Saturday, March 10, 2018

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ চাপের মুখে by কুলদীপ নায়ার

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এতটাই চাপের মুখে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে দেয়া পাঁচ বছরের কারাদণ্ড প্রকৃত কিনা। বিচারকরা দৌড়ের ওপর আছেন। কারণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কথিত মতে তাদের ওপর অসন্তুষ্ট। একজন বিচারক বিদেশে গেছেন। কিন্তু তিনি আর নাও ফিরতে পারেন। কারণ বলা হয়ে থাকে, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সুনজরে নেই। এটা বোধগম্য যে, যদি তিনি কখনো ঢাকায় ফেরেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে কিছু একটা ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে বলে তার শঙ্কা আছে। সত্যি বলতে কি, সমগ্র বিচার বিভাগ বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে।
আমি বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে সাফাই বক্তব্য দিচ্ছি না।  কিন্তু ওই রায়ের পেছনে শেখ হাসিনার হাত রয়েছে বলে অনুভূতি এতটাই জোরালো যে, রায়টি তার ‘ফেস  ভেলু’তে গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে না। বিশেষ আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে শাস্তিদান কালে বলেছেন, ‘স্বাস্থ্য’ ও সামাজিক মর্যাদা’ বিবেচনায় তাকে তিনি কম মেয়াদি সাজা দিয়েছেন। এর অর্থ হলো তিনি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো  বিদেশি অনুদান থেকে পাওয়া তার পরিবারের দ্বারা পরিচালিত জিয়া এতিমখানা পরিচালনার তহবিল থেকে ২১ মিলিয়ন টাকা তিনি আত্মসাৎ করেছেন। তার সঙ্গে তার ছেলেসহ আরো পাঁচ জন ১০ বছর মেয়াদে কারাদণ্ড পেয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ বলেছেন, জিয়াউর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট কেবল কাগজে কলমে টিকে আছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও তার তিন সহযোগী জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট থেকে আরো সাড়ে ৩১ মিলয়ন টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ আছে। রায়ের প্রাক্কালে বেগম খালেদা জিয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাকে একটি মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। তার কথায়, ‘আমি বিশ্বাস করি, সব অভিযোগ থেকে আমাকে রেহাই দেয়া হবে। এটা একটি মিথ্যা মামলা। আমি ও আমার পরিবারকে হয়রানি করার জন্য এসব মামলা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওই রায় যদি ক্ষমতাসীন সরকারকে সন্তুষ্ট করার জন্য দেয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা একটি কলঙ্কিত ইতিহাস সৃষ্টি করবে। খালেদা জিয়া আরো বলেছিলেন, তাকে নির্বাচন ও রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে আদালতকে ব্যবহার করা একটি নজির। তিনি আরো বলেছিলেন, আমি সব ধরনের ফলাফল মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত আছি। আমি জেল বা শাস্তিকে ভয় পাই না। অমি আমার মাথা নত করব না। কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট যদি ভিন্নতর কোনো রায় না দেন, তাহলে এই রায় তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিচারিক আদালতের রায় পাওয়ার একদিন পরে রায়কে চ্যালেঞ্জ করে তার আইনজীবীরা হাইকোর্টে আপিল করেছেন। ১২২৩ পৃষ্ঠার আপিল আবেদনে তার আইনজীবী আবদুর রেজ্জাক খান খালেদা জিয়া কেন মুক্তি পাবেন তার সপক্ষে ২৫টি যুক্তি দেখিয়েছেন। এর সারকথা হচ্ছে রাজনীতি থেকে তাকে বিদায় দিতেই মামলাটি পরিচালনা করা হয়েছে। কিন্তু এই অভিযোগ শেখ হাসিনার সরকার নাকচ করেছেন। আদালতের কর্মকর্তারা বলেছেন, দুই সদস্যের হাইকোর্ট বেঞ্চে এই আপিলের শুনানি চলতি সপ্তাহের শেষে শুরু হতে পারে। বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলাটি হলো তার বিরুদ্ধে দায়ের করা এক ডজন দুর্নীতি মামলার অন্যতম। বেগম জিয়া গত এক দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০১৪ সালে তিনি ইতিমধ্যে একটি সাধারণ নির্বাচন বয়কট করেছেন, আর সেটা তখন বিরাট প্রতিবাদের মুখে পড়েছিল। কিন্তু বেগম জিয়া এবারে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা আলমগীর বলেছেন, বেগম জিয়াকে ছাড়া তাদের দল নির্বাচনে যাবে না। তার কথায়, ‘বেগম জিয়াকে ছাড়া কোনো জাতীয় সাধারণ নির্বাচন হবে না।’ এদিকে শেখ হাসিনার সরকার বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে তাদের কিছু করার নেই। বিএনপি আসুক আর না আসুক, যথারীতি ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
মিডিয়া সমালোচনার মুখে শেখ হাসিনা বলেছেন, ওই দুর্নীতি মামলা বেগম জিয়ার সমর্থকরাই ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়ের করেছিল। ওই সময়ে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন ওই  অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করেছিল। তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিএনপি যদি রায়ের কারণে নির্বাচন বর্জন করে তাহলে আমরা তো নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে পারি না। ১৯৯১ সাল থেকে বেগম জিয়া তিন বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি এখন ৩০টির বেশি অভিযোগের মুখোমুখি রয়েছেন। এর মধ্যে দুর্নীতি থেকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আছে। বিএনপি ওই কারাদণ্ড ঘোষণার পরে দ্রুততার সঙ্গে তার ছেলেকে তার পদে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। শেখ হাসিনা এমনকি মন্তব্য করেছেন, এই সিদ্ধান্তে বিএনপির ‘নৈতিক দারিদ্র’ প্রকাশ পেয়েছে। এটা প্রশংসনীয় যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বিচার বিভাগ স্বাধীনতা বজায় রাখছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ সুপ্রিম কোর্টে তাকে দণ্ডিত করার পাশাপাশি বলেছিলেন তিনি আদালত ও সংসদের ভেতরের ও বাইরের জনগণকে বোকা বানোনোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কখনই সমগ্র সত্য নিয়ে আদালতের সামনে উপস্থিত হননি।
নওয়াজ শরীফ রায় গ্রহণ করে মন্তব্য করেছেন যে, তিনি আবার জনগণের কাছে ফিরে যাবেন। ফোডার স্কামে রাচি হাইকোর্টে দণ্ডিত রাষ্ট্রীয় জনতা দল প্রধান লালু প্রসাদ যাদবের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটেছে। এ রকম আরো উদাহরণ রয়েছে, যেখানে রাজনীতিকদের পদত্যাগ করতে হয়েছে। এরকম ভুরি ভুরি নজির আছে যেখানে রাজনীতিকরা এমন পরিস্থিতি থেকে পুনরায় ফিরে এসেছেন। রাজনীতিতে নিজদের প্রাসঙ্গিক রাখতে তারা উচ্চ আদালতে নিম্ন আদালতের রায় চ্যালেঞ্জ করেছেন। বিদ্যমান ব্যবস্থায় একটা সংস্কার আনা দরকার, যাতে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিকরা চিরজীবনের জন্য রাজনীতিতে অযোগ্য থাকেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ‘সরকারে ‘অপরাধী রাজনীতিকদের’ কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। কিন্তু এই বিষয়ে পরিবর্তন আনার দায়িত্ব আদালত নির্বাহী বিভাগের হাতে ন্যস্ত করেছেন। কিন্তু এটা এখনো পর্যন্ত কাজ করেনি। সুপ্রিম কোর্ট কিভাবে আশা করতে পারেন যে, নির্বাহী বিভাগ এটা ভবিষ্যতে করবে?’
(কুলদীপ নায়ার, ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামনিস্ট। লেখাটি ডেকান হেরাল্ডে সমপ্রতি প্রকাশিত তার নিবন্ধের অনুবাদ)

শ্রীলঙ্কায় সহিংসতার মূলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি by গ্যারি আনন্দসাঙ্গারে

শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি এলাকায় সিংহলিজ দাঙ্গাকারীরা সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতা চালিয়েছে। এর শিকার হয়েছেন নিরাপরাধ মুসলিম পুরুষ, নারী ও শিশুরা। হত্যা করা হয়েছে নারী, পুরুষদের। তাদের  দোকানপাট, মসজিদ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে ১০ দিনের জন্য জরুরি অবস্থা জারি করেছে সরকার। এই সহিংসতা ও জাতিবিদ্বেষী কর্মকাণ্ডের কড়া নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
শ্রীলঙ্কায় এই ধরনের সহিংসতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিজরা ১৯৫৮, ১৯৭৭ ও ১৯৮৩ সালে তামিলবিরোধী কর্মসুচি হাতে নিয়েছিল। দেশটির অস্থির ইতিহাসে তামিল, মুসলিম ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর মাঝে মাঝেই সহিংসতা হয়েছে থেমে থেমে। এখানে ১৯৮৩ সালের ২৩ শে জুলাই রাতে তামিল বিরোধী অভিযান শুরু হয়। এর নাম দেয়া হয় ‘ব্লাক জুলাই’। ওই সময় শ্রীলঙ্কার সরকার তামিল ভোটারদের তালিকা সরবরাহ করে সশস্ত্র দাঙ্গাকারীদের কাছে। এর ফলে তারা হত্যা করে কমপক্ষে ৩০০০ তামিলকে। রাজধানী কলম্বোতে তামিলদের মালিকানাধীন বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনার ফলে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা থেকে দলে দলে তামিলরা দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিতে থাকেন কানাডার মতো দেশে। ওই ঘটনার ফলে শ্রীলঙ্কায় সৃষ্টি হয় ২৬ বছর স্থায়ী গৃহযুদ্ধের। তা শেষ হয় ২০০৯ সালের মে মাসে। এই যুদ্ধ শেষ হয় গুরুত্বর সব অভিযোগের মধ্য দিয়ে। অভিযোগ করা হয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক আইন ভয়াবহভাবে লঙ্ঘন করেছে সরকার। ২০১৫ সালে মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের হাই কমিশনারের অফিস প্রমাণ পায় যে, ওই যুদ্ধের শেষের দিকে মারাত্মকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। মানবাধিকার ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। যৌন সহিংসতা, সংক্ষিপ্ত বিচারে ফাঁসি ও জোরপূর্বক গুমের সঙ্গে জড়িত শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী।
এসব সহিংসতার সবটাই একই সুতোয় গাঁথ। তাহলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। প্রায় ৭০ বছর আগে স্বাধীনতা অর্জন করে শ্রীলঙ্কা। তারপর থেকেই এই দায়মুক্তির সংস্কৃতি সেখানে বিদ্যমান। এসব দাঙ্গার জন্য যারা দায়ী অথবা ২০০৯ সালে শেষ হওয়া যুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে সক্ষমতা নেই শ্রীলঙ্কার। তারা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অব্যাহতভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বা দিয়ে যাচ্ছে। বলছে, এই বিচারে বিদেশী ও কমনওয়েলথের বিচারক, প্রসিকিউটর, তদন্তকারী থাকবেন। কিন্তু নয় বছর পেরিয়ে গেলেও এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পথে কোনোই অগ্রগতি হয় নি।
সরকার তার সেনাবাহিনীকে যেকোনো রকম জবাবদিহিতা থেকে সুরক্ষিত রেখেছে। প্রকৃত সত্য হলো, ২০০৯ সালে শেষ হওয়া যুদ্ধে জড়িত ছিলেন এমন সেনাবাহিনীর সিনিয়র অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে। কিন্তু সরকার কি করেছে! সরকার তাদেরকে উত্তম পুরস্কার দিয়েছে। তাদেরকে নিয়োগ করেছে বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে। সেখানে তারা বিচারের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি সুবিধা ভোগ করছেন।
কঠোরভাবে বলতে হয়, সর্বশেষ মুসলিমদের বিরুদ্ধে যে দাঙ্গা বা হামলা হচ্ছে তা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কাউন্সিল শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার রেকর্ড, জবাবদিহিতা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ও পুনরেকত্রীকরণের রেকর্ড নিয়ে আলোচনা করছে। এ সপ্তাহে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার প্রিন্স জায়েদ বিন রাদ জায়েদ আল হোসেন শ্রীলঙ্কার বিষয় তুলে ধরেছেন। এতে শ্রীলঙ্কায় দায়মুক্তির সুবিধা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতির অগ্রগতিতে অভাব তুলে ধরেন তিনি। তিনি সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান শ্রীলঙ্কার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে সার্বজনীন বিচারের মূলনীতি প্রয়োগ করতে।
গণতান্ত্রিক একটি অভ্যুত্থান এরই মধ্যে ঘটে গেছে দেশটিতে। সেটা ঘটেছে ২০১৫ সালে। তখন কর্তৃত্ববাদী শাসক মাহিন্দ রাজাপাকসেকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে ওই অভ্যুত্থান। এর মধ্য দিয়ে একটি আশার আলো দেখা দেয় যে, শান্তির পথে অগ্রসর হবে শ্রীলঙ্কা। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় ক্ষমতায় আসেন নতুন প্রেসিডেন্ট। তিনি সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি তার সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। সমর্থন প্রকাশ করেন ‘ওয়্যার হিরো’ বা তাদের দৃষ্টিতে যুদ্ধের নায়কদের প্রতি। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত যারা তাদের বিরুদ্ধে দায়মুক্তি দেন। এর ফলে নির্যাতিতরা বা ভিকটিমদের সত্য ও ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়ে নতুন করে সংশয়ের সৃষ্টি হয়।
শ্রীলঙ্কা তার নিজের ছায়ার ভিতরেই রয়েছে। দায়মুক্তি দেয়ায় এই দ্বীপরাষ্ট্রটির এবং এর জনগণের যে ক্ষতি করা হয়েছে তা তাদের উল্টো দেয়া উচিত। আমরা যদি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চাই, যদি অতীতের ভুল এড়িয়ে চলতে চাই, তাহলে যারা নিয়মিতভাবে অন্যরে অধিকার লঙ্ঘন করেছে তাদেরকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। তাদের কর্মকা-, তাদের নির্লিপ্ততায় যে ক্ষতি হয়েছে, যা হারিয়ে গেছে তার জন্য যদি এই বিচার করতে ব্যর্থ হলে পুরো মানবতা ব্যর্থ হবে।
আমাদের প্রার্থনা করা উচিত। প্রার্থনা করা উচিত সেখানে সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে তার উত্তেজনা যেন আরো ছড়িয়ে না পড়ে, যার জন্য দেশটি শত্রুতায় ভরা পরিবেশে ফিরে যায়। এই দ্বীপরাষ্ট্রে এমন ঝুঁকি কমাতে আমাদেরকে নিশ্চিত হরতে হবে যে, সাম্প্রতিক অপরাধীরা যারা সহিংসতায় লিপ্ত হয়েছে, তাদেরকে বিচার প্রক্রিয়ায় আনতে হবে। অতীতের আইন লঙ্ঘনের বিষয়টিকে প্রকৃতঅর্থে মাথায় রাখতে হবে।
(গ্যারি আনন্দসাঙ্গারে, কানাডা পার্লামেন্টের স্কারবরো-রৌগ পার্ক আসনের এমপি। তিনি বর্তমানে জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কাউন্সিলের ৩৭তম অধিবেশনে যোগ দিচ্ছেন। অনলাইন টরোন্টো স্টার থেকে তার এ লেখাটি অনুবাদ প্রকাশ হলো)

