Tuesday, September 1, 2026

যুদ্ধ, অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান ক্ষেত্র এখন হরমুজ

ইরান কেন দীর্ঘদিন ধরে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করার হুমকি দিলেও, বাস্তবে একে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা থেকে বিরত ছিল; এবং ২০২৬ সালের যুদ্ধের পর কেন সেই হিসাব বদলে যায়? কারণ, হরমুজ বন্ধ করা ইরানের জন্য একটি ‘শেষ অস্ত্র’। প্রণালিটি বন্ধ করলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল বা উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে না—ইরানের নিজের অর্থনীতি ও তেল রপ্তানিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সাউথ এশিয়া মনিটরে ২৮ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত ‘ইরান অ্যান্ড দ্য স্ট্রেইট অভ হরমুজ ব্লকেড: হোয়াই তেহরান ডিড নট ক্লোজ দ্য স্ট্রেইট আরলিয়ার’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে ব্রিগ্রেডিয়ার সঞ্জয় আগরওয়াল (অব.) এসব মন্তব্য করেন।

হরমুজ কেন ইরানের জন্য এত গুরুত্বপূর্ণ

হরমুজ প্রণালি ইরানের ভূগোলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। পারস্য উপসাগরের তেল ও গ্যাসের বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। তাই ইরান চাইলে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কিন্তু প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করা এবং সীমিতভাবে নিয়ন্ত্রণ/বাধা সৃষ্টি করা—দুটি এক জিনিস নয়। ইরান দীর্ঘদিন ধরে দ্বিতীয় পথটিই বেশি কার্যকর মনে করেছে।

পুরোপুরি বন্ধ করলে ইরানেরও ক্ষতি

ইরান নিজেও তেল রপ্তানি, আমদানি এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজ সম্পূর্ণ বন্ধ হলে: ইরানের তেল রপ্তানি কমে যাবে; বৈদেশিক মুদ্রা আয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে; খাদ্য ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি কঠিন হবে; ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়বে; যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়বে। অর্থাৎ যে অস্ত্র দিয়ে শত্রুকে আঘাত করা যায়, সেটিই উল্টো নিজের অর্থনীতির বিরুদ্ধেও ব্যবহার হয়। এই কারণেই এতদিন হরমুজ বন্ধ করা ইরানের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত ছিল।

তাহলে ইরান কী করত?

সম্পূর্ণ অবরোধের বদলে ইরান বিভিন্ন সময়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতা, পরিদর্শন, সামরিক টহল এবং নির্দিষ্ট জাহাজের চলাচল সীমিত করার মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রদর্শন করেছে। ২০২৬ সালের মে মাসেও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানিয়েছিল যে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল তাদের অনুমতি ও সমন্বয়ের মাধ্যমে হচ্ছে। এটি ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল তৈরি করে: “প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ না করেও আমি চাইলে তোমার বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা তৈরি করতে পারি।”অর্থাৎ হরমুজ ইরানের কাছে শুধু অবরোধের অস্ত্র নয়, কূটনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরির উদ্দেশ্যসাধনের উপায়।

২০২৬ সালে পরিস্থিতি কেন বদলে গেল?

২০২৬ সালের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের পর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে হরমুজ আর কেবল ইরানের সম্ভাব্য ‘শেষ অস্ত্র’ থাকেনি; প্রণালির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচল নিয়ে সরাসরি সামরিক সংঘাতের অংশ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজে নৌ চলাচল নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে, আর ইরান তার সামরিক সক্ষমতা ব্যবহার করে প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার চেষ্টা করছে। ৩১ আগস্টের ঘটনাবলিতে লারাক দ্বীপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলে মার্কিন হামলা এবং পরবর্তী ইরানি পাল্টা হামলা দেখিয়েছে যে হরমুজ এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্র।

ইরানের জন্য নতুন ‘হরমুজ প্যারাডক্স’

এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। হরমুজ যত বেশি সময় বন্ধ বা অস্থিতিশীল থাকবে, তত বেশি বিকল্প পথ খুঁজবে বিশ্বের দেশগুলো। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতোমধ্যে বিকল্প পাইপলাইন ও রপ্তানি পথের ওপর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে হরমুজের ওপর বিশ্বের নির্ভরতা কমতে পারে। অর্থাৎ ইরান যদি দীর্ঘদিন হরমুজকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে তার সবচেয়ে মূল্যবান ভূকৌশলগত সম্পদের গুরুত্বই ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। এটাই হরমুজ প্যারাডক্স: হরমুজকে যত বেশি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে, বিশ্ব তত বেশি হরমুজকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

চীন, ভারত ও এশিয়ার জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হরমুজের গুরুত্ব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উপসাগরীয় জ্বালানির বড় অংশ এশিয়ার দেশগুলোতে যায়। ফলে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে তেল ও জ্বালানির দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। ভারতের মতো দেশ ইতিমধ্যে হরমুজ সংকটের সময় নিজেদের জাহাজ ও জ্বালানি সরবরাহ নিরাপদ রাখতে নৌ-নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব পড়তে পারে।

সারকথা হলো— ইরান এতদিন হরমুজকে পুরোপুরি বন্ধ করেনি, কারণ সেটি ছিল নিজের অর্থনীতিকে আঘাত করার মতো সিদ্ধান্ত। কিন্তু ২০২৬ সালের যুদ্ধ সেই পুরোনো হিসাবকে বদলে দিয়েছে। এখন হরমুজ নিজেই যুদ্ধ, অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র।

