Thursday, December 15, 2016

‘মোদির বেলুন চুপসে যাবে বলে আমাকে কথা বলতে দিচ্ছে না’

দিন কয়েক আগে বলেছিলেন, মুখ খুললে ভূমিকম্প হয়ে যাবে। গতকাল বুধবার রাহুল গান্ধী বললেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত দুর্নীতির এমন তথ্য তাঁর কাছে আছে, যা জানাজানি হলে ওঁর বেলুন চুপসে যাবে। সেই জন্যই তাঁকে সংসদে বলতে দেওয়া হচ্ছে না। নোট-বন্দী নিয়ে এক মাস ধরে অচল সংসদ বুধবারও সচল না হওয়ায় অন্য বিরোধী নেতাদের পাশে নিয়ে কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের এই কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে কী কী তথ্য আছে, তা প্রধানমন্ত্রী জানেন। সবই তাঁর ব্যক্তিগত দুর্নীতির কাহিনি। এর মোক্ষম প্রমাণ আমার কাছে রয়েছে। এসব জানেন বলেই তিনি ভয় পেয়ে গেছেন। তাই আমাকে সংসদে বলতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ আমরা সব বিরোধী এক জোট হয়ে আলোচনা চেয়েই আসছি।’ রাহুল বলেন, ‘আমি এসব তথ্য বাইরে প্রকাশ করতে চাই না। চাই নির্বাচিত সদস্য হিসেবে লোকসভায় বলতে। কারণ, এ দেশের গণতন্ত্র সেই অধিকারই আমাকে দিয়েছে। আমার অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী শুনুন। তারপর তাঁর জবাব দিন। মানুষ বুঝে নিন কে সত্য কে মিথ্যা। কিন্তু ভয়ে থরথর বিজেপি তা শুনতে চায় না। তাই আমাদের বলতেও তারা দিচ্ছে না।’ সারা দেশে ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করার পর পাঁচ সপ্তাহ কেটে গেছে। সংসদের শীতকালীন অধিবেশনেরও এক মাস হয়ে গেল। এই এক মাসে ১৯টা কাজের দিন এই নোট-বন্দী নিয়েই ভেস্তে গেল। বাকি আর মাত্র দুই দিন। সেই দুই দিনেও নোট-বন্দী নিয়ে কোনো আলোচনাই যে হবে না, তা প্রায় নিশ্চিত হয়েই বলা যায়। বিরোধী ও সরকার দুই পক্ষই একে অপরকে সন্দেহ করছে। মনে করছে, এক পক্ষের বক্তব্য শেষ হলে তারা অন্য পক্ষকে কিছুতেই বলতে দেবে না।
এই কারণেই নোট-বন্দী নিয়ে কোনো কক্ষেই আর কোনো পক্ষ আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও আলোচনার রাস্তায় হাঁটতে চাইছে না। বুধবার অধিবেশন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই তাই রাহুল সংবাদ সম্মেলন করে এই কথা বলেন। রাহুলের বক্তব্যকে বিজেপি উড়িয়ে দিয়েছে। দলের দুই নেতা অনন্ত কুমার ও প্রকাশ জাভড়েকর বলেছেন, রাহুল যা-ই বলুন, ওর কোনো বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। তাঁরা বলেন, রাহুল ও কংগ্রেস এসব আজগুবি কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন অগস্তা হেলিকপ্টার দুর্নীতি থেকে চোখ ফেরাতে। এই দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক বায়ুপ্রধান এস পি ত্যাগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কংগ্রেসের ভয়, এই দুর্নীতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং জড়িয়ে পড়বেন। তা চাপা দিতেই রাহুল এসব কল্পিত কাহিনি শুরু করেছেন। বিহার থেকে বিজেপির সদস্য নিশিকান্ত দুবে সন্ধ্যায় বলেন, রাহুল এত কথা না বলে যা তথ্য-প্রমাণ আছে তা প্রকাশ করুন। দেখা যাক সত্য-মিথ্যার মিশেল কতটা। নোট-বন্দী নিয়ে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালও সরকারের বিরুদ্ধে সরব। কিন্তু রাহুলের বক্তব্যের পর তিনি বুধবার বলেছেন, কংগ্রেসের সহসভাপতির কাছে মোদির দুর্নীতির কোনো তথ্য-প্রমাণ থাকলে তা তিনি প্রকাশ করুন। হেঁয়ালির কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু তা তিনি করছেন না। বিজেপি যেমন অগস্তা ওয়েস্টল্যান্ড নিয়ে কংগ্রেসকে চাপে রাখতে চাইছে, কংগ্রেসও তেমন করছে। এটা আসলে ‘গট আপ গেম’।

জয়ললিতার দ্বিতীয় শেষকৃত্য!

