Showing posts with label ঐতিহ্য. Show all posts
Showing posts with label ঐতিহ্য. Show all posts

Friday, June 26, 2026

ভারতে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদসহ যেসব স্থাপনা ধ্বংস করেছে মোদি সরকার

পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ার সুপুরডিহি গ্রামের ঠেলাগাড়িতে বাসনপত্র বিক্রেতা দরিদ্র মুসলিম আকবর ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানধারী জঙ্গি হিন্দুদের হাতে প্রাণ দিয়ে অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে মুক্তি পেয়েছেন। পুরুলিয়ায় আরেক হতভাগ্য মুসলিম মাইমুর উগ্রবাদী হিন্দুদের হামলায় গুরুতর আহত হয়ে এখন বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করছেন।

ভীতসন্ত্রস্ত মাইমুর পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করে বলেন, হামলার মুহূর্তে আমি শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম। ওরা ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়ে আমাকে ধাওয়া করছিল। আমি কোথায় লুকাব, তা বুঝতে পারছিলাম না। থানায় গেলে যে পুলিশ আমাকে সাহায্য করবে না, সেটা নিশ্চিত ছিলাম। তারপরও থানায় গিয়ে উঠলাম। পুলিশ তখন আমাকে নিরাপত্তা দেওয়ার পরিবর্তে গরু পাচার মামলার আসামি বানিয়ে দিল। বুঝতে পারলাম, আমাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে ভারতে বসবাস করা সবচেয়ে বড় অপরাধ!

মাইমুরই এখন ভারতের ২৫ কোটি মুসলিমের জীবনের প্রতিচ্ছবি। অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে জীবন পার হচ্ছে দেশটির মুসলিমদের। হতাশা আর আতঙ্ক এখন তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কখন যেন হিন্দু জঙ্গিদের হাতে প্রাণ যায়! মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয় অথবা বেঁচে থাকার অবশিষ্ট অবলম্বন জয় শ্রীরাম স্লোগানধারীদের বুলডোজারের নিজে চাপা পড়ে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ভারতের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তথা মুসলিমদের ওপর নানামুখী নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলছে। তথাকথিত গোরক্ষা গোষ্ঠীসহ উগ্রবাদী হিন্দু সংগঠনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হত্যাসহ বহুমাত্রিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। প্রতিনিয়ত প্রকাশ্য দিবালোকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে তাদের। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এমনকি অনেক রাজ্যে তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে টার্গেটে পরিণত হয়েছে মুসলিমদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ, মাদরাসা, দরগা থেকে শুরু করে কবরস্থান পর্যন্ত। গত দেড় মাসে মসজিদসহ অন্তত ২৩টি ধর্মীয় স্থাপনা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরা, পাবলিক প্লেসে নামাজ বা মসজিদের মাইক ব্যবহারের মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে কড়াকড়ি তৈরি হয়েছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের রাজনীতিতে মুসলিম প্রতিনিধিদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমে গেছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে মুসলিম শাসকদের ইতিহাস বাদ দেওয়া এবং ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত বিভিন্ন শহরের নাম পরিবর্তনের ঘটনা ঘটছে।

বিজেপি সমর্থিত বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) এবং বজরং দলের (বিডি) মতো হিন্দু আধিপত্যবাদী জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো দেশজুড়ে, বিশেষ করে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় অবাধে তাদের কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। সংগঠনগুলোর সদস্যরা বিভিন্ন অজুহাতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলমানদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আক্রমণ এবং হত্যা অব্যাহত রেখেছে।

পাহালগাম হামলা এবং তার ফলস্বরূপ পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতের পর দেশজুড়ে হাজার হাজার মুসলমানকে যথেচ্ছভাবে গ্রেপ্তার করে কর্তৃপক্ষ। ভারতজুড়ে হাজার হাজার বাংলাভাষী মুসলমানকে আটক করা হয় এবং গুজরাট ও আসামে তাদের বসতিগুলো নির্বিচারে ভেঙে দেওয়া হয়। এছাড়া একটি নতুন ‘পুশব্যাক’ নীতির অধীন যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া ছাড়াই অন্তত এক হাজার ৮৮০ জনকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়, যাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।

বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় ৪৫ দিনে ২৩টির বেশি মুসলিম স্থাপনা ধ্বংস

ভারতে গত ৪৫ দিনে (দেড় মাসে) অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, এই উচ্ছেদ অভিযানের অধিকাংশই বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে সংঘটিত হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো মূলত দিল্লি, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, গুজরাট এবং হরিয়ানা রাজ্যে চালানো হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অধিকারকর্মী সংগঠন ‘জাস্টিস ফর অল’ ভারতে মসজিদ ভাঙার ঘটনা দ্রুতগতিতে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা সম্ভল, বারাণসী এবং জয়পুরে সাম্প্রতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে। ১০০০ বছরের পুরনো মসজিদ থেকে শুরু করে ২০০ বছরের পুরনো দরগাহ পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতের কয়েকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্যে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থানগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই ধ্বংসযজ্ঞের ঢেউ গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, এই ধ্বংসযজ্ঞগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে হচ্ছে না। মে মাস থেকে ছয়টি রাজ্য জুড়ে মসজিদ, দরগাহ, ঈদগাহ, মাদরাসাসহ অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বারাণসীর ১০০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক মসজিদ গঞ্জ শহীদা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

দিল্লির মঙ্গোলপুরীতে অবস্থিত প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ‘দরগাহ পঞ্চ পীরান’ ভেঙে ফেলা হয়। এছাড়া রাজস্থানের জয়পুরের নূরানি মসজিদ, মুম্বাইয়ের বান্দ্রা ও গোরেগাঁওয়ের বেশ কয়েকটি মসজিদ ও দরগাহ এবং বারাণসীর গঞ্জ শাহিদা মসজিদও এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ওয়াকফ বোর্ড এবং স্থানীয় তত্ত্বাবধায়কদের অভিযোগ, আইনি বাধা এবং স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও কোনো পূর্ব নোটিস ছাড়া তাড়াহুড়া করে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।

নির্বাচন-পরবর্তী মুসলিম নির্যাতন

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার শিকার মুসলিম সম্প্রদায়ের সর্বশেষ পরিস্থিতি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে আমার দেশ-এর কলকাতা প্রতিনিধি জানান, পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার শুরু হয়েছে ভারতের অন্যান্য বিজেপি-শাসনাধীন রাজ্যের মতো।

শুভেন্দু দায়িত্ব গ্রহণ করেই পশ্চিমবঙ্গে হিমন্ত ও যোগীর বুলডোজার ও উচ্ছেদ মডেলের পথ বেছে নিয়েছেন। মুসলিম বসতিস্থলে চলেছে বুলডোজার, তপশিয়া, তিলজলার বহুতলে বুলডোজার অ্যাকশন। কারণ, এগুলো নাকি অবৈধ আনপ্ল্যানড নির্মাণ। তপশিয়ায় বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে দেওয়া ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইরফান এখন সহায় সম্বলহীন।

রাতারাতি ফ্ল্যাট হারিয়ে বাস করছেন তিলজলার ছোট্ট ঘুপচি ঘরে। তিনি জানালেন, পুরো কলকাতা শহরজুড়ে অবৈধ নির্মাণ। প্ল্যান নেই সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই। কিন্তু মুসলমান, সেজন্য আমাদের বাড়িতে বুলডোজার চালিয়ে দিল। আমাদের মাল-সামান সরিয়ে নেওয়ার সময়টুকু দেয়নি প্রশাসন। বিজেপি সরকারের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই কাজ করিয়েছেন। আমরা এখন কী করব জানি না! এ রকম ইরফানের সংখ্যা প্রায় ৩০ জনের বেশি যারা তপশিয়ায় বুলডোজার অ্যাকশনে বাড়িছাড়া হয়েছেন। তারা কেউ আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ বা পাড়ি দিয়েছেন নতুন বাসার খোঁজে। তাদের মনে প্রশ্ন, বড়বাজার তো সবচেয়ে ঘিঞ্জি আনপ্ল্যানড এলাকা। সেখানে বুলডোজার চলছে না কেন? ওখানে বিজেপি জিতেছে, ওখানে হিন্দু মাড়োয়ারি, গুজরাতিরা থাকে বলে বুলডোজার যাবে না?

অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটসের (এপিসিআর) একটি বিস্তৃত রিপোর্ট বলছে, মে মাসের ৪ থেকে ৭ তারিখের মধ্যে রাজ্যের অন্তত আটটি জেলায় ব্যাপক সহিংসতা, ভাঙচুর করা হয়েছে। কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা মেট্রো, মুর্শিদাবাদ এবং হাওড়ার মতো জেলাগুলোতে সব মিলিয়ে ৩৪টি এ ধরনের দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই অসহিষ্ণুতার মর্মান্তিক পরিণতি হিসেবে অন্তত দুজনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে কোচবিহারের গোসানিমারিতে একটি মসজিদ রক্ষা করতে গিয়ে এক মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

এই ধারাবাহিক আক্রমণের ফলে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে অন্তত ৫৪টি সম্পত্তি যার মধ্যে বসতবাড়ি, দোকানপাট এবং দলীয় কার্যালয় রয়েছে আক্রমণ বা ধ্বংসের শিকার হয়েছে এবং শারীরিকভাবে বা অন্য কোনো উপায়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন ব্যক্তি। উত্তর ২৪ পরগনার বারাসাতে মুসলিম মালিকানাধীন হোটেল বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া, আমতায় বেছে বেছে ১৫টি বাড়িতে ভাঙচুর চালানো এবং কলকাতার হকার ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার ঘটনাগুলো এই আগ্রাসনের স্পষ্ট প্রমাণ দেয়। শুধু তাই নয়, অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার একটি সুপরিকল্পিত রূপরেখাও দেখা গেছে, যেখানে হাওড়া, কলকাতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জোরপূর্বক গবাদি পশুর বাজার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং মাংসের দোকানগুলোতে অবাধে হামলা চালানো হয়েছে।

ভারতে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী মসজিদসহ যেসব স্থাপনা ধ্বংস করেছে মোদি সরকার

Wednesday, June 17, 2026

সময় বদলালেও যে খাবার এখনো হারিয়ে যায়নি

‘গরুর গোশতের শুঁটকি’- একসময় যে খাবারটি মূলত গ্রামের ঘরোয়া সংরক্ষণ পদ্ধতির অংশ ছিল, এখন সেটিই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে অনলাইন ব্যবসা, ফুড ভ্লগ আর শহুরে খাবারের তালিকায়।

বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় কোরবানির গোশত সংরক্ষণের উপায় হিসেবে অনেক পরিবার গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরি করতো।

আগেকার দিনে আজকের মতো ধনী-গরীব নির্বিশেষে ঘরে ঘরে রেফ্রিজারেটর ছিল না। তাই, মানুষ তখন গোশতে লবণ, হলুদ ও বিভিন্ন মসলা মাখিয়ে রোদে শুকাতো। এতে গোশত দীর্ঘদিন ভালো থাকতো এবং পরে রান্না করেও খাওয়া যেত।

উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল ও কিছু গ্রামীণ এলাকায় যুগ যুগ ধরে এভাবেই মাছের পাশাপাশি গোশতের শুঁটকিও করা হতো এবং কোথাও কোথাও এখনো তা টিকে আছে।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রচলন আছে এবং রোদে বা কৃত্রিম উপায়ে শুকানো গোশতের বেশ কদরও রয়েছে বিশ্বজুড়ে।

রোদ, ধোঁয়া আর স্মৃতিতে টিকে থাকা এক খাবার

সময় বদলেছে। রেফ্রিজারেটরের বদৌলতে বদলেছে খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতিও। কোরবানির ঈদে গোশত রান্না ও বিতরণ করার পর এখন আর মানুষকে সেগুলো সংরক্ষণ করা নিয়ে ভাবতে হয় না।

কিন্তু কেউ কেউ আছেন, যাদের গরুর গোশতের শুঁটকির প্রতি আগ্রহ কমেনি। সেকারণেই এই রেফ্রিজারেটরের যুগেও তারা নিজেদের খাওয়ার জন্য গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরি করেন।

আর এটি বোঝা যায় অনলাইনে গরুর গোশতের শুঁটকি বিক্রির হিড়িক দেখে। এটি এখন হলফ করে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন ব্যবসার কারণেও এটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অনেকেই এখন এটিকে ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবেও তুলে ধরছেন।

বর্তমানে যশোরের বেনাপোলে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা মো: কাউসার আহমেদ, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলায়। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ছোটবেলায় তিনি কোরবানির ঈদে তাদের গ্রামের প্রত্যেক ঘরে ঘরেই গরুর গোশতের শুঁটকি বানাতে দেখতেন। কারণ তখন ফ্রিজ ছিল না।

গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরির জন্য সাধারণত গোশত পাতলা বা ছোট টুকরো করে কাটা হয়। এরপর লবণ, মরিচ, হলুদসহ বিভিন্ন মসলা মাখিয়ে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়।

কাউসার আহমেদ নিজেও নানা ধরনের খাবার রান্না করতে বা নতুন নতুন খাবার নিয়ে পড়াশোনা করতে পছন্দ করেন। তিনি তার স্মৃতি থেকে বলছিলেন, ‘সবসময় যে হলুদ-মরিচ মাখানো হতো, তা না। শুধু লবণ দিয়েও মেটালের চিকন তারের মাঝে ঝুলিয়ে কড়া রোদে দেয়া হতো।’

কোথাও কোথাও ধোঁয়ায় শুকানোর পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়। এতে গোশত বা মাছ সরাসরি আগুনে পোড়ানো হয় না। বরং, আগুনের একটু ওপরে বা পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে আগুনের ধোঁয়া ও তাপে পানি কমে গিয়ে ধীরে ধীরে গোশত বা মাছ শুকিয়ে যায়।

বাংলাদেশের কিছু গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে যেখানে দীর্ঘদিন খাবার সংরক্ষণের প্রয়োজন হতো, সেখানে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। এতে এক ধরনের আলাদা ধোঁয়ার স্বাদও যোগ হয়।

কাউসার আহমেদ এই প্রক্রিয়ায়ও শুঁটকি করতে দেখেছেন জানিয়ে বলেন, ‘গ্রামের মাটির চুলায় যখন রান্না হতো, সেই চুলার উপরে একইভাবে গোশত ঝুলিয়ে রাখা হতো। রান্নার যে তাপ, তাতে সেই রোদের কাজ হয়ে যেত। যারা স্মোকি ফ্লেভার চান, তারা এভাবে করতো।’

তিনি জানান, এভাবে গরুর গোশতের শুঁটকি করতে অনেক সময় দিতে হয় এবং সেই সময়টা দেয়া অনেকের জন্য এখন কঠিন।

তিনি হাসতে হাসতে বলেন, আগে এই শুঁটকি খেতে হলে এত কষ্ট করে সব নিজেরই করা লাগতো। এখন যেকোনো ঐতিহ্যবাহী খাবার অনলাইনে পাওয়া যায়।

চাঁদপুরের স্থানীয় সাংবাদিক কাদের পলাশ, যিনি সেখানকার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কাজও করেছেন, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যে তিনিও তার মা-চাচিদের কোরবানি এলেই গোশতের শুঁটকি তৈরি করতে দেখেছেন। কিন্তু গত ২০ বছর ধরে তার পরিবারের আর কেউ তা বানান না।

প্রয়োজন ফুরিয়েছে, টিকে আছে স্বাদ ও ঐতিহ্য

এটি স্পষ্ট যে গরুর গোশত সংরক্ষণের পুরোনো পদ্ধতি ‘শুঁটকি’ অনেকের কাছে শুধু একটি খাবার না; বরং, পারিবারিক ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের অংশ।

দিনের পর দিন রোদে-ধোঁয়ায় গোশত শুকিয়ে আসছে দিনের জন্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা এখন ফুরিয়েছে। তবুও এটি টিকে রয়েছে এর স্বাদ ও ঐতিহ্যের কারণে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো: নিজামুল হক ভূঁইয়া এ নিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ফ্রিজ অপ্রতুল ছিল। অনেক পরিবারের কেনার সামর্থ্যও ছিল না। তখন মানুষ মাছ-গোশত শুঁটকি করে রেখে দিতো।

তিনি বলেন, ‘অনেকে এখনো সেই আগের প্রসেসটাই ফলো করছে বা ওই খাদ্যসংস্কৃতিকে রক্ষা করছে, তা মূলত এর (গরুর গোশতের শুঁটকির) স্বাদের কারণে।’

তবে তিনি মনে করেন, যেকোনো খাবার আসলে মানুষের অভ্যাসের ব্যাপার।

‘বরিশাল অঞ্চলে সেভাবে শুঁটকি খায় না, চরাঞ্চলগুলোতে অনেকে খায়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, নেত্রকোনা– এই বেল্টে শুঁটকি খায়। চট্টগ্রাম মানেই শুঁটকি। এর মূল কারণ, হয়তো তাদের পূর্ব-পুরুষরা শুঁটকি খেত। অথচ সেখানেও কিন্তু সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়, সেখানকার মাছ রফতানি করা হচ্ছে। অর্থাৎ, যেখানে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেখানেই মানুষ খায়।’

গরুর গোশতের শুঁটকি কিভাবে এসেছে, এর ‘আভিধানিক কোনো ব্যাপার নেই’।

তবে আগে মানুষ ‘গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে প্রসেস করে শুঁটকি নিয়ে যেত। শুধু গরুর গোশত না, মুরগির গোশত, মহিষের গোশতও নিয়ে যেত,’ যোগ করেন এই অধ্যাপক।

শুঁটকির পশ্চিমা সংস্করণ 'জার্কি'

এই অঞ্চলের পরিচিত গরুর গোশতের শুঁটকির সাথে মিল রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের জনপ্রিয় খাবার বিফ জার্কির। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এটি বেশ পরিচিত একটি খাবার।

বিফ জার্কি বলতে সাধারণত এমন শুকনো গরুর গোশতকে বোঝানো হয়, যা পাতলা করে কেটে মসলা বা সস মাখিয়ে মেরিনেট করে পরে শুকানো হয়, যাতে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।

এটি সাধারণত স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া হয়। তবে এই খাবারের ধারণা অনেক পুরোনো।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ‘জার্কি’ (শুকনো গোশত) মূলত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের গোশত সংরক্ষণের ঐতিহ্য থেকে এসেছে। তারা স্থায়ীভাবে এক জায়গায় থাকতো না।

কখনো খাবারের সন্ধানে বা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতো। সেসময় তাদের খাদ্যের বড় উৎস ছিল মহিষ, এল্ক ও হরিণের মতো প্রাণী।

এসব প্রাণী শিকার করে তারা গোশত খেত। এক সাথে এত গোশত খেয়ে শেষ করতে পারতো না, কিংবা শীতকাল বা দীর্ঘ ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতো, তখন তারা সেই গোশত সংরক্ষণ করতো।

রেফ্রিজারেশন বা ফ্রিজিং পদ্ধতি আবিষ্কারের আগে গোশত সংরক্ষণের উপায়ই ছিল সেটি শুকিয়ে ফেলা।

সেখানেও গোশত পাতলা করে কেটে উঁচুতে বেঁধে ঝুলিয়ে রোদে শুকানো হতো। কখনো মাছি তাড়াতে ও ধোঁয়ার স্বাদ যোগ করতে সেগুলো ধোঁয়ার ওপরেও রাখা হতো।

মূলত, গোশত শুকানো ও স্বাদ তৈরির নিজস্ব পদ্ধতি প্রতিটি পরিবারেরই আলাদা ছিল।

তবে বর্তমানের এই ‘জার্কি’ শব্দটি এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার কেচুয়া ভাষার “চ’আর্কি” শব্দ থেকে, যার অর্থ শুকনো গোশত, যেটিকে স্প্যানিশরা ‘চারকি’ হিসেবে উচ্চারণ করতো।

কেচুয়া ছিল ইনকা সভ্যতার ইনকাসহ বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা। ঐতিহ্যগতভাবে চ’আর্কি তৈরি হতো লামা বা গরুর গোশতের পাতলা টুকরো রোদে শুকিয়ে ও ঠাণ্ডা রাতে জমিয়ে।

পরে স্প্যানিশরা যখন দক্ষিণ আমেরিকায় আসে, তখন সেখানকার আদিবাসীদের কাছ থেকে এই পদ্ধতি সম্পর্কে জানে এবং পরে আমেরিকাসহ নানা জায়গায় এটি ছড়িয়ে যায়।

একসময় এই জার্কি কাউবয় (যারা গরু বা অন্যান্য গবাদিপশু চরানো, দেখাশোনা করা ও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কাজ করে) ও ভ্রমণকারীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ খাবারটি সহজে বহন করা যেত এবং দ্রুত নষ্ট হতো না।

সুতরাং, মূল ধারণার দিক থেকে বিফ জার্কি আর বাংলাদেশের গরুর গোশতের শুঁটকি অনেকটাই একই ধরনের খাবার। দু’টিতেই গোশত শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে দীর্ঘদিন খাওয়া যায়।

তবে প্রস্তুত প্রণালী ও খাওয়ার ধরনে অঞ্চল ও সংস্কৃতিভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

গরুর গোশতের শুঁটকিতে পুষ্টিগুণ একই থাকে?

পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, গরুর গোশতে রয়েছে আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিনস, মিনারেলস বা খনিজ উপাদান। যেমন- জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, আয়রন। আবার ভিটামিনের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন বি২ বি৩, বি৬, এবং বি১২।

আর এই পুষ্টিকর উপাদানগুলো-

১) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

২) পেশি, দাঁত ও হাড়ের গঠনে ভূমিকা রাখে।

৩) ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

৪) শরীরের বৃদ্ধি ও বুদ্ধি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

৫) ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।

৬) দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে।

৭) অতিরিক্ত আলসেমি বা ক্লান্তি বা শরীরের অসাড়তা দূর করে কর্মোদ্যম রাখে।

৮) ডায়রিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।

৯) রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে।

১০) খাবার থেকে দেহে শক্তি যোগান দেয়।

১১) স্মৃতিশক্তি বাড়ায়

১২) অবসাদ, মানসিক বিভ্রান্তি ও হতাশা দূর করে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মো: নিজামুল হক ভূঁইয়া বলছিলেন, ‘গরুর গোশতের শুঁটকিতেও প্রোটিন গুণাবলী প্রায় একইরকম থাকে, খুব একটা নষ্ট হয় না। কিন্তু এর সাথে আবার বিভিন্ন ফুড অ্যাডিটিভস (খাবারে ব্যবহৃত সংযোজক উপাদান) যোগ করা হয়, যেজন্য এটা সুস্বাদু হয়। যেমন- টেস্টিং সল্ট। নরমাল গোশতের স্বাদ একরকম, শুঁটকির স্বাদও ভিন্নরকম। এজন্যই অনেক মানুষ শুঁটকি খেতে পছন্দ করেন।’

এ প্রসঙ্গে পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম বলেন, গরুর গোশতের শুঁটকি করা হলে সেখান থেকে পানির পরিমাণ বের হয়ে যায়। অর্থাৎ, ‘একই ওজনের গরুর গোশতে যে ৬৫ শতাংশ পানি, সেটা বের হয়ে ওজন কমে যাচ্ছে এবং সাধারণ গোশতের তুলনায় পুষ্টিও তুলনামূলক বেড়ে যাচ্ছে।’

শুঁটকি করার সময় অতিরিক্ত লবণ দেয়া হলে সোডিয়ামের পরিমাণ তাতে বাড়বে। তাই, রান্নায় করার সময় বাড়তি লবণ ব্যবহার না করাটাই ভালো বলে জানান তিনি।

কারণ গরুর গোশতে এমনিতেই প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। আর উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

আর গোশত ঠিকভাবে শুকানো বা সংরক্ষণ না হলে ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস জন্মাতে পারে।

সূত্র : বিবিসি

রোদে শুকিয়ে গোশত সংরক্ষণের পদ্ধতি বিভিন্ন দেশেই প্রচলিত আছে
রোদে শুকিয়ে গোশত সংরক্ষণের পদ্ধতি বিভিন্ন দেশেই প্রচলিত আছে। বিবিসি

Wednesday, June 10, 2026

হাজার বছর বয়সী একটি পাইনগাছের সুরক্ষায় কী করছে চীনা শহর

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হু শিয়াওসোং তাঁর নিয়মিত টহলে বেরিয়েছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫ হাজার ৫০০ ফুটের বেশি উচ্চতায় অবস্থিত এক হাজার বছরের পুরোনো একটি পাইনগাছকে রক্ষা করাই তাঁর দায়িত্ব। হুর ভাষায়, গাছটি তাঁর কাছে পরিবারের একজন সদস্যের মতো।

অদ্ভুত আকৃতি ও মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের এই পাইনগাছ চীনের বিখ্যাত ইয়েলো মাউন্টেনের (হুয়াংশান পর্বত) সবচেয়ে আইকনিক নিদর্শন। পূর্ব চীনের আনহুই প্রদেশে অবস্থিত এই পর্বত পর্যটন খাতের একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। ইংকেসোং বা ‘গেস্ট-গ্রিটিং পাইন’ নামে পরিচিত গাছটি আতিথেয়তা ও বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। অবিশ্বাস্যভাবে এটি পাহাড়ের চূড়ায় থাকা শক্ত গ্রানাইট পাথরের গা থেকে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছে।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে অনেক ব্যক্তি গাছটি দেখভালের দায়িত্ব পালন করেছেন। হু হলেন ১৯তম প্রজন্মের ব্যক্তি, যিনি একরকম গাছটির ‘দেহরক্ষী’ হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কাজ হলো তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অতিরিক্ত উৎসাহী পর্যটকদের হাত থেকে এ ঐতিহাসিক গাছকে রক্ষা করা।

হুয়াংশানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হু বলেন, ‘আমি ১৬ বছর ধরে এই কাজ করছি। প্রতিদিন দুই ঘণ্টা পরপর টহল দিয়ে এই গাছ পরীক্ষা করি এবং এর সুরক্ষা নিশ্চিত করি।’

গত সপ্তাহে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের মেয়ররা জলবায়ু পরিবর্তন ও অতিরিক্ত পর্যটনের প্রভাব থেকে নিজেদের শহরকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করতে জড়ো হয়েছিলেন।

এর আগে ২০১৮ সালে এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হু বলেছিলেন, তিনি শুধু বানর ও কাঠবিড়ালির হাত থেকেই নয়, পর্যটকদের কাছ থেকেও গাছটিকে রক্ষা করেন। তখন তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল পর্যটকদের গাছটির কাছ থেকে দূরে রাখা এবং এটিকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া। এর পর থেকে চীনের ‘সবচেয়ে মনোরম পর্বত’ হিসেবে পরিচিত ইয়েলো মাউন্টেনে পর্যটকের সংখ্যা আরও বেড়েছে। গত বছর প্রথমবারের মতো এখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়েছে।

তবে হুর মতে, আজকাল পর্যটকেরা আগের তুলনায় অনেক বেশি নিয়ম মেনে চলেন। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তিও গাছটিকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

হু বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, বছরের পর বছর ধরে পর্যটকদের সামগ্রিক আচরণ উন্নত হয়েছে। তা ছাড়া আট বছর আগের তুলনায় আমরা এখন আরও কিছু নতুন উচ্চপ্রযুক্তির নজরদারি ব্যবস্থাও যুক্ত করেছি।’

অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ২০২০ সালে একটি অ্যালার্ম সিস্টেম স্থাপন করা হয়। এর সঙ্গে একটি অ্যাপ যুক্ত আছে। কোনো পর্যটক গাছটির খুব কাছে চলে গেলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সতর্কবার্তা পাঠায়।

হু বলেন, ‘আমি সতর্কবার্তা পাওয়া মাত্র দ্রুত টহল দিতে পারি। এতে অনেক সময় বাঁচে।’

হু আরও বলেন, এ মূল্যবান পাইনগাছ যে এখন পর্যন্ত ভালো অবস্থায় আছে, সেটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয়। কারণ, বয়সের কারণে গাছটিকে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়। তা ছাড়া পরিবর্তিত আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

হুর ভাষায়, বরফ-শীতল বৃষ্টি এ পাইনগাছের জন্য সবচেয়ে বেশি ভয়ের। কারণ, সঠিকভাবে সামলানো না গেলে এ বৃষ্টি ডালপালার ক্ষতি করতে পারে।

চীনের ন্যাশনাল ক্লাইমেট সেন্টার বলেছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলে আগের তুলনায় ২০২৪ ও ২০২৫ সালে বেশি বিস্তৃত এলাকায় তীব্র বরফ-শীতল বৃষ্টি হয়েছে। একে জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হু আরও বলেন, ‘তীব্র আবহাওয়ার সময় আমাকে প্রতি ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পরপর গাছটি পরীক্ষা করতে হয়। আর যদি প্রবল বাতাস বা বন্যা হয়, তাহলে আমরা সারা রাত জেগে থাকি। গাছটিকে এ কঠিন আবহাওয়া সহ্য করতে দেখে সত্যিই খুব কষ্ট লাগে।’

গত সপ্তাহে হুয়াংশানে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক সংলাপে ইতালি, জার্মানি, থাইল্যান্ডসহ ১০টি দেশের মেয়ররা অংশ নেন। সেখানে তাঁরা আরও টেকসই শহর গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।

নেপালের পোখারা শহরের মেয়র ধন রাজ আচার্য বলেন, তাঁর শহরের সমস্যাগুলোর সঙ্গে হুয়াংশানের অনেকটাই মিল আছে।

ধন রাজ বলেন, ‘একটি নাজুক পাহাড়ি এলাকার মধ্যে পোখারার অবস্থান। তাই আমরা অসামঞ্জস্যপূর্ণ বৃষ্টিপাত, বন্যা, ভূমিধস এবং দ্রুত নগরায়ণের মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি।’

বিশ্বের বিভিন্ন শহরে অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ সামলানো নিয়ে উদ্বেগে থাকা মেয়রদের কেউ কেউ হুয়াংশানের পর্যটন ব্যবস্থাপনা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অনুসরণ করতে চান। এর মধ্যে ছিলেন ইতালির গ্রাদারার মেয়র ফিলিপ্পো গাস্পেরি। তাঁর শহরের জনসংখ্যা মাত্র ৫ হাজার হলেও বছরে সেখানে ৫ লাখের বেশি পর্যটক আসে।

গাস্পেরি বলেন, ‘এটি একটি বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা।’

চীনের অন্যতম বিখ্যাত প্রাকৃতিক উদ্যান ইয়েলো মাউন্টেনে প্রতিবছর ভিড় করা লাখো পর্যটকের চাপ সামলাতে বিস্তৃত পরিসরে পর্যটন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

বিশ্বের কিছু শহরের কর্তৃপক্ষ আবার চীনের সড়কে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবস্থা অনুসরণ করতে চায়। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এই আগ্রহ আরও বাড়ছে।

সান মারিনো-চীন অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিত্বকারী আনা জিওর্জেটি বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশে যা সত্যিই অনুসরণ করতে চাই, তা হলো চীনের বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রযুক্তির ব্যবহার।’

জিওর্জেটি বলেন, ইতালির অভ্যন্তরে অবস্থিত ক্ষুদ্র রাষ্ট্র সান মারিনো সম্প্রতি চীনের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক যানবাহন নির্মাতা কোম্পানি বিওয়াইডির সঙ্গে একটি চুক্তি করেছে। তিনি এটিকে সান মারিনোর জন্য একটি বড় পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেন। -তথ্যসূত্র: এনবিসি নিউজ, চীন

চীনের এক হাজার বছরের পুরোনো পাইনগাছ, যা ‘গেস্ট-গ্রিটিং পাইন’ নামে পরিচিত
চীনের এক হাজার বছরের পুরোনো পাইনগাছ, যা ‘গেস্ট-গ্রিটিং পাইন’ নামে পরিচিত। ছবি: চায়না ডিসকভারির ফেসবুক

Saturday, October 25, 2025

পবিত্র ভূমি সিনাই পর্বতে বিলাসবহুল মেগা রিসোর্ট নিয়ে কেন এত আলোচনা

ভোরে সূর্য ওঠার সময় বেদুইন গাইডের সঙ্গে সিনাই পর্বতের খাড়া পাথুরে পথে হাঁটার অভিজ্ঞতা হয়তো অনেক ভ্রমণকারীই মনে রেখেছেন। সেখানে ছিল প্রার্থনার নীরবতা, প্রাচীন কাহিনি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর আকাশছোঁয়া শিলা—সব মিলিয়ে জায়গাটি যেন অন্য কোনো ভুবন।

মিসরের অন্যতম এই পবিত্র স্থান ইহুদি, খ্রিষ্টান ও মুসলিমরা সমানভাবে শ্রদ্ধা করে থাকেন। সেই সিনাই এবার বদলে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট, মুছে যাচ্ছে বহু প্রজন্ম ধরে থাকা মানুষের জীবনযাত্রা। এখানে নির্মিত হচ্ছে বিলাসবহুল হোটেল, ভিলা ও শপিং সেন্টার। সিনাই পবর্তের এ স্থানে একটি নতুন পর্যটন মেগা প্রকল্পে রূপান্তরের পরিকল্পনা ঘিরে তুমুল বিতর্কও চলছে।

স্থানীয়ভাবে সিনাই পর্বত জাবাল মূসা নামে পরিচিত। পবিত্র কোরআন ও বাইবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, এখানে নবী মুসা (আ.) আল্লাহর কাছ থেকে ১০টি আদেশ পেয়েছিলেন। অনেকের বিশ্বাস, এখানেই পবিত্র কোরআন ও বাইবেল অনুযায়ী এখানেই আল্লাহ মুসা (আ.)-এর সঙ্গে জ্বলন্ত ঝোপের মধ্য থেকে কথা বলেছিলেন।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন খ্রিষ্টান মঠগুলোর একটি হলো ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত সেন্ট ক্যাথরিন মঠ। গ্রিক অর্থোডক্স চার্চের অধীন পরিচালিত এই মঠও এখানে অবস্থিত। গ্রিসের চাপের কারণে মিসরীয় কর্তৃপক্ষ এই মঠটি বন্ধ করার কথা অস্বীকার করেছে। তাই মঠের সন্ন্যাসীরা এখনো সেখানে অবস্থান করছেন।

দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন এই মরুভূমি অঞ্চল যা মঠ, শহর ও পর্বত নিয়ে গঠিত ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান, তা বদলে যাচ্ছে। সেখানে এখন বিলাসবহুল হোটেল, ভিলা ও শপিং মল নির্মিত হচ্ছে। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বেদুইনদের কান্না

এ অঞ্চলে জেবেলিয়া নামের একটি ঐহিত্যবাহী বেদুইন জনগোষ্ঠীর বাস। প্রাচীনকাল থেকে তারা সেন্ট ক্যাথরিনের অভিভাবক হিসেবে পরিচিত। এই জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি এবং পর্যটন ইকো-ক্যাম্পগুলো প্রায় ক্ষতিপূরণ ছাড়াই ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া পার্কিংয়ের জায়গা করার জন্য স্থানীয় কবরস্থান থেকে মৃতদেহ সরাতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে।

ব্রিটিশ ভ্রমণ লেখক বেন হফলার সিনাই উপজাতিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, প্রকল্পটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় টেকসই উন্নয়ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটি পর্যটনকে আরও উৎসাহিত করবে ঠিকই। তবে এটি বেদুইনদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বেন হফলার বলেন, জেবেলিয়ারা যে রকম চেয়েছিল, এটি ঠিক সে রকম কোনো উন্নয়ন নয়। বাইরের মানুষের স্বার্থরক্ষার জন্য এটি স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি পরিকল্পনা।

এই ভ্রমণ লেখক আরও বলেন, ‘যাযাবর ঐতিহ্যের বেদুইন উপজাতির চারপাশে গড়ে তোলা হচ্ছে এক নতুন নগরসভ্যতা। এটি এমন একটি নগর, যা থেকে তারা সব সময় বিচ্ছিন্ন থেকেছে, যা নির্মাণে তারা কোনো সম্মতি দেয়নি। এ ছাড়া এটি মাতৃভূমিতে তাদের অবস্থান চিরতরে বদলে দেবে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের নীরবতা


এই অঞ্চলে প্রায় চার হাজার বেদুইন বাস করে। তাদের কণ্ঠ চাপা পড়ে গেছে। এই পরিবর্তন নিয়ে তারা কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলছে না।

এ পর্যন্ত গ্রিস হলো একমাত্র বিদেশি শক্তি, যারা এই মিসরীয় পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে সরব। কারণ, এখানকার মঠের সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পর্ক আছে।

গত মে মাসে মিসরের একটি আদালত বিশ্বের প্রাচীনতম ও বহুল ব্যবহৃত খ্রিষ্টান মঠ সেন্ট ক্যাথেরিনসকে রাষ্ট্রীয় জমিতে অবস্থিত বলে রায় দেওয়ার পর এথেন্স ও কায়রোর মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

কয়েক দশক ধরে চলা বিরোধের পর বিচারকেরা বলেন, মঠটি শুধু এর জমি ও আশপাশের প্রত্নতাত্ত্বিক ধর্মীয় স্থানগুলো ‘ব্যবহারের অধিকার’ রাখে।

গ্রিসের চার্চপ্রধান আর্চবিশপ দ্বিতীয় ইয়েরোনিমোস দ্বিতীয় এই রায়ের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মঠের সম্পত্তি দখল ও বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। অর্থোডক্স ও হেলেনিজমের এই আধ্যাত্মিক বাতিঘর এখন অস্তিত্ব–সংকটের মুখে।

দীর্ঘদিন আর্চবিশপের দায়িত্ব পালন করা দামিয়ানোস গ্রিক সংবাদপত্রকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এ সিদ্ধান্ত ‘আমাদের জন্য মারাত্মক আঘাত...এবং এক লজ্জাজনক ঘটনা।’ বিষয়টি সামলাতে গিয়ে যাজকদের ভেতরে বিভাজন তৈরি হয়েছে। এ কারণে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন বলেও জানিয়েছেন।

আদালতের বিতর্কিত রায় বহাল থাকলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর গ্রিস ও মিসর একটি যৌথ ঘোষণায় সেন্ট ক্যাথরিনের গ্রিক অর্থোডক্স পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

উন্নয়ন, নাকি ধ্বংস

মিসর সরকার ২০২১ সালে গ্রেট ট্রান্সফিগারেশন নামের এই প্রকল্প শুরু করে। পর্যটকদের জন্য করা এই পরিকল্পনার মধ্যে আছে হোটেল, ইকো লজ ও একটি বৃহৎ দর্শনার্থীকেন্দ্র খোলার পাশাপাশি কাছাকাছি ছোট বিমানবন্দর ও মাউন্ট মোজেসা পর্যন্ত একটি কেব্‌ল কার স্থাপন।

সরকার এ উন্নয়নকে ‘পুরো বিশ্বের ও সব ধর্মের জন্য মিসরের উপহার’ হিসেবে প্রচার করছে।

গত বছর মিসরের গৃহায়ণমন্ত্রী শেরিফ এল-শেরবিনি বলেন, ‘প্রকল্পটি দর্শনার্থীদের সব পর্যটন ও বিনোদনমূলক সেবা দেবে; সেন্ট ক্যাথরিন শহর ও আশপাশের এলাকার উন্নয়ন করবে, পরিবেশগত, নান্দনিক ও ঐতিহ্যগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ করবে এবং প্রকল্পে কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে।’

অর্থসংকটের কারণে এই প্রকল্পের কাজ আপাতত থেমে থাকলেও সেন্ট ক্যাথরিন মঠের সামনে এল-রাহা সমভূমি ইতিমধ্যেই বদলে গেছে। সেখানে নতুন সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এ অঞ্চলের বিশেষ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে ইউনেসকো উদ্বেগ জানালেও প্রকল্প থেমে নেই। ইউনেসকোর নথিতে লেখা হয়েছে, মঠের চারপাশের দুর্গম পাহাড়ি প্রাকৃতিক দৃশ্য মঠের জন্য এক নিখুঁত পটভূমি তৈরি করেছে। স্থানটির অবস্থান প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নির্জনতা একদিকে এবং মানুষের আধ্যাত্মিক অঙ্গীকার অন্যদিকে—এই দুয়ের এক অন্তরঙ্গ বন্ধন প্রকাশ করে।

২০২৩ সালে ইউনেসকো উদ্বেগ প্রকাশ করে মিসরকে এই উন্নয়ন বন্ধ করতে, প্রভাব যাচাই করতে ও সংরক্ষণ পরিকল্পনা করার আহ্বান জানায়; কিন্তু তা হয়নি।

চলতি বছরের জুলাই মাসে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ওয়াচ ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি সেন্ট ক্যাথরিনকে বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় রাখার আহ্বান জানিয়ে একটি খোলাচিঠি দেয়।

সেন্ট ক্যাথেরিন ফাউন্ডেশনের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্তরাজ্যের রাজা চার্লসের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। ফাউন্ডেশন মঠের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রাচীন খ্রিষ্টান পাণ্ডুলিপি নিয়ে কাজ করে এবং তহবিল সংগ্রহ করে। রাজা চার্লস এ স্থানকে ‘একটি মহান আধ্যাত্মিক সম্পদ, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা উচিত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

অর্থনীতি বনাম ঐতিহ্য

এ মেগা প্রকল্প মিসরে এটিই প্রথম নয়। দেশের অনন্য ইতিহাসের প্রতি সংবেদনশীল না হওয়ায় সরকারের এমন প্রকল্প নিয়ে আগেও সমালোচনা হয়েছে। তবে সরকার এসব বড় প্রকল্পকে দুর্বল অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার মূল হাতিয়ার হিসেবে দেখছে।

কোভিড-১৯ মহামারি থেকে পুনরুদ্ধারের পথে থাকা মিসরের সমৃদ্ধ পর্যটন খাত গাজার যুদ্ধ ও নতুন আঞ্চলিক অস্থিরতায় আবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। এরই মধ্যে সরকার ২০২৮ সালের মধ্যে ৩ কোটি পর্যটক আকর্ষণের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে।

মিসরের বিভিন্ন সরকারের সময়ে সিনাইয়ের ক্রমাগত বাণিজ্যিক উন্নয়ন স্থানীয় বেদুইন সম্প্রদায়ের সঙ্গে কোনো পরামর্শ ছাড়াই করা হয়েছে।

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে ইসরায়েল সিনাই উপদ্বীপ দখল করে। ১৯৭৯ সালে দুই দেশের মধ্যে এক শান্তিচুক্তির পর তা আবার মিসরের কাছে ফেরত আসে। তখন থেকেই বেদুইনরা অভিযোগ করে আসছে, তাদের সঙ্গে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ করা হচ্ছে।

১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ সিনাইয়ে শারম আল–শেখসহ জনপ্রিয় লোহিত সাগরের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। অনেকে বলছেন, সেন্ট ক্যাথরিনে যা ঘটছে, তার সঙ্গে এর মিল আছে।

মিসরীয় সাংবাদিক মোহান্নাদ সাবরি বলেন, বেদুইনরা এ অঞ্চলের মানুষ। তারা ছিল পথপ্রদর্শক ও শ্রমিক। এরপর শিল্পপর্যটন এসে তাদের সরিয়ে দিল—শুধু ব্যবসা থেকে নয়, সমুদ্রের কাছ থেকেও শারীরিকভাবে তাদের পেছনে ঠেলে দেওয়া হলো।

ধারণা করা হচ্ছে, লোহিত সাগরের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মতোই দেশের অন্য প্রান্ত থেকে এই উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ করার জন্য শ্রমিক নিয়ে আসা হবে। তবে সরকার বলছে, তারা বেদুইন আবাসিক এলাকাগুলোরও ‘উন্নয়ন’ করছে।

আধ্যাত্মিক ভুবনের ভাঙন

গত দেড় সহস্রাব্দ ধরে সেন্ট ক্যাথরিন মঠ বহু উত্থান-পতন সহ্য করে টিকে আছে। শুরুতের এটি ছিল এক নির্জন আশ্রয়স্থল। তবে লোহিত সাগরের পর্যটন সম্প্রসারণের পর থেকে হাজারো দর্শনার্থী এখানে এক দিনের জন্য ভ্রমণে আসতে শুরু করে। আর এতেই এর প্রাচীন পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই জ্বলন্ত ঝোপের অবশেষ বলে পরিচিত স্থান কিংবা নিউ টেস্টামেন্টের প্রাচীনতম প্রায় পূর্ণাঙ্গ হস্তলিপি কোডেক্স সিনাইটিকাসের পৃষ্ঠা প্রদর্শনকারী জাদুঘরে মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।  

এতে সেন্ট ক্যাথরিন ও এই স্থানের গভীর ধর্মীয় তাৎপর্য অটুট হয়তো থাকবে। তবে চারপাশের পরিবেশ ও শতাব্দীপ্রাচীন জীবনযাত্রা চিরতরে বদলে যাবে। তবু স্থানীয় অনেকের কাছে এখন একটাই প্রশ্ন—পবিত্র ভূমি কি টিকে থাকবে বিলাসবহুল রিসোর্টের ভিড়ে? এর উত্তর তাদের জানা নেই। -বিবিসি

মিসরের দক্ষিণ সিনাইয়ে অবস্থিত সেন্ট ক্যাথেরিন মঠ
মিসরের দক্ষিণ সিনাইয়ে অবস্থিত সেন্ট ক্যাথেরিন মঠ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Wednesday, June 4, 2025

প্রাচীন মিশরীয় শহর আলেকজান্দ্রিয়া ধসে পড়ছে কেন?

