Monday, April 1, 2019

জ্বলছে ঢাকা

বৃহস্পতিবার বনানীর ২২তলা বানিজ্যিক ভবনে আগুন ঢাকায় ঘটা শহুরে দুর্যোগের তালিকাকে আরেকটু বড় করেছে। এর শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে রানা প্লাজা ধ্বংস থেকে। এই দুটি ট্রাজেডির মধ্যে একইসঙ্গে মিল ও অমিল উভয়ই রয়েছে। যদিও বনানীর ঘটনায় আজ থেকে ৬ বছর আগের ঘটনার মত ১১০০ মানুষ নিহত হয়নি। তারপরেও বনানীর মত অভিজাত এলাকায় যেখানে বিদেশি ক্লায়েন্টদের নিয়মিত আসাযাওয়া থাকে সেখানে এফআর টাওয়ারে ঘটা ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ক্ষুদ্র কোনো বিষয় নয়।
গত মাসেই পুরান ঢাকার অগ্নি দুর্ঘটনা ভোলার মত নয়। তাতে নিহত হয়েছিলেন কমপক্ষে ৭০ জন। দুর্বল নগর পরিকল্পনার কারণে সংগঠিত এত এত দুর্ঘটনা সত্যিই কষ্টদায়ক। বনানীর ঘটনায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছেন ২৫ জন।
কিন্তু এই বিপর্জয় নিয়ে বলা এখানেই শেষ নয়। কোলকাতার পার্ক স্ট্রিটে ২০১২ সালের মার্চে একইরকম অগ্নিকান্ডে ৬ জন নিহত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হওয়ার পূর্বেই আগুন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছিল।
এ থেকেই বোঝা যায় এখানে নিরাপত্তা বিষয়ক উপকরণের কত অভাব ছিল। যুদ্ধক্ষেত্রের মত হেলিকপ্টার থেকে দড়ি ফেলে উদ্ধার করা হচ্ছিল আটকে পরাদের অনেককেই। ভবনে কোনো সংকটকালীন এক্সিট না থাকায় কেউ কেউ জানালা দিয়ে বাইরে থাকা বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও টেলিফোনের তার বেয়ে নিচে নামার চেষ্টা করে। এর মাধ্যমেই ¯পষ্ট হয়ে গেছে যে এফআর টাওয়ার আসলে একটি শহুরে দানব যেটা কিনা নির্মানের পর থেকেই একটা মৃত্যুফাঁদ হয়ে ছিল। অনুন্নত এলাকার উন্নয়নের যে ভয়াবহতা তার সঙ্গে কোলকাতা ও ঢাকার পুরোপুরি মিল রয়েছে।
ঢাকায় ঘটা সিরিয়াল অগ্নিকান্ডের বিষয়ে কিছুটা আঁচ করা যায় ২০১৭ সালে ফায়ার সার্ভিসের জরিপের পর। সেখানে দেখা যায় রাজধানীর ৩৭০০ সুউচ্চ ভবনের মধ্যে মাত্র ১২৯ টি ভবনের সন্তোষজনক অগ্নি নিরাপত্তা বিদ্যমান। বাকি ভবনগুলো ঝুকিপূর্ন নয়ত খুবই ঝুকিপূর্ন। এই ভবনগুলোর অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের ঘাটতি রয়েছে ও নির্মানের সময় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত উপায়ে পর্যাপ্ত ফায়ার এক্সিট রাখা হয়নি।
দ্রুত বর্ধনশীল মেগাসিটি ঢাকার ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ এখন এ ধরনের নানা দুর্ঘটনার ঝুকিতে রয়েছে। এর বেশিরভাগ উন্নয়নই অপরিকল্পিত। অগ্নি দুর্ঘটনা ছারাও এই ভবনগুলো রয়েছে ভূমিকম্প ঝুঁকিতে। এছাড়া ২০১৫ সালের এক গবেষণায় জানা গেছে ঢাকা শহরের অর্ধেক সড়কই এত সংকীর্ণ যে কোথাও আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিস সেখানে পৌছাতে পারে না।
(দ্যা স্টেটমেন্টের সস্পাদকীয় থেকে অনূদিত)

চীনের সহায়তায় নির্মিত হচ্ছে পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ বিমানবন্দর

চীনের সহায়তায় গোয়াদারে নির্মিত হচ্ছে পাকিস্তানের সবথেকে বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এটি হতে চলেছে বিশ্বের বৃহত্তম যাত্রীবাহী বিমান এয়ারবাস এ-৩৮০সহ বড় সব বিমান চলাচলে সক্ষম পাকিস্তানের দ্বিতীয় বিমানবন্দর। বর্তমানে কেবল ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেই এ৩৮০ বিমান অবতরণ করতে পারে। করাচি ও লাহোর বিমানবন্দরে এ ধরনের বিমান অবতরণ করতে পারে না। নতুন গোয়াদার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাবে। জানা গেছে এটি উন্মুক্ত আকাশ নীতিতে পরিচালিত হবে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শুক্রবার গোয়াদার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ সময় তিনি বলেন, গোয়াদার হবে পাকিস্তানের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি।
বিমানবন্দরটি ২৫৬ মিলিয়ন ডলারে তিন বছরে নির্মাণ করা হবে।
চীনা ঋণেই এটি নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হয়। ৪,৩০০ একর জায়গায় নির্মিত এটি হবে পাকিস্তানের বৃহত্তম বিমানবন্দর। করাচি বিমানবন্দর (৩,৭০০ একর), ইসলামাবাদ বিমানবন্দর (৩,৬০০ একর), লাহোর বিমানবন্দরের (২,৮০০ একর) চেয়ে বড় হবে গোয়াদার বিমানবন্দর (৪,৩০০ একর)। গোয়াদারে ৬৯০ মিলিয়ন ডলারে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, বিমানবন্দরটি এর অন্যতম। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে এর পরিকল্পনা করা হয়। বেলোচিস্তানের সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হবে এই প্রকল্প।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেন, এই প্রকল্পটি স্থানীয় জনসাধারণের জন্য কল্যাণকর হবে। অতীতে বেলোচিস্তানের উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোতে স্থানীয়দের উপেক্ষা করা হতো। ফলে বেলোচিস্তানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা হলেও তা স্থানীয়দের জন্য কল্যাণকর হতো না। তিনি বলেন, গোয়াদার হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এছাড়া একটি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রও নির্মাণ করা হবে। তিনি প্রতিটি পরিবারের জন্য সাত লাখ ২০ হাজার রুপি মূল্যের স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা দেয়ার জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালু করেন।
ইমরান খান জানিয়েছেন, চীন পাকিস্তানের রেললাইনের আধুনিকায়ন করে দিতে সম্মত হয়েছে। করাচি ও লাহোরের মধ্যে চার ঘন্টায় চলাচল উপযোগী রেললাইন নির্মাণ করে দেবে চীন। ৫৬ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পটি হলো চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড (ওবিওআর) উদ্যোগের অংশবিশেষ। এটি হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক যোগাযোগ। চীনকে মধ্য এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সাথে সংযুক্ত করার প্রকল্প এটি। সিপিইসির মাধ্যমে পাকিস্তানের বার্ষিক জিডিপি প্রায় ২০ ভাগ বাড়বে বলে আশ্বাস দেয়া হচ্ছে।
২০৩০ সাল নাগাদ ৩,২১৮ কিলোমিটার রুটটির নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে মনে করা হয়। এতে মহাসড়ক, রেললাইন, পাইপলাইন, বিদ্যুত কেন্দ্র থাকছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১৭,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।

পোড়া জিনিস কিনতে ভিড়

মাত্র ৪০ টাকায় বিক্রি হলো একটি প্লাস্টিকের বালতি। যার বাজার মূল্য ১শ’ ২০ টাকা। আবার একটি পাতিল ৩০ টাকায়। যেটার বাজার মূল্য ১শ’ টাকা। এভাবেই অল্প মূল্যে বিক্রি হচ্ছে পণ্য। এচিত্র রাজধানীর গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেটের। থরে থরে সাজানো ক্রোকারিজ পণ্য। সঙ্গে আছে প্যাকেটজাত খাদ্য ও কাপড়ও।
পণ্যগুলো নতুন। তবে তাতে লেগে গেছে আগুনের ছোয়া। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিরা বিক্রি করছেন সেসব পণ্য। অতি অল্প দামে। আর ক্রেতাদের ভিড় ছিলো চোখে পড়ার মতো।
আনোয়ারুল ইসলাম কষ্ট নিয়ে বলেন, আজ সকাল থেকে আড়াই হাজার টাকার পন্য বিক্রি করছি। এই পণ্যের প্রকৃত বাজার মূল্য ২০ হাজার টাকা হবে।
রিমি রহমান এখানেই একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। অফিসের বিরতিতে দেখতে এসেছেন মার্কেটটি। কেনেন বেশ কিছু পণ্য। বলেন, অল্প দামে পেলাম অনেক কিছু। তাদের ক্ষতিটা একটু কমলো আর আমাদের লাভ হলো। গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেট। গত শনিবারের আগুনে পুড়ে যায় মার্কেটটি। পুড়ে যায় মার্কেটের ২শ’র অধিক দোকান। যে আগুনে জড়িয়ে আছে কতগুলো পরিবারের দীর্ঘশ্বাস।
পুড়ে ছাই হওয়া মার্কেটটিতে গতকাল সরজমিন দেখা যায়- এখনো প্লাস্টিকের পণ্য থাকা দোকানগুলোতে থেকে থেকে জ্বলে উঠছে আগুন। অতি সামান্য এই আগুন নিভেও যাচ্ছে কিছু সময় পর। ছড়াচ্ছে ধোঁয়া। এই আগুনের মতো থেকে থেকে জ্বলছে ব্যবসায়ীদের মন। তারা তাদের দোকানের ধ্বংসস্তূপ থেকে ভালো জিনিস খুঁজতে ব্যস্ত। মূলত তারা সন্ধান করছেন লোহা। যাতে বিক্রি করতে পারেন সেসব পণ্য। মার্কেটের ভেতর দেখা যায় চুরির উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বেশ কিছু মানুষ। দোকানদাররা বারবার তাড়িয়ে দিয়েও আটকানো মুশকিল হয়ে পড়ছে তাদের। মাহিরউদ্দিন সরকারের মার্কেটে ছিলো ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকান। তিনি বলেন, কোনো কিছু খুঁজে পেলেই নিয়ে যেতে হচ্ছে নিরাপদ স্থানে। নয়তো হচ্ছে চুরি। একটু আগে একটা মাল্টিপ্লাগ পেলাম এখন দেখি তা নাই। এ ছাড়াও একই ধরনের অভিযোগ মেলে অনেকের কাছ থেকে। রমজান আলী, একটি কার্টনে জমা করছিলেন ব্যবহারযোগ্য পণ্য। কিন্তু সেই কার্টন সমেত গায়েব। এরপর তিনি এক ছোট ছেলের বস্তায় আবিষ্কার করেন তা।
মার্কেটে ধ্বংসাবশেষ উদ্ধারের লোকের থেকে দর্শনার্থীর সংখ্যা ঢের বেশি।
মার্কেটের বাইরে ছিল বেশ কয়েকটি পিকআপ। যেসব পিকআপে ঠাঁই হয়েছে পোড়া টিন, গ্রিল, লোহা ইত্যাদি। ক্রেতারাই এখানে আসছেন। কিনছেন। নিয়ে যাচ্ছেন নিজস্ব পরিবহনে।
পুরো মার্কেটজুড়ে এখনো ধ্বংসস্তূপ। সেই সঙ্গে কাদা, ময়লায় সয়লাব। পরিষ্কার করা হয়নি এখনো মার্কেটটি। গতকাল দুপুরে ছিল প্রচণ্ড রোদ। আর উপরের টিনের ছাদের ফুটা দিয়ে আসছিলো আলো। এই আলোর মুখে কাজ করছিলেন ক্রোকারিজ ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান। তার কাজের সময় দেখা যায় ৫ জন ফটোগ্রাফার দুদিক থেকে ছবি তুলছেন। সে সময় রেগে গিয়ে তিনি বলেন, মজা নেন। এতো ছবি তুলে কি হবে? আমি কি মডেল? যান এখান থেকে। বলছি চলে যান। মার্কেটের বাইরে দোকান মালিক সমিতির লোকেরা খুলেছেন সাহায্য কেন্দ্র। আর রয়েছে পুলিশ বক্সও। দোকান মালিক সমিতির সভাপতি দীন মোহাম্মদ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে আমাদের।