আর দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হতে পারে—হরমুজকে যত বেশি সময় অস্থিতিশীল রাখা হবে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার তত বেশি বিকল্প পথ তৈরি করবে। ফলে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকৌশলগত উদ্দেশ্যসাধনের উপায়টি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

সূত্র: সাউথ এশিয়া মনিটর, দ্য গার্ডিয়ান, এশিয়া টাইমস, আল-জাজিরা, রয়টার্স ও উইকিপিডিয়া

যুদ্ধ, অর্থনীতি ও কূটনীতির প্রধান ক্ষেত্র এখন হরমুজ

ফিলিস্তিনিরা ঘরবন্দি, অবাধে চলাফেরা করছে ইহুদিরা

পশ্চিম তীরের নাবলুসের কাছে কুসরা গ্রামে চার ফিলিস্তিনি বাড়ি থেকে বের হতে পারছেন না। ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর চেকপোস্ট তাদের আটকে রেখেছে। পরিবারের সদস্যরাও খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ওষুধ নিয়ে তাদের কাছে যেতে পারছেন না। অথচ একই এলাকায় ইসরাইলি বসতির বাসিন্দারা অবাধে চলাফেরা করছেন।

আটকে পড়া ব্যক্তিদের একজন ফিলিস্তিনি-আমেরিকান লুই আবু রিদি। তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের তাদের বাড়িতে আসতে হলে ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে আগে সমন্বয় করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় কয়েক দিন লেগে যায়।

আল জাজিরাকে আবু রিদি বলেন, ‘সামরিক বাহিনী আমাদের পরিবারের সদস্যদের খাবার, প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও ওষুধ দিতে আসতে বাধা দিচ্ছে।’

ইসরাইলি সেনাদের সঙ্গে কথা বললেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না বলে জানান তিনি। সেনারা এলাকাটিকে ‘বন্ধ সামরিক এলাকা’ বলে উল্লেখ করছে।

আবু রিদি বলেন, ‘তারা বলে, এটি একটি বন্ধ সামরিক এলাকা এবং এখানে কেউ থাকতে পারবে না। অন্যদিকে, বসতির লোকজন অবাধে চলাফেরা করতে পারে। আসলে সর্বশেষ হামলাটিও আমার বাড়ি থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরে হয়েছে।’

২৯ আগস্ট গ্রামটিতে হামলার পর সেখানে আটকে থাকা বাসিন্দার সংখ্যা তিন থেকে বেড়ে চারজনে দাঁড়িয়েছে। গত এক মাসে কুসরায় ইসরাইলি বসতিদের সহিংসতাও বেড়েছে। আগস্ট থেকে গ্রামের তিনটি বাড়ি অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আবু রিদির পরিবারও সংকটে পড়েছে। তার ৮৩ বছর বয়সি মায়ের ওষুধ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। তার বোন একজন স্কুলশিক্ষক। আগামী সপ্তাহে তার স্কুলে যাওয়ার কথা। তার ভাই ও প্রতিবেশীরা এক মাস ধরে কাজে যেতে পারছেন না। তারা নিজেদের বাড়িতেই আটকা পড়ে আছেন।

ফিলিস্তিনিরা ঘরবন্দি, অবাধে চলাফেরা করছে ইহুদিরা
ছবি: এএফপি

‘ইরানের চেয়েও বড় হুমকি পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাস’

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ ইরান, গাজা কিংবা লেবানন নয়—ইসরাইলের জন্য এখন সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে উঠেছে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা। এমনটাই মনে করছেন দেশটির সাবেক জেনারেল, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রীদের একটি অংশ।

তাদের অভিযোগ, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে সরকারের সমর্থন ও নিরাপত্তা কাঠামোর একাংশের সহযোগিতা রয়েছে। বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, মসজিদ ও গ্রামে হামলা চালাচ্ছেন, আগুন দিচ্ছেন। তাদের জমি ও গবাদিপশু দখলেরও অভিযোগ রয়েছে।

ইসরাইলের সাবেক মেজর জেনারেল আইয়াল বেন-রুভেন সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেছেন। সেখানে তিনি বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দেখেছেন লুট হওয়া একটি স্কুলের ধ্বংসাবশেষও।

বেন-রুভেনের সামরিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে ইসরাইলের হয়ে যুদ্ধ করে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে তার প্লাটুন প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। পরে তিনি পশ্চিম তীরে একটি ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন। ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধেও ইসরাইলের স্থলবাহিনীর নেতৃত্ব দেন।

এখন সেই সাবেক জেনারেলই বলছেন, ইসরাইলের নিরাপত্তা নিয়ে তার ধারণা বদলে গেছে। বেন-রুভেন বলেন, ‘বসতিস্থাপনকারীরা এখানে যা করছে, সেটিই ইসরাইলের জন্য প্রকৃত হুমকি। ইরান, গাজা কিংবা লেবাননের চেয়েও এটি আমাকে বেশি উদ্বিগ্ন করছে।’

তার সঙ্গে সফরে থাকা সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী এফ্রাইম স্নেহ বলেন, ‘সহজভাবে বললে, এটি জাতিগত নির্মূল।’

পশ্চিম তীরে বাড়ছে হামলা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলে হামলার পর থেকে দেশটি একের পর এক যুদ্ধে জড়িয়েছে। ওই হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরাইলি নিহত হন। এরপর গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। এতে গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং কয়েক দশক হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে দুই দফা সংঘর্ষ হয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধেও দুটি সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরাইল।