পৃথিবীর অন্যতম ঐতিহাসিক বন্দরনগরী আলেকজান্দ্রিয়া ভয়াবহ সংকটের মুখে। বিখ্যাত ক্লিওপেট্রার জন্মস্থান এবং প্রাচীন লাইব্রেরির জন্য খ্যাত এই শহর ধীরে ধীরে ধ্বংসের মুখে পড়ছে। এর জন্য মূলত দায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলের ক্ষয়। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গবেষণায় (আর্থ ফিউচার) দেখা গেছে, গত ২০ বছরে ২৮০টি ভবন সম্পূর্ণরূপে ধসে পড়েছে। বর্তমানে আরও ৭,০০০-এর বেশি ভবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গবেষকরা আলেকজান্দ্রিয়ার এই সংকটের জন্য সমুদ্রের পানির কারণে ক্ষয় ও লবণাক্ত পানির প্রবেশকে দায়ী করেছেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লবণাক্ত পানি উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে প্রবেশ করছে, যা ভবনগুলোর নিচের মাটি ক্ষয় করে ফেলছে এবং ভবনগুলোর ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৮৬টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে, ২০১টি ভবন আংশিকভাবে ধসে পড়েছে, ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। পুরনো মানচিত্র (১৮৮৭, ১৯৫৯, ২০০১) ও স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে দেখা গেছে, শহরের উপকূল দ্রুতই ভিতরের দিকে সরছে। মাটির নমুনায় আইসোটোপ বিশ্লেষণ (যেমন বি৭) করে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় আইসোটোপের মাত্রা কম, সেসব জায়গার মাটি অনেক বেশি ক্ষয়প্রবণ। গবেষণার সহ-লেখক এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার পানি বিষয়ক বিজ্ঞানী ড. এসসাম হেগগি বলেন- এই ক্ষতির পরিমাণ শুধু ভবনের ইট বা সিমেন্টে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ক্ষতি। আমরা প্রত্যক্ষ করছি কীভাবে উপকূলীয় ঐতিহাসিক শহরগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন ভবিষ্যতের নয়- এটা এখনই বাস্তব। গবেষকরা প্রাকৃতিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন, যেমন- উপকূল বরাবর বালুর ঢিবি ও গাছপালা দিয়ে প্রাকৃতিক ব্যারিয়ার তৈরি, যা সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ ঠেকাতে সাহায্য করবে। এতে ভবনের নিচে পানির স্তর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারবে না, ফলে ভবনের ভিত্তিও রক্ষা পাবে। আলেকজান্দ্রিয়ার অবস্থা শুধু মিশরের জন্যই নয়, বরং সমুদ্রতটবর্তী ঐতিহাসিক শহরগুলোর জন্য একটি সতর্কবার্তা। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আমরা শুধু ভবন নয়, সভ্যতার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কেই চিরতরে হারাতে পারি।

mzamin

Monday, May 26, 2025

তাজমহলের সুরক্ষায় বসছে অ্যান্টি ড্রোন সিস্টেম

ভারত-পাক সংঘাতের আবহে এবার তাজমহলের নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে।  ভারত সরকারের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য আকাশ হুমকি মোকাবেলায় একটি অ্যান্টি-ড্রোন সিস্টেম স্থাপনের মাধ্যমে ঐতিহাসিক তাজমহলের নিরাপত্তা আঁটোসাঁটো করা হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্তমানে কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনী (CISF) এবং উত্তরপ্রদেশ পুলিশ দ্বারা সুরক্ষিত এই স্মৃতিসৌধটিতে শীঘ্রই উন্নত ড্রোন নিরপেক্ষকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে সুরক্ষার একটি অতিরিক্ত স্তর সংযুক্ত করা হবে। পেহেলগাম হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ হিসেবে ৭ মে পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে নয়টি ‘সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে’ ভারত অপারেশন সিঁদুরের অধীনে সুনির্দিষ্ট হামলা চালানোর কয়েকদিন পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হল। পাল্টা হিসেবে পাকিস্তান থেকে  ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক এই ধরণের সমস্ত বিমান হুমকি প্রতিহত করা হয়েছিল, সেইসঙ্গে  সংবেদনশীল স্থানে ড্রোন-বিরোধী ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিল। সহকারী পুলিশ কমিশনার (তাজ নিরাপত্তা) সৈয়দ আরিব আহমেদ বলেন, তাজমহলের প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কার্যকর থাকবে এই সিস্টেম। ২০০ মিটার দূর থেকেই ড্রোনকে নিষ্ক্রিয় করে দেবে নতুন সিস্টেম । আহমেদ আরও বলেন, পুলিশ কর্মীদের এই ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং একটি টিম  গঠন করা হচ্ছে। এই টিম ড্রোনটির উৎপত্তিস্থল চিহ্নিত করবে এবং যেখানে এটি নামানো হয়েছে সেই এলাকাটি সুরক্ষিত করবে। তিনি বলেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সিস্টেমটি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় তাজমহল ভারতের উল্লেখযোগ্য একটি স্মৃতিসৌধ এবং জাতীয় গর্বের প্রতীক। যার ফলে এর নিরাপত্তা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয় বলে মনে করছে মোদি সরকার।

সূত্র :  এনডিটিভি

mzamin

Tuesday, April 1, 2025

মুঘল ভারতের অলিন্দে by ড. মাহফুজ পারভেজ

বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীতে মানুষ দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। একদল, যারা তাজমহল দেখেছে। আরেক দল, যারা দেখে নি। তাজমহলের শহর আগ্রাকে বলা হয় মুঘল ঐতিহ্যের হৃৎপিণ্ড। মুঘলদের যতগুলো রাজধানী ছিল, তারমধ্যে দীর্ঘস্থায়ী হলো আগ্রা। মধ্যযুগের বিশ্বে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শহর আগ্রায় এখনো বিশ্বের নানা প্রান্তের ভ্রমণ বিলাসী মানবস্রোত গভীর আগ্রহ নিয়ে উপসি'ত হয়। ভারতের পর্যটন ক্ষেত্রের মধ্যে যে কারণে শীর্ষে অবস্থান করছে আগ্রা। উত্তর ভারতের পথে-প্রান্তরে ভ্রমণের সূত্রে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নাভিমূল, মুঘল রাজধানী, তাজমহলের শহর আগ্রা সম্পর্কে সবিস্তারে হচ্ছে এই লেখায়। বর্তমানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে অতীতের বিচিত্র উপাদান দিয়ে সাজানো হয়েছে লেখাটি।

বৃষ্টিস্নাত জয়পুর থেকে আগ্রার পথে
আমরা আগ্রায় প্রবেশ করি তুমুল বৃষ্টিপাতের মধ্যে। সারা উত্তর ভারতই তখন বৃষ্টিতে ভেসে যাচ্ছে। মধ্য সেপ্টেম্বরের বর্ষণে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রাদুর্ভাব। বৃষ্টিভেজা সড়ক পথে রাজস্থানের রাজধানী জয়পুর থেকে আগ্রায় এসেই মুখোমুখি হলাম প্রবল বর্ষণের।
মধ্যযুগে ভারতের রাজধানী আগ্রা নানা কারণে এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত মুঘল স্থাপনায় উজ্জ্বল হয়ে আছে প্রাচীন আগ্রা। বাগিচা, প্রাসাদ ও দুর্গের নগরীতে ঢুকতেই গা ছমছমে ইতিহাসের পরশ পেলাম, যার কয়েকটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষণা করেছে।
রাজনৈতিক ও যোগাযোগের দিক থেকে অত্যন্ত কৌশলগত স্থান হওয়ায় আগ্রাকে শাসনের কেন্দ্রস'ল রূপে বেছে নিয়েছিলেন মুঘলরা। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগ্রায় প্রবেশের অনেকগুলো পথ রয়েছে। সম্ভবত এ কারণেই মধ্য এশিয়া থেকে আগত মুঘল বিজেতারা দিল্লি জয় করলেও রাজধানী বানিয়েছিলেন আগ্রায়। আগেকার মুসলিম শাসকদের হাতে গড়া রাজধানী দিল্লিকে ছেড়ে আগ্রায় ক্ষমতার মূলকেন্দ্র ও রাজধানী তৈরির পেছনে অনেকগুলো বিবেচনার মধ্যে আগ্রার কৌশলগত ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ও যোগাযোগ সুবিধাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল।

আগ্রা থেকে ভারতের সব দিকে যাওয়ার পথ সুগম। সব জায়গা থেকে আগ্রায় আসাও সহজ। উত্তর প্রদেশের অংশ হলেও আগ্রা দিল্লির কাছেই। পাঞ্জাব থেকে সন্নিকটে। রাজস্থান, গুজরাত হয়ে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের দিকেও পথ উন্মুক্ত। মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র থেকেও আসা যায় আগ্রায়। আর লক্ষ্ণৌ, আলিগড় ছুঁয়ে বিহারের পাটনা হয়ে বাংলায় যাতায়াতের সুবিধাও আগ্রার রয়েছে।
এক সময়ে ভারতের রাজধানী বা এক নম্বর শহর আগ্রা এখন উত্তর প্রদেশের চতুর্থ আর সারা ভারতের ২৪তম গুরুত্বপূর্ণ শহর। উত্তর ভারতের হিন্দি-উর্দু বলয়ের এই শহরের প্রধান ভাষা হিন্দুস্থানি তথা হিন্দি ও উর্দু। জনসংখ্যার ৮৫% ভাগ হিন্দু, ১০% মুসলমান আর বাকি জনসংখ্যা জৈন, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান। ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত হিন্দি পত্রিকা দৈনিক জাগরণ-এর প্রধান দপ্তর আগ্রায়, যদিও উত্তর ভারতের অন্যান্য শহর থেকেও পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় একযোগে।

আগ্রাকে বলা যায় উত্তর ভারত বা হিন্দি বলয়ের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন কেন্দ্র। মুঘল স্থাপনা ছাড়াও এখানে আছে ক্যান্টনমেন্ট, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা। আগ্রার প্রধান দ্রষ্টব্য অবশ্য বিশ্বের বিস্ময় তাজমহল, আগ্রার দুর্গ ও সম্রাট আকবরের রাজধানী ফতেহপুর সিক্রি, যার প্রতিটিই ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিজেট বা বিশ্বসভ্যতার অংশ। এগুলো ছাড়াও ছোট-বড় আরও বহু দর্শনীয় স্থান, বাগ-বাগিচা-উদ্যান, হর্ম্য, প্রাসাদ, স্থাপনা ছড়িয়ে আছে আগ্রার সর্বত্র।
ভারতের প্রধান পর্যটন ডেসটিনেশন বা ভ্রমণ এলাকাকে বলা হয় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল বা সোনালি ত্রিভুজ, যার একবাহু দিল্লিতে, আরেক বাহু জয়পুরে এবং অন্য বাহু আগ্রায় মিশেছে। ত্রিভুজের মতো এই তিনটি এলাকাতেই ভারতের সিংহভাগ বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেন।

জয়পুর থেকে আসার কারণে আমরা পথে পেয়েছি উত্তর প্রদেশের আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যার মধ্যে রয়েছে মথুরা ও বৃন্দাবন। জয়পুর-আগ্রা সুপার হাইওয়ে ধরে রিজার্ভ কারে চলতে চলতে সুবিধা মতো থেমে থেমে এগিয়েছি আমরা। পথের ধারে রাজস্থানী ধাবায় চা, নাস্তা করে দেখেছি ঊষর মরুময় প্রান্তরে সবুজের সমাবেশ। রঙ-বেরঙের শাড়ি ও ওড়নায় ঢাকা রাজস্থানের গ্রাম্য নারীদের। বিশালাকায় পাগড়ি মাথায় রাজস্থানের রাজপুত বা জাট। কখনো ময়ূরের সমাবেশ বা উটের বহর।
গ্রামের দিকে পুরুষদের সবারই বড় পাগড়ি ব্যবহারের রহস্য বুঝতে গিয়ে দেখলাম, এর সঙ্গে ঐতিহ্য ও বাস্তব প্রয়োজন মিশে আছে। রাজস্থানের মরুময় ও ঊষর ভূমি থেকে প্রচুর ধুলাবালি বাতাসে ছড়িয়ে থাকে। বিরাট পাগড়িতে নাক, মুখ, মাথা, শরীর ঢেকে ফেলার সুবিধা নিয়ে থাকেন স্থানীয় অধিবাসীরা।
জয়পুর থেকে আগ্রা যেতে একটি পাহাড়ের ভেতরের সংক্ষিপ্ত ট্যানেল পেরিয়ে ধরতে হয় দিগন্ত বিস্তৃত মাঠের মাঝ দিয়ে প্রসারিত সুপার হাইওয়ে। ২০০ মাইলের এই দূরত্ব নৈসর্গিক দৃশ্যে ভরপুর। পথের পাশে হাট, বাজার ও ছোট ছোট শহর। আর আছে প্রতিমা ও পূজার মঞ্চ তৈরির কুটির শিল্প। মার্বেল ও গ্রাফাইট পাথর কেটে কেটে বানানো হয় মনোরম প্রতিমূর্তি, যেজন্য যোধপুর, কিষাণগড়, জয়সালমের থেকে আসে বাহারি পাথর।

রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশের সীমানায় হিন্দু তীর্থক্ষেত্র মথুরা ও বৃন্দাবন জয়পুর-আগ্রা সড়কের পাশেই। ফলে পূজার সামগ্রী ও প্রতিমা বানানো আর বিক্রির জমজমাট বাজার চারপাশে। হিন্দু ধর্মের ভাবাবেগ স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে এই নির্দিষ্ট স্থানে।  
সড়কের রাজস্থান অংশ পেরিয়ে উত্তর প্রদেশে ঢুকতেই হিন্দি ভাষা, পোশাক, পরিচ্ছদে পার্থক্য দেখা গেল। রাজস্থানের হিন্দিতে গুজরাতি, মাড়োয়ারি ও পাঞ্জাবি টান বদলে গেল। উত্তর প্রদেশের হিন্দিতে পাওয়া গেল উর্দু আর বিহারি হিন্দির প্রভাব। হিন্দি ভাষার অনেকগুলো উপভাষা ও কথ্যরূপ আছে। যার মধ্যে মৈথিলি, ভোজপুরি, ব্রজবুলি ইত্যাদি অন্যতম। বিশাল উত্তর ভারতের হিন্দি বলয়ের নানা প্রান্তে চর্চিত হচ্ছে হিন্দি ভাষার একেকটি ধারা।    
মথুরা ও বৃন্দাবনে এক চক্কর দিতে গিয়ে পেলাম পেয়ারিলালকে। অবসর নিয়ে ফৌজি ধাবা নামে জলপানির দোকান চালাচ্ছেন তিনি। চাকরি করেছেন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামেও। ভাঙা ভাঙা বাংলা জানেন। ঢাকা ও বাংলাদেশের অনেক কথা বললেন তিনি।
কৃষ্ণের কারণে মথুরা আর রাধার জন্য বৃন্দাবন প্রসিদ্ধ। স্থান দুটি বৈষ্ণব ভাবধারার হিন্দুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। মন্দির আর ভক্তের উপসি'তিতে মুখর স্থান দুটি। একটির থেকে আরেকটি মোটামুটি নিকটবর্তী। তবে বৃন্দা বা তুলসী বন নামে পরিচিতি বৃন্দাবনে নগরায়ণের ফলে বনাঞ্চল কমছে। কিন' ভক্তি-মিশ্রিত ধর্মীয় ভাবাবেগ আর প্রেমের বাতাবরণ সেখানে অটুট। বার্ডস আই ভিউ ধরনের সংক্ষিপ্ততম চোখের দেখা দেখে ফিরে আসার সময় আর্দ্র হৃদয়ে বাজে দুটি লাইন:
সে কি মথুরায় থাকে আমায় ভুলে
বাজে বাঁশি যুগে যুগে যমুনা কূলে।

ধর্মীয় ভক্তির নিদর্শন কিন' ভারতের দ্রষ্টব্য স্থানগুলোতে খুবই স্পষ্ট। রাজস্থানের মুসলিম ধর্মীয় কেন্দ্র আজমির থেকে খানিক এগিয়ে গেলে টিলা ও মরুর উপান্তে পৃথিবীর একমাত্র ব্রহ্মা মন্দির পুষ্পর। সেসব স্থানে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমাদের মূল আকর্ষণ যেহেতু আগ্রা, তাই পথের দ্রষ্টব্য স্থানগুলোতে যথেষ্ট সময় দেয়া যায় নি। এমনিতেই বৃষ্টি পিছু নেওয়ায় গাড়ির গতি কমিয়ে রেখেছে ড্রাইভার সুরজিৎ। এসিতে বসে গাড়ির এফএম রেডিওতে রাজস্থানী কান্ট্রি মিউজিক শুনতে শুনতে চলে এলাম আগ্রার কাছাকাছি। আগ্রার শহরে প্রবেশের আগে আগে পথে পড়লো বিখ্যাত ফতেহপুর সিক্রি। দিল্লি হয়ে এলে মূল আগ্রা শহর আগে পড়তো। আমরা বিপরীত দিক দিয়ে আসায় এ সুবিধা পেলাম। ভোরে রওয়ানা দিয়ে থেমে থেমে ১১টা নাগাদ ফতেহপুরের সামনে পৌঁছে গেলাম। মূল সড়ক থেকে ডানে মোড় দিয়ে পাঁচ মিনিটের দূরত্বে ফতেহপুর সিক্রি। যদিও হাইওয়ে থেকে ফতেহপুর সিক্রির প্রাচীর ঘেরা দুর্গ-সদৃশ্য বিশালাকায় নগরীর আবছায়া দেখা যায়, তথাপি এতে প্রবেশ করতে হয় মূল সড়ক থেকে উপপথ ধরে খানিকটা ভেতরে এসে।

আমরা ঠিক করেছি দুপুরটা এখানে কাটিয়ে বিকালে যাবো আগ্রা শহরের মূল আকর্ষণ বিশ্বের বিস্ময় তাজমহলে। তারপর রাতে বিশ্রাম নিয়ে পরদিন আগ্রার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানে। যমুনা তীরে স্থাপিত ইতিহাসের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিময় ঐতিহাসিক আগ্রা-ফতেহপুরের বৃষ্টিভেজা বাতাসের স্পর্শে কেমন একটা শিহরণ দোলা দিল শরীর ও মনে। গাড়ি থেকে নামতে সময় লাগলো কিছুটা। তন্ময় চোখে ফতেহপুর সিক্রিতে প্রবেশের অতিকায় বুলন্দ দরওয়াজা নামের রাজকীয় তোরণের দিকে তাকাতেই মনে হলো ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছি ইতিহাসের অলিন্দে।  

ফতেহপুর সিক্রি
পরিত্যক্ত মুঘল রাজধানীতে ষোড়শ শতকে শুরু হয়ে (৩০ এপ্রিল, ১৫২৬) ঊনিশ শতকে সমাপ্ত (১৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৫৭) কয়েক শতাব্দীব্যাপী মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে মাত্র ১৪ বছর রাজধানী ছিল ফতেহপুর সিক্রি। সে আমলে রাজা-বাদশাহের খেয়াল-খুশির অন্ত ছিল না। আর সেসব ছিল বড়ই বিচিত্র ও সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের চেয়ে অনেক আলাদা। ফতেহপুর সিক্রিতে মিশে আছে সেইসব রাজসিক খেয়ালের খানিকটা ঝলক।
স্বল্প জীবনপ্রাপ্ত হলেও ফতেহপুর সিক্রির দীর্ঘ ইতিহাস ও তাৎপর্য আছে। ১৫৭১ সালে এখানে রাজধানী বানিয়ে তৃতীয় মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালেই তা সরিয়ে নেন। ১৬১০ সালে শহরটি সম্পূর্ণরূপে বর্জিত হয়। পরিত্যক্ত হয়ে নিঃসঙ্গভাবে পড়ে থাকে বিশাল স্থাপনাসমূহ, যা এখন ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের অংশ।

রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি ফতেহপুর সিক্রির সঙ্গে মিশে আছে আধিভৌতিক রহস্যময়তা। কালের করাল গ্রাসে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন রাজধানীর পাদদেশে টুপটুপ বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে সেই পরশ এসে শরীরে লাগলো। খানিক অপেক্ষার পর বৃষ্টির আঁচ কমে এলে আমরা ফতেহপুরের ভেতরে প্রবেশ করি আর তখনো এর অতীত ও ইতিহাসের গুঞ্জন সঙ্গী হলো আমাদের।
সম্রাট আকবর এখানে রাজধানী স্থাপন করার আগে সিক্রি নামের একটি গ্রাম ছিল। মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর এ জায়গাটি চিনতেন এবং পছন্দও করতেন। ফলে জায়গাটি মুঘলদের কাছে অচেনা-অজানা ছিল না। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, সিক্রি নামটি সম্রাট বাবরের দেওয়া। বাবর এই এলাকাটিকে বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য অনেকবার ব্যবহার করেছিলেন এবং সিক্রির নিকটবর্তী সীমান্তে রাজস্থান-পাঞ্জাব হয়ে আগত মহারাজা রানা সংগ্রাম সিংহের বাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন।
বাবরের জীবনীকার বেভারেজ লিখেছেন, রানা সংগ্রাম সিংহকে পরাজিত করে বাবর এখানে ফতেহবাগ বা বিজয় উদ্যান নামে একটি বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্য এশিয়ান মুঘলদের উদ্যানপ্রীতি ছিল সর্বজনবিদিত। তারা যেখানেই কর্তৃত্ব করেছে, সেখানেই সুপরিকল্পিত বাগান বা উদ্যান বানিয়েছেন। বাগানকে তারা বলতেন  গুলিস্তাঁ। আগ্রার চারদিকে শত শত বছর পরেও ছড়িয়ে আছে মুঘল রাজন্যদের উদ্যানপ্রেমের চিহ্ন। দিল্লি, ঢাকা, কাশ্মীর, লাহোর, সর্বত্র মুঘল-প্রতিষ্ঠিত বাগানের দেখা পাওয়া যায় এখনো।
ফতেহপুরে বাবরের বাগান সম্পর্কে তার কন্যা ও সম্রাট হুমায়ূনের জীবনী হুমায়ূননামা-এর রচয়িতা গুলবদন বেগম লিখেছেন, বাবর সেই বাগানে একটি আটকোণা চাতাল বানিয়েছিলেন, যা তিনি বিনোদন ও লেখার কাজে ব্যবহার করতেন। তিনি নিকটবর্তী ঝিলের মাঝখানে একটি বেদিও নির্মাণ করেন।
     
সম্রাট আকবর রাজধানী বানানোর সময় (১৫৭১) জায়গাটির কোনো আনুষ্ঠানিক নামকরণ করেন নি। রাজকীয় ফরমান দিয়ে ফতেহপুর বা বিজয়ের শহর নামটি প্রতিষ্ঠা করেন আরো পরে, ১৫৭৩ সালে গুজরাট জয় উপলক্ষে। তারও আগে, ১৫৬৯ সালে বেশ পরিণত বয়সে এক পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে আকবরের ঔরসে। আগে থেকেই এখানে শেখ সেলিম চিস্তি নামে একজন বুজুর্গ পিরের খানকাহ বা আশ্রম ছিল এবং পিরের দোয়ায় আকবর পুত্রসন্তান লাভ করেছিলেন বলে পুত্রের নামও রাখা হয় পিরের নামানুসারে, সেলিম, যিনি পরবর্তীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর নামে খ্যাত। জাহাঙ্গীরের দ্বিতীয় জন্মদিনেই আকবর এখানে রাজধানী নির্মাণ শুরু করেন।  

জয়পুর-আগ্রা হাইওয়ে থেকে ডানে মোড় দিয়ে যে গলিপথ, তাতে কিছুদূর এগিয়ে আবার ডানে কিঞ্চিত উপরের দিকে উঠতে হয় ফতেহপুর সিক্রিতে যেতে। আকবর বাদশাহের এই রাজধানী নগরীটি কিছুটা উচ্চভূমিতে অবসি'ত। নগরের প্রবেশের মুখেই বুলন্দ দরওয়াজা নামে বিশাল গেট। মধ্যযুগের বিবেচনায় সুবিশাল তোরণে এক সুপরিকল্পিত নগরীর প্রাচীন প্রচ্ছায়া ভেসে আসে প্রথম দর্শনেই। মুঘল পূর্ব-পুরুষ তৈমুর লং মধ্য এশিয়ার রীতির সঙ্গে পারসিক আদলের মিশেলে যে স্থাপত্যশৈলীর প্রচলন করেছিলেন, সম্রাট আকবর সেভাবে ফতেহপুর সিক্রি নির্মাণ করতে চাইলেও এতে স্থানীয় স্থাপত্যরীতির মিশেল হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পার্শ্ববর্তী রাজস্থানে প্রচুর ও বিচিত্র বেলেপাথর থাকায় ভেতরের অট্টালিকাগুলো পাথুরে এবং অধিকাংশই লালচে রঙের। মুঘলরা সাধারণত লাল আর সাদা, এই দুই রঙের প্রতি তাদের আগ্রহ দেখিয়েছেন। মুঘল স্থাপনাগুলোর যেগুলো ধর্মস্থান বা সমাধিস'ল, সেগুলো সাধারণ সাদা আর রাজকীয় অন্যান্য নির্মাণের ক্ষেত্রে লাল রঙের প্রাধান্য দিয়েছেন তারা।    
 
মুঘলরা ভারতকে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও স্থাপত্য উপহার দিয়েই শেষ করেন নি, এখনো আয়ের পথ খুলে দিয়ে গেছেন। টিকিট কেটে ঢুকতে হচ্ছে এসব স্থাপনায়। এতে ভারতীয়দের জন্য টিকিটের দাম কম হলেও বিদেশিদের জন্য যথেষ্ট উচ্চমূল্য। তাজমহল, আগ্রা ফোর্ট, কুতুব মিনারসহ বিভিন্ন মুঘল ও মুসলিম স্থাপনায় লাখ লাখ পর্যটক কোটি কোটি টাকা দিচ্ছে ভারত সরকারের তহবিলে। টিকিটের পাশাপাশি দালাল ও গাইডের লম্বা বহর। সব কিছু চিনিয়ে-জানিয়ে দেওয়ার জন্য পিছু নেয় তারা। ভারতের মুঘল ঐতিহ্য এমনই এক নিঃশেষ-না-হওয়া বিষয়, যা এখনো খুলে রেখেছে কর্মসংস্থান ও রোজগারের পথ!

বৃষ্টির কারণে ফতেহপুর সিক্রিতে ভিড় কম। দালাল ও গাইডরাও তেমন নেই। ড্রাইভার সুরজিৎ সঙ্গী হলো আমাদের। রাজপুত যুবক এ পথে পর্যটক আনা-নেওয়া করতে করতে ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্থান-কাল সম্পর্কে বেশ ওয়াকেবহাল। যথারীতি বুলন্দ দরওয়াজা দিয়েই প্রবেশ করি আমরা। তবে বাদশাহী দরওয়াজা নামে আরেকটি প্রবেশদ্বারও রয়েছে। লাল-হলুদ বেলে পাথরে নির্মিত ফটকে সাদা-কালো মার্বেল দিয়ে নকশা করা। মাটি থেকে ৫৪ মিটার লম্বা দরওয়াজা পর্যন্ত পৌঁছাতে ৪২টি সিঁড়ির ধাপ উঠতে হলো। দরজার পাল্লাগুলো কাঠের কারুকাজ করা এবং এর মাথায় এক সারি প্যারাপেট ও পেছনে তিনটি ছত্রী রয়েছে। মূল দ্বারের দেওয়ালে খোদাই করা আছে ধর্মকথা, যাতে এই বিশ্বের নশ্বরতার উল্লেখ করে অবিনশ্বর সৃষ্টিকর্তার গুণ কীর্তন করা হয়েছে। বুলন্দ বা সুমহান নামে খ্যাত প্রবেশ তোরণে সৃষ্টিকর্তার মহিমাব্যঞ্জক বাণী থাকাই স্বাভাবিক।

ফতেহপুরের ভেতরে প্রাসাদ প্রাঙ্গণ, যেখানে জ্যামিতিকভাবে সজ্জিত বেশকিছু চাতাল দেখা গেল। রয়েছে বুজুর্গ-পির সেলিম চিস্তির মাজার শরিফ। দুর্দান্ত শিল্প ভাবনা ও নান্দনিক স্থাপত্যের কেন্দ্রবিন্দু ফতেহপুর সিক্রির চারদিকে তাকিয়েই নিজের বোকামির জন্য লজ্জিত হলাম। বৃষ্টিসিক্ত বিরূপ আবহাওয়ায় আর স্বল্প সময় নিয়ে এখানে আসার কোনও মানেই হয় না। পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে অনুসন্ধান করে দেখতে হলে দীর্ঘ সময় নিয়ে এখানে আসাই শ্রেয়। তা না হলে দুই মাইল লম্বা ও এক মাইল চওড়া প্রাসাদ আর প্রাঙ্গণ সমৃদ্ধ রাজধানী শহর ভালো করে দেখা মোটেও সম্ভব নয়।
পুরো ফতেহপুর সিক্রি পাঁচ মাইল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মনে করা হয়, রাজপুত, জাঠ, মারাঠা, শিখ আক্রমণের কারণে শহরটিকে দুর্গ-সদৃশ্য করা হয়েছে মুঘল যুদ্ধরীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলের আলোকে। আগ্রা দুর্গও তেমনি। রাজস্থানেও দুর্গ শহর দেখেছি। মধ্যযুগের শহরগুলো সামরিক নিরাপত্তার কারণে সুদৃঢ় প্রাচীর বেষ্টিত দেখতে পাওয়া যায়। আশ্চর্য্যের বিষয় হলো, শত শত বছর পরেও প্রাচীরগুলো বেশ মজবুত ও সুরক্ষিত।

সুললিত ও সুসজ্জিত ফতেহপুর আবাস দেখে মুঘলদের পরিচ্ছন্ন রুচি ও গুছানো প্রশাসনিক কার্যক্রমের নমুনা বোঝা যায়। রাষ্ট্রীয় কাজ, বসবাস, আহার, বিহার, বিনোদন ও অন্যান্য তৎপরতায় জীবনকে চমৎকার অবকাঠামোয় প্রবাহিত করেছিলেন মুঘলরা। তৎকালের ভারতে সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত, খাদ্য, উন্নত প্রশাসনের পাশাপাশি যুক্ত করেছিলেন স্থাপত্য সুষমায় ঋদ্ধ নান্দনিক বসবাসের আমেজ।
হাতের সময়কে যথাসম্ভব কাজে লাগানোর পরও ফতেহপুর সিক্রি পুরো ঘুরে না দেখতে পারার অতৃপ্তি নিয়ে ফিরতে হলো। ভেতরে অনেক ছোট বড় স্থাপনা, মহল, প্রাঙ্গণ এবং এসবের ইতিহাস ও শিল্প গুণ পরখ করে দেখার জন্য পুরো একটি দিনও মনে হয় যথেষ্ট নয়। অনুচ্চ ফতেহপুর সিক্রির চারপাশে প্রসারিত বিশাল ভারতের সবগুলো দিক, যেখানে বসে মধ্য এশিয়ার পারস্য-তুর্কি-মোঙ্গল ঐতিহ্যের মুঘলরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সমাজের শৈল্পিক রূপান্তর সাধন ও সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ করেছিলেন, যার ঐতিহাসিক প্রভাব আজও অম্লান।  

কয়েক শত বছর মুঘলরা ভারত শাসন করে চুঘতাই তুর্কি ও পার্শি ভাষা এবং মধ্য এশীয় সংস্কৃতির নানা উপকরণের মিশেলে হিন্দি ও উর্দু ভাষা, হিন্দুস্থানী সঙ্গীত, রুচি, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভাসে যুক্ত করেছিলেন অভাবনীয় উৎকর্ষতা। ফতেহপুর সিক্রিতে দাঁড়িয়ে মনে হলো, তারা ছিলেন মিলনের দূত। তারা না ছিলেন বিদেশি, না ছিলেন এদেশীয়। তারা ছিলেন এ উপমহাদেশের গঙ্গা-যমুনা-সিন্ধু বাহিত বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক স্রোতধারা আর বর্ণময় শিল্পকলার সুসমন্বয়ের প্রতীক। উন্নত সকল কিছুর মিশ্রণে ও ভালোবাসায় ভারতকে তারা সাজিয়ে ছিলেন আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে।

মুঘলরা একই সঙ্গে তৈমুর ও চেঙ্গিস খানের বংশধারার ঐতিহ্য বহন করলেও তাদের ধমনীতে মিশেছিল উপমহাদেশীয় রক্ত। এজন্যই তারা ছিলেন দেশজ কাঠামোতে উত্তর-পুরুষের ঐতিহ্যের সংস্থাপক। ইতিহাস বলে, শুধুমাত্র বাবর ও হুমায়ূন ছিলেন প্রকৃত মধ্য এশীয়। আকবর ছিলেন পার্শিয়ান হামিদা বানুর গর্ভজাত অর্ধেক ইরানি। মাতা যোধাবাঈ-এর কারণে জাহাঙ্গীর ছিলেন অর্ধেক রাজপুত। পূর্বের বাংলা থেকে পশ্চিমের কাবুল আর উত্তরের কাশ্মীর থেকে দক্ষিণের কাবেরী নদী পর্যন্ত শাসন করেছিলেন তারা মৈত্রী, সমন্বয় ও মিলনের মাধ্যমে। ৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার জায়গায় ১৫০ মিলিয়ন মানুষকে নিয়ে যে সাম্রাজ্য ভারতবর্ষে মুঘলরা শাসন করেছিলেন, তা ছিল তৎকালীন বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ এবং সমৃদ্ধতম দেশ, যার অপসৃয়মান ঝলক এখনো মিশে আছে আগ্রা, দিল্লি, লাহোর, হায়দরাবাদ, লখনৌ, ঢাকা এবং সংক্ষিপ্ততম রাজধানী ফতেহপুর সিক্রির সুনিপুণ বিন্যাসে।       

ফতেপুর সিক্রির শান বাঁধানো চত্বরে হাঁটতে হাঁটতে অতীত ঐতিহ্যের সেইসব কথা বার বার প্রতিধ্বনি তুলেছে মনের অজান্তেই। বার বার মনে জাগে, শ্রেষ্ঠ মুঘল সম্রাট ও নগরের গোড়াপত্তনকারী আকবরের কথাও। স্বল্প সময়ের রাজধানী হলেও ফতেহপুর সিক্রিতে আকবর তার অভিনব দ্বীন-ই-ইলাহি বিষয়ে নানা ধর্মের পণ্ডিতদের সঙ্গে আলোচনায় মত্ত হতেন। আকবরের তারিখ-ই-ইলাহি-এর জন্মস্থানও ফতেহপুর সিক্রি, আকবরের যে বর্ষগণনা রীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের বাংলা সাল বা বঙ্গাব্দ। নিঃসন্তান আকবরের শেষজীবনে একমাত্র পুত্রও পির সেলিম চিস্তির দোয়ায় ভূমিষ্ঠ হয় ফতেহপুরের মাটিতে। আর এখানেই পরবর্তীকালে শেষ দিকের মুঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের প্রতিনিধি সৈয়দ হাসান আলি খানকে হত্যা করা হয় ঔপনিবেশিক ইংরেজ দখলদারদের ইঙ্গিতে। মুঘলরা দুর্বল হলে এই পরিত্যক্ত রাজধানী কখনো মারাঠা, কখনো রাজপুত, জাঠ বা শিখ জাতির দখলে আসে। সর্বশেষে ইংরেজরা ভারত দখল করে তারা এখানে গড়ে সেনা ছাউনি। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কিছুই হয়েছে এই সংক্ষিপ্তকালের রাজধানী শহরে। ফলে এখানে রয়েছে রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পাশাপাশি আনন্দ ও বেদনার প্রবহমান অশ্রুধারা। বৃষ্টিভেজা ফতেহপুর সিক্রি ঘুরে ইতিহাস ছুঁয়ে আগ্রায় ফিরে আসার সময় সেসব কথাই দোলা দিয়েছে মনে।

প্রেম ও বেদনার মহাকাব্য তাজমহলে
তাজমহলের সামনে এসে আমি বৃষ্টির সঙ্গে ভেঙে পড়লাম বিষাদে। পৃথিবীর সপ্তমাশ্চর্য শ্বেতমর্মরকাব্য নামে পরিচিত তাজমহলও কম বেদনার্ত নয়। যার বুকের উপর দাঁড়িয়ে অনিন্দ্য সুষমাময় তাজ, সেই মমতাজ মহল দেখতে পারেন নি তাজকে। প্রেমে ও আবেগে আপ্লুত নির্মাতা সম্রাট শাহজাহানও বন্দি জীবন কাটিয়েছেন অদূরের আগ্রা দুর্গে, সেখান থেকে তাজের দিকে চেয়ে চেয়ে তার চোখ হয়েছে অশ্রুসিক্ত, হৃদয় বেদনা-দীর্ণ ও রক্তাক্ত। কারণ তাজের চত্বরেই প্রিয়তমা স্ত্রীর শেষশয্যার অদূরে সমাহিত করা হয় তার প্রিয় পুত্র, ভ্রাতৃঘাতী ক্ষমতার লড়াইয়ে পরাজিত দার্শনিক রাজপুত্র দারাশিকোহ’র মস্তক-বিহীন দেহ। (তার কর্তিত মস্তক সমাহিত রয়েছে দিল্লিতে, হুমায়ূনের কবরগাহ বা মাকবারায়)।

আরজুমান্দ বানু নামে ১৫ বছর বয়সী কিশোরীর ফুফু ছিলেন মুঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান। ১৬০৭ সালে পারস্য বংশধারার এই কিশোরীর প্রেমে পড়েন শাহজাদা খুররম, যিনি পরে পরিচিতি লাভ করেন সম্রাট শাহজাহান নামে। প্রেম ও পরিচয়ের পাঁচ বছর পর ১৬১২ সালে আরজুমান্দকে বিয়ে করে শাহজাহান নাম স্ত্রীর দেন মমতাজ মহল বা প্রাসাদের রত্ন। সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনের শেষে ১৪তম সন্তানের (কন্যা গওহর বেগম) জন্ম দিতে গিয়ে মাত্র ৩৭ বছর বয়সে মমতাজ মারা যান। ব্যথিত শাহজাহান, আরো স্ত্রী থাকার পরেও মমতাজের প্রেম ও স্মৃতি ভুলতে পারেন নি। মমতাজের সমাধিস'লে তাজমহল নির্মাণ শুরু করেন তিনি।   
১৬৩১ সালে মমতাজের মৃত্যুর পরের বছর (১৬৩২) শাহজাহান তাজমহলের নির্মাণকাজ শুরু করেন। মূল সমাধি ছাড়াও উদ্যান আর অন্যান্য স্থাপনা নিয়ে তাজমহল নামে বিরাট কমপ্লেক্সের মূল নির্মাণ ১৬৪৮ সালে এবং সামগ্রিক নির্মাণকাজ ১৬৫৩ সালে শেষ হয়। অনেক শিল্পী ও নকশাকারক ছাড়াও দেশ-বিদেশের ২০ হাজার সুদক্ষ কর্মী জড়িত ছিলেন তাজমহল নির্মাণে। এদের মধ্যে উস্তাদ আহমেদ লাহোরীর নাম রয়েছে সর্বাগ্রে। এছাড়াও পারস্য থেকে আনা হয় স'পতি ঈসাকে। বেনারসের পুরু নামের একজন কিছু কাজ করেন। বড় গম্বুজটির নকশা করেন উসমানিয়া সাম্রাজ্য থেকে আগত তুর্কি শিল্পী ইসমাঈল খান। বড় গম্বুজের শীর্ষে স্বর্ণের দণ্ড নির্মাণ ও স্থাপন করেন লাহোরের কাজিম খান। পাথর খোদাইয়ের কাজের নেতৃত্ব দেন দিল্লির ভাম্বর চিরঞ্জিলাল। পারস্যের সিরাজ থেকে এসেছিলেন চারুলিপিকর আমানত খান, যার নাম তাজমহলের প্রবেশ পথের দরজায় প্রত্যায়ন করা হয়েছে। পুরো কাজের রাজমিস্ত্রিদের নেতৃত্ব দেন মোহাম্মদ হানিফ। ইরানের মীর আ. করিম ও মুকার্রিমাত খান সমগ্র কাজের ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক হিসাবের দায়িত্বে ছিলেন। মোটামুটি এমন কয়েকজনের নাম নানা সূত্রে উল্লিখিত হলেও তাজমহলের পেছনে আরও বহু শিল্পী ও শ্রমিক যে নিয়োজিত ছিলেন তা এর বিরাট এবং সূক্ষ্ম কাজের দিকে তাকালেই বুঝা যায়।  

তাজমহলে প্রবেশের তিনটি গেট আছে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া তাজের শুভ্রতা ও সৌন্দর্য ম্লান করছে বলে বেশ দূরে গাড়ি আটকে দেওয়া হয়। আমরা নগরীর বিশাল রাজপথ ছেড়ে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে তাজে প্রবেশের অপেক্ষাকৃত সরু গলিপথের মুখে আসি। সেখানে বেজায় ভিড়। গাইড, টাঙ্গা, ব্যাটারিচালিক ও মানবচালিত রিকশার হট্টগোল। আরো আছে হুইলচেয়ারের সারি এবং সাহায্যকারীদের দল। এদের এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াও বেশ মুশকিল। বছরে যাকে দেখতে ৩ থেকে ৪ মিলিয়ন পর্যটক আসেন, সেখানে ভিড় হবে না তো কোথায় হবে!