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম জয়ললিতার দ্বিতীয় শেষকৃত্য করার দাবি করেছেন তাঁর জ্ঞাতিভাই বলে দাবি করা এক ব্যক্তি। ৬ ডিসেম্বর মারা যাওয়া জয়ললিতাকে হাজারো শোকার্ত ভক্তের উপস্থিতিতে সমাহিত করা হয়েছে। জয়ললিতার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁর মরদেহ দাহ করার বদলে সমাহিত করা হয়। এর মধ্যে বিশ্লেষকদের অনেকে ভারতের হিন্দু সমাজে প্রচলিত ঐতিহ্যবাহী জাতপাতের সংস্কৃতিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছেন। জয়ললিতাকে প্রথা ভেঙে সমাহিত করায় বিবিসি হিন্দির সাংবাদিক ইমরান কোরেশিকে নিজ অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন তাঁর জ্ঞাতিভাই দাবি করা কে ভরদারজন নামের ওই ব্যক্তি।
ভরদারজন বলেন, তিনি জয়ললিতার কুশপুতুল তৈরি করে ধর্মীয় প্রথামতে তা দাহ করেছেন। আর এর মধ্য দিয়ে বিপুল জনপ্রিয় এই প্রয়াত নেত্রীর দ্বিতীয় শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছেন তিনি। তবে জয়ললিতার ভাগনি দীপা জয়রাম প্রয়াত এই মুখ্যমন্ত্রীর জ্ঞাতিভাই হওয়া নিয়ে ভরদারজনের দাবির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছেন। দীপা বলেন, ‘আমার মনে হয় না, কর্ণাটকের মহীশুরে আমাদের কোনো আত্মীয় আছেন, যিনি এ ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন। আমাদের পরিবারের অধিকাংশ সদস্য দেশের বাইরে থাকেন।’

এক নম্বরে পুতিন

মার্কিন বাণিজ্যবিষয়ক সাময়িকী ফোর্বস ২০১৬ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ৭৪ জনের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে।
এতে এক নম্বরে রয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ফোর্বস-এর তালিকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছেন যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল। এই নিয়ে পরপর চার বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ফোর্বস-এর সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের তালিকায় শীর্ষস্থান পেলেন। পত্রিকাটির কথায়, পুতিন তাঁর নিজের দেশ, সিরিয়া এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন—সব ক্ষেত্রেই যা চেয়েছেন তা-ই পেয়েছেন।

দাভাওতে নিজের হাতেই হত্যা করেছি: দুতার্তে

নিজ হাতে মানুষ খুন করার কথা স্বীকার করলেন বেফাঁস কথাবার্তার জন্য পরিচিত ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে। গত সোমবার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলার সময় দুতার্তে বলেন, দক্ষিণের শহর দাভাওয়ের মেয়র থাকার সময় পুলিশের কাছে দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য সন্দেহভাজন অপরাধীদের তিনি নিজেই খুন করেছিলেন। কিছুদিন আগেই তাঁর এক সাবেক সহযোগীও এ রকম দাবি করেছিলেন।
গত জুনে ক্ষমতায় আসার পর দুতার্তের শুরু করা কঠোর মাদকবিরোধী ও অপরাধ দমন অভিযানে নির্বিচার সন্দেহভাজনদের হত্যা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে প্রসঙ্গে সোমবার রাতে প্রেসিডেন্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। দুতার্তে তাঁদের বলেন, ‘দাভাওতে এমনটা (হত্যা) আমি নিজে হাতেই করতাম। শুধু তাদের (পুলিশ) দেখানোর জন্য যে যদি আমি পারি, আপনারা নয় কেন? ...দাভাওতে আমি মোটরসাইকেল নিয়ে বের হতাম, সড়কে সড়কে ঘুরতাম, দেখতাম কোথাও কোনো ঝামেলা হচ্ছে কি না।’ রদ্রিগো দুতার্তে তাঁর অপরাধ দমন কৌশল নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার জবাব দিয়ে বলেন, মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চলবেই। গত অক্টোবরে দুতার্তে নিজেকে অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, ৩০ লাখ নেশাখোরকে হত্যা করতে পারলে তিনি খুশি হবেন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গণমানুষের আবেগের ফসল

আসাদুজ্জামান নূর
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ কে এম জাকারিয়া
প্রথম আলো : আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, ডিসেম্বর মাস আপনার কাছে বিশেষ কী নিয়ে হাজির হয়?
