশপ্রধান অভিযোগ করেছেন, বিলটি নিয়ে সংসদে যেভাবে আলোচনা হওয়া দরকার, সেভাবে হয়নি। সংসদীয় কমিটিতে যায়নি। সংসদীয় কমিটিতে না পাঠিয়ে কোনো বিল সংসদে পাস করার নজির নেই। এসব উদ্ভট কথাবার্তার মানে কী? প্রকৃত ঘটনা হলো বিলটি নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে সাত দফা আলোচনা হয়েছে। সেই কমিটির সভাপতি ছিলেন সাবেক মন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু এবং সদস্য আ স ম ফিরোজ, নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, হাফিজ আহমেদ মজুমদার, জুনাইদ আহ্মেদ পলক, মুহিবুর রহমান মানিক, আবদুল হাই ও সৈয়দা আশরাফী পাপিয়া। কমিটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, আমীর-উল ইসলাম, আবদুল বাসেত মজুমদার, সুলতানা কামাল, আদিলুর রহমান প্রমুখের মতামত নিয়েছে। এরপর সেটি ভেটিং বা ছাড়পত্রের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র ছাড়া সরকারি–বেসরকারি কোনো বিল সংসদে অনুমোদিত হতে পারে না।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর একটি নির্যাতনবিরোধী সনদ গ্রহণ করে। যার শিরোনাম ছিল নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা অমর্যাদাকর আচরণ অথবা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সনদ (ইউনাইটেড নেশনস কনভেনশন অ্যাগেইনস্ট টর্চার অ্যান্ড আদার ক্রুয়েল ইন হিউম্যান অব ডিগ্রেডিং ট্রিটমেন্ট অর পানিশমেন্ট)। বাংলাদেশ এই সনদের স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে নির্যাতনবিরোধী ওই আইন প্রণয়ন করতে বাধ্য।
এখন দেখা যাক আইনে কী আছে এবং পুলিশ বিভাগ কী কী সংশোধনী চাইছে। আইনে হেফাজতে মৃত্যু বলতে সরকারি কোনো কর্মকর্তার হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু, অবৈধ আটকাদেশ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গ্রেপ্তারের সময়ে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু বোঝানো হয়েছে। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কেবল সরকারি কর্মকর্তার হেফাজতে মৃত্যু অথবা গ্রেপ্তারের সময় ফৌজদারি কার্যবিধি এবং অন্য কোনো প্রচলিত আইনের বিধানের অধীনে কৃতকাজ ব্যতিরেকে মৃত্যু বোঝানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বলতে এ আইনের অধীনে বা তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারও ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, তাকে বোঝাবে। আইনে থাকা ‘উদ্বিগ্ন কারও ওপর নির্যাতন করা হয়েছে’ অংশটি সংশোধনীতে বাদ দেওয়া হয়েছে। আইনে নির্যাতন বলতে শারীরিক ও মানসিক দুটোই বোঝানো হয়েছে। কিন্তু সংশোধনীতে মানসিক নির্যাতন বাদ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আইনটি ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮-এর বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ এই কার্যবিধি প্রণয়নের পর বিভিন্ন দেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানুষের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে বহু আইন হয়েছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের পুলিশ সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ফৌজদারি কার্যবিধির দোহাই দিচ্ছে।
আইনে বলা হয়েছে, আদালতের সামনে কোনো ব্যক্তি যদি অভিযোগ করেন যে তাঁকে নির্যাতন করা হয়েছে, তাহলে আদালত ব্যক্তির বিবৃতি লিপিবদ্ধ করে সেই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তির নির্দেশ দিতে পারবেন। পুলিশের সংশোধনীতে থানা বা ম্যাজিস্ট্রেট শব্দটি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেটের বিষয়টি না হয় মানা গেল। কিন্তু থানায় পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে যে তার প্রতিকার মিলবে তার ভরসা কী?
