Friday, June 12, 2015

রুশ-ভারতকে সন্দেহ করেনি যুক্তরাষ্ট্র -মার্কিন নথি: জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড by মিজানুর রহমান খান

জেনারেল মঞ্জুর
৩০ মে জিয়া হত্যাকাণ্ডের ৩৪ বছর পূর্তি হবে। দীর্ঘ সময় পরে মার্কিন গোপন দলিলে উদ্ঘাটিত হলো জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনি। এ বিষয়ে প্রথম আলোর বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজনের দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশিত হলো আজ।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরে খোন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকার একটি সম্ভাব্য ভারতীয় হস্তক্ষেপের ব্যাপারে সন্দিহান ছিল। আর সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন বিশ্বাস করেছিল। আর ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরও আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন বিএনপি প্রশাসন ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তখন তা বিশ্বাস করেনি। ১৯৮১ সালের ৩০ মে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড টি স্নাইডার ওয়াশিংটনকে জানিয়েছিলেন, ‘আমরা চট্টগ্রাম বেতার থেকে প্রচারিত মঞ্জুরের ঘোষণা শুনতে পেয়েছি যে তিনি ভারতের সঙ্গে ১৯৭২ সালের মৈত্রী চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। এই ঘোষণা সত্ত্বেও কিংবা সম্ভবত এই কারণেও আমাদের বলা হয়েছে যে অনেক বাংলাদেশির সন্দেহ ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মঞ্জুরের অভ্যুত্থানচেষ্টাকে সমর্থন জুগিয়েছে।’
জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান গতকাল প্রথম আলোকে ইঙ্গিত দেন যে ওই সময় সামরিক বাহিনী ও সরকারের মধ্যে এ রকমই একটা সন্দেহ-সংশয় ছিল। তাঁর ধারণা, জিয়া সেনাবাহিনীতে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। আর ওই দুটি দেশের সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন ছিল। সে কারণেই হয়তো ওই রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব দানা বেঁধেছিল। কিন্তু ওই সময়ে জিয়ার ঘনিষ্ঠ এবং পরিকল্পনা কমিশনের অবৈতনিক উপদেষ্টা ও গণস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এক প্রশ্নের জবাবে গতকাল বলেন, জিয়াউর রহমান কখনো তাঁর সরকারের অস্থিতিশীলতার জন্য রুশ-ভারত বা বাইরের কোনো শক্তির তরফে হুমকির আশঙ্কা করতেন বলে তাঁর জানা নেই।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত ওই একই তারবার্তায় জানিয়েছিলেন, ‘মন্ত্রিসভা সচিব মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার বিশ্বাস করে যে তারা মঞ্জুরের অভ্যুত্থানচেষ্টাকে সামলে নিতে পারবে। কিন্তু সরকার মঞ্জুরের প্রতি “বাইরের সমর্থন” নিয়ে উদ্বিগ্ন।’ উল্লেখ্য, এই নথিতে মন্ত্রিসভা সচিবের নামটি নেই। তবে ১৯৭৭ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১৯৮২ সালের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত মন্ত্রিসভা সচিব ছিলেন এম কেরামত আলী। ১৯৯১ সালে তিনি বাণিজ্য ও পরে ধর্মমন্ত্রী হন।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই তারবার্তায় পরিষ্কার করেন যে মন্ত্রিসভা সচিবের ওই মন্তব্য বিচ্ছিন্ন ছিল না। কারণ, তিনি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে ‘এই মন্তব্যে একাধিক সূত্রে পাওয়া একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিবেদনের প্রতিফলন ঘটেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভ্যুত্থানচেষ্টার পেছনে ভারতীয় ও সোভিয়েতদের কোনো না কোনোভাবে হাত রয়েছে বলে বাংলাদেশ সরকার সন্দেহ করে থাকে।’ এরপরই স্নাইডার মন্তব্য করেন যে ‘আমরা অবশ্য মনে করি যে এই ধারণা সত্য হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’
এর কারণ হিসেবে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেনারেল মঞ্জুরকে ভারতবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করেন। ওই তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে ভারতীয়দের সীমা লঙ্ঘনের বিষয়ে মঞ্জুরের কঠোর মনোভাব রয়েছে। চট্টগ্রামে তিনি রেডিওতে ঘোষণা দিয়েছেন যে ভারতের সঙ্গে ’৭২-এর মৈত্রী চুক্তি তিনি বাতিল করবেন এবং অ-ইসলামি হিসেবে মদ-জুয়া নিষিদ্ধ করবেন। যদিও তাঁর এই ঘোষণাকে কতিপয় বাংলাদেশি একটি ভারতীয় ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে মনে করেন। যদিও ঠুনকো অভিযোগ রয়েছে যে তিনি সোভিয়েতপন্থী (মন্ত্রিসভা সচিবও সেই অভিযোগ করেছেন)। তবে বিভিন্ন সূত্র সাক্ষ্য দিচ্ছে যে এই অভিযোগের ভিত্তি নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মঞ্জুরের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনা করেছেন—এমন দুজন ব্যক্তি আমাদের জানিয়েছেন, মঞ্জুর যুগোস্লাভের ব্যবস্থা সম্পর্কে অনুরাগী ছিলেন। মঞ্জুরের যুগোস্লাভ সফরকালে তাঁর ভেতরে এটা জন্ম নিয়েছিল। এবং যুগোস্লাভ মডেল সম্পর্কে সেই থেকে তাঁর একটা শক্তিশালী সহানুভূতি তৈরি হয়। একজন পশ্চিমা কূটনীতিক তাঁকে একজন সামাজিক গণতন্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই সিক্রেট তারবার্তাটির এর পরের কিছু অংশ প্রকাশ করা হয়নি এবং উল্লেখ করা হয়েছে, এতে স্পর্শকাতর গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
১৯৮১ সালের ৩০ মে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেনারেল মঞ্জুরের একটি জীবনবৃত্তান্ত মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এবং ভারতের মার্কিন দূতাবাসকে অবহিত করেছিলেন। এই ‘সিক্রেট’ তারবার্তায় বলা হয়, ’৭১-এর যুদ্ধের আগে তাঁর চাকরিগত তথ্য সম্পর্কে সামান্যই জানা যায়। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে লে. কর্নেল ছিলেন, আগস্টে কর্নেল, ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে নয়াদিল্লিতে সামরিক অ্যাটাশে হিসেবে যোগ দেন। এবং মুজিব হত্যাকাণ্ডের আগে ১৯৭৫ সালের জুনে ব্রিগেডিয়ার হিসেবে পদোন্নতি পান। জিয়া তাঁকে চিফ অব জেনারেল স্টাফ করেন। ১৯৭৭ সালের আগস্টে তাঁকে মেজর জেনারেল এবং নভেম্বরে চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক হিসেবে বদলি করা হয়। এই সময়ে সেখানে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদ্রোহ দমন কার্যক্রমে নিয়োজিত ছিলেন। ২৯ মে ১৯৮১ মঞ্জুরকে মিরপুর স্টাফ কলেজে বদলি করা হয়েছিল।
মার্কিন দূতাবাসের মূল্যায়নপত্রে বলা হয়, ‘১৯৭৫ সালে জিয়া ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তিনি জিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে ওই সময় মঞ্জুর জেনারেল জিয়ার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মঞ্জুরকে প্রায়ই একজন উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তা এবং ক্ষমতার প্রশ্নে জিয়াউর রহমানের একজন শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়েছে। এটা ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে ঢাকায় ক্ষমতার আসন থেকে অপসারণ করতেই জিয়া তাঁকে চট্টগ্রামে বদলি করেছিলেন। আমরা অনুমান করি যে একই আশঙ্কা থেকে জিয়া মঞ্জুরকে মিরপুর স্টাফ কলেজে পুনরায় বদলি করেছিলেন। এই অবস্থানটি থেকে সৈন্য নিয়ন্ত্রণের কোনো সুযোগ নেই। যদিও চার বছরে কর্মরত থাকার পরে চট্টগ্রাম থেকে বদলির ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।’
মার্কিন দূতাবাসের ওই তারবার্তায় আরও উল্লেখ রয়েছে যে ‘মঞ্জুরের রাজনৈতিক দীক্ষা অস্পষ্ট। তাঁকে ঘিরে প্রধানত যে গুজব রটে থাকে, তাতে তাঁকে একজন “চীনা বামপন্থী” হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। যদিও মঞ্জুর আমেরিকানদের প্রতি অত্যন্ত বন্ধুপরায়ণ ছিলেন। দিল্লিতে থাকাকালে আমেরিকানদের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতেন।’ উল্লেখ্য, জেনারেল মঞ্জুরের চীনা ঝোঁক সম্পর্কে জানতে চাইলে জেনারেল মাহবুবুর রহমান, ১৯৮১-র অভ্যুত্থানকালে যিনি ছিলেন চীনের বাংলাদেশ দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাশে, গতকাল আবেগের সঙ্গে বলেন, ‘এটা একদম খাঁটি। একাত্তরে আমি ইসলামাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা পড়তে শুরু করেছিলাম, কিন্তু শেষ হয়নি। তিনি (মঞ্জুর) তখন চিফ অব জেনারেল স্টাফ। ১৯৭৬ সালের গোড়ায় একদিন তাঁর ফোন পেলাম। তিনিই আমাকে চীনা ভাষা শিক্ষা শেষ করতে চীন পাঠান।’ তিনি মঞ্জুরকে চীনের সঙ্গে জিয়ার সম্পর্ক দৃঢ় করার প্রয়াসের শক্তিশালী সমর্থক হিসেবে বর্ণনা করেন।
মার্কিন দূতাবাসের ওই তারবার্তায় বলা হয়েছে, ‘চট্টগ্রামে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনাকালে জেনারেল মঞ্জুরকে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি তাঁর পরিশীলিত মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতেই দেখা গেছে।’ কিন্তু কবে তাঁদের এই সাক্ষাৎ ঘটেছে, তার উল্লেখ নেই। স্নাইডার বলেন, ‘তঁার (মঞ্জুর) দিল্লি অবস্থানকালে তিনি এই মনোভাব ব্যক্ত করেছেন যে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ, মতবাদ ও সাজসরঞ্জাম উৎকৃষ্ট। মঞ্জুরের বরাতে এটাও বলা হয়েছে যে তিনি সোভিয়েত উপদেষ্টাদের সম্পর্কে সমালোচনামূলক এবং বাংলাদেশে সোভিয়েতদের তৎপরতাকেও সুনজরে দেখেন না। বাংলাদেশে সোভিয়েতরা “বাড়াবাড়ি” (মঞ্জুরের নিজের কথায় “ওভার বিয়ারিং”) এবং “সবকিছুই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা” করে বলেও তিনি বর্ণনা করেন। দিল্লিতে থাকাকালে মঞ্জুর বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মনোভাব সম্পর্কে অত্যন্ত সন্দিগ্ধ ও অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর ওই মনোভাব সত্ত্বেও কতিপয় সূত্র তাঁকে সোভিয়েতপন্থী ও ভারতপন্থী হিসেবেই বর্ণনা করেছে। তাঁর রাজনৈতিক ঝোঁক সম্পর্কে যদিও দ্ব্যর্থক এবং স্ববিরোধী খবরাখবর মিলেছে, কিন্তু সব সূত্রই নিশ্চিত করেছে যে তিনি একজন ঐকান্তিক জাতীয়তাবাদী, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে যাঁর জীবন উৎসর্গীকৃত।’
স্নাইডার ওই তারবার্তার উপসংহার টানেন এই মন্তব্য করে যে ‘রাষ্ট্রদূত স্নাইডার চট্টগ্রামে মঞ্জুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁকে বুদ্ধিদীপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে লক্ষ করেন। বহু দিক থেকে জিয়ার চেয়ে তিনি পরিশীলিত ও বিষয়বুদ্ধিসম্পন্ন। যদিও তাঁর ঔদ্ধত্য সম্পর্কে আমরা বিভিন্ন সূত্রে জেনেছি, কিন্তু তিনি একই সঙ্গে তাঁর সেনাদের মধ্যে বেশ ক্যারিশম্যাটিক ও জনপ্রিয় ছিলেন। বাংলা ও উর্দু ছাড়াও তিনি অনর্গল ইংরেজি বলতেন।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