আসাদুজ্জামান নূর : ডিসেম্বর তো অবশ্যই বিশেষ। আসলে আমার কাছে শুরুটা তো বেশ আগে থেকেই। সেই ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ঘূর্ণিঝড়, ত্রাণ নিয়ে যাওয়া, সংসদ অধিবেশন বাতিল হওয়া। এরপর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ৮ মার্চ আমার নিজের এলাকায় ফিরে আসা, এরপর মুক্তিযুদ্ধের শুরু—এসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্য দিয়েই একাত্তরের ডিসেম্বর এসেছে আমাদের জীবনে। এখনো ডিসেম্বর আসে এগুলো নিয়েই। কোনোটিই বাদ দিতে পারি না।
প্রথম আলো : আপনারা কী বিবেচনা থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন?
আসাদুজ্জামান নূর : আসলে প্রথমে আমাদের ভাবনা ছিল বধ্যভূমিগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়। এই চিন্তা থেকে আমরা কুল্লাপাথার বধ্যভূমি পরিদর্শনে যাই। তারপর খুলনার চুকনগরসহ আরও কিছু বধ্যভূমিতে যাই। সেসব দেখার পর আমাদের মনে হয়েছে কাজটি সরকার বা সরকারি উদ্যোগ ছাড়া সম্ভব নয়। তখন আমরা অন্যভাবে চিন্তাভাবনা করা শুরু করি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধরে রাখার মতো কোনো উদ্যোগ তখনো ছিল না, অনেক কিছু নষ্ট হয়ে গেছে ও হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে। তখন একটা জাদুঘর গড়ে তোলার ভাবনা নিয়ে আমরা এগোই। আটজনের একটি ট্রাস্টি গঠন করা হয়। আমরা প্রত্যেকে ২৫ হাজার করে টাকা দিই। সেগুনবাগিচার বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়। এটি আক্কু চৌধুরীর বোনের শ্বশুরবাড়ি। সেই পরিবারের লোকজনও আমাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। তাঁরা অনেক কম ভাড়াতেই বাড়িটি আমাদের দিয়েছেন।
প্রথম আলো : আপনাদের এই উদ্যোগের প্রতি সমাজের সাড়া কেমন ছিল?
আসাদুজ্জামান নূর : উদ্যোগ সফল করতে আমরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি। সব মহল থেকেই ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব দলের নেতা-কর্মীরা সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন। সবাই টাকা দিয়ে সহায়তা করতে পেরেছেন এমন নয়, কিন্তু আমাদের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। যুদ্ধের স্মারক উপাদান সংগ্রহের ক্ষেত্রেও আমরা সব পর্যায়ে সহযোগিতা পেতে শুরু করি।
প্রথম আলো : আনুষ্ঠানিক যাত্রা কবে?