তাজের আশেপাশে প্রাচীন মুঘল ধরনের নগর বিন্যাস দেখা গেল, যদিও পুরনো কাঠামো বদল করে অস্থায়ী দোকান, খাবারের স্টল গড়ে উঠেছে সেখানে। তাজের চারপাশের জায়গাটির নাম তাজগঞ্জি বা মুমতাজাবাদ। তাজের দক্ষিণ দিকে এলাকাটি নির্মাণ করা হয়েছিল দর্শনার্থীদের জন্য থাকার সরাইখানা ও অন্যান্য প্রয়োজনে। এখন নানা দোকানে গিঞ্জি অবস্থা সেখানে। এসব ভিড় ঠেলে আসতে হলো মূল ফটকের কাছে এবং যথারীতি টিকিট কেটে ঢুকতে হলো ভেতরে। 
 
তাজ আসলে একটি নয়, অনেকগুলো স্থাপনার মিলনে একটি উদ্যানময় কমপ্লেক্স। মমতাজের মূল সমাধিস'লই তাজমহল নামে পরিচিতি। তাজমহল তৈরি হয়েছে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী নকশার ভিত্তিতে, যাতে মুঘল, পারস্য, তুর্কি, কুর্দি, মধ্য এশীয় তৈমুর প্রভাব রয়েছে। সমরখন্দে তৈমুর নির্মিত গুর-ই-আমির-এর পরোক্ষ প্রভাব এখানে কেউ কেউ লক্ষ্য করেন। যদিও মুঘলদের দুর্গ, লালকেল্লা, জামে মসজিদ, দেওয়ানে খাস, দেওয়ানে আম ইত্যাদিতে মধ্য এশীয় প্রভাব সুবিদিত।
তাজমহলের ক্ষেত্রে ভবন, মিনার, কারুকাজ, লিপি, অলংকরণ ইত্যাদির মধ্যে সুসমন্বয় রক্ষা করা হয়েছে চমৎকারভাবে। বাগানের বিন্যাসেও মুঘল, পারস্য, তুর্কি শিল্প ও স্থাপত্য কলাকে একাকার করা হয়েছে। প্রথম দর্শনের সবুজ গালিচাময় পুষ্পিত বাগানের মধ্যে শ্বেত-শুভ্র তাজমহল ও পুরো কমপ্লেক্সকে দেখে মনে হয়েছে শান্ত-সমাহিত এমন এক উদ্যান, যা পৃথিবীর কোলাহল ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে একখণ্ড নান্দনিক পরিসর ও স্বর্গীয় আরাম।
খুব কাছে থেকে নয়, তাজমহলের সামনের চত্বরের বাগানে দাঁড়িয়ে দেখলে চোখের সামনে তাজের সামগ্রিক সৌন্দর্য প্রস্ফূটিত হয় সবচেয়ে বেশি। বাগানটি চারটি অংশে বিভক্ত এবং একে বলা হয় চারবাগ বা চারটি বাগান। বাগানের মাঝখানে স্বচ্ছ জলের চৌবাচ্চা, যেখানে তাজের প্রতিবিম্ব জলে টলমল করে। ভেতরের পুরোটাই পাকা ও চিলতে সড়কের মাধ্যমে সংযুক্ত, যে হাঁটা-সড়কের চারপাশ পুষ্পিত ও বৃক্ষময়।

তাজমহলের চত্বরটি বেলে পাথরের দুর্গের মতো দেয়াল দিয়ে তিন দিক থেকে বেষ্টিত। এতে মমতাজের বড় ও আরো কয়েকটি ছোট সমাধিক্ষেত্র রয়েছে। এতে কিছু কিছু লাল বেলে পাথরও ব্যবহার করা হয়েছে। সমাধি ছাড়াও দেয়াল, স্তম্ভ ইত্যাদি অপূর্ব নান্দনিক অলংকরণে সমৃদ্ধ। বরফি-কাটা ঝালর, খিলান, প্রভৃতির জ্যামিতিক বিন্যাস পুরো স্থাপনাকেই শৈল্পিক ব্যঞ্জনায় উজ্জ্বলতর করেছে। তাজ কমপ্লেক্সের মধ্যে অনন্য সুন্দর একটি মসজিদও রয়েছে।
শুধু ভবন নয়, প্রসারিত দেয়াল আর তাজের গম্বুজ ও মিনারের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতেও কোনো ক্লান্তি আসে না। কেন হাজার হাজার মানুষের এতো বছর লেগেছিল তাজ বানাতে, তা টের পাওয়া যায় শৈল্পিক কাজের দিকে নজর দিলে। গম্বুজ ও মিনারের সৌন্দর্য ছাড়াও কারুকাজ, জালির কাজ, অলংকরণ, হস্তলিপি, খোদাই, সূক্ষ্ম কাট-স্টাইলে দেয়াল বা আচ্ছাদনের ঝালক পুরো আয়োজনকে একটি সামগ্রিক শিল্পকর্ম বা আর্টপিসে রূপ দিয়েছে। দূরের তাজমহল কাছে থেকে দেখলে মনে হয়, রাজকীয় পোশাক পরিহিত তার প্রতিটি অঙ্গ ও অংশ। প্রতিটি স্থানে শিল্পীর নানা রকমের স্পর্শ উদ্ভাসিত। কোথাও পারস্য ইমেজ তো কোথাও তুর্কি চিত্রময়তা কিংবা কোথায় মধ্য এশীয় স্টাইলের সমুন্নত রূপ।

সমাধি সৌধ মূল কেন্দ্রে রেখে সমগ্র তাজ কমপ্লেক্স প্রায় তিন একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। এতো মানুষের অংশগ্রহণ ও দীর্ঘ সময় ছাড়াও তাজের নির্মাণ সামগ্রীতে ছিল তৎকালের বিশ্বসেরা উপাদান। নির্মাণসামগ্রী আনাতে মানুষের পাশাপাশি হাজার হাজার হাতি ব্যবহৃত হয়। রাজস্থানের স্বচ্ছ আলো-প্রবাহী পাথর, পাঞ্জারের মার্বেল ও রঙিন পাথর, চীন দেশের সবুজ রত্ন ও স্ফটিক, তিব্বতের ফিরোজা পাথর, আফগানিস্তানের নীলকান্তমণি, শ্রীলঙ্কার বর্ণময় পাথর ও রত্ন তাজমহলের নির্মাণের সময় সৌন্দর্য বিধানের কাজে ব্যবহার করা হয়। আর নির্মাণে খরচ করা হয় তৎকালীন সময়ের আনুমানিক ৩২ মিলিয়ন রুপি, যা আজকের হিসাবে অকল্পনীয়ভাবে এক বিশাল অঙ্ক।   

তাজমহল নিয়ে ভাবালুতা ও আবেগ আসা খুবই স্বাভাবিক বিষয়। নির্মম শাসক ও বহু নারীর স্বামী হয়েও যে প্রেমের প্রকাশ ঘটানো যায়, তাজমহল সে প্রমাণবহ। তাজমহল মুঘল নির্মাণশৈল্পী ও সৌন্দযপ্রিয়তার বিশ্বজনীন নিদর্শনও বটে। প্রেম ও সৌন্দর্যে তাজ এতোই আকর্ষক যে ভারতের সিংহভাগ পর্যটকের প্রায়-সবাই এখানে আসেন, যাদের মধ্যে বিদেশিই বেশি। বৃষ্টির হাল্কা দাপটের মধ্যে আমরা যখন তাজমহল পরিদর্শন করি, তখনো পর্যটকদের কমতি ছিল না। অধিকাংশই ছিলেন বিদেশি এবং নানা বয়সের।
সন্ধ্যার মুখে তাজ কমপ্লেক্স থেকে ফিরে আসার সময় বৃষ্টিভেজা মেঘলা আকাশের কারণে রাতের চন্দ্রালোকে তাজের আরেক মায়াবী রূপ দেখার সুযোগ ঘটেনি। তাজের মূল গম্বুজ আর চারটি মিনার ও কারুময় দেয়াল, খিলান, গম্বুজ, হর্ম্য, ঝালর থেকে পাশের যমুনা নদীতে জোছনা ছুঁয়ে চির শায়িত মমতাজ মহলের বিষাদ মিশে যাওয়ার ছবিটিও দেখা হলো না। বরং নিজের ভেতরে কেন যেন টের পাওয়া গেল অন্য রকম অচেনা এক তরঙ্গ। উত্তর ভারতের ঐতিহাসিক বাতাসে ভেসে আসা সে তরঙ্গে হাহাকার নয়, প্রেম নয়, বেদনা নয়, আনন্দ নয়, মিলন নয়, ছিল অন্যরকম, অন্য কিছুর পরশ, যা এসে মিশে যাচ্ছিল হৃদয়ের মর্মমূলে, পাওয়া-না-পাওয়ার মাঝখানের গভীর শূন্যতায়।  

রাতের আগ্রায়
তাজমহল থেকে বের হয়ে অলিগলি পেরিয়ে বড় রাস্তায় এসে রাতের আগ্রার মুখোমুখি হলাম। পুরনো আগ্রার গিঞ্জি এলাকার ভিড়, রিকশার টুংটাং, মিনা বাজারের হইচই ফেলে চলে এসেছি নগরীর আলো-শোভিত এভিনিউ-এ। মোবাইল অ্যাপে হোটেল বুক করা আছে, ড্রাইভার সুরজিৎ সেখানে ব্যাগ রেখে বিশ্রাম নিতে চলে গেল। আমরা আগামীকাল সারাদিন ঘুরে রাতের মধ্যে জয়পুর ফিরে যাবো, এমন চুক্তি হয়েছে তার সঙ্গে। কাজটি ভুল হয়েছে। যে টাকায় আগ্রা-জয়পুর আপ-ডাউন করছি, তাতে জয়পুর-আগ্রা হয়ে দিল্লি চলে যাওয়া যেতো। রাস্তায় যেতে কষ্ট হবে ভেবে আমরা জয়পুর থেকে দিল্লির প্লেনের টিকিট কেটে রেখেছি। ফলে আমাদের আগ্রা থেকে আবার জয়পুরই ফিরতে হচ্ছে। এতে সময় ও টাকা খরচ হলো বেশি। একই পথ দুবার ঘুরতে হলো।
সবচেয়ে ভালো হতো, জয়পুর থেকে আগ্রা হয়ে দিল্লি চলে যাওয়া। জয়পুর-আগ্রা-জয়পুরের খরচে জয়পুর-আগ্রা-দিল্লি যাতায়াত হয়ে যেতো। সময় যেমন বাঁচতো, তেমনি হোটেল আর জয়পুর-দিল্লির বিমান ভাড়াও লাগতো না। অভিজ্ঞতা না থাকায় ভুলের মাশুলস্বরূপ সময় ও টাকার গচ্চা দিতেই হলো।

উত্তর ভারতে হোটেল বেশ সুলভ, কলকাতার চেয়েও কম টাকায় ভালো হোটেল পাওয়া যায় অ্যাপে। গাড়িও অ্যাপে নেওয়া যায়। ওয়ান ওয়ে, টু ওয়ে, ঘণ্টা ধরে গাড়ি পাওয়া যায়। সুরজিৎ সার্বক্ষণিক থাকার জন্য চুক্তিবদ্ধ। সে গাড়ি নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলও। কাল আবার জার্নি করবে আর আমি হেঁটে শহরের জীবনকে স্পর্শ করতে চাই বলে ওকে বিদায় দিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুরতে শুরু করি। অবশ্য প্রয়োজন হলে ফোনে ডাকলেই সে ছুটে আসবে। আমাদের হোটেলের পাশেই কম দামের একটি হোটেলে সে উঠেছে। অতএব, চিন্তার কিছু নেই।
ঘুরাঘুরির সময় খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটাও আমি ঝামেলাহীন রাখি। যেখানে সুবিধা হয় খেয়ে নিই। প্রধানত পাউরুটি, কলা, আপেল, ডিম সেদ্ধ, দুধ খেয়ে দিব্যি চলছে। ভ্রমণে ভারি খাবার আমার অপছন্দ। রাতের দিকে সুবিধা মতো কোথাও ডিনার করে নেওয়া যাবে। খাওয়া ও দেখার পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে তাজমহল সংলগ্ন এলাকা থেকে হেঁটে হেঁটে চলে এলাম আগ্রা শহরের মূলকেন্দ্রে।
এতো বছরের পুরনো হওয়ার পরেও আগ্রার সর্বত্র মুঘলাই রোশনাই ঝলঝল করছে। চারিদিকে বাগান, উদ্যানের ছড়াছড়ি। আগ্রা ফোর্টের সামনে শাহজাহান গার্ডেন তো এলাহী ব্যাপার। আর আছে মোড়ে মোড়ে নেতৃবৃন্দের ভাস্কর্য। নেতাজি সুভাষ বসুর মূর্তি পেলাম। পেলাম উত্তর ভারতের পুরনো হিন্দু শাসক পৃথ্বিরাজ চৌহানের মূর্তি। উত্তর প্রদেশ বিজেপি শাসনে থাকায় প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্য পুনরুত্থানের বিশেষ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ক্ষমতায় এসেই প্রাচীন নগর এলাহাবাদের নাম বদলে রেখেছেন প্রয়াগ। বিখ্যাত মুঘলসরাই রেলজংশন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নামও বদল করা হয়েছে। শুনতে পেলাম, আগ্রার নামও বদলে অগ্রবন রাখা হবে। কিন' ইতিহাসবিদ ও সুশীল সমাজ তা হতে দিচ্ছেন না। তারা অগ্রবন নামের অস্তিত্ব পাচ্ছেন না। বরং আগ্রা নামের মজবুত ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যাচ্ছে। মুঘলদের আগে লোদি বংশও আগ্রায় অনেক স্থাপনা করেছে। আগ্রা সম্পূর্ণভাবে মুঘল ও মুঘল-পূর্ব মুসলিম শাসকদের শহর। ফলে নামবদলের বিষয়টি খানিক পিছিয়ে গেছে।
আলোশোভিত, উদ্যানময় এভিনিউ ধরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম আগ্রার বিখ্যাত জামে মসজিদের কাছে। মুঘলরা যেখানেই গিয়েছে প্রাসাদ ও দুর্গের পাশাপাশি বড় আকারের মসজিদ নির্মাণ করেছে। আগ্রার জামে মসজিদও বিরাট চত্বর, মিনার, গম্বুজ, ক্যালিগ্রাফিতে সমৃদ্ধ। মসজিদটি চট করে দেখলে মধ্য এশীয় কোনও স্থাপনা বলে ভ্রম হবেই। পাথুরে কাঠামোতে নান্দনিক অঙ্গসজ্জায় উজ্জ্বল হয়ে আছে মুঘল ঐতিহ্য। রাতের বেলাতেও দেশি-বিদেশি পর্যটক-দর্শনার্থীদের ভিড় দেখতে পাওয়া গেল মসজিদের চারপাশে।

মসজিদের লাগোয়া আগ্রার বিখ্যাত পাইকারি বাজারগুলো অবসি'ত। চামড়ার জুতা, পোশাক, ধাতব তৈজসপত্র ইত্যাদিতে ঠাসা ছোট ছোট অসংখ্য দোকান। পুরান ঢাকার চকবাজার বা লালবাগের মুঘল নগর বিন্যাসের আদল এখানেও লক্ষণীয়। দোকানের মালামাল আর হরেক রকম ক্রেতায় ঠাসাঠাসি ভিড়। দামও আধুনিক মলের চেয়ে অনেক কম। সস্তায় মজাদার খাবারের অনেক হোটেলও পাওয়া গেল। কাবাব ও মাংসের প্রাধান্যে মুঘলাই রান্নার প্রাচুর্য হোটেলগুলোতে।
অনেকেই আমাদের আগ্রা ভ্রমণের সময় অবশ্যই ইতিমুদ্দৌলাহ নামের একটি সমাধিস'লে যেতে পরামর্শ দিয়েছিলে, যাকে শিশু তাজমহল বলা হয়। এটা দিল্লির হুমায়ুন মাকবার আর সেকেন্দ্রার আকবর মাকবার অনুরূপ। মাকবারা মানে সমাধিস'ল। মুঘলরা মধ্য এশীয় রীতিতে সমাধি সৌধ নির্মাণ করতেন, যার অনেকগুলো এখনো ভারতের নানা স্থানে অটুট। ইতিমুদ্দৌলা যমুনা নদীর পূর্ব পাশে অবসি'ত সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের পিতা মির্জা গিয়াস বেগ ও মাতা আসমৎ বেগমের কবরস্থান। নূরজাহান নিজের অর্থে এই সুরম্য সৌধ নির্মাণ করেন।

আরেকটি জায়গায় যাওয়ার জন্যও পরামর্শ ছিল। সেটার নাম মাহতাব বাগ, যার বাংলা হলো চন্দ্রালোকিত বাগান (মুনলাইট গার্ডেন)। সম্রাট বাবর এটি নির্মাণ করেন যমুনার অপর তীরে, যেখান থেকে ভিন্ন কৌণিক অ্যাঙ্গেলে তাজমহল ও আগ্রা দুর্গকে দেখতে পাওয়া যায়। বিশেষত রাতে এবং জোছনায় মাহতাব বাগ থেকে তাজের অসামান্য সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। নদীর জোছনা প্লাবিত স্রোতে বিম্বিত শ্বেত মর্মর তাজের অনিন্দ্য অবয়ব দেখার জন্য মোহতাব বাগ শ্রেষ্ঠ স্থান।

বৃষ্টিমগ্ন আবহাওয়া এবং সময় স্বল্পতার কারণে এসব স্থানের মতো আরো কিছু ছোটখাটো স্থাপনা, ঐতিহাসিক নিদর্শন ও দর্শনীয় স্থান দেখা সম্ভব হলো না এবারে ভ্রমণে। মনে মনে ঠিক করলাম, এটা কেবল প্রাথমিক দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়।
না দেখার আফসোস আর যতটুকু দেখেছি, তার তৃপ্তি নিয়ে নগর পরিভ্রমণ শেষে হোটেলে ফিরে এলাম। আমরা যে হোটেলে উঠেছি, সেটি একটি বিশাল ও আধুনিক স্থাপনার তিনতলার পুরো ফ্লোর নিয়ে অবসি'ত। একতলায় দেখতে পেলাম কোচিং সেন্টার চলছে। বাইকে চেপে জিন্স আর টি-শার্ট চাপিয়ে শত শত ছেলেমেয়ে ক্লাসে আসছে, যাচ্ছে। সম্ভবত দিনে কোনও চাকরি করে রাতের দিকটায় প্রাইভেটে তারা পড়াশোনা করছে। ক্যারিয়ার আগে বাড়াতে এসব প্রতিযোগিতামূলক শহরে ডিগ্রি, ট্রেনিং নিয়েই চলতে হয়। ইতিহাসের প্রাচীন আগ্রাতেও আধুনিক জীবনের গতিময় তেমন ধারা চলছে।

দিল্লি বা বেঙ্গালুরুর মতো নারীর নিরাপত্তাহীনতা আগ্রায় ততটা প্রকট মনে হলো না। রাত ১১/১২টা পর্যন্ত অনায়াসে তরুণ-তরুণীরা নিজস্ব বাইকে চলাফেরা করছে। দীপক রাঠোর নামে একটি ১৯/২০ বছরের ছেলে হোটেলে দেখা করতে এলো। আমাদের জয়পুরের বন্ধুর পরিচিত ছেলেটি কলেজে পড়ে এবং স্থানীয় ক্লাবে ক্রিকেট খেলে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক খোঁজ-খবরই সে রাখে। সুস্বাস'্যবান দীপক ছাড়াও প্রতিটি ছেলে-মেয়েকেই স্বাস'্য সচেতন মনে হলো। দীপকের বাইকে আশেপাশের এলাকায় এক চক্কর দিতে দিতে পথে জিম দেখেছি অনেকগুলো। জীবনকে উপভোগ করতে হলে অটুট স্বাসে'্যর অধিকারী হওয়ার মন্ত্র তরুণ প্রজন্মের চোখে-মুখে। নিজের কাজ অন্য কারো ভরসা ছাড়া নিজেকেই যে করতে হবে, এই কাণ্ডজ্ঞানটি আগ্রায় ছেলেমেয়েদের মধ্যে প্রকট। পথে পথে অলস আড্ডায় মেতে চা খেয়ে, সিগারেট ফুঁকে ফুটপাথ দখল করতে বিশেষ কাউকে দেখিনি। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত এবং সেটা অবশ্যই উদ্দেশ্যভিত্তিক, লাভজনক ও প্রয়োজনীয়। আর বিখ্যাত পর্যটক শহর বলে এখানে নানা কিসিমের কাজের কমতি নেই।
শুধু স্বাস'্য নয়, আগ্রায় বসবাস করতে আরেকটি জিনিস লাগবে, তা হলো মুঘল বাদশাহ হয়ে জন্মানোর ভাগ্য। বিরাট বিরাট বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও তকমাধারী স্থাপনা ছাড়াও আগ্রায় ছড়িয়ে আসে অসংখ্য রাজকীয় ঢঙের প্রাসাদ, বাড়িঘর। ইংরেজ আমলে তৈরি রাজসিক ভবনও কম নয়। সম্ভবত এসব দেখেই কথাটি বলেছিলেন কবি ও অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসু। যাদবপুরের অধ্যাপক বুদ্ধদেব এক চিঠিতে দার্শনিক দেবীপ্রসাদকে কথাটি জানিয়েও ছিলেন। সেই ভাষ্যটিই তুলে দিচ্ছি:
‘আমি এখন আগ্রায়। এসব শহরে বসবাস করতে হলে মুঘল বাদশাহ হয়েই জন্মাতে হয়। আগ্রা ফোর্টে জাহান আরার ঘরগুলো ভারি ভালো, ও-রকম বাড়িতে থাকতে পারলে তবেই এ-অঞ্চলে বসবাস সম্ভব। কিংবা তাজমহলের ভেতরটাও মন্দ নয়। এ ছাড়া আর ঠাণ্ডা জায়গা এখানে আছে বলে মনে হয় না। যে যুগে ইলেকট্রিসিটি ছিল না, সে যুগে ও-ধরনের বিরাট কেল্লা গড়তেই হতো শাহানশাহদের, নয়তো প্রাণ কি বাঁচতো? স্নানের কী বিলাসিতা! শ্বেতপাথরের কী উদার মসৃণ শীতলতা! ইলেকট্রিসিটি থাকলে অত দরকার হতো না, এয়ার কন্ডিশন করে দিলেই হতো। তবু ওরা ওগুলো করেছিলেন বলেই আজ সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমরা একটু বুঝতে পারি যে ভারতবর্ষ এককালে সত্যিই ইংরেজ বর্জিত ছিলো এবং ইংরেজ-বর্জিত সে ভারত তখনকার পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের চাইতে কোনো অংশে ছোটও ছিল না। নবাবী আমলের সূর্যাস্তের সোনা এ অঞ্চলে চেখে বেড়াচ্ছি,-পচে গেছে, কিন' একটা রূপ আছে।
১৯৪১ সালের ১০ই অক্টোবর দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে বুদ্ধদেব বসু চিঠিতে কথাগুলো বলেছিলেন। আগ্রায় শত শত বছরের প্রাচীন মুঘল ঐতিহ্যের অপসৃয়মান দ্যুতিময় রশ্মি এখনো সেইসব স্থাপনার চমকাচ্ছে।   
 
