Friday, February 26, 2021

মাটি-মানুষের তন্নিষ্ঠ ও নৈর্ব্যক্তিক

আমাদের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক বিচারে মুষ্টিমেয় যে-কজন সৃজনশীল লেখক সৎ সাহিত্য-ভাবনাকে তন্নিষ্ঠ ও নৈর্ব্যক্তিকভাবে প্রকাশে উন্মুখ রয়েছেন, শওকত আলী তাঁদের একজন। শুধু একজন নন, নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে একজন। লেখকের দায়ভার নিয়ে আজো তাঁর সৃষ্টি-চিকীর্ষা অব্যাহত রয়েছে। আমাদের এই দুঃখী দেশের গণমানুষের হাসিকান্না, শোকসমত্মাপ, কান্না ও বিলাপ, সুখ ও আনন্দ দিয়ে তিনি তাঁর সাহিত্য-চেতনায় যে ভূখ- গড়ে তুলেছেন, তাতেই বোঝা যায় সাহিত্যিকরূপে লেখকের ভূমিকা ও তৎপরতা। এ-উপমহাদেশের মানুষের সমাজবাসত্মবতা যে তাঁর অভিজ্ঞতায় আসত্মীর্ণ তা বুঝতে অসুবিধে হয় না। তিনি তাঁর আহরণ নিয়ে সময়কে তুচ্ছ করে বোধ করি আরো সুদূর অতীতের আবহমান বাংলাদেশকেই শনাক্ত করতে চান। ‘জীবনের গভীর থেকে গভীরতর ভেতরের দিকে যেতে’ পারার লক্ষক্ষ্য তিনি আজো নিষ্ঠাভরে নির্মাণ করে চলেছেন। বাংলা কথাসাহিত্যের বিবেচনায় লেখকের প্রাতিস্বিক অনুভবের ঈপ্সিত ফসল এই সাক্ষাৎকার।                          -বজলুল করিম বাহার

বজলুল করিম বাহার : বাংলাসাহিত্যের মূল স্রোতের ধারাবাহিকতায় আমাদের কথাসাহিত্যের স্থান কোথায়?

শওকত আলী : আমার ধারণা, বাংলাসাহিত্যের মূল স্রোত বলে কিছু নেই। আসলে মূল-অমূল যা-ই বলা যাক, স্রোত একটাই এবং একমাত্র, ১৯৪৭ পর্যন্ত। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণে বাংলা ভাষাভাষী জনগণের দেশটি ১৯৪৭ সালে দুভাগে ভাগ হয়ে গেলে বাংলাসাহিত্যের প্রবাহটিও দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তারপরে এখন পর্যন্ত, আমাদের সাহিত্যক্ষক্ষত্রে যা-কিছু অর্জন, এবং ওপার বাংলার সাহিত্যক্ষক্ষত্রেরও, ভালোমন্দ যা-ই হোক, সবই ১৯৪৭-পূর্ববর্তী বাংলাসাহিত্যেরই ধারাবাহিক অংশ। আমি মনে করি, আমাদের কথাসাহিত্যের স্থান এই পরিপ্রেক্ষিতেই নির্ধারিত হওয়া উচিত। অর্থাৎ ১৯৪৭-পরবর্তী দ্বিধাবিভক্ত বাংলাসাহিত্য এখন দুই ধারায় দুরকম জীবনবাসত্মবতার মধ্যে নির্মীয়মাণ। আমাদের দেশের বাসত্মবতার কথা এখানে উলেস্নখ করা যেতে পারে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির জাতীয় উত্থান এবং উপর্যুপরি গণআন্দোলন চলে বাংলাদেশে পুরো ষাটের দশকজুড়ে এবং একটি রক্তাক্ত ও সর্বাত্মক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ জাতীয় স্বাধীনতা অর্জন করে। এই যুদ্ধের প্রভাব এখন পর্যন্ত আমাদের জীবনে রয়ে গেছে।

এখানে বলার কথা এই যে, ১৯৪৭ সালের পর গত চারটি দশকজুড়ে আমাদের অস্থির এবং খুব টানটান সময়ের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। জীবনের বাইরের দিকে যেমন, তেমনি ভেতরের দিকেও এত ভাঙচুর ও দ্রম্নত ভালোমন্দ পরিবর্তন ঘটেছে যে, তাতে লেখক ও পাঠকের দম ফেলার অবকাশ থাকছে না। অভিনিবিষ্ট কাজ, বড়মাপের কাজ, আবেগ ও বুদ্ধিকে সংহত করে ব্যবহার করার কাজ, করার মতো অবকাশ আমাদের কম। এককথায় বলতে হয়, আমাদের লেখকদের ওপর জীবনবাসত্মবতার চাপ খুব বেশি। এত বেশি যে, জীবনবাসত্মবতার শিল্পরূপটি আমরা সাফল্যের সঙ্গে বিন্যসত্ম করতে পারি না – আর গল্প বানানোও সম্ভব হয় না। তাই, আমার মনে হয়, শিল্পতার মান যা-ই হোক, বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে জীবন বেশি, বানানো গল্প কম। সম্ভবত সে-কারণেই চমকদার ভাষায় জমজমাট ও বানানো গল্প পাঠে অভ্যসত্ম পাঠকরা মনে করেন যে, এদেশের লেখকরা ভালো গল্প লিখতে পারেন না।

শুধু লেখকের কথা নয়, প্রকাশনার কথাও এ-প্রসঙ্গে আসে। নিয়মিত কোনো সাহিত্য পত্রিকা নেই, এই দুঃখজনক বাসত্মবতা কি অস্বীকার করা যায়? আর বইয়ের প্রকাশনা? সবই নিদারুণভাবে নেতিবাচক অবস্থায় বিদ্যমান।

তাই আমাদের কথাসাহিত্যের স্থান খুঁজতে যাওয়ার প্রশ্নটাকে আমি অযৌক্তিক বলে মনে করি। তুলনাটা করব কার সঙ্গে কার? হ্যাঁ, আমরা জানি, বাংলাদেশে একটিই তেজি, সৃজনশীল এবং গভীরভাবে জীবনবোধসম্পন্ন লেখক ছিলেন এবং আছেন, তাতে কি কিছু প্রমাণিত হয়? একজন সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহ্ বা তাঁর মতো আরো দু-তিনজন লেখকের দু-একটি করে কাজ নিয়ে কি তুলনা করা যায় ১৯৪৭-পূর্ববর্তী ‘মূলধারার’ লেখকদের সঙ্গে? কিংবা সাম্প্রতিককালের বাংলা কথাসাহিত্যের দুই প্রবাহের মধ্যেই কি তুলনা করার মতো অবস্থা আছে? একজন-দুজন ভালো লেখক দিয়ে কি সমগ্র সাহিত্যের অবস্থা বোঝা যাবে?

এ-প্রসঙ্গে আমার একটি সবিনয় নিবেদন আছে, কী দরকার তুলনা করতে আর স্থান খুঁজতে যাওয়ার? একটি স্বাধীন জাতির জন্য সাহিত্য নির্মাণের প্রয়োজন আমাদের – আমাদের কি ওই কাজেই বেশি সময় ও মনোযোগ দেওয়া দরকার নয়? ষাটের দশকের কথা স্মরণ করুন – তখন তো তুলনায় যাওয়া হয়নি, সুযোগও অবশ্যি ছিল না। আমরা যে তখন নিজের মতো করে কাজ করে গিয়েছি, তাতে কি ক্ষতি হয়েছে আমাদের, না লাভ হয়েছে? আমি সাহিত্যকর্মীদের কথাটা ভেবে দেখতে অনুরোধ করি।

বাহার : কথাসাহিত্যের বাসত্মবতা প্রসঙ্গে আপনার অভিজ্ঞতা কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে?

শওকত : কথাসাহিত্যের বাসত্মবতা কী, এই প্রশ্নটিই এখন আপেক্ষক্ষক হয়ে উঠেছে। আমি বাসত্মবতাকে যেভাবে দেখি, অন্য লেখক সেভাবে নাও দেখতে পারেন। এমনিতে তো জানি, মানুষের কাহিনি জীবনযাপনের বাসত্মবতার যত কাছাকাছি আসতে পারে, ততই তা উপন্যাস হয়ে ওঠে। সত্মাদাঁলের সময় থেকেই প্রক্রিয়াটি সুস্পষ্ট। তবু দেখা যায়, ফ্লবেয়ার আর জোলার বাসত্মবতায় দুসত্মর ফারাক। অবয়বিকতা যেমন বাসত্মব, প্রাণময়তাও তেমনই বাসত্মব। দিবালোকিত প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও বাসত্মব; আবার, ফ্রয়েড সাক্ষী, স্বপ্নের ঝাপসা অভিজ্ঞতাও বাসত্মব। উপরন্তু কার্ল য়ুঙের তত্ত্ব মানলে তো তন্ত্রমন্ত্র আর পরাবাসত্মবতার বিষয়গুলোও বাসত্মবতার সীমানার মধ্যে এসে যায়। আর সাম্প্রতিককালের তাজা তত্ত্ব ম্যাজিকাল রিয়ালিজম যদি বিবেচনায় আনি, তাহলে তো বাসত্মবতা আর অবাসত্মবতার সীমানা ঠাহর করা মুশকিল হয়ে যাবে। অথচ আমরা জানি সবই বাসত্মবতা। আসলে লেখক কী লিখবেন, সেটাই প্রধান কথা। এখানে লেখকের মনের প্রবণতাটাই আসল। প্রবণতাই লেখককে জগতের সঙ্গে যুক্ত করে – এবং সেই যুক্ত থাকার ফলেই লেখকের অভিজ্ঞতার সঞ্চয় বাড়ে, যে-সঞ্চয় লেখক ব্যবহার করতে পারেন তাঁর শিল্প নির্মাণের সময়। আমার অনুমান, এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই সব লেখককে যেতে হয়।

আমার অভিজ্ঞতায় শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত যা সঞ্চিত হয়েছে এবং হয়ে চলেছে, তা-ই আমি ব্যবহার করেছি এবং করছি আমার লেখায় – এই সোজাসাপ্টা জবাবটা দিতে পারলে সুখী হতাম। কিন্তু আসলে তা হয়নি, এবং বোধহয় হয়-ও না। কারণ এই যে, বাসত্মবতা তো শিল্প নয় – শিল্পের একটা আলাদা দাবি আছে। আমি বাসত্মবতা নিয়ে লিখব বলে সিদ্ধান্ত নিলেই যে লিখতে পারব এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। জনগণের জীবন-সংগ্রাম নিয়ে অনেক লেখাই যে প-শ্রম হয়েছে, সে-উদাহরণ তো ভূরি ভূরি, আমাদের জীবৎকালেই আমরা দেখেছি।

বাসত্মব অভিজ্ঞতার সঞ্চয় এবং শিল্প নির্মাণের সময় তার ব্যবহার, এই প্রক্রিয়ার ব্যত্যয় অবশ্যই হয় না। কিন্তু সব অভিজ্ঞতাই যে শিল্পের কাজে লাগানো যাবে, এমন কোনো কথা নেই। এখানে নিজের কথা বলতে পারি। ধরা যাক, ‘কপিলদাস মুর্মুর শেষ কাজ’ নামক গল্পটির কথা। ওই গল্পের বৃদ্ধ কপিলদাস আর আসল কপিলদাস দেখতে আপাদমসত্মক হুবহু একই রকম। আচার-আচরণও একই রকম। কিন্তু পরিণতিতে যে-কা-টি সে ঘটায়, সেটি কিন্তু বাসত্মবে সে ঘটায়নি, ঘটিয়েছিল তার নাতি। এরকম অনেক এদিক-ওদিক হয় অভিজ্ঞতাকে শিল্পে রূপান্তর করার সময়। আবার যেমন ‘প্রদোষে’র কথা বলা যায়। ওই লেখাটি উপন্যাস হয়েছে কিনা জানি না – কিন্তু ওটির মধ্যে শুধু ইতিহাসের বাসত্মবতাই নয়, প্রত্যক্ষ বাসত্মবতাও আছে। ১৯৭১-এর শত্রম্ন-কবলিত ও আক্রান্ত বাংলাদেশই হলো ওই লেখাটির প্রেরণা এবং একই সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও বাসত্মব উপাদান। আমার মনে হয়, কেবলই অবয়বিকতা কিংবা কেবলই বিমূর্ততা বাসত্মবতা নয়। শুধুই অবয়বিকতা বস্ত্তর অবয়ব মাত্র, আর শুধুই বিমূর্ততা, পস্নাস্টিসিটি থাকলেও, আকারপ্রকারবিহীন প্রতিভাস মাত্র – পুরো বাসত্মবতা কখনোই নয়। কিন্তু উপন্যাস বা গল্পের প্রধান উপাদানই বাসত্মবতা। আমি মনে করি, জীবন্ত প্রাণময় বস্ত্তই হতে পারে সেই বাসত্মবতা, যার পক্ষে শিল্পের উপাদান হওয়া সম্ভব।

বাহার : লেখার ক্ষক্ষত্রে কোনো  বিশেষ অঞ্চলের পটভূমি, গণমানুষ বা পারিপার্শ্বিকতাকে কি আপনি প্রাধান্য দিয়ে থাকেন?

শওকত : হ্যাঁ, যে-অঞ্চলের মাটি ও মানুষ আমার ভালোভাবে জানা, মাটি ও মানুষসুদ্ধ সেই অঞ্চলটি আমার লেখায় বারবার নানান প্রসঙ্গে চলে আসে। তাছাড়া এমনিতে লেখক হিসেবে কোনো অঞ্চলের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব নেই।

বাহার : তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে বীরভূমের, মনোজ বসুকে সুন্দরবন এলাকার, হাসান আজিজুল হককে রাঢ়বঙ্গের লেখক বলা হয়। আপনাকে কি এভাবে উত্তরবঙ্গের লেখক অভিধায় চিহ্নিত করা বিবেচনাপ্রসূত বলে মনে করেন?

শওকত : অবশ্যই বিবেচনাপ্রসূত হবে না। কেন হবে? আমি কি বরেন্দ্রের গল্প বলে কোনো গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করেছি? হ্যাঁ, দিনাজপুর-রংপুরের উত্তরাঞ্চলে আমার জন্ম, কিছুকাল সেদিকে বসবাস ছিল এবং সেই সুবাদে ওই এলাকার মানুষ এবং মাটির সঙ্গে আমার গভীরভাবে জানাশোনা। তাই ওই এলাকা এবং তার মানুষ আমার অনেক গল্পে এবং উপন্যাসে এসেছে। শুধু এই কারণে কেমন করে দাবি করব যে, আমি উত্তরবঙ্গের লেখক? দিনাজপুরের উত্তরাঞ্চলটিই কি পুরো উত্তরবঙ্গ?

কোনো বিশেষ অঞ্চলের লেখক হতে পারা গৌরবের ব্যাপার। টমাস হার্ডি, উইলিয়াম ফকনার, মিখাইল সোলোকভ – এঁদের বিশেষ অঞ্চলের প্রকৃতি ও মানুষের লেখক বলে অভিহিত করা হয়েছে। সুতরাং যদি আমি যথার্থই উত্তরবঙ্গের লেখক হয়ে উঠতে পারি অর্থাৎ পুরো উত্তরবঙ্গের মাটি ও মানুষ নিয়ে লিখে উঠতে পারি তাহলে অবশ্যই গর্ববোধ করব।

বাহার : আমাদের কথাসাহিত্যে মানবিক মূল্যবোধ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় কতটুকু প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয় আপনার?

শওকত : যতদূর জানি, আদ্যন্ত মানুষ আর তার জীবনযাপনের যাবতীয় অনুষঙ্গই মানবিক মূল্যবোধের এলাকার জিনিস। মানুষকে শ্রেষ্ঠ ভাবা, মানবিক গুণগুলোকে জীবনাচরণের ক্ষক্ষত্রে প্রাধান্য দেওয়া এবং সকল মানব-প্রসঙ্গকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করাকেই আমি মানবিক মূল্যবোধের বিষয় বলে বিবেচনা করি। আর কথাসাহিত্যের প্রধান শিল্পরূপ উপন্যাস এবং ছোটগল্প, যার সূচনাতেই মানুষ এবং মানুষের যাবতীয় অনুষঙ্গকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। কথাসাহিত্যের মূল ভিত্তিটাই তৈরি হয়েছে মানব-প্রসঙ্গ দিয়ে। তাই মানবিক মূল্যবোধকে কথাসাহিত্যের ক্ষক্ষত্রে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনা করার আদৌ কোনো অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি না।

বাহার : একুশের চেতনা আপনার সাহিত্যকর্মে কতটুকু স্থান পেয়েছে?

শওকত : এ-প্রশ্নের জবাব দেওয়া কি ঠিক হবে? পাঠক-সমালোচকরাই বরং ভালো বলতে পারবেন, একুশের চেতনা আমার সাহিত্যকর্মে কতটুকু স্থান পেয়েছে। এখানে একটি তথ্য আমি জানানো প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। তা হলো এই যে, ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রম্নয়ারির দিন আমি শুধু ঢাকা নয়, তখনকার দিনের পূর্ববাংলাতেই অনুপস্থিত ছিলাম। তবে কয়েকদিন পরই আমি দিনাজপুর শহরে গিয়ে পৌঁছি এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ছাত্র ইউনিয়নের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ি।

বাহার : এদেশের কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ কি তেমন কোনো সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব পেয়েছে বলে আপনার মনে হয়? আপনার নিজের ক্ষক্ষত্রে?

শওকত : মুক্তিযুদ্ধ অবশ্যই সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব লাভ করেছে আমাদের কথাসাহিত্যে। গল্প-উপন্যাস, আলোচনা ইত্যাদি লেখাও হয়েছে প্রচুর। প্রশ্ন উঠতে পারে, সেসব লেখা শিল্পের দিক থেকে কতখানি সার্থক হয়ে উঠতে পেরেছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, মুক্তিযুদ্ধ যতখানি বড় ব্যাপার সে-মাপের সাহিত্য এখনো লেখা হয়নি। আশা করি, ভবিষ্যতে আমাদের লেখকরা সেই কাজটি করবেন। যদি না করতে পারেন, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় তাঁদেরই বহন করতে হবে। কিন্তু যতটুকু কাজ এক্ষক্ষত্রে হয়েছে তার সবটুকু কি আমরা পড়ে দেখেছি? আমি যতদূর জানি, মুক্তিযুদ্ধ অবলম্বনে একাধিক ভালো গল্প এবং উপন্যাস ইতোমধ্যে লেখা হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হক, হাসান আজিজুল হক প্রমুখ শীর্ষস্থানীয় লেখক তো লিখেইছেন, তরুণতর লেখকরাও এ-বিষয়ের ওপর কাজ করেছেন।

আসলে প্রশ্নটা তো বাসত্মবতার, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের বাসত্মবতা কি আগের চেয়ে অন্যরকম নয়? লেখকরা তো সেই পরিবর্তিত বাসত্মবতার মধ্যে বাস করেন, সুতরাং সেই পরিবর্তিত বাসত্মবতাই তো ধরা থাকবে সাহিত্যে। আমার ধারণা, লেখকরা পরিবর্তিত সেই জীবনবাসত্মবতার মধ্যেই লিখবেন আরো বহুকাল ধরে। এছাড়া কি অন্য পথ আছে তাঁদের? আমার মনে হয় না। একটা জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধের মতো ঘটনা কি হরহামেশাই ঘটে? আমার গল্প-উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ বারবারই চলে আসে।

বাহার : এদেশের কথাসাহিত্যের বিকাশের ক্ষক্ষত্রে আপনার বিবেচনায় প্রধান অন্তরায়গুলো কী কী?

শওকত : সাহিত্যের পাঠ ও চর্চা যে জীবনের জন্য প্রয়োজন, এই উপলব্ধি যতদিন পর্যন্ত না সবার মনে জাগছে, ততদিন পর্যন্ত শুধু কথাসাহিত্য নয়, সবরকম সাহিত্যেরই সহজ ও স্বাভাবিক বিকাশ সম্ভব নয় বলে আমি মনে করি।

এখন সমস্যা, সাহিত্যের গুরুত্ব উপলব্ধি করানোর কাজটা কে করবে, এবং কীভাবে করবে। আমার মনে হয়, এ-ব্যাপারে লেখকদের কিছু করণীয় আছে। এমনিতে সাহিত্যচর্চার সুযোগ খুব বেশি নেই। কিন্তু যতটুকু আছে তার ব্যবহার কি আমরা, লেখকেরা, করছি? আমরা এত কম লিখি কেন? একজন সৃজনশীল লেখক বছরে একখানা উপন্যাসও লিখবেন না, এটা কোনো কাজের কথা নয়। না-লেখার কারণে, সীমিতসংখ্যক পাঠকও যে সাহিত্যবিমুখ হয়ে যেতে পারেন – এ-কথাটা আমরা মনে রাখি না। আরো একটি কথা এই যে, আমরা অনেকেই ছোটদের জন্য লিখি না। এ-প্রসঙ্গে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, রবীন্দ্রনাথ থেকে আরম্ভ করে তিরিশের দশক এবং তারপরের লেখকেরাও ছোটদের জন্য নিয়মিত লিখেছেন। এবং তাঁদের লেখার মাধ্যমেই পাঠক তৈরি হয়েছে। সাহিত্যপাঠ তো অভ্যাসেরই ব্যাপার – আর বালক ও কিশোর পাঠকেরাই যে বয়সী পাঠক হয়ে ওঠে, এ-সত্য কি অস্বীকার করা যাবে?