আসাদুজ্জামান নূর : মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্বোধন হয় ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ। সেগুনবাগিচায় আমরা জাদুঘরের সামনে প্যান্ডেলসহ একটি মঞ্চ করেছিলাম। সেদিন এমন বৃষ্টি শুরু হয়েছিল যে আমরা আর সেখানে অনুষ্ঠান করতে পারিনি। জাদুঘরের ভেতরের প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে সবাইকে ভিজতে হয়েছে। পরে যখন সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া শুরু হলো, তখন আমাদের অনেকেরই চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছিল। দর্শক-শ্রোতাদেরও অনেকেই আবেগ সামলাতে পারেননি। এই জাদুঘরের সঙ্গে আমাদের সবার একটি আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। অনেক দেশেই হয়তো ওয়ার মিউজিয়াম আছে, কিন্তু এ ধরনের একটি উদ্যোগ বা জাদুঘর খুব কমই আছে। এ জাদুঘরে দর্শনার্থীদের জন্য একটি মন্তব্য খাতা রয়েছে। সেখানে লেখা বিভিন্ন দর্শনার্থীর মন্তব্য পড়লে আপনি বুঝতে পারবেন এই জাদুঘরকে ঘিরে মানুষের কত গভীর আবেগ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কতটা সংরক্ষণ করতে পেরেছি তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে আবেগ রয়েছে, তা এই জাদুঘরের মাধ্যমে ধারণ করা গেছে।
প্রথম আলো : ১৯৭৫ সালের পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলা বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার বিষয়টি দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি। বরং এসব বিষয় চেপে রাখার উদ্যোগই লক্ষণীয় ছিল। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সূচনা পর্বের যে আবেগের কথা আপনি বললেন, দীর্ঘ সময়ের সেই বদ্ধ পরিস্থিতিই কি মানুষকে এত আবেগাক্রান্ত করেছিল?
আসাদুজ্জামান নূর : বলতে পারেন দীর্ঘ সময় একটি পাথর চাপা দেওয়া ছিল। আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার উদ্যোগ নিই, তখন এটা যেন ছিল ঝরনার মুখ থেকে পাথর সরিয়ে দেওয়ার মতো। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দীর্ঘ সময় আমরা কোনো কথা বলতে পারিনি। টেলিভিশনে একধরনের বিধিনিষেধ ছিল। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নাটক ও অনুষ্ঠানের ব্যাপারে বাধা ছিল। বঙ্গবন্ধু তো তখন বাংলাদেশ টিভিতে কার্যত নিষিদ্ধ। পত্রপত্রিকায়ও বঙ্গবন্ধুর ছবি তেমন ছাপা হতো না। একটা দীর্ঘ সময় আমরা একটি দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি।
প্রথম আলো : আপনারা যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগ নিয়েছিলেন ও কাজ শুরু করেছিলেন, তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। তখন সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছেন কি?
আসাদুজ্জামান নূর : তারা এ ব্যাপারে কোনো উৎসাহ দেখায়নি, তবে বাধাও দেয়নি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ১৯৯৬ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হয়েছে আর সে বছরই ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু স্মারক জাদুঘরে দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগ এবং আজ এ পর্যায়ে আসার পেছনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বড় অবদান রয়েছে। বর্তমানে আমরা সরকারের কাছ থেকে নিয়মিত অনুদান পাই। এর বাইরেও বিশেষ অনুদান পেয়ে থাকি।
প্রথম আলো : আগারগাঁওয়ে বর্তমানে বৃহত্তর পরিসরে ও নিজস্ব জায়গায় যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তৈরির কাজ চলছে, তার শুরুটা কীভাবে? আর বর্তমান অবস্থা কী?
