Saturday, January 9, 2016

পৌর নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি : ছহুল হোসাইন by কাজী জেবেল

৩০ ডিসেম্বর দেশের ২৩৪ পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে; অন্যদিকে বিজিত বিএনপি নির্বাচনী ফল প্রত্যাখ্যান করেছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ছহুল হোসাইন পৌরসভা নির্বাচনের বিভিন্ন দিক নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার মতে, এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। তিনি আরও মনে করেন, নির্বাচনে সহিংসতা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দেবে, দেশে জঙ্গিবাদের মতো বড় সমস্যারও উদ্ভব ঘটবে।
প্রশ্ন : পৌরসভা নির্বাচনের সার্বিক বিষয় নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর : পত্রপত্রিকা ও টেলিভিশনগুলোতে দেখেছি, অনেক কেন্দ্রে বিপুলভাবে আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও কোথাও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া দেখা গেছে। সহিংসতাও হয়েছে। আবার অনেক কেন্দ্রে নির্বিঘ্নে ভোট গ্রহণ হতে দেখা গেছে। ভোটের দিন আওয়ামী লীগের পক্ষে এইচটি ইমাম সাহেবকে নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে অভিযোগ করতে দেখেছি। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, নির্বাচনে অনেক পৌরসভায় বিএনপি-জামায়াত ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। অপরদিকে বিএনপিকেও অভিযোগ করতে দেখেছি। ভোটের দিন তারাও দফায় দফায় অভিযোগ করেছে। অর্থাৎ উভয়পক্ষই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনেছে। এসব বিবেচনায় বলা যায়, পৌর নির্বাচন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। একটি স্বচ্ছ নির্বাচন সবার প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
প্রশ্ন : নির্বাচনে গড়ে ৭৪ শতাংশ ভোট পড়েছে। আওয়ামী লীগ কোথাও কোথাও ৯০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছে- এটি যৌক্তিক কিনা?
উত্তর : এটা বিভিন্ন দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে। প্রথমত, স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ২০টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে কাউন্সিলর পদে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে জয়ী হতে কাউন্সিলররা ভোটারদের ধরে ধরে কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। এদিক বিবেচনায় এ নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ বেশি ছিল। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে কারচুপির কারণে বেশি ভোট পড়েছে। বড় দুটি দলই অভিযোগ করেছে, নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। তবে তদন্ত করে দেখা দরকার, কী কারণে এ পরিমাণ ভোট পড়েছে। সঠিক তথ্য-উপাত্ত ছাড়া এ বিষয়ে মন্তব্য সঠিক হবে না।
হামলা-মামলার কারণে দীর্ঘদিন বিএনপির নেতাকর্মীরা মাঠে ছিলেন না। অপরদিকে সরকারি দল মাঠ দখল করে রেখেছিল। নির্বাচনের জন্য এটা সাংঘাতিক বিষয়। কারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দল হওয়ার পরও বিএনপির লোকজন এদিক-সেদিক লুকিয়ে ছিলেন। অপরদিকে আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে নির্বাচনের আগে ও পরে অনেক অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ তদন্ত করেছে এমনটি কখনোই জানায়নি।
প্রশ্ন : ৭ জন মেয়র ও ১৪০ জন কাউন্সিলর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
উত্তর : এটি অবিশ্বাস্য। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়েছেন। বড় দুই দলই অনেক চেষ্টা করেও বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে ৭টি মেয়র পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পাওয়ার বিষয়টি অবিশ্বাস্য। এসব পৌরসভায় কিছু একটা ঘটেছিল বলেই অনুমেয়। তিনি বলেন, যেসব পৌরসভায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী জয়ী হয়েছেন, সেসব এলাকায় তদন্ত করে দেখা দরকার কী কারণে অন্য কোনো প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আসেননি। নাকি সেখানকার অন্য প্রার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে এগুলো এখনই খতিয়ে দেখা দরকার। যদিও গেজেট হওয়ার পর এসব নির্বাচন বন্ধের সুযোগ নেই। তবুও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এখনই পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
প্রশ্ন : নির্বাচনে অনেক কেন্দ্রে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর কারণ কী হতে পারে?
উত্তর : ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র, যেগুলো নির্বাচন কমিশনের ভাষায় অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বলা হয়- এসব কেন্দ্রে সহিংসতা বেশি দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশন বলেছে, অতি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তাহলে সঙ্গত কারণে প্রশ্ন ওঠে- তারা কী দায়িত্ব পালন করেছে? কার কী কাজ বণ্টন করা হয়েছিল? তারা সঠিকভাবে সেগুলো পালন করেছিল কিনা? নির্বাচন কমিশন এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই জানায়নি। গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচনের ফল পরিবর্তন হয়- এমন অভিযোগের তদন্ত করা যায় না। কিন্তু নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন কিনা, তা তদন্ত করতে কোনো বাধা নেই। নির্বাচন কমিশন চাইলে এখনও এসব বিষয় তদন্ত করতে পারে।
প্রশ্ন : বিএনপি পৌর নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে- বিষয়টি কতটুকু গ্রহণযোগ্য?
উত্তর : রাজনৈতিকভাবে বিএনপি বিপদে ছিল। হামলা-মামলার কারণে বিএনপির নেতাকর্মীরা এলাকার বাইরে পালিয়ে ছিলেন। নির্বাচন উপলক্ষে তারা কমবেশি মাঠে ফিরেছেন। জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। অপরদিকে নির্বাচন ইস্যুতে সরকারকে চাপে রেখে নানা ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। এসব দিক বিবেচনায় এ নির্বাচনে হেরে গেলেও একে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে বিজয় হিসেবে দেখছেন। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে- ৩০-৩২ শতাংশ বিএনপির একনিষ্ঠ ভোটার রয়েছেন। কিছু কিছু এলাকা বিএনপি অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত। ওইসব পৌরসভায়ও বিএনপির পরাজয় হয়েছে। এখন তদন্তের বিষয় হচ্ছে- বিএনপির এসব একনিষ্ঠ ভোটার কি দলবদল করেছেন, নাকি তারা ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি।
প্রশ্ন : তিন সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের সহিংসতার প্রভাব ইউনিয়ন পরিষদে পড়ার আশংকা আছে কিনা?
উত্তর : নির্বাচনের মানের যে নিম্নগামিতা দেখা দিয়েছে তাতে ধরে নেয়া যায়, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একই ধরনের ঘটনার আশংকা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ের লোকজন অংশ নেন। এ নির্বাচনে যারা হেরে যাবেন, তাদের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। সব নির্বাচনে একটি পক্ষ সহিংসতার চেষ্টা চালায়। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে শক্ত ভূমিকা পালন করতে হয়। নির্বাচন কমিশন যদি এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়, তাদের ক্ষমতার প্রয়োগ করে তাহলেই সুষ্ঠু নির্বাচন হতে বাধ্য। এজন্য নির্বাচনে ইসির অ্যাকশনগুলো দৃশ্যমান করা দরকার। তাহলে মাস্তান, সন্ত্রাসীরা ভয় পাবে। নির্বাচন কর্মকর্তা ও আইনশৃংখলা বাহিনী সঠিকভবে দায়িত্ব পালন করবে।
নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্র উত্তরণের পথ। নির্বাচনে সহিংসতা হলে তা গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দেখা দেবে। দেশে জঙ্গিবাদের মতো বড় বড় সমস্যার উদ্ভব ঘটবে।

দু’বছরে সরকারের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা by একে এম শাহনাওয়াজ

