Tuesday, September 15, 2009

শিয়ালদহ থেকে আজমির পর্যন্ত প্রতিদিন চলবে এক্সপ্রেস ট্রেন

ভারতের রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত শনিবার আজমির শরিফ এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রার উদ্বোধন করেছেন। রাজস্থানের আজমিরে পূণ্যার্থীদের যাতায়াতের সুবিধা করে দিতে শিয়ালদহ থেকে আজমির শরিফ পর্যন্ত প্রতিদিন এক্সপ্রেস ট্রেনটি চলবে। শিয়ালদহ স্টেশনে এক অনুষ্ঠানে মমতা সবুজ পতাকা নাড়িয়ে আজমির শরিফ এক্সপ্রেস টেনের যাত্রার সূচনা করেন।
এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়। এ সময় তিনি রেলমন্ত্রী মমতার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, মমতা বাজেটে যেসব কথা বলেছেন তা কাজ করে দেখিয়ে দিচ্ছেন। একই সঙ্গে এ দিন নবদ্বীপ ধাম এক্সপ্রেসেরও সূচনা করেন রেলমন্ত্রী।
কয়েক দিন আগে কলকাতার পার্কসার্কাস ময়দানে আয়োজিত এক ইফতারে যোগ দিয়ে মমতা আজমির শরিফ এক্সপ্রেস চালু করার কথা ঘোষণা করেন। অবশ্য এর আগে রেলমন্ত্রী থাকাকালে মমতা আজমির পর্যন্ত সপ্তাহে একটি ট্রেন চালু করেছিলেন। কিন্তু সপ্তাহে এক দিন হওয়ার ফলে সবাই এই ট্রেনের সুবিধা নিতে পারছিলেন না। তাই এবার মমতা সপ্তাহে প্রতিদিনই ট্রেন চালানোর ব্যবস্থা করেছেন।
এ ছাড়া তিনি আজমির স্টেশনের নাম আজমির শরিফ স্টেশন করার যে দাবি সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে উঠেছে, তা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।

সবুজ বিপ্লবের জনক নোবেলজয়ী নরম্যান বরলগ আর নেই

প্রখ্যাত কৃষিবিজ্ঞানী ও শান্তিতে নোবেলজয়ী নরম্যান এর্নেস্ট বরলগ আর নেই। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ডালাসে নিজ বাড়িতে গত শনিবার তিনি মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। তিনি সবার কাছে কৃষিতে সবুজ বিপ্লবের জনক হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে কৃষিতে যখন বন্ধ্যা অবস্থা চলছিল, তখন এই মহান বিজ্ঞানীই খাদ্যশস্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটান। তাঁর গবেষণার কারণে উচ্চ ফলনশীল খাদ্যশস্য উত্পাদন সম্ভব হয়। এ কারণে ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষ, ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের কবল থেকে রক্ষা পায়। ধারণা করা হয়, অধ্যাপক নরম্যানের উদ্ভাবনের কল্যাণে ওই সময়ে দুর্ভিক্ষ থেকে কমপক্ষে ১০০ কোটি মানুষের জীবন রক্ষা পায়। তাঁর এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল কমিটি ১৯৭০ সালে তাঁকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে। ওই সময় নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান অ্যাসি লিওনায়েস তাঁর বক্তৃতায় বলেন, অধ্যাপক নরম্যান ক্ষুধার্ত বিশ্বের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। এ পুরস্কার তাঁরই প্রাপ্য।
বিশ্লেষকেরা বলেন, নরম্যানের ওই উদ্ভাবনের ফলে ১৯৬০ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে খাদ্যশস্য উত্পাদন দ্বিগুণেরও বেশি হয়। ভারত উপমহাদেশ এ থেকে বেশি সুফল লাভ করে।
আইওয়ার ক্রেসকো এলাকার একটি খামারে ১৯১৪ সালের ২৫ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন নরম্যান। মাটি, মানুষ ও কৃষি নিয়েই তিনি আজীবন গবেষণা করে গেছেন। তিনি টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনায় নিয়োজিত ছিলেন।

নিট খাতে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে আগ্রহী জাপান

জাপানের দুটি খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের নিট পোশাকশিল্প খাতে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠান দুটি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের প্রাথমিক জরিপকাজ সম্পন্ন করেছে।
অন্যদিকে হংকংয়ের বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারীও এ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য শিগগিরই বাংলাদেশ সফর করবেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) উদ্যোগে আগামী ২ থেকে ৪ নভেম্বর ঢাকার অনুষ্ঠেয় ‘নিট এক্সপোজিশন ২০০৯’-এ দেশ দুটির বড় দুটি প্রতিনিধিদল অংশ নেবে।
বিকেএমইএর সভাপতি ফজলুল হকের নেতৃত্বে সংগঠনের একটি প্রতিনিধিদল গত সপ্তাহে জাপান ও হংকং সফরকালে এসব বিষয়ের নিশ্চয়তা পেয়েছে। বিকেএমইএর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল রোববার এসব তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, জাপান ও হংকংয়ের শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারকেরা বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ নিট পণ্য আমদানি করার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বিকেএমইএর পক্ষ থেকে ব্যবসায়ী নেতাদের সম্মানে জাপানের টোকিও ও ওসাকায় এবং হংকংয়ে পৃথক তিনটি নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এসব অনুষ্ঠানে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আশরাফ-উদ-দৌলা, কমার্শিয়াল কাউন্সেলর আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফায়জুল্লাহ, হংকংয়ে নিযুক্ত কনসাল জেনারেল আসুদ আহমেদ, বিকেএমইএর সহসভাপতি জাহিদুল হক ভূঁইয়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সফরকালে প্রতিনিধিদল হংকংয়ের বস্ত্রভিত্তিক তিনটি সংগঠন, জাপান টেক্সটাইল ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন ও জাপান অ্যাপারেল ইন্ডাস্ট্রিজ কাউন্সিলসহ শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাদাভাবে আটটি বৈঠক করে।
জাপান সফরকালে বিকেএমইএ প্রতিনিধিদল সেখানকার শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইলভিত্তিক দৈনিক পত্রিকা দ্য সেন-ই-নিউজ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকদের সঙ্গেও বৈঠক করে। ‘বাংলাদেশের নিটওয়্যার চীনের প্রাচীরকে টপকাতে চায়’ শিরোনামে ওই বৈঠকের সংবাদ ওই দৈনিকের পুরো পাতায় বাংলাদেশি নিটওয়্যারের সাফল্য এবং বিকেএমইএর সভাপতির বিস্তারিত সাক্ষাত্কার প্রকাশ করা হয়।
এ ছাড়া জাপান থেকে প্রকাশিত টেক্সটাইলভিত্তিক কয়েকটি দৈনিকের সাংবাদিকের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে বিকেএমইএর প্রতিনিধিদল বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়। উল্লেখ্য, তাদের দৈনিক প্রচারসংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।
জাপানে বাংলাদেশি নিট পণ্যের রপ্তানি এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য না হলেও গত কয়েক মাসে এর অবস্থান ১৮তম থেকে অষ্টম স্থানে উন্নীত হয়েছে। উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসেও বিকেএমইএর ২০ সদস্যবিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল জাপান ও হংকং সফর করে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশকারী জাপানি প্রতিষ্ঠান দুটির একটি হচ্ছে সোয়েটার উত্পাদনে ব্যবহূত উল ও উলজাত বিভিন্ন সুতা উত্পাদনকারী স্পিনিং কারখানা। অপরটি জাপানের বাজারের প্রধানতম মোজা প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান।
এদিকে নিট প্রদর্শনীকে সামনে রেখে নতুন বাজার প্রসারের লক্ষ্যে বিকেএমইএর প্রতিনিধিদল আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকা ও বোতসোয়ানা সফর করবে। বিকেএমইএ আশা করে, এবারের প্রদর্শনীতে জাপান, হংকং ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা, বোতসোয়ানা, রাশিয়া ও তুরস্কের মতো নতুন নতুন বাজারে বিপুল সংখ্যক ক্রেতা প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।

নতুন কমিটির প্রতি দাবাড়ুদের অনাস্থা

জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) ভবনের নিচে বসে ছিলেন গ্র্যান্ডমাস্টার রিফাত বিন সাত্তার, গ্র্যান্ডমাস্টার আবদুল্লাহ আল রাকিব, ফিদে মাস্টার মেহেদী হাসান, মিনহাজউদ্দিন আহমেদ, শারমীন সুলতানা, শামীমা আক্তার লিজাসহ দেশের শীর্ষ সারির দাবাড়ুরা। না, তাঁরা কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নিতে আসেননি। অবস্থান ধর্মঘটও ছিল না তাঁদের। তাঁরা এসেছিলেন দাবার নতুন আহ্বায়ক কমিটি বাতিল করে সরকারের কাছে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নতুন গ্রহণযোগ্য কমিটি গঠনের দাবি তুলে ধরতে। গ্র্যান্ডমাস্টার জিয়াউর রহমান ও এনামুল হোসেন দেশের বাইরে থাকলেও ই-মেইলে দাবাড়ুদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন।
মাত্রই চার দিন আগে দাবা ফেডারেশনের মেয়াদোত্তীর্ণ নির্বাচিত কমিটি ভেঙে ২৬ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছে সরকার। কিন্তু এই কমিটি গ্রহণ করতে পারছেন না দাবাড়ুরা। বর্তমান কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোকাদ্দেস হোসাইন এবং দুই যুগ্ম সম্পাদকের অন্যতম মাসুদুর রহমান মল্লিকের বিরুদ্ধেই বেশি অভিযোগ তাঁদের।
কাল দাবাড়ুদের ডাকা সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান গ্র্যান্ডমাস্টার রিফাত বিন সাত্তার। তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল একটি সুষ্ঠু নির্বাচন। কিন্তু তা না করে সরকার আহ্বায়ক কমিটি করেছে। এই কমিটির গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন বেশ কয়েকজন অযোগ্য ও অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তি।’ রিফাতদের কথা, আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নির্বাচনে ন্যূনতম যোগ্যতাও বিবেচনা করা হয়নি। বিশেষ করে সাধারণ সম্পাদক ও প্রথম যুগ্ম সম্পাদক পদে যে দুই ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাঁরা সব বিবেচনাতেই নেতৃত্ব প্রদানে অক্ষম। কমিটির সাধারণ সদস্য হওয়ার যোগ্যতাও তাঁদের নেই। জাতীয় পর্যায়ে কখনোই দাবা সংগঠক হিসেবে কাজ করেননি তাঁরা। তাঁরা দুজনেই খেলোয়াড় এবং র্যাঙ্কিংয়ের প্রথম ৫০ জনের বাইরে। খেলোয়াড় হিসেবেও তাঁরা খেলোয়াড়দের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত ছিলেন। সাধারণ সম্পাদকসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফেডারেশন কার্যালয়ে নিয়মিত জুয়া খেলার মতো গুরুতর অভিযোগও তুলেছেন দাবাড়ুরা।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে মোকাদ্দেস হোসাইন বলেছেন, ‘আমি তো তাসই খেলতে পারি না, জুয়া খেলব কীভাবে? ওখানে জুয়ার বোর্ড বসলে ব্রিজ ফেডারেশনের সঙ্গে যারা জড়িত তারাই সেটা ভালো বলতে পারবে। আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’ মাসুদুর রহমান জানান, ‘আমার জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন করতেই কিছু কুচক্রী এসব করছে। বিগত ১২ বছরে ফেডারেশনে যা হয়নি আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর সেসব করে দেখাতে চাই।’
নতুন আহ্বায়ক কমিটি দায়িত্ব না নিতেই তাঁদের প্রতি খেলোয়াড়দের অনাস্থা। সংশয় জাগতে পারে, খেলোয়াড়েরা ফেডারেশন আয়োজিত প্রতিযোগিতা বা টুর্নামেন্টে অংশ নেবেন তো? সবার হয়ে রিফাত দিলেন কূটনৈতিক উত্তর, ‘অংশ নেব না, এটা ঠিক নয়। তবে আমরা মাননীয় মন্ত্রীর কাছে যাব এবং তাঁকে বুঝিয়ে বলব, কিছু সুবিধাবাদী লোক ভুল বুঝিয়ে যে কমিটি গঠন করতে তাঁকে প্ররোচিত করেছে তাতে দাবার ভালো হবে না। দাবাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে সত্যিকারের ভালো একটি কমিটিই চাই আমরা।

ফাইনালেই প্রতিশোধ চায় ভারত

আগের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে উঠে গিয়েছিল ভারত। কিন্তু সেই রাজত্ব স্থায়ী হলো মাত্র ২৪ ঘণ্টা ৪ মিনিট। কমপ্যাক ত্রিদেশীয় সিরিজের পরের ম্যাচেই শ্রীলঙ্কার কাছে ১৩৯ রানের বিশাল পরাজয় ভারতের সেই রাজত্ব নিল কেড়ে। শুধু কি তাই? র্যাঙ্কিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার পর তিন নম্বরে নেমে দাঁড়াতে হয়েছে তাদের। শিগগিরই শীর্ষে ফেরার সম্ভাবনাও এখন নেই। মহেন্দ্র সিং ধোনির নতুন লক্ষ্য তাই আজ কলম্বোর ফাইনালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে তিন জাতি সিরিজে চ্যাম্পিয়ন হওয়া।
তিন জাতি সিরিজে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে ইংল্যান্ডের কাছে অস্ট্রেলিয়ার একটা পরাজয়ই ভারতকে রাখত র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে। পরশু শ্রীলঙ্কার বাজে হারের পর ভারতের আর শীর্ষে তাকানোর সুযোগ নেই। তবে আজকের ফাইনাল জিতলে শিরোপা জয়ের তৃপ্তিটা তারা পাবে।
শনিবারের ম্যাচের অভিজ্ঞতা ধোনির সামনে ফাইনাল জেতার অপরিহার্য এক শর্ত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে টস জয়কে। তিনি বলছেন, ফাইনালে কে জিতবে, সে প্রশ্নে টস জয়ই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফাইনালে আগের ম্যাচের শুধু এ অভিজ্ঞতাটাই টেনে আনছেন ধোনি, অন্য কিছু নয়। পরশুর হারটাকেও কেবলই একটা বাজে দিন হিসেবে দেখছেন তিনি।
‘টসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। টসে জেতা মানে ম্যাচ জেতার ৬০ শতাংশ সম্ভাবনা আপনার। এর পর যদি ২৩০-২৪০ রান করে ফেলা যায়, তাহলে সুযোগটা আরও বাড়ে। বোলারদের জন্যও পরে বল করাটা সহজ হয়’—বলেছেন ভারত অধিনায়ক। তবে বোলারদের কাছে তাঁর বিশেষ দাবি, শ্রীলঙ্কার ইনিংসটাকে যেন শুরুতেই নড়বড়ে করে দেন তাঁরা, ‘আগে বল করলে প্রতিপক্ষ যাতে ভালো শুরু না করতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে বোলারদের। আশা করি, গতকালের (পরশুর) ম্যাচ থেকে আমরা কিছু শিখব।’
স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার জন্য ফাইনালে বাড়তি প্রেরণা হয়ে আসছেন অফ স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন। ইনজুরি কাটিয়ে এ ম্যাচে দলে ফিরছেন তিনি।

