Showing posts with label প্রবাস. Show all posts
Showing posts with label প্রবাস. Show all posts

Friday, September 26, 2025

নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগের সহিংস আচরণ, সরকারের ব্যর্থতা ও নতুন সংঘাতের লক্ষণ by আসিফ বিন আলী

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সহিংসতা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও পৌঁছে গেছে অনেক আগেই। যে–ই বিরোধী পক্ষে থাকে, সে–ই প্রবাসে চেষ্টা করেছে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে ও ক্ষমতায় থাকা মানুষদের প্রবাসে হেনস্তা করতে। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখলাম যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপসহ সবখানেই আওয়ামী লীগের (দেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সমর্থক দাবি করে এমন কিছু মানুষের সহিংস আচরণ।

সাম্প্রতিকতম ঘটনা হলো আমেরিকার নিউইয়র্কে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা। প্রথম আলোর খবর নিশ্চিত করে যে এই হামলার সঙ্গে প্রবাসী আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীরাই জড়িত ছিলেন। আখতার হোসেনের সঙ্গে ছিলেন সফরসঙ্গী হিসেবে আসা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-সদস্যসচিব তাসনিম জারা।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা এ সময় তাসনিম জারাকে কটূক্তি বা অশ্লীল মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুলও এই অশোভন আচরণ থেকে নিরাপদে ছিলেন না। তাঁরা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনে যোগ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান।

এই ঘটনা মোটেই নতুন নয়। আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে একদল আওয়ামী লীগ সমর্থক হেনস্তা করেন। সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর হামলার চেষ্টা করেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। ওই সময় হাইকমিশনের গাড়িতে মাহফুজ আছেন, এই সন্দেহে গাড়ির ওপর ডিম নিক্ষেপ করা হয়। কয়েকজন গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের হস্তক্ষেপে তাঁদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

প্রথম আলো লন্ডন হাইকমিশনের বরাতে প্রতিবেদন করে, যাতে আমরা জানতে পারি ওই গাড়ির ভেতরে মাহফুজ আলম ছিলেন না। আওয়ামী লীগের ওই নেতা-কর্মীরা যে মাহফুজ আলমকেই টার্গেট করেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ খুব কমই আছে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র সফরেও মাহফুজ আলমকে হেনস্তার চেষ্টা করে আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীরা। নিউইয়র্কে বাংলাদেশ কনস্যুলেট ভবনের কাচের দরজা ভেঙে ফেলেন তাঁরা।

এই ঘটনাগুলো আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের মুখোমুখি করে। প্রথম প্রশ্ন, এই ঘটনার দায় কাদের? উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা সংগঠিতভাবে জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ও বিশেষ করে যাঁরা সরকারে আছেন, তাঁদের টার্গেট করে আগ্রাসী বিক্ষোভ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই সেটি সহিংস হয়েছে।

সরকারপন্থী কারও বিরুদ্ধে প্রবাসে বিক্ষোভ কি নতুন কিছু? যেমন ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে যখনই ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাজ্যে রাষ্ট্রীয় বা ব্যক্তিগত সফর করেছেন, প্রতিবারই তাঁর অবস্থানস্থল, এয়ারপোর্ট ও অনুষ্ঠানস্থলের সামনে বিভিন্ন ধরনের বিক্ষোভ ও প্রতিবাদী কর্মসূচি পালিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের বিএনপি মূলত এর আয়োজন করে।

বাংলাদেশি রাজনীতিতে প্রবাসে নেতাদের টার্গেট করে বিক্ষোভ বা লাঞ্ছনার ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেটি আরও চরম পর্যায়ে চলে গেছে।

২০১৪, ২০১৮, ২০২৪–এর বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে অকেজো করে দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। যার প্রেক্ষিতে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। এর নেতৃত্বও পালিয়ে গিয়ে বিদেশে আশ্রয় নেয়।

এই বিষয়ে সন্দেহ নেই যে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফেরত আসতে মরিয়া। তবে তারা যে প্রক্রিয়ায় অর্থাৎ প্রবাসে নিজেদের একত্রিত করে সরকার ও জুলাই আন্দোলনের জড়িত ব্যক্তিদের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা করে, তা বরং জনগণকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তোলে তাদের প্রতি। যদিও আওয়ামী লীগের বয়ানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’, কিন্তু সেই বয়ান দেশের মানুষের কাছে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও অগ্রহণযোগ্য।

তাই আওয়ামী লীগ যদি মনে করে গায়ের জোরে ও সহিংসতা করে তারা রাজনীতিতে ফিরতে পারবে, তবে ভুল করবে। বিগত কয়েক মাসে তাদের প্রতি যদি কোনো সহানুভূতি তৈরি হয়েও থাকে, তবে এ ধরনের আচরণ মানুষের মধ্যে বিরক্তি ও ঘৃণার উদ্রেক করবে।

আওয়ামী লীগের বোঝা উচিত, জুলাই-আগস্ট মাসে যে হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্ব তারা দিয়েছে, তার স্মৃতি মানুষের মন থেকে সহজে মুছে যাবে না। নিউইয়র্ক বা লন্ডনকে মঞ্চ বানিয়ে ক্ষমতা দেখিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বোঝানো হচ্ছে, তারা এখনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। কিন্তু প্রতীকী এই প্রদর্শন জনগণের কাছে উল্টো নেতিবাচক বার্তা দেয়।

এখন আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, প্রবাসে আওয়ামী লীগের এসব সহিংস আচরণে সরকারের দায় কী? বিশেষ করে নিউইয়র্কে যে বিষয়টি ঘটেছে, তার দায় সরকার ও নিউইয়র্কের বাংলাদেশের কনস্যুলেট অফিস এড়াতে পারেন না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া ভিডিওগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে সেখানে প্রধান উপদেষ্টার সফরসঙ্গী রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তার অভাব ছিল। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এমন ধারণা করা ভুল নয় যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা এমন কাজ করতে পারেন, তবে কেন সরকার ও নিউইয়র্ক কনস্যুলেট ঘটনার মোকাবিলার জন্য যথাসম্ভব পূর্বপরিকল্পনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলো?

অন্যদিকে এই হামলার ঘটনায় যে প্রতিক্রিয়া দেশের অভ্যন্তরে আমরা দেখছি, তা আশঙ্কাজনক। কেউ কেউ হামলাকারীদের ছবি শেয়ার করে তাদের পরিবারের ‘খোঁজ খবর’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

একজন লিখেছেন, নিউইয়র্কে সরকারি প্রোটোকলের দায়িত্বে থাকা কনস্যুলেট অফিসারদের একটি তালিকা চাই—প্রশ্ন উঠেছে, তাঁরা এই তালিকা নিয়ে কী করবেন; আইন কি নিজেদের হাতে নেবেন? তাঁদের রাগ ও ক্ষোভের উৎস আওয়ামী লীগের কর্মীদের অবিবেচক আচরণ।

সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় পারস্পরিক উগ্রতা (রেসিপ্রোক্যাল র‍্যাডিকালাইজেশন), যেখানে এক পক্ষের সহিংসতা অপর পক্ষকে আরও উত্তেজিত করে তোলে। কিন্তু এই উত্তেজনা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? আমরা কি আরও সহিংসতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি?

যুক্তরাষ্ট্র, লন্ডন কিংবা সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশি রাজনীতির নোংরামির ধারাবাহিকতা নয়, বরং এগুলো দেখায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতা এখন আর অভ্যন্তরীণ পরিসরে সীমাবদ্ধ নেই, সেটা ট্রান্স-ন্যাশনালাজাইড হয়েছে।

এই মুহূর্তে বিবদমান পক্ষগুলো এই সহিংসতার মাধ্যমে প্রতীকী ক্ষমতার প্রদর্শন করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ দেখাতে চাচ্ছে যে প্রবাসের মাটিতে তারা রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম রেখেছে। কিন্তু এতে লাভ কি আওয়ামী লীগের?

এতে করে তাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ ও রাগ আর বাড়বে। এ ধরনের আচরণ দেশে থাকা আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতা-কর্মীদের আরও বিপদের মুখে ঠেলে দেবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বও যাঁরা প্রবাসে থেকে এসব কাজের ইন্ধন দিচ্ছেন, তাঁদের বোঝা উচিত, সহিংসতা করে, মানুষকে হেনস্তা করে জনসমর্থন পাওয়া যায় না।

প্রবাসী সম্প্রদায় প্রায়ই নিজ দেশের রাজনীতির সম্প্রসারণ হিসেবে কাজ করে।সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, ডায়াসপোরা রাজনীতি ‘হোমল্যান্ড পলিটিকস’ ও ‘হোস্টল্যান্ড পলিটিকস’-এর মাঝামাঝি এক অস্বস্তিকর অবস্থানে থাকে। এই অস্বস্তিকর অবস্থানে যদি নেতারা সহিংসতার উসকানি দেন, তবে তার রাজনৈতিক ফলাফল ভালো হয় না।

বাস্তবতা হলো প্রবাসী রাজনৈতিক সহিংসতা শুধু বিদেশে অশান্তি তৈরি করবে না, বরং বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করবে। পাশাপাশি সরকার কূটনৈতিক পর্যায়ে নিরাপত্তাসংকট পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিদেশের মাটিতে দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা ব্যর্থতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আরও উসকে দেবে।

* আসিফ বিন আলী, ডক্টরাল ফেলো, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি
- মতামত লেখকের নিজস্ব

নিউইয়র্কের ঘটনায় জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ স্ট্রিট থেকে আটক করা হয় যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানকে
নিউইয়র্কের ঘটনায় জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ স্ট্রিট থেকে আটক করা হয় যুবলীগ কর্মী মিজানুর রহমানকে। ছবি: তোফাজ্জল হোসেন

Saturday, June 14, 2025

ভাইয়ের ‘প্রতারণায়’ নিঃস্ব প্রবাসফেরত তমিজ

দীর্ঘ ৩৪ বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এসেছেন ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা তমিজ উদ্দিন। ১৯৯০ সালে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। তবে প্রবাসে কাটানো জীবনের বড় একটি সময় (২৫ বছর) তিনি কুয়েতের কারাগারে কাটিয়েছেন। সব কিছু উপেক্ষা করে দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরুর আশায় ছিলেন তিনি।

কিন্তু দেশে ফিরে দেখেন স্ত্রী, সন্তান, পৈতৃক ভিটেমাটি, জমিজমা, কোনো কিছুই আর তার নেই। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, তমিজ উদ্দিনের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আপন ছোট ভাই আলাউদ্দিন দখল করে নিয়েছেন পৈতৃক সব সম্পত্তি। আর স্ত্রী-সন্তানরাও অন্যত্র চলে গিয়েছেন। শেষ বয়সে সব হারিয়ে এখন মাথা গোঁজার ঠাঁইও নেই। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সর্বশেষ এক বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানেন না সম্পত্তি আদৌ ফিরে পাবেন কি না? এ জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তমিজ উদ্দিন বলেন, এক ভারতীয় নাগরিক হত্যার ঘটনায় কুয়েত পুলিশ আমাকে জেলে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। পরে তারা আমাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। আমি ভেঙে পড়িনি, আপিল করেছি। পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। খালাসের জন্য কয়েক দফা আবেদন করি, অবশেষে ২৫ বছর সাজা ভোগ করার পর মুক্তি পাই।

তিনি বলেন, ভেবেছিলাম দেশে ফিরে অন্তত একটা ছায়া পাব। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করব। কিন্তু এসে দেখি, নিজের ভিটেতেই আমি অনাহূত। স্ত্রী-সন্তান মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমায়। আমার আপন ভাই সব সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে। আমি সরকারের কাছে প্রতিকার দাবি করছি।

তমিজ উদ্দিনের ভাই জহির উদ্দিন জানান, এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ হলেও আলাউদ্দিন কোনো প্রকার মীমাংসায় রাজি হননি। উল্টো প্রবাসী তমিজ উদ্দিনকে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে। এর আগে তমিজ উদ্দিনকে মাদক মামলায় জড়িয়ে দিয়েছিল। পরে আদালত তাকে মামলা থেকে খালাস দিয়েছেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে মো. আলাউদ্দিন বলেন, আমি কারও সম্পত্তি দখল করিনি। পৈতৃক সম্পত্তি যতটুকু পেয়েছি, ততটুকই ভোগদখল করছি। তার (তমিজ উদ্দিন) সম্পত্তি কোথায় আছে, কার দখলে আছে জানি না।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাশেম বাহাদুর কালবেলাকে বলেন, এমন অনেক প্রবাসী আছেন, যারা বছরের পর বছর কষ্ট করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠালেও দেশে ফিরে ভিটেমাটি খুঁজে পান না। সরকারের কাছে আবেদন, প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ান। নইলে একের পর এক তমিজ উদ্দিনরা নিঃস্ব হয়ে যাবে।

জানতে চাইলে দাগনভুঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স ম আজহারুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

ভুক্তভোগী প্রবাসফেরত তমিজ উদ্দিন। ছবি : কালবেলা
ভুক্তভোগী প্রবাসফেরত তমিজ উদ্দিন। ছবি : কালবেলা

Wednesday, May 14, 2025

কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নবদিগন্তের অন্বেষণ by রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

দোহায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রখর তাপমাত্রায় মোহাম্মদ রহিম বাংলাদেশ দূতাবাসের বাইরে অন্তহীন লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর কপাল থেকে শ্রান্তির স্বেদবিন্দু ঝরছে। তৃষ্ণায় কণ্ঠনালি শুকিয়ে কাঠ। তবু তাঁকে প্রতীক্ষার কঠিন বাস্তবতা থেকে একচুলও নড়ানো যায়নি। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) লাগবে। এটি শেষ সুযোগ। শত শত প্রবাসী শ্রমিক সূর্যের প্রখর তেজ উপেক্ষা করে ধীরলয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে দিচ্ছেন না।

ঘর ছেড়ে আসা এই খেটে খাওয়া মানুষেরা মাতৃভূমির রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তনের স্বপ্নে স্বৈরাচারী শাসনের প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে অকুণ্ঠচিত্তে কারাবাসের ঝুঁকিও নিয়েছিলেন। তাঁদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারই পতিত স্বৈরাচারের খাদের কিনারে রেখে যাওয়া অর্থনীতি ফেরানোর চালিকা শক্তি। রহিম ও তাঁর মতো কোটি বাংলাদেশি উৎসুক নয়নে তাকিয়ে আছেন, এই পরিবর্তনের ঢেউ তাঁদের প্রবাসজীবনের কঠিন বাস্তবতায় কোনো ইতিবাচক প্রভাব ফেলে কি না।

বিংশ শতাব্দীর ডিজাইন দিয়ে একবিংশ শতাব্দীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রয়োজন কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। কীভাবে এই রাষ্ট্র তার অগণিত প্রবাসী নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত, বাণিজ্য বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব জোরালোভাবে বিস্তার করবে? চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি ও ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি ভূরাজনৈতিক খেলার মঞ্চে কীভাবে শান্তি, সমৃদ্ধির বঙ্গোপসাগর অঞ্চল গড়ে তুলবে? এমনই অনেক প্রশ্ন নিয়ে তর্ক–বিতর্ক জরুরি।

উপাত্তভিত্তিক পুনর্বিন্যাস

বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলগত পুনর্বিন্যাসে জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তা নীতিবিষয়ক স্থায়ী রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল ও পারস্পরিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি আবশ্যক। একইভাবে কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণও জরুরি। কূটনৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব নির্ধারণে অন্যান্য বিবেচনার সঙ্গে সুস্পষ্ট ও ন্যায়সংগত মূল্যায়ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, পাঁচটি প্রধান সূচকের ওপর ভিত্তি করে এই মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে। প্রথমত, রাজনৈতিক সম্পর্ক—মোট গুরুত্বের ৩০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত তাৎপর্যের গভীরতা বিবেচিত হবে।

দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য (২৫ শতাংশ)—বর্তমান অর্থনৈতিক লেনদেন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। তৃতীয়ত, প্রবাসীর আকার (২০ শতাংশ)—বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের সংখ্যা ও গুরুত্ব। চতুর্থত, নিরাপত্তা–সংশ্লিষ্টতা (১৫ শতাংশ)—সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা। এবং পঞ্চমত, বহুপক্ষীয় সম্পৃক্ততা (১০ শতাংশ)—আন্তর্জাতিক সংস্থা ও ফোরামে সক্রিয়তার গুরুত্ব।

এই পাঁচ সূচকের ওপর ভিত্তি করে বর্তমানের ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক মিশন শূন্য থেকে ১–এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট মান লাভ করবে। যেসব অবস্থানের মান শূন্য দশমিক ৭ বা তার বেশি হবে, ওই স্থান পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস স্থাপনের জন্য বিবেচিত হবে। শূন্য দশমিক ৪ থেকে শূন্য দশমিক ৭ মানযুক্ত স্থানে কনস্যুলেট স্থাপন যুক্তিযুক্ত এবং শূন্য দশমিক ৪-এর চেয়ে কম মানযুক্ত স্থানে নিকটবর্তী দূতাবাস থেকে অনাবাসী রাষ্ট্রদূত কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

এ ধরনের নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক মিশন স্থাপন, সম্প্রসারণ ও পুনর্গঠনে বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

কৌশলগত পুনর্গঠন

বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্য নিয়ে তীব্র উত্তেজনায় লিপ্ত থাকলেও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অধীন বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রেখেছে। বৈশ্বিক শক্তিদ্বয়ের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে চলমান টানাপোড়েন এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংকট ও জাতিগত সংঘাতের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশকে তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে কার্যকরভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করতে হবে।

প্রায় ৮০ লাখ প্রবাসী শ্রমিকের উন্নত পরিষেবা প্রদানের জন্য রিয়াদ, দুবাই, মাসকাট ও দোহার কূটনৈতিক কার্যক্রমকে জরুরি ভিত্তিতে সম্প্রসারণ অপরিহার্য। একই সঙ্গে ওই উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত কূটনৈতিক পোস্টগুলোকে একত্র করে কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। দুর্নীতিগ্রস্ত অভিবাসনপ্রক্রিয়া, ভিসার নামে হয়রানি, ভুল চাকরি ও বেতনের প্রতিশ্রুতির মাধ্যমেই প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগের সূত্রপাত। এই সমস্যার সমাধান ঢাকায় শুরু হওয়া উচিত। অ্যাপভিত্তিক কনস্যুলার সেবা সময়ের দাবি।

ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক দৃশ্যপটও বিবেচনায় আনতে হবে। বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ১২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে বসবাস করেন। মনে রাখা জরুরি, ভবিষ্যতের শ্রমবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা বিদ্যমান বিধায় ১৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঊর্ধ্বে বাণিজ্যে সক্ষমতায় পৌঁছাতে হবে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য সুচিন্তিত নীতির প্রয়োজন। যেমন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দপ্তর ব্রাসেলসের এবং গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র তথা বার্লিন মিশন সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। অন্যান্য মিশন একত্র করা যেতে পারে। ডি-৮–ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ককে কার্যকর করতে তুরস্কের দূতাবাসকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। সব প্রতিবেশীই সর্বাধিক গুরুত্ব দাবি করে। দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীর পাশাপাশি আসিয়ানও প্রতিবেশী। ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ উন্মোচনে আসিয়ান সদস্যপদ প্রাপ্তি অতীব জরুরি।

বাংলাদেশ ১৭ কোটি ভোক্তার বাজার। আসিয়ান তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ব্লক। বিপুল পরিমাণে অভিবাসী মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে কর্মরত। আসিয়ান ও পূর্ব এশিয়ায় বয়সী মানুষ দ্রুতগতিতে বাড়ছে, অন্যদিকে বাংলাদেশের সাড়ে ৪ কোটির বেশি ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী। সদস্যপদ উভয়ের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করবে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মিশনগুলোর জন্য আলাদা কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন।

আফ্রিকায় গুরুত্ব বিবেচনা করে পুনর্গঠন করা যেতে পারে। আফ্রিকান ইউনিয়ন হাব, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য প্রবেশদ্বার এবং ফ্রাঙ্কোফোন আফ্রিকার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের দিকেই মনোযোগ দেওয়া যায়।

সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামো

প্রয়োজন সমন্বিত কাঠামো, ‘সমগ্র সরকার’ভিত্তিক কৌশল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাফল্য অন্য মন্ত্রণালয়েরও ওপর নির্ভরশীল। ‘এক দেশ, এক কৌশল’ নীতির ভিত্তিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একা নয়; বরং অর্থ, বাণিজ্য, প্রবাসীকল্যাণ, প্রতিরক্ষা, শিল্প, পরিকল্পনা, কৃষি, স্বাস্থ্যসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নিয়ে সমন্বিত কূটনৈতিক কাঠামো জরুরি। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘জাতীয় কূটনৈতিক সমন্বয় পরিষদ’-এর মাসিক সভায় অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ এবং আন্তমন্ত্রণালয় দ্বন্দ্বের সমাধান করা হবে।

সমন্বিত কৌশল বাস্তবায়ন–সংক্রান্ত বিধানাবলি প্রণয়ন ছাড়াও নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রাতিষ্ঠানিক সহমর্মিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে ঢাকা ও মিশনভিত্তিক সীমিত কূটনৈতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বর্তমান উইংগুলোর ব্যাপক পুনর্গঠন এবং শক্তিশালী ‘কর্মদক্ষতা ব্যবস্থাপনা কাঠামো’ প্রবর্তন জরুরি। প্রতি ছয় মাস অন্তর প্রধান সূচকগুলোর ভিত্তিতে স্কোরিং অনুযায়ী সব কার্যক্রমের মূল্যায়ন হতে পারে। মূল্যায়নের আলোকে ‘ট্যালেন্ট অপটিমাইজেশন’–পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। কৌশলগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে নতুন উইং, যেমন ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যানালাইসিস ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

কাঙ্ক্ষিত সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য ব্যাপক কূটনৈতিক গতি বৃদ্ধির প্রয়োজন। একই কারণে মিশনগুলোর বাজেট বরাদ্দকাঠামোয় পরিবর্তন আনা জরুরি। কৌশলগত মিশনে জনবল ও ব্যয় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। দূতাবাস রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। মিশন পর্যায়ে রাষ্ট্রদূতের নেতৃত্বে ‘সমন্বিত কান্ট্রি টিম’ গঠনের পাশাপাশি আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জন্য ‘ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড’ চালু করা যেতে পারে। কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর, সমন্বিত ও ভবিষ্যৎমুখী করতে গুণগত সংস্কার আবশ্যক।

* রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি
প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্সই দেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। প্রতীকী ছবি: এআই/প্রথম আলো

Sunday, January 19, 2025

মিয়ানমারে আটক ১৮ বাংলাদেশির ফেরার আকুতি by মিজানুর রহমান

দেশি কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের লোভের বলি হয়ে কয়েকশ’ প্রবাসীর জীবন এখন দুর্বিষহ। বিভিন্ন দেশের বিদ্রোহীদের কাছে তাদের বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এরমধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার লাওস, কম্বোডিয়া, চীনসহ বিভিন্ন সীমান্তের গহিন অরণ্যে। থাইল্যান্ড সীমান্তের অদূরে মিয়ানমারের একাধিক স্ক্যাম সেন্টারে কয়েক মাস ধরে জিম্মি অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন ১৮ জন প্রবাসী বাংলাদেশি। নিকটজনের মাধ্যমে থাইল্যান্ডে মোটা অঙ্কের বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের নিয়ে সেখানে জিম্মি করা হয়েছে। অন্ধকার যুগে মানুষকে যেভাবে ক্রয়-বিক্রয় করা হতো এখনো যুদ্ধ বা সংঘাতকবলিত এলাকায় তা-ই চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পেশাদাররা।

সেগুনবাগিচার এক কর্মকর্তা মানবজমিনকে গতকাল বলেন- রিপোর্ট ভয়াবহ। বাংলাদেশি দালালদের মাধ্যমে প্রলুব্ধ হয়ে উন্নত জীবনের আশায় তারা আজ কঠিন পথে পড়েছেন। তাদের হয়তো উদ্ধার করা যাবে কিন্তু জীবন-ঝুঁকিতে পড়া এই পথসহ দুনিয়ার দেশে দেশে অবৈধ মানব পাচারের রুটগুলো বন্ধ করতে এখনই আন্তঃসরকার উদ্যোগ জোরদার  করা জরুরি। ঢাকায় প্রাপ্ত রিপোর্ট মতে, হাত বদলের পর স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে জিম্মিদের ওপর চলে বর্বর নির্যাতন। বাংলাদেশিদের অবস্থাও তাই। প্রাণে বাঁচতে তারা বিভিন্ন মারফতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে উদ্ধারের আকুতি জানাচ্ছেন। কিন্তু দুর্গম এবং বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় স্ক্যাম সেন্টারের রিয়েল টাইম পিকচার পাচ্ছে  না সরকার। তাদের উদ্ধারেরও কূলকিনারা নেই। এ বিষয়ে মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. মনোয়ার হোসেন সম্প্রতি ঢাকায় মানবজমিনকে বলেন, আমরা আমাদের মতো করে চেষ্টা চালাচ্ছি। মিয়ানমার সরকারকে বিষয়টি দফায় দফায় অবহিত করেছি। থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী ওই এলাকাটা কারেন বিদ্রোহীদের দখলে। স্ক্যাম সেন্টারগুলোর নিয়ন্ত্রণও তাদেরই হাতে। তাই এটা একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে গেছে।

থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার তাদের উদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে জানান রাষ্ট্রদূত। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব পূর্ব এশিয়া ড. নজরুল ইসলামও প্রায় অভিন্ন অভিমত দেন। অবশ্য অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, এই ঘটনায় সবার আগে থাইল্যান্ডের সঙ্গে বোঝাপড়া জরুরি। কারণ তাদের অপরাধী চক্র বিদেশিদের চাকরির অফার করে প্রথমে থাইল্যান্ডে নেয়। সেখান থেকে মিয়ানমারের গহীন অরণ্যে পাচার করে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে। এটাকে ‘মানুষ  বিক্রি’ আখ্যা দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, এটা নিশ্চিতভাবে থাইল্যন্ডের বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের নলেজের বাইরে নয়। হয় তারা বিষয়টি ওভার লুক করে বখরার বিনিময়ে, অন্যথায় তারাই এই চক্রের পৃষ্ঠপোষক। সেগুনবাগিচার দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে,   থাইল্যান্ড সীমান্তের গহীন অরণ্যে মিয়ানমার অংশে থাকা স্ক্যাম সেন্টারে জিম্মি বাংলাদেশিদের উদ্ধারকল্পে দফায় দফায় বৈঠক ও চিঠি চালাচালি হচ্ছে। কিন্তু দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি এখনো নেই। সূত্রমতে, ওই স্ক্যাম সেন্টারগুলোর নিয়ন্ত্রক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক একটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্র। ওই অঞ্চলে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সক্রিয় অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তারা এটি গড়ে তুলেছে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া ও চীনের সীমান্তবর্তী এলাকায় অনেকগুলো স্ক্যাম সেন্টারের অস্তিত্ব রয়েছে বলে রিপোর্ট পেয়েছে ঢাকা। রিপোর্ট মতে, অপরাধী চক্রটি বিভিন্ন দেশে মোটামুটি কম্পিউটার জানা লোকদের টার্গেট করে। তাদের বড় মাইনের চাকরি অফার করে নিটকজনকে দিয়ে। বিশ্বাস জন্মানোর জন্য তারা এমনটি করে। এরমধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতি তাদের আকর্ষণ বা টার্গেট সবচেয়ে বেশি। যারা তাদের ফাঁদে পা দেয় তাদের প্রথমে ব্যাংকক নেয়া হয়। চূড়ান্ত গন্তব্য মিয়ানমার-থাইল্যান্ড সীমান্তের মিয়ানমার অংশে অবস্থিত স্ক্যাম সেন্টারগুলো।

সেখানে তাদের প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট হয় স্ক্যামিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সিতে অনলাইনে অর্থ বিনিয়োগের জন্য পরিচিতদের প্রলুব্ধ করা। অনলাইনভিত্তিক ওই অপকর্মে অনেকে মজাও পেয়ে যায়। কিছুদিন তাদের ভালো বেতন দেয়া হয়। বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংকের এন্ট্রিলেভেলে চাকরির সঙ্গে যেভাবে বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয়া হয় সেভাবে তাদেরও একটি লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়। সেটি অর্জনে ব্যর্থ হলেই নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে যা অবর্ণনীয়। তাদের জিম্মি করে স্বজনদের কাছ থেকেও অর্থ নেয়ার রেকর্ড রয়েছে। সূত্র বলছে, বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। কিন্তু কোনো অ্যাকশনে যেতে অপরাগতা প্রকাশ করেছে। চলমান গৃহযুদ্ধের কারণে সংশ্লিষ্ট ওই এলাকা বিদ্রোহীদের দখলে। তাই মিয়ানমার কারও বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারছে না। ঢাকা রিপোর্ট পেয়েছে, জিম্মি বাংলাদেশিরা যে স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে আটকে আছেন তা থাইল্যান্ড সীমান্তের শো কেকো শহরে অবস্থিত। শহরটি কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন নামের একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর দখলে। যাদের নিজস্ব কারেন ‘স্টেট বর্ডার গার্ড ফোর্স’ নামে একটি বাহিনী রয়েছে। ওই শহরে তাদের সদর দপ্তর। আন্তঃসীমান্ত অপরাধীদের কাছে বখরা আদায় তাদের আয়ের অন্যতম উৎস। আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞদের বিবেচনায় এই অঞ্চল বহুমুখী অপরাধের ‘হাব’ হিসেবে কুখ্যাত।

পালিয়ে প্রাণে বাঁচা এক বাংলাদেশির বর্ণনা: সরকারি সূত্র বলছে, ওই স্ক্যাম সেন্টার থেকে বেশ ক’জন পালিয়ে কোনোমতে প্রাণে বাঁচতে পেরেছেন। তাদেরই একজন বেলাবো, নরসিংদীর মো. জুনায়েদ হোসেন। তার ভাষ্য মতে, ‘তিনিসহ পাঁচজন ফেনী জেলার ইফতেখারুল আলম রনি, (পাসর্পোট নং-অ ০৪৭৬১৭১৬, ঠিকানা: ফাজিলপুর, ওয়ার্ড নং-০৭, ফেনী সদর, ফাজিলপুর-৩৯০১, ফেনী) এর প্ররোচনায় বিগত ১২ই আগস্ট ২০২৪ তারিখে দুবাই থেকে থাইল্যান্ড যান। এরপর তাদের একজনকে থাইল্যান্ডের মাইসর্ট শহরে মাসিক ১২০০ ডলার বেতনে কম্পিউটার অপারেটর পদের চাকরির অফার দেয়া হয়। পরবর্তীতে তাদের থাই-মিয়ানমার সীমান্তের দুই নদী পার করে মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থিত স্ক্যাম সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কম্পিউটার সংক্রান্ত প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাদের মাসে ১৫০০০ ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর নির্মম শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। ইলেকট্রিক শক ও হ্যান্ডকাফ পরিয়ে গরম পানি ঢেলে নির্যাতন করা হতো। দেশে ফিরে আসার কথা বললে উপর্যুপরি নির্যাতন চালানো হতো। ভুক্তভোগী সুযোগ বুঝে মুই নদী পার হয়ে থাইল্যান্ড সীমান্তে ফিরে আসেন। এরপর থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং এনজিও’র সহায়তায় দেশে ফিরেন। তার বর্ণনায় বোঝা যায়, স্ক্যাম সেন্টারটি মিয়ানমারের ‘ডেমোক্রেটিক কারেন বোদ্ধিস্ট আর্মি’ নামের প্রতিষ্ঠিত একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্ক্যাম সেন্টারে তাদের সশস্ত্র প্রহরা রয়েছে এবং স্ক্যাম সেন্টারের অবস্থান কিছুদিন পরপরই পরিবর্তন করা হয়। স্ক্যাম সেন্টারের টেকনিক্যাল বিষয়গুলো চাইনিজ নাগরিকরা নিয়ন্ত্রণ করে।