২০১৪-এর নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। কিন্তু দুর্বল গণতান্ত্রিক এই দেশ খুব যৌক্তিক ও জীবন্ত শক্তিতে এগোতে পারে না। ক্ষমতাপ্রত্যাশী বিরোধী দল জনমত গঠন করে সরকার পরিবর্তনের ঝামেলায় যেতে চায় না- সময় ক্ষেপণও করতে চায় না। তাই সরকারকে টেনে নামানোর স্থূল শক্তি প্রয়োগে অরাজকতা তৈরি করতে বেশি পছন্দ করে। সরকার পক্ষও চায় নানা কৌশলে ক্ষমতায় টিকে থাকতে। সেখানেও শক্তি প্রয়োগের বিষয়টিই প্রাধান্য পায়। এ ধারার দুরাচার অপার সম্ভাবনার দেশটির এগিয়ে যাওয়ার পথটিকে বারবার কণ্টকাকীর্ণ করে তোলে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মহাজোট সরকার গঠন করা হয়। এ পর্বে বিএনপি অনেকটা ব্যাকফুটে চলে যায়। সে সময় রাজনীতিতে যে কৌশলী ভূমিকা রাখার দরকার ছিল, বিএনপি নেতৃত্ব সেখানে সফল হতে পারেনি। বিপরীতে নানা শক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ সরকার নিজেকে অনেকটা স্থিতির মধ্যে নিয়ে আসে। এই পর্বে আওয়ামী লীগ নেত্রী অনেক বেশি দূরদর্শিতা দিয়ে উন্নয়নের নীতিনির্ধারণ করেন এবং নানা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যান।
আওয়ামী লীগের টার্গেট ছিল উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য দলটিকে পরবর্তী নির্বাচনেও বিজয়ী হয়ে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ যতটা কৌশলী পথে হাঁটতে থাকে, বিএনপি ততটাই খুঁজতে থাকে বিভ্রান্ত রাজনীতির পথ। অনেকের মতে, এ সময় বিএনপি বন্দি হয়ে পড়েছিল জামায়াতের অক্টোপাস বেষ্টনীতে। যে কারণে ২০১৪-এর নির্বাচনে যাওয়ার আগে দল সুসংগঠিত করে জনমত গঠনের কোনো চেষ্টা বিএনপি করেনি। তার বদলে জামায়াতের সঙ্গী হয়ে নির্বাচনে না গিয়ে নির্বাচন ঠেকানোর কথা বলে দেশজুড়ে অরাজতকা তৈরি করতে চাইল। বোঝা উচিত ছিল, সে সময়ের বাস্তবতায় এ পথে আওয়ামী লীগকে দুর্বল করা যাবে না। উল্টো লাগাতার হরতাল-অবরোধের ডাকের ভেতর ঘটতে থাকল নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। পেট্রলবোমায় পুড়ে মরতে থাকল নিরীহ মানুষ। যদিও এখন অনেক বিএনপি নেতা বলতে চান- এসবের দায় তাদের নয়, সব সরকারের ষড়যন্ত্র। কিন্তু ভুক্তভোগী মানুষকে বিশ্বাস করানো কঠিন হবে একথা। বিএনপির যদি আত্মবিশ্বাস থাকত তবে সে সময় ঝলসানো মানুষকে দেখতে হাসপাতালে যেতে পারতেন বিএনপি নেতারা। কিন্তু তাদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর এসবের ভেতর থেকে আওয়ামী লীগের কুশলী নেতারা বিএনপি-জামায়াতকে বিপন্ন করার জন্য সব রসদ পেয়ে যান। এখন প্রতিদিনই এসব রসদ ব্যবহার হচ্ছে। আর কৃশকায় হয়ে পড়ছে বিএনপি।
দেশে সার্বিকভাবে গত দুই বছরে অনেক ইতিবাচক ভূমিকায় আসতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকার। উন্নয়নের জন্য যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য তা স্পষ্ট হল। স্বেচ্ছায় না হলেও রাজনৈতিক ভুলের খেসারত দিতে বিগত দু’বছরে বিএনপি ইতিবাচক রাজনীতির পথে হেঁটে দল সুসংগঠিত করায় ভূমিকা রাখতে পারেনি।
এমন বাস্তবতায় উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় অনেকটা পথ হাঁটতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকার। সুতরাং বলা যায়, এ দুই বছরে সরকারের সাফল্যের ভাণ্ডারে একটি জোয়ার ছিল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মানুষের যাপিত জীবনকে অনেকটাই সহজ করেছে। বিশ্বব্যাংক পিছিয়ে গেলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তায় নিজস্ব অর্থে পদ্মা সেতুর মতো একটি বিশাল প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল আগেই। এ দুই বছরে তা বাস্তবায়নের পথে পা বাড়িয়েছে। এ সাফল্যকে ছোট করে দেখার উপায় নেই। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রেরও যাত্রা শুরু হয়েছে এ বছর। এ দুই বছরে শেখ হাসিনা সরকার সড়কপথের অনেক উন্নয়নের পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। বেশ ক’টি মহাসড়ক চার লেন হওয়ার পথে। কোনো কোনোটি এর মধ্যে বাস্তবায়িতও হয়ে গেছে। সরকারের আগের মেয়াদ এবং বর্তমান দু’বছরে অনেক উড়াল সেতু নির্মিত হয়ে যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় বেশ ক’জন প্রথম সারির অপরাধীর ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার এ দুই বছরে বিদেশনীতির ক্ষেত্রেও সাফল্য দেখিয়েছে।
কিন্তু এ দু’বছর নানা ধরনের আনুকূল্য থাকার পরও কিছু জরুরি বিষয়ে সরকার কেন যে দৃষ্টি দেয়া থেকে বিরত থাকল ঠিক বোঝা গেল না। আমাদের মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের পর এই প্রথমবার আওয়ামী লীগ এবং সরকার অনেক বেশি শক্ত মাটির ওপর দাঁড়াতে পেরেছে। এমন অবস্থায় ইতিবাচক রাজনীতির পথে হেঁটে দলকে জনসমর্থনের উচ্চাসনে বসানোর কথা। কিন্তু এ জায়গায় খুব গতানুগতিক হয়ে গেল আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। আশা ছিল, এ বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ওপর শুদ্ধি অভিযান চালাবে। দুর্বৃত্তদের দল থেকে বের করে দিয়ে এসব সংগঠনের অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু এমন পথে হাঁটতে দেখা গেল না। অভিজ্ঞ অনেকের ধারণা, আজকাল রাজনৈতিক দলগুলো নাকি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক যুদ্ধে সন্ত্রাসীর প্রয়োজন থাকে বলে তাদের পেলে-পুষে রাখে। হয়তো গণতান্ত্রিক চেতনায় দৃঢ় থাকলে গণশক্তির ওপরই ভরসা করতে পারতেন তারা।
সরকার দৃশ্যত সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। প্রতি সেক্টরে ঘুষ-দুর্নীতি সাড়ম্বরেই চলছে। এসব ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা বহাল থাকায় সরকার জনআকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারছে না। এবারই আওয়ামী লীগ বন্ধু বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে পারত। এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত আর পাকিস্তানপন্থী বিএনপির নেতা-নেত্রী বাদ দিলে বৃহত্তর মানুষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করেন। এদের অধিকাংশের নৈতিক সমর্থন থাকে আওয়ামী লীগের প্রতি। আবার আপাত দলনিরপেক্ষ অনেক মেধাবী মানুষ পারিবারিক প্রেক্ষাপটে এবং আদর্শিক জায়গায় আওয়ামী লীগের সরাসরি সমর্থক। এ সময়ে আওয়ামী লীগ এদের সম্মানিত করে ঘনিষ্ঠভাবে কাছে টানতে পারত। এতে দলের শক্তি নিশ্চয়ই অনেক বৃদ্ধি পেত। কিন্তু দলীয়করণের অন্ধ মোহ থেকে আওয়ামী লীগ দলকে অনেকটা সংকুচিত করে ফেলেছে।
এ দুই বছরে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা উন্নয়নের কথা বলে যতটা দামামা বাজিয়েছে সরকার, শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে আঘাত করেছে এর চেয়ে বেশি। শিক্ষানীতির বাইরে থেকে কোমলমতি শিশুদের পিইসি নামের পরীক্ষায় এনে আত্মবিকাশের শুরুতে তাদের কাছ থেকে শৈশব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এই সূত্রে কোচিং ব্যবসা আর গাইড ব্যবসাকে পরোক্ষভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। পাবলিক পরীক্ষার নামে এসব শিশুকে কোথাও কোথাও পরীক্ষায় নকল করার প্রথম পাঠ দেয়া হচ্ছে। জীবনের শুরুতে এসব শিশু শিক্ষার্থীর সুস্থ বিকাশের পথ বন্ধ করে দেয়ার দায় সরকার এড়াতে পারে না।
এ দু’বছরে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্র দূষণের হাত থেকে রক্ষা করার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি আওয়ামী লীগ সরকার। দলীয় বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগের সংস্কৃতি শিক্ষার পরিবেশ অনেকটাই নষ্ট করে দিয়েছে। দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ করতে গিয়ে মেধাবীরা ছিটকে পড়ছেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। নিষ্ঠাবান শিক্ষক গবেষকরাও অস্বস্তির মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন। অথচ সুস্থ রাজনীতির পথে হাঁটতে পারলে আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল পরিবেশ তৈরির কৃতিত্ব দেখাতে পারত।
এ বছরে সরকারকে একটি বড় ধূম্রজালে ফেলে দিয়েছে পে-কমিশন ও এর রিপোর্ট। একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় পে-স্কেল ঘোষিত হওয়ার পরও সরকার এর ভেতর থেকে কোনো রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে পারল না। উল্টো ডেকে আনল নানা সংকট। এই একটি জায়গায় এসে প্রধানমন্ত্রী কোনো কুচক্রী মহলের হাতে যেন বন্দি হয়ে গেলেন! এতসব কায়দা-কানুন না করে মানুষের কাছে সাদরে গৃহীত পুরনো ধারাক্রমে স্কেল সাজালে কী ক্ষতি হতো? এর বদলে গোটাতিনেক সুপার স্কেল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্কেল অবনয়ন করে ক্ষোভ বাড়ানো হয়েছে। টাইম স্কেল এবং সিলেকশন গ্রেডের সুবিধা অকারণেই বিলুপ্ত করা হয়েছে। ক্যাডার সার্ভিসের একটি পক্ষ ছাড়া সবাইকে খেপিয়ে তোলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষক, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, ২৬টি ক্যাডার সবাইকে আন্দোলনের মাঠে নামানোর ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে। অথচ এ অবস্থা সৃষ্টির কোনো প্রয়োজন ছিল না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ চিন্তার পরিচয় এর আগে অনেকবার পাওয়া গেছে। পে-স্কেল সংক্রান্ত জটিলতায় এই প্রাজ্ঞ চিন্তার প্রতিফলন এখনও দেখা যাচ্ছে না। এটি তো স্পষ্ট, সরকারকে জটিলতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে কোনো এক পক্ষ। পাকিস্তান আমল থেকে এ কথাটি প্রচলিত ছিল- আমলাতন্ত্র চাইলে কোনো সরকারকে ডোবাতে পারে আবার ভাসাতেও পারে। সাম্প্রতিক অতীতে এ দেশের আমলাতন্ত্রকে অতটা নেতিবাচক অবস্থানে থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখা যায়নি। কে জানে গোকুলে কোনো পক্ষ বেড়ে উঠল কিনা! সরকারের পকেটে থেকে পকেট কাটলে সেই ঘূণপোকা থেকে রেহাই পাওয়াটা কঠিন।
আওয়ামী লীগ সরকার এখন প্রকৃতপক্ষেই তেমন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে নেই। এমন বাস্তবতায় দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এনে দেয়ার কৃতিত্ব শেখ হাসিনা সরকারই দেখাতে পারে। আমরা আশা করব, সরকার তৃতীবর্ষে পা ফেলে দেশকে একটি যৌক্তিক ও নৈতিক পথে চলার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেবে। বক্তৃতা আর রাজনৈতিক কূটকৌশলে নয়, জনআস্থা আসে গণমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com

