Monday, October 28, 2024

ইসরায়েলিদের তোপের মুখে বক্তব্য থামাতে বাধ্য হলেন নেতানিয়াহু

গাজায় ইসরায়েলি হামলা নিয়ে প্রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে থাকেন ইসরায়েলিরা। এমনকি এ হামলার মূল লক্ষ্য অর্জন নিয়েও নানা সময়ে নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত হন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এবার তিনি ইসরায়েলি আন্দোলনকারীদের তোপের মুখে পড়েছেন। এ সময় নিজের বক্তব্য থামাতেও বাধ্য হন নেতানিয়াহু।

সোমবার (২৮ অক্টোবর) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারের রাজধানী দোহায় গাজায় যুদ্ধবিরতি আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গত বছরের ৭ অক্টোবরে হামলায় নিহতদের স্মরণে একটি স্মৃতিসৌধে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। এ সময় ইসরায়েলি বিক্ষোভকারীদের কারণে নিজের বক্তব্যও থামাতে বাধ্য হন তিনি।

অনুষ্ঠানের একটি লাইভ সম্প্রচারে দেখা গেছে, রোববার (১৭ অক্টোবর) অনুষ্ঠান চলাকালে ইসরায়েলিদের বিক্ষোভের কারণে মঞ্চে এক মিনিটের বেশি সময় ধরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন নেতানিয়াহু। এ সময় কিছু লোক ‘শেম অন ইউ’ বলে স্লোগান দেন। নেতানিয়াহুর বক্তব্য শুরুর পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় বক্তব্য থামাতে বাধ্য হন তিনি।

এ সময় বিক্ষোভকারীদের একজন চিৎকার করে বলেন, আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে।

টাইমস অব ইসরায়েল জানিয়েছে, অনুষ্ঠানে প্রাথমিকভাবে শোকাহত পরিবারের সদস্যদের বক্তৃতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। আশঙ্কা করা হচ্ছিল যে তারা সরকারের সমালোচনা করবে। কিন্তু বিক্ষোভের মুখে পরিবারের সদস্যদের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়।

এদিকে ইসরায়েলিদের তোপের মুখে পড়লেও গাজায় তাদের তাণ্ডব চলছে। আলজাজিরা জানিয়েছে, রোববার গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে উত্তর গাজায় অন্তত ৪৬ জন নিহত হয়েছেন। এলাকাটিতে ইসরায়েলি সেনারা অভিযান জোরদার ও গণগ্রেপ্তার চালাচ্ছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলায় নিহতদের মধ্যে আরও দুজন সংবাদিক রয়েছেন। এ নিয়ে গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ যুদ্ধে মোট ১৮২ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ নিয়ে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৪২ হাজার ৯২৪ জনে দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার ৭৬৫ জন শিশু রয়েছেন। এ ছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন আরও প্রায় ১০ হাজারের বেশি মানুষ।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, এক বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে গাজায় এক লাখ ৮৩৩ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া অধিকৃত পশ্চিত তীরে আরও ছয় হাজার ২৫০ জন আহত হয়েছেন।

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় এক বছর ধরে অব্যাহত ইসরায়েলি হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে অন্তত ১৫ বছর সময় লাগবে। এ জন্য প্রতিদিন ১০০টি লরি ব্যবহার করতে হবে। জাতিসংঘের হিসাবমতে, গাজায় ভবন ধসে এ পর্যন্ত ৪২ মিলিয়ন টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপ জমা হয়েছে। এ ধ্বংসস্তূপগুলো যদি একসঙ্গে এক জায়গায় রাখা যায়, তাহলে তা মিশরের ১১টি গ্রেট পিরামিডের সমান হবে। এ ধ্বংসস্তূপ সরাতে ব্যয় হবে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি)।

ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের হিসাব অনুসারে, গাজায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৯৭টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা অঞ্চলটির মোট ভবনের অর্ধেকের বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া এক-দশমাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এক-তৃতীয়াংশ বেশ খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলার জন্য ২৫০ থেকে ৫০০ হেক্টর জমির প্রয়োজন পড়বে

গাজাভিত্তিক জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘অবকাঠামোর যে পরিমাণ ক্ষতি করা হয়েছে, তা পাগলামির পর্যায়ে পড়ে; দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি ভবনও নেই যেখানে ইসরায়েল হামলা চালায়নি।’ 
সেনাদের নিয়ে এক অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত
সেনাদের নিয়ে এক অনুষ্ঠানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : সংগৃহীত

লেবানন যুদ্ধে ইসরায়েলের আরও ৪ সেনা নিহত, আহত ১৪

দক্ষিণ লেবাননের একটি গ্রামে ইরান সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে আরও চারজন ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং ১৪ সেনা আহত হয়েছেন।

শনিবার (২৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এ হতাহতের খবর জানায়।

নিহত সেনাদের মধ্যে রয়েছেন ক্যাপ্টেন (রিজার্ভ) রাব্বি আব্রাহাম যোশেফ গোল্ডবার্গ (৪৩), মাস্টার সার্জেন্ট (রিজার্ভ) গিলাদ এলমালিয়াচ (৩০), ক্যাপ্টেন (রিজার্ভ) অমিত চাইউট (২৯) এবং মেজর (রিজার্ভ) এলিয়াভ আব্রাম আবিতবোল (৩৬)। তারা সবাই আলন ব্রিগেডের ৮২০৭তম ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন।

এ চার সেনা আলন ব্রিগেডের ৮২০৭তম ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তাদের মৃত্যু ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ তারা দেশের নিরাপত্তার জন্য লড়াই করছিলেন।

ইসরায়েলের সেনাদের নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া লেবাননের যুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায়। যুদ্ধটি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আইডিএফের চলমান স্থল অভিযানের অংশ এবং সীমান্তে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলছে। আইডিএফের মতে, এ নতুন ঘটনার ফলে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাতের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে।

এদিকে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী হিজবুল্লাহকে পিছু হটাতে তাদের অস্ত্র মজুত ও তৈরি স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে আক্রমণ চালিয়েছে। বৈরুতে হিজবুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রাগারে হামলা চালানো হয়েছে, যা সংঘাতের তীব্রতা বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া হিজবুল্লাহর ওপর ক্রমবর্ধমান হামলার ফলে ইসরাইলের উত্তর সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে নিরাপত্তার জন্য ৬০ হাজারেরও বেশি বাসিন্দাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতি মানবিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে।

এখন পর্যন্ত চলমান লেবানন যুদ্ধে ২০০০-এর বেশি হিজবুল্লাহ সদস্য নিহত হয়েছে এবং আইডিএফের ৫৫ জন সৈন্য ও রিজার্ভ সদস্যের মৃত্যু হয়েছে বলে জানায় আইডিএফ। এ পরিসংখ্যান যুদ্ধের পরিস্থিতির জটিলতা ও সংঘাতের তীব্রতার কথা বলছে।

ইসরায়েলি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হিজবুল্লাহর রকেট ও ড্রোন হামলার ফলে উত্তর ইসরাইলের অনেক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সেখানে প্রচুর অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

চলমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের গোটা অঞ্চলে আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। 

ছবি : সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত শেষ হবে কীভাবে?

গেল বছর ৭ অক্টোরের মাত্র এক সপ্তাহ আগে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জ্যাক সুলিভান বলেছিলেন, ‘গত দুই দশকের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্য আজ অনেকটাই শান্ত।’ কিন্তু তারপর থেকে অঞ্চলটিতে এক বছর ধরে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট চলছে। গাজা থেকে শুরু হয়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননেও। এতে যোগ দিয়েছে ইরাক, ইয়েমেন ও সিরিয়ার বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী।

একের পর এক শান্তি প্রক্রিয়া ব্যর্থ হচ্ছে। একদিকে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশগুলো তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে তুলেছে অন্যদিকে পশ্চিমা অস্ত্রের সরবরাহও সমানতালে ইসরায়েলকে শক্তিশালী করছে। এমন পরিস্থিতিতে সবার প্রশ্ন মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শেষ হবে কীভাবে?

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছরের সাতই অক্টোবরের আগে গাজার বাসিন্দাদের জীবন কেমন ছিল, তা মানুষ প্রায় ভুলতে বসেছে। কারণ গণমাধ্যম ক্রমাগত মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘সর্বাত্মক যুদ্ধের’ আশঙ্কার কথা বলছে। এই সংকট মোকাবিলা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল মাইকেল কুরিলার সাম্প্রতিক সময়ের ইসরায়েল সফর দেখে মনে হয়, কূটনৈতিক উপায় খোঁজার চেয়ে ব্যবস্থাপনার দিকে যুক্তরাষ্ট্র বেশি মনোযোগী।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র এ সপ্তাহ বাকি এবং এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বিষাক্ত অবস্থায় আছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো সাহসী ও নতুন উদ্যোগ নিবে বলে মনে হয় না। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো, বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাত প্রতিরোধ করা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের শাসকরা ইসরায়েলবিহীন একটি বিশ্বের স্বপ্ন দেখতেই পারে, কিন্তু তারাও জানে, এই অঞ্চলের একমাত্র পরাশক্তিকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে ইরান খুবই দুর্বল। বিশেষ করে, এমন এক সময়ে যখন ইরান সমর্থিত হামাস ও হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। একইভাবে, ইরানের দেওয়া হুমকি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি পেতে চায় ইসরায়েল। কিন্তু ইসরায়েল জানে, সম্প্রতি তারা বিভিন্ন অভিযানে সফল হলেও একা এ কাজ করতে পারবে না।

ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ইসরায়েলের চলমান বিরোধ সমাধান নিয়ে আলোচনাও বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো একদিন যদি ইসরায়েলের মনে হয়, তারা হামাস ও হিজবুল্লাহর যথেষ্ট ক্ষতিসাধন করেছে বা যখন মার্কিন নির্বাচন শেষ হবে, তখন হয়তো সংকট সমাধানের সুযোগ আসবে। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে, সংকট সমাধানের পথ আরও অনেক দূরে।

ছবি : সংগৃহীত

ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট বাড়াতে কী খাবেন?

এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। রোগটিতে লাফিয়ে বাড়ছে আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা। এতে আতঙ্ক বিরাজ করছে জনমনে। কারণ অতীতের তুলনায় রোগটির প্রভাব এবার অনেক বেশি। প্রতিদিনই হাসপাতালে ভিড় করছে অসংখ্য রোগী। যাদের অনেকের একটাই সমস্যা, প্লাটিলেট কমে যাচ্ছে।

প্লাটিলেট হলো রক্তের কোষ, যা রক্তকে জমাট বাঁধতে সাহায্য করে। একজন সুস্থ মানুষের প্রতি ১০০ মিলিমিটার রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা দেড় থেকে চার লাখ থাকা উচিত। প্লাটিলেটের ওপর নির্ভর করে মানুষের সুস্থ থাকা। আর তাই শরীরে প্লাটিলেটের অভাব হলে সহজে ক্লান্তি ভর করে। খুব সহজে আঘাত পাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ডেঙ্গুর কারণে এই প্লাটিলেটের মাত্রা কমে যেতে পারে অস্বাভাবিকভাবে। জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে এই প্লাটিলেটের মাত্রা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। রক্তে কমে যাওয়া প্লাটিলেটের পরিমাণ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কিছু খাবারের বিশেষ ভূমিকা আছে।

নিয়মিত ভিটামিন বি-১২ খেলে শরীরে প্লাটিলেটের পরিমাণ বাড়ে। যেকোনো আমিষ খাবারেই এই ভিটামিন বি১২ প্রচুর পরিমাণে থাকে।

পেঁপে : প্লাটিলেট বাড়াতে পেঁপের জুস খেতে পারেন। পেঁপেপাতা অণুচক্রিকা বাড়াতে সাহায্য করে বলে ডেঙ্গুতে উপকারী। পেঁপেপাতা বেটে রস করে পান করতে পারেন। এ ছাড়া পাতা সেদ্ধ করেও খাওয়া যায়।

ব্রোকলি : ভিটামিন ‘কে’– এর দারুণ উৎস ব্রোকলি, যা রক্তে প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে। যদি দ্রুত কমতে থাকে, তবে প্রতিদিনকার খাবারে অবশ্যই ব্রোকলি যুক্ত করবেন। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও নানা উপকারী খনিজ রয়েছে।

বেদানা : বেদানায় দরকারি নানা পুষ্টি ও খনিজ উপাদান রয়েছে, যা শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে পারে। শরীরের ধকল কাটাতে বেদানা দারুণ উপকারী। এ ছাড়া এটি আয়রনের উৎস বলে রক্তের জন্য উপকারী। প্লাটিলেটের সংখ্যা স্বাভাবিক রাখতে এবং ডেঙ্গু সারাতে এটি উপকারী।

পালংশাক : আয়রন ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের অন্যতম উৎস পালংশাক । এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এ ছাড়া শরীরে প্লাটিলেটের সংখ্যা বাড়াতে পারে।

ডাব : ডাবের পানিতে খনিজ বা ইলেকট্রোলাইটস আছে, যা ডেঙ্গু জ্বরে খুবই দরকারি।

এ ছাড়াও মিষ্টিকুমড়ার বীজ, লেবুর রস, বিটের রস, আমলকী, অ্যালোভেরার রসও প্লাটিলেট বাড়াতে সাহায্য করে।

মনে রাখা জরুরি ➡️

ডেঙ্গু রোগীর হজমশক্তি অনেকাংশে কমে যায় বলে বমি ও পেটব্যথা হতে পারে। রোগীর যকৃতে অস্বাভাবিকতা সৃষ্টি হয়ে রক্তে এসজিপিটির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই রোগীকে বাড়তি মসলা ও তেলচর্বিযুক্ত খাবার না খাওয়ানোই ভালো। তবে রোগীর খাবারে পর্যাপ্ত আমিষ উপাদান থাকা জরুরি। এ জন্য মাছ, মুরগি, দুধ, ডিম প্রভৃতি উপকরণে তৈরি বিভিন্ন ধরনের খাবার খেতে দেয়া উচিৎ।

(লেখক: নিউট্রিশনিস্ট ও ডায়েটিশিয়ান, কনসেল হেলথ; ক্লে বিউটি অ্যান্ড স্পা।)

প্রতীকী ছবি। পিক্সাবে

ফেরারির মতো ছুটছেন ছাত্রলীগ নেতারা, সামনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই -আল জাজিরার প্রতিবেদন

নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। রোববার (২৭ অক্টোবর) প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন ২৪ বছর বয়সী ফাহমি (ছদ্মনাম)। তবে গত আগস্টের শুরুর দিক থেকে তিনি আত্মগোপনে আছেন। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন এটি। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে লৌহমুষ্টি দিয়ে দলটি দেশ শাসন করেছে। আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে এই সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশ ভারতে পালিয়ে যান।

সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে একটি ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, গত ১৫ বছরে সহিংসতা, হয়রানি ও নিজেদের স্বার্থে জনসম্পদ ব্যবহারসহ গুরুতর অসদাচরণের ইতিহাস রয়েছে ছাত্রলীগের।

ফলিত রসায়নের স্নাতকের শিক্ষার্থী ফাহমি আল জাজিরাকে জানান, কিছুদিন আগে তিনি এখানের কর্তৃত্বের কণ্ঠস্বর ছিলেন। অথচ এখন তিনি ফেরারির মতো ছুটছেন, যার সামনে কোনো ভবিষ্যৎ নেই।

আজ জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফাহমির গল্পে তার মতো হাজারো শিক্ষার্থীর বর্তমান অবস্থার প্রতিফলন আছে। এসব শিক্ষার্থী আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারা একসময় বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলোতে শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু রাতারাতি তাদের অবস্থান ধসে গেছে। ক্যাম্পাসের সাবেক ক্ষমতাশালী, রাজপথে আওয়ামী লীগের পেশিশক্তি হিসেবে পরিচিত এসব ছাত্র এখন উচ্ছেদ, প্রতিশোধ, এমনকি কারাবাসের মুখোমুখি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ দমনচেষ্টা এবং তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য তাদের আজ এই দশা।

ফাহমি আল জাজিরাকে আরও বলেন, ‘আমি হাসিনাবিরোধী বিক্ষোভকালে জনগণের বিরুদ্ধে সরকারের প্রাণঘাতী দমনপীড়নে সরাসরি অংশগ্রহণ করিনি। আমার বোনেরা বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিল। আমিও মনে করতাম, দাবি সঠিক। কিন্তু আমি দলীয় বাধ্যবাধকতায় আটকা পড়েছিলাম।’

ফাহমি বলেন, হাসিনাবিরোধী বিক্ষোভকারীরা ঢাকা থেকে ১৭৩ কিলোমিটার দূরে নোয়াখালী জেলায় তার পরিবারের বাড়ি ও কোল্ডস্টোরেজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি কোথায় আছি, তা না জানালে তারা আমার ছোট ভাইকে হাওয়া করে দেবে বলে হুমকি দিয়েছেন।’

ফাহমি স্বীকার করেন, ছাত্রলীগের একজন নেতা হওয়াটা তার একটি সরকারি চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতি তার আনুগত্যের আরেক অর্থ হলো, পরিবারের প্রয়োজনে তিনি সব সময় পাশে থাকতে পারেননি।

ফাহমি আক্ষেপ করে বলেন, ‘পেছনে ফিরে তাকালে আমি দেখতে পাই, আমি আমার পরিবারকে সমর্থন করার চেয়ে দলকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।’

তিনি জানান, যখন শেখ হাসিনা ভারতে নিরাপদে আছেন, তখন তিনি ক্রমাগত সহিংসতা বা গ্রেপ্তারের হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, একসময় তিনি যে দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেন, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি ছাত্র, তারা তাকে পরিত্যাগ করেছে। তিনি তিক্তস্বরে বলেন, ‘আমি যে সালাম দিতাম এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিনিয়োগ করেছিলাম আমাদের নেতাদের জন্য এবং দলীয় সমাবেশের আয়োজনে, এখন তা অর্থহীন মনে হচ্ছে।’

ফাহমি বলেন, ‘দল আমাদের তার রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু যখন আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন কোনো সুরক্ষা দেয়নি। হঠাৎ সরকার পতন হলো। ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোটা আমার পক্ষে সেই সন্ধ্যায় সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল। তারপরও দলের শীর্ষ নেতারা বা ছাত্রলীগের নেতারা কেউই আমার খোঁজ নেননি।’

তিনি বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরিতে যোগ দিতে চেয়েছিলাম এবং জাতির সেবা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ক্যাম্পাসে পা রাখলে নানা গোলমেলে অভিযোগে আমাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। কিংবা আরও খারাপ কিছু- আমাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হতে পারে।’

আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু ফাহমি একাই এমন পরিস্থিতিতে পড়েননি। আওয়ামী লীগের আনুমানিক হিসাব মতে, সারা দেশে দলসংশ্লিষ্ট অন্তত ৫০ হাজার ছাত্র এখন অচল হয়ে আছেন। তারা তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছেন।

উল্লেখ্য, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যাওয়ার পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। এই সরকার ২৩ অক্টোবর এক গেজেটে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে (২০০৯) ছাত্রলীগকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে। পরিহাসের বিষয় হলো, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই আইনটি পাস করে। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতৃত্বে দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর এই সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