ইয়াঙ্গুন মিশনের রিপোর্ট কি বলছে: ঢাকায় পাঠানো মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুন মিশনের রিপোর্টে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। সেইসঙ্গে মিশনের পদক্ষেপের খানিকটাও উল্লেখ ছিল। সেই রিপোর্ট মতে, আগস্ট-২০২৪ তারিখে ১৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকের একটি তালিকা পায় বাংলাদেশ মিশন। যারা স্ক্যাম সেন্টারে আটক রয়েছেন। ১৫ জনের মধ্যে ৪ জনের দুবাইয়ে অবস্থানের ভিসা ছিল। বাকিরা বাংলাদেশ থেকে ভ্রমণ ভিসায় দুবাই যান। সেখান থেকে ভ্রমণ ভিসা জোগাড় করে থাইল্যান্ড পৌঁছান। ডেমোক্রেটিক কারেন বোদ্ধিস্ট আর্মি এবং থাইল্যান্ডের বর্ডার গার্ড সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ করায় ভিসা ছাড়া লোকজন মিয়ানমারে প্রবেশ করতে পারে। ফলে মিয়ানমার ইমিগ্রেশনের কাছে বাংলাদেশি কতোজন প্রবেশ করলো সে তথ্য থাকে না। উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেনভিত্তিক ফরেন ফান্ডেড এনজিও’র মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে ঢাকাকে জানিয়েছে বাংলাদেশের ইয়াঙ্গুন মিশন।

mzamin

Wednesday, December 11, 2024

বিদেশে পাসপোর্টের জন্য হাহাকার by মিজানুর রহমান

দুনিয়ার দেশে দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাসপোর্টের জন্য হাহাকার চলছে। বিশেষ করে শ্রমিক অধ্যুষিত দেশগুলোতে এই সংকট প্রকট। ইতালি, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাসপোর্টের মেয়াদ না থাকায় ভিসা নবায়ন বন্ধ, দেশে জরুরি কাজে ভ্রমণে আসতে না পারাসহ নানামুখী জটিলতায় দিনাতিপাত করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ।

মালয়েশিয়ায় এমআরপি পাসপোর্ট সেবা বন্ধ করায় রেমিট্যান্স শাটডাউনের ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছেন প্রবাসীরা। তারা তাদের ভোগান্তির বার্তা পাঠাচ্ছেন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। স্বৈরশাসনের নিষ্ঠুর হয়রানি আর স্ব স্ব দেশের কঠোর বিধি নিষেধের ঝুঁকি সত্ত্বেও জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে নিঃশর্তভাবে সাপোর্ট দেয়া প্রবাসীদের বিষয়ে আগাগোড়ায় সংবেদনশীল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু কারিগরি কারণে তাদের পাসপোর্ট সমস্যার চটজলদি সমাধান অসম্ভব। একদিকে প্রবাসীদের কান্না অন্যদিকে তাদের প্রতি দায় থেকে নড়েচড়ে বসেছে সরকার। দ্রুততম সময়ের মধ্যে সংকটটির একটি অন্তর্বর্তী সমাধান বের করতে গতকাল জরুরি বৈঠক  বসেছিলেন পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ৩ উপদেষ্টা। সঙ্গে ছিলেন- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ, বহির্গমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কনস্যুলার সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের ৯ কর্মকর্তা। সেগুনবাগিচায় অনুষ্ঠিত ওয়ে-আউট খোঁজার ওই জরুরি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফট্যানেন্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা প্রফেসর ড. আসিফ নজরুলের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পাসপোর্ট অধিদপ্তর জরুরি ভিত্তিতে সাড়ে ৩ লাখ পাসপোর্ট বুক সংগ্রহের কথা জানিয়েছে। সেইসঙ্গে বলা হয়েছে, প্যান্ডিং ১ লাখ ৯০ হাজার পাসপোর্টের একটি বড় অংশ ১৫ই ডিসেম্বরের মধ্য বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোতে  পৌঁছানো সম্ভব হবে। বাকিটা আগামী ৩ সপ্তাহের মধ্যে পৌঁছানো হবে বলে জানানো হয়।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরা ৩ উপদেষ্টাকে এই বলে আশ্বস্ত করেছেন, ই-পাসপোর্টের পাশাপাশি  মেশিন-রিডেবল পাসপোর্ট সেবা চালু রাখতে এমআরপি বই এবং লেমিনেশন ফয়েল আমদানিতে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। বৃটেনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচআইডি সিআইডি লিমিটেড থেকে এমআরপি বই এবং লেমিনেশন ফয়েল আমদানি করা হচ্ছে। আগেও এই প্রতিষ্ঠান থেকে একই জিনিস আমদানি করেছিল সরকার। এ দফায় সর্বমোট ১৫ লাখ মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) বই এবং ১৫ লাখ লেমিনেশন ফয়েল আমদানি করা যাচ্ছে। বৈঠকে জানানো হয়, বিদেশে বাংলাদেশের ৮০টি মিশন রয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি মিশনে ই-পাসপোর্ট চালু আছে। বাকি ৩৫টি মিশনে ই-পাসপোর্ট চালু করা হবে পর্যায়ক্রমে। ই-পাসপোর্ট চালু না হওয়া পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন চাহিদা পূরণে ২০২৫ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত এমআরপি চালু থাকবে। নতুন বুক সরবরাহ না হওয়া পর্যন্ত  সংকট থাকবে বলে আশঙ্কা করা হয়। স্মরণ করা যায়, ১৫ লাখ এমআরপি বই এবং ২০ লাখ লেমিনেশন ফয়েল আমদানির জন্য বিগত সরকারের আমলে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র ডাকা হয়। কিন্তু তখন সরকার যে গুণের ও মানের এমআরপি বই ও ফয়েল চেয়েছিল, নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের দেয়া স্পেসিফিকেশন তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকায় সেই দরপত্র কার্যক্রম বাতিল করা হয়। সংকটটা এ কারণে ঘনীভূত হয়েছে বলে জানা গেছে।

আবেদনের ৬ মাসেও পাসপোর্ট পাচ্ছেন না মালয়েশিয়ান প্রবাসীরা: ঢাকা রিপোর্ট পেয়েছে, আবেদনের ৬ মাসেও পাসপোর্ট না পেয়ে ক্ষোভ বাড়ছে মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের মধ্যে।  দেশটির বাংলাদেশ মিশনে দীর্ঘদিন ধরে এমআরপি পাসপোর্ট সেবা বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা। পাসপোর্ট না থাকায় অবৈধ হয়ে পড়েছেন অনেকে। করতে পারছেন না ওয়ার্ক ভিসা নবায়ন। পাসপোর্টের জন্য কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রতিদিন ভিড় করছেন শত শত প্রবাসী।

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় এমআরপি পাসপোর্ট নবায়নের জন্য ২০ হাজারের বেশি প্রবাসী আবেদন করে রেখেছেন। অবশ্য  ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর জানিয়েছে, এমআরপি আবেদন প্রিন্টিংয়ে অপেক্ষমাণ থাকা আবেদনকারীরা ফি জমা দিয়ে আবেদন করলে দ্রুত ই-পাসপোর্ট দেয়া হবে। অন্যদিকে কুয়ালালামপুরের বাংলাদেশ হাইকমিশন ক’দিন আগে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, এমআরপির বুকলেট, লেমিনেশন ফয়েল পেপার ঘাটতি ও এমআরপির প্রিন্টিং মেশিনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বাংলাদেশ থেকে পাসপোর্ট প্রিন্ট হতে দেরি হচ্ছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন হাজারো প্রবাসী। পাসপোর্ট না থাকায় কেউ কেউ এরই মধ্যে অবৈধ হয়ে পড়েছেন, অনেকে রয়েছেন অবৈধ হওয়ার ঝুঁকিতে। এমন অবস্থায় নতুন করে ই-পাসপোর্ট নিতে প্রতিদিনই আবেদন করছেন অনেকে। হাইকমিশন নিজে থেকে অন্তর্বর্তীকালীন একটি সমাধানও বের করেছে। বলা হয়েছে, এমআরপির জন্য যারা আগে আবেদন করেছেন তাদের সেই ব্যাংক স্ল্লিপ কপির সঙ্গে অতিরিক্ত ৫১ রিঙ্গিত জমা দিলে এমআরপির জন্য অপেক্ষায় না রেখে ই-পাসপোর্ট দিয়ে দেয়া হবে।

mzamin

Thursday, November 28, 2024

মালয়েশিয়ায় নার্স সংকট: যেভাবে খুলতে পারে রেমিটেন্সের নতুন দুয়ার by আরিফুল ইসলাম

মালয়েশিয়ায় দেখা দিয়েছে নার্স সংকট। এ সংকট আরও প্রকট হতে পারে যদি দেশটির নার্সদের প্রতি সপ্তাহে অতিরিক্ত আরো তিন ঘণ্টা কাজ করতে হয়।

দেশটির ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ নার্সেস (আইসিএন) বলছে, সিভিল সার্ভিস রিমুনারেশন সিস্টেমের অধীনে একটি নতুন নির্দেশনার এসেছে, যেখানে ওয়ার্ড নার্সদের সপ্তাহে ৪২ ঘণ্টার পরিবর্তে ৪৫ ঘণ্টা কাজ করতে বলা হয়েছে। দেশটিতে এই নিয়ম ১ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে।

এই পদক্ষেপটিকে একটি স্বল্পমেয়াদি দ্রুত সমাধান হলেও আইসিএন-এর সিইও হাওয়ার্ড ক্যাটন বলছেন যে, পদক্ষেপটি নার্সদের শারীরিক এবং মানসিকভাবে আরও চাপ বাড়িয়ে দেবে, যা আরও বেশি নার্স হারানোর কারণ হতে পারে।

এদিকে দেশটির ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে জানিয়েছে, মালয়েশিয়া গুরুতর নার্স সংকটের মুখোমুখি, যা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আরও প্রকট করে তুলছে। এর কারণ হিসেবে জনপ্রিয় এ গণমাধ্যমটি জানিয়েছে, বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যার বৃদ্ধি এবং ব্রেন ড্রেন সমস্যা।

ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে আরো জানিয়েছে, গত মে মাসে, দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রী জুলকেফলি আহমাদ বলেছিলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে নার্সিং কর্মী ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৬০% ছাড়িয়ে যাবে।

কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় নার্স সংকটের এ সুযোগ বাংলাদেশ নিতে পারে কি না? এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিলো মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার, মো. শামীম আহসান-এর কাছে, তিনি এ সম্পর্কে দৈনিক মানবজমিনের মালয়েশিয়া করেসপন্ডেন্ট আরিফুল ইসলামকে বলেন;

"নীতিগতভাবে, আমরা মালয়েশিয়ায় দক্ষ কর্মী ও প্রফেশনালদের নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেই। মানব সম্পদের ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের শুধু শ্রমিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি পরিবর্তনের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্যে নার্সিং একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও, কেয়ার-গিভারের চাহিদা সম্পর্কে আমরা শুনেছি। অন্যান্য খাতগুলোর পাশাপাশি আমরা এই খাতগুলো নিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অনুসন্ধান চালাচ্ছি। তবে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই খাতগুলোতে পেশাদারিত্ব সম্পর্কে আমাদের আরো আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, কারণ আমাদের দেশের অধিকাংশ নার্সদের রয়েছে পেশাদারিত্বের অভাব, ইংরেজিতে দুর্বলতা, সাথে লোকাল ভাষার সাথে সম্পূর্ণ অপরিচিতি। যার ফলে, কিছু নিয়োগদাতা অন্য দেশ থেকে কর্মী সংগ্রহ করেছে।"

এদিকে মালয়েশিয়াতে ঘুরতে আসা অনেক ইউরোপীয় বিদেশিরা বলেছেন যে, তাদের দেশে নার্সরা তাদের রোগীদের ভাই, বোন ও মায়ের মতো যত্ন করেন এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন। তবে আমাদের নার্সদের এখনও এই ধরনের নোংরা কাজ, মানবিকতা নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি, পেশাদার মানসিকতা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশি একাডেমিসিয়ান, মেডিকেল মাইক্রোবায়োলোজিস্ট, মেডিকেল সায়েন্টিস্ট এবং যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশপিডিয়া কর্তৃক প্রকাশিত ‘সাকসেসফুল পিপল্ ইন মালয়েশিয়া’ নামক বইয়ে স্থান পাওয়া বাংলাদেশি, বর্তমানে মালয়েশিয়ার পারদানা ইউনিভার্সিটি গ্রাজুয়েট স্কুল অফ মেডিসিন-এর মেডিকেল সায়েন্টিস্ট ড. নাজমুল হাসান মাজিজ এ সম্পর্কে দৈনিক মানবজমিনকে জানিয়েছেন-

“মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি নতুন পলিসি করে, সার্কুলার দিয়ে বিদেশ থেকে নার্স নেওয়ার ঘোষণা দেয় তখন সরকারিভাবে বাংলাদেশ থেকে নার্স নিয়ে আসা সম্ভব। যদিও প্রাইভেট সেক্টরে এখনো নার্স নিয়ে আসা সম্ভব তবে মালয়েশিয়া ইমিগ্রেশনের ভিসা জটিলতা এবং আমাদের দেশের নার্সদের ভাষা জটিলতার কারণে তা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।”

স্বাস্থ্যসেবায় নিরাপত্তার বিষয়টিকে খুব সতর্কতার সাথে গুরুত্ব দিতে হয়। এখানে ভুলের পরিণতি খুব ভয়াবহ। নার্সরা ক্লান্ত হলে সেবার মান ও কার্যকারিতা কমে যায়। যদি একজন নার্স ভুল করে, তবে তার পরিণতি ভুল নম্বরে ডায়াল করার মতো না যে, কেটে দিয়ে সঠিক নাম্বারে ডায়াল করলাম। এটা জীবন সম্পর্কিত বিষয়, যদি তা পেশাদারিত্বের সাথে নিতে পারা যায়, তবেই না মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি নার্স নিয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ ডা. শংকর চন্দ্র পোদ্দারের সাথে। যিনি দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জানিয়েছেন, “মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশি নার্স নিয়ে আসার ব্যাপারে আমি প্রথম কাজ শুরু করি কিন্তু আমাদের দেশের নার্সদের রয়েছে পেশাদারিত্বের অভাব, ইংরেজিতে দুর্বলতা এবং লোকাল (মালয়) ভাষা না শেখার প্রবণতা।

ভাষাগত জ্ঞান না থাকার ফলে ইমার্জেন্সি রোগীর চিকিৎসায় গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। রোগীর অবস্থা সঠিকভাবে চিকিৎসককে জানানো কঠিন হয়ে যায়, যা সঠিক চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটায়। ভুল বোঝাবুঝি বা অপর্যাপ্ত তথ্য প্রদান রোগীর স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও ব্যাঘাত ঘটে, যা কখনো কখনো রোগীর জীবনকে সংকটাপন্ন করে তোলে। এই সমস্যাগুলো এড়াতে ভাষার প্রাথমিক ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ থেকে নার্স নিয়ে আসার সঙ্কটের সমাধান নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, বাংলা প্রেসক্লাব মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট, দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভির মালয়েশিয়া প্রতিনিধি, আহমাদুল কবিরকে, তিনি জানিয়েছেন