এ-ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানেরও বড় রকমের দায়িত্ব আছে বলে মনে করি। সরকার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। সরকারি ব্যবস্থায় কি পাঠাভ্যাস বাড়ানোর কোনো সুযোগ আছে? আমার জানামতে বহু পৌরসভা আছে, যারা স্থানীয় লাইব্রেরিগুলোতে নামমাত্র অনুদান, অথবা আদৌ দেয় না। সরকার কি লাইব্রেরির সংখ্যা বাড়ানোর কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? আমার মনে হয় না। জনসংখ্যার অনুপাতে হাসপাতালের বেডের হিসাব আমরা জানি, কিন্তু লাইব্রেরির হিসাব কি কখনো করা হয়েছে? স্রেফ মনোযোগ ও সচেতনতার অভাবে বহু প্রাচীন লাইব্রেরির এখন নাম-নিশানা পর্যন্ত নেই। সুতরাং কথাসাহিত্য বা সাধারণভাবেই সাহিত্য-বিকাশের প্রশ্নটা জাতীয় পর্যায়ে বিবেচিত হওয়া উচিত। আমাদের রাজনৈতিক ক্ষক্ষত্রে যাঁরা কাজ করেন তাঁরা কি বিষয়টা নিয়ে ভাবেন? আমার মনে হয় না। যদি ভাবতেন তাহলে তার খবর কাগজ মারফত আমাদের কাছে অবশ্যই পৌঁছত।

বাহার : কৃষিকেন্দ্রিক ও শিল্পকেন্দ্রিক আমাদের আর্থ-সমাজ ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতর যে ব্যবধান – এদেশের কথাসাহিত্যে তার কোনো উপস্থিতি না
থাকার কারণ কী?

শওকত : আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবস্থায় শিল্পকেন্দ্রিক উৎপাদন এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। তবু যতটুকু শিল্পক্ষক্ষত্র রয়েছে তার প্রতিফলন আমাদের কথাসাহিত্যে নিদারুণ রকম অনুপস্থিত – এ-কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। এর কারণ, শিল্প উৎপাদনের প্রক্রিয়া ও
শিল্প-শ্রমিকদের জীবন যথেষ্ট প্রবলভাবে সমাজ-মানসে অনুভূত হয় না – আর দ্বিতীয় কারণ যাঁরা লেখালেখি করেন, সেই লেখকেরাও শিল্প উৎপাদন প্রক্রিয়া ও
শিল্প-শ্রমিকদের জীবনযাপনের সঙ্গে সংশিস্নষ্ট হতে পারেননি। এরও অবশ্যি কারণ আছে। যে-শ্রেণি থেকে আমাদের কথাসাহিত্যিকরা এসেছেন, সেই শ্রেণিটির অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল কৃষি। আমাদের শহরাঞ্চলগুলোর চারদিকে তো ক্ষিত, ফসল, গ্রাম আর গাছগাছালি। ফলে, সামান্য ঠাঁই বদল করলেই আমরা কৃষির যাবতীয় অনুষঙ্গের মধ্যে পড়ে যাই। শিল্প এলাকায় যদি আমরা যাই-ও তাহলে আমরা থাকি অতিথি দর্শকের মতো। যন্ত্রপাতি কিংবা উৎপাদন-প্রক্রিয়া চোখ মেলে দেখি শুধু। তাতে কখনো চমৎকৃত হই, কখনো হতাশ। ভেতরের দিকে যেতে পারি না।

আমার মনে হয়, লেখকদের অবস্থানগত ও মানসিক দূরত্বের কারণেই শিল্প ও কৃষিকেন্দ্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়ার ব্যবধান-সংক্রান্ত বিষয়টি আমাদের কথাসাহিত্যে অনুপস্থিত।

বাহার : আমাদের কথাসাহিত্য কাহিনির অভাবে ক্রমেই যে বৈচিত্র্য হারাতে বসেছে, এ-ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

শওকত : কথাটা সবদিক থেকে ঠিক, আবার অন্যদিক থেকে ঠিক নয়। প্রশ্ন হচ্ছে কথাসাহিত্যিক কি আমোদ বিতরণকারী এন্টারটেইনার? যদি সেদিক থেকে বিচার করতে হয়, তাহলে কথাসাহিত্যিক নিটোল গোলগাল মজাদার গল্প বানাতে না পারলে সেটা তার ব্যর্থতা এবং এক্ষক্ষত্রে বুঝতে হবে মজাদার কাহিনির অভাবে কথাসাহিত্য বৈচিত্র্য হারিয়েছে। কিন্তু মূল প্রশণটা এখানে বিবেচনা করতে হবে যে, কথাসাহিত্য কি শুধুই গল্প বা কাহিনি? যদি হতো তাহলে রূপকথা বা কল্পকাহিনির বৈচিত্র্য দিয়েই তো কথাসাহিত্যের কাজ চলত। উপন্যাস বা আধুনিক ছোটগল্পের শিল্পরূপের দরকার হতো না। আসলে মানুষের জীবনই কথাসাহিত্যের বিবেচ্য বিষয়। তাতে পূর্ণাঙ্গ কাহিনি থাকতেও পারে, না-ও পারে। বিচার্য বিষয় হচ্ছে লেখক জীবনের কতটুকু দেখলেন ও দেখালেন এবং কীভাবে দেখালেন। লেখক জীবনের গভীর থেকে গভীরতর ভেতরের দিকে যদি যেতে পারেন, তাহলে তাঁর লেখায় যা উঠে আসবে তাতেই পাওয়া যাবে সাহিত্যের সেই অন্বিষ্টকে যা মানুষকে ভাবায় এবং আলোড়িত ও উদ্দীপ্ত করে।

বাহার : ভারতীয় ও এদেশি বেস্ট সেলার্স উপন্যাসগুলো আমাদের পাঠক সমাজে যেভাবে আদৃত হচ্ছে, তাতে এদেশের সিরিয়াস সাহিত্য কি ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছে না? এ-প্রতিকূলতার সমাধান কী?

শওকত : ভারতীয় বা এদেশি বেস্ট সেলার্স মাত্রই কি হালকা সাহিত্য? বিষয়টা আমি ওভাবে দেখি না। বিদেশি বই অবাধে এলে তা দেশীয় প্রকাশনা-শিল্পকে অবশ্যই ক্ষতিগ্রসত্ম করবে; এ-বিষয়ে আমি একমত। কিন্তু সব বেস্ট সেলারই হালকা সাহিত্য হবে, এমন আমি মনে করি না। হেমিংওয়ের বই তো বেস্ট সেলার হয়েছিল, হেমিংওয়ের বই কি আপনার ভাষায় ‘সিরিয়াস’ নয়? আরো কথা এই যে, মানুষের সাহিত্য-রুচি উন্নততর হওয়ার জন্য সময় এবং চর্চার দরকার। আবার এও সত্য যে, সব দেশেই জনপ্রিয় সাহিত্য থাকে এবং তার পাশাপাশি প্রকৃত সৃজনশীল সাহিত্যও থাকে। সব দেশেই জনপ্রিয় সাহিত্যের কাটতি বেশি তাই বলে কি সৃজনশীল সাহিত্য কোণঠাসা হয়ে পড়ে? আইন করে কি ‘সিরিয়াস সাহিত্য’ বেশি পড়ানো যাবে? এক্ষক্ষত্রে যদি আদৌ সমস্যার সৃষ্টি হয়, তাহলে সে-সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে সৃজনশীল সাহিত্যিকদেরই। আমি আগেই বলেছি, তাঁদের আরো বেশি এবং আরো ভালো লিখতে হবে। এমন ভালো যে, পাঠক যেন সেই লেখা পড়তে বাধ্য হন।

বাহার : আমাদের সাহিত্যের কোন ক্ষক্ষত্রটি পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় সবচেয়ে বেশি এগিয়েছে বলে আপনার মনে হয়?

শওকত : এই তুলনা আমি করতে পারব না, কারণ ও-বঙ্গের সাহিত্য বেশি পড়ার সুযোগ নেই। শুনতে পাই, আমাদের কবিতা ভালো এগিয়েছে। কিন্তু দেশ পত্রিকার কল্যাণে পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক কবিতা পড়ে মনে হয় না যে, আমাদের তরুণ কবিরা এগিয়েছেন। কেননা, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়েছে ভাষা, উপমা, বিষয় ইত্যাদিতে দুই বাংলার কবিতা একই রকম। গল্প-উপন্যাস সম্প্রতি যা হাতের কাছে পেয়েছি তাতেও মনে হয়নি যে, ও-বাংলায় কথাসাহিত্য খুব একটা এগিয়েছে। আমাদের কথাসাহিত্য যে তুলনায় বেশি এগিয়েছে তাও বলার সময় এসেছে বলে মনে হয় না। এক্ষক্ষত্রে বলার কথা একটাই যে, বাংলাদেশের
কথাসাহিত্যে জীবনের স্পন্দন অনেক বেশি। আমাদের লেখকেরা সীমিত ক্ষমতা নিয়েও জীবনের অনেকখানি ভেতরের দিকে যেতে পেরেছেন। আমাদের কথাসাহিত্যিকদের লেখায় একটা তাজা ভাব ধরা পড়ে।

বাহার : এদেশের কথাসাহিত্যের বিকাশের ক্ষক্ষত্রে বর্তমানে যে প্রবল সংকট রয়েছে, এই প্রতিবন্ধকতার পেছনে কার ভূমিকা সবচেয়ে প্রধান – লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক, পাঠক, সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি?

শওকত : এ-প্রশ্নের জবাব কিন্তু ইতোমধ্যে দেওয়া হয়ে গেছে।

বাহার : আপনি কি মনে করেন ধর্মীয় কুসংস্কার আমাদের লেখার সুযোগকে সীমিত করছে?

শওকত : অনেকটা। ধর্মীয় ব্যাপার নিয়ে আমাদের লেখকরা লেখেন না। অনেকের আশঙ্কা, ধর্মীয় বিষয়াদি নিয়ে লিখলে আমাদের দেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকেরা ক্ষক্ষপে উঠবে।
কিন্তু কথাসাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালীউলস্নাহ্ যে-কাজ করেছেন তারপরে আমার মনে হয় না ধর্মীয় কুসংস্কার নিয়ে লেখালেখি হলে তেমন বড় কোনো সমস্যা হবে। যতদূর মনে হয়, আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এমন অসহিষ্ণু নয়।

এ-প্রসঙ্গে উর্দু সাহিত্য বা সাম্প্রতিক আরবি-সাহিত্যের উদাহরণ উলেস্নখ করা যায়। উর্দু কথাসাহিত্যের অনেকক্ষক্ষত্রে ধর্মীয় কুসংস্কারের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে। আরবি বিশেষত মিশরীয় সাহিত্যে তো ধর্মীয় কুসংস্কার নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ পর্যন্ত করা হয়েছে – তাতে যে খুব অসুবিধায় পড়েছেন ওদেশের লেখকরা, এমন খবর আমার জানা নেই।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্য : শওকত আলী by হাসান আজিজুল হক

খুব ছোট্ট বৃত্তে ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশের সাহিত্যে আধুনিকতার একটা সূচনা আমরা সাধারণত উল্লেখ করে থাকি। কেন করি, জানি না। আধুনিকতার সংজ্ঞা কী, তাও জানি না। আর রবীন্দ্রনাথের পরবর্তীকালের সাহিত্যকে আধুনিক সময়ের লেখা বলে আমরা চিহ্নিত করেছি। তিরিশের দশকের কবিদের কথা বলেছি। এদিক থেকে বাংলাদেশের আধুনিক সাহিত্য কবে থেকে? আমরা আবার খতিয়ে বিচার করি – দশক ধরে। সেই সূত্রে, পঞ্চাশের দশকের লেখকদের লেখা আর পড়ি না। মানিক-তারাশঙ্কররা তো আরো আগের। সাহিত্য বিচার দশকওয়ারি হওয়া একেবারেই উচিত না। তাতে আত্মম্ভরী বেড়ে যায় যে, আগের দশকের লেখকরা ডুবে গেছে, এই মুহূর্তের লেখাই জীবমত্ম। আমাদের গ্রাম্য একটি প্রবাদ আছে, পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সতীনাথ ভাদুড়ী, শরৎচন্দ্র, বিশেষ করে তিন বন্দ্যোপাধ্যায় বিভূতি-মানিক-তারাশঙ্কর, এখনো কি আমরা এঁদেরকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি? তাহলে পঞ্চাশের দশক, ষাটের দশক, সত্তরের দশক, আশির দশক, নববইয়ের দশক, শূন্যের দশক, দ্বিতীয় দশক এভাবে ভাগ করা হচ্ছে কেন? আমাদের তরুণরা এসব ভাগাভাগি নিয়ে বেশি মাতামাতি করছে। আমি এটা একদমই মেনে নিতে পারি না। এছাড়া সাহিত্যের এই দশকওয়ারি বিচার করাটা একদিক থেকে আমাদের সাহিত্যিকদের নিজেরই অপমান করা হয়। যখন বলা হয় ষাটের দশকের লেখা, তখন প্রচ্ছন্নভাবে হলেও বলা হয়, লেখাটি অনেক পুরনো লেখা। এটা বললে পৃথিবীর বহু সাহিত্যকে বাতিল করে দিতে হয়। ষাটের দশকের লেখা যদি বাতিলযোগ্য হয়, তাহলে সেটা তখন-ই বাতিলযোগ্য ছিল, আর এখনো বাতিলযোগ্য। আর যদি তারা টিকে থাকে, চিরকালই টিকে থাকবে। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা আগে ঠিক করে নেওয়া উচিত। এটা কোন পদ্ধতিতে সাহিত্যের দিকে তাকানো? এটা উচিত নয়। সাহিত্য টেকসই হয়। অনেকে মনে করেন যে, সাহিত্য অজনপ্রিয় হলেই টেকসই হবে। কথাটা ঠিক নয়। জনপ্রিয় হয়েও সাহিত্য টেকসই হয়। শরৎচন্দ্র টেকসই হয়েছেন। শরৎচন্দ্রের নাম উচ্চারিত হলেই আমরা বলে দিতে পারি এই মাপের লেখক। আজ থেকে শত বছর পরে কী হবে তা আমি জানি না। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এই মাপেরই লেখক। ঠিক তেমনিভাবে শওকত আলীকে বলা হয় পঞ্চাশের দশকের একদম শেষভাগের লেখক। এবং পরের যে-দশক আমাদের সাহিত্যে আধুনিকতার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে ভাবা হচ্ছে, তার কিছু কিছু স্ফুলিঙ্গ শওকত আলী তাঁর নিজের মধ্যে বহন করেছেন। পিঙ্গল আকাশ এমনি একটি লেখা। আমি এই রকম বিচারের সম্পূর্ণ বিরোধী, যা টেকার তা টিকবেই। এই মুহূর্তে যিনি লিখছেন, তিনি যদি একটি মুহূর্তকে চিহ্নিত করতে পারেন, আলাদা করে ফেলতে পারেন, সময় থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা তারকার মতো চিহ্নিত করতে পারেন, তাহলে ওই তারা আর নিভবে না। সেজন্যে অনেকে মনে করেন, শওকত আলী যখন পঁচাত্তর পেরিয়েছেন, আশি ধরেছেন, লেখালেখি একদম ছেড়েই দিয়েছেন, এখন আর তিনি সেভাবে আলোচনায় আসছেন না। অথবা আসার খুব প্রয়োজন আছে বলেও যেন মনে হচ্ছে না।  তাহলে আমরা কি বাতিলযোগ্য, আমাদের যাদের বয়স হয়েছে, স্মৃতিশক্তি তেমন নেই, হাঁটার সামর্থ্য নেই, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি? দেবেশ রায় একবার বলেছেন, ‘খেলতে যখন নেমেছি, যতো খুশি ফউল করো, মাঠ কিন্তু ছাড়ছি না।’ কার ভাগ্যে কী আছে বলা যায়? রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়স পর্যমত্ম তীক্ষন-ধীর ছিলেন। যেমন ছিলেন তেমনি ছিলেন, বরং আরো তীক্ষনতর হয়েছিলেন। তা না হলে, ‘তোমার সৃষ্টির পথ’, কিংবা ‘রূপ-নারানের কূলে’ কিংবা ‘শেষ প্রশ্ন’ মৃত্যুর এক সপ্তাহ-দুই সপ্তাহ আগের লেখাগুলো লেখা সম্ভব হতো না। তাঁর লেখা এতটুকু স্মান হয়নি, পুরনো হয়নি, ক্ষয়ে যায়নি। মাত্র ষাট-বাষট্টি বছর বয়সে হেমিংওয়ে নিজেই মনে করলেন, আমার লেখা একরকম শেষ। আমার কোনো ক্ষমতাই নেই। নিজের মাথায় নিজেই গুলি করলেন। না লেখার ক্ষমতা, না নারী ভোগের ক্ষমতা, কোনোটিই যখন নেই, তখন আর শারীরিকভাবে বেঁচে থেকে কী লাভ। আবার বহু বৃদ্ধ লেখক সমানে লিখে চলেছেন। শওকত আলী সম্পর্কে আমার মনে হয়, এই সময়ের পাঠক ও লেখকের চোখে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন। যদিও তাঁর প্রদোষে প্রাকৃতজন নিয়ে বহু বিদগ্ধজন লিখেছেন, তারপরও আরো কিছু সমৃদ্ধ লেখা লিখেছেন। অসাধারণ কিছু লিখে ফেলার পরে কেউ কেউ বাকি জীবনই টেনে নিয়ে চলতে পারেন, কেউ ছাপিয়ে যান, কেউ পিছিয়ে পড়েন, কেউ মধ্যপথে হাঁপাতে থাকেন। শওকত আলী বাষট্টি সালের দিকে তাঁর প্রথম উপন্যাস পিঙ্গল আকাশ লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে একটির পর একটি অসাধারণ গল্প ও উপন্যাস লিখে গেছেন। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে লেখা তাঁর গল্পগুলো সত্যিই সুখপাঠ্য। প্রামত্মবর্গীয় জীবন, জোতদার, মহাজন, আদিবাসীদের নিয়ে লেখা কি কোনোদিন লয় পাবে? বাংলা সাহিত্য থেকে হারিয়ে যাবে? আমি অমত্মত বিশ্বাস করি না। অসাধারণ অনেক গল্প একমাত্র তাঁর কলম থেকেই বেরিয়েছে। স্থানীয় যে ঝাঁঝালো গন্ধ, স্থানীয় গন্ধ সবসময় মিষ্টিমধুর হয়, কোনো গাছে অত্যমত্ম ঝাঁঝালো, কোনো গাছকে নিংড়ালে যে-গন্ধ পাওয়া যায় সেটা অন্য রকমের। সেই গন্ধ নিয়ে ওই এলাকার মানুষের যে-গল্প তা অসাধারণ। তিনি যখন অভিনব একেকটি গল্প লিখে চলছেন, তখন আমার মনে হয়েছিল, আচ্ছা, এমন গল্প সমরেশ বসু কি লিখেছেন, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী কি লিখেছেন, কিংবা আমাদের জগদীশ গুপ্তের গল্পের কথাও ভেবেছি। খুঁজে দেখিছি। কিন্তু না, শওকত আলী সকলের চেয়ে আলাদা। উনি ওনার মতো করে গল্প লিখেছেন। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় উত্তরাঙ্গ নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু শওকত আলী শওকত আলী-ই। তিনি তাঁর মতো করেই লিখছেন। শওকত আলীর এই সমসত্ম খুবই জীবমত্ম গল্প। এই গল্পগুলো আমি মনে করি, এই ভূখণ্ডেরবাংলা ভাষার মানুষদের চিরদিনের পাঠ্য অবশ্যই। আর অনুবাদের ভাগ্য খারাপ। বাংলার অনুবাদ ইংরেজিতে কেন দাঁড়ায় না, আমি বুঝতে পারি না। দুই ভাষাতে কী যেন একটু তুমুল কলহ আছে! ইংরেজিকে কিছুতেই উপনিবেশ স্থাপন করতে দেবে না। বাংলা থেকে ইংরেজি অনুবাদ তেমন ভালো হলো না। পৃথিবীতে আমরা রাতকানা হয়েই কাটালাম। আমাদের আর কিছুই হলো না। আমাদের সকলের ভাগ্যে যা আছে, শওকত আলীর ভাগ্যেও তাই ঘটছে।