৩০ সহকর্মী নিয়ে বকুলের বেঁচে ফেরা -ভাইয়ের বর্ণনায় সেই শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত

বনানীর এফ আর টাওয়ার। এ টাওয়ারের ১০ তলায় ছিল বকুলের অফিস। বকুল যেখানে বসতেন ঠিক তার নিচেই ছিল ৯ তলার কিচেন। দুপুর বেলা, সবাই তখন কর্মব্যস্ত। ঠিক ওই সময় বকুল হইচই শুনতে পান। তিনি ওঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে তা দেখার চেষ্টা করেন। নিচের দিকে রাস্তায় চোখ পড়তেই   দেখেন ভবন ঘিরে মানুষের ভিড়। নিচের ফ্লোরে আগুনও দেখতে পান।
সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে জানিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে যান। কিন্তু ঘন ধোঁয়ার কারণে আর সম্ভব হয়নি। ফিরে যান ভেতরেই। তারপর শ্বাসরুদ্ধকর এক পরিস্থিতি। জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি। কিছু সময়ের ব্যবধান মাত্র। এরপরও বকুল মাথা ঠান্ডা রেখেছেন। কীভাবে? সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন বকুলের ভাই প্রবাসী ফরিদ আহমেদ। এ নিয়ে তিনি তার ফেসবুক ওয়ালে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছেন।
ফরিদ আহমদের স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে দেয়া হলো- 
‘তোমাদের দেশে আগুন লেগেছে। জানো নাকি?’ অফিসে ঢুকেই আমার এক সার্বিয়ান সহকর্মী আমাকে বললো। সে দেরি করে অফিসে এসেছে। বেলা তখন এগারোটা। ‘নাতো। কোথায়?’ আমি বলি। ‘বড় একটা বিল্ডিংয়ে আগুন লেগেছে। আল জাজিরায় দেখাচ্ছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার। তোমাদের দেশেতো কয়দিন আগেও আগুন লেগেছিল, তাই না। প্রেটি ব্যাড।’
ওর কথায় সমর্থন জানাই আমি। চট করে ডেইলি স্টার খুলে ঢাকার অবস্থাটা জেনে নিই। দেখি বনানীর একটা টাওয়ারে আগুন লেগেছে। মন খারাপ করতে গিয়েও করি না। তার বদলে কাজে ডুবে যাই আমি। বাংলাদেশ নিয়ে চিন্তা করতে গেলে অন্য কিছু করা সম্ভব নয়। কাজেই, চিন্তা-টিন্তা না করাটাই ভালো।
গত কিছুদিন ধরে ভয়ঙ্কর ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে দিন কাটছে আমার। ভোর না হতেই কাজের দিকে দৌড় দেই। বাসায় ফিরি রাত সেই এগারোটায়। দুনিয়াদারীর কী হচ্ছে, কিছুই জানি না বলতে গেলে আমি।
স্পর্শকাতর তথ্য নিয়ে কাজ করতে হয় বলে অফিসে আমরা ফোন ব্যবহার করতে পারি না। এমনকি ডেস্কের উপরেও ফোন রাখা নিষিদ্ধ। আমি ড্রয়ারের মধ্যে ফোনটাকে রাখি। মাঝে মাঝে ড্রয়ার খুলে চুপি চুপি দেখি কোনো মেসেজ আছে কিনা।
বিকাল চারটার দিকে দেখি আন্না মেসেজ করেছে আমাকে। ‘আগুনের হাত থেকে বকুল কোনো মতে বেঁচে গেছে। ওদের অফিস বিল্ডিংয়ে  আগুন লেগেছে।’
বকুল আমার ছোট ভাই। এক ঝটকায় ফোনটা হাতে নিয়েই বাইরে চলে আসি আমি। বকুলকে ফোন দেই। ওকে পাই না। ঢাকায় তখন অনেক রাত। হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। বকুলকে না পেয়ে ওর স্ত্রী নোভাকে মেসেজ দেই আমি। নোভার কাছ থেকেও কোনো উত্তর পাই না। রাত নয়টার দিকে অফিস থেকে বের হয়েই আবার কল দেই। তখনও ফোন ধরে না কেউ। আমি ক্রমাগত ফোন দিয়ে যেতে থাকি। সাড়ে নয়টার দিকে ঘুম জড়ানো গলায় ফোন ধরে বকুল। ওর কাছ থেকে পুরো বিবরণ শুনি।
বকুলের অফিস দশ তলায়। ওদের বেশ কয়েকটা অফিস রয়েছে ওই বিল্ডিংয়ের বিভিন্ন তলায়। সে অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার। আগুন লেগেছিল নয় তলার কিচেনে। ওটা বকুলের রুমের ঠিক নিচেই। হইচই শুনে সে জানালার কাছে গিয়ে পর্দা সরিয়ে নিচে তাকায়। দেখে অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছে নিচে। জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে নিচে আগুনও দেখতে পায় সে। দ্রুত গিয়ে অফিসের সবাইকে খবর দেয়। আমার চাচাতো ভাই রঞ্জুও এই কোম্পানির সিএফও। তার অফিস দুই তিনটা বিল্ডিং পরে অন্য একটা বিল্ডিংয়ে। আগুন লাগার খবর পেয়ে রঞ্জু ততক্ষণে বিল্ডিংয়ের নিচে চলে এসেছে। ওখান থেকে সে বকুলকে ফোন করে বলছে, ‘আট আর নয় তলায় আগুন লেগেছে। ফায়ার ব্রিগেড এসেছে। কিন্তু কাজ শুরু করতে দেরি হবে। তুই অফিসের সবাইকে নিয়ে ছাদের দিকে চলে যা।
অফিসের মেইন দরজা খুলে দুই চারজন সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায় উপরে কিংবা নিচের দিকে যাবার জন্য। কিন্তু পুরো সিঁড়ি তখন ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে। ওই ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে কারো পক্ষেই কোনো দিকে যাওয়া সম্ভব হয় না। সবাই ফিরে আসে অফিসের ভিতরে।
সিঁড়ি দিয়ে নামা সম্ভব হবে না ভেবে চার-পাঁচজন বাদে সবাইকে নিয়ে অফিসের অন্য-প্রান্তে চলে যায় বকুল। এই চার-পাঁচজন গিয়ে আশ্রয় নেয় বোর্ড-রুমে। বোর্ড-রুমের দরজা আটকে রাখলে ধোঁয়া ঢুকবে না এই যুক্তি দিয়ে সেখানে ঢুকে যায় তারা। এর মধ্যে একজন মহিলাও ছিল।
অফিসের অন্য প্রান্তে ওদের একটা বাথরুম আছে। এই বাথরুমে জানালা কাঁচের। তবে কাঁচের সঙ্গে সঙ্গে গ্রিলও রয়েছে। জানালার গা-ঘেঁষেই পাশের বিল্ডিং। সেই বিল্ডিংয়ে-ও একটা জানালা আছে। যদিও সেটা পুরোপুরি এই জানালার মুখোমুখি না। কিন্তু ভাঙতে পারলে এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিংয়ে চলে যাওয়া সম্ভব।
স্ট্যান্ড ফ্যানের স্ট্যান্ড দিয়ে সেই গ্রিল ভাঙার নির্দেশনা দেয় সে। কয়েকজন তরুণ কর্মচারী বেশ খানিকক্ষণ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দেয়। ‘এ দিয়ে এই গ্রিল ভাঙা সম্ভব না ভাইয়া।’ হতাশ কণ্ঠে বলে তারা। বকুল হাল ছাড়তে রাজি হয় না। ‘নিশ্চয় ভাঙা যাবে। ভাঙতে হবেই। নইলে সবার আগুনে পুড়ে মরা লাগবে।’
ক্রমাগত গ্রিলে আঘাত করা শুরু হয় আবার। কাজ হয় এতে ভেঙে যায় গ্রিল। লোহার একটা টুকরো দিয়ে পাশের বিল্ডিংয়েরও কাঁচ ভাঙা হয়। সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় ভিন্ন জিনিস। ওই জানালাতেও গ্রিল দেয়া। ওদের হাতের ফ্যানের স্ট্যান্ড বা লোহার টুকরো দিয়ে ওখানে শক্ত করে আঘাত করা সম্ভব হচ্ছে না। আগুন লেগেছে দেখে ওই বিল্ডিংয়ের লোকজনও ভয়ে নেমে গেছে। চিৎকার করে ডাকাডাকি করেও কেউ আসে না।
এর মধ্যে রঞ্জু আবার ফোন দেয়। ছাদে যাওয়ার কথা বলে। বকুল বলে, ছাদে যাওয়া সম্ভব না এই ধোঁয়ার মধ্যে। আপনি বরং পাশের বিল্ডিংয়ে লোক পাঠান। আমরা এপাশে জানালা ভেঙেছি। কিন্তু ওপাশেরটা ভাঙতে পারছি না। রঞ্জু সঙ্গে সঙ্গেই চার-পাঁচজনকে পাঠায় পাশের বিল্ডিংয়ে। কিন্তু তারা খালি হাতে এসেছে। গ্রিল ভাঙার কিছু সঙ্গে নেই। এপাশ থেকে লোহার রড দেয়া হয় ওদের কাছে। সেটা দিয়ে গ্রিল ভাঙার বহুক্ষণ চেষ্টা করে তারা। কিন্তু কিছুতেই গ্রিল ভাঙে না। একপর্যায়ে গিয়ে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেয় তারা। ‘এই গ্রিল ভাঙা সম্ভব নয়।’
বকুল চাপ দেয় ওদের। ‘চেষ্টা করে যান। অবশ্যই ভাঙবে। এতগুলো মানুষের জীবন মরণ নির্ভর করছে, হাল ছেড়েন না।’
ওর কথা শুনে আবারও গ্রিলের ওপরে আঘাত হানতে থাকে তারা। হঠাৎ করে একটা গ্রিল ভেঙে যায়। এক দেড় ফুটের মতো ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। এটা দেখে প্রবল উৎসাহে দ্বিতীয়টার ওপর আঘাত হানতে থাকে তারা। এটা ভাঙতেও বেশি সময় লাগে না। মানুষ ঢোকার মতো জায়গা তৈরি হয়ে যায়। এখান দিয়ে বের হয়ে পা এগিয়ে দেয় একেকজন আর অন্যপাশ থেকে ধরে তাদের পাশে বিল্ডিং এ নিয়ে যাওয়া হয়।
এর মধ্যে ফায়ার ব্রিগেডের লোকও চলে এসেছে। বকুল ওদের বোর্ড- রুমে আশ্রয় নেয়া চার-পাঁচজনের দলের কথা বলে। তাদের উদ্ধার করার জন্য অনুরোধ জানায়। ফায়ার ব্রিগেডের লোক এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিংয়ে যেতে শুরুতে অস্বীকার করে। কিন্তু ওদের চাপাচাপিতে রাজি হয়। গিয়ে দেখে, সেই মানুষগুলো বাথরুমের কাছে এসে প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মহিলাটা পুরোপুরিই অজ্ঞান। সবাইকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনা হয়।
বিল্ডিংয়ে থাকা অবস্থাতেই বকুল নোভাকে কল দিয়েছিল। বলেছিল আটকা পড়েছে সে। বিল্ডিং এর নিচে এসে আবার কল দিয়ে জানায়, সে বের হতে পেরেছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই চার্জ শেষ হয়ে যায় ওর ফোনের। নোভা ওকে কল করে না পেয়ে ভেবে নিয়েছে বকুল তাকে মিথ্যা কথা বলেছে। আসলে বিল্ডিংয়ে আটকে গিয়েছে সে। উন্মত্ত অবস্থায় সে নিজেও রওনা দিয়ে দিয়েছে বনানীর দিকে। তার বোনকেও বলেছে বনানীর দিকে যেতে। বোন তার আগেই চলে এসেছে বনানীতে। তিনি এসে দেখেন এক লোক আগুনের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে পাইপ ধরে ধরে নামছিল। কিন্তু, হাত ফসকে পড়ে গিয়েছে। লম্বা ধরনের মানুষ আর গায়ের শার্ট দেখে দূর থেকে দেখে তার মনে হয়েছে বকুল বোধ হয় পড়ে গিয়েছে বিল্ডিং থেকে। তিনি নোভাকে ফোন করে বলেছেন, ‘ভাইয়ার মতো শার্ট গায়ে লম্বা একটা লোক পড়ে গেছে দশ তলা থেকে। ভাইয়াই কিনা বুঝতে পারছি না।’
শুধু নোভা একা না। আমার ভাই-বোনেরাও তখন সবাই অস্থির, উদ্বিগ্ন। ভাই-ভাগ্নেরা যে যেখানে আছে সবাই তখন বনানীর দিকে রওনা দিয়ে দিয়েছে। বিভীষিকাময় এক পরিস্থিতি।
নিজের ভাই বলে বলছি না। এই ভয়াবহ আগুন থেকে সে শুধু নিজে বাঁচেনি, বুদ্ধি করে ঠান্ডা মাথায় তার অফিসের প্রায় তিরিশ জন মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে আজ।
আমরা যারা দেশের বাইরে চলে আসতে পেরেছি, অনেক সময় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি এই ভেবে যে যাক নিরাপত্তাহীন দেশ ছেড়ে চলে আসতে পেরেছি। আসলেই কি আসা হয়েছে? পরিবার-পরিজন সবাইতো রয়ে গেছে বাংলাদেশেই। নগরে আগুন লাগলে যেমন দেবালয়ও তা এড়াতে পারে না, দেশে কিছু হলে তার রেশও আমরা সরাতে পারি না। আগুনের উত্তাপটা ঠিকই গায়ে এসে লাগে। না লেগে উপায়ও নেই যে। লতায়-পাতায় সবাই যে জড়িয়ে আমরা।