ভিআইপি বন্দি থাকায় কারাগারে বিনোদনকেন্দ্র নির্মাণ আপাতত বন্ধ by দীন ইসলাম

ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারে ভিআইপি বন্দি হিসেবে আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তাই ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা দুইশ’ বছরের পুরনো ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগারকে বিনোদনকেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে নাজিমউদ্দিন রোডের জেলখানাটি হস্তান্তরও করছে না স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। যদিও এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর চিঠি চালাচালি করছে। কিন্তু সর্বশেষ চিঠিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এ জায়গাটি তারা নিজেরাই রক্ষণাবেক্ষণ করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের শেষদিকে কেরানীগঞ্জের জেলখানায় বন্দি স্থানান্তরের পর পরই সিদ্ধান্ত হয় নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারের ১৮ একর জমিতে করা হবে পার্ক, জাদুঘর, কনভেনশন সেন্টার, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, উন্মুক্ত নাট্যমঞ্চ ছাড়াও বিনোদনের নানা ব্যবস্থা। এছাড়া ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে এমন ভবনগুলো সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত হয়। এজন্য গেল বছরের ২৫শে মার্চ থেকে ২৭শে মার্চ পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয় সাবেক ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। ওই সময় ১০০ টাকায় দর্শন করা গেছে লাল দালান নামে পরিচিত পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারটি। এর আগে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে প্রথম বারের মতো ২০১৬ সালের ২রা নভেম্বর থেকে ৫ই নভেম্বর পর্যন্ত ১০০ টাকা টিকিটের বিনিময়ে কারাগারটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করেছিল কারা কর্তৃপক্ষ। সূত্রমতে,  ১৭৮৮ সালে একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড চালুর মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের (পুরনো ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে) যাত্রা শুরু হয়েছিল। তখন এর ধারণ ক্ষমতা ছিল ৫শ’। সুদীর্ঘ যাত্রাপথে এ কারাগারের রয়েছে হাজারো স্মৃতি। এটি শুধু কারাগার নয়, এর সঙ্গে জড়িত বাংলাভাষা ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস। দেশের সর্ববৃহৎ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারটি ২০১৬ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর স্থানান্তরিত হয়েছে কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুরে। স্থানান্তরের পর পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারটি স্থান পায় ইতিহাসের পাতায়। ১৯৪৮ সালে ভাষা  আন্দোলনের সময় তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকের ঠাঁই হয় এ কারাগারে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন ছাড়াও রাজনৈতিক, সেনা শাসকবিরোধী আন্দোলন, ছয় দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় অনেককেই এ কারাগারে রাখা হয়। তবে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় অনেক কারারক্ষী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তৎকালীন রাজবন্দিদের তথ্য আদান-প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি কারারক্ষী ও কর্মকর্তারা যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধ শুরু হলে, কয়েদিখানা খুলে দেয় কারারক্ষীরা। এ কারণে পাকিস্তানিরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ সব কারাগারে হামলা চালিয়ে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর খুলে দেয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। সর্বশেষ একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের দণ্ড কার্যকর হয় এই কারাগারে। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে বন্দি করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর রাতে এ কারাগারের ভেতরেই এই চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়। বর্তমানে নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে ?দু’টি জাদুঘর রয়েছে। এর একটি ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর,’ অপরটি ‘জাতীয় চার নেতার জাদুঘর’। দেশের শ্রেষ্ঠ স্থপতিদের নকশায় অনেক কিছুই করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আলতাফ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনা হস্তান্তর করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তারা জানিয়ে দিয়েছে নিজেরাই এসব স্থাপনা সংরক্ষণ করবেন।

পত্রিকা পড়ে নিভৃতে সময় কাটছে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

বাড়িটির নাম ‘গ্র্যান্ড প্রেসিডেন্ট কনকর্ড’। কিন্তু মানুষের কাছে এটি পরিচিত প্রেসিডেন্ট হাউজ হিসেবে। রাজধানীর গুলশান-২ এর ৫৯ নম্বর সড়কের ১০ নম্বর ধূসর রঙের এই বাড়িতে থাকেন একসময়ের আলোচিত প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন আহমদ। প্রায় নব্বই বছর বয়সী এই  সাবেক প্রধান বিচারপতির শরীর তেমন ভালো নেই এখন। বয়সজনিত নানা রোগে ভুগছেন। স্বাভাবিক চলাফেরা করতে কষ্ট হয় তার। সাধারণত তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বাসায় আসেন চিকিৎসকরা। প্রায় দুই মাস আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ দুই সপ্তাহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। বাসায় তার সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করার জন্য রয়েছেন দু’জন সেবিকা।
তিনি কখনও রাজনীতি করেননি। রাজনীতিক না হয়েও বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে অনন্য হয়ে আছে তার নাম। ছিলেন বিচারপতি, পরে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতির এক সন্ধিক্ষণে নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও। শুধু একবার নয়, দু’বার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বহুদিন ধরে নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে নিয়ে গেছেন এই মানুষটি। সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীনের খোঁজ-খবর জানতে তার গুলশানের বাড়িতে গিয়েছিলেন এই প্রতিবেদক। বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। আবাসন কোম্পানি কনকর্ডের সঙ্গে অংশীদারে বানানো ছয়তলা বাড়িটিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশে রয়েছে বেশ কড়াকড়ি। নিজের পরিচয় দিয়ে বাড়ির প্রধান ফটক পেরিয়ে অভ্যর্থনা কক্ষে গিয়ে জানা গেল, অনেক দিন থেকেই সাহাবুদ্দীন মিডিয়ায় কথা বলেন না। তার শরীরও ভালো নেই। কথা বলতে কষ্ট হয় তার। কানে শুনেন না। বেশির ভাগ সময় ইশারা-ইঙ্গিতে কথা বলেন তিনি।
গত ৮ই মার্চ দুপুরের দিকে বাড়িটির নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুপারভাইজার আবদুর রাজ্জাক মানবজমিনকে জানালেন, স্যার একান্ত আপনজন ছাড়া কারও সঙ্গেই দেখা করেন না। রাজ্জাক আরো জানান, স্যার-এর ছোট ছেলে সোহেল আহমেদ বলেছেন উনি (সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ) কানে শোনেন না। সুতরাং আপনার সঙ্গে কথা বলবেন না। বাড়িটির দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে ছোট ছেলে সোহেল আহমদের সঙ্গে থাকেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। একই তলার অন্য একটি ফ্ল্যাটে থাকেন তার বড় মেয়ের জামাই ও নাতনি। সাহাবুদ্দীনের তিন মেয়ে আর দুই ছেলের মধ্যে বড় মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সিতারা পারভীন। ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। বছর তিনেক আগে সাহাবুদ্দীন আহমদের স্ত্রী আনোয়ারা বেগমও মারা যান। বড় ছেলে পরিবেশ প্রকৌশলী শিবলী আহমদ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। মেজো মেয়ে স্থপতি সামিনা পারভীন থাকেন যুক্তরাষ্ট্রে। ছোট মেয়ে চারুশিল্পী সামিয়া পারভীন থাকেন দুবাই।
সাবেক প্রেসিডেন্টের একজন চিকিৎসক বলেন, মূলত পত্রিকা পড়া তিনি বেশি পছন্দ করেন। বেশির ভাগ সময়ই তিনি ঘরে থাকেন। শারীরিক দুর্বলতার কারণে কোনো সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না, এমনকি কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে যান না তিনি।  প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে আসার পর থেকেই তিনি কোনো ধরনের অনুষ্ঠানে যান না। নিভৃতে থাকতেই বেশি পছন্দ করেন তিনি। নিজেকে নিয়ে আলোচনা হোক সেটি চান না তিনি।
চলতি বছরের ১২ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই সপ্তাহ চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাসভবনে ফিরেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। বিএসএমএমইউ সূত্র জানায়, সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন আহমদ গত বছরের ৩০শে ডিসেম্বর পেট ব্যথা ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে ডা. এবিএম আব্দুল্লাহর তত্ত্বাবধানে কেবিন ব্লকের ৬১১নং কেবিনে ভর্তি হয়েছিলেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ছাড়াও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কানের সমস্যা, পারকিনসন্সসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মানবজমিনকে জানান, সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন আহমদ পেটে প্রচণ্ড ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কানের সমস্যাসহ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। কানে শুনেন না। ইশারা-ঈঙ্গিতে কথা বলেন।
এদিকে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার সিভিল সার্জন অফিস সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন আহমদের চিকিৎসার দায়িত্ব দেয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ওপর। এ বিষয়ে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মানবজমিনকে জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকার সিভিল সার্জন অফিস সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দীন আহমদের চিকিৎসার দায়িত্ব তাদের ওপর দিয়েছে। তাঁর প্রয়োজন হলেই আমাদের চিকিৎসক দল সাহাবুদ্দীন আহমদের বাড়িতে গিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
কারও সঙ্গে কথা বলতে অনাগ্রহী এই মানুষটি একদা যেমন বিচক্ষণতার সঙ্গে বিচারিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তেমনি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনটিও উপহার দিয়েছিলেন জাতিকে। সাহাবুদ্দীন আহমদ কোনোবারই নিজের ইচ্ছায় প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেননি। ১৯৯০ সালের ৫ই ডিসেম্বর গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হয়। তখন প্রশ্ন দেখা দেয়, কে দেশের দায়িত্ব নেবেন? রাজনৈতিক দলগুলো মিলে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে অস্থায়ী  প্রেসিডেন্ট করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি বিচারিক পদ ছাড়তে চাননি বলেই সর্বসম্মতিক্রমে তাকে আবার আগের পদে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে। একাদশ সংশোধনী ছিল সেই অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন। নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের পর সেদিন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন দায়িত্ব না নিলে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিত। সাহাবুদ্দীন আহমদের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রেক্ষাপটও ভুলে যাওয়ার নয়। প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বিদায় নিয়ে অন্তরালে চলে যান সাহাবুদ্দীন আহমদ। আগেও যে খুব একটা প্রকাশ্যে আসতেন এমন নয়। বরাবরই প্রচারবিমুখ মানুষ তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ শেষে একেবারেই নিভৃতে চলে আসেন।
উইকিপিডয়ার মতে, ১৯৩০ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে জন্ম নেন সাহাবুদ্দীন আহমদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) এবং ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ছিলেন ফজলুল হক হলের ছাত্র। ১৯৫৪ সালে তদানিন্তন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রশাসনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। তার বাবা তালুকদার রিসাত আহমেদ একজন সমাজসেবী ও এলাকায় জনহিতৈষী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
অবশ্য বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের কর্মজীবনের সূচনা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। পরবর্তী সময়ে সহকারী জেলা প্রশাসক হওয়ার পর ১৯৬০ সালে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগে বদলি হন। আসীন হন বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে। তারপরের ইতিহাস তো জানা। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ৬ই ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৯১ সালে তার অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। পরে শর্তানুযায়ী তাকে প্রধান বিচারপতির পদে ফিরিয়ে দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২৩শে জুলাই তাকে বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট করা হয়। তখন তিনি অবসরকালীন সময় কাটাচ্ছিলেন। ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তফসিলের আগের ও পরের বৈধতার প্রশ্ন by মিজানুর রহমান খান

নির্বাচনী আচরণবিধি নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যকার চলমান বিতর্ক নির্দেশ করছে যে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনকালে কী রকম আচরণ করবে, তা নিয়ে কখনো কার্যকর আলোচনা হয়নি। নির্বাচনী আইনে ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য যে বাধানিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তার সবটাই তফসিল ঘোষণা থেকে ভোট গ্রহণের দিন পর্যন্ত কার্যকর হবে। সুতরাং বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ নির্বাচনী আইন লঙ্ঘনের যে দাবি তুলেছেন, তা আক্ষরিক অর্থে সঠিক বলা চলে না।
মওদুদ আহমদকে টেলিফোনে এ বিষয়ে যুক্তি দিতেই তিনি স্বীকার করলেন যে প্রয়োজনে আইনে সংশোধন আনতে হবে। তাঁর কথায়, কিন্তু সব সুবিধা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ভোট চাইছেন, তা অনৈতিক। প্রধানমন্ত্রী যখন ভোট চাইছেন, তখন বিএনপিকে ঘরোয়া সভা করতে পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে না। আর নির্বাচন কমিশন এর কোনোটিরই প্রতিকার দিতে ব্যর্থ। আমরা স্মরণ করতে পারি যে মাগুরার বিতর্কিত উপনির্বাচনের পর যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি উঠেছিল, তখন তা মোকাবিলায় বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে কীভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু করা যায়, সে জন্য কিছু আইনি সংস্কার করেছিল, কিন্তু তা তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের কাছে সংগত কারণেই যথেষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়নি। কারণ, বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো নির্বাচিত-অনির্বাচিত ব্যক্তিদের অজুহাত দেখিয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল, যাতে দলীয় সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা তৈরি হতে পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে বিএনপি ক্ষমতাসীন অবস্থায় নানা কলাকৌশল খাটিয়ে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার চিন্তায় বুঁদ ছিল। এরপর তারা অসহায় অবস্থায় সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী বিল পাস করেছিল। সুতরাং ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারের পতনের পর দলীয় সরকারের অধীনে উপযুক্ত নির্বাচনী সংস্কার আনা এবং তার ফলাফল কী হতে পারে, সেই পরীক্ষায় না গিয়ে আমরা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার করেছিলাম। এরপর ২০০৬ সালে পুতুল ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের হাতে নামকাওয়াস্তে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিএনপি প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যের কর্মকাণ্ড দ্বারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কবর রচনা করেছিল। আবার একইভাবে আওয়ামী লীগ মোটামুটি ওই একই ধরনের অজুহাত খাড়া করে তাদেরই আন্দোলনের ফসল এবং বিশ্বের দেশে দেশে তাদের অসামান্য উদ্ভাবন (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা) হিসেবে দাবি করা পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে দলীয় নির্বাচনকালীন সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। দলীয় সরকারের অধীনে ভালো নির্বাচন কীভাবে ভারত, ব্রিটেনসহ উন্নত গণতন্ত্র করে থাকে, তার সপক্ষে তারা প্রায়ই সঠিক যুক্তি দিয়ে থাকে, কিন্তু তা বহুলাংশে খণ্ডিত। ওই সব দেশে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নিজেই গোটা মন্ত্রিসভাকে নিয়ে কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধানে রূপান্তরিত হন, সে বিষয়ে খোলামন নিয়ে আলোচনা করতেও ক্ষমতাসীন দলের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কম নয়। অথচ একটি যোগ্য জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে আমাদের উচিত হবে দলীয় সরকার যে নির্বাচনে জয়ী হতে মরিয়া হয়ে ওঠে না, সেটা প্রমাণ করা। আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারিনি। কার দোষ বেশি, কার কম, সেটা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু বিশ্ব দেখছে যে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছি এমন একটি পরিবেশে, যখন বাংলাদেশ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারে কি না, তা গুরুতরভাবে প্রশ্নের মুখে। প্রধান বিরোধী দলের দুর্বলতার কারণে কোনো একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিকাশ টেকসই নয়, বরং আরও বেশি ভঙ্গুরই থেকে যেতে পারে। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন ও একতরফা নির্বাচনের পরিস্থিতি থেকে সরে এসে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা। ওই নির্বাচন বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। একটি মর্যাদাসম্পন্ন জাতি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকট, তিস্তা চুক্তি না হওয়া, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক শক্তি ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতেই হবে। ত্রিপুরার নির্বাচনে সাম্প্রদায়িক বিজেপির হাতেই বাম দুর্গের পতন ইঙ্গিত করছে যে এটা একটা ঢেউ, যা গোটা বাংলাদেশের সীমান্ত ছুঁয়ে যাওয়া ভারতের অবশিষ্ট রাজ্যগুলোতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কল্পনা করুন, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যগুলোতে বিজেপি সরকার গঠন করতে পারলে বাংলাদেশের জন্য তা এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে হাজির হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যদি ভেতরে-ভেতরে ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে, তাহলে বিদেশনীতির মৌলিক ইস্যুগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়বে, না কমবে? আরও একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন কিংবা কার্যত আরও একটি বিতর্কিত বা অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন বিশ্বসভায় বাংলাদেশের মর্যাদাকে আরও ক্ষুণ্ন করবে। প্রতিপক্ষকে সুযোগের সমতা দিয়ে নজির স্থাপন করার কাজটি তাই আওয়ামী লীগের তরফে জরুরি। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করা মানে সরকার ও দলকে এক করে ফেলা নয়। সরকার না চাইলে বিএনপি খুশি হবে বা আওয়ামী লীগ বিব্রত হবে এমন কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নেওয়ার বাস্তব পরিস্থিতি রয়েছে কি না, তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। প্রধানমন্ত্রীর ভোট চাওয়ার ব্যাপারে বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে যে চিঠি দিয়েছে, সে বিষয়ে তারা নীরব। কিন্তু তারা অক্ষম অজুহাত দেখিয়েছে যে আইনে তার হাত-পা বাঁধা। প্রকৃতপক্ষে যা তফসিলের পর অবৈধ, তা আগে আরও বেশি অবৈধ।
ভারত গত ৭০ বছরে কয়েকটি নির্বাচন লোকসভা না ভেঙে (চারটির বেশি নয়) করেছে, প্রণব মুখার্জির কাছ থেকে এই তথ্য জেনে আওয়ামী লীগের উৎফুল্ল একজন নেতা আমাকে বলেছিলেন, ‘সংসদ রেখে নির্বাচন করার উদাহরণ আমরা পেয়েছি।’ সেই নেতার উদ্দেশে বলতে চাই, ভারতের নির্বাচনী আচরণবিধিতে যা আছে, তা-ও মেনে দেখান। ভারতে কংগ্রেস শাসনামলে মৌলবাদী বিজেপির সভা-সমাবেশ করার অধিকার ছিল। তারা বড় ধরনের কোনো চাপ, ভয়ভীতি ছাড়াই প্রতিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোর খাটিয়েছিল, মূল প্রতিপক্ষের গণতান্ত্রিক অধিকার নস্যাৎ করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল বা বিজেপিকে এ জন্য অহর্নিশ ব্যতিব্যস্ত থাকতে হয়েছিল-এমন কিছু আমরা স্মরণ করতে পারি না। বরং ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও নির্বাচন কমিশন পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে দলীয় সরকারের অধীনে কী করে দলীয় সরকারের অবাঞ্ছিত ও অনৈতিক প্রভাবমুক্ত নির্বাচন করার সব উপায় উদ্ভাবন করেছে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ১৯৭১ সালে নির্বাচিত হওয়াকে চার বছর পর অবৈধ বলা এবং পরের আরও ছয় বছর তাঁকে নির্বাচনের জন্য অযোগ্য করে দেওয়া এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় আজ সোনার হরফে লেখা। ভারতীয়রা গর্বিত। আর সেই রায়ের কারণে ইন্দিরার জরুরি অবস্থা জারির ঘটনা ভারতের গণতন্ত্রের কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। ইন্দিরা গান্ধীকে দুটি কারণে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। উত্তর প্রদেশ সরকারের গেজেটেড অফিসারদের এবং বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে স্পেশাল ডিউটিতে থাকা গেজেটেড কর্মকর্তা যশপাল কাপুরকে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়েছিল। কোনো সন্দেহ নেই, দলীয় সরকারের প্রভাবমুক্ত ভারতের নির্বাচনব্যবস্থা গড়তে এ ধরনের বহু রায় ভূমিকা রেখেছে এবং ক্ষমতাসীনেরা তা মেনেছেন। বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৯ (সংসদ নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধান করবে ইসি) ও ১২৬ (ইসির দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সরকারের কর্তব্য) অনুচ্ছেদ এবং এই বিষয়ে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের মাইলফলক রায়গুলোর আলোকে আমরা বলতে পারি, বিএনপির ওই চিঠির প্রেক্ষাপটে ইসি সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠিয়ে দিতে পারে। আমরা সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেনের (অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার) সঙ্গে একমত যে আওয়ামী লীগকে তিরস্কার না করেও এ রকম পদক্ষেপ ইসি নিতে পারে, আর তাতে সরকার বিব্রত হয়ে সংযত হতে পারে। অবশ্য ইসির উচিত হবে নির্বাচনী বছরে সরকারের জন্যই কার্যকর একটি আচরণবিধি তৈরি করা।
মিজানুর রহমান খান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক
mrkhanbd@gmail.com

যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলি লবি: কী আছে আল জাজিরার প্রতিবেদনে? by মাহমুদ ফেরদৌস

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় নব্য-রক্ষণশীল থিংকট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস (এফডিডি) আসলে ইসরাইলি সরকারের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রে তৎপর ইসরাইল-পন্থী লবিগোষ্ঠীর ওপর আল জাজিরার প্রচারিতব্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অন্যতম মূল বক্তব্য এটি। গোপন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে নির্মিত এই তথ্যচিত্র দেখেছেন এমন একজনের বরাত দিয়ে এই খবর দিয়েছে ফিলিস্তিন-ইসরাইল বিষয়ক সংবাদ মাধ্যম ইলেকট্রনিক ইন্তিফাদা।
ওই সূত্র জানিয়েছে, তথ্যচিত্রে একজন ক্ষমতাধর ইসরাইলি কর্মকর্তার বক্তব্য সম্বলিত ফুটেজও রয়েছে। এতে ওই কর্মকর্তাকে বলতে দেখা যায়, ‘আমাদের আছে এফডিডি। এছাড়া এ নিয়ে অন্যরাও কাজ করছে।’ এই কর্মকর্তার নাম সিমা ভাকনিন-জিল। তিনি ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তথ্যচিত্রে তাকে বলতে দেখা যায়, এফডিডি ইসরাইলের জন্য বেশ কয়েকটি প্রকল্পে কাজ করছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘উপাত্ত সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ, অ্যাকটিভিস্ট সংগঠন নিয়ে কাজ করা, অর্থের উৎস অনুসন্ধান করা। কোনো একটি দেশের পক্ষে এটিই সবচেয়ে ভালোভাবে করা সম্ভব।’
আমেরিকার ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের আওতায়, যেসব মার্কিন সংগঠন ও নাগরিক বিদেশী সরকারের পক্ষ হয়ে কাজ করেন, তাদেরকে আইন মন্ত্রণালয়ের কাউন্টার ইন্টিলিজেন্স বিভাগে নিবন্ধিত হতে হয়। কিন্তু এফডিডি থিংকট্যাংক ইসরাইল সরকারের এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত নয়। আল জাজিরার প্রচারিতব্য তথ্যচিত্রে এই বিষয়টিই ফুটিয়ে তোলা হবে। উল্লেখ্য, বিদেশী সরকারের এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত হলে একটি সংগঠনের অনেক কার্যক্রমই সীমিত হয়ে পড়ে। আবার বিদেশী সরকারের এজেন্টের মতো কার্যক্রম করা সত্ত্বেও নিবন্ধিত না হলে বড় ধরণের আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে।
প্রতিবেদনে দেখা যাবে যে, ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে এমন বেশ কয়েকটি লবি গ্রুপ মার্কিন নাগরিকদের ওপর নজরদারি করছে। এছাড়া ইসরাইলের সমালোচক মার্কিন নাগরিকদের হেয় করা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনে ইসরাইল-পন্থী কয়েকটি সংগঠনের গোপন তৎপরতাও এই তথ্যচিত্রে দেখানো হবে।
এর আগে বৃটেনে ইসরাইলি লবির প্রভাব ও তৎপরতা নিয়ে প্রতিবেদন নির্মান করেছিল আল জাজিরা। ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বৃটিশ রাজনীতিতে হুলস্থুল পড়ে যায়। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বৃটেনে ইসরাইলি দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা বৃটিশ একজন মন্ত্রীকে অপসারণ করার ছক কষছেন, কারণ ওই মন্ত্রী ইসরাইলের সরকারী নীতির বিরোধী। এ নিয়ে বৃটিশ পার্লামেন্টে ব্যপক হইচই পড়ে যায়। ওই কর্মকর্তাকে অপসারণেও বাধ্য হয় ইসরাইল।
ওই প্রতিবেদন নিয়ে সাড়া পাওয়ার পর আল জাজিরা এক পর্যায়ে জানায় যে, যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন লবি গ্রুপের তৎপরতা নিয়েও কাজ করেছেন চ্যানেলটির একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক। ফলে প্রতিবেদন প্রচারের আগেই এ নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে যে, এই তথ্যচিত্র প্রকাশ না করতে আল জাজিরার মালিক কাতার সরকারের ওপর ভীষণ চাপ সৃষ্টি করে বেশ কয়েকটি ইসরাইল-পন্থী লবি গ্রুপ। এমনকি এদের কেউ কেউ পরে দাবি করেন, কাতার সরকার তাদেরকে ওই তথ্যচিত্র প্রচার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। 
কিন্তু, হারেৎস পত্রিকা জানায়, সম্প্রতি আল জাজিরা থেকে আমেরিকার বেশ কয়েকটি ইসরাইলপন্থী সংগঠন ও ব্যক্তিবিশেষের কাছে বার্তা গেছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাদের সংগঠন কিংবা ব্যক্তিবিশেষকে আল জাজিরার একটি তথ্যচিত্রে দেখা যাবে। সেখানে তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের উত্তর দিতে বলা হয়। যদিও এখন পর্যন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়নি, ইলেক্ট্রনিক ইন্তিফাদা একটি সূত্রের বরাতে ওই প্রতিবেদনে কী আছে, তা প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে সিমা ভাকনিক-জিল নামে যেই ইসরাইলি সাবেক সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে দেখা যায়, তিনি এখনও ইসরাইলি সামরিক বাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদমর্যাদায় কর্মরত রয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা তার বর্তমান কর্মস্থল হলো ইসরাইলের স্ট্রাটেজিক অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ে। এই মন্ত্রণালয়ে তিনিই সবচেয়ে উর্ধ্বতন সরকারী কর্মকর্তা। স্ট্রাটেজিক অ্যাফেয়ার্স নামে এই মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশিদিন হয়নি। এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যেই বয়কট, ডিভেস্টমেন্ট (বিনিয়োগ প্রত্যাহার) ও স্যাঙ্কশন্স (অবরোধ) অর্থাৎ বিডিএস আন্দোলনে চলছে, তার বিরুদ্ধে গোপন প্রচারণা ও নাশকতা চালানো। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হলেন গিলাদ এরদান, যিনি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ। ফলে, এই মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে ভাকনিন-জিলের মন্তব্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
২০১৬ সালে এই মন্ত্রণালয় নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে, ভাকনিন-জিল অনলাইনে যোদ্ধাবাহিনী গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। এই যোদ্ধাবাহিনী ইসরাইলি প্রোপাগান্ডা দিয়ে ইন্টারনেট ভর্তি করে ফেলবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অপরদিকে ফিলিস্তিন-বিরোধী ইহুদী বিলিয়নিয়ার ও ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সবচেয়ে বড় দাতা শেলডন আডেলসন হলেন ফাউন্ডেশন অব ডেমোক্রেসিস (এফডিডি) থিংকট্যাংকের অন্যতম অর্থদাতা। এফডিডি সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলে। গত বছর ফাঁস হওয়া ইমেইল থেকে দেখা গেছে, ওয়াশিংটনে আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত কাতার থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নিতে এই এফডিডির সাহায্য কামনা করেন।
এই প্রতিবেদনে আরও দেখা যাবে, ইসরাইল-পন্থী একজন তরুণ লবিস্ট গর্ব করে বলছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক কত ঘনিষ্ঠ! ম্যাক্স আডেলস্টেইন নামে ওই লবিস্ট কাজ করতেন হার্বর গ্রুপে। তাকে গর্ব করে বলতে দেখা যাবে, হার্বর গ্রুপ কীভাবে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে গোপনে নিরাপত্তা সম্পর্ক স্থাপনে ভ’মিকা রেখেছে। হার্বর গ্রুপের গ্রাহকদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাশাপাশি সৌদি আরবও রয়েছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছ থেকে ২২ লাখ ও সৌদি আরবের কাছ থেকে ছয়মাসে ৩ লাখ ডলার পেয়েছে হার্বর গ্রুপ।
আল জাজিরার তথ্যচিত্রে দেখা যাবে, এফডিডি’র জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান জোনাথন স্ক্যাঞ্জার ব্যাখ্যা করে বলছেন কীভাবে তার সংগঠন আমেরিকায় কাজ করা ফিলিস্তিনি সংহতি গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে। তাকে বলতে দেখা যাবে যে, বিডিএস আন্দোলনের সাফল্য সকলকে বিস্মিত করে দিয়েছে। তিনি বলেন, বিডিএস আন্দোলনের সাফল্যের বিপরীতে ইসরাইলপন্থী লবি গ্রুপের প্রতিক্রিয়া ছিল হতচ্ছাড়া ও বিশৃঙ্খল। স্ক্যাঞ্জার সেখানে হতাশামিশ্রিত কন্ঠে বলেন, স্টুডেন্টস ফর জাস্টিস ইন প্যালেস্টাইন ও আমেরিকান মুসলিমস ফর প্যালেস্টাইন্স নামে দুইটি আমেরিকা-ভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে ইসলামি সন্ত্রাসবাদের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয় এফডিডি। তিনি আরও স্বীকার করে নেন যে, ফিলিস্তিনের পক্ষে যেসব অ্যাক্টিভিস্ট কাজ করেন তারা ইহুদীদের প্রতি বিদ্বেষ থেকেই তা করছেন, এমন প্রচারণা এখন অত কাজ করছে না। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, প্রচারণার কৌশল হিসেবে ইহুদী-বিদ্বেষী লেবেল সেঁটে দেওয়াটা আগে যেমন কাজ করতো, এখন আর তেমন কাজ করছে না।’
এর আগে ইসরাইল সরকারের একটি গোপন প্রতিবেদন, যা যুক্তরাষ্ট্রে তৎপর ইসরাইলপন্থী সংগঠনে বিলি করা হয়েছিল, সেখান থেকেও এই পরিস্থিতির ইঙ্গিত মিলে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিলিস্তিনি সংহতি আন্দোলনের অগ্রগতি নস্যাতে ইসরাইল যেসব প্রচেষ্টা হাতে নিয়েছে তা মোটাদাগে ব্যর্থ হয়েছে।
আল জাজিরার এই তথ্যচিত্রের সম্প্রচার ঠেকাতে ইসরাইল-পন্থী লবি গ্রুপ কাতার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা ছাড়াও অন্যান্য কৌশল হাতে নিয়েছে। যেমন, কমিটি ফর ইসরাইল নামে আরেকটি নব্য রক্ষণশীল প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক নোয়াহ পোলাক বলেন, আল জাজিরার এই তৎপরতা কী ছিল, তা নিয়ে মিনমিন করে বলার কিছু নেই। এটি ছিল আমেরিকার মাটিতে কাতারের চালানো পেশাদার গুপ্ত অভিযান। শুধু তা-ই নয়, আল জাজিরা যেখানে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে আমেরিকায় যেসব সংগঠন ইসরাইল সরকারের পক্ষে কাজ করে, তারা বিদেশী এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত নয়, সেখানে ইসরাইল-পন্থী মার্কিন কংগ্রেস সদস্যরা এখন দেশটির বিচার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছেন যাতে উলটো আল জাজিরাকে কাতারের বিদেশী এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধন করা হয়! কয়েকদিন আগে, রাশিয়ার সরকারী অর্থায়নে চালিত রাশিয়া টুডে চ্যানেলকেও বিদেশী এজেন্ট হিসেবে নিবন্ধিত হতে বাধ্য করেছে বিচার মন্ত্রণালয়। ঠিক সেভাবেই আল জাজিরাকে নিবন্ধিত করার কথা বলছেন ওই কংগ্রেস সদস্যরা।