প্রদোষে প্রাকৃতজন মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, বিশেষ করে অনেকটা কেন্দ্র ছিল গৌড় এবং পু-্রবর্ধন ওই এলাকার পাল রাজা, সেন রাজাদের শাসনামলের কাহিনি। খুব প্রশংসিত হয়েছে উপন্যাসটি। যথেষ্ট পড়াশোনা করেছেন। যদিও আমি মনে করি, উপন্যাসটিতে কিছুটা ঝুঁকে পড়ার ব্যাপার আছে। মানুষ ঠিক সোজা হয়ে দাঁড়ায় না। একটু বাঁয়ে কাত, একটু ডানে কাত, একটু সামনে ঝুঁকে পড়া। বাঙালি নারী তখন কী গহনা পরতেন, কী পোশাক পরতেন, দৈনন্দিন জীবন কেমন ছিল, এটা কিন্তু রোমান্সও বটে। অসিত্মত্বে ফেরা মানেই রোমান্স। পেছনের রহস্য মাখানো। যার মায়াটি একটি কুহকী, যে কুহকী মায়া আমি কোনোদিন অনুভব করব না। আমার নিজের জীবনেই এমনটা ঘটেছে। ১৭ বছর যে কুহকী মায়াতে আমি পড়েছিলাম রাঢ়ের মাটিতে, কী যে প্রেম আমার সেই মাটির সঙ্গে, এখনো সেই মায়া কাটিয়ে উঠতে পারিনি।

কাজেই, শওকত আলী প্রদোষে প্রাকৃতজনে যে ফিরে গিয়েছিলেন, তখন খুব আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। খুব সূক্ষ্মভাবে তাঁর একটা ঝুঁকে পড়ার জায়গায় আছে। এই জায়গাটাতেই আমার আপত্তি। আমি মনে করি, যে-কোনো সাহিত্যিকের জন্য ঝুঁকে পড়াটা এজন্যে অন্যায্য, ঝুঁকে পড়লেই তো ওই জায়গাটাতে আমি আর বিচার করছি না। মেনে নিচ্ছি। এতক্ষণ আমি ঝকঝকে চোখে দেখছিলাম, তখন আমার দৃষ্টির চশমাটা পালটে নিয়েছি। তারপরেই আবার শওকত আলী ফিরে গেছেন অন্য উপন্যাস লেখার দিকে। যে-উপন্যাসগুলো অনেকটা তারাশঙ্করীয়। যেমন দলিল, ওয়ারিশ ইত্যাদি। তারাশঙ্করের এলাকা আমি চিনি, শওকত আলীর মধ্যে কাছাকাছি একটা জিনিস চলে আসে। উপন্যাসের ভালো মন্দ বিচার করা কঠিন। উপন্যাস কতটা ভালো হয়েছে, আমি এখানে বিচার করতে পারব না। আর করলেও মুহূর্তের মধ্যে আর একজন আমার বিপরীত কথা বলতে পারবেন। শওকত আলী কিছু উপন্যাস লিখেছেন যেগুলো বেশ সুখপাঠ্য, উঁচু শিল্পমানের। আমার কাছে তাঁর লেখার মূল্য অপরিসীম।

Wednesday, February 24, 2021

স্বর্ণালী বৃক্ষের শাখা থেকে by বিজয় কুমার

কয়েক বছর আগে মাস্টার-স্কলার, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদ শেলডন পোলক সংস্কৃত ও অন্যান্য ভারতীয় ক্লাসিক ভাষার অবস্থা সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিন হাজার বছরের জ্ঞান, পাণ্ডিত্য ধারণ করে থাকা ভাষাগুলো এখন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। পণ্ডিত, বিদ্বান, মুন্সিরা হারিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সাথে ভারতীয় প্রাচীন ভাষাবিষয়ক বিপুল জ্ঞানও বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এসব ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চেষ্টাও ক্ষীণ।
এই পরিস্থিতিতে ভালো অনুবাদ বিপুল ভূমিকা পালন করতে পারে। প্রাচীন সাহিত্যগুলো ইংরেজিতে অনূদিত হওয়া উচিত। এতে তরুণদের কাছে অতীতের দরজা খুলে গিয়ে ভারতের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের জ্ঞান বাড়িয়ে দিতে পারে।
কূটনীতিক, পণ্ডিত ও বর্তমানে অনুবাদকে পরিণত এ এনডি হাস্কার খুশিমনে এই কাজেই নিয়োজিত হয়েছেন। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই দায়িত্বটি গ্রহণ করেছেন। তিনি খুব যত্নের সাথে আধুনিক ভাষাতে দায়িত্বটি পালন করে যাচ্ছেন।
ঋতুসম্বরণ: সংস্কৃত সাহিত্যের অনুবাদের হাস্কারের সংক্ষিপ্ত ভাণ্ডারে সর্বশেষ সংযোজন হলো ‘অ্যা গ্যাদারিং অব সিজন্স’।  তিনি এতে ছন্দ, মাত্রা ও সৌন্দর্য রূপান্তরে যে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই বিরল।
ইংরেজিতে হয়তো বিশ্বাস করা হয়ে থাকে, ইউরোপের রোমান্টিক কবিরাই প্রথম স্বতন্ত্র থিম হিসেবে প্রকৃতিকে নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু বাস্তবে তাদের অনেক আগেই কালিদাস যে সহিত্য সৃষ্টি করে গেছেন, তা অনেক বেশি প্রাণবন্ত, সজীবন ও কালোত্তীর্ণ। অনুবাদে হাস্কারও একই ধরনের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে মূলকেই ইংরেজিতে তুলে ধরেছেন। প্রাচীন সাহিত্যকেই তিনি আধুনিকভাবে উপস্থাপনের কাজটি করেছেন অত্যন্ত মুন্সিয়ানার সাথে।
কালিদাস প্রকৃতিকে কালোত্তীর্ণ বহুমুখিতার পরিচয় দিয়েছেন আশ্চর্য দক্ষতার সাথে। চিরায়ত ভারত বছরকে ছয়টি ঋতুতে ভাগ করে। ইউরোপিয়ানদের ঋতু চারটি: গ্রীষ্ম, বসন্ত, শরৎ ও শীত। সৌর পঞ্জিকার ভিত্তিতে তৈরি ভারতে ঋতু ছয়টি। এগুলো হলো গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত।
কবিতাগুলো প্রতিটি ঋতুতে সংশ্লিষ্ট ছবি প্রাণবন্তভাবে তুলে ধরেছে। পৃথিবী ও আকাশ, চাঁদ ও সূর্য, নদী ও হৃদ, পাখি ও প্রাণি, বৃক্ষ ও পুষ্প সবকিছুই আছে প্রাচুর্যপূর্ণভাবে। এখানে প্রায়ই দেখা যায়, মানুষ, বিশেষ করে তরুণীরা তার প্রেমিকের জন্য অকূলভাবে অপেক্ষায় থাকে। আকাঙ্ক্ষা আর আকূলতা সবসময়ই দেখা যায়।
মোট ছয় সর্গে ১৪১টি শ্লোক ছিল মূল সংগ্রহে। ১৬টি অতিরিক্ত শ্লোক পরে ইউরোপিয়ান ভারততত্ত্ববিদেরা আবিষ্কার করেছিলেন। এগুলোও হাস্কারের অনুবাদে উঠে এসেছে। পাঠকেরা যেসব পরিভাষার সাথে পরিচিত নয়, হাস্কার সেগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে বিষয়টিকে খোলাসা করে দিয়েছেন। ফলে পাঠক অবলীলায় প্রাচীনকালে চলে যেতে পারেন।
অনুবাদে একটি অদ্ভূত কাজ করেছেন হাস্কার। তা হলো বৃক্ষ ও পুষ্পের ভারতীয় নাম ব্যবহার করেছেন। আর প্রাণির জন্য করেছেন ইংরেজি নাম। ফলে অশোক গাছ, কুমড়া ফুল ইংরেজিতেই পাওয়া যাচ্ছে। তবে হাতি, মৌমাছি ইত্যাদি ইংরেজিতে পড়তে হয়।
সংস্কৃত সাহিত্য এভাবে অনুবাদ করা আরো কঠিন কাজ। তিনি সেটিই করেছেন বেশ অবলীলায়। হাস্কারের মতো অনুবাদে ক্লাসিক ভারতের সন্ধানপ্রার্থীদের চোখ আর মন খুলে দেয়।

Thursday, February 18, 2021

লেওনার্ড কোহেন : অতলের অনুবাদক by আনিস পারভেজ

বোধের অনুবাদ করতে কবি ধ্বনিকে শব্দে গাঁথেন। এর উল্টো যাত্রায় শব্দ ধ্বনি হয়ে অস্তিত্বের অতল স্পর্শ করে। লেওনার্ড কোহেন কবি ও সঙ্গীতকার, যিনি সুরে ও কথায় আমাদের অতলকে অনুবাদ করেছেন।
বাবার মৃত্যুতে শিশু কোহেন তার অনুপস্থিতি কতটা টের পেয়েছে? বড়রা কাঁদছে, প্রার্থনা করছে। ইহুদি যাজক মৃতদেহের সৎকার করেছে মন্ট্রিয়লের গোরস্তানে। বাড়িতে শীতের বাতাস শরীর ভেদ করে যায়। সমস্ত উচ্চারণ হিম হয়ে আছে। এই স্তব্ধতার ভেতর কোহেন বাবার বো টাই-এ কিছু একটা লিখে বাবাকে গোর দেয়ার মতো বাড়ির সামনে বরফ সরিয়ে মাটির ভেতর পুঁতে দেয়। সেদিন কী লিখেছিল কোহেন—বড় হয়ে স্মৃতিতে তা আর কোনো ভাবেই ধরা দেয় না। কোহেন জীবনভর অবিরত স্মৃতির ধোঁয়াশা হাতড়েছে সেই লিপি খুঁজে পেতে, জানতে চেয়েছে সে কী লিখেছিল। জানা হয়নি।  কিন্তু তার খোঁড়াখুঁড়িতে আমরা পেয়েছি গান ও কবিতা, আমরা পেয়েছি আমাদের অতলের স্পর্শ।  
১৯৩৪ এর ২১ সেপ্টেম্বর লেওনার্ড নরমেন কোহেনের জন্ম মন্ট্রিয়লে একটি অভিবাসী ইহুদি পরিবারে। নাথান ও মাশা কোহেন তার বাবা মা। অভিবাসনের বেদনা থাকে, থাকে গল্প, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে একটি নদীর মতো বয়ে চলে। সেই নদীতে মাশা কোহেনকে স্নান করিয়েছে, স্নানের জল ঝরেছে কোহেনের কথা ও সুরে। তাই প্রচলিত ধর্মে বিশ্বাসী না হলেও তার সৃষ্টি পুষ্টি নিয়েছে ইহুদি গাঁথা থেকে।
১৯৪৯-এর গ্রীষ্মে পুরনো বইয়ের দোকান থেকে কোহেন গার্সিয়া লোরকার কবিতার বই কেনে। ইহুদি গাঁথার উষ্ণতা নিয়ে যেন একটি প্রবাল দ্বীপে এসে পৌঁছে কোহেন—ডুবে থাকে লোরকায়। ঠিক সেসময় বাসার পাশে বিকেলের পার্কে দেখা হয় এক অচেনা যুবকের সাথে। হিস্পানিক যুবক গীটারে সুর ভাজছিল। প্রবাল দ্বীপে অন্যরকম বাতাস বয়ে গেলো। পরিচয়য়েই সখ্য, কোহেন যুবকটির কাছে গীটারে লেসন নিচ্ছিল। ক’দিন থেকে হিস্পানিক যুবকটির দেখা নেই। খোঁজ নিয়ে জানতে পেলো, গীটার বাজানো হিস্পানিক যুবক গলায় দড়ি দিয়েছে। মৃত্যু, লোরকা এবং ইহুদি গাঁথা লেওনার্ড  কোহেনের অবচেতনে শুদ্ধতম টোকা, যার প্রতিধ্বনি তার পরবর্তী জীবনের সমস্ত  উচ্চারণ ও নীরবতা।
ম্যাকগ্রিলে ছাত্রাবস্থায় লেওনার্ড কোহেনের কবিতা বেরিয়েছে মুদ্রিত হয়ে। আড্ডায় ও বৈঠকে তার স্বকণ্ঠ কবিতা পাঠ। কবিতায় কোহেন অধরাকে ধরতে চেয়েছে, যেমন তার উদগ্রীবতা চোখের সামনে যে মানুষটিকে দেখি, দেখি তার বাইরের রূপ, তার ভেতরের অদেখাকে দেখা। জগতকে দেখতে চাই সম্মোহন। এক বন্ধুর বাবার কাছ থেকে সম্মোহনের পাঠ নিয়ে বাসার পরিচারিকাকে সম্মোহিত করে বিবস্ত্র করে কোহেন বুঝতে পারে অজানার অতল অনেক দূর। চাই একটা পরিব্রাজকের জীবন—লোকালয় থেকে লোকালয়ে, নারী থেকে নারীতে।
শুরু হল পথের জীবন—নিউইয়র্কের গ্রিনউইচ ভিলেজ, নাশভিল হয়ে লন্ডনে। ইতিমধ্যে বেরিয়েছে কাব্যগ্রন্থ, জুটেছে স্বীকৃতি—পুরস্কার, এবং নারীর ভালোবাসা। পোশাক খুলে শরীরের ভেতরে ঢুকেছে কোহেন, পরিপূর্ণ শরীরকে বিশুদ্ধ মন দিয়ে ছুঁয়েছে। কিন্তু অতল রয়েছে অধরা।
১৯৬০-এর মার্চ, লন্ডনের বৃষ্টি ভেজা বিকেল, আত্মায় শূন্যতা বয়ে কোহেন গন্তব্যহীন হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে Bank of Greece-এ এক আগন্তুকের সাথে দেখা, সে গল্প বলছে গ্রিসের অ্যাজিয়ান দ্বীপের। মুহূর্তেই একটা গন্তব্য পেয়ে গেল কোহেন—গ্রিসের হাইড্রা। হাইড্রায় অতলের তল একটু একটু করে উঁকি দিল। নাবিককেও হতে হয় ডুবুরি, ডুবুরিকে নাবিক। নাবিক পৌঁছে গন্তব্যে, ডুবুরি অতলে। মানুষকে নাবিক আর ডুবুরি দুটোই হতে হয়। অন্তর্গত এ বোধের অনুবাদে কোহেন বলে:
And Jesus was a sailor
When he walked upon the water
And he spent a long time watching
From his lonely wooden tower
And when he knew for certain
Only drowning men could see him
He said "All men will be sailors then
Until the sea shall free them”
ভূমধ্যসাগরের জল দখিনের হাওয়ায় উড়ে এসে হাইড্রাকে ভিজিয়ে দেয়। ছোট্ট একটি দ্বীপ, ধুলো উড়িয়ে যায় গাধা টানা গাড়ি। সময় এখানে মন্থর।  সারাদিন লিখে বিকেলে কোহেনের আড্ডা একটি পানশালায়, সেখানে দেখা মারিয়ান্নে ইহলেনের সাথে। মারিয়ান্নের স্বামীর সাথে কোহেনের বন্ধুত্ব, সেই বন্ধুত্বের সেতু পার হয়ে মারিয়ান্নের সাথে গড়ে ওঠে প্রণয়। অতলের সন্ধানে কোহেন অনুভূতির সব রঙে নিজেকে রাঙায়। রঙ উঠে আসে তার লেখায় ও সুরে। কোহেনের প্রথম এলবাম Songs of Leonard Cohen বের হয় ১৯৬৭-তে। আপাত মেলানকোলিক স্বর কিন্তু গভীরতায় বিমূর্ত প্রার্থনার চাইতেও বিশুদ্ধ ব্যালার্ড তার সঙ্গীত। একই ধারায় এলো আরও কিছু এলবাম।
১৯৮৮-এর I’m Your Man ভিন্ন ধারা নিয়ে এলো, কি-বোর্ড আর ইলেকট্রনিক সঙ্গীতে প্রার্থনা ও  অনুসন্ধানের ভাষা চিরায়ত আবেদনের পাশাপাশি সমসাময়িক ব্যঞ্জনা পেলো। নন্দিত সাধক জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। ৯০ দশকের মাঝামাঝি সাধক খুঁজলো নীরবতা, নিজেকে আড়াল করলো জেন বৌদ্ধ সাধনাগারে। ধ্যানমগ্ন কোহেনের শরীরে মন্দিরের ভেজানো জানালা দিয়ে আলো আসে, অজানার কিরণ তার শরীর কেটে অস্তিত্বের ভেতরে ঢুকে পড়ে, যেন মাখনে চাকু—তেমনি অনায়াস কিরণের ছটা। সেই কিরণে লেওনার্ড কোহেন বিস্মৃত হয়, কোনো শব্দ শোনে না, কেনো না অতলের জগত তো শব্দহীন, আদিতে কোনো নাম নেই।  কোহেন সুরের ভাঁজে ভাঁজে গেঁথে দেয় অতলের উচ্চারণ:
The light came through the window
Straight from the sun above
And so inside my little room
There plunged the rays of love
In streams of light I clearly saw
The dust you seldom see
Out of which the nameless makes
A name for one like me
কিছুকাল জেন ধ্যানাগারে থেকে নাগরিক জীবনে ফিরে আসে কোহেন। জানতে পারে তার ৫ মিলিয়ন ডলার বেহাত হয়ে গেছে ম্যানেজারের কারসাজিতে। নিমিষেই কপর্দকশূন্য ষাটোর্ধ্ব কোহেন বিমুঢ়তা কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় আবারও পথে নামতে হবে—কথা ও সুর তার পুঁজি।
কোহেন তো সবসময়ই জানতো, I was born like this, I had no choice, I was born with the gift of a golden voice; তাই সোনালি কণ্ঠ আর অতলের স্বর নিয়ে নতুন পাঁচটি এলবাম ও  দুই শতাধিক কনসার্ট নিয়ে ৮২ বছর বয়স পর্যন্ত কোহেন দেশ দেশান্তরে। শেষ পনেরো বছরে তরুণদের কাছে তার আবেদন হয়ে উঠেছে কল্পনাতীত যারা তাঁকে সাধারণত এড়িয়ে যেত বিষাদের নবী বলে। তৃতীয় পর্বের সঙ্গীতে কোহেন বিষাদের পোশাকের ভেতর মানুষের আত্মার মুক্তিকে তুলে এনেছে। মুক্তিতে প্রশান্তি আছে, এবং আছে উৎসব। উৎসব, প্রশান্তি ও বিষাদের যুগলবন্দী শেষ পাঁচটি এলবাম।
জগত ধোঁয়াশা, কিন্তু একটা সময়ে মানুষের হয়তো দৃষ্টি  খুলে যায়। আশির্বাদপুষ্টরা বুঝতে পারে মিশন পূর্ণ হয়েছে, এবার ঘরে ফেরার পালা। ২১ অক্টোবর ২০১৬ লেওনার্ড কোহেনের শেষ এলবাম বের হয়—You Want It Darker, যেখানে কোহেন জানিয়ে দেয় “Hineni, hineni; I’m ready, my lord”। নিজেকে উৎসর্গ করার ক্ষুধা মানুষের অন্তরতর, যদিও আমরা জানি না উৎসর্গ কখন ও কাকে।  সহসাই একটি মুহূর্ত উপস্থিত হয়, মানুষ জেনে যায় সময় এসেছে উৎসর্গের। “Hineni, hineni” অর্থাৎ আমি হাজির, ঘোষণা দেয়ার তিন সপ্তাহ পর লেওনার্ড কোহেন ৭ নভেম্বর ২০১৬ ফিরে যান আদিতে, জন্মের মাধ্যমে যেখান থেকে মানুষের বিচ্ছেদ এবং মৃত্যুই আবার সেখানে ফিরিয়ে আনে।  মাঝখানের সময়টাতেই কেবল আমরা অতল খুঁজে বেড়াই।
অতল খুঁজতে খুঁজতে আমাদের উপলব্ধি হয় সৃষ্টি নিজেকে ভেঙে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে আছে। আমাদের কাজ অংশগুলোকে আবারও সমগ্রে ফিরিয়ে আনা। লেওনার্ড কোহেন তার শব্দ ও সুরে সেই সমগ্রকেই গেঁথেছেন। আমরা যারা এখনও অংশগুলো জোড়া দিচ্ছি এবং এখনও সমগ্রে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় আছি, আমাদের কাজ ও আমাদের অপেক্ষা অন্তর্দৃষ্টি পায় কোহেনের সঙ্গীতে।

