Friday, August 28, 2015

লিবিয়ায় ডুবে যাওয়া নৌকায় নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা ছয়

লিবিয়ার উপকূলরক্ষী বাহিনী জীবিতদের
উদ্ধারের কাজ অব্যাহত রেখেছে
লিবীয় উপকূলের কাছে কয়েকশ অভিবাসন প্রত্যাশীকে নিয়ে ডুবে যাওয়া দুটি নৌকায় নিহতদের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি বলে নিশ্চিত করেছেন তিউনিসিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের লিবিয়া দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা।
নৌকাদুটির অন্তত দুইশ’ জন অভিবাসন প্রত্যাশী মারা গেছে বলে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তিউনিসিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশের লিবিয়া দূতাবাসের কর্মকর্তা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মোজাম্মেল হক বলেছেন ডুবে যাওয়া নৌকা দুটিতে মোট ৩১জন বাংলাদেশি ছিল।
নিহত ছয়জনের মধ্যে দুজন শিশু বলে জানিয়েছেন দূতাবাসের কর্মকর্তা।
লাইফ জ্যাকেট পরে থাকায় বেশিরভাগ বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীকেই জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে বলে দূতাবাস সূত্র থেকে বলা হয়েছে।
মোজাম্মেল হক বলেছেন, ৪টি পরিবারসহ মোট ৩১জন বাংলাদেশি লিবিয়ার যোওয়ারা এলাকা দিয়ে ট্রলারে করে ইতালি যাবার চেষ্টা করছিলেন বলে তারা জানতে পেরেছেন।
তবে নৌকার তলদেশে ফুটো থাকায়, প্রায় একঘণ্টা যাওয়ার পরে নৌকাটি উল্টে যায়।
ছয় বছর আর ছয় মাস বয়সী দুটি শিশু সেখানেই মারা যায় বলে মোজাম্মেল হক জানান। তবে অন্যরা লাইফ জ্যাকেট পরে থাকায় সারারাত ভেসে ছিল। ভোরে তাদের উদ্ধার করা হয়।
তাদের লিবিয়ায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ দূতাবাসের ওই কর্মকর্তা জানান, উদ্ধারকৃত যাদের সাথে তার কথা হয়েছে তাদের মধ্যে দুটি পরিবার সিরতে থেকে এসেছে, অন্যরা ত্রিপলিতেই বসবাস করতেন।
মোজাম্মেল হক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই পরিবারগুলো লিবিয়াতে রয়েছে। সন্তানদের সবার জন্ম হয়েছে লিবিয়ায়। তবে দেশটির পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাওয়ায় তারা সমুদ্রপথে ইতালি যাবার চেষ্টা করছিলেন।
তিনি বলছেন, এর আগেও তারা খবর পেয়েছিলেন যে, এই পরিবারগুলো ইতালি যাবার চেষ্টা করছে। তাদের বারবার সতর্ক করার পরেও তারা ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পথে সেখানে যাবার চেষ্টা করেন।
এখন পরিবারগুলোর ইচ্ছা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে তিনি জানান।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র উইলিয়াম স্পিনড্‌লার বিবিসিকে জানিয়েছেন নৌকা দুটিতে প্রায় ৫০০ মানুষ ছিল যারা ইউরোপে আসার চেষ্টায় সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল।
লিবিয়ার উপকূলরক্ষীরা উদ্ধারকৃতদের তীরে আনার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
এই নৌকাদুটিতে অভিবাসন প্রত্যাশীদের মধ্যে সিরিয়া, বাংলাদেশ ও সাহারা মরুভূমির দক্ষিণের দেশগুলোর নাগরিকরা ছিলেন।
বিবিসির উত্তর আফ্রিকা সংবাদদাতা বলেছেন লিবিয়ার উপকূলরক্ষীদের ব্যবহারের জন্য যে উদ্ধারযানগুলো আছে সেগুলোতে উদ্ধারকাজের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই।
সমুদ্রপাড়ি দেবার জন্য অনুপোযোগী নৌকায় লিবিয়া থেকে ইটালিতে সাগরপাড়ি দিতে গিয়ে এ বছর এ পর্যন্ত দু’হাজারের মত অভিবাসন প্রত্যাশীর মৃত্যু ঘটেছে। সূত্র : বিবিসি

জাসদ বিতর্ক: কী রয়েছে নেপথ্যে? by পীর হাবিবুর রহমান

জাসদ নিছক বিতর্ক, শাসক জোটের ভঙ্গুর সমন্বয় নাকি অন্য কিছু? কী রয়েছে নেপথ্যে? ইতিহাসের অমীমাংসিত সত্যের সুরাহা নাকি জাসদ ও গণবাহিনী নেতা হাসানুল হক ইনুকে সরকার থেকে মাইনাস করা? রাজনীতির অন্দরমহলে নানামুখী আলোচনার কবর দিয়ে জাসদ বিতর্কই এখন তুফান তুলেছে। পর্যবেক্ষকরা গভীরভাবে এর অন্তর্নিহিত অর্থ খোঁজার প্রাণান্তকর চেষ্টা করছেন। হঠাৎ কেন ৪০ বছর পর এই বিতর্ক? খোদ আওয়ামী লীগ সরকারের অতি অনুগত তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও তার জাসদ নিয়ে? জাসদ নেতার জন্য সরকারি দলের শীর্ষ নেতাদের এ কেমন উপহার? শোকাবহ আগস্ট মাসেই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরির অভিযোগে মুজিব সরকার উৎখাতে গণবাহিনীর সশস্ত্র বিপ্লবের সেকেন্ড ইন কমান্ড ইনু ও তার জাসদকে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মাহবুব উল আলম হানিফ ও ক্যাপ্টেন অব. এবিএম তাজুল ইসলাম সিরিজ আক্রমণে অস্থির করে তুলেছেন। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, এ নিছক বিতর্ক নয়। ইতিহাসের নির্মম সত্যকে টেনে আনার চেষ্টাও নয়। মন্ত্রিসভা থেকে জাসদ সভাপতিকে সরিয়ে তার দলকে আগামী দিনের নির্বাচনী ময়দানে ঠেলে দেয়ার সরকারি পরিকল্পনারই অংশ। ইনু নিজের ও দলের কোন গণভিত্তি না থাকলেও দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে বলেছিলেন। সেই ইনুকেই আজ সরকার থেকে মাইনাসের নকশা অনুসারে এই বিতর্কের ঝড় তোলা হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, স্বাধীনতা উত্তরকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ মুক্তিযুদ্ধে উদ্ভাসিত মেধাবী তারুণ্যের বড় অংশটিকেই ছাত্রলীগের সম্মেলন ঘিরে ভাঙনের পথ ধরে জাসদের জন্ম দেয়া হয়েছিল। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফলাফলে এমনটি ঘটেছিল বলে তারা মনে করেন। কারণ, এই বিভক্তির পথ ধরেই জাতীয় ঐক্যের দরজা ভেঙে দেয়া হয়। যুদ্ধোত্তর সমস্যা কবলিত বাংলাদেশে বিভ্রান্তির পথ হাঁটা তীব্র হয় এখান থেকেই। দেশের সব যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের আগেই, মানুষের খাবার-বাসস্থানের মতো দুর্যোগকে মোকাবিলা না করেই ’৭২ সালের জুলাই মাসে ছাত্রলীগের তড়িঘড়ি সম্মেলন ছিল সেই ষড়যন্ত্রের শুভসূচনা। একটি জাতি, তার নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ আজীবন গণতন্ত্রের দীর্ঘ সংগ্রামের পথ হাঁটলেও স্বাধীন বাংলাদেশে কোনপক্ষই গণতন্ত্রের পথ ধরে রাখতে পারেনি। শাসক আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু করলেও শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে উঠতে দেয়নি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিশেষ করে জাসদের প্রতি দমন নির্যাতন আর ক্ষমতার উন্মাষিকতা যেমন দেখিয়েছে, তেমনি একটি সদ্য স্বাধীন দেশের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের রোমান্টিক স্বপ্ন নিয়ে উগ্র রোমান্টিক পথটি নিয়েছে জাসদ। দলটিকে রাজনৈতিকভাবে হৃষ্টপুষ্ট হতে দেয়নি। হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও, নৈরাজ্যের অন্ধকার পথ নিতে গিয়ে সরকারকে অস্থির ও অশান্তই রাখেনি, দলের কর্মীদেরও মৃত্যুর অন্ধকার পথে ঠেলে দিয়েছে। কর্নেল তাহেরের জন্য জাসদ তার প্রথম অক্টোবর সম্মেলনে সহ-সভাপতির পদটি শূন্য রাখলেও তাকেই গণবাহিনীর প্রধান করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীর সৈনিকদের নিয়ে শ্রেণীবিপ্লবের স্লোগান তুলে সৈনিক সংস্থা গঠন করে গণবাহিনীর সশস্ত্র বিপ্লবের পথে মুজিব সরকার উৎখাতে পথ নিয়েছিল জাসদ। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়ি ঘেরাও করার মতো হঠকারী কর্মসূচি দিয়ে যে জাসদের উগ্র রাজনীতির সূচনা, তার পরিণতি ছিল দেশ ও দলের জন্য বিয়োগান্তক। জাসদের ইতিহাস হয়ে উঠেছিল দল ও দেশের জন্য রক্তাক্ত দলিল। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, ’৭৫ সালের ৭ই নভেম্বর সিপাহী জনতার বিপ্লবের নামে কর্নেল তাহের ও হাসানুল হক ইনুরা সেনাবাহিনীতে সৈনিক সংস্থা ও গণবাহিনী দিয়ে যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, ’৭৫-এর ১৫ই আগস্টের হত্যাকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় তাদের শক্তিকে প্রকাশ্যে এনেছিলেন। ১৫ই আগস্ট না ঘটলেও গণবাহিনী মুজিব সরকার উৎখাতের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফেলতো। ১৫ই আগস্টের খুনিচক্র আগাম ঘটিয়ে ফেলায় জাসদের বিপ্লবের পরিকল্পনা ৭ই নভেম্বর উন্মোচিতই হয়নি, ভুল ফাঁদেও পড়েছে।
পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য জাসদের কর্মকাণ্ড বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল সত্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও মস্কোপন্থি কমিউনিস্টরা কখনও আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখেনি। দুই বিশ্ব মোড়লের ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগে আজীবন গণতন্ত্রের সংগ্রামে পথ হাঁটা বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে একদলীয় বাকশালের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের পথে ঠেলে দিয়ে সব দল ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ আরেকটি হঠকারিতা ছিল। সেই সঙ্গে সিরাজ সিকদারের পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির অন্ধকার রাজনীতি, আজকের সরকারের পার্টনার রাশেদ খান মেনন, দিলীপ বড়ুয়াদের চিনাপন্থি রাজনীতির তৎপরতাও কম ছিল না। সেদিন সিপিবি আর ন্যাপ গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে ক্ষমতার দাসত্ব বরণ করেছিল।
কিন্তু পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, ভাঙনের পথে পথে যে জাসদ রিক্ত-নিঃস্ব, তাকে মুজিব কন্যা নৌকায় তুলেই না সংসদে এনেছেন। তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো মন্ত্রণালয় জাসদ সভাপতি ইনুর হাতে তুলে দিয়েছেন। এর আগে সাম্যবাদী দলের দিলীপ বড়ুয়াকেও মন্ত্রী করেছিলেন। সাম্যবাদী দল বঙ্গবন্ধু হত্যাকে সমর্থনও করেছিল। বর্তমান সরকারে রাশেদ খান মেননও রয়েছেন। ’৭৫ সালের পরেও এদের রাজনীতি ছিল বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে ১৪ দল গঠনকালে জাসদের অতীত জেনেই জোটে নেয়া হয়েছিল। তাহলে আজ যখন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যে কোন ধরনের ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে, সরকারি দলের মাঠনেতারা আধিপত্যের লড়াইয়ে রক্তের হলি খেলছেন, শীর্ষ নেতারা বলছেন- ঐক্যই এখন বড় শক্তি হতে পারে। ক্ষমতা রক্ষা করতে পারে না, ঠিক তখন মহাজোট সরকারের শীর্ষ নেতাদের মুখোমুখি অবস্থান- এমনকি নামে বিরোধী দল, কামে সরকারের অংশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদও বলেছেন, এই সরকারের আমলে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। গণমাধ্যম কথা বলতে পারছে না। সব বিতর্কের মুখে জাসদের পর তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, হঠাৎ জাসদ বিরোধী বিষোদগার ১৪ দলের ঐক্য বিনষ্টের ষড়যন্ত্র। ১৪ দলও অর্থহীন বৈঠক করেছে। দায়িত্বশীলতার সঙ্গে আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ, নেতাদের মুখোমুখি অবস্থান রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। সেখানে পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বিএনপির ওপর সরকারের খড়গনীতি চরম পর্যায়ে নিয়ে দলটিকে যেভাবে মাটিতে শুইয়ে দেয়া হয়েছে, সেখানে ১৪ দলের শরিকদের বিরোধী দলের মঞ্চে পাঠিয়ে আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিকল্পনা শেষ করতে চায়। জাসদ বিতর্কের মধ্য দিয়ে ১৪ দলের ভাঙন ও হাসানুল হক ইনুকে মন্ত্রিসভা থেকে আপাতত সরিয়ে তার দলকে সেই মঞ্চে দিতে চায়। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে। সাংবিধানিক স্বীকৃতি পেলেও নৈতিক সমর্থন পায়নি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জাসদ বিতর্কসহ আগামী দিনের রাজনীতির সরকারের দাবার চাল দেখতে আরেকটু সময় লাগবে।

জামালপুর পৌর মেয়র মামুন সাময়িক বরখাস্ত

জামালপুর পৌরসভার মেয়র বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট শাহ্ মোঃ ওয়ারেছ আলী মামুনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। দ্রুত বিচার আইনে দুটি মামলার অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ায় রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব এ কে এম আনিছুজ্জামান এ প্রজ্ঞাপন জারি করেন।
বৃহস্পতিবার রাতে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আনোয়ার হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ওয়ারেছ আলী মামুন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও শহর বিএনপির সভাপতি।
প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ রয়েছে, জামালপুর পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট শাহ্ মোঃ ওয়ারেছ আলী মামুনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে দুটি মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক দাখিলকৃত অভিযোগপত্র বিজ্ঞ আদালতে গৃহীত হয়েছে। এর ফলে আপনার দ্বারা মেয়র-এর ক্ষমতা প্রয়োগ পৌরসভা তথা জনস্বার্থের পরিপন্থি এবং প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমীচীন নয় মর্মে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতীয়মান হয়েছে। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ এর ৩১(১) ধারার বিধান অনুযায়ী পৌর মেয়রকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। পত্র প্রাপ্তির তিন দিনের মধ্যে প্যানেল মেয়র-১ এর নিকট দায়িত্বভার হস্তান্তরের জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। (স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯ এর ৩১(২) উপ-ধারার বিধান অনুযায়ী। (স্মারক নং-৪৬.০৬৩.০২৭.০১.০০.০০২.২০১৫-১৩২৯/১(৮))।
এ ব্যাপারে জামালপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আনোয়ার হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার পর এ প্রজ্ঞাপনটি আমরা পেয়েছি।
ওয়ারেছ আলী মামুন জানান, রাজনৈতিক মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