আসাদুজ্জামান নূর : বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমরা জমির জন্য আবেদন করেছিলাম। নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে জমিটি পেয়েছি। নামমাত্র দামে সরকার আমাদের জমিটি দিয়েছে। এই জাদুঘর বানানোর উদ্যোগের জন্য বড় তহবিলের প্রয়োজন ছিল। জনগণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় আমরা কাজটি এগিয়ে নিয়েছি। সাধারণ মানুষ অর্থ জুগিয়েছেন। ধনী ব্যক্তিরা ও বিভিন্ন বড় বড় প্রতিষ্ঠান আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ভবনের জন্য আমরা নকশা আহ্বান করেছিলাম। প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ও একটি কমিটির মাধ্যমে সেই নকশা চূড়ান্ত করা হয়। আগারগাঁওয়ে সেই জাদুঘর তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পথে। এখন গ্যালারি সাজানোর কাজ চলছে। দুজন মার্কিন কিউরেটর কাজ করছেন। আগামী মার্চে উদ্বোধন করার চিন্তাভাবনা রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা উদ্বোধনের জন্য তারিখ চেয়েছি।
প্রথম আলো : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি—এসব পরিচয়ের বাইরে আপনি এখন বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী। সেদিন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উচ্চাঙ্গসংগীতের অনুষ্ঠানে আপনি দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সাংস্কৃতিক চর্চার গুরুত্বের কথা বলেছিলেন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো আপনার।
আসাদুজ্জামান নূর : আসলে সংস্কৃতিচর্চা শুরু হয় প্রথমে বাড়ি থেকে, তারপর স্কুল থেকে। এখন আমরা দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখতে পাচ্ছি। সামগ্রিকভাবে মূল্যবোধের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আয়-রোজগারের দিকটিই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আমরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। শিক্ষার সবকিছু পাঠ্যপুস্তকনির্ভর হয়ে পড়েছে। শিক্ষার মান কমেছে। গ্রামের অনেক স্কুলে শিক্ষকদের মান ভালো নয়। আগে একজন শিক্ষক যে দায়িত্ব নিয়ে একজন ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনা ও বিকাশে ভূমিকা রাখতেন, সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। পরিবেশটাই বেশ বদলে গেছে। সংস্কৃতির চর্চা মানে তো শুধু নিজে গান গাওয়া বা অভিনয় করা নয়। গান শোনা বা নাটক দেখাও সংস্কৃতিচর্চার অংশ। স্কুল পর্যায়েই কাজটি করতে হয়। তবে মন্ত্রণালয় হিসেবে সংস্কৃতিচর্চা বাড়াতে নানা পর্যায়ে আমরা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। সাংস্কৃতিক অবকাঠামো যথেষ্ট আছে। উপজেলা পর্যায়েও আমরা মুক্তমঞ্চ বা গণগ্রন্থাগার গড়ে তুলছি। ফলে সংস্কৃতির চর্চা বাড়াতে আমাদের নানা উদ্যোগ অব্যাহত আছে।
প্রথম আলো : আপনি পরিবার ও স্কুল পর্যায়ে সমস্যার কথা বললেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংস্কৃতিচর্চা নিশ্চিত করার দায়িত্বটা তো সরকারের।
আসাদুজ্জামান নূর : আমরা বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে সংস্কৃতিচর্চা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গান শেখানোর কর্মসূচি বর্তমানে চালু আছে। তা ছাড়া ব্যক্তি ও সংগঠন পর্যায়ে যাঁরা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত, আমরা তাঁদের সহায়তা করার চেষ্টা করছি। সরকারের কাঠামোর বাইরেও অনেক প্রতিষ্ঠানকে আমরা নানাভাবে সম্পৃক্ত করছি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, এ ধরনের অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই আমরা কাজ করছি। ঢাকায় দেখবেন কত অনুষ্ঠান হচ্ছে। হল খালি পাওয়া যায় না। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে আমরা উৎসাহ জুগিয়ে যাচ্ছি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখার উদ্যোগ হোক বা জঙ্গিবাদ মোকাবিলার চেষ্টা হোক, সংস্কৃতির চর্চা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রথম আলো : সরকার কি এই দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে? সরকারের নীতির ক্ষেত্রে কি এর প্রতিফলন রয়েছে?