এই আইনের অধীনে সব অপরাধ অ–আপসযোগ্য ও অজামিনযোগ্য বলা হয়েছে। কিন্তু পুলিশের প্রস্তাবে অপরাধ জামিনযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনের ১১(৪) ধারায় আছে, কোনো মামলা নিষ্পত্তিকালে আদালত প্রয়োজনে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্যূন সাত দিনের অন্তরীণ আদেশ দিতে পারবেন। পুলিশ এটির বিলুপ্তি চেয়েছে। আইনে আছে, কোনো ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হলে অন্যূন পাঁচ বছর সশ্রম জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের কথা আছে। কিন্তু সংশোধনীতে সর্বোচ্চ পঁাচ বছর ও সর্বনিম্ন দুই বছর জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ তারা দণ্ড লঘু করতে তৎপর।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো আইনে যেখানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বলতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কাস্টম, ইমিগ্রেশন, অপরাধ তদন্ত বিভাগ, বিশেষ শাখা, গোয়েন্দা শাখা ইত্যাদির কথা বলা আছে; সেখানে সংশোধনীতে এলিট ফোর্স হিসেবে পরিচিত র্যাব, অপরাধ তদন্ত বিভাগ, বিশেষ শাখা ও গোয়েন্দা শাখার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। একই যাত্রায় দুই ফল হতে পারে না।
আরেকটি উদ্বেগজনক প্রস্তাব হলো পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হলে সেই মামলার শাস্তির অর্ধেক বাদীকে ভোগ করতে হবে। এটি ফরিয়াদির প্রতিকার চাওয়ার পথ অনেকটাই রুদ্ধ করবে। অন্যদিকে এই প্রস্তাবটি যদি খোদ পুলিশ বিভাগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তাহলে কতজন পুলিশ সদস্য জেলখানার বাইরে এবং কতজন ভেতরে থাকবেন, সেটি বলা কঠিন।
পুলিশের এসব প্রস্তাব কি ভীতি বা আতঙ্কেরই বহিঃপ্রকাশ নয়? আসামি ধরার সময় এবং ধরার পর যে তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চলে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। আর যদি সেটাই না হবে, তাহলে পুলিশের বাড়তি আইনি সুরক্ষার প্রয়োজন পড়ল কেন? কোনো সভ্য দেশই এই অদ্ভুত আবদার মেনে নিতে পারে না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

কালক্ষেপণের খেসারত- প্রকল্প বাস্তবায়নে দক্ষতা বাড়াতে হবে

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে কালক্ষেপণের কারণে গত এক বছরে সরকারের প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা গচ্চা গেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে এ তথ্য পেয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন না হলে এর ব্যয় বেড়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। কখনও তা কয়েক গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। আমাদের মতো স্বল্প সম্পদের দেশে এ বিশাল পরিমাণ অর্থের অপচয় কোনোমতেই কাম্য নয়। তারপরও প্রতিবছর প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের কোনো প্রয়াসও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এটি দুর্ভাগ্যজনক।
বস্তুত প্রতিবছর সরকার মহাআড়ম্বরে ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করে থাকে এডিপি। তবে শেষ পর্যন্ত গৃহীত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যায় লেজেগোবরে অবস্থা। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্পের ত্র“টি-বিচ্যুতিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অদক্ষতা ও অবহেলা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, সময়মতো অর্থ ছাড় না করা, সর্বোপরি দুর্নীতি-অনিয়ম-অব্যবস্থা ইত্যাদি কারণে অনেক প্রকল্প অর্ধসমাপ্ত অথবা অসমাপ্ত থেকে যায়। অনেক প্রকল্প ঘিরে পুকুর চুরির অভিযোগও আছে। আবার অর্থবছরের শেষপ্রান্তে এসে তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের কাজ শেষ করায় কাজ মানসম্মত হয় না। এ সমস্যাগুলো দূর করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনার একটি বড় কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ। এ ধরনের প্রকল্প মূলত স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন হওয়ায় এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয় বেশি। এ কারণে এডিপির আকার বড় হয়; কিন্তু সময়মতো বাস্তবায়িত হয় না। প্রকল্প গ্রহণে রাজনৈতিক বিবেচনা অগ্রাধিকার পাওয়ার আরেকটি নেতিবাচক দিক হল- এক্ষেত্রে এডিপির সিংহভাগ বরাদ্দ দেয়া হয় ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের এলাকার উন্নয়নে। সেক্ষেত্রে অন্য এলাকাগুলো বঞ্চিত হওয়ার আশংকা থেকে যায়। স্বভাবতই এর ফলে দেশে সৃষ্টি হয় উন্নয়ন বৈষম্য। কাজেই এ প্রবণতা বন্ধ হওয়া জরুরি।
এডিপির প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিবছরই কিছু জটিলতার সৃষ্টি হয়। প্রায় প্রতিবছরই এডিপিতে কাটছাঁট করা হয়- সরকারের ভাষায় যাকে বলা হয়ে থাকে সংশোধন। মূলত বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর অদক্ষতাই এর কারণ। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। বাস্তবায়ন কম হওয়ার ফলে বৈদেশিক সাহায্যের ছাড়ও কমে যায়। এ বাস্তবতায় এডিপির অর্থায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গৃহীত প্রকল্পগুলোয় মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি ও পরিবীক্ষণ প্রয়োজন। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে এডিপির যথাযথ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এর ওপর সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতাও অনেকাংশে নির্ভরশীল। কাজেই সরকার এডিপি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণগুলো বিবেচনায় নিয়ে তা দূর করার উদ্যোগ নেবে, এটাই কাম্য।

ঈশান কোণে মেঘ, উত্তর-পূর্বে অস্থিরতা by মাসুম খলিলী

এক.
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের ভারতীয় রাজ্যগুলো একেবারে কাছে হলেও এসবের অনেক খবর কদাচিৎ আমাদের কাছে আসে। উত্তর-পূর্বের সাত বোন রাজ্যের সবচেয়ে দূরের রাজ্যটির নাম অরুণাচল প্রদেশ। প্রতিবেশী চীনের সাথে সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ সীমান্ত রাজ্যগুলোর একটি। এই রাজ্যটির সীমান্তবর্তী দুই হাজার কিলোমিটার এলাকাকে চীন মনে করে তার দক্ষিণ তিব্বতেরই অংশ। ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলের যেসব চুক্তি বলে ভারত এই অঞ্চলের অধিকার দাবি করে তার কোনোটিরই স্বীকৃতি দেয় না বিশ্বের এখনকার অন্যতম পরাশক্তি দেশটি। চীনা মানচিত্রেও সেটিকে দেশটির অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়। সেখানকার অধিবাসীদের দেয়া হয় আলাদাভাবে ভিসা। এ নিয়ে মাঝে মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে সৃষ্টি হয় উত্তেজনা। এই উত্তেজনা নতুন করে চাঙ্গা হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদির সাম্প্রতিক অরুণাচল সফরে। গত ২০ ফেব্রুয়ারি মোদি অরুণাচলের রাজধানী ইটানগরে যান সেখানকার ২৯তম রাজ্য প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তিনি সেখানে নহরলগুন থেকে নয়াদিল্লি পর্যন্ত একটি এক্সপ্রেস ট্রেনের উদ্বোধনও করেছেন।