এসব সংঘাতের আড়ালে পশ্চিম তীরে আরেকটি সংঘাত তীব্র হয়েছে।

সশস্ত্র ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর, মসজিদ ও গ্রামে হামলা চালাচ্ছেন। কোথাও আগুন দেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব হামলার উদ্দেশ্য ফিলিস্তিনিদের ওই এলাকা থেকে বিতাড়িত করা।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীরা হাজারো হামলা চালিয়েছেন। এতে হাজারো ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।

চলতি বছরেই বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় ৩ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গত বছরের তুলনায় এই হার দ্বিগুণ।

জাতিসংঘ বলছে, ২০২০ সালে বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় গড়ে প্রতি তিন দিনে একজন ফিলিস্তিনি আহত হতেন। ২০২৬ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিদিন তিনজনের বেশি।

ইসরাইলের পশ্চিম তীরে দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ সামরিক কমান্ডারও সতর্ক করেছেন, এই সহিংসতা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

‘ইহুদি সন্ত্রাস’ বন্ধের দাবি

পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে ইসরাইলের ভেতরে ক্ষোভও বাড়ছে। জুনে ২০০-এর বেশি প্রভাবশালী ইসরাইলি একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। তাদের মধ্যে ছিলেন দুজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ৩০-এর বেশি অবসরপ্রাপ্ত সেনা ও বিমানবাহিনীর জেনারেল এবং দেশটির বিদেশ ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক প্রধানেরা। ছিলেন রাব্বি, নোবেল পুরস্কারজয়ী ব্যক্তি ও একজন খ্যাতিমান ঔপন্যাসিকও।

চিঠিতে তারা পশ্চিম তীরে ‘ইহুদি সন্ত্রাস’ ও ‘জাতিগত নির্মূল’ বন্ধের দাবি জানান।

স্বাক্ষরকারীদের অনেকে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল থেকেও এসেছেন। তাদের অনেকেই একসময় কঠোর নিরাপত্তাপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

চিঠিতে বলা হয়, নেতানিয়াহু সরকার শুধু বসতিস্থাপনকারীদের হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়নি। বরং এটি একটি ‘পরিকল্পিত সরকারি নীতি’ অনুসরণ করছে।

সামরিক বাহিনী, শিন বেত ও পুলিশসহ পুরো নিরাপত্তা কাঠামো এতে জেনেশুনে জড়িত বলে তাদের অভিযোগ।

অবৈধ ইসরাইলি বসতি ও খামার গড়ে তুলতে সরকারি অর্থ ব্যয়েরও হিসাব চেয়েছেন তারা। এসব স্থাপনায় রাস্তা,

 পানি, বিদ্যুৎ, যানবাহন ও অস্ত্র সরবরাহে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।

অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আরো অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার সময় অনেক ক্ষেত্রে ইসরাইলি সেনারা দাঁড়িয়ে থাকে। কোথাও কোথাও সেনারা বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে মিলে ফিলিস্তিনি গ্রামেও হামলা চালায়।

‘আগের প্রধানমন্ত্রীদের কেউ এটা হতে দিতেন না’

চারজন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আজরিয়েল নেভো পশ্চিম তীরে যা দেখেছেন, তা ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।

তিনি বলেন, তিনি যেসব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের কেউ এমন ঘটনা ঘটতে দিতেন না।

এই সমালোচনার গুরুত্ব আরো বেশি। কারণ এসব অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনেকেই নিজের সামরিক জীবনে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়েছেন।

তারা হত্যার অনুমোদন দিয়েছেন, বিমান হামলা চালিয়েছেন এবং অভিযান পরিচালনা করেছেন। এসব অভিযানে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকও নিহত হয়েছেন।

তাদের বক্তব্য, তখন তারা ইসরাইলের নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক কাঠামো ও আইনি ব্যবস্থার অধীনে কাজ করেছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন বলে তারা মনে করেন।

তাদের মতে, এখন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণহীন ও নির্বিচার। নিরপরাধ বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য পশ্চিম তীরের বড় অংশ থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে সেখানে ইসরাইলিদের বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা শেষ করা।

নাৎসিবাদের সঙ্গে তুলনা

কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান হামলাকে নাৎসিবাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ইসরাইলে এই তুলনা অত্যন্ত বিতর্কিত। কারণ ইউরোপে নাৎসি নিপীড়নে বহু ইহুদি পরিবার নিশ্চিহ্ন হয়েছিল।

সাবেক সেনাপ্রধান ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন সম্প্রতি পশ্চিম তীরের উগ্র ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীদের আদর্শের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার জার্মানির তুলনা করেন।

ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেটে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ব কী?’