আত্মহত্যার ঝুঁকিতে সেমেনিয়া

কাস্টার সেমেনিয়ার ভেতর দিয়ে কী ঝড় যাচ্ছে, সেটি শুধু তিনিই অনুভব করছেন। এ তো তাঁর অস্তিত্বের শেকড় ধরে টান মারা। পরিচয়ের সংকটে ফেলে দেওয়া। এত দিন ধরে লালন করে আসা ‘নারী’ পরিচয়টা নিয়ে তৈরি করা সংশয়ের ধূম্রজাল। অসহ্য মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে সেমেনিয়া না শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যাই করে বসেন! এখন এমনই আশঙ্কা করছেন দক্ষিণ আফ্রিকার নীতিনির্ধারকেরা। তাই মনোবিশেষজ্ঞরা বিশেষ যত্ন নিচ্ছেন গত বার্লিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে মেয়েদের ৮০০ মিটার দৌড়ে সোনা জেতা এই ১৮ বছর বয়সীর।
এদিকে আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক সংস্থার (আইএএএফ) বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন সেমেনিয়ার মা ডরকাস সেমেনিয়া। তাঁর দাবি, সেমেনিয়ার অজান্তেই করা হয়েছে তাঁর লিঙ্গ পরীক্ষা, ‘ওকে নিয়ে কে কী বলল তাতে আমার কিছুই আসে যায় না। কারণ আমি তো ওর মা। কিন্তু একটা বিষয় আমাকে খুবই ক্ষুব্ধ করেছে যে, ওকে যে পরীক্ষা করা হবে সেটা অভিভাবক হিসেবে আমাদের জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি কেউ। ওরা চোরের মতো আচরণ করছে, যেন এই মাত্র ঘরে ঢুকে যা খুশি নিয়ে গেল। সবচেয়ে কষ্টদায়ক ব্যাপার হলো, আমার মেয়েকে এই পরীক্ষার ব্যাপারে কিছু বলাই হয়নি।’
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার সানডে টাইমস জানিয়েছে, আগস্টের শুরুতে নিজস্ব উদ্যোগে লিঙ্গ পরীক্ষার পর সেমেনিয়াকে বার্লিন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের দলে না রাখার পরামর্শ দিয়েছিল দলের চিকিত্সকেরা। কিন্তু এই পরামর্শ অ্যাথলেটিকস সাউথ আফ্রিকা (এএসএ) শোনেনি। কারণ সেমেনিয়া ছিল তাদের কাছে একটি সোনার নিশ্চয়তা।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকানদের ক্ষোভের কারণ, গত কয়েক বছরে চার-পাঁচজনের লিঙ্গ পরীক্ষা করা হয়েছে। এর আগে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। কোনো ঘটনাই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু সেমেনিয়ার ব্যাপারে সেই গোপনীয়তা কেন পালন করা হলো না! কীভাবে ফাঁস হয়ে গেল সব?

এ দলের সফরসূচিতে পরিবর্তন

বাংলাদেশ ‘এ’ দলের ক্রিকেটারদের প্রিমিয়ার ডিভিশন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট লিগে খেলা নিশ্চিত করতে মহারাষ্ট্র সফরসূচিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাবটা সিসিডিএম থেকেই দেওয়া হয়েছিল বিসিবির ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটিকে। ক্রিকেট অপারেশন্সের প্রস্তাবে পুরোপুরি সম্মতি না জানালেও আংশিক সম্মতি জানিয়েছে মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন।
২৭ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্র অনূর্ধ্ব-২২ দলের সঙ্গে তিন দিনের ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ‘এ’ দলের ভারত সফর। মহারাষ্ট্রের বিপক্ষে চার দিনের ম্যাচ শুরু ২ অক্টোবর। ৮ ও ৯ অক্টোবর দুটি ওয়ানডে। এর পর ১১ ও ১২ অক্টোবর দুটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে পরদিন দেশে ফিরবে ‘এ’ দল।

কিউবার বিপ্লবী নেতা আলমেইদার জীবনাবসান

কিউবার বিপ্লবী নেতা হুয়ান আলমেইদা বস্ক (৮২) আর নেই। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে কিউবা বিপ্লবে অংশ নেওয়া এই নেতা হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত শুক্রবার মারা যান। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে। কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে আলমেইদা ছিলেন একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ নেতা। তিনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর অধীন কাউন্সিল অব স্টেটের ভাইস প্রেসিডেন্টদের একজন ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুতে গতকাল রোববার কিউবায় জাতীয় শোক দিবস পালন করা হয়। আলমেইদা ছিলেন কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির তৃতীয় শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তি।
হাভানার একটি শহরতলিতে জন্ম নেন আলমেইদা। তিনি ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালে কিউবার মনকাদা সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ব্যর্থ হন এবং গ্রেপ্তার হন। বিপ্লবীদের জন্য ঘোষিত সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পেয়ে ১৯৫৬ সালে মেক্সিকোতে যান আলমেইদা। সেখানে দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে বিপ্লবের প্রস্তুতি নেন। গেরিলা লড়াইয়ের মাধ্যমে ১৯৫৯ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি কিউবার ক্ষমতা দখল করে। ওই সময় আলমেইদার দেওয়া স্লোগান ‘হেয়ার নো বডি সারেন্ডারস’ বিপ্লবীদের স্লোগানে পরিণত হয়।

জেট এয়ারওয়েজের বিমান চলাচল শুরু

ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি বিমান সংস্থা জেট এয়ারওয়েজের পাইলট ধর্মঘটের অবসান হয়েছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা হওয়ার পর পাইলটরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন।
জেট এয়ারওয়েজের মুখপাত্র এ কে শিবানন্দন গতকাল রোববার নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সকাল থেকেই আমাদের বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। আশা করি বিকেলে সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।’
চার সহকর্মীকে বরখাস্তের প্রতিবাদে পাইলটরা গত মঙ্গলবার থেকে ধর্মঘট পালন করছিলেন।

ভারতে সরকারের মোট খরচের ৭৫ শতাংশ হয় মন্ত্রীদের বিদেশ সফরে

ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি তাঁর সহকর্মী মন্ত্রীদের প্রতি বিদেশ সফরের ব্যাপারে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দা ও খরার ফলে মন্ত্রীদের এই বিদেশ সফরের ব্যয়ভার সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। মন্ত্রীদের বিদেশ সফরের বিমানের খরচ, হোটেল ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে তা বিশাল অঙ্কে দাঁড়ায়।
এক হিসাবে দেখা যায়, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে মন্ত্রীদের পেছনে ব্যয়ের ৭৫ শতাংশই খরচ হয়েছে তাঁদের বিদেশ সফরে; যেখানে ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ৬৭ শতাংশ এবং ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ছিল ৬২ শতাংশ। অর্থাত্ দিন দিন এই ব্যয় বেড়েই চলেছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে মন্ত্রীদের বিদেশ সফর খাতে মোট ব্যয় হয় ১৩৮ কোটি রুপি। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় হয়েছে ৮২ কোটি রুপি এবং ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ৬১ কোটি রুপি। কিন্তু ওই অর্থবছরগুলোতে যথাক্রমে সব মন্ত্রীর মোট বেতন ছিল পৌনে দুই কোটি, এক কোটি ৫৪ লাখ এবং এক কোটি ২০ লাখ রুপি। তাঁদের বেতন এত নগণ্য মনে হলেও ২০০৭-০৮ অর্থবছরে দেখা যায়, একেকজন মন্ত্রীর পেছনে বেতন বাদেই খরচ হয় দুই কোটি ৩০ লাখ রুপি।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পর বিচার বিভাগের পেছনে ভারতে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়। ২০০৭-০৮ সালে বিচার বিভাগ সর্বমোট খরচ করে ১৮৪ কোটি রুপি। তবে এই ব্যয় ২০০৬ ও ২০০৫ সালে ছিল আরও বেশি। ২০০৬ ও ২০০৫ সালে বিচার বিভাগের পেছনে সরকারের ব্যয় হয় যথাক্রমে ২৮৯ ও ২০২ কোটি রুপি। তবে বিচার বিভাগের খরচের তুলনায় একেকটি মন্ত্রণালয়ের খরচ অনেক বেশি। কারণ, বিচার বিভাগের আয়তন ও কর্মপরিধি একেকটি মন্ত্রণালয়ের চেয়ে অনেক বেশি।

নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খুশি পন্টিং

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাকিস্তানের ‘হোম’ ম্যাচ লর্ডস এবং হেডিংলিতে আয়োজনের ঘোষণাকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন রিকি পন্টিং। অস্ট্রেলীয় অধিনায়কের মতে, এই মুহূর্তে পাকিস্তানের জন্য এর চেয়ে ভালো বিকল্প আর নেই, ‘এটা পাকিস্তানের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমি নিশ্চিত একেবারে না খেলতে পারার চেয়ে অন্তত এখানে (ইংল্যান্ড) হলেও তারা খেলতে চাইবে। বিভিন্ন কারণেই পাকিস্তান এখন ক্রিকেট খেলার জন্য নিরাপদ নয়। খেলাটির ভালোর জন্যই নিরপেক্ষ ভেন্যুতে পাকিস্তানের ম্যাচগুলো হওয়া উচিত।’ আগামী বছর আরেকবার ইংল্যান্ডে আসতে পারবেন ভেবেও রোমাঞ্চিত পন্টিং, ‘ওই ম্যাচগুলো খেলার জন্য ইংল্যান্ডের চেয়ে ভালো জায়গা আর হতে পারে না। লর্ডসে আরেকটি টেস্ট খেলতে পারাটা আমার এবং এই তরুণ দলের জন্য হবে দারুণ অভিজ্ঞতা। আমরা আবার ওখানে ফিরতে উন্মুখ হয়ে আছি।’
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে বিদায় জানিয়েছেন পন্টিং। অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক কে হবেন, তা নিয়ে এখন চলছে জল্পনা-কল্পনা। সহ-অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্কের সঙ্গে শোনা যাচ্ছে উইকেটকিপার ব্রাড হাডিন ও ভিক্টোরিয়া অধিনায়ক ক্যামেরন হোয়াইটের নাম। তবে পন্টিংয়ের ভোট পড়েছে তাঁর ডেপুটির পক্ষেই।

ইংল্যান্ডকে ধসিয়ে দিলেন লি

ইংল্যান্ডকে হোয়াইটওয়াশ করে অ্যাশেজের বদলা নেওয়ার কথা বলেছেন ক্যামেরন হোয়াইট। আর বিশ্রাম শেষে এই ম্যাচ দিয়েই আবার মাঠে ফেরা অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক রিকি পন্টিং চেয়েছেন কালই সিরিজ নিশ্চিত করে ফেলতে। সতীর্থদের কথা রাখতে, অ্যাশেজের জ্বালা ভোলার প্রত্যয়ে ব্রেট লি অস্ট্রেলিয়াকে অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছেন কাল। ৪৯ রানে ৫ উইকেট নিয়ে ইংল্যান্ডের ইনিংস ২২০ রানে শেষ করে দিয়েছেন। এই প্রতিবেদন লেখার সময় ২২ ওভারে ২ উইকেটে ১২০ রান তুলেছে অস্ট্রেলিয়া। টিম পাইন করেছেন ৫১ রান। পন্টিং ৩৪ ও ক্লার্ক ৪ রান নিয়ে উইকেটে ছিলেন।
সিরিজ বাঁচানোর ম্যাচের শুরুতেই ওপেনার জো ডেনলিকে হারিয়ে ধাক্কা খায় ইংল্যান্ড। তবে তারা তা ভালোই সামলে নেয় অ্যান্ড্রু স্ট্রাউস ও রবি বোপারার ব্যাটে। কিন্তু ৬৩ রান করে স্ট্রাউস আউট হয়ে যেতেই আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি ইংল্যান্ড। তাদের ইনিংস এভাবে ভেঙে পড়ল আসলে লির দুর্দান্ত বোলিংয়ে। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে নবমবারের মতো ৫ উইকেট নেওয়ার পথে চার ব্যাটসম্যানকেই তিনি বোল্ড করেছেন ইয়র্কারে।
লির পাশাপাশি ভালো বোলিং করেছেন নাথান হরিজও। ২৩ রানে ২ উইকেট নিয়েছেন এই অফ স্পিনার। ইংল্যান্ডের পক্ষে স্ট্রাউস ছাড়া রান পেয়েছেন ওয়াইজ শাহ (৩৯), ম্যাট প্রিয়র (২৯) ও বোপারা (২৬)।

এ দলের ক্রিকেটারদের আলাদা দলবদল

২৫ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্র সফরে যাচ্ছে বলে বাংলাদেশ ‘এ’ দলের ক্রিকেটারদের দলবদলের সময় এগিয়ে আনা হয়েছে। প্রিমিয়ার লিগের দলবদল আগামী ২৯-৩১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হলেও ‘এ’ দলের ক্রিকেটাররা দলবদল করবেন ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। দলবদল হবে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের সিসিডিএম কার্যালয়ে। টি-টোয়েন্টি লিগ শুরুর তারিখ ১০ অক্টোবর।
সিসিডিএমের গত সভায় প্রিমিয়ার ডিভিশন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট লিগের গ্রুপিং চূড়ান্ত হয়েছে। ‘এ’ গ্রুপের দলগুলো হলো গতবারের চ্যাম্পিয়ন মোহামেডান, বাংলাদেশ বিমান, খেলাঘর, পারটেক্স, বিকেএসপি ও ভিক্টোরিয়া। ‘বি’ গ্রুপে গতবারের রানার্সআপ গাজী ট্যাংকের সঙ্গে আছে ওল্ড ডিওএইচএস, কলাবাগান, আবাহনী, সূর্যতরুণ ও ক্রিকেট কোচিং স্কুল (সিসিএস)।
এদিকে ‘এ’ দলের খেলোয়াড়দের প্রিমিয়ার ডিভিশন টি-টোয়েন্টি লিগে খেলা নিশ্চিত করতে সিসিডিএমের অনুরোধে তাদের মহারাষ্ট্র সফরের সূচিতে পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দিয়েছে বিসিবি। ক্রিকেট অপারেশনস ম্যানেজার শরফুদ্দৌলা ইবনে সৈকত জানিয়েছেন, মহারাষ্ট্র অনূর্ধ্ব-২২ দলের সঙ্গে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে যে চার দিনের ম্যাচ খেলার কথা ছিল সেটিকে তিন দিনের ম্যাচ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মহারাষ্ট্রের সঙ্গে চার দিনের ম্যাচটি ৩ অক্টোবরের পরিবর্তে ২ অক্টোবর শুরু করার কথা বলা হয়েছে। তিনটি ওয়ানডের তারিখ প্রস্তাব করা হয়েছে ৮, ৯ ও ১১ অক্টোবর। সিরিজে মহারাষ্ট্রের সঙ্গে তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলার কথা থাকলেও এখন সম্ভবত হবে একটি ম্যাচ, ১২ অক্টোবর।

বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি বেইনস আর নেই

বারাক ওবামাকে দ্বিতীয় দফা ভোট দেওয়ার স্বপ্নটা আর পূরণ হলো না তাঁর। এই সময়ে তিনিই ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক মানুষ। গত এপ্রিল মাসে কেক কেটে গানের সুরে সুরে ধুমধাম করে তাঁর ১১৫তম জন্মদিন পালন করা হয়েছিল। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বয়স্ক ভোটার হিসেবে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সেই গেরট্রুড বেইনস আর বেঁচে নেই। গত শুক্রবার লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি হাসপাতালে স্থানীয় সময় সকাল সাতটা ২৫ মিনিটে তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ১১৫ বছর ১৫৮ দিন।