আল জাজিরায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট। ছবি : সংগৃহীত

কেমন ছিল গাদ্দাফির রাজ্য, কীভাবে হত্যা করা হয় তাঁকে by শুভা জিনিয়া চৌধুরী

নিজ দেশের অনেক প্রজার কাছে তিনি ছিলেন ভালোবাসার রাজা। আর পশ্চিমাদের চোখে ছিলেন একনায়ক। ৪২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর টলে যায় মসনদ। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সমর্থনপুষ্ট বিরোধী একটি গোষ্ঠীর হাতে আটক হন তিনি। ২০১১ সালের ২০ অক্টোবর হত্যা করা হয় তাঁকে। বলছি, লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির কথা।

গাদ্দাফি আরব বিশ্ব ও আফ্রিকায় ছিলেন বেশ জনপ্রিয়। আর স্বাভাবিকভাবেই পশ্চিমাদের চক্ষুশূল। ১৯৬৯ সালে সামরিক এক অভ্যুত্থানে লিবিয়ার মসনদে বসেন তিনি। লিবিয়ার রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন গাদ্দাফি।

তখন লিবিয়ার বাদশাহ ছিলেন সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ইদ্রিস বিন মুহাম্মদ আল মাহদি। গাদ্দাফির নেতৃত্বে সামরিক দলের অভ্যুত্থানে ইদ্রিসের পতন হয়।

গাদ্দাফির ৪২ বছরের শাসনামলে তাঁকে ঘিরে রয়েছে সমালোচনা, ভালোবাসা, আক্ষেপ, ঘৃণা। কীভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়, কেমন ছিল তাঁর শাসনব্যবস্থা, গাদ্দাফির পতন ঘটিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব কী চেয়েছিল, লিবিয়া কী পেল—এমন অনেক প্রশ্ন রয়েছে আজও। কিছু প্রশ্নের উত্তর মিলেছে, কিছু মেলেনি। এসব প্রশ্নের উত্তর মেলাতে ফিরে যাওয়া যাক গাদ্দাফি যুগে।

গাদ্দাফির মসনদে বসা

গাদ্দাফি ছিলেন সুদর্শন ও ক্যারিশম্যাটিক তরুণ এক সেনা কর্মকর্তা। মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসেরের ভক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৫৬ সাল থেকে  ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নেন। ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর একটি দলকে সঙ্গে নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটান। ওই সময় বাদশাহ ইদ্রিস তুরস্কে ছিলেন।

রাষ্ট্রক্ষমতা দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন বাদশাহর ভাইপো যুবরাজ সাইদ হাসান অর রিদা আল মাহদি। এই সুযোগই কাজে লাগান গাদ্দাফি। রিদা আল মাহদিকে গৃহবন্দী করে ক্ষমতা দখল করেন গাদ্দাফি। এভাবে তাঁর নেতৃত্বে লিবিয়া রাজতন্ত্রমুক্ত হয়। নাসেরের ভক্ত গাদ্দাফি অভ্যুত্থানের পর নিজেকে ক্যাপ্টেন থেকে কর্নেল পদে উন্নীত করেন।
কেমন ছিল গাদ্দাফির শাসন

গাদ্দাফির শাসনের চার দশকে লিবিয়াবাসী কি সুখী ছিল? এর উত্তরে আসে নানা মত। স্বৈরশাসক গাদ্দাফির বিরুদ্ধে দমন-পীড়নসহ অভিযোগের পাল্লা কম ভারী ছিল না। তবে এ কথাও সত্যি, তাঁর আমলে লিবিয়ায় স্থিতিশীলতা ছিল। আফ্রিকা তো বটেই, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শ্রমিকদের কাছে লিবিয়া ছিল লোভনীয় কর্মক্ষেত্র। দেশটিতে গিয়ে তাঁরা বিপুল অর্থ আয় করেছেন। জীবনমানের উন্নয়ন করেছেন। অনেকে দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে এসেছেন।

গাদ্দাফি দেশের তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিলেন। তাঁর সময়ে লিবিয়া অনেক বেশি তেলসমৃদ্ধ দেশে পরিণত হয়। প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য লিবিয়ার ১১টি সীমান্ত এলাকাকে ৪টি জোনে ভাগ করে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় দেশকে অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত করার কাজ করেছিলেন।

দেশকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে গেলেও গাদ্দাফি ছিলেন একনায়ক। ৪২ বছরের শাসনে দিন দিন হয়ে উঠেছিলেন স্বৈরশাসক। ‘জনগণ লিবিয়া পরিচালনা করে,’ এমন স্লোগান দিলেও গাদ্দাফির সময়ে জনগণের কথা বলার স্বাধীনতা ছিল না। বিরোধী মতকে দমনপীড়ন করতেন তিনি। কয়েক দশকের শাসনামলে শত শত নারীর ওপর যৌন নির্যাতন চালানোর অভিযোগ রয়েছে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে। ত্রিপোলির প্রাসাদে অনেক নারীকে আটকে রাখতেন তিনি। আর গাদ্দাফির নানা সব খেয়ালি ইচ্ছা পূরণে সাহায্যকারী কর্মকর্তারা দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে যেতেন।

অভিযোগ আছে, গাদ্দাফি অনেক বিচারকাজ করেছেন প্রকাশ্যে ও গোপনে। হত্যা করেছেন অনেক মানুষ। ১৯৮৮ সালে স্কটল্যান্ডের লকারবিতে প্যানঅ্যাম এয়ারলাইনসের একটি জাম্বো জেট বিমানে বোমা হামলায় ২৭০ জন নিহতের ঘটনায় গাদ্দাফির জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার পরিকল্পনা করার জন্য অভিযুক্ত হন লিবীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা। বহু বছর ধরে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তিনি। ফলে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয় লিবিয়াকে। পরে অবশ্য ১৯৯৯ সালে লকারবি বিমান হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন দুজনকে হস্তান্তর করে গাদ্দাফি প্রশাসন।

পশ্চিমাদের সঙ্গে বিরোধ

শুরু থেকেই পশ্চিমা বিশ্বের চক্ষুশূল ছিলেন গাদ্দাফি। তিনি চাইতেন আরব আধিপত্য। ১৯৭২ সালে ফেডারেশন অব আরব রিপাবলিকস গঠনের মাধ্যমে আরব দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়তে চেয়েছিলেন তিনি। তবে এ উদ্যোগ সফল হয়নি। আউজো উপত্যকা নিয়ে প্রতিবেশী দেশ চাদের সঙ্গে সত্তর দশকে যুদ্ধে জড়ায় লিবিয়া। গাদ্দাফি সব সময়ই ফিলিস্তিনের পক্ষে ছিলেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকে সমর্থন দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর রোষের শিকার হন তিনি।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান গাদ্দাফিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের পাগলা কুকুর’ বলতেন। ১৯৮২ সালের মার্চে লিবিয়ার তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। লিবিয়ার তেলশিল্পে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে ২০০৪ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়। এ সময়ে লিবিয়ার ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

২০০৯ সালে গাদ্দাফি আফ্রিকান ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। আফ্রিকার দেশের স্বার্থ নিয়ে জাতিসংঘ অধিবেশনে গাদ্দাফির ঝাঁজালো বক্তব্য, নীতিমালার অনুলিপি ছিঁড়ে ফেলা পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্কে আবারও অবনতি ঘটায়। এসবেরই প্রভাব পড়তে থাকে গাদ্দাফির নিজের সাম্রাজ্যে।

গাদ্দাফিকে হত্যা

২০১০ সালের শুরুর দিকে বিশ্ব আন্দোলিত হয় আরব বসন্তের ঢেউয়ে। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিউনিসিয়া, মিসরের প্রতিবেশী দেশগুলোতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলে। তিউনিসিয়ায় জাইন আল-আবিদিন বেন আলী ও মিসরে হোসনি মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হন। এ সময়েই বেনগাজি শহরে ছড়িয়ে পড়ে গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ। বিক্ষোভ দমনে গাদ্দাফি বেছে নেন সহিংস উপায়। গোলাবারুদ, যুদ্ধবিমান দিয়ে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করেন। গাদ্দাফি সরকারের অনেক মন্ত্রী এই পদক্ষেপের প্রতিবাদ করেন।

বিক্ষোভ যত জোরালো হতে থাকে, পদত্যাগ করার জন্য গাদ্দাফির ওপর পশ্চিমাদের চাপ তত বাড়তে থাকে। গাদ্দাফি ও তাঁর বাহিনীও প্রতিরোধ শুরু করে। গৃহযুদ্ধ বাধার পরপরই জাতিসংঘ গাদ্দাফিবিরোধী ন্যাশনাল ট্রানজিশনাল কাউন্সিলকে (এনটিসি) সমর্থন দেওয়া শুরু করে। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক দেশ এতে মদদ জোগায়। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সমর্থনে এনটিসি লিবিয়ায় আক্রমণ শুরু করে।

এভাবে এনটিসিই হয়ে ওঠে লিবিয়ার অঘোষিত সরকার। ২০১১ সালের আগস্টে বিদ্রোহী বাহিনী ত্রিপোলিতে ঢুকে পড়ে। শহরের বেশির ভাগ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। ২৩ আগস্ট তারা ত্রিপোলিতে গাদ্দাফির সদর দপ্তর আল-আজিজিয়া কম্পাউন্ড দখল করে। শুরু হয় গাদ্দাফির খোঁজ। গাদ্দাফি বাহিনীও প্রতিরোধ চালাতে থাকে।

রাজধানী ত্রিপোলির পতনের পর, সিয়ার্ত শহরে গাদ্দাফির অনুগত বাহিনী শেষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই শহরেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয় গাদ্দাফিকে। গাদ্দাফিকে হত্যার বর্ণনা বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিভিন্নভাবে এসেছে। পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও এটা বলা যায়, ২০ অক্টোবর স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে আটটার দিকে শহর থেকে তিন-চার কিলোমিটার পশ্চিমে ফ্রান্সের কয়েকটি বিমান গাদ্দাফির গাড়িবহরের ওপর হামলা চালায়।