বেতন বৈষম্য নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ জরুরি by মো. মোতাহার আলী

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নতুন বেতন স্কেল কার্যকর হলেও তা প্রজাতন্ত্রের প্রায় ২৩ লাখ কর্মচারীকে হতাশায় নিমজ্জিত করেছে। প্রধানমন্ত্রী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের একটি সম্মানজনক বেতন স্কেল উপহার দেয়ার বিষয়ে আন্তরিক থাকলেও প্রশাসনের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা একটি দুষ্টচক্রের কারণে তা আজ হতাশায় রূপ নিয়েছে।
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নকারী ও ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, নতুন বেতন স্কেল প্রবর্তনের কারণে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার চেয়ে ক্ষতির মুখোমুখি আজ লাখ লাখ সরকারি কর্মচারী। নতুন বেতন স্কেলে ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৫ থেকে ৩০ জুন, ২০১৬ পর্যন্ত বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি প্রথা বাতিল করা হয়। যে কারণে প্রজাতন্ত্রের প্রায় অর্ধেক সমপদের জ্যেষ্ঠ কর্মচারী তাদের কনিষ্ঠ কর্মচারীদের চেয়ে কম বেতন পাচ্ছেন। তা ছাড়া প্রচলিত বিধান অনুযায়ী একই পঞ্জিকা বর্ষে সমমানের পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত অভ্যন্তরীণ কর্মচারীরা সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের তুলনায় জ্যেষ্ঠতাপ্রাপ্ত হন। নতুন বেতন স্কেলে ১৫ ডিসেম্বর থেকে সিলেকশন গ্রেড প্রথা বাতিল করার কারণে ১৩ ডিসেম্বর, ২০১১ তারিখে ৯ম গ্রেডের পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীর চেয়ে ১৫ ডিসেম্বর তারিখে ৯ম গ্রেডের পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মচারী নিু গ্রেডে কম বেতন পাচ্ছেন। অভিজ্ঞ মহলের মতে, কম বেতন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়মে ১৪ ডিসেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত কনিষ্ঠ কর্মচারীর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির তারিখে জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধির তারিখ নির্ধারণ করে কনিষ্ঠ ও জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর বেতন সমতাকরণ করে এবং নিু গ্রেডে বেতন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে, কনিষ্ঠ কর্মচারীর বেতন গ্রেডের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর বেতন গ্রেডের সমতাকরণ করে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ৯ম গ্রেডের পদে দুইজন কর্মচারী ২০০৫ সালে নিয়োগলাভ করেন এবং উভয় কর্মচারী ৪ (চার) বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্তিতে ২০০৯ সালে ৭ম গ্রেডে সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত হন। দুইজনের মধ্যে জ্যেষ্ঠ কর্মচারী যোগ্যতার ভিত্তিতে ২০১৪ সালে ৭ম গ্রেডের পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হন। অর্থাৎ পদোন্নতিপ্রাপ্ত এবং যিনি পদোন্নতিপ্রাপ্ত হননি উভয়ই ৭ম গ্রেডে বেতন পাচ্ছিলেন। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী যে কর্মচারী পদোন্নতিপ্রাপ্ত হননি তিনি ১০ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূতির্তে ১ জুলাই ২০১৫ তারিখে ৬ষ্ঠ গ্রেডে টাকা ৩৫,৫০০-৬৭,০১০ স্কেলে বেতন পাচ্ছেন, অপরদিকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ কর্মচারী এক গ্রেড নিচে ৭ম গ্রেডে টাকা ২৯,০০০-৬৩,৪১০ স্কেলে বেতন পাচ্ছেন। অভিজ্ঞ মহলের মতে, জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর ৭(১) অনুচ্ছেদে ‘কোনো স্থায়ী কর্মচারী তাদের নিজ বেতন গ্রেডে ৬ বছর সন্তোষজনক চাকরি পূর্তির পরবর্তী তারিখে অথবা, নিজ বেতন গ্রেডের সর্বোচ্চ ধাপে পৌঁছার পরবর্তী তারিখে স্বয়ংক্রিভাবে পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন প্রাপ্য হবেন’- এ সংক্রান্ত সংশোধনী এনে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।
জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫ জারির পূর্ব পর্যন্ত ৪র্থ গ্রেডের কর্মচারীরা নিজ পদের বেতন স্কেলের সর্বশেষ ধাপে পৌঁছানোর এক বছর পর ৩য় বেতন গ্রেডপ্রাপ্ত হতেন। এতে দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মচারীদের একটু আর্থিক ক্ষতি লাঘব হতো। জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫-এর মাধ্যমে পদোন্নতিবঞ্চিত ৫ম ও ৪র্থ গ্রেডের কর্মচারীদের ৩য় বেতন গ্রেডে বেতনপ্রাপ্তির সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অভিজ্ঞ মহলের মতে, জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫-এর ৭(৩) অনুচ্ছেদে ‘উপ-অনুচ্ছেদ (১) ও (২)-এ উল্লিখিত আর্থিক সুবিধা বেতন স্কেলের ২য় গ্রেড বা তদূর্ধ্ব গ্রেডের কোনো কর্মচারী এই সুবিধা গ্রহণপূর্বক ১ম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব বিশেষ গ্রেডে বেতন প্রাপ্য হইবেন না’- এ সংক্রান্ত সংশোধনী এনে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে। ফলে প্রকৃচি সমন্বয় পরিষদ ও নন-ক্যাডার কর্মচারী ঐক্য পরিষদের অন্যতম দাবি পূরণ হবে, উচ্চতর স্তরের পদ সৃষ্টি করতে হবে না এবং স্থায়ী সংস্থাপন ব্যয় হ্রাস পাবে।
একই ধরনের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নতুন বেতন স্কেলে ৯ম গ্রেডের নন-ক্যাডার ও ক্যাডার কর্মচারীদের প্রবেশ পদে যথাক্রমে ৯ম ও ৮ম গ্রেডে বেতন নির্ধারণে বড় বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। এতে প্রশাসনের সর্বক্ষেত্রে চরম হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর বৈষম্যহীন সম্মানজনক বেতন স্কেল নীতির কারণে ১ম শ্রেণী, ২য় শ্রেণী, ৩য় শ্রেণী ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী পরিচয় প্রথা বিলোপ করে গ্রেডভিত্তিক কর্মচারী পরিচয়দানের প্রথা প্রবর্তন করা হলেও এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর বৈষম্যহীন সম্মানজনক বেতন স্কেল প্রদানের নীতির প্রতিফলন ঘটেনি। অভিজ্ঞ মহলের মতে ‘ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মচারীদের প্রবেশ পদ জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫-এর ৮ম গ্রেডে নির্ধারিত হবে’- এ সংক্রান্ত সংশোধনী এনে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।
বৈষম্যমূলক প্রশাসন দিয়ে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তাই আলোচ্য বৈষম্যসমূহ নিরসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
মো. মোতাহার আলী : সরকারি চাকরিজীবী

