Sunday, March 10, 2019

ভারতে লোকসভা নির্বাচন: ভোট শুরু ১১ এপ্রিল, ফল ঘোষণা ২৩ মে

আগামী ১১ ই এপ্রিল ভারতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হবে। এরপর আরও ছয় ধাপে এপ্রিল ও মে মাস জুড়ে হবে এবারের লোকসভা নির্বাচন। মোট সাত ধাপে এপ্রিল ও মে মাসের সাতটি দিনে লোকসভার মোট ৫৪৩টি আসনের ভোটগ্রহণ হবে। প্রথম দফার নির্বাচন ২০টি রাজ্যের ৯১টি আসনে হবে ১১এপ্রিল।
দ্বিতীয় দফায় ১৩টি রাজ্যের ৯৭টি আসনে ১৮ এপ্রিল, তৃতীয দফায় ১৪টি রাজ্যের ১১৫টি আসনে ২৩ এপ্রিল, চতুর্থ দফায় ৯টি রাজ্যের ৭১টি আসনে ২৯ এপ্রিল, পঞ্চম দফায় ৭টি রাজ্যের ৫১টি আসনে ৬ মে, ষষ্ট দফায় ৭টি রাজ্যের ৫৯টি আসনে) ১২ মে এবং সপ্তম ও শেষ দফায় ৮টি রাজ্যের ৫৯টি আসনে ১৯ মে নির্বাচন অনুষ্টিত হবে। আর ফল ঘোষনা করা হবে ২৩ মে।
নির্বাচন হওয়ার পর আগামী ২৩ মে ভোটের ফল ঘোষণা করা হবে। দেশজুড়ে লোকসভা নির্বাচনের পাশাপাশি অন্ধ্রপ্রদেশ, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ ও ওডিশা রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হবে। তবে জম্মু ও কাশ্মীরে এখনই বিধানসভা নির্বাচন হবে না বলে কমিশন জানিয়েছে।
রোববার স্থানীয় সময় বিকাল পাঁচটায় সংবাদ সম্মেলনে দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) সুনীল অরোরা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন।
প্রায় ৯০ কোটি ভোটার লোকসভা এবারের নির্বাচনে ভোট দেবেন। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা বিভিন্ন রাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাজ করা শুরু করে দিয়েছেন।
এদিকে এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তফসিল ঘোষণায় অযথা দেরি করার অভিযোগ এনেছে কংগ্রেস। বর্তমান লোকসভার মেয়াদ ৩ জুন পর্যন্ত। সেই হিসেবে সংবিধান অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যেই নতুন সরকারকে শপথ নিতে হবে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা নিয়ে কমিশন টালবাহানা করছে।
শেষ মুহূর্তে কয়েকটি উন্নয়নমূলক প্রকল্প ঘোষণার জন্য বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারকে। তবে নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে।

‘বিএসএমএমইউ হাসপাতালে যেতে রাজি হননি খালেদা জিয়া’

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে যেতে রাজি হননি বলে জানিয়েছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির।
আজ (রোববার) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলতে যান সিনিয়র জেল সুপার ইকবালকবিরসহ মেডিকেল টিম। পরে পৌনে ১টার দিকে কারাগার থেকে বেরিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে সিনিয়র জেল সুপার বলেন, ‘উনি যাবেন না’।
এ বিষয়ে জেলার মাহবুব আলম জানান, চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি অনীহা প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘উনি দেরিতে ঘুম থেকে ওঠায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে নেওয়ার যে প্রক্রিয়া ছিল তা সম্ভব হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষ সবরকম চেষ্টা করেও খালেদা জিয়াকে রাজি করাতে পারেনি।’
চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শামীম অর রশীদ তালুকদার বলেন, খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে পাঠানোর যাবতীয় প্রস্তুতি সকাল থেকে নেয়া ছিল। কিন্তু রেজাল্ট নেগেটিভ। উনি বিএসএমএমইউতে যেতে রাজি হননি।
এদিকে, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে চিকিৎসা নিতে চান বলে বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টর’স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ—ড্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। 
ড্যাবের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার আজ দুপুরে বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ। এমনকি হুইলচেয়ারে বসার যে পাদানি থাকে, সেখানে ঠিকমতো পা রাখতে পারেন না। উনার যে ইচ্ছাটা, ইউনাইটেড হাসপাতালে উনি চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। ওখানে নিজস্ব যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন, যারা সারাজীবন উনাকে দেখছেন, তাঁরা ওখানে আছেন, তাদের অধীনে চিকিৎসা নিতে।’
এর আগে কারাগার সূত্র জানায়, আজ দুপুর ১২টার পর বেগম খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে নেয়া হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আবদুল্লাহ আল হারুনও বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়াকে নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউতে আনার খবরে সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যাপ্ত সংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়। হাসপাতালে ভিড় জমান গণমাধ্যম কর্মীরা। তবে বেলা একটার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা চলে যান।
এর আগে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য শিগগিরই বিএসএমএমইউতে নেয়া হবে বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। গত সপ্তাহের মঙ্গলবার দুপুরে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে কথা বলতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যান বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল। তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় একটি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। সেই বোর্ডের পরামর্শ অনুযায়ীই তার চিকিৎসা চলছে। যেহেতু এটা আদালতের নির্দেশ, তাই বোর্ড যেমন বলছে তেমনভাবেই সব চলছে।
বিএনপি নেতারা বৈঠকে কী বলেছেন জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তারা খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার জন্য ইউনাইটেড হাসপাতালে নিতে চেয়েছেন। কিন্তু যেহেতু আদালতের নির্দেশ আছে তাই বোর্ড যা সিদ্ধান্ত নেবে তাই হবে।

পর্যটনশিল্প বিকাশে চীনা কায়দা by তৌহিদুল ইসলাম

পর্যটন শিল্প বিকাশে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে চীন। বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্নভাবে দেশি-বিদেশ পর্যটক টানার চেষ্টা করছে দেশটি। তার ফলও পেয়েছে। ২০১২ সাল থেকে বিশ্বে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছে চীন।
গত বছর প্রায় ১৫ কোটি বিদেশি পর্যটক চীনে ঘুরে গেছেন। তার আগের বছর পর্যটকেরা চীন সফরে ব্যয় করেছেন ২৫ হাজার কোটি ডলারের ওপরে। যা বিশ্ব পর্যটকদের একই সময়ে প্রায় আমেরিকা ভ্রমণে ব্যয়ের সমান।
চীনা কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রচারণা ও প্রভাবিত করেই পর্যটক টানতে হবে। আর এ জন্য পর্যটন স্থানগুলো ব্যাপকভাবে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ চলছে। মূলত বিদেশি পর্যটকদের আরও বেশি করে আকৃষ্ট করতে এই কায়দা নিয়েছে চীন। সম্প্রতি নিজেদের প্রতিটি খাত ধরে ধরে উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাক্রমশালী দেশটি।
যুক্তরাজ্যের সাপ্তাহিক প্রকাশনা টাইমস হায়ার এডুকেশন সাময়িকীর জরিপে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চীনের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না থাকায় কর্তৃপক্ষকে ভাবিয়ে তুলেছে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে শীর্ষস্থান দখলে নিতে চীন প্রবল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ক্রয়-বিক্রয়ের স্থান হলো সাংহাই এক্সচেঞ্জ। চাইলে যে কেউ এই বাজারে প্রবেশের অনুমতি পায়। চীনের এই স্বর্ণের বাজার এখন রমরমা। এরপর পর্যটন খাত নিয়ে ভিন্নভাবে ভাবছে তারা।
রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে পর্যটন শিল্পকে গুরুত্ব দিচ্ছে পূর্ব এশিয়ার এই দেশ। এমনকি ‘পর্যটন কূটনীতি’ শীর্ষক টার্ম ব্যবহার এই খাতের গুরুত্বের জানান দেওয়া হচ্ছে। দেশটির কমিউনিস্ট পার্টির মুখপাত্র দ্য পিপলস ডেইলি বলছে, চীনা পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য হাতিয়ার হচ্ছে ‘পর্যটন কূটনীতি’।
বিশ্বের বিপুলসংখ্যক পর্যটক যেমন চীন ভ্রমণে যায়, তেমনি চীনের নাগরিকের বড় একটি অংশ প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরতে যায়। এতে চীনা পর্যটকেরাও বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক খাতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই ছুটির দিন বা অবকাশ যাপনে বিদেশে না গিয়ে যাতে দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে ঘুরে বেড়ায়—সেদিকটিতে উৎসাহ দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। লক্ষ্য, দেশের অর্থ দেশেই রাখা।
লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন বলছে, ‘নিউজিল্যান্ড এমন একটি দেশ। যেখানে পর্যটন হচ্ছে দেশটির সবচেয়ে বড় বিদেশি আয়ের খাত। নিউজিল্যান্ড এ খাতে সবচেয়ে বেশি অর্থ আয় করে অস্ট্রেলীয়দের কাছ থেকে। এরপরই আছে চীনা পর্যটকেরা।
নিউজিল্যান্ডের পর্যটন খাতে এমন রমরমা বাণিজ্য চীনের কাছে যেন আক্ষেপের গল্প। এক রকম কারণ ছাড়াই গত মাসেই ওয়েলিংটনে চীন-নিউজিল্যান্ড যৌথ পর্যটন বর্ষের অনুষ্ঠান স্থগিত করে দেয় বেইজিং। এমন আচরণে ক্ষুব্ধ চীনা কোম্পানি হুয়াইয়ের ‘ফাইভ জি’ প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে চীনের অভ্যন্তরে কর্মসূচির পরিবর্তন করে নিউজিল্যান্ড।
চীনের ট্যাবলয়েড সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই দেশের উদ্ভূত রাজনৈতিক সম্পর্কে সম্ভাব্য চীনা পর্যটকেরা নিউজিল্যান্ড ভ্রমণ কমিয়ে দিয়েছে। এ বিষয়ে বেইজিংয়ের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ‘নিউজিল্যান্ড আমাদের পেছনে ছুরিকাঘাত করেছে।’
এ দিকে হুয়াইয়ের সরঞ্জাম ব্যবহারকারী চীনের কম্পিউটার সফটওয়্যার কোম্পানি ‘স্পার্ক’ নিউজিল্যান্ডে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জ্যাকিন্ড আর্মডেন। তিনি বলেন, হুয়াইয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বিদেশে ভ্রমণে নিজের দেশের নাগরিকদের ওপর চীন সরকার কখনো শাস্তি আরোপ করেনি। কিন্তু সেটাই এখন করার চিন্তা-ভাবনা করছে দেশটি। ২০০৮ সালে চীন ও তাইওয়ানের সম্পর্কোন্নয়ন হয়। এই সুযোগে তাইওয়ানে চীনের পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। তবে সম্প্রতি নিজের জনগণের বিদেশ ঘুরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে লাগাম টেনে ধরতে শুরু করছে চীন। ২০১৫ সালে বিদেশগামী চীনা ট্রিপ ছিল প্রায় ৪২ লাখ। আর গত বছর (২০১৮) সেই ট্রিপ নেমে আসে ২৭ লাখে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভ্রমণ পরিচালনাকারীদের ওপর সরকারের চাপের মুখে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০১৭ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আমেরিকান মালিকানাধীন একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পদ্ধতি ‘থাড’ স্থাপন করার পর সে দেশে চীনের পর্যটকের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। গত বছরের শেষের দিকে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে সেখানে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। ২০১৮ সালে প্রায় ৫০ লাখ চীনা পর্যটক সেখানে যায়। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ লাখ। যদিও এই সংখ্যা ‘থাড’ স্থাপনের আগের সময়ের চেয়ে অনেক কম।
অর্ধযুগ আগে জাপান ও ফিলিপাইন পর্যটক সংকটে পড়ে। ২০১২ সালে চীনে জাপানবিরোধী প্রতিবাদের সময় চীনা পর্যটকেরা জাপান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অবশ্য দুই বছর পর দেশ দুটি পর্যটন শিল্পে আগের অবস্থানে ফিরে যেতে সক্ষম হয়। পর্যটন শিল্প বিকাশ নিয়ে বছর খানিক আগে ফিলিপাইন জানায়, দক্ষিণ কোরিয়ার পর চীন তার পর্যটকদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস আমেরিকাকে ছাড়িয়ে গেছে।
চীনা সরকারের হস্তক্ষেপে বর্হিগামী পর্যটন কী পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে সেটা অবশ্য নিরূপণ করাও কঠিন। কারণ দাপ্তরিকভাবে নাগরিকদের মধ্যে স্বদেশপ্রেমী মনোভাব জাগ্রত করা হয়েছে। এ জন্যও অনেক ভ্রমণ পিপাসু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদেশে না গিয়ে স্বদেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ভ্রমণ করছেন।