আসাদুজ্জামান নূর : সংস্কৃতিচর্চা বাড়ানোর বিষয়টি সরকার খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। এই খাতে বাজেট বাড়ানো হচ্ছে। নিয়মিত বাজেটের বাইরেও আমরা বরাদ্দ পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর এসব ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ আছে। তাঁরা ব্যক্তিগতভাবেও খোঁজখবর রাখেন। সংস্কৃতির চর্চা যে বাড়ানো দরকার, তা এখন নতুন করে বেশ আলোচনায় এসেছে। আমার মনে হয়, পাঠ্যক্রমের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। আমরা সম্ভবত স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশি বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি। ছাত্রছাত্রীরা সময় পাচ্ছে না। তারা যে মনের আনন্দে একটু খেলাধুলা করবে, ছবি আঁকবে, সেই সুযোগগুলো তাদের দিচ্ছি না। পরীক্ষা আর ফলাফলের চাপ তাদের সব সময় কেড়ে নিচ্ছে। আমাদের সময়ে মনে আছে পরীক্ষার ফলাফলে ভূমিকা না থাকলেও খেলাধুলার ক্লাস হতো, দ্রুত পঠনের ক্লাস হতো। এসব নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
আসাদুজ্জামান নূর : ধন্যবাদ।

দুই স্বাধীনতা—একটা তুলনামূলক বিচার

সশস্ত্র যুদ্ধের যে অঙ্গীকার ছিল, তা আমরা ভুলে গেছি
১৯৭১ সালের ২৪ বছর আগে ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের কলোনি ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যায়। একই সঙ্গে দেশটিকে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দুই ভাগ করে দিয়ে যায়। দুটি দেশ হলো ভারত ও পাকিস্তান। আমরা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলাম। তখনো বুঝিনি যে আমরা নতুন করে আবার পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হলাম। আমাদের নতুন শোষকেরা তখনকার পশ্চিম পাকিস্তানে কেন্দ্রীভূত, যারা তখনকার পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানকে কলোনির মতো মনে করেছিল।
অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের উপলব্ধি হলো এবং শুরু হলো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণসংগ্রাম। নানা পর্যায় অতিক্রম করে ১৯৭১ সালে মহান সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছিলাম সেই স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সেই বিজয় অর্জিত হয়েছিল। অন্যদিকে ভারতের স্বাধীনতা এসেছিল ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের মধ্যরজনীতে। যদিও একই সঙ্গে দেশটি আর অখণ্ড থাকেনি। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট (ভারতের স্বাধীনতা দিবস) এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর (বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের বিজয় দিবস)—এ দুই দিনের মধ্যকার পার্থক্যটি কেমন ছিল, তা আলোচনার দাবি রাখে। ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা দিবস সম্পর্কে এক চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন তদানীন্তন বোম্বে ক্রনিক্যাল-এর সম্পাদক ও বিখ্যাত লেখক ডি এফ কারাকার তাঁর একটি বইয়ে। বইটি ইংরেজিতে লেখা। বইয়ের শিরোনাম দ্য বিট্রেয়াল অব ইন্ডিয়া। ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্টের মধ্যরজনীতে তিনি ছিলেন বোম্বে শহরে। উৎসবমুখর বোম্বে শহর। ২০০ বছর পর দেশটি স্বাধীন হচ্ছে। আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও উৎসব তো থাকবেই। কারাকার ছিলেন বোম্বের এক অভিজাত হোটেলে। সেখানে প্রচুর খানাপিনা ও উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই আয়োজনের মধ্যে ছিলেন বোম্বের ইংরেজ শাসক শ্বেতাঙ্গ গভর্নর। আরও ছিলেন স্থানীয় কংগ্রেস নেতারা এবং কালো চামড়ার গণ্যমান্য ভারতীয়রা।