হলোকাস্টের ৮০ বছর পর পরিস্থিতিকে ‘উল্টো মাইন ক্যাম্পফ’ হিসেবে উল্লেখ করে ইয়ালন বলেন, ‘শ্রেষ্ঠ জাতি আমরা।’

নেতানিয়াহুর কার্যালয় এসব অভিযোগ নিয়ে মন্তব্য করেনি। পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা নিয়ে তথ্য চাইলেও সরকার একাধিক অনুরোধের জবাব দেয়নি।

এর আগে নেতানিয়াহু বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ‘মুষ্টিমেয় কয়েকজন তরুণের’ বেআইনি কর্মকাণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী আবার বলেছেন, ‘ইহুদি সন্ত্রাস’ বলে কিছু নেই।

তবে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রও এর নিন্দা জানিয়েছে।

সম্প্রতি বসতিস্থাপনকারীরা কয়েকটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ঘেরাও করেন। এর একটি বাড়ির মালিক ছিলেন একজন মার্কিন নাগরিক।

এর পর নেতানিয়াহু এক বিরল বিবৃতিতে এসব ঘটনাকে ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ বলেন।

তার মতে, এতে আইন মেনে চলা বসতিস্থাপনকারীদের ‘ব্যাপক ক্ষতি’ হচ্ছে এবং বিশ্বে ইসরাইলের অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনী অবশ্য বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতায় সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

তাদের বক্তব্য, পশ্চিম তীরে তাদের দায়িত্ব হলো ‘সব বাসিন্দাকে সুরক্ষা দেওয়া’।

সামরিক বাহিনী বলেছে, কোনো সেনা বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় অংশ নিলে বা হামলার সময় দাঁড়িয়ে থাকলে তিনি তার আদেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছেন।

‘ওরা আমার বাড়ি নিয়ে নিতে চায়’

পশ্চিম তীরের বুরিন গ্রামে সাবেক ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সামনে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ফিলিস্তিনি কৃষক বাশার ঈদ। লাঠিতে ভর দিয়ে তিনি তাদের বাড়ির ছাদে নিয়ে যান। তার দাবি, বসতিস্থাপনকারীদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হয়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন।

তিনি বলেন, পাহাড়ের আশপাশে থাকা বসতিস্থাপনকারীদের ঘাঁটি থেকে প্রায় প্রতিদিন তার গ্রামে হামলা হয়। এমনকি ইহুদিদের বিশ্রামের দিন সাবাথেও তারা সেখানে আসেন।

একদিন নিজের জমিতে এক কিশোর বসতিস্থাপনকারীকে দেখতে পান ঈদ। কী করছে জানতে চাইলে কিশোরটি তাকে চুপ করতে বলে। অন্যথায় তার অন্য পা-টিও ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেয়।

ঈদ বলেন, ‘একটি শিশু আমাকে এ কথা বলেছে।’

হামলার ভয়ে এখন আর নিজের জমিতে চাষ করতে পারেন না তিনি। দিনের বড় সময় বাড়ির ছাদে বসে বসতিস্থাপনকারীদের গতিবিধি দেখেন।

তিনি বলেন, ‘আমি জানি না কী করব। ওরা আমার বাড়ি নিয়ে নিতে চায়।’

সফরে থাকা সাবেক এক প্রধান রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলি প্রশ্ন করেন, ইসরাইলি বাহিনী যখন ফিলিস্তিনিদের রক্ষা করছে না, তখন তারা নিজেদের রক্ষা করেন না কেন।

ঈদ বলেন, তিনি নিজেকে রক্ষা করলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে বলে ভয় পান।

সফর আয়োজনকারী সাবেক জেনারেল ইয়াকভ অর বলেন, ফিলিস্তিনিরা সহিংসভাবে প্রতিরোধ করলে বসতিস্থাপনকারীদের পাল্টা হামলা আরো কঠোর হতে পারে। ইসরাইলি সেনাবাহিনীও তখন অভিযানে নামতে পারে।

একটি জনপদ মুছে যাওয়ার গল্প

পশ্চিম তীরের জর্ডান উপত্যকায় গত কয়েক বছরে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতায় কয়েকটি ফিলিস্তিনি জনপদ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এর একটি হামামাত আল-মালেহ।

ফেব্রুয়ারিতে সেখানে কয়েকটি পরিবারকে উসমানীয় আমলের একটি পাথরের ভবনে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। তারা খালি মেঝেতে গাদাগাদি করে থাকতেন।

৩৭ বছর বয়সি মোহাম্মদ খলিল বলেন, ‘আমরা এক ঘণ্টাও ঘুমাতে পারি না। তারা যখন আসে, আর আপনি ঘুমিয়ে থাকেন, তাহলে বাঁচবেন না।’

সেখানে দাতাদের অর্থে তৈরি একটি স্কুলও ছিল। তবে শিক্ষার্থীরা সবাই চলে যাওয়ায় স্কুলটি বন্ধ ছিল।

মার্চে বসতিস্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলা, লুটপাট ও চুরির পর খলিলসহ শেষ পরিবারগুলোও এলাকা ছেড়ে যায়।

এরপর বাসিন্দা ও অধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বসতিস্থাপনকারীরা বুলডোজার দিয়ে স্কুলটি গুঁড়িয়ে দেয়। পরে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাসওভার উৎসব উদ্‌যাপনের ভিডিও প্রকাশ করা হয়।

জুনের শেষ দিকে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলরা সেখানে পৌঁছানোর সময় পুরো জনপদটি ফাঁকা।

ধ্বংস হওয়া স্কুল দেখে ক্ষুব্ধ হন সাবেক বিমানবাহিনী জেনারেল নেহেমিয়া ডাগান।

তিনি বলেন, ‘যখন আপনি বই পোড়ান, জ্ঞান ধ্বংস করেন এবং শিশুদের ওপর হামলা করেন, তখন আপনি জার্মানদের মতো আচরণ করছেন।’

৮৬ বছর বয়সি ডাগান বলেন, ‘আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলেছি। এই লড়াইটিও আমরা হেরে গেছি।’

দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের আলাদা হতে হবে। তাদের জন্য নয়, আমাদের নিজেদের জন্য।’