ভারতের অভিযান পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি

মিয়ানমারে ভারতের সামরিক অভিযান নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বাকযুদ্ধ চলছে। উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ে জড়িয়ে পড়েছেন দুই দেশের রাজনীতিক ও সামরিক কর্তারা। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ, সেনাপ্রধান রাহিল শরীফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান, সাবেক সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ভারতের বিরুদ্ধে। জবাবে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর বলেছেন, যারা ভয় পেয়েছে, তারাই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। অভিযানের পরপর ভারতের কেন্দ্রীয় তথ্য ও সমপ্রচার প্রতিমন্ত্রী রাজ্যবর্ধন রাথোড় মিয়ানমারে তার দেশের অভিযানকে প্রতিবেশী দেশসমূহের মধ্যে যারা সন্ত্রাসবাদকে মদদ দেয়, তাদের জন্য ‘বার্তা’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনে যেকোন স্থানে যেকোন সময় ভারত অভিযান চালাবে। রাথোড়সহ ভারতীয় নেতাদের সাম্প্রতিক ‘উসকানিমূলক’ মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট। গতকাল এ নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছে। এর আগে তারা জানিয়ে দিয়েছে, পাকিস্তানকে মিয়ানমার ভেবে ভারতের ভুল করা উচিত হবে না। পাকিস্তান নিজেদের মাটিতে ভারতের এ ধরনের যেকোন রোমাঞ্চকর আকাঙক্ষাকে সমুচিত জবাব দিয়ে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম। সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ একপ্রকার ইঙ্গিত দিয়ে বলেই ফেলেছেন, আমরা শবেবরাতে ফুটানোর জন্য পারমাণবিক বোমা তৈরি করিনি। পাকিস্তানের এ ধরনের তীব্র প্রতিক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত করেই ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর বলেছেন, যারা মিয়ানমারে ভারতের অভিযানে ভয় পেয়েছে, তারাই প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। ভারতের সাবেক কর্নেল ও বর্তমানে প্রতিমন্ত্রী রাজ্যবর্ধন রাথোড় বলেছেন, পাকিস্তান হামলা করলে, আমরা পাল্টা হামলা চালাবো। আবার ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস মিয়ানমারে ওই অভিযান নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর মন্তব্যের সমালোচনা করেছে। একটি গোপন অভিযানের বিষয়বস্তু এমন প্রকাশ্যে প্রচার করে বিজেপি রাজনৈতিক ফায়দা নিচ্ছে বলে অভিযোগ দলটির। এছাড়া ভারতের অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞও বিষয়টি নিয়ে এমন প্রকাশ্য প্রচারণায় অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। অপর দিকে যে দেশে অভিযান নিয়ে চারদিকে এত হৈ চৈ, সেই মিয়ানমার নিজেদের মাটিতে কোনো ধরনের ভারতীয় অভিযানের কথা বেমালুম অস্বীকার করেছে। দেশটির দাবি, ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের পাশে ভারতীয় অংশে ওই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব খবর দিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া, পিটিআই, এএফপি, সিএনএন-আইবিএন, এনডিটিভি, ডন ও ডিএনএ।
গত ৪ঠা জুন ভারতের মনিপুরে বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গিদের হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নিহত ও ১৫ জন আহত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় মঙ্গলবার রাত ৩টায় ভারত মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে দুটি নাগা জঙ্গি শিবিরে হামলা চালায়। ভারতীয় সেনা ও বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে ৪৫ মিনিটব্যাপী ওই অভিযানে কমপক্ষে ৫০ জঙ্গি নিহত হয় ও দুটি শিবিরই ধ্বংস হয়। পরের দিন দুপুরেই বিষয়টি ফলাও করে আলোচনায় আনে ভারতীয় গণমাধ্যম। ওই অভিযানকে প্রতিবেশী যেসব দেশ সন্ত্রাসবাদ লালন করে, তাদের প্রতি স্পষ্ট বার্তা বলে উল্লেখ করেন ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলি খান বলেন, যেকোন ধরনের বিদেশী আগ্রাসন মোকাবিলায় আমাদের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণ সক্ষম। তাই ভারতীয় নেতাদের উচিত দিবাস্বপ্ন দেখা বন্ধ করা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, সরকার দেশকে যেকোন মূল্যে রক্ষা করবে। যদি ভারত পাকিস্তানকে শিক্ষা দেয়ার কথা বলে থাকে, তাহলে তাদের জানা উচিত, ভারতকেও উপযুক্ত শিক্ষা দিতে সক্ষম পাকিস্তান। অপরদিকে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের এক সম্মেলনে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ বলেছেন, পাকিস্তানের দিকে অশুভ দৃষ্টিতে তাকানোর সাহস করা কারও উচিত হবে না। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী সংযোগ অধিদপ্তর (আইএসপিআর) এক টুইট বার্তায় জানিয়েছে, ভারতের রাজনীতিবিদরা কেবল জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করে এমন কর্মকাণ্ডকে আনুকূল্যই দেখাচ্ছে না, তারা অন্য দেশের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ করাকে গর্বের সঙ্গে প্রচার করছে। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক। অপরদিকে পাকিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক সামরিক শাসক ও সেনাপ্রধান পারভেজ মোশাররফ ভারতকে ইঙ্গিত করে বলেন, আমাদের আক্রমণ করো না। আমাদের আঞ্চলিক অখণ্ডতার দিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ো না। কারণ, আমরা ছোটখাটো কোন শক্তি নই, আমরা একটি বৃহৎ ও পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন রাষ্ট্র।
অপরদিকে মিয়ানমার অভিযান নিয়ে পাকিস্তানের তীব্র প্রতিক্রিয়ার দিকে ইঙ্গিত করে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বলেন, যারা ভারতের নতুন রুপে ভয় পেয়েছে, তারাই বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছে। গতকাল সকালে তিনি বলেন, মিয়ানমারে দুটি জঙ্গি শিবির ধ্বংসে ভারতের অভিযান অনেকের ‘মনোজগতে’ পরিবর্তন এনেছে। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে একটি সাধারণ অভিযানেই দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। তবে মিয়ানমারে ভারতের অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি। এদিকে ওই অভিযানকে অনেকে চীন ও পাকিস্তানের প্রতি ভারতের বার্তা ভাবলেও,  ভারতের অন্যতম শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল সুব্রত সাহা বলছেন ভিন্ন কথা। বুধবারের ওই অভিযানের সঙ্গে কাশ্মীর সীমান্ত পরিস্থিতির সম্পর্ক খোঁজা সঠিক হবে না বলে তার মন্তব্য। তার মতে, কাশ্মীর সীমান্তে ওই ধরনের অভিযান চালানো সম্ভব নয়। তবে ভারতের সাবেক অনেক উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা অভিযানের প্রশংসা করেছেন। দেশটির সাবেক সেনা উপ-প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) এমএল নাইড়ু বলেন,  মিয়ানমারের সঙ্গে আমাদের চুক্তি আছে। তাই সে দেশে ঢুকে খুনিদের হত্যা করার মধ্যে দোষের কিছু দেখি না। অভিযান নিয়ে বিজেপি সরকারের মন্ত্রীদের বিভিন্ন খোলামেলা মন্তব্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিরোধী দল কংগ্রেস। কংগ্রেসের মুখপাত্র আনন্দ শর্মা বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উচিত তার দলের মন্ত্রীদের ভাল করে জ্ঞান দেয়া। সাবেক কংগ্রেসদলীয় এ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বিজেপির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকরের মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, মন্ত্রীদের মধ্যে সংযত ভাব ও পরিপক্বতা থাকা উচিত। উগ্র দেশপ্রেম ও দাম্ভিকতার প্রদর্শন ভারতের বিশেষ বাহিনীর অভিযানে কোন সাহায্য করবে না। তিনি বলেন, মনোহর পারিকরের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করার অভ্যাস রয়েছে। আনন্দ শর্মা ও কংগ্রেসদলীয় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বিজেপির রাজ্যবর্ধন রাথোড়েরও সমালোচনা করেন।
ওদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ভারতীয় ওই অভিযানের কথা সোজা অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। দেশটির প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের পরিচালক জা তায় এক ফেসবুক বার্তায় লিখেছেন, মাঠে থাকা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের পাঠানো তথ্য মতে, আমরা জেনেছি যে, অভিযান মিয়ানমার-ভারত সীমান্তের ভারতীয় অংশে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের মাটি ব্যবহার করে যে বিদেশীরা প্রতিবেশী দেশে হামলা করে ও সমস্যা সৃষ্টি করে, তাদের সহ্য করা হবে না।
মিয়ানমারের ওই বক্তব্যের পর দেশটির অভ্যন্তরে অভিযান চালানো হয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। ভারতে কেউ কেউ ওই অভিযানকে লাদেন হত্যায় পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন নেভি সিলের অভিযানের সঙ্গে তুলনা করছেন। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, মার্কিন ওই অভিযানের কথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন। কিন্তু মোদি প্রশাসন এখনও বিষয়টি সরাসরি বলেনি যে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই হামলা চালানো হয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের টুইটার অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত সেনাবাহিনীর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সীমান্তের পাশে’ হামলা হয়েছে। অনেক গণমাধ্যমে অভিযানের আগে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে না জানানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনীর ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেই হামলা হয়েছে। বিষয়টিকে অনেকেই পেশিশক্তি প্রদর্শন বলে উল্লেখ করছেন। যদিও বিভিন্ন রাজনীতিক ও নিরাপত্তা সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে, অভিযান মিয়ানমারের ভেতরেই হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে মিয়ানমারের এক সরকারি কর্মকর্তা তার দেশের অভ্যন্তরে ভারতীয় অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সঙ্গে তিনি এ-ও জানালেন, ভারতীয় সেনা ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা ছিল। তবে মিয়ানমারের কোন সেনা সরাসরি ওই অভিযানে অংশ নেয়নি। বিবিসি জানিয়েছে, ভারতের অনেকে মনে করছেন, বিষয়টিকে ফলাওভাবে প্রচার করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায় বিজেপি। তাদের এমন খোলাখুলি মন্তব্যে বিব্রত হচ্ছে মিয়ানমারও। ভারতের সাবেক কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, এ ধরনের অভিযানের বিষয়ে যত কম কথা বলা যায়, ততই ভাল। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযানে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় কমান্ডোদের একটি ছবি প্রকাশ হওয়া নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেছেন অনেকে।
ভারতে এখন যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলছে, সেটি হচ্ছে, মিয়ানমারের মতো অভিযান কি পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও পরিচালনা করা সম্ভব? কিন্তু অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কৌশল-বিশেষজ্ঞরা ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযান চালানোর আকাঙক্ষা ও সম্ভাব্যতা নিয়ে সতর্কতা উচ্চারণ করেছেন। ভারতের সাবেক শীর্ষ এক সেনা কর্মকর্তা বলেন, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ঢুকে এ ধরনের অভিযান চালানোর সামর্থ্য আমাদের আছে। কিন্তু সে জন্য এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান যা করবে, তার জন্য আমাদের প্রস্তুতি থাকতে হবে। একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, আমরা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে দেশটির এমনকি আধা কিলোমিটার ভেতরেও যেতে পারবো না। আপনি এটি করতে পারেন, যদি আপনি একটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকেন। তাছাড়া মিয়ানমার ও পাকিস্তান আসলেই এক নয়। মিয়ানমার ভারতের শত্রু রাষ্ট্র নয়, কিন্তু পাকিস্তান শত্রু রাষ্ট্র। তাই আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে মিয়ানমারে অভিযান চালানো গেলেও, পাকিস্তানে পরিস্থিতি হবে ভিন্ন। মিয়ানমারের সমস্যাটি হলো, চীন দেশটির ভেতরে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে ভারতের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে সহায়তা দিচ্ছে। তবে সাবেক র’ কর্মকর্তা জয়ন্ত উমরানিকর বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, দুটি সাম্প্রতিক বিবৃতি পাকিস্তানের ভালভাবে নেয়া উচিত। সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর বলেছেন, সন্ত্রাসীদের বিনাশ করা উচিত সন্ত্রাসী দিয়ে। অপরদিকে এক প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, যে কোন সময় যে কোন স্থানে আমাদের ইচ্ছানুযায়ী হামলা চালাবো। মিয়ানমার অভিযান পাকিস্তানের জন্য সতর্কবার্তা। আমাদের সঙ্গে লাগতে এলে, আমরা চুপচাপ বসে থাকবো না। আমাদের অভিযান যদিও গোপনে হবে। কিন্তু তা হয়তো কেবল সীমান্ত এলাকা বা বিশেষ কোন সন্ত্রাসী শিবিরে চালানো হবে না। ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক আজাই সাহনি বলেন, অভিযানটি ভাল, গোছানো ও সফল ছিল। কিন্তু অন্য দেশের অভ্যন্তরে আমাদের অভিযান চালানোটা এবারই প্রথম নয়। নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, এমনকি পাকিস্তানে অভিযান চালানোর ঘটনা আমাদের জানা অল্প কিছু অভিযানের অন্যতম। কিন্তু এটি সামগ্রিক কোন কৌশল নয়। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে, শত্রুর কৌশলগত সামর্থ্যকে দুর্বল করা। তিনি আশ্চর্য হয়েছেন যে, অভিযানের খুঁটিনাটি প্রকাশ্যে প্রচার করা হয়েছে। তার ভাষায়, পৌরুষ প্রদর্শন আকাঙ্ক্ষিত নয়।
ওদিকে অভিযানের ব্যাপারে ভারতীয় সেনাদের দাবিকে সঠিক নয় বলে দাবি করেছে নাগা বিচ্ছিন্নতবাদী সংগঠন এনএসসিএন। সংগঠনটির দাবি, সেনাবাহিনী নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষায় এ ধরনের কল্পকাহিনী ছড়াচ্ছে। এনএসসিএন (কে)-এর কোন ঘাঁটি আক্রান্ত হয়নি, এর কোন সদস্য হতাহতও হয়নি। কিন্তু কিছু প্রতিবেদন বলছে, এনএসসিএন (কে)-এর জঙ্গিরা ভারতে প্রতিশোধমূলক হামলা চালাতে প্রবেশ করেছে। তাই উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে ভারত সরকার। এর আগে মণিপুরে ভারতীয় সেনাদের ওপর হামলার ঘটনায় এ সংগঠনটিকেই দায়ী করা হয়। সংগঠনটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ)। ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা উপদেষ্টা ও সাবেক গোয়েন্দা প্রধান অজিত দোভাল শিগগিরই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ‘যৌথ পদক্ষেপ’ নেয়ার জন্য মিয়ানমার সফর করবেন। মিয়ানমারে ভারতীয় অভিযানের পরিকল্পনাও অজিত দোভাল করেছিলেন।

সনদ ছাড়াই দাঁতের চিকিৎসক তাঁরা

ঢাকায় তিন ভুয়া চিকিৎসককে গতকাল রাতে আটক করেছে
র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। ছবিতে তাঁদের মধ্যে
দুজনকে দেখা যাচ্ছে। ছবি: প্রথম আলো
একজন মাধ্যমিক পাস। আরেকজনের শিক্ষাগত যোগ্যতা কামিল দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত। আর একজনের শিক্ষাগত কোনো সনদই নেই। তবুও তাঁরা চিকিৎসক। রাজধানী ঢাকায় বসে দাঁতের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন তিন ভুয়া চিকিৎসককে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আটক করেছে র‍্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।
আটক তিনজন হলেন মো. আক্তার হোসেন (৩৮), মো. আবদুল আওয়াল (২৪) ও জিএম ওয়াহিদ (৭০)। আক্তার ও ওয়াহিদকে কারওয়ান বাজার থেকে এবং আবদুল আওয়ালকে পূর্ব তেজতুরী বাজারে নিজেদের চেম্বার থেকে আটক করা হয়।
সনদ ছাড়া চিকিৎসার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রতারণা করায় আক্তার হোসেনকে দুই বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা, আবদুল আওয়ালকে এক বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা এবং জিএম ওয়াহিদকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেন র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান।
ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমানের ভাষ্য, তিন ‘চিকিৎসকের’ মধ্যে আক্তার হোসেন মাধ্যমিক পাস। অথচ তাঁর ভিজিটিং কার্ডে ডিডিটিবিকেপিএল ডিগ্রি উল্লেখ করা ছিল। কারওয়ান বাজার সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় আল মদিনা ডেন্টাল কেয়ার নামে একটি চেম্বার খুলে দাঁতের চিকিৎসা করছিলেন আক্তার হোসেন। ২০১৪ সালে ৪ সেপ্টেম্বর একই অপরাধে তাঁকে একবার আটক করা হয়। । জামিনে বেরিয়ে আবারও দাঁতের চিকিৎসায় ফিরে যান তিনি।
ঢাকার ১৭৯ পূর্ব তেজতুরী বাজারে শামীম ড্রাগ হাউস নামে একটি চেম্বার রয়েছে আবদুল আওয়ালের। তাঁর পড়াশোনার যোগ্যতা কামিল দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত।
অন্যদিকে কারওয়ান বাজার সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে জিএম ওয়াহিদের ঢাকা ডেন্টাল কেয়ার নামে একটি চেম্বার। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা করছিলেন। তাঁর শিক্ষাগত কোনো সনদই ছিল না।