আমাদের দেশের নার্সদের পেশাদারিত্ব মনোভাবের পরিচয় দিতে হবে। কাটাতে হবে ইংরেজিতে দুর্বলতা, সাথে মালয় ভাষা অনর্গল বলতে শিখতে হবে কারণ মালয়েশিয়াতে একজন নার্সকে সার্বক্ষণিক একজন ডাক্তারদের তত্ত্ববধানে থাকতে হয়। আর এর জন্য প্রয়োজন আমাদের দেশে প্রফেশনাল নার্স ইনস্টিটিউট এবং ল্যাঙ্গুয়েজ সেন্টার গড়ে তোলার। যা মালয়েশিয়া তথা বিশ্বের স্বাস্থ্য খাতের পলিসিগত বিষয়কে প্রভাবিত করতে পারে।

যদিও মালয়েশিয়া সকল ক্ষেত্রে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এর ব্যবহার নিয়ে ভাবছে, তবে সময়ের প্রয়োজনে স্বাস্থ্যসেবায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এর ব্যবহারের এক প্রশ্নে ক্যাটন বলছিলেন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) নার্সদের বিকল্প হতে পারবে না, কারণ রোগীরা স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পছন্দ করে। আমরা সেই মানবিক যোগাযোগ চাই। এটি কেবল আমাদের শারীরিক প্রয়োজন নয়, আমাদের মানসিক প্রয়োজনও মেটায়। যা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স রোবট কখনোই তা বিকল্প হতে পারবে না।

সে হিসেবে আমাদের দেশের নার্সদের ভাষাগত জ্ঞান এবং পেশাদারিত্বের সকল স্তরে উন্নীত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়োগদাতাদের সকল শর্ত মেনে নার্সদের বৈশ্বিকভাবে তৈরি করতে এখন থেকেই সঠিক পদক্ষেপ, পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন করতে পারলেই খুব দ্রুতই খুলতে পারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা পৃথিবীর অন্যতম আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের দেশ মালয়েশিয়ার আরেক নতুন দুয়ার।

mzamin
প্রতীকী ছবি


Tuesday, October 29, 2024

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন যেসব প্রবাসী

চলতি বছরের গত ৫ই আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এর পেছনে দেশের ছাত্র-জনতা যেমন ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি একঝাঁক প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটররাও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, দুঃশাসন, খুন, গুম ও লুটপাটের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তারাও।  ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনলাইন ও গণমাধ্যমে টকশোতে অংশ নিয়ে সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখেন তারা।  পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব থেকেছেন এসব প্রবাসী।

এদের মধ্যে লন্ডনের সাংবাদিক রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী সুয়েব, যুক্তরাষ্ট্রের এম রহমান মাসুম, আলাউর খন্দকার, কানাডার ড. তাজ হাশমী, ফ্রান্সের সাইফুর সাগর ও অস্ট্রেলিয়ার মুন্নী চৌধুরী মেধাসহ আরো অনেকেই রয়েছেন। যারা ছিলেন নিয়মিত সরব।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের কারণে এসব সাংবাদিকদের অনেকেই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে আসতে পারেননি। তবে স্বৈরাচার সরকারের হুমকি-ধমকি, রোষানল তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। তারা প্রতিবাদ চালিয়ে গিয়েছেন প্রতিনিয়ত।

টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র গঠনমূলক সমালোচনায় দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলেছেন।

এমনকি সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের পরামর্শে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকেও তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর ফয়সল চৌধুরী, পিনাকী ভট্টাচার্য ও তাজ হাশমীকে নিয়ে ‘দেশবিরোধী ভয়ানক তিন সাইবার দুর্বৃত্ত’ শিরোনামে ওই জাতীয় দৈনিকে প্রধান সংবাদ প্রকাশিত হয়।

ওই প্রতিবেদনে ফয়সল চৌধুরীকে দেশবিরোধী দিগভ্রান্ত আখ্যায়িত করে বলা হয়, তিনি বিদেশে বসে মিথ্যাচার, উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

তাকে যুদ্ধাপরাধী অপশক্তি এবং জঙ্গিবাদের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার পেইড এজেন্ট বলেও  বর্ণনা করা হয়।

এতে আরও বলা হয়, সরকার, প্রধানমন্ত্রী, শিল্পপতি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিষোদগার ও গুজব ছড়ানোই কথিত সাংবাদিক ফয়সল চৌধুরী সুয়েবের মূল কাজ। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের বিরুদ্ধে তিনি মিথ্যাচার করে চলেছেন। এছাড়া অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, জুনাইদ আহমেদ পলক, আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ, এস আলম গ্রুপ, এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস শরাফতসহ বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে ইচ্ছামাফিক বিষোদগার করে যাচ্ছেন এই স্বঘোষিত পণ্ডিত।

লন্ডনে বসবাস করেন রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী। ঢাকার স্যাটেলাইট টিভি ‘চ্যানেল আই’র ইউরোপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তিনি।

বহির্বিশ্বে ফয়সল চৌধুরীই প্রথম টিভি চ্যানেলটির মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের অন্যায়-অত্যাচার, গুম-খুনের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেন।

তার সঞ্চালনায় চ্যানেল আই-ইউকেতে ‘স্ট্রেইট ডায়ালগ’ শিরোনামে টকশো সম্প্রচারিত হয়।  ২০১৩ থেকে টানা ২০১৮ সাল পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া ‘স্ট্রেইট ডায়ালগে’র কারণে আওয়ামী লীগ সরকার তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। এক পর্যায়ে টকশোটি বন্ধ করতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ হাইকমিশন নানা তৎপরতা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হাসিনা সরকারের চাপে ঢাকার চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ লন্ডনে চ্যানেল আই এর সম্প্রচার এক দিনের নোটিশে বন্ধ করে দেয়। অভিযোগ করা হয়, লন্ডন স্টুডিওতে কেক কেটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্মদিন উদযাপন করা হয়েছে।

তব এসব করেও স্বৈরাচার সরকারের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেমে থাকেনি। ‘চ্যানেল ইউরোপ ফেসবুক পেজ’, ‘স্ট্রেইট ডায়ালগ ইউটিউব চ্যানেল’ ও ‘আইপিটিভি চ্যানেল ইউরোপ; দিয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন তিনি।

এছাড়া গত বছরে ডিসেম্বরে সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের কাছে বাংলাদেশ সরকারের দুঃশাসনের কিছু চিত্র তুলে ধরেন ফয়সল চৌধুরী।

‘ফিফটি ইয়ার্স অব বাংলাদেশ’ বইয়ের লেখক ডক্টর তাজ হাশমী বসবাস করেন কানাডায়। সেখানে বসে শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে আলোচিত হন তিনি।

এদের মধ্যে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এম রহমান মাসুমও বাংলাদেশে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসে ২০১২ সাল থেকে ইউটিউব-ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠান শুরু করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর, কংগ্রেসম্যান, ইউরোপিয়ান মেম্বার অব পার্লামেন্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মীদের তার অনুষ্ঠানে যুক্ত করে আওয়ামী লীগ সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেন। সে সময় তার অনুষ্ঠান থেকে দেশের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারত  মানুষ।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের দুর্দশা ও তাদের অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেন এম রহমান মাসুম। যিনি সরজমিন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে তাদের অবস্থা দেখেন এবং একটি প্ল্যাটফর্মে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ‘রেমিট্যান্স ফাইটার্স অব বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন গঠন করেন। এটি বেশ  জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এছাড়া কানাডা থেকে ‘ফেস দ্য পিপল’ নামে টকশো করে শেখ হাসিনা সরকারের কাছে বিতর্কিত হন সাইফুর সাগর, ফ্রান্স থেকে সুসময় শরীফ ও সিডনি থেকে বনী আমীন। টকশোতে অতিথি হয়ে মালয়েশিয়া থেকে ডা. ফয়জুল হক, সাকিব আলী, ব্যারিস্টার সরওয়ার হোসেনসহ অনেকে হাসিনা সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লন্ডন থেকে আরিফ আল মাহফুজ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অনলাইনে জনমত গঠনেও ভূমিকা রাখেন।

এদিকে লন্ডন থেকে সাংবাদিক আব্দুর রব ভুট্টোও স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনিও সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নায়েব আলী। তিনি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন নূরে আলম হামিদী। তিনি বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী। পাকিস্তানি নাগরিক ও লস্কর-ই-তৈইয়্যবার স্কোয়াড লিডার হিসেবে পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন এমনকি জাতীয় সংসদে নূরে আলম হামিদীকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

আমেরিকায় বসবাস করেন আলাউর খন্দকার। আমেরিকা বাংলা চ্যানেল (এবিসি) নামে একটি টিভিতে টকশো করে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখেন তিনি।

ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মোখলেসুর রহমান চৌধুরী দীর্ঘদিন থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন। তিনি পতিত হাসিনা সরকারের নানা অপকর্ম, দুঃশাসন ও নৈরাজ্যের  বিরুদ্ধে সে সময় সরব ছিলেন। লন্ডন-আমেরিকার বেশ কয়েটি চ্যানেলের টকশোতে নিয়মিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে জোরালো ভূমিকাও পালন করেন মোখলেসুর রহমান।

mzamin

Sunday, October 20, 2024

আনোয়ার ইব্রাহিমের বাংলাদেশ সফরের প্রতিফলন: বাংলাদেশি কর্মীদের ইপিএফ বাধ্যতামূলক করছে মালয়েশিয়া by আরিফুল ইসলাম

মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ সহ সমস্ত বিদেশি কর্মীদের জন্য এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইপিএফ) বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে।

প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের বরাতে দেশটির সরকারি নিউজ এজেন্সি বারনামা সহ দেশটির প্রায় সকল মিডিয়া জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মান অনুসারে, জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য ছাড়াই সকল কর্মীকে ন্যায্য অধিকার প্রদানের জন্য মালয়েশিয়া সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গত শুত্রুবার দেশটির সংসদ 'দেওয়ান রাকয়াতে' ২০২৫ সালের বাজেট পেশ করার সময় এই প্রস্তাব ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার এমন ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

অবসরকালীন সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মী ও অনিয়মিত আয়ের ব্যক্তিদের জন্য, আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি দেশটির অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ ঘোষণা করেছেন যে, এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইপিএফ) এর আওতায় রিটায়ারমেন্ট সেভিংস আই-সারাণ ম্যাচিং প্রণোদনা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে, যা বার্ষিক সীমা হিসেবে সর্বোচ্চ ৫০০ রিঙ্গিত থেকে সারাজীবনে সর্বোচ্চ ৫০০০ রিঙ্গিত পর্যন্ত থাকবে।

এছাড়া জনবান্ধব এ প্রধানমন্ত্রী আরো জানিয়েছেন, 'আই-সুরি' প্রোগ্রামটি অর্থাৎ, গৃহিণী, বিধবা, একক মা এবং একক মহিলাসহ জাতীয় দারিদ্র্য ডেটা ব্যাংক 'ইকাছিহ'তে নিবন্ধিত মহিলাদের জন্য স্বেচ্ছাসেবী এ সাবস্ক্রিপশন প্রোগ্রামটি সরকারি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের অবদানের ভিত্তিতে ম্যাচিং প্রণোদনার সাথে চালিয়ে যাওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষা এজেন্ডা আরও জোরদার করা হবে যাতে বেশি সংখ্যক মানুষের অবসরকালীন সঞ্চয় এবং দুর্যোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। আত্ম-কর্মসংস্থান সামাজিক সুরক্ষা স্কিমটি কর্মচারীদের অবদানের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কভার করবে, যার জন্য ১০০ মিলিয়ন রিঙ্গিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তাছাড়া মালয়েশিয়া একটি বয়স্ক জাতির দিকে ধাবিত হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে আনোয়ার বলেন, এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইপিএফ) তাদের স্কিমগুলিকে পর্যালোচনা করছে যাতে সকল জেনারেশনের মধ্যে শক্তভাবে তা বণ্টন করা যায় এবং ইপিএফ সদস্যদের সঞ্চয়ের একটি অংশ সরাসরি তার পরিবারের সদস্যদের ইপিএফ অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করার সুযোগ তৈরি করে দেবে।

উল্লেখ্য যে, গত ৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, ‘আমরা পুরো ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমাদের শ্রমিক দরকার, তাদের আধুনিক দাস হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তারা বাংলাদেশ বা অন্য যেখান থেকেই আসুক না কেন, আমি এখানকার মতো আগেও প্রকাশ্যে এ কথা বলেছি।’

mzamin

Tuesday, October 15, 2024

প্রবাসীরা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছেন by এম এস সেকিল চৌধুরী

এগারো কোটির বেশি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন দেশে কর্মরত দেড় কোটির বেশি প্রবাসী, যাদের রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ ও সামাজিক-পারিবারিক অবদান আমাদের দেশটাকে আর্থ-সামাজিকভাবে সবল করে রেখেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রেস ব্রিফিং ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত খবর অনুযায়ী দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত তথ্য অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে কতিপয় অসাধু প্রভাবশালী মানুষের ব্যক্তিগত অর্থ লালসার কারণে। এ ঘটনা জাতিকে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে কর্মরত ও বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিক যাদের এনআইডি কার্ড রয়েছে তারা ভীষণ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। অনেকের এনআইডি কার্ডে ছোটখাটো বানান বিভ্রাট ও তথ্যের ভ্রান্তি থাকার অবকাশ আছে। এ কারণে প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থান সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রবাসীদের তথ্যভাণ্ডারের সম্ভাব্য অসঙ্গতির প্রধান কারণ হচ্ছে এ বিষয়ে আমরা ‘প্রথম জেনারেশন’ এবং সম্যকভাবে অবহিত ছিলাম না সুতরাং ভ্রান্তিগুলো নির্মূল করে আদর্শ অবস্থানে আসতে আমরা এখনো সক্ষম হইনি। দ্বিতীয়ত: অনেকদিন আগে থেকে যারা বিদেশে থাকেন তাদের বিদেশের তথ্যাবলী ও দেশের তথ্যভাণ্ডারে থাকা তথ্যের সমন্বয়ে কিছু ঘাটতি আছে। এমতাবস্থায় দেশে থাকা তথ্য ভাণ্ডারের তথ্য বিদেশি নিয়োগকর্তা ও কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছালে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

দেশের অপরাপর জনগোষ্ঠীর তথ্যও অন্যদের কাছে থাকা নিরাপদ নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।  বিশ্ব সম্প্রদায় যখন নিজেদের নাগরিকদের তথ্য ভাণ্ডার সুরক্ষিত ও নিরাপদ রাখার জন্য নানা কর্মকৌশল গ্রহণ করছে, প্রতিনিয়ত নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করার জন্য নিয়ত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে তখন আমাদের দেশের কতিপয় লোক নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে দেশ জাতির নিরাপত্তা বিক্রি করে দিচ্ছে এবং এ কাজে রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল সহায়তা পাচ্ছে। কি বিভৎস্য ও ভয়ঙ্কর এই ঘটনা!

বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক নানা উপলক্ষে বাংলাদেশের বহু নাগরিকের বিভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ আছে বহির্বিশ্বের সঙ্গে। এই তথ্যপাচার এসব মানুষকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে। আর্থিক ও বৈষয়িক নানা ক্ষেত্রে এই তথ্য সংশ্লিষ্ট থাকায় মানুষ বিপদে থাকবেন।

এমনিতেই আমাদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার নষ্ট করার জন্য প্রতিযোগী কতিপয় দেশ আমাদের নামে দেশে-বিদেশে নানা অপপ্রচার চালায়। আমরাও নানা রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য নিজ দেশকে জঙ্গিবাদের ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থানের কথা বলে বেড়িয়েছি নিজেদের দলীয় রাজনীতির সুবিধা আদায়ের জন্য। এ সবই আমাদেরকে জাতি হিসেবে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে।

উপরন্তু কতিপয় মানুষের অতি লোভ ও অসাধুতায় গোটা জাতির নিরাপত্তা আজ ঝুঁকিপূর্ণ, এ অবস্থায় দেশে ও বিদেশে অবস্থানকারী সকল নাগরিকদের ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেয়া যায় এ ব্যাপারে খাত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করে তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারকে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাই। এ ক্ষেত্রে যেকোনো বিলম্ব নানা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

mzamin

Sunday, October 13, 2024

৫ সিকার ছাগল চিনতে না পারলে রক্ত দেয়া থামবে না: পিনাকী ভট্টাচার্য by আব্দুল মোমিত

কথায় আছে হাজার টাকার বাগান খায় ৫ সিকার ছাগলে। এই ৫ সিকার ছাগল চিনতে না পারলে বারবার বাংলাদেশের মানুষকে রক্ত দিতে হবে। এই ৫ সিকার ছাগল হচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং ভারত। এই দুই শক্তিকে মোকাবিলা করতে না পারলে বাংলাদেশে শান্তি আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য।

শনিবার প্যারিসের একটি হোটেলের বলরুমে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফরোয়ার্ড’র (এইচআরএফ) উদ্যোগে ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ: প্রবাসীদের ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি পিনাকী ভট্টাচার্য আরও বলেন, বারবার প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষে থেকে দাবি জানানো হয়। কিন্তু হওয়ার কথা ছিল তারা বলবে এবং সেটি সরকার মেনে নেবে। আমাদেরকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। আমি একটি উদ্যোগ নিয়েছি পুরো বিশ্ব থেকে প্রবাসীরা পাঁচ বিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রকে দেবে। এটি হলে সরাসরি প্রবাসীরা রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে চলে আসবেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এইচআরএফ সভাপতি মোহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ফরাসি গণমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ। বাংলা টেলিগ্রাম সম্পাদক সাংবাদিক শাহ সুহেল আহমদের সঞ্চালনায় শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সাংবাদিক অনুক্ত কামরু। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ থেকে আগত রাজনীতিবিদ নুরুল ইসলাম ভুঁইয়া (ছোটন), ফ্রান্স বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা এহসানুল হক বুলু,  সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের, সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মিয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদ, কমিউনিটি নেতা টি এম রেজা।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধের উপর প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন ফ্রান্স (বিসিএফ)-এর প্রেসিডেন্ট এম ডি নূর, অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, আইনজীবী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মনোয়ার হোসাইন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি আইনজীবী আকাশ হেলাল, বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন ফ্রান্স (বিসিএফ)-এর প্রেসিডেন্ট এম ডি নূর।

এছাড়া সেমিনারে অতিথি আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শামীমা আক্তার রুবি, বিকশিত নারী সংঘের সভানেত্রী তৌফিকা শাহেদ, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মীর জাহান, লিটল ম্যাগ স্রোতের সম্পাদক কবি বদরুজ্জামান, মানবাধিকার সংগঠন এফডিএইচআর ফ্রান্স- এর সভাপতি মোহাম্মদ আল আমিন, সিনিয়র সাংবাদিক কামরুজ্জামান কাজল।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ থেকে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। সেগুলো হলো, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোর তত্ত্বাবধানে জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, দ্বিতীয়ত ফ্রান্সসহ সবগুলো দূতাবাসে দ্রুত ই-পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরির ব্যবস্থা করা, তৃতীয়ত দাবি হচ্ছে জাতীয় সংসদে প্রবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা, চতুর্থত অনিয়মিত অভিবাসীদের লাশ সরকারি খরচে দেশে প্রেরণের ব্যবস্থা করা।

এছাড়া বক্তারা বলেন, এই প্রথমবারের মতো অভিবাসী বাংলাদেশিরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্টেক হোল্ডারের ভূমিকায় এসেছেন। চার দফা দাবি আদায়ে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে জোরদার ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়াও ৫ই আগস্টের বিপ্লবকে সার্থক করার জন্য প্রবাসে সকল বাংলাদেশিকে সজাগ থাকার আহ্বান জানানো হয়।

mzamin

Friday, October 11, 2024

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকের গলা কাটা লাশ উদ্ধার by আরিফুল ইসলাম

মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের ইপোহ'র তেলুক ইন্তানের তামান লেজেন্ডার ফেজ থ্রি'র শেয়ার্ড হাউসের পেছনের জঙ্গল থেকে বাংলাদেশি এক নির্মাণ শ্রমিকের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করেছে দেশটির স্থানীয় থানা (বালাই) পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) এ ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজন বাংলাদেশি শ্রমিককে আটক করে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে নিহত ঐ বাংলাদেশি এবং হত্যার এ ঘটনায় আটক তিনজনের নাম ঠিকানা প্রকাশ করেনি দেশটির পুলিশ প্রশাসন।

এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পেরাক পুলিশের প্রধান দাতুক আজিজি মাত আরিস দেশটির সরকারি নিউজ এজেন্সি বারনামা ও স্থানীয় নিউজ পোর্টাল দি ষ্টারকে বলেছেন, বৃহস্পতিবার ভোর-সকাল সাড়ে ৫টার সময় ২৭ বছর বয়সী বাংলাদেশী এক নির্মাণ শ্রমিকের লাশের খবর পায়। পরে লোকালদের পক্ষ থেকে একটি ফোন কল পেলে লাশটি উদ্ধার করে তারা।

প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দেশটির পুলিশ গত রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভিকটিমের তিন জন সঙ্গী নিখোঁজ থাকার খবরও দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে তারা আরো জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তি তার সহকর্মী বন্ধুদের সাথে গত রাত সাড়ে ৮টার সময় রাতের খাবার খেতে ও একসময় জামাতে নামাজ পড়তে দেখা গেছে তাদের। বৃহস্পতিবার পেরাক পুলিশ কন্টিনজেন্ট (আইপিকে) তাদের সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, পরিদর্শনে দেখা গেছে এই এলাকায় প্রায় ৩৪ জন বিদেশী পৃথক পৃথক ছোট ছোট রুমে বাস করতো।

তদন্তের স্বার্থে গ্রেফতারকৃত (৩২-৩৯) বছর বয়সী তিন বাংলাদেশির তথ্য প্রকাশ করেনি মালয়েশিয়া পুলিশ এবং ঘটনার উদ্দেশ্য শনাক্ত করতে তারা তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে তারা।

এদিকে, তেলুক ইন্তান ম্যাজিস্ট্রেট নাইদাতুল আথিরাহ আজমানের আদালত তিন বাংলাদেশিকে তাদের স্বদেশীকে হত্যার তদন্তে সহায়তা করার জন্য সাত দিনের (১৬ অক্টোবর পর্যন্ত) রিমান্ডে রাখার অনুমতি দিয়েছে।

mzamin


এবার বাংলা গানে বৃটেনের প্রয়াত রানী এলিজাবেথ by আরিফ মাহফুজ

‘সবার প্রিয় রানী যে তুমি বিশাল তুমার মন’  শিরোনামের বাংলা গানে স্থান পেয়েছেন বৃটেনের প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। বিলেতে বাংলা সংস্কৃতির অঙ্গনের পরিচিত মুখ ড. আনোয়ারুল হক গানটির কথা লিখেছেন। সুর করেছেন কলকাতার বিশিষ্ট সুরকার ও সংগীত শিল্পী সৌমেন অধিকারী। গানের কথা ইংরেজিতে সাবলীলভাবে অনুবাদ করেছেন যুক্তরাজ্যের বিশিষ্ট কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ড. নাজিয়া খানম ওবিই ডিএল। ইতিমধ্যে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কোম্পানি বিঠোফেন রেকর্ডস গানটির মিউজিক ভিডিও প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্য প্রবাসী ড. আনোয়ারুল হক রানির দীর্ঘ এই কীর্তিময় জীবনের সাফল্যগাঁথা বর্ণনা করেছেন তাঁকে নিয়ে লেখা একটি বাংলা গানের মাধ্যমে। রানীকে নিয়ে লেখা বাংলা গান সম্ভবত এটিই প্রথম। এ গানটি বাংলা গানের জগতে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে আশা করা যায়। গানের কথায় রানির বর্ণময় জীবনের স্মৃতিচারণ করা হয়েছে।  

ড. আনোয়ারুল হক বলেন গানটি রচনা করার পর অনেকদিন এগুতে পারিনি। বছর খানেক আগে সৌমেন অধিকারীকে পেয়ে লেখাটি তার সঙ্গে শেয়ার করি। তিনি লেখাটি পড়েই ভীষণ উৎসাহিত বোধ করেন এবং গানটির সুর করার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এভাবেই এই ঐতিহাসিক কাজটির যাত্রা শুরু হয় আর এর পূর্ণতা আসে বিঠোফেন রেকর্ডস কোম্পানির ততোধিক আগ্রহের কারণে। এই গানকে ইংলিশ শ্রোতাদের বোধগম্য করে তোলার জন্যে রানির দেয়া ওবিই খেতাব প্রাপ্ত ড. নাজিয়া খানম উচ্চমানের সাবটাইটেল করে গানের মাত্রাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। এ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যারা আজ ইতিহাস সৃষ্টি করলেন তাঁদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আশা করি এ গান সবার ভালো লাগবে, জায়গা করে নেবে সবার হৃদয়ে।”

যুক্তরাজ্যের সার্বজনীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় যাবত ক্ষমতায় থাকা নারী রাষ্ট্রপ্রধান। অবশেষে ৯৬ বছর বয়সে ১৯২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর চিরবিদায় নেয়ার মধ্য দিয়ে একটি বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। 

mzamin

Wednesday, September 25, 2024

বিমানবন্দরে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা ভিআইপি সুবিধা পাবেন

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেছেন, দেশের বিমানবন্দরে সেবার মান উন্নয়ন ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। আরেকটি সেবা আমরা চালু করতে যাচ্ছি- বিমানবন্দরে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দেশে আসলে ভিআইপি সেবা পাবেন। একজন ভিআইপি এয়ারপোর্টে যেসব সুবিধা পান, লাউঞ্জ ব্যবহার ছাড়া আমরা সব সুবিধাই তাদের দেবো। গতকাল রাজধানীর ইস্কাটনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সমসাময়িক বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রুহুল আমিন এ সময় উপস্থিত ছিলেন। আসিফ নজরুল বলেন, একজন ভিআইপি যখন এয়ারপোর্টে যান তখন তার লাগেজ নিয়ে একজন সঙ্গে থাকেন, চেক-ইন করার সময় সঙ্গে একজন থাকেন, ইমিগ্রেশন করার সময় পাশে একজন থাকেন। প্রাথমিকভাবে আমরা মধ্যপ্রাচ্যের কর্মীদের টার্গেট করেছি। ইউরোপের কর্মীদের পরে করবো। প্রথম স্তরে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া এবং ফেরত আসা একজন কর্মী ভিআইপি ট্রিটমেন্ট পাবেন। লাউঞ্জ ব্যবহার করতে দেয়ার বিষয়ে আমরা পরে চিন্তা করছি, এটা অনেক পরের কাজ। আগামী দুই সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে আমরা এটা করবো, বিমানবন্দরে যাওয়ার পর একজন কর্মীর যে অসহায় অবস্থা তৈরি হয় সেটি দূর করবো।

তিনি বলেন, কর্মী কোন গেট দিয়ে প্রবেশ করবেন, চেকইন কীভাবে করবেন, ফর্ম পূরণ করা লাগলে কীভাবে করবেন, ইমিগ্রেশনে কোনো কাগজ চাইলে কীভাবে সেটি করবেন এসব কাজে নিয়োজিত থাকবে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক। দরকার পড়লে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ট্রেনিং দিয়ে নতুন লোক নিয়োগ করবো। আমরা এটি দুই সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যে বাস্তবায়ন করবো। একজন প্রবাসী যেন কোনো অবস্থাতেই এয়ারপোর্টে হয়রানির শিকার না হন, অপমানিত বোধ না করেন এই ব্যাপারে আমাদের জিরো টলারেন্স থাকবে। এটা আমরা অবশ্যই নিশ্চিত করে ছাড়বো।

উপদেষ্টা বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় যেসব প্রবাসীরা জীবন এবং জীবিকার রিক্স নিয়ে বিদেশে জেল খেটেছেন তাদের এই সেক্রিফাইস আমরা সবাই মনে রেখেছি। তাই আজকে তাদের বিষয়ে আমরা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ৫৭ জন যারা ফেরত এসেছেন তাদের বাইরে আমরা মোট ৮৭ জনকে এনলিস্ট করেছি। এই ৮৭ জনকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের প্রবাসী কল্যাণে যেসব স্কিম আছে তার অধীনে সাহায্যের পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কল্যাণ বোর্ড ও মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চাকরি কিংবা ব্যবসা করাসহ অন্য যেকোনো দেশে, যেখানে তারা যেতে পারবেন সে ব্যবস্থা করা হবে। মোট কথা, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।

আসিফ নজরুল বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে আগে শুধুমাত্র ঋণ পরিশোধের জন্য প্রবাসীরা টাকা পাঠাতে পারতেন। এখন থেকে প্রবাসীরা এই ব্যাংকে ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে রেমিট্যান্সও পাঠাতে পারবে, এ ব্যবস্থা করেছি। এই বিষয়ে বেসরকারি সিটি ব্যাংক আমাদের সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রবাসীদের এতদিন যে ঋণ দিতো, তাদের সঙ্গে দেশের বৃহৎ আরও ১২ ব্যাংকও প্রবাসীদের ঋণ দেবে। এসব বিষয়ে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। প্রবাসীদের অনেক বেশি ঋণের প্রয়োজন আছে। ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলে আমরা জেনেছি ঋণ দেয়ার জন্য এক ধরনের গ্যারান্টির প্রয়োজন আছে, যেটা বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা করবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, খুব দ্রুত এই ক্রেডিট গ্যারান্টির বিষয়ে সমাধান হবে। তিনি বলেন, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের আরও কোনো শাখা না খুলে আমরা সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকে প্রস্তাবনা দিয়েছি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে যেসব জায়গায় সোনালী ও অগ্রণী ব্যাংক আছে, সেখানে গ্রাহকরা প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের সুযোগ সুবিধা পাবে।

mzamin

Friday, September 13, 2024

ফাহিম সালেহ হত্যাকাণ্ড: অভিযুক্ত টাইরেস হাসপিলের ৪০ বছর কারাদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশি তরুণ ফাহিম সালেহ’র হত্যাকারী টাইরেস হাসপিল (২৫)কে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। টাইরেস ফাহিমের সাবেক সহকারী ছিলেন। ফাহিম সালেহ বাংলাদেশের রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘পাঠাও’র সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নাইজেরিয়াভিত্তিক মোটরবাইক স্টার্টআপ ‘গোকাদা’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন।

২০২০ সালের জুলাইয়ে ম্যানহাটনের অ্যাপার্টমেন্টে ফাহিম সালেহর মরদেহ পাওয়া যায়। ৩৩ বছর বয়সী ফাহিম সালেহর হত্যাকারী টাইরেস হাসপিলের বিরুদ্ধে হত্যা ও লুটপাটের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এরপরই নিউ ইয়র্ক স্টেট সুপ্রিম কোর্টের জুরি টাইরেস হাসপিলকে ৪০ বছর কারাভোগের আদেশ দেন। একইসঙ্গে চুরির সমুদয় অর্থ কোম্পানিকে ফেরতের নির্দেশ দেয়া হয়। বিচারক ম্যানহাটন ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি অ্যালভিন এল. ব্র্যাগ জুনিয়র এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, বিলাসবহুল জীবনযাপনের জন্য হাসপিল ফাহিমের চার লাখ ডলার চুরি করেন। বিষয়টি ফাহিম বুঝতে পারলে হাসপিলকে দ্বিতীয়বার সুযোগও দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি আড়াল করতে টাইরেস ফাহিমকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। শুধু তাই নয়, ইলেকট্রিক করাত দিয়ে খণ্ড-বিখণ্ড করে দেন ফাহিমের দেহ। ফাহিমের চাচাতো ভাই অ্যাপার্টমেন্টে এসে তার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মরদেহ দেখতে পান। কয়েকদিন পর পুলিশ হাসপিলকে গ্রেপ্তার করে।

