Monday, February 3, 2014

ভারতের জাতীয় জাদুঘরের ২০০ বছর পূর্তি

কলকাতায় ভারতের জাতীয় জাদুঘরের দ্বিশত বর্ষপূর্তি
অনুষ্ঠানের একটি মুহূর্তে আলাপচারিতায় মগ্ন প্রধানমন্ত্রী
মনমোহন সিং ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।এএফপি
ভারতের জাতীয় জাদুঘরের ২০০ বছর পূর্ণ হয়েছে৷ এ উপলক্ষে কলকাতায় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং গতকাল রোববার দ্বিশত বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন৷ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এশিয়ার অন্যতম পুরোনো কলকাতার এই জাতীয় জাদুঘর দেশের ঐতিহ্য এবং পুরাতত্ত্ব রক্ষায় নেতৃত্বের ভূমিকায় উঠে আসুক৷ ১৮১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠিত এই জাদুঘরই ভারতের জাতীয় জাদুঘর৷ প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের দ্বিশত বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা এবং স্মারক ডাকটিকিটের উন্মোচন করেন৷ অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী চন্দ্রেশ কুমারী কাটোচ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ৷

বাশারের ওপর ফের চাপ বাড়াবে পশ্চিমারা

বাশার আল-আসাদ
সিরিয়ায় মানবিক ও রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে সংকট বাড়তে থাকায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সরকারের ওপর আবার পশ্চিমা দেশগুলো চাপ বাড়াবে৷ সদ্যসমাপ্ত জেনেভা শান্তি আলোচনায় আশানুরূপ সাফল্য না আসার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়৷ পশ্চিমা কূটনীতিকেরা জানান, সিরিয়ার হোমস ও অন্যান্য অবরুদ্ধ শহরে ত্রাণকর্মীদের প্রবেশাধিকারের সুযোগ নিয়ে এ সপ্তাহেই নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব তৈরি করা হতে পারে৷ জেনেভা শান্তি আলোচনা শুরুর আগেই হোমসে আটকে পড়া আড়াই হাজারের বেশি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রীবাহী ট্রাক পাঠিয়েছিল জাতিসংঘ৷ কিন্তু সিরিয়ার সরকার ওই ট্রাক ঢুকতে দেয়নি৷ এমনকি সিরিয়াবিষয়ক জাতিসংঘ ও আরব লিগের বিশেষ দূত লাখদার ব্রাহিমি জেনেভা আলোচনায় চাপ দিলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি দামেস্ক৷ কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই গত শুক্রবার শান্তি আলোচনা শেষ হয়৷
কূটনীতিকেরা জানান, প্রেসিডেন্ট বাশারের পক্ষের মধ্যস্থতাকারীরা হোমস থেকে কেবল নারী ও শিশুদের বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন৷ কিন্তু কূটনীতিকেরা বলেন, এতে শহরে অবস্থানরত বািক নাগরিকদের ওপর সরকারের গণহত্যা চালানোর পথ খুলে যাবে৷ এদিকে অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রহিবিশন অব কেমিক্যাল উইপনসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, এ পর্যন্ত সিরিয়ার মারাত্মক বিপজ্জনক রাসায়নিক অস্ত্রের মাত্র ৪ শতাংশ দেশটির বাইরে নেওয়া সম্ভব হয়েছে৷ সিরিয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান: সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ মুয়াল্লেম গত শনিবার দাবি করেন, জেনেভা শান্তি সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সিরিয়ার সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছিল৷ কিন্তু দামেস্ক তা গ্রহণ করেনি৷ তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এ দাবি নাকচ করে দিয়ে এর মুখপাত্র জেন সাকি বলেন, সরাসরি মধ্যস্থতার কোনো রকম চেষ্টা করেনি যুক্তরাষ্ট্র৷ এএফপি৷

লেকের তলার গুহায় বিয়ে, নতুন রেকর্ড

লেকের তলার গুহায় বিয়ে
বিয়ের দিন পোশাক ভিজে গেলে অধিকাংশ দম্পতিই নিশ্চিত বিরক্ত হবেন৷ কিন্তু বর ও কনে যখন দুঃসাহসিক কোনো অভিযানে নামবেন, তখন ব্যাপারটা ভিন্ন হতেই পারে৷ জাপানের হিরোয়ুকি ইয়োশিদা এবং যুক্তরাষ্ট্রের স্যান্ড্রা স্মিথ নিজেদের বিয়ের শপথ নিয়েছেন থাইল্যান্ডের সং হং লেকের তলে একটি গুহায়৷ জায়গাটির অবস্থান ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৩০ মিটার নিচে৷ ঘটনাটি ঠাঁই করে নিয়েছে গিনেস কর্তৃপক্ষের রেকর্ড তালিকায়৷ অভিনব ওই বিয়ের জন্য অনেক আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেন ইয়োশিদা ও স্মিথ৷ তাঁরা নিজেরাও পেশাদার ডুবুরি৷ তবে বিয়ে বলে কথা৷
পানির নিচে থাকতে হবে দীর্ঘ সময়৷ এ জন্য তাঁরা পেশাদার প্রশিক্ষকের কাছে ছয় মাস ধরে নিবিড় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন৷ তিন ঘণ্টা ১০ মিনিট স্থায়ী তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় গত সেপ্টেম্বরে৷ তাঁদের বন্ধু এবং ডুবুরি প্রশিক্ষক বেন রেমেনেন্টস পালন করেন বিয়ের শপথ পড়ানোর অানুষ্ঠানিক দায়িত্ব৷ সবচেয়ে কঠিন পর্বটি ছিল অাংটি বিনিময়ের৷ অাংটি যাতে পিছলে পড়ে হারিয়ে না যায়, সে জন্য বিশেষ সুতার সাহায্যে বাঁধা ছিল অাগে থেকেই৷ অার শ্বাসকার্য চালানোর জন্য যন্ত্রনির্ভরতার কারণে বর আলিঙ্গন করতে পারেননি কনেকে৷ পিটিঅাই৷

তালেবান থেকে নিজেকে দূরে রাখছেন ইমরান

ইমরান খান
পাকিস্তানের রাজনৈতিক দল তেহরিক-ই-ইনসাফ পাকিস্তানের (পিটিঅাই) প্রধান ইমরান খান নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) পক্ষে শান্তি অালোচনায় অংশ নিতে রাজি হননি৷ তিনি বলেছেন, অালোচনার জন্য টিটিপির নিজস্ব প্রতিনিধি থাকা উচিত৷ nতালেবানের সঙ্গে শান্তি অালোচনার জন্য টিটিপির পক্ষ থেকে ইমরানকে মনোনীত করা হয়েছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়৷ এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি গত শনিবার একটি বিবৃতি দেন৷ ওই বিবৃতিতে ইমরান খান বলেন, শান্তি অালোচনার জন্য সরকার চার সদস্যের যে কমিটি গঠন করেছে, তার প্রতি পিটিঅাইয়ের পূর্ণ অাস্থা রয়েছে৷ তবে অালোচনা এগিয়ে নিতে পিটিঅাই কী ধরনের সহায়তা দিতে পারে, সে ব্যাপারে দলীয় বৈঠকে অালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে৷ পিটিঅাইয়ের তথ্যসচিব শিরিন মাজারি বলেন, ইমরানকে সরকারের সঙ্গে শান্তি অালোচনায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব দিয়ে তাঁর দলের সঙ্গে তালেবান কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি৷ ডন৷

কংগ্রেসের নজর শেষ অধিবেশনে

কংগ্রেস এবারের নির্বাচনকে ধর্মনিরপেক্ষ বনাম
সম্প্রদায়িকতার তকমায় মুড়ে দিতে চাইছে
ভারতের লোকসভার আসন্ন বাজেট অধিবেশনে কংগ্রেস কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করাতে চায়৷ এই বিলগুলোর কয়েকটি যেমন দুর্নীতি রোধে সহায়ক হবে, অন্যগুলো আর্থিক সংস্কারের জন্য জরুরি৷ কিন্তু বিরোধীরা তা হতে দেবে কি না, অধিবেশনের প্রাক্কালে সেটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিচ্ছে৷ আগামী বুধবার দুই সপ্তাহ স্থায়ী অিধবেশন বসছে৷ গত মাসে কংগ্রেসের এক দিনের অধিবেশনে সহসভাপতি রাহুল গান্ধী দুর্নীতি রোধে তাঁর মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন৷ লোকপাল বিল পাস হলেও এর পরিপূরক আরও দুটি বিল পাস না হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন৷
সেই বিল দুটি হলো হুইসেল ব্লোয়ার বিল ও সিটিজেনস চার্টার৷ দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের রক্ষায় লোকপালের সঙ্গে হুইসেল ব্লোয়ার বিল আনতে চেয়েছিলেন আন্না হাজারে৷ একই সঙ্গে তিনি চেয়েছিলেন, কোন কাজে কত দিন লাগবে, তা নির্ধারণ করা৷ ওই সময়ে কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সিটিজেনস চার্টার বিল পাস করতে হবে৷ কংগ্রেস চাইছে, সংক্ষিপ্ত এই বাজেট অধিবেশনে এই দুই বিলের পাশাপাশি আর্থিক সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি বিলও পাস করতে৷ বাজেট অধিবেশন শুরুর দিনেই কংগ্রেস ও বিজেপির বাইরের দলগুলো বৈঠক করে তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের প্রক্রিয়ায় গতি আনতে চাইছে৷ নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা নিতে পারে, কংগ্রেসকে এমন কোনো সুযোগ দিতে চায় না এসব দল৷ কংগ্রেস সরকারকে কোনো রকমের কৃতিত্ব দিতে বিরোধীরা আর রাজি নয়৷ এ কারণে রাজ্যসভায় সীমান্ত বিল পাস করা নিয়েও সংশয় রয়েছে৷ শনিবার কর্ণাটকে কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী বিজেপিকে আক্রমণ করে বলেছিলেন, বিজেপি বিষের খেত তৈরি করেছে৷ গতকাল রোববার নরেন্দ্র মোদি উত্তর প্রদেশে তার জবাব দিয়ে বলেন, কংগ্রেসই বেশি বিষপান করেছে৷ ভোটের সময় যত ঘনিয়ে আসছে, কংগ্রেস ততই এবারের নির্বাচনকে ধর্মনিরপেক্ষ বনাম সাম্প্রদায়িকতার তকমায় মুড়তে চাইছে৷ কংগ্রেসের লক্ষ্য, রাজনৈতিক শক্তিকে দুই শিবিরে ভাগ করে বিজেপিকে কোণঠাসা করা, যাতে কেন্দ্রে ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠন হতে পারে৷