পাথর by জয়দীপ দে

চেহারাটা ঠিক বোঝা যায় না। ঘষতি খাওয়া কাচের মধ্য দিয়ে দেখার মতো অস্বচ্ছ। স্পষ্ট কেবল দুটো চোখ। অগ্নিগর্ভের মতো দাউ দাউ করছে। এখনই যেন ছিটকে পড়বে আগুনের গোলা। যাওয়ার আগে একটা মেঘমন্দ্রধ্বনিতে চারিপাশ কাঁপিয়ে গেল: পাথর। অমনি যেন পাথর হতে শুরু করল তার দেহখানি। ধীরে ধীরে নিচ থেকে অসাড় হওয়া। শাহেদ ভয়ে লাফিয়ে ওঠে। বুকটা ধড়ফড় করে। চোখের সামনে খোলা জানালা। ক্ষয়েটে আলোয় অলস মনে দুলছে নারকেলের পাতা। ঘরের ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা। জানালা দিয়ে উড়ে আসছে মশার ঝাঁক। ভনভন করছে চারপাশে। শাহেদ মর্মর-মূর্তির মতো চেয়ে থাকে জানালার দিকে। একটা সুস্থসবল মানুষ। পেট ভরে খেতে পারে। ভাবতে পারে আকাশপাতাল। মীরাক্কেল দেখে প্রাণভরে হাসতে পারে। কোনো ব্যথা নেই, বেদনা নেই। নেই কোনো অনুযোগ। অথচ উঠে দাঁড়ানোর শক্তিটা তার নেই। পারার মধ্যে যা পারে কতগুলো জড়ানো শব্দ চারদিকে ছড়িয়ে দিতে। এখন এটাই তার ভাষা। তার নিজের ভাষা শুনে ভয় লাগে নিজেরই। তাই শব্দ করে না সে। নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে কেবল অনাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে। ইদানীং এই স্বপ্নটা ঘন ঘন দেখছে ও। ইদানীং বলতে মাস তিনেক হবে। ইন্ডিয়া থেকে ফিরে আসার পর থেকে। ছোট্ট একটা সমস্যা নিয়ে ইন্ডিয়া যাওয়া। গলাটা কিছুদিন হয় বসে গিয়েছিল। তারপর এমবিবিএস থেকে স্পেশালিস্ট। বঙ্গবন্ধু থেকে সিআরপি। থেরাপি ওষুধ কিছুতেই যখন আর কাজ হচ্ছে না ডাক্তারই বলল, ‘যান না, একবার ঘুরে আসেন ওপার। গলাটাও দেখালেন, সঙ্গে পুরো শরীর চেকআপ।’
জুন-জুলাইয়ের চাপ শেষে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। পুরো ব্রাঞ্চের চার্জ তার মাথায়। এজিএম ব্রাঞ্চ। আপাতত এসপিও দিয়ে চলছে। সব সময় প্রেশার। তার ওপর মিড ইয়ারের ধাক্কা। কিন্তু দ্রুতই পরিস্থিতি পাল্টে যেতে লাগল। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে হাতের মুঠোয় ব্রাশটা থাকছে না। মনের ভেতরে কু ডেকে উঠল। সেদিনই সার্কেল অফিসে গিয়ে ডিজিএমকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলল। ডিজিএম খিটমিটে মেজাজের লোক। কিন্তু কেন জানি সেদিন খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লেন। তাঁর সহযোগিতায় দিন দশেকের মধ্যে চলে যাওয়া। ডাইরেক্ট এয়ার। একজন প্রফেশনাল পেশেন্ট গাইডকে দেওয়া হলো তাঁর সঙ্গে। নিমহানসে দিন কুড়ি ছিল। চেকআপের সব রিপোর্ট আসার পর ডাক্তার বেশ ইতস্ততার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে একজন নিকটাত্মীয়কে চাইছিল বারবার। শেষমেশ শাহেদ শক্ত হয়ে বলল, ‘প্লিজ টেল মি, আই এম রেডি ফর অল।’ ডাক্তার মিনমিন করে বলল, ‘মটর নিউরন ডিজিস।’ কথার ফাঁকে মুচকি হেসে, ‘রোগটা এই গ্রহের সবচেয়ে মেধাবী মানুষটার হয়েছে। তাঁর নাম জানেন—স্টিফেন হকিংস। কেন এমনটা হয়, আমাদের জানা নেই। এটা প্রগ্রেসিভ ডিজিস। কিউরেবল নয়। কেবল ঠেকিয়ে রাখা যায়।’ আর কিছু তার মাথায় ঢুকছিল না। মাথাটা পাক খাচ্ছিল অদৃশ্য কোনো অক্ষের ওপর। যত দিন অফিসে যাওয়া-আসা ছিল, গুগলে সার্চ দিয়ে দিয়ে দেখত। কোথাও কোনো আশার আলো নেই। রুরিল নামে একটা ওষুধ দিয়েছিল ডাক্তার, তিন মাসের মধ্যে কাজ দেওয়ার কথা। কিছুদিনের জন্য অবসন্নতার আগ্রাসন থমকে যাবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। এখন হাঁটুর নিচে কিছু আছে বলে মনে হয় না।
অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়েছে। মশার ঝাঁক তার নিশ্চল হাতে-পায়ে রিগ গাড়ছে। বাপেক্সের ইঞ্জিনিয়ারও এত ক্ষিপ্রতায় কাজ করতে পারে না। শাহেদ অন্ধকারে বসে বসে মশাদের তামশা দেখে। তার অনুভূতির দরজায় তালা দেওয়া। অতএব ব্যথা-বেদনার বালাই নেই। এই সময় রাহেলার আসার কথা। কিন্তু চারপাশে কোনো সাড়াশব্দ নেই। মনে মনে ভীষণ রাগ হয়। ইচ্ছা করে জান্তব আওয়াজগুলো ছড়িয়ে একবার প্রতিবাদ জানাতে। এই অবহেলা তার প্রাপ্য নয়। এই ঘরবাড়ি আসবাব সব তার রক্ত-ঘামে গড়া। এখনো সে বেঁচে আছে। এখনো সে পাথর হয়ে যায়নি। তাকে ইগনোর করার সাহস পায় কী করে এরা? আবার মনের ভেতরের মনটা সরব হয়ে ওঠে। আর কত। আর কত জ্বালাবি এই মহিলাকে। নারকেলের পাতার ফাঁকে ফাঁকে সন্ধ্যাপ্রদীপের মতো তারারা জ্বলে। ধূপছায়া আকাশ। আসন্ন পূর্ণিমার আলোয় ঝলমল করছে দূরের গাছগুলো। এমন সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরে দলেবলে ছাদে চলে যেত শাহেদ। রাহেলা খালি গলায় ‘আজি জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে...’ গাইত। রাহেলা হুমায়ূনভক্ত। সে পূর্ণিমা উপভোগ করে। সে এইসব দিনরাত্রির টুনির মা হতে চেয়েছিল কৈশোরে। ওপরওয়ালা তার সেই ইচ্ছা পূরণ করেন হয়তো—প্রথম সন্তান হয় কন্যা। পরেরটি পুত্র। রাহেলার সন্তানভাগ্যে তার বোনেরা হিংসায় পুড়ে খাক। ফিজিকসের ছাত্রী রাহেলা ট্রপিক্যাল টুনির মা হতে গিয়ে আর চাকরি-বাকরির ধারেকাছে যায়নি। যে রাহেলা হুমায়ূনের দুঃখবিলাসী উপন্যাস পড়ে রাতদুপুরে কাঁদত, আজ হাজার দুঃখেও নির্বিকার সে; সেকেন্ড-মিনিট-ঘণ্টা-দিন—এভাবে তার স্বামীর মৃত্যুর প্রহর গুনছে। মন শক্ত করে স্বামীর সঞ্চয় স্থিতি বুঝে নিচ্ছে। ভাবছে, কোথাও একটা চাকরি ধরবে। সেটা যে ধরনের চাকরিই হোক। মাটির সঙ্গে গড়াগড়ি খাওয়া দুটো বাচ্চার জীবন তাকেই সাজিয়ে দিতে হবে।
হঠাৎ ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। তীব্র আলোয় চোখ দুটো কিছুক্ষণের জন্য ব্ল্যাক আউট হয়ে গেল। রাহেলা দৌড়ে গিয়ে জানালা লাগাল। ‘সরি, দেরি হয়ে গেল।’ পেটমোটা একটা কাচের বোতল টেবিলের ওপর রেখে মসকিউটো ব্যাট হাতে নিল সে। ‘এসব কী আনলে আবার।’ বিজড়িত স্বরে শাহেদ বলল। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি থাকলে হয়তো কিছু বুঝতে পারত না, রাহেলা বুঝল। ‘অল্টারনেটিভ মেডিসিনে নাকি...’ ‘কিচ্ছু হবে না।’ ‘এভাবে বলো না তো। আল্লাহ বিপদ আপদে ফেলে মানুষের ইমান টেস্ট করেন। ইমান ধরে রাখো। সব ঠিক হয়ে যাবে।
‘ডুমুরিয়া যাওয়ার কী হলো—’
‘ডুমুরিয়া’ শব্দটা ছ্যাৎ করে লাগল রাহেলার বুকে। গত সপ্তাহে নবগ্রহ বাড়ি থেকে এক তান্ত্রিককে নিয়ে এসেছিল রাহেলা। তিনি বিভিন্ন বিচার-বিশ্লেষণ করে রায় দিলেন, ‘রাহুর দশা। তার সঙ্গে একটা পাপ। ভয়াবহ পাপ। সেটা খণ্ডন না করলে কিছুতেই কিছু হবে না।’ রাহেলা রাগে ঝনঝন করে উঠল, ‘কিসের পাপ, অন্ধকারে ঢিল ছুড়লেন, যদি লেগে যায়...আপনার ভিজিট কত, নিয়ে দূর হোন।’
তান্ত্রিক চলে গেল, কিন্তু শাহেদের মনে কথাটা লেগে রইল চোরাকাঁটার মতো। তারপর থেকে শাহেদ তার অতীতকে বারবার রিক্যাপ করে দেখছে। ছোটবেলায় ব্যাঙের ডোবায় ঢিল ছোড়া থেকে শুরু করে জীবনের ছোট-বড় সব অপরাধ নেড়েচেড়ে দেখছে। কই, নিজেকে কখনো বড় কোনো পাপে পাপিষ্ঠ মনে হয়নি। কিন্তু কিছুতেই শাহদের মন থেকে অস্বস্তিটা কাটে না। এ জগতের কোনো মানুষ পাপ-পুণ্যের ঊর্ধ্বে নয়। তার ভুলচুক হতে পারে। তাই বলে ভয়াবহ কোনো পাপ...। সেই থেকে স্বপ্নে-জাগরণে এ নিয়ে ভাবছে সে। একদিন বেদনার্ত জন্তুর মতো কেঁদে উঠল। তারপর অস্ফুট স্বরে কী যেন বলছিল। রাহেলা কিছুই বুঝতে পারেনি। শেষমেশ একটা লেটার–প্যাড এগিয়ে দিলে কাঁপা কাঁপা অক্ষরে সে লিখল, ডুমুরিয়া যাব।
সেই থেকে দিনে কয়েকবার শুধু ডুমুরিয়া ডুমুরিয়া করত শাহেদ। কী আছে ডুমুরিয়ায়? রাহেলা ব্যাপারটা তার বড় বোনকে বললে তিনি তো বিস্ময়ে মুখে হাত দিলেন, ‘কী বলিস! ওখানে ওর কোনো ওয়াইফ-টোয়াইফ নেই তো?’
কথাটা শুনে অপ্রস্তুত হয়ে গেল রাহেলা। ও তো এভাবে ভাবেনি!
‘দূর, এসব কী বলো বড়পা।’
‘শুন, ব্যাটা মানুষে কোনো বিশ্বাস নাই।’
তারপর থেকে রাহেলাই চায় ব্যাপারটা চেপে যেতে। এমনিতেই তো শাহেদের মৃত্যু ঠেকানো যাবে না, শেষ মুহূর্তে একটা কেলেঙ্কারি। সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারার ঝামেলা। বুদ্ধিটা অবশ্য বড় আপারই দেওয়া।
রাহেলার অনুৎসাহে ব্যাপারটা কিছুদিন চাপা পড়ে ছিল। আজ আবার ডুমুরিয়ার কথা তুলল শাহেদ। রাহেলা ভাবল, এই একটা সুযোগ। বাচ্চারা বাসায় নেই। বড় খালা নিয়ে গেছে তাদের বিবাহবার্ষিকীর পার্টিতে। এখন যদি জেনে নেওয়া যায় বিষয়টা।
‘কেন ডুমুরিয়া যেতে চাও তুমি? আমাকে বলবা।’ পরম মমতায় শাহেদের হাতে হাত রাখে রাহেলা।
এখন শাহেদের সঙ্গে তার দীর্ঘ কথোপকথনগুলো হয় লেখার মাধ্যমে। কাঁপা কাঁপা অক্ষরে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে শাহেদ।
শাহেদ বিছানার কোনা থেকে কোনো প্রকারে লেটার–প্যাডটা টেনে আনল। দুটো আঙুলে কলমটা জড়িয়ে নিয়ে লিখল, শুনবা?
‘বলো।’ ‘চাকরির বছর খানেকের মাথায় একটা ব্রাঞ্চের চার্জ পেয়ে গেলাম। মনে মনে একটা রোমাঞ্চ। চ্যালেঞ্জও বটে। ডুমুরিয়া ছোট্ট ব্রাঞ্চ। সব মিলিয়ে ছয়জন স্টাফ। ট্রানজেকশন খুব একটা নেই। গরিব এলাকা। ছোটখাটো ঋণ-টিন নেয়, এই আর কি। চেয়ারে বসার পরের মাসেই এজিএম স্যার হিসাব চেয়ে পাঠালেন। তিনি জানালেন, এভাবে লোকসান দিয়ে ব্রাঞ্চ চালানো যাবে না। ইয়াং লোক পোস্টিং দেওয়ার উদ্দেশ্যই হলো লোন রিকভার করা।’ ‘এ জন্য তুমি কারও ওপর জুলুম-টুলুম করো নাই তো?’ রাহেলা উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠল। ‘প্রশ্নই আসে না। আমি নিয়মমতো ক্লাসিফায়েড লোন হোল্ডারদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে লাগলাম। চিঠি পাঠালাম। খুব একটা সাড়া মিলল না। তারপর এজিএম স্যারের নির্দেশে মামলার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম। উকিল নোটিশ হলো। যারা সময় চাইল, তাদের সময়ও দিলাম। একসময় বিষয়টা আদালতে গড়াল।’ ‘ও।’ রাহেলা ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে রইল শাহেদের লেখার দিকে। একদিন দুপুরে চেম্বারে বসে কাজ করছি। এক রোগা সিরিঙ্গে টাইপের লোক এসে ঢুকলেন রুমে। জানালেন তাঁর পরিচয়—স্থানীয় হাই স্কুলের শিক্ষক। লাখ দুয়েক টাকা কনজিউমার লোন নিয়েছিলেন ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর জন্য। ছেলেটা মালয়েশিয়ায় আছে। একটু রুজিরোজগার শুরু করলে আস্তে আস্তে সব শোধ করে দেবেন। আমি বললাম, ‘এত দিন পর এলেন কেন? এখন তো বিষয়টা আর আমার হাতে নেই, আদালতে চলে গেছে।’ ভদ্রলোক নাছোড়বান্দা। বারবার বলছেন, ‘আপনি চাইলে আমার ইজ্জতটা বাঁচে। সামনে মেয়ের বিয়ে। কথা পাকা হয়ে আছে। বেশ ধারকর্জ হয়ে গেছে এরই মধ্যে। এখন যদি কিছু একটা হয়, বিয়েটা ভেস্তে যাবে।’ মামলাধীন বিষয়ে আমার অপারগতার কথা বললাম। কিন্তু ঘুরেফিরে তিনি বলছিলেন সেই একই কথা। বিরাট এক সংকটের মধ্যে পড়লাম আমি। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। নমনীয়তা দেখানোর কোনো উপায় নেই; জানাজানি হয়ে গেলে আর লোন রিকভারি করা হবে না। একসময় অসহিষ্ণু হয়ে বললাম, ‘যা বলার আদালতে গিয়ে বলুন।’ নিজের কণ্ঠ শুনে নিজেই চমকে গেলাম। কেমন পুলিশি পুলিশি আওয়াজ। ভদ্রলোক হঠাৎ কান্না জুড়ে দেন। কাঁদতে কাঁদতে জড়িয়ে ধরেন আমার পা দুটি। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চমকে উঠলাম আমি। মনে হলো, আমার দুটো পা অনুভূতিহীন হয়ে পড়েছে। এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে গিয়ে ছাড়িয়ে নিলাম তাঁকে। চেয়ারে বসিয়ে আশ্বস্ত করলাম, এসব নিয়ে আর ভাবতে হবে না। চোখ মুছতে মুছতে চলে গেলেন ভদ্রলোক। তবে জানো রাহেলা, আমি কিছুই করতে পারিনি। কোনো কিছুই আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল না। সেই স্যারকে আদালতে যেতে হয়েছিল। মেয়ের বিয়ে ভেঙে গিয়েছিল। এমনকি...’ কান্নায় ভেঙে পড়ে শাহেদ। রাহেলা জড়িয়ে ধরে তাকে, ‘নিজেকে শুধু শুধু অপরাধী ভাবছ, এখানে তোমার কীই-বা করার ছিল?’ সেই স্যারের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়েছিল একদিন। লজ্জায় দ্রুত পাশ কেটে যাচ্ছিলাম। তিনি পাশ থেকেই সালাম দিয়ে বললেন, ‘বড্ড পাথর মানুষ গো আপনে—’
সেই পাথর শব্দটা এখনো আমার কানে বাজে।