উপজেলায় ৪র্থ ধাপেও একই চিত্র: ভোটার আনতে মসজিদের মাইকে আহ্বান

উপজেলা পরিষদের বিগত তিন ধাপের মতো চতুর্থ ধাপেও ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। বিক্ষিপ্ত সহিংসতা, জালভোট ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ এসেছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কাছ থেকে। তবে নির্বাচন কমিশন বলেছে, নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। অনিয়মের অভিযোগ আসায় কুমিল্লার তিতাস উপজেলা নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া অনিয়মের কারণে বিভিন্ন উপজেলার ১২টি কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছে। কেন্দ্র দখল সহিংসতা ও প্রার্থী ও এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগে বিকালে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা দেয়। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার একটি কেন্দ্রে যেতে মসজিদের মাইকে ভোটারদের আহ্বান জানানো হয়। গতকাল সকালে উপজেলার রাধানগর এলাকার একটি মসজিদ থেকে এই আহ্বান জানানো হয় বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।
খুলনার বিভিন্ন উপজেলায় ভোটার উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। ভোটার না থাকায় নির্বাচনী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের অলস সময় কাটাতে দেখা যায়। টাঙ্গাইলের বাসাইলে নৌকায় জালভোট দেয়ায় সহযোগিতা করায় সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ ২ জনকে আটক করা হয়। নারায়ণগঞ্জের আড়াই হাজারে কেন্দ্রগুলোতে তেমন ভোটার না দেখা গেলেও ব্যালটে বাক্স ভরে যায়।
পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের চতুর্থ ধাপে ভোটগ্রহণ মোটামুটি শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে দাবি করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য সন্তোষ প্রকাশ  করেছেন ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। গতকাল নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রতিক্রিয়া জানান ইসি সচিব। হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, অনিয়মের কারণে কুমিল্লার তিতাস উপজেলার সবগুলো কেন্দ্র্র্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। এর বাইরে ১২টি কেন্দ্র স্থগিত করা হয়েছে। স্থগিত কেন্দ্র্র্রগুলো হলো মুন্সীগঞ্জের তিনটি, ধামরাইয়ের একটি, কুমিল্লার চান্দিনায় চারটি, কুমিল্লার মেঘনায় দুটি ও হোমনার দুটি। বাকি কেন্দ্রগুলোতে মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ইসি সচিব বলেন, অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকায় সাতজন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে তাদের আইনের আওতায় সাজা দেয়া হবে।
তিনি আরো দাবি করেন উপজেলা নির্বাচনে প্রস্তুতি ভালো হওয়ার কারণে চার ধাপের নির্বাচনে একটি লোকও নিহত হয়নি। হয়তো কিছু আহত হয়েছে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য আমরা অনেকগুলো উপজেলার নির্বাচন স্থগিত করেছি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), এমনকি আমরা পুলিশ সুপারকে (এসপি) প্রত্যাহার করেছি। কয়েকজনকে আমরা সাময়িক বরখাস্তও করেছি। হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, যেসব কেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে তদন্ত করে ইসি ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করবে। আর যেসব উপজেলা স্থগিত করা হয়েছে, সেসব উপজেলা নির্বাচন বন্ধের বিষয়েও তদন্ত করা হবে। পরবর্তীকালে এর তারিখ নির্ধারণ করা হবে। আগামী ১৮ই জুন ৩০ থেকে ৪০টি উপজেলায় নির্বাচন হবে বলেও জানান ইসি সচিব। চার ধাপের ভোটগ্রহণে ভোটের হার নিয়ে ইসি কতখানি সন্তুষ্ট- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। আহত, নিহত যাতে না হয়, সেটার ওপরে আমরা সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছি। আপনারা আমাদের শতকরা হারের কথা বলেছেন, শতকরা হার বাড়াতে গেলে অনিয়মের মধ্যে পড়তে হয় আমাদের।
এ জন্য ভোটাররা যে পরিমাণ আসুন না কেন, আমরা ওটার ওপরে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা যদি ভোটার হার বাড়াতে চাই, তাহলে আবার সেই স্থানীয় প্রশাসন বা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অনিয়মের দিকে ঝুঁকে পড়বে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাহলে ৮০ শতাংশ ভোট কীভাবে পড়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে উপজেলা নির্বাচনের তুলনা করলে চলবে না। জাতীয় নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু উপজেলায় নির্বাচনে সকল দল অংশগ্রহণ করেনি। আমরা চেয়েছি  যাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটাররা যাতে অংশগ্রহণ করে। রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির ব্রাস্ট ফায়ারের ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, এটা তো নির্বাচনকালীন সংহিসতা নয়। আপনারা কি এটাকে তাই বলবেন? আপনারা জানেন, সেখানে পাহাড়িদের বিভিন্ন গ্রুপ কাছ করে। সেখানে ভোটকেন্দ্র দখলের কোনো ঘটনা ঘটেনি।
আঞ্চলিক দলের প্রাধান্য বিস্তারের জন্য এমন হতে পারে। এটাকে আমরা নির্বাচনী সহিংসতা বলতে নারাজ। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) বিষয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ফলাফল আসতে দেরি হয়। তৃতীয় ধাপে ইভিএমের ফলাফল রেজাল্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (আরএমএস) আনতে চেয়েছিলাম। ইন্টারনেট ডাউন থাকার কারণে আমরা পারিনি। চতুর্থ ধাপে আমরা সেটা বাদ দিয়েছি। ম্যানুয়ালি ফলাফল আনা হচ্ছে। সংসদ নির্বাচনেও ইন্টারনেটের গতি কম থাকায় ফলাফল প্রকাশে দেরি হয়েছিল। উপজেলা নির্বাচনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে ইসি সচিব দাবি করলেও দ্বিতীয় ধাপের ভোটগ্রহণে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে ফলাফল নিয়ে ফেরার সময় দুর্বৃত্তদের ব্রাশ ফায়ারে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাসহ সাতজন নিহত হন। আর আহত হন ১৫ জনের মতো।

বাদশা মিয়া ফের নিঃস্ব by পিয়াস সরকার

বাদশা মিয়ার বয়স ৬০-এর কাছাকাছি। শূন্য হাতে শুরু করেছিলেন মাছের ব্যবসা। রাজধানীর গুলশান-১ ডিএনসিসি মার্কেটে ছিল তার দোকান। এই দোকান দিয়ে চলতো তার পরিবারসহ ৮টি পরিবার। এখন ঘাড়ে তার ১১ লাখ টাকার ঋণ। গত শনিবার ভোরে এই মার্কেটটিতে লাগে আগুন। আগুনে পুড়ে যায় ২শ’র অধিক দোকান। তার মধ্যে ছিল বাদশা মিয়ার দোকানও।
তার দোকানে ছিল ২টি ফ্রিজ। ফ্রিজভর্তি ছিল সামুদ্রিক মাছ। আগুনে ফ্রিজ পুড়ে ছাই। সেইসঙ্গে ছাই ফ্রিজে থাকা মাছ। আবার অন্যের ফ্রিজেও মাছ রাখতেন ভাড়ায়। বাদশা মিয়া ও তার ছেলে মিলে চালাতেন দোকানটি। বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ কিনতেন। তিনি মূলত মাছ সরবরাহ করতেন বিভিন্ন রেস্তরাঁয়। এর পাশাপাশি করতেন খুচরা বিক্রি। তার দোকানে কাজ করতেন আরো ৬ কর্মচারী। দু’জন কাজ করতেন দোকানে আর চারজন বিভিন্ন রেস্তরাঁয় করতেন মাছ সরবরাহ। এখন সব হারিয়ে নিঃস্ব তিনি। কর্মচারীরাও হারিয়েছেন কাজের জায়গা।
এই মার্কেটেই ২৬ মাস আগে লাগা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন তিনি। তখন তার ছিল ৫টি দোকান। সেবারের আগুনেও খুইয়েছিলেন সব। তখন ঋণ ছিল ৬ লাখ টাকা। এরপর শূন্য হাতে ফের যাত্রা শুরু করেন। ৪টি দোকান ছেড়ে দিয়ে রাখেন একটি মাত্র দোকান। এতে তার ভাগ্য ফেরে। মার্কেটে বিক্রির পাশাপাশি শুরু করেন রেস্তরাঁয় মাছ সরবরাহ। এই মাছ সরবরাহ করেই ঘুরে দাঁড়ান। বাদশা মিয়া বলেন, হোটেলে মাছ সাপ্লাই দিয়েই আমার দিন ফিরলো। লোন শোধ করলাম। ব্যবসা বড় করতে আবার লোন নিলাম ১৫ লাখ টাকা। এরপর লোনের টাকায় আরো বড় হতে থাকে ব্যবসা। দিনদিন বাড়তে থাকে মাছের চাহিদা। ঋণ নিয়েছেন ৮ মাস আগে। পরিশোধ হয়েছে ইতিমধ্যে ৪ লাখ টাকা। ফের তার ঘাড়ে ১১ লাখ টাকার বোঝা। তিনি আরো বলেন, আগুন নেভার পর দোকানে আসি। দেখি ধোঁয়া উড়ছে ফ্রিজ থেকে। ফ্রিজ ভেঙে দেখি সব মাছ ফ্রাই হয়ে গেছে। তার দুটি ফ্রিজ ও অন্যের ফ্রিজে রাখা সব মাছ আগুনে পুড়ে ছাই। তার আনা শাপলা পাতা মাছ ছিল প্রায় ১০টি। এই মাছের কেজি বিক্রি হয় দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়। একেকটি মাছ ১২ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত ছিল। এ ছাড়াও চিংড়ি মাছ ছিল প্রায় ৩শ’ কেজি। আইড় মাছ ছিল প্রায় দেড় শ’ কেজি। সব মিলিয়ে বিভিন্ন মাছ ছিল হাজার কেজির মতো। মাছের মূল্য জানতে চাইলে দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসে পড়েন, তার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া দোকানে। দেন মাথায় হাত। চোখে স্পষ্ট পানি। ইনহেলার দিয়ে শ্বাস নেয়ার পর বলেন, তাও লাখ দশেক টাকার মাছ ছিল। তিনি আরো বলেন, এই লোনের টাকা শোধ দেবো কেমনে? মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এই ব্যবসাটা দাঁড় করাইলাম। দু’বারের আগুনে পথের ফকির হয়ে গেলাম। ফের পরক্ষণেই বলেন, রাস্তার ফকিরের থেকেও খারাপ অবস্থা। ফকির দিন শেষে খাইয়া না খাইয়া থাকে। কিন্তু লোন থাকে না।