কিশোরী মাতৃত্ব রোধে হেরে যাচ্ছে লাতিন আমেরিকা by নাজনীন আখতার

রান্নাঘরে বসে নুনেজ স্মৃতিচারণা করছিলেন। তাঁর শারীরিক আকৃতি জানান দিচ্ছিল, তিনি মা হতে যাচ্ছেন। ১৮ বছর বয়সী এই তরুণীর পুরো নাম রাধাইসিস মার্তিনেজ নুনেজ। তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন তাঁর গা ঘেঁষে দুই বছর বয়সী এক নগ্ন শিশু নড়াচড়া করছিল। শিশুটি নুনেজেরই ছেলে। মাকে বিরক্ত করছিল বলে আয়া তাকে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। নুনেজ জানান, মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি প্রথম গর্ভধারণ করেন। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ছেলের বাবা মারা গেছেন। গর্ভের সন্তানটি তাঁর আরেক সঙ্গীর। নুনেজ বিদ্যালয়ে পড়তেন, তবে সন্তান গর্ভধারণের পর পড়াশোনায় আর ফিরে যাননি।
নুনেজের দেশের নাম ডমিনিকান রিপাবলিক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর লাতিন আমেরিকার একটি দেশ। নুনেজের শহরের নাম ইস্তেবানিয়া। দেশটির দক্ষিণ উপকূলের শহরটি পরিচিত ‘লা ভিলা দে লাস বেলাস’ বলে, অর্থাৎ ‘সৌন্দর্যের শহর’ নামে। তবে জলরাশিঘেরা অপরূপ শহরটিতে কলঙ্কের দাগের মতো বসে আসে কিশোরী মাতৃত্ব। বিশ্বজুড়ে কিশোরী মাতৃত্বের বিরুদ্ধে যে এত লড়াই, এর কোনো প্রভাব নেই সেখানে। বেশির ভাগ মেয়ে কৈশোরে পা দিয়েই মাতৃত্বকে বরণ করে নিতে বাধ্য হচ্ছে। দুই-পঞ্চমাংশ মা সেখানে কিশোরী। আফ্রিকার পর কিশোরী মাতৃত্ব হারের দিক দিয়ে এই শহরের অবস্থান।
শহরের এক নার্সের ভাষায়, এত কম বয়সে মা হওয়া মানে এটা বোঝায় না যে শহরের মেয়েরা দারুণ সুন্দর। এর জন্য যৌনতা নিয়ে যথাযথ জ্ঞানের অভাব এবং যথেচ্ছ মেলামেশাকে দায়ী করেন তিনি।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কমবেশি ইস্তেবানিয়ার মতোই দশা! লাতিন আমেরিকার এক-তৃতীয়াংশ নারী ২০ বছর বয়স পেরোনোর আগেই মা হন। সাব-সাহারা আফ্রিকা ছাড়া আর কোনো অঞ্চলে এত বেশি হারে কিশোরী মায়েদের সন্তান জন্ম দেওয়ার ঘটনা ঘটে না। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক শাখা প্যান আমেরিকান স্বাস্থ্য সংস্থা (পিএএইচও), জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ ও জাতিসংঘের জনসংখ্যাবিষয়ক তহবিলের (ইউএনএফপিএ) যৌথ প্রতিবেদনে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কিশোরী মাতৃত্বের উচ্চহার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এতে এই পরিস্থিতির জন্য জন্মনিরোধক পাওয়ার ঘাটতি ও নারীর প্রতি সহিংসতাকে দায়ী করা হয়। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি এক হাজার কিশোরীর সন্তান জন্মদানের হার ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে একই বয়সী কিশোরীদের সন্তান জন্মদানের হার প্রতি হাজারে ৪৬ শতাংশ।
লাতিন আমেরিকা একমাত্র অঞ্চল, যেখানে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের মধ্যে মাতৃত্বের হার বাড়ছে। লাতিন আমেরিকার দেশ ইকুয়েডরে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের মা হওয়ার হার ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের তুলনায় তিন গুণ বেড়েছে।
এই অঞ্চলের সরকারগুলো এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে এটা একটি সমস্যা। কিশোরী মাতৃত্বের হার কমাতে এক দশক ধরে জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এ খাতে ধীরগতিতে অগ্রগতি হচ্ছে। কম বয়সী মা ও শিশু দেশের জন্য খারাপ পরিণতি ডেকে আনে। ১৬ বছরের কম বয়সের মায়ের মৃত্যুহার ২০ বছর বয়সী মায়ের তুলনায় চার গুণ বেশি। আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায় লাতিন আমেরিকার নারীরা দেরিতে বিয়ে করেন। ফলে, সামঞ্জস্যহীনভাবে কিশোরী মায়েদের একাকী মা হতে হয়। মেক্সিকোতে গড়ে ২৭ বছর বয়সে নারীরা বিয়ে করেন। তবে সেখানে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রায় এক–চতুর্থাংশ একাকী মা রয়েছেন।
কম বয়সে মা হওয়ার কারণে ওই নারীদের পেশাগত জীবনও বাধাগ্রস্ত হয়। ব্রাজিলের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সেখানে শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ কমছে। মেয়ের সন্তান দেখাশোনা করতে গিয়ে কাজ ছাড়তে হয় নানিকে। ডমিনিকান রিপাবলিকে কিশোরী মায়েরা অন্য মেয়েদের তুলনায় বিদ্যালয়ে গড়ে দুই বছর কম পড়ে। অর্ধেকের কম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন।
লাতিন আমেরিকার সংস্কৃতিতে কৈশোরে মা হওয়াকেই উৎসাহিত করা হয়। এই অবস্থা পরিবর্তনে সরকারের তরফ থেকে পদক্ষেপ খুব কম। দরিদ্র পরিবার থেকে আসা মেয়েরা পড়াশোনার চেয়ে মা হওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। এক-তৃতীয়াংশ ডমিনিকান নারী মা হওয়ার জন্য বিদ্যালয় ছেড়ে দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেয়ার ব্রিনডিসের মতে, গর্ভধারণকে কিছু মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার প্রথম ধাপ বলে মনে করে। তাদের মতে, মা হলে যত্ন পাওয়া যায়, পরিবারের মনোযোগ পাওয়া যায়। এই অধ্যাপকের কথার প্রমাণ পাওয়া গেছে ইস্তেবানিয়ার ১৬ বছর বয়সী এক মা দারলেনিসের কথায়। ওই কিশোরী মা বলে, মা হলে পুরো বিশ্ব শ্রদ্ধা করে।
আবার অনেক মেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে নতুন পরিবার গড়ে তোলে। নির্যাতন করে—এমন পরিবার থেকে পরিত্রাণ পেতে প্রেমিকের হাত ধরে তারা বেরিয়ে যায়।
বিশ্ব ব্যাংকের রাফায়েল কর্তেজ অপরাধপ্রবণ এল সালভেদরের কম বয়সী মায়েদের একবার সাক্ষাৎকার নেন। ওই সময় তিনি অবাক হন যে ওই মায়েদের অর্ধেকেরই গর্ভধারণের আগ্রহ ছিল।
বেশির ভাগ কিশোরীর কাছে গর্ভধারণ একধরনের বিস্ময় নিয়েই আসে। অনেক বিদ্যালয়ে যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে কোনো শিক্ষা দেওয়া হয় না। জন্মনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতেও দেখা যায় না।
ইস্তেবানিয়ার নুনেজ জানান, তিনি এলাকার এক ক্লিনিকে দিয়ে জন্মনিরোধক চেয়েছিলেন, কিন্তু পাননি। সেখানে পুরুষেরা নারীদের যৌন সম্পর্কের জন্য চাপ দেয়, আর নারীরা তা প্রত্যাখ্যান করতে শেখেনি।
লাতিন আমেরিকায় ক্যাথলিক গির্জার প্রভাব রয়েছে। তাই সেখানে যৌনতা নিয়ে সেভাবে খোলামেলা আলোচনা করা হয় না। হন্ডুরাসে ক্যাথলিক ও ইভানজেলিকাল গির্জাগুলো গত বছর দেশটির পাঠ্যপুস্তকে যৌনবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে। জন্মনিয়ন্ত্রণেরও বিরোধিতা করে গির্জাগুলো। এসব কারণেও সরকারগুলো কিশোরী মাতৃত্ব হ্রাসে জোরালো ভূমিকা রাখতে চায় না।
এর মধ্যেও ব্যতিক্রম রয়েছে। কলাম্বিয়ার রাজধানী বগোটের একটি দরিদ্র এলাকার বিদ্যালয়ে ‘সেক্সুয়াল সিটিজেনশিপ’ পাঠ্য কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এতে বয়সে বড় শিক্ষার্থীরা ছোট শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যৌন শিক্ষার বিষয়ে আলোচনা করে। এই কর্মসূচির পর এক বছরে ওই বিদ্যালয়ের চার হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে গর্ভধারণ ৭০ থেকে কমে শূন্যে নেমে আসে।
লাতিন আমেরিকার সরকারগুলো জানিয়েছে, তারা কিশোরী বয়সে গর্ভধারণের হার কমানোর চেষ্টা করছে। গত ১৫ বছরে এ–সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা তারা প্রকাশ করেছে। তবে সেগুলোর বেশির ভাগ গ্রামাঞ্চলের চেয়ে শহরকে লক্ষ্য করেই নেওয়া হয়েছে। অথচ গ্রামের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। কখনো কখনো সরকারগুলো তাদের পরিকল্পনার কোনোটাই বাস্তবায়ন করে না। আর্জেন্টিনা ও চিলির দুই প্রেসিডেন্ট নিজ দেশের পাঠ্যসূচি যৌনবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর্জেন্টিনায় অর্ধেকেরও কম প্রদেশে তা গ্রহণ করা হয়েছে। আর চিলির বিদ্যালয়গুলোয় যৌনবিষয়ক শিক্ষার কথা শোনাই যায় না। মেক্সিকো এ বিষয়ে ২০১৫ সালে কৌশলগত পরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানালেও তা বাস্তবায়নে এক সংস্থা অন্য সংস্থার ওপর অব্যাহতভাবে দায়িত্ব চাপিয়ে যাচ্ছে। ভেনেজুয়েলা ২০১৩ সালে পরিকল্পনা নিলেও বাস্তবায়ন করেনি। আর এখন দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। সরকার বিনা মূল্যে জন্মনিরোধক সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে।
তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম হাইতি। সেখানে ৩০ বছরে কিশোরী মাতৃত্ব উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। দেশটি ডমিনিকান রিপাবলিকের সঙ্গে লাগোয়া। দুটি দেশ সেখানে দ্বীপগুলো ভাগাভাগি করে অবস্থান করে। ওই অঞ্চলে হাইতি সবচেয়ে দরিদ্র হলেও সেখানে কিশোরীদের মধ্যে মা হওয়ার প্রবণতা কম। সেখানে সরকার এতটা দুর্বল যে কিশোরী মাতৃত্বকে নিরুৎসাহিত করার মতো কর্মসূচিগুলো বেসরকারি সংগঠনগুলো নিয়ে থাকে। হয়তো সে কারণেই কর্মসূচিগুলো সফলতা পাচ্ছে। কারণ, সরকারি সংস্থার চেয়ে বেসরকারি সংগঠনগুলো রাজনৈতিক চাপের মধ্যে তুলনামূলক কম নাজুক পরিস্থিতিতে থাকে এবং বেশি দক্ষ হয়। কলাম্বিয়ায় গত এক দশকে বড় আকারে কিশোরী মাতৃত্ব কমেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকা বিদ্রোহ শেষ হওয়ায় দেশটি গেরিলা যোদ্ধা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশিকার পেয়েছে। ওই অঞ্চলগুলোয় কিশোরী মাতৃত্ব খুব সাধারণ বিষয় ছিল। সরকারের প্রবেশিকারে এ হার কমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, রয়টার্স