তাঁদের মধ্যে জওহরলাল নেহরুর বোন কৃষ্ণা হাতিসিংহও ছিলেন। ঠিক মধ্যরজনীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইউনিয়ন জ্যাক পতাকা নামল এবং বিপুল করতালির মধ্যে ভারতের তিন রঙের পতাকা উত্তোলিত হলো। উপস্থিত সাদা ও কালো-বাদামি চামড়ার মানুষেরা পরস্পরকে অভিনন্দিত করল। আলিঙ্গন করল। ডি এফ কারাকার লিখেছেন, ‘দুই শ বর্ষের ইতিহাস কি আমরা এভাবে ভুলে যাব? শাসক-শাসিতের সম্পর্কের, প্রভু-দাসের সম্পর্কের সত্যিই অবসান হলো মাত্র এক রাতের মধ্যে?’ তুলনা করুন ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্টের বোম্বের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের ঢাকার। ঢাকায় আমরা সেদিন শত্রুর সঙ্গে আলিঙ্গন তো দূরের কথা, হাত পর্যন্ত মিলাইনি। আগের দিন পর্যন্ত আমরা পরস্পরের দিকে বন্দুক তাক করে ছিলাম। এমনকি ১৬ ডিসেম্বরের সকালেও ঢাকায় পাকিস্তানি দস্যুদের গুলিতে মানুষ মারা গেছে। এ রকম একটি জানা ঘটনার কথা আমি বিবৃত করতে চাই। ঘটনাটি ঘটেছিল আমারই পরিবারে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ভয়াবহ গণহত্যার পর ২৭ মার্চ সকালে কারফিউ উঠে গেলে আমি, আমার ছোট ভাই হায়দার আনোয়ার খান জুনো, কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক জহির রায়হানের দেওয়া গাড়িতে করে ঢাকা ত্যাগ করি। জহির রায়হান তাঁর গাড়িটি আমাদের দিয়েছিলেন, যদি তা যুদ্ধের জন্য কোনো কাজে লাগে।
আমরা গিয়েছিলাম নরসিংদী জেলার শিবপুরে। সেখানে পরবর্তী সময়ে মান্নান ভূঁইয়ার নেতৃত্বে বিশাল গেরিলা ঘাঁটি গড়ে উঠেছিল। কদিন পর আমার মা–বাবাও শিবপুরে চলে আসেন। ডিসেম্বর মাসের দিকে মা-বাবা ও আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ঢাকায় ফিরে আসেন। আমার খালাতো বোন ড. আয়েশা চৌধুরী ডোরা ঢাকায় ছিলেন নয় মাস, কিন্তু গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন। ১৬ ডিসেম্বর সকালে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পেয়ে ডা. ডোরা গাড়িতে করে বেরিয়ে পড়েন। তাঁর গাড়িতে করে আমার মা-বাবা ও আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী চপলও রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। ডোরার কণ্ঠে ছিল ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি। সেই সময় বঙ্গবন্ধুর পরিবার (বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী, শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, ড. ওয়াজেদ) ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডে একটা একতলা বাসায় পাকিস্তানি বাহিনীর পাহারাধীনে বন্দী ছিল। শুনেছি একাত্তরের নয় মাসে কেউ ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করত না। কারণ বাড়ির ছাদে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর বাংকার। পাকিস্তানি বাহিনীর একটা ইউনিটও ছিল। আমার মা-বাবা ও বোন ডা. ডোরা ভেবেছিলেন, দেশ তো এখন স্বাধীন, এখন নিশ্চয়ই ওই রাস্তায় যাওয়া যায়। সম্ভবত তাঁরা বঙ্গবন্ধুর পরিবার কেমন আছে, সেটা জানতে আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যরা সারেন্ডার করলেও ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের ওই বাড়িটিতে অবস্থিত ইউনিটটি আত্মসমর্পণ করেছিল এক দিন পরে। মা-বাবা ও বোনের গাড়িটি বাড়িটির সামনে যেতেই পাকিস্তানি ইউনিট গুলি করে।