আগ্রা দুর্গে ইতিহাসের প্রতিধ্বনি
বৃষ্টির মধ্যেই সকাল হলো আগ্রায়। বাংলাদেশের বর্ষার মতো উত্তর ভারতে মনে হয় বৃষ্টি এসেই চলে যায় না। আসা অবধি দেখছি, ক’দিন ধরেই উত্তর ভারত জুড়ে অবিরাম বর্ষণের রেশ থেমে থেমে চলছে। সকালের শুরুতে তাজমহলের দিকে এক চক্কর দেওয়ার ইচ্ছা ছিল, সেটা স'গিত করতে হলো আবহাওয়ার বিরূপতায়। কিছুক্ষণ হোটেলে অপেক্ষার পর বৃষ্টি সহনীয় হলে চলে এলাম আগ্রা দুর্গে।
আগ্রা দুর্গ নামটি শুনে মনে হতে পারে পারে যে, এটি কোনও সামরিক ছাউনি বিশেষ। আসলে মোটেও তা নয়। আসলে আগ্রা দুর্গ হলো একটি আস্ত শহর। মুঘল সচিবালয়, বাসগৃহ, সামরিক স্থাপনা ইত্যাদি মিলিয়ে পরিকল্পিত এক রাজধানী, মধ্যযুগের আরবান সেটেলমেন্ট।
তাজমহল থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে অবসি'ত আগ্রা দুর্গের সামনে, রাস্তার আরেক পাশে শাহজাহান গার্ডেন। বিশাল মুঘল উদ্যান আর আগ্রা দুর্গের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে প্রশস্ত এভিনিউ। গাড়ি থেকে নেমে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখলাম একপাশের সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা দুর্গ-নগরী আর অন্যপাশের সুবিস্তৃত শাহজাহান গার্ডেন।

৯৪ একক আয়তন বিশিষ্ট অতিকায় আগ্রা দুর্গে প্রবেশের জন্য দুটি প্রবেশ তোরণ আছে। একটির নাম অমর সিং গেট, যাকে লাহোর গেটও বলা হয়। আরেকটি দিল্লি গেট, যা দুর্গের পশ্চিমাংশে অবসি'ত। বর্তমানে দিল্লি গেট বন্ধ আর একমাত্র প্রবেশ পথ হলো অমর সিং গেট। তবে দুর্গের আরো দুটি ছোট আকারের প্রবেশ পথ আছে। দুর্গে অনেকটাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাসুট ব্রিগেডের সদর দপ্তর আগ্রা দুর্গের উত্তরাংশে অবসি'ত।   
আগ্রা দুর্গ হলো একমাত্র স্থান, যেখানে ভারতের সব শাসকরাই কর্তৃত্ব করেছেন। আফগান-গজনির শাসকরা যখন প্রথম আগ্রায় সামরিক ছাউনি গড়েন, তা ছিল এই দুর্গের চৌহদ্দিতেই। পরে চৌহান, রাজপুত, জাঠ, শিখরা এখানে কর্তৃত্ব করেন। দিল্লি দখল করে সেখানেই রাজধানী স্থাপন করা হলেও সিকান্দার লোদি আগ্রায় রাজধানী নিয়ে আসেন ষোড়শ শতকেই। পানিপথের প্রথম যুদ্ধ জয়ী হয়ে বাবরও এ দুর্গ থেকেই রাজত্ব শুরু করেন। পুত্র হুমায়ূনের রাজ-অভিষেকও আগ্রা দুর্গে সম্পন্ন হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আকবরের জীবনীকার আবুল ফজল আইন-ই-আকবরি গ্রনে' জানিয়েছেন। তা হলো আগ্রা দুর্গের নির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলার কারিগরগণ, সঙ্গে ছিলেন গুজরাটের শ্রমিকরা। 

হুমায়ূনের শাসনামলে বাংলার আফগান-সুরি বংশ শের শাহের নেতৃত্বে ভারত তথা দিল্লি দখল করে আগ্রা থেকে শাসন চালায়। পরে মুঘলরা আবার ভারতের ক্ষমতা দখল করলে আগ্রার দুর্গ হয় শাসনের মূল কেন্দ্র। আকবর আগ্রা দুর্গকে বর্ধিত করেন এবং বিশাল আকারে অনেকগুলো স্থাপনা নির্মাণ করেন। তিনি কিছুদিনের জন্য রাজধানী পাশের ফতেহপুর সিক্রিতে নিয়ে গেলেও পরবর্তী মুঘল শাসকরা আগ্রাকেই রাজধানী হিসেবে বেছে নেন। পরে রাজধানী কিছু দিনের জন্য লাহোর এবং আবার দিল্লি স্থানান্তরিত হলেও মুঘল শাসনে আগ্রার গৌরব, শক্তি ও ঐতিহ্য সমুন্নত ছিল। ফলে আগ্রা দুর্গের প্রতিটি বালি-কণা ও ইটে বহু বছরের বিচিত্র ইতিহাসের জানা-অজানা বহু কথা ও কাহিনি ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়।
আগ্রার দুর্গ একজনের হাতে নয়, অনেক মুঘল নৃপতির দ্বারা সংস্কার ও পরিবর্ধন লাভ করে। তবে আকবরের সময় এর সর্বোচ্চ বিকাশ হয়। তিনি রাজস্থানের লাল বেলে পাথর দিয়ে আগ্রা দুর্গের ভেতরে অনেকগুলো স্থাপনা নির্মাণ করেন এবং সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে পুরো স্থাপনাকে পরিবেষ্টন করেন।    

আগ্রার দুর্গস' সমগ্র এলাকা অর্ধবৃত্তাকার ভূমিতে পরিকল্পিতভাবে নির্মিত। প্রবেশ তোরণ থেকে শুরু করে দুর্গের প্রতিটি স্থাপনা অত্যন্ত সুনির্মিত ও কারুকার্যময়। লাল বেলে পাথরের সঙ্গে সাদা মার্বেলের ব্যবহারও দুর্গটির বিশেষ নির্মাণ বৈশিষ্ট্য। ফলে ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ দুর্গের দিকে তাকালেই গা ছমছম করে।
রাজকীয় মুঘলাই ফটক দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করে লালের সঙ্গে সবুজের মিতালিতে চোখ জুড়িয়ে গেল। মুঘল রীতি ও ঐতিহ্যানুযায়ী সাজানো উদ্যান দুর্গের ভেতরেও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মুঘলরা যেখানেই গেছেন, যে স্থাপনাই গড়েছে, তাতে বাগানের উপসি'তি আবশ্যিক। হালকা বৃষ্টি থাকলেও দর্শনার্থীর ভিড় কম নেই। ঘুরে ঘুরে দেখলাম মুঘল ঐতিহ্যের অনবদ্য আকর্ষণ আগ্রা দুর্গ।
দুর্গের ভেতরেও একটি গেট আছে, যাকে বলা হয় হাতি গেট। খুবই পরিকল্পিত স্থাপত্য বিন্যাস চারিদিকে। অসংখ্য স্থাপনার মধ্যে কালের করাল গ্রাস থেকে সামান্যই রক্ষা পেয়েছে। শত শত যুদ্ধ, দাঙ্গা, বিশেষত দখলদার ইংরেজদের হাতে অনেক সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে। ভাঙা-গড়া হয়েছে ভেতরের অনেক ইমারত ও প্রাসাদ। মুঘল সম্রাটের অধিষ্ঠানের ময়ূর সিংহাসন আর কোহিনূর হীরক সম্পদও ইংরেজরা এখান থেকে লুট করে নিয়ে গেছে বিলাতে। সিপাহি বিপ্লবের পর বিজয়ী হয়ে ইংরেজরা শুধু গণহত্যাই করেনি, হীরা-জহরত, বই-পত্র, তৈজসপত্র, ব্যবহার সামগ্রী লুটে নিয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের মিউজিয়াম, বাজার ও ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় এসবের কিছু কিছু এখনো রয়েছে।

আগ্রা দুর্গের প্রধান আকর্ষণ দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, জাহাঙ্গীর হৌস, যা আকবর নির্মাণ করিয়েছিলেন পুত্রের জন্য। বাবরের আমলে নির্মিত বাওলি (পানির কূপ) আছে। আছে মসজিদ, আকবর মহল। সম্রাট শাহজাহানের আমলে নির্মিত মহলও আছে, যাতে তার দুই কন্যা রওশান আরা ও জাহান আরা বসবাস করতেন।
আশ্চর্য হলাম, আগ্রার দুর্গে বাংলা মহল দেখে। কথিত আছে, সম্রাজ্ঞী নূরজাহান এটি নির্মাণ করেছিলেন। এর নির্মাণশৈলীতে বাংলার কুটিরের ছাপ আছে। নূরজাহান সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিণত সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বে ছিলেন বাংলার এক সুবেদারের স্ত্রী। ফলে পারসিক বংশধারার হলেও নূরজাহানের একটি সম্পর্ক ছিল বাংলার সঙ্গে। বাংলার আম গাছ তিনি আগ্রার দুর্গে রোপণ করেছিলেন এবং ঢাকাই মসলিন কাপড়ের উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করেছিলেন।
দুর্গের ভেতর যমুনা নদীমুখী একটি আবাসে সম্রাজ শাহজাহানের বন্দি জীবন কেটেছিল। এর বারান্দা থেকে দূরের তাজমহল দেখা যায়। বন্দি সম্রাটের জীবন কাটে এখান থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাজ দেখে আর তাজে শায়িত প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজমহলের স্মৃতিতে।
আগ্রার দুর্গ নিয়ে প্রচলিত আছে বহু উপকথা ও কাহিনী। দুর্গের নিচে সুড়ঙ্গপথ নাকি নানা জায়গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ছিল অনেক গোপন কুঠরী, যেখানে সংকটকালে সম্রাট আত্মগোপন করতে পারতেন বা প্রতিপক্ষকে লোকচক্ষুর আড়ালে বন্দি করে রাখতে পারতেন।

মুঘল হেরেম নিয়ে শত শত উপাখ্যানের ভিত্তিভূমিও আগ্রার দুর্গ। যেখানে সেলিম (সম্রাট জাহাঙ্গীর) ও আনারকলির করুণ প্রেম-উপাখ্যান ছাড়াও বহু বাদশাহজাদি ও শাহজাদার নানা রোমাঞ্চকর ইতিবৃত্ত প্রচলিত রয়েছে। বলতে গেলে মুঘল ইতিহাসের আখ্যান রচনা করতে গেলে সর্বাগ্রে চলে আসবে আগ্রা দুর্গের নাম। বিশ্বসেরা গোয়েন্দা শার্লক হোমস পর্যন্ত আগ্রা দুর্গের পটভূমিতে অনুসন্ধান চালিয়েছেন। শার্লক হোমসের রচয়িতা স্যার আর্থার কোনাল ডুয়েল  দ্য সাইন অব ফোর গ্রন'টিতে আগ্রা দুর্গের পটভূমি নিয়ে এসেছেন। এমন আরো শত শত গ্রন' আছে আগ্রা দুর্গের সামগ্রিক বা বিশেষ বিশেষ ঘটনার আলোকে। স্থাপত্য ও নির্মাণ প্রকৌশলেও আগ্রা দুর্গকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। মধ্যযুগে বাগদাদ, দামেস্কো, ইস্পাহান, সিরাজ, কায়রোর মতোই আগ্রা ছিল এক আন্তর্জাতিক শহর, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল আগ্রা দুর্গ কেন্দ্রিক রাজপ্রাসাদসমূহ, আবাসস'ল ও প্রশাসনিক দপ্তরগুলো।
বৃষ্টি কমে এক সময় হাল্কা রোদ ঝলক দেওয়ায় মনে হলো শত শত বছরের ঘুম ছেড়ে চমকে উঠেছে আগ্রা দুর্গের ভেতরের স্থাপনাগুলো। শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে দুর্গের নানা স্থাপনা দেখতেই সময় কেটে যায় না, প্রতিটি স্থানের পেছনের ইতিহাস ও ইতিবৃত্তও সামনে চলে আসে হারিয়ে যাওয়া অতীতের ঝঙ্কার তুলে।

সুদূর মধ্য এশীয় অঞ্চলের মোঙ্গল-তুর্ক-পারস্য ঐতিহ্য নিয়ে যে মুঘলরা ভারতে এসেছিলেন, তারা শাসন ও সংস্কৃতির প্রতিটি অঙ্গনকে করেছিলেন আলোকিত ও সমৃদ্ধ। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে আধুনিক জীবনবোধ ও যাপন প্রণালী মিলে আছে অর্ধ-সহস্র বছরের মুঘল শাসনের পরতে পরতে। তাদের প্রাসাদ, হর্ম্য, স্থাপনা, প্রশাসনিক রীতি, খাদ্য, পোশাক, লোকাচার, কাব্য, সঙ্গীত ইত্যাদি প্রতিটি বিষয়ই শুধু ভারত নয়, বিশ্ব সভ্যতা ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল রত্নস্বরূপ। সেই মুঘলদের নাভিমূল আগ্রার দুর্গে প্রতিটি পদক্ষেপে কানে বাজে ইতিহাসের শব্দ-সঙ্গীত। অতীত পুরনো হলেও যে দীপ্তি হারায় না, মুঘল ঐতিহ্যের হৃৎপিণ্ড ও রাজধানী আগ্রা সে সত্যটিই মনে করিয়ে দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘতম রাজধানী আগ্রা
আগ্রার দুর্গ থেকে বের হলাম পড়ন্ত বিকাল বেলায়। অতীতের উজ্জ্বলতায় ঝলমল আগ্রা শহরের কথায় ইতিহাসের নানা কথা মনে পড়ে। যদিও বিশাল ভারতবর্ষের কথা আসলেই চলে আসে দিল্লির নাম, তথাপি দিল্লি নয়, অধিকাংশ সময় আগ্রা ছিল মুঘল ভারতের রাজধানী। মধ্যযুগে ভারতবর্ষের রাজধানী হিসাবে যেসব শহরের নাম জানা যায়, তার মধ্যে আগ্রা ছিল সুদীর্ঘকাল। দক্ষিণ এশিয়ায় আগ্রা ছাড়া অন্য কোনো শহর এতো অধিক বছর রাজধানীর মর্যাদা পায় নি।
মুসলিমরা ভারত জয় করে রাজধানী গড়েন দিল্লিতে। দিল্লির প্রতিষ্ঠাতা ধরা হয় মুহাম্মদ ঘোরীকে। দিল্লি সালতানাতের শাসনকালেরই একপর্যায়ে আগ্রায় রাজধানী স্থাপন করা হয়, যেখানে কয়েক শত বছর আগে গজনীর সুলতান মাহমুদ দুর্গ গড়েছিলেন। আগ্রা থেকে উত্তর, মধ্য, পশ্চিম ভারত শাসন ছিল সহজতর। এবং পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে গমনের পথও ছিল সুগম। ফলে আগ্রা রাজধানী ও কেন্দ্রীয় শহরের মর্যাদা পায় রাজনৈতিক এবং ভূকৌশলগত গুরুত্বের কারণে।

পূর্ববর্তী মুসলিম শাসকদের মতোই মুঘলরাও ছিলেন প্রধানত আগ্রা কেন্দ্রিক। উপমহাদেশের নানা স্থানে নানা স্থাপনা, দুর্গ, প্রাসাদ নির্মাণ করলেও মুঘলদের মূল আবাস ছিল আগ্রা এবং শাসনের কেন্দ্রবিন্দুও ছিল এই শহর। যদিও আকবর কিছুদিনের জন্য রাজধানী আগ্রার পাশে ফতেহপুর সিক্রিতে স্থানান্তরিত করেন, যা আসলের আগ্রারই সম্প্রসারিত এলাকা বিশেষ। গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য হলো এই যে, মাত্র একটি ছাড়া, মুঘলদের সবগুলো রাজধানীই বর্তমান ভারতের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবসি'ত। ভারতের বাইরে একমাত্র শহর পাকিস্তানের লাহোর, যেখানে সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী স্থানান্তরিত হয় স্বল্পকালের জন্য। তারপর আগ্রা হয়ে দিল্লি হয় ভারতের রাজধানী। তথাপি মুঘল ক্ষমতা ও স্থাপনার অন্যতম শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী কেন্দ্র রূপে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখে আগ্রা।
বাংলা তথা কলকাতায় ক্ষমতাসীন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে ভারত দখল করে ইংরেজরা রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে সরিয়ে নিয়ে আসে নতুন শহর কলকাতায়। তারপর ১৯১৩ সালে আবার ভারতের রাজধানী হয় দিল্লি। এভাবে আগ্রার ক্ষমতা ও শক্তি স্থানান্তরিত হয়। তথাপি মধ্যযুগের পটভূমিতে নানা শাসকের অধীনে আগ্রার চেয়ে সুদীর্ঘ বছর রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকার গৌরব ভারত বা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় অন্য কোনো দেশের অন্য কোনো শহরের নেই।

শাহজাহান বাগিচা আর আগ্রা দুর্গের দিকে ফিরে আসার সময় পেছন তাকিয়ে দেখতে পেলাম, অস্তাচলগামী সূর্যের রক্তিমাভা আগ্রার লালাভ দুর্গ স্থাপনায় টকটক করছে। ততক্ষণে বৃষ্টি কমে সূর্যের স্বচ্ছ আলো ছড়িয়েছে প্রাসাদ আর উদ্যান ঘেরা নগরী আগ্রার দিগন্তে। পায়ে পায়ে হোটেলের দিকে যেতে যেতে কানে বাজে রণধ্বনি, উৎসব আর হুল্লোড়ের কোলাহল। আগ্রার আশেপাশেই হয়েছে ভারতবর্ষে বিখ্যাত ও ভাগ্যনির্ণায়ক যুদ্ধগুলো। কাছেই মুহাম্মদ ঘোরী আজমিরের শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহানকে পরাজিত করে ভারত অধিকার করেন। সন্নিকটের পানিপথে লোদি বংশকে পরাজিত করে বাবর বসেন মসনদে। আকবর এই পানিপথেই হিমুকে হারিয়ে ভারতের ক্ষমতা সুসংহত করেন। আফগান আহমাদ শাহ আবদালি পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠা-শিখদের বিতাড়িত করেন। আগ্রাকে নাভিশূলে রেখেই মধ্যযুগের ভারতের ক্ষমতার পালাবদল আর বিন্যাস রচিত হয়েছে।

এতো যুদ্ধ ও দামামার মধ্যেও আগ্রাকে সাজানো হয়েছে সুরম্যভাবে। লোদি গার্ডেন, শাহজাহান গার্ডেন, মাহতাব বাগ ইত্যাদি বহু কিছু এখনো অটুট সবুজে-শ্যামলে। আর স্থাপনার তো শেষ নেই! ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া তাজমহল, ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা দুর্গ ছাড়াও শত শত মসজিদ, প্রাসাদ ইত্যাদি মুঘল স্থাপনা ছড়িয়ে রয়েছে আগ্রার সর্বত্র।
বিদেশি পর্যটকদের ভ্রমণবৃত্তান্তে আগ্রা লাভ করেছে স্বপ্নের শহরের মর্যাদা। শান-শওকত, আভিজাত্য, সমৃদ্ধিতে আগ্রাকে তুলনা করা হয়েছে ভেনিস, প্যারিসের সঙ্গে। আগ্রার নান্দনিক অবয়ব লোভনীয় হয়ে ধরা দিয়েছিল পৃথিবীর মানুষের কাছে। তৎকালের ভাগ্যান্বেষী মানুষের ঢল নেমেছিল আগ্রা নগরীতে। বহুবিচিত্র মানব সমাবেশের কারণে আগ্রা পরিণত হয়েছিল মধ্যযুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অগ্রণী আন্তর্জাতিক শহর বা কসমোপলিটন সিটিতে।

আগ্রা দুর্গ পরিদর্শনের পর প্রাচীন গ্রিক নগর রাষ্ট্রগুলোর কথা মনে পড়ে। কি নেই এই দুর্গে। একটি আস্ত শহর আড়াই-তিন মাইল জায়গা জুড়ে সুপরিকল্পিতভাবে সজ্জিত করার কৃতিত্ব মুঘলদের। বসবাস, রাজকাজ, প্রশাসনিক দপ্তর, যুদ্ধ কৌশল প্রণয়ন, বিনোদন ইত্যাদি সবই হয়েছে এখানে। খেলার মাঠ, মল্লযুদ্ধ, হাতি বা বাঘের লড়াইয়ের ব্যবস্থাও ছিল দুর্গের ভেতরেই। শীশ মহল, স্নানাগার, হারেম ও হাভেলিতে মশগুল আগ্রার দুর্গে জীবন যেন প্রবহমান ছিল আরব্য রজনীর মখমল কার্পেটে।

আগ্রা দুর্গের বাইরেও সাধারণদের বসবাসের জায়গায় মিনাবাজার, মসজিদ, প্রমোদালয়, বিশ্রামাগার, সরাইখানার অন্ত ছিল না। এখনো আগ্রার পথে পথে গম্বুজওয়ালা প্রহরী ছাউনির দেখা পাওয়া যায়, যা মুঘল নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হয়ে স্মৃতিস্বরূপ বিরাজমান।
শুধু ইতিহাস আর ঐতিহ্যই নয়, কিংবা যুদ্ধ আর বিজয়ই নয়, আগ্রার উপর দিয়ে বয়ে গেছে মর্মান্তিক রক্তস্রোত। সিপাহি বিদ্রোহে মুঘল-ভারতীয় পক্ষ পরাজিত হলে দিল্লির মতো আগ্রাতেও বয়ে যায় রক্তের বন্যা। শুধু মুঘল পরিবারের সদস্যই নয়, মুসলিম সম্ভ্রান্ত, অভিজাত ও সৈনিকদের গণহারে হত্যা করা হয়। দিল্লির পতন হলে বিপুল মানুষ এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন আগ্রা দুর্গে। তাদের ধরতে সশস্ত্র অভিযান ও গণহত্যা চালানো হয় আগ্রায়।

এখনো আগ্রার পথে-প্রান্তরে, দুর্গের দেয়ালে কালচে রক্তের ছোপ মিশে আছে। নিহতের আহাজারি আর নিগৃহীত রমণীর বিলাপ গুমড়ে কাঁদে আগ্রায়। আগ্রার একটি প্রচলিত উপকথার বিষয়ে স্থানীয় লোকমুখে শুনেছি। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে পরাজিত করে ইংরেজরা বন্দি বানিয়ে পাঠিয়ে দেয় সুদূর বার্মার রেঙ্গুনে। তার পরিবারের অনেককেই হত্যা করা হয় দিল্লিতে। দিল্লির হুমায়ূন মাকবারা বা কবরগাহে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারা। সেই স্থানে কাতারবন্দি করে মুঘল পরিবারের শত শত সদস্যকে হত্যা করে ইংরেজ সেনাপতি। আগ্রায় যারা লুকিয়ে এসেছিলেন, তাদেরকেও দুর্গের ভেতরে চিরুনি তল্লাশি করে খুঁজে খুঁজে বের করে মারা হয়। আজও নাকি সেসব নিহত আত্মা প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে আগ্রা দুর্গে ফিরে আসে। অনেকেই দুর্গের অভ্যন্তরে, খিলান ও স্তম্ভের পাশে নারী ও শিশুদের কান্না শুনতে পান!