Wednesday, February 17, 2021

তবুও কামনা সন্তানেরা ভালো থাকুক by আবুল কালাম

তবুও কামনা সন্তানেরা ভালো থাকুক
সন্তানদের কাছে উপেক্ষিত হয়েও সন্তানের প্রতি বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণদের ভালোবাসা এতটাই গভীর ও নিঃস্বার্থ যে ছেলেমেয়ের জন্য সবসময় তারা মঙ্গল কামনা করেন। সন্তানদের নির্মমতার পরও সবার প্রার্থনা ও কামনা সন্তান ভালো থাকুক। অনেকটা মোঘল সাম্রাজ্যে সেই ইতিহাসের মতো, রুগ্ন পুত্র হুমায়ুনকে নিজের জীবনের বিনিময়ে বাঁচাতে সম্রাট বাবর আল্লাহর কাছে মুনাজাত করেছিলেন। ফলে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন হুমায়ুন। আর মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন সম্রাট বাবর। পিতার এমন আত্মত্যাগের পরও বৃদ্ধ বয়সে এসে কোনো কোনো সন্তানের কাছে বাবারা ‘বোঝা’ হয়ে পড়েন। যাদের ঠিকানা এখন বৃদ্ধাশ্রম। বৃদ্ধ বয়সে যখন সন্তানের ভালোবাসা ও সেবাযত্ন পাওয়ার কথা, সে সময় বৃদ্ধাশ্রমই তাদের শেষ ভরসা। যাদের জন্য সব ছেড়ে তারা আজ নিঃস্ব তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, ক্ষোভ থাকলেও অভিশাপ নেই। মৃত্যু পর্যন্ত সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন তারা।
আশ্রমে থাকা প্রবীণদের মধ্যে যারা কথা বলেছেন, তাদের প্রত্যেকের কথায় সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অভিমানের বিষয়টি উঠে এলেও অভিশাপ ছিল না। তবে প্রায় প্রত্যেকেই তাদের জীবনের ঘটে যাওয়া কাহিনী বলতে গিয়ে কেঁদেছেন। সব অভিযোগে পর একজনের ভাষ্য, ‘যাই হোক সন্তানতো। তারা ভালো থাকুক’।
একজন বললেন, ‘আমার যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। এখন মরতে পারলেই বাঁচি। তবে সন্তানদের অভিশাপ দেই না। যাই করুক আমিই তো তাদের পেটে ধরেছি। আমি কষ্টে থাকি অসুবিধা নেই। আমার ছেলেমেয়ে সুখে থাকুক। মা হয়ে সন্তানদের কি করে অভিশাপ দেব’।
আরেকজন সরকারি উচ্চপদে চাকরি করতেন। ১০ বছর আছেন এখানে। প্রায় ঘণ্টাখানেক কথা বললেন। তার প্রতিটি কথায় ছিল সন্তানদের দুর্ব্যবহারের ভয়াবহ বর্ণনা। বিদায় নেয়ার আগের কথায় মনে হলো এতক্ষণ যা বর্ণনা দিয়েছেন সবই ভুলে গেছেন। বললেন, ‘আমার তো আর হারানোর কিছু নেই। আর ক’দিন বাঁচব। সুতরাং এত কিছুতেও কষ্ট নেই। সন্তানগুলো ভালো থাকুক। আমার অভিশাপে যদি তাদের কোনো ক্ষতি হয় তবে তো তারা কষ্টে থাকবে। এ জন্য কারো কাছে কিছু বলতে চাই না। তোমাকে বললাম। যাক অতীত ভুলে থাকতে চাই’।
অপরজনের ভাষ্য, ‘অভিযোগ যাই করি সবই মনের কষ্টে। তবে বাবা-মায়ের কাছে সব সন্তানই সমান। আমার সন্তানেরাও আমার কাছে প্রাণের চেয়েও প্রিয়। যার কারণে আমি কষ্ট করলেও কোনো কারণে তারা আমার মতো এমন জায়গায় এসে কষ্ট করুক তা চাই না। কারণ বাবা হয়ে আমি তা সহ্য করতে পারবো না’।
আরেকজন বললেন, ‘ওরা ছোট মানুষ, হয়তো বুঝতে পারেনি বলে আমার সাথে এমন আচরণ করেছে। যাক যা হওয়ার তো হয়েই গেছে। এখন আমি ছাড়া যদি ওরা ভালো থাকে তাতে ক্ষতি কি। আমারই তো সন্তান। পিতা হিসেবে সবসময় তাদের জন্য দোয়া করি। সন্তান তো অপরাধ করবেই। কিন্তু পিতা হিসেবে উচিত তাদের ক্ষমা করে দেয়া। কারণ আমরা অভিশাপ দিলে ওরা কোথায় যাবে’?

Tuesday, February 16, 2021

সিকিমের অকথিত কাহিনী by কে পি ফ্যাবিয়ান

লেখক জি বি এস সিধু সত্য কথা ও তা প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বর্তমান সময়ে এটি একটি বিরল কৃতিত্ব। কারণ বর্তমান এস্টাবলিশমেন্টের স্বার্থ থাকায় এখন ইতিহাসের পুনঃলিখন ভারতে বেশ বিকশিত শিল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বলা হয়ে থাকে, সর্বশক্তিমানের চেয়েও শক্তিধর ইতিহাসবিদ। সর্বশক্তিমান অতীতকে বদলাতে পারেন না, কিন্তু ইতিহাসবিদ পারেন, যদি তিনি সততার সাথে কাজ করতে পারেন। সিধু খুবই সৎ থেকেছেন, যা ঘটেছে, সে সম্পর্কে প্রায় পুরো সত্য আমাদেরকে বলেছেন।
রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (র) নামের গোয়েন্দা সংস্থাটির সিকিম অফিসের প্রধান ছিলেন তিনি। অন্যান্য দেশ সাদাকে সাদাই বলে। জার্মানির সংস্থাটির নাম ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি, রাশিয়ারটিকে বলা হয় ফরেন ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি। ১৯৬৮ সালে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) থেকে সংস্থাটি আলাদা হয়েছিল। সিধু ১৯৭৩ সালে গ্যাংটকে গিয়েছিলেন, ১৯৭৫ সালে একীভূত হওয়ার পর ফেরেন। র-এর কিংবদন্তিপ্রতীম প্রধান আর এন কাওয়ের নিখুঁত ছকের তিনি ছিলেন প্রধান কুশীলব। আর কাজটি করেছেন পররাষ্ট্রসচিব কেওয়াল সিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায়। কাজটি শুরু করা ছিল প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সিদ্ধান্ত।
বইটির সূচনা মনোমুগ্ধকর। ১৯৭৭ সালে কাও ত্যাগ করেন র। তিনি ১৯৮৮ সালে সিকিমের একীভূত হওয়া নিয়ে একটি বই লিখতে সিধুকে অনুরোধ করেন। সিধু তখন ছিলেন র-এর সদরদফতরের যুগ্ম সচিব। কাও তাকে বলেন যে সংস্থাটি ৫ বছরে দুটি বড় ধরনের অভিযান (একটি বাংলাদেশে অপরটি সিকিমে) চালিয়েছে। বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কিছু লেখা হলেও সিকিম যবনিকার অন্তরালেই রয়ে গেছে। সিধু ও তার বস পি এন ব্যানার্জিসহ (কলকাতাভিত্তিক) মাত্র তিন থেকে চারজন এ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ব্যানার্জি ১৯৭৪ সালে পরলোকগমন করেন। কাও এমনকি তার ডেপুটি ও পরে তার উত্তরসূরী হওয়া কে সনকরন নাইয়ারকে পর্যন্ত অন্ধ রেখেছিলেন। কাওকে সিধু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি অবসরগ্রহণের পর বইটি লিখবেন। ১৯৯৮ সালে তিনি অবসরগ্রহণ করেন। তবে পারিবারিক কিছু বিষয়ে তাকে মনোযোগ দিতে হয়েছিল। তার স্ত্রী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্মরণ সিংয়ের মেয়ে ইকবাল অসুস্থ হয়ে পড়েন। লিওমিসারকোমায় আক্রান্ত ইকবাল ২০১৭ সালে পরলোকগমন করেন। সিধু ২০১৭ সালে তার বইটি লেখা শুরু করেন। এর মাধ্যমে ২০ বছর আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি পূরণের কাজ শুরু করেন।
সৌভাগ্যবশত, সিধু বেশ ভালো একটি ডায়েরি রাখতেন। তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নেহরু মিউজিয়াম অ্যান্ড লাইব্রেরির সাথে প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি ওই সময়ে থাকা প্রখ্যাত কর্মকর্তাদের সাথেও যোগাযোগ করেন। তিনি ইগোকেন্দ্রিক প্রলোভন দমন করতে সক্ষম হন। তিনি অন্যদের ভূমিকা লিপিবদ্ধ করার দিকে বেশ যত্নবান হন।
এতে মোট অধ্যায় আছে ১৪টি। পাঠকেরা এখানে ওই সময় সিকিম শাসনকারী নামগিয়াল রাজবংশ ও ভারতে ব্রিটিশ সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে চুম্বক অংশ তুলে ধরেছেন। ১৯৪৭ সালে সর্দার প্যাটেল ও বি এন রাওসহ (সাংবিধানিক পরিষদে সাংবিধানিক উপদেষ্টা) অনেকেই সিকিমসহ রাজাশাসিত রাজ্যগুলোকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আদর্শবাদ, সর্বএশিয়া ভিশন, এই অঞ্চলের প্রতি চীনা উদ্বেগের মতো বিষয়গুলোর কারণে সিকিমকে বিশেষ ইস্যু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। নেহরুর মনোভাবই জয়ী হয়েছিল। গণতান্ত্রিক সংস্কার প্রতিরোধ করার সময় চোগিয়ালকে সমর্থন করে ভারত।
ইন্দিরা গান্ধী তার বাবার কাছে কখনো কারণ জানতে চাননি। তবে তিনি তার ঘনিষ্ঠ সহকারী পি এন ধরকে বলেন, নেহরু সম্ভবত এমন কিছু করতে চাননি যাতে করে চীন ক্ষুব্ধ হয়। তিনি আশা করেছিলেন যে ভারত যদি সিকিমকে একীভূত না করে, তবে তিব্বতের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি চীন শ্রদ্ধা পোষণ করবে। ইন্দিরা নিজে পুরোপুরি প্যাটেলের মনোভাবের সাথে একমত ছিলেন। ঘটনাক্রমে ১৯৪৭ সালে ক্ষমতা হস্তান্তরের ১৫ দিন পর সিকিম ১৮৩৫ সালে ছেড়ে দেয়া দার্জিলিং ফিরে পাওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল।
স্থিতিবস্থার চুক্তি
স্বাভাবিকভাবেই সিকিমের শাসক নেহরুর প্রতি খুশি ছিলেন এই কারণে যে তিনি সফলভাবে ভারতের সাথে সিকিমের একীভূত করার সব পদক্ষেপ ভণ্ডুল করে দিয়েছেন। তবে তাশি শেরিংয়ের নেতৃত্বাধীন সিকিম স্টেট কংগ্রেস ও অপর দুটি রাজনৈতিক দল চেয়েছিল সিকিমে গণতন্ত্র ও ভারতের সাথে একীভূত হওয়া। ভারত সরকার লোকরঞ্জক দাবি অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়ে চোগিয়ালকে তার ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ দেয়। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে নয়া দিল্লি সিকিমের সাথে স্থিতিবস্থা চুক্তিতে সই করে। পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষাসহ ১১টি বিষয় এতে স্থান পায়। পরে ১৯৫০ নতুন চুক্তি হয়।
শেরিং মারা যান ১৯৫৪ সালে। তার স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায়। দলের প্রধান হিসেবে তার উত্তরসূরী হন লেন্দুপ দর্জি কাজি। তিনি চোগিয়াল শাসনের বদলে সিকিমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও ভারতের সাথে একীভূত হওয়ার জন্য জনমত সংগঠিত করেন। তিনি না থাকলে একীভূত প্রক্রিয়াটি এত সাবলীলভাবে হতো না।
১৯৬৭ সাল থেকে চোগিয়াল ১৯৫০ সালের চুক্তিটি নতুন করে লিখতে আহ্বান জানাতে থাকেন। চুক্তির অধীনে সিকিম ছিল প্রটেক্টরেট বা করদ রাজ্য। চোগিয়ালের প্রধান দাবি ছিল, সিকিমের মর্যাদা ভুটানের সমান হওয়া উচিত। মনে হচ্ছে, তিনি নেহরুর কাছে প্রশ্নটি উত্থাপন করতে চাইছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন, বিষয়টি ইন্দিরা গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। তিনি পাশ্চাত্যে সিকিমের মর্যাদা বাড়ানোর পথ তৈরি করছিলেন। তিনি ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে দিল্লি গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত করেন। ওই সময় বিদেশ থেকে ফিরে এসেছিলেন টি এন কাউল। তিনি সিকিমবিষয়ক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কাউল পরে পররাষ্ট্র সচিব হয়েছিলেন।
চোগিয়ালের উচ্চাভিলাষের প্রতি কাউল সহানুভূতিসম্পন্ন ছিলেন। ১৯৭০ সাল নাগাদ পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে কাউল ‘স্থায়ী একত্রীকরণের’ জন্য সিকিমকে প্রস্তাব দেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ ছাড়া আর কেউ কোনো কথা বলেননি। তিনি বলেছিলেন, ‌আপনারা যা ইচ্ছা বলুন। আমি দাবি করব সিকিমে যেকোনো স্থানে সৈন্য মোতায়েন ও অভিযান চালানোর পূর্ণ স্বাধীনতা। ভারত ও চীনের মধ্যকার চলমান দোকলাম সঙ্কটের সময় তার ওই কথাগুলোর গুরুত্ব অনুধাবন করা গেছে।
সিকিমে র-এর একটি দায়িত্ব ছিল তিব্বতে চীনা কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করা ও চোগিয়ালকে অবহিত করা। চোগিয়ালকে নিয়মিত তা ব্রিফ করতেন সিধু। কিন্তু চোগিয়াল বুঝতেই পারেননি যে সিধু আসলে তার শাসন ধ্বংস করতে, সিকিমের ভারতের সাথে একীভূত করার কাজই ত্বরান্বিত করছেন। তিনি বিচক্ষণতার সাথে কাজটি সম্পন্ন করেন। ভারত এ ধরনের দক্ষতা ও সাবলীলভাবে অন্য কোনো দেশে অভিযান চালাতে পারেনি। সিধু ১৯৭৬ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছ থেকে ইন্ডিয়ান পুলিশ মেডেল লাভ করেন। সিধু দেখিয়েছেন, সিকিমকে ভারত দখল করেনি, বরং সিকিমের জনগণের আন্তরিক ইচ্ছার প্রতি সাড়া দিয়েছে মাত্র।
স্পেশাল ডিউটি অফিসের অফিসার (ওএসডি) ছিলেন পলিটিক্যাল অফিসারের থেকে আলাদা। এটি ছিল দারুণ ব্যবস্থা। ওএসডি সহকারীরা গ্যাংটক যখন মোটামুটিভাবে ঘুমিয়ে থাকত, তখন তাদের রাজনৈতিক যোগাযোগ করতেন।
পিও ছাড়াও ভারত থেকে যাওয়া প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন প্রশাসনের দায়িত্বে। সিধুকে কাও বলে দিয়েছিলেন, তিনি যেন চীন ও তিব্বত সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সিইওকে না জানান। কারণ তাতে করে চোগিয়াল কিছু আভাস পেয়ে যেতে পারতেন। ওই সময় সিইও বি এস দাস তার বই দি সিকিম সাগায় অভিযোগ করেছিলেন যে ভারতীয় গোয়েন্দারা তাকে কিছুই জানায়নি।
র-এর অফিসের উত্তরে থাকা আইবি অফিস সিকিমের ব্যাপারে সক্রিয় থাকে। সংস্থাটি চোগিয়াল ও তার এজেন্টদের ওপর নজর রাখতে থাকে। চোগিয়াল বা তার রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বোন কো কো লা কখনোই সিধুর কার্যক্রমের ফলে গণতন্ত্রীপন্থীরা উৎসাহিত হচ্ছে বলে ভারতের কাছে অভিযোগ করেনি। তবে তারা আইবির তৎপরতা নিয়ে ভারত সরকারের কাছে অভিযোগ করেছেন।
সিধু কিভাবে এই জটিল মিশনটি সম্পন্ন করেছিলেন, সে ব্যাপারে নজর দেয়া যাক। সাধারণভাবে ক্লায়েন্টদেরকে টাকা দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার যে প্রথা প্রচলিত ছিল, সিধুরা কিন্তু তা করেননি। কাজটি হয়েছিল গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর সাথে র-এর যোগসাজশের মাধ্যমে। গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো যাতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পায়, তা নিশ্চিত করেছে র।
জটিল মিশন
সিধু নিজেকে ভারত থেকে পাঠানো কাজির রাজনৈতিক সহকারী বিবেচনা করতেন। এটি সত্য যে সিধুর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে কিছু অর্থ দিয়েছিল ভারত। তবে নিজের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন তথা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে ধ্বংস করাসহ অন্যান্য কাজে চোগিয়াল যে পরিমাণ অর্থ ভারতের কাছ থেকে পেতেন, সে তুলনায় তা ছিল খুবই কম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, প্রাসাদ মেরামতের জন্য চোগিয়াল ২০ লাখ রুপি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি আরো ৩৫ লাখ রুপি দাবি করেন। তবে সিইও প্রাসাদে গিয়ে দেখেন যে মেরামতের কোনো কাজই করা হয়নি। সিধু বুঝতে পারেন যে চোগিয়াল পুরো অর্থ অন্য কাজে ব্যয় করেছেন।
সিধুর মিশন শুরু করার আগে চোগিয়াল ক্রমবর্ধমান গণআন্দোলনের মুখে পড়েন। ফলে তাকে রাজনৈতিক কর্মকর্তা কে এস বাজপাইয়ের প্রণীত একটি চিঠিতে সই করতে বাধ্য হতে হয়। এতে পিওকে প্রশাসন গ্রহণ করতে বলা হয়। বি এস দাসকে প্রধান প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়। ১৯৭৩ সালের এপ্রিলে দিল্লি ত্যাগ করার সময় তাকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে উৎসাহিত করতে বলা হয়, তবে ভারতের সাথে একীভূত করার মিশন সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। ১৯৭৩ সালের মে মাসে কেওয়াল সিং সিকিমে গিয়ে আইন পরিষদের নির্বাচন দিতে চোগিয়ালকে রাজি করান।
তারপর ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে কলকাতায় গিয়ে সিধু সাত দফার কর্ম পরিকল্পনা তৈরি করেন পি এন ব্যানার্জির সাথে পরামর্শ করে। লক্ষ্য ছিল চোগিয়ালকে নিঃসঙ্গ করা, গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে জোরদার করা, গণদাবির মুখে একীভূত করার পরিবেশ সৃষ্টি করা। নির্বাচন হয় ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে। সিধু খুবই খুশি হন এটা জেনে যে কাজির দল ৩২টি আসনের মধ্যে ৩১টি পেয়েছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, কাজির রাজনৈতিক সহকারী পর্দার অন্তরালে কাজ করেছিলেন। ১৯৭৪ সালের মে মাসে পরিষদ ইন্দো-সিকিম সম্পর্ককে আরো জোরদার করা এবং ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিকিমের অংশগ্রহণ করার পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানায়। অর্থাৎ পরিষদ একীভূত হওয়ার আহ্বান জানায়। চোগিয়াল এটি প্রতিরোধ করেন। সিকিম ‘সহযোগী রাষ্ট্রে’ পরিণত হয়। ১৯৭৫ সালের এপ্রিলে গণভোট হয়। এতে ৯৭ ভাগ ভোটার একীভূত হওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। একীভূত হওয়ার কাজটি হয় ১৯৭৫ সালের মে মাসে।
শেষ অধ্যায়ে সিধু জানান কিভাবে একটি সফল অভিযানের পরবর্তী কাজগুলো করার সময় তালগোল পাকিয়ে সেগুলো করতে ব্যর্থ হয়েছিল ভারত। সিধু ১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গ্যাংটক ত্যাগ করেন। কে এস বাজপাই ও বি এস দাস ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে ফিরে যান। ইন্দিরা গান্ধী তার দলে যোগ দিতে কাজিকে চাপ দেন, তিনি রাজি হন। ১৯৭৬ সালে ইন্দিরা গান্ধী আইবির পরামর্শের বিপরীতে কাজির বিরোধী হিসেবে পরিচিত সঞ্চয় গান্ধীকে যুব কংগ্রেসের প্রধান করেন। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে হেরে যান। পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী মরারজি দেসাই চেয়েছিলেন কাজি তার দলে যোগ দিক। ১৯৭৮ সালের মার্চে প্রধানমন্ত্রী দেসাই ঘোষণা করেন যে একীভূত করাটা ছিল একটি ভুল, তবে তা সংশোধন করা যাবে না। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে কাজির দল নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ১৯৯৫ সালের মে মাসে একীভূত হওয়ার ২০তম বার্ষিকীতে কাজি এক বিবৃতিতে একীভূত বাতিল করার আহ্বান জানান। ২০০২ সালে কাজি ৯৮ বছর বয়সে পদ্মভূষণ লাভ করেন। ৫ বছর পর তিনি মারা যান। ভারত তার সাথে আরো ভালো আচরণ করতে পারত।
সিধুর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণকারী কে পি বাজপাই, বি এস দাস ছিলেন ক্ষীণদৃষ্টির অধিকারী। তাদের ভুলে নানা অব্যবস্থাপনা ঘটে।
বইটি খুবই মূল্যবান, সাধারণ পাঠকের পাশাপাশি কূটনীতি ও গুপ্তচর বৃত্তির ছাত্রদের জন্যও খুবই উপযোগী।
লেখক: গ্রন্থকার, ডিপ্লোমেসি: ইন্ডিয়ান স্টাইল