দুর্নীতির অর্থ কী কবর বা শ্মশানে নিয়ে যাবেন? -রাজউক কর্মচারীদের মন্ত্রীর কড়া বার্তা

দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ আপনাদের কত দরকার? এসব অর্থ কি কবর বা শ্মশানে নিয়ে যেতে পারবেন। জনগণ কিন্তু আপনাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। আশা করি বাইরে চলাফেরা করলে বিষয়টি আপনারা অনুধাবন করতে পারবেন। গতকাল বনানীর ১৭ নম্বর রোডের এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এবং ঢাকা শহরের বিদ্যমান ভবনগুলোর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে করণীয় বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়ে রাজউক অডিটরিয়ামে এক দিকনির্দেশনামূলক সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ.ম. রেজাউল করিম কর্মকর্তা- কর্মচারীদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী রেজাউল করিম বলেন, টেলিভিশন টকশোতে গেলে আপনাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা আমাকে বার বার শুনতে হয়। তখন বলা হয়, রাজউকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি ডুবতে বসেছে। আমি তাদের এ কথার প্রতিবাদ জানাই। বলি, রাজউকের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতিগ্রস্ত নয়।
তাদের মধ্যে ভালো কর্মকর্তা-কর্মচারীও রয়েছে। তারাই প্রতিষ্ঠানটিকে ধরে রেখেছে। তাদেরকে বুঝানোর পর আমার কথায় সায় দেন।
গণপূর্তমন্ত্রীর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের আগে ইমারত শাখার বিভিন্ন সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে কথা বলেন অথরাইজড অফিসার সেগুফতা শারমীন ও আশরাফুল ইসলাম, সহকারী অথরাইজড অফিসার তামান্না হক, ইমারত পরিদর্শক ইসমাঈল প্রমুখ। তারা বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়। গাড়িসহ বিভিন্ন লজিস্টিক সাপোর্ট আমরা পাই না। এ কারণে সাইট ভিজিট করতে আমাদের নানা সমস্যা পোহাতে হয়। কষ্ট করে কাজ করলেও আমাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। আদতে আমরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। দিকনির্দেশনামূলক সভায় অথরাইজড অফিসার আশরাফের দুর্নীতি নিয়ে কথা উঠে। এর বিপরীতে আশরাফ জানান, একটি সাইনবোর্ডসর্বস্ব পত্রিকার সাংবাদিকের কাজ করে দেইনি বলে আমার বিরুদ্ধে আবোল তাবোল লিখেছে। ওই রিপোর্টে আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা সঠিক নয়। গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, আপনারা ডেভিয়েশনকৃত ভবনে নোটিশ দিয়ে তা আর মনিটরিং করেন না।
অনেকে বলেন, নোটিশ দেয়ার পর আপনারা ম্যানেজ হয়ে যান। অথচ সামান্য ডেভিয়েশন নিয়ে তোলপাড় শুরু করে দেন। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে। দিকনির্দেশনামূলক সভার পর সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ. ম. রেজাউল করিম। তিনি বলেন, রাজধানীর সব বহুতল ভবনের সার্বিক তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে। এজন্য সোমবার (আজ) থেকে ২৪টি টিম অভিযান চালাবে রাজধানীর ভবনগুলোতে। বিল্ডিং নির্মাণ বিষয়ে প্রতিদিন সব ধরনের রিপোর্ট রাজউককে মনিটরিং করতে হবে।
এ ছাড়া এফ আর টাওয়ারের সার্বিক বিষয়ে পর্যবেক্ষণ কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। রাজউককে ঢেলে সাজানো হবে। প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্যান্যের মধ্যে রাজউকের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী সাহাদাত হোসেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. রাশিদুল ইসলাম, স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি কাজী গোলাম নাসির এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, আমাদের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হওয়ার পর আমরা এটি জনসম্মুখে জাতীয় পত্রিকা ও টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন আকারে দরকার হয় প্রকাশ করবো। কারণ দেশের মানুষের জানা দরকার অর্থলোভী মানুষরূপী যারা এভাবে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণ করে জানমালের নিরাপত্তা রক্ষা করেনি তাদের চেহারা দেশবাসীর দেখা উচিত। তিনি বলেন, যেসব ভবনে পরিকল্পনা নকশা অনুযায়ী করা হয়নি সেসব ভবনের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। নিয়মের বাইরে যেসব থাকবে সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে ১৯৯৬ থেকে ২০০৮-এর আগের সময়ের অবস্থায় অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বা গ্যারেজ রাখার কোনো বিধান ছিল না, সেসব ভবনের জন্য নতুন করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে।
গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, বিল্ডিংয়ের কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা শুধুমাত্র বিল্ডিং মালিক এবং ডেভেলপার কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতাম আগে। কিন্তু এখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবো। তিনি বলেন, প্রতিটি ভবন যারা ব্যবহার করবেন তারা ভাড়াটিয়া হিসেবে বা সেখানকার মানুষ হিসেবে আগে দেখে নিতে হবে যে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা আছে কিনা। অতিরিক্ত সিঁড়ি লাগানো আছে কিনা বা সবকিছু মেনে বিল্ডিং করা হয়েছে কিনা, যদি এসব নিয়ম মেনে না করা হয় তাহলে আপনি সেই ভবনটি ব্যবহার করবেন না। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শ. ম. রেজাউল করিম বলেন, আদালত নতুনভাবে সময় না দিলে নির্দিষ্ট সময় পরে বিজিএমইএ ভবন ভেঙে ফেলা হবে। এ ছাড়া পহেলা মে থেকে রাজউকের সব সেবা ডিজিটালাইজেশন হবে। এর মাধ্যমে জনগণের ভোগান্তি দূর হবে এবং জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে।

এফ আর টাওয়ার একটি ময়নাতদন্ত by রুদ্র মিজান

এফ আর টাওয়ার। ফারুক রূপায়ণ টাওয়ার। দু’দিন ধরে দেশ-বিদেশে আলোচিত এ টাওয়ারটি। বৃহস্পতিবার ওই ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরই আলোচনায় আসে টাওয়ার। থাই কাচ, দৃষ্টিনন্দন টাইলসে ঘেরা দেয়াল। উত্তর-দক্ষিণে প্রশস্ত রাস্তা। এই ভবনেই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ দিতে হয়েছে ২৫ জনকে। এজন্য  অনিয়মকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবারের বিভীষিকাময় অগ্নিকাণ্ডের পর প্রকাশ পেয়েছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য।
সরজমিনে বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে গিয়ে দেখা গেছে, ভবনের সঙ্গে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অন্যান্য ভবন। পশ্চিমে আহমেদ টাওয়ার, পূর্বদিকে আউয়াল সেন্টার। সব ক’টি ভবনই বহুতল। প্রতিটি ভবন ১৮ থেকে ২২ তলাবিশিষ্ট। উত্তরদিকে প্রশস্ত রাস্তা। রয়েছে বেশ কয়েক ব্যাংক, হোটেল সারিনা, প্রিয়প্রাঙ্গণ, কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা প্রতিষ্ঠান। দক্ষিণ দিকে দুই লেনের প্রশস্ত রাস্তা। তারপর বিভিন্ন ভবনে ব্যাংক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। এই ভবনে ছিল না অগ্নিনিরাপত্তা। জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার জন্য ভবনে দুটি সিঁড়ি থাকলেও তার প্রশস্ততা খুবই কম। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক লে. কর্নেল এসএম জুলফিকার রহমান জানান, সিঁড়ি দুটি দুই থেকে আড়াই ফিট। যা দিয়ে একজন মানুষ জরুরি অবস্থায় বের হতে গেলেই হিমশিম খাবে। তাও প্রায় সময়ই সিঁড়ির রাস্তা বন্ধ থাকে। বৃহস্পতিবার অগ্নিকাণ্ডের সময়ও সিঁড়ির রাস্তা সাত তলায় বন্ধ ছিল। যে কারণে উপরের লোকজন সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে পারেননি। ভবনে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও ছিল না।
সূত্রমতে, ভবনটিতে ২০০৮ সালেও একবার আগুন লেগেছিল। ভবনের ব্যাজমেন্টে একটি গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। আগুন ছড়ানোর আগেই তখন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। তারপর বিভিন্ন সময়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে তিনটি নোটিশ দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ভবনের লিফট ছিল তিনটি। অগ্নিকাণ্ডের সময় দুটি নিচে ছিল। একটি ছিল ১২ তলায়। ওই লিফট দিয়ে একবার বেশ কয়েকজন নিচে নামতে পেরেছেন। তারপরই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে সঙ্গে সাততলা থেকে নিচের লোকজন নিরাপদে নেমে গেছেন। আগুনের উৎপত্তি আট তলায় বলেই ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত আট তলা থেকে উপরের দিকে ছড়িয়ে যায় আগুন। ভয়াবহ এই আগুনে ৯, ১০, ১১ ও ১২ তলার লোকজনই বেশি মারা গেছেন। তার উপরের তলার অনেকে ছাদ দিয়ে পাশের আহমেদ টাওয়ারের ছাদ হয়ে নিচে নামতে পেরেছেন। কিন্তু ধোঁয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার পর তাদের অনেকে আর বের হতে পারেননি। উদ্ধারকর্মীরা জানান, ভবনে অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা না থাকায় দ্রুত ধোঁয়া ছড়িয়ে যায় প্রতিটি ফ্লোরে। ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে রয়েছে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, কার্পেট, সোফা, ক্যাবল, রাবার, সিনথেটিক ইত্যাদি। যে কারণে ধোঁয়া বাড়তেই থাকে। নিহতদের বেশিরভাগেরই ধোঁয়ার কারণে, অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু ঘটেছে।
এই ভবনের ভূমির মালিক এসএমএইচআই ফারুক। তিনি একজন প্রকৌশলী ও ব্যবসায়ী। ২০০৫ সালে এই ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ডেভেলপার কোম্পানি হিসেবে কাজ করেছিল রূপায়ণ। ২০০৭ সালে কাজ শেষ হয়। রূপায়ণের মালিকানাধীন ফ্লোরগুলো ২০০৮ সালে বিক্রি করে দেয়া হয়। তারপর থেকে এসএমএইচআই ফারুক ছাড়াও ভবনের মালিক হন অনেকে। তবে নিচের সাতটি দোকান ও ১০টি সম্পূর্ণ ফ্লোরের মালিক ফারুক। নিচতলার প্রিতম রেস্টুরেন্ট, বুস্টার জুস, কিনড্রেড ক্যাফে, দ্বিতীয় তলার বাটার দি অফেল ক্যাফে, বোমা বার্গার, ৫ তলার ডিডিড গ্লোবাল, ডেনটোটাল, ৬, ১৮ ও ১৯ তলার আমরা নেটওয়ার্কস লি. ১২ তলার ই ইউ আর সার্ভিস, ১৩ ও ১৪ তলার ডার্ড গ্রুপ, ১৫ তলার এফ আর প্রোপার্টিজ, চোরী কোম্পানি, ১৯ তলার এভার বেস্ট ও ২০ তলার এজে বিজনেস প্রতিষ্ঠানগুলো তার ফ্লোরে ভাড়া দিয়েছেন তিনি।
এফ আর টাওয়ারের ৪ তলার রোজডেল কনভেনশন হল ও ১৮ তলার এবিসিডি বিজনেস সেন্টার পরিচালনা করেন ফারুক নিজেই। সবমিলিয়ে এই ভবনে প্রায় ৩৩টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিদিন সহস্রাধিক মানুষ এখানে কাজ করেন।
এই বিপুল মানুষের জীবনের নিরাপত্তায় কর্তৃপক্ষ ছিলেন উদাসীন। ভবনটি আইন না মেনেই তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ভবনটিকে ১৯৯৬ সালে ১৮ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। ২০০৭ সালে তারা রাজউকে একটি নথি দাখিল করে ২৩ তলা করার জন্য। কিন্তু তাদের সেই নথি অনুমোদনের পক্ষে কোনো দলিল রাজউকে নেই। অবৈধভাবে ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে ২৩ তলা করা হয়েছে। এই কাজের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তারা যদি রাজউকের লোকও হয় তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।
ভবনের মালিক এসএমএইচআই ফারুক থাকেন গুলশান-২ এলাকার ৫০ নম্বর রোডের বাসায়। তাকে পাওয়া না গেলেও গতকাল কথা হয় তার প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার কামাল হোসেনের সঙ্গে। কামাল হোসেন জানান, এফ আর টাওয়ারের মালিক সমিতির সভাপতি ব্যবসায়ী তাসবিরুল ইসলাম। তিনি ওই ভবনের ২১, ২২ ও ২৩ তলার সানলাইট কোম্পানির মালিক। ১৮ তলা থেকে ভবনকে ২৩ তলা করার সময় তিনি অনুমোদন নিয়েছেন বলে সবাইকে জানিয়েছেন। এই ঘটনায় এসএমএইচআই ফারুক জড়িত না বলে দাবি করেন কামাল। তবে চেষ্টা করেও গতকাল তাসবিরুল ইসলামের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ভবনের ডার্ড গ্রুপের অফিসের কর্মকর্তা শরীফ হোসাইন বলেন, অগ্নিনিরাপত্তা যেখানে নেই সেখানে কেন রাজউক, ফায়ার সার্ভিস অনুমোদন দিল। অথবা অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ হয়ে থাকলে তারা কেন ব্যবস্থা নেননি। একইভাবে এরকম প্রশ্ন তোলেন ওই ভবনের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মোহাম্মদ নোমান।
ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের গুলশান জোনের উপ-কমিশনার মোস্তাক আহমেদ জানান, এফ আর টাওয়ারের অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনসুারেই পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইতিমধ্যে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ২৫টি লাশ উদ্ধার ও তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। ২৪ লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