এর আগে ড. মনমোহন সিংয়ের অরুণাচল সফরের সময়ও প্রতিবাদ জানিয়েছিল চীন। এবারো যে মোদির সফরে প্রতিবাদ জানাবে সেটিই ছিল স্বাভাবিক। যথারীতি হয়েছেও সেটি। আর এই প্রতিবাদের ভাষাও আগের চেয়ে বেশখানিকটা চড়া। চীনের আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের সবটা দেশটির নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেন না। এবার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের লেখায়ও এর প্রকাশ ঘটে। সরকার নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় মোদির অরুণাচল সফর নিয়ে এক কড়া নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ‘যে অনুষ্ঠানেই নরেন্দ্র মোদি বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় আনুষ্ঠানিক সফরে যান না কেন তা চীনের পায়ে পা দেয়ার মতো এবং এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে প্রভাবিত করবে।’ এতে বলা হয়, ‘মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলে গেলেন, চীন-ভারত সীমানা বিরোধের ‘আউট অব বক্স সমাধান’ করা হবে আর এখন চীনের তিব্বতি ভূখণ্ডে একতরফাভাবে ঘোষণা করা অরুণাচল রাজ্যে মোদি সফর করছেন। এ সফর চীনের তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।’
চীনের স্পষ্ট কথা হলো, ‘কথিত রাজ্যটির চার হাজার কিলোমিটার সীমানার মধ্যে দুই হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ তিব্বতের অংশ। সেখানে মোদির সফরের পেছনে যেমন অনেক কারণ রয়েছে তেমনিভাবে সেখানে সফর না করার কারণ তার চেয়েও অনেক বেশি ছিল।’ মার্চে অনুষ্ঠেয় দুই দেশের মধ্যকার ১৮তম সীমান্ত আলোচনায় বিষয়টি যে বেশখানিকটা কালো ছায়া ফেলবে তার ইঙ্গিত রয়েছে লেখাটিতে।
ভারতের সাথে আকসাই চীন, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল নিয়ে সীমান্ত বিরোধ রয়েছে চীনের। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৯৬২ সালে সংঘটিত হয় দুই দেশের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ। এ নিয়ে তিক্ততা মাঝে মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট ওবামার ভারত সফরের সময় পারমাণবিক সহায়তাসহ অন্যান্য চুক্তি সম্পাদন এবং দক্ষিণ চীন সাগরে ভারত-জাপান-মার্কিন অভিন্ন নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণা নিয়ে চীন-ভারত সম্পর্কে নতুনভাবে উত্তেজনা দেখা দেয়। সেই উত্তেজনা প্রশমনের চেষ্টায় তাৎক্ষণিকভাবে সুষমা স্বরাজ বেইজিং সফরে গিয়ে চীনা নেতাদের আশ্বস্ত করেন দুই দেশের চলমান সম্পর্কে মার্কিন-ভারত সমঝোতার কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। পরবর্তী মার্চ-এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী মোদি চীন সফর করবেন বলেও জানানো হয় সে সময়। অরুণাচলকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট নতুন উত্তেজনায় সে সফর শেষ পর্যন্ত হবে কি না তা নিয়েও নয়াদিল্লির অনেক পর্যবেক্ষক সংশয় প্রকাশ করেছেন।
চীনারা যত কথা বলে কাজ করে তার চেয়ে বেশিÑ এ রকম একটি ধারণা রয়েছে দিল্লিতে। তাদের পর্যবেক্ষণ হলো মোদির সফর নিয়ে শুধু গ্লোবাল টাইমসে প্রতিবাদ ক্ষোভ জানানো হয়েছে তাই নয়, সেই সাথে চীন ভারত সীমান্তে তার নিরাপত্তা উপস্থিতিও বাড়িয়েছে। অত্যাধুনিক দূরপাল্লার কামান ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে সেখানে, যা দিল্লিকে উদ্বিগ্ন না করে পারছে না। চীন যে এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে সেটি বোঝা গিয়েছিল যখন বেইজিংয়ে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত অশোক কন্থকে ডেকে বলা হয়, ‘মোদির এ সফর চীনের আঞ্চলিক সার্বভৌমত্বের অধিকার ও স্বার্থের অবমাননা’।