আইনজীবী ব্র্যাগ জানান, যদিও আজকের সাজা সালেহকে ফিরিয়ে আনবে না, তবে আমি আশা করি এই রায় তার পরিবারের বেদনাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করবে। বিচারে প্রমাণিত ফাহিম সালেহ ২০১৮ সালের মে মাসে তার উদ্যোক্তা সহকারী হিসেবে হাসপিলকে নিয়োগ করেছিলেন। হাসপিল কোম্পানির আর্থিক দিকটা সামলাতেন। যেখানে তিনি ফাহিমের আর্থিক রেকর্ডগুলো অ্যাক্সেস পেয়েছিলেন। তিনি দু’টি আলাদা অত্যাধুনিক স্কিম ব্যবহার করে ফাহিমের কোম্পানি থেকে চুরি করছিলেন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে হাসপিল অন্য নাম ব্যবহার করে একটি পেপ্যাল অ্যাকাউন্ট তৈরি করে প্রথম স্কিম শুরু করেছিল, যা ব্যবসার অন্যান্য আর্থিক লেনদেন নকল করে জাল স্টেটমেন্ট তৈরি করার সময় সেই অ্যাকাউন্টে তহবিল জমা করেন।
২০১৮ সালের ডিসেম্বরে হাসপিল একটি দ্বিতীয় আর্থিক স্কিম তৈরি করেছিল যেখানে তিনি একটি কর্পোরেট সত্তা এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে আরও অর্থ চুরি করতে শুরু করেন।

প্রসিকিউটররা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ফাহিম সালেহর কাছ থেকে নগদ অর্থ চুরি করছিলেন হাসপিল। বিষয়টি ফাহিম বুঝতে পারলে হাসপিলকে মামলা থেকে বাঁচাতে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য দুই বছর সময় দেন। কিন্তু হাসপিল তখনও ফাহিমের কোম্পানি থেকে টাকা চুরি করে যাচ্ছিলেন। বিষয়টি   ফাহিম জেনে গেলে ভয় থেকে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। ২০২০ সালের ১৩ই জুলাই ফাহিম সালেহকে হত্যা করেন টাইরেস হাসপিল। সূত্র: এবিসি নিউজ

mzamin

Saturday, September 7, 2024

মালয়েশিয়ায় কর্মক্ষেত্র পরিবর্তনের অভিযোগে ২২২ বাংলাদেশি আটক by আরিফুল ইসলাম

মালয়েশিয়ায় কোম্পানি ও কাজ চেঞ্জ করার অভিযোগে ২২২ বাংলাদেশিকে আটক করেছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ।

শুক্রবার (৬ সেপ্টেম্বর) দেশটির কেদাহ রাজ্যের কুলিমে বিদেশি কর্মীর কর্ম পরিবর্তনের পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান একটি এজেন্সি অফিসে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করে মোট ২২৮ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করেছে।

কেদাহ জিআইএম এনফোর্সমেন্ট ডিভিশনের ইনটেলিজেন্স অ্যান্ড অপারেশনস ইউনিটের ইমিগ্রেশন অফিসারদের একটি দল এই অভিযান পরিচালনা করে বাংলাদেশি ছাড়াও ৫ চীনা এবং একজন ভারতীয় নাগরিককে আটক করতে সক্ষম হয়েছে।

দেশটির কেদাহ ইমিগ্রেশনের অফিসিয়াল ফেসবুক পোস্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে, ইমিগ্রেশনের ডিরেক্টর মোহাম্মদ রিদজুয়ান মোহাম্মাদ জেইন বলেন, অভিযানের সময় দেখাগেছে জড়িত এজেন্সিগুলো একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে কর্মিদের সব সেক্টরে কোম্পানি চেঞ্জ করা ও ভালো কাজের প্রলোভনে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছিলো।

ইমিগ্রেশনের উক্ত বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে যে, নিজের কোম্পানির অনুমতি ছাড়া কোনো এজেন্সির প্রলোভনে কর্মসংস্থান বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে। এছাড়া এজেন্সিটি মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধিত কি না তা নিশ্চিত হয়ে সেখানে যেতে প্রবাসী কর্মীদের অনুরোধ করা হয়েছে।

ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট ১৯৫৯/৬৩, ইমিগ্রেশন রেগুলেশন ১৯৬৩, পাসপোর্ট অ্যাক্ট ১৯৬৬ এবং অ্যান্টি-ট্রাফিকিং ইন পারসনস এবং অ্যান্টি-হিউম্যান স্মাগলিং অ্যাক্ট ২০০৭ অনুযায়ী বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। আটকদের ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য আলোর সেতার ইমিগ্রেশন অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে দেশটির ইমিগ্রেশন বিভাগ।

Monday, August 26, 2024

লন্ডনে ‘বিমানে লুটিলার’ শীর্ষক প্রতিবাদ: সিলেটে পূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার দাবি প্রবাসীদের by আরিফ মাহফুজ

‘লুটিলার লুটিলার বিমানে লুটিলার গুটিলার গুটিলার বিমানে কুটিলার! লুটেপুটে বিমানে সিলেটিদের খাচ্ছে আমাদের ছেলেমেয়ে দেশে না যাক চাচ্ছে। বয়স্ক মা-বাবা সদা থাকেন চিন্তায়’ এমন শিরোনাম শীর্ষক কবিতা ও প্রবাসী হোক বৈষম্যবিহীন, প্রবাসীদের দাবি একটাই, পূর্ণ আন্তর্জাতিক সিলেট বিমানবন্দর চাই, অন্য এয়ারলাইন্সের সুযোগ দিন এই স্লোগানগুলো সামনে রেখে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সকল অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবাদে লন্ডনে আন্দোলনে নেমেছেন বৃটিশ বাংলাদেশি ও সাধারণ প্রবাসীরা।

২২শে আগস্ট বৃহস্পতিবার  লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে বৃটিশ বাংলাদেশি এবং প্রবাসীদের সংগঠন বৃটিশ বাংলাদেশি কমিটি ভয়েস ইউ.কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। বিক্ষোভ সমাবেশে প্রবাসীরা বলেন- বাংলাদেশিদের প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটের মূল্য বৈষম্য এবং সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে রূপদানের মাধ্যমে অন্যান্য বিদেশি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু করে প্রবাসী বৃটিশ বাংলাদেশিদের ছেলে সন্তান এবং বৃদ্ধ অসুস্থ মা-বাবাকে নিয়ে যাতে সিলেটে একটি ন্যায্যমূল্যে নিজের দেশে যাতায়াত করতে পারেন।  

সভায় বক্তারা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং ঢাকা হেড অফিসে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নতুন চেয়ারম্যান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, এ ছাড়াও লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার এবং বিমানের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গের কাছে দাবি জানান যে, লন্ডন থেকে সিলেট রুটে বিমানের টিকিটের মূল্য এবং লাভের স্বচ্ছতা প্রদান।

অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের সঙ্গে মিল রেখে লন্ডন থেকে সিলেট রুটে বিমানের টিকিটের দাম কমানো, বিমানের অনলাইন টিকিট কেনার সিস্টেম শুরু করা, যেখানে দাম এবং ফি আগেই দেখানো হয়, বিমানের টিকিট বিক্রির মূল্য নির্ধারণ এবং সিন্ডিকেট কেলেঙ্কারি বন্ধ করা, লন্ডন থেকে সিলেট রুটে অন্যান্য আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোকে সিলেট অবতরণের অনুমতি দেয়া এবং সিলেট ওসমানীকে প্রকৃত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পরিণত করা। তবে এই সভার মূল আলোচনার মধ্যে ছিল বিমান এয়ারলাইন্স লন্ডন থেকে সিলেট রুটের টিকিটের উচ্চমূল্য, মূল্য বৈষম্য, অবিচার এবং সিলেট যাত্রীদের প্রতি অন্যায় আচরণের আসল কারণ চিহ্নিত করা এবং সম্ভাব্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

সভায় সভাপতিত্ব করেন বৃটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি ভয়েসের চেয়ারম্যান সেলিম উদ্দিন চাকলাদার এবং যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক নাসের আল-আমিন এবং ভাইস চেয়ারম্যান অ্যান্ড মিডিয়া রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং সাবেক কাউন্সিলর শাহ সোহেল আমিন। বক্তব্য রাখেন বিবিসিভি সংস্থার পক্ষ থেকে ভাইস চেয়ারম্যান জামালুর রহমান ও সহকারী সেক্রেটারি তমিজুর রহমান রঞ্জু এবং হাফসা ইসলাম (বিবিসিভি মহিলা কর্মকর্তা)।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের স্পিকার কাউন্সিলর ব্যারিস্টার সাইফ উদ্দিন খালেদ, আব্দুল মুমিন জাহেদী কেরল-সাংবাদিক, শামসুল হক- কমিউনিটি সমাজকর্মী, লুকমান উদ্দিন- কমিউনিটি সমাজকর্মী, দিলাওয়ার হুসাইন- কমিউনিটি সমাজকর্মী, আবু হুরায়রা সাব-মাস্টার-কমিউনিটি সমাজকর্মী, আজম আলী-কমিউনিটি কর্মী আব্দুর রব-কমিউনিটি সমাজকর্মী, কামাল উদ্দিন-কমিউনিটি সমাজকর্মী, সুয়েজ মিয়া-কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট, রুপিয়া বেগম-কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট বক্তব্য রাখেন। এ সময় আরও অনেকগুলো সংগঠনের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন সংগঠনের কমিটির সদস্যরা বক্তব্য রাখেন।

বৃটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটি ভয়েস বিশ্বাস করে যে, এটি যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ১ মিলিয়ন বৃটিশ বাংলাদেশির বাংলাদেশে যাওয়া ও সহজ যোগসূত্র স্থাপনের জন্য একটি কমিউনিটি ক্যাম্পেইন। যদি বৃটিশ বাংলাদেশিরা বাংলাদেশে সহজে যাতায়াত করতে পারে তবে বাংলাদেশের ইকোনমিতে তাদের কন্ট্রিবিউশন বাড়বে এবং বাংলাদেশে ইনভেস্ট করতে সাহস পাবে। বিমান বাংলাদেশিদের  জাতীয় বাহক এয়ারলাইন, বাংলাদেশিদের  গর্ব এবং সম্পদ এর থেকে সবাই  আরও ভালো সেবা পাওয়ার দাবিদার এবং দাবি করাটা আমাদের ন্যায্য অধিকার।

বক্তারা ইউকে কান্ট্রি ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন দাবিগুলো নিয়ে অনেক চেষ্টা ও লেখালেখির পরও  বিমান ইউকে কান্ট্রি ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে পারিনি অথবা কোনো ভালো জবাব পাননি। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন উপরোক্ত দাবিগুলো স্পষ্ট এবং আলোচনাযোগ্য এবং যতক্ষণ না বিমান এয়ারলাইন্স বৃটিশ গ্রাহকদের লুটপাট বন্ধ না করবে এবং আমাদের দাবি পূরণ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই বিবিসিভি ‘লুটিলার’ প্রচারাভিযান বিমানের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জোরালোভাবে লড়াই চালিয়ে যাবে।

Wednesday, March 18, 2020

লন্ডন বাংলাটাউনের বাঙালিরা কোথায়? by শাকিল বিন মুশতাক

বদলে যাচ্ছে এককালের বাঙালি অধ্যুষিত ব্রিক লেনের চেহারাঃ
লন্ডনের এক সড়কের কোনায় পর্যটকদের একটা ছোট্ট দল তাদের গাইডের কথা মন দিয়ে শুনছিল। এলাকার বিবরণ দিচ্ছিলো গাইড। এক পর্যটক গাইডকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চাইলেন, তুমি বলছো এটা বাংলাটাউন, তাহলে বাঙালিদের দেখা যাচ্ছে না কেন? দেয়ার মতো তেমন জবাব অবশ্য ছিল না গাইডের কাছে।
ইংল্যান্ডের পূর্ব লন্ডনের একটি সড়কের নাম ব্রিক লেন। দুই কারণে এলাকাটি বিখ্যাত: গ্রাফিতি আর ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাঁ। গ্রাফিতিগুলো তৈরিতে বাঙালিদের ভূমিকা নেই। কিন্তু প্রায় প্রতিটি ভারতীয় খাবারের রেস্তোরাঁর মালিকই বাঙালি, চালাচ্ছেনও তারা। বাংলাটাউন ছাড়া কারি ক্যাপিটাল নামেও ডাকা হয় এলাকাটাকে।
পুরো উনবিংশ শতক এমনকি বিংশ শতকের শুরুতেও ইহুদিরাই ছিল এ এলাকার প্রধান জনগোষ্ঠী। কিন্তু বিংশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে বাঙালি অভিবাসীরা সংখ্যাগুরু হয়ে ওঠে এখানে। জনসংখ্যার এই বিবর্তনের প্রতীক হিসেবেই একটা সিনাগগ রূপান্তরিত হয়ে লন্ডন জামে মসজিদে রূপ নিয়েছে। সিনাগগটাও এক সময় চ্যাপেল ছিল। সেই সাথে বিখ্যাত খাবারের রেস্তোরাঁগুলো চালু হয়েছে বাঙালিদের রসনা বিলাস মেটাতে।
কিন্তু এই ইতিহাসও অতীত হতে চলেছে। গ্রাফিতিগুলো এখনও রয়েছে, কিন্তু রেস্তোরাঁর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, একইভাবে কমছে বাঙালির সংখ্যাও। বাঙালিরা এই এলাকা ছেড়ে লন্ডনের অন্যান্য এলাকা যেমন ইস্ট হ্যাম, ইলফোর্ড অথবা বার্কিংয়ের মতো জায়গায় চলে যাচ্ছে। এই এলাকায় এখন খুব সামান্যই বাঙালি তৎপরতা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চোখে পড়বে। অনেক বাঙালিই অন্যান্য কমিউনিটিগুলোতে চলে গেছে। রেস্তোরাঁগুলোর মালিকানাও বদল হয়েছে। এককালের বিখ্যাত বাঙালি রেস্তোরাঁ ‘ক্লিফটন্স’-এর জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে তুর্কী চেইনশপ ইফেস।
এই মিনি-বাংলাদেশকে কিভাবে দেখেন প্রবাসীরা?
ওসমান গনি ব্রিক লেনের একজন প্রবীণ কমিউনিটি নেতা। এখানে আসেন ১৯৭৬ সালে। তিনি বললেন, “পরিবারের প্রবীণদের দেখাশোনা করা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। তাই যখনই নতুন প্রজন্মের কেউ এই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র গেছে, তারা পরিবারের অন্যদেরও সাথে নিয়ে গেছে।”
ওসমান গনি বললেন, “পরবর্তী প্রজন্মের কাউকে দোষ দেয়া যায় না। কারণ তারা সরাসরি বাংলাদেশ থেকে আসেনি। তাদের জন্ম এখানে, ব্রিটিশ নাগরিক হিসেবেই বড় হয়েছে তারা। তাই ব্রিক লেনের বাঙালি চারিত্রগুলো দেখাশোনা করার ব্যাপারে তাদের দৃষ্টিভঙ্গী আমাদের চেয়ে ভিন্ন হতেই পারে। এটা ধ্বংস হয়ে যাক, সেটা হয়তো তারা চায় না, কিন্তু এ জন্য আলাদা করে সময় দেয়ার মতো অবস্থাও তাদের নেই।”
পুরনো দিনের কথা স্মরণ করলেন গনি। কমিউনিটির তখন স্বর্ণযুগ। স্পাইটালফিল্ডস আর বাংলাটাউন ওয়ার্ডে প্রায় ৫০ হাজার বাঙালি বাস করতো সে সময়। এদের অধিকাংশই লন্ডনে এসেছেন ১৯৭৬ আর ১৯৯০ সালের মাঝামাঝি। সরকারের কিছু পদক্ষেপ আর ব্রিটিশ বাঙালিদের কঠিন চেষ্টার কারণে বাংলাটাউন হিসেবে পরিচিতি পায় এই এলাকা।
গনি বলেন, “অনেকে এমনকি চায়নাটাউটনের যে প্রতীকী মূল্য, তার সাথে বাংলাটাউনকে তুলনা করেন। কিন্তু চায়নাটাউন হলো বাণিজ্যিক আর বিনোদনের জায়গা, কিন্তু বাংলাটাউন হলো একটা সংস্কৃতির পরিমণ্ডল.. বাংলাটাউন সত্যিকার অর্থেই টাউন, কোন বাণিজ্যিক এলাকা নয়।”
শাহ মুনিম একজন প্রথম সারির ব্যবসায়ী ও কমিউনিটি নেতা। নব্বই দশকের শেষের দিকে এখানে আসেন তিনি। এখন “স্বাদ গ্রিল” নামের বিখ্যাত এক রেস্তোরাঁসহ বেশ কিছু ব্যবসা রয়েছে তার। এই এলাকায় বাঙালিদের সংখ্যা কমে যাওয়ার ব্যাখ্যাটা তার কাছে খুবই সহজ: “অর্থের দরকার রয়েছে। মানুষ ঘরবাড়ি বিক্রি করে দিয়েছে (যেহেতু জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে).. আর আপনি বাড়ি বিক্রি করলে অন্য কমিউনিটির মানুষ এসে সেগুলো কিনবে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সংখ্যা এখানে বাড়বে।”
মুনিম আরও বললেন, “এটা সত্যি যে, আমাদের ঐতিহ্যগুলো তুলে ধরতে বা এগুলোর যত্নের ব্যাপারে আমরা বাঙালিরা অতটা ঐক্যবদ্ধ নই। আমরা এমনকি বাঙালি স্মৃতিগুলো ধরে রাখার জন্য ভালো একটা দোকান চালু করিনি। খাবারের ঐতিহ্যটা কিভাবে ধরে রাখা যায়, সে ব্যাপারেও আমাদের কোন গবেষণা নেই। এর পরও কমিউনিটি সদস্যরা যদি একসাথে দাঁড়িয়ে যায়, আমাদের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে।”
মুনিম মনে করেন, “আমরা যদি এখনই পদক্ষেপ না নিই, তাহলে বাংলাটাউন হারিয়ে যাবে।”
গনি অবশ্য অন্যভাবে দেখছেন। তার বিশ্বাস ভবিষ্যতেও বাঙালিরা এখানে থাকবে, কিন্তু হয়তো সেভাবে সঙ্ঘবদ্ধভাবে নয়।