নগর সরকার নাকি রাজউকের স্বশাসন? by কাজী মাসেলউল্লাহ

রাজউকের তৈরি ২০ বছর মেয়াদি ‘ঢাকা স্ট্রাকচার প্লানের’ খসড়া প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। এখন এর ওপর চলছে জনমত যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া। এ পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ঢাকা শহর ও এর আশপাশের বৃহত্তর এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা মহানগরীর আঞ্চলিক উন্নয়ন- বিশেষত ভৌত উন্নয়নের নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করা। ১৩ অধ্যায়ে বিভক্ত প্রতিবেদনের শেষ অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলা হয়ছে। কারণ, সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে কোনো পরিকল্পনাই সঠিকভাবে কার্যকর হবে না।
অধ্যায়ের শুরুতে ঢাকা শহরকে ঘিরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি সমস্যাকে সবচেয়ে প্রকট হিসেবে ধরা যায়। প্রথমটি জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বের অভাব। বিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার অভাবের পাশাপাশি সেবা ও উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে সমস্যার বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সুশাসন প্রশ্নে রাজউকের প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ড। সমস্যাগুলোকে যথার্থভাবে তুলে ধরার জন্য এ প্রতিবেদনের পরামর্শক বা পরামর্শকদের ধন্যবাদ জানাতে হবে। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানে প্রতিবেদনটিতে যে নীতি ও কৌশল গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে তার অধিকাংশই অনেকটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বরং এ সুপারিশগুলো অনুসরণ করলে সমস্যা আরও বাড়বে। প্রশ্নবিদ্ধ প্রতিষ্ঠান রাজউকের কর্তাব্যক্তিদের কাছে পুরো ঢাকা মহানগরীর জনগণ আরও জিম্মি হয়ে পড়বে। ব্যাপারটাকে খোলাসা করার জন্য আগে দেখা যাক রাজউকের ওই প্রতিবেদনে কী কী পরামর্শ বা সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে বলা হচ্ছে, রাজউককে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। এছাড়া, রাজউক পুরো ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন কাজের প্রধান সংস্থা হিসেবে কাজ করবে। যেহেতু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর যথেষ্ট সামর্থ্য নেই, তাই তারা রাজউক অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুসরণ করে কাজ করবে। অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থার ভেতর সমন্বয়ের জন্য রাজউক মুখ্য ভূমিকা পালন করবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারগুলো (যেমন- সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ) রাজউককে সহায়তা করবে। আবার এটিও বলা হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও রাজউকের কর্মকাণ্ডের ভেতর সুনির্দিষ্ট বিভাজন থাকতে হবে। সর্বোপরি, এসব সুপারিশ মেনে রাজউককে একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা যাবে।
অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থাকে সমন্বয়ের জন্য রাজউক কীভাবে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে? অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো ভৌত পরিকল্পনাকে অতটা গুরুত্ব দেয় না; কিন্তু তাদের কর্মপরিধি রাজউকের চেয়ে নেহায়েত কম এটি দাবি করা যায় না। ধরে নিলাম, রাজউক যেহেতু মূল পরিকল্পনাকারী, তাই সমন্বয়ের মুখ্য ভূমিকা রাজউক পালন করবে। কিন্তু, বাস্তবতা কি তাই বলে যে অন্যান্য সংস্থা এ সমন্বয়ের জন্য রাজউককে সহায়তা করবে? রাজউক ও অন্যান্য সংস্থার যে আইনি কাঠামো আছে তাতে কি তাদের এই সহায়তার জন্য বাধ্য করা যায়? যায় না। তারপর, রাজউক ও স্থানীয় সরকারের কাজের বিভাজন করে কি সমন্বয় বাড়ানো যাবে, নাকি এটি আরও বেশি সমন্বয়হীনতা তৈরি করবে?
এরকম বিভাজন তো আরও বেশি একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপানোর সংস্কৃতিকে উসকে দেবে। কারণ, সবকিছু বিভক্ত করে দেখা সম্ভব নয়। বরং, এমন কিছু করা উচিত যাতে সবাই সহাবস্থানে থেকে কাজ করে। সেটা কীভাবে করা যায় তার কিছুটা ইঙ্গিত ওই প্রতিবেদনেও দেয়া আছে; কিন্তু সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা নেই। অথচ অনেক গৌণ বিষয় বিস্তরভাবে বলা হয়েছে। যেমন রাজউক নিলামের মাধ্যমে আবাসিক প্লট বিক্রি ও আয়-উপার্জন করতে পারবে।
প্রতিবেদনে রাজউককে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়ছে। আসলে এখানেই বোঝা যায়, যারা প্লান করেছেন তারা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন যে পুরো ঢাকা মহানগরীর জন্য একটি একক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দরকার, যেটি সব নাগরিকের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। এমন একটি সংস্থা দরকার যা পুরো ঢাকা শহরের সব সেবাদানকারী সংস্থাগুলোকে পরিচালনা করবে। কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিবেদনে সেরকম কোনো প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা দেয়া হয়নি। বরং রাজউকের মতো একটি অনির্বাচিত সংস্থার অধীনে অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করার মাধ্যমে রাজউককে অধিক ক্ষমতাশালী করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে রাজউককে সব কাজের নিয়ন্ত্রক বা সমন্বয়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