এলারি একারস্-এর কবিতা: ভাষান্তর by মঈনুস সুলতান

কবি, শিশুসাহিত্যিক, শিল্পী ও নিসর্গবিদ এলারি একারস্-এর জন্ম ১৯৪৬ সালে। তিনি হার্বার্ড ও সানফ্রানসিসকো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তার কাব্যগ্রন্থ দুটি। ২০১৫ সালে ‘প্র্যাকটিসিং দ্যা ট্রুথ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি অটাম হাউস পোয়েট্রি প্রাইজ পান। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত তার ‘নকিং অন দি আথর্’ কাব্যগ্রন্থ ওয়েসলিয়ান নিউ পোয়েট সিরিজের জন্য নির্বাচিত হয়। এছাড়াও তিনি শিশুদের জন্য ‘সারাজ্ ওয়াটার ফল : অ্যা হিলিং স্টোরি আবাউট সেক্সুয়াল এবিউস (২০০৯)’ শিরোনামে একটি উপন্যাসও রচনা করেছেন। কবি উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করেন।
প্রায় চল্লিশ বছর ধরে পাখি পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি নিসর্গ নিবিড় পরিবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
ফার বৃক্ষের বনানীতে পাখি পরিসংখ্যান
খুব ভালোভাবেই জানি—একর জুড়ে থাকা বনানীর কোথায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। যখন এক ফোঁটা বৃষ্টি গড়িয়ে পড়ে হাকোলবেরির পাতা থেকে, কোথায় তা ঝরে পড়লো আমি তা অনুভব করি।ঘুরে ফিরে জানা হয়ে গেছে প্রতিটি পাখির নীড়ের নির্দিষ্ট অবস্থান। পরিচয় হয়েছে প্রতিটি আলাদা আলাদা কাকলীর গীতল ব্যঞ্জনার সঙ্গে, কোন বার্ডকল, কত প্রকারের কুজনে কথা বলছে কে কার সাথে, কোন খেচরটি শাসন করছে ছানাদের, ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে কোন পাখিটি। আমি সচেতন যে—কখন কমলাবউ পাখিটি ভুল করে ঢুকে পড়বে ভিন্ন এক খেচরের গণ্ডিতে, আর তাড়া খাবে তৎক্ষণাত।
আমার পরিবারে বাউন্ডারি বা নিজস্ব গণ্ডির বিষয়টি মানা হয় না তেমন। আমার জননী, যখন মদ্যপানে বেহেড, মাঝরাতে আমার কামরায় ডোর ঠেলে এসে হুড়মুড়িয়ে শুয়ে পড়েন আমার বিছানায়।
বসন্ত ঋতুর পুরোটা জুড়ে আমি বসবাস করেছি বনানীতে, আর তৈরি করেছি নানা রকমের গণ্ডিরেখা নির্ধারিত পরিসরের চার্ট। একটি চড়ুই যখন মাতে সংগীতময় কাকলিতে, সে হেলিয়ে দেয় তার ছোট্ট মাথাটি আর ফুলে ফেঁপে ওঠে তার গলার পালক। প্রতিক্রিয়ায় গান করে ওঠে আরেকটি চড়ুই, সে কাকলি দিয়ে তৈরি করে তার গণ্ডিবদ্ধ পরিসরের সীমান্তে দেয়াল। বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে আমিও সে অনুযায়ী রেখা টানি চার্টের মানচিত্রে।
---হাঁস---
যখন আমি পত্রিকার সংবাদ পাঠে ক্লান্ত, একজন পুরুষ বাতাস ভরা পুতুল-মানবীর সঙ্গে সঙ্গমের সময় মৃত্যুবরণ করছে হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে; ফুলের মতো শোভন নামের একটি শহর ফলুজা, চলছে ওখানে খণ্ডযুদ্ধ; চাবুক ও হাতকড়ার সমবায়ে নতুন পদ্ধতিতে টর্চারের উদ্ভব...আমি পত্রিকাটি বন্ধ করে চলে আসি পুকুর পাড়ে। দেখি, হাঁসগুলো ডুবসাঁতারে মেতেছে, কখনো-বা কথা বলছে কোয়াক কোয়াক ধ্বনিতে। জলে ডোবা ম্যালার্ড হাঁসটির কমলালেবু রঙের দু-পা বাতাস কাটছে শূন্যে। তারা পাড়ের প্রান্ত ঘেঁষে আদার খুঁটছে, পুচ্ছ দুলিয়ে গিলে ফেলে ছুড়ে দেয়া রুটির টুকরা-টাকরা; জলজগুল্ম ঠোঁটে টেনে চলাচলে তৈরি হয় বাঁকানো বৃত্তাকার ট্রেইল; আর তাদের কণ্ঠনালীর সবুজ পালক রোদে ঝলকায়।
---মেফ্লাই---
মেফ্লাই নামের জলপতঙ্গটি কাদামাখা পানিতে যুঝে যাচ্ছে। আমি প্রকৃতির নিজস্ব বিষয়-আশয়ে জড়িয়ে না পড়ার জন্য নিজেকে সতর্ক করি, কিন্তু পতঙ্গটি যে ভাবে ডানা কাঁপিয়ে যুঝছে, আর দারুণভাবে ক্লান্ত হয়ে ভাসছে, তারপর ফের ডানা থেকে ঝরাতে চাচ্ছে কর্দমাক্ত জল—তা স্রেফ নির্লিপ্তভাবে দেখে যাওয়া বড় কঠিন। এবার মেফ্লাইটি ভেসে থাকার যুদ্ধে ক্লান্ত হতে হতে আমার দিকে আসতে চাচ্ছে। আমি একটি ডাল বাড়িয়ে দিলে সে তা আঁকড়ে ধরে। আমি নিজের আচরণে না হেসে পারি না। এ পতঙ্গটির সারা জীবনের মেয়াদ কেবলমাত্র এক দিনের। তো কাদাজল থেকে উদ্ধার করে আমি তার জীবনকে কতোটা দীর্ঘায়িত করতে পারলাম? সম্ভবত আমার সহায়তায় জলপোকাটি বেঁচে থাকবে আরো এক কিংবা দুই ঘণ্টা, তারপর অবধারিত মৃত্যুতে ঢলে পড়বে সে। কিন্তু যে ভাবে মেফ্লাইটি পরিষ্কার করছে তার পা, এবং রোদে মেলে শুকানোর চেষ্টা করছে তার ডানা, তা পর্যবেক্ষণ করে আমার মন ভরে ওঠে ভালো লাগার অনুভূতিতে।
---প্যাঁচা---
প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়াতে ভারী বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলো আমার মন। তখন আমি বনানীর কুয়াশা কেটে হাঁটতে বেরোই । চাঁদ যেন ব্যান্ডেজ বাঁধার গজ কাপড়ে জড়ানো, গাছ বৃক্ষকেও দেখাচ্ছে আবছা। আমি শুয়ে পড়ি টিলার ঢালে। টারউইড গাছ থেকে নিসৃত গন্ধ এসে লাগছিলো নাকে, আর মাঝে মাঝে সমুদ্র থেকেও ভেসে আসছিলো নোনা গন্ধ। আমি করোটিতে ফারের মতো দেখতে ব্যারেট পরে ছিলাম, এবং হাত দুটো ভাঁজ করে রেখেছিলাম মাথার ওপর। ধারালো ও শীতল কিছু আমার আঙুল ছুঁয়ে উড়ে যায়। বুঝতে পারি—একটি প্যাঁচা, সম্ভবত নিশচর খেচরটি আমার ফার সদৃশ্য ব্যারেটটিকে ভেবেছে ছোট্ট কোন প্রাণী। সে ধারালো নখর দিয়ে ছোবল মেরে উড়ে যায় সামনে।
---অবশিষ্ট আছে যা---
শেষ বার যেদিন আমি আমার দিদিমাকে টেলিফোন করেছিলাম, মনে হয়েছিলো কোনো কিছু নিয়ে তিনি ব্যস্ত আছেন, যেন কিছু একটা একাকি তিনি নিমগ্ন হয়ে শুনছেন। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রায় সব কিছুই আমি ভুলে গেছি, তবে শুধু একটি জিনিস এখনো মনে দাগ কেটে আছে...তার কফিনের উপর রাখা ফুলের তোড়ায় মৌমাছিগুলো মেতেছিলো পরাগায়ণে, তারা গর্ভকেশরগুলোতে হুল বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে ওড়াউড়ি করছিলো।
এলারি একারস্

শেষ নীল পাহাড়ের ওপারে: পাকিস্তানে আফগান উদ্বাস্তুদের স্মৃতিকথা by ঋশিকা পারদিকার

পাকিস্তানে এক আফগান উদ্বাস্তু, ছবি: ফ্লিকার
১৯৮৮ সালে পেশোয়ারের বাজারগুলোতে ঘুরে ঘুরে হ্যারিয়েট স্যান্ডিস কার্পেট আর বস্ত্রসামগ্রী কিনছিলেন তার লন্ডনের দোকানের জন্য। তখনো তিনি শুনলেন, পশতুদের স্বাধীন আবাসভূমির জন্য ক্লান্তিহীন যোদ্ধা আবদুল গাফফার খান মারা গেছেন। খবর প্রকাশের পরপরই আফগান সরকার চার দিনের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন, মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে বিরতি দেন এবং পেশোয়ারে তার কনস্যুলেটকে নির্দেশ দেয় যে যারা গাফ্ফার খানের জানাজায় অংশ নিতে চায়, তাদের সবাইকে যেন ভিসা দেয়া হয়। সাথে সাথে হ্যারিয়েট আবেদন করেন। আর তখনোই ‘বিয়ন্ড দ্যাট লাস্ট ব্লু মাউন্টেইন- মাই সিল্ক রোড জার্নিস’ লেখার শুরু হলো।
পুরো সফরে তিনি ছোট ছোট নোট নিয়েছিলেন। সেগুলো জড়ো করেই তার বইটি লেখা হয়ে গেল। ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাজ্যভিত্তিক মদিনা পাবলিশিং বইটি প্রকাশ করে।
হ্যারিয়েট বেড়ে ওঠেন ইংল্যান্ডের লেক ডিস্ট্রিক্টে। প্রাচ্যে তার প্রথম সফর হয় ১৯৭৭ সালে, তার শৈশবের আর্ট শিক্ষক ম্যারি বারকেটের সাথে। তিনি একটি দল নিয়ে আফাগনিস্তানের বাজার, শহর আর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো দেখাতে নিয়ে চললেন। তখন তার বয়স ২৩।
এই সফরই তার জীবনধারা পাল্টে যায় বলে তিনি নিজেই জানিয়েছেন।
আফগানিস্তান দেশটি বৈচিত্র্যে ঠাসা। শুষ্ক মরুভূমি সেখানে আছে, আছে বিশাল বিশাল পর্বত, রয়েছে বর্ণালী সব বাজার। এসব বাজারে যাযাবর আর বণিকেরা কিলিম কার্পেট বিক্রি করে। তিনি যেমনটা প্রত্যাশা করেছিলেন, তার সবই আছে এখানে। আর এর টানেই তিনি তার মা-বাবার স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে নতুন পথ ধরেন।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন হয় ১৯৭৯ সালে। এর জের ধরে ১৯৮০-এর দশকে লাখ লাখ আফগান চলে যায় পাকিস্তানে। এদের অনেকেই ছিল বিধবা বা পঙ্গু।
এই সময়ে হ্যারিয়েট ছিলেন পাকিস্তানে। তার সফরসূচির মধ্যে ছিল খাইবার পাসের কাছে কাতচাগুরি উদ্বাস্তু শিবির পরিদর্শন। এখানে প্রায় ৩৩ হাজার উদ্বাস্তু আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে থাকা হাসপাতালের শয্যা ছিল ৪০টি। সবকটিই তরুণ আর শিশুদের ভরা ছিল।
হ্যারিয়েট পাকিস্তানের ওল্ড সিটির বাজারগুলোও সফর করেন। তিনি সেখান থেকে কার্পেট আর এম্ব্রয়েডারি কিনে লন্ডনে বিক্রি করতেন। স্যান্ডিস ওরিয়েন্টাল কার্পেটস নামের দোকানটি ছিল তার মালিকানায়। তবে অর্থ ও মুনাফা পাশে সরিয়ে তিনি যেসব উদ্বাস্তুর সাথে পরিচিত হতেন, তাদের সহায়তা করতে আগ্রহী ছিলেন।
পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে তিনি আফগান উদ্বাস্তু নারীদের কাছ থেকে এম্ব্রয়ডারি ও কার্পেট কিনে তাদের সহায়তা করার পদ্ধতিটি শিখে নেন। এছাড়া তিনি পেশোয়ারের ফুটপাতগুলো থেকে সালোয়ার কামিজ, আফগান চাপলান, রোপ প্যানিয়ার ইত্যাদিও কিনেছেন।
এর এইসব কাজও তিনি করেছেন যুদ্ধের দামামার মধ্যে। ওই যুদ্ধে লাখ লাখ লোক নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে এমন কয়েকজন সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফারও ছিলেন, যারা হ্যারিয়েটের সফরে তার সাথে পরিচিত হয়েছিলেন।
তারপর ১৯৯১ সালে হ্যারিয়েট কাবুলে ইকাত সিল্ক বোনার শিল্পটির সন্ধান করেন। খুবই জটিল এই শিল্পটির কেন্দ্র ছিল কাবুলের এমন এলাকায়, যেখানে কোনো কোনো দিন ৪০টিরও বেশি রকেট হানা দিতো। ওই সময় যুদ্ধ করতে সক্ষম এমন প্রতিটি লোককেই কাশালনকিভ কাঁধে নিয়ে রাজপথে ছুটতে দেখা যেত। হ্যারিয়েট যে এলাকায় ছিলেন, তার কাছাকাছি এলাকাগুলোতেও হানা দিত সশস্ত্র ব্যক্তিরা।
তবে এমন বিপদের মধ্যেও আফগানিস্তান আর পাকিস্তান তাকে কাছে টেনেছে। পাকিস্তান আর আফগানিস্তানে তিনি যে উষ্ণ আতিথেয়তা পেয়েছেন, তা ভোলার নয়। তারা তার সাথে তাদের খাবার ভাগ করে খাইয়েছেন। এই যে আন্তরিকতা, তা তিনি পাশ্চাত্যে কখনো পাননি।
আফগানিস্তান থেকে তিনি বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় সহায়তা মিশনে গিয়েছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল স্লাভিক মুসলিম সম্প্রদায়কে সহায়তা করা। সেখানে মুসলিমেরা জাতিগত নির্মূল অভিযানের শিকার হয়েছিল সার্বিয়া আর ক্রোয়েশিয়ার লড়াইয়ে। এরপর আসে সিরিয়া সফর। তারপর তিনি যান সিরিয়ায়।
তবে তার ভাষ্য কেন্দ্রিভূত আফগানিস্তানের বর্ণাঢ্য বাজার আর রাস্তাঘাটের মধ্যে। তার বই যুক্তরাজ্যের বেশ স্বচ্ছল জীবনকে উপেক্ষা করে এক নারীর অনেক সময় একাকী সঙ্ঘাত-জর্জরিত এলাকায় তার অভিযানের কথাই সামনে নিয়ে আসে।
লেখা: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, বেঙ্গালুরু
বিয়ন্ড দ্যাট লাস্ট ব্লু মাউন্টেইন, হ্যারিয়েট স্যান্ডিস, পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া, ২০১৭

Monday, February 15, 2021

ফড়িংবন্ধু by অরণ্য প্রভা

স্কুলে যাবার সময় আম্মু তালহাকে অনেক বুঝিয়েছেন, কিচ্ছুতেই গলে নি সে। তার একটাই কথা—আগে কাশবনে বেড়াতে যাবে তারপর...।

দিন গড়িয়ে বিকেল এলে তালহার আনন্দ দেখে কে? বাড়ির অদূরেই কাশবন। কাশবন তো নয় এটা গড়। এটা ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়েরই অংশবিশেষ। এই গড়ের নিচ দিয়েই বয়ে গেছে করতোয়া নদীপুত্র। স্থানীয়রা তার নাম দিয়েছে সুবিল। এই সুবিল এসেছে শিলাদেবীর ঘাট থেকে। শিলাদেবী ছিলেন পরশুরামের বোন। যাকগে সেসব, আজ এখানে এমন ইতিহাস জানতে আসে নি তালহা।

তালহা যখন আম্মুর সঙ্গে গড়ের ওপর এসে দাঁড়াল, তখন আকাশে খণ্ড খণ্ড মেঘ প্যাঁচানো তুলার মতো। আর অদূরের কাশফুলগুলো যেন মেঘের সঙ্গে মিশে গেছে। এমন দৃশ্যে তালহার প্রবল ইচ্ছে জাগে ছবি আঁকবার। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো ফিকে হয়ে এলে তালহা বলে, আম্মু দেখ দেখ, গঙ্গাফড়িং আর ঘাসফড়িং কীভাবে খেলা করছে। ফড়িং নাকি খুব বুদ্ধিমান। আম্মু ফড়িং আমার বন্ধু হতে পারে না?

আম্মু বলেন, পশুপাখিকে পোষ মানানো যায়, কিন্তু পোকামাকড়, কীটপতঙ্গকে পোষ মানানো যায় কি-না আমার জানা নেই।

কাশবনে দুলে ওঠা হাওয়ায় দুজনেরই মন ভরে ওঠে। এরই মধ্যে তালহা এক পা, দু পা করে এগিয়ে যায় গঙ্গাফড়িং ধরতে। খুব ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে যেই-না ফড়িংয়ের ল্যাজটা ধরবে—অমনি ফড়িংটা ফুড়ুত করে উড়ে গিয়ে বসে অন্য কাশফুলে।

ফড়িং ধরার নেশায় চিত্কার দিয়ে পড়ে যেতে থাকে নিচে। অল্পের জন্য সুবিলের পানি থেকে রক্ষা পায়। চিত্কার শুনে আম্মু দ্রুত নিচে নেমে তালহাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। তালহা আলতো করে আম্মুর বাহুডোর  থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, তুমি ঠিকই বলেছ আম্মু। আর যা-ই হোক কীটপতঙ্গের সঙ্গে বন্ধু হয় না। ওই ফড়িংটার জন্যেই তো আমাকে পড়তে হলো।

-----২.-----

সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে এসে বাম হাঁটুতে ব্যথার সঙ্গে জেগে উঠেছে ফড়িংটাকে না-ধরতে পারার কষ্ট। ক্ষোভের সঙ্গে তালহা বলে, ফড়িংয়ের বাচ্চা, ধরতে পারলে বুঝিয়ে দিতাম, আর কেমন মজা দেখাতাম। আজ না হোক অন্য কোনোদিন তোকে নিশ্চয় ধরে ফেলব।

আম্মু তালহার পড়ার টেবিল হরলিক্স দিয়ে যাবার পরপরই কোত্থেকে একটা ফড়িং এসে ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র... করে উড়তে থাকে। তখন তার কী আনন্দ! আম্মু আম্মু দেখে যাও, তাড়াতাড়ি আসো, আবার বেরিয়ে যাবে।...

আম্মু দৌড়ে এলে তালহা বলে, আজ বিকেলে কাশবনে যে ফড়িংটাকে ধরতে গিয়ে গড় থেকে পড়ে গিয়েছিলাম ঠিক সেই ফড়িংটাই এসেছে।

ফড়িং আবার বাল্বের চারপাশ দিয়ে উড়তে থাকে ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র...।

ফড়িংটা এই মুহূর্তে পড়ে আছে লাইটের ওপরে ঝুলে থাকা হাওয়া চুপসে যাওয়া বেলুনে—বেশ ক’দিন আগে জন্মদিনের জন্য যে বেলুনগুলো ঝোলানো হয়েছিল।

ফড়িংটা পড়ামাত্র দেয়ালের অন্যপাশ থেকে টিকটিকি দ্রুত এগিয়ে আসে বেলুনের দিকে। ক্যা..ট.. ক্যা..ট.. করতে করতে টিকটিকি দুটো বেলুনের কাছাকাছি এলেই ফড়িংটা আবার উড়াল দেয়—ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র...।

তালহা ফড়িংটা ধরবার ফন্দি আঁটে। নখ দিয়ে ল্যাজটাকে ধরলে কামড়ে দিলে কেমন ব্যাথা পাবে? ফড়িংয়ের দাঁত কেমন তাও সে জানে না। ভয় পেয়ে নখ দিয়ে না ধরে সুতা দিয়ে ল্যাজটা বাঁধবার পরিকল্পনা করে।

টিকটিকিটা এবার ফড়িংয়ের খুব কাছে চলে এসেছে। তালহা তখন আফসোস করে বলতে থাকে—এই বুঝি ধরেই ফেলল। তাহলে কি ফড়িংটাকে ধরেই ফেলবে?