গরিবের ‘বাইপাসওয়ালা বাবা’ by জিয়া চৌধুরী

‘মানুষের সেবা করা হাত, প্রার্থনারত ঠোঁটের চেয়ে পবিত্র’। মানব সেবার আলোকবর্তিকা মাদার তেরেসার জীবনের এমন উপলব্ধি নিজের কাজে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছেন এক চিকিৎসক। গত প্রায় চার দশক ধরে ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের ভেদাভেদ ভুলে মানুষের মাঝে ফিরিয়ে আনছেন জীবনের আলো, করে চলেছেন হৃদয়ের মেরামত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে, হৃদযন্ত্রের শল্যচিকিৎসা। চিকিৎসাবিজ্ঞানকে সেবার রূপ দেয়া কিংবদন্তি এ চিকিৎসকের পুরো নাম ডা. দেবী প্রসাদ শেঠি, তবে  তিনি পরিচিত ডা. দেবী শেঠি নামে। সেবার পরিধিতে ছাড়িয়ে গেছেন নিজ দেশ ভারতের সীমারেখাও। তার প্রতিষ্ঠিত নারায়ণা হেলথ ও নারায়ণা ইন্সটিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্সেস হাসপাতাল এখন নানা দেশের নানা ভাষার মানুষের ভরসার কেন্দ্র। বিশ্বের বাঘা বাঘা কার্ডিয়াক সার্জনদের তালিকায়ও শুরুর দিকেই আছেন ভারতের প্রখ্যাত এই চিকিৎসক।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ডা. দেবী শেঠিকে বলা হয় বাইপাসওয়ালা বাবা। তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলোকে তারা মনে করেন এক একটি আশ্রম।
ভারতের নিম্ন আয়ের অনেক নাগরিক মনে করেন, দেবী শেঠির হাসপাতালে গেলে হৃদরোগে আক্রান্ত কেউ চিকিৎসা ছাড়া ঘরে ফেরেন না। ধনী, মধ্যবিত্ত কিংবা একেবারে নিতান্ত কৃষক সবার দুয়ার খেলা দেবী শেঠির হাসপাতালে। ধনীদের চিকিৎসক সে তো সোজা ব্যাপার, পয়সা দিবেন চিকিৎসা পাবেন। কিন্তু দেবী শেঠি কি করে হয়ে উঠলেন কৃষক পরিবার কিংবা মধ্যবিত্তের চিকিৎসক? এমন প্রশ্নের উত্তর জানা যায় দেবী শেঠির সাক্ষাৎকারে। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন বিবিসি’র হার্ডটক অনুষ্ঠানে তিনি জানান সহজলভ্য চিকিৎসার আদ্যোপান্ত। যেখানে সেবা ও ব্যবসা হেঁটেছে একে-অপরের হাত ধরে। জীবনের শুরুর দিকে দেবী শেঠি ছিলেন মাদার তেরেসার চিকিৎসক।
মাদার তেরেসার সঙ্গে কাটানো প্রায় ছয়বছর সময় তার জীবনবোধ বদলে দেয়। বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে দেবী শেঠি বলেন, চিকিৎসা পদ্ধতি আধুনিক করে তেমন ফল নেই, যদি না সেই পদ্ধতি সাধারণের কাছে সহজলভ্য করা যায়। চিকিৎসাকে সাধারণের দুয়ারে নিয়ে যাওয়ার ভাবনা থেকেই জন্ম হয় নারায়ণা হেলথের। নব্বইয়ের দশকে কলকাতার বিড়লা হার্ট ফাউন্ডেশনে কাজ করার সময় অসংখ্য হৃদরোগী পেতেন, যাদের অধিকাংশেরই অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো। কিন্তু তিনি অবাক হয়ে খেয়াল করতেন এমন রোগীদের বেশির ভাগই অস্ত্রোপচারের জন্য আর ফিরে আসতেন না। রোগীদের চিকিৎসার জন্য ফিরে না আসা শেঠির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে। চিকিৎসার জন্য এসব রোগীকে হয় টাকা ধার নিতে হয়, অথবা বিক্রি করতে হয় তাদের সম্পত্তি। এমন অবস্থায় অধিকাংশ মানুষই যে, ব্যয়বহুল চিকিৎসাকে এড়িয়ে যেতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক। এ কারণেই ভারতে প্রতিবছর যেখানে গড়ে ২০ লাখ সার্জারির দরকার পড়তো, সেখানে সার্জারি হতো মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার। ডা. শেঠী বুঝলেন, অবস্থার উন্নতি করতে হলে সার্জারির খরচ কমানোর কোনো বিকল্প নেই।
বিদেশি প্রযুক্তি আর দেশের সেবার মিশেলে তিনি গড়ে তুলতে চাইলেন এক অনবদ্য প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে মানের বিষয়ে কোনো আপস করবেন না বলেও মনস্থির করেছিলেন ডা. দেবী শেঠি। সেবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্যবসাকেও এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। কারণ, শুধু দানে কোনো উদ্যোগে সামনে টেনে নেয়া যায় না। এমন ভাবনা থেকে দেবী শেঠি দাঁড় করান আদর্শ ব্যবসার মডেল। তিনি মনে করেন, দানশীলতার মাধ্যমে যত মানুষের সাহায্য করা সম্ভব, তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের সাহায্য করা সম্ভব একটি আদর্শ প্রক্রিয়ার ব্যবসার মাধ্যমে। এছাড়া ব্যবসার পরিধি ধীরে ধীরে বাড়বে, দানশীলতার নয়। এ উদ্দেশ্যেই তিনি ২০০১ সালে ব্যাঙ্গালুরুতে ‘নারায়ণা হেলথ’ প্রতিষ্ঠা করেন। একটি ২২৫ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে যাত্রা শুরু করা নারায়ণা হেলথ এখন ২৩টি হাসপাতাল, ৭টি হার্ট সেন্টার ও ১৯টি প্রাথমিক সেবা কেন্দ্রের এক বিশাল নেটওয়ার্ক, রয়েছে ছয় হাজারেরও অধিক শয্যা। এ পর্যন্ত নারায়ণা হাসপাতালে লক্ষাধিক অস্ত্রোপচার হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগীই ছিল দরিদ্র, যাদের কেউ স্বল্পমূল্যে, কেউ বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়েছেন। নারায়ণা হাসপাতাল এটি সম্ভবপর করেছে সার্জারির ব্যয় কমানোর মাধ্যমে। দেড় লাখ থেকে এ খরচ তারা কমিয়ে এনেছেন ৬০-৬৫ হাজার রুপিতে।
ডলারের হিসাবে যা মাত্র ৮০০ ডলার, যেখানে এ ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রে ১,৪৪,০০০, মেক্সিকোতে ২৭,০০০ ও কলাম্বিয়ায় ১৪,৮০০ ডলার। নারায়ণা হাসপাতালে হৃদরোগের চিকিৎসার এত কম খরচের প্রধান কারণ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সময়ের যথোপযুক্ত ব্যবহার। হাসপাতালটির অপারেশন কক্ষে একজন রোগীকে অস্ত্রোপচারের পর সেলাই করা হচ্ছে, পাশের কক্ষে গিয়ে দেখা যাবে অন্য একজনকে প্রস্তুত করা হচ্ছে অস্ত্রোপচারের জন্য। এভাবে একই বিশেষজ্ঞ ও সহকারী চিকিৎসকদের কাজে লাগিয়ে পাঁচজন রোগীর অপারেশন করা হয় একই সঙ্গে। একজন ডাক্তার বা নার্স একই কাজ করে থাকেন সকল রোগীর ক্ষেত্রে। ডা. শেঠির এমন চিকিৎসা পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে সময় সংক্ষেপ করা। বিশেষজ্ঞ সার্জনের সংখ্যা কম হওয়ায় তাদের সময়ের যথাযথ ব্যবহার করা হয় এমন পদ্ধতিতে। সাধারণত যা হয়, একজন বিশেষজ্ঞ সার্জন ও অন্য সকল ডাক্তার নার্সরা উপস্থিত থেকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত কাজ সম্পন্ন করেন। কিন্তু এসব কাজের অনেকগুলো অংশ অন্যান্য ডাক্তার বা নার্সরা, সার্জনের পুরোটা সময় এক্ষেত্রে ব্যয় করার খুব একটা প্রয়োজন নেই। ডা. শেঠি তাই এ প্রক্রিয়া শুরু করলেন, অন্যান্য ডাক্তার নার্সরা একজন রোগীকে সার্জারির জন্য সম্পূর্ণ তৈরি করে রাখেন, এরপর তিনি এসে কেবল মূল কাজটি করেন।
তার কাজ শেষ হতে হতে আবার অন্য একজন রোগী প্রস্তুত হয়ে পড়ে, আর এ রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় অস্ত্রোপচারের পরের ধাপের জন্য। ভারতে যেখানে অন্যান্য হাসপাতালগুলোতে দিনে গড়ে মাত্র চার-পাঁচটি অস্ত্রোপচার করা হয়, সেখানে দেবী শেঠির হাসপাতালে এ সংখ্যা ত্রিশেরও অধিক। এ সময়ের সাশ্রয়ই অস্ত্রোপচারের ব্যয় কমিয়ে আনে। এছাড়া এতে অন্য একটি সুবিধাও আছে। যেহেতু একজন নার্স ও ডাক্তার কেবল একটি কাজই করেন, তাই তারা ঐ বিষয়ে যথেষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেন। কোনো সমস্যা হলে তারা দ্রুত টের পান। এছাড়া নারায়ণা হাসপাতাল থেকে কখনো কাউকে আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে ফিরে যেতে হয় না। তারা অনেক দরিদ্র মানুষকে স্বল্পমূল্যে সেবা দিয়ে থাকেন। তবে এটি কোনো দান হিসেবে করেন না তারা। এ ব্যয় বহন করতে তারা ‘ভর্তুকি মডেল’ অনুসরণ করেন। ধনী ব্যক্তিরা দরিদ্রদের জন্য ভর্তুকি দেন, ধনীরা এজন্যে হয়তো বিলাসবহুল কক্ষ কিংবা এ ধরনের অতিরিক্ত কিছু সুবিধা পান। কিন্তু মূল চিকিৎসার মান সকলের জন্যই বিশ্বমানের বলে জানান ডা. দেবী শেঠি। মাগুরার তানজেল হোসেন খান ও কামরুল লায়লা জলি দম্পতি দু’বছর হলো চিকিৎসা নিচ্ছেন নারায়ণা হেলথে।
তাদের ছেলে রিফাত খান জানিয়েছেন সেখানকার এমন চিকিৎসা পদ্ধতি ও হাসপাতালের বর্ণনা। তিনি বলেন, হাসপাতালের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই মন চাঙ্গা হয়ে যায়। একই ছাদের নিজে মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও গুরুদুয়ারা। যে যার মত প্রার্থনা করার অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে মন সত্যি জুড়িয়ে যায়। মূল ভবনে ঢুকতেই একদম মুখোমুখি শ্রী শ্রী ভিরুপতি মন্দির ও সামনের পানিতে রাশি রাশি ফুল। নারায়ণার রোগীরা হিন্দি বা ইংরেজি বলতে না পারলেও দোভাষীদের আন্তরিকতায় মুহূর্তের সব টেনশন গায়েব। ভাষা সমস্যা একদমই নেই। নারায়ণায় চিকিৎসা নিতে যাওয়া অনেক বাংলাদেশি শুধু বাংলা জানলেও সেবা পেতে খুব একটা সমস্যা হয় না। আর চিকিৎসক তারা তো আরও আন্তরিক। সেবা আর মানবতার এক নাম নারায়ণা হাসপাতাল। ১৯৫৩ সালের ৮ই মে দেবী শেঠি ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের দক্ষিণ কনাডা জেলার কিন্নিগলি গ্রামে জন্ম নেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে অষ্টম শেঠি পঞ্চম গ্রেডে পড়ার সময় কার্ডিয়াক সার্জন হওয়ার ইচ্ছার কথা জানান। সে সময়ে প্রথমবারের মতো হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের ঘটনা থেকে নিজেকে হৃদরোগের সার্জন হিসেবে দেখবার আকুল আগ্রহ ছিল দেবী শেঠির।
পঞ্চম গ্রেডে পড়ুয়া শেঠি ১৯৯১ সালে ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নয়দিন বয়সী এক শিশুর হৃৎপিণ্ড অপারেশন করেন। এরপর প্রায় চল্লিশ বছরের সার্জারি জীবনে তিনি প্রায় ১৫,০০০ এর বেশি কার্ডিয়াক সার্জারি করেছেন। দক্ষিণ ভারতে জন্ম নেয়া দেবী শেঠি ১৯৮২ কস্তুরবা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস কোর্স সম্পন্ন করেন। পরে ইংল্যান্ড থেকে সার্জারি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ১৯৮৯ সালে লন্ডনের উচ্চাভিলাষী চাকরির লোভ ত্যাগ করে ভারতে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে ডা. রায়ের সঙ্গে কলকাতায় গড়ে তোলেন ভারতের প্রথম হৃদরোগ চিকিৎসা হাসপাতাল বিএম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার। ২০০১ সালে ব্যাঙ্গালোরে গড়ে তোলেন নারায়ণা হেলথ নামে এক আধুনিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, যেখানে কম খরচে হৃদরোগের সবচেয়ে আধুনিক চিকিৎসা দেয়া শুরু হয়। চিকিৎসা সেবার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ২০০৪ সালে পদ্মশ্রী ও ২০১২ সালে পদ্মভূষণ পদক পান। বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. দেবী শেঠি বলেন, চিকিৎসক জীবনে আমার সব থেকে কষ্টের মুহূর্ত হলো মানুষের জীবনকে টাকার নিক্তিতে মাপা। একটি বাচ্চার হৃদযন্ত্রে ফুটো আছে, আমি তার মা’কে বললাম অপারেশন করলে ভালো হয়ে যাবে।
মায়ের প্রথম প্রশ্ন কত টাকা লাগবে? আমি মনে করি চিকিৎসক হিসেবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মানুষের জীবনকে প্রাইস ট্যাগ বন্দি করে ফেলি। অথচ ওই শিশুর পরিবারের ন্যূনতম ৬০ হাজার রুপি দিয়ে অপারেশন করারও সামর্থ্য থাকে না। তাদের কাছে জীবন তখন মাত্র ক’টা রুপিতে বন্দি হয়ে যায়। আমি আমার চিকিৎসক জীবনে সব সময় চেয়েছি জীবনকে প্রাইস ট্যাগের বাইরে নিয়ে আসতে। চিকিৎসা পদ্ধতিকে সাধারণের কাছে আরও সহজলভ্য করতে চেয়েছি। এজন্য অবশ্য রাজ্য সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আমাদের সহায়তা করছে। আমরা ছোট করে হলেও একটি স্বাস্থ্যবীমা করতে পেরেছি। কৃষকদের প্রতিদিনের জমানো ৫ রুপি থেকে তারা অনেকে এখন সেবা পাচ্ছে। আমি চাই, মানুষের জীবন হবে অর্থের ঊর্ধ্বে, যেখানে রুপি কিংবা ডলারে বন্দি থাকবে না চিকিৎসা।

৬ মাসের শিশু ভাড়া খাটে দুই শিফটে by পিয়াস সরকার

ধানমন্ডি লেক। সূর্য উঠছে। সেই সঙ্গে লেকে বাড়ছে মানুষ। প্রায় সকলের উদ্দেশ্য শরীর চর্চা করা। তবে এরই মাঝে ধানমন্ডি লেকের রবীন্দ্রসরোবর ৮নং ব্রিজের পাশে বসে পড়েছেন প্রায় ৫০ জনেক ভিক্ষুক। এদের মাঝে কয়েকজনের কোলে শিশু। বিভিন্ন বয়সের শিশু। আবার তাদের কোলের শিশুদের মধ্যে অধিকাংশই ঘুমে কাতর।
মাঝে-মধ্যে জেগে উঠলে খাওয়ানো হচ্ছে ফিডার। আবার ঘুমিয়ে পড়ছে শিশুগুলো। এই ঘুম কোনো স্বাভাবিক ঘুম নয়। এই ঘুম চেতনাশকের ঘুম। যা স্বাস্থ্যের জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার অন্তরায়।
রাকিব হাসান। বয়স মাত্র ৬ মাস। তাকে কোলে নিয়ে ভিক্ষা করছেন আরেক শিশু। নাম তানিয়া, বয়স আনুমানিক ৬ বছর। শিশুটিকে কোলে নিয়ে লেকে আসা বিভিন্ন লোকেদের কাছে হাত পাতছে মেয়েটি। ভিক্ষা পাচ্ছে অন্য ভিক্ষুকদের তুলনায় বেশি। সকাল ৬ টা থেকে ১০টা পর্যন্ত কখনো হেঁটে কখনো বসে ভিক্ষা করতে থাকে তানিয়া। তবে দীর্ঘ এই সময়ে কয়েকবার ঘুম থেকে জাগলেও ফের ঘুমিয়ে পড়ে রাকিব।
তানিয়া জানায়, কোলের সন্তানটি তার ভাই। সারাক্ষণ ঘুমিয়ে কেন? এই প্রশ্নের জবাবে জানায়, ছোট বাচ্চা ঘুমিয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক।
সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে তানিয়াকে দেখা যায় এক মহিলার সঙ্গে চায়ের দোকানে। সারছে সকালের নাস্তা। তখন সেই মহিলার কোলে শিশু রাকিব। তবে তানিয়ার প্রতি যে মমতা দেখা গেল তা নেই রাকিবের জন্য। শুধু কোলেই ঠাঁই মিলেছে তার। কিছু পর ওই মহিলা হাঁটা শুরু করলেন। পিছন পিছন লাঠি চকলেট হাতে তানিয়া।
হেঁটেই গেলেন রায়ের বাজার বস্তিতে। বস্তির মুখে ঢোকার আগেই মোবাইলে যোগাযোগ করলেন। আটতলীতে যাওয়ার পর বেরুলেন এক মহিলা। তার কোলে রাকিবকে দিয়ে আবার চললেন তানিয়া ও তার মা।
রাকিবের মা’র সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি কোনো জবাব না দিয়ে চলে যান। একটি ছাপড়া ঘরের ভিতর। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বেরুলেন না তারা। আটতলী পাড়ার গলির মুখেই সবুজ মিয়ার চায়ের দোকান। তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা। তিনি জানান, রাকিবের মা কাজ করেন মানুষের বাসায়। রাকিবের জন্মের আগেই তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে যায়। আর সবসময় ঘুমানোর কারণ হিসেবে জানানো হয়, ফিডারে মেশানো থাকে চেতনানাশক ওষুধ। শিশুটি যখন জেগে ওঠে তখন তাকে খাওয়ানো হয় বা একটু পরপর খাওয়ানো হয়।
চায়ের দোকানে থাকা অবস্থায় বের হয় রাকিব ও রাকিবের মা। এবার শিশুটি জাগনা অবস্থায় রয়েছে। বেশ হাসি-খুশি তখন শিশুটি। কথা বলতে ভয় পেলেও চা ওয়ালার সহযোগিতায় তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পেটের দায়ে শিশুকে ভাড়া দেন তানিয়ার মায়ের কাছে। তিনি মানুষের বাসায় কাজ করে যে অর্থ পান তা দিয়ে সংসার চলে না।
স্বামী প্রায় বছরখানেক হলো আসে না। কোনো খোঁজ নেয় না। শুনেছেন আরেকটি বিয়ে করে চট্টগ্রামে থাকেন। রাকিবের মা আমেনা বেগম জানান, এই শিশুটিকে দিনে দুইবার পাঠান তানিয়ার সঙ্গে। ভোর ৫টার দিকে নিয়ে যায় লেকে আর দিয়ে যায় ১১ টার দিকে। আবার ৪ টার দিকে নিয়ে যায় কখনো ফার্মগেটে আবার কখনো বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের সামনে। প্রতি বেলার জন্য পান ৬০ টাকা করে। দিনশেষে ১২০ টাকা। বিশেষ দিনে আয় বেশি হলে ২০ থেকে ৩০টাকা বাড়িয়েও দেন।
আর শিশুটিকে ঘুমিয়ে রাখার বিষয়ে জানান, ছোট বাচ্চা যে কোনো সময় কান্না করতে পারে। কান্না করলে মা ছাড়া সামলানো কঠিন। আর শিশুর খাবারের জন্য বানানো ফিডারে দেয়া হয় চেতনানাশক ওষুধ। ওষুধের নাম বলতে পারলেন না তিনি। এই ওষুধ শিশুর জন্য ক্ষতির কারণ কিনা জানতে চাইলে- এই বিষয়ে কোনো ধারণা নেই তার বলে জানান। এই ওষুধ গুঁড়া করে ফিডারের মধ্যে দিয়ে দেন রাকিবের মা। এক ট্যাবলেটে দিয়ে ২ বার ফিডার বানান। তাতেই কাজ হয়ে যায়।
ওষুধ কেনেন পাশেই অবস্থিত আলেয়া-আরিফ ফার্মেসি থেকে। সেখানে এসব বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান দোকানের এক কর্মচারী। তবে তার অনুপস্থিতিতে দোকানের আরেক কর্মচারী জানান, এসব বাচ্চাকে ফিডারে মেশানো হয় সেডিল কিংবা বারবিট। তার কথা অনুযায়ী অনেকে এখান থেকে এসব ওষুধ কিনে থাকেন।
এই বিষয়ে আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের শিশু বিশেষঞ্জ ড. মুমতানিয়া সেতু বলেন, এসব চেতনানাশক ওষুধ খাওয়ানোর কারণে বাচ্চা সমাজের সঙ্গে অন্য মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এছাড়াও তন্দ্রাচ্ছন্নতা, ঘুমের ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হবে। সে স্বাভাবিক জীবন যাপনের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এমনকি বিকলাঙ্গও হয়ে যেতে পারে।
এরপর রাকিবের দিনে দ্বিতীয়বারের মতো ভাড়ায় বের হবে বিকাল ৪টার দিকে। এক অসহায় মায়ের অসহায় সেই দুধের শিশুকে বিকাল ৫টার দিকে ফের দেখা যায় ফার্মগেইটের ওভারব্রিজে। সেই পাতানো বোন তানিয়ার কোলে। সকালের মতো এখনো সে ঘুমে। আর তানিয়ার হাত ব্যাগে উঁকি দিচ্ছে আত্মঘাতী ফিডার। যা দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ হচ্ছে। আর ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে দীর্ঘ মেয়াদি জটিলতায়।