এ অধ্যায়ের একেবারে শেষ ভাগে দায়সারাভাবে ‘নগর সরকারে’র কথা বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে ‘নগর সরকার’ই হবে সর্বোৎকৃষ্ট সমাধান। রাজউক সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়েছে তা ক্ষেত্র বিশেষে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে কাজ করতে পারে, যেমন- রাজউকের পরিকল্পনা শাখাকে শক্তিশালী করা। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হতে পারে ‘নগর সরকার’ প্রতিষ্ঠা। সেটা সুস্পষ্টভাবে এ স্ট্রাকচার প্লানে বলতে হবে। যাতে খুব দ্রুতই এমন একটি সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া যায়। প্রশ্ন আসে, কেমন হবে সেই নগর সরকারের রূপরেখা? ঢাকা শহর তো একাধিক স্থানীয় সরকার ইউনিটে বিভক্ত। এ রূপরেখার একটি সফল উদাহরণ ওই প্রতিবেদনেই দেয়া আছে। কিন্তু সেটা শুধু উদাহরণ হিসেবেই দেয়া আছে, স্বল্প পরিসরেও কেন জানি তা ব্যাখ্যা করা হয়নি বা ওই উদাহরণকে মাথায় রেখে কোনো সুপারিশ করা হয়নি। যেমন- ওই প্রতিবেদনে উল্লেখিত মেট্রোপলিটন ম্যানিলা ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) দিকে যদি তাকাই, তাহলে দেখব ১৭টি শহর নিয়ে ওই কর্তৃপক্ষ গঠিত। সেই কর্তৃপক্ষের অধীনে উন্নয়ন পরিকল্পনা, যোগাযোগ, ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, এমনকি জননিরাপত্তাসহ বেশ কয়েকটি শাখা রয়েছে। কর্তৃপক্ষটি নিয়ন্ত্রিত হয় নির্বাচিত মেয়রদের দ্বারা। নির্বাচিত মেয়রদের নিয়ে মেট্রো ম্যানিলা কাউন্সিল গঠিত। অনেক অনির্বাচিত সরকারি কর্মকর্তা (যেমন- পুলিশ প্রধান, পাবলিক ওয়ার্ক ও হাইওয়ে বিভাগের প্রধান, পর্যটন বিভাগের প্রধান ইত্যাদি) পদাধিকার বলে সেই কাউন্সিলের সদস্য; কিন্তু তাদের যে কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ভোট দেয়ার সুযোগ নেই। তারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে থাকেন এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেটা নির্দেশনা দেন সেটা পালন করেন। যদিও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি ক্ষেত্রে মেট্রোপলিটন ম্যানিলার খুবই শক্তিশালী ভূমিকা, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, এই সংস্থাটি স্থানীয় পৌর প্রশাসনের ক্ষমতাকে খর্ব করে। এ সংস্থা মূলত সেসব বিষয় নিয়ে কাজ করে যা পৌর প্রশাসনের সীমানা ও সামর্থ্যরে ভেতর থেকে করা যায় না, যে সমস্যাগুলোকে পুরো আঞ্চলিক পরিধি বজায় রেখে প্রতিটি শহরকে একসঙ্গে মোকাবেলা করতে হয়।
তবে এটি ঠিক মেট্রো ম্যানিলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো একটি নগর সরকার রাতারাতি ঢাকার ক্ষেত্রে করা যাবে না। কারণ, এখানে অপেক্ষাকৃত নিুমাত্রার শাসন (লো গভর্নেন্স) বিদ্যমান। হঠাৎ করে উচ্চমাত্রার শাসন (হাই গভর্নেন্স) এখানে খাপ খাবে না। কিন্তু আমরা হাই গভর্নেন্সের দিকে যাত্রা করতে পারি। সেক্ষেত্রে কেমন হবে আমাদের যাত্রাপথ? এখানে তিনটি সুপারিশ তুলে ধরছি। আশা করি যথাযথ কর্তৃপক্ষ সুপারিশ তিনটিকে আমলে নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখবেন।
এক, স্বল্পমেয়াদের জন্য পুরো ঢাকা মহানগরীর জন্য একটি সমন্বয়কারী বোর্ড স্থাপন করা। এর নেতৃত্ব দেবেন স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত মেয়ররা। তাদের অধীনে স্টিয়ারিং কমিটি বা সাব-কমিটি করে তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবেন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। ঢাকা মহানগরীর অধীনে যেসব ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে তাদের প্রতিনিধিরাও এ সাব-কমিটিতে থাকবেন। এ বোর্ড এবং সাব-কমিটি বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার ভেতর সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করবেন। স্ট্রাকচার প্লান পাস হলে যে বিশদ পরিকল্পনার কাজ শুরু হবে তাতে এ বোর্ড জনগণের পূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে। জনগণের পূর্ণ অংশগ্রহণ একমাত্র তাদের দ্বারাই সম্ভব, কারণ তারা নির্বাচিত প্রতিনিধি। বিশদ পরিকল্পনা যাতে অন্যান্য সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে করা হয় তার সমন্বয় করবে এ বোর্ড। এভাবে কাজ করতে থাকলে স্থানীয় প্রতিনিধিরাও নির্বাহীদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা লাভ করবে। বোর্ডের সমন্বয়ের দায়িত্ব পালনের জন্য আইনি ক্ষমতা দিতে হবে।
দুই, মধ্যমেয়াদে সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর কাজের জবাবদিহিতা ওয়ার্ড (ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে, কারণ এখানে এক একটি ওয়ার্ডের জনসংখ্যা অনেক পৌরসভার সমান), পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায় থেকে করতে হবে। অন্তত যেসব সেবা সরাসরি বাসযোগ্য পরিবেশকে প্রভাবিত করে, যেমন- পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনা, যাতায়াত ব্যবস্থা, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও ইমারত নির্মাণ ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তৃণমূল পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এসব সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাজের মূল্যায়ন হতে হবে ওয়ার্ড কাউন্সিলর বা অনুরূপ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।
তিন, দীর্ঘমেয়াদে মেট্রো ঢাকা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা অনুরূপ নামে একটি নগর সরকার গড়ে তুলতে হবে যার অধীনে ওয়াসা, রাজউকসহ অনান্য প্রতিষ্ঠান যারা কেবল ঢাকা মহানগরীতে কাজ করে তারা চলে আসবে। প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে কাজ করবে, যেমন- রাজউক কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা ও ভূমি উন্নয়ন শাখা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে।
এ পথ ধরে এগোলে মনে করি, যে তিনটি সমস্যার কথা শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে (জনগণের প্রতিনিধিত্বের অভাব, বিকেন্দ্রীকরণের অভাব, সমন্বয়ের অভাব) ভবিষ্যতে তা দূর হবে। বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই সুপারিশগুলো প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছি। খসড়া স্ট্রাকচার প্লানে রাজউককে অধিক ক্ষমতাশালী করার যে প্রস্তাবগুলো করা হয়েছে, তা একেবারেই অবাস্তব বলে মনে হয়েছে। নির্বাহী বা অনুরূপ ক্ষমতাপ্রাপ্ত লোকজনদের দিয়ে পুরো ঢাকা মহানগরীর উন্নয়ন পরিচালনা করলে তাতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কখনই ঘটবে না। বরং, স্বায়ত্তশাসনপ্রাপ্ত নির্বাহী ক্ষমতা সুষম এবং প্রকৃত সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের প্রাপ্তির সম্ভাবনাকে আরও সীমিত করে ফেলবে।
কাজী মাসেলউল্লাহ : নগর গবেষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
kazimasel@bracu.ac.bd