ওই সময় বিদ্রোহী সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের বিমান হামলায় গাড়িবহরের অন্তত ১৫টি সশস্ত্র পিকআপ ট্রাক বিধ্বস্ত হয়। গাদ্দাফিসহ কয়েকজন বড় একটি পাইপের ভেতরে আশ্রয় নেন। বিদ্রোহীরা কামানের গোলা ছোড়ে। পাইপের ভেতর থেকে গাদ্দাফি বের হয়ে আসার পর গুলি ছোড়া শুরু হয়।

আল–জাজিরা সে সময় এক ভিডিওতে দেখায়, রক্তাক্ত গাদ্দাফিকে বিদ্রোহীরা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরে এনটিসির প্রধান মাহমুদ জিবরিল সাংবাদিকদের বলেন, বিদ্রোহী ও গাদ্দাফি বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে গাদ্দাফি নিহত হন। আল-জাজিরার আরেকটি ভিডিওতে কর্নেল গাদ্দাফির মরদেহ মাটিতে টেনে নিতে দেখা যায়। এমনও বলা হয়, একসময়ের লৌহমানব গাদ্দাফির মরদেহ সেখানকার একটি বিপণিবিতানের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়।

কেমন ছিল গাদ্দাফিবিহীন লিবিয়া

গাদ্দাফির পতন তো হলো। পশ্চিমাদের চাওয়াও পূর্ণ হয়েছিল। তবে গাদ্দাফিকে হত্যার পর এক দশকেও লিবিয়ায় কাঙ্ক্ষিত শান্তি ও গণতন্ত্র ফেরেনি। বরং বেড়ে যায় অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাহীনতা। লিবিয়ার সমৃদ্ধ অর্থনীতি এখন অনেকটাই বেহাল।

গাদ্দাফি-পরবর্তী এক দশকে ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়ার লড়াইয়ে নেমেছে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী। ধ্বংস করেছে অবকাঠামো। এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলসমৃদ্ধ লিবিয়ার অর্থনীতি ধীরে ধীরে পতনের দিকে গেছে। পশ্চিমাদের মোহভঙ্গের পর লিবিয়ায় শান্তি ফেরাতে উদ্যোগ নেয় জাতিসংঘ। অবশেষে ২০২০ সালের অক্টোবরে সফলতা মেলে। অস্ত্রবিরতির মধ্য দিয়ে দেশটিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘাত থামে, খুলে যায় শান্তি আলোচনার পথ।

জাতিসংঘের উদ্যোগে ২০২১ সালে লিবিয়ায় গঠন করা হয় ঐক্যের সরকার। ২০২১ সালে লিবিয়ার প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট হন মোহাম্মদ ইউনুস আল-মেনফি।

গাদ্দাফিকে হত্যার এক দশক পরে এসেও লিবিয়ার অনেক মানুষ গাদ্দাফি ও তাঁর শাসনামলের কথা মনে রেখেছেন। দেশটির বনি ওয়ালিদ শহরের প্রবেশমুখে তাঁর একটি বিশাল প্রতিকৃতি রয়েছে। সেখানকার ওয়ারফারা সম্প্রদায়ের মানুষ গাদ্দাফি ও তাঁর পরিবারকে মনে রেখেছেন। ২০২১ সালে প্রকাশিত এএফপির এক খবরে সেখানকার বাসিন্দা মোহাম্মদ দাইরিকে বলতে শোনা যায়, ‘গাদ্দাফি আমাদের হৃদয়ে রয়েছেন। আমরা সব সময় তাঁর দেখানো পথেই চলব।’

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, আল–জাজিরা, বিবিসি বাংলা, ডয়চে ভেলে

লিবিয়ায় টানা ৪২ বছর শাসনক্ষমতায় ছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি
লিবিয়ায় টানা ৪২ বছর শাসনক্ষমতায় ছিলেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ফাইল ছবি: রয়টার্স


ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেল সংযোগ এখন সময়ের দাবি by মনিরুল হক চৌধুরী

সড়কপথে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৪৮ কিলোমিটার। রেলপথে এ দূরত্ব ৩২০ কিলোমিটার। ট্রেনে ঢাকা-চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে হয় টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া ঘুরে। তাই সড়কের চেয়ে রেলে বেশি সময় ব্যয় করে চট্টগ্রাম যেতে হয়। এই বাড়তি দূরত্ব ও সময় কমিয়ে আনতে একমাত্র সমাধান ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইন স্থাপন। যা ঢাকা-চট্টগ্রাম পুরো রেল রুটের দূরত্ব কমিয়ে দেবে। এতে যাত্রীদের মূল্যবান সময় বাঁচবে। এই রুটে ট্রেনের উপর যাত্রীদের নির্ভরশীলতাও বেড়ে যাবে। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেয়ার খরচও অনেক কমে যাবে। ঢাকা থেকে সরাসরি কুমিল্লা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের প্রস্তাব অনেক পুরনো। এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হলেও এর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বিগত সময়ে। রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব প্রকল্প নেয়া হয় বেশি। এ কারণে প্রকল্পের খরচের তুলনায় সুবিধা পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠে। কিন্তু অতি জরুরি ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইন স্থাপন প্রকল্প বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে।

প্রতিবেশী ভারতে ট্রেন ভ্রমণ যারা করেছেন তারা অবশ্যই উপলব্ধি করেন; দেশটির বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্কটি কতো সহজ, আরামদায়ক, নিরাপদ, অর্থ ও সময় সাশ্রয়ী। তবে বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র। মুখরোচক কথা বলা ছাড়া বিগত ১৫-১৬ বছর রেলের বাস্তবধর্মী উন্নয়ন হয়নি। বরং অকাজে অর্থ খরচ হয়েছে বেশি। সময়োপযোগী, আধুনিক প্রকল্পের নামে একের পর এক নিত্যনতুন প্রকল্প সৃষ্টি করে লুটপাটের প্রতিযোগিতা হয়েছে রীতিমতো।

অনেক দিন থেকেই আমি ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইনের কথা বলে আসছি, এখনো বলছি।  নেহায়েত অকারণে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইনের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বিপরীতে দেশের কয়েকটি জায়গায় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও ঠিকাদারতাড়িত প্রকল্প নেয়া হয়েছে সমানে। কিছু রাজনীতিক ও ঠিকাদারকে লাভবান করাই ছিল ওইসব প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু মানুষকে শোনানো হয়েছে উন্নয়নের মিষ্টি কথা। রাজবাড়ী থেকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণ ও পুরনো লাইন সংস্কারে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করার সময় বলা হয়েছিল, এই রেললাইন দিয়ে দিনে ১৪টি ট্রেন চলাচল করবে। কী ঘটা করেই না ২০১৮ সালের নভেম্বরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নতুন এই রেলপথ উদ্বোধন করেন। এখন এই পথে ট্রেন চলছে মাত্র দু’টি। রাষ্ট্রীয় সম্পদের কী নিদারুণ অপচয়! রাজবাড়ী-গোপালগঞ্জের মতো ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্মিত রেললাইন এবং নিত্যনতুন প্রকল্প নিয়ে এ ব্যবসাই চলেছে দেদারছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ওই সব প্রকল্পের কোনোটি নেয়া হয়েছিল রাজনৈতিক বিবেচনায়, কোনোটি অর্থায়নকারী দেশের পরামর্শে, কোনোটি ঠিকাদারদের অপতৎপরতায়। প্রকল্পগুলো দেশের মানুষের জন্য আজ বোঝায় পরিণত হয়েছে। জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে সিন্দাবাদের ভূতের মতো। রাজবাড়ী থেকে টুঙ্গিপাড়া, পাবনার ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর, পদ্মা সেতুর রেলসংযোগ (ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার), চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, খুলনা-মোংলা ও আখাউড়া-আগরতলা-সবখানে প্রায় একই নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে।

সাতচল্লিশে বৃটিশ শাসনের অবসানের ৭৬-৭৭ বছর এবং একাত্তরে স্বাধীনতা অর্জনের ৫২-৫৩ বছর পর দেশজ চিন্তায় আমাদের রেলওয়েতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। স্থাপিত হয়েছে অনেক রুট। প্রয়োজনীয় রুটের ভিড়ে অপ্রয়োজনীয় রুটের সংখ্যাও কম নয়। পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। তবে সেই রেলপথে ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতে ঘুরতে হয় অন্তত ৬টি জেলা। সড়ক পথের চেয়ে সময় বেশি লাগে ৪-৫ ঘণ্টা। এই ডিজিটাল যুগে এসে তা কেবল অবিশ্বাস্য নয়, বিস্ময়করও। নিদারুণ এই বাস্তবতার প্রেক্ষিত অনেকের অজানা। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে আখাউড়া হয়ে ২১৩ মাইলের অস্বাভাবিক ঘুরপথের ঐতিহাসিক কারণ ছিল। বৃটিশ আমলে ঔপনিবেশিক ভারতে রেলপথ তৈরি হয়েছিল মূলত বৃটিশদের অর্থনৈতিক স্বার্থে। আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয় সিলেট ও আসামের শত শত চা-বাগানের উৎপাদিত চা চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিদেশে রপ্তানির উদ্দেশ্যে।

ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন হলে দেশের রেল নেটওয়ার্ক সত্যিকার অর্থেই আধুনিকায়ন হবে। একইসঙ্গে পথের বিশাল দূরত্বই শুধু কমবে না, সময়ও বাঁচবে। তখন ঢাকা-কুমিল্লা যাতায়াতে লাগবে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট। রেল ছুটবে কুমিল্লা হয়ে ফেনী, সেখান থেকে লক্ষ্মীপুর হয়ে নোয়াখালী। অবশ্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা রেলকে লাভজনক করতে ‘কর্ডলাইন’ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা অনুভব করে আমাদের আশ্বাসও দেন। কিন্তু পরে আটকে যায় নানা বাহানা ও অন্য ব্যস্ততায়। সাবেকদের মতো সদ্য প্রাক্তন রেলমন্ত্রীও সেদিন বলেছেন, ১৯৬৮ সাল থেকে এই রেলপথ নির্মাণের চেষ্টা চলছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথকে এবার ইলেকট্রিক ট্র্যাকশনে রূপান্তর করা হবে। এই পথে ট্রেন চলবে বিদ্যুতে। এর আগে বাস্তবায়ন করা কারিগরি সহায়তা প্রকল্প ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ উন্নয়ন প্রস্তুতির অধীনে কর্ডলাইনের বিশদ নকশা ও সমীক্ষা করার পরিকল্পনা ছিল। পরে তা আরসিআইপিএফ প্রকল্পে স্থানান্তর করা হয়। বিদ্যমান রেলপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ট্রেন যায় টঙ্গী-ভৈরব-আখাউড়া ঘুরে। এ দূরত্ব কমাতে নারায়ণগঞ্জ থেকে কুমিল্লার লাকসাম কর্ডলাইন নির্মাণের চিন্তা শুরু ১৯৬৮ সালে। এ পথে ঢাকা-চট্টগ্রামের দূরত্ব ২৪০ কিলোমিটার। লাইনটি নির্মিত হলে যাতায়াতে সময় লাগবে মাত্র ২ ঘণ্টা ৫৬ মিনিট। ২০২৬ সাল নাগাদ নারায়ণগঞ্জ-লাকসাম কর্ডলাইন নির্মাণকাজ শুরুর কথা প্রকাশিত হয়েছিল। এ প্রকল্পে এডিবি’র ঋণ পাওয়ার আশায় ছিল রেলওয়ে।

সূত্র মতে, ঢাকা-লাকসাম কর্ডলাইন কমলাপুর থেকে কুমিল্লা-জাঙ্গালিয়া ও লাকসামের মাঝামাঝি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইনের লালমাই স্টেশনের উত্তরে সুবিধাজনক কোথাও সংযুক্ত হবে। এবং এ উদ্দেশ্যে তৎকালীন পাকিস্তানের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় জমিও হুকুম দখল করে। যা বর্তমানে চার লেন সড়কের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এই প্রসঙ্গটি জনসম্মুখে কখনো আলোচনায় আসেনি। এমনকি এ প্রসঙ্গটি আমি নিজেও অবগত ছিলাম না। বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য থাকার সময়ই নোয়াখালী রেলযাত্রী কল্যাণ সমিতি বিষয়টি আমার নজরে আনে। এরপর তৎকালীন রেল সচিব শফিকুল ইসলামসহ সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নজরে আনার পর তিনি এক বাক্যেই এই প্রকল্পের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। এবং তার আসন্ন চীন সফরকালে চীন সরকারের সঙ্গে প্রকল্পের সর্বশেষ পরিস্থিতিতে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য চীন সরকারের সঙ্গে আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। যথারীতি প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা হয়। এবং বিএনপি সরকারের সময়ই চীন সরকার নিজ খরচে পাকিস্তান আমলে নির্ধারিত সংক্ষিপ্ত পথে তথা- ঢাকা-দাউদকান্দি-চান্দিনা-কুমিল্লা-জাঙ্গালিয়া এবং লালমাইয়ের মাঝামাঝি বর্তমান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক বরাবর সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব করে। পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক ভাবে কুমিল্লা রেলস্টেশন বরাবর সংযোগের একটি চিন্তা ক্যান্টনমেন্ট ও তার উত্তর- পূর্বে ঘনবসতির কারণে নাকচ হয়ে যায়।

কিন্তু চীন সরকারের সমীক্ষাটিকে ধামাচাপা দিয়ে বিগত সরকার কাল্পনিকভাবে সমীক্ষার নামে বারবার বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দিয়ে রেল মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রেরণ করে। এ ধরনের কাল্পনিক প্রস্তাবের কারণ ছিল-প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা-চট্টগ্রাম আলাদা বৈদ্যুতিক রেল চালুর প্রস্তাব ও আকাঙ্ক্ষা। তাও লক্ষাধিক কোটি টাকা ব্যয়ে। এলিভেটেড এক্সপ্রেস এর চেয়েও বেশি খরচে। যা ছিল লোক দেখানো এবং বেকার কনসালটেন্টের আয়ের পথ করে দেয়া মাত্র। আরও একটি অবান্তর প্রস্তাব ২০০৯-২০১৪ সালে আওয়ামী সরকারের কাছে দেয়া হয়েছিল- যাতে ঢাকা-দাউদকান্দি-মনোহরগঞ্জ-লাকসাম। এক কথায় কুমিল্লাকে বাইপাস করার জন্য ষড়যন্ত্রমূলক এ প্রস্তাবটি তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর প্রচুর কৃষিজমি নষ্ট হবে বলে দাবি করায় বাতিল হয়ে যায়। আরও এরকম গোপন স্টাডি আছে কিনা জানি না। ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইনের সমীক্ষা বাবদ মোট কতোটি স্টাডি হয়েছে এবং কতো টাকা খরচ হয়েছে, পাকিস্তান আমলে দরপত্রকৃত ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইনের দরপত্রের মূল্য কতো ছিল জাতীয় স্বার্থে তা জানা দরকার।

বাংলাদেশের যেকোনো মানুষ স্বীকার করেন স্বাধীন বাংলাদেশে কোনো রেললাইন হলে প্রথম হওয়া উচিত ছিল রাজধানী-বন্দরনগরী সংযোগকারী রেললাইনকে সংক্ষিপ্ত করে সহজ করা ঢাকা-মদনপুর, অথবা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-মদনপুর-দাউদকান্দি-চান্দিনা-ক্যান্টনমেন্ট-জাঙ্গালিয়ার দক্ষিণে রেল ওভারপাসের দক্ষিণে কুমিল্লা বাইপাস বরাবর সংযোগ। এতে দূরত্ব, খরচ কমবে, জমি অধিগ্রহণ লাগবে সামান্যতম। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-কুমিল্লা, ঢাকা-নোয়াখালী যাত্রীদেরও এটাই দাবি। এই দাবি পূরণে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিদায়ী সরকার এ অঞ্চলের মানুষের জন্য যে পাহাড় সমান বৈষম্য রেখে গেছে তা দূর করবে- এটাই আমি প্রত্যাশা করি।
লেখক: প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাবেক সংসদ সদস্য

mzamin

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব প্রধান বিচারপতির

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় চান প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ। এরই মধ্যে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের প্রস্তাব আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, গতকাল এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি।

চিঠিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, বাংলাদেশ একটি সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে ক্ষমতার পৃথক্‌করণ নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে, দীর্ঘদিন ধরে বিচার বিভাগের উপর নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব প্রয়োগের প্রবণতার যে চর্চা অব্যাহত রয়েছে তা রোধ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, এর ফলে স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি আমাদের দেশে আইনের শাসন ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা চর্চার সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশ ভীষণভাবে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ, আমাদের সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ নিশ্চিতকরণকে  রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের সংবিধানে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক রাখার কথা বলা হলেও সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এদেশে বিচার বিভাগের কার্যকর পৃথক্‌করণ অসম্পূর্ণই থেকে গেছে। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, এমন একটি প্রেক্ষাপট সত্ত্বেও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ৭৯/১৯৯৯ নম্বর সিভিল আপিল মামলার রায়ে (যা মাসদার হোসেন মামলা নামেই অধিক সমাদৃত) নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণের পূর্ণ রূপরেখা তুলে ধরার মাধ্যমে আমাদের দেশে ক্ষমতার পৃথক্‌করণ নীতির বাস্তবায়নের পথকে সুগম করে দিয়েছে। উক্ত রায়ে ক্ষমতার পৃথক্‌করণের যে রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে তার অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হলো দেশের বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। মাসদার হোসেন মামলার রায়ে একাধিকবার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রসঙ্গ এসেছে। আর বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণের সর্বোত্তম কার্যকর উপায় স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। এ কারণে উক্ত মামলার রায়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত বর্তমানে প্রচলিত দ্বৈত-শাসন কাঠামো তথা অধস্তন আদালতের বিচারকগণের নিয়োগ, বদলি, শৃঙ্খলা প্রভৃতি বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের যে যৌথ এখতিয়ার রয়েছে তা সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করে বিচার বিভাগের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠাকে ক্ষমতার পৃথক্‌করণের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করেছে।  এ কথা সত্য যে, বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক সরকারের অনীহার কারণে বিচার বিভাগের পৃথক্‌করণ সম্ভবপর হয়নি। একারণে বিগত জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বর্তমান সময় হচ্ছে মাসদার হোসেন মামলার রায়ের বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের শ্রেষ্ঠ সময়।
প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদে হাইকোর্ট বিভাগের অধস্তন সকল আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের উপর অর্পণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রি অধস্তন আদালতের বিভিন্ন বিষয় পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট তথা হাইকোর্ট বিভাগকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। কিন্তু হাইকোর্ট বিভাগের এই তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ নিরঙ্কুশ নয়। কেননা, বিদ্যমান কাঠামোতে আইন মন্ত্রণালয় থেকে অধস্তন আদালত সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব আসার পর হাইকোর্ট বিভাগ তার তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। কিন্তু আমাদের সংবিধানের ১০৯ অনুচ্ছেদের মর্ম অনুসারে অধস্তন আদালত ও ট্রাইব্যুনালের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ হাইকোর্ট বিভাগের একচ্ছত্র অধিকার। তাই সাংবিধানিক এই বাধ্যবাধকতা সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক। এ ছাড়া, বর্তমানে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের মামলার সংখ্যা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি, অধস্তন আদালতের বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রির কর্মপরিধি পূর্বের তুলনায় ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলেও বিচার বিভাগের জন্য পৃথক একটি সচিবালয় স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে। তাই সার্বিক বিশ্লেষণে কেবলমাত্র পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই অধস্তন আদালতের বিচারকগণের শৃঙ্খলা, বদলি, পদোন্নতি, ছুটি ও অন্যান্য বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

mzamin

নবায়ন হচ্ছে না কুইক রেন্টাল: অর্থ পাচার অনিয়মের তদন্ত হচ্ছে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