চিকিৎসায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন নাহারের অনন্য নজির by কাজী সোহাগ

একসময় গান গাইতেন, শুনতেন। কিন্তু এখন আর এসব কিছুই সম্ভব হয় না। কারণ দিনের কর্মঘণ্টার বেশির ভাগ সময় কাটে অপারেশন টেবিলে। যমে-মানুষে টানাটানির মাঝখানে থাকেন তিনি। এতে বেশির ভাগ সময়ই সফল হয়েছেন। অসংখ্য মৃতপ্রায় শিশুকে বাঁচিয়েছেন প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে। তাইতো জীবনের আশা ছেড়ে দেয়া অনেক শিশুর পরিবারের সঙ্গে রয়েছে তার আবেগের সম্পর্ক, অনুভূতির সম্পর্ক। এ কারণে অসংখ্য সদ্যজাত শিশুর নামকরণ করতে হয়েছে তাকে।
তার এ ধরনের সফলতার পেছনেও রয়েছে আরেক গল্প। তিনি শিশুদের বাঁচাতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। নিয়েছেন উচ্চ প্রশিক্ষণ। আর এটা করতে গিয়েই মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন। আইসিইউ এর টেবিল থেকে ফিরে এসেছেন। পেয়েছেন নতুন জীবন।
এরপর থেকে নতুন উদ্যমে নামেন শিশুদের বাঁচাতে। গল্পটি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নুরুন নাহার ফাতেমা বেগমের। শিশুদের জটিল হৃদরোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ হওয়ায় এ বছর দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার ঢকা ক্যান্টনমেন্টের কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে (সিএমএইচ) মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তার জীবনের গল্প, কাজের সফলতা। সিলেট জেলার মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার পাকশাইল গ্রামের কৃতীসন্তান তিনি। সেনাবাহিনীতে চাকরিরত অবস্থায় ব্যক্তিগত কৃতিত্বের কারণে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার একমাত্র গৌরবোজ্জ্বল উদাহরণ নুরুন নাহার ফাতেমা বেগম। দীর্ঘদিন ধরে অসহায় রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন তিনি।
স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে মানবজমিনকে তিনি বলেন, এককথায় আমি অভিভূত। মহান আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া আদায় করি। তিনি বলেন, কৃতজ্ঞতা জানাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আমার জন্য স্বাধীনতা পদকের স্বপ্নদ্রষ্টা আর্মি মেডিকেল কোরের পথিকৃৎ শ্রদ্ধেয় ডিজিএম স্যারের প্রতি। চিকিৎসা সেবার শুরুর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, এর আগে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান কার্ডিয়াক সেন্টারে ২ বছর কাজ করেছি। ১৯৯৬ সালে সেখানে যাই এবং ১৯৯৮ সালে ফিরে আসি।
সেটা ছিল অনেক কষ্টের একটি ট্রেনিং। সকাল ৭টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। কারণ এই বিষয়টি অনেক জটিল।
বাংলাদেশে এটা ছিল না। আমি দেখলাম বাংলাদেশে এমন অনেক ছোট বাচ্চা জন্মগত হৃদরোগ নিয়ে চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। তাদের বাঁচানোর জন্য যে টেকনোলজি তা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তখন ভেবেছি এই টেকনোলজি যদি আমি শিখতে পারি এবং বাংলাদেশে নিয়ে যেতে পারি তাহলে এমন অনেক বাচ্চাকে বাঁচানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, শিশুদের যে হার্টে রোগ হয় তখন মানুষ এটা বিশ্বাস করতো না। ধারণাও ছিল না। ডা. নুরুন নাহার ফাতেমা বেগম জানান, অসংখ্য শিশুর অপারেশন করেছি। বাবা, মা আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমন মৃতপ্রায় বাচ্চাদের অপারেশন করে তাদের সুস্থ করতে পেরেছি। আর প্রতিটি অপারেশনের আগে আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য চেয়েছি। অনেক বাচ্চার নামকরণ করতে হয়েছে আমাকে।
জন্মের ২ থেকে তিন দিনের মধ্যে অপারেশন করতে হয়েছে এমন শিশুর সংখ্যা অনেক। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজারের মতো ইন্টারভেনশন (জন্মগত হৃদরোগ) করেছি। যেটা বিশ্বের যে কোনো উন্নত সেন্টারের সঙ্গে আমরা তুলনা করতে পারি। প্রফেসর ডা. নুরুন নাহার ফাতেমা বাংলাদেশের প্রথম পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্ট এবং তিনি প্রথম জন্মগত শিশু হৃদরোগের ইন্টারভেনশন চালু করেন ও ধারণা দেন। তখন বুক কেটে হার্ট সার্জারি  চিকিৎসা একমাত্র বিকল্প পথ ছিল। তিনি ১৯৯৮ সালে সিএমএইচ ঢাকায় পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন, যা ছিল বাংলাদেশের প্রথম পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্ট। এখানে শিশু কার্ডিয়াক ইমারজেন্সি এবং শিশু কার্ডিয়াক ইন্টারভেনশন সহ সব ধরনের জরুরি রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়।
এছাড়া তিনি বাংলাদেশের সকল শিশুর জন্য ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালে শিশু হৃদরোগের চিকিৎসা চালু করেন। যা বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ততম শিশু হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। দরিদ্র শিশুরা যাতে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ না করে সেই লক্ষ্যে তার প্রচেষ্টায় বিভিন্ন দাতব্য কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তিনি বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের আয়োজনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। তার প্রচেষ্টায় এফসিপিএস পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি কোর্স চালু হয় ২০১৮ সালের অক্টোবরে। তিনি সর্বশেষ আবিষ্কৃৃত শিশু  হৃদরোগের ইন্টারভেনশন সমূহ নিজস্ব প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে একীভূত করেন। এর অংশ হিসেবে ২০১২ সালের ২৫শে ডিসেম্বর ঢাকায় সর্বপ্রথম সাউথ এশিয়ার মেলোডি পালমোনারি ভাল্ব প্রতিস্থাপন হয়।
তিনি বিশ্বের প্রায় ২১টি দেশ থেকে শিশু হৃদরোগ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রযুক্তি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন। অক্লান্ত প্রচেষ্টায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের শিশু কার্ডিওলজি বিভাগকে উন্নত বিশ্বের সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হন। তার প্রচেষ্টায় সিএমএইচ ঢাকার শিশু বিভাগ দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিভাগগুলোর মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। তার এসব সফলতার পেছনে রয়েছে একটি বিশেষ ঘটনা। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, যখন সৌদি আরবে ট্রেনিং করতে গিয়েছিলাম তখন অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কারণ এই টেকনোলজি বাংলাদেশে নেই। আমার মনে একটাই টার্গেট ছিল যেভাবেই হোক এটা আমাকে শিখতে হবে এবং বাংলাদেশে নিয়ে যেতে হবে। ট্রেনিংয়ের একপর্যায়ে অধিক পরিশ্রমের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ি।
ভেনটিলেটর ছাড়াও অনেকদিন আইসিইউতে ছিলাম। তখন আমার বাঁচারও কোনো আশা ছিল না। তখন আমার বস এসে আমাকে বকা দিয়ে বলেন, তুমি কি তোমার জীবন দিয়ে কাজ শিখবে নাকি। অসুস্থতার সময় সবাই বলে আমি হয়তো মারা যাবো। পরে যখন বেঁচে গেলাম তখন সিদ্ধান্ত নিলাম আমি এই সাবজেক্ট কখনই ছাড়বো না। এ থেকে যা শিখবো তা মানুষের কাজে লাগাবো। ওই সময় তো আমি নাও বাঁচতে পারতাম। আল্লাহ্‌ যে আমাকে জীবনটা দিয়েছেন তা কাজে লাগাতে অনেক চ্যারিটি কাজ বা অন্যান্য কাজ করে থাকি। নুরুন নাহার ফাতেমা বেগমের মাইলফলক হিসেবে স্বীকৃত ইন্টারভেশনগুলো হচ্ছে- বেলুন এট্রিয়াল সেপটোসটোমি, পেটেন্ট ডাকটাস আরটারিওসাস কয়েল অকলুশন, এট্রিয়াল সেপটাল ডিফেক্ট ডিভাইস ক্লোজার, ভেট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট ডিভাইস ক্লোজার, পেটেন্ট ডাকটাস আরটারিওসাস ডিভাইস ক্লোজার, মাসকুলার ভেট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট ডিভাইস ক্লোজার, পেরিম্ব্রেনাস ভেটিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট ডিভাইস ক্লোজার, রাইট ভেনট্রিকেল আউটফ্লো ট্রাক্ট স্টানটিং,  পেটেন্ট ডাকটাস আরটারিওসাস স্টানটিং, করোনারি ফিসটুলা কয়েল অকলুশন, করোনারি স্টানটিং,  ভেট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট ডিভাইস ক্লোজার (এমপ্লাজার ডিভাইস অকলুডার দ্বারা), পেটেন্ট ডাকটাস আরটারিওসাস ডিভাইস ক্লোজার (এমপ্লাজার ডিভাইস অকলুডার দ্বারা), দক্ষিন এশিয়ায় প্রথম পালমোনারি ভাল্ব প্রতিস্থাপন (বৈদেশিক প্রক্টোর সহ), দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম পালমোনারি ভাল্ব (নিজস্ব প্রচেষ্টায়)।
১৯৮৭ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া নুরুন নাহার ফাতেমা বেগমের স্বামী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল আজহারউদ্দিন আহমেদ। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে মার্জিয়া তাবাস্‌সুম প্রকৌশলী হলেও বর্তমানে লন্ডনে কাজ করছেন ব্যাংকার হিসেবে। আর ছোট মেয়ে মাশিয়া মাইশা আহমদ যুক্তরাজ্যের ম্যানচেষ্টার ইউনিভার্সিটিতে মেডিকেলের ওপর পড়াশেনা করছেন।