আবার ফড়িংটা ভ..র..র... ভ...র...র... ভ...র...র... করতে করতে তালহার সাদা খাতার ওপর টপাস করে পড়ে। তালহা ধরতে চায়, সাহস পায় না। ফড়িংটার নড়াচড়া আস্তে করে বন্ধ হয়ে গেলে তার মনটাও ভারী হয়ে ওঠে। সে কারণে বলে—ইস! ফড়িংটা মরে গেল।

আবার চিত্কার করতে থাকে। এবার আম্মু এসে ধমক দিয়ে তালহাকে অন্যঘরে নিয়ে যান। এ মুহূর্তে ফড়িং নিয়ে কোনো কথাই শুনতে চান না আম্মু। শাসনের সুরে বলেন—এমনিতে আজ স্কুলে যাও নি, স্কুল আছে, কাল সকালে উঠতে হবে, ঘুমিয়ে পড়ো।

------৩.------

ঘুমের মধ্যে চিত্কার দিয়ে লাফিয়ে ওঠে তালহা। আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বলে, আম্মু তুমি তো বলেছ পশুপাখিকে পোষ মানিয়ে বন্ধু বানানো যায়, কিন্তু কীটপতঙ্গ পোষা যায় না। যে ফড়িংটা আমাদের বাসায় এসেছে সেটা বলল, আমি তোমার বন্ধু হতে এসেছি, বিকেলে কাশবনে আমাকে ধরতে গিয়ে তুমি যে ব্যথা পেয়েছ তার জন্য অনুতাপ প্রকাশ করতে এসেছি। বন্ধুত্ব গড়ার আরো অনেক সব কথা, স্বপ্নে কি এত কথা মনে থাকে!

তালহা যেখানে পড়ছিল সেখানে আম্মুকে টেনে নিয়ে যায়। আম্মু লাইটের সুইচ অন করলে তালহা দেখতে পায় দেয়ালে শত শত পিপড়ার সারি। কতকগুলো পিপড়া ফড়িংয়ের মস্তক, আবার কতকগুলো পাখা, কতকগুলো আবার ফড়িংয়ের ল্যাজ নিয়ে সারিবেঁধে যাচ্ছে। এমন দৃশ্যে কী এক অবর্ণনীয় ব্যথায় তালহার চোখ দুটো টলমল করে, আর ঠোঁট দুটোও থির থির করে কাঁপতে থাকে।

‘গল্পটা আসতে হবে ভেতর থেকে’ by জিয়া উস সালাম

উজমা আসলাম খান
উজমা আসলাম খানের দি মিরাকুলাস ট্রু হিস্টরি অব নমি আলি পড়তে হলে ভালোবাসার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এই পাকিস্তানি লেখক নিজে বলেছেন: ভালোবাসা হলো ঘৃণার বিপরীত। তুমি যাকে ভালোবাসবে, সে তোমাকে ভালোবাসবে। তিনি শব্দ নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন কিংবা বলা যায় শব্দের জীবন ভালোবাসেন। সেগুলোই তার কাজে ফুটে ওঠে। তার থিনার দ্যান স্কিন ম্যান ছিল এশিয়ান লিটারেরি প্রাইজের সংক্ষিপ্ত তালিকায়, কমনওয়েলথ প্রাইজের জন্য মনোনীত হয়েছিল ট্রেসপাসিং। থিনার দ্যান স্কিন ২০১৪ সালের করাচি লিটারেচারি ফেস্টিভ্যালে সেরা ফিকশনের জন্য ফ্রেঞ্জ প্রাইজ পেয়েছিল। তিনি জিওমেট্রি অব গডসের জন্য স্বাধীন পাবলিশার বুক অ্যাওয়ার্ডসে ব্রোঞ্জ পদক জিতেছিলেন।
দি মিরাকুলাস ট্রু হিস্টরি অব নমি আলিকে কোনো গণ্ডিতেই ফেলা যায় না এবং এ কারণেই লেখক একে ‘ঐতিহাসিক ফিকশন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের প্রেক্ষাপটে লেখা গ্রন্থটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ঘটনা বলেছে, ওই সময় সেখানে বন্দীদের লড়াই, উপনিবেশ প্রভুদের আচরণের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
একদিকে আমরা এমনসব ব্রিটিশের দেখা পাই, যারা মেয়াদ কাটিয়ে দেয়া বা নির্দোষ ঘোষিত বন্দীদের ব্যাপারে তেমন যত্নবান ছিল না। কেবল তাদেরকে এক টুকরা জমি মঞ্জুর করেই দায়িত্ব শেষ করত। অন্য দিকে ছিল জাপানিরা। তারা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিকে (আইএনএ) সমর্থন করত। এমন অবস্থাতেই নমি ও তার ভাই জি এবং তাদের বন্ধু আইয়ের কথা সামনে এসেছে। বিশ্ব শক্তিগুলোর দাবার ঘুঁটি ছিল তারা। এসব লোকের মধ্য দিয়েই উজমা ইংল্যান্ড, জাপান, ফিলিপাইন ও ওশেনিয়ার সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
ফিকশনটির প্লট এতই জটিল যে কাহিনী শেষ করতে তার লেগেছে ২৬ বছর। তিনি এর মধ্যে চারটি উপন্যাস লিখে ফেলেছেন, তবে এর মধ্যে নমি আলির কাহিনী শেষ করার কথা ভোলেননি।
অনেক বছর আগে উজমা আসলাম খান পছন্দের পছন্দের বই পাওয়ার জন্য লাইব্রেরির তাকগুলোতে হাতরাচ্ছিলেন। এই সময়েই সেলফ থেকে একটি বই পড়ে যায়। তিনি বইটি কুড়িয়ে নাম দেখে তথ্যটি জ্যাকেটে টুকে রাখেন। বইটি নিয়ে তার আগ্রহের সৃষ্টি হলো। এটি ছিল আন্দামান নিয়ে। আর তখনই তার মাথায় নমি আলির কাহিনী ভর করে। এখানে ফ্রন্টলাইনে দেয়া তার সাক্ষাতকার প্রকাশিত হলো।
প্রশ্ন: ভারতে ইতিহাস নিয়ে নতুন আঙ্গিকে লেখা হচ্ছে। অনেকে এমনকি একে কৌতুকের মতো করে বলে, ঐতিহাসিক ফিকশন। দি মিরাকুলাস ট্রু হিস্টরি অব নমি আলির লেখক হিসেবে ঐতিহাসিক ফিকশন বলতে আপনি কী বোঝেন? এতে কি ফিকশনের আড়ালে চলে যায় ইতিহাস?
উজমা: যারা ক্ষমতায় থাকে, তারাই পুনঃলেখনের কাজটি করছে। তারা ক্ষমতাহীন লোকদের কথা মুছে ফেলার জন্য এমনটি করে। ক্ষমতার মাধ্যমে ইতিহাস নির্মাণ করা অবস্থায় বেড়ে ওঠা পাকিস্তানের একজন নারীর জন্য ঐতিহাসিক ফিকশন আলাদা উদ্দেশ্য বহন করে। এটা নীরব থাকা বা ঘৃণার জন্য নয়, বরং সমৃদ্ধ করার জন্য, সহানুভূতি প্রকাশ করার জন্য। আমাদের সামনে যে ইতিহাস রয়েছে, সেটাই একমাত্র ইতিহাস, তা আমরা সবসময় প্রত্যাখ্যান করে আসছি। ঐতিহাসিক ফিকশনের উদ্দেশ্য হলো অস্তিত্বহীন কাহিনীগুলোতে মূর্ত করা।
প্রশ্ন: আপনি কোথা থেকে শুরু করলেন?
উজমা: আমি গবেষণার জন্য অনেক সময় ব্যয় করেছি। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ইতিহাসকে পেছনের দিকে যেতে দিয়েছি। ঐতিহাসিক বা সমসাময়িক, যে ঘটনাই হোক না কেন, কাহিনীটি অনুভূত হতে হবে। আর তা হতে হবে নিজের ভেতর থেকে। আমার কাছে কোনো রূপরেখা থাকে না, কোনো সংক্ষিপ্ত ধারণা থাকে না। কাহিনী এগিয়ে যায় নিজের গতিতে। চরিত্রগুলো থাকে প্রধান অবস্থানে, ইতিহাস হয়ে পড়ে গৌণ।
প্রশ্ন: অনেক ইতিহাস আছে এবং ইতিহাস দেখার পদ্ধতিও অনেক। কিন্তু তারপরও নারীদের ভূমিকা, তাদের অর্জন, তাদের দুর্ভোগ প্রান্তিক করার একটি অভিন্ন অবস্থানও আছে। ইতিহাস প্রায়ই পুরুষদের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়। ঐতিহাসিক ফিকশন নিয়ে কাজ করার সময় এসব বৈষম্য সমাধানের চ্যালেঞ্জ কিভাবে নিয়েছেন?
উজমা: শুরুতে যতটা হতাশাজনক ছিল, ততটা চ্যালেঞ্জিং ছিল না। আমি স্বাধীনতা আন্দোলনের দুই ধরনের নারীর সামনে পড়েছি। এক ধরনের নারী ছিলেন নারী আদর্শ। তাদেরকে কর্তব্যপরায়ণ, সামাজিক কাজের মাধ্যমে পুরুষদের প্রয়াসের প্রতি সমর্থক সতী বোন ও স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অপর ধরনের নারীরা পুরুষদের মতোই শক্তিশালী হিসেবে ছিলেন। পুরুষদের লিখিত গ্রন্থে তাদের নাম কেবল উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশ্ন: নিশ্চিতভাবেই তা হতাশা হওয়ার কথা?
উজমা: উপন্যাস লেখার একপর্যায়ে কী বলা হয়েছে, কী বলা হয়নি, তা নিয়ে চিন্তা করা বন্ধ করে দিয়েছি। আমি অন্য জগতে প্রবেশ করেছি, ভাষা ও চরিত্রের ওপর নির্ভর করেছি। আমি ২৬ বছর ধরে যে উপন্যাসটি লিখেছি, তাতে প্রথম চরিত্রটিই ছিল পরিচয় অজানা এক রাজবন্দী। শুরু থেকেই আমার লক্ষ্য ছিল ওই নারীর দৈনিক ও অন্তর্মুখী জীবন। আমি তাকে স্রেফ বন্দী হিসেবে দেখেছি। আমি তাকে কথা বলার সুযোগ দিয়েছি।
প্রশ্ন: আপনি কারাগার হিসেবে আন্দামানের কথা বলেছেন। এখানে ইতিহাস আছে সামান্য। আমরা ভারতে জানি যে এক বন্দী ব্রিটিশদের কাছে ক্ষমার পত্র লিখেছিলেন এবং উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন স্থায়ী করার জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গবেষক হিসেবে এ ধরনের চিঠিপত্রকে কি আপনি কাপুরোষিত আত্মসমর্পণ হিসেবে বিবেচনা করেন?
উজমা: অবশ্যই, আমি জানি না কে বলছে। তবে আমার বইতে আমি ওই ধরনের লোকদের নিয়ে কাজ করিনি। তাদের নিয়ে তো লেখা হয়েই গেছে।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, আপনার চরিত্রগুলো ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে বাস করে। এটা কি আপনার কাজকে জটিলতার দিকে নিয়ে গেছে?
উজমা: মনে হয় নিয়েছে।
প্রশ্ন: ভারতে আপনার বেশ কিছু নিবেদিতপ্রাণ পাঠক আছে। পাকিস্তানি লেখক হিসেবে তাদের মানসিকতা এবং তাদের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতাকে কিভাবে দেখেন?
উজমা: আগের চারটি উপন্যাসে আমি ভিন্ন কিছুর সামনে পড়িনি। এটা নির্ভর করে যিনি রিভিউ করেন, তার ওপর। এই বইটির জন্য এখন পর্যন্ত ভারত থেকেই বেশি চাপ এসেছে। সম্ভবত শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি।

Friday, February 12, 2021

গল্প- পাপস্নান by নিবেদিতা আইচ

------(১)-----

-অ মা…মা…

ডাকটা কানে যেতেই আদুরির পিঠে দুম করে কিল বসিয়ে দিল সুফিয়া। সাথে সাথে কান্নার তীব্রতা বেড়ে গেল মেয়েটার।

-মরোস না ক্যান হারামির বাচ্চা! কোন পাপে তরে আমি জনম দিছিলাম…

এবার সুফিয়া নিজেও হাপুস নয়নেকাঁদতে লাগল। গরীবের কপালে এত ভোগান্তি কেন জানে না সে।

সুফিয়া ছুটা কাজের বুয়া।ভোর হতে না হতেই ছুটতে হয় বস্তির পাশের ফ্ল্যাটবাড়িতে। তিনটা বাসায় কাজ করে ফিরে আসে এগারোটা নাগাদ। তারপর মেসবাড়িতে যেতে হয় রান্না করতে। আজ এসবের কোনটাই হবে না। গতকালও সে কাজে যায় নি ।

চারদিন আগে সকালে দুই কেজি কৈ মাছ কাটতে বসেছিল ম্যাডামের বাসায়। ঠিক তখুনি নুড়ির মা হন্তদন্ত হয়ে এসে তাকে ডেকে নিয়ে গেলো। যাবার সময় ওই ফ্ল্যাটের ম্যাডাম বলে দিলেন শিগগির ফিরে আসতে নইলে বেতন কাটা হবে। এত কথা কানে তোলার সময় ছিল না তখন সুফিয়ার। ভয়ংকর কোন বিপদ যে হয়েছে সেটা নুড়ির মায়ের চেহারা দেখে বেশ আঁচ করতে পেরেছিলো সে।

সেদিন রাতে প্রচন্ড ব্যথায় নীল হয়ে গেলে আদুরিকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়েছে। এমন একটা মারাত্মক ঘটনায় ভীষণ ঘাবড়ে গেছে সুফিয়া, ভয়ে বাড়িই ফেরে নি। এখন আর বেতন কাটার ভয় নেই তার। কাজ থেকেই ওকে ছাটাই করে দেবে মনে হয়।

আজ সকালে ডাক্তার এসে আরো কিছু ওষুধ লিখে দিলেন। নার্স ব্যাথার ইনজেকশন পুশ করল। পাশের বিছানার মহিলাটা থুথু ফেলেছে সদ্য ঝাড়ু দেয়া ফ্লোরে। এই নিয়ে গন্ডগোল লেগে গেল ওয়ার্ডের আয়ার সাথে। সুফিয়ার ইচ্ছে করছে সব কিছু ভেঙ্গেচুরে দিতে। একটু পর নুড়ির মা এলো। সে আজকে সকাল সকাল এসেছে ওদের দেখতে। এসেই জানতে চায় পুলিশ এসেছিলো কিনা। সুফিয়া অস্ফুটে মাথা নাড়ে। কেউ আসে নি শুনে নুড়ির মা রাগে গজগজ করে খানিকক্ষণ। সুফিয়ার কান্না দেখে তিতিবিরক্ত হয়ে পড়ে সে।

-আহ আর কাইন্দো না তো! কান্দনের সময় না অহন। পুলিশ আইলে সব কইবা কইলাম। ডরাইও না,আর কিসের ডর কও?

সুফিয়ার মাথা কাজ করছে না। আতঙ্ক আর বিষাদে দিশেহারা লাগছে তার।

-জানের ডর গো বইন। বাইচ্চাটারেও ছাড়ল না ..কোন শত্তুর এই কামডা করলো…অহন কেইস করছি জানলে মাইরা ফেলাইবো।

পেটের ব্যাথায় কাতরাচ্ছে নয় বছরের আদুরি। ওর ব্লিডিং থামে নি।

-মন শক্ত করো বইন। মাইয়ার তো মাসিক শুরু অয় নাই, চিন্তা কইরো না। ব্যথা সারলেই ছুডি দিব,আমগো বাড়িত নিমু তোমারে। নুড়ির বাপরে আইতে কমুনি আমার লগে।

সুফিয়া কথাগুলো শুনে যেন একটু আশ্বাস পেল। তবু এত বড় দুর্যোগ কীকরে সামলাবে জানে না সে। সুফিয়া নুড়ির মাকে বললো কাল সকালে সে যেন মেসে গিয়ে ওর হয়ে রান্নাটা করে দিয়ে আসে। তার এই রান্নার চাকরিটা হারালে মহাবিপদ হয়ে যাবে। বেতন কাটলেও চাকরিটা থাকুক। মেয়ের চিকিৎসার খরচ আছে। চোখে রীতিমতো অন্ধকার দেখছে সে।

একটা যোনির লোভ সামলাতে পারে না পুরুষগুলো। ভাবতেই গা গুলিয়ে বমি পায় সুফিয়ার। তার নয় বছরের বাচ্চা মেয়েটাকেও ছাড় দেয়া গেলো না!

আর পাঁচ দশটা দিনের মতোই চারদিন আগে খুব ভোরে কাজে বেড়িয়ে পড়েছিল সুফিয়া। বস্তির অনেকেই দুয়ার খুলে বেরোয় নি তখনো। ঠিক সেই সময়টায় ঘুমন্ত আদুরির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নরপশুর দল। সুফিয়া খবর পেয়ে ছুটে এসেছিল। তখনই হাসপাতালে নেবার সাহস হয় নি ওর। যেন ব্যাপারটা গোপন করতে পারলেই বেঁচে যেত সে! সারাদিন কেটে গেলেও রাতে ব্যথা আর ব্লিডিং সামলানো গেলো না, আদুরি কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। তখুনিই ছুটে গিয়ে নুড়ির মাকে ডেকে আনে সুফিয়া। তারপর সে-ই হাসপাতালে দিয়ে গেছে ওদের।

গত কয়েকটা দিনের প্রতিটা মুহূর্ত ঘুরেফিরে চোখের সামনে ভাসছে। সুফিয়া ভেবে ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে সারাদিন। এর মধ্যেও ওর ঝিমুনি পায় ক্লান্তিতে।দুপুর একটা নাগাদ ট্রলি করে খাবার নিয়ে এলো ওয়ার্ড বয়। নুড়ির মা কনুই দিয়ে ধাক্কা দেয় ওকে। সুফিয়া লজ্জিত ভঙ্গিতে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ায়, থালা নিয়ে খাবার নিতে ছুটে যায়। কে কার আগে নেবে এই নিয়ে হুলস্থূল চললো কিছুক্ষণ। সুফিয়ার গলা দিয়ে ভাত নামে না। সে নুড়ির মাকে সাধে, খাবার নষ্ট করতে ইচ্ছে হয় না ওর। এই এক ভাতের জন্যই তো রক্ত পানি করা সংগ্রাম করে চলেছে দিনরাত!

পরের দিন নুড়ির মা যখন এলো তখন বেলা পড়ে গেছে। সুফিয়া দুশ্চিন্তায় ছটফট করেছে সারাদিন। তার উপর সকালে পুলিশ এসেছিল। ওদের জেরার মুখে সুফিয়া বোবার মত তাকিয়ে ছিল শুধু, কোন প্রশ্নের জবাব দেয়নি। ভয় আর আতঙ্কে জড়োসড়ো হয়ে বসে ছিল পুরোটা সময়। বিকেলে নুড়ির মাকে দেখে মনে মনে স্বস্তি ফিরে পেলেও ওর দিকে তেড়ে গেলো সুফিয়া।

– এত দেরি করলি ক্যান আজকা? না আইলেই তো পারতি।

-বস্তির ঘর ছাড়তে কইতেসে তোরে…

সুফিয়া হা করে তাকিয়ে আছে।

-বেয়ানবেলা পুলিশ খুঁজতে গেছিলো তোগোরে, তারপর থেইকা মালিকে ঘর ছাড়তে কইতেসে।

কাল রাতে আদুরি যখন কাঁথা মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছিল,দুটো ছেলে ওর বেডের পাশে ঘুরঘুর করেছে। সুফিয়ার ছেলেগুলিকে একদম সুবিধের মনে হয় নি, সে খুব দ্রুত অন্যদিকে সরে পড়েছিল। কেন এসেছিল ওরা? ডিউটিরত নার্স জেরা করতেই ব্যস্ত ভঙ্গিতে চলে যায় ছেলে দুটো। এখন নুড়ির মায়ের মুখে সব শুনে সুফিয়ার মাথাটা গুলিয়ে যাচ্ছে।ভয়ে ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে সুফিয়া। এরকম উত্তেজনার মধ্যেও সুফিয়া বুঝতে পারছে বস্তিতে ফিরে যাওয়া এখন মোটেই নিরাপদ নয়।

শুরুতে খুব সাহস দিলেও নুড়ির মা এখন বলছে ওদের গ্রামে চলে যেতে। অন্য কোথাও একটা থাকার জায়গার খোঁজ করবে সে, খোঁজ পেলে সুফিয়া ফিরে আসতে পারবে। এছাড়া আর কী করা যেতে পারে! গরীব বাঁচে ধুঁকে ধঁকে, মরণটাও যেন এদের অচ্ছুৎ মনে করে! নুড়ির মা আক্ষেপ করে ওর পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়।

এর তিনদিন পর আদুরিকে ছুটি দিল ডাক্তার। ওকে নুড়িদের ঘরে রেখে রাতের বেলা চুপিচুপি সুফিয়া বস্তির ঘরে গেল, নিজের জমানো টাকাটা সরিয়ে আনতে। গুটিয়ে রাখা তোশকটা নামিয়ে রেখে টিনের তোরঙ্গটা সামনে টেনে আনল। চুলার উপরের তাক থেকে চাবিটা খুঁজে বার করল। তালাটা খুলছে না কিছুতেই। কয়েকবার চেষ্টার পরও যখন খুলল না তখন খুব মরিয়া হয়ে গেল সুফিয়া। শিল নোড়া নিয়ে এলো হাতের কাছে কিছু না পেয়ে। তিনবারের সময় ভেঙ্গে গেল পুরনো মরচে ধরা তালাটা। তোরঙ্গ থেকে প্লাস্টিকের বয়ামটা বার করল। তার মধ্যেই টাকাটা রয়েছে। হাতে নিয়ে গুনতে লাগল সে। এ টাকায় এত দ্রুত হাত দিতে হবে সে ভাবে নি।