বিশ্ব অর্থনীতির পরিবর্তন by আজিজুর রহমান খান

নির্দ্বিধায় বলা যায়, গত পাঁচ বা ছয় দশকে বিশ্বে যতখানি উন্নয়ন হয়েছে, মানব ইতিহাসের আর কোনো সময় ততটা হয়নি। আমি এই সময়ের নাম দিয়েছি ‘আমাদের আমল’। এই রূপান্তরের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি হলো, এই সময়ে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে বিশ্বের সেই সব অংশে, যেগুলোতে শিল্পবিপ্লবের প্রথম দুই শতকের ছোঁয়াই লাগেনি। আমাদের প্রজন্ম উন্নয়নশীল বিশ্ব বলতে বিশ্বের যে অংশকে চেনে, একুশ শতকে সেই অংশেই আনুপাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি বস্তুগত অগ্রগতি হয়েছে। এই অগ্রগতি বহুমাত্রিক: মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু, স্বাস্থ্য ও সাক্ষরজ্ঞান বাড়া, তীব্র দারিদ্র্য ও চরম দুর্দশা আনুপাতিক হারে কমে আসা এই অগ্রগতির প্রধান দিক।
অতিসাম্প্রতিক দশকগুলোতে বিস্ময়কর ধারাবাহিকতায় সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ঘটেছে। ট্রাম্পের উত্থানকে কেন্দ্র করে হইচই, ইউরোপ ও তার আশপাশের দেশগুলোর উপকূলে শরণার্থীদের ভাসমান মৃতদেহের বীভৎস দৃশ্য, সন্ত্রাসবাদের অবিরাম তৎপরতা, দেশে দেশে যুদ্ধ-সংঘাতের ফলে হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ-এসব সত্ত্বেও উল্লিখিত মানব উন্নয়নের সূচকগুলোর নিরিখে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি অর্জনের বছর হলো ২০১৭ সাল। এসব সমস্যার মধ্যেও আমাদের এই সময়কাল যে অর্জন ও অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করল, তাকে অস্বীকার করা অসম্ভব। এই বিষয়সংশ্লিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আমি তুলে ধরতে চাচ্ছি। অর্থনীতিবিদেরা সুদীর্ঘকাল ধরে উৎপাদন-সম্ভাব্যতা নিয়ে যে ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করে আসছেন, সেটি হলো বিদ্যমান সম্পদ ও মেধা দিয়েই সর্বোচ্চ উৎপাদন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। সমৃদ্ধি ও উৎপাদন-সম্ভাব্যতা রেখা যেটাকে বলা যেতে পারে, বিশ্বের বস্তুগত সমৃদ্ধির ধারা তার অনেক নিচে রয়েছে। তবে আমাদের সমাজগুলোকে আরও সুন্দরভাবে সংগঠিত করে বিদ্যমান জ্ঞান ও মেধার সর্বোচ্চ উৎকর্ষ নিশ্চিত করা যায় এবং অনর্থক সংঘাত এড়ানো যায়, এমন নীতি গ্রহণ করে সমষ্টিগত সমৃদ্ধি ও এর ক্রমবৃদ্ধি আরও বাড়ানো যেত। এর সত্যতা প্রমাণ করতে আমাদের এই উপমহাদেশের বাইরে তাকানোর দরকার নেই। দেখা যাবে, এই অঞ্চলের দেশগুলো নিজেদের মধ্যকার বাণিজ্য সীমিত করে, পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে এবং এক দেশ আরেক দেশের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য অস্ত্রের মজুত বাড়িয়ে সমষ্টিগত সমৃদ্ধির গতি নামিয়ে ফেলেছে।
দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক দশকগুলোতে দ্রুত প্রবৃদ্ধির একটি বৈশিষ্ট্য হলো, কম-বেশি সবখানেই আয় বণ্টনের বৈষম্য বেড়ে যাওয়া। আমি এ বিষয়ে প্রায়ই দুটি গতানুগতিক বিরোধিতার মুখোমুখি হই: ১. যেহেতু বেশির ভাগ আয় বৃদ্ধি হয়েছে দরিদ্রতর দেশগুলোতে, সেহেতু মনে হয় বিশ্বের সব ব্যক্তির মধ্যে আয় বণ্টনের অসমতা হয় কমেনি, নয়তো কমলেও তা খুবই কম। ২. চরম দারিদ্র্য যেখানে কমতির দিকে, তখন বৈষম্য বাড়ায় কারও উদ্বেগ থাকবে কেন?
এ দুই যুক্তির কোনোটিই মানতে আমি রাজি নই। আমাদের কাছে এমন কোনো সন্তোষজনক প্রমাণ নেই, যা দিয়ে প্রমাণ করা যায় যে একেকটি দেশের ভেতরের বৈষম্যকে বিভিন্ন দেশের মধ্যকার বিদ্যমান বৈষম্যের মাধ্যমে পুষিয়ে আনা যায়। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটি দেশের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বৈষম্য সমাজকাঠামো কেমন হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়: যেমন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও অভ্যন্তরীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান এই বৈষম্যই ঠিক করে দেয়। চরম দারিদ্র্য কমতে থাকার পরও বৈষম্য বাড়ায় কারও উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ এই যে সামগ্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে দারিদ্র্য হ্রাসের চেয়ে বৈষম্য বড় বাধা সৃষ্টি করে। এরপর আরও একটি উদ্বেগের কারণ হলো, বিদ্যমান আয় নিরূপণের হিসাব পদ্ধতি বহু খরচের খাতকে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে পরিবেশ বিপর্যয়ের যে বিশাল ক্ষতি, সেটি এই হিসাবের মধ্যে ধরা হচ্ছে না। আয় বণ্টনের হেরফের সমন্বয় করতে অর্থনীতিবিদেরা একটি পন্থা অবলম্বন করেন। সমষ্টিগত আয়কে ‘সুষমভাবে বণ্টিত সমমূল্যের আয়ে’ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে তাঁরা এই সমন্বয় করেন। যদিও ভিন্ন ভিন্ন স্তরের জীবনমানে থাকা জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত আয়ের একক তাদের সমাজ কীভাবে মূল্যায়ন করে, তা বিবেচনায় আনা খুবই জরুরি। পরিবেশগত বিপর্যয়ের বিষয়টি কীভাবে সমন্বয় করতে হয়, তা-ও অর্থনীতিবিদেরা জানেন। যেমন বনজ সম্পদ ও পানির উৎসের ক্ষতির মতো কিছু বিষয়ে কী করতে হবে, তা স্পষ্ট। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের মতো কিছু বিষয়ের ক্ষতি নিরূপণের জন্য আরও বেশি তথ্য এবং কোনো সমাজব্যবস্থা প্রত্যাশিত গড় আয়ু ও রুগ্ণতাকে কীভাবে মূল্যায়ন করে, তা আমলে নিতে হয়। আমি মনে করি, প্রাথমিকভাবে পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা অতি দুরূহ হিসেবে প্রতীয়মান হলেও এটিকে অপেক্ষাকৃত কম ভীতির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করে মূল্যায়ন করা উচিত। মূল ব্যাপার হচ্ছে, পরিবেশ বিপর্যয়ের বিপরীতে সমন্বয়কৃত সুষম বণ্টনলব্ধ আয় আমাদের সময়ের, বিশেষ করে আমাদের দেশ, চীন ও ভারতের মতো দেশে, উচ্চ প্রবৃদ্ধির শতকরা হার কমিয়ে ফেলবে। এমনকি এই সমন্বয়ের পরও আমাদের আমলে অর্জিত হতে থাকা সমৃদ্ধির বিকাশ অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক হবে; তবে দাপ্তরিক আনুমানিক মূল্য বিচারে সম্ভাব্য অর্জনকে যতটা জমকালো হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তার থেকে সেই অর্জন কিছুটা কম হবে।এখন দেখা যাক সমৃদ্ধির ক্রমবৃদ্ধি নিরূপণের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়া কী অবস্থায় আছে। কর্মজীবনের শুরুতে আমাদের প্রজন্মের অনেকেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন, যে আদর্শের প্রভাবশালী ধরন ছিল সোভিয়েত কেন্দ্র-নির্দেশিত পরিকল্পনার ধরন। তাঁদের সামনে আশার বিষয় ছিল, এটি অত্যন্ত দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও সাম্যের মিশ্রণ ঘটায়। যেমনটা ঘটেছিল সোভিয়েতে। গভীর হতাশায় পুঁজিবাদী বিশ্ব যখন পঙ্কিল হয়ে উঠেছিল, সেই মুহূর্তে সোভিয়েত অর্থনীতির ক্ষিপ্র অগ্রগতি এবং শ্রমের শোষণ বন্ধ ও সাম্য নিশ্চিতে পুঁজির বেসরকারি মালিকানা বিলুপ্ত করার অঙ্গীকার তাঁদের সামনে আশাজাগানিয়া ভূমিকা রেখেছিল।আমাদের কর্মজীবন শেষের বহু আগেই কেন্দ্র-নির্দেশিত পরিকল্পনাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল। জনগণের বস্তুগত আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থতার জন্য অনিবার্যভাবে দায়ী হয়ে উঠেছিল যে বিষয়টি, সেটি হলো সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের জন্য অপরিহার্য প্রচলিত যুক্তিগ্রাহ্য অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের পদ্ধতি থেকে বিচ্যুতি।নিজেকে সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ অর্থনীতিবিদ মনে করতেন, এমন ব্যক্তিসহ বহু অর্থনীতিবিদ এর কারণ বিশদভাবে পর্যালোচনা করেছেন। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে তা নিয়ে আলোচনা করার অবকাশ নেই। আমি যা বলতে চাই, তা হলো সোভিয়েতের কেন্দ্র-নির্দেশিত পরিকল্পনাব্যবস্থাও সন্তোষজনক সাম্যবাদী সমাজ গড়তে পারেনি। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর জন্য তৈরি করা অসংখ্য হিসাবে দেখা যায়, তাদের বৈষম্য যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর চেয়ে কম ছিল বটে; কিন্তু পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক-গণতান্ত্রিক দেশগুলোর চেয়ে ছিল বেশি।এর কারণ হিসেবে নানা ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে আমি যেটির ওপর জোর দিতে চাই সেটি হলো ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত করে সরকারের অধীনে উৎপাদন হলে বৈষম্য দূর হবে-জনগণের মধ্যে এই আশা ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। মার্ক্সীয় সমাজতন্ত্রে ব্যক্তিমালিকানায় কলকারখানা থাকাটাকে পুঁজিবাদী শোষণের উৎস বলে বিবেচনা করা হয় এবং উনিশ শতকের বাস্তবতায় হয়তো মার্ক্সের কথা ঠিকই ছিল।কিন্তু আধুনিক পুঁজিবাদে পুঁজির মালিকানা আর এক জায়গায় পুঞ্জীভূত থাকার সুযোগ নেই। এখনকার পুঁজি ছড়ানো-ছিটানো থাকে। পাল্টে যাওয়া আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরনের কারণেই শীর্ষ ব্যবস্থাপকেরা সম্পূর্ণ আয় কুক্ষিগত করতে পারে না। যোগ্যতামাফিক কর্মীদের মধ্যে তা বণ্টন করতে হয়। সোভিয়েত ঘরানার সমাজতন্ত্র উৎপাদন কারখানার ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত করেছিল। সরকারের নিয়ন্ত্রণে এনে সেগুলোর ওপর আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। তখন দেখা গেল, সেগুলো কার্যত সরকারের অনুগত ব্যক্তি অথবা সরকারের ঘনিষ্ঠ কোনো গ্রুপ চালাচ্ছে। ব্যবস্থাপনাভিত্তিক পুঁজিবাদের চেয়ে এই ব্যবস্থা ভালো ছিল, এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।
কেন্দ্র-নির্দেশিত পরিকল্পনার বিকল্প হচ্ছে এমন এক বাজারের ওপর নির্ভর করা, যেটি পুঁজিবাদী অর্থনীতির একটি অন্যতম অঙ্গ। কিন্তু গণতন্ত্রে পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠান বলতে যা বোঝানো হয়, আধুনিক বাজার আর সেই জায়গায় নেই। এমনকি চরম বিশুদ্ধতাবাদী অর্থনৈতিক তত্ত্ব পর্যন্ত আধুনিক বাজারের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েছে। আধুনিক বাজারকেও যেসব সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয় সেগুলো হলো সবার জন্য তথ্য পাওয়ার সমান সুযোগের অভাব, সরাসরি বিনিয়োগকৃত পুঁজির বাইরে আরও যেসব পুঁজি ও সম্পদমূল্য আছে, সেগুলোকে হিসাবের অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া এবং সর্বোপরি বাজারে সক্রিয় বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে সম্পদের বৃত্তির বণ্টনবৈষম্য। আয় ও সম্পদ বণ্টনের বৈষম্যের মধ্যেই পুঁজিবাদের অধীনে বাজারের এই অসাম্যের কারণ নিহিত রয়েছে। যখন বৈষম্য সীমিত পর্যায়ে নেমে আসে এবং অন্য ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে ক্ষতিপূরণমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই বাজার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আসলে এটিই সম্পদের লাগসই ব্যবহার নিশ্চিত করার একমাত্র কার্যকর পদ্ধতি। বাজারকে বাতিল বা পরিত্যাগ করা মানুষের কথোপকথনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপেরই নামান্তর। কিছু লোক আছে, যারা এত উচ্চ স্বরে কথা বলে যে তাদের কণ্ঠের নিচে কম শব্দ করে অন্যদের বলা কথা চাপা পড়ে যায়। সেই কথাগুলো ঠিকমতো শোনা যায় না। এখানে ন্যায্য সমাধান হবে উচ্চ স্বরে কথা বলা লোকদের আওয়াজ একটু কমিয়ে দেওয়া, যাতে অন্যদের কথাও বোঝা যায়। বাজারের বিষয়টি অনেকটা তেমনই। বেশির ভাগ অর্থনীতিতে উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে উৎসারিত আয়ের প্রাথমিক বণ্টনকে সুনির্দিষ্ট পুনর্বণ্টন নীতি আবার হিসাব-নিকাশ করে আরও সীমিত করে আনে। অক্সফোর্ডের গবেষণায় কয়েকটি দেশের প্রাক্পুনর্বণ্টন ও পুনর্বণ্টনোত্তর আয়বৈষম্যের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সেখানে দেখা গেছে, যেসব দেশ প্রাক্পুনর্বণ্টন ও পুনর্বণ্টনের আয়বৈষম্য যত বেশি কমিয়ে আনতে পেরেছে, সেসব দেশ তত বেশি অর্থনৈতিক সমতা অর্জন করতে পেরেছে। এ কারণে আমার যৌবনে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা কেন্দ্র-নির্দেশিত পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনীতির মৃত্যুতে আমি অশ্রুপাত করি না। এ নিয়ে আমার কোনো শোক-তাপ নেই। তার বদলে আমি এই ভেবে আনন্দ পাই যে বিশ্ব এখন একটি নতুন ধরনের সমাজতন্ত্র পেয়েছে, নতুন ধরনের সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র পেয়েছে, যা অর্থনৈতিক দক্ষতা ও সমতার মিশ্রণ ঘটিয়েছে। সুনির্দিষ্ট পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে বৈষম্য কমিয়ে আনা অবশ্য খুবই কঠিন কাজ। এর জন্য সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের দরকার হয়। সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের দেশগুলোতে এসব প্রতিষ্ঠান থাকলেও উন্নয়নশীল দেশে খুবই দুর্লভ। এ কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত এমন নীতি প্রণয়ন করা, যার মাধ্যমে উৎপাদন প্রক্রিয়ার সময়ই অপেক্ষাকৃত বেশি সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। এটি করতে হলে যা দরকার: কর্মসংস্থানের ব্যাপক বৃদ্ধি, বেতন যাতে সব পর্যায়ে সন্তোষজনকভাবে বাড়ে সে জন্য উৎপাদনে প্রতিযোগিতা বাড়ানোয় উৎসাহ দেওয়া, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বেশি বেশি সুযোগ দেওয়া এবং দরিদ্রদের বৃত্তি দেওয়া বাড়ানো।অক্সফোর্ডের যে গবেষণার কথা আমি ওপরে উল্লেখ করেছি, তাতে দেখা গেছে যে সুনির্দিষ্ট পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে বৈষম্য অনেকখানি কমিয়ে সমতার সূচকে অনেক ওপরের দিকে গেছে দক্ষিণ কোরিয়া। পূর্ব এশিয়ার আদি বাঘ হিসেবে পরিচিত দেশগুলোকে অবশ্যই একইভাবে সমতা অর্জন করতে হবে। আমাদের মতো সমকালীন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথ খুঁজতে তাদের কাছ থেকে শিখতে হবে।
আজিজুর রহমান খান, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইডের অর্থনীতি বিভাগের ইমেরিটাস প্রফেসর

ত্রিপুরার নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি কী? by আলতাফ পারভেজ