৯/১১-এর হামলায় নিহতদের স্মরণ করল বিশ্ববাসী

যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার অষ্টম বার্ষিকীতে নিহতদের স্মরণে নানা অনুষ্ঠান হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে মূল অনুষ্ঠানটি হয় নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে। শুক্রবার সেখানে জড়ো হয়েছিল হাজারো মানুষ।
প্রতিবারের মতো এবারও ওই হামলায় নিহত মানুষের শোকাহত স্বজনেরা তাঁদের প্রিয়জনের নাম পড়ে শোনান। আফগানিস্তানে মোতায়েন মার্কিন সেনাদেরও শুভ কামনা করেন তাঁরা। এ সময় উপস্থিত অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দুটি বিমানের হামলা এবং ভবন দুটি ধসে পড়া—ওই চারটি মুহূর্তের স্মরণে সেখানে চারবার নীরবতা পালন করা হয়।
এ সময় সেখানে টিপটিপ বৃষ্টি ঝরছিল। এক শোকার্ত ব্যক্তি বলেন, ‘এটা বৃষ্টি নয়, এ যেন নিহত স্বজনদের চোখের পানি।’ ওই সময় তাঁর হাতে ছিল নিহত স্বজনের ছবি।
ওই দিনের হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পেন্টাগনে দেখা করেছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছেন তিনি। শোকাবহ পরিবেশে প্রায় ৫০০ মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দেন ওবামা। সকাল আটটা ৪৬ মিনিটে নীরবতা পালন করা হয় হোয়াইট হাউসে। নীরবতা পালন অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
স্মরণানুষ্ঠান হয়েছে আফগানিস্তানেও। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ওই হামলার ষড়যন্ত্র হয়েছিল ওই দেশটিতেই। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে যখন প্রথম বিমান আঘাত হানে, তখন আফগানিস্তানের সময় ছিল বিকেল পাঁচটা ১৬ মিনিট। ঠিক ওই সময়কে স্মরণ করে আফগানিস্তানের বাগরাম বিমানঘাঁটিতে শুক্রবার স্মরণানুষ্ঠান শুরু হয়। বিমানঘাঁটিতে পতাকা ছিল অর্ধনমিত। প্রায় ২০০ মার্কিন সেনা সূর্যাস্তের সময় ‘আমেরিকা দ্য বিউটিফুল’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। স্মরণানুষ্ঠান হয়েছে নিউজিল্যান্ডেও।

সামুদ্রিক পাখি ফিজি পেট্রেলের দেখা মিলল আবার

বিশ্বের অন্যতম দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায় সামুদ্রিক প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে। ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা এবং গাঢ় বাদামি রঙের ওই পাখিটির নাম ‘ফিজি পেট্রেল’। সর্বশেষ ১৯৮৪ সালে এর দেখা মিলেছিল। সম্প্রতি একদল আন্তর্জাতিক গবেষক প্রশান্ত মহাসগরে টানা কয়েক দিন অনুসন্ধান চালিয়ে পাখিটির সন্ধান পান।
বার্ডলাইভ ইন্টারন্যাশনাল নামের ওই প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা এ অনুসন্ধান কার্যক্রম চালান। প্রশান্ত মহাসাগরে ১১ দিনেরও বেশি সময় ধরে অভিযান চালিয়ে তাঁরা বহু আকাঙ্ক্ষিত ওই পাখির দেখা পান। ফিজির মালিকানাধীন গুয়া দ্বীপের ২৫ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে গভীর সমুদ্রে তাঁরা দেখতে পান আটটি ফিজি পেট্রেল।
গবেষক দলের প্রধান পাখিবিজ্ঞানী হাদোরাম শিরিহাই বলেন, দুর্লভ প্রজাতির ওই পাখির দেখা পাওয়া এবং তার ছবি তোলা সত্যিই একটা আনন্দের ব্যাপার।
১৮৫৫ সালে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত গুয়া দ্বীপে প্রথম ওই পাখির বাচ্চা নজরে আসে। এরপর প্রায় ১৩০ বছর আর তাদের দেখা মেলেনি। দীর্ঘকাল পর ১৯৮৪ সালে আবার ওই গুয়া দ্বীপেই একটি প্রাপ্তবয়স্ক ফিজি পেট্রেল ধরা পড়ে। পাখিটিকে ছেড়ে দেওয়া হয় তখন। এরপর বেশ কয়েকবার গুয়া দ্বীপের লোকজনের বাড়ির চালে ফিজি পেট্রেলের ওড়াউড়ির খবর পাওয়া যায়। এসব পাখির বেশির ভাগই ছিল ছানা পর্যায়ের।
এ পর্যন্ত হাতে গোনা মাত্র কয়েকবার নজরে আসায় বিজ্ঞানীরা ওই প্রজাতির পাখিকে দুর্লভ পাখির তালিকাভুক্ত করেন। প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক ইউনিয়নের বিলুপ্ত প্রজাতির ১৯২ ধরনের পাখির তালিকায় ফিজি পেট্রেলও রয়েছে।
পাখিটির সর্বশেষ অনুসন্ধানের বর্ণনা যুক্তরাজ্যের পাখিবিজ্ঞানীদের ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ বুলেটিনেও তুলে ধরা হয়েছে।

সুঁই-সিরিঞ্জের বদলে কলম -চারদিক by আবদুল কুদ্দুস

‘সুঁই-সিরিঞ্জ নিয়ে একসময় যে হাতে মাদক গ্রহণ করতাম, নানা অপকর্ম চালাতাম; এখন সেই হাতে তুলে নিয়েছি কলম। এই কলম দিয়ে ছবি আঁকছি, ছড়া-গল্প-কৌতুক লেখার চেষ্টা করছি। সময়টা বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছে, স্যার।’
৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে কক্সবাজার শহর থেকে ৮৫ কিলোমিটার দূরে টেকনাফ পৌরসভার কায়ূকখালী গ্রামে স্বেচ্ছাসেবী মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র ‘মধুমিতা নোঙর’ কেন্দ্রের বারান্দায় বসে সাদা কাগজে প্রজাপতির ছবি আঁকতে আঁকতে কথাগুলো বললেন স্থানীয় মাদকাসক্ত যুবক নবী আলম।
নবী আলমের পাশে দুই লাইনে সারিবদ্ধভাবে বসে ছবি আঁকছেন জহির উদ্দিন, বাবুল, সফিক, কবিরসহ আরও অন্তত ৪৫ তরুণ যুবক। এরাও সবাই মাদকাসক্ত। সুস্থ করার জন্য পরিবারের সদস্যরা এদের ধরে এনে এই কেন্দ্রে ভর্তি করিয়ে দেয়। তিন মাস পর সুস্থ হলে এদের নিজ নিজ বাড়িতে ফেরত পাঠানো হবে।
এদের প্রত্যেকের হাতে কাগজ-কলম। কেউ সাদা কাগজের ওপর হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের ছবি আঁকছে। কেউ আবার অঙ্কে ১, ২, ৩ এভাবে ১০ পর্যন্ত লিখছে। শিক্ষিত যারা, তারা গল্প-কৌতুক লেখার চেষ্টা করছে। মাঝেমধ্যে একজনের ছবি দেখে অন্যজন হাসি-ঠাট্টা-মশকরা করছে। কেউ আবার অন্যের ওপর শিক্ষকতা চালাচ্ছে। দেখিয়ে দিচ্ছে, ‘ণ’ এভাবে লিখতে হয়। ‘৯’ এদিক থেকে লিখতে হবে।
নবী আলম জানান, ‘এক বন্ধুর পাল্লায় পড়ে জীবনটা শেষ করে দিলাম। ব্যবসার লাখ টাকার মূলধন, ঘরের ধনসম্পদ, দামি কাপড়চোপড়, স্ত্রীর মূল্যবান গয়না এই মাদকের পেছনে খরচ করে এখন পথের ফকির। অনেক চেষ্টার পরও স্ত্রী আমাকে ভালো পথে আনতে না পেরে দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে দেড় বছর আগে বাপের বাড়ি চলে যান।’
নবী আলমের বাড়ি কক্সবাজার পৌরসভার ঘোনারপাড়ায়। শহরের প্রধান পাইকারি মাছের বাজার ফিশারিঘাটে আড়তদাড়ি (মাছের ব্যবসা) করেই চলত তাঁর সুখের সংসার। সাত বছর আগে বন্ধুর পাল্লায় পড়ে নবী গাঁজা সেবন করেন। এরপর চোলাই মদ, হেরোইন। তারপর নেশার বড়ি ‘ইয়াবা’। তিন বছর আগে ইয়াবার দাম বেড়ে গেলে নবী শরীরে সুঁই-সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে মাদক গ্রহণ করতেন। সুঁই-সিরিঞ্জের আঘাতে একসময় তাঁর দুই হাত ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়। দুই মাস আগে স্থানীয় কয়েকজন লোক নবী আলমকে রাস্তা থেকে অচেতন অবস্থায় তুলে এই কেন্দ্রে ভর্তি করায়। এখানে বিনামূল্যে নবী আলমের চিকিত্সা চলছে। পাশাপাশি চলে খেলাধুলা, ছবি আঁকাআঁকির কাজ। সচেতন করা হচ্ছে মাদক ও এইডস সম্পর্কে।
চিকিত্সা নিতে আসা যুবক জহির ও কবির জানান, এখানে আমরা সেবার পাশাপাশি অনেক কিছু শিখতে পারছি। যে হাত দিয়ে আমরা মাদক গ্রহণ করতাম, কিংবা সুঁই ফোটাতাম নিজের শরীরে, সেই হাত দিয়ে এখন পরিবেশ রক্ষা, আয়-উপার্জনের পথ তৈরির জন্য বৃক্ষরোপই, শাক-সবজির বাগান তৈরি, মত্স্য চাষ ও শুঁটকি প্রক্রিয়াকরণের কাজের প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। সুঁই-সিরিঞ্জের বদলে কলম তুলে নিয়ে শিখছি লেখাপড়া। শরীর সুস্থ রাখার জন্য নিয়মিত অনুশীলন করি। খেলি ভলিবল, ফুটবলসহ না খেলাধুলা।
টেকনাফের নিলা গ্রামের জহির উদ্দিন (২৮) বলেন, “দুই মাস ধরে এই কেন্দ্রে সেবা নিচ্ছি। মোটামুটি সুস্থ হয়ে এখন বুঝতে পারছি, জীবনে কী ভুল করেছিলাম। এখন আমরা সবাই শপথ নিয়েছি, সুস্থ হয়ে গ্রামে ফিরে গিয়ে আর খারাপ বন্ধুর সঙ্গে মিশব না। খারাপ কাজে জড়িত হব না। মাদককে সব সময় ‘না’ বলব। যে বন্ধু নেশা করতে বলবে, তাকে এড়িয়ে চলব।”
মধুমিতা নোঙর কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক হুমায়ূন কবীর জানান, বর্তমানে এই কেন্দ্রে টেকনাফ, কক্সবাজার শহর, ঈদগাহ, চকরিয়া, লামা ও০ সাতকানিয়ার গরিব ৬১ জনের বিনামূল্যে সেবা চলছে। এদের বয়স ১৪ থেকে ৩৫ বছর। তিন মাস পর সুস্থ করে এদের পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক দিদারুল আলম রাশেদ জানান, এ পর্যন্ত ৫৫৭ জন মাদকাসক্তকে বিনামূল্যে এই কেন্দ্রে সেবা দিয়ে সুস্থ করা হয়েছে। এরা সবাই এখন সুস্থ জীবন ফিরে পেয়েছে। আরও ৪৭৯ জন মাদকাসক্তকে দীর্ঘমেয়াদি সেবা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ৮৫৫ জনকে এসটিআই, ৩১১ জনের এইচআইভি পরীক্ষা এবং ৮৫ জনকে কর্মমুখী শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল আহমদ চৌধুরী জানান, টেকনাফ সীমান্ত দিয়েই মিয়ানমার থেকে পাচার হয়ে আসা নেশার বড়ি ইয়াবা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু টেকনাফে ইয়াবা পাচারকারী রয়েছে তিন শতাধিক। অবশ্যই এর মধ্য থেকে ৮০ জনের মতো পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ১০ হাজারের বেশি ইয়াবা বড়ি। পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা গত কয়েক মাসে অভিযান চালিয়ে তিন কোটি টাকা দামের তিন কেজি হেরোইনসহ তিন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করেছেন। তার পরও মাদক পাচার বন্ধ করা যাচ্ছে না। ফলে মাদকাসক্তের সংখ্যাও বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে মধুমিতা নোঙর কেন্দ্র বিনামূল্যে মাদকাসক্তদের সুস্থ করার যে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে, নিঃসন্দেহে তা প্রশংসার দাবি রাখে।
সুঁই-সিরিঞ্জের বদলে হাতে কমল তুলে নিয়ে ছবি আঁকছে ওরা।