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক রোধী ব্যাকটেরিয়া: এখনই তৎপর না হলে মানুষ বাঁচানো যাবে না

অ্যান্টিবায়োটিকের মতো শক্তিশালী ওষুধ প্রতিরোধ করছে নানা ব্যাকটেরিয়া। বাংলাদেশের চিকিৎসা জগতে এটি এক মারাত্মক সমস্যা হয়ে দেখা দেবে।
রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ঢাকার তরুণ ডাক্তার রাজীব হোসাইন সরকার। রেডিও তেহরানের স্বাস্থ্যকথা অনুষ্ঠানের জন্য তিন পর্বের এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন স্বাস্থ্যকথার পরিচালক সৈয়দ মূসা রেজা।
ভবিষ্যতে সর্দি-কাশির মতো সাধারণ রোগও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন ডা. রাজীব। তিনি আরো বলেন,  সামান্য আঘাতও ডেকে আনতে পারে প্রাণঘাতী পরিস্থিতি।
ঘরে আগুন লাগলে মানুষ তা নিভানোর জন্য যেমন শশব্যস্ত হয়ে  ওঠে। তার সাহায্যে ছুটে আসে পাড়া প্রতিবেশী। অ্যান্টি-বায়োটিক রোধী জীবাণু ঠেকানোর কাজ সে ভাবেই জরুরি ভিত্তিতে করা প্রয়োজন। এ নিয়ে সময় নষ্ট করা মোটেও উচিত হবে না।
তিনি আরো জানান যে দু'বছর আগে কুড়িগ্রামের প্রত্যন্ত চরাঞ্চলে বন্যা দুর্গতদের মধ্যে কাজ করতে যেয়ে প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক রোধী ব্যাকটেরিয়ার বিষয়টি নজরে আসে। কান পাঁকা বা ত্বকের ছোটখাটো সমস্যা আক্রান্ত এ সব রোগীকে ওষুধ দিয়ে কোনো সুফল পাওয়া যায় নি। এ সব রোগীর রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পাঠানো হলে দেখা যায় তারা অ্যান্টিবায়োটিক রোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসা বা ওষুধ সহজলভ্য নয় এমন একটি অঞ্চলে মানুষ কি করে অ্যান্টিবায়োটিক রোধী হয়ে উঠল তা কল্পনাতীত ব্যাপার।
পরবর্তীতে ঢাকার শিশু হাসপাতালের তিন বছরের এক রোগীর পরীক্ষা প্রতিবেদন দেখেও চমকে উঠতে হয়। শিশু এ রোগীও প্রচলিত সব অ্যান্টিবায়োটিক রোধী হয়ে গেছে বলে দেখা যায়।
এ সব চিত্র ভয় ধরিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। অন্যান্য চিকিৎসকেরও কমবেশি একই অভিজ্ঞতা হচ্ছে বলেও জানান ডা. সরকার। যে কোনো রোগীই দুই থেকে তিনটা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী বলে চিকিৎসকরা দেখতে পাচ্ছেন।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে যেয়ে তিনি জানান, বিনা ব্যবস্থাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিক বেচাকেনা। সঠিক মাত্রায় বা ডোজে এর ব্যবহার না করা। রোগী একটু সেরে উঠলেই ওষুধ ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া। এতে ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবায়োটিক রোধী হওয়া সহজ হয়ে ওঠে। এ ছাড়া, মানহীন বা ভেজাল ওষুধের বিক্রি হওয়া।
দেরি না করে অ্যান্টিবায়োটিক রোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঠেকাতে সবার তৎপর হওয়া উচিত বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, সময় নষ্ট করার মতো সময় নেই।
জীবাণুর অ্যান্টি বায়োটিক হওয়া প্রতিরোধ করতে প্রথমেই বিনা ব্যবস্থাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত  সঠিক মানের অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন এবং বিক্রির নিশ্চয়তা থাকতে হবে।  চিকিৎসকের দেয়া ডোজ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে। এ ছাড়া, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিষয়টি পাঠ্য তালিকাভুক্ত করতে হবে। গণ সচেতনতা সৃষ্টিতে সব সংবাদ মাধ্যম এবং টিভি চ্যানেলকে এগিয়ে আসতে হবে।
ডাক্তার রাজীব হোসাইন সরকার

খরস্রোতা ডাকাতিয়া এখন মৃত: দুই তীরে দখল by কামরুল ইসলাম

এক সময়ের খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদী বর্তমানে মৃত প্রায়। আর নদীর দুই তীর দখল করে বিল্ডিং নির্মাণ করায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদী। এক সময় পাল তুলে নৌকা চলত। জেলেরা মাছ ধরত। নদী ছিল এখানকার কৃষি অর্থনীতির প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা। নদীর তীর ও জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা সংকুচিত হচ্ছে নদী। বুড়িগঙ্গা তুরাগ নদী দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করায় গত ২রা মার্চ পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী লাকসাম পৌরসভা ও ইউএনও’র উদ্যোগে ডাকাতিয়া দুই তীর পরিদর্শন করেন। নদীর নাব্যতা ফিরে পেতে ডাকাতিয়া নদী খনন ও  উচ্ছেদ অভিযান শিগগিরই শুরু হবে বলে জানান। এর মধ্যে গত ৬ই মার্চ থেকে নদীর দুই তীরে সীমানা নির্ধারণ শুরু হয়েছে।
নদীর পাড়ে বিভিন্ন রাইস মিল মালিকরা ছাঁই ফেলে নদীর তীর দখল করে নিচ্ছে। এছাড়া মিলের গরম পানি নদীতে ফেলার কারণে দিন দিন মাছ শূন্য হয়ে পড়েছে ডাকাতিয়া। এসময় নদীর তীরের জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু বর্তমানে নদীতে মাছ না পাওয়ার কারনে জেলেরা অনাহারে অর্ধহারে দিন কাটাচ্ছে। জেলেরা মাছ না পাওয়ার কারণে তারা বিভিন্ন পেশায় ঝুঁকে পড়ছে।
নদীর দুই তীরের কোনো পাড় নেই। দুই তীরের বাসিন্দারা স্থাপনা নির্মাণ করছে। প্রশাসনের নাকের ডোগায় দৌলতগঞ্জ বাজারে রেলওয়ে থেকে লিজ নিয়ে মার্কেটসহ বিভিন্ন বিল্ডিং নির্মাণ করছে। লাকসাম হাসপাতালের এক সিনিয়র নার্স নদীর পাশে জায়গা ক্রয় করে নির্মাণ করেছেন বহুতল ভবন। এছাড়াও বাতখালী, শ্রীয়াং এলাকা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আবদুর রহিম নামে এক কর্মকর্তা বিল্ডিং নির্মাণ করছেন।
ডাকাতিয়া নদীটির দুই তীর দখল হওয়ার কারণে দিন দিন সংকুচিত হওয়ায় মরা খালে পরিণত হয়েছে। ১৬০ ফুট চওড়া নদীটি বর্তমানে ৬০ ফুটে পরিণত হয়েছে। ডাকাতিয়া নদীটির কারণে লাকসাম দৌলতগঞ্জ বাজারটি এক সময় বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বড় বড় নৌকা, স্টিমার চলাচল করতো। তখনকার সময় দৌলতগঞ্জ গোলবাজারে নৌকা ও স্টিমারের ঘাট ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে নদীটি খনন না করায় পল্লী মাটি জমাটের কারনে বর্তমানে নৌকা, স্টিমার চলাচল করে না।
এছাড়াও ডাকাতিয়া নদীটি বিভিন্ন শাখা খালগুলো অস্তিত্ব একবারে বিলীন। ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শাখা খালগুলো দখল করে নিচ্ছে দুষ্কৃতকারীরা।  এ ব্যাপারে পানি উন্নয়নের বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল লতিফ জানান, আমাদের লোকজন কম। তাই পৌরসভার, এসি ল্যান্ড ও আমাদের সার্ভেয়ার দ্বারা ডাকাতিয়া নদীর সীমানা নির্ধারণ কাজ শুরু হয়েছে। যেসব বিল্ডিং সীমানার মধ্যে পড়বে ওইসব স্থাপনা ভাঙার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে। যদি না ভাঙে তাহলে আমরা ওইসব স্থাপনা উচ্ছেদ করব। এরপর শুরু হবে খনন প্রক্রিয়া।

নারীর আয়ে বদলে গেছে পুরো পাড়ার চিত্র by মুসলিমা জাহান

বিকেল হতেই সুই, সুতা আর কাঁথা নিয়ে মন্দির প্রাঙ্গণে হাজির হন চম্পা রানী সরকার। ততক্ষণে দুধ বিক্রি করে শাশুড়ি সেবা দাসী সরকারও সেখানে চলে আসেন। তাঁরা জীবনজীবিকার গল্পে গল্পে ফোঁড় তোলেন কাঁথার জমিনজুড়ে।
সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া উত্তর কালশীর হিন্দুপাড়ায় ঢুকলেই রোজ বিকেলে এ দৃশ্য চোখে পড়বে। কাঁথা সেলাই করে চম্পার রোজগার মাসে হাজার চারেক টাকা। তবে গরুর দুধ বিক্রি করে শাশুড়ির আয় কিছুটা বেশি। চম্পার স্বামী ছোটখাটো চাকরি করেন। তিনজনের আয়ে বেশ ভালোভাবেই তাঁদের সংসার চলছে।
তবে একসময় তিনবেলা খাবারও খেতে পেতেন না এ পরিবারের সদস্যরা। থাকতেন পরের ঘরে। সেবা দাসী সরকার জানান, তাঁর স্বামী আবার বিয়ে করে অন্যত্র চলে গেলে দুই ছেলেকে নিয়ে ভীষণ সমস্যায় পড়েন। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারীকে হারিয়ে ঠাঁই নেন ভাইয়ের পরিবারে। ভাইয়ের রোজগার কম, পরিবারে সদস্যসংখ্যা সাত। এই পরিস্থিতিতে এক আত্মীয়ের পরামর্শে দুধ বিক্রি শুরু করেন সেবা দাসী। স্থানীয় খামার থেকে গরুর দুধ কিনে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন। সেই আয়েই তাঁর সংসার চলে। কয়েক বছরের ব্যবধানে নিজে ঘর তোলেন। ছেলেদের স্কুলেও পাঠান। ঘটনাটি বছর ৩০ আগের। তখন এই পাড়ায় হাতে গোনা দু–একজন নারী আয়রোজগার করতেন।
বর্তমানে কেবল চম্পা বা সেবা দাসী নন, হিন্দুপাড়ার অধিকাংশ নারী অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। পাড়ার পূজা কমিটির হিসাবমতো, এ পাড়ায় ১৩০টি পরিবারের বসবাস। এসব পরিবারের ৯০ শতাংশ নারী অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত। পাড়ায় মোট ৩২টি ঘরে সেলাই মেশিন আছে। দুধ বিক্রি করেন ৩৫ জন নারী। তাঁদের মাসিক আয় ৪ থেকে ২০ হাজার টাকা। কয়েকজনের আয় অবশ্য আরও বেশি।
এখানকার নারীরা মূলত গরুর দুধ বিক্রি, সেলাইয়ের কাজ, কাপড়ের ব্যবসা, ক্রোকারিজের ব্যবসা করেন। কেউ চাকরি করেন। অনেকে প্রাইভেট পড়িয়েও রোজগার করেন।
পাড়ার বয়স্ক ব্যক্তিরা জানান, প্রায় দেড় শ বছর আগে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা এখানে বসতি গড়েছেন। তাঁরা মূলত মুন্সিগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ থেকে নৌপথে এখানে আসেন। শুরুতে তাঁরা তুরাগ নদে মাছ ধরে এবং তুলসী কাঠের মালা বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কেউ কেউ অবশ্য বাড়িতে গরু পালন করতেন। সে আয়ে তাঁদের তিনবেলা খাবার জুটত না। শিক্ষার ছোঁয়া থেকেও তাঁরা দূরে ছিলেন। তবে বছর ১৫ ধরে সে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। পরিবর্তনের হাওয়া খুব বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে সাত–আট বছর। এখন প্রতিটি পরিবারের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে। বিলাসিতা না থাকলেও অভাব নেই।
বাসিন্দা চন্দনা সরকারের কথায়, ‘আমরা ছিলাম হতদরিদ্র। পড়াশোনা দূরের কথা, ভাতের অভাবে কত যে কান্নাকাটি করেছি।’ এ পাড়ার নারীরা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক কাজে যুক্ত হওয়ায় তাঁদের আর্থিক পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি পাড়াবাসীর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারীদের আর্থিক কাজে অংশগ্রহণে পুরুষেরা কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেনি। তাই কাজ করতে গিয়ে বাইরে নানান কাঠখড় পোড়াতে হলেও ঘরে বেশ সহযোগিতা পান নারীরা। ঘরের কাজেও অনেক সময় সহযোগিতা করেন পুরুষেরা।
কাঠমিস্ত্রি অম্রিকা মল্লিক বলেন, ‘আমি যখন একা আয় করতাম, তখন সংসারে অভাব ছিল। প্রতি মাসেই ঋণ করে চলতে হতো। স্ত্রী আয় শুরুর পরে এখন অনেক ভালো আছি।’ তাঁর স্ত্রী মানিক্কি রানী মল্লিক বছর দশেক ধরে গরুর দুধ বিক্রি করেন।
সম্প্রতি এক দুপুরে পাড়াটি ঘুরে দেখা যায়, কোনো নারী পাঞ্জাবিতে নকশা তুলছেন। কেউ কেউ ঘরঘর শব্দ তুলে সেলাই মেশিন চালিয়ে কামিজ সেলাইয়ের কাজ করছেন। কেউ–বা দুধের কলস কাঁখে নিয়ে বের হচ্ছেন, কেউ আবার বিক্রি শেষে ঘরে ফিরছেন। আবার পাড়ার মুখে নিজের দোকানে ক্রেতার চাহিদামতো চা বানাতে ব্যস্ত মনেকা সরকার। তবে দল বেঁধে কাঁথা সেলাইয়ের দৃশ্য মুহূর্তেই গ্রামীণ পরিবেশকে মনে করিয়ে দেয়।
হিন্দুপাড়ার পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি খগেন্দ্র চন্দ্র সরকার প্রথম আলোকে বলেন, নারীরা আয় করছে। বিষয়টি কেবল এ পাড়া নয়, সমাজের জন্য ইতিবাচক। এতে পাড়ার বাসিন্দাদের জীবন মান বেড়ে গেছে। নারীদের এগিয়ে যাওয়ার এ যাত্রায় তাঁরা সব সময় পাশে থাকতে চান।

‘ভারত কিংবা কোনো পরাশক্তি পাকিস্তানকে পরাভূত করতে পারবে না’