ভারতের জাতীয় কংগ্রেস সম্পর্কে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একটা ধারণা রয়েছে যে দলটির সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও সমর্থক ভিত্তি সেক্যুলার ধাঁচের এবং বিজেপির হিন্দুত্ববাদের রাজনীতির বিপক্ষে-এটাই ভারতবাসীর (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারও) ভরসা। ভারতের প্রগতিশীল সমাজের একাংশ বরাবরই এই ধারণার বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করে থাকে। কিন্তু তাতে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে কংগ্রেসের ওই ইমেজের ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে সম্প্রতি ত্রিপুরার নির্বাচনী পরিসংখ্যান কংগ্রেসের উক্ত ঐতিহাসিক সেক্যুলার আবেদন ও ইমেজকে মোটা দাগে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যা দেশটিতে জাতীয়ভাবে কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিজেপিকে প্রতিরোধের লক্ষ্যে জোট গঠনের মরিয়া চেষ্টাকেও বড় মুশকিলে ফেলেছে। ছোট্ট ত্রিপুরার নির্বাচনী ফলের তাৎক্ষণিক ও বৃহৎ প্রতিক্রিয়া পড়েছে ভারতজুড়ে। তারই চুম্বক অংশটুকু এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।
দুই. অনেকেই জানেন, ভারতে সাধারণভাবে পাঁচ বছর পরপর রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হয়। ত্রিপুরায় ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ভোট পেয়েছিল প্রদত্ত ভোটের ৩৭ শতাংশ (৮ লাখ ৪ হাজার)। ২০০৮ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ভোট পায় প্রদত্ত ভোটের ৩৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ (৬ লাখ ৮৪ হাজার)। এ দুই নির্বাচনী ফল থেকে এটা স্পষ্ট, ত্রিপুরায় কংগ্রেসের মোটামুটিভাবে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ভোট ভিত্তি রয়েছে। কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছে প্রদত্ত ভোটের ১ দশমিক ৮ শতাংশ মাত্র (৪১ হাজার ভোট)। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ রাতারাতি এই রাজ্যে কংগ্রেসের ভোটব্যাংক কোথায় উধাও হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের যেতে হবে বিজেপির ভোটের পরিসংখ্যানে।
তিন. যদিও ত্রিপুরায় ২০১৮-এর আগে হিন্দুত্ববাদী বিজেপির কোনো প্রার্থী কখনো জেতেননি, কিন্তু বহুকাল ধরেই তারা সেখানে নির্বাচন করে যাচ্ছে। ২০০৮-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মনোনীত প্রার্থীরা পান প্রদত্ত ভোটের ১ দশমিক ৪৯ শতাংশ (২৮ হাজার ভোট)। ২০১৩ সালের নির্বাচনে একই দল পায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ ভোট (৩৩ হাজার ৮০৮)। অর্থাৎ, রাজ্যে দলটির ভোটব্যাংক ১ লাখের নিচে ছিল বরাবর। কিন্তু ২০১৮ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে তারা পেল প্রায় ৪৩ শতাংশ ভোট (১০ লাখ) ! অর্থাৎ বিজেপির ভোট যখন ত্রিপুরায় ১ লাখ থেকে ১০ লাখে উঠছে (এর মধ্যে কিছু ভোট রয়েছে আদিবাসীদের), ঠিক তখনই কংগ্রেসের ভোট ৭-৮ লাখ থেকে ৪১ হাজারে নেমে আসছে। এ দুই দলের ভোটের এই অবিশ্বাস্য উত্থান-পতনের রহস্যটি অনুমান করা কঠিন নয়। তবে পাঠককে সেই অনুমানে সাহায্য করার জন্য আমরা পরিসংখ্যানের আরও নিবিড় চিত্র বিশ্লেষণে যাব, যাতে উল্লিখিত রহস্যটি একেবারেই রহস্যমুক্ত হয়ে যাবে।
চার. ত্রিপুরায় এবার যে ৫৯টি বিধানসভা আসনে ভোট হয়েছে, তার একটি হলো পশ্চিম ত্রিপুরা জেলার বামুতিয়া আসন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসনে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী) বা সিপিএমের প্রার্থী ছিলেন হরিচরণ সরকার। তিনি ভোট পান ১৭ হাজার ৩২৪। আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের প্রকাশ চরণ দাস ভোট পান ১৪ হাজার ৯৪৪। সিপিএম প্রার্থী জেতেন ২ হাজার ৪০০ ভোটে। একই আসনে ২০১৩ সালের ভোটে সিপিএম প্রার্থী ছিলেন যথারীতি হরিচরণ আর কংগ্রেসেরও প্রার্থী ছিলেন যথারীতি প্রকাশ চরণ। এবারও হরিচরণ জেতেন। তিনি ভোট পান ১৯ হাজার ৭৪৪। আর কংগ্রেসের প্রকাশ চরণ পান ১৬ হাজার ৯৯৪। লক্ষণীয় হচ্ছে কংগ্রেসের যে নির্দিষ্ট দৃঢ় ভোটব্যাংক রয়েছে তা স্পষ্ট। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনে দেখা যায়, সিপিএমের হরিচরণ দাসের ১৯ হাজার ৪২ ভোটের বিপরীতে কংগ্রেসের স্বপনানন্দ দাস পেয়েছেন মাত্র ৪০২ ভোট। কিন্তু বিজেপির কৃষ্ণচন্দ্র দাস পেয়েছেন ২০ হাজার ১৪ ভোট। অবিশ্বাস্য এক ব্যাপার। অর্থাৎ সিপিএমের ভোটব্যাংক এই আসনে অক্ষুণ্নই ছিল। কেবল কংগ্রেসের ভোটগুলো প্রায় পুরোটাই গিয়ে বিজেপির মার্কায় পড়েছে। বামুতিয়ার কেস স্টাডিটি আমরা দৈবচয়ন আকারেই নিয়েছিলাম এবং বামুতিয়ার এই চিত্র ত্রিপুরার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না এবার। আগরতলার খয়েরপুর আসনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিচ্ছি। সেখানে এবার বিজেপির রতন চক্রবর্তী পেয়েছেন ২৫ হাজার ৪৯৬ ভোট (প্রদত্ত ভোটের ৫৭ শতাংশ)। কংগ্রেসের সুখময় সাহা পেয়েছেন ৪৮২ ভোট (প্রদত্ত ভোটের ১ শতাংশ!)। আর সিপিএম পেয়েছে ১৮ হাজার ৪৫৭ ভোট (প্রদত্ত ভোটের ৪১ শতাংশ)। এই একই আসনে গত নির্বাচনে কংগ্রেস ভোট পেয়েছিল ১৯ হাজার ৬৭৫ এবং বিজেপি পেয়েছিল ৬৯৮ ভোট। লক্ষণীয়, সিপিএমের ভোট প্রায় অপরিবর্তিতই আছে (২০ হাজার ৯৭২)। কিন্তু কংগ্রেসের পুরো ভোট বিজেপির দিকে গেছে।
পাঁচ.ত্রিপুরার নির্বাচনী এসব পরিসংখ্যানের পুরোটাই নেওয়া হয়েছে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের ডেটা ব্যাংক থেকে। এসব পরিসংখ্যান স্পষ্ট সাক্ষী দিচ্ছে, ত্রিপুরায় বিজেপির বিজয়ের মূল ভিত্তি গড়ে দিয়েছে কংগ্রেস। অথচ জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস নিজেকে যেকোনো মূল্যে হিন্দুত্ববাদ ও মৌলবাদবিরোধী সংগ্রামের চ্যাম্পিয়ন শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে বদ্ধপরিকর। আর কংগ্রেসের এই চেষ্টার পরিণতিতে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতেও তার রয়েছে ভিন্ন এক ভাবমূর্তি। কিন্তু ত্রিপুরার নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের কংগ্রেস সমর্থকদের মৌলবাদ ও হিন্দুত্ববাদবিরোধী অঙ্গীকারের আদর্শিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। পাশাপাশি উপরিউক্ত পরিসংখ্যান এ-ও বলছে, ভারতীয় প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো যেভাবে প্রচার করছে যে কর্মসংস্থান সংকটের কারণে দলে দলে সিপিএম-সমর্থক তরুণেরা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে, তা-ও মূল সত্যকে আড়াল করছে। সিপিএম এবারের এই ভূমিধসেও যে আসনগুলো রক্ষা করতে পেরেছে, সবগুলো প্রান্তিক গরিব এলাকা নিয়ে গঠিত নির্বাচনী আসন। এ ছাড়া প্রদত্ত ভোটে সিপিএমের গড় হিস্যা মাত্র ৪ শতাংশ কমেছে এবং ওপরে বামুতিয়া ও খয়েরপুরের যে কেস স্টাডি তুলে ধরা হয়েছে, তাতে সিপিএমের ভোট পূর্বের তুলনায় প্রায় অপরিবর্তিত থাকতেই দেখা গেছে।
পুনশ্চ
ত্রিপুরায় কংগ্রেসের এই আত্মসমর্পণ বা রহস্যময় ভূমিকা ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস-সিপিএম জোট গঠনের সম্ভাবনা এ কারণেও দুরূহ করে তুলবে যে ত্রিপুরা-সিপিএম নেতা মানিক সরকার হলেন দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাতের এই অবস্থানের একজন দৃঢ় সমর্থক যে বিজেপির মতোই কংগ্রেসকেও একইভাবে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। স্বভাবত কংগ্রেস সিপিএমকে যেভাবে হারিয়েছে, তা মানিক সরকার-প্রকাশ কারাত জোটকে ক্রুদ্ধ করেছে।
আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক

বুদ্ধিজীবীরা কখন অবান্তর হয়ে যান? by সোহরাব হাসান

অগ্রজ লেখক-সাংবাদিক আবুল মোমেন ৩ মার্চ প্রথম আলোর লেখায় একটি জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন। যখন বাংলাদেশে ক্ষমতা নিয়ে কেউ কথা বলতেই সাহস পান না, তখন তিনি ‘ক্ষমতাধর শাসক ও নাগরিক সমাজের’ মধ্যকার টানাপোড়েন এবং কার কী করণীয়, সে সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। এ জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। তবে লেখার শুরুতে আবুল মোমেন চীন ও রাশিয়ার যে উদাহরণ টেনেছেন সেটি কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ আছে।
কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে ভিন্ন দল ও মতের কোনো সুযোগ ছিল না। পুতিনের বর্তমান রাশিয়ায় বহুদলীয় ব্যবস্থা চালু থাকলেও কাজকর্মে তাঁর বিরোধিতা কতটা সম্ভব, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। পুতিন দুই দফা প্রেসিডেন্ট থাকার পর এক দফা প্রধানমন্ত্রিত্ব করে ফের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন আছেন। বিপ্লবোত্তর চীন যেমন সোভিয়েত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল; সি চিন পিংয়ের চীনও সম্ভবত পুতিনকে মডেল হিসেবে বেছে নিতে চাইছে। চীন বা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ববাদী শাসন আর বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে গণতন্ত্রই ছিল অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী জনগণের রায় বানচাল করার কারণেই যে বাংলাদেশ আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, সে কথা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেই স্বীকৃত। অতএব, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু কর্তৃত্ববাদী শাসন জারি করলেই বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে যেত, তা মনে করার কারণ নেই। বরং শুরু থেকে গণতন্ত্র ঠিকমতো কাজ করলে ইতিহাসের দুর্ঘটনাগুলো হয়তো এড়ানো যেত। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের আলাপচারিতা স্মরণ করা যেতে পারে। আবদুর রাজ্জাক শক্তিশালী বিরোধী দলের তাগিদ দিয়েছিলেন। (সূত্র: যদ্যপি আমার গুরু, আহমদ ছফা) আবুল মোমেন উল্লেখ করেছেন, ভারতে জওহর লাল নেহরু একটানা ১৭ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থেকে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি ঠিক করে যেতে পেরেছিলেন। এটি যেমন সত্য, তেমনি অসত্য নয় তিনি দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী থাকলেও কর্তৃত্ববাদী শাসন চাপিয়ে দেননি। বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু রেখেছিলেন। আমরা সেটি পারিনি। এ জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা, না বিরোধী দলের হঠকারিতা বেশি দায়ী, সে নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসকে বদলানো যাবে না। আবুল মোমেন লিখেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাদের (নাগরিক সমাজ) অন্তর্জ্বালা ও হতাশার শেষ নেই। এর আগেও একাধিক লেখায় তিনি নাগরিক সমাজের ভূমিকা সম্পর্কে সজাগ করার চেষ্টা করেছেন। ধারণা করি, আরও অনেকের মতো নাগরিক সমাজের একজন হিসেবে তিনিও অন্তর্জ্বালা ও হতাশা থেকে মুক্ত নন। কারণ, তাঁর ভাষায়, ‘বড় অংশই (নাগরিক সমাজের) ব্যক্তিগত সুযোগ গ্রহণে আর বাক্সর্বস্ব নিষ্ক্রিয় আলোচনার পণ্ডশ্রমে জড়িয়ে পড়েছে।’ পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিক সমাজের একটি আলাদা অবস্থান থাকে। তারা কোনোভাবেই ক্ষমতাকাঠামোর অংশ নয়। কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানো বা ক্ষমতা থেকে নামানো নাগরিক সমাজের কাজ নয়। তারা কথা বলবে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের অধিকারসহ কতগুলো নীতিগত বিষয়ে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা যুদ্ধাপরাধের বিচারের বিষয়টিও দেখতে হবে এই আলোকে। এখানে কোনো একটি বাদ দিয়ে অপরটি আঁকড়ে ধরার সুযোগ আছে বলে মনে করি না। আবুল মোমেনের বক্তব্যের প্রতি সহমত পোষণ করে বলতে চাই, যাঁরা সরকারের কাছ থেকে ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নেন, তাঁরা কোনোভাবে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হতে পারেন না। নুন খাওয়ার গুণ তাঁদের গাইতেই হয়। কিন্তু এর বাইরেও তো লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিক্ষাবিদ-সাংবাদিক-আইনজীবীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ আছেন, যাঁরা স্বাধীনভাবে চিন্তা করেন এবং দেশের মঙ্গল চান। মনে রাখতে হবে, ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী লড়াইয়েও ছাত্রসমাজের পাশাপাশি তাদের উদ্যোগেই গড়ে উঠেছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জাতীয় কবিতা পরিষদসহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন। সে সময় ৩১ বুদ্ধিজীবীর বিবৃতি ও তাঁদের সাহসী ভূমিকা স্বৈরাচারের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের আমলে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘুদের ওপর যে সংঘবদ্ধ আক্রমণ হয়েছিল, তার বিরুদ্ধেও নাগরিক সমাজ প্রথম মাঠে নামে। তাহলে এখন কেন সেই নাগরিক সমাজ আজ ‘বাক্সর্বস্ব নিষ্ক্রিয় আলোচনার পণ্ডশ্রমে জড়িয়ে পড়েছে’? সাধারণভাবে অভিযোগ আছে যে বিএনপি আমলে রাষ্ট্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজ যতটা সোচ্চার, আওয়ামী লীগ আমলে ততটাই নমনীয় থাকে। এর পেছনে হয়তো এই বিশ্বাস কাজ করে যে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দলকে’ ক্ষমতায় রাখতে হবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে আমরা কী বুঝি? গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ কিংবা ভয়ভীতিতে রাখা, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা কোনোভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হতে পারে না। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, অপহরণ, দলীয় মাস্তানিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হতে পারে না। আবুল মোমেন বলেছেন, বিএনপির বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি দুর্বলতা দেখানোয় নাগরিক সমাজ দলটিকে আওয়ামী লীগের বিকল্প শক্তি হিসেবে ভাবতে পারছে না এবং সেটাই আওয়ামী লীগকে অধিকতর কর্তৃত্ববাদী করেছে। কিন্তু যে নাগরিক সমাজ আওয়ামী লীগকে একমাত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মেনে নিয়েছে, তার প্রতি সরকারের আচরণ কতটা সহিষ্ণু? আওয়ামী লীগ বুদ্ধিজীবী তথা নাগরিক সমাজের স্বাতন্ত্র্য অবস্থান ততটুকুই চায়, যতটুকু তার জন্য সহায়ক হবে। ২০১৩ সালের গণজাগরণ মঞ্চের বিকাশ ও পরবর্তীকালে বিলয় এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। গণজাগরণ মঞ্চ ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ও ব্যতিক্রমী নাগরিক আন্দোলন। এই আন্দোলনের উদ্যোক্তারা কেউ ক্ষমতার হিস্যা চাননি।
যুদ্ধাপরাধের বিচার ও মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশ পরিচালনার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তাঁরা মাঠে নেমেছিলেন। সরকার প্রথমটি বাস্তবায়ন করলেও দ্বিতীয়টির বিষয়ে দেশবাসী তাদের উল্টোযাত্রা প্রত্যক্ষ করেছে। হেফাজতে ইসলাম নামে যে মৌলবাদী সংগঠনটি ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকা শহরে ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়েছিল, সেই হেফাজতের দাবি মেনে তারা ২০১৭ সালে পাঠ্যবইয়ে অদলবদল করেছে। এর বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের মৃদু প্রতিবাদ হলেও সরকার সেসব আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। এখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার চেয়ে ভোটের হিসাব-নিকাশ অগ্রাধিকার পেয়েছে। আবুল মোমেন বলার চেষ্টা করেছেন, নাগরিক সমাজের বড় অংশের সুবিধাবাদিতা ও নিষ্ক্রিয়তার কারণে সরকার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে। তাহলে কি সরকার প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখিয়ে নাগরিক সমাজের মুখ বন্ধ করতে চাইছে? যাঁরা প্রলোভনে তুষ্ট হবেন, তাঁদের সুবিধা দেওয়া আর যাঁরা প্রলোভনে তুষ্ট হবেন না, তাঁদের ভয়ভীতি দেখিয়ে খামোশ করা হবে। এই নীতি দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে? আবুল মোমেন স্বাধীন বুদ্ধিজীবীর অস্তিত্ব ও ভূমিকা প্রায় অবান্তর হয়ে যাচ্ছে বলে আফসোস করেছেন। কিন্তু উত্তরণের উপায় কী, তা বলেননি। যখন একটি দেশের সরকার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়, শিক্ষাঙ্গন থেকে শেয়ারবাজার, গণমাধ্যম থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে, তখন বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা পালন মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছে, যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি দিয়েছে, অর্থনীতির অগ্রযাত্রা ধরে রেখেছে। নাগরিক সমাজ এসব কাজের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছে। কিন্তু যখন তারা দেখছে দলীয় মাস্তানি বেড়েছে, ঘুষ-দুর্নীতি অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়েছে, মানুষের ভোটাধিকার খর্ব হচ্ছে, তখন তো নিশ্চুপ থাকতে পারে না। নাগরিক সমাজের দায়িত্ব চোখ-কান খোলা রেখে সবকিছু দেখা এবং যা গণতন্ত্র ও বৃহত্তর জনগণের জন্য কল্যাণকর, তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেওয়া। ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ও তার জন্মের ইতিহাস ও নায়কদের অস্বীকার করতে পারবে না’ বলেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা তথা গণতন্ত্রে ফিরে যেতে হবে; কর্তৃত্ববাদী শাসনে নয়। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের হাজারটা দুর্বলতা আছে। তাদের মধ্যে সুবিধাবাদিতাও কম নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী শাসনের দায় তাদের ওপর চাপানো বোধ করি ঠিক হবে না।
সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan 55 @gmail. com

দুর্নীতি নেবে গো, দুর্নীতি! by মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