নিজেদের যোগ্য বানানোর চ্যালেঞ্জ নিতে হবে : শিবির সভাপতি

ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার বলেছেন, সব বাঁধা অতিক্রম করে সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক উপহার দিতে ছাত্রশিবির জাতির কাছে ওয়াদাবদ্ধ। সুতারং সব বাঁধার বিপরীতে নিজেদেরকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আজ রাজশাহীর এক মিলানায়তনে ছাত্রশিবির রাজশাহী অঞ্চল পশ্চিমের সদস্য প্রার্থী শিক্ষাশিবিরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন। শিক্ষাশিবিরে আরো উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ইয়াছিন আরাফাত, কলেজ কার্যক্রম সম্পাদক শাহ আলম প্রমুখ।
শিবির সভাপতি বলেন, দেশের যুব সমাজের একটি বিরাট অংশ যখন মাদক, অপসংস্কৃতি, সন্ত্রাস ও অনৈতিকতায় ডুবে আছে তখন ছাত্রশিবির নেতাকর্মীর তার বিপরীতে চলছে। সব মত পথ প্রত্যাখ্যান করে কুরআনের আলোকে নিজেদের ও ছাত্রসমাজকে পরিচালিত করার চেষ্টা করছে। আর তাই বাতিলের আতে ঘাঁ লাগছে। ছাত্রসমাজকে মাদক, অপসংস্কৃতি ও বেহায়াপনার এই প্রচেষ্টা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং জাতি বিনাশী সুদুর প্রসারী পরিকল্পনা। এটা আজ প্রমাণিত যে এসব অপতৎপরতার পেছনে রাষ্ট্রীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। ছাত্রদেরকে সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার সুষ্ঠু ব্যবস্থা না করলেও তাদের ধ্বংস করার সব প্রচেষ্টার সাথেই রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জাড়িত। যা জাতির জন্য চরম লজ্জাজনক বিষয়।
তিনি আরো বলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সব বাতিল পথের হাতছানি প্রত্যাখান করে নিজেদের দুনিয়া ও আখেরাতের যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ছাত্রশিবির সত্য ও ন্যায়ের পথে দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলা এক দুঃসাহসিক কাফেলার নাম। যোগ্যতাসম্পন্ন করে নিজেদেরকে গড়ে তোলার পথে বাধা আছে এবং থাকবে। কিন্তু ছাত্রশিবির এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা করেই এগিয়ে যাবে। ইতোমধ্যে তার প্রমাণ জাতির সামনে পেশ করেছে ছাত্রশিবির। অবর্ণনিয় জুলুম নির্যাতন ও সিমাহীন অপপ্রচারের পরও ছাত্রশিবিরের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে না পারা ক্ষোভে তাদের অপতৎপরতার আরো বৃদ্ধি করতে পারে। বাড়তে পারে বাঁধার পরিধি। কিন্তু সব বাধাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেই ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা নিজেদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য যোগ্য গড়ে তুলবে। জাতি এমটিই প্রত্যাশা করে।

পাক-ভারত সীমান্তে গোলাগুলি : নিহত ১০

বিরোধপূর্ণ ভারত ও পাকিস্তান সীমান্তে গোলাগুলিতে কমপক্ষে ১০ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে পাকিস্তানের ছয়জন ও ভারতের চারজন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো অনেকে। আজ শুক্রবার ভোরে এ ঘটনা ঘটে।
পাকিস্তানের স্থানীয় ডন পত্রিকা জানায়, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফের গুলি ও বোমায় ছয় পাকিস্তানী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো অনেকে। ভোরে শিয়ালকোট চারওয়াহ, হারপাল, চাপরার ও সুচিতগড় সেক্টরে এ ঘটনা ঘটে।
এর আগে নিহতের সংখ্যা সাতজন বলে জানানো হয়েছিল। পরে সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং-এর পক্ষ থেকে নিহতের সংখ্যা ছয়জন বলে নিশ্চিত করা হয়।
অপরদিকে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, পাকিস্তানী সেনাদের গুলিতে জম্মু ও কাশ্মিরে চার ভারতীয় নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে গোলাগুলির এ ঘটনা ঘটল।
পাকিস্তানের এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী শুক্রবার ভোর ৩টার দিকে গুলিবর্ষণ শুরু করে। সকাল পর্যন্ত তা চলে। এতে ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ২২ নারীসহ ৪৬ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
অপরদিকে, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের কর্মকর্তা রাকেশ কুমার শর্মা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, পাকিস্তানের মর্টার শেলের আঘাতে গ্রামের চারজন বাসিন্দা নিহত হয়েছেন।

নিলয় হত্যায় গ্রেপ্তার দুজন ৫ দিনের রিমান্ডে

ব্লগার নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার দুজনকে পাঁচ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করে ঢাকার মহানগর হাকিম এমদাদুল হক এই হেফাজত মঞ্জুর করেন।
গ্রেপ্তার কাউছার হোসেন খান (২৯) ও কামাল হোসেন সরদারকে (২৯) ১০ দিনের রিমান্ডে চেয়েছিল পুলিশ।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর মিরপুর ১০ নম্বর থেকে কাউছারকে এবং শ্যামপুরের ধোলাইপাড় থেকে কামালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তারা দুজনই ব্লগার আসিফ মহীউদ্দীনকে হত্যাচেষ্টা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি বলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (পূর্ব) মাহবুব আলম জানিয়েছেন।
গত ৭ আগস্ট ঢাকার গোড়ানে নিজের বাসায় সন্ত্রাসীদের ধারাল অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন ব্লগার নিলয়। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে এর আগে সাদ আল নাহিন ও মাসুদ রানা নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এদের মধ্যে নাহিন শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নুর ভাতিজা। ২০১৩ সালে উত্তরায় আসিফ মহীউদ্দীনের উপর হামলার পর নাহিন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং এক বছরের বেশি সময় কারাবাসের পর তিনি জামিনে ছাড়া পান।
কাউছার ও কামালও এর আগে আসিফ মহীউদ্দীনের উপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলে উপকমিশনার মাহবুব জানান।
আসিফ মহীউদ্দীন হত্যাচেষ্টা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নিবারণ চন্দ্র বর্মন জানান, নাহিন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সক্রিয় সদস্য বলে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
ব্লগার নিলয় হত্যাকাণ্ডের পিছনেও নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহর সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে পুলিশের সন্দেহ।

খালেদার বিবৃতি প্রত্যাহারের নেপথ্যে...

বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়ার নামে দেয়া একটি বিবৃতি প্রত্যাহার নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে বিএনপিসহ বিরোধী জোটে। নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধানে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের তরফে নেয়া হচ্ছে খোঁজ-খবর। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে একটি জরুরি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিএনপি। চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন দলের স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যসহ বেশ কয়েকজন ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও যুগ্ম মহাসচিব। সংবাদ সম্মেলন থেকে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান যুক্তরাজ্যে চিকিৎসাধীন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গাজীপুরে গাড়ি পোড়ানো মামলার চার্জশিট দেয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে দেয়া লিখিত বক্তব্যের ভাষা ছিল বেশ কড়া। এমন কি সে সংবাদ সম্মেলন থেকে গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, যতদিন তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে বাধা রয়েছে ততদিন যেন তার বিরুদ্ধে বলা কোন বক্তব্যও প্রচার বা প্রকাশ করা না হয়।
২০১৪ সালের শেষদিকে ও চলতি বছরে গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে একাধিক সংবাদ সম্মেলন ও মতবিনিময় সভায় দেয়া বক্তব্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে কঠোর কর্মসূচি দেবেন। গতকাল বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার। প্রসঙ্গতই সংবাদ সম্মেলনে এ ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান জানতে চান গণমাধ্যমকর্মীরা। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের মূল এজেন্ডা ‘তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চার্জশিট’ এর বাইরে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন বিএনপি নেতারা। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিষয়টি নিয়ে দলের ও জোটের নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং পরে তা জানানো হবে।
এদিকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরপর হঠাৎ করেই বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নামে একটি বিবৃতিতে পাঠানো হয় গণমাধ্যমে। দলের মুখপাত্র ড. আসাদুজ্জামান রিপনের স্বাক্ষরে বিবৃতিটি পাঠানো হয় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে। অন্যান্য সময় ই-মেইলে খালেদা জিয়ার বিবৃতি পাঠানোর পর ফোনে বা মোবাইলে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে খোঁজ-খবর নেয়া হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার পাঠানো বিবৃতির ব্যাপারে তেমন কোন তাগিদ ছিল না।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্তের ব্যাপারে বিরোধী জোট নেতা খালেদা জিয়ার বিবৃতিই ছিল প্রাসঙ্গিক। কিন্তু বিবৃতিতে দেখা যায়, বিষয় অন্য। বিবৃতির ভাষাও বেশ কৌতুহলময়। প্রথমত, বিবৃতিতে দেয়া হয়েছে জয়পুরহাট জেলা বিএনপি সভাপতি ও সাবেক এমপি মোজাহার হোসেন প্রধানকে কারাগেট থেকে পুনরায় গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে। কিন্তু বিবৃতিতে খালেদা জিয়ার তরফে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, ‘হিংসা-বিদ্বেষের পথ ছেড়ে আসুন একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আমরা আগের মতো একসঙ্গে কাজ করি। জনগণের রায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা-আস্থা আছে। আপনাদের ভয় কিসে?
আমি শঙ্কিত-হিংসাশ্রয়ী রাজনীতি দেশের মৃতপ্রায় গণতন্ত্রকে কফিনে পুরে ফেলবে একদিন। সরকার যেন সেই কাজটি করতেই বেশি তৎপর হয়ে উঠেছে। আমি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আমরা এজন্য দেশ স্বাধীন করিনি। কারণ এখন যে নীতিতে সরকার দেশ চালাচ্ছেÑ তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে বেইমানি ছাড়া কিছু নয়।’ খালেদা জিয়ার নামে দেয়া বিবৃতির এমন ভাষা ও নরম আহ্বান দেখে অনেকেই কৌতুহলী হয়ে ওঠেন। দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন উঠেÑ দীর্ঘদিন ধরে কারাভোগকারি দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের জামিনের আদেশ স্থগিত বা একাধিক জাতীয় নেতার ইস্যু বাদ দিয়ে জয়পুরহাট জেলা বিএনপি সভাপতির ঘটনায় কেন খালেদা জিয়া এমন বিবৃতি দিতে গেলেন? নেতাকর্মীদের কাছে কৌতুহলের বিষয় হচ্ছেÑ একজন জেলা নেতাকে কারাফটকে গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়ে দেয়া বিবৃতিতে কেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি এমন উদাত্ত আহ্বান?
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে বিবৃতিটি পাঠানোর কিছুক্ষণের মধ্যে একাধিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল সেটা প্রকাশ করে। বিষয়টি নেতাকর্মীদের দৃষ্টিগোচর হলে দলের নানামহলে প্রশ্ন ওঠে। সূত্র জানায়, দলের কয়েকজন সিনিয়র নেতা বিষয়টি খালেদা জিয়ার নজরে আনেন। নেতারা চেয়ারপারসনকে জানান, যেখানে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যানের প্রসঙ্গে দলের তরফে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে সেখানে এই বিবৃতিতে কেন? এছাড়া খালেদা জিয়ার বিবৃতির পর স্বাভাবিকভাবেই সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যটি গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে গণমাধ্যমে। এতে দলের বৃহস্পতিবারের মূল এজেন্ডা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিষয়টি জেনে খালেদা জিয়া ক্ষুব্ধ হন এবং বিবৃতিটি প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। এদিকে রাত সোয়া নয়টার সময় দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে একটি এসএমএস পাঠানো হয়। এতে লেখা হয়, ‘স্টেটম্যান্ট অব বিএনপি চেয়ারপারসন হুইচ হ্যাজ বিন সেন্ট অলরেডি উইল বি স্টপড বাট কনডোলেন্স প্রেস রিলিজ উইল বি ব্রডকাস্টড এ্যান্ড প্রিন্টেড।’ কিন্তু ততক্ষণে বেশিরভাগ দৈনিক পত্রিকা খালেদা জিয়ার বিবৃতি নিয়ে তৈরি প্রতিবেদনটি মেকআপে বসিয়ে ফেলেছে। দু’একটি পত্রিকা প্রেসেও চলে গেছে। অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে ঝুলছে খালেদা জিয়ার বিবৃতির বক্তব্য। খালেদা জিয়ার বিবৃতি প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে দলের দপ্তরে ফোন করলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, আমাকে বিবৃতিটি পাঠাতো নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং পরে প্রত্যাহারে খবর জানাতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আমি এর বেশি কিছু জানি না। অন্যদিকে সহ-দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন বিষয়টিকে ভুল আখ্যায়িত করে বলেন, পরের দিনের বিবৃতিটি আগেরদিন পাঠানো হয়েছে।
এদিকে দলের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ধরনের বিবৃতি দেয়ার ব্যাপারে দলের শীর্ষ মহল কিছুই জানেন না। একটি সাধারণ বিবৃতির মধ্যদিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি একসঙ্গে কাজ করার আহ্বানের মতো গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান মানানসই নয়। কিন্তু দলের মুখপাত্রসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা অনেক সময় নিজেদের গরজ অনুযায়ী গণমাধ্যমে এ ধরনের বিবৃতি পাঠান। নিজেদের ক্ষমতা ও অবস্থানের চর্চা করতে তারা এ ধরনের অতিউৎসাহী কাজ করেন। তাদের অতিউৎসাহী মনোভাব ও আচরণের কারণে অতীতে এ ধরনের অনেক বিবৃতিতে প্রত্যাহার করতে হয়েছে। যা দলের সমন্বয়হীনতার প্রকাশ ঘটায়।
সূত্র জানায়, সহ-দপ্তর সম্পাদক আসাদুল করিম শাহীন এ বিবৃতিটি দেয়ার ব্যাপারে মুখপাত্রকে জানান। মুখপাত্রের তৈরি করা খসড়া হাতে পাওয়ার পর তিনি তা গণমাধ্যমে পাঠিয়ে দেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চলতি বছরের প্রথমদিকে খালেদা জিয়া যখন তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন তখনও এধরনের বিবৃতি ও পাল্টা বিবৃতি পাঠানোর ঘটনা ঘটেছে। খালেদা জিয়ার সঙ্গে অবস্থান করে গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান বিবৃতি পাঠালেও দলের তৎকালীন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমদের বরাতে অনেকটা সাংঘর্ষিক বিষয় ও বক্তব্যযুক্ত বিবৃতি পাঠানো হয় গোপন জায়গা থেকে। একপর্যায়ে শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে সেটা বন্ধ হয়। খালেদা জিয়ার অজান্তে তারই নামে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ আহ্বান সম্বলিত বিবৃতি পাঠানোর বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান, বিষয়টির খোঁজ-খবর নেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বিএনপির মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন জানান, চেয়ারপারসনের নির্দেশে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি বিবৃতি দেয়ার কথা আমাকে জানানো হয়। কিন্তু আমি অসুস্থ থাকার কারণে কার্যালয়ে ছিলাম না। পরে আমি বিবৃতির খসড়া তৈরি করে কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেই। তবে বৃহস্পতিবার দলের সংবাদ সম্মেলন ও চেয়ারপারসনের শোকবার্তাসহ একাধিক সংবাদ থাকার কারণে এটি শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানোর কথা ছিল। কিন্তু ভুল করে দপ্তর থেকে গতকালই তা পাঠিয়ে দেয়া হয়। যা পরে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। বিবৃতি শুক্রবার পাঠানো হবে।