‘ছয় মাস আগে এটি আমাদের জমি ছিল’

সফরের শেষ দিকে উত্তর জর্ডান উপত্যকার একটি অনুর্বর এলাকায় যান সাবেক জেনারেলরা।

সেখানে এক তরুণ ফিলিস্তিনি কৃষক তাদের নিজের জমির দিকে দেখান। পেছনের পাহাড়ে বসতিস্থাপনকারীদের একটি ঘাঁটি। তার ওপর ইসরাইলি পতাকা উড়ছে। সামনেও সারি করে ইসরাইলি পতাকা পোঁতা। কাছেই একটি বেড়া দেওয়া হয়েছে। এতে কৃষকের জমিটি অনেকটা ঘেরের মতো হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘ছয় মাস আগে এটি আমাদের জমি ছিল। এখন এটি জেলের মতো।’

জানুয়ারি পর্যন্ত তাদের জীবন স্বাভাবিক ছিল। তারা চাষ করতেন, ভেড়া চরাতেন এবং নিজেদের মতো চলাফেরা করতেন।

প্রথম বসতিস্থাপনকারীরা পাহাড়ে অবস্থান নেওয়ার পর সব বদলে যায়।

কৃষক বলেন, জমিতে যাওয়ার চেষ্টা করলেই বসতিস্থাপনকারীরা পুলিশে খবর দেয়। তাকে চারবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রতিবারই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বসতিস্থাপনকারীদের হয়রানি কিংবা
 পানির ট্যাংক নষ্ট করার অভিযোগ জানাতে পুলিশকে ফোন করলে কেউ সাড়া দেয় না বলে তার অভিযোগ।

ইসরাইলের জাতীয় পুলিশ অবশ্য বলেছে, সন্দেহভাজন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিটি অভিযোগ ও ঘটনা তারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে।

জমিতে যেতে না পারায় কৃষক তার ভেড়াগুলোও বিক্রি করে দেন। কারণ, সেগুলো চরাতে না পারলে বসতিস্থাপনকারীদের হাতে হারানো অথবা খাবারের অভাবে মারা যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।

‘আমি লজ্জিত’

সফরে থাকা অনেক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজেরাও ইসরাইলের সামরিক অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের কেউ কেউ এমন হামলার অনুমোদন দিয়েছেন, যেখানে শিশু নিহত হওয়ার আশঙ্কাও তারা জানতেন।

তাদের যুক্তি ছিল, এসব পদক্ষেপ ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন।

কিন্তু পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের বর্তমান হামলা ইসরাইলকে নিরাপদ করছে না বলে মনে করেন তারা। বরং এর বিপরীতটাই ঘটছে বলে তাদের আশঙ্কা।

সাবেক বিমানবাহিনী জেনারেল আসাফ আগমন বলেন, ‘ইসরাইলের ভাবমূর্তি, কূটনৈতিক মূল্য এবং সামরিক বাহিনীকে একসঙ্গে ধরে রাখা মূল মূল্যবোধগুলো নষ্ট করে আপনি কিছুই অর্জন করতে পারবেন না।’

৭৮ বছর বয়সি আগমনের নাতি একজন ইসরাইলি সেনা ছিলেন। গত বছর লেবাননে তিনি নিহত হন।

আগমন বলেন, ‘আমার পরিবার ও আমি এই দেশের জন্য সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছি।’

এরপর তার বক্তব্য আরো কঠোর হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ এখানে যা করছে, তাতে আমি লজ্জিত।’

একসময় যারা ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুদ্ধ করেছেন, তাদেরই কেউ কেউ এখন বলছেন, পশ্চিম তীরের এই সহিংসতা শুধু ফিলিস্তিনিদের জীবনকেই বিপন্ন করছে না। এটি ইসরাইলের গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

‘ইরানের চেয়েও বড় হুমকি পশ্চিম তীরে ইহুদি সন্ত্রাস’
ছবি: আনাদোলু

দেশে কোটির বেশি মানুষ জানেনই না তাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত

নভেম্বর ডায়াবেটিস সচেতনতা মাস। এ উপলক্ষে কংগ্রেসিয়া ও প্রথম আলোর আয়োজনে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন দেশের কয়েকজন স্বনামধন্য চিকিৎসক। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল ‘ডায়াবেটিস আমার, দায়িত্বও আমার’। সহযোগিতায় ছিল হেলদি লিভিং ট্রাস্ট। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. তানজিনা হোসেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বারডেম একাডেমির পরিচালক (শিক্ষা) এবং ডায়াবেটিস মেলার উপদেষ্টা পরিষদ সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. ফারুক পাঠান। তাঁর বক্তব্যটি এখানে তুলে ধরা হলো।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই আমাদের দেশেও ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর সেই হারটা উন্নত দেশের চেয়ে আরও দ্রুত। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশের ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখের মতো। অনুমান করা হচ্ছে, এভাবে বাড়লে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ বা আরও বেশি হতে পারে। বাংলাদেশ ডায়াবেটিস সমিতির নিজস্ব পরিসংখ্যানমতে, ২৫ শতাংশ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্করা জানেন না তাঁরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সংখ্যা যদি ১২ কোটি হয় তাহলে ৩ কোটির ওপর মানুষ জানেন না তাঁদের ডায়াবেটিস আছে। ডায়াবেটিসের পেছনে যতই জিনগত কারণ থাকুক না কেন, যদি পরিবেশ সহায় না হয়, তাহলে এই রোগের বহিঃপ্রকাশ কখনোই হয় না।