অগ্নি নিরাপত্তা: ঢাকার ৯৮ ভাগ ভবনই ঝুঁকিতে by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিল্ডিং কোড মানা হচ্ছে না। উপেক্ষিত থাকছে অগ্নিনির্বাপণের নির্দেশনাও। ঢাকা মহানগরীর ৯৮ শতাংশ ভবনই অগ্নি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে। বহুতল ভবনের অগ্নিনির্বাপণের ন্যূনতম বিধি-বিধানগুলোও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রকৌশলী, স্থপতি ছাড়াই রাজমিস্ত্রির সাহায্যে বড় বড় ভবন গড়ে উঠছে রাজধানীর বুকে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর বেশির ভাগ বহুতল ভবনে যথাযথ অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য অগ্নিকাণ্ডে বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ মানুষের নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিটি ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার কিছু বিধিমালা নির্ধারণ করে দিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর সর্বশেষ ঢাকার জনবহুল ভবন বিশেষ করে হাসপাতাল, শপিংমল/মার্কেট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, আবাসিক হোটেল ও মিডিয়া সেন্টারসহ মোট ৩ হাজার ৭৩৪টি ভবনের ওপর জরিপ চালায়। এর মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ ভবনই অগ্নি নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এতে দেখা গেছে, এর মধ্যে মাত্র ৮৫টি ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা সন্তোষজনক রয়েছে। বাকি ৩ হাজার ৬৪৯টি ভবনই অগ্নিঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৬৬টি খুব বেশি ঝুঁকিতে এবং ২ হাজার ৫৮৩টি ঝুঁকিতে রয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ২০১৭ সালে অক্টোবর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এই জরিপ চালায়। 
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজউক থেকে আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে বাণিজ্যিক, শিল্পকারখানা, হোটেল বাণিজ্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আর এসব অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করছে সিটি করপোরেশন, রাজউক, ওয়াসা, ফায়ার সার্ভিসের একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। এ ছাড়া অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণ করা ছাড়াও পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান না রেখে ভবন নির্মাণ করায় আলো-বাতাস প্রবেশেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতীয় নির্মাণবিধি (ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড) মানছেন না বেশির ভাগ বাড়ির মালিক ও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এই বিধি মানানোর জন্য কোনো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষও আজ পর্যন্ত গঠিত হয়নি। অথচ ১৯৯৩ সালে জাতীয় নির্মাণবিধি প্রণীত হয়। হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র  রিসার্চ অফিসার মো. আখতার হোসেন সরকার বলেন, বিল্ডিং কোড মানা বাধ্যতামূলক। বাড়ির মালিক, বিল্ডিংটির নকশা প্রণয়নকারী বা প্রকৌশলী সবাইকে মানতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে তা সঠিকভাবে মানা হচ্ছে না। ১৯৯৩ সালে জাতীয় নির্মাণবিধি প্রণীত হয়। এরপর ২০০৬ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হয়। তা ২০১০ সালে সংশোধন হয়ে এখন সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। তারা মানুষকে সচেতন করার জন্য কাজ করছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবু নাঈম মো. শহিদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং (বিএনবিসি) কোড মানছে না। বনানীর ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন,  নিয়মিত ফায়ার ডিল করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না। আবার ফায়ার ডোর ছিল না। এসব কারণেই আগুনে এমন হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, বিএনবিসি কোর্ড অনুযায়ী হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রতি ৫ তলার উপরে একটি করে রিফিউজ এরিয়া বা নিরাপদ এলাকা করা হলে মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঁচু ভবন থেকে লাফিয়ে পড়তে হতো না। কেউ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ছোটাছুটি করতেন না।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল সহজেই তাদের উদ্ধার করতে পারত। আবু নাঈম মো. শহিদুল্লাহ বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত দেশে প্রতিটি উঁচু ভবনে প্রতি পাঁচতলার উপরে রিফিউজ এরিয়া থাকে। ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটলে ভবনের বাসিন্দারা ওই এরিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে আগুন তো দূরের কথা, ধোঁয়াও প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মানুষ মরতো না। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি ফ্লোরে ফায়ার ডোর থাকার কথা। যদি একটি তলায় আগুন লাগে তাহলে ফারার ডোর বন্ধ করে বাসিন্দারা উপরে উঠবে। তিনি বলেন, ভবনটিতে যে সিঁড়ি ছিল তাও পর্যাপ্ত ছিল বলে মনে হয় না। তিনি বলেন, আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সচেতনতা বাড়বে। যখনই আমাদের ওপরে চাপ থাকে, তখনই আমরা আইন মানি। যত উন্নত দেশ, তত আইন কড়া। আমাদের দেশও উন্নত হচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের বৈদ্যুতিক চাহিদা বাড়বে, গ্যাসের চাহিদা বাড়বে। দুর্ঘটনাও ঘটবে। সে কারণে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
জাতীয় অধ্যাপক ও প্রকৌশলী বিশেষজ্ঞ ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ২৬ বছর আগের আইন দিয়ে চলে না। পৃথিবীর কোনো দেশে এরকম নেই। সরকার কেন আইনটি আপডেট করছে না, বুঝতে পারছি না। ২০০৬ সালের আইনে ইমারত নির্মাণের বিষয়ে রাজউক দেখবে। ৯তলা ভবনের উপরে হলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সেরসহ ১১টি সংস্থার অনুমোদন নিতে হবে। তিনি বলেন, ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় বহুতল ভবনের অগ্নিনির্বাপণের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে। এর মধ্যে ফায়ার রেটিং, ফায়ার এক্সটিংগুইশার, ফায়ার সেফটিক ব্যবস্থা ও জলাধার রাখাসহ বেশ কিছু নির্দেশনা রয়েছে। এসব নির্দেশনা মেনে চললে খুব সহজেই আগুন নিভিয়ে ফেলা সম্ভব। কিন্তু দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মনিটরিংয়ের অভাবে সেসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিনি বলেন, ২০০৬ সালে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগ অনেক বিল্ডিংকে বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, সরকার কেন ওইগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

কে হচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী?