ভদ্রলোকের বয়স ষাট-একষট্টি বছর। দু’বছর আগে সরকারি চাকরি থেকে রিটায়ার করেছেন। তার সঙ্গে আমার প্রায় ১২-১৪ বছরের পরিচয়। তার জ্ঞানগর্ভ কথা আমাকে মুগ্ধ করে। আরও মুগ্ধ করে তার রাজনৈতিক দর্শন। তিনি কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব না হয়েও চমৎকার রাজনৈতিক দর্শনের প্রবক্তা। একবার বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে অন্য একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের তুলনা করায় ১০-১২ জন মানুষের সামনে তিনি স্পষ্ট উচ্চারণে বলেছিলেন, ‘আপনারা কেন যে এভাবে তুলনা করেন। শেখ হাসিনা পারিবারিকভাবে যে রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অধিকারী, তার সঙ্গে অমুকের তুলনা চলে না। তিনি তার জায়গায়, আর শেখ হাসিনা তার জায়গায়।’ সেদিন ভদ্রলোককে আরও ভালো লেগেছিল। কারণ তিনি কাউকে খাটো না করেই শেখ হাসিনাকে আলাদা মর্যাদায় সমাসীন করেছিলেন। সেই তিনিই কয়েকদিন আগে বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে কিছু কথা বললেন। কারণ, তারই এক বন্ধু তার সারা জীবনের সঞ্চিত পেনশনের মোট ৭০ লাখ টাকা থেকে গত বছর ৫০ লাখ টাকা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন, যার মূল্যমান এখন ৩০ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভদ্রলোকের ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ, বন্ধুটি তার কথাতেই পুঁজিবাজারে নেমেছিলেন। ভদ্রলোক তার বন্ধুকে বলেছিলেন, ‘আমাদের পুঁজিবাজার খুবই সম্ভাবনাময়। সঠিক পথে চলতে ও চালাতে পারলে এর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে।’ তিনি নিজেও পুঁজিবাজারে একজন বিনিয়োগকারী। এ বিষয়ে তিনি প্রায়ই আমেরিকার ধনকুবের ওয়ারেন বাফেটের উপমা টানতেন। ওয়ারেন বাফেট নাকি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমেই প্রথম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। তাই তার জীবনী তিনি প্রায়ই আমাদের শোনাতেন। এ ছাড়া আরও বলতেন, আমাদের এ বয়সে টাকা থাকলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করাই ভালো। কারণ এখন ব্যবসা শুরু করা সম্ভব নয়। সে বয়স নেই। আর ব্যাংকে টাকা ফেলে রাখারও পক্ষপাতী নন তিনি। তার চেয়ে দেখে-শুনে-বুঝে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকেই তিনি উৎসাহিত করতেন। বলতেন, ৫০-৬০ লাখ থেকে শুরু করে ৫০-৬০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগেও কোনো কারখানা-ফ্যাক্টরি লাগে না, গুদামঘর লাগে না। আর তার কথাতেই তার বন্ধুর ৫০ লাখ টাকা এখন ৩০ লাখে পরিণত হয়েছে। অথচ তার বন্ধুটি ভালো ভালো কোম্পানি, যেসব কোম্পানির পিই রেশিও, এনএভি, ইপিএস ভালো এবং উদ্যোক্তারাও ভালো, সেসব দেখেই শেয়ার ক্রয় করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে সেসব কোম্পানিই বেশি করে দর হারিয়েছে। অন্যদিকে বাজে-খারাপ কোম্পানি যারা কোনোদিনই ডিভিডেন্ড দেয় না, পিই রেশিও রেকর্ডযোগ্য নয়, অর্থাৎ পিই নেই, এক বছরে সেসব কোম্পানির ৩-৪শ’ পার্সেন্ট মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে! এ অবস্থায় ভদ্রলোক ক্ষিপ্ত হয়ে এসবের কারণ হিসেবে ডিএসই, এসইসি,
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ অর্থ মন্ত্রণালয়কে তুলাধোনা করলেন। খারাপ ও বাজে কোম্পানির দরবৃদ্ধির জন্য তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে বললেন, ‘ওইসব সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবের নামে তারা বিও অ্যাকাউন্ট খুলে তাদের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে কারসাজি করেন। আর ভালো কোম্পানিতে কারসাজির সুযোগ না থাকায় তারা এ ক্ষেত্রে খারাপ কোম্পানিকে বেছে নেন। ছোট ছোট এসব কোম্পানির শেয়ারমূল্যকে প্রভাবিত করে তারা এসব করে থাকেন। এ ছাড়া ডিএসই, এসইসির আরও অনেক দুর্নীতির কথা তিনি জানালেন। ডিএসইর কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রসঙ্গ টেনে বললেন, সেখানেও চীন ও ভারতের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। এ ক্ষেত্রে তারা কে কোনভাবে লাভবান হবে, ডিএসই ও এসইসির কর্তাব্যক্তিরা কতটা সুবিধা পাবেন সেই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অন্যথায় ডিএসইর প্রস্তাবনাকে চ্যালেঞ্জ করে এসইসি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি না করে একটি মিটিংয়ের মাধ্যমে তা ফয়সালা করতে পারত। কিন্তু তা না করে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করায় বিষয়টি যাতে সহজে ফয়সালা না হয় এবং ভারত ও চীন উভয়েই যাতে তাদের তোষামোদি করে তজ্জন্য বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। মোটকথা, ডিএসই ও এসইসির কর্তাব্যক্তিরাও দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় আছেন! ফলে দেশের পুঁজিবাজার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। উপরোক্ত দুটি প্রতিষ্ঠানে সৎ, যোগ্য ও দক্ষ লোকের অভাব আছে। পুঁজিবাজার ধ্বংসের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং অর্থমন্ত্রীকেও তিনি দোষারোপ করলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এডিআর কমানোর ফলে পুঁজিবাজারে ধস নেমেছে, এই তার অভিযোগ। বেসিক ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ইত্যাদি ব্যাংকে যেসব তুঘলকি কাণ্ড চলছে- এত বড় দুর্নীতি বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনও হয়নি বলেও তিনি জানালেন। আমি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষে-বিপক্ষে লিখব বলে কলম ধরিনি। দেশে দুর্নীতি নিয়ে যেসব আলোচনা-সমালোচনা চলছে সে বিষয়ে সরকারের অবিমৃষ্যকারিতার কারণেই যে এ বিষম সর্বনাশ ঘটে চলেছে তার ওপর কিছুটা আলোকপাত করাই আজকের লেখাটির উদ্দেশ্য। স্থানাভাবে এ বিষয়ে আরও কিছু ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েই লেখাটি শেষ করব।
২.রাস্তাঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট-ফ্লাইওভারসহ অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দুর্নীতি নিয়ে দেশের মানুষকে অধিকতর সোচ্চার দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রায় প্রতিটি বড় প্রকল্পেই নির্মাণ সময়ের মধ্যে থেমে থেমে নির্মাণ ব্যয় দুই-তিন গুণ বাড়িয়ে নেয়ার প্রবণতাকে জনগণ খুব খারাপ দৃষ্টিতে দেখছেন। কোনো কোনো রাস্তাঘাট নির্মাণের ছয় মাস-বছরের মধ্যেই তা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, সেসব নিয়েও প্রচুর কথাবার্তা হচ্ছে। দেড়-দুই বছর আগে সাভার-আশুলিয়া ইপিজেড হয়ে চন্দ্রা পর্যন্ত নির্মিত চার লেনের রাস্তাটির বিভিন্ন জায়গায় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। বিটুমিন উঠে অনেক স্থানেই গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় সেসব স্থান যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অথচ সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওই রাস্তাটি নির্মাণের সময় নিজে দাঁড়িয়ে থেকে মাঝে-মধ্যে তদারক করেছেন। কিন্তু সেখানেও নির্মাণকাজে ফাঁকি দেয়া হয়েছে। নিুমানের মালামাল ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ দুর্নীতি করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, স্বয়ং মন্ত্রী সাহেবও সে দুর্নীতি রুখতে পারেননি। এটি একটি উদাহরণ মাত্র। রাস্তাঘাট নির্মাণের ক্ষেত্রে এমন দুর্নীতি সারা দেশেই হয়েছে এবং হচ্ছে। ব্যয় বরাদ্দের অর্ধেক টাকারও কাজ হচ্ছে না! সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, এলজিইডি ইত্যাদি বিভাগে দুর্নীতির পরিমাণ আরও বেশি। অতি সম্প্রতি পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, ‘২১টি প্রকল্পে ৪৬৫ কোটি টাকা ব্যয় হলেও এখন পর্যন্ত কাজ কিছুই হয়নি।’ দাবিটি অবশ্য পত্রিকার নয়। এ দাবি করেছেন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। এ অবস্থায় দুর্নীতির ব্যারোমিটার কোথায় ঠেকেছে সে বিষয়টি সরকার ভেবে দেখতে পার ে।
৩. ব্যাংক জালিয়াতি এবং ব্যাংক ডাকাতির বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকের লোক দেখলেই মানুষ তাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন। সেদিন হাঁটার সময় একজন বড় ব্যবসায়ী একটি ব্যাংকের এমডিকে দেখিয়ে বললেন, গত বছর এই এমডি সাহেব তার কাছ থেকে একটি গাড়ি ঘুষ নিয়েছেন! হাঁটার দলে আমরা যে ক’জন ছিলাম, তাদেরই একজন বলে বসলেন, ‘আস্ত একটা গাড়ি গিলে ফেলল, বাপরে, কত্তো বড় পেট!’ অথচ এসব ব্যাংকেই সাধারণ মধ্যবিত্ত-নিুবিত্তের মানুষকে সামান্য কারণে নাজেহাল করা হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধার মাসিক সম্মানীবাবদ ১০ হাজার টাকা সোনালী ব্যাংকে জমা হলে সেখান থেকে তিনি ১০ হাজার তো দূরে থাক, সাড়ে ৯ হাজার টাকাও তুলতে পারেন না। তাকে সেখানে ১ হাজার টাকা ফেলে রেখে ৯ হাজার টাকা তুলতে হয়। কারণ সোনালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নির্দেশ জারি করেছে, কমপক্ষে ১ হাজার টাকা লিয়েনে রাখতে হবে। সোনালী ব্যাংকের এই তামাশা বাংলাদেশ ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয় জানে কিনা, তা আমরা বলতে পারব না। ৫ টাকা বা ৫০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার অনুমতি দিয়ে ১ হাজার টাকা লিয়েনে রাখার তামাশা করার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকই ভালো বলতে পারবে। কিন্তু দুঃখের কথা হল, হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে একজন গরিব মানুষকে ১ হাজার টাকা লিয়েনে রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে। আবার একজন গৃহিণী একটি ব্যাংকে ৬৫ হাজার টাকার চেক পাঠালে ব্যাংকে তার স্থিতি থাকা সত্ত্বেও, স্বাক্ষর মেলা সত্ত্বেও টেলিফোন করা হচ্ছে এবং সেই টেলিফোন তার স্বামী রিসিভ করে, যিনি হিসাবটির নমিনিও বটে, তিনি সবকিছু বলা সত্ত্বেও ওই গৃহিণীকে ডেকে তার হাতে টেলিফোন দিয়ে বলানোর পর সেই টাকা প্রদান করা হয়েছে। প্রশ্ন হল, তাহলে ব্যাংকে এত বেশি জাল-জোচ্চুরি-লুটপাট কেন? একজন ম্যানেজার নগদ টাকা ঘুষ পেলে, একজন এমডি গাড়ি পেলে যেখানে ব্যাংকের ভল্ট খুলে দেয়া হচ্ছে, পক্ষান্তরে একজন মুক্তিযোদ্ধার ১০ হাজার টাকার ক্ষেত্রে, একজন গৃহিণীর ৬৫ হাজার টাকার ক্ষেত্রে নিত্যনতুন ফরমান দেখানোর কারণ কী? ব্যাংকের দুর্নীতি কত প্রকার ও কী কী তা কি আরও উদাহরণসহ বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন আছে? স্থানাভাবে আর বেশি কিছু না বলে উপসংহারে যা বলতে চাই তা হল- বর্তমান সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এ দুই আমলের দুর্নীতি নিয়েই সাধারণ মানুষ চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছেন। আগেই বলেছি, দুর্নীতির বিষয়টি এখন টক অব দ্য কান্ট্রি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা একটি নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। সবার মুখে এখন একই আলোচনা- দুর্নীতি, দুর্নীতি, দুর্নীতি! তাই দেশের বড় দুটি দলের জন্য এসব আলোচনা-সমালোচনা একটি অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ জনগণ দুটি দলকেই দুর্নীতিবাজ বলছেন। কথাটি হয়তো সরকারি দলের কানে ঢুকছে না, এই যা! কারণ এ দেশে সরকার বলতে হচ্ছেন সরকারপ্রধান এবং দল বলতে হচ্ছেন দলীয়প্রধান! আর সরকারপ্রধান ও দলীয়প্রধানগণ সব সময়ই একশ্রেণীর খাস তোষামোদকারী দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকেন। তারা তাদের চারদিকে এমন বলয় তৈরি করে রাখেন যে আসল কথা যেন সরকারপ্রধান বা দলীয়প্রধান জানতে, শুনতে বা বুঝতে না পারেন। কারণ এতে করে ওইসব তোষামোদকারীর ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হয়ে যায়। তাই আমরা অনেকটাই নিশ্চিত যে কোনো সমালোচনাই সরকারপ্রধানের কাছে পৌঁছায় না। এমনকি এ লেখার বিষয়টিও পৌঁছাবে না। পৌঁছাবে শুধু স্তুতি। সামনে দেশে জাতীয় নির্বাচন। আর এ মুহূর্তে যা লক্ষ করা যাচ্ছে তাতে করে আবারও সেই রাজনীতি করে খাওয়া লোকজনকেই বড় দুটি দল জনগণের সামনে উপস্থাপিত করতে যাচ্ছে। দলীয় আদর্শ ও নীতির প্রতি অবিচল নিষ্ঠার নামাবলি গায়ে দেয়া ওইসব নেতাই আবার ভোট চাইতে মাঠে নামছেন। সারা দেশের দুর্নীতি যাদের দ্বারা বিন্দুমাত্র কমেনি, নতুন করে তারাই জনগণের সামনে উপস্থিত হতে যাচ্ছেন। দারুণভাবে দলীয় কর্মকাণ্ডে জড়িত, দারুণভাবে দলীয় নেতা-নেত্রীর ভক্ত, আবার একই সঙ্গে আরও দারুণভাবে ঘুষ-দুর্নীতি, চুরি-চামারির সঙ্গে সম্পৃক্ত- রাজনীতি করে খাওয়া ওইসব ব্যক্তিই আবার জনগণের সামনে ভোট চাইতে যাবেন, এটাই বাস্তব সত্য। কারণ রাজনীতির মাঠ থেকে কামানো অর্থ তারা একা খান না। দলবাজি করে কামানো টাকার কিছুটা দলের উপরের দিকেও তারা বিলিবণ্টন করেন। তাই বড় দুটি দল আবারও ওইসব নেতাকে ঝাঁকায় তুলে জনগণের সামনে তাদের উপস্থিত করে বলবেন, ‘দুর্নীতি নেবেন গো, দুর্নীতি’। এ মুহূর্তে আপাতত সেটাই স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে। কারণ দেশের ভালো মানুষ, জ্ঞানী-গুণী-পরোপকারী মানুষ রাজনীতি থেকে নির্বাসিত। এ শ্রেণীর মানুষ ওই পথে পা বাড়ালে তাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়, ঠেঙিয়ে পা ভেঙে দেয়া হয়।
মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য শুধু কথার কথা নয় by ইকতেদার আহমেদ