সৈন্যদের যুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশ কিম জং-উনের

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন শুক্রবার থেকে রণাঙ্গনবর্তী সৈন্যদের যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সুরক্ষিত সীমান্তে উভয়পক্ষের মধ্যে গোলা বিনিময়ের পর সিউলের সাথে পিয়ংইয়ংয়ের সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
সিউলকে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সীমান্তে লাউডস্পিকার দিয়ে প্রচারণা বন্ধ করতে হবে, তা না হলে তাদেরকে সামরিক পদক্ষেপের সম্মুখীন হতে হবে বৃহস্পতিবার পিয়ংইয়ংয়ের এমন আল্টিমেটামের পর দ. কোরিয়ার বাহিনী ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় উত্তর কোরিয়ার শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সিএমসি) এক জরুরী বৈঠকে এ আল্টিমেটাম দেয়া হয় এবং গোটা রণাঙ্গনে পাল্টা হামলা চালানোর পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন দেয়া হয়। উ. কোরীয় নেতা কিম জং-উন বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।
সরকারি সংবাদ সংস্থা কেসিএনএ’র খবরে বলা হয়েছে, কিম কোরিয়ান পিপলস আর্মির (কেপিএ) রণাঙ্গনবর্তী সৈন্যদের শুক্রবার বিকেল ৫টা থেকে যুদ্ধকালীন অবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
কেসিএনএ তার বরাত দিয়ে বলেছে, সৈন্যদের আকস্মিক অভিযান চালানোর জন্য সম্পূর্ণ যুদ্ধ প্রস্তুতি নিতে হবে এবং গোটা সীমান্তকে ‘প্রায় যুদ্ধকালীন অবস্থায়’ রাখতে হবে।
দ. কোরিয়ার জয়েন্ট চীফস অব স্টাফ কেপিএ’কে সরাসরি একটি বার্তায় ‘বেপরোয়া কর্মকাণ্ড’ থেকে বিরত থাকার আহবান জানিয়েছে। একইসাথে আবারো যেকোনো উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের কড়া জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারিও উচ্চারণ করেছে।
উ. কোরিয়া অতীতেও ব্যাপক উত্তেজনা চলাকালে একই ধরণের ঘোষণা দিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৩ সালে কিম দ. কোরিয়ার সাথে ‘যুদ্ধাবস্থার’ ঘোষণা দিয়েছিলেন।
দুই কোরিয়ার মধ্যে ১৯৫০-৫৩ পর্যন্ত যুদ্ধ চলে যা ইতিহাসে কোরীয় যুদ্ধ নামে পরিচিত। এ যুদ্ধ অবসানের পর গত ৬৫ বছর ধরে দুই কোরিয়া কার্যত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।
লাউডস্পিকার দিয়ে প্রচারণা বন্ধে উ. কোরিয়ার আল্টিমেটাম শনিবার বিকেল ৫টায় শেষ হচ্ছে। তবে দ. কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ আল্টিমেটাম প্রত্যাখান করে বলেছে, তারা লাউডস্পিকার দিয়ে প্রচারণা অব্যাহত রাখবে।

সুতানাগ by জাকির তালুকদার

সন্ধের মুখে মুখে বাড়িতে ঢুকে নিজের বউকে ‘টেলিভিশন থাইকা নাইমা আসা মাইয়া’ ভেবে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিল মোবারক। না ভেবে উপায়ই বা কী! চুলের পাট, মুখের জৌলুস, শাড়ি পরার কায়দা—একেবারেই অন্যরকম। মনেই হয় না যে এটাই তার বউ সাজেদা। স্বামীর মুখ দেখে মুখ টিপে হাসে বউ। এমনটাই হবে বলে আশা ছিল তার। মোবারক কিছুক্ষণ হা করে বউয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে শুধু বলতে পারে, ‘কী বেপার, আইজ যে একবারে আলাদা। নিজের বউরে চিনবারই পারতিছি না।’ সাজেদা রহস্য ভাঙে না। কেবল বলে, ‘হাতমুখ ধুয়ে আসো। আমি ভাত বাড়তিছি।’ ‘আরে রাখ তোর ভাত! ঘরে চল। আগে তরে ভালো কইরা দেইখা লই।’ বউ কপট চোখ রাঙায়, ‘এই সানঝের আগে কিসের ঘর?’
বলে বটে, কিন্তু ঘরে ঠিকই আসে। বউকে কোলের মধ্যে টেনে নিতে গিয়ে অদ্ভুত মাদকতাময় একটা সুবাস পায় মোবারক। বউয়ের চুল থেকেই বেশি আসছে সুবাস। শরীরেও সুবাস।
নিজেকে সুস্থির করার পরে মোবারক প্রশ্ন করে, ‘কী লাগাইছস সাজু?’
সাজেদা এবার আর রহস্য রাখে না। বলে, ‘শ্যাম্পু লাগাইছি চুলে। খুব ভালো হইছে না?’
‘শ্যাম্পু!’—চোখ বড় বড় হয়ে যায় মোবারকের, ‘কই পাইলি এত ট্যাকা? শ্যাম্পুর দাম কত জানস?’
বউ তুড়ি মারার ভঙ্গিতে বলে, ‘কত আর। তিন ট্যাকা।’
‘তিন ট্যাকায় শ্যাম্পু হয়? আমি তো জানি এক বোতল শ্যাম্পুর দাম চার-পাঁচ শ ট্যাকা।’
‘দূর পাগল। অত ট্যাকা আমরা পামু কই! তিন ট্যাকাই। মিনি প্যাক কয় এইডারে।’
‘কিন্তু পাইলি কই? তুই কি গঞ্জে গেছিলি?’
‘না। উত্তরখান্দারে দোকান করছে না রশিদ মিয়া!’
এই খবরটাও নতুন মোবারকের কাছে। এখানে যে কেউ দোকান দিয়ে বসতে পারে, সেটাই তো ভাবেনি কোনোদিন সে। এই বাঁধের ওপর ঘরহারা মানুষের ঘরের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন দুই শ ঘরের কাছাকাছি। আদমশুমারি হয়নি। কিন্তু অনেক বছর থেকে এই বাঁধে মানুষ আসছে, থাকছে। স্থায়ীভাবে থাকছে। এই অঞ্চলের মানুষের কাছে তাই এটার নামই হয়ে গেছে বাঁধগাঁ। বিদ্যুতের আলোর প্রশ্নই আসে না। বাঁধগাঁয়ের মানুষের নাম ভোটার তালিকায় ওঠেনি। সেই কারণে কোনো নেতা-পাতিনেতার গরজ নাই বাঁধগাঁ নিয়ে। এতগুলান মানুষের বাচ্চা, তারা কী খায় কীভাবে বাঁচে, কেউ কোনোদিন উঁকি মেরেও দেখতে আসেনি। পুলিশ এসেছে মাঝেমধ্যে। আশপাশের গাঁয়ে চুরির হিড়িক বেড়ে গেলে লোকেরা বাঁধগাঁয়ের ওপর দোষ চাপায়। এনজিওর লোক আসে। ক্ষুদ্রঋণের দাদন ব্যবসা এখানেও ছড়িয়ে পড়েছে। কিস্তির টাকা তুলতে আসতে হয় তাদের। সবচেয়ে পাশের গ্রাম থেকেও কমপক্ষে এক মাইল উত্তরে বাঁধগাঁ। তার উত্তরে নদীর বালু। নদী এখন অনেকটা দূরে। পয়োস্তি জমিতে ধানচাষ হয়, আলু হয়, খুব বড় জাতের রসুন হয়। ফসলের মাঠের দিকে তাকিয়ে বাঁধগাঁয়ের কোনো কোনো মানুষ নিজের হারানো আবাদি জমির কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তবে বেশির ভাগেরই সেসব চিন্তার বালাই নাই। তারা খাটতে যায়—হয় অন্যের জমিতে, নয়তো কারও দোকানে। কেউ গঞ্জে ভ্যান চালায়, কুলির কাজ করে। মেয়েরা, বিশেষ করে মাঝবয়সী আর বালিকারা আশপাশের গ্রামের সম্পন্ন বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে। বিদ্যুৎ নাই। টেলিভিশন থাকার প্রশ্নই ওঠে না বাঁধগাঁয়ে। ব্যাটারি দিয়ে টিভি চালাবে এমন পয়সাঅলাও কেউ নাই বাঁধগাঁয়ে। তবে টিভি দেখা হয়ে যায় অনেকেরই। পুরুষেরা তো গঞ্জের দোকানে-দোকানে দেখে। মেয়েরাও, যারা ঝিয়ের কাজ করতে যায়, তারাও টিভি দেখার অভ্যেস করে ফেলেছে। বাঁধগাঁয়ের পুরুষ-নারী—সবাই একই কথা ভাবে, ‘টেলিভিশনের ব্যাডা-মাইয়ারা অত সোন্দর হয় কেমন কইরা! আল্লাহ কী আলাদা ছঞ্চ দিয়া বানাইছে অগো।’ বাঁধগাঁয়ের মেয়েরাও সাজে। বিকেলে মেয়েরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে একজন আরেকজনের চুলে নারকোল তেল মাখায়, পরস্পরের বেণি-খোঁপা বেঁধে দেয়। মা–দাদিদের আমল থেকে তারা নানান নামের তেল-স্নো চেনে, পাউডার চেনে, আলতা চেনে।
শ্যাম্পু চিনে ফেলার কথা আজই প্রথম শুনল মোবারক। নিজে সে চেনে ওই জিনিস। গঞ্জে-বাজারে যারা কাজ করতে যায়, তারা সবাই-ই চেনে। কিন্তু কেউ কোনোদিন নিজেদের বাড়িতে ওই রকম কোনো জিনিস আনেনি। পোলাপানদের নিয়ে ভাত-সালুনের ব্যবস্থা করতে করতেই ফাট ফাট, ওই সব জিনিস যাতে কোনো মাইয়ার চোখে না পড়ে, সেদিকেই বরং তাদের নজর ছিল বেশি।
কিন্তু পড়ে তো গেলই।
পরদিন রশিদের দোকান দেখতে গেল মোবারক। টিনের বেড়ার ঘের দেওয়া টিনেরই চালার ঘর। কিন্তু জিনিসপত্রে ঠাসা। আর সাজানের কায়দাও খুব সুন্দর। সব জিনিস যেন খদ্দেরের চোখের সামনে দেখা যায়, গঞ্জের মোল্লা স্টোরের মতো। তার মতো অনেকেই দোকান দেখতে এসেছে। এই সকালবেলাতেও খদ্দের আসা শুরু হয়ে গেছে। কেউ কেউ বউয়ের জন্য কিনছে মিনিপ্যাক। কোনো কোনো ঘর থেকে মেয়েরাও এসেছে কিনতে। বাঁধগাঁয়ে পুরুষের সামনে নারীদের শরম পাওয়ার কোনো অবকাশ নাই। সব গায়ে গা লাগিয়ে থাকতে হয়। কিন্তু এখানে জিনিস কিনতে এসে কারও কারও মুখে একটু সলজ্জ হাসি। দোকানে বেশিক্ষণ কাটানো যায় না। কাজের সন্ধানে বেরোতে হবে মোবারকদের। তাই তারা উঠে পড়ে। একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল মোবারকের মাথায়, রশিদ এত পুঁজি পেল কোথায়? সমিতি থেকে লোন নিয়েছে? এত টাকা লোন দেয় সমিতি? ছিরু মিয়া ভেতরের খোঁজ বের করার ওস্তাদ। সে জানায়, ‘লোন-ফোন কিচ্ছু না। যারা মাল তৈরি করে, সেই কম্পানির লোকেরা বাকিতে মাল দিয়ে যায় রশিদকে। বিক্রি হওয়ার পরে টাকা নেয়। রশিদের লাভ লাভই থাকে। কোনো পুঁজিই লাগে না। এমনকি দোকান বানিয়ে দেওয়া, র্যাক এনে মালামাল সাজিয়ে দেওয়ার কাজও করেছে কম্পানির লোকেরা।’
আহা এমন একটা কোম্পানি যদি মোবারকের দিকে একবার তাকাত!
কয়েক দিন পরেই বাঁধগাঁয়ে একদল মেয়ে-মদ্দ এসে হাজির। তিন দিন পরে নাকি বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। তারা এসেছে কোম্পানির তরফ থেকে মানুষকে হাত ধোয়া শেখাতে। গাঁয়ের মানুষ শুনে প্রথমে হাসে। কিন্তু কিছুক্ষণ ওদের কথা শোনার পরেই তারা বুঝতে পারে, এত দিন কী বাজে অভ্যেস লালন করে এসেছে তারা! ছুঁচে এসে মাটিতে হাত ঘষে পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলে। এতে নাকি অনেক ক্ষতি। হাতে তো জীবাণু থাকেই, মাটির জীবাণুও যোগ হয় তার সঙ্গে। ফলে পেটের অসুখ সারা বছর সঙ্গী।
তাই তো! বাঁধগাঁয়ের সব পোলাপানই তো সারা বছর পেটরোগা।
হাত মাইটানির বদলে এখন থেকে হাত ধুতে হবে হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে। তা না পেলে সাবান। প্রথমে বিনা পয়সায় জনপ্রতি একটা করে মিনি সাবান ফ্রি দিয়ে যাচ্ছে কোম্পানির লোকেরা। গাঁয়ের লোক ব্যবহার করেই দেখুক। হাতে হাতে ফল পাবে তারা।
হাত ধোয়া দিবসের পরের দিন গাঁয়ে আসে একরাম সাঁই। সে কবে কখন গাঁয়ে আসে ঠিক নাই। আসে, কয়েক দিন থাকে, গাঁ-পড়িশদের গান শোনায়, গল্প শোনায়, আবার চলে যায়। বাঁধগাঁয়ের মানুষ ভক্তি করার মতো একজনকেই চেনে। ভক্তি নিয়ে কথা শোনে। কিন্তু একরাম সাঁইয়ের সব কথা বুঝতে তারা পারে না। সাঁইও রহস্য ভেঙে বলে না সবকিছু।