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ‘নিরুপায়’ শিশুরা by প্রণব বল

চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুরের একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় কাজ
করছে এক​ শিশু। গতকাল সকালে তোলা ছবি l প্রথম আলো
১৩ বছরের শচীন কাজ করে চট্টগ্রাম নগরের মোমিন রোডের একটি গাড়ি মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানে। বাবার আয়রোজগার কম, তাই ষষ্ঠ শ্রেণির পরই পড়াশোনার পাট চুকাতে হয়েছে তাকে। একই দোকানে কাজ করে তার সমবয়সী রিপন। পরিবারের অভাবের তাড়নায় এই বয়সে কাজ করছে সে।
মোমিন রোডের ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. আলমগীর বলেন, ‘শচীনকে আমার এখানে আনার পর তার অভিভাবকদের বলেছিলাম, তাকে লেখাপড়া করাতে। কিন্তু তার অভিভাবক বলল, ঠিকমতো খেতে পায় না। কাজ করা ছাড়া উপায় নেই।’
শচীন ও রিপনের মতো হাজারো শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত। সরকারি হিসেবে চট্টগ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ১০ হাজার। কিন্তু বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, এই সংখ্যা ৪০ হাজারের মতো। শ্রম আইন অনুযায়ী, শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ করা নিষেধ। এ ছাড়া শিশুদের দিয়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের শ্রম একেবারেই নিষিদ্ধ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনেক শিশু শ্রমিকের আয়ে চলে তাদের পরিবার। অভাবের তাড়নায় নিরুপায় হয়ে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। অন্যদিকে সস্তা শ্রমের কারণে শিশুদেরও কাজে নিয়োগের প্রবণতা আছে। এসব কারণে শিশুশ্রম বন্ধ করা যাচ্ছে না।
সরকারি হিসাবে, চট্টগ্রামে ১০ হাজার শিশু শ্রমিক আছে। এরা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত।
‘বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুশ্রম নিরসন’ নামের একটি প্রকল্প ছিল শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে। সম্প্রতি প্রকল্পটি শেষ হয়ে গেছে। ওই প্রকল্পের প্রোগ্রাম সুপারভাইজার ছিলেন মো. ইয়াসির আরাফাত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সঙ্গে ১০ হাজার শিশু শ্রমিক জড়িত।’
বিভিন্ন সূত্র জানায়, শিশু শ্রমিকেরা জাহাজভাঙাশিল্প, ঝালাই কারখানা, পুরান লোহালক্কড়ের দোকানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িত। এসব কাজে নিয়োজিত বেশির ভাগ শিশুই দৈনিক ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করে।
ওয়ার্ল্ড ভিশন, অপরাজেয় বাংলাদেশ ও ব্রাইট বাংলাদেশ নামে তিনটি সংস্থার ‘শিশুশ্রম হ্রাসকরণ’ নামের একটি প্রকল্প আছে। ওই প্রকল্পের অধীনে নগরের চারটি ওয়ার্ডে শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।
অপরাজেয় বাংলাদেশের প্রকল্প সমন্বয়কারী মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শ্রমজীবী শিশুদের নিয়ে কাজ করছি। আমাদের অভিজ্ঞতায় বলে নগরে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা ৪০ হাজারের কম নয়। আমরা শিশুশ্রম বিষয়ে শিশুদের অভিভাবক ও মালিকপক্ষকে সচেতন করে যাচ্ছি। তবে বাস্তবতা হলো, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে নিরুপায়।’
ইউসেপ বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠন প্রায় ৩৫ বছর ধরে চট্টগ্রামে শ্রমজীবী শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। তারা শিশুদের কাজের ফাঁকে লেখাপড়া ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছে।
ইউসেপ বাংলাদেশের সহকারী প্রোগ্রাম কর্মকর্তা দেবাশীষ সেন বলেন, ‘আমাদের ১০টি জেনারেল স্কুল ও দুটি টেকনিক্যাল স্কুলে ১০ হাজারের বেশি শিশু আছে। তারা কাজের ফাঁকে পালা করে এখানে পড়ছে।’ তিনি বলেন, শিশুরা অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে কাজে আসছে। দেবাশীষ সেনের মতে, চট্টগ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ হাজার।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাহাড়তলী থানাসংলগ্ন পুরোনো জাহাজের সরঞ্জাম বিক্রির দোকানগুলোতে অন্তত ৫০টি শিশু কাজ করছে। শিশুদের প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে টানা আট-নয় ঘণ্টা কাজ করতে হয়।
রঙ্গাজীব নামের একটি শিশু বলল, ‘আমার বাবা অসুস্থ। মা বাসাবাড়িতে কাজ করে। তাতে চলে না। তাই এখানে কাজ করছি।’

বিশ্ব শিশুশ্রমবিরোধী দিবস- ২০১৬ সালের মধ্যে নিরসন হচ্ছে না ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম by সামছুর রহমান

মো. সুজন। জীবিকার তাগিদে ওকে বেছে নিতে হয়েছে
চালকের সহকারীর কাজ। ছবিটি রাজশাহী-কাকনহাট
সড়ক থেকে গতকাল তোলা l প্রথম আলো
সরকার ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু কাজের যে অগ্রগতি, তাতে ২০১৬ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২১ সালকে লক্ষ্য ধরে নতুন জাতীয় পরিকল্পনা করতে হবে।
২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি বাস্তবায়নের জন্য ২০১২ সালে পাঁচ বছরমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১২-২০১৬) তৈরি করা হয়েছিল। তাতে ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের অঙ্গীকার করা হয়।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান মানছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘অঙ্গীকারবদ্ধ সময়ের মধ্যে সম্ভব হচ্ছে না, তাই বলে কাজ থেমে নেই।’
২০১৬ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনের পরিকল্পনা অবান্তর ছিল বলে মনে করেন বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন মো. ইমরানুল হক চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীতি অনুযায়ী যেসব সরকারি প্রতিষ্ঠান শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করার কথা, তাদের মধ্যে কোনো ধরনের সমন্বয় গড়ে ওঠেনি।’
সরকার শিশুশ্রম নিরসনে অঙ্গীকার করলেও দেশে এই মুহূর্তে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা কত, সে তথ্য নেই। চার বছর আগে কর্মপরিকল্পনা নিলেও করা হয়নি কোনো জরিপ বা শুমারি। তাই শিশু শ্রমিকের সংখ্যার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভরসা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) পরিচালিত ২০০২-০৩ সালের সর্বশেষ জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ। জরিপে সপ্তাহে ৪৩ ঘণ্টার বেশি কাজ করে—এমন শিশুদের শিশু শ্রমিক ধরা হয়েছে। সে হিসাবে তখন দেশে শিশু শ্রমিক ছিল ৪৭ লাখ। এদের মধ্যে ১৩ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত।
শিশুশ্রম নিরসনে কাজ করছে—এমন বেসরকারি সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে শিশুশ্রমের ওপর হালনাগাদ শুমারি করার দাবি জানিয়ে আসছে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবদুল্লা আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশুশ্রমের আসল চিত্রটা কী, এটা কি বাড়ল নাকি কমল, কেউ বলতে পারবে না। কত শিশু শ্রমে জড়িত, সেটির সঠিক সংখ্যা জানা না থাকলে কীভাবে শিশুশ্রম নিরসন হবে। একটি জাতীয় শিশুশ্রম শুমারি জরুরি।’
সরকার ২০১৩ সালে শিশুদের জন্য ৩৮টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকা প্রকাশ করে। দেশের শিশু শ্রমিকদের একটি বড় অংশ গৃহকর্মে নিয়োজিত। কিন্তু জোরালো দাবি সত্ত্বেও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় গৃহকর্মকে স্থান দেয়নি সরকার।
শিশুশ্রম নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন গৃহকর্ম, ভাঙারি, পোশাক কারখানার ঝুটের কাজ, তুলা কারখানা বা বেডিংয়ের কাজকে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ৩৮টি কাজের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, কিন্তু একেক ধরনের কাজে ঝুঁকি বিভিন্ন রকম। তাই সেক্টর অনুযায়ী কাজের ঝুঁকিও চিহ্নিত করতে হবে।
শিশুশ্রম নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও তাদের কাজে সমন্বয়ের অভাব আছে। শিশুশ্রম বিষয়ে কাজ করছে—এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো শিশুদের জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশু অধিদপ্তর করার দাবি জানিয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ২০০৯ সালে শিশুশ্রম ইউনিট গঠন করেছিল। ২০১২ সালে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে শিশু ইউনিটের আর কোনো কার্যক্রম নেই। অবশেষে শ্রম মন্ত্রণালয় এ বছর একটি শিশুশ্রম শাখা চালু করেছে।
যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ ফয়জুর রহমান বলেন, এ শাখার কাজ হবে মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশুশ্রম নিরসনে যেসব কাজ হচ্ছে, সেগুলো দেখভাল করা।