ভারতের প্রতিরক্ষা প্রতিযোগিতা এক দিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সামর্থ্যকে সামনে রেখে যেমন করতে হয় তেমনিভাবে সামনে রাখতে হয় চীনের সামর্থ্যকেও। এ ক্ষেত্রে দিল্লি কোনো সময়ই চীনা প্রতিরক্ষা সামর্থ্যকে অতিক্রম করতে পারেনি। অস্ত্র আমদানিতে বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেও ভারত এখনো চীনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কাছাকাছিও পৌঁছাতে পারেনি। এ কারণে দেশটি উন্নত প্রতিরক্ষাসামগ্রী যৌথভাবে প্রস্তুত করতে এবার ওয়াশিংটনের সাথে চুক্তি করেছে। এ চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্র¿শস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি পাবে দিল্লি, যা এত দিন আমেরিকা সেভাবে দিতে চায়নি ভারতকে। তবে একই সাথে কান টানলে মাথা আসার মতো চীনের বিপরীতে আঞ্চলিক বিরোধে আমেরিকার সাথে জোটবদ্ধ হতে হবে দিল্লিকে। ফলে সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকিটাও নিতে হচ্ছে ভারতকে। সেই উত্তেজনার একটি প্রকাশ যে এবার অরুণাচলে মোদির সফর এবং এ ব্যাপারে বেইজিংয়ের প্রতিবাদের মধ্যে রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। আর এ নিয়ে যে উত্তর-পূর্ব ভারতে আবার নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকছে এতে সংশয়ের অবকাশ থাকছে না। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিষ্ক্রিয়তা শতভাগ নিশ্চিত করতে পেরেছে দিল্লি। কিন্তু চীনা হাত কিভাবে নিষ্ক্রিয় করবে ভারত?
দুই.
পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদ বা অস্থিরতা দেখা যায় পাহাড়ি বা দুর্গম এলাকাগুলোতে। লাদাখ আকসাই চীন সিকিম বা অরুণাচল সবটাই দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। বাংলাদেশের সমতল ভূখণ্ডের সাথে যে এক-দশমাংশ দুর্গম অঞ্চল রয়েছে সেটি হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম। দুই দশককালের বেশি সময় ধরে এই এলাকা ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অপারেশনাল অঞ্চল। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সামরিক শাখা শান্তিবাহিনীর সশস্ত্রযুদ্ধের কারণে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয় এই পাহাড়ে। স্বাধীনতার পর তদানীন্তন সরকার প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের রাঙ্গামাটির এক সমাবেশে সব পাহাড়িকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার পরামর্শ তারা মানতে পারেনি। সেখান থেকে যে ক্ষোভের শুরু হয় সেটি প্রতিবেশী দেশে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য মদদ পেয়ে পুরোপুরি বিদ্রোহে রূপ নেয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে সেই বিরোধ একটি শান্তিচুক্তির মাধ্যমে মীমাংসা করার ক্ষেত্রে সহযোগিতাও করে প্রতিবেশী ভারত। কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদের এই বীজকে কোনো সময় উপড়ে ফেলা হয়নি। সেটি এখন আবার নতুন করে যেন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আলামত দেখা যাচ্ছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রধান সন্তু লারমা বেশ ক’বছর ধরে বলে আসছিলেন তাদের সাথে যে শান্তিচুক্তি হয়েছিল তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। জনসংহতির মূল আপত্তিটি ছিল অলিখিত চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে। আওয়ামী লীগ সরকার স্বীকার করে না যে লিখিত চুক্তির বাইরে অলিখিত কোনো চুক্তি সেখানে ছিল। কিন্তু শান্তিবাহিনী যে লিখিত চুক্তির কথা বলছে তা হলো মারাত্মক। এর একটি হলো স্বাধীনতার পর যেসব বাঙালি পার্বত্য এলাকায় বসতি স্থাপন করেছে তাদের ও বংশধরদের সেখান থেকে তুলে নিয়ে আসা। আর দ্বিতীয়টি হলো পাহাড়িরা যেভাবে সেখানকার ভূমির মালিকানা দাবি করে সেভাবে তাদের হাতে জমির মালিকানা দিয়ে দেয়া। এ দু’টির যেকোনোটি করা হলে সে এলাকায় বাংলাদেশের সার্বভৌম কর্তৃত্ব বজায় রাখা একপর্যায়ে আর সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক বিশেষজ্ঞই।