রাষ্ট্রপতি মুখার্জিকে ভাবতে হবে

প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের পরে প্রণব মুখার্জিরই তাঁর উত্তরাধিকারী হওয়ার কথা। মূলত এ কারণেই ব্যাপক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে ঠেলে ওপরে পাঠানো হয়। সোনিয়া গান্ধী তাঁর সন্তান রাহুল গান্ধীকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বানাতে বদ্ধপরিকর। রাহুল গান্ধীই ছিলেন প্রণব মুখার্জির রাজনৈতিক অভিলাষের পথের বাধা। রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণ করা না-করার সিদ্ধান্ত প্রণব মুখার্জির ওপরই নির্ভর করে। কিন্তু যেই তিনি ঘোষণা করলেন যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হচ্ছেন না, সেই পরিষ্কার হয়ে গেল, সাজঘরে অপেক্ষা করতে করতে তিনি ক্লান্ত হয়ে গেছেন। সোনিয়া গান্ধীও সঙ্গে সঙ্গে এই ঘোষণা মেনে নিলেন, প্রণব তো রাহুলের জন্যই পথ ছেড়ে দিলেন। প্রণব মুখার্জি কংগ্রেসের খারাপ সময়ে যেভাবে উদ্ধারকর্মীর ভূমিকায় নেমেছিলেন, তাতে তাঁর ধারণা হয়েছিল নেহরুর রাজবংশকে তিনি যেমন নিরবচ্ছিন্নভাবে সেবা দিয়েছেন, তাতে তাঁকে কখনো উপেক্ষা করা হবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রণব নিজেকে রাষ্ট্রপতির পদের জন্য তৈরি করেননি। রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি যা বলতে পারেন, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তেমন মন্তব্য করা থেকে নিজেকে বিরত রাখা উচিত ছিল তাঁর। কিন্তু কেজরিওয়াল তাঁর আইনমন্ত্রীর পক্ষ নিয়ে যা করলেন তাতে বাজে নজির তৈরি হলো। তাঁর উচিত ছিল, দুই পুলিশের ‘ঔদ্ধত্যের’ প্রতিকারের দায়িত্ব রাজ্যের মুখ্য সচিবকেই দেওয়া।
তাঁর যুক্তি হলো, তিনি তো সংবিধান লঙ্ঘন করেননি। এটা এক অদ্ভুত যুক্তি, কেননা তিনি সেই সংবিধানের ভাষা ও চেতনার কথা বলছেন, যা সব ক্ষমতা দিয়েছে নির্বাহী বিভাগকে আর মুখ্যমন্ত্রীকে বানিয়ে রেখেছে নামমাত্র সরকারপ্রধান। মুখ্যমন্ত্রীর এই ধরনা অসাংবিধানিক নয় এমনতর যুক্তি ধোপে টিকবে না। তিনি উপলব্ধি করতে পারেননি, যে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভেতরে তাঁর দুর্গ, তারা মুখ্যমন্ত্রীর তরফে ধরনা জাতীয় কর্মসূচি চায় না, তারা চায় নিয়মতান্ত্রিক প্রশাসন। কিন্তু কেন রাজনৈতিক বিষয়ে প্রণব মুখার্জি মন্তব্য করলেন, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তিনি রাজনীতি মেশানো বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। দেশের সামনে উপস্থিত হওয়া সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি এমনভাবে মন্তব্য করে যাচ্ছেন, যেন তিনি দেশ চালানোর সভার সভাপতি। প্রজাতন্ত্র দিবসের বক্তৃতায় তিনি আগের সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং অনেকের মুখ থেকে বের করেছেন রাগত প্রতিক্রিয়া। কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়াসহ (সিপিআই) কয়েকটি রাজনৈতিক দল তাঁর ওই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বলে চিহ্নিত করেছে। রাষ্ট্রপতি মুখার্জি যা বলেছেন তা সাধারণভাবে সঠিক। যেমন, জনপ্রিয় প্রতিবাদ কখনো দেশ পরিচালনকার্যের বিকল্প নয় কিংবা বলেছেন, লোকচক্ষুর সামনে হাজির করা ভাবমূর্তির মধ্যে অনেক শঠতা থাকে। কিন্তু তিনি ভুলে গেছেন যে তিনি নিছকই সাংবিধানিক প্রধান। নির্বাচিত সংসদ এবং রাষ্ট্রের আইনসভা রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তির কাছ থেকে অন্য এ রকম মন্তব্য কেউ আশা করে না। রাষ্ট্রপতি মুখার্জি সাধারণভাবে যা বলেছেন তা যে সঠিক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
রাজনীতিকে তিনি পরিচিত বিচরণভূমি ভেবেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি সেই ভূমি ছেড়ে দিলেন। সোনিয়া গান্ধীর দ্বারা তাঁর বঞ্চনা হয়তো নিখাদ। ‘সরকার দাতব্য দোকান নয়’ বলেছেন রাষ্ট্রপতি মুখার্জি। নির্বাচনের আগে জনসমর্থন কাড়ার জন্য সরকারের নানা রকম প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করে তিনি এটা বলেন। সব রাজনৈতিক দলই এটা করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যখন ‘গরিবি হটাও’ স্লোগান তুলেছিলেন, সেই মন্ত্রিসভায়ও মুখার্জি ছিলেন। ডিএমকে পার্টির সমর্থন ধরে রাখতে মনমোহন সিং সরকার তাদের বেশ কিছু সুবিধা দিয়েছিল। সবাই জানে, কীভাবে মুলায়ম সিং যাদবের দলের সমর্থন পেতে তাঁর বিরুদ্ধে করা সিবিআইয়ের মামলাটি তুলে নেওয়া হয়েছিল। অনাস্থা ভোটে মনমোহন সিং সরকারের পতন ঠেকাতে যে ‘দেওয়া-নেওয়া’ হয়েছিল, মুখার্জিও তার অংশ ছিলেন। মুখার্জি যদি এসবের এতই বিরুদ্ধে, যা তাঁর এখনকার মন্তব্য থেকে মনে হচ্ছে, তাহলে কেন তিনি মুখ খুললেন না? তাঁর বিরোধিতা নিশ্চয়ই গণ্য হতো, কারণ তিনি জ্যেষ্ঠ নেতা। যে সময় মিসেস গান্ধী পাঞ্জাব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি জ্ঞানী জৈল সিংয়ের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে তাঁর কাছে সরকারি কাগজপত্র পাঠানো বন্ধ করলেন, সে সময়ও মুখার্জি মন্ত্রী ছিলেন। মিসেস গান্ধী সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘন করেছিলেন।
পারতেন মুখার্জি সে সময় প্রতিবাদ করতে! রাষ্ট্রপতির দপ্তর এমন এক প্রতিষ্ঠান, যাকে হেয় করা উচিত নয়। তার পরও রাজনীতিবিদেরা তা করে থাকেন। মুখার্জিও যদি সেটা করেন, তাহলে সেটা হবে তাঁর মতো বিচক্ষণ মানুষের জন্য দুঃখজনক উদাহরণ। মুখার্জির নীরবতার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো, ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির ঘটনা। তিনি সে সময় তাঁর বাবা জওহরলাল নেহরুর তৈরি করা সংবিধানের ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছিলেন। মুখার্জি সে সময় ইন্দিরাপুত্র সঞ্জয় গান্ধীর অসাংবিধানিক ক্ষমতাকেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। সেই জরুরি অবস্থার সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ফল হলো, রাজনীতি থেকে নৈতিকতার বিদায় নেওয়া। সেটা এমন এক ভয়ের সময়, যখন রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দিন আলি আহমেদ মন্ত্রিসভায় পাস হওয়ার আগেই সরকারি ঘোষণায় সই করে ফেলতেন। আমার অভিজ্ঞতা হলো, প্রধানমন্ত্রীরা রাষ্ট্রপতির কথায় কমই মনোযোগ দেন। যাঁরা রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির জায়গায় সংসদীয় পদ্ধতিকে পছন্দ করেছিলেন, সংবিধানের সেই কাঠামোকারেরা ঠিক করে দিয়েছেন যে রাষ্ট্রপতি কী করতে পারেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে কংগ্রেস রাষ্ট্রপতির পদকে অবান্তর করে দিয়েছে। ঠিক-বেঠিক, নৈতিক-অনৈতিকের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্যরেখা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব হলো সেই রেখাটা বজায় রাখা। বক্তৃতামঞ্চ থেকে বলা সহজ যে দেশের জন্য কোনটা বিপজ্জনক আর কোনটা তা নয়। রাষ্ট্রপতি মুখার্জি যতই সঠিক হয়ে থাকুন না কেন, তাঁর উচিত ফিরে দেখা যে মন্ত্রী থাকাকালে যা যা করেছেন তার কতটা সঠিক ছিল। কেবল আইনি বিচারেই নয়, নৈতিক বিচারেও। বল এখন তাঁর কোর্টে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

ক্ষতিপূরণের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থাও জরুরি

১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা
নির্বাচন না ছিল অবাধ, না ছিল সুষ্ঠু
৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এক বিতর্কে বলা হয়, ওই নির্বাচন না ছিল অবাধ, না ছিল সুষ্ঠু। সে কারণে তা সঠিক বা যথার্থ হয়নি বলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ঘোষণা করা উচিত। পাঠক কাজী এস আহমদের মন্তব্য: যে যতই চেঁচাক, ওনারা কানে তুলো দিয়েছেন আর চোখে পাশের দেশের দেওয়া রঙিন চশমা। অধিকাংশ জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন এবং বাকি জায়গায় একপ্রকার ভোটার ছাড়া ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার যে আনন্দ ওনারা পেয়েছেন, সেটা অনেকটা বাঘের রক্তের স্বাদ পাওয়ার মতো। এই স্বাদ ভুলে বাস্তবতার নিরিখে গণতন্ত্রের ডাকে ওনারা সাড়া দেবেন, অধিকাংশ জনগণের চাওয়া এবং বিদেশি বন্ধুদের উপদেশকে উপযুক্ত সম্মান দেবেন, সেটা আশা করা যদিও বাতুলতা, তবু আশা করব, আমাদের মনের কথা বুঝে ওনারা অনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসবেন। সোলায়মান: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আগেই সরকারকে সমর্থন দিয়েছে, নতুন করে অন্য কিছু বলার অবকাশ নেই। আপনারা পর্যবেক্ষকই পাঠাননি, তাহলে কীভাবে বুঝলেন নির্বাচন খারাপ হয়েছে। দেশি পর্যবেক্ষকেরা তো খুব একটা খারাপ বলেননি। জামায়াত-বিএনপি যে সহিংসতা ঘটিয়েছে, এটি যদি আপনাদের দেশে ঘটাত, তাহলে কি আমাদের ভোটের অর্ধেকও কালেকশন হতো?
সরকার যথেষ্ট নিরাপত্তা দিতে পারাতে স্থগিত কেন্দ্রে ভোটারের উপস্থিতি ৫০ শতাংশের ওপর ছিল। ওই কেন্দ্রগুলোতে অন্য কিছু হওয়ারও সুযোগ হয়নি। হেলাল: শুধু বিদেশেই নয়, বাংলাদেশের বোকা জনগণ এ রকমের অদ্ভুত প্রহসনের নির্বাচন এর আগে কখনো দেখেনি! আর এখন বিরোধী দলগুলোকে শেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে আর তারা কোনো রকমের সরকারের অনৈতিক কাজের সমালোচনাই করতে না পারে! মো. গোলাম মামুন চৌধুরী: বিদেশিরাই বিএনপি-জামায়াতের মাথায় ইট ভেঙেছে। বিএনপি বিদেশিদের ওপর অতিনির্ভরতা দেখিয়ে ডুবেছে। বিদেশিরা নির্বাচনের আগে যেভাবে বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে গান গেয়েছিল, নির্বাচনের পরে ঠিক উল্টো পথেই সরকারকে সমর্থন দিয়ে বক্তব্য ও অভিনন্দন জানিয়েছে। আসলে বিদেশিরা জোয়ারের আগে আগেই চলে। এখন বিএনপি আর কিছু করতে পারবে বলে মনে হয় না। ২০১৯ সাল পর্যন্ত যদি শক্তি ধরে রাখতে পারে তাহলে কিছু হতে পারে। আর যদি শক্তি হারিয়ে ফেলে তাহলে আওয়ামী লীগের ভিশন-২০২১ পরিকল্পনা এগিয়ে যাবে। আব্দুল মজিদ কাজী: তাদের মাথাব্যথা খুব বেশি মনে হচ্ছে। আমাদের দেশের বিরোধী দলকে নির্বাচনের সুযোগ দিয়েই বা কী লাভ। যদি তারা সরকার গঠনের মতো মেজরিটি না হয়, তবে তো আবার তাদের তোষামোদ করতে হবে সংসদে আসার জন্য। এই হচ্ছে আমাদের দেশ!
১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় নিজামী-বাবরসহ ১৪ জনের ফাঁসি
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনায় দায়ের করা দুটি মামলার একটিতে সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং দুটি গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ১৪ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এ নিয়ে এ ডব্লিউ হক লিখেছেন: যত দ্রুত রায় কার্যকর করা যায়, তত দ্রুত দেশের মঙ্গল। আপিল, নানা টালবাহানা, চাপটাপ অগ্রাহ্য করে ফাঁসি এখনই কার্যকর করা উচিত। সাব্বির আহামেদ: বিচারক সাজাপ্রাপ্তদের নাম ঘোষণা করে বলেন, পৃথক দুই মামলায় যাবজ্জীবন ও ফাঁসির আদেশ দেওয়া হলো। দুটি সাজা একসঙ্গে চলবে এবং আসামিদের হাজতবাস সাজা থেকে বাদ যাবে। মানে ১৪ বছর জেল খাটার পর কি ফাঁসি হবে? বিরোধী দলবিহীন সংসদ দশম সংসদে রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলের আসনে অভিষিক্ত হওয়ার পরও একে সরকারি-বিরোধী দল বা বিরোধী-সরকারি দল বলেই মনে করা হচ্ছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান আলী রীয়াজের এই কলামের মন্তব্যে পাঠক সায়েম সজল লিখেছেন: যেমন আমরা, তেমনি আমাদের সরকার ও বিরোধী দল। আমরা দুমুঠো ভাতের জোগাড় হলে দরজায় খিল দিই। দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে, আমাদের বয়েই গেল!! যত দিন না আমাদের দেশের প্রতি সেন্স অব ওনারশিপ (sense of ownership) আসবে, সরকার, বিরোধী দল যার যা খুশি করতেই থাকবে। সাইফ আল খান: পরাজয়ের ভয়ে হোক বা গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করতে হোক বিএনপি জোট নির্বাচনে না এলে বর্তমান নির্বাচিত সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হবে কেন? সোলায়মান: বিএনপি তো গত পাঁচ বছর সংসদে যায়নি। তখন কি বিরোধী দলবিহীন ছিল না?
কমল হাসান: কটি লাইনের সূত্র ধরে বলতে হয়, আমরা সংসদের বর্তমান বিরোধী দলকে যেই বিশেষণেই বিশেষায়িত করি না কেন, এ প্রশ্ন ঘুরেফিরেই আসবে যে, ‘এযাবৎকালে বিরোধী দলের সংসদে ভূমিকা কী ছিল?’ কী হতে পারত আর কী হয়েছে? এসব হতাশার বাণী চর্চা বন্ধ করে বরং যা আছে তারই সর্বোত্তম ব্যবহার কী উপায়ে করা যায়, সেটাতেই মনোনিবেশ করা উচিত। বিরোধী দল হলো সরকারেরই একটি ছায়া। কিন্তু আমাদের বিরোধী দলগুলো কোনোকালেই সেই সংজ্ঞাতে পড়েনি! বরং সাধারণের জীবনযাপনে সাক্ষাৎ যমরূপে আবির্ভূত হয়েছে! তাদের নিজেরই ধারণা ‘বিরোধী দলের কাজ হলো শুধুই বিরোধিতা করা’। শহিদুল ইসলাম: নয়া এক গণতন্ত্র পেয়েছি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর। কোথাও এ ধরনের গণতন্ত্র নেই। প্রচলিত ধারার গণতন্ত্রের সংজ্ঞার সঙ্গে বাংলাদেশি গণতন্ত্রের কোনো মিল নেই। এই গণতন্ত্রে কোনো ভোটের প্রয়োজন হয় না। সংসদেও দরকার হয় না বিরোধী দলের। বিরোধী নেত্রী আছেন, আছেন তাঁর দলের মন্ত্রীরা। দলের প্রধান সরকারের বিশেষ দূতও। সরকার আর বিরোধী দলকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। শওকত আলী: ২৯ জানুয়ারি যে সরকারকাঠামো এবং সংসদ শুরু হলো, তা ভবিষ্যৎ গণতন্ত্র ও রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। জনগণের ব্যাপক অংশ নেওয়া ছাড়াই নির্বাচন হওয়ার ধারা তৈরি হবে, যা অদূর ভবিষ্যতে এই পদ্ধতি বারবার ব্যবহার হবে। জনগণ শুধুই তাকিয়ে দেখবে।
যারা নির্বাচনে জিতে উল্লাস করছে এবং যেসব সমর্থক, সুশীল সমাজ সরকারকে বাহবা দিচ্ছে, তাদেরও একদিন অনুতাপ করতে হবে এই ভুলের জন্য। কিন্তু সেদিনও আমরা সাধারণ জনগণ শুধুই তাকিয়ে দেখব। কপাল পুড়বে আমাদের কিন্তু বলতে পারব না কিছুই। রানা প্লাজা ধস: ক্ষতিপূরণ চূড়ান্ত, বাগড়া মালিকদের রানা প্লাজায় নিহত, নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজন এবং আহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করেছে সরকারি কমিটি। কিন্তু এ নিয়ে বাগড়া বাধাচ্ছেন পোশাকমালিকেরা। এ নিয়ে মন্তব্য করে পাঠক মনিরুজ্জামান লিখেছেন: রানা প্লাজার মালিক রানার বাকি সম্পত্তি বেচে আবার রানা প্লাজার জায়গায় ভবন বানিয়ে দোকান-অফিস বেচে টাকার জোগান দেওয়া যেতে পারে। পোশাকমালিকদের সম্পত্তি একইভাবে নিলাম করে টাকার জোগান দেওয়া যেতে পারে। কারণ ওনারা জীবনবিমা করেননি। রেজা: যথাযথ ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থাও জরুরি। সাইফুর সাহিন: আদালত নির্দেশিত কমিটির ক্ষতিপূরণের সুপারিশ অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপে বাস্তবায়ন করার দাবি জানাই।