নতুন করে কুইক রেন্টাল চুক্তি নবায়ন করা হচ্ছে না। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের নামে আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাচার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর এ কাজটি করেছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের একটি বড় সিন্ডিকেট। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত বিদ্যুৎ  ও  জ্বালানি বিভাগের চুক্তিসমূহ পর্যালোচনা সংক্রান্ত জাতীয় রিভিউ কমিটি এই নিয়ে মন্ত্রণালয়ে দুই দফা বৈঠকও করেছে।

এ প্রসঙ্গে কুইক রেন্টালের চুক্তি প্রসঙ্গে-কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম মানবজমিনকে বলেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি বাতিল করতে হবে। কোনো নবায়ন করা চলবে না। কারণ এধরনের অবৈধ চুক্তি যারা করেছেন, তারা ফৌজদারি অপরাধ করেছেন। যারা সুবিধা নিয়েছেন সেসব ব্যবসায়ী এবং যারা সুবিধা তৈরি করে দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তুলেছে ভোক্তা অধিকার রক্ষার এই সংগঠনটি।

২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পরই দ্রুত বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ছোট ও মাঝারি বেশকিছু রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের লাইসেন্স দেয় আওয়ামী লীগ সরকার। তিন বছরের জন্য এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হলেও তা চলেছে আট থেকে ১০ বছর। কোনোটি চলেছে আবার ১২ থেকে ১৫ বছর। এসব কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জও নির্ধারণ করা হয় অতি উচ্চ হারে। এতে বিনিয়োগের প্রায় সাড়ে চারগুণ বা ৪৫০ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ তুলে নিয়েছে কোনো কোনো কোম্পানি। ঘোড়াশালে এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনালের নির্মিত ১৪৫ মেগাওয়াট দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক (গ্যাস ও ডিজেল) বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এ কেন্দ্রটি উৎপাদন শুরু করে ২০১০ সালের ২৩শে আগস্ট। প্রথমে ডিজেলে ১৮ মাস চললেও পরে তা গ্যাসে উৎপাদন শুরু করে। উৎপাদন শুরুর সময় কুইক রেন্টাল এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ ধরা হয়েছিল ২১ ডলার। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রতি মাসে ৩০ লাখ ৪৫ হাজার ডলার ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হতো। এগ্রিকো’র ঘোড়াশাল ১৪৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রের জন্য এ হারে বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ পড়তো তিন কোটি ৬৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার। তিন বছরের জন্য কুইক রেন্টাল এ বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। আর এগ্রিকো বিনিয়োগ করেছিল ১০ কোটি ডলার বা ৫৬০ কোটি টাকা। এতে তিন বছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতো ১০ কোটি ৯৬ লাখ ২০ হাজার ডলার।

পিডিবি’র কর্মকর্তারা বলেন, ২০০৯ থেকে ২০১১ সালে বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল সবচেয়ে বেশি। আর ঘাটতির এ সুযোগকে দুর্নীতির জন্য কাজে লাগানো হয়েছে বেশি হারে। এজন্য ওই সময়ে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল বিনা দরপত্রে। তারা আরও জানান, পরবর্তী সময়ে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল। ওই কেন্দ্রগুলোয় কিলোওয়াটপ্রতি মাসিক ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় ১০ থেকে ১২ ডলার। অর্থাৎ ঘাটতির সুযোগের আড়াই থেকে তিনগুণ হারে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হয়েছিল বিনা দরপত্রের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয়। এতে প্রচুর অর্থ গচ্চা গেছে। যদিও এসব ক্যাপাসিটি চার্জও ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে বলেই জানা গেছে।

সূত্র মতে,  কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের নামে আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাচার করেছে। আর এ কাজটি করেছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিদ্যুৎ বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব আহমদ কায়কাউসসহ বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেট বিশেষ আইনে, বিনা দরপত্রে প্রতিযোগিতা ছাড়াই তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ ও আওয়ামী সমর্থক ব্যবসায়ীদের কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুবিধা দেয়। বছরের পর বছর এই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ চালানো হলেও ক্যাপাসিটি চার্জের নামে এগুলোর মালিকরা হাজার হাজার কোটি টাকা পকেটে ভরেন। ক্যাপাসিটি চার্জের টাকায় ফুলেফেঁপে ওঠা এই বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দেন। যারা এ কাজে তাদের সহযোগিতা করেন সেই সিন্ডিকেটের প্রভাবশালীরাও বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে পাচার করে দিয়েছেন। এ প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি দমন কমিশন এরই মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের দুর্নীতি অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, নো ইলেকট্রিসিটি নো পেমেন্ট’ হচ্ছে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড। কিন্তু এতদিন আওয়ামী লীগ সরকার তাদের প্রিয় লোকদের আবদার পূরণে বিদ্যুৎ না নিয়েও ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়েছে। এর বিনিময়ে তৎকালীন সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সুবিধাভোগী বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীরা অর্থ সুবিধা দিয়েছেন। তাদের মতে, বিদ্যুৎ দেয়া ছাড়াই ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিল নেয়ার মতো মারাত্মক অনিয়ম আর কিছু নেই। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে তা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, এ টাকা দেশের নাগরিকদের। তারা আরও বলেন, কোনো ধরনের টেন্ডার ছাড়া এসব রেন্টাল আর কুইক রেন্টালের লাইসেন্স তুলে দেয়া হয় দেশের প্রভাবশালী কোম্পানিগুলোর কাছে।  মূলত আওয়ামী লীগ সরকার বিনা টেন্ডারে দায়মুক্তি আইনের আওতায় একসময়ে উচ্চমূল্যের রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দিয়েছিল। ২০১০ সালে বলা হয়েছিল, এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র আপৎকালীন চাহিদা মেটানোর জন্য। কিন্তু গত দেড় দশকেও এগুলো আর বন্ধ করা যায়নি।

অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতে হরিলুটের অন্যতম উৎস ছিল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। তখন বিনা টেন্ডারে প্রয়োজনের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়। এসব উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে চুক্তি অনুযায়ী বছরের পর বছর সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এর সিংহভাগই গেছে নসরুল হামিদ ও জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পকেটে। এরই মধ্যে এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এ বিষয়ে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক  প্রকৌশলী বিডি রহমত উল্লাহ মানবজমিনকে বলেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ করতে হবে। কুইক রেন্টালের নামে ডলারে বিদেশে ৬২ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এসব টাকা উদ্ধার করতে হবে। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ (রেন্টাল ভাড়া) হিসেবে দিতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ দরকার নেই কিন্তু টাকা চলে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য এই টাকা ভাগাভাগি করা। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা ছিল না। অথচ কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করেনি গত জনবিরোধী আওয়ামী লীগ সরকার। বিদ্যুতের চাহিদা না থাকা সত্ত্বেও কেন এগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল- এমন প্রশ্ন রাখেন এই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, এগুলো প্রথমে ৩ বছরের জন্য চুক্তি ছিল। পরে তা নবায়ন করে ১৫ বছর চলেছে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

গত ১৯শে সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, নতুন করে কুইক রেন্টাল চুক্তি নবায়ন করা হবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা চুক্তিগুলো দু’টি কমিটি পর্যালোচনা করছে। কমিটির পরামর্শের ভিত্তিতে আমরা কাজ করবো। একটু ধৈর্য ধরুন। কমিটির প্রতিবেদন আসুক। তারপর দেখুন আমরা ব্যবস্থা নিই কিনা। এ বিষয়ে যথাযথ চিন্তা করেই পিডিবিকে সিদ্ধান্ত বলে দিয়েছি। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারণে দাম বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

mzamin

দুর্নীতির অভিযোগে জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক by আরিফুল ইসলাম

দুর্নীতির অভিযোগে সাজাপ্রাপ্ত মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিরলভাবে মাল্টিবিলিয়ন ডলারের ১এমডিবি অর্থ কেলেঙ্কারির মামলায় জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন।

দেশটির সরকারি নিউজ এজেন্সি বারনামা সহ প্রায় সবকটি গণমাধ্যম এবং রয়টার্স সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অর্থ সরানোর ঘটনায় নাজিব বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, তহবিল থেকে অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না।

গত বৃহস্পতিবার কুয়ালালামপুরের আদালত প্রাঙ্গণে তার পক্ষে লিখিত বিবৃতি পাঠ করেন তার ছেলে মোহাম্মদ নিজার। চিঠিতে ৭১ বছর বয়সী নাজিব রাজাক বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী হিসাবে আমার তত্ত্বাবধানে মালয়েশিয়ার প্রধান উন্নয়ন তহবিল ওয়ানএমডিবির বিপর্যয় ঘটেছে জেনে প্রতিদিন আমার কষ্ট হয়। এ জন্য আমি মালয়েশিয়ার জনগণের কাছে নিঃশর্তভাবে ক্ষমা চাইছি। তিনি আরও বলেন, তিনি যে সৌদি আরব থেকে তহবিল পেয়েছিলেন তা ছিলো রাজনৈতিক অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত। যদিও পেট্রোসৌদির দুই কর্মকর্তা সুইস আদালতে ১এমডিবি তহবিল আত্মসাতের জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং পরে তারা তাদের অপরাধ অস্বীকার করেছেন।