সংসদীয় কমিটি সাজিয়ে রাখার জিনিস নয় -জবাবদিহি by মলয় ভৌমিক

ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে কোনো পদক্ষেপই শেষ পর্যন্ত কার্যকর হচ্ছে না। পদে পদে কেবল পেছনমুখী যাত্রা! সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ডাকে সাড়া না দেওয়াটাও মনে হচ্ছে রেওয়াজে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাহলে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার উপায়টা কী? এখন দেখা যাচ্ছে সংসদীয় কমিটিগুলো কেবল ডেকে ডেকে নিরাশ হচ্ছে তা-ই নয়, তারা নানা বাগিবতণ্ডাতেও জড়িয়ে পড়ছে। সর্বশেষ উদাহরণ হলো, দুই বিচারককে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে সেই অবসর দেওয়ার আদেশ প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের বাকযুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ঘটনা।
সংসদীয় কমিটিগুলোর উত্থাপিত অভিযোগ দেশের সব বাঘা বাঘা লোকের বিরুদ্ধে। লোকগুলো কেবল বাঘাই নন, তাঁরা দেশের দায়িত্বশীল নাগরিকও বটে। তো এসব মানুষকে যখনই সংসদীয় কমিটি তলব করছে, তখনই সংসদীয় কমিটির তলবের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা। আবার তলব করার এখতিয়ার থাকলেও তাঁদের ডাকে সাড়া দিতে কেউ বাধ্য নন—এমন যুক্তিও উত্থাপন করছেন কেউ কেউ। এসব প্রশ্ন বা যুক্তি আইনের দৃষ্টিতে হয়তো গুরুত্বহীন নয়। কিন্তু এমন যুক্তি বা প্রশ্ন তুলে গোঁ ধরে বসে থাকায় আইন রক্ষা হলেও সংসদীয় রীতিনীতি অনুশীলনের যে দরজা এবার খুলে দেওয়া হয়েছে তা তো শুরুতেই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো।
সংসদের প্রথম অধিবেশনেই সবগুলো সংসদীয় কমিটি গঠনের নজির এর আগে দেখা যায়নি। এটা আওয়ামী লীগ সরকারের কেবল একটা ইতিবাচক পদক্ষেপই নয়; এর মাধ্যমে দলটি আমাদের সংসদ-সংস্কৃতির একটা পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তন দূরে থাক, ভবিষ্যতে এই কমিটিগুলো আরও অকার্যকর হয়ে পড়বে—এমন শঙ্কা এখনই তৈরি হয়েছে।
পরিবর্তন প্রত্যাশী বর্তমান সংসদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রথমেই ধাক্কা খেল দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধূরী এবং অন্য দুই কমিশনারকে তলব করতে গিয়ে। সংসদীয় কমিটির হাত দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত লম্বা কি না— এ প্রশ্ন বেশ জোরেশোরে তোলা হলো। বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য, নানা আইনি ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ উঠে এল মিডিয়ায়। আর এই শোরগোলের মধ্যে চাপা পড়ে গেল অতি গুরুতর দুটি বিষয়। এর একটি হলো, রাষ্ট্রের সব বিভাগের ওপর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি তথা জনগণের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয় এবং অন্যটি হলো, খোদ দুর্নীতি দমন কমিশনের কারো কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। এখানে দুর্নীতি দমন কমিশনের কারো বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগই কিন্তু মুখ্য, আইনি ফ্যাকড়া গৌণ। কেননা দুর্নীতি দমন কমিশন যদি গ্রহণযোগ্যতা হারায় তাহলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ইত্যাদি কোনোটাই প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। না, এ কথা কেউ বলছেন না যে কমিশন সত্যি সত্যি দুর্নীতি করেছে। কিন্তু সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মতো একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ কমিটি যখন এ ধরনের অভিযোগ তোলে তখন সাধারণের মধ্যে কমিশন সম্পর্কে প্রশ্নের উদ্রেক করে বইকি। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানসহ কমিশনাররা যা করতে পারতেন তা হলো, সংসদীয় কমিটির কাছে উপস্থিত হয়ে আগে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করে তারপর তাদের তলবের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা। তাঁরা বলতে পারতেন, ‘ওঁদের এখতিয়ার না থাকা সত্ত্বেও আমরা জনমনে সন্দেহ দূর করার জন্যই ওঁদের ডাকে সাড়া দিয়েছি।’ কিন্তু না, এই সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। আসলে আমাদের প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিরাই এ ব্যাপারে পেছনতাড়িত।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির হাত দুর্নীতি দমন কমিশন পর্যন্ত লম্বা না হতে পারে, কিন্তু এই হাত নিজের ঘরের সীমানা অর্থাত্ সংসদ-সীমানা পর্যন্ত লম্বা হবে না—এমনটা কি বিশ্বাসযোগ্য? কিন্তু এবার সেটাও বিশ্বাস করতে হলো। সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার, সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী ও সাবেক চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন তো কেবল ঘরের লোকই নন, সংসদে এক সময়ের অভিভাবকও। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ উঠল তখন তাঁরাও সর্বদলীয় সংসদীয় তদন্ত কমিটির ডাকে সাড়া দিলেন না। বিভিন্ন অজুহাতে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেন। চাপা পড়ে গেল দুর্নীতি আর জনপ্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহিতার সংসদীয় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি। ঘরের লোক যদি ঘরের নিয়ম না মানেন, তাহলে সে নিয়ম মানার দায় বাইরের লোকের ওপর বর্তাবে কীভাবে?
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ডাকে সাড়া দেওয়া না দেওয়ার বিতর্কটি সব থেকে বেশি ঘোলাটে হয়ে গেল ক্ষমতাসীন দলের মধ্যেই, এ ব্যাপারে তীব্র বাগিবতণ্ডা শুরু হওয়ায়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তলব প্রসঙ্গে প্রশ্ন উত্থাপন করায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠনের যৌক্তিকতাই প্রশ্নের মুখে পড়ল। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করেছেন এবং সংসদীয় কমিটিগুলোর ডাকে সাড়া দেওয়ার ব্যাপারটিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পরামর্শ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই পদক্ষেপ ইতিবাচক হলেও এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভেতরের মানসিকতা কতটা পরিবর্তিত হবে—তা বলা শক্ত।
এর আগে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) এম এ মতিন তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের জবাব দেওয়ার জন্য সংসদীয় কমিটির কাছে হাজির হননি। ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকাও সংসদীয় কমিটির তলবের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দেখা যাচ্ছে, সংসদীয় কমিটিগুলো যখন যাকে ডাকছেন, তাঁর তরফ থেকেই নানা রকম আপত্তি উঠছে। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠন করে কী লাভ হলো? সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কি সংসদের আলনায় সাজিয়ে রাখার মতো কোনো পোশাকি জিনিস? সংসদীয় কমিটিগুলো যাঁদের তলব করেছে তাঁরা কেউ সরকারি দলের, কেউ বিরোধী দলের, আবার কেউ বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের লোক। এবং তাঁরা কোনো সাধারণ লোক নন। তাঁদের কেউ গণতন্ত্র আদায়ের জন্য এবং কেউ গণতন্ত্র দেওয়ার জন্য অতি উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। সমাজের উচ্চকণ্ঠ এই ব্যক্তিবর্গ তাঁদের আচরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে গণতন্ত্র সম্পর্কে কী শিক্ষা দিলেন? ‘গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন’— সাধারণের মধ্যে বদ্ধমূল এই ধারণাকে তাঁরা আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করলেন না কি? নির্বাচন গণতন্ত্রের অতি ক্ষুদ্র একটি অনুষঙ্গ মাত্র। গণতন্ত্রের অর্থ রাষ্ট্রের সব স্তরে জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মূলত গণতান্ত্রিক আচরণ তথা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুশীলন করা। অথচ গভীর এই সত্যের পথে মানুষকে পরিচালিত করার দায়িত্ব যাঁদের তাঁরাই আজ অগণতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু আচরণের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে দুর্বল করার প্রক্রিয়ায় শামিল হচ্ছেন।
এ কথা ঠিক যে সংসদীয় কমিটিগুলোও কাউকে তলবের ব্যাপারে অসতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ফেলতে পারে, হয়ে যেতে পারে কোনো ক্ষেত্রে বাড়াবাড়িও। এ ছাড়া কমিটিগুলোর নির্বাহী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া, এমন কি কমিটির তলবে সাড়া দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়ে আইনি প্রশ্ন তোলাও হয়তো অযৌক্তিক কিছু নয়। কিন্তু তাই বলে কমিটি তলব করলেই ঢালাওভাবে কেবল ‘না’ জবাব আসবে—এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে রাখতে হবে সব ক্ষমতার উত্স জনগণ, সুতরাং জনগণের ভোটে নির্বাচিত সাংসদদের কাছে জবাবদিহি করায় অমর্যাদা বা অগৌরবের কিছু নেই; বরং ‘জবাবদিহি না’ করার মধ্যেই অগৌরব নিহিত আছে।
দেশে প্রতিনিয়ত হাজারো দুর্নীতি-অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। অথচ আদালতে এসব ঘটনার ছিটেফোঁটাও নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আইনি এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপারে সাধারণ মানুষ আজ হতাশ। এই হতাশার মধ্যেও দুর্নীতি দমন ব্যুরো ভেঙে তাকে অধিকতর ক্ষমতা দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করায় মানুষ অনেকটাই উত্সাহিত হয়েছিল। কিন্তু কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে শুরুতেই বিতর্ক দেখা দেওয়ায় মানুষের সে উত্সাহ এখন ফিকে হয়ে আসছে। এ অবস্থায় সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো মন্দের ভালো হিসেবেও মানুষের মনে আশা জাগাতে পারে। কেউই কামনা করে না, দেশের দায়িত্বশীল নাগরিকদের নেতিবাচক মনোভাবের কারণে এই কমিটিগুলো অকার্যকর হয়ে পড়ুক। তাই গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার স্বার্থেই সংসদীয় কমিটিগুলোকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। তবে কমিটিগুলো কার্যকর করা যাবে তখনই যখন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এ ব্যাপারে অগণতান্ত্রিক আচরণ পরিহার করে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন।
মলয় ভৌমিক: শিক্ষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; নাট্যকার।

তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা by হাসিব বিন জামান

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসেছে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই, বিশেষত কম্পিউটার এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগসুবিধা পর্যাপ্ত নয়।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল ডিসিপ্লিন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮ বছর আগে, যা বাংলাদেশের প্রাচীন তিনটি কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের একটি। কিন্তু এখনো এখানে মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়নি। এমনকি এখানকার ফলাফলও আশানুরূপ নয়। ২০০৬-০৭ সেশনে ৩০ জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ১০ জন (৩৩.৩৩%) এবং ২০০৫-০৬ সেশনে ৩৫ জন ছাত্রের মধ্যে মাত্র ১১ জন ( ৩১.৪৩%) কৃতকার্য হয়, যা খুবই হতাশাজনক। এর কারণ কী তা খুঁজে বের করতে হবে। এর পাশাপাশি কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল ডিসিপ্লিনে মাস্টার্স কোর্স চালুর উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
শিক্ষার্থী, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