হাসান রুহানির হারানো সুযোগ

হাসান রুহানি
ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির ব্যক্তিত্বের চমক ফুরিয়ে গেছে। তাঁর এই চমক বেশ ভালো কাজ করেছিল গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময়, যখন তাঁর সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাব করার ছিল: ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ব্যাপারে একটা চুক্তি—এমন আশা জাগানো যে ইরানের কঠোর পররাষ্ট্রনীতি এবার নমনীয় হবে। কিন্তু সম্প্রতি জেনেভায় সিরিয়া নিয়ে দ্বিতীয় দফার সম্মেলনে ইরানকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন যখন প্রত্যাহার করলেন, তখন বোঝা গেল, রুহানির দেশের বিচ্ছিন্নতা দূর করতে হলে তাঁর ব্যক্তিত্বের আরও চমৎকারিত্ব প্রয়োজন; কিংবা এমনকি তুর্কি প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের তেহরান সফরের প্রয়োজন। রুহানি তাঁর পূর্বসূরি মাহমুদ আহমাদিনেজাদের স্থূল নেতৃত্বকে অতীতের গহ্বরে পাঠিয়ে দেওয়ার কাজটি ভালোভাবেই করতে পেরেছেন।
আঞ্চলিক প্রতিবেশীদের কাছে ইরানের দরজা খুলে দেওয়া, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়াদিতে পরিমিতি-সংযমের আহ্বান জানানো এবং এমনকি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণুবিষয়ক সমঝোতা চুক্তি মেনে চলার যেসব উদ্যোগ রুহানি নিয়েছেন, ইরানি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেসবের প্রতি সমর্থন জুগিয়েছে। বস্তুত, ইরানের পরমাণু কর্মসূচিবিষয়ক সমঝোতা চুক্তিটি যদি ইরানের ভেতরে ও আন্তর্জাতিকভাবে যথেষ্ট মাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে সেটাই হবে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের থেকে এ পর্যন্ত ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি ব্যক্তিগতভাবে এই উদ্যোগের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করায় বিষয়টি আরও প্রতিশ্রুতিময় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান সরকারের সম্পর্ক উন্নয়নের সম্ভাবনা মধ্যপ্রাচ্যে একটা উদ্বেগের উৎস হিসেবেই রয়ে গেছে। কারণ, এর ফলে ইরান আরও শক্তিশালী হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পশ্চিমের প্রতি রুহানির অপেক্ষাকৃত উদার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে ইরানের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে কি না।
জেনেভায় ইরানকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি বান কি মুন স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও সিরিয়ার আসাদবিরোধী পক্ষের  চাপের মুখে। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে জরুরি অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা দিয়ে আসছে। সেই সঙ্গে তাঁর লেবাননি মিত্র শক্তিশালী হিজবুল্লাহ গেরিলাদের সংগঠিত করে সিরিয়ায় আসাদবিরোধী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়তে মদদ দিচ্ছে। ইরান নিঃসন্দেহে সিরীয় সমীকরণের একটা অংশ; সিরিয়ার ব্যাপারে কোনো বন্দোবস্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ইরানের সংশ্লিষ্টতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সিরিয়ার বিষয়ে একটা দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে রুহানি কোনো বিবৃতি প্রকাশ করেননি; আসাদ সরকারের সংগঠিত নির্যাতন-গণহত্যার চিত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখার পরেও রুহানি সিরিয়ার বিষয়ে কোনো শক্ত কথা বলেননি। তাঁর এই ব্যর্থতা সিরিয়াবিষয়ক আলোচনায় ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়নি। ইরানের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করার একটা সুযোগ রুহানি সম্প্রতি পেয়েছিলেন দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের সম্পর্কে তিনি শুধু এটুকু মন্তব্য করেছেন যে জনগণকে বোঝা ও জনগণের সঙ্গে যুক্ত থাকার সামর্থ্য তাঁদের নেই। দাভোসে সমবেত বিশ্বনেতাদের প্রত্যাশা ছিল, রুহানি হয়তো সিরিয়া ও অন্যান্য আঞ্চলিক সমস্যার ব্যাপারে একটা দৃঢ় বিবৃতি দেবেন। কিন্তু তিনি তা না করে জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বরপূর্ণ একটা বক্তৃতা দিয়েছেন, ‘ইরানবিরোধী পক্ষপাত’ অবসানের কথা বলেছেন। রুহানির নিশ্চয়ই জানা ছিল যে সিরিয়ায় মানবিক বিপর্যয় সম্পর্কে তিনি কিছু না বললে তাঁর কূটনৈতিক নীতিকৌশল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ক্ষেত্রে তাঁর ব্যর্থতার কারণ হতে পারে দুটি: হয় বিদ্যমান নীতি পরিবর্তনের পক্ষে ইরানের শাসকদের মধ্যে মতৈক্য নেই, নয় তাঁরা আসাদের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখতে ঐক্যবদ্ধ।
এ দুইয়ের কোনোটাতেই কোনো চমৎকারিত্ব নেই; এ কারণেই রুহানি সিরিয়ার ব্যাপারে তাঁর দেশের অবস্থান পরিষ্কার করেননি। এ সপ্তাহে এরদোয়ানের তেহরান সফর সিরিয়া নিয়ে উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হতে পারে। এ বিষয়ে তুরস্ক ও ইরানের অবস্থান পরস্পর বিপরীত। কিন্তু এরদোয়ানের তেহরান সফরের ফলে ইরানের শাসকদের মধ্যকার বিভাজন দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম; কট্টরপন্থীরা আসাদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করতে রাজি হবেন—এমন সম্ভাবনাও নেই। ফলে এই সফরের তাৎপর্য অনিশ্চিত। সিরিয়ার ব্যাপারে একটা শক্ত অবস্থান নিতে অস্বীকৃতি জানানোর মধ্য দিয়ে রুহানি ২৩ লাখ সিরীয় শরণার্থীর স্বার্থের চেয়ে বড় করে দেখছেন নিজের স্বার্থকে। যে এক লাখ ৩০ হাজার সিরীয় নিহত হয়েছেন, আরও যে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং অবশিষ্ট যে বিপুলসংখ্যক মানুষ সীমাহীন বিপদ ও দুঃখ-কষ্টের মধ্যে রয়েছেন, তাঁদের স্বার্থও হাসান রুহানি উপেক্ষা করছেন। আরও গুরুতর বিষয় হলো, সিরিয়ায় এই মানবিক বিপর্যয়ে ইরানের ভূমিকা স্বীকার করতে রুহানি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। দাভোসে তিনি যখন বলেন, ‘এই অঞ্চলে আমরা আমাদের ভাইদের দুঃখ-দুর্দশার প্রতি নির্বিকার থাকতে পারি না’, তখন হয়তো তিনি সব দায়দায়িত্ব চাপাতে চেয়েছেন আসাদ সরকার ও তার সহযোগীদের কাঁধে। সিরিয়ার জনগণের যা প্রয়োজন, তা বাগাড়ম্বর বা ক্যারিশমা নয়। তাদের প্রয়োজন সক্রিয় পদক্ষেপ। ইরান সেই পদক্ষেপ নিতে অক্ষম বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সে কারণেই হাসান রুহানির ব্যক্তিত্বের চমক এটা প্রমাণ করতে যথেষ্ট নয় যে ইরান নামের ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি শীতল অতীত থেকে বেরিয়ে আসতে প্রস্তুত।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
বুলেন্ত আরাস: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, সাবানসি ইউনিভার্সিটি, ইস্তাম্বুল। গ্লোবাল ফেলো, উইলসন সেন্টার, ওয়াশিংটন ডিসি।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

হায় ওয়েস্টমিনস্টার!

তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিলের কথা ওঠার সময় থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবারই গণতন্ত্রের যে মডেলটির কথা বলে এসেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ওয়েস্টমিনস্টারেই তিনি তাঁর ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন’ নিয়ে সবচেয়ে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছেন। তা-ও একবার নয়, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুবার। ওয়েস্টমিনস্টারের বার্তা পরিষ্কার যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন না ছিল অবাধ, না ছিল সুষ্ঠু এবং সে কারণে তার কোনো নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। ওয়েস্টমিনস্টারে এ ক্ষেত্রে মতৈক্যটা দলমত-নির্বিশেষে। ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে অভিন্ন।
যথাযথভাবে সচল গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায়, বাংলাদেশে তার অনুপস্থিতি তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। কেননা, যে পাঁচ লাখ বাংলাদেশি ব্রিটেনে বসতি গেড়েছেন, তাঁদের ছায়া অনুসরণ করে ওই সংকটের অস্থিরতার আঁচ ব্রিটেনেও পড়তে পারে। তাই রাজনৈতিক সংলাপ এবং সমঝোতার মধ্য দিয়ে আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্যই তাঁদের আকুতি। বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল যতটা সময় সংসদের ভেতরে কাটিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটিয়েছে রাজপথে। সংসদের বিরোধী আসনে যাঁরা বসেন (বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ উভয়েই এই ঐতিহ্যের অধিকারী) তাঁদের যেহেতু সেখানে বসাটা খুবই অপছন্দের, সে কারণে তাঁদের স্থায়ীভাবে রাজপথে পাঠিয়ে দেওয়ার ধারণাটিতে যে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছে তা রাজনীতিবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে নতুন অধ্যায় সংযোজন করবে কোনো সন্দেহ নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পার্লামেন্ট ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী নব্বইয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে নবম সংসদ পর্যন্ত চারটি সংসদে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের গড় দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ শতাংশ। আর প্রতি সংসদেই এ বর্জনের মাত্রা বাড়তে বাড়তে নবমে তা সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশে পৌঁছেছিল। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের রেকর্ডটি হচ্ছে প্রায় ৬০ শতাংশ। সমর্থকদের ভাষায় ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’ এবং সমালোচকদের ভাষায় একতরফা ও প্রতিনিধিত্বহীন এবং কারও কারও ভাষায় ‘কেরামতির’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দশম সংসদে বিরোধী দলের সরকার এবং বিরোধী দল উভয় আসন অলংকৃত করার বিষয়টিকে ‘কিম্ভূতকিমাকার’ ছাড়া আর কী বিশেষণে অভিহিত করা যায়, তা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না। সাংবাদিকতার প্রথম শিক্ষাই হচ্ছে সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলে বর্ণনা করা। কিন্তু জাতীয় পার্টিকে না বলা যাচ্ছে বিরোধী দল, না সরকারি দল।
জাতীয় পার্টির একজন প্রয়াত নেতা সিরাজুল হোসেন খান এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্বৈরাচারবিরোধী জোট গঠনকে বিদ্রূপ করতে গিয়ে পল্টনের জনসভায় বলেছিলেন ‘ঘোড়া আর গাধার মিলনে ঘোড়াও হয় না, গাধাও হয় না, হয় খচ্চর।’ জাতীয় পার্টির জন্য বোধ হয় এ রকম একটি চমকপ্রদ ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক রেফারেন্স এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। জাতীয় পার্টিকে প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর সহযোগী মন্ত্রীরাও যে বিরোধী দল ভাবতে পারছেন না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাঁদের বক্তৃতা-বিবৃতি। এসব বক্তৃতার যতটুকু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে তার প্রায় সবটা জুড়েই থাকছে রাজপথের বিরোধী দলের সমালোচনা। তাঁদের বক্তব্যে জাতীয় পার্টির উল্লেখ বিরল বললেও বোধ হয় কম বলা হবে। এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরির কৃতিত্ব যে সরকারের, সেই সরকারের কতিপয় কট্টর সমর্থক যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রশাসনে যদি রিপাবলিকান চাক হেগেল প্রতিরক্ষামন্ত্রী হতে পারেন তাহলে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় বাবলু- চুন্নুরা মন্ত্রী হলে সমস্যা কোথায়? জার্মানিতে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের গ্র্যান্ড কোয়ালিশনের কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলছেন যে এর ফলে জার্মানিতে গণতন্ত্রের অবসান ঘটে না থাকলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ঝুঁকির মুখে পড়বে কেন? আপাতদৃশ্যে দৃষ্টান্তগুলো যতটা নিরীহ, বাস্তবে কিন্তু ততটাই শঠতাপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও যদি অতীতের মতো রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারপদ্ধতি চালু থাকত তাহলে বিরোধী দলের কারও মন্ত্রী হওয়া নিয়ে আলোচনাটা হতো ভিন্ন।
মিজান চৌধুরী, কোরবান আলীদের মন্ত্রী হওয়ার কথা আমাদের এত সহজেই ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। তাঁরা কিন্তু মন্ত্রী হয়েছিলেন আগে এবং পরে আওয়ামী লীগ তাঁদের বহিষ্কার করেছিল। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জার্মানিতে বাংলাদেশের সংবিধানের মতো ৭০ ধারা নেই, যাতে দলীয় সাংসদদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। জার্মানিতে প্রধান দুই দলের যে মহাজোটের সরকার, সেটির পটভূমিও ভিন্ন। চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ছোট কোনো দলকে সঙ্গে নিয়েও সরকার গঠনে সক্ষম ছিলেন না। ফলে পুনর্নির্বাচন এড়াতে মহাজোটের সরকার এবং জোটটি গড়ে উঠেছে মন্ত্রিত্ব বা ক্ষমতা ভাগাভাগির সমঝোতার ওপর নয়, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে ন্যূনতম কর্মসূচির ওপর। ডান এবং বামপন্থী দুটো দলের এ সমঝোতা তাই রাজনৈতিক আপসরফার এক নতুন দৃষ্টান্ত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে এই সমঝোতাটির সিদ্ধান্ত হয়েছে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির তৃণমূলের সাধারণ সদস্যদের ভোটে। জাতীয় স্বার্থে দলের প্রায় আড়াই লাখের বেশি সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, আর বিপক্ষে ৪০ হাজার। বিপরীতে বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে জাতীয় পার্টিকে আধা সরকারি-আধা বিরোধী (যথার্থ বর্ণনায় সুবিধাবাদী) দলে রূপান্তরিত করা পর্যন্ত সবকিছুই হয়েছে একজনের ইচ্ছায়। আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমঝোতার কথা কেউ দাবি করেছেন বলে আজ পর্যন্ত শুনিনি। অবশ্য বামপন্থী মেনন বা ইনু সাহেবদের বিভিন্ন ইসলামি মাহফিলে উপস্থিতি হেফাজতভক্ত জেনারেলের সঙ্গে সমঝোতার আলামত কি না, তা তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন।
নতুন মেয়াদে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বসম্প্রদায়ের অভিনন্দনে খরার কারণে শেষ পর্যন্ত ‘ডি এইট’ নামক গোষ্ঠীর মহাসচিবের বিবৃতির কথাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানাতে হচ্ছে। ভারত, রাশিয়া ও চীন ছাড়া বৈশ্বিক পরিসরে ওজনদার আর কোনো দেশের নাম যুক্ত না হওয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ঘুম হারাম হয়েছে বলেই এমনটি ঘটছে কি না কে জানে। তাঁরা হয়তো এ ক্ষেত্রে টনি ব্লেয়ারের মতো অবসরপ্রাপ্ত সুপারস্টারের কথা ভুলে গেছেন। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের চেয়েও জঙ্গি ইসলামপন্থীদের মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরতে উৎসুক যাঁরা, তাঁদের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক মি. ব্লেয়ার এ সপ্তাহে আবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। মিসরে ইসলামি ব্রাদারহুডকে নির্মূলে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি আবারও শিরোনামে উঠে এসেছেন। স্বৈরশাসন এবং দুর্নীতির জন্য বহুল আলোচিত কাজাখস্তান এবং মালাওয়ির হয়ে বেতনভোগী উপদেষ্টার কাজ করার ইতিহাস তাঁর রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য একপর্যায়ে ওয়েস্টমিনস্টার ছাড়াও মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের কথাও কখনো কখনো বলেছেন। নভেম্বর মাসে যখন ঢাকায় ছিলাম তখন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীও আমাকে বলেছিলেন যে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো উন্নতি করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। বিরোধীদের হয়রানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গেই তাঁর বক্তব্যে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কথা উঠেছিল। তখনই আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে আসলে আওয়ামী লীগ ওই সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার পথটাই অনুসরণ করতে চাইছে কি না। রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ,
নির্বাচন কমিশন এবং গণমাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে সরকার পরিবর্তন কি জিনিস সেটাই সেখানকার নাগরিকেরা ভুলে গেছেন। মালয়েশীয় নাগরিক জীবনে ভূমিপুত্রদের অগ্রাধিকার আর অন্যদের দ্বিতীয় শ্রেণীর অবস্থানে যেমন বৈষম্য, সে ধরনের গণতন্ত্র বাংলাদেশে কারোরই (সুবিধাভোগীরা ছাড়া) পছন্দ হওয়ার কথা নয়। সরকারপ্রধানের অনুগত থাকলে উপপ্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলে গেলে সমকামিতার অভিযোগে বন্দী রাখা এবং বিচারের নামে হয়রানির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম। সিঙ্গাপুরের শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও মালয়েশিয়া ওই দুর্নাম থেকে মুক্ত নয়। আর সংবাদপত্রের ওপর শাসকদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকায় সরকারের কোনো জবাবদিহির অবকাশ নেই। কৌশল যা-ই হোক না কেন, আলামতগুলো সুবিধার নয়। আদালতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রক্রিয়ার মৃত্যু ঘটেছে অনেক আগেই। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে ২০৪১ সালের রূপকল্প। সংসদকে বিরোধীমুক্ত করার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের জন্য যেসব নীতিমালার কথা বলা হচ্ছে, তাতে করে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনে ক্ষমতাসীনদের কর্তৃত্ববাদী বা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার আশঙ্কাই প্রবল।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

প্রতিবেশী- ভারতে বাংলাদেশ নিয়ে জরুরি কথা by আনু মুহাম্মদ

‘বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ কী জন্য বাড়ছে? এভাবে যদি বিদ্বেষ জমতে থাকে, তাহলে আপনি দুই দেশের জনগণের সংহতির যে প্রস্তাব রাখছেন, তা কী করে সম্ভব?’
কলকাতা ও দিল্লিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তিনটি সমাবেশে কথা হচ্ছিল ভারতের অনেক সংগঠক, লেখক, পরিবেশবাদী, রাজনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকের সঙ্গে। এসব সভায় এ রকম প্রশ্ন এল, অনেক বিষয়ে আলোচনা ছড়াল। মূল বিষয় ছিল রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র। এ বিষয় নিয়ে ভারতে সভা-সমাবেশ করার কারণ হলো, সুন্দরবন ধ্বংস করে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ করছে ভারতেরই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি। দ্বিতীয়ত, সুন্দরবন ভারতেও বিস্তৃত। বাংলাদেশের সুন্দরবন যদি ক্ষতবিক্ষত হয়, ভারতেও সুন্দরবন অক্ষত থাকবে না। এ ধ্বংসাত্মক কাজ ঠেকাতে ভারতের জনগণও ভূমিকা পালন করবে—এ প্রত্যাশা থেকেই এসব সভা।