পৃথিবীর প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র্রে বিচার বিভাগকে বলা হয় জনগণের শেষ ভরসাস্থল। বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের অন্যতম একটি। অপর দুটি হল আইন বিভাগ ও শাসন বিভাগ। উন্নত ও সমৃদ্ধ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ তিনটি বিভাগ পারস্পরিক আস্থা, বিশ্বাস ও সমঝোতার ভিত্তিতে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালন করে থাকে। বাংলাদেশের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল নামে অভিহিত। অ্যাটর্নি জেনারেল পদটি সাংবিধানিক। সাংবিধানিক অপরাপর পদের সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল পদের পার্থক্য হল- অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি শপথের অধীন নন এবং এ পদের নির্ধারিত কোনো মেয়াদ নেই।
সুপ্রিমকোর্টের বিচারক হওয়ার যোগ্য এমন কোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি অ্যাটর্নি জেনারেল পদে নিয়োগ দান করেন; তবে রাষ্ট্রপতিকে এ নিয়োগ কার্যটি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হয়। সুপ্রিমকোর্টের বিচারকরা নির্ধারিত বয়সে পৌঁছা অবধি কর্মে বহাল থাকলেও অ্যাটর্নি জেনারেলের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অ্যাটর্নি জেনারেল বাংলাদেশের সব আদালতে রাষ্ট্রের পক্ষে তার বক্তব্য প্রদানের অধিকার রাখেন। অ্যাটর্নি জেনারেল রাষ্ট্রপতির সন্তোষানুযায়ী তার পদে বহাল থাকেন। রাষ্ট্রপতির এ সন্তুষ্টটি সরকারের প্রধান নির্বাহীর আকাক্সক্ষার মধ্যে আবদ্ধ। সচরাচর দেখা যায়, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকারের পরিবর্তন ঘটলে অথবা অন্য কোনো কারণে সরকারের পরিবর্তন ঘটলে অ্যাটর্নি জেনারেল পদে ক্ষমতাসীন সরকার সবসময় স্বীয় মতাদর্শের ব্যক্তিকে নিয়োগদানে সচেষ্ট থাকে। সরকারের নীতির সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের আদালতে প্রদত্ত বক্তব্য সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে, যদিও তাকে বক্তব্য প্রদানকালীন সংবিধান ও আইন উভয়ের বিধিবিধান যেন কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ না হয় সে ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আদালতে কাজ করে বিধায় তার বক্তব্যের সঙ্গে ক্ষমতাসীন সরকারের বক্তব্যের পার্থক্য কদাচিৎ পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশের ২২তম প্রধান বিচারপতির শপথগ্রহণ-পরবর্তী অ্যাটর্নি জেনারেল স্বীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের উদ্দেশে বক্তব্য প্রদানকালে দেশের সর্বোচ্চ আদালতসংশ্লিষ্ট কিছু দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে আলোকপাত করেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন- ‘আমি মনে করি, উচ্চাদালতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভেতরে একটি বিরাট অংশ ইতিমধ্যে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ যে বিষয়টি, তা হল বিশেষ বিশেষ কিছু কোর্ট বিশেষ বিশেষ আইনজীবীর কোর্ট হয়ে গেছে। বিচারপ্রার্থী অনেকে জেনে গেছেন কোন্ কোর্টে কাকে নিয়ে গেলে মামলায় জেতা যাবে। এটা তো ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। অনেকেই ছুটছেন বিচারপতিদের সন্তান, স্ত্রীদের প্রতি, যারা আইনজীবী হিসেবে নিয়োজিত আছেন এ চিন্তা করে যে, এদের নিয়ে গেলে হয়তো মামলায় জেতা যাবে।’ তিনি আরও বলেন- ‘এমনও দেখা যায়, ৪ বছর আগে দায়ের করা মামলা লিস্টে বহাল তবিয়তে আছে, অথচ ২ মাস আগে দায়ের করা মামলার চূড়ান্ত শুনানি হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়াও আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারী মামলা নিচ থেকে উপরে উঠানোর কাজ করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। কিছু মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না। আবার কিছু মামলার শুনানি হয়ে যাচ্ছে রকেট গতিতে।’ আইনাঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও দেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে উচ্চাদালতের এ অবস্থা জাতির জন্য ভয়াবহ বিপদের বার্তাবহ। আর তা অনুধাবন করে শুধু কি ফাঁকা মুখে বললেই হল আমরা বীরের জাতি, আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছি? উচ্চ আদালতে যে কোনো ধরনের মামলা দায়ের, হলফনামা প্রদান, মামলার পক্ষগণের প্রতি নোটিশ প্রদান, মামলার রায় ও আদেশের অনুলিপি সংগ্রহ প্রভৃতি বিষয়ে নির্ধারিত ফি থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত ১০-১০০ গুণ অধিক অর্থ আদায় করে মামলাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দারুণভাবে হয়রানি ও ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবৎ এসব বিষয় নিয়ে মামলা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্ষোভ প্রকাশ করে এলেও তাদের ক্ষোভ প্রশমনে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে খুব কমই যথাযথ ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ২০১১ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সেবা খাতের দুর্নীতিবিষয়ক তাদের প্রতিবেদনে বিচার বিভাগকে শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে অভিহিত করে। প্রতিবেদনটি প্রকাশ-পরবর্তী সময়ে সুপ্রিমকোর্টের পক্ষ থেকে কী ধরনের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হল তা জানতে চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালককে সুপ্রিমকোর্টে তলব করলে তারা তাদের প্রতিবেদনের পক্ষে তথ্য-উপাত্তসহ দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। টিআইবির অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদনটি যে সঠিক ছিল এ বিষয়ে আদালতের সব ধরনের সংশয় দূরীভূত হয়। উচ্চাদালতে কর্মরত বিচারকদের অনেকের স্ত্রী, কন্যা, কন্যা-জামাতা, পুত্র, পুত্রবধূ, ভ্রাতা তাদের বাসভবনে একসঙ্গে অবস্থান করে উচ্চাদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। দেশের ১৫তম প্রধান বিচারপতি মো. রুহুল আমিন পদে বহাল থাকাকালীন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে সুপ্রিমকোর্টের একটি ফুলকোর্ট সভায় কোনো কর্মরত বিচারক তাদের নিজ গৃহে তাদের সঙ্গে অবস্থান করে এমন স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ, কন্যা, কন্যা-জামাতা, ভ্রাতার সুপ্রিমকোর্টের আইন পেশায় নিয়োজিত থাকা নীতি-নৈতিকতাবহির্ভূত বিধায় এহেন কাজ থেকে বিরত থাকতে সবিশেষ অনুরোধ করেন। তার সে অনুরোধ যে উপেক্ষিত হয়েছে তা অ্যাটর্নি জেনারেলের এ বিষয়ে সাম্প্রতিক প্রদত্ত বক্তব্য থেকে স্পষ্ট প্রতিভাত। বিগত দিনে বিচার বিভাগ সম্পর্কে দু’জন সাবেক প্রধান বিচারপতি, একজন সাবেক আইনমন্ত্রী এবং একজন প্রথিতযশা আইনজ্ঞের বক্তব্য অ্যাটর্নি জেনারেলের সাম্প্রতিক প্রদত্ত বক্তব্যে যে হতাশা ও ক্ষোভের চিত্র ব্যক্ত হয়েছে তার চেয়ে ভিন্নতর কিছু নয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন বিচার বিভাগ সম্পর্কে তার এক মন্তব্যে বলেন- ‘এখন বিচার বিভাগ কাচের ঘর, এটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়বে।’ সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. রুহুল আমিন আইনজীবীদের উদ্দেশে বক্তব্য প্রদানকালীন বলেন- ‘বিচারক নিয়োগ নিয়ে বিগত বছরগুলোতে মহাপ্রলয় ঘটে গেছে।’ উচ্চাদালতের বিচারক নিয়োগ সম্পর্কে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগের সফল আইনমন্ত্রী সুপ্রিমকোর্টে কর্মরত অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু বলেন- ‘যাদের কেরানি হওয়ার যোগ্যতা নেই তাদের বিচারক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’ উচ্চাদালতের বিচারক সম্পর্কে দেশবরেণ্য আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের মন্তব্য- ‘এখন বিচারকরা মুখ দেখে রায় দেন।’
উপরোক্ত মন্তব্যসমূহে বিচার বিভাগ সম্পর্কে যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ব্যক্ত হয়েছে তা অ্যাটর্নি জেনারেলের এ বিষয়ে প্রদত্ত বক্তব্যের প্রায় এক দশকের অধিক সময় আগে করা হলেও দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সামগ্রিক চিত্রের উন্নীত না হয়ে যে অবনতি ঘটেছে এর সমর্থন তার সাম্প্রতিক প্রদত্ত বক্তব্যে খুঁজে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা নির্ধারণী আইনের অনুপস্থিতিতে ২০০১ সাল-পরবর্তী সময়ে অধিকাংশ নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা, জ্যেষ্ঠতা, সততা- এ চারটি বিষয়ের চেয়ে দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন অনেক ব্যক্তি বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর দলীয় আবরণ থেকে মুক্ত হয়ে নিরপেক্ষভাবে বিচার পরিচালনার জন্য স্বীয় শপথ দ্বারা বাধিত হলেও তাদের অনেকে যে সে আবরণ থেকে মুক্ত নন, এর ইঙ্গিত অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের ‘বিশেষ বিশেষ কিছু কোর্ট বিশেষ বিশেষ আইনজীবীর কোর্ট হয়ে গেছে’ এবং ‘কোন্ কোর্টে কাকে নিয়ে গেলে মামলায় জেতা যাবে’- এর মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। বিচার বিভাগ জনগণের শেষ ভরসাস্থল বিধায় একজন বিচারককে শুধু ন্যায়বিচার করলেই হবে না, ন্যায়বিচার দৃশ্যমানও হতে হবে। উচ্চাদালত বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের যে অনুযোগ ও অভিযোগ, তা অধস্তন আদালতের ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। উভয় আদালতে বিচারকার্য যাতে সঠিকভাবে পরিচালিত হয়ে দেশের মানুষ কাক্সিক্ষত মানের ন্যায়বিচার পায় এটি নিশ্চিতে সরকারের পাশাপাশি বিচারক ও আইনজীবী উভয়ের দায়িত্ব রয়েছে। বিচারক ও আইনজীবীরা নিজেদের সম্পূর্ণ দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্ত রাখলে অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি, সাবেক আইনমন্ত্রী ও প্রথিতযশা আইনজীবীর বক্তব্যে যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ব্যক্ত হয়েছে এর উত্তরণ ঘটবে। অতীতে অ্যাটর্নি জেনারেলের ন্যায় দেশের চারজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বিচার বিভাগ বিষয়ে রূপক অর্থে প্রায় সমরূপ বক্তব্য দিলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা লাঘবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়ে বরং তা ক্রমঅবনতির দিকে গেছে। আর তাই সময় থাকতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করে উপরোক্তদের বক্তব্যের অভিযোগ ও অনুযোগ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। বর্তমান প্রধান বিচারপতি দীর্ঘদিন তার পদে বহাল থাকবেন। অ্যাটর্নি জেনারেল তার অভিযোগ ও অনুযোগ বিষয়ে প্রধান বিচারপতিকে অবহিত করেছেন। বিচার বিভাগসংশ্লিষ্ট অনেকেই সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্ত; কিন্তু কতিপয়ের কারণে সামগ্রিকভাবে বিভাগটির মর্যাদা প্রশ্নের সম্মুখীন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ দুরূহ হলেও অসম্ভব নয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যকে শুধু কথার কথা না ভেবে তা অনুধাবন করে পরিস্থিতির উন্নয়নে সচেষ্ট হলে আশা করা যায় প্রতিকার ও প্রতিবিধান সুদূরপরাহত নয়।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
iktederahmed@yahoo.com

পাট নিয়ে পরস্পরবিরোধিতা

পাট আমাদের অন্যতম অর্থকরী ফসল। এ খাতের বিকাশ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। অথচ তা নিয়েই পরস্পরবিরোধী অবস্থান প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম। অর্থমন্ত্রী নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে বলেছেন, ‘লোকসান কমাতে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) একেবারে বন্ধ করে দেয়া উচিত। এদের কোনো কাজ নেই। প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজমেন্ট হরিলুটে জড়িত।’ অন্যদিকে পাট প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিগত সরকারগুলো বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে পাট খাত ধ্বংস করেছে আর বর্তমান সরকার এ খাত চাঙ্গা করার উদ্যোগ নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘বিজেএমসি যে লোকসান দেয় তা যৌক্তিক, কারণ এ খাতের সঙ্গে ৬০ হাজার শ্রমিক জড়িত, তাদের বেতন-ভাতা দিতে হয়।’ স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন দেশের প্রধান অর্থকরী পণ্য ছিল পাট। আর রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিজেএমসি ছিল দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী প্রধান প্রতিষ্ঠান। দেশব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল সংস্থাটির অধীনে থাকা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পাটকল। বর্তমানে সংস্থাটির আগের সেই অবস্থা আর নেই। বেশিরভাগ পাটকল ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সেসব পাটকলের অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে বিজেএমসির অধীনে রয়েছে ২৬টি মিল। এসব মিলেরও কোনো কোনোটির উৎপাদন বন্ধ থাকে মাঝেমধ্যে। সন্দেহ নেই, এর অন্যতম কারণ লোকসান। এটি সত্য, নানা কারণে বিজেএমসিকে লোকসান দিতে হচ্ছে। দুর্নীতি, মাথাভারি প্রশাসন, সরকার কর্তৃক সময়মতো পাট কেনার অর্থছাড় না দেয়া ইত্যাদি এর কিছু কারণ। কিন্তু তাই বলে সংস্থাটি বন্ধ করে দেয়া হলে সেটা হবে মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার শামিল। মনে রাখা দরকার, জনবলের দিক থেকে বিজেএমসি এখনও দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান। তাছাড়া সরকার যখন নতুন করে পাট খাতের উন্নয়নের কথা ভাবছে,
তখন বিজেএমসি নিয়ে এ ধরনের মনোভাব নেতিবাচক বার্তাই বহন করে। অর্থমন্ত্রী হয়তো বাজেটের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিজেএমসি বন্ধ করে দেয়ার কথা বলেছেন। কারণ সংস্থাটির জন্য দেয়া ভর্তুকি প্রতি বছর বাজেটের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে যাওয়া কাজের কথা নয়। তাই যা করা প্রয়োজন তা হল সংস্থাটির লোকসান কমিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ। এ উদ্যোগ নানাভাবেই নেয়া যায়। প্রথমত, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করা। দ্বিতীয়ত, পাটকলে পুরনো যন্ত্রপাতির বদলে নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন। তৃতীয়ত, ভরা মৌসুমে পাট কেনার অর্থছাড় করা। চতুর্থত, পাটের বহুমুখী পণ্য তৈরি করে নতুন বাজারের সন্ধান। সর্বোপরি, পাট ও পাটশিল্পের উন্নয়নে সময়োপযোগী নীতি নির্ধারণ। পাট খাতের রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। পাট পরিবেশবান্ধব পণ্য হওয়ায় বিশ্বে প্লাস্টিক পণ্যের বদলে পাটপণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধির সম্ভাবনা উজ্জ্বল। এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়ছে। পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বিজেএমসি। সংস্থাটিকে সেভাবে কাজে লাগাতে হবে। বিজেএমসি বন্ধ করে দিয়ে পাট খাতকে এগিয়ে নেয়া যাবে না, বরং এ প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করে আরও এগিয়ে নেয়ার উপায় খুঁজতে হবে।

ওরা জানে না নারী দিবসের তাৎপর্য

গতকাল সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, চা বাগানের নারীদের কাছে এই দিনটি বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে না। চা শ্রমিক নারীরা জানেনও না এ দিবসের কথা। অথচ দেশের চা শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন এই শ্রমিকরা। দেশের অন্যান্য শ্রমজীবী নারীদের তুলনায় চা বাগানের নারী শ্রমিকদের জীবনধারা ও কাজের ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। চৌকিদারের ডাকে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সাংসারিক সব কাজকর্ম করে ভোর ৪টার মধ্যে তাদের কাজে বেরিয়ে পড়তে হয়। স্থানভেদে ৪-৫ মাইল হেঁটে কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়। সাধারণত চা পাতা তোলা ও চা গাছ ছাঁটাই করা দুটি কাজই নারী শ্রমিকরা করে থাকেন, যা খুবই কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে বর্ষাকালে তাদেরকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। উঁচু উঁচু টিলা (ছোট পাহাড়) বেয়ে তাদের চা পাতা সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া যেহেতু চা গাছকে ঘিরে গভীর জঙ্গল বা আগাছা থাকে, তাই সেখানে বিষাক্ত পোকামাকড়, সাপ, বিচ্ছু, গজর (শুঁয়াপোকা), হাড়ি বরল (এক ধরনের বিষাক্ত মাছি যা চা গাছের ডালে মাটির হাঁড়ি বানিয়ে বাস করে), বিষাক্ত পিঁপড়া ইত্যাদির অবাধ বিচরণ। চা শ্রমিকরা এগুলোর কামড় খেতে খেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। তাই এগুলোকে বিষাক্ত বলে মনে করেন না। যা হোক, মাত্র ৮৫ টাকার বিনিময়ে সকাল ৪টা থেকে বিকাল ৫টা অবধি তাদের কাজ করতে হয়। এর মধ্যে তারা দুপুর ২টায় আধঘণ্টা সময় পান খাবারের জন্য। তখন বাড়ি থেকে আনা রুটি এবং এর সঙ্গে মরিচ, পিঁয়াজ, আলু ও কচি চা পাতা মিশিয়ে বিশেষ একধরনের চাটনি তৈরি করে দুপুরের খাবার সেরে ফেলেন। কেউবা চাল ভাজা ও লাল চা দিয়েই সাঙ্গ করেন দুপুরের খাবার। তারপর আবার কাজ শুরু করেন, যা চলতে থাকে বিকাল ৫টা অবধি। এরপর আবার বাড়ির কাজ করতে হয় এবং পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হয়।
এভাবেই শত কষ্টের মধ্যে কেটে যাচ্ছে তাদের জীবন। এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে এই পরিশ্রমী নারীরা এক বিরাট ভূমিকা পালন করছেন, অথচ তাদের ভাগ্যের উন্নতির জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী সমাজের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও নারী চা শ্রমিকের ভাগ্য উন্নয়নে কেউ এগিয়ে আসছে না। এমনকি নারী সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানেও এই নারীরা কোনো সেবা পাচ্ছেন না। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও উপেক্ষিত হচ্ছেন আমাদের নারী চা শ্রমিকরা। বিশ্বব্যাপী নারী সমাজের উন্নয়নে যেসব আইন-নীতি, উন্নয়ন-পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয় তাতে আমাদের নারী চা শ্রমিকরা স্থান পান না। নারী চা শ্রমিকদের উন্নয়নে কয়েকটি প্রস্তাব রাখতে চাই : ১. নারী দিবসে চা বাগানে ছুটি ঘোষণা করে এই দিনটি বিশেষভাবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। ২. চা শ্রমিক নারীদের উন্নয়নে কাজ করার জন্য উপজেলা ও জেলা মহিলা ও শিশুবিষয়ক অধিদফতর সর্বোপরি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে এগিয়ে আসতে হবে। ৩. জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১০সহ নারী সংশ্লিষ্ট সব আইন-নীতিতে চা-বাগানের নারীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ৪. নারীদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে। ৫.নারী চা শ্রমিকদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতিসহ উপযুক্ত মজুরি দিতে হবে।
মোহন রবিদাস : এমএসএস (লোক প্রশাসন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নারীর কিডনি রোগ