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামাবাদের আন্তরিকতার ঘাটতি নেই তবে তিনি এও পরিষ্কার করে বলেছেন যে, মাতৃভূমি রক্ষার জন্য জীবনের শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও জনগণ সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারত কিংবা অন্য কোনো পরাশক্তি তার দেশকে পরাভূত করতে পারবে না।
তিনি বলেন, “ভারত হোক আর অন্য কোনো পরাশক্তি হোক, কেউ যদি পাকিস্তানকে বশীভূত করতে চায় তাহলে তাদের জানা উচিত যে আমরা এবং আমাদের সশস্ত্র বাহিনী শেষ পর্যন্ত লড়াই করব। এজন্য তারা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে।” সিন্ধু প্রদেশে আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। 
ইমরান খান বলেন, পাকিস্তান শান্তি চায় এবং একথা নয়াদিল্লিকে বার বার জানিয়েছে। “আমরা ভারতের পাইলটকেও তাদের কাছে হস্তান্তর করেছি কারণ আমরা যুদ্ধ চাই না। পুলওয়ামা হামলার পর আমরা ভারতকে সহযোগিতা করতে চেয়েছি। কিন্তু কারোরই এটা ভাবা ঠিক হবে না যে, ভারতকে আমরা ভয় পেয়ে এসব করেছি। এটা নতুন পাকিস্তান; আমরা দারিদ্র দূর করতে চাই।”
ইমরান খান বলেন, “আমি ক্ষমতায় আসার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বলেছি, ভারতীয় উপমহাদেশে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র মানুষের বসবাস। সে কারণে সমস্ত ইস্যু সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। কিন্তু আমি জানতাম না নরেন্দ্র মোদি নির্বাচনী প্রচারণার শুরু পর এইসব করবেন।” তিনি নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে বলেন, “আপনি যদি মনে করেন পাকিস্তানের ভেতরে রক্তপাত ঘটিয়ে আসন্ন নির্বাচনে বিজয়ী হবেন তাহলে আপনি জেনে রাখুন আমরা পাল্টা হামলা চালাব।”

অচিন্তনীয় পরিণতি ঘটতে পারে ভারত-পাকিস্তানের

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার প্রেক্ষিতে পারমাণবিক হুমকিতে বিশ্ব সম্প্রদায়। যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলোতে সতর্ক করা হয়েছে, কাশ্মির নিয়ে বিরোধ থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় শুরু হয়ে যেতে পারে পারমাণবিক যুদ্ধ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের একজন সিনিয়র সেনা কর্মকর্তা বলেছেন, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে অব্যাহতভাবে তৎপর রয়েছে সন্ত্রাসীরা। ওই সেনা কর্মকর্তা হলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের নেতৃত্বে থাকা জেনারেল জোসেফ ভোটেল। তিনি মনে করেন, এই অঞ্চলে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে লড়াই করতে হবে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। ওদিকে সিনেটর মিট রমনি মনে করেন, কাশ্মির সমস্যার সমাধান না হলে এ অঞ্চল থেকে শান্তি দূরে থাকবে। পাকিস্তানের অনলাইন ডন এ খবর দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের হাউস কমিটি অন আর্মড সার্ভিসেসে জেনারেল জোসেফ বলেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বাইরে সক্রিয় জঙ্গিরা আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতার জন্য অব্যাহত হুমকি হয়ে উঠেছে।
পাশাপাশি তারা ভারত ও পাকিস্তানের উত্তেজনায়ও ভূমিকা রাখছে। এরই মধ্যে শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশিত হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী দুই দেশ ভারত ও পাকিস্তানের চলমান সংঘাতের বিপজ্জনক পরিণতি হতে পারে।
এতে আরো বলা হয়, দুই দেশই বিপজ্জনক ভূখন্ড অতিক্রম করেছে। ভারত হামলা চালিয়েছে পাকিস্তানে। দু’পক্ষই আকাশ পথে লড়াইয়ে লিপ্ত। এর পরবর্তী কোনো সংঘাত বা এরপরের কোনো ঘটনা অচিন্তনীয় পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। 
আরো একধাপ এগিয়ে রিপোর্ট করেছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তাতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ভারত ও পাকিস্তান পারমাণবিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। অন্যদিকে আটলান্টিক ম্যাগাজিন তার এক লেখায় বলেছে, দুই দেশই তার জনগণ থেকে সত্য আড়াল করছে এবং তারা নীরবে যুদ্ধ পরিহার করার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে আনার চেষ্টায় রত, তখন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের দূত আসাদ মাজিদ খান যুক্তরাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে তার দেশের অবস্থাব ব্যাখ্যা করেছেন। সিনেটর মিট রমনিকে তিনি বলেছেন, দখলীকৃত কাশ্মিরের মানুষের আত্মমর্যাদার বৈধ অধিকার যতদিন ভারত অস্বীকার করবে ততদিন দক্ষিণ এশিয়ায় টেকসই শান্তি ও স্থিতিশীলতা আসবে না। তাই আলোচনার মাধ্যমে আঞ্চলিক এই মূল সমস্যাটি সমাধান করতে আগ্রহী পাকিস্তান।
ওদিকে কংগ্রেশনাল শুনানিতে জেনারেল জোসেফ বলেছেন, পাকিস্তানকে দেয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তামূলক সহযোগিতা স্থগিতই আছে। তবে দু’পক্ষের মধ্যে কিছু সামরিক সহযোগিতা অব্যাহত আছে। যা থেকে দু’পক্ষের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও সামরিক সহযোগিতার গুরুত্ব প্রকাশিত হয়। তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তারা অবস্থান করছে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইরানের পাশাপাশি। তাই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তান সব সময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হবে।

আইএসের সেই শামীমার শিশুটি বাঁচল না

আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএসে যোগ দেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ তরুণী শামীমা বেগমের শিশুপুত্র গতকাল শুক্রবার সিরিয়ায় মারা গেছে। মার্কিন–সমর্থিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) বরাতে আজ শনিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ২০ দিন বয়সী শিশুটি মারা গেছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শরণার্থীশিবিরে গত ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছেলের জন্ম দেন শামীমা বেগম (১৯)। ছেলেকে নিয়ে তিনি দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও ব্রিটিশ সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করে।
এর আগে শামীমা আরও দুটি সন্তানের জন্ম দিলেও অসুস্থতা ও অপুষ্টিতে ভুগে শিশু দুটি মারা গেছে।
এসডিএফের মুখপাত্র মুস্তেফা বালি এএফপিকে শিশুটির মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করলেও কীভাবে এবং কখন মারা গেছে, তা জানাননি। এর আগে টুইটার পোস্টে তিনি শিশুটির মৃত্যুর খবর অস্বীকার করেছিলেন। পরে ওই পোস্ট তিনি মুছে দেন।
শামীমা তাঁর স্কুলের দুই বন্ধু খাদিজা সুলতানা ও আমিরা আবাসের সঙ্গে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়ায় আইএসে যোগ দিতে যুক্তরাজ্য ছেড়ে যান। ওই সময় শামীমার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। সিরিয়ায় আইএসের এক সদস্য ডাচ্‌ তরুণকে বিয়ে করেন শামীমা। তাঁর স্বামী আত্মসমর্পণের পর সিরিয়া বাহিনীর কাছে এখন বন্দী। শামীমার বন্ধু খাদিজা সুলতানা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আমিরার ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানা যায়নি।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের দ্য টাইমসের সাংবাদিক অ্যান্টনি লয়েড সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় একটি শরণার্থীশিবিরে সাক্ষাৎ পান শামীমার। ওই সাংবাদিককে শামীমা বলেন, তিনি নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এখন যেকোনো দিন তাঁর সন্তানের জন্ম হতে পারে। এর আগে অপুষ্টি আর রোগে ভুগে তাঁর দুই সন্তানের মৃত্যু হয়েছে। নবাগত সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরতে চান।
শামীমার ঘটনায় ইউরোপের দেশগুলো উভয়সংকটে পড়ে। জিহাদি এবং আইএসের প্রতি সহানুভূতিশীল কাউকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা হবে, নাকি দেশে ফিরতে বাধা দেওয়া হবে, তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্তি দেখা যায় অনেকের মধ্যে।
সন্তানের জন্য যুক্তরাজ্যে ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়ে শরণার্থীশিবির থেকে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শামীমা বলেছিলেন, ‘আমি আমার এই সন্তানকে হারাতে চাই না। এটা শিশুদের বেড়ে ওঠার মতো কোনো জায়গা নয়।’ তবে ওই সাক্ষাৎকারে আইএসের হামলা নিয়ে শামীমার একটি বক্তব্যে তাঁর বিরুদ্ধে জনসমর্থন চলে যায়। তিনি বলেছিলেন, ২০১৭ সালে ম্যানচেস্টার এরেনা হামলায় ২২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তিনি ‘বেদনাহত’ হয়েছিলেন। তবে একই সঙ্গে সিরিয়ায় সামরিক হামলার তুলনা করে বলেন, ‘একজন সৈন্যকে হত্যা করা হলে ঠিক আছে, আত্মরক্ষার জন্য তা করা হয়েছে। বাঘুজে নির্বিচারে বোমা মেরে আইএসের নারী ও শিশু হত্যা করা হচ্ছে। এটি এখন দুই দিকের ব্যাপার। কারণ, আইএসেও নারী ও শিশু মারা যাচ্ছে।’ শামীমা আরও বলেন, ‘এটা একধরনের প্রতিশোধ। তাদের (আইএস) যুক্তি ছিল যে এটা প্রতিশোধ, তাই আমি ভেবেছিলাম, ঠিক আছে, এটা ন্যায্য।’
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ শামীমার নাগরিকত্ব বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা জানান।
এদিকে শামীমার সন্তানের মৃত্যুর খবরে ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ নেতা ডিয়ানে অ্যাবট। তিনি বলেন, কাউকে রাষ্ট্রহীন করা আন্তর্জাতিক আইনপরিপন্থী। একজন ব্রিটিশ নারী তাঁর নাগরিকত্ব হারিয়েছেন বলে আজ একটি নির্দোষ শিশুকে মরতে হলো।

ছাত্রী হলে অন্যরকম চিত্র by মরিয়ম চম্পা

শনিবার। দুপুর ২টা ৫০ মিনিট। রোকেয়া হলের সামনে যেতেই একদল যুবক-যুবতী নির্বাচনী প্রচারণার লিফলেট নিয়ে এগিয়ে আসে। ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে রোকেয়া হলে নির্বাচন করছেন এমনই একজন নেত্রীর পক্ষে ভোট চাইছেন তারা। গেটের সামনে, ডানে-বামে সর্বত্রই প্রার্থীদের পোস্টারের ছড়াছড়ি। হলের প্রবেশদ্বারের ভেতরে বাম পাশে কাঠের বেঞ্চে একদল তরুণ তরুণী বসে আছে। তারা প্রচারণা চালিয়ে অনেকটা ক্লান্ত। জিরিয়ে নিচ্ছে খানিকটা।
শামছুন নাহার হলেরও একই চিত্র।
হলের বাইরে পোস্টারে  সয়লাব। থেমে নেই টং দোকানে চায়ের কাপে নারী ভোটারদের ভোটের তুমুল আলোচনা। প্রথম বর্ষের একাধিক শিক্ষার্থীকে তাদের বড় আপুদের হয়ে প্রচারণায় ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। এদিকে নির্বাচনী বুথ তৈরিতে ব্যস্ত হলের কর্মচারীরা।
রোকেয়া হলের প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য সমর্থিত প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জি.এস) পদপ্রার্থী মুনিরা দিলশাদ ইলা বলেন, রোকেয়া হলে প্রায় ৪ হাজারের মতো ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে আবাসিক ভোটারের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আশা করছি হলের পরিচিত ছাত্রীদের ভোট অবশ্যই পাবো। তাছাড়া আমাদের হলে সকল দলের প্রার্থীরা তাদের মতো করে স্বাধীন ভাবেই প্রচারণা চালাচ্ছে। ৩০শে ডিসেম্বও জাতীয় নির্বাচনের পর ডাকসু নির্বাচন আসলে কেমন হবে এটা নিয়ে কিছুটা সংশয় আছে। তবে এটা সত্য জাতীয় নির্বাচন টাইপের নির্বাচন হলে যৌথভাবে অবশ্যই সেটা প্রতিহত করা হবে। তবে ভয়ের বিষয় হচ্ছে ফলাফল কি হবে।
আসন্ন নির্বাচনে জয়যুক্ত হলে সর্বপ্রথম যে কাজটি করবো সেটা হচ্ছে হলকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে হল দখল সংস্কৃতিকে বিদায় জানানো। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রথম তিন মাসের মধ্যে হলে সিটের ব্যবস্থা করা দেয়া। হলের ভেতরে একটি ফার্মাসি-অ্যাম্বুলেন্স, ওয়াইফাই সংযোগ, ডায়নিং-এর খাবারের মান উন্নয়ন। রিডিংরুমের সিট দখলমুক্ত করা। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা প্রার্থনা কক্ষের ব্যবস্থা ইত্যাদি। এ ছাড়া রুমমেট কর্তৃক শারীরিক ও মানসিক টর্চার বন্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে।
স্বতন্ত্র সহ-সভাপতি (ভিপি) মৌসুমি বলেন, আমরা সবাই চাই সুষ্ঠু একটি নির্বাচন। যেখানে স্বচ্ছতা থাকবে। বিগত জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় ডাকসু নির্বাচন নিয়েও অনেকের মনেই প্রশ্ন আদৌ কি নির্বাচন হবে।
তার পরেও আমরা যতটুকু সম্ভব হলের সব রুমে রুমে গিয়েছি। এবং তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করেছি যে রোকেয়া হল হচ্ছে একটি ঐতিহ্যবাহী হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় ভোট ব্যাংক হচ্ছে রোকেয়া হলো। কাজেই আমরা রোকেয়া হলের ছাত্রীরা এই ধরনের অনিয়ম-কারচুপি হতে দেবো না। আমরা মাঠে থেকে সেটা প্রতিরোধ করবো। আমি রোকেয়া হলে বিগত ৫ বছর ধরে খেলাধুলা অর্থাৎ ক্রীড়াঙ্গনে জড়িত। টানা দু’বছর ধরে আমি রোকেয়া হলের ক্রীড়া বিষয়ক ক্যাপ্টেন। এমন কোনো ট্রফি আসেনি আমার হাতের ছোঁয়া ছাড়া। কাজেই সাধারণের মধ্যে আমার বড় হওয়া। তাই সাধারণ ছাত্রীরা কি চায় তা আমি জানি। আমিও বেড শেয়ার করেছি। আমার মা ও গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তেমন কোনো বাড়তি সুবিধা পাইনি। তাই আমি বঞ্চিতদের জন্য কাজ করতে চাই। তিনি বলেন, যেহেতু ২৮ বছর পর নির্বাচন হচ্ছে তাই ভোটাররা চায় একটি ভালো নির্বাচন হোক।   
একই হলের প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য পরিষদের সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক তাসলিমা হোসেন নদী বলেন, নেত্রী হতে নয় বরং কোনো নেত্রীর অধীনে যেন থাকতে না হয় তাই নির্বাচন করছি। হলের নেতানেত্রীদের অত্যাচার সম্পর্কে কম বেশি ধারণা আছে। যদিও আমি হলের আবাসিক ছাত্রী নই। আমার বিরোধী নেত্রী হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের। তাই নির্বাচন নিয়ে কিছুটা সংশয় অবশ্য থেকেই যায়। আমাদের হলে শুধুমাত্র সরস্বতী পূজা ছাড়া সেভাবে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় না। তাই নির্বাচিত হলে হলের মাঠে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, বৈশাখী মেলা, বুটিক মেলা, হলে কালচারাল ক্লাব তৈরি করা হবে। অর্র্থাৎ রোকেয়া হল যেন স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং সব সময় সব কিছুর জন্য প্রস্তুত থাকি সে ব্যবস্থা করা হবে।
শামসুন নাহার হলের ছাত্রলীগের ইনডোর গেইম বিষয়ক সম্পাদক পদ প্রার্থী ফারজানা আক্তার নিপা বলেন, অনেক বছর পর নির্বাচন হচ্ছে তাই সাধারণ ভোটারদের কাছ থেকে ব্যাপক সারা পাচ্ছি। তাছাড়া কয়েকটি নিরাপত্তা বেষ্টনী পেরিয়ে ভোটাররা বুথে প্রবেশ করে ভোট প্রদান করবে। যেখানে তাদের ভয়ভীতি বা জোরজবরদস্তি করার কোনো সুযোগ নেই। কাজেই আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আমি যথেষ্ট আশাবাদী। প্রতি বছর আমাদের হলগুলোতে যে ইনডোর গেইম অনুষ্ঠিত হয় তখন আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা উন্মুখ হয়ে বসে থাকি একটি জার্সির আশায়। কিন্তু কেবলমাত্র যারা অংশগ্রহণ করে তারাই জার্সি পায়। তাই আমি নির্বাচিত হলে হলের প্রত্যেকটি মেয়ের জন্য জার্সির ব্যবস্থা করবো। টেবিল টেনিস, দাবা, লুডু ইত্যাদি খেলা বছরে ৩ থেকে ৪ বার আয়োজনের ব্যবস্থা করা হবে। যারা জিতবে তাদের জন্য ব্যতিক্রমধর্মী পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হবে।
ছাত্রলীগের প্যানেলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক সাবরিনা তাবাসসুম নিথিয়া বলেন, প্রতিদিনই আমরা নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছি। অনাবাসিকদের কাছে প্রচারণা করতে বাসে বাসে গিয়ে লিফলেট বিতরণ করেছি। আবাসিক হলের সবগুলোতে সমানভাবে প্রচারণা চালিয়েছি। প্রচারণার শেষ দিনেও হল কেন্দ্রিক প্রচারণা কিন্তু থেমে থাকেনি। ক্লাস বন্ধ থাকায় ভোটারদের সংখ্যা যদিও কিছুটা কম। আমি ছোটবেলা থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িত। তাছাড়া আমি যেহেতু এই বিভাগের শিক্ষার্থী তাই এ বিষয়ে আমার দক্ষতা অন্য প্রার্থীদের থেকে অনেক বেশি বলে মনে করছি। আমি নির্বাচিত হলে সংগীত, নৃত্যকলা, থিয়েটার এন্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ এই তিন ডিপার্টমেন্টের জন্য ‘কালচারাল অডিটরিয়াম’ বা আলাদা মিউজিক রুমের ব্যবস্থা করবো।
ছাত্রলীগের সদস্য পদ প্রার্থী মাকসুদা আক্তার তমা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সচেতন শিক্ষার্থীরা আজ শুধুমাত্র আত্মকেন্দ্রিক স্থানে নেই। তারা এখন রাষ্ট্র নিয়ে ভাবে। রাষ্ট্রের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে দেশের সাধারণ জনগণ এই বিদ্যাপীঠের দিকেই অতীতেও তাকিয়ে ছিল, এখনো আছে। আমরা তারই ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রত্যয়ে এগিয়ে যাবো।
শামছুন নাহার হলের ভোটার শামীমা সুলতানা বলেন, ছাত্রলীগের দল যেহেতু ভারি তাই তারা নিজেদের মতো করে প্রচারণা চালাচ্ছে। অন্য দলের প্রার্থীদের প্রচারণা কিছুটা কম মনে হচ্ছে। তবে আশা করছি সুষ্ঠু ভোট হবে। তবে এখনো বোঝা যাচ্ছে না কেমন নির্বাচন হবে।
উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী রুবিনা খাতুন বলেন, ভোট সুষ্ঠু হবে বলে মনে করছি। তবে সুষ্ঠু না হলে অবশ্যই প্রতিবাদ আসবে। আমরা সবাই মিলে প্রতিবাদ করবো।
ম্যাথম্যাটিকস বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়দা আইরিন আক্তার বলেন, প্রচারণা দেখে মনে হচ্ছে ভালো ভোট হবে। সব দলের প্রার্থীরাই ভোট চাইতে রুমে আসছে। তবে যারা দলে ভারি তারা প্রচারণাটা বেশি চালাচ্ছে। এ বছর যদি ভোট খারাপ হয় তাহলে সামনের বছর কেউ ভোট দিতে যাবে না।
ভাষা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী শারমিন আক্তার বলেন, আমরা ছাত্রলীগের হয়ে প্রচারণা চালাতে অন্য প্রার্থীদের কাছে যাই একইভাবে তারাও আমাদের কাছে ভোট চাইতে আসে। তাছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গায় ভোট কারচুপির কোনো সুযোগ নেই এবং আমরা সেটা করতে দেবো না।
পালি এন্ড বুদ্ধিষ্ট-এর শিক্ষার্থী শারমিন বলেন, এখানে সবাই সচেতন ভোটার। তাই ভোট জালিয়াতির কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনী উত্তাপ দেখে খুব ভালো লাগছে।
রোকেয়া হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পূর্ণ প্যানেলে প্রার্থী দিয়েছে ছাত্রলীগ। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও রোকেয়া পরিষদ স্বতন্ত্র হিসেবে আংশিক প্যানেল ঘোষণা করেছে। যার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভোট দুই ভাগ হয়ে যাবে। এখানে ১৩ পদের বিপরীতে লড়াই করবেন ৩০ জন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের ৫টি হলে  ছাত্রদলের একমাত্র ভিপি প্রার্থী দিয়েছে শামসুন্নাহার হলে। এ কারণে ছাত্রলীগের প্রার্থীকে দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এ হলে ভোটার রয়েছে ৩ হাজার ৭৬৪ জন।
বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে নির্বাচন করা প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। ছাত্রলীগের প্রার্থীর পরিচিতি কম, বিপক্ষ প্যানেলে ছাত্রলীগের সমর্থন থাকা ও সাধারণ ছাত্রদের সমর্থনের কারণে এমনটা ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ১ হাজার ৯২৮ ভোটার রয়েছে এই হলে।
শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ছাত্রলীগের ৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ছাত্রলীগের পূর্ণ প্যানেল ছাড়াও তিনজন প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন। ভিপি ও সাহিত্য সম্পাদক পদে তারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিয়েছেন। এ হলে মোট ভোটার ২ হাজার ২২৮ জন।
কবি সুফিয়া কামাল হলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ছাত্রলীগ ও স্বতন্ত্র প্যানেলের সঙ্গে। মেয়েদের হলের মধ্যে সর্বোচ্চ পাঁচজন ভিপি পদে এ হলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কবি সুফিয়া কামাল হলে ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ৭২৪ জন। এর মধ্যে আবাসিক ১৮৫৬ জন, বাকিরা অনাবাসিক।