তাঁদের বললাম, বাংলাদেশে ভারত সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যেসব বিষয়ে যুক্তিযুক্ত ক্ষোভ আছে, সেগুলো আপনারা হয়তো জানেন না। কারণ, আমরা ভারত সম্পর্কে যতটা জানি, সে তুলনায় আপনারা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেন অনেক কম। আপনারা আমাদের টিভি দেখতে পারেন না, বইপত্রও আসে খুব কম। আপনাদের মিডিয়ায় বাংলাদেশ সম্পর্কে সেসব খবরই গুরুত্ব পায়, যাতে মনে হয়, বাংলাদেশ ‘মৌলবাদ জঙ্গি’-অধ্যুষিত দেশ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে লড়াই ও চিন্তার খবর কমই আসে।
আপনারা অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম বইটির কথা জানতে পারেন, এটি নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের কথাও নিশ্চয়ই জানেন। কিন্তু জানেন না ভারতের ভারী যন্ত্রপাতি নেওয়ার জন্য সেই নদী আড়াআড়িভাবে ভরাট করা হয়েছিল। আপনারা জানেন না ভারতের পণ্য বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পার হয়ে ভারতেরই আরেক অঞ্চলে নেওয়ার জন্য নানা ব্যবস্থা করা হচ্ছে জনগণকে না জানিয়ে। এর জন্য বাংলাদেশের কী লাভ, কী ক্ষতি—সে সম্পর্কে সরকার জনগণকে পরিষ্কারভাবে কিছু জানায়নি। ভারতের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ অবকাঠামো প্রস্তুত করছে। অথচ বাংলাদেশের তিন দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত সন্ত্রাসীদের ঠেকানোর নামে। তিন দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরাও হয়ে থেকে বন্ধুত্ব কীভাবে সম্ভব? ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরায়েল এ রকম বেড়া দিয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কি সে রকম সম্পর্ক তৈরি করতে চায়? ভারতের মানুষ কি তা অনুমোদন করে?
আরও বললাম, আপনারা সীমান্ত হত্যার খবর খুব কম জানেন। আপনারা জানেন না যে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতি কত দূর বিস্তৃত হয়েছে। এরপর আবার টিপাইমুখ বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করলে মানুষ কেন ক্ষুব্ধ হবে না? বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ৫৪টি নদী নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি, তিস্তা নদী নিয়ে বিরোধ ঝুলে আছে। আপনারা জানেন না, ভারতের বিনিয়োগ বাংলাদেশে অগ্রাধিকার পেলেও ভারতে বাংলাদেশের বিনিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা মাত্র বছর খানেক আগে শিথিল করা হয়েছে, কিন্তু এখনো নানা বাধা-বিপত্তি বজায় আছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে আইনি পথে যেসব পণ্য আসে, তার চেয়ে বেশি আসে বেআইনিভাবে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ভারতে আইনিভাবে পণ্য নিতে গেলেও শত অশুল্ক বাধা। এত সব বৈষম্য, অসম্মান ও আধিপত্যের ঘটনা থাকলে আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষমাত্রই তার প্রতিকার চাইবে। এ ক্ষোভকে ভারতবিরোধী বিদ্বেষ বা মৌলবাদীদের তৎপরতা হিসেবে চিত্রিত করা মানে মূল ইস্যুকে আড়াল করা। তাতে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের রাস্তাই প্রশস্ত হবে।
আলোচনায় প্রশ্ন এল, তাহলে এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার পথ কী? বললাম, এ পথ পেতে গেলে চিন্তার একটি অস্বচ্ছতা থেকে আমাদের মুক্ত থাকা দরকার। সেটি হলো, রাষ্ট্র ও জনগণ যে সমার্থক নয়, তা স্পষ্ট করা। ভারতের সরকার যা করছে, ভারতের শাসকশ্রেণী যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে, তার দায়দায়িত্ব ভারতের জনগণের নয়। যেমন আমাদের দেশের সরকার বা শাসকগোষ্ঠী যত অপকর্ম করে, তার দায়দায়িত্ব গ্রহণে আমরা রাজি নই। এ বিষয় সব দেশের জন্যই প্রযোজ্য।
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি দেশের নাম বলা দরকার। পাকিস্তান বাংলাদেশে গণহত্যা করেছিল। তাদের যুদ্ধাপরাধীদের এখনো বিচারের আওতায় আনা হয়নি। এখন পর্যন্ত পাকিস্তান তাদের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করেনি, উল্টো নানা ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। তার পরও পরিষ্কার করে বলতে হবে যে পাকিস্তান মানেই নির্যাতক সামরিক জান্তা নয়। পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কৃষক-শ্রমিক-গরিব-নারী-পুরুষ-শিশু-শিক্ষার্থী নিজেরাও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিপীড়ন, নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার। সেখানে সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এখনো স্বাধীনতার চিন্তা লালন করছে। ভারতের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। অরুন্ধতী রায়ের হিসাবে, ভারতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল এখন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে, বাংলাদেশে ভারতবিরোধী ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সেই শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধেই। এটাই দুই দেশের মানুষের ঐক্যের জায়গা।
কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণকে কি সব সময় আলাদা করে দেখা সম্ভব? বিশেষত বেশি শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন তুলনামূলকভাবে দুর্বল দেশের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে নিয়োজিত থাকে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মানুষের পক্ষে এ রকম বিভাজন করা কঠিন হয়। তা ছাড়া শক্তিশালী দেশ নিজ দেশের জনগণকে যেমন অজ্ঞতা, তথ্য গোপন বা বিকৃত করে বিভ্রান্তির মধ্যে আটকে রাখতে চেষ্টা করে, তেমনি চেষ্টা করে সীমান্তের বাইরের জনগণের সঙ্গে দেশের মানুষের যোগাযোগের সুযোগ যতটা সম্ভব কম রাখতে। কলকাতা ও দিল্লির আলোচনায় তাই জোর দিয়ে বললাম, ভারতের জনগণ বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যবাদী অন্যায় তৎপরতার বিরুদ্ধে সরব হলে বাংলাদেশের মানুষও বুঝতে পারবে, ভারতের জনগণ তাদের সরকার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অন্যায় কাজের শরিক নয়। রামপালে যখন ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে শুধু বাংলাদেশের নয়, মানবসমাজের স্থায়ী ক্ষতি করতে উদ্যত, তখন ভারতের সজাগ মানুষ নীরব থাকলে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন সম্ভব হবে না। বললাম, আপনারা যদি রামপাল প্রকল্প, সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিট নিয়ে গোপন চুক্তি, টিপাইমুখ বাঁধ, নদী চুক্তি নিয়ে টালবাহানা, অসম বাণিজ্য ইত্যাদির প্রতিবাদ করেন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষ তার বন্ধু ভারতের অস্তিত্ব উপলব্ধি করতে পারবে।
ভারতের শাসকশ্রেণীর এসব তৎপরতাকে পুঁজি করে বাংলাদেশে ধর্মপন্থী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিস্তারের চেষ্টা বরাবরই শক্তিশালী। ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানাভাবে ভূমিকা রাখে। ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশলও তা-ই। কিন্তু ভারত মানেই কেবল হিন্দু নয়, বাংলাদেশ মানেই কেবল মুসলমান নয়। ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রের আধিপত্যের ব্যাকরণ নির্ধারিত হয় না। নেপাল হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্র হলেও ভারতের কাছে তার অবস্থানের উন্নতি হয়নি। ভারতের নির্যাতিত মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠই হিন্দুধর্মাবলম্বী, পাকিস্তানে তারা মুসলমান। ধর্মের কারণে তাদের পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। ধর্মপন্থী রাজনীতি বস্তুত স্বধর্মের মানুষকেই শৃঙ্খলিত করে প্রথম।
ভারতে বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের ওপর নিপীড়ন ও সহিংসতার বিষয়টি ঘুরে ঘুরে আসে। ২০১৩ সালে দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হতবাক করে বাংলাদেশের মানুষকে, আর বিজেপির হাতে তুলে দেয় নির্বাচনী অস্ত্র। ২০১৪ সালে একতরফা নির্বাচনের পর আবারও বেশ কয়েকটি স্থানে সহিংসতা দেখা যায়। ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় উন্মাদনার প্রধান সংগঠন বিজেপি বাংলাদেশের এ সহিংসতাকে তাদের রাজনৈতিক পুঁজি করে ঢাকা অভিমুখী লংমার্চের কর্মসূচিও দেয়।
বস্তুত ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ জাতিগত, বর্ণগত, শ্রেণীগত, লিঙ্গীয় ও আঞ্চলিক বৈষম্য-নিপীড়নের শিকার। দারিদ্র্য, সহিংসতা, নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত। সামরিকীকরণে শৃঙ্খলিত ভারতের বিশাল খনিসমৃদ্ধ অঞ্চল। আরেক ভারত শাইনিং—দক্ষিণ এশিয়া থেকে আফ্রিকা পর্যন্ত আধিপত্য বিস্তারে ব্যস্ত; নিজ দেশের মানুষের জীবন ও পরিবেশের বিনিময়ে বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভবন করা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন ও ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে যে বিজেপি বর্তমানে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী, তারা এ গোষ্ঠীর বিশেষ আস্থাভাজন হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা বহুজাতিক পুঁজিও তাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কংগ্রেসের ভোটের রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি বিপর্যস্ত, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক নীতির কারণে বিক্ষুব্ধ জনগণ। একই পরিস্থিতি বাংলাদেশেও।
কোন ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাংলাদেশকে নিরাপদ করবে? যে শাসকশ্রেণী নিজ দেশের মানুষকে নিপীড়িত রাখে, তাদের পক্ষে অন্য দেশকে বিপর্যস্ত করা ছাড়া আর কী সম্ভব? দক্ষিণ এশিয়াকে জনগণের জন্য এক সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা খুবই সম্ভব। তার জন্য প্রতারিত ও নিপীড়িত জনগণের মধ্যে সংহতি গড়ে তোলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিজ নিজ দেশে সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, নিপীড়ন ও মানববিধ্বংসী প্রকল্পবিরোধী লড়াইয়ের পাশাপাশি সীমান্ত ছাড়িয়ে জনগণের স্বার্থের ঐক্যসূত্রকে স্পষ্ট করতে নানামুখী উদ্যোগ তাই জরুরি।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রতিবেশী- ভারতে বাংলাদেশ নিয়ে জরুরি কথা by আনু মুহাম্মদ

‘বাংলাদেশে ভারতবিদ্বেষ কী জন্য বাড়ছে? এভাবে যদি বিদ্বেষ জমতে থাকে, তাহলে আপনি দুই দেশের জনগণের সংহতির যে প্রস্তাব রাখছেন, তা কী করে সম্ভব?’

আমি কারও লুঙ্গি ধরে টানাহেঁচড়া করিনি by ওয়েছ খছরু

আমি নির্দোষ। ওরা আমার চরিত্রে কলঙ্কের তিলক এঁকে দিলো। আমি কোনও পাপ করিনি। কারও লুঙ্গি ধরে টানাহেঁচড়া করিনি। কোনও ছবিও তুলিনি।’
-একদিনের হাজতবাস শেষে গতকাল বেরিয়ে এসে কেঁদে কেঁদে সাংবাদিকদের এ কথা জানালেন সিলেটের গ্রেপ্তার হওয়ার সিটি কাউন্সিলর দিবা রানী দে বাবলী। এ সময় তাকে বরণ করতে কারা ফটকে অর্ধশতাধিক লোক উপস্থিত ছিলেন। এ সময় দিবা রানী বলেন, ‘আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। আমার সম্পত্তি দখল করতে একটি সিন্ডিকেট পুলিশকে দিয়ে হেনস্তা করিয়েছে। ওরা আমার সম্পত্তি দখল করতে চায়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলর হয়েও কেবলমাত্র সম্পত্তির কারণে সাজানো মামলায় হাজতে যেতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বিএনপির রাজনীতি করি। এ কারণে ওই চক্র বিরোধী চক্রকে দিয়ে নাটক সাজিয়েছে।’ কারাগার থেকে বেরিয়ে দিবা বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বিচার জনতার আদালতে দিলাম।’

সিলেটে সরকারদলীয় ভূমিখেকোদের ছোবলে পড়ে কারাগারে যেতে হয় সিলেট সিটি করপোরেশনের মহিলা কাউন্সিলর দিবা রানী দে বাবলীকে -এমন অভিযোগ তার স্বামীসহ পরিবারের সদস্যদের। গ্রেপ্তার হয়ে একদিন কারাভোগের পর রোববার সন্ধ্যায় মুক্তি পেয়েছেন তিনি। সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাকে জামিনে মুক্তির আদেশ দিলে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। এ সময় সিলেট সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরসহ তার স্বজনরা কারা ফটকে উপস্থিত হয়ে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন। শনিবার বিকালে সিলেট নগরীর যতরপুরের নিজ বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে সিলেট কোতোয়ালি পুলিশ। একই এলাকার আবদুল মতিনের দায়ের করা মামলায় (নং-২৯(১)১৪) তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাওলানা আবদুল মতিনকে উলঙ্গ করে অশ্লীল ছবি তোলার দায়ে দায়ের করা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল জানায় পুলিশ।
সিলেট সিটি করপোরেশনের সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর দিবা রানী দে-র বর্তমান বাসস্থানের বাসা ও ভূমি নিয়ে রয়েছে বিরোধ। সিলেট নগরীর যতরপুরের শ্রীশ্রী বিশ্বেশ্বর দেবমন্দিরের ওই ভূমিতে থাকেন দিবা রানীর স্বামী মনীন্দ্র রঞ্জন দে-র পরিবার। এ ভূমি নিয়ে রয়েছে মনীন্দ্র দে-র একাধিক মামলা। শ্রীশ্রী বিশ্বেশ্বর দেবমন্দিরের ওই ভূমি অর্পিত সম্পত্তির তালিকায় নিয়ে একটি মহল দখল করে নেয়ার চেষ্টা করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। মনীন্দ্র রঞ্জন দে তার পিতার ক্রয় করা ভূমি দাবি করে বসবাস করে আসছেন এবং বর্তমান সরকারের  সঙ্গে রয়েছে তার একাধিক দেওয়ানি ও অর্পিত আইনের মামলা রয়েছে। মনিন্দ্র রঞ্জন দে-র অভিযোগ, সরকারদলীয় স্থানীয় একটি প্রভাবশালী ভূমিখেকো চক্র তার স্বত্ব-দখলীয় বাসা ও দেবমন্দির দখলে নিতে উঠে পড়ে লাগে। দু’বছর আগে এ দলের ভূমিখেকোরা ছাত্রলীগের কর্মী তিতাসকে দিয়ে তার বাড়িঘরে হামলা করে তাদের উচ্ছেদ করতে ব্যর্থ হয়। সিলেট জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সুব্রত চক্রবর্তী জুয়েলকে দিয়েও আদালতে একটি মামলা করানো হয়। ভূমিসংক্রান্ত মামলাগুলো নিম্ন ও উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। এ অবস্থায় অতি সমপ্রতি সরকারদলীয় একটি ভূমিদস্যুচক্র সংখ্যালঘু মনীন্দ্র পরিবারকে উচ্ছেদে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে বলে দাবি করেন মনিন্দ্র রঞ্জন। আর এ অংশ হিসেবে গত ২৭শে জানুয়ারি জনৈক আবদুল মতিনকে দিয়ে তার পরিবারের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি মামলা করায়। পরে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে পুলিশকে দিয়ে মনীন্দ্রর স্ত্রী দিবা রানীকে গ্রেপ্তার করানো হয় বলে দাবি করেন তিনি। এদিকে, দিবা গ্রেপ্তারের পর সিলেটে তোলপাড় শুরু হয়। দিবা রানীর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা তিন দিনের মধ্যে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিজ-এইচআরসিবিএম। গতকাল জিন্দাবাজারস্থ জেলা কার্যালয়ে সভায় বক্তারা বলেন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মামলা প্রত্যাহার না করলে শুক্রবার থেকে আন্দোলন শুরু করা হবে। বিভাগীয় সমন্বয়ক রাকেশ রায়ের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন ভাইস চেয়ারম্যান অতীন্দ্র রঞ্জন দে, সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন রঞ্জন দাস, নারীনেত্রী পিংকি দেব নাথ। এইচআরবিসিএম-এর সমন্বয়ক রাকেশ রায় বলেন, একটি চক্র দিবাকে হয়রানিকে করতে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তিনি দাবি করেন, দিবার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক।