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন নাজিব ১এমডিবি নামে একটি তহবিল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই তহবিলের উচ্চ-পর্যায়ের কর্মকর্তারা এবং তাদের সহযোগীরা প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন ডলারের অপব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যা অন্তত ছয়টি দেশে দুর্নীতির দায়ে তদন্তের মুখে পড়ে। পরে বিশ্বাস ভঙ্গ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মুদ্রা পাচারের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।

২০২২ সালে মালয়েশিয়ার সর্বোচ্চ আদালত নাজিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া এবং সাবেক ১এমডিবি ইউনিট এসআরসি ইন্টারন্যাশনাল থেকে অবৈধভাবে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার পাওয়ার জন্য দোষী সাব্যস্ত করে ১২ বছরের কারাদণ্ড এবং এবং ২১ কোটি রিংগিত জরিমানা করা হয়। পরবর্তীতে মালয়েশিয়ার প্রাক্তন রাজার নেতৃত্বে এক ক্ষমা বোর্ড তার শাস্তি অর্ধেক করে দেওয়া হলে সম্প্রতি সে ক্ষমা জাতির কাছে নি:শর্তভাবে ক্ষমা চাইলে তার ক্ষমা চাওয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

এদিকে নাজিব আরও কয়েকটি দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি আছেন। গত পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া ১এমডিবির দুর্নীতি মামলায় নাজিবকে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হবে কিনা তা আগামী ৩০ অক্টোবর, বুধবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কুয়ালালামপুরের হাইকোর্টের রায়ের জন্য।

mzamin

বিনামূল্যে পাঠ্য বই: ২৭০ কোটি টাকা লোপাট by পিয়াস সরকার

বিনামূল্যের পাঠ্য বই নিয়ে নানা অনিয়ম হয়েছে বিগত সরকারের সময়ে। বইয়ের মান, ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছাপার সঙ্গে লুটপাট হয়েছে সরকারি অর্থ। বিপুল অর্থ লুটপাট হলেও সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে দেয়া যায়নি বই। খোদ আওয়ামী লীগের শাসনামলের হওয়া অনুসন্ধানেই উঠে এসেছে ২৭০ কোটি টাকা লোপাটের তথ্য। এর বাইরেও ৯৪৫ কোটি টাকা বাজেটের বই থেকে প্রকাশনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোও করেছে অর্থের নয়-ছয়। ২৭০ কোটি টাকার দুর্র্নীতির তথ্য মেলার পর নিশ্চুপ ছিল প্রশাসন। কারও শাস্তি হয়নি। জবাবদিহিতা করতে হয়নি কাউকে।

পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের দায়িত্বে থাকা জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা যায়, পাঠ্য বই ছাপাতে মূলত পাঁচ খাতে দুর্নীতি করা হয়েছে। বইয়ের আকারে সুক্ষ্মভাবে ছোট করা হতো। যার কারণে সেখানে খরচ কমে আসতো। কাগজের উজ্জ্বলতার জন্য নির্দিষ্ট মান থেকে কমিয়ে আনা হতো। আর এই অপরাধকে একপ্রকার বৈধতা দিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা ডা. দীপু মনি। পূর্বের বছরের পাঠ্য বই নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের ছাপানো বইয়ের কাগজের মান খারাপ নয়, রং কিছুটা ভিন্ন হলেও তা নিউজপ্রিন্ট নয়। ছাপানো কাগজ অনেক বেশি সাদা হলে তা চোখের জন্য তত ভালো নয়। আমাদের দেশে সবাই মনে করে বইয়ের কাগজ যত বেশি সাদা হবে তত বেশি ভালো কিন্তু তা নয়। আমাদের বইয়ের কাগজের উজ্জ্বলতা কিছুটা কম হলেও তা নিউজপ্রিন্ট নয়।

২০২৩ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রায় ৩৪ কোটি পাঠ্য বই ছাপানো হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৪৫ কোটি ৬৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৭৩ টাকা। এতে পাঠ্য বইয়ের প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠাসংখ্যার ক্ষেত্রেও করা হয় নয়ছয়। পাঠ্য বইয়ে প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠাসংখ্যা বেশি দেখিয়ে ছাপানো হয় এসব বই। আর বাঁধাইয়ের কাজেও নিম্নমানের সুতা ও আঠা ব্যবহারের অভিযোগও ছিল। একই মানের বই ছাপানো হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দরে। এনসিটিবি’র গুটিকয়েক কর্মকর্তা যাদের বইয়ের মান দেখভালের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছিল তারাই কোটি কোটি টাকা লোপাট করেন।

২০২৩ সালের ছাপানো পাঠ্য বইয়ের কাজে অনিয়ম পেয়েছিল বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অধীন শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। সংস্থাটি জানায়, এসব অনিয়মের কারণে সরকারের প্রায় ২৪৫ কোটি টাকা লোপাট হয়। আর এ ছাড়াও দেনদরবার, উপঢৌকন ও অযাচিত বিলের কারণে আরও ২৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। অধিদপ্তর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারিতে পত্র দেয়া হলেও যথাযোগ্য জবাব দেয়নি এনসিটিবি। পাঠ্য বই নিয়ে নানাবিধ সমালোচনা শুরু হলে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী গত মার্চে বলেছিলেন, কারও বিপক্ষে দুর্নীতির অভিযোগ মিললে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আদতে কোনো ব্যবস্থাই নেননি তিনি।

অডিট অধিদপ্তরের চিঠিতে বলা হয়েছিল, বই ছাপায় দরপত্রে অনিয়মের কারণে সরকারের ২৩৫ কোটি ৩০ লাখ ৫৭ হাজার ৭৮৫ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। চিঠিতে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবং অর্থ আদায় করে এনসিটিবি’র তহবিলে জমা দেয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ছাড়া প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ না দেয়ায় অতিরিক্ত ৬ কোটি ৫৩ লাখ ৪১ হাজার ২৮৭ টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। এজন্য জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া বই ছাপানোর কাজে গঠিত বিভিন্ন কমিটিকে অতিরিক্ত হারে ৬৪ লাখ ৭২ হাজার ৩০ টাকার অতিরিক্ত সম্মানী দেয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, দরপত্র উন্মুক্তকরণ কমিটিতে তিনজন, মূল্যায়ন কমিটিতে সাতজন সদস্য থাকবেন। এই অতিরিক্ত সম্মানীসহ ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রাপ্যতা না থাকলেও সম্মানী ও উদ্দীপনা ভাতা দেয়ায়, আয়কর না কাটায়, অতিরিক্ত হারে প্রশিক্ষণ-কর্মশালা ভাতা ও নির্দিষ্ট সীমার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ অগ্রিম দেয়ায় প্রায় ২৫ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে।

অধিদপ্তরের চিঠিতে বলা হয়, বিভিন্ন উদ্দেশ্যে নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ৭ কোটি ৫৫ লাখ ৮ হাজার ১১২ টাকা অগ্রিম দেয়া হয়েছে। সার্ভিস চার্জ এবং প্রদত্ত সম্মানী থেকে আয়কর না কাটায় ৫ কোটি ৮৮ লাখ ১৩ হাজার ৬৭৬ টাকা এবং ভ্যাট আদায় না করায় ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৫৬ হাজার ৯৬৩ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এসব অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে সুপারিশ করা হয়।

তথ্যমতে, সে বছর ২৮০টি লটে বই ছাপানো হয়। ৪৩ লটের বই ছাপানো হয় ২ টাকা ৬৮ টাকা করে। ২৩৭ লটের বই ছাপানো হয় ১ টাকা ৬৩ পয়সা দরে। একই মানের বই হওয়ার কথা থাকলেও ভিন্ন দামে বই ছাপানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, যোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছিল।

এনসিটিবি’র সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানটিতে গত চার থেকে পাঁচ বছরে ব্যাপক পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে। আমাকেসহ কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছিল তাদের কথামতো না চলায়। এটার দুর্নীতি এতটাই স্ট্রং যে এটা ওপেন সিক্রেট ছিল। যার ভাগ সরাসরি যেত শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও পানি জাহাঙ্গীরের (শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী জাহাঙ্গীর আলম) কাছেও।

তিনি বলেন, এখন এসব দুর্নীতি তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্ত হলে এসব দুর্নীতির বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে আসবে। প্রথম ২০১৭ সালের দেয়া বইয়ে নিম্নমানের কাজ শুরু হয়। এরপর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় পরবর্তী বছর থেকে দুর্নীতি বাড়তেই থাকে। এরপর এমনি অবস্থা হয় যে ২০২৩ সালের পাঠ্য বইয়ে তারা নিজেদের ছেলে-মেয়ে ও পরিচিতজনদের জন্য আলাদাভাবে বই ছাপিয়ে নিতেন। বই মনিটরিংয়ের জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৭৫ লাখ টাকা করে সম্মানী দেয়া হয়। কিন্তু জানা মতে, তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৫ লাখ টাকা। টিএ-ডিএ আরও ২ লাখ টাকার মতো। কিন্তু এই টাকা তারা আত্মসাৎ করেছেন। এই পুরো কর্মযজ্ঞের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এনসিটি’র পূর্ববর্তী চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফরহাদুল ইসলাম।