হলে হলে ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ

by  হাফিজ মুহাম্মদ/শাহনেওয়াজ বাবলু/মোহাম্মদ ওমর ফারুকঃ
পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে আছে গোটা ক্যাম্পাস। শেষ দিনের প্রচারণায় সরগরম ছিল হলগুলোও। তবে হলে হলে দেখা যায় ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ। হল গেট, ক্যান্টিন, টিভি রুম পর্যন্ত ছাত্রলীগের ব্যানার আর পোস্টারের দখলে। আর হলের বাইরে ছাত্রদল, কোটা সংস্কার আন্দোলন, বামজোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রচারণা চালিয়েছেন নির্বিঘ্নে। শেষদিনের এমন প্রচারণায় ছাত্রলীগ ছাড়া অন্য প্রার্থীরা সংশয় আর শঙ্কায় রয়েছেন। 
সাজেন্ট জহুরুল হক হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হল: প্রচারণার শেষদিনে পুরো ক্যাম্পাস ছিল সরগরম। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বামসহ বিভিন্ন প্যানেলের প্রার্থীরা প্রচারণা চালিয়েছেন।
তবে হলগুলো ছিল ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে শুধুমাত্র প্রচারণা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। সেখানে নিজ নিজ হলের প্রার্থীরা হলের গেট, ক্যান্টিন এবং টিভি রুমে নিজেদের ব্যানার-পোস্টার টানিয়েছেন। রুমে রুমে গিয়ে বিতরণ করছেন লিফলেট। সরজমিন বিভিন্ন হল ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সব প্রার্থীর ছোট-বড় পোস্টার, ব্যানার ও দেয়াল লিখনে হলগুলো ছেয়ে গেছে। কোথাও প্যানেলসহ ব্যানার আবার কোথাও প্রার্থীর একক পোস্টার ও ব্যানার চোখে পড়ছে। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছাত্রলীগ ও শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল দুটিতে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের প্যানেল থাকলেও কোটা সংস্কার আন্দোলন, বামজোট ও অন্যান্য স্বতন্ত্র প্যানেলের পক্ষ থেকে ভিপি ও জিএস পদে কোনো প্রার্থী নেই। তবে কোটা সংস্কার আন্দোলন, বামজোট ও অন্যান্য স্বতন্ত্র প্যানেলে হল দুটিতে সদস্য পদে নির্বাচন করছেন কয়েকজন। তাদের কোনো পোস্টার-ব্যানার দেখা যায়নি।
এসএম হলের ছাত্রদল থেকে ভিপি প্রার্থী নাহিদুজ্জামান শিপন বলেন, আমি হলে মোটামুটি প্রচারণা চালিয়েছে। প্রায় প্রত্যেকটি রুমে গিয়েছি। সব শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। সবাই আমাকে ভোটের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে। আবার অনেকে ভয়ে কথা বলতে চায়নি। আমি জানি না এটা কিসের ভয়। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমি জয়লাভ করবো। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের ছাত্রলীগ মনোনীত ভিপি প্রার্থী সাইফুল্লাহ আব্বাসী অনন্ত বলেন, শেষদিন বলে আমরা সারাদিন পুরো হলে প্রচারণা চালিয়েছি। হলের প্রায় শিক্ষার্থী আমাদের প্যানেলের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। ভোটে জহুরুল হক হলের ছাত্রলীগের প্যানেল জয়যুক্ত হবে ইন্‌শাআল্লাহ।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ছাত্রলীগ মনোনীত ভিপি প্রার্থী সাইফুল্লাহ আব্বাসী অনন্ত ও জিএস প্রার্থী মো. রিফাত উদ্দিন। এই হলে ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন, জিএস প্রার্থী সৈকত ইসলাম। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী মুজাহিদ কামাল উদ্দিন, জিএস প্রার্থী জুলিয়ার সিজার তালুকদার। ছাত্রদল মনোনীত ভিপি প্রার্থী নাহিদুজ্জামান সিপন জিএস প্রার্থী আল আমিন।
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগের প্যানেলের নাম সম্মিলিত শিক্ষার্থী সংসদ। এ প্যানেলটি ডাকসুতে ২৫টি ও ১৮টি হল সংসদের প্রতিটিতে ১৩ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পেরেছে। ছাত্রদল, বামপন্থি ছাত্রসংগঠন বা কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদসহ কোনো ছাত্রসংগঠনই ডাকসু ও হল সংসদে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিতে পারেনি।
বিজয় একাত্তর হল: বিজয় একাত্তর হলের সামনের রাস্তটি ছেয়ে আছে লিফলেটে। গাছের মগডালগুলো বাঁধা পড়েছে নির্বাচনী ব্যানারের রশিতে। হলের মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল প্যানেলের ব্যানার। দেয়াল ঢেকে আছে বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ছবি সংবলিত পোস্টারে। ডাকসুর হল সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি হলে ১৩টি করে আসনের বিপরীতে বিজয় একাত্তর হলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ৩০ জন। সজিবুর রহমান সজীবকে ভিপি, নাজমুল হাসান নিশানকে জিএস ও মুহাম্মদ আবু ইউনুসকে এজিএস ঘোষণা করে এই হলে একমাত্র পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিয়েছে ছাত্রলীগ। ছাত্রদলের প্যানেল থেকে প্রার্থী তিনজন। সেখানে ভিপি পদপ্রার্থী মো. কাউসার এবং জিএস ও এজিএস পদপ্রার্থী যথাক্রমে বজলুর রহমান বিজয় ও তানজিল হাসান। প্রগতিশীল ছাত্র জোট প্যানেল থেকে লড়ছেন ১১ জন। কোটা আন্দোলনের প্যানেল থেকে শুধু ভিপি পদে লড়ছেন হাসানুল বান্না। এছাড়া স্বতন্ত্র পদপ্রার্থী আছেন দু’জন।
শনিবার প্রচারণার শেষদিনে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন প্রার্থীরা। হলের নির্বাচনী প্রচারণার হালচাল সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের ভিপি পদপ্রার্থী মো. কাউসার বলেন, প্রচারণা যথেষ্ট ভালো চলছে। কোনো ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। তবে তার আপত্তি ভোটের সময় নিয়ে। কাউসার বলেন, বিজয় একাত্তর হলে ভোটার শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন হাজার। প্রশাসন ভোটের জন্য যে সময় নির্ধারণ করেছে তাতে দুই হাজার শিক্ষার্থী ভোট দিতে সক্ষম হবে। এতে সকল শিক্ষার্থীর ভোটাধিকার প্রয়োগ করা সম্ভব না। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে ভোটের সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়ে এলেও প্রশাসন তাতে টালবাহানা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিজয় একাত্তর হলে ভোটার সংখ্যা ৩,১৫৫ জন। ভোট গ্রহণের জন্য হলে ১৮টি বুথ স্থাপনের কথা রয়েছে। প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য তিন মিনিট নির্ধারণ করা হলে ৬ ঘণ্টায় ১৮টি বুথে ভোট দিতে পারবেন ২,১৬০ জন ভোটার। দুপুর ২টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পারবে- প্রশাসন থেকে এমন কথা বলা হলেও তাতে আশ্বস্ত নন কাউসার।
ভোটের সময়ের বিষয়ে ছাত্রলীগ প্যানেলের এজিএস পদপ্রার্থী মুহাম্মদ আবু ইউনুস বলেন, তারা প্রশাসনের যেকোনো সিদ্ধান্ত মাথা পেতে নিতে প্রস্তুত। ভোটের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব প্রস্তুতি ভালোভাবেই সম্পন্ন করছি। ছাত্রলীগ সব সময় হলের শৃঙ্খলা ও ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে আসছে। আমি মনে করি হলের শিক্ষার্থীরা আমাদের সেই মর্যাদা রক্ষা করবে।’
হল সংসদে স্বতন্ত্র সাহিত্য সম্পাদক পদপ্রার্থী মো. জুবায়ের ইসলাম সানি মনে করেন, বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্রদের মধ্য থেকে যোগ্যরা নির্বাচিত হয়ে একটি সমন্বিত সংসদ গঠিত হলে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে কল্যাণকর হবে। সেখানে কোনো দলীয় প্রভাব থাকবে না। সকলের সুচিন্তিত মতের ভিত্তিতেই সব সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। দলীয় প্রভাবমুক্ত ছাত্রবান্ধব হল সংসদই প্রত্যাশা করেন সাধারণ ভোটার শিক্ষার্থীরা। হলের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শরীফ বলেন, শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করবে, এমন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত হোক, এটাই তার প্রত্যাশা। হল সংসদে সানির বিপরীতে সাহিত্য সম্পাদক পদে লড়ছেন আরো দু’জন। এছাড়া সংস্কৃতি সম্পাদক পদে দু’জন, পাঠকক্ষ সম্পাদক পদে তিনজন, সমাজসেবা সম্পাদক পদে দু’জন, সদস্য পদে আটজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যদিকে বিকল্প প্রার্থী না থাকায় এই হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে নির্বাচিত হচ্ছেন অভ্যন্তরীণ ও বহিরাঙ্গন ক্রীড়া সম্পাদক দুই প্রার্থী।
কবি জসীমউদ্‌দীন ও শহীদুল্লাহ হল: ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টারে সয়লাব পুরো হল। রাস্তাঘাট ও খেলার মাঠ, বাগান সব জায়গায় নির্বাচনী ছাপ। আমেজ ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে কেন্দ্র থেকে হল পর্যন্ত। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীদের একটু পরপর দৌড়ঝাপ। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। প্রচার-প্রচারণার শেষ মুহূর্তে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। নিজেদের পরিচয় করিয়ে দিতে শেষ সময়ে হলে আসা আগতদের হাতে হ্যান্ডবিল তুলে দিচ্ছেন। যোগ্য প্রার্থী হলে নিজ নিজ ব্যালট নম্বর উল্লেখ করে ভোট প্রদানের জন্য আহ্বান জানান। হল সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী ও ভোটারদের মাঝে রমরমা পরিবেশ। এখনো অনেক হল সংসদ প্রার্থীর পক্ষে ব্যানার, ফেস্টুন টানানো হচ্ছে। গতকাল প্রচার-প্রচারণার শেষ দিন কবি জসিমউদদীন হল ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হল ঘুরে দেখা যায় এ চিত্র। এ হল দুটিতে কেন্দ্রীয় সংসদের মতো বিভিন্ন দলীয় প্যানেল ও স্বতন্ত্র  প্যানেলে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
তবে ছাত্রলীগ মনোনীত সম্মিলিত শিক্ষার্থী সমর্থিত পূর্ণ প্যানেল অংশ নিলেও অন্য প্যানেলগুলো আংশিকভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ছাত্রলীগ প্যানেল ছাড়া অন্য প্যানেলগুলোর মধ্যে রয়েছে ছাত্রদল, কোটা সংস্কারের বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য, প্রগতিশীল ছাত্র জোট, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের বিভিন্ন পদের প্যানেল। তবে এসব প্যানেলের কোনোটিতে পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী নেই। কোনো প্যানেলে সহ-সভাপতি (ভিপি), সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদে প্রার্থী রয়েছে আবার কোনো প্যানেলে সহ-সভাপতি ও আরো কয়েকটি পদসহ সাধারণ সদস্য পদের প্যানেল রয়েছে। কবি জসীমউদদীন হলে মোট ভোটার সংখ্যা ১৬৮০। এরমধ্যে ৩০০ থেকে ৩৫০ জন ভোটার হলের বাইরে থাকেন। বাকিরা হলেই অবস্থান করছেন। ছাত্রলীগের প্যানেলে ভিপি পদে লড়ছেন মো. ফরহাদ আলী, জিএস পদে ইমাম হাসান ও এজিএস পদে সাইফুল ইসলাম। এ ছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্যানেলে এ হলে ভিপি পদে লড়ছেন মাহফুজুর রহমান খান, জিএস পদে সোহাগ হোসেন। প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্য পরিষদে ভিপি, জিএস পদে তাদের প্রার্থী না থাকলেও এজিএসসহ আরো কয়েকটি পদে তাদের প্রার্থী রয়েছে। এর বাইরে অন্যদলের প্রার্থীদের হল সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী থাকলেও তাদের ব্যানার ফেস্টুন তেমন চোখে পড়েনি।