যেমন আছেন সালাহউদ্দিন by দীন ইসলাম

নানা ধকল কাটিয়ে মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন বর্তমানে আইনগত প্রয়োজনে মেঘালয়ের শিলংয়ে থাকা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ। শিলং শহরের ক্যান্টনমেন্টের পাশে একটি ছোট্ট ডুপ্লেক্স কটেজে এখন নীরবে তার দিন কাটছে। বাসা থেকে বাইরে বের হচ্ছেন না। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী খাওয়া-দাওয়া করছেন। বাসাতেই খাবার রান্না হচ্ছে। নিখোঁজ, উদ্ধার ও হাসপাতালে চার মাস কাটিয়ে এখন রাজনীতিবিদের চিরাচরিত অভ্যেস পেয়ে বসেছে সালাহউদ্দিনের। প্রতিদিন বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২০-৫০ জন নেতাকর্মী সাক্ষাৎ পেতে তার কটেজের সামনে ভিড় জমাচ্ছেন। প্রিয় নেতাকে এক নজর দেখার জন্য অনেকেই দিনের পর দিন অপেক্ষা করেন। সালাহউদ্দিনের ভাতিজা সাফওয়ানের মাধ্যমে সাক্ষাতের চেষ্টা করেন। কোন নেতাকর্মীকে এড়িয়ে চলতে ব্যর্থ হলে সালাহউদ্দিন দেখা করেন। সময় দেন। তবে নিখোঁজ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করলেই এড়িয়ে যান। বলেন, এসব প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলার সময় এখন নয়। ভবিষ্যতে এ নিয়ে অনেক কথা বলা যাবে। কেউ প্রসঙ্গটি তুললে স্ত্রী হাসিনা আহমেদও তখন বাধা দিয়ে বলেন, আগে পুরোপুরি সুস্থ হোক তারপর সব কিছু বলা যাবে। এদিকে স্বামীর আইনগত ব্যবস্থা একটি পর্যায়ে দিয়ে দুয়েক দিনের মধ্যে বাংলাদেশে আসবেন সালাহউদ্দিন আহমেদের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশে আসার টিকিট কেটেছেন। শিলং থেকে কলকাতা হয়ে বাংলাদেশে ফিরবেন। তার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সালাহউদ্দিনের মেয়ে এ লেভেল পরীক্ষা দিচ্ছে তাই হাসিনা আহমেদকে আপাতত বাংলাদেশে যেতে হচ্ছে। তবে ১০ দিন থেকে আবারও শিলং-এ স্বামীকে সঙ্গ দিতে ফিরে যাবেন হাসিনা আহমেদ। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, স্ত্রী হাসিনা আহমেদের অবর্তমানে ভাতিজা সাফওয়ান ছাড়াও কলকাতা থেকে আরেক স্বজন আইয়ুব শিলং যেতে পারেন। আইয়ুব মানবজমিনকে বলেন, শুনেছি ভাবী প্রয়োজনে বাংলাদেশে চলে যেতে পারেন। তবে সহসাই আবার শিলং চলে আসবেন। এ সময়টাতে শিলং গিয়ে ভাইকে সঙ্গ দেয়ার জন্য যেতে পারি। সালাহউদ্দিনের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ১১ই মে মেঘালয়ের শিলংয়ের গলফ লিঙ্ক এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়ার পর প্রথমদিকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ বিপর্যস্ত ছিলেন সালাহউদ্দিন। মীমহ্যানস, সিভিল হাসপাতাল ও নেগ্রিমস হাসপাতালে নিবিড় চিকিৎসার পর এখন অনেকটাই সুস্থ সালাহউদ্দিন। চলাফেরায় বেশ পরিবর্তন এসেছে। গত বুধবার আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার পর তার মধ্যে এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের ছাপ চোখে পড়ে। ওই দিন বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমি এখন বেশ ভাল আছি। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা ছাড়াও কারও সহায়তা ছাড়া তাকে হাঁটাচলা করতে দেখা যায়। এর আগে সিভিল হাসপাতালে তার শারীরিক স্ক্যানিং করতে নিয়ে যাওয়ার সময় দুই থেকে তিন জন ব্যক্তির উপর ভর করে তাকে চলাফেরা করতে হয়। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে,  সালাহউদ্দিন যে ডুপ্লেক্সটিতে থাকেন এতে রয়েছে তিনটি বেডরুম, ড্রইং ও লিভিং রুম। সালাহউদ্দিনের আইনজীবী এসপি মোহান্ত ও শিলংয়ে বসবাসরত কয়েক জন বাংলাদেশী তাকে এ ডুপ্লেক্সটি ঠিক করে দিয়েছেন। গত সোমবার শিলংয়ের বিশেষায়িত নেগ্রিমস হাসপাতাল থেকে রিলিজ নিয়ে ডুপ্লেক্স কটেজে উঠেছেন বাংলাদেশের এ রাজনীতিবিদ। এ ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও ভাতিজা সাফওয়ানকে নিয়ে থাকছেন। সালাহউদ্দিনের সঙ্গে গত কয়েক দিন মানবজমিনের পক্ষ থেকে কথা বলার জন্য যোগাযোগ করা হলে বলা হয়, শর্তসাপেক্ষে জামিনে থাকায় আপাতত তিনি কোন কথা বলবেন না। মামলার পরবর্তী কার্যক্রম দেখে তিনি কথা বলবেন। এর আগে প্রায় দুই মাস নিখোঁজ থাকার পর গত ১১ই মে ভারতের শিলংয়ে উদ্ধার হন সালাহউদ্দিন আহমেদ। পরে পুলিশ তাকে আটক করে মানসিক হাসপাতাল মীমহ্যানসে নিয়ে যায়। একদিন পর মীমহ্যানস থেকে আবার তাকে পাঠানো হয় সিভিল হাসপাতালে। ওই হাসপাতালের আন্ডার প্রিজনার সেলে (ইউটিপি) তাকে রেখে চিকিৎসা দেয়া হয়। সিভিল হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকায় তাকে বিশেষায়িত হাসপাতাল নেগ্রিমসে এক সপ্তাহ ধরে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। ৩রা মে সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট-৪৬’ এ দায়ের করা মামলার চার্জশিট দেয়া হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে মেঘালয় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে এ চার্জশিট জমা দেয়া হয়। চার্জশিটে ফরেনার্স অ্যাক্টের ১৪ ধারা অনুযায়ী  বৈধ ডকুমেন্ট ছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগ আনা হয়েছে সালাহউদ্দিনের বিরুদ্ধে। ২০শে মে সিভিল হাসপাতাল থেকে সালাহউদ্দিনকে স্থানান্তরিত করা হয় মেঘালয়ের নর্থ ইস্টার্ন ইন্দিরা গান্ধী রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড মেডিক্যাল সায়েন্সেস (নেগ্রিমস) হাসপাতালে। নেগ্রিমস থেকে পুলিশ হেফাজতে নেয়ার পর ২৭শে মে আদালতে তোলা হয়। আদালতের নির্দেশে ১৪ দিন বিচারিক  হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপর ৫ই মে শিলংয়ের আদালত থেকে শর্তসাপেক্ষে জামিন পান সালাহউদ্দিন আহমেদ।

‘প্রাণে বাঁচতে এএসআই জহিরের হাতে তুলে দিই তিন লাখ টাকা’ by মহিউদ্দীন জুয়েল

উদ্দেশ্য ছিল ব্যবসায়ীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়া। টার্গেট অনুযায়ী ৩ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার পর হুমকি দেয়া হয় নাসিম আহমেদ নামের ওই ব্যবসায়ীকে। বিষয়টি জানাজানি হলে গতকাল সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে চট্টগ্রাম নগর গোয়ন্দা পুলিশের ৫ সদস্যকে। সাময়িক বরখাস্তরা হলেন- এসআই আমিরুল ইসলাম, এএসআই জহির উদ্দিন, কনস্টেবল শাহ আলম, গোলাম সামদানি ও সোহেল ওমর। ঘটনাটি ঘটেছে নগরীর পাঁচলাইশ থানার কেবি ফজলুল কাদের সড়কে ল্যানসেট হাসপাতাল ভবনের নিচতলায় অবস্থিত একটি অফিসে। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাসিম আহমেদ এ ঘটনায় শহরের পাঁচলাইশ থানায় জিডি করেন।
জিডিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, তার অফিস থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকা লুট করে নিয়েছেন নগর গোয়েন্দা পুলিশের এএসআই জহির উদ্দিন। সোমবার মধ্যরাতে এ ঘটনা ঘটে। জহির উদ্দিনের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশ দল ওই অফিসে গিয়ে তার কাছে ইয়াবা আছে বলে জানায়। একপর্যায়ে অস্ত্র আছে বলে গ্রেপ্তার করার হুমকি দেয়। ঘটনা থেকে বাঁচতে নিরাপরাধ নাসিম ওই পুলিশ কর্মকর্তাদের চাহিদামতো ৩ লাখ টাকা তুলে দেয়।
পরে এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তার অফিসে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে থানায় জিডি করেন নাসিম। জিডিতে আরও বলা হয়, ডিবি পরিচয় দিয়ে অজ্ঞাতনামা ১০ জন লোক আমার অফিসে ঢুকে আমাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালায়। তারা আমার টাকা-পয়সা ও মোবাইল ফোন দিয়ে দেয়ার জন্য বলে। এই কাজে ছিলেন পুলিশের জহির উদ্দিন, সোর্স আবু তাহেরসহ আরও বেশ কয়েকজন। বাইরে গাড়ি ছিল। কোমরে পুলিশের ব্যবহৃত পিস্তলও ছিল।
নগর পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিয়ম বহির্ভূতভাবে এ ধরনের অপারেশন চালিয়েছে পুলিশের ওই কর্মকর্তা জহির। যা ঊর্ধ্বতন মহলের কেউ জানতো না। গতকাল ভিডিও ফুটেজ শনাক্তের পর পুলিশ বিভাগ ৫ জনকে এ কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে সাময়িক বহিষ্কার করে। ঘটনার অনুসন্ধানে তারা জানিয়েছে মূলত পারিবারিক বিরোধ থেকেই একপক্ষকে সমর্থন দিতে জহির ব্যবসায়ী নাসিমের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। তার উদ্দেশ্য ছিল ভয়-ভীতি প্রদর্শন।
জিজ্ঞাসাবাদে ব্যবসায়ী সৈয়দ নাসিম আহমেদ পুলিশকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি ছোটবোন সৈয়দা শারমিন আহমেদের স্বামী ডা. ফজলে রাব্বির বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা করেন তিনি। সেই মামলা তুলে নিতে পুলিশের ওই ব্যক্তিকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে ভাড়া করেন ফজলে রাব্বি। আগামী ১৪ই জুন এ মামলার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার কামারুজ্জামান এ ব্যাপারে মানবজমিনকে বলেন, সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে কয়েকজনকে। যেহেতু অভিযোগ উঠেছে তাই খতিয়ে দেখে তদন্ত করে তারপর বলা যাবে। তবে ভিডিও ফুটেজ সত্যি হলে কঠোর ব্যবস্থা নেবে পুলিশ বিভাগ।
জানতে চাইলে জিডির তদন্ত কর্মকর্তা কায়সার বলেন, ঘটনা সত্যি। তবে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চাচ্ছি না। আমরা সবাইকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। পুলিশ বিভাগ ঘটনাটি নিয়ে বৈঠক করেছে।
ব্যবসায়ী সৈয়দ নাসিম আহমেদ বলেন, ভিডিও ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করা হয়েছে। যারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের মধ্যে অনেকে পুলিশের লোক ছিল। ওরা যখন জানতে পারে আমার কাছে ফুটেজ আছে তখথন দ্রুত আমার অফিসে আসে। এরপর ক্ষমা চায়।
তিনি আরও বলেন, আমি পুলিশের জহিরের হাতে ৩ লাখ টাকা তুলে দেই। সে আমাকে বলেছিল যাতে কাউকে কিচ্ছু না বলি। বললে নাকি মেরে ফেলবে। আমি তারপরও গতকাল আদালতে গিয়েছি।

সিটি নির্বাচনে অনিয়ম তদন্ত না হওয়া লজ্জাজনক

দেশের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ব্যাপারে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। বলেছেন, ওই দিন সকালে আমি ভোটে কোন বিচ্যুতি দেখিনি। যে কারণে নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু দুপুরে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়মের খবর আসতে থাকে। বিভিন্ন কেন্দ্র দখল এবং বিচ্যুতির ঘটনাও দেখতে পাই। এ অবস্থায় বিএনপির নির্বাচন থেকে সরে আসার খবরও পাই। আমি আশা করেছিলাম নির্বাচনে যেসব অনিয়মের অভিযোগ এসেছে, নির্বাচনে হস্তক্ষেপের যে চিত্র গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওঠে এসেছে তার পূর্ণ এবং স্বচ্ছ তদন্ত হবে। কিন্তু তা আর হয়নি, এটা বড়ই লজ্জাজনক। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিকাব) আয়োজিত ডিকাব টক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বৃটিশ দূত এসব কথা বলেন। ডিকাব সভাপতি মাসুদ করিমের সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় আনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন সাধারণ সম্পাদক বশির আহমেদ। অনুষ্ঠানে ডিকাব সদস্যরা ছাড়াও বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্টাররা অংশ নেন। সিটি নির্বাচনে ফল ঘোষণা প্রসঙ্গে গিবসন বলেন, ওই নির্বাচনকে আইনিভাবে কেউ চ্যালেঞ্জ করেনি। ফল ঘোষণায়ও কোন বাধা ছিল না। বিধায় নির্বাচন কমিশন ফল ঘোষণা করেছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য আশা করে বিজয়ী ৩ সিটি মেয়র জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবেন। গঠনমূলক কাজে সক্রিয় থাকবেন। পরিবেশের এমন উন্নয়ন করবেন যেন নগরবাসী সুখী হয়। বিদেশী দূতদের সঙ্গে ডিকাবের নিময়তি মতবিনিময়ের আয়োজন ডিকাব টক এর গতকালের বিষয় ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে বৃটেনের সম্পর্ক। সেখানে কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্র হিসাবে গণতন্ত্রচর্চাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের অভিন্ন যে মূল্যবোধ এবং অঙ্গীকার রয়েছে তা নিয়ে কথা বলেন হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আবারও সংলাপে বসার আহ্বান জানান। তার আলোচনায় ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের প্রসঙ্গও আসে। এক প্রশ্নের জবাবে গিবসন বলেন, দুর্ভাগ্যজনক বিষয় ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়নি। অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল না ভুল ছিল সেই মূল্যায়নে যাব না। গণতন্ত্র চর্চা নিয়ে অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। নির্বাচনই গণতন্ত্রের একমাত্র পূর্বশর্ত নয়। তবে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভোটের জন্য আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের প্রশংসা করে বৃটিশ রাষ্ট্রদূত বলেন, সার্বিক বিচেনায় এ দেশের মানুষ অসহিংস। তারা সহিংসতা পছন্দ করে না।  কিন্তু অনেক সময় সেই ‘সহিষ্ণু’ পরিবেশ থাকে না। এটা দুংখজনক। তার দেশ সবসময় সহিংসতার নিন্দা করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। লিখিত বিবৃতিতে গিবসন বলেন, আধুনিক স্বৈরতন্ত্র একটা বড় চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর অনেক দেশে অনেকের মধ্যে এ মানসিকতা রয়েছে। সরকার রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ, গণমাধ্যম, বিচার বিভাগ, অর্থনীতি, নাগরিক সমাজ, সামরিক বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রে এরকম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা রয়েছে। ওই সব যারা করতে চায় তারা কিছু জালিয়াতি করে অন্যায় সুবিধা নিতে চায়। ওই মনোভাব দিয়ে নির্বাচন কমিশনে নিজেদের লোকদের বসায়। কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনের রায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চায়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে গিবসন বলেন, আমি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না। এটা আমার কাজ নয়। যে কোন দেশেই এটা যেন না ঘটে সেজন্য যুক্তরাজ্য উৎসাহ দেয়। তার দেশ এ থেকে ‘মুক্ত’ বলেও দাবি করেন বৃটিশ হাই কমিশনার। সূচনা বক্তৃতায় বৃটেনের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ৩ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এমপি নির্বাচিত হওয়ার উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বৃটিশ দূত বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র বিভিন্ন সময়ে ধাক্কা খেয়েছে। জাতীয় সংসদ ‘গণতন্ত্রের সুরক্ষা’র কাজ করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশের বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে বৃটিশ হাইকমিশনার বলেন, দুর্নীতি বিনিয়োগে বড় চ্যালেঞ্জ। এটি বিনিয়োগকে নিরোৎসাহিত করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পাকিস্তান ছাড়তে নির্দেশ সেভ দ্য চিলড্রেনকে