এই আশঙ্কা যেন এখন বিপদের ঘনঘটা হয়ে দেখা দিতে শুরু করেছে। জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে নেদারল্যান্ডসের হেগে ইউএনপিও (আন রিপ্রেজেনটিটিভ নেশনস অ্যান্ড পিপলস অরগানাইজেশন) নামে একটি সংগঠন করা হয়েছে ১৯৯১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। যেসব অঞ্চলে স্বাধিকারের আন্দোলন চলছে অথবা যেসব রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি নেই সেসবের প্রতিনিধিত্বের জন্য এই সংগঠন করা হয়। এ সংগঠনের ৪৬টি সদস্যের একটি হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতি। কাশ্মির আসাম মনিপুর নাগাল্যান্ড এর সদস্য না হলেও বেলুচিস্তান সিন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রাম বা আচেহসহ অনেক অঞ্চলকে এর সক্রিয় সদস্য করা হয়েছে। এর সদস্য হিসেবে পূর্ব তিমুর কসোভো বা দক্ষিণ সুদানকে ইতোমধ্যে স্বাধীন করে ফেলা হয়েছে।
সেই ইউএনপিওর ওয়েবসাইটে দেয়া হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর। ২ মার্চের এই খবরটি এ রকমÑ ‘একটি মানবাধিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে বাংলাদেশের ২১০টি পরিবার ২০১৪ সালে রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনের হুমকি ও ভূমিগ্রাসের শিকার হয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছে। এর বাইরে নারী ও মেয়েদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে একই সময়ে ১২২টি। ২০১৫ সালের এপ্রিলের মধ্যে যদি পার্বত্য শান্তিচুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তা বাস্তবায়ন না করা হয় তাহলে এই অঞ্চলে ভয়ঙ্কর অস্থিরতা দেখা দেবে এবং সহিংসতার বিস্তার ঘটবে।’
এর সাথে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনও যুক্ত করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। অবশ্য এর কোনো প্রমাণের কথা বলা হয়নি অথবা পত্রিকা নিজস্বভাবে উল্লিখিত ঘটনার সত্যাসত্য যাচাই করে দেখেছে কি না তার কথা বলেনি। এতে সন্তু লারমার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে যেখানে তিনি ৩০ এপ্রিলের মধ্যে শান্তিচুক্তি পুরো বাস্তবায়ন করা না হলে সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন। সন্তু বলেছেন, ১ মে থেকে তিনি অসহযোগ আন্দোলন শুরু করবেন। তার মতে, শান্তিচুক্তির ৭২টি অনুচ্ছেদের মাধ্যমে ২৫টি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ৩৪টি একবারে অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। ১৩টি আংশিক বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
সন্তু লারমা তার অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার জন্য বিভিন্ন এলাকা সফর শুরু করেছেন। তা নিয়ে ইতোমধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও হানাহানি শুরু হয়েছে। বান্দরবানে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষ হয়েছে সন্তুর সফরকে কেন্দ্র করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন ও তার জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি যে উত্তেজনা নতুন করে দেখা দেয় তা নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে অব্যাহত রয়েছে। লর্ড এরিক অ্যাভাবুরি, সুলতানা কামাল ও এলসা এসটামাটোপাউলোর নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন এ নিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পুনর্বাসিত বাঙালি উচ্ছেদ এবং পাহাড়িদের দাবি অনুসারে ভূমিমালিকানা নিষ্পত্তির জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানায়। শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত বিষয়গুলো বাস্তবায়নের দাবিও তারা বারবার জানিয়েছে।