Thursday, February 13, 2020

শোনো শোনো ওশানের গান by নুসরাত সাবিনা

সূর্যোদয়
গৎবাঁধা কর্মসূচি তলিয়ে গিয়ে নতুন আয়োজন শুরু হলো। নাসিফ হোটেল বুক করছে। আমি খাবার প্যাক করছি। আগামীকালের স্কেজুয়ালটা আকাশে ঠিক হয়ে গিয়েছিল। তাই আল্লাহ আমাকে দিয়ে সারা দিন ধরে কিমা ভুনা, পরোটা, লাউ ভাজি ইত্যাদি বানিয়ে নিয়েছেন। তখন আমি জানতাম না, কেন এত বেশি পরিমাণে রান্না করছি পদগুলো!
হোটেলে গিয়ে হোমমেড ফুড খেতে ভালো লাগার নানাবিধ দিক ছিল। যেমন হোমমেড ফুড খাওয়ার তৃপ্তি, অজান্তেই তা প্রস্তুত করতে পারার গর্ব এবং যিনি তা করিয়ে নিয়েছেন তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা। আর খাবারের মধ্যেও স্বর্গীয় একটা ব্যাপার ছিল। তা না হলে সাধারণ লাউ-আলু ভাজি, পরোটা, কিমাতে এত স্বাদ থাকা অস্বাভাবিক। শাব্দিক অর্থেই রাতারাতি ওশন সিটি ভ্রমণের বন্দোবস্ত হয়ে গেল একটা এক রত্তি গল্প প্রসঙ্গে।
গল্পটি শানেনুজুলসহ সংক্ষেপে বর্ণিত হলো।
সাতটি জ্যৈষ্ঠ মাস গত হয়েছে গ্রামে যাইনি। সেই মাসে, যখন এইচএসসি ফার্স্ট ইয়ার ফাইনাল দিয়ে ফ্রি হয়েছি, মেজ চাচা এসে জোর করে আব্বার সম্মতি আদায় করে আমাদের গ্রামে নিয়ে গেলেন। বড় হয়ে সেই প্রথম ও শেষ গ্রাম দেখা। ছোটবেলার স্মৃতিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠল। সেই হলদে হাঁসের ছানার হেলাদোলা, সেজ চাচার ধরা ছোট মাছের ছালুন, গাছের আম, কাঁঠাল, ঘরের লালি, গমের ভাত, খেতের কাঁচা মরিচ, দাদি, ফুফু, চাচা, চাচির সঙ্গে বেড়ানো—এসবই স্মরণীয়-বরণীয়। এর মাঝে সবচেয়ে মন কেড়েছিল তিনটা জিনিস—তর্জনী, মধ্যমা ও অনামিকা উঁচিয়ে বললাম নাসিফকে।
এক নম্বর ‘বাতাস’। ঢাকা থেকে রাজশাহী কোচ ভ্রমণের পর লোকাল বাস, তারপর রিকশা। রিকশাটা যখনই শহর ছাড়ল, সবুজের ঘনত্ব বাড়ল, সন্ধ্যা আঁচল নাড়ল, মিকাইল ছাড়ল সেই সুষম হাওয়া, যা ক্ষুধা তৃষ্ণা, ক্লান্তি মোছার ভার নিল। মুমূর্ষু শরীর, মনকে নবজীবন দিল। কী তামসা! বাথরুমেও বেশুমার বাতাস। গোসলে, খাওয়াতে, রাতে উঠানে গপ্পে, গীতে—কোথায় নেই সেই আম, তেঁতুল, নিমপাতাবাহিত শীতল, ঔষধি হাওয়া?
দুই নম্বর ‘প্রশস্ততা’। এত বড় একটা পৃথিবী ও আকাশের মালিক আমি ঢাকায় থাকায় বুঝতেই পারিনি।... আমার আম চটকানি বয়ানের মাঝে ছেদ ফেলে নাসিফ বলল, চলো, আম্মু এই ছুটিতে আমরা শহর ছেড়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যাই।
ওর প্রস্তাবকে উড়িয়েই দিলাম, ধেৎ! বাসা বদলসংক্রান্ত খরচপাতির শেষই হচ্ছে না। প্রয়োজনের তেনা এখনো পেঁচতেই আছে। আর, শাঁখের করাতের ক্যাচরম্যাচর তো আছেই।
টাকার ব্যাপার আমি আর ওয়াসিফ দেখব। শীতের দিন, এখন হোটেল ভাড়া কম, ব্লা-ব্লা-ব্লা বলে নাসিফ আমার সম্মতি নিয়ে বাবা ও ভাইদের কাছে দৌড়াল।
আবহাওয়াও অনুকূলে। ৪৫-৪৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। ডিসেম্বরের শেষে আল্লাহ যেন আমাদের এই ভ্রমণের জন্যই মিকাইলকে বিশেষ অর্ডার দেন, নো স্নো ফল, নো রেইন ফর বুধ ও বৃহস্পতি।
শুক্রবার বৃষ্টির পূর্বাভাস বিধায় আমরা পরদিন বুধবারকে পবিত্র দিন হিসেবে ঠিক করলাম। বাসা থেকে মাত্র তিন ঘণ্টার ড্রাইভ ওশান সিটি। বিচের ধারে মাইলকে মাইল সারি সারি ওয়াটার ফ্রন্ট হোটেল। প্রতিটা রুমের ব্যালকনি থেকে সাগর দেখা যায়। আমরা কয়তলায় রুম নেব, হলিডে ইনের রিসেপশনিস্ট জিজ্ঞেস করলে, ওদের বাবা টপেস্ট অ্যাভেইলেবল ফ্লোর চায়। ১১ তলার ব্যালকনি থেকে দুনিয়া জোড়া সাগর দেখে মনে হয়, পলকেই অচিন কোনো জগৎ চলে এসেছি! সুলাইমানের প্রাসাদে নিজের সিংহাসন দেখে রানি বিলকিসের চোখ যেমন ছানাবড়া হয়েছিল, তেমনি আমাদের চোখ এই জললোক দেখে।
সাতসকালে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটেও অনেক মানুষ বিচে বেড়াচ্ছে। বোর্ড ওয়াকে বাইকিং, জগিং, রানিং সবই চলছে। কচি রোদের সৌম্য সংক্রমিত হয়েছে সবার মধ্যে। সময়ও চলছে সন্তর্পণে এখানে। তাই মানুষের ফুরসত হয়েছে পরস্পরের দিকে তাকাতে, হাসতে, হাই বলতে। শীতের বেলাভূমি সূর্যোদয়ের মতো শান্ত, পবিত্র। হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে একসময় পানির কাছে বসলাম। ডান পাশে বড় বড় পাথরে ধাক্কা খেয়ে সিংহের মতো গর্জন করছে ঢেউ। গায়ে এসে লাগছে পানির ছিটা। এই বিস্তীর্ণ জলতরঙ্গ গিয়ে আছড়ে পড়ছে ইউরোপ, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকায়। এই জলে হাত দিয়ে স্পর্শ করছি স্পেন, মরক্কো, ব্রাজিল।
বিশালতা ও সৌন্দর্য একই সূত্রে গাঁথা সমুদ্রে। এ দুটো গুণের সমাবেশ মানুষের মাঝে বিরল। যে উল্লম্বতায় উঁচু, সে সর্বত্র খাটো খোঁটে, আর আত্মপ্রসাদ চাটে। কেউ নিজকে মহাজ্ঞানী ভেবে অন্যের মূর্খতা মাপে, আর কাঁপে সুখ শিহরণে। কেউবা নিজের গুণটা অন্যের মাঝে অনুপস্থিত দেখে তাকে বেগুন ভেবে পোড়ায়, ভর্তা করে। স্রষ্টার অসংখ্য গুণ বুকে ধারণ করে সাগর এমন সমৃদ্ধ, আর আমরা নিদারুণ দেউলিয়া!
আমি গ্রামের বাতাসের কথা স্মরণ করেছি। আল্লাহ আমাকে সাগরের হাওয়া খাওয়াতে এনেছে। এ স্বর্গীয় হাওয়ার পরশে শরীর, মন, আত্মা পরস্পর দলাদলি ছেড়ে গলাগলি উড়ছে। তার সমাদরে গত দুই সপ্তাহব্যাপী ছ্যাঁচড়া কাশি সমূলে উৎপাটিত হয়েছে। কাঠের ব্যালকনি ফ্রিজ হয়ে আছে শিশির জমে। সেখানে খালি পায়ে, হালকা শালে দাঁড়িয়ে আছি দীর্ঘক্ষণ, তবু শীত লাগছে না। শীতও কি প্রীত হয়ে গেছে অনন্ত ছোঁয়া এই গীত শুনে? মাঝরাতে, চাঁদ ও সাগরের গীতিনকশা রেখে কার বিছানায় যেতে ইচ্ছে হয়? তবু ফজর ও সূর্যোদয়ের প্রত্যাশায় গেলাম। ডান কাতে দেখি, বিছানার নিচ দিয়ে সাগর ডাগর চোখে নাচছে জমকালো কালো শাড়িতে, চাঁদের টিপে।
মুসা কিছুতেই আসবে না। সেদিন ওর বুক ব্যথা, জ্বর ভাব। পরদিন দুপুর বারোটা পর্যন্ত বিছানায়। সবার ডাকাডাকি ব্যর্থ। শেষে পুরো রেডি হয়ে ১৮ বছরের বুড়োকে পটানোর মতো শক্ত কাজ করতে হলো, যার কিছু খুচরো নমুনা:
বিচ হলো প্রেসক্রিপশন মেডিসিন। গাড়িতে আমার কোলে ঘুমিয়ো। হোটেলে গিয়ে সারা দিন রাত শুয়ে থেকো। তোমার বাইরে বের হতে হবে না। বেড়ে গেলে ডাক্তার দেখাব। তুমি ছাড়া আমরা ইনকমপ্লিট। উই ক্যান্ট ইভেন গো উইদাউট ইউ। টাকা পে করা হয়ে গেছে, নন রিফান্ডেবল।
জানি না কোন ঝড়ে বক পড়ল। সে উঠে পাঁচ মিনিটে রেডি হলো। আর সাগরের গানে মুসাই বেশি নেচেছে। একান–ওকান হাসি বিস্তৃত থেকেছে চেহারায়। লিভিং রুমে একাই কুইন সাইজ সোফা বেডটায় কিংয়ের মতো গেজিয়েছে। ইজি চেয়ারে পিসি ইউজ করেছে সাতসকালে, যখন তাকে বোমা মেরেও তোলা যায় না বিছানা থেকে। ডলফিনের ডাইভের মতো ফজর পড়েই বেডে তলিয়ে যায়। সেই মুসা আজ সূর্যোদয়ের জন্য অপেক্ষা করছে ফজর থেকে।
সূর্যটা কি সোনার কাঠি দিগন্তজোড়া, সাগর ও আকাশের ফাঁকে গোঁজা, ঘন আঁধারের বাঁকে, মহারাজার হাতে ধরা, ধরার ঘুম ভাঙাতে? তাই তো রূপকথা হার মেনেছে আজ। ধীরে ধীরে পুরু হয় কাঠিটা। সোনাল আজ কোন গয়না গড়বে এ সোনা দিয়ে? এত তাপাচ্ছে কেন? এই কড়া কমলার চমকে থমকে গেছে প্রতিটা পলক! তারপর, দেখ টিকলির ঝলক পৃথিবীর কপালে। ঠিকরে পড়া আলোর হাসি আকাশে, বাতাসে, সাগরে। সে হাসি দেখে কে ঠিক থাকতে পারে? তাই তো মুসা সাতসকালে ভাইয়ের সঙ্গে বিচে চলে গেল। সেখান থেকে ফিরে এসে ধুমসে কফি বানিয়ে খেলছে। ১৮ বছরের জীবনে আজই সে প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সম্পূর্ণ রঙিন কফি প্রস্তুত করেছে। আর হ্যাঁ, গতকালের অসুস্থতার কোনো লক্ষণ আছে মুসার মাঝে? নেই। লক্ষ্মণ সেনের মতো তা পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে গেছে।
ফেরার পথে ওদের বাবার অনুরোধে গাড়িতে বাজানোর জন্য বাংলা, ইংলিশ, হিন্দি, আরবি, জাপানি কোনো একটা গানও খুঁজে পেলাম না। যে গান ছাড়ি ত্যানা ত্যানা লাগে। কোনো গান টু ওয়ার্ডি, কোনোটা টু মিউজিকি, কোনোটা চড়া তো কোনোটা মিনমিনে।
প্রাণে বাজে সাগরের গান, যা অসীমের পানে টানে।
নুসরাত সাবিনা: শিক্ষক, মন্টিসরি স্কুল, এলকরিজ, মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র।