কী উন্নয়নের অজুহাতে গণতন্ত্র হরণ? by আনু মুহাম্মদ

বস্তুত গণতন্ত্র নিয়ে বহুরকম সংজ্ঞা শোনার অভিজ্ঞতা আমাদের পুরনো। ঔপনিবেশিক আমলে আমরা শুনেছি এখানকার মানুষ গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়, সেজন্য তাদের নিজ রাষ্ট্রেও যে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা আছে তা এখানে প্রবর্তন করা হয়নি। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও বিভিন্ন সরকারের সময়ে ‘মানুষ গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়’ এরকম কথা বহুবার শুনতে হয়েছে।
পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খানের দীর্ঘ সামরিক শাসন আমলে, যখন হার্ভার্ডের বিশেষজ্ঞদের দিয়ে দেশের উন্নয়ন পথ ঠিক করা হচ্ছিল, তখন ‘এই উন্নয়নের স্বার্থে’ এদেশের মানুষের জন্য ‘উপযোগী’ গণতন্ত্র বানিয়ে ‘উপহার’ দেয়া হয়। নাম তার বেসিক ডেমোক্রেসি (বিডি) বা ‘বুনিয়াদি গণতন্ত্র’। এর অর্থ হল দেশের নাগরিকরা সরাসরি ভোটাধিকার পাবে না, তাকে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও চেয়ারম্যান নির্বাচনের অধিকার দেয়া হবে। সেই বিডি মেম্বারদের ভোটে নির্বাচিত হবেন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এর পাশাপাশি গ্রামে উন্নয়ন কর্মসূচির নামে, তদারকি বা হিসাব-নিকাশের শৈথিল্য রেখে, বিডি মেম্বারদের জন্য যথাসম্ভব অর্থ বরাদ্দ দেয়া হল এমনভাবে যাকে ঘুষ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। বলা হল, ‘উন্নয়নের জন্যই এরকম গণতন্ত্র দরকার। সার্বজনীন ভোটাধিকারসহ গণতান্ত্রিক অধিকার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে। এগুলো পশ্চিমা মডেল, আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।’
আইয়ুব খানের নেতৃত্বে জেনারেল ও বাইশ পরিবারের এ খেলা জনগণ গ্রহণ করেনি, কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রামাঞ্চলে বিডি মেম্বার আর কেন্দ্রে আইয়ুব খান প্রবল গণঅভ্যুত্থানের তোড়ে ভেসে যায়। মহা আড়ম্বরে পাকিস্তানজুড়ে ‘উন্নয়নের এক দশক’ পালনের কিছুদিনের মধ্যেই আইয়ুব খানকে পদত্যাগ করতে হয়। আবার সামরিক শাসন। জনমতের চাপে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন হয়; কিন্তু শাসকরাই যে গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয় তা আবারও প্রমাণিত হয়। ভয়ংকর গণহত্যা দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণতন্ত্র ঠেকাতে চেষ্টা করে। পরিণতিতে স্বাধীনতার সশস্ত্র যুদ্ধ এবং গণতন্ত্রের অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।
স্বাধীনতার পর দেশকে পাকিস্তানের স্বৈরশাসনের ধারা থেকে বের করার সুবর্ণ সম্ভাবনাকে পদদলিত করে কিছু দিনের মধ্যেই আবারও স্বৈরাচারী শাসন বলবৎ হয়। জরুরি অবস্থা জারি ও একদলীয় শাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে গণতন্ত্রের অবসান ঘটে। এর পর ১৫ বছরের সামরিক শাসনের সময় কখনও নিয়ন্ত্রিত, কখনও ঘরোয়া গণতন্ত্রের খেলা দেখেছি আমরা। দেড় দশকের সামরিক শাসনের পর যে নির্বাচিত সরকারের কাল চলছে তাতে তফাৎ হয়েছে সামান্যই। এরশাদের পদাংক অনুসরণ করে নির্বাচিত সরকারগুলো নিজেদের পকেটের প্রতিষ্ঠান সাজিয়েছে আর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের ধারা অব্যাহত রেখেছে।
ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার আকাঙ্ক্ষায় একবার খালেদা ও একবার হাসিনার আমলে ভোটারবিহীন নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনকে পুরোপুরি প্রহসন বানিয়ে এখন যে পরিবারতান্ত্রিক শাসন চলছে তাকে বৈধতা দেয়ার জন্য আবার তোলা হয়েছে সেই পুরনো সুর : ‘উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্র ছাড় দিতে হবে’। কিংবা ‘বাংলাদেশ এখনও গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়’।
কী উন্নয়নের চেষ্টা সরকারের, যার জন্য মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতে হবে? সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ লোকজন জমি, খালবিল, নদী, পাহাড় দখল করতে চায়? দশ টাকার কাজ একশ’ টাকা দেখিয়ে বাকি টাকা মেরে দিতে চায়? সেজন্যই সব বড় বড় প্রকল্প হাজির হয়, আর দিনে দিনে শুধু তার খরচ বাড়ে? যা তৈরি হয় টাকা মেরে দেয়ার উন্মাদনায় তার সবই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, টাকার সৌধ তৈরি হয় অন্য দেশে? ক্ষমতা এবং যোগাযোগের জোরে যারা জনগণের সম্পদ পেটে ভরতে চায় তাদের জন্য জোরজবরদস্তির ব্যবস্থাই দরকার, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা থাকলে সত্যিই অসুবিধা!
একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার ঘটে চলেছে একের পর এক, অন্যদিকে টাকার অভাবে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, সড়ক ও রেলওয়ে ধুঁকছে। জাতীয় সংস্থাকে পঙ্গু বানিয়ে, কোণঠাসা করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত দখল বিস্তারে দেশী-বিদেশী কোম্পানিকে ব্ল্যাংক চেক দেয়া হচ্ছে। সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত টানা হয়। সেসব দেশে কি জাতীয় সংস্থাকে ডুবিয়ে কমিশনের লোভে বিদেশী কোম্পানির হাতে দেশের সম্পদ তুলে দেয়া হয়েছে? এসব দেশে কি ভিআইপি হলে যা খুশি তাই করা সম্ভব? এসব দেশে কি আইন, বিচারের চেয়ে মন্ত্রীর কথা বড়? এসব দেশে কি প্রতিষ্ঠানের বদলে জমিদারি স্বেচ্ছাচারিতা চলে? সেসব দেশে কি নদী-নালা, খালবিল এবং পাহাড় সবই দখলের বিষয়? সেখানে কি কতিপয়ের লোভ মেটানোর জন্য সুন্দরবনের মতো অনবায়নযোগ্য অতুলনীয় প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করা হয়েছে?
জ্বালানি খাতে দায়মুক্তি আইন দিয়ে সব অনিয়ম-দুর্নীতিকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে, আইসিটি আইন দিয়ে সবার চিন্তা-মত বন্ধ করার জন্য ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে। সংবাদপত্র টিভি চ্যানেল শুধু নয়, ফেসবুকও এখন চাপের মুখে। যেন মতপ্রকাশ করতে না দিলে সেই মত সমাজ থেকে উবে যাবে! ফেসবুকে মন্তব্য করার জন্য একের পর এক আটক হচ্ছে, কোনো কিছু না করেও আটক, গুম, খুন হচ্ছে তরুণ-যুবকরা। গ্রেফতার, আটক, ক্রসফায়ার এখন শুধু নিপীড়নের নাম নয়, বাণিজ্যেরও বিষয়। আসলে আইন লাগেও না, দেখাই যাচ্ছে ক্ষমতা আর অর্থ থাকলে যা খুশি তাই করা সম্ভব। আইন নিজের গতিতে চলে না, তা চলে ক্ষমতাবানদের ইচ্ছা ও প্রয়োজন অনুযায়ী। বিভিন্ন বাহিনী ‘হাডুডু খেলার’ বদলে একের পর এক ‘ক্রসফায়ারে’ মানুষ মারছে। অন্যদিকে ত্বকীর খুনিসহ অনেক খুনির রক্ষায় নিয়োজিত আছে প্রশাসন। পহেলা বৈশাখের যৌন সন্ত্রাসের কোনো বিচার হয়নি, পথে-ঘরে-ঘাটে-বাজারে প্রতিষ্ঠানে নারীর ওপর যৌন সন্ত্রাস চলছেই। পাহাড়ে-সমতলে সংখ্যালঘু জাতি ও ধর্মের মানুষদের ওপর হামলা-মামলা, জমি সম্পত্তি দখলে কোনো বিরতি নেই। খুনি লুটেরাদের বিরুদ্ধে কথা বললে আটক, ক্রসফায়ারের হুমকি। পেটানোর জন্য প্রতিপক্ষ না পেয়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগ গ্রাম-শহরে শিশু-কিশোর নারী-পুরুষ নানাজনকে মারছে, জমি-টাকা-প্রতিষ্ঠান দখল করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে খুনাখুনি করছে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক হল, খুন আর সহিংসতার পক্ষে সমাজে নানাপক্ষ তৈরি করছে সম্মতি। কাউকে সন্ত্রাসী বললে ক্রসফায়ার, কাউকে চোর বললে নৃশংস নির্যাতন, কাউকে নাস্তিক বললে কুপিয়ে হত্যা এসব কিছুর পক্ষে নানা যুক্তি সমাজে তৈরি করা হচ্ছে। অপরাধের জন্য আইন, বিচার, কথার উত্তর কথা, লেখার উত্তর লেখা এতটুকু সহিষ্ণুতা আশা করাই যেন দিনে দিনে আরও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে গত ৪৩ বছরে জিডিপি বেড়েছে বহুগুণ, বিপুল বিত্তশালী তৈরি হয়েছে, ভবনসহ সড়ক-গাড়ি-বাড়ি বেড়েছে অনেক। কিন্তু মানুষের ন্যূনতম অধিকার, গণতন্ত্র এখনও দুরস্ত! গণতন্ত্র মানে যেমন শুধু ভোট দেয়ার অধিকার বোঝায় না, উন্নয়ন বলতেও তেমনি শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি বোঝায় না। কিন্তু গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত সার্বজনীন ভোটাধিকারই এখন এত বছর পর আক্রমণের সম্মুখীন। নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা- তা কখনোই শক্ত ভিত পায়নি। ফলে শাসক পরিবার বা গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারিতাই এ দেশ পরিচালনার মূল ধরন হিসেবে থেকেছে। সংসদ আছে, নির্বাচন আছে, আইন ও বিচার বিভাগ আছে, দুর্নীতি দমন কমিশন আছে, তথ্য অধিকার কমিশন আছে। কিন্তু সবই খেলা খেলা।
বাংলাদেশে সরকারি আধা-সরকারি এমনকি বেসরকারি বিভিন্ন পদে নিয়োগের জন্য এখন লাখ লাখ টাকা ঘুষ জোগাড়ে নামতে হয় মানুষকে। যোগ্যতা প্রমাণে অর্থ চাই, যোগাযোগ চাই। কোটা আর অঞ্চল দিয়ে যোগ্য তরুণদের সামনে তৈরি করা হয়েছে প্রবল প্রাচীর। অদক্ষ, অযোগ্য, চাটুকার, সন্ত্রাসীতে ভরে গেছে সব প্রতিষ্ঠান। জাতীয় প্রতিষ্ঠান, জাতীয় সক্ষমতা, প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, প্রশাসন সব এভাবে ডুবিয়ে দিয়ে দেশকে কী উন্নয়নের পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের সরকার?
বস্তুত ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার বাসনা তৈরি হয় লুণ্ঠন, দুর্নীতি আর সর্বজনের সম্পদ দখলকে চিরস্থায়ী করার জন্য। আর ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে গেলে কোনো সংজ্ঞাতেই গণতন্ত্র রাখা চলে না। এমনকি দলের ভেতরও নয়। বর্তমানে ‘উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র’ যে আওয়াজ তোলা হয়েছে তার সারকথা হল এই যে, কিছু দেশী-বিদেশী গোষ্ঠীর হাতে বাংলাদেশকে তুলে দিতে গেলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বন্দি করে ফেলতে হবে। কেননা জবাবদিহিতা আর স্বচ্ছতা রাখলে কতিপয়ের দস্যুবৃত্তি অব্যাহত রাখা যায় না।
আনু মুহাম্মদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ
anujuniv@gmail.com