এ হলের ছাত্রলীগ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মো. ফরহাদ আলী বলেন, আমি নির্বাচিত হতে পারলে হলের সাধারণ ছাত্রদের জন্য কাজ করবো। আমাদের হলটি ছোট। সব হলের মতো এ হলেও সিট সংকট, খাবারের মান নিম্নমানের এবং হলে গ্যারেজের কোনো ব্যবস্থা নেই। এসব বিষয়ে কাজ করবো। হলের প্রতি ফ্লোরে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করবো। এছাড়া আমাদের হলেই এক পাশে কর্মচারীরা তাদের পরিবারসহ বাস করে তাদের অন্যত্র ব্যবস্থা করে হলের শিক্ষার্থীদের জন্য ঐ সিটগুলো বরাদ্দের জন্য ভূমিকা রাখবো। এ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সায়েদুল হকও হলের খাবারের মানের কথা বলেন। যে প্রার্থী ভালো নেতৃত্ব দিতে পারবে তাকেই তিনি ভোট দিবেন। এ হলের নবীন শিক্ষার্থী মো. মেসবাহুল ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল মুজাহিদ। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এ শিক্ষার্থীদ্বয় এখন গণরুমে উঠছেন। এক রুমে ২০/২২ জন শিক্ষার্থীর যাতে এক সঙ্গে থাকতে না হয় সে বিষয়ে যারা অবদান রাখবে তাদেরকেই ভোট দিবেন বলে জানান হলের নীবন এ শিক্ষার্থীরা। এছাড়া হলের নিজস্ব একটি খেলার মাঠ চান তারা।
অন্যদিকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ হলেও ছাত্রলীগের রয়েছে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল। অন্য প্যানেলগুলোয় দুই একটি পদে লড়লেও অন্য কারো পূর্ণাঙ্গ সদস্যের প্যানেল নেই। এ হলে মোট ভোটার সংখ্যা ২০৫০। এর মধ্যে হলে অবস্থান করছেন এক হাজারের অধিক। অন্যরা বাইরেই থাকেন। ছাত্রলীগের সম্মিলিত শিক্ষার্থী পরিষদে এ হল নির্বাচনে ভিপি পদে লড়ছেন হুসাইন আহমেদ সোহান, জিএস পদে ইরফানুল হাই সৌরভ এবং এজিস পদে সোহেল আহমেদ মিলন। তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের এ হলে ভিপি পদে লড়ছেন সাইদুর রহমান রাফসান, জিএস মাহবুব আলম শাহীন এবং এজিএস মো. নূরুল আমিন নূর। ছাত্রদলের মতো অন্যান্য পরিষদেরও দুই একটি পদে প্রার্থী রয়েছে। আবার কেউ কেউ প্যানেলের বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেই লড়ছেন। তবে প্রথম তিনটি পদে স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থী দেখা যায়নি। এ হলের ছাত্রলীগ প্যানেলের ভিপি প্রার্থী হুসাইন আহমেদ সোহান বলেন, অন্যসব হলের মতো আমাদের সংকটগুলোও একই ধরনের। তবে হলে ছারপোকার তাণ্ডব থেকে শিক্ষার্থীদের রক্ষা করতে ব্যবস্থা নিবো। এ হলটি বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের হওয়ায় আমি হলের লাইব্রেরি আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখবো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাইব্রেরির বই, গবেষণাপত্র অনলাইনে বসেই যাতে শিক্ষার্থীরা পড়তে পারে।
মৈত্রী হলে ‘ঈদের পরিবেশ’: মূল ফটকে ছোট ছোট দলে দাঁড়িয়ে নারী শিক্ষার্থীরা। হাতে নির্বাচনী প্রচারপত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গত কয়েকদিনে সকাল-সন্ধ্যা এমন চিত্রই দেখা গেছে বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের সামনে। হলের ভেতরের পরিবেশ আরো বেশি উৎসবমুখর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের ভোটার শিক্ষার্থী রোকসানা আফরিন বলেন, নির্বাচনী আমেজে হলের ভেতরে যেন ‘ঈদের পরিবেশ’ বিরাজ করছে।
বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ছাত্র সংসদে ১৩ আসনের বিপরীতে মোট প্রার্থী ৩৪ জন। ভিপি ও জিএস পদে চারজন করে এবং সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে লড়ছেন দুইজন। কুয়েক মৈত্রী হলে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দিয়েছে কেবল ছাত্রলীগ। ছাত্রদল, কোটা সংস্কার ও বাম জোট থেকে কোনো প্যানেল নেই এই হলে। তবে রাজনৈতিক দলের বাইরে অপূর্ণাঙ্গ দুটি প্যানেল রয়েছে। ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে ভিপি, জিএস ও এজিএস পদপ্রার্থী যথাক্রমে রাজিয়া সুলতানা কথা, শাওলীন জাহান সেঁজুতি ও জান্নাতুল হাওয়া আঁখি।
নুরুন্নাহার পলিকে ভিপি, সাগুপ্তা বুশরা মিশমাকে জিএস ও মুন্নী আক্তারকে সহ-সাধারণ সম্পাদক করে  ‘সাধারণ শিক্ষার্থী স্বতন্ত্র পরিষদ’ নামক প্যানেল থেকে লড়ছেন সাত জন। এছাড়া সুস্মিতা দে’কে ভিপি ও আনতারা লাবীবা প্রত্যাশাকে সাধারণ সম্পাদক করে ‘সচেতন শিক্ষার্থী প্যানেল’ থেকে ১১ জন ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী আছেন তিন জন।
নির্বাচন প্রসঙ্গে রোকসানা আফরিন বলেন, মৈত্রী হল সংসদে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ছাত্রলীগ প্যানেল ও সচেতন শিক্ষার্থী প্যানেলের মধ্যে। তবে প্যানেলের তুলনায় এখানে ব্যক্তিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। রোকসানা বলেন, যারা হলের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক কাজের মধ্য দিয়ে সুপরিচিত পেয়েছেন, তারাই এগিয়ে থাকবে। এদিকে সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী প্রোভা মনে করেন, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে রাজনৈতিক দলের বাইরে সচেতন শিক্ষার্থী প্যানেল ও সাধারণ শিক্ষার্থী স্বতন্ত্র পরিষদের মধ্যে।
নিজের সম্ভাবনার বিষয়ে শিরিন সুলতানা মানবজমিনকে বলেন, হলের শিক্ষার্থীরা ব্যক্তি ও দলের স্বার্থ ত্যাগ করে যদি যোগ্যতা বিচার করে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে, তাহলে তিনিই জয় লাভ করবেন। নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে হলের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রার্থী নির্ণয় ও ভোট দেয়ার বিষয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
হল ছাত্রলীগ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী রাজিয়া সুলতানা কথা বলেন, সবাই সমান তালে প্রচার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যে কেউ নির্বাচিত হতে পারেন, তবে নিজের প্যানেলকেই এগিয়ে রাখছেন এই ছাত্রলীগ নেত্রী। নির্বাচিত হলে নিজেদের ইশতেহারের কথা তুলে ধরে তা বাস্তবায়নে কাজ করে যাবেন বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
অমর একুশে হল: ডাকসু ও হল নির্বাচন নিয়ে অমর একুশে হলেও জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের মুখে উঠে আসছে নানা দাবি। খাওয়ার মান, হলের সিট অপ্রতুলতা, সাইকেল স্ট্যান্ড, একটি মাত্র খাবারের দোকান, শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত প্রোটিন সেবা, ইন্টারনেট সেবাসহ নানান সংকট রয়েছে এই হলটিতে। এর বাইরে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়েও রয়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্রপ্রতিক্রিয়া। অন্যদিকে ছাত্রলীগ ছাড়া অন্যসব দলের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় কাজ করছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছেন নির্বাচিত যেই হোক তাকে হলের অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানা চাহিদার কথা মাথায় রাখতে হবে। একুশে হলের শহীদ রফিক ভবনের শিক্ষার্থী শান্ত বাৎশা বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ছাত্রলীগের পাশাপাশি ছাত্রদলের বড় ভাইরাও দেখছি হলের প্রতিটি কক্ষে গিয়ে তাদের প্রচারণা চালাচ্ছেন। লিফলেট দিচ্ছেন। এতে মনে হয় সব দলের মধ্যে একটি বন্ধন সৃষ্টি হচ্ছে।
একই ভবনের শিক্ষার্থী তাসনিম আল রিফাত বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠ হওয়া নিয়ে আমার সন্দেহ হয়। নির্বাচনের দিন ভোট কারচুপিও হতে পারে। যেখানে জাতীয় নির্বাচনে কারচুপি হতে পারে, সেই জায়গায় এটাতো মাত্র একটা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা।
সালাম ভবনের নাজমুল ইসলাম নাহিন বলেন, আগে রাজনৈতিক বড় ভাইদের যেমন আচরণ ছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতি। এখন আর সেটা নেই। সবাই আমাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করছে। আশা করি নির্বাচন শেষ হলেও এটা অব্যাহত থাকবে। একই ভবনের একরাম গাজী হৃদয় বলেন, নির্বাচন নিয়ে সবার মধ্যে এক ধরনের উৎসাহ কাজ করছে। আমাদের কাছে সবদলের নেতাকর্মীরা আসছেন, ভোট চাইছেন। আমাদের সমস্যার কথা জানতে চাইছেন। এটা খুব ভালো লাগছে।
তবে কোনো কোনো শিক্ষার্থী মনে করছেন ছাত্রলীগের একধরনের আধিপত্য নির্বাচনে প্রভাব পড়বে। এ কারণেই বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রার্থীদের মধ্যে একধরনের আতঙ্‌ল কাজ করছে। সরজমিন দেখা যায় একুশে হলে প্রচারণা চালাচ্ছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান। তিনি জসীমউদ্‌দীন হলে জিএস পদপ্রার্থী। কেন্দ্রীয় প্যানেলের জন্য তিনি প্রচারণা করতে এসেছেন এই হলে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত আমরা প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারছি। তবে মাঝে-মধ্যে দেখা যায় আমাদের পোস্টার ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনের দিন কী হবে জানি না। বুঝেন-ই তো। কি ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে আমরা আগাচ্ছি।
হলটিতে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করতে পারেনি ছাত্রদল। ১৩ জনের প্যানেলে তারা দিতে পেরেছে মাত্র পাঁচজনকে। এর মধ্যে ছাত্রদলের ভিপি পদে মোছাদ্দেক হোসেন সৌরভ, জিএস পদে মো. জসিম খান, এজিএস পদে সাব্বির হোসেন লড়ছেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগ থেকে ভিপি পদে তামিম মৃধা, জিএস পদে আহসান হাবীব এবং এজিএস পদে আলিফ আল আহাম্মেদ লড়ছেন। এর বাইরে স্বতন্ত্রভাবে ভিপি পদে নির্বাচন করছেন ছাত্রলীগের হলের যুগ্ম সম্পাদক মেহেদী হাসান সুমন। হলটির ১৩শ’ ৪০ জন শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করতে প্রায় ৩৮ জন প্রার্থী বিভিন্ন পদে লড়ছেন। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল এবং স্বতন্ত্র ছাড়া এই হলে অন্যকোনো দল বা সংগঠনের শিক্ষার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না। একুশে হলে ছাত্রলীগের এজিএস পদপ্রার্থী আলিফ আল আহাম্মেদ বলছেন, এখানে সবাই প্রচারণা করতে পারছেন, কেউ কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। এখন সবাই সঠিকভাবে ভোট দিলে ছাত্রলীগ জয়ী হবে এটা আমার বিশ্বাস।