আমাদের আর্থসামাজিক পরিবর্তন হচ্ছে, নগরায়ণ হচ্ছে। এর সঙ্গে সুস্থ জীবনযাত্রার যে উপাদানগুলো আছে, সেখান থেকে আমরা অনেকটা দূরে সরে যাচ্ছি। স্বাস্থ্যকর খাবার পরিবর্তন হয়ে এখন অস্বাস্থ্যকর খাবার চলে এসেছে। দ্রুত খাওয়া ও সময় বাঁচানোর জন্য ফাস্ট ফুডের মতো উচ্চ ক্যালরি ও উচ্চ ফ্যাটজাতীয় খাবারের দিকে ঝুঁকছি। বাড়িতে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তৈরির সুযোগ কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যে কায়িক পরিশ্রম দরকার, সেটিও আমরা ঠিকমতো করছি না। এ ছাড়া আমাদের মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন আসছে। এখন এআইয়ের যুগ। মানুষ বেশির ভাগ সময় ব্যয় করছে ইলেকট্রনিক মিডিয়াকে কাজে লাগানোর জন্য। দিনে আমরা প্রায় ১০–১৫ ঘণ্টা সময় কাটাচ্ছি ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পেছনে। আমরা সব সময় চাপের মধ্যে থাকছি। এ ছাড়া আমাদের যে ৬–৭ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন, তা–ও আমরা পাচ্ছি না।

যাঁদের ডায়াবেটিসের বংশগত কারণ রয়েছে, কায়িক পরিশ্রম করেন না বা ওজন বাড়ছে, তাঁদের ডায়াবেটিস আছে কি না, তা দ্রুত নির্ণয় করতে হবে। আমাদের জানামতে, ৯২ শতাংশ ডায়াবেটিক রোগীর শর্করা নিয়ন্ত্রণে নেই। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় নানা জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। আমাদের কর্মজীবন ও কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে, যা অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। আজ আমাদের যে স্লোগানটি রয়েছে ‘ডায়াবেটিস আমার, দায়িত্বও আমার’, এটি কিন্তু আসলেই নিজের। যতই চিকিৎসক থাকুন না কেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিজেকেই সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিমাণমতো খেতে হবে, প্রতিদিন কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। সুগার নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধ ঠিকমতো খেতে হবে। রোগীকে ভাবতে হবে, তাঁর অন্য কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলো কি না। এমন কোনো জটিলতার সৃষ্টি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-26%2Fp5vcw85h%2FDIPU0138.jpg?rect=458%2C0%2C3266%2C2177&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
অধ্যাপক ডা. ফারুক পাঠান। ছবি: দীপু মালাকার

যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারির পদত্যাগ

হেগসেথের সঙ্গে দ্বন্দ্বঃ যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ডিসক্রল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে কয়েক মাসের টানাপোড়েনের মধ্যেই তার এই পদত্যাগের খবর সামনে এলো। একাধিক সূত্রের বরাতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সিএনএন।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ বিষয়ে খবরটি সর্বপ্রথম প্রকাশ করে।

একটি সূত্রের মতে, সেক্রেটারি অব ডিফেন্স (প্রতিরক্ষামন্ত্রী) পিট হেগসেথের সঙ্গে ঝামেলার পর তার এমন সিদ্ধান্ত অবাক করার মতো নয়।

মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, ডিসক্রল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বাহিনীর বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন এবং তার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।

হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বিবৃতির মাধ্যমে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এমএজিএ (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) এজেন্ডা বাস্তবায়নে সেক্রেটারি ডিসক্রল দক্ষ ছিলেন। তিনি সামরিক অভিযানে উল্লেখযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাশিয়া ও ইউক্রেনে এবং আরও বিভিন্ন জায়গায় দর কষাকষিতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন।

সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে ডিসক্রলের দ্বন্দ্বের খবর প্রকাশ্যে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য সাবেক আর্মি সেক্রেটারি ডিসক্রল ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের দীর্ঘদিনের বন্ধু।

এই বছরের শুরুতে হেগসেথ দুই জেনারেলের পাশাপাশি আর্মি চিফ অব স্টাফ রেন্ডি জর্জকে বরখাস্ত করেন। জর্জ ও ডিসক্রল দীর্ঘদিন একসঙ্গে কাজ করেছেন। জর্জকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় ডিসক্রল ও হেগসেথের মধ্যকার টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্যে আসে।

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত ছয় মাসে গড়িয়েছে। যুদ্ধ থামার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর চাপও ক্রমেই বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা, যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রাখার ফলে বিশ্বের অন্য অঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা মনে করছেন।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে দেশটির সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ইরানের বিরুদ্ধে বড় আকারের সামরিক অভিযান আরও দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।

এ বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাতে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, তারা মনে করছেন, এভাবে অভিযান চালিয়ে যাওয়া টেকসই নয় ও এতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যত্র, এমনকি নিজ ভূখণ্ডের নিরাপত্তা মোকাবিলার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গোপনীয় ওই মূল্যায়নের বিষয়টি ১৪ আগস্টের ‘সেক্রেটারি অব ডিফেন্স অর্ডার্স বুক’ বা এসডিওবিতে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। নথিটি সাধারণত মাসে দুইবার তৈরি করা হয়। এতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ, বিমান, সেনাসদস্য ও অস্ত্রব্যবস্থার প্রাপ্যতা সম্পর্কে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সামরিক অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে কী ধরনের সম্পদ কোথায় ব্যবহার করা হচ্ছে ও বাহিনীর শীর্ষ জেনারেল ও অ্যাডমিরালরা সেই ব্যবস্থাপনা নিয়ে কী ভাবছেন, তারও প্রতিফলন থাকে।