এবার গাঁয়ে এসে মিনিপ্যাকের কথা শুনেছে সাঁই। কিংবা শুনেই হয়তো এসেছে গাঁয়ে। তার ভিটায় গল্পের আসর সন্ধের পরে।
‘মনসার তো খুব জেদ। সেই রকম জেদ চাঁদ সদাগরের। মনসা কয়, চাঁদ তোরে আমি নিব্বংশ করমু। চাঁদ কয়, তরে সামনে পাইলে আমি জিগার ওলা দিয়া পিডাইয়া ঠ্যাং ভাঙমু। চাঁদ সদাগরের সাতপুত্রের মইদ্যে ছয়পুত্র ডুইবা মরছে মনসার কোপে। বাকি আছে লখিন্দর। লখাই। তারও মরণ নিশ্চিত। তাই পুত্রের বিয়া দেওনের সময় সদাগর কোনো মাইয়া খুঁইজা পায় না। কোনো বাপ-মায় মাইয়া দিবার চায় না। জাইনা-শুইনা কে বিধবা বানাইবার চায় নিজের মাইয়ারে। কিন্তুক রাজি হয় বেহুলা। রাজি হয় বেহুলার মা-বাপ। এই তত্ত্ব শুইনা মনসা কয়, বিয়া হইব অগো কিন্তু বাসর হইব না। চাঁদ সদাগর লোহার বাসরঘর বানায়। কিন্তু মনসার চরেরা গোপনে সেই দেয়ালে একটা কাঠি রাইখা যায়। তাই লোহা ঢালাই হইলেও একচুল ফাঁক থাইকা যায় একদিকের দেয়ালেত। বাসর রাইতে মনসা একে একে ডাকে কালনাগরে, আজদাহারে, গোক্ষুররে, শীশনাগরে। কিন্তু কেউ ঢুকবার পারে না বাসরঘরে। তখন ডাক পড়ে সুতানাগের। তারপরের কাহিনি তো তোমরা সক্কলেই জানো।’
এই পর্যন্ত বলেই উঠে পড়ে একরাম সাঁই।
বাঁধগাঁয়ে এখন কারও ঘরে আর পয়সা জমা থাকার জো নাই। চালের বাতায় গুঁজে রাখা এক টাকা-দুই টাকার নোট, মেলা থেকে শখ করে কিনে আনা পয়সা জমানোর রং-মাটির ব্যাংক, বাঁশের খুঁটিতে ফোকর বানিয়ে জমানো পয়সা—সব চলে যেতে থাকে রশিদের দোকানে। যেসব জিনিস ছাড়া আগে দিব্যি দিন কেটে যেত তাদের, সেসব ছাড়া এখন চলেই না।
গাঁয়ে কোম্পানির মেয়ে-মদ্দ আসার বিরাম নাই। এবার তারা এসেছে নতুন এক তত্ত্ব নিয়ে। এই যে এত দিন ধরে বাঁধগাঁয়ের মানুষ দাঁত মাজছে কাঠকয়লা আর ঘুঁটের ছাই দিয়ে, এটা আদৌ ঠিক না। ঘুঁটে মানে তো গোবরই। সেই গোবর মুখে তোলা! তাদের কথা শুনে গাঁয়ের মানুষ এ-ওর মুখের দিকে তাকায়। তাই তো!
এখন কী করতে হবে?
এত দিন যা হওয়ার হয়েছে। এবার থেকে দাঁত মাজতে হবে ব্রাশ আর টুথপেস্ট দিয়ে। এবারও একটা করে ব্রাশ আর একটা মিনিপ্যাক টুথপেস্ট ফ্রি।
এক বছরের মধ্যেই বাঁধগাঁয়ের চেহারা পাল্টে যায়। রশিদের দোকানের জৌলুস বাড়ে আর গাঁয়ের মেয়েদের চেহারায় জৌলুসও কিছুটা বাড়ে। কিন্তু অশান্তি কেন এত! চালের হাঁড়িতে কোনো কোনো দিন চাল কম পড়ে। হঠাৎ রোগ-ব্যাধি হলে তার ওষুধ জোটানো কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ বুঝতে পারে না যে তাদের খরচ বেড়ে গেছে, কিন্তু উপার্জন আছে আগের মতোই। গাঁয়ের মধ্যে কোনো চুরি-চামারি ছিল না। এখন গাঁয়ে তো চুরি হচ্ছেই, আশপাশের গ্রামগুলোতে ছিঁচকে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ছে বাঁধগাঁয়ের মানুষ। মেয়েরা গেরস্ত বাড়িতে কাজ করতে গিয়ে ছোঁক ছোঁক করে। সুযোগমতো টাকা হাতড়ায়। টাকা না পেলে অন্য জিনিস। ধরা পড়ে যথারীতি। চোরের দশদিন তো গেরস্তের একদিন! উত্তমমধ্যম খায়। তাড়িয়ে দেয় কাজ থেকে। এক বছরেই অবস্থা এমন যে বাঁধগাঁয়ের মানুষকে আর কাজ দিতে চায় না কেউ।
বাঁশঝাড়ের ছায়ায় একসঙ্গে বসে পুরুষেরা আলোচনা করে, ‘এসব কী ঘটছে?’ কিন্তু উত্তর পায় না কেউ। তারা দুপুরে আলোচনা করে। সন্ধ্যায় আলোচনা করে। রাতে আলোচনা করে। দুজনে আলোচনা করে। চারজনে আলোচনা করে। দশজনে আলোচনা করে। দলবেঁধে আলোচনা করে। কিন্তু উত্তর খুঁজে পায় না। উপায় খুঁজে পায় না। তারা বিরসমুখে ঘরের দিকে ফিরে যায়। শ্যাম্পুর সুবাস ছড়ানো বউয়ের শরীর তাদের উচ্ছ্বসিত করে না। পেস্ট দিয়ে দাঁত মেজে আসা বউ তাদের দিকে ঠোঁট এগিয়ে দেয়। কিন্তু তারা বিড়ির গন্ধঅলা মুখ দিয়ে স্বাগত জানায় না সেই ঠোঁট। তারা শুধু বিষণ্ন হতে থাকে, নির্জীব হতে থাকে। রাতে ঘুম ভালো হয় না তাদের। ভোর হতেই আবার গিয়ে বসে বাঁশতলায়। মনে আশা, কেউ যদি সমাধানের কোনো সূত্র নিয়ে উপস্থিত হতে পারে! কিন্তু ভোরের পর ভোর কেটে যায়। দিনের পর দিন কেটে যায়। কোনো সমাধান হয় না।
হঠাৎ-ই এক রাতে একরাম সাঁইয়ের গলার গান শোনা যায়। ‘বাউল আইছে! এইবার একখান সমাধান পাওয়া যাইবার পারে।’—গাঁয়ের অর্ধেক পুরুষ উত্তেজিত হয়ে বিছানায় উঠে বসে। রাত বেশি হয়নি। তারা ঘর থেকে বেরিয়ে একরাম সাঁইয়ের ঘরের দিকে যায়। মোবারক সেখানে পৌঁছে দেখতে পায়, অন্তত তিরিশজন মানুষ উপস্থিত। কিন্তু সাঁই তার ঘরে নাই। তাহলে এই অমাবস্যা রাতে কে গান গাইল তাদের গাঁয়ের পথে? তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ করে নিজ নিজ ঘরে।
কিন্তু হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে জামিরুল বুড়া, ‘পাইছি! শত্তুররে খুঁইজা পাইছি।’
এই বাঁধে আসার আগে জামিরুল বুড়া নিজের গ্রামে ছিল মোড়লস্থানীয় মানুষ। চলাফেরা, কথাবার্তার মধ্যে এখনো কিছুটা সেই ছাপ রয়ে গেছে। তাই কখনো কখনো কর্তৃত্বব্যঞ্জক আচরণই করে ফেলে সে। এই মুহূর্তে সবাই তার কর্তৃত্ব মেনেও নেয়। জানতে চায়, ‘কও মোড়ল, কে সেই শত্তুর?’
মোড়ল এমনভাবে বিড়বিড় করে বলে যাতে সবাই শুনতে পায়, সাঁই তো এক বচ্ছর আগেই কইয়া গেছিল শত্তুরের কথা। সুতানাগ।’
‘সুতানাগ?’
মুহূর্তে অন্যরাও বুঝে ফেলে শব্দটার তাৎপর্য, ‘ওরে! এ যে সেই মিনিপ্যাক! রশিদের দোকান!’
লাঠিসোঁটা-শাবল হাতে জনা তিরিশেক ক্রুদ্ধ মানুষ অন্ধকারেই জোরপায়ে হেঁটে চলে উত্তরখান্দারের দিকে। আজ তারা রশিদের দোকানের চিহ্ন রাখবে না।
তারা উত্তেজিত।
কিছুটা হিংস্রও।
তাদের জীবনে অশান্তি ডেকে আনা, অভাবের মধ্যে আরও অভাব ডেকে আনা এই দোকান আজ তারা উচ্ছেদ করবেই।
অন্ধকারে বারবার হোঁচট খেতে হচ্ছে। ব্যথাও লাগছে। কিন্তু কেউই কঁকিয়ে উঠছে না। কেউই ফিরে যাওয়ার নাম করছে না।
তবে তারা এই উত্তেজনার মধ্যেও একটু অবাক হয়েই খেয়াল করে যে তারা যত উত্তরখান্দারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ততই ফিকে হয়ে আসছে অন্ধকার। ব্যাপারটা কী? ওই দিকে কি চাঁদ উঠেছে নাকি বিজলি বাতি জ্বলেছে?
রশিদের দোকানের সামনে পৌঁছে ক্রুদ্ধ মানুষগুলো হতবাক হয়ে যায়। আলোয় আলোময় চারপাশ। সেই আলোর নিচে ঝিকমিক করে হেসে চলেছে রশিদের দোকানের নতুন টিনের চালা, টিনের বেড়া। বেড়ার গায়ে গায়ে অপ্সরীর মতো মুম্বাই নায়িকাদের ফটো। তারা একেকজন একেকটা মিনিপ্যাক নিয়ে মোহনীয় আহ্বানের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন মিনিপ্যাক কিনলেই সঙ্গে সঙ্গে তাকে পাওয়া যাবে।
কিন্তু এত আলো কোত্থেকে এল! রশিদের দোকানের মাথার ওপর খোপকাটা একটা বড় প্যানেল। সৌরবিদ্যুৎ।
এত আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া মানুষগুলো নিজেদের ভবিষ্যৎ বুঝে ফেলে। তাদের হাতের ভোঁতা হাতিয়ারগুলো ভারী হয়ে আসে। হাত থেকে খসে পড়তে চায়। তারা বুঝে যায়, রশিদ আসলে রশিদ নয়। রশিদ হচ্ছে কোম্পানির হাত। আর কোম্পানির দোকান উচ্ছেদ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয় কোনোদিন।