আন্তর্জাতিক সংস্থা সেভ দ্যা চিলড্রেনকে ১৫ দিনের মধ্যে পাকিস্তান ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সরকার। ইতিমধ্যে সংস্থাটির অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে পুলিশ বলছে। সরকারের দেয়া এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে সংস্থাটি পাকিস্তান বিরোধী কর্মকাণ্ড জড়িত থাকার কারণে এই নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেয়া ঐ বিবৃতিতে বলা হয়েছে সেভ দ্যা চিলড্রেনের সমস্ত বিদেশী কর্মকর্তাদের ১৫ দিনের মধ্যে পাকিস্তান ছাড়তে হবে। ইতিমধ্যে রাজধানী ইসলামাবাদে সংস্থাটির অফিসে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে পুলিশ।
এর আগেও সেভ দ্যা চিলড্রেনকে পাকিস্তানে সব কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নেয়ার কথা বলেছিল দেশটির সরকার।
২০১২ সালে এক টিকা দান কর্মসূচী শুরু করেছিল তারা, তবে সে সময় অভিযোগ ওঠে ঐ নকল টিকাদান কর্মসূচীর মাধ্যমে মূলত আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ট্র্যাক করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
পাকিস্তানের গোয়েন্দা বিভাগের এক প্রতিবেদনে বলা হয় শাকিল আফ্রিদি নামে এক চিকিৎসককে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ- ঐ টিকা দেয়ার কাজে ব্যবহার করেছিল।
অভিযোগ রয়েছে মি. আফ্রিদি সেসময় ওসামা বিন লাদেন যে শহরে অবস্থান করছিলেন সেখানকার মানুষের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন।
উদ্দেশ্য ছিল বিন লাদেনের অবস্থান সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়ার। পরে ২০১১ সালে মার্কিন অভিযানে বিন লাদেন নিহত হন একই শহরে। পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার করা যৌথ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে সেভ দ্যা চিলড্রেনের একজন সাবেক পরিচালক চিকিৎসক মি. আফ্রিদিকে আমেরিকার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন। এদিকে সংস্থাটির সব কার্যক্রম গত ছয়মাস ধরে কড়া নজরদারির মধ্যে ছিল।

মিসরে পর্যটন এলাকায় আত্মঘাতী বোমা হামলা

মিসরে নীল নদের তীরবর্তী লুক্সর শহরের একটি পর্যটনকেন্দ্র এলাকায় আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়েছে। প্রাচীন কর্নক মন্দির এলাকায় এ হামলা চালানো হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, হামলাকারী তিন আত্মঘাতী বোমারু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে দু’জন পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এ সময় আহত হন মন্দিরের চার দর্শনার্থী। উল্লেখ্য, প্রতিবছর মিসরের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র কর্নক মন্দিরে ঘোরতে যান দেশ-বিদেশের কয়েক কোটি পর্যটক। পর্যটন গুরুত্বের দিক থেকে গিজার পিরামিডের পরই এর স্থান। পুলিশ জানিয়েছে, তারা একই মন্দিরে এর আগে দুটি আত্মঘাতী বোমা হামলার ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করেছে। এখন পর্যন্ত কেউ হামলার দায়দায়িত্ব স্বীকার করেনি। তবে সেনা অভ্যুত্থানে মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে উৎখাতের পর থেকে দেশটিতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। কর্নক মন্দির মিসরের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অন্যতম। হামলাকারীর পরিকল্পনা ছিল পর্যটকদের ভিড়ের মধ্যে থেকে বিস্ফোরণ ঘটানো।
পুলিশ সন্দেহজনক গতিবিধি বুঝতে পেরে তিনজনের সংঘবদ্ধ একটি দলকে ঘিরে ফেলতে চেষ্টা করলে তারা কর্নক মন্দিরে নিকটস্থ একটি প্রতিবন্ধক টপকাতে চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে, দু’জন ঘটনাস্থলে নিহত হয়। দেশত্যাগে ইচ্ছুক এক-চতুর্থাংশ তরুণ : মিসরীয় তরুণ-তরুণী যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ এর মধ্যে তাদের প্রায় এক-চতুর্থাংশই বিদেশে পাড়ি জমাতে চায়। মিসরের বার্তা সংস্থা মেনা জানিয়েছে, ২০১৪ সালে পরিচালিত এক সরকারি জরিপ মতে, প্রায় ২৫.৮ ভাগ তরুণ-তরুণী দেশত্যাগ করে অন্য দেশে বসবাসের জন্য চলে যেতে চায়। জরিপে দেখে যায়, ১৭.২ ভাগ তরুণ দেশত্যাগ করতে চায়। তুলনায় মাত্র ৭.৮ ভাগ তরুণী মিসর ত্যাগ করে অন্য দেশে চলে যাওয়ার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেছে। জরিপটি ২০১৪ সালে সেন্ট্রাল এজেন্সি ফর পাবলিক মবিলাইজেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের (ক্যাপম্যাস) সহায়তায় ইজিপ্টিয়ান সেন্টার ফর পপুলেশন কর্তৃক পরিচালিত হয়। কেন তারা দেশান্তরী হতে চায়, তরুণ-তরুণীরা তার কারণও জানিয়েছে।

নিলামে হিটলারের ১৪ চিত্রকর্ম

প্রায় ১০০ বছর আগে অ্যাডলফ হিটলারের আঁকা কয়েকটি জলরং চিত্রকর্ম চলতি মাসেই নিলামে তুলছে দক্ষিণ জার্মানির একটি নিলাম হাউস। মঙ্গলবার নুরেমবার্গের ওয়েডলার নিলাম হাউস জানায়, এসব চিত্রকর্ম ১৯০৪ থেকে ১৯২২ সালের মধ্যে আঁকা হয়েছিল এবং তাতে হিটলারের স্বাক্ষর রয়েছে। নিলামে মোট ১৪টি চিত্রকর্ম স্থান পাবে। আগামী ১৮ থেকে ২২ জুন নিলাম অনুষ্ঠিত হতে পারে। প্রতিটি চিত্রকর্ম ১ হাজার ১২৮ ডলার থেকে ৫০ হাজার ৭০০ ডলারে বিক্রি হতে পারে।
একই নিলাম হাউসে হিটলারের তরুণ বয়সে ১৯১৪ সালে আঁকা একটি চিত্রকর্ম গত নভেম্বরে মিউনিখে ১ লাখ ৩০ হাজার ইউরোতে (১ কোটি ১৩ লাখ টাকায়) বিক্রি হয়। তবে ক্রেতা তার নাম প্রকাশ করতে চাননি। তরুণ বয়সে আঁকাআঁকিতে জড়িত ছিলেন হিটলার। তিনি ভিয়েনা একাডেমি অব আর্টসে ভর্তির আবেদন করেছিলেন তবে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। তা সত্ত্বেও আঁকাআঁকি চালিয়ে যান যুদ্ধবাজ নেতা। তিনি চিত্রকর্ম এঁকে পর্যটকদের কাছে বিক্রি করতেন। বোদ্ধাদের মতে, হিটলারের চিত্রকর্মগুলো মাঝারি মানের।

আদমজীর ৬৫ বছরের পুরনো পুকুর ভরাটের পাঁয়তারা ক্ষোভ by বিল্লাল হোসেন রবিন

বন্ধ হয়ে যাওয়া এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজী জুট মিল এখন শুধুই স্মৃতি। সেখানে গড়ে উঠেছে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)। তবে দু’একটি স্মৃতিচিহ্ন এখনও আদমজী জুট মিলের অস্তিত্বকে জানান দিচ্ছে। এরমধ্যে অন্যতম তিনটি সুবিশাল পুকুর। তবে একটি পুকুরের পঞ্চাশ ভাগ ভরাট হয়ে গেছে। আরেকটি পুকুর তেমন একটা গুরুত্ব বহন না করলেও ইপিজেডের প্রধান ফটকের পাশের পুকুরটি ইপিজেডের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রকাশ। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষারও উপাদান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বেপজা কর্তৃপক্ষ সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য সহায়ক ৬৫ বছরের পুরনো এই বিশাল আয়তনের পুকুরটি ভরাট করার আগ্রাসী পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছেন। ইতিমধ্যে পুকুরটির কিছু অংশ ভরাট করে ফেলা হয়েছে। পুরো পুকুরটি ভরাটের পাঁয়তারা চলমান। এতে এলাকাবাসীর মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সূত্রমতে, ১৯৫১ সালে আদমজী জুট মিল প্রতিষ্ঠার সময় মিলের সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে মিল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। পুরো মিল এলাকাকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যসমৃদ্ধ এক মনোরম পরিবেশের আবহ দিতে বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার গাছ লাগানো হয়। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় অসংখ্য ফুলের বাগান। মিল অভ্যন্তরে বিশাল আয়তনের ৯টি পুকুর মিলের সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই পুকুরগুলো শ্রমিক-কর্মচারীদের বিনোদনের একটি মাধ্যমে পরিণত হয়। পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে গোসল, সাঁতার, নৌ ভ্রমণ সবই হতো। আবার প্রচণ্ড গরমে একটু স্বস্তির জন্য শত শত শ্রমিক পুকুর পাড়ে বসে বিশ্রাম নিতো। যে সুবিধাটা পেতে পারতো ইপিজেডের শ্রমিকরা। কিন্তু বেপজা কর্তৃপক্ষ মিল অভ্যন্তরের সুবিশাল ৯টি পুকুরের মধ্যে ৬টিই ভরাট করে ফেলেছে। বাকি তিনটির মধ্যে ২ নং পুকুর পঞ্চাশ ভাগ ভরাট হয়ে গেছে। ৩ নং পুকুরটি পরিত্যক্ত হয়ে আছে। অবাঙালিদের আবাসনের জন্য বরাদ্দকৃত ১১ একর জায়গার মধ্যে পড়েছে ওই পুকুরটি। ফলে এই পুকুরটি ভরাট হলেও কারো কোন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু পরিষ্কার স্বচ্ছ পানির সুবিশাল ৪ নং পুকুরটি ইপিজেডের সৌন্দর্যের অন্যতম প্রকাশ। পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষারও উপাদান। কিন্তু বেপজা কর্তৃপক্ষ সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য সহায়ক এই বিশাল আয়তনের পুকুরটি ভরাট করার আগ্রাসী পরিকল্পনা নিয়ে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছেন। ইতিমধ্যে মেইন রোড থেকে পুকুরটি প্রায় ১৬০ ফুট ভরাট করে ফেলেছে। পুরো পুকুরটি হয়তো এসময় ভরাট করে ফেলবে। বাপা নারায়ণগঞ্জ শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক শরীফুদ্দিন সবুজ বলেন, আদমজী বন্ধ হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন নামে একটি সংগঠনের পক্ষ থেকে আমরা দাবি জানিয়েছিলাম, যাতে গাছগুলো কাটা না হয় এবং পুকুরগুলো ভরাট করা না হয়। তখন সরকার বলেছিল এই দাবি বাস্তবায়ন হবে। কিন্তু বাস্তবে তা করা হয়নি। তিনি বলেন, পরিবেশ ধ্বংস হলে কী ক্ষতি হয় তা আমরা টের পেতে শুরু করেছি। হাজার হাজার গাছ কর্তন ও পুকুর ভরাটের কারণে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দেবে। এর খেসারত আদমজীতে যারা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন সেই মালিক ও শ্রমিকদের দু’দিন আগে আর পরে দিতে হবে। চালু থাকা অবস্থায় আদমজী জুট মিলস এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এমএ মাসউদ বাদল (৬৪) বলেন, বিশাল আকারের পুকুরগুলো মিলের পরিবেশ রক্ষায় ও সৌন্দর্যবর্ধনে ভূমিকা রেখেছিল। শ্রমিকরা পুকুরগুলোকে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহার করেছে। এগুলো বর্তমান ইপিজেডের কল্যাণেরও কাজে আসতো। এগুলো রক্ষা করে ইপিজেড নির্মিত হলে এর সৌন্দর্য আরও কয়েকগুণ বেড়ে যেত। পরিবেশও ভালো থাকতো। কিন্তু ৬টি পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়েছে। বাকিগুলোও ভরাটের পাঁয়তারা করা হচ্ছে। যদিও মানুষের মাঝে ক্ষোভ আছে এই পুকুর ভরাট নিয়ে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তবে আমি পুকুর ভরাটের এই প্রক্রিয়ার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। বিশেষ করে ইপিজেডের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতে হাতের বাম পাশের বিশাল পুকুরটি পুরো ইপিজেডের সৌন্দর্য বর্ধন করে আছে। এটা ভরাট হলে আমার মতো হাজারো মানুষ কষ্ট পাবে। এলাকাবাসী বলছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুকুর ও জলাশয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঐতিহ্যবাহী পুরনো পুকুর ভরাট না করার জন্য এর আগেও আমরা  দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু বেপজা কর্তৃপক্ষ কোন কর্ণপাত করেনি। বিশালাকার শত শত গাছ কেটে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিনষ্টের পাশাপাশি ৬টি পুকুর ভরাট করে ফেলেছে। এখন বাকিগুলোও ভরাট করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটা দুঃখজনক। অথচ এই পুকুরগুলো পরিবেশের ভারসাম্যের পাশাপাশি ইপিজেডের সৌন্দর্যবর্ধনেও ভূমিকা রেখে আসছে। বিশেষ করে ইপিজেডের প্রধান ফটক দিয়ে প্রবেশ করার সময় হাতের বামপাশে কয়েক একর জায়গা জুড়ে স্বচ্ছ পানির পুকুরটি ইপিজেডের শ্রমিক, কর্মচারী-কর্মকর্তা ও আগন্তুকদের দৃষ্টি কাড়ছে। তাই আমরা মনে করি, পরিবেশের মৌলিক বিষয়গুলো বিবেচনা করে বেপজা কর্তৃপক্ষ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী এই বিশাল পুকুরটি ভরাট করার উদ্যোগ থেকে বিরত থাকবেন।
এব্যাপারে ইপিজেডের জিএম মেহবুব আলম বলেন, পুকুরগুলো মাস্টার প্ল্যানে রেকর্ড করা। আর মাস্টার প্ল্যান তো সরকারই অনুমোদন দেন। মাস্টার প্ল্যানে পুকুরগুলো প্লট আকারে নির্ধারণ করা আছে। এখন বিনিয়োগকারীদের প্লট বুঝিয়ে দিতে হলে তো এগুলো ভরাট করতেই হবে।
অব্যাহত লোকসানের অভিযোগে ২০০২ সালের ৩০শে জুন সরকার আদমজী জুট মিল বন্ধ ঘোষণা করেন। ২০০৬ সালে বেপজার কাছে হস্তান্তর করা হয় মিলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি। ওই সময় মিল অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েক হাজার গাছ ও সুবিশাল ৯টি পুকুর ছিল। বেপজা কর্তৃপক্ষ মিলের জমিতে গড়ে তুলেছে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড)।

তিস্তা চুক্তি সইয়ের ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে শেখ হাসিনার দিল্লি সফর কাম্য