ইরান যুদ্ধের জন্য ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় দায়িত্ব পালনকারী মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও অন্যান্য সরঞ্জামের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে সংশ্লিষ্ট কমান্ডগুলোর নিজ নিজ এলাকায় মিশন পরিচালনা ও নিয়মিত প্রশিক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে নৌবাহিনী যুদ্ধকালীন চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে যাচ্ছে বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে।

মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর ইরান যুদ্ধের চাপ সবচেয়ে বেশি বলে মূল্যায়নে উঠে এসেছে। নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল হেগসেথকে জানিয়েছেন, বর্তমান মাত্রায় ইরান যুদ্ধকে আর দীর্ঘ সময় সমর্থন করা সম্ভব নয়। কারণ সংঘাত শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দেখা যাচ্ছে না।

ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণ মোকাবিলায় নৌবাহিনীকে বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করতে হয়েছে। পরবর্তী কয়েক মাসে ট্রাম্পের ইরানি বন্দর অবরোধ কার্যকর করা এবং হরমুজ প্রণালি খুলতে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও এসব জাহাজ ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে কিছু যুদ্ধজাহাজ ও নৌসদস্যের মোতায়েনের মেয়াদ কয়েক মাস করে বাড়ানো হয়েছে।

ডিসক্রলের পদত্যাগ এমন এক সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্বে একের পর এক পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা চলছে। তার বিদায়ের ফলে সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।

সূত্র: সিএনএন, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

সদ্য পদত্যাগ করা যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ডিসক্রল। ছবি: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
সদ্য পদত্যাগ করা যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ডিসক্রল। ছবি: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

গানের কথাই যেন জীবনের পরিণতি, চাদরে মোড়ানো জেনস সুমনের শেষযাত্রা by মনজুর কাদের

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫ঃ ‘একটা চাদর হবে চাদর, যে চাদরে লুকিয়ে থাকবে মানবপ্রেমের আদর’—নিজের গাওয়া সেই গানের মতোই চাদরে লুকিয়েই শেষযাত্রায় বেরিয়ে পড়লেন আলোচিত সংগীতশিল্পী জেনস সুমন। তবে এ যাত্রায় তিনি নিজে সেই চাদর পরেননি, তাঁকে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে সেই চাদর, যা পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে তাঁর নিথর দেহ।

অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে তিনি চিরঘুমে; চারদিকে গাড়ি, রিকশা, মানুষের ব্যস্ত চলাচল। কতটাই না নিষ্ঠুর জীবন—অ্যাম্বুলেন্সের মাত্র কয়েক হাত দূরেই পাশের চায়ের দোকানে কয়েকজন তরুণ চা খাচ্ছিলেন। তাঁদের একজন গুনগুন করে গাইছিলেন, ‘একটা চাদর হবে চাদর…।’ হয়তো জানতেও পারেননি, যাঁর গান তিনি গাইছিলেন, সেই শিল্পী পাশের অ্যাম্বুলেন্সেই শুয়ে আছেন নিথর। এ-ই হয়তো শিল্পীর সত্যিকারের সার্থকতা। চলে যাওয়ার পরও গান বেঁচে থাকে।

শেষযাত্রার শুরু
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার একটু বেশি। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে মিরপুর রোড ধরে সুমনের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স এসে থামে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের আল মারকাজুলে। মোটরসাইকেলে পেছনে ছিলেন সংগীতশিল্পী ও সংগীতায়োজক ঈশা খান। সঙ্গে যন্ত্রসংগীতশিল্পী ফয়েজ পুলক এবং সুমনের এক মামাও। সেখানে মরদেহ ধোয়া ও কাফন পরানোর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। সেখান পৌঁছান যন্ত্রসংগীতশিল্পী আজমীর বাবু, গায়ক নমন। ফোনে বারবার খবর নিচ্ছিলেন শিল্পী ইথুন বাবু, যিনি প্রথম সুমনকে শ্রোতাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। কাজ শেষে মরদেহ আবার নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।

হাসপাতালে আহাজারি, সিদ্ধান্তহীনতা
হাসপাতালে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন সুমনের মা সুফিয়া খাতুন, স্ত্রী বীথি মেহেদী, দুই সন্তান, ছোট ভাই শরিফ মেহেদী ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন। একমাত্র ছোট বোন খুলনা থেকে তখন ঢাকার পথে। রাত আটটা। তখনো ঠিক হয়নি কোথায় দাফন হবে। এদিকে হাসপাতালের এক কোণে একটু পরপর ভেঙে পড়ছেন মা সুফিয়া খাতুন। ১৮ বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর এবার বড় ছেলেকে হারানো—এই ব্যথা কোনো ভাষায় ধরা যায় না। অবশেষে তাঁকে বাসায় পাঠানো হয়। কাঁদতে কাঁদতেই গাড়িতে ওঠেন তিনি। এ সময় হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে নিথর সুমন অপেক্ষা করে আছেন… যেন নীরব দর্শক।