গার্ল সামিটের এক বছর by সারাহ কুক ও এডওয়ার্ড বিগবেদার

‘আমি স্কুলে যেতে ভালোবাসি। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে লুকোচুরি এবং অন্য সব মজার খেলা করি। আমি আবার স্কুলে যেতে চাই এবং শিক্ষকতা করতে চাই,’ ১৫ বছর বয়সের এক বাল্যবধূ এ কথা বলছিল। আসুন, একসঙ্গে কাজ করি, যাতে কোনো শিশু তার স্বপ্নপূরণে ব্যর্থ না হয়।
এক প্রজন্মের মধ্যে, নারীর খতনা, বাল্যবিবাহ এবং জোরপূর্বক বিয়ে বন্ধে বৈশ্বিক কার্যক্রমকে সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্য সরকার এবং ইউনিসেফ যৌথভাবে গত বছরের ২২ জুলাই আয়োজন করেছিল গার্ল সামিট। ৫০টির বেশি দেশ থেকে সাত শতাধিক প্রতিনিধি সেখানে অংশ নেন। সিভিল সোসাইটি, ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধি, সরকারের মন্ত্রী, বেসরকারি খাত, ভুক্তভোগী এবং যুব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিসহ নানা স্তরের অংশগ্রহণকারী যোগ দেন এ আয়োজনে। সামিটের পর গেল এক বছরে অনেক অগ্রগতি হয়েছে এবং লক্ষ্য অর্জনে ১৮০টির ওপর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
এই জুলাইতে, আমরা গার্ল সামিটের প্রথম বার্ষিকী উদ্যাপন করছি। এই বার্ষিকীর প্রাক্কালে বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানাই নারী ও কন্যাশিশুর জীবনমান উন্নয়নে অবদানের জন্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভেদাভেদ কমিয়ে আনা এবং শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাসেই কেবল সরকারের সাফল্য সীমাবদ্ধ নয়, অগ্রগতি এর চেয়ে বেশি। এশিয়ার একটি বর্ধনশীল জাতি হিসেবে জেন্ডার, বৈচিত্র্য ও উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ এবং সব ধরনের জাতিগত বৈষম্য বিলোপ সনদে অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ বাংলাদেশ।
নারী–পুরুষের বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্যগুলো হচ্ছে গত এক দশকে প্রতি এক লাখ শিশুজন্মে মাতৃমৃত্যু ৪০০ থেকে ২৪০-এ নেমে এসেছে, ২০০২ সালের জানুয়ারি থেকে মেট্রোপলিটন শহরের বাইরে এইচএসসি পর্যন্ত নারীশিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছে, ঝরে পড়া হ্রাস পেয়েছে এবং শিশুবিষয়ক আইন ২০১৩, শিশুনীতি ২০১১, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা ও পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইনসহ ২০১০ নানা আইনি কাঠামো তৈরির মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
এসব অর্জনের পাশাপাশি অনেক চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করার প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষত নারী–পুরুষের সমতার ব্যাপক ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে। বাল্যবিবাহের হার এখনো অনেক বেশি। দেশের অর্ধেকের বেশি নারী, যাঁদের বয়স ২০ থেকে ২৪-এর মাঝামাঝি, তাঁরা ১৮তম জন্মদিন পালনের আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেন। প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন নারীর বয়স ১৫ বছর হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যায় (ইউনিসেফের গবেষণা তথ্য)। শিশুর স্বার্থ সুরক্ষায় প্রতিটি জাতিকেই বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে দেশের উন্নয়নের পরিপ্রেক্ষিত থেকে এটি একধরনের উন্নয়নবিমুখতা। শৈশবে বিয়ে হওয়া মানে বর ও কনে দুজনেই মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করা বা সমাজের কাছ থেকে দরকারি সুবিধাগুলো নেওয়ার ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয় বাল্যবিবাহের শিকার শিশু।
সবকিছুর পরও ভালো সংবাদ আছে। গবেষণা তথ্য বলছে, বাল্যবিবাহ বাংলাদেশে নিম্নগামী। ২০১৪ সালের বাংলাদেশ জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য জরিপে জানা গেছে, ইতিপূর্বে ২০-২৪ বয়স গ্রুপের নারীদের ক্ষেত্রে ১৮ বছর বয়সের আগে বাল্যবিবাহ শতকরা ৬৮ ভাগ ছিল। গত এক দশকে এটি ১৬ পয়েন্ট কমেছে। এই নিম্নগামিতা প্রমাণ করে বাল্যবিবাহ রোধে বাংলাদেশ বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে। শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তোলা, বাস্তবায়ন, তদনুযায়ী নীতিমালা বাস্তবায়ন, বাল্যবিবাহ বন্ধে সংশ্লিষ্ট কমিউনিটিগুলোকে সচেতন করা ও সংঘবদ্ধ করার মাধ্যমে এই অগ্রগতিকে বেগবান করার এটিই উপযুক্ত সময়। বাংলাদেশ সরকার দেশের সব মানুষের কাছে উন্নয়ন সুবিধা পৌঁছে দিতে ও মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার পথে চলছে। এ অবস্থায় বাল্যবিবাহ বন্ধ করা অসম্ভব কোনো কাজ নয়। উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে, শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনে অনুপ্রাণিত হয়ে মেয়েদের ক্ষমতায়ন হচ্ছে এবং পরিবর্তিত হচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধ।
এটি আশাব্যঞ্জক যে বাংলাদেশ বাল্যবিবাহ রোধে বর্তমানে অনেক কিছু করছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যে গার্ল সামিটে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিবাহ বন্ধের ব্যবস্থা করবেন। ২০২১ সালের মধ্যে তিনি ১৫ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে বাল্যবিবাহ এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনবেন বলেও কথা দিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ আয়োজন করে নিজস্ব গার্ল সামিট। এই নিবিড় সম্পৃক্ততা ও সদিচ্ছা, উন্নয়ন সহযোগীদের বাল্যবিবাহ বন্ধে একযোগে কাজ করায় অনুপ্রাণিত করে।
সরকারের বর্তমানে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন ১৯২৯ সংশোধনের উদ্যোগ এবং বিয়ের বয়স ১৮ বছর করা বড় ধরনের অর্জন। একইভাবে বাল্যবিবাহ বন্ধে জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়া প্রস্তুতের মাধ্যমে বাংলাদেশ একই ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের প্রতিবেশী দেশ যেমন ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো শিশু অধিকার ও জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করার পথ বেছে নিয়েছে। অনূর্ধ্ব–১৮ বছরের শতকরা ৩৯ ভাগ জনগোষ্ঠী নিয়ে বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। এই শক্তি কাজে লাগাতে দরকার সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, শিক্ষিত এবং সবল জনগোষ্ঠী। এক হিসাবে জানা গেছে, বাংলাদেশে শতকরা ৫০ ভাগ জনবল নারী—যা দেশের জন্য সম্পদবিশেষ। নিজের ভাগ্য গড়তে এবং দেশের উন্নয়নে এই নারী জনগোষ্ঠীকে জীবনমুখী শিক্ষা, দাতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্য সুবিধা দিতে হবে। এই সম্ভাবনাময় তরুণ জনগোষ্ঠী যদি বাল্যবিবাহ এবং অপরিপক্ব বয়সে মাতৃত্বের শিকার হয়, তবে দেশ হারাবে সেই জনবল, যারা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারত।
বাংলাদেশের সহযোগী হিসেবে প্রথম গার্ল সামিট বার্ষিকীতে আমরা কিশোর-কিশোরীদের জন্য বরাদ্দ রাখার গুরুত্ব তুলে ধরছি। বিশেষ করে বাল্যবিবাহের মতো শিশু অধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধের মাধ্যমে শিশুর সুন্দর আগামী গড়ে তোলার উপযুক্ত বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে অনুরোধ করছি।
সারাহ কুক: যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ডিএফআইডির বাংলাদেশের প্রধান। এডওয়ার্ড বিগবেদার: বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি।

উত্তাল মোদির গুজরাট

কোটার দাবিতে আন্দোলনরত প্যাটেল সম্প্রদায়ের সদস্যরা
গতকাল ভারতের গুজরাটের আহমেদাবাদের একটি রেলপথের
ওপরে তারে আগুন দিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে পুলিশ
সদস্যরা সেগুলো সরিয়ে ফেলেন। ছবি: রয়টার্স
প্যাটেল সম্প্রদায়ের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাট। সরকারি চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সংরক্ষিত কোটার দাবিতে গত মঙ্গলবার সম্প্রদায়টি আন্দোলনে নামলে এ সমস্যার সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষে সেখানে ছয়জনের প্রাণহানি ঘটেছে। পরিস্থিতি সামলাতে কারফিউ জারি করা হয়েছে। খবর পিটিআই, এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া ও বিবিসির। গুজরাটের কমবেশি ১৫ শতাংশ মানুষ প্যাটেল সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা হীরক প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অনেকে হীরকের ব্যবসা বা কৃষিকাজেও যুক্ত। অর্থনৈতিকভাবে রাজ্যে তারাই যথেষ্ট প্রভাবশালী। তবে নিম্নবর্ণের জন্য অন্যান্য অনগ্রসর জাতি (ওবিসি) কোটার বিধান রাখায় প্যাটেল সম্প্রদায়ের লোকজনকে অসুবিধায় পড়তে হয় বলে বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য। নিজেদের অন্যান্য ওবিসি তালিকাভুক্ত করার দাবিতে বেশ কিছু দিন ধরেই আন্দোলন করে আসছে প্যাটেল সম্প্রদায়। কিন্তু এই দাবি নিয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় থাকা ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারের সঙ্গে প্যাটেলদের ক্রমেই দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ মঙ্গলবার সম্প্রদায়টির কয়েক লাখ সদস্য গুজরাটের রাজ্যের প্রধান শহর আহমেদাবাদে জমায়েত হয়। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাত্র ২২ বছর বয়সী হার্দিক প্যাটেল। তিনি বিজেপি সরকারের উদ্দেশে বলেন, সরকার প্যাটেলদের দাবি অবজ্ঞা করলে আগামী ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে গুজরাটে হারতে হবে বিজেপিকে। এরপর রাজ্যজুড়ে মঙ্গলবার বন্ধ্ পালনের ডাক দেন হার্দিক। ঘোষণা দিয়ে আহমেদাবাদে অনশনে বসেন তিনি। রাতে হার্দিক প্যাটেলকে অনশন মঞ্চ থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। এ সময় বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে লাঠিপেটা শুরু করে তারা। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় রাস্তায় অন্তত ১০০টি বাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি সম্পত্তিতে ভাঙচুর করে তারা।
বিক্ষোভকারীরা গুজরাটের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রজনী প্যাটেলের বাড়িতেও আগুন লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের নেতা হার্দিককে ছেড়ে দেয়। তবে পরিস্থিতি সামলাতে আহমেদাবাদের কয়েকটি এলাকার পাশাপাশি সুরাট এবং মহেসানা জেলায়ও কারফিউ জারি করা হয়। মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বুধবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সংঘর্ষে অন্তত ছয়জন নিহত হওয়ার খবর মিলেছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাতে আহমেদাবাদের বস্ত্রাল এলাকায় পুলিশের গুলিতে দুজন নিহত হয়। গতকাল আহমেদাবাদে আরেকজন নিহত হয়। আর আহমেদাবাদ থেকে ১৪৫ কিলোমিটার দূরের পালানপুর শহরে একটি থানায় গতকাল স্থানীয় ৩০০-৪০০ বিক্ষোভকারী হামলা চালায়। এ সময় পুলিশ গুলি ছুড়লে দুজন নিহত হয়। এ ছাড়া মহেসানা জেলায় সংঘর্ষে একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গুজরাটে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ), সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশের (সিআরপি) প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর কয়েকটি দল বিভিন্ন সড়কে টহল দিচ্ছে। আর গুজব ছড়ানো বন্ধ করতে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় গতকাল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্কুল-কলেজ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল। বন্ধ হয়ে যায় গণপরিবহনও। ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী আনন্দিবেন প্যাটেল। দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সহিংসতা পরিহার করে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সব সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

কৃষ্ণগহ্বরে কিছুই হারিয়ে যায় না?

দ্য ব্ল্যাক হোল চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য। মুভিস্টোর
কৃষ্ণগহ্বরে প্রবেশের পর সবকিছুই হারিয়ে যায় বলে যে ধারণার প্রচলন রয়েছে, ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি সম্প্রতি বলেছেন, কৃষ্ণগহ্বরের গ্রাস করা তথ্য হয়তো সেখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্য কোনো মহাজগতে হাজির হয়। খবর গার্ডিয়ানের। নন্দিত পদার্থবিদ হকিং সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের কেটিএইচ রয়েল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে এক উন্মুক্ত বক্তৃতায় বলেন, ‘যদি মনে করেন, কৃষ্ণগহ্বরে চলে গেছেন—হাল ছেড়ে দেবেন না। সেখানেও পথ আছে, যার মধ্য দিয়ে তথ্য বাইরে যেতে পারে।’ কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যাওয়া তথ্যের পরিণতি কী হয়, তা নিয়ে নতুন একটি তত্ত্ব দিয়েছেন হকিং। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, কৃষ্ণগহ্বর হচ্ছে মহাশূন্যের এমন এক জায়গা, যেখানে অসীম মাধ্যাকর্ষণ যেকোনো বস্তু প্রচণ্ড শক্তিতে টেনে নেয়। তখন সেখানে পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়মগুলোও অকার্যকর হয়ে যায়। হকিং বলছেন, তিনি একটি বিশেষ কৌশলের খোঁজ পেয়েছেন, যার মাধ্যমে কৃষ্ণগহ্বর থেকে তথ্য ফিরে আসতে পারে। কৃষ্ণগহ্বরে যাওয়ার পর কোনো বস্তুর ভৌত অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে যায় যে মনে হয়, সেটি সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। কিন্তু মহাবিশ্বের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী এটা অসম্ভব। কৃষ্ণগহ্বরে যাওয়ার পরও কোনো বস্তু কোথাও না কোথাও গিয়ে থামবে। হকিংয়ের যুক্তি, ‘কৃষ্ণগহ্বরের বিকল্প ইতিহাস থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। গহ্বরটি নিশ্চয়ই অনেক বড় এবং যদি তা আবর্তিত হয়, অবশ্যই এর আরেকটি মহাবিশ্বে যাওয়ার পথ আছে। কিন্তু আমাদের মহাবিশ্বে ফিরে আসার সুযোগ নেই।
স্টিফেন হকিং
তাই আমি মহাকাশ ভ্রমণে আগ্রহী হলেও, সেটা করতে যাচ্ছি না। এই বক্তৃতার মূল বার্তা হলো কৃষ্ণগহ্বর কালো নয়। সেগুলো চিরন্তন কারাগারও নয়, যেমনটা ভাবা হতো। কৃষ্ণগহ্বর থেকেও বস্তু বেরিয়ে যেতে পারে এবং তা সম্ভবত অন্য কোনো মহাবিশ্বে গিয়ে হাজির হয়।’ হকিং বর্তমানে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত গণিত ও তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যা গবেষণার পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। কৃষ্ণগহ্বর বা ব্ল্যাক হোল বিজ্ঞানীদের কাছে বরাবরই এক ধাঁধা। মহাশূন্যের ওই রহস্যময় স্থানে মাধ্যাকর্ষণ এত বেশি যে তা সবকিছুকেই গ্রাস করে। এমনকি আলো পর্যন্ত সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। কোনো তারকা বা নক্ষত্রের মৃত্যুর সময় এমনটা ঘটতে পারে। কোনো আলো বেরোয় না বলেই কৃষ্ণগহ্বর দেখা যায় না।

ইরান ও রাশিয়ার অব্যাহত সমর্থন পাবে সিরিয়া

বাশার আল-আসাদ
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বলেছেন, তিনি তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ইরান ও রাশিয়ার কাছ থেকে অব্যাহতভাবে সমর্থন পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। মঙ্গলবার এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি। খবর বিবিসির। সিরিয়ায় চার বছর ধরে চলমান গৃহযুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। এতে করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে, সিরীয় সরকারকে বিদ্রোহীদের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে বাধ্য করা হতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট বাশার বলছেন, মস্কো ও তেহরান তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু দামেস্ককে পরিত্যাগ করেনি। লেবাননের শিয়া যোদ্ধাগোষ্ঠী হিজবুল্লাহ পরিচালিত টেলিভিশন চ্যানেল আল-মানারকে দেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে বাশার যুগান্তকারী কোনো কিছু আসন্ন, এমন প্রত্যাশা না করতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বহির্বিশ্ব যদি ‘সন্ত্রাসবাদ’কে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে, তাহলেই কেবল চলমান সংঘাতের একটি সমাধান সম্ভব। পশ্চিমা-সমর্থিত সরকারবিরোধী বিদ্রোহী ও বিভিন্ন জিহাদি গোষ্ঠী সবাইকেই ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করে থাকে সিরিয়া।
সিরিয়ায় ২০১১ সালের মার্চে প্রথম সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর দেশটির সেনাবাহিনীর অনেকেই পক্ষ ত্যাগ করে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী গড়ে তুললে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই সংঘাতে এ পর্যন্ত আড়াই লাখের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। এ ছাড়া বাড়িঘর ছাড়া হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ। সিরিয়ার সরকারি বাহিনী সাম্প্রতিক সময়ে লড়াই ক্ষেত্রে একের পর এক এলাকা হারিয়ে চলেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী শহর পালমিরার পাশাপাশি ইরাক-সিরিয়া সীমান্ত এলাকার কৌশলগত কিছু এলাকা। তবে প্রেসিডেন্ট বাশারের কণ্ঠে নমনীয়তার কোনো লক্ষণ নেই। চার বছরের এই সংঘাতের ইতি ঘটাতে জাতিসংঘের সিরিয়াবিষয়ক দূত স্টেফান ডি মুস্তারা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি সবাইকে আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনায় বসানোর চেষ্টা করছেন। তবে সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট বাশার জাতিসংঘ দূতকে পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে বর্ণনা করেন। এদিকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেছেন, সিরীয় সংঘাতের ইতি ঘটাতে প্রেসিডেন্ট বাশারকে ‘নিরপেক্ষ’ করা জরুরি। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সন্ত্রাসীদের প্রভাবও কমাতে হবে। আবার বাশারকেও সরিয়ে দিতে হবে।’