রাত পোহালেই ভোট, ডাকসুতে কোন মডেল by মুনির হোসেন

রাত পোহালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। আগামীকাল সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত চলবে এ ভোটগ্রহণ। স্বাধীনতার পর ডাকসু’র এটি অষ্টম নির্বাচন। ইতিমধ্যে প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। গতকাল রাত ১২টা পর্যন্ত প্রার্থীরা শেষ সময়ের প্রচারণা সেরেছেন। বহুল প্রত্যাশিত এ নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ   করছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। হলগুলোতে সাজ সাজ রব। ব্যানার- পোস্টারে ছেয়ে গেছে পুরো ক্যাম্পাস।
চারদিকে উৎসবের আমেজ।
অন্যদিকে হল প্রশাসনও ব্যস্ত সময় পার করছে নির্বাচনী সংশ্লিষ্ট কাজে। হলগুলোতে চলছে বুথ তৈরির কাজ। গতকাল কয়েকটি হলে গিয়ে দেখা যায়, নির্ধারিত স্থানে তৈরি করা হচ্ছে নির্বাচনী বুথ। তবে এতো উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হবে কি না? ভোট দিতে পারবতো? এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। এদিকে নির্বাচনে প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট না থাকায় অভ্যন্তরীণ কারচুপির গন্ধ পাচ্ছেন অনেক প্রার্থী। যদিও প্রতিটি হলের আবাসিক শিক্ষকরা পোলিং এজেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এছাড়াও গণমাধ্যমের ওপর অতিরঞ্জিত কড়াকড়িও নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে- ডাকসুতেও কি হুদা কমিশনের মডেল হতে যাচ্ছে কি না? নাকি অন্য কোন নতুন মডেল? জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেলে জিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক গতরাতে মানবজমিনকে বলেন, ‘নির্বাচনে পোলিং এজেন্ট না রাখা নিঃসন্দেহে একটি কারচুপির লক্ষণ। যদি তারা আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূরণ করে কেন্দ্রে নিয়ে যায় তাহলে সেটি কে দেখবে।
আবার নির্বাচনে সরাসরি সম্প্রচারসহ গণমাধ্যমের উপরও ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এ বিষয়গুলো আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে শঙ্কিত করছে। আমরা বলে দিতে চাই যদি কোনো ধরনের কারচুপির চেষ্টা করা হয়, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কঠোরভাবে অতীতের মতো প্রতিহত করবে। সে সময় কিছু ঘটলে তার দায়-দায়িত্ব প্রশাসনকেই নিতে হবে।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে অবাধ সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধ পরিকর তারা। জানা গেছে, ডাকসু ও হল সংসদে মোট ভোটার ৪২ হাজার ৯২৩ জন। কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫টি ও হল সংসদে ১৩টি পদের জন্য শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। নির্বাচনে ১৩টি প্যানেল ও স্বতন্ত্র মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সংসদে ২২৯ জন এবং হল সংসদে ৫০৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ক্ষমতাসীনদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছাড়াও নির্বাচনে ছাত্রদল, বামজোট, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের প্যানেল, স্বতন্ত্র জোট, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, জাসদ ছাত্রলীগ, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীসহ ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলো প্যানেল দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা আইডি কার্ড দেখিয়ে নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। তবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও আইডি কার্ড নবায়ন না করে কেউ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না বলে শিক্ষার্থীদের আগে জানানো হয়েছিল। যদিও এমন সিদ্ধান্ত থেকে কিছুটা সরে এসেছে প্রশাসন।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘নির্বাচনের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম থাকলেই ভোট দিতে পারবে শিক্ষার্থীরা। তবে এক্ষেত্রে তাকে হলের শিক্ষার্থী হিসেবে একটি ডকুমেন্ট দেখাতে হবে।’ প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক ড. এসএম মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘ভোটারদের আবসিক হলের আইডি কার্ড নবায়ন করা কোনো বিষয় না। চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তারাই ভোট দিতে পারবে। তবে সে যে ওই হলের ছাত্র তার একটা প্রমাণ সঙ্গে রাখতে হবে। সেক্ষেত্রে পে-ইন স্লিপ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড সঙ্গে রাখাই উচিত।’ এদিকে ১৮টি হলে ৪২ হাজার ৯২৩ শিক্ষার্থীর ভোটগ্রহণের জন্য ৫১১টি বুথ তৈরি করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। হলগুলোর প্রাধ্যক্ষ ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী- সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ৩৫টি, ড. মু. শহীদুল্লাহ হলে ২০টি, ফজলুল হক মুসলিম হলে ৩৫টি, অমর একুশে হলে ২০টি, জগন্নাথ হলে ২৫টি, পল্লী কবি জসীমউদ্‌্‌দীন হলে ২০টি, মাস্টার’দা সূর্যসেন হলে ৩৫টি, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলে ৩০টি, রোকেয়া হলে ৫০টি, কবি সুফিয়া কামাল হলে ৪৫টি, শামসুন্নাহার হলে ৩৫টি, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে ২০টি, বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলে ১৯টি, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ২২টি, স্যার এএফ রহমান হলে ১৬টি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে ২৪টি, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলে ২০টি ও বিজয় একাত্তর হলে ৪০টি পোলিং বুথ তৈরি করতে কাজ করছে প্রশাসন। এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্যাম্পাস ও হলে হলে প্রার্থীরা গতকাল রাত ১২টা পর্যন্ত প্রচারণা চালিয়েছে। শেষ মুহূর্তের প্রচারণাও জমেছে বেশ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় এবং আবাসিক হলগুলোতে চলেছে বিরামহীন প্রচারণা।
থাকছে না পোলিং এজেন্ট: নির্বাচনী আচরণবিধির ১১ এর (খ) ধারায় আছে- নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রার্থী, পোলিং এজেন্ট, রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারবে না। ভোটকেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাদের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করবেন। তবে নির্বাচনে পোলিং এজেন্ট থাকছেন না বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট হলের শিক্ষকরা পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন। এ ব্যাপারে জহুরুল হক হলের চিফ রিটার্নিং অফিসার অধ্যাপক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, ভোটকেন্দ্রের বুথে পোলিং এজেন্ট রাখার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট হলের শিক্ষকরা পোলিং কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করবেন।
স্বাধীকার স্বতন্ত্র পরিষদের ইশতেহার ঘোষণা: এদিকে গতকাল দুপুরে ইশতেহার ঘোষণা করেছে ‘স্বাধীকার স্বতন্ত্র পরিষদ’। পরিষদ মনোনীত প্যানেলের জিএস প্রার্থী ও ঢাবি সাংবাদিক সমিতির সভাপতি এএমআর আসিফুর রহমান লিখিত বক্তব্যে ইশতেহার তুলে ধরেন। ইশতেহারে হল ব্যবস্থাপনা, গণরুম, গেস্টরুম, শিক্ষক নিয়োগ, সিট সংকট, খাবার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, প্রকাশনা, খেলাধুলা, ছাত্র সংগঠন, পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। ১৬ দফা ইশতেহারে রয়েছে- সমাধান-চিন্তা, কথা বলা ও কাজের স্বাধীনতা; সকল ক্যান্টিনে খাবারের কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, বাধ্যতামূলক ত্রৈমাসিক নিরীক্ষণ; অনলাইনে রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের সকল কার্যক্রম; স্থায়ী নিয়োগের আগে শিক্ষার্থীদের দ্বারা দুই বছর মূল্যায়ন; উন্নত আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ; মেয়েদের হলে সার্বক্ষণিক ডাক্তার নিশ্চিতকরণ ও ডিসপেন্সারি স্থাপন; সবগুলো ছাত্রী হল রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখা; প্রকাশনা সংস্থার নিয়মিত মনিটরিং; তদন্ত কমিটিতে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি; শিক্ষার্থী অনুপাতে হল নির্মাণ; বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য হলের মাঠ ভাড়া বন্ধ; পুলিশ ফাঁড়ি উচ্ছেদ করে অ্যাকাডেমিক ভবন/হল নির্মাণ; শিক্ষার্থী অনুপাতে হল নির্মাণ; উপরে ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মানোন্নয়ন; বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণ সরকার নয়, স্বায়ত্তশাসন পুনরুদ্ধার; আন্দোলনে ব্যানারবাজি নয়, সুস্থ ধারার রাজনীতির বিকাশ, ইত্যাদি।
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেকেই চটকদার বিভিন্ন ইশতেহার দিচ্ছে উল্লেখ করেন আসিফ বলেন, অন্যদের ইশতেহার দেখে মনে হচ্ছে, ১১ই মার্চ নির্বাচন হলে ১২ই মার্চই ২৮ বছর ধরে চলে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনিয়ম বন্ধ হয়ে যাবে। বিষয়টি তা নয়। লেখালেখিতে জড়িত থাকার ফলে আমার পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও সমস্যার গোড়ায় পৌঁছা সম্ভব হয়েছে। তাই এসব সমস্যার মূলোৎপাটনে কাজ করব, কথা দিচ্ছি শিক্ষার্থীদের।
ধাওয়া খেয়ে পালালো ছাত্র সমাজ: এদিকে ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্যাম্পাসে প্রচারণা চালাতে গিয়ে ধাওয়া খেয়েছে এরশাদের জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্র সমাজ। গতকাল দুপুরে ক্যাম্পাসের শ্যাডো এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ছাত্র সমাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ পরিষদ কর্তৃক নিষিদ্ধ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুর ১২টার দিকে ২০-২৫ জন নিয়ে শ্যাডো থেকে মিছিল নিয়ে মধুর ক্যান্টিনের দিকে যাচ্ছিল জাতীয় ছাত্র সমাজ। এ সময় তারা এরশাদের নামে স্লোগান দেয়। এ সময় মধুর ক্যান্টিনে থাকা ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ শাহরিয়ারের নেতৃত্বে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো তাদের ধাওয়া করে। ধাওয়া খেয়ে ছাত্র সমাজের নেতাকর্মীরা দৌঁড়ে পালায়। পরে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো বিক্ষোভ মিছিল বের করে। এ সময় বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি ইকবাল কবির, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জিএম জিলানী শুভ, জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি শাজাহান আলী সাজু, ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স বক্তব্য রাখেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ছাত্র সমাজের থেকে জিএস প্রার্থী মামুন ফকির বলেন, আমার প্রশ্ন তারা কেন হামলা করবে। আমরা কি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থী না। আমরা ভিসি, প্রো-ভিসি, প্রক্টরসহ সবার সঙ্গে কথা বলেই নির্বাচন করছি। তারা বলছেন কোনো সমস্যা নেই। অথচ বামরা আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আমি মনে করি এরা বাম নামে দেশের কলঙ্ক। তারা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে। তিনি বলেন, ৯০ সালে আমাদের ওপর একটা নিষেধাজ্ঞা ছিল ঠিক। কিন্তু আমার প্রশ্ন আমরা কেন আমাদের পূর্ব-পুরুষদের দায় নেবো। আমরাতো নতুন প্রজন্মই। এ বিষয়টি এখন বিবেচনা করার সময় হয়েছে।

গণফোরামের বৈঠকে সুলতানকে নিয়ে আলোচনা: তথাকথিত নির্বাচন গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেয়া সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি গণফোরাম। এ নিয়ে গতকাল সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত মতিঝিল ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে বৈঠক করেন গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্যরা। বৈঠকের একপর্যায়ে বিকালে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, সুলতান মনসুরের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে কি না সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। তবে তিনি যে কাজটি করেছেন তা মোটেও ঠিক হয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, আমি আইনের ব্যাখ্যা করবো না। কারণ আইনের ব্যাখ্যা এভাবে মিডিয়াতে করার কথাও না।
এটার জন্য কোর্টে যেতে হয়। এর পর আদালতের রায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তো আপনিও বলতে পারেন।
আমরাও সবাই বলতে পারি যে, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর এতদিন আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। এক সঙ্গে রাজনীতি করেছি। আপনাদের কাছে অনুরোধ নির্বাচনের আগে তার বক্তব্যগুলো পর্যালোচনা করে দেখেন। তিনি এই সরকার সম্পর্কে, তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কি বলেছেন। বিভিন্ন সভা সমাবেশে আমাদের চেয়ে বেশি সমালোচনা করেছেন উনি। অথচ এখন ঝট করে গিয়ে শপথ নিয়ে নিলেন। শপথ নেয়ারও একটা ভদ্রতা আছে। একটা নিয়ম নীতি আছে। উনি একটুও অপেক্ষা না করে গিয়ে শপথ নিলেন। তিনি বলেন, আজকে আমরা আলোচনা করেছি দেশে একটি পার্লামেন্ট হয়েছে। এখানে কিভাবে কার্যকর সংসদ আমরা আনতে পারি। কিভাবে দেশে কর্যকর গণতন্ত্র আমরা আনতে পারি।
কিভাবে সংবিধানের বিধানকে আমরা কার্যকরভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। এসব আলোচনার জন্য সুলতান মনসুরের ধৈর্য থাকলো না। উনি চট করে চলে গেলেন। এই ব্যাপারে আমরা দুঃখ প্রকাশ করেছি। বলেছি এটা আমরা উনার কাছ থেকে আশা করিনি। কারণ নির্বাচনের আগে উনি যেসব জায়গায় গিয়েছেন সেখানে কি ভাষায় সমালোচনা করেছেন সেটা পত্রিকা খুললে দেখতে পারবেন। যে ব্যক্তির এক দিনের মধ্যে এত পরিবর্তন হতে পারে তার সম্পর্কে আমার আর কিছু বলার থাকতে পারে না।
ড. কামাল বলেন, গণফোরামের জন্মলগ্ন থেকেই নীতি ধরে আমরা কাজ করেছি। কেউ বলতে পারবে না যে গণফোরাম দল হিসেবে নীতি-চ্যুত হয়েছে। বরং এখান থেকে কেউ কেউ চলে গেছে। তারা যদি মনে করে নীতির চেয়ে মন্ত্রিত্ব বড় তাহলে তারা হোক মন্ত্রী। যারা গেছেন তারা মন্ত্রী হয়েছেন, এমপি হয়েছেন। মানুষ সেগুলো ভুলেও গেছেন। আর যদি কুকর্ম করে থাকেন সেটা মানুষ ভুলবে না। এ সময় তিনি দলের অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য ও নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের বিষয়ে বলেন, তিনি আগামীতে শপথ নিতেও পারেন, না-ও নিতে পারেন। শপথ নেবে কি না সেটা দলীয়ভাবে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত হবে। সবাই মিলে শপথের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে তো ভালো। তবে আমরা এখনো শপথ না নেয়ার পক্ষে।
ড. কামাল বলেন, যে নীতিকে নিয়ে মানুষ ৫২-র ভাষা আন্দোলন করেছে। ৬ দফা আন্দোলন করেছে। স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে। সেই নীতির উপরেই গণফোরাম ছিল, এখনো আছে। আগামীতেও থাকব।  আর দেশকে ধ্বংসের হাত থেকে জনগণই রক্ষা করবে। তিনি বলেন, ৩০শে ডিসেম্বরের কলংকিত তথাকথিত সংসদ নির্বাচন গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে। গণতন্ত্র পুনঃরুদ্ধার, আইনের শাসন কায়েম এবং জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় ঐক্যকে সুদৃঢ় ও জোরদার করতে হবে। জনগণ বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের জন্য সচেষ্ট। এই লক্ষ্যে আমাদের কাজ করে যেতে হবে।
সিইসির বক্তব্যের বিষয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, আপনারা সিইসির বক্তব্য ধরতে পেরেছেন বলে আমাকে এখন দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। আপনারা যেভোবে বুঝেছেন আমিও সেভাবেই বুঝেছি। তিনি কায়দা করে বুঝাচ্ছেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। দেশের মানুষ কিন্তু এখন সচেতন। স্বাধীনতার ৪৮ বছর হয়েছে। আমরা আর শিশু গণতন্ত্রে নেই। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবির মাধ্যমেই কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল। মানুষ যেন এদেশের মালিক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে সেই জন্যই যুদ্ধ করেছিল। মানুষ এখনো লেগে আছে। আমাদের মাঝে এখন নতুন প্রজন্ম জন্ম নিয়েছে। সবাই মিলেই আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। আমাদের দাবি আদায় করতে হবে।
সভায় এক সিদ্ধান্তে আগামী ২৭শে এপ্রিল শনিবার গণফোরামের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সভাপতি পরিষদ সদস্যদের নেতৃত্বে কাউন্সিলের পূর্বেই জেলা সম্মেলন ও সফরসূচি সম্পন্ন করারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
ড. কামাল হোসেনের সভাপতিত্বে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- দলটির সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু, কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, প্রেসিডিয়াস সদস্য মফিজুল ইসলাম খান কামাল, মেজর জেনারেল (অব.) আমসাআ আমিন, অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক, অ্যাডভোকেট এস. এম. আলতাফ হোসেন, মোকাব্বির খান, মোশতাক আহমেদ, অ্যাডভোকেট শান্তিপদ ঘোষ, অ্যাডভোকেট তবারক হোসেইন, আ.ও.ম. শফিক উল্লাহ, ইঞ্জিনিয়ার সিরাজুল হক।