এসব কাহিনীর সত্যাসত্য যাচাই করা দুরূহ। কিন' যে বীভৎসতা এ নগরের উপর দিয়ে বয়ে গেছে, তাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। সাজানো-সুন্দর শহরকে ছারখার শ্মশানে পরিণত করার কষ্ট শুধু মানবতার কষ্ট নয়, সভ্যতার জন্যও বেদনার। আগ্রা এখনো বেঁচে আছে মৃত্যুর বিষাদ নিয়ে। সঙ্গে আছে সভ্যতার এমন বহু চিহ্ন, যা ধ্বংস ও আক্রমণের কবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে মুঘল সভ্যতার জয়গান গাইছে।
আমরা আবার ফিরে যাবো জয়পুরে, সেখান থেকে দিল্লি। ভ্রমণ পরিকল্পনায় ভুল করায় এখান থেকে সহজে দিল্লি যাওয়ার বদলে আবার উল্টো দিকের জয়পুর ফিরে গিয়ে দিল্লি যেতে হচ্ছে। ফেরার পথে গাড়িতে একে একে চোখের সামনে থেকে সরে যাচ্ছিল তাজমহল, অসংখ্য বাগিচা, স্থাপনা, আগ্রা দুর্গের মজবুত দেয়াল, ফতেহপুর সিক্রির আবছা কাঠামো, যা প্রমাণ করে এই সত্য যে, ধ্বংস করলেই সব শেষ হয় না; হত্যা করলেও সবকিছুর অবসান ঘটানো যায় না। সাম্রাজ্যবাদী-ঔপনিবেশিক শাসনের কবলে নিষ্পেষিত হয়েও শত বছরের মুঘল ঐতিহ্য ঠিকই মাথা উঁচিয়ে আছে সারা ভারতে, দক্ষিণ এশিয়ায়, সমগ্র বিশ্বে। বিশ্বসভ্যতার অংশ হয়ে বিশ্বসাংস্কৃতিক গৌরব বৃদ্ধি করছে মুঘল ঐতিহ্য। আর প্রতিনিয়ত শাসক ও শোষকদের সামনে হাজির করছে, ইতিহাসের সেই শিক্ষা, যে শিক্ষা স্বৈরাচারীরা কখনোই গ্রহণ করে না। এটাও এক অমোঘ ঐতিহাসিক শিক্ষণীয় বিষয়, ইতিহাস শিক্ষা দিলেও ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। তবু ইতিহাস শিক্ষা দিয়েই যাচ্ছে। একদার মুঘল রাজধানী সুরম্য আগ্রা নগরী ধ্বংসের করাল গ্রাস থেকে নিজেকে রক্ষা করে তেমনই এক ইতিহাসের শিক্ষালয় হয়ে আছে। আগ্রা, জীবন্ত ইতিহাস বইয়ের মতো ইতিহাসের কঠিন অধ্যায়গুলোর শিক্ষা বিতরণ করছে আজ এবং আগামীর পৃথিবীকে।  
      
ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের বর্ণনায় আগ্রা
বিশ্ববিখ্যাত ফরাসি পর্যটক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের মুঘল শাসিত ভারতে এসেছিলেন এবং একপর্যায়ে তিনি সম্রাট আওরঙ্গজেবের চিকিৎসক নিযুক্ত হন। তার ভ্রমণ-বৃত্তান্তে সেকালের বাদশাহী জীবন তো বটেই, সামাজিক, সাংস্কৃতিক জীবনেরও অতুলনীয় ইতিহাস রয়েছে। বিশেষত রাজধানী আগ্রা এবং মুঘল দরবার ও হারেমের অন্তরঙ্গ বিবরণ পাওয়া যায় তার ভাষ্যে। বার্নিয়েরের অসাধারণ পর্যবেক্ষণশক্তির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন স্বয়ং কাল মার্কস ও ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস।
বার্নিয়েরে বিবরণের গুরুত্ব একটি বিশেষ কারণে অপরিসীম। আর তা হলো, আগ্রা বা তাজমহল সম্পর্কে আমরা যা দেখি বা পড়ি, তা অন্তত কয়েক শত বছর পরের অভিজ্ঞতা। বার্নিয়েরের মাধ্যমে ঠিক সেই সময়কার ইতিবৃত্ত জানা যায়। তিনি জানিয়েছেন, আগ্রার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো দুটি স্থাপনা। একটি সম্রাট জাহাঙ্গীরের তৈরি আকবর বাদশাহের সমাধি-স্মৃতিস্তম্ভ। আর একটি সম্রাট শাহজাহানের তৈরি বেগম মমতাজের সমাধি-স্মৃতিস্তম্ভ তাজমহল। তার পর্যবেক্ষণ মতে, আকবর বাদশাহের সমাধি-স্মৃতিস্তম্ভ ও স্থাপনার যে সৌন্দর্য তা তাজমহলের মধ্যে আরো চমৎকারভাবে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। তাজমহলের বিস্তারিত বর্ণনা বার্নিয়ের তার ভ্রমণ কাহিনীতে চার পৃষ্ঠার অধিক জায়গা জুড়ে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাজমহল সম্পর্কে সমকালীন পর্যটক ও বিশ্লেষক বার্নিয়েরের মূলকথা বা সারমর্ম ছিল এই রকম:
তাজমহল বাস্তবিকই বিস্ময়কর কীর্তি। হয়তো বলবেন যে, আমার রুচি অনেকটা ভারতীয় ধরনের হয়ে গেছে, দীর্ঘকাল ভারতবর্ষে থাকার জন্য। কিন' তা নয়। আমি গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি যে মিশরীয় পিরামিড আগ্রার তাজমহলের তুলনায় এমন কিছু আশ্চর্য কীর্তির নিদর্শন নয়। মিশরের পিরামিডের কথা অনেক শুনেছি এবং দু-দুবার নিজের চোখে দেখেও যে আমি ব্যক্তিগতভাবে আনন্দ পাইনি, একথা স্বীকার করতে আমার কোনো কুণ্ঠা নেই। নিরাকার পাথরের স্তূপ ছাড়া মিশরীয় পিরামিড আমার কাছে আর কিছু মনে হয়নি। বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই স্তরে স্তরে সাজিয়ে একটা কিমাকার কিছু গড়ে তুললেই বিস্ময়কর কীর্তি হয় না। তার মধ্যে মানুষের কল্পনা বা কারিগরির নিদর্শন কিছু নেই। কিন' আগ্রার তাজমহলের মধ্যে তা আছে।
বার্নিয়ের এক চিঠিতে মুঘল সম্রাটদের প্রধান শহর দিল্লি এবং রাজধানী আগ্রা সম্পর্কে প্রত্যক্ষদর্শী রূপে অতি জীবন্ত একটি বিবরণ দিয়েছেন। ১৬৬৩ সালের জুলাই মাসে ফ্রান্সের মঁশিয়ে দ্য লা ভেয়ারের কাছে লিখা চিঠিকে মুঘল রাজ-দরবারের জীবনধারা, আচার-ব্যবহার, রীতি-নীতি তথা মধ্যযুগের মুঘল শাসিত ভারতবর্ষের সামাজিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন তিনি:
মঁশিয়ে, আমি জানি আমি স্বদেশে ফিরে আসবার পর আপনি প্রথমেই আমাকে হিন্দুস্থানের রাজধানী তথা দিল্লি ও আগ্রা শহরের কথা জিজ্ঞাসা করবেন। সৌন্দর্যে, আয়তনে ও লোকজনের বসবাসের দিক থেকে ফরাসি শহর প্যারিসের সঙ্গে দিল্লি ও আগ্রার তুলনা হয় কিনা, সেকথা জানবার জন্য এবং আমার কাছ থেকে শুনবার জন্য আপনি ব্যাকুল হয়ে উঠবেন।
দিল্লি ও আগ্রার সৌন্দর্য-প্রসঙ্গে প্রথমেই একটি কথা আমি বলতে চাই। আমি দেখেছি, অনেক সময় ইউরোপীয় পর্যটকরা বেশ একটা উদাসীন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে হিন্দুস্থানের এইসব শহরের কথা বলে থাকেন। তাদের মন্তব্য শুনে আমি অবাক হয়ে যাই। পাশ্চাত্য শহরের সঙ্গে এসব শহরের সৌন্দর্য্যের তুলনা করেন যখন তারা তখন একটি কথা একেবারেই ভুলে যান যে ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুযায়ী স্থাপত্যের বিভিন্ন স্টাইলের বিকাশ হয়। প্যারিস, লন্ডন বা আমস্টার্ডামের স্থাপত্য আর হিন্দুস্থানের স্থাপত্য এক ও অভিন্ন হতে পারে না। কারণ, ইউরোপে যা বাসোপযোগী, হিন্দুস্থানে তা ব্যবহার্য নয়। কথাটা যে কতখানি সত্য তা রাজধানী স্থানান্তরিত করলেই বোঝা যেতে পারে। ইউরোপের শহর যদি হিন্দুস্থানে স্থানান্তরিত করা যায়, তাহলে তা সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে নতুন পরিকল্পনায় আবার গড়ে তোলার দরকার হবে। ইউরোপের শহরের সৌন্দর্য অতুলনীয় স্বীকার করি। কিন' তার একটা নিজস্ব রূপ আছে, যেটা শীতপ্রধান দেশের রূপ। সেইরকম দিল্লি-আগ্রারও একটা নিজস্ব সৌন্দর্য আছে, যেটা গ্রীষ্মপ্রধান দেশের শহরের সৌন্দর্য।     

বার্নিয়ের জানান, যমুনা তীরে বর্তমান সম্রাট আওরঙ্গজেবের পিতা সম্রাট শাহজাহান দিল্লি শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন নিজের নাম অমর করার জন্য। নতুন রাজধানীর নামকরণ তার নামেই হবে, এই ছিল তার বাসনা। সে মতে, দিল্লি শহর যখন নতুন করে তৈরি হলো, তখন তার নাম রাখা হয়  শাহজাহানাবাদ বা সংক্ষেপে  জাহানাবাদ। যার অর্থ, সম্রাট শাহজাহানের বাসস্থান।
সম্রাট শাহজাহান সি'র করেন, নতুন নির্মিত দিল্লি বা শাহজাহানাবাদেই তিনি আগ্রা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত করবেন। কারণ, আগ্রায় গ্রীষ্মের উত্তাপ এতো বেশি যে, সেখানে তার পক্ষে বাস করাই সম্ভব নয়। (শেষ জীবনে একটি দীর্ঘ সময় তাকে কিন' আগ্রা দুর্গে বন্দি হয়েই কাটাতে হয়।) মুহাম্মদ ঘোরি প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন দিল্লির ধ্বংসাবশেষের ওপর সম্রাট শাহজাহান প্রতিষ্ঠিত নতুন দিল্লি নগরী গড়ে উঠলো। হিন্দুস্থানে এখন আর কেউ দিল্লিকে দিল্লি বলেন না, জাহানাবাদ বলেন।  

আগ্রা কিন' দিল্লির চাইতেও প্রাচীন শহর। অনেক মুসলিম ও মুঘল সম্রাট শহরটির প্রতিষ্ঠা ও বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন। তবে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে শহরটি পরিপূর্ণ অবয়ব ও মর্যাদা লাভ করে। সেজন্য আগ্রার প্রাচীন নাম ছিল আকবরাবাদ। দিল্লির চাইতে অনেক বড় শহর আগ্রা। আগ্রায় আমির-ওমরাহ, রাজা-রাজড়াদের বাড়িঘরও অনেক বেশি। পাকাবাড়ি, ইটপাথরের বাড়ির সংখ্যা দিল্লির চাইতে আগ্রায় অধিক। ক্যারাভান, সরাইয়ের সংখ্যাও দিল্লির চেয়ে আগ্রায় অনেক বেশি। বিশেষত, বিখ্যাত কীর্তিস্তম্ভের জন্য আগ্রার খ্যাতি সমধিক। আগ্রার রাস্তাঘাট অবশ্য দিল্লির মতন সুপরিকল্পিত নয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র চার-পাঁচটি রাস্তা মোটামুটি সুন্দর, ঘরবাড়িও মন্দ নয়। তা ছাড়া বাকি সব রাস্তা খুবই সংকীর্ণ, ঘিঞ্জি ও আঁকাবাঁকা।

দিল্লি তুলনায় আগ্রাকে অনেকটা মফস্বল শহরের মতন মনে হয়। আমির-ওমরাহ, রাজা-রাজড়াদের বাড়িঘর অনেকটা বাগানবাড়ির মতন উদ্যান পরিবেষ্টিত, খোলামেলা এবং রাজকীয় ঢঙে নির্মিত। তার মধ্যে ধনী হিন্দু বেনিয়ান ও ব্যবসায়ীদের বাড়িগুলো ঠিক প্রাচীন দুর্গের মতো দেখায়। প্রাকৃতিক পরিবেশের দিক থেকে বিচার করলে আগ্রা শহর দিল্লির তুলনায় অনেক বেশি মনোরম মনে হয়। গ্রীষ্মপ্রধান দেশে সবুজের সমারোহ যে কতো মনোমুগ্ধকর তা বর্ণনা করা যায় না।  

আগ্রা শহরে জেসুইটদের একটি গির্জা আছে। একটি প্রতিষ্ঠানও আছে পৃথক বাড়িতে, যাকে  কলেজ বলা হয়। প্রায় পঁচিশ-ত্রিশটি খ্রিষ্টান পরিবারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের এখানে খ্রিষ্টধর্ম সম্বন্ধে শিক্ষা দেয়া হয়। বার্নিয়েরের মতে, কোথা থেকে কীভাবে এই খ্রিষ্টান পরিবারগুলো এখানে জুটলো, তা জানি না। এইটুকু জানি যে, জেসুইটদের আর্থিক দানের লোভেই তারা এখানে এসেছে এবং তার ওপর নির্ভর করেই তারা বসবাস করছে। এই পাদ্রি সাহেবরা আকবর বাদশাহের আমলে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন এখানে। ভারতবর্ষে পর্তুগিজদের প্রতিপত্তি ছিল যখন খুব বেশি, তখন সম্রাট আকবর এই ধর্মযাজকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে এনেছিলেন। সম্রাট আকবর এই পাদ্রিদের একটা বাৎসরিক আয়েরই যে ব্যবস্থা করেছিলেন, শুধু তাই নয়, আগ্রায় ও লাহোরে তাদের গির্জা নির্মাণ করার অনুমতি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। জেসুইট পাদ্রিরা অবশ্য আকবর বাদশাহের পুত্র সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে আরও বেশি সহযোগিতা ও সমর্থন পান। কিন' সম্রাট জাহাঙ্গীরের পুত্র সম্রাট শাহজাহানের কাছ থেকে তারা পান প্রচণ্ড বিরোধিতা ও শত্রুতা। তবে খ্রিষ্টান গির্জার ঘড়ির শব্দ সারা আগ্রা শহরে শোনা যেতো।

ফরাসি পর্যটক বার্নিয়ের যে আমলের আগ্রা ও তাজমহলের বিবরণ দিয়েছেন, তা সম্রাট শাহজাহান পরবর্তী সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়কালের কথা। কালের করাল গ্রাসে সেসব চিত্রের অনেক কিছুই বিলীন হয়ে গিয়েছে। তথাপি আগ্রা মুঘল ঐতিহ্য আর তাজমহলের গৌরব নিয়ে বহাল রয়েছে। বহু ধর্ম ও বর্ণে মানুষের মতো আগ্রা এখনো বিশ্বের নানা জাতির পর্যটকদের আকর্ষণ করছে একটি আন্তর্জাতিক কসমোপলিটন শহরের মতো।   

দক্ষিণ এশিয়ার আইকন আগ্রার তাজমহল
বলা হয়ে থাকে, পৃথিবীতে মানুষ আছে দুই ধরনের। একদল, যারা তাজমহল দেখেছে। আরেক দল, যারা তাজমহল দেখেনি। দেখুক বা না দেখুক, আগ্রার তাজমহল তাবৎ পৃথিবীর মানুষকেই আকৃষ্ট করছে অহর্নিশি। সারা বিশ্ব তো বটেই, পাক-ভারত-বাংলা উপমহাদেশের একক কোনো ব্র্যান্ডের নাম করতে হলেও বলতে হয় তাজমহলের নাম। দক্ষিণ এশিয়ার আইকন রূপে চিহ্নিত করা যায় আগ্রার তাজমহলকে। উপমহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের আফগান সীমান্তের খাইবার পাস থেকে পূর্ব প্রান্তের মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন চট্টগ্রামের টেকনাফ পর্যন্ত এবং উত্তরের কাশ্মীর থেকে দক্ষিণের কন্যাকুমারী পর্যন্ত এমন কোনো ছোট-বড় শহর, জনপদ নেই, যেখানে তাজের নাম উচ্চারিত হয় না।

আমার জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের জনপ্রিয় খাবারের দোকানের নাম তাজ হোটেল। ময়মনসিংহ শহরের সবচেয়ে নামকরা প্রতিষ্ঠানটি রেল স্টেশনের সামনের তাজমহল হোটেল। ঢাকা-চট্টগ্রামে সড়ক পথে যাতায়াতের সময় কুমিল্লায় যে একাধিক অভিজাত হোটেলে বিরতি দেয়া হয়, তার অন্যতম একটি হলো তাজমহল। চট্টগ্রাম শহরের আনন্দকিল্লায় সবচেয়ে বনেদি প্রতিষ্ঠানের নাম তাজ সায়েন্টিফিক, যেখানে নানা ধরনের বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়।
নেপালে যেমন যেদিকেই তাকানো যাক, হিমালয় নামের পানি, বাস, হোটেল, দোকানের ছড়াছড়ি, দক্ষিণ এশিয়ার সর্বত্র তেমনি তাজ নামটি দৃষ্টিগোচর হয়। হয়তো অনেকেই তাজমহল দেখেন নি। তথাপি দেখার আগ্রহ বুকে ধারণ করেন এবং নিজের প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন। সাধারণ মানুষও তাজ নামকে একান্ত নিজস্ব ও আপন ভেবে গ্রহণ করেন।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন ও অভিজাত হোটেল চেইনের সঙ্গে মিশে আছে তাজমহলের নাম, যা একদিকে উপমহাদেশীয় গৌরব ও বৃটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে স্বদেশী প্রত্যয়ের প্রতীকস্বরূপ এবং জাতীয় জাগরণের ঐতিহাসিক ছোঁয়ায় মহিমান্বিত। একথা সবারই জানা যে, টাটাদের প্রথম দিকের উদ্যোগগুলো যেসব ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে ও নানা মাত্রায় বৃটিশবিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনার সম্পর্ক ছিল। সম্ভবত এটা সবচেয়ে বর্ণময় রূপে দেখা গিয়েছিল বোম্বাইয়ের একটি সর্বোচ্চ স্তরের বিশ্বমানের হোটেল প্রতিষ্ঠার জন্য জামসেদজী টাটার দৃঢ় সংকল্পের মধ্যদিয়ে, যার নেপথ্যে একটি বহুকথিত কাহিনী রয়েছে।

একবার জামসেদজী টাটা তার এক বিদেশি বন্ধুকে খাওয়ানোর জন্য তৎকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পায়ার্কস অ্যাপোলো হোটেলে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে তাকে বলা হয় যে হোটেলটিতে কেবলমাত্র ইউরোপীয়দের প্রবেশাধিকার রয়েছে। ফলে হোটেলে তার বন্ধুকে স্বাগত জানানো হচ্ছে, কিন' তাকে নয়। তারপরই জামসেদজী ১৯০৩ সালে তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা-প্রসূত হোটেল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন, যার নাম ঠিক করেন তাজমহল। তাজমহল ছিল বোম্বাইয়ে প্রথম বৈদ্যুতিক আলোয় আলোকিত ভবন এবং যা অচিরেই সমারসেট মম থেকে গ্রেগরি পেক-এর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করেছিল। স্পষ্টতই এই গল্পে সত্যতা রয়েছে, যা আর. এম. লাল তার ক্রিয়েশন অব ওয়েলথ গ্রনে' লিপিবদ্ধ করেছেন। অমর্ত্য সেন মনে করেন, কাহিনীটি আত্মপরিচয় ও অগ্রাধিকার সম্পর্কে জামসেদজীর বোধ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে অবশ্যই সমৃদ্ধ করেছে। আর এক্ষেত্রে হাতিয়ার ছিল মুঘল গৌরবসিক্ত তাজমহলের নাম ও মাহাত্ম্য।     

টাটাদের তাজ হোটেল সারা ভারত ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বে পৌঁছে গেছে। কলকাতাতেও সবচেয়ে নামি হোটেলের নাম তাজ বেঙ্গল। উপমহাদেশের সর্বত্র শ্রেষ্ঠ থেকে সাধারণ মানের হোটেলের সঙ্গে তাজের নাম যুক্ত হওয়ার ঘটনাটি দৃষ্টান্তমূলক। সারা দক্ষিণ এশিয়ায় তাজ/তাজমহল ছাড়া আরেকটি নাম পাওয়া যাবে না, যা ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, অঞ্চল নির্বিশেষে সকলের কাছেই সার্বজনীনভাবে সাদরে গৃহীত হয়েছে। শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার যেখানেই বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের অভিবাসীরা রয়েছেন, সেখানেই তাজ বা তাজমহল নামের একটি প্রতিষ্ঠান, নিদেনপক্ষে হোটেল রয়েছে।
আগ্রা ও তাজমহল নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখির অন্ত নেই। তাজমহল নিয়ে যত উক্তি করা হয়েছে, তা নিয়েও ইংরেজি ভাষায় একাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন' রয়েছে। তাজমহলের অতীত, ইতিহাস, রোমাঞ্চ এবং তাতে বসবাসকারী বা জড়িতদের নিয়েও গল্প, উপন্যাসের কমতি নেই। তাজমহলে শায়িত মমতাজমহলের মতোই নানা গবেষক ও লেখক আকৃষ্ট হয়েছেন আগ্রা তথা মুঘল ইতিহাসের বিভিন্ন চরিত্রের প্রতি। যাদের মধ্যে একাধিক মুঘল সম্রাট ছাড়াও রয়েছেন নূরজাহান, জাহান আরা, রওশান আরা, আনারকলি প্রভৃতি আলোচিত চরিত্র।