এ বিষয়ে এনসিটিবি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রিয়াজুল হাসান বলেন, বিগত দিনে নানাবিধ অনিয়মের বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরাও চাই এসব বিষয়ের তদন্ত হোক। উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি আর্থিক অনিয়ম বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রদান করে উপদেষ্টার দপ্তরে পৌঁছে দিতে।

mzamin

মিশিগানে মুসলিম ফ্যাক্টর কমালার পক্ষে মিশেল

আর বাকি ৮ দিন। এরপরই যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এতে ‘নেক-টু-নেক’ বা সমানে সমানে টক্কর দিচ্ছেন ডেমোক্রেট কমালা হ্যারিস ও রিপাবলিকান ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু গাজা যুদ্ধ পাল্টে ফেলতে পারে নির্বাচনের গতিপথ। কারণ, ওই যুদ্ধের কারণে অনেক মুসলিম বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ডেমোক্রেটদের পছন্দ করছে না। বিশেষ করে মিশিগানে এক র‌্যালিতে মুসলিম নেতারা মঞ্চে উঠে ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছেন। তাদের যুক্তি গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে জো বাইডেনের সরকার। সেই ক্ষোভ থেকে তারা ট্রাম্পকে বেছে নিয়েছেন। মিশিগান অন্যতম একটি সুইং স্টেট। সেখানে শনিবার রাতে এক র‌্যালিতে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন আরব-আমেরিকান বা মুসলিম ভোটাররা এবারের নির্বাচনকে যেকোনো দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন। মিশিগানের নোভি’তে এক র‌্যালিতে তার সঙ্গে যুক্ত হন আরব-আমেরিকান ও মুসলিম সম্প্রদায়ের বেশ কিছু নেতা। তারা ট্রাম্পের সঙ্গে একই মঞ্চে উঠে তাকে সমর্থন দেন। এই রাজ্যটি কোনো দলকে বিশেষ করে সমর্থন করে না। তারা ট্রাম্পকেও সমর্থন করে না। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তারা কমালা হ্যারিসকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কারণ, গাজা যুদ্ধে যে ধ্বংসযজ্ঞ এবং গণহত্যা দেখছে বিশ্ব, কমালা হ্যারিসের দল বা তার প্রেসিডেন্ট বা প্রশাসন তা বন্ধে ব্যর্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে ইসরাইলকে তারা অস্ত্র সরবরাহ দিয়ে গেছে। ঠিক এই রাজ্যে একই রাতে কমালা হ্যারিসের পক্ষে প্রচারণায় নেমেছেন সাবেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামা। তিনি নারীদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অগ্নিঝরা ভাষণ দেন। তিনি পুরুষ ভোটারদের প্রতি সরাসরি আহ্বান জানান ‘আমাদের জীবনকে সিরিয়াসলি নিন’। কমালা হ্যারিসের প্রচারণায় এটাই তার প্রথম উপস্থিতি। মিশেল বলেন, যদি আমরা এই দেশটাকে সাহায্য করতে চাই তাহলে ঘৃণা এবং বিভক্তির রাজনীতির পৃষ্ঠাটাকে উল্টে ফেলতে হবে। ওদিকে জাতীয় পর্যায়ে জনমত জরিপে গড় সমর্থনে দুই প্রার্থীর মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে। তাতে দেখা গেছে, কমালা হ্যারিস তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে সামান্য এগিয়ে আছেন। কমালাকে সমর্থন করছেন শতকরা ৪৮ ভাগ ভোটার। ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন ৪৭ ভাগ। আগস্টের শেষের দিকে ট্রাম্পের চেয়ে কমালা এগিয়ে ছিলেন চার পয়েন্টে। কিন্তু সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সেই ব্যবধান ক্রমশ সংকীর্ণ হচ্ছে। পুরুষদের মধ্যে জনপ্রিয়তায় অনেকটাই এগিয়ে আছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে নারী ভোটাররা বলেছেন, তারা কমালা হ্যারিসকে পছন্দ করেন। তবে তাদের ব্যবধান খুব কম। রাজনীতিতে এই লিঙ্গগত ব্যবধান যুক্তরাষ্ট্রের এবারের নির্বাচনে বড় রকমের প্রভাব ফেলতে পারে। কমালা হ্যারিস গত মাসে সিএনএন’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। এর কারণ আমি বিশ্বাস করি জাতি ও লিঙ্গভেদ উপেক্ষা করে সব মার্কিনির জন্য এই মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের জন্য আমিই সেরা ব্যক্তি। তবে নভেম্বরের নির্বাচনে কয়েকটি ফ্যাক্টর বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে গাজা যুদ্ধ, লেবানন যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে ইসরাইলের সংঘাতময় পরিস্থিতি অন্যতম। এর প্রভাব পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী মুসলিমদের মধ্যে। নারী ও পুরুষ লিঙ্গগত ব্যবধানও এক্ষেত্রে বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। বিবিসি’র যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ক স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট কেটি কে মনে করছেন নভেম্বরের এই নির্বাচন হয়ে উঠেছে লিঙ্গগত আদর্শের গণভোট। বিষয়টি নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা হয়েছে। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় পডকাস্টের অন্যতম দ্য জো রোগান শো। এতে ডনাল্ড ট্রাম্পের একটি সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। সেখানে তিনি স্বীকার করেন যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল কিছু মানুষকে তার সরকারে নেয়া। এসব মানুষকে দায়িত্বে নেয়া উচিত হয়নি।
mzamin

ভিডিওকলে রেখে একসঙ্গে প্রেমিক-প্রেমিকার আত্মহত্যা

নিজের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করতে না পারার অভিমানে ভিডিওকলে স্বামীর বাড়িতে প্রেমিকা ও প্রবাসে প্রেমিক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। শনিবার সন্ধ্যা অনুমান সাড়ে ৬টায় কুমিল্লার লালমাই উপজেলার বেতুয়ায় এ ঘটনা ঘটে। ওই দিন রাত ১১টায় পুলিশ স্বামীর বাড়ি থেকে নববধূর ঝুলন্ত মরদেহ ও চিরকুট উদ্ধার করে। নিহত গৃহবধূ খাদিজা আক্তার ঊর্মি (১৬) কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানাধীন মাটিয়ারা গ্রামের জামাল হোসেনের মেয়ে। সে চৌয়ারা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী। গত ১৪ই অক্টোবর লালমাই উপজেলার ভুলইন উত্তর ইউনিয়নের বেতুয়া (কৃষ্ণপুর) গ্রামের রংমিস্ত্রি আরিফুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বাল্যবিয়ে হওয়ায় মোবাইল কোর্ট আতঙ্কে সেদিন ঘরোয়াভাবে গোপনে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। এদিকে নিহত ওমান প্রবাসী প্রেমিক সাফায়েত হোসেন (২২) কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পূর্ব জোড়কানন ইউনিয়নের জয়নগর গ্রামের আবদুল খালেকের ছেলে। নববধূ ঊর্মি চিরকুটে লিখেছেন, ‘চাইছিলাম দু’জনে একসঙ্গে বেঁচে থাকতে। বাঁচতে দিলো না। এটা সত্যি ও আমার প্রথম সাথী। ওরে আমি বিয়ে করছি। কিন্তু ওর জায়গায় আমি অন্য কাউরে দিতে পারি নাই, পারবোও না। তোমরা সুখে থেকো। আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না। ও বেঁচে থাকলেও তোমরা ওকে খুন করতে এবং ওর ফ্যামিলিকে জেলের ভাত খাওয়াইতে। তাই নিজেও দুনিয়া ছাড়লাম। ওরে আমার সঙ্গে নিয়ে গেলাম। আপনাদের কাছে একটা শেষ ইচ্ছা থাকবে। বাবা-মা-ভাই-বোনের কাছে একটা আবদার দুনিয়াতে যেহেতু থাকতে দেয় নাই, আমাদের দাফনটা যেন একসঙ্গে হয়। একদিন আগে পরে হলেও একই কবরস্থানে যেন দাফন করে। সে চাওয়াটা যেন পূরণ করেন আপনারা। প্রবাসী সাফায়াত মৃত্যুর পূর্বে চিরকুটে লিখেছেন, শেষ ইচ্ছা পূরণ করার দায়িত্ব আপনাদের। নিহত ঊর্মির মা নুরুন্নাহার জানান, আমার মেয়ের সঙ্গে সাফায়েত নামের একজন প্রবাসী ছেলের সম্পর্ক ছিল। গত ১৪ই অক্টোবর সম্মতি নিয়েই আমাদের আত্মীয় বেতুয়ার আরিফুর রহমানের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিই। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে হাসি-খুশিতেই ছিল। শনিবার রাতে হঠাৎ শুনি ঊর্মি ও তার প্রেমিক সাফায়েত ভিডিওকলে আত্মহত্যা করেছে। মেয়ের স্বামীর বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। প্রবাসী ছেলেটাই আমার মেয়ের মাথা খারাপ করে দিয়েছে।

প্রবাসী সাফায়াতের বাবা আবদুল খালেক বলেন, একবছর আগে ছেলেকে ওমান পাঠিয়েছিলাম। কিছুদিন আগে ছেলে হঠাৎ বিদেশে কর্মস্থলে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। খবর নিয়ে শুনলাম ফেসবুক মেসেঞ্জারে আমার ছেলের সঙ্গে ঊর্মি নামের এক মেয়ের পরিচয় হয়েছিল। হঠাৎ মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়ায় সে অসুস্থ হয়ে গেছে। শনিবার রাতে সেই মেয়ে আমার ছেলের সঙ্গে ভিডিওকলে চিরকুট লিখে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে বলে শুনেছি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমার ছেলেসহ দু’টি জীবনের আলো নিভে গেছে। তিনটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর জন্য আমি মেয়ের বাল্যবিয়েকে দায়ী করি। লালমাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, বিয়ের ১৭তম দিনে নববধূ প্রবাসী প্রেমিককে ভিডিওকলে রেখে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে। শুনেছি প্রবাসী প্রেমিকও একইভাবে আত্মহত্যা করেছে। শনিবার রাত অনমুান ১১টায় নববধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। মরদেহের পাশে হাতে লিখা একটি চিরকুট পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আত্মহত্যার পূর্বে মেয়েটি তার মা-বাবার উদ্দেশ্যে এটি লিখেছিল। এই ঘটনায় নববধূর ভাই মেহেদী হাসান বাদী হয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।

mzamin