সন্তু লারমার নতুন হুমকির পর লিখিত ও এই দুই অলিখিত দাবি বাস্তবায়নে নতুন করে শান্তিবাহিনীর অভিযান পার্বত্য জেলাগুলোতে শুরু হলে কী পরিস্থিতি দাঁড়াবে সেটি অনুমান করা কঠিন। পার্বত্য জেলাগুলোতে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদে থাকাকালে ব্রিগেড কমান্ডার পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন মেজর জেনারেল (অব:) মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক। পার্বত্য জেলার পার্শ¦বর্তী এক থানায় জন্ম নেয়া এই প্রতিভাধর সাবেক জেনারেলের লেখা এক কলামে মনে হয়েছে তিনি পাহাড়ে অনাহূত কোনো কিছুর গন্ধ পাচ্ছেন। জেনারেল ইবরাহিম সেখানে সেনা কর্মকর্তা-জওয়ানসহ পাহাড়ি বাঙালির বিপুল রক্তক্ষয়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ‘আজকের ২০১৫ সালে আমার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি কৃত্রিম শান্তি বিরাজ করছে। এই কৃত্রিম শান্তিও যদি লঙ্ঘিত হয়ে যায়, তখন শান্তি পুনঃস্থাপনের জন্য বাংলাদেশ সরকার এবং আমাদের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর।’
পার্বত্য শান্তিচুক্তির শর্ত অনুসারে তিন জেলা থেকে সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে। পার্বত্য এলাকার অপারেশনাল অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সেনাকর্মকর্তাদের কমসংখ্যকই এখন বাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। নতুন প্রজন্মের সৈনিক ও কর্মকর্তাদের জাতিসঙ্ঘ মিশনের ছাড়া অপারেশনাল অভিজ্ঞতা সেভাবে নেই। সৈনিকদের তিন বেলা মাছ-গোশত দিয়ে ভারী খাবার সরবরাহ করায় তাদের বেশখানিকটা আরাম-আয়েসের প্রতি অভ্যস্ত করা হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। এখন তেমন পরিস্থিতি দেখা দিলে দুর্গম এলাকার যুদ্ধ বা অপারেশন কতটা দক্ষতার সাথে তারা করতে পারবেন তা নিয়ে অনেকের উদ্বেগ রয়েছে। নিরাপত্তাবাহিনীতে দৈনন্দিন সক্ষমতা বজায় রাখতে গোলাবারুদের জোগান ঠিক রাখার চেয়েও অবকাঠামো উন্নয়ন ও আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। এতে দৈনন্দিন সক্ষমতা বজায় রাখার বাজেটের একটি অংশ সে দিকে প্রবাহের প্রভাব থাকতে পারে। এর পাশাপাশি অস্ত্র গোলাবারুদের উৎস দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রক্ষা না করার কোনো প্রভাব এ ক্ষেত্রে দেখা দেয় কি না তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিপক্ষের তথ্য সংগ্রহের যে অপরেশনাল নেটওয়ার্ক আগে ছিল, সেটিও গত কয়েক বছরে অনেকখানি দুর্বল হয়েছে প্রতিরক্ষা দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসার কারণে। সন্তু লারমার যে হুমকির খবর ইউএনপিওর রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, সেটি বাস্তবায়ন হলে সত্যিকার এক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক নিরাপত্তাবাহিনী।
সাধারণত যেকোনো বহিঃশক্তির আক্রমণ অথবা অভ্যন্তরীণ সংহতির বিরুদ্ধে যেকোনো অন্তর্ঘাতী বিদ্রোহ মোকাবেলায় জনগণের মধ্যে বিশেষভাবে ঐক্যের প্রয়োজন হয়। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই ঐক্য ভেঙে চুরমার করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে হুমকিদাতাদের উৎসাহিত করেছে কি না কে-ই বা বলতে পারে। দেশের পরিস্থিতি অবলোকন করে অনেকে অনাগত বিপদের ঘনঘটার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, সেই বিপদ যেন এখন একেবারে দোরগোড়ায় চলে এসেছে। পরম করুণাময় যেন সেই বিপদ থেকে এই হতভাগা জাতিকে রক্ষা করেন।