------(২)-----

নেশাখোর জলিলের সাথে একবছর সংসার করার পর সুফিয়া বুঝতে পেরেছিল নিজের সঞ্চয় না থাকলে হঠাৎ বিপদ হলে অকূল পাথারে পড়তে হবে ওর। জলিল এর আগে ট্রাক চালাতো। ওর আয়ে ভালোই চলছিল সংসার।

শুরুর দিকে খুব আদর সোহাগ করতো জলিল। এমনকি বাসাবাড়িতে কাজ করতেও দিতো না। তারপর কী হলো কে জানে! একদিন রাতে এসে চোরের মতো লুকিয়ে ঘরে ঢুকলো। কদিন বেরুলোই না। দুদিন পর পুলিশ খুঁজতে এলো ওকে। পুলিশের মুখেই সুফিয়া জানতে পেলো রাস্তায় কাকে যেন চাপা দিয়ে এসেছে জলিল। কিন্তু সেদিন ওর নাগাল পাওয়া গেলো না, পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেলো সে।

সুফিয়া বুঝতে পারলো ঘরে বসে থাকলে চলবে না তার। বাসাবাড়িতে কাজ শুরু করলো সে। আদুরি তখন পেটে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে অল্প অল্প করে টাকা জমাতে লাগলো সুফিয়া।

মাসখানেক পর জলিল ফিরে এলো। কিন্তু কেমন বদলে গেলো লোকটা! কথায় কথায় গায়ে হাত তোলে আর টাকার জন্য চেঁচামেচি করে। সুফিয়া লুকিয়ে রাখতে শুরু করলো ওর রক্ত পানি করা উপার্জন। মাঝেমাঝে জলিল কী করে যেন টের পেয়ে যেতো। লুকিয়ে ফেলার আগেই বেদম মার মেরে ছিনিয়ে নিয়ে যেতো সব।

আদুরির জন্মের পর জলিল একটু সদয় হলো। মেয়ের জন্য মনটা নরম হলো ওর। তবু হুটহাট আফসোস ঝরে পড়তো, আদুরিকে কোলে নিয়ে বলতো – পোলা হইলে তোর মায়ের কষ্ট কমতো রে বেটি! এসব কথায় সুফিয়া বেশির ভাগ সময় নীরব থাকতো। কখনো কখনো অতিষ্ঠ হয়ে মুখ ঝামটে উত্তর দিতো- ‘মায়ে নিজেরে পালতে জানে, পোলার ঠ্যাকা নাই।’ সেদিন আবার দুয়েকটা কিল চড় কপালে জুটে যেতো ওর। এতকিছুর পরেও এই জলিলের সাথেই সংসার করছিল সুফিয়া।

আদুরির বয়স যখন দুই তখন সুফিয়া আরেকবার পোয়াতি হল। জলিল ততদিনে পুরোপুরি উচ্ছন্নে গেছে। নেশায় চূড় হয়ে থাকে সারাদিন। একরাতে খুপড়িতে ফিরে সুফিয়াকে আচ্ছামতো পেটালো। মার খেতে খেতে কাঁদতে ভুলে গিয়েছিলো সুফিয়া। ব্যথার চেয়েও বিস্ময় কাজ করছিল মনে মনে। এই পোয়াতি অবস্থাতেও ছাড় দিলো না তাকে? কী অপরাধ ওর?

সেদিনের পর ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে কোন চুলোয় যে চলে গেল জলিল, সুফিয়া খোঁজও নেয় নি আর। বাচ্চাটাও বাঁচে নি। এর কিছুদিন পর ওর দ্বিতীয় বিয়ের খবরটা শুনতে পেয়েছে সুফিয়া। সেখানেও দুবেলা মারধর করে বউকে। সেই মেয়েটা গার্মেন্টস এ কাজ করে। তার টাকায় নেশা করছে জলিল আজকাল। এমন লোকের কাছে বিয়ে মানে টাকাপয়সার নতুন একটা উৎস ছাড়া আর কিছু নয়।

পুরনো দিনের কথা মনে করতে চায় না সুফিয়া। তবু দিনশেষে ঘামে ভেজা শরীরটাকে যখন বস্তির ঘরের মেঝেতে এলিয়ে দেয় তখন কোত্থেকে এইসব দিন ফিরে এসে গিলে খেতে চায় পুরো রাতটাকে! আজ বড় অন্ধকার রাত, বিপদের রাত। এসব স্মৃতিচারণের বিলাসিতা মানায় না এ মুহূর্তে। সুফিয়া আঁচলে টাকাগুলো ভালো করে গুঁজে নেয়।

ঠিক তখনই খুপরির পেছনের দিকটায় খুট করে একটা শব্দ হল যেন। সুফিয়া কান খাড়া করে। সতর্ক হয়ে নোড়াটা হাতে নেয় সে। উত্তেজনায় বুকটা ঢিপঢিপ করছে ওর। দ্রুত ব্লাউজের ভেতর মুঠো করে টাকাটা ঢুকিয়ে ফেলল সে। দরজা খুলে বেড়িয়ে যেতে উঠে দাঁড়াতেই কড়া নাড়ল কেউ। সুফিয়া হাতের মধ্যে নোড়াটাকে শক্ত করে ধরল। কয়েক মিনিট পর দরজাটা খুলে দিল। ঘুঁটঘুঁটে আঁধার ঘাঁপটি মেরে আছে চারপাশে। একটু গলা বাড়াতেই চেনা মুখটা দেখতে পেয়ে ভূত দেখার মত চমকে উঠল সুফিয়া। বিশ্রী একটা হাসি খেলা করছে লোকটার চোখেমুখে।

-কইত্তে আইলা এদ্দিন বাদে? কী চাও? সুফিয়া খেঁকিয়ে উঠল।

-ঘটনা হুনছি আমি। না আইয়া পারি? পরিবার বইলা কথা…কই, মাইয়াডা কই?

ঘরের ভেতর উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে জলিল। সুফিয়া বিস্ময়টাকে চাপা দিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে নিরুত্তর হয়ে।কুতকুতে দৃষ্টি দিয়ে ওকে আপাদমস্তক দেখছে জলিল। সুফিয়ার গা ঘিনঘিন করছে।

-আমারে দিয়া দে, ওরে ধান্ধায় লাগায়ে দিমু। তুই ঠ্যাং এর উপরে ঠ্যাং তুইল্যা খাবি।আর কত খাটবি, ক? ইশ্‌ কি চেহারা হইসে তোর!

মুখ দিয়ে চুকচুক করে শব্দ করছে জলিল।সুফিয়ার চোখ দুটো জ্বলছে। রাগে কাঁপছে সে। ওকে দেখে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেল জলিল।

-ওরে আর অন্য কামে নিত না কেউ। এইটাই ঠিক হইব, একবার ইজ্জত গেছে, আর চিন্তা কইরা কি হইব? টাকার বিছানায় ঘুমাইবি তুই..

হড়বড় করে কথাগুলো বলছে জলিল। ওকে একটা ধূর্ত শেয়াল ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না। কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে জলিল মাথা নিচু করেখুকখুক কাশতে লাগলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কাশির দমক আরো বেড়ে গেল ওর। কাশতে কাশতে বুকে হাত দিয়ে বসে পড়েছে লোকটা। সুফিয়া তবু নির্বিকারে দাঁড়িয়ে থাকে। ওর কানের কাছে অশরীরি কেউ অবিরাম বলে যায়- “তোর শত্তুর ফিইরা আইছে রে সুফিয়া… তোর শত্তুর ফিরছে…”

বহুদিনের পুরনো ইচ্ছেটা তীব্রতর হতে থাকে। সুফিয়া হাতের মুঠোটাকে শক্ত করে আরেকটু। আদুরিকে জন্ম দেয়াটা পাপ হলে আজ আরেকটা পাপ করতে একটুও হাত কাঁপবে না ওর।

একটু পর রক্তাক্ত জলিল ঘরের চৌকাঠে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলে সুফিয়া উদভ্রান্তের মতো ছুটে চলল মেয়ের কাছে। আকাশে তখন একটাও তারা নেই, শুধু একটা অপাপবিদ্ধ চাঁদ স্থির হয়ে চেয়ে থাকে। তার আলোয় স্নাত হয় সুফিয়া ও বাকি চরাচর।

Thursday, February 11, 2021

নাক ছুঁই ছুঁই পাহাড় by আবু সাইদ কামাল

ফেসবুকে প্রিয় একজন বরেণ্য সাহিত্যিকের পোস্ট দেখে ফয়সাল মনে মনে বেশ ক্ষুব্ধ হয়। কারণ, শক্তিমান কথাসাহিত্যিক আবু আসলামের পরিচিত একজন সিরিয়াস পাঠক নাকি বইমেলা উপলক্ষে প্রশ্ন করেছেন, ‘পাহাড় ডিঙালেন, না পাহাড় কাছে চলে এলো? জবাবে তিনি লিখলেন, পাহাড়টা এখন এতটাই কাছে চলে এসেছে যে, আমার নাক ছুঁই ছুঁই করছে। তিনি আরো লিখলেন, ... দায় আমার মত অগোত্রভুক্ত-বিচ্ছিন্ন এবং তেলবাজিতে নিরাসক্ত লেখকদের বহন করতে হয়।’ ফয়সাল বুঝতে পারে, মেলা উপলক্ষে কোনো এক প্রকাশক বেশ আগ্রহভরে তাঁর কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস এবং গল্পের পাণ্ডুলিপি নিয়েও মেলাতে প্রকাশ করেনি। তাই বই দু’টি প্রকাশের ক্ষেত্রে পাহাড় সমান বাধাটা রয়েই গেল। সেই পোস্টে মন্তব্য করতে গিয়ে ফয়সাল লিখল, এ দেশের শক্তিমান একজন কথাসাহিত্যিকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ও গল্পের বই প্রকাশ না হওয়া আমাদের দেশের জাতীয় সাহিত্য প্রবণতার ক্ষেত্রে একটি দুঃসংবাদ। যারা তাঁর বেশির ভাগ লেখা পড়েছেন, তাদের অনেকেই আমার সাথে একমত হবেন যে, এ লেখকের সব লেখাই মানোত্তীর্ণ। কিছু কিছু লেখা জাতীয়মান উপচে বিশ্বসাহিত্যের মান ধারণ করে। আমার মনে হয়, মুনাফার মোহে অনেক ক্ষেত্রেই মানহীন গ্রন্থ প্রকাশ হচ্ছে, অন্য দিকে, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এমন বরেণ্য ব্যক্তিদের মানসম্পন্ন গ্রন্থ হচ্ছে উপেক্ষিত। উর্বর ফসলি জমিতে আগাছা হলে তা সাফ করা যায়। কিন্তু ঢলের জলে আবর্জনার স্তূপ যদি ফসলি ক্ষেতে জায়গা করে নেয়, তাহলে স্বাভাবিক ফসল তো নষ্ট হবেই। বই মেলায় টাকার মোহে মানহীন বই প্রকাশের ঢল নেমেছে, আর সেসব আবর্জনার চাপে মূল ফসলই বুঝি বিনষ্ট হওয়ার পথে এখন। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফেসবুকের আর একটি পোস্ট ফয়সালের শুধু মনোযোগই আকর্ষণ করেনি, বিক্ষুব্ধ মনে হতাশার পানি ঢেলে দিয়ে ক্ষোভের আগুন একেবারে নিভিয়ে দিয়েছে। ওই পোস্টে বলা হয়, আগামীকাল কবি আবু আহমেদের ষাটতম জন্মদিনের বিশাল আয়োজন। আর এ জন্য তার এ জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন জেলাপর্যায়ের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি, কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, পৌরপিতাসহ শহরের উল্লেখযোগ্য কবি-ছড়াকাররা।
কারণ, তিনি এখন একটি দলের অঙ্গ সাহিত্য সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তা থেকেই ফয়সালের মনে প্রশ্ন উঠে, তাহলে কি সেই ‘ অগোত্রভুক্ত-বিচ্ছিন্ন এবং তেলবাজিতে নিরাসক্ত’ লেখকেরা অপাঙ্ক্তেয়ই থেকে যাবে, আর ধুরন্ধর, প্রতারক এবং মতাদর্শভুক্তরাই প্রাধান্য পাবে? এ কারণেই কি আবু আহমেদের মতো ব্যক্তিরা নন্দন চর্চার অঙ্গন দখল করে রেখেছে। এই আবু আহমেদের স্বরূপ উন্মোচনের জন্য ফয়সাল পেছন-ফিরে তাকায়; মাত্র পাঁচ দিনের জ্বরে ন’মাসের শিশুকন্যাকে রেখে ফয়সালের স্ত্রী পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। আকাশ ভেঙে তখন বিনামেঘে বজ্রপাত হয় ফয়সালের মাথার ওপর। সদ্য গোছানো সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আকস্মিক এরূপ কোনো ভয়াল আঘাতের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না ফয়সাল। শরতের জোছনামুখর স্বপ্নিল রাত যে হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে দিয়ে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এভাবে লণ্ডভণ্ড করে দেবে, এ কথা কখনো ভাবতে পারেনি সে। স্ত্রী বিয়োগের বেদনায় বিধুর ফয়সালের মুখের দিকে কি আর তাকানো যায়! তার সমস্ত সত্তা নিংড়ে চুইয়ে চুইয়ে ঝরে পড়ে যেন অব্যক্ত কান্না। এমন ভয়াল আঘাতের রসায়নে তার মনোজগতটা ক’দিনেই গভীর বেদনার এক নির্ঝরণীতে রূপ নেয়। কিন্তু তার হৃদয়মথিত শোকের মাতম না কোনো শাব্দিক কান্নায়, না কোনো বাহ্যিক আচরণে প্রকাশ করতে পারে। অনেক সময় সে তার পুঞ্জীভূত বেদনাকে অন্য দশটা মানুষের বেদনার সাথে একাত্ম করতে চেষ্টাও করেছে। কিন্তু কেনো যেন তা পারেনি। শেষে অনেক ভাবনা-চিন্তার পর কিংবা গুমোট মনে অনেক দিন ধ্যানমগ্ন থাকার পর সে বুঝতে পারে- মহৎ শিল্পমাত্রই গভীর বেদনার কাছে দায়বদ্ধ। তাই ফয়সাল স্থির সিদ্ধান্ত নেয়- সে শিল্প চর্চায় ব্রতী হবে। ছাত্রজীবন থেকেই যদিও অল্প-স্বল্প লেখার অভ্যেস ছিল তার। লিখতো আড়ালে- আবডালে। বন্ধু-বান্ধবদের দু-চারজন জানতো, ফয়সাল নিভৃতে লেখালেখি করে। সীমিত বন্ধুদের পরিসর ছাড়া আর কেউ এ বিষয়টা জানতোও না। তাই ওভাবে তার আত্মপ্রকাশও হয়নি। ফয়সাল তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝে নিয়েছে, প্রতিটি বিয়োগান্ত ঘটনাই মানুষকে শোকের অথৈ সাগরে ভাসায়। কিন্তু স্ত্রী বিয়োগের ঘটনায় হৃদয় জগতে যে অবিনাশী আঘাত হানে, তার ফলে সৃষ্ট ক্ষত থেকে নিরন্তর ক্ষরণ হতেই থাকে।
দুই স্ত্রী বিয়োগের ঐ মর্মান্তিক ঘটনার পর ফয়সালের রূঢ় জীবনচর্চার পর্বে পর্বে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। এরই মধ্যে সে বেশ এলোমেলো হয়ে গেছে। তচনচ হয়ে গেছে সাংসারিক জীবন। শুধু আক্ষেপ, আফসোস আর হুতাশন করে মনে মনে বলে, হায় হায়! এ কী হলো, এ কী হলো আমার! যেন শত মাথা কুটেও শান্তি পায় না সে, পায় না কোনো স্বস্তি। আপাত দৃষ্টে বাহ্যিক দিক হতে তাকে বিষণ্ন ও শান্ত মনে হলেও মনোজগত বড়ই অস্থির। ভেতরের আবেগে কখনো এমন উত্তেজিত হয় যে, নিজেকে সামলাতেই সে ব্যস্ত হয়ে উঠে। ধীরে ধীরে সে অস্থির চিত্তকে স্বশাসনে আনে। আর জ্ঞান সাধনায় মনোযোগী হয়। অফিসের কাজ শেষ করে বিকালে উপজেলা পরিষদের পাবলিক লাইব্রেরিতে পড়াশোন করে চলে সে। পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে লিখে যায় ফয়সাল। লিখে যায় দুঃখবোধজাত হৃদয় নিংড়ানো আবেগের ফসল। এক পর্যায়ে নান্দনিক শব্দ-সুষমায় লিখে যায় পঙ্ক্তিমালা। আস্তে আস্তে প্রকাশ্যে শুরু হয় তার সাহিত্য চর্চা। পশ্চাৎপদ একটি উপজেলা সদরের কর্মস্থলে অবস্থান করে একাকী কাব্যচর্চা করে চলে সে। প্রায় ছয়-সাত মাসের মধ্যে সে তৈরি করে ফেলে কবিতার একটি পাণ্ডুলিপি। কেমন হয়েছে তার পাণ্ডুলিপির কবিতগুলো, তা দেখানোর জন্য চলে যায় জেলা শহরে। সহপাঠী বন্ধু রাজু আহমেদ, বাড়ি শহরের প্রাণকেন্দ্রে। এ জেলা শহরে অবস্থান করে একই সাথে বাংলায় এম এ পড়তো ওরা। রাজুর সাথেই প্রথম কবিতার পাণ্ডলিপি নিয়ে কথা বলে ফয়সাল। এ ব্যাপারে রাজু বলে, আমার এক বড় ভাই, চাঁদের আলো সাহিত্য পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক। চলো তোমাকে তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। শফিকুল ইসলাম শফি চাঁদের আলো সাহিত্য পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক। রাজু আহমেদের সাথে গিয়ে শফিকুল ইসলামের সাথে পরিচিত হয় ফয়সাল। পরিচয় পর্ব শেষ হলে কবিতার পাণ্ডুলিপিটা শফিকে দেখায়। শফি পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখে। আর এদিকে শফির মন্তব্যের জন্য দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করতে থাকে ফয়সাল। শফি ক’টা কবিতা পড়ে গম্ভীর স্বরে বলে, যেহেতু আপনি কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করে ফেলেছেন, লিখতে পারবেন- অন্তত এটুকু আশা করা যায়। মি: শফি আবার বলে, তবে-
-তবে!
-আপনাকে নিরন্তর সাধনা করে যেতে হবে। কিছুদিনের মধ্যেই ফয়সাল আটচল্লিশ পৃষ্ঠার একটি কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি করে দেয়। পাঁচ শ’ বই করে দেবে বলে দফারফা হয়। কথা হয় তিন কিস্তিতে নেবে টাকা। কথামতো ঢাকার একটি প্রকাশনার নামে বই প্রকাশ করে। বইমেলার স্টলেও উঠে ফয়সালের বই। পরিবেশনায় যে পাবলিশারের নাম দেয়া হয়, সে স্টলেই ডিসপ্লে করা হয় কাব্য গ্রন্থটি। কিন্তু চুক্তিমত পাঁচ শ’ বইয়ের মধ্যে সরবরাহ করে মাত্র তিন শ’ বই। বাকি দুই শ’ বই নিয়ে শুরু হয় টালবাহানা। ফয়সাল বইয়ের তাগিদ দিলে বলে, এখনো বাঁধাই হয়নি। কিন্তু ঢাকার বাঁধাইখানায় ফয়সাল খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, আবু আহমেদ বই-ই করেছে মাত্র তিন শ’। অথচ মূল্য নিয়েছে পাঁচ শ’ বইয়ের। আসল ঘটনা উদ্ধার হলে, তার প্রতারণা ধরা পড়ে। ফয়সাল যখন বাকি দুই শ’ বইয়ের টাকার জন্য চাপ দেয়, তখন তথাকথিত কবি ছদ্মবেশধারী প্রতারক আবু আহমেদ হৃদরোগীর ভান করে শয্যাশায়ী হয়। ধীরে ধীরে জানা যায়, অনেক নবীন লেখকই তার প্রতারণার শিকার হয়েছে। এভাবে প্রতারণার ফলে-এক সময়ে আবু আহমেদ নাজুক অবস্থায় পড়তে হয়। কারণ, সবার কাছেই সে প্রতারক হিসাবে চিহ্নিত হয়ে যায়।
তিন জেলা শহরের রেলস্টেশনের কাছেই খোশ মহল রেস্টুরেন্ট। ঐতিহ্যবাহী এ রেস্টুরেন্টে কবি সাহিত্যিকদের আড্ডা বসে প্রাক স্বাধীনতা আমল থেকেই। আড্ডাটা জমে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। কারণ,ওই দিনই দৈনিক পত্রিকাগুলোতে সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশিত হয়। জেলাপর্যায়ের লেখকদের অনেকের লেখা ছাপা হয় সাময়িকীগুলোতে। ওরা খোশমহল রেস্টুরেন্টের মোড়ে পত্রিকার দোকানে দৈনিকগুলোর সাময়িকীতে খাঁজ-খবর নেয়। যারা শহরের সেরা কবি- লেখক বলে ইতোমধ্যে আত্মপ্রচার করেছেন এবং প্রচার করে যাচ্ছেন, তাদের এক ধরনের মোড়লিপনাও আড্ডাতে প্রকাশ পায়। নবীন লেখক হিসেবে ফয়সাল আহমেদ এক কোণে বসে থাকে। কিন্তু এরই মাঝে হঠাৎ করে একটা অঘটন ঘটে। দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি পত্রিকার সাহিত্য পাতায় পনেরো-বিশ বছরের সাধনায় এ জেলা শহরের যারা এখনো স্থান করে নিতে পারেনি, তেমন একটি পত্রিকার সাময়িকীতে হঠাৎ একদিন ফয়সাল আহমেদের কবিতা ছাপা হয়ে যায়। এতে টনক নড়ে জেলা শহরের কবি মহলে। ইতোমধ্যে যারা শহরে মস্তবড় কবি বলে মোড়লিপনা দেখিয়ে যাচ্ছিল, ওরা একটু নড়েচড়ে বসে। তাদের কারো কারো রাশভারী স্বরেও ফয়সাল আহমেদের নাম উচ্চারিত হতে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে প্রবীণদের সাথেও আড্ডায় বসে ফয়সাল। সেই আবু আহমেদ, যে কি না শত চেষ্টা সত্ত্বে শেষ বয়সেও জাতীয় পত্রিকায় লেখা প্রকাশের যোগ্যতা অর্জন করে মূলধারার লেখক হতে পারেনি, এখনো স্থানীয় মানের লেখকই রয়ে গেছে। আর তেলবাজি করে প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় থেকে করে যাচ্ছে ধান্ধাবাজি। শুধু তাই নয়, সে এখন কোনো এক অঙ্গ সংগঠনের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মণ্ডলির সদস্যও। কাজেই তার জন্মদিন তো পালন করা হবে আড়ম্বরপূর্ণভাবেই। অথচ একজন সৎ ও বরেণ্য কথাসাহিত্যিক যাঁর শিল্পোত্তীর্ণ লেখার সাহিত্যমান জাতীয়পর্যায় উপচে বিশ^সাহিত্যমানের পর্যায়ে...; তিনি আজ উপেক্ষিত। কারণ, তিনি অগোত্রভুক্ত-বিচ্ছিন্ন এবং তেলবাজিতে নিরাসক্ত। আর এ জন্যই তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কালোত্তীর্ণ হওয়ার মতো গ্রন্থ প্রকাশের ক্ষেত্রেও পাহাড়সমান বাধা। ফেসবুকে এমন পোস্ট দেখে ফয়সালের ক্ষুব্ধ হওয়াটা কি অসঙ্গত?