আমরাই পারি পৃথিবী বদলে দিতে -নেলসন ম্যান্ডেলা বক্তৃতা by মুহাম্মদ ইউনূস

পৃথিবীর সবচেয়ে দারুণ মানুষটির সামনে দাঁড়াতে পেরে আজ আমি রোমাঞ্চিত। আজ এত একান্তভাবে তাঁকে শুভ জন্মদিন বলতে পেরে আমি গর্বিত। আপনি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন; আপনি জানেন না আমরা কে, আমরা কোথায় বেড়ে উঠেছি, কিন্তু আপনি ছুঁয়ে গেছেন আমাদের জীবন।
আমরা, তরুণেরা দেখেছি আপনি শিরদাঁড়া খাড়া করে দাঁড়িয়েছেন, আমাদেরও শিখিয়েছেন মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড়াতে। আপনি সংস্কারহীন হয়েছেন, আমাদেরও তা করতে প্রাণিত করেছেন। আপনি আমাদের মানুষকে ভালোবাসার প্রেরণা যুগিয়েছেন, প্রেরণা দিয়েছেন শান্তিকে আলিঙ্গন করতে ও সাহসী হতে। আপনি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন উদ্ধত হতে। অনুপ্রাণিত করেছেন শত্রুর মোকাবিলা করতে, তারপর তাদের দিকে নিঃশর্ত বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে, তাদের ভালোবেসে শান্তিময় জীবন কাটাতে। আপনি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন আপসহীন হতে, সেই সঙ্গে অপেক্ষা করতে বলেছেন সন্ধির মুহূর্তের, পরস্পরকে জড়িয়ে ধরার অপূর্বমুহূর্তের। আপনি মানবিকতার সর্বোত্তম প্রকাশ। আপনি অনুপ্রাণিত করেছেন সমগ্র পৃথিবীকে।
আজ আপনার ৯১তম জন্মদিনে আপনার সঙ্গে এক মঞ্চে থাকাটা আমার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা। একই পৃথিবীর অংশীদার আমরা। আমি ধন্য। সারা জীবন এই মুহূর্তটি আমাকে আলোড়িত করবে।
আপনি মানুষকে মুক্তি দিয়েছেন তার ক্ষুদ্রতা থেকে। জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে মানুষকে করেছেন সম্মানিত, দিয়েছেন আত্মমর্যাদা। মানুষের উদ্যমের প্রতীক আপনি। আপনি চিরদিনের জন্য মানুষের নৈতিক শক্তির এক অনন্য উচ্চতা স্থাপন করেছেন, দেখিয়েছেন কতটা নৈতিক উচ্চতায় উঠতে পারে মানুষ। চিরকাল আপনি থাকবেন অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে। নিজস্ব সংগ্রামের ভেতর দিয়ে গিয়েছেন আপনি; পৃথিবী দেখেছে আপনার সংগ্রাম, দূর থেকে দেখেছি আমরাও। আমাদেরও ছিল নিজস্ব লড়াই—ছিল স্বাধীনতাযুদ্ধ, ছিল নিজেদের নায়ক; তবুও আপনিও ছিলেন প্রেরণা হয়ে।
স্বাধীনতার লগ্নে বাংলাদেশ ব্যাপক দারিদ্র্যে নিপতিত ছিল। বিধ্বস্ত ছিল যুদ্ধ ও রক্তপাতে। দারিদ্র্যই ছাপিয়ে উঠেছিল সব কিছু—তার পরই এলো চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ।
অর্থনীতির তরুণ শিক্ষক হিসেবে আমি ছাত্রদের বোঝাচ্ছিলাম অর্থনীতি কত চমত্কার বিষয়, কী দারুণ এর তত্ত্বগুলো। আর শ্রেণীকক্ষের বাইরে দুর্ভিক্ষ প্রচণ্ড হয়ে উঠছে। তখনই এল হতাশা, ‘কী হবে এসব তত্ত্ব দিয়ে, যদি তা মানুষের কাজেই না লাগে?’
তখন প্রয়োজন ছিল একটি সাহসী পদক্ষেপের, পাঠ্যবইয়ের বাইরে এসে মানবীয় উদ্যম ও স্বাভাবিক যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে দেখা যে, পাঠ্যবইয়ের সাহায্য ছাড়াই কিছু করা যায় কি না?
ঋণদাতাদের থাবা থেকে আমরা আমাদের প্রতিবেশীদের মুক্ত করার চেষ্টা করছিলাম—এটাই ছিল আমাদের শুরুর ইতিহাস।
গ্রামের কয়েকজন মানুষ মিলে ২৭ মার্কিন ডলার ঋণ নেয়। কারও পরামর্শ ছাড়াই আমি তাদের এই ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই, যাতে তারা মহাজনদের ঋণ শোধ করে তাদের থাবা থেকে মুক্ত হতে পারে। মানুষের উদ্দীপনা আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করল। মনে হলো যদি মাত্র ২৭ ডলারেই মানুষকে এত সুখী করা যায়, তাহলে আরও এগোই না কেন?
এ ধারণা নিয়ে আমার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ব্যাংকটির কাছে গেলাম। মহাজনদের বদলে ব্যাংক কি এই ঋণ দিতে পারে না? কিন্তু তারা এটাকে আমলে নিল না। তারা বলল, এটা হয় না, এটা অসম্ভব।
মাদিবা, আপনি শিখিয়েছেন কিছুই অসম্ভব নয়। তাই আমরা যাত্রা শুরু করলাম এবং অসম্ভবকে সম্ভব করলাম।
আমি হলাম জামানতদার, ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠল গ্রামীণ ব্যাংক, যা কখনোই ধসে পড়েনি। এখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে শুরু করে সারা পৃথিবীতে আমাদের শাখা আছে। যারা বলেছিল আমাদের মডেল ধসে পড়বে, তারাই ধসে পড়েছে।
ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা পুরুষের চেয়ে নারীদের বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। কারণ, আমরা দেখেছি সংসারে নারীদের মাধ্যমে টাকা এলে সেটা বেশি কার্যকর হয়। আমরা যত বেশি ঋণ দিতে থাকলাম তত বেশি রোষের সম্মুখীন হলাম, বিরোধের মুখোমুখি হলাম। শুরুতে আমাদের প্রতিপক্ষ ছিল পুরুষ, শিগগিরই তারা পরিণত হলো ধর্মীয় প্রতিপক্ষে।
লোকজন বলত, আমরা তাদের সংস্কৃতি ধ্বংস করছি। নারীদের থাকা উচিত ঘরের ভেতর, সংসার চালানো তাদের কাজ নয়। তারা বলত, ‘মেয়েদের হাতে টাকা দিয়ে তোমরা আমাদের সংস্কৃতি নষ্ট করছ, তাদের হাতে টাকা থাকা উচিত নয়।’
আমি বলতাম, ‘তোমরা তোমাদের সংস্কৃতি নিয়ে থাক, আমি বিকল্প সংস্কৃতি তৈরি করছি।’
তখন আমার খুব মনে হতো, যেকোনো সংস্কৃতিই অর্থহীন, যদি তা প্রতিনিয়ত কোনো প্রতিসংস্কৃতির মুখোমুখি না হয়। মানুষ সংস্কৃতি তৈরি করে, সংস্কৃতি মানুষ তৈরি করে। এটি দ্বিমুখী চলাচল। যখন মানুষ সংস্কৃতির পেছনে লুকায়, তখন তা মৃত সংস্কৃতি।
এখন প্রায় আশি লক্ষ মানুষ গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা, এদের ৯৭ শতাংশই নারী। তারা তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠায়। আমরা কেবল আশা করেছিলাম, তারা অন্তত প্রাথমিক শিক্ষাটা শেষ করবে। কিন্তু অসম্ভবও সম্ভব হয়ে উঠল। তারা শুধু প্রাথমিক শিক্ষাই শেষ করল না, উচ্চবিদ্যালয়েও গেল। গ্রামীণ ব্যাংক তাদের সাহস জোগাল, বৃত্তির ব্যবস্থা করল যাতে তারা স্নাতক হতে পারে।
যাতে তাদের এখানেই থামতে না হয় তার জন্য গ্রামীণ ব্যাংক শিক্ষাঋণের ব্যবস্থা করল। গ্রামীণ ব্যাংকের শিক্ষাঋণ নিয়ে ৩৮ হাজার ছাত্র এখন বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিত্সা, প্রকৌশলবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে পড়াশোনা করছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পিএইচডিও অর্জন করেছে।
এদের মধ্যে কেউ কেউ আমার কাছে চাকরি চান। কারণ, বাংলাদেশে চাকরি পাওয়া কঠিন। আমি তাদের বলি, তোমরা হলে গ্রামীণ ব্যাংকের সন্তান, তোমাদের অন্যদের মতো করে ভাবা উচিত নয়। আমি তাদের একটি শপথ করতে বলি এবং প্রতিদিন সকালে সেই শপথ আওড়াতে বলি, ‘আমি জীবনে কখনো চাকরি খুঁজব না, আমার জীবনের লক্ষ্য হচ্ছে অন্যের জন্য চাকরি সৃষ্টি করা। আমি চাকরি সন্ধানী নই, চাকরিদাতা।’
আমি বলি, তোমরা বিশেষ কেউ। কারণ, তোমাদের মায়েরা একটি ব্যাংকের মালিক, সেটা হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক। টাকা তোমাদের জন্য সমস্যা নয়। আমি তাদের বলি, ‘তোমাদের মায়েদের ব্যাংক তোমাদের জন্য প্রচুর টাকা গচ্ছিত রেখেছে, পড়াশোনার সময় তোমরা শুধু পরিকল্পনা করবে—কী করে এ টাকার সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারবে, যাতে অন্যদের জন্য তোমরা চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পার।’
সহকর্মীদের দ্বারা নির্বাচিত হয়ে নারীরাই আমাদের পরিচালনা পর্ষদে বসেন, সিদ্ধান্ত নেন। নিজেদের সম্পদ থেকেই অর্থায়ন হয়। আমরা ভেবে দেখেছি, অর্থায়নের জন্য দাতাদের ওপর নির্ভর করতে হলে আমরা স্থবির হয়ে পড়ব। তাই আমরা মানুষের কাছ থেকে টাকা জমা নিলাম, সেখান থেকেই গরিব মহিলাদের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করলাম।
এখন আমাদের রয়েছে সম্পূর্ণ নতুন ও তরুণ একটি প্রজন্ম, যারা বেড়ে উঠেছে গ্রামীণ পরিবারে।
একদিন আমি এক গ্রামে গিয়ে এক মহিলাকে পেলাম, যিনি ১৫ বছর ধরে গ্রামীণ ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর সঙ্গে চটপটে একটি মেয়ে। মেয়েটির সঙ্গে তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁরই মেয়ে। সে এখন ডাক্তার। ব্যাপারটি আমাকে নাড়া দিল। মহিলাটি তাঁর মেয়েকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে মেডিকেল কলেজে পড়তে পাঠিয়েছিলেন, পাশ করে মেয়েটি কাছের শহরে রোগী দেখে। মা-মেয়ে দুজনকে একসঙ্গে দেখে আমার শুধু একটি কথাই মনে এল—মেয়েটির মা-ও একজন চিকিত্সক হতে পারতেন। তাঁর কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু কেউ তাঁকে সে সুযোগটি দেয়নি। তিনি কখনো স্কুলে যাননি। তিনি শুধু একটি সুযোগই পেয়েছেন—গ্রামীণ ব্যাংকে যোগদানের সুযোগ। তারপর তিনি মেয়েটিকে স্কুলে পাঠিয়েছেন, শিক্ষাঋণ নিয়ে ডাক্তারি পড়িয়েছেন। এটাই ছিল দুজনের মধ্যে তফাত্। কিন্তু এটাই জীবনে কত বিশাল ফারাক তৈরি করেছে।
তাদের দিকে তাকালে সহজেই বোঝা যায়, দারিদ্র্য ব্যক্তিগত নয়। সমস্যা গরিবদের নয়—তারা অন্য যে কারও মতো যেকোনো কিছু করতে সক্ষম। কিন্তু সমাজ তাদের কখনো সে সুযোগটি দেয়নি। সমাজব্যবস্থাই দারিদ্র্য সৃষ্টি করে। ব্যাংক গরিবদের ঋণ দিতে চায় না। তারা মনে করে গরিবদের ঋণ দিলে তা কখনো উশুল হবে না। কিন্তু আজ সারা বিশ্বে গ্রামীণ ব্যাংক ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রকল্প প্রমাণ করেছে, গরিবরাও ঋণের টাকা ফেরত দেয়।
‘অন্যান্য ব্যাংক কেন এটা করে না?’—এ বিষয়ে তাদের কোনো সদুত্তর নেই। দারিদ্র্যের শিকড় এখানেই প্রোথিত। কিছু প্রতিষ্ঠান মনে করে, গরিবরা চিরদিন গরিবই থাকবে, আর একদল উন্নতি করবে। আমরা যদি এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঠিক করতে পারি, তবেই মানুষ তাদের সৃজনশীলতা দেখাতে পারবে, সন্তানেরা হবে তাদের পিতাদের চেয়ে বেশি সক্ষম।
সমস্যা আছে নীতিনির্ধারণেও। সরকার ও দাতারা গরিবদের যা দেয়, দান হিসেবে দেয়। কিন্তু এটা কোনো সমাধান নয়। দান দারিদ্র্যকে জমাট করে তোলে, মানুষকে আটকে ফেলে। মানুষের ভেতর থেকে দায়িত্ববোধ মুছে দেয়, উদ্যোগকে নিরুত্সাহিত করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে গরিব মানুষের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করা, তাদের সহযোগিতা করা, যাতে তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে। চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাই হচ্ছে মানুষের জীবন। এটা মানুষকে চ্যালেঞ্জ নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
প্রতিষ্ঠিত কিছু ধারণাও এর পেছনে দায়ী। যেমন ধরুন ব্যবসার যে ধারণা। ব্যবসার উদ্দেশ্য দাঁড়িয়েছে টাকা তৈরি করা, সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা। অস্বীকার করা যাবে না যে, যারা এ ধরনের ব্যবসায়িক কাঠামো তৈরি করেছে, তারা মানুষকে শুধু টাকা তৈরির একমাত্রিক হাতিয়ার হিসেবে গণ্য করেছে। কিন্তু মানুষমাত্রই বহুমাত্রিক, তাদের অনেক কিছু প্রয়োজন। তাহলে অর্থনৈতিক তত্ত্বেই বা কেন তাদের অন্য দিকগুলোকে অগ্রাহ্য করে তাদের একমাত্রিক বলে বিবেচনা করা হবে। এখানেই ছিল ভুল।
আমাদের ভেতরে স্বার্থপরতা আছে। এর ওপরই টাকা তৈরির ব্যবসাগুলো দাঁড়িয়ে আছে। এর দ্বারা চালিত হই বলেই আমরা সবকিছু নিজেদের জন্য চাই। আমি অন্য একধরনের ব্যবসার কথা প্রস্তাব করছি, যার ভিত্তি হবে ‘নিঃস্বার্থপরতা’, আমাদের সবার ভেতরেই যা আছে। এর নাম দিতে চাই সামাজিক ব্যবসা। আমি জানি, কিছু লোক এতে বিনিয়োগে আগ্রহী। কেউ ভাবতে পারে, আমি নির্বোধের মতো কথা বলছি। কিন্তু অনেক মানুষ এখানে হাজার হাজার ডলার বিনিয়োগ করছে। কেউ তাদের নির্বোধ ভাবে না। তাহলে আমাকে কেন এ রকম ভাবা হবে?
আমার মনে হয়, সামাজিক ব্যবসা খুবই যুক্তিযুক্ত। আমরা যদি এটা করতে পারতাম, তবে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। দারিদ্র্য বিমোচনে, পুষ্টি উন্নয়নে, খাবার পানির ব্যবস্থা করতে এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে আমরা সামাজিক ব্যবসা শুরু করতে পারি।
বাংলাদেশে আমরা কিছু কাজ করেছি। যখনই আমি কোথাও কোনো সমস্যা দেখি, সেখানে একটি প্রতিষ্ঠান খুলি। সারা জীবন আমি তা-ই করেছি। গরিবদের ঋণ পাওয়ার সমস্যা দূর করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছি গ্রামীণ ব্যাংক। আমার জন্য নয়, মানুষের জন্য। আমি এর মালিক নই, মালিক হচ্ছে ঋণগ্রহীতারা। এটা তাদের প্রচুর সাহায্য করে।
শিশুদের পুষ্টিহীনতা দূর করার জন্য আমরা বাংলাদেশে গ্রামীণ ডানোন নামে একটি সামাজিক ব্যবসা শুরু করেছি। এখান থেকে আমরা কোনো লভ্যাংশ নিই না। অপুষ্ট শিশুদের জন্য পুষ্টির ব্যবস্থা করতে এটা করা হয়েছে। আয়রন, ভিটামিন, জিঙ্ক, আয়োডিন পুষ্টির সব উপাদান এতে [এ দই-এ] আছে। এটি সুস্বাদুও। শিশুরা এটি পছন্দ করে, আমি করি, আপনারাও পছন্দ করবেন। কোনো শিশু যদি টানা আট-নয় মাস প্রতি সপ্তাহে দুই কাপ করে এই দই খায়, তাহলে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার মতো সব প্রয়োজনীয় পুষ্টি সে পাবে।
মাননীয় শ্রোতাগণ, আমরাও কেন এটা করি না। এখানে উপস্থিত যে কেউ এটা করতে পারেন। যে কেউ একটি সামাজিক ব্যবসা শুরু করে বেকারদের জন্য কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেন। উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীর কেউ একজন যদি একটি সামাজিক ব্যবসা শুরু করেন, তবে পাঁচজন লোকের চাকরির ব্যবস্থা হবে। এভাবেই বেকারত্ব কমবে।
আমি আপনি মিলে যদি এ রকম একটি করে সামাজিক ব্যবসা খুলি, তবে অনেকের চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। আমরা যদি নিজেরাই আমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারি, তবে আমাদের সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না। যদি পাঁচজন লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়, তাহলে একটি বীজ তৈরি হয়। যেখানেই প্রয়োজন সেখানেই আমরা এই বীজ রোপণ করব, যতক্ষণ না বেকার সমস্যার সমাধান হয়, এই বীজ ছড়িয়ে যাব।
সামাজিক ব্যবসায় আমি টাকা বানাতে চাই না, আমি শুধু মানুষের স্বাস্থ্যসুবিধা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে চাই। এটা মানসিকতার পরিবর্তন ঘটায়। আমরা যদি এই বদলে যাওয়া মানসিকতা ছড়িয়ে দিতে পারি, তবে দারুণ একটি সমাজ পাব। প্রত্যেক কোম্পানিই একটি করে সামাজিক ব্যবসা খুলতে পারে। অনেক জায়গায় কোম্পানি তাদের কার্যক্রম চালাতে চায় না। কারণ, সেখানে ব্যবসা চালানো অতটা লাভজনক নয়। যদি সেই কোম্পানি সেখানে একটি সামাজিক ব্যবসা চালু করে, তবে অনেক লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং সেখানকার লোকজন এমন অনেক সেবা পাবে, যেগুলো আগে সেখানে ছিল না। এটা টাকা বানানোর জন্য হবে না, হবে সামাজিক ব্যবসার জন্য। আমরা যদি প্রতিষ্ঠান ও প্রচলিত ধারণাগুলোকে বদলাতে পারি, তবে একটা বদলে যাওয়া পৃথিবী পাব।
বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্দশা এটাই প্রমাণ করে যে প্রচলিত কাঠামো ভালোভাবে কাজ করছে না। পরিবর্তনের জন্য আদর্শ সময় এটাই, এটাই জেগে ওঠার সময় এবং কোন বিষয়গুলোতে পরিবর্তন জরুরি, সেটা উপলব্ধি করার সময়। আমরা গুরুতর কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি—অর্থনৈতিক সমস্যা, খাদ্য সমস্যা, জ্বালানি সমস্যা, পরিবেশসংক্রান্ত সমস্যা, সামাজিক সমস্যা ইত্যাদি। এটাই কি জেগে ওঠার সেরা সময় নয়?
আমরা জানি কোন বিষয়গুলো বদলাতে হবে। এই নভেম্বরে আমরা বার্লিন দেয়াল পতনের ২০ বছর পালন করব। সেই দেয়াল কোনো উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মারণাস্ত্র বা অপ্রতিরোধ্য কোনো সেনাবাহিনী দ্বারা ধ্বংস হয়নি। সেই দেয়াল চূর্ণ করেছে কিছু একতাবদ্ধ মানুষ, যাদের অনেকের কোলে ছিল তাদের সন্তানেরা। এটাকেই আমরা মানুষের শক্তি বলে থাকি।
যদি কিছু মানুষ এ রকম পরাক্রমশালী একটি দেয়াল ধূলিস্মাত্ করে দিতে পারে, তবে দারিদ্র্য কেন পৃথিবী থেকে দূর করা যাবে না? দারিদ্র্যের দেয়ালও ভেঙে দিতে পারে মানুষের মিলিত শক্তি। এটা খুবই সম্ভব।
এ বছর মানুষের চাঁদে যাওয়ার ৪০তম বার্ষিকী। মানুষ কখনো ভাবেনি এরকমটি হবে। তারা এটাকে এক ধরনের পাগলামো মনে করত। কিন্তু ৪০ বছর আগে সব মানুষের চোখের সামনে এটা ঘটেছে। আমরা যদি চাঁদে যেতে পারি, তবে আমাদের দরিদ্র প্রতিবেশীর কাছে কেন যেতে পারব না তার দারিদ্র্য নিরসনের জন্য? এটাই যুগে যুগে মানুষ করেছে।
সব সময় মানুষ তা করত। কারণ, তারা এটা করার প্রয়োজনীয়তাটুকু বুঝতে পারত। কারণ, এটাকে অসম্ভব বলে প্রতীয়মান হতো। আপনি যদি মনে করেন, দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়া অসম্ভব, তাহলে সে চেষ্টাই করা উচিত। কারণ, করার জন্য উপযুক্ত কাজ এটাই।
মাদিবার ৯১তম জন্মদিনে এখানে আমরা একত্র হয়েছি, যিনি ইতি টেনেছেন বর্ণবৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার—সবাই মনে করত, এটা কখনোই হতে পারে না। তিনি এটাকে সম্ভব করে তুলে অসম্ভবকে সাধন করেছেন। আমরা সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি পেয়েছি, মুক্তি পেয়েছি দাসত্ব ও বর্ণবৈষম্য থেকেও, যেগুলোর প্রত্যেকটিই অসম্ভব মনে হতো। আসুন, আমরা আরেকটি অসম্ভবের দিকে হাত বাড়াই, উত্সাহ-আনন্দ নিয়ে কাজটি শেষ করি, দারিদ্র্যমুক্ত একটি পৃথিবী গড়ে তুলি। চলুন, আমরা আমাদের মনের মতো একটি পৃথিবী গড়ে তুলি।
মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছিল এই আফ্রিকাতেই। আসুন, আফ্রিকা থেকে আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকেই প্রথম দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলি, যেখানে কোনো দরিদ্র লোক থাকবে না। আসুন দ্রুত এটা করি, ২০ বছরের মধ্যেই। আপনারা হাসছেন। কারণ, এটাকে অসম্ভব মনে হচ্ছে। যদিও অসম্ভব মনে হচ্ছে, কিন্তু এটাকে সম্ভব করার মতো সব উপাদানই এখানে আছে। আমরা শপথ নিই, আমরা এটা করবই। আসুন আমরা পরিকল্পনা করি, ২০ বছর পর দারিদ্র্যমুক্ত হওয়ার পর আমরা কী করব? যেমন ধরেন, আমরা বিজ্ঞাপন দিতে পারি, যদি কেউ দক্ষিণ আফ্রিকায় একজন দরিদ্র লোক খুঁজে পায়, তবে তাকে এক মিলিয়ন ডলার পুরস্কার দেওয়া হবে। আমরা আত্মবিশ্বাসী থাকব, কেউ এই পুরস্কার দাবি করতে পারবে না। কারণ কেউ কোনো দরিদ্র লোক দক্ষিণ আফ্রিকায় খুঁজে পাবে না।
আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাতেই প্রথম দারিদ্র্য জাদুঘর চালু করব। আমাদের শিশুরা সেখানে দেখতে যাবে—কেমন ছিল দরিদ্র মানুষের জীবন। আসুন, আমরা এটাকে সম্ভব করে তুলি। ধন্যবাদ।
সপ্তম নেলসন ম্যান্ডেলা বার্ষিক বক্তৃতা, জোহানেসবার্গ, দক্ষিণ আফ্রিকা। ১১ জুলাই ২০০৯
ইংরেজি থেকে অনুবাদ তামিম ইয়ামীন
মুহাম্মদ ইউনূস: নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা।

ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি রকেট ও গুলি ছোড়ার অভিযোগ

পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষীরা গত শুক্রবার দিবাগত রাতে ভারতের ভেতর দুটি রকেট ছুড়েছে বলে অভিযোগ করেছে ভারত। অভিযোগে বলা হয়, ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে পর্যটকদের একটি জনপ্রিয় স্থানে গিয়ে রকেট দুটি আঘাত হানে, তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। পাকিস্তান এ রকেট হামলা চালানোর কথা অস্বীকার করেছে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পাকিস্তান সীমান্ত লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পাল্টা জবাব দিয়েছে।
ভারতের পাঞ্জাবে বিএসএফের প্রধান হিম্মত সিং জানান, ‘পাঞ্জাব সীমান্তসংলগ্ন ওয়াগা এলাকায় একটি গ্রামের ফাঁকা মাঠে গিয়ে রকেট দুটি আঘাত হানে। ঘটনার পর মেশিনগানের গুলি ছুড়ে আমরা পাল্টা জবাব দিই। ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উন্নয়নে দুই পক্ষে কূটনীতিকেরা যখন উদ্যোগী হয়েছেন, ঠিক এমন সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটল।’ ভারতের সেনা সূত্রের ভাষ্য, গত কয়েক দশকের মধ্যে ওয়াগায় এ ধরনের ঘটনা এটিই প্রথম। হিম্মত সিং বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের আধাসামরিক সীমান্ত বাহিনী পাকিস্তান রেঞ্জার্সের কাছে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছি। কারা রকেট ছুড়েছে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি।’
উল্লেখ্য, চলতি মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বৈঠকের কথা রয়েছে। এর আগে দেশ দুটির শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিকেরাও বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন।
পাঞ্জাবের ওই গ্রামের নির্বাচিত মেম্বার বালজিত্ সিং বলেন, গ্রামবাসীকে ভয় দেখাতে পাকিস্তান এ রকেট হামলা চালায়। এ ছাড়া সদ্য মোতায়েন করা নারী সীমান্তরক্ষীদের নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়াও এ হামলার লক্ষ্য। ওয়াগা সীমান্তে ভারত সম্প্রতি একটি আধাসামরিক কনটিনজেন্ট মোতায়েন করেছে, যার সব সদস্য নারী।
পাকিস্তান রেঞ্জার্সের মুখপাত্র নাদিম রাজা বলেন, ‘বিএসএফ ভুল বুঝে আমাদের সীমান্ত লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে।’ ভারতের দিকে রকেট ছোড়ার কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, ভারত থেকেই রকেট ছোড়া হয় এবং তা ভারতের মাটিতেই পড়ে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে।’ তিনি জানান, ঘটনাটি নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল সকালেই দুই পক্ষের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা সাক্ষাত্ করেন।
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান আলাদা দুটি দেশ হওয়ার পর থেকে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। ২০০২ সালে ভারতের লোকসভায় জঙ্গি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাধার উপক্রম হয়েছিল।

একের পর এক পশুমৃত্যুর রহস্য কী -চিড়িয়াখানায় বাঘ-সিংহের মৃত্যু

ঢাকা চিড়িয়াখানা অযত্ন-অবহেলার প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছে। গত তিন সপ্তাহে পাঁচটি মূল্যবান প্রাণী মারা গেছে। শনিবার গর্জন নামের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বৃহস্পতিবার সিংহ, সোমবার জিরাফের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ আগস্ট আরবীয় ঘোড়া ও ২৫ আগস্ট চিতাবাঘের মৃত্যু হয়। এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে একের পর এক পশুমৃত্যুর ঘটনাগুলো কোনোভাবেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। অভিযোগ রয়েছে, নতুন করে পশু কেনার জন্যই অযত্ন-অবহেলায় কৌশলে পশুগুলো মেরে ফেলা হচ্ছে। এই অভিযোগ সত্য হয়ে থাকলে পশু ‘হত্যা’ করে যাঁরা কেনার সুযোগ খুঁজছেন, সেই চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত, তাদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তা ছাড়া এই অশুভ তত্পরতা থামানো যাবে বলে মনে হচ্ছে না।
চিড়িয়াখানার আরও বেশ কয়েকটি প্রাণী রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। সঠিক চিকিত্সা ও যত্নের অভাবে এগুলোর মৃত্যু হওয়া অস্বাভাবিক নয়। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ পশুপাখির দেখভালের দায়িত্ব যেন নিয়তির ওপর ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া ও চিকিত্সার ক্ষেত্রে ঢাকা চিড়িয়াখানার পশুপাখিরা সবচেয়ে বেশি অবহেলার শিকার হয়। চিড়িয়াখানার কিছু অসত্ কর্মকর্তা-কর্মচারী পশুপাখিদের পর্যাপ্ত খাবার না দিয়ে এ খাত থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন—এমন অভিযোগ হরহামেশা শোনা যায়। দেশের প্রধান চিড়িয়াখানাটি এভাবেই চলছে বছরের পর বছর।
ঢাকা চিড়িয়াখানায় অনেক দুর্লভ প্রাণী রয়েছে, যারা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় স্বচ্ছন্দ বোধ করে না। এদের জন্য বাড়তি যত্ন ও বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। পশুদের চিকিত্সার জন্য চিড়িয়াখানায় শুধু পশু চিকিত্সকেরা কর্মরত থাকেন। কিন্তু চিকিত্সকদের পাশাপাশি প্রাণীবিদদের নিয়োগ দেওয়াও জরুরি। কিন্তু চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ সেদিকে দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না। আফ্রিকা থেকে কেনা এক কোটি টাকা দামের জিরাফটির মৃত্যু এর অন্যতম উদাহরণ।
জিরাফের মৃত্যুর পর কিউরেটর ও ডেপুটি কিউরেটরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। কিন্তু এরপর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে থাকে। সপ্তাহ না পেরোতেই মৃত্যু হয় সিংহ ও বাঘের। কর্তব্যকর্মে অবহেলার জন্য সাময়িক বহিষ্কারের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, এ ধরনের ঘটনা শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা পড়ে যায়। এবার আমরা এর ব্যতিক্রম প্রত্যাশা করতে পারি কি? দায়িত্বে অবহেলার জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার বিকল্প নেই। সঠিকভাবে তত্ত্বাবধান করতে ব্যর্থ হলে দেশের প্রধান চিড়িয়াখানাটির অবস্থা আরও করুণ হয়ে পড়তে পারে। পশুসম্পদ মন্ত্রণালয় কবে চোখ মেলে তাকাবে?

রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালক নিয়োগ অগ্রহণযোগ্য -রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর পর্ষদ

দেশের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে ব্যাপক ভিত্তিতে রদবদল করেছে সরকার। আর এই রদবদলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সক্রিয় নেতা-কর্মী এবং তাঁদের সহযোগীদের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে তাঁদের বেশির ভাগেরই ব্যাংক বা ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে তেমন কোনো অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা নেই। আবার প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিধি মোতাবেক তাঁরা ঋণখেলাপি কি না, তা যাচাই করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্যও প্রেরণ করা হয়নি। বোঝাই যাচ্ছে, দলীয় লোকজনকে খুশি করতে সরকার নিয়মকানুন অনুসরণের ধার ধারতেও চাইছে না। বিষয়টি দেশের আর্থিক খাতের, বিশেষত ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার পরিপন্থী বিধায় উদ্বেগজনক।
বস্তুত দেশের রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণের বোঝায় জর্জরিত। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাবে ঋণ বিতরণ করার কারণে খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়ে গেছে। ফলে ব্যাংকগুলোও লোকসানি হয়ে উঠেছে। আর লোকসানের দায় টানতে হচ্ছে সরকারকে এবং তা জনগণের করের টাকায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যাংকগুলো পুনর্গঠনের জন্য বিভিন্ন সময় যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। ফলে ব্যাংকগুলো আর ইতিবাচক ধারায় ফিরতে পারেনি। অথচ এই ব্যাংকগুলোর সারা দেশে শাখা বিস্তৃত আছে, আছে লোকবল। সঠিকভাবে ও পরিকল্পিত উপায়ে ব্যাংকগুলো পুনর্গঠন করা গেলে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মতো রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোও লাভজনক হতে পারে।
কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকারের সেদিকে কোনো মনোযোগ নেই, নেই তেমন কোনো আগ্রহ। যদি সেই আগ্রহ থাকতই, তাহলে ব্যাংক-ব্যবসা সম্পর্কে ভালোভাবে জানা-শোনা-বোঝা আছে সে রকম লোকদের দিয়েই ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদ পুনর্বিন্যাস করা হতো। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিচালনা করার কাজটি অনেক সহজ হতো, বাস্তবসম্মত হতো। বছরের পর বছর জমে থাকা খেলাপি ঋণ সমস্যা থেকে উত্তরণে পাওয়া যেত সঠিক ও অর্থবহ দিকনির্দেশনা। সর্বোপরি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার জন্য ব্যাংকগুলোয় যে প্রয়োজনীয় পরিবেশ, তাও তৈরি করা যেত।
তার বদলে এখন ব্যাংকগুলোয় রাজনৈতিক প্রভাব-হস্তক্ষেপ তৈরির পথ প্রশস্ত করা হলো। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকেরা দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে ব্যাংক পরিচালনায় অর্থবহ ভূমিকা রাখবেন—এমনটা বিশ্বাস করার যৌক্তিক কারণ নেই। তার ওপর ব্যাংক-ব্যবসা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখেন না এমন ব্যক্তিরা যখন পর্ষদে সমবেত হয়েছেন, তখন পরিস্থিতি যে আরও খারাপ হবে, কেউ এমনটি মনে করলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। দিনবদলের প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ পুরোনো নিন্দনীয় আচরণের ধারায় ফিরে গেলে তা হবে দেশের জন্য অমঙ্গলজনক। সময় থাকতে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা উচিত।

মধ্যপ্রাচ্য রবার্ট ফিস্ক ফিরে দেখা: সিরিয়া-ইরাক সম্পর্ক

s
বাগদাদ ও দামেস্কে যেন পুরোনো দিন ফিরে এসেছে। আগের মতোই পারস্পরিক দোষারোপ, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটছে, আর সিরিয়া ও ইরাক কূটনৈতিক সম্পর্কের অবসান যেন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
সিরিয়া দুজন ইরাকি বাথপন্থীকে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তাই ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি একটি আন্তর্জাতিক আদালত গঠনের দাবি করেছেন। মালিকির অভিযোগ, সেই দুই ব্যক্তি বাগদাদে আত্মঘাতী বোমা হামলার মাধ্যমে ১০০ বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছেন। সিরিয়া এতে ক্রুদ্ধ হয়ে বলেছে, দেশটি সব সময় ‘অন্যায়’ আচরণের শিকার ব্যক্তিদের জন্য আশ্রয়স্থল ছিল।
সাদ্দাম হোসেন ও হাফিজ আল-আসাদ ২০ বছর আগে দামেস্ক ও বাগদাদে বোমা হামলাকারী পাঠিয়েছিলেন একে অন্যের শহরকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য। এখন মালিকি এবং হাফিজের পুত্র বাশার পরস্পরকে আক্রমণ করছেন। উপজাতীয় সংযোগ, ঐতিহাসিক সম্পর্ক, আরব ঐক্যের প্রতি ‘ভ্রাতৃসুলভ’ ভালোবাসা—এসবের জন্য মনে হয় যেন দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র সময়ে সময়ে একে অন্যের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিতে থাকবে।
সাদ্দাম-হাফিজ যুগে তাঁরা একে অন্যের বোমা হামলকারীদের প্রকাশ্যে ফাঁসি দিতেন। সিরিয়ার দালালদের দেখা যেত বাগদাদের কোনো রাস্তায় ঝুলছে, বাতাসে মৃদু দুলত তাদের দেহ। দামেস্কেও একই অবস্থা হতো সাদ্দামের পাঠানো খুনিদের। এখনকার দিনগুলো আরেকটু সভ্য হয়েছে। এমন বোমা হামলাকারী আর দেখা যায় না। ইরাক এখন কোনো বোমা হামলাকারী আটক করে না। কিন্তু সিরিয়া যখন নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে জাহির করে, ইরাক তখন আন্তর্জাতিক আইনের দাবি জানায়।
তবে সিরিয়ার স্মৃতি অপেক্ষাকৃত ভালো। দুই দেশের শত্রুভাবাপন্ন বাথ পন্থার পুরোনো দিনগুলোতে সাদ্দামের ক্রোধানল থেকে বাঁচতে মালিকি ও ইরাকের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জালাল তালাবানি দামেস্কে আশ্রয় চান। হাফিজ তাঁদের প্রতি সদয় হন, তাঁদের ‘আরব জাতির মাতা’ সিরিয়ায় স্বাগত জানান (দেশটি নিজেকে এ নামে ডাকতে পছন্দ করে)। অন্তত সেই সময়টাতে তাঁরা হাফিজের কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন। আজ সিরিয়াবাসী এই যুগলকে সেই উদার সহযোগিতা ও তাঁদের ভণ্ডামির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে বিলম্ব করে না।
সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন আল-থাউরা সংবাদপত্র ঘোষণা করেছে, ‘অন্যায়, স্বেচ্ছাচারিতা ও মৃত্যুর হুমকি থেকে বাঁচতে কেউ আশ্রয় প্রার্থনা করলে সিরিয়া কখনো তাঁকে হস্তান্তর করে না।’ এটি আরও বলেছে, ‘... তাঁরা (মালিকি ও তালাবানি) জানেন, তাঁদের ভাগ্য কী ঘটত যদি সিরিয়ার এমন রাজনৈতিক নৈতিকতা থাকত।’ সাদ্দামের বাথ পার্টির উচ্চপদস্থ সদস্য মহামেদ আল-ইউনিস ও সাতাম ফারহান দামেস্কে নেই—এমন কথা সিরিয়া বলেনি। কিন্তু বাগদাদে বোমা বিস্ফোরণে তাঁদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ চেয়েছে দেশটি। দামেস্ক মনে করে, এই প্রমাণ দেওয়া ইরাকের পক্ষে কঠিন হবে।
কিন্তু সিরিয়া যে ভণ্ডামির নিন্দা করে, তার দেখা মিলবে সীমান্তের উভয় পারেই। সিরিয়া-ইরাক সীমান্তে বেড়া ও পর্যবেক্ষণ চৌকি নির্মাণের দায়িত্বে নিয়োজিত সিরীয় জেনারেলের সঙ্গে আমার সাক্ষাত্ হয়েছিল। তিনি মনে করেন, ইরাকে বিদ্রোহীদের যাতায়াত বন্ধ করার জন্য এটি এক আন্তরিক প্রচেষ্টা। অথচ লেবাননের এক আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীর পরিবারের সঙ্গে আমার সর্বশেষ সাক্ষাতে সেই বোমা হামলাকারীর চাচা আমাকে জানিয়েছেন, ‘সে ইরাকে গিয়েছিল, কারণ লেবানন সীমান্ত পার হয়ে ইসরায়েলি শত্রুর ওপর আক্রমণ করার চেয়ে সিরিয়া সীমান্ত পার হয়ে ইরাকে গিয়ে আমেরিকার সেনাদের ওপর আক্রমণ করা সহজ ছিল।’
আসলে ইরাক ও সিরিয়ার বাথপন্থীদের মধ্যে সব সময় সহিষ্ণু, অর্থপূর্ণ, কখনো কখনো বোঝাপড়ার সম্পর্ক ছিল। এমনকি সাদ্দামের শাসনামলেও এ অবস্থা ছিল। এই পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল আফলাক ছিলেন সিরীয় খ্রিষ্টান, যাঁর শেষ জীবন কেটেছে ইরাকে। তাঁর পরিবারের মতে, ২০০৩ সালে আমেরিকার হামলায় তাঁর সমাধির ব্যাপক ক্ষতি হয়। বর্তমানে সমাধিটি আমেরিকা-নিয়ন্ত্রিত গ্রিন জোনে অবস্থিত। বাথপন্থীরা যেমন সবাই ‘ভাই’, আল-ইউনিস ও ফারহানও তেমনি ‘ভাই’—যাঁরা ইরাকে অবস্থানরত আমেরিকানদের সামরিক কৌশল ও মালিকির বাহিনীর বিষয়ে সিরিয়ার দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা তত্পরতায় অবশ্যই নতুন কিছু যুক্ত করতে পারেন।
কিন্তু সিরিয়ার রাজনৈতিক অখণ্ডতার প্রশংসা করে আল-থাউরার ভাষ্য পাঠ করা দরকার ইতিহাসের ওপর দৃষ্টি রেখে। মৃত্যুর হুমকিতে থাকা কাউকে সিরিয়া কখনো হস্তান্তর করে না, দেশটি এমন দাবি করে। অথচ আমরা কি দেখিনি আবদুল্লাহ ওসালান নামের সেই কুর্দি গেরিলা নেতাকে? সিরিয়া তাঁকে নানাভাবে সহায়তা করেছিল। তুরস্কের কাছ থেকে তাঁর জীবন বিপন্ন ছিল। কিন্তু তুরস্ক যখন আসাদের শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিল, তত্ক্ষণাত্ ওসালানকে দামেস্ক ছেড়ে যেতে বলা হলো। আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায় যাত্রা করার পর, তুরস্কের গোয়েন্দা বাহিনীর হাতেই তাঁকে কি ধরা পড়তে হয়নি? আজ পর্যন্ত তাঁকে তুরস্কের কারাগারে পচতে হচ্ছে।