আমি কারও লুঙ্গি ধরে টানাহেঁচড়া করিনি by ওয়েছ খছরু

আমি নির্দোষ। ওরা আমার চরিত্রে কলঙ্কের তিলক এঁকে দিলো। আমি কোনও পাপ করিনি। কারও লুঙ্গি ধরে টানাহেঁচড়া করিনি। কোনও ছবিও তুলিনি।’

ব্যর্থতা মানতে রাজি নন খালেদা

আন্দোলনে ব্যর্থতা মানতে রাজি নন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলছেন আন্দোলনে সাফল্য অনেক। এক. নির্বাচন এক তামাশায় পরিণত হয়েছে।
দুই. দেশে-বিদেশে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তিন. গ্রামের মানুষও এই আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। সর্বোপরি দলকে এক রাখা সম্ভব হয়েছে। পেশাজীবীসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে মতবিনিময়কালে খালেদা জিয়া এমন মনোভাবই ব্যক্ত করেছেন। দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার দিকও কবুল করেছেন। সরকারের কৌশলের সঙ্গে পেরে ওঠেননি- সরাসরি এমন মন্তব্য না করলেও বলছেন, আমাদের কল্পনার মধ্যে ছিল না সরকার নিজেই সহিংসতায় নেমে পড়বে। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের আচরণে তিনি মোটেই সন্তুষ্ট নন তা বলছেন ঘনিষ্ঠজনদের। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলা বিএনপিতে আগাগোড়াই ছিল। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পর্যন্ত অবিশ্বাসের ছক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। অবশ্য,  আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন তার ভূমিকা ছিল অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ, রহস্যে ভরা। অবশ্য দলনেত্রী তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। বলেছেন, তারই নির্দেশ ছিল গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য। কিন্তু দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তার মতে, আলমগীর জেলের বাইরে থেকে এমন কোন কাজ করেননি যাতে দলটি লাভবান হয়েছে। অথবা আন্দোলন বেগবান হয়েছে। বরং মোটরসাইকেলের পেছনে চড়ে আত্মগোপনে যাচ্ছেন এই চিত্র দেশবাসী দেখেছে মিডিয়ার কল্যাণে। আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন একটি ভিডিও ক্লিপ অনেককেই হতাশ করেছে। অবশ্য মির্জা আলমগীর বন্ধু-বান্ধবদের বলছেন, আমি যাবো কোথায়? ম্যাডাম আমাকে নির্দেশ দিলেন পুলিশের কাছে ধরা না দিতে। আমি তা-ই করলাম। এখন দেখছি ভুলই করেছি। তিনি স্বীকারও করছেন, বাইরে থেকে তেমন কোন কাজ করতে পারেননি দলের জন্য। একজন নেতাকে ভারমুক্ত না করাও কিন্তু সঠিক রাজনৈতিক কৌশল নয়। এতে অবিশ্বাস স্থায়ী রূপ নেয়। যা-ই হোক, অন্য নেতাদের অবস্থা কি? যারা জেলে ছিলেন তাদের নিয়ে কথা কম দলে। যারা বাইরে ছিলেন তারা ২৯শে ডিসেম্বর কোথায় ছিলেন? কেউ তো নয়া পল্টনমুখী হননি। ঢাকার প্রবেশপথে উঁকি মেরেও দেখেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি করছে। নেতাদের ফোন বন্ধ ছিল এটা ঠিক, কিন্তু সব সিম কি অকার্যকর ছিল? কেউ কি কথা বলেননি? বলেছেন, তবে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে। কোন নেতাই দলের কর্মীদেরকে মাঠে নামতে বলেননি। বরং বলেছেন, ‘শোনা যাচ্ছে রাস্তায় নামলে নাকি  দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’ অন্যভাবেও ম্যানেজ হয়ে গিয়েছিলেন নেতারা - এ নিয়ে তো বিএনপি শিবিরেই এখন জোর আলোচনা চলছে। খালেদা জিয়ার কাছেও এসব অভিযোগ যাচ্ছে। তিনি যখন নিজ গৃহে বন্দি ছিলেন তখনও নানা মাধ্যমে তার কাছে খবর পৌঁছেছিল। অতিসমপ্রতি বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা করে এসেছেন এমন একজন পেশাজীবী নেতা বলেন, দলের সাংগঠনিক অবস্থা যে এতটা দুর্বল সে ধারণা ম্যাডামের ছিল না। তাছাড়া অতিমাত্রায় জামায়াত-শিবির নির্ভর হওয়াটাও ঠিক হয়নি। সরকার এই সুযোগ নিয়ে অন্য খেলা খেলেছে। আন্দোলনকে অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য তারা এমন সব সহিংসতা করেছে যাতে পশ্চিমা দুনিয়াসহ নানা মহলে পৌঁছেছে ভিন্ন বার্তা। ফলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি, পাশাপাশি সহিংসতা বন্ধেরও তাগিদ এসেছে। আন্দোলন মাঝপথে ধাক্কা খেয়েছে। কৌশলগত ভুলের কথাও বলা হচ্ছে। ঢাকাকে আন্দোলনের বাইরে রেখে যারা কৌশল ঠিক করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তারা এখন বলছেন, কৌশল ভুল ছিল এখন হয়তো বলা যাবে। তবে শুরুতে চিন্তা ছিল সারা দেশ অচল করে শেষ কর্মসূচি হিসেবে ‘চলো চলো ঢাকা চলো’ কর্মসূচি দেয়া হবে। পরবর্তীকালে এরই নাম ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ দেয়া হয়েছিল। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল তা নেয়া হয়নি - এখন সে বিষয়টি তারা মূল্যায়ন করছেন। এটাও বলছেন, হেফাজতের ওপর দৃষ্টি রাখা দরকার ছিল। আগের দিন সরকারি প্রতিনিধি এক গুচ্ছ প্রস্তাব নিয়ে হেফাজত নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বলাবলি আছে এই বৈঠকের পরই হেফাজত আন্দোলনে শরিক না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটাও লক্ষণীয় যে হেফাজত ঢাকার মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে তিন বার তারিখ পরিবর্তন করেছে। সরকার অবশ্য অনুমতি দেয়নি। অনুমতি ছাড়াই  সমাবেশ হবে এমন ঘোষণা দিয়ে হেফাজত নেতারা কেন হঠাৎ চুপসে গেলেন তা নিয়ে নানা পর্যালোচনা চলছে খোদ হেফাজতের ভেতরেই। ঢাকায় একজন হেফাজত নেতা বলেন, গোটা বিষয়টি ধোঁয়াশায় ভরা। ‘সিগন্যাল’ শব্দটি নিয়ে বিরোধী শিবিরে বহুলভাবে আলোচিত হচ্ছে। কি সে সিগন্যাল? কারও ওপর নির্ভর করে কি এমন আন্দোলনের ছক তৈরি করা হয়েছিল?  একজন বিএনপি নেতা বললেন, এটা রটনা। জনগণ আমাদের সঙ্গে ছিল এবং আছে। এরচেয়ে বড় আন্দোলন বাংলাদেশে এর আগে কখনও কি হয়েছে? বাংলাদেশ ভেঙে পড়েছিল - এটা তো নতুন করে বলার কিছু নেই। তারপরও নির্বাচন কেন ঠেকানো যায়নি এ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। আওয়ামী লীগ-ও তো ১৫ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ঠেকাতে পারেনি। ২০০৬-এর আন্দোলনে আওয়ামী লীগ বা তার মিত্ররা কি সফল হয়েছিল? ওয়ান-ইলেভেন না হলে এখন যে অবস্থা হয়েছে তখনও সেরকম অবস্থাই হতো। বরং আরও  খারাপ হতে পারতো। বিএনপি নেতারা বলছেন, এটাও তো দেখতে হবে সরকারের পেছনে এমন এক শক্তি ছিল যারা সারা বিশ্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে। আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে এমন সরলীকরণ খুব সহজ। সংবিধান সংশোধন করার পেছনে তো সুনির্দিষ্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল। সে পরিকল্পনায় বিএনপিকে নির্বাচনী দৌড়ের বাইরে রাখাই ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। যা পুরোপুরি সফল না হলেও অনেকটাই হয়েছে।  শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে রাজি হলে নির্বাচন হতো কিনা সে প্রশ্নও তুললেন একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য। বললেন, বেগম জিয়া যে এই বিকল্প নিয়ে ভাবেননি তা নয় কিন্তু। তখন সব খবরাখবরই এসেছিল নেতিবাচক। বেগম জিয়ার কাছে খবর ছিল,  সরকার এমন খেলা খেলবে যাতে নির্বাচনই হবে না। তখন সবাই বলতো বেগম জিয়ার কারণে অন্য শাসন এসেছে। খেলাটা ছিল সূক্ষ্ম। অঙ্ক মেলানো সহজ ছিল না। বিএনপির এই স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, আজ হোক কাল হোক সবার অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ নির্বাচন হোক- তখন দেখবেন সবাই বলবে বেগম জিয়া ভুল করেননি। ’৮৬ সালেও তো একই রকম হয়েছিল। ’৯০ সালে সবাই বলছেন বেগম জিয়াই সঠিক ছিলেন। ’৯১-এর নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক পণ্ডিতরা অবশ্য বলছেন, ১৯৯০ আর ২০১৪ কি এক? বুড়িগঙ্গায় অনেক পানি গড়িয়েছে।

ব্যর্থতা মানতে রাজি নন খালেদা

আন্দোলনে ব্যর্থতা মানতে রাজি নন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি বলছেন আন্দোলনে সাফল্য অনেক। এক. নির্বাচন এক তামাশায় পরিণত হয়েছে।

ইউক্রেনে সেনা হস্তক্ষেপ হতে পারে

ইউক্রেনের বিরোধীদলীয় নেতা আরসেনি ইয়াৎসিনিয়ুক ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেছেন, ইউক্রেনে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিক্ষোভরতদের ছত্রভঙ্গ করতে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হতে পারে। ইয়াৎসিনিয়ুকের দলের পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইয়াৎসিনিয়ুক জার্মানির প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধানকে বলেন, এটি ‘খুবই সম্ভাব্য’ যে ইউক্রেন কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীকে জড়ানোসহ বল প্রয়োগের পথ অবলম্বন করতে পারে।
কথা নয়, কার্যকর পদক্ষেপ চায় : ইউক্রেনের সরকারবিরোধীরা দেশটির সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পাশ্চাত্যের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। শুক্রবার জার্মানির মিউনিখে ইউক্রেনের বিরোধীদলীয় নেতারা জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফ্রাঙ্ক ওয়াল্টার স্টেইনমায়ার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন অ্যাশ্টনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ইউক্রেনের বিরোধী নেতা ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরসেনি ইয়াৎসিনিয়ুক বলেছেন, আমরা পাশ্চাত্যের পক্ষ থেকে কেবল ঘোষণা নয় বরং অত্যন্ত স্পষ্ট অ্যাকশন প্ল্যান চাই।

থাইল্যান্ডে চূড়ান্ত বিক্ষোভ আজ

থাইল্যান্ডে রোববার (আজ) সাধারণ নির্বাচন বন্ধ করতে রাজধানী ব্যাংককের ব্যস্ত পর্যটন এলাকা চায়নাটাউনে শনিবার সরকারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও ব্যাপক বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে বিরোধী দলগুলো। এ অবস্থায় দেশটিতে আরও সহিংসতার আশংকা করা হচ্ছে। এদিকে বিরোধী দলগুলোর অব্যাহত আন্দোলনের মধ্যেও নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ নির্বাচনের নামে পুনরায় ক্ষমতা দখল করতে চাচ্ছে সরকার। এজন্য তারা এই নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। নির্বাচনের একদিন আগে শনিবার ব্যাংককের সড়কগুলোতে শান্তিপূর্ণ অবরোধের ডাক দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা সুথেপ থাগসুবান। তিনি ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেবেন না বলেও জানিয়েছে। শুক্রবার রাতে সুথেপ বলেন, ‘আমাদের লোকজন ভোট কেন্দ্রের কাছে যাবে না। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করবে। তবে কেউ যদি বাধা দিতে আসে তবে ঝামেলা বাধতে পারে।’ থাই সংবাদপত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের দিন বিক্ষোভকারীরা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ব্যালটপেপার সরবরাহ কেন্দ্রগুলো বিশেষ করে পোস্ট অফিসগুলোতে অবস্থান নেবে। ওই অঞ্চলে বিরোধী নেতা সুথেপ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
এদিকে জাতিসংঘ থাইল্যান্ডে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট অনুষ্ঠানের আহ্বান জানিয়েছেন। দেশটিতে গত নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সহিংসতায় এরই মধ্যে ১০ জন প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে আরও ৫৭৭ জন। গত নভেম্বর থেকে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে অব্যাহত আন্দোলন শুরু করেছে থাইল্যান্ডের বিরোধী দলগুলো। বিক্ষোভের মুখে নতুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি এ নির্বাচন বর্জন করেছে। তারা নির্বাচন বয়কট করায় রোববার ভোটগ্রহণ করা হলে ক্ষমতাসীন পুয়ে থাই পার্টির জয় প্রায় নিশ্চিত। এ কারণেই বিরোধীরা এ নির্বাচন বানচালে অনড়। তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সংস্কার চাইছে। এর আগে গত রোববার ব্যাংককে বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে ৫০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫টি কেন্দ্রেই আগাম ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা কাল মূল ভোটের দিনও ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেবে বলে আগেভাগেই হুশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ভোটের দিন ব্যাংককে ১০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে পাঁচ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা হবে।গত দুই দশক ধরে সাধারণ নির্বাচনে পরাজয়ের পর থাইল্যান্ডের সবচেয়ে পুরানো রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক পার্টির বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের বিপরীতে অবস্থান নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। রোববারের বিতর্কিত নির্বাচন বর্জনের প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা এ অভিযোগ করছেন। দলটি চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা একটি অনির্বাচিত ‘গণপরিষদ’র পথ প্রশস্ত করতে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগ চান। তারা আজকের নির্বাচন ব্যাহত করারও হুমকি দিয়েছে।

মুরসি আদালতে

গত সপ্তাহে একটি শুনানিতে নিজেকে ‘বৈধ প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দাবি করার দিন কয়েক পরেই মিসরের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান মোহাম্মদ মুরসিকে হত্যাকাণ্ডের মামলায় আবারও আদালতে আনা হয়েছে। এই নিয়ে একই সপ্তাহের মধ্যে দু’বার আদালতে হাজির করা হল মিসরের সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে। সংবাদ মাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী শনিবার কায়রোর পুলিশ অ্যাকাডেমিতে পৌঁছেছেন মুরসি।
২০১২ সালে ক্ষমতায় থাকাকালীন রাষ্ট্রপতির বাসভবনের কাছে সরকারবিরোধীদের আন্দোলনের সময় বিদ্রোহীদের হত্যাকাণ্ডে মদদ থাকার অভিযোগে আবারও আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছে সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে। বর্তমানে নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুডের আরও ১৪ জন কর্মী সঙ্গে এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন তিনি। এদিকে আদালতে মুরসির উপস্থিত হওয়ার বিষয়টিকে কেন্দ্র করে নাশকতার আশংকায় আদালত চত্বরে বিপুল পরিমাণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়েছে। তবে আদালত চত্বরে মুরসির সমর্থকগোষ্ঠীর কেউ উপস্থিত নেই। সূত্র : আলজাজিরা।

উপজেলা নির্বাচন

১৯ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি সরগরম হয়ে ওঠার একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা ইতিবাচক। প্রথম পর্যায়ের এই নির্বাচনে দেশের ৯৭টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন নিয়ে দেশে সব সময় উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়। একটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করাই এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। গত ৫ জানুয়ারি দেশে যে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, তা অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় সেই নির্বাচন জনমনে আগ্রহ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং নির্বাচনী উৎসাহ-উদ্দীপনা বলতে যা বোঝায়, সেটাও ছিল না। ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম পর্যায়ের যে উপজেলা নির্বাচন হতে যাচ্ছে তা নির্দলীয়, কিন্তু অরাজনৈতিক নয়। জাতীয় নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন দলের নেতাদের অংশগ্রহণে এই নির্বাচন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ৫ জানুয়ারি কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করেছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা ফিরে আসা শুরু করুক—সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। সব দল ও মতের প্রার্থীরা যদি সমান সুযোগ ও সুবিধার ভিত্তিতে নির্বাচন করতে পারে, তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি উৎসবমুখর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।
নির্বাচন কমিশনকেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গত মহাজোট সরকারের মেয়াদে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় না রাখতে পারলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারটি আরও বিতর্কিত হয়ে পড়বে। তবে শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠান নয়, স্থানীয় সরকার হিসেবে উপজেলা পরিষদকে কার্যকর করে তোলার উদ্যোগটিও সরকারকে নিতে হবে। তা না হলে মেয়াদ শেষে এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে। এটা দুঃখজনক যে উপজেলা পরিষদ বর্তমানে একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবেই রয়ে গেছে। স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর স্থানীয় সাংসদদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা উপজেলা পরিষদকে প্রায় অকার্যকর করে রেখেছে। উপজেলা পরিষদ আইনে স্থানীয় সাংসদদের উপদেষ্টা করে তাঁদের পরামর্শ মানা বাধ্যতামূলক করার যে বিধান কার্যকর রয়েছে, তা বাতিল করা জরুরি। কারণ, এই বিধান সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। পাশাপাশি যে ১৭টি বিভাগ উপজেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করার নির্দেশনা মন্ত্রিপরিষদের রয়েছে, তা যেন আগামী নির্বাচিত পরিষদের হাতে হস্তান্তর করা হয়, সেই বিষয়টি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা একটি সুষ্ঠু, অবাধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য উপজেলা নির্বাচনের পাশাপাশি একটি কার্যকর উপজেলা পরিষদ দেখতে চাই।

প্রেমে পরাজিত বাঁধন

অভিনেত্রী বাঁধন ভালোবেসে ফেলেন এক যুবককে। তাদের ভালোবাসার দিনগুলো ভালোই চলচ্ছিল। এই অবস্থায় তাকে হঠাৎ কিছু দিনের জন্য বিদেশ যেতে হয়। এরই মধ্যে অন্য মেয়েকে বিয়ে করে ফেলে তার ভালোবাসার মানুষটি। কিন্তু তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না বিষয়টি। যে কোনো কিছুর বিনিময়ে তাকে ফিরে পেতে চান। ভালোবাসার মানুষটির সংসার ভেঙে তিনি তার সঙ্গে নতুন সংসার করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার সাবেক প্রেমিক কিছুতেই তাকে বিয়ে করতে চাইছেন না। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত চলছে তার জীবনে নতুন ঘটনা।
ঘটনার ইতি টানার জন্যই হাজির হন অন্য কোনো যুবক। তার ভালোবাসার কাছে হার মানতে বসেন বাঁধন। এভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে ‘ভালোবাসা ভালোবাসি’ খণ্ডনাটকের কাহিনী। নাটকটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন এইচএস রোকন। এ নাটক প্রসঙ্গে অভিনেত্রী বাঁধন বলেন, নাটকটি ভিন্ন ধরনের গল্প নিয়ে লেখা। পাণ্ডুলিপিটি আমার পছন্দ হয়েছে। কাজ করে মজা পেয়েছি। আশা করি, নাটকটি দর্শক জনপ্রিয়তা পাবে।’ নাটকে বাঁধনের বিপরীতে অভিনয় করেছে কল্যাণ। নাটকটি যে কোনো চ্যানেলে প্রচার হবে বলে জানান নির্মাতা।

চট্টগ্রামে ঘুরে দাঁড়াব

শ্রীলংকার বিপক্ষে দু’দিন আগেই প্রথম টেস্টে ইনিংস ও ২৪৮ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। মঙ্গলবার চট্টগ্রামে শুরু হবে দ্বিতীয় টেস্ট। শনিবার বিকেলে চট্টগ্রাম পৌঁছেছে বাংলাদেশ দল। এর আগে দুপুরে মোবাইল ফোন কোম্পানি বাংলালিংকের সঙ্গে শুভেচ্ছা দূতের চুক্তি সেরে নিলেন সাকিব আল হাসান। প্রথম টেস্টে টাইগারদের পারফরম্যান্সে সবাই হতাশ হলেও দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে বলে মনে করেন সাকিব।
সাকিব বলেন, ‘গত দেড়-দুই বছরে আমরা এত বাজে খেলিনি। প্রতিটা দলেরই এ রকম সময় আসে। ঢাকায় আমরা একেবারেই বাজে সময় কাটিয়েছি। আশা করি, চট্টগ্রামে আমরা ঘুরে দাঁড়াব। দ্বিতীয় টেস্টে ভালো খেলব।’ তিনি বলেন, ‘এটি ছিল বাজে একটি ম্যাচ। আমরা যত দ্রুত সম্ভব ভুলে যেতে চাই। চট্টগ্রামে আমাদের ভলো স্মৃতি আছে। সবাই কঠোর পরিশ্রম করছে। ভালো খেলার ব্যাপারে সবাই আত্মবিশ্বাসী।’ তিনি বলেন, ‘চাপ একেক জনের কাছে একেক রকম। আমার কাছে কখনও এটা চাপ মনে হয়নি। আমার মনে হয় দলের অন্য কারও মধ্যেও সেরকম কোনো চাপ ছিল না।’

উপজেলা নির্বাচন

১৯ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতি সরগরম হয়ে ওঠার একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা ইতিবাচক। প্রথম পর্যায়ের এই নির্বাচনে দেশের ৯৭টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতিমধ্যে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন নিয়ে দেশে সব সময় উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়। একটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি করাই এখন নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। গত ৫ জানুয়ারি দেশে যে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, তা অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। প্রধান বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় সেই নির্বাচন জনমনে আগ্রহ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং নির্বাচনী উৎসাহ-উদ্দীপনা বলতে যা বোঝায়, সেটাও ছিল না। ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম পর্যায়ের যে উপজেলা নির্বাচন হতে যাচ্ছে তা নির্দলীয়, কিন্তু অরাজনৈতিক নয়। জাতীয় নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন দলের নেতাদের অংশগ্রহণে এই নির্বাচন যথেষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ৫ জানুয়ারি কার্যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে যে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করেছে, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা ফিরে আসা শুরু করুক—সেটাই আমাদের প্রত্যাশা। সব দল ও মতের প্রার্থীরা যদি সমান সুযোগ ও সুবিধার ভিত্তিতে নির্বাচন করতে পারে, তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি উৎসবমুখর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।
নির্বাচন কমিশনকেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের দায়িত্বপূর্ণ আচরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গত মহাজোট সরকারের মেয়াদে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে যেসব নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবেই বিবেচিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতা বজায় না রাখতে পারলে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারটি আরও বিতর্কিত হয়ে পড়বে। তবে শুধু নির্বাচন অনুষ্ঠান নয়, স্থানীয় সরকার হিসেবে উপজেলা পরিষদকে কার্যকর করে তোলার উদ্যোগটিও সরকারকে নিতে হবে। তা না হলে মেয়াদ শেষে এ ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে। এটা দুঃখজনক যে উপজেলা পরিষদ বর্তমানে একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবেই রয়ে গেছে। স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর স্থানীয় সাংসদদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা উপজেলা পরিষদকে প্রায় অকার্যকর করে রেখেছে। উপজেলা পরিষদ আইনে স্থানীয় সাংসদদের উপদেষ্টা করে তাঁদের পরামর্শ মানা বাধ্যতামূলক করার যে বিধান কার্যকর রয়েছে, তা বাতিল করা জরুরি। কারণ, এই বিধান সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। পাশাপাশি যে ১৭টি বিভাগ উপজেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করার নির্দেশনা মন্ত্রিপরিষদের রয়েছে, তা যেন আগামী নির্বাচিত পরিষদের হাতে হস্তান্তর করা হয়, সেই বিষয়টি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা একটি সুষ্ঠু, অবাধ, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য উপজেলা নির্বাচনের পাশাপাশি একটি কার্যকর উপজেলা পরিষদ দেখতে চাই।