Wednesday, February 10, 2021

এক প্রবীণের হাউমাউ কান্না : ‘বাবা-মার সাথে যা করেছি তার বদলা পাচ্ছি এখন’ by আবুল কালাম

‘জীবনের শেষ বয়সে আজ আমি সন্তানদের থেকে বিতাড়িত। নিঃস্ব স্বজনহীন একাকী জীবনে বৃদ্ধাশ্রমই আমার ঠিকানা। এসবের জন্য আমিই দায়ী। কারণ জীবনে আমি আমার বাবা-মার সাথে যা আচরণ করেছি এখন শেষ বয়সে আমার সন্তানদের কাছে থেকে তার বদলা পাচ্ছি। নয়তো এমন হওয়ার কথা নয়। শেষ জীবনে আমার সন্তানদের কাছ থেকে অবহেলা, অবজ্ঞা সর্বশেষ ঘরছাড়া হয়ে আজ আমি তা উপলব্ধি করতে পেরেছি’। জীবনের বাস্তব উপলব্দি থেকে এমনটাই বলছিলেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা ৭০ বছরের এক প্রবীণ।
জীবনের ফেলে আসা স্মৃতি মনে করে বুক চেপে ধরে হাউমাউ করে তিনি কাঁদছিলেন। বললেন, ‘কথাগুলো কারো কাছে কোনোদিন বলিনি। কিন্তু এখন আর পারছি না। অন্তত তোমাদের শিক্ষার জন্য আজ বলব। শোন, আমার এমন পরিণতির জন্য আমিই দায়ী। সবই আমার দোষ। জীবনে আমি যদি আমার বাবা-মায়ের সাথে ভালো আচরণ করতাম তবে আজ হয়তো আমাকে স্বজনবিহীন হয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আসতে হতো না। সন্তানদের কাছে অপমাণিত হতে হতো না। সবই আমার কপাল। সবই আমার কর্মের ফল। যা আজ আমার সন্তানদের কাছ থেকে আমি ফেরত পাচ্ছি’। এরপর একটু শান্ত হয়ে বললেন, ‘এখন যদি বাবা-মা বেঁচে থাকতেন তবে তাদের পায়ে পড়ে ক্ষমা চেয়ে নিতাম। তাতে অন্তত আমার অন্তরের জ্বালা কিছুটা হলেও কমত। কিন্ত তা তো আর সম্ভব না। আমি বুঝতে পারছি এভাবেই মানসিক যন্ত্রণার পুড়ে আমাকে শেষ পর্যন্ত বিদায় নিতে হবে’।
তার জীবন সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলতে শুরু করলেন অতীতের কথা। জানালেন ছোট থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তিনি। কৃষক পরিবার হওয়ায় অর্থকষ্ট লেগেই থাকত সংসারে। ভাই বোনদের মধ্যে অত্যন্ত মেধাবী ও লেখাপড়ার প্রতি প্রবল ইচ্ছা থাকায় স্থানীয় পাঠশালায় ভর্তি করে দেন তার পিতা। প্রতিটি পরীক্ষায় ফলাফলও ভালো করেন। পড়াশোনা শেষ করে সরকারি উচ্চ পদে চাকরিতে যোগ দেন, বিয়ে করেন। এরপর থেকে কারণে-অকারণে বাবা-মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছেন। নিজের টাকা পয়সা থাকার পরও তাদের অর্থকষ্টে রেখেছেন। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবা-মা গ্রামে চলে যান। এরপর অভিমানে তারা তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত পিতা-মাতার সাথে তার যোগাযোগ বন্ধ ছিল।
তিনি বলেন, ‘আজ আমি তাদের জায়গায়। এ বয়সে তাদের চেয়েও করুণ অবস্থায় আছি। আমার তিন সন্তানের সবাই ভালো চাকরি করছে। রাজধানীতে বাড়ির মালিক আমি। অথচ আমার টাকায় করা বাড়ি থেকে আজ আমি বিতাড়িত। সন্তানদের কেউই আমার খোঁজ নেয় না। যে দিন বের করে দেয় সেদিন অনেক কেঁদেছি। তাদের বললাম, আমি না হয় বারান্দায় থাকব তবুও আমাকে বের করে দিওনা। কিন্তু তারা শুনল না। আমার কারণে নাকি তাদের সমস্যা হয়, ঘর নোংরা হয়, কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এরপর চোখ মুছতে মুছতে বললেন, এখন বুঝিÑ এসবই আমার বাবা মায়ের অভিশাপ। আমি যদি আমার পিতা-মাতার প্রতি অবিচার না করতাম তাহলে আমার সন্তানরা আমার সাথে এমন করত না। আমি সব সময় দোয়া করি আমার সন্তানরা যেন কখনোই বৃদ্ধ না হয়, তাহলে তারা এত কষ্ট সহ্য করতে পারবে না’।

প্রযুক্তির প্রভাবে মন্দা বাংলাদেশের ‘চটি উপন্যাসের’ বাজার by শফিক রহমান

‘যদি এই বাস্তবধর্মী উপন্যাসটি পড়ে বর্তমান যুব সমাজ সামান্যতমও জ্ঞান লাভ করে সেই মতো চলার প্রেরণা পায়, তবে নিজেকে ধন্য মনে করব।’ এমন দাবি ও প্রত্যাশা বাংলাদেশের বহুল বিক্রিত বইয়ের (উপন্যাস) লেখক কাসেম বিন আবুবাকারের। তার প্রথম উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’ এর ভূমিকায় তিন এ কথাগুলো লিখেছেন। যে উপন্যাসটিতে তিনি নির্মাণ করেছেন ইসলামী আদর্শ ও হুকুম-আহকাম মেনে চালা এক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রী ও একই ভাবাদর্শে বিশ্বাসী এক ছাত্রের প্রেম-বিবাহ ও সংসার জীবনকাহিনী। গল্পের ভাঁজে ভাঁজে আবার রেখেছেন বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুদের কূট-কৌশলে বিরহ, বিচ্ছেদ অতপর মিলন…।
কাসেম বিন আবুবাকার ‘ভিন্ন ধারার’ লেখক। ওই পথে তিনি পৌঁছেছেন লাখ লাখ পাঠকের কাছে। ১৩৬ পৃষ্ঠার ফুটন্ত গোলাপেরই ৩২তম সংস্করণ শেষ। কাজ চলছে পরবর্তী সংস্করণের। বইটির প্রকাশক এবং নূর-কাসেম পাবলিশার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সায়ফুল্লাহ খাঁন বলেন, পাঠকের কাছে বইটি ‘অঘোষিত পাঠ্যবই’ (স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই বুঝাচ্ছেন)।
দেশের পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রির বড় মোকাম হিসেবে পরিচিত পুরান ঢাকার বাংলাবাজার কেন্দ্রীক প্রকাশনী সংস্থা ‘সাহিত্যমালা’ ১৯৮৬ সালে বইটি প্রথম প্রকাশ করে। ১০ বছর কপিরাইট মেয়াদ শেষে ১৯৯৬ সালে প্রাকশনার দায়িত্ব পায় নূর-কাসেম পাবলিশার্স। সায়ফুল্লাহ খাঁন জানান, ১৯৯৭ সাল থেকে তিনি ৩২টি সংস্করণ শেষ করেছেন। বিক্রি করেছেন কয়েক লাখ কপি। আগের হিসাব তার জানা নেই।
তবে শুধু ‘ফুটন্ত গোলাপ’ই নয় বাসর রাত, বালিকার অভিমান, বিদেশী মেম, বিদায় বেলায়, বিলম্বিত বাসর, অবশেষে মিলন, প্রেম যেন এক সোনার হরিণ, একটি ভ্রমর পাঁচটি ফুল, সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে, আমিও মানুষ, তুমিও মানুষ, শ্রেয়সী এবং ক্রন্দসী প্রিয়াসহ শতাধিক উপন্যাস লিখেছেন কাসেম বিন আবুবাকার। এর মধ্যে বিদেশী মেম উপন্যাসটির চলছে ১৭তম সংস্করণ, ক্রন্দসী প্রিয়া’র ১৬তম, বাসর রাত’র ১৪তম এবং বিদায় বেলায়’র ১১তম সংস্করণ। একটু পুরনোর মধ্যে সবচেয়ে কম সংস্করণ ‘শবনম’ শিরোনামের উপন্যাসটির। সেটিরও পঞ্চম সংস্করণ বাজারে।
বর্তমানে ৮১ বছর বয়সী এই লেখকের ধারায় আরও লিখছেন অনেকে। যুক্ত হয়েছেন তার ছেলে সায়ফুল্লাহ খাঁনও। পুস্তক প্রকাশনার পাশাপাশি তিনি লিখছেন গল্প-উপন্যাস। বাজারে তার বই ১৫টি। ২০০১ সালে প্রকাশ হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘প্রথম প্রেম’। বর্তমানে ১০৩ পৃষ্ঠার ওই বইটির দ্বাদশ সংস্করণ বাজারে। বইটিরও হাজার পঞ্চাশেক কপি বিক্রি হয়েছে বলে জানান সায়ফুল্লাহ খাঁন। তিনি বলেন, লেখার মধ্যে আমরা সহজ ভাষায় গল্প বলি। পাঠক তৈরি করি। পরবর্তীতে তারা যাতে সিরিয়াস গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ পাঠে আগ্রহী হয়।
তাদের এ ধারায় আরও সহজ করে বর্তমানে যারা ‘উপন্যাস’ লিখছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন মো. আকাশ চৌধুরী (বকুল), মো. আরিফুল ইসলাম (আরিয়ান), মো. আবু ইউসুফ (সৌরভ), মো. কহিনূর ইসলাম (শিশির), ফরহাদ হাসান সবুজ, মো. কামরুল হাসান, খোরশেদ আলম, মোস্তাক আহমেদ, শুভশ্রী নুপুর, সুমনা আক্তার সুমী, এমডি মুরাদ, এম এ কালাম। বাহারি নামে এবং বলিউড, ঢালিউড (ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র) এবং টালিউডের (কলকাতার চলচ্চিত্র) বিখ্যাতসব নায়িকাদের ছবি দিয়ে প্রচ্ছদ সাজানো তাদের ওই লেখাগুলো ‘চটি উপন্যাস’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অশ্লীল নয়। তবে বিষয় মূলে ‘কিশোর প্রেম’।
এদের মধ্যে এম এ কালামের ২০০৪ সাল থেকে লেখা ২১টি উপন্যাসের মধ্যে তৃতীয় উপন্যাসটিরই নাম ‘প্রিয়া এখন অন্য কারো’। বলিউড অভিনেত্রী ভূমিকা চাওলার ছবি নিয়ে প্রচ্ছদ সাজানো ৪৮ পৃষ্ঠার বইটিতে গল্প এঁটেছেন স্কুল পড়ুয়া কিশোর-কিশোরীর প্রেম কাহিনী। কাহিনীতে প্রেম নিবেদন পর্যায়ে গল্পের মূল চরিত্র প্রিয়ার ভাইয়ের হাতে বেদম পিটুনি খায় আশিক। আশিকের বয়ানে তখন লেখক এম এ কালাম ছন্দ মিলিয়ে লিখছেন, “জাল যখন পুকুরে ফেলেছি, মাছ আমি ধরবো। মাইর যখন খেয়েছি প্রিয়াকে আমি ভালোবাসবো”।
গল্পের ধারাবাহিকতায় আশিকের প্রস্তাবে সাড়া মিললেও প্রিয়ার বিয়ের আয়োজন হয় আরেক জনের সঙ্গে। আবার আশিকের জবানে লেখক লিখছেন, “হায়রে ভালোবাসা, একজন কাঁদে আরেক জন সুখের ঘর বাঁধে। এর নাম কি ভালোবাসা”। লেখক আরও লিখছেন, “এভাবে শেষ হয়ে যায় একটি প্রেমের নিষ্ঠুর…কাহিনী, প্রিয়া এখন অন্য কারো।”
বর্তমানে এ ধারার লেখকদের প্রতিনিধিত্ব করছেন এই এম এ কালামই। যিনি স্কুল-কলেজের শিক্ষা সহায়ক বইয়ের (বাংলাদেশে যা গাইড বই হিসেবে পরিচিত) প্রকাশনী সংস্থা অবস্মরনীয় পাবলিকেশন্সের বিক্রয় প্রতিনিধি। পেশার পাশাপাশি এসব বই লিখছেন, আবার নিজের প্রকাশনী সংস্থা ‘কালাম বুক হাউজ’র ব্যানারে অন্য লেখকদের বই প্রকাশও করছেন। বাংলাবাজারের আলী রেজা মার্কেটের সাগর বুক ডিপোর সামনে একটি ব্যানারে ঝুলছে এম এ কালামের ছবি সস্বলিত বিজ্ঞাপন। লেখা রয়েছে, ‘এম এ কালাম- এই প্রজন্মের প্রতিভাবান তরুণ লেখক’। তিনি জানান, তার প্রথম উপন্যাস ‘প্রথম দেখায় তোমাকে আমি ভালোবেসেছি’ আর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘এই জীবনে তোমাকে ভালোবেসে পেলাম না’।
বাজারে খুঁজে পাওয়া এই ধারার আরও কিছু ‘উপন্যাসের’ মধ্যে রয়েছে সুমনা আক্তার সুমীর ‘দুফোটা চোখের জল’, শুভশ্রী নুপুরের ‘বড় বেশি ভালোবাসি তোমাকে’, ফরহাদ হোসেন সবুজের ‘ভালোবাসা হলো সংসার হলো না’, মো. কামরুল হাসানের ‘স্বার্থপর ভালোবাসা’, নুরুজ্জামান শেখ সোহাগের ‘কণ্ঠের মাধুর্যে প্রেম করা ভুল’, মো. আকাশ চৌধুরী বকুলের ‘না বলা ভালোবাসা’, মো. আরিফুল ইসলাম আরিয়ানের ‘শুধু তোমার জন্য’ এ এম সোহাগের ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ এবং মো. আবু ইউসুফ সৌরভের ‘ভালোবাসার শেষ নেই’।
তবে সম্প্রতি বাজার অনুসন্ধানে জানা গেছে, নামে এমন আকর্ষণীয় ও বাহারি হলেও বর্তমানে বিক্রিতে মন্দা এসব ‘চটি উপন্যাসের’। আগে যেখানে বাংলাবাজারের সোহেল বুক ডিপো, তানিয়া বুক ডিপো, হিমু প্রকাশনী, মনিহার বুক ডিপো, একতা প্রকাশনী, শরীফ বুক ডিপো এবং সাগর বুক ডিপোসহ বেশ কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা এসব ‘চটি উপন্যাস’ প্রকাশ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল। সম্প্রতি বাংলাবাজার খুঁজে শুধু সাগর বুক ডিপোতে উপরে উল্লেখিত লেখকদের বইকয়টি পাওয়া গেছে। সাগর বুক ডিপোর কর্ণধার সাগর হোসেন বলেন, এসব বই এখন আর চলে না। কেউ প্রকাশও করে না। সপ্তাহ খানেক হলো ১০ কপি করে কয়েকজন লেখকের বই উঠিয়েছি। প্রতি কপি বইয়ের দাম ১৫ টাকা। কিন্তু এক কপিও বিক্রি হয়নি।
২০১০ সালের দিক থেকে মন্দার এ ধারা শুরু হয়েছে বলেও জানান সাগর হোসেন। কারণ হিসেবে তিনি দায়ি করেন ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউবকে। এসব বইয়ের আগের বাজার চাঙ্গার কথা জানিয়ে এই প্রকাশক ও বিক্রেতা বলেন, “গফ্ফার হোসেন নামের একজন লেখক ছিলেন। ২০০১ সালে তার লেখা ‘কেউ বুঝেনা দুঃখ আমার’ এবং ‘আমি ভুল করেছি ছাত্রজীবনে তোমাকে ভালোবেসে’ শিরোনামের দুইটা বই আমি প্রকাশ করেছিলাম। বই দুইটির কয়েক লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। ২০০২ সালে প্রকাশ করেছিলাম জালিশ মাহমুদ সাগরের ‘চোখ যে মনের কথা বলে’। এই বইটিরও অনেক সাড়া পেয়েছিলাম। এর আগে ১৯৯৫ সালের দিকে হাফিজ লাইব্রেরী প্রকাশ করেছিল এম ডি মুরাদের ‘হৃদয় দেবে কি দেবে না’। ওই সময়ে এই বইটিও অনেক সাড়া জাগানো বই ছিল।”
মজার বিষয় হলো সেই এম ডি মুরাদ এখনও লিখছেন। সাগর বুক ডিপোতেই পাওয়া গেল তার উপন্যাস ‘প্রেম দেবে কি দেবেনা’। কিন্তু এবার আর সাড়া জাগছে না। জানা গেছে, ওই সময়ে পাঠক প্রিয় লেখকদের তালিকায় আরও ছিলেন- সোহেল রানা, আবু হানিফ, হুমায়ুন কবির মৃধা, চঞ্চল চৌধুরী ও এইচ এম আলম হৃদয়। সোহেল রানার আলোচিত বই ‘অনেক স্বপ্ন ছিল তোমাকে নিয়ে’।
কালাম বলেন, লেখকের অভাব নেই। পুরনোদের জায়গায় নতুনরা এসেছেন। কিন্তু পাঠকেরই অভাব। মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক ও ইউটিউব সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। মাত্র একটা ক্লিকেই সবাই পেয়ে যাচ্ছেন দুনিয়ার সব বিনোদন। আমাদের বই পড়ে বিনোদনের যুগ বুঝি শেষ হয়েই গেল।
শহরের ফুটপাতে হকারদের বসায় কড়াকড়ির কথাও তুলে ধরেন এম এ কালাম। তিনি জানান, গ্রাম-গঞ্জে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মধ্যে আমাদের পাঠক ছিল। এছাড়া শহরাঞ্চলের বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামসহ যেখানে যেখানে গার্মেন্টস শিল্প কারখানা রয়েছে ওইসব এলাকার শ্রমিকদের আসা যাওয়ার রাস্তার ফুটপাতে বিক্রি হতো এসব বই। এখন ফুটপাতে বিক্রিও কমে গেছে।
ফলে ‘প্রযুক্তি’ যার প্রভাবে পাঠক পেয়েছে ভিন্ন স্বাদের পথ, তাতে সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে এদেশের আদি একটি অধ্যায়ের। প্রশ্ন হচ্ছে, কালাম, মুরাদ, নুপুর ও সূমীরা কি খুঁজে নিতে পারবে নতুন কোন পথ?