নির্বাচন মানেই খেলা। দেশে দেশে এটাই যেন একমাত্র সত্য। এই যেমন ভারতে চলছে বহুমুখী রশি টানাটানি। রাজনীতিক থেকে শুরু করে বলিউডি তারকা, বলতে গেলে সবাই নেমেছেন এ রশি টানাটানিতে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত ভারতের নির্বাচনের দিকে চোখ সবার, যা অনুষ্ঠিত হবে আগামী মে মাসে। তার আগেই অবশ্য আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আরেক দেশ ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নির্বাচন। একেবারে দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে সময়। এ অবস্থায় নানা খেলা চলবে এটাই স্বাভাবিক।
ইসরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই খেলা এখন পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই খেলে যাচ্ছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি জয় নিশ্চিত করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও রয়েছে যথেষ্ট সংশয়। নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজকে ধরাশায়ী করতে নানামাত্রিক প্রচার চালাচ্ছেন তিনি। এই তো কিছুদিন আগেই তিনি বলেছেন, ‘গান্টজ যদি নিজের ফোনকেই নিরাপদ না রাখতে পারেন, তবে দেশকে নিরাপদ রাখবেন কী করে?’ মোক্ষম প্রশ্ন নিঃসন্দেহে। আর ইসরায়েলের মতো দেশের জন্য তো অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটি। কারণ দেশটির ভোটারদের কাছে দেশের নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় বিবেচ্য বিষয়।
ঘটনার শুরু একটি প্রচার থেকে। ভোটের মাত্র কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই ইসরায়েলে প্রচার হলো যে প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী বেনি গান্টজের সেলফোনের তথ্য হ্যাক করেছে ইরান, যেখানে এমন কিছু ছবি রয়েছে, যা গান্টজের জন্য ভীষণ অস্বস্তিকর। বেনি গান্টজ নিজে এমন দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু ভোটের আগে রাজনৈতিক এই গল্প হালে বেশ পানি পেয়েছে। এই গল্প চাউর হওয়ার পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর করা প্রশ্নটি, গল্পটির নির্মাতা হিসেবে তাঁকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, ইসরায়েলিদের কাছে নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিবেচনায় প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন নেতানিয়াহু। গত এক দশক ধরে তিনি ইসরায়েলকে নিরাপদ রেখেছেন। কিন্তু অনেকেই আবার তাঁকে অপছন্দ করেন, তাঁর দুর্নীতি ও বিভাজনের রাজনীতির জন্য। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গে অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে প্রাথমিক তদন্তও হয়েছে। আর এটিই বড় সুযোগ তৈরি করেছে বেনি গান্টজের জন্য। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সাবেক এই চিফ অব স্টাফের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। রাজনীতিতে নতুন হলেও তাঁর ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট দল নেতানিয়াহুর লিকুদ দলের সঙ্গে বেশ ভালোই লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। ফলে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নামটি কিছু মহলে বেশ ভালোভাবেই উচ্চারিত হচ্ছে।
তবে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের নির্বাচনে নিরাপত্তার বিষয়টিই প্রধান হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। এমনকি গান্টজের উপদেষ্টাও মনে করেন, নির্বাচনে জয় পেতে হলে নেতানিয়াহুর গা থেকে মিস্টার সিকিউরিটি তকমাটি আগে সরাতে হবে। গান্টজ নিজেও বিষয়টি বেশ ভালোভাবে বোঝেন। এ কারণেই জন–আস্থা তৈরি করতে সাবেক দুই সেনাপ্রধান গাবি আশকেনাজি ও মোশে ইয়ালুনকে তিনি রানিং মেট করেছেন। নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেই তাঁর প্রচার শিবির যে চারটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, তার তিনটিতেই তাঁকে লৌহমানব হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আর এই উপস্থাপনের ক্ষেত্রে বলার অপেক্ষা রাখে না যে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের হামলার সময় তাঁর নেতৃত্ব কতটা নিষ্ঠুর ছিল, তাই তুলে ধরা হয়েছে কোনো রাখঢাক না রেখেই। ২০১২ ও ২০১৪ সালে গাজায় দুটি যুদ্ধে ইসরায়েল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন গান্টজ। ভিডিওতে গান্টজের সাফল্য হিসেবে তথাকথিত ‘সন্ত্রাসী নির্মূল’, ‘শত্রু ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া’ ইত্যাদি কথা বলা হচ্ছে। আর সবশেষে ভিডিওর বয়ানে গান্টজের জন্য প্রশংসাবাক্য হিসেবে আসছে, ‘(ওই হামলায়) গাজার কিছু অংশ প্রস্তর যুগে ফিরে গিয়েছিল।’ সত্যিই কী দারুণ প্রচার! একটি ভিডিওতে দেখানো হচ্ছে কী করে গাজার নিয়ন্ত্রণ রাখা হামাসের শীর্ষ নেতাকে ড্রোন হামলায় হত্যা করা হয়েছিল।
ঠান্ডা মাথার কমান্ডার হিসেবে বেনি গান্টজের বেশ পরিচিতি রয়েছে ইসরায়েলে। সামরিক বাহিনীতে তাঁকে ‘প্রিন্স’ নামেও ডাকা হয়। কারণ তিনি খুব কম সময়ে দ্রুত পদোন্নতি পেয়েছিলেন। দ্রুত উত্থানের কারণে তাঁকে সৌভাগ্যবানও বিবেচনা করা হয়। নির্বাচনী প্রচারের জন্য প্রকাশ করা চতুর্থ ভিডিওতে আগের তিন ভিডিওর বয়ানের ঠিক বিপরীত বয়ান হাজির করেছেন গান্টজ। সেখানে তিনি বলছেন, শান্তির পথে এগোনোতে কোনো লজ্জা নেই। একদিকে লৌহমানব, অন্যদিকে শান্তিকামী! বলার অপেক্ষা রাখে না যে যুদ্ধবাজ ও শান্তিকামী উভয় পক্ষকেই তিনি পাশে চাইছেন। এ ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে ভিডিওতে। বলা হচ্ছে, ফিলিস্তিনে হামলার সময় তাঁর মা তাঁকে বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের খাদ্য নিরাপত্তা যেন নিশ্চিত করা হয়! সামরিক বাহিনীর প্রধান থাকাকালে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি সব স্তরের মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন।
ইকোনমিস্ট বলছে, গান্টজের অবস্থান রাজনীতির মধ্যপন্থায়। তাঁর বাবা ছিলেন লেবার পার্টির বাম ঘরানার নেতা। তাঁর সন্তান হিসেবে তিনি অবস্থান নিচ্ছেন মধ্যপন্থায়। তাঁর দলের অন্য নেতাদের দৃষ্টিতে গান্টজ হচ্ছেন ‘নিরাপত্তা বিষয়ে প্রখর ও কূটনীতিতে উদার’ ভাবধারার। তেল আবিবের থিংক ট্যাংক ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রস্তাবিত একটি শান্তি পরিকল্পনায় তাঁর সমর্থন রয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে এমন একটি কাঠামো তৈরি হবে, যাতে দীর্ঘ মেয়াদে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। তবে তাঁর নির্বাচনী মেনিফেস্টো এ বিষয়ে অস্পষ্ট। সেখানে ফিলিস্তিনের সঙ্গে আরও বিভাজনের কথাই বলা হচ্ছে। যদিও নির্বাচিত হলে গান্টজ নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু করবেন বলেই মনে করা হচ্ছে, যা ২০১৪ সালের পর থেমে যায়।
গান্টজ শান্তি আলোচনা শুরু করবেন, এমন মনে করার কারণও রয়েছে। কারণ এরই মধ্যে তিনি নেতানিয়াহুর করা জাতিরাষ্ট্র আইন সংশোধনের কথা বলেছেন। ওই আইনে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েল শুধু ‘ইহুদি’ হিসেবেই বিবেচিত হবে বলে বলা হয়েছে। গান্টজ এই আইন সংশোধন করে সবার জন্য সমানাধিকার নিশ্চিত করতে চান। তবে এ বিষয়গুলো নিয়ে নির্বাচনী প্রচারে খুব বেশি কথা বলতে চান না গান্টজ। কারণ নেতানিয়াহুর প্রচার শিবির গান্টজকে ‘দুর্বল বামপন্থী’ হিসেবে চিত্রিত করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। তাই গান্টজও তাঁর প্রচারের স্লোগান হিসেবে বলছেন, ‘সর্বাগ্রে ইসরায়েল।’
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের নির্বাচনে আরব বিশ্বে বিদ্যমান সংকট ও ইসরায়েলের তথাকথিত নিরাপত্তার বিষয়টি এমনভাবে মুখ্য হয়ে উঠেছে যে প্রচারে দুই পক্ষই নিজের আক্রমণাত্মক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে তৎপর। বিষয়টি রীতিমতো কদর্য হয়ে উঠেছে। গাজা উপত্যকা, পশ্চিম তীরসহ ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে কে কতটা নির্মম, তাই হয়ে উঠেছে এই প্রচারের মূল। নেতানিয়াহু অবশ্য দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কিছুটা বিপাকে আছেন। তাঁর বিরুদ্ধে নৌবাহিনীর জন্য সাবমেরিন কেনার সময় ৪৪ লাখ ডলার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। গান্টজ এ বিষয়টিকেই পাখির চোখ করেছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু গান্টজকে দুর্বল হিসেবে চিত্রিত করতেই সব শক্তি নিয়োগ করেছেন। শেষ পর্যন্ত কে শেষ হাসি হাসবেন তা এখনো কেউ জানে না। তবে অনেকেই ‘সৌভাগ্যবান’ হিসেবে পরিচিত বেনি গান্টজের ‘ঠান্ডা মাথা’র দিকেই তাকিয়ে আছেন।

বউডা পোয়াতি, এহন চলুম কেমনে?

আগুন নিভে গেছে তখন। কিন্তু একটি খোলা ভ্যানের ওপর নীরব বসে আছেন আসমা খাতুন। পুড়ে গেছে তার স্বপ্ন। পুড়ে গেছে তার আয়ের উৎস। গুলশানের ডিএনসিসি মার্কেটে ছিল তাদের মাছের দোকান। এই দোকানই আয়ের একমাত্র উৎস। স্বামীর সঙ্গে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন ব্যবসা। আগে করতেন মাছ কাটার কাজ।
বিয়ে হয়েছে ৬ বছর আগে। প্রথম সন্তানের বয়স ৪ বছর। আর আসমা খাতুন ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ছোট একটি জায়গা ভাড়া নিয়ে  চালাতেন মাছের দোকান। কষ্টের জীবন পাড়ি দিয়ে দেখতে শুরু করেছিলেন আলোর মুখ। পরিবারে এসেছিলো সচ্ছলতা। এই আলোকে পিছু ফেলে এখন শুধুই অন্ধকার। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তাদের সংসারের উপার্জন। পুড়ে গেছে সকল মাছ। তার স্বামী সজীব মিয়া। কথা বলার শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছেন। তিনি জানান, ৬০ হাজার টাকার মাছ নিয়ে এসেছেন শুক্রবার। এই টাকার মধ্যে ৪০ হাজার টাকাই ধার করে নেয়া। একটা মাছও বিক্রি হয়নি। তিনি বলেন, বউডা পোয়াতি। এহন চলুম কেমনে?
১৬ লাখ টাকার মাছ এনেছেন রাতে, সকালে ছাই
চট্টগ্রাম থেকে নিয়মিত মাছ আনেন ব্যবসায়ী মো. আবদুুর রাজ্জাক। মাছের মধ্যে রয়েছে কোরাল, শাপলা পাতা, আইড়, চিংড়িসহ নানা ধরনের মাছ। শুক্রবার রাত ২ টার দিকে এই মাছগুলো আনা হয় মার্কেটে। দোকানে থাকা ৮টি ফ্রিজ ভর্তি। এর কয়েক ঘণ্টার মাধ্যেই লাগে আগুন। জ্বলে যায় সব। আবদুুর রাজ্জাক যখন মাছগুলো বের করছিলেন। তার দিকে তাক করে ছিলো বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমকর্মীর ক্যামেরা। তখন তিনি অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, এই নেন ১৬ লাখ টাকার ছাই। এই নেন।
সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে জিসান রহমান। তিনি বলেন, আমরা মূলত চট্টগ্রাম থেকে সামুদ্রিক মাছ কিনে আনি। এরপর খুচরা ও পাইকারি বিক্রি করি। রাতেই মাছগুলো আনা হয়েছে। আমাদের মোট ৮টা ফ্রিজ। ২টা ফ্রিজ ভর্তি ছিলো। নতুন মাছ আসার জন্য অল্প দামে বিক্রি করে দেয়া হয় আগের মাছগুলো। সব ফ্রিজ ভর্তি ছিলো। সকালে ২০ কেজি মাছের অর্ডারও ছিলো।
তিনি বলেন, রাতে বাবা ৩ টার দিকে বাড়িতে আসে। ঘুমায় ৪টার দিকে। সকালে আগুনের ঘটনা শুনে বাবার সঙ্গে ছুটে আসি। আমরা জানতাম না কি আছে আমাদের ভাগ্যে। এখন দেখি প্রায় সব মাছ পুড়ে গেছে। শুধু একটি ফ্রিজের মাছ ভালো আছে। ওই ফ্রিজটা ছাড়া সকল ফ্রিজও পুড়ে ছাই।
জমি বিক্রির টাকা পুড়ে ছাই
মুদি দোকান, চালান দুই ভাই। এনামুল ইসলাম ও আইনুল ইসলাম। বাড়ি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গায়। বড় ভাই এনামুল ইসলাম আগে দোকান করতেন কাওরান বাজারে। আর ছোটভাই আইনুল ইসলাম ভাঙ্গায়। এরপর দুইভাই মিলে ৮ মাস হলো ডিএনসিসি মার্কেটে দোকান নেন। ব্যবসা চলছিলো ভালোই। দেখছিলেন আলোর মুখ। বাড়িতে জমিও কিনেছেন এরই মধ্যে। আর গ্রামের বাড়ি থেকে অনেক দূরে ছিলো একটি পুকুর। দূরে হওয়ায় দেখা শুনার সমস্যা। তাই বিক্রি করে দেন পুকুরটি। দাম পান আড়াই লাখ টাকা। এই টাকা এনে রাখেন দোকানে। উদ্দেশ্য নতুন মালামাল নিয়ে আসা। ক্যাশেই ছিলো সেই টাকা।
গতকাল দুপুরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করেন টাকা রাখার লকার। চাবিতে যখন খোলে না, তখন ভাঙেন ইট দিয়ে। বের করে দেখতে পান সব টাকা পুড়ে ছাই। তবে টাকা না মিললেও অক্ষত ছিলো কিছু পয়সা।
ভাত গুলাও যদি বিক্রি হতো
চালের দোকান। বস্তায় বস্তায় চাল। আবার ছোট প্যাকেটে ছিলো সুগন্ধি চাল। আগুনের তাপে সেগুলো পরিণত হয়েছে ভাত ও পোলাও-এ। দোকানে দোকানে উদ্ধার কার্যক্রম চললেও এসব দোকানের মালিকদের নেই কোনো তাড়া। কারণ তাদের দোকানের সকল পণ্যই সেদ্ধ।
উজ্জ্বল ঠাকুর। তার দোকানে ছিলো প্রায় ৬৩ মণ চাল। পোলাওর চাল ছিলো আরো ১৫ মণের মতো। তিনি দোকানের সামনে চিৎকার করছিলেন। তার দোকানের সামনে দাঁড়ানো যাচ্ছিল না। ভাতের ভিতর যাচ্ছিল পা ডেবে। বলেন, এই ভাতগুলোও যদি বিক্রি করা যেতো, একটু লোকসান কমতো। আমার সব চাল শেষ। ব্যবসা শেষ। এর আগের আগুনের সময়ও সব চাল পুড়ে গেছিলো। কোনোরকম ব্যবসাটা দাঁড়ালো। আবার সব শেষ হয়ে গেলো।
পুড়লো সঙ্গে চুরিও হলো
দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্লাস্টিক সামগ্রীর দোকান চালাতেন। মিথিলা ফারজানা। দোকানে ছিলো প্লাস্টিকের বালতি, মগ, জগ, চেয়ার, টেবিলসহ নানা পণ্য। আরো ছিলো ব্যবহার্য বিভিন্ন কাপড়ের সামগ্রী। যেমন টেবিল ম্যাট, তোয়ালে, দরজা-জানালার পর্দা ইত্যাদি। তার দোকানটি মার্কেটের মূল মার্কেটের থেকে কয়েক হাত দূরে। তাই এই দোকানে আগুনের ছোঁয়া লেগেছে কম। তবে যেসব পণ্য পোড়েনি, সেসবপণ্য নেই দোকানে। শুধু পুড়ে যাওয়া পণ্যগুলোই সেখানে।
মিথিলা ফারজানা বলেন, এক গাঁট্টিতে ছিলো ৮টা চেয়ার। লাল রংয়ের দু’টা চেয়ার অর্ধেক পোড়া। বাকি চেয়ারগুলো কই। বালতি ছিলো ২০টির মতো এখন আছে ৬টি। বাকিগুলো সব চুরি হয়ে গেছে। আমি যখন প্রথম এখানে আসি। তখন দেখি অল্প কিছু জিনিস পুড়েছে। আর একটা অক্ষত বড় টেবিল ফ্যান ছিলো টেবিলের ওপর। এরপর আমার পাশের দোকানে ধোঁয়া উড়তে দেখে বের হয়ে যাই। এখন এসে দেখি ফ্যান নাই।
পাড়াইয়েন না ভাই, এগুলোই আমার সব
ক্রোকারিজের দোকান চালান চার ভাই। একটি দোকান ঘিরেই এই চার ভাইয়ের স্বপ্ন। সংসার। দোকানে খুঁজে খুঁজে বের করছিলেন ভালো পণ্যগুলো। ছাইয়ের সঙ্গে পানির স্পর্শ পাওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে কালো কাদার। সেই কাদার মধ্যেই হাত দিয়ে খুঁজছিলেন ভাইয়েরা। তাদের দোকানের নাম পাটোয়ারী ট্রেডার্স। টেনে টেনে বের করছেন হাঁড়ি-পাতিল, ফ্রাই পেন, চামচ ইত্যাদি।
বড় ভাই সৌরভ পাটোয়ারী বলেন, এই দোকান দিয়েই চলে আমাদের সংসার। প্রায় দশ লাখ টাকার পণ্য ছিলো। কথা বলার সময় একজন গণমাধ্যমকর্মী তার বাছাই করা পণ্যের ওপর পা দিয়ে ফেলেন। তখন তিনি আকুতির স্বরে বলেন, পাড়াইয়েন না ভাই, এগুলোই আমার সব।
বিয়ের ৭ দিনের মাথায়...
বিকাশ চন্দ্র দাস। হাতে মেহেদীর রং এখনো শুকায়নি। করেন মুরগির ব্যবসা। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী। ঘরে বৃদ্ধ মা। বিয়ের কারণে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্ধ ছিলো তার দোকান। শুক্রবার বিয়ের পর প্রথম দোকান খোলেন। তারপরদিনই ব্যবসার সামগ্রী পুড়লো। ছাই হলো ড্রেসিং মেশিন।
কপালে হাত দিয়ে ড্রেসিং মেশিনের সামনে বসে ছিলেন তিনি। আবেগী গলায় বলেন, আমি গরিব মানুষ। এই ড্রেসিং মেশিনটা কিনেছিলাম বছরখানেক আগে। এর ৩০ হাজার টাকা এখনো বাকি। আর বিয়ের সময় করেছি ৩০ হাজার টাকা ধার। আর এই টাকা শোধ দিয়ে দিতাম কিন্তু হায় ড্রেসিং মেশিনটাই পুড়ে গেলো।