ডাইনি অপবাদ মোকাবিলায় বেকায়দায় ভারত

ইন্দিরা জয়সিং ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একজন আইন বিশেষজ্ঞ...
ডাইনি অপবাদ দিয়ে সম্প্রতি এক নারীর শিরশ্ছেদের ঘটনা আবারো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো যে, ভারতের কিছু এলাকায় মেয়েদের ডাইনি অপবাদ দিয়ে হত্যার কুপ্রথা এখনো রয়ে গেছে৷ এর আসল কারণ জাতপাত, লিঙ্গবৈষম্য ও প্রতিশোধস্পৃহা৷
ভারতের কয়েকটি রাজ্যে ডাইনি প্রতিরোধক বিশেষ আইন থাকা সত্ত্বেও ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্য আসামে গত ২০শে জুলাই ৬৩ বছরের এক বৃদ্ধা পাঁচ সন্তানের মা পনি ওরাংকে ডাইনি সন্দেহে হত্যা করা হয়৷ মধ্য রাতে গ্রামের শ-দেড়েক লোক পনি ওরাং-এর বাড়িতে চড়াও হয়ে তাকে নির্যাতনের পর, ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলাকেটে খুন করে৷ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়, তার মধ্যে নয়জন নারী৷ গ্রামের কিছু লোক অসুস্থ হয়ে পড়লে গ্রামের ওঝা বিধান দেন যে, ওই ডাইনি নারীর কুদৃষ্টিতেই নাকি অসুখ ছড়িয়েছে৷
দুর্ভাগ্যবশত, এই ধরনের অপরাধ ভারতের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে দৈন্য কবলিত উপজাতি সম্প্রদায়ের মধ্যেই বেশি হয়৷ এর কারণ, এরা ডাইনিবিদ্যায় বিশ্বাস করে৷ আর এই অন্ধ বিশ্বাস বেড়েই চলেছে, যার বেশিরভাগ শিকার নারী৷ গালিগালাজ, নির্যাতনের পর কখনো কখনো খুনও করা হয় এ সব নারীদের, মিথ্যা অপবাদ দিয়ে৷
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং ডয়চে ভেলের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, এই ধরণের হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ কুসংস্কার হলেও অপরাধটা করা হয় সাধারণত জাতপাত, লিঙ্গবৈষম্য এবং প্রতিশোধস্পৃহা থেকে৷
সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
ডয়চে ভেলে: সত্যিই কি ভারতের গ্রামাঞ্চলে ডাইনিবিদ্যা আছে?
ইন্দিরা জয়সিং : ভারতে এখনো বহু মানুষ আছেন যারা ডাইনিবিদ্যায় বিশ্বাস করেন৷ যদিও আমার স্থির বিশ্বাস, ডাইনি বলে কিছু হয় না৷ তা সত্ত্বেও এই বিশ্বাসের শিকার হন নারীরাই বেশি৷ প্রথমে নির্যাতন, হিংসা এবং তারপর খুন৷ প্রচলিত গ্রাম্যপ্রবাদ, ডাইনিদের নাকি জন্মগত এক জাদুশক্তি থাকে৷ সংবাদপত্রের খবরে বলা হচ্ছে, লোকেরা তাই রোগ-ব্যাধির চিকিৎসায় ওদের কাছেই যায়৷ প্রসঙ্গত আশারাম বাপুর নাম উঠতেই পারে৷ তার ভক্তরা গুরুর আশ্চর্য্য জাদুশক্তিতে বিশ্বাস করে চিকিৎসার জন্য তার কাছেই ছুটে যায়৷ এখন অবশ্য তিনি চিকিৎসার নামে এক নাবালিকাকে যৌন নিগ্রহের দায়ে বিচারাধীন আছেন৷
ডাইনি অপবাদে পুরুষ বা নারীদের নির্যাতন ও খুন করার ঘটনার ছবিটা কেমন?
ইন্দিরা জয়সিং : ভারত সরকারের সাম্প্রতিকতম হিসেব বলছে, ২০০০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ডাইনি অপবাদে খুন হয়েছেন ২,১০০ জন, যাঁদের বেশিরভাগই নারী৷ তবে ভারতের সর্বত্র এমনটা হয় না৷ কয়েকটি রাজ্যের উপজাতি অঞ্চলেই সাধারণত এটা হয়ে থাকে৷ ২০০২ সালে আসামে ডাইনি অপবাদে খুন হন ১৩০ জন, যাঁদেরও বেশিরভাগই ছিলেন নারী৷ পূর্ব ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যে ২০০১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ডাইনিকাণ্ড নাম দিয়ে ‘বিচার' হয় ১৫০০ জনের৷ ওই সব ঘটনায় খুন হন ২১০ জন৷ পূর্ব ভারতের ওড়িষা রাজ্যে মাওবাদী এলাকায় ডাইনিবিদ্যার প্রচণ্ড প্রভাব, যদিও ঐ সব এলাকা অপেক্ষাকৃত উন্নত এবং অনুপজাতি প্রধান৷ এছাড়া অন্য সব রাজ্যের মধ্যে ঝাড়খন্ড, হরিয়ানা ও কর্নাটকে ডাইনিবিদ্যার কুসংস্কার রয়েছে৷ এই তথ্য জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর৷
নারীরাই কেন এর শিকার বেশি হন?
ইন্দিরা জয়সিং : দুর্ভিক্ষ, খরা, গ্রামের কুঁয়োতে পানি শুকিয়ে যাওয়া – সব কিছুর জন্যই বলির পাঁঠা করা হয় মেয়েদের৷ পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাবই এর প্রধান কারণ৷ এছাড়াও অন্যান্য কারণের মধ্যে আছে মেয়েদের জমিজমা, বিষয়-সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা৷ কখনো কখনো দেখা গেছে, তথাকথিত শিক্ষিতদের মধ্যে এবং অপেক্ষাকৃত সচ্ছল এলাকাগুলোতেও এ ধরনের ঘটনা বিরল নয়৷ এখানেই শেষ নয়, মানসিক স্বাস্থ্য বা হরমোনজনিত কারণে মেয়েদের হাবভাব বা চালচলনের মধ্যে কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে সেটাকেও ডাইনির লক্ষণ বলে মনে করা হয় ভারতে৷ আর তখন পরিবারের লোকেরা চিকিৎসার জন্য মেয়েদের নিয়ে যায় কাছের হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে৷ সরকারের সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবা সুলভ না হলে এটা চলতে থাকবেই৷ বলা বাহুল্য, এর মধ্যে সমাজের জাতপাতের ব্যাপারও আছে৷ উঁচুজাতের লোকেরা ডাইনি নাম দাগিয়ে পায়ের নিচে রাখতে চায় নীচুজাতকে৷
ডাইনি প্রতিরোধক আইন ঠিকমত কার্যকর হচ্ছে না কেন?
ইন্দিরা জয়সিং
: ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের আইন বিভিন্ন রকমের৷ সমস্যাটা হচ্ছে এর যথাযথ রূপায়ন নিয়ে৷ এই যেমন আসামে ২০০৮ সাল থেকে ১৫ শতাংশ মামলার কোনো সুরাহা হয়নি৷ পুলিশ অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারেনি৷ এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে সমাজকেই৷
এক্ষেত্রে করণীয় কী?
ইন্দিরা জয়সিং
: বিভিন্ন ধরণের নারী নির্যাতনের মধ্যে ডাইনি অপবাদ অন্যতম৷ তাই অসাম্য ও লিঙ্গবৈষম্যের মানসিকতা দূর করতে সচেতনতা অভিযান শুরু করতে হবে একেবারে তৃণমূলস্তর থেকে৷ প্রণয়ন করতে হবে উপযুক্ত নীতি৷ একনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে সরকার ও নাগরিক সমাজকে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে৷ এটা সম্ভব হতে পারে তথ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে৷ এক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ৷ ডাইনি প্রথা প্রতিরোধে গড়ে তুলতে হবে কমিউনিটি-ভিত্তিক সংগঠন৷ সংস্থান রাখতে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের৷ মিলন ঘটাতে হবে দুর্গত এবং দুর্গতদের পরিবারের মধ্যেও৷
ইন্দিরা জয়সিং ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের একজন আইন বিশেষজ্ঞ এবং ভারত-ভিত্তিক এনজিও ‘ল'ইয়ার কালেক্টিভ' সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা৷ এই সংগঠন মানবাধিকার প্রসারে সক্রিয়৷ ইন্দিরা জয়সিং ভারতের প্রথম মহিলা অতিরিক্ত সলিসিটার জেনারেলও৷

দাফনের একদিন পর কফিনে কেঁদে উঠলো কিশোরী

দাফনের একদিন পর কংক্রিটের তৈরি কবরের অভ্যন্তরে স্থাপিত কফিনের ভেতর থেকে কেঁদে উঠল এক কিশোরী। সাহায্যের জন্য আর্তনাদও করেছিল। কিন্তু আত্মীয়দের প্রাণান্তকর চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা আর হয়নি। ফের মরেই গেল নেইসি পিরেজ নামে হণ্ডুরাসের ১৬ বছর বয়সী কিশোরীটি। কিশোরীর আর্তনাদে আত্মীয়রা কংক্রিটের তৈরি কবরটি ভাঙ্গতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। কিন্তু কফিনটি বের করে আনার আগেই এবার স্থায়ীভাবে তার প্রাণপাখিটি উড়ে গেল। কফিনটি বের করে আনার পর আত্মীয়রা দেখতে পান যে, এর উপরের স্বচ্ছ কাঁচটি ভাঙ্গা। আর কিশোরীর হাতের আঙ্গুলের ডগাগুলো থেতলানো। সম্ভবত বাঁচার জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেই মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে হাত দিয়েই কাঁচটি ভেঙ্গে ফেলেছিল ওই কিশোরী।
কফিন থেকে বের করে এনে ডাক্তাররা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার মধ্যে প্রাণের আর কোনো চিহ্ন দেখতে পাননি। ফলে পুনরায় তাকে একই কবরে দাফন করা হয়।
মিস পেরেজ নামে ওই কিশোরী মৃত্যুর সময় তিন মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা ছিলেন। পশ্চিম হণ্ডুরাসের লা এন্ত্রাদাতে নিজবাড়িতে অবস্থানকালে গত পরশু গভীর রাতে প্রকৃতির ডাকে ঘরের বাইরে বের হন টয়লেটে যাওয়ার জন্য। ধারণা করা হচ্ছে, গুলি-বোমার বিস্ফোরণের আওয়াজে আতঙ্কিত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি।
কিন্তু জ্ঞান হারানোর পর তার নাক-মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে দেখে তার ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন বাবা-মা ভাবেন যে তাকে হয়তো জ্বীন-ভুতে পেয়েছে বা কোনো শয়তানি আত্মা তার দেহে ভর করেছে। যেই ভাবা সেই কাজ। তারা মেয়েকে ডাক্তারের কাছে না নিয়ে স্থানীয় খ্রিস্টান ধর্মগুরু বা পাদ্রিকে ডেকে আনেন।
পাদ্রি এসে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন মন্ত্র প্রয়োগ ও তুক-তাক করেও কোনো কুল কিনারা করতে পারেন নি। অবেশেষে কিশোরীর দেহটি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তারপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
দাফনের সময় কিশোরীটিকে তার বিয়ের পোশাকেই কবর দেওয়া হয়েছিল। কিশোরী স্ত্রীকে অকালে হারানোর শোকে কাতর স্বামী রুডি গঞ্জালেস দাফনের একদিন পরই পিরেজের কবর পরিদর্শনে যান। আর তখনই তিনি কবরের ভেতর থেকে স্ত্রীর আর্তনাদ শুনতে পান।
সঙ্গে সঙ্গে গঞ্জালেস আত্মীয়দের ডেকে পাঠান। সবাই মিলে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালান পিরেজকে জীবিত উদ্ধারের। স্লেজ হ্যামার দিয়ে ইট-পাথরের তৈরি কবরটি মুহূর্তেই ভেঙ্গে ফেলা হয়।
গঞ্জালেস স্থানীয় টিভি চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘অকালে স্ত্রীকে হারিয়ে আমি শোকে কাতর হয়ে পড়েছিলাম। ফলে পরদিন আমি তার কবরের পাশে গিয়ে বসেছিলাম। এ সময় কবরে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছিলাম। আর ঠিক সে সময়ই আমি ভেতরে তাকে সাহায্যের জন্য আর্তনাদ শুনতে পাই। কিন্তু প্রথমে আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পরে কয়েকবার খেয়াল করে শোনার পর আমার মনে আশার আলো জেগে ওঠে।
গোরস্থানের নিরাপত্তা প্রহরী জেসাস ভিলেনোভা আমাকে বলেন যে তিনিও রাতে আর্তনাদ শুনতে পেয়েছেন। কিন্তু জেসাস কল্পনাও করতে পারেননি যে গোরস্থানের কোনো কবরের ভেতর থেকে কেউ আর্তনাদ করছিল।
জেসাস সাংবাদিকদের বলেন, দুপুর বেলাতেই পিরেজের স্বামী পাগলের মতো তার পরিবারের লোকজনদের নিয়ে গোরস্থানে ছুটে আসে। এরপর কবর ভেঙ্গে তার লাশ উদ্ধার করে সান পেদ্রোর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ডাক্তাররা হাজার চেষ্টা করেও আর তার প্রাণ ফেরাতে পারেননি।
ডাক্তাররা বলেন, ‘মিস পিরেজ সেদিন রাতে আতঙ্কে জ্ঞান হারানোর ফলে হয়তো তার হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর এতেই হয়তো ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেছিল। অথবা এমনও হতে পারে তার হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়নি। কিন্তু আতঙ্কের ফলে পুরো দেহের মাংসপেশি অবশ হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে হয়তো তার পূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও মাংসপেশী অবশ হয়ে পড়ায় ডাক্তাররা তার হৃদস্পন্দন ধরতে পারেননি। এমনকি এমনও হতে পারে তার পূর্ণ জ্ঞান থাকা অবস্থায়ই তাকে দাফন-কাফন করা হয়েছিল। কিন্তু সব কিছু বোঝার পরও হয়তো সে কিছুই বলতে পারছিল না। কারণ চোখের পাতাটিও নাড়ানোর ক্ষমতা ছিল না তার।
দাফনের একদিন পর কবরের ভেতরে জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে আসার পর অক্সিজেনের অভাবেই তার মৃত্যু হয়।
ওই কিশোরীর চাচাতো বোন ক্যারোলিন পিরেজ বলেন, ‘তাকে উদ্ধারের পর আমি তার দেহে হাত দিয়ে দেখেছি। তখনও তার শরীর গরম ছিল। এমনকি তার হৃদপি-ের ধুকপুকানিও শুনেছি আমি। তার কপালটি ছিল ক্ষতবিক্ষত। হাতের আঙ্গুলগুলোও থেতলানো ছিল। এ থেকেই প্রমাণিত হয় সে বাঁচার জন্য কতটা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কফিনের কাঁচ ভাঙ্গতে গিয়েই সে এভাবে জখম হয়।’
ক্যারোলিন কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আশার আলোতে আমাদের মন জ্বলে উঠেছিল। আমরা ভাবছিলাম আমরা হয়তো তাকে ফিরে পেতে যাচ্ছি। কিন্তু কী কষ্টটাই না পেয়ে সে মারা গেল। ফলে আগের চেয়ে অনেক বেশি বেদনাহত হয়েছি আমরা।’
মৃত কিশোরী নেইসি পিরেজের মা অভিযোগ করেন, প্রথমবার ডাক্তারার অতিবেশি তাড়াহুড়ো করে তাকে মৃত ঘোষণা করেছিল।

গুজরাটে সহিংসতায় নিহত ৭

ভারতের গুজরাটে কোটার দাবিতে প্যাটেল সম্প্রদায়ের আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় বুধবার সাতজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচজন পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ এলাকায় দাঙ্গার আশংকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য করা হয়েছে সেনা মোতায়েন। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি ও দ্য হিন্দুর। মঙ্গলবার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দাবিতে দিনব্যাপী সমাবেশ সহিংস আকার ধারণ করে। গুজরাটের ২০ শতাংশ মানুষ প্যাটেল সম্প্রদায়ের হওয়ায় তারা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। তবে বিক্ষোভকারীদের দাবি, নিুবর্গের মানুষ হওয়ায় তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। সমাবেশে প্রায় তিন লাখ মানুষ অংশগ্রহণ করে। মঙ্গলবার সমাবেশের নেতৃত্বদানকারী নেতা হারদিক প্যাটেলকে (২২) আটক করা হয়। এর ফলে রাতে নগরীর বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা ঘটে। বিক্ষোভকারীরা অন্তত ৭০টি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। এদিকে, হারদিক এক বিবৃতিতে বলেন, পুলিশ আমার সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর চড়াও হয়েছে, আমাদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করেছে যেন আমরা জঙ্গি। আমরা আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাব।’
মঙ্গলবারের সমাবেশে আহ্বান করা ধর্মঘট ও কর্তৃপক্ষের জারি করা কারফিউয়ের কারণে রাজ্যের প্রধান নগর আহমেদাবাদ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়েছে, আহমেদাবাদ, সুরাট, মেহসানা, বিশনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। আহমেদাবাদ ও সুরাটের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারির পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করা হয়েছে। এসব এলাকাসহ রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃংখলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। উত্তর গুজরাটে উত্তেজিত জনতা একজন মন্ত্রী ও দুজন আইনপ্রণেতার কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। দুটি ব্যাংকের এটিএম বুথেও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। প্যাটেল সম্প্রদায়ের বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, ভারতের জটিল সামাজিক কাঠামোতে কোটা প্রথা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যদের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। কলেজে ভর্তি বা ছোট ও মাঝারি মানের শিল্প প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গেলে এ প্রথার কারণে অনেককে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়। পেশায় ব্যবসায়ী হারদিক প্যাটেল সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের এ আন্দোলন কোনো সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়। সরকার যদি আমাদের দাবি না মানে, তাহলে ২০১৭ সালে এ রাজ্যে আর পদ্ম ফুটবে না।’ মূলত এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে হারদিক প্যাটেল গুজরাটে ২০১৭ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিজেপির ভাগ্যে কী ঘটতে পারে, সে দিকে সতর্ক করে দিয়েছেন। গুজরাটে বিজেপির সঙ্গে প্যাটেল সম্প্রদায়ের সম্পর্কটা এতদিন ভালোই ছিল। তাই প্যাটেলদের দাবি না মানলে বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক পদ্ম যে হালে পানি পাবে না, সে সমীকরণটি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন হারদিক প্যাটেল। ভারতে অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্য ওবিসি কোটা আছে। এ কোটার মাধ্যমে রাষ্ট্র অনগ্রসর সম্প্রদায়কে শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সুযোগ করে দেয়। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আনন্দিবেন প্যাটেল। যিনি এ সম্প্রদায়েরই। তবে কোটার দাবিতে প্যাটেলদের আন্দোলনের সঙ্গে একমত নন মুখ্যমন্ত্রী।

নির্বাচনে কারচুপির আশংকা সুচির

মিয়ানমারে ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচন আগামী ৮ নভেম্বর। ২৫ বছর পরে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের দেখা মিললেও এতে কারচুপির শংকা প্রকাশ করেছে দেশটির গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী অং সান সুচি। বুধবার এএফপিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচনে কারচুপির বড় আশংকা রয়েছে। কিন্তু আমরা এ প্রতিযোগিতা থেকে পিছপা হব না। সুচি বলেন, দেশের জনগণ আমাদের পক্ষে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায়ও ভোটারদের হৃদয়ে শক্ত অবস্থান নিয়েছে ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হলে আমরাই জয় লাভ করব।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পরিবেশ আমাদের অনুকূলে থাকলেও ভোট গ্রহণে ক্ষমতাসীন দলের কারচুপি, দুর্নীতি সবকিছু নস্যাৎ করে দিতে পারে। ইতিমধ্যে, বিরোধীরা এনএলডি’র বিরুদ্ধে ধর্মঘেঁষা সাম্প্রদায়িক হিসেবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। কট্টর বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের এ দলে ভেড়ার অজুহাত কাজে লাগিয়ে এ কুকর্ম করছে তারা। এছাড়া, সুচির আস্থাভাজন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে পাশে থাকা নেতা শোয়েমানকে সংসদের স্পিকারের আসন থেকে সরিয়ে দেয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি। সামরিক বাহিনী তাদের অবস্থান মজবুত করতেই তাকে অপসারণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। এসব বৈরী পরিস্থিতির পরেও আশায় বুক বেঁধেছেন তিনি। কয়েক সপ্তাহ ধরে তাদের প্রচারণা গণতন্ত্রায়নের পথে ঊষার আলো জাগিয়েছে। এ জন্য বিজয় অতি নিকটে বলেও মনে করছেন তিনি।
মিয়ানমারের গণতন্ত্রকন্যা ও বিরোধীদলীয় নেত্রী
১৯ জুন ১৯৪৫
ইয়াংগুনে জন্ম। বাবা স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সান ও মা দাউ খিন চি একজন নার্স
১৯৪৭
জে. অং সান গুপ্তহত্যার শিকার
১৯৬৯
ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে গমন। ব্রিটিশ অধ্যাপক মাইকেল এরিসকে বিয়ে করেন
১৯৮৮
মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তন। এনএলডি’র সহপ্রতিষ্ঠাতা
১৯৮৯
সুচি গৃহবন্দি হন (২০ বছর)
১৯৯০
নির্বাচনে এনএলডি’র জয়। জান্তা সরকারের প্রত্যাখ্যান
১৯৯১
শান্তিতে নোবেল জয়
১৯৯৯
স্বামী মাইকেল এরিসের মৃত্যু
২০০২
গৃহবন্দি থেকে মুক্তি
২০০৩
সুচির গাড়িবহরে হামলা, ৪ দেহরক্ষী নিহত। আবারও গৃহবন্দি
১৩ নভেম্বর ২০১০
গৃহবন্দি থেকে পুনরায় মুক্তি
২০১১
সাবেক সেনাপ্রধান থিয়েন সিয়েনের নেতৃত্ব আধাসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা
২০১২
পার্লামেন্ট আসনে বিজয়ী
২০১৪
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াতে সুচিকে নিষেধাজ্ঞা
২০১৫
৮ নভেম্বর নির্বাচনে এনএলডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে

আমাদের যেন বদনাম না হয় by আনিসুল হক

ছোট বোনের সঙ্গে তোলা ছবির নিচের অশোভন মন্তব্যগুলোয়
আহত হয়ে নাসির পোস্ট দিয়েছিলেন: ডোন্ট ফলো মি
আমাদের যেন বদনাম না হয়—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন। ‘শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-নন-বেঙ্গলি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপরে, আমাদের ওপরে, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’
একজনের ছোট্ট একটা ভুল আচরণ হয়ে পড়তে পারে অনেক বড় ঘটনা, পুরো জাতিরই কিন্তু মাথা নিচু হয়ে আসতে পারে। বাংলাদেশে তখন চলছিল বিশ্বকাপ ক্রিকেট। ২০১১ সালের ৪ মার্চ। শেরেবাংলা স্টেডিয়াম মিরপুরে সেদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট দল খুব খারাপ করেছিল, ৫৮ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল। ক্রিকেটে এ রকম আকসার ঘটে থাকে। এর চেয়ে কম রানে বহু দল অনেকবার আউট হয়েছে। তাতে খুব বদনাম হয় না। খেলা খেলাই। তাতে জয়-পরাজয় থাকবে। সেটাকে সুন্দরভাবে মেনে নিতে পারাই খেলোয়াড়সুলভ মানসিকতা। কিন্তু আমাদের আসল বদনাম হলো তখন, যখন কোনো এক অবিমৃশ্যকারী ঢিল ছুড়ে বসল ওয়েস্ট ইন্ডিজের খেলোয়াড়বাহী বাসে। ক্রিস গেইল টুইটে লিখলেন, ‘আমাদের বাসে ঢিল ছোড়া হচ্ছে। কাচ ভেঙে যাচ্ছে। এরপর কী? বুলেট’...সেই বার্তায় ঢিঢি পড়ে গেল ক্রিকেট বিশ্বে। বাংলাদেশ অধোবদন হতে বাধ্য হলো।
এতটুকুন একটা দেশ। এখানে গিজগিজ করছে মানুষ। এর মধ্যে একজন-দুজন মানসিকভাবে অসুস্থও থাকতে পারেন। আমি প্রতীকী অর্থে কথাটা বলছি না, শাব্দিক অর্থেই বলছি। ঢাকার রাস্তায় লাখ লাখ লোক চলাচল করে, তাদের মধ্যে সত্যিকারের মানসিক রোগীও তো থাকবেন কয়েক ডজন। কাজেই কে কখন কী করে বসে আর কী বলে বসে, আগেভাগে বলা সত্যি মুশকিল।
স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে কত মানুষ যায়। এদের একেকজনের মানসিকতা একেক রকম। গ্যালারিতে বসে কোনো খেলোয়াড়ের উদ্দেশেই যে অশোভন কোনো কথা বলা যায় না, জাত ধরে, বর্ণ ধরে, ধর্ম ধরে তো বলা যায়ই না, সেটা কি আমরা সবাই জানি? শুধু খেলার মাঠেই বা বলি কেন, ধর্মবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, জাতবিদ্বেষ কখনোই পোষণ করা যায় না, প্রকাশ করা যায় না।
কথাটা পাড়ছি নিচের খবরটা পড়ে:
দু-দুবার ঘটেছে একই ঘটনা। ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড এরপরই বাধ্য হলেন হুমকিটা দিতে। আর একবার এ ঘটনা ঘটলে টেস্ট ম্যাচ বন্ধই করে দিতে বাধ্য হবেন তিনি।
কাল চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় দিনের শুরুর দিকের ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বাদশ খেলোয়াড় কাগিসো রাবাদার উদ্দেশে কিছু বাজে মন্তব্য করা হয় পশ্চিম গ্যালারি থেকে। ক্রিকেটাররা নাকি এ সময় ‘ব্ল্যাক ব্ল্যাক’ ধ্বনিও শুনতে পান গ্যালারি থেকে। ঘটনাটা দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ম্যানেজার জানার আগেই জেনে যান ম্যাচ রেফারি। পানি পানের বিরতিতে সেই তথ্য আম্পায়ারদের মাধ্যমে কানে যায় তাঁর। ভেন্যু ম্যানেজার ফজলে বারী খানকে তখনই প্রথম সতর্কবার্তা দেন ব্রড।
এরপর মধ্যাহ্ন বিরতির সময় আবারও প্রায় একই ঘটনা ঘটে। প্র্যাকটিস উইকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার দু-একজন ক্রিকেটার ব্যাটিং অনুশীলন করছিলেন। এ সময় গ্যালারি থেকে আবারও বাজে মন্তব্য ভেসে আসে, যা জানার পর ম্যাচ রেফারি খুব চটে যান। ভেন্যু ম্যানেজারকে ডেকে বলেন, এটা বর্ণবাদী আচরণ। আর একবার এ ঘটনা ঘটলে তিনি খেলা বন্ধ করে দেবেন। এরপর বেশ কয়েকবার মাইকে ঘোষণা দিয়ে এ ধরনের আচরণ আর না করার জন্য সতর্ক করে দেওয়া হয় দর্শকদের।
কাল রাতে মুঠোফোনে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন ভেন্যু ম্যানেজার। প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন, ম্যাচ রেফারির চূড়ান্ত সতর্কবাণী শোনার পর দর্শকদের উদ্দেশে মাইকে এ ধরনের আচরণ করার ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়। পরে এ নিয়ে আর কোনো সমস্যা হয়নি। (প্রথম আলো, ২৩ জুলাই ২০১৫)।
আশা করি, আর সমস্যা হবে না। বাংলাদেশের দর্শকেরা মোটের ওপরে ভালো, চট্টগ্রামের দর্শকেরাও অতিথিপরায়ণ হিসেবেই সুখ্যাত।
আমরা কজন মিলে ২০১১ বিশ্বকাপের সময় ফেসবুকে একটা পেজ খুলেছিলাম, বাংলাদেশ, দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ চ্যাম্পিয়নস, দেয়ার ক্যান বি মিরাকলস হোয়েন উই বিলিভ। তাতে আমরা একটা কথাই বারবার প্রচার করেছিলাম, খেলায় জয়-পরাজয় আছে, থাকবে। একটা বিশ্বকাপে সবগুলো দেশ চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হতে পারে স্বাগতিক হিসেবে, অতিথিপরায়ণতার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠার মাধ্যমে। আমরা যদি আমাদের অতিথিদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করি, ঐতিহ্যবাহী বাঙালি আতিথেয়তার অপূর্ব উদাহরণগুলো দেখাই, তাহলেই আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পারব।
সেবার আমাদের সুনামও হয়েছিল। ক্রিকইনফো লিখেছিল, বাংলাদেশ বিশ্বকাপকে তার আত্মা ফিরিয়ে দিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় হাঁটছিল, বিশ্বকাপের ভেন্যু দেখতে বেরিয়ে পড়েছিল নারী-শিশুরা, কী উৎসবের পরিবেশই না তৈরি হয়েছিল! স্টেডিয়ামেও ভারতের মানচিত্র গায়ে এঁকে নিয়ে বেড়ানো সুধীরের মতো সমর্থক কিংবা পাকিস্তানের সাদা-সবুজ আলখাল্লা পরা দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো সুপরিচিত সমর্থক ভদ্রলোককে বাংলাদেশের দর্শকেরা খাতির-যত্ন করেছেন, কোনো বিদেশির প্রতি বিন্দুমাত্র বিরূপতা দেখাননি কেউই।
এ বছরই বরং সুধীরের সঙ্গে কয়েকজন দর্শকের আচরণ সীমা লঙ্ঘন করেছে কি করেনি, এই নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। এবং সর্বশেষ, চট্টগ্রামের টেস্ট বাতিলের হুমকি দিলেন ম্যাচ রেফারি, দর্শকদের বর্ণবাদী মন্তব্যের অভিযোগে। বিষয়টা খুবই গুরুতর, আমাদের উচিত এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা।
তবে এই সতর্কতা আসবে সার্বিক শিক্ষা থেকে, দেশ-বিদেশের জ্ঞান নিজেদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। আমাদের আচার-আচরণের মধ্য দিয়ে কখনো কখনো আমাদের অশিক্ষা, আমাদের কুশিক্ষা, আমাদের পশ্চাৎপদ মানসিকতার পরিচয় বেরিয়ে আসে। এই উপমহাদেশের মানুষের মধ্যে গায়ের রং নিয়ে যে অবসেশন, তা আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ। তাই তো এ দেশে গায়ের রং ফরসা করার ক্রিমের এত রমরমা। রবীন্দ্রনাথকে কবিতা লিখতে হয়, কালো তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ। আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে কবিতা লিখতে হয়, কালো বউ গটগট গটগট করে চলে গেল।
আমাদের অনেকেরই মনের ভেতরে অন্ধকার রয়ে গেছে। কখনো কখনো তা বেরিয়েও যায়। আমাদের একজন নেতা, যিনি সুন্দর কথা ও বিদেশি শিক্ষার জন্য সুখ্যাতই, একদিন হঠাৎ করে একজন আমেরিকান মন্ত্রীর পদমর্যাদা ও আদি দেশ নিয়ে কথা বলে ফেলেছিলেন। এটা যে বলা যায় না, ওই নেতা সেটা খুব ভালো করে জানেন, আমরা যারা বিদেশে লেখাপড়ার সুযোগ পাইনি, তারা সেই ভুল করতে পারি, কিন্তু তিনি পারেন না।
আর আছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম! এই জায়গাটা মানুষের মনের অন্ধকার, হিংসা, রিরংসা উগরে দেওয়ার একটা অরণ্যে পরিণত হয়েছে। এটা যে শুধু বাংলাদেশের বেলায় সত্য তা নয়, পৃথিবীজুড়েই প্রায় একই ঘটনা। একাকী একজন মানুষ তার পরিচয় গোপন করে নিজের ÿক্ষুদ্র কোটরে বসে গালি দিতে পারছে পৃথিবীর এক নম্বর কোনো খেলোয়াড়কে বা গায়ককে, কী বিকৃত আনন্দই না সে লাভ করছে! শচীন টেন্ডুলকারের শততম সেঞ্চুরির পর টাইমস অব ইন্ডিয়ার ওয়েব পাতা খুলেছিলাম খবরটা পড়ার জন্য, মন্তব্যের ঘরে ভারতীয়দের কেউ কেউ টেন্ডুলকারকে গালি দিচ্ছেন বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচ হারার জন্য দায়ী করে, খানিক পরেই মন্তব্যগুলো বিভিন্ন দেশের সমর্থকদের মধ্যে জাতিবিদ্বেষী গালিগালাজের অবাধ অনুশীলনে পর্যবসিত হলো।
বাংলাদেশে প্রায় এক কোটি ফেসবুকে গ্রাহক আছেন। এক কোটি মানুষের মন এক কোটি রকম। এদের সবার কাছে আপনি সভ্যতা, সংস্কৃতি, উন্নত রুচি ও মূল্যবোধ আশা করতে পারেন না। ক্রিকেটার নাসিরের ছোট বোনের সঙ্গে তোলা ছবির নিচের মন্তব্যগুলো ছিল বেদনাদায়ক আর অশোভন। নাসির তাই পোস্ট দিয়েছিলেন: ডোন্ট ফলো মি। প্রতিবাদে মাশরাফি তাঁর ফেসবুকের পাতা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আপনি যেকোনো জনপ্রিয় ব্যক্তির ফেসবুকের কমেন্টস পড়ে দেখুন, সেটা সাকিব আল হাসানই হোন, মুশফিকুর রহিমই হোন, কিংবা আমাদের মন্ত্রীরাই হোন। যদি কোনো নারীর সঙ্গে তাঁদের ছবি থাকে, তাহলে তার নিচে যেসব মন্তব্য দেখবেন, তাতে আপনার বিবমিষার উদ্রেক হতে বাধ্য। যে দেশের সমর্থকেরা মাশরাফিকে অস্ট্রেলিয়ায় জুমার নামাজ শেষে ধরতে পারে, তাঁর গায়ে হাত তুলে বলতে পারে, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে কেন বাংলাদেশ খারাপ করল, সেই দেশের মানুষ কী করতে পারে, ভেবে আমাদের অন্তর সারাক্ষণই শঙ্কিত হয়ে থাকে।
তবু ভরসা এই যে এরা সংখ্যায় কম। এবং অন্ধকার দূর করার আর কোনো উপায় নেই, আলো জ্বালানো ছাড়া। আমাদের আলোর কথা, ভালোর কথা, সুসংস্কৃত দেশ, আলোকিত মানুষ, আলোকিত হৃদয় তৈরির কথা বলে যেতেই হবে। বই হতে পারে সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। সংস্কৃতির চর্চা হতে পারে মনের দিগন্ত বাড়ানোর বড় উপায়। আর থাকবে স্কুলের শিক্ষা, পারিবারিক শিক্ষা, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং নেতাদের আদর্শ আচরণ। নেতা বলতে সবÿক্ষেত্রের নেতাদের কথাই বলছি, রাজনীতি থেকে শুরু করে শিল্পী-খেলোয়াড়-শিক্ষক কিংবা পাড়ার মুরব্বি। সবার আচরণ হতে হবে সুন্দর, সুশোভন, অনুকরণীয়। ভালো হতে আসলেই পয়সা লাগে না। তাই ভালো হওয়ার চেষ্টা আমাদের করে যেতে হবে সারাক্ষণ। ক্রিকেট মাঠে খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বর্ণবাদী কিংবা জাতিবিদ্বেষী উক্তি করা হলে সেটা হবে খুব বড় বদনাম। বঙ্গবন্ধুর উক্তিটাই বারবার করে বলব, আমাদের যেন বদনাম না হয়।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