গতকাল যুগপৎ পালিত হয়েছে বিশ্ব নারী দিবস ও বিশ্ব কিডনি দিবস। এ দুই দিবসের একটি আন্তঃসম্পর্কও ধরা পড়েছে। সেটা হল, কিডনিসংক্রান্ত রোগে পুরুষের চেয়ে নারীরাই ভুগছে বেশি। নারীর ১৪ শতাংশের বিপরীতে কিডনি রোগে পুরুষের আক্রান্তের হার ১২ শতাংশ। একটি গবেষণায় দেখে গেছে, ক্রনিক কিডনি রোগ বিশ্বব্যাপী একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ সমস্যায় বিশ্বের ১ কোটি ৫০ লাখ নারী আক্রান্ত এবং প্রতি বছর এ রোগে মৃত্যু ঘটে থাকে ৬ লাখেরও বেশি। নারীদের ক্ষেত্রে কিডনি রোগের এটাই যখন বাস্তবতা, তখন এর চিকিৎসার সুযোগ কী অবস্থায় রয়েছে দেখা যেতে পারে। দেশে কিডনি রোগীর সংখ্যার তুলনায় ডায়ালাইসিস সেন্টার খুব কম, মাত্র ৯৬টি। ১৮ হাজার রোগী এসব সেন্টারে সপ্তাহে দু’বার সেবা পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে বেসরকারি সেন্টারগুলোয় ডায়ালাইসিস করাতে হলে সাড়ে তিন হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা গুনতে হয়। বলাবাহুল্য, এই টাকা বহন করা মধ্যবিত্তদের জন্যও কষ্টকর, নিম্নবিত্ত বা বিত্তহীনদের জন্য তা প্রায় অসম্ভব। একটা জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় মোট কিডনি রোগীর মাত্র ১৫ শতাংশ ডায়ালাইসিসের সুযোগ পেয়ে থাকে। আমাদের তাই বলতেই হচ্ছে, ডায়ালাইসিসের খরচ কমাতে হবে এবং তা সরকারি ও বেসরকারি উভয় উদ্যোগে। দ্বিতীয় কথা, কিডনি রোগ প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত করা সম্ভব হলে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে কিডনির বিকল হয়ে যাওয়া রোধ করা সম্ভব। কিন্তু সাধারণ মানুষের অধিকাংশই কিডনির অবস্থা ও এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করান না। এর কারণ দ্বিবিধ। স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব ও পরীক্ষাসংক্রান্ত খরচ। সাধারণ মানুষের এই স্বাস্থ্য অসচেতনতা দূর করতে হবে এবং একইসঙ্গে কিডনিসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচও কমাতে হবে। নারীদের ক্ষেত্রে কিডনি রোগের আধিক্যের কারণে এবার বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে- ‘কিডনি অ্যান্ড উইমেন হেলথ; ইনকুড, ভ্যালু, এমপাওয়ার’। অর্থাৎ নারীদের কিডনি রোগের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বস্তুত বাংলাদেশের বিশেষত গ্রামীণ নারীসমাজ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত থাকে। তারা কীভাবে কোন্ রোগ পুষে চলেছে, তা টেরও পায় না অনেক ক্ষেত্রে। এই ভাগ্যবিড়ম্বিত নারীদের চিকিৎসা, বিশেষত কিডনি রোগের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোর ভূমিকা এক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গ্রামীণ নারীরা পিছিয়ে রয়েছে আর্থিকভাবেও।

সাত মার্চ উদযাপন

বাঙালির মুক্তির সনদ, বাঙালি জাতির ম্যাগনাকার্টা, স্বাধীনতার ঘোষণা- বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতিকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে আসছে। একে অবলম্বন করে জুলুম, নির্যাতন-নিপীড়ন ও শোষণের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার মাধ্যমে এসেছে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। ফলে প্রতিবছর দিবসটি পালন করে আসছে সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক দল। তবে এবার সাত মার্চ উদযাপিত হয়েছে একেবারে ভিন্নভাবে। কারণ গত বছরের ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ভাষণটিকে বিশ্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। এর ফলে আমাদের স্বাধীনতার অনানুষ্ঠানিক ঘোষণাটি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তের নিপীড়িত জনগণের নৈতিক অধিকার, দাবি ও শোষণমুক্তির অন্যতম সনদ হিসেবে কাজ করবে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন দ্বিতীয় ভাষণের কোনো নজির আর নেই। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। আমি যদি হুকুম দেওয়ার নাও পারি, তোমাদের যার যা কিছু আছে, তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত থাকো। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ভাষণটির সবচেয়ে ক্যারিশম্যাটিক দিক হল, এতে বঙ্গবন্ধু এমন কৌশলের আশ্রয় নিলেন যে, এটি একদিকে স্বাধীনতার ঘোষণা হয়ে গেল, অন্যদিকে শর্তারোপের মাধ্যমে পাকিস্তানি শাসকদের ফাঁদে পা দেননি তিনি। বঙ্গবন্ধু যদি বলতেন ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’, তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত করে তাকে তখনই গ্রেফতার করা হতো। কিন্তু সেটি তিনি না করায় পরদিন আইএসআই রিপোর্ট করল ‘চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সঙ্গে বক্তৃতা করে গেল। একদিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করল, আরেকদিকে ৪টি শর্তারোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত হল না। আমাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।’
এখানেই সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের সার্থকতা। আমরা মনে করি, সাত মার্চের ভাষণ আরও আগেই বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেতে পারত। তবে দেরিতে হলেও এ স্বীকৃতি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রথমবারের মতো গতকাল রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করা হয়েছে ঐতিহাসিক সাত মার্চ দিবস। তরুণ প্রজন্মকে স্বাধীনতার সত্যিকারের ইতিহাস ও পথপরিক্রমা সম্পর্কে জানানোর জন্য এ ধরনের উদ্যোগ দরকার। অন্যথায় ইতিহাস বিকৃতি ফের আমাদের ঘাড়ে জেঁকে বসতে পারে। সাত মার্চ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়েছেন এবং সোরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী আবেগঘন বক্তব্য দিয়েছেন। বিশ্বসম্পত্তিতে পরিণত হওয়া বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বাঙালি জাতির- একক কোনো দলের নয়। এটি নিশ্চিত করার জন্য উদযাপনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ- ভোটের ও ভাতের অধিকারসহ শোষণহীন জাতি গড়নের শপথও নিতে হবে। তবেই উদযাপন-আয়োজন সার্থক হবে।

পেঁয়াজের দাম কমেছে, লেবুর হালি ৪০-৬০ টাকা

দীর্ঘদিন ধরে চড়া পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানীর বাজারগুলোয় দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজের দাম কেজিতে ১০ টাকা কমেছে। মাছ-মাংস, সবজির দাম স্থিতিশীল থাকলেও লেবুর দাম ছিল আকাশছোঁয়া। প্রতি হালি লেবু বিক্রি হয়েছে ৪০-৬০ টাকায়। শুক্রবার রাজধানীর শান্তিনগর ও মালিবাগ কাঁচাবাজার ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। গত সপ্তাহে যে দেশি পেঁয়াজ ৫০-৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে, তা শুক্রবার ৪০-৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। একই অবস্থা আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজের। প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৩৫-৪৫ টাকায়, গত সপ্তাহে এ পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল ৪৫-৫৫ টাকায়। গত নভেম্বরে দেশি পেঁয়াজ প্রতি কেজি ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। আর ভারতীয় পেঁয়াজ ১০০ টাকার আশপাশে বিক্রি হয়েছিল। আদা-রসুনের দাম কেজিতে ১০ টাকা বেড়েছে। শীতকালীন সবজির দাম স্থিতিশীল ছিল। পাকা টমেটো প্রতি কেজি ১০-১৫ টাকা, ক্ষীরা ৪০ টাকা, শালগম ২০-২৫ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা, বরবটি ৬০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, পেঁপে ২০ টাকা, গাজর ৩০ টাকা, আলু ১৬-২০ টাকা, বেগুন ৩০-৪০ টাকা, মুলা ১৫-২০ টাকা,
শিম ৩০-৪০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া প্রতি পিস ফুলকপি ও বাঁধাকপি ২৫-৩০ টাকা, লাউ প্রতি পিস ২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত সপ্তাহে লাউ ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। লালশাক, পালংশাক ও ডাঁটাশাক ৩ আঁটি ২০ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। সবজি বিক্রেতারা বলছেন, এবার সবজির উৎপাদন ফলন ভালো হয়েছে। তাই সরবরাহ বেশি। বাজারে লাউ ও টমেটোর সরবরাহ বেড়েছে। যে কারণে আগের সপ্তাহের তুলনায় দাম কিছুটা কম। সপ্তাহের ব্যবধানে দাম সব থেকে বেশি কমেছে লাউয়ের। গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় অর্ধেক দামে এখন লাউ বিক্রি হয়েছে। যদিও খাবারের স্বাদ বাড়াতে সহায়ক লেবুর দাম ছিল আকাশছোঁয়া। প্রতি হালি লেবু বিক্রি হয়েছে ৪০-৬০ টাকায়। শান্তিনগরের কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা মোকলেছুর রহমান বলেন, গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম বাড়েনি। বরং দাম কিছুটা কমেছে। তবে আগাম গ্রীষ্মকালীন সবজি যেমন পটোলের দাম তুলনামূলক বেশি। মাছ ও মাংসের দামও রয়েছে গত সপ্তাহের মতোই। প্রতি কেজি কাতল মাছ ২২০ টাকা, পাঙ্গাশ ১২০ টাকা, রুই ২৩০-২৮০ টাকা, সিলভারকার্প ১৩০ টাকা, তেলাপিয়া ১৩০ টাকা, টেংরা ৩৫০-৪০০ টাকা, শিং ৪০০ টাকা ও চিংড়ি ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। মাংসের মধ্যে গরুর মাংস ৪৫০-৫০০ টাকা, খাসির মাংস ৭০০-৭৫০ টাকা ও ব্রয়লার মুরগি ১৩০-১৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এছাড়া সোনালি মুরগি প্রতি পিস আকারভেদে ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

ফারমার্স ব্যাংকের ৬০ শতাংশ শেয়ার বিক্রিতে বাধ্য করা হবে

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ফারমার্স ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে মোট শেয়ারের ৬০ শতাংশ বিক্রি করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করা হবে। এসব শেয়ার সরকারি ব্যাংক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কিনে নেবে। তিনি বলেন, ফারমার্স ব্যাংক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের সবাইকে আইনের মুখোমুখি করা হবে। আমরা কোনো ব্যাংককেই মরে যেতে দেব না। বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় আগামী ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। আলোচনায় অংশ নেয় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস), পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউট (পিআরআই), ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ (ইআরজি) এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। অর্থমন্ত্রী বলেন, আলোচনায় ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে উঠে এসেছে। আসলে ব্যাংক কলাপসটা জাতীয় ইস্যু হয়ে যায়। ব্যাংক কলাপসের অভিজ্ঞাও আমাদের খুবই কম। এর আগে বাংলাদেশের ১৯৮৪ সালে ব্যাংক কলাপসের ঘটনা ঘটে। তখন আমিও ?কিছু টাকা খুয়েছিলাম। ‘অনেক ইন্ডাস্ট্রি সমস্যায় পড়ে।
তাই তো আমরাই রুগ্ন শিল্প পলিসি করেছি। অনেক প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়েছি। তারপরও অনেকগুলো মরেছে। কিন্তু সেগুলো নিয়ে এত হইচই হয়নি। কিন্তু ব্যাংকটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ তাই নতুন করে আর কোনো ব্যাংককে মরে যেতে দেয়া হবে না।’ অর্থমন্ত্রী বলেন, ফারমার্স ব্যাংকের বর্তমান কর্তৃপক্ষ টাকা চায়। কিন্তু অধিকাংশ শেয়ার তাদের নামেই রাখতে চাই। কিন্তু আমরা মোট শেয়ারের ৬০ শতাংশ বিক্রি করতে কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করব। তবে এক্ষেত্রে সরকার কোনো টাকা দিচ্ছে না। সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এসব শেয়ার কিনবে। যারা এ ব্যাংকটিকে ধ্বংস করল তাদের কোনো শাস্তি হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবশ্যই তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে। মুহিত বলেন, আমরা এতদিন রান নেইনি। তবে আগামী বাজেটে কিছু ঋণ নিতে পারি। তবে এ বিষয়ে আলাচনায় অংশ গ্রহণকারী অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ঋণ নেয়াতে যাতে দায়ভার বেশি না হয়। সে বিষয়টি আমিও তাদের নিশ্চিত করেছি যে খুব বেশি বার্ডেন (বোঝা) হবে না। আলোচনায় উঠে এসেছে দক্ষ শ্রমিক তৈরির বিষয়টি। ওয়েল আমাদের সরকারও দক্ষতার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। দক্ষতা মানে শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে দক্ষতা নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও দক্ষতার প্রয়োজন।

হৃৎস্পন্দন মাপবে ড্রোন!

দূর থেকেই মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন মাপতে পারবে ড্রোন! হ্যাঁ, এমনই ড্রোন বানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা। ৬০ মিটার দূর থেকেই মানুষের হৃদস্পন্দন মাপতে সক্ষম এ ড্রোন। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, মানবিক সংকটের সময় সহায়ক হতে পারে এ প্রযুক্তি। আইএএনএস।
এ গবেষক দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার জাভান চাল। ক্যামেরা ব্যবহার করে লক্ষ্য করা ব্যক্তির মাথা পর্যবেক্ষণে প্রতিটি বিটের জন্য এক মিলিমিটারের স্পন্দন দেখাতে পারে ড্রোনটি। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশনকে জাভান চাল বলেন, ‘একটি দুর্যোগ মুহূর্তে আপনাকে মূলত গুরুত্ব দিতে হবে কে বেঁচে আছে, কে মারা গেছে এবং কে মারা যাচ্ছে- এ বিষয়গুলোর ওপর। এ পরিস্থিতে একটি ড্রোন ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে মানুষের সাধারণ অবস্থা নির্ণয় করতে পারে। এ একই সফটওয়্যার মুখ শনাক্ত করতে পারে, হৃদস্পন্দন মাপতে পারে এবং প্রতিদিন এক লাখ মানুষের জন্য এটি করা যেতে পারে।’ অস্ট্রেলিয়ান ডিফেন্স ফোর্সের সঙ্গেই ড্রোনটি তৈরি করেছে গবেষক দলটি। মানবিক সংকটের সময় এটি ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে তাদের। ওই গবেষক বলেন, ‘গোয়েন্দাগিরি এবং অস্ত্রের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও ড্রোনটি ব্যবহার করা যেতে পারে। আমরা যদি এটির ব্যবহার শুরু করি, খারাপ উদ্দেশ্য নিয়েও কেউ এটি ব্যবহার করতে পারেন।’

অর্থ পাচার তদন্ত করবে এনবিআরের সব সংস্থা

এখন থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন সব সংস্থা অর্থ পাচার তদন্ত করতে পারবে। কাস্টমস, আয়কর, ভ্যাট ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) মধ্যে যে শাখা অর্থ পাচার সংক্রান্ত তথ্য উদ্ঘাটন করবে তারাই এর তদন্ত করবে।
এর আগে এনবিআর এক আদেশ জারির মাধ্যমে শুধুমাত্র সিআইসিকে তদন্ত করার ক্ষমতা দিয়েছিল। এ নিয়ে তখন শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতরসহ বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের কার্যালয় আপত্তি করেছিল। এনবিআর সূত্র জানায়, আগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে বিধান অনুযায়ী কাস্টমস, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) এবং আয়কর বিভাগের কোনো করদাতা টাকা পাচার করলে সংশ্লিষ্ট বিভাগ তদন্ত করতে পারত। কিন্তু ২০১৬ সালের ২ অক্টোবর এনবিআর এক আদেশ জারির মাধ্যমে শুধু সিআইসিকে অর্থ পাচার তদন্তের দায়িত্ব দেয়। এর যুক্তিতে বলা হয়েছিল, কর অঞ্চল, কাস্টম হাউসগুলোকে রাজস্ব আদায় ও ট্রেড ফ্যাসিলিটেশনের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সীমিত জনবলের কারণে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে তেমন ভূমিকা রাখতে পারে না।
নতুন আদেশে বলা হয়েছে, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ধারা ২(ঠ)(অ) এ বর্ণিত তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধ কাস্টমস, ভ্যাট, আয়কর ও সিআইসির মধ্যে যে সংস্থার মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হয়ে সেই দফতরই আইন অনুযায়ী তদন্ত ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এছাড়া অন্য দফতর থেকে উদ্ঘাটিত মামলা তদন্তের জন্য এনবিআরকে অনুরোধ জানানো হলে তা তদন্তের জন্য এনবিআর কাস্টমস, আয়কর, ভ্যাট ও সিআইসিকে দায়িত্ব দিতে পারবে। এ বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আগে আইনের ভুল ব্যাখ্যা করে সিআইসিকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। এখন সেটিকে স্পষ্ট করা হয়েছে।