আমি এলাম, আমি দেখলাম এবং আমি জয় করলাম।’ বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সদ্য সমাপ্ত সফরকে এভাবেই উচ্ছ্বাস ভরে সাফল্যজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার ফারুক সোবহান। গত ১০ই জুন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় লেখা এক নিবন্ধে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের ইতিবাচক দিকগুলো বিস্তারিত উল্লেখ করার পরে তিনি মন্তব্য করেছেন, তিস্তা চুক্তি সইয়ের ব্যর্থতার কারণে সৃষ্ট আশাবাদ শক্তিশালী হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছে।
ফারুক সোবহান লিখেছেন, মোদির সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষ করে গত বছরে ঢাকায়  একটি সফল সফরের পরে তার উপস্থিতির কারণে জনগণ উৎসাহিত হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হূদয় হয়তো গলেছে। কিন্তু এ বিষয়ে মমতা নীরব থাকলেন, যা তার স্বভাবের সঙ্গে মানানসই নয়। মমতা এবারে তার সফরজুড়ে মিতবাক ও মনমরা হয়েই থাকলেন। সুতরাং বহুল প্রয়োজনীয় তিস্তার পরিবর্তে আমরা পুনর্বার  প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস বোঝাই আরেকটি ঝুড়ি পেলাম অথচ আমাদের দিকের ক্ষুধার্ত তিস্তা অববাহিকায় সেচের জন্য পানি ভীষণ দরকারি।
বাংলাদেশের প্রবীণ কূটনীতিক ফারুক সোবহান এরপর লেখেন, আমি এর আগের আরেকটি লেখায় বিশ্বাস ও আস্থা প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছিলাম। মোদির সফরের মধ্য দিয়ে কিছু অস্বস্তি ও সন্দেহ-সংশয়, যা অতীতে অগ্রগতিকে ব্যাহত করেছিল, তা  লক্ষণীয়ভাবে দূর হয়েছে। দীর্ঘ ভ্রমণের পথে মোদি প্রথম পদক্ষেপটি দিয়েছেন। তিস্তা চুক্তি সইয়ের জন্য আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত হবে দিল্লি সফর করা। আগামী ছয় মাসে সীমান্তে বিএসএফ দ্বারা কোন গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটা উচিত নয়। উভয় পক্ষের দ্বারা একটি টাস্কফোর্স গঠন হওয়া উচিত, যারা নিয়মিতভাবে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করবে।

বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধন দৃঢ় করছে ভারত by মীরা শঙ্কর

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর প্রতি মনোযোগী হলো ভারত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে ভূ-যুক্ততার পথে বাংলাদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ হলেও ভারতের জনদৃষ্টিতে কিংবা দিল্লির পররাষ্ট্রনৈতিক ধ্যানধারণায় বাংলাদেশ যথাযথ ওজন অর্জন করেনি। খালেদা জিয়ার বিগত আমলে দুই দেশের সম্পর্ক ছিল শীতল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার আগের সেই পথ থেকে সরে আসায় দৃঢ় ও সাহসী প্রচেষ্টা নিয়েছে। এই সরকার বেশ কটি সহিংস মনোভাবাপন্ন ইসলামি দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। নিজেদের অস্তিত্বের ঝুঁকি নিয়েও এই সরকার ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা চালানোর হোতাদের বেশ কয়েকজনকে বিচারের মুখোমুখি করেছে। কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর শাস্তি হয়েছে এবং এর প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক সহিংসতা ও অস্থিতিশীল কর্মকাণ্ডও করেছে জামায়াত ও তার সমর্থকেরা। সম্প্রতি চারজন ‘নাস্তিক’ ব্লগারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আরও অনেককে সম্ভাব্য শিকার হিসেবে চিহ্নিত করাও হয়েছে। মূল ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ এখন দুটি পক্ষের মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও উত্তেজনায় কম্পিত। এক পক্ষ মনে করে যে বাঙালি পরিচয় ও সংস্কৃতিই বাংলাদেশের পরিচয়ের ভিত্তি, অন্য পক্ষ বিশ্বাস করে যে প্রাথমিকভাবে এর ভিত্তি ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এই মৌলিক অন্তর্দ্বন্দ্বের পরিণতিই ঠিক করে দেবে কোন ধরনের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য নির্ভর করছে। এটা মধ্যপন্থী উদার গণতন্ত্র হবে কি না, এর ওপরই তা নির্ভর করছে। তবে এটা বাংলাদেশের জনগণকেই বেছে নিতে হলেও ভারত কেবল পারে সে দেশের উদার ও মধ্যপন্থী অংশকে সাহায্য করে যেতে।
মোদির এই সফরের কেন্দ্রীয় মনোযোগে ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আরও জোরদার সংযুক্তি ও নিরাপত্তার ওপর। এ ব্যাপারে গত কয়েক মাসে দুটি লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সমুদ্র ও স্থলসীমান্ত চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর ভারত-বাংলাদেশ উভয়েই হেগে অবস্থিত সমুদ্রসীমাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সালিস আদালতের রায় মেনে নিয়ে সমুদ্র নিয়ে বিরোধের মীমাংসা করে। বাংলাদেশের জন্য এটা ছিল বিরাট প্রাপ্তি। কারণ তারা বিবদমান এলাকার পাঁচ ভাগের চার ভাগই পেয়েছে নিজেদের বলে। অন্যদিকে বিবদমান নিউমুরিং এলাকার ওপর ভারতের সার্বভৌমত্বও স্বীকৃত হয়। সমুদ্রসীমার ওপর অধিকার আসায় বাংলাদেশের পক্ষে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাব্য বিপুল জ্বালানি উত্তোলনের দরজা খুলে গেল। এ ঘটনার অর্থনৈতিক অবদান বাংলাদেশের জন্য বিপুল।
মোদির এই সফরের কেন্দ্রীয় মনোযোগে ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আরও জোরদার সংযুক্তি ও নিরাপত্তার ওপর। এ ব্যাপারে গত কয়েক মাসে দুটি লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা সমুদ্র ও স্থলসীমান্ত চিহ্নিত করার মধ্য দিয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির মুহূর্ত সৃষ্টি হয়েছে।
১৯৭৪ সালের ভারত-বাংলাদেশ স্থলসীমান্ত চুক্তির পূর্ণ অনুমোদনই হলো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের মুখ্য আলোকপাতের বিষয়। ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি ভারতের সঙ্গে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তের ১৪টি সেক্টরে বিরাজমান বিবাদের সমাধান করেছিল। বাংলাদেশ সঙ্গে সঙ্গেই চুক্তিটি অনুসমর্থন করলেও ভারত এই আইনি অজুহাতে বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছিল যে আগে সীমান্ত চিহ্নিত হতে হবে। ২০১৫ সালের মে মাসে সংবিধান সংশোধন বিলের সর্বসম্মত অনুচ্ছেদ প্রমাণ করে যে আমাদের সব রাজনৈতিক দল দায়িত্বশীল আচরণ করতে পারে। বিজেপি বিলটি এগিয়ে নিলেও বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তারা এর বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু এবার কংগ্রেস প্ররোচনায় পা না দিয়ে বিদ্যমান রাজনীতির সীমার চাইতেও দূর পর্যন্ত দেখে বিলটি পাস করায় সমর্থন দেয়।
স্থল ও সমুদ্রসীমা বন্দোবস্তে দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আনা উচিত। বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে শেখ হাসিনার সরকার গঠনমূলক সাড়া দিয়েছে। ওই গোষ্ঠীগুলোর কয়েকজন মূল নেতাকে তারা ভারতের কাছে হস্তান্তরও করেছে। দুই দেশই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দমন করায় সহযোগিতার হাত শক্তিশালী করেছে। সময়মতো তথ্য ও গোয়েন্দা সহযোগিতা দেওয়ার মাধ্যমে আরও নিবিড় সমন্বয় এবং কার্যকর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থেকে দুই দেশই তাদের নিরাপত্তা হুমকিগুলো মোকাবিলায় সক্ষম হবে। এ ব্যাপারে উভয়েরই বড় স্বার্থ রয়েছে।
কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা এবং শিলং হয়ে ঢাকা থেকে গুয়াহাটি বাস চলাচল চালুর মাধ্যমে কানেকটিভিটি বা সংযুক্তিও এক লাফে এগিয়ে গেল। তাহলেও দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলে মানুষ, পণ্য ও সেবার বাধাহীন চলাচলের স্বপ্ন অর্জনের জন্য আমাদের আরও দূরে যেতে হবে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধের পর রাজনৈতিকভাবে যে যোগাযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল, তা আবার বহাল করতে হবে। বস্তুগত অবকাঠামোর তুমুল উন্নতি—সড়ক, রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে—এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে বেগবান করা এই লক্ষ্য হাসিলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং একে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাংলাদেশ, ভুটান, নেপাল ও ভারতের মধ্যে মোটরগাড়ি চলাচলের যে সার্ক চুক্তি পাকিস্তানের কারণে আটকে আছে, তা সম্পন্ন করা উচিত।
বাংলাদেশের অর্থনীতি ভালো উন্নতি করছে, বছরে গড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিতে বড় আকারে আবির্ভূত হয়েছে এবং সৃষ্টি করেছে কাজ ও সমৃদ্ধি। সামাজিক উন্নয়নের বেলায়ও বাংলাদেশ প্রশংসনীয় অগ্রগতি ঘটিয়েছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক সূচকে দেশটি ভারতের চেয়েও এগিয়ে। বলতেই হবে, বাংলাদেশ আমাদের পশ্চিম সীমান্তের প্রতিবেশীর চেয়ে সুখকর ব্যতিক্রম এ কারণে যে তারা নিরাপত্তা-সামর্থ্যের জন্য অর্থনীতিকে ভুগিয়েছে। ভারত, বাংলাদেশসহ বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতা দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগ ঘটাবে এবং সমগ্র অঞ্চলের সমৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বেড়ে ৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ভারত একতরফাভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ উভয়ের মধ্যে বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা বা বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ দেখালেও ভারত থেকে বেশির ভাগ আমদানি তাদের বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি খাতে অবদান রেখে যাচ্ছে। বর্তমানে আড়াই বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে ভারত এককভাবে এই উদ্বেগে সাড়া দিয়েছে। গত বছর থেকে দৈনিক ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহকেও শুভসূচনা বলা চলে। জ্বালানি খাতে সহযোগিতা আরও বাড়ানো উভয় দেশের স্বার্থেই মঙ্গলজনক।
মোদির এবারের সফরে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়টি ছিল না। তাহলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সফরকারী দলে নিয়ে নরেন্দ্র মোদি ভবিষ্যতের আশা জিইয়ে রেখেছেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কের গড়ন ঠিক করায় ভারতের সীমান্ত রাজ্যগুলোর ভূমিকা ব্যাপক, এ জন্যই তাদের উপস্থিতি থাকা ভালো।
ভারতের দ্য ট্রিবিউন পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ থেকে নেওয়া এবং ইংরেজি থেকে অনূদিত।
মীরা শঙ্কর: যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