Thursday, November 21, 2019

সুবর্ণবন্দরের খোঁজে by হাবীবুল্লাহ সিরাজী

পায়ে ধুলো লাগা বাঁচায় জুতো আর গায়ে ময়লা যাতে না লাগে তা রক্ষা করে পোশাক। কিন্তু বনের ময়লার জন্য তো কেউ এগিয়ে আসে না। এ ময়লা বনে যেমন পড়ে, তেমনি বনকেই মুছে ফেলতে হয়। যে পারে সে ময়লা সাফ করতে, সে-ই তো অরণ্য। তার জন্মই তো সার্থক অরণ্যজন্ম। পড়শি ফোড়ন কাটে, ধূলিসম পত্রালি নিচে পড়ে, ভিন্ন পাড়া গলা উঁচিয়ে কেচ্ছাকাহিনি ছড়ায়। হেলাফেলা গা থেকে ঝেড়ে ফেলা যায়, কিন্তু পরদেশি যদি নাক-মাথা দোলায় তখন তো তা সামাল দেওয়ার জন্য নিজের মাথাকেও ওপরে তোলার প্রয়োজন পড়ে। এই মন ও মাথা নিয়ে, এই হৃদয় ও বুদ্ধি নিয়ে চলাচলের অংশে চাই জুতসই একটি মাধ্যম—বিস্তারমাধ্যম।
কথার পিঠে কথা তাই—মানুষের জন্য হৃদয়কে পঞ্চভূতে মিশিয়ে এবং মস্তিষ্ককে সৃষ্টিদর্শনে লগ্ন করে দাঁড়াতে হবে। মেরুদণ্ডী প্রাণীর সব গুণ ধারণপূর্বক জানান দিতে হবে বিশ্বকে—আমরা এসেছি। নিজের ভাষা বাংলাই এই আগমনের একমাত্র প্রতীক! তাই বাংলা নিয়েই আমরা দখল নিতে চাই সারা বিশ্বের। আমাদের কর্মী দল মজবুত, আমাদের মেধাবাহিনী অটুট এবং আমাদের মেধা-সমবায় অভিযানের জন্য প্রস্তুত।
এখন এই অভিযাত্রার স্থানচিত্র এবং বিজয়সীমা নির্ধারণের জন্য পরিকল্পনা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। পৃথিবীর মানচিত্রে বিজয়বিন্দু বসিয়ে এগোলে দরজার ওপাশেই তো আপনচিত্র। এরপর পশ্চিমের ডাক। স্থলপথে যেতে সময় লাগবে, জলপথ এখন প্রায় অচল, বাকি রইল উড়ালযাত্রা। নামা যাক ইউরোপে, আশপাশে অনেক ঝাল-ঝোলের গল্প। অনেক ছুরি-কাঁচির সঙ্গে পাঁচ-আঙুল পাল্লা দিচ্ছে দীর্ঘদিন। অতএব, অগ্রবর্তী বাহিনীর সমর্থনে বিজয় সম্ভব হতে দিন-ক্ষণ বেশি ব্যয় হবে না। এবার মহাসাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পতাকা পোঁতার পালা। ঢোল–শোহরত করে শুরুর সময় নির্ধারিত হলে মনে হয় না সমাগম হতে বেশি সময় লাগবে। ওখানে দাঁড়িয়েই স্থানীয় চিত্রটি নজর করার পাশাপাশি এশিয়ার পূর্বাঞ্চলটির কথা ভাবা যাবে।
আসুন লুই পা, আসুন আলাওল, আসুন মাইকেল, আসুন রবীন্দ্রনাথ, আসুন বঙ্গবন্ধু,—আসুন বৈশাখ, আসুন ডাল-ভাত—আসুন একুশে, আসুন মুক্তিযুদ্ধ—পায়ের ধুলো, গায়ের ময়লা ঝেড়ে হৃদয়ে হৃদয় রাখি। বিশ্বময় গড়ে তুলি বাংলা ভাষার অমিয় সংস্কৃতি।
---দুই.---
কখন যে কোন বিষয় মোচড় দেবে বোঝা দায়। ঘর থেকে বেরোনোর মুখেই বিপত্তি মাথা ধরে টান দিল। ঢাকা থেকে দোহা হয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস–যাত্রা। আমন্ত্রণটি কবিতা উৎসবের, আর যাত্রাপথের বিমান মাশুলও পরিশোধিত হয়েছে উৎসবকর্তাদের মাধ্যমে। তবে বিপত্তি কোথায়? বিপত্তি, যে মাধ্যমে মাশুল পরিশোধিত হয়েছে তার নিশ্চিতকরণ নিয়ে! বিমানবন্দরে নানা টানাপোড়েন উতরিয়ে বুঝিবা একটা ঝুঁকি ঝুলিয়ে রেখেই শুরু করা গেল যাত্রা।
এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহের আমেজটুকু রাত তিনটায় চোখমুখে ঝাপ্টা দিয়ে যায়। ছয় ঘণ্টার যাত্রা। দোহা এসে দুই ঘণ্টার বিরতির পর আবার শুরু হলো টানা ষোলো ঘণ্টার যাত্রা—লস অ্যাঞ্জেলেসের জন্য।
একসময় ভারি চকচকে অপরাহ্ণে ঢুকে গেলাম নগরীর অভ্যন্তরে। চারদিকে মাথা তোলা পাহাড়ের পেটের মধ্যে বসতি। ঘন সবুজের অপরূপ সমারোহে চিনিয়ে দিল বৈচিত্র্যের আন্তরিক মাত্রা। তাপমাত্রা সতেরো-আঠারোর বেশি নয়, মৃদু হাওয়ায় বসন্তের পুলক।
এখানে যাঁর প্রথম আহ্বান আমাকে মূকাভিনয় পর্বটি মনে করিয়ে দিল, তিনি তো একদিন বাংলাদেশেই ছিলেন। যশোরের ধুলো-জল ছেঁকে-ছেনে ঢাকা এসে ছড়িয়েছিলেন প্রতিভার দ্যুতি। অভিনয়ে পটু, তাও আবার বাক্‌বিহীন সবই তো ছিল তাঁর ঝুলিতে। তারপরও অন্য এক আকর্ষণ, ভিন্ন এক প্রণয় তাঁকে দেশ থেকে বৈদেশে নিয়ে এসেছে! তা-ও বুঝি তিন যুগ আগেকার অমোঘ আখ্যান। তিনি—কাজী মশহুরুল হুদা হাতে গহনা বাজিয়ে, আঙুলের অলংকার ঘুরিয়ে—আজ এই বেলা আমাকে ভাত ও সরপুঁটি মাছের ঝোলে নামিয়ে দিলেন। ‘স্বদেশ’-এর ভান্ডারে করলা ভাজি থেকে বেগুন-মানকচু, মুগডাল কিছুই বাদ নেই। লস অ্যাঞ্জেলেসের এই ‘লিটল বাংলাদেশ’ যেন বৈশাখের বৈভব নিয়ে এল, দিল বাংলার পূর্ণতা।
আমার আমিতে খুঁজি সুবর্ণবন্দর!
---তিন.---
‘হলিউড’ শব্দটির সঙ্গে ঝমঝম করে ওঠে পরিপার্শ্ব এবং দৃশ্যপটে আলোর ঝলকানি নেড়ে দেয় লৌকিক ও অলৌকিক চালচিত্র।
বাস্তবের সঙ্গে কল্পনার অংশটুকু মিলিয়ে নেওয়ার অভিপ্রায়ে সকাল-দুপুর কাটল ‘গ্রিফিথ অবজারভেটরি টাওয়ার’ আর ‘বেভারলি হিলস’–এ। উপত্যকার শোভার সঙ্গে দর্শনার্থীর ঢল মিলেমিশে তৈরি করেছে বিচিত্র এক অবকাশ-প্রণালি। ছবি তোলা থেকে স্যুভেনির ক্রয়—এক পর্যায়ে ভেতর মহলে আপন অবস্থানটির জানান দিয়ে যায়।
‘উত্তর আমেরিকা কবিতা সম্মেলন ২০১৯’-এর আয়োজনকে সামনে রেখে নানা কর্মকাণ্ডের ফাঁকে সন্ধ্যায় ভয়েস অব আমেরিকার একটি সাক্ষাৎকার রেকর্ড করার ভেতর দিয়ে ফুরাল দিন। তবে এ কথাও ঠিক, দিনের সঙ্গে কে কবে পাল্লা দিতে পেরেছে? এই যে এখন সূর্যের উল্টো দিকে পৃথিবীর এ অঞ্চল তার হাসি-তামাশায় উনিশে এপ্রিল শেষ করল, তার ভঙ্গি কতটুকু পাবে গোলকের ওপারের মানুষ?
‘লাল একটি পিঁপড়েপৃথিবী
মিথ্যের মধ্যে পড়ে আছে!’
---চার.---
বেশ ঠান্ডা বাতাস, তাপমাত্রা পনেরো ছুঁই-ছুঁই। সকালে বেরোবার মুখে দূরের পামসারি ক্যামেরা টেনে নিল। যেন প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম উপকূলের পাকাপোক্ত একটি ব্যবস্থার মধ্যে একমাথা চুল নিয়ে তারা পাহারা দিচ্ছে জনবসতি। পথে পড়ল ‘ইউনিভার্সাল স্টুডিও’। ভেতরে ঢোকার মুখেই ঝাপটা দেওয়া মিশ্র ঘ্রাণ ঠেলে দিল নানা বর্ণে, ভিন্ন ভিন্ন প্রাঙ্গণে। শিশু-তরুণ-বয়সী মিলে যে সাদা-কালোর তৈলচিত্র, তা যেন কেবল আনন্দের, তা যেন কেবল শনিবারের ছুটি-উপভোগের।
হু-হু করে বেলা নেমে যায়। সন্ধ্যায় কবিতার আয়োজন। প্রবাসে বাংলা কবিতার তল ঠাহর করা বড় কঠিন! অর্থ-বাণিজ্য-সচ্ছলতার এত দেমাগের মধ্যে লাজুক কবিতার ঠাঁই পাওয়া ভার। হ্যাঁ, এসব আয়োজনের শেষ দৃশ্যে সংগীত এবং নৈশভোজের পর্ব বড় মনোহর।
‘একটি দিনের জন্য রাত ফর্সা হলে
একটি রাতের লোভে লুট হয় জীবনের ছুটি’
---পাঁচ.---
ফুরিয়ে আসে সময়। বাঁধাধরা ভ্রমণের শেষ দিন চোখ জুড়িয়ে দেয় সাগরের প্রসন্নতা। বালু ও ফেনার কোলাহলে এক জলরেখা যেন ডাক দিয়ে বলে:
 ‘তুমি ইংরেজি লেখা নিয়ে
বাংলায় কি আমার সঙ্গে খেলবে’।
উত্তর আমেরিকা কবিতা সম্মেলনে কবিতাপাঠ। মঞ্চে বসে আছেন লেখকসহ অন্য অতিথিরা। ছবি: সংগৃহীত

Sunday, October 27, 2019

‘প্রবাসে কেউ কারও নয়’ by মো. মুখলেছুর রহমান (মুকুল)

পরিবারের স্বচ্ছলতাসহ সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে নিজ মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে কাটাতে হয় প্রবাসজীবন। হয়তো একেই বলে এক ধরনের দেয়ালবিহীন কারাগার। প্রবাসে সবাই ব্যস্ত যে যার কাজে। সবার একই চিন্তা কীভাবে বেশি উপার্জন করা যায়। মা-বাবা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানদের মান অভিমান পূরণ করতে গিয়ে তারা ভুলে যান নিজের শখ।
‘দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু লিখছি। হয়তো অনেকেই ভাবতে পারেন পরবাসে আমার মতো দুখী আর কেউ নেই। ভাবাই স্বাভাবিক, সত্যিই আমি দুখী পরবাসী। বলতে পারেন কষ্টবিলাসী। দেশে সবাই থাকার পরও প্রবাসে আমি একা বড়ই একাকিত্ব। হায়রে! জীবন।’
প্রবাসে কেউ কারো নয়, নিজেই নিজের আপন। প্রবাসীদের সব থেকে বড় সমস্যা হলো একাকিত্ব, আর এ কারণেই অনেক সময় অনেক ছোট সমস্যাগুলোও অনেক বেশি অস্থির ও যন্ত্রণা দেয়। আর প্রবাসীদের তার আপনজন বা প্রিয়জন কষ্ট দিলে সেটা সহ্য করার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলে। অনেকে একাকিত্বের কারণে আত্মহত্যাও করে। প্রবাসীরা তাদের আপনজন কত ভালবাসে সেটা শুধু সে নিজেই জানে।
প্রবাসীরা দুঃখ বিলাসী হবার কোনো অবকাশ নেই কারণ আমরা তো একটু সুখের আশায় পাড়ি দিয়েছি অজানার দেশে। আমাদের দুটি চোখ এক চিলতে সুখ দেখার জন্য অপলকে চেয়ে আছে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর। দুঃখ নিয়ে বিলাসীতা করার সুযোগ আমাদের নেই।
দুঃখ নিবারণ করার ইচ্ছা নিয়ে মা মাটি ছেড়ে অজানা অচেনা এক দেশের মাটিতে আশার ঘর বেঁধেছি, আমরা দুঃখ বিলাসী নই, আমরা সুখের কাঙাল। বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সুখ খুঁজে বেড়াই। ঘুরে বেড়াই পরদেশের এপার-ওপার। কতকিছুই না করি সবকিছু তো লিখে বোঝানো সম্ভব নয়, অনুভবে আমাদের কষ্ট বোঝা যাবে।
দুঃখ বিলাসী ওরাই হয় যাদের জীবনে সুখের ছোঁয়া লাগে, যাদের জীবনে সুখ শান্তির নেই কোনো অন্ত নেই কোনো অভাব। ‘আমি তাদের কেউ নই, আমি এতটুকু সুখ সন্ধানী একজন খেটে খাওয়া মানুষ আমার জীবনে সুখের ছোঁয়া লাগেনি। প্রবাসী নিঃসঙ্গ জীবনে সুখ আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। সুখ খুঁজতে গিয়ে অবশিষ্ট সুখটুকু আমি হারিয়ে ফেলেছি।’
হাজারে একজনের ভাগ্যে যদি সুখ থাকে ৯৯৯ জন বুকভরা হাহাকার নিয়ে এই প্রবাসে ধুকে ধুকে মরছে, আমি ৯৯৯ জনের একজন তাই আমি আমার কথা বলবো ৯৯৯ জনের কথা বলবো। দু’একজনের সুখের কাহিনি নাইবা শুনলেন। আমাদের কথা শুনুন এবং জেনে রাখুন যারা প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকার লড়াই করে, যারা সুখের তরে সুখ হারায় ওদের কথা জেনে রাখা খুবই জরুরি কারণ ওদের ত্যাগ তিতিক্ষার ফসল হলো দেশবাসী আপনজনের মুখের নির্মল হাসি।
সত্যি কথা বলতে কি, প্রবাসীর কষ্ট প্রবাসী ছাড়া আর কেউ বোঝে না। অনুমান করে সব কষ্ট বোঝা যায় না। অনুমান করে যদি প্রবাসীদের কষ্ট বোঝা যেত তাহলে এই লেখার প্রয়োজন হত না। আমি এসব কেন লিখছি? কেন প্রবাসীদের প্রতি আমার এই দুর্বলতা? এই প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো আমি তাদের একজন।
প্রবাসীরা ভালো থাকুক। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সেই আমাদের অর্থনীতির চাকা হয় বেগবান। আমরা সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছি। সম্মান করা উচিত সব প্রবাসী ভাইদের। আর কোনো প্রবাসী ভাই যেন দুঃশ্চিন্তা করে বিদেশের মাটিতে প্রাণ না হারায় সেই কামনা। ভালো থাকুক প্রবাসীরা।