(ইংরেজি থেকে অনূদিত)
* রবার্ট ফিস্ক: ব্রিটেনের দি ইনডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদদাতা।
জেলেজীবন
শমসের আলী, রবিউল ইসলাম, শরিফুজ্জামান শরিফ, এ এস এম আতীকুর রহমান ও রোবায়েত ফেরদৌস
নতুন জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি

সময়চিত্র আসিফ নজরুল বিচার বিভাগ: অসামান্য মানুষের গল্প

মসিউর আমার অফিসে প্রথম আসে বছর দুয়েক আগে। হঠাত্ এক দুপুরে ‘আছ্ছালামোলায়কুম স্যার’ শুনে চোখ তুলে দেখি তাকে। তার উচ্চারণে সামান্য সমস্যা আছে। এমনিতেও খুব সাদামাটা সে। মলিন বেশবাস, সাধারণ চেহারা, সারা মুখে চিকচিক করছে ঘাম। অনেকক্ষণ হেঁটে আসা মানুষের ঘাম।
মসিউর দিনাজপুরের প্রত্যন্ত এক অঞ্চলের দরিদ্র কৃষকের সন্তান। অনেক কষ্টে ভালো রেজাল্ট করে গ্র্যাজুয়েশন করেছে, তবু কোনো চাকরি হয় না তার। এই দুঃখে কিছু একটা করার জেদ নিয়ে চলে এসেছে শহরে। খুব সাধারণ ঘটনা এটি। ঢাকাতে এমন মানুষ প্রতিদিনই আসছে; কিন্তু মসিউর আসলে সবার মতো না। সে সামান্য মানুষও নয়। তার জীবনে আছে অসামান্য গল্প।
ঢাকায় প্রথম কয়েক মাস অর্থাভাবে খুবই করুণ জীবন কাটে তার। মসিউরের ফোন এলে তাই মন খারাপ হয়ে যেত আমার। সেই মসিউর নিজের চেষ্টায় একদিন চাকরি পায় মফস্বলের এক স্কুলে। সেখানে যোগদানের আগে গ্রামের বাড়ি গেলে তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে। গাছ থেকে পড়ে মেরুদণ্ডের হাড় নড়ে যায় তার। মফস্বলের ডাক্তার জানিয়ে দেয়, ভালো হওয়ার কোনো আশা নেই। মসিউর কান্নায় ভেঙে পড়ে ফোনে, ‘স্যার, আমি তো পঙ্গু হয়ে গেলাম!’
মসিউর পঙ্গু থাকেনি শেষ পর্যন্ত। মাসের পর মাস বিছানায় থেকে একটু সুস্থ হয়ে একদিন উঠে দাঁড়ায় সে। ঢাকায় এসে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করে। মাত্র তিন দিন আগে—আমাকে চমকে দিয়ে আবারও কান্নায় ভেঙে পড়ে সে—ফোনে। স্যার, আমি জজ হয়ে গেছি স্যার! জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের সব পরীক্ষায় পাস করে একজন সম্মানিত বিচারক হয়ে গেছে আমাদের মসিউর! তার কান্না থামে না আনন্দে। সে জানে না তার সঙ্গে সঙ্গে আমারও চোখ ভিজে যায়। সারা দিন টিউশনি করার পর অমানুষিক পরিশ্রম করে এসব পরীক্ষার দিয়েছে সে। কত দিন তাকে বলতাম: পরীক্ষায় টিকতে না পারলে মন খারাপ কোরো না। সারা দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্ররা এখন এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। মসিউর কি এসব শুনে মন খারাপ করত তখন!
আমার অভিভূত অবস্থা কাটতে না কাটতেই ফোন আসে শিউলির বাবার। শিউলি আমার সরাসরি ছাত্রী ছিল। প্রাণঘাতী ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার কারণে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ করতে পারেনি সে। তার চিকিত্সার জন্য সহযেগিতা চেয়ে প্রথম আলোয় লিখেছিলাম আমি। সারা দেশ থেকে বহু মানুষ সাহায্য করেছে তার চিকিত্সায়। আমার সঙ্গে কিছুদিন আগে মাত্র পরিচয় হয়েছিল ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের, শিউলির কথা শুনেই তিনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পঞ্চাশ হাজার টাকা! এমন সহূদয় মানুষদের সহযোগিতায় ও তাই সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পেরেছিল দেশে। শিউলির বাবা আমাকে জানালেন, শিউলিও এবার জজ হয়েছে। মৃত্যুর থাবা থেকে ফিরে এসে আমাদের মেয়েটি তার জীবনের প্রথম বড় যুদ্ধে জিতে গেছে। এই আনন্দ একা চেপে রাখি কীভাবে!
শিউলি আর মসিউরদের এই অসামান্য সাফল্য কিছুটা হলেও জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কারণে। পিএসসি এবং সরকারি নিয়োগদাতা আরও বহু প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতির কলঙ্ক স্পর্শ করেনি এই কমিশনকে। মসিউরের মতো ছেলেরা তাই সেখানে সুস্থ প্রতিযোগিতা করে নিম্ন আদালতে বিচারক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। শিউলির মতো মেয়ে তাই সেখানেই যোগ্যতার পরীক্ষা দেওয়ার আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে। এই কমিশনকে আমরা পেয়েছি বিচার বিভাগ পৃথক হয়েছিল বলে। কমিশনের নিয়োগ রাজনীতিমুক্ত হতে পেরেছে বলে।
কমিশনের এই সাফল্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় উচ্চ আদালতে নিয়োগের করুণ অবস্থা; সেখানকার নিয়োগে ক্ষমতাসীন দলগুলোর হস্তক্ষেপের করুণ পরিণতির কথা; এবং উচ্চ আদালতের স্বাধীনতা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে আমাদের ব্যর্থতার কথা।

২.
২০০৬ সালে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয় মাসদার হোসেন মামলার আলোকে। মামলার রায়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিম্ন আদালতে নিয়োগের জন্য পৃথক কমিশন প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। এই কমিশনের সব কার্যক্রম পরিচালিত হয় সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বে। এর সাচিবিক এবং পরীক্ষা কার্যক্রমের দায়িত্বও পালন করেন সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক বাছাই করা জেলা জজ পর্যায়ের বিচারকেরা। কমিশনের প্রতিষ্ঠা এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পদক্ষেপের অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব পড়ে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে। নিম্ন আদালতে নিয়োগের প্রতি নজিরবিহীন আগ্রহের সৃষ্টি হয়। এর প্রথম প্রমাণ পাওয়া পায় কমিশন কর্তৃক পরিচালিত নিম্ন আদালতে বিচারক নিয়োগদানের প্রথম পরীক্ষাতেই।
বর্তমান প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে কমিশন এই কাজটি সম্পন্ন করে ২০০৭ সালে। সে বছর যে ৩৯৪ জন নিম্ন আদালতে নিয়োগ পান, তাঁদের সবাই এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ পাওয়া। এঁদের মধ্যে এসএসসিতে মেধা তালিকায় অবস্থান ছিল ২১ জনের এবং এইচএসসিতে ২৭ জনের। আইন বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন পর্যায়ে (এলএলবি) প্রথম শ্রেণী পাওয়া পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫৩ এবং মাস্টার্স (এলএলএম) পরীক্ষায় ৪১। তুলনা হিসেবে বলে রাখি, আমি ১৯৯১ সালে যে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিই, সেখানে নিম্ন আদালতে বিচারক হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে একজনও এলএলবি বা এলএলএম পর্যায়ে প্রথম শ্রেণীপ্রাপ্ত ছিলেন না।
আরেকটি চমকপ্রদ তুলনা দিই। নিম্ন আদালতের বিচারকদের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বেতন-ভাতা আর মর্যাদা উপভোগ করেন হাইকোর্ট অর্থাত্ উচ্চ আদালতের বিচারকেরা। ২০০৭ সালের পর হাইকোর্টে যে ১৫ জন (তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৬, বর্তমান সরকারের আমলে ৯) বিচারক নিয়োগ পেয়েছেন তাঁদের অধিকাংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা ২০০৭ সালে নিয়োগ পাওয়া নিম্ন আদালতের বিচারকদের তুলনায় অনুজ্জ্বল। এই ১৫ জনের মধ্যে একাধিক বিচারক শিক্ষাজীবনের কোনো না কোনো স্তরে উত্তীর্ণ হয়েছেন তৃতীয় বিভাগ পেয়ে। বিএনপির শাসনামলে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকদের অন্তত ছয়জনের শিক্ষাজীবনে ছিল একাধিক তৃতীয় বিভাগ পাওয়ার গ্লানি।

৩.
এই ‘কদর্য’ তুলনা এমনি এমনি দিইনি। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বিচারক নিয়োগে কী ভূমিকা রাখতে পারে তার একটি বড় প্রমাণ এই তুলনা। নিম্ন আদালতে বিচারক নিয়োগ দেয় স্বাধীন প্রতিষ্ঠান জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন; উচ্চ আদালতে নিয়োগ দেয় সরকার নিজে। একাধিক মামলায় (যেমন: সামসুল হুদা বনাম বাংলাদেশ, ১৫ বিএলটি ৬২; রাষ্ট্র বনাম মানবজমিন, ৫৭ ডিএলআর ৩৫৯) উচ্চ আদালতে নিয়োগদানের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করার প্রথাগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলা আছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই পরামর্শ অধিকাংশ ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত তালিকার মধ্যেই। এই তালিকা তৈরিতে দলের প্রতি অনুগতদের প্রধান্য দেওয়া প্রায় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশে। একজন প্রধান বিচারপতি তাই আক্ষেপ করে বলেছিলেন: উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে ভুলের কারণে মহাপ্রলয় ঘটে গেছে!
উচ্চ আদালতে নিয়োগে রাজনৈতিক পছন্দের সুযোগ আরও অবারিত হয়েছে সংবিধান পালনে আমাদের সরকারগুলোর অনীহার কারণে। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে বলা আছে, হাইকোর্টে কমপক্ষে ১০ বছর অ্যাডভোকেট হিসেবে না থাকলে বা নিম্ন আদালতে ১০ বছর বিচারক হিসেবে না থাকলে কেউ হাইকোর্টের বিচারক হতে পারবেন না। হাইকোর্টে নিয়োগের জন্য এই যোগ্যতাই যথেষ্ট হতে পারে না। সংবিধান তাই বিচারক পদে নিয়োগের জন্য অন্যান্য যোগ্যতা নির্ধারণের দায়িত্বও সংসদকে দিয়ে দিয়েছে। গত ৩২ বছরে (১৯৭৭—২০০৯) এই দায়িত্ব কোনো সংসদ পালন করেননি, সংসদে এ নিয়ে এমনকি কোনো আলোচনাও সম্ভবত কখনো হয়নি।
আমাদের সরকারগুলো এই সুযোগ গ্রহণ করেছে অকাতরে। সফল বা এমনকি সক্রিয়ও নয়, এমন আইনজীবীদের হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগ করা হয়েছে ১০ বছরের সনদ দেখে। জেলা জজদের তুলনায় রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয় বলে হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে আইনজীবীদের।
আইনজীবীদের মধ্য থেকে ভালো নিয়োগও যে কম হয়েছে, তা নয়। কিন্তু তা করা হয়েছে মন্দ নিয়োগের কলঙ্ককে আড়াল করার জন্য। যোগ্যতাগুণে নিয়োগপ্রাপ্তরা তাতে হতদ্যম হয়েছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে ভালো আর মেধাবী আইনজীবীদের বেশির ভাগ এখন আর হাইকোর্টের বিচারক হওয়ার আগ্রহই অনুভব করেন না।