দুর্ভোগ

রাস্তায় হাঁটু সমান পানি। যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা। পানি-কাদা মাড়িয়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছা। যানজট আর জলজটে স্থবির রাজধানীতে গতকাল দিনভর ছিল এ চিত্র। মওসুমের প্রথম ভারি বৃষ্টিতে তপ্ত আবহাওয়া শীতল পরশ লাগলেও তা রাজধানীবাসীর জন্য নিয়ে আসে সীমাহীন দুর্ভোগ। সকাল থেকে ভারি বর্ষণে সড়কে পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় শুরু হয় যানজট। এছাড়া কয়েকটি সড়কে ট্রাফিক পুলিশ যান চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় যানজটের এ দুর্ভোগের মাত্রা বাড়ে। দিনের বেশির ভাগ সময় নগরীর ব্যস্ততম সব রাস্তা প্রায় স্থবির অবস্থায় ছিল। এছাড়া জলজটের কারণে গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়কে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে গতকাল সকাল ৬টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ঢাকায় ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এতে রাজধানীর মতিঝিল, গুলিস্তান, মগবাজার,  মৌচাক, মালিবাগ, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেট, শান্তিনগর, গ্রীনরোড, খিলগাঁও, বনশ্রী, গোড়ান, মাদারটেক, মাতুয়াইল,  ডেমরা, দনিয়া, শ্যামপুর, জুরাইন, বাসাবো, মিরপুর, পল্লবীসহ বিভিন্ন এলাকা প্রায় হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। তলিয়ে যায় এসব এলাকার রাস্তাঘাট। কোন কোন বাড়ির নিচতলায় প্রবেশ করেছে পানি। এছাড়া গতকাল সকালের বৃষ্টি স্বস্তির চেয়ে বেশি দুর্ভোগে  ফেলে অফিস ও স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গামী নগরবাসীকে। গতকাল সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে  ভোরের আলো চোখ মেলেছে বৃষ্টিতে ভিজে। সকাল ৯টা থেকে সোয়া ৯টার দিকে বৃষ্টি অনেকটাই কমে যায়। সাড়ে ৯টার দিকে কালো মেঘে পুরো আকাশ ছেয়ে যায়। এ সময় যাত্রাবাড়ীতে আড়তের দোকানিরা বাতি জ্বালিয়ে দেন। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভার দিয়ে ছুটে চলা যানবাহনে হেডলাইট জ্বলছে। শুরু হয় বৃষ্টি। পৌনে ১০টার মধ্যে বৃষ্টি থেমে যায়। আকাশ পরিষ্কার হতে থাকে। তবে মাত্র কয়েক মিনিট পরই আবার মেঘে মেঘে যেন সন্ধ্যা নেমে আসে। ১০টার দিকে আবার শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি সঙ্গে জোরালো বাতাস। ফ্লাইওভার দিয়ে এসে গুলিস্তান নামা যাত্রীদের দৌড়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সের নিচতলা, গুলিস্তান পাতাল মার্কেট ছিল লোকে-লোকারণ্য। সাড়ে ১০টার দিকে বৃষ্টি অনেকটা কমে যায়। ১০টা ৫০ মিনিটের দিকে আবার অন্ধকার হয়ে যায় চারপাশ, আবার জোরালো বৃষ্টি। সাড়ে ১১টার মধ্যে সে বৃষ্টিও থেমে যায়। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে ঢাকার বিভন্ন সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। মগবাজার, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক এলাকার সড়কে কোথাও কোথাও কোমর সমান পানি জমে যায়। এসব এলাকায় ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলায় বৃষ্টির পানিতে কাদা পানি একাকার হয়ে যায়। এতে দিনভর ওসব রাস্তায় যানবাহন আটকে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। ছোটখাত দুর্ঘটনাও ঘটে। মতিঝিল, পুরান ঢাকার বিভিন্ন সড়কেও যানজট আর জলজটে একাকার হয়ে যায়। দুপুরে সড়ক পরিস্থিতি দেখতে রাজধানীর শান্তিনগর এলাকায় কর্মকর্তাদের নিয়ে হাজির হন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। তখন রাস্তায় হাঁটু সমান পানি। পানি ডিঙিয়ে মেয়র ওই এলাকার রাস্তা পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, অপরিকল্পিত সড়ক এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে এই জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে সিটি করপোরেশন কাজ শুরু করেছে।
এদিকে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অসহনীয় যানজটের কবলে পড়েন নগরবাসী। স্থবির হয়ে পড়ে নগরজীবন। যানজটের কবলে পড়ে নগরের কর্মব্যস্ত বেশির ভাগ মানুষেরাই নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে যেতে পারেননি। আবার এরাই বিকালে সময়মতো পৌঁছতে পারেননি নিজ ঘরে। গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট, কাওরানবাজার, বাংলামোটর, মগবাজার, শাহবাগ, মৎস্য ভবন, পুরানা পল্টন, গুলিস্তান এলাকাগুলো ঘুরে দেখা গেছে যানজটের ভয়াবহ চিত্র। যানজট ছড়িয়ে পড়ে কাকরাইল, নয়াপল্টন, সায়েন্সল্যাবরটরি, নিউমার্কেট, গুলশান বনানী এলাকায়ও। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, যানজটে বিরক্ত অনেক যাত্রী যানবাহন থেকে নেমে পায়ে হেঁটে জল কাদা মাড়িয়ে গন্তব্যে  পৌঁছান।
সকালে ফার্মগেট এলাকায় দেখা যায় বৃষ্টির মধ্যেই শত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে গণপরিবহনে ওঠার অপেক্ষায়। এদের কেউ কেউ আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোন বাসে উঠতে পারেননি। উত্তরা, মহাখালী থেকে গাড়িগুলো আসতেই হুমড়ি খেয়ে পড়েছে  লোকজন। মতিঝিলের বাসের অপেক্ষায় থাকা কর্মজীবী কাকলী বেগম বলেন, প্রায় আধাঘণ্টা ধরে বৃষ্টির মধ্যে অপেক্ষায় আছি। কিন্তু কোন বাসেই উঠতে পারিনি। আবদুল্লাহপুর থেকে গুলিস্তান রুটের সুপারভাইজার জামাল বলেন, বনানী সিগন্যাল পার হতে গিয়ে আধঘণ্টার বেশি সময় লেগেছে। সময় বাঁচাতে ফার্মগেট, শাহবাগ অভিমুখী অনেক গাড়ি মহাখালী ফ্লাইওভার দিয়ে আসার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোন লাভ হয়নি। আবার বিজয় সরণি সিগন্যালেও অনেক সময় ধরে অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। যে কারণে কোন গাড়িই সঠিক সময়ে গুলিস্তান পৌঁছতে পারেনি। ফার্মগেট এলাকার একাধিক ট্রাফিক পুলিশ যানজট নিয়ন্ত্রণে তাদের গলদঘর্ম অবস্থার কথা জানিয়ে এজন্য বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতাকে দায়ী করেন। দুপুরে হাতিরঝিল-সংলগ্ন পুলিশ প্লাজা কনকর্ড ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যান প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠান ঘিরে আশপাশ এলাকায় তৈরি হয় তীব্র যানজট। এ সময় ফার্মগেট থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে দুপাশে আটকে থাকা যানবাহনের চাপ পড়ে আশপাশের সড়কগুলোতেও। বিশেষ করে গুলশান, মগবাজার, হাতিরঝিল-সংলগ্ন এলাকায় যানজট চরম আকার ধারণ করে। এতে দুর্ভোগ পোহান যাত্রীরা। প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান ঘিরে হাতির ঝিলের রাস্তাগুলোও বন্ধ রাখা হয় দীর্ঘ। এ কারণে আশপাশের সড়কে দেখা দেয় যানজট। একাধিক ট্‌্রাফিক কর্মকর্তা জানান, সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে রাজধানীতে ব্যক্তিগত গাড়ি ও গণপরিবহন বেশি থাকে। তার ওপর সকাল থেকে টানা বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে বিভিন্ন সড়কে পানি জমেছে। মূলত এসব কারণেই যানজট তীব্র আকার ধারণ করে। বেলা তিনটায় শাহবাগ এলাকায় দেখা যায়, মৎস্য ভবন থেকে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে শাহবাগ শিশুপার্ক পর্যন্ত শ’ শ’ গাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে। কখনও তা একটু এগিয়েই আবার থেমে যায়। ত্যক্ত বিরক্ত যাত্রী ও গাড়ির স্টাফদের অনেকেই জানান, এই সিগন্যাল পার হতে আধা ঘণ্টা থেকে একঘণ্টা সময় লাগছে। পুরানা পল্টন মোড়ে গিয়ে দেখা যায়, গুলিস্তান ও মতিঝিল অভিমুখী গাড়িগুলো যেন আর এগোয় না। গাড়ির সারি চলে আসে প্রেস ক্লাবের অপর পাশের সড়ক হয়ে হাইকোর্টের সামনের সড়ক পর্যন্ত। মিরপুর টু সদরঘাট রুটের ইউনাইটেড পরিবহনের যাত্রী মুজিবুর রহমান বলেন, প্রায় দেড় ঘণ্টা লেগেছে পল্টন আসতে। যানজটের কারণে অনেক যাত্রী পায়ে হাঁটা ধরেছে। চিড়িয়াখানা থেকে সদরঘাট অভিমুখী তানজিল পরিবহনের সুপারভাইজার মামুন বলেন, প্রতিদিন যেখানে সাত থেকে ৮টি ট্রিপ পড়ে আজ (গতকাল) সকাল থেকে তিনটি ট্রিপ পড়েনি। কিন্তু মালিককে ঠিকই তার পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে।
এদিকে আহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গতকাল সর্বোচ্চ বৃষ্টি হয়েছে সিলেটে ১৪৬ মিলিমিটার। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৩৭ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২৪ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাজধানীতে সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তবে আজ থেকে এমন ভারি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক মো. শাহ্‌ আলম বলেন, ‘বর্ষাকাল চলে এসেছে, এখন মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হবে। তবে সহসা এমন ভারি বৃষ্টি হবে না। তাপমাত্রা এক থেকে ৩ ডিগ্রি কমতে পারে। গতকাল সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, রংপুর, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দুইএক জায়গায় অস্থায়ী দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে। রাজশাহী, পাবনা, যশোর ও কুষ্টিয়া অঞ্চলের উপর দিয়ে মৃদু তাপ প্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা হ্রাস পেতে পারে। সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা এক থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমতে পারে।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক: মনমোহনের প্রক্রিয়াকেই এগিয়ে নিলেন মোদি! by এম হুমায়ুন কবির

রাষ্ট্রপতির আবদুল হামিদের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী
নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর নিয়ে যে বিরাট প্রত্যাশা ও উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, তার কতটা পূরণ হয়েছে, সে নিয়ে বিতর্ক আছে। ভারতীয় পার্লামেন্টে স্থলসীমান্ত চুক্তির অনুস্বাক্ষরকে আমরা বিশাল অর্জন বলে দাবি করছি, শোরগোল তুলছি। কিন্তু এর প্রেক্ষাপট বিচার করলে এতটা শোরগোল তোলার যুক্তিসংগত কারণ নেই। কেননা, এই সীমান্ত চুক্তিটি সই হয়েছিল ৪১ বছর আগে। বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে তখনই এটি অনুমোদন বা অনুস্বাক্ষর করে। এরপর বহু চড়াই-উতরাই পার হয়ে ২০১১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন ঢাকা সফরে আসেন, তখনই এর বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। এমনকি দুই দেশের মধ্যে প্রটোকল সইও হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি, তৃণমূল প্রভৃতি দলের বিরোধিতার মুখে ইউপিএ সরকার চুক্তিটি পার্লামেন্টে অনুমোদন করাতে ব্যর্থ হয়। এসব সত্ত্বেও নরেন্দ্র মোদি স্থলসীমান্ত চুক্তি পার্লামেন্টে অনুমোদনের ব্যাপারে যে সক্ষমতা দেখিয়েছেন, তাকে আমরা স্বাগত জানাই।
তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের চুক্তিটিও সে সময় আটকে গেল পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে। চার বছর ধরে বিষয়টি ঝুলে থাকলেও নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে আমরা সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পাইনি। বরং গত শনিবার দেওয়া বিবৃতিতে তিনি তিস্তার বিষয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আমাদের মোটেই আশান্বিত করে না। তিনি বলেছেন, ‘আমি আস্থাশীল যে রাজ্য সরকারগুলোর সমর্থনে ফেনী ও তিস্তা সমস্যার ন্যায্য সমাধানে পৌঁছাতে পারব।’ কবে সমাধান হবে তা তিনি বলেননি। দ্বিতীয়ত, তিস্তা ও ফেনীর পানি বণ্টনের বিষয়টি আলাদা হলেও তিনি একসঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছেন। এতে কিছুটা হলেও সংবেদনশীলতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এই সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল কানেক্টিভিটি বা সংযোগ। এ নিয়ে দুই দেশের গণমাধ্যমে প্রচুর কথাবার্তা হয়েছে। এ কথা সত্য যে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ যত বাড়বে, সম্পর্কও তত সুদৃঢ় হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। কিন্তু দেখার বিষয়, এই কানেক্টিভিটির মধ্য দিয়ে দুই পক্ষই সমভাবে লাভবান হতে পারবে কি না। যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে যেসব চুক্তি হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনার দাবি রাখে। অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ট্রানজিট চুক্তি তিন বছর পর পর নবায়ন হতো, যা ১৯৭২ সাল থেকেই হয়ে আসছে। এবারের চুক্তিতে পাঁচ বছর পর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়নের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে চুক্তি পর্যালোচনার ও মূল্যায়নের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
দুই দেশের মধ্যে কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা এবং ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও অধিক সুবিধা পাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ। এত দিন তাদের দীর্ঘ ঘুরপথে কলকাতা বা ভারতের অন্যান্য পথে যেতে হতো। এখন তারা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সেসব জায়গায় যেতে পারবে। অন্যদিকে ঢাকা-শিলং-গুয়াহাটি বাস সার্ভিস চালু হওয়ায় উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে প্রচুর মানুষ বাংলাদেশে বেড়াতে আসবে। এতে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প লাভবান হবে। তবে এই পরিবহনব্যবস্থায় বাংলাদেশ ভাড়া ও মাশুল হিসেবে কী সুবিধা পাবে, সে বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া দরকার। উপকূলীয় পরিবহন দুই দেশের জন্যই লাভজনক হবে বলে আমাদের ধারণা। এতে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের পরিবহন ব্যয় কমবে। কিন্তু চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তার বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পরিমাণ মাশুল পাবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। ভারত চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে নৌ ও সড়ক দুটি পরিবহনই ব্যবহার করতে চাইবে। ইতিমধ্যে সাবরুমে সেতু বানানো হচ্ছে। আমাদেরও দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু এর জন্য উপযুক্ত মাশুল দিতে হবে। উত্তর-পূর্ব ভারতে আগে ঘুরপথে পণ্য পরিবহনে যে বাড়তি খরচ হতো, তার একটা অংশ বাংলাদেশ পেতে পারে। একইভাবে নেপাল ও ভুটান যাতে নেপাল বন্দর ব্যবহার করতে পারে, সেই নিশ্চয়তা ভারতকে দিতে হবে।
এ কথা সত্য যে বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ এখন খুবই কম। ভারতীয় বিনিয়োগ বাড়াতে মংলা ও ভেড়ামারায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা সঠিক বলেই মনে করি। কিন্তু বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে যেমন দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন, তেমনি দরকার উন্নত অবকাঠামো। কোরিয়ান ইপিজেডের অভিজ্ঞতা ততটা সুখকর নয়। সেখানে সমস্যা চলছে। সত্যিকারভাবে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সেটি ভারতীয় বা অন্য যেকোনো দেশের হোক না কেন, আমাদের দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে, তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে, বিনিয়োগানুকূল পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে।
এবার আসি বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে। রিলায়েন্স ও আদানি গ্রুপের সঙ্গে ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে চুক্তি হয়েছে, সেটি ইতিবাচক হলেও কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। এ ধরনের প্রকল্প প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, বিদেশি কোম্পানিকে দায়মুক্তি দেওয়ার কোনো যুক্তি আছে বলে মনে করি না।
ভারত এবার ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ২০১১ সালে মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় ১০০ কোটি ডলার দেওয়া হয়েছিল, যার কাজ এখনো শেষ হয়নি। সেই ঋণের বেশির ভাগই দেওয়া হয়েছিল ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয় মাথায় রেখে। এবারও তাই। কিন্তু ঋণের শর্ত হচ্ছে, এসব প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল ভারত থেকে কিনতে হবে। কিন্তু যেসব পণ্যের জোগান বাংলাদেশ নিজেই দিতে পারে, সেগুলো বাইরে থেকে আনবে কেন? ঋণ বা প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্ব অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়টি বরাবরই ভারত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। আমরাও মনে করি, এ ব্যাপারে আমাদেরও মনোযোগ বাড়াতে হবে। কেউ কেউ মনে করেন, মোদি চীনের কথা মনে রেখে বাংলাদেশকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। আমার সেটি কখনো মনে হয়নি। দুই বৃহৎ প্রতিবেশীই আমাদের বন্ধু এবং প্রধান পণ্যের জোগানদাতাও। বাংলাদেশ ভারত ও চীন উভয় দেশ থেকে সর্বাধিক পণ্য আমদানি করে থাকে। তাই এখানে প্রতিযোগিতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্ন অবান্তর। সম্পর্কের নানা টানাপোড়েন সত্ত্বেও ভারত, চীন ও মিয়ানমার যদি একসঙ্গে গ্যাস প্রকল্পে কাজ করতে পারে, আমরা কেন ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে কাজ করতে পারব না?
বাংলাদেশ ও ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল এবং অনেকগুলো পণ্যের শুল্ক বাধা দূর হয়েছে। কিন্তু অশুল্ক বাধা রয়েই গেছে। এবার মোদির সফরে এ ক্ষেত্রে একটিই অগ্রগতি, তা হলো পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআই ও ভারতের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মধ্যে চুক্তি সই। এখন থেকে বিএসটিআইয়ের ছাড়পত্র ভারত গ্রহণ করবে। এতে কিছুটা সুবিধা আমরা পাব বলে আশা করি।
তবে এই সফরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ভারত প্রশ্নে বাংলাদেশে বিরল রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে সব দলই আগ্রহ প্রকাশ করেছে, আগের মতো পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেয়নি। পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্কও এগিয়ে যাবে—এটাই সবার প্রত্যাশা হওয়া উচিত।
সব মিলিয়ে মোদির এই সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে বড় কিছু অর্জন হয়েছে, তেমনটি মনে হয় না। চার বছর আগে ইউপিএ সরকারপ্রধান মনমোহন সিং যে প্রক্রিয়া শুরু করে গিয়েছিলেন, কোনো ক্ষেত্রে মোদি সেটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারেননি।
এম হুমায়ুন কবির: যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত।