Tuesday, September 2, 2014

আমিই বাংলাদেশ -একজন উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা by নুরুন্নবী চৌধুরী

২০০৫ সাল। ব্যবসায় পরিকল্পনাবিষয়ক প্রতিযোগিতায় সুইডেনের স্টকহোম স্কুল অব এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপে অংশ নেয় তরুণ শিক্ষার্থীদের একটি দল। মেলে সেরা পরিকল্পনার স্বীকৃতি। কেবল পরিকল্পনা নয়, ‘হেলভেরা’ নামের অনলাইনে কেনাকাটার ই-কমার্স সাইট তৈরি করে তা বাস্তবে রূপও দিল তারা। আর এই পুরো কাজের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের ইরাজ ইসলাম।

এই অর্জনের সুবাদে মাত্র ২১ বছর বয়সে এই বাংলাদেশি তরুণ সেই সময় সুইডেনের জনপ্রিয় ইন্টারনেট ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের করা শীর্ষ তিন উদ্যোক্তার তালিকায় স্থান করে নেন।
তবে সুইডেনের মতো উন্নত দেশের বাজারে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকাটা কঠিন। তাই হেলভেরাও টিকতে পারেনি। এরপর দেশে ফিরে আসেন ইরাজ। বললেন, ‘দেশে ফিরে আমি উপলব্ধি করি, বাংলাদেশে অনেক মেধাবী কম্পিউটার বিজ্ঞান প্রকৌশলী তৈরি হয়েছেন, যাঁরা দারুণ সব কাজ করতে পারেন। মেধা ও প্রযুক্তি দুটিই যেহেতু আছে, তাই চিন্তা করি নতুন কিছু করার, যা ঢাকায় বসেও যেমন করা যাবে, তেমনি আবার চাইলে দেশের বাইরে থেকেও পরিচালনা করা যাবে।’
২০০৮ সালে ইরাজ দুই বন্ধু শাফকাত ইসলাম ও আসিফ রহমানকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘নিউজক্রেড’ নামের সংবাদভিত্তিক বিশেষ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে তা বিভিন্ন গ্রাহক, প্রকাশক কিংবা সংস্থার চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করাই নিউজক্রেডের কাজ। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নিউজক্রেডের প্রধান কার্যালয় হলেও নিয়মিত কার্যক্রমগুলো পরিচালিত হয় ঢাকার বনানী থেকে। এ ছাড়া কাজ হয় লন্ডন ও ম্যানহাটান থেকে। ঢাকা থেকেই পুরো কাজের সমন্বয় করেন ইরাজ।
পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে শুরুর দিকে যথেষ্ট অর্থ ছিল না। তাই স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিউজক্রেড চার পর্বে তহবিল সংগ্রহ করে। তাতে যুক্ত হন বিশ্বসেরা সব বিনিয়োগকারী। কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি ও ইস্ট কোয়েস্ট থেকে বিনিয়োগ হিসেবে নিউজক্রেড পেয়েছে চার কোটি ডলার। বর্তমানে প্রায় দুই হাজারের বেশি প্রকাশনার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ আছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, দি ইকোনমিস্ট, দ্য গার্ডিয়ান ইত্যাদি। গ্রাহকদের তালিকায় রয়েছে পেপসি, পিঅ্যান্ডজি, মাইক্রোসফট, ইয়াহু, ভিসাসহ বিখ্যাত সব প্রতিষ্ঠান।
ইরাজ বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বিষয়, আমরা বিশ্ববাজারে এ সেবায় শীর্ষে এবং আমরা গর্বিত যে আমাদের প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের।’ নিউজক্রেডের এ সফলতায় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা সাময়িকী বিজনেস ইনসাইডার-এর করা “সিলিকন ভ্যালি ১০০” তালিকায় ইরাজসহ যুক্ত হয়েছে নিউজক্রেডের অন্য দুই প্রতিষ্ঠাতার নাম।
সুইডেনের স্টকহোমে বেড়ে ওঠা ইরাজের বাবা জিনথেরাপি বিশেষজ্ঞ খালিদ বিন ইসলাম এবং মা ক্যানসার গবেষক তাহমিনা সি ইসলাম। ইরাজ স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছেন স্টকহোমের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি থেকে। তাঁর সহধর্মিণী ফাহমিদা ইসলাম বর্তমানে পড়াশোনা করছেন।
একজন উদ্যোক্তা হিসেবে ভবিষ্যতে দেশের জন্য কিছু করতে চান ইরাজ। তাঁর মতে, বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচয় সস্তা শ্রমের দেশ হিসেবে। যদিও বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে প্রখ্যাত কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানীসহ বিভিন্ন খাতের মেধাবীদের দেশ। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ইরাজ বলেন, তরুণ উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশকে বিশ্বের মাঝে তুলে ধরতে হবে এবং সেটি বাংলাদেশি ব্র্যান্ড দিয়েই করতে হবে। বাংলাদেশ থেকেই পরবর্তী ফেসবুক, গুগল অথবা অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে মেধাবী তরুণদের।
আমিই বাংলাদেশ নিয়ে পরামর্শ ও তথ্য যোগাযোগ: ab@prothom-alo.info

এ কে খন্দকারের ভেতরে বাইরে

একাত্তরে যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন এ কে খন্দকার ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ঢাকা ঘাঁটির সেকেন্ড ইন কমান্ড। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে ১৫ই মে ত্রিপুরার মতিননগরে পৌঁছার পর মুজিবনগর সরকার তাকে মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করে। এরপর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও রণাঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। এক পর্যায়ে নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরে  গড়ে তোলেন বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, তারপর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালনা করেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সফল অভিযান। ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখায় ১৯৭২ সালে তাকে ভূষিত করা হয় বীর উত্তম খেতাবে। স্বাধীনতার পর এ কে খন্দকার হন বিমান বাহিনীর চিফ অব এয়ার স্টাফ। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বিমানের চেয়ারম্যান। ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তিনিই প্রথম প্রতিবাদ স্বরূপ সরকারি পদ ত্যাগ করেন। ১৯৭৬-৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ার এবং ১৯৮২-৮৬ সালে ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছিলেন তিনি। পরে ১৯৮৬-৯০ সালে হন পরিকল্পনা মন্ত্রী। ১৯৯৮ ও ২০০১ সালে নির্বাচনে পাবনা-২ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার। ২০১১ সালে আবার পরিকল্পনা মন্ত্রী হন তিনি। ২০১১ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করা হয় তাকে। ২০০১-০৬ সালে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম গঠন এবং এতে নেতৃত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। এত সব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ফাঁকে ফাঁকে লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা। ‘১৯৭১ ভেতরে বাইরে’ শীর্ষক সেই স্মৃতিকথা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে গতকাল। এতে মুক্তিযুদ্ধকালের জানা-অজানা কাহিনী ও তথ্য নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরেছেন তিনি। স্বভাবই এসেছে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রসঙ্গ। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইটিতে ওই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, কোন মাধ্যমে বা চিরকুট পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হচ্ছে, ২৫শে মার্চ রাতে তার ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীরা প্রায় শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে ছিলেন। অথচ তারা কেউ কিছু আঁচ করতে পারবেন না বা জানতে পারবেন না, এটা তো হয় না। তবে কি তিনি তাদের বিশ্বাস করতে পারেন নি? এটা তো আরও অবিশ্বাস্য। বঙ্গবন্ধু যদি স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেনই, তবে তিনি ৩২ নম্বর সড়কের বাসায় থাকবেনই বা কেন?
এ কে খন্দকার আরও লিখেছেন, স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে কাউকে কিছু বলেননি বলেই আমি জানি। অনেকে বলেন, বঙ্গবন্ধু ২৫শে মার্চ রাতে এক হাবিলদারের মারফত চিরকুট পাঠিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আবার বলা হয়, বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরীকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। কোথাও কোথাও এমনও উল্লিখিত হয়েছে যে বঙ্গবন্ধু ইপিআরের বেতারযন্ত্রে বা ডাক ও তার বিভাগের টেলিগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তাটি প্রচার করেন। এগুলোর কোন যুক্তিসংগত প্রমাণ আমি কোথাও পাইনি। আর যা প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় তার বিশ্বাসযোগ্যতা খুঁজে পাইনি। কোন যুক্তিতে বঙ্গবন্ধু চিরকুট পাঠাবেন, যেখানে প্রকাশ্যে স্বাধীনতা ঘোষণায় তাঁর কোন বাধাই ছিল না। বলতে গেলে মার্চ মাসের শুরু থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই দেশ চলেছে। ২৩শে মার্চ পাকিস্তানের জাতীয় দিবসেও সারা দেশে দু’-চারটা সরকারি ভবন ছাড়া কোথাও পাকিস্তানি পতাকা ওড়েনি, বরং সবাই স্বাধীন বাংলার পতাকা অথবা কালো পতাকা উড়িয়েছে। এ ধরনের অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু কেন গোপনে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে যাবেন? স্বাধীনতার ঘোষণা করতে চাইলে তিনি তো জনগনের পাশে থেকেই তা করতে পারতেন। তাঁর মতো সাহসী এবং ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় নেতার স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে রাতের অন্ধকারের প্রয়োজন হয় না। আমরা যতদিন যুদ্ধ করেছি, ততদিন পর্যন্ত এ চিরকুট পাঠানোর কথা শোনা যায়নি। বরং আমরা সবাই আলোচনা করতাম যে বঙ্গবন্ধু কেন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলেন না, দিলে কি ক্ষতি হতো ইত্যাদি। এ কে খন্দকার লিখেছেন, ২৫শে মার্চ সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া যখন ঢাকা ছেড়ে চলে যান, তখন একটা চরম সংকটপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি হয়। সবাই ভাবতে থাকেন এখন আমাদের কি করণীয়। এ সময় তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও কিছু নেতা বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে সমবেত ছিলেন। সেখানে এক ফাঁকে তাজউদ্দীন আহমদ একটি টেপ-রেকর্ডার এবং স্বাধীনতার ঘোষণার একটি খসড়া বঙ্গবন্ধুকে দেন এবং তাঁকে তা পড়তে বলেন। কিন্তু তিনি তা পড়েননি। এ ঘটনা স্বয়ং তাজউদ্দীন আহমদ সাংবাদিক ও লেখক মঈদুল হাসানকে বলেছিলেন।

এ কে খন্দকারের বর্ণনায়, মুক্তিযুদ্ধকালে আমিও একদিন তাজউদ্দীন আহমদকে ২৫শে মার্চের রাতের ঘটনা নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাজউদ্দীন আহমদ স্বীকার করেছিলেন, সেই খসড়া ঘোষণাটি তাঁর নিজের লেখা ছিল এবং তিনি বঙ্গবন্ধুকে খসড়া ঘোষণাটি পাঠ করার প্রস্তাব করেছিলেন। লেখাটা ছিল সম্ভবত এই রকম: ‘পাকিস্তানি সেনারা আমাদের আক্রমণ করেছে অতর্কিতভাবে। তারা সর্বত্র দমননীতি শুরু করেছে। এই অবস্থায় আমাদের দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলাম।’ তাজউদ্দীন সাহেব আরও বলেন, এই খসড়া ঘোষণাটা শেখ মুজিবুর রহমানকে দেয়ার পর সেটা তিনি পড়ে কোন কিছুই বললেন না, নিরুত্তর রইলেন। অনেকটা এড়িয়ে গেলেন।
পরবর্তী সময়ে মঈদুল হাসানের কাছ থেকে জানতে পারি, বঙ্গবন্ধুকে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে। কেননা কালকে কি হবে, যদি আমাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়? তাহলে কেউ জানবে না যে আমাদের কি করতে হবে? এই ঘোষণা কোন গোপন জায়গায় সংরক্ষিত থাকলে পরে আমরা ঘোষণাটি প্রচার করতে পারবো। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায়, তাহলে সেটাও করা হবে।’ বঙ্গবন্ধু তখন প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে একটা দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানিরা আমাকে দেশদ্রোহের বিচার করতে পারবে।’ এ কথায় তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে সম্ভবত রাত নয়টার পরপরই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর ছেড়ে চলে যান। অবাক করার বিষয় হলো, পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতা ঘোষণার সেই ছোট্ট খসড়াটি, যা তাজউদ্দীন আহমদ তৈরি করেছিলেন, তার প্রায় হুবহু একটি নকল বঙ্গবন্ধুর ২৬শে মার্চের ঘোষণা হিসেবে প্রচার হতে দেখি। ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রকাশিত পত্রপত্রিকাতেও তাজউদ্দীনের সেই খসড়া ঘোষণার কথাগুলো ছাপা হয়েছিল। ২৫শে মার্চ রাতে যখন পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের আক্রমণ করে, সেই রাতেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। স্বাধীনতার ঘোষণাটি জনসম্মুখে কিভাবে এলো? ২৬শে মার্চ তারিখে তো সারা দেশেই সান্ধ্য আইন ছিল। আওয়ামী লীগের তরুণ কর্মী এবং ছাত্রলীগের নেতারা স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য বঙ্গবন্ধুকে মার্চ মাসে বেশ চাপ দিচ্ছিল। ধারণা করা যায়, সেই সময় তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর খসড়াটি তাঁদের দিয়েছিলেন এবং এদের মাধ্যমে যদি এটা স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে প্রচারিত হয়ে থাকে, তাহলে আমি বিস্মিত হবো না।
পরবর্তী সময়ে ঘটনার প্রায় এক বছর পর আরেকটা কথা প্রচার করা হয় যে, ধবংসযজ্ঞ শুরু হওয়ার ঠিক আগে শেখ সাহেব ইপিআরের বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন। এই তথ্যটি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রথমত, সামরিক বাহিনীতে থাকার ফলে আমি জানি যে, সিগন্যাল সেন্টার বা বার্তাকেন্দ্র সব সময় অত্যন্ত বিশ্বাসী লোক দ্বারা পরিচালনা করা হয়। সিগন্যালই কোনও বাহিনীর প্রতিরক্ষা ও আক্রমণের মূল যোগাযোগমাধ্যম। সেখানে তো বিশ্বাসীদের বাদ দিয়ে সন্দেহের পাত্র বাঙালিদের হাতে সিগন্যাল ব্যবস্থা থাকতে পারে না। বাস্তবেও পাকিস্তানি বাহিনী আগে থেকেই পিলখানায় ইপিআরের বেতারকেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিল। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, বঙ্গবন্ধু যার মারফত এই ঘোষণা ইপিআরের বার্তাকেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন, সেই ব্যক্তি স্বাধীনতার ৪৩ বছরেও জনসমক্ষে এলেন না কেন? বঙ্গবন্ধুও তার জীবদ্দশায় কখনও সেই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেননি কেন? একই ভাবে চট্টগ্রামের ইপিআর বেতার কেন্দ্র থেকে কে, কিভাবে জহুর আহমেদকে বার্তাটি পাঠালেন, তা রহস্যাবৃতই থেকে গেছে। কাজেই ইপিআরের বার্তাকেন্দ্র ব্যবহার করে শেখ সাহেব স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন- এটা সম্ভবত বাস্তব নয়। দ্বিতীয়ত, জহুর আহমেদ চৌধুরীর কাছে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এমন কোন সংবাদ আমরা শুনিনি। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের জুন মাসে বাংলাদেশের নেতারা স্বীকৃতিদানের প্রশ্নে ভারত সরকারকে বেশ চাপ দেয়া শুরু করেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও অন্য প্রধান নেতাদের জিজ্ঞেস করে, শেখ মুজিবুর রহমান কি স্বাধীনতার প্রশ্নে কাউকে কিছু বলে গেছেন? তারা আরও জানতে চান যে স্বাধীনতার ঘোষণার কোন প্রমাণ, কোন দলিল, কোন জীবিত সাক্ষ্য আমাদের কাছে আছে কি না? এসময় জহুর আহমেদ চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যেকেই বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু কাউকে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বলে যাননি। জহুর আহমেদ চৌধুরী নিজে তাজউদ্দীনকে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু তাঁকে কিছু বলে যাননি। ইপিআরের বেতারযন্ত্রের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠান- এ দাবিটি প্রচার শুরু হয় ১৯৭২ সালে। এর আগে এটি শোনা যায়নি। অথচ ২৫শে মার্চ রাত সাড়ে ১২টায় টেলিযোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগে শেখ মুজিব চাইলে শুধু একটি ফোন করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (এখন রূপসী বাংলা) ভিড় করা যে কোন বিদেশী সাংবাদিককে স্বাধীনতার ঘোষণার কথা জানাতে পারতেন। তাহলে মূহর্তের মধ্যে সেটি সারা পৃথিবীতে প্রচার পেয়ে যেতো। বেশ পরে স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়ে আরেকটি তথ্য প্রকাশ পায়। এতে বলা হয় যে বঙ্গবন্ধু টেলিগ্রামের মাধ্যমে কাউকে কাউকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠিয়েছিলেন। সেই ঘোষণার একটি কপি কিছুদিন আগে পত্রিকায় ছাপানো হয়। এই ঘোষণায় পাওয়া বিবৃতি আগের ঘোষণা থেকে পৃথক। ঘোষণা সংবলিত টেলিগ্রামটি হাতে লেখা এবং প্রাপকের স্ত্রী দাবি করেছেন যে এটি বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে লেখা। মিথ্যা প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতায় সাধারণ বিবেচনা ও জ্ঞানও রহিত হয়ে যায়। টেলিগ্রাম যে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে পাঠানো হয় এবং এখানে প্রেরকের হাতের লেখা প্রাপকের কাছে যায় না, তা তারা ভুলে যান।
২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান বাহিনীর অভিযানের পর ইস্ট পাকিস্তান রেডিওর চট্টগ্রাম কেন্দ্রের বাঙালি কর্মকর্তারা বেতারের মাধ্যমে কিছু করার পদক্ষেপ নেন। চট্টগ্রামে সান্ধ্য আইনের মধ্যেই তাঁরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকে কিছু প্রচার করতে উদ্যোগী হন। সেখানকার বেতার কেন্দ্রের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে বেতারে কিছু-না-কিছু বলা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাঁরা সবাই মিলে স্বাধীনতার ঘোষণার একটা খসড়া তৈরি করেন। ২৬শে মার্চ বেলা দুইটায় কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে গিয়ে তাঁরা সেই খসড়াটি নিজেদের কন্ঠে প্রচার করেন। পরবর্তী সময়ে সেই ঘোষণা চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ হান্নান পাঠ করেন। তাঁর ভাষণটি সেদিন সাড়ে চারটা-পাঁচটার দিকে পুনঃপ্রচার করা হয়। তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে- এমন কথা বলা হয়েছিল। তবে প্রথম যে ঘোষণাটি পাঠ করা হয়েছিল, তার থেকে পরবর্তী সময়ে পাঠ করা ঘোষণাটি একটু আলাদা ছিল। এ সময় বেতারের কর্মীরা দু’টি বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। প্রথমত, যদি কোন সামরিক ব্যক্তিকে দিয়ে এই কথাগুলো বলানো যায়, তাহলে এর প্রভাব আরও ব্যাপক হবে। দ্বিতীয়ত, নতুন চালুকৃত বেতার কেন্দ্রটির নিরাপত্তা প্রদানের জন্য সামরিক বাহিনীর লোক প্রয়োজন। তাঁরা জানতে পারলেন, সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈনিকেরা চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে বিদ্রোহ করে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধ করছেন। তাঁরা খোঁজ নিয়ে আরও জানতে পারেন যে মেজর জিয়াউর রহমান নামের একজন উধর্বতন বাঙালি সামরিক কর্মকর্তা অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্যান্য কর্মকর্তা, সৈনিকসহ পটিয়ায় রয়েছেন। ২৭শে মার্চ সকাল ১০টার দিকে এসব বেতারকর্মী পটিয়ায় যান। তাঁরা মেজর জিয়াকে বেতার কেন্দ্রের প্রতিরক্ষার জন্য কিছু বাঙালি সেনাসদস্য দিয়ে সাহায্য করার অনুরোধ জানান। মেজর জিয়া সঙ্গে সঙ্গে এ ব্যাপারে সম্মতি দেন। এ সময় তাঁদের মধ্যে কেউ একজন মেজর জিয়াকে অনুরোধ করে বলেন, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার একটি ঘোষণা তিনি পড়তে রাজি আছেন কিনা। মেজর জিয়া বেশ আগ্রহের সঙ্গে এই প্রস্তাবে রাজি হন। তিনি পটিয়া থেকে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে এসে প্রথম যে ঘোষণা দিলেন, সেটা ভুলভাবেই দিলেন। কারণ, তিনি প্রথম ঘোষণায় নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা করেছিলেন। পরে সংশোধন করে মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সেটি টেপে ধারণ করা হয় এবং ২৭শে মার্চ সন্ধ্যার কিছু আগে তা পুনঃপ্রচার করা হয়। আর এভাবেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রকাশ ঘটলো। রেডিওতে আমি মেজর জিয়ার ঘোষণা শুনেছি। ওই সময় আমি জিয়াকে চিনতাম না। তবে এই ঘোষণায় আমি স্বস্তিবোধ করলাম এবং আশ্বস্ত হলাম যে অন্তত মেজর পর্যায়ের একজন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা এই যুদ্ধে জড়িত হয়েছেন। এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন, ২৭শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজ উদ্যোগে মেজর জিয়ার কাছে গিয়েছেন এবং তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। মেজর জিয়া নিজস্ব উদ্যোগে তাঁদের কাছে আসেননি। এটা ঠিক জিয়া তাঁদের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তিনি নিজে স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যক্তিগতভাবে এ উদ্যোগ নেননি। মেজর জিয়ার ঘোষণাটিকে কোনভাবেই স্বাধীনতার ঘোষণা বলা চলে না। মেজর জিয়া রাজনৈতিক নেতাও ছিলেন না বা স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার মতো উপযুক্ত ব্যক্তিও ছিলেন না। যে ঘোষণা চট্টগ্রাম বেতার থেকে তিনি দিয়েছিলেন, ঠিক একই ধরনের একাধিক ঘোষণা ২৬শে ও ২৭শে মার্চ চট্টগ্রাম বেতার থেকে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতাও দিয়েছিলেন, এমনকি বেতারকর্মীরাও একই ধরনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে মেজর জিয়ার এই ঘোষণাটি প্রচারের ফলে সারা দেশের ভেতরে ও সীমান্তে যাঁরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে এবং সাধারণ মানুষের মনে সাংঘাতিক একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেই সঙ্কটময় মূহর্তে জিয়ার ভাষণটি বিভ্রান্ত ও নেতৃত্বহীন জাতিকে কিছুটা হলেও শক্তি ও সাহস যোগায়। যুদ্ধের সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধার কাছ থেকে শুনেছি এবং যুদ্ধের পরবর্তী সময়ও শুনেছি, মেজর জিয়ার ঘোষণাটি তাঁদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে কতটা উদ্দীপ্ত করেছিল। মেজর জিয়ার ঘোষণায় মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে, হ্যাঁ এইবার বাংলাদেশ সত্যিই একটা যুদ্ধে নেমেছে। হান্নান সাহেব বা অন্য ব্যক্তিদের ঘোষণা ও মেজর জিয়ার ঘোষণার মধ্যে তফাৎটা শুধু এখানেই ছিল। মেজর জিয়া যে কাজটি করতে পেরেছিলেন, তা করা উচিত ছিল জাতীয় পর্যায়ের প্রধান রাজনৈতিক নেতাদের এবং এর জন্য তাঁদের একটা পূর্বপরিকল্পনাও থাকা প্রয়োজন ছিল। স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে আরেকটি চরম সত্য ও বাস্তব কথা হলো, ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার পর স্বাধীনতার ঘোষণা হলো কিনা, তা শোনার জন্য সাধারণ মানুষ কিন্তু অপেক্ষা করেনি। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

পাকিস্তান সংকটের ময়নাতদন্ত

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বিক্ষোভরত পিটিআই ও
পিটিএর কর্মী-সমর্থকেরা গতকাল লাঠিসোঁটা নিয়ে রাষ্ট্রীয়
টেলিভিশন পিটিভির কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালান। রয়টার্স
পাকিস্তানে সরকারবিরোধী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা আপাতত সুনির্দিষ্টভাবে বলা অসম্ভব। তবে এ পর্যন্ত যা যা ঘটে গেল তার একটি ময়নাতদন্ত এখনই করে ফেলা যায়। চলমান সংকটে চারটি পক্ষ স্পষ্ট। পক্ষগুলো হলো: প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও পাকিস্তান মুসলিম লিগ (পিএমএল-এন), পার্লামেন্টের তৃতীয় বৃহত্তম দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ও ইমরান খান, পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক (পিএটি) ও তাহির-উল কাদরি এবং দেশটির সেনাবাহিনী। গত বছর অনুষ্ঠিত পার্লামেন্ট নির্বাচনে স্বস্তিদায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসেন নওয়াজ। এক বছরের মাথায় চলমান এই সংকটের জন্য নওয়াজ সরকারের অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলেরও দায় আছে। প্রথম বছরেই কিছু ভুল করেছে সরকার। যার অন্যতম হলো, ইমরানের ভোট জালিয়াতির অভিযোগকে সেভাবে পাত্তা না দেওয়া। ইমরানের অভিযোগ নিয়ে সরকারের এ অবস্থান যদিও আইনগতভাবে এখন পর্যন্ত ঠিকই আছে। কারণ, ভোট জালিয়াতির বিষয় নিয়ে কাজ করার কথা নির্বাচন কমিশনের তথা নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের। এ কারণেই হয়তো সরকার ইমরানের অভিযোগ আনুষ্ঠানিক ও আইনি-প্রক্রিয়ার ওপর ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু এটা না করে সরকার একটি কমিটি বা কমিশন গঠন করে অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে পারত। এ ধরনের ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই রাজপথে নামার সুযোগ পেয়েছেন ইমরান।
সরকারের আরেক ভুল হলো, পিএটির নেতা কাদরির বিরুদ্ধে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখানো। গত ১৭ জুন লাহোরে বিক্ষোভের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কাদরির ১১ নেতা-কর্মী নিহত হন। এতে নৈতিকভাবে এবং আইনগতভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে সরকার। ওই ঘটনার পর পুলিশ পিএটির এফআইআর নেয়নি। যদিও কয়েক দিন আগে আদালতের নির্দেশের পর সরকার জানায়, এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এফআইআর করতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অথচ সরকার এটা আগেই করতে পারত। নওয়াজ সরকারের শেষ ভুল হলো, পার্লামেন্টে আলোচনা না করে সংকট মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতা চাওয়া। গত কয়েক দিনে সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে চলেছেন নওয়াজ। রাজনীতিবিদ ইমরান বারবার তাঁর লক্ষ্য পাল্টান। কারও কারও আশঙ্কা, ইমরানের আন্দোলন দেশটিতে টানা ছয় বছরের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় ছেদ টানতে পারে। ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুললেও প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আনতে পারেননি ইমরান। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং তা প্রমাণ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় অবস্থান নেওয়াটা কতটা ঠিক, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ইমরান আন্দোলনে নামার আগে পার্লামেন্টের অন্য কোনো দলের সমর্থন জোগাড় করেননি। কোনো জোটও গড়েননি।
বারবার গণতন্ত্র শক্তিশালী করার কথা বললেও, একাই আন্দোলনে নামা এবং পার্লামেন্টে থেকে দাবি আদায়ের জোর চেষ্টা না করাটা ইমরানের ঠিক হয়নি বলে মনে করেন কেউ কেউ। কাদরি বিপ্লবের ডাক দিয়েছেন। কিন্তু লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট করেননি। তিনি ‘পদ্ধতিগত পরিবর্তনের’ দাবি তুলেছেন। কিন্তু কোথায়, কীভাবে তা করা হবে, তা প্রকাশ করেননি। তবে লাহোরে তাঁর ১১ নেতা-কর্মীর নিহত হওয়ার ঘটনা এবং পুলিশ এফআইআর না নেওয়াকে কেন্দ্র করে সরকারের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভ অনেকের চোখেই যৌক্তিক। চলমান সংকটের পেছনে সেনাবাহিনীর হাত রয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফকে বিচারের মুখোমুখি করা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টাসহ বিভিন্ন কারণে নওয়াজের প্রতি নাখোশ সেনাবাহিনী। এ কারণে নওয়াজকে বাগে আনতে তারা ইমরানকে ব্যবহার করছে বলেও মনে করা হয়। এখন সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যর্থতা বা টানা ছয় বছরের গণতান্ত্রিক অর্জন ধরে রাখতে ব্যর্থতার জন্য সরকারকে দোষারোপ করা হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কোনটা নৈতিকভাবে ঠিক এবং কোনটা আইনগতভাবে বৈধ, তা বিবেচনা করার মতো পরিস্থিতি যেন এই মুহূর্তে পাকিস্তানে নেই।

কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারের অঙ্গীকার

টোকিওতে গতকাল বৈঠকের আগে জাপানের প্রধানমন্ত্রী
শিনজো আবে ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এএফপি
এশিয়ার দ্বিতীয় ও তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দুই দেশ জাপান ও ভারত কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের নেতা পারমাণবিক জ্বালানি খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়াতে আলোচনা জোরদার করতেও রাজি হয়েছেন। গতকাল সোমবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। মোদি পাঁচ দিনের সফরে জাপান রয়েছেন। খবর এএফপি, রয়টার্স, এনডিটিভির। জাপানের রাজধানী টোকিওতে দুই নেতার শীর্ষ বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে বলা হয়, দুই প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা খাতে দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরে এ সম্পর্ককে আরও জোরদার ও শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেন। বৈঠকে ভারতের নৌবাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়।’ জাপান আগামী পাঁচ বছর ভারতকে অবকাঠামো নির্মাণ ও ‘স্মার্ট সিটি’ নির্মাণে তিন হাজার ৩৫৮ কোটি মার্কিন ডলার দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভারতে বুলেট ট্রেন চালু করতে আর্থিক, কারিগরি সহায়তাও দেবে জাপান।
এর আগে গতকাল সকালে জাপানের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমি গুজরাটি। আমার রক্তে রক্তে মিশে আছে ব্যবসা।’ তিনি বলেন, ব্যবসায় কোনো ছাড় দেওয়ার বিষয় নেই। এর জন্য দরকার সঠিক পরিবেশ। মোদি দাবি করেন, তিনি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে ব্যবসার ক্ষেত্রে ‘নিরাশার পরিবেশ’-এর অবসান হয়েছে। ক্ষমতায় আসার ১০০ দিনের মধ্যে ভারতে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা ব্যবসায়ীদের বলতে ভোলেননি মোদি। তিনি জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়াসহ নানা সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিরক্ষা, কৌশলগত নানা খাতে জাপানের সঙ্গে সমঝোতা, বিনিয়োগ টানতে আন্তরিক আহ্বানের পাশাপাশি চীনকে খোঁচা দিতে ছাড়েননি নরেন্দ্র মোদি। দুই দেশের সঙ্গেই চীনের সীমানা নিয়ে বিরোধ পুরোনো। অবশ্য এ ক্ষেত্রে তিনি চীনের নাম উল্লেখ করেননি। মোদি বলেন, ‘বিশ্ব দুই ধারায় বিভক্ত। একদিকে আছে সম্প্রসারণবাদ, অন্যদিকে ‘উন্নয়নমুখিতা’ বা ‘বিকাশবাদ’। আমাদের ঠিক করতে হবে, আমরা কোন পথে যাব।” এরপর চীনের দিকে তির নিক্ষেপ করে মোদি বলেন, অনেকেই অষ্টাদশ শতকের সম্প্রসারণবাদী ধারণায় বিশ্বাস করে। অন্যদের ভূমি, সমুদ্র দখলের ভাবনা নিয়ে আছে তারা। মোদি বলেন, যারা ভগবান বুদ্ধের পথে বিশ্বাস করে, তারা চায় উন্নয়ন। কেননা, এভাবেই শান্তি ও উন্নয়নের পথ প্রশস্ত হয়। তবে বিশ্বে এখন সম্প্রসারণবাদই বেশি চোখে পড়ে। মোদির কথিত সেই ‘সম্প্রসারণবাদের’ বিরুদ্ধে জাপান আর ভারত যে এককাট্টা, সেই কথাও মোদির মুখে শোনা যায়। বললেন, বলা হচ্ছে এশিয়া একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে। জাপান ও ভারতকে শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের ধারায় নেতৃত্ব দিতে হবে।

সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের দণ্ড

মোহাম্মদ রেজা রাহিমি
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা রাহিমিকে কারাদণ্ড ও জরিমানা করা হয়েছে। অর্থ আত্মসাতের দায়ে তাঁকে এই দণ্ড দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার দেশটির বিচার বিভাগের সদস্য গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজাজের বরাত দিয়ে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ করা হয়। তবে এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তিনি বলেন, এই দণ্ডাদেশ চূড়ান্ত নয়। রাহিমির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে বলে ইরানের গণমাধ্যমে এর আগে খবর বেরিয়েছিল। এএফপি

৮০০ বছর পর আবার চালু নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাস।
ছবি: বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইট
শিক্ষার্থীদের পদচারণে আবার মুখরিত হলো ভারতের বিহার রাজ্যের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। ৮০০ বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। গতকাল সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষাকার্যক্রম আবার চালু হয়েছে। খবর আইএনএস ও এনডিটিভির। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গোপা সাভ্রাওয়াল জানান, শিক্ষার্থীদের তিন দিনের পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠান গত শুক্রবার শুরু হয়ে রোববার শেষ হয়। পাঁচ ছাত্রীসহ মোট ১৫ জন শিক্ষার্থী ও ১১ জন শিক্ষক নিয়ে গতকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি বিভাগে পড়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে মোট ১৫ জনকে বাছাই করা হয়। উপাচার্য জানান, গতকাল সকালে বাস্তুবিদ্যা ও পরিবেশ শিক্ষা এবং ইতিহাস শিক্ষা বিভাগের ক্লাসের মাধ্যমে ছোটখাটো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম চালু করা হয়।
১৪ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শনকালে বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে সম্পূর্ণ আবাসিক। ২০২০ সালের মধ্যে আবসনের সব ব্যবস্থা করা হবে। বিহারের রাজধানী পাটনা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাজগির শহরে একটি অস্থায়ী ক্যাম্পাসে এই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলো। শহরটি বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান। সেখান থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে আজও দাঁড়িয়ে আছে দ্বাদশ শতকের প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টির ধ্বংসাবশেষ। তুর্কি বাহিনীর এক অভিযানের সময় সেটি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন যাত্রা ভারত সরকার ও পূর্ব এশিয়া সম্মেলনভুক্ত (ইএএস) ১৮টি দেশের একটি উদ্যোগের ফসল। ২০১৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ব্রুনাই সফরকালে অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ ইএএসভুক্ত সাতটি দেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। এছাড়া ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। ভারতের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন বিশ্ববিদ্যালয়টির পরিচালনা পর্যদের চেয়ারম্যান।

ক্রিকেটের পিচ ধরে রাজনীতির রাজপথে

ক্রিকেট তারকা থেকে রাজনীতির খেলোয়াড় ইমরান খান। ক্রিকেট পিচের ২২ গজের পথ ধরে তিনি উঠে এসেছেন রাজনীতির রাজপথে। পাকিস্তান ক্রিকেটের সফলতম অধিনায়ক এবার নেতৃত্ব দিতে চাচ্ছেন পরমাণু ক্ষমতাধর এই রাষ্ট্রের। ১৯৯৬ সালে পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) প্রতিষ্ঠা করার পর গত বছরের মে মাসের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অবির্ভূত হন রাজনীতির ময়দানে। চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিগর্ভে পাকিস্তানের নেপথ্য নায়ক তিনি। সত্তর ও আশির দশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিখ্যাত তারকা ছিলেন ইমরান খান। পাকিস্তান ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অধিনায়ক হিসেবে ১৯৯২ সালে বিশ্বকাপ জয় করেন তিনি। পরবর্তীতে সেরা খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে সমাজসেবায় নেমে পড়েন। ১৯৯৬ সালে তার মায়ের নামে পাকিস্তানের সর্ববিখ্যাত ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্র ‘শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যান্সার হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠা করেন।
সেবছরই সিদ্ধান্ত নেন রাজনীতিতে নামার। পাক-রাজনীতির উঠোন থেকে দুর্নীতির ময়লা-আবর্জনা ধুয়েমুছে সাফ করতে নতুন ধারার দল গঠন করেন পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই)। ক্রিকেট জগতের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে তরুণদের কাছে টানতে সমর্থ হন তিনি। পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলার কঠোর সমালোচক হয়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সমর্থন লুফে নেন ইমরান। তিনি ঘোষণা দেন প্রচলিত ধারা ভেঙে দুর্নীতিবিরোধী দেশপ্রেমিক ‘সাচ্চা রাজনীতিক’ তৈরি হবে তার পিটিআইয়ের প্লাটফর্মে। ২০০২ সালের হাতেখড়ি নির্বাচনে তার দলের একমাত্র বিজয়ী প্রার্থী ছিলেন তিনি। এরপর ২০০৮ সালের নির্বাচন বয়কট করে ইমরানের দল। গত দু’বছরে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা হঠাৎ করে অস্বাভাবিক রকম বেড়ে যায়। এক দশকের মধ্যে ইমরান খান হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় রাজনীতিক। তার নির্বাচনী র‌্যালিগুলোতে সর্বাধিকসংখ্যক মানুষ অংশগ্রহণ করতে থাকে।
অন্য দলের রাজনীতিবিদরাও যোগ দেয়া শুরু করেন তার দলে। ইমরান সম্পূর্ণ নতুন ভিন্নধারার সাচ্চা রাজনীতিবিদ তৈরির কথা বললেও প্রচলিত দলের নেতাদেরও তার দলে ভিড়তে দেন। ফলে ‘পরিবর্তন’ শুরু হয় তার মতাদর্শে। ইমরান খানের রাজনৈতিক আদর্শ বর্তমানে অনেকটাই ‘মিশ্র’। একদিকে তিনি উদারনৈতিক প্রগতিশীল ধারার কথা বলেন, একইসঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধ ও পশ্চিমা বিরোধী ধারণারও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। আবার সামরিক নেতা ও জেনারেলদের সঙ্গে সৌহার্দ্য বজায় রাখেন। ২০১৩ সালের নির্বাচনে তৃতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে পার্লামেন্টে প্রতিনিধিত্ব করেন। খায়বার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সরকার গঠন করে ইমরানের পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ। এখানেই থেমে থাকেনি তার দেশ গড়ার ইনিংস। গত নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ এনে নওয়াজ শরিফ সরকারের পতনে ইসলামবাদ অবরোধ করেছেন তিনি। পাকিস্তান মুসলিম লীগের (পিএমএল-এন) সরকার হটিয়ে ‘নয়া পাকিস্তান’ গড়ার ডাক দিয়েছেন তিনি।

ভারতীয় স্কুলে জাপানি ভাষাশিক্ষা চান মোদি

‘২১ শতাব্দী হবে এশিয়ার শতাব্দী, বিশ্ব এটি স্বীকার করে নিয়েছে, কিন্তু আমাদের এটি জিজ্ঞেস করা উচিত, আমরা কি নিজেদের এর জন্য প্রস্তুত করেছি।’ সোমবার জাপানের তাইমেই এলিমেন্টারি স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেয়া এক ভাষণে এ আহ্বান জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৩৬ বছরের পুরনো এই স্কুলটি ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। এ সময় ভারত ও জাপানের মধ্যে ভাষার সখ্য গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন মোদি। এ লক্ষ্যে ভারতে এসে জাপানি ভাষাশিক্ষা দিতে জাপানি শিক্ষকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর দাফতরিক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করা মোদির ভাষণের টুইটে বলা হয়, ‘আমরা আমাদের স্কুলগুলোতে জাপানি ভাষাশিক্ষা দেয়ার চেষ্টা করছি।
এ জন্য আমাদের শিক্ষক দরকার। আমি আপনাদের সবাইকে ভারতে এসে শিক্ষা দেয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’ এশিয়ার দেশগুলোতে শিক্ষার আরও প্রসার ঘটানো দরকার বলে মন্তব্য করেন মোদি। বর্তমানে পাঁচ দিনের সফরে জাপানে রয়েছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। শনিবার তিনি জাপানের প্রাচীন শহর কিয়াটোতে পৌঁছলে জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে তাকে স্বাগত জানান। রোববার মোদি কিয়াটোর বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দির তোজি ও কিনকাকু-জি পরিদর্শন করেন। পিটিআই। বিনা বিচারে বন্দিদের মুক্তি দিচ্ছে ভারত : বিনা বিচারে দীর্ঘদিন ধরে আটক আছেন অধিকাংশ কারাবন্দি। বিচারের অপেক্ষায় সর্বোচ্চ সাজার মেয়াদেও জেলে কাটিয়ে ফেলেছেন ইতিমধ্যে। বছরের পর বছর ধরে চলমান মামলাগুলোর আসামিদের এবার মুক্তির ব্যবস্থা করছে ভারত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। সোমবার আলোচনায় বসেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ও আইনমন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদ।
ভারতের বিচারিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে বন্দিদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ বিচারের অপেক্ষায় কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে বিচার হলে যে শাস্তি হতো, তার চেয়ে বেশি সময় কারাগারে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, বিচারাধীন ব্যক্তিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে আইনগত কোনো জটিলতা নেই। বন্দিদের মুক্তি দিতে কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউরে কোনো সংশোধনীও আনার প্রয়োজন নেই। বিচারাধীন ব্যক্তিদের মামলাগুলো পর্যালোচনা করার জন্য বিশেষ একটি প্যানেল গঠন করা হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রতিটি রাজ্যের মুখ্য সচিবের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, দোষ প্রমাণ হলে যে সাজা হতো, এর অর্ধেকের বেশি সময় ধরে কেউ যদি বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি থাকেন, তাহলে সিআরপিসি ৪৩৬ এ ধারায় তাদের মুক্তি দিতে হবে।

অভিনয়ে ফিরছেন সারিকা

খামখেয়ালিপনার কারণে অভিনয় থেকে দূরে সরে গিয়েছেন মডেল অভিনেত্রী সারিকা। দীর্ঘদিন তাকে মিডিয়ার কোনো মাধ্যমেই দেখা যায়নি। গেল মাসে বিয়ে করে সংসারীও হয়েছেন। সারিকা ভক্তদের জন্য সুখবর হচ্ছে, ফের অভিনয়ে ফিরছেন তিনি। আসছে ঈদের পরই কাজে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে সারিকা বলেন, ‘আমার বিয়ের আগে অনেক কথাই রটেছে। কিন্তু যা রটেছে তার সব মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি যে,
আমি আমার জীবনে মনের মতো একজন সঙ্গী খুঁজে পেয়েছি। সবার কাছে দোয়া চাই যেন সুখে-শান্তিতে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিতে পারি। এরই মধ্যে আমার কাছে বেশকিছু ভালো নাটকের স্ক্রিপ্ট এসেছে। আমি সেগুলো দেখছি, পড়ছি। ভালো লাগলে আসছে ঈদের পর থেকেই আবারও অভিনয়ে নিয়মিত হব।’ তিনি আরও জানান, ভালো নাট্যনির্মাতাদের নির্দেশনাতেই একদম বেছে বেছে কাজ করব। তবে সবার আগে সংসার জীবনকে প্রাধান্য দেব, তারপর অভিনয়। এদিকে বিয়ের দু’বছর আগে চলচ্চিত্রে অভিনয় করার ইচ্ছার কথা জানালেও আপাতত চলচ্চিত্রে কাজ করার কোনো ইচ্ছা নেই বলেও তিনি জানান। সর্বশেষ সারিকা অভিনেতা অপূর্ব পরিচালিত ‘ব্যাকডেটেড’ টেলিফিল্মে অভিনয় করেন।

অঘটনের অরণ্যে অদৃশ্য শারাপোভা

একে একে অনেক তারাই খসে পড়েছে। এবার প্রথম ধ্র“বতারার পতন দেখল ইউএস ওপেন। অঘটনের চোরাবালি এড়াতে পারলেন না মারিয়া শারাপোভাও। ফ্লাশিংমিডোর জৌলুস কমিয়ে চতুর্থ রাউন্ড থেকেই বিদায় নিলেন রুশ গ্ল্যামার কুইন। হেরে গেলেন ড্যানিশ রূপসী ক্যারোলিন ওজনিয়াকির কাছে। মেয়েদের আরেক সাবেক নাম্বার ওয়ান জেলেনা জানকোভিচের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছেন ১৭ বছর বয়সী সুইস সেনসেশন বেলিন্দা বেনচিচ। এতদিন শুধু মেয়েদের এককেই ছিল অঘটনের ঘনঘটা। রোববার অঘটনের আঁচ লাগল পুরুষ এককেও। শীর্ষ দশের প্রথম নক্ষত্র হিসেবে ঝরে পড়লেন চতুর্থ বাছাই ডেভিড ফেরার। তৃতীয় রাউন্ডে তাকে ৬-৩, ৩-৬, ৬-১, ৬-৩ গেমে হারিয়েছেন ফ্রান্সের গিলেস সিমন। এছাড়া বিদায় নিয়েছেন দ্বাদশ বাছাই রিচার্ড গাসকুয়েট।
কোনো গ্র্যান্ডস্লাম না জিতেই একসময় র‌্যাংকিংয়ের চূড়ায় পা রেখেছিলেন ওজনিয়াকি। পতন হতেও সময় লাগেনি। তবে গলফ তারকা রবি ম্যাকলরয়ের সঙ্গে সম্পর্ক চুকে যাওয়ার পর ওজনিয়াকির ক্যারিয়ারে আবারও জোয়ারের টান লেগেছে। রোববার বদলে যাওয়া সেই ওজনিয়াকির সঙ্গে পেরে উঠলেন না পঞ্চম বাছাই শারাপোভা। ফরাসি ওপেনজয়ী শারাপোভাকে ৬-৪, ২-৬, ৬-২ গেমে হারিয়ে প্রায় দুই বছর পর কোনো গ্র্যান্ডস্লাম টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখলেন দশম বাছাই ওজনিয়াকি। নবম বাছাই জানকোভিচকে ৭-৬, (৮/৬), ৬-৩ গেমে হারিয়ে ১৯৯৭ সালের পর সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে ইউএস ওপেনের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছেন বেনচিচ। ১৯৯৭ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ইউএস ওপেন জিতেছিলেন বেনচিচের স্বদেশী গ্রেট মার্টিনা হিঙ্গিস। মজার ব্যাপার হল, বেনচিচের কোচ এখন হিঙ্গিসের মা মেলানি মলিতর! এদিকে চতুর্দশ বাছাই লুসি সাফারোভাকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো কোনো গ্র্যান্ডস্লামের শেষ আটের টিকিট কেটেছেন চীনা কন্যা পেং শুয়াং। ইতালির সারা ইরানিও পা রেখেছেন শেষ আটে। পুরুষ এককে ফেরারের বিদায়ের দিনে চতুর্থ রাউন্ড নিশ্চিত করেছেন রজার ফেদেরার, টমাস বার্ডিচ, গ্রিগর দিমিত্রভ ও সিলিচ। এএফপি।