৪.
উচ্চ আদালতের এই দুরবস্থা বদলাতে হবে। উচ্চ আদালতে রাজনৈতিকভাবে অনুগত নিম্ন মেধার লোকের নিয়োগের কারণে কী পরিণতি হয় তা সাবেক বিচারপতি ফয়েজীর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি। উচ্চ আদালতে নিয়োগের জন্য তাই প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নামেমাত্র এমন একটি কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বটে। কিন্তু তা না ছিল স্বাধীন, না ছিল ক্ষমতাসম্পন্ন। আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতকৃত তালিকা থেকে এই কমিশন প্রতিটি পদে নিয়োগের জন্য দুজন ব্যক্তিকে বাছাই করার ক্ষমতা পেয়েছিল মাত্র।
প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করা হলে, বিচারক নিয়োগের জন্য যোগ্যতা নির্ধারণী আইন প্রণীত হলে এবং বিচারকদের বেতন ভাতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করা হলে নিম্ন আদালতের মতো উচ্চ আদালতেও আমরা মেধাবী ও যোগ্য বিচারকদের আরও অনেক বেশি সংখ্যায় দেখতে পাব।
এসব ব্যবস্থা না করা হলে একদিন নিম্ন আদালতের নিয়োগও প্রশ্নবিদ্ধ হযে যেতে পারে। রাজনৈতিকভাবে অনুগত ও অযোগ্য কোনো উচ্চ আদালতের বিচারককে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের প্রধান বানিয়ে দিয়েই এই সর্বনাশ করা সম্ভব। এ ধরনের ব্যক্তিরা যাতে আর কখনো উচ্চ আদালতে নিয়োগ না পেতে পারেন, সে জন্য এখন থেকে সতর্ক হতে হবে।
মসিউর মতো আরও অনেক অনাগত তরুণের ভবিষ্যত্ আমরা এভাবেই নিশ্চিত করতে পারি।

[পুনশ্চ: নিবন্ধের শুরুতে যার কথা বললাম তার প্রকৃত নাম মসিউর নয়। অনুমতি ছাড়াই তার জীবনের সত্যি ঘটনাগুলো লিখে ফেলেছি বলে নাম সামান্য পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে।]

আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শ্রদ্ধাঞ্জলি ‘আসি বলে চলে গেল...’ মুস্তাফা জামান আব্বাসী

ভাটিবাংলার বাউল সাধক শাহ আবদুল করিম গতকাল সকালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মন ছুটে গেল সুদূর অতীতে যেখানে কবির আপন বাসভূমে সেই উজানধলের কালনীর স্রোতের সামনে দেখেছিলাম তাঁকে তাঁর যুবা বয়সে। দীর্ঘাঙ্গে যেন প্রস্তুত দারিদ্র্য-বঞ্চনায় সিক্ত একটি চাবুকের মতো উপস্থাপনা, বাঙ্ময় চোখ দুটি যেন মুহূর্তে সামনে এনে দেয় তাঁর লোকাচার, স্মৃতি, তীরবর্তী জনজীবনের হতাশা ও দুঃখ। আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘সত্যি, আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন? আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। কোথায় আপনাকে বসতে দিই?’
বললাম: রোটারির গভর্নর হিসেবে দিরাই এসেছি, দীর্ঘ জলপথ অতিক্রম করে ‘অফিশিয়াল ভিজিটে। আসল আকর্ষণ আমার: ‘কালনীর স্রোতের’ কবি আবদুল করিম দর্শন।
এর আগের বছর সিলেট শহরে তাঁকে নিয়ে উপস্থাপিত ‘আমার ঠিকানা’ টেলিভিশন উপস্থাপনায় তাঁর গানে এখনো কানে বাজছে: ‘মানুষ যদি হইতে চাও করো মানুষের ভজনা/সবার উপরে মানুষ সৃষ্টিতে নাই যার তুলনা।’ বিটিভির প্রযোজক মুসা আহমেদ অবাক হয়ে তাঁর গান শুনছিলেন। বললেন, আজ রাতে সিলেট রেস্ট হাউসে সারা রাত গান শুনব এই শিল্পীর। বললাম: তথাস্তু। রাতে আবদুল করিম আমার আরও ঘনিষ্ঠ হলেন।
গাইলেন একটার পর একটা গান চোখ বন্ধ করে। আল্লাহ স্মরণ, নবী স্মরণ, ওলি স্মরণ, পীর-মুর্শিদ স্মরণ—সর্বমোট ২৫টি গান। এমনি আসরে আমি নাওয়া-খাওয়া ভুলে যাই। গুরু মশুরউদ্দীন, জসীমউদদীন ও বাবা আব্বাসউদ্দীনের ছিল একই রোগ।
বললাম, আবদুল করিম ও তাঁর পুরো দল আমার সঙ্গে খেয়ে বিদায় নেবেন।
কবি কী যেন বলতে গিয়েও বললেন না। লাজুক স্বভাবের। হয়তো অর্থকষ্টের কথা। রেডিও-টেলিভিশনের এই সামান্য অনুষ্ঠানে কটা টাকাই বা পাবেন। আমার সুন্দর লম্বা পাঞ্জাবিটা তাঁর গায়ে চড়িয়ে দিয়ে বললাম, আপনাকে দারুণ মানাচ্ছে। পাড়াগ্রামের অনেক সাধককে জামা পরিয়েছি, এটা আমার আরেক রোগ।
আবদুল করিমের গান এই প্রজন্ম গলায় তুলে নিয়েছে শুধু দিরাই, সিলেটেই নয়; লন্ডনে, নিউইয়র্কেও। যখন যেখানে যাই, দেখি আবদুল করিমকে গভীরভাবে ভালোবেসে তাঁর গানগুলো গাইছে:
‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু-মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান ঘাটু গান গাইতাম।’
এই গানের ছন্দে আজ বাংলা গানের সমঝদারেরা আন্দোলিত। গানগুলোর জনপ্রিয়তার মূলে সংগীতগোষ্ঠীর অবদান সর্বাধিক। তাঁরা গাইছেন বলেই আবদুল করিম আজ ‘বাউলসম্রাট’ নামে অভিহিত। লালনের আখড়ায় বাউলেরা গাইছেন বলেই লালনের গান আমরা ফিরে পেলাম। লালনগীতির শিল্পীরা এই কাজটি করেছেন। তুলনায় পাগলা কানাই, পাঞ্জু শাহ, দুদু শাহ ও অন্য এক শ জন বাউল সাধকের গান তেমনটি গাইতে দেখি না। তবে করিমের অবদান সর্বাধিক। তাঁর গান সহজ, সরল ও স্বভাবগতির। ড. জাফর আহমদ খান, সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শাহ আবদুল করিমের রচনাসমগ্র পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে তাঁর শ্রেষ্ঠ গান স্থান পেয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থ আফতাব সংগীত, গণসংগীত, কালনীর ঢেউ (১৯৮১), ধলমেলা (১৯৯০), ভাটির চিঠি (১৯৯৮) ও কালনীর কূলের (২০০১) নির্যাস এই গ্রন্থটি। ধ্রুব এষ অসাধারণ প্রচ্ছদ এঁকেছেন। করিমের আউলা কেশ দেখা যাচ্ছে, মধ্যে একটি সাদা পালক।
সুমন কুমার দাশ সম্পাদিত শাহ আবদুল করিম সংবর্ধনা গ্রন্থে নাসির আলী মামুনের তোলা একটি অসাধারণ পোর্ট্রেট স্থান পেয়েছে আর ৩২ জন লেখকের হূদয়-নিঃসৃত নৈবেদ্য। আমিও আছি। সুমন একটি সুন্দর কাজ করেছেন। করিমের ‘একুশে পদক’ প্রাপ্তি সংস্কৃতিজগেক উদ্ভাসিত করেছে। ‘প্রথম আলো-মেরিল’ আজীবন সম্মাননা তার মুখে শেষ হাসিটুকু পৌঁছে দিয়েছিল। আমি ভাগ্যবান, কারণ পুরস্কারটি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলাম সেদিন।
শাহ আবদুল করিম তাঁর নিজের পরিচয় পদ্যাকারে দিয়েছেন এইভাবে:
‘কেউ বলে শাহ আবদুল করিম, কেউ বলে পাগল
যার যা ইচ্ছা তাই বলে বুঝি না আসল-নকল
বসত করি দিরাই থানার গ্রামের নাম হয় ধল
ধল একটি প্রসিদ্ধ গ্রাম দূরদূরান্তে আছে নাম
এই গ্রামের জয় জিলাম নাই কোন সম্বল...
গানের উস্তাদ করমুদ্দিন, ধল আশ্রমে বাড়ি
পরে সাধক রশীদ উদ্দিন, উস্তাদ মান্য করি
বাউল ফকির আমি একতারা সম্বল
সবলাকে সঙ্গে নিয়া আদি উজানঢল।’

বছর খানেক আগে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার আমাকে ফোন করে জানালেন ‘আব্বাসী ভাই, আপনাকে এক্ষুণি একবার আসতে হয়। বাউল সম্রাট খুব অসুস্থ... তাঁকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান করতে চাই।’ খানিকক্ষণ পর ফোন করে জানালেন উনি এত অসুস্থ আর কথা বলতে পারছেন না।
সেরা শিল্পীরা সেরা কবিরা তাঁদের সবটুকু দিয়ে চলে গেলেন। হয়তো দিনকতক হৈচৈ, তারপর সব স্তব্ধ। বয়ে চলবে কালনীর স্রোত। নতুন কোনো গায়ক গান গাইবে। শাহ আবদুল করিমেরই গান:
‘আসি বলে চলে গেল আর তো ফিরে এলো না
আজ আসবে কাল আসবে বলে গো
আমার দিন যায় না রাত পোহায় না।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সঙ্গীতব্যক্তিত্ব।

ঈদে পরিবহন-ভোগান্তি নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরার বন্দোবস্ত করা সরকারেরই দায়িত্ব

ঈদের আগে ঘরে ফেরা মানুষের পরিবহন-ভোগান্তি যেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে বসেছে। বছরের পর বছর যাত্রীসেবার বেহাল দশা। জনপরিবহন যেন আমাদের সার্বিক অব্যবস্থাপনার মূর্তিমান প্রতীক।
জানা কথা, ঈদের আগে লাখ লাখ মানুষ ঘরে ফেরার তাড়ায় থাকবে। এটাও জানা কথা, এ খাতে পরিবহনসংকট, টিকিট নিয়ে কালোবাজারি, নিম্নমানের যাত্রীসেবাও বহাল থাকবে। যেখানে চাপটা পড়ে ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলাগামী পরিবহনে, সেখানে ঈদের জন্য অতিরিক্ত যানবাহন জেলাগুলো থেকে আনা হয় না কেন? সর্বোপরি, সড়কপথে আরও সরকারি ট্রেন-বাস এবং নৌপথে আরও সরকারি লঞ্চ-স্টিমারের বন্দোবস্ত করতে অসুবিধা কোথায়? সদিচ্ছার অভাব? তাহলে এর উত্স— সরকার যে জনগণের সেবক, এই প্রয়োজনীয় কথাটি মান্য না করার মধ্যে। পরিবহন ব্যবসায়ীরাও কম যান না। ঈদে ভাড়া বাড়ে, যাত্রীদের টিকিট পাওয়া হয়ে দাঁড়ায় সোনার হরিণ পাওয়ার মতো অসাধ্য।
ভোগান্তিটা বেশি হয় ঢাকা নগরে এবং নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তরাই এর বেশি শিকার হয়। অন্যদিকে রাতের যাত্রীরা প্রায়ই ছিনতাই-রাহাজানির শিকার হয়। তাই পুলিশ প্রশাসনের আরও তত্পর হওয়া চাই। ঈদ ও শারদীয় দুর্গোত্সব এবার পর পর হওয়ায় গ্রামে ফেরার টানও বেশি। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের উচিত, সরেজমিনে তদারক করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং টিকিট বিক্রয়কেন্দ্র ও বাসস্টপে নজরদারি বাড়ানো।
বাংলাদেশে সমাজের শেকড় এখনো গ্রামে; শহরবাসী মানুষের মনের শেকড়ও গ্রামেই পোঁতা থাকে। দেশের মানুষ তখন ‘দেশের’ মানুষের সঙ্গে মিলিত হয়। এই সুযোগ থেকে কেউই যাতে বঞ্চিত না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
শহরের মানুষের এভাবে গ্রামে ফেরা গ্রাম-শহরের দেওয়া-নেওয়াকেও বাড়ায়। ঈদ নিছক উত্সব নয়, উেস ফেরার ডাক। সেই ডাক আরও বহুকাল আসুক, মানুষ নির্বিঘ্নে ঘরে ফিরুক—সেটাই প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন মোড় পারস্পরিক সহযোগিতা থেকে পারস্পরিক কল্যাণ

পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি ভারতে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষে দেশে ফিরে বেশ কিছু সুখবর জানিয়েছেন। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সীমানা চিহ্নিতকরণ, অমীমাংসিত ছিটমহল, অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন, অপরাধী বিনিময়, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে পরস্পরের ভূখণ্ড ব্যবহার, বাণিজ্য ঘাটতি, আঞ্চলিক যোগাযোগ ইত্যাদি বিষয়ে ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে তাঁর আলোচনা হয়েছে এবং এসব বিষয়ে বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূরীকরণে উভয় দেশ সম্মত হয়েছে। আমাদের মনে হয়, বহু বছর ধরে অমীমাংসিত সমস্যাগুলো সমাধান করে পারস্পরিক মঙ্গলের স্বার্থে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় সূচনায় উভয় পক্ষ আন্তরিক হলে এখন তা অবশ্যই সম্ভব।
ভারত আমাদের সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী, তিন দিকের সীমান্তের প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে ভারত। এটি আমাদের ভৌগোলিক বাস্তবতা। আর রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে, স্বাধীনতার অল্প সময় পর থেকেই ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক জটিলতাপূর্ণ; আনুষ্ঠানিক ও কূটনৈতিকভাবে যতটা নয়, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিকভাবে। একদিকে ‘ভারত-বিরোধিতা’, অন্যদিকে ‘ভারতের দালালি’, ‘দেশ ও জাতীয় স্বার্থ বিক্রি করে দেওয়া’ ইত্যাদি শব্দমালা এ দেশের রাজনীতিতে এখনো বহুল উচ্চারিত। ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে নিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলে জাতীয়ভাবে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা কখনোই সেভাবে করা হয়নি। ভারতের তরফেও সে রকম তাগিদ যথেষ্ট মাত্রায় ছিল কি না, বলা কঠিন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির সাম্প্রতিক ভারত সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতির বিষয়বস্তুগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, উভয় পক্ষ এখন একটি কার্যকর সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী। আমাদের কতগুলো প্রস্তাব ও দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের ইতিবাচক সাড়ার আভাস মিলেছে। যেমন, বিতর্কিত সীমানা চিহ্নিতকরণ, আঙ্গরপোতা, দহগ্রাম ছিটমহল ও তিনবিঘা করিডর সমস্যা নিষ্পত্তির আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত। ভারত যেমন তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের সুবিধা চায়, বাংলাদেশও তেমনই নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে ভারতের ভূমির ব্যবহারের সুবিধা চায়। এবার উভয় দেশ পারস্পরিক সুবিধার্থে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়েছে। বাংলাদেশের নদীগুলোর নাব্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নদী খননে সহযোগিতা, একটি সেচ প্রকল্প গড়ে তোলা, রেল যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে সহযোগিতা, দিনে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহ করাসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে যেসব প্রস্তাবের খবর জানা গেল, তা এককথায় উত্সাহব্যঞ্জক।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির ভারত সফরকে বেশ ফলপ্রসূ বলে বর্ণনা করা যায়। তবে আলোচ্য বিষয়গুলোর চূড়ান্ত ফল পাওয়া যাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই ভারত সফরে যাবেন। সে-সময় এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে। তার আগে সব বিষয়ে আলোচনা, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দর-কষাকষির প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে ভালোভাবে। যেকোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেওয়া ও পাওয়ার মধ্যকার ন্যায্যতা নিশ্চিত করা একটি কঠিন বিষয়। জাতীয় স্বার্থই যেখানে সবকিছুর ওপরে বলে বারবার বলা হচ্ছে, সেখানে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থেকে সব খাতে নিজেদের ন্যায্য পাওনা আদায় করতে কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান এবং কূটনৈতিক প্রস্তুতি নেওয়া খুব প্রয়োজন। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগেই সেসব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হবে।