চুপসে গেছে ধর্মভিত্তিক দলগুলো by সেলিম জাহিদ

অনৈক্য, দলাদলি, মামলার ভয় ও পারিপার্শ্বিক নানা চাপে চুপসে গেছে ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠনগুলো।
কয়েকটি দলের দায়িত্বশীল নেতাদের দাবি, ইসলামপন্থী দলগুলোর কার্যক্রমের ওপর সরকারি বিভিন্ন সংস্থার কড়া নজরদারি ও সাংগঠনিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে পারিপার্শ্বিক চাপ রয়েছে। এ অবস্থায় মাঠের কার্যক্রম গুটিয়ে তারা এখন অনেকটাই ঘরবন্দী হয়ে পড়েছে।
দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য সাতটি ধর্মভিত্তিক দল ও সংগঠন হলো জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ঐক্যজোট, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম।
এর মধ্যে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার পাশাপাশি গত কয়েক বছরে নানা ফৌজদারি মামলায় কাবু হয়ে পড়েছে জামায়াত।
দলটির একাধিক সূত্র বলছে, নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে প্রায় ১৫ হাজার ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় অনেকে কারাগারে, বাকিরা গা ঢাকা দিয়ে চলছেন। কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরসহ অধিকাংশ জেলায় দলীয় কার্যালয় বন্ধ রয়েছে।
এ অবস্থায় গোপনে ও নানা কৌশল অবলম্বন করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে জানান ঢাকা মহানগর জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের একজন নেতা।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কারাবন্দী ১০ নেতার মধ্যে ইতিমধ্যে দুজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। বাইরে থেকে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত আমির, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারিসহ ঢাকা মহানগরের নেতারাও গত কয়েক বছরের বিভিন্ন সহিংসতা ও নাশকতার মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।
জামায়াতের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা দাবি করেন, পরিস্থিতি যত প্রতিকূলই হোক, জামায়াত কখনো সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধ করে না। এখন পরিস্থিতির আলোকে সতর্কতার সঙ্গে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে, এটুকুই।
প্রয়াত মুফতি ফজলুল হক আমিনীর দল ইসলামী ঐক্যজোটের রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই কয়েক বছর ধরে। গত রোজায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ রাজনীতিকদের সম্মানে ইফতার অনুষ্ঠান এবং সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর গ্রেপ্তারের দাবিতে দুই শুক্রবার লালবাগে মিছিল করা ছাড়া চলতি বছর ইসলামী ঐক্যজোটের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি ছিল না।
দলটির সহকারী মহাসচিব আহলুল্লাহ ওয়াছেল প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে অনেকটা ফোনে ফোনে। জেলার নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগটা রক্ষা করছি।’
দলটির অপর একটি সূত্র জানায়, ইসলামী ঐক্যজোটে সম্প্রতি অনৈক্য দেখা দিয়েছে। আমিনীর ছেলে আবুল হাসানাত ও তাঁর ভগ্নিপতি সাখাওয়াত হোসাইনের সঙ্গে মতবিরোধ চলছে দলের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী ও মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লার সঙ্গে। আবুল হাসানাত দলের মহাসচিব হতে আগ্রহী। এ বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে গত রমজানে জাতীয় ইসলামী পরিষদ নামে একটি নতুন সংগঠন করেন হাসানাত। সংগঠনটির প্রথম অনুষ্ঠানে পানিসম্পদমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে প্রধান অতিথি করা হয়।
চরমোনাইপীর সৈয়দ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলনে প্রকাশ্যে দলাদলি নেই। তবে যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানসহ একটি অংশ দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্তৃত্ব খাটান বলে অভিযোগ আছে। এ অংশকে ডিঙিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
গাজী আতাউর রহমান দাবি করেন, ‘কর্তৃত্ব খাটানোর অভিযোগ ঠিক না। তবে এটা ঠিক যে আমি ছাত্রজীবন থেকেই দলে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করেছি।’
মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ বিরোধ চলছিল। হাফেজ্জী হুজুরের বড় ছেলে আহমদুল্লাহ আশরাফ খেলাফত আন্দোলনের আমির ছিলেন। বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হওয়ায় সম্প্রতি ভোটাভুটিতে তাঁরই ভাই আতাউল্লাহ দলের আমির নির্বাচিত হন। আর জাফরুল্লাহ খান পুনরায় মহাসচিব হন। যদিও আহমদুল্লাহ আশরাফের বড় ছেলে হাবিবুল্লাহ মিয়াজি মহাসচিব হতে চেয়েছিলেন। তা হতে না পেরে তিনি নতুন এ কমিটির বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠান এবং নিজের বাবাকে দলের আমির বলে দাবি করেন। এসব দলাদলিতে দলীয় কার্যক্রম অনেকটা বন্ধ হয়ে পড়ে।
খেলাফত আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব মুজিবুর রহমান হামিদী দাবি করেন, কমিটি নিয়ে সম্প্রতি বিরোধের মীমাংসা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সাংগঠনিক কাজ চলছে। তবে প্রশাসনের বাধা ও হয়রানির কারণে মিছিল-মিটিং করা যাচ্ছে না। ঘরোয়া বৈঠকের কথা শুনলেও পুলিশ-গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন এসে উপস্থিত হন।’
শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হকের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে ভেঙে যায়। দলটির অবস্থা এখন অনেকটাই ছন্নছাড়া বলে একাধিক নেতা মন্তব্য করেছেন।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনে দলের অগোচরে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছিলেন খেলাফত মজলিসের মহাসচিব হুমায়ুন কবির। এরপর তাঁকে দল থেকে বাদ দিয়ে শায়খুল হাদিসের এক ছেলে মাহফুজুল হককে মহাসচিব করা হয়। এ নিয়ে বিবাদে দলটির গুরুত্বপূর্ণ দুই নেতা আবদুর রব ইউসুফী ও তাফাজ্জল হক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে যোগ দেন।
এখন খেলাফত মজলিসের আমির সিলেটের মাওলানা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে দলের মহাসচিবসহ মূলধারার নেতাদের নানা বিষয়ে বিরোধ চলছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানায়। এ অবস্থায় মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠানো ছাড়া দলটির সাংগঠনিক কোনো কার্যক্রম নেই।
এ দেশে ধর্মভিত্তিক সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ। দলটির নায়েবে আমির নূর হোসাইন কাসেমী ও মহাসচিব মুফতি মোহাম্মদ ওয়াক্কাছের মধ্যে বিরোধ চলছে। সম্প্রতি আবদুর রব ইউসুফী ও তাফাজ্জল হক এবং ইসলামী ঐক্যজোটের নেতা জুনায়েদ আল হাবিবকে এ দলে যোগদান করিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার পর থেকে এ বিরোধের সৃষ্টি বলে দলীয় একাধিক সূত্র বলছে।
অবশ্য মুফতি ওয়াক্কাছ এ বিরোধের কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এসব বাজে কথা। লোকজন খালি খালি কথা ওঠায়।’ তিনি সাংগঠনিক স্থবিরতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘এখন তো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। সময় হলে জাগবে। আমরা নভেম্বরে কাউন্সিল করব।’
জমিয়তের প্রচার সম্পাদক ওয়ালী উল্লাহ আরমান বলেন, এটা ঠিক যে ২০১৩ সালের ৫ মের আগ পর্যন্ত রাজপথে ইসলামি দলগুলোর যে ভূমিকা ছিল, এখন আর তা নেই। নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা এবং নানা প্রশাসনিক চাপ আতঙ্কজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
রাতারাতি গড়ে ওঠা কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক কাঠামো প্রায় ভেঙে গেছে। ২০১২ সালে গঠিত এ সংগঠনটি পরের বছর ৫ মে ঢাকার মতিঝিলে বিশাল সমাবেশ করে দেশ-বিদেশে হইচই ফেলে দিয়েছিল। এখন এটি অনেকটাই কাগুজে সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নানামুখী চাপ, বিভক্তি, হতাশায় সংগঠনটির নেতারা চুপ মেরে গেছেন। এখন মাঝেমধ্যে ধর্মীয় বিষয়ে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেন সংগঠনটির নেতারা।
হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাঈনউদ্দিন রুহী দাবি করেন, হেফাজত একেবারে বিনাশ হয়ে গেছে, তা নয়। তবে সরকারি-বেসরকারি চাপ, নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা ও সংগঠনের ভেতরে ষড়যন্ত্রের কারণে যতটা দরকার ছিল, ততটা সক্রিয় থাকা সম্ভব হয়নি।