অ্যালেক্স রাদারফোর্ড রচনা করেছেন Empire of Moghil: Ruler of the World নামের সুবিখ্যাত গ্রন'। অ্যালেক্স রাদারফোর্ড হলো দুইজনের পেন নেইম বা লেখক নাম। তারা হলেন ডায়না প্রিস্টন এবং মাইকেল প্রিস্টন। মুঘল ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী পশ্চিমা লেখকদের অন্যতম এই দুইজন লেখক অ্যালেক্স রাদারফোর্ড নামে Empire of Moghil: Ruler of the World বিখ্যাত গ্রন' ছাড়াও মুঘল বিষয়ক Empire of Moghil সিরিজের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গ্রন' প্রকাশ করেছেন। এগুলো হলো: Empire of Moghil: Raiders from North, Empire of Moghil: Brothers at Wat, Empire of Moghil: Ruler of the World, Empire of Moghil: The Tainted Throne, Empire of Moghil: The SerpentÕs Tooth, Empire of Moghil: Traitors in the Shadwos।
তাছাড়া মুঘল ঘটনাবলির বিশ্বস্ত সাংস্কৃতিক বিবরণ পাওয়া যায় তাজমহল ট্রিলজির রচয়িতা ভারতীয়-আমেরিকান লেখক ইন্দু সুন্দারেসানের অ্যাখ্যানে। তাজমহল ট্রিলজিতে যে তিনটি গ্রন' রয়েছে, সেগুলো হলো: BOOK ONE:  The Twentieth Wife, BOOK TWO: The Feast of Roses, BOOK THREE:  Shadow Princess। কাহিনীগুলোর সূত্রপাত প্রাচীন পারস্য থেকে ভারতের পথে আগত আমত্য গিয়াস বেগের পরিবারের যাত্রাপথের রোমাঞ্চকর বিবরণের মধ্যে আবর্তিত। পথিমধ্যে আফগানিস্তানের কান্দাহারে গিয়াস-পত্নী মেহেরুন নেসা নামে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। নানা বির্পযয় পেরিয়ে এক সময় গিয়াস বেগ সম্রাট আকবরের রাজদরবারে স্থান লাভ করেন। তার কন্যা বিবাহসূত্রে আগ্রা থেকে বাংলায় চলে আসেন। প্রাথমিক অবস্থায় কন্যার বৈবাহিক জীবনে নানা বিপদ ও সমস্যা নেমে আসে। অবশেষে বহু উত্থান-পতনের মধ্যদিয়ে জন্মের ৩৪ বছর পর এই কন্যা নূরজাহান নামে মুঘল ভারতের সম্রাজ্ঞীর আসন লাভ করেন। এটাই ট্রিলজি বা তিনখণ্ডের প্রথম বইটির মূল উপজীব্য বিষয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রনে' সম্রাট শাহজাহান-পত্নী মমতাজ মহল আর তদীয় কন্যা জাহান আরার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। আগ্রার মুঘল রাজপরিবার ও হেরেমের অন্তরঙ্গ বিবরণ, প্রেম ও প্রণয়ের বহুমাত্রিক ভাষ্য লিপিবদ্ধ রয়েছে ‘তাজমহল ট্রিলজিতে’।

বাংলা ভাষায় আনিস সিদ্দিকী  মুঘল হেরেমের অন্তরালে নামের এক চমৎকার গ্রন' রচনা করেন, যা মূলত সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ভাগ্যহত জীবনের উত্থান-পতনের নাটকীয় কাহিনীগুলোকে চিত্রিত করেছে। এতে আগ্রা শহর, আগ্রা দুর্গ, আগ্রার বিশিষ্ট চরিত্রসমূহ, যেমন তাজমহলে চিরনিদ্রায় শায়িত সম্রাজ্ঞী মমতাজ মহল, সম্রাট শাহজাহানের কন্যা জাহান আরা, রওশন আরা প্রমুখের জীবনালেখ্যের কথাও এসেছে। সম্রাট শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে মুঘল রাজধানী আগ্রা শহর আর রাজ-অন্তঃপুর ছিল উত্তাল। সেসময় জাহান আরা দারাশিকোহর এবং রওশন আরা আওরঙ্গজেবের পক্ষে ছিলেন। আগ্রার রাজদরবারের মতোই হেরেমের অভ্যন্তরে ক্ষমতার লড়াই ও রাজনৈতিক মেরূকরণ জমে উঠেছিল।

এসব কারণে আগ্রার মুঘল হেরেম নিয়েও গবেষণার অন্ত নেই। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: রুবি লালের Domesticity and Power in the Early Mughal World, কে. এস. লালের The Mughal Harem, করুণা শর্মার A Visit to the Mughal Harem: Lives of Royal Women, South Asia, তিরমিজি সাই-এর Edicts from the Mughal Harem, সুগন্ধা রাওয়াতের The Women Of Mughal Harem, বাঁশি শর্মার The Naked Mughals: Forbidden Tales of Harem and Butchery, রেশমি বাচ্চুর গঁমযধষ ঐধৎবস, সুভদ্রা সেনগুপ্তার Mahal: Power and Pageantry in the Mughal Harem এবং তনুশ্রী পোদ্দারের Escape from Harem অন্যতম। এসব প্রসিদ্ধ গ্রনে' ঐশ্বর্যশালী মুঘল সাম্রাজ্যের বিবর্তনের সমান্তরালে রাজধানী আগ্রা, রাজদরবার ও হেরেমের উত্থান ও বিকাশ, আগ্রার অন্যতম প্রধান নির্মাতা সম্রাট আকবরের হাতে নগরীর মতোই হেরেমের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন, মুঘল রাজধানীর পাওয়ার, পলিটিক্স ও পার্সোনালিটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এসেছে আগ্রা নগরের আলোকিত ও অন্ধকার নানা দিকও। মুঘল আগ্রার পটভূমিতে বিশেষ বিশেষ কাউকে কেন্দ্র করে উপন্যাস বা আখ্যান বা কাহিনীও রচিত হয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে বহু লোকশ্রুতি, মিথ ও উপাখ্যান।

বাংলার সাহিত্যের প্রায়-সকল প্রধান কবিই তাজমহল নিয়ে অসাধারণ কবিতা রচনা করেছেন। যে তালিকার উপরের দিকে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের নাম। উর্দু ও হিন্দি সাহিত্যে তাজমহল পেয়েছে সর্বোচ্চ মর্যাদা। বিখ্যাত কবি ও গীতিকার সাহির লুধিয়ানভী ও লেখিকা অমৃতা প্রীতমের মধ্যে যে অভাবনীয় প্রেমময়তা বিরামজান ছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আগ্রার তাজমহল। আগ্রার সঙ্গে মিশে রয়েছে এমন এক ট্র্যাজিক নায়িকার নাম, তিনি বাস্তব নাকি কাল্পনিক চরিত্র, তা নিয়ে বিস্তর সংশয় থাকলেও জনপ্রিয় হয়ে আছেন তিনি আনারকলি নামে মানুষের মুখে মুখে, লোককথায়, চলচ্চিত্রে, নাটকে ও সাহিত্যে। অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র মুঘল-ই-আজম নির্মিত হয়েছে যার করুণ প্রেমের ভিত্তিতে।
মুঘল ভারতের অলিন্দে এখনো লুক্কায়িত ইতিহাসের অধ্যায়, প্রেমের আখ্যান, আনন্দের ধ্বনি এবং বেদনার ইতিবৃত্ত, যা গৌরব ও ঐতিহ্যের সমান্তরাল ধারায় রোমাঞ্চকর শিহরণে আজও প্রবহমান। 

mzamin

Monday, March 31, 2025

মোগল আমলে যেমন ছিল ঢাকার ঈদ by সাদিয়া মাহ্‌জাবীন ইমাম

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে প্রকাশিত একটি পোস্টকার্ডে দেখা যায়, সতেরো শতকের শুরুতে নায়েব নাজিমদের ঈদ উদ্‌যাপন, ঈদ মিছিলের দৃশ্য। সেখানে তৎকালীন ঢাকার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চকবাজার, বড় কাটরার ফটক ও মীর জুমলার কামান ‘বিবি মরিয়ম’ দৃশ্যমান।

ছবির সেই ঈদের মিছিলটি নিমতলী প্রাসাদ থেকে বের হয়ে হোসেনি দালান, বেগমবাজার, চকবাজার ঘুরে আবার নিমতলীতে গিয়ে শেষ হয়। জলরঙে আঁকা শিল্পী আলম মুসাওয়ারের এসব চিত্রকলায় ধরা আছে শত শত বছর ধরে পুরান ঢাকায় মোগল ঐতিহ্যের পরম্পরার কথা।

একই সময়ের মোগল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রের একটি দৃশ্য দেখা যাক। হাতি এনে বসানো হলো বাদশাহর সামনে। পাশে হাওদায় রাখা রত্নখচিত শৈল্পিক কেদারায় বসলেন বাদশাহ। কেদারা তুলে দেওয়া হলো হাতির পিঠে। হাতিযোগে বাদশাহ আর পদযোগে রাজকর্মচারীরা চললেন দিল্লির ঈদগাহ অভিমুখে নামাজ পড়তে। মোগল আমলের শেষ দিকের ঈদ মিছিলের এমন বর্ণনা পাওয়া যাবে মুন্সি ফাইজুদ্দিনের ‘বাজম-ই আখির’ নামের লেখা উর্দু কাব্যগ্রন্থে। সতেরো শতকে লেখা হয় এই কাব্যগ্রন্থ।

মূলত মোগলদের ঈদের দুই ধারার বর্ণনা পাওয়া যায়। রাজ্য বিজয়ের জন্য যখন ঘোড়ার খুরের সঙ্গে পথে পথে ছন্দ মেলাতে হতো অথবা শত্রুর আক্রমণ থেকে পালিয়ে বাঁচতে হতো, তখন ঈদের উৎসব হতো না। কিন্তু যখন ঈদ উৎসব করতে চেয়েছেন, তখন তা হয়েছে শত শত বছর পরও স্মরণ করার মতোই জাঁকজমকপূর্ণ ইতিহাস। তবে এর সবই ছিল মোগল বাদশাহ, সুবেদার ও বিত্তবানদের জন্য। সাধারণ মানুষের জীবনে সে প্রভাব কমই পড়েছে মোগল আমলে। হোক দিল্লিতে অথবা ঢাকায়।

ঈদ গণমানুষের উৎসব ও অংশগ্রহণের হয়েছে ব্রিটিশ শাসন শেষ হওয়ার পর। তখন পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে আবার ফিরে এসেছে মোগলরীতির ঈদ ঐতিহ্য। গত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পুরান ঢাকার ঈদে ছিল সেই ছাপ, যা এখনো বর্তমান এখানকার প্রবীণদের শৈশবস্মৃতিতে। এক মাস সিয়াম সাধনার পর রোজার ঈদের দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতো চাঁদ দেখা দিয়ে।

একই চাঁদ দিল্লি আর ঢাকার আকাশে

দিল্লির লালকেল্লায় চাঁদ দেখার খবর সম্রাটের কানে পৌঁছানোর পর ‘নাকাখানা’ থেকে তোপধ্বনি করার মাধ্যমে তা জানিয়ে দেওয়া হতো শহরবাসীকে। তবে চাঁদটি যে কেল্লা থেকে দেখা যাবেই, এমন নিশ্চয়তা ছিল না। তাই মোগল বাদশাহরা নিশ্চিত হতে ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে দিতেন শহরের নানা দিকে। অশ্বারোহীরা দূরে দূরে বিভিন্ন টিলায় উঠে যেতেন চাঁদ দেখতে।

সত্যি চাঁদ দেখা গেছে কি না, এ জন্য আবার কাজিকে সাক্ষী মানতে হতো। সেই হুলুস্থুল ব্যাপার ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়েছে ক্ষমতার পালাবদলে। একসময় খোদ বাহাদুর শাহ জাফরকে ঈদের নামাজ আদায় করতে হয়েছে ইংরেজ শাসকদের নজরদারিতে। তবে মোগল বাদশাহর মতো এত জাঁকজমক না থাকলেও পুরান ঢাকার বিত্তবানদের শখও কম ছিল না চাঁদ দেখা নিয়ে।

এই আয়োজনের বর্ণনা পাওয়া যায় ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হেকিম হাবীবুর রাহমানের ‘ঢাকা পাচাস বারাস পাহ্লে’ গ্রন্থে। তিনি বলেছেন, ‘অতি শৌখিন লোকেরা নৌকার সাহায্যে মধ্য নদীতে গিয়ে চাঁদ দেখতেন। কিশোর ও যুবক সবাই যেত। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সী লোকেরা নিজের দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করার জন্য অবশ্যই যেতেন...অবশেষে চাঁদ দেখা গেল। বন্দুকের গুলি ছোড়া হলো। তোপধ্বনি করা হলো। এমন সরব হলো যে বধিরও জানতে পারল যে চাঁদ উঠেছে।’

এ বর্ণনা ১৯৪৫ সালের আগের ঢাকার। কিন্তু এখন আর চাঁদ দেখতে না যেতে হয় ঘোড়া নিয়ে দূরের টিলায়, না যেতে হয় বুড়িগঙ্গায়। দিল্লি বা ঢাকা সব জায়গাতেই চাঁদ উঠলে দেখতে পারে সবাই। তবু কিন্তু চাঁদ দেখা গেল কি গেল না, তা নিয়ে উন্মাদনার কমতি ঘটেনি এখনো।

মোগল রীতির প্রভাবের একটি বড় উদাহরণ স্থাপত্য, যার সাক্ষী হয়ে আছে এ অঞ্চলের কয়েকটি শাহি ঈদগাহ। যেখানে ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়াই ঈদের সকালের প্রথম আনুষ্ঠানিকতা।

স্থাপনায় মোগল ইতিহাস

ঢাকার প্রথম শাহি ঈদগাহ নির্মাণের সময় বহু আগের। বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে আসার ৪৪ বছর পর ১৬৪০ সালে। সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজার প্রধান অমাত্য মীর কাশিম নির্মাণ করেছিলেন বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত পুরাকীর্তি ধানমন্ডির ঈদগাহটি। এখানে একসময় অনুষ্ঠিত ঈদের প্রধান জামাতে আসতেন সুবা বাংলার সুবাদার, নায়েবে নাজিম ও তাঁদের পরিষদেরা। সাধারণ মানুষ এই মসজিদে নামাজ আদায়ের সুযোগ পেয়েছেন অনেক পরে।

৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী সিলেটের শাহি ঈদগাহটিও মোগল আমলের। সপ্তদশ শতকের গোড়ার দিকে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে এই ঈদগাহ নির্মিত হয়েছিল। ওই সময় সিলেটের ফৌজদার ছিলেন ফরহাদ খাঁ। তাঁরই তত্ত্বাবধানে ঈদগাহ নির্মিত হয় বলে জানা যায়। পরে অনেক রকম পরিবর্তন হয়েছে, তবে মূল স্থাপত্য নকশা আছে সেই সুপ্রাচীন আদলেই। ফলে এই ঈদগাহও মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন। সাধারণ মানুষের জীবনে সে আমলে ঈদের উৎসবের কথা সেভাবে জানা না গেলেও মোগলদের তৈরি বিভিন্ন স্থাপনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঈদের স্মৃতি।

আরেকটি ছিল ঈদ মিছিল। তখন রাজনির্দেশেই আয়োজিত হতো ঈদের মিছিল। যার অনুকরণে ঢাকায়ও হয়েছে মিছিল, যার উদাহরণ রয়েছে পোস্টকার্ডে।

ঈদ মিছিলের আয়োজন

মুহম্মদ সাকি মুস্তক খান ও মির্জা মুহম্মদ কাজিম প্রণীত ‘মসির ই আলমগিরি’ নামে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের জীবনীতে উল্লেখ পাওয়া যায়, তাঁর অধিকাংশ বিজয় রোজার মাসে হয়েছে। প্রথম দিকে তাই এ মাসে শুরু হয়েছিল উদ্‌যাপন। সংযমের মাস বিবেচনায় পরে উৎসব সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ঈদের দিন সকাল থেকে পরবর্তী ১০ দিন পর্যন্ত।

মোগল আমলের শেষ দিকের ঈদ বর্ণনা স্থান পেয়েছে ‘বাজম-ই আখির’ বইতে। বইটি উর্দু থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন ভারতের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও স্থাপত্য নিয়ে গবেষণা করা প্রখ্যাত লেখক রানা সাফভি। রানা সাফভির ‘হাউ দ্য বাদশাহস অব দিল্লি সেলিব্রেটেড ঈদ ডিউরিং দ্য ফাইনাল ইয়ারস অব দ্য মোগল এম্পায়ার’ প্রবন্ধে উল্লেখ পাওয়া যায়, ঈদ মিছিলের কথা। সেখানে উল্লেখ আছে বাহাদুর শাহ জাফর হাতির পিঠে ওঠার জন্য কেদারায় বসার পর তাঁর পাশে বসলেন বাদশাহর ছেলেরা। ঈদগাহ অভিমুখে ঈদের প্রথম জামাত আদায়ের সে যাত্রাই হতো ঈদ মিছিল। মোগল আমলের এই ঐতিহ্য ঢাকা শহরেও এসেছে মোগল আমলেই। প্রসঙ্গত, ঢাকার চকবাজারের শাহি মসজিদ আর দিল্লির জামা মসজিদের নির্মাণকালের মধ্যে ব্যবধান মাত্র ৩০ বছরের মতো।

বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে প্রকাশিত পোস্টকার্ডে সতেরো শতকের শুরুতে নায়েব নাজিমদের ঈদ উৎসব উদ্‌যাপন, ঈদ মিছিলের দৃশ্য আমরা আগেই বর্ণনা করেছি। তবে তখনো ঈদ শুধু বিত্তবানদের। রাজধানী ঢাকাতে সবাইকে নিয়ে ঈদ মিছিলের জমকালো আয়োজন আবার শুরু হয় দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে। তবে সে মিছিল থেকে সামাজিক সচেতনতা, প্রশাসকদের ব্যর্থতা নিয়ে ব্যঙ্গবিদ্রূপের কথাও উঠে আসে। ফলে ঈদ মিছিল অনেকটা জড়িয়ে ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের সেই ঈদ মিছিলের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ঢাকা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আজিম বখশ প্রথম আলোকে বললেন, ঈদের নামাজের ক্ষেত্রে ভাগ ছিল তখনো। আহলে হাদিসের অনুসারীরা ঈদের জামাত পড়তে যেতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে। পুরান ঢাকার ঈদগাহতে নামাজ শেষে এলাকার বিশিষ্টজনেরা যেতেন পঞ্চায়েত সরদারের বাড়িতে। তখন নারীরা ঈদের নামাজ বাড়িতেই পড়তেন।

খাবারে মোগল প্রভাব

উর্দু রোডের বাসিন্দা লেখক হুমায়রা হুমা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘সুপারি কাটার সরতা দিয়ে চিকন করে কেটে রাখা হয় খুরমা। সেটা ভিজিয়ে রাখা হয় দুধের মধ্যে। বাড়ির মা-খালা, স্ত্রী কাজটি আগের রাতে করে রাখেন। পুরুষেরা সেই খাবার মুখে দিয়ে যান নামাজ পড়তে। এই প্রচলন বহুকালের।’

ঈদ উৎসবের মোগল ঐতিহ্যের অনেক কিছু হারিয়েছে এভাবে। তবু রয়েছে রসনাবিলাসের পরম্পরা। মোরগ পোলাও থেকে কাচ্চি বিরিয়ানি, কোরমা থেকে কোপ্তা—এর সবকিছুতে মোগলদের রসুইঘরের মতো পেস্তাবাদাম, দুধ, ঘি, জাফরানের ব্যবহার প্রাধান্য পায় পুরান ঢাকার ঈদের রান্নায়।

উর্দু রোড, আগামসি লেন, বংশালসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন মহল্লার পুরুষেরা ঈদের সকালে নামাজ পড়তে যান দুধে ভেজানো খোরমা খেয়ে। এর নাম শির খোরমা। কোনো কোনো বাড়িতে সকালেই হয় দুধ সেমাই, জর্দা, লাচ্ছা সেমাই। ফিরে এসে খান পোলাও বা খিচুড়ির সঙ্গে নানা পদের মাংস। এই মিষ্টি মুখে দিয়ে নামাজে যাওয়া মোগল আমলের পরম্পরা।

বংশালের কয়েকজন ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা বললেন, তাঁদের ছোটবেলায় ঘরে পিতলের তৈরি সেমাইয়ের কল দিয়ে সেমাই বানানো হতো। এর নাম ছিল চুটকি। সেটাই রান্না করা হতো ঈদের দিন সকালে। পানি ঠান্ডা করার কায়দা ছিল কর্পূর, ফিটকিরি। ঈদের রান্নার মসলা করে রাখা হতো আগের রাতে। এখন এসব কল্পনা মনে হয়। সময় কোথায় মানুষের!

বংশালের এই বাসিন্দাদের অনেকের সন্তান এখন থাকেন বর্ধিত ঢাকায়। তাঁরা ঈদের দিন বংশালের বাড়িতে যান। তবে ঐতিহ্য রক্ষার বাধ্যবাধকতা নেই তাঁদের দ্রুতগতির জীবনে। এখানকার বাসিন্দারা অভিযোগ করলেন, পুরান ঢাকার ঐতিহ্য বলে অনেক কিছু চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে এখন, যা আদতে পুরান ঢাকার নয়। যেমন চকবাজারের ইফতারের আইটেমের নাম বলে অনেক কিছু বিক্রি হয়। কিন্তু একসময় মানুষ কি কেনা খাবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল?

ইতিহাসবিদ ও গবেষক হাশেম সূফী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকার ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো হলেও বর্তমান পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্য মোগল আমল থেকে। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন শুরু হয়েছে পাকিস্তান আমলের শেষ সময় থেকে। এ সময় রেস্তোরাঁয় খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। এরপর বাংলাদেশের জন্মের অনেক পরে শুরু হয় হোটেলে বসে ইফতারের সুযোগ।’

ঢাকার নবাবদের আয়োজনে হতো বাহারি ঘোড়দৌড়। ঈদ উৎসব তখনও আমজনতার হয়নি
ঢাকার নবাবদের আয়োজনে হতো বাহারি ঘোড়দৌড়। ঈদ উৎসব তখনও আমজনতার হয়নি। ছবি: সংগৃহীত