দাফনের জায়গা-সময় নিয়ে মতবিরোধ
পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে সুমনের মরদেহ ফরিদপুরে দাফনের কথা ওঠে। পরে সিদ্ধান্ত হয়, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে সমাহিত করা হবে। কিন্তু সমাহিত করার সময় নিয়ে বড় জটিলতা দেখা দেয়। সুমনের ভাই ও মামারা চান, ছোট বোন ঢাকায় পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা হোক, যাতে বড় ভাইকে শেষবার দেখতে পারেন। কিন্তু সুমনের স্ত্রীর ইচ্ছা ছিল রাত ১০টার মধ্যেই দাফন করা হোক। পরিবার দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। আর সাদা কাফনে মোড়ানো সুমন অ্যাম্বুলেন্সে।

ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে জটিলতা
হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে সাদা কাফনে মোড়ানো সুমন চিরঘুমে। এদিকে তাঁর মরদেহ কখন দাফন হবে এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এসব কথাবার্তার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স বদলের একটা সিদ্ধান্ত আসে। একমাত্র বোনের আসা এবং সকাল পর্যন্ত মরদেহ রাখতে হলে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের চালকদের সঙ্গে কথা বলেন সুমনের অধ্যাপক মামা দেলোয়ার হোসেন (তিতুমীর কলেজ, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ)। মৃত ব্যক্তির পরিবারের অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে দেরি করলেন না অ্যাম্বুলেন্সের চালক। দ্বিগুণ ভাড়া চেয়ে বসলেন। পরে আল মারকাজুলে যোগাযোগ করলে তারা ২০ থেকে ৩০ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর কথা জানায়। তখনই প্রথম চালক এসে বলেন, ‘ঠিক আছে, যা দিবেন ওদের, আমাকেও দিলেই হবে। মরা মানুষটারে আর কষ্ট দিই না।’ সুমনের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আমরা ওখানে কথা দিয়েছি, ওরাই নিয়ে যাক। কথাবার্তার একপর্যায়ে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায়। সুমনকে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এর মধ্যে শেষ হয় হাসপাতালের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা। রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলে উত্তরার খানটেক এলাকায় সুমনের বাসার উদ্দেশে।

খানটেকের বাড়িতে শেষ রাত
ফ্রিজিং গাড়িতে পাশে ছিলেন ছোট ভাই শরিফ ও যন্ত্রসংগীতশিল্পী পুলক। বাড়িতে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন ইথুন বাবু, তিনি সুমনের স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলেন সকালে দাফন করাই ভালো। এভাবেই ঠিক হয় জানাজার সময়। আজ শনিবার সকাল ১০টায় উত্তরার খানটেক জামে মসজিদে প্রথম জানাজা হয়। পরে ৪ নম্বর সেক্টর জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে একই সেক্টরের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সেই কবরেই ২০০৭ সালে সমাহিত করা হয়েছিল সুমনের বাবা ফারুক মেহেদীকে। এবার তাঁর কবরেই সমাহিত করা হলো সুমনকে।

একনজরে সুমন
সুমনের পুরো নাম গালিব আহসান মেহেদী। বিনোদন অঙ্গনে ও তাঁর ভক্ত–শ্রোতাদের কাছে তিনি জেনস সুমন নামেই পরিচিত। জন্ম ১৯৭৯ সালে শরিয়তপুরে নানাবাড়িতে হলেও ছোটবেলা কেটেছে ধানমন্ডি ১৫ নম্বর এলাকায়। এরপর বেড়ে ওঠার সময়টায় ছিলেন ঢাকার মণিপুরিপাড়ায়। বাবা উত্তরার খানটেক এলাকায় বাড়ি বানানোর পর সুমনরা সেখানে বসবাস শুরু করেন।

কয়েক বছর ধরে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যাত্রাবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। গত ২৮ নভেম্বর ২০২৫ শুক্রবার সকালে যাত্রাবাড়ির বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর দ্রুত তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে জানতে পারেন তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। পরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। এরপর বেলা সাড়ে তিনটায় তিনি মারা যান। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৫। সুমন স্ত্রী, দুই সন্তান, মা, এক ভাই, এক বোনসহ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবাবন্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের রেখে গেছেন।

‘একটা চাদর হবে’—এই একটি গানই তাঁকে দেশের ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। ১৯৯৭ সালে তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘আশীর্বাদ’ প্রকাশের পর একের পর এক শ্রোতাপ্রিয় অ্যালবাম উপহার দেন তিনি ‘আকাশ কেঁদেছে’, ‘অতিথি’, ‘আশাবাদী’, ‘একটা চাদর হবে’, ‘আয় তোরা আয়’, ‘চেরি’সহ আরও অনেক গান। ২০০২ সালে বিটিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে প্রচারের পর সাড়া ফেলে ‘একটা চাদর হবে’ গানটি। রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন গানটির গায়ক জেনস সুমন। তারপর আরও কিছু গান করেছেন। এরপর দীর্ঘ বিরতি।

২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সবশেষ অ্যালবাম ‘মন চলো রূপের নগরে’। এরপর কিছুটা অনিয়মিত হয়ে পড়লেও শ্রোতাদের মনে জায়গা ছিল অটুট। ১৬ বছরের বিরতি ভেঙে ২০২৪ সালে প্রকাশ পায় তাঁর গান ‘আসমান জমিন’। জি-সিরিজের ইউটিউব চ্যানেলে গানটি মুক্তি পায়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-29%2F21uat6u5%2F5450171108081720118950122717428912645130051n.jpg?rect=0%2C0%2C1728%2C1152&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সংগীতশিল্পী জেনস সুমন। ছবি: ফেসবুক