বিশ্বের প্রথম কোরআনিক পার্ক উন্মুক্ত

দুবাইয়ে বিশ্বের প্রথম কোরআনিক পার্কের নির্মাণ কাজ সমাপ্তের পর গত শুক্রবার দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত বিভিন্ন এলাকা, জাতিগোষ্ঠী ও ৪৩ টি বৃক্ষ ও নবীদের কেরামতি নিয়ে পার্কটি সাজানো হয়েছে। খবর গালফ নিউজ, খালিজ টাইমস।
৬০ হাজার হেক্টর আয়তনের এ পার্কটিতে কোনো টিকিট ছাড়াই দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারবেন। দুবাই মিউনিসিটিপল বৃহস্পতিবার টুইটারে একটি ভিডিও শেয়ার করেছে, যাতে বলা হয়েছে পার্কটির নির্মাণে দুবাই সরকার আন্তর্জাতিক ডিজাইন ও সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।
কোরআনের অলৌকিক ঘটনাবলির আলোকে বিভিন্ন কর্ণার ও বাগানের মাধ্যমে সাজানো হয়েছে দুবাইয়ের খাওয়ানেজ এলাকায় নির্মিত বিশ্বের প্রথম এ কোরআনিক পার্ক। যা ইসলাম ও পবিত্র কোরআন সম্পর্কে দর্শনার্থীদের আগ্রহী করে তুলবে। কোরআনে উল্লেখিত গাছের সমন্বয়ে ১২ টি উদ্যান রয়েছে পার্কটিতে। পাশাপাশি জান্নাতের নহর বোঝাতে কৃত্রিম হ্রদ বানানো হয়েছে।
আগত দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে কোরআনের প্রাসঙ্গিক আয়াত ও ঘটনা লিখে দেয়া হয়েছ প্রতিটি নির্মাণের পাশে। আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে রয়েছে ডিজিটাল থিয়েটার। যেখানে কোরআনের বিভিন্ন ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ভিডিও দেখানো হবে। অন্যান্য পার্কের মতো বাচ্চাদের খেলা সুবিধাও সহ রাখা হয়েছে পার্কটিতে। ওয়াইফাই এবং ফোন চার্জিং স্টেশনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের বসার জন্য রয়েছে সুন্দর ব্যবস্থা।
কোরআনিক পার্কটি বিভিন্ন সংস্কৃতি, ধর্ম ও জনগণের সঙ্গে বুদ্ধিভিত্তিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সেতু নির্মাণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসলাম ধর্মের সাংস্কৃতিক অর্জন সম্পর্কেও মুসলমানদের আগ্রহী করে তুলবে।

মন ভোলানো গোলাপি হ্রদ -দ্য সান

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের ওয়েস্টগেট পার্কের একটি হ্রদ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। হ্রদটি ভরা গোলাপি রঙের পানিতে। দেখলে মনে হবে কেউ বুঝি রং ঢেলে বদলে দিয়েছে পানির রং। কিন্তু তা নয়, প্রাকৃতিকভাবেই হ্রদের পানি গোলাপি হয়ে গেছে।
হ্রদটি মেলবোর্নের শিল্প এলাকায় অবস্থিত। প্রথমে অনেকে ধারণা করেছিলেন, শিল্পবর্জ্যই হয়তো হ্রদটির পানির রং পরিবর্তনের কারণ। তবে খোঁজখবরের পর বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ওই হ্রদের পানিতে লবণের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হওয়ায় এমনটা হয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে কড়া রোদ, উচ্চ তাপমাত্রা আর দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়া। এমন পরিবেশে পানিতে জন্মে বিশেষ এক ধরনের শৈবাল। ওই শৈবাল পানিতে ছাড়ে বিটা ক্যারোটিন। এটি রঞ্জক পদার্থ। লাল এই রঞ্জক পানিতে যোগ হওয়ার পর পানির রং বদলে গোলাপি হয়ে যায়।
কর্তৃপক্ষ বলেছে, এই শৈবাল প্রাণিকুলের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবু লোকজনকে পানির সংস্পর্শে না যেতে সতর্ক করা হয়েছে।
ভিক্টোরিয়া অঙ্গরাজ্যের উদ্যানবিষয়ক সরকারি সংস্থা পার্কস ভিক্টোরিয়া জানিয়েছে, হ্রদটি ২০১২-১৩ সালের ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে প্রথম গোলাপি রং ধারণ করে। তখন থেকে প্রতি গ্রীষ্মে এ রকম হচ্ছে। শরতে বৃষ্টি বাড়লে হ্রদের পানির রং আবার স্বাভাবিক হয়।
তবে পৃথিবীতে এটিই একমাত্র গোলাপি পানির হ্রদ নয়। অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়াতেই এমন আরও কয়েকটি হ্রদ রয়েছে। এ ছাড়া স্পেন, বলিভিয়া, ইকুয়েডর ও সেনেগালেও গ্রীষ্মে এমন হ্রদ দেখা যায়।

বছরে ধর্ষণের শিকার ৫৭১ শিশু

২০১৮ সালে সারা দেশে ২৮ প্রতিবন্ধী শিশুসহ ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৬ শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে। এদিকে একই বছরে ৮১২ শিশু বিভিন্ন ধরনের যৌন নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে।
‘শিশু অধিকার সংরক্ষণে ২০১৮-এর পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে প্রতিবেদনটির তথ্য তুলে ধরা হয়। এই উপলক্ষে চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ ‘শিশু অধিকার সংরক্ষণে ২০১৮-এর পরিস্থিতি, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
এবারের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৮ সালে ৪৩ শিশু উত্ত্যক্তের এবং ৮৭ শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। বখাটেদের হাতে লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৮টি। এই সংখ্যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং রিপোর্ট থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে এর সংখ্যা আরও বেশি।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক বলেন, ‘এই প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে, এটাই দেশের শিশু অধিকার পরিস্থিতির অবস্থা। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে প্রতিবন্ধকতা আছে, তা অতটা কঠিন নয়। আইন তো আছেই। অংশীজনদের দায়িত্ব পালন করা উচিত। এ থেকে উত্তরণের উপায় যে আইন, বিজ্ঞপ্তি আছে, তা দিয়ে সচেতনতা তৈরি করা এবং অপরাধের ভীতিটা জানাতে হবে।’
ধর্ষণ, আত্মহত্যা বাড়ছে, উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, চাইল্ড পার্লামেন্টের নিজস্ব জরিপে এসেছে, ৮৭ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গণপরিবহনেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৩ শতাংশ। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমনকি পরিবারেও শিশুরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কর্মজীবী ও গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। শিশুদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ২৯৮ শিশু আত্মহত্যা করেছে, ২০১৭ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ২১৩।
প্রতিবেদনে শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে একটি জাতীয় সুরক্ষা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা, পৃথক শিশু অধিদপ্তর ও জাতীয় শিশু অধিকার কমিশন গঠনের সুপারিশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. আবু তালেব। তিনি বলেন, ‘শিশু অধিকার কমিশন ও অধিদপ্তর গঠনের কাজ এগিয়েছে। কিন্তু হয়নি। আমার বিশ্বাস ও আশা ২০১৯ সালের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়িত হবে।’
মা-বাবার হাতে ৫৩ শিশু খুন
শিশু পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালে ৪ হাজার ৫৬৬ শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত বছর ৪১৮ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ২৩ দশমিক ৩০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে ৮১ শিশুকে অজ্ঞাত দুষ্কৃতকারীরা হত্যা করেছে। মা-বাবার দ্বারা খুন হয়েছে ৫৩ শিশু। ৩১ শিশুকে অপহরণের পর হত্যা এবং ৬০ শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।
২০১৮ সালে আগুনে পুড়ে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, বজ্রপাতে, রাজনৈতিক সহিংসতায়, ভুল চিকিৎসায়, কর্তৃপক্ষের অবহেলায়, নৌ দুর্ঘটনায়, খাদ্যে বিষক্রিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনায় অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে ২ হাজার ৩৫৪ শিশু, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। পানিতে ডুবে মারা গেছে ৬০৬ শিশু। আর সড়ক দুর্ঘটনায় ৬২৭ শিশু নিহত হয়েছে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৭৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ বেশি (৩৫৭ শিশু)।
চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ হচ্ছে শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বেসরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার ১০ সদস্যের একটি জোট। ২০১৩ সাল থেকে এই জোটের পক্ষ থেকে প্রতিবছর শিশু অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য কোয়ালিশন সদস্য এবং অন্যান্য সংগঠনের কর্ম এলাকা থেকে জরিপ, দলগত আলোচনা এবং সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে গুণগত ও পরিমাণগত উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।