চীনে পৃথিবীর প্রথম যাত্রীবাহী ড্রোন

পৃথিবীতে প্রথমবারের মতো তৈরি হল যাত্রীবাহী ড্রোন। বুধবার চীনা এক কোম্পানি পৃথিবীর প্রথম যাত্রীবাহী ড্রোন ওড়ানোর ঘোষণা দেয়। ইহাং ইঙ্ক নামের ওই কোম্পানি লাস ভেগাস কনভেনশন সেন্টারে ইহাং ১৮৪ নামের ওই ড্রোনটি উড়িয়ে দেখায়। কোম্পানির এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ছোট্ট একটি হেলিকপ্টারের মতো দেখতে ওই ড্রোনে রয়েছে অন্যান্য ড্রোনের মতোই চারটি প্রপেলার। ইহাংয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও অর্থবিষয়ক প্রধান শাং শিয়াও বলেন,
‘আমরা আশা করছি এটি ২ থেকে ৩ লাখ মার্কিন ডলারে বিক্রি করতে পারব। তবে এ বিষয়ে কিছু আইনি বিধিনিষেধ থাকতে পারে। তবে পৃথিবীতে এমন কিছু এর আগে তৈরি হয়নি, এ বিষয়ে আমরা নিশ্চিত।’ ইলেকট্রিক শক্তিতে চলা ওই ড্রোনটি দুই ঘণ্টায় পুরোপুরি চার্জ হয়ে যায়। ১০০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে এবং ২৩ মিনিট ধরে উড়তে সক্ষম এই ড্রোন। একজন মানুষ বসার পরও একটি ব্যাকপ্যাক রাখার জায়গা থাকে এতে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াও এতে রয়েছে একটি রিডিং লাইটের ব্যবস্থা। সূত্র গার্ডিয়ান।

হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও ভয়ংকর কিম জং উন!