বিশ্বায়নের কাল- হায় ওয়েস্টমিনস্টার! by কামাল আহমেদ

তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিলের কথা ওঠার সময় থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবারই গণতন্ত্রের যে মডেলটির কথা বলে এসেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ওয়েস্টমিনস্টারেই তিনি তাঁর ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন’ নিয়ে সবচেয়ে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছেন।
তা-ও একবার নয়, দুই সপ্তাহের ব্যবধানে দুবার। ওয়েস্টমিনস্টারের বার্তা পরিষ্কার যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন না ছিল অবাধ, না ছিল সুষ্ঠু এবং সে কারণে তার কোনো নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। ওয়েস্টমিনস্টারে এ ক্ষেত্রে মতৈক্যটা দলমত-নির্বিশেষে। ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে অভিন্ন। যথাযথভাবে সচল গণতন্ত্র বলতে যা বোঝায়, বাংলাদেশে তার অনুপস্থিতি তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। কেননা, যে পাঁচ লাখ বাংলাদেশি ব্রিটেনে বসতি গেড়েছেন, তাঁদের ছায়া অনুসরণ করে ওই সংকটের অস্থিরতার আঁচ ব্রিটেনেও পড়তে পারে। তাই রাজনৈতিক সংলাপ এবং সমঝোতার মধ্য দিয়ে আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্যই তাঁদের আকুতি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল যতটা সময় সংসদের ভেতরে কাটিয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় কাটিয়েছে রাজপথে। সংসদের বিরোধী আসনে যাঁরা বসেন (বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগ উভয়েই এই ঐতিহ্যের অধিকারী) তাঁদের যেহেতু সেখানে বসাটা খুবই অপছন্দের, সে কারণে তাঁদের স্থায়ীভাবে রাজপথে পাঠিয়ে দেওয়ার ধারণাটিতে যে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছে তা রাজনীতিবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে নতুন অধ্যায় সংযোজন করবে কোনো সন্দেহ নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পার্লামেন্ট ওয়াচের হিসাব অনুযায়ী নব্বইয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে নবম সংসদ পর্যন্ত চারটি সংসদে বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের গড় দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ শতাংশ। আর প্রতি সংসদেই এ বর্জনের মাত্রা বাড়তে বাড়তে নবমে তা সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশে পৌঁছেছিল। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের রেকর্ডটি হচ্ছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
সমর্থকদের ভাষায় ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা’ এবং সমালোচকদের ভাষায় একতরফা ও প্রতিনিধিত্বহীন এবং কারও কারও ভাষায় ‘কেরামতির’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দশম সংসদে বিরোধী দলের সরকার এবং বিরোধী দল উভয় আসন অলংকৃত করার বিষয়টিকে ‘কিম্ভূতকিমাকার’ ছাড়া আর কী বিশেষণে অভিহিত করা যায়, তা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না। সাংবাদিকতার প্রথম শিক্ষাই হচ্ছে সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলে বর্ণনা করা। কিন্তু জাতীয় পার্টিকে না বলা যাচ্ছে বিরোধী দল, না সরকারি দল। জাতীয় পার্টির একজন প্রয়াত নেতা সিরাজুল হোসেন খান এরশাদবিরোধী গণ-আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্বৈরাচারবিরোধী জোট গঠনকে বিদ্রূপ করতে গিয়ে পল্টনের জনসভায় বলেছিলেন ‘ঘোড়া আর গাধার মিলনে ঘোড়াও হয় না, গাধাও হয় না, হয় খচ্চর।’ জাতীয় পার্টির জন্য বোধ হয় এ রকম একটি চমকপ্রদ ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক রেফারেন্স এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
জাতীয় পার্টিকে প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর সহযোগী মন্ত্রীরাও যে বিরোধী দল ভাবতে পারছেন না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ তাঁদের বক্তৃতা-বিবৃতি। এসব বক্তৃতার যতটুকু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে তার প্রায় সবটা জুড়েই থাকছে রাজপথের বিরোধী দলের সমালোচনা। তাঁদের বক্তব্যে জাতীয় পার্টির উল্লেখ বিরল বললেও বোধ হয় কম বলা হবে।
এই অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরির কৃতিত্ব যে সরকারের, সেই সরকারের কতিপয় কট্টর সমর্থক যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রশাসনে যদি রিপাবলিকান চাক হেগেল প্রতিরক্ষামন্ত্রী হতে পারেন তাহলে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভায় বাবলু- চুন্নুরা মন্ত্রী হলে সমস্যা কোথায়? জার্মানিতে ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের গ্র্যান্ড কোয়ালিশনের কথা উল্লেখ করে তাঁরা বলছেন যে এর ফলে জার্মানিতে গণতন্ত্রের অবসান ঘটে না থাকলে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ঝুঁকির মুখে পড়বে কেন?
আপাতদৃশ্যে দৃষ্টান্তগুলো যতটা নিরীহ, বাস্তবে কিন্তু ততটাই শঠতাপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশেও যদি অতীতের মতো রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারপদ্ধতি চালু থাকত তাহলে বিরোধী দলের কারও মন্ত্রী হওয়া নিয়ে আলোচনাটা হতো ভিন্ন। মিজান চৌধুরী, কোরবান আলীদের মন্ত্রী হওয়ার কথা আমাদের এত সহজেই ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। তাঁরা কিন্তু মন্ত্রী হয়েছিলেন আগে এবং পরে আওয়ামী লীগ তাঁদের বহিষ্কার করেছিল। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র কিংবা জার্মানিতে বাংলাদেশের সংবিধানের মতো ৭০ ধারা নেই, যাতে দলীয় সাংসদদের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। জার্মানিতে প্রধান দুই দলের যে মহাজোটের সরকার, সেটির পটভূমিও ভিন্ন। চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটরা নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ছোট কোনো দলকে সঙ্গে নিয়েও সরকার গঠনে সক্ষম ছিলেন না। ফলে পুনর্নির্বাচন এড়াতে মহাজোটের সরকার এবং জোটটি গড়ে উঠেছে মন্ত্রিত্ব বা ক্ষমতা ভাগাভাগির সমঝোতার ওপর নয়, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে ন্যূনতম কর্মসূচির ওপর। ডান এবং বামপন্থী দুটো দলের এ সমঝোতা তাই রাজনৈতিক আপসরফার এক নতুন দৃষ্টান্ত। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে এই সমঝোতাটির সিদ্ধান্ত হয়েছে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির তৃণমূলের সাধারণ সদস্যদের ভোটে। জাতীয় স্বার্থে দলের প্রায় আড়াই লাখের বেশি সদস্য প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন, আর বিপক্ষে ৪০ হাজার। বিপরীতে বাংলাদেশে সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে জাতীয় পার্টিকে আধা সরকারি-আধা বিরোধী (যথার্থ বর্ণনায় সুবিধাবাদী) দলে রূপান্তরিত করা পর্যন্ত সবকিছুই হয়েছে একজনের ইচ্ছায়। আর কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সমঝোতার কথা কেউ দাবি করেছেন বলে আজ পর্যন্ত শুনিনি। অবশ্য বামপন্থী মেনন বা ইনু সাহেবদের বিভিন্ন ইসলামি মাহফিলে উপস্থিতি হেফাজতভক্ত জেনারেলের সঙ্গে সমঝোতার আলামত কি না, তা তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন।
নতুন মেয়াদে সরকার গঠন করায় প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বসম্প্রদায়ের অভিনন্দনে খরার কারণে শেষ পর্যন্ত ‘ডি এইট’ নামক গোষ্ঠীর মহাসচিবের বিবৃতির কথাও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এখন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানাতে হচ্ছে। ভারত, রাশিয়া ও চীন ছাড়া বৈশ্বিক পরিসরে ওজনদার আর কোনো দেশের নাম যুক্ত না হওয়ায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ঘুম হারাম হয়েছে বলেই এমনটি ঘটছে কি না কে জানে। তাঁরা হয়তো এ ক্ষেত্রে টনি ব্লেয়ারের মতো অবসরপ্রাপ্ত সুপারস্টারের কথা ভুলে গেছেন। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের চেয়েও জঙ্গি ইসলামপন্থীদের মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার হিসেবে বিশ্বসম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরতে উৎসুক যাঁরা, তাঁদের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক মি. ব্লেয়ার এ সপ্তাহে আবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। মিসরে ইসলামি ব্রাদারহুডকে নির্মূলে সামরিক বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি আবারও শিরোনামে উঠে এসেছেন। স্বৈরশাসন এবং দুর্নীতির জন্য বহুল আলোচিত কাজাখস্তান এবং মালাওয়ির হয়ে বেতনভোগী উপদেষ্টার কাজ করার ইতিহাস তাঁর রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবশ্য একপর্যায়ে ওয়েস্টমিনস্টার ছাড়াও মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের কথাও কখনো কখনো বলেছেন। নভেম্বর মাসে যখন ঢাকায় ছিলাম তখন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীও আমাকে বলেছিলেন যে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো উন্নতি করতে হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। বিরোধীদের হয়রানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রসঙ্গেই তাঁর বক্তব্যে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার কথা উঠেছিল। তখনই আমার আশঙ্কা হয়েছিল যে আসলে আওয়ামী লীগ ওই সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ার পথটাই অনুসরণ করতে চাইছে কি না।
রাজনৈতিক ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং গণমাধ্যমে ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে সরকার পরিবর্তন কি জিনিস সেটাই সেখানকার নাগরিকেরা ভুলে গেছেন। মালয়েশীয় নাগরিক জীবনে ভূমিপুত্রদের অগ্রাধিকার আর অন্যদের দ্বিতীয় শ্রেণীর অবস্থানে যেমন বৈষম্য, সে ধরনের গণতন্ত্র বাংলাদেশে কারোরই (সুবিধাভোগীরা ছাড়া) পছন্দ হওয়ার কথা নয়। সরকারপ্রধানের অনুগত থাকলে উপপ্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলে গেলে সমকামিতার অভিযোগে বন্দী রাখা এবং বিচারের নামে হয়রানির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম। সিঙ্গাপুরের শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকলেও মালয়েশিয়া ওই দুর্নাম থেকে মুক্ত নয়। আর সংবাদপত্রের ওপর শাসকদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকায় সরকারের কোনো জবাবদিহির অবকাশ নেই।
কৌশল যা-ই হোক না কেন, আলামতগুলো সুবিধার নয়। আদালতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার প্রক্রিয়ার মৃত্যু ঘটেছে অনেক আগেই। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে রয়েছে ২০৪১ সালের রূপকল্প। সংসদকে বিরোধীমুক্ত করার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের জন্য যেসব নীতিমালার কথা বলা হচ্ছে, তাতে করে সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনে ক্ষমতাসীনদের কর্তৃত্ববাদী বা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠার আশঙ্কাই প্রবল।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

বিশ্বায়নের কাল- হায় ওয়েস্টমিনস্টার! by কামাল আহমেদ

তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিলের কথা ওঠার সময় থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বারবারই গণতন্ত্রের যে মডেলটির কথা বলে এসেছেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ওয়েস্টমিনস্টারেই তিনি তাঁর ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন’ নিয়ে সবচেয়ে কঠোরভাবে সমালোচিত হয়েছেন।