একটি গুলিতে তৎক্ষণাৎ মারা যান আমার বোন ডা. আয়েশা চৌধুরী ডোরা। আরেকটি গুলিতে মারা যান গাড়ির ড্রাইভার। একটি গুলি আমার ছোট ভাই জুনোর স্ত্রী মাহবুবা রশিদা চপলের মাথা ছুঁয়ে আমার মায়ের হাতের মধ্য দিয়ে ডা. ডোরাকে আঘাত করেছিল। মা ও চপলের রক্তক্ষরণ হলেও তাঁরা মারা যাননি। পরে শুনেছি, শেখ হাসিনা ও তাঁর মহীয়সী মা দুজনেই গুলিবিদ্ধ গাড়ির আরোহীদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের দিকে রাইফেল উঁচিয়ে ধরেছিল। সেদিন ঢাকার রাস্তায় আরও অনেকে হতাহত হয়েছেন। ঘটনাটির একটু বিস্তারিত বর্ণনা দিলাম এটা বলার জন্য যে আমরা শত্রুর সঙ্গে করমর্দন করে স্বাধীনতা পাইনি। হ্যাঁ, ভারতের স্বাধীনতাও এসেছিল বহু লোকের শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যায়ে স্বাধীনতাটা এসেছিল আপসের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে। তার সঙ্গে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ঘটনাটি একেবারেই ভিন্ন। আবার ফিরে যাই কারাকারের বইটিতে। তিনি বলছেন, ভোর চারটার দিকে তিনি হোটেল থেকে বের হয়ে বোম্বের পথে নামলেন। পথের দুই ধারে ভিক্ষুকেরা দল বেঁধে বসে আছে। কারাকার লিখছেন, ২০০ বছর পর এই স্বাধীনতার তাৎপর্য কী ওই ভিক্ষুকদের কাছে? তারপর তিনিই উত্তর দিচ্ছেন, ভিক্ষুকেরা জানে যে আজকে এমন এক উৎসবের দিন, যেদিন বেশি ভিক্ষা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, লেখক বলতে চেয়েছেন,
ভিক্ষুক বা নিম্ন শ্রেণির মানুষের কাছে স্বাধীনতা এর চেয়ে বেশি অর্থবহ হয়ে আসেনি। কিন্তু ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় ভিক্ষুকসহ সব মানুষ জানত এই স্বাধীনতার মানে কী? প্রথমত, অবরুদ্ধ জীবনের অবসান এবং মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস নেওয়ার স্বাদ। আরও বেশি। রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, তা সব মানুষের জন্য সত্যিই অর্থবহ হয়ে উঠবে, এমন ধারণা করেছিল দেশের সব মানুষ। সশস্ত্র সংগ্রামের উত্তাপ থাকতে থাকতেই যে সংবিধান রচিত হলো, তাতে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ঘোষিত হলো সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা। আজ সাড়ে চার দশক পর যখন পেছন ফিরে তাকাই, তখন একটা বড় দীর্ঘশ্বাস পড়ে। লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, সেই আকাঙ্ক্ষা আজও বাস্তবায়িত হয়নি। বরং সশস্ত্র যুদ্ধের যে অঙ্গীকার ছিল, তা আমরা ভুলে গেছি। গণতন্ত্র নির্বাসিত। সমাজতন্ত্রের বদলে চলছে নিকৃষ্ট ধরনের লুটেরা পুঁজিবাদ, যে কেবল ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়াচ্ছে। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে বাণিজ্যিক উপাদানে পরিণত করা হয়েছে। আর ধর্মনিরপেক্ষতা? জিয়াউর রহমান ওই শব্দটাকে ছেঁটে ফেলে দিলেও পরবর্তী সময়ে তা সংবিধানে সংযোজিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম রেখে দিলে ধর্মনিরপেক্ষতার কতটুকু অবশিষ্ট থাকে? উপরন্তু মৌলবাদের উৎপাত, পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের ঘোরাফেরা এবং ধর্মীয় ও জাতীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনকে কি আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলতে পারি না? ডি এফ কারাকার লিখেছিলেন বিট্রেয়াল অব ইন্ডিয়া—ভারতের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিবৃত্ত। আমাদের কেউ কি লিখবেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস—কেন, কীভাবে, কে, কবে এই বিশ্বাসঘাতকতা করল, যা এখনো অব্যাহত আছে?
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।