কিম জং উন। বিশ্বের সবচেয়ে অভবিতব্য খামখেয়ালি নেতা। উত্তর কোরিয়ার এই অপরিণামদর্শী একনায়কতার স্বৈরশাসক পূর্ব পুরুষদের চেয়েও একগুঁয়ে। বুধবার দেশটি প্রথমবারের মতো হাইড্রোজেন বোমার সফল বিস্ফোরণের দাবি করেছে। বিশেষজ্ঞদের যদিও সন্দেহ রয়েছে সেটা হাইড্রোজেন বোমা নাকি পারমাণবিক বোমা। কিন্তু যে বোমাই হোক না কেন, কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এমন বোমা ফাটানো স্বৈরশাসককে পুরো কোরীয় উপদ্বীপ ও বিশ্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিম জং উনের বাবা কিম জং ইল কিংবা দাদা কিম ইল সাংয়ের নীতি-কৌশলে এক ধরনের ধারাবাহিকতা ছিল।
কিন্তু কিম জং উন একেবারেই আলাদা ও ঘাড়ত্যাড়া। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় একঘরে হয়ে থাকা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এই নেতার মতিগতির কোনো ঠিক নেই। অতীতে পরমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের আগে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে রাখত উত্তর কোরিয়া। কিন্তু ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একেবারে আকস্মিকভাবে হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বিশ্বকে দ্বন্দ্বে ফেলে দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড ইউনিফিকেশন স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র গবেষক চাং ওয়াং সিউক বলেন, ‘ধারণার বাইরে গিয়ে সাহসী কিন্তু অশুভ পদক্ষেপ নিয়েছেন উন। তাই তার পরিকল্পনা আঁচ করা কঠিন। অতীতের সব আচরণের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।’
উনকে থামাতে পারবে বেইজিং?
উত্তর কোরিয়ার হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণে সবচেয়ে বিস্মিত হয়েছে ‘আজন্ম মিত্র’ বলে পরিচিত চীন। বেইজিংকে না জানিয়ে এমন কাণ্ড করায় তার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অনেকে মনে করেন, উত্তর কোরিয়াকে শান্ত করতে হলে একমাত্র বেইজিংই ভূমিকা রাখতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীন একটু ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কোরীয় যুদ্ধের সময় চীনের নেতা মাও সে তুং কিম ইল সাংকে সহায়তায় সেনা পাঠিয়েছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে দরকষাকষিতে চীনকে বাফার স্টেট হিসেবে নেয় উত্তর কোরিয়া। আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে টক্কর দিতে বেইজিংয়ের দাবার গুটি পিয়ং ইয়ং। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন-কোরিয়া সম্পর্ক এখন আর আগের অবস্থায় নেই। ২০১১ সালে কিম জং ইলের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি বদলে গেছে।
রগচটা কিম জং উন কারও কথাই শোনেন না। তিনি তার নিজের চাচা জাং সং থায়েকসহ চীনের ঘনিষ্ঠ অনেক সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। কিম জং উন কখনোই চীন সফরে আসেননি, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গেও কখনও দেখা করেননি। যদিও দুই নেতার বৈঠকের জন্য কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করা হয়েছিল। ইয়োনসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লি জাং হুমের বলেন, ‘চীনের দৃষ্টিতে কিম জং উন একজন খচ্চর, দায়িত্বজ্ঞানহীন, বেপরোয়া নেতা।’ বিপজ্জনক এই ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সঙ্গে চীন সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বন্ধ, চীনা আকাশসীমা ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে বেইজিং। তবে চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা বলছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সামষ্টিক প্রজ্ঞা ও স্থির সংকল্প নিয়ে এগুতে হবে।

ইয়েমেনে ইরানি দূতাবাসে সৌদির বোমা হামলা?

ইরান অভিযোগ করেছে, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় তাদের দূতাবাসে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিমান থেকে বোমা হামলা চালিয়েছে। ইরানের দাবি, এতে তাঁদের বেশ কয়েকজন দূতাবাসকর্মী আহত হয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসাইন জাবের আনসারিকে উদ্ধৃত করে এ খবর জানায়। তবে সৌদি জোট বলেছে, ইরানের এই অভিযোগের ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ নেই। এদিকে, গতকাল ইরান সরকার সৌদি আরবের সব ধরনের পণ্য সে দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। একই সঙ্গে পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত সব ইরানি নাগরিককে মক্কায় ওমরাহ পালন করতে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। খবর আল-জাজিরার। হোসাইন জাবের আনসারি বলেন, ‘দূতাবাসের ক্ষয়ক্ষতি ও কর্মীদের আহত হওয়ার জন্য সরাসরি সৌদি সরকার দায়ী।’ তবে ঠিক কখন এ হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলেননি। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেন সরকারের অনুরোধে দেশটির বিদ্রোহী হুতিদের ওপর বিমান হামলা চালিয়ে আসছে। সৌদি জোটের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ আসেরি গতকাল রয়টার্সকে বলেছেন, ইরানের অভিযোগ তাঁরা খতিয়ে দেখবেন। আসেরি বলেন, সানায় পরিত্যক্ত দূতাবাসগুলোসহ বিভিন্ন বেসামরিক স্থাপনায় বিদ্রোহী হুতিরা রকেট উৎক্ষেপণব্যবস্থা পেতেছে বলে তাঁরা খবর পাচ্ছেন। ওই খবর অনুযায়ী বুধবার দিবাগত রাতে সানায় বেশ কয়েকটি স্থাপনায় তারা বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, ইরান শিয়া গোষ্ঠীভিত্তিক হুতি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগ তুলেছে।
কাজেই এই অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। সৌদির পক্ষে এবার কাতার, জিবুতি ও তুরস্ক: ইরানে সৌদি দূতাবাস ও কনস্যুলেট ভবনে হামলা এবং অগ্নিসংযোগের জেরে সৌদি আরবের পক্ষে এবার সক্রিয় অবস্থান নিয়েছে কাতার। এর অংশ হিসেবে কাতার তেহরানে থাকা তার রাষ্ট্রদূতকে গত বুধবার প্রত্যাহার করে নিয়েছে। একই দিনে আফ্রিকান দেশ জিবুতি ইরানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। জর্ডান তাঁর দেশে ইরানের নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। ইরানের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এরদোয়ান গত বুধবার আঙ্কারায় দেওয়া এক ভাষণে বলেন, ‘(ইরানে) সৌদি দূতাবাসে রকেট লঞ্চার দিয়ে হামলা করা হয়েছে। ইরাকেও সৌদি দূতাবাস তছনছ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনের নিরিখে এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ সৌদি আরব গত শনিবার সে দেশের প্রভাবশালী শিয়া নেতা শেখ নিমর আল-নিমরসহ ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই শিয়াপ্রধান দেশ ইরান ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। শনিবার দিবাগত রাতে তেহরানে সৌদি দূতাবাস ও ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর মাশহাদে সৌদি কনস্যুলেট ভবনে বিক্ষোভকারীরা হামলা চালায় ও আগুন ধরিয়ে দেয়। এর জের ধরে সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে। সৌদির সমর্থনে বাহরাইন ও সুদানের পর সর্বশেষ বুধবার জিবুতিও ইরানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে। অবশ্য ইতিমধ্যেই ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সৌদি দূতাবাসে হামলায় জড়িত বেশির ভাগ ব্যক্তিকে ধরা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ আর নেই

মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ
ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ (৭৯) মারা গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেসে (এআইআইএমএস) শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মুফতি মোহাম্মদ সাঈদের মৃত্যুতে জম্মু ও কাশ্মীর সরকার সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে জানানো হয়, সাঈদকে গত ২৪ ডিসেম্বর এআইআইএমএসে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্থানীয় সময় গতকাল সকাল সাড়ে সাতটায় তিনি মারা যান। নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন মুফতি মোহাম্মদ সাঈদ। হাসপাতালে ভর্তির পর তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়।
সাঈদের মরদেহ শ্রীনগরে নেওয়া হবে। জনগণকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দিতে সেখানে তাঁর মরদেহ রাখা হবে। দক্ষিণ কাশ্মীরে পৈতৃক গ্রামে তাঁকে দাফন করা হতে পারে। গত বছরের মার্চে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) প্রতিষ্ঠাতা সাঈদ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে সাঈদের উত্তরসূরি হতে পারেন তাঁর মেয়ে মেহবুবা মুফতি।

বিজ্ঞান কংগ্রেসের সমালোচনায় রামকৃষ্ণান

ভি. রামকৃষ্ণান
ভারতীয় বংশোদ্ভূত নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ভি. রামকৃষ্ণান ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি জীবনে আর বিজ্ঞান কংগ্রেসে যোগ দেবেন না। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। ভারতের মহিশুরে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দেননি রামকৃষ্ণান। এর কারণ প্রসঙ্গে টাইমস অব ইন্ডিয়াকে গত মঙ্গলবার চণ্ডীগড়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রামকৃষ্ণান বলেন, 
‘এর আগের অধিবেশনে আমি এক দিন যোগ দিয়েছিলাম। সেখানে বিজ্ঞান নিয়ে তেমন কথাবার্তা হয়নি। এটা একটা সার্কাস। আমার এখন মনে হয়, এটি এখন এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিজ্ঞান খুবই কম আলোচিত হয়। আমি আমার জীবনে বিজ্ঞান কংগ্রেসে আর যাব না।’